যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন আজ (৫ নভেম্বর)। লাখ লাখ আমেরিকান ডেমোক্রেটিক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস অথবা তার রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভোট দেবেন। ওয়াশিংটন থেকে প্রায় ১৩ হাজার ১১৯ কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশের পোশাক ব্যবসায়ীরা দেশটির নির্বাচনের ফলাফল নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন। কারণটি মূলত বাণিজ্যিক স্বার্থ।
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে তৈরি পোশাকের একক বৃহত্তম ক্রেতা। চীনের পর বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক প্রস্তুতকারক।
দেশের পোশাক নির্মাতারা মনে করছেন, বৈশ্বিক পোশাক বাজারের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীনকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি আগামীতে তাদের ব্যবসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া, ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকা আসার পর বাংলাদেশকে নিয়ে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) ও অন্যান্য বৈশ্বিক বাণিজ্য সংস্থার ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ।
দেশের পোশাক রপ্তানিকারকরা বলছেন, চীনের পণ্যে উচ্চ শুল্ক আরোপের বিষয়ে রিপাবলিকান প্রার্থী ট্রাম্পের পরিকল্পনা বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বাড়িয়ে দিতে পারে।
তবে তাদের আশঙ্কা, ট্রাম্পের শাসনামলে ডব্লিউটিওর মতো বহুপাক্ষিক বাণিজ্য সংস্থা সংকটে পড়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক রপ্তানি প্রতিযোগিতা আরও বাড়তে পারে।
গত বছর ১৫ দশমিক ৬২ শতাংশ শুল্ক দিয়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে আট দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলারের পোশাক পণ্য রপ্তানি করেছে।
ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান উভয় প্রশাসনের অধীনে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল আছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্য অনুসারে, ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ট্রাম্পের শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ১৭ শতাংশ থেকে ১৮ দশমিক ৯০ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করেছিল।
ডেমোক্র্যাটিক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের অধীনে তা খুব বেশি বাড়েনি। রপ্তানির হার ১৮ দশমিক ১২ শতাংশ থেকে ২১ দশমিক ১৫ শতাংশের মধ্যে থেকেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এক শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক মনে করেন, ট্রাম্পের চীনবিরোধী উদ্যোগে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশই লাভবান হবে। তার মতে, চীনা পণ্যে আরও শুল্ক ধরা হলে বাংলাদেশে কার্যাদেশ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।
বিজিএমইএর বর্তমান সভাপতি খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, চীনা পণ্যের ওপর ট্রাম্পের অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের কারণে ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক ক্রেতা বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের মতো দেশ থেকে পণ্য কিনছে। তিনি আরও বলেন, কমলা নির্বাচিত হলে চীনের জন্য বিদ্যমান মার্কিন শুল্ক বহাল থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব না পড়লেও রপ্তানি খুব বেশি বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
তবে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক মনে করেন, ট্রাম্প ও কমলার দৃষ্টিভঙ্গিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে।
ট্রাম্প নির্বাচিত হলে বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান ও ডব্লিউটিওর মতো সংস্থাগুলো চ্যালেঞ্জে পড়তে পারে।
আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ট্রাম্প হয়তো আরও চীনবিরোধী নীতি নিতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্র চীনা পণের ওপর আরও শুল্ক আরোপ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পরোক্ষভাবে লাভবান হতে পারে। চীন থেকে কার্যাদেশ বাংলাদেশে আসার সম্ভাবনা আছে।
তবে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও মৌলিক বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে দুর্বল করার ফলে চাহিদা কমে যেতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
র্যাপিড চেয়ারম্যানের ভাষ্য, গত তিন-চার বছর ধরে পোশাক পণ্যের চাহিদা কমছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশিরভাগ জি-২০ দেশ সংরক্ষণবাদী বাণিজ্যনীতি গ্রহণ করেছে।
তার আশঙ্কা, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় আসবে তখন চ্যালেঞ্জ আরও বাড়তে পারে। নিয়মতান্ত্রিক বাণিজ্য প্রভাবিত হতে পারে।
তার মতে, একটি গণতান্ত্রিক দেশ চরম ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা কমিয়ে দিতে পারে। সম্ভবত বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থা রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে বাংলাদেশ উপকৃত হবে।
তবে তিনি মনে করিয়ে দেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান স্বার্থ চীনকে নিয়ন্ত্রণ। আব্দুর রাজ্জাকের মতের সঙ্গে একমত পোষণ করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ। তিনি বলেন, ট্রাম্প আগের মেয়াদে চীনা পণ্যের ওপর প্রচুর শুল্ক আরোপ করেছিলেন। পুনর্নির্বাচিত হলে তিনি বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারেন। দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতি হওয়ায় জেনারেলাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্সেস (জিএসপি) পুনরুজ্জীবিত করতে বাংলাদেশের উচিত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা আবার শুরু করা।
২০০৪ সালে মাল্টি-ফাইবার অ্যারেঞ্জমেন্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে কোনো শুল্ক অগ্রাধিকার পায়নি।
২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প প্রশাসন চীনা পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার আগে চীনা রপ্তানিকারকদের পোশাক রপ্তানিতে তিন দশমিক শূন্য আট শতাংশ শুল্ক দিতে হতো।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) হংকংয়ে মন্ত্রী পর্যায়ের ঘোষণায় বলা হয়েছে, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সব পণ্যের শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দেওয়ার কথা যুক্তরাষ্ট্রের। অথচ দেশটি মাত্র ৯৭ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ৯৭ শতাংশ শুল্কমুক্ত ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করার কথা থাকলেও তা করা হয়নি।
চব্বিশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান বাংলাদেশে নতুন করে গণতান্ত্রিক চর্চার পথ খুলে দিয়েছে। দেশ এই মুহূর্তে একটি গণতান্ত্রিক ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়ার দিকে হাঁটছে।
