বুধবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২২

গুমের প্রকৃত রহস্য উন্মোচিত হচ্ছে

সেলিম মাহমুদ
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত
দৈনিক বাংলা ডেস্ক

সেলিম মাহমুদ

বাংলাদেশে গুমের রহস্য একে একে উন্মোচিত হচ্ছে। নিজের মাকে অন্যত্র লুকিয়ে রেখে প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করতে মরিয়ম মান্নান নামে এক তরুণীর অবিশ্বাস্য অভিনয় দেখল পুরো জাতি। এই মেয়েটি কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময়ও একই রকমের অভিনয় করেছিল। ২০১৮ সালে তার সরকারবিরোধী বক্তব্যের ভিডিও ক্লিপ গণমাধ্যমে আবারও দেখলাম। তার অভিনয় দেখে মনে হয়েছে, সরকারবিরোধীদের এজেন্ট হিসেবেই সে কাজ করে আসছে।

গত কয়েকদিন আগে ভারতের গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে, বাংলাদেশে গুম হয়ে যাওয়া ৭৬ জন মানুষের যে তালিকা প্রকাশিত হয়েছে, তার মধ্যে দুজন ব্যক্তি ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা এবং তারা ভারতের আদালত কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত। পরবর্তী সময় এই খবর বাংলাদেশের গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে। অথচ এই তালিকায় এই দুজন ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশি নাগরিক ও গুমের ভিক্টিম হিসেবে দেখানো হয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় এটি পরিষ্কার, যারা এই তালিকা করছে এবং বাংলাদেশে তারা যাদের তথ্যের ওপর নির্ভর করে তৈরি করছে, সেই তথ্য সরবরাহকারীরা নিরপেক্ষ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নয়। তারা একটি পক্ষকে প্রতিনিধিত্ব করে অর্থাৎ তারা আওয়ামী লীগবিরোধী বা বর্তমান সরকারবিরোধী। তারা বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এই কাজগুলো করে যাচ্ছে। এ ধরনের ঘটনায় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের দায়িত্ব এড়াতে পারে না। এ ধরনের কাজের জন্য পৃথিবীর দেশে দেশে তাদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেবে। এই সুনির্দিষ্ট ঘটনায় বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের রিসার্চ ফাইন্ডিংসের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এটি অবশ্যই তাদের জন্য সুখবর নয়।

গত মাসে জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার এবং চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল বেশেলেট ও তার টিমকে আমরা এই কথাটিই বলেছিলাম। আমরা বলেছিলাম, কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশে মানবাধিকার বিষয়ে যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে তাদের তথ্যের উৎস হিসেবে গ্রহণ করছে, তারা নিরপেক্ষ নয়। বাংলাদেশে তারা আওয়ামী লীগবিরোধী গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত। কেবল সরকারবিরোধী পক্ষের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এ ধরনের রিপোর্ট প্রস্তুত করা শুধু অপেশাদারত্বই নয়, নিরপেক্ষতা নিয়ে কাজ করার শপথের লঙ্ঘনও বটে। এটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিধি বা টার্ম অব রেফারেন্সে উল্লিখিত বিধানাবলিরও লঙ্ঘন।

৭৬ জনের এই তালিকায় বেশ কিছু ব্যক্তি আছেন, যারা বিভিন্ন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। তালিকার কিছু ব্যক্তি রয়েছে, যারা নানা কারণে বহু দিন ধরেই নিখোঁজ। বাংলাদেশে নানা কারণে কিছু ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এই তরুণী মরিয়ম মান্নানের মায়ের ঘটনাটি জাতির সামনে উন্মোচিত না হলে নিশ্চয়ই তার মায়ের নামও গুম হয়ে যাওয়া মানুষদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতো। মরিয়ম মান্নান গত কয়েকদিন গণমাধ্যমে তার মায়ের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নিয়ে অনেক আহাজারি করেছে। তারপর গুম হওয়ার পর তার মায়ের মৃত্যু হয়েছে- এটি প্রতিষ্ঠিত করার জন্য অজ্ঞাত এক নারীর মরদেহকে নিজের মায়ের মরদেহ হিসেবে ঘোষণা করেছেন এই মরিয়ম মান্নান। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুসন্ধানে তার মায়ের আত্মগোপনে থাকার বিষয়টি উন্মোচিত না হলে এই তরুণী ইতিমধ্যে তার মায়ের মৃত্যুর জন্য প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর পাশাপাশি সরকারকেও তার মায়ের ‘হত্যার’ জন্য দায়ী করে মানববন্ধনসহ অন্যান্য কর্মসূচি দিত। সেই কর্মসূচিতে নিশ্চিতভাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম সশরীরে গিয়ে একাত্মতা প্রকাশ করে মরিয়ম মান্নানের পাশে দাঁড়িয়ে তার মায়ের 'গুম এবং হত্যার' জন্য চোখের পানি ফেলত এবং এই ঘটনার জন্য সরকারকে দায়ী করত। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, বিএনপি-জামায়াতের এজেন্ট মরিয়ম মান্নানের মতো আরও অনেক ঘটনা এভাবে আমাদের সামনে উন্মোচিত হবে। কেননা কথায় আছে- ‘You shall know the truth, and the truth shall make you free.’

ড. সেলিম মাহমুদঃ তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

অর্থ পাচার বন্ধ হলেই রিজার্ভের ধস থামবে

প্রতীকী ছবি
আপডেটেড ৭ ডিসেম্বর, ২০২২ ০৯:০২
এম এ খালেক

গত ৩০ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ৭ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার বিক্রি করেছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের গ্রস পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অবশ্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত মানা হলে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভের পরিমাণ হচ্ছে ২৫ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ মোট ৬০০ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি বিক্রি করেছে। এ নিয়ে ১৫ মাসে মোট ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিক্রি করা হয়েছে রিজার্ভ থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ অর্থ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রি করে মূলত স্থানীয় মুদ্রা টাকার অবমূল্যায়ন ঠেকানোর জন্য।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের হিসাবায়ন করে দুইভাবে। এর মধ্যে একটি গ্রস হিসাব এবং অন্যটি নিট হিসাব। রিজার্ভের পরিসংখ্যান প্রকাশকালে এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড গঠনের জন্য ব্যবহৃত ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারসহ লংটার্ম ফান্ড, গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড এবং শ্রীলঙ্কাকে ঋণ হিসাবে দেয়া ২০ কোটি মার্কিন ডলারও অন্তর্ভুক্ত করে দেখানো হয়। কিন্তু আইএমএফ এবং স্থানীয় অধিকাংশ অর্থনীতিবিদের মতে, যে রিজার্ভ অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকের মালিকানায় থাকলেও হাতে বা নিয়ন্ত্রণে নেই তাকে মোট রিজার্ভে অন্তর্ভুক্ত করে দেখানোর কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। রিজার্ভ সেটাই, যা তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহারযোগ্য এবং চাওয়া মাত্রই বের করে দেয়া যায়।

মার্কিন ডলারের সংকটের কারণে গত ১৫ মাস ধরে রিজার্ভের পরিমাণ ক্রমাগত কমছে। ২০২১ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করে গিয়েছিল। সেই অবস্থা থেকে রিজার্ভ ক্রমাগত হ্রাস পেতে পেতে এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে নেমে এসেছে। বর্তমানে প্রতি মাসে গড়ে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার করে রিজার্ভ কমছে। ২০১২-২০১৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ১৫ দশমিক ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে তা ৩৩ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়। ২০২০-২০২১ অর্থবছরে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৪৬ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২১-২০২২ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২১ সালের আগস্ট মাসে রিজার্ভের পরিমাণ ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করে যায়। এটিই ছিল বাংলাদেশের এ যাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ রিজার্ভ। অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রদর্শিত এই রিজার্ভ থেকে ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োজিত রয়েছে তা বাদ দিলে নিট রিজার্ভের পরিমাণ পাওয়া যাবে।

অর্থনীতিবিদগণ মনে করছেন, পণ্য রপ্তানিকালে আন্ডার ইনভয়েসিং এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের উপার্জিত অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে দেশে আসার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি আমদানি পণ্যের ক্ষেত্রে ওভার ইনভয়েসিং করার কারণে রিজার্ভ দ্রুত কমে যাচ্ছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রা বাজারে টাকার অবমূল্যায়ন ঠেকানোর জন্য মাঝে মাঝেই রিজার্ভ থেকে বাজারে মার্কিন ডলার ছাড়ছে। এতে সার্বিকভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সূত্র মতে, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু পণ্যের আমদানি ব্যয় নিরীক্ষা করে তারা দেখেছে, এসব পণ্যের আমদানি ব্যয় প্রকৃত মূল্যের চেয়ে ২০ শতাংশ থেকে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। আমাদের দেশের একটি সাধারণ প্রবণতা হচ্ছে, কোনো রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হলে এবং জাতীয় নির্বাচনের আগের বছর দেশ থেকে অর্থ পাচার বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে মুদ্রা পাচার অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অনেকেই মনে করছেন। আগামী জাতীয় নির্বাচন হবে এ যাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন এবং জটিল নির্বাচন। তাই যারা রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে যা উপার্জন করেছেন তারা এখন তা পাচারে ব্যস্ত রয়েছেন।

অর্থ পাচারকারীদের অপতৎপরতা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে যত ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হোক রিজার্ভের স্ফীতি ধরে রাখা সম্ভব হবে না। দেশ থেকে যে ব্যাপক আকারে অর্থ পাচার হচ্ছে তার কিছু লক্ষণ বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল দায়িত্ব গ্রহণের কিছুদিন পর প্রসঙ্গক্রমে বলেছিলেন, আজ থেকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক টাকাও বাড়বে না। কিন্তু অর্থমন্ত্রী তার অঙ্গীকার রক্ষা করতে পারেননি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের যে পরিমাণ প্রকাশ করে থাকে, প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ তার চেয়ে অনেক বেশি। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের হিসাবের মধ্যে মামলাধীন প্রকল্পের নিকট পাওনা ঋণ, অবলোপনকৃত প্রকল্পের বিপরীতে পাওনা ঋণ এবং পুনঃতফসিলীকৃত প্রকল্পের নিকট পাওনা ঋণাঙ্ক অন্তর্ভুক্ত করে না। আইএমএফের সুপারিশ মোতাবেক যদি খেলাপি ঋণের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরা হয়, তাহলে ব্যাংকিং সেক্টরের খেলাপি ঋণের পরিমাণ অন্তত আড়াই থেকে তিন গুণ বৃদ্ধি পাবে। এই বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশই নানাভাবে বিদেশে পাচার হয়ে গেছে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, খেলাপি ঋণের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের সম্পর্ক কী? খেলাপি ঋণের যে অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে, তা নিশ্চয়ই স্থানীয় মুদ্রায় পাচার হয়নি। এই অর্থ বৈদেশিক মুদ্রায় কনভার্ট করেই তা পাচার করা হয়েছে। এতে রিজার্ভের ওপর টান পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সূত্র মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণের কারণে আমদানি বাবদ খোলা এলসির হার কমেছে ৩৫ শতাংশ। একই সময়ে শিল্পে ব্যবহার্য ক্যাপিটাল মেশিনারিজ, কাঁচামাল এবং মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি ব্যাপকভাবে কমেছে। এর মধ্যে কোনো কোনোটির আমদানি ৭৬ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। শিল্পে ব্যবহার্য এসব উপকরণের আমদানি হ্রাস পেলে ব্যাংক ঋণও আনুপাতিকভাবে হ্রাস পাওয়ার কথা। কিন্তু সেখানে ঘটছে সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা। চলতি মুদ্রানীতিতে ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণ প্রবৃদ্ধির হার প্রাক্কলন করা হয়েছে ১৪ দশমিক ১ শতাংশ। অথচ বাস্তবে ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি এক পর্যায়ে ১৪ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত হয়। ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণ বৃদ্ধির বিপরীতে শিল্পে ব্যবহার্য উপকরণ আমদানি কমে যাওয়ার অর্থই হচ্ছে ব্যাংক ঋণের অর্থ অন্য কোনো খাতে প্রবাহিত হয়েছে।

একটি ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংক থেকে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী ৩০ হাজার কোটি টাকা ঋণের নামে সরিয়ে নিয়েছে। এই অর্থ নিশ্চয়ই ওই শিল্পগোষ্ঠী তাদের সিন্দুকে ভরে রাখেনি। এর একটি বড় অংশই পাচার করা হয়েছে। এই পাচার কার্য বৈদেশিক মুদ্রাতেই সম্পন্ন হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রতিটি খাত সংকুচিত হয়ে পড়েছে। কিন্তু ব্যয়ের খাত ক্রমশ সম্প্রসারিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রা বাজারকে কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে মাঝে মাঝেই বাজারে মার্কিন ডলার ছেড়ে দেয়। এটি মোটেও কাম্য নয়। বরং মুদ্রার বিনিময় হারকে বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়াটাই হবে মঙ্গলজনক। ব্যাংকিং চ্যানেল এবং কার্ব মার্কেটে মুদ্রার বিনিময় হারের পার্থক্য যদি কমে না আসে, তাহলে হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স আসা কোনোভাবেই বন্ধ করা যাবে না। গত এক বছরে ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমতুল্য রেমিট্যান্স দেশে আসেনি, বিদেশেই থেকে গেছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্থানীয় বেনিফিশিয়ারিদের লোকাল কারেন্সিতে এই অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। বাংলাদেশে যেসব বিদেশি নাগরিক অবৈধভাবে কাজ করছেন, তারা প্রতিবছর অন্তত ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশে প্রেরণ করেন। এই অর্থ বৈধ চ্যানেলে পাঠানো হয় না।

বিশ্বব্যাপী উচ্চ মূল্যস্ফীতিজনিত কারণে প্রতিটি দেশেরই আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। আমাদের মতো দেশ উচ্চ মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি অর্থ পাচারের সমস্যা মোকাবিলা করছে। পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণ করে থাকে চীন। সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, চীনের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ হচ্ছে ৩ দশমিক ২৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। জাপানের রিজার্ভ ১ দশমিক ৩১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। ভারতের রিজার্ভের পরিমাণ ৬৩৪ দশমিক ২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রিজার্ভের পরিমাণ হচ্ছে ৩ হাজার ৩৮২ কোটি মার্কিন ডলার। বাংলাদেশ অনেক বছর ধরেই সার্ক দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ধারণ করে চলেছে। সার্ক দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র ভারতই রিজার্ভ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ওপরে অবস্থান করছে। বিভিন্ন দেশের মুদ্রায় রিজার্ভ সংরক্ষণ করা হয়। তবে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি রিজার্ভ সংরক্ষিত হয় মার্কিন ডলারে, যার পরিমাণ ৬ দশমিক ৭৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। এটি বিশ্বের মোট রিজার্ভের ৬১ দশমিক ৮২ শতাংশ। ইউরোপিয়ান একক মুদ্রা ইউরোতে রিজার্ভ সংরক্ষণ করা হয় ২ দশমিক ২১ ট্রিলিয়ন বা মোট বিশ্ব রিজার্ভের ২০ দশমিক ২৪ শতাংশ। জাপানি ইয়েনে রিজার্ভ সংরক্ষণ করা হয় ৫৭২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা মোট বিশ্ব রিজার্ভের ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ। চীনা ইউয়ানে রিজার্ভ সংরক্ষণ করা হয় ২১৩ বিলিয়ন বা ১ দশমিক ৯৫ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংক যদি বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের স্ফীতি অব্যাহত রাখতে চায়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অতিমূল্যায়ন এবং অবমূল্যায়ন (ওভার ইনভয়েসিং এবং আন্ডার ইনভয়েসিং) কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একই সঙ্গে মুদ্রার বিনিময় হারকে বাজারের ওপর ছেড়ে দিতে হবে। অপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। ব্যাংক ঋণের আপার ক্যাপ তুলে দিয়ে বাজারভিত্তিক করতে হবে। এসব কার্যক্রম গ্রহণ করা হলে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের স্ফীতি হ্রাসের যে প্রবণতা প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে তা অনেকটাই রোধ করা সম্ভব হবে।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার, বিডিবিএল ও অর্থনীতিবিষয়ক লেখক।


তৃতীয় ধারার জনগণই বেশি শক্তিশালী

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
এ কে এম শাহনাওয়াজ

অনেক বছর আগের কথা। যখন রাজনীতির নানা পঙ্‌ক্তিমালা সম্পর্কে আমার ধারণা তেমন স্বচ্ছ ছিল না। তখন বিস্মিত হতাম স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনের সময়। প্রার্থীদের পোস্টার দেখে বিস্ময়টি বড় হতো। অমুক ভাইকে চেয়ারম্যান বা মেম্বার পদে ভোট দিন। পোস্টারের নিচে লেখা হতো, ‘প্রচারে নির্বাচনী এলাকার জনগণ’। প্রশ্ন জাগত, নির্বাচনী এলাকার সব ভোটার যদি এই প্রার্থীকেই চায় তাহলে আর প্রচারের প্রয়োজন কি! তিনি তো জিতেই আছেন। পরে দেখি তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রচারেও রয়েছে সব জনগণ। পরে বুঝলাম এভাবে প্রার্থীরা জনগণের নাম ভাঙিয়ে প্রচারণা চালান। বিষয়টি আমার কাছে একধরনের প্রতারণা মনে হতো। এ ধারার এখনো কোনো পরিবর্তন হয়নি।

পাকিস্তান আমলে ষাটের দশকের শুরুর দিকের কথা। প্রথম পর্বটি আব্বার মুখে শোনা। শেষ অধ্যায়ের ছবি কিছুটা নিজের স্মরণে থাকা। আইয়ুব খানের বুনিয়াদি গণতন্ত্রে (বেসিক ডেমোক্রেসি) চলছিল দেশ। এই অদ্ভুত গণতন্ত্র পূর্ব পাকিস্তানে বেশ সমালোচিত। তারপরও এই বুনিয়াদি গণতন্ত্রী তৃণমূলের নেতারা জনগণের জন্য নিবেদিত ছিলেন। আব্বার মামাকে আমরা প্রেসিডেন্ট দাদা নামেই চিনতাম। তার জীবন সায়াহ্নটা আমার দেখা। তিনি ইউনিয়ন বোর্ডের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট (চেয়ারম্যান) ছিলেন। বিক্রমপুরের টঙ্গীবাড়ী উপজেলার কোনো একটি ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি। আজীবন অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রেসিডেন্ট ছিলেন। বিস্তর জমিজমা ছিল তার। সরকারি বরাদ্দের বাইরেও নিজের জমিজমা বিক্রি করে জনগণের দুঃখ ঘোচানোর চেষ্টা করতেন। পরিণতি হিসেবে তিনি তার ছেলেদের জন্য কিছুই রেখে যেতে পারেননি। আমার চাচারা কায়ক্লেশে স্বজনদের সহযোগিতায় বড় হয়েছেন।

এসব শুনে ও দেখে মনে হতো রাজনৈতিক নেতারা ঈশ্বরের বরপুত্র। নানা ত্যাগ স্বীকার করে তারা জনকল্যাণ করতে চান। আবার নির্বাচনের সময় যখন একটি পদের জন্য একাধিক প্রার্থী দাঁড়ান তা দেখে আবেগে চোখের পাতা ভিজে যেত। আহা সমাজের কত মানুষ আছেন যারা জনগণের সেবা করার জন্য স্বেচ্ছায় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

ধীরে ধীরে ধারণা পাল্টে যেতে থাকল। জনবিচ্ছিন্ন, সাধারণ মানুষের খুব আপনজন নন, এমন প্রার্থীরা সবচেয়ে বেশি সামনের সারিতে আসেন নির্বাচনে। ভালোবেসে জনগণ সমর্থন দেবে এই আত্মবিশ্বাস থাকে না বলে জেতার জন্য অর্থ ছড়ান আর পেশিশক্তি ব্যবহার করেন নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে। ক্ষমতা থাকলে প্রশাসনকেও ব্যবহার করেন। এভাবে নির্বাচিত হন তারা। এখনকার প্রার্থীদের বড় অংশ আগে থেকেই জনবিচ্ছিন্ন, নির্বাচনে ‘বিজয়ী’ হওয়ার পরও জনগণের কাছে অধরা হয়ে যান। এসব কারণে এখন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে এমপিদের উল্লেখযোগ্য অংশ নির্বাচনী এলাকা ছেড়ে শহরে বিলাসী জীবনযাপন করতে বেশি পছন্দ করেন। জনপ্রতিনিধির তকমা গলায় ধারণ করে ব্যক্তিগত লাভালাভ নিয়ে অনেকে ব্যস্ত থাকেন। আমার প্রেসিডেন্ট দাদার মতো জননেতারা জনকল্যাণ করে নিঃস্ব হতে পছন্দ করতেন, আর এখনকার জনপ্রতিনিধিদের বড় অংশ ফুলে-ফেঁপে ঢোল হন আর উত্তরাধিকারীদের জন্য বিপুল বিষয়-বৈভব রেখে যান। এখন তো প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর নেতারা ক্ষমতা পেতে আর ধরে রাখতে নিজেদের অবস্থান গৌরব আর ব্যক্তিত্বকে জলাঞ্জলি দিয়ে রাজনৈতিক ঝগড়াকে কৌতুকে পরিণত করছেন।

