মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রাজসাক্ষী হয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের জবানবন্দি শেখ হাসিনার দুঃশাসনের এক অকাট্য দলিল। চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম গতকাল সংবাদ সংস্থা বাসসকে বলেন, ‘চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন যে জবানবন্দি দিয়েছেন, তা অবশ্যই শেখ হাসিনার দুঃশাসনের অকাট্য দলিল।’
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ গত মঙ্গলবার জবানবন্দি দেন চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন।
সেসময় তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল তাকে ফোন করে জানান যে আন্দোলন দমনে সরাসরি প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন শেখ হাসিনা। তখন তিনি পুলিশ সদর দপ্তরে ছিলেন এবং তার সামনে ছিলেন তৎকালীন অতিরিক্ত ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদার। পরে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের এই নির্দেশনা তৎকালীন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ সারাদেশে পৌঁছে দেন প্রলয় কুমার। সেদিন থেকেই মারণাস্ত্র ব্যবহার শুরু হয়।
চৌধুরী মামুন আরও জানান, এই মারণাস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে অতি উৎসাহী ছিলেন ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর ও ডিএমপির সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ। এক্ষেত্রে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের নির্দেশ ছিল, যেকোনো মূল্যে আন্দোলন দমন করতে হবে।
সাবেক আইজিপি তার জবানবন্দিতে বলেন, শেখ হাসিনাকে মারণাস্ত্র ব্যবহারে প্ররোচিত করতেন ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান, আনিসুল হক, সালমান এফ রহমান, রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মির্জা আজম, ফজলে নূর তাপস ও মোহাম্মদ আলী আরাফাত।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান দমাতে হেলিকপ্টার ও ড্রোন ব্যবহার বিষয়ে জবানবন্দিতে তিনি বলেন, হেলিকপ্টার ও ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছিল সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে। যার পরামর্শ দিয়েছিলেন র্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক হারুন অর রশীদ। আন্দোলনপ্রবণ এলাকাগুলো ভাগ করে ব্লক রেইড দিয়ে হেলিকপ্টার, ড্রোন ও মারণাস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনরত অসংখ্য ছাত্র-জনতাকে হত্যা ও আহত করা হয়। আন্দোলন দমনে সরকারকে উৎসাহিত করেন আওয়ামীপন্থি বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও ব্যবসায়ীরা।
জবানবন্দিতে ‘কোর কমিটি’র মিটিং বিষয়ে চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই থেকে প্রায় প্রতি রাতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের ধানমন্ডির বাসায় ‘কোর কমিটি’র বৈঠক হত। সব বৈঠকেই আন্দোলন দমনসহ সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হত। একটি বৈঠকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের আটক করার সিদ্ধান্ত হয়।
ডিজিএফআই এই প্রস্তাব দেয় উল্লেখ করে মামুন বলেন, তিনি এর বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে পরে রাজি হন। আর সমন্বয়কদের আটকের দায়িত্ব তৎকালীন ডিবি প্রধান হারুনকে দেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত মোতাবেক ডিজিএফআই ও ডিবি তাদের আটক করে ডিবি হেফাজতে নিয়ে আসে। সমন্বয়কদের ডিবি হেফাজতে এনে আন্দোলনের বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আপস করার জন্য চাপ দেওয়া হয় এবং তাদের আত্মীয়স্বজনদের ডিবিতে এনে চাপ দেওয়া হয়। একপর্যায়ে সমন্বয়কদের আন্দোলন প্রত্যাহার করে টেলিভিশনে বিবৃতি দিতে বাধ্য করা হয়। এ ব্যাপারে তৎকালীন ডিবি প্রধান হারুন অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন সাবেক এই আইজিপি। তিনি জানান, ডিবির তৎকালীন প্রধান হারুনকে ‘জিন’ বলে ডাকতেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বেলা ১১টায় গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নিরাপত্তা সমন্বয় কমিটির বৈঠক সম্পর্কেও তথ্য দিয়েছেন আবদুল্লাহ আল-মামুন। তিনি জানান, ওই বৈঠকে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, তিন বাহিনীর প্রধান, এসবির প্রধান, ডিজিএফআইয়ের প্রধান, এনএসআইয়ের প্রধানের সঙ্গে তিনিসহ মোট ২৭ জন উপস্থিত ছিলেন। জুলাই আন্দোলন দমন এবং নিয়ন্ত্রণ করা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়। সেখানে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন তুলে ধরছিল। কিন্তু চারদিকে পরিবেশ-পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হওয়ায় বৈঠকটি মুলতবি করা হয়।
তবে ওইদিন রাতে গণভবনে আবারও বৈঠক ডাকা হয় বলেও জবানবন্দিতে জানান সাবেক আইজিপি মামুন। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার সঙ্গে শেখ রেহানা, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, তিন বাহিনীর প্রধান, র্যাবের মহাপরিচালক ও সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মজিবুর রহমানসহ তিনিও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তবে তৎকালীন ডিজিএফআই প্রধান ও এসবির প্রধান বাইরে অপেক্ষমাণ ছিলেন।
ওই বৈঠকে ৫ আগস্ট আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঠেকানোর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয়, পুলিশ ও সেনাবাহিনী সমন্বয় করে দায়িত্ব পালন করবে। ওই বৈঠক থেকে সেনাবাহিনীর অপারেশন কন্ট্রোল রুমে যান বলে জবানবন্দিতে চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, সেখানে (কন্ট্রোল রুম) তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী, তিন বাহিনীর প্রধান, র্যাবের মহাপরিচালক, ডিজিএফআইয়ের প্রধান, এসবির প্রধান ও মজিবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। সেখানে ঢাকা শহরের প্রবেশমুখে কঠোর অবস্থান নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয় এবং ৪ আগস্ট রাত সাড়ে ১২টায় সেনাবাহিনীর অপারেশন কন্ট্রোল রুম থেকে তারা সবাই চলে যান।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের বিষয়ে জবানবন্দিতে তিনি জানান, সেদিন সকালে পুলিশ হেডকোয়ার্টারে আমার দপ্তরে যাই। এর মধ্যে উত্তরা-যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন পথ দিয়ে ছাত্র-জনতা স্রোতের মতো প্রবেশ করতে থাকে। দুপুর ১২টা থেকে ১টার মধ্যে জানতে পারি ক্ষমতা ছেড়ে দেবেন প্রধানমন্ত্রী। ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে তিনি কোথায় যাবেন তা জানতাম না। এরপর বিকেলে আর্মির হেলিকপ্টার এসে পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে আমাকে প্রথমে তেজগাঁও বিমানবন্দরের হেলিপ্যাডে নেওয়া হয়। সেখান থেকে ক্যান্টনমেন্টের অফিসার্স মেসে নিয়ে যাওয়া হয়। হেলিকপ্টারে আমার সঙ্গে এসবি প্রধান মনিরুল, ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিব ও ডিআইজি আমেনা ছিলেন।
