মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ঐতিহাসিক দিনে প্রথমবারের মতো রাজধানীর তেজগাঁওস্থ কার্যালয়ে দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ শনিবার সকাল ১০টা ১০ মিনিটে তিনি কার্যালয়ে পৌঁছালে তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার এবং অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। নবগঠিত সরকারের প্রধান হিসেবে তেজগাঁও কার্যালয়ে এটিই তাঁর প্রথম কার্যদিবস, যা কেন্দ্র করে সকাল থেকেই সংশ্লিষ্ট এলাকায় কড়া নিরাপত্তা ও সাজ সাজ রব বিরাজ করছিল। ২১ ফেব্রুয়ারির মতো একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিনে প্রধানমন্ত্রীর এই দাপ্তরিক যাত্রাকে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কার্যালয়ের মূল ভবনে প্রবেশের প্রাক্কালে এক আবেগঘন ও হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর মাতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সাথে দীর্ঘ সময় নিয়ে কুশলাদি বিনিময় করেন। দীর্ঘ বিরতির পর অনেক পুরোনো কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে কাছে পেয়ে তিনি তাদের নাম ধরে সম্বোধন করেন এবং প্রত্যেকের খোঁজখবর নেন। সরকারপ্রধানের এমন আন্তরিকতায় উপস্থিত কর্মীরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। প্রধানমন্ত্রীর এই সাধারণ ও বিনয়ী আচরণ দাপ্তরিক পরিবেশে এক অন্যরকম প্রাণের সঞ্চার করে, যা অনেককেই স্মৃতিকাতর করে তোলে।
দাপ্তরিক কর্মসূচি শুরু করার আগে প্রধানমন্ত্রী পরিবেশ সুরক্ষা ও প্রকৃতির প্রতি মমতা প্রকাশে কার্যালয় চত্বরে একটি ‘স্বর্ণচাঁপা’ ফুলের চারা রোপণ করেন। বৃক্ষরোপণ শেষে তিনি দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা কামনায় মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জ্ঞাপন করে বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন। এরপর তিনি মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে একটি বিশেষ স্মারক ডাকটিকিট উন্মোচন করেন। ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং জাতীয় ঐতিহ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই তাঁর আজকের দিনের কার্যক্রমগুলো সাজানো হয়।
প্রধানমন্ত্রীর এই প্রথম কর্মদিবসে তাঁর সাথে উপস্থিত ছিলেন প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলামসহ সরকারের উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ। দীর্ঘ এক রাজনৈতিক লড়াই ও পটপরিবর্তনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তেজগাঁও কার্যালয়ে নিয়মিত অফিস শুরু করার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে নতুন গতিশীলতা আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রশাসনিক সংস্কার এবং জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী দেশ পরিচালনার যে নতুন অধ্যায় সূচিত হয়েছে, আজকের দিনটি তার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
দেশের সাধারণ মানুষের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চলতি ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই ৪ কোটি ১০ লাখ পরিবারের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। আজ শনিবার মহান একুশে ফেব্রুয়ারি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বরিশালে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন শপন এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা প্রদান করেন। সরকারের এই বিশাল উদ্যোগটি দেশের একটি বড় অংশকে প্রত্যক্ষ সহযোগিতার আওতায় নিয়ে আসবে, যা বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্যমন্ত্রী ভাষা আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে দেশ গড়ার সংগ্রামের যোগসূত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কেবল রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মাধ্যমেই কাঙ্ক্ষিত মুক্তি ও সমৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন একটি সুসংগঠিত ও দূরদর্শী পরিকল্পনা। সেই লক্ষ্যেই বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার আগে জনগণের সামনে '৩১ দফা রাষ্ট্র মেরামত' রূপরেখা উপস্থাপন করেছিল। মন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন যে, সরকারের প্রতিটি প্রতিশ্রুতি জনগণের কাছে স্পষ্ট এবং তাঁরা সবসময় জনগণের অত্যন্ত কাছাকাছি থেকে দেশ পরিচালনার নীতিতে বিশ্বাসী। এই ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রম সেই জনবান্ধব নীতিরই একটি অংশ।
প্রশাসনিক সংস্কার এবং কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে তথ্যমন্ত্রী সভায় গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি প্রশাসনের স্বকীয়তা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে বলেন, প্রশাসনের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক যদি স্বচ্ছ না থাকে, তবে অহেতুক ভুল বোঝাবুঝি ও দূরত্ব তৈরি হয়। মন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, বিগত বছরগুলোতে প্রশাসনকে একটি নির্দিষ্ট দলের বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল, যা কাম্য ছিল না। তিনি বর্তমান কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, যারা বিগত সময়ে পরিস্থিতির শিকার হয়ে কেবল অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁদের যথাযথ সম্মান ও সুরক্ষা দেওয়া হবে। তবে যারা ব্যক্তিগত হীনস্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে স্বেচ্ছায় অন্যায় করেছেন, তাঁদের অবশ্যই চিহ্নিত করে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে।
