রবিবার, অক্টোবর ২, ২০২২

ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম রোধে গণসচেতনতা প্রয়োজন

ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম রোধে গণসচেতনতা প্রয়োজন
শিশুশ্রম। ছবি: সংগৃহীত
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত

মিজান মনির

বাংলাদেশে দিন দিন বেড়েই চলেছে শিশুশ্রম। হাজার হাজার শিশু শ্রম দিয়ে যাচ্ছে কলকারখানায়, বড় বড় গাড়ির গ্যারেজে, হোটেল-রেস্তোরাঁয়, রিকশা-টেম্পোর কিংবা সিএনজিচালিত অটোরিকশার ওয়ার্কশপে। আবার অনেক শিশুকে দেখা যায়, বাস ও টেম্পোর হেলপারি করতে। পরিবারের অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা আর দরিদ্রতার জন্যই প্রতিনিয়ত বেড়ে যাচ্ছে শিশুশ্রম। যে বয়সে বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে হেসে-খেলে স্কুলে কাটানোর কথা; জীবিকার তাগিদে আজ সে বয়সে কোমলমতি শিশুরা মুখোমুখি হচ্ছে কঠিন বাস্তবতার। যে বয়সে হাতে থাকার কথা বই-কলম ইত্যাদি। অথচ আজ সেই বয়সেই তাদের হাতে তুলে নিচ্ছে কঠোর শ্রমের হাতিয়ার। নিজের কিংবা পরিবারের দুই মুঠো অন্ন জোগাতে এ শিশুরা যোগ দিচ্ছে বিভিন্ন পেশায়। এদের মধ্যে অনেক শিশুই ঝুঁকির্পূণ পেশায় নিয়োজিত।

শিশুশ্রম নিরসনে নেই কোনো কার্যকর উদ্যোগ। আমাদের দেশে স্কুল পড়ুয়া শিশুদের বৃহৎ একটি অংশ বিদ্যালয়ে যায় না। প্রায় ৪০ শতাংশ শিশু বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক কারণে স্কুলে গমন করতে পারে না। অনেকেই বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও চালিয়ে যেতে পারে না তাদের পড়ালেখা। আর তাই অর্থাভাবে মাঝপথে থেমে যায় তাদের পড়াশোনা, বেছে নিতে হয় জীবন রক্ষার পথ। পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে গিয়ে বিসর্জন দিতে হয় তার ভবিষ্যৎ গড়ার শিক্ষাজীবন। দেশের বিভিন্ন মাছের আড়তে মাছের ভাঁড় শ্রমিক, ওয়ার্কশপের হেলপার বা কারিগর, মিস্ত্রি, মাটি কাটা, রিকশা চালানো, গাড়ির হেলপার, ঠেলা গাড়ি-ভ্যানগাড়ি চালানো, হোটেলবয়সহ বিভিন্ন কাজে জড়িয়ে যাচ্ছে এসব কোমলমতি শিশু। বাংলাদেশে ২০ লাখ গৃহশ্রমিকের মধ্যে ৯৩ শতাংশই হচ্ছে অর্থাৎ ১৮ লাখ ৬০ হাজার শিশুই গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করছে। এসব গৃহশ্রমিক মানসিক, শারীরিক, মৌখিক, যৌন নির্যাতন ও আর্থিক শোষণের শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

বাংলাদেশে প্রায় ৩০০ ধরনের কাজ করে থাকে শিশুরা। এসবের মধ্যে ৪৫টির বেশি কাজই হচ্ছে অধিক ঝূঁকিপূর্ণ। শ্রমিকের বৃহৎ একটা অংশ হচ্ছে পথশিশু। বেঁচে থাকার তাগিদে এরা নিজেদের শ্রম বিভিন্নভাবে বিক্রি করে থাকে। পথশিশুদের বৃহৎ অংশ বিভিন্ন অপরাধ কর্মে জড়িত হয়ে যায়। শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা দ্বিগুণ। শহরে কাজ করে থাকে ১৮ লাখ ও গ্রামে ৬৭ লাখ শিশু শ্রমিক। এসব শিশু শ্রমিকের মধ্যে ৪৭ লাখ শিশু ঝুঁকির্পূণ পেশায় নিয়োজিত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও আইএলওর জরিপ মতে, কর্মক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ রয়েছে ৪৫ ধরনের। তার মধ্যে শিশুরা ৪১টি কাজে অংশগ্রহণ করে। যারা গৃহপরিচারিকার কাজ করছে তাদের বয়স ১৬ বছরের নিচে। ইউনিসেফের তথ্য অনুসারে, গৃহপরিচারিকার ৮৬ শতাংশ মেয়ে। ৩০ শতাংশের বয়স ৬ থেকে ১১ বছর আর বাকিদের বয়স ১২ থেকে ১৬ পর্যন্ত। এরা প্রতিদিন ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করে থাকে। শিশুশ্রম বন্ধের জন্য মূলত প্রয়োজন গণসচেতনতা ও দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা।

শিশু শ্রমিকরা অনেকাংশে বেশি সময় কাজ করে থাকলেও সে অনুযায়ী তারা তাদের শ্রমের ন্যায্য দাম পায় না। কাজের চাপ থাকে প্রচুর, অথচ ঠিকমতো খেতে পারে না! গৃহকর্ত্রীর ছেলেমেয়েরা রোজ ঠিকই স্কুলে যাওয়া-আসা করে কিন্তু কখনো চিন্তা করেনি কাজের মেয়েটির কথা। অনেক সময় কাজের চাপ সহ্য করতে না পেরে নীরবে কান্না করে থাকে কিশোরীরা। গৃহকর্ত্রীর চোখ রাঙানিতে কাজের মেয়েরা অনেক সময় প্রতিবাদ করতে চাইলে পরিবারের পুরুষ সদস্যরা মারধর বা নানা রকমের অত্যাচার করে থাকে। নারীদের পাশাপাশি পুরুষরাও হাত তোলে এসব অসহায় শিশু শ্রমজীবীর কোমল শরীরে। অনেক সময় জানা যায়, গৃহকর্ত্রীর অসহ্য যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে আত্মহত্যার মতো পথ বেরছ নেয় কোমলমতি শিশুরা। অনেক কিশোরী মানুষের বাড়িতে কাজ করা অবস্থায় বাড়ির কর্তা কর্তৃক যৌন হয়রানির শিকার হয়, প্রতিবাদ করার মতো ভাষা বা সুযোগ পায় না ভিকটিম কিশোরী। জাতীয় শিশুনীতি-২০১১-এর ৮-এর ৮৯-এ বলা হয়, ‘যে সকল প্রতিষ্ঠানে শিশুরা নিয়োজিত আছে, সেখানে শিশুরা যেন কোনরূপ শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের কার্যক্রম মূল্যায়ন করতে হবে।’ কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। নিজেদের সন্তানকেই দেখেন স্নেহ-মায়া-মমতার দৃষ্টিতে আর কাজের মেয়েটির প্রতি যত্ন নেয়া তো দূরের কথা, তাদের সঙ্গে ধমকের সুরে কথা বলে গৃহকর্ত্রীর অধিকাংশই। তাদের প্রতি বিভিন্নভাবে নির্যাতন করে থাকেন। কেউ দৈহিক নির্যাতন করে আবার কেউ কেউ করে মানসিক কিংবা যৌন নির্যাতন। কাজের মেয়েটি নীরবে সহ্য করে থাকে, কারণ সে অপারগ, ছায়াবিহীন।

সব শিশুশ্রম বন্ধের জন্য প্রয়োজন সচেতনতা ও আইনের সঠিক প্রয়োগ। সারা দেশের মতো চিটাগং রেলওয়ে এলাকায়ও রয়েছে শিশু কুলিদের ছড়াছড়ি। এই পেশায় যুক্ত হওয়ার ফলে এদের মন-মানসিকতার বিকাশ হয় না বরং কুসঙ্গে থাকার ফলে এরা বিভিন্ন অসামাজিক কার্যকলাপ বা অপরাধ চক্রে জড়িয়ে যায়। সিগারেট, ইয়াবা ও নানা ধরনের মাদকসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক সেবনে এসব শিশু শ্রমিক অল্প বয়সেই অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। কাজের মন্দা হলে এরাই বিভিন্ন অপরাধ করে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের মধ্যে অন্যতম হলো ‘ওয়েল্ডিং’-এর কাজ। ‘ওয়েল্ডিং’ কাজে অনেক শিশু কাজ করতে গিয়ে চোখে আঘাত পেয়ে অসহায় হয়ে পড়ে। অসুস্থ হয়ে পড়লে এদের কোনো খোঁজ-খবর নেয় না মালিকপক্ষ। অদূর ভবিষ্যতে দেশের শিশুশ্রম কমিয়ে আনতে হলে প্রয়োজন সুনির্দিষ্টভাবে আইনের প্রয়োগ ও কঠোর শাস্তির বিধান, যাতে যারা শিশু শ্রমিক নিযুক্ত করে তারা যেন কিছুতেই মুক্তি না পায়।

চরমভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয় কিন্তু শিশুশ্রম সমস্যার সমাধানে নেই কোনো কার্যকরী ব্যবস্থা। ১৯৯০ সালে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে (১৯৮৯) স্বাক্ষরকারী ও অনুসমর্থনকারী প্রথম রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো বাংলাদেশ। ১৯৯৪ সালে জাতীয় শিশুনীতি প্রণয়ন করা হয় বটে কিন্তু আদৌ কি সুনির্দিষ্টভাবে আমাদের দেশে কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ আছে কি? শুধু গ্রাম বা চট্টগ্রাম শহর নয়, ঢাকাসহ সারা দেশে দিন দিন বাড়রছ শিশু শ্রমিকের সংখ্যা।

দেশের শ্রম আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দিব্যি বেড়েই চলছে শিশুশ্রম। শিশুশ্রম নিবারণ করতে হলে প্রয়োজন সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগ আর সমাজের সর্বস্তরে গণসচেতনতা সৃষ্টি করা। তবেই শিশুশ্রম বন্ধ হবে। শিশুদের হাতেই জাতির উন্নয়ন সম্ভাবনার চাবিকাঠি। তাই শিশুদের গড়ে তুলতে হবে আমাদেরই। শিশুরা জাতির সেরা সম্পদ, আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। আজ যারা শিশু, আগামীকাল হবে তারাই দেশ গড়ার সৈনিক। শিশুকে তার প্রাপ্য পূর্ণ অধিকার দিয়ে গড়ে তুলতে পারলেই সার্থক হবে বাংলাদেশ।

লেখক: সম্পাদক, নাগরিক চোখ


মিয়ানমারের সামরিক জান্তার পা থেকে কি মাটি সরে যাচ্ছে

মিয়ানমারের সামরিক জান্তার পা থেকে কি মাটি সরে যাচ্ছে
দেলোয়ার হোসেন।
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত

দেলোয়ার হোসেন

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারের নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে দেশটির ক্ষমতায় আসা সামরিক জান্তা সরকার বর্তমানে গভীর সংকটে পতিত হয়েছে। ২০২০ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের ফলাফলকে সামরিক শাসকরা প্রত্যাখ্যান করে, যা তাদেরই তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এমনকি তারা দেশটির পেছনের সব ইতিহাসকে ছাড়িয়ে গেছে। দীর্ঘদিনের সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে ২০১১ সালে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) জোট ক্ষমতায় আসার মাধ্যমে দেশটির গণতন্ত্রায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়। তখন থেকেই সামরিক জান্তা ও এনএলডি যৌথভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করে আসছিল। এমনকি সু চি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর বর্বর ও নৃশংস কার্যকলাপের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। কিন্তু ২০২০ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচন সামরিক জান্তা ও এনএলডির মধ্যকার সম্পর্ক পরিবর্তন করে দিয়েছে। জান্তা সরকারের নেতৃত্ব মিয়ানমারের গত ১০ বছরের সব অর্জন ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছে।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে জান্তা সরকার রাজনৈতিক ও সামরিক উভয় দিকেই বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। দেশব্যাপী জনগণ রাস্তায় নেমে এসেছে এবং জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছে। অন্যদিকে আধুনিক মিয়ানমারে প্রথমবারের মতো জাতীয় ঐক্য সরকার বা এনইউজি নামে একটি ছায়া সরকার গঠিত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এনইউজিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য বেশ বেগ পেতে হয়েছে, কিন্তু বর্তমানে সারা বিশ্বেই বিভিন্ন দেশে এর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও আসিয়ানের সদস্য রাষ্ট্রগুলো মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ হিসেবে এনইউজির ভূমিকার ওপর জোর দিচ্ছে। জান্তা সরকারকে মোকাবিলার জন্য এনইউজি পিপলস ডিফেন্স ফোর্স নামে তাদের সশস্ত্র বাহিনী গঠন করেছে, যা মূলত এনএলডির নেতা ও অনুসারী নিয়ে গঠিত হয়েছে। অন্যদিকে মিয়ানমারে কয়েক দশক যাবৎ বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। জান্তা সরকার বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর বিরোধিতার মুখোমুখি হচ্ছে। তবে এসব জাতিগত দলগুলো এনইউজিকে সমর্থন করছে এবং এসব দলের অনেকেই এনইউজির সঙ্গে জোট করেছে।

একই সঙ্গে এসব জাতিগত দলগুলো জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য নিজস্ব সামরিক শক্তি তৈরি করেছে। ফলে মিয়ানমারে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় জান্তা সরকার গভীর সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। কূটনৈতিকভাবে তারা সমগ্র বিশ্ব থেকে আলাদা হয়ে পড়েছে। কূটনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক- এই তিন ফ্রন্টেই তারা প্রায় পরাজিত হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, শক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য জান্তা সরকার আরাকান আর্মির মতো কিছু বিদ্রোহী গ্রুপের সঙ্গে জোট তৈরি করেছিল। প্রথমদিকে আরাকান আর্মি জান্তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করে চলত, কিন্তু সম্প্রতি রাখাইন রাজ্যে নিজেদের শক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য আরাকান আর্মি নিজেদের কৌশল বাস্তবায়ন শুরু করেছে। দিনে দিনে তারা জান্তার বিরুদ্ধে কঠোর হয়ে উঠেছে এবং জান্তা সরকারও তাদের একটি মুখ্য প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। আগস্টের মাঝামাঝি থেকে রাখাইনে দুই প্রতিপক্ষের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়।

বর্তমানে রাখাইনে সামরিক জান্তা গভীর সংকটে রয়েছে। তারা তাদের আধিপত্য এমনকি তাদের মৌলিক উপস্থিতিও হারাচ্ছে। সৈন্য হারানোর সঙ্গে সঙ্গে তারা প্রাণহানির সম্মুখীন হচ্ছে এবং বেশ কয়েকটি সামরিক চৌকির নিয়ন্ত্রণও হারিয়েছে। আরাকান আর্মি দ্বারা ব্যাপকভাবে আক্রমণের শিকার হয়ে তারা উল্লেখযোগ্যভাবে সামরিক সরবরাহ ও যোগাযোগব্যবস্থা হারিয়েছে।

মিয়ানমারের সামরিক জান্তা অব্যাহতভাবে রাজনীতিবিদ ও বেসামরিক নাগরিকদের দমন করছে। তারা নির্বিচারে হামলা ও হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে। আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে জয়ের জন্য তাদের সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করছে, কিন্তু কৌশলগতভাবে তারা খুব একটা লাভ করতে পারেনি। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, মিয়ানমারের ভূখণ্ডের মাত্র ১৭ শতাংশ জান্তার নিয়ন্ত্রণে, ৫২ শতাংশ এনইউজির অধীনে এবং বাকি অঞ্চলে কোনো দলেরই নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ নেই। সুতরাং ধারণা করা যায় যে, জান্তা মিয়ানমারে তার নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। রাখাইনেও তারা বেশ ধরাশায়ী। এটি সবার কাছেই স্পষ্ট যে, যেসব অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো খুবই সক্রিয় সেখানে তাদের কোনো শক্তিশালী অবস্থান নেই। এমনকি বার্মিজ এবং বৌদ্ধদের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের মধ্যেও জান্তা জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে। তাই জান্তা নেতারা এখন নিজেদের ভবিষ্যৎ, ক্ষমতা ও দেশের সামরিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভাবছেন। ২০২০ সালের নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করার মূল কারণটি ছিল সংবিধানের সংশোধনী, যা মিয়ানমারে সামরিক কর্তৃত্ব হ্রাস করত। যার ফলে জান্তা তার ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব হারাত।

