অন্তর্বর্তী সরকারকে অবৈধভাবে পাহাড় দখলকারীদের তালিকা প্রকাশ করার আহ্বান জানিয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।
আজ শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) আয়োজিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে গণতান্ত্রিক শাসন কায়েম এবং জনগণের অধিকার, মর্যাদা ও ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ আহ্বান জানান।
আনু মুহাম্মদ বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানে সরকার পূর্ণ ক্ষমতা না রাখলেও অনেক কিছুই করতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো পাহাড়গুলো কাদের দখলে রয়েছে সেগুলো প্রকাশ করা।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামরিক ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠী পাহাড় দখল করে রেখেছে এবং এ বিষয়ে কোনো জবাবদিহিতা নেই। পাহাড়ের উন্নয়নে স্বচ্ছ জবাবদিহির প্রয়োজন এবং এ জন্য একটি শ্বেতপত্র কমিটি গঠন করতে হবে।
আনু মুহাম্মদ আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে হলে সরকারের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা থাকতে হবে।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, পাহাড়ের সমস্যা রাজনৈতিক সংকট, যা সামরিকীকরণের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়।
জাতীয়তাবাদী মুক্তি কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফয়জুল হাকিম লালা উল্লেখ করেন, বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে হবে, তা ছাড়া পার্বত্য অঞ্চলের সমস্যার সমাধান হবে না।
গোলটেবিল বৈঠকে ইউপিডিএফ তাদের সাত দফা প্রস্তাবনায় পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনান প্রত্যাহার, ভূমি সমস্যা সমাধান ও পাহাড়িদের জন্য কোটা পুনর্বহালের দাবি তুলে ধরেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ অবাধ, নিরপেক্ষ এবং উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন করতে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী দেশব্যাপী সুপরিকল্পিত ও প্রযুক্তিনির্ভর সদস্য মোতায়েন সম্পন্ন করেছে।
বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বাহিনীটি জানায় যে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট–২০২৬ আয়োজনের আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি। জাতির এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর নির্বাচন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী সারাদেশে সুপরিকল্পিত, প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বচ্ছ পদ্ধতিতে সদস্য মোতায়েন সম্পন্ন করেছে। নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট অনিয়ম, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে বাহিনী ধারাবাহিক ও কাঠামোগত সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে; বিশেষত দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও প্রথাগত দুর্বলতাগুলো দূর করে একটি জবাবদিহিতামূলক ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে গৃহীত প্রশাসনিক সংস্কার, প্রশিক্ষণ কাঠামোর আধুনিকায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার বাস্তব প্রয়োগের ফলেই সম্প্রতি বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট অনিয়ম দ্রুত শনাক্ত ও প্রতিরোধ সম্ভব হয়েছে। অতীতে বিশেষ করে ভিডিপি/টিডিপি দলনেতা ও দলনেত্রীদের নির্বাচনী দায়িত্ব প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অর্থ আত্মসাতের যে অনভিপ্রেত প্রথা বিদ্যমান ছিল, বর্তমান ডিজিটাল ডাটাবেজভিত্তিক ও স্বয়ংক্রিয় যাচাই পদ্ধতির মাধ্যমে সেই অপসংস্কৃতির কার্যকর অবসান ঘটানো সম্ভব হয়েছে। এবার প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ ডিজিটাল ডাটাবেজভিত্তিক পদ্ধতিতে ভোটকেন্দ্রে সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। কেন্দ্রভিত্তিক ডিজিটাল তালিকা প্রণয়ন, স্বয়ংক্রিয় যাচাই-বাছাই এবং কেবলমাত্র প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্য নির্বাচন—পুরো প্রক্রিয়াটি কঠোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মানদণ্ডে সম্পন্ন হয়েছে। কোনো প্রকার প্রভাব, সুপারিশ বা আর্থিক লেনদেনের সুযোগ রাখা হয়নি।
চট্টগ্রামের কোতোয়ালী থানায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ১৩ জন সদস্যের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত ডেটা যাচাই ও ডিজিটাল রেকর্ড বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাদের প্রশিক্ষণবিহীন থাকার বিষয়টি প্রাথমিকভাবে শনাক্ত হয়। AVMIS সফটওয়্যারের তথ্যভিত্তিক যাচাইয়ের ফলাফল হিসেবে তাদের তাৎক্ষণিকভাবে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়। এ ঘটনা বাহিনীর পূর্বপ্রস্তুত তদারকি ও প্রযুক্তিনির্ভর যাচাই ব্যবস্থার কার্যকারিতার একটি বাস্তব দৃষ্টান্ত।
রাজধানীর গুলশান থানাধীন ১৯ নম্বর ওয়ার্ড এবং ভাটারা থানাধীন ৪০ নম্বর ওয়ার্ডে দায়িত্বপ্রাপ্ত দুইজন দলনেত্রীর বিষয়ে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা যাচাই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গোয়েন্দা তথ্য ও প্রশাসনিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া যায়। পূর্বনির্ধারিত নীতিমালার আলোকে উভয়কেই তাৎক্ষণিকভাবে নির্বাচনী দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে—যা বাহিনীর ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির বাস্তব প্রয়োগের সুস্পষ্ট প্রতিফলন।
সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় ভিডিপি সদস্য পরিচয়ে নির্বাচনী ডিউটির প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ গ্রহণের অভিযোগটি স্থানীয় পর্যায়ের পর্যবেক্ষণ ও অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত শনাক্ত হয়। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে নজরে আসার পর তদন্ত শুরু হয়েছে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শনাক্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ৩৬টি ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত সকল সদস্যকে পূর্বেই বহুমাত্রিক যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে নির্বাচন করা হয়েছে, ফলে অনিয়মটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতারণা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলায় আনসার সদস্য পরিচয়ে প্রতারণার ঘটনাটিও ডিজিটাল পরিচয় যাচাই ব্যবস্থার ফলেই দ্রুত উদ্ঘাটিত হয় এবং তদন্তে নিশ্চিত হওয়া যায় যে তিনি বাহিনীর কোনো সদস্য নন।
