২০২৪ সালের ৫ আগস্ট লুট হওয়া পুলিশের অস্ত্র এখন অপরাধীদের হাতে। তদন্তে উদ্ধার হওয়া কয়েকটি অস্ত্রের ব্যবহার মিলেছে হত্যা, ছিনতাই ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে। অথচ ঘটনার দুই বছর পরও ১ হাজার ৩০৯টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ২ লাখ ৫৭ হাজার ১১৩টি গোলাবারুদের কোনো হদিস নেই। এসব অস্ত্র কোথায়, কার হাতে এবং কতগুলো অপরাধে ব্যবহৃত হয়েছে—তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো পুলিশের কাছে নেই। ফলে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টি এখন সরাসরি জননিরাপত্তার ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৬ আগস্ট পর্যন্ত লুট হওয়া ৪ হাজার ৪৫৪টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু এখনো উদ্ধার হয়নি ১ হাজার ৩০৯টি অস্ত্র। একই সময়ে উদ্ধার হয়েছে ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৮৯৫টি গোলাবারুদ। তবে ২ লাখ ৫৭ হাজার ১১৩টি গোলাবারুদের এখনো কোনো হদিস নেই।
অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক অস্ত্র ও গোলাবারুদ এখনো পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এগুলোর কতগুলো অপরাধীদের হাতে রয়েছে, কতগুলো কোথাও লুকিয়ে রাখা হয়েছে কিংবা কতগুলো সীমান্ত পেরিয়ে গেছে—এর পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনো পুলিশের কাছে নেই।
ধীরগতিতে উদ্ধার, বাড়ছে উদ্বেগ: লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত থাকার কথা জানিয়েছে পুলিশ। অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেছেন, ধীরগতিতে হলেও মাঝেমধ্যে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে।
তবে দুই বছর পরও ১ হাজার ৩০৯টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে উদ্ধার হওয়া কয়েকটি অস্ত্র অপরাধে ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়ার পর বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে।
এ অবস্থায় গত শনিবার লুট হওয়া ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে নতুন করে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠন করা হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ইউনিটটি ইতোমধ্যে মাঠে কাজ শুরু করেছে।
অস্ত্রের সন্ধান দিতে উৎসাহিত করতে তথ্যদাতাদের জন্য আর্থিক পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছে। ভারী অস্ত্রের তথ্য দিলে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা, পিস্তল, রিভলবার ও শটগানের তথ্য দিলে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা এবং অন্যান্য লুট হওয়া অস্ত্র, টিয়ার গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেডের তথ্য দিলে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পুরস্কার দেওয়া হবে। তথ্যদাতার পরিচয় গোপন রাখার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের অস্ত্র, অপরাধীর হাতে: লুট হওয়া অস্ত্রের কিছু যে শেষ পর্যন্ত অপরাধীদের হাতে পৌঁছেছে, তার প্রমাণ মিলেছে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায়।
এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ‘গলাকাটা মোবারক’। গত ২৬ আগস্ট তাকে গ্রেপ্তারের অভিযান চলার সময় পুলিশের দিকে যে পিস্তল দিয়ে গুলি ছোড়া হয়েছিল, সেটি পরীক্ষা করে পুলিশ নিশ্চিত হয়—অস্ত্রটি পুলিশেরই। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হয়েছিল ৯ মিমি পিস্তলটি।
গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মোবারক পুলিশকে জানান, অন্য এক সন্ত্রাসীর মাধ্যমে তিনি অস্ত্রটি পেয়েছিলেন। অর্থাৎ থানা থেকে লুট হওয়ার পর অস্ত্রটি একপর্যায়ে চলে যায় অপরাধীদের নেটওয়ার্কে।
এ ঘটনা শুধু একটি অস্ত্রের নয়; লুট হওয়া অস্ত্রের অপব্যবহারের সম্ভাব্য চিত্রও সামনে এনেছে।
২০২৪ সালের নভেম্বরে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের সার্ভিস লেনে এক নারীর গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধারের ঘটনায় ব্যবহৃত পিস্তলের সন্ধান করতে গিয়ে পুলিশ জানতে পারে, সেটিও ঢাকার ওয়ারী থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র।
অর্থাৎ পুলিশের অস্ত্রাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্র শুধু হারিয়ে যায়নি; এর কিছু পরবর্তী সময়ে অপরাধের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে।
নিখোঁজ অস্ত্রের বড় অংশ পিস্তল-শটগান: পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে ছিল ১ হাজার ১১৪টি চায়না রাইফেল, ২৫৩টি চায়না এসএমজি, ৩৪টি এলএমজি, ৫৩৯টি ৭.৬২ মিমি পিস্তল, ১ হাজার ৯২টি ৯ মিমি পিস্তল এবং ২ হাজার ৭৯টি ১২-বোর শটগান। এর মধ্যে এখনো উদ্ধার হয়নি ১০৯টি চায়না রাইফেল, ৩০টি চায়না এসএমজি, তিনটি এলএমজি, ২০৩টি ৭.৬২ মিমি পিস্তল, ৪৪২টি ৯ মিমি পিস্তল এবং ৩৮৪টি ১২-বোর শটগান। এ ছাড়া রয়েছে ১২৮টি গ্যাস গান, সাতটি ৩৮ মিমি টিয়ার-গ্যাস লঞ্চার ও দুটি সিগন্যাল পিস্তল।