সম্প্রতি নির্বাচন সামনে বলে রাজনৈতিক ঝগড়া তুঙ্গে। নেতাদের শব্দচয়ন আর কণ্ঠভঙ্গিকে পরিশীলিত বলা যাবে না। হতাশ হয়ে ভাবি, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বিস্ময়কর ত্যাগ স্বীকার করে দেশ স্বাধীন করেছে যে জাতি; দূরদর্শিতা আর অক্লান্ত পরিশ্রম করে অবকাঠামোগত ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন বিশ্ব দরবারে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছেন সেখানে একশ্রেণির নেতা তাদের অপরিশীলিত নিম্নমানের শব্দ প্রয়োগে ঝগড়া করে এবং তা আবার গণমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে নোংরা করছেন দেশের গৌরবময় ক্যানভাস। জনগণের কষ্টে পাশে না দাঁড়ানো মানুষগুলো নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধার জন্য জনগণের নাম ভাঙানোর প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। তাদের প্রতিদিনের বক্তৃতা শুনলে মনে হয়, দেশে এখন তিন ধারার জনগণ রয়েছে। একটি আওয়ামীপন্থি জনগণ, একটি বিএনপিপন্থি জনগণ আর তৃতীয় ধারার আরেকটি জনগণ। ‘জনগণ’ শব্দটি এতকাল অবিভাজ্য থাকলেও নেতারা রাজনৈতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে বিভাজিত করে ফেলছেন প্রতিদিন। এতে সাধারণ মানুষ আগে বিস্মিত হতো,Ñএখন বিরক্ত হয়। ভাষা-ভাষণে এখন নির্বাচনী মাঠ মারদাঙ্গা হয়ে উঠছে যেন। বিএনপি নেতারা যখন বলেন তারা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সরকার পতনের আন্দোলন গড়ে তুলবেন। অথবা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ‘আওয়ামী সন্ত্রাসীদের’ প্রতিরোধ করবেন। তখন মনে হবে দেশের সব জনগণ বিএনপি দলের পেছনে। এসব দেখে এবং শুনে একজন রাজনৈতিক সমালোচক চমকে যেতে পারেন। ভাববেন এ কী করে সম্ভব! যে দল এখনো প্রকাশ্যে তারেক রহমানকে নিজেদের দলনেতা হিসেবে পরিচয় দেয়। যিনি দুর্নীতিগ্রস্ত ও অর্থ পাচারকারী হিসেবে পরিচিত, জঙ্গি ও জামায়াতের পৃষ্ঠপোষকতা করে ক্ষমতার একচ্ছত্র নায়ক হতে চেয়েছেন। যিনি দেশের আদালতে সাজাপ্রাপ্ত আসামি, রাজনীতি না করার মুচলেকা দিয়ে দেশ ত্যাগ করে নিজেকে বাঁচিয়েছেন; তেমন নেতৃত্বের গণ্ডিতে কিসের মোহে আর ভালোবাসায় জনগণ পাশে দাঁড়াবে! তাহলে বোধ হয় এ ধারার জনগণ বিএনপি নেতাদের কল্পিত জনগণের অংশ, দলীয় বৃত্তে বন্দি জনগণ। অন্যদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধগতিতে বিধ্বস্ত মানুষ, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতিতে বিপর্যস্ত তারা, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের কঠিন সময় পার করছে এ দেশবাসী, অঙ্কের হিসাবে দেশের প্রবৃদ্ধির হার বাড়ছে, কিন্তু এর বড় অংশ চলে যাচ্ছে ক্ষমতাবানদের ঝুড়িতে। এমন বাস্তবতায় অবকাঠামোগত উন্নয়নের উদাহরণ বাজারে-বিধ্বস্ত মানুষের কঠিন বস্তুগত জীবনে তেমন প্রভাব ফেলছে না। তাই প্রতিদিনের বক্তৃতা ও দেহ-ভাষায় সরকারি দলের নেতাদের তেমন সপ্রতিভ মনে হচ্ছে না। বিএনপির বিভাগীয় জনসভা দুর্বল করতে অপ্রয়োজনে বারবার পরিবহন মালিকদের দিয়ে পরিবহন ধর্মঘট ডেকে কেন যে আওয়ামী লীগ নেতারা নিজেদের দুর্বলতার প্রকাশ ঘটাচ্ছেন তা আমাদের বোধগম্য নয়। এখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগ নেতারাও জনগণের নাম ভাঙাচ্ছেন। বিএনপি নেতারা যেমন জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সরকার পতনের আন্দোলন করবেন, তাদের ভাষায় আওয়ামী সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করবেন, তেমনি আওয়ামী লীগ নেতাদের জবানীও অনেকটা এক। তারাও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপির সন্ত্রাস ও জ্বালাও-পোড়াওয়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন।

এসব দেখে ১৩ শতকের বাংলার ইতিহাসের একটি বাস্তব চিত্র মনে পড়ল। সেই সময় সবে মুসলমান আক্রমণকারীরা দিল্লি অধিকার করেছে। পত্তন ঘটেছে স্বাধীন সুলতানি শাসনের। দিল্লির সুলতানরা সেনাপতি পাঠিয়েছেন বাংলা জয় করতে। অনেক গভর্নরই বাংলার ক্ষমতায় বসে নিজ সুলতানের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করতেন। সে যুগের নিজেদের শাসন বৈধ বোঝাতে সুলতানরা বাগদাদের খলিফার কাছ থেকে সনদ আনতেন। আর নিজ মুদ্রায় খলিফার নাম ব্যবহার করে জনগণের সমর্থন আদায়ের জন্য প্রচার করতেন। কিন্তু মুশকিল হলো দিল্লির সুলতান ইলতুতমিশ তার নামাঙ্কিত মুদ্রায় খলিফার নাম ব্যবহার করলেও একই সময় বাংলায় তার বিদ্রোহী সেনাপতি গিয়াস উদ্দিন ইওয়াজ খলজি স্বাধীন সুলতান হিসেবে নিজ নামে মুদ্রা প্রচারের সঙ্গে খলিফার নাম ব্যবহার করেন। বাগদাদের খলিফার একই সঙ্গে দিল্লির সুলতান ও তার বিদ্রোহীকে সনদ দেয়ার কথা নয়। তাই গবেষকরা মনে করেন জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য ইওয়াজ খলজি জাল সনদ ব্যবহার করছেন।

এখন আমাদের অবস্থা আরও জটিল। প্রতিদ্বন্দ্বী দুই পক্ষই দাবি করছে জনগণ তাদের পক্ষে আছে। জনগণের পক্ষ কোনটি তা জানার একমাত্র উপায় সহি হ্যাঁ-না ভোট। তেমন কোনো আয়োজন তো এ দেশে হয়নি। তাহলে জনগণের নাম ভাঙাচ্ছেন কোন তথ্যের ভিত্তিতে। জনসভায় লোকসমাগম দেখে কোনো পক্ষেরই আহ্লাদিত হওয়ার কিছু দেখছি না। প্রকৃত জনগণ জানেন, সব পক্ষের জনসভায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কমন জনগণ থাকে। দলগুলোর নেতারা জানেন এসব জনসমাগম ঘটাতে কী পরিমাণ অর্থ ছড়াতে হয়। তার পরও নেতারা জনগণ জপ করেন। আমি বিশ্বাস করি অতি সাধারণ জনগণও এসব বোঝে। তবুও সব পক্ষের নেতা গ্রাম্যতায় ভরা সাতপুরোনো রাজনৈতিক আচরণ থেকে বেরুতে পারছেন না।

আমরা মনে করি তথাকথিত বিএনপির জনগণ ও আওয়ামী লীগের জনগণকে বাদ দিয়ে এ দেশের প্রকৃত জনগণ যারা আছেন তারা বায়বীয় নন বলে তারাই প্রকৃত শক্তিশালী। তারা দলীয় আজ্ঞাবহ নন। নিজেদের বিবেক ও বিবেচনাবোধকে তারা নির্বাসনে পাঠাননি। দেশপ্রেমিকতা তাদের সঠিক পথ দেখায়। কিন্তু কণ্ঠশীলন করা নেতারা এসব জনগণের কাছে যান না, তাদের পাশে দাঁড়ান না। দাম্ভিকতা ও অসততার শক্তি দিয়ে রাজনীতির ঘূর্ণাবর্ত অতিক্রম করতে চান, যা অনেকটাই দুরূহ।

আমাদের মনে হয়, নির্বাচনের ওয়ার্মআপের মাঠে প্রতিদিন খেলাখেলির রাজনীতি জনগণের সামনে এনে নিজেদের খেলো না করে মেধাবী ও গণতান্ত্রিক শব্দ প্রয়োগে একটি আধুনিক ও স্মার্ট দেশের মানুষ হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করুন। আর মাথায় রাখুন একে অন্যকে যতই পেশিশক্তির হুমকি দেন, বেলা শেষে প্রমাণ পাবেন তৃতীয় ধারার এই দেশপ্রেমিক জনগণই প্রকৃত শক্তিশালী।

লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়


বাংলাদেশকে স্বীকৃতি ও ইন্দিরা গান্ধীর বিচক্ষণতা

ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
এম এ মোমেন

প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয় ১৭ এপ্রিল ১৯৭১। এর পরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বীকৃতির জন্য ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দাপ্তরিক পত্র পাঠনো শুরু করে। স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়া বাঙালিদের প্রত্যাশা, অবিলম্বে ভারতের স্বীকৃতির ঘোষণা আসবে এবং ভারতকে অনুসরণ করে অন্যান্য দেশও স্বীকৃতি দেবে। অবিলম্বে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার দাবি ভারতের অনেকগুলো রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন তুলল। বড় মাপের নেতাদের মধ্যে জয়প্রকাশ নারায়ণ ভারত সরকারের ওপর রীতিমতো চাপ দিতে থাকেন।

১৯৭১-এর ৭ মে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বিরোধীদলীয় নেতাদের সঙ্গে বাংলাদেশ পরিস্থিতি ও ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক নিয়ে বৈঠকে বসেছিলেন। সে সময় বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের পক্ষে যেসব রাজনৈতিক দল দাবি জানায় তার মধ্যে রয়েছে সিপিএম, সিপিআই, ডিএমকে, জনসংঘ, আদি কংগ্রেস, পিএসপি, এসএসসি ও আরএসপি। ইন্দিরা গান্ধীর নিজের দল কংগ্রেসেরও একটি উল্লেখযোগ্য অংশ স্বীকৃতির পক্ষে ছিল।

আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মেলন করে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের দাবি জানায় একটি ভারতীয় মজদুর সংগঠন। আসামের কামরূপ-কামাখ্যা জেলার পাণ্ডুতে অনুষ্ঠিত সভায় কাউন্সিল নির্দোষ স্বাধীনতাকামী জনগণের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরতা ও হত্যাযজ্ঞের নিন্দা করে। এ ধরনের চাপ তখন ক্ষমতাসীন দল কংগ্রেসের ভেতর ও বাইরে থেকে ছিল। পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তার সরকারের শ্রেষ্ঠ মেধাবীদের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন ডি পি ধর, পি এন হাকসার, রামনাথ কাও প্রমুখ।

নীল শাড়ি এবং পূর্ণ হাতার ব্লাউজ পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পশ্চিমবঙ্গে শরণার্থী শিবির পরিদর্শনে প্রথম এলেন একাত্তরের মে মাসে। এ সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দেয়া নিয়ে তিনি সাংবাদিকদেরও বিভিন্ন প্রশ্নের মুখোমুখি হন। দমদম বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের কাছে স্পষ্ট করে তিনি বলেন, এ মুহূর্তে বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি প্রদান কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য আশু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। তিনি বলেন, এ প্রশ্নের মুখোমুখি অনেকবারই তাকে হতে হয়েছে। কিন্তু তিনি সব সময়ই মনে করেছেন, ভারতের একটি নিজস্ব নীতি রয়েছে, সেই নীতির আলোকে বিভিন্ন বিষয়ে কী করণীয় তা নির্ধারণের জন্য অন্য কারও ওপর নির্ভর করতে হয় না।

দমদম থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং তার সঙ্গীরা হেলিকপ্টারে বনগাঁ যান। অন্য একটি হেলিকপ্টারে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রীরা তাদের অনুসরণ করেন। সাড়ে ৫টার কিছু পর তারা দমদম ফিরে আসেন। শরণার্থী শিবির দেখে তার কী প্রতিক্রিয়া হয়েছে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, সমস্যা অনেক বড়, কেমন করে এর সমাধান করা হবে তা বের করাও আমাদের জন্য কঠিন কাজ। আমাদের সম্পদের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রয়োজনীয় সামগ্রীরও অভাব রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার ভালো কাজই করে যাচ্ছে।

ইন্দিরা বলেন, ‘যারা দেশ ছেড়ে এখানে এসে শরণার্থী হয়েছে যত শিগগির সম্ভব তাদের নিজ দেশে ফিরে যেতে হবে।’ কিন্তু কত তাড়াতাড়ি তা সম্ভব হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা আমার জানা নেই।’ তবে তিনি আশা করেন আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ দেশত্যাগী এই মানুষদের দেশে ফেরার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে। বাংলাদেশে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এসেছে পাকিস্তান সরকারের এই দাবি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘দেশ থেকে মানুষ বের করে দিয়ে স্বাভাবিক অবস্থার দাবি করা স্বাভাবিক মানসিকতার পরিচায়ক নয়।’

সীমান্ত এলাকা থেকে শরণার্থীদের সরিয়ে আনার ব্যাপারে ইউনিয়ন গভর্নমেন্টের প্রস্তাব নিয়ে গান্ধী বলেন, ‘ত্রিপুরা খুব ছোট রাজ্য। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে শরণার্থীদের স্থানসংকুলান করার বিষয়টি বিবেচনাধীন আছে।’ তবে তা কতটা সম্ভব হবে এখনই তিনি নিশ্চিত নন। বাংলাদেশের মুক্তিফৌজকে অস্ত্র সরবরাহ করার জন্য জনতার বিভিন্ন অংশ এবং রাজনৈতিক দলের দাবি প্রসঙ্গে গান্ধী বলেন, ‘নো কমেন্ট’। (বিবরণটি ভারতীয় পত্রিকা স্টেটসম্যান থেকে নেয়া)।

কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী মনে করেছেন এবং যথার্থই মনে করেছেন, তখনই স্বীকৃতি প্রদান করলে বাংলাদেশ এমন কোনো স্বার্থোদ্ধার করতে পারত না। পরিস্থিতি সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের অনুকূলে আনার সুযোগ সৃষ্টি করার পর ভারত ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। একাত্তরের যুদ্ধের তৃতীয় দিন ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। যুক্তিসম্মত আলোচনায় এটা প্রতিষ্ঠিত হবে যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সঠিক সময়েই স্বীকৃতির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যখন পাকিস্তানের পরাজয় ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র।

৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে লেখা ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর চিঠি।

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী,

হিজ এক্সিলেন্সি, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং আপনি ৪ ডিসেম্বর যে বার্তাটি পাঠিয়েছেন, তা আমাকে এবং ভারত সরকারে আমার সহকর্মীদের বিশেষভাবে স্পর্শ করেছে। বার্তাটি পাওয়ার পর আপনারা যেভাবে আত্মনিবেদিত হয়ে বাংলাদেশকে পরিচালনা করছেন, সেই দেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি ভারত সরকার পুনরায় বিবেচনা করে।

আমি হৃষ্টচিত্তে আপনাকে জানাতে চাই, বর্তমানে যে অবস্থা বিরাজ করছে নিশ্চয়ই তার আলোকে ভারত সরকার স্বীকৃতি প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আজ সকালে এ বিষয়ে আমি আমাদের সংসদে একটি বিবৃতি দিয়েছি। বিবৃতির অনুলিপি সংযুক্ত করছি।

বাংলাদেশের মানুষকে অনেক ভুগতে হয়েছে। আপনার তরুণ ছেলেরা স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য আত্মবলিদানের সংগ্রামে লিপ্ত। ভারতের জনগণও একই আদর্শের প্রতিরক্ষায় লড়ে যাচ্ছে। আমার কোনো সন্দেহ নেই যে, এই শ্রেষ্ঠতম উদ্যোগ এবং আত্মদান ভালো কাজের জন্য আমাদের আত্মনিবেদনকে আরও শক্তিশালী করবে এবং দুই দেশের জনগণের বন্ধুত্ব অক্ষুণ্ন রাখবে। যাই হোক, পথ যত দীর্ঘই হোক, আত্মদান যত বেশিই হোক, আমাদের দুই দেশের মানুষের ভবিষ্যতে ডাক পড়বে, আমি নিশ্চিত আমরা বিজয়ীই হব।

ব্যক্তিগতভাবে আপনাকে, আপনার সহকর্মীদের এবং বাংলাদেশের বীর জনতাকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানানোর সুযোগ নিচ্ছি।

আপনার মাধ্যমে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিজ এক্সিলেন্সি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে আমার সর্বোচ্চ সম্মানের নিশ্চয়তা জ্ঞাপন করবেন।

আপনার একান্ত

(স্বাক্ষরিত)

ইন্দিরা গান্ধী

হিজ এক্সিলেন্সি মিস্টার তাজউদ্দীন আহমদ

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী

মুজিবনগর।

(বিদেশির চোখে ১৯৭১, নালন্দা ২০১২ সালে প্রকাশিত গ্রন্থ থেকে)

ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পাকিস্তানের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করছিল। একজন বিদেশি পর্যবেক্ষক বললেন, ‘ভারতীয় মন্ত্রিপরিষদকে মার্চের শেষে সেনা ও গোয়েন্দা সংস্থার পরামর্শ ছিল- ভারত পূর্ব বাংলার আশু সামরিক হস্তক্ষেপের জন্য এখনো প্রস্তুত নয়। বাঙালিদের সামরিক সাহায্য করতে হলে তাদের আরও কিছু অপেক্ষায় থাকতে হবে। ভারত কৌশলগত কারণেই সে অপেক্ষা করেছে।

এয়ার মার্শাল কপিল কাক লিখেছেন: ১৯৭১-এ সাফল্যের প্রশংসাপ্রাপ্য ইন্দিরা গান্ধীরই। তিনিই ‘মাস্টার স্ট্রাটেজিস্ট’। তিনি তার সশস্ত্র বাহিনীর ওপর বিশ্বাস রেখেছেন এবং তাদের লড়াই করার স্বাধীনতা দিয়েছেন। এই যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট, পরিকল্পনায় ছিল পেশাদারিত্ব, তিন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় ছিল অনবদ্য। তিনি স্বীকৃতিও এমন সময় দিয়েছেন যা তাকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্নের মুখোমুখি করবে না।

ভারত ও ভুটান একই দিন ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলেও ভূটানের ঘোষণাটি ভারতের কয়েক ঘণ্টা আগের। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিবই এ ঘোষণা দিয়েছেন। কয়েক ঘণ্টা আগে তা নিশ্চিত না করলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি থেকে এটা উঠে এসেছে যে বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদাতা প্রথম দেশ হচ্ছে ভুটান। এ সম্মান ভুটান অবশ্যই পেতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সে সময় ভারত স্বীকৃতি না দিলে এবং ভারতীয় পরামর্শ না পেলে কি ভুটান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবার মতো সাহসিকতা দেখাতে পারত? অবশ্যই না। এটাকে বরং ভারতীয় কর্মকৌশলের একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করাই অধিকতর যুক্তিসঙ্গত। ভারতই চেয়েছে সে সময় ভারতের অনুগত ভুটানকে দিয়ে প্রথম স্বীকৃতি দেয়াবে, তাই হয়েছে। অবশ্য নয়াদিল্লি থেকে ডেনজিল পিরিসের ক্রিশ্চিয়ান সাায়েন্স মনিটরের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়া দ্বিতীয় দেশ ভুটান। এই রিপোর্টে আরও বলা হয়, ভারত বাংলাদেশের জন্য স্বীকৃতি আদায়ে বার্মা, আফগানিস্তানসহ তার মিত্র অনেক দেশের ওপর চাপ দিচ্ছে।

