সম্প্রতি তুরাগ নদীর নিচে গ্যাসের পাইপলাইনে বড় ধরনের ফাটল এবং গ্যাস উত্তোলনের পরিমাণ কমে যাওয়ায় ঢাকাজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে নগরবাসী গ্যাস সিলিন্ডার, ইন্ডাকশন কুকার বা জ্বালানি কাঠ ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছেন, যা খরচ বাড়াচ্ছে এবং দৈনন্দিন কাজকর্মকে ব্যাহত করছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গ্যাসের আমদানি কমে যাওয়া এবং শীতকালে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। বিশেষ করে মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও উত্তরা এলাকার বাসিন্দারা এই সংকটের সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছেন।
এই পরিস্থিতিতে রাজধানী ঢাকার বাসিন্দারা রান্নার জন্য বিকল্প হিসেবে মাটির চুলা কিংবা বৈদ্যুতিক চুলার ব্যবহারে ঝুঁকছেন। ফলে মাটির চুলা তৈরি যেমন বেড়েছে, তেমনি দোকানে বেড়েছে বৈদ্যুতিক চুলার চাহিদা।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা মৌসুমী মৃধা সম্প্রতি গ্যাস সংকটের কারণে একটি বৈদ্যুতিক চুলা কিনেছেন। তিনি বলেন, দিনের বেলায় গ্যাস থাকে না বললেই চলে। রাতে কিছুটা আসে, কিন্তু তাও সবসময় না। রান্না করা রীতিমতো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই বৈদ্যুতিক চুলা কিনেছি।
তিনি আরও বলেন, রান্নার জন্য এখন গ্যাসের চুলার বিকল্প হয়ে উঠেছে ইন্ডাকশন কুকার। এটি দিয়ে যেকোনো সময় রান্না বা খাবার গরম করা যায়। বিশেষ করে দ্রুত কিছু রান্নার জন্য এটি খুবই কাজে দেয়।
তীব্র গ্যাস সংকটের এই সময়ে বৈদ্যুতিক চুলাকেই বাস্তবসম্মত সমাধান বলে মনে করেন মৌসুমী মৃধা।
বাজারে ওয়ালটন, ভিশন, ভিগো, কিয়াম, গাজী, মিয়াকো ও ফিলিপসসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বৈদ্যুতিক চুলা পাওয়া যাচ্ছে। এসব চুলার মধ্যে মূলত দুটি ধরন রয়েছে—ইন্ডাকশন ও ইনফ্রারেড। পাশাপাশি নোভা ও প্রেস্টিজের মতো কম পরিচিত ব্র্যান্ডের চুলাও পাওয়া যাচ্ছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, ইন্ডাকশন চুলার চেয়ে ইনফ্রারেড চুলার দাম তুলনামূলক কিছুটা বেশি। সাধারণত এসব কুকারের দাম তিন হাজার ৫০০ থেকে ছয় হাজার টাকার মধ্যে হয়। তবে প্রিমিয়াম মডেলগুলোর দাম একটু বেশি।
আরএফএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আর এন পাল বলেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বৈদ্যুতিক চুলা—বিশেষ করে ইনফ্রারেড ও ইন্ডাকশন মডেলের চাহিদা হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে। মাত্র দুই সপ্তাহে আমাদের ইনফ্রারেড ও ইন্ডাকশন চুলার স্টক প্রায় শেষ হয়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, ইন্ডাকশন চুলা খুবই কার্যকর। কারণ এটি ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক শক্তি ব্যবহার করে সরাসরি পাত্র গরম করে। অন্যদিকে ইনফ্রারেড কুকার সাধারণ কয়েল হিটারের মতো কাজ করে।
আর এন পাল আরও বলেন, ইন্ডাকশন চুলা অত্যন্ত বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী। প্রচলিত হিটিং পদ্ধতির তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে। বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন থাকলে রান্নার জন্য এর ব্যবহার ও জনপ্রিয়তা অনেক বাড়বে।
