সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২২

নিছক জয় নয়, এই জয় নারীমুক্তির

নিছক জয় নয়, এই জয় নারীমুক্তির
প্রভাষ আমিন
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত

প্রভাষ আমিন

সোমবার বিকেলে ব্রিটিশ রানির শেষকৃত্য চলছিল। অধিকাংশ গণমাধ্যম ব্যস্ত ছিল সেটা নিয়েই। সুকান্তের কবিতার মতো হঠাৎ গোটা বাংলাদেশ দখল করে নিল নারীরা। ‘হিমালয় থেকে সুন্দরবন, হঠাৎ বাংলাদেশ’-এর মতো সেই হিমালয়ের দেশেই বাংলাদেশের ফুটবলের নতুন সূর্য উঠল। ব্রিটিশ রানির বিদায়ের দিনেই বাংলাদেশ পেল একঝাঁক নতুন রানি। সেই রানিদের নামগুলো একটু দেখে নিন- রূপনা চাকমা, ইতি রানী, সাথী বিশ্বাস, মাসুরা পারভীন, আঁখি খাতুন, শামসুন্নাহার, শিউলি আজিম, নিলুফা ইয়াসমিন নীলা, আনাই মগিনি, মারিয়া মান্ডা, মনিকা চাকমা, সোহাগী কিসকু, স্বপ্না রানী, ঋতুপর্ণা চাকমা, সানজিদা আক্তার, মার্জিয়া, সাবিনা খাতুন, কৃষ্ণা রানী সরকার, সিরাত জাহান স্বপ্না, তহুরা খাতুন, আনুচিং মোগিনি ও সাজেদা খাতুন। কী যে থোকা থোকা মন ভালো করা নাম।

বাংলাদেশের মেয়েরা প্রথমবারের মতো সাফ ফুটবলের চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসের জন্য এটুকুই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু তাদের হিমালয় জয়ের পেছনের সংগ্রামের গল্পটা জানলে বাঁধভাঙা কান্না আমাদের ভাসিয়ে নেয়। সাফ ফুটবল আসলে ভারতের টুর্নামেন্ট। আগের পাঁচটি আসরেরই চ্যাম্পিয়ন ভারত। বাংলাদেশ কেবল একবার ফাইনাল খেলতে পেরেছিল। বাকি সব বার ফাইনালে ভারতের প্রতিপক্ষ ছিল নেপাল। এবার বাংলাদেশ ভারতকে উড়িয়ে দিয়েছে আগেই। ফাইনালের প্রতিপক্ষ ছিল নেপাল। আর খেলাটা হচ্ছিল নেপালের কাঠমান্ডুতে। আগে কখনো নেপালের সঙ্গে জিততে পারেনি বাংলাদেশ। আর মাঠে নেপালের খেলোয়াড়রা তো ছিলই, ছিল স্টেডিয়ামভর্তি নেপালের সমর্থকরাও। সব বাধা উড়িয়ে দিয়ে যোগ্যতর দল হিসেবে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ। ফাইনালের পথে বাংলাদেশ মালদ্বীপকে হারিয়েছে ৩-০ গোলে, ভারতকে ৩-০, পাকিস্তানকে ৬-০, আর সেমিফাইনালে ভুটানকে ৮-০ গোলে। পুরো টুর্নামেন্টে রূপনা চাকমাকে একবারই ফাঁকি দিতে পেরেছে বল, আর সেটি ফাইনালে। কৃষ্ণা সরকারের একটি ড্রিবলিঙের ক্লিপ ভাইরাল হয়েছে, যেটি দেখে অনেকেই রোনালদিনহোর কথা মনে করছেন। টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং সেরা খেলোয়াড় বাংলাদেশের রানিদের নেতা সাবিনা খাতুন।

তবে ফুটবল সামর্থ্য দিয়ে এই জয়ের মাহাত্ম্য বিবেচনা করা যাবে না। বাংলাদেশের নারীদের এই জয় ফুটবলের চেয়েও বেশি কিছু। ফাইনালের আগে সানজিদা আক্তার তার ফেসবুক স্ট্যটাস দিয়ে জয় করে নিয়েছেন ১৬ কোটি মানুষের হৃদয়। সানজিদার পুরো স্ট্যাটাসটি তুলে দিতে মন চাইছে। কিন্তু সেটা তো আর সম্ভব নয়। তবু কিছু অংশ উদ্ধৃত না করলে এই জয়ের মাহাত্ম্যটা বোঝানো যাবে না। সানজিদা লিখেছেন, ‘যারা আমাদের এই স্বপ্নকে আলিঙ্গন করতে উৎসুক হয়ে আছেন, সেই সব স্বপ্নসারথীর জন্য এটি আমরা জিততে চাই। নিরঙ্কুশ সমর্থনের প্রতিদান আমরা দিতে চাই। ছাদ খোলা চ্যাম্পিয়ন বাসে ট্রফি নিয়ে না দাঁড়ালেও চলবে, সমাজের টিপ্পনীকে এক পাশে রেখে যে মানুষগুলো আমাদের সবুজ ঘাস ছোঁয়াতে সাহায্য করেছে, তাদের জন্য এটি জিততে চাই। আমাদের এই সাফল্য হয়তো আরও নতুন কিছু সাবিনা, কৃষ্ণা, মারিয়া পেতে সাহায্য করবে। অনুজদের বন্ধুর এই রাস্তাটুকু কিছু হলেও সহজ করে দিয়ে যেতে চাই। পাহাড়ের কাছাকাছি স্থানে বাড়ি আমার। পাহাড়ি ভাইবোনদের লড়াকু মানসিকতা, গ্রামবাংলার দরিদ্র ও খেটে খাওয়া মানুষদের হার না মানা জীবনের প্রতিটি পরত খুব কাছাকাছি থেকে দেখা আমার। ফাইনালে আমরা একজন ফুটবলারের চরিত্রে মাঠে লড়ব এমন নয়, এগারোজনের যোদ্ধা দল মাঠে থাকবে, যে দলের অনেকে এই পর্যন্ত এসেছে বাবাকে হারিয়ে, মায়ের শেষ সম্বল নিয়ে, বোনের অলংকার বিক্রি করে, অনেকে পরিবারের একমাত্র আয়ের অবলম্বন হয়ে।’ এটুকুতেই সানজিদা কী অসাধারণভাবে তুলে আনল তাদের সব কথা, ভালোবাসা, আবেগ, লড়াই আর সংগ্রামের গল্প।

বাংলাদেশের নারীদের ফুটবল খেলার ইতিহাসটা বেশি দিনের নয়। ফিফার বাধ্যবাধকতার কারণেই নারীদের দল বানাতে হয়েছে বাফুফেকে। কিন্তু ফুটবল এমনিতেই বাংলাদেশের দুয়োরানি। আর নারীরা আরও বৈষম্যের শিকার। তাই ফাইনালে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ নিছক নেপাল নয়; ছিল পাহাড় সমান বৈষম্য, সমাজের ভ্রুকুটি, টিপ্পনী, মৌলবাদীদের হুমকি, আর দারিদ্র্য। এই রূপকথার গল্পের শুরুটা গারো পাহাড়ের কোলঘেঁষা ময়মনসিংহের ধোবাউড়ার কলসিন্দুর গ্রাম থেকে। এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ টুর্নামেন্টের চ্যাম্পিয়নশিপের ১৮ সদস্যের দলের ১০ জনই ছিল কলসিন্দুরের। সাংবাদিকরা যখন কলসিন্দুরের মেয়েদের কাছে জানতে চেয়েছেন তারা কী চায়, তখন তারা বলেছে, পেটভরে খেতে চায়। আর  কী চায়? জানতে চাইলে তারা বলেছিল, একটু বেশি খাবার, যাতে বাড়িতে নিয়ে যেতে পারে। একটি পত্রিকা যখন কলসিন্দুরের মেয়েদের নিয়ে ডকুমেন্টারি বানাল, তখন তারা বলেছে, সেটা দেখার কোনো উপায় তাদের নেই। কারণ তাদের গ্রামে বিদ্যুৎ নেই। তারপর কলসিন্দুরের ৮০০ ঘরে পৌঁছে গেছে বিদ্যুতের আলো। আর সেই আলোয় এখন ঝলমলে গোটা বাংলাদেশ।

এই নতুন রানিদের লড়াইটা অনেক কঠিন ছিল। কারণ বাংলাদেশে এখন সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে গেছে রন্ধ্রে রন্ধ্রে। নারীরা টিপ পরে রাস্তায় বেরোলে হেনস্তার শিকার হতে হয়। পছন্দের পোশাক পরলে রেলস্টেশনে প্রকাশ্যে ধাওয়া খেতে হয়। সাম্প্রদায়িকদের সঙ্গে সুর মেলান হাইকোর্টের বিচারপতিরাও। বোরকাকে ফরমাল পোশাক ঘোষণার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মানববন্ধন হয়। লোকাল বাসে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে বাসে কলসিন্দুরের মেয়েদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়। নারীদের ফুটবল বন্ধের দাবিতে বাংলাদেশে মিছিল হয়। মাঠে খেলতে নামলে নারীদের মাথায় রাখতে হয়, শর্টসটা বেশি ছোট হয়ে গেল না তো! এত সব প্রতিবন্ধকতা ঠেলে জিততে হয়েছে নারীদের। তাই এই জয় সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে অনেক জয়। এই জয় তাই নিছক একটি জয় নয়, নারীমুক্তির পথে বড় এক অগ্রগতি।

