আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় দেশের জ্বালানি খাতে আর্থিক চাপ সামাল দিতে মূল্য সমন্বয় করেছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্তে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য—বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান কমানো, জ্বালানি আমদানির অর্থায়ন নিশ্চিত করা, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানো এবং দেশে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা।
নতুন দরে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও আমদানি ব্যয় বাড়লেও দীর্ঘ সময় দেশে জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত ছিল। এতে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। প্রতি মাসে গড়ে লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা।
এক বছরে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ১০৭ শতাংশ: দেশের জ্বালানি খাতে আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ কতটা বেড়েছে, তা আমদানি ব্যয়ের পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। গত অর্থবছরে বিপিসি রেকর্ড ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি তেল আমদানি করেছে। আগের অর্থবছরে এই ব্যয় ছিল ৫ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ১০৭ শতাংশ।
বর্তমানে দেশের মোট পণ্য আমদানি ব্যয়ের ১৪ শতাংশের বেশি জ্বালানি খাতে ব্যয় হচ্ছে। শুধু আগস্ট মাসেই শুল্ক, কর ও পরিচালন ব্যয় বাদ দিয়ে বিপিসির জ্বালানি আমদানি ব্যয় হয়েছে ৭ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। এক বছর আগে একই সময়ে এ ব্যয় ছিল ২ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারের হিসাবে, মূল্য সমন্বয় না করলে শুধু ডিজেলেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত লোকসান বা ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে। সব ধরনের জ্বালানি মিলিয়ে সম্ভাব্য চাপ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
নতুন মূল্য সমন্বয়ের ফলে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত কমানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।
দাম বাড়ার পরও বড় ভর্তুকি: জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম বেশি থাকায় মূল্য সমন্বয়ের পরও সরকারকে প্রতি লিটারে প্রায় ৭০ টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। অর্থাৎ নতুন মূল্য নির্ধারণের পরও আন্তর্জাতিক বাজারের পুরো ব্যয় ভোক্তার ওপর চাপানো হয়নি।
প্রতিমন্ত্রীর মতে, মূল্য সমন্বয় ছাড়া বিপিসির ক্রমবর্ধমান লোকসান সামাল দেওয়ার বিকল্প ছিল না। একই সঙ্গে অতিরিক্ত ভর্তুকির চাপ কমিয়ে সেই অর্থ সামাজিক সুরক্ষা, সরকারি সেবা ও অন্যান্য অগ্রাধিকার খাতে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।
উন্নয়ন তহবিল থেকে নেওয়া হয়েছে ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা: বাড়তি আমদানি ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে মূল্য সমন্বয়ের পাশাপাশি সরকারি ভর্তুকি ও বিকল্প অর্থায়নের ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। জ্বালানি আমদানির অর্থ পরিশোধে বিপিসি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য সংরক্ষিত তহবিলের একটি অংশ ব্যবহার করেছে।
বিপিসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য রাখা তহবিল থেকে ইতোমধ্যে প্রায় ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যবহার করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের জন্য সংরক্ষিত মোট তহবিল ছিল প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা। অর্থ ব্যবহারের পর প্রকল্পগুলোর হিসাবে অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র ১ হাজার ৬৭৯ কোটি ৭২ লাখ টাকা।
তবে কর্মকর্তারা বলছেন, জ্বালানি তেল বিক্রির আয় ও সরকারি ভর্তুকি পাওয়ার পর এসব তহবিল পুনর্গঠন করা সম্ভব হবে। ফলে জরুরি আমদানি সচল রাখার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন অব্যাহত রাখার সুযোগ থাকবে।
পাচার রোধেও কাজে আসবে নতুন দাম: জ্বালানি বিভাগের আরেকটি যুক্তি হলো, প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে দীর্ঘদিন জ্বালানি তেলের দাম কম থাকায় পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। নতুন মূল্য সমন্বয়ের ফলে এ দামের ব্যবধান অনেকটাই কমেছে।
সরকারের দেওয়া হিসাবে, বাংলাদেশি মুদ্রায় কলকাতায় ডিজেলের দাম প্রায় ১৩৪ টাকা, মিয়ানমারে ১৬৫ টাকা, নেপালে ১৬১ টাকা এবং শ্রীলঙ্কায় প্রায় ১৭৯ টাকা। বাংলাদেশে নতুন দরে ডিজেল বিক্রি হচ্ছে ১৩৫ টাকায়।
ফলে সীমান্তবর্তী দেশগুলোর সঙ্গে দামের বড় ব্যবধান না থাকায় দেশের জ্বালানি দেশের বাজারেই ব্যবহারের সুযোগ বাড়বে এবং অবৈধ পাচারের ঝুঁকি কমতে পারে বলে আশা করছে সরকার।
জ্বালানি আমদানিতে নতুন ঋণ: বিপিসির হাতে বর্তমানে জ্বালানি আমদানির জন্য প্রায় ১২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা রয়েছে। সেপ্টেম্বরের আমদানি ব্যয় পরিশোধের পর এ অর্থ আরও কমবে। এ অবস্থায় জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকারি ভর্তুকি, নিজস্ব তহবিল ও বৈদেশিক অর্থায়নের সমন্বয়ে অর্থ জোগানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
আগামী অর্থবছরের জ্বালানি আমদানির অর্থায়নে ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইআইটিএফসি) থেকে ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ অর্থ পাওয়া গেলে জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানির অর্থায়নের চাপ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বড় প্রকল্পও চালু রাখার উদ্যোগ: জ্বালানি আমদানির পাশাপাশি বিপিসির উন্নয়ন প্রকল্পগুলোও চালু রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এলপিজি ট্যাংক স্থাপনের জন্য জমি অধিগ্রহণে প্রায় ৫২৪ কোটি টাকা এবং সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্পের ঋণ পরিশোধে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় ৬৯০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
এ ছাড়া বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। নতুন অর্থায়ন ব্যবস্থা কার্যকর হলে এসব প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
পরিবহন ভাড়া সমন্বয়ের উদ্যোগ: জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রভাব পরিবহন খাতেও পড়ছে। এ কারণে বাসভাড়া পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাস মালিকেরা কিলোমিটারপ্রতি ৪০ পয়সা বাড়ানোর দাবি করলেও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সিটি সার্ভিসে ১৮ পয়সা এবং দূরপাল্লার বাসে ২০ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে।
সর্বনিম্ন ভাড়া বাসে ১০ টাকা এবং মিনিবাসে ৮ টাকা অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিআরটিএর সুপারিশ সরকারের কাছে যাবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়।
রিজভীর বক্তব্যেও উঠে এসেছে বিশ্ববাজারের প্রসঙ্গ: জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় নিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও আন্তর্জাতিক বাজারের দামের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, বিশ্ববাজারের তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম এখনো কম। তার বক্তব্য অনুযায়ী, মূল্য সমন্বয়ের পরও সরকারকে প্রতি লিটারে প্রায় ৭০ টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।
তার বক্তব্যেও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সংগ্রহের বাড়তি ব্যয় এবং দেশে ভর্তুকি অব্যাহত রাখার বিষয়টি উঠে এসেছে।
সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে সরকার একদিকে মূল্য সমন্বয় করেছে, অন্যদিকে ভর্তুকি, নিজস্ব তহবিল ও বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে আমদানির অর্থায়ন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে উন্নয়ন তহবিল পুনর্গঠন, পাচার নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবহন ভাড়া সমন্বয়ের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে বিপিসির লোকসান ও আর্থিক চাপ কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি আমদানি অব্যাহত রাখা এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সরবরাহ নিরাপত্তা ধরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।