রোববার, ২৩ জুন ২০২৪

মানবতার সেবায় ইসলাম

আপডেটেড
২৮ এপ্রিল, ২০২৩ ০৯:২৬
মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন
প্রকাশিত
মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন
প্রকাশিত : ২৮ এপ্রিল, ২০২৩ ০৯:২৫

ইসলাম মানবতার ধর্ম। শান্তি, সৌহার্দ্য, সাম্য-মৈত্রী, সহনশীলতা, পরমতসহিষ্ণুতা, উদার-নৈতিকতা, মূল্যবোধগত উৎকর্ষতা, অসাম্প্রদায়িকতা আর মানবিকতা হলো ইসলামের পরমাদর্শ। ইসলাম প্রবর্তনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিচার-বিশ্লেষণ করলেই পুতঃপবিত্র এই জীবন-বিধানের নান্দনিক ও সৌন্দর্যময় চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ পরিলক্ষিত হবে। সর্বপ্রকার হিংস্রতা, নিষ্ঠুরতা আর পাশবিকতার ভিতের ওপর মানবতাবাদী ইসলামের কল্যাণধর্মী সৌধমালার গোড়াপত্তন ঘটে। সারা বিশ্বে অমানবিকতার সব ধরনের রেকর্ড যখন অতিক্রান্ত হয়ে গিয়েছিল, তখনই ইসলাম তার সর্বমানবিক রূপটি নিয়ে বিশ্বমানবতার জন্য আবির্ভূত হয়। জেহালতের অন্ধকার ভেদ করে ইসলাম তার মানবিকতার স্পর্শে সব মানুষকে আপন করে নেয়। ব্যক্তি-আক্রোশ, পারিবারিক বিরোধ, সামাজিক বৈষম্য আর জাতি-ধর্মের সব ভেদাভেদ দূর করে সাম্য-মৈত্রী আর বিশ্বভ্রাতৃত্বের আদলে এক আদর্শস্থানীয় শান্তিময় সমাজ-কাঠামো গড়ে তোলে। অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে ইসলামের দ্রুত প্রসারের মূলে যে কয়টি অনুষঙ্গ কার্যকর ভূমিকা রেখেছে তার অন্যতম হলো সমাজে মানবিক মূল্যবোধের উপস্থিতি ও তার সফল প্রয়োগ। ইসলামের মানবতাবাদী আদর্শ সমকালীন ব্যক্তি ও সমাজ-মানসের ইতিবাচক পরিবর্তনে অনবদ্য অবদান রেখেছে।

ইসলামি জীবনদর্শনে বিশ্বমানবতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। মানবসভ্যতায় সম্প্রীতির পৃথিবী আর সর্বজনীনতার প্রকৃষ্ট নজির স্থাপন করেছে ইসলাম। ইরশাদ হচ্ছে- ‘আল ইয়াওমা আকমালতু লাকুম দিনাকুম ওয়া আতমামতু আলাইকুম নিমাতি ওয়া রাদিতু লাকুমুল ইসলামা দিনা’, অর্থাৎ আজ আমি তোমাদের জীবনব্যবস্থাকে পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের ওপর প্রদত্ত আমার অনুগ্রহকেও সম্পূর্ণ করে দিলাম আর তোমাদের জন্য জীবন পদ্ধতি হিসেবে ইসলামকেই মনোনীত করে দিলাম। মানবজাতির জন্য মহান স্রষ্টার মনোনীত এই ইসলামের মূল মর্মবাণীই হচ্ছে কল্যাণকামিতা, মানবিকতা। বলা হচ্ছে- ‘আদ্দিনু ওয়ান্নাসিহা’ অর্থাৎ ইসলাম এমন এক ধর্ম, যা সর্বদাই কল্যাণের কথা বলে, মানবিকতার জয়গান গায় এবং ভালোবাসার পূর্ণতা দান করে। ইসলাম, কোরআনে কারিম আর মহানবী (সা.)-এর প্রতিটি বাণী ও বক্তব্যে বিশ্বমানবতার প্রকৃত স্বরূপ পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। কোরআনে কারিমকে বলা হয় ‘হুদাল্লিন্নাস’ তথা গোটা মানবতার জন্য পথপ্রদর্শক আর বিশ্বনবী (সা.)-কে বলা হয় ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’ তথা গোটা বিশ্ববাসীর জন্য করুণাস্বরূপ। এতে ইসলামের সর্বজনীন এবং বিশ্বজনীন রূপটিই স্বমহিমায় প্রকাশিত হয়ে থাকে এবং মানবতার পরিশুদ্ধ সুরতটিই তাতে বাক্সময় হয়ে ওঠে।

