আপডেট : বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২২, ১০:৩৬ pm

দাম বাড়িয়ে ধরা ইউনিলিভার-কাজী ফার্মস-সিটি গ্রুপ

প্রতিবেদক, দৈনিক বাংলা
দাম বাড়িয়ে ধরা ইউনিলিভার-কাজী ফার্মস-সিটি গ্রুপ
পণ্যের দাম বাড়িয়ে ধরায় ইউনিলিভার, সিটি গ্রুপ, কাজী ফার্মস, প্যারাগন গ্রুপসহ ১১ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে সরকার। ছবি: দৈনিক বাংলা

অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির অভিযোগে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ইউনিলিভার, কাজী ফার্মস, সিটি গ্রুপসহ ১১ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন। বাজারে চাল, আটা-ময়দা, ডিম, মুরগির মাংস ও টয়লেট্রিজ পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে অস্থিরতা তৈরির অভিযোগে এ সব ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কমিশন।

প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারম্যান মফিজুল ইসলাম বৃহস্পতিবার (২২ সেপ্টেম্বর) দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। বাজারের সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার নিয়ম ভেঙে চাল, আটা, ডিম, ব্রয়লার মুরগি, সাবান, ডিটারজেন্টসহ অস্বাভাবিকভাবে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়িয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ জন্য মামলা করা হয়েছে। আগামী সোমবার থেকে এসব কোম্পানির বিরুদ্ধে শুনানি শুরু হবে।’

চালের বাজারে সংকট সৃষ্টির অভিযোগ আনা হয়েছে রশিদ অ্যাগ্রো ফুড প্রোডাক্ট লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী আব্দুর রশিদ ও নওগাঁর বেলকন গ্রুপের বেলকন প্রাইভেট লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে।

দুই করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সিটি গ্রুপ ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে আটা-ময়দার সংকট তৈরির অভিযোগে। বাংলাদেশ এডিবল অয়েল লিমিটেডের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তেলের বাজারে সংকট তৈরির অভিযোগে।

ডিমের সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর অভিযোগ আনা হয়েছে প্যারাগন পোলট্রি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডিম ব্যবসায়ী-আড়তদার বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি আমানত উল্লাহ্, কাজী ফার্মস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী জাহেদুল ইসলামের বিরুদ্ধে।

মুরগির বাজারে সংকট সৃষ্টির অভিযোগও আনা হয়েছে প্যারাগন পোলট্রি ও কাজী ফার্মসের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নামে। এ জন্য তাদের বিরুদ্ধে আলাদা মামলা হয়েছে। ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে সাবান, সুগন্ধী সাবান ও গুঁড়া সাবানের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি বা কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ এনে।

কমিশনের সচিব আবদুস সবুর দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘গত বুধবার বিভিন্ন অভিযোগে চাল, আটা, মুরগির মাংস, ডিমসহ বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাতকারী ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

ভোক্তাদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘ভোক্তাদের স্বার্থে প্রতিযোগিতা কমিশন তো এত দিন কিছুই করেনি। এই প্রথম কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করল। এখন দেখতে হবে, কত দ্রুততার সঙ্গে মামলাটির নিষ্পত্তি হয়। আইন অনুযায়ী কাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়। এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান অন্যায়ভাবে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে মানুষের পকেট থেকে বাড়তি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। সেই অপরাধে যদি সত্যিই এদের উপযুক্ত শাস্তি হয়, তাহলে বাজারে একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। অন্যরা ভয় পাবে, অযৌক্তিকভাবে ইচ্ছামতো আর পণ্যের দাম বাড়াবে না। দেশের মানুষ স্বস্তি পাবে।’

গোলাম রহমান আরও বলেন, ‘আমি প্রতিযোগিতা কমিশনের এই মামলা করাকে ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছি। যদি সত্যিই এদের উপযুক্ত শাস্তি হয়, তাহলে আমি কমিশনকে সাধুবাদ জানাব।’

মামলার বিষয়ে কমিশনের ওয়েবসাইটে বৃহস্পতিবার ১১ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশ করে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশের বাজারে চাল, আটা-আটা, ডিম, বয়লার মুরগি, টয়লেট্রিজের (সাবান, সুগন্ধী সাবান, গুঁড়া সাবান, ইত্যাদি) অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং কৃত্রিম সংকটের ফলে যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে, তা দূরীকরণে এই ১১ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলা দায়ের করেছে।

