শনিবার, ১০ ডিসেম্বর ২০২২

নারী খেলোয়াড়দের লাগেজ কাটা গেল কোথায়

ছবি: সংগৃহীত
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত
দৈনিক বাংলা ডেস্ক

আমীন আল রশীদ

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, যেটি দেশের প্রধান বিমানবন্দর। এখানকার বেল্টে যাত্রীদের লাগেজ গায়েব কিংবা লাগেজ কেটে অর্থ ও মূল্যবান জিনিসপত্র চুরির ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু এবারের বিষয়টি বেশ আলোচনায় এসেছে। কেননা, যে তিনজনের লাগেজ কেটে অর্থ তছরুপের ঘটনা আলোচিত হচ্ছে, তারা সাফ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য।

গণমাধ্যমের খবর বলছে, বিমানবন্দরে সাফজয়ী বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের তিন সদস্য- কৃষ্ণা রানী সরকার, সানজিদা আক্তার ও শামসুন্নাহারের লাগেজ ভেঙে ডলার ও টাকা চুরি হয়েছে। তিনজনের প্রায় দুই লাখ টাকার মতো খোয়া গেছে। এ ছাড়া দলের অন্যান্য সদস্যের লাগেজও পাওয়া গেছে ভাঙা অবস্থায়। সারা দিনের সংবর্ধনা ও ক্লান্তি শেষে ফুটবলাররা যখন লাগেজ হাতে পান, তখন বিষয়টি নজরে আসে তাদের (সময় টিভি, ২২ সেপ্টেম্বর)।

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) বলছে, যদি চুরি যাওয়া অর্থ ফেরত পাওয়া না যায় তাহলে তারা ক্ষতিপূরণ দেবে। প্রশ্ন হলো, বিমানবন্দর থেকে অর্থ চুরির ক্ষতিপূরণ বাফুফে কেন দেবে? ক্ষতিপূরণ তো দেয়ার কথা বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের। তা ছাড়া এর আগে যাদের লাগেজ কেটে এ রকম অর্থ ও মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি করা হয়েছে, তাদের ক্ষতিপূরণ কে দেবে? বাফুফে নিশ্চয়ই তাদের দায়িত্ব নেবে না। বাফুফে এই ঘোষণা দিয়ে মূলত এক ধরনের বাহবা নিচ্ছে। কারণ, এই মুহূর্তে নারী ফুটবলাররা সারা দেশে প্রশংসায় ভাসছেন। এখন তাদের জন্য যা কিছুই করার ঘোষণা দেয়া হোক না কেন, সেটিই সংবাদ শিরোনাম হবে।

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, ফুটবলারদের লাগেজ অক্ষত অবস্থায় বুঝে নিয়েছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। টাকা চুরির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত করে বৃহস্পতিবার (২২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে এই বিবৃতি দেয় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। প্রশ্ন হলো, বাফুফে যে ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা বলছে, তার মধ্য দিয়ে তারা কি এটা মেনে নিল যে লাগেজ কাটার ঘটনাটি বিমানবন্দরে ঘটেনি, বরং লাগেজ গ্রহণের পরই ঘটেছে? যদি তা-ই হয় তাহলে ক্ষতিপূরণ দেয়ার পাশাপাশি বাফুফেরও উচিত হবে, কে বা কারা খেলোয়াড়দের লাগেজ কেটে ডলার ও অন্যান্য জিনিস চুরি করল, সেটি খুঁজে বের করা। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ যেমন সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করার কথা বলছে, তেমনি বাফুফেরও উচিত হবে, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অপরাধী চিহ্নিত করা। তবে ঘটনাস্থলে আদৌ সিসি ক্যামেরা ছিল কি না বা ঘটনার সময় সেটি সচল ছিল কি না—সেটিও বড় প্রশ্ন। আবার যদি লাগেজগুলো বিমানবন্দর থেকে বাফুফে ভবনে আসার পথে কাটা হয়, তাহলে সেখানে সিসি ক্যামেরা থাকার সুযোগ নেই। অর্থাৎ পথিমধ্যে ঘটনা ঘটলে অপরাধী চিহ্নিত করা কঠিন। সেক্ষেত্রে লাগেজ বহন ও পাহারার দায়িত্বে থাকা সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে।

সুতরাং লাগেজ কাটার ঘটনাটি বিমানবন্দরের বেল্টে, বাফুফে ভবনে না কি বিমানবন্দর থেকে বাফুফে আসার পথে কাটা হয়েছে, সেটি গভীর অনুসন্ধানের দাবি রাখে। ঘটনাটি অনেক বড় না হলেও কিংবা চুরি যাওয়া অর্থের পরিমাণ টাকার অঙ্কে খুব বেশি না হলেও এটি দেশের ভাবমূর্তি এবং দেশের জন্য সম্মান বয়ে এনেছেন যে নারী খেলোয়াড়রা, তাদের সম্মানের প্রশ্ন। অতএব, এর সঠিক অনুসন্ধান হতে হবে। তবে যদি এটি প্রমাণিতও হয় যে, বিমানবন্দরে লাগেজ কাটা হয়নি, তারপরও প্রসঙ্গটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, দেশের প্রধান এই বিমানবন্দর থেকে যাত্রীদের লাগেজ হাওয়া হয়ে যাওয়া কিংবা লাগেজ কেটে অর্থ ও মূল্যবান জিনিসপত্র চুরির ঘটনা নিয়মিত। কিন্তু সব ঘটনা নিয়ে সংবাদ হয় না বা সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড় হয় না। বিষয়টি তখনই আলোচনায় আসে, যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ঘটনার শিকার হন। বলা হয়, বিমানবন্দর হচ্ছে কোনো রাষ্ট্রের প্রথম দর্শনধারী। অর্থাৎ একজন বিদেশি নাগরিক কোনো একটি দেশের বিমানবন্দরে পা রেখেই বুঝতে পারেন সেই দেশের বিমাবন্দরের কর্মীরা কতটা আন্তরিক; সেই দেশটি কতটা নিয়ম-কানুনের মধ্যে চলছে; সেই দেশের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা কতটা আধুনিক ও মানবিক; সেই দেশের মানুষ কতটা নিয়মানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলা মেনে চলে ইত্যাদি। সেইসব মানদণ্ডে বাংলাদেশের প্রধান বিমানবন্দরটি যে খুব প্রশংসা করার মতো জায়গায় নেই, তা এই বিমানবন্দরের সঙ্গে যুক্ত মানুষ এবং সরকারের নীতিনির্ধারকরাও নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন।

বিশ্বের সেরা বিমানবন্দরগুলোর তালিকা প্রকাশ করে আসছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্কাইট্র্যাক্স। তাদের সবশেষ (২০২১) জরিপে বিশ্বসেরা বিমানবন্দরের তালিকায় ভারতের চারটি, এমনকি ভুটানের বিমানবন্দরের নাম থাকলেও সেখানে জায়গা হয়নি বাংলাদেশের। এমনকি এশিয়া ও দক্ষিণ-মধ্য এশিয়ার সেরা ১০ বিমানবন্দরের মধ্যেও নাম নেই বাংলাদেশের (জাগো নিউজ, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২১)। বলা হয়, মাথা ঠিক থাকলে পা ঠিক থাকে। সুতরাং বিমানবন্দর ঠিক করতে হলে আগে বিমানমন্ত্রীকে বিশ্বাস করতে হবে যে, তিনি যেমন বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনা দেখে পুলকিত হন, তার নিজের দেশের বিমানবন্দরটিও সে রকম হবে। এই বিশ্বাস ছড়িয়ে দিতে হবে তার অধস্তনদের মধ্যে।

এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যাতে কাউকে চুরি করতে না হয় এবং সেইসঙ্গে এমন শাস্তির বিধানও রাখা দরকার যাতে সে চুরির কথা কল্পনাও করতে না পারে। অর্থাৎ অপরাধ করলেই তাকে ধরা পড়তে হবে এবং ধরা পড়লেই কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হবে, এই ভয় যতক্ষণ পর্যন্ত না বিমানবন্দরসহ সব প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মনে ঢুকিয়ে দেয়া যাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত অপরাধ বন্ধ হবে না। যেকোনো অপরাধ ঘটার সঙ্গে সঙ্গে অপরাধীদের চিহ্নিত করে তাদের চাকরিচ্যুত করা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে সোপর্দ করা না গেলে বিমানবন্দরকে যাত্রীবান্ধব করা যাবে না। পরিশেষে, যে বিমানবন্দর দেশের আয়না, সেখানকার ব্যবস্থাপনা ঠিক করা তথা কঠোর নজরদারিতে এনে এটিকে সত্যিই আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দরে পরিণত করার বিষয়টি যেন অন্য কোনো ইস্যুর নিচে চাপা পড়ে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট


আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রাজনীতি ও বাংলাদেশ

আপডেটেড ১০ ডিসেম্বর, ২০২২ ০৯:২৬
দেলোয়ার হোসেন

মানবাধিকার একটি বহুল আলোচিত বিষয়। মানুষের আইনগত অধিকার, নৈতিক অধিকার এবং সাংবিধানিক অধিকারের সমষ্টি হলো মানবাধিকার। অন্যভাবে বললে, সকল আইনগত অধিকার, নৈতিক অধিকার ও মৌলিক অধিকারই মানবাধিকার। মানবাধিকার মানুষের জন্মগত অধিকার। আজ ১০ ডিসেম্বর বিশ্ব মানবাধিকার দিবস। ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র গৃহীত হওয়ার পর ১৯৫০ সালে জাতিসংঘ এই দিনটিকে বিশ্ব মানবাধিকার দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। সেই থেকে বিশ্বজুড়ে দিনটি পালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশও প্রতিবছর এই দিনটিকে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করে।

প্রতিবছর নানা আয়োজন ও কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্ব মানবাধিকার দিবস পালিত হয়ে থাকলেও এবার এই দিবসটিকে অধিক গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। কারণ এবার দিবসটি পালিত হতে যাচ্ছে এমন একটি প্রেক্ষাপটে, যখন কিনা বিশ্ব একটি ব্যাপক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক অতিমারির পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপট, শরণার্থী-সংকট, উগ্র জাতীয়তাবাদের উত্থান, জনরঞ্জনবাদের আবির্ভাব এবং জাতিগত বিভেদের দরুন বৈশ্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

মানবাধিকার ধারণাটি সর্বজনীন, জন্মগত ও মৌলিক অধিকার-সংশ্লিষ্ট হলেও এটিকে ঘিরে রাজনীতি, কূটনীতি ও বিতর্ক লক্ষণীয়। মানবাধিকারকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার এবং কূটনীতির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের ইতিহাস বেশ পুরোনো হলেও সম্প্রতি এটিকে ঘিরে বিতর্ক বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৪০-এর দশকে স্নায়ু যুদ্ধের শুরু থেকে বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার রাজনীতির একটি প্রধান ইস্যু হিসেবে বিকশিত হয়েছিল। নব্বইয়ের দশকে স্নায়ু যুদ্ধের অবসান হয়। বর্তমান বিশ্বে বৃহৎ শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুনভাবে ফিরে আসার কারণে মানবাধিকার ইস্যুটি পররাষ্ট্রনীতিতে নতুনভাবে এর কৌশলগত গুরুত্ব ফিরে পেয়েছে। ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের ফলে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান দেশগুলো মানবাধিকারকে ঘিরে রাজনীতি ও কৌশলের সম্মুখীন হচ্ছে। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ শক্তিগুলো তাদের রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য এটিকে কাজে লাগাচ্ছে। বাংলাদেশকে মানবাধিকার ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্রের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রচেষ্টা এই কূটনীতি ও রাজনীতির অংশ। এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী দেশ হিসেবে তুলে ধরার মাধ্যমে বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার একটি প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায় এবং দেশ ও দেশের বাইরের একটি স্বার্থান্বেষী মহল তাদের কায়েমি স্বার্থ অর্জনের চেষ্টা করছে।

মানবাধিকার বিষয়টিকে ঘিরে ধারণাগত অস্পষ্টতা, রাজনৈতিক বিতর্ক এবং কূটনৈতিক কৌশল ও স্বার্থের ফলে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান দেশগুলো বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। প্রথমত; মানবাধিকারের সঙ্গে সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার সম্পর্ক থাকায় এটিকে স্থান ও প্রেক্ষাপটভেদে অনেকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা ও উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন। ফলে উন্নয়নশীল বিশ্বের একটি দেশ হিসেবে বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হচ্ছে। বিশ্ব মানবাধিকারের বিষয়ে দৃশ্যত যে দেশগুলো সরব, তারা নিজেরাই বর্ণবাদ থেকে শুরু করে ও বিচারবহির্ভূত হত্যাক্যাণ্ডের অভিযোগে অভিযুক্ত। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী এসব দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়। বরং একটি উপনিবেশোত্তর জাতি হিসেবে বাংলাদেশ তার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মানবাধিকার বিষয়ে সহনশীলতা দেখায় এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এমনও প্রমাণ আছে, যেসব দেশ মানবাধিকার বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে, তাদের দেশকে প্রতিবেদনের বাইরে রেখে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

মানবাধিকার বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনের রিপোর্ট পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, মানবাধিকারের বিভিন্ন নির্দেশকে বাংলাদেশ অন্য অনেক দেশের তুলনায় এগিয়ে আছে। বিশ্ব জনসংখ্যা পর্যালোচনা রিপোর্টে দেখা যায়, ২০২১ সালে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ফলে মৃত্যুর দিক থেকে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছে যথাক্রমে ব্রাজিল (৪৯,৪২৬ জন), যুক্তরাষ্ট্র (৩৭,০৩৮ জন) এবং মেক্সিকোতে (২২,১১৬ জন)। এই প্রতিবেদন অনুসারে নারীর প্রতি সহিংসতার ক্ষেত্রে প্রথম তিনটি দেশ হলো যুক্তরাজ্য, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা। উভয় ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক উন্নত দেশের তুলনায় ভালো।

দ্বিতীয়ত; দ্ব্যর্থহীনভাবে মানবাধিকার তার সর্বজনীনতা এবং বিশেষত্বের প্রশ্নে একটি বড় বিতর্ক তৈরি করে। এই সর্বজনীনতা ও বিশেষত্ব ঘিরে রাজনীতি ও কূটনীতি লক্ষণীয়। মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রের নীতি ও আদর্শগুলো প্রধানত পশ্চিমা সমাজ ও সংস্কৃতি থেকে নেয়া। কিন্তু মূল্যবোধ, সমাজ ও সংস্কৃতি এবং নীতির ক্ষেত্রে সারা বিশ্বে বৈচিত্র্যতা রয়েছে। আফ্রিকা, এশিয়া বা লাতিন আমেরিকার মূল্যবোধ, সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে পশ্চিমা মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির পার্থক্য রয়েছে। অথচ মানবাধিকারের ঘোষণাপত্রকে সর্বজনীন বলা হলেও এর নীতিগুলো বিশেষ একটি সমাজ ও সংস্কৃতি থেকে নেয়া। এটি জাতি-রাষ্ট্রগুলোর ব্যাপক বৈচিত্র্যময় সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থা সত্ত্বেও মানুষের কিছু অধিকারকে সর্বজনীন করার পেছনের যুক্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

মানবাধিকার প্রসঙ্গে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদ ও লি কুয়ান ইউর মন্তব্য উল্লেখ করা যেতে পারে। মাহাথির মোহাম্মদ মানবাধিকারকে সাংস্কৃতিকভাবে আপেক্ষিক বলে দাবি করে মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রটি পর্যালোচনার প্রস্তাব করেছিলেন। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে ঘোষণাপত্রটি এশীয় সমাজের ওপর একটি পশ্চিমা আরোপ, যা এশীয় মূল্যবোধকে উপেক্ষা করেছে এবং ফলপ্রসূতে উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে। তারা উভয়েই প্রধান এশীয় মূল্যবোধকে এই বিশ্বাস হিসেবে বর্ণনা করেন যে সমাজের প্রতি বাধ্যবাধকতা এবং বৃহত্তর সম্প্রদায়ের অধিকারগুলো ব্যক্তির অধিকারের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তৃতীয়ত; মানবাধিকার ইস্যুতে যথেষ্ট বিতর্ক এবং বৈচিত্র্য থাকা সত্ত্বেও অনেক দেশ এটিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে কূটনীতির একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে। বিশেষত স্নায়ু যুদ্ধের যুগে দুই পরাশক্তির মধ্যে আদর্শগত দ্বন্দ্ব মানবাধিকার এবং উদার গণতন্ত্রের বিষয়গুলোকে বিশ্বব্যাপী বিতর্কের সামনে নিয়ে আসে। চতুর্থত; যেহেতু মানবাধিকারের ইস্যুটি স্বাভাবিকভাবেই অভ্যন্তরীণ প্রকৃতির, তাই এটি শক্তিশালী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করে। এর ফলে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অনেক দেশকে বড় ধরনের রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এটি শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারই না, বরং কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত এবং সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপের শামিল।

পঞ্চমত; আধুনিক বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তি ও যোগাযোগব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়নের ফলে ভুল তথ্য ও গুজব ছড়ানো এবং তথ্য ম্যানিপুলেশনের প্রবণতা বহুলভাবে প্রচলিত হয়ে গেছে। এর মাধ্যমে মানবাধিকারের মতো সংবেদনশীল ও সর্বজনীন বিষয়ে ভুল তথ্য ও গুজব ছড়ানোর মাধ্যমে দেশ ও বিদেশের একটি স্বার্থান্বেষী মহল চেষ্টা করে যাচ্ছে। অনেক সময় শক্তিশালী রাষ্ট্র অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী ও দুর্বল রাষ্ট্রকে চাপে রাখার জন্য বা সেখানে তার স্বার্থ অর্জনের জন্য এটিকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে।

এহেন বাস্তবতায়ও বাংলাদেশ মানবাধিকার রক্ষা এবং উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। মানবাধিকারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ তার সাংস্কৃতিক চর্চা, আইনগত অনুশীলন এবং মানবিক জীবনবোধের মাধ্যমে মানবাধিকার রক্ষা এবং বিকাশে কাজ করে আসছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকেই মানবাধিকারের ব্যাপারে আমরা সোচ্চার। বাংলাদেশের মানবাধিকার সমর্থনের ইতিহাস রয়েছে। স্বাধীনতা অর্জনের বহু আগে থেকেই বাঙালি জাতি অধিকার রক্ষায় জীবন উৎসর্গ করেছে। সূর্য সেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার তার বাস্তব উদাহরণ। বাংলাদেশের মুক্তি ও স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান লক্ষ্য ছিল অন্যায়, অবিচার ও শোষণ থেকে বাঙালি জাতিকে মুক্তির মাধ্যমে মানবাধিকারের বিকাশ সাধন এবং বিশ্বের বুকে একটি আত্মমর্যাদাসম্পন্ন দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠিত করা। মানবাধিকারের দাবি ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা ছিল অসাধারণ। তিনি ছিলেন মানবাধিকারের প্রবক্তা ও অনুশীলনকারী। রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং দাবিতে তিনি সর্বদা বাঙালি জনগণের, বিশেষভাবে কৃষক ও শ্রমিকদের মতো প্রান্তিক জনগণের অধিকার, তাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা, আন্দোলনের স্বাধীনতা এবং পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উপনিবেশিকতা থেকে মুক্তির কথা চিন্তা করেছিলেন।

মানবাধিকার রক্ষা, এর চর্চা ও বিকাশ আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ। প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকে শুরু করে উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রতিরোধ এবং পরবর্তী সময়ে আমাদের স্বাধীনতামাধ্যমে মুক্তি সংগ্রাম প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও রক্ষার নির্মোঘ দাবি ও আন্দোলন। পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে মানবাধিকারকে মৌলিক অধিকারের মর্যাদা দেয়া এবং মুক্তি ও গণতন্ত্রকে জাতীয় উন্নয়নের লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ প্রমাণ করে বাংলাদেশ শুধু মানবাধিকারের প্রবক্তাই না, মানবাধিকার রক্ষক, প্রচারক। বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় আমাদের শান্তিরক্ষী বাহিনীর অবদান, নারীর ক্ষমতায়নে আমাদের সফলতা ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিশ্বে আমাদের রোল মডেলের স্বীকৃতি বলে দেয় মানবাধিকারের প্রতি বাংলাদেশের অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা ও প্রচেষ্টা।

বিশেষভাবে গত ৫০ বছরে আইনগত সংস্কার, প্রশাসনিক উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন আইন ও চুক্তির প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার এবং প্রতিপালন প্রমাণ করে মানবাধিকার রক্ষা ও উন্নয়ন বাঙালি জাতির সহজাত সংস্কৃতি। মানবাধিকার রক্ষা ও বিকাশে বাংলাদেশ আইনগত পদক্ষেপ ও প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন সাধনসহ অনেক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। মানবাধিকার রক্ষায় ২০০৮ সালে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠা, তথ্য অধিকার নিশ্চিত করতে ২০০৯ সালে তথ্য কমিশন প্রতিষ্ঠা, শ্রম অধিকার প্রতিষ্ঠায় একটি শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনাল এবং ১০টি শ্রম আদালত স্থাপন, নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় আইন প্রণয়ন, ২০১৩ সালে হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতিসহ বাংলাদেশ অনেক আইনি এবং প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন করেছে। উল্লেখ্য, ২০২২ সালের জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচনে বাংলাদেশ পঞ্চমবারের মতো সাফল্যের সঙ্গে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করে। এর আগে বাংলাদেশ ২০০৬, ২০০৯, ২০১৪ এবং ২০১৮ সালেও জয়লাভ করে সদস্য নির্বাচিত হয়। এটি মানবাধিকার রক্ষায় বাংলাদেশের প্রচেষ্টা ও অঙ্গীকারের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। সুতরাং ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশ মানবাধিকারের রক্ষক ও চর্চাকারী।

পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান বিশ্বে মানবাধিকার ঘিরে রাজনীতি ব্যাপক হয়ে উঠেছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় এটি অতিমাত্রায় হয়েছে, যা মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণার উদ্দেশ্য এবং চেতনার পরিপন্থী। তাই জন্মগত ও সর্বজনীন এই অধিকার নিয়ে রাজনীতি ভুলে বিশ্বের সব দেশের উচিত মানবাধিকার উন্নয়ন ও রক্ষায় কাজ করা। মানবাধিকার রক্ষা ও উন্নয়নে বাংলাদেশ কাজ করেছে, করছে এবং ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত রাখবে।