পরিস্থিতি বলে দিচ্ছে, সামরিক জান্তার বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু তারা বাস্তবতা মেনে নেবে না। মিয়ানমার একঘরে নাকি ব্যর্থ রাষ্ট্র, তা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। বরং তারা নিজেদের শক্তিশালী করে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করবে এবং এ অঞ্চলকে নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেবে। তারা ইতিমধ্যেই রোহিঙ্গা সংকটের মতো আঞ্চলিক সমস্যা তৈরি করেছে। তাদের নৃশংসতা ও বর্বরতা লাখ লাখ বাস্তুচ্যুত, শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু তৈরি করেছে, যা তার প্রতিবেশী বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। সবশেষে সীমান্তে সংঘাত তৈরি করে বাংলাদেশকে উসকে দিচ্ছে জান্তা সরকার। বিশ্ব সম্প্রদায়কে বারবার বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে চলেছে তারা। দেশটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানকেও পাত্তা দিচ্ছে না। ফলে সংস্থাটির কিছু মিটিং ও শীর্ষ সম্মেলনে আমন্ত্রণ না জানানোর মধ্য দিয়ে আসিয়ান ইতিমধ্যে জান্তার বিরুদ্ধে তার অবস্থান জানান দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য মিয়ানমার জান্তা সরকারকে চাপ প্রয়োগ করা। সু চিকে মুক্তি দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে জান্তার উচিত ২০২০ সালের নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেয়া এবং বেসামরিক সরকারকে কাজ করার অনুমতি দেয়া। ভারত ও চীনের মতো আঞ্চলিক শক্তির উচিত জান্তা শাসনকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করা। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি বজায় রাখতে পাশ্চাত্যেরও উচিত জান্তার ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করা।

লেখক: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা

তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা
প্রয়াত একুশে পদকপ্রাপ্ত বর্ষীয়ান সাংবাদিক তোয়াব খান।
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত

তোয়াব খান

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তো সাধারণ মানুষ নন। অনন্যসাধারণ, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। আমি মনে করি, হাজার বছরের মধ্যে বাঙালির জীবনে কোনো দিন স্বাধীন রাষ্ট্র হয়নি। বাঙালির প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু, বাঙালির সহস্র বছরের স্বাধীন রাষ্ট্রীয় সত্তার প্রতিষ্ঠাতা।

১৯৭৩ সালের মে মাসে বাসায় এসে জানতে পারলাম ইতিমধ্যে গণভবন থেকে দুইবার টেলিফোন এসেছে। আবার টেলিফোন এলো। এক্ষুনি চলে আসুন, জরুরি দরকার আছে। গণভবনে পৌঁছালে সোজা নিয়ে যাওয়া হলো বঙ্গবন্ধুর বেডরুমে। দুপুরে খেয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। উনি বললেন দেখো, তোমাকে একটা কথা বলি। আমার একটা কাজ করে দিতে হবে। এই কাজটা যত তাড়াতাড়ি তুমি করতে পারবা, তত তাড়াতাড়ি তোমার ছুটি। আর যত দিন না হবে তত দিন তোমার এখানে থাকতে হবে। আজকেই জয়েন করো, যাও।

এই অবস্থায় ওখানে যোগ দিলাম। প্রথম কাজ ছিল বঙ্গবন্ধুর একটি বক্তৃতা লেখা। বক্তৃতা লেখার বিষয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, তুমি একা চলে আসবা। এসে কথাবার্তা বলবা। এই হচ্ছে সূত্রপাত। আমি ১৯৭৩ সালে যখন প্রথম সেখানে যাই, তখন নিতান্তই বহিরাগত ছিলাম। তারপর ক্রমে একেবারে কাছের লোক হিসেবে কাজ করতে পেরেছি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি বা রাষ্ট্রনায়ক নয়; এগুলোর চেয়ে ব্যক্তি মুজিব বড়। তিনি নিজেকে প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখতেন না। যারাই তাঁর সঙ্গে কাজ করত, সবাই তাঁর নিজের লোক। ওভাবেই তিনি দেখতেন।

গণভবনের লেকে মাছ ছাড়া আছে। আমাকে বললেন, ‘দেখো, এই মাছগুলো জানে, আমি কখন আসব। আসলে আমি খাবার দেব। তারপরে খেয়ে চলে যাবে।’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ স্যার, মাছেরা তো সব বুঝতে পারছে, আপনি আসছেন।’

বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘অ্যাই, আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছিস নাকি।’ আমি বললাম, ‘কোনো দিন হয় এ রকম!’ এই কথাগুলো শুধু তাঁকেই বলা যেত।

আরেকবার লাহোর ইসলামিক সামিট প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু বললেন, বাদশাহ ফয়সাল ও ইউএইর শেখ জায়েদ বলছেন, তুমি যত টাকা চাও, পাবে। ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধী বা পাকিস্তানি সেনাকে ছেড়ে দাও।

ফিরে এসে একটা ক্লিমেন্সি ফরমান জারি করলেন। জেলে ছিল যারা, তাদের ছেড়ে দেওয়া হলো। ক্লিমেন্সির প্রথম যে ড্রাফটা ছিল তাতে সবাই ছাড়া পেয়ে যেত। তখন আমলারা খুব খুশি। এমনকি অনেক আওয়ামী লীগ নেতাও খুশি। একজন বললেন, সবুর ভাইয়ের টেলিফোনটা রিস্টোর করা দরকার। অমুক জায়গায় তাঁর বাড়িটা দখল হয়ে আছে। বঙ্গবন্ধু বলেছেন, এগুলো করে দেওয়া যাবে। সেখানে গাফ্‌ফার চৌধুরী, এম আর আখতার মুকুল ও আমি ছিলাম। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘সবাই দেখো। সবার আজকে খুব আনন্দের দিন। কেবল তিনজনের মুখে কোনো হাসি নেই।’

আমি বললাম, স্যার, হাসিটা কী করে আসবে! আমাদের মা-বোনদের যারা রেপ করেছে, তাদেরও ছেড়ে দিতে হবে। যারা বাড়িঘর জ্বালিয়েছে, তারাও ছাড়া পাবে। যে খুন করেছে তাকেও ছাড়তে হবে।

সব শুনে বঙ্গবন্ধু আমলাদের বললেন, ‘তোমরা করো কী? আমাকে তো ডেনজারাস পথে নিয়ে যাচ্ছিলে।’ তখন ডেকে আবার সংশোধন করা হলো। এটা বলা সম্ভব হয়েছিল, তিনি শেখ মুজিব বলে, তিনি বঙ্গবন্ধু বলে; তিনি জাতির পিতা বলে।

