অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত এবং দেশবিরোধী ও ধ্বংসাত্মক আন্দোলন-সমাবেশে উসকানিদাতাদের গ্রেপ্তার করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।
মঙ্গলবার (২৫ মার্চ) দুপুরে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির ৮ম সভা শেষে তিনি এ কথা বলেন।
উপদেষ্টা বলেন, সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বিশেষ করে ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস এবং আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণে থাকে সেসব বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত এবং দেশবিরোধী ও ধ্বংসাত্মক আন্দোলন-সমাবেশে উসকানিদাতাদের গ্রেপ্তার করা হবে।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা, টহল জোরদার এবং গোয়েন্দা নজরদারি আরও বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া ঈদ নির্বিঘ্ন করার লক্ষ্যে ঢাকার বিভিন্ন প্রবেশপথে চেকপোস্ট বসানো এবং বিভিন্ন আবাসিক হোটেল ও বস্তিতে অভিযান বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ঈদে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একগুচ্ছ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
নির্দেশনাগুলো হলো-
১. আসন্ন ঈদুল ফিতরের প্রাক্কালে দেশব্যাপী সার্বিক আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হবে।
২. চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড রোধে ইউনিফর্মধারী পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য মোতায়েন, বিশেষ বিশেষ রাস্তায় ও মোড়ে চেকপোস্ট স্থাপন, টাকা স্থানান্তরে মানি এস্কর্ট প্রদান, জাল টাকার বিস্তার রোধ ও শনাক্তকরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৩. রাজধানীর কূটনৈতিক এলাকা, গুরুত্বপূর্ণ স্থানসহ দেশের অন্যান্য বড় বড় শহর ও বন্দরে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও র্যাবের টহল বৃদ্ধি করতে হবে।
8. গার্মেন্টস ও অন্যান্য শিল্পের মালিক পক্ষ অর্থাৎ বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং শিল্প পুলিশ একত্রে বসে ঈদের পূর্বেই শ্রমিকদের বেতন-ভাতাদি, বোনাস ইত্যাদি পরিশোধের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৫. সাধারণ জনগণের ঈদ উপলক্ষ্যে নির্বিঘ্নে কেনাকাটা নিশ্চিত করতে পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি নারী পুলিশ ও সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্য মোতায়েন করতে হবে। মার্কেটগুলোতে বিশেষ রাত্রিকালীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে এবং সব মার্কেট সিসি ক্যামেরার আওতায় আনার ব্যবস্থা করতে হবে।
৬. ঈদ উপলক্ষ্যে ঘরমুখো মানুষের যাতায়াত নিরাপদ নিশ্চিতকল্পে বাস, ট্রেন ও লঞ্চে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় না করা, লঞ্চ/ফেরি ঘাটসমূহে অনিয়ম ও অবৈধ সিরিয়াল প্রদানের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা আদায় না করা, অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন না করা এবং পরিবহনে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
৭. পবিত্র ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ সারা দেশে যানজট নিরসনের লক্ষ্যে যথাযথ ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৮. যমুনা সেতু, পদ্মা সেতু এবং ফ্লাইওভারসহ টোলপ্লাজাসমূহে যানজট নিরসনে ইটিসিসহ (ইলেক্ট্রনিক টোল কালেকশন) দ্রুত টোল আদায়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৯. যানজট নিরসনে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ কর্তৃক চিহ্নিত ১৫৫ স্পটে আইপি/সিসি ক্যামেরা স্থাপনপূর্বক ঈদুল ফিতরের পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সময় মনিটরিং জোরদার করতে হবে। প্রয়োজনে অধিক গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ড্রোনের মাধ্যমে মনিটরিং করা যেতে পারে;
১০. যানজট নিরসনে লক্ষ্যে ঈদের পূর্বের ৭ দিন ও পরের ৭ দিন সুনির্দিষ্ট পূর্ব তথ্য ব্যতীত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক সড়কের ওপরে মোটরযান তথা যানবাহন থামানো যাবে না;
১১. অত্যাবশ্যকীয় পণ্য পরিবহনকারী বা যাত্রীবাহী যানবাহন ব্যতীত স্থলবন্দর ও নৌবন্দরসহ যেকোনো জায়গা থেকে ছেড়ে আসা নির্মাণ সামগ্রী বহনকারী ও লম্বা যানবাহনসমূহ ঈদের পূর্বের ৩ দিন এবং পরের ৩ দিন যেন মহাসড়কে চলাচল করতে না পারে বা নৌ-রুটে ফেরি পারাপার করতে না পারে সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে;
১২. ঈদের আগে ৫ দিন ও পরে ৫ দিন নদীতে বাল্কহেড চলাচল বন্ধ রাখতে হবে;
১৩. বিভিন্ন সড়ক, মহাসড়ক ও নৌ-পথে আকস্মিক দুর্ঘটনায় উদ্ধারকার্য পরিচালনায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের টিম, রেসকিউ বোট, ডুবুরি, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামাদিসহ অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখতে হবে। প্রয়োজনে কোস্টগার্ডের সহযোগিতা গ্রহণ করতে হবে;
১৪. দুর্ঘটনা কবলিত অথবা রাস্তা/ব্রিজে কোন গাড়ি নষ্ট হলে দ্রুত দুর্ঘটনা কবলিত/অকেজো গাড়ি অপসারণ/রেকারিং করে পার্শ্ববর্তী খালি জায়গায় স্থানান্তর করতে হবে। যমুনা ও পদ্মা সেতুসহ যানজট প্রবণ এলাকায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক রেকারের ব্যবস্থা রাখতে হবে;
১৫. ঈদের সময় সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি সড়কের শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ অধিদপ্তর এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক কন্ট্রোলরুম স্থাপন করতে হবে। সকল কন্ট্রোল রুমকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় জয়েন্ট অপারেশন সেন্টারের (01320001223) সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এর সাথে কন্ট্রোল রুমের সংযোগ স্থাপনপূর্বক সড়কের শৃঙ্খলা রক্ষায় সমন্বয় জোরদার করতে হবে।
এছাড়া ধর্ষণ মামলার বিচার কেবল দ্রুতই নয়, বিচারটা যাতে নিশ্চিত ও যথাযথ হয় ব্যবস্থা নিতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন কঠোর করা হচ্ছে। তাছাড়া সভায় মাদকের অপব্যবহার রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
একই পরিবারের একাধিক সদস্য সারের ডিলারশিপ গ্রহণ করতে পারবেন না—সরকারের প্রণীত এমন বিধানের কার্যকারিতা বহাল রেখেছেন সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার আদালত। হাইকোর্টের দেওয়া স্থিতাবস্থার আদেশ স্থগিত করে বুধবার আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হকের আদালত এই আদেশ দেন। এর ফলে ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০২৬’ কার্যকর করে সরকারি ব্যবস্থাপনায় সার সরবরাহে কোনো প্রকার আইনি বাধা রইল না বলে নিশ্চিত করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।
কৃষি খাতে সারের কৃত্রিম সংকট দূরীকরণ, ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি প্রতিরোধ এবং নির্দিষ্ট পরিবারের একচেটিয়া প্রভাব বন্ধ করার লক্ষ্যে গত ২৭ আগস্ট নতুন এই সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন করেছিল সরকার। পরবর্তীতে এই নীতিমালার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে কয়েকজন ডিলার হাইকোর্টে রিট আবেদন করলে আদালত নীতিমালার ওপর স্থিতাবস্থা জারি করেন।