লেখক: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


গায়েবি মামলা যেন রাজনীতির অস্ত্র না হয়

ছবি: দৈনিক বাংলা
আপডেটেড ১০ ডিসেম্বর, ২০২২ ০৯:২৬
প্রভাষ আমিন

বেআইনি কিছু ঘটলে তা নিয়ে মামলা হয়। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি অভিযুক্তদের আসামি করে মামলা করেন। পুলিশ তদন্ত করে চার্জশিট দিলে সে অনুযায়ী আদালতে বিচারকাজ চলে। বিচার শেষে আদালত অভিযুক্তদের দোষ বিচার করে সাজা দেবেন। অভিযোগ প্রমাণ না হলে আদালত খালাসও দিতে পারেন। এটিই আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। মামলা সত্য হতে পারে, মিথ্যাও হতে পারে। প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে সাজানো মামলা করার ঘটনা আকছার ঘটে থাকে। এমনকি অনেক সময় মিথ্যা সাক্ষীর জোরে সাজানো মামলায় নির্দোষ ব্যক্তিও সাজা পেয়ে যেতে পারেন। আবার আইনের ফাঁক গলে দোষী ব্যক্তিও পার পেয়ে যেতে পারেন। মেধা ও অভিজ্ঞতায় শক্তিশালী উকিলরা যেকোনো সময়ে মামলা উল্টাপাল্টা করে ফেলতে পারেন। নানা ধরনের মামলার মধ্যে কিছু আছে রাজনৈতিক মামলা। মূলত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতেই রাজনৈতিক মামলা করা হয়। সাধারণত রাজনৈতিক মামলা পরিণতি পায় না, বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখা হয়। এসব মামলা ব্যবহার করা হয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণ করতে, বশে রাখতে। আপস হলে মামলা নিষ্ক্রিয়, মতে না মিললে মামলা সক্রিয়।

সত্য মামলা, মিথ্যা মামলা, রাজনৈতিক মামলার সঙ্গে ইদানীং নতুন এক ধরনের মামলার কথা শোনা যাচ্ছে। গণমাধ্যমে এসব মামলাকে বলা হচ্ছে ‘গায়েবি মামলা’। বাস্তবে কোনো ঘটনাই ঘটেনি, কিন্তু মামলা হয়ে গেছে, এমন মামলাকেই বলা হচ্ছে ‘গায়েবি মামলা’। এই মামলাগুলোও রাজনৈতিক মামলারই অংশ। মূলত ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করতে ব্যাপক হারে গায়েবি মামলা করার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করা হয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে এসব মামলায় অনেককে গ্রেপ্তারও করা হয়। কিন্তু ২০১৮ সালের নির্বাচনে ভরাডুবির পর রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি যেন শীতনিদ্রায় চলে যায়, যা সাধারণত সাপ-ব্যাঙ দিয়ে থাকে। এরপর রাজনৈতিক মামলা বা গায়েবি মামলাও যেন গায়েব হয়ে যায়। কিন্তু গত আগস্ট থেকে বিএনপি আবার রাজপথে সক্রিয় হয়েছে। বিশেষ করে গত ১২ অক্টোবর থেকে বিভাগীয় সমাবেশের কর্মসূচিকে ঘিরে দেশজুড়ে চাঙা হয়েছেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা। আর এই বিভাগীয় সমাবেশ ঘিরে চাঙা হয়েছে রাজনৈতিক মামলা, সঙ্গে শুরু হয়েছে গায়েবি মামলাও। বিএনপির ১০টি বিভাগীয় সমাবেশের ৯টি এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। আজ ঢাকায় চূড়ান্ত বিভাগীয় সমাবেশকে ঘিরে চলছে প্রবল উত্তেজনা।

নয়টি বিভাগীয় সমাবেশ থেকে বিএনপির অর্জন কম নয়। অনেক দিন পর বিএনপির নেতা-কর্মীরা মাঠে নেমেছেন। নানা রকম বাধা-বিঘ্ন, ধর্মঘট ঠেলে বিপুলসংখ্যক মানুষ এসব সমাবেশে যোগ দিয়েছেন। জনগণের এই বিপুল সাড়ায় নতুন করে আশায় বুক বাঁধছেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা। তবে দীর্ঘদিন পর জনগণের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের সুযোগ পেলেও তাদের ঝুলিতে যুক্ত হয়েছে অনেকগুলো মামলার বোঝাও। যথারীতি এসব মামলায় আছে সত্য মামলা, মিথ্যা মামলা এবং গায়েবি মামলা। অনেক জায়গায় পুলিশ বা সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে মামলার আসামি হয়েছেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা। অনেক জায়গায় বিএনপির নেতা-কর্মীরা একতরফা হামলার শিকার হয়েছেন, আবার মামলাও হয়েছে তাদের বিরুদ্ধেই। আবার কোনো ঘটনাই ঘটেনি, এমন বিষয়েও মামলা হয়েছে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে। গণমাধ্যমের অনুসন্ধান বলছে, এসব মামলার বাদী হয় পুলিশ, নয় সরকারি দলের নেতা-কর্মীরা। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে মামলার বাদী বা সাক্ষী দাবি করছেন, তারা মামলা সম্পর্কে কিছুই জানেন না। মামলায় উল্লেখ করা ঘটনাস্থলের আশপাশের লোকজনও ঘটনা সম্পর্কে অজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। অধিকাংশ গায়েবি মামলার অভিযোগই সংঘর্ষ, গাড়ি ভাঙচুর, গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ককটেল বিস্ফোরণ ঘটনার। এসব ঘটনা ঘটলে আশপাশের মানুষ অবশ্যই জানতেন। কিন্তু কেউ কিছু জানেন না, কেউ কিছু দেখেননি, কেউ কিছু শোনেননি; কিন্তু মামলা হয়ে গেছে কয়েক শ লোকের বিরুদ্ধে। তাদের মধ্যে বেশির ভাগই অজ্ঞাতনামা। এই অজ্ঞাতনামার কাহিনিতে পরে আসছি।

গত দুই মাসে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে কয়টি মামলা হয়েছে; তার মধ্যে কয়টি সত্য, কয়টি মিথ্যা, কয়টি গায়েবি; তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে গত কয়েক দিনে মূলধারার গণমাধ্যমের রিপোর্ট, অনুসন্ধানে গায়েবি মামলার বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে। যেগুলোর শিরোনাম- ‘নভেম্বরে ৪০ ‘গায়েবি’ মামলা, ১০ হাজার নেতা-কর্মী আসামি’, ‘কসম, আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম না বললেন বাদী’, ‘স্থানীয়রা বলছেন ককটেল ফোটেনি, তবু বিএনপির ৮৮ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে পুলিশের মামলা’, ‘১৬৯ গায়েবি মামলার তালিকা দিল বিএনপি’, ‘বিস্ফোরণের আগেই গ্রেপ্তার নেতা-কর্মী’, ‘বিদেশে থাকলেও হয়েছেন পুলিশের মামলার আসামি’, ‘আবার গায়েবি মামলা: এত্ত ককটেল বিস্ফোরণ কেউ শোনেনি, দেখেনি’, ‘ককটেল ফাটাতে দেখেনি কেউ, তবে মামলা দিয়েছে পুলিশ’, ‘নাশকতা মামলার আসামি হলেন জাপানে থাকা ছাত্রদল নেতা’।

বিএনপির ১০ ডিসেম্বরের সমাবেশ সামনে রেখে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চলছে বিশেষ অভিযান, ব্লক রেইড। গ্রেপ্তারও করা হয়েছে অনেককে। পুরোনো মামলায় বিএনপির অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অনেকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। বুঝতে অসুবিধা হয় না, বিএনপির সমাবেশ না হলে এসব অভিযান চালানো হতো না, গ্রেপ্তার হতো না কেউ। তার মানে এই গ্রেপ্তার পুরোপুরি রাজনৈতিক। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তারা বিভিন্ন মামলার আসামি। এটিও বুঝতে অসুবিধা হয় না, তারা অতীতের কোনো না কোনো রাজনৈতিক মামলার আসামি।

গত এক মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে যেসব সত্য মামলা, মিথ্যা মামলা বা গায়েবি মামলা হয়েছে; আশঙ্কা করা হচ্ছে, প্রয়োজনে আগামী নির্বাচন পর্যন্ত এসব মামলাকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। সত্য হোক, মিথ্যা হোক বা গায়েবি হোক; সব মামলাতেই কিছু নাম উল্লেখ করা আসামির পাশাপাশি অসংখ্য অজ্ঞাতনামা আসামি থাকে। সুবিধামতো পুলিশ যে কাউকে ধরে সেই সব ‘অজ্ঞাতনামা’র জায়গায় তাদের নাম বসিয়ে দিতে পারে।

বেআইনি কিছু ঘটলে অবশ্যই মামলা হতে পারে। আসামিরা যে রাজনৈতিক দলের সদস্যই হোক, তাদের গ্রেপ্তারও করা হতে পারে। কিন্তু ঘটনাটি যেন সত্যি হয়। যেমন ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে এবং নির্বাচনের পরে বিএনপি দেশজুড়ে অগ্নিসন্ত্রাস চালিয়েছিল, অনেক মানুষকে হত্যা করেছে, পুড়িয়ে মেরেছে। সে সময় অনেক মামলাও হয়েছিল। কিন্তু এত বছরেও কোনো মামলার নিষ্পত্তি হয়নি। পুড়িয়ে মানুষ মারার ঘটনায়ও কেউ সাজা পায়নি। রাজনীতির আড়ালে হারিয়ে গেছে সত্য মামলার বিচারও। আমরা চাই ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে দেশজুড়ে অগ্নিসন্ত্রাসের জন্য দায়ীদের যেন অবশ্যই বিচার করা হয়। কেউ যেন রাজনৈতিক বিবেচনায় ছাড় না পায়। কোনো মামলা যেন রাজনীতির অস্ত্র না হয়।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট


বিএনপির ‘অতি রাজনীতি’:  লাভ না ক্ষতি

সংবাদ বিশ্লেষণ
নয়াপল্টনে বিএনপি নেতাকর্মীর সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ। ছবি: দৈনিক বাংলা
আপডেটেড ১০ ডিসেম্বর, ২০২২ ০৭:৩৮
তানভীর সোহেল

বিএনপি বিভাগীয় সমাবেশ শুরু করে গত ৮ অক্টোবর। ইতিমধ্যে ৯টি বিভাগীয় শহরে সমাবেশ করেছে দলটি। কিন্তু গোল বেঁধেছে দশম ও সর্বশেষ এই বিভাগীয় সমাবেশ নিয়ে, যেটি আজ শনিবার হতে যাচ্ছে ঢাকায়। নানা নাটকীয়তার পর এই সমাবেশ হতে যাচ্ছে রাজধানীর গোলাপবাগ মাঠে। বিএনপি নিজেই এই মাঠে সমাবেশ করার প্রস্তাব দিয়েছিল। পুলিশও তাতে রাজি হয়েছে মাইক ব্যবহার ও নিরাপত্তা দিতে। তাই আপাত দৃষ্টিতে বলা যায়, ঢাকায় বিএনপির সমাবেশ হচ্ছে যথাসময়ে এবং সমাবেশ নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও তা কেটে গেছে।

প্রশ্ন হচ্ছে এই সমাবেশ নিয়ে গত বুধবার যে সহিংসতা হলো তা এড়ানো যেত কি না। সমাবেশের স্থান নিয়ে একজনের প্রাণ চলে যাওয়া আর বহু আহতের (পুলিশ-সাংবাদিক-বিএনপি নেতা-কর্মী) ঘটনায় বিএনপি কি রাজনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছে, নাকি লোকসানে পড়েছে?

ঢাকায় সমাবেশের স্থান নিয়ে বিএনপি শুরুতেই ‘অতি রাজনীতি’ করেছে। নয়াপল্টনেই সমাবেশ করা হবে— এমন একরোখা মনোভাব দেখিয়েছে দলটি। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান দেয়ালঘেরা বলে স্থানটি দলটি প্রত্যাখ্যান করেছে। অথচ এখানে আগেও বিএনপি অনেক সমাবেশ করেছে। আবার দেয়ালঘেরাকে কারণ দেখিয়ে সরকারের বরাদ্দ দেয়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রত্যাখ্যান করে বিএনপি সমাবেশ করার জন্য পুলিশের কাছে প্রস্তাব দেয় আরও বেশি দেয়ালঘেরা কমলাপুর স্টেডিয়ামের নাম। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান যদি নেতা-কর্মীদের পদদলিত হওয়ার কারণ হয়, তবে কমলাপুর স্টেডিয়ামে এটি হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। কেননা সেটি আরও বদ্ধ জায়গা।

সমাবেশের স্থান নিয়ে এমন ‘টানাটানি’র মধ্যে অনুমতি ছাড়াই নয়াপল্টনে সমাবেশের ঘোষণা দেয় বিএনপি। এর মাধ্যমে হয় বিএনপি মনে করেছিল ক্ষমতাসীনরা দুর্বল, অথবা তারা দেখতে চেয়েছিল সরকার কী করে। ১৪ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগে সরকারকে দুর্বল ভাবলে সেটি বিএনপির রাজনৈতিক অজ্ঞতা। আর সরকার কী করবে সেটা দেখতে চাওয়ার সময় হয়তো এখনো আসেনি।

বুধবার নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে পুলিশের সঙ্গে ‘পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া’ করতে গিয়ে যে সহিংসতার সৃষ্টি হয়েছিল তা বিএনপিকে অনেক দিন ভোগাবে। বিএনপিকে কিছু দিনের জন্য আয়ত্তে আনার একটা ‘তাজা কারণ’ পেয়ে গেল পুলিশ ও সরকার। ভোটের এক বছর বাকি থাকতে এমন একটি সহিংস ঘটনার রেশ বয়ে বেড়াতে হবে বিএনপির শীর্ষ থেকে তৃণমূলের নেতাদের। ইতিমধ্যে এই ঘটনায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস (যিনি ঢাকার সমাবেশের সমন্বয়কদের দায়িত্ব পালন করেছেন) গ্রেপ্তার হয়েছেন। এর আগে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, শিমুল বিশ্বাস, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানিসহ ৩০০ শতাধিক নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন। বুধবারের সহিংস ঘটনায় যে মামলা হয়েছে সেই মামলায় এখন যেকোনো সময় যে কাউকে গ্রেপ্তার দেখানোর একটা মোক্ষম হাতিয়ার পেয়ে গেলে পুলিশ।

এ কথা ঠিক যে রাজনৈতিক আন্দোলনে জেল, গ্রেপ্তার স্বাভাবিক ঘটনা। বাংলাদেশে বিরোধী মতের ওপর এ ধরনের হামলা-মামলার ঘটনা সব সময় সব সরকারের আমলেই ছিল, কম বা বেশি। তাই দলের শীর্ষ নেতারা গ্রেপ্তার হলেই যে বিএনপি চুপসে যাবে, তা নয়। কিন্তু কিছুটা সংকটে যে পড়বে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই রাজনীতিবিদরা সব সময়ই সময়ের অপেক্ষায় থাকেন। শক্তি সঞ্চয় করেন। কিন্তু সরকার পতন বা সরকারকে নির্দলীয় সরকারের দাবি মানাতে বাধ্য করার মতো শক্তি বিএনপি এখনো সঞ্চয় করতে পারেনি। তেমন রূপরেখাও দলটি দিতে পারেনি। বিএনপির নেতারাই বলে আসছিলেন, ঢাকার বিভাগীয় সমাবেশ থেকে সাধারণ মানুষকে তাদের (বিএনপির) চাওয়া এবং দাবি আদায়ের আন্দোলনের রূপরেখা সম্পর্কে জানাবেন।

মূলত বিএনপির এই সমাবেশ থেকে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা দেয়ার কথা রয়েছে। সরকারের পতনের এক দফা আন্দোলন, যুগপৎ আন্দোলনের রূপরেখা ঘোষণার মতো বেশ কিছু বিষয় ছিল, যা এই সহিংসতার কারণে কিছুটা হলেও আড়ালে চলে গেল। বিএনপি এখন ভোটের সময় নির্দলীয় সরকারের ব্যবস্থার দাবিতে আন্দোলন করছে। এরপর বিএনপি চেয়ারপারসনের মুক্তি, দলীয় নেতা-কর্মীদের মুক্তি, মামলা প্রত্যাহারের মতো বিষয়গুলোও সামনে আনছে। কিন্তু সরকারের পতন বা নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন ছাড়া ক্ষমতায় যাওয়ার যে অন্য কোনো পথ নেই সে কথা কিন্তু বিএনপিই বলে আসছে।

দীর্ঘ দিন পর এমন টানা কর্মসূচির মধ্যে আছে দলটি। দলটির প্রধান দুই নেতা দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের দৃশ্যমান উপস্থিতি রাজনীতিতে নেই। বলা যায়, দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ওপর ভর করে দলটি রাজনীতির মাঠে অবস্থান শক্ত-পোক্ত করতে চাইছে। ৯টি বিভাগীয় সমাবেশও সফল বলা যায়। দলীয় নেতা-কর্মীদের উপস্থিতি ছিল লক্ষ করার মতো। তৃণমূলে দলটির নেতা-কর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষের মধ্যেও এমন আলোচনা হচ্ছিল— রাজনীতির মাঠে বিএনপি আবার বিরোধী দলের ভূমিকায় ফিরে এসেছে।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে। অর্থাৎ আগামী বছরের নভেম্বর থেকে নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্যে ঢুকে যাবে রাজনৈতিক দলগুলো। তার আগেই বিএনপিকে দাবি আদায় করতে হবে। নয়তো তখনো আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। প্রায় এক বছর আগে যখন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনের দিকে তাকিয়ে আছে, অনেক সাধারণ মানুষও বিএনপি কী করতে চাইছে সেটা দেখার অপেক্ষায় আছে, তার আগেই সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে বিএনপি নিজেদের গোছানো পথে কাঁটা বিছিয়েই দিল নিজেরাই। এটা ঠিক যে রাজনীতি ফুল বিছানো পথ ধরে হয় না। এখন কাঁটা বিছিয়ে সেই পথে বিএনপি কতটা এগিয়ে যেতে পারবে, সেটাই দেখার বিষয়।

বিষয়:

নারীশিক্ষার অগ্রদূত 

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
মোহাম্মদ মাজহারুল হান্নান

মহানবীর মাধ্যমে আল্লাহর প্রথম বাণী ছিল, ‘পড়ো’ অর্থাৎ জ্ঞান অর্জন করো। সে জন্যই মহানবী বলেছেন, শিক্ষা প্রত্যেক মানুষের জন্যই ফরজ। এ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের কোনো প্রভেদ নেই। বরং নারী বিনে পুরুষ অসমাপ্ত, আবার পুরুষ ছাড়া নারী অসম্পূর্ণ। সৃষ্টিকে অব্যাহত রাখার লক্ষ্যেই নারীর সৃষ্টি। আর এই সৃষ্টিকে সার্থক করতে, সফল করতে, সুন্দর করতে পুরুষের যেমন শিক্ষার প্রয়োজন, তেমনই নারীর শিক্ষাও অপরিহার্য। তবু এ কথা সত্য যে নারীশিক্ষার বিষয়টি বিভিন্ন সময়ে চরমভাবে উপেক্ষিত হয়েছে, অবহেলিত হয়েছে। নারী প্রগতির দিশারী। বেগম রোকেয়া দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘স্বামী যখন পৃথিবী হইতে সূর্য ও নক্ষত্রের দূরত্ব নির্ণয় করিতে ব্যস্ত, স্ত্রী তখন একটা বালিশের ওয়াড়ের দৈর্ঘ-প্রস্থ মাপেন, সেলাই করিবার জন্য।’

ধর্মীয় গোঁড়ামি আর সংকীর্ণতার কারণে অতীতে মেয়েদের লেখাপড়া শিখিয়ে তাদের মানসিক বিকাশ ঘটানোর রীতি এ দেশে ছিল না বললেই চলে। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে কয়েকজন উদার চিন্তার প্রগতিশীল মানুষের প্রচেষ্টার ফলেই এ দেশে নারীশিক্ষার সূচনা হয়। সর্বপ্রথম শ্রীরামপুরে মিশনারিরাই নারীশিক্ষার উদ্যোগ নেন। ১৮১১ সালে ৪০টি বালিকা নিয়ে উইলিয়াম কেরি-মার্শম্যান ও ওয়ার্ড ধর্ম শিক্ষার জন্য একটি বালিকা বিদ্যালয় খোলেন। ১৮১৮ সালে চুচুরায় বালিকাদের জন্য আলাদা একটি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল লন্ডন মিশনারি সোসাইটির রবার্ট মের প্রচেষ্টায়। এরপর ১৮১৯ সালের মে-জুনে ব্যাপ্টিস্ট মিশনারিদের স্ত্রীদের উদ্যোগে অবিভক্ত বাংলার কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘দি ফিমেল জুভেনাইল’ নামে মেয়েদের শিক্ষা বিস্তারের প্রতিষ্ঠান। এ সময় রাধাকান্ত দেব ও গৌরীমোহন বিদ্যালংকার বাঙালি মেয়েদের শিক্ষার জন্য উদ্যোগী হন। এইভাবে খুব ধীরগতিতে মেয়েদের লেখাপড়া শেখানোর প্রচেষ্টা চলতে থাকলেও তখনো সমাজে মেয়েদের লেখাপড়া দোষের বলে গণ্য হতো। মেয়েদের জন্মের পর থেকে তাদের অবরুদ্ধ করে রাখা হতো, নানা ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সামাজিক বিধিনিষেধে মেয়েদের মধ্যে ভয়ভীতি জাগিয়ে রাখা হতো।

মিশনারিদের উদ্যোগের ফলে নারীশিক্ষার প্রতি এ দেশের শিক্ষিত মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ে। মেরি অ্যান কলকাতায় এসে চার্চ মিশনারি সোসাইটিতে যোগ দেন এবং কিছুদিনের মধ্যে কলকাতার কুমারটুলী, মল্লিকবাজার, শ্যামবাজার, ঠনঠনিয়া, মির্জাপুর ইত্যাদি স্থানে মেয়েদের জন্য আটটি স্কুল শুরু করেন। ১৮২৪ সালের মধ্যে মেয়েদের জন্য ২৪টি স্কুল খোলা হয়। মিশনারিদের পরিচালনায় যখন ৩০টি স্কুল চালু ছিল, তখন দেশীয় ব্যক্তিদের উদ্যোগে আরও কয়েকটি স্কুল খোলা হয়। রাজা রামমোহন রায় নারীশিক্ষার জন্য খুবই আগ্রহী ছিলেন। এ ছাড়া কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, রামগোপাল ঘোষ, অক্ষয় কুমার দত্ত প্রমুখ ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠী ও ব্রাহ্ম-সমাজের মাধ্যমে নারীশিক্ষার সমর্থনে বক্তব্য প্রচার করতে থাকেন।

তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর এবং শিক্ষা কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট জন এলিয়ট ডিংকওয়াটার বেথুন ১৮৪৯ সালের ৭ মে কলকাতায় ‘ক্যালকাটা ফিমেল স্কুল’ নামে একটি অবৈতনিক বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। এই নারীশিক্ষা নিকেতনটি পরবর্তীকালে বেথুন বালিকা বিদ্যালয় নামে খ্যাতি লাভ করে। পরে বেথুন বালিকা বিদ্যালয়ের অনুসরণে আরও স্কুল খোলা হয়। বেথুন বালিকা বিদ্যালয়টি ১৮৭৯ সালে বেথুন মহিলা কলেজে রূপান্তরিত হয় এবং এটিই ছিল ভারতবর্ষের প্রথম মহিলা কলেজ। নিরক্ষরতার অন্ধকারে ডুবে থাকা বঙ্গনারী-সমাজকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নিজেও ১৮৫৭-৫৮ সালে বাংলায় বিভিন্ন জেলায় মেয়েদের জন্য ৩৫টি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। এসব স্কুলে প্রায় ১ হাজার ৩০০ ছাত্রী পড়ত।

১৮৬৩-৬৪ সালে ঢাকার শিক্ষক প্রশিক্ষণ স্কুল ও সাধারণ স্কুলে ছাত্রীসংখ্যা ছিল মাত্র ১৬। তবে সে সময়ে শিক্ষিকার অভাব নারীশিক্ষা প্রসারে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ১৮৬৭-৬৮ সালে পূর্ববঙ্গের ছয়টি স্কুলে মাত্র ছয়জন শিক্ষয়িত্রী ছিলেন। বাল্যবিবাহ ও অবরোধ প্রথার জন্যই মেয়েদের শিক্ষার চরম এই দুরবস্থা ছিল।

বাংলার মুসলমান সম্প্রদায়ের গোঁড়ামির কারণে নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে তখনো কোনো বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় মুসলিম সমাজের অবরোধ প্রথার কঠোর শৃঙ্খলা ভেঙে উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে পরবর্তী পাঁচ দশকের মধ্যে যে কয়েকজন মহীয়সী নারীশিক্ষার জন্য উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে বিবি তাহেরুননেছা, কুমিল্লার নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী (১৮৩৪-১৯০৩) এবং রংপুরের কুরিমুন্নেসা খানমের (১৮৫৫-১৯২৬, বেগম রোকেয়ার বড় বোন) নাম উল্লেখযোগ্য। তা ছাড়া ওই সময়ে মুসলিম বালিকাদের শিক্ষাদানের জন্য আরও উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন মুর্শিদাবাদের নওয়াব ফেরদৌস মহল এবং খুজিস্তা আক্তার বানু (হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মাতা)।

এই সময়েই মুসলিম নারীশিক্ষার অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেনের আবির্ভাব মুসলিম নারী সমাজের জন্য ছিল আশীর্বাদস্বরূপ। তার প্রতিভা আর মহৎ উদ্যোগ সেকালের ভগ্নহৃদয় মুসলমান সমাজের জন্য এক দৈব আশ্বাস। তার মতো বুদ্ধিদীপ্ত, আত্মনির্ভরশীল ও দৃঢ়প্রত্যয়ী শিক্ষানুরাগীর জন্ম মুসলিম নারী সমাজে নবজাগরণের সৃষ্টি করে। সাহিত্যিক, সমাজসেবী ও শিক্ষাব্রতী বেগম রোকেয়া ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুরের পায়রাবন্দ গ্রামের রক্ষণশীল মুসলিম জমিদার বংশে জন্ম নেন। তিনি ১৮৯৭ সালে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ সাখাওয়াৎ হোসেনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। স্বামীর উৎসাহে তিনি বাংলা-ইংরেজি শেখেন। ১৯০৯ সালে তার স্বামী মারা যান। বিধবা হওয়ার পাঁচ মাস পর মুসলিম মেয়েদের শিক্ষার জন্য ব্রতী হয়ে মাত্র পাঁচজন ছাত্রী নিয়ে ১৯০৯ সালে ভাগলপুরে একটি স্কুল চালু করেন। তারপর ১৯১০ সালে তিনি কলকাতায় চলে যান এবং ১৯১১ সালের ১৬ মার্চ কলকাতায় তালতলা ওলিউল্লা লেনে মাত্র আটজন ছাত্রী নিয়ে মরহুম স্বামীর নামানুসারে সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। সেটিই অবিভক্ত বাংলায় মুসলিম মেয়েদের জন্য প্রথম স্থায়ী স্কুল। রোকেয়াকে এ কাজে সহযোগিতা করেছিলেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকসহ সেই সময়ের শিক্ষিত বিশিষ্ট মুসলিম ব্যক্তিরা।

অনেক প্রচেষ্টার পর ১৯১৭-তে সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলটি মধ্য ইংরেজি গার্লস স্কুলে এবং ১৯৩১-এ উচ্চ ইংরেজি গার্লস স্কুলে রূপান্তরিত হয়। স্কুলের প্রধান শিক্ষয়ত্রী ও সুপারিনটেনডেন্টের দায়িত্ব পালন করে বেগম রোকেয়া কোনো পারিশ্রমিক গ্রহণ করতেন না। স্কুলের উন্নতির জন্য নিজের অর্থ ব্যয় করতেন। মুসলিম নারীশিক্ষার অন্ধকার যুগে কলকাতার বিভিন্ন পাড়ায় ঘুরে স্কুলের জন্য ছাত্রী সংগ্রহ করতেন। সেই কুসংস্কারের যুগে নানা প্রকার লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সত্ত্বেও বেগম রোকেয়া নারীশিক্ষা প্রসারের কর্তব্য কর্ম থেকে সামান্যও বিচ্যুত হননি। বলা যায়, নারীশিক্ষার উন্নয়নের জন্য তিনি নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে গেছেন।

ক্রমান্বয়ে উদার ও প্রগতিশীল চিন্তার উন্মেষ ঘটতে শুরু হলো। নারীশিক্ষার রুদ্ধ দুয়ার খুলে গেল এবং নারীশিক্ষার প্রসার হতে লাগল। সমাজের অনেকেই বুঝতে শিখলেন, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্যই শিক্ষা অপরিহার্য। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি। এ জন্য বেগম রোকেয়া নারী সমাজের দুঃখ-দুর্দশা দূর করার লক্ষ্যে নারীশিক্ষার প্রসার ও উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে সারা জীবন কাজ করেছেন, সংগ্রাম করেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় আজকের নারীদের এগিয়ে আসতে হবে। সব কুসংস্কারের বেড়াজাল ছিন্ন করে তাদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত হতে হবে।

বেগম রোকেয়া দ্বার্থহীনভাবে পিতা-মাতা ও অভিভাবকদের উদ্দেশে বলেছেন, কন্যাসন্তানদের অলংকার দিয়ে না সাজিয়ে বরং সেই অর্থ দিয়ে মেয়েদের শিক্ষার আলো দিতে হবে। মেয়েরা পুরুষের সমান মর্যাদা নিয়ে জন্মায়, কিন্তু শিক্ষার অভাবেই তারা প্রাপ্য মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়। তাই মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে, তবেই তাদের পরনির্ভরশীলতা দূর হবে এবং সমাজ উন্নয়নে ও জাতি গঠনের কাজে পুরুষের পাশে তারা সমানভাবে অংশ নিতে পারবে। তাই আর করুণা নয়, বরং অধিকার ও মর্যাদা দিয়েই তাদের শিক্ষিত করে তুলতে হবে। মুসলিম নারী মুক্তি আন্দোলনের পথিকৃত বেগম রোকেয়া সারা জীবন নিরলস সংগ্রাম করে ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। চরম প্রতিকূলতার মাঝেও এ দেশের মুসলিম নারীশিক্ষার উন্নয়নের ইতিহাসে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াতের অবদানের কথা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

পরিশেষে বলতে হয়, ছেলে-মেয়ে উভয়েই আল্লাহর সৃষ্টি। তাই একজনকে অন্যজনের ওপর প্রাধান্য দেয়ার কোনো কারণ নেই। কন্যা ও পুত্র উভয়ই সন্তান হিসেবে স্বীকৃত, বিধায় উভয়ের প্রতি একই প্রকার আচরণ করতে হবে। কোনো পিতা-মাতাই যেন পক্ষপাতিত্ব করে পুত্রসন্তানকে প্রাধান্য দিয়ে কন্যাসন্তানকে উপযুক্ত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না করেন। বরং শিক্ষার আলোতেই নারী ও পুরুষের বৈষম্যের অবসান হবে, এই প্রত্যাশাই করি।

লেখক: অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদ


বেগম রোকেয়ার ধর্মচেতনা

আপডেটেড ৯ ডিসেম্বর, ২০২২ ১০:৫৯
মোহাম্মদ হাননান

রংপুরের পায়রাবন্দ গ্রামটি বেগম রোকেয়ার জন্য দেশে ও বিদেশে বিখ্যাত। রোকেয়া এ গ্রামে ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তার পারিবারিক নাম ছিল ‘রোকেয়া খাতুন’। বিয়ের পর তিনি নিজেই স্বামীর নামের সঙ্গে মিলিয়ে নাম রাখেন ‘রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন’। ‘মিসেস আর এস হোসেন’ নামেও তিনি লেখালেখির জগতে পরিচিত ছিলেন। তবে ‘বেগম রোকেয়া’ নামেই তিনি সমধিক পরিচিত।

বাংলা সাহিত্যে মুসলিম নারীদের মধ্যে বেগম রোকেয়া ছিলেন তার সময়ের একজন সফল গদ্যকার। বাঙালি মুসলিম সমাজে তিনি সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও সমালোচিত হয়েছিলেন তার সামাজিক আন্দোলনের প্রশ্নে। তার জীবন ইতিহাসকে মূল্যায়ন করে বলা হয়, তিনি বাঙালি মুসলিম আন্দোলনের অগ্রদূত। তার সমকালে তাকে পুরোপুরি না বুঝে, না জেনেই একদল তার সমালোচনা করেছেন। আরেক দল রোকেয়ার সামগ্রিক দর্শনকে আত্মস্থ না করেই ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। দুই দলের হাতেই ছিল খণ্ডিত রোকেয়া। তারা রোকেয়ার জীবন দর্শন, লেখালেখি ও সামাজিক আন্দোলন সম্পর্কে খুব কমই পর্যালোচনা করে দেখেছেন। সব মিলিয়ে দুই দলই এমন একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছে, যাতে মনে হয়, বেগম রোকেয়া ধর্মের বিরুদ্ধে, বিশেষ করে ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে সুবিদিত অভিযোগ, তিনি পর্দা প্রথার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। কিন্তু আসল সত্য কী?

তার রচনাবলি পাঠ করলে এ সম্পর্কে প্রকৃত সত্য কী তা বেরিয়ে আসে। প্রথমত, ইসলাম সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গিটা আমরা পরখ করে দেখতে পারি। ‘ইসলাম’ নামে লেখা তার একটি প্রবন্ধও আছে। এতে ইসলামের ইতিহাস, আরবে নবী (সা).-এর সংগ্রাম, তার পাশে দাঁড়ানো স্ত্রী খাদিজা (রা.)-এর ভূমিকা তিনি বিশ্লেষণ করে ইসলাম সম্পর্কে তার ব্যুৎপত্তিকে জানান দিয়েছেন। মোহাম্মদ (সা.) প্রসঙ্গে লিখেছেন, “কেহ কখনও শুনে নাই, তিনি প্রতিজ্ঞাভঙ্গ করিয়াছেন। তিনি সর্বদা বিপদগ্রস্তের সাহায্যের জন্য প্রস্তুত থাকিতেন, বিধবা ও পিতৃহীন শিশুদের সান্ত্বনা ও প্রবোধ দান তাহার নিত্যকর্ম ছিল। প্রতিবেশীবর্গ তাহাকে ‘আল আমীন’ বিশ্বস্ত বলিয়া ডাকিত। …তিনি যেভাবে আত্ম-বিস্মৃত হইয়া ধ্যানমগ্ন অবস্থায় ঈশ্বর-অনুসন্ধান করিতেন, তাহা বর্ণনা করিবার উপযুক্ত ভাষা দুর্লভ; অথবা ইহার মর্ম কেবল তাহারাই বুঝিতে পারেন, যাহারা একাগ্রচিত্তে খোদার পথে আত্মসর্মপণ করিয়াছেন’। (বেগম রোকেয়া: ‘ইসলাম’, মূলগ্রন্থ: মতিচূর, দ্বিতীয় খণ্ড, বেগম রোকেয়া রচনাসমগ্র, বিশ্বসাহিত্য ভবন, ঢাকা, ২০১৯ সংস্করণ, পৃষ্ঠা ৫৪)

বেগম রোকেয়া মোহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি কতটা ভক্তিপূর্ণ আর শ্রদ্ধাশীল ছিলেন তার আরেকটি নজির দেখানো যেতে পারে- ‘‘পয়গম্বর সাহেবের নিম্নোক্ত বচনসমূহের প্রতি দৃষ্টিপাত করলে আমি ভক্তিপ্রেমে অভিভূত হইয়া পড়ি। তিনি বলিয়াছেন, ‘বিদ্বানের (লিখিবার) মসী শহীদ (ধর্মার্থ সমরশাহী)-দের রক্তপেক্ষাও অধিক মূল্যবান’। ভ্রাতৃগণ! বিদ্যার গৌরব বর্ণনা এতদপেক্ষা অধিক আর কি হইতে পারে”? (‘ইসলাম’, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৬৩)।

একই সঙ্গে ইসলামে বিদ্যা অর্জন, লেখাপড়া ও শিক্ষাকে কত গুরুত্বপূর্ণ করা হয়েছে সে বিষয়টিও রোকেয়া মন্তব্যসহ উপস্থাপন করেছেন। রোকেয়ার সারা জীবনের আন্দোলন-সংগ্রাম এই লেখাপড়া নিয়েই। বোধকরি গত দু-তিন শতকে রোকেয়ার মতো এত শিক্ষা-সংগ্রামী সমগ্র দুনিয়ায় আর কেউ আসেননি। রোকেয়া লক্ষ করেছিলেন, একটি গোষ্ঠী ইসলামের নামে পর্দার কথা বলে মেয়েদের শিক্ষায় বাধা দিচ্ছে, ইসলামের সঙ্গে যার কোনো সম্পর্ক নেই। রোকেয়া এর বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়েছিলেন।

রোকেয়ার রুখে দাঁড়ানোকেই অনেকে ব্যাখ্যা করেন যে, তিনি পর্দা, বোরকা এবং অবরোধ প্রথার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু কস্মিনকালেও নয়, রোকেয়া কখনোই পর্দার বিরুদ্ধে কথা বলেননি। বরং আমরা দেখতে পাই, তিনি পর্দার পক্ষে ছিলেন। রোকেয়া মনে করতেন পর্দা না থাকলে মানুষ ও পশুর মধ্যে কোনো প্রভেদ থাকে না।

বোরকা পরার জন্য অভ্যাসের প্রয়োজন আছে বলে তাগিদ দিয়েছেন রোকেয়া। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ‘বিনা অভ্যাসে কোন কাজটা হয়?’ তবে রোকেয়া বোরকার উন্নতি দাবি করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘জুতা, কাপড়সহ প্রভৃতির ক্ষেত্রে যেমন ক্রমশ উন্নতিপ্রাপ্ত হইয়াছে, সেইরূপ বোরকারও উন্নতি প্রার্থনীয়’। (বোরকা, পৃষ্ঠা ৪০)।

সমকালে প্রচারণা চলত যে, মেয়েরা যে পিছিয়ে পড়ছে, সেটা পর্দা প্রথার কারণেই। কিন্তু রোকেয়া তা মনে করতেন না। তিনি সমস্যার মূল জায়াগাটিই চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘সম্প্রতি আমরা যে এমন নিস্তেজ, সঙ্কীর্ণমনা ও ভীরু হইয়া পড়িয়াছি, ইহা অবরোধে থাকার জন্য হয় নাই- শিক্ষার অভাবে হইয়াছে’। (‘বোরকা’, পৃষ্ঠা ৪১)। রোকেয়ার সংগ্রামটা ছিল এখানেই। তিনি ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন, মেয়েদের পিছিয়ে পড়ার কারণ হলো শিক্ষায় পিছিয়া থাকা।

এ জন্য রোকেয়া পুরুষদের কাছে অনুরোধ করেছিলেন, তারা যে ‘টাকার শ্রাদ্ধ’ করে মেয়েদের অলঙ্কারে শোভিত করে থাকেন, সেটা না করে তারা যেন মেয়েদের ‘জ্ঞান ভূষণে’ অলঙ্কৃত করে তোলেন। রোকেয়ার অমৃত বাক্য, ‘একখানা জ্ঞানগর্ভ পুস্তক পাঠে যে অনির্বচনীয় সুখ লাভ হয়, দশখানা অলঙ্কার পরিলে তাহার শতাংশের একাংশ সুখও পাওয়া যায় না। অলঙ্কারের টাকা দ্বারা জেনানা স্কুলের আয়োজন করা হউক’। তবে রোকেয়া সন্দেহ করেছেন, অলঙ্কারপ্রিয় মেয়েরা এটা মেনে নেবেন কি না। তাই তিনি বলেছেন, ‘ভগ্নীগণ যে স্কুল লাভের জন্য সহজে গহনা ত্যাগ করিবেন, এরূপ ভরসা হয় না’ (‘বোরকা’, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৪১)। রোকেয়ার সিদ্ধান্ত, ‘পর্দা কিন্তু শিক্ষার পথে কাঁটা হইয়া দাঁড়ায় নাই’ (‘বোরকা’, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৪২)।

আবার বেগম রোকেয়া মেয়েদের প্রাথমিক শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘মসুলমান বালিকাদের প্রাথমিক শিক্ষায় কোরান শিক্ষাদান করা সর্বাপেক্ষা অধিক প্রয়োজন’। কিন্তু আমরা সাধারণরা কোরআন শিক্ষাটা যেভাবে করি রোকেয়ার তাতে আপত্তি। তিনি বলেন, ‘কোরান শিক্ষা অর্থে শুধু টিয়া পাখির মত আরবি শব্দ আবৃত্তি করা আমার উদ্দেশ্য নহে’। তিনি পবিত্র কোরআন মাতৃভাষায় অনুবাদ করে অথবা বলা যেতে পারে, অর্থ বুঝে কোরআন পড়ার কথা উল্লেখ করেছিলেন। কোরআন শেখার এ অবস্থানের কারণে কেউ তাকে সমালোচনা করতে পারে, এটা ভেবে রোকেয়া বলেন, ‘আপনারা কেহ মনে করিবেন না যে, প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে কোরআন শিক্ষা দিতে বলিয়া আমি গোঁড়ামির পরিচয় দিলাম। তাহা নহে, আমি গোঁড়ামি হইতে বহুদূরে। প্রকৃত কথা এই যে, প্রাথমিক শিক্ষা বলিতে যাহা কিছু শিক্ষা দেয়া হয়, সে সমস্ত ব্যবস্থাই কোরানে পাওয়া যায়। আমাদের ধর্ম ও সমাজ অক্ষুণ্ণ রাখিবার জন্য কোরান শিক্ষা একান্ত প্রয়োজন’। (সওগাত সাময়িকী, চৈত্র, ১৯৩৩)।

অন্যান্য আরও রচনায় ধর্ম এবং ইসলাম সম্পর্কে রোকেয়ার ভাষ্য এবং তুলনামূলক আলোচনা সবাইকে বিস্মিত করে। তিনি সংবাদ-সাময়িকীতে একটি নিবন্ধে লিখেছিলেন, ‘এই বিশাল জগতে কোনো দেশ, কোনো জাতি, কোনো ধর্ম্ম নারীকে কিছুমাত্র অধিকার দান দূরে থাকুক, নারীর আত্মাকেও স্বীকার করে নাই। একমাত্র ইসলাম ধর্ম্মই নারীকে তাহার প্রাপ্য অধিকার দান করিয়াছে’। অন্যত্র বলেছেন, ‘কোনো জাতি কন্যাকেও সম্পত্তির ভাগ দেয় নাই, ইসলাম কন্যাকে পৈত্রিক সম্পত্তিতে ভ্রাতার অর্ধেক অংশ ভাগিনী করিয়াছে।…মুসলিম স্ত্রী নিজের সম্পত্তি স্বচ্ছন্দে ভোগ করিবার অধিকারিণী’ (বেগম রোকেয়া: ‘রানী ভিখারিনী’, মাসিক মোহাম্মদী, পৌষ ১৩৩৪)।

সমকালে ইসলাম সম্পর্কে অনেক ইসলাম বিশেষজ্ঞও রোকেয়ার মতো ইসলামকে এমন সুন্দর করে তুলে ধরতে পারেননি। রোকেয়া এটা কেন পেরেছিলেন, কারণ ইসলামি তত্ত্ব ও ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে তার ছিল অগাধ পড়াশোনা ও জ্ঞান। ফলে সমকালে যেসব মুসলমান সামাজিক নেতা ইসলামের নামে নানা রকম ভুল ব্যাখ্যা এবং নারীবিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত ছিল, বেগম রোকেয়া ইসলামি তত্ত্ব দিয়েই তাদের বিরুদ্ধে মতাদর্শগত সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। শুধু তাই নয়, যেসব অপব্যাখ্যা করা হতো, রোকেয়া তারও সমুচিত জবাব দিতেন।

মতাদর্শগত সংগ্রাম চালাতে গিয়ে রোকেয়া লেখেন, ‘হিন্দু স্ত্রীকে মৃত স্বামীর সহিত পোড়াইয়া মারিবার ব্যবস্থা আছে।…কিন্তু ইসলাম নারীকে পুনর্বিবাহের অনুমতি দিয়াছে।… হিন্দুগণ শাস্ত্রানুসারে স্ত্রীলোকের প্রতি গৃহপালিত পশু ‍কিংবা দাসীর ন্যায় ব্যবহার করিতে বাধ্য’। কিন্তু ইসলাম ধর্ম্মে স্ত্রীলোককে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দান করা গিয়াছে’ (‘রানী ভিখারিনী’, পূর্বোক্ত)।