উল্লেখ্য, এসব ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্বলতার প্রতিফলন নয়; বরং প্রশিক্ষণ নীতিমালার সংস্কার, প্রযুক্তিনির্ভর যাচাই ব্যবস্থা এবং কঠোর তদারকির প্রত্যক্ষ ফলাফল। AVMIS সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রকৃত সনদধারীদের শনাক্তকরণ, কিউআর কোডসংযুক্ত পরিচয়পত্রের প্রবর্তন এবং STDMS সফটওয়্যারের মাধ্যমে নির্বাচনী ভাতা ও আনুষঙ্গিক সুবিধা সরাসরি বিতরণের ব্যবস্থা নেয়ার ফলে ভুয়া পরিচয়, দায়িত্ব প্রদানের নামে অর্থ আত্মসাৎ কিংবা প্রভাব বিস্তারের সুযোগ কার্যত রুদ্ধ হয়েছে। মূল ডিউটি শুরুর আগেই খাবার বাবদ অর্থ প্রদান সদস্যদের পেশাগত স্বচ্ছতা ও নৈতিক দৃঢ়তা আরও সুসংহত করেছে।
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে—স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, ধারাবাহিক সংস্কার এবং প্রযুক্তির কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমেই একটি নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করা সম্ভব। নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের অনিয়ম দূরীকরণ ও ডিজিটাল স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার এই পদক্ষেপ কেবল তাৎক্ষণিক নির্বাচনী পরিবেশকে সুরক্ষিত করবে না; বরং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা, সুশাসন এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর প্রতি জনআস্থা পুনর্গঠনে তা কাঠামোগত ভূমিকা রাখবে। এই পদক্ষেপগুলো ভবিষ্যতে একটি টেকসই ও দুর্নীতিমুক্ত নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার মানদণ্ড হিসেবে কাজ করবে বলে বাহিনী আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।
সৈয়দপুর বিমানবন্দরে ৭৪ লাখ টাকাসহ ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমির বেলাল উদ্দিন প্রধানের আটকের ঘটনায় পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট আটককারী সংস্থাগুলোই নির্ধারণ করবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।
বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান। আটককৃত নেতার বিষয়ে কমিশনের অবস্থান স্পষ্ট করে তিনি বলেন, “যারা আটক করেছে, তারা এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দেবেন। আপনারা (সাংবাদিক) যদি আমার কাছে আইনি ব্যাখ্যা চান, তাহলে তো এটা আমার প্রতি অবিচার করা হচ্ছে।” ভোটের মাত্র ১৩ ঘণ্টা বাকি থাকা অবস্থায় সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “দয়া করে এই অপতথ্য সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসেন। আমাকে মিসকোট করার আগে যাচাই-বাছাই করে নেবেন। নির্বাচনের আর ১৩ ঘণ্টা বাকি, একটা ভালো দিকে আমরা এগোচ্ছি। সবাই সচেষ্ট থাকি, যেন নির্বাচন সুন্দরভাবে আয়োজন করতে পারি।”
নির্বাচনী সময়ে টাকা বহনের সীমা নিয়ে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া একটি বিভ্রান্তিকর তথ্যের কড়া সমালোচনা করে ইসি সচিব দাবি করেন যে, তাঁকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ৫ কোটি টাকা বহন সংক্রান্ত ভাইরাল হওয়া খবরটি মিথ্যা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমি নাকি বলেছি, ৫ কোটি টাকা নিয়ে গেলেও কোনো অসুবিধা নেই, এটা বলার এখতিয়ার, অধিকার, ক্ষমতা আমার নেই। এটা বলিনি। এটা আমাকে মিসকোট করা হয়েছে। আমার জন্য অত্যন্ত অপমানজনক এবং আমি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ।” তিনি গণমাধ্যমকে যেকোনো তথ্য প্রচারের ক্ষেত্রে সত্যতা যাচাইয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা বা নাশকতার চেষ্টা করা হলে সর্বোচ্চ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন র্যাব মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান। বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ সংলগ্ন রাজধানী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান যে, নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর তা মেনে না নিয়ে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্টদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “যারা ভোটকেন্দ্রে নাশকতার চেষ্টা করবে, জালভোট, ব্যালট বক্স ছিনতাই বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে ঝুঁকি তাদেরই।” তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, “আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো ঝুঁকি নেই, কারণ তারা আইন অনুযায়ী কাজ করবেন। আমরা কোনো ধরনের হেজিটেশন করবো না। ঝুঁকি যদি কারও থাকে, তা আইন ভঙ্গকারীদেরই।” নির্বাচনী পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে তিনি আরও বলেন, “এবার নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কোন ঝুঁকি নেই। তবে নির্বাচনে যারা বিশৃংখলার চেষ্টা করবে, যারা আইন অমান্য করবে, ভোট চুরি, ব্যালট ছিনতাইয়ের চেষ্টা করবে তারা এবার ঝুঁকিতে পড়বেন। আমরা এবার শক্ত অবস্থানে আছি। আমরা প্রতিটি বাহিনী সমন্বয়ের সঙ্গে কাজ করছি। আশা করছি দেশবাসীকে আমরা একটা সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে পারব।”
র্যাব মহাপরিচালক জানান যে, নির্বাচনী তফশিল ঘোষণার আগে থেকেই অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের দমনে তারা জোরালো অভিযান পরিচালনা করে আসছেন এবং এরই মধ্যে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন। নির্বাচনকে তিনটি স্তরে ভাগ করে নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে যার প্রথম ধাপ তথা নির্বাচন-পূর্ব সময়টি অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এখন ভোটের দিন এবং ভোট-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে র্যাব স্ট্রাইকিং ও মোবাইল ফোর্স হিসেবে ৬৪টি জেলাতেই সক্রিয় থাকবে। সেনাবাহিনীর পাশাপাশি নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সাথে সমন্বিতভাবে র্যাব দায়িত্ব পালন করবে এবং প্রতিটি রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা হবে। গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা ও পুলিশের প্রায় ২৫ হাজার ৭০০ বডি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হবে এবং আকাশপথে ড্রোন ও হেলিকপ্টারের পাশাপাশি ডগ স্কোয়াড ও বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটও সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকবে। বহিরাগতদের উপস্থিতি ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে সতর্ক নজরদারির পাশাপাশি অবৈধ অর্থ লেনদেনের অপচেষ্টা কঠোরভাবে দমনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তিনি জানান যে, বর্তমানে জঙ্গি হামলার কোনো সুনির্দিষ্ট হুমকি না থাকলেও যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের সর্বাত্মক প্রস্তুতি রয়েছে।
