বুধবার, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

তোয়াব খান-নিরন্তর অনুপ্রেরণা

তোয়াব খান। ছবি: দৈনিক বাংলা
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত
দৈনিক বাংলা ডেস্ক

তারিক আনাম খান

তোয়াব খান আমার মামা। পারিবারিক আন্তরিক ভাষায় আমার ‘কেলো মামু’। তিনি একাধারে আমার মামা। অর্থাৎ মায়ের আপন মামার ছেলে। তিনি আবার আমার আপন ফুফাতো ভাই। বৈবাহিক সূত্রে আবার আমার দুলাভাই। তবে তিনি ছিলেন আমার কেলো মামু।

হয়তো কেলো মামুর মধ্যে অদ্ভুত এক নিবিড়তা, এক আপন গন্ধ খুঁজে পেতাম বলেই তিনি সব সম্পর্কের ওপরে আমার মামু। আবার বয়সে তিনি আমার মায়ের পিঠাপিঠি ছিলেন। মাত্র এক বছরের বড় ছিলেন আমার মা। তাই ‘কেলো মামু’ শব্দ দুটোর সঙ্গে হাজির হয়ে যেত আমাদের ছোটবেলা, আমাদের গৌরব, আমাদের অনুকরণের এক নাম। এই খাঁ পরিবারের সঙ্গে অনুকরণীয় সব নাম আমাদের ফুফাতো ভাইদের মধ্যেই ছিল। যেমন- শফি খান, ডা. এম আর খান, সহি খান- তেমনই একজন তোয়াব খান।

আমাদের ভাইবোনসহ অনেকের কাছে বিস্ময় ছিল এ রকম অসম্ভব ফর্সা, সুদর্শন একজন মানুষের নাম ‘কেলো’ কী করে হয়! আর এই মানুষটাকে সিনেমায় কেউ ‘চান্স’ দেয় না কেন? তোয়াব খান আমার জন্মের আগে থেকেই সাংবাদিক। জীবনের শেষ দিন পর্যন্তও সাংবাদিক।

আমাদের বাড়িতে সংবাদপত্র পাঠ ছিল একটি নিয়মিত অভ্যাস। আমার চাচারাও সংবাদপত্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। সেই আজাদ পত্রিকা ও মওলানা আকরাম খাঁর আমল থেকে পত্রিকার সঙ্গে এই পরিবারের ঘনিষ্ঠতা শুরু। এ কারণে পত্রিকা, সংবাদপত্র, খবর মানেই কেমন যেন আত্মীয় আত্মীয় গন্ধ লাগে। বাড়িতে খবরের কাগজ কমপক্ষে দুটো আসতই। পড়ার প্রতি, খবর জানার প্রতি যে প্রবল আগ্রহ তার বড় কারণ ছিলেন আমার চাচা শামসুল আনাম খান, আর অবশ্যই তোয়াব খান।

প্রথমে পড়তাম ‘সংবাদ’। মনে হতো কি সাহসী, অকুতোভয় আর প্রগতিশীলতা। পত্রিকাটির সাহিত্য পাতাটাও ছিল অদ্ভুত আকর্ষণীয়। সঙ্গে থাকত ‘পূর্বদেশ’, পরে দৈনিক পাকিস্তান। দৈনিক পাকিস্তান তখন সরকারি পত্রিকা। কিন্তু সেখানে মিথ্যাচার অন্তত ছিল বলে মনে হতো না। তার কারণ এ পত্রিকায় ছিলেন তোয়াব খানসহ সে সময়কার অকুতোভয় সংবাদকর্মীরা। আর দৈনিক পাকিস্তানের বড় কৃতিত্ব তার ছাপা, লেখা, চলতি কথ্য ভাষা আর ঝকঝকে চৌকস প্রকাশনা। ছোটদের পাতা, সাহিত্য পাতা কী ভীষণ আকর্ষণীয় আর আধুনিক। এই যে তোয়াব খানসহ একদল তেজি মানুষ সংবাদপত্রে কাজ করার ঝুঁকি জেনেও এই সাংবাদিকতা পেশাকেই ধ্যান, জ্ঞান করেছেন, তা আজও বড় প্রেরণার। তখন সাংবাদিকদের চাকরির নিরাপত্তা আর বেতনও খুব বেশি ছিল না। সেটিও আমরা জানতাম।

তোয়াব খান, আমার কেলো মামু আপাদমস্তক একজন সাংবাদিক। ঢাকায় এসে তার কাছাকাছি কদিন থেকে দেখেছি- তার দেখা পাওয়াটাই ছিল দুঃসাধ্য। সংবাদপত্রের কাজ শেষে গভীর রাতে তিনি বাড়ি ফিরতেন। আবার সকালে উঠেই নিজের কাগজখানায় একবার চোখ বুলিয়ে অন্য কাগজে কী ছাপা হলো তা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতেন। ভুল কিছু লিখলে সেটার যুক্তি-তথ্য দিয়ে বাড়ির সবাইকে জানাতেন। কিংবা খবরের ভেতরের খবরটা মাঝে মাঝে প্রকাশ করতেন। কিন্তু ওই যে সাংবাদিকরা যেমন ‘সোর্স’ জানান না, তেমনি তার বাড়ির লোকজনও জানতে পারতাম না খবরের উৎস। তবে খবর নিয়ে বাড়ির লোকের সমালোচনা তিনি শুনতেন।