বঙ্গবন্ধু আসলেই বাংলার সাধারণ মানুষের নাড়ির স্পন্দনটা বুঝতে পেরেছিলেন। মুসলিম লীগের শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে দুটো বিষয় কাজ করত। একটা হচ্ছে, সাধারণ মানুষের চিন্তাভাবনা এবং তাদের যে দুঃখ, কষ্ট, দুর্দশা; তা থেকে মুক্ত করার জন্য কর্মসূচি গ্রহণ। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, সাহসিকতা। অর্থাৎ সাহস করে মানুষকে আন্দোলনের পথে নিয়ে আসা। স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হলে যে সাহস ও দৃঢ় মনোবলের দরকার হয়, সেটা অর্জন করা। এই ক্ষেত্রে দেখা যায়, শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্রনেতা, যুবনেতা এবং তিনিই আওয়ামী লীগের একজন নেতা, যিনি প্রতিটি ক্ষেত্রে সেই সময়কার অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি অগ্রসর ছিলেন। মানুষের কাছেও তিনি দ্রুত পৌঁছে যেতে পারতেন। আওয়ামী লীগের নেতা শামসুল হক ১৯৪৯ সালে প্রথম উপনির্বাচনে জিতে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্রদের মিটিং চলছে, ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে কি না তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আমার নিজের পরিষ্কার মনে আছে, শামসুল হক সাহেব বারবার বলেছিলেন, আপনারা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করবেন না, তাহলে ওরা রক্তগঙ্গা বইয়ে দেবে। তিনি বারবার এটা বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ওই ছাত্রসভায় আমার যতদূর মনে পড়ে আবদুল মতিন- যিনি ভাষা মতিন নামে খ্যাত। তিনি প্রস্তাব দেন, চারজন করে বেরিয়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করুন। শামসুল হক সাহেবকে সেখানে রীতিমতো অপদস্থ হতে হয়। বঙ্গবন্ধু তখন হাসপাতালে কারারুদ্ধ ছিলেন। ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে সিদ্ধান্ত নেয় ১৪৪ ধারা ভঙ্গের। কিন্তু যে রাজনৈতিক নেতারা এই আন্দোলনের জন্য সর্বদলীয় ভাষাসংগ্রাম পরিষদ করেছিলেন, তাঁরা ওই রাতে আবার এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু জেলখানা থেকে বঙ্গবন্ধু হাসপাতালে থাকা অবস্থায় অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছেন। জনগণ যদি কোনো আন্দোলনে এগিয়ে যায়, তখন কোনো নেতা যদি সেখান থেকে পিছিয়ে পড়েন বা থেমে যান, তাহলে তিনি কিন্তু জনগণের আস্থা হারান এবং নেতৃত্বে থাকেন না। বঙ্গবন্ধু জীবনে কোনো দিন এই ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দেননি।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনের আগে নানা টানাপোড়েনে একপর্যায়ে যুক্তফ্রন্ট ভেঙে যাচ্ছিল। সেই টালমাটাল সময়ে শেখ মুজিবুর রহমান যুক্তফ্রন্টের পক্ষে সর্বাত্মক সমর্থন দিয়ে দাঁড়িয়ে যান। আবার ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের পর যখন মুসলিম লীগ বা পাকিস্তানের কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী আদমজীতে দাঙ্গা লাগায়, সেই দাঙ্গা প্রতিরোধের জন্য সবার আগে এগিয়ে এসেছিলেন একজন, তিনি বঙ্গবন্ধু। অর্থাৎ মানুষের সংগ্রাম ও আন্দোলনের পর্যায়গুলো এভাবে যদি আমরা দেখি, তাহলে দেখব শেখ মুজিবের একটি অগ্রণী ভূমিকা সব ক্ষেত্রেই পাওয়া যায়। অর্থাৎ এই অগ্রণী ভূমিকার জন্য শেখ মুজিব ক্রমান্বয়ে বঙ্গবন্ধুতে রূপান্তরিত হয়েছেন। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সংগ্রামী ছাত্র-জনতা তাঁকে শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গবন্ধুরূপে অভিষিক্ত করেছে।

জনগণের মন ও চাহিদা বুঝতে পারা এবং বুঝে উপযুক্ত কর্মসূচির মাধ্যমে এগিয়ে আসা- এটাই নেতৃত্বের বড় যোগ্যতা। এই ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু কোনো দিন ব্যর্থ হননি। আইয়ুব খান ক্ষমতা দখলের পর বহুবার চেষ্টা করেছে দুর্নীতির দায়ে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে মামলা করার, তাঁকে কারাগারে আটকে রাখার। কিন্তু প্রমাণ করতে না পেরে ছেড়ে দিতে হয়েছে। জেল থেকে বেরিয়ে এসেছেন তিনি। এসেই আবার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের বৈষম্য ব্যাপক, সর্বক্ষেত্রে পূর্বাঞ্চল বঞ্চিত। এবং এ অঞ্চলের মানুষের জন্য এটা একটা বড় বিষয়। ১৯৪৭-এ পাকিস্তান যখন প্রতিষ্ঠিত হয়, বাংলার গভর্নর তখন ব্রিটিশ সরকারকে জানিয়েছিলেন, এই যে দুই টুকরো পাকিস্তান হচ্ছে, এর পূর্ব অংশ কিন্তু ২০ বছরের বেশি এই পশ্চিম অংশের সঙ্গে থাকবে না। দেখা গেছে, এটা ২৫ বছরের মধ্যে স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে গেছে। এই যে পূর্বাঞ্চল বঞ্চিত এবং পশ্চিমের সঙ্গে থাকতে পারবে না, এই ধারণা বঙ্গবন্ধুর মধ্যে শুরু থেকেই ছিল।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়ই ছিলেন পাকিস্তানের জেলে। কিন্তু তাঁর আহ্বানে এবং সেই অর্থে তাঁর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। আমার মতে, মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় উপাদান ছিল বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ। এই এক ভাষণ বারবার প্রচারের মাধ্যমে লাখ লাখ সৈনিক যা করতে পারেনি, তা-ই করা গেছে। অতএব তিনি ছিলেন সেই অর্থে মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের সর্বাধিনায়ক।

বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ঢাকায় ফিরে আসার পর গণতান্ত্রিক দেশ গড়ায় তাঁর যে দায়বদ্ধতা, সেটা কিন্তু পরদিন ১১ জানুয়ারিই বোঝা গেছে। তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করে হলেন প্রধানমন্ত্রী, যা পাকিস্তানের ইতিহাসে কোনো দিন হয়নি। পাকিস্তানে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রথম দিনই গভর্নর জেনারেল হয়েছেন। এটা একটা বৈশিষ্ট্য। দ্বিতীয়ত, এরই সূত্র ধরে বঙ্গবন্ধু বলেছেন যে, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে আমি গণতান্ত্রিক নীতি অনুসরণ করব। এই গণতান্ত্রিক নীতিগুলো ক্ষেত্রে কী কী হতে পারে, সেগুলো বারবারই এসেছে। যেমন নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচন কীভাবে হয়েছে- যেভাবে আমাদের এই সমাজব্যবস্থায় সব নির্বাচন হয়। এবং নির্বাচনে ব্যতিক্রমও থাকে। তবে সাধারণভাবে দেখা যায়, নির্বাচনে নানা ফ্যাক্টর থাকে, এই ফ্যাক্টরগুলো নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করে। ব্যতিক্রম ’৫৪ সালের নির্বাচন ও ’৭০ সালে পাকিস্তানের নির্বাচন। কিন্তু অন্য সব নির্বাচনে কোনো না কোনো ফ্যাক্টর ছিল।

বঙ্গবন্ধু এসে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য আত্মনিয়োগ করলেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এটাও মনে রাখা দরকার, একটি দেশ মুক্তিযুদ্ধ করেছে, নয় মাস ধরে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুয়ায়ী, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে ইউরোপে যে ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছিল, তার চেয়েও ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছিল বাংলাদেশে। দেশের দুটো বন্দরই ছিল অচল। সব রেললাইন অকেজো। সব সেতু ভাঙা। এই অবস্থায় একটা দেশকে গড়ে তোলা দুরূহ কাজ। অবধারিতভাবে আর্থিক দৈন্য, খাদ্যাভাব ও সংকট- এগুলো দেখা দেয়। কখনো খাদ্যাভাবে দুর্ভিক্ষও হয়। চীন, রাশিয়ায় এমন হয়েছে। অন্য যেসব দেশে বিপ্লব হয়েছে, সব জায়গারই ছিল এক অবস্থা।