জহির উদ্দিন শপন আরও উল্লেখ করেন যে, সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে প্রশাসনের পূর্ণ সহযোগিতা প্রয়োজন। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রতি তিনি আহ্বান জানান যেন তাঁরা কোনো রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করেন। একুশের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে দুর্নীতিমুক্ত ও বৈষম্যহীন একটি দেশ গড়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের এই সুবিধার মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের কাছে সরকারের সেবা সরাসরি পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। সভায় বরিশালের স্থানীয় প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
আজ মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নির্বাচিত প্রতিনিধিদের একাংশ। তবে এই শ্রদ্ধা নিবেদনকে কেন্দ্র করে ডাকসুর ভেতরেই অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সমন্বয়হীনতার চিত্র ফুটে উঠেছে, যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সংগঠনটির কয়েকজন সদস্য। ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম এবং জিএস এস এম ফরহাদের নেতৃত্বে একটি দল শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানালেও সেখানে ডাকসুর অনেক কার্যনির্বাহী সদস্যকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকে সরব হয়েছেন ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য সর্ব মিত্র চাকমা।
শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ৪৮ মিনিটে বিটিভির সরাসরি সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানের একটি স্ক্রিনশট শেয়ার করে সর্ব মিত্র চাকমা তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, ডাকসু যে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করতে গেছে, সেটি তিনিসহ আরও কয়েকজন সদস্য কেবল টেলিভিশনের মাধ্যমেই জানতে পেরেছেন। তাঁর এই পোস্টে ফাতেমা তাসনিম জুমা, হেমা চাকমা, উম্মে উসওয়াতুন রাফিয়া এবং উম্মে সালমাসহ ডাকসুর অন্য সদস্যদের নাম উল্লেখ করে বিষয়টি নিয়ে বিদ্রূপ করা হয়। অভিযোগ উঠেছে যে, ভিপি ও জিএসের সাথে মূলত ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত নেতারাই সেখানে উপস্থিত ছিলেন, আর বাকি সদস্যদের পরিকল্পিতভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ডাকসুর অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র এবং অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যেও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এর আগে একুশের প্রথম প্রহরে প্রথা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। রাষ্ট্রীয় এই আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বর্তমান সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান শ্রদ্ধা জানান। তাঁর সাথে উপস্থিত ছিলেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। এর কিছু সময় পর অর্থাৎ রাত ১টার দিকে ডাকসু নেতাদের একাংশকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করতে দেখা যায়। শহীদ মিনারের মতো পবিত্র স্থানে শ্রদ্ধা নিবেদনের ক্ষেত্রেও এমন বিভাজন ও দূরত্ব তৈরি হওয়াকে অত্যন্ত দুঃখজনক বলে অভিহিত করেছেন ক্ষুব্ধ সদস্যরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সর্ব মিত্র চাকমার সেই পোস্টটি দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়, যেখানে তিনি অত্যন্ত বিদ্রূপাত্মক ভাষায় লিখেছেন, ‘আমরা বাংলাদেশ টেলিভিশনের বদৌলতে জানলাম ডাকসু শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করতে গেছে, হাহা!’ এই ঘটনার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে একুশের চেতনায় যেখানে ঐক্য ও বৈষম্যহীনতার কথা বলা হয়, সেখানে ডাকসুর মতো একটি প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠনের ভেতর এমন সমন্বয়হীনতা ও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে প্রাধান্য দেওয়ার বিষয়টি কাম্য নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। তবে এই অভিযোগের বিষয়ে ভিপি সাদিক কায়েম বা জিএস এস এম ফরহাদের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। সব মিলিয়ে মহান শহীদ দিবসের প্রথম প্রহরেই ডাকসুর অভ্যন্তরীণ এই ফাটল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতিতে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সাথে সংহতি প্রকাশ করে এবং বাংলা ভাষায় কথা বলে বিশেষ শুভেচ্ছা জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন। শনিবার সকালে ‘মার্কিন দূতাবাস, ঢাকা’-র অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় তিনি এই আন্তরিক অভিবাদন জানান। রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন তাঁর বার্তায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেন যে, ভাষা প্রতিটি মানুষের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য পরিচয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, একুশে ফেব্রুয়ারি বিশ্ববাসীকে নিজের মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার এবং নিজস্ব ইতিহাসকে ধারণ করার শিক্ষা দেয়। আমেরিকার পক্ষ থেকে বাংলাদেশের মানুষের এই মহান আত্মত্যাগের দিনে তিনি গভীর একাত্মতা প্রকাশ করেন।