মাঝে মাঝে আমার কাছে তাকে রহস্যমানব মনে হতো। ব্যক্তিজীবনে একেবারেই বাহুল্যবর্জিত আপাদমস্তক ভদ্রলোক মানুষ ছিলেন আমার মামু তোয়াব খান। কোনো কিছু নিয়ে তাকে কখনো বাড়াবাড়ি করতে দেখিনি। পোশাক, খাওয়াদাওয়া, ঘর-দুয়ার নিয়ে তার বাড়াবাড়ি ছিল না। এ রকম অভিযোগহীন, কাজে ও সংবাদপত্র সৃজনে মগ্ন অতিমাত্রার ভদ্রলোক তোয়াব খান তাই অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

এ অবস্থার ব্যত্যয় কোনো দিন দেখিনি, এমনকি যখন তোয়াব খান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার কাছাকাছি থেকেছেন, তখনও দেখিনি। শৃঙ্খলা, কর্মনিষ্ঠা আর পেশাদারত্বের চূড়ান্ত নিদর্শন হয়ে তিনি থেকেছেন। তার বাম হাতও বোধ হয় জানতে পারত না, ডান হাত কী করছে। ক্ষমতার এত কাছাকাছি থেকেও কত সুবিধাই তো কত লোক করে নেয় বা নিতে পারে। কিন্তু সেখানেও তোয়াব খান নির্লোভ ছিলেন।

একেবারে আপন চেষ্টা, শ্রম ও নিষ্ঠায় তোয়াব খান নিজেকে এতদূর নিয়ে গেছেন, তা আমাদের কাছে অনুকরণীয় ও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ছিল, থাকবে। তেমনি সংবাদপত্র, সংবাদ, সাংবাদিকতা যে একটি সৃজনশীল ও সার্বক্ষণিক পেশা, তা তোয়াব খানের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, থাকবে। নির্লোভ ও একনিষ্ঠ হয়ে নিজ কর্মের প্রতি মগ্ন থেকে অভিযোগহীন এক জীবনযাপনে অনুপ্রেরণা আমার কেলো মামু- আছেন, থাকবেন।


জেলায় জেলায় মডেল লাইব্রেরি হোক

প্রতীকী ছবি
আপডেটেড ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ ১৩:৫৮
ইমরান ইমন

ফেব্রুয়ারি আমাদের ভাষার মাস, বইমেলার মাস। ফেব্রুয়ারিজুড়ে চলে আমাদের প্রাণের বইমেলার কর্মযজ্ঞ। আবার এ মাসেই আমাদের জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস। ১৯৫৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরির দ্বার উন্মোচিত হয়। এ দিনটিকেই জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। জ্ঞানভিত্তিক, বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ গঠনের প্রত্যয়ে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রন্থাগারকে জনপ্রিয় করা, গ্রন্থ ও গ্রন্থাগারের প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে ২০১৭ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫ ফেব্রুয়ারিকে জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস ঘোষণা করেন। ২০১৮ সাল থেকে প্রতিবছর ৫ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস পালিত হয়ে আসছে। এ বছর জাতির গ্রন্থাগার দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘স্মার্ট গ্রন্থাগার, স্মার্ট বাংলাদেশ’।

জ্ঞানের আধার হলো বই, আর বইয়ের আবাসস্থল হলো গ্রন্থাগার বা লাইব্রেরি। একটি জ্ঞানভিত্তিক, বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ গঠনে গ্রন্থাগার বা লাইব্রেরির ভূমিকা অপরিসীম। প্রাচীনকাল থেকেই পুঁথি সংরক্ষণের প্রথা ছিল। এসব পুঁথি লেখা হতো তালপাতায়, গাছের বাকলে, পশুর চামড়ায়, আবার কখনো পাথরে ও টেরাকোটা পদ্ধতিতে। সাধারণত এই পুঁথিগুলো সংরক্ষণ করা হতো বিভিন্ন ধর্মগৃহে বা বিহারে অথবা উপসনালয়ে। তবে বিশ্বের প্রথম লাইব্রেরির ধারণা শুরু করা হয়েছিল প্রাচীন মিসরে। তখন উপাসনার পাশাপাশি তাত্ত্বিক আলোচনা বা জ্ঞান প্রসারের জন্য পুরোহিতদের নিজেদের প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস বা তথ্য সংরক্ষণের প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

সেই থেকে মিসরের এক প্রার্থনাগৃহে শুরু এই লাইব্রেরি। সভ্যতার ক্রমশ অগ্রসর হওয়ার পথে মানুষ তার সৃষ্টিশৈলীকে সংরক্ষণ করা শুরু করল। মিসরের আলেকজান্দ্রিয়া, ইরাকের বাগদাদ, দামেস্ক, প্রাচীন গ্রিস ও রোমে সমৃদ্ধ গ্রন্থাগারের নিদর্শন পাওয়া যায়। এ ছাড়া উপমহাদেশের তক্ষশীলা ও নালন্দায় সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার গড়ে উঠেছিল।