শুক্রবার রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে আয়োজিত ‘বেঙল ডেল্টা কনফারেন্স ২০২৫’ -এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, আমরা পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ফিরতে চাই না। আমি আশা করি, তরুণরা এই বিষয়ে রাজনৈতিকভাবে সচেতন থাকবে।
মালয়েশিয়ার সাবেক শিক্ষামন্ত্রী অধ্যাপক মাজলি বিন মালিক বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ফিরে এসেছে। সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে সংলাপ করছে, এটি খুবই ভালো পদক্ষেপ।’
তিনি আরও বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী এসব সংস্কারের সিদ্ধান্ত শুধু বাংলাদেশের জন্য নয় বরং সারা বিশ্বের যে কোন দেশের অগ্রগতির জন্যই একটি লিটমাস টেস্ট হিসেবে বিবেচিত হবে।’
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যার-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক সিদ্ধার্থ ভারদারাজান বলেন, ‘বাংলাদেশ তার ভবিষ্যতের অর্থনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবছে।’
বাংলাদেশ নতুন ইতিহাস তৈরির পথে হাঁটছে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের ওপর আরোপ করা মার্কিন শুল্ক ইস্যুতে বাংলাদেশ যা করতে পেরেছে, তা নিঃসন্দেহে দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের দিকে ইঙ্গিত করে।
সম্প্রতি বাণিজ্য উপদেষ্টার নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করে বাংলাদেশের ওপর আরোপ করা মার্কিন শুল্ক সহনীয় পর্যায়ে কমিয়ে আনা হয়।
দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, মুক্তিযুদ্ধ থেকে আজ পর্যন্ত ইতিহাসের পরতে পরতে আমরা বারবার স্বপ্ন দেখেছি। কিন্তু আমরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি করতে পারিনি। এ কারণে বারবার আমাদের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে। আমরা আবারও রুখে দাঁড়িয়েছি স্বৈরাচারী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এবং নতুন করে স্বপ্ন দেখেছি।
মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী সময়ের অভ্যুত্থান নিয়ে তিনি বলেন, প্রতিবার নতুন স্বপ্ন দেখার পরই আমাদের ঐক্যে ফাটল ধরে, আর আমরা ব্যর্থ হই। চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছে।
নেপালের সাবেক মন্ত্রী ড. দীপক গাওয়ালি জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে বলেন, বাংলাদেশের তরুণরা যারা গণঅভ্যুত্থানে অংশ নিয়ে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছে, তাদেরকে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান। দুইদিন ব্যাপী বেঙ্গল ডেলটা কনফারেন্সের আয়োজন করেছে ঢাকা ইনস্টিটিউট অফ রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিক্স (দায়রা)।
উপদেষ্টা পরিষদের সভায় ‘গুম প্রতিরোধ, প্রতিকার ও সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। চূড়ান্ত অনুমোদন এখনও দেওয়া হয়নি; ভবিষ্যতে আরও আলোচনার পর এটি চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হবে।
আজ প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে উপদেষ্টা পরিষদের ৪০তম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস সভাপতিত্ব করেন।
পরে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, খসড়া অধ্যাদেশে গুমকে চলমান অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে মৃত্যুদণ্ডসহ কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। গোপন আটক কেন্দ্র ব্যবহার শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, অধ্যাদেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের ক্ষমতা প্রদান, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন, অভিযোগ গঠনের ১২০ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর সুরক্ষা, ক্ষতিপূরণ ও আইনগত সহায়তা নিশ্চিত করার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
শফিকুল আলম বলেন, ‘বাংলাদেশে যেন আর কোনো দিন গুম না হয়, সেই বিষয়ে সরকার কার্যকর আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। খসড়া অধ্যাদেশ প্রণয়নের সময় আন্তর্জাতিক ও জাতীয় মানবাধিকার সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের মতামত বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এটি দেশের মানবাধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করবে।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘আজকের অনুমোদন কেবল নীতিগত। চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য এটি ভবিষ্যতে আরও আলোচনার মাধ্যমে উপস্থাপন করা হবে। অধ্যাদেশ কার্যকর হলে ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারকে যথাযথ সুরক্ষা এবং প্রতিকার নিশ্চিত করা যাবে।’
সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার ও সিনিয়র সহকারী প্রেস সচিব ফয়েজ আহম্মদ উপস্থিত ছিলেন।
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পদমর্যাদাক্রম (ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স) নিয়ে দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শুনানির জন্য আগামী ৪ নভেম্বর দিন ধার্য করেছেন আপিল বিভাগ।
আপিল বিভাগের দেওয়া এ সংক্রান্ত রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে করা আবেদনের শুনানিতে লিভ মঞ্জুর (আপিলের অনুমতি) আজ জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন ছয় বিচারপতির আপিল বিভাগ বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
আদালতে রিভিউ আবেদনকারী মন্ত্রিপরিষদ সচিবের পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী সালাহ উদ্দিন দোলন শুনানি করেন। রিট আবেদনকারীর পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী প্রবীর নিয়োগী ও নিহাদ কবির। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলদের পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী আহসানুল করিম। আর আদালতে ইন্টারভেনর হিসেবে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী ১৯৮৬ সালে ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স তৈরি করে।
রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর, ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর তা জারি করা হয়। পরে বিভিন্ন সময়ে তা সংশোধন করা হয়।
তবে ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স তৈরির ক্ষেত্রে সাংবিধানিক পদ, সাংবিধান কর্তৃক স্বীকৃত ও সংজ্ঞায়িত পদগুলো প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের নিচের ক্রমিকে রাখা হয়েছে বলে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক মহাসচিব মো. আতাউর রহমান ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০০৬ সালে হাইকোর্টে রিটটি করেন।
২০১০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট আট দফা নির্দেশনাসহ ১৯৮৬ সালের ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স (সংশোধিত) অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে রায় দেন।
