জামিনে কারামুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলাল এবং সানজিদুল ইসলাম ইমনকে দ্রুতই আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার রেজাউল করিম মল্লিক।
আজ মঙ্গলবার ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলন তিনি এ কথা বলেন।
ডিবি প্রধান বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যাতে স্বাভাবিক থাকে সে জন্য আমরা বিশেষ নজর দিচ্ছি। কোনও সন্ত্রাসী আইনের আওতা থেকে রক্ষা পাবে না। সে পিচ্চি হেলাল হোক, ইমন হোক। তাদের আইনের আওতায় আনতে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে, অবশ্যই তারা গ্রেপ্তার হবেন।
তিনি বলেন, সম্প্রতি এই দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে হত্যা ও ছিনতাইয়ের অভিযোগে মামলা হয়েছে। সর্বশেষ ইমনের বিরুদ্ধে এলিফ্যান্ট রোডে দুই ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে আহতের ঘটনায় এক নম্বর আসামি করা হয়।’
রেজাউল করিম মল্লিক বলেন, কোনো চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারীর ঠিকানা এ দেশে হবে না। পুলিশ তাদের কঠোর হাতে দমন করবে। রাজধানীসহ বিভিন্ন জায়গায় গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। গেলো ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা থেকে ২৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবিপুলিশ। এ সময় বন্দুক, বিদেশি পিস্তল, ম্যাগজিন ও গুলি উদ্ধার করা হয়।’
গোয়েন্দা প্রধান বলেন, কোনো অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে আমি ব্যক্তিগতভাবে রক্তচক্ষুকে ভয় পাই না। যতদিন কাজ করবো ততদিন দেশ ও জনগণের সেবার মানসে থাকবো। অন্যায়ের কাছে মাথানত করিনি, ভবিষ্যতেও করবো না। আমার হারানোর কিছু নেই। দীর্ঘ ১৮ বছর পুলিশে যে অত্যাচার, নির্যাতন সহ্য করেছি, তা থেকে ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতা আমাদের মুক্ত করেছে। এ জন্য ছাত্র-জনতার কাছে আন্তরিক কৃতজ্ঞ। বর্তমান সরকার প্রধান শুধু বাংলাদেশে না বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। তার অধীনে আমরা যেসব পুলিশ কাজ করতে পারছি এ জন্য গর্বিত।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন- ডিবির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের দক্ষিণের যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ, গোয়ন্দা উত্তর বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ রবিউল হোসেন ভূঁইয়া, তেজগাঁও গোয়েন্দা পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মিজানুর রহমান এবং ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মোহাম্মদ তালেবুর রহমান।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট–২০২৬ সামনে রেখে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দেশব্যাপী সুসংগঠিত প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম শুরু করেছে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী। এই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার (০৫ ফেব্রুয়ারি) টাঙ্গাইল জেলা স্টেডিয়ামে এক বর্ণাঢ্য প্রস্তুতিমূলক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় যেখানে বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে সংশ্লিষ্ট সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।
সমাবেশে তিনি দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সংযোগ ও ঐক্য সুদৃঢ়করণ এবং সম্মিলিত শক্তির কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমে যেকোনো ধরনের অনিয়ম ও আগ্রাসন প্রতিহত করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। মহাপরিচালক তাঁর বক্তব্যে পেশাদারিত্ব বজায় রাখার তাগিদ দিয়ে বলেন, “মৌলিক প্রশিক্ষণের আলোকে ঐক্য, শৃঙ্খলা ও নিষ্ঠার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনই একটি সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করার প্রধান ভিত্তি।”
রাজশাহী, নওগাঁ ও ময়মনসিংহ জেলায় সরাসরি সম্প্রচারিত এই সমাবেশের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা ও আত্মবিশ্বাসের সঞ্চার করা হয়েছে। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত ১৩ জন আনসার ও ভিডিপি সদস্যের সম্মিলিত প্রতিরোধের বিষয়টি তুলে ধরে মহাপরিচালক বলেন, “বাহিনীর ধারাবাহিক প্রস্তুতিমূলক সমাবেশের মূল উদ্দেশ্য হলো দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ, ঐক্য ও সচেতনতা আরও জোরদার করা। জাতীয় নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল দায়িত্ব নিঃসন্দেহে চ্যালেঞ্জিং; তবে সম্মিলিত প্রস্তুতি ও দায়িত্ববোধ সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখে।” তিনি মনে করেন, সম্মিলিত প্রস্তুতির মাধ্যমেই যেকোনো অপচেষ্টা রুখে দেওয়া সম্ভব।
