সোমবার, অক্টোবর ৩, ২০২২

উৎপাদন বাড়াতে বর্ষাকালীন কৃষির উন্নয়ন অপরিহার্য

উৎপাদন বাড়াতে বর্ষাকালীন কৃষির উন্নয়ন অপরিহার্য
জাহাঙ্গীর আলম
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত

জাহাঙ্গীর আলম

ঋতু বৈচিত্র্যের দেশ বাংলাদেশ। এখানে রয়েছে ছয়টি ঋতু। সেগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় বর্ষাকাল। গ্রীষ্মের দিনগুলোতে মানুষ যখন অসহ্য গরমে ছটফট করতে থাকে, তখন বৃষ্টির বর্ষণ এসে বুলিয়ে দেয় শীতল পরশ। এদেশে বৃষ্টি হয়ে থাকে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে। বঙ্গোপসাগর থেকে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত মৌসুমী বায়ু অনেক জলীয় বাষ্প বয়ে আনে। এরপর তা হিমালয়ের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে এদেশে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়। যার ফলে বর্ষা শুরু হয়।

পঞ্জিকান্তরে আষাঢ় ও শ্রাবণ- এই দুই মাস বর্ষাকাল। কিন্তু বাংলাদেশে এ ঋতুর আগমন আগেই ঘটে যায়, শেষ হয় দেরিতে। এদেশে সাধারণত জ্যৈষ্ঠ মাসে বর্ষণ শুরু হয়ে আশ্বিন মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়। হাওর এলাকায় এর স্থায়িত্ব আরও বেশি হয়, ছয় মাসেরও অধিক। দেশের মধ্য অঞ্চলে এর স্থায়িত্ব কম, প্রায় চার মাস। তখন মাঠ-ঘাট, পথ-প্রান্তর, খাল-বিল ও নদী-নালা জলপূর্ণ থাকে। বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার হয়ে যায় সমস্ত ময়লা-আবর্জনা। এ সময় তরুলতা ও গাছপালা খুব সতেজ হয়ে ওঠে। প্রকৃতিতে দেখা যায় নানা রকম ফলের সম্ভার, ঘটে বিচিত্র ফুলের সমারোহ। বর্ষাই এই বাংলাকে করেছে শস্য-শ্যামল। এ ঋতুতে কৃষকরা বীজতলা প্রস্তুত করেন। বীজ বোনার পর চারাগাছ তুলে তা রোপণ করেন। এ ঋতুই ধান কাটা ও পাট কাটার উপযুক্ত সময়। এ সময় কৃষকেরা বৃষ্টিতে ভিজে ফসল ফলানোর জন্য ব্যস্ত থাকেন। তখন জলমগ্ন প্লাবনভূমিগুলো মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর এক বিশাল আবাসক্ষেত্রে পরিণত হয়। জেলেদের হাতে ধরা পড়ে বিভিন্ন জাতের মাছ।

বাংলাদেশের প্রধান ফসল ধান। তিনটি প্রধান ধানের মধ্যে দুটিই উৎপাদিত হয় বর্ষাকালে। এ  মৌসুমে আউশ ও আমন ধানের চাষ হয়। আর বোরো ধানের চাষ হয় শীতকালে। মোট ধান উৎপাদনের দিক থেকে আউশের অবস্থান তৃতীয়, শতকরা ৮ ভাগ। আমন ধানের শরিকানা ৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ মোট ধানের শতকরা ৪৬ ভাগ উৎপাদিত হয় বর্ষা মৌসুমে। উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বোরো ধানের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া হতো। ফলে আউশ ও আমন ধানের উৎপাদন তুলনামূলকভাবে হ্রাস পাচ্ছিল। এখন অতিরিক্ত সেচনির্ভরতা ও উৎপাদন খরচের কারণে বোরো ধানের প্রতি কৃষকের নিরবচ্ছিন্ন আগ্রহ কিছুটা হ্রাস পাচ্ছে। আউশ ও আমনের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। এ দুটি ধানের ক্ষেত্রে উচ্চ ফলনশীল জাতের উদ্ভাবন এবং কৃষক পর্যায়ে তা সম্প্রসারণের ফলে একরপ্রতি ফলনও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে আবহাওয়ার পরিবর্তন, বর্ষায় ঘন ঘন বন্যা এবং শুষ্ক মৌসুমে খরার কারণে অনেক সময় ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হন এ দুটি ধানের উৎপাদনকারী কৃষকরা।

এবার আউশের উৎপাদন বিস্তৃত হয়েছে বন্যার কারণে। আমনের বীজতলাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রাথমিক বন্যায়। পরে দীর্ঘ খরায় বিলম্বিত হয়েছে মূল জমিতে আমনের চারা রোপণ কার্যক্রম। কৃষকরা বাধ্য হয়ে জমি তৈরি করেছেন সম্পূরক সেচ দিয়ে। ইতিমধ্যে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিরুৎসাহিত হয়েছেন পানি সেচে। সারের দাম বৃদ্ধির কারণেও খরচ বেড়েছে ধান উৎপাদনের। ফলে এবার পূরণ হয়নি আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা। তা ছাড়া বিলম্বে আমনের চারা রোপণের ফলেও ফলন হ্রাসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এবার ১০-১৫ শতাংশ উৎপাদন কম হবে। ভবিষ্যতে আমন চাষের জন্য সম্পূরক পানি সেচের আগাম ব্যবস্থা রাখতে হবে। বিদ্যুতের আওতায় আনতে হবে গভীর-অগভীর নলকূপগুলোকে। উচ্চ ফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের আওতাধীন এলাকা সম্প্রসারিত করতে হবে। হাওরের জন্য ব্যবস্থা করতে হবে লাগসই গভীর পানি সহনশীল আমন জাতের। এর জন্য গুরুত্ব দিতে হবে গবেষণার ওপর। বর্ষাকালীন ধান অনেক সময় মার খায় বন্যার কারণে। এর জন্য শস্যবীমা বা তৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।

বর্ষাকালীন আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ফসল পাট। এটি বাংলাদেশের সোনালি আঁশ। রপ্তানি বাণিজ্যে পাটের অবস্থান দ্বিতীয়। একসময় ৮০ শতাংশ রপ্তানি আয় আসত পাট থেকে। এখন তা নেমে এসেছে ৩ শতাংশে। রপ্তানি বাণিজ্যে গার্মেন্ট পণ্যসামগ্রীর আধিপত্যের কারণে পাটের শরিকানা কমেছে। কিন্তু নিরঙ্কুশ অঙ্কে তা বেড়েছে। পাটের আওতায় চাষকৃত জমির পরিমাণও কমেছে। তবে ফলন বেড়েছে। বর্তমানে প্রায় ১৭ লাখ একর জমিতে পাটের চাষ হয়। উৎপাদন হয় প্রায় ৮৪ লাখ বেল পাট। বাংলাদেশে পাট গবেষণার ক্ষেত্রে অনেক সাফল্য আছে। এ পর্যন্ত সাদা পাটের ১২টি উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। তোষা পাটের ৮টি, কেনাফের ৪টি এবং মেস্তার ৩টি উচ্চ ফলনশীল জাত অবমুক্ত করা হয়েছে। এগুলোর সম্প্রসারণ চলছে মাঠ পর্যায়ে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়া এবং আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে এদেশের কৃষি পরিবেশে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। এখন আমাদের লবণাক্ততা, খরা ও শীতসহিষ্ণু জাতের পাট উদ্ভাবন করা দরকার। ইতিমধ্যে দুবার, অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি ও মে মাসে পাট বোনার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তাতে পাটের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। তবে গবেষণার মাঠে নতুন উদ্ভাবিত পাটজাতের ফলন যত বেশি, কৃষকের মাঠে তত বেশি নয়। এ ফারাক কমিয়ে আনতে হবে। এর জন্য গবেষণা ও সম্প্রসারণের মধ্যে জোরালো সমন্বয় দরকার। পাট গবেষণা ও সম্প্রসারণে বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার।

দেশের বিভিন্ন জেলায় মাটির ধরন, বৃষ্টিপাত ও আবহাওয়ার পার্থক্যের কারণে পাটের উৎপাদন, গুণাগুণ ও মানের তারতম্য ঘটে। পাট পচানোর ওপর নির্ভর করে এর রং ও ঔজ্জ্বল্য। পরিষ্কার করে চার মাস পানিতে পাট পচালে ও ধুলে এর রং ভালো ও উজ্জ্বল হয়। বর্তমানে আমাদের কৃষকের বড় সমস্যা পাট পচানো। বর্ষার পানি অনেক সময় দ্রুত নেমে যাওয়ায় এবং প্রয়োজনীয় বৃষ্টির অভাবে ঠিকভাবে পাট জাগ দিতে পারেন না কৃষকেরা। পুকুর, ডোবা, খাল-বিল, দীঘি ও নালায় পর্যাপ্ত পানি না থাকায় এ সমস্যা হয়। এবার দীর্ঘ খরার কারণে এ সমস্যাটি প্রকট আকার ধারণ করছে। বিকল্প হিসাবে রিবন রেটিং বা পাটের ছালকরণ ও পচানোর পদ্ধতির শরণাপন্ন হন অনেক কৃষক। পাটের বীজের অপ্রতুলতা এদেশে পাট চাষের আরেকটি সমস্যা। দেশে উৎপাদিত বীজে চাষ হয় প্রায় ২০ শতাংশ জমি। বাকি জমি চাষ হয় আমদানীকৃত বীজ দিয়ে। যার গুণগত মান সম্পর্কে অনেক সময় কোনো নিশ্চয়তা থাকে না।

গত দুই বছর ধরে পাটের বাজারমূল্য বেশ ভালো। এবার প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকায়। বিদেশে পাট পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণভাবে পাটের ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে কাঁচা পাটের মূল্য বাড়ছে। তাতে লাভবান হচ্ছেন কৃষক। সামনের দিনগুলোতে দেশে ও বিদেশে পাটপণ্যের চাহিদা আরও বৃদ্ধি পাবে। এর জন্য পাটপণ্য বহুমুখীকরণ, এর মান উন্নয়ন ও মোট উৎপাদন বৃদ্ধি করা দরকার। বন্ধ থাকা পাটকলগুলোকে অতি দ্রুত আধুনিক করে এবং দীর্ঘ মেয়াদে লিজ প্রদানের মাধ্যমে উৎপাদন ফিরিয়ে আনা দরকার।

বর্ষাকালের অন্যতম ফসল সবজি। অনেক সময় তা বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন এর দাম বেড়ে যায়। বাংলাদেশে শীত মৌসুমেই সবজির উৎপাদন হয় বেশি। গ্রীষ্ম ও বর্ষায় এর উৎপাদন কিছুটা কম হয়। এ সময়ে উৎপাদিত সবজির মধ্যে রয়েছে ঢ্যাঁড়স, পটোল, মিষ্টি কুমড়া, চাল কুমড়া, কাঁকরোল, চিচিঙ্গা, ঝিঙ্গা, ডাঁটা, লালশাক, পুঁইশাক, করলা, শসা ইত্যাদি। কিছু সবজি সকল মৌসুমে উৎপাদিত হয়। এগুলোর মধ্যে আছে বেগুন, কচু, পেঁপে, কাঁচকলা, সজিনা ইত্যাদি। বর্ষাকালে মরিচ হয় কম। তাই দাম থাকে বেশি। পেঁয়াজ, রসুন, টমেটো- এগুলোর প্রাপ্যতাও বর্ষাকালে থাকে কম। তাই বাজারমূল্য বেশি থাকে। তবে শীতকালীন কিছু সবজি যেমন ফুলকপি, বাঁধাকপি, পেঁয়াজ, টমেটো এখন গ্রীষ্মকালেও উৎপাদিত হচ্ছে বাংলাদেশে। এগুলোর ওপর আরও গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। দেশের বিভিন্ন এলাকায় সবজির হিমায়িত সংরক্ষণাগার স্থাপনা প্রয়োজন। তাতে সারা বছর সবজির সরবরাহ ঠিক রাখা ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।

বর্ষায় ফলের সরবরাহ থাকে প্রচুর। দামও থাকে ভোক্তাদের নাগালের মধ্যে। গ্রীষ্মকালে শুরু হয়ে বর্ষার শেষ নাগাদ পাওয়া যায় অনেক দেশি ফল। এর মধ্যে আছে আম, কাঁঠাল, আনারস, তাল, আমড়া, পেয়ারা ও সবুজ মালটা। গবেষণার মাধ্যমে এগুলোর নতুন জাত উদ্ভাবিত হচ্ছে। উৎপাদনও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ সুবিধা বৃদ্ধি পেলে ফল উৎপাদনে অচিরেই স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে বাংলাদেশ।

