ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানটি শুরুতে ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা কোটা সংষ্কার আন্দোলন। সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ সংরক্ষিত কোটা সংস্কার করে কমানোর দাবিতে গত বছরের ১ জুলাই রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকা ও পরে শাহবাগে এ কর্মসূচির শুরু। ওই মাসের প্রথম ১৪ দিন ওই এলাকাতেই ছিল আন্দোলন। এতে সড়ক অবরোধের কারণে শহরজুড়ে তীব্র যানজট দেখা দিলেও কোন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে ১৫ জুলাই চীন থেকে ফিরে এসেই সংবাদ সম্মেলন করার সময় এক প্রশ্নের জবাবে এই ইস্যু নিয়ে মুখ খোলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ‘কোটা মুক্তিযোদ্ধার নাতিপুতি পাবে নাকি রাজাকারের নাতিপুতিরা পাবে’বলে বিস্ফোরক মন্তব্য করায় তাতে ভীষণ ক্ষুব্ধ হয় আন্দোলনকারী সাধারণ ছাত্ররা। সে রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ও পরে টিএসসিতে ‘চেয়েছিলাম অধিকার হয়ে গেলাম রাজাকার’জাতীয় স্লোগানে তাদের প্রতিবাদ অব্যাহত থাকলে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ হন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এ ঘটনায় ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দিলে পরদিন থেকেই ক্যাম্পাসে ও শাহবাগে পুলিশের উপস্থিতিতে সাধারণ ছাত্রদের ওপর নির্মম হামলা চালায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ক্যাডাররা। সেইদিন আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে রাজধানীসহ সারাদেশে। ১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন আবু সাঈদ। ঢাকাতেও নিহত হন দুজন। ১৭ জুলাই ছিল আশুরা। সেদিন টিএসসিতে আবু সাইদের প্রতীকী জানাজা পড়তে চাইলে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা পুলিশের সহযোগিতায় আন্দোলনরত ছাত্রদের বেধড়ক পেটায়। সাধারণ ছাত্রদের বিরুদ্ধে পুলিশ ও ছাত্রলীগের উন্মুক্ত হওয়া অস্ত্র আর বন্ধ হয়নি। ১৮ জুলাই শতাধিক ছাত্র-পথচারী সাধারণ মানুষ হত্যার ঘটনা ঘটে।
তবে এ আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি হত্যার ঘটনা ঘটে ১৯ জুলাই। সেদিন রাজধানীসহ সারাদেশে ১৪৮ জন মানুষ হত্যার শিকার হন। হত্যাকারীরা এতটাই নির্মম ছিল যে তাদের ছোড়া গুলিতে ৫৪ জন মাথায় বা গলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। এদের অধিকাংশেরই বয়স ৪০ বছরের মধ্যে। হতাহতের মাত্রা এত বেশি ছিল যে ঢাকায় একটি হাসপাতালে আক্ষরিক অর্থে গজ এবং ব্যান্ডেজ ফুরিয়ে যায়। ঢাকা একটি যুদ্ধক্ষেত্রের মতো হয়ে ওঠে। ‘ব্লাডশেড ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বুধবার বাংলা একাডেমির আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তনে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে ইন্টারন্যাশনাল ট্রুথ অ্যান্ড জাস্টিস প্রজেক্ট (আইটিজেপি) এবং টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট (টিজিআই)। তারা হাসিনা সরকার পতনের কয়েকদিন পর থেকে প্রমাণ সংগ্রহ করতে মাঠে নামে এবং পরিবারগুলো ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকার নেয়।
প্রতিবেদনের পাশাপাশি আইটিজেপি, টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট এবং আউটসাইডার মুভি কোম্পানি দুটি প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশ করে। এতে সামাজিক মাধ্যমে প্রাপ্ত পুলিশি অত্যাচারের ভিডিও প্রমাণগুলো একত্রিত করে কী ঘটেছিল তা পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। একটিতে দেখা যায়, যাত্রাবাড়ীতে পুলিশ বিপুল সংখ্যক তরুণ আন্দোলনকারীদের ঠান্ডা মাথায় হত্যা করছে। অন্যটিতে মোহাম্মাদ হৃদয় নামে এক তরুণকে ৫ আগস্ট গাজীপুরে পুলিশ ধরে এনে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে গুলি করে হত্যা করে।
অনুষ্ঠানে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম, শহীদ হৃদয়ের বোন জেসমিন ও শহীদ মুনতাসীর রহমান আলিফের বাবা গাজীউর রহমান, আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান, আইটিজেপির নির্বাহী পরিচালক ইয়াসমিন সুকা, টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক সাবহানাজ রশিদ দিয়া বক্তব্য রাখেন।
৬০ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনে উঠে আসে, নিহতদের পরিবারগুলোর একটি যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। যেখানে তারা ‘পা রক্তে ভিজিয়ে’ পুলিশের গুলিতে আহত সন্তানদের খুঁজতে হাসপাতালের মর্গে ঘুরে বেড়িয়েছেন। আহত কিংবা শহীদ পরিবারগুলোর কাছে অপরিচিত লোকজন ফোন করে গুলিবিদ্ধ সন্তান কিংবা ভাইবোনের খবর দিতেন। এরপর টালমাটাল অবস্থায় এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছোটাছুটি করা অথবা গুরুতর আহত অবস্থায় কোনোমতে বেঁচে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার মতো হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রবল মানসিক আঘাতের মধ্যেও শোকাহত পরিবারগুলোকে ক্ষমতাসীনদের বৈরিতা মোকাবিলা করতে হয়েছে। প্রিয়জনের মৃতদেহ দাফনের জন্য মৃত্যুসনদ ও পোস্টমর্টেম রিপোর্ট সংগ্রহ করতেও নানা ঝুঁকি-ঝামেলায় পড়তে হয়েছে। ভয় ও আতঙ্কে আচ্ছন্ন ছিল দাফনের আয়োজন, যেখানে কিছু পরিবার বাধা এড়াতে ভোরের আলো ফোটার আগেই গোপনে দাফন সম্পন্ন করেছে, যেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় কর্মীদের কোনো বাধার মুখে পড়তে না হয়।
