জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আজ। এবার এক ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রথমবারের মতো একই দিনে ব্যালটের মাধ্যমে সংসদ সদস্য নির্বাচন ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের পক্ষে-বিপক্ষে রায় দেবেন ভোটাররা। এ নির্বাচন ঘিরে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে; মাঠে নেমেছে ৯ লাখ সদস্যের বিশাল বাহিনী। দীর্ঘদিন পর একটি মুক্ত ও নিরপেক্ষ পরিবেশে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা ছেড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ নাড়ির টানে গ্রামে গেছেন ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে।
সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীন সর্বশেষ তিনটি নির্বাচনই ছিল বিতর্কিত। এর মধ্যে ২০১৪ সালের নির্বাচন ‘একতরফা’, ২০১৮ সালে নির্বাচন ‘রাতের ভোট’ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন ‘আমি–ডামির নির্বাচন’ হিসেবে পরিচিতি পায়। ভোটারদের একটি বড় অংশই বিগত নির্বাচনগুলোতে ভোট দিতে পারেননি। গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনার পতন হয়। ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেয়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দেড় বছরের মাথায় জাতীয় সংসদ নির্বাচন হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে জানা গেছে, দুটি ভোট একই দিনে হওয়ায় ভোটগ্রহণের সময় এবার এক ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হয়ে ভোটগ্রহণ চলবে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। সংসদ নির্বাচনের জন্য সাদা ব্যালট এবং গণভোটের জন্য গোলাপী ব্যালট ব্যবহার করা হবে। এবার নিবন্ধিত ৬০টি দলের মধ্যে ৫০টি দল অংশ নিচ্ছে। ২৯৯টি আসনে মোট প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী। ইতোমধ্যে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন সাড়ে ১১ লাখের বেশি ভোটার। গতকাল বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, দেশের ভেতরে ও বাইরে মিলিয়ে ১১ লাখ ৫৭ হাজারের বেশি ভোটার পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিয়েছেন।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারেনি। ফলে মূল লড়াইটা সীমাবদ্ধ থাকছে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের মধ্যে। বিএনপি ২৯১টি আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়ছে। জামায়াতের প্রার্থী রয়েছেন ২২৮ জন, পাশাপাশি জোটের শরিক এনসিপি, এবি পার্টি এবং খেলাফত মজলিসের প্রার্থীরাও মাঠে রয়েছেন।
তবে রাজধানীর আসনগুলোর দিকে নজর সবার। বিশেষ করে ঢাকা-১৭ আসনে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিপরীতে লড়ছেন জামায়াতের স. ম. খালিদুজ্জামান। অন্যদিকে ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং বিএনপির শফিকুল ইসলাম খানের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলেছে।
ইসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবারের ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন আর হিজড়া পরিচয়ে ভোটার আছেন ১ হাজার ২৩২ জন।
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, এবার ভোটাররা সশরীর ভোট দেবেন, এমন ভোটকেন্দ্র আছে ৪২ হাজার ৬৫৯টি। আর ২৯৯টি কেন্দ্রে পোস্টাল ভোটের গণনা করা হবে। মোট ভোটকেন্দ্র ৪২ হাজার ৯৫৮টি। তিনি জানান, নির্বাচনে মোট ৪৫ হাজার ৩৩০ জন পর্যবেক্ষক থাকছেন। এর মধ্যে ৩৫০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক। বিদেশি পর্যবেক্ষকের সংখ্যা আরও কিছু বাড়তে পারে।
এই নির্বাচন কমিশনার জানান, ভোটকেন্দ্রগুলোতে নজরদারি নিশ্চিত করার জন্য ৯০ ভাগের বেশি কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। নির্বাচনে মোট ৬৯ জন রিটার্নিং কর্মকর্তা, ৯৫৮ জন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা, ৪৩ হাজার ৭৮ জন প্রিজাইডিং কর্মকর্তা, ২ লাখ ৪৭ হাজার ৮৬২ জন সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও ৫ লাখের বেশি পোলিং কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন। নির্বাচনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন ২ হাজার ৯৮ জন আর বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট আছেন ৬৫৭ জন।