১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই বাহিনী দেশের মাটি ও মানুষের কল্যাণে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখ করে মহাপরিচালক বলেন, “রাষ্ট্রসেবার মানসিকতায় গড়ে ওঠা এই বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের দিকে আজ সারা দেশের মানুষ প্রত্যাশাভরে তাকিয়ে আছে। জনগণের আকাঙ্ক্ষা—একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন। সেই স্বপ্নের গর্বিত বাহক হিসেবে আনসার ও ভিডিপি সদস্যরা বাহিনীর ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করবেন।” তিনি সদস্যদের ব্যক্তিগত সরঞ্জামাদির সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নির্ধারিত পোশাক-পরিচ্ছদ ও শৃঙ্খলার বিষয়ে সর্বোচ্চ সচেতন থাকার আহ্বান জানান যাতে বাহিনীর জনআস্থা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।
সমাবেশের সমাপনী বক্তব্যে মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন যে, অপশক্তির প্রভাবমুক্ত থেকে জাতিকে একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়া একটি পবিত্র আমানত। জন্মভূমির প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা থেকে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী এই রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে অতীতের মতোই অটল থাকবে বলে তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন। এই প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে একটি শক্তিশালী ও গণতন্ত্রবান্ধব নির্বাচন ব্যবস্থার ভিত আরও মজবুত হবে—এটিই বাহিনীর মূল অঙ্গীকার হিসেবে পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। মূলত আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে মাঠ পর্যায়ে শৃঙ্খলা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই এই বিশেষ সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
কাস্টমস প্রশাসনে বড় ধরনের রদবদল ঘটিয়ে কমিশনারসহ ৩৮ জন কর্মকর্তাকে একযোগে বদলি করা হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পৃথক পাঁচটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) এই বদলির নির্দেশনা জারি করা হয়।
বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে ৩ জন কমিশনার, ৪ জন যুগ্ম কমিশনার, ৫ জন অতিরিক্ত কমিশনার, ৮ জন উপ-কমিশনার এবং ১৮ জন সহকারী কমিশনার পদমর্যাদার কর্মকর্তা রয়েছেন। এসব আদেশের একটি গত মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) এবং অপর চারটি বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশ করা হয়। নির্দেশনায় এই কর্মকর্তাদের ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন কাস্টমস হাউজে এবং বিভাগীয় শহরগুলো থেকে ঢাকায় স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে।
বদলির তালিকায় থাকা তিন কমিশনার হলেন—আবুল বাশার মো. শফিকুর রহমান, চলতি দায়িত্বে থাকা মো. মাহাফুজুর রহমান ও মো. জাকিন হোসেন। যুগ্ম কমিশনারদের মধ্যে রয়েছেন মো. আল আমিন, সুমন দাস, মাজেদুল হক ও মহিবুর রহমান ভুঞা। অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে বদলি হয়েছেন কামনাশীষ, মোহাম্মদ সেলিম শেখ, রাকিবুল হাসান, মিনহাজ উদ্দিন ও আব্দুল রশিদ মিয়া। উপ-কমিশনার পদে রদবদল হওয়া কর্মকর্তারা হলেন মোহাম্মদ সাইফুর রহমান, প্রভাত কুমার সিংহ, নুরুন নাহার লিলি, তানজিলা ইয়াসমিন, জোবায়দা খানম, রবীন্দ্র কুমার সিংহ, মো. মশউর রহমান ও আলী রেজা হায়দার।
এছাড়া সহকারী কমিশনার হিসেবে শুভ্র দেব মণ্ডল, অপূর্ব সাহা, আবদুস সাত্তার, ফয়ছাল আহম্মদ, মো. শওকত হোসেন, দীপু রাম রায়, সামিয়া নিশাত, মো. আইয়ুব, ফিরোজ হোসেন বিশ্বাস, আসিবুল হক, রেবেকা সুলতানা রীমা, আবু সালেহ আব্দুন নূর, মিনহাজ উদ্দিন আহমেদ সৌরভ, মো. শাহাদাত হোসেন, মো. আবদুল্লাহ, একেএম জামিউল আলম, আব্দুস সালাম ও মোস্তফা কামালকে নতুন কর্মস্থলে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মূলত প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক প্রয়োজনে কাস্টমসের এই শীর্ষ ও মধ্যম সারির কর্মকর্তাদের একযোগে নতুন কর্মস্থলে বদলি করা হলো।
এলপি গ্যাসের ভ্যাট কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার যার ফলে বাজারে এলপি গ্যাসের দাম কমে আসবে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদের সভায় এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পরবর্তীতে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রেস সচিব সাংবাদিকদের এই সিদ্ধান্তের কথা জানান।
সরকারের নতুন এই পদক্ষেপে এলপি গ্যাসের স্থানীয় উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে বিদ্যমান কর কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। শফিকুল আলম বলেন, ‘এলপি গ্যাসের স্থানীয় উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে আরোপিত ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ২ শতাংশ আগাম কর অব্যাহতি প্রদানপূর্বক এলপি গ্যাসের আমদানি পর্যায়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।