খ্রিষ্টীয় সমাজ সম্পর্কেও রোকেয়ার মূল্যায়ন রয়েছে। তিনি লেখেন, ‘খ্রিস্টিয়ান সমাজে যদিও স্ত্রী শিক্ষার যথেষ্ট সুবিধা আছে, তবু রমণী আপন স্বত্ত্ব ষোল আনা ভোগ করিতে পায় না। তাহাদের মন দাসত্ব হইতে মুক্তি পায় না (রোকেয়া: অর্ধাঙ্গী, মূলগ্রন্থ: মতিচূর, প্রথম খণ্ড, পুর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ২৯)। রোকেয়া মনে করতেন, ‘ইংল্যান্ডের লোকদিগকে মসুলমানরাই তাহাদের বিস্মৃত বিদ্যার বর্ণমালার পুস্তকবলী অধ্যয়ন করাইয়াছিলেন’। তিনি লিখেছেন, ‘একসময় ইউরোপের খ্রিষ্টীয় বিভাগ কেমন ঘোর মূর্খতায় তমসাচ্ছন্ন ছিল।’ (বেগম রোকেয়া: ইসলাম, মূল গ্রন্থ: মতিচূর দ্বিতীয় খণ্ড,পূর্বোক্ত,পৃষ্ঠা ৬৪)।

রোকেয়ার সুবিখ্যাত গ্রন্থ অবরোধ-বাসিনী। এখানে পর্দা, বোরকা এবং অবরোধ প্রথা বিষয়ে নানা রকম গল্প-কাহিনির একটি সংগ্রহ উপস্থাপিত হয়েছে। বিষয়গুলো নারীদের এবং নারীদের জন্য এবং নারীদের দ্বারা পর্দা নিয়ে যেসব কুসংস্কার, অপসংস্কৃতি আছে- তার একটি সংগ্রহ। রোকেয়া এসব সংগ্রহের মাধ্যমে নারীদের এ বার্তাই দিতে চেয়েছেন, পর্দা সম্বন্ধে তাদের সংস্কারগুলো আসলে পর্দা না, এগুলো এক ধরনের অশিক্ষা। যেমন- ‘এক বাড়িতে আগুন লাগলো, গ্রামের মানুষ আগুন নিভাতে এসেছে, কিন্তু গৃহিণী ঘর থেকে বের হলেন না, কারণ এতে তার পর্দা ছুটে যাবে। ফলে তিনি পুড়েই মারা গেলেন’ (রোকেয়া, অবরোধ-বাসিনী, পূর্বোক্ত ২৩৪)।

রোকেয়া দেখেছিলেন, সমাজের একদল পুরুষ সামাজিক পর্দা বিষয়ে তাদের মনগড়া তত্ত্ব চালিয়ে সমাজে নারীদের অবনমিত রাখার চেষ্টা করছেন। আর মেয়েরাও পর্দা সম্বন্ধে মূল শিক্ষাটা পাননি। ফলে তারা কোনো কোনো ক্ষেত্রে যা করেছিলেন তা পর্দার মূল প্রণোদনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। রোকেয়া সমসাময়িককালে ইসলামি পণ্ডিত ছিলেন, কোরআন-হাদিস তিনি আয়ত্ত করেছিলেন, ফলে শরিয়া বিধানকে সামনে নিয়ে এসেই বেশি সংগ্রাম করে গেছেন। তিনি এভাবে ইসলামের প্রকৃত মূল্যবোধকেই জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছেন।

রোকেয়ার সংগ্রামের মূল ইস্যু ছিল মেয়েদের লেখাপড়া শিখতে দিতে হবে। কোরআন-হাদিসকে উদ্ধৃত করে তিনি এর স্বপক্ষে যুক্তিগুলো তুলে ধরেছিলেন। ইসলাম বিষয়ে তার ছিল প্রবল অনুরাগ, সে অনুরাগের প্রকাশ তার লেখালেখির সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। তেমনি মেয়েদের শিক্ষার বিষয়টিও তিনি সমাজের অগ্রাধিকার ইস্যুতে পরিণত করেছিলেন। আজকের বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার ভর্তির হার প্রায় শতভাগ, আর ভর্তির ক্ষেত্রে ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের অগ্রগামিতার যে ফলাফল আসছে, তা বেগম রোকেয়ার সংগ্রামের সফলতারই অংশ।

লেখক: ইতিহাসবিদ ও গবেষক


কঠিন শীত মোকাবিলা করতে হবে ইউক্রেনকে

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
আশিস আচার্য

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের গতি-প্রকৃতি দিন দিন জটিল হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের খবর, গত কিছুদিন ধরে ইউক্রেনের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো নিশানা করে রুশ বাহিনী নিয়মিত বিরতিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করে যাচ্ছে। এতে যুদ্ধকবলিত দেশটিতে নতুন একটি সংকট দেখা দিয়েছে। সেটা হলো- বিদ্যুতের চরম ঘাটতি। রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন শহর অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে প্রায়ই। দেশটির কর্তৃপক্ষ এ বিপর্যয় সামাল দিতে তৎপর হলেও নতুন করে একই ধরনের রুশ হামলায় ফের বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে।

এতে স্পষ্টত, আসন্ন শীতকে সামনে রেখে ইউক্রেনকে বিদ্যুৎ-বিচ্ছিন্ন করতে চাইছে রাশিয়া। যুদ্ধে বাড়তি সুবিধা নিতে এটি তাদের একটি কার্যকর কৌশল। শীতকালে শীতপ্রধান দেশগুলোয় ঘরবাড়ি উষ্ণ রাখতে বিপুলপরিমাণ বিদ্যুৎ-জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ প্রয়োজন হয়। তাই এ সময় ইউক্রেনকে বিদ্যুৎ-বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারলে তাদের যুদ্ধ করার সামর্থ্য অনেকটাই কমে যাবে।

সার্বিক অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, এই যুদ্ধ আপাতত থামছে না। এ অবস্থায় ইউক্রেনকে একটি কঠিন শীত মৌসুমের মোকাবিলা করতে হবে। এটি তাদের অস্তিত্বের লড়াইও বটে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এ কথা বলেছেন। চলমান যুদ্ধের কারণে ইতিমধ্যে ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ ইউক্রেন ছেড়ে অন্য দেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। আর যারা রয়ে গেছে তাদের সহ্যসীমার চূড়ান্ত পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে। শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা লাফিয়ে নিচের দিকে নামছে। তীব্র শীতে ইউক্রেনে তামপাত্রা মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যায়। পাশাপাশি শীত মৌসুমে ওই অঞ্চলে দিনের আলো থাকে তুলনামূলক কম সময়। সরকারি কর্মকর্তারা বলে দিয়েছেন, পর্যাপ্ত আলো ও উষ্ণতার বন্দোবস্ত করার মতো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মিলবে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সতর্ক করেছে, ইউক্রেনের লাখো মানুষের জীবন হুমকির মুখে পড়তে চলেছে।

ইউক্রেনে রুশ সামরিক অভিযান শুরুর পর পেরিয়ে গেছে ৯ মাসের বেশি সময়। এই যুদ্ধের প্রভাব গোটা বিশ্বে কমবেশি পড়েছে। করোনাভাইরাস মাহামারির ধকল পুরোপুরি সামলে ওঠার আগেই এ যুদ্ধ শুরু হওয়ায় বিশ্ববাসী নতুন ভোগান্তিতে পড়েছে। মানুষের তৈরি এ দুর্দশা ঘুচতে আরও কত দিন লাগে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। রাশিয়ার তেল-গ্যাসের ওপর পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর নির্ভরশীলতা আছে। চলমান যুদ্ধে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে সমর্থনকারী ইউরোপীয় দেশগুলো রুশ তেল-গ্যাসের পর্যাপ্ত জোগান পাচ্ছে না। এতে শীতে তারাও অল্পবিস্তর সমস্যার মুখে নিশ্চিতভাবে পড়তে যাচ্ছে।

অন্যদিকে, ইউক্রেন ইউরোপসহ গোটা বিশ্বে খাদ্যশস্য সরবরাহকারী দেশ হিসেবে পরিচিত। যুদ্ধের ফলে সেই সরবরাহে নানামুখী ঘাটতি দেখা দিয়েছে। প্রতিবেশী এই দুই দেশের (রাশিয়া-ইউক্রেন) অব্যাহত বিরোধের জেরে সারা বিশ্বের মানুষ এমন দুর্ভোগে পড়েছে, যা করোনাসংক্রান্ত বিপর্যয়ের চেয়ে কোনো অংশে কম মনে হচ্ছে না। জ্বালানির সংকট, খাদ্য ঘাটতি এবং মূল্যস্ফীতির প্রভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি এই গ্রহের সব প্রান্তের মানুষকে মুশকিলে ফেলে দিয়েছে।

কূটনৈতিক উপায়ে ইউক্রেন-রাশিয়ার এই বিরোধ মীমাংসার বিভিন্ন প্রস্তাব এলেও তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ তেমন চোখে পড়ছে না। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ দুই পক্ষের (মস্কো ও কিয়েভ) সঙ্গেই কথাবার্তা চালাচালি করে তাদের সমঝোতার আলোচনায় বসানোর চেষ্টা করছেন। পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের এ লড়াই থামাতে আরও বেশি তৎপরতা প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু তারা সেটা না করে বরং রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখতে ইউক্রেনকে অবিরত প্রেরণা দিয়ে চলেছে। অবশ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন গত সপ্তাহে বলেছেন, তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারেন। তবে মার্কিন নেতা এটাও বলেছেন যে, ইউক্রেনে যুদ্ধ বন্ধ করতে পুতিন যদি সত্যিকার অর্থে আগ্রহী হয়ে থাকেন, তবেই মস্কো-ওয়াশিংটন শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা হতে পারে।

ক্রেমলিন এমন শর্তসাপেক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি হয়নি। তারা বরং পাল্টা শর্ত দিয়ে বলেছে, ইউক্রেনের যে অঞ্চলগুলো রাশিয়া তাদের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে একীভূত করে নিয়েছে, সেটার বৈধতা যদি যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো দেয়, তখন তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসা যেতে পারে।

শক্তিধর দুই দেশ রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের এমন পাল্টাপাল্টি শর্ত দেয়া দেখে এটা স্পষ্ট হয় যে, আপাতত সংকট নিরসনের তেমন সম্ভাবনা নেই। যুদ্ধ চলতেই থাকবে, আর বাড়বে মানুষের দুর্ভোগও। ইতিহাস বলছে, যেকোনো যুদ্ধে সাধারণ মানুষ বরাবরই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাজনৈতিক নেতারা আলোচনার টেবিলে মীমাংসার চেষ্টা যেমন করেন, তেমনি যুদ্ধের গতিপথও নির্ধারণ করে দেন। আর সেনানায়কেরা যুদ্ধের ময়দানে সেসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চেষ্টা করেন। দুই পক্ষের কেউই ক্ষয়ক্ষতি থেকে রেহাই পায় না।

বিশ্বশান্তির ধারক সংস্থা হিসেবে পরিচিত জাতিসংঘকে রুশ-ইউক্রেনীয় যুদ্ধ নিরসনের চেষ্টায় তেমন আশাব্যঞ্জক ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে না। তাদের কার্যক্রম কেবল নিন্দা প্রস্তাব উত্থাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে তা বাস্তবিক কোনো সুফল নিয়ে আসবে না। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হওয়ায় রাশিয়া তার ভেটো ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে বাড়তি সুবিধা নিচ্ছে। পাশাপাশি মিত্র দেশ চীনের সমর্থনও তারা পাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদের বাকি সদস্যদের তৎপরতা অসহায় আস্ফালন ছাড়া আর কিছুই নয়।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স গত ২ ডিসেম্বর যে হিসাব দিয়েছে তাতে দেখা যায়, ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৪১ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। আহত হয়েছে অন্তত ৫৩ হাজারের বেশি। এ ছাড়া ধ্বংস হয়েছে অন্তত ১ লাখ ৪০ হাজার ভবন। আর ক্ষতি হয়েছে ৩৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের। মার্কিন গোয়েন্দারা বলছেন, আসছে শীতে রুশ-ইউক্রেনীয় যুদ্ধের গতি কিছুটা কমে যেতে পারে। বসন্তে যুদ্ধের পরিসর বড় হবে। সে জন্য দুই পক্ষই নাকি এই শীতে প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা নিতে থাকবে।

এদিকে রুশ অপরিশোধিত তেল কেনার মূল্যসীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে পশ্চিমারা। রাশিয়া সেটা মেনে নেয়নি, বরং জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে এমনও হতে পারে যে রাশিয়ার তেল ছাড়াই ইউরোপকে চলতে হবে আগামী দিনগুলোতে। রাশিয়ার কাছ থেকে পশ্চিমা দেশগুলো প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল সর্বোচ্চ ৬০ মার্কিন ডলার দামে কিনবে বলে পশ্চিমা জোট জি৭ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অন্তর্ভুক্ত দেশগুলো এবং অস্ট্রেলিয়া গত শুক্রবার সিদ্ধান্ত নেয়। গত রোববার থেকেই এ মূল্যসীমা পশ্চিমা দেশগুলো মেনে চলছে। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, তেলের দামে এই সীমা নির্ধারণের ফলে রাশিয়ার আয় কমে যাবে। ফলে ইউক্রেনে ‘অবৈধ যুদ্ধের’ খরচ জোগানো তাদের জন্য কঠিন হবে। অন্যদিকে মস্কো বলেছে, রাশিয়ার সমুদ্রসীমা থেকে উত্তোলন করা তেলের ওপর এই ‘বিপজ্জনক’ মূল্যসীমা বেঁধে দেয়া সত্ত্বেও তারা ক্রেতা অনুসন্ধানের কাজ অব্যাহত রাখবে। আর ইউক্রেনের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, রাশিয়ার অর্থনীতি আরও দ্রুত ধ্বংস করার জন্য তাদের তেলের এই দাম ব্যারেলপ্রতি ৩০ ডলার নির্ধারণ করা উচিত।

ইউক্রেনে সামরিক অভিযান বন্ধ করতে মস্কোর ওপর চাপ বাড়ানোর লক্ষ্যেই পশ্চিমারা রুশ অপরিশোধিত তেল ক্রয়ের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। তবে রাশিয়া বলেছে, যেসব দেশ এমন মূল্যসীমা দিয়েছে তাদের কাছে মস্কো তেল বিক্রি বন্ধ রাখবে।

শিল্পপ্রধান দেশগুলোর জোট জি৭-এর সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও জাপান এবং ইইউ গত সেপ্টেম্বরে রুশ তেল ক্রয়ের এই মূল্যসীমা নির্ধারণের উদ্যোগ নেয়। মার্কিন প্রশাসন মনে করে, পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার তেল বিক্রির সর্বোচ্চ দাম নির্ধারণ করে দেয়ার ফলে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের অর্থ বিভাগের আয় সংকুচিত হয়ে পড়বে। ফলে ইউক্রেনে অভিযানের খরচ জোগাড় করা তাদের জন্য আগের চেয়ে কঠিন হবে। পাশপাশি এ উদ্যোগের ফলে বিশ্বব্যাপী তেলের সরবরাহ বন্ধ হওয়ার কোনো ঝুঁকি থাকবে না। রাশিয়ার অর্থনীতি ইতিমধ্যে সংকুচিত হতে শুরু করেছে। জি৭ জোটের উদ্যোগে গৃহীত নীতিগত সিদ্ধান্তটিতে যেসব দেশ সই করেছে, তারা এখন থেকে সমুদ্রপথে পরিবহন করা তেল ও তেলজাত পণ্য ব্যারেলপ্রতি ৬০ ডলারের বেশি দামে কিনতে পারবে না। যেসব দেশ এই সিদ্ধান্তের আওতায় পড়বে না, তাদের কাছে যাতে রাশিয়া বেশি দামে অপরিশোধিত তেল বিক্রি করতে না পারে—সেটা নিশ্চিত করতে ইউক্রেনের পশ্চিমা মিত্র দেশগুলো তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর জন্য কোনো বিমা না দেয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। রাশিয়ার জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ লেওনিদ স্লাৎস্কি বলেছেন, এই উদ্যোগ নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে।

পশ্চিমাদের এই উদ্যোগে সুনির্দিষ্টভাবে রাশিয়ার ওপরই কিছু প্রভাব পড়বে। অন্য যেসব ক্রেতার কাছে মস্কো তেল বিক্রি করে, তাতে বড় কোনো প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম। এখন রাশিয়ার কাছ থেকে ভারত ও চীন সবচেয়ে বেশি অপরিশোধিত তেল কিনে থাকে। ভিয়েনায় কর্মরত রুশ কূটনীতিক মিখাইল উলিয়ানভ সামাজিক যোগাযোগের অনলাইন মাধ্যমে লিখেছেন, আগামী জানুয়ারি থেকে ইউরোপকে হয়তো রাশিয়ার তেল ছাড়াই টিকে থাকতে হবে।

তেলের মূল্যসীমা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশগুলো সমুদ্রপথে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল আমদানির সুযোগ পাবে। কিন্তু তাদেরও রুশ অপরিশোধিত তেল কিনতে হবে পশ্চিমাদের নির্ধারণ করে দেয়া দামে। নইলে তেলবাহী ট্যাংকারগুলো বিমা সুবিধার আওতার বাইরে চলে যাবে। কারণ এ-সংক্রান্ত সব বিমা প্রতিষ্ঠান পশ্চিমা দেশগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে পশ্চিমাদের নির্ধারিত মূল্যসীমার চেয়ে বেশি দামে অন্য কারও কাছে তেল বিক্রি করাটা রাশিয়ার জন্য কঠিন হবে।

যুদ্ধ অব্যাহত রাখার বিষয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যেমন অপ্রতিরোধ্য ভাবমূর্তি নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন, তেমনি ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও অটল মনোভাব দেখাচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট অন্য দেশগুলোর নেতারা যেভাবে স্বার্থসংশ্লিষ্ট ভূরাজনীতির গণ্ডিতে নিজেদের আটকে রেখে কালক্ষেপণ করছেন, তাতে ক্ষতিটা হচ্ছে কেবল মানুষের।

লেখক: সাংবাদিক, [email protected]


খাদ্যশস্যের উৎপাদন বৃদ্ধিই সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষ এড়াতে পারে

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ড. জাহাঙ্গীর আলম

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও মূল্যস্ফীতি আমাদের অর্থনৈতিক সমস্যাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। সম্প্রতি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকুচিত হয়েছে। আসন্ন মহামন্দা ও দুর্ভিক্ষের শঙ্কায় অনেকেই উদ্বিগ্ন। গত তিন বছরে করোনা মহামারির অভিঘাতে বিঘ্নিত হয়েছে খাদ্যপণ্যের উৎপাদন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে খাদ্য সরবরাহ চেইন। আফ্রিকায় স্বরণকালের দীর্ঘ খরা এবং পাকিস্তানসহ আরও কয়েকটি দেশে অস্বাভাবিক বন্যার ফলে হ্রাস পেয়েছে বৈশ্বিক খাদ্যশস্যের উৎপাদন। হ্রাস পেয়েছে খাদ্যের সরবরাহ। যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে ২০২৩ সালের মধ্যে খাদ্যঘাটতির পরিমাণ আরও স্ফীত হবে। ফলে খাদ্যশস্যের মূল্য আরও বাড়বে। তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে উন্নয়নশীল দেশগুলো। চরম দারিদ্র্যে নিপতিত হবে বিশ্বের প্রায় শতকোটি মানুষ। এমন এক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে। সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষ এড়ানোর জন্য এটাই উত্তম পন্থা।

স্বাধীনতার পর গত ৫১ বছরে কৃষি খাতে বাংলাদেশ বিস্তর উন্নতি করেছে। ১৯৭২-৭৩ সালে দেশে মোট খাদ্যশস্যের উৎপাদন ছিল ১ কোটি ১০ লাখ টন। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ কোটি ৬৫ লাখ টনে। খাদ্যশস্যের উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে প্রায় ৩ শতাংশ হারে। পরিসংখ্যান সঠিক হলে আমাদের খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকার কথা। কিন্তু প্রকৃত অবস্থা বিপরীত। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্যানুসারে পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষ বছরে গড়ে ১৪৯ দশমিক ৮ কেজি খাদ্যশস্য গ্রহণ করে থাকে। বাংলাদেশে যদি তার পরিমাণ ১৮২ দশমিক ৫ কেজি ধরা হয় (জনপ্রতি দৈনিক আধা কেজি হিসেবে) এবং শতকরা ২৫ ভাগ বীজ, পশুখাদ্যও অপচয় ধরা হয়, তাহলে মোট খাদ্য চাহিদা দাঁড়ায় সর্বোচ্চ ৩ কোটি ৬০ লাখ টন। কিন্তু হিসাব বলে এর চেয়ে অনেক বেশি চাল ও খাদ্যশস্য প্রতিবছর আমরা উৎপাদন করছি। তার পরও কমবেশি প্রায় ১ কোটি টন চাল, গম ও ভুট্টা প্রতিবছর আমাদের আমদানি করতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্রমাগতই তা বেড়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় সরকারের দেয়া পরিসংখ্যানের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন জাগে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে প্রাথমিক পণ্যের আমদানি খরচ ছিল ১ হাজার ৯৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ৯ হাজার ৮৯৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২০-২১ অর্থবছরে আমাদের চাল ও গম আমদানি করতে হয়েছে ৬৭ দশমিক শূন্য ২ লাখ মেট্রিক টন। তার সঙ্গে যোগ করতে হবে ২৪ লাখ মেট্রিক টন ভুট্টা। প্রাপ্ত তথ্য থেকে দেখা যায়, গত ১৩ বছরে কৃষি খাতে উৎপাদন বেড়েছে গড়ে প্রায় ৪ শতাংশ হারে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সঠিকভাবে কৃষিপণ্যের আমদানির রাশ টেনে ধরা সম্ভব হয়নি। আমরা চাল আমদানিতে এখন বিশ্বে দ্বিতীয়।

ডালের বর্তমান উৎপাদন প্রায় ১০ লাখ টন। এটি প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার। এটি গরিবের মাংস। এর সরবরাহ ৫০ শতাংশই আমদানির ওপর নির্ভরশীল। তেলের ক্ষেত্রে আমাদের আমদানি-নির্ভরতার পরিমাণ প্রায় ৯০ শতাংশ। চিনির ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ প্রয়োজনের প্রায় পুরোটাই আমরা আমদানি করছি। দেশে উৎপাদিত লাল চিনি মাত্র ২ শতাংশ চাহিদা মেটায়। এটুকু সেনাবাহিনী, পুলিশসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে রেশন হিসেবে সরবরাহ কাজেই লেগে যায়।