এতে আরও বলা হয়, নিরাপত্তা বাহিনীগুলো জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে কোনো অহিংস উপায় গ্রহণ করেনি ও কোনো সতর্কতা জারি করেনি। পুলিশ আহতদের চিকিৎসায় কোনো সহায়তা তো করেইনি বরং প্রায়শই চিকিৎসার ক্ষেত্রে বাধা দিয়েছে।
এ প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন নিহতদের স্বজনরাও। নিহত হৃদয়ের বোন জেসমিন বলেন, আমার ভাই ৫ আগস্ট মিছিলে পুলিশের ধাওয়া খেয়ে গোলাগুলি থেকে জীবন বাঁচাতে একটি জায়গায় আশ্রয় নিয়েছিল। ভিডিওতে দেখছেন- কীভাবে ধরে নিয়ে আমার ভাইকে গুলি করে হত্যা করেছে। লাশটা নিয়ে গেছে। লাশটা আর দেয়নি। লাশ কোথায় গুম করল, লাশটা কই গুম করল। আমি ওত কথা বলতে পারি না, আমি শিক্ষিত না। বড় বড় আইনজীবীরা এখানে আছে আমার ভাইরে যারা নির্মমভাবে হত্যা করছে, আমার ভাইয়ের হত্যার বিচার চাই।
কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন জেসমিন। বলেন, পাঁচ-ছয় মাসেও আমার ভাইয়ের বিচার পাইনি, সরকারের কোনো সহায়তা পাইনি। সরকারের কেউ বাবা-মায়ের খোঁজ নিতে যায়নি। আমার বাবা খুব অসহায়, একটা ভাই ছিল খুব আদরের। কত কষ্ট করে বড় করছি, রোজগারের জন্য ঢাকায় আসছে। মরার আগে কথা বলছে, আপা আমি রাতে কথা বলমু। সেই ভাই আর ফিরে আসল না।
তিনি আরও বলেন, মাইরা আবার পুলিশ লাশটা নিয়ে গেছে, লাশটারে দেয়ও নাই। ভাইয়ের খোঁজ পাইনি। কোথায় রাখল, কোন জায়গায় রাখছে, খুঁজেই পাইলাম না। আপনা-গো কাছে একটাই দাবি আমার ভাইয়ের লাশটা কোন জায়গায় কী করছে তদন্ত কইরা খুঁজে আইনা দেন। হাড্ডিটা পাইলেও দেশের বাড়িতে ভাইরে মাটি দিমু। অন্তত দেখমু ভাই বাড়ির পাশে আছে।
শহীদ মুনতাসিরের বাবা গাজীউর রহমান বলেন, আজ পর্যন্ত যত মামলা হয়েছে যাত্রাবাড়ী ছাড়া আর কোথাও কেউ গ্রেপ্তার হয়েছে দেখি নাই। তাহলে কী হইতেছে, আজ পাঁচ-ছয় মাস হয়ে গেল কোনো পুলিশ হেলমেট বাহিনী অন্তত আমার মামলায় কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। এদের যদি বিচার না হয় তাহলে আমাদের কী হবে, আমরা প্রত্যেকে তাদের টার্গেটে পরিণত হয়েছি।
তিনি বলেন, আমরা জানি না, আমাদের আর কত কাল রক্ত দিতে হবে। আমরা সন্তান সবই দিয়েছি। আর কী দেব। আমাদের জীবন বিপন্ন, অনেকে বাড়িতে থাকতে পারছে না। এগুলো দেখার কেউ নাই। এ জাতির জন্য দেশের জন্য সবই দিয়েছি, কিন্তু আমরা ঘরে থাকতে পারি না।
আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, যখনই অত্যাচারে মৃত্যুর দৃশ্য দেখি মনে হয় বিচার নিশ্চিত করতে না পারলে আমাদের বেঁচে থাকার অধিকার নাই। আমাদের প্রসিকিউশন টিম তদন্ত টিম কাজ করছে, আমি কথা দিচ্ছি এটার সুবিচার নিশ্চিত করবই। এ সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব জুলাই অভ্যুত্থানে সুবিচার নিশ্চিত করা। ফ্যাসিস্ট হাসিনার বিচার চেয়ে আমাদের বিচার যে ভিন্ন সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, আপনাদের মতো আমাদের তাড়না থাকে। কালকেই যদি বিচার হয় খুশি হতাম। কিন্তু আমাদের তো প্রসেস মেইনটেইন করতে হবে। আমাদের এত অকাট্য প্রমাণ এত সাক্ষী আছে, ডিউ প্রসেস মেইনটেইন করে বিচার করতে পারব।
চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, তারা যে নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করেছে, তাদের শনাক্ত করার পাশাপাশি এটা বের করা জরুরি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কেন এমন নিষ্ঠুর হয়ে উঠল? কেন রাষ্ট্র এ পর্যায়ে গিয়েছিল, কার নির্দেশে তারা এ কাজ করেছিল? এগুলো নিয়েও আমরা কাজ করছি। এভাবে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা সর্বত্র হয়েছে, একই মাত্রায় একই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীকে হত্যার গায়েবি নির্দেশ কোথা থেকে এসেছে সেটা যদি বের করা যায় তাহলে বোঝা যাবে সুপিরিয়র কমান্ড কতটুকু সম্পৃক্ত হয়েছিল।
তিনি বলেন, শহীদ পরিবারের পর্বতসম বেদনা আমরা বুঝি। তাদের ন্যায়বিচার দিতে হবে পাশাপাশি জাস্টিস প্রক্রিয়া যেন আন্তর্জাতিক এবং জাতীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য করা যায় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে অতীতের মত ট্রাইব্যুনালকে কলঙ্কিত করা হবে।
তাজুল ইসলাম বলেন, কারা পেছন থেকে এ কাজটা করেছিল, কার নির্দেশে এটা হয়েছিল। এটার সঙ্গে কমান্ডারের কীভাবে হুকুম করা হয়েছিল এই সূক্ষ্ম কাজ উদঘাটন না করা হলে পুরোপুরি জাস্টিস নিশ্চিত করতে পারব না। শহীদ পরিবারদের দ্রুত বিচার চাওয়ার প্রক্রিয়াকে আমরা শ্রদ্ধা করি। তবে বিচার প্রক্রিয়া যথাযথ প্রক্রিয়ায় তদন্ত হওয়ার জন্য ধৈর্য ধরার অনুরোধ করব। সেটা যেন অপ্রয়োজনীয়ভাবে অনেক সময় না হয় সেজন্য আমরা সক্রিয় এবং সচেতন আছি।
চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, হেলিকপ্টার দিয়ে অপারেশন চালানো হয়েছে। অস্ত্র ব্যবহার হয়েছে কিনা তা প্রমাণের আগেই তদানীন্তন নির্বাহী প্রধান বলেছিলেন হেলিকপ্টার দিয়ে পানি ছিটিয়েছি। তার মানে নির্দেশনা তার থেকে এসেছিল। এখন হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানো হয়েছিল সেটা তদন্তে প্রমাণ করার বিষয় আছে। শহীদ পরিবার, আন্তর্জাতিক মহল জাতির কাছে এটা আমাদের অঙ্গীকার, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আমরা প্রাণপণ চেষ্টা করব।
তিনি বলেন, একটা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পরে একটা রিকনসিলিয়েশনের (পুনর্মিলন) মাধ্যমে নতুন যাত্রা শুরু করবে। আমরা কখনও এই দিন দেখব না শাসকরা রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে ক্রিমিনালাইজ করে সিভিলিয়ানদের হত্যা করবে এমন বাংলাদেশ যেন আর ফিরে না আসে সেজন্য আমাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা থাকবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, এমপি এর সভাপতিত্বে আজ সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়।
কমিটির সদস্য ও জাতীয় সংসদের চীফ হুইপ মো: নূরুল ইসলাম, এমপি; কমিটির সদস্য ও আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান, এমপি; কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন, এমপি; কমিটির সদস্য ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো: জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, এমপি; কমিটির সদস্য ও আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি আন্দালিভ রহমান, এমপি; কমিটির সদস্য ও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মোঃ নুরুল হক,এমপি; কমিটির সদস্য ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, এমপি ; কমিটির সদস্য ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, এমপি;কমিটির সদস্য সাকিলা ফারজানা, এমপি ও মো: মাহমুদুল হক রুবেল এমপি বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
কমিটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে আলোচনা করে। কমিটি আজকের এই বৈঠককে জাতির জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত বলে উল্লেখ করে।
কমিটি সংবিধান সংশোধনের জন্য জুলাই যোদ্ধা, জুলাই আন্দোলনে নিহত পরিবারের সদস্য, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া, শিক্ষক প্রতিনিধি, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র সংগঠনের সদস্য, বিরোধী দলের সদস্য ও অন্যান্য অংশীজনদের সাথে আলোচনা করবে।
কমিটি সংবিধান সংশোধনকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে চায় যাতে সমাজের সকল শ্রেণীর পেশার মানুষ মনে করবে তিনি সংবিধান সংশোধনের একজন অংশীজন। সংবিধান সংশোধন এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হবে যা আগামী প্রজন্মের জন্য সুফল বয়ে নিয়ে আসবে বলে কমিটি অভিমত ব্যক্ত করে।
জুলাই চেতনা তথা জুলাই সনদকে ধারণ করেই সংবিধান সংশোধন হবে বলে কমিটি বৈঠকে উল্লেখ করে।
বৈঠকে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব ও সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির কমিটি সচিব ব্যারিস্টার মো: গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া, আইন ও বিচার বিভাগের সচিব, লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সচিব এবং আইন মন্ত্রণালয় ও জাতীয় সংসদ সচিবালের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে আগ্রহী বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য একটি নতুন সতর্কবার্তা জারি করেছে ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের সময় চিকিৎসাজনিত জরুরি পরিস্থিতিসহ সম্ভাব্য সকল ব্যয় বহনের জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক সক্ষমতা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সোমবার দূতাবাসের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়।
মার্কিন দূতাবাস জানিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের পরিকল্পনা করার সময় ভ্রমণকারীদের এমনভাবে আর্থিক প্রস্তুতি নিতে হবে যাতে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি বা চিকিৎসাজনিত জরুরি অবস্থায় তারা নিজেদের খরচ নিজেরাই বহন করতে পারেন। মূলত মার্কিন করদাতাদের অর্থে পরিচালিত সরকারি সুযোগ-সুবিধার ওপর নির্ভরশীলতা এড়াতেই এই আগাম সতর্কতা প্রদান করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোনো ভ্রমণকারী যদি মার্কিন সরকারের জনকল্যাণমূলক সুবিধার অপব্যবহার করেন, তবে এর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে ওই ব্যক্তির যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ, উচ্চশিক্ষা বা কাজের সুযোগ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে স্থায়ী অযোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হওয়ার বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই আইনগত ও কূটনৈতিক জটিলতা এড়াতে পর্যটকদের নিজস্ব আর্থিক সামর্থ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েই ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে দূতাবাস। মূলত স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল পর্যটন নিশ্চিত করাই এই নির্দেশনার মূল লক্ষ্য।
আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী কোনো গণমাধ্যম যেন শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার না করে, সেই বিষয়ে বিশেষ আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জানিয়েছেন যে, আদালতের এই আদেশ অমান্য করা হলে সরকার আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এই অবস্থান পরিষ্কার করেন।
উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, “এর আগেও এ বিষয়ে গণমাধ্যমের জন্য সতর্কতামূলক নির্দেশনা দিয়েছিল সরকার। কেউ যদি আগাম প্রচার করে যে শেখ হাসিনা বক্তব্য দেবেন এবং পরে তা প্রকাশ বা সম্প্রচার করে, তাহলে সেটি আদালতের আদেশ অমান্য করার শামিল হবে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বিচার বিভাগের নির্দেশনা প্রতিপালন করা প্রতিটি নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের আইনি বাধ্যবাধকতা। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা আবারও সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেব, কেউ যেন এ ধরনের কাজ না করেন। আদালতের নির্দেশনা মানা প্রত্যেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। সরকারের কাজ হলো আদালতের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।”
সংবাদ সম্মেলনে তিনি আদালতের আদেশের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ওপর গুরুত্বারোপ করে জানান যে, আইনি প্রক্রিয়া চলাকালীন তা লঙ্ঘন করার কোনো সুযোগ নেই। ডা. জাহেদ উর রহমান আরও বলেন, “আদালতের আদেশ না থাকলে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারে বাধা দেয়া ঠিক হতো না—এটি তার ব্যক্তিগত মতামত। কেউ যদি আদালতের ওই আদেশের সঙ্গে একমত না হন, তাহলে আদালতে গিয়ে সেই আদেশ চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। তবে যতক্ষণ পর্যন্ত আদালতের আদেশ বহাল থাকবে, ততক্ষণ তা সবাইকে মেনে চলতে হবে।” মূলত বিচারিক নির্দেশনার কার্যকারিতা বজায় রাখতে এবং আইনগত জটিলতা এড়াতে তিনি সকল গণমাধ্যমকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে বহুল প্রতীক্ষিত সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (সিইপিএ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তির ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্য অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক সুবিধা লাভ করবে। একইভাবে বাংলাদেশের বাজারেও কোরিয়ার ৮৭ শতাংশ পণ্য এই বিশেষ সুবিধার আওতায় আসবে। মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পন্ন হয়।
চুক্তি স্বাক্ষর শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সংবাদ সম্মেলনে জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতির দেশের সঙ্গে এই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছে। তিনি এটিকে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেন। মন্ত্রীর ভাষ্যমতে, এই চুক্তি কার্যকর হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, চামড়া ও পাটজাত পণ্য দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে সরাসরি শুল্ক সুবিধা পাবে। অন্যদিকে, কোরিয়া থেকে কৃষি পণ্য, প্লাস্টিক ও বিভিন্ন খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানিতেও বাংলাদেশ বিশেষ সুবিধা ভোগ করবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল অর্থনীতির দেশ দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে এই অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হওয়ার লক্ষ্যমাত্রাকে ত্বরান্বিত করবে। দেশের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে এ ধরনের মুক্ত বাণিজ্যধর্মী চুক্তি অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বিশেষ করে বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকতে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে সরকার এ ধরনের কৌশলগত চুক্তির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী ইয়ো হান-কু দুই দেশের দীর্ঘ ৫৬ বছরের অর্থনৈতিক সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করে বলেন, টেক্সটাইল খাতের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই বন্ধুত্ব এখন নতুন দিগন্তে প্রবেশ করেছে। তিনি মনে করেন, সিইপিএ কার্যকর হলে দক্ষিণ কোরিয়ার বড় বড় কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগে আরও বেশি আগ্রহী হবে। ইয়ো হান-কু আশা প্রকাশ করেন যে, বাংলাদেশের বর্তমান সরকার অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে যে পদক্ষেপ নিচ্ছে, তাতে প্রযুক্তি ও সরবরাহ ব্যবস্থার বৈচিত্র্য আনায় দক্ষিণ কোরিয়া সবসময় পাশে থাকবে। মূলত এই চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর ও টেকসই হবে বলে উভয় দেশই বিশ্বাস করে।