এদিকে, রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে আজ যথাযোগ্য মর্যাদায় ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হচ্ছে। দিবসের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনের অমর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় তাঁর সঙ্গে মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ এবং বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে শহীদদের স্মৃতি স্মরণ করেন এবং তাঁদের আত্মার শান্তি কামনা করেন। প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পর পর্যায়ক্রমে বিরোধীদলীয় নেতা, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ, সংসদ সদস্য এবং সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রধানগণ ভাষাশহীদদের প্রতি পুষ্পস্তবক অর্পণ করে সম্মান প্রদর্শন করেন। উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরাও এই রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেন।
রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। ভোরের আলো ফোটার আগেই রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সর্বস্তরের মানুষ খালি পায়ে এবং হাতে ফুল নিয়ে শহীদ মিনারের অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানের কালজয়ী সুরের মূর্ছনায় চারপাশ এক আবেগঘন পরিবেশে রূপ নেয়। নারী, পুরুষ ও শিশুসহ সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে সুশৃঙ্খলভাবে ভাষা শহীদদের বেদিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। কেবল ঢাকাতেই নয়, দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা এবং বিদেশের মাটিতে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোতেও আজ যথাযথ মর্যাদায় দিবসটি পালিত হচ্ছে।
মার্কিন রাষ্ট্রদূতের পক্ষ থেকে বাংলায় শুভেচ্ছা প্রদান এবং আন্তর্জাতিক মহলের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ একুশের গুরুত্বকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নিজের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ধারণ করার বিষয়ে রাষ্ট্রদূতের এই বক্তব্য একুশের বিশ্বজনীন চেতনারই প্রতিফলন। আজ সারা বিশ্বে ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষার প্রতীক হিসেবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হচ্ছে, যা ১৯৫২ সালের সেই অদম্য সাহসিকতা ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে এক অনন্য বৈশ্বিক দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-২০২৬ উপলক্ষে এক বিশেষ আয়োজনের মধ্য দিয়ে রাজধানীর তেজগাঁওস্থ কার্যালয়ে নিজের প্রথম আনুষ্ঠানিক দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার সকালে তেজগাঁও কার্যালয়ে পৌঁছে তিনি ভাষা শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি বিশেষ স্মারক ডাকটিকিট অবমুক্ত করেন। নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এই কার্যালয়ে এটিই তাঁর প্রথম সরকারি স্বাক্ষর ও আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি, যার মাধ্যমে দীর্ঘ সময় পর সরকারপ্রধানের উপস্থিতিতে এই দপ্তরের প্রশাসনিক কার্যক্রম পুনরায় পূর্ণোদ্যমে সচল হলো। ২১শে ফেব্রুয়ারির মতো একটি জাতীয় ও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দিনে এই যাত্রাকে নতুন সরকারের পথচলায় এক বিশেষ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী আজ সকাল ১০টা ১০ মিনিটে তেজগাঁও কার্যালয়ে পৌঁছালে সেখানে এক উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। তাঁকে স্বাগত জানান প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার এবং অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। কার্যালয়ের মূল ভবনে প্রবেশের সময় এক অভূতপূর্ব ও আবেগঘন পরিস্থিতির অবতারণা হয়। প্রধানমন্ত্রী সেখানে কর্মরত বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময় দায়িত্ব পালনকারী অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে কাছে পেয়ে তিনি তাঁদের নাম ধরে সম্বোধন করেন এবং প্রত্যেকের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক খোঁজখবর নেন। সরকারপ্রধানের এমন সহমর্মিতা ও ব্যক্তিগত ছোঁয়ায় উপস্থিত দীর্ঘদিনের কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা পরিলক্ষিত হয়।
দাপ্তরিক কাজ শুরুর আগে প্রধানমন্ত্রী প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি গভীর মমতা প্রদর্শন করে কার্যালয় চত্বরে একটি ‘স্বর্ণচাঁপা’ ফুলের চারা রোপণ করেন। বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শেষে তিনি মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে শুকরিয়া জ্ঞাপন করেন এবং দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি ও সর্বস্তরের জনগণের কল্যাণ কামনায় আয়োজিত বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন। এই সময় প্রধানমন্ত্রী দেশ ও জাতির সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তেজগাঁও কার্যালয়ের পুনরুজ্জীবিত এই কর্মতৎপরতাকে সংশ্লিষ্টরা প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে নতুন প্রাণের সঞ্চার হিসেবে অভিহিত করছেন।
স্মারক ডাকটিকিট উন্মোচন অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত মতবিনিময় সভায় মিলিত হন এবং দেশের বর্তমান প্রশাসনিক পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলামসহ উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। ভাষা শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা এবং জাতীয় চেতনার আলোকে দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু করার এই উদ্যোগকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অত্যন্ত ইতিবাচক ও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন। এর ফলে তেজগাঁও কার্যালয়ে পুনরায় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাঞ্চল্য ফিরে এসেছে।
