ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ওপর গণভোটে ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদের ওপর গণভোট উপলক্ষে দেশবাসীকে সাহস নিয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি এই নির্বাচনকে কেবল প্রতিনিধি বাছাইয়ের প্রক্রিয়া হিসেবে নয়, বরং গত ১৭ বছরের স্বৈরাচারী শাসন ও নীরবতার বিরুদ্ধে জনগণের এক জোরালো জবাব হিসেবে অভিহিত করেন। প্রধান উপদেষ্টা দেশবাসীকে নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, “আমি আপনাদের কাছে অনুরোধ নয়, দাবি জানাচ্ছি-ভয়কে পেছনে রেখে, সাহসকে সামনে এনে ভোটকেন্দ্রে যান। আপনার একটি ভোট শুধু একটি সরকার নির্বাচন করবে না; এটি ১৭ বছরের নীরবতার জবাব দেবে, বাধাহীন ফ্যাসিবাদের জবাব দেবে, জাতিকে নতুনভাবে গঠিত করবে এবং প্রমাণ করবে—এই দেশ তার তরুণ ও নারী এবং সংগ্রামী জনতার কণ্ঠ আর কোনওদিন হারাতে দেবে না।”
আসন্ন নির্বাচনের গুরুত্ব তুলে ধরে ড. ইউনূস দিনটিকে ‘নতুন বাংলাদেশের জন্মদিন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ভোটারদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে তিনি বলেন, “আপনার মূল্যবান ভোট দিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা খুলে দিন। দেশের চাবি আপনার হাতে। সে চাবিটি সঠিকভাবে ব্যবহার করুন।” এই নির্বাচন ও গণভোটের মাধ্যমেই রাষ্ট্র কোন পথে পরিচালিত হবে, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জনগণ নেবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। নির্বাচনকে অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করতে অন্তর্বর্তী সরকার সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা জানান, এবার রেকর্ডসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসম্পন্ন সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। প্রযুক্তির ব্যবহারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সারা দেশে প্রথমবারের মতো সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে এবং নজরদারিতে ড্রোন ও ডগ স্কোয়াড ব্যবহারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
নির্বাচনকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে ঐতিহাসিক পদক্ষেপের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে অধ্যাপক ইউনূস জানান, প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিরা ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। এ ছাড়া সরকারি কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি এবং আইনি হেফাজতে বা কারাগারে থাকা যোগ্য নাগরিকদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা প্রমাণ করে রাষ্ট্র সবাইকে নিয়ে এগোতে চায়। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি বিশৃঙ্খলা বর্জন করার আহ্বান জানিয়ে তিনি সতর্ক করে বলেন যে, একটি ত্রুটিপূর্ণ বা সহিংস নির্বাচন শেষ পর্যন্ত কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনে না। যারা ইতিপূর্বে জনগণের মতামত উপেক্ষা করে অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছে, তাদের কঠিন জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নির্বাচন নিয়ে অপপ্রচার ও গুজব ছড়ানো মহলের বিষয়ে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, তথ্য যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনে ‘নির্বাচনবন্ধু’ হটলাইন ৩৩৩-এ যোগাযোগ করতে হবে। ক্ষমতা হস্তান্তর প্রসঙ্গে সকল প্রকার বিভ্রান্তি দূর করে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, “এখন অপপ্রচার চালানো হচ্ছে যে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবে না। এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আপনারা নিশ্চিত থাকুন, নির্বাচনে বিজয়ী প্রতিনিধিদের কাছে দ্রুততম সময়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করে এই সরকার বিদায় নেবে। আমরা এই শুভ মুহূর্তের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।”
জুলাই জাতীয় সনদকে গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকনির্দেশনা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জানান, ৩০টিরও বেশি রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে এই সনদ প্রস্তুত করা হয়েছে এবং গণভোটের মাধ্যমে জনগণই এর চূড়ান্ত সংস্কার কাঠামোর বৈধতা দেবেন। ভাষণের শেষাংশে দেশবাসীকে দায়িত্ববোধ নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “ভয় নয়– আশা নিয়ে; উদাসীনতা নয়– দায়িত্ববোধ নিয়ে আমরা ভোটকেন্দ্রে যাব। আপনার ভোটেই রচিত হবে গৌরবময় আগামীর বাংলাদেশের ইতিহাস।”