ইসলামের ইতিহাসের বিখ্যাত পয়গম্বর হজরত ইব্রাহিম (আ.) যিনি মুসলিম নামটির প্রবর্তন করেছেন, তার জীবনের একটি শিক্ষণীয় ঘটনায় ইসলামে মানবিকতার বিষয়টি সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে। ইব্রাহিম (আ.)-এর স্বভাব ছিল মেহমান নিয়ে খাবার গ্রহণ করা। কোনো একসময় এমন হলো যে, তিনি মেহমান পাচ্ছেন না; এতে করে তিনি খাদ্য গ্রহণও করছেন না। অবশেষে মেহমান একজন এল, তিনি পরমানন্দে আগন্তুক মেহমান নিয়ে খাবার খেতে বসলেন এবং মেহমানকে প্রভুর নামে খেতে বললেন। মেহমান এতে বিরক্তি ও অপারগতা প্রকাশ করে খাবার না খেয়েই চলে যেতে উদ্যত হলে প্রিয় নবীর প্রতি প্রত্যাদেশ এল মেহমানকে তার ইচ্ছামতো খাদ্য গ্রহণের স্বাধীনতা দিতে। নবীজি তাই করলেন, মেহমান খাবার খেয়ে যাওয়ার সময় নবীকে এর কারণ জানতে চাইলে বিষয়টি তার কাছে ব্যক্ত করা হলো এবং সে তখন অজ্ঞানতা আর খোদাবিমুখতার পথ পরিহার করে নিজেকে শুধরে নিল। মানবতার পরম সুহৃদ হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর উপস্থিতিতে মসজিদে অমুসলিম জনৈক ব্যক্তি পেশাব করতে উদ্যত হলে সাহাবিরা যখন এর সমুচিত জবাব দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, দয়ার নবী তখন তাদের থামিয়ে দিলেন। লোকটি কাজ সেরে যখন চলে যাচ্ছিল, তখন নবীজি তাকে বুঝিয়ে বললেন- এটি আমাদের উপাসনার জায়গা, যা আমাদের কাছে খুবই পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র। এখানে ময়লা হলে আমাদের কষ্ট লাগে। ওই ব্যক্তি যা প্রমাণ করতে এসেছিল তা সে পেয়ে গেল। অর্থাৎ শেষ জমানার পয়গম্বর যিনি হবেন, তিনি চরম ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা বহন করবেন। আর সেটি প্রমাণের জন্যই তার অনাকাঙ্ক্ষিত কাজটি করা, প্রমাণ শেষে একত্ববাদের কালেমা পড়ে তিনি মহাসত্যে ইমান আনয়ন করলেন। নবীজির বাড়িতে মেহমান এল, যাদের ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে নবীজির মতদ্বৈততা রয়েছে। কিন্তু মেহমানের আতিথেয়তা ইসলামের অমোঘ বিধান। নবীজি সাহাবিদের মেহমান ভাগ করে দিলেন এবং নিজেও তার বাড়িতে আপ্যায়নের জন্য একজনকে সঙ্গে নিলেন। রাতের খাবার পরিবেশিত হলো মেহমানের সামনে, এতই খেল যে, অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে তার পেট খারাপ করল। নবীজির ঘর ও বিছানা নোংরা হলো। মেহমান প্রত্যুষের আগেই নবীগৃহ ত্যাগ করল। সকালবেলা মেহমানকে ওঠাতে গিয়ে নবীজি দেখলেন সে নেই এবং যা ঘটেছে তা তিনি ধৈর্যসহ প্রত্যক্ষ করলেন। বিছানা, ঘর নিজ হাতে পরিষ্কার করলেন। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকজন সাহাবিসহ নবীজি যখন এই ঘটনায় আফসোস করছিলেন, তখনই দেখতে পেলেন মেহমান ওদিকে আসছে। কিন্তু তার মধ্যে খুব ভয়, নবীজি তাকে অভয় দিলেন। সামনে আসার পর নিজ হাতে মেহমানের রেখে যাওয়া তরবারিটি ফেরত দিয়ে বললেন- রাতে আমার বাড়ির খাবার খেয়ে তোমার পেট খারাপ করেছে, আমাকে জাগালেই পারতে। আমি তোমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করতাম। তোমার অসুস্থতায় আমি কোনো সেবাই করতে পারলাম না এ জন্য তুমি আমার প্রতি কোনো কষ্ট পোষণ করো না, আমাকে মাফ করে দিও। মেহমান ভাবতে লাগল, যার একটা হুকুমে এই মুহূর্তে আমার তরবারি দিয়ে আমারই মস্তক দ্বিখণ্ডিত হয়ে মরুভূমির তপ্ত বালিতে গড়াগড়ি খেতে পারে, সেই মানুষ আমার সঙ্গে কতই না মানবিক আচরণ করছেন। নবীজির মহানুভবতায় মুগ্ধ-বিহ্বল হয়ে তরবারিটি প্রিয় নবীর পায়ে ফেলে মেহমানের কণ্ঠে উচ্চকিত হলো তাওহিদের কালেমা। এসব দৃষ্টান্তে ইসলামে মানবিকতার অবিচ্ছেদ্য রূপটি জাজ্বল্যমান হয়ে ওঠে।

মহানবী (সা.) ইসলামের আলোকে যে সমাজ গড়ে তুলেছিলেন তার ভিত্তি ছিল সততা, ন্যায়বিচার, পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও মানবিকতাবোধ। ইসলামে পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম প্রধান হলো নামাজ, আর সেই নামাজের মাধ্যমে আমরা মানবিকতা আর সাম্যের এক প্রকৃষ্ট নজির দেখতে পাই। একই কাতারে আমির-ফকির, সেখানে মানুষ হিসেবে কোনো ভেদাভেদ থাকে না। নবীজি তার এক বাণীতে বলেছেন- ‘মানুষের প্রতি যে ব্যক্তি দয়া বা অনুগ্রহ প্রদর্শন করে না, মহান আল্লাহ তার প্রতিও করুণা প্রদর্শন করবেন না।’ তিনি আরও বলেছেন- ‘সমগ্র সৃষ্টিই হচ্ছে মহান আল্লাহর পরিবারভুক্ত। আর তাই সৃষ্টিকুলের মাঝে সেই মহান আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অধিক প্রিয় যে তার পরিবারের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে।’ মহানবী (সা.) মক্কা বিজয়ের পর যারা তার সঙ্গে অতীতে চরম দুর্ব্যবহার করেছিল, নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করেছিল, তাদের সবার প্রতি তিনি মানবিক আচরণ করেন। চরম দুঃসময়ে, যুদ্ধের ময়দানে, এমনকি শত্রুর সঙ্গেও তিনি মানবিক আচরণের ধারা বজায় রেখেছেন। মক্কা বিজয়ের পর এক বৃদ্ধাকে তিনি দেখতে পেলেন ভারী এক বোঝা বহন করে দূর পাহাড়ের দিকে যাচ্ছেন। দয়ার নবী বুড়ির কাছ থেকে বোঝাটি নিজের মাথায় উঠিয়ে নিলেন এবং তার গন্তব্যে পৌঁছে দিলেন। বিদায়বেলায় বুড়ি অবাক-বিস্ময়ে মক্কার পাশবিক ও রুক্ষ সমাজে এমন বিনয়ী, পরোপকারী মানুষের সন্ধান পেয়ে হতবিহ্বল হয়ে পড়েন। কৌতূহলভরে জিজ্ঞেস করে যখন দয়াল নবীর পরিচয় পেলেন, বুড়ি তখন আর চোখের পানি সংবরণ করতে পারেননি। চিৎকার করে আর আত্মবিশ্বাসভরে তিনি বলতে লাগলেন- ‘এই যদি হয় মোহাম্মদ (সা.)-এর মানবিক চরিত্র, তবে তিনি কোনো মানুষেরই ক্ষতি করতে পারেন না।’ আর হ্যাঁ, তিনি কারও ক্ষতি করতে আসেননি, তিনি এসেছেন মানবিকতা, সম্প্রীতি আর পরোপকারিতার মাধ্যমে সর্বোন্নত ও মহত্তম এক মানবিক বিশ্ব গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়ে; যেখানে তিনি সর্বোতভাবে সফল হয়েছেন।