হাইকোর্টের ওই আদেশ চ্যালেঞ্জ করে রাষ্ট্রপক্ষ সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার আদালতে আপিল আবেদন জানায়। চেম্বার আদালতের এই নতুন আদেশের মাধ্যমে সরকারের প্রণীত নীতিমালার আইনি ভিত্তি সুদৃঢ় হলো এবং নীতিমালা অনুযায়ী দ্রুততম সময়ে মাঠ পর্যায়ে সার বণ্টন ও সুষ্ঠু ডিলার ব্যবস্থাপনা কার্যকর করার পথ সুগম হলো।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ১৬ হাজার ২০৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে মোট ১৩টি উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ১০ হাজার ৬০০ কোটি ৮০ লাখ টাকা, প্রকল্প ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তা থেকে ৪ হাজার ৮১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর নিজস্ব তহবিল থেকে ১ হাজার ৫২৪ কোটি ৯১ লাখ টাকার সংস্থান করা হবে। বুধবার সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এসব প্রকল্প ছাড়পত্র পায়।
অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে ১০টি সম্পূর্ণ নতুন, দুটি সংশোধিত এবং একটি প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সর্বোচ্চ সাতটি প্রকল্প রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নতুন পাঁচটি অঞ্চলের ১৮টি ওয়ার্ডের সড়ক অবকাঠামো ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, রংপুর সিটি করপোরেশনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা পুনর্বাসন, গাজীপুর সিটির ১ থেকে ৮ নম্বর জোনের সড়ক, নর্দমা ও ফুটপাত নির্মাণ, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও নওগাঁর গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় (দ্বিতীয় সংশোধন) এবং সমবায়ের মাধ্যমে নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা তৈরির প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
যোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ‘বিআইডব্লিউটিসির জন্য ৩৫টি বাণিজ্যিক ও ৮টি সহায়ক জলযান সংগ্রহ এবং দু’টি নতুন স্লিপওয়ে নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধন এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ‘রেলওয়ের সক্ষমতা সম্প্রসারণ প্রকল্প-বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহ’ প্রকল্পটি অনুমোদন পেয়েছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনে পঞ্চগড়ের ভজনপুর-আমতলী-মিরগড় সড়কের ১৫তম কিলোমিটারে দ্বিতীয় করতোয়া সেতু নির্মাণ এবং থানচি-রিমাকরি-মদক-লিকরি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধন অনুমোদন করা হয়। এছাড়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ‘রামপাল ৪৪২ মেগাওয়াট পিক সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ’ এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘ফ্রান্সের প্যারিসে ক্রয়কৃত চ্যান্সারি ভবন ব্যবহারোপযোগী করার জন্য সংস্কার ও আধুনিকায়ন’ প্রকল্পটি ছাড়পত্র লাভ করেছে। একই সাথে পরিকল্পনা মন্ত্রী কর্তৃক ইতোমধ্যে অনুমোদিত ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়সংবলিত জয়পুরহাটের নদী ও খাল পুনঃখনন প্রকল্পের বিষয়ে সভাকে অবহিত করা হয়।
উক্ত সভায় অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, মহিলা ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন, ভূমি মন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু, শিল্প, বস্ত্র ও বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, পানি সম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, সড়ক ও রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিবছর ৭ নভেম্বর ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ উপলক্ষ্যে সারা দেশে নিয়মিত সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি-৬ শাখা থেকে বুধবার এ সংক্রান্ত একটি আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ওয়ালীউল দামান স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়, গত ৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবছর ৭ নভেম্বর ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ উপলক্ষে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হলো।
এর আগে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস পালন সংক্রান্ত পরিপত্রে সংশোধন এনে দিনটিকে ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত দিবস হিসেবে তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ফলে দিনটি এখন থেকে যথাযথ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে উদযাপিত হবে এবং সরকারি ছুটি কার্যকর থাকবে।
আগামী ডিসেম্বর মাসকে কেন্দ্র করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দলের যেকোনো ধরনের নাশকতা ও অপতৎপরতা কঠোর হস্তে দমন করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান ও অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম। বুধবার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এই অবস্থানের কথা জানান।
ডিসেম্বর মাসে শেখ হাসিনার দেশে প্রত্যাবর্তনের গুঞ্জন এবং এ উপলক্ষে দলটির কোনো কর্মসূচি বা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরে ডিবিপ্রধান স্পষ্ট করেন যে, আইনের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এমন কোনো সংগঠনের অপতৎপরতা দেশে বরদাশত করা হবে না। এই ধরনের অপচেষ্টা রুখে দিতে গোয়েন্দা পুলিশ সর্বোচ্চ কঠোর ও সক্রিয় অবস্থানে রয়েছে।
নগরবাসীর সুরক্ষার বিষয়ে জোর দিয়ে শফিকুল ইসলাম বলেন, দেশের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার বাসিন্দাদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই পুলিশ বাহিনীর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বদা সজাগ ও প্রস্তুত রয়েছে এবং যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিহত করা হবে।
ডিবিপ্রধান আরও জানান, নিষিদ্ধ দলের যেকোনো তৎপরতা নস্যাৎ করতে আইনানুগ কঠোর পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে এবং এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে নিয়মিত গ্রেপ্তার অভিযান পরিচালিত হবে।
বিয়ের সময় বকেয়া রাখা দেনমোহর স্ত্রী দাবি করামাত্রই স্বামীকে তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধ করতে হবে বলে ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। এই পাওনা আদায়ের জন্য স্ত্রীকে আর বিবাহবিচ্ছেদ কিংবা স্বামীর মৃত্যুর মতো পরিস্থিতির জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। দেনমোহর সংক্রান্ত একটি সিভিল রিভিশন আবেদনের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি শেষে বিচারপতি আব্দুর রহমানের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এই যুগান্তকারী পর্যবেক্ষণ ও রায় দেন, যার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে উচ্চ আদালত পর্যবেক্ষণ দিয়ে উল্লেখ করেন, পরিশোধের আর্থিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোনো স্বামী যদি দেনমোহর প্রদানে অযথা কালক্ষেপণ বা গড়িমসি করেন এবং স্ত্রীকে অর্থ আদায়ের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হতে বাধ্য করেন, তবে বিচারিক আদালত স্বামীকে মূল দেনমোহরের পাশাপাশি স্ত্রীকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারবেন। পর্যবেক্ষণে আরও স্পষ্টভাবে জানানো হয়, দেওয়ানি চুক্তি ও বিদ্যমান আইনের সুস্পষ্ট নিয়ম লঙ্ঘন করে কোনো অবস্থাতেই দেনমোহরের কোনো অংশ হ্রাস, কর্তন কিংবা মওকুফ করার আইনি এখতিয়ার কোনো আদালতের নেই।