খুব স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশেও এমন হওয়ার কথা ছিল; এবং একেবারে যে হয়নি, তা-ও নয়। তবে ’৭২ বা ’৭৩-এ কিন্তু হয়নি। হয়েছে ’৭৪ সালে। কারণ যে বৃহৎশক্তি পাকিস্তানকে রক্ষা করার জন্য সর্বতোভাবে চেষ্টা করেছে, তারা তখন আর্থিক দিক থেকে বাংলাদেশ যেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে না পারে, খাদ্যসংকট যাতে দূর না হয়, তার জন্য ব্যবস্থা নিয়েছে। তারা আসা বন্ধ করে দিয়েছে খাদ্যের জাহাজ। হেনরি কিসিঞ্জার বঙ্গবন্ধুকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছিলেন, আমরা তো এক লাখ টন পাঠিয়েছি। আরেক লাখ টন খাদ্য পাঠাচ্ছি। কিন্তু সেই জাহাজ আর আসেনি। এ দেশে এভাবেই বিপর্যয় সৃষ্টি করার চেষ্টা হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে শাসক বঙ্গবন্ধুর জন্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শুধু এই আর্থিক দিকটাই বড় কথা নয়, দেখতে হবে শাসনতান্ত্রিক পরিকাঠামো কেমন ছিল, কী ছিল। পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল করাচির মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন যেভাবে চলত, তার চেয়ে একটু উন্নত। অর্থ মন্ত্রণালয় ছিল না, সেন্ট্রাল ব্যাংকের কোনো কিছুই ছিল না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলতে ছিল না কিছু। তার চেয়ে বড় জিনিস হচ্ছে, এ রকম একটি রাষ্ট্রবিপ্লব- যুদ্ধ বা সংঘাতের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে সাংঘাতিক সমস্যা দেখা দেয়। দুনিয়ার সব জায়গায় দেখা দিয়েছে, দেখা দিয়েছে বাংলাদেশেও। সে ক্ষেত্রে পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিডিআর- অর্থাৎ যে প্রশাসনিক যন্ত্রের মাধ্যমে এর মোকাবিলা করা হবে, সেটা ছিল না। সবাই নির্ভর করত একজন ব্যক্তির ওপর। আমি নিজেও কতগুলো ক্ষেত্রে দেখেছি, তখন দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর ছিলেন বঙ্গবন্ধু। একটা উদাহরণ দিই, তখন আমি বঙ্গবন্ধুর প্রেস সচিব হিসেবে যোগ দিয়েছি। একদিন গিয়ে শুনলাম, হঠাৎ ওয়াপদা ঘেরাও করা হয়েছে। কে করেছে? শ্রমিক লীগ। এখন ঘেরাও তুলে নেওয়ার জন্য যেতে হবে প্রধানমন্ত্রীকে। বঙ্গবন্ধু যখন ওখানে গেলেন, তখন ঘেরাও ওঠানো হলো।

এরপর একপর্যায়ে বিডিআরের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানে চলে গেল সেনাবাহিনী। কখনো-বা সেনাবাহিনী-বিমানবাহিনী মুখোমুখি অবস্থানে। সব ক্ষেত্রে তাকেই সশরীরে নিষ্পত্তি করতে হয়েছে। অর্থাৎ ব্যক্তি মুজিবের প্রভাব, বঙ্গবন্ধুর প্রভাব- একে সর্বোতভাবে কাজে লাগিয়ে সমস্যার সুরাহা করতে হয়েছে। ব্যক্তির অবদান এখানে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। চতুর্থ সংশোধনী নিয়ে অনেক কথা বলা হয়। বিশেষত, বাকশাল বিষয়ে। এটা একটা রাষ্ট্রব্যবস্থা। এ নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এ-ও মনে রাখা দরকার, আমাদের দেশের ওই অবস্থায় কী করা প্রয়োজন ছিল। এগুলো বঙ্গবন্ধুর চিন্তা-ভাবনায়ও ছিল। তবে এটা ঠিক, বাকশালকে স্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করেননি বঙ্গবন্ধু। তিনি সব সময় বলতেন, এটা অস্থায়ী এবং সময় এলে এটা ফিরিয়ে নেওয়া হবে। বাকশাল হওয়ার পরে যখন মন্ত্রিপরিষদ নতুন করে গঠন করা হয়, দেখা যায় প্রায় সব মুখই পুরোনো। নতুন তেমন কেউ নেই। অনেকেরই প্রশ্ন ছিল, এটা কী হলো? জবাবে একদিন বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘দেখ, সবাই তো বুদ্ধিমান। রাষ্ট্রচিন্তায় সব বড় বড় তাত্ত্বিক। কিন্তু আমরা পার্লামেন্টারি ব্যবস্থা করেছি। পার্লামেন্টারি ব্যবস্থার মতোই করেছি রাষ্ট্রপতির পদটাকে। সংসদ সার্বভৌম রয়ে গেছে। পার্লামেন্টের সদস্যরা ইচ্ছে করলে রাষ্ট্রপতিকে না করে দিতে পারে। আমি যদি আজকে এখানে পুরোনো সবাইকে বাদ দিয়ে নতুন নতুন লোক নিয়ে মন্ত্রী করি আর কালকে এরা আমার বিরুদ্ধে নো কনফিডেন্স মোশান নিয়ে আসতে পারে’? এটা সর্বজনবিদিত, পার্লামেন্ট তখনো সার্বভৌম। যদিও সেই রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী তখন প্রেসিডেন্ট।

আমার মনে আছে, ১৪ আগস্ট রাতে আমি বসে কাজ করছিলাম। বঙ্গবন্ধু পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন। বিশেষ কনভেনশনে বক্তব্য দেবেন। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ওই বক্তব্য এক্সটেম্পো দেবেন। কারণ বঙ্গবন্ধুর কতকগুলো স্পর্শকাতর বিষয় ছিল। যেমন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এক সময় বঙ্গবন্ধুকে বহিষ্কার করেছিল। সেই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নিয়ে তারা বঙ্গবন্ধুকে একটা ডক্টরেট ডিগ্রি দেবে। আমাকে বললেন, ‘আমাকে তোমার কোনো ড্যাটা দেওয়ার থাকলে কাগজে লিখে দেবে।’ তখন শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী। মোকাম্মেল সাহেব তখন ভারপ্রাপ্ত শিক্ষাসচিব। তাঁদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে একটা কার্ডে বাসায় বসে লিখছি। রাত তখন প্রায় ১২টা হবে। হঠাৎ লাল টেলিফোনে বঙ্গবন্ধু ফোন করলেন, ‘কাল সকালে তুমি তাড়াতাড়ি আমার বাসায় চলে আসবা। আর কার্ড নিয়ে আসবা। মোটা মোটা অক্ষরে। আমি এক্সটেম্পো বক্তৃতা করব’। আমি বললাম, আমি ওই কাজই করছি। তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে। কাল সকালে তাড়াতাড়ি আসো।’ এই ছিল তাঁর সঙ্গে আমার শেষ কথা।

পরদিন ভোর হয়েছে। সবাই যেমন শুনেছে। আমিও গোলার আওয়াজ শুনেছি। মর্টারের আওয়াজ শুনেছি। তারপর রেডিও অন করলাম। ততক্ষণে সব জায়গায় কান্নার রোল পড়ে গেছে।


যাকে ভয় পেতাম, শ্রদ্ধাও করতাম

যাকে ভয় পেতাম, শ্রদ্ধাও করতাম
তোয়াব খান। ছবি: দৈনিক বাংলা
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত

শরিফুজ্জামান পিন্টু

ঠিক এক বছর আগের কথা, অক্টোবরের শুরুর দিকে এক দিন পত্রিকার প্রকাশক চৌধুরী নাফিজ সরাফাত ফোন দিয়ে বললেন, বিকেলে ইউনাইটেড হাসপাতালে যাবেন। আমাকে সঙ্গে যেতে হবে। কারণটি তিনি আগে বলেননি। তবে আন্দাজ করছিলাম, উনি হাসপাতালে তোয়াব ভাইকে দেখতে যাবেন।

হাসপাতালে তোয়াব ভাইয়ের কেবিনে গিয়ে কিছুটা বিস্মিত। উনি দৈনিক বাংলার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার জন্য তোয়াব ভাইকে অফার লেটার দিতে চান। সেখানে আমাদের আরেক সুহৃদ সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন।

তোয়াব ভাইকে সম্পাদক হিসেবে পাওয়ার ইচ্ছা আমাদের শুরু থেকেই ছিল। ওনার বাসায় কয়েকবার গিয়েছি, কথা বলেছি। কিন্তু উনি রাজি হচ্ছিলেন না। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থেকে তিনি অফার লেটার হাতে নিলেন। সেটি নেড়েচেড়ে দেখলেন। এরপর বললেন, ওই চিঠিতে তিনটি বিষয় যুক্ত করতে হবে। তা হলো- মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং স্বাধীন সাংবাদিকতা। এই তিনটি বিষয় লিখে দিলে তিনি ভেবে দেখবেন।

চৌধুরী নাফিজ সরাফাত উনাকে আশ্বস্ত করে বললেন, দৈনিক বাংলার পথচলার পাথেয় এই তিনটি বিষয়। যেহেতু অফার লেটার, সেহেতু এসব বিষয় উল্লেখ করা হয়নি। তিনি চাইলে এগুলো উল্লেখ করেই বোর্ডের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক নিয়োগপত্র দেবেন। পরে এই তিনটি বিষয় লিখে উনাকে দেয়া হয়েছিল।