সিরাজগঞ্জ-২ (সিরাজগঞ্জ-কামারখন্দ) আসনের কামারখন্দ উপজেলায় ভোট কেনার উদ্দেশ্যে টাকা বিলি করার সময় স্থানীয় জনতার ধাওয়া খেয়ে এক জামায়াত নেতার দৌড়ে পালানোর ঘটনা ঘটেছে। বুধবার সকালে উপজেলার ঝাঐল ইউনিয়নের ময়নাকান্দি গ্রামে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটে। অভিযুক্ত ওই নেতার নাম মোস্তাক সরকার, যিনি কামারখন্দ উপজেলার ঝাঐল ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতে ইসলামীর আমিরের দায়িত্বে রয়েছেন। ঘটনার একটি ভিডিও ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যা নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওতে দেখা যায়, জামায়াত নেতা মোস্তাক সরকার গ্রামের এক ব্যক্তির হাতে নগদ টাকা তুলে দিচ্ছেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই স্থানীয় কয়েকজন যুবক সেখানে উপস্থিত হয়ে মোবাইলে ভিডিও ধারণ শুরু করেন এবং তাঁকে টাকার উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। ক্যামেরার সামনে ধরা পড়ে যাওয়ায় এবং পরিস্থিতি বেগতিক দেখে মোস্তাক সরকার কোনো উত্তর না দিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে দৌড়ে পালাতে শুরু করেন। এ সময় উপস্থিত জনতাও তাঁকে ধরার জন্য পিছু ধাওয়া করে। দীর্ঘ সময় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার পর শেষ পর্যন্ত ওই জামায়াত নেতা এলাকা ছেড়ে আত্মগোপন করতে সক্ষম হন। নির্বাচনের ঠিক আগের দিন এমন প্রকাশ্য অর্থ বিতরণের ঘটনায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও গুঞ্জন তৈরি হয়েছে।
এই ঘটনার বিষয়ে সিরাজগঞ্জ-২ আসনের জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলামের প্রধান নির্বাচনি এজেন্ট ও জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি শহিদুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। তিনি দাবি করেন, নির্বাচনের আগে প্রতিটি কেন্দ্রের নির্বাচনি খরচ এবং কর্মীদের নাস্তার জন্য কিছু টাকা বরাদ্দ থাকে। মোস্তাক সরকারের কাছে থাকা অর্থটি হয়তো সেই কেন্দ্র খরচের টাকা ছিল। তবে জনসমাগম দেখে এবং ভিডিও করতে আসায় হয়তো ভয় পেয়ে তিনি সেখান থেকে দৌড়ে পালিয়েছেন। এটি কোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ড ছিল না বলে তিনি দাবি করেন।
অন্যদিকে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন সিরাজগঞ্জ-২ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর প্রধান নির্বাচনি এজেন্ট ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চু। তিনি বলেন, টাকা দিয়ে ভোট কিনতে গিয়ে জামায়াত নেতার প্রাণভয়ে দৌড়ে পালানোর দৃশ্যটি অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। তিনি অভিযোগ করেন যে, শুধু কামারখন্দেই নয়, জেলার বিভিন্ন স্থানে জামায়াত চক্র একইভাবে ভোটারদের অর্থ দিয়ে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এ ছাড়া তাঁরা সাধারণ ভোটারদের ভয়ভীতি দেখিয়ে কেন্দ্রে যেতে বাধা দিচ্ছে বলেও তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তিনি অবিলম্বে এই ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে প্রশাসনের কাছে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
নির্বাচনি এলাকার এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে স্থানীয় ভোটাররা অবাধ ও নিরপেক্ষ পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচনি এলাকায় যেকোনো ধরণের অনৈতিক অর্থ লেনদেন বা ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা কঠোর হাতে দমন করা হবে। বর্তমানে ওই এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং যেকোনো ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশ ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে নির্বাচনি আচরণবিধি মেনে চলার জন্য পুনরায় সতর্ক করা হয়েছে।
নীলফামারীর সৈয়দপুর বিমানবন্দরে ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা বেলাল উদ্দিন প্রধানের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া অর্থের পরিমাণ গণনা শেষে ৭৪ লাখ টাকা বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ। বুধবার দুপুরে তাঁকে আটকের সময় প্রাথমিকভাবে ৫০ লাখ টাকা উদ্ধারের কথা জানানো হলেও বিকেলে চূড়ান্ত গণনা শেষে টাকার সঠিক অংক প্রকাশ করা হয়। নির্বাচনের ঠিক আগের দিন বিপুল পরিমাণ এই নগদ অর্থ বহনের ঘটনাটি কেন্দ্র করে বর্তমানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও বাদানুবাদ শুরু হয়েছে।
সৈয়দপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রেজাউল করিম রেজা আজ বিকেলে গণমাধ্যমকে জানান, বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থসহ ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমিরকে আটক করা হয়েছে এবং গণনা শেষে সেখানে মোট ৭৪ লাখ টাকা পাওয়া গেছে। তবে অভ্যন্তরীণ রুটে বিমানে ভ্রমণের সময় নগদ অর্থ বহনের আইনি বাধ্যবাধকতা নিয়ে ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন রাগিব সামাদ। তিনি জানান, দেশের অভ্যন্তরীণ রুটে আকাশপথে যাতায়াতের ক্ষেত্রে যেকোনো পরিমাণ নগদ অর্থ বহনে কোনো আইনি সীমাবদ্ধতা নেই। সৈয়দপুরে আটক জামায়াত নেতার সঙ্গে থাকা অর্থের বিষয়ে তিনি ঢাকা থেকে রওনা হওয়ার আগে শাহজালাল বিমানবন্দর কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছিলেন এবং প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে কর্তৃপক্ষ তাঁকে ‘অনাপত্তিপত্র’ প্রদান করেছিল।
এদিকে, ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমিরের এই আটকের ঘটনাকে ‘পরিকল্পিত নাটক’ এবং ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এক বিবৃতিতে দাবি করেন, মাওলানা বেলাল উদ্দিন প্রধান তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবসার টাকা বহন করছিলেন এবং তাঁর কাছে ঢাকার বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দেওয়া বৈধ অনাপত্তিপত্র ছিল। তিনি অভিযোগ করেন, বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও তাঁকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে। টাকার সঠিক উৎস সম্পর্কে যথা সময়ে যাবতীয় প্রমাণসহ বিস্তারিত তথ্য জাতির সামনে তুলে ধরা হবে বলেও তিনি জানান।