আব্বাসীয় ও উমাইয়া শাসনামলে ‘দারুল হকিমা’ নামক গ্রন্থাগার ইউরোপকে জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ করেছিল। সমকালীন মিসরের ‘বাইতুল হিকমা’ও অনুরূপ ভূমিকা পালন করেছে। যুগে যুগে গ্রন্থাগারগুলো গড়ে উঠেছিল রাজদরবার ও ধর্মীয় উপাসনালয়কে কেন্দ্র করে।

বিশ্বের বিখ্যাত গ্রন্থাগারগুলোর মধ্যে প্রথমেই আসে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গ্রন্থাগার ‘লাইব্রেরি অব কংগ্রেস’-এর নাম। আমেরিকার ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত এই লাইব্রেরিতে রয়েছে ৩ কোটি ২০ লাখ বইয়ের এক বিশাল সমাহার। লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামও বিশ্বের বিখ্যাত লাইব্রেরির মধ্যে অন্যতম। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বডলিন লাইব্রেরি’তে রয়েছে ১ কোটিরও বেশি বই ও পাণ্ডুলিপি।

বিশ্বের প্রাচীনতম লাইব্রেরির মধ্যে রয়েছে ‘ভ্যাটিকান লাইব্রেরি’। এ ছাড়া ফ্রান্সের বিবলিওথিক লাইব্রেরি, মস্কোর লেনিন লাইব্রেরি ও কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরি উল্লেখযোগ্য। মিসরের আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরিও পৃথিবীর প্রাচীন লাইব্রেরির মধ্যে অন্যতম। যা একসময় পৃথিবীর সপ্তাচার্যের মধ্যেও ছিল।

লাইব্রেরির বিভিন্ন প্রকারভেদের মধ্যে জাতীয় গ্রন্থাগার অন্যতম। জাতীয় গ্রন্থাগার সাধারণত দেশের সরকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে। অন্যান্য গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার পেছনে যে সকল কারণ বিদ্যমান, এ ক্ষেত্রেও তার সবগুলো কারণ বিদ্যমান। তবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে কিছুটা পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। আর এটি হয় এজন্য যে, জাতীয় পর্যায়ের গ্রন্থাগার অন্য আর দশটি অনুরূপ প্রতিষ্ঠান থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।‌ জাতীয় গ্রন্থাগার এমন একটি প্রতিষ্ঠান যার সংগ্রহের পরিধি জাতীয় ভিত্তিক, গুরুত্ব আন্তর্জাতিক এবং দেশ ও জাতি সম্পর্কে দেশি-বিদেশি সব প্রকাশনা সংগ্রহ করে জাতীয় ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করাই এর প্রধান বৈশিষ্ট্য।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১৯৭২ সালের ৬ নভেম্বর বাংলাদেশ জাতীয় গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে ৫ লাখেরও অধিক বইয়ের সংগ্রহশালা রয়েছে। এ ছাড়া ১৯৫১ সাল থেকে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক এবং আঞ্চলিকসহ বিভিন্ন সংবাদপত্র ও দেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহশালা রয়েছে এ গ্রন্থাগারে। ২০১৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি প্রথম জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।‌ এরপর ২০১৮ সাল থেকে প্রতিবছর দেশব্যাপী জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস পালিত হয়ে আসছে। কিন্তু জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস পালনের তাৎপর্য দেশের মানুষকে, বর্তমান প্রজন্মকে বইপড়ায়, জ্ঞানচর্চায়, মুক্তচিন্তার চর্চায় কতটুকু উদ্বুদ্ধ করতে পারছে; সার্বিকভাবে এ দিবস কতটুকু ফলপ্রসূ—সে প্রশ্ন না উঠে পারে না। দেশের বেশির ভাগ মানুষই এ দিবস সম্পর্কে অবগত নন। এ দিবসটির গুরুত্ব ও তাৎপর্য কী সে সম্পর্কে দেশের মানুষ এখনো জানেন না।

দেশের বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে দিনদিন বইবিমুখতা বেড়েই চলছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও নেই বইপড়ার চর্চা, মুক্তবুদ্ধির চর্চা। নেই বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য কার্যকর কোনো উদ্যোগ বা পদক্ষেপ। শুধু গাইড মুখস্থনির্ভর আর সরকারি আমলা হওয়ার প্রতিযোগিতায় বিভোর হয়ে আছে প্রজন্ম।

জ্ঞানভিত্তিক, বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ গঠন ব্যতীত আমাদের পরিপূর্ণ মুক্তি বা সমৃদ্ধি সম্ভব নয়। বইবিমুখ সৃজনশীলতা বিবর্জিত একটা প্রজন্ম গড়ে উঠছে। এমন প্রজন্ম পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সবার জন্যই অকল্যাণকর। যা অবশেষে সবার জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। বই ছেড়ে আমাদের তরুণ প্রজন্ম এখন নানা অপকর্মে লিপ্ত।‌ অথচ বিপুল সংখ্যার এই প্রজন্ম নিয়ে যেন ভাবার কেউ নেই! তরুণ প্রজন্মই দেশ ও জাতির গুরুত্বপূর্ণ মানবসম্পদ। তরুণ প্রজন্মের সঠিক পরিচর্যা ও তাদের বেড়ে ওঠার ওপর নির্ভর করে দেশের ভবিষ্যত কেমন হবে।