একাত্তরের ডিসেম্বরে ভারত ও ভুটান ছাড়া অন্য কোনো দেশ এমনকি ১৬ ডিসেম্বরের পরও স্বীকৃতি দেয়নি। পরবর্তী স্বীকৃতি এসেছে ১২ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে। সেদিন সোভিয়েত ব্লকের দুটি ইউরোপীয় দেশ পোল্যান্ড ও বুলগেরিয়া বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন আরও অপেক্ষা করে।

পরদিন ১৩ জানুয়ারি বার্মা (এখন মিয়ানমার) স্বীকৃতি দেয়। অত্যন্ত সহজ বিশ্লেষণ- সে সময় বার্মা চীনের প্রভাবের অজ্ঞাবহ হয়ে ওঠেনি। স্বাধীনভাবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে ধরে নেয়া যায়। তখনকার জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্ট ছিলেন বার্মার নাগরিক এবং শুরু থেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন।

১৫ জানুয়ারি ১৯৭২ স্বীকৃতি দেয় নেপাল, ২০ জানুয়ারি বার্বাডোজ, ২২ জানুয়ারি যুগোস্লাভিয়া, ২৪ জানুয়ারি সোভিয়েত ইউনিয়ন। ২৫ জানুয়ারি স্বীকৃতি দেয় টোঙ্গা। ২৬ জানুয়ারি স্বীকৃতি দেয় চেকোস্লোভাকিয়া, সাইপ্রাস, হাঙ্গেরি, অস্ট্রেলিয়া, ফিজি ও নিউজিল্যান্ড।

লেখক: কলামিস্ট ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তা


নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান ও সময়ের রাজনীতি

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
নাজমুল হক প্রধান

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমাদের স্লোগান ছিল গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা। এর মধ্যে পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সব বদলে গেল। রাজনীতিতে বহুদলীয় গণতন্ত্রের সুযোগ নিয়ে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির জায়গা হলো। মুক্তিযুদ্ধের পর যে রাজনৈতিক দলগুলো নিষিদ্ধ ছিল, সেই দলগুলোও রাজনীতি করার সুযোগ পেল। শাহ আজিজের মতো একজন মানুষ তখন প্রধানমন্ত্রী হলেন। এরই মধ্যে আবার জিয়াউর রহমান নিহত হলেন।

অবৈধভাবে ক্ষমতায় এলেন এরশাদ। এরশাদ আসার পর তখন যারা ক্ষমতায় ছিলেন, সেই দলের ১৩০ সংসদ সদস্য এরশাদকে সমর্থন দিলেন। আমরা ছাত্রসমাজ ভাবলাম, এর বিরুদ্ধে কথা বলা দরকার। কিন্তু তখন আবার এমন নির্দেশনা বহাল ছিল যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে একত্রে পাঁচজনের বেশি কথা বলা যাবে না, হাঁটা যাবে না।

প্রথমে ১৪ বা ১৭টি ছাত্রসংগঠন ছিল। সবার মাঝেই তখন কীভাবে এরশাদবিরোধী কথা শুরু করা যায়, এই নিয়ে একটা আলোচনা ছিল। আমি তখন ছিলাম ছাত্রলীগের (জাসদ) প্রচার সম্পাদক। বুয়েটের এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হলো, ১৯৮২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর আমরা তৎকালীন মজিদ খানের শিক্ষানীতি নিয়ে একটি বিবৃতি দেব। বিশ্ববিদ্যালয়ে একত্রে অনেকে মিলে হাঁটব। আমরা ঠিক তা-ই করলাম।

তখনো বিভিন্ন দেশে সামরিক শাসন ছিল। আনোয়ার ভাই (??) আমাকে বললেন, ‘কাল সকালেই আমরা এই সামরিক শাসন নিয়ে একটা পোস্টার প্রদর্শনী করতে চাই। আপনি আর কাবুল জানবেন, আর কেউ নয়।’ কাবুল পড়ত ইতিহাস বিভাগে। কাবুল আমাকে জানাল, আমরা সকাল ৭টার মধ্যেই সব কাগজপত্র নিয়ে তৈরি থাকব। সকাল ৮টায় তো আমাদের ক্লাস শুরু, এর আগেই আমরা পোস্টার প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করে ফেলব।

সকালে গিয়ে দেখি, বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্টস ফ্যাকাল্টির ভেতরে পুলিশ। কাবুল তখন লাইব্রেরির পাশে ঘুর ঘুর করছে। আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল, এই পরিস্থিতিতে কী করা যায়। আমি বললাম, চলো, দেখি কী করা যায়। গিয়ে পুলিশদের বললাম, আপনারা এখানে কেন? আপনাদের দায়িত্ব তো বাইরে, এখানে কী করছেন? আমাদের ক্লাস করতে দেন। তখন পুলিশ কী মনে করে আস্তে আস্তে বেরিয়ে গেল।

এর ফাঁকেই আমরা দেয়ালজুড়ে পোস্টার লাগিয়ে দিই। প্রতিক্রিয়া এমন হলো, শিক্ষার্থীরা বোধহয় এমন দৃশ্য আগে দেখেনি। তাদের সঙ্গে সঙ্গে আমরাও দাঁড়িয়ে দেখছি, মনে হয় পাঁচ মিনিট হলো। প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থীর দেখা হয়ে গেল। পরক্ষণেই পুলিশ এসে সব পোস্টার ছিঁড়ে ফেলল। পরে নেতারা এলেন। বিভিন্ন বিষয়ে কথা হলো। আমরা পুরো ক্যাম্পাসে হাঁটলাম। এই হলো আন্দোলনের সূত্রপাত।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন করার কোনো এক বছরের ৭ নভেম্বর আমরা কর্নেল তাহের দিবস পালন করি। এ দিন মিছিল করার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমরা মিছিল শুরু করে দিলাম। মধুর ক্যানটিন থেকে বেরিয়ে আমরা ডাকসু পর্যন্ত যেতে না যেতেই পুলিশের হামলা। চলল প্রায় পাঁচ ঘণ্টা। আমি, নুরুল আমিন ব্যাপারীসহ অনেকেই আহত হলাম। এভাবেই শুরু হলো আন্দোলন।

এর মধ্যেই আমি ছাত্রলীগের (জাসদ) কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পেলাম। সে সময় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এরশাদের স্বৈরাচারী সরকারকে পতন ঘটানোর আন্দোলনে মতদ্বৈধতা ছিল। এই সুযোগটা এরশাদ ব্যবহার করছিলেন। সে কারণে এই স্বৈরাচার সরকারের পক্ষে ১৯৮৬ এবং ১৯৮৮ সালের দুটি নির্বাচন করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু আমরা কয়েকটি ছাত্র সংগঠনের নেতারা এরশাদের পতনের জন্য কার্যকরী ছাত্র আন্দোলন গড়ে তুলতে চেয়েছিলাম। এ সময় এরশাদবিরোধী আন্দোলন অনেকটা ঝুলে গিয়েছিল। আমরা তখন মনে করেছিলাম এই আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি আনতে গেলে গোটা ছাত্রসমাজকে এক জায়গায় আনতে হবে। একই সঙ্গে জাতীয় নেতৃবৃন্দকেও এক জায়গায় আনতে হবে। এ সময় আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে আমি, তৎকালীন জাতীয় ছাত্রলীগের সভাপতি জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকু, ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল এবং ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি নূর আহমেদ বকুল নিজেদের মধ্যে একটি বৈঠক করি। আমরা তখন মনে করতাম, আন্দোলন করতে গেলে রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে হয়। তখন এরশাদবিরোধী প্রধান দুই রাজনৈতিক নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মধ্যে মতদ্বৈধতা চরমে পৌঁছে গিয়েছিল। এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা এবং না করা নিয়ে বিতর্কটা চরমে পৌঁছে গিয়েছিল। তখন আমরা ছাত্রনেতারা চিন্তা করছিলাম, কীভাবে ছাত্রদের একটা মঞ্চে আনা যায়।

এর মধ্যে বাসের ভাড়া বৃদ্ধির সরকারি সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। তখন বাবুল, টিংকু, বকুল, মোস্তফা ফারুক আর আমি একসঙ্গে বৈঠক করে বাস ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে একটি বিবৃতি দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম। এই বিবৃতিতে ডাকসুর ভিপি-জিএস হিসেবে ছাত্রদলের নেতাদের স্বাক্ষর নেয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এই বিবৃতিতে স্বাক্ষর করতে চাইছিলেন না। এই সংগঠনের তৎকালীন সভাপতি হাবিবুর রহমান হাবিব আমাকে জানালেন, ছাত্রদলের সঙ্গে কোনোভাবেই একসঙ্গে বিবৃতি বা আন্দোলন না করার নির্দেশনা দিয়েছেন শেখ হাসিনা। আমাদের এক ধরনের অনুরোধের চাপাচাপিতে শেষ পর্যন্ত তিনি সই দিলেও ছাত্রলীগের সেই সময়ের সাধারণ সম্পাদক অসীম কুমার উকিল যৌথ আন্দোলনের ব্যাপারে সায় দিতে গড়িমসি করছিলেন।

এর মধ্যে ১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে সচিবালয় অবরোধ কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে মারা যান ছাত্রনেতা খন্দকার নাজির উদ্দিন জেহাদ। তিনি ছাত্রদলের রাজনীতি করতেন। পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী সেই দিন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ৮ দল, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৭ দল এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) নেতৃত্বাধীন ৫ দলসহ অন্যান্য দলের আহ্বানে ঢাকায় সচিবালয় অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়।

এই অবরোধ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের জন্য জেহাদ উল্লাপাড়া থেকে ৬০ জন ছাত্র নিয়ে ঢাকায় আসেন এবং অবস্থা্ন কর্মসূচিতে যোগ দেন। সচিবালয়ের চারপাশে পুলিশ অবস্থান নেয়। পুলিশ অবরোধকারীদের ওপর গুলি চালালে ‘দৈনিক বাংলা’র মোড়ে বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে জেহাদ মারা যান।

বিক্ষুব্ধ জনতার সঙ্গে সংঘর্ষে পুলিশ লাঠিপেটা, কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার ও গুলি বর্ষণ করে। সংঘর্ষে অন্তত ৩০০ লোক আহত হয়। ৪৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গুলিতে নিহত জেহাদের লাশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে আসার পর গোটা ক্যাম্পাস প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটের মধ্যে ডাকসুসহ ২২টি ছাত্র সংগঠন একত্রিত হয়ে ‘সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য’ গঠন করে। ছাত্রঐক্য জেহাদের লাশ নিয়ে মিছিল করে।

সেই মিছিলের নেতৃত্বে আমার সঙ্গে ছিলেন ছাত্রদলের তৎকালীন ডাকসুর সহসভাপতি আমানউল্লাহ আমান, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি হাবিবুর রহমান হাবিব, ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক খায়রুল কবির খোকন, ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি নূর আহমেদ বকুলসহ অনেকে।

জেহাদের লাশ দেখতে যান শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া। তাতে ছাত্ররা আরও উৎসাহিত হন। বিকেলে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে ছাত্রঐক্য পরিষদ এক সমাবেশে তাদের পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করেন। সন্ধ্যায় ছাত্রঐক্যের এক বিরাট মিছিল বের হয়। শিশুপার্কের কাছে পুলিশের হামলায় আমরা বেশ কয়েকজন ছাত্রনেতা আহত হই।

১০ অক্টোবরের ঘটনার প্রতিবাদে পরদিন ১১ অক্টোবর ছাত্রঐক্যের ডাকে অর্ধদিবস হরতাল পালিত হয়। হরতাল চলাকালে ঢাকা ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের সঙ্গে ছাত্রদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। ১৫ জন ছাত্রনেতাসহ শতাধিক ছাত্র আহত হন। এভাবে এরশাদবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদসহ (স্কপ) বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন আন্দোলনে যুক্ত হয়। এই গতিশীলতা এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ১৫ দল, ৭ দল এবং ৫ দলের রাজনৈতিক জোটের নেতৃত্বকে এক জায়গায় আনতে পারে। এর মধ্যে ১৯৯০-এর ২৭ নভেম্বর বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) তৎকালীন যুগ্ম মহাসচিব ডা. শামসুল আলম খান মিলন নিহত হন। আন্দোলনের গতি আরও অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। এরশাদ সরকার কারফিউ জারি করে। কিন্তু ছাত্ররা সেই কারফিউ না মেনে রাস্তায় নেমে আসতে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক জায়গায় কারফিউ ভেঙে মিছিল বের করে ছাত্ররা। অবশেষে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতন ঘটে।

আমাদের আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল, অবৈধ সামরিক শাসনের অবসান ও বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের ধারায় নিয়ে যাওয়া। ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, ক্ষমতায় যেতে বা টিকে থাকতে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল নব্বইয়ের মূল লক্ষ্য, দর্শন বা আদর্শ থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। বিএনপি যেমন একদিকে ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক দলকে সঙ্গে নিয়ে ক্ষমতায় গিয়েছে, তেমনি অপর দিকে আওয়ামী লীগও স্বৈরচারী এরশাদের নেতৃত্বাধীন দলের সঙ্গে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য জোট করেছে। এভাবেই ’৯০-এর গণ-আন্দোলনের মূল চেতনাকে পরিত্যাগ করা হয়েছে। অবশ্য এর মধ্যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে। বিচার হয়েছে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের। কিন্তু স্বৈরাচারী এরশাদের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঐক্য কখনোই সমীচীন ছিল না। রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দেয়া কখনো শুভ ফল বয়ে আনতে পারে না। আর এখন ছাত্ররাজনীতির স্বকীয়তাকেও গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে। ছাত্ররা ক্ষমতাসীনদের লাঠিয়ালে পরিণত হয়েছে।

লেখক: বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য

বিষয়:

দৈনিক পাকিস্তান সরকারি পত্রিকা হলেও ৭১ সালে ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়

অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান।
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
প্রতিবেদক, দৈনিক বাংলা
    অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের সাক্ষাৎকার

অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক। তিনি কথা বলেছেন ১৯৭১ সালের দৈনিক পাকিস্তান (পরে দৈনিক বাংলা) এবং ওই সময়ে নিজের জীবনের আলোচিত অধ্যায় নিয়ে। তার এ সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রাহাত মিনহাজ

রাহাত মিনহাজ: আপনি দৈনিক পাকিস্তানে কবে যোগ দিলেন?

সাখাওয়াত আলী খান: ১৯৭১ সালে বায়তুল মোকাররমের পূর্ব পাশে বর্তমান দৈনিক বাংলা মোড়েই ছিল পত্রিকার অফিস। দৈনিক পাকিস্তান ১৯৬৪ সালের নভেম্বরে যাত্রা শুরু করেছিল। ১৯৬৫ সালের ৫ জানুয়ারি আমি দৈনিক পাকিস্তানে জয়েন করেছিলাম। তখন পত্রিকা অফিস ছিল মদনমোহন বসাক রোডে। যেটির বর্তমান নাম টিপু সুলতান রোড। সেখানে একটি ভাড়া বাড়িতে ছিল অফিস। পরবর্তী সময়ে নতুন ভবন নির্মাণ হলে দৈনিক বাংলা মোড়ে অফিস চলে আসে।

রাহাত মিনহাজ: দৈনিক পাকিস্তান অফিস ১৯৬৯ সালে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। অনেক সাক্ষাৎকারে আপনি মজা করে বলেছিলেন এই আগুন দেয়ার কাজে আপনি নিজেও হাত লাগিয়েছিলেন।

সাখাওয়াত আলী খান: দৈনিক পাকিস্তান অফিস আর মর্নিং নিউজ অফিস ১৯৬৯-এর ২৪ জানুয়ারি গণ-অভ্যুত্থানের সময় বিক্ষুব্ধ মানুষ পুড়িয়ে দিয়েছিল। মূলত সরকারি পত্রিকা হিসেবে পুড়িয়ে দেয়া হলো। যদিও দৈনিক পাকিস্তান তখন সাংঘাতিক কোনো রোল (ভূমিকা) পালন করত না। মানুষের ক্ষোভ ছিল মর্নিং নিউজের ওপর। ২০ জানুয়ারি আসাদ নিহত হওয়ার পর মর্নিং নিউজে কোনো সম্পাদকীয় প্রকাশ হয়নি। এ ছাড়া সামগ্রিকভাবে সংবাদপত্রটির ভূমিকা ছিল গণবিরোধী। মনিং নিউজ ও দৈনিক পাকিস্তান একই ভবনে ছিল। মূলত আন্দোলনকারীরা আগুন দেয় মনিং নিউজে, সঙ্গে পুড়ে যায় দৈনিক পাকিস্তান।

দৈনিক পাকিস্তানের ভূমিকা ইতিবাচকই ছিল। তখন সব পত্রিকা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিস্তারিত সংবাদ প্রকাশ করছিল। এ বিষয়গুলো মানুষ বিশ্বাস করছিল। মানুষ মনে করছিল শেখ মুজিব যদি ষড়যন্ত্র করেও থাকেন তাহলে ভালো কাজ করেছেন। সে সময় যেসব রিপোর্টার এসব ছেপেছেন, তাদের সবাই ছিলেন আইয়ুব খান ও মোনায়েম খানবিরোধী। ফয়েজ আহমেদ ভাই অন্যতম। তার ভূমিকা ছিল অসাধারণ। এখানে সরকারের একটি সিদ্ধান্ত বুমেরাং হয়েছিল। শেখ মুজিবুর রহমানকে দেশদ্রোহী প্রমাণ করার জন্য সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ডিটেইলস ছাপার বিষয়টি অনুমোদন করেছিল। কিন্তু রেজাল্ট হলো উল্টো। মানুষ আরও বেশি ক্ষেপে গেল।

ওই দিন আমার ডিউটি ছিল। আমি অফিসের সামনে গিয়ে দেখি আগুন জ্বলছে। সামনে উত্তেজিত অনেক মানুষ। তারাই আগুন লাগিয়েছিল। তারা তো আমাকে চেনে না। আমাকে বলল, ভাই আপনিও একটু হাত লাগান! আমি তখন মনে মনে বলি, আমার পত্রিকা অফিস আমি পুড়িয়ে দেব। আমিও হাত লাগালাম। আমার সামনেই পুরো অফিস দাউ দাউ করে জ্বলে গেল।

রাহাত মিনহাজ: দৈনিক পাকিস্তানে আপনি কোন দায়িত্বে ছিলেন?

সাখাওয়াত আলী খান: দৈনিক পাকিস্তানে আমি সিনিয়র সাব-এডিটর হিসেবে ছিলাম। মূলত সিনিয়র শিফট ইনচার্জ হিসেবে আমি কাজ করতাম। রাতের শিফটেই আমার বেশি ডিউটি থাকত। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ আমি ঢাকা থেকে চলে যেতে বাধ্য হই।

রাহাত মিনহাজ: একটু পেছন দিকে আসতে চাই। খুব সম্ভবত ১ মার্চের পর থেকেই সংবাদপত্রে কী ছাপা হবে, সে বিষয়ে একটি বড় পরিবর্তন এসেছিল।

সাখাওয়াত আলী খান: ওই সময়টায় প্রেস ট্রাস্টের যারা মালিক ছিলেন, তারা সংবাদপত্রটির কাছেই ভিড়তেই পারতেন না। পত্রিকার নামটি দৈনিক পাকিস্তান ছিল বটে, কিন্তু সেখানে যারা কাজ করতেন অনেক গুণী মানুষ। তারা বাংলাদেশের স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন। তখন দৈনিক পাকিস্তানে কাজ করতেন আবুল কালাম শামসুদ্দিন, হাসান হাফিজুর রহমান, তোয়াব খান, এহতেশাম হায়দার চৌধুরি, ফওজুল করিম, শামসুর রাহমান, আহসান হাবীব, সানাউল্লাহ নূরী, আহমেদ হুমায়ূন, নির্মল সেন, খন্দকার আলী আশরাফ, সৈয়দ কামাল উদ্দীনসহ আরও অনেকেই। মার্চের আগের দিকে ফার্স্ট এবং সেকেন্ড লিডে কোনো রকমে মোনায়েম খান, আইয়ুব খানের নামে দিয়ে বাকি সব নিউজে পশ্চিম পাকিস্তানিদের অভিলাষ ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে লেখালেখিতে ভর্তি ইত্যাদি থাকত। ঠিক এ কারণেই দৈনিক পাকিস্তান ন্যাশনাল প্রেস ট্রাস্টের মালিকানার পত্রিকা হয়েও বিরাট সার্কুলেশন পেয়েছিল।

রাহাত মিনহাজ: বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ সম্পর্কে একটু জানতে চাই। আপনি এ ভাষণটি কীভাবে শুনেছিলেন?

