দেশের জ্বালানি সংকট এখন আর শুধু গ্যাস বা বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যা নয়। এর প্রভাব পড়ছে শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, ব্যাংকিং, গৃহস্থালির ব্যয় এবং এলপিজি বাজারে। একদিকে গ্যাসের অভাবে শিল্পকারখানার উৎপাদন কমছে ও বন্ধ হচ্ছে, অন্যদিকে বাসাবাড়িতে বাড়ছে বিকল্প জ্বালানির খরচ। গ্যাসের বিকল্প হিসেবে অনেক পরিবার বৈদ্যুতিক চুলার ওপর নির্ভর করলেও বাড়তি বিদ্যুৎ বিল ও বিদ্যুৎ সংকটে সেই ভরসার বৈদ্যুতিক চুলাতেও তৈরি হচ্ছে নতুন চাপ। বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি ঘাটতি, কেন্দ্রের কারিগরি সমস্যা ও গ্রিড সীমাবদ্ধতায় লোডশেডিংও বেড়েছে। একই সময়ে বাড়তি আমদানির পরও এলপিজি বাজারে তৈরি হয়েছে সরবরাহ সংকট।
দেশের শিল্প খাত দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, ব্যাংক ঋণের চাপ, কাঁচামালের ব্যয় বৃদ্ধি এবং ক্রয়াদেশের অনিশ্চয়তায় গভীর সংকটে পড়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ মাসে গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদীর তিন শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এতে সরাসরি কর্মসংস্থান হারিয়েছেন ৬১ হাজার ৮৮১ জন। তবে সাময়িকভাবে বন্ধ ও অর্ধেক সক্ষমতায় চলা কারখানা ধরলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, বন্ধ কারখানার তুলনায় কাজ হারানো মানুষের সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি হতে পারে। স্থায়ীভাবে বন্ধ কারখানার শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি, সার্ভিস বেনিফিট ও ক্ষতিপূরণ নিয়েও সংকট তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল জানান, আগামী দুই বছর গ্যাস ও বিদ্যুতের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা নেই—এমন ধারণা থেকেই তিনি তার মালিকানাধীন একটি পার্টিকেল বোর্ড মিল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর আগে জ্বালানি সংকটে তার পাঁচটি স্পিনিং মিলও বন্ধ হয়েছে।
আগস্ট ২০২৪ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত বিজিএমইএ’র ৪৯৯টি, বিকেএমইএ’র ২৩৫টি, বিটিএমএ’র ১৬৬টি এবং বেপজার ৫৯টি সদস্য কারখানা বন্ধ হয়েছে। অর্থাৎ এসব সংগঠনের সদস্য কারখানার মধ্যেই বন্ধের সংখ্যা ৯৫৯টি। অন্যান্য শিল্প খাতেও ২০২৪ ও ২০২৫ সালে এক হাজারের বেশি কারখানা বন্ধ হয়েছে বলে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো জানিয়েছে।
মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যা, এলএনজি সংগ্রহ ও কার্গো গ্রহণের জটিলতায় গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে টেক্সটাইল, স্পিনিং, ডাইং, ইস্পাত, কাগজ, পার্টিকেল বোর্ড ও সিরামিক শিল্প। শিল্পে গ্যাসের ব্যবহার ১ হাজার ১৮৬ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে ১ হাজার ১৪৮ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধিও ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ১ শতাংশে নেমেছে।
উৎপাদন বন্ধ থাকলেও কারখানার ভাড়া, শ্রমিকের বেতন, ব্যাংক ঋণের সুদসহ স্থায়ী ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। আবার কম সক্ষমতায় কারখানা চালালেও প্রতি ইউনিট পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তি ব্যয় ক্রেতার ওপর চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব না হওয়ায় উদ্যোক্তারা লোকসানে উৎপাদন চালাবেন, নাকি কারখানা বন্ধ রাখবেন—সেই কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়েছেন।
কারখানা বন্ধ হলে নগদ অর্থপ্রবাহ কমে যায়, কিন্তু ব্যাংকের কিস্তি ও সুদের দায় থেকে যায়। শওকত আজিজ রাসেল জানিয়েছেন, কারখানা বন্ধ হলেও ব্যাংকের দায় পরিশোধের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। প্রয়োজনে অবশিষ্ট সম্পদ বিক্রি করেও পাওনা পরিশোধ করতে হতে পারে।
