বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে রাষ্ট্রপতি এবং বঙ্গভবনকে কেন্দ্র করে নানা ঘটনাপ্রবাহ দেখা যায়। দেশটিতে এখন পর্যন্ত যতজন রাষ্ট্রপতি এসেছেন তাদের মধ্যে অনেকের বিদায় সুখকরও হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে- কেউ ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন, কেউ রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। অনেক সময় দেখা গেছে রাষ্ট্রপতির সাথে ক্ষমতাসীন দলের মানসিক দূরত্ব তৈরির কারণে তাদের পদ ছেড়ে যেতে হয়েছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এখনো পর্যন্ত যেসব রাষ্ট্রপতি ছিলেন তাদের বিদায় কীভাবে হয়েছিল? এই লেখায় সেদিকে ফিরে তাকানো হয়েছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পরে যে প্রবাসী সরকার গঠন করা হয়েছিল সেখানে রাষ্ট্রপতি ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। যেহেতু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি ছিলেন সেজন্য অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি দেশে আসার পর শেখ মুজিবুর প্রধানমন্ত্রী হন এবং রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে।
আবু সাঈদ চৌধুরী
আবু সাঈদ চৌধুরী লন্ডন থেকে ফিরে ১৯৭২ সালের ১২ই জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তখন শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে যান প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু রাষ্ট্রপতি পদে থাকার সময় নানা বিষয় নিয়ে আবু সাঈদ চৌধুরীর মধ্যে মনোবেদনা তৈরি হয়।
তার এসব মনোবেদনার কথা রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে প্রকাশ করেছিলেন। মি. চৌধুরী মনে করতেন তাকে অবহেলায় রাখা হয়েছে এবং তিনি দেশের কোনো কাজে লাগছেন না। তাছাড়া বঙ্গভবনে তার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। তখন বঙ্গভবনে কর্মরত ছিলেন মাহবুব তালুকদার, যিনি পরবর্তীতে নির্বাচন কমিশনার হয়েছিলেন। বঙ্গভবনের নানা ঘটনা নিয়ে মাহবুব তালুকদার ‘বঙ্গভবনে পাঁচ বছর’ শিরোনামে একটি বই লিখেছেন।
সে বইতে মি. তালুকদার লিখেছেন, প্রথম দিকে কয়েকজন মন্ত্রী তার সঙ্গে দেখা করতে আসলেও কালক্রমে দেখা গেল প্রায় সবাই ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় রাষ্ট্রপ্রধানকে পরিহার করেছেন। রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালনকালে তিনি স্বভাবতই আশা করেছিলেন মন্ত্রীরা নিয়মানুযায়ী তার সঙ্গে মাঝে মাঝে সাক্ষাৎ করে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের বিষয় ও সমস্যাদি নিয়ে আলোচনা করবেন।
এছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনার নানা ইস্যু এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতি নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের নানা সিদ্ধান্ত পছন্দ করেননি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে আর কিছুদিন গেলেই রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যকার মানসিক দূরত্ব জনসমক্ষে প্রকাশ হয়ে যেতো। এমন প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী পদত্যাগ করেন ১৯৭৩ সালের ২৪শে ডিসেম্বর।
মুহম্মদুল্লাহ
আবু সাঈদ চৌধুরীর পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতি করা হয় মুহম্মদুল্লাহকে। তিনি ছিলেন তৎকালীন জাতীয় সংসদের স্পিকার। ব্যক্তিত্বের দিক থেকে আবু সাঈদ চৌধুরী এবং মুহম্মদুল্লাহর মধ্যে অনেক ফারাক ছিল। তাকে নিয়ে সরকারের সাথে কখনো টানাপড়েন সৃষ্টি হয়নি। রাষ্ট্রপতি মুহম্মদুল্লাহ নিজেও এসব বিষয় নিয়ে খুব একটা চিন্তা করতেন না। রাষ্ট্রপতি মুহম্মদুল্লাহকে খুব একটা মূল্যায়ন করা হতো না। এ বিষয়টি নিয়ে তিনি বিচলিত ছিলেন না।
এ রকম একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন মাহবুব তালুকদার। ১৯৭৫ সালের ৮ই জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির কর্মসূচি অনুযায়ী নেপালের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গভবনে আসার কথা। এজন্য রাষ্ট্রপতি মুহম্মদুল্লাহ নিজেও তৈরি ছিলেন। কিন্তু সকালে পত্রিকা মারফত তিনি জানতে পারলেন, নেপালের প্রধানমন্ত্রী আজ ঢাকায় আসছেন না। ঢাকায় আসার তারিখ তিনি দুদিন আগেই পিছিয়েছেন। কিন্তু বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রপতিকে জানানোর প্রয়োজন মনে করেনি। ১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতি ছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমান একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি মুহম্মদুল্লাহর মেয়াদও শেষ হয়।
শেখ মুজিবুর রহমান
১৯৭৫ সালের ২৫ শে জানুয়ারি সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু করে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার। এর মাধ্যমে দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার প্রবর্তন করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমান পুনরায় রাষ্ট্রপতি হন। শেখ মুজিবুর রহমানের যে পদক্ষেপ নিয়ে এখনও সবচেয়ে বেশি বিতর্ক হয়, সেটি হচ্ছে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা। এই শাসন ব্যবস্থা বাকশাল নামে পরিচিত। এই শাসনব্যবস্থা শেখ মুজিবুর রহমান খুব বেশিদিন ধরে রাখতে পারেননি। বাকশাল প্রবর্তনের মাত্র সাত মাসের মাথায় সেনাবাহিনীর তৎকালীন কিছু কর্মকর্তা তাকে হত্যা করে। শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন খন্দকার মোশতাক আহমদ।
খন্দকার মোশতাক আহমেদ
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তিনি মোট ৮১ দিন রাষ্ট্রপতি ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন মুজিবনগর সরকারের পররাষ্ট্র, আইন ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী।
স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রিসভায় তিনি বিদ্যুৎ, সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং পরে তাকে বাণিজ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। শেখ মুজিবুর রহমানের গঠিত বাকশালে খন্দকার মোশতাক আহমদ ছিলেন কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য। ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি অভ্যুত্থানের পর ৫ই নভেম্বর তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।
আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম
খন্দকার মোশতাক আহমেদ ক্ষমতাচ্যুত হবার পরে আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম ১৯৭৫ সালের ৬ই নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম প্রধান বিচারপতি। তিনি রাষ্ট্রপতি হলেও তখন রাষ্ট্রক্ষমতা ছিল কার্যত সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের হাতে। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম ছিলেন ‘ক্ষমতাহীন’ রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি সংসদ ও মন্ত্রী পরিষদ ভেঙে দিয়ে সারা দেশে সামরিক আইন জারি করেন এবং নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ঘোষণা করেন।
এ বিষয়টিকে অনেকে নজিরবিহীন বলে বর্ণনা করেন। একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি এবং বেসামরিক রাষ্ট্রপতি কীভাবে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হতে পারেন সেটি নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছিল। নির্বাচন অনুষ্ঠানে অপারগতার জন্য তিনি দায়ী করেছিলেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে।
রাষ্ট্রপতি পদ থেকে পদত্যাগের পর অবসর জীবনে আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম একটি বই লিখেছেন ‘অ্যাট বঙ্গভবন: লাস্ট ফেইজ’। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, অনেকটা তাড়াহুড়ো করেই তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে যান। মূলত; তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান চাননি যে আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম আর রাষ্ট্রপতি থাকুক। ১৯৭৭ সালের ২১ শে এপ্রিল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ছিলেন আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। যদিও মি. সায়েমের পদত্যাগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল তার ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের বিষয়টি।
জিয়াউর রহমান
১৯৭৭ সালের ২১শে এপ্রিল তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম সরিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জিয়াউর রহমান উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে প্রধান করে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) প্রতিষ্ঠা করেন।
