আপডেট : সোমবার, জুলাই ১৮, ২০২২, ১২:০০ am

মানুষের চোখে লুকিয়ে আছে ভিনগ্রহে প্রাণের সংকেত

দৈনিক বাংলা ডেস্ক
মানুষের চোখে লুকিয়ে আছে ভিনগ্রহে প্রাণের সংকেত
প্রতীকী ছবি

প্রাণ বলতে আমাদের প্রচলিত ধারণা একেবারেই আপেক্ষিক। আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, এই পৃথিবীরই আদিম পর্যায়ের প্রাণের আক্সিজেন চাহিদা ছিল বলতে গেলে শূন্য। সেই সময়ের প্রাণের নিদর্শন এখনো টিকে আছে আমাদের দেহের ভেতরেই। সেটি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর আদিম পর্যায়, এমনকি মহাবিশ্বের ভিনগ্রহেও প্রাণের অস্তিত্বের সূত্র বের করতে পারছেন।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই পৃথিবীতে এখনকার প্রাণীদের শরীর কাঠামো নির্ধারণ করে দিয়েছে কোটি কোটি বছর ধরে বদলে যাওয়া পৃথিবীর পরিবেশ। আর এ কারণে ভিন গ্রহে প্রাণের বিবর্তন বিবর্তনটি হতে পারে একেবারেই আলাদা, সেখানকার পরিবেশ উপযোগী। ভিন গ্রহে প্রাণ বা এলিয়েন কেমন হতে পারে তার সূত্র লুকিয়ে আছে মানুষেরই চোখের ভেতরে।

অন্য গ্রহের প্রাণের সাধারণ নিদর্শন বা আদিকোষগুলো কেমন হতে পারে তা নিয়ে গবেষণা করেছে আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইডে (ইউসি রিভারসাইড) এই গবেষণা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট ইউনিভার্স টুডে। সেটি অবলম্বনে লিখেছেন রুবাইদ ইফতেখার

পৃথিবীতে প্রাথমিক জীবনের নিদর্শন ছিল এখনকার চেয়ে একেবারে আলাদা। এরপর কয়েক শ কোটি বছর আগে গ্রেট অক্সিজেনেশন ইভেন্ট (জিওই) আমাদের গ্রহটির বৈশিষ্ট্য একেবারেই বদলে দেয়। ওই ঘটনার ফলে অক্সিজেন-সমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডল ও জটিল প্রাণসহ একটি গ্রহে পরিণত হয় পৃথিবী।

জিওইর আগে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল অনেক আলাদা ছিল, যা তখনকার প্রাণ ও প্রাণের সক্রিয়তাকে পরিচালিত করেছে। শুরুর দিকের পৃথিবীর প্রাণের নিদর্শন বা আদিকোষগুলো কম শক্তির পরিবেশে বাস করত, যেখানে অক্সিজেনের উপস্থিতি ছিল একেবারেই কম।

সূর্যের রশ্মিই ছিল শক্তির একমাত্র উৎস এবং সালোকসংশ্লেষণ পদ্ধতিতে বিবর্তিত হওয়ার আগে অনুজীব বা আদিকোষে সূর্যালোককে অন্যভাবে ব্যবহার করতো।

রোডোপসিন নামের এক ধরনের প্রোটিন ব্যবহার করা হতো সৌরশক্তিকে ব্যবহারের জন্য। সালোকসংশ্লেষণের মতো একটি জটিল প্রক্রিয়ার চেয়ে এই প্রোটিন ব্যবহার করার পদ্ধতি ছিল অনেক সহজ।

এ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক রিভিউ জার্নাল মলেকিউলার বায়োলজি অ্যান্ড ইভোলিউশনে প্রকাশিত ‘আর্লিয়েস্ট ফোটিক জোন নিশেজ প্রোবড বাই অ্যানসেস্ট্রাল মাইক্রলোবিয়াল রোডোপসিনস’ শীর্ষক এ গবেষণার নেতৃত্ব দিচ্ছেন আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অফ উইসকনসিন-ম্যাডিসনের অ্যাস্ট্রোবায়োলজিস্ট বেতুল কাচার। দলের অন্যতম গবেষক ইউসি রিভারসাইডের অ্যাস্ট্রোবায়োলজিস্ট এডওয়ার্ড শোয়েইটারম্যান এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, ‘পৃথিবীর শুরুর দিকে, শক্তি খুব কম ছিল। ব্যাকটেরিয়া ও আর্কিয়া সালোকসংশ্লেষণের জন্য প্রয়োজনীয় জটিল জৈবঅণু ছাড়াই কীভাবে সালোকসংশ্লেষণ করা যায় তা খুঁজে বের করেছিল।’