গ্রন্থাগার আমাদের আলোর পথের নীরব পথপ্রদর্শক। সমৃদ্ধ জাতি গঠনে গ্রন্থাগার বা লাইব্রেরির বিকল্প নেই। শূন্যতায় হাহাকার করা গ্রন্থাগারগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায় আমাদের জ্ঞানচর্চার, মুক্তচিন্তার দৈন্যদশা। জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ আলোকিত প্রজন্ম গড়ে তোলার জন্য গ্রন্থাগারগুলোর দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।‌ পুরোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পরিহার করে গ্রন্থাগারগুলোকে যুগোপযোগী ও আধুনিকায়ন করতে হবে। প্রজন্মকে বইপড়ায় জ্ঞানচর্চায় মুক্তচিন্তায় উৎসাহিত করতে হবে এবং তার জন্য উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।‌ প্রতিটি জেলায় একটি মডেল লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দেশে অবকাঠামোগত অনেক ঈর্ষণীয় উন্নয়ন হয়েছে, আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নও ঘটেছে কিন্তু আমাদের সংস্কৃতি ও মননশীলতার কি সে ধরনের কোনো উন্নয়ন হয়েছে? সেভাবে হয়ে ওঠেনি বলেই আমাদের আজ এই করুণ দশা। অথচ সাংস্কৃতিক জাগরণ ও মননশীলতার উন্নয়ন ব্যতীত জাতির সমৃদ্ধি ও পরিপূর্ণ মুক্তি সম্ভব নয়।

স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫২ বছরে দেশে কোনো মডেল লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অথচ এই লাইব্রেরি আমাদের বাতিঘর। আমরা আমাদের বাতিঘরকে হারাতে বসেছি বিধায় আমাদের আজ এই করুণ দশা। আমাদের সমৃদ্ধির পথে এগোতে হলে, একটি সৃজনশীল প্রজন্ম ও মননশীল জাতি গড়ে তুলতে হলে লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পাশাপাশি এর কার্যকারিতায় আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে।

লেখক: গদ্য লেখক


রাজশাহীতে ২৫ শতাংশ বই ছাড়াই মাস পার

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
এনায়েত করিম, রাজশাহী

চলতি শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনে সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উৎসব করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেয়া হয় নতুন বই। পরদিন ২ জানুয়ারি থেকে নতুন শিক্ষাবর্ষের পাঠদানও শুরু হয়। এরপর এক মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো ২৫ শতাংশ বই হাতে পায়নি রাজশাহী বিভাগের মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।

এদিকে নতুন বইয়ের সংকট থাকায় পুরোনো বই সংগ্রহ করে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে পাঠ্যক্রম বদলে যাওয়া সে সুযোগও পাচ্ছে না শিক্ষার্থীরা। এ পরিস্থিতিতে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক আপাতত অনলাইন থেকে বই ডাউনলোড করে পাঠদান চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও কারিগরি মিলিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫ হাজার ৮৮৩টি। এর মধ্যে নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক স্তরের ৩ হাজার ৯২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১২ লাখ ৯৩ হাজার ৬৮১ জন, ২ হাজার ২২৪টি মাদ্রাসায় ইবতেদায়ি ও দাখিল স্তরে ৬ লাখ ৮০ হাজার ৪১৯ জন এবং ৫৬৭ কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৬৭ হাজার ২৮ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও কারিগরি মিলে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২ লাখ ৪১ হাজার ১২৮। সব শিক্ষার্থীর জন্য নতুন পাঠ্যবই প্রয়োজন ২ কোটি ৯৮ লাখ ৮৪ হাজার ৬১২টি। এর মধ্যে ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৭৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ বই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে হস্তান্তর করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭৩ দশমিক ৫০ শতাংশ বই হাতে পৌঁছেছে শিক্ষার্থীদের। সে হিসাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে চাহিদার তুলনায় ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ বই এখনো হাতে পায়নি শিক্ষার্থীরা।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, বিভাগের আট জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বই পেয়েছে জয়পুরহাট। এই জেলায় ৩৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বইয়ের চাহিদা ছিল ১০ লাখ ৯ হাজার ৭৫৪টি। এর বিপরীতে ৮১ দশমিক ৭২ শতাংশ বই পেয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো। সব বই শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণও করা হয়েছে। অন্যদিকে বিভাগে সবচেয়ে কম বই পেয়েছে নওগাঁ জেলা। এই জেলায় ৮৭৩ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ২৬ লাখ ৭ হাজার ৪৩৪টি বইয়ের চাহিদা ছিল। পাঠদান শুরু হওয়া এক মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো এই জেলার ৩৪ শতাংশ শিক্ষার্থীর হাতে বই পৌঁছায়নি।

এ ছাড়া রাজশাহী জেলায় ১ হাজার ৪১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো ২৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ বই পৌঁছায়নি। ৩২ লাখ ৬ হাজার ৫৫টি চাহিদার বিপরীতে শিক্ষার্থীদের হাতে ৭০ দশমিক ৬৫ শতাংশ বই পৌঁছেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪৩৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২১ লাখ ৩ হাজার ৭৩০টি বইয়ের চাহিদার বিপরীতে পৌঁছেছে ৭২ দশমিক ৬৫ শতাংশ বই। নাটোরে ৫৮৫ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১৯ লাখ ৪ হাজার ৯৫৪টি বইয়ের চাহিদার বিপরীতে বই পাওয়া গেছে ৭১ শতাংশ বই, বিতরণ করা হয়েছে ৭০ শতাংশ। ফলে শিক্ষার্থীদের হাতে এখনো ৩০ শতাংশ বই পৌঁছেনি।