নারীদের এই বিশাল ও ব্যাপক জয়ের পর ছড়াকার ব্রত রায় লিখেছেন, ‘গোল দিয়েছে ভারত, নেপাল, পাকিস্তানের জালে/ গোল না ওটা, চড় ছিল ঠিক অনেক লোকের গালে।’ আসলে বাংলাদেশের নারীদের প্রতিটি গোল, প্রতিটি আক্রমণ ছিল সেই সব সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মতো, জবাব দিয়েছে তাদের যারা নারীদের পিছিয়ে রাখতে চায়। এমনিতে নারীরা এখন আমাদের অর্থনীতির বড় শক্তি, উন্নয়নের পথে তারা সবার সঙ্গে পা মিলিয়ে চলছে। শিক্ষায় নারীরা পুরুষদের চেয়ে এগিয়ে। নারীদের পেশা, পুরুষদের পেশা বলে আলাদা কিছু নেই। সংসদ থেকে হাইকোর্ট, বিমান থেকে স্কুটি, যুদ্ধের ময়দান থেকে অপারেশনের টেবিল, গার্মেন্ট থেকে কাঁচাবাজার- সর্বত্র এখন নারীদের জয়জয়কার, তাদের প্রবল এবং দাপুটে উপস্থিতি। এত কিছু প্রমাণ করার পরও আমরা তাদের ঘরে আটকে রাখতে চাই। বাংলাদেশের জনপ্রিয় ধর্মীয় নেতা প্রয়াত আল্লামা শফি একবার নারীদের তেঁতুলের সঙ্গে তুলনা করে বলেছিলেন, ‘মেয়ে মানুষ হচ্ছে তেঁতুলের মতো। ছোট্ট একটা ছেলে তেঁতুল খাইতেছে, তা দেখলে আপনার মুখ দিয়া লালা ঝরবে। তেঁতুলগাছের নিচ দিয়া আপনি হাঁইটা যান তাইলেও আপনার লালা ঝরবে। দোকানে তেঁতুল বিক্রি হইতে দেখলেও আপনার লালা ঝরবে। ঠিক তেমনি মহিলাদের দেখলে দিলের মাঝে লালা ঝরে।’ আল্লামা শফির পরামর্শ ছিল মেয়েদের ক্লাস ফোর/ফাইভ পর্যন্ত হবে, যাতে তারা স্বামীর টাকা-পয়সার হিসাব রাখতে পারে। এই মানসিকতা এখনো বাংলাদেশের অনেকে লালন করেন। নারীদের ফুটবল খেলা নিয়ে, খেলোয়াড়দের পোশাক নিয়ে তাদের প্রবল আপত্তি। সাফ জয়ের পর সেই অন্ধকার শক্তি এখন মুখ লুকিয়েছে বটে; তবে সাবিনা, কৃষ্ণা, রূপনাদের লড়াইটা কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি। আমি জানি, সাফল্যের চেয়ে বড় কোনো প্রতিশোধ নেই। একটার পর একটা অর্জন দিয়েই তাদের বুঝিয়ে দিতে হবে, বাংলার নারীরা অদম্য, তাদের আটকে রাখা যাবে না।

শুরুতে যে একঝাঁক রানির নাম লিখেছি। ভালো করে মিলিয়ে দেখুন, এই তালিকায় রূপনা চাকমা যেমন আছে, মাসুরা পারভীনও আছে, আনাই মগিনি আছে, মারিয়া মান্ডা আছে, আছে সাবিনা খাতুনও। এটাই আসল বাংলাদেশ। বৈচিত্র্যেই যে সৌন্দর্য, সেটা আমরা ভুলতে বসেছিলাম। আমরা নারীদের, আদিবাসীদের, সংখ্যালঘুদের দমিয়ে রেখে একটা এককেন্দ্রিক সমাজ গড়তে চাই। কিন্তু একটা দেশকে এগিয় যেতে হলে নারী-পুরুষ, হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি-আদিবাসী সবাইকে নিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়েই এগোতে হবে।

বাংলাদেশের নারীদের এই জয় যেন সব নারীর জন্য খুলে দেয় সম্ভাবনার সব দুয়ার। সানজিদা যে অনুজদের বন্ধুর এই রাস্তাটুকু কিছু হলেও সহজ করে দিতে চেয়েছিল, আশা করি এই জয় সেই পথ অনেকটাই সহজ করে দেবে। নারীদের প্রতি, নারী ফুটবলারদের প্রতি আমাদের, সমাজের যে অবহেলা; আশা করি এই জয় তা উড়িয়ে দেবে।

নতুন রানিদের জন্য প্রাণঢালা অভিনন্দন আর বুকভরা ভালোবাসার সঙ্গে সুকান্তের একটি কবিতা দিয়ে শেষ করছি আজকের অর্ঘ্য-

‘সাবাশ বাংলাদেশ, এ পৃথিবী

অবাক তাকিয়ে রয়,

জ্বলে-পুড়ে-মরে ছারখার

তবু মাথা নোয়াবার নয়!’

লেখক: সাংবাদিক


গুমের প্রকৃত রহস্য উন্মোচিত হচ্ছে

গুমের প্রকৃত রহস্য উন্মোচিত হচ্ছে
সেলিম মাহমুদ
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত

সেলিম মাহমুদ

বাংলাদেশে গুমের রহস্য একে একে উন্মোচিত হচ্ছে। নিজের মাকে অন্যত্র লুকিয়ে রেখে প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করতে মরিয়ম মান্নান নামে এক তরুণীর অবিশ্বাস্য অভিনয় দেখল পুরো জাতি। এই মেয়েটি কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময়ও একই রকমের অভিনয় করেছিল। ২০১৮ সালে তার সরকারবিরোধী বক্তব্যের ভিডিও ক্লিপ গণমাধ্যমে আবারও দেখলাম। তার অভিনয় দেখে মনে হয়েছে, সরকারবিরোধীদের এজেন্ট হিসেবেই সে কাজ করে আসছে।

গত কয়েকদিন আগে ভারতের গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে, বাংলাদেশে গুম হয়ে যাওয়া ৭৬ জন মানুষের যে তালিকা প্রকাশিত হয়েছে, তার মধ্যে দুজন ব্যক্তি ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা এবং তারা ভারতের আদালত কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত। পরবর্তী সময় এই খবর বাংলাদেশের গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে। অথচ এই তালিকায় এই দুজন ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশি নাগরিক ও গুমের ভিক্টিম হিসেবে দেখানো হয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় এটি পরিষ্কার, যারা এই তালিকা করছে এবং বাংলাদেশে তারা যাদের তথ্যের ওপর নির্ভর করে তৈরি করছে, সেই তথ্য সরবরাহকারীরা নিরপেক্ষ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নয়। তারা একটি পক্ষকে প্রতিনিধিত্ব করে অর্থাৎ তারা আওয়ামী লীগবিরোধী বা বর্তমান সরকারবিরোধী। তারা বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এই কাজগুলো করে যাচ্ছে। এ ধরনের ঘটনায় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের দায়িত্ব এড়াতে পারে না।  এ ধরনের কাজের জন্য পৃথিবীর দেশে দেশে তাদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেবে। এই সুনির্দিষ্ট ঘটনায় বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের রিসার্চ ফাইন্ডিংসের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এটি অবশ্যই তাদের জন্য সুখবর নয়।

গত মাসে জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার এবং চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল বেশেলেট ও তার টিমকে আমরা এই কথাটিই বলেছিলাম। আমরা বলেছিলাম, কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশে মানবাধিকার বিষয়ে যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে তাদের তথ্যের উৎস হিসেবে গ্রহণ করছে, তারা নিরপেক্ষ নয়। বাংলাদেশে তারা আওয়ামী লীগবিরোধী গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত। কেবল সরকারবিরোধী পক্ষের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এ ধরনের রিপোর্ট প্রস্তুত করা শুধু অপেশাদারত্বই নয়, নিরপেক্ষতা নিয়ে কাজ করার শপথের লঙ্ঘনও বটে। এটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিধি বা টার্ম অব রেফারেন্সে উল্লিখিত বিধানাবলিরও লঙ্ঘন।

