মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং এর ফলে নতুন করে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সতর্কবার্তা দিয়েছে। এ সংঘাতের ফলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দশমিক ১-২ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের এ সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বজুড়ে খুচরা পণ্যের দাম বাড়তে পারে।
সতর্কবার্তায় আন্তর্জাতিক এ প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা জানিয়েছেন, জ্বালানি তেলের দাম ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পায় এবং তা বছরের অধিকাংশ সময়জুড়ে বজায় থাকে, তাহলে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ৪০ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। সোমবার (৯ মার্চ) জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক সভায় তিনি এই সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
বর্তমান অস্থিতিশীল বিশ্ব পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে আইএমএফ প্রধান নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশে বলেন, ‘এই পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিবেশে অপ্রত্যাশিত বিষয়গুলো নিয়েও ভাবা এবং সেভাবেই আগাম প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।’
তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতির সহনশীলতাকে আবারও বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। জ্বালানি তেলের বাজার অস্থির হলে তা সরাসরি পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়, যার প্রভাব পড়ে নিত্য পণ্যের ওপর। আইএমএফ-এর এই সতর্কবার্তা মূলত বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে মন্দা বা উচ্চ মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি নির্দেশ করছে।
এদিকে, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রভাব পড়ছে তেলের বাজারে। বিশ্ববাজারে টানা বেড়েই চলেছে দাম। সোমবার তেলের দাম ২৫ শতাংশ বেড়েছে, যা ২০২২-এর মধ্যভাগের পর সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি। এর ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে এখন ব্যারেল প্রতি দাঁড়িয়েছে ১১০ মার্কিন ডলার। অন্যদিকে, সোনার দামে পতন হয়েছে দুই শতাংশ। তাছাড়া ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সংঘাতে দাম বাড়ছে ডলারের। তেলের দাম বাড়ায় কৃষিজাত পণ্যেরও দাম বাড়ছে।
মার্কেট অ্যানালিস্ট টনি সিকামোর রয়টার্সকে জানান, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার কোনো লক্ষণ না দেখা যাওয়ায় বাজারে তার প্রভাব পড়ছে। বাজারে এর ফল দীর্ঘমেয়াদি হবে বলে জানান তিনি।
মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় বিশ্ব অর্থনীতির পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত হতে পারে: ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জেরে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতির ধাক্কা বিশ্ব অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। নাজুক বিশ্ব অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর যে সম্ভাবনা ছিল, এ সংঘাত সেটিকে বিলম্বিত করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, বিশ্ব অর্থনীতি দারুণ সহনশীলতা দেখিয়েছে। ধাক্কার পর ধাক্কা সত্ত্বেও বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৩ শতাংশে রয়েছে। এ সংঘাতের ফলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দশমিক ১-২ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের অনুমান, চলতি বছরের শেষে গিয়ে যুক্তরাজ্য এবং ইউরোজোনে (ইউরোপীয় ইউনিয়নের যেসব দেশ ইউরো ব্যবহার করে) মূল্যস্ফীতি আগের পূর্বাভাসের চেয়ে দশমিক ৫-৬ শতাংশ পয়েন্ট বেশি হতে পারে। গত জানুয়ারিতে যুক্তরাজ্যে মূল্যস্ফীতি ছিল ৩ শতাংশ। আর ফেব্রুয়ারিতে ইউরোজোনে তা ছিল ১ দশমিক ৯ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের চলতি বছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস এখনো ২ দশমিক ২ শতাংশে অপরিবর্তিত রয়েছে। এর কারণ হলো, পাইকারি বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি দেশটির ফ্র্যাকিং (তেল ও গ্যাস উত্তোলনকারী) কোম্পানিগুলোর বড় মুনাফার মাধ্যমে আংশিকভাবে সামলানো হচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তারা এখন থেকেই সরাসরি আর্থিক চাপের মুখে পড়ছেন।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল রিসার্চের মতে, এ সংঘাতের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হলে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দশমিক ২ শতাংশ কমে যেতে পারে। যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে সরকারি পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ১ শতাংশ হওয়ার কথা থাকলেও তা কমে দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে।
একইভাবে ইউরোপীয় কমিশনের পূর্বাভাস, ইউরোজোনের প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমে ১ শতাংশে নেমে আসতে পারে। নিম্ন প্রবৃদ্ধি দীর্ঘ সময় ধরে চললে, তা বিনিয়োগকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, সুদের হার বাড়াবে এবং সরকারি কোষাগারে চাপ সৃষ্টি করবে। নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের চাপে থাকা সাধারণ মানুষের জন্য এটি নতুন সংকট তৈরি করবে।
বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারক ও অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করেছেন, এ সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বজুড়ে খুচরা পণ্যের দাম বাড়তে পারে। পাশাপাশি চলতি বছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও সংশোধন করার দরকার হতে পারে।