চলতি মাসের ২৬ তারিখ থেকে কোম্পানিগুলোকে ধারাবাহিকভাবে শুনানির জন্য ডাকা হয়েছে। প্রতিযোগিতা কমিশন আইনের ১৫ ও ১৬ ধারা অনুযায়ী এ মামলা হয়েছে। ধারা ১৫-তে বলা হয়েছে, বাজারে প্রভাব বিস্তার করে একপক্ষীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি করলে তারা শাস্তির আওতায় আসবে। আর ধারা ১৬-তে বলা হয়েছে, কোনো পণ্যের বাজারজাত বা উৎপাদনে শীর্ষে থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে পণ্যের দামে কারসাজি করলে সেই অপরাধও শাস্তিযোগ্য।

গত কয়েক মাস ধরে দেশে চাল, তেল, আটা, ডিম, মুরগি, সাবান, ডিটারজেন্ট ও টুথপেস্টের বাজারে অস্থিরতা চলছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর নিয়মিত বাজার তদারকির পাশাপাশি এসব পণ্যের উৎপাদনকারী ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে সভা করেছে, যেখানে অস্বাভাবিকভাবে মূল্যবৃদ্ধির অভিযোগ ওঠে। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ এইচ এম শফিকুজ্জামান বলেন, ‘যারা বাজারে অস্থিরতা তৈরির জন্য দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে শিগগিরই ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

ভোক্তা অধিদপ্তর ডিমের বাজারে কারসাজিতে জড়িত সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি প্রতিবেদনও পাঠিয়েছে।

এদিকে কয়েক মাস ধরে বাজারে চালের দাম বেশি। মাসখানেক আগে মোটা চালের দাম উঠেছিল প্রতি কেজি ৫৫ টাকার ওপরে। একইভাবে সরু বা চিকন চালের দাম উঠেছিল প্রতি কেজি ৮৫ টাকা পর্যন্ত। বাজারে অভিযান শুরু ও চাল আমদানির কারণে তা আবার কমতে শুরু করেছে।

একইভাবে মাসখানেক আগে ডিমের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। তখন ব্রয়লার মুরগির দাম প্রতি কেজি ২০০ টাকার ওপরে ওঠে। অভিযানের কারণে ডিম ও মুরগির দাম মাঝে কিছু দিন কম থাকলেও এখন আবার বেড়েছে; ফার্মের মুরগির ডিম প্রতি ডজন ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকা এবং ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

অন্যান্য নিত্যপণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ডলারের বাড়তি দাম ও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাত দিলেও সরকারি-বেসরকারি একাধিক মতবিনিময় সভায় মূল্য যতটা বৃদ্ধির কথা, তার চেয়ে বেশি বেড়েছে বলে মত দিয়েছেন অনেকে। মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে ইউনিলিভার বাংলাদেশের করপোরেট কমিউনিকেশনস বিভাগের প্রধান শামীমা আক্তার দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘আমরা এখনো এ বিষয়ে কোনো নোটিশ পাইনি। তবে গণমাধ্যমে দেখেছি। তাই কী পরিপ্রেক্ষিতে এটি হয়েছে, সেটি নিশ্চিত করে বলতে পারছি না। বহুজাতিক কোম্পানি হিসেবে আমরা দেশের সব ধরনের আইন মেনে এ দেশে ব্যবসা পরিচালনা করছি। কমিশনকে আমরা সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছি।’ 

সিটি গ্রুপের পরিচালক (করপোরেট ও রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স) বিশ্বজিৎ সাহা দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘প্রতিযোগিতা কমিশন অনেক ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। এর আগেও এমন হয়েছে।’

সিটি গ্রুপের মামলার ব্যাপারে জানেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ তথ্য আমরা পেয়েছি। এর আগেও প্রতিযোগিতা কমিশন সয়াবিন তেলের মূল্যবৃদ্ধির সময়ও মামলা করেছিল। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আমরা আমাদের অবস্থান কমিশনকে জানাব।’

কমিশন সূত্রে জানা গেছে, অস্বাভাবিকভাবে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ানোর অভিযোগ চালে ১৯টি, আটা-ময়দায় আটটি, ব্রয়লার মুরগি ও ডিমে ছয়টি, সাবান ও ডিটারজেন্টে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১১ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। অন্যদের বিরুদ্ধেও মামলা করা হবে।

শুনানি সোমবার থেকে

আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর সোমবার দুপুর ১২টায় কাজী ফার্মস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ডিম ও ‍মুরগির বাজারে সংকট সৃষ্টির অভিযোগে শুনানিতে ডাকা হয়েছে। পর দিন বাকি অভিযোগগুলোর বিষয়ে শুনানি হবে।