রাসুলে পাকের উপরোক্ত শিক্ষা অনুযায়ী বিপন্ন মানবতার পাশে দাঁড়ানো আমাদের কর্তব্য। দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় সময়ই নানাবিধ দুর্যোগ নেমে আসে। অগ্নিকাণ্ড, অনাবৃষ্টি বা ভয়াবহ বন্যার কারণে সৃষ্ট দুর্যোগে দুর্গত মানুষের ভোগান্তি ও কষ্ট সীমাহীন পর্যায়ে পৌঁছে। এমতাবস্থায় বিপন্ন ও দুর্গত মানবতার পাশে দাঁড়ানো আমাদের সবার নৈতিক, ইমানি ও আবশ্যিক দায়িত্ব হয়ে পড়ে।

সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, সংগঠন থেকে শুরু করে নানা স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান তখন আর্তমানবতার পাশে দাঁড়ায়, সাধ্যমতো সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। স্রষ্টাকে পেতে হলে আগে তার সৃষ্টিকে ভালোবাসতে হবে, সৃষ্টির সেবায় আত্মনিয়োগ করতে হবে। মহানবী (সা.) বলেছেন, তোমরা দুনিয়াবাসীর প্রতি রহম করো, আকাশবাসী (আল্লাহ) তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করবেন। সুতরাং নানা ধরনের দুর্যোগে আর্তমানবতার পাশে সেবার মানসে নিজেদের বিলিয়ে দেয়া, দুর্গত মানুষদের ওপর আসা বিপদাপদ ও সমস্যাসংকুল অবস্থায় আন্তরিক হয়ে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তাদের খেদমতে নিয়োজিত হওয়াই ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত হিসেবে পরিগণিত হবে।

সুফি সমাজে একটি কথা প্রচলিত আছে, খেদমাতে খোদা মিলে ইবাদাতে জান্নাহ অর্থাৎ সেবায় মহান আল্লাহ সন্তুষ্ট হন আর আল্লাহর বন্দেগিতে বান্দার জন্য জান্নাত নিশ্চিত হয়। সুতরাং মানবতার সেবাই গুরুত্বপূর্ণ; যার পরিপ্রেক্ষিতে স্বয়ং আল্লাহর সন্তুষ্টি রয়েছে। বলাবাহুল্য, মহান আল্লাহ কারও প্রতি সন্তুষ্ট থাকলে তার আর কী-ই বা প্রয়োজন হয়!

লেখক: অধ্যাপক, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


বাঙালি মুসলমানের পদবির ঐতিহ্য

মোহাম্মদ হাননান
আপডেটেড ৬ মে, ২০২৩ ১০:০৪
মোহাম্মদ হাননান

প্রথম কিস্তির পর

ভূমির মালিকানা থেকেই ‘ভূঁইয়া’ পদবি। বাঙালি হিন্দু সমাজে যারা ‘ভৌমিক’, মুসলমানদের মধ্যে তারাই ‘ভুইয়া’। বাংলার ‘বার ভুঁইয়া’ নামক বার-রাজার কাহিনি আজও বাংলায় কিংবদন্তি হয়ে আছে।

রাজস্ব, জমিজমা ও খাজনাপত্র সম্বন্ধীয় বিষয় থেকে উদ্ভব হয়েছে ‘দেওয়ান’ পদবি। খাজনা আদায়ের জন্য রাজ্যের মুখ্য কর্মচারীর উপাধি ছিল ‘দেওয়ান’। বিশিষ্ট দার্শনিক ছিলেন দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ।

‘হালদার’ ও ‘হাওলাদার’ একই পদবি নয়। ‘হালদার’ হচ্ছে ব্রাহ্মণ কায়স্থ এবং নাপিতের উপাধি। [হরিচরণ: বঙ্গীয় শব্দকোষ, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ২৩৫৭]। আর ‘হাওলাদার’ মোগল আমলের সামরিক উপাধি। (আরবি) হাওয়াল + (ফারসি) দার হয়ে শব্দটি নির্মিত হয়েছে। [শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী সম্পাদিত ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, বাংলা একাডেমি, ১৯৮৪, পৃষ্ঠা ১১০৭]। এখনো পুলিশ বা সামরিক বাহিনীর সিপাহি কমান্ডারকে হাওলাদার বলা হয়। লেখক ও কমরেড গোপাল হালদার, রাজনীতিক রুহুল আমীন হাওলাদার এই দুই পদবির প্রতিনিধি।

‘মজুমদার’ এসেছে মোগল আমলের রেকর্ডকিপার থেকে। শব্দটি ফারসি। তবে শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী বলছেন, এটা ব্রিটিশ আমলের রাজস্ব অফিসের হিসাব পরীক্ষক। [ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, বাংলা একাডেমি, পৃষ্ঠা ১১০৭]। এ হিসাবে পদবিটি অনেকটা আজকের ‘অডিটর’ পদের মতোই ছিল। হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ে রয়েছে এ পদবির ব্যবহার। বাংলাদেশ বিমানের ম্যানেজার ছিলেন আখতারুজ্জামান মজুমদার।

যে কেউ অবাক হতে পারেন যে বাংলায় ‘জমিদার’ নিয়ে কোনো পদবি নেই, কিন্তু ছোট ছোট তালুকের অর্থাৎ স্বল্প ভূসম্পত্তির মালিক হয়েই ‘তালুকদার’ পদবি বিকশিত হয়েছে। আরবি ‘তাল্লুক’ থেকে ‘তালুক’ এসেছে। বিএনপি নেতা ছিলেন ব্যারিস্টার আবদুস সালাম তালুকদার।

মোগল আমলে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের উপাধি ছিল ‘চাকলাদার’। ‘চাকলা’ ছিল এখনকার ‘জেলা’র অনুরূপ। চাকলাদার মানে জেলা প্রশাসক। কিন্তু বংশ-পদবি হিসেবে এটি খুব বেশি ব্যবহৃত হয়নি। ‘জায়গীরদার’ শব্দ এসেছে ‘জায়গীর’ ব্যবস্থা থেকে, আগের আমলে কোনো বাড়িতে সন্তানের টিউশনের বিনিময়ে শিক্ষকের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা। তবে মোগল আমলে কিছু কর্মচারী ছিলেন, যারা বেতনের পরিবর্তে ভূসম্পত্তির উপস্বত্ব ভোগ করতেন। এরাও ছিলেন ‘জায়গীরদার’। বাংলাদেশে গত শতকের নব্বইয়ের দশকে সিএনএনের প্রতিনিধি ছিলেন অনু জায়গীরদার।