উল্লেখ্য, দেশে বিদ্যমান মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালায় বকেয়া দেনমোহরের কথা উল্লেখ থাকলেও তা ঠিক কখন পরিশোধযোগ্য হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যার অভাব ছিল। ফলে বিবাহবিচ্ছেদ বা স্বামীর মৃত্যুর পরই কেবল দেনমোহর দাবি করা যায় বলে সমাজে যে ভ্রান্ত ধারণা গড়ে উঠেছিল, এই আদেশের মাধ্যমে সেই দীর্ঘদিনের আইনি অস্পষ্টতার অবসান ঘটল। পবিত্র কোরআনের প্রাসঙ্গিক আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে রায়ে বলা হয়, ইসলামে দেনমোহর আটকে রাখা বা বকেয়া রাখার সুযোগ নেই; বরং এটি স্ত্রীর তাৎক্ষণিক ও অবিচ্ছেদ্য অধিকার।
এই রায়কে দেশের বিচারিক অঙ্গন ও নারীর অধিকার সুরক্ষায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্ট মামলার আইনজীবী ব্যারিস্টার ইশরাত হাসান। তিনি অভিমত দেন, এই আদেশের ফলে বকেয়া দেনমোহর আদায়ের ক্ষেত্রে নারীদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা দূর হলো এবং আর্থিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোনো স্বামীর দেনমোহর নিয়ে টালবাহানা করার সুযোগ বন্ধ হয়ে সমাজে নারীর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের পথ সুগম হলো।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান বলেছেন, শিশুদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। শিশুদের জন্য কাজ করা মানে দেশের ভবিষ্যতের জন্য কাজ করা। আজকের শিশুরাই আগামী দিনে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেবে।
বুধবার সকালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে শিশু অধিকার দিবস ২০২৬ ও একাডেমির ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত ‘শিশুর স্বপ্নে ৫০ বছর: অর্জনে অভিজ্ঞতা ও আগামীর বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন।
ড. আবদুল মঈন খান বলেন, আজকের শিশুরাই ভবিষ্যতে এ দেশের পূর্ণ নাগরিক হয়ে দেশকে গড়ে তুলবে। এটা কঠিন দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব শুধু তাদের নয়, আজকে আমরা যারা বয়স্ক, আমাদেরও দায়িত্ব রয়েছে যাতে তারা সঠিকভাবে গড়ে উঠতে পারে।
তিনি শিশুদের উদ্দেশে বলেন, তোমরা যদি সঠিকভাবে গড়ে উঠতে ব্যর্থ হও, সেটার দায় আমাদের ওপর এসে বর্তাবে। তাই তোমরা যদি দেশকে ভালোবাসো, তাহলে বাংলাদেশের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।
শিশুদের অধিকার নিয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দূরদর্শিতার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘ বিশ্বজুড়ে শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার ১৩ বছর আগেই ১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করেছিলেন যে শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। দেশের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করতে শিশুদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের সুযোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও তিনি অনুধাবন করেছিলেন।
তিনি বলেন, ‘শিশুর পিতা ঘুমিয়ে আছে সব শিশুরই অন্তরে’- এই কথার অর্থ হলো- শিশুরাই ভবিষ্যতে দেশের পূর্ণ নাগরিক হয়ে দেশকে গড়ে তুলবে। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের রাষ্ট্রনায়ক এবং দেশের নেতৃত্ব দেবে।
বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ৫০ বছর পূর্তিকে শিশুদের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করে ড. আবদুল মঈন খান বলেন, আজকের অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিশুরা বাংলাদেশের শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছে। আজকের অভিজ্ঞতা তাদের সারাজীবন মনে রাখা উচিত।
সৃষ্টির চাকার সঙ্গে শিশুদের ভবিষ্যৎকে তুলনা করে মন্ত্রী বলেন, পৃথিবী কখনো থেমে থাকে না। সৃষ্টির চাকা ঘুরে চলেছে এবং তা সামনের দিকে এগিয়ে যায়। শিশুরা সেই সৃষ্টির চাকারই একটি অংশ। তাই তাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে হবে।
শিশুদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ইতিহাস থেকে আমরা যে শিক্ষা আজকে নেব, সেই শিক্ষা তোমাদের জীবনে প্রতিফলিত করবে। তোমরা ভবিষ্যতের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে এবং বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শ অনুসরণ করবে। একই সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শ অনুসরণ করে দেশ ও মানুষের কল্যাণে নিজেদের নিয়োজিত করবে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি সেলিমা রহমান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম আমানুল্লাহ, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সালমা আক্তার ও শিশু একাডেমির মহাপরিচালক আরজু আরা বেগম। সূত্র: বাসস
ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যা, ডায়াগনস্টিক কিট, ওষুধ এবং স্যালাইন সরবরাহ নিশ্চিত করেছে সরকার। ফলে বিগত তিন বছরের তুলনায় এবার ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের কাছে ডেঙ্গু চিকিৎসা সহজলভ্য করা, ব্যাপক সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং পরিচ্ছন্নতা অভিযানসহ সরকারের সমন্বিত উদ্যোগের কারণে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হার ০.৩১ শতাংশে রাখা সম্ভব হয়েছে। এ বছর ৬ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট ২৮১ জনের মৃত্যুর হয়েছে।
এর আগে ২০২৩ সালে ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যুতে এই হার ছিল ০.৫৩ শতাংশ, ২০২৪ সালে ৪৮২ জনের মৃত্যুতে ০.৪৯ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ৩২৩ জনের মৃত্যুতে এই হার ছিল ০.৩৪ শতাংশ। গত বছর একই সময়ে মৃত্যুর হার ছিল ০.৪২ শতাংশ।
সরকারি নির্দেশনার আলোকে, ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি, ওয়ান স্টপ সার্ভিস ও ডেডিকেটেড ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু, পর্যাপ্ত ডায়াগনস্টিক কিট ও স্যালাইনের মজুত এবং বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিনামূল্যে ডেঙ্গু এনএস১ পরীক্ষা নিশ্চিতকরণসহ দেশব্যাপী ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত ২২৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন। সেখানে দুটি ফ্লোরকে ডেডিকেটেড ডেঙ্গু ওয়ার্ডে রূপান্তর করে হাসপাতালটি তাদের মোট শয্যা সংখ্যা ৬০টি (শিশুদের জন্য ২০টি এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৪০টি) থেকে বাড়িয়ে ২০০টিতে উন্নীত করেছে।
হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম জানান, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু করা হয়েছে, যাতে তারা ওয়ার্ড থেকে বের না হয়েই পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবা পেতে পারেন।
তিনি জানান, ডেঙ্গু চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসকরা সম্প্রতি একটি ইন-হাউস সেমিনারে অংশ নিয়েছেন। তাছাড়াও মেডিসিন ও শিশু বিভাগের চিকিৎসকরা নিয়মিত সকালে ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা বিষয়ক সেশন পরিচালনা করছেন, যা মৃত্যুর হার কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
অন্যদিকে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) ৬ অক্টোবর পর্যন্ত ২৩১ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন। বর্তমানে ৪০২, ৫০২ এবং ৭০২ নম্বর ডেডিকেটেড ওয়ার্ডের মাধ্যমে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে, যার মধ্যে ৭০২ নম্বর ওয়ার্ডটি নারী রোগীদের জন্য নির্ধারিত।
ঢামেক ডেঙ্গু ইউনিটের প্রধান অধ্যাপক শাহনুর শারমিন মুন্নি জানান, প্রতিটি ওয়ার্ডের নির্ধারিত ক্ষমতা প্রায় ৫০টি শয্যা হলেও রোগীর সংখ্যার ওপর নির্ভর করে অতিরিক্ত শয্যার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কারণ ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কম বেশি হয়।
তিনি জানান, ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় জরুরি পণ্যসামগ্রী, যেমন- আইভি ফ্লুইড (স্যালাইন), আইভি সেট, প্যারাসিটামল, বমি ও গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ এবং বিশেষ তরল হিসেবে ব্যবহৃত প্লাজমা সলিউশনের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে হাসপাতালে।
কুর্মিটোলা মাল্টিকেয়ার স্পেশালাইজড হাসপাতালেও ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় চিকিৎসা সক্ষমতা আরও ১০০ শয্যা বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাইদুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘আমরা হাসপাতালের অষ্টম তলায় আরও ১০০টি শয্যা চালু করেছি, যার মধ্যে ৫০টি পুরুষ এবং ৫০টি নারী রোগীদের জন্য।
ইতোমধ্যেই সেখানে রোগী ভর্তি শুরু হয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, বিদ্যমান স্বাস্থ্যকর্মীদের সহায়তা করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ডেঙ্গু চিকিৎসার জন্য আলাদাভাবে ৬ জন চিকিৎসক ও ১০ জন নার্স নিয়োগ দিয়েছে।
সাইদুর রহমান জানান, ১ হাজার ২০০ শয্যার এই হাসপাতালে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত ১০৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন। বর্তমানে জরুরি বিভাগে ৫০টি শয্যা ছাড়াও প্রায় ২০০টি শয্যা বিশেষভাবে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য রাখা হয়েছে।
সব ডেঙ্গু রোগীর হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হয় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, কেবল ১০ থেকে ১৫ শতাংশ রোগী—যাদের রক্তপাত, তীব্র ডায়রিয়া বা অনিয়ন্ত্রিত বমির মতো গুরুতর লক্ষণ রয়েছে, তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়।
বাসসের খুলনা প্রতিনিধি জানান: ডেঙ্গু সংক্রমণের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হটস্পট হিসেবে খুলনা আবির্ভূত হওয়ায় সেখানকার বিভিন্ন সরকারি ও অন্যান্য স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবেলায় একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
সংক্রমণের তীব্রতা বিবেচনায় খুলনা শহরের বিভিন্ন স্থানে ৯টি ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে এবং নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে সপ্তাহজুড়ে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা সেবা প্রদান করা হয়েছে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চারটি ওয়ার্ড ও সংলগ্ন বারান্দায় ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। কেসিসি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এক দিনের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ দিয়ে হাসপাতালে ৩০টি শয্যা সরবরাহ করেছে, যার ফলে হাসপাতালের মোট ডেঙ্গু শয্যা সক্ষমতা ১৫০টিতে পৌঁছেছে।
সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালসহ বিভিন্ন বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানেও ডেঙ্গু রোগীদের ভর্তি ও চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
ক্ষমতাসীন দল বিএনপি শহরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা সেবা ও অস্থায়ী হাসপাতাল চালু করেছে এবং খুলনা ডায়াবেটিক সমিতি মাত্র ১০০ টাকা খরচে ডেঙ্গু পরীক্ষার সুযোগ সুবিধা চালু করেছে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. মো. নুরুল ইসলাম রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, দেশজুড়ে বিশেষ করে রাজধানীতে ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দেওয়ায় ক্রমবর্ধমান রোগীর চাপ সামলাতে ঢামেক প্রাঙ্গণে ফিল্ড হাসপাতালটি পুনরায় চালু করার কথা বিবেচনা করছে সরকার।
একই সাথে, ডেঙ্গু চিকিৎসা সহজতর করতে পর্যাপ্ত জায়গা সাপেক্ষে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের কিছু রোগীকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে স্থানান্তরের কথাও বিবেচনা করছেন কর্তৃপক্ষ।
ডা. নুরুল ইসলাম বলেন, সরকার বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে স্যালাইনের মজুতের তথ্য সংগ্রহ করেছে এবং অতিরিক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
তিনি বলেন, আগামী মাসগুলোতে প্রত্যাশিত চাহিদার কথা মাথায় রেখে সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোরস ডিপো (সিএমএসডি) এবং এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল)-কে পর্যাপ্ত মজুত বজায় রাখতে বলা হয়েছে।
পরিচালক জানান, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র স্ট্রাইডস কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশকে ৫ লাখ ডেঙ্গু এনএস১ র্যাপিড ডায়াগনস্টিক টেস্ট কিট প্রদান করেছে। এর ফলে দেশের যেকোনো অংশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
এছাড়া, চিকিৎসকরা যাতে ডেঙ্গু রোগীদের শনাক্তকরণ ও চিকিৎসায় একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করেন এবং ব্যবস্থাপনার ভুলে মৃত্যু প্রতিরোধ করা যায়—সে লক্ষ্যে ২০২৫ সালের ডেঙ্গু চিকিৎসা নির্দেশিকা অনুযায়ী ১ হাজার ৬০০ চিকিৎসককে ক্লিনিক্যাল ব্যবস্থাপনার ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে বলে জানান ডা. নুরুল ইসলাম।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা আরও জানান, হাসপাতালে যেন ডেঙ্গু থেকে নতুন করে সংক্রমণ না ছড়ায়, সেজন্য রোগীরা যাতে মশারি ব্যবহার করেন তা নিশ্চিত করছেন কর্তৃপক্ষ। সূত্র: বাসস