সিপিডির পর্যালোচনায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে। নিট বিদেশি বিনিয়োগ ৬৬২ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৫৯৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলার প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ঋণাত্মক ১৩ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ পুরোনো কারখানা যেমন বন্ধ হচ্ছে, তেমনি নতুন শিল্প স্থাপন ও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির গতিও কমছে।
একটি কারখানা বন্ধ হলে শুধু শ্রমিক নয়—পরিবহন শ্রমিক, কাঁচামাল সরবরাহকারী, স্থানীয় ব্যবসায়ী, খাবারের দোকান ও ভাড়াবাজারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে শিল্পাঞ্চলে সংকটের প্রভাব দ্রুত স্থানীয় অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক দশমিক ২৮ শতাংশে নেমেছে।
জ্বালানি ও উৎপাদন ব্যয়ের পাশাপাশি ওষুধ শিল্পেও তৈরি হয়েছে বড় সংকট। বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির (বাপি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় থাকা ১১৭টির মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও দীর্ঘদিন ধরে ওষুধের দাম সে অনুযায়ী সমন্বয় না হওয়ায় উৎপাদকরা লোকসানের মুখে পড়েছেন।
বাপির ভাইস প্রেসিডেন্ট মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, ‘বর্তমানে এসব ওষুধের অনেকগুলোর উৎপাদন খরচ বিক্রয়মূল্য থেকে উঠে আসে না। মূল্য সমন্বয় না হওয়ায় প্রায় ৬০ শতাংশ ওষুধের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।’
বাপির সাবেক মহাসচিব ও ডেল্টা ফার্মা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. জাকির হোসেন বলেন, ‘ওষুধ শিল্পকে শুধু মূল্য নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন ও নতুন বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’ তার মতে, বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে এবং দাম নির্ধারণে স্বচ্ছ, বাস্তবসম্মত ও নিয়মিত সমন্বয়যোগ্য ব্যবস্থা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনীয় ওষুধ সুলভ মূল্যে জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। সরকার চাইলে ভর্তুকি বা সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার মাধ্যমে কম দামে এসব ওষুধ সরবরাহ করতে পারে। তবে ভর্তুকি ছাড়া বেসরকারি উৎপাদনকারীদের দীর্ঘদিন কম দামে ওষুধ উৎপাদনের প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।’
শিল্পের পাশাপাশি গ্যাস সংকটে ভোগান্তি বেড়েছে সাধারণ মানুষের। রাজধানীর পশ্চিম শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা আজমল হোসাইন জানান, আড়াই মাস ধরে তার বাসায় গ্যাস নেই। বাধ্য হয়ে তিনি সাত হাজার টাকা দিয়ে বৈদ্যুতিক চুলা কিনেছেন। গ্যাসের বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক চুলার ওপর নির্ভর করলেও বাড়তি বিদ্যুৎ বিলের কারণে তার সংসারের খরচ বেড়েছে। তার ভাষায়, আগে বিদ্যুৎ বিল ১ হাজার ৫০০ টাকা এলেও এখন তা বেড়ে ২ হাজার ৮০০ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ গ্যাসের সংকট থেকে বাঁচতে যে বৈদ্যুতিক চুলার ওপর ভরসা করতে হচ্ছে, বাড়তি বিদ্যুৎ বিলের কারণে সেই বিকল্পও সাধারণ মানুষের জন্য নতুন ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গ্যাস না থাকায় নিরাপদ পানি নিয়েও সমস্যায় পড়েছেন তিনি। পানি ফুটিয়ে খেতে না পারায় তার দুই সন্তান অসুস্থ হয়ে পড়েছিল বলে জানান আজমল।
মিরপুরের আয়েশা সিদ্দিকা জানান, চার মাস ধরে গ্যাসের সমস্যা চলছে। তিনি সিলিন্ডার ও বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছেন। আগে তার বিদ্যুৎ বিল প্রায় ১ হাজার টাকা হলেও এখন ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা আসে। তার বক্তব্য, গ্যাসের বিল দেওয়ার পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানির জন্যও বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে গ্যাসের বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করেও সংকট থেকে পুরোপুরি মুক্তি মিলছে না।