বর্তমানে মাওলানা বেলাল উদ্দিন প্রধান সৈয়দপুর থানা পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, নির্বাচনি পরিস্থিতির সংবেদনশীলতা এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে অধিকতর নিশ্চিত হতে তারা তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, বিমানবন্দরের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে নগদ অর্থ বহনে কোনো আইনি বাধা নেই বলে জানানোর ফলে এই আটকের বিষয়টি এখন আইনি ও প্রশাসনিক তর্কের জন্ম দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, উদ্ধারকৃত অর্থের বৈধতা এবং নির্বাচনি আচরণবিধির কোনো লঙ্ঘন হয়েছে কি না, তা পর্যালোচনার পরেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সব বাধা কাটিয়ে নির্বাচনের আগের এই ঘটনাটি স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে টানটান উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও দেশব্যাপী গণভোটকে কেন্দ্র করে কোনো প্রকার অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.)। বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ও পুলিশ সদর দপ্তর পরিদর্শনকালে তিনি বলেন, যদি কোনো কেন্দ্রে ব্যালট বাক্স ছিনতাই, জাল ভোট প্রদান কিংবা অন্য কোনো নির্বাচনি অপরাধ সংঘটিত হয়, তবে শুধুমাত্র জড়িত ব্যক্তিরাই নয়, বরং ওই কেন্দ্রের নিরাপত্তায় নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ভোটকেন্দ্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে তিনি এই মুহূর্তে প্রশাসনের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বুধবার সকালে পুলিশ সদর দপ্তরের অপারেশন কন্ট্রোল রুম পরিদর্শনকালে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সারাদেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন। নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ পুলিশের নেওয়া আধুনিক বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং কৌশল সম্পর্কে তাকে বিস্তারিত অবহিত করা হয়। বিশেষ করে মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের বডি-ওয়ার্ন ক্যামেরার কার্যক্রম তিনি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেন। এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে নির্বাচনি ডিউটিতে থাকা কর্মকর্তাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। পরিদর্শনকালে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলমসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপদেষ্টাকে নিরাপত্তা পরিকল্পনার বিভিন্ন কারিগরি দিক বুঝিয়ে দেন।
এরপর স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা রাজধানীর নিউমার্কেট এবং মোহাম্মদপুর থানা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। সেখানে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের শৈথিল্য না দেখানোর নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে পুলিশ বাহিনীকে তাদের সততা, পেশাদারিত্ব এবং দেশপ্রেমের মাধ্যমে জনগণের আস্থা জয় করতে হবে। ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে যাতায়াত করতে পারেন এবং কোনো ধরনের ভয়ভীতির মুখে না পড়েন, সেটি নিশ্চিত করাই পুলিশের প্রধান কাজ। যেকোনো উসকানিমূলক পরিস্থিতি মোকাবিলায় শান্ত থেকে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তিনি পুলিশ সদস্যদের পরামর্শ দেন।
বিকেলের দিকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা রাজধানীর টিচার্স ট্রেনিং কলেজ কেন্দ্র পরিদর্শন করেন, যেখান থেকে ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন সংসদীয় আসনের নির্বাচনি সরঞ্জাম ও সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। সেখানে ব্যালট পেপার, ব্যালট বাক্স ও অন্যান্য নির্বাচনি সামগ্রী বিতরণের সুশৃঙ্খল পরিবেশ দেখে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচনি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়া সম্ভব হবে। তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন যে, নির্বাচনের দিন সারা দেশে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বজায় থাকবে এবং ভোটারদের পূর্ণ অধিকার রক্ষায় সরকার সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। সব বাধা কাটিয়ে একটি সফল নির্বাচন সম্পন্ন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে বদ্ধপরিকর বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) সকালে রাজধানী ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার বিভিন্ন নির্বাচনী বেইজ ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শনকালে তিনি রাজধানীর মুগদা আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ, উত্তরা হাজী ক্যাম্প এবং গাজীপুরের টঙ্গীতে স্থাপিত ক্যাম্পগুলোতে দায়িত্বরত বিজিবি সদস্যদের সাথে মতবিনিময় করেন এবং যেকোনো প্রকার নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা দৃঢ়তার সাথে প্রতিহত করার নির্দেশ দেন। নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সরেজমিনে পর্যালোচনা করে তিনি বিজিবির অপারেশনাল সক্ষমতা যাচাই করেন এবং নিরাপত্তা পরিকল্পনা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালনের তাগিদ দিয়ে বিজিবি মহাপরিচালক বলেন যে, “আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় কোনো ধরনের শৈথিল্য বা গাফিলতি গ্রহণযোগ্য হবে না।” তিনি বিজিবি সদস্যদের সর্বোচ্চ সতর্ক থেকে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি নির্বাচনকালীন যেকোনো সংঘাত মোকাবিলায় দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন। ভোটারগণ যাতে নির্বিঘ্নে ও শঙ্কামুক্ত পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ সংখ্যক টহল পরিচালনা এবং চেকপোস্টের মাধ্যমে তল্লাশি কার্যক্রম জোরদার করার ওপর তিনি বিশেষ জোর দেন। একই সাথে জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সুরক্ষায় বিজিবি সদস্যদের সাধারণ মানুষের সাথে ভদ্র, মানবিক ও দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, প্রতিটি সদস্য সততা ও নিষ্ঠার সাথে তাদের অর্পিত দায়িত্ব পালন করবে।
আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশের বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জাতীয় সনদের ওপর গণভোট। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু হলেও নতুন মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ না করা পর্যন্ত বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টারা নিজ নিজ পদে বহাল থাকবেন। প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই এই ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে বলে সরকারের নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন। আইন অনুযায়ী, নতুন সরকার গঠিত হওয়ার আগপর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনার দৈনন্দিন ও অপরিহার্য কাজগুলো বর্তমান উপদেষ্টা পরিষদই তদারকি করবে।
বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে ফল ঘোষণা করবে এবং নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নামে গেজেট প্রকাশ করা হবে। এরপর নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা স্পিকারের কাছে শপথ গ্রহণ করবেন, যার মাধ্যমে নতুন সংসদ গঠিত হবে। সংসদে নিরঙ্কুশ বা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া দল বা জোট তাদের সংসদ নেতা নির্বাচন করার পর রাষ্ট্রপতি তাঁকে সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানাবেন। বঙ্গভবনে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নতুন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ পাঠ করাবেন। এই শপথ গ্রহণের মুহূর্ত থেকেই নতুন সরকার দায়িত্বভার গ্রহণ করবে এবং বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টারা তাঁদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাবেন।
নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন এ বিষয়ে স্পষ্ট করেছেন যে, মন্ত্রিসভা যেদিন গঠিত হবে, সেদিনই উপদেষ্টাদের কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটবে। তিনি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে জানিয়েছেন, নতুন সংসদ সদস্যদের গেজেট আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি নাগাদ প্রকাশিত হতে পারে। সেই সময় পর্যন্ত উপদেষ্টারা দাপ্তরিক কাজ চালিয়ে যাবেন কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, নতুন সরকার দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত প্রশাসনিক শূন্যতা এড়াতে তাঁরা দপ্তরে উপস্থিত থাকবেন। প্রধান উপদেষ্টার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রাক-নির্দেশনা না থাকলেও প্রচলিত রেওয়াজ অনুযায়ী সরকার গঠন পর্যন্ত উপদেষ্টারা স্বপদেই বহাল থাকেন।
অন্যদিকে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানিয়েছেন এক ভিন্নধর্মী নৈতিক অবস্থানের কথা। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, গত মঙ্গলবার তিনি উপদেষ্টা হিসেবে তাঁর শেষ নিয়মিত দাপ্তরিক কার্যদিবস অতিবাহিত করেছেন। আইনত নতুন মন্ত্রিসভার শপথ পর্যন্ত তিনি পদে থাকলেও নির্বাচনের পর নৈতিক বিবেচনায় তিনি আর কোনো গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করবেন না। তাঁর মতে, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পর নতুন সরকারের আগমনের পথ প্রশস্ত করাই এখন তাঁদের প্রধান লক্ষ্য। তিনি আরও আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, যে দল বা জোটই বিজয়ী হোক না কেন, জাতি হিসেবে সবাই তাঁদের পেছনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়াবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতি অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির হাত ধরে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের আগপর্যন্ত আগের প্রশাসন দায়িত্ব পালন করে থাকে। যেহেতু এটি একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, তাই নির্বাচনের পর ফল ঘোষণা থেকে শুরু করে শপথ গ্রহণ পর্যন্ত কয়েক দিনের এই অন্তর্বর্তী সময়ে প্রশাসনিক স্থবিরতা রোধে উপদেষ্টাদের পদে থাকা অপরিহার্য। বর্তমানে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ নতুন সরকারের জন্য লজিস্টিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করছে, যার মধ্যে হবু মন্ত্রীদের ব্যবহারের জন্য পরিবহন পুলের ৫০টি গাড়ি প্রস্তুত রাখার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সব মিলিয়ে একটি সুন্দর ও সুশৃঙ্খল হস্তান্তরের মাধ্যমে দেশ এক নতুন রাজনৈতিক গন্তব্যের দিকে যাত্রা শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও দেশব্যাপী গণভোটের আগের দিন কুমিল্লার মুরাদনগরে বড় অংকের নগদ টাকাসহ মাওলানা হাবীবুর রহমান হেলালী নামের এক জামায়াত নেতাকে আটক করা হয়েছে। বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে উপজেলার ছালিয়াকান্দি এলাকায় ব্যক্তিগত গাড়িতে করে টাকা নিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয় জনতা তাকে হাতেনাতে আটক করে। পরবর্তীতে খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসন ও থানা পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। আটক মাওলানা হাবীবুর রহমান হেলালী কুমিল্লা-৩ (মুরাদনগর) আসনে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী ইউসুফ হাকিমের ছালিয়াকান্দি ভোটকেন্দ্রের প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার দুপুরে মাওলানা হেলালী ব্যক্তিগত একটি গাড়িতে চড়ে উপজেলার ধামগড় থেকে ছালিয়াকান্দি এলাকায় যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে তাঁর গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হলে স্থানীয়রা গাড়িটি গতিরোধ করে তল্লাশি চালায়। এ সময় গাড়ির পেছনে রাখা একটি বাজারের ব্যাগের ভেতর পাতলা কম্বল দিয়ে ঢেকে রাখা অবস্থায় ১ হাজার টাকা নোটের দুটি বান্ডিল উদ্ধার করা হয়। ব্যাগে মোট ২ লাখ টাকা পাওয়া যায়। নির্বাচনের আগমুহূর্তে ভোটারদের প্রভাবিত করতে এই অর্থ ব্যবহার করা হচ্ছিল বলে স্থানীয়রা অভিযোগ তুলেছেন। এই ঘটনার পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় এবং বিপুল সংখ্যক মানুষ সেখানে ভিড় জমায়।
ঘটনার বিষয়ে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও মুরাদনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুর রহমান জানান, স্থানীয়দের দেওয়া খবরের ভিত্তিতে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে দ্রুত ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। যেহেতু টাকা বিলি করার সময় তিনি সরাসরি হাতেনাতে ধরা পড়েননি, তাই বিষয়টি আরও গভীরভাবে তদন্তের প্রয়োজন। তবে নির্বাচনি এলাকায় বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ বহনের বিষয়টি আচরণবিধির পরিপন্থী হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পুলিশ বর্তমানে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে এবং এই অর্থের উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা চালাচ্ছে।
