দেশের রপ্তানি আয় বাড়ানো এবং তৈরি পোশাকনির্ভরতা কমাতে পণ্য ও বাজার—দুই ক্ষেত্রেই বৈচিত্র্য আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে বিশ্বের ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক গন্তব্যের বাজার সম্ভাবনা, বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা, প্রতিযোগী দেশগুলোর অবস্থান এবং বাংলাদেশের করণীয় বিশ্লেষণ করে পৃথক রপ্তানি কৌশল তৈরি করা হচ্ছে। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে ‘বাংলাদেশ রপ্তানি বহুমুখীকরণ কৌশল: ১৮টি প্রধান বাণিজ্য গন্তব্যে পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণ’ শীর্ষক কর্মশালায় এ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান।
বাণিজ্য সচিব বলেন, ‘বাংলাদেশের রপ্তানিকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করতে পণ্য ও বাজার—দুই ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচিত ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি গন্তব্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেশভিত্তিক প্রোফাইল এবং বাস্তবায়নযোগ্য কৌশল প্রস্তুত করা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশি বাণিজ্যিক উইং থেকে সংশ্লিষ্ট বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি, রপ্তানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাধা, বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় পণ্য এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব তথ্য সমন্বয় করে প্রতিটি দেশের জন্য পৃথক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হবে।’
বাজারভিত্তিক বিশ্লেষণ: বাজার বিশ্লেষণে একটি নির্দিষ্ট ম্যাট্রিক্স অনুসরণ করা হচ্ছে। এতে সংশ্লিষ্ট দেশে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির অংশ, নির্দিষ্ট পণ্যে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশ, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির উপায় এবং বাজার সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
১৮টি বাজার বিশ্লেষণের মাধ্যমে সম্ভাবনাময় নতুন পণ্য চিহ্নিত করার পাশাপাশি বিদ্যমান পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং নতুন বাজারে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নির্ধারণ করা হবে। ফলে কোন বাজারে কোন পণ্যের সম্ভাবনা বেশি এবং কোথায় কী ধরনের বাধা রয়েছে—সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
পোশাকের বাইরে নজর: কর্মশালায় তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, ইলেকট্রনিকস, কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি এবং অন্যান্য সেবা খাতকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাক বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। এই নির্ভরতা কমাতে নতুন পণ্য ও সেবা খাতকে রপ্তানি কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি যেসব পণ্য ইতোমধ্যে রপ্তানি হচ্ছে, সেগুলোর নতুন বাজার তৈরির বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
সেবা রপ্তানিতে গুরুত্ব: কর্মশালায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘রপ্তানি বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে শুধু পণ্য নয়, সেবা রপ্তানিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তি, দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতি ও সক্ষমতাবর্ধক সেবা খাতের উন্নয়নের পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সারদের বিকাশে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে উৎপাদন ও সেবা খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে ভৌগোলিক নৈকট্য ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে বাংলাদেশের পণ্য ও সেবা রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ জোরদারের পরামর্শ দেন।
এলডিসি উত্তরণে প্রস্তুতি: বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রেক্ষাপটে রপ্তানি বহুমুখীকরণের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে পণ্যের মান, উৎপাদন সক্ষমতা, প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ এবং সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে শুল্ক, অশুল্ক বাধা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
এ কারণে ১৮টি বাজারের জন্য প্রস্তাবিত কৌশলে শুধু সম্ভাবনাময় পণ্যের তালিকা নয়, বাজারে প্রবেশের প্রতিবন্ধকতা এবং তা দূর করতে প্রয়োজনীয় নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
শিল্প খাতের প্রস্তাব: কর্মশালায় বিজিএমইএ, ফ্লেক্সা, সিপিডি, ওয়ালটন গ্রুপ, বাংলাদেশ এগ্রোপ্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশন এবং ফার্মাসিউটিক্যালস খাতের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তারা রপ্তানি সম্প্রসারণে নিজেদের প্রস্তাব তুলে ধরেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাও কর্মশালায় অংশ নেন।
শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং নতুন বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে সরকারি সহায়তা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন।
বহুমুখী রপ্তানি কাঠামোর লক্ষ্য: ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক গন্তব্যকে কেন্দ্র করে প্রণীত এই কৌশলের লক্ষ্য শুধু নতুন বাজার খোঁজা নয়; বরং বিদ্যমান বাজারে বাংলাদেশের অংশ বাড়ানো, নতুন পণ্য চিহ্নিত করা এবং সেবা রপ্তানির পরিধি সম্প্রসারণ করা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাজারভিত্তিক তথ্য ও চাহিদা বিশ্লেষণ করে পৃথক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে রপ্তানি বহুমুখীকরণের উদ্যোগ আরও কার্যকর হতে পারে। তবে এর জন্য উৎপাদন সক্ষমতা, পণ্যের মান, প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ, বাণিজ্য অবকাঠামো, লজিস্টিকস এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় জোরদার করা প্রয়োজন।
১৮টি বাজারকে ঘিরে সরকারের এই উদ্যোগের মাধ্যমে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, কৃষি, ইলেকট্রনিকস, চামড়া, হালকা প্রকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও শক্ত অবস্থানে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এর মাধ্যমে বাংলাদেশের রপ্তানি ভিত্তি আরও বিস্তৃত ও বহুমুখী করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।