সাখাওয়াত আলী খান: বঙ্গবন্ধুর ভাষণের দিন আমি রেসকোর্সের মাঠে ছিলাম। আমি অনেকটা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম যদি লেখার মতো কিছু পাই, তবে লিখে ফেলব। আর্ট কলেজের (চারুকলা ইনস্টিটিউট) গেট দিয়ে আমি মাঠে ঢুকেছিলাম। ওই সময় রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে) কিছু ছোট টিলা ছিল। তার ওপরে কিছু ঘরও ছিল। ছিল বারান্দা। সেসব ঘরে সেদিন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অফিসাররা বসে ছিলেন। আমি পরিষ্কারভাবে তাদের দেখেছি। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ দেয়ার সময় আমাদের মাথার ওপর দিয়ে আর্মির বড় বড় হেলিকপ্টার উড়ছিল। বর্তমানে যেখানে ফুলের দোকানগুলো, সেখানে সে সময় আমি সারি সারি আর্মির ট্রাক দাঁড় করানো অবস্থায় দেখেছি। পাশেই ছিল মূল রেডিও অফিস (বর্তমান বঙ্গবন্ধু মেডিকেল) পরে জেনেছি, পাক বাহিনী রেডিও অফিসে ঢুকে বন্দুকের নল ধরে বলেছিল, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার করা যাবে না। তখন রেডিও অফিস আর প্রচার করতে পারেনি। কিন্তু রেডিও পরদিন বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার করেছিল এবং সেটি একাধিকবার প্রচার করেছিল।

রাহাত মিনহাজ: ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে আপনার আর অন্য কোনো মূল্যায়ন বা স্মৃতি আছে?

সাখাওয়াত আলী খান: পুরো ভাষণে বঙ্গবন্ধুর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ছিল দেখার মতো। বঙ্গবন্ধু কীভাবে উচ্চারণ করেছিলেন, তর্জনী তুলেছিলেন এগুলো আমার স্পষ্ট মনে আছে। বঙ্গবন্ধু শুরু করার আগেও রেডিওতে ঘোষণা চলছিল। যখন একজন অ্যাংকর বললেন, এখন সরাসরি ভাষণ দেবেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ঠিক সেই মুহূর্তে যখন ভাষণ শুরু হবে, ঠিক সেই সময়েই রেডিও একেবারে অফ হয়ে গেল। কোনো কথা নাই বার্তা নাই, একবারে অফ। পরে বোধহয় কিছু গানবাজনা অথবা কোরআন তেলাওয়াত শুরু হয়েছিল।

রাহাত মিনহাজ: ৭ মার্চে যখন বঙ্গবন্ধু ভাষণ দিলেন, অনেক পত্রিকাই পরের দিন বঙ্গবন্ধুর বড় ছবি ছাপল, ট্রেডমার্ক তর্জনীর ছবি ছাপল। ইত্তেফাক একটি ডিফেন্সিভ শিরোনাম করল, পরিষদে যাইবার পারি যদি...।

সাখাওয়াত আলী খান: ইত্তেফাকের ওমন শিরোনাম করার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তখনো এমন একটি পরিস্থিতি ছিল যে পাকিস্তান যদি টিকে যায়! টিকে যেতেও পারে। এখানে মানিক মিয়ার কথা একটু বলতে হয়। ছয় দফা আন্দোলনে মানিক মিয়া প্রথম দিকে অতটা সাপোর্ট দেননি। তবে পরের দিকে পুরোপুরি সাপোর্ট দিয়েছিলেন। ওই সময় ইত্তেফাকের সাপোর্টটি খুব জরুরি ছিল। ১৯৬৯ সালে মানিক মিয়া মারা গেলেন। তিনি তো মুক্তিযুদ্ধ কিংবা স্বাধীন বাংলাদেশ দেখে যেতে পারলেন না। পরে অন্যরা দায়িত্বে এলেন। তাদের আলাদা চিন্তা ছিল। সে জন্যই হয়তো ওই রকম হেডলাইন ছিল ‘গণপরিষদে যাইবার পারি যদি...’।

রাহাত মিনহাজ: ২৫ মার্চ রাতের অভিজ্ঞতা জানতে চাই। এরপর সাংবাদিকতা কীভাবে চলেছে?

সাখাওয়াত আলী খান: ২৫ মার্চ আমার ডিউটি ছিল দিনের বেলা। দিনটি ছিল উত্তেজনায় ভরা। নানা দিক থেকে নানা রকম খবর আসছিল। চলমান পরিস্থিতি নিয়ে অফিসে আমি, তোয়াব খান, ফওজুল করিম, নির্মল সেন, সানাউল্লাহ নূরী, সালেক খান অনেকক্ষণ ধরে আলোচনা করলাম। আমরা বুঝতে পারছিলাম নিশ্চিতভাবেই খারাপ কিছু ঘটতে যাচ্ছে। তবে পাকিস্তান সেনাবাহিনী যে এভাবে বর্বর হত্যাকাণ্ড চালাবে, তা আমরা কল্পনাও করিনি। যা-ই হোক, অফিসে আলাপ-আলোচনা সেরে বিকেলের শেষ দিকে আমি অফিস থেকে বের হই।

অফিস থেকে বের হয়ে দেখি রাস্তাঘাট ফাঁকা। থমথমে ভাব। বাসায় ফিরব, কিন্তু কোনো যানবাহন নেই, রিকশা নেই। আমি হেঁটে প্রেসক্লাবের সামনে পর্যন্ত যাই। আমরা থাকতাম লালমাটিয়ায়। আমরা থাকতাম দোতলায়। এটি ছিল পেশাজীবীদের কলোনি। রাতে কারফিউ ঘোষণা হলো। এরপর মধ্যরাতের আগেই শুরু হলো গোলাগুলি। আর চারদিকে আগুন। আমি আমার বাড়ি থেকেই অনেক বস্তি পুড়তে দেখেছি। গোলাগুলি হচ্ছে। আর মিরপুর-নিউমার্কেট রাস্তা দিয়ে চলছিল ট্যাংক। ভয়াবহ ভীতিকর অবস্থা। আমাদের অবস্থা আরও খারাপ ছিল, কারণ আমাদের কলোনির পাশেই বিহারিরা থাকত। রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী অভিযান শুরুর পর পরই বিহারিরা জঙ্গি মিছিল শুরু করে। ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ, আল্লাহ হু আকবর’ ধ্বনি তুলে আমাদের কলোনির পাশেই মিছিল করে। এ সময় তারা মাইকে ভাঙা ভাঙা বাংলায় ঘোষণা দেয়, কালো পতাকা নামিয়ে ফেলুন, বাংলাদেশের পতাকা নামিয়ে ফেলুন।

২৬ মার্চ সকাল থেকেই নতুন আতঙ্ক। আমাদের শঙ্কা ছিল বিহারিরা যেকোনো সময় আমাদের কলোনি আক্রমণ করবে। এর মধ্যে ২৯ মার্চ সন্ধ্যায় গুজব রটে গেল বিহারিরা আমাদের কলোনিতে আক্রমণ করবে। এ সময় আমরা নিজেরা নিজেদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করেছিলাম। আমার পাশের বাসায় ফায়ার ব্রিগেডের একজন কর্মকর্তা থাকতেন। আমরা একসঙ্গে নিরাপত্তা জোরদারের চেষ্টা করলাম। আমার একটি বন্দুক ছিল। সেই বন্দুক নিয়ে আমরা ছাদে অবস্থান নিলাম। ছাদের ওপর ইটপাটকেল জড়ো করলাম। ওই ভদ্রলোক আমাদের গরম পানির ব্যবস্থা করতে বললেন। তিনি উল্লেখ করলেন, যদি কেউ আক্রমণ করে ওপর থেকে গরম পানি ঢেলে দেব। যদিও আমাদের কলোনি আক্রান্ত হয়নি। পরে কারফিউ উঠে গেলে দেখি কলোনির অনেকেই চলে যাচ্ছেন। ঢাকা ছাড়ছেন।

রাহাত মিনহাজ: আপনিও ঢাকা ছাড়লেন?

সাখাওয়াত আলী খান: আসলে ওখানে থাকা যাচ্ছিল না। পরিস্থিতি অনেক ভীতিকর। আমার প্রতিবেশী এপিপির আজিম সাহেবের একটি ভক্সওয়াগন গাড়ি ছিল। ওনার ছেলে দশম শ্রেণিতে পড়ে। ও গাড়ি চালাতে পারত। ছেলেটিকে বললাম, আমাদের আগাইয়া দাও, আমরা দেশের বাড়িতে চলে যাই। আমার দেশের বাড়ি নরসিংদীর শিবপুর। আমরা আজিম সাহেবের ছেলের গাড়িতে করে টিকাটুলী পর্যন্ত গেলাম। রাস্তায় আমরা প্রচুর লাশ দেখলাম। রাজারবাগ ধ্বংস হয়ে গেছে। আগুনের দাগ। এর মধ্য দিয়ে আমরা টিকাটুলী গেলাম। সেখান থেকে বেবিট্যাক্সি ভাড়া করেছিলাম ঘাট পর্যন্ত যাওয়ার জন্য। ও হ্যাঁ। আমার বন্দুকটি আমি সঙ্গেই নিই, কায়দা করে লুকিয়ে। পুরোটা লুকানো সম্ভব হলেও নলটি একটু বের হয়ে ছিল। এদিকে রেডিওতে ঘোষণা ছিল, যার যার বন্দুক জমা দেয়ার। সে যা-ই হোক, টিকাটুলী থেকে আমরা ডেমরা যাই। তখন শীতলক্ষ্যার ওপর ব্রিজ হয়নি। সরকারি ফেরি চলছে, কিন্তু অনেকক্ষণ পরপর। তাই আমরা আলাদাভাবে নৌকা রিজার্ভ করে ঘাট পার হলাম।

রাহাত মিনহাজ: ঘাট পার হয়ে কী দেখলেন?

সাখাওয়াত আলী খান: নদীর ওপারে তো ভিন্ন চিত্র। বাংলাদেশ একদম স্বাধীন। বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে। জয় বাংলা স্লোগান দিচ্ছে। পুরো ভিন্ন পরিস্থিতি। আমি নদী পার হওয়ার পর ঘাটেই বন্দুক দেখে আমাকে একজন বলল, খুব ভালো কাজ করেছেন। এ বন্দুক খুব কাজে লাগবে। ওখান থেকে একটি গাড়ি ভাড়া করে আমরা নরসিংদী পর্যন্ত পৌঁছালাম। সেখান থেকে শিবপুরে গেলাম। সেখানকার থানা আমাদের পক্ষে ছিল। ওসি বন্দুকটি নিয়ে গেল। সেখানে ছেলেরা স্কুলের মাঠে ট্রেনিং শুরু করে।

রাহাত মিনহাজ: ১৯৭১ সালের সাংবাদিকতা সম্পর্কে জানতে চাই। সে সময়ের বিশেষ কোনো ঘটনা যদি আমাদের বলেন?

সাখাওয়াত আলী খান: ১৯৭১ সালে একটি সংবাদের কথা আমার বেশ মনে আছে। যেটি পত্রিকায় বড় করে বক্স আকারে হেডলাইন করা হয়েছিল। খবরটি ছিল মোনায়েম খানকে হত্যার খবর। যারা পত্রিকা অফিসে তখন ছিলেন, তারাও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেই ছিলেন, কিন্তু কায়দা করে কিছুটা নেগেটিভভাবে সংবাদটি প্রচার করেছিলেন। আর্মিরা তখন এই সংবাদের ব্যাপারে কিছু করতে পারেনি। মুক্তিবাহিনী মোনায়েম খানের বাড়িতে ঢুকে গুলি করে তাকে হত্যা করেছিল। যদিও সংবাদে মুক্তিবাহিনী না বলে দুষ্কৃতিকারী বলা হয়েছিল। একাত্তর সালজুড়ে পত্রিকা এভাবেই সেনাবাহিনীর নজরদারিতেই চলেছিল। তা ছাড়া ইত্তেফাক, দ্য পিপল আর সংবাদ পত্রিকা অফিস তো ধ্বংসই করে দেয়া হয়েছিল। সংবাদের সাংবাদিক শহীদ সাবের রাতের বেলা পত্রিকা অফিসে ঘুমাতেন। রাতে ট্যাংকের বোমার আঘাতে যখন পত্রিকা অফিস ধ্বংস হয়, তিনি পুড়ে মারা যান। কিছুদিন পর ইত্তেফাক আবার বের হয়েছিল। কিন্তু সংবাদ এবং দ্য পিপল এই দুটি পত্রিকা আর বের হয়নি। এই তিনটি পত্রিকার ওপর পাকিস্তান বাহিনীর অন্য রকম ক্ষোভ ছিল। এসব পত্রিকায় মুক্তি সংগ্রামের সংবাদ (২৬ মার্চের আগ পর্যন্ত) বেশি প্রচারিত হতো। আর মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হলো, তখন এ ধারা কিছুটা পাল্টে গিয়েছিল। কারণ তখন সেন্সর করা পত্রিকা বের হতো। পত্রিকায় কী কী সংবাদ প্রকাশিত হবে, তা আর্মি এসে চেক করত, আবার বাংলা না বুঝলে তা ট্রান্সলেশন করে পাঠিয়ে দিত।

রাহাত মিনহাজ: দৈনিক পাকিস্তানের তোয়াব খান কলকাতায় চলে গিয়েছিলেন। আপনিও ঢাকা ছাড়লেন। সংবাদপত্রটির বাকি অন্যরা কী করেছিলেন। আর এই সময়টা আপনি কীভাবে কাটিয়েছেন?

সাখাওয়াত আলী খান: ২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউনের পর অনেকেই গ্রমাঞ্চলে পালিয়ে যান। অনেকেই আত্মগোপনে থাকেন। অফিসে আসেননি দীর্ঘদিন। শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান ও আমি ঢাকা থেকে পালিয়ে গেছি। কিন্তু আমরা কেউ বর্ডার ক্রস করিনি। আমাদের বাড়িটিকে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পের জন্য ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। ফলে আমরা ফ্যামিলিসহ নরসিংদীর শিবপুর অঞ্চল থেকে পালিয়ে দূরে দূরে থাকতাম। হায়দার আকবর খান রনো, রনোর ভাই জুনো, কাজী জাফর, রনোর বাবা হাতেম আলী খান, তার স্ত্রী- এরা আমাদের বাড়িতে ছিলেন। জহির রায়হানের গাড়িও ছিল সেখানেই। আসলে আগরতলা যাওয়ার রুট ছিল আমাদের বাড়ির ওপর দিয়ে। আমার বাড়ি এবং আমার চাচার বাড়িতে সব মিলিয়ে ১৫-১৬ জন ছিলেন। সেখানে একজন মহিলা পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তিনি গর্ভবতী ছিলেন। আমার স্ত্রীর হাতেই তার বাচ্চা হয়েছিল। বাচ্চার নাম রাখা হয়েছিল মুক্তি। আমার ওপরেও একটি কাজের ভার পড়েছিল। নাড়ি কাটার জন্য ব্লেড জোগাড়ের।

রাহাত মিনহাজ: মুক্তিযুদ্ধে আপনার পরিবারের এক সদস্য শহীদ হয়েছিলেন। তার সম্পর্কে একটু জানাবেন?

সাখাওয়াত আলী খান: আমার শ্যালক ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট, নাম আতিক। আতিক ছিল ইঞ্জিনিয়ার কোরের অফিসার। ফোর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসার হিসেবে ওর পোস্টিং ছিল কুমিল্লা সেনানিবাসে। আতিকের কমান্ডিং অফিসার ছিলেন খালেদ মোশাররফ। ২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউনের আগে এই রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার ও অনেক কর্মকর্তা-সদস্যকে সীমান্তে পাঠানো হয়েছিল। এটি ছিল পাক বাহিনীর কৌশল। তাদের সরিয়ে দিয়ে রেজিমেন্টকে দুর্বল করেছিল পাকসেনারা। এরপর কুমিল্লা সেনানিবাসে বাঙালি অফিসারদের বন্দি করে পাকসেনারা। তারপর একটি ঘরের মধ্যে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। এতে আতিকসহ বেশির ভাগ বন্দি শহীদ হন। এই ক্যান্টনমেন্টেই বর্ষীয়ান বাঙালি রাজনৈতিক নেতা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে হত্যা করা হয়েছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই বিষয়গুলো নিয়ে আমি প্রতিবেদন তৈরি করেছিলাম। পরে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে গর্ত খুঁড়ে অনেক অফিসার ও সেনাসদস্যের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়। আতিকের মরদেহও পাওয়া যায়। হাসান হাফিজুর রহমানের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্রের অষ্টম খণ্ডে এ বিষয়ে আমার লেখা আছে।

রাহাত মিনহাজ: ১৯৭১ সালে অনেক সাংবাদিক শহীদ হলেন।

সাখাওয়াত আলী খান: সাংবাদিকদের অনেকেই তো মারা গেলেন। অনেকেই আবার দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও মারা গেছেন। যেমন মিরপুরে শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে জহির রায়হান মারা গেলেন। নিজাম উদ্দীন সাহেব, তাকে আলবদররা তুলে নিয়ে গেল। আসলে এই মুহূর্তে নামগুলো সঠিক মনে নেই সব। তবে অনেক সাংবাদিককে টার্গেট করে পাক বাহিনী হত্যা করেছে। যাদের সহযোগী ছিল আলবদর।

রাহাত মিনহাজ: ঢাকায় কবে ফিরলেন? যতদূর জানি আপনি দৈনিক পাকিস্তান বা দৈনিক বাংলা নতুন করে প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলেন?

সাখাওয়াত আলী খান: দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ১৯ ডিসেম্বর আমি ঢাকায় আসি। ঢাকার কাছাকাছি থাকায় আমি অফিসে দ্রুত আসতে পেরেছিলাম। অনেকেই মুজিবনগরে কিংবা দূরে দূরে ছিলেন। তারা ভাই পালিয়ে গেলেও তিনি ঢাকাতেই থাকতেন। আমি আর তারা ভাই মিলে আরামবাগে গিয়ে প্রেসের ম্যানেজারকে ধরে অফিসে নিয়ে এলাম। তাকে বলা হলো মেশিন চালানোর জন্য কিছু লোক জোগাড় করতে। তিনি তখন কিছু লোক জোগাড় করেছিলেন।

অফিসে ছিলাম মাত্র কয়েকজন। আমি, তারা ভাই, আমিনুল ইসলাম, প্রেস ম্যানেজার আবদুল হাইসহ আরও কয়েকজন। অফিসে ঢুকে দেখি অফিস একদম ফাঁকা। সুনসান নীরবতা। ১৯ ডিসেম্বরেই আমরা পত্রিকা প্রকাশের প্রস্তুতি নিই। প্রকাশের তারিখটি সঠিক মনে নেই। সম্ভবত ২০ অথবা ২১ ডিসেম্বর ‘দৈনিক বাংলাদেশ’ নামে প্রথম প্রকাশিত হয়। দৈনিক বাংলাদেশ নামে তিনটি সংখ্যা বের হওয়ার পর এর নাম হলো দৈনিক বাংলা। এর জন্য আমরা কারও কোনো পারমিশন নিইনি। আমরা নিজেরাই নতুন নামে পত্রিকা বের করি।

রাহাত মিনহাজ: দৈনিক বাংলাদেশ থেকে দৈনিক বাংলা কীভাবে হলো?