আদিকোষগুলোর বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার সঙ্গে রোডোপসিন কিন্তু নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি। বিভিন্ন প্রাণীতে এর অস্তিত্ব এখনও দেখা যায়। এমনকি আমাদের চোখের রড কোষে রয়েছে রোডোপসিন। এটি কম আলোতে আমাদের দেখতে সহায়তা করে।

এছাড়া এই প্রোটিন এখনও লবনাক্ত হ্রদে আদিপ্রাণ বা এককোষী প্রাণীতে উপস্থিত। আধুনিক পৃথিবীতে এসব প্রাণের উপস্থিতি রোডোপসিনের বিবর্তনীয় ঐতিহাসিক সংযোগ আমাদের সামনে উপস্থাপন করে।

গবেষকরা মেশিন লার্নিং ও প্রোটিন সিকোয়েন্সিং ব্যবহার করে সেই সংযোগটি খুঁজেছেন। তারা বলছেন, পৃথিবীর বর্তমান জীব ও বায়ুমণ্ডল দেখে অন্য গ্রহে জীবনের ধারণা পাওয়া সম্ভব নয়। আমাদের বর্তমান বায়ুমণ্ডল অক্সিজেন-সমৃদ্ধ, তবে কিছু গবেষণা অনুযায়ী, পৃথিবীর প্রথম দিকের বায়ুমণ্ডল বর্তমান কালের শুক্রের মতো হতে পারে।

রোডোপসিন কীভাবে বিবর্তিত হয়েছে সেটি পর্যালোচনা করে গবেষকেরা প্রোটিনটির একটি ফ্যামিলি ট্রি তৈরি করেছেন। এর মাধ্যমে ২৫০ থেকে ৪০০ কোটি বছর আগের রোডোপসিন পুনর্গঠন করা সম্ভব হয়েছে।

যে সব গ্রহ বা গ্রহের চাঁদে পৃথিবীর মতো বায়ুমণ্ডল আছে সেখানে প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজছেন বিজ্ঞানীরা। বায়ুমণ্ডলের নির্দিষ্ট কিছু অণু জৈব-মার্কার হতে পারে, তবে সহজ ও আদি প্রাণকে জানতে আমাদের বিশদভাবে সৃষ্টির সময়কার পৃথিবীর প্রাথমিক বায়ুমণ্ডল সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন।

বেতুল কাচার বলেন, ‘প্রাণকে আমরা এখন যেভাবে দেখি সেটি আসলে আমাদের গ্রহের বর্তমান অবস্থারই একটি প্রকাশভঙ্গী। আমরা একটি অণুর প্রাচীন ডিএনএ ক্রমকে পুনরুত্থিত করেছি। এটি আমাদেরকে অতীতের জীববিজ্ঞান ও এর পরিবেশের সঙ্গে সংযোগ খোঁজায় সহায়তা করেছে।’

এ দলের গবেষণা বর্তমানে প্রচলিত জিনগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার সমান্তরাল। বর্তমানে ডিএনএ থেকে আমরা কোথা থেকে এসেছি সে সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারি। তবে দলের মূল কাজটি এর চেয়ে অনেকটাই জটিল।

শোয়েইটারম্যান বলেন, ‘বিষয়টা অনেকটা এমন যে, নাতি-নাতনির ডিএনএ থেকে তাদের দাদা-দাদির ডিএনএ তৈরি করা। তবে পার্থক্য হলো, আমরা দাদা-দাদির বদলে বিশ্বজুড়ে কয়েক শ কোটি বছর আগে থাকা ক্ষুদ্র প্রাণ তৈরির চেষ্টা করছি।’

