বাবা জিয়াউর রহমান ছিলেন সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি। তার হাতে গড়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির হয়ে বেগম খালেদা জিয়া তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। এবার তাদের বড় ছেলে তারেক রহমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল জয় নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিলেন। এর মধ্য দিয়ে তারেক রহমান এবং তার পরিবারের ঝুলিতে যুক্ত হলো নতুন এক রেকর্ড। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শুভ সূচনা হলো নতুন অধ্যায়ের, গণতন্ত্রের। বাংলাদেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৪টার পর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি শপথ নেন। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাকে শপথ পাঠ করান। একই অনুষ্ঠানে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরাও শপথ নেন। চব্বিশের গণঅভ্যূত্থানের দেড় বছর পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন যাত্রা শুরু হলো বাংলাদেশের। এর মধ্য দিয়ে দুই দশক পর আবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিল বিএনপি। আর তিন দশক পর নতুন একজন রাজনীতিবিদকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পেল বাংলাদেশ।
রেওয়াজ ভেঙে বঙ্গভবনের বদলে এবারের শপথ অনুষ্ঠান হয় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়। মঙ্গলবার বিকাল ৪টায় জাতীয় সংগীত এবং তারপর কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে শপথ অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর প্রধানমন্ত্রী পদে তারেক রহমানের নাম ঘোষণা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি।
তারেক রহমান নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছ থেকে প্রথমে সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের এবং তারপর গোপনীয়তার শপথ নেন। সব শেষে তিনি শপথের নথিতে স্বাক্ষর করেন।
নতুন প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিক অভিনন্দন জানানোর পর মন্ত্রিপরিষদে জায়গা পাওয়া নেতাদের নাম ঘোষণা করা হয় এবং শপথ গ্রহণের জন্য আহ্বান জানানো হয়।
এরপর নতুন মন্ত্রীদের পর্যায়ক্রমে শপথ এবং গোপনীয়তার শপথ বাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
সবশেষে প্রতিমন্ত্রীদের নাম ঘোষণা করে তাদেরকে শপথগ্রহণের জন্য আহ্বান জানিয়ে মঞ্চে ডাকেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় খোলামেলা এই শপথ অনুষ্ঠানে ১ হাজার ২০০ অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে এসেছিলেন তার মেয়ে দীনা আফরোজকে সঙ্গে নিয়ে। উপদেষ্টাদের মধ্যে আসিফ নজরুল, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, চৌধুরী রফিকুল আববারকেও শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে দেখা গেছে।
মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী দাশো শেরিং তোবগে, ভারতীয় লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা, পাকিস্তানের পরিকল্পনামন্ত্রী আহসান ইকবাল, শ্রীলঙ্কার স্বাস্থ্য ও গণমাধ্যম বিষয়ক মন্ত্রী নালিন্দা জয়াসিতা, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দ শর্মাসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক, তিন বাহিনীর প্রধান, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকসহ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমান এবং তাদের মেয়ে জাইমা রহমান ও পরিবারের সদস্যরাওে উপস্থিত ছিলেন অনুষ্ঠানে।
বিশ্বে অল্প কয়েকটি রাজনৈতিক পরিবার আছে, যাদের পরিববারের তিন সদস্য কোনো দেশের রাষ্ট্র কিংবা সরকারপ্রধানের গুরুদায়িত্ব সামলেছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পদে তারেক রহমানের আসীন হওয়ার মধ্য দিয়ে এই পরিবারগুলোর তালিকায় নাম লেখাল জিয়া পরিবারও।
তারেক রহমানের বাবা জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮১ সালে তারেক যখন কিশোর, তখন এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন জিয়াউর রহমান। এর পর থেকে খালেদা জিয়া দলের নেতৃত্ব দেন এবং ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে সরকার গঠন করেন। বাংলাদেশের একাধিক সাধারণ নির্বাচনে একাধিক আসনে দাঁড়িয়ে কখনোই কোনোটিতে না হারার অনন্য রেকর্ড রয়েছে খালেদা জিয়ার দখলে। গত ৩০ ডিসেম্বর তিনি ইন্তেকাল করেন।
জিয়াউর রহমান: ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহী জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অধিষ্ঠিত হন বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত জিয়াউর রহমান। সেনাপ্রধান হন তিনি। এরপর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক করা হয় তাকে। বিএনপির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এ এস এম সায়েম পদত্যাগ করলে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান নিজে চেয়ারম্যান হিসেবে থেকে নতুন রাজনৈতিক দল বিএনপি গঠন করেন। ১৯৯১ সালের পর থেকে তার প্রতিষ্ঠিত দলটি এবার নিয়ে চারবার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হলো। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের হাতে জিয়াউর রহমান নিহত হন।
বেগম খালেদা জিয়া: স্বামীর মৃত্যুর পর ১৯৮১ সালে দলের হাল ধরেন পুরোদস্তুর গৃহবধূ খালেদা জিয়া। দুই সন্তানকে নিয়ে তখন ঢাকা সেনানিবাসে অবস্থান করছিলেন। সে সময় খালেদা জিয়া রাজনীতিতে যোগ দেন নেতাকর্মীদের আগ্রহে।