‘বিদেশে গ্যাস সিলিন্ডারের ঝুঁকি এড়াতে অধিকাংশ মানুষ ইন্ডাকশন কুকার ব্যবহার করেন’, যোগ করেন তিনি।
দামের বিষয়ে আরএফএলের এমডি বলেন, বৈদ্যুতিক চুলার দাম সাধারণত পাঁচ হাজার টাকা থেকে শুরু হয়। চার সদস্যের একটি পরিবার নিয়মিত ব্যবহার করলে মাসে প্রায় দুই হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল আসে, যা সিলিন্ডারের খরচের সমান বা তার চেয়েও কম।
তিনি বলেন, বাজারে এখন ১২ কেজির একটি গ্যাস সিলিন্ডারের দাম দুই হাজার ২০০ টাকা, যা গত মাসে ছিল এক হাজার ৩০৬ টাকা। সরবরাহ সংকট ও পরিবহন খরচ বাড়ার পাশাপাশি ডিলাররা নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি করায় দাম বেড়েছে।
আর এন পাল বলেন, বৈদ্যুতিক চুলা নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব পণ্য। বিশ্বজুড়ে এটি এখন ট্রেন্ডিং পণ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, আরএফএল বছরে প্রায় একশ কোটি টাকার বৈদ্যুতিক চুলা বিক্রি করে এবং মাসে গড়ে প্রায় ২০ হাজার কুকার বিক্রি হয়।
তিনি আরও বলেন, এই খাতে বছরে আনুমানিক ২৫০ থেকে ৩০০ কোটি টাকার ক্রয়-বিক্রয় হয়, এর মধ্যে আরএফএলের বিক্রি প্রায় ৪০ শতাংশ।
ওয়ালটনের সহকারী পরিচালক অগাস্টিন সুজন বড়াই বলেন, গ্যাস সিলিন্ডারের দাম বৃদ্ধি ও সংকটের কারণে বর্তমানে প্রতি মাসে সাত থেকে ১০ হাজার বৈদ্যুতিক চুলা বিক্রি হচ্ছে।
তিনি বলেন, চাহিদা স্পষ্টভাবেই বাড়ছে। ভোক্তারা বিকল্প খুঁজছেন এবং বৈদ্যুতিক চুলা একটি নির্ভরযোগ্য সমাধান হিসেবে প্রমাণিত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ওয়ালটনের ১০ থেকে ১২টি মডেলের ইন্ডাকশন ও ইনফ্রারেড কুকার রয়েছে। যেগুলোর দাম তিন হাজার ৭০০ টাকা থেকে পাঁচ হাজার ৭০০ টাকার মধ্যে। ওয়ালটনের ইন্ডাকশন কুকারের সর্বোচ্চ ক্ষমতা দুই হাজার ওয়াট। তবে ২০০ ওয়াট থেকে ব্যবহারের জন্য অ্যাডজাস্টেবল সেটিং রয়েছে। এছাড়া টাচস্ক্রিন কন্ট্রোল, একাধিক তাপমাত্রা সেন্সর, স্বয়ংক্রিয় সেফটি শাট-অফ এবং সর্বোচ্চ তিন ঘণ্টার টাইমার সুবিধা রয়েছে।
সুজন বড়াই বলেন, ওয়ালটনের ইনফ্রারেড কুকারগুলো আরও আধুনিক। ৩০০ থেকে দুই হাজার ওয়াট পর্যন্ত পাওয়ার রেঞ্জ, উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল গ্লাস, টাচ কন্ট্রোল, টাইমার, সেফটি শাট-অফ এবং সব ধরনের ফ্ল্যাট-বটম প্যান ব্যবহারের সুবিধা রয়েছে।
কিয়াম মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মতিয়ার রহমান হায়দার বলেন, গত দুই সপ্তাহে গ্যাস সিলিন্ডারের দাম বৃদ্ধি ও অনেক এলাকায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় বৈদ্যুতিক কুকারের বিক্রি বেড়েছে।
তিনি আরও বলেন, গ্যাসের নিয়মিত সমস্যা মানুষকে বিকল্প রান্না পদ্ধতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। ফলে বৈদ্যুতিক চুলার চাহিদা বেড়েছে।
মতিয়ার রহমান বলেন, ইন্ডাকশন ও ইনফ্রারেড—দুই ধরনেরই কুকার রয়েছে কিয়ামের। তবে বাজারে আমাদের দখল তুলনামূলকভাবে কম।
তিনি বলেন, ইন্ডাকশন কুকারে নির্দিষ্ট ধরনের পাত্র প্রয়োজন হয়, কিন্তু ইনফ্রারেড কুকারে যেকোনো ফ্ল্যাট-বটম বা সমতল পাত্র ব্যবহার করা যায়। এ কারণে অনেক ভোক্তা ইনফ্রারেড চুলা পছন্দ করেন।