৭৬ জনের এই তালিকায় বেশ কিছু ব্যক্তি আছেন, যারা বিভিন্ন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। তালিকার কিছু ব্যক্তি রয়েছে, যারা নানা কারণে বহু দিন ধরেই নিখোঁজ। বাংলাদেশে নানা কারণে কিছু ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এই তরুণী মরিয়ম মান্নানের মায়ের ঘটনাটি জাতির সামনে উন্মোচিত না হলে নিশ্চয়ই তার মায়ের নামও গুম হয়ে যাওয়া মানুষদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতো। মরিয়ম মান্নান গত কয়েকদিন গণমাধ্যমে তার মায়ের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নিয়ে অনেক আহাজারি করেছে। তারপর গুম হওয়ার পর তার মায়ের মৃত্যু হয়েছে- এটি প্রতিষ্ঠিত করার জন্য অজ্ঞাত এক নারীর মরদেহকে নিজের মায়ের মরদেহ হিসেবে ঘোষণা করেছেন এই মরিয়ম মান্নান। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুসন্ধানে তার মায়ের আত্মগোপনে থাকার বিষয়টি উন্মোচিত না হলে এই তরুণী ইতিমধ্যে তার মায়ের মৃত্যুর জন্য প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর পাশাপাশি সরকারকেও তার মায়ের  ‘হত্যার’ জন্য দায়ী করে মানববন্ধনসহ অন্যান্য কর্মসূচি দিত। সেই কর্মসূচিতে নিশ্চিতভাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম সশরীরে গিয়ে একাত্মতা প্রকাশ করে মরিয়ম মান্নানের পাশে দাঁড়িয়ে তার মায়ের 'গুম এবং হত্যার' জন্য চোখের পানি ফেলত এবং এই ঘটনার জন্য সরকারকে দায়ী করত। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, বিএনপি-জামায়াতের এজেন্ট মরিয়ম মান্নানের মতো আরও অনেক ঘটনা এভাবে আমাদের সামনে উন্মোচিত হবে। কেননা কথায় আছে- ‘You shall know the truth, and the truth shall make you free.’

ড. সেলিম মাহমুদঃ তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ


মানবকঙ্কাল সংগ্রহে নীতিমালা প্রয়োজন

মানবকঙ্কাল সংগ্রহে নীতিমালা প্রয়োজন
ছবি: সংগৃহীত
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত

শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল

আমাদের দেশে অবৈধভাবে মানবকঙ্কালের ব্যবসা হয়, এমন অভিযোগ অনেক আগে থেকেই আছে। বলা হয়, অবৈধ মানবকঙ্কাল ব্যবসায়ীরা বিভিন্নভাবে মানুষের হাড়গোড় জোগাড় করে তা বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের কাছে বিক্রি করে থাকে। সংগ্রহ করা কঙ্কাল দেশের বাহিরেও পাচার হয়ে থাকে। এ কথা সত্য যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অবৈধ মানবকঙ্কাল ব্যবসায়ীদের মাঝেমধ্যে গ্রেপ্তার করে কোর্টের মাধ্যমে জেলে পাঠিয়ে থাকে। তারপর অভিযুক্তরা জামিনে মুক্তি পেয়ে আবার কঙ্কাল ব্যবসায় লেগে যায়।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায়, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা কঙ্কাল ব্যবসায় জড়িত। এমন অভিযোগও আছে, অনেক ক্ষেত্রে ডাক্তারি পড়তে আসা ছাত্ররাও এ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। সাধারণত অবৈধ কঙ্কাল ব্যবসায়ীরা গোপনে কবরস্থান থেকে মানবকঙ্কাল চুরি করে। আবার এমন অভিযোগও আছে, হাসপাতালে বেওয়ারিশ হিসাবে পড়ে থাকা লাশগুলোকে মানবকঙ্কাল ব্যবসায়ীরা সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের অসাধু ব্যক্তিদের মাধ্যমে সংগ্রহ করে থাকে। তারপর দেহ থেকে রাসায়নিকের মাধ্যমে মাংস ছাড়িয়ে কঙ্কাল সংগ্রহ করা হয়। যেহেতু মানবকঙ্কাল সংগ্রহের বা কেনাবেচার সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই, তাই ডাক্তারি পড়তে আসা শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে অবৈধ কঙ্কাল ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কিনে নেন।

ডাক্তারি পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও গবেষাণার জন্য মানবকঙ্কালের প্রয়োজন পড়ে। যদিও আজকাল কৃত্রিম কঙ্কাল পাওয়া যায়। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিজ্ঞজনেরা বলে থাকেন, কৃত্রিম কঙ্কাল দিয়ে শিক্ষার বিষয়টি পরিপূর্ণ হয় না। কৃত্রিম কঙ্কাল আসলের মতো বানানো সম্ভব নয়। এতে অনেক সময় ভুল থাকে।

আমাদের দেশে অনেক কিছুর সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় অপরাধীরা অপরাধের পথ খুঁজে বেড়ায়। দেখা যায়, অনেক সময় আইনের দুর্বলতার জন্য অপরাধীরা অপরাধ করেও পার পেয়ে যায়। সেখানে যথাযথ কর্তৃপক্ষেরও কিছু করার থাকে না। আমাদের এখানে কঙ্কাল বেচাকেনার কোনো নীতিমালা নেই। অথচ আমরা যদি আমাদের সন্তানদের ডাক্তার বানাতে চাই, সেক্ষেত্রে মানবকঙ্কালের প্রয়োজন পড়বেই। সেটা বৈধ বা অবৈধ- যেকোনো উপায়ে সংগ্রহ করতেই হবে। শিক্ষার্থীরা বৈধভাবে নাকি অবৈধভাবে মানবকঙ্কাল সংগ্রহ করছে তা তারা অনেক সময় বুঝে উঠতে পারছে না।

আইন অনুযায়ী, কবরস্থান থেকে কঙ্কাল সংগ্রহ করে বিক্রি করা চরম অনৈতিক কাজ হলেও আমাদের দেশের আইনে এ ধরনের অপরাধের সুস্পষ্ট কোনো বিচার বা শাস্তির নির্দেশনা নেই। যার ফলে অপরাধীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পরলেও শেষে পার পেয়ে যায়। তাই কঙ্কাল কেনাবেচা, এর সংরক্ষণ, সেইসঙ্গে দেহদান-সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট নীতিমালার প্রয়োজন আছে। এটা করা সম্ভব হলে অবৈধ কঙ্কাল ব্যবসা বন্ধ করা সম্ভব হবে। আমরা সবাই এটা জানি যে, দেহদান ছাড়া বৈধভাবে কঙ্কাল সংগ্রহের তেমন সুযোগ নেই। এ কথা তো সবাই বলবেন, যেখানে বৈধতার সুযোগ থাকে না, সেখানে বৈধ প্রয়োজনের তাগিদে মানুষকে বাধ্য হতে হয় বাঁকা পথ ধরতে। আর এই সুযোগটাই নেয় অপরাধী চক্রের লোকজন।

অ্যানাটমি বিষয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে কঙ্কালের ব্যবহার হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ভাষ্য হলো- যতই আপনাকে পড়ানো হোক না কেন, হাতে ধরে দেখানোর আগ পর্যন্ত কিছুই বোঝা সম্ভব না।

আগেই বলা হয়েছে, ডাক্তারি পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও গবেষণার জন্য মানবকঙ্কালের প্রয়োজন হয়। সে জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা। তাই যারা মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা নিয়ে চিন্তাভাবনা করে থাকেন, তারা এ বিষয়ে স্বচ্ছতা নিয়ে আসতে দুটি প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছেন। এর মধ্যে একটি প্রস্তাব হলো- মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যলয়গুলোতে কঙ্কালের ব্যবহার এবং সরবরাহের পদ্ধতি নিয়ে নীতিমালা তৈরি করা। অন্যটি হলো- মেডিকেল কলেজগুলোতে ছাত্রছাত্রীদের জন্য সিমুলেশন ল্যাব তৈরি করা। তবে বিজ্ঞজনরা বলে থাকেন, এ ধরনের সিমুলেশন ল্যাব সহজ ব্যাপার নয়। তা অনেক সময়ের ব্যাপার। এটি তাড়াতাড়ি তৈরা করা যাবে না। আমাদের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তার মতে, এ ধরনের সিমুলেশন ল্যাব প্রতিষ্ঠা করতে পাঁচ বছরের মতো সময় লেগে যেতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের সিমুলেশন ল্যাব ব্যবহার হচ্ছে। আমাদের দেশে এখনো এটা প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। বাংলাদেশের কুমিল্লার একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ছোট্ট আকারে একটি ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

একই সঙ্গে মেডিকেল কলেজে ডাক্তারি পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের গবেষণা ও পড়াশোনার জন্য যেহেতু মানবকঙ্কালের প্রয়োজন, তাই যথাযথ কর্তৃপক্ষের উচিত হবে ছাত্রছাত্রীদের জন্য সহজ ও বৈধভাবে মানবকঙ্কালের ব্যবহার সুনিশ্চিত করা। অপরাধীরা হয়তো বিভিন্নভাবে মানবকঙ্কাল সংগ্রহ করে তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চলিয়ে যায়। কিন্তু কোমলমতি মেডিকেলের ছাত্রছাত্রীদের অনেক সময় আইনের মারপ্যাচে পরে ভোগান্তির শিকার হতে হয়। এখানে একটি কথা বলে রাখা প্রয়োজন, কর্তৃপক্ষ যদি ডাক্তারি পড়তে আসা ছাত্র-ছাত্রীদের বৈধভাবে মানবকঙ্কাল পাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন এবং ছাত্রছাত্রীদেরও আইনের ব্যাপারে সচেতন করে তোলেন, তাহলে দেখা যাবে অপরাধীরা অর্থাৎ মানবকঙ্কাল পাচারকারী কিংবা ব্যবসায়ীরা ছাত্রছাত্রীদের হাতে অবৈধভাবে সংগ্রহ করা মানবকঙ্কাল তুলে দিতে পারবে না। ছাত্রছাত্রীরাও কোনো অপরাধীর কাছ থেকে মানবকঙ্কাল গ্রহণ করবে না। তখন দেখা যাবে অপরাধীরাও ডাক্তারি পড়তে আসা ছাত্রছাত্রীদের আশপাশে আসতে পারছে না।