তোয়াব ভাই সুস্থ হলেন। সম্ভবত ৬ অক্টোবর উনি বাড্ডায় আর এল স্কয়ারে নিউজবাংলার আগের কার্যালয়ে গেলেন। সবার সঙ্গে পরিচিত হলেন। দৈনিক বাংলার কার্যালয় তখনো প্রস্তুত হয়নি। কার্যালয় কেন দ্রুত প্রস্তুত হচ্ছে না, এ নিয়ে উনি কিছুটা বিরক্ত ছিলেন। কারণ, উনি প্রতিদিন আসতে চান, মিটিং করতে চান। করোনার সময় উনাকে বুঝিয়ে মিটিং করা থেকে বিরত রাখি। কিছুদিন অনলাইনে মিটিং করি। কিন্তু করোনা শেষে আবার উনার অফিসে আসার আগ্রহ চাপে। ভবনের কাজ মোটামুটি শেষ হলো। কিন্তু লিফটের কাজ চলমান।

তোয়াব ভাইয়ের মধ্যে অফিসে বসে কাজ করার আগ্রহটা যে কতটা সেটা তার এক দিনের কাণ্ডে বুঝেছিলাম। কাউকে কিছু না জানিয়ে তিনি তেজগাঁওয়ে দৈনিক বাংলার নির্মাণাধীন ভবনে এসে পড়েন। এসে দেখলেন, কাজের অগ্রগতি কেমন। আমাদের সহকর্মীদের কাছে জানতে চাইলেন, কাজ শেষ হতে কত দিন লাগবে, ইত্যাদি। তারপর চলে গেলেন।   

ফোন করলে তোয়াব ভাই প্রায়ই বলতেন, ‘তোমার লিফট কবে লাগবে? আমি পটল তুললে?’ উনার কাছে বাস্তবতা তুলে ধরতাম। ধুলাবালির মধ্যে উনার আসা যে ঠিক হবে না, সেটি বুঝাতাম। এসব শোনার পর তিনি ছোট্ট করে বলতেন, ‘দেখো কত দ্রুত লিফট লাগানো যায়’।

গত কয়েক মাসে তোয়াব ভাই প্রায়ই মৃত্যুর প্রসঙ্গ তুলতেন। উনার মুখে মারা যাওয়ার কথা শুনে বিষয়টি হেসে উড়িয়ে দিতাম, বলতাম আপনি একশ বছর বাঁচবেন। এ কথা বলার পর আবার বাস্তব জগতে ফিরে যেতাম, বুঝতে পারছিলাম যে উনার ভেতরটা ক্ষয়ে যাচ্ছে। গত কয়েক মাসে তোয়াব ভাই মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। তাঁর মধ্যে মৃত্যুচিন্তা ঢুকেছে। উনার বাবাও এমন বয়সে মারা গেছেন, বিষয়টি তিনি বাচ্চু ভাইয়ের (তোয়াব ভাইয়ের ছোট ভাই) সঙ্গে আলোচনা করেছেন। 

আসলে তোয়াব ভাইয়ের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এ দেশে সাংবাদিকতা জগতের সবচেয়ে শ্রদ্ধার মানুষটির বিদায় হলো। এমন বর্ণাঢ্য জীবন সত্যিই ঈর্ষণীয়। তিনি হয়ে ওঠেন এ দেশে সাংবাদিকতার শিক্ষক ও বাতিঘর। সততা, নিষ্ঠা ও কঠোর পরিশ্রম করে সাংবাদিকতা পেশায় শ্রদ্ধা অর্জন করা এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন।   

তোয়াব ভাইয়ের ভরাট ও টনটনে গলার সঙ্গে আজীবনের সম্পর্ক। সেই মানুষটি কথা বলতে কষ্ট পান, কাশি চেপে রাখার চেষ্টা করেন-এটা অসহনীয় মনে হতো। শ্রদ্ধেয় এই মানুষটির সঙ্গে অদ্ভুত সম্পর্ক ছিল। আমি উনাকে ভয় পেতাম, আবার প্রচণ্ড শ্রদ্ধাও করতাম। শ্রদ্ধাটা এমন যে, প্রথম একটি বই লিখে সেটি উৎসর্গ করেছিলাম উনাকে।

আসলে উনার কারণেই আমার সাংবাদিকতা পেশায় টিকে থাকা। ১৯৯৩ সালের মার্চে জনকণ্ঠ প্রকাশের কয়েক মাস পর তোয়াব ভাই আনুষ্ঠানিকভাবে উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। সেখানে প্রায় সাত মাস বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার হিসেবে কাজ করার পর এক দিন প্রধান প্রতিবেদক জানালেন, আমাকে আর অফিসে যেতে হবে না। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার হিসেবে আরেকজনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। অথচ খণ্ডকালীন এই কাজের আশায় আমি বিনা টাকায় সাত মাস কাজ করছি। প্রয়াত কবি সৈয়দ হায়দারের সঙ্গে শেয়ার করি এই ঘটনাটা। সৈয়দ হায়দার বিষয়টি নিয়ে কথা বললেন জনকণ্ঠের সাহিত্য সম্পাদক ও তাঁর বন্ধু নাসির আহমেদের সঙ্গে। নাসির ভাই কথা বললেন তোয়াব ভাইয়ের সঙ্গে। আমার ওপর অন্যায়ের বিষয়টি নাসির ভাই তুলে ধরেন তোয়াব ভাইয়ের কাছে। পরদিন আমাকে ডাকলেন তোয়াব ভাই।

চোখের সামনে সেই দৃশ্য আজও ভেসে ওঠে। একজন নায়ক বসে আছেন। ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি, পাজামা পরা। ভরাট গলায় জানতে চাইলেন, আমার সমস্যার কথা। উনার সামনে আমি শুধু বলতে পারলাম, ‘আমাকে যদি নাইবা নেবেন, তাহলে সাত মাস বিনা বেতনে উনারা কাজ করালেন কেন?’ উনি খোঁজ নিয়ে জানলেন, বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার হিসেবে আরেকজন কাজ শুরু করেছেন। সবকিছু জেনে ও বুঝে তোয়াব ভাই সিদ্ধান্ত দিলেন, জনকণ্ঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুজন বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার থাকবে। তবে নতুন পত্রিকা হিসেবে আপাতত একজনের বেতন দুজনকে ভাগ করে দেয়া হবে। আমরা দুজনই উনার সিদ্ধান্ত খুশিমনে মেনে নিই, আরেকজন হলেন জাতীয় প্রেসক্লাবের এখনকার সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান। 

১৯৯৬ সালে লেখাপড়া শেষ করার পর এক দিন তোয়াব ভাইয়ের কাছে গিয়ে বললাম, ‘মাস দুয়েকের মধ্যে চাকরি ছেড়ে দেব। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার খুঁজে দেব কি না।’ উনি বললেন, ‘তা খুঁজে দেও। কিন্তু তুমি থাকো।’ জানতে চাইলেন, ‘এখন বিসিএস পাস করলে বেতন কত?’ তখন সম্ভবত সাড়ে ১২ হাজার টাকা ছিল। খণ্ডকালীন হিসেবে আমি তখন বেতন পাই পাঁচ হাজার পঞ্চাশ টাকা। বললেন, মাস্টার্সের রেজাল্ট বের হলে আমার বেতন হবে ১৪ হাজার টাকা। উনার উৎসাহে সেই যে সাংবাদিকতা পেশায় থেকে গেলাম আর কোথাও চাকরির আবেদন করতে পারিনি। জনকণ্ঠের বেতন-ভাতা অনিয়মিত হলে একযুগ পর ২০০৫ সালে প্রথম আলোতে যোগ দিই। এরপর দেড় দশক উনার কাছ থেকে শারীরিকভাবে দূরে থাকলেও মানসিক নৈকট্য ছিল সব সময়। ২০২০ সালে প্রথম আলো ছেড়ে আবার আসলাম তোয়াব ভাইয়ের কাছে। কিন্তু এই যাত্রায় এক বছরের মধ্যে উনাকে হারালাম। তিনি আমার জীবনের প্রথম সম্পাদক, শেষ সম্পাদক কি না বলতে পারব না। তবে এই পেশায় এত শ্রদ্ধার মানুষ আর নেই, আরও হবে কি না তাও জানি না। 