রাজধানীর যানজট নিরসনে অন্যতম মেগা প্রকল্প ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পরিধি ও নির্মাণ ব্যয় বড় পরিসরে বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি একনেক সভায় প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদনের মাধ্যমে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, বাইপাইল ইন্টারসেকশন এবং নির্মাণাধীন পাতাল মেট্রোরেলের এমআরটি লাইন-১ এর সঙ্গে সরাসরি সংযোগের বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই তিনটি নতুন অঙ্গ যুক্ত হওয়ার ফলে প্রকল্পটির ব্যয় মূল বরাদ্দের চেয়ে ৯ হাজার ৪৯২ দশমিক ৬৩ কোটি টাকা বা প্রায় ৫৪ দশমিক ০৮ শতাংশ বেড়েছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই এক্সপ্রেসওয়েটি বিমানবন্দরের কাওলা থেকে শুরু হয়ে আব্দুল্লাহপুর, আশুলিয়া ও বাইপাইল হয়ে সাভারের ঢাকা ইপিজেড পর্যন্ত বিস্তৃত হবে, যা দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।
প্রকল্পের সামগ্রিক অগ্রগতি সম্পর্কে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, "ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে আগামী ২০২৮ সালের জুনে যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ এগিয়ে চলছে।" কাজের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, "ধউর থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত প্রায় ৩ দশমিক ৭১ কিলোমিটার অংশের দুটি সার্ভিস লেন সেতু এক সপ্তাহের মধ্যে যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।" এছাড়া আব্দুল্লাহপুর থেকে ধউর পর্যন্ত সড়কের কার্পেটিংয়ের কাজ দ্রুত শেষ করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ব্যয় বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রকল্প পরিচালক জানান, "ডলারের বিনিময় হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রয়োজন হতে পারে। এ ছাড়া অন্য কোনো কারণে প্রকল্প ব্যয় বাড়বে না।" মূলত ডলারের দর বৃদ্ধি, নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি, ভূমি অধিগ্রহণ এবং সেতুর নেভিগেশন ক্লিয়ারেন্স পরিবর্তনের কারণে অতিরিক্ত ১৭৭০ দশমিক ৮৪ কোটি টাকাসহ সামগ্রিক ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
শুরুতে ১৬ হাজার ৯০১ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের এই প্রকল্পটি ২০২২ সালে শুরু হলেও বর্তমানে এর মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৪৬ কোটি টাকায়। চীন ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছে চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট কর্পোরেশন (সিএমসি) এবং অর্থায়ন করছে এক্সিম ব্যাংক অব চায়না। প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত জুন মাস পর্যন্ত সার্বিক অগ্রগতি ৭১ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং ভৌত কাজের অগ্রগতি ৬৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। সমীক্ষা অনুযায়ী, এই এক্সপ্রেসওয়েটি চালু হলে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার শূন্য দশমিক ২১৭ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রকল্পটির কৌশলগত গুরুত্ব নিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে এই প্রকল্পের সংযোগ অত্যন্ত জরুরি। তার মতে, উভয় প্রকল্পের কাজ সমন্বিতভাবে সম্পন্ন হলে রাজধানীর ভেতর দিয়ে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের যানবাহনের বিরামহীন চলাচল নিশ্চিত হবে। বিশেষ করে তুরাগ নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ঠিক রাখতে ধউর থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত বিশেষ সার্ভিস লেন নির্মাণ করা হয়েছে, যা আগামী ১০ আগস্টের মধ্যে খুলে দেওয়ার কথা রয়েছে। এর ফলে স্থানীয় যানজট নিরসনের পাশাপাশি মূল প্রকল্পের নির্মাণ কাজ আরও দ্রুতগতিতে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গৌরবময় ইতিহাস এবং শহীদ ও অকুতোভয় যোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণের লক্ষ্যে নির্মিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ আগামীকাল বুধবার (৫ আগস্ট) উদ্বোধন করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে এই জাদুঘরটির দ্বার উন্মোচন করবেন। মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জুলাই আন্দোলনের বীর যোদ্ধা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত থেকে তাদের অভিজ্ঞতার স্মৃতিচারণ করবেন। এছাড়া অভ্যুত্থানের ঘটনাক্রম, সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং চূড়ান্ত বিজয়ের ইতিহাস নিয়ে নির্মিত একটি বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হবে। অনুষ্ঠানটিকে ঘিরে সাংস্কৃতিক আয়োজনের প্রস্তুতিও সম্পন্ন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, ৫ আগস্ট উদ্বোধনের পরদিন অর্থাৎ ৬ আগস্ট থেকে জাদুঘরটি সর্বসাধারণের দর্শনের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে জাদুঘর প্রকল্পের দুর্নীতির অভিযোগ সংক্রান্ত সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সংস্কৃতি মন্ত্রী বলেন, সুনির্দিষ্ট কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মূলত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের সঠিক ইতিহাস পৌঁছে দিতেই সরকারের এই বিশেষ উদ্যোগ।