আমাদের কৃষিজাত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি-নির্ভরতা যখন এত বেশি, তখন বৈশ্বিক মূল্য অস্থিরতা ও ঘাটতি অভ্যন্তরীণ বাজারে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাতে কঠিন সংকটে পড়তে পারে দেশের জনগণ। পর্যাপ্ত উৎপাদন বৃদ্ধি ছাড়া এ সংকট এড়ানো সম্ভব নয়। এমতাবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির আহ্বান খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে একটি আমদানি বিকল্প নীতি গ্রহণ করা দরকার। কৃষি খাতে নীতিগত সহায়তা ও ভর্তুকি বাড়ানো দরকার।

সম্প্রতি সার, জ্বালানি তেল ও বীজের দাম বেড়েছে। অপর দিকে আমন ধানের সংগ্রহ মূল্য ধরা হয়েছে প্রতি কেজি ২৮ টাকা। সে ক্ষেত্রে কৃষকের উৎপাদন খরচ ২৭ দশমিক ৬৪ টাকা। চাল প্রতি কেজি ৪২ টাকা মূল্য ধরা হয়েছে। উৎপাদন খরচ প্রতি কেজি ৪১ দশমিক ৫৮ টাকা। সরকারি গুদামে ধান রেখে আসতে কৃষকের কমপক্ষে খরচ পড়ে প্রতি কেজি ১ টাকা করে। তাতে দিন শেষে উৎপাদিত পণ্যে লোকসান গুনতে হয় কৃষকদের। সে কারণে গত তিনটি মৌসুমে সরকারের ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্ধেকও পূরণ হয়নি। এবারও হবে না। এর অর্থ হলো, কৃষক সরকারি মূল্য সহায়তার সুবিধা তেমন একটা পান না।

সম্প্রতি কৃষিজমির সর্বোচ্চ ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে। তাতে রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব রয়েছে। এক হিসাবে দেখা যায়, বর্তমানে আবাদযোগ্য পতিত জমির পরিমাণ ৪ লাখ ৩১ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে আছে চিনিকল, পাটকল ও রেলের বিশাল আকৃতির পতিত জমি। সিলেট, বরিশাল, বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকা এবং উপকূলীয় লবণাক্ত অঞ্চলে চাষযোগ্য পতিত জমির পরিমাণ বেশি। এসব জমি চাষের আওতায় নিয়ে আসার সুযোগ রয়েছে। সামান্য উদ্যোগ নিলেই এগুলো আবাদের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব। বর্তমানে যে জমিগুলো আবাদ করা হচ্ছে তার শতকরা ৭৫ ভাগ জমির উর্বরতা হ্রাস পেয়েছে। বেশির ভাগ কৃষিজমিতে জৈব উপাদান কমে গেছে ২ শতাংশের নিচে। এটি উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বড় অন্তরায়। এর জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক উৎপাদন পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার।

কৃষিজমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে উৎপাদনে লাভজনকতা নিশ্চিত করতে হবে। গত কয়েক বছর ধরে কৃষকের উৎপাদন খরচ বেড়েছে, লাভ হ্রাস পেয়েছে, দেনা বেড়েছে। এরূপ কষ্ট থেকে পরিত্রাণের জন্য মৃত্যুকেও বরণ করে নিয়েছেন অনেক কৃষক। ২০১৭ সালের ১২ নভেম্বর রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় অবস্থিত দুর্গাপুর গ্রামের কৃষক শ্যামল কুণ্ডু আত্মহত্যা করেছেন। একই বছর ঝিনাইদহের ক্ষুদ্র কৃষক কাউসার আত্মহত্যা করেছেন। পরের বছর ৭ এপ্রিল দেনা শোধ করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার অন্য একজন কৃষক (ডেইলি স্টার, ৪ মে ২০১৮)। অতি সম্প্রতি (২৩ মার্চ ২০২২) দুজন সাঁওতাল কৃষক রাজশাহীর বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের এলাকায় জমিতে সেচের পানির ব্যবস্থা করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন। গত নভেম্বরে (২০২২) ২৫ হাজার টাকা ঋণখেলাপির জন্য জেলে গেছেন ৭ কৃষক। পরে আরও ২২ জন ফেরারি কৃষকসহ মোট ৩৭ জনকে জামিন নিতে হয়েছে। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি-উপকরণ বিতরণ করেছিলেন নামমাত্র মূল্যে। প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন ১০ লাখ কৃষকের সার্টিফিকেট কেস। সেই চেতনা কি এখন আছে?

আমাদের দেশে জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। তাতে কৃষিজমি হ্রাস পাচ্ছে। ১৯৮৩-৮৪ সালে দেশে কৃষিজমির পরিমাণ ছিল ৯ দশমিক ২ মিলিয়ন হেক্টর। ২০১৮ সালে এসে কৃষিজমির পরিমাণ ৭ দশমিক ৬৬ মিলিয়ন হেক্টর। তবে কৃষিজমি হ্রাসের এই প্রবণতা বর্তমানে কম। কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধির অপরিহার্যতা এবং কৃষিজমি ধরে রাখার জন্য সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে এই অগ্রগতি। ইটভাটার সম্প্রসারণ বন্ধ করা এবং উন্নয়নকাজে প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমি একোয়ার করার প্রবণতা ঠেকানো গেলে অকৃষি কাজে কৃষিজমির ব্যবহার আরও কমে আসবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন এবং তার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন দরকার।

আমাদের দেশে অহরহই খাদ্য সমস্যার কথা শোনা যায়। খাদ্যমূল্য বেড়ে যায়। প্রয়োজনের তুলনায় উৎপাদন কম হওয়া এর একটি কারণ। ব্যবসায়ীদের অশুভ আঁতাতের মাধ্যমে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের প্রচেষ্টা গ্রহণ এর অন্যতম একটি কারণ। তা ছাড়া প্রচুর খাদ্য অপচয় চলমান খাদ্য সমস্যা ও দুর্মূল্যের অন্যতম একটি কারণ। এক হিসাবে দেখা যায়. ফসলের মাঠ থেকে রান্নাঘর পর্যন্ত আনতে প্রতিবছর ৩৭ লাখ টনের বেশি খাবার নষ্ট হচ্ছে। বাড়িতে সংরক্ষণ ও খাবার পরিবেশনে বার্ষিক অপচয় হচ্ছে ১ দশমিক শূন্য ৭ কোটি টন। মোট অপচয়ের পরিমাণ ১ কোটি ৪৫ লাখ টন, যা আমাদের বার্ষিক উৎপাদনের প্রায় ৩১ শতাংশ। শাকসবজির বেলায় এই অপচয়ের পরিমাণ ক্ষেত্রবিশেষে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘের তথ্যমতে, এই অপচয়কৃত খাদ্য দিয়ে দেশের মানুষকে তিন মাস খাওয়ানো সম্ভব। আরও অবাক হওয়ার মতো তথ্য হচ্ছে, বাংলাদেশে খাবার টেবিলে প্রতিবছর মাথাপিছু ৬৫ কেজি খাবার নষ্ট হয়। যা অনেক উন্নত দেশের চেয়েও বেশি। উদাহরণস্বরূপ যুক্তরাজ্যে মাথাপিছু খাদ্য অপচয়ের পরিমাণ ৫৯ কেজি, জাপানে ৬৪ কেজি, নিউজিল্যান্ডে ৬১ কেজি, আয়ারল্যান্ডে ৫৫ কেজি ও রাশিয়ার ৩৩ কেজি।

আমাদের দেশে গ্রামাঞ্চলে যে খাবার নষ্ট হয় তার কিছু অংশ হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু শহরে নষ্ট হওয়া সব খাদ্য চলে যায় ডাস্টবিনে। এই অপচয় রোধ করা দরকার। এর জন্য জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। ফসল কর্তন ও প্রক্রিয়াকরণে আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার উৎসাহিত করা প্রয়োজন। ফসল সংরক্ষণের আধুনিক পদ্ধতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। দেশের হাটবাজারগুলোর কাছাকাছি কৃষিপণ্যের আধুনিক সংরক্ষণাগার স্থাপন করা প্রয়োজন।

খাদ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি ও অপচয় রোধের সঙ্গে এর গুণগত মানও নিশ্চিত করা দরকার। আমাদের দেশের খাদ্য নিরাপদ কি না, তা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। মূলত খাদ্যশস্য অনিরাপদ হয়ে ওঠে অতিরিক্ত রাসায়নিক ও পোকার ওষুধ ব্যবহারের কারণে। এরপর খাদ্যশস্যের কর্তন, মাড়াই, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেটজাতকরণ, বাজারজাতকরণ ও টেবিলে পরিবেশনের সময়ে খাদ্য অনিরাপদ হয়ে উঠতে পারে। এসব ক্ষেত্রে উত্তম কৃষি কার্যক্রম গ্রহণ করা দরকার। খাদ্যে ভেজাল প্রয়োগকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা থাকা দরকার। নতুবা জনস্বাস্থ্য হুমকিতে পড়বে। কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হবে। দেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে লোকসমাগম কমে যাবে। তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে অর্থনীতি। আমাদের দেশে নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ নামে একটি আইন আছে। তা ছাড়া ইতিমধ্যেই কাজ করে যাচ্ছে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। এর দৃশ্যমান উন্নতি অবলোকন করতে আরও অপেক্ষা করতে হবে।

লেখক: কৃষি অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও শিক্ষাবিদ।


অর্থ পাচার বন্ধ হলেই রিজার্ভের ধস থামবে

প্রতীকী ছবি
আপডেটেড ৭ ডিসেম্বর, ২০২২ ০৯:০২
এম এ খালেক

গত ৩০ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ৭ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার বিক্রি করেছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের গ্রস পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অবশ্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত মানা হলে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভের পরিমাণ হচ্ছে ২৫ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ মোট ৬০০ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি বিক্রি করেছে। এ নিয়ে ১৫ মাসে মোট ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিক্রি করা হয়েছে রিজার্ভ থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ অর্থ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রি করে মূলত স্থানীয় মুদ্রা টাকার অবমূল্যায়ন ঠেকানোর জন্য।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের হিসাবায়ন করে দুইভাবে। এর মধ্যে একটি গ্রস হিসাব এবং অন্যটি নিট হিসাব। রিজার্ভের পরিসংখ্যান প্রকাশকালে এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড গঠনের জন্য ব্যবহৃত ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারসহ লংটার্ম ফান্ড, গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড এবং শ্রীলঙ্কাকে ঋণ হিসাবে দেয়া ২০ কোটি মার্কিন ডলারও অন্তর্ভুক্ত করে দেখানো হয়। কিন্তু আইএমএফ এবং স্থানীয় অধিকাংশ অর্থনীতিবিদের মতে, যে রিজার্ভ অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকের মালিকানায় থাকলেও হাতে বা নিয়ন্ত্রণে নেই তাকে মোট রিজার্ভে অন্তর্ভুক্ত করে দেখানোর কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। রিজার্ভ সেটাই, যা তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহারযোগ্য এবং চাওয়া মাত্রই বের করে দেয়া যায়।

মার্কিন ডলারের সংকটের কারণে গত ১৫ মাস ধরে রিজার্ভের পরিমাণ ক্রমাগত কমছে। ২০২১ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করে গিয়েছিল। সেই অবস্থা থেকে রিজার্ভ ক্রমাগত হ্রাস পেতে পেতে এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে নেমে এসেছে। বর্তমানে প্রতি মাসে গড়ে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার করে রিজার্ভ কমছে। ২০১২-২০১৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ১৫ দশমিক ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে তা ৩৩ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়। ২০২০-২০২১ অর্থবছরে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৪৬ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২১-২০২২ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২১ সালের আগস্ট মাসে রিজার্ভের পরিমাণ ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করে যায়। এটিই ছিল বাংলাদেশের এ যাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ রিজার্ভ। অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রদর্শিত এই রিজার্ভ থেকে ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োজিত রয়েছে তা বাদ দিলে নিট রিজার্ভের পরিমাণ পাওয়া যাবে।

অর্থনীতিবিদগণ মনে করছেন, পণ্য রপ্তানিকালে আন্ডার ইনভয়েসিং এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের উপার্জিত অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে দেশে আসার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি আমদানি পণ্যের ক্ষেত্রে ওভার ইনভয়েসিং করার কারণে রিজার্ভ দ্রুত কমে যাচ্ছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রা বাজারে টাকার অবমূল্যায়ন ঠেকানোর জন্য মাঝে মাঝেই রিজার্ভ থেকে বাজারে মার্কিন ডলার ছাড়ছে। এতে সার্বিকভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সূত্র মতে, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু পণ্যের আমদানি ব্যয় নিরীক্ষা করে তারা দেখেছে, এসব পণ্যের আমদানি ব্যয় প্রকৃত মূল্যের চেয়ে ২০ শতাংশ থেকে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। আমাদের দেশের একটি সাধারণ প্রবণতা হচ্ছে, কোনো রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হলে এবং জাতীয় নির্বাচনের আগের বছর দেশ থেকে অর্থ পাচার বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে মুদ্রা পাচার অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অনেকেই মনে করছেন। আগামী জাতীয় নির্বাচন হবে এ যাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন এবং জটিল নির্বাচন। তাই যারা রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে যা উপার্জন করেছেন তারা এখন তা পাচারে ব্যস্ত রয়েছেন।

অর্থ পাচারকারীদের অপতৎপরতা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে যত ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হোক রিজার্ভের স্ফীতি ধরে রাখা সম্ভব হবে না। দেশ থেকে যে ব্যাপক আকারে অর্থ পাচার হচ্ছে তার কিছু লক্ষণ বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল দায়িত্ব গ্রহণের কিছুদিন পর প্রসঙ্গক্রমে বলেছিলেন, আজ থেকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক টাকাও বাড়বে না। কিন্তু অর্থমন্ত্রী তার অঙ্গীকার রক্ষা করতে পারেননি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের যে পরিমাণ প্রকাশ করে থাকে, প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ তার চেয়ে অনেক বেশি। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের হিসাবের মধ্যে মামলাধীন প্রকল্পের নিকট পাওনা ঋণ, অবলোপনকৃত প্রকল্পের বিপরীতে পাওনা ঋণ এবং পুনঃতফসিলীকৃত প্রকল্পের নিকট পাওনা ঋণাঙ্ক অন্তর্ভুক্ত করে না। আইএমএফের সুপারিশ মোতাবেক যদি খেলাপি ঋণের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরা হয়, তাহলে ব্যাংকিং সেক্টরের খেলাপি ঋণের পরিমাণ অন্তত আড়াই থেকে তিন গুণ বৃদ্ধি পাবে। এই বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশই নানাভাবে বিদেশে পাচার হয়ে গেছে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, খেলাপি ঋণের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের সম্পর্ক কী? খেলাপি ঋণের যে অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে, তা নিশ্চয়ই স্থানীয় মুদ্রায় পাচার হয়নি। এই অর্থ বৈদেশিক মুদ্রায় কনভার্ট করেই তা পাচার করা হয়েছে। এতে রিজার্ভের ওপর টান পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সূত্র মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণের কারণে আমদানি বাবদ খোলা এলসির হার কমেছে ৩৫ শতাংশ। একই সময়ে শিল্পে ব্যবহার্য ক্যাপিটাল মেশিনারিজ, কাঁচামাল এবং মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি ব্যাপকভাবে কমেছে। এর মধ্যে কোনো কোনোটির আমদানি ৭৬ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। শিল্পে ব্যবহার্য এসব উপকরণের আমদানি হ্রাস পেলে ব্যাংক ঋণও আনুপাতিকভাবে হ্রাস পাওয়ার কথা। কিন্তু সেখানে ঘটছে সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা। চলতি মুদ্রানীতিতে ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণ প্রবৃদ্ধির হার প্রাক্কলন করা হয়েছে ১৪ দশমিক ১ শতাংশ। অথচ বাস্তবে ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি এক পর্যায়ে ১৪ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত হয়। ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণ বৃদ্ধির বিপরীতে শিল্পে ব্যবহার্য উপকরণ আমদানি কমে যাওয়ার অর্থই হচ্ছে ব্যাংক ঋণের অর্থ অন্য কোনো খাতে প্রবাহিত হয়েছে।

একটি ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংক থেকে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী ৩০ হাজার কোটি টাকা ঋণের নামে সরিয়ে নিয়েছে। এই অর্থ নিশ্চয়ই ওই শিল্পগোষ্ঠী তাদের সিন্দুকে ভরে রাখেনি। এর একটি বড় অংশই পাচার করা হয়েছে। এই পাচার কার্য বৈদেশিক মুদ্রাতেই সম্পন্ন হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রতিটি খাত সংকুচিত হয়ে পড়েছে। কিন্তু ব্যয়ের খাত ক্রমশ সম্প্রসারিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রা বাজারকে কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে মাঝে মাঝেই বাজারে মার্কিন ডলার ছেড়ে দেয়। এটি মোটেও কাম্য নয়। বরং মুদ্রার বিনিময় হারকে বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়াটাই হবে মঙ্গলজনক। ব্যাংকিং চ্যানেল এবং কার্ব মার্কেটে মুদ্রার বিনিময় হারের পার্থক্য যদি কমে না আসে, তাহলে হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স আসা কোনোভাবেই বন্ধ করা যাবে না। গত এক বছরে ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমতুল্য রেমিট্যান্স দেশে আসেনি, বিদেশেই থেকে গেছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্থানীয় বেনিফিশিয়ারিদের লোকাল কারেন্সিতে এই অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। বাংলাদেশে যেসব বিদেশি নাগরিক অবৈধভাবে কাজ করছেন, তারা প্রতিবছর অন্তত ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশে প্রেরণ করেন। এই অর্থ বৈধ চ্যানেলে পাঠানো হয় না।

বিশ্বব্যাপী উচ্চ মূল্যস্ফীতিজনিত কারণে প্রতিটি দেশেরই আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। আমাদের মতো দেশ উচ্চ মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি অর্থ পাচারের সমস্যা মোকাবিলা করছে। পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণ করে থাকে চীন। সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, চীনের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ হচ্ছে ৩ দশমিক ২৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। জাপানের রিজার্ভ ১ দশমিক ৩১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। ভারতের রিজার্ভের পরিমাণ ৬৩৪ দশমিক ২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রিজার্ভের পরিমাণ হচ্ছে ৩ হাজার ৩৮২ কোটি মার্কিন ডলার। বাংলাদেশ অনেক বছর ধরেই সার্ক দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ধারণ করে চলেছে। সার্ক দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র ভারতই রিজার্ভ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ওপরে অবস্থান করছে। বিভিন্ন দেশের মুদ্রায় রিজার্ভ সংরক্ষণ করা হয়। তবে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি রিজার্ভ সংরক্ষিত হয় মার্কিন ডলারে, যার পরিমাণ ৬ দশমিক ৭৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। এটি বিশ্বের মোট রিজার্ভের ৬১ দশমিক ৮২ শতাংশ। ইউরোপিয়ান একক মুদ্রা ইউরোতে রিজার্ভ সংরক্ষণ করা হয় ২ দশমিক ২১ ট্রিলিয়ন বা মোট বিশ্ব রিজার্ভের ২০ দশমিক ২৪ শতাংশ। জাপানি ইয়েনে রিজার্ভ সংরক্ষণ করা হয় ৫৭২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা মোট বিশ্ব রিজার্ভের ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ। চীনা ইউয়ানে রিজার্ভ সংরক্ষণ করা হয় ২১৩ বিলিয়ন বা ১ দশমিক ৯৫ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংক যদি বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের স্ফীতি অব্যাহত রাখতে চায়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অতিমূল্যায়ন এবং অবমূল্যায়ন (ওভার ইনভয়েসিং এবং আন্ডার ইনভয়েসিং) কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একই সঙ্গে মুদ্রার বিনিময় হারকে বাজারের ওপর ছেড়ে দিতে হবে। অপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। ব্যাংক ঋণের আপার ক্যাপ তুলে দিয়ে বাজারভিত্তিক করতে হবে। এসব কার্যক্রম গ্রহণ করা হলে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের স্ফীতি হ্রাসের যে প্রবণতা প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে তা অনেকটাই রোধ করা সম্ভব হবে।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার, বিডিবিএল ও অর্থনীতিবিষয়ক লেখক।


তৃতীয় ধারার জনগণই বেশি শক্তিশালী

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
এ কে এম শাহনাওয়াজ

অনেক বছর আগের কথা। যখন রাজনীতির নানা পঙ্‌ক্তিমালা সম্পর্কে আমার ধারণা তেমন স্বচ্ছ ছিল না। তখন বিস্মিত হতাম স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনের সময়। প্রার্থীদের পোস্টার দেখে বিস্ময়টি বড় হতো। অমুক ভাইকে চেয়ারম্যান বা মেম্বার পদে ভোট দিন। পোস্টারের নিচে লেখা হতো, ‘প্রচারে নির্বাচনী এলাকার জনগণ’। প্রশ্ন জাগত, নির্বাচনী এলাকার সব ভোটার যদি এই প্রার্থীকেই চায় তাহলে আর প্রচারের প্রয়োজন কি! তিনি তো জিতেই আছেন। পরে দেখি তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রচারেও রয়েছে সব জনগণ। পরে বুঝলাম এভাবে প্রার্থীরা জনগণের নাম ভাঙিয়ে প্রচারণা চালান। বিষয়টি আমার কাছে একধরনের প্রতারণা মনে হতো। এ ধারার এখনো কোনো পরিবর্তন হয়নি।

পাকিস্তান আমলে ষাটের দশকের শুরুর দিকের কথা। প্রথম পর্বটি আব্বার মুখে শোনা। শেষ অধ্যায়ের ছবি কিছুটা নিজের স্মরণে থাকা। আইয়ুব খানের বুনিয়াদি গণতন্ত্রে (বেসিক ডেমোক্রেসি) চলছিল দেশ। এই অদ্ভুত গণতন্ত্র পূর্ব পাকিস্তানে বেশ সমালোচিত। তারপরও এই বুনিয়াদি গণতন্ত্রী তৃণমূলের নেতারা জনগণের জন্য নিবেদিত ছিলেন। আব্বার মামাকে আমরা প্রেসিডেন্ট দাদা নামেই চিনতাম। তার জীবন সায়াহ্নটা আমার দেখা। তিনি ইউনিয়ন বোর্ডের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট (চেয়ারম্যান) ছিলেন। বিক্রমপুরের টঙ্গীবাড়ী উপজেলার কোনো একটি ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি। আজীবন অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রেসিডেন্ট ছিলেন। বিস্তর জমিজমা ছিল তার। সরকারি বরাদ্দের বাইরেও নিজের জমিজমা বিক্রি করে জনগণের দুঃখ ঘোচানোর চেষ্টা করতেন। পরিণতি হিসেবে তিনি তার ছেলেদের জন্য কিছুই রেখে যেতে পারেননি। আমার চাচারা কায়ক্লেশে স্বজনদের সহযোগিতায় বড় হয়েছেন।

