রাজনীতি ও শাসনের মূল ভিত্তি জনআকাঙ্ক্ষা। একটি নির্বাচিত সরকারের সূচনা মানেই কিছু নীতি-নির্ধারণী কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং তা কোটি মানুষের স্বপ্ন ও প্রত্যাশাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার অঙ্গীকার। পরিবর্তন ও উন্নয়নের যেসব বুনিয়াদী প্রতিশ্রুতি নিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার যাত্রা শুরু করেছিল, তার প্রথম ১৮০ দিন বা ছয় মাস অতিক্রান্ত হলো সোমবার (১৭ আগস্ট)। শাসনের এই প্রারম্ভিক সময়টি একটি ক্যালেন্ডারের হিসাব নয়; এটি মূলত সরকারের লক্ষ্য, গতি ও সদিচ্ছার এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
বিশ্ব অর্থনীতির টানাপোড়েন, অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ এবং জনপ্রত্যাশার গুরুভারকে সঙ্গী করে সরকারের এই পথচলা নির্বাচনী ইশতেহারে বন্দি না থেকে বাস্তবতার জমিনে ডালপালা মেলতে শুরু করেছে; সূচিত হয়েছে প্রগতির এক নতুন অধ্যায়ের।
এ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় সরকারের ছয় মাসের কর্মকাণ্ড ও বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন।
সোমবার (১৭ আগস্ট) তিনি সরকারের ছয় মাসের কর্মকাণ্ডকে ১০টি প্রধান দিকের আলোকে তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্যে জনসমর্থন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন, অর্থনৈতিক সংস্কার, আইনশৃঙ্খলা, অবকাঠামো, পরিবেশ ও পররাষ্ট্রনীতির বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
মাহ্দী আমিন বলেছেন, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার দায়িত্ব নেয়। ১৮০ দিন পূর্তির এই আয়োজন সরকারের জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রতিফলন।
সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে জনগণের প্রত্যক্ষ সমর্থনকে উল্লেখ করেছেন মাহ্দী আমিন। তার দাবি, দীর্ঘ সময় পর মানুষ নিজেদের পছন্দের দল ও প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। নির্বাচনের পর বিভিন্ন কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেখানেই গেছেন, সেখানেই মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা গেছে। তার ভাষায়, এই আস্থা ও ভালোবাসাকে ধারণ করেই সরকার কাজ করছে। নির্বাচনী ইশতেহারকে শুধু প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তা বাস্তবায়নে সরকার কাজ করছে।
সরকারের কার্যক্রমে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটেছে বলে দাবি করে মাহ্দী আমিন বলেন, বাগস্বাধীনতা, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের ক্ষেত্রে সরকার সর্বোচ্চ মান বজায় রাখার চেষ্টা করছে। সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা আলোচনা ও সমালোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরে তিনি উল্লেখ করেন সংসদের প্রথম অধিবেশনেই শতাধিক অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তরের কথাও। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে বিভিন্ন আইন সংস্কার এবং শিক্ষার্থীদের সংসদে উপস্থিত থাকার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।
ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার বলে উল্লেখ করেন মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতে প্রায় ১৩ লাখ কৃষক পরিবার উপকৃত হয়েছে। কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড ও প্রবাসী কার্ড চালুর উদ্যোগের কথাও বলেন তিনি। জেলা পর্যায়ে কর্মসংস্থান বিনিময়কেন্দ্র চালু, ধর্মীয় নেতাদের সম্মানী এবং খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন।
দায়িত্ব নেওয়ার সময় রাষ্ট্রব্যবস্থায় নানা সংকট ছিল বলে মন্তব্য করেন মাহ্দী আমিন। তার দাবি, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং বাজারে সিন্ডিকেট ঠেকাতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় শ্রমিক অসন্তোষ হয়নি বলেও উল্লেখ করেন তিনি। শ্রমিকদের বেতন, বকেয়া ও বোনাস পরিশোধে মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে সমন্বয়ের কথা বলেন। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লেও বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় তেলের দাম না বাড়ানোর বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। এ ছাড়া কোরবানির পশুতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, দ্রুত বর্জ্য অপসারণ এবং এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস না হওয়ার বিষয়গুলোও সরকারের সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেন।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট তৈরি হয়েছে বলে উল্লেখ করেন মাহ্দী আমিন। একটি এফএসআরইউতে কারিগরি ত্রুটির কথাও বলেন তিনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, জ্বালানি খাতের দীর্ঘদিনের সমস্যা কাটাতে সরকার কাজ করছে। চীন ও মালয়েশিয়ার বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোনাসের মাধ্যমে গ্যাস সংকট মোকাবিলায় অগ্রগতির কথাও জানান তিনি।
দেশের অভ্যন্তরে গ্যাসের বিকল্প উৎস তৈরি এবং জ্বালানি সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