১৯৮২ সালের দলের প্রাথমিক সদস্য হওয়ার পর এক বছরের মাথায় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন খালেদা জিয়া। ১৯৮৪ সালের নির্বাচিত হন দলীয় চেয়ারপারসন। সেই থেকে চার দশকের বেশি সময় ধরে তিনি বিএনপিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। রাজনীতিতে এসে রাজপথের আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান খালেদা জিয়া। চষে বেড়ান দেশের নানা প্রান্ত। এর ফলও পান। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হলে খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। এরপর তিনি তিন দফা সরকারপ্রধানের দায়িত্ব সামলেছেন।
তারেক রহমান: নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে তিনি দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দলের নেতা, দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির বিপুল বিজয় সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম সেরা রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন। গত বছর ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে লাখো জনতার সংবর্ধনা সমাবেশে তারেক রহমান তার একটি পরিকল্পনা আছে বলে জানিয়েছিলেন। মার্কিন অধিকারকর্মী মার্টিন লুথার কিংয়ের ঐতিহাসিক উক্তির অনুকরণে বলেছিলেন, ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান।’ নির্বাচনী প্রচারের সময় সারাদেশে তিনি সেই পরিকল্পনার কথাই বলে বেড়িয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে জনমত গঠন করেছেন, পাশাপাশি দলের তৃণমূলকেও সংগঠিত করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের এই উত্থান গত তিন দশক ধরে দেশের রাজনীতিতে চলে আসা দ্বিমেরুকরণের দীর্ঘদিনের ব্যবস্থাকে ভেঙে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যে দীর্ঘ নির্বাসনে থাকা ৬০ বছর বয়সি তারেক রহমান ১৭ বছরের বেশি সময় পর দেশে ফেরেন। দেশে ফেরার পাঁচ দিনের মধ্যে তার মা বেগম খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর ১০ দিন পর দলের হাল ধরেন তারেক। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি দলকে সুসংগঠিত করতে বিরামহীন কাজ করেন। দেশের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, দুর্নীতি দমন এবং নির্বাচনী সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে চষে বেড়িয়েছেন দেশের বিভিন্ন জেলা। লাখো নেতাকর্মী আর সমর্থক তার প্রচারণায় অংশ নেন। টানা ৪০ দিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে দলকে তুলে দেন ক্ষমতার শীর্ষে। তারেক রহমান ১৯৬৭ সালের ২০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি এর আগে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক উত্থান-পতনের একজন সাক্ষী ও অংশগ্রহণকারী। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়, যখন তার পিতা জিয়াউর রহমান বীরউত্তম বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং দেশকে স্বাধীন করার জন্য যুদ্ধ শুরু করেন, তখন তাকে, তার মা ও ভাইকে অন্য অনেক মুক্তিযোদ্ধা সামরিক কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয়।
শৈশব ও কৈশোর ঢাকায় কাটানো তারেক রহমান ১৯৮৮ সালে ২২ বছর বয়সে বগুড়ার গাবতলী উপজেলা বিএনপির সদস্য হন। তবে দলীয় রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেওয়ার আগে থেকেই তিনি এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে মায়ের সঙ্গে রাজপথে ছিলেন। ১৯৮৬ সালে এরশাদ সরকারের পাতানো নির্বাচনের প্রাক্কালে স্বৈরাচারী সরকার তাকে তার মায়ের সঙ্গে গৃহবন্দি করে একাধিকবার।
২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ২০০২ সালের জুনে তাকে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব করা হয়। ২০০৫ সালে তিনি দেশব্যাপী তৃণমূল সম্মেলনের আয়োজন করেন এবং বাংলাদেশের প্রতিটি উপজেলা ইউনিটের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এই সম্মেলনের সময় তিনি তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলা, স্থানীয়দের সঙ্গে মতবিনিময় করা এবং সমর্থকদের চিন্তাধারা শোনেন এবং জনগণের কাছে বিএনপির কর্মসূচি প্রচার করেন। তিনি কৃষকদের জন্য সরকারি ভর্তুকি, বয়স্কদের জন্য ভাতা, পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য প্লাস্টিক ব্যাগবিরোধী আন্দোলন এবং নারী শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি বিতরণ সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করেন, যা স্কুলে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য কমিয়ে ভারসাম্য আনতে সহায়ক হয়। তিনি ব্যক্তিগতভাবে সম্মেলনে নিবন্ধনকারীদের অন্তত ১৮ হাজার চিঠির উত্তর দেন।
২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গ্রেপ্তার হন তারেক রহমান। অভিযোগ রয়েছে, ১৮ মাস কারাগারে থাকাকালে তিনি নির্যাতনের শিকার হন। ওই সময়ের সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, আদালতে হাজির করার সময় তিনি অসুস্থ ছিলেন এবং মেরুদণ্ডে আঘাত পেয়েছিলেন। ২০০৮ সালের ২৮ আগস্ট চিকিৎসার জন্য তিনি জামিন এবং ৩ সেপ্টেম্বর কারাগার থেকে মুক্তি পান। এর এক সপ্তাহ পর স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান তিনি। সে সময় দেশে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা চলছিল। প্রবাসে থাকাকালেই তিনি দলের নীতি-কৌশল ঠিক করতেন। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। এর মাঝে ২০১৫ সালে ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুতে ব্যক্তিগত শোক সইতে হয় তাকে। দীর্ঘ প্রবাস জীবন তারেক রহমানকে রাজনীতিতে আরও সহনশীল ও ধীর-স্থির করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তার বিরুদ্ধে থাকা সকল মিথ্যা, উদ্দেশ্যমূলক মামলা ও দণ্ড বাতিল হলে দেশে ফেরার আইনি বাধা কাটে। গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর তিনি দেশে ফিরলে তাকে বিপুল সংবর্ধনা দেওয়া হয়।