ছয়টি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত ফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হন। এ নির্বাচন নিয়ে বেশ বিতর্ক ছিল। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এটিকে ‘প্রহসনের নির্বাচন’ বলে অভিহিত করেন। জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর প্রধানের পদ না ছেড়েই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি বা বিএনপি গঠন করেন। ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে। ১৯৮১ সালের ৩০শে মে একদল সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানকে হত্যা করে।
আব্দুস সাত্তার
জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন তৎকালীন উপরাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সহ-সভাপতি পদে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি আব্দুস সাত্তার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাসের মধ্যে দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৬৬% ভোট পেয়ে তিনি নির্বাচিত হন। যদিও সে নির্বাচন নিয়ে বেশ বিতর্ক ছিল। ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ সেনাপ্রধান হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ কর্তৃক এক সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার ক্ষমতাচ্যুত হন।
আহসান উদ্দিন চৌধুরী
১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ তৎকালীন সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে ঘোষণা করেন। এর তিনদিন পর, অর্থাৎ ১৯৮২ সালের ৩০ শে মার্চ জেনারেল এরশাদ আহসান উদ্দিন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি পদে বসান। কিন্তু বিচারপতি চৌধুরীর কোনো প্রকার কর্তৃত্ব ছিল না, কারণ ঘোষিত সামরিক আইনে সুনির্দিষ্টভাবে বলা ছিল যে সিএমএলএর উপদেশ বা অনুমোদন ব্যতীত প্রেসিডেন্ট কোনো ক্ষমতা প্রয়োগ বা কোনো ভূমিকা পালন করতে পারবেন না। আহসান উদ্দিন চৌধুরী ২০ মাসের মতো রাষ্ট্রপতি ছিলেন। এক পর্যায়ে জেনারেল এরশাদ আহসান উদ্দিন চৌধুরীকে সরিয়ে দিয়ে নিজেই রাষ্ট্রপতি হন।
এইচ এম এরশাদ
রাষ্ট্রপতি আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে অপসারণ করে ১৯৮৩ সালের ১১ই ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এইচ এম এরশাদ। জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় থাকার সময় দুটো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। একটি ১৯৮৬ সালে এবং আরেকটি ১৯৮৮ সালে। এ দুটি নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক ছিল। জেনারেল এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার সময় তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ধীরে ধীরে সোচ্চার হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে সবগুলো বড় রাজনৈতিক দল একত্রিত হয়ে তার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে। আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ই ডিসেম্বর ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন জেনারেল এরশাদ।
বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ
নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর আন্দোলনকারী তিন জোটের অনুরোধে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। তার প্রধান দায়িত্ব ছিল একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন করা। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ একই সাথে প্রধান নির্বাহী এবং রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ১৯৯১ সালের সে নির্বাচনে জয়লাভ করে ক্ষমতায় আসে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বিরল সমঝোতায় দ্বাদশ সংশোধনী পাস হওয়ার পর উত্তরসূরি নির্বাচন করেই তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে সুপ্রিম কোর্টে ফিরে গিয়েছিলেন।
নতুন রাষ্ট্রপতির নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির কার্যভার গ্রহণের পর সাহাবুদ্দিন আহমদ ১৯৯১ সালের ১০ই অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে ফিরে যান। ১৯৯৫ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি তিনি প্রধান বিচারপতির পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
আব্দুর রহমান বিশ্বাস
১৯৯১ সালের ৮ই অক্টোবর জাতীয় সংসদের দ্বারা রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন আব্দুর রহমান বিশ্বাস। আব্দুর রহমান বিশ্বাস বরিশালে আইন পেশা এবং রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৯৭৭ সালে তিনি বরিশাল পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বরিশাল থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর তিনি জিয়াউর রহমানের মন্ত্রীসভায় যোগ দেন। জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর মি. বিশ্বাস আব্দুস সাত্তার সরকারের মন্ত্রিসভায়ও ছিলেন।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পূর্বে আব্দুর রহমান বিশ্বাস ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি মূলত রাজনীতিবিদ এবং আইনজীবী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ৪ঠা এপ্রিল ১৯৯১ তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং ১৯৯৬ সালের ৮ই অক্টোবর তার মেয়াদ শেষ হয়।
সাহাবুদ্দিন আহমদ
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সাহাবুদ্দিন আহমদকে আবারও রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করে সংসদের মাধ্যমে। সে বছরের ৯ই অক্টোবর থেকে ২০০১ সালের ১৪ই নভেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বিচারপতি আহমেদ। তিনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর ‘জননিরাপত্তা আইন’ নামের একটি বিতর্কিত আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানান। সেকারণে তার সাথে তৎকালীন সরকার এবং আওয়ামী লীগের তিক্ততা তৈরি হয়েছিল। তখন থেকে সেই সম্পর্কে আর উন্নতি হয়নি। ২০০১ সালে নির্বাচনে পরাজিত হবার পর আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে ‘বিশ্বাসঘাতকতার’ অভিযোগ এনেছিলেন। সংসদীয় পদ্ধতিতে সরকার ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি অতি সীমিত ক্ষমতার অধিকারী হলেও রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর পাঁচ বছরের মেয়াদে সাহাবুদ্দিন আহমেদ তার নিরপেক্ষ ভূমিকার জন্য প্রশংসিত ছিলেন।
বদরুদ্দোজা চৌধুরী
২০০১ সালের ১৪ই নভেম্বর বাংলাদেশের ১৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব শুরু করেন। কিন্তু সাত মাসের মাথায় ২০০২ সালের ২১শে জুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে পদত্যাগ করেন মি. চৌধুরী। সেসময় বিএনপি সংসদে তার বিরুদ্ধে অনাস্থা এনেছিল। বাংলাদেশে প্রেসিডেন্ট হবার পর এমন নাটকীয় পদত্যাগের ঘটনা আর ঘটতে দেখা যায়নি। তার আগে বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে অনেক সংসদ সদস্য দাবি তোলেন যে রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী পদত্যাগ করুন। অন্যথায় তাকে ইমপিচ করার হুমকি দেন তারা।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার মাত্র সাত মাসের মাথায় বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে কেন বিদায় নিতে হয়েছিল, তার নানাবিধ কারণ উল্লেখ করে তখনকার সংবাদপত্রে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিল। যেসব কারণের কথা ওইসব প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, তার মধ্যে রয়েছে- জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে তার সমাধিতে রাষ্ট্রপতির শ্রদ্ধা নিবেদন না করা; রাষ্ট্রপতির বাণীতে জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে উল্লেখ না করা; বিরোধী নেত্রী শেখ হাসিনাকে মুন্সিগঞ্জে স্বাগত জানিয়ে রাষ্ট্রপতির ছেলে এবং সংসদ সদস্য মাহী বি. চৌধুরীর তোরণ নির্মাণ; রাষ্ট্রপতির বিভিন্ন বক্তব্যে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ ব্যবহার না করা, কারণ ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ বিষয়টি বিএনপি রাজনৈতিকভাবে ধারণ করে। এছাড়া বদরুদ্দোজা চৌধুরী বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়েছিলেন। এটি নিয়ে বিএনপি বেশ নাখোশ ছিল।
ইয়াজউদ্দিন আহমদ
বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতির পদের জন্য বিএনপির তরফ থেকে পছন্দ করা হয় অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমদ। ২০০২ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। বিএনপি ক্ষমতা ছাড়ার পর ২০০৬ সালে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বের সঙ্গেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানের দায়িত্বও নেন, যা সেই সময় দেশের রাজনীতিতে একটি সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল বলে মনে করা হয়। বাংলাদেশের রাজনীতির এক উত্তাল সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেব দায়িত্ব নেন ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ।
প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় ২০০৬ সালে তার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানেরও দায়িত্ব নেওয়াটা তুমুল বিতর্কের জন্ম দেয় এবং তার প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার পদ্ধতিটি কিছুটা নিয়মের লঙ্ঘন বলেও মনে করেন অনেকে। ইয়াজউদ্দিন আহমদ বিএনপির মনোনীত রাষ্ট্রপতি হলেও তাকে নিয়ে এক পর্যায়ে বিএনপি নেতারাও সমালোচনা করেছিলেন। তাদের যুক্তি হচ্ছে, ২০০৭ সালে রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ থামাতে তিনি কোনো ভূমিকা রাখেননি। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ২০০৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ইয়াজউদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির পদ থেকে বিদায় নেন।
জিল্লুর রহমান
২০০৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে নেয়া জিল্লুর রহমানকে। ২০০৮ সালে জিল্লুর রহমান জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি নবম জাতীয় সংসদের সংসদ উপনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জিল্লুর রহমান রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। জিল্লুর রহমানের রাজনৈতিক জীবন ছিল সুদীর্ঘ। ২০১৩ সালের ২০শে মার্চ সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান মারা যান। তার বয়স হয়েছিলো ৮৪ বছর।
আব্দুল হামিদ
জিল্লুর রহমানের অসুস্থতার কারণে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন তৎকালীন স্পিকার আব্দুল হামিদ। তিনি হচ্ছেন একমাত্র ব্যক্তি যিনি পরপর দুই মেয়াদে দেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন। মি. হামিদ প্রথম মেয়াদে ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল এবং দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সালে। তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ মেয়াদি রাষ্ট্রপতি ছিলেন।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১১ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) সচিবালয়ে পরিবহণ ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে শ্রমিক মালিকদের সঙ্গে বৈঠক শেষে এ কথা জানান সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
তিনি বলেন, ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে দূরপাল্লার গাড়িতে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ১১ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আন্তঃজেলার প্রতি কিলোমিটারেও বাড়ানো হবে ১১ পয়সা।
নতুন এ ভাড়া আজ থেকেই কার্যকর হবে বলে জানিয়েছেন সড়কমন্ত্রী।
সিএনজিচালিত বাসের ক্ষেত্রে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে না বলে জানিয়েছেন শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেন, ডিজেল চালিত বাসের ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। সিএনজিচালিত বাসের ক্ষেত্রে ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচিত হবে না। জ্বালানি তেলের দাম কমে গেলে বাস ভাড়া আবার কমবে। তবে রেল ও নৌ পরিবহণের ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
এর আগে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় যৌক্তিকভাবে ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল পরিবহণ মালিক সমিতি।
বর্তমানে দেশের দূরপাল্লার রুটের জন্য সরকার নির্ধারিত রয়েছে বাসভাড়া কিলোমিটার প্রতি ২ টাকা ১২ পয়সা। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে বাসের বর্তমান ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ৪২ পয়সা।
উল্লেখ্য, শনিবার (১৮ এপ্রিল) রাতে ভোক্তা পর্যায়ে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়। নতুন এই দাম রোববার (১৯ এপ্রিল) থেকে কার্যকর হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের নির্ধারিত নতুন দরে প্রতি লিটার ডিজেল ১০০ টাকা থেকে ১৫ টাকা বেড়ে ১১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অকটেন ১২০ টাকা থেকে ২০ টাকা বেড়ে ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা থেকে ১৯ টাকা বেড়ে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে ১৮ টাকা বেড়ে ১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
জাতীয় সংসদের বিভিন্ন গ্যালারির পূর্বের নাম পরিবর্তন করে মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখা সাত বীরশ্রেষ্ঠের নামে নামকরণ করা হয়েছে।এ উদ্যোগকে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানানোর এক তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সংসদ, যা দেশের গণতন্ত্রের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, সেখানে এই নামকরণ কেবল একটি আনুষ্ঠানিক পরিবর্তন নয়; বরং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্থানে মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথাকে স্থায়ীভাবে ধারণ করার একটি প্রতীকী উদ্যোগ। এর আগে গ্যালারিগুলোর নাম ছিল ফুল ও নদীর নামে।
বুধবার (২২ এপ্রিল) রাতে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্তি প্রেসসচিব আতিকুর রহমান রুমন বলেন, নতুন এই নামকরণের মাধ্যমে সেই স্থানগুলো এখন সরাসরি স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে।
এক নজরে নতুন নামকরণ; গ্যালারি-৩: বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফ (পূর্বের নাম: শিমুল), গ্যালারি-৪: বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান (পূর্বের নাম: শিউলি), গ্যালারি-৫: বীরশ্রেষ্ঠ ইঞ্জিন রুম আর্টিফিসার মোহাম্মদ রুহুল আমিন (পূর্বের নাম: বকুল), গ্যালারি-৬: বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ (পূর্বের নাম: শাপলা), গ্যালারি-৭: বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল (পূর্বের নাম: যমুনা), ভিআইপি গ্যালারি-১: বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর (পূর্বের নাম: পদ্মা), ভিআইপি গ্যালারি-২: বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমান (পূর্বের নাম: মেঘনা), এছাড়াও, গ্যালারি-১ ও গ্যালারি-২ সাংবাদিকদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে (সাংবাদিক গ্যালারি)।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সংসদে আগত দর্শনার্থীদের মধ্যেও দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বীরদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ আরো সুদৃঢ় হবে।
এই নামফলক স্থাপনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে আরো দৃশ্যমান ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষণ করা হলো বলে অভিমত বিশ্লেষকদের।
জাতীয় সংসদে বীরশ্রেষ্ঠদের নামে গ্যালারির নামকরণ শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি বাংলাদেশের ইতিহাস, ত্যাগ ও বীরত্বের প্রতি গভীর সম্মান প্রদর্শনের এক অনন্য উদাহরণ।
দেশের মানুষের স্বার্থে আলোচনায় বসতে বিরোধীদলকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ‘মতপার্থক্য থাকলেও দেশের স্বার্থে আমরা এক।’ বুধবার (২২ এপ্রিল) রাতে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে তিনি এই আমন্ত্রণ জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিরোধীদল যদি পরামর্শ বা কোনো প্রস্তাব দেয় তবে সে বিষয়ে বিএনপি আলোচনা করতে প্রস্তুত আছে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জ্বালানি তেলের সমস্যা শুধু বাংলাদেশে নয়, সারাবিশ্বজুড়ে। সরকার যথাযথভাবে জনগণকে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছে। সে ক্ষেত্রে বিরোধীদল গ্রহণযোগ্য কোনো প্রস্তাব দিলে গ্রহণ করতে সরকারের আপত্তি নেই। বিরোধীদলের সঙ্গে আলোচনায় বসতেও প্রস্তুত।’