সাখাওয়াত আলী খান: দৈনিক পাকিস্তান যখন দৈনিক বাংলাদেশ নামে প্রকাশিত হচ্ছে, তখন বগুড়া থেকে এক ভদ্রলোক এলেন। তিনি বললেন, ‘আপনারা দৈনিক বাংলাদেশ নামে পত্রিকা প্রকাশ করতে পরবেন না।’ আমরা বললাম কারণ কী? তিনি জানালেন, তার একটি সংবাদপত্র আছে। যার নাম দৈনিক বাংলাদেশ। এরপর আমরা বাংলাদেশ নাম বাদ দিয়ে নতুন নাম দিলাম দৈনিক বাংলা। পরবর্তী সময়ে এ নামেই সংবাদপত্রটি প্রকাশিত হতে থাকে বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত।

রাহাত মিনহাজ: আপনাকে ধন্যবাদ

সাখাওয়াত আলী খান: আপনাকেও ধন্যবাদ।


যত গতি তত ক্ষতি

ইলিয়াস কাঞ্চন
আপডেটেড ৪ ডিসেম্বর, ২০২২ ১১:৫৪
ইলিয়াস কাঞ্চন

দুর্ঘটনা আগের চেয়ে বেড়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। দুর্ঘটনার সঙ্গে এর উপকরণও বেড়েছে। বদলে গেছে দুর্ঘটনার ধরন। এতদিনেও সড়ক পরিবহন আইনের বিধিমালা হয়নি। বিধিমালা প্রকাশ করে আইন বাস্তবায়ন করার জন্য দৃশ্যমান যে কাজ, সেটি হয়নি। সুতরাং দুর্ঘটনা রোধ করার জন্য যেসব নিয়ামক বাস্তবায়ন করা দরকার ছিল, সেগুলো না করলে দুর্ঘটনা বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক।

দুর্ঘটনার পর গাড়িতে করে মানুষকে ছেঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার যে ঘটনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটেছে, এটি নতুন নয়। এ ধরনের ঘটনা আগেও ঘটেছে। যে ব্যক্তি এই কাজটি করেছেন তার মানসিক সমস্যা নয়। নিজেকে বাঁচানোর জন্যই দুর্ঘটনার পর পালানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি জানতেন তার গাড়ির নিচে কেউ একজন বেঁধে আছেন। সুতরাং এটা মানসিক কোনো বিষয় নয়। এই পালিয়ে যাওয়ার মনমানসিকতা রোধ করতে হলে সিসি ক্যামেরা দেখে দুর্ঘটনার আসল কারণ নির্ধারণ করে বিচার করতে হবে। তাহলে এ ধরনের নির্মম ঘটনা ঘটবে না।

আমরা দেখেছি, দুর্ঘটনা ঘটার পর পালিয়ে যাওয়ার সময় আরও একাধিক দুর্ঘটনা ঘটে। এটা শুধু প্রাইভেট কারের ক্ষেত্রে না। বাস-ট্রাক সব ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনা ঘটিয়ে পালানোর একটা টেনডেন্সি থাকে। কিন্তু নিয়ম হলো, দুর্ঘটনা ঘটলে সেই চালকেরই উচিত আহত মানুষটাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু আমাদের দেশে সবাই পালিয়ে বাঁচতে চাই এবং পালিয়ে গিয়ে কিন্তু তারা বেঁচেও যান। সে কারণে সবাই পালানোর চেষ্টা করেন।

সড়ক আইনে আছে, গতিসীমা ভায়োলেশন করলে শাস্তি হবে। কিন্তু সেই বিষয়গুলো পরিষ্কার করা হয় আইনের বিধিমালার মাধ্যমে। সেই বিধিমালা আজও প্রণয়ন করতে পারেনি সড়ক পরিবহন মহাসড়ক বিভাগ। কোন সড়কে কোন গাড়ির জন্য কত গতি হবে, কত গতিতে চলতে পারবে, তার গাইডলাইন দরকার। আলাদা সড়কে আলাদা ধরনের গতিসীমা দিতে হবে। সব সড়কে ৮০ কিলোমিটার গতির অনুমোদন দিলে দুর্ঘটনা ঘটবেই।

জাতিসংঘের নির্দেশনা আছে, শহরের মধ্যে ৩০ কিলোমিটার গতির বেশি গাড়ি চালানো যাবে না। লন্ডন ও নিউইয়র্কের মেয়র তাদের শহরে দুর্ঘটনা কমানোর জন্য নিজেরাই এই গতিসীমা থেকেও কমিয়ে ২৫ কিলোমিটার গতিতে শহরে গাড়ি চালানোর নির্দেশনা দিয়েছেন।

একটা শহরের মধ্যে যানবাহন বেশি থাকে। মানুষের চলাফেরাও বেশি । সেখানে যদি যানবাহনের গতি বেশি থাকে, তাহলে তো দুর্ঘটনা ঘটবেই, মানুষ মারা যাবেই। দুর্ঘটনার সবচেয়ে বড় নিয়ামক হলো গতি। যত গতি তত ক্ষতি। যারা এসবের দায়দায়িত্বে, তাদের অজ্ঞতা এবং অনীহার কারণেই দুর্ঘটনা রোধ করা যাচ্ছে না।


শিক্ষার অগ্রগতি কতটা, নিরীক্ষা দরকার

প্রতীকী ছবি
আপডেটেড ৪ ডিসেম্বর, ২০২২ ০৯:৫২
ড. মিহির কুমার রায়

গত ২৮ নভেম্বর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, এসএসসিসহ ১১টি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৮৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ, যা গত বছর ছিল ৯৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ। আবার সর্বোচ্চ সাফল্য হিসেবে বিবেচিত জিপিএ-৫ পেয়েছে ২ লাখ ৬৯ হাজার ৬০২ শিক্ষার্থী, যা গত বছর ছিল ১ লাখ ৮৩ হাজার ৩৪০ জন। ফলাফল মূল্যায়নে দেখা গেছে, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে বেশি। তবে গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার কমেছে।

উল্লেখ্য, ১১টি শিক্ষা বোর্ডে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ২০ লাখ ৩৪ হাজার ১৮ জন, পরীক্ষায় অংশ নেয় ১৯ লাখ ৯৪ হাজার ১৩৭ জন এবং পাস করেছে ১৭ লাখ ৪৩ হাজার ৬১৯ জন। তিন ধারার শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে শুধু এসএসসিতে পরীক্ষার্থী ছিল ১৫ লাখ ৮৮ হাজার ৬৫৭ জন, পাস করেছে ১৩ লাখ ৯৯ হাজার ৫৭১ জন। মাদ্রাসায় পরীক্ষার্থী ছিল ২ লাখ ৬০ হাজার ১৩২ জন, পাস করেছে ২ লাখ ১৩ হাজার ৮৮৩ জন। আর কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি ও দাখিল ভোকেশনাল পরীক্ষার্থী ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৪৮ জন, পাস করেছে ১ লাখ ৩০ হাজার ১৬৫ জন। মোট পরীক্ষার্থীর মধ্যে ছেলে ছিল ৯ লাখ ৯৮ হাজার ১৯৩ জন ও মেয়ে পরীক্ষার্থী ৯ লাখ ৯৫ হাজার ৯৪৪ জন। ২৯ হাজার ৬৩৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে শতভাগ পাস ছিল ২ হাজার ৯৭৫টি প্রতিষ্ঠানে, অন্যদিকে ৫০টি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি।

গত বছর এই পরীক্ষায় ৫ হাজার ৪৯৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শতভাগ পাস ছিল, অন্যদিকে ১৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। সে হিসাবে এ বছর শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২ হাজার ৫১৯টি কমেছে এবং শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৩২টি। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঢাকা বোর্ডের শিক্ষার্থীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ৬৪ হাজার ৯৮৪ শিক্ষার্থী। এ ছাড়া রাজশাহী বোর্ডে ৪২ হাজার ৫১৭ জন, কুমিল্লা বোর্ডে ১৯ হাজার ৯৯৮, যশোর বোর্ডে ৩০ হাজার ৮৯২, চট্টগ্রাম বোর্ডে ১৮ হাজার ৬৬৪, বরিশাল বোর্ডে ১০ হাজার ৬৮, সিলেট বোর্ডে ৭ হাজার ৫৬৫, দিনাজপুর বোর্ডে ২৫ হাজার ৫৮৬ এবং ময়মনসিংহ বোর্ডে ১৫ হাজার ২১৬ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। পরীক্ষায় ছাত্রদের থেকে ছাত্রীদের পাসের হার বেশি। ছাত্রীদের পাসের হার ৮৭ দশমিক ৭১ শতাংশ অর্থাৎ এবার ছাত্রদের থেকে ছাত্রীদের পাসের হার শূন্য দশমিক ৫৫ শতাংশ বেশি।

১১টি শিক্ষা বোর্ডের ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নেপথ্যে মোটাদাগে পাঁচটি দিক ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। এগুলোর মধ্যে প্রথমেই আসে সংক্ষিপ্ত সিলেবাস। এ ছাড়া প্রশ্নপত্রে অধিকসংখ্যক বিকল্প থেকে পছন্দের সুযোগ, ৫০-এর মধ্যে দেয়া পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বর ১০০তে রূপান্তর, কঠিন বিষয়ে অবলীলায় ৯০ শতাংশের ওপরে নম্বরপ্রাপ্তি এবং সাবজেক্ট ম্যাপিং। শিক্ষার্থীদের জীবনে মাধ্যমিক স্তরের পরীক্ষার ফলাফল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পাসের হার বাড়ানোর চেয়েও বেশি জরুরি শিক্ষার মান বাড়ানো। এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি কতটা হচ্ছে তার যথাযথ নিরীক্ষা হওয়া দরকার। কারণ পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের একটি বড় অংশ পরবর্তী ধাপে পৌঁছানোর আগেই ঝরে পড়ছে। তবে এটি স্বীকার করতে হবে যে বর্তমানে পরীক্ষায় নকলের প্রবণতা কমে গেছে। তবে এখনো দেশে নোট-গাইড বইয়ের দৌরাত্ম্য, কোচিং বাণিজ্য ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের সংস্কৃতি বন্ধ হয়নি; যা শিক্ষার মানের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

নিকট-অতীতে দেখা যায়, দেশের অধিকাংশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় প্রাপ্ত জিপিএ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভর্তি পরীক্ষার স্কোরে যোগ হচ্ছে। ফলে কম জিপিএ পাওয়া শিক্ষার্থী মূল ভর্তি পরীক্ষায় অনেক সময় বেশি নম্বর পেয়েও মেধা-স্কোরে টিকতে পারছে না। কিন্তু কেন এই নিয়ম, তার সুনির্দিষ্ট সন্তোষজনক ব্যাখ্যা কেউ দেয়নি। বরং এসব জিপিএ স্কোর থাকার কারণে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একটি নির্দিষ্ট গ্রুপকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দিচ্ছে। ২০ বছর আগেও যেখানে জিপিএ-৫ পাঁচ হাজারের ঘরে থাকত, সেটি প্রায় ২০ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ঘরে ঘরে জিপিএ-৫-এ ঠেকছে, যা দেশের শিক্ষার মানকে শুধু সংকুচিতই করছে না, বরং রাষ্ট্রকে ভুল পথে পরিচালিত করার প্রয়াস জোগাচ্ছে। জিপিএ-৫কে যে বা যারা মেধার মানদণ্ড মনে করছেন, তারা হয়তো জানেন না এই জিপিএ-৫ পাওয়া মানেই মেধাবী নয়, এটি কেবল একটি নির্দেশক হতে পারে, সেটি কিছুতেই একজন শিক্ষার্থীর মেধা যাচাইয়ের মাধ্যম হতে পারে না। সৃজনশীল চিন্তাধারায় বিশ্বাসী শিক্ষার্থী গড়ায় নজর না দিয়ে কেবল নিয়মতান্ত্রিক প্রশ্ন আয়ত্ত করে পরীক্ষার খাতায় উগরে দিয়ে জিপিএ-৫ বাগিয়ে নেয়া গেলেও আমাদের শিক্ষার্থীরা কতটা কম জানে, তা নিয়ে যেমন প্রশ্ন থাকছে, তেমনি দেশের বাইরে যখন উচ্চশিক্ষায় আসছে তখন তারা ঠিকই টের পাচ্ছে।

প্রতিবেশী দেশ যেমন ভারত, নেপাল- তারা তাদের উচ্চশিক্ষার ভর্তির বিষয়টি খুবই মানসম্মতভাবে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে, যেখানে মেধার প্রকৃত মূল্যায়ন হয়। এ জন্য আমাদের যেসব বিষয়ের ওপর নজর দেয়া উচিত তা হলো- প্রথমত, বিশ্বের অনেক কলেজ উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে স্নাতক ভর্তি পরীক্ষায় পূর্বের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রাপ্ত জিপিএ মূল ভর্তি পরীক্ষায় প্রাপ্ত স্কোরে বিবেচনায় নেয় না। অথচ বাংলাদেশে এই নিয়ম চালু রেখেছে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরি কমিশন কিংবা কেউ এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলেনি। এর মধ্য দিয়ে দেশে একশ্রেণি শিক্ষার্থীদের সুবিধা দেয়া হচ্ছে, অন্যদিকে বঞ্চিত হচ্ছে কম জিপিএপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা। উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিযোগিতা করার অধিকার সব শিক্ষার্থীর থাকা উচিত। প্রকৃত মেধাবীদের বের করে আনার দায়িত্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিক।

দ্বিতীয়ত, করোনা মহামারির পরিবর্তিত পরিস্থিতি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে শ্রেণিকক্ষের মূল্যায়ন, অবিরত মূল্যায়ন বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি। দেশের শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সর্বোপরি পুরো ব্যবস্থাকে অবিরত মূল্যায়ন পদ্ধতির জন্য প্রস্তুত করতে হবে। উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে যাতে বাস্তবধর্মী পরীক্ষা নেয়া হয়, সে বিষয়টি লক্ষ রাখতে হবে। কারণ শিক্ষার্থীরা বহুদিন ধরে প্রকৃত লেখাপড়ার সঙ্গে সেভাবে যুক্ত নেই। পরীক্ষা দিয়ে ফল অর্জন করার মধ্যে যে আনন্দ, উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সেটি যাতে বহাল থাকে সেদিকে সবার দৃষ্টি দিতে হবে।

তৃতীয়ত, পাসের হারে এক বোর্ড থেকে আরেক বোর্ডের এগিয়ে থাকা কিংবা পিছিয়ে যাওয়ার কারণ কোনো বছরেই খতিয়ে দেখা হয় না, যা সঠিক নয়। এ ব্যাপারে প্রতিটি বোর্ডেই একটি গবেষণা সেল থাকা উচিত। সর্বশেষে বলা যায়, উচ্চশিক্ষা উন্মুক্ত রাখা উচিত কেবল মেধাবীদের জন্য এবং অন্যদের জন্য কারিগরি ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে শিক্ষার প্রতি জোর দেয়া উচিত।

লেখক: ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি


কাগজের মূল্যবৃদ্ধি, সংকটে মুদ্রণশিল্প

আপডেটেড ৩ ডিসেম্বর, ২০২২ ০৮:২২
মোস্তফা কামাল

মুদ্রণশিল্পে মন্দার টান শুরু হয়েছে করোনা মহামারির সময়ই। এই সংকট কেবল দেশে নয়, বহির্বিশ্বেও দেখা দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি দেশের উত্তরণ ঘটলেও বাংলাদেশ এই সংকট কাটাতে পারছে না। দেশে অভ্যন্তরীণ শিল্পের সুরক্ষা দিতে আমদানি করা কাগজের ওপর অনেক শুল্ক আরোপ করা রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই শুল্কের হার ৬০ শতাংশের বেশি ধরা হচ্ছে। বাতিল কাগজের সঙ্গে পাল্প মিশিয়ে অনেক কারখানায় যে নতুন কাগজ তৈরি হয় সেখানেও সমস্যা দেখা যাচ্ছে। আমরা জানি, করোনার কারণে দুই বছর স্কুল-কলেজ বন্ধ ছিল। ফলে বাতিল কাগজপত্রের সরবরাহ তেমন একটা ছিল না। তাই পেপার মিল রিসাইকেল করার জন্য কাগজ পাচ্ছে না। আবার নতুন পাল্পও আমদানি করতে পারছে না।

এতে এখন আর খাদের কিনারে নয়, খাদেই পড়ে গেছে বাংলাদেশের কাগজশিল্প। তিন মাস আগেও যে কাগজের রিম ১ হাজার ৫০০ টাকায় পাওয়া যেত, তার দাম এখন ৪ হাজার টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এ ছাড়া কাগজ, কালি, প্লেটসহ মুদ্রণসংশ্লিষ্ট প্রায় প্রতিটি উপকরণের দাম বেড়েছে।

দেশে পেপার মিল রয়েছে ২০৬টি। চালু আছে ৮০টির মতো। ছাপার কাগজের কাজ করে মাত্র ৩০-৩৫টি কারখানা। নানা সূত্র বলছে, গুটিকয়েক কারখানা ছাড়া আর কারও কাছে কাগজ তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত পাল্প নেই। ফলে কোনো কারখানা কাগজ উৎপাদন করতে পারছে না। যেসব প্রতিষ্ঠান বাতিল কাগজ বা বইপত্র রিসাইকেল করে থাকে, তারা কিছু উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। পর্যাপ্ত কাঁচামাল না থাকায় কেউ বাজারে কাগজের জোগান দিতে পারছে না। আবার নতুন করে কাঁচামাল আমদানি করার জন্য এলসি খুলতে রাজি হচ্ছে না ব্যাংকগুলো। কারণ হিসেবে তারা ডলারসংকটকে দায়ী করেছে।

বাংলাদেশে মূলত দুই ধরনের কাগজ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। বইপত্র ছাপানো বা পড়াশোনার কাজে হালকা কাগজ ব্যবহৃত হয়। এর পুরোটাই দেশীয় কারখানায় উৎপাদিত হয়। প্রকাশক সমিতির সূত্র বলছে, বাংলাদেশে লেখা ও ছাপার জন্য বছরে ১০ লাখ টন কাগজের চাহিদা রয়েছে। এর বেশির ভাগটা দেশে উৎপাদিত হয়। এ খাতটি পড়েছে চরম সংকটে। ক্যালেন্ডার, প্যাকেজিং বা গার্মেন্টস শিল্পের জন্য ভারী কাগজের দরকার হয়ে থাকে। এ ধরনের কাগজ বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়। আবার ডলারের মূল্যবৃদ্ধির মারাত্মক প্রভাবও পড়েছে পাল্প আমদানিতে। সেই সঙ্গে দুই বছর করোনার কারণে দেশীয় উৎস থেকে রিসাইকেল করার মতো কাগজও পাওয়া যাচ্ছে না।

অন্যদিকে কাগজ তৈরির কোনো কোনো উপকরণ দুষ্প্রাপ্যও হয়ে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সিন্ডিকেটের কালো থাবা। সব মিলিয়ে গোটা শিল্পটি নজিরবিহীন বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। গত বছর জানুয়ারিতে ৮০-১০০ গ্রাম অফসেট কাগজ ১ হাজার ৪৫০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তার দাম হয়েছে ৩ হাজার ৩০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা। ১০০ গ্রাম অফসেট কাগজের দাম ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৭৫০ টাকার জায়গায় ৪ হাজার ২০০ থেকে ৪ হাজার ৩০০ টাকা করে নেয়া হচ্ছে।

কাগজ উৎপাদনকারী কারখানাগুলোর মধ্যে কিছু কারখানা সরকারি পাঠ্যপুস্তক ছাপার টেন্ডার পেয়ে থাকে। তাদের কাগজ উৎপাদন চালিয়ে যেতে হচ্ছে এবং এসব কারখানার লোকসানও খুব একটা হবে না। কেননা তারা তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটিয়ে সরকারের সঙ্গে দেনদরবারের ক্ষমতা রেখে থাকে। তাই এবারও তারা একই পদ্ধতি ব্যবহার করে তাদের কাগজ উৎপাদনের লোকসান পুষিয়ে নিতে পারবে। আবার বড় প্রকাশনীগুলো কিছু সহায়ক বই ছাপিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে দুই-আড়াই গুণ দামে বিক্রি করবে। সাধারণত কাগজের মূল্য ধরেই বইয়ের মূল্য নির্ধারণ হয়। সমিতিভুক্ত প্রকাশক ও বিক্রেতারা ফর্মাপ্রতি ২৫ শতাংশ মূল্য বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ফলে ৬৫০ টাকা দামের বই এখন ৮০০-৮৫০ টাকায় বিক্রি করা হবে। কিন্তু ছোট প্রকাশনীরা কী করবে?