অবসরপ্রাপ্ত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের পাওনা পরিশোধের উদ্যোগকে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন মাহ্দী আমিন। বলেন, অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের পাওনা বাবদ ২ হাজার কোটি টাকার চেক শিক্ষকদের দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যা বাড়ানো এবং ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় আর্থিক সহায়তার কথাও বলেন। শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন বিষয় যুক্ত করা, বিনা মূল্যে ওয়াই-ফাই, শিক্ষার্থীদের পোশাক ও ব্যাগ দেওয়া এবং মিড-ডে মিল চালুর উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
মেয়েদের স্নাতক পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা, তৃতীয় ভাষা শিক্ষা এবং বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের ব্যাংক গ্যারান্টির ব্যবস্থার কথাও বলেন মাহ্দী আমিন। এ ছাড়া খেলাধুলা, উদ্যোক্তা তৈরি, স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সার কার্ড, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বন্ধ কলকারখানা চালুর উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থনৈতিক কাঠামোয় সংস্কার শুরু হয়েছে বলে জানিয়ে মাহ্দী আমিন বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করতে কর কমানো, আমানতকারীদের সুরক্ষা, বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা সম্প্রসারণ এবং ব্যবসার লাইসেন্স নবায়ন সহজ করা হয়েছে।
দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে কাঁচামাল আমদানির ব্যয় কমানো এবং তৈরি পণ্যের আমদানি নিরুৎসাহিত করতে শুল্ক সমন্বয়ের কথাও বলেন তিনি। জুলাইয়ে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আসা, মূল্যস্ফীতি কমা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ার বিষয়টিও সরকারের অর্থনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলেও জানান মাহ্দী আমিন। আনোয়ারা ও মোংলায় অর্থনৈতিক অঞ্চল, ইপিজেড এবং বন্দরগুলো ২৪ ঘণ্টা চালুর উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলে দাবি করেন মাহ্দী আমিন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশ ও প্রশাসনকে রাজনৈতিক হয়রানিমুক্ত ও জনবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরকে সন্ত্রাসীদের দখল থেকে মুক্ত করার কথা উল্লেখ করেন তিনি। নারী ও শিশু নির্যাতনসহ গুরুতর অপরাধের ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার উদ্যোগের কথাও বলেন। তনু হত্যা ও শহীদ ওসমান হাদী হত্যার মতো পুরোনো মামলার তদন্তে অগ্রগতির কথাও জানান তিনি। এ ছাড়া শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের এক আসামিকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি উল্লেখ করেন। মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরাতে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন করা হয়েছে বলেও জানান মাহ্দী আমিন। এছাড়া জুয়া, মাদক, ধূমপান ও সাইবার অপরাধ দমনে আইন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ সতর্কতা লেভেল ৩ থেকে ২-এ নামার বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন।
ঢাকার যানজট কমাতে এআইভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থার পরীক্ষামূলক বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে বলে জানান মাহ্দী আমিন। নারীদের জন্য পিংক বাস চালু, ঢাকায় ২০০টি বৈদ্যুতিক বাস নামানো এবং পরিবহন খাতে বিদ্যুতায়নের উদ্যোগের কথাও বলেন তিনি। বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ট্রেনের ভাড়ায় ছাড় এবং নারীদের জন্য বিশেষ কামরার ব্যবস্থার কথাও তুলে ধরেন।
এছাড়া তিস্তা মহাপরিকল্পনা, পদ্মা ব্যারেজ এবং বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ে অগ্রগতির কথাও জানান তিনি। মেগা প্রকল্পের নামে অতিরিক্ত ব্যয় ও দুর্নীতির পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী প্রকল্পে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন মাহ্দী আমিন। সরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের উদ্যোগ, তিনটি এসডিজি ভিলেজ এবং বৃক্ষরোপণ ও খাল খনন কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন তিনি।
সরকারের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ বলে উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক হবে সমতা, ন্যায্যতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পর্যটন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর চীন ও মালয়েশিয়া সফরের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব সফরে বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টিও তিনি দেশের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো দেশের হস্তক্ষেপ মেনে নেওয়া হবে না।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের ধরনকে সরকারের আরেকটি স্বাতন্ত্র্য হিসেবে তুলে ধরে মাহ্দী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তথাকথিত ভিআইপি সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে যাচ্ছেন। তৃণমূলের কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। খাল খননে কোদাল হাতে নামছেন। শিশুদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন। ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের পর রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে জমে থাকা সমস্যা ছয় মাসে পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে সরকার প্রতিটি ক্ষেত্রে আন্তরিকতা, দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহি নিয়ে কাজ করছে।
মাহ্দী আমিন বলেন, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতার উৎস জনগণ। জনগণই সরকারের অনুপ্রেরণার উৎস। জনগণের সরকার হিসেবেই এই সরকার কাজ করছে।