বর্ষায় নানা ধরনের ফুল ফোটে। বিভিন্ন ফুলের গল্পে বিমোহিত থাকে প্রকৃতি। আবেগপ্রবণ হয় মানুষের মন। বর্ষাকালে ফোটা ফুলগুলোর মধ্যে রয়েছে কদম, কেয়া, কামিনী, লিলি, বেলি, বকুল, দোলনচাঁপা, শাপলা, সন্ধ্যামালা, হাসনাহেনা প্রভৃতি। দেশের দক্ষিণ ও উত্তরাঞ্চলে এখন বাণিজ্যিকভাবে গড়ে উঠেছে অনেক ফুলের বাগান। ঢাকাসহ অন্যান্য বিভাগীয় শহরগুলোতে এর ব্যবসা বেশ জমজমাট। বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে ফুল। তাতে উৎসাহিত হচ্ছেন ফুল চাষিরা। এদের উৎপাদনে ধরে রাখা ও বাজার সম্প্রসারণের জন্য পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে উন্মুক্ত জলাশয় ও নদী-নালা বর্ষার পানিতে ভরপুর থাকে। তাতে পাওয়া যায় অনেক ধরনের মাছ। তখন জেলেদের মধ্যে মাছ ধরার ধুম পড়ে যায়। তবে দীর্ঘ দিন ধরে মুক্ত জলাশয়ে মাছ উৎপাদনের হার কম। অতিরিক্ত মাছ আহরণই এর প্রধান কারণ। প্রতিকার হিসেবে মাছের পোনা অবমুক্তকরণ কর্মসূচি জোরদার করা প্রয়োজন।

পশু-পাখির প্রতিপালন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বর্ষাকালে বেশ সতর্ক থাকতে হয় কৃষকদের। এ সময় পশু-পাখির রোগ বেশি হয়। খাদ্য সমস্যা হয় প্রকট। কাঁচা ঘাসের অপ্রতুলতা দেখা দেয়। ফলে পশু-পাখির উৎপাদন কমে যায়। মূল্য বৃদ্ধি পায় পশু-পাখিজাত পণ্যের। এ সময় বিভিন্ন রোগের প্রতিকারে সাইলেজ তৈরির জন্য কৃষকদের সহায়তা দেয়া দরকার। তা ছাড়া বর্ষাকালে সবুজ আকার ধারণ করে বনরাজি। এ সময় বেশি করে গাছ লাগানো দরকার। সামাজিক বনায়নে সহায়তা দিয়ে কৃষকদের উৎসাহিত করা দরকার। বর্ষাকাল কৃষকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন মৌসুম। এ সময়ে শস্য বৃষ্টিনির্ভর। খাদ্যপণ্য, ফল ফুল, শাক-সবজির উৎপাদন হয় অপেক্ষকৃত কম খরচে। মাছের সরবরাহ থাকে প্রচুর। পশু-পাখির উৎপাদন হয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। তবে এ মৌসুমে সমস্যা আছে অনেক। সম্ভাবনাও কম না।

প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সমর্থন দিয়ে বর্ষাকালীন কৃষির উন্নয়ন সাধন অপরিহার্য। তাতে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে দেশ। অর্জিত হবে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা।

লেখক: একুশে পদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ। সাবেক উপাচার্য, ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ।


৭০ সালেই ‘দৈনিক পাকিস্তান’ কার্যত ‘দৈনিক বাংলাদেশ’ হয়ে যায়

৭০ সালেই ‘দৈনিক পাকিস্তান’ কার্যত ‘দৈনিক বাংলাদেশ’ হয়ে যায়
তোয়াব খান।
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত
  • তোয়াব খান

এই সাক্ষাৎকারটি ২০২০ সালের মার্চ মাসে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ থেকে অনুদানপ্রাপ্ত বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ বিশ্লেষণ শীর্ষক গবেষণার জন্য নেয়া হয়। দৈনিক জনকণ্ঠ ভবনে বসে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রাহাত মিনহাজ।

মিনহাজ: ১৯৭১ সালে আপনি ‘দৈনিক পাকিস্তান’ সংবাদপত্রের বার্তা সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। পত্রিকাটি তখন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ছাপা হতো, ন্যাশনাল প্রেস ট্রাস্টের অধীনে ছিল। মার্চের শুরুর দিকে বাংলাদেশের স্বাধীকার বা অসহযোগ আন্দোলনের প্রশ্নে এই সংবাদপত্রটির অবস্থান বা ভূমিকা কেমন ছিল?

তোয়াব খান: ১৯৭১ সালের মার্চের গণ-আন্দোলনের শুরুতে ‘দৈনিক পাকিস্তান’ কার্যত ‘দৈনিক বাংলাদেশ’-এ পরিণত হয়েছিল। ওই সময়ে পত্রিকাটিতে দুটি বিষয়ের সমন্বয় ছিল। একটা হচ্ছে দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সংবাদ প্রকাশ। কারণ, এটা না করলে কাগজ টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, ১৯৬৯ সালে গণ-অভ্যুত্থানের সময় ইংরেজি দৈনিক মর্নিং নিউজ জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিল। একই ভবনে অবস্থান হওয়ায় সে সময় দৈনিক পাকিস্তানও পুড়ে গিয়েছিল। সুতরাং দৈনিক পাকিস্তানে যারা কাজ করতেন তারা কোনো অবস্থাতেই চাইতেন না, কাগজটার ভূমিকা যাতে কোনো অবস্থাতেই জনবিরোধী হয়। কারণ জনবিরোধী সংবাদ ছাপা হলে জনগণ আবারও অফিসটি পুড়িয়ে দিতে পারে। এ জন্য ১৯৬৯-এর পর থেকে পত্রিকাটিতে ক্রমান্বয়ে গণমানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটতে থাকে। যেমন- ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনের আগে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটা ধারাবাহিক স্টোরি ছাপা হয়েছিল। এটা প্রায় টানা দেড় মাস ছাপা হয়েছিল। সম্ভবত ‘এ দেশেই জন্ম আমার...’ শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। ফজলে লোহানী সাহেব ছিলেন টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব, খুবই গুণী মানুষ। তিনি এই ধারাবাহিকটি লিখেছিলেন। ধীরে ধীরে দৈনিক পাকিস্তান-এর ওপর প্রেস ট্রাস্টের খবরদারি কমতে থাকে। বরং মানুষের চাহিদার প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা ছিল।

১৯৭১-এর মার্চের আন্দোলন শুরুর পর ঢাকা থেকে সংবাদপত্র অন্যান্য জেলা শহরে যাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কারণ ট্রেন, বাস, প্লেন চলাচল বন্ধ ছিল। ঢাকার আশপাশে মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর- এসব অঞ্চলে পত্রিকা যেত। তখনকার মানুষের যা যা চাহিদা এবং আন্দোলনের যেসব কর্মসূচি ছিল, সেগুলো সিম্বলিক নির্দেশনার মাধ্যমে প্রতিফলন ঘটানো হয়। যেমন- ‘বঙ্গবন্ধুর তর্জনী’- এটা কর্মী-সমর্থকদের জন্য একটা নির্দেশ। এভাবে আওয়ামী লীগের বা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ প্রকাশ করা হতো। এভাবেই পত্রিকাটি কার্যত ‘দৈনিক বাংলাদেশ বা দৈনিক বাংলা’য় পরিণত হয়েছিল। এটা হয়েছিল ১৯৭০ সালেই।

মিনহাজ: ‘দৈনিক পাকিস্তান’-এর ‘দৈনিক বাংলা’ হয়ে যাওয়ার এই বিষয়টি মার্চ থেকে, নাকি তারও আগে থেকেই হয়েছিল?

তোয়াব খান: আমি বলব এটা ১৯৭০-এর ১ জানুয়ারি থেকে। ১৯৭০-এর নির্বাচনের আগেই ১ জানুয়ারি থেকে ইয়াহিয়া খান পলিটিক্যাল অ্যাক্টিভিটি চালু করলেন। তারপর থেকেই দৈনিক পাকিস্তান রাজনৈতিকভাবে ধীরে ধীরে ঘুড়ে দাঁড়ায়। গণমানুষ, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের পক্ষে চলে আসে।

মিনহাজ: হোটেল পূর্বাণী থেকে বঙ্গবন্ধু ১ মার্চই ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি ৭ই মার্চ ভাষণ দেবেন। এই ভাষণ কাভারের জন্য ৬ মার্চ আপনারা কী ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন?

তোয়াব খান: সিদ্ধান্ত ছিল বঙ্গবন্ধু যা বলবেন, যেভাবে বলবেন, মূল যে নির্দেশনা দেবেন- সেগুলোই ছাপা হবে, কোনো কিছুই বাদ যাবে না। বড় পরিসরে, গুরুত্বসহকারে ছাপা হবে। ৮ মার্চের সংবাদপত্র দেখলে দেখবেন, ‘সংগ্রাম চলবেই’ এই মূল শিরোনামের সংবাদ যেমন এসেছে। ঠিক তেমনি মুক্তির সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম, এটাও নিউজে এসেছে। মূল শিরোনামের ওপরে চারটি ব্লকে ছোট ছোট করে বঙ্গবন্ধুর চারটা শর্তও প্রকাশ করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রকাশই ছিল আমাদের মূল লক্ষ্য।

মিনহাজ: ৮ মার্চের পত্রিকায় আপানারা ছেপেছিলেন বঙ্গবন্ধুর দুর্নিবার তর্জনী তুলে ঘোষণার ছবি। পত্রিকাজুড়ে প্রায় সাত কলামে ছবিটি ছেপেছিলেন। আমি জানতে চাই ৭ই মার্চ দৈনিক পাকিস্তান-এর নিউজ রুমের পরিস্থিতিটা কেমন ছিল?

তোয়াব খান: তখন দৈনিক পাকিস্তান-এ প্রতিদিন সকালে রিপোর্টার, নিউজ এডিটর, চিফ রিপোর্টার ও সাব-এডিটরদের নিয়ে মিটিং হতো। সেখানে সিদ্ধান্ত হতো কী কী নিউজ যাবে। কোন রিপোর্ট কীভাবে কাভার করা হবে ইত্যাদি। ৭ই মার্চের ওই সকালে মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর জনসভায় যা যা হবে, যেভাবে হবে, যতটা সম্ভব ঠিক সেভাবে তুলে ধরা হবে।

মিনহাজ: ৮ মার্চের পত্রিকায় শেষের পাতায় আপনারা সাতটি ছবি ছেপেছিলেন। যেখানে ছিল বঙ্গবন্ধুর তর্জনীর ছবি, মানুষের হাতে লাঠি, পতাকা হাতে নারী, লাঙ্গল কাধে কৃষকদের ছবি ইত্যাদি। এর পেছনে কি আপনাদের আলাদা কোনো পরিকল্পনা ছিল?

তোয়াব খান: সাংবাদিকতায় একটা কথা আছে ‘এক হাজার শব্দের চেয়েও একটি ছবি অনেক বেশি কার্যকর’। আর সে কারণেই সারা বিশ্বের প্রথম সারির ও পাঠকপ্রিয় সংবাদপত্রগুলো তাদের সংবাদপত্রের পাতাতে ফটোগ্রাফিক রিফ্লেকশন রাখার চেষ্টা করে। আমরাও সেই চেষ্টা করতাম। তবে এক্ষেত্রে দৈনিক পাকিস্তান-এর একটা সুবিধা ছিল। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় আমাদের অফিসটি পুড়ে যাওয়ার পর আমরা পত্রিকা ছাপানোর জন্য নতুন যন্ত্রপাতি পাই। আধুনিক সুবিধাসংবলিত প্রেস। এতে আমরা ছবি ভালো করে ছাপতে পারতাম। যুদ্ধের কিছু আগে থেকেই বিভিন্ন পত্রিকায় ছবির ব্যবহার বাড়তে থাকে।

আমি আপানার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেয়ার আগে একটু পুরাতন কথাতে আসি। ১৯৭০ সালে উপকূলে একটা ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় হয়। ১২ নভেম্বর। সাইক্লোন হওয়ার পর আমরা চিন্তা করলাম ছোট ছোট ছবি দিয়ে যদি ফিচার করা যায়, তাহলে একটা ভালো ফল পাব। পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করা যাবে। ওই সাইক্লোনটি ছিল ভয়াবহ। লাখ লাখ মানুষ মারা যান। উপকূলের অনেক লোকালয় এতে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। পাঠককে আকৃষ্ট করার জন্য আমরা এই সাইক্লোনের বড় বড় ছবি ছাপানোর পরিকল্পনা করেছিলাম। আমরা সফল হয়েছিলাম। দেখা গেছে, একটা লাশ পড়ে আছে, তার ওপরে একটা মরা সাপ পড়ে আছে। অর্থাৎ একটা সাইক্লোন মানুষ ও সাপ- উভয়ের জীবন শেষ করে দিয়েছে। মূলত ওই সাফল্য থেকেই আমরা ৮ মার্চের পত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের ফটোফিচার করার সিদ্ধান্ত নিই।

মিনহাজ: ওই সময়ে অন্যান্য পত্রিকার ভূমিকা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

তোয়াব খান: ইংরেজি পত্রিকা দ্য পিপল মোটামুটিভাবে জনগণের পক্ষে ছিল। এটি আওয়ামী লীগের এক অর্থে মুখপত্র ছিল। বাংলা যারা পড়তে পারতেন না, তাদের কাছে পত্রিকাটি জনপ্রিয় ছিল।

মিনহাজ: বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ টেলিভিশনে প্রচার হয়নি। আমরা বড় একটা শট অর্থাৎ ওপর থেকে তোলা একটা ছবি দেখি, এই ভিডিওটা পাকিস্তানের ডিএসপি (বর্তমানে ডিএফপি) নামের প্রকাশনা সংস্থাটি করেছিল, নাকি অন্য কেউ?

