বিশ্ব রাজনীতির এক অস্থিরতম অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য। সেখানকার সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতির গতিপথকে বদলে দিতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশেও। কারণ, অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে বেশ কিছু ঝুঁকির মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশীদের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার হুমকিতে পড়তে পারে। আবার আমদানিনির্ভর জ্বালানি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাঁচামালের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার শঙ্কাও রয়েছে। এছাড়া দাম বাড়তে পারে এলএনজিরও। সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, এমনিতেই বাংলাদেশের অর্থনীতি এক ভঙ্গুর অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। করোনার ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ধাক্কা লাগে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের। বিদেশি ঋণের ফাঁদ আর মূল্যস্ফীতির চাপে অর্থনীতি রয়েছে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে। অর্থনৈতিক এই টানাপোড়েনের মধ্যেই নতুন সরকার ক্ষমতা নেওয়ার শুরুতেই আবার শুরু হলো মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ। যুদ্ধের স্থায়িত্ব যত বেশি হবে, তার প্রভাব ততই বাড়তে থাকবে।
এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ আবু আহমেদ বলেন, ইরানে হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে সবচেয়ে বড় শঙ্কা তৈরি হয়েছে জ্বালানি তেল ঘিরে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় যদি সরবরাহ বিঘ্নিত হয় বা হরমুজ প্রণালি ঝুঁকির মুখে পড়ে, তবে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যাবে। বাংলাদেশ যেহেতু শতভাগ আমদানিনির্ভর, তাই এ মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সরাসরি এসে পড়বে দেশের উৎপাদন ও পরিবহন খাতে।
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, তেলের দাম বাড়া মানেই সবকিছুর দাম বাড়া। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও অসহনীয় হয়ে উঠবে। মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকিটি তৈরি হবে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে। আমাদের ব্যালেন্স অব পেমেন্ট এমনিতেই আমাদের বিরুদ্ধে আছে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তেলের দাম বাড়লে এ ঘাটতি আরও বিস্তৃত হবে। তেলের উচ্চমূল্যের কারণে ডলারের চাহিদা বাড়বে, ফলে টাকার ওপর চাপ তৈরি হবে। বিনিময় হার আরও অবনতির দিকে যেতে পারে, যা আমদানি ব্যয় ও ঋণ পরিশোধ—দুটোকেই কঠিন করে তুলবে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি এবং বহুমুখী হতে পারে। তবে এ সংকটের প্রভাব কতটা গভীর হবে, তা মূলত নির্ভর করবে যুদ্ধের স্থায়িত্ব এবং এর বিস্তৃতির ওপর। যুদ্ধ দ্রুত থেমে গেলে এর প্রভাব হয়তো খুব প্রকট হবে না। কিন্তু এটি দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশ বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় বেশকিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা যাতে কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়, সেদিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে ।
নিট পোশাক শিল্পের মালিকের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম গণমাধ্যমকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ তাদের মিত্রদেশের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের সঙ্গে ব্যাংকিং করা জটিল। তা ছাড়া ইরান থেকে আমাদের দেশে ক্রেতারাও সেভাবে আসেনি। সে কারণে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি তৈরি পোশাক কম যায়।
তার মতে, ইরানের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্য কম হলেও বর্তমান যুদ্ধে পরোক্ষ ক্ষতি অনেক বেশি। তিনি বলেন, আমরা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধকল এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি। এরই মধ্যে আবার নতুন যুদ্ধ। হরমুজ খাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাহাজে পণ্য পরিবহনে খরচ বাড়বে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যেসব জাহাজ যায়, সেগুলো হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে। এখন সেই জাহাজ ভারত মহাসাগর ও আটলান্টিক ঘুরে যেতে হবে।