প্রাচীন ও আধুনিক রোডোপসিনের আলোক শোষণের ক্ষমতায় পার্থক্য খুঁজে পেয়েছেন গবেষকেরা। জিনগত পুনর্গঠন বলছে, প্রাচীন রোডোপসিন প্রাথমিকভাবে নীল ও সবুজ আলো শোষণ করত। আর আধুনিক রোডোপসিন নীল, সবুজ, হলুদ ও কমলা আলো শোষণ করে। এই তফাৎ পর্যালোচনা করে গবেষকেরা প্রাচীন ও আধুনিক পৃথিবীর পরিবেশগত পার্থক্য খুঁজেছেন।

জিওইর আগে পৃথিবীতে কোনো ওজন স্তর ছিল না। এটি সৃষ্টি হয় ২০০ থেকে ২৪০ কোটি বছর আগে। বায়ুমণ্ডলে মুক্ত অক্সিজেনের উপস্থিতি ছাড়া ওজন তৈরি হতে পারে না। আর ওজন স্তর না থাকার মানেই হলো আদিম পৃথিবীর জীবের ওপর অনেক বেশি অতিবেগুনি রশ্মি পড়ত। বর্তমানে পৃথিবীতে আসা ৯৭ থেকে ৯৯ শতাংশ অতিবেগুনি রশ্মি শুষে নেয় ওজন স্তর।

গবেষকদের মতে, প্রাচীন রোডোপসিনের নীল ও সবুজ আলো শুষে নেয়া এবং হলুদ ও কমলা আলো শুষে না নেয়ার অর্থ হচ্ছে, তখন এই প্রোটিন ব্যবহার করা প্রাণ বা আদিকোষ পানির বেশ খানিকটা গভীরে বাস করত।

পৃথিবীতে জিওইর পর ওজন স্তর অতিবেগুনি রশ্মি শোষণ শুরু করলে রোডোপসিন বিবর্তিত হয়ে আরও বেশি আলো শোষণের প্রক্রিয়া শুরু করে। এ কারণেই আধুনিক রোডোপসিন নীল ও সবুজ আলোর সঙ্গে হলুদ ও কমলা আলো শোষণ করতে সক্ষম।

আধুনিক রোডোপসিন আলো শোষণ করতে পারে, যা সালোকসংশ্লেষণকারী ক্লোরোফিল রঞ্জক করতে পারে না। বিবর্তনের ধারায় আধুনিক রোডোপসিন ও সালোকসংশ্লেষণ বিভিন্ন আলো শোষণ করে একে অপরের পরিপূরক হয়েছে। তবে এরা সম্পূর্ণ আলাদাভাবে ও স্বাধীন প্রক্রিয়ায় কাজ করে।

শোয়েইটারম্যান বলেন, ‘এর থেকে সহ-বিবর্তনের ধারণা পাওয়া যায়, যেখানে এক কোষের শুষে নেয়া আলো আরেক কোষ শোষণ করে না। এর কারণ হতে পারে, রোডোপসিন আগে বিবর্তিত হয়েছে এবং সবুজ আলোকে শোষণ করা শুরু করেছে। ক্লোরোফিল পরে এসে বাকি আলো শুষে নেয়া শুরু করে। অথবা ঘটনা এর বিপরীতও হতে পারে।’

পৃথিবীর আদি প্রাণের ধরন ও বৈশিষ্ট্য এর ভূ-স্তরের সঙ্গে জড়িত। গবেষকরা নিয়মিত প্রাচীন শিলাখণ্ড নিয়ে গবেষণা করে বোঝার চেষ্টা করেন, আদি পৃথিবীতে কীভাবে প্রাণের বিকাশ ঘটেছিল ও বিবর্তিত হয়েছিল। তারা সূর্যের আচরণও পর্যবেক্ষণ করেন। তারা পরীক্ষা করেন, শুরু থেকে প্রতিনিয়ত কী পরিমাণ সৌরশক্তি পৃথিবীতে আসছে। এটি অনুসন্ধানে এখন তাদের হাতে নতুন একটি উপায় রয়েছে।

গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘প্রাণীর মধ্যে এনকোড করা তথ্য ভূতাত্ত্বিক ও নাক্ষত্রিক প্রভাব কমিয়ে আমাদের এই গ্রহের বাসযোগ্যতা ধরের রাখার পদ্ধতি সম্পর্কে অভিনব তথ্য প্রদান করতে পারে।’

রোডোপসিনের কাজটা আসলে কী?

