রাজধানীতে লাইনের গ্যাসের চাপ একেবারে কমে গেছে। চাপ কম থাকায় দুই চুলা একসঙ্গে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। যে এক চুলা জ্বালানো যাচ্ছে, তাতে রান্না তো দূরের কথা, দিনের বেলা পানিও ঠিকমতো গরম করা যাচ্ছে না। ফলে বাসাবাড়িতে রান্নার একমাত্র ভরসা এলপিজি সিলিন্ডার; কিন্তু তাতেও দেখা দিয়েছে তীব্র সংকট। গ্রাহক পর্যায়ে চাহিদা থাকলেও এলাকার খুচরা দোকানগুলোয় মিলছে না বাসাবাড়িতে বেশি ব্যবহৃত এ গ্যাসের সিলিন্ডার। ফলে দোকানে দোকানে ঘুরছেন গ্রাহকরা। আবার কোথাও কোথাও পাওয়া গেলেও নির্ধারিত দামের চেয়ে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। অনেককেই হোটেল থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। এই অবস্থায় নতুন বছরের শুরুতেই সাধারণ গ্রাহকদের জন্য দুঃসংবাদ নিয়ে এল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। জানুয়ারি মাসের জন্য ভোক্তাপর্যায়ে লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এবার প্রতি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৫৩ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে।
রোববার (৪ জানুয়ারি) বিইআরসি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই নতুন দাম ঘোষণা করেন বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিইআরসির সদস্য (গ্যাস) মিজানুর রহমান, সদস্য মো. আবদুর রাজ্জাক প্রমুখ।
বিইআরসি চেয়ারম্যান বলেন, আমরা যে দাম নির্ধারণ করে দিচ্ছি, ভোক্তা একদম সেই দামেই যে পণ্যটা কিনতে পারবে, সে নিশ্চয়তা আমরা দিতে পারছি না। যে কোম্পানিগুলো এলপিজি ইমপোর্ট করে থাকে, তাদের যাবতীয় খরচ হিসাব করেই আমরা দামটা নির্ধারণ করে দিই। অ্যাসোসিয়েশন আমাদের বলছে, নির্ধারিত দামেই তারা পণ্যটা সরবরাহ করছে।এছাড়া আমরা ভোক্তা অধিকারেও কথা বলেছি, যাতে তারা উচ্চমূল্য প্রতিরোধে অভিযান পরিচালনা করে। আর উচ্চমূল্যের বিষয়ে যদি কোনো কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যায়, তাহলে আমরা ব্যবস্থা নেব।
জালাল আহমেদ বলেন, পণ্যবাহী জাহাজের সমস্যাটা মূলত মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রে হচ্ছে। আমি সংশ্লিষ্ট কোম্পানিদের বলেছি, তারা যেন সিঙ্গাপুর থেকে আমদানিটা বাড়ায়। কারণ মধ্যপ্রাচ্য থেকে জাহাজের ঘাটতি আছে। এছাড়া এলসি ইস্যু নিয়েও সমস্যাটা হচ্ছে যে, কোম্পানিগুলো এলসি খুলতে পারছে, কিন্তু পণ্য আনতে পারছে না। এরপরেও যদি কেউ এলসি খোলা নিয়ে জটিলতায় পড়ে, সেক্ষেত্রে সরকারের উচ্চপর্যায় এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে।
কমিশন জানিয়েছে, রোববার (৪ জানুয়ারি) সন্ধ্যা থেকেই এই নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। এর আগে গত ডিসেম্বর মাসেও এলপিজির দাম ৩৮ টাকা বাড়িয়ে এক হাজার ২৫৩ টাকা এবং অটোগ্যাসের দাম ১.৭৪ টাকা বাড়িয়ে ৫৭.৩২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। অর্থাৎ, পর পর দুই মাস রান্নার গ্যাসের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে।