রাজধানীর বস্তি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মাঝে যক্ষ্মা রোগ দ্রুত শনাক্তকরণের সুযোগ সম্প্রসারণ করতে ১ লাখ ৪৫ হাজার মার্কিন ডলারের অনুদান সহায়তা দিচ্ছে জাপান সরকার। এ লক্ষ্যে সোমবার ঢাকাস্থ জাপানি দূতাবাসে একটি দ্বিপক্ষীয় অনুদান চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি এবং ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়রিয়াল ডিজিজ রিসার্চ, বাংলাদেশ’ (icddr,b)-এর প্রতিনিধিরা নিজ নিজ পক্ষে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
জাপান সরকারের ‘গ্রাসরুটস হিউম্যান সিকিউরিটি প্রজেক্টস’ (জিজিপি) কর্মসূচির অধীনে ‘ঢাকা জেলায় যক্ষ্মা রোগ নির্ণয়ের জন্য ল্যান্ড ক্রুজার গাড়ি সংগ্রহ প্রকল্প’ শীর্ষক উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করা হবে। এই সহায়তার মাধ্যমে icddr,b একটি টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার ও একটি অত্যাধুনিক ফুজিফিল্ম পোর্টেবল ডিজিটাল এক্স-রে ইউনিট সংগ্রহ করবে, যা ব্যবহার করে ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্যকর্মী দল সুবিধাবঞ্চিত ও স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির সুযোগবঞ্চিত মানুষের কাছে সরাসরি যক্ষ্মা স্ক্রিনিং সেবা পৌঁছে দেবে।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতি বছর অন্তত ৯ হাজার মানুষকে নিয়মিত যক্ষ্মা পরীক্ষার আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এর ফলে অপ্রকাশিত যক্ষ্মা রোগীদের দ্রুত চিহ্নিত করে যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যাবে, যা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এই রোগের সংক্রমণ রোধে সহায়ক হবে।
অনুষ্ঠানে জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি উল্লেখ করেন, সাধারণ মানুষের জীবন ও সামাজিক মর্যাদা সুরক্ষাকে জাপান সর্বদা বিশেষ গুরুত্ব দেয় এবং স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়ার এই প্রয়াস জাপানের সেই অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন। অনুষ্ঠানে টয়োটা সুশো কর্পোরেশনের ভাইস চেয়ারম্যান ইচিরো কাশিদানি উপস্থিত ছিলেন; প্রতিষ্ঠানটি এবং ফুজিফিল্ম যৌথভাবে এই প্রকল্পের প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাতি ও যানবাহন পরিচালনায় প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান করবে। উল্লেখ্য, তৃণমূল পর্যায়ে মানব নিরাপত্তা নিশ্চিতের ধারাবাহিকতায় ১৯৮৯ সাল থেকে জিজিপি কর্মসূচির অধীনে বাংলাদেশে ২২৪টি উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায় ১৭ দশমিক ৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছে জাপান।
যেসব অফিসে দুর্নীতর শিকড় গজিয়েছে সেসব জায়গা থেকে কর্মকর্তাদের বদলি করা হবে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেছেন, ‘সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গড়ে ওঠা দুর্নীতির সিন্ডিকেট ভাঙতেই লটারির মাধ্যমে সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলি করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সকালে আইন মন্ত্রণালয়ে ঢাকা জেলার ‘এ’ ক্যাটাগরির ১৮টি সাবরেজিস্ট্রার পদের জন্য ১৮ জনকে লটারির মাধ্যমে নির্বাচন করা হয়। এই লটারি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে এসব কথা বলেন আইনমন্ত্রী।
মন্ত্রী বলেন, ‘যেখানে দুর্নীতির শিকড় গজিয়েছে কিংবা যেসব অফিসকে দুর্নীতির আখড়া মনে করা হচ্ছে, সেসব জায়গায় প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মকর্তাদের বদলি করা হবে।’
সাবরেজিস্ট্রার পদে বদলি নিয়ে অনেক অভিযোগ পাওয়া গেছে, নেতিবাচক সেই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে স্বচ্ছ লটারির মাধ্যমে বদলি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
যাদের বদলি করা হয়েছে তাদের নজরদারিতে রাখা হবে বলে সতর্ক করেন আইনমন্ত্রী। বলেন, ‘কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সারাদেশে ৩৭২টি সাবরেজিস্ট্রার পদের মধ্যে বর্তমানে ১৩৯টি পদ খালি আছে বলেও জানান তিনি।
অর্থনীতির গতি কমছে, কিন্তু মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমছে না। বিনিয়োগ ও শিল্প উৎপাদনে মন্দা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংক খাত, কম রাজস্ব আদায় এবং বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতায় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্যেও। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে অবিলম্বে কাঠামোগত সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
সংস্থাটি জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত থেকে উদ্ভূত বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জকে আরও বাড়িয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বিশ্বব্যাংক তাদের সর্বশেষ ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনে ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ফেরানো, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কর-রাজস্ব বাড়ানো এবং দরিদ্র ও ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত থেকে তৈরি বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ আরও বাড়াতে পারে বলেও সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক।
প্রবৃদ্ধিতে বড় ধাক্কা: বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ হার ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। পরের দুই অর্থবছরে তা কমে যথাক্রমে ৪ দশমিক ২ ও ৩ দশমিক ৫ শতাংশ হয়। গত অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ২ দশমিক ২ শতাংশে, যা করোনা মহামারির পর কোনো প্রান্তিকে সর্বনিম্ন।
প্রবৃদ্ধি কমার বড় কারণ বিনিয়োগের সংকোচন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ কমেছে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। একই সময়ে পণ্য ও সেবার প্রকৃত রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়নও ঐতিহাসিকভাবে নিচু পর্যায়ে নেমেছে। বড় অবকাঠামো প্রকল্প পর্যালোচনা, নতুন প্রকল্পে সতর্কতা এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতার দুর্বলতায় উন্নয়ন ব্যয় কমেছে।
গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতিতে অনেক কারখানা সক্ষমতার নিচে উৎপাদন করেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২ শতাংশ। তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প উৎপাদন শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে, যা করোনা মহামারির পর শিল্প খাতের প্রথম প্রান্তিকভিত্তিক সংকোচন।
বাংলাদেশ এখন মোট গ্যাস চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আমদানির মাধ্যমে মেটায়। কয়েকটি বড় গ্যাসক্ষেত্র ও মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা জ্বালানি নিরাপত্তায় ঝুঁকি তৈরি করছে।
মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্যের চাপ: মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও চাপ এখনো বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ শতাংশ। গত অর্থবছরে তা কমে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে। আগস্টে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহব্যবস্থার সমস্যায় মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত রয়েছে। খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় দাম প্রায় ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে।