‘পরের ধনে পোদ্দারি’ এখনো জনপ্রিয় প্রবাদ। বাঙালি মুসলমানে একটি হারিয়ে যাওয়া পদবি হচ্ছে ‘পোদ্দার’। মধ্যযুগে ব্যাংক ছিল না, ফলে ধনসম্পদ-টাকা জমা রাখা হতো যার কাছে তিনি ‘পোদ্দার’ নামে পরিচিত ছিলেন। জমাকৃত অন্যের টাকা তিনি আবার ধার দিয়ে নিজের লাভের অঙ্কও বাড়াতেন। এ জন্যই ‘পরের ধনে পোদ্দারি’ কথাটি প্রচলিত হয়েছিল। মধ্যযুগের কবি কঙ্কন মুকুন্দরাম তার চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে লিখেছেন, ‘পোদ্দার হইল যম। টাকায় আড়াই আনা কম’। আরবি ‘ফূতহ এবং ফারসি’ ‘দা’র মিলে হয়েছে ফূতহদার। তার থেকে ফোতদার এবং এরপর ‘পোদ্দার’।

রাজকীয় সিলমোহর যার জিম্মায় থাকত তার পদবি ছিল দস্তিদার। যেমন ছিলেন বিপ্লবী পূর্ণেন্দু দস্তিদার। বাঙালি মুসলমানের কাছে কি রাজার সিলমোহর থাকত না! মুসলমানে ‘দস্তিদার’ পদবি নেই। তবে রয়েছে দস্তগীর পদবি। মেজর জেনারেল গোলাম দস্তগীর।

আবার আদালতে যে রাজকর্মচারীরা বাদী, আসামি ও সাক্ষীদের শপথ করাতেন তার পদের নাম ছিল ‘ওয়াদ্দেদার’। বিপ্লবী নারী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার বাংলার ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন। আরবি ‘ওয়াদা’ শব্দ থেকে এসেছে ‘ওয়াদ্দেদার’ পদবি। কিন্তু আরবি ভাষা থেকে এলেও বাঙালি মুসলমানে এ পদবি নেই। এ পদে হয়তো মুসলমানরা কেউ চাকরি করেননি।

‘সরদার’ পদবি সমাজে কিছুটা নেতিবাচক সম্বোধনে পরিণত হয়েছিল, তবে ড. কামিনী কুমার রায় এ পদবিকে ‘আভিজাত্য সূচক’ পদবি বলেছেন [লৌকিক শব্দকোষ, কলকাতা, ১৯৭৯]। একসময়ে গ্রামীণ সামন্ততান্ত্রিক সমাজে ‘মোড়ল’রা সরদার পদবি ধারণ করতেন। ‘মোড়ল’ও অবশ্য একটি পদবি। এটাতেও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া থাকায় সরদারের মতো মোড়লও প্রায় বিলুপ্ত পদবি হয়েছে। তবে ‘মোড়ল’ এসেছে ‘মণ্ডল’ থেকে। কমরেড জসিম উদ্দীন মণ্ডল সিপিবি নেতা এবং জেনারেল জিয়ার মন্ত্রী রসরাজ মণ্ডল একই সূত্রের বংশ-পদবি।

আরবি মালিক থেকে ‘মল্লিক’ পদবি এসেছে মনে করা ন্যায়সংগত। তবে এরা কিসের মালিক ছিলেন তা নিশ্চিত নয়। মল্লযোদ্ধা থেকেও ‘মল্লিক’ আসতে পারে। ইতিহাসবিদ ছিলেন আজিজুর রহমান মল্লিক।

মোগল আমলে রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিকে বলা হতো ‘সরকার’, আবার খাজনা আদায় ও হিসাবরক্ষক কর্মচারীকেও বলা হতো ‘সরকার’। সরকার পদবিধারী কেউ কেউ ‘ইংরেজিতে লেখেন Sarkar, আবার কেউ ‘Sircer’। এ বানানভেদেও লুকিয়ে থাকতে পারে ‘সরকার’ পদবির উৎসের ভিন্নতা। স্পিকার ছিলেন ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার।

শিখদার বা সিকদার নিছক পুলিশ ছাড়া আর কিছু নয়। ‘শিক-বন্দুক’ ব্যবহারকারী হচ্ছেন ‘শিকদার’। ড. আহমদ শরীফ বলেছেন, ‘শিক’ নামে পরগনার রাজস্ব আদায়কারী কর্মচারী ছিল এ শিকদার। [সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৫৮৮]। তবে শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী বলেছেন, আরবি ‘সিখ’ থেকে এসেছে ‘সিকদার’ রাজস্ব আদায়কারী। কমরেড সিরাজ সিকদার ছিলেন বাংলাদেশ সর্বহারা পার্টির নেতা।

লস্কর, মৃধা, গোলন্দাজ, ঢালী ইত্যাদি সামরিক পদবি। ‘লস্কর’ মোগল আমলের পদাতিক বাহিনীর সদস্য। আর দশজন গদাধারী সৈন্যের অধিপতি হলেই ‘মৃধা’ উপাধি পাওয়া যেত। একেবারে কামান-বন্দুকের গোলা থেকে ‘গোলন্দাজ’ পদবির বিকাশ। ‘ঢালী’রা সমরক্ষেত্রে ঢালধারী সৈন্য ছিলেন।

‘বিশ্বাস’রা রাজার গোপন খবর বিশ্বস্তার সঙ্গেই রাখতেন। ‘ভরসা’ও আস্থা ও নির্ভরতার প্রতীক হিসেবে বংশপরম্পরায় চলে এসেছেন। রংপুরের রহিমউদ্দিন ভরসা ও করিমউদ্দিন ভরসা রাজনীতিতেও ভরসা জাগাতেন। ভাগ্য গণনা করেই ‘বখত’ পদবি বিকশিত। মন্ত্রী ছিলেন সাতক্ষীরার সৈয়দ দীদার বখত, ছাত্রনেতা সৈয়দ উপল বখত, ইত্তেফাকের সাংবাদিক ইয়াহিয়া বখত। হরিচরণ বলেছেন, ‘বখত’ এসেছে ফারসি ভাষা থেকে, কিন্তু ড. আহমদ শরীফ বলেন, ‘বখত’ এসেছে আরবি থেকে। ‘প্রামাণিক’রা বিয়ে ইত্যাদির প্রমাণপত্র আগলে রাখতেন। ‘মাঝিরা ছিল দুই দল বা দুই পাড়ের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী। আলোকচিত্রী শামসুল ইসলাম আল মাজি ‘মাঝি’কেই ঘষামাজা করে নিয়েছিলেন।