এর ফলে এলপি গ্যাসের ওপরে যে করভার, এ করভার একটু হলেও কমবে এবং এর ফলে লোকাল মার্কেটে এলপি গ্যাসের দাম আরও কমে আসবে।’ মূলত সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জ্বালানি খরচ কমিয়ে আনতেই সরকার এই শুল্ক ছাড়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে যা ভোক্তা পর্যায়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’ ২০২৬-এর জন্য মনোনীত ব্যক্তিদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এ বছর শিল্প, সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ নয়জন বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং একটি জনপ্রিয় ব্যান্ড দলকে এই সম্মাননার জন্য মনোনীত করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম পদকপ্রাপ্তদের এই তালিকা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেন।
এবারের পদকপ্রাপ্তদের তালিকায় বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে রয়েছেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী ফরিদা আক্তার ববিতা। চলচ্চিত্র শিল্পে দীর্ঘদিনের অনবদ্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে এই সম্মানে ভূষিত করা হচ্ছে। সাংবাদিকতা বিভাগে পদক পাচ্ছেন প্রবীণ ও প্রথিতযশা সাংবাদিক শফিক রেহমান। দেশের সাংবাদিকতা জগতে তাঁর দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় পথচলার মূল্যায়ন হিসেবে এই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। এদিকে দেশের সংগীত জগতের অন্যতম নক্ষত্র ও এলআরবি’র প্রতিষ্ঠাতা আইয়ুব বাচ্চুকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করা হচ্ছে। গিটার জাদুকর হিসেবে পরিচিত এই শিল্পীর মৃত্যুপরবর্তী এই সম্মাননা তাঁর ভক্ত ও অনুরাগীদের মধ্যে বিশেষ আবেগের সৃষ্টি করেছে।
শিল্পকলার অন্যান্য শাখায় পদকজয়ীদের মধ্যে রয়েছেন স্থাপত্যে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম এবং ভাস্কর্যে তেজস হালদার যস। শিক্ষাক্ষেত্রে অনন্য অবদানের জন্য প্রফেসর মাহবুবুল আলম মজুমদার এবং চারুকলায় প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আব্দুস সাত্তারকে এই পদক দেওয়া হচ্ছে। লোকজ সংস্কৃতিতে বিশেষ ভূমিকার জন্য ইসলাম উদ্দিন পালাকার এবং নৃত্যে অর্থি আহমেদ সরকারের এই উচ্চ সম্মাননা পাচ্ছেন।
এ বছরের একুশে পদকের তালিকায় একটি ব্যতিক্রমী সংযোজন হলো প্রথমবারের মতো কোনো ব্যান্ড দলকে দলীয়ভাবে এই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান। দেশের জনপ্রিয় ও দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী ব্যান্ড দল ‘ওয়ারফেজ’ সংগীত বিভাগে এই অনন্য সম্মাননা পেতে যাচ্ছে। প্রেস সচিব শফিকুল আলম তাঁর ব্রিফিংয়ে জানান, সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গুণী ব্যক্তিদের কাজ পর্যালোচনা করে এই তালিকা চূড়ান্ত করেছে। নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে অসামান্য মেধা ও দেশপ্রেমের স্বাক্ষর রাখায় এই বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও প্রতিষ্ঠানকে একুশে পদকের জন্য মনোনীত করা হয়েছে। খুব শীঘ্রই এক আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁদের হাতে এই পদক ও সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হবে। মূলত গুণীজনদের কাজের স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমেই দেশের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে বলে সরকার মনে করছে।
বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিসের সদস্যদের বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণের লক্ষ্যে গঠিত পে-কমিশনের সুপারিশ সংবলিত প্রতিবেদন রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এই প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস পে-কমিশনের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি এস এম এমদাদুল হকের নেতৃত্বে গঠিত কমিশনের একটি প্রতিনিধিদল। দেশের বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের জীবনমান উন্নয়ন এবং বেতন কাঠামোর আধুনিকায়নে এই প্রতিবেদনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সাক্ষাৎকারকালে বিচারপতি এস এম এমদাদুল হক রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন এবং জুডিসিয়াল সার্ভিসের কর্মকর্তাদের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে যৌক্তিক বেতন-ভাতা নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেন। রাষ্ট্রপতি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে কমিশনের সুপারিশগুলো শোনেন এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বিচারকদের সামাজিক নিরাপত্তা ও আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এই সময় রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য যে, সম্প্রতি বেতন স্কেল নিয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে নানা আলোচনা চলমান রয়েছে। এই প্রতিবেদনের প্রেক্ষাপটে জ্বালানি উপদেষ্টা মন্তব্য করেছেন যে, বর্তমানে প্রস্তাবিত বা নির্ধারিত এই পে-স্কেল পরবর্তী সময়ে কোনো নির্বাচিত সরকার চাইলে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় পরিবর্তন বা বাতিল করার এখতিয়ার রাখবে। তবে বিচারকদের জন্য বিশেষ এই পে-কমিশনের সুপারিশগুলো কার্যকর হলে তা বিচারিক কাজে আরও গতিশীলতা ও সততা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে। সরকার এখন এই প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো পর্যালোচনা করে পরবর্তী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে ভোটারদের