তোয়াব খান: এ বিষয়ে দুই ধরনের তথ্য আছে। মূলত কাজও করেছিল আলাদা দুটি পক্ষ। পুরো সমাবেশের যে ছবিটা ওপর থেকে তোলা, সেটা ডিএসপির তরফ থেকে ধারণ করা হয়েছিল। আবুল খায়ের নামের একজন ব্যক্তি ওই সময় ডিএসপিতে কাজ করতেন। উনি অভিনয়ও করতেন। আরেকটা বেসরকারি কোম্পানি অডিও রেকর্ডিং করেছিল, সেখানে কলিম শরাফি সাহেবও কাজ করতেন। তার আগেই কলিম শরাফিকে টেলিভিশন থেকে সরিয়ে দেয়ার পর উনি ওই প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। তারা জয় বাংলা রেকর্ড বের করেছিলেন। যাই হোক যত দূর আমি জানি, ছবিটা ডিএসপির প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে না, ব্যক্তিগত তরফ থেকে তোলা হয়েছিল।

মিনহাজ: যতটা জানি, ২৫ মার্চের কালরাতে আপনি ইত্তেফাকের সিরাজুদ্দীন হোসেনকে বলেছিলেন, আপনারা (দৈনিক পাকিস্তান) পত্রিকা বের করতে পারছেন না। আপনার কাছে ওই রাতের ঘটনাপ্রবাহ একটু জানতে চাই।

তোয়াব খান: ২৫ মার্চ রাত ১০টার কিছু আগে থেকে আর্মি ঢাকার রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। এরপর গোলাগুলির আওয়াজ হতে থাকে। আমাদের অফিসে শ্রমিক লীগের নেতা মান্নান এসেছিলেন। উনি যে হঠাৎ কোথা থেকে এসে উদয় হলেন তা আমি আজও বুঝতে পারিনি। উনাকে বললাম, কী বুঝলেন, কী চলছে? উনি বললেন, শুরু হয়ে গেছে। আমরা আর ফিরছি না। আমরা চলে যাচ্ছি। এই বলে উনি চলে গেলেন। আমরা তখন অফিসে বন্দি। বন্দি এজন্য যে, চতুর্দিকে গোলাগুলি। কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছিল। আমাদের একই ভবনে ছিল মর্নিং নিউজের অফিস। মর্নিং নিউজে শহীদুল ইসলাম নামের একজন সাংবাদিক কাজ করতেন। পরে তিনি বাংলাদেশ টাইমসের এডিটর ছিলেন। শহীদুল হক ভীষণ মুসিবতে ছিলেন। কারণ, তার পরিবার রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের কাছে থাকত। রাজারবাগ এলাকাতেই বেশির ভাগ গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। আমরা ওই দিন যে পত্রিকাটি ছাপানোর জন্য তৈরি করেছিলাম, সেটি ওই দিন ছাপা হয়নি (২৬শে মার্চ)। তবে অনেক পরে ওই পত্রিকাটি ছাপা হয়েছিল। জিয়াউর রহমানের কিংবা এরশাদের শাসনামলের দিকে।

মিনহাজ: ২৫ মার্চের পরের দিনগুলো আপনার কেমন কেটেছিল? তখন তো সবকিছু পাকিস্তানি সেনা কর্তৃপক্ষের কঠোর নিয়ন্ত্রণে ছিল।

তোয়াব খান: তখন সময়গুলো ছিল আতঙ্কের। ১৯৭১ সালের মে মাসের এক বিকেলের কথা উল্লেখ করতে চাই। ওই দিন সকালে আমরা অফিসে যাই। কাজ শেষে বাসায় ফিরে বিকেলের দিকে আমি বিশ্রাম করছিলাম। এমন সময় আমাদের পত্রিকার চিফ রিপোর্টার ফোন করেন। তিনি জানতে চাইলেন আমার স্বাস্থ্য কেমন আছে। আমি একটু অবাকই হলাম। কারণ সকালেই অফিসে দেখা হলো। সম্পাদকীয় ও বার্তা বিভাগে সবার সঙ্গে মিটিং-আলোচনায় নানা কথা হলো। চিফ রিপোর্টারকে জানালাম, স্বাস্থ্যে আমার নতুন কিছু ঘটেনি, ভালোই আছি। তিনি কেন যেন জবাব দিলেন, না! আপনার স্বাস্থ্য ভালো নেই। তাড়াতাড়ি ডাক্তার দেখান। একটু অবাক করা ইঙ্গিতপূর্ণ কথা।

টেলিফোনে আর কথা হলো না। ভাবছিলাম হঠাৎ স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ কেন? চিফ রিপোর্টার কোনো নবীন সাংবাদিক নন। অনেক অভিজ্ঞ। দীর্ঘদিন পেশায় ও রাজনীতিতে পোড় খাওয়া ব্যক্তি। সাংবাদিক ইউনিয়নেরও একজন সক্রিয় নেতা। সব মহলেই তার যথেষ্ট পরিচিতি আছে। তাই স্বাস্থ্য নিয়ে তার এই প্রশ্ন একটু চিন্তার বিষয়। ইতিমধ্যে আবার টেলিফোন। এবার আমাদের পত্রিকার একজন সিনিয়র সহকারী সম্পাদক। তিনি অবশ্য হেঁয়ালিতে যাননি। সরাসরি জানালেন, যা কিছু করার আজ রাতের মধ্যেই শেষ করে ফেলুন। কাল আপনার সঙ্গে দেখা না হলেই মঙ্গল। আরও স্পষ্ট ইঙ্গিত পেলাম। বুঝতে পারলাম, আমার আর অফিসে না যাওয়াই ভালো।

মিনহাজ: ওই সময়ের সংবাদপত্র, সাংবাদিকতা ও সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাই।

তোয়াব খান: ২৫ মার্চের পর থেকেই কার্যত সংবাদপত্র অবরুদ্ধ। কঠোর সেন্সর বলবৎ। যা বলা হবে অর্থাৎ পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী যা বলবে সেভাবেই লিখতে হবে, ছাপাতে হবে। এদিক-সেদিক হওয়ার সুযোগ নেই। ২৫ মার্চের পর বেশ কয়েক দিন তো সংবাদপত্র বন্ধই ছিল। প্রকাশনা আবার শুরুর পর দখলদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দেয়া খবরই শুধু ছাপা হতো। সম্পাদকীয় কেউ লিখতেন না। নিজস্ব প্রতিবেদন প্রকাশের ধারেকাছেও কেউ যেত না। দখলদারদের দেয়া তথ্যবিবরণী (হ্যান্ডআউট) এবং তাদের বার্তা সংস্থা এপিপি (অ্যাসোসিয়েট প্রেস অব পাকিস্তান) পরিবেশিত খবরই শুধু ছাপা হতো।

কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই দখলদারদের খেয়াল হলো সংবাদপত্রগুলো নিজেদের কোনো অভিমত বা সম্পাদকীয় প্রকাশ করছে না। সঙ্গে সঙ্গে হুকুম এলো অবশ্যই সম্পাদকীয় লিখতে হবে। ওই অবরুদ্ধ সময়ে পত্রিকা পড়ার লোক, গ্রাহক সংখ্যা একেবারে তলানিতে। দলে দলে লোক ঢাকা ছেড়ে চলে গেছে বা যাচ্ছে। ইত্তেফাক ও সংবাদ-এর অফিস কামানের গোলা দেগে জ্বালিয়ে দিয়েছে পাক সেনারা। পত্রিকাগুলো পৃষ্ঠা সংখ্যা অর্ধেক কমিয়ে দিয়েছে। সেনা কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা আসার পর কয়েকটি পত্রিকা প্রথমে সম্পাদকীয় লিখতে আরম্ভ করল। অবজারভার হাউসের দুটি পত্রিকা পাকিস্তান অবজারভার আর পূর্বদেশ। প্রেস ট্রাস্টের মর্নিং নিউজ এবং আজাদও লেখা শুরু করেছিল। এদিকে কয়েক দিনের মধ্যেই দৈনিক পাকিস্তানকে কড়া ভাষায় জানিয়ে দেয়া হলো, দ্রুত সম্পাদকীয় নিবন্ধ প্রকাশিত না হলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কোনো উপায় না দেখে দৈনিক পাকিস্তানও সম্পাদকীয় লেখার সিদ্ধান্ত নিল। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল অন্য জায়গায়। সহকারী সম্পাদক কবি হাসান হাফিজুর রহমান ২৫ মার্চের পর থেকে অফিসে আসেন না। তিনি নাকি ঢাকা ছেড়ে চলে গেছেন। হাসান সাহেব ১৬ ডিসেম্বর অর্থাৎ বিজয় দিবসের আগে আর কোনো দিনই দৈনিক পাকিস্তান-এর কাজে যোগ দেননি। কবি শামসুর রাহমান ঢাকাতেই ছিলেন, তবে অফিসে আসতেন না। আহমেদ হুমায়ুন অফিসে আসেন; কিন্তু সম্পাদকীয় লেখার ফরমান জারি হওয়ার পর ঢাকা ছেড়ে দেশের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া চলে যান। নিয়মিত অফিস করেন সহকারী সম্পাদকের মধ্যে সানাউল্লাহ নূরী আর মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ। তারা সম্পাদকীয় লিখতে অস্বীকৃতি জানান। তাদের বক্তব্য দখলদারদের গুণকীর্তনে তাদেরকেই শুধু ব্যবহার করা হচ্ছে। তাই তারা প্রথম দিন লিখবেন না। শেষ পর্যন্ত কোনো উপায় না পেয়ে প্রবীণ সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীনকেই সেদিন সম্পাদকীয় লিখতে হয়েছিল। 

মিনহাজ: তারপর কী ঘটল? পরিস্থিতি কি স্বাভাবিক হলো?

তোয়াব খান: এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহের দিকে দখলদার পাকিস্তানিরা এটা প্রমাণ করতে উঠেপড়ে লাগে যে, সর্বত্র স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে। সবকিছুই তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। যদিও হত্যাযজ্ঞ চলছিল। মানুষ ঢাকা ছেড়ে পালাচ্ছিল। আমি দৈনিক পাকিস্তান অফিসে দাঁড়িয়ে লাল ত্রিপল দিয়ে ঢেকে মরদেহ বোঝাই ট্রাক চলাচল করতে দেখেছি। তবে সেনা কর্তৃপক্ষ অনেক চেষ্টা করেছিল। ঢাকায় সবকিছু স্বাভাবিক এমন বিষয় প্রচার-প্রকাশের জন্য  তারা সাংবাদিকদের একটি প্রতিনিধি দল পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ঢাকায় পাঠায়। এই প্রতিনিধি দলে লাহোর-করাচির অনেক নামকরা সাংবাদিক ছিলেন। ছিলেন এসআর ঘোরি, এবিএম জাফরিসহ আরও অনেকেই। আবার এটাও শুনেছি মাজহার আলী খান (প্রখ্যাত বামপন্থি নেতা) এটি চৌধুরী, আসরার আহমেদের মতো সম্পাদক-সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু তারা আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। দখলদারদের ‘স্বাভাবিক অবস্থা’ প্রমাণের ঢাক পেটানোর চেষ্টায় সবচেয়ে বড় ব্যাক ফায়ার করেছিলেন অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাস। তিনি এখানে এসে ঘুরে গিয়ে পাক সেনাদের হত্যাযজ্ঞ নিয়ে ‘জেনোসাইড’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদন লেখেন। কিন্তু নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তার জন্য তিনি তখন পাকিস্তান থেকে সেটি প্রকাশ করতে পারেননি। পাকিস্তানের মর্নিং নিউজের পাশাপাশি অ্যান্থনি লন্ডনের দ্য সানডে টাইমস-এ কাজ করতেন। তিনি ওই প্রতিবেদনটি দ্য সানডে টাইমসে প্রকাশ করেছিলেন ১৩ জুন, ১৯৭১। যা নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এর আগে তিনি তার পরিবারকে লন্ডনে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। আর নিজেও দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে আফগানিস্তান হয়ে পাকিস্তান ত্যাগ করেছিলেন। এরপর অ্যান্থনি পাক দখলদারদের মৃত্যুঘণ্টা বাজানোর মতো একটি বই লিখেছিলেন- ‘দ্য রেপ অব বাংলাদেশ’।

মিনহাজ: আপনি কবে, কীভাবে, কোন পথে ঢাকা থেকে ভারতের উদ্দেশে রওনা হলেন। ভারতে পৌঁছে আপনি কী করেছিলেন ?