২১শে ফেব্রুয়ারি মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে অমর ভাষা শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ)। শনিবার দিবসের প্রথম প্রহরে রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে এই শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য এবং প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মোঃ আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে বিএমইউ প্রশাসনের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ শেষে ভাষা আন্দোলনের বীর শহীদদের আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনায় কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করা হয়।
শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের পাশাপাশি সূর্যোদয়ের সাথে সাথে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখার কর্মসূচি পালন করা হয়। শ্রদ্ধা নিবেদনকালে ভারপ্রাপ্ত উপাচার্যের সাথে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মোঃ মুজিবুর রহমান হাওলাদার, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার এবং শিশু অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. মোঃ আতিয়ার রহমান। এছাড়াও ডেন্টাল অনুষদের ডিন ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মোঃ নজরুল ইসলাম এবং প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক ডা. শেখ ফরহাদসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক, চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ এই জাতীয় কর্মসূচিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এই তাৎপর্যপূর্ণ আয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও চিকিৎসা সেবা বিভাগের অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইরতেকা রহমান, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন পরিচালক এবং বিএমইউ ড্যাবের সভাপতি সহযোগী অধ্যাপক ডা. এরফানুল হক সিদ্দিকী, অর্থ ও হিসাব পরিচালক খন্দকার শফিকুল হাসান রতন এবং সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের অতিরিক্ত পরিচালক ডা. মোঃ শাহিদুল হাসান বাবুল উল্লেখযোগ্য। একুশের চেতনাকে ধারণ করে চিকিৎসা শিক্ষার মানোন্নয়ন ও সেবামূলক কর্মকাণ্ড এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন উপস্থিত নেতৃবৃন্দ।
বিএমইউ প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও উপস্থিত ছিলেন উপ-পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. মোহাম্মদ আবু নাছের, উপ-রেজিস্ট্রার (আইন) ডা. আবু হেনা হেলাল উদ্দিন আহমেদ, উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক লুৎফর রহমান ও মোঃ হুমায়ুন কবীর এবং উপ-রেজিস্ট্রার সাবিনা ইয়াসমিন ও এটিএম আমিনুল ইসলাম। বিএমইউ অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইয়াহিয়া খাঁন এবং প্রচার সম্পাদক শামীম আহম্মদসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে পুরো অনুষ্ঠানটি ভাবগাম্ভীর্যের সাথে সম্পন্ন হয়। ভাষা আন্দোলনের এই অদম্য স্পৃহা যেন আগামী দিনে দেশের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে, সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন সংশ্লিষ্টরা।
মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রথম প্রহরে ভাষা শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন বিএনপি মহাসচিব ও নবগঠিত সরকারের স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শুক্রবার দিবাগত রাতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে তিনি বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একুশের তাৎপর্য নিয়ে গণমাধ্যমের সাথে কথা বলেন। মির্জা ফখরুল তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, দীর্ঘ সময় ধরে দেশ একটি ফ্যাসিস্ট শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট ছিল, যার ফলে একুশের অবরুদ্ধ চেতনা জনমানুষের হৃদয়ে চাপা পড়ে ছিল। বর্তমান পরিবর্তনের পর এবারের একুশে ফেব্রুয়ারিকে তিনি ‘মুক্ত একুশ’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং এবারের দিবস পালনের অনুভূতিকে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে ভিন্ন ও তাৎপর্যপূর্ণ বলে বর্ণনা করেন।
নবগঠিত সরকারের লক্ষ্য ও জনগণের প্রত্যাশা নিয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর দেশে যে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে, তাকে ঘিরে সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা এখন আকাশচুম্বী। তিনি বিশ্বাস করেন, জনগণের এই অসীম প্রত্যাশা পূরণে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর। বিশেষ করে বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থেই ইনসাফ বা ন্যায়বিচারের ওপর ভিত্তি করে একটি গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলাই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য। একুশের সেই অমর চেতনা, যা একটি বৈষম্যহীন সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, সেই আদর্শকে ধারণ করেই সরকার আগামী দিনগুলোতে এগিয়ে যাবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার বক্তব্যে ভাষা আন্দোলনের মূল স্পিরিট এবং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরির চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, একুশের নতুন অনুপ্রেরণা নিয়ে সামনের দিনগুলোতে জনগণের সার্বিক কল্যাণে কাজ করা আরও সহজ হবে। কেবল রাজনৈতিক সংস্কার নয়, বরং বাংলা ভাষাকে বিশ্ব দরবারে আরও সমৃদ্ধ করা এবং দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশেও সরকার বিশেষ গুরুত্ব দেবে। বৈষম্যমুক্ত রাষ্ট্র বিনির্মাণের যে অঙ্গীকার নিয়ে ভাষা শহীদরা আত্মত্যাগ করেছিলেন, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের মাধ্যমেই শহীদদের প্রতি প্রকৃত সম্মান প্রদর্শন সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনকালে তাঁর সঙ্গে দল ও প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই রাজধানী ঢাকার রাজপথে শুরু হয়েছে একুশের পদযাত্রা। মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ভাষা আন্দোলনের বীর শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেমেছে অগণিত মানুষের ঢল। হাতে ফুলের তোড়া আর হৃদয়ে গভীর আবেগ নিয়ে সর্বস্তরের মানুষ আজ সারিবদ্ধভাবে পুষ্পস্তবক অর্পণ করছেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই জনস্রোত আরও বিস্তৃত হয়েছে, যার ফলে শহীদ মিনারের মূল বেদি এখন নিপুণ কারুকাজের ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে।