তিনি বলেন, ‘এই সংসদ বহু শহীদের রক্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই সংসদ দেশের মানুষের ভবিষ্যৎ কীভাবে সুন্দর করা যায় সেই আশা আকাঙ্ক্ষার ওপর প্রতিষ্ঠিত।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘সংসদে আমরা যে যেখানেই বসি না কেন বাংলাদেশের মানুষ আমাদের এখানে পাঠিয়েছেন তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য। সে কারণে সংসদে যে আলোচনা করলে দেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষা হবে আমরা সেই কাজ করব।’
তিনি বলেন, ‘আমি বিরোধীদলীয় নেতা, বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের আজকের জ্বালানি তেল নিয়ে আলোচনা উপস্থাপন করার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।’
কৃষি উন্নয়নে বর্তমান সরকার সময়োপযোগী ৭ দফা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে: প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশে একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, দারিদ্র্যবিমোচন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তরের সময় টাঙ্গাইল-৬ আসনের সংসদ সদস্য রবিউল আলমের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বিকেল ৩টায় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনের প্রথম কর্মসূচি ছিল প্রথম ৩০ মিনিট প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব। এ সময় কৃষি উন্নয়নে সরকারের ৭ দফা পরিকল্পনা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দেখছি আমাদের চোখের সামনেই ঘটছে বিভিন্ন বিষয়। যেমন জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জমির পরিমাণ হ্রাস এবং প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা। এসব কারণে কৃষি খাত বিভিন্ন রকম চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। আমাদের এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই কৃষি উৎপাদন এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কৃষিকে টেকসই এবং লাভজনক খাতে রূপান্তর করতে হবে। এ লক্ষ্যে আমরা কৃষক কার্ড বিতরণ শুরু করেছি। এ কার্ডের মাধ্যমে ১০টি সেবা, যথা ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ বিতরণ, সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা প্রদান, স্বল্পমূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ, ন্যায্যমূল্যে সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে কৃষি ঋণ, কৃষি বিমা সুবিধা, ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রয়ের সুবিধা, কৃষিবিষয়ক প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আবহাওয়া ও বাজার তথ্য প্রাপ্তিসহ ফসলের রোগ-বালাই দমনের পরামর্শ প্রদান ইত্যাদি কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। পর্যায়ক্রমে দেশের সব কৃষককে (প্রায় ২ কোটি ৭৫ লাখ) এ কার্ড প্রদান করা হবে।’
আধুনিক সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ: আধুনিক সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কৃষির উন্নয়নে বর্তমান সরকার আরও অনেকগুলো সময়োপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। কৃষি উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য সরকার উন্নত ও উচ্চফলনশীল বীজ সুষম সার ব্যবহারের পাশাপাশি আধুনিক সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়েছে। এ জন্য এরই মধ্যে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচি সরকার হাতে নিয়েছে, যা ইনশাআল্লাহ আমরা আগামী পাঁচ বছরে করব। কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ভুর্তুকি প্রদান করে ট্রাক্টর হারভেস্টার রিপারসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কৃষকদের কাছে সহজলভ্য করার পরিকল্পনা বর্তমান সরকারে হয়েছে।’
‘ক্রপ জোনিং’ পদ্ধতি চালু: তারেক রহমান বলেন, ‘পতিত জমি আবাদের আওতায় আনা এবং জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য ‘ক্রপ জোনিং’ পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট অঞ্চলের মাটি, আবহাওয়া ও পরিবেশের উপযোগী ফসল নির্ধারণ করা হয়। ফলে জমির অপচয় কমে এবং উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। একইসঙ্গে পতিত জমি চিহ্নিত করে সেগুলো আবাদের আওতায় আনার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে, যেমন খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে পতিত জমি কৃষির আওতায় আনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া সিলেট অঞ্চলে পতিত জমিসহ চরাঞ্চলের পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় আনার জন্য বিশেষ প্রকল্পের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।’
কৃষিপণ্যের বহুমুখীকরণ: কৃষিপণ্যের বহুমুখীকরণে সরকারের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একসময় ধাননির্ভর কৃষিব্যবস্থা এখন ধীরে ধীরে ফল, সবজি, ডাল, তেলবীজ, মসলা, ফুল চাষ খাতে সম্প্রসারণ করার জন্য সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।’
কৃষকদের প্রণোদনা: তারেক রহমান বলেন, ‘কৃষকদের জন্য প্রণোদনা ও সহায়তা কার্যক্রম স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার জন্য কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের বীজ, সার, কৃষিযন্ত্র ক্রয়সহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি প্রদান করা হবে। তা ছাড়া কৃষকদের জন্য স্বল্প সুদের কৃষিঋণ এবং ফসল বিমা চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের জন্যও বিশেষ সহায়তা কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে।’
আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ ও গুদাম নির্মাণ: প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কৃষিপণ্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ ও গুদাম নির্মাণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া ফল ও সবজি সংরক্ষণের জন্য মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন এবং পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য এয়ার ফ্লো-মেশিন বিতরণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।’
উত্তরাঞ্চলকে কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল প্রতিষ্ঠা: প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কৃষিপণ্য রপ্তানির লক্ষ্যে, উত্তরাঞ্চলকে কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল প্রতিষ্ঠা এবং ক্রয়কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।’
হাসিনা আমলে অর্থপাচারের ১১ মামলা সরকারের অগ্রাধিকারে: সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবার এবং ওই আমলে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অর্থপাচারের ১১টি মামলা সরকারের অগ্রাধিকারে রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ আমলে সংঘটিত অর্থপাচার ও দুর্নীতির অনুসন্ধান করে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং এতে চিহ্নিত দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রী জানান, অর্থপাচারের গন্তব্য দেশগুলোর মধ্যে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১০টি দেশের মধ্যে (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও হংকং-চায়নার) ৩টির (মালয়েশিয়া, হংকং ও সংযুক্ত আরব আমিরাত) সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে সম্মতি দেওয়া হয়েছে। অন্য সাতটি দেশের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।’
নতুন ডিলার নিয়োগ: পুরোনো ডিলারদের বাতিল করে নতুন সার ডিলার নিয়োগের বিষয়ে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেন, ‘চিফ হুইপ বলেছেন, উনি যখন বক্তব্যটি উপস্থাপন করেন তখন আমি খেয়াল করেছি মোটামুটি পুরো সংসদ বিষয়টিকে ওয়েলকাম (স্বাগতম) করেছেন। এ ব্যাপারে যদি পুরো সংসদের সম্মতি থাকে, তবে নিশ্চয়ই সরকার দ্রুতই ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’
হামের টিকা: অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শিশুদের হামের টিকা বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়নি বলে সংসদে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই মিলে স্বৈরাচারকে দেশ থেকে বিতাড়িত করেছি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সেই অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শিশুদের হামের টিকা বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়নি।’