আর মুদ্রণের আওতায় শুধু বইপুস্তক কিংবা পত্রপত্রিকা, ম্যাগাজিন আর স্মরণিকাও থাকে না। মুদ্রণের আওতাটা আরও বড় আকারের। সরকারি-বেসরকারি অফিসের নথি, প্যাকেজিং ও ব্যাগশিল্প, খাম, দাপ্তরিক কাজ, ডেকোরেশনসহ বিভিন্ন কাজের কাগজও এই মুদ্রণশিল্পের আওতাধীন। সেটির বাজারও মূল্যবৃদ্ধির পাগলা ঘোড়ার দাপটে অস্থির হচ্ছে। কিছু পেপার মিল মালিক ও কাগজ ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট বিদেশি আর পুনর্ব্যবহৃত রিসাইকেল পাল্পের সংকটকে আরও ঘনীভূত করছেন। বিশেষ করে বই ছাপানো নিয়ে বেশি সংকট তৈরি হচ্ছে। আবার অমর একুশে বইমেলা শুরু হতেও খুব বেশি দেরি নেই। কিন্তু কাগজ ছাপানো নিয়ে সংকট তৈরি হওয়ায় তারা বিপাকে পড়েছেন। তাদের যেখানে এই সময়ে বই ছাপানোর তোড়জোড়ে ব্যস্ত দিন পার করার কথা, তাদের অনেকেই এখন কর্মহীন দিন কাটাচ্ছেন। এর মূল কারণ হিসেবে কাগজের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিকে দায়ী করা যায়।

দেশের বেশির ভাগ মানুষের মধ্যে সৃজনশীল বই কেনার প্রবণতা অনেক কমে গিয়েছে। কিন্তু পাঠ্যপুস্তক না কিনে তো শিক্ষার্থীদের উপায় থাকে না। আবার উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে রেফারেন্স বুকের দরকার হয়। এখন কাগজের দাম বাড়াতে বইয়ের দামও বাড়ছে। ফলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা দুশ্চিন্তায় পড়ছেন। তাই কাগজের বাজারের চলমান অস্থিরতা দূর না হলে কেবল প্রকাশনা খাতসংশ্লিষ্টরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, শিক্ষাব্যয় বৃদ্ধির জেরে বহু শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার দুর্ভাবনাও দেখা দিচ্ছে।

আবার জ্বালানি-সংকটের কারণে কাগজসহ আরও অনেক কিছুরই উৎপাদন খরচ বেড়েছে। পরিবহন খরচ, শ্রমিকদের মজুরির অবস্থাও বাড়বাড়ন্ত পর্যায়ে চলে গিয়েছে। ডলারসংকটের কারণে বিদেশ থেকে ভার্জিন পাল্প আমদানি বন্ধ এক রকম বন্ধই আছে। রিসাইকেল পাল্পে তৈরি কাগজের মাধ্যমে বই মুদ্রণ ও স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখার খাতার চাহিদা মেটানো হয়। কিন্তু পুরোনো কাগজের দামও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে একটি চক্র। অভিযোগ উঠেছে- কয়েকটি মিল, পাইকারি কাগজের কিছু চতুর ব্যবসায়ী এবং নোট-গাইড প্রকাশকরা হাজার হাজার টন কাগজ কিনে নানা জায়গায় মজুত করেছেন। এ কারণে সৃজনশীল বই প্রকাশের অন্যতম উপলক্ষ একুশে বইমেলার জৌলুস নষ্ট হবে না; পাঠ্যবইয়ের বাজারও সংকটে পড়বে। ছোট ছোট প্রকাশনীর গাইড বই ও লেখার খাতা তৈরিতেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে।

২০২২ সালের বইমেলায় যে কাগজের দাম ১ হাজার ৬০০ টাকা রিম ছিল, এখন বাজারে একই কাগজের দাম ৩ হাজার ৫০০ টাকা। বইয়ের প্রকাশনীগুলো এমনিতেই দুই বছর ধরে করোনার ধকলে ছিল। তার পরও ছোট প্রকাশনীগুলো তারা কষ্ট করে গত বইমেলায় ১০-১৫টি বই প্রকাশ করেছে। বড় প্রকাশনীগুলোও ৫০-৬০টির বেশি বই প্রকাশ করতে পারেনি। কাগজের এ সংকট চলতে থাকলে আসন্ন বইমেলায় বইয়ের সংখ্যা অনেক কমে যাবে। আর বইয়ের দামও অনেক বেশি রাখতে হবে। ফলে এবারের মেলায় বইয়ের দাম দেড় গুণ বৃদ্ধি পাবে। তাই প্রকাশকরাও পরিচিত লেখকের বাইরে নতুন লেখকের বই প্রকাশ করতে ঝুঁকি নিতে চাইবেন না।

নিউজ প্রিন্ট কাগজের দাম ৪৫-৫০ টাকা থেকে বেড়ে গিয়ে কেজিতে ১০৮ টাকা করে ধরা হচ্ছে। সে কারণে বছরের শুরুতে সহায়ক বই ছাপানো নিয়েও যন্ত্রণায় পড়ছেন প্রকাশকদের বড় একটি অংশ। ইতিমধ্যে অনেক প্রকাশক জানিয়ে দিয়েছেন, কাগজ ও বিদ্যুৎসংকটের কারণে তারা ঠিক সময়ে বই সরবরাহ করতে পারবেন না।

আবার ক্ষেত্রবিশেষে টাকা থাকলেও প্রয়োজনীয় কাগজ পাওয়া যাচ্ছে না। কিছু কাগজ ব্যবসায়ীর মজুতদারির জন্য ইচ্ছামতো দাম ধরা হচ্ছে এবং এই দাম বাড়ার লাগামও টানা যাচ্ছে না। প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই ছাপা একেবারে বন্ধ না হলেও চলছে ঢিমেতালে। মাধ্যমিকের বই ছাপার ক্ষেত্রেও অনুরূপ চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।

এখন পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে একই দিনে দুবার করে কাগজের দাম বাড়ানো হচ্ছে। আবার এই সুযোগে কয়েক ধরনের কাগজের দাম দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ বাড়ানো হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে শুল্কমুক্ত কাগজ আমদানির অনুমোদন প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। আর এখনই এই সংকট না কাটাতে পারলে আগামী বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের জন্য ‘বই উৎসব’ও না হওয়ার শঙ্কায় পড়ছে।

এই সংকট নিয়ে একাধিকবার বৈঠক করেছেন এফবিসিসিআই, বাংলাদেশ ব্যাংক, শিক্ষা ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। কিন্তু ডলারসংকটসহ কিছু কারণে সমাধানের পথ বের করা যাচ্ছে না। ক্ষতিগ্রস্তরা বলছেন, তেল আমদানির ঘোষণার পর এর দাম রাতারাতি কমে গিয়েছিল। এখন সরকার শুল্কমুক্ত কাগজ আমদানির ঘোষণা দিতে পারলে সিন্ডিকেটও দাম কমাতে বাধ্য হতে পারে। পাশাপাশি সরকারকেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

এখনো শেষ পর্যন্ত সংবাদের সত্যতা পেতে পাঠক আজও ছাপা পত্রিকার ওপর বেশি আস্থা রাখেন। এখনো পাঠকের আস্থাই ছাপা কাগজের প্রধান শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু কাগজের মূল্যবৃদ্ধি এই ছাপা পত্রিকার জন্য অশুভ আলামত হিসেবে হাজির হয়েছে।

লেখক: বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন


বৈদেশিক সাহায্য, ঋণের ফাঁদ ও উন্নয়ন বিতর্ক

ডলার। ফাইল ছবি
আপডেটেড ৩ ডিসেম্বর, ২০২২ ০৮:১৯
দেলোয়ার হোসেন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির পর মার্শাল প্ল্যানের মাধ্যমে বৈদেশিক সাহায্য কিংবা উন্নয়ন সহায়তা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রপঞ্চ বা প্রবঞ্চনা হিসেবে আবির্ভূত হয়। বিষয়টি আন্তর্জাতিক রাজনীতি বা বিশ্বব্যবস্থায় একটি নতুন মাত্রা যুক্ত করেছিল। মার্শাল প্ল্যানের আওতায় পশ্চিম ইউরোপে ব্যাপক অর্থনৈতিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া সূচিত হয়েছিল, যা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি কর্মসূচি হিসেবে বিবেচিত। এটি ইউরোপের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছিল। একই সঙ্গে আমরা দেখতে পায় বিশ্বব্যাপী ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলগুলোতেও সাহায্যের একটি নতুন প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই প্রক্রিয়াটির অগ্রভাগে ছিল পশ্চিমা বিশ্ব কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ব্রেটন উডসের মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। যেহেতু পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অন্যতম ধারক ও বাহক হিসেবে এসব প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তাই এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পশ্চিমা দেশগুলো পুঁজিবাদী ও উদারবাদী একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে।

পরবর্তী সময়ে স্নায়ুযুদ্ধকালে এই চেষ্টা অব্যাহত থাকে এবং ব্যাপক মাত্রা লাভ করে। ওই সময় বিশ্ব রাজনীতিতে মেরুকরণ ও বিভাজনের কারণে বৈদেশিক সাহায্য ঘিরে রাজনীতি ও কূটনীতি শুরু হয়। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা বিশ্ব পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠায় বৈদেশিক সাহায্যকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে। অন্যদিকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক ব্লক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বৈদেশিক সাহায্যকে ব্যবহার করে। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কাঠামো ভিন্ন হওয়ার কারণে এই তত্ত্বের অনুসারী দেশগুলো পুঁজিবাদী ব্যবস্থার থেকে ভিন্ন একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। মার্শাল প্ল্যানের বিপরীতে তারা কমেকন নামে একটি সাহায্য ফান্ড গঠন করে, যেখান থেকে তারা তাদের অনুসারী সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোকে অবকাঠামো, খাদ্যসহ বিভিন্ন খাতে ব্যাপক সহায়তা প্রদান করে। এভাবে বিদেশি সাহায্যের একটি দীর্ঘ ইতিহাস আমরা লক্ষ করি। বৈদেশিক সাহায্যের বিষয়টিকে আমরা যতটা মানবিকভাবেই দেখি না কেন, এটি নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনীতির একটি অন্যতম অনুষঙ্গ। এই রাজনীতি ও কূটনীতিতে যে শুধু ভূরাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির বিষয় থাকে তা না, বরং অর্থনৈতিক বিভিন্ন দিকগুলোর মাধ্যমেও সাহায্যকারী দেশগুলো তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ ও পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য পূরণে সচেষ্ট থাকে।

বৈদেশিক সাহায্যের এই প্রক্রিয়ার প্রতি অনেকের বিরোধিতাও ছিল। বিংশ শতাব্দীর ষাট ও সত্তরের দশকে বৈদেশিক সাহায্যের ওপর অনেক গবেষণা হয়েছে। অনেকে এটিকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার একটি ফাঁদ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। স্নায়ুযুদ্ধের পরিসমাপ্তির পর পশ্চিমাদের বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ অনেক হ্রাস পেয়েছিল। কারণ তখন বিশ্বে আমরা একটি নতুন বাস্তবতা লক্ষ করি, যেখানে এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চল থেকে বিভিন্ন দেশ উন্নয়নের ক্ষেত্রে সফলতা দেখায় এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় তাদের একটি জোরালো উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। তার আগেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, জাপানসহ দূরপ্রাচ্যের দেশগুলো ব্যাপক অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জন করে। দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকংসহ এই অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়নের সফলতার বিষয়টিকে টাইগার অর্থনীতি বলে অভিহিত করা হয়।

দূরপ্রাচ্য বলয়ের বাইরে চীন-ভারতও এ ক্ষেত্রে ব্যাপক সফলতা দেখায়। এর ফলে বিংশ শতাব্দীর নব্বইয়ের দশক ও একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অনেক দেশ উন্নয়নের চূড়াতে পৌঁছাতে শুরু করে। তখন পশ্চিমা দেশগুলোর বৈদেশিক সহায়তার প্রবাহ এশিয়া ও আফ্রিকা অঞ্চল থেকে পূর্ব ইউরোপীয় অঞ্চলে যেতে শুরু করে। ফলে লক্ষ করা যায় যে ২০১০-এর পর থেকে চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তার অর্থনৈতিক উপস্থিতি বাড়ায়। বিশেষ করে আফ্রিকা ও এশিয়ায় চীনের ব্যাপক অংশগ্রহণ আমরা লক্ষ করি। এসব অঞ্চলের দেশগুলোতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যেটিকে অনেকে চীনের আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে দেখে। এমনকি অনেকে এটিকে চীনের নব্য-উপনিবেশবাদ হিসেবেও আখ্যায়িত করেছে।

আফ্রিকায় পশ্চিমা দেশগুলো তাদের অর্থনৈতিক আধিপত্য বজায় রেখেছে দীর্ঘদিন ধরে। এই অঞ্চলে চীন তার অর্থনৈতিক উপস্থিতি শুরু করে অনেক পর এবং ২০১০-এর পর থেকে তা বাড়তে থাকে। বিভিন্ন দেশকে সহায়তার ক্ষেত্রে চীনের যে সামর্থ্য, সেটি বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যুক্ত করে। আরও স্পষ্টভাবে বললে, আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে চীনের উত্থানে নতুন একটি আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এই সময়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। প্রথমত. চীন, ভারত, রাশিয়া, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার অংশগ্রহণে ব্রিকস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নতুন একটি শক্তিকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়। দ্বিতীয়ত. বিশ্ব অর্থনীতিতে জি-৭-এর প্রভাবের পাশাপাশি জি-২০-এর ক্রমবর্ধমান শক্তিশালী উপস্থিতি নতুন একটি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক গোষ্ঠীর আবির্ভাবের জানান দেয়। তৃতীয়ত. সাউথ-সাউথ সহযোগিতার মাধ্যমে উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক দেশ বিশ্ব অর্থনীতিতে তাদের সফলতার সাক্ষ্য রাখে। ব্রিকসের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের কথা উল্লেখ করা যায়। এগুলোর মাধ্যমে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোর সামনে পশ্চিমা বিশ্বকেন্দ্রিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে নতুন বিকল্প সামনে আসে। এতে বিশ্বব্যাংক, ইউএসএআইডি, ড্যানিডা, সিডাসহ বিভিন্ন সাহায্যকারী সংস্থা একটি নতুন চাপের মধ্যে পড়ে।

উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল বিশ্বের এই উত্থান আরও শক্তিশালী হয় ২০১৩ সালে চীন কর্তৃক বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এটির সঙ্গে ৭০টির বেশি দেশ যুক্ত হয়। ফলে এ ক্ষেত্রে চীন ও ভারতের প্রভাব বাড়ে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের সামনে অর্থনৈতিক সহায়তার বিকল্প উৎস পায়। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় দর-কষাকষির নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয় এবং উন্নয়ন সহযোগিতার সহজলভ্যতাও আমরা লক্ষ করি। যার ফলে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর জন্য উন্নয়ন সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। ফলে উন্নয়ন সহযোগিতাকে কেন্দ্র করে স্নায়ুযুদ্ধকালীন যে রাজনৈতিক ও কূটনীতিক তৎপরতা লক্ষণীয় ছিল, সেটি আবার সামনে আসছে।

এখানে দেখা যায় যে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে উন্নয়নের যে গতি ও ধারার সৃষ্টি হয়েছিল, তাকে কেন্দ্র করে বিতর্ক ও প্রশ্ন তৈরি করা হয়। সেই প্রশ্ন আসে কখনো পরিবেশের নামে, কখনো মানবাধিকারের নামে, কখনোবা জলবায়ু পরিবর্তনের নামে, আবার কখনোবা কোনো বিশেষ দেশের সাহায্য গ্রহণের ক্ষেত্রে। এই ধরনের প্রশ্ন ও বিতর্ক নিঃসন্দেহে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর চাপ তৈরি করে ও উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করে। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল অনেক দেশ তাদের অর্থনৈতিক সফলতার জন্য উন্নয়ন সহযোগিতার একটি সুযোগ সৃষ্টি করেছে, যেখানে অনেক উন্নয়ন সহায়তাকারী দেশ সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসছে। এসব দেশে একসময় এককভাবে পশ্চিমা দেশগুলো উন্নয়ন সহায়তা করে এসেছে। কিন্তু উন্নয়নশীল বিশ্ব থেকে চীন ও ভারতের মতো উন্নয়ন সহায়তাকারী দেশের উত্থান বিদ্যমান উন্নয়ন সহযোগিতা ব্যবস্থায় বিতর্ক ও প্রতিযোগিতার উত্থান ঘটিয়েছে। সাম্প্রতিককালে সেই বিতর্ক আরও জটিল হয়েছে। এই প্রতিযোগিতা ও বিতর্কের অংশ হিসেবে অনেকে এটিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ঋণের ফাঁদ হিসেবে মন্তব্য করছে।

অথচ উন্নয়নের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে লক্ষ করা যায়, উন্নয়ন সহায়তাকারী দেশগুলোও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাদের উন্নয়ন ঘটিয়েছে। তারাও বৈদেশিক উন্নয়ন সহায়তা নিয়ে তাদের উন্নয়ন ঘটিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলো এবং জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ অনেক দেশ মার্শাল প্ল্যান বা অন্যান উন্নয়ন সহায়তার মাধ্যমে তাদের উন্নয়ন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করেছে। সুতরাং অর্থনৈতিক উন্নয়নে বৈদেশিক সহায়তার উপস্থিতি নতুন কিছু না, বরং এটি ঐতিহাসিক ক্রমধারা। কিন্তু পরবর্তী সময়ে চীন ও ভারতের অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে যখন এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশে উন্নয়নের প্রক্রিয়া শুরু করে, তখন অনেকে এটিকে ঋণের ফাঁদ ও ঋণ কূটনীতির বিশেষণে বিশেষায়িত করতে শুরু করল। উন্নয়ন সহযোগিতা যদি একটি দেশের উন্নয়নে কাজে লাগে, তাহলে সেই সহযোগিতা দেয়া এবং নেয়া উভয়ই কাম্য, হোক সেই সহযোগিতা কোনো ইউরোপের দেশ বা আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশের, হোক সেই সহায়তা গ্রহণকারী দেশ এশিয়া, আফ্রিকা বা লাতিন আমেরিকার। রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক বিবেচনায় নিয়ে এটিকে ঘিরে বিতর্কিত করা কাম্য নয়।

বৈদেশিক সহায়তা নিয়ে রাজনীতি, কূটনীতি বা এটিকে ঘিরে বিতর্কের বিষয়টি উন্নয়নশীল বা অনুন্নত দেশগুলোর উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে বৈদেশিক সাহায্য প্রয়োজন। যে সহযোগিতা বিশ্বের প্রায় সব রাষ্ট্রই উন্নয়নের কোনো না কোনো পর্যায়ে গ্রহণ করেছে। সেই সহযোগিতা কখনোই শর্তহীন ছিল না, সেই সহযোগিতা কখনোই রাজনীতি বা কূটনীতি নিরপেক্ষ ছিল না। তার পরও উন্নয়ন সহযোগিতা বিভিন্ন দেশকে এগিয়ে নিয়েছে। এটিকে বিভিন্নভাবে অনেকে সমালোচনা করতে পারে। উন্নয়ন সহযোগিতাকে নিয়ে যত বিতর্কই হোক না কেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নে এর গুরুত্ব অনস্বীকার্য এবং এটি ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত। ইউরোপের দেশগুলো থেকে শুরু করে চীন ও ভারত- সব দেশই তাদের উন্নয়নে বৈদেশিক সহায়তা গ্রহণ করেছে। ফলে এই বিতর্কের মাধ্যমে প্রকারন্তে উন্নয়নশীল দেশগুলোর উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। সুতরাং যত দ্রুত আমরা এটি অনুধাবন করতে পারব, তত দ্রুতই আমাদের জন্য মঙ্গল হবে।

লেখক: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


সদা জাগ্রত থাকুক একাত্তর

প্রতীকী ছবি
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
সালেক খোকন

সিরাজগঞ্জ শহরের পাশেই শিয়ালকোল এলাকা। সেখানে শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সামনে দিয়ে চলে গেছে বড় একটি রাস্তা। রাস্তার পাশে একটি ডোবা। অন্যসব ডোবার মতোই কচুরিপানা আর বড় বড় ঘাসে পূর্ণ। ১৯৭১ সালে এখানেই নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল সাতজন নিরীহ-নিরপরাধ মানুষকে।

শুধু হিন্দু হওয়ার অপরাধেই হত্যা করা হয়েছিল তাদের। লুঙ্গি খুলে হিন্দুত্ব নিশ্চিত হয়ে সবাইকে নির্মমভাবে গুলি করে পাকিস্তানি সেনারা। নিহতদের কেউ কেউ দুধ ও কলা দিয়ে তৃপ্তি নিয়ে ভাত খেয়েছিলেন খানিক আগেই। গুলির তোরে পেট ফেটে সেগুলোও বেরিয়ে আসে। সে সব ক্ষত-বিক্ষত লাশের বর্ণনা দিয়েছেন কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী।