এদিকে কুমিল্লা উত্তর জেলা জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাঁরা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছেন এবং প্রকৃত ঘটনা কী তা জানার জন্য স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। নির্বাচনের মাত্র এক দিন আগে এমন ঘটনায় নির্বাচনি এলাকায় টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। সাধারণ ভোটারদের মধ্যে কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে ছালিয়াকান্দি ও এর আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে যেকোনো ধরনের অর্থ লেনদেন বা অনিয়মের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে নির্বাচনি আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে নিশ্চিত করেছে উপজেলা প্রশাসন।
সৈয়দপুর বিমানবন্দরে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকাসহ ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা বেলাল উদ্দিনকে আটক করেছে পুলিশ। বুধবার দুপুর ১২টার দিকে বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ এলাকা থেকে তাকে হেফাজতে নেয় সৈয়দপুর বিমানবন্দর থানা পুলিশ। তল্লাশি চালিয়ে তার কাছ থেকে উদ্ধার করা এই বিপুল অর্থের কোনো বৈধ উৎস তিনি তাৎক্ষণিকভাবে দেখাতে পারেননি বলে পুলিশ দাবি করেছে।
সৈয়দপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল আলম আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বজায় রাখতে এই তল্লাশি চালানো হয়। প্রাথমিক হিসেবে মাওলানা বেলাল উদ্দিনের কাছে প্রায় ৫০ লাখ টাকা পাওয়া গেছে। তবে উদ্ধারকৃত অর্থের সঠিক পরিমাণ নিশ্চিত করতে বর্তমানে গণনা প্রক্রিয়া চলছে। নির্বাচনি পরিস্থিতির এই স্পর্শকাতর সময়ে এত বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা এক জেলা থেকে অন্য জেলায় কেন বহন করা হচ্ছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছে পুলিশ।
আটকের পর মাওলানা বেলাল উদ্দিন দাবি করেছেন যে, উদ্ধারকৃত এই অর্থ তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবসার লেনদেনের টাকা। তবে পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এই বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ বহনের সপক্ষে তিনি কোনো দাপ্তরিক প্রমাণ বা বৈধ কাগজপত্র প্রদর্শন করতে পারেননি। বর্তমানে তাকে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে এবং এই ঘটনায় যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সারা দেশে লাইসেন্স করা বৈধ অস্ত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা শেষ হলেও ২০ হাজারের বেশি অস্ত্র এখনো জমা পড়েনি। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বারবার কড়াকড়ি আরোপ করা সত্ত্বেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র সংশ্লিষ্ট থানায় জমা না হওয়ায় জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী যারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অস্ত্র জমা দেননি, তাদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ব্যক্তিগত পর্যায়ে মোট ৪৮ হাজার ২৮৩টি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ২৭ হাজার ৯৯৫টি অস্ত্র সরকারি কোষাগার বা সংশ্লিষ্ট থানায় জমা পড়েছে। অর্থাৎ, এখনো ২০ হাজার ২৮৮টি লাইসেন্স করা অস্ত্র সাধারণ মানুষের হাতে রয়ে গেছে। গত ১৮ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জারিকৃত এক প্রজ্ঞাপনে ৩১ জানুয়ারির মধ্যে সব বৈধ অস্ত্র জমা দেওয়ার চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। ওই আদেশে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছিল যে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অস্ত্র জমা না দিলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং অস্ত্র আইন ১৮৭৮-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, যেসব অস্ত্র এখনো জমা পড়েনি সেগুলোর অধিকাংশেরই লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল বিগত সরকারের আমলে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকের বিরুদ্ধেই বর্তমানে ফৌজদারি মামলা রয়েছে অথবা তারা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আত্মগোপনে আছেন। অনেক অস্ত্রের মালিক ইতিমধ্যে দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন, যার ফলে এসব অস্ত্র সংগ্রহে বড় ধরনের প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে এই বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া নাশকতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
এ বিষয়ে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম গত মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান যে, উদ্ধার না হওয়া প্রতিটি অস্ত্রই নির্বাচনের জন্য এক একটি বড় ঝুঁকি বা ‘থ্রেট’। শুধু বৈধ অস্ত্রই নয়, বিভিন্ন উপায়ে দেশে প্রবেশ করা অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারের বিষয়েও পুলিশ বিভাগ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। নির্বাচনের দিন এবং পরবর্তী সময়ে যেকোনো ধরনের সহিংসতা বা অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তিন স্তরের বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। যারা সরকারি নির্দেশ অমান্য করে এখনো অস্ত্র নিজেদের কাছে রেখেছেন, তাদের লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর আইনি পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে বলেও পুলিশের পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। সব বাধা কাটিয়ে একটি নিরাপদ নির্বাচনি পরিবেশ নিশ্চিতে কাজ করে যাচ্ছে প্রশাসন।
নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতির বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের দুদিন আগে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেছেন, বিজয় যেমন গণতন্ত্রের অংশ, তেমনি পরাজয়ও গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য সত্য। নির্বাচনের পর সবাই মিলে একটি নতুন, ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করুন। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) রাতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ওপর গণভোট বিষয়ে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি এ কথা বলেন।