এ রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ ২০১১ সালে আপিল করে। সে আপিলের শুনানি শেষে ২০১৫ সালের ১১ জানুয়ারি রায় দেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
এই রায়ে হাইকোর্টের দেয়া আট দফা নির্দেশনার কিছুটা সংশোধন করে তিন দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়। সেগুলো হলো:-
১. যেহেতু সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন, তাই বিরোধপূর্ণ প্রিসিডেন্সে সাংবিধানিক পদধারীরা অগ্রাধিকার পাবেন।
২. জুডিশিয়াল সার্ভিসের সদস্য হিসেবে জেলা জজ ও সমপদমর্যাদাসম্পন্নরা সরকারের সচিবদের সঙ্গে ১৬ নম্বরে অবস্থান করবেন।
৩. জেলা জজদের পরেই অতিরিক্ত সচিবেরা ১৭ নম্বর ক্রমিকে থাকবেন।
এক পর্যায়ে আপিল বিভাগের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। পরবর্তীতে রিভিউ আবেদনে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলরা পক্ষভুক্ত হয়।
যৌথ আলোচনার দলিল স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের ৪ দিনব্যাপী (২৫-২৮ আগস্ট) ৫৬তম সীমান্ত সম্মেলন আজ শেষ হয়েছে।
সম্মেলনে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী এর নেতৃত্বে ২১ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল অংশগ্রহণ করেন। বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলে বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ ছাড়াও মাননীয় উপদেষ্টার কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়, সড়ক বিভাগ, ভূমি জরিপ অধিদপ্তর, যৌথ নদী কমিশন এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণও প্রতিনিধিত্ব করেন। অপরদিকে, বিএসএফ মহাপরিচালক শ্রী দালজিৎ সিং চৌধুরী, আইপিএস এর নেতৃত্বে ১১ সদস্যের ভারতীয় প্রতিনিধিদল সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। ভারতীয় প্রতিনিধিদলে বিএসএফের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ ছাড়াও ভারতের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনের কর্মকর্তাগণও অন্তর্ভূক্ত ছিলেন।
সম্মেলনের আলোচ্য বিষয়ের উপর ভিত্তি করে আলোচনার সারসংক্ষেপ নিম্নে প্রদত্ত হল :
ক. বিজিবি মহাপরিচালক সীমান্তে বিএসএফ ও ভারতীয় নাগরিক কর্তৃক নিরীহ বাংলাদেশি নাগরিকদেরকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা ও আহতের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। জবাবে বিএসএফ মহাপরিচালক সীমান্তে অতিরিক্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় রাতের বেলায় টহল জোরদার করে সীমান্ত হত্যার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে সে ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি পূনর্ব্যক্ত করেন। উভয় পক্ষ যৌথভাবে সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়নমূলক কর্মসূচি গ্রহণ, সীমান্তের অলঙ্ঘনীয়তা সম্পর্কে প্রেষণা প্রদান এবং অপরাধীদের আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম প্রতিরোধের মাধ্যমে এ ধরনের আক্রমণ, নির্যাতন ও হামলার ঘটনা শূন্যে নামিয়ে আনার বিষয়ে উভয় পক্ষ সম্মত হয়।
খ. বিজিবি মহাপরিচালক বিএসএফ কর্তৃক অবৈধভাবে বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ, ভারতীয় নাগরিক ও বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিক (FDMN) বাংলাদেশে পুশইনের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণের আহ্বান জানান। বিএসএফ মহাপরিচালক ভারতে অবৈধভাবে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদেরকে পারস্পরিকভাবে সম্মত প্রক্রিয়া অনুযায়ী ফেরত পাঠানোর আশ্বাস দেন।
গ. সীমান্ত দিয়ে মাদক, অস্ত্র-গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক দ্রব্য, স্বর্ণ, জাল মুদ্রা নোট (FICN) এবং অন্যান্য চোরাচালান প্রতিরোধে ‘সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (Coordinated Border Management Plan-CBMP)’এর গুরুত্ব তুলে ধরে উভয় পক্ষ পাচার ও পাচারকারীদের রিয়েল-টাইম তথ্য শেয়ার এবং অধিক সতর্কতার মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে সতর্ক ও দৃঢ় থাকার বিষয়ে একমত হয়।
ঘ. উভয় পক্ষ সীমান্তবর্তী জনগণকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালান, মানবপাচার, সীমান্ত স্তম্ভ উপড়ে ফেলা ও অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধ থেকে বিরত রাখার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে একমত হয়। সার্বিকভাবে উভয় পক্ষ সীমান্তের অলঙ্ঘনীয়তা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে।
ঙ. উভয় পক্ষ সীমান্ত শূন্যরেখা থেকে ১৫০ গজের মধ্যে পূর্ব অনুমোদন ছাড়া কোনো উন্নয়নমূলক কাজ না করার পাশাপাশি সীমান্তবর্তী এলাকায় চলমান উন্নয়নমূলক কাজগুলো দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়ে একমত হয়। এছাড়া যৌথ নদী কমিশন কর্তৃক অনুমোদিত নদীর তীর সংরক্ষণ কাজ সহজতর করা এবং সীমান্তবর্তী অভিন্ন নদীগুলোতে অননুমোদিত কাজ বন্ধ রাখার ব্যাপারে একমত হয়।
চ. ‘কানেক্টেড বাংলাদেশ’ প্রকল্পের আওতায় তিনবিঘা করিডরের মাধ্যমে দহগ্রামকে সংযুক্ত করার জন্য অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক স্থাপনের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়ে বিএসএফ মহাপরিচালক ভারতের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/সংস্থার কাছে উপস্থাপন করে তা সমাধানের আশ্বাস দেন।
ছ. উভয় প্রতিনিধিদল আন্তঃসীমান্তে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী অবস্থান করলে সে ব্যাপারে ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন এবং রিয়েল-টাইম তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে একমত হন।
জ. বিজিবি মহাপরিচালক ফেনীর মুহুরীর চর এলাকায় স্থায়ী সীমান্ত পিলার নির্মাণ এবং ইছামতি, কালিন্দী, রায়মঙ্গল ও হারিয়াভাঙ্গা নদী এলাকায় সীমান্ত রেখা নির্ধারণের কাজ সম্পন্নের ব্যাপারে জোর তাগিদ দেন। বিএসএফ মহাপরিচালক এ বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/সংস্থার কাছে উপস্থাপন করে তা সমাধানের আশ্বাস দেন।
ঝ. উভয় পক্ষ কোনো ধরনের আকাশসীমা লঙ্ঘন না করার বিষয়ে একমত হয়। ভবিষ্যতে যাতে কোনো ভুল বোঝাবুঝি না ঘটে সেজন্য পূর্বনির্ধারিত ফ্লাইট সম্পর্কে রিয়েল-টাইম তথ্য শেয়ারের মাধ্যমে পরস্পরকে অবহিত করার বিষয়ে সম্মতি জানায়।
ঞ. উভয় পক্ষ নিজ নিজ দেশের গণমাধ্যমে পরস্পর বিরোধী বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার /গুজব ছড়িয়ে সীমান্তে যাতে কোনো উত্তেজনা সৃষ্টি না হয় সে ব্যাপারে উভয় দেশের গণমাধ্যমকে পরামর্শ প্রদানের বিষয়ে একমত হয়।
উভয় মহাপরিচালক সম্মেলনের ফলাফলে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁরা সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে যৌথভাবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৪৩০ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ সময়ের মধ্যে কেউ মারা যাননি। চলতি বছর এখনো পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ১১৮ জনের এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৯ হাজার ৯৪৪ জন।
