দেশে দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ মানুষের কাছে নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে সঞ্চয়পত্র অত্যন্ত জনপ্রিয়। অনেক নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত সঞ্চয়পত্রের মুনাফার টাকায় পরিবারের খরচ চালান। গত সপ্তাহে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে বেশি ঋণ নিতে মুনাফার হার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সঞ্চয়পত্রের ধরন অনুযায়ী এ হার বেড়ে হতে যাচ্ছে ১২ দশমিক ২৫ থেকে ১২ দশমিক ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত। তাই এখনই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের উপযুক্ত সময় বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের চালু সঞ্চয় কর্মসূচির (স্কিম) সংখ্যা ১১। এগুলোর মধ্যে ৪টি সঞ্চয়পত্র, ২টি ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক হিসাব, ১টি ডাক জীবন বীমা, ১টি প্রাইজবন্ড এবং ৩টি প্রবাসীদের জন্য বন্ড। সব কর্মসূচিতে বিনিয়োগের বিপরীতে সুদ বা মুনাফার হার ভিন্ন। সুদ বা মুনাফার ওপর উৎসে কর কর্তনের হারও ভিন্ন।
বর্তমানে চার ধরনের সঞ্চয়পত্র চালু রয়েছে। এগুলো হলো পাঁচ বছরমেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র, পরিবার সঞ্চয়পত্র, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র ও পেনশনার সঞ্চয়পত্র। বর্তমানে সঞ্চয়পত্র কেনা ও মুনাফা উত্তোলনের ব্যবস্থা ডিজিটাল হয়েছে। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের ৭১টি সঞ্চয় ব্যুরো কার্যালয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের সব কার্যালয়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, ডাকঘর ছাড়াও বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সঞ্চয়পত্র কেনা ও ভাঙানো যায়।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের আওতায় পরিচালিত সঞ্চয় কর্মসূচিগুলোর (স্কিম) মুনাফার হার বাড়ছে। বর্ধিত হার নির্ধারণের আদেশ জারি করতে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগকে (আইআরডি) গত ৮ জানুয়ারি অনুরোধ জানিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। চিঠির সঙ্গে অর্থ বিভাগ দুটি সংযুক্তিও দিয়েছে, যাতে সঞ্চয়পত্রের ধরন ও মেয়াদ অনুযায়ী মুনাফার হারের কথা উল্লেখ করেছে। বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কোনো সঞ্চয়পত্রের মুনাফাই ১২ শতাংশের কম হবে না। সবচেয়ে কম মুনাফা পাওয়া যাবে ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের বিপরীতে। এর হার ১২ দশমিক ২৫ শতাংশ। আর সবচেয়ে বেশি মুনাফা পাওয়া যাবে পেনশনার সঞ্চয়পত্রে, যে হার হবে ১২ দশমিক ৫৫ শতাংশ। ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার নিচের বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও বেশি হার রাখারও সুপারিশ করেছে অর্থ বিভাগ।
বিনিয়োগকারীদের দুটি ধাপ হচ্ছে
শুধু সুদের হারের পরিবর্তন নয়, বিনিয়োগকারীদের ধাপেও পরিবর্তন আনার কথা বলেছে অর্থ বিভাগ। বর্তমানে ধাপ রয়েছে তিনটি- ১৫ লাখ টাকা; ১৫ লাখ ১ টাকা থেকে ৩০ লাখ টাকা এবং ৩০ লাখ ১ টাকার বেশি। প্রতিটি ধাপে রয়েছে আলাদা মুনাফার হার। বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, পাঁচ বছরমেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে বর্তমানে মেয়াদ শেষে ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ মুনাফা পাওয়া যায়। এই সঞ্চয়পত্রে ১৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগকারীরা মেয়াদ শেষে মুনাফা পাবেন ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ হারে। আর ৩০ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ থাকলে মুনাফার হার হবে সাড়ে ৯ শতাংশ।
নতুন নিয়মে দুটি ধাপের কথা বলা হয়েছে। একটি ধাপে থাকবেন ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার নিচের বিনিয়োগকারীরা। আরেকটি ধাপে থাকবেন এর ওপরের বিনিয়োগকারীরা।
পাঁচ বছরমেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের উদাহরণ দিয়েই বলা যায়, নতুন হারে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার নিচের বিনিয়োগকারীরা পাবেন ১২ দশমিক ৪০ শতাংশ। আর ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার বেশি বিনিয়োগকারীরা পাবেন সামান্য কম অর্থাৎ ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
অন্যগুলোর ক্ষেত্রেও এভাবে দুটি করে হার হবে। বরাবরের মতো নতুন হারেও সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবেন পেনশনার সঞ্চয়পত্রের বিপরীতে বিনিয়োগকারীরা। ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার নিচের বিনিয়োগকারীরা পাবেন ১২ দশমিক ৫৫ শতাংশ। এর বেশি বিনিয়োগকারীরা পাবেন ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশ। তবে মেয়াদপূর্তির আগে ভাঙালে সব সঞ্চয়পত্রের বিপরীতেই মুনাফার হার কমবে।
কোন সঞ্চয়পত্রের কত মেয়াদ
নামের মধ্যেই রয়েছে পাঁচ বছরমেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র পাঁচ বছরের মেয়াদের। পরিবার সঞ্চয়পত্র ও পেনশনার সঞ্চয়পত্রের নামের মধ্যে মেয়াদ উল্লেখ না থাকলেও দুটি সঞ্চয়পত্রই পাঁচ বছর মেয়াদের। এ ছাড়া রয়েছে তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র। পরিবার সঞ্চয়পত্রের সুদ মাসিক ভিত্তিতে এবং তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র ও পেনশনার সঞ্চয়পত্রের সুদ ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে তোলা যায়।
কারা কোন সঞ্চয়পত্র কিনতে পারবেন
সবাই সব ধরনের সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন না। এ ব্যাপারে সরকার কিছু শর্ত ঠিক করে দিয়েছে। যেমন ১৮ বছর ও তার চেয়ে বেশি বয়সের যেকোনো বাংলাদেশি নারী, যেকোনো বাংলাদেশি শারীরিক প্রতিবন্ধী নারী ও পুরুষ এবং ৬৫ বছর ও তার চেয়ে বেশি বয়সি বাংলাদেশি নারী ও পুরুষেরা শুধু একক নামে পরিবার সঞ্চয়পত্র কিনতে পারবেন।
পেনশনার সঞ্চয়পত্রও কিনতে পারেন না সবাই। অবসরভোগী সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও কর্মচারী, সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য এবং মৃত সরকারি চাকরিজীবীর পারিবারিক পেনশন সুবিধাভোগী স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানেরা এ সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন।
পাঁচ বছরমেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র এবং তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র সবার জন্য উন্মুক্ত। ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সি যেকোনো শ্রেণি-পেশার মানুষ একক বা যুগ্ম নামে এ দুই ধরনের সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন। তবে নাবালকের পক্ষে সঞ্চয়পত্র কেনার এখন আর সুযোগ নেই।
সঞ্চয়পত্রের গ্রাহক কোনো কারণে মারা গেলে টাকা পাবেন তার মনোনীত ব্যক্তি বা নমিনি। সঞ্চয়পত্রে এক বা একাধিক নমিনি করার সুযোগ রয়েছে। যদিও নমিনি মনোনয়ন বাধ্যতামূলক নয়। তবে ভবিষ্যতে নগদায়ন ঝামেলা এড়াতে গ্রাহকরা সাধারণত নমিনি মনোনয়ন করে থাকেন। নাবালককেও নমিনি করা যায়। গ্রাহকের মৃত্যুর তিন মাসের মধ্যে আদালত থেকে উত্তরাধিকার সনদ নিয়ে সঞ্চয়পত্রের নগদায়ন করতে হয়। গ্রাহক ও নমিনি উভয়ই মারা গেলে সঞ্চয়পত্র ভাঙাতে পারেন আইনানুগ উত্তরাধিকারীরা।
ব্যক্তি সঞ্চয়পত্র কিনতে যা যা লাগে