তোয়াব খান: আমার জন্য দৈনিক পাকিস্তান-এ কাজ করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর অনুচর জামায়াত নেতারা শান্তি ও সংহতি কমিটির আলখেল্লা নিয়ে সাংবাদিক-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের ওপর নজরদারি শুরু করে। তারা নিয়মিত ইনফরমারের কাজ করছিল। মোহাম্মদপুর এলাকায় বসবাসরত আমাদের পত্রিকার এক নারী সাংবাদিকের মাধ্যমে আমাকে সাবধানে থাকার অনুরোধ করেন। কারফিউয়ের মধ্যে আটকা পড়ে মোহাম্মদপুরের ওই নারীকে তার এক আত্মীয়ের (যিনি জামায়াত নেতা) বাসায় রাত কাটাতে হয়েছিল। সেখানে তিনি জামায়াত নেতার সহকর্মীদের আলোচনা থেকে জানতে পারেন, দৈনিক পাকিস্তান-এর বার্তা সম্পাদককে সরিয়ে না দিলে পাকিস্তানপ্রেমীদের খবরা-খবর ওই পত্রিকায় ভালোভাবে যাবে না। তাই পাকিস্তানকে হেফাজত করার স্বার্থেই তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। জামায়াত নেতাদের মুখে ‘কঠোর ব্যবস্থা’র কথা শুনে ভদ্রমহিলা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। একই সময়ে আরও একটি ঘটনা আমার নিরাপত্তা নিয়ে সহকর্মীদের উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়। এক রাতে মর্নিং নিউজ অফিসের গেটে মুক্তিবাহিনীর গেরিলারা গ্রেনেড হামলা চালিয়েছিল। এ নিয়ে তদন্তে এসে পাক বাহিনী মর্নিং নিউজ ও দৈনিক পাকিস্তান ভবনটিতে তদন্ত তল্লাশির নামে ত্রাস সৃষ্টি করে। সন্ধ্যায় পাক সেনাদের আরও একটি দল এসে বিকেলের শিফটে কর্মরত সাংবাদিকদের রীতিমতো জেরা শুরু করে দেয়। পরিস্থিতি আরও ভীতিকর হয়ে ওঠে। আমি দ্রুত ঢাকা ত্যাগের প্রস্তুতি শুরু করি।

সীমান্ত পার হয়ে আমি প্রথমে বক্সনগর পৌঁছাই। সেখানে লাউড স্পিকারে গান চলছিল ‘শোনো একটি মুজিবের কন্ঠ... ।’ তারপর এল মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি, জয় বাংলা এবং ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

আগরতলা পৌঁছেই আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশের সরকারের ক্যাম্প অফিসে নাম নথিভুক্ত করে বাংলাদেশের নাগরিকত্বের সনদ তথা চিরকুট গ্রহণ করি। ১৯৭১ সালে এই চিরকুটের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। ত্রিপুরা-পশ্চিমবঙ্গের যেখানেই যান, জয় বাংলার ওই ক্ষুদ্র চিরকুটটি প্রায় ম্যাজিকের মতো কাজ করত। আমি যত দ্রুত সম্ভব কলকাতায় পৌঁছাতে চাচ্ছিলাম। সেখানে আমাদের আত্মীয়স্বজন আছে।

মিনহাজ: কলকাতা পৌঁছে কী করলেন?

তোয়াব খান: কলকাতায় পৌঁছেই জীবনধারণের অপরিহার্য কিছু কাজ শেষ করে গেলাম বাংলাদেশ মিশন অফিসে। এটা আগে ছিল পাকিস্তান ডেপুটি হাইকমিশনের অফিস। ডেপুটি হাইকমিশনার হোসেন আলী ২৫ মার্চে গণহত্যা শুরু হলে সদলবলে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন। এরপর পুরো ডেপুটি হাইকমিশন অফিস ভবন বাংলাদেশ মিশনে রূপান্তরিত হয়। বাংলাদেশ থেকে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিকসহ সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী তথা উল্লেখযোগ্য যারাই আসছেন শরণার্থী হিসেবে, তাদের সবাই একবার বাংলাদেশ মিশন ঘুরে যাচ্ছেন। মিশন তাই সব সময় লোকারণ্য থাকত। আমি ও আমার ছোট ভাই বাচ্চুও গেলাম। উদ্দেশ্য যদি পরিচিত কারও সাক্ষাৎ পাই। প্রথম দিনেই টেলিভিশনের জামিল চৌধুরী, মুস্তফা মনোয়ার, চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানসহ অনেকের সঙ্গে দেখা হলো। জামিল চৌধুরী আমাকে রেডিওতে নিউজ অপারেশনের জন্য একটি বাজেট তৈরি করতে বললেন। আমি কিছুটা বিস্মিত। কারণ, কোথায় নিউজ প্রচার হবে, সেটা কি পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্র, নাকি যুদ্ধাবস্থায় কাজ চালিয়ে যাওয়ার মতো একটি ব্যবস্থা? এসব প্রশ্ন আমার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল।

মিনহাজ: তারপর তো খুব দ্রুত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কাজ শুরু হলো এবং সেখানেও আপনি আপনার পূর্ব পরিচিত অনেককেই পেয়েছিলেন?

তোয়াব খান: স্বাধীন বাংলা বেতারের একনিষ্ঠ কর্মী, সাংবাদিক ও শিল্পীদের সঙ্গে একে একে পরিচিত হতে শুরু করলাম। তবে সৌভাগ্যের বিষয় ছিল অনেকেই আমার পূর্ব পরিচিত ছিলেন। বার্তা বিভাগের দায়িত্বে থাকা কামাল লোহানী দৈনিক সংবাদ-এ আমার সহকর্মী ছিলেন। বেতার কেন্দ্রের অন্যান্য দায়িত্বে প্রশাসনের আসফাকুর রহমান, বাংলা সংবাদ পাঠক সৈয়দ হাসান ইমাম, ইংরেজি সংবাদের দায়িত্বে ছিলেন আলী যাকের ও আলমগীর কবির।

মিনহাজ: আপনি ‘পিন্ডির প্রলাপ’ সংবাদ ভাষ্যটি নিয়ে কাজ করতেন। এ বিষয়ে যদি বিস্তারিত একটু বলতেন। আর সার্বিকভাবে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের অনুষ্ঠানমালা ও শ্রোতাদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাই?

তোয়াব খান: আমার সংবাদভাষ্যটির নাম দেয়া হয় ‘পিন্ডির প্রলাপ’। সত্যি কথা বলতে কী, স্বাধীন বাংলা বেতারের সংবাদ ও অন্যান্য অনুষ্ঠান শোনার জন্য শরণার্থী শিবিরে এবং শিবিরের বাইরে আশ্রয় গ্রহণকারী লাখ লাখ মানুষ প্রতিদিন উদগ্রীব হয়ে থাকতেন। শুধু যে শরণার্থীরাই অনুষ্ঠান শুনতেন, এমন নয়। পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসীদের ৩০-৪০ শতাংশই ছিলেন পূর্ববঙ্গের। এরা সবাই স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের একনিষ্ঠ শ্রোতা। মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে শুরু হওয়া সম্প্রচারটি চলত সন্ধ্যা থেকে ৪-৫ ঘণ্টা। সকালেও অনুষ্ঠান প্রচারিত হতো। প্রচারিত অনুষ্ঠানের মধ্যে সংবাদ, সংবাদভাষ্য, দেশাত্মবোধক গান, নাটক থাকত। প্রচার করা হতো বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ। অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয় ছিল এম আর আখতার মুকুলের চরমপত্র। মুকুল সাহেব চরমপত্র নিজে লিখতেন এবং স্বকণ্ঠে ঢাকাইয়া উচ্চারণে বিশেষ বাচনভঙ্গিতে পাঠ করতেন। অনুষ্ঠানটি শোনার জন্য শরণার্থী শিবিরের লোকজন, বাড়িঘরে আশ্রয় গ্রহণকারী শরণার্থীরা, পূর্ববঙ্গ থেকে আগত পশ্চিমবঙ্গবাসী এবং রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা সবাই উদগ্রীব হয়ে থাকতেন। এ ছাড়া পাকিস্তানের লম্পট স্বৈর সেনাশাসক ইয়াহিয়া খানের কার্যকলাপ নিয়ে একটি ব্যঙ্গাত্মক ধারাবাহিক নাটক ‘জল্লাদের দরবার’ও যথেষ্ট জনপ্রিয়তা পায়।

মিনহাজ: ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১। এদিন বেতারকেন্দ্রে আপনারা কী করেছিলেন। ঐতিহাসিক এই দিনটিতে বেতারে কী সম্প্রচার হয়েছিল?

তোয়াব খান: পাক দখলদারদের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ উপলক্ষে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে গান লেখা হলো তাৎক্ষণিকভাবে। গানটি ছিল ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই, বাংলার ঘরে ঘরে।’ সুর দিলেন সুজেয় শ্যাম। আর সেই সুরের তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ল বাংলার ঘরে ঘরে। এরপর মুক্ত স্বদেশে ফেরার পালা। ২২ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে কাজ করছি। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। এমন সময় জানানো হলো কাল, অর্থাৎ ২৩ ডিসেম্বর মুজিবনগর সরকার দেশে ফিরে যাবে সন্ধ্যায়। সকালে স্বাধীন বাংলা বেতারের একটি বিশেষ দল ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিশেষ বিমানে ঢাকা যাবে। এই বিমানে আমাকেও যেতে হবে। এই দলটির একটি বিশেষ দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। ঢাকায় ফিরে রেডিও বাংলাদেশের ঢাকাকেন্দ্রে অনুষ্ঠান সম্প্রচার চালু করতে হবে। নানা ঝুটঝামেলায় আগে থেকেই ঢাকাকেন্দ্র থেকে অনুষ্ঠান সম্প্রচার বন্ধ আছে। ঢাকাকেন্দ্রের অনুষ্ঠান সম্প্রচার শুরুর সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীন বাংলা বেতারের অনুষ্ঠান প্রচারের পরিসমাপ্তি ঘটবে।

মিনহাজ: সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ স্যার।

তোয়াব খান: আপনাকেও ধন্যবাদ।


আমারে যেন না করি প্রচার

আমারে যেন না করি প্রচার
আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক।
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক

তোয়াব খানের মৃত্যুতে এ দেশের সাংবাদিকতা জগতে যে শূন্যতার সৃষ্টি হলো, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। জীবদ্দশায় নিজেকে কিংবদন্তির জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন আমাদের প্রিয় তোয়াব ভাই। প্রায় সত্তর বছরের সাংবাদিকতা জীবনে তিনি ছিলেন নানা স্বাতন্ত্র্যে সমুজ্জ্বল।

সদ্য প্রয়াত তোয়াব খানের চেহারাটা মনে এলেই আমার কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৩১৩ বঙ্গাব্দে রচিত ‘আমার মাথা নত করে দাও হে প্রভু’ কবিতার ‘আমারে যেন না করি প্রচার’-পঙ্‌ক্তিটি বারবার স্মরণে আসছে। বাংলা সাংবাদিকতার অন্যতম পথিকৃৎ মওলানা আকরম খাঁর পরিবারে জন্ম নেয়া তোয়াব ভাই ১৯৫৩ সালে সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হন। এরপর থেকে তিনি বহু সংবাদমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশেষ করে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ থেকে তার উপস্থাপিত ‘পিন্ডির প্রলাপ’ জনমানসে উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিল। স্বাধীনতার বীজমন্ত্রে সঞ্জীবিত তোয়াব খান তাই মৃত্যুর অল্প কয়েক দিন আগে নব উদ্যোগে প্রকাশিত ‘দৈনিক বাংলা’র সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণের সময় শর্ত দিয়েছিলেন, দৈনিকটিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার হতে হবে।

