জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় পুলিশের সাবেক সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন ও সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এছাড়া, তিনজন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, তাজহাট থানার সাবেক অফিসার ইনচার্জ রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন ও বেরোবির সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধব।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) নবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-২ রায় ঘোষণা করেছেন।
বিচারের এ রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আবু সাঈদের পরিবারের সদস্যরা।
এদিকে, রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আসামিপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দোলন দাবি করেছেন, মামলার উপস্থাপিত প্রমাণে গুলির অস্তিত্ব নিশ্চিত করা যায়নি।
মামলায় অভিযুক্ত বাকি ২৫ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে সাতজন আসামিকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাবেক উপাচার্য ড. হাসিবুর রশিদ ওরফে বাচ্চু, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক পুলিশ কমিশনার মনিরুজ্জামান ওরফে বেল্টু, বেরোবির গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, লোক প্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মন্ডল ওরফে আসাদ, সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, সহকারী রেজিস্ট্রার হাফিজুর রহমান ওরফে তুফান, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বেরোবি শাখার সভাপতি পোমেল বড়ুয়া।
এছাড়া, আরও ৮ আসামিকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন আরপিএমপির সাবেক উপপুলিশ কমিশনার আবু মারুফ হোসেন ওরফে টিটু, সাবেক অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারী ওরফে সুমন, বেরোবির সাবেক প্রক্টর শরীফুল ইসলাম, ছাত্রলীগের রংপুর শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ ওরফে দিশা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হাসান ওরফে মাসুদ, বেরোবির অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মাহাবুবার রহমান ওরফে বাবু, রংপুর স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি ডা. সারোয়াত হোসেন ওরফে চন্দন ও এমএলএসএস একেএম আমির হোসেন ওরফে আমু।
গতকাল দুপুর সোয়া ১২টার দিকে মামলার সংক্ষিপ্ত রায় পড়া শুরু হয়। তার আগে গ্রেপ্তার ছয় আসামিকে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় তোলা হয়। তারা হলেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের চুক্তিভিত্তিক সাবেক কর্মচারী মো. আনোয়ার পারভেজ, পুলিশের সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন, সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায় ও নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা ইমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ।
রায় পড়ার প্রাক্কালে ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী মন্তব্য করেছেন, ‘যে পুলিশ সদস্যদের সামনে আবু সাঈদ বুক পেতে দাঁড়িয়েছিলেন, তারা সেদিন অমানুষে পরিণত হয়েছিল।’
তিনি বলেন, ‘আবু সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে অকুতোভয় চিত্তে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন তার সামনে যারা দাঁড়িয়ে আছে তারা মানুষ, তাই তার কোনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু তিনি তখন বুঝতে পারেননি যে, সেই মানুষগুলো অমানুষ হয়ে গেছে।’
মামলায় পলাতক থাকা আসামিরা হলেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিসি ড. হাসিবুর রশিদ ওরফে বাচ্চু, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক পুলিশ কমিশনার মনিরুজ্জামান ওরফে বেল্টু, সাবেক উপপুলিশ কমিশনার আবু মারুফ হোসেন ওরফে টিটু, সাবেক অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারী ওরফে সুমন, সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, তাজহাট থানার সাবেক অফিসার ইনচার্জ রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন, এসআই বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধব, বেরোবির গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, বেরোবির লোক প্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডল ওরফে আসাদ, বেরোবির সহকারী রেজিস্ট্রার হাফিজুর রহমান ওরফে তুফান ও বেরোবির সেকশন অফিসার মনিরুজ্জামান পলাশ।
শহীদ আবু সাঈদ হত্যার সঙ্গে জড়িতদের বিচারের রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আবু সাঈদের পরিবারের সদস্যরা। গতকাল বৃহস্পতিবার মামলার রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় শহীদ আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন বলেন, আবু সাঈদ হত্যার নির্দেশদাতা বড় বড় পুলিশের কর্মকর্তারাই বেঁচে গেছেন। সব আসামির ফাঁসি দাবি করে তিনি বলেন, আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
আবু সাঈদের মা মনোয়ারা বেগম বলেন, ছেলের হত্যাকাণ্ডে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে রায় হয়েছে। কিন্তু আমি তখনই শান্তি পাবো যখন এ রায় কার্যকর হবে।
প্রসঙ্গত, এই মামলায় বেরোবির তৎকালীন ভিসি হাসিবুর রশীদসহ ৩০ জন আসামির বিরুদ্ধে গত বছরের ৩০ জুন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে গত ২৭ জানুয়ারি মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখা হয়েছিল। এরপর গত ৫ মার্চ রায়ের দিন ধার্য করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল।
প্রসিকিউটর এস এম ময়নুল করিম জানান, এ মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে মোট ২৫ জনের জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে প্রত্যক্ষদর্শী, বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিক, চিকিৎসক এবং পুলিশ সদস্য রয়েছেন।
আবু সাঈদের সঙ্গে গুলিবিদ্ধ হওয়া ব্যক্তিরা এবং পটভূমির সাক্ষী হিসেবে বর্তমান সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ আদালতে সাক্ষ্য দেন। এছাড়া, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ভিডিও ও টেলিভিশনের লাইভ সম্প্রচারের ভিডিও প্রমাণ হিসেবে দাখিল করা হয়।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই দুপুরে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পার্ক মোড়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ও আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবু সাঈদ। দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের সামনে বুক পেতে দেওয়া সাঈদের সেই ভিডিওটি দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং একপর্যায়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ দেয়।
আবু সাঈদের মরদেহে গুলির অস্তিত্ব প্রমাণ হয়নি: আসামিপক্ষের আইনজীবী
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের মামলায় ট্রাইব্যুনাল দুই পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড এবং তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। এছাড়া এক আসামিকে খালাস দেওয়ার পাশাপাশি অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আসামিপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দোলন দাবি করেছেন, মামলার উপস্থাপিত প্রমাণে গুলির অস্তিত্ব নিশ্চিত করা যায়নি।
তিনি বলেন, আবু সাঈদের জব্দকৃত গেঞ্জিতে কোনো গুলির চিহ্ন ছিল না, অর্থাৎ কোনো ছিদ্র পাওয়া যায়নি। তার ডেথবডিতেও (মরদেহ) কোনো ধরনের গর্ত বা ক্ষতের চিহ্ন ছিল না। এমনকি দেহে এক্স-রে বা অন্য কোনো পরীক্ষাও করা হয়নি। ফলে গুলির অস্তিত্ব প্রমাণ হয়নি।
তিনি আরও বলেন, প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে ১২ বোর শর্টগানের কার্টিজ ব্যবহার করে গুলি করার অভিযোগ আনা হলেও সেই কার্টিজ জব্দ করা হয়নি। এ বিষয়ে তারা আদালতে একাধিক পয়েন্টে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছেন।
আইনজীবী দোলন জানান, আসামিপক্ষের পক্ষে ২০টিরও বেশি পয়েন্টে লিখিত যুক্তি আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে ট্রাইব্যুনালের রায়ে প্রত্যাশিতভাবে খালাস না পাওয়ায় তারা পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি হাতে পাওয়ার পর তা বিশ্লেষণ করে আপিল বিভাগে আপিল করবেন বলে জানিয়েছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আপিল শুনানির মাধ্যমে আসামিরা ন্যায়বিচার পাবেন।