পরে হেলিকপ্টারে এডিশনাল ডিআইজি প্রলয়, এডিশনাল আইজি লুৎফুল কবিরসহ অন্যদেরও সেখানে নেওয়া হয়। পরদিন ৬ অগাস্ট আইজিপি হিসেবে তার নিয়োগ চুক্তি বাতিল করা হয় এবং ক্যান্টনমেন্টে থাকাকালে ৩ সেপ্টেম্বর তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলেও জানান মামুন।
আন্দোলনের দিনগুলোর বর্ণনা দিতে গিয়ে চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ২৭ জুলাই আন্দোলন চলাকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, স্বরাষ্ট্র সচিব জাহাঙ্গীর, ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ আমরা নারায়ণগঞ্জে আন্দোলনের পরিস্থিতি দেখতে যাই। পথে যাত্রাবাড়ী থানার সামনে আমরা কিছুক্ষণ অবস্থান করি।
ওই সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে মোবাইলে একটি ভিডিও দেখান ওয়ারি জোনের ডিসি ইকবাল। ভিডিও দেখিয়ে ইকবাল বলেন যে, ‘গুলি করি, একজন মরে। সেই যায়। বাকিরা যায় না।’ পরবর্তীতে এই ভিডিও সারাদেশে ভাইরাল হয়।
২০১৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজির দায়িত্বে ছিলেন উল্লেখ করে জবানবন্দিতে আল-মামুন বলেন, তখন পুলিশের আইজিপি ছিলেন জাবেদ পাটোয়ারী। নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট বাক্সে ৫০ শতাংশ ব্যালট ভর্তি করে রাখার পরামর্শ শেখ হাসিনাকে এই জাবেদ পাটোয়ারী দিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন।
পরবর্তীতে সরকারের পক্ষ থেকে ডিসি, এসপি, ইউএনও, এসিল্যান্ড, ওসি ও দলীয় নেতা-কর্মীদের সেই নির্দেশনা দেওয়া হয় এবং তারা সেটা বাস্তবায়ন করেন। যেসব পুলিশ কর্মকর্তা এই নির্দেশনা যথাযথভাবে পালন করেছেন, তাদের পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কৃত করা হয়।
২০২০ সালের ১৪ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত র্যাবের মহাপরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, র্যাব সদর দপ্তর পরিচালিত উত্তরাসহ র্যাব-১ এর কার্যালয়ের ভেতরে টিএফআই সেল (টাস্কফোর্স ইন্টারোগেশন সেল) নামে একটি বন্দিশালা ছিল। র্যাবের অন্যান্য ইউনিটের অধীনেও অনেক বন্দিশালা ছিল। এসব বন্দিশালায় রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বী এবং সরকারের জন্য হুমকি হয়ে ওঠা ব্যক্তিদের আটকে রাখা হত, যা একটা কালচারে (সংস্কৃতি) পরিণত হয়েছিল।
তার ভাষ্যমতে, অপহরণ, গোপন বন্দিশালায় আটক, নির্যাতন এবং ক্রসফায়ারের মাধ্যমে হত্যার মত কাজগুলো র্যাবের এডিজি (অপারেশন) এবং র্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালকেরা সমন্বয় করতেন। আর র্যাবের মাধ্যমে কোন ব্যক্তিকে উঠিয়ে আনা, আটক রাখা কিংবা হত্যা করার নির্দেশনাগুলো সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে আসত এবং এই নির্দেশনাগুলো সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকের মাধ্যমে আসত বলে জানতে পারেন বলেও জবানবন্দি দেন সাবেক আইজিপি।
সেসব নির্দেশনা চেইন অব কমান্ড ভঙ্গ করে সরাসরি এডিজি (অপারেশন) ও র্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালকদের কাছে পাঠানো হতো বলে উল্লেখ করেন চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন।
ব্যারিস্টার আরমান আটক থাকার বিষয়টি তিনি আইজিপির দায়িত্ব গ্রহণের সময় জানানো হয় বলেও উল্লেখ করেন চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। তিনি বলেন, র্যাবের সাবেক ডিজি বেনজীর আহমেদ বিষয়টি আমাকে অবহিত করেন। তাকে তুলে আনা এবং গোপনে আটক রাখার সিদ্ধান্ত সরকারের ছিল।
বিষয়টি জানার পর আমি প্রধানমন্ত্রীর সামরিক উপদেষ্টা তারিক সিদ্দিকের সঙ্গে কথা বলি। তিনি আমাকে বলেন, ‘ঠিক আছে, রাখেন। পরে বলব।’ কিন্তু পরে আর কিছু তিনি জানাননি। এরপর আমি কয়েকবার বিষয়টি তুলেছিলাম, কিন্তু কোন প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমন করতে গিয়ে সরকারের আদেশে অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করে নৃশংস হত্যাকাণ্ড হয়েছে উল্লেখ করে জবানবন্দিতে সাবেক আইজিপি বলেন, আমি পুলিশ প্রধান হিসেবে লজ্জিত, অনুতপ্ত ও ক্ষমাপ্রার্থী। জুলাই আন্দোলনে যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড হয়েছে, তার জন্য আমি অপরাধবোধ ও বিবেকের তাড়নায় রাজসাক্ষী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পরবর্তী সময়ে আমি ট্রাইব্যুনালে স্বজন হারানোদের কান্না, আকুতি ও আহাজারি দেখেছি। ভিডিওতে নৃশংসতা দেখে অ্যাপ্রুভার হওয়ার সিদ্ধান্ত আমি যৌক্তিক মনে করছি।
তিনি আরও বলেন, বিশেষ করে হত্যাকাণ্ডের পর আগুন দিয়ে লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার মত বিভৎসতা আমাকে ভীষণভাবে মর্মাহত করেছে। আমি সাড়ে ৩৬ বছর পুলিশে চাকরি করেছি। পুলিশের চাকরি খুবই ট্রিকি। সব সময় পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসে। চাকরি জীবনের শেষ পর্যায়ে আমার দায়িত্বশীল সময়ে এসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এর দায় আমি স্বীকার করছি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের নির্দেশে এই গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। আমি প্রত্যেক নিহতদের পরিবার, আহত ব্যক্তি, দেশবাসী ও ট্রাইব্যুনালের কাছে ক্ষমা চাইছি। আমাকে দয়া করে ক্ষমা করে দিবেন। আমার এই সত্য ও পূর্ণ বর্ণনার মাধ্যমে সত্য উদঘাটন হলে আল্লাহ যদি আমাকে আরও হায়াত (বাঁচিয়ে রাখেন) দান করেন, বাকি জীবনে কিছুটা হলেও অপরাধবোধ থেকে মুক্তি পাব।
এদিকে, সাবেক আইজিপির জবানবন্দি দেওয়ার পর চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, রাজসাক্ষী হওয়া চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন ক্ষমা পাবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত ট্রাইব্যুনাল নেবেন। তিনি নিজের বিবেকের তাড়নায় অপরাধ স্বীকার করেছেন। নিজের পক্ষ থেকে রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন করেছিলেন।
তাজুল ইসলাম আরও বলেন, সাবেক আইজিপি ট্রাইব্যুনালে যে সাক্ষ্য দিয়েছেন, বিশ্বের কোন আদালতেই এ সাক্ষ্যকে দুর্বল প্রমাণ করার সুযোগ নেই। এটি একটি অকাট্য অপ্রতিরোধ্য সাক্ষ্য। এটি শুধু জুলাই-আগস্টের ঘটনা নয়, বাংলাদেশে গত ১৫ বছরে যত গুম-খুন হয়েছে তার বিরুদ্ধে অকাট্য দলিল হিসেবেও কাজ করবে।
ট্রাইব্যুনালে এই মামলায় প্রসিকিউশন পক্ষে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। সঙ্গে ছিলেন বিএম সুলতান মাহমুদ, প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, মঈনুল করিম, আবদুস সাত্তার পালোয়ানসহ অন্য প্রসিকিউটররা।