১৮ মে ১৯৭১। দুপুরের ঘটনা। কামারখন্দের পাইপোসা গ্রাম থেকে পাকিস্তান আর্মিদের একটি গ্রুপ শিয়ালকোল হয়ে সিরাজগঞ্জ শহরের দিকে যাচ্ছিল। ওরা শিয়ালকোল বাজারে এসে মোস্তফা খন্দকার নামে এক সাইকেল মিস্ত্রিকে পায়। তাকে জিজ্ঞেস করে, ‘মালাউন কাহা হে?’ সে বলে, এখানে তো মালাউন নাই। খানিক পরেই এক গরিব হিন্দু অন্ধ লোক আসে তাদের কাছে সাহায্য চাইতে। তার পরনে ছিল ধুতি। এক আর্মি বলে, ‘এই তো মালাউন।’ বুঝে যায় এটা হিন্দু এলাকা। মোস্তফা কেন মিথ্যা বলল তাই তাকে ধরে মারতে থাকে। এরপর পাক আর্মিরা পাশের হিন্দুপাড়ায় ঢুকে।

ওই পাড়া থেকে সিরাজগঞ্জ জ্ঞানজানি হাইস্কুলের শিক্ষক জোগেন্দ্র নারায়ণ বসাক, তার বড় ভাই ননী গোপাল বসাক ও ভাতিজা প্রণব কুমার বসাককে ধরে নিয়ে যায়। পথেই পায় আরও তিনজনÑশুকুচরণ রবিদাস, ফনীন্দ্রনাথ দাস ও প্রেমনাথ দাসকে। আর শিয়ালকোলে শিবচরণ রবিদাস ওই সময় তার বাড়িতে স্নান সেরে ধুতি নাড়ছিলেন। তাকেও ওরা ডেকে নেয়। এরপর পাকিস্তানি সেনারা তাদের গুলি করে হত্যা করে। ফনীন্দ্রনাথ দাস গুলিবিদ্ধ হয়েও বেঁচেছিলেন। কিন্তু প্রচণ্ড রক্তক্ষরণে ওই দিন রাতেই বিনা চিকিৎসায় তার মৃত্যু হয়।

আর্মিরা চলে যাওয়ার পর সেখানে ছুটে আসেন কয়েকজন। সাতজন তখনো যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন। সবার হাতের বাঁধন খুলে দেন আজম, জামাল উদ্দিনসহ আরও কয়েকজন। সেই স্মৃতি বলতে গিয়ে আজও তারা আপ্লুত হন।

একাত্তরের হত্যাযজ্ঞটি যেখানে ঘটেছে সেখানে নেই কোনো স্মৃতিস্তম্ভ বা ফলক। খুব কাছেই ভাঙাচোরা একটি খুপরি ঘর। এটিই শহীদ শিবচরণ রবিদাসের বাড়ি। একাত্তরে জুতার কাজ করতেন তিনি। হত্যার পর পরিবার তার লাশ এনে সমাধিত করেন ঘরের সামনেই। সমাধির ওপর এলোমেলোভাবে পড়ে আছে কয়েকটি লাল জবা। পিতার সমাধিতে সকাল-বিকেল এভাবেই ফুলেল শ্রদ্ধা জানান রবিদাসের ছেলে মংলা চন্দ্র রবিদাস।

স্বাধীনতা লাভের পর বঙ্গবন্ধু দুই হাজার টাকার সহযোগিতাসহ একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। এরপর আর কেউ খোঁজ নেননি। পরিবারও পায় না কোনো সরকারি সুবিধা। শহীদ পুত্রের ভাষায়, ‘শেখ মুজিব মারা যাওয়ার পর আমাদের ভাগ্যেরও মৃত্যু ঘটছে।’

সমাধির পাশে একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ দেখিয়ে মংলা চন্দ্র রবিদাস বলেন, ‘এখন বাবাকে মনে রেখেছে শুধুই সিরাজগঞ্জ গণহত্যা অনুসন্ধান কমিটি।’ ওই গাছটির গোড়ায় ছোট্ট সাইবোর্ডে লেখা, ‘’৭১-এ গণহত্যায় নিহত শহীদ শিবচরণ রবিদাস কৃষ্ণচূড়া বৃক্ষ।’

সিরাজগঞ্জ শহরে গিয়ে এভাবেই একটি উদ্যোগের পরিচয় মিলে। সেখানে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ সিরাজগঞ্জ গণহত্যা অনুসন্ধান কমিটি গঠনের মাধ্যমে একাত্তরকে জীবন্ত রাখার কাজ করে যাচ্ছেন। শিয়ালকোলে ওই কমিটির সদস্য শহিদুল আলম জানান, বাড়ি বাড়ি গিয়ে গণহত্যায় শহীদদের তালিকা প্রণয়নসহ শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামে বিভিন্ন জায়গায় বৃক্ষরোপণ করছেন তারা। শুধু তাই নয়, হাট-বাজারে ঘুরে ঘুরে মানুষের কাছ থেকে ১০-১৫ টাকা করে আর্থিক সহযোগিতা তুলে প্রায় ৩৯ হাজার টাকার তহবিল হয়েছে। প্রশাসনের সহযোগিতায় ওই তহবিলের মাধ্যমে তারা শিয়ালকোলের গণহত্যার জায়গায় স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করতে চান।

সিরাজগঞ্জ গণহত্যার অনুসন্ধান কমিটির উদ্যোক্তাদের মধ্যে বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইফুল ইসলাম, বীর মুক্তিযোদ্ধা আশরাফুল ইসলাম জগলু চৌধুরী, নবকুমার কর্মকারের কথা উঠে আসে আলাপচারিতায়। প্রচলিত ধারায় পদ-পদবির কমিটি না করে তারা শুধু আহ্বায়ক পদ রেখে সবাই সদস্য হিসেবেই একাত্তরের স্মৃতিরক্ষা ও ইতিহাস তুলে ধরার জন্য নিরলসভাবে কাজ করছেন।

কোন ভাবনা থেকে একাত্তর নিয়ে এমন মহতী উদ্যোগ? এমন প্রশ্ন নিয়েই মুখোমুখি হই সিরাজগঞ্জ গণহত্যা অনুসন্ধান কমিটির আহ্বায়ক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইফুল ইসলামের।

সাইফুল ইসলামের অকপট উত্তর, ‘মূলত মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করার আগ্রহ থেকেই আমরা মাঠে নামি। এরপর বিভিন্ন আইডিয়াগুলো আসতে থাকে। যেমন একাত্তরে শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধার নামে কৃষ্ণচূড়া, বঙ্গবন্ধুর নামে বটগাছ লাগানো প্রভৃতি। এভাবেই আইডিয়া পাই। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের তেমন কোনো স্মৃতি নেই, চিহ্নও নেই। এখানে যদি মুক্তিযোদ্ধাদের, শহীদদের ও বঙ্গবন্ধুসহ জাতীয় নেতাদের নামে নামে গাছ লাগানোটা শুরু করা যায়। তাহলে ওই গাছটা বড় হবে। গাছটা মুক্তিযোদ্ধার কথা বলবে। একজন পথচারী হয়তো গাছের নিচে দাঁড়িয়ে নাম দেখে জানবে এই গাছটি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার নামে। তখন ওই মুক্তিযোদ্ধার জীবনীসহ মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ও আলোচিত হবে। এই চিন্তা ও আবেগ থেকেই গাছ লাগানোর কাজটি শুরু হয়। আমাদের শর্ত হলো, শুধু ঘটা করে গাছ লাগানো নয়, গাছটাকে নার্সিং করার কেউ না কেউ থাকতে হবে। এভাবে প্রায় দেড় শ গাছ লাগিয়েছি। গাছ লাগাতে অনেকেই আগ্রহী হচ্ছেন এবং যত্ন করে তা বড় করছেন- এটা খুব আশার কথা।

কৃষ্ণচূড়া গাছ কেন? সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘কারণ এই গাছের পাতা ও ফুলের সঙ্গে জাতীয় পতাকা লাল-সবুজের একটা মিল আছে। তাই আমরা ব্র্যান্ডিং করছি কৃষ্ণচূড়া গাছ। আবার গ্রামের ভেতরে বঙ্গবন্ধুর নামে লাগানো হচ্ছে বটগাছ। কিন্তু শহর এলাকায় জায়গা কম থাকায় বঙ্গবন্ধুর নামে আমরা বকুল বা আমলকী গাছ লাগাচ্ছি।’

সাইফুল ইসলাম জানান, কমিটির আরেকটি উদ্যোগের কথা। তিনি বলেন, বিভিন্ন স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে কমিটি করা হয়েছে। প্রতি বিজয় দিবস ও স্বাধীনতা দিবসের দিনে দলবেঁধে তারা ফুল হাতে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের কাছে গিয়ে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে আপনার বা আপনার পরিবারের অবদান অনেক। সে কারণে জাতি আপনার বা আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ।’ তখন ওই মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবার ভীষণ আবেগতাড়িত হয়। সেটা দেখে নতুন প্রজন্মকে আবেগতাড়িত হতে দেখছি। এভাবে চার বছর ধরে সিরাজগঞ্জের ৪০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা শ্রদ্ধা জানাচ্ছে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারকে। এটাকে একটা রীতিতে পরিণত করতে চাই আমরা। এই রীতি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লেই আমরা সার্থক হবো।’

গণহত্যা প্রসঙ্গে সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘একাত্তরে কোথায় কোথায় গণহত্যা হয়েছে সেটার অধিকাংশই আপনার মতো গবেষকরা লিখে রেখেছেন। আমরা সেটা সাধারণ মানুষকে জানাচ্ছি। পাশাপাশি শহীদ স্মরণে তাদের নিয়েই ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবসে গণহত্যার স্থানে, যুদ্ধের স্থানে আর শহীদ মিনারে মোমবাতি প্রজ্বালন করছি। প্রতিটি গণহত্যার স্থান ও যুদ্ধের স্থানে সরকার যদি স্মৃতিফলক না করে তাহলে আমরা স্থানীয় জনগণের উদ্যোগেই সেটা করার চেষ্টা করছি।’

সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধটা ছিল একটি জনযুদ্ধ। মুক্তিযোদ্ধা বা শহীদের নামে বিভিন্ন রাস্তার নামকরণে সরকারের নির্দেশনা আছে কিন্তু বাস্তবায়ন নেই। স্থানীয় জনগণও সে দাবি তুলে ধরছে না। জনযুদ্ধে জনগণের অংশগ্রহণ যেমন ছিল তেমনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে জনগণের অংশগ্রহণটাও বাড়ানো প্রয়োজন। আমরা সেটাই চেষ্টা করছি মাত্র।’

একাত্তরকে জাগ্রত রাখার কাজ করছে সিরাজগঞ্জ গণহত্যা অনুসন্ধান কমিটি। ফলে সেখানে প্রজন্ম অনুভব করতে শিখছে একাত্তরকে। কমিটির সদস্যদের স্বপ্ন, একদিন প্রত্যেকটি গ্রাম হবে মুক্তিযুদ্ধের গ্রাম। ওই গ্রামের সড়কগুলোর নামকরণ হবে বীর মুক্তিযোদ্ধা বা শহীদের নামে। গ্রামে একটি পাঠাগার থাকবে। সেটি হবে বঙ্গবন্ধুর নামে। গ্রামে ঢুকতে গেলে যে কেউই অনুভব করতে পারবেন এ দেশে একদিন মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, লাখো মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল আমাদের স্বাধীনতা।

সিরাজগঞ্জের মতো মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিরক্ষার এমন স্বপ্নগুলো সঞ্চারিত হোক সারা দেশে। সিরাজগঞ্জ গণহত্যা অনুসন্ধান কমিটির উদ্যোগগুলো ছড়িয়ে পড়ুক গ্রামে গ্রামে। মানুষের মনে সদা জাগ্রত থাকুক একাত্তর।

লেখক: মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক


জঙ্গিদের সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
মুফতি এনায়েতুল্লাহ

জঙ্গি শব্দটি অতি পরিচিত। জঙ্গি মানে যারা আকস্মিকভাবে কারও ওপর হামলে পড়ে। জনজীবনকে বিষিয়ে তোলে, উগ্রতার মাধ্যমে এক ভয়াল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। যারা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়। যাদেরকে সবাই বিপজ্জনক বলে মনে করে। এদের মধ্যে কোনো গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থ হাসিলের নিমিত্তে লড়াই করে, আবার কোনো গোষ্ঠী পর্দার অন্তরালের কোনো দেশি-বিদেশি অপশক্তির হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে ব্যবহৃত হয়। জঙ্গিদের সঙ্গে ইসলাম ও মুসলমানদের কোনো সম্পর্ক নেই। ইসলাম জবরদস্তিমূলক প্রতিষ্ঠা করার বিষয় নয়, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জীবদ্দশায় তিনি এটি করেননি, এর শিক্ষাও দেননি উম্মতকে।

ইসলাম হলো শাশ্বত জীবনবিধানের নাম। কোরআনে কারিমের ভাষায়- ‘নিশ্চয় ইসলাম আল্লাহর কাছে একমাত্র মনোনীত ধর্ম।’ ইসলাম মানুষের প্রকৃতজাত ধর্ম। অসি নয়, মসিতেই ইসলামের বিজয় হয়েছে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো কোনো যুদ্ধে নিজে থেকে শত্রুপক্ষকে আক্রমণ করেননি, যতক্ষণ না নিজে আক্রান্ত হন। মানুষকে ইসলামাইজ করেই ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই ফেতনা (প্রলোভন, দাঙ্গা, বিশৃঙ্খলা, যুদ্ধ, শিরক, ধর্মীয় নির্যাতন ইত্যাদি) সৃষ্টি করা যাবে না। কারণ ফেতনা হত্যা অপেক্ষা গুরুতর (সূরা আল বাকারা: ১৯১)।

অকারণে ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত হওয়া ইসলাম কখনো সমর্থন করে না। আমাদের দেশে যারা প্রতিনিয়ত সামাজিক অনাচার সৃষ্টি করে যাচ্ছে, তাদের প্রচলিত দেশীয় অর্থে ফেতনাবাজ কিংবা জঙ্গি বললে অত্যুক্তি হবে না। সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ইসলামের অবস্থান অত্যন্ত সুস্পষ্ট। মানুষ হত্যাকারীর স্থান জাহান্নামে উল্লেখ করে কোরআন মাজিদে বলা হয়েছে, ‘কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম, সেখানে সে স্থায়ী হবে’ (সূরা আন নিসা: ৯৩)।

বিনা কারণে মানুষ হত্যার কোনো সুযোগ নেই। কোরআন মাজিদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি মানুষ হত্যা কিংবা জমিনে সন্ত্রাস সৃষ্টির কারণ ব্যতীত কাউকে হত্যা করবে সে যেন তামাম মানুষকেই হত্যা করল’ (সূরা মায়িদা: ৩২)।

অশান্তি সৃষ্টি করতে নিষেধ করে আল্লাহতায়ালা কোরআন মাজিদে নির্দেশ দিয়েছেন, ‘দুনিয়ায় শান্তি স্থাপনের পর তাতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না’ (সূরা আরাফ: ৫৬)।

যারা পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায় তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে অভিশাপ এবং মন্দ আবাসের হুঁশিয়ারি (সূরা রাদ: ২৫)।

হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) রক্তপাত সম্পর্কে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন মানুষের মধ্যে সর্বপ্রথম যে মোকদ্দমার ফয়সালা হবে তা হলো, রক্তপাত বা হত্যা সম্পর্কিত’ (সহিহ বোখারি: ৬৩৫৭)।

জঙ্গি, উগ্রপন্থি বা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তখন তৈরি হয়, যখন কোনো বিশেষ শক্তি স্বীয় উদ্দেশ্য হাসিলের লক্ষ্যে তাদের নেপথ্যের শক্তি হিসেবে কাজ করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য মতে, জঙ্গিরা অত্যন্ত বিপজ্জনক, তারা দেশের জন্য মারাত্মক হুমকি।

বাংলাদেশ মুসলিমপ্রধান দেশ। শুরু থেকেই দেশের শ্রদ্ধাভাজন আলেম-উলামা, পীর-মাশায়েখ থেকে শুরু করে মসজিদের ইমাম-খতিবরা জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়ে সমাজে শান্তি রক্ষার পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অটুট রাখার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছেন। জঙ্গিবাদ ইসলামের পথ নয়, রাসুলের পথ নয়, কোরআনের পথ নয়- তা দ্ব্যর্থহীনভাবে দেশবাসীকে জানিয়েছেন। জঙ্গিবাদের সঙ্গে ধর্মের ন্যূনতম কোনো সম্পর্ক নেই। কোথাও বোমা মেরে, কিছু লোককে হত্যা করে কোনো উগ্রপন্থি ইসলামের নামে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে ফেলবে এমন নির্দেশনা ইসলামের কোথাও নেই। তার পরও জঙ্গিবাদ দমনে রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তিপর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে-

এক. আগামী প্রজন্মের জন্য জাগতিক জ্ঞানের পাশাপাশি ধর্মীয় জ্ঞানার্জনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কারণ কর্মমুখী শিক্ষার পাশাপাশি পরকালীন জ্ঞানার্জনের মাধ্যমেই একজন মানুষ নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের ব্যাপারে সচেতন হয়, ভালো-মন্দের ফারাক বুঝতে সক্ষম হয়। শুধু ধর্মীয় শিক্ষার্জনের মাধ্যমেই সত্যকে সত্য ও মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সৎসাহস অর্জন করে, অনাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সৎসাহস অর্জন করে। সুতরাং প্রকৃত ধর্মশিক্ষা ও ধর্মচর্চা হতে পারে জঙ্গিবাদ দমনের প্রধান হাতিয়ার।

দুই. ধর্মচর্চার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। যে যার যার ধর্ম পালন করবে, কোনো ব্যক্তি বা কোনো গোষ্ঠী যেন কোনো ধর্মপালনের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করতে না পারে সে ব্যাপারে রাষ্ট্রকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। এক ধর্মের জনগোষ্ঠী যেন আরেক ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর ওপর কোনো বিরূপ মন্তব্য না করে, বাধা না দেয়। এটি করা সম্ভব হলে পারস্পরিক সম্প্রীতি নষ্ট হবে না। বরং সবাই সবার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠবে, সমাজে সম্প্রীতি গড়ে উঠবে।

তিন. উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। পরিবারের কোনো সদস্য উগ্রবাদে লিপ্ত হচ্ছে কি না? কারা তাদের সঙ্গ দিচ্ছে? তাদের ব্যাপারে বিস্তারিত খোঁজখবর রাখতে হবে। কারণ স্বার্থান্বেষী মহল ভুলভাল বুঝিয়ে যা ইসলাম নয় তাকে ইসলাম হিসেবে উপস্থাপন করিয়ে অনেক সময় সরল মানুষের মস্তিষ্ক ধোলাইয়ের অপচেষ্টা করে বা করছে।

চার. যারা ইসলামের পক্ষশক্তি হিসেবে দাবি করে, অথচ ইসলামবিরোধী কাজে লিপ্ত হয় তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। কারণ, বিনা কারণে ইসলামের দোহাই দিয়ে কিছু লোককে হত্যা করলে ইসলাম কায়েম হয়ে যাবে, তা ভাবা নেহাত বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়। ইসলাম এমন কোনো ঠুনকো জিনিস নয় যে, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

পাঁচ. রাষ্ট্রের স্বার্থে, প্রশাসনের সহযোহিতায় ইসলামি দল, সংগঠন ও সংস্থাগুলোকে দিয়ে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে এর ভয়াবহতা ও অনিষ্টকর দিকগুলো সম্পর্কে জনসাধারণকে বোঝাতে হবে। ইসলামের জেহাদ, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ এক নয়, এ বিষয়ে সব মুসলিমকে, বিশেষ করে মুসলিম যুবকদের মাঝে প্রচার করতে হবে। জঙ্গিবাদের সঙ্গে সত্যিকার ইসলামপন্থিরা জড়িত নয়। তাই সরকারকে জঙ্গিবাদ দমনের জন্য প্রকৃত ইসলামি শক্তি, ইসলামি দলগুলোর সহযোগিতা নিতে হবে এবং তাদের সঙ্গে নিয়েই যাবতীয় কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে হবে।

ছয়. কোনো পক্ষ-বিপক্ষ না নিয়ে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে জঙ্গি, সন্ত্রাসী ও উগ্রবাদীদের তৎপরতা জাতির সামনে পরিষ্কার করার পাশাপাশি প্রকৃত দোষীদের যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। জঙ্গিবাদকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