গতকাল বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের দেওয়া তথ্য থেকে এসব জানা যায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, আগস্টে এখন পর্যন্ত ৮ হাজার ৯৬৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মারা গেছেন ৩৫ জন। সারাদেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে বর্তমানে ১ হাজার ৪২৬ জন ডেঙ্গুরোগী ভর্তি আছেন। তাদের মধ্যে ঢাকায় ৪৭৮ জন, বাকি ৯৪৮ জন ঢাকার বাইরে বিভিন্ন বিভাগের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ১ হাজার ১৬১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৩৭৪ জন, মার্চে ৩৩৬ জন, এপ্রিলে ৭০১ জন, মে-তে ১ হাজার ৭৭৩ জন , জুনে ৫ হাজার ৯৫১ জন এবং জুলাইয়ে ১০ হাজার ৬৮৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ১০ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৩ জন, এপ্রিলে ৭ জন, মে-তে ৩ জন, জুনে ১৯ জন এবং জুলাইয়ে ৪১ জন মারা গেছেন।
এদিকে সম্প্রতি আগামী সেপ্টেম্বরে উচ্চ আর্দ্রতা ও অবিরাম বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানা গেছে। রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়বে বলে আশঙ্কা জানানো হয়েছে ডেঙ্গু পরিস্থিতির পূর্বাভাস-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে।
সম্প্রতি রাজধানীর গুলশানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ‘ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া সংলাপ আগস্ট ২০২৫: প্রতিরোধ, প্রস্তুতি ও নিরসন’ শীর্ষক সমন্বয় সভায় এই ডেঙ্গু পরিস্থিতির পূর্বাভাস প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আগস্টে টানা বৃষ্টি হওয়ায় ও বিগত বছরের অভিজ্ঞতা অনুসারে সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এতে হাসপাতালগুলোতে ভর্তির চাপও বাড়তে পারে। তবে অক্টোবরে বর্ষা শেষে সংক্রমণ কমার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও দ্বিতীয় দফায় প্রাদুর্ভাব চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। এ সময়ও লার্ভিসাইডিং ও স্যানিটেশন কার্যক্রম জোরদার রাখার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সভায় মশক নিয়ন্ত্রণে প্রতিবন্ধকতার বিষয়ে বলা হয়েছে, জনগণের সচেতনতার অভাব, সঠিকভাবে কীটনাশক প্রয়োগ না করা ও অপর্যাপ্ত সরকারি উদ্যোগ এ জন্য দায়ী। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পানি নিষ্কাশন সমস্যা ও আবহাওয়ার প্রভাবেও মশার বংশবিস্তার বাড়ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতা ও ফগিংনির্ভর ভ্রান্ত ধারণা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড় ঘিরে উসকানিমূলক কার্যক্রমের চিহ্ন দেখামাত্র ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের তিন উপদেষ্টা।
গতকাল বুধবার রেলভবনে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ঐতিহ্যবাহী চন্দ্রনাথধাম (কাঞ্চননাথ-চন্দ্রনাথ-আদিনাথ) স্রাইন কমিটির নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে এই নির্দেশ দেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার এবং ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে স্রাইন কমিটির নেতারা জানান, পাঁচ বছর ধরে মন্দির ঘিরে বিভিন্ন ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড দেখা যাচ্ছে। সম্প্রীতির পরিবেশ নষ্টের অপচেষ্টা চলছে।
তাৎক্ষণিকভাবে বৈঠক থেকে তিন উপদেষ্টা মাঠ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের এ ব্যাপারে সজাগ থাকার নির্দেশ দেন। কোনো ধরনের উসকানির চিহ্ন দেখলে সঙ্গে সঙ্গে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
পাহাড়ে অবস্থিত মন্দিরে যাতায়াতের জন্য সিঁড়ির সংস্কার প্রয়োজন বলে জানান কমিটির সদস্যরা। স্রাইন কমিটির সভাপতি অপূর্ব কুমার ভট্টাচার্য বলেন, সিঁড়ি এখন খুব একটা ভালো অবস্থায় নেই। দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
এই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে তাৎক্ষণিকভাবে চট্টগ্রামের স্থানীয় সরকার সচিব রেজাউল মাকছুদ জাহেদীকে ফোন করে সিঁড়ি সংস্কারের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বলেন উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান।
বৈঠকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার বলেন, ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি নির্বিশেষে অন্তর্বর্তী সরকার সবার জন্য বৈষম্যহীন সমাজে নির্মাণে কাজ করছে।
ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, ‘অন্য ধর্মের স্থাপনার ওপর যারা আক্রমণ করে, তারা কোনোভাবেই ধার্মিক হতে পারে না। এটা অপরাধ। এ কাজে কোনো ধর্ম নেই, অধর্ম রয়েছে। ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্টের কোনো ধরনের চেষ্টা হলে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নেব। আমি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আহ্বান জানাই আপনারা নায্য দাবিদাওয়াগুলো মন্ত্রণালয়ে হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট বরাবর পাঠান, আমরা উপযুক্ত ব্যবস্থা নেব।’
রেল উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘চন্দ্রনাথ মন্দিরের সঙ্গে ইতিহাস, ঐতিহ্য জড়িত। আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হয় এমন কোনো উসকানিমূলক কার্যক্রম বরদাশত করা হবে না। কোনো ধরনের উসকানির চিহ্ন দেখলে সঙ্গে সঙ্গে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ বলেছেন, "৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের কারণেই আমরা আজ স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েছি, আর ২৪ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে আমাদের গণতান্ত্রিক ধারা আরও সুদৃঢ় হবে। কিন্তু দীর্ঘ ১৫ বছরের দুঃশাসন এক-দুই বছরে দূর করা সম্ভব নয়। আগামী নির্বাচন আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।"
তিনি আরও বলেন, "আমরা একটি নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছি, তাই সকলের প্রতি অনুরোধ থাকবে—নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যেন কোনো ধরনের সহিংসতা না ঘটে। সহিংসতা হলে নির্বাচন প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে, গণতন্ত্র বিপন্ন হবে। একটি শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনই আমাদের মূল লক্ষ্য।"
আজ (২৭.০৮.২৬) বুধবার বিকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার নাসিরাবাদ গ্রামে নদীভাঙন এলাকা পরিদর্শন এবং স্থানীয়দের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
