দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে জ্বালানি খাতের তীব্র সংকট। জুন মাসেই পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৯.৮৫ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে ১৬.৬৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল। তবে দাম বাড়ানোর পর দুই মাস পার হতে চললেও বিদ্যুৎ সরবরাহের চিত্র এতটুকু বদলায়নি; বরং প্রতিদিন নতুন নতুন রেকর্ড ভাঙছে লোডশেডিং। জ্বালানির মারাত্মক ঘাটতি, আমদানিনির্ভর এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে পাহাড়সম বকেয়া বিল জমে থাকা—সব মিলিয়ে দেশের বিদ্যুৎ খাত আজ এক জটিল ও ত্রিমুখী সংকটে এসে দাঁড়িয়েছে।
দেশের বিদ্যুৎ খাতের বিদ্যমান এই মহাবিপর্যয় একদিনে তৈরি হয়নি। একাধিক অবকাঠামোগত, অর্থনৈতিক এবং জ্বালানি সরবরাহজনিত কারণে পুরো ব্যবস্থাটি মুখ থুবড়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্য এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নে সংকটটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা রয়েছে ২৯ হাজার মেগাওয়াট। অথচ মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বিকেলে যেখানে সর্বোচ্চ বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট, সেখানে সরবরাহ দেওয়া সম্ভব হয়েছে মাত্র সাড় ১২ হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ, অর্ধেকেরও বেশি উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি অভাবে কেন্দ্রগুলো বন্ধ রাখতে হচ্ছে। জ্বালানি সংকট ও জরুরি রক্ষণাবেক্ষণজনিত কারণে বর্তমানে দেশের ৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। যেগুলো চালু আছে, সেগুলোর অধিকাংশও পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় পূর্ণ সক্ষমতায় চালনা করা সম্ভব হচ্ছে না।
এর ফলে সাম্প্রতিক সময়ে লোডশেডিং অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিদিন গড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। গত রোববার (৯ আগস্ট) বিকেল ৩টায় লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট, যা রাত ১টায় দাঁড়ায় ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে। ১০ ঘণ্টার ব্যবধানে এটি ছিল দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের রেকর্ড। এর আগে ৩ আগস্ট লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৫১২ মেগাওয়াট এবং ২০২৩ সালের ২৭ জুন ছিল ৩ হাজার ৪১৯ মেগাওয়াট।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিগত দেড় দশকে পাইকারি পর্যায়ে ১২ বার এবং খুচরা পর্যায়ে ১৪ বার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলেও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি উৎস নিশ্চিত করা হয়নি। উৎপাদন না করলেও কেন্দ্রগুলোকে বিপুল পরিমাণ ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা কেন্দ্র ভাড়া দিতে হয়েছে। বর্তমানে বেসরকারি ও বিদেশি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে পিডিবির দেনা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।
প্রাথমিক জ্বালানি খাতের প্রতিটি উৎস একযোগে সংকটে পড়ায় মূল অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতে প্রতিদিনের গ্যাসের চাহিদা ২৫২ কোটি ঘনফুট। লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণে রাখতে অন্তত ১০০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হলেও পেট্রোবাংলা দিতে পারছে মাত্র ৭০ কোটি ঘনফুট। ফলে গ্যাসভিত্তিক উৎপাদন ৫ হাজার মেগাওয়াট থেকে কমে ৩,৫০০-৪,০০০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে। ২১ জুলাই মহেশখালী ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (FSRU) ক্ষতিগ্রস্ত হলে সরবরাহ ৬০ কোটি ঘনফুট কমে যায়। পরবর্তীতে মেরামত শেষে ২৫ কোটি ঘনফুট যোগ হলেও বঙ্গোপসাগরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে নতুন এলএনজি কার্গো ভিড়তে না পারায় সরবরাহ ফের ২৫ কোটি ঘনফুট কমে মোট সরবরাহ ২২০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে আসে।
৭,৯৪৫ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিপরীতে কয়লা থেকে উৎপাদিত হচ্ছে সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। ৯ হাজার কোটি টাকারও বেশি পাওনা নিয়ে ধুঁকতে থাকা পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট রক্ষণাবেক্ষণে থাকায় উৎপাদন অর্ধেকে নেমেছিল। আদানির ১,৬০০ মেগাওয়াটের কেন্দ্রে বন্যায় কয়লা ভিজে যাওয়া এবং পটুয়াখালী উপকূলে বৈরী আবহাওয়ার কারণে জাহাজ থেকে কয়লা খালাস না হওয়ায় সরবরাহ কমে ৮০০-১,০০০০ মেগাওয়াটে নেমেছে। রামপাল ও বড়পুকুরিয়াতেও উৎপাদন কমেছে; বড়পুকুরিয়ার তিনটি ইউনিটের দুটিই কারিগরি ত্রুটিতে বন্ধ।