কোনো ব্যক্তি সঞ্চয়পত্র কিনতে গেলে তাকে ৮ থেকে ৯ ধরনের কাগজ জোগাড় করতে হয়। প্রথমেই লাগবে তার জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) ফটোকপি। দুই লাখ বা তারও বেশি টাকার সঞ্চয়পত্র কিনতে লাগবে করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) সনদের ফটোকপি।
বিনিয়োগের পরিমাণ দুই লাখ টাকার মধ্যে হলে নগদে পরিশোধ করা যাবে, তবে দুই লাখ টাকার বেশি হলেই তা পরিশোধ করতে হবে ব্যাংকের চেকের মাধ্যমে। যে নামে সঞ্চয়পত্র কিনতে ইচ্ছুক, চেক দিতে হবে সেই নামের ব্যাংক হিসাবেরই। একক নামে সঞ্চয়পত্র কেনার ক্ষেত্রে একক নামে ব্যাংক হিসাবের চেক এবং যুগ্ম নামে সঞ্চয়পত্র কেনার ক্ষেত্রে যুগ্ম নামে ব্যাংক হিসাবের চেক দিতে হবে।
আবেদনের সঙ্গে নমিনির এনআইডির ফটোকপিও দিতে হবে। নমিনি নাবালকও হতে পারবে। সে ক্ষেত্রে নমিনির জন্মনিবন্ধন সনদ বা পাসপোর্টের ফটোকপি দিতে হবে। নাবালক নমিনির পক্ষে দিতে হবে মনোনীত অভিভাবকের এনআইডির ফটোকপিও। ব্যক্তি ছাড়া প্রতিষ্ঠানও নমিনি হতে পারবে। সে ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধনের সনদ বা স্থানীয় সরকারের (ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন) প্রত্যয়নপত্র লাগবে। সঞ্চয়পত্রের ক্রেতা বা গ্রাহকের এবং নমিনির দুই কপি করে পাসপোর্ট আকারের ছবি লাগবে। গ্রাহকের ছবি সত্যায়ন করবেন ইস্যুকারী কর্মকর্তা এবং নমিনির ছবি সত্যায়ন করবেন সঞ্চয়পত্রের গ্রাহক।
প্রভিডেন্ট ফান্ড
ভবিষ্য তহবিলের (প্রভিডেন্ট ফান্ড) অর্থ সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করা যায়। এ বিনিয়োগ করে প্রতিষ্ঠানগুলো। এ ক্ষেত্রেও কিছু নিয়ম-কানুন রয়েছে। প্রথমেই সংশ্লিষ্ট কর কমিশনারের কার্যালয় থেকে স্বীকৃতপত্র নিতে হবে। আবেদনের সঙ্গে দিতে হবে প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের ভবিষ্য তহবিল সংরক্ষণবিষয়ক সরকারি গেজেট বা প্রজ্ঞাপনের কপি।
ভবিষ্য তহবিলের নামে যে টিআইএন সনদ আছে সেটা এবং ব্যাংক হিসাবের চেক ও হিসাব বিবরণী জমা দিতে হবে। যে প্রতিষ্ঠান সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের কার্যবিবরণী এবং আবেদনকারীদের নাম, পদবি ও স্বাক্ষরসংক্রান্ত প্রত্যয়নপত্র দাখিল করতে হবে। সবশেষে লাগবে একটি ফরওয়ার্ড লেটার।
অটিস্টিকদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অটিস্টিকদের জন্য গড়ে উঠেছে, এখন সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক তিন বছরমেয়াদি সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করতে পারে। তবে ২০২০ সালের ডিসেম্বরের আগে এ ধরনের কোনো প্রতিষ্ঠান এ সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করতে পারত না।
অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের (আইআরডি) জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, শুধু অটিস্টিকদের জন্য গড়ে ওঠা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, যেসব প্রতিষ্ঠান অটিস্টিকদের সহায়তায় কাজ করে, তারাও এ সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করতে পারবে। ব্যক্তির ক্ষেত্রে একক নামে ৫০ লাখ বা যৌথ নামে এক কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র কেনার সুযোগ থাকলেও অটিস্টিকদের জন্য গড়ে ওঠা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য বিনিয়োগের কোনো সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি।
তবে যে প্রতিষ্ঠানই এই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করতে যাবে, তার আগে সেই প্রতিষ্ঠানকে জেলা সমাজসেবা কার্যালয় থেকে প্রত্যয়নপত্র নিতে হবে। জমা দিতে হবে টিআইএন সনদ এবং ব্যাংক হিসাবের চেক ও হিসাব বিবরণী। যে প্রতিষ্ঠান সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের কার্যবিবরণী এবং আবেদনকারীদের নাম, পদবি ও স্বাক্ষরসংক্রান্ত প্রত্যয়নপত্র দাখিল করতে হবে। সবশেষে লাগবে একটি ফরওয়ার্ড লেটার।
পেনশনার
এ সঞ্চয়পত্র যেখান থেকে কেনা হয়, সেখানে ভবিষ্য তহবিলের চূড়ান্ত মঞ্জুরিপত্র দাখিল করতে হবে। এ ছাড়া লাগবে প্রাপ্ত আনুতোষিকের মঞ্জুরিপত্র এবং পেনশন বইয়ের ফটোকপি। নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের একটি সনদও দাখিল করতে হয় এ সঞ্চয়পত্র কেনার আবেদনের সঙ্গে।
দীর্ঘদিন ধরে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়ার ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং জাতীয় ব্যবস্থাপনার ওপর যে অসহনীয় চাপ তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে জাপানের সক্রিয় সহযোগিতা কামনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জাপান সরকারের মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত এবং নিপ্পন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ইয়োহেই সাসাকাওয়ার সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক সৌজন্য বৈঠকে তিনি এই আহ্বান জানান।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ একটি অধিক জনবহুল রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও মানবিক কারণে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর ভার বহন করতে গিয়ে দেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো এবং সামাজিক শৃঙ্খলার ওপর ব্যাপক বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তিনি রোহিঙ্গাদের তাঁদের নিজ ভূমি মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক এবং সসম্মানে দ্রুত প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে জাপানের বিশেষ দূতকে তাঁর প্রভাব কাজে লাগানোর অনুরোধ জানান। প্রধানমন্ত্রী আশ্বস্ত করেন যে, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সম্ভাব্য সকল কারিগরি ও মানবিক সহায়তা প্রদানে প্রস্তুত।
জাপানের বিশেষ দূত ইয়োহেই সাসাকাওয়া রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রশংসা করেন এবং এই সংকটের কারণে সৃষ্ট বহুমুখী চাপের বিষয়ে সমবেদনা প্রকাশ করেন। তিনি জানান যে, রোহিঙ্গাদের জন্য জাপান সরকারের মানবিক সহায়তা অব্যাহত থাকবে। মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে তাঁর সাম্প্রতিক আলোচনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মিয়ানমার এই সংকট সমাধানে নীতিগতভাবে রাজি থাকলেও রাখাইন রাজ্যের অস্থিতিশীল ও জটিল পরিস্থিতির কারণে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে। তিনি ব্যক্তিগতভাবে এই সমস্যা সমাধানে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানোর প্রতিশ্রুতি দেন।