এই মামলায় পলাতক শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে ছিলেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন। আর সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদ।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান চালিকাশক্তি রেমিট্যান্সের সূচনালগ্নের কৃতিত্ব শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে প্রদান করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, পরবর্তীকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুযোগ্য নেতৃত্বে সেই ধারাকে সুসংহত করা হয়েছিল। শুক্রবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত মে দিবসের এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতি তাঁর বক্তব্যে বলেন, “আজ যে রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি তার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সেই ধারা সমুন্নত রেখে শ্রমিকদের একাধিক সমাবেশে শ্রমিক সমাজের সঙ্গে একাত্ব ঘোষণা করেন।” তিনি আরও বলেন যে, “জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত ত্রিপক্ষীয় শ্রম নীতি ও সংস্কার শ্রমকল্যাণের ভিত্তিতে ভিত্তিকেই শক্তিশালী করেছে। ১৯৭৬ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন মিনিস্ট্রি অব ম্যানপাওয়ার। এ সময় তিনি মধ্যপ্রাচ্যসহ ৩৩টি দেশে বাংলাদেশি শ্রমিক পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। এই উদ্যোগই পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহের নতুন যুগের সূচনা করে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ‘শ্রম আইন ২০০৬’ প্রণয়ন ও শ্রম কল্যাণ ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠাসহ শ্রমিকের অধিকার কর্মসংস্থান ও কল্যাণের ভিতকে আরও বিস্তৃত করেন। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার দেশের আপামর শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণ ন্যায্য অধিকার রক্ষা শারীরিক ও মানসিক সুস্বাস্থ্য সুস্বাস্থ্য নিরাপদ ও নিরাপদ ও শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নানাবিধি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।”
দেশের সামগ্রিক অগ্রযাত্রায় মেহনতি মানুষের অনবদ্য ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করে রাষ্ট্রপতি বলেন, শ্রমিকরাই উন্নয়নের প্রকৃত রূপকার। শিল্প-কারখানা থেকে শুরু করে কৃষি ও পরিবহনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি খাতে তাদের অক্লান্ত শ্রম আমাদের সমাজ ও সভ্যতার ভিত্তিকে সমৃদ্ধ করছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, প্রবাসী ভাইদের পাঠানো অর্থ এবং পোশাক খাতের শ্রমিকদের ঘামঝরানো উপার্জনই আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী রাখে।
রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষণে সরকারের কার্যক্রমের কথা তুলে ধরে আরও বলেন যে, “সরকার প্রতিশ্রুতি অনুসারে শ্রমিকদের কল্যাণে ঘোষিত কর্মপরিকল্পনার সবগুলোই ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করছেন। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র দুই মাসের মধ্যে সরকারি মালিকানাধীন বন্ধ বন্ধ চিনিকল রেশম পাট ও শিল্প কল কারখানা চালু করে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়। চলতি বছরের ছয় মাসের মধ্যে পর্যায়ক্রমে ছয়টি পাঠকল চালু করার চিন্তাভাবনা রয়েছে।”
মালিক ও শ্রমিকের মধ্যকার সুসম্পর্কের ওপর গুরুত্বারোপ করে রাষ্ট্রপতি একটি টেকসই শিল্প উন্নয়নের জন্য পারস্পরিক আস্থার আহ্বান জানান। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, “শ্রমিক ও মালিক পারস্পরিক আস্থা সম্পর্ক সহযোগিতা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ কর্মপরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি টেকশই শিল্প উন্নয়ন ও সুরক্ষিত কর্মসংস্থান দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। শ্রম খাতে শিল্প সম্পর্ক বজায় রাখা ও শ্রমিক মালিক এর অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ট্রেড ইউনিয়নের কার্যক্রমকে উৎসাহ দিতে এই সরকার সচেষ্ট।”
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার শ্রমবান্ধব নীতি ও কর্মসংস্থান প্রসারের মাধ্যমে মেহনতি মানুষের জীবনমান পরিবর্তনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। আজ শুক্রবার সকালে রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে মহান মে দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মাহদী আমিন তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, বর্তমান প্রশাসন প্রতিটি শ্রমিকের নিরাপত্তা ও জীবনমান উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। দক্ষ জনবল তৈরি এবং নিরাপদ কর্মক্ষেত্র নিশ্চিত করার মাধ্যমে আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য সুনিশ্চিত করা হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। শ্রমিকের গুরুত্ব তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, “শ্রমজীবী মানুষই বিশ্বের যেকোনো দেশের উন্নয়ন, সমৃদ্ধি এবং অগ্রযাত্রার প্রধান চালিকাশক্তি। শ্রমিকের নিরলস পরিশ্রমেই গড়ে ওঠে শিল্প, কৃষি, অবকাঠামো ও শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি। সুতরাং তাদের জীবনমান উন্নয়ন, ন্যায্য অধিকার নিশ্চিতকরণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা—এসবই যেকোনো গণতান্ত্রিক, দায়িত্বশীল সরকারের অগ্রাধিকার।”
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সংসদীয় পরিবেশের প্রশংসা করে মাহদী আমিন জানান, জনগণের ক্ষমতায়নের প্রতিফলন প্রতিটি স্তরে দৃশ্যমান হচ্ছে। তিনি বলেন, “সংসদের প্রথম অধিবেশনে যে প্রাণচাঞ্চল্য, জনগণের সমস্যা নিয়ে যে গভীর আলোচনা এবং মুক্ত বাকস্বাধীনতা ও মানবাধিকারের প্রশ্নে সবার সম্মিলিত অবস্থান আমরা দেখেছি, সেটিই জনগণের ক্ষমতায়নের প্রতীক। আগামী দিনগুলোতেও প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এই ইতিবাচক ধারা ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ বর্তমান সরকার অব্যাহত রাখবে—এটিই আমাদের প্রতিশ্রুতি। এই ধারাবাহিকতায় সরকারের সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও দায়বদ্ধতার মাধ্যমে একদিকে যেমন নারীর ক্ষমতায়ন হবে, যুবকদের ক্ষমতায়ন হবে, তেমনি শ্রমিকদের ক্ষমতায়নেও সর্বোচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগত প্রাধান্য দেওয়া হবে।”
বর্তমান সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলোকে পূর্ববর্তী সফল ধারার অংশ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জানান, “জনগণের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে, শ্রমবান্ধব নীতি, কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ এবং কল্যাণমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনকে অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছে।” এসময় তিনি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করে বলেন, “প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানও বিশ্বাস করতেন, শ্রমিকের দুটি হাতই রাষ্ট্র ও সমাজের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি।”
দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত তৈরি পোশাক খাতের উন্নয়নের প্রসঙ্গ টেনে মাহদী আমিন বলেন, “দেশের বৃহত্তম শ্রমঘন খাত পোশাক শিল্প—যার রপ্তানির ওপর দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের অর্থনীতি—আজ যে অবস্থানে পৌঁছেছে, তা মূলত বিএনপি সরকারের নীতিমালার ফল। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের ধারাবাহিকতায় শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার যে প্রচেষ্টা, তা বর্তমান নির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে অব্যাহত রয়েছে।”
মহান মে দিবস উপলক্ষে আজ শুক্রবার সকাল থেকেই রাজধানী ঢাকার রাজপথ শ্রমজীবী মানুষের পদভারে মুখরিত হয়ে ওঠে। তোপখানা রোডে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে জড়ো হয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক, শ্রমিক ও পেশাজীবী সংগঠন নিজেদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে বিক্ষোভ, সমাবেশ ও বর্ণাঢ্য র্যালি করেছে। গানে, স্লোগানে আর মিছিলে তারা শ্রমিকের মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানান।
শ্রমজীবীদের পক্ষ থেকে বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা কমানো, মাতৃত্বকালীন ছুটি নিশ্চিত করা এবং কর্মক্ষেত্রে নারীবান্ধব পরিবেশসহ নানা দাবি উত্থাপন করা হয়। রানা প্লাজা ও তাজরিন ট্র্যাজেডির মতো ঘটনার বিচারসহ নিয়োগপত্র প্রদান, অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার এবং নিত্যপণ্যের দাম কমানোর মতো জীবনঘনিষ্ঠ দাবিগুলোও জোরালোভাবে উঠে আসে।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক ফ্রন্টের শীর্ষ স্থানীয়রা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘‘নতুন সরকারের কাছে আমাদের চাওয়া, বারবার যেন আমাদের দাবি নিয়ে পথে নামতে না হয়। তারা যেন শ্রমিকদের দাবিগুলো পূরণ করেন। আমাদের জন্য যেন গণতান্ত্রিক শ্রম আইন করা হয়। কারণ গণতান্ত্রিক শ্রম আইন ছাড়া শ্রমিকদের মুক্তি নেই।’’
শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) নেতৃবৃন্দ নূন্যতম মজুরি বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘শ্রমিকদের নূন্যতম মজুরি ৩০ হাজার করতে হবে। নাহলে আমাদের যে দাস প্রথা, সেটি সমাজ থেকে যাবে না।’’ তাঁরা আরও উল্লেখ করেন, ‘‘আমরা মনে করি শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে প্রথমে শ্রম আইন বাস্তবায়ন করতে হবে। শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করে সেটার বাস্তব প্রয়োগ করতে হবে।’’
শ্রমিকদের ঐক্যে ফাটল ধরানোর চেষ্টার সমালোচনা করে বক্তারা মালিকপক্ষের ভূমিকার তীব্র প্রতিবাদ জানান। তাঁরা বলেন, ‘‘শ্রমিকরা যেন একত্রিত হয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে না পারি সেজন্য মালিকপক্ষ দালাল তৈরি করে রাখে। শ্রমিকদের বিভক্ত করে রাখে। এগুলো বন্ধ করতে হবে। আমাদের শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। নিজেদের জন্য লড়াই করে, সংগ্রাম করে বেচে থাকতে হবে।’’
বিড়ি শ্রমিকরা আগামী বাজেটে শুল্ক না বাড়ানো ও রেশন সুবিধা চালুর দাবি করেন। পাশাপাশি ট্যাক্সি ও অটোরিকশা চালক ইউনিয়ন অবিলম্বে মজুরি বোর্ড গঠন করে নূন্যতম বেতন ৩৫ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানায়। অন্যদিকে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন (টাফ) জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত বিভিন্ন চুক্তি বাতিল এবং বিদেশের মাটিতে সামরিক হামলার নিন্দাসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক ও কৌশলগত দাবি উপস্থাপন করে।
এই মেগা জমায়েতে কর্মজীবী নারী, জাগো বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন, আওয়াজ ফাউন্ডেশন, সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন এবং সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টসহ আরও বহু সংগঠন সংহতি প্রকাশ করে অংশ নিয়েছে।
সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালনের আড়ালে অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে মোহাম্মদপুর থানার দুই উপ-পরিদর্শক (এসআই) এবং এক সহকারী উপ-পরিদর্শককে (এএসআই) প্রশাসনিক কারণে প্রত্যাহার করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ডিএমপি সদর দপ্তরের উপ-পুলিশ কমিশনার (সদর দপ্তর ও প্রশাসন) আমীর খসরু স্বাক্ষরিত এক আদেশে এই বদলি নিশ্চিত করা হয়।
প্রত্যাহার হওয়া কর্মকর্তারা হলেন মোহাম্মদপুর থানার সিভিল টিমের ইনচার্জ এসআই সাধন মণ্ডল, এসআই রেজাউল করিম রেজা এবং এএসআই সোহেল রানা। অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশনা সম্বলিত এই আদেশে জানানো হয় যে, তাঁদের বর্তমান কর্মস্থল থেকে সরিয়ে ডিএমপির সদর দপ্তর ও প্রশাসন বিভাগের কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে।
প্রশাসনিক প্রয়োজনে গৃহীত এই বদলি আদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, “ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, ঢাকার তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর থানায় কর্মরত নিম্নলিখিত পুলিশ সদস্যদের প্রশাসনিক কারণে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে (ডিএমপি) সদর দপ্তর ও প্রশাসন বিভাগের কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত করা হলো।” অভিযুক্ত এই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনৈতিক উপায়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠলে প্রাথমিক তদন্ত ও প্রশাসনিক বিবেচনায় এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে আজ শুক্রবার রাজধানীর নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এক বিশাল সমাবেশ আয়োজন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দুপুর আড়াইটা থেকে শুরু হতে যাওয়া এই বিশেষ কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি হিসেবে সশরীরে উপস্থিত হয়ে ভাষণ দেবেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার পর মে দিবস উপলক্ষে আয়োজিত কোনো প্রকাশ্য শ্রমিক সমাবেশে রাজধানীতে এটিই তাঁর প্রথম সশরীরে অংশগ্রহণ ও বক্তব্য হতে যাচ্ছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই সমাবেশের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা পেশ করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান। তিনি জানান, ঢাকা ও এর আশপাশের জেলাগুলো থেকে অগণিত শ্রমজীবী মানুষ এবং দলীয় নেতাকর্মীরা এই সমাবেশে যোগ দেবেন বলে দলটি প্রত্যাশা করছে। কেন্দ্রীয় নেতাদের দাবি অনুযায়ী, এই জমায়েত শেষ পর্যন্ত জনসমুদ্রে পরিণত হবে এবং লাখো মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত হবে।
জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের উদ্যোগে আয়োজিত এই সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশ নেবেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলটির শীর্ষ পর্যায়ের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। সংবাদ সম্মেলনে নজরুল ইসলাম খান বর্তমান প্রেক্ষাপট তুলে ধরে উল্লেখ করেন যে, শ্রমজীবী মানুষ বর্তমানে নানাবিধ সংকটের মধ্য দিয়ে সময় পার করছে। তাঁর মতে, উপযুক্ত জাতীয় বেতন স্কেলের অভাব, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া বৃদ্ধি এবং শ্রমবাজারের সংকুচিত অবস্থার কারণে শিক্ষিত বেকারত্ব মহামারি আকার ধারণ করেছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, বিগত সময়ে বিভিন্ন সরকারি পদ বিলুপ্ত করে আউটসোর্সিংয়ের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর ফলে সাধারণ শ্রমিকের কর্মের সুযোগ কমেছে। এর ফলে পাট খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী শিল্পগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং স্থানীয় পণ্যের পরিবর্তে বিদেশি মালামালের ওপর দেশের নির্ভরতা বহুগুণ বেড়েছে। আজকের এই সমাবেশ থেকে শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষায় অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, শোভন কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রেশনিং সুবিধা চালুর মতো গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলো পুনরায় জোরালোভাবে উত্থাপন করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বায়ুদূষণের প্রকোপ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে রাজধানী ঢাকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন জনবহুল শহরে। এমনকি বৃষ্টির মধ্যেও আজ ঢাকার বাতাসের মান মাঝারি থেকে অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে রয়েছে। শুক্রবার বেলা ১১টায় আন্তর্জাতিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইকিউএয়ার-এর তথ্যানুযায়ী, ১০৭ স্কোর নিয়ে দূষিত শহরের তালিকায় ৫ম অবস্থানে উঠে এসেছে ঢাকা।
একই সময়ে ১৩৩ স্কোর নিয়ে বায়ুদূষণের শীর্ষে অবস্থান করছে চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী প্রাগ, যেখানকার আবহাওয়া সংবেদনশীল মানুষের জন্য অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে পাকিস্তানের লাহোর, যার স্কোরও ১৩৩। এছাড়া ১৩২ স্কোর নিয়ে ভারতের দিল্লি তৃতীয় এবং ১২৯ স্কোর নিয়ে কলকাতা চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে, যা ওইসব অঞ্চলের সংবেদনশীল জনগোষ্ঠীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
বায়ুমান সূচকের মানদণ্ড অনুযায়ী, শূন্য থেকে ৫০ স্কোরকে ভালো এবং ৫১ থেকে ১০০ স্কোরকে মাঝারি ধরা হয়। তবে স্কোর ১০১ থেকে ১৫০ হলে তা সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর হিসেবে গণ্য হয়। সূচক ১৫১ থেকে ২০০ এর মধ্যে থাকলে তাকে ‘অস্বাস্থ্যকর’ এবং ২০১ থেকে ৩০০ স্কোরকে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ বলা হয়। এমন পরিস্থিতিতে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের ঘরের বাইরে চলাচল সীমাবদ্ধ রাখার পরামর্শ প্রদান করা হয়। এছাড়া ৩০১ থেকে ৪০০ স্কোরকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ধরা হয়, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি স্বরূপ।
সাধারণত বাতাসে বিদ্যমান বিভিন্ন বস্তুকণা ও গ্যাসীয় উপাদানের ওপর ভিত্তি করে এই দূষণের মাত্রা নির্ধারণ করা হয়। বিশেষ করে পিএম২.৫, পিএম১০, নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড ও ওজোনের মতো উপাদানের আধিক্য জনস্বাস্থ্যের গুরুতর ক্ষতি করে। বায়ুদূষণ সব বয়সীদের জন্য ক্ষতিকর হলেও শিশু, প্রবীণ এবং অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ভারতের আসাম রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার বাংলাদেশ নিয়ে বিতর্কিত ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাকা। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পাওয়ান বঢ়েকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে তাঁকে মন্ত্রণালয়ে ডেকে সরকারের পক্ষ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদপত্র হস্তান্তর করা হয়।
কূটনৈতিক সূত্র অনুযায়ী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (দক্ষিণ এশিয়া অনুবিভাগ) ইশরাত জাহানের দপ্তরে বিকেল ৫টার দিকে ভারতীয় দূতকে উপস্থিত হতে বলা হয়। সেখানে আসামের মুখ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্য নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়।
চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এবিপি-র লাইভ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ও কথিত অনুপ্রবেশকারী নিয়ে বিতর্কিত দাবি করেন হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। বিশেষ করে ‘পুশব্যাক’ বা অনানুষ্ঠানিকভাবে সীমান্ত দিয়ে মানুষ ঠেলে দেওয়া সংক্রান্ত তাঁর বক্তব্যকে ঢাকা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে। অনিবন্ধিত সন্দেহভাজন বাংলাদেশিদের হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে আসামের মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, “ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তা করা কঠিন। তাই তারা রাত নামা পর্যন্ত অপেক্ষা করেন এবং যখন সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কোনো সদস্য উপস্থিত থাকেন না, তখন অন্ধকারের আড়ালে তাদের সীমান্ত পেরিয়ে ঠেলে দেন।”
এই মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতীয় দূতকে স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, কোনো প্রকার তথ্যপ্রমাণ ছাড়া এ ধরনের স্পর্শকাতর দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে দায়িত্বহীন মন্তব্য করা দুই প্রতিবেশী দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের জন্য মোটেই সহায়ক নয়। যেকোনো অমীমাংসিত সমস্যা বা দ্বিপক্ষীয় সংকট সমাধানের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন এবং বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অনুসরণ করা বাঞ্ছনীয় বলে ঢাকা জোর দেয়। সেই সঙ্গে ভবিষ্যতে দুই দেশের বিদ্যমান সুসম্পর্ককে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে—এমন বক্তব্য প্রদান থেকে বিরত থাকতে ভারতীয় রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের পরম পবিত্র ও সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শুভ বুদ্ধপূর্ণিমা আজ শুক্রবার যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হচ্ছে। প্রায় আড়াই সহস্রাব্দ আগে এই পুণ্য তিথিতেই জগতের আলোর দিশারি মহামতি গৌতম বুদ্ধ ধরাধামে এসেছিলেন। তাঁর জন্মলগ্নে আবির্ভাব, বোধিজ্ঞান লাভ এবং মহাপরিনির্বাণ—এই তিন স্মৃতিবিজড়িত বৈশাখী পূর্ণিমাই বিশ্বজুড়ে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কাছে বুদ্ধপূর্ণিমা হিসেবে চিরস্মরণীয়।
সাম্য, মৈত্রী ও অহিংসার পথে চলে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া মহামতি বুদ্ধের দর্শনের মূল ভিত্তি। অহিংসবাদের এই মহান প্রচারকের অমর দর্শন অনুযায়ী— “বৈরিতা দিয়ে বৈরিতা কিংবা হিংসা দিয়ে হিংসা কখনো প্রশমিত হয় না; বরং অহিংসা দিয়ে হিংসাকে এবং অবৈরিতা দিয়ে বৈরিতাকে প্রশমিত করতে হয়।” এই শাশ্বত দর্শনকে হৃদয়ে ধারণ করে আজ সারা দেশে বৌদ্ধ উপাসকগণ বুদ্ধপূজা, শীল গ্রহণ, পিণ্ডদান ও ভিক্ষু সংঘের প্রাতরাশসহ নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দিনটি অতিবাহিত করছেন।