বর্তমানে টিকা পেতে ইউনিসেফ সাহায্য করছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ইউনিসেফ হামের ভ্যাকসিনেশন খুব দ্রুততার সঙ্গে পাঠিয়েছে, ফলে আমরা ওষুধগুলো পেয়েছি। প্রায় দুই কোটি শিশুকে এই হামের ভ্যাকসিনেশন আমরা দেব।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অনেক কিট এসে পৌঁছেছে। খুব সম্ভবত একটি কিট দিয়ে তিন শিশুকে টেস্ট করা সম্ভব হয়। কিছু কিট এই মুহূর্তে সম্ভবত ঢাকার কাস্টমসে আছে, এয়ারপোর্টে আছে।’
জাতীয় সংসদে এক সংসদ সদস্য তার বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ‘মহামান্য প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে সম্বোধন করলে, প্রধানমন্ত্রী তাকে শব্দটি ব্যবহার না করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মাননীয় সংসদ সদস্যকে একটি অনুরোধ করতে চাইব, আপনি আমাকে যখন অ্যাড্রেস করেছেন ‘‘মহামান্য’’ শব্দটি মনে হয় ব্যবহার করেছেন। দয়া করে আমাকে এরপর অ্যাড্রেস করার সময় কখনো এই কথাটি আর বলবেন না।’
তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, ‘সমাজ ও রাষ্ট্রে জেন্ডার সংবেদনশীলতা নিশ্চিত করতে হলে বিচ্ছিন্ন কোনো উদ্যোগ নয়, বরং গণমাধ্যম ও রাজনীতিতে সামগ্রিকভাবে জবাবদিহিতার সংস্কৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘জেন্ডার সংবেদনশীলতার অভাব কেবল নারী বা পুরুষের মনস্তাত্ত্বিক বিষয় নয়, এটি আমাদের সমষ্টিগত মূল্যবোধের ঘাটতির বহিঃপ্রকাশ। রাজনীতি ও গণমাধ্যম- এই দুটি শক্তিশালী মাধ্যম যদি পেশাদারত্ব ও জবাবদিহিতার আওতায় আসে। তখন সমাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে জেন্ডার সংবেদনশীল হয়ে ওঠবে।’
বুধবার (২২ এপ্রিল) দুপুরে রাজধানীর প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) সেমিনার কক্ষে ‘সাংবাদিকতায় জেন্ডার সংবেদনশীলতা’ বিষয়ক ম্যানুয়ালের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
জহির উদ্দিন স্বপন আরও বলেন, ‘রাজনীতিবিদ ও গণমাধ্যমকর্মী- উভয়কেই সারাক্ষণ জনগণের সাথে সম্পৃক্ত থাকতে হয়। রাজনীতিবিদদের লক্ষ্য রাষ্ট্র ক্ষমতা ও জনসেবা আর গণমাধ্যমের লক্ষ্য সংবাদ পরিবেশন। কিন্তু এই দুই ক্ষেত্রে যদি সঠিক জবাবদিহিতার প্রক্রিয়া না থাকে, তবে জনস্বার্থ বিঘ্নিত হয়।’
তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার স্বাধীন গণমাধ্যমে বিশ্বাসী। কারণ, শক্তিশালী ও স্বাধীন গণমাধ্যমই রাজনীতিবিদদের ক্ষমতাকে জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসতে পারে।’
মন্ত্রী বলেন, ‘ইউটিউব বা সামাজিক মাধ্যমে বিমূর্ত কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহিতার কথা বলা অবাস্তব। জবাবদিহিতা হতে হবে সুনির্দিষ্ট অস্তিত্বসম্পন্ন কর্তৃপক্ষের কাছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশ্বব্যাপী নজরদারি ও সুস্থ নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।’
পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, তথ্য ও সম্প্রচার সচিব মাহবুবা ফারজানা।
বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে নিজেদের সদিচ্ছার কথা জানিয়েছে বিএনপি। পাশাপাশি বাংলাদেশ চিকিৎসা ও কৃষি খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ এবং কারিগরি সহযোগিতা বাড়াতে চীনের প্রতি আহ্বানও জানিয়েছে দলটি। গত মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) বেইজিংয়ে বিএনপির উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে দুটি আলাদা ও গুরুত্বপূর্ণ সভায় এই আহ্বান জানানো হয়। বৈঠকে নেতৃত্ব দেন বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। প্রতিনিধিদলটি চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান জেং এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিংয়র সঙ্গে বৈঠক করে।
বৈঠকে উভয় পক্ষই বাংলাদেশ ও চীনের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ওপর আলোকপাত করেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন এবং পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে যা বিকশিত হয়েছিল, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে তা এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়। এই সম্পর্ককে ব্যাপক কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্ব হিসেবে অভিহিত করে উভয় পক্ষ একটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের বিষয়ে একমত হয়েছে।
বৈঠকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পুনর্ব্যক্ত করেন, বর্তমান সরকারের বৈদেশিক নীতির মূল ভিত্তি হলো- সবার আগে বাংলাদেশ। তিনি চীনের ‘এক-চীন নীতি’র প্রতি বাংলাদেশের দৃঢ় সমর্থনের কথা জানান। এ ছাড়া রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের গঠনমূলক ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে চীনের সহায়তা কামনা করেন।
বৈঠকে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও জীবন-জীবিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে চীনের সদিচ্ছা ও অংশীদারিত্বের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। এ ছাড়াও প্রতিরক্ষা প্রশিক্ষণ, আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পানি পরিশোধন প্রযুক্তিতে চীনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের লক্ষ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং হালকা ও মাঝারি শিল্পে চীনের বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হয়।
স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে ‘বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী হাসপাতাল’ স্থাপনের প্রস্তাবের পাশাপাশি রোবোটিক সার্জারি এবং আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তিতে সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া চীনা ভাষা শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে দুদেশের জনগণের মধ্যে সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়।
চীনের উপরাষ্ট্রপতি এবং সিপিসির শীর্ষ নেতারা বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ও অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করেন। তারা পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থার ভিত্তিতে বাংলাদেশের সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার এবং যৌথ অগ্রগতির লক্ষে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন।
পড়ার টেবিল ছেড়ে ভয়ংকর সব অপরাধে জড়ানো কিশোর গ্যাং এবার হাত পাকাচ্ছে খুনোখুনিতে। তাদের হাতে উঠছে চাপাতি, পিস্তল ও রিভলবারসহ আগ্নেয়াস্ত্রও। ফলে ছিনতাই, চুরি, খুনসহ পাড়া-মহল্লায় যেকোনো অপরাধ ঘটলেই সবার আগে আসছে কিশোর গ্যাংয়ের নাম। এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা বদলেছে দল, কেউবা বদলেছে নেতা, বদলেছে তাদের অপরাধের ধরনও। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এরা হয়ে ওঠে বেপরোয়া। গড়ে তোলে নতুন নতুন গ্যাং। ফলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এখন বেগ পেতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে।
কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা নিজেদের হিরোইজম জাহির করতে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক কারবার এমনকি খুনোখুনিতে লিপ্ত হচ্ছে। এতে আতঙ্কিত রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহর, পাড়া-মহল্লার বাসিন্দারা। সমাজের বিভিন্ন স্তরে মাদকের আগ্রাসন বেশি। এ আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে কিশোররা। এ কারণে তারা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করতে দ্বিধা করছে না।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর গ্যাং সদস্যরা রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে বিষফোঁড়ার মতো হয়ে ওঠছে। গত ২০ মাসে এদের হাতে খুন হয়েছে ২৪ জন। আর বিগত ১৬ বছরে ১০০টির বেশি খুন হয়েছে।
সবশেষ গত বুধবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে আসাদুল হক ওরফে লম্বু আসাদুল (২৮) নামে এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে কিশোর গ্যাং সদস্যরা। এর আগে ১২ এপ্রিল মোহাম্মদপুরে এলেক্স গ্রুপের প্রধান ইমন হোসেন ওরফে এলেক্স ইমনকে কুপিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষ। মূলত ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোন নিয়ে এলেক্স গ্রুপের সঙ্গে আরমান-শাহরুখ গ্রুপের দ্বন্দ্বে হত্যা করা হয় এলেক্স ইমনকে। একই দিন সকালে দুই দফায় তাদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়। এ ঘটনায় আরমান-শাহরুখ গ্রুপের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। নিহত এলেক্স ইমনের বিরুদ্ধে জোড়া খুনসহ ১৮টি মামলা ছিল।