এছাড়া ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলচালিত কেন্দ্রগুলো সারা দিন চালানো অসম্ভব ব্যয়বহুল। তাই কেবল সন্ধ্যার পর ‘পিক আওয়ারে’ লোডশেডিং সহনীয় রাখতে সীমিত সময়ের জন্য তেলভিত্তিক কেন্দ্র চালু রাখা হচ্ছে।
জাতীয় গ্রিডে সঞ্চালন ও বণ্টনের ক্ষেত্রে নগর ও গ্রামের চরম অসম চিত্র ফুটে উঠেছে। ঢাকার দুই বিতরণ সংস্থা (ডেসকো ও ডিপিডিসি) জানিয়েছে তাদের বড় ঘাটতি নেই, ফলে রাজধানীতে সরবরাহ প্রায় নিরবচ্ছিন্ন। কিন্তু বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) আওতাধীন গ্রামীণ জনপদে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১০-১২ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকছে না।
প্রচণ্ড উত্তাপ আর বিদ্যুৎহীনতার ডাবল-চাপে গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা চরম দুর্ভোগে পড়েছে।
নেত্রকোনার পূর্বধলার বাঘবেড় গ্রামের আক্কাস আলী জানান, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৫ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ মিলছে না।
কেরানীগঞ্জের গৃহবধূ রোকেয়া বেগম ও নীলফামারীর টুপামারীর সাদ্দাম আলী জানান, তীব্র গরমে দিন-রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু থেকে শুরু করে কর্মজীবী মানুষের দৈনন্দিন কাজ ও স্বাভাবিক জীবন স্থবির হয়ে পড়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান না করে আমদানিনির্ভর এলএনজির দিকে ঝোঁকার খেসারত দিচ্ছে পুরো দেশ। সাগরে সামান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা আন্তর্জাতিক বাজারের সামান্য দোলাচলেই দেশের পুরো বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে।
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের জোড়া সংকটে রপ্তানিমুখী খাত, প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং কৃষিতে ধস নামার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বস্ত্র, পোশাক ও ভারী শিল্পকারখানায় ব্যাকআপ জেনারেটর চালাতে গিয়ে ডিজেল ও গ্যাসের পেছনে বিপুল বাড়তি খরচ হচ্ছে, ফলে লাফিয়ে বাড়ছে উৎপাদন খরচ।
নারায়ণগঞ্জ, রূপগঞ্জ ও ফেনীর শিল্পমালিকরা জানান, বিদ্যুৎ চলে গেলে কারখানার বিশাল উৎপাদন লাইন বন্ধ হয়ে যায় এবং তা পুনরায় চালু করতে দীর্ঘ সময় নষ্ট হয়। ফেনীর স্টারলাইন ফুড প্রডাক্টসের পরিচালক মো. মাইন উদ্দিন জানান, প্রতিদিন গড়ে ৩৫ শতাংশ সময় লোডশেডিং হওয়ায় উৎপাদন খরচ অহেতুক বেড়ে যাচ্ছে। চুনারুঘাটের দেউন্দি চা-বাগানের সহকারী ব্যবস্থাপক দেবাশীষ রায় জানান, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে সংগৃহীত চা-পাতা পচে নষ্ট হয়ে বড় ধরনের লোকসান হচ্ছে। এছাড়া গ্রামাঞ্চলে সেচ পাম্প চালানো বিঘ্নিত হওয়ায় মৌসুমী ফসল উৎপাদনে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানান, সন্ধ্যার পর লোডশেডিং সহনীয় রাখতে অতিরিক্ত উৎপাদন করা হলেও মধ্যরাতের পর আবার তা কমাতে হচ্ছে। পিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম এবং পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) প্রকৌশলী মো. শোয়েব আশা প্রকাশ করে জানান, এলএনজি টার্মিনাল মেরামত শেষ হলে এবং কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক হলে দুই-তিন দিনের মধ্যে সরবরাহে কিছুটা উন্নতি হতে পারে।
অন্যদিকে নেত্রকোনা, ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৪ এবং ডোমার নেসকোর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, চাহিদার বিপরীতে অর্ধেকেরও কম সরবরাহ পাওয়ায় গ্রামাঞ্চলে ঘন ঘন লোডশেডিং দেওয়া ছাড়া তাদের বিকল্প কোনো পথ নেই।
সংকট সমাধানে বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, দেশের মোট গ্যাসের ৫৮ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে যায়, অথচ ৮ শতাংশই নষ্ট হয় সিস্টেম লসে—যা গ্রহণযোগ্য নয়। শিল্প খাতে গ্যাস দিলে উৎপাদন বাড়ে ও ডলার আসে, সেখানে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত ছিল।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম মনে করেন, সাময়িক এলএনজি আমদানির পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিতে হবে এবং অপচয় ও অন্যায্য ব্যয় বন্ধ করতে হবে। একই সাথে সাপ্লাই চেইন বিশেষজ্ঞ মো. মজিবুল হক জানান, দেশের জ্বালানি মজুতের স্টোরেজ ক্ষমতা বাড়াতে হবে ও ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেল শক্তিশালী করতে হবে, তা না হলে কৃষি, শিল্প ও পরিবহন খাত বড় হুমকির মুখে পড়বে।