মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদিমদের জন্য গ্রেডভিত্তিক বেতন কাঠামো নির্ধারণ করেছে সরকার। পাশাপাশি নিয়োগ, ছুটি, আবাসন ও অবসরকালীন সুবিধার বিষয়গুলোও নতুন মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০২৫–এ সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। গত সোমবার বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় নীতিমালাটি প্রকাশ করা হয়েছে বলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, খতিব ছাড়া মসজিদে কর্মরত অন্যান্য জনবলের জন্য গ্রেডভিত্তিক বেতন কাঠামো কার্যকর হবে। খতিবদের বেতন নির্ধারিত হবে চুক্তিপত্রের শর্ত অনুযায়ী। তবে আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও পাঞ্জেগানা মসজিদের ক্ষেত্রে সামর্থ্য অনুসারে বেতন-ভাতা নির্ধারণের সুযোগ রাখা হয়েছে।
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী সিনিয়র পেশ ইমামকে ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী পঞ্চম গ্রেডে, পেশ ইমামকে ষষ্ঠ গ্রেডে এবং ইমামকে নবম গ্রেডে বেতন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রধান মুয়াজ্জিন দশম গ্রেড, মুয়াজ্জিন একাদশ গ্রেড, প্রধান খাদিম পঞ্চদশ গ্রেড এবং খাদিম ষেড়শ গ্রেডে বেতন পাবেন।
জাতীয় বেতন স্কেলে পঞ্চম গ্রেডে মূল বেতন শুরু হয় ৪৩ হাজার টাকায়, সঙ্গে অন্যান্য ভাতা ও সুযোগ সুবিধা যুক্ত হয়। উপসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তারা এই গ্রেডে বেতন পান।
নীতিমালায় মসজিদে কর্মরত জনবলের কল্যাণের বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সামর্থ্য অনুযায়ী সপরিবারে আবাসনের ব্যবস্থা নিতে বলার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য মাসিক সঞ্চয়ের বিধান রাখা হয়েছে। চাকরি শেষে এককালীন সম্মাননা দেওয়ার কথাও আছে নীতিমালায়।
মসজিদে কর্মরত ব্যক্তিদের ছুটির বিষয়টি নীতিমালায় নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। কমিটির অনুমোদনক্রমে প্রতি মাসে সর্বোচ্চ চারদিন সাপ্তাহিক ছুটি ভোগ করা যাবে। এ ছাড়া পঞ্জিকাবর্ষে ২০ দিন নৈমিত্তিক ছুটি এবং প্রতি ১২ দিনে একদিন অর্জিত ছুটির বিধান রাখা হয়েছে।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে নীতিমালায় সাত সদস্যবিশিষ্ট একটি বাছাই কমিটির কথা বলা হয়েছে। এই কমিটির সুপারিশ ছাড়া কোনো পদে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া যাবে না। নিয়োগের সময় বেতন-ভাতা, দায়িত্ব ও চাকরির অন্যান্য শর্ত উল্লেখ করে নিয়োগপত্র দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।
নতুন নীতিমালায় মসজিদে নিরাপত্তা প্রহরী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। পাশাপাশি নারীদের জন্য শরিয়তসম্মতভাবে পৃথক নামাজের কক্ষ বা স্থান রাখার বিষয়েও মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটিকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে ১৫ জন করা হয়েছে। তবে মসজিদের আয়, আয়তন ও অবস্থান বিবেচনায় প্রয়োজনে এই সংখ্যা কম বা বেশি করা যাবে।
চাকরিসংক্রান্ত বিরোধের ক্ষেত্রে সংক্ষুব্ধ কোনো ব্যক্তি উপজেলা নির্বাহী অফিসার অথবা সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে পারবেন। নীতিমালা বাস্তবায়নে জটিলতা দেখা দিলে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি কমিটি তা নিরসনের দায়িত্ব পাবে।
বেতন আসবে যেসব খাত থেকে: এই বেতন কাঠামোর প্রয়োগ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতুহল দেখা দিয়েছে। গেজেটের তথ্যানুযায়ী এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াটি নিম্নরূপ:
সরকারি ও মডেল মসজিদ: সরকার কর্তৃক সরাসরি পরিচালিত মসজিদ (যেমন: বায়তুল মোকাররম, আন্দরকিল্লা শাহী মসজিদ) এবং নবনির্মিত ৫৬০টি মডেল মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনরা সরাসরি সরকারি তহবিল বা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে এই স্কেলে বেতন পাবেন।
বেসরকারি বা স্থানীয় মসজিদ: পাড়া-মহল্লা বা গ্রামের স্থানীয় কমিটি দ্বারা পরিচালিত মসজিদগুলোর ক্ষেত্রে এই গেজেটটি একটি ‘আদর্শ মানদণ্ড’ হিসেবে কাজ করবে। তবে এসব মসজিদে বেতন প্রদানের মূল দায়িত্ব এখনো স্থানীয় কমিটির হাতেই থাকছে। সরকার এই কাঠামো অনুসরণ করার জন্য কমিটিগুলোকে উৎসাহিত করছে।
চাকরির বিরোধ নিষ্পত্তি: চাকরির বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসার কিংবা সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট ৩০ দিনের মধ্যে আপিল কর্মরত যেকোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি। এছাড়া, নীতিমালা বাস্তবায়নে কোনো জটিলতা দেখা দিলে তা নিরসনের জন্য জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি কমিটিও রয়েছে এ নীতিমালায়। এ নীতিমালা জারির মাধ্যমে ২০০৬ সালের মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালাটি রহিত করা হয়েছে।