এসব শুনে ও দেখে মনে হতো রাজনৈতিক নেতারা ঈশ্বরের বরপুত্র। নানা ত্যাগ স্বীকার করে তারা জনকল্যাণ করতে চান। আবার নির্বাচনের সময় যখন একটি পদের জন্য একাধিক প্রার্থী দাঁড়ান তা দেখে আবেগে চোখের পাতা ভিজে যেত। আহা সমাজের কত মানুষ আছেন যারা জনগণের সেবা করার জন্য স্বেচ্ছায় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

ধীরে ধীরে ধারণা পাল্টে যেতে থাকল। জনবিচ্ছিন্ন, সাধারণ মানুষের খুব আপনজন নন, এমন প্রার্থীরা সবচেয়ে বেশি সামনের সারিতে আসেন নির্বাচনে। ভালোবেসে জনগণ সমর্থন দেবে এই আত্মবিশ্বাস থাকে না বলে জেতার জন্য অর্থ ছড়ান আর পেশিশক্তি ব্যবহার করেন নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে। ক্ষমতা থাকলে প্রশাসনকেও ব্যবহার করেন। এভাবে নির্বাচিত হন তারা। এখনকার প্রার্থীদের বড় অংশ আগে থেকেই জনবিচ্ছিন্ন, নির্বাচনে ‘বিজয়ী’ হওয়ার পরও জনগণের কাছে অধরা হয়ে যান। এসব কারণে এখন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে এমপিদের উল্লেখযোগ্য অংশ নির্বাচনী এলাকা ছেড়ে শহরে বিলাসী জীবনযাপন করতে বেশি পছন্দ করেন। জনপ্রতিনিধির তকমা গলায় ধারণ করে ব্যক্তিগত লাভালাভ নিয়ে অনেকে ব্যস্ত থাকেন। আমার প্রেসিডেন্ট দাদার মতো জননেতারা জনকল্যাণ করে নিঃস্ব হতে পছন্দ করতেন, আর এখনকার জনপ্রতিনিধিদের বড় অংশ ফুলে-ফেঁপে ঢোল হন আর উত্তরাধিকারীদের জন্য বিপুল বিষয়-বৈভব রেখে যান। এখন তো প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর নেতারা ক্ষমতা পেতে আর ধরে রাখতে নিজেদের অবস্থান গৌরব আর ব্যক্তিত্বকে জলাঞ্জলি দিয়ে রাজনৈতিক ঝগড়াকে কৌতুকে পরিণত করছেন।

সম্প্রতি নির্বাচন সামনে বলে রাজনৈতিক ঝগড়া তুঙ্গে। নেতাদের শব্দচয়ন আর কণ্ঠভঙ্গিকে পরিশীলিত বলা যাবে না। হতাশ হয়ে ভাবি, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বিস্ময়কর ত্যাগ স্বীকার করে দেশ স্বাধীন করেছে যে জাতি; দূরদর্শিতা আর অক্লান্ত পরিশ্রম করে অবকাঠামোগত ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন বিশ্ব দরবারে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছেন সেখানে একশ্রেণির নেতা তাদের অপরিশীলিত নিম্নমানের শব্দ প্রয়োগে ঝগড়া করে এবং তা আবার গণমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে নোংরা করছেন দেশের গৌরবময় ক্যানভাস। জনগণের কষ্টে পাশে না দাঁড়ানো মানুষগুলো নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধার জন্য জনগণের নাম ভাঙানোর প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। তাদের প্রতিদিনের বক্তৃতা শুনলে মনে হয়, দেশে এখন তিন ধারার জনগণ রয়েছে। একটি আওয়ামীপন্থি জনগণ, একটি বিএনপিপন্থি জনগণ আর তৃতীয় ধারার আরেকটি জনগণ। ‘জনগণ’ শব্দটি এতকাল অবিভাজ্য থাকলেও নেতারা রাজনৈতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে বিভাজিত করে ফেলছেন প্রতিদিন। এতে সাধারণ মানুষ আগে বিস্মিত হতো,Ñএখন বিরক্ত হয়। ভাষা-ভাষণে এখন নির্বাচনী মাঠ মারদাঙ্গা হয়ে উঠছে যেন। বিএনপি নেতারা যখন বলেন তারা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সরকার পতনের আন্দোলন গড়ে তুলবেন। অথবা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ‘আওয়ামী সন্ত্রাসীদের’ প্রতিরোধ করবেন। তখন মনে হবে দেশের সব জনগণ বিএনপি দলের পেছনে। এসব দেখে এবং শুনে একজন রাজনৈতিক সমালোচক চমকে যেতে পারেন। ভাববেন এ কী করে সম্ভব! যে দল এখনো প্রকাশ্যে তারেক রহমানকে নিজেদের দলনেতা হিসেবে পরিচয় দেয়। যিনি দুর্নীতিগ্রস্ত ও অর্থ পাচারকারী হিসেবে পরিচিত, জঙ্গি ও জামায়াতের পৃষ্ঠপোষকতা করে ক্ষমতার একচ্ছত্র নায়ক হতে চেয়েছেন। যিনি দেশের আদালতে সাজাপ্রাপ্ত আসামি, রাজনীতি না করার মুচলেকা দিয়ে দেশ ত্যাগ করে নিজেকে বাঁচিয়েছেন; তেমন নেতৃত্বের গণ্ডিতে কিসের মোহে আর ভালোবাসায় জনগণ পাশে দাঁড়াবে! তাহলে বোধ হয় এ ধারার জনগণ বিএনপি নেতাদের কল্পিত জনগণের অংশ, দলীয় বৃত্তে বন্দি জনগণ। অন্যদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধগতিতে বিধ্বস্ত মানুষ, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতিতে বিপর্যস্ত তারা, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের কঠিন সময় পার করছে এ দেশবাসী, অঙ্কের হিসাবে দেশের প্রবৃদ্ধির হার বাড়ছে, কিন্তু এর বড় অংশ চলে যাচ্ছে ক্ষমতাবানদের ঝুড়িতে। এমন বাস্তবতায় অবকাঠামোগত উন্নয়নের উদাহরণ বাজারে-বিধ্বস্ত মানুষের কঠিন বস্তুগত জীবনে তেমন প্রভাব ফেলছে না। তাই প্রতিদিনের বক্তৃতা ও দেহ-ভাষায় সরকারি দলের নেতাদের তেমন সপ্রতিভ মনে হচ্ছে না। বিএনপির বিভাগীয় জনসভা দুর্বল করতে অপ্রয়োজনে বারবার পরিবহন মালিকদের দিয়ে পরিবহন ধর্মঘট ডেকে কেন যে আওয়ামী লীগ নেতারা নিজেদের দুর্বলতার প্রকাশ ঘটাচ্ছেন তা আমাদের বোধগম্য নয়। এখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগ নেতারাও জনগণের নাম ভাঙাচ্ছেন। বিএনপি নেতারা যেমন জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সরকার পতনের আন্দোলন করবেন, তাদের ভাষায় আওয়ামী সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করবেন, তেমনি আওয়ামী লীগ নেতাদের জবানীও অনেকটা এক। তারাও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপির সন্ত্রাস ও জ্বালাও-পোড়াওয়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন।

এসব দেখে ১৩ শতকের বাংলার ইতিহাসের একটি বাস্তব চিত্র মনে পড়ল। সেই সময় সবে মুসলমান আক্রমণকারীরা দিল্লি অধিকার করেছে। পত্তন ঘটেছে স্বাধীন সুলতানি শাসনের। দিল্লির সুলতানরা সেনাপতি পাঠিয়েছেন বাংলা জয় করতে। অনেক গভর্নরই বাংলার ক্ষমতায় বসে নিজ সুলতানের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করতেন। সে যুগের নিজেদের শাসন বৈধ বোঝাতে সুলতানরা বাগদাদের খলিফার কাছ থেকে সনদ আনতেন। আর নিজ মুদ্রায় খলিফার নাম ব্যবহার করে জনগণের সমর্থন আদায়ের জন্য প্রচার করতেন। কিন্তু মুশকিল হলো দিল্লির সুলতান ইলতুতমিশ তার নামাঙ্কিত মুদ্রায় খলিফার নাম ব্যবহার করলেও একই সময় বাংলায় তার বিদ্রোহী সেনাপতি গিয়াস উদ্দিন ইওয়াজ খলজি স্বাধীন সুলতান হিসেবে নিজ নামে মুদ্রা প্রচারের সঙ্গে খলিফার নাম ব্যবহার করেন। বাগদাদের খলিফার একই সঙ্গে দিল্লির সুলতান ও তার বিদ্রোহীকে সনদ দেয়ার কথা নয়। তাই গবেষকরা মনে করেন জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য ইওয়াজ খলজি জাল সনদ ব্যবহার করছেন।

এখন আমাদের অবস্থা আরও জটিল। প্রতিদ্বন্দ্বী দুই পক্ষই দাবি করছে জনগণ তাদের পক্ষে আছে। জনগণের পক্ষ কোনটি তা জানার একমাত্র উপায় সহি হ্যাঁ-না ভোট। তেমন কোনো আয়োজন তো এ দেশে হয়নি। তাহলে জনগণের নাম ভাঙাচ্ছেন কোন তথ্যের ভিত্তিতে। জনসভায় লোকসমাগম দেখে কোনো পক্ষেরই আহ্লাদিত হওয়ার কিছু দেখছি না। প্রকৃত জনগণ জানেন, সব পক্ষের জনসভায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কমন জনগণ থাকে। দলগুলোর নেতারা জানেন এসব জনসমাগম ঘটাতে কী পরিমাণ অর্থ ছড়াতে হয়। তার পরও নেতারা জনগণ জপ করেন। আমি বিশ্বাস করি অতি সাধারণ জনগণও এসব বোঝে। তবুও সব পক্ষের নেতা গ্রাম্যতায় ভরা সাতপুরোনো রাজনৈতিক আচরণ থেকে বেরুতে পারছেন না।

আমরা মনে করি তথাকথিত বিএনপির জনগণ ও আওয়ামী লীগের জনগণকে বাদ দিয়ে এ দেশের প্রকৃত জনগণ যারা আছেন তারা বায়বীয় নন বলে তারাই প্রকৃত শক্তিশালী। তারা দলীয় আজ্ঞাবহ নন। নিজেদের বিবেক ও বিবেচনাবোধকে তারা নির্বাসনে পাঠাননি। দেশপ্রেমিকতা তাদের সঠিক পথ দেখায়। কিন্তু কণ্ঠশীলন করা নেতারা এসব জনগণের কাছে যান না, তাদের পাশে দাঁড়ান না। দাম্ভিকতা ও অসততার শক্তি দিয়ে রাজনীতির ঘূর্ণাবর্ত অতিক্রম করতে চান, যা অনেকটাই দুরূহ।

আমাদের মনে হয়, নির্বাচনের ওয়ার্মআপের মাঠে প্রতিদিন খেলাখেলির রাজনীতি জনগণের সামনে এনে নিজেদের খেলো না করে মেধাবী ও গণতান্ত্রিক শব্দ প্রয়োগে একটি আধুনিক ও স্মার্ট দেশের মানুষ হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করুন। আর মাথায় রাখুন একে অন্যকে যতই পেশিশক্তির হুমকি দেন, বেলা শেষে প্রমাণ পাবেন তৃতীয় ধারার এই দেশপ্রেমিক জনগণই প্রকৃত শক্তিশালী।

লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়


বাংলাদেশকে স্বীকৃতি ও ইন্দিরা গান্ধীর বিচক্ষণতা

ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
এম এ মোমেন

প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয় ১৭ এপ্রিল ১৯৭১। এর পরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বীকৃতির জন্য ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দাপ্তরিক পত্র পাঠনো শুরু করে। স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়া বাঙালিদের প্রত্যাশা, অবিলম্বে ভারতের স্বীকৃতির ঘোষণা আসবে এবং ভারতকে অনুসরণ করে অন্যান্য দেশও স্বীকৃতি দেবে। অবিলম্বে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার দাবি ভারতের অনেকগুলো রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন তুলল। বড় মাপের নেতাদের মধ্যে জয়প্রকাশ নারায়ণ ভারত সরকারের ওপর রীতিমতো চাপ দিতে থাকেন।

১৯৭১-এর ৭ মে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বিরোধীদলীয় নেতাদের সঙ্গে বাংলাদেশ পরিস্থিতি ও ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক নিয়ে বৈঠকে বসেছিলেন। সে সময় বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের পক্ষে যেসব রাজনৈতিক দল দাবি জানায় তার মধ্যে রয়েছে সিপিএম, সিপিআই, ডিএমকে, জনসংঘ, আদি কংগ্রেস, পিএসপি, এসএসসি ও আরএসপি। ইন্দিরা গান্ধীর নিজের দল কংগ্রেসেরও একটি উল্লেখযোগ্য অংশ স্বীকৃতির পক্ষে ছিল।

আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মেলন করে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের দাবি জানায় একটি ভারতীয় মজদুর সংগঠন। আসামের কামরূপ-কামাখ্যা জেলার পাণ্ডুতে অনুষ্ঠিত সভায় কাউন্সিল নির্দোষ স্বাধীনতাকামী জনগণের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরতা ও হত্যাযজ্ঞের নিন্দা করে। এ ধরনের চাপ তখন ক্ষমতাসীন দল কংগ্রেসের ভেতর ও বাইরে থেকে ছিল। পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তার সরকারের শ্রেষ্ঠ মেধাবীদের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন ডি পি ধর, পি এন হাকসার, রামনাথ কাও প্রমুখ।

নীল শাড়ি এবং পূর্ণ হাতার ব্লাউজ পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পশ্চিমবঙ্গে শরণার্থী শিবির পরিদর্শনে প্রথম এলেন একাত্তরের মে মাসে। এ সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দেয়া নিয়ে তিনি সাংবাদিকদেরও বিভিন্ন প্রশ্নের মুখোমুখি হন। দমদম বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের কাছে স্পষ্ট করে তিনি বলেন, এ মুহূর্তে বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি প্রদান কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য আশু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। তিনি বলেন, এ প্রশ্নের মুখোমুখি অনেকবারই তাকে হতে হয়েছে। কিন্তু তিনি সব সময়ই মনে করেছেন, ভারতের একটি নিজস্ব নীতি রয়েছে, সেই নীতির আলোকে বিভিন্ন বিষয়ে কী করণীয় তা নির্ধারণের জন্য অন্য কারও ওপর নির্ভর করতে হয় না।

দমদম থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং তার সঙ্গীরা হেলিকপ্টারে বনগাঁ যান। অন্য একটি হেলিকপ্টারে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রীরা তাদের অনুসরণ করেন। সাড়ে ৫টার কিছু পর তারা দমদম ফিরে আসেন। শরণার্থী শিবির দেখে তার কী প্রতিক্রিয়া হয়েছে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, সমস্যা অনেক বড়, কেমন করে এর সমাধান করা হবে তা বের করাও আমাদের জন্য কঠিন কাজ। আমাদের সম্পদের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রয়োজনীয় সামগ্রীরও অভাব রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার ভালো কাজই করে যাচ্ছে।

ইন্দিরা বলেন, ‘যারা দেশ ছেড়ে এখানে এসে শরণার্থী হয়েছে যত শিগগির সম্ভব তাদের নিজ দেশে ফিরে যেতে হবে।’ কিন্তু কত তাড়াতাড়ি তা সম্ভব হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা আমার জানা নেই।’ তবে তিনি আশা করেন আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ দেশত্যাগী এই মানুষদের দেশে ফেরার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে। বাংলাদেশে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এসেছে পাকিস্তান সরকারের এই দাবি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘দেশ থেকে মানুষ বের করে দিয়ে স্বাভাবিক অবস্থার দাবি করা স্বাভাবিক মানসিকতার পরিচায়ক নয়।’

সীমান্ত এলাকা থেকে শরণার্থীদের সরিয়ে আনার ব্যাপারে ইউনিয়ন গভর্নমেন্টের প্রস্তাব নিয়ে গান্ধী বলেন, ‘ত্রিপুরা খুব ছোট রাজ্য। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে শরণার্থীদের স্থানসংকুলান করার বিষয়টি বিবেচনাধীন আছে।’ তবে তা কতটা সম্ভব হবে এখনই তিনি নিশ্চিত নন। বাংলাদেশের মুক্তিফৌজকে অস্ত্র সরবরাহ করার জন্য জনতার বিভিন্ন অংশ এবং রাজনৈতিক দলের দাবি প্রসঙ্গে গান্ধী বলেন, ‘নো কমেন্ট’। (বিবরণটি ভারতীয় পত্রিকা স্টেটসম্যান থেকে নেয়া)।

কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী মনে করেছেন এবং যথার্থই মনে করেছেন, তখনই স্বীকৃতি প্রদান করলে বাংলাদেশ এমন কোনো স্বার্থোদ্ধার করতে পারত না। পরিস্থিতি সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের অনুকূলে আনার সুযোগ সৃষ্টি করার পর ভারত ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। একাত্তরের যুদ্ধের তৃতীয় দিন ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। যুক্তিসম্মত আলোচনায় এটা প্রতিষ্ঠিত হবে যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সঠিক সময়েই স্বীকৃতির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যখন পাকিস্তানের পরাজয় ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র।

৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে লেখা ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর চিঠি।

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী,

হিজ এক্সিলেন্সি, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং আপনি ৪ ডিসেম্বর যে বার্তাটি পাঠিয়েছেন, তা আমাকে এবং ভারত সরকারে আমার সহকর্মীদের বিশেষভাবে স্পর্শ করেছে। বার্তাটি পাওয়ার পর আপনারা যেভাবে আত্মনিবেদিত হয়ে বাংলাদেশকে পরিচালনা করছেন, সেই দেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি ভারত সরকার পুনরায় বিবেচনা করে।

আমি হৃষ্টচিত্তে আপনাকে জানাতে চাই, বর্তমানে যে অবস্থা বিরাজ করছে নিশ্চয়ই তার আলোকে ভারত সরকার স্বীকৃতি প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আজ সকালে এ বিষয়ে আমি আমাদের সংসদে একটি বিবৃতি দিয়েছি। বিবৃতির অনুলিপি সংযুক্ত করছি।

বাংলাদেশের মানুষকে অনেক ভুগতে হয়েছে। আপনার তরুণ ছেলেরা স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য আত্মবলিদানের সংগ্রামে লিপ্ত। ভারতের জনগণও একই আদর্শের প্রতিরক্ষায় লড়ে যাচ্ছে। আমার কোনো সন্দেহ নেই যে, এই শ্রেষ্ঠতম উদ্যোগ এবং আত্মদান ভালো কাজের জন্য আমাদের আত্মনিবেদনকে আরও শক্তিশালী করবে এবং দুই দেশের জনগণের বন্ধুত্ব অক্ষুণ্ন রাখবে। যাই হোক, পথ যত দীর্ঘই হোক, আত্মদান যত বেশিই হোক, আমাদের দুই দেশের মানুষের ভবিষ্যতে ডাক পড়বে, আমি নিশ্চিত আমরা বিজয়ীই হব।

ব্যক্তিগতভাবে আপনাকে, আপনার সহকর্মীদের এবং বাংলাদেশের বীর জনতাকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানানোর সুযোগ নিচ্ছি।

আপনার মাধ্যমে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিজ এক্সিলেন্সি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে আমার সর্বোচ্চ সম্মানের নিশ্চয়তা জ্ঞাপন করবেন।

আপনার একান্ত

(স্বাক্ষরিত)

ইন্দিরা গান্ধী

হিজ এক্সিলেন্সি মিস্টার তাজউদ্দীন আহমদ

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী

মুজিবনগর।

(বিদেশির চোখে ১৯৭১, নালন্দা ২০১২ সালে প্রকাশিত গ্রন্থ থেকে)

ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পাকিস্তানের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করছিল। একজন বিদেশি পর্যবেক্ষক বললেন, ‘ভারতীয় মন্ত্রিপরিষদকে মার্চের শেষে সেনা ও গোয়েন্দা সংস্থার পরামর্শ ছিল- ভারত পূর্ব বাংলার আশু সামরিক হস্তক্ষেপের জন্য এখনো প্রস্তুত নয়। বাঙালিদের সামরিক সাহায্য করতে হলে তাদের আরও কিছু অপেক্ষায় থাকতে হবে। ভারত কৌশলগত কারণেই সে অপেক্ষা করেছে।

এয়ার মার্শাল কপিল কাক লিখেছেন: ১৯৭১-এ সাফল্যের প্রশংসাপ্রাপ্য ইন্দিরা গান্ধীরই। তিনিই ‘মাস্টার স্ট্রাটেজিস্ট’। তিনি তার সশস্ত্র বাহিনীর ওপর বিশ্বাস রেখেছেন এবং তাদের লড়াই করার স্বাধীনতা দিয়েছেন। এই যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট, পরিকল্পনায় ছিল পেশাদারিত্ব, তিন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় ছিল অনবদ্য। তিনি স্বীকৃতিও এমন সময় দিয়েছেন যা তাকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্নের মুখোমুখি করবে না।

ভারত ও ভুটান একই দিন ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলেও ভূটানের ঘোষণাটি ভারতের কয়েক ঘণ্টা আগের। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিবই এ ঘোষণা দিয়েছেন। কয়েক ঘণ্টা আগে তা নিশ্চিত না করলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি থেকে এটা উঠে এসেছে যে বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদাতা প্রথম দেশ হচ্ছে ভুটান। এ সম্মান ভুটান অবশ্যই পেতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সে সময় ভারত স্বীকৃতি না দিলে এবং ভারতীয় পরামর্শ না পেলে কি ভুটান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবার মতো সাহসিকতা দেখাতে পারত? অবশ্যই না। এটাকে বরং ভারতীয় কর্মকৌশলের একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করাই অধিকতর যুক্তিসঙ্গত। ভারতই চেয়েছে সে সময় ভারতের অনুগত ভুটানকে দিয়ে প্রথম স্বীকৃতি দেয়াবে, তাই হয়েছে। অবশ্য নয়াদিল্লি থেকে ডেনজিল পিরিসের ক্রিশ্চিয়ান সাায়েন্স মনিটরের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়া দ্বিতীয় দেশ ভুটান। এই রিপোর্টে আরও বলা হয়, ভারত বাংলাদেশের জন্য স্বীকৃতি আদায়ে বার্মা, আফগানিস্তানসহ তার মিত্র অনেক দেশের ওপর চাপ দিচ্ছে।

