চলতি বছরের মাঝামাঝিতে এসে বাংলাদেশের অর্থনীতি এক বহুমাত্রিক ও জটিল সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে। খাদ্যপণ্য, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও পরিষেবা—সব খাতেই খরচ বৃদ্ধির ধাক্কায় নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এখন প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী মূল্যস্ফীতির হার কমার কিছুটা ইঙ্গিত মিললেও বাস্তবে বাজারে গিয়ে সেই স্বস্তির দেখা পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। বরং আয়ের সাথে ব্যয়ের সামঞ্জস্য রাখতে না পেরে মধ্যবিত্তের দীর্ঘদিনের চেনা জীবনযাত্রার ছক ও সঞ্চয় আজ মারাত্মক হুমকির মুখে।
পরিসংখ্যানে স্বস্তি, বাজারে অস্বস্তি: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিএসবি) তথ্য ও অন্য হিসাব অনুযায়ী মূল্যস্ফীতির গ্রাফ ওঠানামা করলেও পণ্যের দাম আগের জায়গায় ফিরে যায়নি। গত ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের সময় রমজান, ঈদ ও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.১৩ শতাংশ। জুনে সেটি বেড়ে ৯.১৬ থেকে ৯.২১ শতাংশের ঘরে পৌঁছায় এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৮.৭ শতাংশে (যা ডিসেম্বরে ছিল ৭.৭১ শতাংশ)।
জুলাইয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৮.৩২ শতাংশে এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭.১৬ শতাংশে নেমেছে। তবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এখনো ৯.২৮ শতাংশের চড়া ঘরে।
মূল্যস্ফীতির গতি কমলেও জুলাই মাসেই আগের মাসের তুলনায় সামগ্রিক মূল্যস্তর উল্টো ১.৪৪ শতাংশ বেড়েছে।
জুনে মানুষের আয় বৃদ্ধির হার ছিল ৮.২ শতাংশ, যা সার্বিক মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম হওয়ায় প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ক্রমাগত কমছে।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যানুযায়ী, গত ছয় মাসে চালের দাম স্থিতিশীল থাকলেও ভোজ্যতেল, আটা, ডাল, লবণ, আলু, রসুন, ডিম, গুঁড়া দুধ ও মৌসুমী সবজির দাম বেশ চড়া।
অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে ডলারের ক্রমাগত দরবৃদ্ধি ও টাকার অবমূল্যায়ন। কয়েক বছর আগে প্রতি ডলারের দর ৮৬ টাকার আশপাশে থাকলেও আগস্টের শুরুতে তা বেড়ে প্রায় ১২৩ টাকা ৮০ পয়সায় ঠেকেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত। ফলে আমদানিনির্ভর খাদ্যপণ্য, জ্বালানি ও শিল্পের কাঁচামাল আনার খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে, যার চূড়ান্ত খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাকে।
এদিকে, গত ২১ জুলাই থেকে দেশজুড়ে গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে, যা দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের ৩০ থেকে ৩৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণকারী এলএনজি খাতের ওপর বড় ধাক্কা।
কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এক্সিলারেট ও সামিট) মোট সক্ষমতা ১১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ২১ জুলাই আগুন লাগার পর এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল ৬ আগস্ট পর্যন্ত বন্ধ ছিল। এরপর জাহাজ না পাওয়ায় সামিটও এক দিন বন্ধ থাকে। সবশেষ গত বুধবার দুপুর পৌনে তিনটার দিকে এক্সিলারেট এনার্জি ফের বন্ধ হয়ে যায়। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বিকালেও দুটি টার্মিনাল থেকে ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আসছিল, যা বুধবার (১৯ আগস্ট) এক্সিলারেট বন্ধ হওয়ায় শুধু সামিটের মাধ্যমে ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে।
ওমান ও কাতারের সঙ্গে জিটুজি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকলেও হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা এবং সরবরাহকারী দেশে হামলার কারণে আমদানি স্থবির। আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে চড়া দামে কিনলেও শিডিউল অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত এলএনজি পৌঁছাচ্ছে না।
পেট্রোবাংলা ও আরপিজিসিএল-এর শীর্ষ কর্মকর্তাদের ফোনে পাওয়া না গেলেও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা জানান, ২৩ আগস্ট সিঙ্গাপুর থেকে একটি জাহাজ রওনা দেওয়ার কথা থাকলেও সেটি কবে পৌঁছাবে তার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। দ্রুত এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করতে কাজ করছে সরকার।
দেশের সবচেয়ে বড় উৎস বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক উৎপাদন ১,৩৫১ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে প্রায় ৭৪০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে।