৪ সেপ্টেম্বর দৈনিক বাংলার উদ্বোধনী সংখ্যায় সম্পাদক হিসেবে উনার লেখা ছাপার সিদ্ধান্ত নিই আমরা। বেশ কয়েক দিন প্রস্তুতি নিয়ে উনি লিখলেন। কিন্তু সেই লেখার শিরোনাম দিতে চাইলেন একটি কবিতার লাইন। তোয়াব খান শিরোনাম করবেন, আর সেই বিষয়ে কথা বলার স্পর্ধা আমার থাকার কথা না। কিন্তু পত্রিকার উদ্বোধনী সংখ্যা বলে কথা। আমি বাসায় গিয়ে উনাকে খুবই বিনয়ের সঙ্গে বললাম, এই শিরোনামে আপনি আরেকটি লেখা লেখেন। কিন্তু উদ্বোধনী সংখ্যার লেখার প্রতিটি শব্দ ঠিক থাকলেও কেবল শিরোনামটি পরিবর্তন করে দেন। কারণ সম্পাদক হিসেবে আপনাকেই বলতে হবে কেন দৈনিক বাংলা ফিরে এসেছে, কীভাবে পথ চলবে দৈনিক বাংলা।

কিন্তু আমার সব চেষ্টা ব্যর্থ হলো। শিরোনাম বদলাতে তোয়াব ভাই রাজি হলেন না। উনার পিএস গিরীশ গৈরিককে দায়িত্ব দিই তোয়াব ভাইকে বোঝানোর জন্য। গিরীশ এসে বললেন, উনি শিরোনাম বদলাতে রাজি নন। এরপর বাচ্চু ভাইকে অনুরোধ করি তিনি যেন তাঁর ভাইয়ের কাছ থেকে শিরোনাম বদলের অনুমতি নিয়ে দেন। বাচ্চু ভাইও ব্যর্থ হলেন।

পত্রিকার উদ্বোধনী সংখ্যা প্রকাশের দিন এগিয়ে আসতে থাকে। ৩ সেপ্টেম্বর পত্রিকার প্রকাশক চৌধুরী নাফিজ সরাফাতকে জানাই বিষয়টি। উনি তোয়াব ভাইকে এ বিষয়ে কিছু বলতে রাজি নন। বললেন, এটা আপনাদের গুরু-শিষ্যের ব্যাপার। অফিসের সবাই শিরোনামের বিষয়টি নিয়ে ফিসফাস করেন। কিন্তু উনাকে কিছু বলার সাহস কারও নেই।

৩ সেপ্টেম্বর সকালে পত্রিকার উদ্বোধনী সংখ্যা প্রেসে পাঠানোর আগে সাহস করে ফোন দিই তোয়াব ভাইকে। প্রেসে পাঠানোর আগে দোয়া চাইলাম উনার কাছে। বললাম, অনেক চাপের মধ্যে আছি তোয়াব ভাই। আপনার অনুমতি ছাড়া শিরোনাম বদলাতে পারব না। উনি বললেন, ‘শিরোনাম কী করতে চাও?’ বললাম, সহজ কথায়- ‘আবার এসেছি ফিরে’। উনি পুরোপুরি একমত নন। এর মধ্যে উনার কাশি হচ্ছিল। আমি ফোন রাখলাম।  আবার ফোন করি বাচ্চু ভাইকে। বাচ্চু ভাই এবার বললেন, ‘উনি কিছুটা নরম হয়েছেন। শিরোনাম বদল করতে পারি’।

৩ সেপ্টেম্বর প্রেসে খটখট করে বিকট শব্দে ছাপা হচ্ছে দৈনিক বাংলার উদ্বোধনী সংখ্যা, তখন বুকটা যেন দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল। সাংবাদিকতায় শিক্ষাগুরু হিসেবে যাকে মেনে এসেছি, তার নির্দেশ মানতে পারিনি। পরদিন উনার কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইলাম। উনি মুচকি হাসলেন, ক্ষমা করে দিলেন মনে হয়।   

হাসপাতালের হিমঘরে তোয়াব ভাইয়ের মরদেহ রেখে তেজগাঁওয়ে দৈনিক বাংলার কার্যালয়ে এলাম। আমাদের প্রত্যাশা ছিল, এই ভবনে আর কদিন পরই তিনি আসবেন। লিফটের দিকে তাকালাম, কাজ চলছে। কিন্তু যে মানুষটির জন্য তাড়াতাড়ি লিফট লাগানো হচ্ছে, তিনি আর এতে উঠবেন না।


দিশেহারা হয়ে গেলাম

দিশেহারা হয়ে গেলাম
একুশে পদকপ্রাপ্ত বর্ষীয়ান সাংবাদিক তোয়াব খান।
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত

মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন

আমার অতিশয় শ্রদ্ধাভাজন তোয়াব খান এই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে বহু দূরে চলে গেলেন। এই দেশের জন্য, সাংবাদিকতা পেশার জন্য, মুক্তবুদ্ধি ও সংস্কৃতির জন্য এবং প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক পরিমণ্ডলে এই অসাধারণ মানুষটির অভাব খুব সহজে পূরণ হওয়ার নয়। ব্যক্তিগতভাবে আমাকে একজন বড় ভাই, পরম সুহৃদ ও বন্ধু হারানোর শূন্যতা নিয়ে বাকি জীবন কাটাতে হবে।

তোয়াব খান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি এই উভয় শাসন আমলেই শক্তিমান প্রেস সচিব হিসেবে কাজ করেছেন। জাতির পিতার ৩ বছর ৭ মাস শাসনকালে তোয়াব খানই সবচেয়ে দীর্ঘ সময় সফলভাবে এই গুরুদায়িত্বটি পালন করেন। বঙ্গবন্ধুর জোট নিরপেক্ষ নীতি, বাংলাদেশি ধাচের সমাজতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা এবং জাতীয়তাবাদের পরিমণ্ডলে তোয়াব খান শুধু প্রেস সচিব নন, একজন বিজ্ঞ উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেছেন। সাংবাদিকতা পেশার শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা যথা আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, এনায়েতুল্লাহ্‌ খান, গোলাম রসুল মল্লিক, শহীদুল হক, রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ ভিন্ন ভিন্ন পথ ও মতের অনুসারী হলেও জাতির পিতার সরকারের কর্মকাণ্ড বুঝতেন এবং এর যথার্থতাও উপলব্ধি করতেন। এ ক্ষেত্রে প্রেস সচিব তোয়াব খানের অবদান অনস্বীকার্য।

কোনো একটি বড় ঘটনা সংঘটিত হলে তাকে ধামাচাপা না দিয়ে জনসম্মুখে আনা অথবা সঙ্গে সঙ্গে এর প্রতিবিধান করা তোয়াব ভাইয়ের পেশাদারত্বের একটা বড় বিশেষত্ব ছিল। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টে সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক হত্যাকাণ্ডের আগের দিন নানা গুজবের ডালপালার মাঝে নোয়াখালীতে একটি ভারতীয় হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়। এতে অন্তত একজন নিহত হন। রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব তোয়াব খান এই ঘটনাটিকে ধামাচাপা দেয়ার সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেন।

একটি বিদেশ সফরকালে মিডিয়া টিমের একজন সদস্য চরম অসদাচরণ করে ফেললে ওই সমাজতান্ত্রিক দেশের কর্তৃপক্ষীয় মহল কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার আগেই তোয়াব ভাইয়ের নেতৃত্বে আমরা মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে তাকে বরখাস্ত করে দেশে পাঠিয়ে দিয়েছি।

দীর্ঘ পেশাজীবনে তোয়াব খানের রয়েছে অনেক বড় বড় অর্জন। তার একটি অসমাপ্ত কাজ: আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী, তোয়াব খান, মাহবুব তালুকদার, শামসুজ্জামান খান প্রমুখের যৌথ প্রচেষ্টায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনকথার যে খসড়াটি আমার জানামতে প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল, এটিকে আর কোনোভাবেই উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