এই পবিত্র দিবস উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে সৌজন্য ও শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় তিনি দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করেন যে, “দল-মত ও ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে দেশের প্রত্যেক মানুষ যাতে শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে বসবাস করতে পারে, এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর।”
বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অভিনন্দন জানিয়ে সরকারপ্রধান আরও উল্লেখ করেন, “প্রতিটি ধর্মই মানুষকে কল্যাণের দিকে আহ্বান করে। বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মগুরু মহামতি গৌতম বুদ্ধ তার অনুসারীদের জন্য পঞ্চশীল নীতি দিয়েছিলেন। এই পঞ্চশীল নীতি হলো– প্রাণী হত্যা না করা, চুরি না করা, ব্যভিচার না করা, মিথ্যা না বলা এবং মাদক থেকে বিরত থাকা। প্রেম, অহিংসা এবং সর্বজীবে দয়াও বৌদ্ধধর্মের শিক্ষা।”
উৎসবকে ঘিরে রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় অবস্থিত আন্তর্জাতিক বৌদ্ধবিহারে দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে বাংলাদেশ বুড্ডিস্ট ফেডারেশন। আজ সকালে বিহারে বুদ্ধপূজা ও শীল গ্রহণের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। এছাড়া সূর্যাস্তের পর সন্ধ্যা ছয়টায় বুদ্ধপূর্ণিমার মাহাত্ম্য ও তাৎপর্য নিয়ে বিশেষ আলোচনা সভা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি জানিয়েছে, দিনটি উদযাপনে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।
আজ পহেলা মে, বিশ্বজুড়ে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় দিন হিসেবে মহান মে দিবস পালিত হচ্ছে। এ বছর বাংলাদেশে মে দিবস এবং জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি দিবস উদযাপিত হচ্ছে ‘সুস্থ শ্রমিক, কর্মঠ হাত; আসবে এবার নব প্রভাত’ এই বিশেষ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে।
দিবসটি পালন করতে সরকারিভাবে নানাবিধ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে, পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক ও শ্রমিক সংগঠনও সমাবেশ, শোভাযাত্রা এবং আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। এরই অংশ হিসেবে আজ শুক্রবার রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল এক সমাবেশের ডাক দিয়েছে, যেখানে উপস্থিত থাকবেন দলটির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
ঐতিহাসিক এই দিবসের প্রেক্ষাপট মূলত ১৮৮৬ সালের ১ মে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটের ঘটনা। সে সময় ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর পুলিশি হামলায় বেশ কয়েকজন প্রাণ হারান। সেই বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগের মাধ্যমেই শ্রমিকের অধিকার নিয়ে বিশ্বব্যাপী জোরালো দাবি ওঠে এবং পরবর্তীতে শ্রমজীবী মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়। শিকাগোর শ্রমিকদের সেই সংগ্রামকে স্মরণ করেই আন্তর্জাতিকভাবে এ দিনটিকে শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন হিসেবে গণ্য করা হয়।
মে দিবস উপলক্ষে পৃথক বাণী প্রদান করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সকল শ্রমজীবী মানুষকে অভিনন্দন জানিয়ে রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে উল্লেখ করেন, “শ্রমিকের অধিকার ও পেশাগত নিরাপত্তার গুরুত্ব বিবেচনায় এ বছরের মে দিবস বিশ্বব্যাপী শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক গৌরবোজ্জ্বল দিন।”
রাষ্ট্রপতি আরও বলেন যে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় যে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন, বর্তমান সরকার সেই পথ অনুসরণ করে শ্রম আইন সংস্কার, ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার এবং বন্ধ শিল্প পুনরায় চালুর মাধ্যমে শ্রমিক সমাজের ভাগ্যোন্নয়নে নানাবিধ কর্মসূচি ও নীতি বাস্তবায়ন করছে।
মে দিবসের বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শ্রমিকের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, “শ্রমিকের নিরলস পরিশ্রমেই গড়ে ওঠে শিল্প, কৃষি, অবকাঠামো ও সমৃদ্ধ অর্থনীতি। সুতরাং তাদের জীবনমান উন্নয়ন, ন্যায্য অধিকার নিশ্চিতকরণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ সৃষ্টি এবং সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধানতম অঙ্গীকার।”
তিনি আরও দৃঢ়তার সঙ্গে ব্যক্ত করেন যে, “শ্রমবান্ধব নীতি, কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ এবং কল্যাণমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন নিশ্চিত করা সম্ভব।”
মহান মে দিবস ও জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি দিবস উপলক্ষে দেশ-বিদেশে কর্মরত সব শ্রমজীবী মানুষের প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ বছর মে দিবসের প্রতিপাদ্য—‘সুস্থ শ্রমিক, কর্মঠ হাত, আসবে এবার নব প্রভাত’—উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শ্রমজীবী মানুষই দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি। তাদের শ্রমেই গড়ে ওঠে শিল্প, কৃষি, অবকাঠামো ও অর্থনীতির ভিত।’ বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) দেওয়া এক বাণীতে তিনি ১৮৮৬ সালের হে মার্কেট আন্দোলনে শ্রমিকদের আত্মত্যাগ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
তিনি বলেন, ‘শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন, ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ সৃষ্টি এবং সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা সরকারের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার।’ শ্রমবান্ধব নীতি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং কল্যাণমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদানের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘শ্রমিক কল্যাণ ও শ্রমবাজার সম্প্রসারণে তার নেওয়া উদ্যোগগুলো দেশের অর্থনীতির ভিত্তিকে শক্তিশালী করেছে।’ বিশেষ করে প্রবাসী শ্রমবাজার সৃষ্টিতে তার ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘শ্রম আইন সংস্কার, মজুরি নির্ধারণ, শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন গঠনসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে শ্রমিকদের উন্নয়নে কাজ করা হয়েছে।’ পোশাক খাতের শ্রমিকদের কল্যাণেও নানা পদক্ষেপ নেওয়ার কথা তুলে ধরেন তিনি।
বাণীতে প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর ৩৯টি কনভেনশন ও একটি প্রোটোকল অনুসমর্থন করেছে এবং সংস্থাটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি বলেন, ‘শ্রমিকদের সময়মতো বেতন-ভাতা প্রদান, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, নারী-পুরুষ সমান মজুরি এবং প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