সংসদের প্রধান বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণ ছাড়াই আজ মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে সংবিধান সংশোধন কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।কমিটির সভাপতি সালাউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিতব্য এই বৈঠকে পরিচিতি এবং পরবর্তী আলোচনার কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হবে। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ এবং কমিটির অন্যতম সদস্য নূরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, প্রথম বৈঠকে মূলত প্রাথমিক আলোচনা ও পরিচিতিমূলক কার্যক্রম সম্পন্ন হবে এবং সংবিধান সংশোধনের মূল কাজ শুরু হবে দ্বিতীয় বৈঠক থেকে।
সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদে ১২ সদস্যের এই বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। প্রাথমিকভাবে প্রতিটি রাজনৈতিক দল, জোট এবং স্বতন্ত্র সদস্যদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে ১৭ সদস্যের কমিটি গঠনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি ও খেলাফত মজলিসের পক্ষ থেকে কোনো নাম না আসায় পাঁচটি পদ শূন্য রেখেই বর্তমানে কমিটিটি গঠন করা হয়েছে। চিফ হুইপ জানিয়েছিলেন যে, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে নাম পাওয়া গেলে তাদের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করে পরবর্তীতে পুনর্গঠন করার সুযোগ রয়েছে।
কমিটির বর্তমান সদস্যদের তালিকায় রয়েছেন সভাপতি সালাউদ্দিন আহমদ ছাড়াও চিফ হুইপ মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল উদ্দিন এবং সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন। এছাড়া সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে রয়েছেন বিএনপির জয়নুল আবেদীন, শাকিলা ফারজানা, মাহমুদুল হক রুবেল, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি- বিজেপির ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. অলিউল্লাহ।
উল্লেখ্য, বর্তমান সংসদের প্রথম অধিবেশনেই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে এই সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সংসদ সচিবালয় একাধিকবার যোগাযোগ করলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে বর্তমান ১২ সদস্যের মাধ্যমেই সংবিধান সংশোধনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধী দলগুলোর এই অনীহা সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিতে পারে।
৫ আগস্ট ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস ২০২৬’ উদযাপনকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ সারা দেশে ব্যাপক নিরাপত্তামূলক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে র্যাব। মঙ্গলবার বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রেরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই কঠোর সতর্কাবস্থার কথা জানানো হয়। রাষ্ট্রের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সম্ভাব্য অপরাধ দমনে র্যাব পেশাদারিত্বের সঙ্গে তাদের নিয়মিত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধীদের শনাক্তকরণ ও যেকোনো প্রকার সহিংসতা প্রতিহত করতে বাহিনীটির সদস্যরা সর্বক্ষণ তৎপর রয়েছেন।
র্যাব কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবসকে কেন্দ্র করে কোনো উগ্রবাদী সংগঠন, নিষিদ্ধ গোষ্ঠী কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী মহল যেন জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে না পারে, সেজন্য বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে নিবিড় সমন্বয় নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া বাহিনীর প্রতিটি ব্যাটালিয়ন নিজ নিজ এলাকার নিরাপত্তা ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে আলাদা পরিকল্পনা সাজিয়েছে। নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহের জন্য তৃণমূল পর্যায়ে কন্টাক্ট পারসন ও সোর্স নিয়োগ করা হয়েছে।
বিশেষ এই দিবসের কর্মসূচিগুলোকে কেন্দ্র করে ৪ আগস্ট রাত থেকেই অনুষ্ঠানস্থল, রোডমার্চ ও পদযাত্রার নির্ধারিত পথ এবং জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ এলাকাগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা বলবৎ করা হয়েছে। র্যাবের নিজস্ব ইউনিফর্মধারী সদস্যদের পাশাপাশি স্পর্শকাতর স্থানগুলোতে সাদা পোশাকে গোয়েন্দা তৎপরতা কয়েক গুণ বাড়ানো হয়েছে। নাশকতার ঝুঁকি এড়াতে এবং নিষিদ্ধ সংগঠনের অপতৎপরতা রুখতে অনুষ্ঠানগুলোর এক সপ্তাহ আগে থেকেই নিবিড় পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা হয়েছে।