অমর একুশের এই মহতী আয়োজনে সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় বিএনসিসি ও স্কাউটস সদস্যরা নিরলস দায়িত্ব পালন করছেন। একে একে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, রাজনৈতিক দল, সরকারি দপ্তর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা তাঁদের শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করছেন। অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনগুলোর মধ্যে আজ সকালে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে ইডেন মহিলা কলেজ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট ও উদীচী, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, টিআইবি এবং বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান। প্রত্যেকের উপস্থিতিতে শহীদ মিনার চত্বর এক অনন্য জাতীয় সংহতির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক শ্রদ্ধার বাইরেও ব্যক্তিগতভাবে অসংখ্য মানুষ এই আয়োজনে শামিল হয়েছেন। অনেক অভিভাবককে দেখা গেছে নিজেদের ছোট শিশুদের হাত ধরে কিংবা কোলে করে শহীদ মিনারে নিয়ে এসেছেন। নতুন প্রজন্মের কাছে বায়ান্নর উত্তাল দিনগুলোর ইতিহাস ও ভাষা শহীদদের বীরত্বগাথা হাতে-কলমে তুলে ধরছেন তাঁরা। কেউ কালো ব্যাজ ধারণ করে শোক প্রকাশ করছেন, আবার কেউবা বাসন্তী সাজে বসন্ত আর একুশের চেতনাকে একই সুতোয় গেঁথেছেন। একুশের ভোরে নগ্নপদে হেঁটে আসা এই মানুষের ভিড় প্রমাণ করে দেয় যে, ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ আজও বাঙালির হৃদয়ে কতটা অম্লান।
শ্রদ্ধা নিবেদন করতে আসা শফিকুল ইসলাম নামের এক নাগরিক তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, একুশ আমাদের চিরন্তন প্রেরণার উৎস। এই আন্দোলন থেকেই আমাদের স্বাধীনতার প্রকৃত পথচলা শুরু হয়েছিল। যখন তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী আমাদের মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র করছিল, তখন ছাত্ররা নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে মায়ের ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল—যা বিশ্ব ইতিহাসে এক বিরল ও গর্বের দৃষ্টান্ত। ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী তানজিলা আক্তার মনে করেন, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস কেবল পাঠ্যবইয়ে সীমাবদ্ধ রাখার বিষয় নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতি বছর এখানে এসে শ্রদ্ধা জানালে সেই বীরত্বপূর্ণ ইতিহাসকে নতুন করে অনুভব করা যায়।
অন্যদিকে, শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত স্কাউট সদস্য মাহদি হাসান মানুষের গভীর আবেগ দেখে মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, জনসমুদ্র সামাল দিতে কষ্ট হলেও মানুষের নিয়ম মেনে শ্রদ্ধা জানানোর মানসিকতা দেখে তাঁরা উৎসাহিত বোধ করছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিশ্ছিদ্র নজরদারিতে পুরো এলাকা এখন উৎসবমুখর অথচ ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ। বিকেলের দিকে জনসমাগম আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে, তিয়াত্তর বছর আগের সেই ফাগুনের আগুন আজও বাঙালির রক্তে ও চেতনায় নতুন করে দোলা দিয়ে যাচ্ছে।
বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনপদ্ধতি এবং সদ্য সমাপ্ত গণভোট নিয়ে এক বিস্ফোরক বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল। তাঁর মতে, গত ১৮ মাস দেশে কোনো নিয়মতান্ত্রিক শাসন নয়, বরং ‘মব’ বা বিশৃঙ্খল জনরোষের মাধ্যমেই রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। একই সাথে তিনি দাবি করেছেন, নির্বাচনপূর্ব সময়ে বিএনপি এক ধরনের রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হয়েছিল, যার ফলে তারা অনেকটা বাধ্য হয়েই রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাবিত গণভোটের বিপক্ষে অবস্থান নিতে পারেনি। আজ শনিবার সকালে তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজ ‘কথা’-য় প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় তিনি এসব কথা বলেন।
মাসুদ কামাল তাঁর বিশ্লেষণে উল্লেখ করেন যে, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার জনমতের দোহাই দিয়ে আসলে রাজপথের শক্তি বা মব কালচারকে ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে যখন সংবিধান সংস্কার বা ‘জুলাই ন্যাশনাল চার্টার’ নিয়ে গণভোটের তোড়জোড় চলছিল, তখন বিএনপিকে এক প্রকার ভয় দেখানো হয়েছিল। বিশ্লেষক কামালের মতে, বিএনপি যদি তখন এই গণভোটের বিরোধিতা করত বা জনগণকে ‘না’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাত, তবে সরকার ও তার মিত্ররা বিএনপির বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ‘মব’ তৈরি করে দিত। এর ফলে বিএনপি একটি মনস্তাত্ত্বিক চাপের মুখে পড়ে জনসমক্ষে এই সংস্কার মেনে নেওয়ার ভান করতে বাধ্য হয়েছে।