মাঠে ৯ লাখ সদস্যের বিশাল বাহিনী: গণতন্ত্রের মহোৎসব উদযাপনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এবার দেশে আট বাহিনীর প্রায় ৯ লাখ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। গত রোববার থেকে পুলিশ সদস্যরা মাঠে নেমেছেন। এর মধ্যে পুলিশ বাহিনীর এক লাখ ৮৭ হাজার সদস্য নির্বাচনি দায়িত্বে রয়েছেন। এছাড়া এক লাখ ৫৮ হাজার সদস্য সরাসরি ভোটকেন্দ্র ও স্ট্রাইকিং ফোর্সে থাকছেন। বাকি ২৯ হাজার সাপোর্ট সদস্য হিসেবে কাজ করবেন। তারা আজ ভোটের দিন এবং আগামী দুদিন টানা দায়িত্ব পালন করবেন।
গত ২০ জানুয়ারি থেকেই এক লাখ সেনাসদস্য মাঠে কাজ করছেন। এছাড়া বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ৩৭ হাজার ৪৫৩ সদস্য মোতায়েন রয়েছেন। বরাবরের মতো সবচেয়ে বড় জনবল জোগান দিচ্ছে আনসার বাহিনী। পাঁচ লাখ ৬৭ হাজার ৮৬৮ সদস্যের মধ্যে পাঁচ লাখ ৫৫ হাজার ৯৫৮ জন সরাসরি কেন্দ্র পাহারায় থাকছেন। এছাড়া র্যাবের সাত হাজার ৭০০ সদস্যও রয়েছেন। দেশজুড়ে ৭০০টির বেশি টহল টিম থাকছে। নৌবাহিনীর পাঁচ হাজার, বিমান বাহিনীর তিন হাজার ৭৩০, কোস্ট গার্ডের তিন হাজার ৫৮৫ সদস্য মাঠে দায়িত্ব পালন করবেন। বিজিবি ও কোস্ট গার্ড উপকূলীয় এবং দুর্গম এলাকাগুলোতে ১৮ জানুয়ারি থেকেই দায়িত্ব পালন শুরু করেছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ১৩ হাজার ৩৯০ সদস্য থাকছেন।
এদিকে, কোস্ট গার্ডের ১০০ প্লাটুন উপকূলীয় ও নদীতীরবর্তী দুর্গম এবং গুরুত্বপূর্ণ এলাকার ভোটকেন্দ্রে থাকছে। চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, কক্সবাজার, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী ও খুলনা জেলার ৬৯ ইউনিয়নের ৩৩২ কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনে মাঠে রয়েছে তারা।
বডিক্যাম ও ড্রোন : প্রযুক্তির নতুন ‘ডিজিটাল প্রহরী’: এবার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ও স্বচ্ছতার রক্ষাকবচ হলো ‘বডিক্যাম’ বা বডিওর্ন ক্যামেরা।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশের উচ্চমাত্রার ঝুঁকিপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রে ২৫ হাজার ৫০০ বডি ওর্ন ক্যামেরা রাখা হচ্ছে। এর মধ্যে ১৫ হাজার ক্যামেরায় সিমকার্ড যুক্ত থাকছে, অর্থাৎ অনলাইনে থাকছে। আর অফলাইনে থাকছে ১০ হাজার। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে সদর দপ্তরের কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টার থেকে সরাসরি লাইভ দেখা যাবে। এতে রয়েছে আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) এবং ফেস রিকগনিশন সিস্টেম। কোনো কেন্দ্রে গণ্ডগোল শুরু হলে ‘এসওএস’ বার্তার মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সতর্ক সংকেত বেজে উঠবে থানা ও এসপি অফিসে। রাতের অন্ধকারেও স্পষ্ট ভিডিও ধারণে সক্ষম নাইট ভিশন ক্যামেরাগুলো জিপিএসের মাধ্যমে নির্দিষ্ট এলাকায় ডিউটিরত ফোর্সের অবস্থান নিশ্চিত করবে এবং নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে গেলে স্বয়ংক্রিয় অ্যালার্ম বেজে উঠবে।
এছাড়া আকাশপথে নজরদারির জন্য এক হাজার ড্রোন এবং বিস্ফোরক শনাক্তকরণে ৫০টি ডগ স্কোয়াড ইউনিট প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, উসকানি বা ভুয়া তথ্য ছড়ানো ঠেকাতে সাইবার মনিটরিং টিম সার্বক্ষণিক কাজ করছে। সন্দেহজনক কনটেন্ট শনাক্ত হলে দ্রুত অপসারণ ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভোট গণনা যেভাবে: ভোট গণনার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল বলেন, ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই কেন্দ্রে গণনার প্রক্রিয়া শুরু হবে। প্রথমে সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ব্যালট আলাদা করা হবে। সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ব্যালট যুগপৎভাবে একই সময়ে গণনা করা হবে। দুটি ভোটের ফলাফলও একসঙ্গে ঘোষণা করা হবে। ভোটকেন্দ্রে ভোটের ফলাফল ঘোষণা করা হবে।
এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, বেশির ভাগ কেন্দ্রের ফলাফল ভোটের দিন মাঝরাতের মধ্যে চলে আসবে বলে তারা আশা করছেন। পরদিন সকালে সব ভোটকেন্দ্রের ফলাফল একীভূত করে ফরম–১৮–তে লিপিবদ্ধ করে প্রার্থী বা এজেন্টের উপস্থিতিতে রিটার্নিং কর্মকর্তারা সই করবেন। এটার ভিত্তিতে ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করা হবে।