পূর্ব শেওড়াপাড়ার শান্তা রানী জানান, গ্যাস না থাকায় মাটির চুলা বানিয়ে রান্না করছেন। ভেজা লাকড়ি জ্বলে না। বেলা দুইটার দিকে সামান্য গ্যাস এলে রান্না শুরু করেন। তার ভাষায়, সকালে রান্না না হওয়ায় দুপুরের খাবার খেতেও অনেক সময় বিকাল হয়ে যায়।
কালশীর বাসিন্দা শিল্পী খাতুন জানান, কয়েকটি পরিবার মিলে একটি টিনশেড বাসায় থাকায় পালা করে রান্না করতে হয়। বাড়িওয়ালা বৈদ্যুতিক ও লাকড়ির চুলা ব্যবহার করতে দেন না। তার স্বামী রিকশা চালান এবং অনেক সময় দৈনিক আয়ের বড় অংশ খাবার কিনতেই চলে যায়। শিল্পীর ভাষায়, রান্না না হইলে বাইরে খাইতে হয়। তখন দুই আড়াইশ টাকা চইলা যায়।
মিরপুর-১২ এর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান শিহাব জানান, দেড় মাস ধরে চুলায় গ্যাস নেই। রান্না করতে না পারলেও মাসিক বিল দিতে হচ্ছে এবং বাইরে থেকে খাবার কিনতে হচ্ছে। এতে তার খরচ বেড়েছে এবং গ্যাস্ট্রিকের সমস্যাও বেড়েছে। কাজীপাড়ার আরেক শিক্ষার্থী সাব্বির হাসান জানান, সিলিন্ডার ব্যবহারে তাদের চারজনের বাসায় জনপ্রতি প্রায় ৭০০-৮০০ টাকা অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে।
দেশে প্রায় নয় বছর ধরে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমছে। ঘাটতি পূরণে ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। গত ১৫ আগস্ট সামিটের টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় এবং এক্সিলারেটের টার্মিনাল আংশিক চালু হলে সরবরাহ বাড়লেও নতুন এলএনজি কার্গোর সংকটে গত বুধবার এক্সিলারেটের সরবরাহ আবার বন্ধ হয়ে যায়। পরে নতুন কার্গো আসায় সরবরাহ শুরু হলেও সংকট পুরোপুরি কাটতে সময় লাগবে।
বিদ্যুৎ বিভাগের মতে, জ্বালানি ঘাটতি, বিদ্যুৎকেন্দ্রের যান্ত্রিক ত্রুটি ও রক্ষণাবেক্ষণ, সঞ্চালন ও গ্রিডের সীমাবদ্ধতা এবং দ্রুত বাড়তে থাকা বিদ্যুতের চাহিদার সম্মিলিত প্রভাবেই বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি এবং বিভিন্ন কেন্দ্রে কারিগরি ও রক্ষণাবেক্ষণজনিত কারণে উৎপাদন কমছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঢাকার দুই বিতরণ সংস্থা ডিপিডিসি ও ডেসকোর এলাকায় লোডশেডিং সমন্বয় করে সাশ্রয় হওয়া বিদ্যুৎ গ্রামাঞ্চলসহ অন্যান্য এলাকায় পুনর্বণ্টনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের দাবি, এতে ঢাকার বাইরে শিল্প-কারখানাসহ গুরুত্বপূর্ণ গ্রাহকদের সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হচ্ছে এবং গ্রামাঞ্চলেও দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংয়ের চাপ কমানো সম্ভব হচ্ছে। জাতীয় গ্রিডে ] মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) বিকাল ৩টার দিকে ১৬ হাজার ১৭৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন ছিল ১৩ হাজার ৯১৭ মেগাওয়াট; লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ২৫৯ মেগাওয়াট।
জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা এবং গ্রিডের সীমাবদ্ধতা দূর হলে পরিস্থিতি আরও স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
পাইপলাইনে গ্যাসের ঘাটতির কারণে ভোক্তাপর্যায়ে সিলিন্ডার গ্যাসের ব্যবহার বেড়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০২৬ সালে এলপিজি আমদানি ২৫ শতাংশের বেশি বাড়লেও বাজারে সংকট কাটেনি। ভারত মহাসাগরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে আমদানি করা এলপিজির চালান বিলম্বিত হওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, ‘এলপিজি ব্যবসার উদ্যোক্তারা চরম বিপাকে পড়েছেন।’ তার মতে, ফ্র্যাঞ্চাইজিরা বড় আমদানিকারকদের কাছ থেকে এলপিজি নিয়ে বোতলজাত করে বাজারজাত করেন। আগে ওমান, দুবাই ও কাতার থেকে এলপিজি এলেও বর্তমানে সরবরাহ ব্যবস্থা এলোমেলো হয়ে গেছে।