আদি প্রাণের ক্ষেত্রে রোডোপসিন এক ধরনের প্রোটন পাম্প হিসেবে কাজ করত। প্রোটিন পাম্প আদি প্রাণের জন্য শক্তি গ্র্যাডিয়েন্ট তৈরি করে। সালোকসংশ্লেষণ থেকে এর ধরন কিছুটা আলাদা। এটি জীবের বেঁচে থাকার জন্য রাসায়নিক শক্তি উত্পাদন করে।

একটি প্রোটন পাম্প ও শক্তি গ্র্যাডিয়েন্ট কোষের ঝিল্লি জুড়ে বৈদ্যুতিক রাসায়নিক সংযোগের পার্থক্য তৈরি করে। এটি একটি ব্যাটারির মতো, কারণ গ্র্যাডিয়েন্ট পরবর্তী ব্যবহারের জন্য শক্তি সংরক্ষণ করে।

গবেষক দলের দাবি, তারা জৈব অণুতে এনকোড করা তথ্য প্রাচীন যুগে টিকে থাকা প্রাণ ও এখনকার জীবাশ্মের আদি প্রাণকে বোঝার জন্য ব্যবহার করতে পারেন। এগুলোকে তারা পেলিওসেন্সর নামে অভিহিত করছেন।

গবেষকরা আদি রোডোপসিনকে আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য সিনথেটিক জীববিজ্ঞান কৌশল ব্যবহার করতে চেয়েছেন। তারা দেখতে চেয়েছেন, কীভাবে রোডোপসিন পৃথিবীর প্রাচীন বায়ুমণ্ডল গঠনে সাহায্য করেছে ও কীভাবে তারা দূর গ্রহের বায়ুমণ্ডলকে পরিবর্তন করতে পারে।

কাচার বলেন, ‘আমরা আধুনিক জিনোমের মধ্যে থাকা প্রাচীন ডিএনএর পরিবর্তন করেছি। লাখ লাখ বছর আগে তাদের আচরণ অনুযায়ী তাদের পরিবর্তন করা হয়েছে। পরীক্ষাগারে টাইম-ট্র্যাভেল গবেষণার জন্য রোডোপসিন দারুণ সহায়ক।’

পৃথিবীর আদি প্রাণ ও বায়ুমণ্ডলের কিছু প্রমাণ লুকিয়ে আছে, গবেষক দলটির কিছু পদ্ধতি সে প্রমাণ অনুসন্ধানের বাধা দূর করছে।

কাচার বলেন, ‘আমাদের গবেষণা থেকে প্রথমবারের মতো দেখা যাচ্ছে যে, এনজাইমের বৈশিষ্ট্য বিবর্তনশীল পুর্নগঠনের প্রতি সংবেদনশীল, কিন্তু একই ধাঁচ প্রচলিত আণবিক বায়োসিগনেচার সমর্থন করে না।’

প্রাচীন পৃথিবী সম্পর্কে আমরা যত বেশি শিখব, তত বেশি আমরা অন্য বিশ্ব সম্পর্কে জানতে পারব। যদি একাধিক গ্রহে প্রাণের উদ্ভব সমর্থনের পরিবেশ থেকে থাকে তাহলে প্রতিটি গ্রহই সম্ভাব্য প্রাণকে ধারণের জন্য ভিন্ন পথ নিয়েছে। তবে এর জন্য দায়ী রসায়ন ও পদার্থবিদ্যার মধ্যে সামঞ্জস্য থাকবে। পৃথিবীতে জীব ও পরিবেশের মধ্যে পারস্পরিক ক্রিয়া যেমন রয়েছে, তেমন একটি ক্রিয়া অবশ্যই অন্যান্য গ্রহেও থাকতে হবে।

শোয়েইটারম্যান বলেন, ‘বর্তমান পৃথিবীর তুলনায় প্রাচীন পৃথিবী এক অচেনা গ্রহ। সময়ের সঙ্গে ও ভিন্ন পরিবেশে কীভাবে এখানে আদি প্রাণ পরিবর্তিত হয়েছে সেটা বুঝতে পারলে অন্য গ্রহেও প্রাণের সন্ধান করা সহজ হবে।’