দেশের বাড়তে থাকা পরিবহন চাহিদা এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কথা বিবেচনায় নিয়ে প্রধান মহাসড়ক বা ট্রাঙ্ক হাইওয়ে নেটওয়ার্কের নতুন মহাপরিকল্পনা তৈরি করছে সরকার। চীনের অনুদানে এই পরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)।
প্রস্তাবিত মহাপরিকল্পনায় দেশের প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র, শিল্পাঞ্চল, বন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর মধ্যে দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত করতে জাতীয় এক্সপ্রেসওয়ে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। পাশাপাশি বড় নদী পারাপারের সেতুগুলোকে একটি সমন্বিত যোগাযোগ নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে পরিকল্পনায় যুক্ত করা হবে।
এ লক্ষ্যে ১২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘প্রিপারেশন অব বাংলাদেশ ট্রাঙ্ক হাইওয়ে নেটওয়ার্ক প্ল্যান ফোকাসিং অন দ্য এক্সপ্রেসওয়ে নেটওয়ার্ক অ্যান্ড মেজর রিভার ক্রসিং ব্রিজেস’ শীর্ষক কারিগরি সহায়তা প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পের পুরো অর্থ চীন সরকার অনুদান হিসেবে দেবে। প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী বছরের অক্টোবরের মধ্যে মহাপরিকল্পনা তৈরির কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
অর্থনৈতিক করিডোরে জোর: সওজ কর্মকর্তারা জানান, নতুন পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হবে দেশের কৌশলগত অর্থনৈতিক করিডোরগুলোকে শক্তিশালী করা। বন্দর, শিল্পাঞ্চল, বড় শহর ও আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রগুলোর মধ্যে উন্নত সড়ক যোগাযোগ গড়ে তোলার মাধ্যমে পণ্য পরিবহন ও যাতায়াতের সক্ষমতা বাড়ানো হবে।
জাতীয় এক্সপ্রেসওয়ে নেটওয়ার্কের সম্ভাব্য রুট ও কাঠামো নির্ধারণের পাশাপাশি কোন কোন বড় নদীতে সেতু প্রয়োজন, সেগুলোও চিহ্নিত করা হবে। জাতীয় ও আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে এসব সেতুর পরিকল্পনা করা হবে। একই সঙ্গে সড়ক ও সেতু উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের একটি রূপরেখা তৈরি করা হবে। এতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সময়ে কোন প্রকল্প আগে নেওয়া প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
আগের মাস্টারপ্ল্যান থেকে ভিন্নতা: সওজ এর আগেও জাতীয় সড়ক নেটওয়ার্ক নিয়ে একটি মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করেছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) আর্থিক সহায়তায় তৈরি ওই পরিকল্পনায় জাতীয় সড়ক নেটওয়ার্কের সার্বিক উন্নয়ন, বিভিন্ন শ্রেণির সড়কের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছিল।
নতুন ট্রাঙ্ক হাইওয়ে নেটওয়ার্ক পরিকল্পনার লক্ষ্য তুলনামূলকভাবে আরও কৌশলগত। এতে দেশের প্রধান অর্থনৈতিক করিডোর, বন্দর, শিল্পাঞ্চল ও প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রগুলোর মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
বিশেষ গুরুত্ব পাবে নিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকারসম্পন্ন এক্সপ্রেসওয়ে নেটওয়ার্ক। এর মাধ্যমে দীর্ঘ দূরত্বে দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ নিশ্চিত করার কাঠামো নির্ধারণ করা হবে।
বড় নদী পারাপারের সেতুগুলোকেও এবার বিচ্ছিন্ন প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং জাতীয় ট্রাঙ্ক হাইওয়ে নেটওয়ার্কের সমন্বিত অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
সমন্বিত পরিকল্পনায় গুরুত্ব: প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, দেশে একটি সমন্বিত পরিবহন তথ্যভাণ্ডার ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতির কারণে বিভিন্ন সময়ে মহাসড়ক উন্নয়ন হয়েছে অনেকটা বিচ্ছিন্নভাবে। এর ফলে কোথাও কোথাও সড়কের প্রযুক্তিগত মান ও সক্ষমতার মধ্যেও পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, নগরায়ন ও যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সওজ ইতোমধ্যে বিভিন্ন সড়ক সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তবে জাতীয় পর্যায়ে প্রধান সড়ক নেটওয়ার্কের জন্য একটি সমন্বিত ও তথ্যভিত্তিক কৌশল প্রয়োজন বলে প্রকল্প প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নতুন মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে এক্সপ্রেসওয়ে, বড় নদীর সেতু এবং কৌশলগত অর্থনৈতিক করিডোরকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতের সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগের অগ্রাধিকার নির্ধারণ আরও সুসংগঠিত হবে।
চীনের কারিগরি সহায়তা: পরিকল্পনাটি তৈরিতে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ সহায়তা দেবে চীন। প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালের নভেম্বর ও ২০২১ সালের জুনে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির ধারাবাহিকতায় এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরে ২০২৫ সালের ২৬ জুন ট্রাঙ্ক হাইওয়ে নেটওয়ার্ক পরিকল্পনায় চীনের সহায়তার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
সওজ কর্মকর্তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের সড়ক যোগাযোগ কাঠামো আরও কার্যকর হবে। একই সঙ্গে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় কমানো, বন্দর ও শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যিক সংযোগ শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হবে।