এদিকে বগুড়ায় ১ হাজার ৮২ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ২৬ লাখ ৯ হাজার ছয়টি বইয়ের চাহিদার বিপরীতে বই পৌঁছেছে ৭৭ দশমিক ৩ শতাংশ বই, বিতরণ করা হয়েছে ৭৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ফলে এখানেও ২৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ বই এখনো পায়নি শিক্ষার্থীরা। আবার ৬১৮ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ২৭ লাখ ৩ হাজার ৬৭৬টি বইয়ের চাহিদার বিপরীতে পাবনা জেলা বই পেয়েছে ৮৫ শতাংশ, বিতরণ করা হয়েছে ৮০ শতাংশ। আর সিরাজগঞ্জ জেলায় ৮৫৪ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৩৮ লাখ ৬ হাজার ১৯টি বইয়ের চাহিদার বিপরীতে পাওয়া গেছে ৭৮ শতাংশ বই। এই জেলায় ২২ শতাংশ বই ছাড়াই নিজেদের শিক্ষাকার্যক্রম এগিয়ে নিতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।

কথা হয় রাজশাহী নগরীর অগ্রণী স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে। পুরো সেট বই না পাওয়ার কথা জানিয়ে তারা বলছে, বাংলা দ্বিতীয়পত্র, ইংরেজি দ্বিতীয়পত্র, উচ্চতর গণিত এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বই তারা হাতে পায়নি। পুরোনো বই দিয়েই এই চারটি বিষয়ে পাঠদান চলছে।

রাজশাহীর লক্ষ্মীপুর বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির কয়েকজন ছাত্রী বলল, অন্য শ্রেণির শিক্ষার্থীরা নতুন বই না পেলেও পুরোনো বই দিয়ে পড়ালেখা চালিয়ে নিতে পারছে। কিন্তু নতুন পাঠ্যক্রম হওয়ায় তারা সেটিও পারছে না। অনলাইন থেকে বইয়ের পিডিএফ কপি দিয়ে কোনোমতে পাঠদান চলছে।

রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক ড. নূরজাহান বেগম বলেন, ‘শুধু আমাদের প্রতিষ্ঠানই নয়, রাজশাহীর কোনো স্কুলেই শতভাগ বই আসেনি। যেগুলো পাওয়া গেছে সেগুলো শিক্ষার্থীর মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে। আর যে বইগুলো এখনো পাওয়া যায়নি সেগুলোর পুরোনো বই দিয়ে পাঠদান করা হচ্ছে। তবে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির পুরো কারিকুলাম নতুন হওয়ায় অনলাইন থেকে পিডিএফ ভার্সন নামিয়ে ক্লাস নিচ্ছেন শিক্ষকরা।’

জানতে চাইলে রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক ড. শরমিন ফেরদৌস চৌধুরী বলেন, কিছু কিছু করে বই আসছে। আসামাত্রই সেগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণের জন্য পাঠানো হচ্ছে।


আইএমএফের ঋণ: সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন জরুরি

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বোর্ড সভা গত ৩০ জানুয়ারি বাংলাদেশের জন্য ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন (৪৭০ কোটি) ডলার ঋণ মঞ্জুর করেছে। সাত কিস্তিতে ৪২ মাসে এ ঋণ দেয়া হবে। এ ঋণের গড় সুদের হার ২ দশমিক ২ শতাংশ। বর্ধিত ঋণসহায়তা বা বর্ধিত তহবিল (ইসিএফ/ইএমএফ) থেকে দেয়া হবে ৩৩০ কোটি ডলার এবং রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটির আওতায় পাওয়া যাবে ১৪০ কোটি ডলার। আইএমএফের প্রেস রিলিজে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা, সামাজিক ও উন্নয়নমূলক ব্যয়ে আরও সক্ষমতা তৈরিতে প্রয়োজনীয় সংস্কার, আর্থিক খাত শক্তিশালী করা, নীতি-কাঠামোর আধুনিকায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাতে জনগণকে সহনশীল করার কাজে এ ঋণ সাহায্য করবে।

এ ঋণ প্রদানের আগে আইএমএফ দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিধারা, সমস্যা ও দুর্বলতা পরীক্ষা করেছে এবং সরকারি ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেছে। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে দারিদ্র্য হ্রাস, জনগণের জীবনমান উন্নয়ন, শিক্ষা বিস্তার, জনস্বাস্থ্য ও কৃষির উন্নয়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি, শিল্পোন্নয়ন, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ইত্যাদিতে যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছে। ১৯৭২ সালের শুরুতে যেখানে মানুষের মাথাপিছু আয় ৯০ ডলারের নিচে ছিল, তা বেড়ে ২ হাজার ৮২৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ২০০৫ সালের ৪০ শতাংশ দারিদ্র্যের হার ২০১৯ সালে এসে ২০ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে। যেখানে ১৯৭৩ সালের জিডিপির আকার ছিল প্রায় ৮ বিলিয়ন, সেখানে ২০২২ সালে তা ৪৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। আইএমএফের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২২ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার সারা বিশ্বে ‘৩৫তম বৃহৎ অর্থনীতি’ হিসেবে পরিগণিত হয়েছে (সূত্র: কানাডাস্থ ভিজুয়াল ক্যাপিটালিস্ট প্রকাশিত ‘দ্য টপ হেভি গ্লোবাল ইকোনমি’)।