নদীভাঙন প্রসঙ্গে শারমীন এস মুরশিদ বলেন, "মেঘনা নদীর ভাঙনে শত শত পরিবার ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও জীবিকার সহায়-সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে। মসজিদ, মাদ্রাসা ও বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পথে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রশাসনকে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।"
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি মব জাস্টিস ও সাইবার অপরাধ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, "মব জাস্টিসের পেছনে অন্যতম বড় কারণ হলো ভুল তথ্য ছড়ানো—আর এর জন্য মোবাইল এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের অপব্যবহার দায়ী। সাইবার অপরাধ একটি নতুন চ্যালেঞ্জ, এটি সরকার একা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। তরুণ সমাজকে আইটি সেক্টরে দক্ষ হতে হবে এবং এই অপরাধ রোধে এগিয়ে আসতে হবে।"
অবৈধ বালু উত্তোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "প্রশাসনের একার পক্ষে এটি বন্ধ করা সম্ভব নয়। স্থানীয় জনগণকে বালুখেকোদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।"
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন উপদেষ্টার একান্ত সচিব তারেক মোহাম্মদ জাকারিয়া, বাংলাদেশ হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি (পূর্ব বিভাগ) মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান খাঁন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক দিদারুল আলম, পুলিশ সুপার এহতেশামুল হক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আবু মোছা, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুর রহমান, নবীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাজিব চৌধুরী, সহকারী পুলিশ সুপার (নবীনগর সার্কেল) পিয়াস বসাক, সহকারী কমিশনার (ভূমি) খালেদ বিন মনসুর, নবীনগর থানার ওসি শাহিনুর ইসলাম এবং নবীনগর প্রেসক্লাব সভাপতি মোহাম্মদ হোসেন শান্তি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কর্মপরিকল্পনা (রোডম্যাপ) আগামীকাল বৃহস্পতিবার ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।
আজ বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের মিডিয়া সেন্টারে এক ব্রিফিংয়ে সচিব সাংবাদিকদের এ কথা জানান।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব বলেন, ‘আমরা যে কর্মপরিকল্পনা (রোডম্যাপ) করেছি, সে কর্মপরিকল্পনাটা আপনাদের জানাবো। আমি ঢাকার বাইরে থাকায় একটু পিছিয়ে পড়েছি। এটা আমার টেবিলে এখন আছে। আগামীকাল পর্যন্ত একটু অপেক্ষা করেন।’
এদিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে চার নির্বাচন কমিশনার ও ইসি সচিব আজ এক বৈঠকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কর্মপরিকল্পনা (রোডম্যাপ) অনুমোদন করেছে কমিশন।
এখন যেকোনো সময় নির্বাচনের এই রোডম্যাপ আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হতে পারে বলে ইসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে একজন নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘কর্মপরিকল্পনার সবকিছু চূড়ান্ত হয়ে গেছে। অনুমোদন হয়েছে, এখন শুধু টাইপিং চলছে।’
উল্লেখ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ইসির পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে দল নিবন্ধন, সীমানা নির্ধারণ, নির্বাচন পর্যবেক্ষক, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংস্কার, বিধিমালা ও নীতিমালা জারি, প্রবাসীদের জন্য আইটি সাপোর্টেড নিবন্ধন ও পোষ্টাল ব্যালট পদ্ধতি ও নির্বাচনী সরঞ্জাম কেনাকাটা বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে রোডম্যাপে।
রাজধানীর জোয়ার সাহারা মৌজায় দুটি মসজিদ ও একটি মন্দিরের জন্য জমি বরাদ্দ প্রদান করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
বুধবার (২৭ আগস্ট) রেলভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে উক্ত মসজিদ ও মন্দিরের পরিচালনা কমিটির নিকট বরাদ্দপত্র তুলে দেন ঢাকার বিভাগীয় রেলওয়ে ম্যানেজার মো: মহিউদ্দিন আরিফ।
বরাদ্দপ্রাপ্ত মসজিদ ও মন্দিরের মধ্যে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থানাধীন জোয়ার সাহারা মৌজায় খিলক্ষেত রেলওয়ে জামে মসজিদের জন্য ০.২০১১ একর (৮৭৬০ বর্গফুট), একই মৌজায় আন-নূর-জামে মসজিদের জন্য ০.০৫৫২ একর (২৪০৫ বর্গফুট) এবং খিলক্ষেত থানাধীন একই মৌজায় খিলক্ষেত সার্বজনীন শ্রী শ্রী দূর্গা মন্দিরের জন্য ০.০৫৬২ একর (২৪৫০ বর্গফুট) জমি বরাদ্দ প্রদান করা হয়। বাংলাদেশ রেলওয়ের নির্ধারিত প্রতীকী মূল্যের বিনিময়ে এসব জমি বরাদ্দ প্রদান করা হয়।
বরাদ্দপত্র হস্তান্তরের জন্য আয়োজিত এ অনু্ষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ে নিযুক্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারি ড. শেখ মইনউদ্দিন, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব মোহাম্মদ শফিকুল আলম, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: ফাহিমুল ইসলাম, বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো: আফজাল হোসেন, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব এড. গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক, মসজিদ ও মন্দির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, খিলক্ষেত এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং রেলপথ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বলেন, বাংলাদেশ ধর্মীয় সম্প্রীতির দেশ। ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সকল ধর্মেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার কথা বলা হয়েছে। কেউ এই সম্প্রীতি বিনষ্ট করার চেষ্টা করলে তাকে কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না। তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রেলওয়ের জমি মসজিদ ও মন্দিরকে বরাদ্দ দেওয়াকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য নজির হিসেবে উল্লেখ করে ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের রোল মডেল। তারপরও বিভিন্ন সময়ে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে থাকে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কিংবা উপাসনালয়গুলোকে যারা অপবিত্র করতে চায় তাদের ধর্মীয় কোন পরিচয় নেই, তারা দুষ্কৃতকারী, ক্রিমিনাল। তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের বেহাত হয়ে যাওয়া দেবোত্তর সম্পত্তি যেগুলো নিয়ে আদালতে কোন মামলা-মোকদ্দমা নেই এরূপ সম্পত্তি উদ্ধারে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বাংলাদেশ রেলওয়ের এই উদ্যোগের ভুয়সী প্রশংসা করেন। বরাদ্দপত্র হস্তান্তর শেষে একটি প্রেস ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হয়। ব্রিফিং শেষে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব মোহাম্মদ শফিকুল আলম উপস্থিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কর্মপরিকল্পনা (রোডম্যাপ) অনুমোদন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
যে কোনো সময় এই নির্বাচনের রোডম্যাপ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করতে পারে ইসি।