তাই বলছিলাম, মেডিকেলে পড়তে আসা ছাত্রছাত্রীদের মানবকঙ্কাল সংগ্রহের ব্যাপারে একটি বৈধ সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা যথাযথ কর্তৃপক্ষের বিশেষ দায়িত্ব হয়ে পড়েছে। দেশবাসী বিশ্বাস করে, মেডিকেলে ডাক্তারি পড়তে আসা ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে যথাযথ কর্তৃপক্ষ অবশ্যই সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করে সামনের দিকে এগিয়ে যাবেন।

 লেখক: গদ্যকার


আমার কিছু নাগরিক আফসোস

আমার কিছু নাগরিক আফসোস
মামুনুর রশীদ
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত

মামুনুর রশীদ

মানুষের জীবনে কত আফসোস থাকে। জীবনে এটা হলো না, সেটা হলো না! জীবনে কত কাজ অসমাপ্ত থেকে যায়। তবে আমার ব্যক্তিগত কারণে কোনো আফসোস নেই। এটা পেলাম না, সেটা পেলাম না, জীবনে কী পেলাম, এ নিয়ে হৃদয়ে কোনো আক্ষেপ নেই। কিন্তু তারপরও কতগুলো ছোট ছোট আফসোস রয়ে গেছে। এর একটি আফসোস হলো, যে শহরটায় থাকি সে শহরটাকে কেউ ভালোবাসে না। সামরিক শাসকরা তাদের সময়ে একভাবে শহর গড়ে তোলে আবার রাজনৈতিক দলের সরকার ক্ষমতায় এসে শহরটাকে নিয়ে আরেক ধরনের কাজকর্ম শুরু করে। আমার দৃষ্টিতে কোনোটাই সমন্বিত আর সুদূরপ্রসারী নয়। তারপরও সেই ভিন্ন শ্রেণির শাসকরা তাদের কাজের জন্য আকুণ্ঠ প্রশংসা দাবি করে। কিন্তু এই সামগ্রিক কাজের মধ্যে নাগরিকদের কোনো অংশগ্রহণ থাকে না।

কতগুলো মুখস্থ করে পাস করা প্রকৌশলী, সৃজনহীন আমলা এবং সদাব্যস্ত জনপ্রতিনিধিদের হইচই, চিৎকার-চেঁচামেচি শহরের ভাগ্য নির্ধারণ করছে। এমন কোনো নগর পরিকল্পনাবিদ, গবেষক কিংবা নৃ-তত্ত্ববিদের মতো ভিশনারির দেখা মেলে না যারা ভাবতে পারে শত বছর পরের নগরী কেমন হতে পারে?

প্রাকৃতিকভাবে ঢাকা শহরের একটা অবস্থা ছিল। মোগল ও ব্রিটিশ শাসনামলে শহরটাকে রক্ষা করা হয়েছিল নদী এবং খাল রক্ষার মাধ্যমে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে এবং স্বেচ্ছাচারিতায় সেসব প্রাকৃতিক ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে। ঢাকার উপকণ্ঠে অনেক বড় বড় শহর গড়ে উঠেছে। তার মধ্যে দনিয়া অন্যতম। সারি সারি দালান, অপরিসর পথ, লাখ লাখ মানুষের বসবাস দেখে সত্যিই মনে হয় ইটের পর ইট মাঝে মানুষ কীট। নিকট অতীতে এ এলাকাটা ছিল ধানখেত এবং ছোটখাটো জলাধার। এখন সেসব নেই, বর্তমানে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নিরেট কংক্রিটের স্তূপ। ঢাকার বাইরের শহরগুলোতে এবং গ্রামাঞ্চলের অবস্থা আরও করুণ। ছোটখাটো শহরের মেয়র সাহেবদেরও বড় বড় দামি গাড়ি দেয়া হয়েছে। উপজেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার এদের বিলাসবহুল জীবনযাপন করার সব ব্যবস্থা করা হয়েছে, কিন্তু গ্রামগুলোতে বাড়িঘর করার ব্যাপারে কোনো বিধিনিষেধ নেই। পুকুর ভরাট করে খাল-বিল ভরাট করে অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর, দোকানপাট, কলকারখানা ইচ্ছেমতো তৈরি করা হচ্ছে। গ্রামবাংলার নিসর্গ তো নেই-ই। দেশটা জাপান, কোরিয়া, সিঙ্গাপুরের মতো একেবারেই পরিকল্পিত হোক, সেই অতিরিক্ত আশাবাদ কখনোই করা হয়নি। তবে প্রাকৃতিক উপায়ে গড়ে ওঠা বনাঞ্চল, জলাধার, পাহাড়গুলোকে রক্ষা করা যেতই। এখন তো মনে হচ্ছে দেশটা একটা আবর্জনার স্তূপে পরিণত করা হচ্ছে। মানুষ কী শুধু খাওয়া আর নিদ্রার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? তার চারদিকে পরিবেশ ঠিক রাখার দরকার পড়ে না? গাছপালাঘেরা একটা পার্ক, শিশুদের খেলার জন্য মাঠ, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা মনোরম ক্যাম্পাসের প্রয়োজন নেই?

সমস্যা হচ্ছে যারা রাজনীতি করেন তারা শুধুই নির্বাচনের কথা ভাবেন। কর্মীদের মধ্যে যে সমাজ নিয়ে ভাবনা দরকার, এটা তারা অনুধাবন করেন না। প্রশাসনে দু-একজন কবিও আছেন। তারা শুধু জেলা শহরে প্রশাসক হিসেবে একটা চিহ্ন রাখতে চান। সামগ্রিক বিষয় নিয়ে তাদের ভাবনা থাকে না। পোস্টিং রক্ষা করাই একমাত্র কাজ, তার জন্য একমাত্র তেলমর্দনই প্রয়োজনীয় কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়।

আরেকটি আফসোস হচ্ছে শিক্ষার বর্তমান অবস্থা। এটি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। শিক্ষা একটি সুদূরপ্রসারী ভাবনা এবং এতে রাষ্ট্রের প্রচুর অর্থ লগ্নি করতে হয়। লগ্নিটা দিন দিন একটু বাড়ছে বটে। কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে একেবারেই অপ্রতুল। এখানে এখনো অপ্রতুল বেতন হওয়ার কারণে মেধাবীরা এই পেশায় আগ্রহী হন না। অথচ আমার জানামতে, বিশ্বের কোনো কোনো দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকের বেতন প্রায় সমান। বর্তমানে সরকারি চাকরি ভেবে বিসিএসে ব্যর্থ একদল তরুণ-তরুণী প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকতা করতে যাচ্ছেন বটে, কিন্তু তাদের মধ্যে রয়েছে বঞ্চনার হাহাকার। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্নীতি। কয়েক বছর আগেই প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেতে ১৬ লাখ টাকা ঘুষ দেয়ার অভিযোগ ছিল। এত টাকা উৎকোচ দিয়ে একজন শিক্ষক তার মেরুদণ্ড ঠিক রাখবেন কীভাবে? মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষারও একই হাল। তার মধ্যে ফুলেফেঁপে উঠছে কোচিং-বাণিজ্য। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সময় কম দেয়ার লক্ষ্যে অনলাইনের মতো শর্টকাট পদ্ধতিও দ্রুত বেছে নেয়ার প্রবণতা বাড়ছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে অর্থের বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে যে প্রশ্ন ফাঁসের মতো দুর্নীতিতেও অনেকে যুক্ত হয়ে পড়ছেন। শিক্ষা প্রশাসন এতই দুর্বল এবং দুর্নীতিপ্রবণ যে তৃণমূল থেকে উচ্চতম পর্যায়ে শিক্ষা বিভাগের অফিসের ইট-কাঠও ঘুষের টাকার জন্য উন্মুখ হওয়ার অভিযোগ প্রচলিত আছে।

এসব অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে রাজনীতিবিদদের আশীর্বাদধন্য হয়ে সংযুক্ত থাকার কথাও হরহামেশা শোনা যায়। এমনিতেই শিশুদের জীবনে বিনোদন বলতে ইন্টারনেটে গেমস, ফেসবুক এবং অন্যান্য আধুনিক ব্যবস্থাকেই এখন বোঝানো হয়। যার মধ্যে টিকটকের ভয়ংকর ব্যবহার বেড়ে যাচ্ছে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতির মধ্যে শুভ উদ্যোগ খুবই কম। কোনো কোনো ছাত্রসংগঠনের নেতা বালুমহালের ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত হয়ে যাচ্ছেন। এখানেও নাগরিকদের কোনো উদ্যোগ প্রয়োজন হয় না। সব জায়গাই ম্যানেজিং কমিটি আমলাশাসিত এবং সব দুর্নীতির উৎস।