এর আগে ১৯৯৩ সালে জনকণ্ঠ পত্রিকার উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবে তার ভূমিকা আমাদের মনে আছে। সাম্প্রদায়িক মৌলবাদ আর জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তার দৃঢ়তা সে সময় দৈনিকটির পাতায় পাতায় প্রতিফলিত হতো। প্রায় ৮৮ বছর বয়সেও তিনি মানসিক এবং শারীরিক স্থিতাবস্থা বজায় রেখে একটি নতুন দৈনিক পরিচালনার কঠিন কাজে কীভাবে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন, সেই কাহিনিটি ইতিমধ্যে তার সেখানকার সহকর্মীদের গণমাধ্যমে প্রকাশিত লেখা বা সংবাদ থেকে জানা যায়। তবে তার এই অসাধারণ কর্মনৈপুণ্য অনেক আগে থেকেই সুবিদিত। স্বাধীনতার ঊষালগ্নে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেস সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি দৈনিক পাকিস্তান থেকে দৈনিক বাংলায় রূপান্তরের ঐতিহাসিক মুহূর্তে সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। আবার তাই যখন নতুন আঙ্গিকে দৈনিক বাংলা প্রকাশিত হলো, তখন তিনি সেই দৈনিকটিরও সম্পাদকের গুরুদায়িত্ব পালন করতে পিছপা হননি। সাংবাদিকতা জগতে এ রকম নানা কৃতিত্বই তাকে এখানকার সংবাদমাধ্যমের একজন মহীরুহে পরিণত করেছিল। কিন্তু এত কিছু তিনি নীরবে-নিভৃতেই করতে চেয়েছেন। নিজেকে কখনো পাদপ্রদীপের আলোতে নিয়ে আসতে চাইতেন না।

তোয়াব ভাই সম্পাদকের টেবিলে বসে সংবাদের মূল্যায়ন করেছেন, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের জন্য সহকর্মীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া থেকে শুরু করে সহায়তা করেছেন এবং সম্পাদকীয় নীতি তৈরি করেছেন। স্বাধীনতার সুফল অবাধ তথ্যপ্রবাহের সাহায্যে জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়ার কাজ করে গিয়েছেন প্রতিনিয়তই। বস্তুনিষ্ঠতার মাধ্যমে নিবেতিপ্রাণ একজন সাংবাদিক হিসেবে তিনি বাংলাদেশের জনমানসে সর্বদা উপস্থিত থাকবেন।

কিছু কিছু মানুষ আছেন, তারা যত দীর্ঘ বয়সেই মারা যান না কেন মনে হয় তাদের অকালপ্রয়াণ হয়েছে। তোয়াব ভাইয়ের মৃত্যুর সময় আমার সেটাই মনে হয়েছে। দীর্ঘ ৭০ বছর সাংবাদিকতা করে ৮৮ বছরে মৃত্যুবরণ করেছেন তোয়াব ভাই। তারপরও মনে হচ্ছে আর কিছুকাল বেঁচে থাকলে, দেশ ও জাতির আরও উপকার হতো। তার মতো একজন সাংবাদিক এবং সম্পাদক যে কোনো দেশের জন্যই বিরল সম্পদ। এ ধরনের একজন মানুষের মৃত্যু প্রকৃত অর্থেই দেশের জন্য একটা বিরাট ক্ষতি হিসেবেই বিবেচিত হয়।

মৃত্যু যে কোনো প্রাণেরই অনিবার্য পরিণতি। আমাদের সবাইকেই এ পরিণতি বরণ করতে হবে। কিন্তু তোয়াব ভাই সাংবাদিকতায় যে আদর্শবাদ আর সৌজন্যের চর্চা করে গিয়েছেন এবং জীবনব্যাপী যে সদাচার আর সংযমের দৃষ্টান্ত তৈরি করে গিয়েছেন, তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে। বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতের বহু কীর্তিমান আছেন, যারা তোয়াব খানের কাছ থেকে এই পেশার দীক্ষা নিয়েছেন। প্রেস ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক হিসেবেও তিনি সেই প্রজন্মের অনেক সাংবাদিক তৈরিতে ভূমিকা রেখেছেন। তার ফলে আমাদের সাংবাদিকতা শুধু পরিবর্তিতই হয়নি, অনেক উন্নত এবং সমৃদ্ধ হয়েছে।

তোয়াব খানের সঙ্গে কথা বললেই মনে হতো তিনি সময়ের বহু আগেই চিন্তা করার ক্ষমতা রাখেন। প্রবীণ বয়সেও তিনি ছিলেন নবীন এবং সদা উৎসুক। আলস্যহীন উদ্যেম আর পরিশ্রম ছিল তার জীবনের মূলমন্ত্র। সে কারণেই বার্ধক্যজনিত নানা অসুস্থতার মধ্যেও একটি নতুন দৈনিক সম্পাদনার দায়িত্ব নিতে তিনি পিছপা হননি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যার ধমনীতে প্রবাহিত, তিনি কোনো প্রতিবন্ধকতাকেই মোকাবিলা করতে ভয় পান না। আর সে কারণেই তোয়াব খান সাংবাদিকতার মতো পৃথিবীর অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় অনন্য ভূমিকা আমৃত্যু পালন করে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়ে গিয়েছেন।

তোয়াব ভাই সত্য প্রকাশে ছিলেন অকুতোভয়। সম্পাদকের টেবিলে বসে সত্য প্রকাশে অবিচল থাকাটাই ছিল তার জীবনের দর্শন। রুশ লেখক আলেকজান্ডার আইসেভিচ সোলঝিনিৎসিন (১৯১৮-২০০৮) বলেছিলেন, ‘সাধারণ মানুষের কাজ হলো মিথ্যাচারে অংশ না নেয়া আর কবি, লেখক, সাংবাদিক এবং বুদ্ধিজীবীদের কাজ মিথ্যাকে পরাভূত করা।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘সাহসী মানুষের কাজ হলো মিথ্যায় না অংশ নেয়া। একটি সত্যি শব্দ গোটা দুনিয়ার চাইতেও বেশি ওজন বহন করে।’ তোয়াব ভাই সম্পাদক, প্রধান তথ্য কর্মকর্তা, মহাপরিচালক, বঙ্গবন্ধুর প্রেস সেক্রেটারি- সব দায়িত্বেই এই দর্শনের প্রতিফলন রেখে গিয়েছেন। সত্য প্রকাশ এবং সততাই যে একজন সাংবাদিকের মূল কর্তব্য, সেটাই তোয়াব ভাই সারা জীবন পালন করে গিয়েছেন। আর তার সাহচর্যে যারাই এসেছেন, তাদের মধ্যে তিনি সুচারুভাবে এই মন্ত্রটিই বপন করে দিতে চেয়েছেন।

আমার মনে আছে উত্তরবঙ্গে যখন বাংলা ভাইয়ের প্রবল প্রতাপ, তখন তিনি তার সম্পাদিত দৈনিকে সবিস্তারে সেই কাহিনি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করেছিলেন। প্রতিবেদকদের তিনি সে সময় আকুণ্ঠ সমর্থন আর সাহস জুগিয়ে গিয়েছেন। তিনি সে সময়ে তাদের সত্য প্রকাশে উদ্বুদ্ধ করে গিয়েছেন এবং প্রয়োজনে জীবনের ঝুঁকি নেয়ার জন্যও উদ্যেমী করে তুলেছেন। এটাই হলো একজন সত্য প্রকাশে অবিচল একজন বস্তুনিষ্ঠ সম্পাদকের প্রধান কর্তব্য।

সে জন্যই মনে করি, তোয়াব খানের মতো একজন সাহসী সম্পাদকের আরও বেশ কিছুদিন প্রয়োজন ছিল। আসলে তোয়াব খানদের মতো মানুষদের প্রয়োজন সমাজে সবসময়ই থাকবে। তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন, কিন্তু তার সত্যপ্রকাশের আত্মবিশ্বাস আর আত্মবোধের শিক্ষা আমাদের জন্য রেখে গিয়েছেন। আমরা যদি তার আদর্শ ধারণ করে নিজেদের প্রস্তুত করতে পারি, তাহলে সেটাই হবে তার স্মৃতির প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা প্রদর্শনের সর্বোৎকৃষ্ঠ পন্থা।

লেখক: সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মিয়ানমারের সামরিক জান্তার পা থেকে কি মাটি সরে যাচ্ছে

মিয়ানমারের সামরিক জান্তার পা থেকে কি মাটি সরে যাচ্ছে
দেলোয়ার হোসেন।
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত

দেলোয়ার হোসেন

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারের নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে দেশটির ক্ষমতায় আসা সামরিক জান্তা সরকার বর্তমানে গভীর সংকটে পতিত হয়েছে। ২০২০ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের ফলাফলকে সামরিক শাসকরা প্রত্যাখ্যান করে, যা তাদেরই তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এমনকি তারা দেশটির পেছনের সব ইতিহাসকে ছাড়িয়ে গেছে। দীর্ঘদিনের সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে ২০১১ সালে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) জোট ক্ষমতায় আসার মাধ্যমে দেশটির গণতন্ত্রায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়। তখন থেকেই সামরিক জান্তা ও এনএলডি যৌথভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করে আসছিল। এমনকি সু চি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর বর্বর ও নৃশংস কার্যকলাপের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। কিন্তু ২০২০ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচন সামরিক জান্তা ও এনএলডির মধ্যকার সম্পর্ক পরিবর্তন করে দিয়েছে। জান্তা সরকারের নেতৃত্ব মিয়ানমারের গত ১০ বছরের সব অর্জন ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছে।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে জান্তা সরকার রাজনৈতিক ও সামরিক উভয় দিকেই বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। দেশব্যাপী জনগণ রাস্তায় নেমে এসেছে এবং জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছে। অন্যদিকে আধুনিক মিয়ানমারে প্রথমবারের মতো জাতীয় ঐক্য সরকার বা এনইউজি নামে একটি ছায়া সরকার গঠিত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এনইউজিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য বেশ বেগ পেতে হয়েছে, কিন্তু বর্তমানে সারা বিশ্বেই বিভিন্ন দেশে এর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও আসিয়ানের সদস্য রাষ্ট্রগুলো মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ হিসেবে এনইউজির ভূমিকার ওপর জোর দিচ্ছে। জান্তা সরকারকে মোকাবিলার জন্য এনইউজি পিপলস ডিফেন্স ফোর্স নামে তাদের সশস্ত্র বাহিনী গঠন করেছে, যা মূলত এনএলডির নেতা ও অনুসারী নিয়ে গঠিত হয়েছে। অন্যদিকে মিয়ানমারে কয়েক দশক যাবৎ বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। জান্তা সরকার বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর বিরোধিতার মুখোমুখি হচ্ছে। তবে এসব জাতিগত দলগুলো এনইউজিকে সমর্থন করছে এবং এসব দলের অনেকেই এনইউজির সঙ্গে জোট করেছে।

একই সঙ্গে এসব জাতিগত দলগুলো জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য নিজস্ব সামরিক শক্তি তৈরি করেছে। ফলে মিয়ানমারে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় জান্তা সরকার গভীর সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। কূটনৈতিকভাবে তারা সমগ্র বিশ্ব থেকে আলাদা হয়ে পড়েছে। কূটনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক- এই তিন ফ্রন্টেই তারা প্রায় পরাজিত হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, শক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য জান্তা সরকার আরাকান আর্মির মতো কিছু বিদ্রোহী গ্রুপের সঙ্গে জোট তৈরি করেছিল। প্রথমদিকে আরাকান আর্মি জান্তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করে চলত, কিন্তু সম্প্রতি রাখাইন রাজ্যে নিজেদের শক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য আরাকান আর্মি নিজেদের কৌশল বাস্তবায়ন শুরু করেছে। দিনে দিনে তারা জান্তার বিরুদ্ধে কঠোর হয়ে উঠেছে এবং জান্তা সরকারও তাদের একটি মুখ্য প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। আগস্টের মাঝামাঝি থেকে রাখাইনে দুই প্রতিপক্ষের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়।

বর্তমানে রাখাইনে সামরিক জান্তা গভীর সংকটে রয়েছে। তারা তাদের আধিপত্য এমনকি তাদের মৌলিক উপস্থিতিও হারাচ্ছে। সৈন্য হারানোর সঙ্গে সঙ্গে তারা প্রাণহানির সম্মুখীন হচ্ছে এবং বেশ কয়েকটি সামরিক চৌকির নিয়ন্ত্রণও হারিয়েছে। আরাকান আর্মি দ্বারা ব্যাপকভাবে আক্রমণের শিকার হয়ে তারা উল্লেখযোগ্যভাবে সামরিক সরবরাহ ও যোগাযোগব্যবস্থা হারিয়েছে।