দ্বিপক্ষীয় এই বৈঠকে শুধু দুই দেশের চেষ্টার ওপর নির্ভর না করে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক বহুপক্ষীয় উদ্যোগ জোরদারের বিষয়েও আলোচনা হয়। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে একটি আধুনিক ভ্যাকসিন উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণে জাপানের সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশে একটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন এবং মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নে বাংলাদেশের আগ্রহের কথা তুলে ধরেন। বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরসহ ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রম পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত ঘোষণা করেছে সরকার। সোমবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এই তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, বর্তমানে ১৪ হাজার ৩৮৪ জন নতুন সহকারী শিক্ষক নিয়োগের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া চলায় এই বদলি কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বদলি প্রক্রিয়াটি সুশৃঙ্খল এবং স্বচ্ছ করতে সরকার এটি পর্যালোচনা করছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, “১৪ হাজারের বেশি যে নিয়োগ হবে, তার জন্য সব বদলি এখন স্থগিত। ১৪ হাজারের ফিক্সড হয়ে গেলে নতুন করে আবার চালু হবে। তখন এটা নেওয়া যাবে।” নতুন শিক্ষকদের পদায়ন সম্পন্ন হওয়ার পর শিক্ষক বদলির বর্তমান নীতিমালায় কোনো পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়েও পরে আলোচনা করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন প্রসঙ্গে ববি হাজ্জাজ জানান, শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি কার্যক্রমকে আরও বেশি ‘ফাইন্যান্সিয়াল নিড বেজড’ বা আর্থিক চাহিদার ওপর ভিত্তি করে পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাওয়া ফিডব্যাক অনুযায়ী, প্রকৃত অভাবী শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে উপবৃত্তির অর্থ ও সংখ্যা বাড়ানোর প্রচেষ্টা চালানো হবে। একই সাথে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের পুনরায় শিক্ষার মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করার ওপর জোর দেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, সরকারের মূল লক্ষ্য হলো ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। এ লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি প্রান্তে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা হবে। প্রাথমিক শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য উন্নত শিক্ষার সুযোগ তৈরি করাই তাঁর মন্ত্রণালয়ের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এবার এলাকাভিত্তিক বিভাজনের পরিবর্তে উপজেলাভিত্তিক নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, একটি নির্দিষ্ট উপজেলার অধীনে থাকা সকল ইউনিয়ন পরিষদে একই দিনে একযোগে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে ইসি সচিব আখতার আহমেদ এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ইসি সচিব জানান, সারাদেশের কয়েক হাজার ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করতে তা একাধিক ধাপে আয়োজন করা হবে। তবে মোট কতটি ধাপে এই ভোট হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। উপজেলাভিত্তিক নির্বাচনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে তিনি বলেন, একটি উপজেলার কিছু ইউনিয়নে এক ধাপে এবং বাকিগুলোতে অন্য ধাপে ভোট হলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। তাই প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সুবিধার্থেই একই উপজেলার সব ইউনিয়নে একযোগে ভোট নেওয়া হবে। তবে নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তফসিল কমিশন আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত করবে বলে তিনি জানান।
নির্বাচনী আচরণবিধিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার আনার ইঙ্গিত দিয়ে সচিব আরও বলেন, পরিবেশ সুরক্ষায় নির্বাচনী প্রচারণায় কাগুজে পোস্টার ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে। এছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনী বিধিমালায় আরও কিছু সংশোধন আনা হয়েছে, যা পর্যালোচনার পর বিস্তারিত জানানো হবে।
এর আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন জানিয়েছিলেন যে, আগামী সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ তফসিল ঘোষণা করে নভেম্বর মাস থেকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশব্যাপী স্থানীয় নির্বাচনের যাত্রা শুরু হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে সিটি করপোরেশন, উপজেলা, পৌরসভা এবং জেলা পরিষদের নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের।
বাংলাদেশ ও ইতালির দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান। আজ সোমবার সচিবালয়ে তাঁর কার্যালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রোর সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তিনি এই আহ্বান জানান। বৈঠকে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমও উপস্থিত ছিলেন।
সাক্ষাৎকালে মন্ত্রী বলেন, দুই দেশের এই নিবিড় মৈত্রীকে আরও ফলপ্রসূ করতে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্রগুলো খুঁজে বের করা জরুরি। বিশেষ করে ইতালিতে দক্ষ বাংলাদেশি জনশক্তি রপ্তানির সুযোগ বাড়াতে ইতালীয় ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম প্রসারে তিনি রাষ্ট্রদূতের সহযোগিতা কামনা করেন। বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষক তৈরি এবং বিদেশ যেতে আগ্রহী কর্মীদের ভাষাগত দক্ষতা অর্জনে দুই দেশের যৌথ উদ্যোগের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়। ইতালির রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ভূমিকার প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যতে সহযোগিতা বৃদ্ধির আশ্বাস দেন।
বৈঠক শেষে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সাংবাদিকদের জানান, বর্তমানে প্রায় আড়াই লাখ বাংলাদেশি ইতালিতে সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন। বৈধ পথে জনশক্তি রপ্তানি বাড়াতে ভাষা শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে অবৈধ পথে বিদেশযাত্রা এবং মানবপাচার রোধে সচেতনতামূলক প্রচারণা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, খুলনার সাথে ইতালির মিলান শহরের খাদ্য নিরাপত্তা ও খাদ্য অপচয় রোধে একটি যৌথ কার্যক্রম চালুর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের স্থপতিদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ বিনিময় এবং দুই দেশের বাণিজ্য ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। বৈঠকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে ঠাকুরগাঁও প্রেস ক্লাবের নির্বাহী পরিষদের সদস্যগণ এক মতবিনিময় সভায় মিলিত হন।
ঠাকুরগাঁওয়ে রাষ্ট্রপতির বাসভবনে আজ সকালে এ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
এ সময় রাষ্ট্রপতি বলেন, স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম গণতন্ত্র, সুশাসন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য।
তিনি মফস্বলভিত্তিক সাংবাদিকদের তৃণমূল ও প্রান্তিক মানুষের কথা নিষ্ঠার সঙ্গে যথাযথভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানান।
ঠাকুরগাঁওয়ের সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ দেশের মফস্বল সাংবাদিকদের বিভিন্ন সমস্যা ও দাবি রাষ্ট্রপতির কাছে তুলে ধরেন। ঠাকুরগাঁও প্রেস ক্লাবের ভবন সম্প্রসারণ, ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় ঠাকুরগাঁওয়ের স্থানীয় নির্যাতিত সাংবাদিকদের জন্য সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দসহ সংবাদিকদের ওয়েজবোর্ড গঠনের ব্যাপারেও রাষ্ট্রপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
রাষ্ট্রপতি সাংবাদিকদের সমস্যা ও দাবি-দাওয়া পূরণে যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন।