বরিশালের মাটিভাঙ্গায় ‘দাঁড়িয়া’ পদবিরা বাস করেন। আরবের নেজদ প্রদেশ থেকে তাদের পূর্বপুরুষরা এসেছিলেন। প্রফেসর মনিরুজ্জামান দাঁড়িয়া, মাটিভাঙ্গা কলেজের শিক্ষক। কোরায়শী বা কোরেশিরা মক্কার কুরাইশ বংশ থেকে আগত। ষাটের দশকের ছাত্রনেতা ছিলেন ফেরদৌস আহমদ কোরাইশী। চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরে একসময় কর্মকর্তা ছিলেন আবদুর রশিদ ‘খলিফা’। বাংলাদেশে একসময় ভুটানের রাষ্ট্রদূত ছিলেন লেন্দুক ‘দর্জি’। সেলাই পেশা থেকেই এসব পদবি। ‘অ্যাডভোকেট’ শব্দটি পদবির মতোই নামের আগে ব্যবহৃত হয়। যদিও আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক স্পিকার আব্দুল মালেক উকিল, কিংবা ছাত্রনেতা অসীম কুমার উকিল প্রমুখরা বংশ-পদবি হিসেবে এ পদবি ব্যবহার করেন।

যে সেনাপতির অধীনে এক হাজার সৈন্য পরিচালিত হতো, মোগল আমলে তিনিই ছিলেন ‘হাজারী’। ফেনী জেলার জয়নাল হাজারী এ রকম সেনাপতি না হলেও দাপটে কম যাননি। হিন্দু সম্প্রদায়ে যারা ‘সিংহ’ (কমরেড মণি সিংহ), মুসলমান সমাজে তারাই ‘সিনহা’ (বিএনপির মন্ত্রী ছিলেন মুন্সীগঞ্জের মিজানুর রহমান সিনহা)।

পটল, কাঁঠাল, পাহাড় নিয়েও বাঙালি মুসলমানে পদবি আছে। ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন ফজলুর রহমান পটল, আওয়ামী লীগের ঢাকা নগরের নেতা ছিলেন হাশিমউদ্দিন হায়দার পাহাড়ি।

‘ওয়ার্শী’, ‘চিশতী’, ‘তর্কবাগীশ’, ‘সোহরাওয়ার্দী’, ‘মাইজভাণ্ডারী’ প্রভৃতি পীর-মাশায়েখদের ধর্মীয় উত্তরসূরির পদবি। অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। পুস্তক প্রকাশক ছিলেন আবদুর বারি ওয়ার্শি। নজিবুল হক মাইজভাণ্ডারী এখনো রাজনীতিতে সরব আছেন। মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ ছিলেন পাকিস্তান আমলে আওয়ামী লীগের সভাপতি।

বুখারায় জন্ম নিয়েছিলেন ইমাম বুখারী, এটা পদবি নয়, আঞ্চলিক পরিচয়। বর্তমানে এমন অনেক নাম পাওয়া যায়, যাদের নামের শেষে বুখারী পদবি যুক্ত আছে। প্রতারণা করতেই এরকম পদবির ব্যবহার। শহীদ আল বোখারী মহাজাতক কখনোই বুখারার নন।

এ রকম শত শত পদবির ব্যবহার রয়েছে বাঙালি মুসলমানে। পাটোয়ারী, বকসি, আটিয়া, বখশ, বাওয়ালী, মলঙ্গী, কাগজী, পাইকার, নিকারী, মীনা, ফকির, (পাকিস্তান আমলের মন্ত্রী ফকির আবদুল মান্নান), শিকারী, বেগ, চোকদার, মাদবর, আকুঞ্জি, মিলকি (রাজনীতিক সলিমুল হক মিলকি), পাইন, নেগাবান (বাংলাবাজার পত্রিকার বরিশাল প্রতিনিধি ছিলেন ইসমাইল হোসেন নেগাবান), মহালী, আসপিয়ান, কারার, সাইলো, সাকলায়েন, আসকারী বসুনিয়া (শহীদ ছাত্রনেতা রাউফুন বসুনিয়া), জমাদার, সেরনিয়াবাত, ফরাজী, লোহানী (সাংবাদিক কামাল লোহানী), আনসারী, তাপাদার, বাগমার (ছাত্রনেতা আবদুল আজিজ বাগমার), খদ্দর (ন্যাপ নেতা হালিমুল্লাহ খদ্দর), কারিগর, বাগোজা, জোয়ারদার (ডা. আবুল কাশেম জোয়ারদার) ইত্যাদি। প্রতিটি পদবির পেছনে রয়েছে ইতিহাস ও ঐতিহ্য।

যদিও বংশ-পদবির ব্যবহার এই একুশ শতকে অনেকটাই কমে এসেছে, তথাপি কোনো কোনো ক্ষেত্রে একাধিক পদবিও আমরা নামের আগে-পরে ব্যবহার করতে এখনো দেখি। পাকিস্তান আমলে পাকিস্তানি নেতারা আগে-পিছে পদবি লিখতেন এভাবে, সীমান্ত গান্ধী বলে পরিচিত, খান আবদুল গাফফার খান, মুসলিম লীগের এক অংশের নেতা ছিলেন খান আবদুল কাইউম খান। এটা দেখে খুলনার নেতা লিখতেন খান আবদুস সবুর খান। বর্তমানে এ রকম নয়, আরেকটু ভিন্ন রকম একাধিক পদবির ব্যবহার করতে দেখা যায়। যেমন, সংসদ সদস্য ছিলেন শাহ রফিকুল বারী চৌধুরী (শাহ ও চৌধুরী), সংসদ সদস্য আবদুল মোতালিব খান পাঠান (খান ও পাঠান), সংসদ সদস্য খুররম খান চৌধুরী (খান ও চৌধুরী), পুরান ঢাকার বিশিষ্ট নাগরিক মির্জা আবদুল কাদের সরদার (মির্জা এবং সরদার) ইত্যাদি হরহামেশাই দেখতে পাওয়া যায়। আবার অনুসন্ধান করলে অনেক দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবে, যারা পূর্বের বংশ-পদবি বাদ দিয়ে নতুন করে সৈয়দ, চৌধুরী ইত্যাদি পদবি গ্রহণ করে সমাজে দিব্যি আছেন। বাঙালি মুসলমানের পদবি ব্যবহারের এটাও একটা বৈশিষ্ট্য বৈকি! (সমাপ্ত)।

