আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে দেশে ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেলের দাম পুনর্নির্ধারণ করেছে সরকার। প্রতিটি জ্বালানি পণ্যের দাম একলাফে অনেকটা বাড়লেও রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোতে মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষার চিরচেনা চিত্রটি বদলায়নি। আজ রোববার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বর্ধিত মূল্যে তেল কিনতে আসা মানুষের চাপে পাম্পগুলোতে তেলের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা আগের মতোই বিরাজ করছে। বিশেষ করে মিরপুর-১৪, মহাখালী, রমনা ও মতিঝিলের মতো ব্যস্ততম এলাকাগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি সড়ক ছাপিয়ে মূল রাস্তায় চলে এসেছে, যা নগরীর স্বাভাবিক ট্রাফিক ব্যবস্থায়ও প্রভাব ফেলছে।
সরেজমিনে মিরপুর-১৪ নম্বর এলাকায় একটি ফিলিং স্টেশনের সামনে প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ সারি লক্ষ্য করা যায়। সেখানে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারের পাশাপাশি গণপরিবহনের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল। অন্যদিকে রমনা এলাকার চিত্র ছিল কিছুটা ভিন্ন; সেখানে ব্যক্তিগত গাড়ির চাপ বেশি থাকলেও বাইকের উপস্থিতি অন্যান্য দিনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক দেখা গেছে। তবে মতিঝিল এলাকায় ডিজিটাল পদ্ধতিতে শৃঙ্খলা ফেরাতে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। সেখানে ‘করিম অ্যান্ড সন্স’ ফিলিং স্টেশনসহ বেশ কিছু পয়েন্টে ‘ফুয়েল পাশ’ ছাড়া কোনো বাইককে তেল দেওয়া হচ্ছে না, যা নতুন এই ব্যবস্থার সাথে অভ্যস্ত না হওয়া চালকদের জন্য বাড়তি বিড়ম্বনা তৈরি করেছে।
গতকাল শনিবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, তেলের দাম এক ধাক্কায় অনেকটা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি লিটার অকটেনের দাম ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ টাকা করা হয়েছে। পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ১৯ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৫ টাকায়। এছাড়া ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বেড়ে ১১৫ টাকা এবং কেরোসিনের দাম ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারিও জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা হয়েছিল, যার দুই মাস যেতে না যেতেই আবারও বড় ধরণের মূল্যবৃদ্ধির মুখে পড়লেন দেশের সাধারণ মানুষ।
পাম্পে অপেক্ষারত চালকদের বক্তব্যে চরম ক্ষোভ ও নিরুপায় অবস্থার চিত্র ফুটে উঠেছে। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা বাসচালক সেলিম জানান, পরিস্থিতির ভয়াবহতার কারণে তিনি এখন একদিন তেল সংগ্রহ করেন এবং অন্যদিন গাড়ি চালান। তাঁর মতে, দাম বাড়লেও যদি লাইনে দাঁড়ানোর ভোগান্তি কমত, তবে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যেত। তিনি বলেন, "দাম বেশি নিলে নিক, কিন্তু এই সাত-আট ঘণ্টার প্রতীক্ষা থেকে মুক্তি চাই।" আবার ফুড ডেলিভারি কর্মী মনিরের কণ্ঠে ছিল জীবন সংগ্রামের করুণ চিত্র। তিনি জানান, মোটরসাইকেল চালানোই তাঁর পরিবারের আয়ের একমাত্র উৎস। অকটেনের দাম যাই হোক না কেন, সেটি সংগ্রহ করা তাঁর জন্য বাধ্যতামূলক। বাইক বন্ধ হয়ে গেলে তাঁর পরিবারের অন্নসংস্থানও বন্ধ হয়ে যাবে।
নীতিনির্ধারকরা বিশ্ববাজারের সাথে সমন্বয় এবং সরবরাহ সচল রাখার স্বার্থে এই মূল্যবৃদ্ধিকে অপরিহার্য বললেও সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক বাজেটে এটি এক বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে পরিবহন ভাড়া ও নিত্যপণ্যের দামের ওপর এর সরাসরি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। উচ্চমূল্য সত্ত্বেও পাম্পগুলোতে এই নজিরবিহীন ভিড় মূলত জ্বালানি তেলের তীব্র চাহিদা এবং আমদানিনির্ভর অর্থনীতির এক নাজুক পরিস্থিতিকেই নির্দেশ করছে। সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই ভোগান্তি সহসা কাটছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।