বাংলাদেশে বলপূর্বক গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অবসান ঘটাতে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্তকরণসহ ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত সংস্কারের সুপারিশ করেছে গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সামরিক বাহিনীর প্রত্যাহার, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ বাতিল বা মৌলিক সংশোধন, সামরিকীকৃত সন্ত্রাসবিরোধী নীতি পরিত্যাগ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইন, ২০০৯-এর ১৩ ধারা বাতিল এবং সব বাহিনীকে কঠোর আইনগত জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়েছে।
কমিশনের সুপারিশে আরও রয়েছে বাধ্যতামূলক মানবাধিকার প্রশিক্ষণ, ভুক্তভোগী-কেন্দ্রিক ন্যায়বিচার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিতকরণ এবং সত্য, স্মৃতি ও জবাবদিহির প্রতীক হিসেবে ‘আয়নাঘর’গুলোকে জাদুঘরে রূপান্তর।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) গুলশান এভিনিউয়ের কমিশন কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, কমিশন অব ইনকোয়ারি অ্যাক্ট, ১৯৫৬-এর ধারা ৩ অনুযায়ী ২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর জারিকৃত প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কমিশনটি গঠিত হয়। কমিশনের ম্যান্ডেট ছিল ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে সংঘটিত বলপূর্বক গুমের ঘটনাসমূহ অনুসন্ধান, গুম হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধান ও শনাক্তকরণ এবং এসব ঘটনা সংঘটনের প্রেক্ষাপট নির্ধারণ।
ম্যান্ডেট বাস্তবায়নে কমিশন বিভিন্ন সরকারি সংস্থার নথি ও তথ্য পর্যালোচনা, পরিদর্শন ও যাচাই-বাছাই কার্যক্রম গ্রহণ করে। এ প্রক্রিয়ায় ডিজিএফআই ও র্যাব পরিচালিত জেআইসি ও টিএফআইসি, র্যাব সদর দপ্তর ও ব্যাটালিয়ন, এনএসআই, ডিবি, সিটিটিসি, পুলিশ লাইন্সসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হয়। অনুসন্ধান কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন জেলায় গোপন বন্দিশালার সন্ধান পাওয়া গেলে কমিশন সেগুলো পরিদর্শন করে স্থানগুলো অপরিবর্তিত রাখার নির্দেশনা দেয়।
কমিশন গঠনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ডিজিএফআইয়ের জেলখানা (আয়নাঘর) এবং র্যাব সদর দপ্তরের ডিটেনশন পরিদর্শন করে আটক রাখার প্রক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সংশ্লিষ্ট বিভাগের উপস্থিতিতে প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টা পরিষদের কয়েকজন সদস্য এই দুটি সহ মোট তিনটি গোপন বন্দিশালা পরিদর্শন করেন।
কমিশনে দাখিল হওয়া ৯ হাজার ১৯১টি অভিযোগের মধ্যে একাধিকবার দাখিলকৃত ২ হাজার ৩১৩টি এবং প্রাথমিক যাচাইয়ে গুমের সংজ্ঞার বাইরে বিবেচনায় ১ হাজার ৩১০টি অভিযোগ বাতিল করা হয়। ফলে ৫ হাজার ৫৬৮টি অভিযোগ কমিশনের সক্রিয় বিবেচনায় আসে। এসব অভিযোগের মধ্যে ২৫১ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন এবং ৩৬ জনের ক্ষেত্রে গুমের পর লাশ উদ্ধার হয়েছে।
নিখোঁজদের অবস্থান নির্ধারণে কমিশন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা, সন্দেহভাজন ব্যক্তি, গুমভুক্ত পরিবারের সদস্য ও বেসামরিক সাক্ষীসহ মোট ১১১ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। পাশাপাশি ৭৬৫ জন গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের একাধিকবার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
সীমান্তবর্তী জেলার পুলিশ সুপার ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের সেক্টর কমান্ডারদের কাছ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনকারী ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহ করা হলেও সেখানে গুমের শিকার কোনো ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়নি। তবে ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর ঢাকার ধামরাইয়ের বালিশার বাসিন্দা, গুমের শিকার মোহাম্মদ রহমত উল্লাহ চাপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর সীমান্ত দিয়ে প্রত্যাবর্তনের একটি নির্দিষ্ট ঘটনা কমিশনের অনুসন্ধানে উঠে আসে।