মিয়ানমারের সামরিক জান্তা অব্যাহতভাবে রাজনীতিবিদ ও বেসামরিক নাগরিকদের দমন করছে। তারা নির্বিচারে হামলা ও হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে। আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে জয়ের জন্য তাদের সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করছে, কিন্তু কৌশলগতভাবে তারা খুব একটা লাভ করতে পারেনি। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, মিয়ানমারের ভূখণ্ডের মাত্র ১৭ শতাংশ জান্তার নিয়ন্ত্রণে, ৫২ শতাংশ এনইউজির অধীনে এবং বাকি অঞ্চলে কোনো দলেরই নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ নেই। সুতরাং ধারণা করা যায় যে, জান্তা মিয়ানমারে তার নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। রাখাইনেও তারা বেশ ধরাশায়ী। এটি সবার কাছেই স্পষ্ট যে, যেসব অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো খুবই সক্রিয় সেখানে তাদের কোনো শক্তিশালী অবস্থান নেই। এমনকি বার্মিজ এবং বৌদ্ধদের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের মধ্যেও জান্তা জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে। তাই জান্তা নেতারা এখন নিজেদের ভবিষ্যৎ, ক্ষমতা ও দেশের সামরিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভাবছেন। ২০২০ সালের নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করার মূল কারণটি ছিল সংবিধানের সংশোধনী, যা মিয়ানমারে সামরিক কর্তৃত্ব হ্রাস করত। যার ফলে জান্তা তার ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব হারাত।

পরিস্থিতি বলে দিচ্ছে, সামরিক জান্তার বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু তারা বাস্তবতা মেনে নেবে না। মিয়ানমার একঘরে নাকি ব্যর্থ রাষ্ট্র, তা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। বরং তারা নিজেদের শক্তিশালী করে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করবে এবং এ অঞ্চলকে নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেবে। তারা ইতিমধ্যেই রোহিঙ্গা সংকটের মতো আঞ্চলিক সমস্যা তৈরি করেছে। তাদের নৃশংসতা ও বর্বরতা লাখ লাখ বাস্তুচ্যুত, শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু তৈরি করেছে, যা তার প্রতিবেশী বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। সবশেষে সীমান্তে সংঘাত তৈরি করে বাংলাদেশকে উসকে দিচ্ছে জান্তা সরকার। বিশ্ব সম্প্রদায়কে বারবার বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে চলেছে তারা। দেশটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানকেও পাত্তা দিচ্ছে না। ফলে সংস্থাটির কিছু মিটিং ও শীর্ষ সম্মেলনে আমন্ত্রণ না জানানোর মধ্য দিয়ে আসিয়ান ইতিমধ্যে জান্তার বিরুদ্ধে তার অবস্থান জানান দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য মিয়ানমার জান্তা সরকারকে চাপ প্রয়োগ করা। সু চিকে মুক্তি দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে জান্তার উচিত ২০২০ সালের নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেয়া এবং বেসামরিক সরকারকে কাজ করার অনুমতি দেয়া। ভারত ও চীনের মতো আঞ্চলিক শক্তির উচিত জান্তা শাসনকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করা। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি বজায় রাখতে পাশ্চাত্যেরও উচিত জান্তার ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করা।

লেখক: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা

তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা
প্রয়াত একুশে পদকপ্রাপ্ত বর্ষীয়ান সাংবাদিক তোয়াব খান।
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত

তোয়াব খান

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তো সাধারণ মানুষ নন। অনন্যসাধারণ, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। আমি মনে করি, হাজার বছরের মধ্যে বাঙালির জীবনে কোনো দিন স্বাধীন রাষ্ট্র হয়নি। বাঙালির প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু, বাঙালির সহস্র বছরের স্বাধীন রাষ্ট্রীয় সত্তার প্রতিষ্ঠাতা।

১৯৭৩ সালের মে মাসে বাসায় এসে জানতে পারলাম ইতিমধ্যে গণভবন থেকে দুইবার টেলিফোন এসেছে। আবার টেলিফোন এলো। এক্ষুনি চলে আসুন, জরুরি দরকার আছে। গণভবনে পৌঁছালে সোজা নিয়ে যাওয়া হলো বঙ্গবন্ধুর বেডরুমে। দুপুরে খেয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। উনি বললেন দেখো, তোমাকে একটা কথা বলি। আমার একটা কাজ করে দিতে হবে। এই কাজটা যত তাড়াতাড়ি তুমি করতে পারবা, তত তাড়াতাড়ি তোমার ছুটি। আর যত দিন না হবে তত দিন তোমার এখানে থাকতে হবে। আজকেই জয়েন করো, যাও।

এই অবস্থায় ওখানে যোগ দিলাম। প্রথম কাজ ছিল বঙ্গবন্ধুর একটি বক্তৃতা লেখা। বক্তৃতা লেখার বিষয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, তুমি একা চলে আসবা। এসে কথাবার্তা বলবা। এই হচ্ছে সূত্রপাত। আমি ১৯৭৩ সালে যখন প্রথম সেখানে যাই, তখন নিতান্তই বহিরাগত ছিলাম। তারপর ক্রমে একেবারে কাছের লোক হিসেবে কাজ করতে পেরেছি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি বা রাষ্ট্রনায়ক নয়; এগুলোর চেয়ে ব্যক্তি মুজিব বড়। তিনি নিজেকে প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখতেন না। যারাই তাঁর সঙ্গে কাজ করত, সবাই তাঁর নিজের লোক। ওভাবেই তিনি দেখতেন।

গণভবনের লেকে মাছ ছাড়া আছে। আমাকে বললেন, ‘দেখো, এই মাছগুলো জানে, আমি কখন আসব। আসলে আমি খাবার দেব। তারপরে খেয়ে চলে যাবে।’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ স্যার, মাছেরা তো সব বুঝতে পারছে, আপনি আসছেন।’

বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘অ্যাই, আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছিস নাকি।’ আমি বললাম, ‘কোনো দিন হয় এ রকম!’ এই কথাগুলো শুধু তাঁকেই বলা যেত।

আরেকবার লাহোর ইসলামিক সামিট প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু বললেন, বাদশাহ ফয়সাল ও ইউএইর শেখ জায়েদ বলছেন, তুমি যত টাকা চাও, পাবে। ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধী বা পাকিস্তানি সেনাকে ছেড়ে দাও।

ফিরে এসে একটা ক্লিমেন্সি ফরমান জারি করলেন। জেলে ছিল যারা, তাদের ছেড়ে দেওয়া হলো। ক্লিমেন্সির প্রথম যে ড্রাফটা ছিল তাতে সবাই ছাড়া পেয়ে যেত। তখন আমলারা খুব খুশি। এমনকি অনেক আওয়ামী লীগ নেতাও খুশি। একজন বললেন, সবুর ভাইয়ের টেলিফোনটা রিস্টোর করা দরকার। অমুক জায়গায় তাঁর বাড়িটা দখল হয়ে আছে। বঙ্গবন্ধু বলেছেন, এগুলো করে দেওয়া যাবে। সেখানে গাফ্‌ফার চৌধুরী, এম আর আখতার মুকুল ও আমি ছিলাম। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘সবাই দেখো। সবার আজকে খুব আনন্দের দিন। কেবল তিনজনের মুখে কোনো হাসি নেই।’

আমি বললাম, স্যার, হাসিটা কী করে আসবে! আমাদের মা-বোনদের যারা রেপ করেছে, তাদেরও ছেড়ে দিতে হবে। যারা বাড়িঘর জ্বালিয়েছে, তারাও ছাড়া পাবে। যে খুন করেছে তাকেও ছাড়তে হবে।

সব শুনে বঙ্গবন্ধু আমলাদের বললেন, ‘তোমরা করো কী? আমাকে তো ডেনজারাস পথে নিয়ে যাচ্ছিলে।’ তখন ডেকে আবার সংশোধন করা হলো। এটা বলা সম্ভব হয়েছিল, তিনি শেখ মুজিব বলে, তিনি বঙ্গবন্ধু বলে; তিনি জাতির পিতা বলে।

বঙ্গবন্ধু আসলেই বাংলার সাধারণ মানুষের নাড়ির স্পন্দনটা বুঝতে পেরেছিলেন। মুসলিম লীগের শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে দুটো বিষয় কাজ করত। একটা হচ্ছে, সাধারণ মানুষের চিন্তাভাবনা এবং তাদের যে দুঃখ, কষ্ট, দুর্দশা; তা থেকে মুক্ত করার জন্য কর্মসূচি গ্রহণ। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, সাহসিকতা। অর্থাৎ সাহস করে মানুষকে আন্দোলনের পথে নিয়ে আসা। স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হলে যে সাহস ও দৃঢ় মনোবলের দরকার হয়, সেটা অর্জন করা। এই ক্ষেত্রে দেখা যায়, শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্রনেতা, যুবনেতা এবং তিনিই আওয়ামী লীগের একজন নেতা, যিনি প্রতিটি ক্ষেত্রে সেই সময়কার অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি অগ্রসর ছিলেন। মানুষের কাছেও তিনি দ্রুত পৌঁছে যেতে পারতেন। আওয়ামী লীগের নেতা শামসুল হক ১৯৪৯ সালে প্রথম উপনির্বাচনে জিতে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্রদের মিটিং চলছে, ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে কি না তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আমার নিজের পরিষ্কার মনে আছে, শামসুল হক সাহেব বারবার বলেছিলেন, আপনারা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করবেন না, তাহলে ওরা রক্তগঙ্গা বইয়ে দেবে। তিনি বারবার এটা বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ওই ছাত্রসভায় আমার যতদূর মনে পড়ে আবদুল মতিন- যিনি ভাষা মতিন নামে খ্যাত। তিনি প্রস্তাব দেন, চারজন করে বেরিয়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করুন। শামসুল হক সাহেবকে সেখানে রীতিমতো অপদস্থ হতে হয়। বঙ্গবন্ধু তখন হাসপাতালে কারারুদ্ধ ছিলেন। ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে সিদ্ধান্ত নেয় ১৪৪ ধারা ভঙ্গের। কিন্তু যে রাজনৈতিক নেতারা এই আন্দোলনের জন্য সর্বদলীয় ভাষাসংগ্রাম পরিষদ করেছিলেন, তাঁরা ওই রাতে আবার এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু জেলখানা থেকে বঙ্গবন্ধু হাসপাতালে থাকা অবস্থায় অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছেন। জনগণ যদি কোনো আন্দোলনে এগিয়ে যায়, তখন কোনো নেতা যদি সেখান থেকে পিছিয়ে পড়েন বা থেমে যান, তাহলে তিনি কিন্তু জনগণের আস্থা হারান এবং নেতৃত্বে থাকেন না। বঙ্গবন্ধু জীবনে কোনো দিন এই ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দেননি।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনের আগে নানা টানাপোড়েনে একপর্যায়ে যুক্তফ্রন্ট ভেঙে যাচ্ছিল। সেই টালমাটাল সময়ে শেখ মুজিবুর রহমান যুক্তফ্রন্টের পক্ষে সর্বাত্মক সমর্থন দিয়ে দাঁড়িয়ে যান। আবার ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের পর যখন মুসলিম লীগ বা পাকিস্তানের কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী আদমজীতে দাঙ্গা লাগায়, সেই দাঙ্গা প্রতিরোধের জন্য সবার আগে এগিয়ে এসেছিলেন একজন, তিনি বঙ্গবন্ধু। অর্থাৎ মানুষের সংগ্রাম ও আন্দোলনের পর্যায়গুলো এভাবে যদি আমরা দেখি, তাহলে দেখব শেখ মুজিবের একটি অগ্রণী ভূমিকা সব ক্ষেত্রেই পাওয়া যায়। অর্থাৎ এই অগ্রণী ভূমিকার জন্য শেখ মুজিব ক্রমান্বয়ে বঙ্গবন্ধুতে রূপান্তরিত হয়েছেন। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সংগ্রামী ছাত্র-জনতা তাঁকে শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গবন্ধুরূপে অভিষিক্ত করেছে।

জনগণের মন ও চাহিদা বুঝতে পারা এবং বুঝে উপযুক্ত কর্মসূচির মাধ্যমে এগিয়ে আসা- এটাই নেতৃত্বের বড় যোগ্যতা। এই ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু কোনো দিন ব্যর্থ হননি। আইয়ুব খান ক্ষমতা দখলের পর বহুবার চেষ্টা করেছে দুর্নীতির দায়ে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে মামলা করার, তাঁকে কারাগারে আটকে রাখার। কিন্তু প্রমাণ করতে না পেরে ছেড়ে দিতে হয়েছে। জেল থেকে বেরিয়ে এসেছেন তিনি। এসেই আবার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের বৈষম্য ব্যাপক, সর্বক্ষেত্রে পূর্বাঞ্চল বঞ্চিত। এবং এ অঞ্চলের মানুষের জন্য এটা একটা বড় বিষয়। ১৯৪৭-এ পাকিস্তান যখন প্রতিষ্ঠিত হয়, বাংলার গভর্নর তখন ব্রিটিশ সরকারকে জানিয়েছিলেন, এই যে দুই টুকরো পাকিস্তান হচ্ছে, এর পূর্ব অংশ কিন্তু ২০ বছরের বেশি এই পশ্চিম অংশের সঙ্গে থাকবে না। দেখা গেছে, এটা ২৫ বছরের মধ্যে স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে গেছে। এই যে পূর্বাঞ্চল বঞ্চিত এবং পশ্চিমের সঙ্গে থাকতে পারবে না, এই ধারণা বঙ্গবন্ধুর মধ্যে শুরু থেকেই ছিল।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়ই ছিলেন পাকিস্তানের জেলে। কিন্তু তাঁর আহ্বানে এবং সেই অর্থে তাঁর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। আমার মতে, মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় উপাদান ছিল বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ। এই এক ভাষণ বারবার প্রচারের মাধ্যমে লাখ লাখ সৈনিক যা করতে পারেনি, তা-ই করা গেছে। অতএব তিনি ছিলেন সেই অর্থে মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের সর্বাধিনায়ক।

বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ঢাকায় ফিরে আসার পর গণতান্ত্রিক দেশ গড়ায় তাঁর যে দায়বদ্ধতা, সেটা কিন্তু পরদিন ১১ জানুয়ারিই বোঝা গেছে। তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করে হলেন প্রধানমন্ত্রী, যা পাকিস্তানের ইতিহাসে কোনো দিন হয়নি। পাকিস্তানে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রথম দিনই গভর্নর জেনারেল হয়েছেন। এটা একটা বৈশিষ্ট্য। দ্বিতীয়ত, এরই সূত্র ধরে বঙ্গবন্ধু বলেছেন যে, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে আমি গণতান্ত্রিক নীতি অনুসরণ করব। এই গণতান্ত্রিক নীতিগুলো ক্ষেত্রে কী কী হতে পারে, সেগুলো বারবারই এসেছে। যেমন নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচন কীভাবে হয়েছে- যেভাবে আমাদের এই সমাজব্যবস্থায় সব নির্বাচন হয়। এবং নির্বাচনে ব্যতিক্রমও থাকে। তবে সাধারণভাবে দেখা যায়, নির্বাচনে নানা ফ্যাক্টর থাকে, এই ফ্যাক্টরগুলো নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করে। ব্যতিক্রম ’৫৪ সালের নির্বাচন ও ’৭০ সালে পাকিস্তানের নির্বাচন। কিন্তু অন্য সব নির্বাচনে কোনো না কোনো ফ্যাক্টর ছিল।

বঙ্গবন্ধু এসে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য আত্মনিয়োগ করলেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এটাও মনে রাখা দরকার, একটি দেশ মুক্তিযুদ্ধ করেছে, নয় মাস ধরে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুয়ায়ী, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে ইউরোপে যে ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছিল, তার চেয়েও ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছিল বাংলাদেশে। দেশের দুটো বন্দরই ছিল অচল। সব রেললাইন অকেজো। সব সেতু ভাঙা। এই অবস্থায় একটা দেশকে গড়ে তোলা দুরূহ কাজ। অবধারিতভাবে আর্থিক দৈন্য, খাদ্যাভাব ও সংকট- এগুলো দেখা দেয়। কখনো খাদ্যাভাবে দুর্ভিক্ষও হয়। চীন, রাশিয়ায় এমন হয়েছে। অন্য যেসব দেশে বিপ্লব হয়েছে, সব জায়গারই ছিল এক অবস্থা।

খুব স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশেও এমন হওয়ার কথা ছিল; এবং একেবারে যে হয়নি, তা-ও নয়। তবে ’৭২ বা ’৭৩-এ কিন্তু হয়নি। হয়েছে ’৭৪ সালে। কারণ যে বৃহৎশক্তি পাকিস্তানকে রক্ষা করার জন্য সর্বতোভাবে চেষ্টা করেছে, তারা তখন আর্থিক দিক থেকে বাংলাদেশ যেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে না পারে, খাদ্যসংকট যাতে দূর না হয়, তার জন্য ব্যবস্থা নিয়েছে। তারা আসা বন্ধ করে দিয়েছে খাদ্যের জাহাজ। হেনরি কিসিঞ্জার বঙ্গবন্ধুকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছিলেন, আমরা তো এক লাখ টন পাঠিয়েছি। আরেক লাখ টন খাদ্য পাঠাচ্ছি। কিন্তু সেই জাহাজ আর আসেনি। এ দেশে এভাবেই বিপর্যয় সৃষ্টি করার চেষ্টা হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে শাসক বঙ্গবন্ধুর জন্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শুধু এই আর্থিক দিকটাই বড় কথা নয়, দেখতে হবে শাসনতান্ত্রিক পরিকাঠামো কেমন ছিল, কী ছিল। পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল করাচির মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন যেভাবে চলত, তার চেয়ে একটু উন্নত। অর্থ মন্ত্রণালয় ছিল না, সেন্ট্রাল ব্যাংকের কোনো কিছুই ছিল না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলতে ছিল না কিছু। তার চেয়ে বড় জিনিস হচ্ছে, এ রকম একটি রাষ্ট্রবিপ্লব- যুদ্ধ বা সংঘাতের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে সাংঘাতিক সমস্যা দেখা দেয়। দুনিয়ার সব জায়গায় দেখা দিয়েছে, দেখা দিয়েছে বাংলাদেশেও। সে ক্ষেত্রে পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিডিআর- অর্থাৎ যে প্রশাসনিক যন্ত্রের মাধ্যমে এর মোকাবিলা করা হবে, সেটা ছিল না। সবাই নির্ভর করত একজন ব্যক্তির ওপর। আমি নিজেও কতগুলো ক্ষেত্রে দেখেছি, তখন দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর ছিলেন বঙ্গবন্ধু। একটা উদাহরণ দিই, তখন আমি বঙ্গবন্ধুর প্রেস সচিব হিসেবে যোগ দিয়েছি। একদিন গিয়ে শুনলাম, হঠাৎ ওয়াপদা ঘেরাও করা হয়েছে। কে করেছে? শ্রমিক লীগ। এখন ঘেরাও তুলে নেওয়ার জন্য যেতে হবে প্রধানমন্ত্রীকে। বঙ্গবন্ধু যখন ওখানে গেলেন, তখন ঘেরাও ওঠানো হলো।

এরপর একপর্যায়ে বিডিআরের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানে চলে গেল সেনাবাহিনী। কখনো-বা সেনাবাহিনী-বিমানবাহিনী মুখোমুখি অবস্থানে। সব ক্ষেত্রে তাকেই সশরীরে নিষ্পত্তি করতে হয়েছে। অর্থাৎ ব্যক্তি মুজিবের প্রভাব, বঙ্গবন্ধুর প্রভাব- একে সর্বোতভাবে কাজে লাগিয়ে সমস্যার সুরাহা করতে হয়েছে। ব্যক্তির অবদান এখানে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। চতুর্থ সংশোধনী নিয়ে অনেক কথা বলা হয়। বিশেষত, বাকশাল বিষয়ে। এটা একটা রাষ্ট্রব্যবস্থা। এ নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এ-ও মনে রাখা দরকার, আমাদের দেশের ওই অবস্থায় কী করা প্রয়োজন ছিল। এগুলো বঙ্গবন্ধুর চিন্তা-ভাবনায়ও ছিল। তবে এটা ঠিক, বাকশালকে স্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করেননি বঙ্গবন্ধু। তিনি সব সময় বলতেন, এটা অস্থায়ী এবং সময় এলে এটা ফিরিয়ে নেওয়া হবে। বাকশাল হওয়ার পরে যখন মন্ত্রিপরিষদ নতুন করে গঠন করা হয়, দেখা যায় প্রায় সব মুখই পুরোনো। নতুন তেমন কেউ নেই। অনেকেরই প্রশ্ন ছিল, এটা কী হলো? জবাবে একদিন বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘দেখ, সবাই তো বুদ্ধিমান। রাষ্ট্রচিন্তায় সব বড় বড় তাত্ত্বিক। কিন্তু আমরা পার্লামেন্টারি ব্যবস্থা করেছি। পার্লামেন্টারি ব্যবস্থার মতোই করেছি রাষ্ট্রপতির পদটাকে। সংসদ সার্বভৌম রয়ে গেছে। পার্লামেন্টের সদস্যরা ইচ্ছে করলে রাষ্ট্রপতিকে না করে দিতে পারে। আমি যদি আজকে এখানে পুরোনো সবাইকে বাদ দিয়ে নতুন নতুন লোক নিয়ে মন্ত্রী করি আর কালকে এরা আমার বিরুদ্ধে নো কনফিডেন্স মোশান নিয়ে আসতে পারে’? এটা সর্বজনবিদিত, পার্লামেন্ট তখনো সার্বভৌম। যদিও সেই রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী তখন প্রেসিডেন্ট।

আমার মনে আছে, ১৪ আগস্ট রাতে আমি বসে কাজ করছিলাম। বঙ্গবন্ধু পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন। বিশেষ কনভেনশনে বক্তব্য দেবেন। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ওই বক্তব্য এক্সটেম্পো দেবেন। কারণ বঙ্গবন্ধুর কতকগুলো স্পর্শকাতর বিষয় ছিল। যেমন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এক সময় বঙ্গবন্ধুকে বহিষ্কার করেছিল। সেই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নিয়ে তারা বঙ্গবন্ধুকে একটা ডক্টরেট ডিগ্রি দেবে। আমাকে বললেন, ‘আমাকে তোমার কোনো ড্যাটা দেওয়ার থাকলে কাগজে লিখে দেবে।’ তখন শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী। মোকাম্মেল সাহেব তখন ভারপ্রাপ্ত শিক্ষাসচিব। তাঁদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে একটা কার্ডে বাসায় বসে লিখছি। রাত তখন প্রায় ১২টা হবে। হঠাৎ লাল টেলিফোনে বঙ্গবন্ধু ফোন করলেন, ‘কাল সকালে তুমি তাড়াতাড়ি আমার বাসায় চলে আসবা। আর কার্ড নিয়ে আসবা। মোটা মোটা অক্ষরে। আমি এক্সটেম্পো বক্তৃতা করব’। আমি বললাম, আমি ওই কাজই করছি। তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে। কাল সকালে তাড়াতাড়ি আসো।’ এই ছিল তাঁর সঙ্গে আমার শেষ কথা।

পরদিন ভোর হয়েছে। সবাই যেমন শুনেছে। আমিও গোলার আওয়াজ শুনেছি। মর্টারের আওয়াজ শুনেছি। তারপর রেডিও অন করলাম। ততক্ষণে সব জায়গায় কান্নার রোল পড়ে গেছে।


যাকে ভয় পেতাম, শ্রদ্ধাও করতাম

যাকে ভয় পেতাম, শ্রদ্ধাও করতাম
তোয়াব খান। ছবি: দৈনিক বাংলা
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত

শরিফুজ্জামান পিন্টু

ঠিক এক বছর আগের কথা, অক্টোবরের শুরুর দিকে এক দিন পত্রিকার প্রকাশক চৌধুরী নাফিজ সরাফাত ফোন দিয়ে বললেন, বিকেলে ইউনাইটেড হাসপাতালে যাবেন। আমাকে সঙ্গে যেতে হবে। কারণটি তিনি আগে বলেননি। তবে আন্দাজ করছিলাম, উনি হাসপাতালে তোয়াব ভাইকে দেখতে যাবেন।

হাসপাতালে তোয়াব ভাইয়ের কেবিনে গিয়ে কিছুটা বিস্মিত। উনি দৈনিক বাংলার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার জন্য তোয়াব ভাইকে অফার লেটার দিতে চান। সেখানে আমাদের আরেক সুহৃদ সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন।

তোয়াব ভাইকে সম্পাদক হিসেবে পাওয়ার ইচ্ছা আমাদের শুরু থেকেই ছিল। ওনার বাসায় কয়েকবার গিয়েছি, কথা বলেছি। কিন্তু উনি রাজি হচ্ছিলেন না। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থেকে তিনি অফার লেটার হাতে নিলেন। সেটি নেড়েচেড়ে দেখলেন। এরপর বললেন, ওই চিঠিতে তিনটি বিষয় যুক্ত করতে হবে। তা হলো- মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং স্বাধীন সাংবাদিকতা। এই তিনটি বিষয় লিখে দিলে তিনি ভেবে দেখবেন।

চৌধুরী নাফিজ সরাফাত উনাকে আশ্বস্ত করে বললেন, দৈনিক বাংলার পথচলার পাথেয় এই তিনটি বিষয়। যেহেতু অফার লেটার, সেহেতু এসব বিষয় উল্লেখ করা হয়নি। তিনি চাইলে এগুলো উল্লেখ করেই বোর্ডের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক নিয়োগপত্র দেবেন। পরে এই তিনটি বিষয় লিখে উনাকে দেয়া হয়েছিল।