একাত্তরের ডিসেম্বরে ভারত ও ভুটান ছাড়া অন্য কোনো দেশ এমনকি ১৬ ডিসেম্বরের পরও স্বীকৃতি দেয়নি। পরবর্তী স্বীকৃতি এসেছে ১২ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে। সেদিন সোভিয়েত ব্লকের দুটি ইউরোপীয় দেশ পোল্যান্ড ও বুলগেরিয়া বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন আরও অপেক্ষা করে।

পরদিন ১৩ জানুয়ারি বার্মা (এখন মিয়ানমার) স্বীকৃতি দেয়। অত্যন্ত সহজ বিশ্লেষণ- সে সময় বার্মা চীনের প্রভাবের অজ্ঞাবহ হয়ে ওঠেনি। স্বাধীনভাবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে ধরে নেয়া যায়। তখনকার জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্ট ছিলেন বার্মার নাগরিক এবং শুরু থেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন।

১৫ জানুয়ারি ১৯৭২ স্বীকৃতি দেয় নেপাল, ২০ জানুয়ারি বার্বাডোজ, ২২ জানুয়ারি যুগোস্লাভিয়া, ২৪ জানুয়ারি সোভিয়েত ইউনিয়ন। ২৫ জানুয়ারি স্বীকৃতি দেয় টোঙ্গা। ২৬ জানুয়ারি স্বীকৃতি দেয় চেকোস্লোভাকিয়া, সাইপ্রাস, হাঙ্গেরি, অস্ট্রেলিয়া, ফিজি ও নিউজিল্যান্ড।

লেখক: কলামিস্ট ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তা


নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান ও সময়ের রাজনীতি

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
নাজমুল হক প্রধান

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমাদের স্লোগান ছিল গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা। এর মধ্যে পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সব বদলে গেল। রাজনীতিতে বহুদলীয় গণতন্ত্রের সুযোগ নিয়ে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির জায়গা হলো। মুক্তিযুদ্ধের পর যে রাজনৈতিক দলগুলো নিষিদ্ধ ছিল, সেই দলগুলোও রাজনীতি করার সুযোগ পেল। শাহ আজিজের মতো একজন মানুষ তখন প্রধানমন্ত্রী হলেন। এরই মধ্যে আবার জিয়াউর রহমান নিহত হলেন।

অবৈধভাবে ক্ষমতায় এলেন এরশাদ। এরশাদ আসার পর তখন যারা ক্ষমতায় ছিলেন, সেই দলের ১৩০ সংসদ সদস্য এরশাদকে সমর্থন দিলেন। আমরা ছাত্রসমাজ ভাবলাম, এর বিরুদ্ধে কথা বলা দরকার। কিন্তু তখন আবার এমন নির্দেশনা বহাল ছিল যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে একত্রে পাঁচজনের বেশি কথা বলা যাবে না, হাঁটা যাবে না।

প্রথমে ১৪ বা ১৭টি ছাত্রসংগঠন ছিল। সবার মাঝেই তখন কীভাবে এরশাদবিরোধী কথা শুরু করা যায়, এই নিয়ে একটা আলোচনা ছিল। আমি তখন ছিলাম ছাত্রলীগের (জাসদ) প্রচার সম্পাদক। বুয়েটের এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হলো, ১৯৮২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর আমরা তৎকালীন মজিদ খানের শিক্ষানীতি নিয়ে একটি বিবৃতি দেব। বিশ্ববিদ্যালয়ে একত্রে অনেকে মিলে হাঁটব। আমরা ঠিক তা-ই করলাম।

তখনো বিভিন্ন দেশে সামরিক শাসন ছিল। আনোয়ার ভাই (??) আমাকে বললেন, ‘কাল সকালেই আমরা এই সামরিক শাসন নিয়ে একটা পোস্টার প্রদর্শনী করতে চাই। আপনি আর কাবুল জানবেন, আর কেউ নয়।’ কাবুল পড়ত ইতিহাস বিভাগে। কাবুল আমাকে জানাল, আমরা সকাল ৭টার মধ্যেই সব কাগজপত্র নিয়ে তৈরি থাকব। সকাল ৮টায় তো আমাদের ক্লাস শুরু, এর আগেই আমরা পোস্টার প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করে ফেলব।

সকালে গিয়ে দেখি, বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্টস ফ্যাকাল্টির ভেতরে পুলিশ। কাবুল তখন লাইব্রেরির পাশে ঘুর ঘুর করছে। আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল, এই পরিস্থিতিতে কী করা যায়। আমি বললাম, চলো, দেখি কী করা যায়। গিয়ে পুলিশদের বললাম, আপনারা এখানে কেন? আপনাদের দায়িত্ব তো বাইরে, এখানে কী করছেন? আমাদের ক্লাস করতে দেন। তখন পুলিশ কী মনে করে আস্তে আস্তে বেরিয়ে গেল।

এর ফাঁকেই আমরা দেয়ালজুড়ে পোস্টার লাগিয়ে দিই। প্রতিক্রিয়া এমন হলো, শিক্ষার্থীরা বোধহয় এমন দৃশ্য আগে দেখেনি। তাদের সঙ্গে সঙ্গে আমরাও দাঁড়িয়ে দেখছি, মনে হয় পাঁচ মিনিট হলো। প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থীর দেখা হয়ে গেল। পরক্ষণেই পুলিশ এসে সব পোস্টার ছিঁড়ে ফেলল। পরে নেতারা এলেন। বিভিন্ন বিষয়ে কথা হলো। আমরা পুরো ক্যাম্পাসে হাঁটলাম। এই হলো আন্দোলনের সূত্রপাত।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন করার কোনো এক বছরের ৭ নভেম্বর আমরা কর্নেল তাহের দিবস পালন করি। এ দিন মিছিল করার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমরা মিছিল শুরু করে দিলাম। মধুর ক্যানটিন থেকে বেরিয়ে আমরা ডাকসু পর্যন্ত যেতে না যেতেই পুলিশের হামলা। চলল প্রায় পাঁচ ঘণ্টা। আমি, নুরুল আমিন ব্যাপারীসহ অনেকেই আহত হলাম। এভাবেই শুরু হলো আন্দোলন।

এর মধ্যেই আমি ছাত্রলীগের (জাসদ) কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পেলাম। সে সময় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এরশাদের স্বৈরাচারী সরকারকে পতন ঘটানোর আন্দোলনে মতদ্বৈধতা ছিল। এই সুযোগটা এরশাদ ব্যবহার করছিলেন। সে কারণে এই স্বৈরাচার সরকারের পক্ষে ১৯৮৬ এবং ১৯৮৮ সালের দুটি নির্বাচন করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু আমরা কয়েকটি ছাত্র সংগঠনের নেতারা এরশাদের পতনের জন্য কার্যকরী ছাত্র আন্দোলন গড়ে তুলতে চেয়েছিলাম। এ সময় এরশাদবিরোধী আন্দোলন অনেকটা ঝুলে গিয়েছিল। আমরা তখন মনে করেছিলাম এই আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি আনতে গেলে গোটা ছাত্রসমাজকে এক জায়গায় আনতে হবে। একই সঙ্গে জাতীয় নেতৃবৃন্দকেও এক জায়গায় আনতে হবে। এ সময় আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে আমি, তৎকালীন জাতীয় ছাত্রলীগের সভাপতি জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকু, ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল এবং ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি নূর আহমেদ বকুল নিজেদের মধ্যে একটি বৈঠক করি। আমরা তখন মনে করতাম, আন্দোলন করতে গেলে রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে হয়। তখন এরশাদবিরোধী প্রধান দুই রাজনৈতিক নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মধ্যে মতদ্বৈধতা চরমে পৌঁছে গিয়েছিল। এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা এবং না করা নিয়ে বিতর্কটা চরমে পৌঁছে গিয়েছিল। তখন আমরা ছাত্রনেতারা চিন্তা করছিলাম, কীভাবে ছাত্রদের একটা মঞ্চে আনা যায়।

এর মধ্যে বাসের ভাড়া বৃদ্ধির সরকারি সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। তখন বাবুল, টিংকু, বকুল, মোস্তফা ফারুক আর আমি একসঙ্গে বৈঠক করে বাস ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে একটি বিবৃতি দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম। এই বিবৃতিতে ডাকসুর ভিপি-জিএস হিসেবে ছাত্রদলের নেতাদের স্বাক্ষর নেয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এই বিবৃতিতে স্বাক্ষর করতে চাইছিলেন না। এই সংগঠনের তৎকালীন সভাপতি হাবিবুর রহমান হাবিব আমাকে জানালেন, ছাত্রদলের সঙ্গে কোনোভাবেই একসঙ্গে বিবৃতি বা আন্দোলন না করার নির্দেশনা দিয়েছেন শেখ হাসিনা। আমাদের এক ধরনের অনুরোধের চাপাচাপিতে শেষ পর্যন্ত তিনি সই দিলেও ছাত্রলীগের সেই সময়ের সাধারণ সম্পাদক অসীম কুমার উকিল যৌথ আন্দোলনের ব্যাপারে সায় দিতে গড়িমসি করছিলেন।

এর মধ্যে ১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে সচিবালয় অবরোধ কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে মারা যান ছাত্রনেতা খন্দকার নাজির উদ্দিন জেহাদ। তিনি ছাত্রদলের রাজনীতি করতেন। পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী সেই দিন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ৮ দল, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৭ দল এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) নেতৃত্বাধীন ৫ দলসহ অন্যান্য দলের আহ্বানে ঢাকায় সচিবালয় অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়।

এই অবরোধ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের জন্য জেহাদ উল্লাপাড়া থেকে ৬০ জন ছাত্র নিয়ে ঢাকায় আসেন এবং অবস্থা্ন কর্মসূচিতে যোগ দেন। সচিবালয়ের চারপাশে পুলিশ অবস্থান নেয়। পুলিশ অবরোধকারীদের ওপর গুলি চালালে ‘দৈনিক বাংলা’র মোড়ে বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে জেহাদ মারা যান।

বিক্ষুব্ধ জনতার সঙ্গে সংঘর্ষে পুলিশ লাঠিপেটা, কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার ও গুলি বর্ষণ করে। সংঘর্ষে অন্তত ৩০০ লোক আহত হয়। ৪৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গুলিতে নিহত জেহাদের লাশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে আসার পর গোটা ক্যাম্পাস প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটের মধ্যে ডাকসুসহ ২২টি ছাত্র সংগঠন একত্রিত হয়ে ‘সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য’ গঠন করে। ছাত্রঐক্য জেহাদের লাশ নিয়ে মিছিল করে।

সেই মিছিলের নেতৃত্বে আমার সঙ্গে ছিলেন ছাত্রদলের তৎকালীন ডাকসুর সহসভাপতি আমানউল্লাহ আমান, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি হাবিবুর রহমান হাবিব, ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক খায়রুল কবির খোকন, ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি নূর আহমেদ বকুলসহ অনেকে।

জেহাদের লাশ দেখতে যান শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া। তাতে ছাত্ররা আরও উৎসাহিত হন। বিকেলে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে ছাত্রঐক্য পরিষদ এক সমাবেশে তাদের পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করেন। সন্ধ্যায় ছাত্রঐক্যের এক বিরাট মিছিল বের হয়। শিশুপার্কের কাছে পুলিশের হামলায় আমরা বেশ কয়েকজন ছাত্রনেতা আহত হই।

১০ অক্টোবরের ঘটনার প্রতিবাদে পরদিন ১১ অক্টোবর ছাত্রঐক্যের ডাকে অর্ধদিবস হরতাল পালিত হয়। হরতাল চলাকালে ঢাকা ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের সঙ্গে ছাত্রদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। ১৫ জন ছাত্রনেতাসহ শতাধিক ছাত্র আহত হন। এভাবে এরশাদবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদসহ (স্কপ) বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন আন্দোলনে যুক্ত হয়। এই গতিশীলতা এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ১৫ দল, ৭ দল এবং ৫ দলের রাজনৈতিক জোটের নেতৃত্বকে এক জায়গায় আনতে পারে। এর মধ্যে ১৯৯০-এর ২৭ নভেম্বর বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) তৎকালীন যুগ্ম মহাসচিব ডা. শামসুল আলম খান মিলন নিহত হন। আন্দোলনের গতি আরও অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। এরশাদ সরকার কারফিউ জারি করে। কিন্তু ছাত্ররা সেই কারফিউ না মেনে রাস্তায় নেমে আসতে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক জায়গায় কারফিউ ভেঙে মিছিল বের করে ছাত্ররা। অবশেষে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতন ঘটে।

আমাদের আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল, অবৈধ সামরিক শাসনের অবসান ও বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের ধারায় নিয়ে যাওয়া। ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, ক্ষমতায় যেতে বা টিকে থাকতে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল নব্বইয়ের মূল লক্ষ্য, দর্শন বা আদর্শ থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। বিএনপি যেমন একদিকে ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক দলকে সঙ্গে নিয়ে ক্ষমতায় গিয়েছে, তেমনি অপর দিকে আওয়ামী লীগও স্বৈরচারী এরশাদের নেতৃত্বাধীন দলের সঙ্গে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য জোট করেছে। এভাবেই ’৯০-এর গণ-আন্দোলনের মূল চেতনাকে পরিত্যাগ করা হয়েছে। অবশ্য এর মধ্যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে। বিচার হয়েছে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের। কিন্তু স্বৈরাচারী এরশাদের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঐক্য কখনোই সমীচীন ছিল না। রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দেয়া কখনো শুভ ফল বয়ে আনতে পারে না। আর এখন ছাত্ররাজনীতির স্বকীয়তাকেও গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে। ছাত্ররা ক্ষমতাসীনদের লাঠিয়ালে পরিণত হয়েছে।

লেখক: বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য

বিষয়:

দৈনিক পাকিস্তান সরকারি পত্রিকা হলেও ৭১ সালে ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়

অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান।
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
প্রতিবেদক, দৈনিক বাংলা
    অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের সাক্ষাৎকার

অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক। তিনি কথা বলেছেন ১৯৭১ সালের দৈনিক পাকিস্তান (পরে দৈনিক বাংলা) এবং ওই সময়ে নিজের জীবনের আলোচিত অধ্যায় নিয়ে। তার এ সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রাহাত মিনহাজ

রাহাত মিনহাজ: আপনি দৈনিক পাকিস্তানে কবে যোগ দিলেন?

সাখাওয়াত আলী খান: ১৯৭১ সালে বায়তুল মোকাররমের পূর্ব পাশে বর্তমান দৈনিক বাংলা মোড়েই ছিল পত্রিকার অফিস। দৈনিক পাকিস্তান ১৯৬৪ সালের নভেম্বরে যাত্রা শুরু করেছিল। ১৯৬৫ সালের ৫ জানুয়ারি আমি দৈনিক পাকিস্তানে জয়েন করেছিলাম। তখন পত্রিকা অফিস ছিল মদনমোহন বসাক রোডে। যেটির বর্তমান নাম টিপু সুলতান রোড। সেখানে একটি ভাড়া বাড়িতে ছিল অফিস। পরবর্তী সময়ে নতুন ভবন নির্মাণ হলে দৈনিক বাংলা মোড়ে অফিস চলে আসে।

রাহাত মিনহাজ: দৈনিক পাকিস্তান অফিস ১৯৬৯ সালে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। অনেক সাক্ষাৎকারে আপনি মজা করে বলেছিলেন এই আগুন দেয়ার কাজে আপনি নিজেও হাত লাগিয়েছিলেন।

সাখাওয়াত আলী খান: দৈনিক পাকিস্তান অফিস আর মর্নিং নিউজ অফিস ১৯৬৯-এর ২৪ জানুয়ারি গণ-অভ্যুত্থানের সময় বিক্ষুব্ধ মানুষ পুড়িয়ে দিয়েছিল। মূলত সরকারি পত্রিকা হিসেবে পুড়িয়ে দেয়া হলো। যদিও দৈনিক পাকিস্তান তখন সাংঘাতিক কোনো রোল (ভূমিকা) পালন করত না। মানুষের ক্ষোভ ছিল মর্নিং নিউজের ওপর। ২০ জানুয়ারি আসাদ নিহত হওয়ার পর মর্নিং নিউজে কোনো সম্পাদকীয় প্রকাশ হয়নি। এ ছাড়া সামগ্রিকভাবে সংবাদপত্রটির ভূমিকা ছিল গণবিরোধী। মনিং নিউজ ও দৈনিক পাকিস্তান একই ভবনে ছিল। মূলত আন্দোলনকারীরা আগুন দেয় মনিং নিউজে, সঙ্গে পুড়ে যায় দৈনিক পাকিস্তান।

দৈনিক পাকিস্তানের ভূমিকা ইতিবাচকই ছিল। তখন সব পত্রিকা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিস্তারিত সংবাদ প্রকাশ করছিল। এ বিষয়গুলো মানুষ বিশ্বাস করছিল। মানুষ মনে করছিল শেখ মুজিব যদি ষড়যন্ত্র করেও থাকেন তাহলে ভালো কাজ করেছেন। সে সময় যেসব রিপোর্টার এসব ছেপেছেন, তাদের সবাই ছিলেন আইয়ুব খান ও মোনায়েম খানবিরোধী। ফয়েজ আহমেদ ভাই অন্যতম। তার ভূমিকা ছিল অসাধারণ। এখানে সরকারের একটি সিদ্ধান্ত বুমেরাং হয়েছিল। শেখ মুজিবুর রহমানকে দেশদ্রোহী প্রমাণ করার জন্য সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ডিটেইলস ছাপার বিষয়টি অনুমোদন করেছিল। কিন্তু রেজাল্ট হলো উল্টো। মানুষ আরও বেশি ক্ষেপে গেল।

ওই দিন আমার ডিউটি ছিল। আমি অফিসের সামনে গিয়ে দেখি আগুন জ্বলছে। সামনে উত্তেজিত অনেক মানুষ। তারাই আগুন লাগিয়েছিল। তারা তো আমাকে চেনে না। আমাকে বলল, ভাই আপনিও একটু হাত লাগান! আমি তখন মনে মনে বলি, আমার পত্রিকা অফিস আমি পুড়িয়ে দেব। আমিও হাত লাগালাম। আমার সামনেই পুরো অফিস দাউ দাউ করে জ্বলে গেল।

রাহাত মিনহাজ: দৈনিক পাকিস্তানে আপনি কোন দায়িত্বে ছিলেন?

সাখাওয়াত আলী খান: দৈনিক পাকিস্তানে আমি সিনিয়র সাব-এডিটর হিসেবে ছিলাম। মূলত সিনিয়র শিফট ইনচার্জ হিসেবে আমি কাজ করতাম। রাতের শিফটেই আমার বেশি ডিউটি থাকত। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ আমি ঢাকা থেকে চলে যেতে বাধ্য হই।

রাহাত মিনহাজ: একটু পেছন দিকে আসতে চাই। খুব সম্ভবত ১ মার্চের পর থেকেই সংবাদপত্রে কী ছাপা হবে, সে বিষয়ে একটি বড় পরিবর্তন এসেছিল।

সাখাওয়াত আলী খান: ওই সময়টায় প্রেস ট্রাস্টের যারা মালিক ছিলেন, তারা সংবাদপত্রটির কাছেই ভিড়তেই পারতেন না। পত্রিকার নামটি দৈনিক পাকিস্তান ছিল বটে, কিন্তু সেখানে যারা কাজ করতেন অনেক গুণী মানুষ। তারা বাংলাদেশের স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন। তখন দৈনিক পাকিস্তানে কাজ করতেন আবুল কালাম শামসুদ্দিন, হাসান হাফিজুর রহমান, তোয়াব খান, এহতেশাম হায়দার চৌধুরি, ফওজুল করিম, শামসুর রাহমান, আহসান হাবীব, সানাউল্লাহ নূরী, আহমেদ হুমায়ূন, নির্মল সেন, খন্দকার আলী আশরাফ, সৈয়দ কামাল উদ্দীনসহ আরও অনেকেই। মার্চের আগের দিকে ফার্স্ট এবং সেকেন্ড লিডে কোনো রকমে মোনায়েম খান, আইয়ুব খানের নামে দিয়ে বাকি সব নিউজে পশ্চিম পাকিস্তানিদের অভিলাষ ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে লেখালেখিতে ভর্তি ইত্যাদি থাকত। ঠিক এ কারণেই দৈনিক পাকিস্তান ন্যাশনাল প্রেস ট্রাস্টের মালিকানার পত্রিকা হয়েও বিরাট সার্কুলেশন পেয়েছিল।

রাহাত মিনহাজ: বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ সম্পর্কে একটু জানতে চাই। আপনি এ ভাষণটি কীভাবে শুনেছিলেন?

সাখাওয়াত আলী খান: বঙ্গবন্ধুর ভাষণের দিন আমি রেসকোর্সের মাঠে ছিলাম। আমি অনেকটা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম যদি লেখার মতো কিছু পাই, তবে লিখে ফেলব। আর্ট কলেজের (চারুকলা ইনস্টিটিউট) গেট দিয়ে আমি মাঠে ঢুকেছিলাম। ওই সময় রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে) কিছু ছোট টিলা ছিল। তার ওপরে কিছু ঘরও ছিল। ছিল বারান্দা। সেসব ঘরে সেদিন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অফিসাররা বসে ছিলেন। আমি পরিষ্কারভাবে তাদের দেখেছি। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ দেয়ার সময় আমাদের মাথার ওপর দিয়ে আর্মির বড় বড় হেলিকপ্টার উড়ছিল। বর্তমানে যেখানে ফুলের দোকানগুলো, সেখানে সে সময় আমি সারি সারি আর্মির ট্রাক দাঁড় করানো অবস্থায় দেখেছি। পাশেই ছিল মূল রেডিও অফিস (বর্তমান বঙ্গবন্ধু মেডিকেল) পরে জেনেছি, পাক বাহিনী রেডিও অফিসে ঢুকে বন্দুকের নল ধরে বলেছিল, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার করা যাবে না। তখন রেডিও অফিস আর প্রচার করতে পারেনি। কিন্তু রেডিও পরদিন বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার করেছিল এবং সেটি একাধিকবার প্রচার করেছিল।

রাহাত মিনহাজ: ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে আপনার আর অন্য কোনো মূল্যায়ন বা স্মৃতি আছে?