রাজনৈতিক এই পরিস্থিতির গভীরতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মাসুদ কামাল জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। তিনি দাবি করেন, বিএনপি যদি সংস্কার প্রস্তাবগুলোতে সায় না দিত, তবে জামায়াত ও এনসিপি প্রচার করত যে বিএনপি সংস্কার চায় না। এটি ছিল মূলত একটি পরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক মব তৈরি করার কৌশল। এই কৌশলের কাছে নতি স্বীকার করেই বিএনপি তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নির্বাচনের আগে চুপ ছিল। তাঁর ভাষ্যে, ড. ইউনূস পুরো দেশটাকেই মবের ওপর ভিত্তি করে পরিচালনা করেছেন, যা গণতান্ত্রিক রীতিনীতির পরিপন্থী।
রাষ্ট্র সংস্কারের দ্বিমুখীতা নিয়েও কড়া সমালোচনা করেছেন এই প্রখ্যাত সাংবাদিক। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিএনপির নিজস্ব ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব দীর্ঘদিন ধরে বহাল থাকা সত্ত্বেও কেন আবার নতুন করে ‘জুলাই সংস্কার’ চাপিয়ে দেওয়া হলো। এই প্রক্রিয়াকে একটি রূপক উদাহরণের মাধ্যমে তুলে ধরে তিনি বলেন, “জাতির জন্য সংস্কার কয়বার করবেন? আপনি এক মুরগি কয়বার জবাই করবেন?” তিনি মনে করেন, বিএনপি মন থেকে এই গণভোটের ফলাফল বা সংস্কার চার্টার কখনোই মেনে নেয়নি। কেবল নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য তারা সাময়িকভাবে এর প্রতি অনীহা প্রকাশ করেনি।
ভিডিওর শেষ অংশে মাসুদ কামাল বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণ নিয়ে তাঁর শঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি মনে করেন, নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠন হলেও সংস্কারের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান আগামী দিনে বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে। ড. ইউনূসের আমলের এই ‘মব শাসন’ দেশের প্রশাসনিক কাঠামোকে দুর্বল করে দিয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর এই বিশ্লেষণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, বিশেষ করে যখন দেশ নতুন একটি নির্বাচিত সরকারের অধীনে যাত্রা শুরু করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মাসুদ কামালের এই পর্যবেক্ষণ অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনকাল মূল্যায়নে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে।
অমর একুশে ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এক ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণে প্রথমবারের মতো কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের মূল বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। আজ শনিবার একুশের প্রথম প্রহরে তিনি তাঁর দলের ও বিরোধী জোটের সংসদ সদস্যদের নিয়ে এই শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার পর তিনি সতীর্থদের নিয়ে সেখানে ভাষা শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন। তবে এই প্রথম আগমনের কারণ ও সংগঠনের পুরনো আদর্শিক অবস্থান নিয়ে সাংবাদিকদের করা প্রশ্নে কিছুটা বিরক্তি ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন জামায়াত আমির।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে উপস্থিত সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন ডা. শফিকুর রহমান। দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি সময় পর জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বের এমন পদক্ষেপে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়। সাংবাদিকরা তাঁর কাছে জানতে চান, জামায়াত ইতিপূর্বে কখনো শহীদ মিনারে ফুল দিতে আসেনি, এবার কোন প্রেক্ষাপটে তাঁরা আসার সিদ্ধান্ত নিলেন। জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, এটি বর্তমানে তাঁর রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ। তিনি উল্লেখ করেন যে, তিনি এখন কেবল একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান নন, বরং জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা। ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিটি আচার ও দিবস পালন করা তাঁর নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব। সঙ্গীদের নিয়ে এই দায়িত্ব পালন করতেই তিনি আজ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে উপস্থিত হয়েছেন।
কথোপকথনের এক পর্যায়ে একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ‘জামায়াতে ইসলামী কি এখনো শহীদ মিনারে ফুল দেওয়াকে নাজায়েজ বা ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ মনে করে?’ এমন প্রশ্নে তাৎক্ষণিকভাবে বিরক্তি প্রকাশ করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি প্রশ্নকর্তার দিকে ইঙ্গিত করে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, ‘এমন একটি পবিত্র দিনে আপনি এ ধরনের প্রশ্ন কেন করছেন? এমন প্রশ্ন না করাই ভালো।’ তাঁর এই বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল যে, পুরনো বিতর্ক এড়িয়ে তিনি বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানকেই গুরুত্ব দিতে চান। ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর এই মুহূর্তটিকে তিনি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও পবিত্র হিসেবে অভিহিত করেন।