কম আয়ের শ্রমিকদের মজুরি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল রাখতে পারেনি। আগস্টে তাদের প্রকৃত মজুরি আবার ঋণাত্মক হয়ে যায়। একই সময়ে শিল্প ও সেবা খাতে কাজ হারানো নারীদের অনেকে শ্রমবাজার থেকে বেরিয়ে গেছেন। নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ ২০২২ সালের ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশে নেমেছে।
দারিদ্র্য পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। বিশ্বব্যাংকের মডেলভিত্তিক হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দৈনিক ৩ ডলারের আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমায় দারিদ্র্যের হার ১০ দশমিক ১ শতাংশে উঠেছে। এক বছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে এই সীমার নিচে নেমেছে। জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে গত অর্থবছরে আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছে। একই সময়ে আয়বৈষম্যও বেড়েছে।
ব্যাংক খাতে বড় ঝুঁকি: বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুতর ঝুঁকিগুলোর একটি হিসেবে ব্যাংক খাতের দুর্বলতাকে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২০ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। ইসলামি ব্যাংকগুলোয় এ হার ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকে ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ।
ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক মূলধন পর্যাপ্ততার হার ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে, যেখানে ন্যূনতম নিয়ন্ত্রক হার ১০ শতাংশ। প্রভিশন সংরক্ষণের নিয়ম শিথিল করায় ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোকে প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ প্রভিশন রাখতে হয়নি। ফলে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত দুর্বলতা পুরোপুরি প্রকাশ পাচ্ছে না।
দুর্বল ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের জামানতবিহীন তারল্য সহায়তা ২০২৬ সালের জুনে ৭৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বিশ্বব্যাংক বলেছে, দুর্বল ব্যাংককে বারবার ছাড় ও তারল্য সহায়তা দেওয়ায় প্রকৃত লোকসান শনাক্ত ও সমাধানের প্রক্রিয়া পিছিয়ে যাচ্ছে।
বেসরকারি ঋণ ও বিনিয়োগে মন্দা: জুনে ব্যক্তি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে, যা ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিপরীতে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ।
গত ২৯ জুন ক্রেডিট কার্ড ও ভোক্তা অর্থায়ন ছাড়া অন্য ঋণে আমানত ও ঋণের সুদের ব্যবধান সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। বিশ্বব্যাংকের মতে, এতে ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসার ঋণ পাওয়া কঠিন হতে পারে এবং ব্যাংকগুলো বড় প্রতিষ্ঠান বা সরকারকে ঋণ দিতে বেশি আগ্রহী হতে পারে।
প্রবাসী আয় অবশ্য রেকর্ড করেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ৩৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবে পণ্য রপ্তানি শূন্য দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। আমদানি ১০ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৭১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ ১৫ শতাংশ কমে প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে।
রাজস্ব কম, বাড়ছে সরকারি ঋণ: ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড লক্ষ্যমাত্রার ৮২ দশমিক ৬ শতাংশ কর আদায় করেছে। মোট রাজস্ব জিডিপির ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ হলেও কর-রাজস্ব প্রায় ৭ শতাংশ। সীমিত করভিত্তি, কর ফাঁকি, দুর্বল প্রশাসন ও অতিরিক্ত করছাড় রাজস্ব বৃদ্ধির পথে বাধা।
বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে। প্রথম ১১ মাসে সরকারের মোট অর্থায়নের ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ এসেছে ব্যাংক খাত থেকে। আগের অর্থবছরে এ হার ছিল ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশ। সরকারি ঋণ জিডিপির ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে।
সামনে দুর্বল প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস: বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে থাকতে পারে। ২০২৭-২৮ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। আগামী অর্থবছরে প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার নিট কর্মসংস্থান তৈরি হলেও তা দ্রুত দারিদ্র্য কমানোর জন্য যথেষ্ট হবে না। জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২২ দশমিক ৮ শতাংশে উঠতে পারে। গড় মূল্যস্ফীতি থাকতে পারে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ।
সংস্কারে তিন অগ্রাধিকার: ব্যাংক খাতে সম্পদের মান পর্যালোচনা দ্রুত শেষ করে কোন ব্যাংক টিকে থাকতে পারবে তা নির্ধারণের পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। মালিক, বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্ট পক্ষকে লোকসানের দায় বহন এবং নিয়ন্ত্রক ছাড় পর্যায়ক্রমে তুলে নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
জ্বালানি খাতে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ও এলএনজি অবকাঠামো বাড়ানো, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থা উন্নত করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। রাজস্ব বাড়াতে করনীতি ও কর প্রশাসন আলাদা করা, কর ফাঁকি শনাক্তে সরকারি তথ্য সমন্বয় এবং অকার্যকর করছাড় কমানোর পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন হলো, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটানো এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কার ছাড়া বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির গতি ফিরিয়ে আনা ও দারিদ্র্য কমানো কঠিন হবে।
সাত দশক পর আবারও ব্রহ্মপুত্র নদ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌযাত্রা শুরু হলো। আসামের ডিব্রুগড় থেকে ৫৪০ মেট্রিক টন মিথানল নিয়ে বাংলাদেশের পানগাঁও বন্দরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছে একটি পণ্যবাহী বার্জ। ভারতের স্বাধীনতার পর আসাম থেকে সরাসরি বাংলাদেশের বন্দরের উদ্দেশে বাণিজ্যিক নৌযাত্রার এটিই প্রথম ঘটনা বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সোমবার (৫ অক্টোবর) বগিবিল টার্মিনাল থেকে ‘ডিএলবি পাটকাই’ নামের বার্জটি যাত্রা শুরু করে। ‘কুশল কোঁওর’ নামের একটি টাগবোটের সহায়তায় বার্জটি বাংলাদেশের উদ্দেশে যাচ্ছে।