সান গ্যাস লিমিটেডের এরিয়া হেড একরামুল হক জুয়েল বলেন, ‘বৈরী আবহাওয়ার কারণে জাহাজ আসতে না পারায় সরবরাহ দেওয়া যাচ্ছে না।’ তার দাবি, মূল আমদানিকারক বা বোটলাররা দাম না বাড়ালেও সরবরাহ কম থাকার সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ডিলার-ডিস্ট্রিবিউটর অতিরিক্ত দাম নিচ্ছেন। তিনি জানান, সরকার নির্ধারিত ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৯৮ টাকা হলেও কিছু ডিলার তা ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৭৫০ টাকায় বিক্রি করছেন।
বিইআরসি গত ২ আগস্ট ১২ কেজি এলপিজির দাম ১ হাজার ৫৯৮ টাকা নির্ধারণ করে, যা আগের মাসের তুলনায় ৭০ টাকা বেশি। অন্যদিকে সরকারি এলপিজিএলের সাড়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৮২৫ টাকা অপরিবর্তিত রয়েছে। এলপিজির মূল্য নির্ধারণে সৌদি আরামকোর প্রোপেন ও বিউটেনের চুক্তিমূল্য বা সৌদি সিপি বিবেচনা করা হয়।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত ৮ লাখ ৩৫ হাজার ২৫৬ টন এলপিজি উপাদান আমদানি হলেও ২০২৬ সালের একই সময়ে আমদানি হয়েছে ১১ লাখ ৪১ হাজার ৭৮৪ টন। অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে ৩ লাখ ৬ হাজার ৫২৮ টন।
বিএম এনার্জির নির্বাহী পরিচালক ক্যাপ্টেন মাইনুল আহসান খান বলেন, ‘এখনো সংকট নেই’, তবে ভারত মহাসাগরের সাইক্লোন পরিস্থিতির কারণে তাদের একটি জাহাজ নির্ধারিত ২০ আগস্টের পরিবর্তে ২৫ আগস্ট (গতকাল মঙ্গলবার) আসবে। তার মতে, আপাতত সরবরাহে ঘাটতি নেই। অন্যদিকে যমুনা স্পেসটেক জয়েন্ট ভেঞ্চারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন জানান, বাজারে কিছুটা সমস্যা রয়েছে এবং একটি জাহাজ এলে পরিস্থিতির কিছুটা লাঘব হতে পারে।
শিল্প উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সাময়িকভাবে গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহ বাড়িয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলা, জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি।
উদ্যোক্তারা গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়ে একটি বাস্তবসম্মত ও নির্ভরযোগ্য রোডম্যাপ চান—কোথায় কতদিন সংকট থাকবে, কোন শিল্পাঞ্চলে কতটুকু সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকারের পরিকল্পনা কী, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
সাময়িক আর্থিক সংকটে থাকা সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখতে ব্যাংক ঋণ পুনর্বিন্যাস, কার্যকর মূলধন সহায়তা ও ব্যবসাবান্ধব নীতির প্রয়োজন রয়েছে। কারণ কারখানা একবার স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেলে দক্ষ শ্রমিক, সরবরাহকারী ও ক্রেতার নেটওয়ার্ক হারিয়ে যায় এবং পুনরায় চালু করা কঠিন হয়ে পড়ে।
দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকটকে আর শুধু গ্যাস-বিদ্যুতের সাময়িক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎ ঘাটতি, এলপিজির সরবরাহ জটিলতা, উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, ব্যাংক ঋণের চাপ, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থানের সংকট। গত দুই বছরে রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কাঁচামালের ব্যয় বৃদ্ধি, ঋণের উচ্চ সুদ, ডলার সংকট ও আমদানি জটিলতার ওপর নতুন করে যোগ হয়েছে জ্বালানি সংকট।
ফলে একজন উদ্যোক্তার কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত এখন আর কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান, ব্যাংকের ঋণ, নতুন বিনিয়োগ, স্থানীয় অর্থনীতি এবং দেশের ভবিষ্যৎ উৎপাদন সক্ষমতা।
বিশেষজ্ঞ ও শিল্প উদ্যোক্তাদের মতামত অনুযায়ী, নির্ভরযোগ্য গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের রোডম্যাপ, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ, শিল্পে অগ্রাধিকারভিত্তিক জ্বালানি সরবরাহ, সম্ভাবনাময় শিল্পে ঋণ পুনর্বিন্যাস ও কার্যকর মূলধন সহায়তা এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতি দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি। কারণ কারখানা বন্ধ হওয়ার পর পুনরায় চালুর চেয়ে বন্ধ হওয়ার আগেই তাকে টিকিয়ে রাখা অনেক বেশি কার্যকর।