আরেক ঘটনা শেরপুরের। গত ১০ মার্চ শেরপুরের নকলায় কিশোর গ্যাংয়ের ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হয় সজীব মিয়া (১৪)। জানা যায়, ১০ মার্চ রাতে সজীবকে আড্ডা দেওয়ার কথা বলে ডেকে নকলা বাইপাস ব্রিজের নিচে নিয়ে যায় একই গ্রামের মো. রিফাত (১৮) ও আরও তিন-চারজন। পরে একটি মোবাইল ফোন হারানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে তর্কাতর্কির একপর্যায়ে সজীবের শরীরে ছুরিকাঘাত করা হয়। এ সময় তার চিৎকার শোনে এলাকাবাসীরা তাকে উদ্ধার করে নকলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। অবস্থা গুরুতর দেখে চিকিৎসক তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। সেখানে চার দিন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন থাকার পর সজীব মারা যায়।
এ দুই ঘটনাই হত্যাকাণ্ডের। শুধু হত্যাকাণ্ডের মতো নৃশংস ঘটনায় নয়, এমন কোনো অপরাধ নেই যাতে কিশোর গ্যাং সদস্যরা জড়িত নয়। আওয়ামী লীগ আমলের কিশোর গ্যাং সদস্যরা ঘুরেফিরে নতুন নামে নতুনভাবে আবির্ভূত হয়েছে।
রাজধানীর অপরাধের প্রায় ৪০ শতাংশই এখন কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করে, যার মধ্যে ছিনতাই ও ছোট-খাটো ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি অন্যতম। কিশোররা এখন দেশীয় অস্ত্রের পাশাপাশি বিদেশি পিস্তল ও আধুনিক অস্ত্রও ব্যবহার করছে। এ ছাড়া মাদক পরিবহন ও সেবনে তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল, অশ্লীল ছবি ছড়ানো এবং হ্যাকিংয়ের মতো কাজেও কিশোরদের সম্পৃক্ততা বাড়ছে।
পুলিশের তথ্যমতে, সারাদেশে বর্তমানে ২৩৭টির বেশি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে ঢাকা মহানগরীতে ১১৮টি। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম, যেখানে ৫৭টি গ্যাং সক্রিয়।। এ ছাড়া কুমিল্লা, সিলেট, বরিশাল ও ময়মনসিংহেও এদের তৎপরতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। প্রতিটি গ্রুপে সাতজন থেকে শুরু করে ২০ জন পর্যন্ত সদস্য রয়েছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তালিকা অনুযায়ী, রমনা বিভাগে ছয়টি, লালবাগ বিভাগে ১০টি, ওয়ারি বিভাগে ১৩টি, মতিঝিল বিভাগে ১০টি, গুলশান বিভাগে ১১টি এবং উত্তরা বিভাগে ১০টি কিশোর গ্যাং গ্রুপ সক্রিয়।
পুলিশ ও র্যাবের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর গত ২০ মাসে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকেই ৪ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে প্রায় ৩ হাজার ২০০ জনকে। র্যাব গ্রেপ্তার করেছে ১ হাজার ২০০ জনকে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ১০ জন রয়েছেন, যারা বিভিন্ন অপরাধী দলের নেতা।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জোর তৎপরতা, নিয়মিত অভিযান ও গ্রেপ্তারের পরও কিছুতেই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না মোহাম্মদপুর এলাকার অপরাধ পরিস্থিতি। বিশেষ করে গত দুই বছরে বেপরোয়া হয়ে ওঠা কিশোর গ্যাংগুলো এখনো আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মোহাম্মদপুর-আদাবর এলাকায় অর্ধশতাধিক কিশোর গ্যাং গ্রুপ সক্রিয়। সেগুলোর মধ্যে বেশি আলোচনায় আসে কবজিকাটা গ্রুপ। তাদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে মানুষের কবজি বিচ্ছিন্ন করার ভিডিও দেখে মানুষ আঁতকে ওঠে। গ্রুপের প্রধান আনোয়ার হোসেনসহ বেশ কয়েকজন সহযোগীকে গ্রেপ্তারের পর তাদের তৎপরতা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে এলেক্স ইমন গ্রুপের কর্মকাণ্ড থেমে ছিল না। এই এলাকার কিশোর গ্যাংগুলোর মধ্যে আরও রয়েছে পাটালি গ্রুপ, বেলচা মনির, ডায়মন্ড, ধাক্কা দে, গ্রুপ টুয়েন্টি ফাইভ, মুরগি গ্রুপ, লাল গ্রুপ, টুন্ডা বাবু, লও ঠেলা, কালা রাসেল, ল্যাংড়া হাসান ইত্যাদি।
ভুক্তভোগী এলাকাবাসী জানান, মোহাম্মদপুরে সন্ধ্যা নামলেই বদলে যায় দৃশ্যপট। তিন রাস্তার মোড়, রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থান, চাঁদ উদ্যান, লাউতলা, নবীনগর হাউজিং, বসিলা চল্লিশ ফিট, কাঁটাসুর, তুরাগ হাউজিং, আক্কাস নগর, ঢাকা উদ্যান নদীর পাড়, চন্দ্রিমা হাউজিং, আদাবর, শেখেরটেক ও মনসুরাবাদ কিংবা রায়েরবাজার- সব জায়গায় একই চিত্র। সন্ধ্যার পর বাইরে বের হওয়া অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ। উঠতি বয়সি কিশোরদের কয়েকটি গ্রুপ প্রকাশ্যেই দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে জড়াচ্ছে। দিনদুপুরেও পথরোধ, মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এসএন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অনেক কিশোর গ্যাং সদস্য গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ছিল। কিন্তু পরে তারা জামিনে বেরিয়ে আবারও অপরাধে যুক্ত হচ্ছে। মোহাম্মদপুর ছাড়াও মিরপুর, পল্লবী, উত্তরা, বাড্ডা, ভাটারা, শাহজাহানপুর, রামপুরা, লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর, পুরাতন ঢাকা, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, শ্যামপুর, সূত্রাপুর এলাকার মানুষও কিশোর গ্যাংয়ের অত্যাচারে অতিষ্ঠ।’
র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, ‘সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের তালিকা প্রণয়ন ও তাদের শনাক্ত করতে র্যাবের সব ব্যাটালিয়ন কাজ করছে। পাশাপাশি এসব গ্যাংয়ের সদস্যদের পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করতেও প্রতিটি ব্যাটালিয়ন সমন্বিত কাজ করছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘আধিপত্য বিস্তার বা রাজনৈতিক স্বার্থে কিশোরদের ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। তরুণদের গঠনমূলক কাজে উৎসাহিত করতে হবে এবং অপরাধের বলয় থেকে বের করে আনতে হবে। কিশোর অপরাধ দমনে রাজনৈতিক মদদদাতাদেরও আইনের আওতায় আনা জরুরি।’
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পিপি ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, ‘অধিকাংশ কিশোর গ্যাংয়ের মামলা জামিনযোগ্য হওয়ায় দীর্ঘসময় তাদের আটক রাখা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষীর অভাবেও বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। শিশুদের জন্য পৃথক আদালত গঠন করলে এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব।’
ফ্যাসিস্ট আমলের সার ডিলারদের বাদ দিয়ে নতুন সার ডিলার নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার (২২ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় চিফ হুইপ নূরুল ইসলামের এ-সংক্রান্ত দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সংসদ নেতা এ প্রতিশ্রুতি দেন।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হয়।
প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ হওয়ার পর ফ্লোর নিয়ে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে সার সরবরাহের জন্য যে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তারা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে। ওই ডিলাররা সার উত্তোলন করছেন না এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘সংসদের পক্ষ থেকে আমি সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করব—সেই ডিলারদের বাতিল করে নতুন করে ডিলার নিয়োগ দেওয়ার জন্য, যাতে ফ্যাসিস্টরা বিচ্ছিন্ন হয় এবং কৃষকরা ন্যায্যমূল্যে সার পায়।’
এ সময় সংসদ সদস্যরা টেবিলে চাপড় দিয়ে তার বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানান।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান বলেন, ‘পুরো সংসদ বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছে। সংসদের সম্মতি থাকলে সরকার শিগগিরই এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে।’
অর্থপাচার ও দুর্নীতির শ্বেতপত্র
এদিকে ফ্যাসিস্ট আমলের অর্থপাচার ও দুর্নীতির পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশের কথাও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
সরকারদলীয় সংসদ সদস্য (মুন্সিগঞ্জ-৩) কামরুজ্জামানের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী আমলে সংঘটিত অর্থপাচার ও দুর্নীতির অনুসন্ধান করে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং এতে চিহ্নিত দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে গুরুত্বসহকারে উল্লেখ রয়েছে।’