এছাড়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতের বিভিন্ন কারাগারে আটক প্রথম দফায় ১ হাজার ৫২ জন এবং দ্বিতীয় দফায় ৩ হাজার ২৮৫ জন বাংলাদেশি নাগরিকের তালিকা কমিশন পেলেও যাচাই শেষে গুমের শিকার কারও নাম পাওয়া যায়নি। তালিকার কিছু তথ্য অসম্পূর্ণ ও অস্পষ্ট হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ও হালনাগাদ তথ্য চেয়ে পত্র পাঠানো হয়েছে এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে বিষয়টি অবহিত করতে বলা হয়েছে।
বলপূর্বক গুম সংক্রান্ত অভিযোগে গণমাধ্যমে জবানবন্দি গ্রহণ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ পাওয়া গেলেও ভিকটিম ও তাদের পরিবারের জীবন, নিরাপত্তা, মানসিক সুস্থতা এবং অনুসন্ধানের স্বার্থে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড বিবেচনায় কমিশন গোপনীয়ভাবে জবানবন্দি গ্রহণকেই অধিকতর সমীচীন বলে মনে করে।
কমিশনের অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রায় ২৫ শতাংশ গুমের ঘটনায় র্যাব জড়িত, ২৩ শতাংশ ঘটনায় পুলিশ, এবং বাকিগুলোতে ডিজিএফআই, সিটিটিসি, ডিবি, ডিটেনশন ও অন্যান্য ব্যাটালিয়ন সংশ্লিষ্ট। বহু ক্ষেত্রে র্যাবকে সমন্বয়কারী বা পরিকল্পনাকারী হিসেবে পাওয়া গেছে। অভিযোগের ধরন বিশ্লেষণে এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও পদ্ধতিগত চর্চা হিসেবে গড়ে ওঠা রাষ্ট্রীয় সমর্থিত কার্যক্রমের ইঙ্গিত দেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
কমিশন অব ইনকোয়ারি অ্যাক্ট-এর ধারা ১৩ অনুযায়ী, সত্যতা নিশ্চিত না হওয়া গুমের অভিযোগগুলোর তদন্ত ও নিষ্পত্তির লক্ষ্যে চার ধাপে কিছু অভিযোগ বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শকের কাছে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং আগামী ছয় মাসের মধ্যে সেই অগ্রগতি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে জানাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নিখোঁজদের ভাগ্য নির্ধারণে কমিশন দেশের বিভিন্ন জেলায় সন্দেহভাজন ক্রাইম সিন, পিক-আপ ভ্যান, আয়নাঘর ও ডাম্পিং গ্রাউন্ড পরিদর্শন করে। ময়মনসিংহে একটি বেওয়ারিশ লাশ দাফনের কবরস্থানের সন্ধান পাওয়া যায়, যেখানে গুমের শিকার ব্যক্তিদের দাফন করা হয়েছে বলে প্রত্যাশা করা হয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে দেখা যায়, দাফনকৃত লাশগুলোর মাথায় গুলির চিহ্ন এবং দুই হাত পেছনে বাঁধা ছিল। এছাড়া বরিশালের বলেশ্বর নদী ও বরগুনার পাথরঘাটায় ডাম্পিং জোনের সন্ধান মেলে।
বরিশালে দুটি দেহ উদ্ধার ও ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে কমিশন শনাক্তকরণ কার্যক্রমের সূচনা করে। অজ্ঞাত মরদেহের ছবি ব্যবহার করে অনুসন্ধান কার্যক্রম মিউনিসিপ্যাল ইমার্জেন্সি রেকর্ড ও অন্যান্য সূত্রের সঙ্গে সমন্বয়ে এগিয়ে নেওয়া হয়। কমিশন অজ্ঞাত ও বেওয়ারিশ মরদেহ শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে একটি ব্যাপক ডিএনএ ডাটাবেস গঠনের সুপারিশ করেছে।
কমিশন গুমের ভিকটিম ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রতিটি বিভাগে পরামর্শ সভা, ৩০০ জনের বেশি ভিকটিম ও ম্যাজিস্ট্রেটদের জন্য চারটি কর্মশালা এবং একাধিক প্রেস ব্রিফিং আয়োজন করে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের মাধ্যমে গুম বিষয়ক একটি তথ্যচিত্রও প্রকাশ করা হয়। দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থা ও কূটনৈতিক মিশনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে কমিশন কাজ করেছে। এসব সংস্থা গুমের ব্যাপকতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে কমিশনের কাজের প্রশংসা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের তাগিদ দেয়।
কমিশন ইতোমধ্যে দুটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, যেখানে দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। পুনরাবৃত্তি রোধ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের লক্ষ্যে কমিশন এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স প্রিভেনশন অ্যান্ড রিড্রেস অ্যাক্ট, ২০২৫ এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ প্রণয়নে সহায়তা করে।