লেখক: গবেষক ও ইতিহাসবিদ


বাঙালি মুসলমানের পদবির ঐতিহ্য

মোহাম্মদ হাননান
আপডেটেড ৬ মে, ২০২৩ ১০:০৫
মোহাম্মদ হাননান

প্রাচীন বাঙালির হিন্দু ও বৌদ্ধ সমাজে পদবির পরিচয় না পাওয়া গেলেও প্রাচীনকালের বাঙালি মুসলমানের পদবির ব্যবহারের নজির পাওয়া যায়। প্রাচীন বাংলার যেসব বৌদ্ধ কবির নাম চর্যাপদ নামক প্রাচীন গ্রন্থে রয়েছে। তাতে কাহ্নপা, লুইপা, কুক্কুরিপা প্রমুখের নাম পাওয়া যায়, কিন্তু বৌদ্ধদের পদবি স্পষ্ট নয়। ‘পা’ শব্দটি পদবি বলে মনে হয় না, এটা পদকর্তার চিহ্ন। যেমন ‘কবি’ শামসুর রাহমান, ‘কবি’ নির্মলেন্দু গ‍ুণ। প্রাচীন বাঙালি পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্করের নামেও কোনো পদবি নেই। হিন্দু সমাজের প্রাচীন রাজা লক্ষ্মণ সেন, বল্লাল সেন ইত্যাদিতে ‘সেন’ পদবি পাওয়া যায়, তবে তারা বাঙালি ছিলেন না।

কিন্তু প্রাচীন আমলের বাঙালি মুসলমানের নামের সঙ্গে পদবি ব্যবহারের প্রবণতা লক্ষ্যযোগ্য। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, মোহাম্মদ (সা.)-এর জীবদ্দশাতেই আরবরা বাংলায় ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে উপমহাদেশে এসেছিলেন। এদের একটা জামাত উত্তর বাংলায় দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম মসজিদ স্থাপন করে। [বিস্তারিত দেখুন ব্রিটিশ গবেষক টিম স্টিলের বিবরণী, প্রথম আলো, ১৯ অক্টোবর ২০১২]। বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে যারা ‘শেখ’ পদবি ব্যবহার করেন তাদের ঐতিহ্য এ দেশে এই আরব মুসলমানদের আগমনের সঙ্গে জড়িত। আরবরা ‘শেখ’ বা তার থেকে ‘শায়খ’ পদবিধারী ছিলেন। বাঙালি যারা সে সময় মুসলমান হয়েছিলেন, তারা সরাসরি ‘শেখ’ পদবি ধারণ করেন। প্রাথমিকভাবে আরবের অনেক শেখ পরিবারও আরব থেকে এসে বাংলাদেশে বসবাস করেছিল। যেমন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবার। ‘শেখ’ পদবি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিয়ের সূত্রেও বিস্তার লাভ করে।

মধ্যযুগের কাব্যগুলোতে মুসলমানদের পরিচয় সূত্রে ‘শেখ’ পদবির সঙ্গে ‘সৈয়দ’ পদবিও উল্লেখিত আছে। ‘সৈয়দ’রা এসেছিলেন মধ্য এশিয়া এবং পারস্য অঞ্চল থেকে। তাদের কাছে যারা মুসলিম হয়েছিলেন তারা ‘সৈয়দ’ পদবি লাভ করেন। এ ক্ষেত্রেও কিছু ‘সৈয়দ’ বংশ-পদবি হিসেবে এসেছে বিয়ের সূত্রে। বাগেরহাটের সৈয়দ-মহল্লার সবাই সৈয়দ পদবিধারী। বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক ‘আবদুল মান্নান সৈয়দ’ তার বংশ-পদবি নামের শেষে ব্যবহার করতেন।

প্রাচীন-মধ্যযুগের সন্ধিক্ষণে প্রথম যে মুসলিম কবির কথা আমরা সাহিত্যের ইতিহাসে পাই, তিনি হলেন ‘শাহ’ মোহাম্মদ সগীর। এ সময়ের আরও কবি, দৌলত উজির বাহরাম ‘খান’ এবং পদকর্তা ‘শেখ’ ফয়জুল্লাহ, ‘শেখ’ কবীর, ‘সৈয়দ’ মর্তুজা, ‘সৈয়দ’ সুলতান প্রমুখ। এখানে আমরা বেশ কয়েকটি অভিজাত বংশ-পদবির পরিচয় পাই। ‘শাহ’ (বাদশাহী বংশ পরিবার), ‘শেখ’ (আরব থেকে আগত), ‘সৈয়দ’ (পারস্য থেকে আগত বংশধারা) ইত্যাদি। ‘খান’ পদবির লোকেরা এসেছিল বৃহত্তর আফগানিস্তান-পখতুনিস্তান থেকে, যারা মূলত ‘পাঠান’ হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশে ‘পাঠান’ বংশ-পদবিও রয়েছে। জেনারেল এরশাদের জামানায় নেত্রকোনা থেকে একজন সংসদ সদস্য ছিলেন, নূরুল আমিন খান পাঠান। এখানে ‘খান’ ও ‘পাঠান’ দুটো পদবিই একই সঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে।

পদবির লিঙ্গান্তরও হয়েছে বাঙালি সমাজে। ‘সৈয়দ’ বংশের মেয়েরা লেখেন ‘সৈয়দা’। সৈয়দা হাফসা বেগম (শিশু একাডেমির কর্মকর্তা ছিলেন)। খান পরিবারের মেয়েরা হয়েছেন ‘খানম’। কবি খালেদা খানম। তবে বাংলা ভাষার পণ্ডিতরা মনে করেন, ‘খানম’ শব্দটি এসেছে তুর্কি ভাষা থেকে। ‘হানুম-খানুম-খানম’। [বাংলা একাডেমি সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান, সম্পাদক: প্রফেসর আহমদ শরীফ, ঢাকা ১৯৯২, পৃষ্ঠা ১৫৮]।

খানরা আবার যারা ব্রিটিশের তাঁবেদার ছিলেন, তারা উপাধি পেয়েছিলেন ‘খান বাহাদুর’। হিন্দুদের মধ্যেও একশ্রেণির ব্রিটিশের দালাল ছিল, যাদের খেতাব দেয়া হয়েছিল ‘রায় বাহাদুর’। ‘খান’ পদবি আরও বিস্তৃত হয় যখন পার্লামেন্ট সদস্যের পদবি ছিল ‘খান মজলিশ’। বংশধারায় পরবর্তীকালে সংসদ সদস্য না হলেও পরিবার-পরিজনের সবার নামের সঙ্গেই রয়েছে ‘খান মজলিশ’ পদবি। দাউদ খান মজলিশ, (ভয়েস অব আমেরিকার সংবাদ পাঠক), আনায়ারুল হক খান মজলিশ (ব্যানবেইসের সাবেক পরিচালক)।

