আপডেট : শুক্রবার, আগস্ট ১২, ২০২২, ৬:৫০ am

ঢাবির শীর্ষ ব্যক্তিরা আমার নামে গল্প বানিয়ে বিক্রি করেছে: সামিয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাবির শীর্ষ ব্যক্তিরা আমার নামে গল্প বানিয়ে বিক্রি করেছে: সামিয়া
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক সামিয়া রহমান। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সাবেক শিক্ষক সামিয়া রহমান অভিযোগ করেছেন, ছয় বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষপদের ব্যক্তিরা তার নামে নানা গল্প বানিয়ে গণমাধ্যমে বিক্রি করেছেন। আজ শুক্রবার সকালে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া পোস্টে এমন অভিযোগ করেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক এই শিক্ষক।

বর্তমানে দেশের বাইরে থাকা সামিয়া রহমান লিখেছেন, ‘গত ৬টা বছর ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষপদের ব্যক্তিদের হিংসা, প্রতিহিংসা, নোংরামি, ষড়যন্ত্র দেখতে দেখতে কখনো মনে হতো, আমিও ওদের মতোই ওদের ঘৃণা করি, ওদের প্রকৃত চরিত্র উন্মোচন করি। আবার পরে মনে হতো, তাহলে আমিও তো ওদের পর্যায়েই নোংরামিতে নেমে গেলাম। তফাৎ আর থাকলো কোথায়- মানুষে আর অমানুষে।’

‘ধৈর্য নিয়ে অপেক্ষা করেছি। সৃষ্টিকর্তা পরীক্ষা করলেও শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার করেন বলেই বোধ হয় উচ্চ আদালত প্রমাণ দিয়েছে, ওদের সিদ্ধান্ত অবৈধ। গত ৬ বছর ধরে ঢাবির শীর্ষ ব্যক্তিরা আমার নামে নানা গল্প বানিয়ে বছরের পর বছর গণমাধ্যমে বিক্রি করেছে। আমাকে তারা হুমকি-ধমকির মধ্যে রেখেছিল ক্রমাগত। আমি চাকরি না ছাড়লে, আমি গণমাধ্যমে বক্তব্য দিলে আমার ক্ষতি করবে- এমন প্রচণ্ড চাপের মধ্যে বছরের পর বছর আমি ছিলাম।’

‘যে লেখাটিতে আমি জড়িত ছিলাম না, আমার স্বাক্ষর ছিল না, সেই লেখাটি নিয়ে আমার বিরুদ্ধে তারা ষড়যন্ত্র করে গেছে বছরের পর বছর। শিকাগো প্রেসের নাম করে মিথ্যা ফেইক চিঠি তৈরি করে আমার বিরুদ্ধে ঢাবির বর্তমান প্রশাসন তদন্ত শুরু করে। আদালতে তো প্রমাণিত হয়েছেই এটি মিথ্যা, ফেইক চিঠি। ট্রাইব্যুনাল বলেছে, প্লেজারিজম (চৌর্যবৃত্তি) হয়নি। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় শাস্তি দিলো। কীসের ভিত্তিতে? এমনকি ট্রাইব্যুনালের রায়ের কপি পর্যন্ত ঢাবি আমাকে দিতে চায়নি মাসের পর মাস, পাছে সত্যি প্রমাণ হয়ে যায়।’

‘মারজানের লিখিত স্বীকারোক্তিতে তার লেখা জমা দেবার, রিভিউ করা ও স্বাক্ষর করার প্রমাণ ঢাবির কাছে থাকা সত্ত্বেও একবারের জন্যও বর্তমান প্রশাসন গণমাধ্যমে সেটি প্রকাশ করেনি। একবারের জন্যও প্রকাশ করেনি যে, আমার কাছ থেকে তারা কোনো লেখা পায়নি এবং ডিন অফিস থেকেও কোনো লেখা আমার কাছে রিভিউ করার জন্য আসেনি।’

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগাম অবসর চেয়ে করা সামিয়া রহমানের আবেদন সম্প্রতি গ্রহণ করে তাকে অবসরের অনুমতি দিয়েছে ঢাবি প্রশাসন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় তার কাছ থেকে ১১ লাখ ৪১ হাজার ৬০১ টাকা পাবে জানিয়ে তা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়। 

এ প্রসঙ্গে ফেসবুক পোস্টে সামিয়া রহমান লিখেছেন, ‘সবচেয়ে হাস্যকর বিষয় ৪ আগস্ট মামলায় হেরে বর্তমান প্রশাসন ৮ আগস্ট আমার কাছে টাকা দাবি করে একটা ইমেইল পাঠায়। যে ইমেইল ৮ আগস্ট পাঠানো, কিন্তু এর ভেতরে ব্যাক ডেটে হাতে লেখা ৩ আগস্ট। মামলায় হেরে কী এখন এই প্রতিহিংসা? ঢাবির কাছে আমার কোনো দেনা নেই। বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে আমার পাওনা আছে। আদালতে লড়াই করেছি, করে যাবো। সৃষ্টিকর্তা বলে তো একজন আছেন। তিনিই ন্যায় বিচার করবেন।’

২০১৬ সালের ডিসেম্বরে সামিয়া রহমান ও সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজানের যৌথভাবে লেখা ‘অ্যা নিউ ডাইমেনশন অব কলোনিয়ালিজম অ্যান্ড পপ কালচার: অ্যা কেস স্টাডি অব দা কালচারাল ইম্পেরিয়ালিজম’ শিরোনামের আট পৃষ্ঠার একটি গবেষণা প্রবন্ধ ঢাবির ‘সোশাল সায়েন্স রিভিউ’ জার্নালে প্রকাশিত হয়।

এরপর অভিযোগ ওঠে ১৯৮২ সালের শিকাগো ইউনিভার্সিটির জার্নাল ‘ক্রিটিক্যাল ইনকোয়ারি’তে প্রকাশিত ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোঁর ‘দা সাবজেক্ট অ্যান্ড পাওয়ার’ নামের একটি নিবন্ধ থেকে প্রবন্ধটির প্রায় পাঁচ পৃষ্ঠা হুবহু নকল করা হয়েছে। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে এক লিখিত অভিযোগের মাধ্যমে ঢাবি কর্তৃপক্ষকে এই নকলের কথা জানায় ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো প্রেস।

শুধু ফুকোঁই নন, বুদ্ধিজীবী অ্যাডওয়ার্ড সাঈদের ‘কালচার অ্যান্ড ইম্পেরিয়ালিজম’ বইয়ের পাতার পর পাতা সামিয়া ও মারজান হুবহু নকল করেন বলে অভিযোগ ওঠে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাবির তৎকালীন উপউপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক নাসরীন আহমেদকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট।

গবেষণায় চৌর্যবৃত্তির প্রমাণ পাওয়ায় ২০২১ সালের ২৮ জানুয়ারি সিন্ডিকেট সভায় সামিয়াকে এক ধাপ পদাবনতি দিয়ে সহকারী অধ্যাপক করা হয়। তবে এই আদেশের বিরুদ্ধে তিনি উচ্চ আদালতে রিট করেন।

এরপর গত ৪ আগস্ট সামিয়া রহমানকে পদাবনতির আদেশ অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে তাকে সব সুযোগ-সুবিধা ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে আগেই আগাম অবসরের আবেদন করায় এবং তা কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করায় আপাতত ঢাবিতে সামিয়া রহমানের শিক্ষকতা করা হচ্ছে না।