যাত্রার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন ভারতের কেন্দ্রীয় বন্দর, জাহাজ চলাচল ও জলপথমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল। এ সময় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত ছিলেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। অনুষ্ঠানে কেন্দ্র ও রাজ্যের কয়েকজন মন্ত্রী, স্থানীয় সাংসদ ও বিধায়ক এবং ভারত ও বাংলাদেশের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সর্বানন্দ সোনোয়াল বলেন, বহু দশক পর ডিব্রুগড়ে আবার স্টিমারের সিটি শোনা যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে ডিব্রুগড়সহ উত্তর-পূর্ব ভারত আন্তর্জাতিক জলপথ বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হলো।
আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা ঘটনাটিকে রাজ্যের অর্থনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য, আসামের শিল্পে উৎপাদিত পণ্য এখন নদীপথ ব্যবহার করে দেশের বাইরে বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ পাবে।
১,৩০০ কিলোমিটারের নৌযাত্রা
এই চালানের মিথানল উৎপাদন করেছে আসামের নামরূপের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান আসাম পেট্রোকেমিক্যালস লিমিটেড (এপিএল)। বগিবিল থেকে বাংলাদেশের পানগাঁও পর্যন্ত নৌপথের দূরত্ব প্রায় ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ভারতের অংশে বার্জটি ব্রহ্মপুত্রের জাতীয় জলপথ-২ (এনডব্লিউ-২) দিয়ে প্রায় ৭৬৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে পৌঁছাবে। এরপর ভারত-বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপথ প্রটোকল (আইবিপিআর) রুট ব্যবহার করে পানগাঁও বন্দরে যাবে।
ডিব্রুগড় থেকে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে ব্রহ্মপুত্রের ব্যবহার অবশ্য নতুন নয়। একসময় এই নদীপথে ডিব্রুগড় থেকে চা পরিবহন করা হতো। পরে রেলপথের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে নদীপথে পণ্য পরিবহন কমে যায়। ১৯৫৬ সালে ডিব্রুগড়ের ঐতিহাসিক ঘাটটি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।
সম্প্রতি বগিবিল ও ধুবড়িতে কাস্টমস ও অভিবাসন-সংক্রান্ত অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বগিবিলে যাত্রী ও পণ্য টার্মিনাল চালু হয়। এসব অবকাঠামো আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।
এর আগে ২০২২ সালে বাংলাদেশের জলপথ ব্যবহার করে ভারতের হলদিয়া থেকে গুয়াহাটির পান্ডুতে টাটা স্টিলের পণ্য পরিবহন করা হয়েছিল। ২০২৩ সালে পর্যটকবাহী জাহাজ ‘এমভি গঙ্গা বিলাস’ও এই পথ অতিক্রম করে। তবে আসাম থেকে সরাসরি কোনো বিদেশি বন্দরের উদ্দেশে বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনের ঘটনা এবারই প্রথম বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও ওষুধশিল্পসহ বিভিন্ন শিল্পে মিথানলের ব্যবহার রয়েছে। ফলে আসাম থেকে সরাসরি নদীপথে মিথানল পরিবহনের এই উদ্যোগ দুই দেশের বাণিজ্যিক যোগাযোগে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নদীপথে পণ্য পরিবহন চালু হলে পরিবহন ব্যয় ও সময় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এই সম্ভাবনা কতটা বাস্তবে কাজে লাগবে, তা নির্ভর করবে নিয়মিত বাণিজ্যিক নৌসেবা চালু রাখা, কাস্টমস ও পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া কতটা সহজ হয় এবং ফেরার পথে পণ্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি করা যায় কিনা- এসব বিষয়ের ওপর।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে পুনর্বহালের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে হলেও জনগণের অনুমোদন নেওয়ার বিধান ফিরিয়ে আনা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে গণভোটের যে বিধান ছিল, তা পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল করা হয়েছিল। আদালতের রায়ে ওই বাতিলের সিদ্ধান্ত অসাংবিধানিক ঘোষিত হওয়ায় সংশোধিত সংবিধানে গণভোটের বিধান পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) জাতীয় সংসদে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবারের প্রতিনিধি ও ‘জুলাই যোদ্ধা’দের সঙ্গে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে এ কথা বলেন তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, যে সংশোধনীটা আমরা সামনে গ্রহণ করব—সে জায়গায় এমন কিছু আর্টিকেলের পরিবর্তন, সংশোধন সংযোজন আসবে; যেগুলো পরিবর্তনে সংশোধনের পূর্ববর্তী রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে গণভোটের ব্যবস্থা করতে হবে। সেটা হচ্ছে সাংবিধানিক গণভোট। আগে যে গণভোট হয়েছে সেটা আইনি গণভোট। এই সাংবিধানিক গণভোটটা আমাদের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা।
মন্ত্রী বলেন, যে সংশোধনটা আমরা সামনে আনব—সেখানে প্রস্তাবনা, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসহ মৌলিক বিষয়গুলোতে পরিবর্তন আসবে। আর্টিকেল ৪৮ ও ৫৬-এ আসবে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে আমরা কেন ধারণ করব, সেই বিষয়গুলো আসবে। আর্টিকেল ১৪২-এ যেখানে গণভোট ছিল না, শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট সরকার সেটা উড়িয়ে দিয়েছিল। সেখানে আবার সেটা আমাদের ধারণ করতে হবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা হলে ভবিষ্যতে যাতে সহজে কেউ তা পরিবর্তন করতে না পারে, সে বিষয়েও সাংবিধানিক সুরক্ষা রাখার কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনরায় আমরা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করলে সেটা যাতে ভবিষ্যতে কেউ সহজে পরিবর্তন করতে না পারে, সেজন্য আমরা ওইটা পরিবর্তন করলেও ভবিষ্যতে জনগণের কাছে যাতে যেতে হয়, সেটায় গণভোটের বিধান রাখতে হবে। সেজন্য এই পরিবর্তনগুলো এবং এই সাংবিধানিক সংশোধনীগুলো আমরা সংবিধানে নিয়ে আসলে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুসারে আমাদের গণভোট দিতে হবে।
সংবিধানে বর্তমানে গণভোটের বিধান নেই—এমন বক্তব্যের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আমি দুই-এক জায়গায় শুনছি, কেউ কেউ বলছেন—সংবিধানে তো গণভোট নাই। আমরা কেন গণভোটের কথা বলছি? সংবিধান সংশোধনের পরে। তারা সঠিক কথা বলছেন না।
এ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনের মাধ্যমে আর্টিকেল ১৪২ থেকে যে গণভোটের বিধানটা তুলে দেওয়া হয়েছিল, সেটার বৈধতা ছিল না। এবং সেটাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে ইতোমধ্যে হাইকোর্ট থেকে রায় দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ আগে যা ছিল, তাই সঠিক।
এ প্রসঙ্গে ‘ডকট্রিন অব ইক্লিপস’-এর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অনেকে বলছেন, সেটা তো অটোমেটিক বহাল হয় না। এখানে আমার বক্তব্য হচ্ছে, সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় একটা ডকট্রিন আছে। এটা হচ্ছে ডকট্রিন অব ইক্লিপস।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটা যারা আইনে প্রফেসরি করেন, আইনের ছাত্র তারা জানেন। চন্দ্রগ্রহণ যখন হয়, গ্রহণটা সরে গেলে চাঁদটা আবার আলো দেখা যায়। এটাকে বলা হয় ডকট্রিন অব ইক্লিপস। ওই সংবিধানের যে বিধানটা পরিবর্তন করে গণভোট বাতিল করে দিয়েছিল, সেটাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট। সুতরাং আগেরটা বহাল হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এখানে একটা আইনের জটিল প্রশ্ন আছে। সেটা যতদিন পার্লামেন্টে আবার সংবিধানে ধারণ না করবে, ততদিন পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিস্থাপিত হয়েছে বলা যাবে না। তবে বিচার বিভাগ তাদের যে রায় দিয়েছে, সেই রায় অনুসারে সংবিধানে আমরা এই সংশোধনীতে সেটা ধারণ করব।