তিনি আরও জানান, অর্থপাচারের গন্তব্য দেশগুলোর মধ্যে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১০টি দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও হংকং রয়েছে। এর মধ্যে মালয়েশিয়া, হংকং এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে সম্মতি মিলেছে। বাকি সাতটি দেশের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে যুদ্ধের জের ধরে হরমুজ প্রণালি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে ইরান। দেশটির ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) এর অনুমতি না পেয়ে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারছে না বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ১৯ এপ্রিল রাতে তুরস্কে এক বৈঠকে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদহকে জাহাজটির হরমুজ প্রণালি নিরাপদে পার হতে সহায়তার অনুরোধ করেছেন বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
এদিকে ক্যামেন আইল্যান্ডের পতাকাবাহী একটি জাহাজ সৌদি আরবের জুয়াইমাহ বন্দর থেকে অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড ওয়েল নিয়ে চট্টগ্রামে আসার কথা থাকলেও ইরানের অনুমতি না পাওয়ায় সেটিও আসতে পারেনি বলে জানা গেছে।
যদিও গত ১ এপ্রিল ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত হরমুজ প্রণালি পার হতে অনুমতির অপেক্ষায় থাকা বাংলাদেশি জাহাজকে সহায়তার কথা বলেছিলেন। এর আগে মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেছিলেন যে, বাংলাদেশসহ ৬টি দেশের জাহাজ চলাচল করতে পারবে।
এরপর দুই দফায় চেষ্টা করেও হরমুজ পার হতে ইরানি নৌবাহিনী ও আইআরজিসির অনুমতি না পেয়ে ৩৭ হাজার টন সারসহ এখন সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বন্দরের কাছে অবস্থান করছে বাংলার জয়যাত্রা।
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন বা বিএসসির মালিকানায় থাকা এই জাহাজটি সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান ভাড়ায় নিয়ে পরিচালনা করছে। তবে এর নাবিকদের সবাই বাংলাদেশি। জাহাজটি হরমুজ প্রণালি পার হয়ে সার নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন ও ডারবানে যাবার কথা ছিল।
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক অবশ্য বলেছেন যে, জাহাজটিকে হরমুজ পার করানোর জন্য ইরানের অনুমোদন পেতে কূটনৈতিক চ্যানেলে জোর তৎপরতা চলছে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে যে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সাথে ইরানের ঐতিহাসিক সহযোগিতামূলক সম্পর্ক থাকার পরেও বাংলাদেশি জাহাজকে হরমুজ পার হতে ইরান কেন বাধা দিচ্ছে।
এমন এক প্রশ্নের জবাবে সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলছেন, কোনো দেশে আক্রমণ বাংলাদেশ সমর্থন করে না- এই নীতিই বাংলাদেশ সবসময় অনুসরণ করে আসছিল কিন্তু এবার সেভাবে হয়নি বলেই হয়তো বিভ্রান্তির অবকাশ তৈরি হয়েছে।
জয়যাত্রাকে ইরান কেন বাধা দিচ্ছে
ঢাকায় কূটনৈতিক সূত্রগুলো যে ধারণা দিচ্ছে তা হলো ইরানে হামলার ঘটনা ও আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর বাংলাদেশ সরকারের বিবৃতি তেহরানকে ক্ষুব্ধ করেছে, যা ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত নিজেও বলেছেন। মূলত এ কারণেই ইরানের নৌ-বাহিনী হরমুজ পার হতে বাংলাদেশি জাহাজকে অনুমতি দিচ্ছে না বলেই মনে করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আক্রমণ করে এবং হামলার প্রথমদিনই নিহত হন দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং তার পরিবারের বেশ কয়েক জন সদস্য। এ ছাড়াও এই হামলায় ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানসহ উচ্চ পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে ইরান।
জবাবে পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরান সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে ‘মার্কিন সেনাঘাঁটি ও স্থাপনাগুলো’ লক্ষ্য করে হামলা চালায়।
এ অবস্থার মধ্যেই ১ মার্চ রোববার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি দেয়, যেখানে ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের ‘কয়েকটি দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে’ দাবি করে এর নিন্দা জানায় বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের ওই বিবৃতিতে কোথাও যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের নামও উল্লেখ করা হয়নি। সেই সঙ্গে ইরানে হামলার ঘটনায়ও কোনো নিন্দা জানানো হয়নি।
এ নিয়ে দেশের ভেতরে তীব্র সমালোচনা দেখা দিলে ২ মার্চ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাঁচ লাইনের আরেকটি বিবৃতি দিয়ে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন উল্লেখ করে ইরানের ‘ভ্রাতৃপ্রতিম’ জনগণের প্রতি শোক প্রকাশ করে।
ঢাকায় কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের খামেনির মৃত্যুর বিষয়ে যথাযথ শোক না জানানো ও দূতাবাসে শোক বইতে কোনো কর্মকর্তা গিয়ে স্বাক্ষর না করার ঘটনা ইরানিদের মধ্যে তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।
ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমী জাহানাবাদী বেসরকারি একটি টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজেই এ তথ্য জানিয়ে উষ্মা প্রকাশ করে বলেছেন, বাংলাদেশের বিবৃতিতে তেহরান সন্তুষ্ট নয়।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদহর সাথে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকের বিষয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি। এ ছাড়া ১ এপ্রিল দূতাবাসে এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর বাংলাদেশের দুই বিবৃতি নিয়ে ইরানের মনঃকষ্টের বিষয়টি প্রকাশ্যেই তুলে ধরেন।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রথম বিবৃতি:
জাহানাবাদী বলেন, বাংলাদেশ যে বিবৃতি দিয়েছে তাতে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করা হয়নি। এ সময় তিনি স্পেনের মত ইউরোপীয় দেশ ও আমেরিকার ভেতরে জনগণের যুদ্ধবিরোধী মিছিল ও সমালোচনার উদাহরণ দেন। সে আলোকে বাংলাদেশও সুস্পষ্ট অবস্থান নেবে বলে আশা করেন ইরানি রাষ্ট্রদূত।
রাষ্ট্রদূত অবশ্য তখনও এ ও জানান যে, বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী ৬ জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি দিয়েছে তেহরান। জালিল রাহিমী জাহানাবাদী বলেন, বাংলাদেশ জাতিসংঘ ও ওআইসির সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে ইরানে আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে নিন্দা জানাতে পারত।
এরপর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান গত ৫ এপ্রিল ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমী জাহানাবাদীর সঙ্গে বৈঠক করে বাংলার জয়যাত্রাসহ আরেকটি বাংলাদেশগামী অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে সহায়তা চান। রাষ্ট্রদূত জানান, এ বিষয়ে যথাযথ পর্যায়ে ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।
কিন্তু এর পরেও দুই দফায় চেষ্টা করেও হরমুজ পার হতে পারেনি বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজটি। ফলে ১৯ এপ্রিল তুরস্কে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আবারও বিষয়টি উত্থাপন করলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো বলছে, মূলত যুদ্ধকেন্দ্রিক বাংলাদেশের অবস্থানটিই ইরানকে ক্ষুব্ধ করেছে, যা এখন সামাল দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলছেন, পররাষ্ট্রনীতির একটা নৈতিক ভিত্তি থাকতে হয় এবং কোনো দেশ আক্রান্ত হোক বা আক্রমণের মুখে পড়লে সেটা বাংলাদেশ সমর্থন করে না।
‘বাংলাদেশের কোনো বিষয়ে অবস্থান প্রকাশের ক্ষেত্রে এ দুটো বিষয় মনে রাখা জরুরি। এর ব্যত্যয় হলেই বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠে। সব রাষ্ট্রেরই সার্বভৌমত্ব ও পারস্পারিক সম্মানকে গুরুত্ব দিতে হয়। এবার সেভাবে হয়নি বলেই হয়তো প্রশ্নটি উঠেছে,’ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
প্রসঙ্গত, ‘বাংলার জয়যাত্রা’ জাহাজটি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় প্রবেশ করে গত ২৬ জানুয়ারি। এরপর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বন্দরে পণ্য নিয়ে যায় জাহাজটি। পরে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি কাতারের একটি বন্দর থেকে প্রায় ৩৯ হাজার মেট্রিক টন স্টিল কয়েল নিয়ে দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দরে গিয়েছিল এমভি বাংলার জয়যাত্রা।
জাতীয় সংসদে বৃহত্তর নোয়াখালীকে দেশের একটি স্বতন্ত্র প্রশাসনিক বিভাগ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদ। আজ বুধবার সংসদের অধিবেশনে জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে আলোচনাকালে তিনি এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, বক্তব্যে তিনি এই অঞ্চলের সুদীর্ঘ ইতিহাস এবং প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেন।
আবদুল হান্নান মাসউদ তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, নোয়াখালীকে বিভাগে রূপান্তরিত করার লক্ষ্যে এই অঞ্চলের সর্বস্তরের মানুষ ১৯৯৪ সাল থেকে সুদীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলন চালিয়ে আসছে। তিনি বলেন, ভৌগোলিক অবস্থান, প্রাচীন ইতিহাস এবং স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কারণে এই জনপদের একটি বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। এই ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে নোয়াখালীকে বিভাগ হিসেবে ঘোষণা করা এখন সময়ের দাবি।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ব্রিটিশ আমলে এই অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনা করে একটি বিশাল বিমানঘাঁটি স্থাপন করা হয়েছিল। এছাড়া প্রাচীন ভুলুয়া নদীবন্দরটি তৎকালীন সময়ে দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। এসব নিদর্শনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি এই অঞ্চলের হারানো গৌরব ও বর্তমান প্রশাসনিক সক্ষমতার বিষয়টি সংসদকে অবহিত করেন।
দেশের সকল আন্দোলন-সংগ্রামে নোয়াখালীবাসীর বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করে হান্নান মাসউদ বলেন, খেলাফত আন্দোলন থেকে শুরু করে ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম, ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থানে এই অঞ্চলের মানুষের অংশগ্রহণ ও আত্মত্যাগ অনস্বীকার্য। প্রতিটি ঐতিহাসিক মুহূর্তে নোয়াখালীর সাহসী জনতা সম্মুখসারিতে থেকে নিজেদের সামর্থ্যের পরিচয় দিয়েছে।
তবে দীর্ঘকাল ধরে এই অঞ্চলটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও অবহেলার শিকার হয়ে আসছে বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেন এই সংসদ সদস্য। তিনি জানান, যথাযথ প্রশাসনিক কাঠামোর অভাবে এখানকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নাগরিক অধিকার ও উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই বঞ্চনা ও বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে নোয়াখালীকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি নতুন বিভাগ হিসেবে ঘোষণা করার জন্য তিনি সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান।
প্রাথমিক শিক্ষাকে ধাপে ধাপে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে বর্তমান সরকারের। একই সঙ্গে অবৈতনিক করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ নিয়ে গণসাক্ষরতা অভিযান আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী। গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরীর সঞ্চালনায় এ অনুষ্ঠান হয়।
৪ থেকে ১৩ বছর বয়সীদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষা করতে চান উল্লেখ করে ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘প্রাথমিক গ্রেড বাড়িয়ে অষ্টম পর্যন্ত নিয়ে যেতে চাই। এটা করব ধাপে ধাপে।’
ইউনেস্কোর কারিগরি সহযোগিতা নিয়ে অপতথ্য ও ভুল তথ্যের নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি কার্যকর ‘রোডম্যাপ’ তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউনেস্কোর প্রতিনিধি ড. সুসান ভাইজের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতকালে মন্ত্রী এ আগ্রহের কথা জানান। বুধবার (২২ এপ্রিল) সকালে সচিবালয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর দপ্তরে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। খবর বাসসের।
এ সময় ইউনেস্কোর প্রতিনিধি বাংলাদেশে সংস্থাটির চলমান কার্যক্রম সম্পর্কে মন্ত্রীকে বিস্তারিত জানান।
ড. সুসান ভাইজ গণমাধ্যম, সংশ্লিষ্ট নীতিমালা এবং বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠা ভুল তথ্য ও অপতথ্য রোধে ইউনেস্কোর ভূমিকা মন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন।
তিনি জানান, বর্তমানে অপপ্রচারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ‘ফ্যাক্ট-চেকিং’ বা তথ্য যাচাইয়ের ওপর ইউনেস্কো বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
ইউনেস্কোর এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তথ্যমন্ত্রী বলেন, গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইউনেস্কোর সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের যৌথভাবে কাজ করার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে।
তিনি প্রযুক্তির এই যুগে তথ্যের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ইউনেস্কোর অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে কাজে লাগানোর আহ্বান জানান।
ইউনেস্কো প্রতিনিধি এ বিষয়ে সরকারকে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
বৈঠকে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এবং সচিব মাহবুবা ফারজানাও উপস্থিত ছিলেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ফরিদা খানমকে ঢাকা জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিয়েছে সরকার।
বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের এ কর্মকর্তাকে ডিসি নিয়োগ দিয়ে বুধবার (২২ এপ্রিল) ও প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
অপর আদেশে ঢাকার ডিসি মো. রেজাউল করিমকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব হিসেবে বদলি করা হয়েছে।
জীবিকার সন্ধানে মালয়েশিয়া গিয়ে দীর্ঘ ২৭ বছর নিখোঁজ থাকার পর অবশেষে দেশে ফিরেছেন শরীয়তপুরের আমির হোসেন তালুকদার। মঙ্গলবার রাত ১২টা ২০ মিনিটে বাটিক এয়ারের একটি ফ্লাইটে তিনি ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। ৬২ বছর বয়সী আমির হোসেনকে বিমানবন্দরে গ্রহণ করেন তার ছেলে বাবু তালুকদার এবং ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কর্মীরা। প্রবাস জীবনের দীর্ঘ তিন দশক পর বাবাকে ফিরে পেয়ে পরিবারের সদস্যরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার বাসিন্দা আমির হোসেন ১৯৯৬ সালে রং মিস্ত্রির কাজ নিয়ে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন। প্রবাস জীবনের প্রথম তিন বছর তিনি পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন এবং নিয়মিত সংসার খরচ পাঠাতেন। কিন্তু এরপর হঠাৎ করেই তার যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দীর্ঘ ২৭ বছর পরিবারের কাছে তার কোনো হদিস না থাকায় স্বজনরা একপর্যায়ে আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন এবং ধরে নিয়েছিলেন যে তিনি হয়তো আর বেঁচে নেই।
সম্প্রতি মালয়েশিয়ার পেনাং এলাকার একটি গভীর জঙ্গলে জরাজীর্ণ এক টিনের ঘরে আমির হোসেনকে খুঁজে পান কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশি। উদ্ধারের সময় তিনি মানসিক ও শারীরিকভাবে ভারসাম্যহীন অবস্থায় ছিলেন। সেখানে অবস্থানরত প্রবাসী সাংবাদিক বাপ্পি কুমার দাস এবং প্রবাসী দীপুসহ অন্যদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় তার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে দেশে থাকা তার পরিবার সেই ভিডিও দেখে আমির হোসেনকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়।
বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম এবং মালয়েশিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে তাকে ট্র্যাভেল পাস প্রদান করে দেশে ফেরার আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর এভিয়েশন সিকিউরিটি ও প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের সহায়তায় তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে ব্র্যাকের উদ্যোগে তাকে শরীয়তপুরের গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘ সময় প্রতিকূল পরিবেশে বসবাসের ফলে আমির হোসেন বর্তমানে শারীরিকভাবে বেশ দুর্বল এবং মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় রয়েছেন। ব্র্যাকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তার উন্নত চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য তারা পাশে থাকবে। দীর্ঘ ২৭ বছর পর প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়াকে অলৌকিক হিসেবে দেখছেন তার স্বজন ও গ্রামবাসী। বর্তমানে তাকে নিজ বাড়িতে রেখে প্রয়োজনীয় সেবা-শুশ্রূষা দেওয়া হচ্ছে।