শেষে প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, শ্রমিকের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিতের মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। পাশাপাশি মে দিবসের সকল কর্মসূচির সফলতা কামনা করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি মানুষ যাতে শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে বসবাস করতে পারে, এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) সকালে সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জনপ্রশাসন সভাকক্ষে শুভ বৌদ্ধ পূর্ণিমা উপলক্ষে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।
সকাল ১০টায় সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জনপ্রশাসন সভাকক্ষে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতারা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান সরকার ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করতে চায় না। ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে আমরা ব্যবহার করতে চাই না, অতীতেও আমরা তা করিনি। আমাদের সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে, ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালি-অবাঙালি বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী সবাই সকল ক্ষেত্রে সমানভাবে অধিকার ভোগ করবে, এটাই বর্তমান সরকারের নীতি।’
নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার আকাঙ্ক্ষাতেই মুক্তিযোদ্ধারা এ দেশ স্বাধীন করেছিলেন মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী প্রতিটি মানুষের জন্যই একটি নিরাপদ বাংলাদেশ বিনির্মাণের আকাঙ্ক্ষা নিয়েই মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন করেছিলেন। মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সবাই মিলে লাখো প্রাণের বিনিময়ে এই দেশটা আমরা স্বাধীন করেছিলাম। মুক্তিযুদ্ধের সময় কে কোন ধর্মের অনুসারী, কে বিশ্বাসী কিংবা অবিশ্বাসী—এটি কারও জিজ্ঞাসা ছিল না। তাই এই স্বাধীন বাংলাদেশ আপনার-আমার, আমাদের সকলের।’
তারেক রহমান আরও বলেন, ‘বর্তমান সরকারের একটি রাজনৈতিক দর্শন ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’। বাংলাদেশে এটি বারবার প্রমাণিত হয়েছে, একমাত্র বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শনই দেশের সকল বর্ণ, ধর্মীয় সম্প্রদায় ও নৃগোষ্ঠীর নিবিড় সহাবস্থান নিশ্চিত করতে পারে। সুতরাং, আপনারা কেউ নিজেদের কখনোই সংখ্যালঘু ভাববেন না। রাষ্ট্র আমার-আপনার-আমাদের সবার পরিচয়। আমরা প্রত্যেকে, প্রত্যেক নাগরিক, সকলে ‘আমরা বাংলাদেশি’।’
বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মগুরু মহামতি গৌতম বুদ্ধ তার অনুসারীদের জন্য পঞ্চশীল নীতি দিয়েছিলেন। এই পঞ্চশীল নীতি হলো প্রাণী হত্যা না করা, চুরি, ব্যভিচার, মিথ্যা এবং মাদক থেকে বিরত থাকা। প্রেম, অহিংস এবং সর্বজীবে দয়াও বৌদ্ধধর্মের শিক্ষা।’
তিনি বলেন, ‘প্রতিটি নাগরিক প্রত্যেকেই যে যার ধর্মীয় রীতি-নীতি ও অধিকার বিনা বাধায়—স্বাধীনভাবে অনুসরণ-অনুকরণ ও ভোগ করতে পারে—এমন একটি রাষ্ট্র ও সমাজ বিনির্মাণই হচ্ছে আমাদের সরকারের প্রধানতম দায়িত্ব ও অঙ্গীকার। দলমত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ যাতে শান্তি এবং নিরাপত্তার সঙ্গে বসবাস করতে পারে, তেমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর।’
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, ধর্মমন্ত্রী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দিপেন দেওয়ান, প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল উদ্দিন, প্রধানমন্ত্রীর হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও নৃগোষ্ঠীবিষয়ক বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার, পার্বত্য বান্দরবানের সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরী, পার্বত্য অঞ্চলের বিএনপি মনোনীত সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য প্রার্থী মাধবী মারমা এবং ড. সুকোমল বড়ুয়া। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর হাতে বৌদ্ধদের পক্ষ থেকে একটি শুভেচ্ছা ক্রেস্ট এবং বুদ্ধমূর্তির প্রতিবিম্ব তুলে দেওয়া হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকটে সৌরবিদ্যুৎ হতে পারত সবচেয়ে কার্যকর ও সাশ্রয়ী বিকল্প। কিন্তু অনেক সম্ভাবনার এই খাতটি নজিরবিহীন দুর্নীতি, জালিয়াতি ও সিন্ডিকেট বাণিজ্যের কারণে গতি হারিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সৌরবিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতির পথ প্রশস্ত করা হয়েছিল ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন ২০১০’-এর মাধ্যমে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো টেন্ডার বা প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া ছাড়াই ‘ক্লিন এনার্জি’র দোহাই দিয়ে পছন্দের ব্যক্তিদের কাজ দেওয়া হয়।
ফলে প্রকৃত বাজারমূল্যের চেয়ে বহুগুণ বেশি দরে বিদ্যুৎ কেনার অসম চুক্তি (পাওয়ার পারচেস অ্যাগ্রিমেন্ট-পিপিএ) করতে বাধ্য হয় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রতিবেদন বলছে, ‘আওয়ামী আমলে প্রতি মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ পড়ে গড়ে ৮ কোটি টাকা। সেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ৬ প্রকল্পে গড়ে প্রতি মেগাওয়াটে ব্যয় হয়েছে ১৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অর্থাৎ কেবল ৬টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পেই প্রায় ২ হাজার ৯২৬ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। অন্যদিকে ৫টি প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ২৪৯ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কৃষিজমিকে অকৃষি দেখিয়ে এবং ভুয়া মৌজা দর ব্যবহার করে প্রকল্পের ব্যয় আকাশচুম্বী করা হয়।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সৌরবিদ্যুৎ খাতের এই লুটপাটের নেপথ্যে ছিল উচ্চপদস্থ আমলা ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
এ বিষয়ে এক্সিলন বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবতাহী ইসলাম শুভ বলেন, ‘বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রতিমন্ত্রীর রেফারেন্স না থাকলে লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) পাওয়া সম্ভব ছিল না। দুঃখজনক হলেও সত্য যে যেখানে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী একটা সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প শেষ করতে সময় বেঁধে দেওয়া হতো ১৮ মাস, সেখানে এলওআই পেতেই সময় লেগে যেত ২ থেকে ৩ বছর। প্রায় ৩২ ধাপ পার হওয়া এই এলওআই অনুমোদন পাওয়া মানেই; কিন্তু কাজ শুরু করা নয়, বরং এরপর নানা ধাপ পার হয়ে পিপিএ সম্পাদন হলে তবেই কাজ শুরু হয়।’
