মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের জেরে বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে জ্বালানি তেল, গ্যাস, সার, পরিবহন ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য ও কৃষি উপকরণ সরবরাহ, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বাজার স্থিতিশীলতার ওপর জোর দিচ্ছে বিএনপি সরকার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, ব্যবসায়ীদের আস্থা অর্জন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কৃষি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে ‘ফার্মারস কার্ড’ ও ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রবর্তন, সার্কুলার অর্থনীতির মাধ্যমে বর্জ্যকে জ্বালানিতে রূপান্তর, তিস্তা ব্যারেজ মহাপরিকল্পনা পুনরায় চালুর উদ্যোগ এবং দুর্নীতি রোধ ও বাজার স্থিতিশীল রাখার কার্যকর পদক্ষেপ। এছাড়া গণতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট সংকটের বিষয়টিকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। এ কারণেই সরকার উদ্যোগ নিয়েছে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে উৎপাদন সচল রাখা এবং মানুষের জীবনযাত্রায় অপ্রয়োজনীয় কষ্ট বাড়তে না দেওয়া।
তিনি বলেন, আমরা দ্রুত উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করেছি, যার কাজ হলো যুদ্ধ পরিস্থিতির সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন করা এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় একটি কার্যকর ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট প্রস্তুত করা। কমিটিতে অর্থ, জ্বালানি, বাণিজ্য, স্বরাষ্ট্র, প্রবাসী কল্যাণ, খাদ্য ও স্থানীয় সরকারের মতো সব গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়কে যুক্ত করা হয়েছে, যাতে সমন্বিত এবং বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়।
তিনি বলেন, আমাদের প্রস্তুতি কয়েকটি স্তরে এগোচ্ছে। প্রথমত, জ্বালানি তেল, এলএনজি ও সারের মজুত, আমদানি ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্যও কাজ চলছে। তৃতীয়ত, প্রয়োজন হলে বিদ্যুৎ, কৃষি ও জরুরি খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে জ্বালানি বণ্টনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অর্থাৎ আমরা প্যানিক রেসপন্স নয়, প্ল্যানড রেসপন্সের পথে হাঁটছি।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা মন্ত্রণালয়ের অন্যতম প্রধান কাজ। বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরদিন থেকেই রমজান মাস শুরু হয়েছে। প্রস্তুতির জন্য খুব বেশি সময় না থাকলেও দেশে যে পরিমাণ খাদ্যপণ্যের সরবরাহ মজুত আছে, তা দিয়ে বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখা সম্ভব, শঙ্কার কোনো কারণ নেই।
খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর বলেন, ২০২৬ সালের পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে আমাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। বৈশ্বিক পরিসরে বাংলাদেশকে শক্ত অবস্থানে নিতে আগামী পাঁচ বছরের প্রতিটি দিন, প্রতিটি ঘণ্টা আমরা পরিকল্পরা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করব।
দেশের রপ্তানি পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর। তার মতে, চার-পাঁচ মাস ধরে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ধারায় আছে, যার প্রভাব বাজারে পড়েছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে রপ্তানি খাতে বৈচিত্র্য আনার বিকল্প নেই। আগামী দিনে বিষয়গুলো মোকাবিলা করাই সরকারের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।
এদিকে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অর্থনীতির কঠিন একসময়ে দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ১৭ বছরে নানা চড়াই-উত্রাইয়ে নিজেকে ‘শাণিত’ করা তারেক রহমান এমন একসময় বাংলাদেশকে সাজানোর ক্ষমতা পেয়েছেন, যখন ব্যাংক খাত লুটপাটে পথহারা। দেশ চলছে ধারদেনায়।
অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ফিন্যানশিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান মামুন রশীদ বলেন, একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকারের প্রথম এবং প্রধান কাজ ভেঙে পড়া অর্থনৈতিক কাঠামোকে মেরামত করা। দীর্ঘদিনের লুণ্ঠনমূলক অর্থনীতি আর সুশাসনের অভাব বিনিয়োগকারীদের মনে যে গভীর আস্থাহীনতা তৈরি করেছে, তা দূর করাই প্রধান চ্যালেঞ্জ।
অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ আরো বলেন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ হাতে নিতে হবে। সবার আগে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি বন্ধ করতে কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করে একটি শক্তিশালী ও গতিশীল মুদ্রানীতি প্রণয়ন করতে হবে, যা কেবল কাগজ-কলমে নয়, বাস্তবে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি ফেরাবে। হুন্ডি বন্ধ করে বৈধ পথে রেমিট্যান্স আনা এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে বিশেষ প্রণোদনা দিতে হবে। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে বেকারত্ব, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য আর ব্যবসায়ের পরিবেশ তৈরিতে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
নিট পোশাক রপ্তানি খাতের উদ্যোক্তা ও বিকেএমইএর সাবেক প্রেসিডেন্ট ফজলুল হক বলেন, ‘আমরা ব্যবসায়ীরা নির্বাচনের আগে তারেক রহমানকে আমাদের সমস্যার কথা জানিয়েছিলাম। বিশেষ করে আইন-শৃঙ্খলার উন্নতি করা, জনজীবন-ব্যবসায় মব কালচার নিয়ন্ত্রণ করা, ব্যাংক খাত পুনর্গঠন, সুদের হার কমানো, জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো, সুশাসন নিশ্চিত করা ইত্যাদি বিষয়ে তিনি খুবই আন্তরিক।