যাতায়াত এবং ভোটাধিকার প্রয়োগ নির্বিঘ্ন করতে সাধারণ ছুটির দিনগুলোতেও রাজধানীতে মেট্রোরেল চলাচল স্বাভাবিক রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আগামী ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের সাধারণ ছুটি এবং এর সঙ্গে সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে টানা চার দিনের সরকারি ছুটি থাকলেও যাত্রীদের সুবিধার্থে মেট্রোরেল তার নিয়মিত সূচি অনুযায়ী চলবে। মেট্রোরেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। রাজধানীর যানজটমুক্ত যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে পরিচিত এই পরিষেবাটি সচল রাখার মাধ্যমে মূলত ভোটারদের কেন্দ্রে পৌঁছানো এবং সাধারণ মানুষের চলাচল সহজতর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনকালীন সময়ে ট্রেন চলাচল এবং রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্ন রাখতে ডিএমটিসিএল কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট সব পর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ছুটি বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে। ডিএমটিসিএলের পরিচালক (প্রশাসন) একেএম খায়রুল আলম স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে জানানো হয়েছে যে, আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ট্রেন অপারেশন, লাইন অপারেশন, রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা কাজে নিয়োজিত সবার ছুটি বাতিল থাকবে। ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক আহমেদ গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, নির্বাচনের দিন অর্থাৎ ১২ ফেব্রুয়ারি ট্রেন চলাচলে কোনো অসুবিধা থাকবে না এবং যাত্রীরা নিয়মিত সময়সূচী অনুযায়ী যাতায়াত করতে পারবেন।
তবে নিরাপত্তার খাতিরে কিছু বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করবে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ। দায়িত্বরত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভোটের দিন সাধারণ কর্মদিবসের মতোই মেট্রো ট্রেন চললেও যে সমস্ত স্টেশনের প্রবেশপথ বা গেট সরাসরি কোনো ভোটকেন্দ্রের একদম সন্নিকটে অবস্থিত, নিরাপত্তার স্বার্থে সেই নির্দিষ্ট গেটগুলো বন্ধ রাখা হতে পারে। তবে যাত্রীদের ওঠানামার জন্য সংশ্লিষ্ট স্টেশনের অন্যান্য বিকল্প গেটগুলো যথারীতি উন্মুক্ত থাকবে। এর ফলে নিরাপত্তা বজায় রাখার পাশাপাশি যাত্রী সাধারণের সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে ডিএমটিসিএল।
অন্যদিকে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সারা দেশে সব ধরনের যান চলাচলের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। মন্ত্রণালয়ের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে যে, ভোটের দিন অর্থাৎ ১২ ফেব্রুয়ারি ট্যাক্সি ক্যাব, পিকআপ, মাইক্রোবাস ও ট্রাক চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। এই নিষেধাজ্ঞা ১১ ফেব্রুয়ারি দিবাগত মধ্যরাত ১২টা থেকে শুরু হয়ে ১২ ফেব্রুয়ারি দিবাগত মধ্যরাত ১২টা পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। এছাড়া মোটরসাইকেল চলাচলের ক্ষেত্রে ১০ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত ১২টা থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত ১২টা পর্যন্ত মোট ৭২ ঘণ্টার নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে।
উল্লেখ্য যে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণা আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। সড়কপথে সাধারণ যানবাহন চলাচলে কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকলেও মেট্রোরেল সচল থাকার সিদ্ধান্তটি রাজধানীর ভোটার ও নাগরিকদের জন্য বড় ধরনের স্বস্তি বয়ে আনবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মূলত একটি সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচনের আয়োজন সম্পন্ন করতেই সরকার এই সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে এনসিটি ইজারা কেন্দ্র করে চলমান অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি ও চরম অচলাবস্থা নিরসনে জরুরি বৈঠকে যোগ দিতে এসে আন্দোলনরত শ্রমিক-কর্মচারীদের তোপের মুখে পড়েছেন নৌপরিবহন উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন। বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে ১১টার দিকে বন্দর ভবনে প্রবেশের পথে শত শত শ্রমিক-কর্মচারী উপদেষ্টার গাড়ি ঘেরাও করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। এসময় পুলিশের কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনী থাকা সত্ত্বেও আন্দোলনকারীরা উপদেষ্টার গাড়িবহর আটকে দিয়ে দীর্ঘক্ষণ স্লোগান দিতে থাকেন। পরে উপদেষ্টা হেঁটে বন্দর ভবনের ভেতরে প্রবেশের সময়ও বিক্ষোভকারীরা চারপাশ থেকে তাঁকে লক্ষ্য করে 'ভুয়া ভুয়া' স্লোগান দিতে থাকায় এক অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নৌপরিবহন উপদেষ্টা সরাসরি ঢাকা থেকে সকাল সোয়া ১০টায় চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান। সেখান থেকে বন্দর চেয়ারম্যানের সঙ্গে তিনি গাড়িবহর নিয়ে বন্দর ভবনের দিকে রওনা হন। সকাল পৌনে ১১টার দিকে উপদেষ্টাকে বহনকারী গাড়িটি বন্দর ভবনের অদূরে কাস্টমস মোড়ে পৌঁছালে আগে থেকে ওত পেতে থাকা আন্দোলনরত শ্রমিক-কর্মচারীরা চারপাশ থেকে গাড়িটি ঘিরে ধরেন। এসময় শ্রমিকরা ‘ডিপি ওয়ার্ল্ডের দালালেরা-হুঁশিয়ার সাবধান’, ‘গো ব্যাক অ্যাডভাইজার’, ‘মা মাটি মোহনা- বিদেশিদের দেব না’—এমন নানা তীব্র স্লোগান দিতে থাকেন। উত্তপ্ত এই পরিস্থিতিতে উপদেষ্টার গাড়িটি প্রায় ১৫ মিনিট সেখানে আটকে থাকে। পরে পুলিশ ও বন্দরের নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মীরা একটি মানববেষ্টনী তৈরি করে গাড়িটিকে কোনোমতে বন্দর ভবনের মূল ফটকের ভেতরে নিয়ে যেতে সক্ষম হন।