মূলত কোনো ধর্ম, মতবাদ ও আদর্শ কখনো জঙ্গিপনা, সহিংসতা কিংবা সন্ত্রাস শিক্ষা দেয় না। মানুষ মানবীয় লোভ, দুর্বলতা, অসহায়ত্ব, প্রতিশোধস্পৃহা ইত্যাদির কারণে সহিংসতায় লিপ্ত হয়। এমন সহিংসতায় লিপ্ত ব্যক্তি নিজের কর্মের পক্ষে সাফাই গাওয়ার জন্য, বিবেককে অপরাধবোধ থেকে মুক্ত করার জন্য, অন্যকে পক্ষে টানার জন্য ধর্মের অপব্যাখ্যার আশ্রয় নেয়। এ জন্য ইসলামি শিক্ষার সম্প্রসারণ, প্রচার-প্রসারই হতে পারে জঙ্গি দমনের অন্যতম উপায়। কারণ, সঠিক ইসলামি জ্ঞান থাকলে তাকে ইসলামের নামে বিভ্রান্ত করা সম্ভব হবে না।

লেখক: শিক্ষক ও গণমাধ্যমকর্মী

বিষয়:

স্বপ্নবাজ মেয়র আনিসুল হক

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) সাবেক মেয়র আনিসুল হক। ছবি: সংগৃহীত
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
শরিফুল হাসান

প্রিয় মেয়র আনিসুল হক! দেখতে দেখতে পাঁচ বছর হয়ে গেল আপনি নেই এই শহরে! আপনি নেই আপনার প্রিয় এই ঢাকা নগরীতে, যে নগরের মেয়র হিসেবে আপনি আমাদের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে আপনাকে চিনতাম বলেই বলতে দ্বিধা নেই, এই দেশে, এই শহরে যোগ্য নেতার যেখানে বড্ড অভাব, সেখা‌নে আপনি এসেছিলেন আশার আলো নি‌য়ে। ঢাকা নিয়ে কত কত স্বপ্ন ছিল আপনার! যানজট কিংবা নাগরিক যেকোনো সংকটের কথা ভাবি, আপনার কথা মনে পড়ে।

প্রিয় মেয়র আপনাকে আমরা কিন্তু নানাভাবে চিনি। বিশেষ করে আমাদের শৈশবে আপনাকে চিনেছি একজন দারুণ উপস্থাপক হিসেবে। কী দারুণ করে কথা বলতেন আপনি। আপনার উপস্থাপনায় ‘আনন্দমেলা’ ও ‘অন্তরালে’ অনুষ্ঠানগুলো দেখেছিলাম। বিশেষ করে ‘জলসা’ অনুষ্ঠানটা স্মৃতিতে এখনো দাগ কেটে আছে।

সালটা ১৯৯৫। আমাদের তখন কিশোর বয়স। স্কুলে পড়ি। সবে ব্যান্ডের গান শুনতে শুরু করেছি। সেই সময় বিটিভিতে দেখলাম ব্যতিক্রমী সংগীতবিষয়ক সেই অনুষ্ঠানটা। ব্যান্ড সংগীতকে তখনো খুব ভালো চোখে দেখেন না আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠরা। আপনি সেই সময়ে অসাধারণ সেই অনুষ্ঠানটা করলেন।

আজও মনে আছে, ক্ল্যাসিকাল বনাম ব্যান্ড সংগীত, চিরকালীন এই দ্বন্দ্ব নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়েছিল সেই অনুষ্ঠানে। এরপর ক্ল্যাসিকাল শিল্পীরা গাইলেন ব্যান্ডের গান, আর ব্যান্ড শিল্পীরা গাইলেন রবীন্দ্রসংগীত। আধুনিক গানের শিল্পীরা গাইলেন নজরুলসংগীত এবং গানের সঙ্গে অর্থনৈতিক-সামাজিক পরিবর্তনের প্রভাব সবকিছু নিয়ে প্রবীণ ও নবীনদের খোলামেলা আলোচনা। আমি এখনো মাঝেমধ্যে মন খারাপ হলে ইউটিউবে সেই অনুষ্ঠান দেখি।

২০০০ সালের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে সাংবাদিকতায় যুক্ত হলাম। আপনাকে তখন দেখলাম বিজিএমইএর নেতা হিসেবে। আশির দশকে এই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের যে শুরু, তাতে আপনিও ছিলেন শুরুর দিকেই।

১৯৮৬ সালে আনিসুল হকের নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘মোহাম্মদী গ্রুপ’ প্রতিষ্ঠা হলো। তৈরি পোশাক, বিদ্যুৎ, তথ্যপ্রযুক্তি, আবাসনসহ নানা খাতে কাজ করলেন আপনি। ২০০৫ থেকে ২০০৬ সাল- এই সময়ে আপনি ছিলেন বিজিএমইএর সভাপতি। ২০০৮ সালে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি। ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ছিলেন সার্ক চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি।

প্রিয় আনিসুল হক, আপনি যখন ব্যবসায়িক নানা সংগঠনের নেতা, সেই সময়ে সাংবাদিক হিসেবে আপনাকে দেখেছি। মনেই হতো না ব্যবসায়ী এই মানুষটা শিল্প-সংগীতও দারুণ বোঝেন। এরপর আপনি এলেন রাজনীতিবিদ হিসেবে। অপনি এলেন এই শহরের ত্রাতা হিসেবে।

২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আপনি প্রার্থী। দারুণ লাগলে ঢাকা নিয়ে আপনার দারুণ সব স্বপ্ন। এরপর মেয়র হলেন। তেজগাঁও ট্রাকস্টান্ডকে দখলমুক্ত করতে আপনার সাহসী লড়াইয়ের কথা এই শহরের মানুষ বহু বছর মনে রাখবে। মেয়র হিসেবে আপনি যে স্বপ্ন আমাদের দেখিয়েছিলেন, সেটি আমার আজীবন মনে রাখব।

প্রিয় অনিসুল হক, আমার একটা অনুশোচনা আছে। ২০১৫ সালের ৩০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আপনি মেয়র হলেন। আপনার মেয়র হিসেবে এক বছর পূর্তিতে একটা লাইভ আলোচনা ছিল এটিএন নিউজে। সেই অনুষ্ঠানে সাংবাদিক হিসেবে আপনার মুখোমুখি ছিলাম আমি। সেই অনুষ্ঠানে মেয়র হিসেবে আপনার প্রশংসার পাশাপাশি কিছু কাজ করতে না পারার কারণে সমালোচনা করেছিলাম। আপনি তখন বলছিলেন কেন কী কারণে বাকি কাজগুলো হচ্ছে না। অমি বলেছিলাম, আপনি না পারলে আর কে পারবে?

সেদিনের অনুষ্ঠান শেষে আপনি আমার কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন, শরিফুল, আমাকে আরেকটু সময় দাও। আমি বলেছিলাম, মাননীয় মেয়র আপনার প্রতি পূর্ণ আস্থা আছে। আপনি না পারলে আর কে পারবে এই শহরকে বাসযোগ্য করতে? কিন্তু আফসোস সেই সময়টা আপনি আর পেলেন না। কিছুদিন পরই শুনি আপনি অসুস্থ। এরপর নানা গুজব। ২০১৭ সালের আজকের দিনে আপনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন! চলে গেলেন এই শহরকে এতিম করে!

স্বপ্নবাজ এক মেয়র হিসেবে, একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে, একজন সৃজনশীল মানুষ হিসেবে আনিসুল হককে মানুষ মনে রাখবে বহুদিন।

লেখক: কলামিস্ট


প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে জলবায়ু সম্মেলন

আপডেটেড ১ ডিসেম্বর, ২০২২ ১৫:০৩
মেহেদী আল আমিন

জাতিসংঘের ২৭তম জলবায়ু সম্মেলন প্রত্যশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। একই কথা প্রযোজ্য সবগুলো জলবায়ু সম্মেলনের ক্ষেত্রে। যদিও ২০১৫ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত ২১তম সম্মেলনে একটি শক্তিশালী চুক্তি হয়েছিল, যেখানে সবগুলো দেশ বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে সম্মত হয়েছিল। তাও যদি সম্ভব না হয়, তবে অবশ্যই ২ ডিগ্রির নিচে রাখতে হবে। চুক্তিটি সবার জন্য ছিল বাধ্যতামূলক। বর্তমানে এ চুক্তিকে ভিত্তি করেই চলছে জলাবায়ু-সম্পর্কিত সব কার্যক্রম।

এতগুলো সম্মেলনের পরও এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রিতে সীমাবদ্ধ রাখার প্রকৃত কোনো লক্ষণ আসলে দেখা যাচ্ছে না। যদিও এ বছর সম্মেলনের চূড়ান্ত ঘোষণায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রিতে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। বাস্তবতা হচ্ছে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা কিছুতেই ২ ডিগ্রিতে রাখা যাবে না। এমনকি এটি ৩ ডিগ্রিতেও চলে যেতে পারে। এমন সব পূর্বাভাস রয়েছে বিভিন্ন গবেষণায়। বিশ্বব্যাপী ১০ কোটি মানুষ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এক মিটার উচ্চতায় বাস করে, তারা সবাই চরম ঝুঁকির মধ্যে আছে।

১ দশমিক ৫ ডিগ্রি আর ২ ডিগ্রির মধ্যে রয়েছে বিস্তর তফাত। দেড় ডিগ্রি তাপমাত্রা বাড়লে ৭০ শতাংশ কোরাল রিফ হারিয়ে যাবে। যদি ২ ডিগ্রি বেড়ে যায়, তবে তা ৯৯ শতাংশ হারিয়ে যাবে। প্রতি পাঁচ বছরে পৃথিবীর এক-সপ্তমাংশ মানুষ মারাত্মক হিটওয়েভের মধ্যে পড়বে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি বৃদ্ধি পেলে। আর ২ ডিগ্রি বৃদ্ধি পেলে এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এ ফ্যাসাদে পড়বে। তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি বাড়লে যত মানুষ পানিসংকটে পড়বে, ২ ডিগ্রি বৃদ্ধি পেলে তার দ্বিগুণ মানুষ এ সমস্যার সম্মুখীন হবে।

এ সম্মেলনের চূড়ান্ত ঘোষণায় জানা গেল ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে হলে ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। এ ছাড়া বর্তমান কার্বনঘন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে লো-কার্বন ইকোনমিতে রূপান্তরে আরও ৪-৬ ট্রিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু অর্থায়ন হয়েছে ৮০৩ বিলিয়ন ডলার। অথচ বৈশ্বিক তাপমাত্রা ২ ডিগ্রির নিচে অথবা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে তা প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র ৩১-৩২ শতাংশ।

এত এত টাকার কথা আপাতত বাদ দেয়া যাক। ২০১৫ সালে উন্নত বিশ্ব ওয়াদা করেছিল, ২০২০ সাল থেকে তারা প্রতিবছর ১০০ বিলিয়ন ডলার করে দেবে, যা দিয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলো জলবায়ুর অভিঘাত মোকাবিলা করবে। কার্বন নিঃসরণ কমাবে এমন প্রকল্প নেবে। পাশাপাশি অভিযোজনের জন্য যা যা করার তা করবে। যাতে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও মানুষগুলো টিকে থাকতে পারে, এমন প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু উন্নত বিশ্ব এ টাকাটাও দেয়নি।

চূড়ান্ত ঘোষণায় উদ্বেগ জানানো হয়েছে প্রতিবছর ১০০ বিলিয়ন ডলার করে জমা না করার জন্য। এবং তাদের ওয়াদা পূরণের আহ্বান জানানো হয়েছে অর্থবহ মিটিগেশন অ্যাকশনের জন্য। অথচ এর অর্ধেকটি অভিযোজনের জন্য দেয়ার কথা ছিল। তা এখানে বলাই হয়নি। ২০২৫ সাল থেকে এ অর্থ দ্বিগুণ বা তারচেয়েও বেশি বাড়ার কথা ছিল। এখানে এখন শুধুই হতাশা।

সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো বিষয় হলো, কোনটিকে জলবায়ু অর্থায়ন বলা হবে তার সংজ্ঞা ঠিক করতে ব্যর্থ হয়েছে এ বিষয়ে গঠিত একটি কমিটি। তারা শতাধিক সংজ্ঞা নির্ধারণ করে মন্ত্রিপর্যায়ে সমঝোতার জন্য পাঠিয়েছে। ফলে মন্ত্রীরা কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি। দুটি, তিনটি বা চারটি সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দিলে মন্ত্রীরা হয়তো একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন।

সংজ্ঞা না থাকার বিপদ হলো- এর জন্য দেয়া ঋণকেও জলবায়ু অর্থায়ন বলে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। অথচ এটি হওয়ার কথা ছিল অনুদান, যা উন্নত বিশ্ব দেবে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে।

বহুজাতিক ব্যাংকগুলোকে বলা হয়েছে অর্থায়নের গতি বাড়াতে, ধরন পাল্টাতে, প্রায়োরিটি পুনর্নির্ধারণে, প্রবেশাধিকার সহজ করতে। তাদের পলিসি, ইনস্টুমেনন্ট পরিবর্তন করতে।

অথচ জাতিসংঘের মহাসচিবের গঠন করা উচ্চপর্যায়ের এক্সপার্ট গ্রুপ তাদের প্রতিবেদনে প্রাইভেট সেক্টর, বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শূন্য নিঃসরণ অর্জনে একটি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার সুপারিশ করেছিল। যেখানে নিয়মিত প্রতিবেদন দাখিল করার কথা বলা হয়েছিল তাদের। এক কথায়, ঐচ্ছিক না হয়ে বাধ্যতামূলক একটি কাঠামো প্রস্তাব করেছিল এক্সপার্ট গ্রুপ। এভাবে তারা আসলে কার্বনঘন কোনো প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে পারত না। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো বাধ্য হতো তাদের সম্পূর্ণ ভ্যালু চেইন কার্বনমুক্ত করতে। শেষমেশ চূড়ান্ত ঘোষণায় তাদের কার্বন নিঃসরণ কমানো ঐচ্ছিকই রাখা হলো। শুধু এটুকু যুক্ত করা হলো, যাতে জবাবদিহি আরেকটু সমন্বয় করা হয়।

বিভিন্ন কৌশল নির্ধারণে, অভিযোজনের কার্যক্রম নেয়ার ক্ষেত্রে এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রে মহাসাগরকে কনসিডারেশনে নেয়াকে উৎসাহিত করা হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্যাপাসিটি ঘাটতি রয়েছে টেকসই ও সফল ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে। তাই উন্নত দেশগুলোকে আহ্বান জানানো হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি সাপোর্ট দিতে। এটুকুই মহাসাগরকে রক্ষা করত বিভিন্ন দূষণ থেকে।

কার্বন নির্গমন কমাতে ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যেতে তাৎক্ষণিক, দ্রুত, গভীর ও টেকসই পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। মিশ্র জ্বালানির ওপর জোর দেয়া হয়েছে কার্বনঘন জ্বালানির পাশাপাশি, এটি বলা হয়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি ক্রাইসিসকে উল্লেখ করে।

কয়লা ফেস আউটের কথা এবারও বলা হয়নি। বরাবরের মতো ফেস ডাউন- মানে কমানো শব্দটিই রাখা হয়েছে। ১০০-এর মতো শহর আর দুটি দেশ এ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করেছে একটি চুক্তিতে। এখানে বলা হয়েছে, কোনো জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করা হবে না। সিভিল সোসাইটি, এনজিওগুলো অনেকটা সরব ছিল জীবাশ্ম জ্বালানি বন্ধ করার ব্যাপারে কোন ধরনের ঘোষণা আসবে। হতে পারে একটি সময় নির্ধারণ করে দেয়া হবে। তবে চূড়ান্ত ঘোষণায় এল ফসিল ফুয়েলে সাবসিডি উঠিয়ে দেয়ার কথা। এ বিষয়টি হতাশ করেছে সবাইকেই।

একমাত্র আশার কথা, এবারই প্রথম একটি ফান্ড গঠন করার ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পেরেছে সব দেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য ও বিভিন্ন ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও বিভিন্ন দুর্যোগ বেড়ে যাওয়ার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে ব্যাপক আকারে ক্ষতি হচ্ছে। এগুলোর জন্য তারা কিছু অর্থ পাবে এ ফান্ড থেকে। একে বলা হচ্ছে লস অ্যান্ড ডেমেজ ফান্ড। তবে এখানেও উন্নত বিশ্ব খেলছে এক গভীর রাজনৈতিক খেলা।

এ ফান্ডটির প্রস্তাব করেছিল জি-৭৭+চায়না, এটি ১৩৬টি উন্নয়নশীল দেশের সমন্বিত ফোরাম, যার নেতৃত্ব দিচ্ছে পাকিস্তান। তাদের প্রস্তাব ছিল, এসব লস অ্যান্ড ডেমেজের দায় উন্নত দেশগুলোকে নিতে হবে। আর এ ফান্ডের মাধ্যমে যে টাকা দেয়া হবে, তা হবে ক্ষতিপূরণ।

তবে যুক্তরাষ্ট্র এই প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছে। তাদের যুক্তি- এটি যদি ক্ষতিপূরণ হয়, তাহলে তারা সে ব্যাপারে আপত্তি জানাবে। ক্ষতিপূরণের কথা বাদ দিয়ে লস অ্যান্ড ডেমেজের বিষয়টি আলোচনার এজেন্ডাভুক্ত হয় সম্মেলন শুরুর দিন।

তবে ১৭ নভেম্বর সম্মেলন শেষ হওয়ার আগের দিন পর্যন্ত কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয় সবাই।

আরোও একটি বিষফোঁড়া রাখা হয়েছে এ প্রস্তাবে। আর তা হলো বিশ্বিব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও এ কর্মকান্ডে যুক্ত হতে পারবে। সুতরাং ফান্ড হলেও ঋণের ফাঁদ তৈরি হলো বাংলাদেশেল মতো উন্নয়নশীল দেশুগুলোর জন্য।

তবে ১৭ নভেম্বর সম্মেলন শেষ হওয়ার আগের দিন পর্যন্ত কোন ঐকমত্যে পৌছাতে ব্যর্থ হয়ে জি ৭৭+চায়না গ্রুপ সংবাদ সম্মেলন করে হতাশার কথা জানায়। তবে ঐদিনই সন্ধ্যা ইউরোপীয় ইউনিয়ন নতুন একটি প্রস্তাব আনে যা জি৭৭+চায়নার প্রস্তাবের চেয়ে ভিন্ন। এতে বলা হয় শুধু উন্নত বিশ্বই ফান্ডে টাকা দিবে তা নয়। ভারত, চীনের মতো দেশগুলোকেও এ ফান্ডে টাকা দিতে হবে কারন তারাও বড় দূষণকারী দেশ।

এছাড়া উন্নয়নশীল দেশগুলো এ টাকা পাবে তা, শুধু ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোই এ ফান্ড থেকে টাকা পাবে। এতে করে পাকিস্তানের মতো দেশ যারা এবছর বন্যায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির সম্মূক্ষীন হয়েছে তারা বাদ পরে যাবে। কারণ তারা উন্নয়নশীল দেশ তবে ভালনারেবল ক্যাটাগরিতে পরে না।

অবশেষে ফান্ড গঠনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়। ২৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। তারা নির্ধারণ করবে কোন কোন দেশ এ ফান্ডে টাকা দিবে আর কারা কারা টাকা পাওয়ার যোগ্য হবে। এ কমিটিই নির্ধারণ করবে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কিভাবে এ ফান্ডের সঙ্গে যুক্ত হবে।

সুতরাং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রস্তাবই কার্যত পাশ হলো, টাকা পাওয়ার ক্ষেত্রে শুধু যুক্ত হলো উন্নয়নশীল দেশগুলো বিশেষ যারা ক্ষতিগ্রস্ত। ক্ষতিগ্রস্ত ক্যাটাগরির নয় তবে উন্নয়নশীল, এমন দেশগুলো ভাগ্য অনেকটাই নির্ভর করছে এখন এ কমিটির উপর। আর ওই কমিটির রিপোর্ট আলোচানা হবে আগামী বছর সম্মেলনে। আর যদি কোন একটি দেশও কোন বিষয়ে দ্বিমত করে তবে সে উদ্যেগটি আলোর মুখ দেখবে না। এমনটিই নিয়ম এ সম্মেলনের। তবে চীন ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে তারা টাকা দিবে না। টাকা দিবে শুধু উন্নত বিশ্ব। তাই আগামী বছর একটি ভালো ফলাফল আসবে, এমন প্রত্যাশা করা আর না করা পাঠকের ওপরই থাকলো।

লেখক: কপ২৭-এ অংশগ্রহণকারী সাংবাদিক


banner close