একইসঙ্গে তিনি সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ থাকার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
এ সময় রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব সরওয়ার আলম, ঠাকুরগাঁও প্রেস ক্লাবের সভাপতি লুৎফর রহমান মিঠু ও সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান তানু, সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাবৃন্দ এবং ঠাকুরগাঁও প্রেস ক্লাবের নির্বাহী পরিষদের প্রতিনিধিগণ উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপতি দু’দিনের সফরে গতকাল ঠাকুরগাঁও পৌঁছান।
সূত্র: বাসস
নতুন উদ্যোক্তা গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশজুড়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে কর্মসংস্থান ব্যাংক আয়োজিত ‘ক্ষুদ্র ব্যবসা, ক্ষুদ্রঋণ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগ তহবিল’ প্রকল্পের উদ্বোধন ও ঋণ বিতরণ অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী জানান, প্রাথমিকভাবে এটি ৫০ কোটি টাকার একটি পরীক্ষামূলক বা পাইলট প্রকল্প হিসেবে শুরু হয়েছে। যারা প্রথাগত ব্যাংক ঋণের জটিলতায় পড়তে ভয় পান, তাঁদের সরাসরি অর্থায়নের মাধ্যমে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “যারা ব্যাংকে যেতে ভয় পায় তাদের ঋণ দিয়ে কর্মসংস্থানে নিয়ে উদ্যোক্তা তৈরির জন্যই কর্মসংস্থান ব্যাংকের যাত্রা শুরু হয়।”
সরকারের অর্থনৈতিক ভাবনার নতুন দিক তুলে ধরে মন্ত্রী ‘ক্রিয়েটিভ’ বা ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’র ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, প্রান্তিক পর্যায়ের সৃজনশীল মানুষদের কেবল ঋণ দেওয়াই যথেষ্ট নয়, তাঁদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও পণ্যের উপযুক্ত ব্র্যান্ডিং নিশ্চিত করে বিপণন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। সংগীতসহ বিভিন্ন সৃজনশীল পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতির মূল স্রোতে নিয়ে আসার পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে। অর্থমন্ত্রীর মতে, সৃজনশীলতাকে পণ্য বা সেবা হিসেবে বাজারজাত (মনিটাইজ) করা গেলে জাতীয় অর্থনীতিতে এর বড় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
কর্মসংস্থান ব্যাংকের কার্যক্রমের প্রশংসা করে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার (NPL) ৪ শতাংশ থেকে ১ বা ২ শতাংশে নামিয়ে আনার পরামর্শ দেন। বর্তমানে ব্যাংকটি মুনাফায় রয়েছে উল্লেখ করে তিনি নতুন এই প্রকল্পের মাধ্যমে আরও বেশি মানুষের জন্য কর্মসংস্থান তৈরির আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
দেশের মসজিদ, মন্দির, বৌদ্ধ বিহার ও গির্জাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন নীতিমালা জারি করেছে সরকার।
এর আওতায় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মাসিক সম্মানী, উৎসব ভাতা ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রোববার ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ‘মসজিদ ও অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিবর্গের জন্য সম্মানী ও কল্যাণ সহায়তা প্রদান নীতিমালা ২০২৬’ শীর্ষক প্রজ্ঞাপন জারি করে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রসার, সামাজিক মূল্যবোধের বিকাশ এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় মসজিদ, মন্দির, বৌদ্ধ বিহার ও গির্জাসহ অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ের কর্মরত ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন।
তাদের এ অবদান বিবেচনায় নিয়ে আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে নতুন এ নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।
নীতিমালার আওতায় মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমসহ অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সেবকদের সম্মানী দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। পাশাপাশি ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে উৎসব ভাতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর মাধ্যমে উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের নিয়মিত আয় ও আর্থিক নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সহায়তা করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
শুধু আর্থিক সহায়তার মধ্যেই এ উদ্যোগ সীমাবদ্ধ থাকছে না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার কথাও নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের বিভিন্ন দক্ষতা বৃদ্ধি ও বিকল্পভাবে আয় করার সুযোগ তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সেবকদের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের পেশাগত দক্ষতাও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, সরকারের ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিকতায় এ নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।
দেশের সব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের কল্যাণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক মূল্যবোধ আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতে কর্মরত ইমাম, মুয়াজ্জিন, পুরোহিত ও সেবকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিকতা ও সামাজিক সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রেখে আসছেন।
নতুন নীতিমালার মাধ্যমে তাদের অবদানকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি আর্থিক সহায়তার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারের এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের আর্থিক অনিশ্চয়তা কমবে এবং তাদের সামাজিক নিরাপত্তা আরও জোরদার হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সূত্র: বাসস
দেশ ও জাতির অনেক ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত গণতন্ত্র যেন পুনরায় অপশক্তির হাতে হারিয়ে না যায়, সে বিষয়ে দেশবাসীকে সজাগ ও সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শেষে উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ বার্তা প্রদান করেন।
রাষ্ট্রপতি তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক হানাহানি ও প্রতিশোধের রাজনীতির কড়া সমালোচনা করে বলেন, “হানাহানি ও সংঘর্ষ নয়, আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। এ জন্য সংঘাত ও প্রতিশোধের রাজনীতি পরিহার করে পুরো দেশে সহনশীলতার রাজনীতির ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে।” তিনি মনে করেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে হলে রাজনৈতিক সহনশীলতার কোনো বিকল্প নেই।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এদিন বেলা ১১টা ২০ মিনিটে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার জামালপুর এলাকায় ‘ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন রাষ্ট্রপতি। প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ এগিয়ে নেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “অল্প সময়ের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণকাজ শুরু হবে। এ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন ঠাকুরগাঁওসহ এ অঞ্চলের মানুষের জন্য আনন্দের দিন। এর মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের মানুষের উচ্চশিক্ষার সুযোগ আরও বিস্তৃত হবে।” উত্তরাঞ্চলের অবহেলিত এই জনপদে উচ্চশিক্ষার প্রসারে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি বড় ভূমিকা পালন করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর নিজ জন্মভূমি ঠাকুরগাঁওয়ে এটিই তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক সফর। দুই দিনের এই সফরের প্রথম দিনে তিনি সার্কিট হাউসে রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার গ্রহণ এবং তাঁর বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করেন। রাষ্ট্রপতির এই আগমনকে কেন্দ্র করে পুরো জেলায় উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে এবং শহরজুড়ে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