জানা যায়, গ্যাসের চাপ কম রয়েছে পুরো রাজধানী জুড়েই। কোথাও কম, কোথায় বেশি। রাজধানীর মতিঝিল, গোপীবাগ, টিকাটুলী, হাটখোলা, ওয়ারিসহ পুরান ঢাকার প্রায় সব এলাকায় গ্যাসের স্বল্প চাপ রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি সংকটের তথ্য পাওয়া গেছে, বনশ্রী, মিরপুরের কিছু এলাকা, শেওড়াপাড়া, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, বাসাবো, মুগধা, মান্ডা, মানিকনগর, বাড্ডা, বিশ্বরোপ, মৌচাক, মগবাজার, ইস্কাটন, আজিমপুর এলাকায়।
আজিমপুরের বাসিন্দা ব্যাংক কর্মকর্তা সাঈদা আনোয়ার বলেন, শুক্রবার সকাল থেকে সারাদিন গ্যাস একেবারেই ছিল না। শনিবার সকাল থেকে নিভু নিভু জ্বলছে চুলা। তবে তা রান্নার মতো না।
ভাষানটেক এলাকার বাসিন্দা নাজিম উদ্দীন বলেন, গত শুক্রবার সারাদিন গ্যাস ছিল না। সন্ধ্যার পর পাওয়া গেলেও গ্যাসের চাপ কম ছিল। আবার শনিবার সকাল থেকেও ছিল না।
কলাবাগান এলাকার মাসউদুর রহমান বলেন, গ্যাসের চাপ একেবারেই কম গত তিনদিন ধরে। যে গ্যাস চুলায় আসছে, এতে দুই চুলা একসঙ্গে জ্বালিয়ে রান্না করা মুশকিল।
গ্যাস সংকটের কথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও শেয়ার করেছেন অনেকে।
আনিসুর রহমান লিখেছেন, ‘ঢাকায় মোটামুটি সবার, সব অঞ্চলেই গ্যাস নেই।’
নাসরিন সুলতানা পিংকি লিখেছেন, ‘আমার ঘরে আছে খুব আস্তে আস্তে খিচুরি রান্না হয়েছে দেড় ঘন্টায়।’
মোরসালিন বাবলা লিখেছেন, ‘বনশ্রীতে গ্যাসের সংকট।’
অনু হকের বাসা পূর্ব তেজতুরি বাজার। তিনি লিখেছেন, ‘আমার বাসায় তো একদমই আসে না, আগে রাতে যা-ও একটু আসত, এখন সেটাও আসে না।’
রেজিনা লিনু লিখেছেন, ‘আমি পল্লবি থাকি, সকাল সাতটায় উঠে দেড় ঘন্টা ধরে গ্যাসের চুলায় চা করেছেন।
তাপসী রাবেয়া আঁখি লিখেছেন, তার বাসায় গ্যাস নেই।
অরণ্য অশ্রু নামের একজন লিখেছেন, তিনি শ্যামলী থাকেন, সারাদিন তার বাসায় গ্যাস থাকে না।
বনানী-১ নম্বর থেকে মাহমুদুল হাসান নিবিড় লিখেছেন, ‘গ্যাসের চাপ একেবারেই কম।’
হাজারিবাগ থেকে শামীম আহমেদ লিখেছেন, ‘সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত গ্যাস থাকে না, রাতে রান্না করতে হচ্ছে।’
রুদ্র নামের একজন ধানমন্ডি ১৯ থেকে লিখেছেন, গত তিন মাস ধরে তার বাসায় সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত গ্যাসের চাপ একেবারে কম থাকে।
রাব্বী সিদ্দিকী শেওড়াপাড়া থেকে লিখেছেন, তার বাসায় গ্যাসের চাপ কম।
ওয়ারি থেকে রাজিব লিখেছেন, পুরান ঢাকার প্রায় বাসাতেই নেই।
কিশোর রায় মালিবাগ থেকে লিখেছেন, তার বাসায় গ্যাস নেই বললেই চলে।
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় ‘তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন’ এর কর্মকর্তাদের সঙ্গে। প্রতিষ্ঠানটির উপমহাব্যবস্থাপক (সিস্টেম অপারেশন বিভাগ-ঢাকা-মেট্রো) মো. মনজুর আজিজ মোহন বলেন, ‘তিতাসের সকল গ্রাহকরাই সাময়িক এই ভোগান্তিতে রয়েছে। শিগগিরই সংকট কেটে যাবে। রোববার (৪ জানুয়ারি) থেকে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে।