আজ বুধবার দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন, চার নির্বাচন কমিশনার ও ইসি সচিব এ নিয়ে বৈঠকও করেছেন।
বৈঠকে কর্মপরিকল্পনার (রোডম্যাপ) অনুমোদন দিয়েছে কমিশন। এখন, যে কোনো সময় নির্বাচনের এই রোডম্যাপ আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হতে পারে বলে ইসি’র কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘কর্মপরিকল্পনার সবকিছু চূড়ান্ত হয়ে গেছে। অনুমোদন হয়েছে, এখন শুধু টাইপিং চলছে।’
এদিকে সংসদীয় আসনের পুনঃনির্ধারিত সীমানার বিষয়ে ইসি’র শুনানি আজ বিকেলে শেষ হচ্ছে।
শুনানি শেষে বিকেলে সার্বিক বিষয় নিয়ে ইসি’র সিনিয়র সচিব আকতার আহমেদের ব্রিফিং করার কথা রয়েছে।
এ বিষয়ে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ‘আমরা ব্রিফিংয়ে আসব। তখন সীমানার শুনানির বিষয়টির পাশাপাশি এ বিষয়টিও (রোডম্যাপ) দেখা যাবে।’
এর আগে গত বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে চার নির্বাচন কমিশনার ও ইসি কর্মকর্তা বৈঠক করেন।
ওই দিন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেছিলেন, বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনার বিষয়ে ইসি সচিব ব্রিফ করবেন।
গত ১৮ আগস্ট ইসি’র সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানিয়ে ছিলেন, ‘একটা কর্মপরিকল্পনার (নির্বাচনী রোডম্যাপ) বিষয়ে বলেছিলাম, আমরা এই সপ্তাহে এটা করবো। কর্মপরিকল্পনার তো আমাদের আন্তঃঅনুবিভাগ সম্পর্কিত এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো নিয়ে। কর্মপরিকল্পনার ড্রাফ্ট করা হয়েছে। ড্রাফ্টটি এখন কমিশনে দিয়ে আমরা অ্যাপ্রুভ করবো।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের পরিবারকে দেওয়া এককালীন অনুদান ও মাসিক ভাতা স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান এবং বাবা-মায়ের মধ্যে সমান তিন ভাগে বণ্টনের বিধান রেখে নতুন বিধিমালা জারি করেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
সরকারি সহায়তাকে কেন্দ্র করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অনেক শহীদ পরিবারের স্বামী-স্ত্রী, সন্তান ও বাবা-মায়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেওয়ার প্রেক্ষাপটে সরকার বণ্টনের এই পদ্ধতি নির্ধারণ করে দিল।
সমস্যা সমাধানে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং জুলাইযোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন বিধিমালা, ২০২৫’ জারি করেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সহায়তা নিয়ে শহীদ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিভিন্ন দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। এসব দ্বন্দ্ব মেটাতে হয়রান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। প্রতিনিয়তই এ বিষয়ে বিচার-সালিশ আসছে। এমনকি শহীদদের উত্তরাধীকারীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেওয়ায় সহায়তা কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটার পাশাপাশি বিলম্ব হচ্ছে বলেও জানান তারা।
এই প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় যার যার ধর্মীয় উত্তরাধিকার আইন মেনে সহায়তার এককালীন অর্থ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া শুরু করেন। কিন্তু পরিবারের অনেক সদস্য এটি মানছিলেন না। যেহেতু অনুদান-ভাতার অর্থ উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কোনো সম্পদ নয়, তাই এটি কেন ধর্মীয় উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী বণ্টন করা হচ্ছে— এমন প্রশ্ন ওঠে। এ পরিস্থিতিতে বিধিমালা করে সহায়তার অর্থ বণ্টন করার পদ্ধতি নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেয় মন্ত্রণালয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের ‘জুলাই শহীদ’ ও আহতদের ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে সরকার। সরকারিভাবে জুলাই শহীদ পরিবারকে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে ৩০ লাখ টাকা দেওয়া হচ্ছে। গত অর্থবছরে (২০২৪-২০২৫) ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র দেওয়া হয়েছে। বাকি ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র চলতি (২০২৫-২০২৬) অর্থবছরে দেওয়া হচ্ছে। গত জুলাই থেকে শহীদ পরিবারকে মাসিক ২০ হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়ার কথা জানায় সরকার। এ পর্যন্ত ৮৪৪ জন শহীদের গেজেট প্রকাশিত হয়েছে, পরে অবশ্য আটজনের গেজেট বাতিল করা হয়।
গত ৭ আগস্ট উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকেও সরকারি এসব সহায়তা নিয়ে শহীদ পরিবারের মধ্যে দ্বন্দ্বের বিষয়টি আলোচিত হয়। বৈঠকে এ বিষয়ে একটি বিধিমালা করে দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘জুলাই শহীদদের পরিবারের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব দেখছি, শহীদদের জন্য যে সম্মানী দেওয়া হচ্ছে সেটা নিয়ে। কে টাকাটা পাবেন তা নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব হচ্ছে। এজন্য একটি বিধি করে দেওয়া হবে। কে কতটুকু অংশ পাবে সেটা বিধিতে উল্লেখ করা হবে। এ বিষয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে জানতে পারবেন।’
এ বিষয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মশিউর রহমান ইউএনবিকে বলেন, ‘শহীদ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সহায়তার অর্থ কীভাবে বণ্টন করা হবে সেটি বিধিমালয় উল্লেখ করা হয়েছে। আগে অনুদানের প্রথম কিস্তির যে অর্থ বণ্টন করা হয়েছে সেটি বিধিমালা অনুযায়ী সমন্বয়ের চেষ্টা করা হবে। অনুদানের বড় অংশটি চলতি অর্থবছরে বিতরণ করা হবে; এটি বিধিমালা অনুযায়ী হবে। এই অর্থ বিতরণের কাজটি করছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘নতুন বিধিমালা জারি হওয়ার মাধ্যমে জুলাই শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের সহায়তা ও পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে আমরা একটি গাইডলাইন পেলাম। প্রাথমিকভাবে কোনো বিধি-বিধান না থাকায় আমরা ধর্মীয় উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী শহীদ পরিবারকে সহযোগিতা দেওয়া শুরু করেছিলাম। এখন বিধিমালা অনুযায়ী সহযোগিতার কার্যক্রম চলবে।’
জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারের সদস্য হিসেবে শহীদদের স্বামী বা স্ত্রী, ঔরসজাত বা গর্ভজাত সন্তান এবং মাতা ও পিতার মধ্যে সরকারের দেওয়া আর্থিক সহায়তা তিন ভাগে বণ্টন করতে হবে বলে বিধিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।
শহীদের স্বামী বা স্ত্রী আর্থিক সহায়তার এক-তৃতীয়াংশ পাবেন। তবে একাধিক স্ত্রী থাকলে আর্থিক সহায়তা সমানভাবে বণ্টন করতে হবে।
শহীদের ঔরসজাত বা গর্ভজাত সন্তানও আর্থিক সহায়তার এক-তৃতীয়াংশ পাবেন। তবে একাধিক সন্তান থাকলে আর্থিক সহায়তা সমানভাবে বণ্টন করতে হবে।