‘চৌধুরী’রা ছিলেন ছোট জমিদার। ‘চৌথহারী’ যার অর্থ। এক-চতুর্থাংশ রাজস্ব আদায়কারী, বাংলার রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি পদ, সেখান থেকেই ‘চৌধুরী’। [লোকেশ্বর বসু: আমাদের পদবির ইতিহাস, আনন্দ, কলকাতা ১৯৯১]। মধ্যযুগে গ্রামের মোড়লকেও বলা হতো চৌধুরী। ‘গ্রাম মুলুকের হলো সে চৌধুরী’। [চৈতন্যচরিতামৃত]।

তাই হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়েই রয়েছে চৌধুরী পদবি, প্রফেসর মুনীর চৌধুরী, রাজনীতিক মতিয়া চৌধুরী, ব্রিটিশের খয়ের খাঁ বুদ্ধিজীবী নীরদ চৌধুরী, শক্তিপদ চৌধুরী প্রমুখ। ‘চৌধুরী’ পদবিরও লিঙ্গান্তর হয়েছে ‘চৌধুরানী’। বঙ্কিমচন্দ্রের বিখ্যাত উপন্যাস দেবী চৌধুরানী।

‘কাজী’রা বিচারকই ছিলেন। বংশধারায় পরবর্তীরা বিচারক না হলেও ‘কাজী’ পদবি ব্যবহার করেছেন। বাংলার বিদ্রোহী কবি নজরুল ছিলেন ‘কাজী’ পদবিধারী। কথাসাহিত্যিক এবং সাবেক সচিব কাজী ফজলুর রহমানও বিশিষ্ট বাঙালি নাগরিক।

ধর্মযুদ্ধে শহীদ হওয়ার পরও ‘শহীদ’ কোনো পদবি হয়নি, কিন্তু যুদ্ধে অংশ নিয়ে জীবিত ফিরে আসায় উপাধি পেয়েছেন ‘গাজী’। পরবর্তীকালে যুদ্ধে অংশ না নিয়েই বংশধারার সবারই পদবি হয়েছে ‘গাজী’। গাজী সাহাবুদ্দিন (সচিত্র সন্ধানী), গাজী আরশাদ (জাতীয় পার্টির নেতা), গাজী নাজমা প্রমুখ।

‘ঠাকুর’ পদবিকে জনপ্রিয় করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই। ইংরেজরা সর্বত্রই বিকৃত করতে ভালোবাসত, তাই রবীন্দ্রনাথ হয়েছিলেন ‘ট্যাগোর’, ‘ঠাকুর’ নন। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ‘ঠাকুর’ শব্দের মূল হচ্ছে সংস্কৃত ‘ঠাক্কুর’। [বঙ্গীয় শব্দকোষ, প্রথম খণ্ড, সাহিত্য আকাদেমি, কলকাতা ১৯৭৮, পৃষ্ঠা ৯৮৭-৯৮৮]। রবীন্দ্রনাথ হিন্দু নন, ব্রাহ্ম ছিলেন। হিন্দুদের মধ্যে ‘ঠাকুর’ পদবির ব্যবহার বিশেষ দেখা যায় না, তবে মুসলমানদের মধ্যে ‘ঠাকুর’ পদবি রয়েছে জোরেশোরে। সাবেক বৃহত্তর বাংলার অংশ এবং বর্তমান মিয়ানমারের রোসাং রাজসভার মন্ত্রী ছিলেন কোরেশী মাগন ঠাকুর। অর্থাৎ তিনি আরবের কুরাইশ বংশোদ্ভূত ছিলেন, আবার ঠাকুরও ছিলেন। ড. আহমদ শরীফ বলেছেন, ‘ঠাকুর’ তুর্কিজাত শব্দ। [সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান, বাংলা একাডেমি, ১৯৯২, পৃষ্ঠা ২৭২]। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ষড়যন্ত্রে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তাহের উদ্দিন ঠাকুর। সচিব ছিলেন আবদুল কাইউম ঠাকুর।

এক অর্থে সব মুসলমানের পদবিই একসময় ছিল মিয়া বা মিঞা। যাদের কোনো পদবি ছিল না, সেসব মুসলমান ‘মিয়া’ পদবি ব্যবহার করতেন। আবার সাধারণ মুসলমান কালু মিয়া, ভোলা মিয়া এখন সব মিয়া আবার নামের অংশ হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে। সম্বোধনেও ‘মিয়া’ শব্দ ব্যবহার হয়, ‘কী মিয়া, কেমন আছেন’। বাঙালি হিন্দুর ‘মহাশয়’ শব্দের বিপরীতে বাঙালি মুসলমানে একসময় ‘মিঞা’ শব্দের ব্যবহার হয়েছে। মিয়া বা মিঞা ফারসি জাত শব্দ।

মীর, মির্জা- একই পরিবারের দুই পদবি। মূল ‘আমির’ থেকে ‘মির’ বা ‘মীর’ শব্দ এসেছে। বাঙালি মুসলমানের মধ্যে মীর মশাররফ হোসেন এই পদবির শ্রেষ্ঠ সন্তান। মীর থেকে তার সন্তান হয়েছে মীরজাদা, যেমন নবাবজাদা, সাহেবজাদা। এই মীরজাদা থেকেই হয়েছে মীরজা বা মির্জা। মির্জা গোলাম হাফিজ। (সাবেক আইনমন্ত্রী), মির্জা আব্বাস (বিএনপি নেতা), মির্জা আযম (আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য)। পঞ্চগড়ের মির্জাপুর গ্রামের সবাই মির্জা।