ভয়কে পেছনে রেখে, সাহসকে সামনে এনে সবাইকে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আপনার একটি ভোট শুধু একটি সরকার নির্বাচন করবে না, এটি ১৭ বছরের নীরবতার জবাব দেবে, বাধাহীন ফ্যাসিবাদের জবাব দেবে, জাতিকে নতুনভাবে গঠিত করবে এবং প্রমাণ করবে— এই দেশ তার তরুণ ও নারী এবং সংগ্রামী জনতার কণ্ঠ আর কোনোদিন হারাতে দেবে না।
তিনি বলেন, নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকেই আমরা লক্ষ্য করছি—একটি চিহ্নিত মহল পরিকল্পিতভাবে গুজব ও অপতথ্য ছড়িয়ে নাগরিকদের মনে সন্দেহ, ভয় ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। তাদের উদ্দেশ্য একটাই—নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট করা, জনগণের আস্থাকে দুর্বল করা।
জাতির উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমি আপনাদের অনুরোধ করছি—সতর্ক থাকুন, দায়িত্বশীল থাকুন। যাচাই না করে কোনো তথ্য শেয়ার করবেন না। গুজবের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো সচেতনতা ও সত্য। নির্বাচন নিয়ে যারা বিগত মাসগুলিতে উদ্দেশ্যমূলকভাবে সংশয়-সন্দেহ সৃষ্টি করেছিল, তারা সম্পূর্ণভাবে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। জনগণকে বিভ্রান্ত করতে তারা চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে। আপনারা সকল প্রকার অপপ্রচার থেকে নিজেদের মুক্ত রাখুন। তথ্য যাচাইয়ের জন্য সরকারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখুন। নির্বাচনবন্ধু হটলাইন—৩৩৩-এতে ফোন করে সঠিক খবর জেনে নিন। এখন নতুন করে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে যে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার নাকি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবে না। এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও পরিকল্পিত অপপ্রচার, যার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো আমাদের গণতান্ত্রিক উত্তরণে বিঘ্ন সৃষ্টি করা। আপনারা নিশ্চিত থাকুন, নির্বাচনে বিজয়ী জনপ্রতিনিধিদের কাছে দ্রুততম সময়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তার দায়িত্ব সমাপ্ত করবে।
শেষ মুহূর্তে এসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গত সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এ চুক্তির পর বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে দেশটির আরোপিত পাল্টা শুল্কহার ১ শতাংশ কমানো হয়েছে। তাতে বাংলাদেশের পণ্যের শুল্কহার ২০ থেকে কমে ১৯ শতাংশ হয়েছে। তবে এই চুক্তির আওতায় দেড় হাজারের বেশি মার্কিন পণ্য বাংলাদেশের বাজারে ঢুকবে শুল্কমুক্ত সুবিধায়। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার এবং বাংলাদেশের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’তে স্বাক্ষর করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির (এআরটি) ফলে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার ‘সুযোগ’ দেখছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। তবে চুক্তিতে কী কী শর্ত আছে তা গোপন থাকায় এবং বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এসে করা মোটেই উচিত হয়নি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
জানা যায়- যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৮০০ কোটি মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ রপ্তানি করে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য, আর আমদানি করে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের পণ্য। বাণিজ্য ঘাটতি বাংলাদেশের অনুকূলে থাকলেও তা কমাতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বাজারে টুকতে এ চুক্তি করেছে। এছাড়া বাংলাদেশ তৈরি পোশাক খাতের কাঁচামাল তুলা ও কৃত্রিম তন্তুর বাজারে প্রবেশ করতে যুক্তরাষ্ট্র এ চুক্তিতে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে।
গত সোমরার রাতে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান বাংলাদেশ থেকে এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন। প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিকবিষয়ক বিশেষ সহকারী লুৎফে সিদ্দিকীও অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত ছিলেন।
চুক্তি সই অনুষ্ঠান উপলক্ষে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব খাদিজা নাজনীনের নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের একটি দল ওয়াশিংটন গেছে। অন্য চারজনের মধ্যে রয়েছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দুই যুগ্ম সচিব ফিরোজ উদ্দিন আহমেদ ও মোস্তাফিজুর রহমান, সিনিয়র সহকারী সচিব শেখ শামসুল আরেফীন এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কমিশনার রইছ উদ্দিন খান। পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদলের সশরীর উপস্থিতিতে এই চুক্তি হয়।
মার্কিন কৃষিপণ্যসহ যেসব পণ্য ঢুকছে বাংলাদেশে :
এই চুক্তির আওতায় থাকা বিভিন্ন শ্রেণির পণ্যের তালিকা প্রকাশ করেছে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর)। প্রায় দেড় হাজারের বেশি মার্কিন পণ্য বাংলাদেশের বাজারে ঢুকবে শুল্কমুক্ত সুবিধায়।
এর মধ্যে আছে গবাদি পশু, মাংস, মাছ, রাসায়নিক দ্রব্য, টেক্সটাইল, যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য শিল্পজাত পণ্য। চুক্তি কার্যকর হওয়ার তারিখ থেকেই এসব পণ্য শুল্কমুক্ত হিসেবে গণ্য হবে।
ইউএসটিআর -এর প্রকাশিত তফসিল-১-এ ইআইএফ শ্রেণিবদ্ধ পণ্য আছে ১ হাজার ৫৫৫টি। এর মধ্যে জীবন্ত প্রাণীর মধ্যে আছে- উন্নত জাতের পশু (ঘোড়া, গাধা, শুকর ইত্যাদি), জীবন্ত ভেড়া, ছাগল, বিভিন্ন ধরনের হাঁস-মুরগি (মুরগির বাচ্চা, হাঁস, রাজহাঁস), স্তন্যপায়ী প্রাণী (তিমি, ডলফিন), সরীসৃপ ও পতঙ্গ।
মাংস, মাছ ও ভোজ্য উপজাত পণ্যের মধ্যে আছে- শুকর, ভেড়া, ছাগল ও ঘোড়ার টাটকা বা হিমায়িত মাংস এবং বিভিন্ন ধরনের পোল্ট্রি (মুরগি, টার্কি, হাঁস)। এছাড়া লবণজাত পণ্য যেমন- শুকানো মাংস ও ভোজ্য চর্বি বা নাড়িভুঁড়ি। অ্যাকোয়ারিয়ামের শোভাবর্ধক মাছ, বিভিন্ন ধরনের টাটকা বা হিমায়িত মাছ (ট্রাউট, স্যামন, হ্যালিবাট, টুনা, হেরিং, সার্ডিন, ম্যাকেরেল, কড ইত্যাদি) এবং কাঁকড়া, চিংড়িও ইআইএফ শ্রেণিভুক্ত।
দুগ্ধ ও প্রাণিজ পণ্যের মধ্যে আছে- দই, ঘোল, বিভিন্ন ধরনের পনির, নিষিক্ত ও সাধারণ ডিম, পশুর লোম, হাড় এবং ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত নির্দিষ্ট কিছু প্রাণিজ উপাদান। শাকসবজি ও ফলমূলের মধ্যে আছে- নির্দিষ্ট জাতের আলু, টমেটো, পেঁয়াজ, রসুন, মাশরুম, মটরশুঁটি এবং অন্যান্য ডালজাতীয় শস্য।