ঠাকুরগাঁওবাসীর দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন অবশেষে সত্যি হওয়ার পথে। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টা ২০ মিনিটে সদর উপজেলার জামালপুর এলাকায় ঠাকুরগাঁও-পীরগঞ্জ সড়কের পাশে প্রস্তাবিত ‘ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এই মাইলফলক স্থাপনের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের অবহেলিত এই জনপদে উচ্চশিক্ষার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো। বিশ্ববিদ্যালয়টি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে ঠাকুরগাঁও ও এর পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার দুয়ার খুলে যাবে বলে মনে করছেন স্থানীয় শিক্ষাবিদ ও সচেতন নাগরিকরা।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নিজ জেলায় প্রথম আনুষ্ঠানিক সরকারি সফর। দুই দিনের এই সফরের দ্বিতীয় দিনটি তিনি উৎসর্গ করেন এই মেগা প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে। এর আগে গতকাল রবিবার দুপুরে হেলিকপ্টারযোগে ঠাকুরগাঁও শহীদ মোহাম্মদ আলী স্টেডিয়ামে অবতরণ করেন তিনি। সেখান থেকে সার্কিট হাউসে গিয়ে রাষ্ট্রীয় ‘গার্ড অব অনার’ গ্রহণ করেন। এরপর মা-বাবার কবর জিয়ারত ও স্থানীয় একটি নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নেন রাষ্ট্রপতি।
নাগরিক সংবর্ধনায় রাষ্ট্রপতি ঠাকুরগাঁওয়ের উন্নয়নের বিষয়ে নিজের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, জেলায় মেডিকেল কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজের পাশাপাশি বন্ধ থাকা ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর পুনরায় সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। রাষ্ট্রপতি তাঁর বক্তব্যে তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলেন, কেবল চাকরির পেছনে না ছুটে তরুণদের উচিত নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধি করে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠা। পাশাপাশি তিনি সমাজ থেকে মাদক নির্মূল এবং গণতান্ত্রিক ধারা বজায় রাখতে রাজনৈতিক দলগুলোকে হানাহানি পরিহার করে সমঝোতার পথে চলার আহ্বান জানান।
রাষ্ট্রপতির এই সফরকে কেন্দ্র করে পুরো ঠাকুরগাঁও জেলা উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে। শহরজুড়ে চলছে ব্যাপক সাজসজ্জা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। স্থানীয় জনসাধারণের মাঝে এই বিশ্ববিদ্যালয়টিকে কেন্দ্র করে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন উপজেলা পরিষদ নির্বাচন আচরণ বিধিমালা-২০২৬ জারি করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ স্বাক্ষরিত নতুন বিধিমালা গেজেট আকারে জারি করা।
নতুন বিধিমালায় নির্বাচনী প্রচারণায় পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি মিছিল-শোডাউন, হেলিকপ্টার ব্যবহার, সরকারি সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর বা বিদ্বেষপূর্ণ কনটেন্ট প্রচারের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
নতুন বিধিমালায় উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের প্রচারণার ধরন ও ব্যয়ের ওপরও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলের সুযোগ রাখা হয়েছে। বিধিমালা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধানও রাখা হয়েছে।
নতুন আচরণবিধির অন্যতম বড় পরিবর্তন হলো পোস্টার নিষিদ্ধ করা। কোনো প্রার্থী বা তার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি নির্বাচনী প্রচারণায় পোস্টার ব্যবহার করতে পারবেন না। ভবন, দেয়াল, গাছ, বেড়া, বিদ্যুতের খুঁটি, সরকারি স্থাপনা, সেতু ও কালভার্টসহ বিভিন্ন স্থানে প্রচারসামগ্রী ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ থাকবে।
তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচনের ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত প্রকাশ্য মিছিল করার সুযোগ থাকবে না। ট্রাক, বাস, মোটরসাইকেল, নৌযান ও ট্রেনসহ বিভিন্ন যানবাহন ব্যবহার করে মিছিল বা শোভাযাত্রাও করা যাবে না। নির্বাচনী প্রচারে হেলিকপ্টার বা অন্য কোনো আকাশযান ব্যবহারও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল মাধ্যমে প্রচারণার সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ধরনের প্রচারণা শুরুর আগে প্রার্থীকে কোন কোন মাধ্যম ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে তথ্য দিতে হবে।
একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণায় ব্যয় হওয়া অর্থও নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে।
ডিজিটাল প্রচারণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার ঠেকাতেও বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে। কোনো প্রার্থী বা তার পক্ষে কেউ মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, বিদ্বেষপূর্ণ বা ব্যক্তিগত আক্রমণমূলক বক্তব্য প্রচার করতে পারবেন না।
নির্বাচনী পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, এমন কনটেন্ট তৈরি বা প্রচারও নিষিদ্ধ। এআই ব্যবহার করে এ ধরনের ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার করা যাবে না।
ভোটারদের প্রভাবিত করতে অর্থ, খাদ্য, পানীয় বা উপহার দেওয়ার ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
ধর্মীয় উপাসনালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি অফিসে নির্বাচনী প্রচারণা চালানো যাবে না। ধর্মের অপব্যবহার, পেশিশক্তির ব্যবহার কিংবা কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে কুৎসা বা ব্যক্তিগত চরিত্রহননমূলক প্রচারণাও নিষিদ্ধ থাকবে।
সরকারি সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করেও কোনো প্রার্থী নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারবেন না। সরকারি যানবাহন, প্রচারযন্ত্র বা অন্য কোনো সরকারি সম্পদ নির্বাচনী কাজে ব্যবহার নিষিদ্ধ। একইভাবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণের ওপর বিধিনিষেধ থাকবে।
নির্বাচনের দিন ভোটারদের কেন্দ্রে আনা-নেওয়ার জন্য যানবাহন ভাড়া বা ব্যবহারের সুযোগও থাকবে না। নির্বাচনী প্রচারণায় নির্ধারিত সীমার বাইরে ক্যাম্প স্থাপন ও মাইক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিধিমালায় নির্দিষ্ট নিয়ম মানতে হবে।