‘মোল্লা’ এবং ‘মুনশী’, মিয়া পদবির মতোই বাঙালি মুসলিম সমাজে জনপ্রিয় ছিল। ‘মোল্লা’ আরবি শব্দ, তবে তুর্কি ভাষাতেও ‘মোল্লা’ শব্দ আছে, যার অর্থ ‘পরিপূর্ণ জ্ঞানবিশিষ্ট মহাপণ্ডিত ব্যক্তি’। [ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, বাংলা একাডেমি, ১৯৯২, পৃষ্ঠা ৯২৫]। তবে হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, মোল্লা হচ্ছেন ‘মুসলমান পুরোহিত’। [বঙ্গীয় শব্দকোষ, সাহিত্য আকাদেমি, কলকাতা, ১৯৭৮]। একসময় মসজিদের ইমামকেও মোল্লা বলা হতো, হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় হয়তো সে কারণেই ‘মুসলমান পুরোহিত’ কথাটি বলেছেন। মোল্লা যেহেতু জ্ঞানী ও পণ্ডিত ব্যক্তিদের বলা হতো, তাই একদল বুদ্ধিজীবী কটূক্তি করতে ‘মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত’ প্রবাদের সৃষ্টি করে ও পদবিকে হেয় ও কৌতুকের পাত্র করার চেষ্টা করেন। ভাষা ও ব্যাকরণ বইয়েও এ প্রবাদকে লিপিবদ্ধ করা হয়। বাদশাহ আকবরের সভাসদ ছিলেন মোল্লা দোপায়েজা। বাংলাদেশের তরুণ সাংবাদিক ছিলেন মোল্লাহ আমজাদ হোসেন।

মসজিদের ইমামকে ‘মুনশী’ও বলা হতো। শব্দটি দক্ষতা ও নৈপুণ্য অর্থেও প্রচলিত ছিল। কাজের মুনশিয়ানা বলতে পটুতাকেই বোঝায়। কিন্তু শব্দটি আরবি হলেও ব্রিটিশ আমলে কেরানি পেশাকে ‘মুনশি’ বলা হতো। বাংলার হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ে রয়েছে ‘মুনশি’ পদবি। ১৯৭১ সালে পশ্চিমবঙ্গের যুব কংগ্রেসের নেতা প্রিয় রঞ্জন দাশ মুনশি মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। মুসলিম সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট লেখক ছিলেন মুনশি মেহেরুল্লা।

একটি বিখ্যাত প্রবাদ হলো, ‘আদার ব্যাপারীর জাহাজের খবর’ নেয়া প্রসঙ্গে। পদবিটি ব্যবসা-বাণিজ্যকে কেন্দ্র করেই। নীহাররঞ্জন রায় তার গ্রন্থে প্রাচীন বাংলায় ‘ব্যাপারী’ পেশার কথা উল্লেখ করেছেন। [বাঙ্গালির ইতিহাস, লেখক সমবায় সমিতি, কলকাতা, ১৩৮২, পৃষ্ঠা ১৩৪]। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন রবীন্দ্র ব্যাপারি। তবে হিন্দু সমাজে ব্যাপারী পদবি খুব ব্যবহৃত হয়নি। ব্যবসা-বাণিজ্য পেশা ধরে হিন্দু সমাজে যেসব পদবি ব্যবহৃত হয়েছে তার মধ্যে সদাগর, সাহা, মণ্ডল, মহাজন, বানিয়া ইত্যাদি প্রধান। মধ্যযুগের কবি বিজয় গুপ্ত তার কাব্যে এ রকম অনেক বাণিজ্য-পদবির কথা উল্লেখ করেছেন। [বিজয় গুপ্ত, পদ্মাপুরাণ, বসন্ত কুমার ভট্টাচার্য সংকলিত, কলকাতা, পৃষ্ঠা ১২৮]। মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপারী পদবির ব্যবহার ছিল যত্রতত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নূরুল আমীন ব্যাপারি, পূর্ববঙ্গে ব্রিটিশ আমলে বিশিষ্ট আম ব্যবসায়ী মিঠু ব্যাপারি প্রমুখ।

খন্দকার, আখন্দ এবং মিয়াজী পদবি এসেছে শিক্ষকতা পেশা থেকে। সাধারণভাবে খন্দকার হচ্ছে কৃষিজীবী, তবে ফারসি ভাষায় ‘খন্দকার’ হচ্ছে শিক্ষক। ‘ভাসানী যখন ইউরোপে’ নামক বিখ্যাত গ্রন্থের লেখক ছিলেন খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের হোতা ছিলেন খন্দকার মোশতাক আহমদ। ‘আখন্দ’ পদবি ‘খন্দকার’ পদবির অপভ্রংশ। ‘মিয়াজী’ পদবির সঙ্গে ‘মিয়া’ পদবির কোনো সম্পর্ক নেই। ফারসি ভাষায় ‘মিয়াজী’ হচ্ছে শিক্ষক। (চলবে)।

লেখক: গবেষক ও ইতিহাসবিদ


আগুন লাগলে যে দোয়া পড়বেন

আপডেটেড ৪ এপ্রিল, ২০২৩ ১৪:২০
ইসলাম ডেস্ক

দুর্ঘটনা বা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বলে-কয়ে আসে না। যেকোনো মুহূর্তে ঘটে যেতে পারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড এবং নিভে যেতে পারে তরতাজা প্রাণ ও সহায় সম্পদ। তাই কোথাও আগুন লাগলে আশপাশে যারা থাকেন, তাদের উচিৎ আগুন নেভানোর যাবতীয় চেষ্টা অব্যাহত রাখার, আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করা ও মাসনুন দোয়া পড়া।

আগুন দেখে হতাশ না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করে তা নিভানোর বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। অতঃপর আল্লাহর কাছে তা সহজে নির্মূলে দোয়া ও আমল করা জরুরি।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা যখন কোথাও আগুন (লাগতে) দেখো, তখন তোমরা (উচ্চস্বরে— আল্লাহু আকবার) তাকবির দাও। কারণ উচ্চস্বরে এই তাকবির আগুন নিভিয়ে দেবে।’ (তাবরানি)

এই (اَللهُ اَكْبَر) তাকবিরের অর্থ হলো হলো— আল্লাহ মহান।

ইমাম ইবনে তাইমিয়া রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ‘আগুন যত ভয়ংকর হোক না কেন, তাকবিরের মাধ্যমে তা নিভে যায়। আর আজানের মাধ্যমে শয়তান পলায়ন করে।

এ ছাড়াও পবিত্র কুরআনে বর্ণিত একটি আয়াত রয়েছে। যেটি পড়লে আগুন নেভাতে প্রভাব পড়ে, আগুনের ক্রিয়া নিস্তেজ হয়ে আসে। আয়াতটিতে হজরত ইবরাহিমকে (আ) আগুন যেন স্পর্শ না করে, সে নির্দেশ দিয়েছিলেন মহান আল্লাহ তায়ালা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন—

يَا نَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ

উচ্চারণ: ‘ইয়া না-রু কু-নি বারদান ওয়া সালামান আলা ইবরাহীম।’ অর্থাৎ ‘হে আগুন! তুমি ইবরাহিমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও।’ (সুরা আম্বিয়া : ৬৯)


banner close