রান্নার গ্যাসের বাজারে অস্থিরতার মধ্যেই ভোক্তাদের ওপর নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হয়েছে। এক মাসের ব্যবধানেই ১২ কেজি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম এক লাফে ২২৩ টাকা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। ফলে এখন থেকে ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে গ্রাহককে গুনতে হবে ২ হাজার ৬০ টাকা। আগে এর দাম ছিল ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি আমদানিকারক, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বাড়ানোর কারণে নতুন এই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে বলে জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
সোমবার (২ নভেম্বর) এক বিজ্ঞপ্তিতে নতুন দাম ঘোষণা করে বিইআরসি। তবে নির্ধারিত দাম বাড়ার পাশাপাশি বাজারে সরবরাহ ও বিক্রয়মূল্য নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কারণ, আগের নির্ধারিত দামের চেয়েও বেশি দামে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এলপিজি বিক্রির অভিযোগ ছিল। ফলে নতুন মূল্য কার্যকর হওয়ার পর সাধারণ ভোক্তাদের ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
দুই মাসে বেড়েছে প্রায় ৫০০ টাকা: এলপিজির মূল্যবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মাত্র দুই মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে ৪৭৫ টাকা। গত সেপ্টেম্বরে ১২ কেজি এলপিজির নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। অক্টোবরে তা ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা করা হয়। নভেম্বরের শুরুতে নতুন করে ২২৩ টাকা বাড়িয়ে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ৬০ টাকা। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে রান্নার গ্যাসের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসা ও হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতেও বাড়তি ব্যয়ের চাপ তৈরি হতে পারে।
কমিশন বাড়ানোর প্রভাব: বিইআরসির নতুন মূল্য সমন্বয়ে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের দর নয়, সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ের কমিশনও বাড়ানো হয়েছে। আমদানিকারকদের মজুতকরণ ও বোতলজাতকরণ চার্জ, অপারেটরের প্ল্যান্ট থেকে ডিস্ট্রিবিউটর পর্যন্ত পরিবহন খরচসহ ১২ কেজি সিলিন্ডারে ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৮১ টাকা ৭৬ পয়সা করা হয়েছে।
একই সঙ্গে ডিলারদের কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮৫ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যয় বৃদ্ধিও চূড়ান্ত বিক্রয়মূল্যে প্রভাব ফেলেছে।
এদিকে শুধু সিলিন্ডার গ্যাস নয়, যানবাহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দামও বাড়ানো হয়েছে। প্রতি লিটার অটোগ্যাসের দাম ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯১ টাকা ৯৫ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে প্রতি লিটারের দাম ছিল ৭৩ টাকা ৯ পয়সা।
সরবরাহ স্বাভাবিক, তবু সংকটের অভিযোগ: এলপিজির দাম বাড়ার পাশাপাশি বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগও নতুন করে সামনে এসেছে। রাষ্ট্রীয় একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে টনপ্রতি দাম ৬৪ ডলার বেড়ে যাওয়ার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পাঁচটি কোম্পানি গত ২২ সেপ্টেম্বর থেকে এলপিজি বিক্রি প্রায় বন্ধ করে দেয়। নতুন দামে বিক্রির উদ্দেশে তারা হাজার হাজার টন গ্যাস মজুত করে রেখেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ওই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এবং সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। আমদানির পরিমাণে বড় ধরনের ঘাটতি না থাকায় বাজারে সরবরাহ সংকটের যৌক্তিক কারণ থাকার কথা নয় বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। তবে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার তথ্যের পরও বাজারে সংকট ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আগে নির্ধারিত ১ হাজার ৮৩৭ টাকার পরিবর্তে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ উঠেছিল। অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে ভোক্তারা জিম্মি হয়ে পড়ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সরকারি ও বেসরকারি গ্যাসের দামে বড় ব্যবধান: গত ২৯ অক্টোবর এলপিজির মূল্য নির্ধারণ নিয়ে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সরকারি ও বেসরকারি এলপিজির দামের বড় ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, বেসরকারি ১২ কেজির সিলিন্ডার যেখানে ১ হাজার ৮৩৭ টাকায় বিক্রির কথা, সেখানে সরকারি ১২ দশমিক ৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৭৭৬ টাকা ৯৩ পয়সা। অথচ বাজারে সরকারি গ্যাসের সরবরাহ ও প্রাপ্যতা নিয়েও ভোক্তাদের অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি ও বেসরকারি এলপিজির দামের এই বড় ব্যবধান বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর প্রভাব ফেলছে। কালোবাজারি এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগের বিষয়েও কার্যকর নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে।
জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবি: এর আগেও এলপিজি বাজারে অস্থিরতা দেখা গেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে খাতটিতে নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট মহলে অভিযোগ রয়েছে। তবে সে সময় আমদানিকারকদের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনিয়মের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না থাকলে বাজারে অসাধু চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের ১২ এপ্রিল প্রথমবারের মতো বেসরকারি এলপিজির মূল্য ঘোষণা করে বিইআরসি। তখন জানানো হয়েছিল, সৌদি আরামকোর ঘোষিত আন্তর্জাতিক বাজারদরের ওঠানামার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি মাসে এলপিজির ভিত্তিমূল্য সমন্বয় করা হবে। পাশাপাশি জাহাজভাড়া, আমদানিকারক, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে গণশুনানির মাধ্যমে তা নির্ধারণ করা হবে।
সেই ধারাবাহিকতায় প্রতি মাসে এলপিজির দাম ঘোষণা করে আসছে কমিশন। তবে নিয়মিত মূল্য সমন্বয়ের পাশাপাশি বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করা, নির্ধারিত দামে বিক্রি কার্যকর করা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যথায় আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধির চাপের সঙ্গে স্থানীয় বাজারের অস্থিরতা মিলিয়ে ভোক্তাদের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।