আইএমএফ মনে করেছে যে করোনা মহামারি চলাকালে এবং মহামারির পর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে বাংলাদেশ ভালো করেছে। কিন্তু ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, মন্দা ও জ্বালানিসংকটে বাংলাদেশ অর্থনীতিও চাপের মুখে পড়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে রপ্তানি (৫২ বিলিয়ন ডলার) রেকর্ড পরিমাণ বাড়লেও আমদানি তুলনামূলক অধিক হারে বেড়েছে (৮৯ বিলিয়ন ডলার)। অন্যদিকে রেমিট্যান্স আসা তেমন বাড়েনি। ফলে বাণিজ্য ও লেনদেনের ভারসাম্যে ঘাটতি দেখা দেয়। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত নেমে যেতে থাকে। ২০২১ সালের আগস্টে যে রিজার্ভ প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল, তা নেমে ২৪ বিলিয়নে দাঁড়িয়েছে (২০২২-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত)। এ অবস্থায় তর্কের কোনো অবকাশ নেই যে বাণিজ্য ঘাটতি ও লেনদেনের ঘাটতি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় বাংলাদেশের জন্য আইএমএফের সহায়তা প্রয়োজন।

নিঃসন্দেহে আইএমএফের এই সহায়তা বাংলাদেশের অর্থ ব্যবস্থাপনার ওপর তাদের আস্থারই বহিঃপ্রকাশ। তবে আইএমএফের শর্ত মোতাবেক বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে সংস্কারমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। যেমন রাজস্ব খাতে সংস্কার করে রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি করতে হবে; যার মাধ্যমে সামাজিক খাত, অবকাঠামো উন্নয়ন, সরকারি অর্থায়ন ও বিনিয়োগ এবং জলবায়ু পরিবর্তন খাতে অধিক বরাদ্দ দেয়া সম্ভব হবে। আর্থিক খাত ও ব্যাংকব্যবস্থা সংস্কারের মাধ্যমে সুশাসন ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার উন্নতি করতে হবে। নীতি-কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে বাণিজ্য ও প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের সহায়ক পরিবেশের সৃষ্টি করতে হবে। বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি কমিয়ে অর্থনীতির লোকসান কমানোরও পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এর ফলে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়বে। বাজেটের ঘাটতি সীমিত রাখার কথাও বলা হয়েছে, যার মাধ্যমে দেশি-বিদেশি ঋণ গ্রহণ ও সরকারি অর্থ ব্যয়ে লাগাম টানা যায়।

তবে এই মুহূর্তে আইএমএফের সব শর্ত একসঙ্গে পালন না করলেও প্রস্তাবিত সংস্কারসমূহ বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, অনিয়ম দূর করে সুশাসন আনা এবং দেশের কর-জিডিপির অনুপাত বৃদ্ধি করে স্বনির্ভরতা আনার জন্য এসব সংস্কার বাস্তবায়নে দেশের অভ্যন্তরে সুশীল সমাজ ও অর্থনীতিবিদদেরও পরামর্শ রয়েছে। কৃষি, জ্বালানি ও গ্যাস-বিদ্যুতে ভর্তুকি পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনতে হবে। বৈশ্বিক মন্দা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে সরবরাহ চেইনে বিপর্যয়, মূল্যস্ফীতি প্রভৃতির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ কতিপয় সমস্যার দিকেও আশু নজর দেয়া এবং প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।