মোহাম্মদ হাতেম আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে আকাশসীমা বন্ধ থাকায় কার্গো বিমানও চলছে না। তাতে জরুরি পণ্য রপ্তানি ব্যাহত হবে। আবার মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও এলএনজি আমদানিও বাধাগ্রস্ত হবে। সব মিলিয়ে আমরা দুশ্চিন্তা রয়েছি। সামনে আরেকটি বড় সংকট দেখতে পারছি আমরা।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, আমরা একটি রপ্তানিনির্ভর দেশ; তাই আমাদের অবশ্যই এই যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলা করতে হবে, বিশেষ করে পোশাক রপ্তানিকারকরা। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, যুদ্ধের কারণে ভোক্তাদের সক্ষমতা কমবে, ফলে তারা পোশাকের মতো পণ্যে কম ব্যয় করবেন। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে দেশের বাজারে উৎপাদন খরচ বাড়বে, কারণ বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ। তৃতীয়ত, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পাঠাতে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের যদি বিকল্প নৌপথ বেছে নিতে হয়, তাহলে সামগ্রিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
মাহমুদ হাসান খান বলেন, এর আগে বাংলাদেশি পোশাক ব্যবসায়ীরা ভেবেছিলেন ইউক্রেন যুদ্ধ দুই সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হবে, কিন্তু সেই যুদ্ধ এখন চার বছর ধরে চলমান। এখন যদি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হয়; তাহলে কুয়েত, ইরাক, ইরান, বাহরাইন, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য রপ্তানি বাজার মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হতে পারে।
জনশক্তি রপ্তানিকারকের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সাবেক সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক মোবারক উল্লাহ শিমুল বলেন, ‘ইরান-ইসরায়েল যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে, সেটা দীর্ঘায়িত হলে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে। আমাদের শ্রমিকরা নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরে আসবেন। দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহে ভাটা পড়বে। এ অবস্থায় সরকারের উচিত প্রথমে প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো হটলাইন চালু করে শ্রমিকদের খবর রাখা ও বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেওয়া। আর আমাদের শ্রমিকদের যাতে ফেরত আসতে না হয় এবং নতুন করে কীভাবে আরও শ্রমিক পাঠানো যায়, সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।’
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক প্রবাসী শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে। এ ছাড়া আকাশপথে ফ্লাইট চলাচল বিঘ্নিত হতে পারে, যা শ্রমিকদের যাতায়াত ও রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে অত্যন্ত সতর্কতা এবং সাবধানতার সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে।’
জ্বালানি তেল ও এলএনজি: মধ্যপ্রাচ্যই হলো বাংলাদেশের জ্বলানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রধান উৎস। তাই এই যুদ্ধ চলতে থাকলে দেশের জন্য জ্বালানির দাম ও সরবরাহ অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে। দেশে বর্তমানে বছরে জ্বালানি তেল আমদানি করা হয় কমবেশি ৭০ লাখ টন। যার বেশিরভাগই আনা হয় মধ্যপ্রাচ্য বা এশিয়ার দেশগুলো থেকে। এই যুদ্ধে তেল সরবরাহ নিয়ে চিন্তায় আছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি)। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে পুরো জ্বালানি খাতে নেমে আসবে বিপর্যয়।
বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, আগামী জুন পর্যন্ত পরিশোধিত জ্বালানি তেল নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। আমরা আপাতত সেফ সাইডে রয়েছি। পরিশোধিত জ্বালানি তেল মালয়েশিয়া, চীন, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আসছে। এসব দেশ থেকে জ্বালানি আমদানিতে হরমুজ প্রণালির কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তবে অপরিশোধিত তেলের দীর্ঘমেয়াদি উৎস সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত হওয়ায় বিষয়টি আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। এটুকু বলা যায় যে, এ মুহূর্তে আমাদের জ্বালানি তেলের রিজার্ভে কোনো সংকট নেই।
বাংলাদেশ কনটেইনার শিপিং অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান হারুন-উর-রশিদ বলেন, বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় সবসময় ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার শিকার হয়। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ বাংলাদেশের পণ্য পরিবহনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। এ ছাড়া এরই মধ্যে ইয়েমেনের হুতিদের হামলার কারণে লোহিত সাগর দিয়ে পণ্য পরিবহন কমিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। রাশিয়া ও চীন এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে পণ্য পরিবহন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।