সরকারি গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের (জিটিসিএল) তথ্যমতে, সোমবার মোট সরবরাহ ছিল ২২৬২ মিলিয়ন ঘনফুট, মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) তা ২০৭৫ এবং বুধবার (১৯ আগস্ট) দুপুরের পর তা আরও কমে ১৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নামার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গ্যাসের চাপ শূন্যের কোঠায় নেমে আসায় নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, সাভার ও চট্টগ্রাম শিল্পাঞ্চলে রড, স্টিল, ডাইং, সিমেন্ট, জাহাজভাঙা এবং তৈরি পোশাক কারখানায় উৎপাদন মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে।
বিএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেন গুপ্ত বলেন, ক্রেতার কাছে নির্ধারিত পণ্য পৌঁছাতে চার গুণ বেশি দাম দিয়ে লাইট ডিজেল এনে উৎপাদন চালু রেখেছিলাম। এত চড়া দামি জ্বালানি পুড়িয়ে রড উৎপাদন করলে দাম অনেক বেড়ে যাবে। পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেব তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।
এদিকে, রাজধানীর আবাসিক এলাকায় দিনের বেলায় চুলা জ্বলছে না। গৃহিণীদের গভীর রাতে রান্না করতে হচ্ছে অথবা বাড়তি খরচে ইলেকট্রিক চুলা ও সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হচ্ছে। এই সংকটের সবচেয়ে নীরব শিকার শহুরে মধ্যবিত্ত। টিসিবির লাইনে দাঁড়াতে না পারা এই শ্রেণি বিদ্যুৎ-গ্যাসের বাড়তি বিল ও বাজারের চাপ সামলাতে গিয়ে জমানো সঞ্চয় হারাচ্ছে। এমনকি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক খরচ কাটছাঁট করতে বাধ্য হওয়ায় বহু পরিবার স্থায়ীভাবে সামাজিক মর্যাদার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বর্তমান সরকারের গৃহীত নীতিগুলোকে ‘পারস্পারিক সাংঘর্ষিক’ বলছেন। একদিকে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি, অন্যদিকে ঋণের সুদহার কমানো, কারখানা চালুর জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন এবং সম্প্রসারণমূলক বাজেট ঘোষণা—এসব পদক্ষেপ বাজারে অর্থের সরবরাহ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির বলছেন, শুধু বাজার তদারকি করেই দাম কমানো সম্ভব নয়। জ্বালানি-বিদ্যুতের মূল্য, ঋণের সুদ, পরিবহন ও অবকাঠামোগত ব্যয় এর সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশে লজিস্টিক ব্যয় জিডিপির প্রায় ১৬ শতাংশ, যেখানে আন্তর্জাতিক গড় প্রায় ১০ শতাংশ।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত অর্থনৈতিক ক্ষত এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসের বর্তমান সংকট কাটিয়ে উঠতে কমপক্ষে দুই বছর সময় লাগবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবল সুদের হার নিয়ন্ত্রণ বা পূর্বসূরিদের ঘাড়ে দোষ চাপানোর কৌশল যথেষ্ট নয়। মাস শেষে একই আয় দিয়ে খাবার, বাসাভাড়া, যাতায়াত ও চিকিৎসার খরচ মেটানো যাচ্ছে কি না, সেটিই আসল। তাই মানুষের মাঝে স্বস্তি ফেরাতে মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা এবং শিল্প উৎপাদন সচল রাখতে অবিলম্বে সমন্বিত সরবরাহমুখী নীতিমালা গ্রহণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকটের গভীরতা বাহ্যিক কারণ নয়, বরং সরকারের নীতিগত সমন্বয়হীনতার ফলেও প্রকট হচ্ছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি), বিআইডিএস এবং পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) মতো শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের নীতিগুলো পরস্পর সাংঘর্ষিক। একদিকে বাজার থেকে টাকা তুলতে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি প্রয়োগ করা হচ্ছে, অন্যদিকে ঋণের সুদের হার কমানো, বন্ধ কারখানা চালুর জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল গঠন এবং সম্প্রসারণমূলক বাজেট ঘোষণা করা হচ্ছে। এই মিশ্র পদক্ষেপ বাজারে অর্থের সরবরাহ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিচ্ছে।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকনোমিক মডেলিং (সানেম)-এর অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারি পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতির গতি কিছুটা কমার কথা বলা হলেও পণ্যের দাম কিন্তু আগের জায়গায় ফিরেনি। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি (৯.২৮শতাংশ) উঁচুতে থাকায় বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, যাতায়াত ও চিকিৎসা খরচ সামলাতে মানুষ হিমশিম খাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, ‘উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ক্ষত’ কিংবা বিশ্ববাজারের দোহাই দিয়ে সুদের হার নিয়ন্ত্রণের কৌশলেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এলএনজি আমদানির শিডিউল বিপর্যয় এবং লজিস্টিক খাতের ১৬ শতাংশ ব্যয় কমানোর জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সংকট কাটাতে কেবল মুদ্রানীতি যথেষ্ট নয়; বরং শিল্পকারখানায় গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করে উৎপাদন সচল রাখা, বাজারের সিন্ডিকেট ভাঙা এবং মধ্যবিত্তের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে একটি সমন্বিত ও সুনির্দিষ্ট সরবরাহমুখী নীতি গ্রহণ করাই এখন একমাত্র পথ।