দেশের খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ, সুশীল সমাজ ও ব্যাংকাররা ব্যাংকব্যবস্থার নানা দুর্বলতা চিহ্নিত করে বিস্তর লেখালেখি করছেন। গত পাঁচ বছরে ঋণখেলাপিদের যে সুযোগ-সুবিধা ও ছাড় দেয়া হয়েছে, তা নজিরবিহীন। এর ফলে ঋণ আদায়ের তো উন্নতি হয়ইনি, বরং খেলাপি ঋণ লুকিয়ে ফেলা হয়েছে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের ঋণের পরিমাণ আরও বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবমতে, গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণ ছিল ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। বিভিন্ন প্রকার সুযোগ ও রাইট অফ করে যে খেলাপি ঋণ লুকিয়ে ফেলা হয়েছে, তাসহ প্রকৃত খেলাপি ঋণ প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা বলে অনেকের অভিমত। ব্যাংকে সুশাসনের অভাবে মন্দ ঋণ ও অর্থ পাচার বাড়ছে। তা ছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার এখন নৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এনবিআর, বিএফআইইউ, দুদক কিংবা সরকারের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা- কেউই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছে না। দেশের সচেতন মানুষ এ ব্যাপারে উদ্বিগ্ন। এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের নজর দেয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ লোক বিদেশে থেকে চাকরি-বাকরি করছেন। ইউরোপ, আমেরিকা ও কানাডায় বসবাসকারী কতিপয় বাংলাদেশি ব্যতীত অন্য সবাই নিয়মিত দেশে রেমিট্যান্স পাঠান। কিন্তু এদের অনেকেই বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠান না। হুন্ডি ব্যবসার কারণে কাঙ্ক্ষিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পৌঁছে না। আবার দেশের রপ্তানি আয়েরও একটা উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশে রেখে দেয়া হচ্ছে। এসব কারণে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিত বিরতিতে বাজারে বৈদেশিক মুদ্রা ছাড়া সত্ত্বেও সংকট কাটছে না। ইতিমধ্যে দেশীয় মুদ্রা (টাকা) প্রায় ২০-২২ শতাংশ অবমূল্যায়িত হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার দুষ্প্রাপ্যতার আরেকটি কারণ হচ্ছে একশ্রেণির ব্যাংক কর্মকর্তা, এক্সচেঞ্জ হাউস, এমনকি সাধারণ মানুষও দাম বাড়িয়ে ডলার/পাউন্ড/ইউরো পরে বিক্রি করার জন্য বেশ কিছুদিন রেখে দিচ্ছে। এতে বাজারের ডলারের সংকট দেখা দিচ্ছে। ডলার-পাউন্ডের অবৈধ ব্যবসার কারণেও বৈদেশিক মুদ্রার বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি এবং রপ্তানিসামগ্রীর কাঁচামাল আমদানির এলসি খোলার জন্য তফসিলি ব্যাংক ডলার সরবরাহ করতে পারছে না।

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক দুর্বিপাকের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের পাশাপাশি দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগও ক্রমান্বয়ে কমছে। টাকার মূল্যের পতন, পুঁজিবাজারের প্রাইস সিলিং, দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ডলারসংকট, এনবিআরের ট্যাক্স ছাড়ের সুবিধাপ্রাপ্তি ও মুনাফা প্রত্যাবাসনে জটিলতা ইত্যাদি কারণে বিগত কয়েক বছর বৈদেশিক বিনিয়োগে নিম্নগতি পরিলক্ষিত হয়েছে। বিশেষ করে গত বছর ইক্যুইটি মূলধন, পুনর্বিনিয়োগকৃত আয় ও আন্তকোম্পানি ঋণ- এ তিন খাতেই এফডিআই স্টক কমেছে। এ ছাড়া বিদেশি নতুন বিনিয়োগও তেমন আসছে না। তাই বিনিয়োগ কমে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধান করে এর সমাধান বের করা জরুরি।

বিদেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি বর্তমান অর্থবছরে বিদেশি সহায়তার প্রতিশ্রুতি ও অর্থ ছাড়করণের পরিমাণও কমেছে। সাধারণত অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি ডলারের সহায়তার প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সূত্রমতে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বরে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে মাত্র ১৭৬ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়নে অদক্ষতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থছাড়ও কম হয়েছে। দেশের রিজার্ভ কম থাকা এবং ডলারসংকটের এই সময়ে বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়ন ও সঠিক উন্নয়ন প্রকল্প নির্বাচনের মাধ্যমে ডলার দেশে এলে সংকট নিরসনে ভূমিকা রাখতে পারত।

বেশ কিছু বছর ধরে দেশে উচ্চ প্রবৃদ্ধির আশায় বার্ষিক বাজেট বরাদ্দের পরিমাণ ও আকার বাড়ানো হচ্ছে। বাজেট ঘাটতি ৪ থেকে ৬ শতাংশে সীমিত রাখার জন্য রাজস্ব সংগ্রহের উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে। কিন্তু কোনো বছরই লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আহরিত হয় না। এর ফলে ঘাটতির পরিমাণ বাড়তে থাকে, যা অভ্যন্তরীণ ও বহিঃস্থ ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে পূরণ করা হয়েছে। ফলে সরকারের ঋণের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। বাংলাদেশকে বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও জাইকার মতো সংস্থার সহজ শর্তের ঋণের সঙ্গে সঙ্গে চীন ও রাশিয়া বা ভারত থেকে উচ্চসুদের ও অপেক্ষাকৃত কঠিন শর্তের ঋণ গ্রহণ করতে হচ্ছে। ফলে বার্ষিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ প্রতিবছরই বাড়ছে। এক হিসাবে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের শেষে বিদেশি ঋণ দাঁড়াবে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪ সালের শেষে এই ঋণ ১২০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারে। ২০২১ সালে সরকার সুদসহ ২ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করেছে। ২০২২ সালে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ হয়েছে পূর্ববর্তী বছরের প্রায় দ্বিগুণ। ২০২৪ সালে এই ঋণ পরিশোধের পরিমাণ পূর্ববর্তী বছরের তিন গুণ ছাড়িয়ে যেতে পারে। এমতাবস্থায় বহুজাতি সংস্থার ঋণ ব্যতীত অন্য কোনো দেশ থেকে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে এবং ঋণের শর্তাবলির ব্যাপারে অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। অবশ্য বছর বছর আমাদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও বাড়ছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেসরকারি বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের পরিমাণও ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। বর্তমানে বেসরকারি খাতে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ২ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। বেসরকারি খাতে গৃহীত ঋণের ক্ষেত্রেও সরকারকে গ্যারান্টি প্রদান করতে হয়। বৈদেশিক মুদ্রার সংকটকালে বেসরকারি ঋণ বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার ওপর বাড়তি চাপের সৃষ্টি করছে। ব্যাংকঋণের মতো বিদেশি ঋণ কোনো বেসরকারি ব্যক্তি বা কোম্পানি কর্তৃক খেলাপি হলে এর দায়ভার সরকারের ওপর বর্তাবে। বিষয়টি সঠিকভাবে তদারকি না করলে ভবিষ্যতে সমূহ বিপদের আশঙ্কা রয়েছে।