গণভোটের বিধান সংবিধানে পুনরায় যুক্ত করার বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সুতরাং ইট ইজ দেয়ার। এটা অসাংবিধানিক যদি কেউ বলে, যদি বলে—এখন তো সংবিধানে গণভোটের বিধান নাই, গণভোটের বিধান বহাল হয়েছে—আমরা এটা যখন সংবিধানে নিয়ে আসব, তখন সেটা আমাদের মানতে হবে। সেই হিসাবে সাংবিধানিক ভোটটা। তাছাড়া প্রস্তাবনা, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসহ মৌলিক বিষয়গুলো যেগুলোতে পরিবর্তন হলে সাংবিধানিক গণভোট দেওয়ার কথা, সেই ১৪২ অনুসারে সেটা তো আছেই এবং আমরা যুক্ত করব। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যবস্থা যে আমরা সংবিধানে আনছি, সেটা যাতে ভবিষ্যতে পরিবর্তন যদি কেউ করতে চায়, তখনও যাতে গণভোটের বিধান বহাল থাকে, জনগণের কাছে যেতে হয়—এইভাবে আমরা একটা সমৃদ্ধ সাংবিধানিক সংশোধনী আনব।
উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ১৪২ অনুচ্ছেদে গণভোটের বিধান প্রথম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরে ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আনা পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এ বিধান সংবিধান থেকে বাদ দেওয়া হয়। একই সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাও সংবিধান থেকে বাতিল করা হয়েছিল।
২০২৬ সালের ৯ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পঞ্চদশ সংশোধনীর মূল অংশগুলো অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল রাখেন। ফলে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোটের বিধান বাতিলের বিষয়টি নতুন করে সাংবিধানিক আলোচনায় আসে।
আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পর আইন মন্ত্রণালয় সংবিধানের সংশোধিত রূপ বা একটি টেক্সট প্রকাশ করবে বলে জানা গেছে। সেখানে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাদ পড়া ১৪২ অনুচ্ছেদে গণভোটের বিধান এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারসংক্রান্ত বিধানগুলো পুনঃস্থাপনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টারি অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং দুই দেশের সম্পর্ক আরও জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ও ব্রিটিশ পার্লামেন্টের অল-পার্টি পার্লামেন্টারি গ্রুপের (এপিপিজি) প্রতিনিধিদল। বৈঠকে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, গণতান্ত্রিক চর্চা, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কার্যক্রম, সংখ্যালঘুদের অবস্থা, নারী নেতৃত্ব, সরকারি চাকরিতে নিয়োগ এবং বাংলাদেশে ব্রিটিশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শাখা চালুর বিষয়েও আলোচনা হয়। ডেপুটি স্পিকারের কার্যালয়ে মঙ্গলবারের (৬ অক্টোবর) বৈঠকে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য আপসানা বেগম, সদস্য শকত আদম এবং ইউকে অল-পার্টি পার্লামেন্টারি গ্রুপের কর্মকর্তা লর্ড কুরবান হুসাইন অংশ নেন।
বৈঠকের শুরুতেই ব্রিটিশ প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় আন্তরিক ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানায়। জবাবে ডেপুটি স্পিকার বলেন, ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশে ও বিদেশে সব জায়গায় অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুলে ধরে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর এবং ঐতিহ্যগতভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ। এ সম্পর্ক মূলত দ্বিপক্ষীয় ও কূটনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। ব্রিটেনে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীরাও উভয় দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে অবদান রাখছেন।
সামাজিক নিরাপত্তা ও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের বিষয়ে ডেপুটি স্পিকার বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী শক্তিশালী করতে ফ্যামিলি কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড ও কৃষক কার্ড চালু করেছেন। কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসেবে ব্রিটেনের সরকারও নাগরিকদের জন্য এ ধরনের ব্যবস্থা করে থাকে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্রিটিশ বিভিন্ন ইনস্টিটিউশনের মতো বাংলাদেশের বিভিন্ন ইনস্টিটিউশনকে শক্তিশালী করার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে বাংলাদেশ পার্লামেন্টের জন্য একটি মডেল হিসেবে বিবেচনা করেন।
বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের অবস্থা নিয়েও প্রতিনিধিদল জানতে চায়। জবাবে ডেপুটি স্পিকার বলেন, বাংলাদেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে সংখ্যালঘুদের সমান দৃষ্টিতে বিবেচনা করা হয়। বর্তমানে অনেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী রয়েছেন, যারা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ।
এ সময় ব্রিটিশ প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ পার্লামেন্টে দীর্ঘ সময় নারী নেতৃত্ব থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে।
দেশের সাম্প্রতিক গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি তুলে ধরে ডেপুটি স্পিকার বলেন, বিগত দেড় দশকে দেশে গণতন্ত্র বহাল ছিল না। বর্তমানে বাংলাদেশের পার্লামেন্টে ডেমোক্রেসি চালু রয়েছে। পার্লামেন্টারি স্ট্যান্ডিং কমিটিগুলো অনেক বেশি ক্রিয়াশীল ও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। বিরোধী দলও জাতীয় সংসদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, যেটি একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।
সংসদকে তরুণ প্রজন্মের কাছে আরও উন্মুক্ত করার উদ্যোগের কথা জানিয়ে ডেপুটি স্পিকার বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অভিপ্রায় অনুযায়ী স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা এখন সংসদ অধিবেশন দেখার এবং সংসদ ভবন পরিদর্শনের সুযোগ পাচ্ছে।
সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না বলে জানান ডেপুটি স্পিকার। প্রতিনিধিদলের উদ্দেশে তিনি বলেন, দেশের গণতান্ত্রিক ধারাকে শক্তিশালী করতে ব্যুরোক্রেটিক সিস্টেমকে আরও বেশি জনমুখী করা হচ্ছে।
বৈঠকে দুই দেশের পার্লামেন্টারি অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন ডেপুটি স্পিকার ও ব্রিটিশ প্রতিনিধিদলের সদস্যরা।
সাক্ষাৎ শেষে ডেপুটি স্পিকার ব্রিটিশ প্রতিনিধিদলকে জাতীয় সংসদ ভবন ও জুলাই স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শনের আহ্বান জানান। প্রতিনিধিদল এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করে। সাক্ষাৎকালে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।