আমার কাছে তৃতীয় আফসোসটি হচ্ছে স্বাস্থ্য। বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবাকে সুনিশ্চিত করেছে। দেশে একের পর এক মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক গড়ে উঠছে। বিদেশি সাহায্যে নতুন নতুন সাজসরঞ্জামও আসছে। কোথাও কোথাও জনবলের অভাবে ওই সব মেশিনপত্র অকেজো হয়ে গুদামে পড়ে থাকছে। গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসকরা যেতে চান না, তাদের গন্তব্য একমাত্র ঢাকা যেখানে সুযোগ-সুবিধা অবারিত। ভালো চিকিৎসকদের কোনো মূল্যায়নের ব্যবস্থা নেই। পদোন্নতিতে তারা পিছিয়ে পড়েন এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ না পেয়ে হতাশ জীবনযাপন করেন। সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার অপ্রতুলতা এবং অদক্ষতার কারণে বেসরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এর পরিপূরক হিসেবে গড়ে উঠেছে প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরি। এই ল্যাবরেটরির মালিকদের সঙ্গে চিকিৎসকদের যোগসাজশে একটা ভয়ংকর দুর্নীতি গড়ে উঠেছে। একটা জেলা শহরেও এখন শতাধিক বেসরকারি ক্লিনিক। একেবারে হতদরিদ্র ছাড়া কেউ সদর হাসপাতালে যান না। চিকিৎসকদের কাজ এখন আর রোগ সারানো নয়, তাদের মূল কাজটিই হচ্ছে রোগীর সংখ্যা বাড়ানো। আজ থেকে চল্লিশ, পঞ্চাশ, ষাট বছর আগে বাংলাদেশে কি এত রোগী ছিল? প্রাকৃতিক জীবনযাপনের ফলে রোগবালাই কমই হতো। সারা থানায় দু-তিনটি ওষুধের দোকান পাওয়া যেত। এখন একটি উপজেলা শহরেই শতাধিক ওষুধের দোকান এবং সেগুলোর রমরমা ব্যবসা প্রচলিত হয়েছে। ঢাকা শহরে দুই কামরার একটি ক্লিনিকের যাত্রা শুরু হয় এক-দুই তলা দিয়ে আর বছর ঘুরতে না ঘুরতে সেটি ১০টি সুরম্য অট্টালিকায় উন্নীত হয়। দিন দিন খ্যাতনামা চিকিৎসকদের ভিজিট বাড়ার সঙ্গে ফুলেফেঁপে উঠছে প্যাথলজিক্যাল কেন্দ্র। নানা কারণেই রোগীরা দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যাচ্ছেন। ভারত মধ্যবিত্তদের গন্তব্য স্থান আর উচ্চবিত্তদের জন্য রয়েছে ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর এবং অন্যান্য ধনী দেশ। দেশে দুর্নীতি করে প্রাপ্ত অর্থের বিরাট অঙ্ক ব্যাংকক, সিঙ্গাপুরের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ব্যয় হচ্ছে। ভারতেও আমাদের চিকিৎসা নেয়ার প্রধান ক্ষেত্র বেসরকারি খাত। কলকাতা, চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ- এসব জায়গায় বেসরকারি ক্লিনিক গড়ে উঠছে, যার অধিকাংশ রোগী বাংলাদেশের। বাংলাদেশের রোগী এবং ছাত্র না হলে ভারতের অনেক শিক্ষা এবং চিকিৎসাকেন্দ্র আর চলতে পারবে না।  

তিনটি মোটা দাগের আফসোসের কথা এখানে প্রকাশ করলাম, কিন্তু এ ছাড়া আছে আরও অনেক আফসোস আর হাহাকার। তবে মনে হয়, এই তিনটি জায়গা ঠিক করতে পারলে হয়তো অনেক সমস্যারই সমাধান হয়ে যেত। যার জন্য প্রথমে প্রয়োজন দেশপ্রেম, যার সূতিকাগার হচ্ছে রাজনীতি। রাজনীতি যদি ব্যবসায়ীদের হাতে চলে যায়, তাহলে এমন পরিণতিই মেনে নিতে হবে। এখন মন্ত্রিপরিষদের অধিকাংশই ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ীরা মনস্তাত্ত্বিকভাবে নিজেদের মুনাফা দেখতেই অভ্যস্ত। তাই মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব নিয়ে নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সর্বাত্মক মঙ্গল সাধনাই তাদের কাছে মুখ্য হয়ে ওঠে। তাদের চাপে প্রশাসনও শিথিলতায় চলে যায়। অনেক বড় বড় আমলার মূল কাজই হয়ে উঠছে বিদেশে টাকা পাচার করা। অবসরের বাকি জীবনটা বিদেশে একটি সুখকর জীবন কাটানোর স্বপ্ন নিয়ে তারা এ কাজ করে থাকেন। সাধারণত ব্যবসায়ীরা নিজের দেশটাকে বাসযোগ্য করার চেষ্টা করে। দেশেই তার পণ্যের একটা বড় বাজার ঠিক করে। যার ফলে বিপুল বেকারত্বের অবসান হয়। কিন্তু এ দেশে অসংখ্য ইংরেজি স্কুলের মাধ্যমে শিশুকাল থেকেই ছাত্রদের অভিবাসনমুখী করে তোলা হয়। তারা দেশে থাকতে চায় না। দেশ তাদের কাছে একটা নোংরা ডাস্টবিনের মতো মনে হয়। এই ডাস্টবিনের ময়লা সরানোর কাজেও কোনো নাগরিক এগিয়ে আসে না। এসব নাগরিক সমস্যার সমাধান কি শুধু সরকার এবং তার বেতনভুক্ত কিছু আমলা দিয়েই সম্ভব? আমার মতে সম্ভব নয়। সচেতন নাগরিকদের এগিয়ে আসতেই হবে। যার পেছনে একটা সুস্থ রাজনীতি থাকা প্রয়োজন। বিদ্যমান রাজনীতিবিদদের দিয়ে সেটা সম্ভব না হলে নিজেরাই নতুন ধারা সৃষ্টি করতে হবে।

লেখক: নাট্যকার ও কলামিস্ট



তাইওয়ান প্রণালির দুই পারে আত্মপরিচয়ের ব্যবধান

তাইওয়ান প্রণালির দুই পারে আত্মপরিচয়ের ব্যবধান
চীন ও তাইওয়ান দ্বীপের মধ্যবর্তী তাইওয়ান প্রণালী। ছবি: সংগৃহীত
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত

পল আরউইন ক্রুকস

চীনের রাষ্ট্রীয় পরিষদের তাইওয়ানসংক্রান্ত দপ্তর তাইওয়ানকে নিয়ে গত মাসে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছে। এতে তাইওয়ানের সঙ্গে চীনের মূল ভূখণ্ডের সংকটপূর্ণ সম্পর্কের অমীমাংসিত বিষয়টি উঠে এসেছে এবং তাইওয়ান প্রণালির দুই পারের মানুষের পরিচয়ের পার্থক্যের বিষয়টি এখানে স্পষ্ট হয়েছে।

বেইজিং কর্তৃপক্ষ তাইওয়ানকে চীনেরই একটি বিচ্যুত প্রদেশ হিসেবে গণ্য করে। এ নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ অনেক পুরোনো। তাইওয়ানের বর্তমান অবস্থানকে চীন নিজেদের ‘অপমানের শতবর্ষ’* এবং গৃহযুদ্ধের অসমাপ্ত কাজের পরিণামরূপে দেখে। এ কারণেই তাইওয়ানকে পুনরায় চীনের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য আত্মপরিচয়ের বিষয়টি চীনের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বেইজিং এখন সব চীনা ‘স্বদেশিদের’ নিয়ে একটি অভিন্ন জনগোষ্ঠীর পুনরুজ্জীবন ঘটাতে আগ্রহী। শ্বেতপত্রের যুক্তি অনুযায়ী, ‘তাইওয়ানের ওপর চীনের সব জনতার অধিকার আছে।’

চীনের সংস্কৃতি থেকে পৃথকীকরণ নামের একটি প্রক্রিয়ার কথা ওই শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, যার মাধ্যমে তাইওয়ান নিজস্ব সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক রীতিনীতি গ্রহণ করে নিয়েছে। তাইওয়ানের বর্তমান রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে চীনের অভিযোগ, তাইপের নেতারা বিদেশি শত্রুদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদকে উসকে দেন। এখানে বিদেশি শত্রু বলতে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। চীনের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই বিদেশিরা তাইওয়ান প্রণালির উভয় পারের অভিন্ন আকাঙ্ক্ষাকে অবমূল্যায়ন করতে চায়।

এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী তাইওয়ান প্রণালির দুই পারের মানুষের আত্মপরিচয়ের ধরনে পরিবর্তনই চীনের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন স্বার্থের কেন্দ্রে রয়েছে। আর দুই পারের মধ্যে চলমান উত্তেজনার প্ররোচনাও এখান থেকেই আসছে। শ্বেতপত্রে এটাও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, যখন শান্তিপূর্ণ উপায়ে পুনরায় একত্রীকরণের বিষয়টি অগ্রাধিকার পায়, চীন বরাবরই শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে যেকোনো বাধার জবাব দিতে প্রস্তুত থাকবে। তবে তাইওয়ানের ব্যাপারে চীনের যে ধারণা আছে, সেটা বাস্তবতার সঠিক চিত্র তুলে ধরে না। কারণ, ওপারের সমমনা সম্প্রদায় হিসেবে তাইওয়ানের মানুষকে বেইজিং যতই মনে করুক, আসলে তারা একটি নিজস্ব পরিচয় গড়ে তুলতে সমর্থ হয়েছে।

তাইওয়ানের জনগণ উদার সামাজিক মূল্যবোধ ধারণ করে বলে সুস্পষ্ট প্রমাণ আছে। একটি মুক্ত গণমাধ্যম বা সংবাদমাধ্যম, রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সমালোচনামূলক জনমত এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের পক্ষে জোরালো সমর্থন তাইওয়ানের সমসাময়িক সমাজব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। গণতন্ত্র সূচকে তাইওয়ান শীর্ষ ১০-এর মধ্যে স্থান করে নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে ভালো। এই গণতান্ত্রিক পরিচয় তাইওয়ানের সব বয়সী, সব আয়ের মানুষ ও সব রাজনৈতিক চিন্তাধারার লোকজনের মধ্যে বিদ্যমান।

তাইওয়ানের জনগণের প্রায় ৫ শতাংশ চীনের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে আবার একত্রিত হওয়ার পক্ষপাতী। স্বাধীনতাকামীদের সংখ্যা সে তুলনায় অনেক গুণ বেশি। তবে এ পরিসংখ্যান থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়। আর সেটা হলো, স্থিতাবস্থা বলে প্রায়ই যে কথাটা বলা হয়ে থাকে তার প্রতিও এক ধরনের জনমত আছে। অবশ্য স্থিতাবস্থার একটা নিজস্ব ব্যাখ্যা তাইওয়ানের কাছেও আছে। মূল ভূখণ্ড চীন মনে করে, স্থিতাবস্থার যেকোনো বিচ্যুতি অগ্রহণযোগ্য। কারণ, সেটা দুই সম্প্রদায়কে ভিন্ন ভিন্ন শাসকের অধীনে স্থায়ী বিচ্ছিন্নতার দিকে নিয়ে যাবে।

শান্তিপূর্ণ উপায়ে পুনরায় একত্রীকরণের কাঙ্ক্ষিত চূড়ান্ত ধাপের পক্ষে প্রচার চালানোর লক্ষ্যেই শ্বেতপত্রটি প্রকাশ করা হয়েছে। তাইওয়ান প্রণালির উভয় পারের জনগণ একই পরিবারের অংশ এবং চীনের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক ঐক্যের বিরোধী কোনো শক্তি অথবা পুনরেকত্রীকরণের পথে যেকোনো বাধার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে বলে ওই দলিলে আহ্বান আছে।

শ্বেতপত্রে তাইওয়ানের স্বতন্ত্র সমাজব্যবস্থার স্বীকৃতি এবং দুটি সমাজব্যবস্থা পাশাপাশি এগিয়ে চলবে বলে উল্লেখ থাকলেও মূল ভূখণ্ড সব সময়ই ‘এক দেশ, দুই ব্যবস্থার’ আদর্শ নিয়ে প্রস্তাবিত সমাধান চায়। তবে ‘দুটি ব্যবস্থা’ ধরে রাখার জন্য ওই শ্বেতপত্রে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে ‘এক দেশের’ ওপর তুলনামূলক বেশি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, তাইপে এবং চীনের মূল ভূখণ্ডের একটি বিশ্বাসনির্ভর সম্পর্ক গড়ে তোলা উচিত, যার মাধ্যমে বেইজিং নিজের কথা রাখবে এবং তাইওয়ানের বর্তমান সমাজব্যবস্থা বহাল রাখবে।

হংকংয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি তাইওয়ানের প্রস্তাবিত সম্পর্কের এই ব্যাখ্যার চেয়ে বেশি কিছুর ইঙ্গিত দিলেও শ্বেতপত্রে বিশদভাবে উপস্থাপিত যুক্তি অনুযায়ী, ‘এক দেশ, দুই ব্যবস্থার চর্চা সন্দেহাতীতভাবে সফল।’ তাইওয়ানের সমাজব্যবস্থায় লোকজন হংকংয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি পর্যবেক্ষণ করতে পারে এবং নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারে। চীনা কর্মকর্তারা জেনেশুনে এই বাস্তবতা উপেক্ষা করেন। চীনা কমিউনিস্ট পার্টি ১৯৯৭ সালের আগে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেসবের কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে, তাও তাইওয়ানের মানুষ স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেন। এ রকম মুক্তভাবে চিন্তা করার মানসিকতা থেকে এই ব্যাখ্যা মিলতে পারে যে, কেন একজন জ্যেষ্ঠ চীনা কূটনীতিক তাইওয়ানের পুনরেকত্রীকরণের পরে সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তাভাবনা ও তত্ত্ব নির্মূলের জন্য নতুন শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন।

তাইওয়ান কর্তৃপক্ষ বরাবরই পুনরেকত্রীকরণের পথে সমাধান হিসেবে ‘এক দেশ, দুই ব্যবস্থা’ নীতির নিন্দা জানিয়ে এসেছে। তবে চীনের মূল ভূখণ্ডবিষয়ক পরিষদের যুক্তি, চীনের দাবি করা এখতিয়ার জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে গৃহীত একটি সিদ্ধান্তের ভুল ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীল। মূলধারার জনমতে এই দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপক প্রতিফলন দেখা যায়।

তাইওয়ান প্রণালির দুই পারের আত্মপরিচয়ের ভিন্নতা চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের জন্য একটি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, তাইওয়ানের পুনরেকত্রীকরণের বিষয়টি তার জাতীয় পুনর্জাগরণ নীতির অন্তর্ভুক্ত। শ্বেতপত্রে এটা স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, তাইওয়ান প্রণালির উভয় পারের রাজনীতিকদের এই সমস্যাটিকে পরবর্তী প্রজন্ম পর্যন্ত প্রবাহিত হতে দেয়া উচিত হবে না।

চিন পিংয়ের স্বপ্নের চীনে তাইওয়ান প্রণালির দুই পারের স্বদেশিদের সঙ্গে পুনরায় একীভূত হওয়ার বিষয়টি পররাষ্ট্রনীতির একটি কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে আছে। চিন পিংকে এমন একজন নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যিনি সুবিশাল লক্ষ্য অর্জনে সর্বোচ্চ উদ্যোগী হতে পারেন। তবে এ ধরনের অর্জনের জন্য দায়িত্বশীলতার পাশাপাশি মূল ভূখণ্ডের স্পষ্ট জাতীয়তাবাদকেও জিইয়ে রাখতে হয়, যা বিভিন্ন প্রত্যাশা পূরণের ক্ষেত্রে বাড়তি চাপ যোগ করে।

শ্বেতপত্রে তাইওয়ান প্রণালির দুই পারের মধ্যকার সম্পর্কের সংকট নিরসনে চীনের নেতৃত্বের সংকল্প যেমন দেখা যায়, তেমনি তাইওয়ানের সঙ্গে বেইজিংয়ের সম্পর্কের অনিয়ন্ত্রিত দিকটিও প্রকাশ পায়। চীনের মূল ভূখণ্ড কখনোই স্থিতাবস্থাকে পুরোপুরি মেনে নেয়নি আর এখন মনে হচ্ছে, তারা এটি বহাল রাখার বিষয়টিও আর মেনে নেবে না। কারণ, মূল ভূখণ্ডে শান্তি বজায় রাখার জন্য এটি একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ও সবচেয়ে কম গ্রহণযোগ্য বিকল্প।

তাইওয়ানে চীনের ‘স্বদেশিরা’ নিজস্ব পরিচয় গড়ে তুলেছে এবং এখন তারা এ বিষয়ে আগের চেয়ে বেশি আত্মবিশ্বাসী যে তাইওয়ানের সমাজব্যবস্থা বেইজিংয়ের হস্তক্ষেপ ছাড়াই টিকে থাকতে পারবে। কোনো একক নীতির মাধ্যমে নিরাপত্তা নিয়ে উত্তেজনার মীমাংসা হতে পারে না। তবে তাইওয়ান প্রণালির উভয় পারের অবস্থান সম্পর্কে আরও ভালো বোঝাপড়ার মাধ্যমে অন্তত একটি উদ্যোগের সূচনা হতে পারে, যা একটি অধিকতর সূক্ষ্ম সমাধানের পথ দেখাতে পারে।

* চীনে ১৮৩৯ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত কিং রাজবংশ এবং চীন প্রজাতন্ত্রের হস্তক্ষেপ বা শাসন বহাল ছিল। সময়টিকে বর্তমান চীন সরকার পশ্চিমা শক্তিধর দেশগুলোর চক্রান্ত এবং জাপানের আগ্রাসনের পরিণামে ‘অপমানের শতবর্ষ’ হিসেবে গণ্য করে।