তোয়াব ভাই সুস্থ হলেন। সম্ভবত ৬ অক্টোবর উনি বাড্ডায় আর এল স্কয়ারে নিউজবাংলার আগের কার্যালয়ে গেলেন। সবার সঙ্গে পরিচিত হলেন। দৈনিক বাংলার কার্যালয় তখনো প্রস্তুত হয়নি। কার্যালয় কেন দ্রুত প্রস্তুত হচ্ছে না, এ নিয়ে উনি কিছুটা বিরক্ত ছিলেন। কারণ, উনি প্রতিদিন আসতে চান, মিটিং করতে চান। করোনার সময় উনাকে বুঝিয়ে মিটিং করা থেকে বিরত রাখি। কিছুদিন অনলাইনে মিটিং করি। কিন্তু করোনা শেষে আবার উনার অফিসে আসার আগ্রহ চাপে। ভবনের কাজ মোটামুটি শেষ হলো। কিন্তু লিফটের কাজ চলমান।

তোয়াব ভাইয়ের মধ্যে অফিসে বসে কাজ করার আগ্রহটা যে কতটা সেটা তার এক দিনের কাণ্ডে বুঝেছিলাম। কাউকে কিছু না জানিয়ে তিনি তেজগাঁওয়ে দৈনিক বাংলার নির্মাণাধীন ভবনে এসে পড়েন। এসে দেখলেন, কাজের অগ্রগতি কেমন। আমাদের সহকর্মীদের কাছে জানতে চাইলেন, কাজ শেষ হতে কত দিন লাগবে, ইত্যাদি। তারপর চলে গেলেন।   

ফোন করলে তোয়াব ভাই প্রায়ই বলতেন, ‘তোমার লিফট কবে লাগবে? আমি পটল তুললে?’ উনার কাছে বাস্তবতা তুলে ধরতাম। ধুলাবালির মধ্যে উনার আসা যে ঠিক হবে না, সেটি বুঝাতাম। এসব শোনার পর তিনি ছোট্ট করে বলতেন, ‘দেখো কত দ্রুত লিফট লাগানো যায়’।

গত কয়েক মাসে তোয়াব ভাই প্রায়ই মৃত্যুর প্রসঙ্গ তুলতেন। উনার মুখে মারা যাওয়ার কথা শুনে বিষয়টি হেসে উড়িয়ে দিতাম, বলতাম আপনি একশ বছর বাঁচবেন। এ কথা বলার পর আবার বাস্তব জগতে ফিরে যেতাম, বুঝতে পারছিলাম যে উনার ভেতরটা ক্ষয়ে যাচ্ছে। গত কয়েক মাসে তোয়াব ভাই মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। তাঁর মধ্যে মৃত্যুচিন্তা ঢুকেছে। উনার বাবাও এমন বয়সে মারা গেছেন, বিষয়টি তিনি বাচ্চু ভাইয়ের (তোয়াব ভাইয়ের ছোট ভাই) সঙ্গে আলোচনা করেছেন। 

আসলে তোয়াব ভাইয়ের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এ দেশে সাংবাদিকতা জগতের সবচেয়ে শ্রদ্ধার মানুষটির বিদায় হলো। এমন বর্ণাঢ্য জীবন সত্যিই ঈর্ষণীয়। তিনি হয়ে ওঠেন এ দেশে সাংবাদিকতার শিক্ষক ও বাতিঘর। সততা, নিষ্ঠা ও কঠোর পরিশ্রম করে সাংবাদিকতা পেশায় শ্রদ্ধা অর্জন করা এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন।   

তোয়াব ভাইয়ের ভরাট ও টনটনে গলার সঙ্গে আজীবনের সম্পর্ক। সেই মানুষটি কথা বলতে কষ্ট পান, কাশি চেপে রাখার চেষ্টা করেন-এটা অসহনীয় মনে হতো। শ্রদ্ধেয় এই মানুষটির সঙ্গে অদ্ভুত সম্পর্ক ছিল। আমি উনাকে ভয় পেতাম, আবার প্রচণ্ড শ্রদ্ধাও করতাম। শ্রদ্ধাটা এমন যে, প্রথম একটি বই লিখে সেটি উৎসর্গ করেছিলাম উনাকে।

আসলে উনার কারণেই আমার সাংবাদিকতা পেশায় টিকে থাকা। ১৯৯৩ সালের মার্চে জনকণ্ঠ প্রকাশের কয়েক মাস পর তোয়াব ভাই আনুষ্ঠানিকভাবে উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। সেখানে প্রায় সাত মাস বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার হিসেবে কাজ করার পর এক দিন প্রধান প্রতিবেদক জানালেন, আমাকে আর অফিসে যেতে হবে না। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার হিসেবে আরেকজনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। অথচ খণ্ডকালীন এই কাজের আশায় আমি বিনা টাকায় সাত মাস কাজ করছি। প্রয়াত কবি সৈয়দ হায়দারের সঙ্গে শেয়ার করি এই ঘটনাটা। সৈয়দ হায়দার বিষয়টি নিয়ে কথা বললেন জনকণ্ঠের সাহিত্য সম্পাদক ও তাঁর বন্ধু নাসির আহমেদের সঙ্গে। নাসির ভাই কথা বললেন তোয়াব ভাইয়ের সঙ্গে। আমার ওপর অন্যায়ের বিষয়টি নাসির ভাই তুলে ধরেন তোয়াব ভাইয়ের কাছে। পরদিন আমাকে ডাকলেন তোয়াব ভাই।

চোখের সামনে সেই দৃশ্য আজও ভেসে ওঠে। একজন নায়ক বসে আছেন। ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি, পাজামা পরা। ভরাট গলায় জানতে চাইলেন, আমার সমস্যার কথা। উনার সামনে আমি শুধু বলতে পারলাম, ‘আমাকে যদি নাইবা নেবেন, তাহলে সাত মাস বিনা বেতনে উনারা কাজ করালেন কেন?’ উনি খোঁজ নিয়ে জানলেন, বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার হিসেবে আরেকজন কাজ শুরু করেছেন। সবকিছু জেনে ও বুঝে তোয়াব ভাই সিদ্ধান্ত দিলেন, জনকণ্ঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুজন বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার থাকবে। তবে নতুন পত্রিকা হিসেবে আপাতত একজনের বেতন দুজনকে ভাগ করে দেয়া হবে। আমরা দুজনই উনার সিদ্ধান্ত খুশিমনে মেনে নিই, আরেকজন হলেন জাতীয় প্রেসক্লাবের এখনকার সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান। 

১৯৯৬ সালে লেখাপড়া শেষ করার পর এক দিন তোয়াব ভাইয়ের কাছে গিয়ে বললাম, ‘মাস দুয়েকের মধ্যে চাকরি ছেড়ে দেব। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার খুঁজে দেব কি না।’ উনি বললেন, ‘তা খুঁজে দেও। কিন্তু তুমি থাকো।’ জানতে চাইলেন, ‘এখন বিসিএস পাস করলে বেতন কত?’ তখন সম্ভবত সাড়ে ১২ হাজার টাকা ছিল। খণ্ডকালীন হিসেবে আমি তখন বেতন পাই পাঁচ হাজার পঞ্চাশ টাকা। বললেন, মাস্টার্সের রেজাল্ট বের হলে আমার বেতন হবে ১৪ হাজার টাকা। উনার উৎসাহে সেই যে সাংবাদিকতা পেশায় থেকে গেলাম আর কোথাও চাকরির আবেদন করতে পারিনি। জনকণ্ঠের বেতন-ভাতা অনিয়মিত হলে একযুগ পর ২০০৫ সালে প্রথম আলোতে যোগ দিই। এরপর দেড় দশক উনার কাছ থেকে শারীরিকভাবে দূরে থাকলেও মানসিক নৈকট্য ছিল সব সময়। ২০২০ সালে প্রথম আলো ছেড়ে আবার আসলাম তোয়াব ভাইয়ের কাছে। কিন্তু এই যাত্রায় এক বছরের মধ্যে উনাকে হারালাম। তিনি আমার জীবনের প্রথম সম্পাদক, শেষ সম্পাদক কি না বলতে পারব না। তবে এই পেশায় এত শ্রদ্ধার মানুষ আর নেই, আরও হবে কি না তাও জানি না। 

৪ সেপ্টেম্বর দৈনিক বাংলার উদ্বোধনী সংখ্যায় সম্পাদক হিসেবে উনার লেখা ছাপার সিদ্ধান্ত নিই আমরা। বেশ কয়েক দিন প্রস্তুতি নিয়ে উনি লিখলেন। কিন্তু সেই লেখার শিরোনাম দিতে চাইলেন একটি কবিতার লাইন। তোয়াব খান শিরোনাম করবেন, আর সেই বিষয়ে কথা বলার স্পর্ধা আমার থাকার কথা না। কিন্তু পত্রিকার উদ্বোধনী সংখ্যা বলে কথা। আমি বাসায় গিয়ে উনাকে খুবই বিনয়ের সঙ্গে বললাম, এই শিরোনামে আপনি আরেকটি লেখা লেখেন। কিন্তু উদ্বোধনী সংখ্যার লেখার প্রতিটি শব্দ ঠিক থাকলেও কেবল শিরোনামটি পরিবর্তন করে দেন। কারণ সম্পাদক হিসেবে আপনাকেই বলতে হবে কেন দৈনিক বাংলা ফিরে এসেছে, কীভাবে পথ চলবে দৈনিক বাংলা।

কিন্তু আমার সব চেষ্টা ব্যর্থ হলো। শিরোনাম বদলাতে তোয়াব ভাই রাজি হলেন না। উনার পিএস গিরীশ গৈরিককে দায়িত্ব দিই তোয়াব ভাইকে বোঝানোর জন্য। গিরীশ এসে বললেন, উনি শিরোনাম বদলাতে রাজি নন। এরপর বাচ্চু ভাইকে অনুরোধ করি তিনি যেন তাঁর ভাইয়ের কাছ থেকে শিরোনাম বদলের অনুমতি নিয়ে দেন। বাচ্চু ভাইও ব্যর্থ হলেন।

পত্রিকার উদ্বোধনী সংখ্যা প্রকাশের দিন এগিয়ে আসতে থাকে। ৩ সেপ্টেম্বর পত্রিকার প্রকাশক চৌধুরী নাফিজ সরাফাতকে জানাই বিষয়টি। উনি তোয়াব ভাইকে এ বিষয়ে কিছু বলতে রাজি নন। বললেন, এটা আপনাদের গুরু-শিষ্যের ব্যাপার। অফিসের সবাই শিরোনামের বিষয়টি নিয়ে ফিসফাস করেন। কিন্তু উনাকে কিছু বলার সাহস কারও নেই।

৩ সেপ্টেম্বর সকালে পত্রিকার উদ্বোধনী সংখ্যা প্রেসে পাঠানোর আগে সাহস করে ফোন দিই তোয়াব ভাইকে। প্রেসে পাঠানোর আগে দোয়া চাইলাম উনার কাছে। বললাম, অনেক চাপের মধ্যে আছি তোয়াব ভাই। আপনার অনুমতি ছাড়া শিরোনাম বদলাতে পারব না। উনি বললেন, ‘শিরোনাম কী করতে চাও?’ বললাম, সহজ কথায়- ‘আবার এসেছি ফিরে’। উনি পুরোপুরি একমত নন। এর মধ্যে উনার কাশি হচ্ছিল। আমি ফোন রাখলাম।  আবার ফোন করি বাচ্চু ভাইকে। বাচ্চু ভাই এবার বললেন, ‘উনি কিছুটা নরম হয়েছেন। শিরোনাম বদল করতে পারি’।

৩ সেপ্টেম্বর প্রেসে খটখট করে বিকট শব্দে ছাপা হচ্ছে দৈনিক বাংলার উদ্বোধনী সংখ্যা, তখন বুকটা যেন দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল। সাংবাদিকতায় শিক্ষাগুরু হিসেবে যাকে মেনে এসেছি, তার নির্দেশ মানতে পারিনি। পরদিন উনার কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইলাম। উনি মুচকি হাসলেন, ক্ষমা করে দিলেন মনে হয়।   

হাসপাতালের হিমঘরে তোয়াব ভাইয়ের মরদেহ রেখে তেজগাঁওয়ে দৈনিক বাংলার কার্যালয়ে এলাম। আমাদের প্রত্যাশা ছিল, এই ভবনে আর কদিন পরই তিনি আসবেন। লিফটের দিকে তাকালাম, কাজ চলছে। কিন্তু যে মানুষটির জন্য তাড়াতাড়ি লিফট লাগানো হচ্ছে, তিনি আর এতে উঠবেন না।