গ্যাসের এই স্বল্প চাপ শুধু রাজধানীতেই নয়, এ পরিস্থিতি গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জেও। গত দুইদিন ধরে এ সকল এলাকায় তীব্র গ্যাস সংকট। কিছু কিছু এলাকায় চুলা জ্বলছেই না।
এ প্রসঙ্গে তিতাসের মহাব্যবস্থাপক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ও অপারেশন ডিরেক্টর আঞ্চলিক বিক্রয় ডিভিশন নারায়ণগঞ্জ প্রকৌশলী মো. সেলিম মিঞা বলেন, এলএনজি টার্মিনালের রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য গত দুই দিন ধরে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
তার নিজের বাসাতেও গ্যাস সংকট উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তিন দিনের কথা বলা হয়েছিল। সে হিসাবে ৫ জানুয়ারি আজ থেকে স্বাভাবিক হওয়ার কথা।’
তিতাস সূত্রে জানা যায়, তিতাসের বিতরণ এলাকায় ১৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রতিদিন সরবরাহ করা হয়। এলএনজি টার্মিনাল মেরামতের কারণে তা ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ কম হচ্ছে। সে কারণে কিছু এলাকায় গ্যাস সংকট তীব্র হয়েছে। আবার কিছু এলাকায় লাইনে সমস্যা থাকায় আগে থেকেই সেসব এলাকায় গ্যাসের চাপ কম, কোথাও কোথাও সরবরাহও ঠিক মতো করা যাচ্ছে না।
তিতাসের উপমহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিকুর রহমান বলেন, এমনিতেই গ্যাসের সংকট রয়েছে। শীত মৌসুমে গ্যাসের সংকট বেশি দেখা দেয়। এরমধ্যে এলএনজি টার্মিনালের কাজ চলছে, সে কারণে সরবরাহ বন্ধ। সব মিলিয়ে সরবরাহের জন্য আমাদের যে চাহিদা তার চেয়ে অনেক কম পাচ্ছি। যে কারণে আবাসিকে বেশি চাপ দেখা দিয়েছে।’
কবে নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এলএনজি সরবরাহ শুরু করলে হয়তো গ্যাসের চাপ বাড়বে। তার জন্যও আরো কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।’
এদিকে, জানুয়ারি মাসের জন্য অটোগ্যাসের দামও বাড়ানো হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি লিটার অটোগ্যাসের দাম ৫৭ টাকা ৩২ পয়সা থেকে ২ টাকা ৪৮ পয়সা বাড়িয়ে ৫৯ টাকা ৮০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই দামও রোববার সন্ধ্যা ৬টা থেকে কার্যকর হয়েছে।
এলপিজির দাম বাড়ায় বাসাবাড়িতে রান্নার খরচ যেমন বাড়বে, তেমনি অটোগ্যাস ব্যবহারকারী যানবাহনের পরিচালন ব্যয়ও কিছুটা বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
২০২১ সালের এপ্রিল থেকে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে বিইআরসি। এলপিজি তৈরির মূল উপাদান প্রোপেন ও বিউটেন বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়।
প্রতি মাসে এলপিজির এই দুই উপাদানের মূল্য প্রকাশ করে সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান আরামকো। এটি সৌদি কার্গো মূল্য (সিপি) নামে পরিচিত। এই সৌদি সিপিকে ভিত্তিমূল্য ধরে দেশে এলপিজির দাম সমন্বয় করে বিইআরসি। আমদানিকারক কোম্পানির চালান (ইনভয়েস) মূল্য থেকে গড় করে পুরো মাসের জন্য ডলারের দাম হিসাব করে বিইআরসি।