পল আরউইন ক্রুকস: অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কনটেম্পোরারি চায়না স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক।

এশিয়া টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত। মূল ইংরেজি থেকে ভাষান্তর: আশিস আচার্য

 


জাতিসংঘে জাতির পিতা

জাতিসংঘে জাতির পিতা
তোফায়েল আহমেদ।
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত

তোফায়েল আহমেদ

জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ প্রাপ্তির ৪৮ বছর পূর্ণ হয়েছে এ বছর। এ উপলক্ষে মনে পড়ছে ১৯৭৪-এর ২৫ সেপ্টেম্বরের কথা। যেদিন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘে মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক অনন্য ও মহত্তর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। জাতির পিতার সফরসঙ্গী হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ২৯তম অধিবেশনে যোগদানের সৌভাগ্য আমার হয়েছিল।

বছর ঘুরে দিনটি এলে মানসপটে অনেক কিছুই ভেসে ওঠে। আমাদের জাতীয় জীবনে এই দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম। বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা ইতিমধ্যে জাতির পিতার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা দিয়েছেন। এবারও ২৩ সেপ্টেম্বর (গতকাল শুক্রবার) ৭৭তম অধিবেশনে মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা দিয়েছেন। মাতৃভাষার প্রতি আমাদের এই প্রগাঢ় ভালোবাসার ফলেই ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ ১৯৯৯ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ রূপে উদযাপিত হচ্ছে। এর শুভ উদ্বোধনটি হয়েছিল মূলত মানবজাতির সর্বোচ্চ ফোরাম জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক মাতৃভাষা বাংলায় ভাষণের মধ্য দিয়ে।

আজ থেকে ৪৮ বছর আগে ১৯৭৪-এর ১৮ সেপ্টেম্বর বুধবার বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে বাংলাদেশকে জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্য রাষ্ট্ররূপে গ্রহণ করা হয়। এই ঘোষণাটি শোনার অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ বঙ্গবন্ধু তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ জাতিসংঘে তার ন্যায্য আসন লাভ করেছে। জাতি আজ গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবে যারা বাংলাদেশকে স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে তাদের জীবন উৎসর্গ করে গেছেন।’ স্বাধীন বাংলাদেশের এই অর্জন মূলত বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞা ও দূরদৃষ্টির ফলেই সম্ভব হয়েছে। মূলত এই শুভদিনেই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বঙ্গবন্ধুর যোগদানের সফরসূচি ঠিক করা হয়। সেই হিসেবে ২৩ সেপ্টেম্বর সোমবার সকাল সাড়ে সাতটায় বাংলাদেশ বিমানের লন্ডন ফ্লাইটে আমরা ঢাকা ত্যাগ করি। সব মিলিয়ে ২৪ জনের এই দলে উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে ছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান ড. নুরুল ইসলাম, বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. নূরুল ইসলাম, গ্যাস ও অয়েল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের চেয়ারম্যান ড. হাবিবুর রহমান, এম আর সিদ্দিকী (সংসদ সদস্য), আসাদুজ্জামান খান (সংসদ সদস্য) ও দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মঞ্জু।

আমেরিকায় ‘ওয়ালডর্ফ অ্যাস্টোরিয়ায়’ বঙ্গবন্ধুর হোটেল কক্ষে দর্শনার্থীদের আগমন ছিল চোখে পড়ার মতো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার হোটেল কক্ষে এসে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এরপর আসে প্রতীক্ষিত সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সদ্য সদস্যপদ  প্রাপ্ত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা। বক্তৃতা দেয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুর নাম যখন ঘোষিত হয়, তখন বিশ্ব নেতাদের মুহুর্মুহু করতালিতে চারদিক মুখরিত হয়ে ওঠে। মঞ্চে দাঁড়িয়ে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে চারদিকে তাকিয়ে পরিষদে সমাগত বিশ্বনেতাদের একবার দেখে নিয়ে জাতিসংঘকে ‘মানবজাতির মহান পার্লামেন্ট’ উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু তার বক্তৃতা শুরু করেন। জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুই প্রথম রাষ্ট্রনায়ক যিনি মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করেন। বঙ্গবন্ধু বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘শান্তি ও ন্যায়ের জন্য পৃথিবীর সকল মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার এক নয়া বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাংলাদেশ আজ অঙ্গীকারবদ্ধ। জাতিসংঘের সনদে যেসব মহান আদর্শ উৎকীর্ণ রয়েছে তারই জন্য আমাদের দেশের লাখ লাখ মানুষ চরম ত্যাগ স্বীকার করেছেন।’

সেদিন সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সভাপতির আসন অলঙ্কৃত করেছিলেন আলজেরিয়ার তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল আজিজ বুতাফ্লিকা। তাকে আমি ইতিপূর্বেই কাছ থেকে দেখেছিলাম। বঙ্গবন্ধুকে ওআইসি সম্মেলনে নেয়ার জন্য ১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট হুয়ারে বুমেদিনের বিশেষ বিমান নিয়ে যে পাঁচজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকায় এসেছিলেন, তিনি ছিলেন তাদের অন্যতম। বক্তা হিসেবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে পরিষদের সভাপতি স্বীয় আসন থেকে উঠে এসে বঙ্গবন্ধুকে মঞ্চে তুলে নিয়েছিলেন। পিনপতন নিস্তব্ধতার মধ্যে বঙ্গবন্ধু তার ৪৫ মিনিটের বক্তৃতা শেষ করেন। এ সময় সভাপতি নিজেই যখন দাঁড়িয়ে করতালি দিচ্ছিলেন, তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনায়ক ও প্রতিনিধিদলের সদস্যরাও বিপুলভাবে করতালি দিয়ে আলিঙ্গন করে অভিনন্দিত করেন বঙ্গবন্ধুকে। অভাবনীয় সেই দৃশ্য। নিজ চোখে না দেখলে লিখে বোঝানো সম্ভবপর নয়। বঙ্গবন্ধুর প্রতি বিশ্বনেতৃবৃন্দের ছিল গভীর শ্রদ্ধা। আন্তর্জাতিক রাজনীতির হিমালয়সম উচ্চতায় আসীন ছিলেন তিনি। আমার মনে পড়ে, অধিবেশনে আসা বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদলের সদস্যরা আমাদের কাছে এসে বলেছিলেন, ‘সত্যিই তোমরা গর্বিত জাতি। তোমরা এমন এক নেতার জন্ম দিয়েছ, যিনি শুধু বাংলাদেশের নেতা নন, এশিয়ার নেতা নন; তিনি সমগ্র বিশ্বের নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেতা।’

বঙ্গবন্ধুকে প্রথমেই অনুরোধ করা হয়েছিল, ইংরেজিতে বক্তৃতা দেয়ার। কিন্তু প্রিয় মাতৃভাষা বাংলার প্রতি সুগভীর দরদ ও মমত্ববোধ থেকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করতে চাই।’ সিদ্ধান্তটি তিনি আগেই নিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর বাংলা বক্তৃতার ইংরেজি ভাষান্তর করার গুরুদায়িত্বটি অর্পিত হয়েছিল ফারুক চৌধুরীর (প্রয়াত) ওপর। তিনি তখন ছিলেন লন্ডনে বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার। পরবর্তী সময়ে পররাষ্ট্রসচিব হয়েছিলেন। ছুটিতে তিনি দেশে এসেছিলেন। ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে মিয়ানমার যান সমুদ্রসীমা নিয়ে আলোচনার জন্য। মিয়ানমার থেকে ফেরার পর বঙ্গবন্ধু ফারুক চৌধুরীকে ডেকে বলেছিলেন, ‘তোমার লন্ডন যাওয়া চলবে না। তুমি আমার সঙ্গে নিউইয়র্ক যাবে এবং জাতিসংঘে আমি বাংলায় যে বক্তৃতা করব, তাৎক্ষণিকভাবে তুমি সেই বক্তৃতার ইংরেজি ভাষান্তর করবে।’ ফারুক ভাই সুন্দর ইংরেজি বলতেন ও লিখতেন। প্রথমে ফারুক ভাই একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। তখন পরিস্থিতি সহজ করতে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘রিহার্সাল দাও। বক্তৃতা ভাষান্তরের সময় ভাববে যেন তুমিই প্রধানমন্ত্রী। তবে পরে কিন্তু তা ভুলে যেও।’

মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা প্রদানের বঙ্গবন্ধুর এই সিদ্ধান্তটি ছিল তার সারা জীবনের স্বাভাবিক এবং যৌক্তিক পরিণতি। সেদিন বক্তৃতারত বঙ্গবন্ধুর দিকে তাকিয়ে কেবলই মনে হয়েছে, তিনি যেন বহু যুগ ধরে এমন একটি দিনের অপেক্ষায় নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন। মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। ১৯৪৮-এর ১১ মার্চ, ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্বের আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু মুজিব ছিলেন সর্বাগ্রে। তার নেতৃত্বেই সেদিন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রামী ছাত্রসমাজ সফল ধর্মঘট পালন করেছিল। এরপর ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মহান ভাষা আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্বে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে তিনি কারাগারে বন্দি অবস্থায়ই আমরণ অনশন শুরু করেছিলেন। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘১৯৪৮ সালে ছাত্ররাই এককভাবে বাংলা ভাষার দাবির জন্য সংগ্রাম করেছিল। আমার বিশ্বাস ছিল, জনগণ এবার এগিয়ে আসবে। কারণ জনগণ বুঝতে শুরু করেছে যে, বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা না করতে পারলে তাদের দাসত্বের শৃঙ্খল আবার পরতে হবে।’ (পৃষ্ঠা-১৯৭)। সংগ্রামী এই বোধ থেকে বঙ্গবন্ধু মুজিব মাতৃভাষার শৃঙ্খল মোচনে অনশনরত অবস্থায় দীপ্ত অঙ্গীকারে স্বীয় অভিপ্রায় ব্যক্ত করে লিখেছেন, ‘ঠিক করেছি জেলের বাইরে যাব, হয় আমি জ্যান্ত অবস্থায়, না হয় মৃত অবস্থায় যাব।’ (পৃষ্ঠা-১৯৭)। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় এমনি মরণপণ অঙ্গীকার ছিল তার। এই প্রতীজ্ঞার বলে বলবান হয়েই জাতিসংঘের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন নিজ ইচ্ছার কথা তথা মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা প্রদানের কথা।

মাতৃভাষায় বঙ্গবন্ধু মুজিবের এই ঐতিহাসিক বক্তৃতার পর অধিবেশনে আগত পাঁচটি মহাদেশের প্রতিনিধি এবং সমগ্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বহুল পঠিত জাতিসংঘের ‘ডেলিগেট বুলেটিন’ বঙ্গবন্ধুকে ‘কিংবদন্তির নায়ক মুজিব’ বলে আখ্যায়িত করে। বুলেটিনটিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনায়কদের প্রদত্ত মন্তব্য-প্রতিক্রিয়া পত্রস্থ করা হয়। বুলেটিনের সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছিল, ‘এযাবৎ আমরা কিংবদন্তির নায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের নাম শুনেছি। এখন আমরা তাকে কাজের মধ্যে দেখতে পাব।’ জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সম্পর্কে বলা হয়, ‘বক্তৃতায় ধ্বনিত হয়েছে মুজিবের মহৎকণ্ঠ।’ জাতিসংঘের মহাসচিব ড. কুর্ট ওয়ার্ল্ডহেইম তাৎক্ষণিক এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতায় আমি আনন্দিত ও গর্বিত। বক্তৃতাটি ছিল সহজ, গঠনমূলক এবং অর্থবহ।’ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের ভূয়সী প্রশংসা করে বুলেটিনটির ভাষ্য ছিল, ‘অতীতের অনগ্রসরতা, যুদ্ধের ধ্বংসলীলা, প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও প্রতিকূল বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ভয়াবহ ফলশ্রুতি হিসেবে যে অসুবিধাজনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ অগ্রসর হচ্ছে তা বাংলাদেশের নেতা শেখ মুজিব তার বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্বসহকারে তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন।’ ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস কালাহান তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিত্ব তাকে মুগ্ধ করেছে। বাস্তবিকই তিনি এক শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব।’

এরপর ২৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতিজনিত সমস্যা এবং বাংলাদেশে সর্বনাশা বন্যার ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতি পর্যালোচনায় জাতিসংঘের মহাসচিবের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আলোচনায় আমার সৌভাগ্য হয়েছিল অংশগ্রহণের। কাছ থেকে দেখেছি অসাধারণ রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞায় জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে স্বদেশের প্রায় দুর্ভিক্ষাবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার পর জাতিসংঘ বাংলাদেশের ত্রাণকার্যে ৭০ লাখ ডলার সহায়তা প্রদান করেছিল এবং উপমহাসচিব ড. ভিক্টর উমব্রাইখটকে বাংলাদেশের সমস্যার প্রতি বিশেষ নজর রাখার ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর সম্মানে নিউইয়র্ক সিটি হলে আয়োজিত এক সংবর্ধনা সভায় নিউইয়র্কের মেয়র বঙ্গবন্ধুকে নগরীর চাবি উপহার দেন এবং বলেন, ‘এই উপহার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও জনগণের প্রতি আমেরিকার জনগণের শ্রদ্ধা ও বন্ধুত্বের নিদর্শন।’ প্রত্যুত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে যারা আত্মদান করেছেন সেই সব শহীদের আর সাড়ে সাত কোটি বাঙালির পক্ষ থেকে এই চাবি গ্রহণ করে তিনি সম্মানিত বোধ করছেন।’ বক্তৃতায় তিনি আরও বলেছিলেন, ‘আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামে আমেরিকার জনগণ যেভাবে সমর্থন জুগিয়েছিল আমি চিরকাল তা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করব।’

তারপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডের সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত বৈঠকে অংশগ্রহণের উদ্দেশে অক্টোবরের ১ তারিখ সকাল ১০টায় আমরা নিউইয়র্ক থেকে ওয়াশিংটনের এন্ড্রুজ বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করি। বেলা ৩টায় বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্ট ফোর্ডের সঙ্গে হোয়াইট হাউসে বৈঠক করেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা স্থায়ী বৈঠকের পর বেলা সাড়ে ৪টায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল হোসেন সংবাদ সম্মেলনে মিলিত হন। বিকেল ৫টায় সাক্ষাৎ করেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকনামারা। পরদিন অক্টোবরের ২ তারিখ সকালে সিনেটর কেনেডি ও জর্জ ম্যাকভার্ন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদান উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর এই সফর ছিল অসংখ্য কর্মসূচিতে ঠাসা। সদ্য স্বাধীন একটি দেশের জাতির পিতার আগমনকে কেন্দ্র করে নিউইয়র্ক নগরীর নাগরিক সমাজে বিশেষ ঔৎসুক্যের সৃষ্টি হয়েছিল। মনে পড়ে, হোটেল ‘ওয়ালডর্ফ অ্যাস্টোরিয়ার’ রেস্টুরেন্টে খেতে বসেছি। আমার সামনেই উপবিষ্ট একটি পরিবার। পরিচয়ের শুরুতেই তারা আমায় জিজ্ঞাসা করেন, ‘তুমি কোন দেশ থেকে এসেছ?’ আমি বললাম, বাংলাদেশ থেকে। আমাকে অবাক করে দিয়ে তখন তাদের মুখে স্বতঃস্ফূর্তভাবে একটি কথাই উচ্চারিত হয়, ‘ও, শেখ মুজিব, শেখ মুজিব! তিনি একজন মহান নেতা।’ পরিচয় দিয়ে বললাম, আমি তার পলিটিক্যাল সেক্রেটারি। কিন্তু তারা বিশ্বাস করতে পারলেন না। আমার মতো অল্প বয়সী একজন কী করে বিশ্বখ্যাত নেতা শেখ মুজিবের পলিটিক্যাল সেক্রেটারি হতে পারে! কেবল বললেন, ‘আর ইউ শিওর?’ আমি সম্মতিসূচক মাথা নাড়ালাম। তখন তারা বলেছিলেন, ‘আমরা মুজিবকে শ্রদ্ধা করি।’ তারপরে যখন বঙ্গবন্ধুকে আমি ঘটনাটি ব্যক্ত করি, তিনি বললেন, ‘তাদের নিয়ে এসো।’ তাদের বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়ে এলাম। অপার বিস্ময়ে কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে আমাকে অভিবাদন জানিয়ে তারা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলাপে মগ্ন হলেন।

বাঙালিদের কাছে শুধু নয়, বিদেশিদের কাছেও বঙ্গবন্ধু পরম শ্রদ্ধার আসনে আসীন। যে নেতার জন্ম না হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না; সব রকম ভয়ভীতি লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থেকে জীবনের-যৌবনের ১৩টি বছর যিনি কারান্তরালে কাটিয়েছেন; বাঙালির জাতীয় মুক্তির প্রশ্নে যিনি কোনো দিন আপস করেননি; ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন; বারবার বক্তৃতায় বলেছেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না, আমি আমার মানুষের অধিকার চাই’; যিনি সমগ্র বিশ্বের নির্যাতিত-শোষিত মানুষের মহান নেতা, তাকে বিশ্বনেতৃবৃন্দ শ্রদ্ধা ও সম্মানের চোখে দেখবেন- এটাই স্বাভাবিক। জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ প্রাপ্তির ৪৮ বছর পূর্তির এই বছরটিতে পেছন পানে চাইলে দেখি কেবল স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই নয়, সেই সঙ্গে যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন একটি দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, শতাধিক দেশের স্বীকৃতি আদায় এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে তথা জোটনিরপেক্ষ সম্মেলন, কমনওয়েলথ, ওআইসি এবং মানবজাতির সর্বোচ্চ পার্লামেন্ট জাতিসংঘে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি ও সদস্যপদ   অর্জনে বঙ্গবন্ধুর নিরলস কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ইতিহাসের পৃষ্ঠায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

লেখক: আওয়ামী লীগ নেতা; সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ।