দেশে হঠাৎই বাড়ছে হামের সংক্রমণ। ফলে জনমনে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ ও আতঙ্ক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা না দেওয়ার কারণে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। টিকা না দেওয়ার পেছনে রয়েছে টিকার স্বল্পতা, বিশেষ ক্যাম্পেইন না হওয়া ও টিকাকেন্দ্রে গিয়ে টিকা নিতে অনীহা। এদিকে, হামে আক্রান্ত হয়ে ৪৭ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে। একই সঙ্গে হামের প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত দেশের সব স্কুল বন্ধ রাখার নির্দেশনাও চাওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী লুৎেফে জাহান পূর্ণিমা এ রিট করেন। রিটে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিবাদী করা হয়েছে।
রিট আবেদনে হামে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত করে আদালতের কাছে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। যে প্রতিবেদনে মৃত্যুর সংখ্যা, সংক্রমণের পরিমাণ, টিকাদানের হার, টিকার প্রাপ্যতা, গৃহীত পদক্ষেপসমূহ উল্লেখ থাকবে। পাশাপাশি টিকাদান কাভারেজ নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা, টিকার ঘাটতি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় বিলম্বের কারণ নির্ধারণের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ, স্বাধীন ও সময়সীমাবদ্ধ তদন্ত পরিচালনা করার নির্দেশনা চাওয়া হয়।
এছাড়াও টিকাদানে কেন সময়মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি তার ব্যাখ্যা এবং সেই তদন্তের ফলাফল আদালতের সামনে উপস্থাপন করতে বলা হয়েছে।
রিট আবেদনে আরও বলা হয়, সময়মতো টিকাদান নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা, টিকার প্রাপ্যতা নিশ্চিত না করা, স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা ও জরুরি সাড়া প্রদানে ঘাটতি—এসবই সংবিধানের ২৭, ৩১ এবং ৩২ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। বিবাদীরা যেন শিগগিরই দেশব্যাপী একটি জরুরি হাম টিকাদান কর্মসূচি গ্রহণ করে এবং টিকা, সিরিঞ্জ ও প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সরবরাহ পর্যাপ্ত ও নিরবচ্ছিন্নভাবে নিশ্চিত করে সে বিষেয়েও আদেশ চাওয়া হয়।
রিটে চলমান প্রাদুর্ভাব থাকা সত্ত্বেও স্কুলে সংস্পর্শ নিয়ন্ত্রণসহ তাৎক্ষণিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থতা জননিরাপত্তার প্রতি বেপরোয়া অবহেলা এবং জীবনের জন্য আসন্ন ঝুঁকি সৃষ্টি করে উল্লেখ করে আদালতের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে।
হাম কী, কীভাবে ছড়ায়: মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আবু সাঈদ শিমুল বলেন, হাম মারাত্মক ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত একটি রোগ, যা মূলত ‘মিজেলস’ ভাইরাসের মাধ্যমে ছড়ায়। রোগটি বায়ুবাহিত, যা শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে ছড়ায়। সংক্রমিত কারো সর্দি, হাঁচি, কাশি, কথা বলা বা শ্বাস নেওয়ার সময় হামের জীবাণু বা ভাইরাসযুক্ত কণা বাতাসে ছড়ায় এবং অন্যদের সংক্রমিত করে।
সাধারণত মিজেলস ভাইরাস শরীরে ঢোকার ১০ থেকে ১৪ দিন পর লক্ষণ প্রকাশ পায়। র্যাশ বের হওয়ার ৪ দিন আগে থেকে পরবর্তী ৪ থেকে ৫ দিন পর পর্যন্ত ভাইরাস ছড়াতে পারে। এ ছাড়া আক্রান্তের হাঁচি, কাশি, শ্বাস নেওয়া ও কথা বলার মাধ্যমে ছড়ানো জীবাণু বাতাসে ২ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
কোন বয়সীরা আক্রান্ত হয়: যেকোনো বয়সেই হাম হতে পারে। তবে ৫ বছর বয়সের নিচে শিশু এবং ২০ বছরের বেশি যাদের বয়স তাদের বেশি হয়।
লক্ষণ: মিজেলস ভাইরাস সংক্রমণে জ্বর হয়। জ্বর ১০০ থেকে ১০৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত হতে পারে। এর সঙ্গে খুব ছোট ছোট র্যাশ দেখা দেয় মুখে, কানের পেছন থেকে, গলা ও বুকের দিকে। নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গও দেখা দেয় এবং কাশি হয়।
হাম হলে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ফলে অন্যান্য জটিলতা তৈরি হয়। এই রোগ হলে শিশু নিউমোনিয়া, ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়, কানে সংক্রমণ, অপুষ্টি দেখা দেয়। অর্থাৎ হামের পাশাপাশি এসব রোগের লক্ষণও প্রকাশ পায়, যা শিশুর জন্য জটিল পরিস্থিতির কারণ হয়ে হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এসময় হামের রোগী বাড়ছে কেন: ডা. আবু সাঈদ শিমুল বলেন, টিকা না দেওয়ার কারণে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। টিকা না দেওয়ার পেছনে রয়েছে টিকার স্বল্পতা, বিশেষ ক্যাম্পেইন না হওয়া ও টিকাকেন্দ্রে গিয়ে টিকা নিতে অনীহা।
দেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় ৫ বছর বয়সি শিশুদের দুই বার এমএমআর, এমআর (হাম-রুবেলা) টিকা দেওয়া হয়। শিশুর ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ এবং দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয় ১৫ মাস বয়সে।
শিশুর ৯ মাস বয়সে টিকা দেওয়ার কথা অনেক অভিভাবকই ভুলে যান। শিশুর জ্বর, সর্দি-কাশি বা অসুস্থতা থাকলে টিকা দেওয়া যায় না। সে কারণেও অনেক সময় দেরি হয়। আবার অনেকে ৯ মাস বয়সের টিকা শিশুকে দিলেও ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার কথা ভুলে যান। যে কারণে শিশু হামে আক্রান্ত হয়। এ ছাড়া গত একবছরে দেশের কিছু কিছু জায়গায় টিকার অপ্রতুলতা থাকার কারণেও অনেক শিশু টিকাবঞ্চিত হয়েছে।
করণীয়: হাম আক্রান্ত হলে আতঙ্কিত না হয়ে ঘরে অবস্থান করতে হবে। হাম যেহেতু ভাইরাসজনিত রোগ, তা নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়। পর্যাপ্ত তরল ও পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে, শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো নিশ্চিত করতে হবে, জ্বর থাকলে প্যারাসিটামল ও সর্দির জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ দিতে হবে। শিশুকে অন্যদের কাছ থেকে আলাদা রাখতে হবে। লোক সমাগম এড়িয়ে চলতে হবে। হাম হলে শিশুকে স্কুলে পাঠানো যাবে না। যদি শিশুর শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়, বারবার বমি হয়, শিশু যদি নেতিয়ে পড়ে, জ্বরের সঙ্গে খিঁচুনি থাকে—তাহলে দেরি না করে যত দ্রুত সম্ভব শিশুকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।