বক্তব্যের শেষ দিকে জামায়াত আমির ভাষা আন্দোলনের বীর শহীদদের পাশাপাশি দেশের সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে প্রাণ হারানোদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের অবদানের কথা তিনি কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই এ দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াই শুরু হয়েছিল, যা আজও অব্যাহত রয়েছে। ডা. শফিকুর রহমানের এই শহীদ মিনার সফর বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বড় ধরনের মেরুকরণ ও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন উপস্থিত পর্যবেক্ষকরা। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তিনি নেতাকর্মীদের নিয়ে আজিমপুর কবরস্থানের উদ্দেশ্যে রওনা হন। সব মিলিয়ে জামায়াত আমিরের এই প্রথম শহীদ মিনার সফর ও সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আজ দিনভর টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে।
অমর একুশে ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সদস্যদের একটি অংশ। তবে ডাকসুর পূর্ণাঙ্গ প্রতিনিধি দলের পরিবর্তে কেবল একটি নির্দিষ্ট অংশের এই অংশগ্রহণ এবং বাকি সদস্যদের অন্ধকারে রাখার বিষয়টি নিয়ে ক্যাম্পাসে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য সর্বমিত্র চাকমা ফেসবুকে এক দীর্ঘ পোস্টের মাধ্যমে তাঁর তীব্র ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তাঁর দাবি, ডাকসু শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে যাচ্ছে—এই খবরটি তিনিসহ অন্য নারী ও সংখ্যালঘু সদস্যরা টেলিভিশন লাইভের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন।
আজ শনিবার একুশের প্রথম প্রহরে রাত ১২টা ১ মিনিটে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর তিন বাহিনীর প্রধান এবং সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। ঠিক এর কিছুক্ষণ পরই রাত ১টার দিকে সাদিক কায়েম, এস এম ফরহাদ ও মহিউদ্দিন খানের নেতৃত্বে ডাকসু সদস্যদের একটি ছোট দল শহীদ মিনারে উপস্থিত হয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, এই দলে উপস্থিত অধিকাংশ সদস্যই ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে পরিচিত।
বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয় যখন ডাকসুর অন্য সদস্যরা দাবি করেন যে, দলীয়ভাবে বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তাঁদের এই সফরের বিষয়ে কিছুই জানানো হয়নি। ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য সর্বমিত্র চাকমা তাঁর ফেসবুক পোস্টে শ্রদ্ধা নিবেদনের একটি ছবি শেয়ার করে লেখেন যে, হেমা চাকমা, ফাতেমা তাসনিম জুমা, উম্মে উসওয়াতুন রাফিয়া এবং উম্মে সালমাসহ ডাকসুর অধিকাংশ সদস্যই জানতেন না যে ডাকসু আজ শহীদ মিনারে ফুল দিতে যাচ্ছে। তিনি ব্যঙ্গ করে উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) কল্যাণে তাঁরা তাঁদের নিজেদের সংগঠনের এই কর্মসূচির কথা জানতে পেরেছেন।
এই ঘটনাটি ডাকসুর অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতা ও একপাক্ষিক সিদ্ধান্তের এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। অভিযোগ উঠেছে যে, ডাকসুর মতো একটি প্রতিনিধিত্বশীল সংস্থাকে নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক বলয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং নারী ও সংখ্যালঘু প্রতিনিধিদের ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। বিশেষ করে এমন একটি জাতীয় দিবসে, যেখানে সবার অংশগ্রহণ ও ঐক্য কাম্য, সেখানে ডাকসু সদস্যদের মধ্যে এই বিভাজন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে।
ক্ষুব্ধ সদস্যদের দাবি, ডাকসু কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সম্পদ নয় বরং এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থীর প্রতিনিধিত্ব করে। ফলে যেকোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা নেতৃত্বের নৈতিক দায়িত্ব। সর্বমিত্র চাকমার এই প্রতিবাদের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই ডাকসু নেতৃত্বের এমন আচরণের সমালোচনা করছেন। এ বিষয়ে ডাকসুর অভিযুক্ত অংশটির পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তবে শহীদ মিনারের ভাবগাম্ভীর্যের মাঝে এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিভেদ ছাত্ররাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি নিয়ে নতুন করে ভাববার অবকাশ তৈরি করেছে। সব মিলিয়ে অমর একুশের ভোরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অভ্যন্তরীণ সংকট এখন প্রকাশ্য বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
অমর একুশে ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে চরম হেনস্তার শিকার হয়েছেন জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা। আজ শনিবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীদের তীব্র প্রতিবাদ ও বাধার মুখে পড়েন তারা। এ সময় ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগানে পুরো এলাকা উত্তাল হয়ে ওঠে এবং একপর্যায়ে জাতীয় পার্টির শ্রদ্ধা নিবেদনের সরঞ্জাম কেড়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, এনসিপির ঢাকা মহানগর ইউনিটের সদস্যরা শহীদ মিনারের মূল বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষ করে যখন ফিরে আসছিলেন, ঠিক তখনই তাদের পেছনে ব্যানার ও ফুলের তোড়া হাতে জাতীয় পার্টির একটি ছোট দল প্রবেশ করার চেষ্টা করে। এই দলে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কোনো পরিচিত শীর্ষ নেতাকে দেখা না গেলেও কয়েকজন স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থক উপস্থিত ছিলেন। জাতীয় পার্টির ব্যানারটি নজরে আসতেই এনসিপির নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং একযোগে উচ্চস্বরে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিতে শুরু করেন।
উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে এনসিপির নেতাকর্মীরা একপর্যায়ে জাতীয় পার্টির কর্মীদের হাত থেকে তাঁদের দলীয় ব্যানার এবং শহীদদের জন্য আনা ফুলের তোড়াটি ছিনিয়ে নেন। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটি হলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। শেষ পর্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষ এড়াতে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা শহীদ মিনারের মূল বেদিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ না করেই তড়িঘড়ি করে এলাকা ত্যাগ করতে বাধ্য হন।
উল্লেখ্য যে, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন ছাত্র ও রাজনৈতিক সংগঠনের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। অমর একুশের মতো জাতীয় সংহতির দিনেও সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটল এই অপ্রীতিকর ঘটনার মাধ্যমে। এই ঘটনার সময় আশেপাশে বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন থাকলেও এনসিপি কর্মীদের ত্বরিত ও স্বতঃস্ফূর্ত বাধার মুখে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা কোনো পাল্টা প্রতিরোধ করতে পারেননি। শহীদ মিনারের ভাবগাম্ভীর্যের মাঝে এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি নিয়ে উপস্থিত সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। তবে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের প্রস্থানের পর পরিস্থিতি পুনরায় স্বাভাবিক হয় এবং অন্যান্য সংগঠনগুলোর শ্রদ্ধা নিবেদন প্রক্রিয়া নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকে।
একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি জাতির পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন ।
শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটের পর পর্যায়ক্রমে তারা শহীদ মিনারের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শ্রদ্ধা জানান। পরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, মহিলা ও শিশু এবং সমাজ কল্যাণ মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রী খলিলুর রহমান, পরিবেশ মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, তথ্য মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনসহ মন্ত্রিসভার সদস্যবর্গ ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
এরপর প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিনসহ নির্বাচন কমিশনারগণ পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর তিনবাহিনীর প্রধান যথাক্রমে সেনা বাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ -জামান, নৌ বাহিনী প্রধান এডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান ও বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন পুস্পস্তবক অর্পণ করেন।
এরপরে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও বিদেশী সংস্থার প্রধানরা শ্রদ্ধা জানান। এরপর ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। পরে একে একে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা শহীদ মিনারের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে
প্রথম প্রহরের শ্রদ্ধা নিবেদন যখন চলছিল, তখন নিরাপত্তা বেষ্টনির বাইরে অপেক্ষায় ছিলেন হাজারো মানুষ।ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়েছেন শহীদ মিনারের আশপাশে। শহীদ মিনারের বেদিতে ফুল দেওয়ার জন্য দীর্ঘ লাইনে তারা অপেক্ষা করছেন।
রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর্ব শেষ হলে শহীদ মিনার সবার জন্য খুলে দেওয়া হয়। শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে মধ্যরাতে ঘড়ির কাঁটা ১২টা ছোঁয়ার আগেই হাজারো মানুষ হাতে ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে যান শহীদ মিনার অভিমুখী লাইনে।বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতা-কর্মীরাও শহীদ বেদীতে শ্রদ্ধার্ঘ অর্পণের অপেক্ষায় দাঁড়ান।
শ্রদ্ধা নিবেদনের আগে বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ফ্যাসিস্ট শাসনের যাতাকলে একুশ ছিলো অবরুদ্ধ, এবার সেই একুশ মুক্ত ’ বলে মন্তব্য করেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম।
শুক্রবার একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনে আসা বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী এই মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, ‘‘দীর্ঘদিন পরে একটা ফ্যাসিস্ট শাসনের যাতা করে থেকে একুশে ছিল অবরোধ এবার সেই একুশে মুক্ত।”
‘‘ আমাদের অনুভূতি সেই জন্যেই একটু ভিন্ন রকম এবং আজকে একটা নির্বাচনের পরে যে সরকার নির্বাচিত সরকার বিএনপির নতুন সরকার জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে। আমাদের সঙ্গে সঙ্গে জনগণের প্রত্যাশাও অসীম হয়ে উঠেছে।”
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘‘ আমরা এটা প্রত্যাশা করছি যে, আমরা জনগণের যে প্রত্যাশা আগামী দিনগুলোর জন্যে গণতান্ত্রিক সরকারের জন্যে একটা বাংলাদেশে একটি সত্যিকার অর্থেই একটা ইনসাফের ওপর ভিত্তি করে একটা গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলা। ”
‘ একুশের যেটা মূল চেতনা ছিল যে সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশে একটি বৈষম্যহীন একটা সমাজ একটা রাষ্ট্র গঠন করা সেই চেতনার ভিত্তিতে আমরা আগামী দিনে এগিয়ে যাবো। আমরা বিশ্বাস করি যে আমাদের এই নতুন একুশের যে অনুপ্রেরণা সে অনুপ্রেরণা নিয়ে আমরা সামনের দিকে নিঃসন্দেহে জনগণের কল্যাণের জন্য আমরা কাজ করতে সক্ষম হব। আমাদের মাতৃভাষাকে আমরা আরো সমৃদ্ধ করতে সক্ষম হবো, আমরা আমাদের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করতে সক্ষম হবো, আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে সমর্থ হবো।”