একই সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য বা গুজব ছড়িয়ে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা রোধ করতে সাইবার পেট্রোলিং জোরদার করেছে র্যাব। ডিজিটাল প্লাটফর্মে রাষ্ট্রবিরোধী যেকোনো ধরনের অপপ্রচার বন্ধে বাহিনীটি বিশেষ নজর রাখছে। র্যাবের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে যে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে সকল নাগরিকের জানমালের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং যেকোনো অপরাধী চক্রকে আইনের আওতায় আনতে র্যাব ফোর্সেস পূর্ণ অঙ্গীকারবদ্ধ।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান উপলক্ষে আজ মঙ্গলবার এক বিশেষ আলোচনা সভার আয়োজন করেছে বিএনপি। ‘রক্তাক্ত জুলাই: ১৭ বছরের অনিবার্য সংগ্রামের রক্তঝরা জুলাই’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানটি বিকেল ৩টায় রাজধানীর ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত হবে। এই সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করবেন বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করবেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। বিএনপির মিডিয়া সেল থেকে জানানো হয়েছে যে, এই সভায় জুলাই আন্দোলনে শহীদ পরিবারের সদস্য এবং আহত যোদ্ধারা বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।
অনুষ্ঠানে বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ছাড়াও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। উল্লেখ্য, জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মরণে বর্তমানে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের উদ্যোগে দেশজুড়ে মাসব্যাপী কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। একইভাবে বিএনপির অন্যান্য অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোও বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরছে। মূলত গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের স্মৃতি ও আত্মত্যাগকে শ্রদ্ধা জানাতেই এই বিশেষ সভার আয়োজন করা হয়েছে।
শিল্পায়নের সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষার সমন্বয় ঘটিয়ে দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে সবুজ, আধুনিক ও বিনিয়োগবান্ধব শিল্পাঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার (৩ আগস্ট) দুপুরে বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) গভর্নিং বোর্ডের সভায় তিনি এ আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চল সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা (সুজন মাহমুদ) জানান, বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সরকারের ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেশের প্রতিটি ইপিজেডে বৃক্ষরোপণ করা হবে। এ কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন ইপিজেডে মোট ১ লাখ ২৫ হাজার বৃক্ষ রোপণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শিল্পায়নের পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, সবুজায়ন বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে পরিবেশবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান উপপ্রেস সচিব সুজন মাহমুদ।
তিনি বলেন, বৈঠকে বেজার গভর্নিং বোর্ডের ৯ম সভার সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। পাশাপাশি নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর মূল্যায়ন পর্যালোচনা এবং সরকারি মালিকানাধীন অব্যবহৃত শিল্প-সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হয়।
সভায় নারায়ণগঞ্জের করিম জুট মিলস ও লতিফ বাওয়ানী জুট মিলসের জমি ও বিদ্যমান অবকাঠামোকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের সম্ভাবনাও পর্যালোচনা করা হয়।
এসব এলাকায় আধুনিক শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এছাড়া বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর আবেদন ও লাইসেন্সের ক্ষেত্রে নির্ধারিত গাইডলাইন অনুসরণ ও নতুন নীতিমালা প্রণয়ন নিয়েও আলোচনা হয় বলে জানান সুজন মাহমুদ।
সভায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ ও নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। সোমবার (৩ আগস্ট) বেলা আড়াইটায় বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী ইয়ো হান-কু সৌজন্য সাক্ষাতে এলে প্রধানমন্ত্রী এ আমন্ত্রণ জানান।
বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও জোরদারের লক্ষ্যে দুই দেশ যখন একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (সিইপিএ) সইয়ের দিকে এগোচ্ছে, তখন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানালেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন জানান, বৈঠকের শুরুতে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে স্বাক্ষর হতে যাওয়া কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (সিইপিএ) বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী।
ইয়ো হান-কু বলেন, এ চুক্তি কার্যকর হলে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারিত হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে ।
দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ইতোমধ্যে অনেক কোরিয়ান কোম্পানি বাংলাদেশে সফলভাবে ব্যবসা করছে এবং ভবিষ্যতে আরও অনেক কোরিয়ান কোম্পানি বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে খেলনা, ইলেকট্রনিক্স, টেলিযোগাযোগ, অটোমোবাইল, সেমিকন্ডাক্টর এবং জাহাজ নির্মাণ খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দক্ষিণ কোরিয়া জাহাজ নির্মাণ শিল্পে অত্যন্ত দক্ষ এবং বাংলাদেশের রয়েছে সম্ভাবনাময় জনশক্তি। দক্ষিণ কোরিয়া চাইলে বাংলাদেশে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও ভাষা শিক্ষা দিয়ে সে দেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পে কাজে লাগাতে পারে।
এছাড়া কোরিয়ান কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে জাহাজ নির্মাণ শিল্পে বিনিয়োগ করতে চাইলে সরকার এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোরিয়ান কোম্পানিগুলোকে নিয়ে বাংলাদেশে একটি সেমিনার আয়োজনের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়।
বাংলাদেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কেও দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রীকে অবহিত করা হয় বলে জানান প্রধানমন্ত্রী উপপ্রেস সচিব।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শুনে দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের এসব প্রস্তাব দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করবে।
এ সময় বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে ঢাকায় নবনিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীর সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার (৩ আগস্ট) বিকেলে তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ সাক্ষাৎকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্ভাব্য বক্তব্যকে ঘিরে উদ্বেগের কথা দিল্লির কাছে তুলে ধরে ঢাকা। এ বিষয়ে ভারতের সহযোগিতা প্রত্যাশা করা হয়েছে।
সাক্ষাতে বাংলাদেশ ও ভারতের বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন দিক এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা ও অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তারা। বৈঠকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া শেখ হাসিনার ৫ আগস্ট প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার সম্ভাবনার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
এ বিষয়ে পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ভারতের হাইকমিশনারকে জানান, ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনাসহ কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনের ব্যক্তি যাতে তাদের দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে না পারেন। এছাড়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কোনো কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না পারেন, সে বিষয়ে ভারতের সহযোগিতা প্রত্যাশা করে বাংলাদেশ। এ ধরনের কার্যক্রম দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ইতিবাচক অগ্রগতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলেও জানান তিনি।
ভারতের হাইকমিশনার বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় খোঁজখবর নেওয়া এবং এ বিষয়ে সচেষ্ট থাকার আশ্বাস দেন। উভয় পক্ষ নিয়মিত সংলাপ ও গঠনমূলক সম্পৃক্ততা অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে পারস্পরিক আস্থা ও আলোচনার মাধ্যমেই সব বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধান সম্ভব বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তারা।
রোহিঙ্গা শরণার্থী ও তাদের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বাংলাদেশকে আরও ২৫ দশমিক ২৫ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার সহায়তা দিচ্ছে অস্ট্রেলিয়া। সোমবার (৩ আগস্ট) অস্ট্রেলিয়া সরকার ও জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর এ সহায়তার ঘোষণা দেয়।
ঢাকার পদ্মা স্টেট গেস্ট হাউসে এ বিষয়ে চুক্তি সই করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার সুসান রাইল এবং ইউএনএইচসিআরের ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ জুলিয়েট মুরেকেইসোনি।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং অস্ট্রেলিয়ার সহকারী মন্ত্রী জুলিয়ান হিল।
অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার জানান, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশকে সহায়তা দেওয়া এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের পাশে থাকা দীর্ঘদিনের অঙ্গীকারেরই অংশ এই নতুন অর্থায়ন। আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেছে দেশটি।
তিনি আরও জানান, মিয়ানমার ও বাংলাদেশে চলমান সংকট মোকাবিলায় ৩ বছর মেয়াদি ৩৭০ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলারের মানবিক সহায়তা প্যাকেজের অংশ। ২০১৭ সাল থেকে রোহিঙ্গা সংকটে ১ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মানবিক সহায়তা দিয়েছে দেশটি।
এই অর্থায়নের মাধ্যমে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আশ্রয়, জীবিকাসহ প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।