এছাড়া বিভিন্ন ধরনের বাদাম (চেস্টনাট, পাইন নাট) এবং ফল (শুকনো খেজুর, ডুমুর, আনারস, অ্যাভোকাডো, পেয়ারা, আম, লেবুজাতীয় ফল, তরমুজ, নাশপাতি, চেরি, পিচ ও স্ট্রবেরি) ইআইএফ শ্রেণিভুক্ত। এসব কৃষিপণ্যের মোট আনুমানিক মূল্য ধরা হয়েছে ৩৫০ কোটি মার্কিন ডলার। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৪২ হাজার কোটি টাকার বেশি।
কৃষিপণ্যের প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে- আগামী পাঁচ বছরে প্রতি বছর কমপক্ষে ৭ লাখ মেট্রিক টন গম আমদানি। পাশাপাশি এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ১২৫ কোটি বিলিয়ন ডলার বা ২৬ লাখ মেট্রিক টন (যেটি কম) মূল্যের সয়াবিন ও সয়াজাত পণ্য।
এছাড়াও রাসায়নিক এবং ওষুধ পণ্যের মধ্যে আছে- শিল্পে ব্যবহৃত গ্যাস (হাইড্রোজেন, আর্গন, নাইট্রোজেন, অক্সিজেন), অ্যাসিড, অক্সাইড, ক্লোরাইড, সালফেট এবং বিভিন্ন ধরনের ওষুধ।
টেক্সটাইল ও পোশাক খাতের পণ্যের মধ্যে আছে- রেশম, পশম এবং তুলাজাত পণ্য; যার মধ্যে সুতা, বোনা কাপড় এবং নির্দিষ্ট কিছু পোশাক যেমন ট্র্যাকসুট ও সাঁতারের পোশাক অন্তর্ভুক্ত।
যন্ত্রপাতি ও শিল্প সরঞ্জামের মধ্যে আছে- বয়লার, ইঞ্জিন, পাম্প, ফ্যান, শিল্প কারখানার চুল্লি, প্রিন্টিং মেশিনারি, টেক্সটাইল মেশিন, মেশিন টুলস এবং বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম।
কেনা হবে ১৪টি বোয়িং ও ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি :
এ বাণিজ্য চুক্তির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ মার্কিন উড়োজাহাজ, জ্বালানি এবং সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে সম্মত হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানির তৈরি ১৪টি বেসামরিক উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত উড়োজাহাজ ক্রয়ের বিকল্পও রাখা হয়েছে। এছাড়া উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ ও সংশ্লিষ্ট সেবা যুক্তরাষ্ট্র থেকে সংগ্রহের বিষয়েও সহযোগিতা বাড়ানোর কথা চুক্তিতে বলা হয়েছে।
চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, জ্বালানি খাতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসসহ (এলএনজি) বিভিন্ন জ্বালানি পণ্য দীর্ঘমেয়াদে আমদানির উদ্যোগ নেবে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিসহ ১৫ বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের জ্বালানি পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া প্রতিরক্ষা খাতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় বাড়ানোর বিষয়ে প্রচেষ্টা চালাবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনার পরিমাণ সীমিত রাখার কথাও চুক্তিতে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাবের শঙ্কা :
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এ বাণিজ্য চুক্তি হওয়ার পর উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন ভারত। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
তথ্য মতে, ভারত ২০২৪-২৫ সালে বাংলাদেশে ১৪৭ কোটি ডলারের তুলার সুতা রপ্তানি করেছে, যা তাদের মোট সুতা রপ্তানি সিংহভাগ ছিল। গত বছর বাংলাদেশে ১২ থেকে ১৪ লাখ বেল তুলা রপ্তানি করেছে ভারত। বাংলাদেশ যে পরিমাণ পোশাক রপ্তানি করে তার ২০ শতাংশ যায় যুক্তরাষ্ট্রে। অপরদিকে ভারতীয় তুলা দিয়ে তৈরি ২৬ শতাংশ পণ্য ঢুকে মার্কিন বাজারে।
কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রির সেক্রেটারি জেনারেল চন্দ্রিমা চ্যাটার্জি বলেছেন, আমার ভয় তাৎক্ষণিক (নেতিবাচক) প্রভাব পড়বে ভারতের তুলার সুতার ওপর। কারণ বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা কিনতে পারবে এবং টেক্সটাইল মিলে সেগুলো থেকে তুলা উৎপাদন করতে পারবে।
ইন্ডিয়ান চেম্বার অব কমার্স ন্যাশনাল কমিটি অন টেক্সটাইলের চেয়ারম্যান সঞ্জয় কে জৈন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি পোশাক (নিট এবং ওভেন উভয়ই) আমদানি করবে। এর ফলে ভারত তার প্রতিযোগিতার ক্ষমতা হারাবে।
তবে কিছু কিছু ভারতীয় ব্যবসায়ী আবার আশা হারাতে চান না। তারা বলছেন যুক্তরাষ্ট্রের তুলা এনে সেখান থেকে সুতা তৈরি করে পোশাক বানিয়ে সেটি রপ্তানি করতে বাংলাদেশকে লজিস্টিকগত সমস্যার মোকাবিলা করতে হবে। যা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার।
ভারতের কটন টেক্সটাইল এক্সপোর্ট প্রমোশন কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক সিদ্ধার্থ রাজগোপাল বলেন, মার্কিন তুলা পেতে সময় এবং পরিবহন ও সংরক্ষণের খরচ বিবেচনা করা উচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম বাণিজ্য চুক্তি:
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান শেষে জেমিসন গ্রিয়ার বলেছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে এই পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে প্রথম। এটি বাজার উন্মুক্ত করা, বাণিজ্য বাধা দূর করা এবং মার্কিন রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রে অর্থবহ পদক্ষেপ।
বড় লাভের সুযোগ দেখছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা :
পরবর্তী সরকার চাইলে এ চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে, সেই সুযোগ রাখা হয়েছে জানিয়ে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেছেন, আমাদের ৮৫ বা ৮৬ শতাংশ রপ্তানির উপরে শুল্কশূন্য হবে, কারণ আমাদের যুক্তরাষ্ট্রের ৮৫-৮৬ শতাংশই তৈরি পোশাক। অন্যদিকে ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ রপ্তানির উপরে ১৯ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক হবে। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) বিকালে সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন তিনি। এই চুক্তির মধ্যে আমাদের এই শর্ত যুক্ত আছে যে, যদি প্রয়োজন হয়, আমরা একটা অ্যাপ্রোপ্রিয়েট নোটিস দিয়ে এই চুক্তি থেকে বের হয়ে আসতে পারব। আমরা এক্সিট ক্লজ চুক্তিতে সন্নিবেশ করেছি। এই মোটা দাগে আমাদের অর্জন।
চুক্তির বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, চুক্তিতে কী কী শর্ত আছে, তা আমরা জানি না। আমি মনে করি, এই ধরনের চুক্তি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এসে করা মোটেই উচিত হয়নি। আমরা কিছু নতুন সুবিধা পেয়েছি, সেটিকে আমরা অর্জন হিসেবে মনে করতে পারি। কিন্তু তার বদলে কী কী শর্ত পূরণ করতে হবে বা বাংলাদেশকে কী কী করতে হবে, তা আমরা জানি না। ফলে এই চুক্তিতে বাংলাদেশ কতটা লাভবান হলো, তা এক কথায় বলা মুশকিল। আমি মনে করি, চুক্তির লাভ-লোকসানের হিসাব কষতে হবে চুক্তিতে কী কী শর্ত আছে, তা সার্বিকভাবে পর্যালোচনার ভিত্তিতে।