উত্তেজনা কেবল রাস্তার মোড়েই সীমাবদ্ধ থাকেনি। গাড়িটি বন্দর ভবনের ভেতরে প্রবেশের পরপরই নিরাপত্তা কর্মীরা গেট বন্ধ করার চেষ্টা করলেও শতাধিক বিক্ষুব্ধ শ্রমিক স্লোগান দিতে দিতে ভেতরে ঢুকে পড়েন। নৌ উপদেষ্টা যখন গাড়ি থেকে নেমে ভবনের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করেন, তখন শ্রমিকরা আবারও তাঁকে ঘিরে ধরে স্লোগান দিতে থাকেন। এসময় পুলিশ ও নিরাপত্তারক্ষীদের বিশেষ পাহারায় উপদেষ্টাকে দ্রুত লিফটে করে ওপরের তলায় নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে উপদেষ্টা বন্দর ভবনে চলমান অচলাবস্থা ও এনসিটি ইজারা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে একটি জরুরি রুদ্ধদ্বার বৈঠকে অংশ নিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে ভবনের বাইরে এবং আশপাশের এলাকায় শ্রমিকদের ব্যাপক উপস্থিতি ও টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে।
এদিকে, বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ডাকা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে আজ বৃহস্পতিবারও চট্টগ্রাম বন্দরের সব ধরনের অপারেশনাল কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বাতিল এবং আন্দোলনকারী শ্রমিকদের ওপর প্রশাসনিক দমন-পীড়ন বন্ধের দাবিতে গত বুধবার সকাল থেকে এই কঠোর কর্মসূচি শুরু হয়। কর্মবিরতির প্রভাবে বহির্নোঙর থেকে জেটিতে জাহাজ আনা-নেওয়া যেমন বন্ধ হয়ে গেছে, তেমনি জেটিতে আটকে থাকা জাহাজগুলো থেকেও পণ্য খালাস করা সম্ভব হচ্ছে না। সব মিলিয়ে দেশের প্রধান এই সমুদ্রবন্দরে এক নজিরবিহীন স্থবিরতা নেমে এসেছে, যা দ্রুত নিরসনে প্রশাসনের পক্ষ থেকে চেষ্টা চালানো হলেও শ্রমিকরা তাদের দাবিতে অনড় অবস্থানে রয়েছেন। মূলত এনসিটি ইজারা বাতিল না হওয়া পর্যন্ত কোনো আলোচনা বা কাজ হবে না বলে জানিয়ে দিয়েছেন শ্রমিক নেতারা।
দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরে আজ বৃহস্পতিবারও শ্রমিক-কর্মচারীদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি অব্যাহত রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির কারণে বন্দরে চরম অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এই সংকটময় পরিস্থিতি নিরসন এবং বন্দরের কার্যক্রম পুনরায় সচল করার লক্ষ্যে আজ একটি উচ্চপর্যায়ের জরুরি সভা আহ্বান করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক)। বন্দর কর্তৃপক্ষের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় সভাপতিত্ব করবেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম. সাখাওয়াত হোসেন। সভায় বন্দর সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের কর্মকর্তা, জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধি ছাড়াও শ্রমিক নেতা ও বন্দর ব্যবহারকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের উপস্থিত থাকতে বিশেষভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব স্বাক্ষরিত এক দাপ্তরিক পত্রে জানানো হয়েছে যে, মূলত বন্দরের সার্বিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা, আমদানি-রপ্তানি পণ্য খালাস ও লোডিং কার্যক্রমে চলমান স্থবিরতা দূর করা এবং শ্রমিকদের মধ্যে বিরাজমান অস্থিরতা মোকাবিলায় পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করতেই এই জরুরি বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। বর্তমানে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ডাকা অনির্দিষ্টকালের এই কর্মবিরতির ফলে বিভিন্ন জেটিতে অবস্থানরত জাহাজগুলো থেকে কনটেইনার ও খোলা পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে বন্দর থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ডেলিভারি, কনটেইনার হ্যান্ডলিং, অফডক থেকে মালামাল আনা-নেওয়া এবং বন্দরের অভ্যন্তরে পণ্যবাহী যান চলাচল স্তব্ধ হয়ে পড়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
আন্দোলনরত শ্রমিকদের পক্ষ থেকে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, সরকার যতক্ষণ পর্যন্ত এনসিটি ইজারা দেওয়ার বিতর্কিত সিদ্ধান্ত থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে আসবে না, ততক্ষণ তাদের এই কঠোর কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। উল্লেখ্য যে, এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল গত শনিবার থেকে, যখন শ্রমিকরা টানা তিন দিন আট ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করেছিলেন। পরবর্তীতে মঙ্গলবার থেকে ২৪ ঘণ্টার এবং বুধবার থেকে তারা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির ডাক দেন। শ্রমিকদের দাবি, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে টার্মিনাল তুলে দেওয়া হলে বন্দরের সার্বভৌমত্ব ও স্থানীয় শ্রমিকদের কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়বে।
অন্যদিকে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার ও বন্দর কর্তৃপক্ষ শুরু থেকেই কঠোর অবস্থান নিয়েছে। আন্দোলনের প্রথম দিন চারজন শ্রমিককে তাৎক্ষণিকভাবে বদলি করা হয় এবং পরে রবিবার আরও ১২ জনকে অন্য জায়গায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সর্বশেষ গত সোমবার নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক অফিস আদেশের মাধ্যমে আরও ১৫ জন আন্দোলনকারী কর্মচারীকে মোংলা ও পায়রা বন্দরে বদলি করা হয়েছে। এছাড়া একদিনের কর্মবিরতিতে রাজস্বের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা নিরূপণ করতে ছয় সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। তবে এসব শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখেও শ্রমিকরা তাদের দাবিতে অনড় থাকায় আজকের জরুরি সভাটি বন্দরের ভবিষ্যৎ এবং চলমান সংকট নিরসনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান এই গেটওয়েতে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা এড়াতে দ্রুত একটি সম্মানজনক সমাধানের প্রত্যাশা করছেন ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর যতদ্রুত সম্ভব নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হস্তান্তর করা হবে বলে স্পষ্ট জানিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, নির্বাচন পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার কোনো পরিকল্পনা বা উদ্দেশ্য নেই। বুধবার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর তথ্যের কড়া সমালোচনা করেন এবং সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেন।
আবুল কালাম আজাদ মজুমদার তাঁর স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেন, নির্বাচনের পরও অন্তর্বর্তী সরকার আরও ১৮০ কার্যদিবস ক্ষমতায় থাকবে বলে যারা দাবি বা প্রচারণা চালাচ্ছেন, তাদের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ অসৎ। তিনি মনে করেন, একটি বিশেষ গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে এই ধরনের প্রপাগান্ডা ছড়াচ্ছে। এই গোষ্ঠীটি কিছুদিন আগেও নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে জনগণের মধ্যে ব্যাপক সংশয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করার চেষ্টা করেছিল। এখন যখন এটি স্পষ্ট যে নির্বাচন যথাসময়েই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তখন তারা নতুন করে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ও গুজব সামনে এনে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে।
উপ-প্রেস সচিব আরও বলেন, এই ধরনের ভিত্তিহীন অপপ্রচার মূলত নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক রূপান্তর নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করার একটি সুকৌশলী অপচেষ্টা। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো এই যে, কিছু উচ্চশিক্ষিত ও সচেতন মানুষও এই ধরনের ভিত্তিহীন প্রচারণায় বিভ্রান্ত হচ্ছেন। তবে বাস্তবতা হলো, এ ধরনের দাবির কোনো আইনি বা দাপ্তরিক ভিত্তি নেই এবং এ নিয়ে বিভ্রান্ত হওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। সরকারের একমাত্র লক্ষ্য হলো একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ নির্বাচন উপহার দেওয়া এবং এরপরই নির্বাচিতদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া।
বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, অন্তর্বর্তী সরকারের মূল ম্যান্ডেট বা দায়িত্ব হলো একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা। এর বাইরে কোনো বিশেষ রাজনৈতিক অভিলাষ বা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় টিকে থাকার লক্ষ্য সরকারের নেই। নির্বাচনোত্তর ক্ষমতার পালাবদল যেন দ্রুত ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে সম্পন্ন হয়, সে বিষয়ে সরকার সম্পূর্ণ অঙ্গীকারবদ্ধ। জনগণকে এই ধরনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গুজবে কান না দিয়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় আস্থাশীল থাকার আহ্বান জানিয়েছে সরকারের এই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। মূলত নির্বাচনের স্বচ্ছতা এবং সময়মতো ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়টি নিশ্চিত করতেই সরকারের পক্ষ থেকে এই জরুরি ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে।
বাংলাদেশের অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও শিল্পীদের সৃজনশীলতা উদযাপনের লক্ষ্যে ঢাকার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত রিকশা আর্ট ফেস্টিভ্যাল উপভোগ করেছেন নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন ও তাঁর স্ত্রী ডিয়ান। এই উৎসবের মাধ্যমে রিকশাকে শিল্পের এক জীবন্ত ক্যানভাস হিসেবে তুলে ধরা হয়, যা বিদেশি অতিথিদের মধ্যে দারুণ উৎসাহ ও কৌতূহল সৃষ্টি করে। অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের শিল্পীদের অসামান্য সৃজনশীলতা ও দক্ষতার ভূয়সী প্রশংসা করেন।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার মার্কিন দূতাবাস এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে যে, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ় সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করে রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন বলেন, রিকশাকে চলমান ক্যানভাসে রূপান্তর করার এই ধারা একদিকে যেমন স্থানীয় ঐতিহ্যকে তুলে ধরে, অন্যদিকে শিল্পে উৎকর্ষ ও উদ্ভাবনের আমেরিকান চেতনাকেও প্রতিফলিত করে। মূলত শিল্পের এই নান্দনিক প্রকাশ ও ঐতিহ্যের সংরক্ষণ দুই দেশের সাংস্কৃতিক সম্পর্কের গভীরতাকে আরও অর্থবহ করে তুলবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এই আয়োজনের মাধ্যমে বাংলাদেশের রিকশা চিত্রকর্মের দীর্ঘ ইতিহাস ও বিশ্বজুড়ে এর ক্রমবর্ধমান গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টিও নতুন করে আলোকপাত করা হয়।
দেশের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী স্পষ্টভাবে জানান যে, “মব ভায়োলেন্স বলে কোনো কিছু নেই। পুলিশের মধ্যে কোনো ভীতি কাজ করছে না। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হবে।” তিনি কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, নির্বাচন চলাকালীন যদি কোনো প্রার্থী আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন, তবে তাঁকে সরাসরি জেলখানায় যেতে হবে। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেল চারটার দিকে রাজশাহী কারা প্রশিক্ষণ একাডেমি মিলনায়তনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের লক্ষ্যে আয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
উপদেষ্টা তাঁর বক্তব্যে জনপ্রতিনিধি ও প্রার্থীদের আচরণের সীমা নির্ধারণ করে দিয়ে বলেন, “আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কোনো জনপ্রতিনিধি অশুভ আচরণ তাহলে ফলাও করে প্রচার করুন সোজা হয়ে যাবে। কোনো প্রার্থী অশোভন আচরণ করলে, তা সমাজে প্রকাশ পেলে এমনিতেই কোণঠাসা হয়ে যাবে। বেশি করলে পাশে জেলখানা দেখিয়ে বলেন সেখানে চলে যাবে।” এছাড়া তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে পুনর্ব্যক্ত করেন যে, আসন্ন নির্বাচনে কোনো প্রকার সহিংসতার আশঙ্কা নেই এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সব ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের অভিযানও নিয়মিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রাজশাহী বিভাগের নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে আয়োজিত এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানগণ উপস্থিত ছিলেন। বর্ডারগার্ড বাংলাদেশের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)-এর মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান এবং বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি ও পুলিশের অতিরিক্ত মহা পুলিশ পরিদর্শক খন্দকার রফিকুল ইসলাম সভায় অংশ নেন। মূলত একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্যে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদানের পাশাপাশি জনমনে আস্থা ফেরাতে এই সভার আয়োজন করা হয়।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে সারা দেশে নির্বাচনী পরিবেশ বজায় রাখতে এবং আইন-শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে বড় আকারের প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে সরকার। এর অংশ হিসেবে সারা দেশের নির্বাচনী অপরাধ প্রতিরোধ ও আচরণবিধি তদারকি করার জন্য মোট ১ হাজার ৫১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। নিয়োগপ্রাপ্ত এই কর্মকর্তারা সরাসরি নির্বাচনী মাঠে থেকে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং মাঠপর্যায়ের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক নির্দেশনা প্রদান করবেন।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নিয়োগপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের কাছে যোগদান করবেন এবং তার আগে তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। তারা ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকায় দায়িত্ব পালন করবেন। নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা রোধে তারা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় দণ্ড প্রদান করতে পারবেন। পাশাপাশি স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্বরত বিজিবি, কোস্টগার্ড ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়ার গুরুদায়িত্বও পালন করবেন এই ম্যাজিস্ট্রেটরা।
সরকারি এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর ৫ ধারা মোতাবেক ভোটগ্রহণের দুই দিন পর পর্যন্ত এই ম্যাজিস্ট্রেটরা তাদের নির্ধারিত এলাকায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনার বিশেষ ক্ষমতা ভোগ করবেন। সংশ্লিষ্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেটরা তাদের নিজ নিজ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এসব ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব বণ্টন এবং সুনির্দিষ্ট এলাকা নির্ধারণ করে দেবেন। এছাড়া নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে প্রতিদিনের কার্যক্রমের তথ্য একটি নির্ধারিত ছকে সংশ্লিষ্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও রিটার্নিং অফিসারকে অবহিত করার জন্য প্রজ্ঞাপনে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই কঠোর প্রশাসনিক নজরদারির ফলে ভোটগ্রহণের আগে ও পরে যেকোনো ধরণের বিশৃঙ্খলা এড়ানো এবং একটি সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
আসন্ন ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এক বড় ধরনের জনমত পরিবর্তনের আভাস মিলেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সাবেক আওয়ামী লীগ সমর্থকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বর্তমানে বিএনপির দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সমর্থকদের প্রায় ৪৮ শতাংশ এখন বিএনপিকে তাদের রাজনৈতিক পছন্দ হিসেবে বেছে নিয়েছেন, আর অবশিষ্ট ৫২ শতাংশ ভোটার অন্যান্য প্রার্থীদের সমর্থন করতে পারেন। বুধবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ‘আনকাভারিং দ্য পাবলিক পালস’ শীর্ষক এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করে কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিআরএফ) ও বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক ওপিনিয়ন স্টাডিজ (বিইপিওএস)।
লেখক ও গবেষক জাকারিয়া পলাশ কর্তৃক উপস্থাপিত এই গবেষণা প্রতিবেদনে ২০২৬ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটারদের অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক মনোভাব এবং নির্বাচনি পরিবেশের একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাহাবুল হকের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞ আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব রিডিংয়ের অর্থনীতি বিভাগের ভিজিটিং প্রফেসর ড. এম. নিয়াজ আসাদুল্লাহ। গবেষণাটি সম্পন্ন করতে ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্ট্রাটিফাইড র্যান্ডম স্যাম্পলিং পদ্ধতিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ১১ হাজার ৩৮ জন ভোটারের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
প্রতিবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নতুন ভোটারদের রাজনৈতিক ঝোঁক। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২০০৮ সালের পর প্রথমবার ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন এমন ভোটারদের মধ্যে ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ জামায়াতে ইসলামীকে তাদের পছন্দ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সামগ্রিকভাবে ভোটারদের মাঝে নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ লক্ষ্য করা গেছে, যেখানে ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ ভোট দেওয়ার বিষয়ে সরাসরি আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তবে প্রায় ৮ শতাংশ ভোটার এখনো ভোট দেওয়ার বিষয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছেন। এই আগ্রহের ক্ষেত্রে লিঙ্গ, বয়স বা ভৌগোলিক অবস্থানের কোনো বড় প্রভাব দেখা যায়নি।
জনমতের ক্ষেত্রে ইস্যুভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভোটারদের কাছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের নাম দুর্নীতি ও সুশাসন। জরিপে অংশ নেওয়া ৬৭ দশমিক ৩ শতাংশ ভোটার দুর্নীতিকে দেশের প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যেখানে ধর্মীয় বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছেন মাত্র ৩৫ দশমিক ৯ শতাংশ ভোটার। নেতৃত্বের গুণাবলির ক্ষেত্রে ভোটাররা এখন আর কেবল ব্যক্তিগত ক্যারিশমার ওপর নির্ভর করতে রাজি নন; বরং তারা এমন নেতৃত্ব খুঁজছেন যারা জনদরদি এবং সাধারণ মানুষের সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম। রাজনৈতিক তথ্য পাওয়ার প্রধান উৎস হিসেবে বর্তমানে টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে।
নির্বাচনকালীন পরিবেশ নিয়ে গবেষণায় ভোটারদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগও ধরা পড়েছে। ভোটাররা নির্বাচন পরিচালনার চেয়ে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে বেশি চিন্তিত। ভয়ভীতি প্রদর্শন, জালিয়াতি এবং ব্যালট দখলের আশঙ্কা সব রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের মধ্যেই কমবেশি বিদ্যমান। এছাড়া ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা এখন বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, ৩০ দশমিক ২ শতাংশ ভোটার কেবল প্রার্থীর যোগ্যতাকে গুরুত্ব দেন এবং ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ ভোটার প্রার্থী ও দল উভয় বিষয়কে বিবেচনায় নিয়ে ভোট দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। সামগ্রিকভাবে এই জরিপটি আসন্ন নির্বাচনের আগে দেশের তৃণমূল পর্যায়ের রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী ইঙ্গিত প্রদান করছে।