আমি আমার পরম শ্রদ্ধাভাজন তোয়াব ভাইকে অন্তরের গভীরতম স্থান থেকে অসীম শ্রদ্ধা জানাই এবং এই অসাধারণ দেশপ্রেমিকের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।

(তোয়াব খান যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেস সচিব ছিলেন তখন ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব ছিলেন)

লেখক: অর্থনীতিবিদ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর


বিদায়: কালের অভিযাত্রী তোয়াব খান

বিদায়: কালের অভিযাত্রী তোয়াব খান
সাংবাদিক তোয়াব খান
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত

দুলাল আচার্য

চলে গেলেন সাংবাদিকতার বটবৃক্ষ তোয়াব খান। গতকাল রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। কিংবদন্তি সাংবাদিক তোয়াব খান বাংলাদেশের সংবাদপত্র জগতে দ্যুতি ছড়ানো গুণীজন ছিলেন।

১৯৫৩ সালে সাপ্তাহিক জনতার মাধ্যমে তিনি সাংবাদিকতা শুরু করেন। ১৯৫৫ সালে যোগ দেন দৈনিক সংবাদে। ১৯৬১ সালে তিনি দৈনিক সংবাদের বার্তা সম্পাদক হন। এরপর ১৯৬৪ সালে যোগ দেন দৈনিক পাকিস্তানে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে যোগ দেন। তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে শব্দসৈনিকের ভূমিকা পালন করেন। সে সময় তার আকর্ষণীয় উপস্থাপনায় নিয়মিত প্রচারিত হয় ‘পিন্ডির প্রলাপ’ নামক অনুষ্ঠান। দেশ স্বাধীনের পর দৈনিক পাকিস্তান থেকে বদলে যাওয়া দৈনিক বাংলার প্রথম সম্পাদক ছিলেন তোয়াব খান। ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি তিনি দৈনিক বাংলার সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেস সচিব ছিলেন। পরে তিনি প্রধান তথ্য কর্মকর্তা এবং প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)-এর মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। দৈনিক জনকণ্ঠ প্রকাশের দিন থেকেই প্রায় তিন দশক পত্রিকাটির উপদেষ্টা সম্পাদক ছিলেন। জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত তিনি দৈনিক বাংলার সম্পাদক ছিলেন। তবে মানুষের কাছে তার পরিচয় জনকণ্ঠের তোয়াব খান হিসেবেই। ২০১৬ সালে সাংবাদিকতায় অনন্য অবদানের জন্য ‘একুশে পদক’ পান এই গুণী সাংবাদিক।

ত্রিকালদর্শী এক স্বপ্নিল মানুষ ছিলেন তোয়াব খান। ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ ও একজন অসাম্প্রদায়িক বাঙালি। অনিয়ম, দুর্নীতি, মৌলবাদ, জঙ্গিতন্ত্রসহ দেশ ও জাতির স্বার্থবিরোধী তৎপরতার বিরুদ্ধে তার সাংবাদিকতা ছিল আপসহীন ও তেজদীপ্ত। সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয়, রিপোর্টিং, ফিচারসহ অন্যান্য পাতায় নিঃসঙ্কোচে লেখা প্রকাশে দিকনির্দেশনা ও উৎসাহ দিতেন। কখনো সক্রিয় রাজনীতি করেননি। তবে রাজনীতির কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যাপক আগ্রহী ছিলেন। তার নীতি ও নৈতিকতা ছিল প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার। সাংবাদিকতার ইতিহাস, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবাবের সঙ্গে স্মৃতিময় ঘটনা, স্বাধীনতা-পূর্ব এবং পরবর্তী রাজনীতির নানা স্মৃতিময় ঘটনা তার কাছ থেকে শুনেছি। তিনি ছিলেন গুণীজন, সাংবাদিকতায় তার অবদান জীবিত অবস্থায়ই তিনি প্রমাণ দিয়ে গেছেন।

তোয়াব খানের সাংবাদিকতা ও জীবনসংগ্রাম আমার সাংবাদিকতা জীবনে অনুপ্রেরণার উৎস। তিনি বলতেন সাংবাদিকতার দায়বদ্ধতা সব সময় পাঠকের কাছে। কোনো সম্প্রদায়, রাজনৈতিক দল বা সরকারের কাছে নয়। সাংবাদিকদের পরীক্ষা দিতে হয় প্রতিদিন। তাই সংবাদ পরিবেশনে অতিমাত্রায় সচেতন হওয়া জরুরি। বলতেন পাঠক যেমন কাগজের মূল প্রাণ তেমনি বিশ্লেষক ও বিচারক। আমার সাংবাদিকতার পরিপূর্ণতা তার কাছে। ২০০৯ সালে জনকণ্ঠের সম্পাদকীয় বিভাগে যোগ দিয়ে প্রথম দিকেই তার নজর কেড়েছিলাম একটি ধারাবাহিক লেখা সম্পাদনা করতে গিয়ে। লেখাটির সম্পাদনা দেখে তোয়াব ভাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, বেশ ভালো করেছ। সব লেখাই এভাবে দেখে ছাড়বে। সেই থেকে বিশ্বাস আর কাজের প্রতি আন্তরিকতায় বিশ্বস্ত হই। প্রায়ই সম্পাদকীয় ও চতুরঙ্গ পাতা দেখাতে গেলে বলতেন লেখাগুলো তুমি পড়েছ তো। বড় লেখা কীভাবে সীমিত শব্দের মধ্যে আনতে হয়, অপ্রয়োজনীয় ও একাধিক বার ব্যবহৃত শব্দ বর্জন করে বিকল্প শব্দের ব্যবহারের নির্দেশ দিতেন। বাক্যের যোগ্যতা হারায় এমন কোনো শব্দ ব্যবহার না করার কথা বলতেন। অনেক ক্ষেত্রে শব্দ ধরে দেখিয়ে দিতেন। যে দিন আমার সম্পাদকীয় লেখার পালা ছিল সে দিন সম্পাদকীয়টিতে কোনো অসঙ্গতি থাকলে মার্ক করে পরিবর্তন এবং পরিমার্জনের কথা বলতেন। আসলে জনকণ্ঠের সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করতে গিয়ে নতুনভাবে আমার সাংবাদিকতার হাতেখড়ি ছিল তোয়াব খানের কাছে।

২০১৯ সালে আমি জনকণ্ঠ ছেড়ে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)তে যোগ দেই। তোয়াব খান চাননি আমি জনকণ্ঠ ছেড়ে আসি। তিনি আমার অব্যাহতিপত্র ১৫ দিন ধরে রেখেছিলেন। বললেন, তোমার ব্যাপারে আমি মালিকের সঙ্গে কথা বলব। তুমি চলে যাও আমি চাই না। সর্বশেষ তিনি জনকণ্ঠে আমাকে পার্টটাইমও রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু চাকরির শর্তের কারণে তা সম্ভব হয়নি। পিআইবিতে যোগদানের পরও তোয়াব ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রায়ই কথা হতো। পিআইবির সাময়িকী নিরীক্ষায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ (আমার তীর্থযাত্রা) ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক তার দুটি লেখা আমরা প্রকাশ করেছিলাম। সর্বশেষ সিনিয়র সাংবাদিক আলী হাবীব ভাইকে দিয়ে তার একটি সাক্ষাৎকার করিয়ে নিরীক্ষায় প্রকাশ করেছিলাম। তোয়াব ভাইকে নিয়ে আমার ব্যক্তিগত বহু স্মৃতি আজ অমলিন।

আমার মতো বহু সাংবাদিকের কাছে তোয়াব খান একটি অহঙ্কারের নাম। কারণ সাংবাদিকতায় তিনি সাধারণ থেকে অসাধারণ। সাংবাদিকতার প্রতিটি স্তরে তিনি প্রতিভার উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে পরিণত হয়েছিলেন মহীরুহে। তাই একজন শারীরিক তোয়াব খানের চলে যাওয়া মানে সবশেষ নয়। সাংবাদিকতায় তার বর্ণাঢ্য জীবনই তাকে বাঁচিয়ে রাখবে অনন্তকাল। তোয়াব খান হারিয়ে যাওয়ার নয়, কারণ তার ব্যাপ্তি গণমাধ্যমব্যাপী, তিনি যে সাংবাদিকতায় কালের অভিযাত্রী।

লেখক: সহকারী সম্পাদক, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)