নতুন বিধিমালায় নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতাও জোরদার করা হয়েছে। কোনো প্রার্থী বা তার নির্বাচনী এজেন্ট আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন বা লঙ্ঘনের চেষ্টা করেছেন বলে কমিশনের কাছে প্রতীয়মান হলে বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে গুরুতর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে নির্বাচন কমিশন।
এ ছাড়া নির্বাচনী ব্যয়সীমা অতিক্রম করা, অর্থ বা পেশিশক্তি দিয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করা এবং সরকারি সুবিধা ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
নির্বাচন কমিশনের নতুন এ বিধিমালার মূল লক্ষ্য হলো উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে আরও অবাধ, সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক করা এবং প্রার্থীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।
বিশেষ করে পোস্টার, মিছিল ও শোডাউন বন্ধ এবং ডিজিটাল প্রচারণায় এআই-নির্ভর অপপ্রচার ঠেকানোর বিধান এবারের উপজেলা নির্বাচনের প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।
সূত্র: বাসস
বাংলাদেশে নদীভাঙন এখন শুধু নদীতীরের মানুষের সমস্যা নয়। এর প্রভাব পড়ছে ভূমি, কৃষি, বসতি, জীবিকা ও নগরজীবনে। গত পাঁচ দশকে দেশের তিন প্রধান নদী—যমুনা, গঙ্গা ও পদ্মার ভাঙনে প্রায় ১ হাজার ৫৮৫ বর্গকিলোমিটার জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। আয়তনের হিসাবে এটি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সম্মিলিত এলাকার পাঁচ গুণেরও বেশি।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস—সিইজিআইএস স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে এই হিসাব দিয়েছে। তবে ভাঙনে হারানো সব জমি স্থায়ীভাবে হারিয়ে যায়নি। একই সময়ে প্রায় ৪৩৩ বর্গকিলোমিটার জমি নতুন চর হিসেবে জেগে উঠেছে। ফলে স্থায়ীভাবে হারানো জমির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ১৫৩ বর্গকিলোমিটার, যা পুরো ঢাকা শহরের প্রায় চার গুণ।
সবচেয়ে বেশি ভাঙন যমুনায়: ১৯৭৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিন নদীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জমি ভেঙেছে যমুনা। এ সময়ে নদীটি প্রায় ৯৪২ দশমিক ২০ বর্গকিলোমিটার জমি বিলীন করেছে। তিন নদীর মোট ভাঙনের প্রায় ৬০ শতাংশই যমুনার।
একই সময়ে গঙ্গায় প্রায় ৩০২ দশমিক ৯০ বর্গকিলোমিটার এবং পদ্মায় ৩৩৮ দশমিক ৪৩ বর্গকিলোমিটার জমি নদীগর্ভে গেছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদি হিসাবে নদীভাঙনের হার কমেছে। ১৯৮০-এর দশকে যমুনায় বছরে গড়ে প্রায় ৫০ বর্গকিলোমিটার জমি ভাঙত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা কমে প্রায় ১৫ বর্গকিলোমিটারে নেমেছে। পদ্মায় ১৯৯০-এর দশকে বছরে গড়ে প্রায় ২৩ বর্গকিলোমিটার ভাঙন হলেও গত এক দশকে তা ১০ বর্গকিলোমিটারের নিচে নেমেছে।
১৯৯৫ সালে যমুনা, পদ্মা ও গঙ্গায় সম্মিলিত ভাঙনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৯৫ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে যমুনায় ৪৭, পদ্মায় ৩৬ এবং গঙ্গায় ১২ বর্গকিলোমিটার জমি ভেঙেছিল।
২০২৫ সালে তিন নদীর সম্মিলিত ভাঙন কমে দাঁড়ায় ১০ দশমিক ৩৪ বর্গকিলোমিটারে। এর মধ্যে গঙ্গায় ৫ দশমিক ৯৩, যমুনায় ৩ দশমিক ৪৮ এবং পদ্মায় শূন্য দশমিক ৯৩ বর্গকিলোমিটার জমি ভেঙেছে।
জমি হারানোর সঙ্গে হারাচ্ছে জীবিকা: নদীভাঙনে সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়ছে কৃষিনির্ভর পরিবারগুলো। জমি হারানোর অর্থ তাদের জন্য শুধু বসতভিটা হারানো নয়; একই সঙ্গে হারাচ্ছে কৃষিকাজ, আয় ও পরিবারের দীর্ঘদিনের জীবিকার ভিত্তি।
ভাঙনের পর অনেক পরিবার প্রথমে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি বা আশপাশের এলাকায় আশ্রয় নেয়। কিন্তু সেখানে দীর্ঘমেয়াদে কাজের সুযোগ না থাকায় একপর্যায়ে তাদের শহরমুখী হতে হয়।
সিইজিআইএসের হিসাবে, প্রতি এক বর্গকিলোমিটার নদীভাঙনে প্রায় এক হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। তবে নদীভাঙনে বাংলাদেশে মোট কত মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছেন, তার পূর্ণাঙ্গ সরকারি হিসাব নেই।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য ২০১৯ সালের। ওই বছর নয়টি জেলায় নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে ২৪ হাজার ৩২৮টি পরিবার তালিকাভুক্ত হয়েছিল। ওই বছর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছিল ৩৬৬ কোটি টাকা। তবে দেশের সব নদী ও সব জেলা এই হিসাবের আওতায় ছিল না।
নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত মানুষের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত ঢাকায় আসে। শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত দক্ষতা না থাকায় তাদের বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে যুক্ত হয়। কেউ দিনমজুর, কেউ রিকশাচালক, কেউ গৃহকর্মী, আবার কেউ বাজারে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন।
ঢাকার পল্লবীর ভোলার বস্তিতে ৩০ হাজারের বেশি মানুষ বসবাস করেন। তাদের বেশির ভাগই ভোলা জেলার নদীভাঙন ও বন্যায় সর্বস্ব হারিয়ে ঢাকায় এসেছেন।
মিরপুর-১২, মোল্লা বস্তি ও দুয়ারীপাড়াসহ ঢাকার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত মানুষের বসতি বেশি দেখা যায়। ফলে এসব এলাকায় অনানুষ্ঠানিক বসতি ও দারিদ্র্যের চাপও বাড়ছে।
নদীভাঙন তাই শুধু গ্রামীণ জনপদের সমস্যা হয়ে থাকছে না। এর প্রভাব রাজধানীর আবাসন, কর্মসংস্থান ও নগর দারিদ্র্যের ওপরও পড়ছে।
ইব্রাহিমের তিন একর জমি এখন নদীতে: জামালপুরের ইসলামপুরের চরগিলাবাড়ি গ্রামের ইব্রাহিম মিয়ার তিন একরের বেশি জমি ছিল। সেখানে আখ, বাদাম ও ধান চাষ করতেন। যমুনার ভাঙনে একসময় তার জমি ও ঘর দুটোই নদীতে চলে যায়। সর্বস্ব হারিয়ে পরিবার নিয়ে গাইবান্ধায় মামার বাড়িতে আশ্রয় নেন তিনি। সেখানে খেতমজুরি ছাড়া অন্য কাজের সুযোগ ছিল না। পরে ২০০৯ সালে ঢাকায় চলে আসেন।
এখন কারওয়ান বাজারের পাইকারি সবজি বাজারে জনমজুরের কাজ করেন। দিনে প্রায় এক হাজার টাকা আয় করেন। খাওয়া ও থাকার পেছনে খরচ হয় প্রায় ১৫০ টাকা।
তবু ঢাকাকে স্থায়ী ঠিকানা মনে করেন না ইব্রাহিম। যমুনায় তার জমি আবার জেগে উঠবে—এই আশায় রয়েছেন। পলি জমে জমি তৈরি হলে আবার জামালপুরে ফিরে যেতে চান তিনি।
চর জাগে, আবার বিলীনও হয়: নদীভাঙনের পাশাপাশি নতুন চর জেগে ওঠে। গত পাঁচ দশকে ভেঙে যাওয়া জমির মধ্যে প্রায় ৪৩৩ বর্গকিলোমিটার নতুন চর হিসেবে জেগেছে। কিন্তু এসব চর স্থায়ী নয়। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে একদিকে নতুন ভূমি তৈরি হয়, অন্যদিকে পুরোনো চর নদীতে বিলীন হয়ে যায়।
এ কারণে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য নতুন চর সবসময় স্থায়ী পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করে না। অনেক পরিবারকে একাধিকবার বসতি বদলাতে হয়।
শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার মাঝেরকান্দি গ্রামের বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতা এর বড় উদাহরণ।
যে গ্রামের তিন ঠিকানা: মাঝেরকান্দির প্রবীণ বাসিন্দা ওয়াহাব খানের জীবদ্দশায় গ্রামটি তিনবার স্থান পরিবর্তন করেছে।
প্রায় ৪০ বছর আগে নদীর অপর পাড়ে থাকা পুরোনো মাঝেরকান্দি নদীতে বিলীন হয়ে যায়। গ্রামের মানুষ বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েন।
এর প্রায় ২৫ বছর পর নদীর মাঝখানে একটি চর জেগে উঠলে তারা সেখানে আবার বসতি গড়েন। নতুন জায়গাটির নামও রাখা হয় মাঝেরকান্দি। কিন্তু সাত বছর আগে সেই চরও নদীতে বিলীন হয়ে যায়।
এবার বাসিন্দারা বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের মালিকানাধীন জমিতে আশ্রয় নেন। তবে সেখান থেকেও জায়গা ছেড়ে দেওয়ার নোটিশ পেতে হয় তাদের।
বারবার জায়গা বদলের কারণে কৃষিজমি, গাছপালা ও স্থায়ী জীবিকার সুযোগ হারিয়েছে পরিবারগুলো। একসময় নিজেদের জমি থেকে বছরে ২০০ মণ ধান পাওয়া পরিবার এখন দুই ছেলের দিনমজুরির আয়ের ওপর নির্ভর করছে।
কাঠুরিয়ায় বাড়ির উঠানেও নদী: শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার কাঠুরিয়া গ্রামে পদ্মার ভাঙনও তীব্র। সেখানে এখনো প্রায় ১০০ থেকে ১৫০টি পরিবার নদীর তীরে বসবাস করছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মনসুরা বেগমের বাড়ির পেছনের সড়ক ইতোমধ্যে নদীতে বিলীন হয়েছে। কয়েক বছর আগেও তাদের বাড়ি থেকে পদ্মা নদী প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে ছিল। গত বছর নদী তাদের জমির কাছে চলে আসে।
চলতি বছর মাত্র ১০ দিনের মধ্যে নদী তার বাড়ির উঠানের অর্ধেক গিলে নেয়। পরে পুরোনো ঘর থেকে খুলে আনা ঢেউটিন দিয়ে নতুন করে অস্থায়ী ঘর তৈরি করেন তিনি ও তার স্বামী।
ভাঙন শুরু হলে স্থানীয় লোকজন এসে ঘর খুলে জিনিসপত্র সরিয়ে নিতে সাহায্য করেন।
ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রায় ৪০ জন শ্রমিক নদীতীরে বালুভর্তি জিওব্যাগ ফেলছেন। এতে মনসুরার বাড়ির উঠানের অবশিষ্ট অংশ আপাতত রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।
তবে পাশের মাঝেরকান্দি গ্রামের মানুষ এতটা ভাগ্যবান হননি। পুরো গ্রামই নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ায় বাসিন্দাদের অন্যত্র আশ্রয় নিতে হয়েছে।
সিইজিআইএস চলতি বছরও নদীভাঙনের পূর্বাভাস দিয়েছে। তাদের হিসাবে, আরও ৯ দশমিক ১৫ বর্গকিলোমিটার জমি নদীতে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গাইবান্ধা, জামালপুর, কুড়িগ্রাম, পাবনা, কুষ্টিয়া ও ফরিদপুরের ১১টি এলাকায় ভাঙনের ঝুঁকি রয়েছে। এসব এলাকায় চারটি স্কুল, তিনটি মসজিদ, একটি ক্লিনিক ও কয়েকটি সড়কসহ মোট ৭৩টি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে ১০০ মিটারের কম এলাকার সম্ভাব্য ভাঙন সিইজিআইএসের পূর্বাভাসে ধরা হয় না। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে ছোট আকারের ভাঙনের আরও কিছু ঘটনা এই হিসাবের বাইরে থাকতে পারে।
নদীভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বালুভর্তি জিওব্যাগসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেয়। কোথাও এতে নদীতীর সাময়িকভাবে রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে। আবার কোথাও ভাঙনের গতি এত বেশি যে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরও তীর রক্ষা করা যাচ্ছে না।
২০০৪ সাল থেকে সিইজিআইএস যমুনা, পদ্মা ও গঙ্গার ভাঙনের পূর্বাভাস দিয়ে আসছে। বর্ষার আগে স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা হয়। এই পূর্বাভাসের ভিত্তিতে পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙনপ্রবণ এলাকায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়। তবে নদীভাঙনের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের সঙ্গে শুধু তীর রক্ষা নয়, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন ও জীবিকার বিষয়টিও যুক্ত।
নদীভাঙনের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও বাংলাদেশের বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। জলবায়ু নিয়ে গবেষণা করা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতি সাতজন মানুষের একজন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত হতে পারেন। এর মধ্যে নদীভাঙনের কারণে বাস্তুচ্যুতির হার হতে পারে মোট বাস্তুচ্যুতির প্রায় ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ।
অর্থাৎ নদীভাঙনকে শুধু নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতির বিষয় হিসেবে দেখলে সমস্যার পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। ভূমি হারানো, কৃষি ও জীবিকার সংকট, বাস্তুচ্যুতি এবং শহরমুখী অভিবাসনের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, যমুনা, পদ্মা ও গঙ্গায় দীর্ঘমেয়াদে ভাঙনের হার কমেছে। কিন্তু নদীর গতিপথ পরিবর্তন, নতুন চর তৈরি এবং পুরোনো চর বিলীন হওয়ার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
একটি পরিবার নদীতে জমি হারানোর পর নতুন চর পেলে সেখানে আবার বসতি গড়তে পারে। কিন্তু সেই চর কতদিন টিকে থাকবে, তার নিশ্চয়তা থাকে না। ফলে অনেক পরিবারকে বারবার নতুন করে ঘর তুলতে হয়, জমি খুঁজতে হয় এবং জীবিকা শুরু করতে হয়।
মাঝেরকান্দির মতো গ্রামের মানুষের অভিজ্ঞতা দেখায়, নদীভাঙনের ক্ষতি শুধু একটি মৌসুমের নয়। বছরের পর বছর ধরে একটি পরিবারকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে দিতে পারে এই ভাঙন। সব মিলিয়ে গত পাঁচ দশকে যমুনা, গঙ্গা ও পদ্মায় ১ হাজার ১৫৩ বর্গকিলোমিটার জমি স্থায়ীভাবে হারানোর হিসাব বাংলাদেশের নদীভাঙনের ব্যাপ্তি স্পষ্ট করে। একই সঙ্গে নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত মানুষের শহরমুখী প্রবণতা দেখাচ্ছে, এই সমস্যা এখন গ্রাম ও নদীতীর ছাড়িয়ে নগরজীবনেও প্রভাব ফেলছে। নদীভাঙনের হার কমানোর পাশাপাশি তাই প্রয়োজন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের নির্ভুল তথ্যভান্ডার, কার্যকর পুনর্বাসন, বিকল্প জীবিকার সুযোগ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি নদীতীর সংরক্ষণ ব্যবস্থা। নইলে নদীর ভাঙনে শুধু জমির পরিমাণই কমবে না, বাড়তে থাকবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা এবং শহরের ওপর তাদের নির্ভরশীলতাও।
ঢাকার অদূরে সাভার-আশুলিয়ায় একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। চলতি বছরের বিভিন্ন সময়ে এখানে ব্যক্তিগত বিরোধ, পারিবারিক কলহ, ছিনতাই, পূর্বশত্রুতা ও তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। কোথাও ঘরের ভেতর মরদেহ মিলেছে, কোথাও সড়কে বা নির্জন স্থানে পড়ে ছিল লাশ। কিছু ঘটনায় দ্রুত রহস্য উদ্ঘাটন ও আসামি গ্রেপ্তার হলেও বেশ কিছু ঘটনায় হত্যার কারণ ও জড়িতদের ভূমিকা নিয়ে তদন্ত চলেছে। এর মধ্যেই সর্বশেষ আমিনবাজারে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আলতাফ হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় এলাকার অপরাধ পরিস্থিতি আবারও সামনে এসেছে।
গত শনিবার রাতে আমিনবাজারের বড়দেশি এলাকায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। ৫৮ বছর বয়সী আলতাফ হোসেন ঢাকার মালিবাগে এসবির কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। স্থানীয় একটি বিরোধের প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিনি হামলার শিকার হন। একই ঘটনায় তার ছেলে আরিফুল ইসলামও আহত হয়েছেন। গুরুতর আহত আলতাফকে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার সূত্রপাত একটি গাড়িকে কেন্দ্র করে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, বড়দেশি মদিনা হাউজিং এলাকায় একটি গেঞ্জি কারখানার সামনে গাড়ি রাখা ও একজন অটোরিকশাচালককে মারধরকে কেন্দ্র করে বিরোধের সৃষ্টি হয়। আলতাফ হোসেন বিষয়টি থামাতে এগিয়ে গেলে তার সঙ্গে কয়েকজনের কথা-কাটাকাটি হয়। পরে তাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
একপর্যায়ে হামলাকারীরা আলতাফের পিছু নিয়ে তার কারখানার দিকে যায়। সেখানে তার ওপর আবার হামলা চালানো হয়। ছেলে আরিফুল ইসলাম বাবাকে রক্ষা করতে গেলে তিনিও হামলার শিকার হন। পরে স্থানীয়রা দুজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। আলতাফের মৃত্যু হয় চিকিৎসাধীন অবস্থায়।
ঘটনার পর আমিনবাজার এলাকা থেকে জহিরুল ইসলাম নামে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তিনি প্রাইভেটকারের চালক ও মালিক বলে পুলিশ জানিয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী মামলা করেছেন। মামলায় ১৫ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
ঘটনাটির ছায়া তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। হামলার সূত্রপাত, দ্বিতীয় দফায় কারা হামলা চালায়, ঘটনাস্থলে কারা উপস্থিত ছিল এবং প্রত্যেকের ভূমিকা কী ছিল—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সাভার-আশুলিয়ায় চলতি বছরের আগের ঘটনাগুলোতেও হত্যার নানা ধরন সামনে এসেছে। জানুয়ারিতে সাভারে ভবঘুরের ছদ্মবেশে থাকা মশিউর রহমান ওরফে সম্রাটের বিরুদ্ধে ছয়জনকে হত্যার অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় এক বৃদ্ধা, এক নারী ও এক কিশোরীসহ ছয়জন নিহত হন। পরে সম্রাট আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
মে মাসে আশুলিয়ায় একই পরিবারের দুই ভাইকে গুলি করার ঘটনা ঘটে। এর আগে স্ত্রীকে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় আদালতে মৃত্যুদণ্ডের রায়ও হয়েছে।
জুন-জুলাইয়েও আশুলিয়া ও সাভারে হত্যাকাণ্ডের একাধিক ঘটনা সংবাদে আসে। জুলাইয়ে পিবিআই একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে আসামিকে গ্রেপ্তার করে। আগস্টে সাভার-আশুলিয়া এলাকায় হত্যার অভিযোগে একাধিক মামলা ও তদন্তের খবর প্রকাশিত হয়।
আগস্টের অন্যতম আলোচিত ঘটনা ছিল একটি তালাবদ্ধ কক্ষ থেকে গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার। পরে পিবিআই তদন্ত করে ওই ঘটনায় আসামি শনাক্তের কথা জানায়।
তদন্তকারীদের জন্য ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, মোবাইল ফোনের তথ্য ও অন্যান্য আলামত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে গ্রেপ্তার জহিরুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদ করে হামলায় অংশ নেওয়া অন্যদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
সাভার-আশুলিয়ায় ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশ বলছে, প্রতিটি ঘটনাকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের ধরন ও কারণ এক নয়। কোথাও পারিবারিক বিরোধ, কোথাও অর্থনৈতিক লেনদেন, কোথাও মাদক ও ছিনতাই, আবার কোথাও তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সহিংসতা তৈরি হচ্ছে।
ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শামীমা পারভীনের বক্তব্য অনুযায়ী, আমিনবাজারের সর্বশেষ ঘটনায় একটি প্রাইভেটকার রাখা নিয়ে বিরোধ মেটাতে গিয়ে এসআই আলতাফ ও তার ছেলে হামলার শিকার হন। ঘটনার পর পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে একজনকে আটক করেছে এবং অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
সাভার মডেল থানার ওসি মো. সাইফুল আলম জানান, আলতাফ হত্যার ঘটনায় একজনকে আটক করা হয়েছে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদেরও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে ঢাকা জেলা পিবিআই ছায়া তদন্ত শুরু করেছে।
পিবিআইয়ের ঢাকা জেলা ওসি সোলেমান গাজী জানিয়েছেন, ঘটনার পরপরই তারা ছায়া তদন্তে কাজ শুরু করেছেন।
আশুলিয়ায় দম্পতি হত্যার ঘটনায়ও পুলিশ তদন্ত চালাচ্ছে। আশুলিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, মামলার পর ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে এবং নিহতদের স্বজন ও আশপাশের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার সূত্র খোঁজা হচ্ছে।
সাভার-আশুলিয়া দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল। বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী মানুষের বসবাস, দ্রুত নগরায়ণ, আবাসিক এলাকার বিস্তার এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আগমন এ এলাকার আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে আরও জটিল করে তুলেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক এলাকায় রাতের বেলায় পর্যাপ্ত টহল ও নজরদারি না থাকায় অপরাধীরা সুযোগ পায়।
বিশেষ করে আমিনবাজার, বড়দেশি, মদিনা হাউজিং, জামগড়া, বাইপাইল ও আশপাশের বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় জনসংখ্যা বাড়লেও সব এলাকায় সমানভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে অপরাধের পর দ্রুত আসামি গ্রেপ্তারের পাশাপাশি অপরাধ প্রতিরোধে আগাম গোয়েন্দা নজরদারি, নিয়মিত টহল এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সিসিটিভি বাড়ানোর দাবি উঠেছে।
সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ ও তার স্ত্রী দিলশাদ নাহার কাকলীর দাখিল করা সম্পদ বিবরণী যাচাই করবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ জন্য দুজনের সম্পদ যাচাই ও অনুসন্ধানের কার্যক্রম এগিয়ে নিতে কর্মকর্তা নিয়োগ করেছে সংস্থাটি।
দুদক জানিয়েছে, তাদের সম্পদ বিবরণী যাচাই ও অনুসন্ধানের জন্য দুদকের সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ হোসেনকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। রোববার দুদকের সহকারী পরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম এ তথ্য জানিয়েছেন।
দুদকের সংশ্লিষ্ট নথিতে বলা হয়েছে, মিরপুর ডিওএইচএসের ঠিকানায় বসবাসকারী দিলশাদ নাহার কাকলীর দাখিল করা সম্পদ বিবরণী যাচাই ও অনুসন্ধানের জন্য কমিশন অনুসন্ধান কর্মকর্তা এবং তদারককারী কর্মকর্তা নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিধি অনুযায়ী যাচাই ও অনুসন্ধান কার্যক্রম শেষ করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালের মে মাসে জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের দাবি জানিয়ে দুদকে আবেদন করেন এক আইনজীবী। পরে একই বছরের সেপ্টেম্বরে জেনারেল আজিজ এবং তার দুই ভাই হারিস আহমেদ ও তোফায়েল আহমেদ জোসেফের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক।
জেনারেল আজিজের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে বাড়ি-ফ্ল্যাট কেনা এবং বিপুল অর্থ ব্যয়ে আলিশান বাংলো নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বাংলো নির্মাণের অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে।
এছাড়া মিরপুর ডিওএইচএসে বাড়ি এবং ঢাকার নিকুঞ্জ-১-এর ৬ নম্বর সড়কে ‘আজিজ রেসিডেন্স’ নামে একটি বাড়ি কেনার অভিযোগ রয়েছে। তাঁর দুই ভাইয়ের নামে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি ও বিপুল পরিমাণ জমি কেনার অভিযোগও রয়েছে।
দেশে-বিদেশে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং অর্থ পাচার করে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও দুবাইয়ে ব্যবসা পরিচালনা ও বাড়ি কেনার অভিযোগও অনুসন্ধান করছে দুদক।
জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ ২০২১ সালের ২৩ জুন সেনাপ্রধানের পদ থেকে অবসরে যান। অবসরের প্রায় তিন বছর পর, ২০২৪ সালের মে মাসে তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র।