রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে ভোট গ্রহণ হবে। মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন ১৩ আগস্ট, যাচাই-বাছাই ১৬ আগস্ট এবং ১৮ আগস্ট পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহার করা যাবে। ইসি সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) দুপুরে এ তফসিল ঘোষণা করেন।
এখন অপেক্ষা, আগামী ৫ বছরের জন্য বঙ্গভবনের নতুন বাসিন্দা দেখার। এটি ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। গত ২৪ জুলাই মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করায় পদটি শূন্য হয়।
সংবিধানের ১২৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করতে হয়। সেই সাংবিধানিক সময়সীমার মধ্যেই ভোটের দিন নির্ধারণ করেছে ইসি। বর্তমানে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন না। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদের সদস্যরা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুসারে ভোট হয় সংসদ কক্ষে এবং নির্বাচন কমিশন পুরো প্রক্রিয়া পরিচালনা করে।
প্রত্যেক সংসদ সদস্যের একটি করে ভোট থাকে। একাধিক প্রার্থী থাকলে প্রকাশ্য ব্যালটে ভোট হয়; সর্বাধিক ভোট পাওয়া প্রার্থী নির্বাচিত হন। ভোট সমান হলে লটারির মাধ্যমে ফল নির্ধারণের বিধান রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থীকে অন্তত ৩৫ বছর বয়সী এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হতে হবে। সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে আগে অভিশংসনের মাধ্যমে অপসারিত কেউ এ পদে প্রার্থী হতে পারবেন না। একজন সংসদ সদস্য প্রস্তাবক এবং অন্য একজন সমর্থক হিসেবে মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষর করেন। একজন বৈধ প্রার্থী থাকলে ভোট ছাড়াই তাকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়।
রাষ্ট্রপতির মেয়াদ দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকে পাঁচ বছর। কোনো ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করতে পারেন। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করেন। তবে প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগে তার নির্দিষ্ট সাংবিধানিক ভূমিকা রয়েছে।
এদিকে, দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হবেন- এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা চললেও এখন সেই সিদ্ধান্তের ভার এককভাবে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে।
সরকার দলীয় সূত্রে জানা গেছে, পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন, ইতোমধ্যে তা ঠিক করেছেন তারেক রহমান। এই নাম প্রধানমন্ত্রীর ফোল্ডারে সংরক্ষিত আছে। অতীতে রাষ্ট্রপতি মনোনয়নে আনুগত্য, দক্ষতা ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতা নিয়ে মিশ্র অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়া বিএনপি এবার ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অনেক বেশি সতর্ক।
দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের মতে, রাষ্ট্রপতি শুধু আনুষ্ঠানিক পদ হলেও রাজনৈতিক সংকটের সময় এ পদটির গুরুত্ব বেড়ে যায়। বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি করে বিএনপিকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। অন্যদিকে অদক্ষতার কারণে ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ ব্যর্থ হয়েছিলেন। তাই অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার দলীয় আনুগত্যের পাশাপাশি দক্ষ, সাহসী, গ্রহণযোগ্য ও রাষ্ট্রনায়কসুলভ ব্যক্তিকেই রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে নিতে চায় বিএনপি।
গত শনিবার রাতে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক হয়। দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, প্রশাসনের কার্যক্রম, সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে।
সবশেষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করে স্থায়ী কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নের দায়িত্ব চেয়ারম্যানের ওপর অর্পণ করে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলের প্রার্থী কে হবেন এবং নির্বাচনসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত কবে নেওয়া হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এ অবস্থায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী মনোনয়নের দায়িত্ব সরাসরি দলের চেয়ারম্যানের হাতে তুলে দেওয়াকে দলটির অভ্যন্তরীণ আস্থার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
একই সঙ্গে এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কেন্দ্র করে দলটি একক নেতৃত্বের অধীনেই কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে চায়। এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের নজর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। তিনি কাকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেন, সেটিই নির্ধারণ করবে দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপ্রধানের পরিচয়।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রশ্নে অতীতের ভালো এবং তিক্ত-দুই ধরনের অভিজ্ঞতাই রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে মূলত তিনটি বিষয় বিএনপি বিবেচনায় নেবে বলে দলটির মধ্যে আলোচনা হচ্ছে।
প্রথমত দেশ ও দলের প্রতি আস্থা বা বিশ্বাস; দ্বিতীয়ত, দক্ষতা ও প্রজ্ঞা এবং তৃতীয়ত, রাষ্ট্রপতি পদের নেতা বা ব্যক্তির মধ্যে কিছুটা সাহস থাকাও প্রয়োজন বলে মনে করে দলটি।
যেমন ১৯৯৬ সালের মে মাসে বিএনপি সরকারের রাষ্ট্রপতি থাকাকালে আবদুর রহমান বিশ্বাসের সাহসিকতায় তৎকালীন সেনাপ্রধান লে. জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিমের একটি অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়।
অন্যদিকে ২০০৬ সালে বিএনপির ক্ষমতা ছাড়ার পর রাষ্ট্রপতির পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিয়েছিলেন অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। কিন্তু বিএনপির প্রতি তার আনুগত্য থাকলেও অদক্ষতার কারণে উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি ব্যর্থ হন বলে অনেকে মনে করেন।
ফলে দেশে এক-এগারোর জরুরি সরকার ক্ষমতায় আসে এবং প্রধান উপদেষ্টার পদ ছাড়তে তিনি বাধ্য হন। এরপর রাষ্ট্রপতি হিসেবেও তিনি সাহসী পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে অভিযোগ আছে।
সার্বিকভাবে এর ফলাফল পুরোপুরি বিএনপির বিপক্ষে গেছে বলে আলোচনা আছে। অনেকের মতে, শুধু দলীয় আনুগত্য যে কাজে লাগে না, ইয়াজউদ্দিনের ঘটনায় তা প্রমাণিত।
অন্যদিকে সাহসের অভাব না থাকলেও বিএনপির নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী দলের প্রতি আনুগত্য দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে প্রথমে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পরে রাষ্ট্রপতি করা হয়।
কিন্তু ওই পদে তাকে বেছে নেওয়ার ফলও শেষ বিচারে বিএনপির পক্ষে যায়নি। রাষ্ট্রপতি থাকাকালে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন না করা, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বাণীতে জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক উল্লেখ না করা এবং তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে মুন্সীগঞ্জে স্বাগত জানিয়ে ছেলে মাহী বি চৌধুরীর তোরণ নির্মাণসহ কয়েকটি ঘটনায় মাত্র সাত মাসের মধ্যে বিএনপির সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়।
এসব ঘটনার সূত্র ধরে ২০০২ সালের ১৯ ও ২০ জুন বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় রাষ্ট্রপতির পদ থেকে তাকে ‘ইমপিচ’ করার সিদ্ধান্ত হলে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে তিনি পদত্যাগ করেন।