নিখোঁজ অস্ত্রের তালিকায় সবচেয়ে বেশি রয়েছে ৯ মিমি পিস্তল ও ১২-বোর শটগান। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য ব্যবহৃত এসব অস্ত্রের একটি অংশ যদি অপরাধীদের হাতে থেকে থাকে, তাহলে তা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
চট্টগ্রামে এখনো নিখোঁজ ১৪৭ অস্ত্র: চট্টগ্রামের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। মহানগরের আট থানাসহ ২৯টি পুলিশ স্থাপনা থেকে লুট হয়েছিল ৯৪৪টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৮৬ হাজার ৪৭৮ রাউন্ড গোলাবারুদ। এর মধ্যে ৭৯৭টি অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এখনো সন্ধান মেলেনি ১৪৭টির।
সাম্প্রতিক উদ্ধার অভিযানের ঘটনাগুলোও দেখাচ্ছে, লুট হওয়া অস্ত্র দীর্ঘ সময় ধরে কোথাও লুকিয়ে থাকতে পারে।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানা থেকে লুট হওয়া দুটি ৯ মিমি পিস্তল উদ্ধার করা হয়। গত আগস্টে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে মাছ ধরার সময় এক জেলের জালে উঠে আসে একটি শটগান। পরে রেজিস্টার যাচাই করে পুলিশ নিশ্চিত হয়, অস্ত্রটি আড়াইহাজার থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের একটি।
অর্থাৎ লুটের দুই বছর পরও এমন অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে, যেগুলো এতদিন কোথায় ছিল সে প্রশ্নও সামনে আসছে।
ফেরত দেওয়ার সময় পেরিয়েছে বহু আগে: লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ ফেরত দেওয়ার জন্য ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব অস্ত্র ফেরত না আসায় পরদিন ৪ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয় যৌথ অভিযান।
মাত্র নয় দিনের অভিযানে ১৪৪টি অস্ত্র উদ্ধার এবং ৬৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। কিন্তু এরপরও বিপুলসংখ্যক অস্ত্র রয়ে গেছে নিখোঁজ।
পুলিশ কর্মকর্তাদের ধারণা, লুট হওয়া কিছু অস্ত্র অপরাধীদের হাতে চলে গেছে। আবার কিছু অস্ত্র আতঙ্কিত বা উত্তেজিত মানুষ নিয়ে যাওয়ার পর কোথাও ফেলে দিতে পারে কিংবা পরে জমা দিয়ে থাকতে পারে। কিছু অস্ত্র সীমান্ত পেরিয়ে অন্য দেশেও চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু কোনটি কোন পথে গেছে, তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র নেই পুলিশের কাছে।
অস্ত্র বিক্রিতেও পুলিশের সদস্য: লুট হওয়া অস্ত্রের অপব্যবহারের পাশাপাশি এগুলো কেনাবেচার অভিযোগও উঠেছে। পুলিশ তদন্তে লুট হওয়া অস্ত্র বিক্রির সঙ্গে কনস্টেবল মো. রিয়াদের জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে তাকে আরও পাঁচজনের সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে রিয়াদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এ ধরনের ঘটনা শুধু অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টিকে নয়, পুলিশের অস্ত্র ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
কোথায় কত অস্ত্র, পূর্ণ হিসাবই নেই: সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, লুট হওয়া অস্ত্রের স্থাপনাভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো প্রকাশিত হয়নি। কোন স্থাপনা থেকে কোন ধরনের কত অস্ত্র লুট হয়েছিল, উদ্ধার হওয়া অস্ত্রগুলোর কোনটি পুলিশের কোন ইউনিট বা সদস্যের নামে বরাদ্দ ছিল—এসব তথ্যও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। ফলে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের সংখ্যা জানা গেলেও নিখোঁজ অস্ত্রের গতিপথ অনুসন্ধান করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যেসব অস্ত্র জমা দেওয়া হয়নি, সেগুলো অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
সীমান্ত পেরিয়ে অন্য দেশে চলে যাওয়া অস্ত্রের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ অন্য দেশের ভূখণ্ডে গিয়ে অভিযান চালাতে পারে না। তবে দেশের ভেতরে যেসব অস্ত্র পাওয়া যাবে, সেগুলো উদ্ধার করা হবে।’
ঝুঁকি শুধু অস্ত্র হারানোর নয়: পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন জানিয়েছেন, অবশিষ্ট অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে অভিযান চলছে। লুট হওয়া অস্ত্র ব্যবহার করে যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি না ঘটে, সে বিষয়েও পুলিশ সতর্ক রয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—দুই বছর পরও ১ হাজার ৩০৯টি আগ্নেয়াস্ত্র কোথায়?
কিছু অস্ত্র যে অপরাধীদের হাতে পৌঁছেছে, তার প্রমাণ ইতোমধ্যে মিলেছে। আবার কোথাও জেলের জালে উঠছে লুট হওয়া শটগান, কোথাও উদ্ধার হচ্ছে থানার অস্ত্রাগার থেকে হারিয়ে যাওয়া পিস্তল। এসব ঘটনা বলছে, লুটের সেই অধ্যায় এখনো শেষ হয়নি।
অস্ত্রগুলো যতদিন উদ্ধার না হচ্ছে, ততদিন সেগুলো সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবেই থেকে যাচ্ছে। বিশেষ করে অপরাধে ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়ার পর নিখোঁজ অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টি আর শুধু পুলিশের হারানো সম্পদ উদ্ধারের প্রশ্ন নয়; এটি এখন জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি জাতীয় উদ্বেগ।