শুভ আরও বলেন, ‘এ ধরনের দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। কারণ, পণ্যের দাম, আমদানি খরচ, ব্যাংকের সুদ হার কোনোটিই ৩ বছর আগের মতো থাকে না। এভাবে অনেক দক্ষ প্রতিষ্ঠান প্রকল্প থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়। কিন্তু মোটা অঙ্কের আন্ডার হ্যান্ড ডিলিংস কিংবা তৎকালীন প্রতিমন্ত্রীর সুদৃষ্টি থাকার কারণে অনেক অদক্ষ প্রতিষ্ঠানও কাজ পেয়েছে নির্বিঘ্নে।’
আওয়ামী আমলের নানা অনিয়মের কথা স্বীকার করেন দেশের প্রথম সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠান এইচডিএফসি সিন পাওয়ার লিমিটেডের স্থানীয় কর্ণধার গ্রুপ ক্যাপ্টেন (অব.) এসকেএম শফিকুল ইসলামও। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের পরিস্থিতি সৌরবিদ্যুৎ প্রসারের জন্য মোটেই অনুকূল নয়।’
জ্বালানি বিশ্লেষক প্রকৌশলী ফরিদ আহমেদ পাঠান বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশগুলো যখন সৌরবিদ্যুৎকে তাদের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রধান উৎস বানাচ্ছিল, তখন বিগত আওয়ামী সরকার একে লুটপাটের মাধ্যমে পকেট ভারী করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। ভারতে সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের দাম যখন মাত্র ৩ সেন্ট, পাকিস্তানে ০.৩২ সেন্ট ও চীনে ০.৪৫ সেন্ট তখন বাংলাদেশে গড় দাম ছিল ১২ সেন্টের বেশি। অর্থাৎ প্রতিবেশী দেশ ভারতের তুলনায় চারগুণ বেশি দামে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ কেনে তৎকালীন আওয়ামী সরকার। এ পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে সৌরবিদ্যুৎ খাতে আওয়ামী আমলে কতটা দুর্নীতি হয়েছে। তাদের এই লুটপাট কেবল অর্থনৈতিক অপরাধ নয়, বরং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর চরম আঘাত।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আওয়ামী আমলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালাই ছিল না। অনেকটা বিশৃঙ্খলভাবে বিভিন্ন নীতিমালায় ২০৫০ সালে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়। আর সেটাও ছিল অগোছাল। যেমন– নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালায় ২০২৩-এ মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ, ২০৪১ সালে ৩০ শতাংশ, আবার ইন্টিগ্রেটেড এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার মাস্টার প্ল্যানে (আইইপিএমপি) ২০৩০ সালে ১০ এবং ২০২৫ সালে ৪০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। আবার জলবায়ু সমৃদ্ধ পরিকল্পনায় (২০২২) ২০৩০ সালে ৩০ শতাংশ, ২০৪১ সালে ৪০ শতাংশ ও ২০৫০ সালে ১০০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জ্বালানি সংকট চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে নিজস্ব ও নবায়নযোগ্য উৎসের গুরুত্ব কতটা। আওয়ামী লীগের আমলে সৌরবিদ্যুৎ খাতকে যদি স্বচ্ছতার ভিত্তিতে গড়ে তোলা হতো, তবে আজ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে এতটা ভোগান্তিতে পড়তে হতো না।
এ সংসদ মজলুমদের বলে মন্তব্য করে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, ‘দীর্ঘ রাজনৈতিক নিপীড়ন, মামলা-হামলা ও দমন-পীড়নের অভিজ্ঞতা নিয়েই বর্তমান সংসদের অনেক সদস্য এখানে এসেছেন। আমরা কেউ মরতে চাই না, সবাই মিলে বাঁচতে চাই— দেশকে বাঁচিয়ে তারপর বাঁচতে চাই—এই দর্শন নিয়েই বর্তমান সংসদ এগিয়ে যেতে হবে।’
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) সকালের অধিবেশনে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেছেন। এ সময় তিনি জাতীয় ঐক্য, কার্যকর সংসদ এবং গণতন্ত্র রক্ষায় সব দলের সমন্বিত ভূমিকার ওপর জোর দেন।
চিফ হুইপ বলেন, ‘বাংলাদেশ বারবার সংকট, অস্থিরতা ও রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। দুর্ভিক্ষ, গণতন্ত্রহীনতা ও স্বৈরশাসনের সময় অতিক্রম করে দেশ আজকের অবস্থানে এসেছে।’
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনে তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার আগে মানুষের স্বপ্ন ছিল গণতন্ত্র, বৈষম্যহীন সমাজ ও স্বাবলম্বী বাংলাদেশ গড়া।’
শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সেই স্বপ্নে উদ্বুদ্ধ হলেও স্বাধীনতার পর নানা দমন-পীড়ন, রক্ষী বাহিনীর অত্যাচার, দুর্ভিক্ষ ও রাজনৈতিক সংকট দেশকে হতাশার দিকে নিয়ে যায়। বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক কাঠামোও সীমিত হয়ে পড়ে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, ‘পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান নেতৃত্ব দিয়ে অর্থনীতি পুনর্গঠন ও উৎপাদনমুখী নীতি চালুর মাধ্যমে দেশকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। তার মৃত্যুর পর আবার অস্থিরতা তৈরি হলেও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন জোরদার হয়।’
চিফ হুইপ বলেন, ‘বাংলাদেশ বারবার সংকট, স্বৈরশাসন ও অন্ধকার সময় পার করে এগিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়েও নির্যাতন, গুম, বিচারহীনতা ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিজ্ঞতা রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এসব চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এখন আবার একটি ‘‘নতুন সূর্যোদয়ের’’ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।’ সেই প্রেক্ষাপটে তিনি সব পক্ষকে বিভাজন ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশের ভবিষ্যৎ গঠনের আহ্বান জানান।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্য উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘দল-মত ভিন্ন হলেও একটি ‘‘ফ্যাসিবাদমুক্ত, স্বাধীন, সার্বভৌম ও মানবিক বাংলাদেশ’’ গঠনে সবার ঐক্য থাকা উচিত।’
একইসঙ্গে তিনি বিরোধী দলের বক্তব্যেরও প্রশংসা করে বলেন, ‘কার্যকর সংসদ গঠনে অতীতের সীমাবদ্ধতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে।’
সংসদকে প্রাণবন্ত করার আগে কার্যকর করা জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সংসদ যদি কার্যকর না হয়, তাহলে শুধু প্রাণবন্ত হলেও লাভ নেই।’ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো সংসদে এনে যুক্তিসংগত সমাধানের চেষ্টা করার আহ্বান করেন তিনি।
চিফ হুইপ আরও বলেন, ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও বিভাজনের রাজনীতি পরিহার করে জাতীয় স্বার্থে ঐকমত্য গড়ে তুলতে হবে।’ উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘জ্বালানি ও গ্যাস ইস্যুতে সংসদে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেওয়ার ফলে জনমনে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।’
তিনি জানান, সরকার ও সংসদ সদস্যরা ব্যক্তিগত সুবিধা ত্যাগ করে জাতীয় স্বার্থে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ‘প্লট নেব না, গাড়ি নেব না— এই সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত লাভের জন্য নয়, জাতির স্বার্থে।’