সাখাওয়াত আলী খান: পুরো ভাষণে বঙ্গবন্ধুর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ছিল দেখার মতো। বঙ্গবন্ধু কীভাবে উচ্চারণ করেছিলেন, তর্জনী তুলেছিলেন এগুলো আমার স্পষ্ট মনে আছে। বঙ্গবন্ধু শুরু করার আগেও রেডিওতে ঘোষণা চলছিল। যখন একজন অ্যাংকর বললেন, এখন সরাসরি ভাষণ দেবেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ঠিক সেই মুহূর্তে যখন ভাষণ শুরু হবে, ঠিক সেই সময়েই রেডিও একেবারে অফ হয়ে গেল। কোনো কথা নাই বার্তা নাই, একবারে অফ। পরে বোধহয় কিছু গানবাজনা অথবা কোরআন তেলাওয়াত শুরু হয়েছিল।

রাহাত মিনহাজ: ৭ মার্চে যখন বঙ্গবন্ধু ভাষণ দিলেন, অনেক পত্রিকাই পরের দিন বঙ্গবন্ধুর বড় ছবি ছাপল, ট্রেডমার্ক তর্জনীর ছবি ছাপল। ইত্তেফাক একটি ডিফেন্সিভ শিরোনাম করল, পরিষদে যাইবার পারি যদি...।

সাখাওয়াত আলী খান: ইত্তেফাকের ওমন শিরোনাম করার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তখনো এমন একটি পরিস্থিতি ছিল যে পাকিস্তান যদি টিকে যায়! টিকে যেতেও পারে। এখানে মানিক মিয়ার কথা একটু বলতে হয়। ছয় দফা আন্দোলনে মানিক মিয়া প্রথম দিকে অতটা সাপোর্ট দেননি। তবে পরের দিকে পুরোপুরি সাপোর্ট দিয়েছিলেন। ওই সময় ইত্তেফাকের সাপোর্টটি খুব জরুরি ছিল। ১৯৬৯ সালে মানিক মিয়া মারা গেলেন। তিনি তো মুক্তিযুদ্ধ কিংবা স্বাধীন বাংলাদেশ দেখে যেতে পারলেন না। পরে অন্যরা দায়িত্বে এলেন। তাদের আলাদা চিন্তা ছিল। সে জন্যই হয়তো ওই রকম হেডলাইন ছিল ‘গণপরিষদে যাইবার পারি যদি...’।

রাহাত মিনহাজ: ২৫ মার্চ রাতের অভিজ্ঞতা জানতে চাই। এরপর সাংবাদিকতা কীভাবে চলেছে?

সাখাওয়াত আলী খান: ২৫ মার্চ আমার ডিউটি ছিল দিনের বেলা। দিনটি ছিল উত্তেজনায় ভরা। নানা দিক থেকে নানা রকম খবর আসছিল। চলমান পরিস্থিতি নিয়ে অফিসে আমি, তোয়াব খান, ফওজুল করিম, নির্মল সেন, সানাউল্লাহ নূরী, সালেক খান অনেকক্ষণ ধরে আলোচনা করলাম। আমরা বুঝতে পারছিলাম নিশ্চিতভাবেই খারাপ কিছু ঘটতে যাচ্ছে। তবে পাকিস্তান সেনাবাহিনী যে এভাবে বর্বর হত্যাকাণ্ড চালাবে, তা আমরা কল্পনাও করিনি। যা-ই হোক, অফিসে আলাপ-আলোচনা সেরে বিকেলের শেষ দিকে আমি অফিস থেকে বের হই।

অফিস থেকে বের হয়ে দেখি রাস্তাঘাট ফাঁকা। থমথমে ভাব। বাসায় ফিরব, কিন্তু কোনো যানবাহন নেই, রিকশা নেই। আমি হেঁটে প্রেসক্লাবের সামনে পর্যন্ত যাই। আমরা থাকতাম লালমাটিয়ায়। আমরা থাকতাম দোতলায়। এটি ছিল পেশাজীবীদের কলোনি। রাতে কারফিউ ঘোষণা হলো। এরপর মধ্যরাতের আগেই শুরু হলো গোলাগুলি। আর চারদিকে আগুন। আমি আমার বাড়ি থেকেই অনেক বস্তি পুড়তে দেখেছি। গোলাগুলি হচ্ছে। আর মিরপুর-নিউমার্কেট রাস্তা দিয়ে চলছিল ট্যাংক। ভয়াবহ ভীতিকর অবস্থা। আমাদের অবস্থা আরও খারাপ ছিল, কারণ আমাদের কলোনির পাশেই বিহারিরা থাকত। রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী অভিযান শুরুর পর পরই বিহারিরা জঙ্গি মিছিল শুরু করে। ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ, আল্লাহ হু আকবর’ ধ্বনি তুলে আমাদের কলোনির পাশেই মিছিল করে। এ সময় তারা মাইকে ভাঙা ভাঙা বাংলায় ঘোষণা দেয়, কালো পতাকা নামিয়ে ফেলুন, বাংলাদেশের পতাকা নামিয়ে ফেলুন।

২৬ মার্চ সকাল থেকেই নতুন আতঙ্ক। আমাদের শঙ্কা ছিল বিহারিরা যেকোনো সময় আমাদের কলোনি আক্রমণ করবে। এর মধ্যে ২৯ মার্চ সন্ধ্যায় গুজব রটে গেল বিহারিরা আমাদের কলোনিতে আক্রমণ করবে। এ সময় আমরা নিজেরা নিজেদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করেছিলাম। আমার পাশের বাসায় ফায়ার ব্রিগেডের একজন কর্মকর্তা থাকতেন। আমরা একসঙ্গে নিরাপত্তা জোরদারের চেষ্টা করলাম। আমার একটি বন্দুক ছিল। সেই বন্দুক নিয়ে আমরা ছাদে অবস্থান নিলাম। ছাদের ওপর ইটপাটকেল জড়ো করলাম। ওই ভদ্রলোক আমাদের গরম পানির ব্যবস্থা করতে বললেন। তিনি উল্লেখ করলেন, যদি কেউ আক্রমণ করে ওপর থেকে গরম পানি ঢেলে দেব। যদিও আমাদের কলোনি আক্রান্ত হয়নি। পরে কারফিউ উঠে গেলে দেখি কলোনির অনেকেই চলে যাচ্ছেন। ঢাকা ছাড়ছেন।

রাহাত মিনহাজ: আপনিও ঢাকা ছাড়লেন?

সাখাওয়াত আলী খান: আসলে ওখানে থাকা যাচ্ছিল না। পরিস্থিতি অনেক ভীতিকর। আমার প্রতিবেশী এপিপির আজিম সাহেবের একটি ভক্সওয়াগন গাড়ি ছিল। ওনার ছেলে দশম শ্রেণিতে পড়ে। ও গাড়ি চালাতে পারত। ছেলেটিকে বললাম, আমাদের আগাইয়া দাও, আমরা দেশের বাড়িতে চলে যাই। আমার দেশের বাড়ি নরসিংদীর শিবপুর। আমরা আজিম সাহেবের ছেলের গাড়িতে করে টিকাটুলী পর্যন্ত গেলাম। রাস্তায় আমরা প্রচুর লাশ দেখলাম। রাজারবাগ ধ্বংস হয়ে গেছে। আগুনের দাগ। এর মধ্য দিয়ে আমরা টিকাটুলী গেলাম। সেখান থেকে বেবিট্যাক্সি ভাড়া করেছিলাম ঘাট পর্যন্ত যাওয়ার জন্য। ও হ্যাঁ। আমার বন্দুকটি আমি সঙ্গেই নিই, কায়দা করে লুকিয়ে। পুরোটা লুকানো সম্ভব হলেও নলটি একটু বের হয়ে ছিল। এদিকে রেডিওতে ঘোষণা ছিল, যার যার বন্দুক জমা দেয়ার। সে যা-ই হোক, টিকাটুলী থেকে আমরা ডেমরা যাই। তখন শীতলক্ষ্যার ওপর ব্রিজ হয়নি। সরকারি ফেরি চলছে, কিন্তু অনেকক্ষণ পরপর। তাই আমরা আলাদাভাবে নৌকা রিজার্ভ করে ঘাট পার হলাম।

রাহাত মিনহাজ: ঘাট পার হয়ে কী দেখলেন?

সাখাওয়াত আলী খান: নদীর ওপারে তো ভিন্ন চিত্র। বাংলাদেশ একদম স্বাধীন। বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে। জয় বাংলা স্লোগান দিচ্ছে। পুরো ভিন্ন পরিস্থিতি। আমি নদী পার হওয়ার পর ঘাটেই বন্দুক দেখে আমাকে একজন বলল, খুব ভালো কাজ করেছেন। এ বন্দুক খুব কাজে লাগবে। ওখান থেকে একটি গাড়ি ভাড়া করে আমরা নরসিংদী পর্যন্ত পৌঁছালাম। সেখান থেকে শিবপুরে গেলাম। সেখানকার থানা আমাদের পক্ষে ছিল। ওসি বন্দুকটি নিয়ে গেল। সেখানে ছেলেরা স্কুলের মাঠে ট্রেনিং শুরু করে।

রাহাত মিনহাজ: ১৯৭১ সালের সাংবাদিকতা সম্পর্কে জানতে চাই। সে সময়ের বিশেষ কোনো ঘটনা যদি আমাদের বলেন?

সাখাওয়াত আলী খান: ১৯৭১ সালে একটি সংবাদের কথা আমার বেশ মনে আছে। যেটি পত্রিকায় বড় করে বক্স আকারে হেডলাইন করা হয়েছিল। খবরটি ছিল মোনায়েম খানকে হত্যার খবর। যারা পত্রিকা অফিসে তখন ছিলেন, তারাও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেই ছিলেন, কিন্তু কায়দা করে কিছুটা নেগেটিভভাবে সংবাদটি প্রচার করেছিলেন। আর্মিরা তখন এই সংবাদের ব্যাপারে কিছু করতে পারেনি। মুক্তিবাহিনী মোনায়েম খানের বাড়িতে ঢুকে গুলি করে তাকে হত্যা করেছিল। যদিও সংবাদে মুক্তিবাহিনী না বলে দুষ্কৃতিকারী বলা হয়েছিল। একাত্তর সালজুড়ে পত্রিকা এভাবেই সেনাবাহিনীর নজরদারিতেই চলেছিল। তা ছাড়া ইত্তেফাক, দ্য পিপল আর সংবাদ পত্রিকা অফিস তো ধ্বংসই করে দেয়া হয়েছিল। সংবাদের সাংবাদিক শহীদ সাবের রাতের বেলা পত্রিকা অফিসে ঘুমাতেন। রাতে ট্যাংকের বোমার আঘাতে যখন পত্রিকা অফিস ধ্বংস হয়, তিনি পুড়ে মারা যান। কিছুদিন পর ইত্তেফাক আবার বের হয়েছিল। কিন্তু সংবাদ এবং দ্য পিপল এই দুটি পত্রিকা আর বের হয়নি। এই তিনটি পত্রিকার ওপর পাকিস্তান বাহিনীর অন্য রকম ক্ষোভ ছিল। এসব পত্রিকায় মুক্তি সংগ্রামের সংবাদ (২৬ মার্চের আগ পর্যন্ত) বেশি প্রচারিত হতো। আর মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হলো, তখন এ ধারা কিছুটা পাল্টে গিয়েছিল। কারণ তখন সেন্সর করা পত্রিকা বের হতো। পত্রিকায় কী কী সংবাদ প্রকাশিত হবে, তা আর্মি এসে চেক করত, আবার বাংলা না বুঝলে তা ট্রান্সলেশন করে পাঠিয়ে দিত।

রাহাত মিনহাজ: দৈনিক পাকিস্তানের তোয়াব খান কলকাতায় চলে গিয়েছিলেন। আপনিও ঢাকা ছাড়লেন। সংবাদপত্রটির বাকি অন্যরা কী করেছিলেন। আর এই সময়টা আপনি কীভাবে কাটিয়েছেন?

সাখাওয়াত আলী খান: ২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউনের পর অনেকেই গ্রমাঞ্চলে পালিয়ে যান। অনেকেই আত্মগোপনে থাকেন। অফিসে আসেননি দীর্ঘদিন। শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান ও আমি ঢাকা থেকে পালিয়ে গেছি। কিন্তু আমরা কেউ বর্ডার ক্রস করিনি। আমাদের বাড়িটিকে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পের জন্য ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। ফলে আমরা ফ্যামিলিসহ নরসিংদীর শিবপুর অঞ্চল থেকে পালিয়ে দূরে দূরে থাকতাম। হায়দার আকবর খান রনো, রনোর ভাই জুনো, কাজী জাফর, রনোর বাবা হাতেম আলী খান, তার স্ত্রী- এরা আমাদের বাড়িতে ছিলেন। জহির রায়হানের গাড়িও ছিল সেখানেই। আসলে আগরতলা যাওয়ার রুট ছিল আমাদের বাড়ির ওপর দিয়ে। আমার বাড়ি এবং আমার চাচার বাড়িতে সব মিলিয়ে ১৫-১৬ জন ছিলেন। সেখানে একজন মহিলা পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তিনি গর্ভবতী ছিলেন। আমার স্ত্রীর হাতেই তার বাচ্চা হয়েছিল। বাচ্চার নাম রাখা হয়েছিল মুক্তি। আমার ওপরেও একটি কাজের ভার পড়েছিল। নাড়ি কাটার জন্য ব্লেড জোগাড়ের।

রাহাত মিনহাজ: মুক্তিযুদ্ধে আপনার পরিবারের এক সদস্য শহীদ হয়েছিলেন। তার সম্পর্কে একটু জানাবেন?

সাখাওয়াত আলী খান: আমার শ্যালক ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট, নাম আতিক। আতিক ছিল ইঞ্জিনিয়ার কোরের অফিসার। ফোর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসার হিসেবে ওর পোস্টিং ছিল কুমিল্লা সেনানিবাসে। আতিকের কমান্ডিং অফিসার ছিলেন খালেদ মোশাররফ। ২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউনের আগে এই রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার ও অনেক কর্মকর্তা-সদস্যকে সীমান্তে পাঠানো হয়েছিল। এটি ছিল পাক বাহিনীর কৌশল। তাদের সরিয়ে দিয়ে রেজিমেন্টকে দুর্বল করেছিল পাকসেনারা। এরপর কুমিল্লা সেনানিবাসে বাঙালি অফিসারদের বন্দি করে পাকসেনারা। তারপর একটি ঘরের মধ্যে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। এতে আতিকসহ বেশির ভাগ বন্দি শহীদ হন। এই ক্যান্টনমেন্টেই বর্ষীয়ান বাঙালি রাজনৈতিক নেতা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে হত্যা করা হয়েছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই বিষয়গুলো নিয়ে আমি প্রতিবেদন তৈরি করেছিলাম। পরে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে গর্ত খুঁড়ে অনেক অফিসার ও সেনাসদস্যের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়। আতিকের মরদেহও পাওয়া যায়। হাসান হাফিজুর রহমানের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্রের অষ্টম খণ্ডে এ বিষয়ে আমার লেখা আছে।

রাহাত মিনহাজ: ১৯৭১ সালে অনেক সাংবাদিক শহীদ হলেন।

সাখাওয়াত আলী খান: সাংবাদিকদের অনেকেই তো মারা গেলেন। অনেকেই আবার দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও মারা গেছেন। যেমন মিরপুরে শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে জহির রায়হান মারা গেলেন। নিজাম উদ্দীন সাহেব, তাকে আলবদররা তুলে নিয়ে গেল। আসলে এই মুহূর্তে নামগুলো সঠিক মনে নেই সব। তবে অনেক সাংবাদিককে টার্গেট করে পাক বাহিনী হত্যা করেছে। যাদের সহযোগী ছিল আলবদর।

রাহাত মিনহাজ: ঢাকায় কবে ফিরলেন? যতদূর জানি আপনি দৈনিক পাকিস্তান বা দৈনিক বাংলা নতুন করে প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলেন?

সাখাওয়াত আলী খান: দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ১৯ ডিসেম্বর আমি ঢাকায় আসি। ঢাকার কাছাকাছি থাকায় আমি অফিসে দ্রুত আসতে পেরেছিলাম। অনেকেই মুজিবনগরে কিংবা দূরে দূরে ছিলেন। তারা ভাই পালিয়ে গেলেও তিনি ঢাকাতেই থাকতেন। আমি আর তারা ভাই মিলে আরামবাগে গিয়ে প্রেসের ম্যানেজারকে ধরে অফিসে নিয়ে এলাম। তাকে বলা হলো মেশিন চালানোর জন্য কিছু লোক জোগাড় করতে। তিনি তখন কিছু লোক জোগাড় করেছিলেন।

অফিসে ছিলাম মাত্র কয়েকজন। আমি, তারা ভাই, আমিনুল ইসলাম, প্রেস ম্যানেজার আবদুল হাইসহ আরও কয়েকজন। অফিসে ঢুকে দেখি অফিস একদম ফাঁকা। সুনসান নীরবতা। ১৯ ডিসেম্বরেই আমরা পত্রিকা প্রকাশের প্রস্তুতি নিই। প্রকাশের তারিখটি সঠিক মনে নেই। সম্ভবত ২০ অথবা ২১ ডিসেম্বর ‘দৈনিক বাংলাদেশ’ নামে প্রথম প্রকাশিত হয়। দৈনিক বাংলাদেশ নামে তিনটি সংখ্যা বের হওয়ার পর এর নাম হলো দৈনিক বাংলা। এর জন্য আমরা কারও কোনো পারমিশন নিইনি। আমরা নিজেরাই নতুন নামে পত্রিকা বের করি।

রাহাত মিনহাজ: দৈনিক বাংলাদেশ থেকে দৈনিক বাংলা কীভাবে হলো?

সাখাওয়াত আলী খান: দৈনিক পাকিস্তান যখন দৈনিক বাংলাদেশ নামে প্রকাশিত হচ্ছে, তখন বগুড়া থেকে এক ভদ্রলোক এলেন। তিনি বললেন, ‘আপনারা দৈনিক বাংলাদেশ নামে পত্রিকা প্রকাশ করতে পরবেন না।’ আমরা বললাম কারণ কী? তিনি জানালেন, তার একটি সংবাদপত্র আছে। যার নাম দৈনিক বাংলাদেশ। এরপর আমরা বাংলাদেশ নাম বাদ দিয়ে নতুন নাম দিলাম দৈনিক বাংলা। পরবর্তী সময়ে এ নামেই সংবাদপত্রটি প্রকাশিত হতে থাকে বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত।

রাহাত মিনহাজ: আপনাকে ধন্যবাদ

সাখাওয়াত আলী খান: আপনাকেও ধন্যবাদ।


যত গতি তত ক্ষতি

ইলিয়াস কাঞ্চন
আপডেটেড ৪ ডিসেম্বর, ২০২২ ১১:৫৪
ইলিয়াস কাঞ্চন

দুর্ঘটনা আগের চেয়ে বেড়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। দুর্ঘটনার সঙ্গে এর উপকরণও বেড়েছে। বদলে গেছে দুর্ঘটনার ধরন। এতদিনেও সড়ক পরিবহন আইনের বিধিমালা হয়নি। বিধিমালা প্রকাশ করে আইন বাস্তবায়ন করার জন্য দৃশ্যমান যে কাজ, সেটি হয়নি। সুতরাং দুর্ঘটনা রোধ করার জন্য যেসব নিয়ামক বাস্তবায়ন করা দরকার ছিল, সেগুলো না করলে দুর্ঘটনা বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক।

দুর্ঘটনার পর গাড়িতে করে মানুষকে ছেঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার যে ঘটনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটেছে, এটি নতুন নয়। এ ধরনের ঘটনা আগেও ঘটেছে। যে ব্যক্তি এই কাজটি করেছেন তার মানসিক সমস্যা নয়। নিজেকে বাঁচানোর জন্যই দুর্ঘটনার পর পালানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি জানতেন তার গাড়ির নিচে কেউ একজন বেঁধে আছেন। সুতরাং এটা মানসিক কোনো বিষয় নয়। এই পালিয়ে যাওয়ার মনমানসিকতা রোধ করতে হলে সিসি ক্যামেরা দেখে দুর্ঘটনার আসল কারণ নির্ধারণ করে বিচার করতে হবে। তাহলে এ ধরনের নির্মম ঘটনা ঘটবে না।

আমরা দেখেছি, দুর্ঘটনা ঘটার পর পালিয়ে যাওয়ার সময় আরও একাধিক দুর্ঘটনা ঘটে। এটা শুধু প্রাইভেট কারের ক্ষেত্রে না। বাস-ট্রাক সব ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনা ঘটিয়ে পালানোর একটা টেনডেন্সি থাকে। কিন্তু নিয়ম হলো, দুর্ঘটনা ঘটলে সেই চালকেরই উচিত আহত মানুষটাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু আমাদের দেশে সবাই পালিয়ে বাঁচতে চাই এবং পালিয়ে গিয়ে কিন্তু তারা বেঁচেও যান। সে কারণে সবাই পালানোর চেষ্টা করেন।

সড়ক আইনে আছে, গতিসীমা ভায়োলেশন করলে শাস্তি হবে। কিন্তু সেই বিষয়গুলো পরিষ্কার করা হয় আইনের বিধিমালার মাধ্যমে। সেই বিধিমালা আজও প্রণয়ন করতে পারেনি সড়ক পরিবহন মহাসড়ক বিভাগ। কোন সড়কে কোন গাড়ির জন্য কত গতি হবে, কত গতিতে চলতে পারবে, তার গাইডলাইন দরকার। আলাদা সড়কে আলাদা ধরনের গতিসীমা দিতে হবে। সব সড়কে ৮০ কিলোমিটার গতির অনুমোদন দিলে দুর্ঘটনা ঘটবেই।

জাতিসংঘের নির্দেশনা আছে, শহরের মধ্যে ৩০ কিলোমিটার গতির বেশি গাড়ি চালানো যাবে না। লন্ডন ও নিউইয়র্কের মেয়র তাদের শহরে দুর্ঘটনা কমানোর জন্য নিজেরাই এই গতিসীমা থেকেও কমিয়ে ২৫ কিলোমিটার গতিতে শহরে গাড়ি চালানোর নির্দেশনা দিয়েছেন।

একটা শহরের মধ্যে যানবাহন বেশি থাকে। মানুষের চলাফেরাও বেশি । সেখানে যদি যানবাহনের গতি বেশি থাকে, তাহলে তো দুর্ঘটনা ঘটবেই, মানুষ মারা যাবেই। দুর্ঘটনার সবচেয়ে বড় নিয়ামক হলো গতি। যত গতি তত ক্ষতি। যারা এসবের দায়দায়িত্বে, তাদের অজ্ঞতা এবং অনীহার কারণেই দুর্ঘটনা রোধ করা যাচ্ছে না।


banner close