বিধিমালায় বলা হয়েছে, শহীদের বাবা-মা আর্থিক সহায়তার এক-তৃতীয়াংশ পাবেন। তবে মা ও বাবার অনুকূলে দেওয়া আর্থিক সহায়তা সমানভাবে বণ্টন করতে হবে। আবার মা ও বাবার মধ্যে কোনো একজনের অবর্তমানে অপরজন আর্থিক সহায়তা উভয়ের সম্মিলিত অংশ অর্থাৎ এক-তৃতীয়াংশই পাবেন। তবে যদি শহীদের স্বামী বা স্ত্রী না থাকে তবে স্বামী বা স্ত্রীর জন্য নির্ধারিত আর্থিক সহায়তার অংশটি শহীদের সন্তান ও বাবা মায়ের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ হবে।
তবে সন্তান না থাকলে সন্তানের সহায়তার অংশটি স্বামী বা স্ত্রী এবং বাবা-মায়ের মধ্যে সমানভাবে ভাগ হবে। আর যদি বাবা-মা না থাকেন, তবে বাবা-মায়ের অংশ স্বামী বা স্ত্রী এবং সন্তানদের মধ্যে সমানভাগে ভাগ হবে।
এ ছাড়া কোনো অবিবাহিত ব্যক্তি শহীদ হলে তার জন্য প্রদত্ত আর্থিক সহায়তা তার বাবা-মায়ের মধ্যে সমানভাগে ভাগ করতে হবে। তবে বাবা ও মায়ের মধ্যে যেকোনো একজনের অবর্তমানে অপরজন সম্পূর্ণ আর্থিক সহায়তা পাবেন বলে বিধিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।
বিধিমালায় বলা হয়েছে, জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারের মাসিক ভাতা সহায়তাপ্রাপ্ত কোনো সদস্য মারা গেলে মারা যাওয়ার তারিখ থেকে ভাতার অবসান ঘটবে। পরবর্তী সময়ে এ ভাতা শহীদ পরিবারের অন্য কোনো সদস্য দাবি করতে পারবেন না।
শহীদের স্বামী বা স্ত্রী অন্যত্র বিয়ে করলে বিয়ে হওয়ার তারিখ থেকে তার মাসিক অনুদান বা ভাতার অংশের অবসান ঘটবে। পরিবারের অন্য কোনো সদস্য এই ভাতা পাবেন না।
এককালীন সহায়তা গ্রহণের আগে জুলাই যোদ্ধা মারা গেলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে তা তিন ভাগে ভাগ করতে হবে। শহীদ পরিবারের মতো এক্ষেত্রে একই নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। একই সঙ্গে জুলাই যোদ্ধা মারা গেলে তার মাসিক ভাতার অংশের অবসান ঘটবে বলেও বিধিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।
বিধিমালায় জানানো হয়েছে, যদি কোনো জুলাই যোদ্ধা অভ্যুত্থানের সময় এক বা একাধিক শারীরিক আঘাতজনিত কারণে অতি গুরুতর হয়ে অব্যাহতভাবে দেশে বা বিদেশে কোনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় মারা যান, তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ হিসেবে গণ্য হবেন এবং তার পরিবার সুযোগ-সুবিধা পাবে বলে বিধিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যরা এককালীন ৩০ লাখ টাকা সমমূল্যের পরিবার সঞ্চয়পত্র পাওয়ার অধিকারী হবেন। তবে যদি তিনি আহত হিসেবে এককালীন আর্থিক সহায়তা নেন, সেই অংশ কেটে রাখা হবে। একই সঙ্গে তার পরিবার শহীদ পরিবারের মতো মাসে ২০ হাজার টাকা ভাতা পাবেন।
সব সরকারি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সরকারি ক্লিনিক বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং সরকার নির্ধারিত বিশেষায়িত হাসপাতাল সব শ্রেণির আহত জুলাই যোদ্ধাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেবে।
চিকিৎসা সহায়তা নিতে হাসপাতাল, ক্লিনিক বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কোনো লিখিত আবেদন করার প্রয়োজন হবে না। তবে সেবা গ্রহণের জন্য স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের দেওয়া পরিচিতিমূলক হেলথ কার্ডের মূল কপি দেখিয়ে জুলাইযোদ্ধার স্বাক্ষর সম্বলিত একটি ফটোকপি দাখিল করতে হবে।
বিধিমালায় বলা হয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসনের জন্য তিনটি কমিটি থাকবে। এর মধ্যে রয়েছে কেন্দ্রীয় কমিটি, জেলা কমিটি ও উপজেলা কমিটি।
কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি হবেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা উপদেষ্টা, জেলা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং উপজেলা কমিটির সভাপতি হবেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। বিধিমালায় তিনটি কমিটির গঠন ও কার্যাবলী উল্লেখ করা হয়েছে।
শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসনের জন্য গৃহীত পরিকল্পনা বা প্রকল্পের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিধি দ্বারা নির্ধারণ করতে হবে। তবে বিধি না হওয়া পর্যন্ত প্রচলিত বিধি-বিধান ও পদ্ধতি অনুযায়ী পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন কাজ সম্পাদন করা যাবে বলে বিধিমালায় জানানো হয়েছে।
পুনর্বাসনের জন্য জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিদপ্তর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিষয়ক; ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক্স-বিষয়ক; ডিজিটাল মার্কেটিং, আইটি সাপোর্ট সার্ভিস, গ্রাফিক্স ডিজাইন এবং ওয়েব ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট; ফ্রিল্যান্সিং, মোবাইল সার্ভিসিং, অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্ট, মেকানিক্যাল ও অটোমোবাইল-বিষয়ক; ড্রাইভিং, আধুনিক অফিস ব্যবস্থাপনা, নির্মাণ ও প্রকৌশলবিষয়ক; খাদ্য ও আতিথেয়তাবিষয়ক; বিউটিফিকেশন আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটস; বস্ত্রশিল্পবিষয়ক; কৃষি, নার্সারি, গবাদি পশুপালন, মৎস্য হ্যাচারি ও মৎস্য চাষ এবং পোল্ট্রি ফার্মিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেবে।
উপার্জনমুখী কাজ বা আত্মকর্মসংস্থানের জন্য সহজ শর্তে ঋণ বা এমন সুবিধাদি দিতে অধিদপ্তর উদ্যোগ নিতে পারবে বলেও বিধিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।
আর্থিক সহায়তা বা পুনর্বাসন-সংক্রান্ত বিষয়ে জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কোনো বিরোধ দেখা দিলে তা নিষ্পত্তিতে একটি সালিশ বোর্ড গঠন করা হবে বলে বিধিমালায় জানানো হয়েছে। শহীদ পরিবারের বিরোধ-সংশ্লিষ্ট সদস্য, গণঅভ্যুত্থান অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের মনোনীত কমপক্ষে সহকারী পরিচালক পদমর্যাদার একজন প্রতিনিধি, দুই পক্ষের ভিত্তিতে মনোনীত একজন সালিশকারীর সমন্বয়ের সালিশ বোর্ড গঠন করা হবে।
বিধিমালায় বলা হয়েছে, সালিশ বোর্ডের সিদ্ধান্তের কারণে কোনো ব্যক্তি সংক্ষুব্ধ হলে তিনি ৩০ দিনের মধ্যে অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে আপিল করতে পারবেন। এই ক্ষেত্রে মহাপরিচালকের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
সূত্র: ইউএনবি
বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৭,৩০০ কোটি টাকা বেশি। মূলত ট্রেজারি বিল, বন্ড এবং সরকারের কাছ থেকে প্রাপ্ত সুদের মাধ্যমে এই মুনাফা অর্জিত হয়েছে। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের মোট পরিচালন আয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকা। সেখান থেকে আনুষঙ্গিক ব্যয় ও কর পরিশোধের পর চূড়ান্ত নিট মুনাফা নির্ধারণ করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই মুনাফা প্রতি বছরই বাড়ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নিট মুনাফা ছিল ১৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, আর ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা ছিল ১০ হাজার ৭৪৮ কোটি টাকা। পরপর তিন অর্থবছরে মুনাফার এই প্রবৃদ্ধি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির স্পষ্ট প্রমাণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘গত অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংক আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি মুনাফা অর্জন করেছে। বিশেষ করে সরকারের কাছে ধার দেওয়া এবং ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ থেকে বড় অঙ্কের সুদ আয় হয়েছে, যা মুনাফা বৃদ্ধির মূল চালিকা শক্তি।’
গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর-এর সভাপতিত্বে পরিচালনা পর্ষদের ৪৪৩তম সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আর্থিক হিসাব বিবরণী অনুমোদন করা হয়। সভা শেষে জানানো হয়, নিট মুনাফার এই বিপুল অঙ্কের অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হবে, যা বাজেটসহ বিভিন্ন আর্থিক পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন ধারাবাহিকভাবে মুনাফা বাড়াতে সক্ষম হয়, তখন তা দেশের আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার প্রতিচ্ছবি হিসেবে বিবেচিত হয়। এতে সরকারের রাজস্ব আদায়ে সহায়তা যেমন বাড়ে, তেমনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বাধীনতা ও সক্ষমতাও বাড়ে।
এদিকে এ মুনাফার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আকর্ষণীয় বোনাস ঘোষণা করা হয়েছে। বোর্ড সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ব্যাংকের কর্মীদের নিজ নিজ বেসিক বেতনের ছয় গুন ইনসেনটিভ বোনাস দেওয়া হবে। বিষয়টি নিয়ে নানামুখী আলোচনা থাকলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এটি ব্যাংকের নিজস্ব নীতিমালার আওতায় এবং মুনাফার অংশ হিসেবেই প্রদান করা হবে।
শুধুমাত্র গত অর্থবছরেই বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারকে দিয়েছে ১০ হাজার ৬৫২ কোটি টাকা। এবারের মুনাফা এর চেয়েও দ্বিগুণের কাছাকাছি হওয়ায়, সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনাতেও তা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন অর্থনীতি সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই মুনাফা বৃদ্ধি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক ও প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধিরই একটি চিত্র তুলে ধরে। যদিও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং অভ্যন্তরীণ নানা চ্যালেঞ্জ ছিল, তবুও বাংলাদেশ ব্যাংক তার আয় বাড়াতে সক্ষম হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা।
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় নির্বিচারে গুলি চালিয়ে আন্দোলনকারীদের হতাহতের ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন প্রসিকিউশনের আরো পাঁচ সাক্ষী। তারা হলেন মিটফোর্ড হাসপাতলের সহকারী পরিচালক মফিজুর রহমান, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার মনিরুল ইসলাম, একই হাসপাতালের একই বিভাগের চিকিৎসক মোস্তাক আহমেদ, ফেনীর ব্যবসায়ী গুলিবিদ্ধ নাসিরউদ্দিন ও শহীদ শাহরিয়ার খান আনাসের নানা সাইদুর রহমান খান।
গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ তারা সাক্ষ্য দেন। সাক্ষীরা হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা হিসেবে শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল, চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ জড়িতদের বিচার দাবি করেন ট্রাইব্যুনালের কাছে।
পরে তাদের জেরা করেন আসামিপক্ষের রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমীর হোসেন। এই মামলার ৮১ জন সাক্ষীর মধ্যে এখন পর্যন্ত ২৯ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। আগামী ১ সেপ্টেম্বর পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহনের দিন ধার্য করা হয়েছে। এই মামলার তিন আসামির মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান পলাতক।
সাক্ষ্য নেওয়ার আগে আসামির কাঠগড়ায় তোলা হয় সাবেক পুলিশ প্রধান (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনকে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যাজুয়ালটি বিভাগের আবাসিক সার্জন মোস্তাক আহমেদ সাক্ষ্যে বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনকারীদের গুলি করা হয়েছিল উঁচু জায়গা বা হেলিকপ্টার থেকে। এসব গুলি কারও কারও মাথায় লেগে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে যায়। গুলিবিদ্ধদের চিকিৎসায় বাধা দেন তৎকালীন সরকার-সমর্থিত স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ তথা স্বাচিপের চিকিৎসকরা। এমনকি ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে জুলাই যোদ্ধাদের সেবা দিতে বারণও করা হয়।’
তিনি বলেন, গত বছর ১৯, ২০ ও ২১ জুলাই এবং ৪ ও ৫ আগস্ট সবচেয়ে বেশি সংখ্যক গুলিবিদ্ধকে চিকিৎসা দেওয়া আমাদের হাসাপাতাল থেকে। ক্যাজুয়ালটি বিভাগে চাকরির সুবাদে আগেও অনেক গুলিবিদ্ধের সেবা দিয়েছি। তবে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে আহতদের ধরন ছিল কিছুটা ভিন্ন। তাদের গুলির নির্দেশনা ছিল ওপর থেকে নিচের দিকে। সাধারণত নির্দেশনা থাকে নিচ থেকে ওপরে বা সমান্তরাল।’
এ সাক্ষী বলেন, রোগীদের কোনো উঁচু জায়গা বা হেলিকপ্টার থেকে গুলি করা হয়েছে। কোনো কোনো আহতের মাথায় গুলি লেগে পিঠ দিয়ে বের হয়ে যায়। এছাড়া আন্দোলন চলাকালে একদিন একটি পরিবারের বাবা-ছেলে দুজন গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে আসেন।
তিনি আরো বলেন, ‘আহতদের বেশিরভাগের বয়স ছিল ২০-৩০ বছরের মধ্যে। আন্দোলন চলাকালে ঢাকা মেডিকেলের শহীদুল্লাহ হল-সংলগ্ন গেট দিয়ে রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স থামিয়ে পরিচয় জানতে চাইতেন ছাত্রলীগের ছেলেরা। ছাত্র পরিচয় পেলে ঢুকতে বাধা দিতেন। এছাড়া চিকিৎসা চলাকালে ছাত্রলীগের সশস্ত্র কর্মীরা হাসপাতালে ঢুকে আহতদের বিষয়ে খোঁজখবর নিতেন। তখন গুলিবিদ্ধ ছাত্ররা নিজেদের পরিচয় গোপন রাখার জন্য আমাদের অনুরোধ করেন।
‘স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) চিকিৎসকদের নিয়ে ডা. মোস্তাক বলেন, ‘গুলিবিদ্ধ ছাত্রদের চিকিৎসা দিতে আমাদের অতিউৎসাহী হতে বারণ করেন আওয়ামী লীগ সরকার সমর্থিত স্বাচিপের কতিপয় চিকিৎসক। তারা বলেন, এরা সন্ত্রাসী। এদের চিকিৎসা দেওয়া যাবে না। এমনকি গুলিবিদ্ধ ছাত্রদের চিকিৎসা দেওয়ায় গত বছরের ২৫ জুলাই আমাদের পাঁচ ডাক্তারকে অন্যত্র বদলি করা হয়। আহতদের চিকিৎসায় বাধার উদ্দেশেই তাদের বদলি করা হয়েছে।’ এ সময় জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে নৃশংসতার জন্য ক্ষমতাচ্যূত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে দায়ী করেন এই চিকিৎসক। একই সঙ্গে সেই সময়ে আইন-শৃঙ্খলা কার্যক্রম পরিচালনায় নিয়োজিতদের বিচার ও শাস্তি দাবি করেন তিনি।
গত বছর ৫ আগস্ট রাজধানীর চানখাঁরপুল এলকায় পুলিশের গুলিতে নিহত শহীদ শাহারিয়ার খান আনাসের নানা সাইদুর রহমান খান তার সাক্ষ্যে শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক পুলিশ প্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনসহ দায়ীদের ফাঁসি দাবি করেন।