বৈদেশিক মুদ্রা সদ্ব্যবহারের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ খাতের প্রতি দৃষ্টি দেয়া দরকার। প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন করে গৃহস্থালি ও শিল্প-কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সরকার হয়তো শিগগিরই জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ বাড়ানো এ ক্ষেত্রে খুবই প্রয়োজন। আইএমএফের কাছ থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে প্রাপ্ত ঋণের পাশাপাশি রপ্তানি বৃদ্ধি ও রপ্তানি আয় দেশে আনা নিশ্চিতকরণ এবং বৈধ পথে বৈদেশিক আয়- আনয়নের দিকে আশু দৃষ্টি দিতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, পেশাজীবী, প্রবাসী বাংলাদেশি- সবার দেশপ্রেম, ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ও দক্ষতা দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।

লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান। বর্তমানে জার্মানিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত


উন্নত নৈতিক ব্যবস্থা ছাড়া স্মার্ট বাংলাদেশ অর্জন সম্ভব কি?

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ফরিদ আহমেদ

বাংলাদেশকে নতুন দিগন্তে নিয়ে যেতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা করেছেন ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ ধারণাটি। সেই থেকে বোঝার চেষ্টা করছি, কী রকম বাংলাদেশ নির্মাণের স্বপ্ন দেখছেন তিনি। দেশ মানে জনগণ, সরকার, সার্ভভৌমত্ব, ভূমি। দেশের এই সংজ্ঞা থেকে অনুমান করার চেষ্টা করছি স্মার্ট বাংলাদেশ কী রকম হতে পারে। আমার একটি স্মার্ট পরিচয়পত্র আছে। এ রকম কার্ড অস্ট্রেলিয়া থাকতে ব্যাংক থেকে এবং চিকিৎসার জন্য মেডিব্যাংক থেকে পেয়েছিলাম। এরপর বন্ধুদের কাছে দেখেছি মেডিকেয়ার কার্ড। এই মেডিব্যাংক/মেডিকেয়ার কার্ডটি নিয়ে ডাক্তার রোগী দেখে পরামর্শ দেন এবং নগদ কোনো ফি নেন না। ব্যাংক কার্ডটি দিয়ে দায়দেনা পরিশোধ, কেনাকাটা করা যায়। ওই কার্ডটি নাগরিক পরিচয়পত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

এসব দেখার পরও আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না, স্মার্ট বাংলাদেশ বলতে প্রধানমন্ত্রী কী বোঝাতে চেয়েছেন। তখন একটি স্মৃতি থেকে বোঝার চেষ্টা করলাম স্মার্ট বাংলাদেশ কী হতে পারে। ২০০৮ সালের দিকে যখন আমি অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছি, তখন ভারতীয় এক তরুণীর সঙ্গে পরিচয়। আমার পাশের টেবিলে বসে। পরিচয়ের পর জানতে চাইলাম তার গবেষণার বিষয়টা কী? উত্তরে সে বলেছিল, স্মার্ট সিটি। তখন মেলবোর্ন বিশ্বের সেরা শহর। তাই স্মার্ট সিটির প্রতি আমার তেমন আগ্রহ হয়নি। কারণ অস্ট্রেলিয়া সেই সময় বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশের মতো eco-living নিয়ে ভাবছে। তাদের ভাবনায় কেবল মানুষ নয়- প্রাণী, পরিবেশও স্থান পেয়েছে।

রাজনীতির অধ্যাপক মেলবোর্নের রবিন একেরসলি এবং লন্ডনের অ্যান্ড্রু ডবসন ইকোলজিক্যাল সিটিজেনশিপ নিয়ে প্রবন্ধের বই লিখছেন। বিশ্ব সংস্থাগুলো পুরোনো টেকসই উন্নয়ন নিয়ে ব্যস্ত। আমি তখন ভাবছি পরিবেশ ন্যায়পরতা কীভাবে উন্নয়ন, পরিকল্পনা এবং সমাজ সংস্কারের আদর্শ হতে পারে। এখন মনে হলো, আমার উচিত ছিল একটু জেনে নেয়া স্মার্ট সিটি বলতে ওই ভারতীয় গবেষক কী ভাবছেন। তাহলে আজ আমি স্মার্ট বাংলাদেশ কিছুটা হলেও বুঝতাম। আসলে এখানেই আমার স্মার্টনেসের ঘাটতি আছে। কারণ স্মার্ট শব্দটির মানে বুদ্ধিমান, বোকা সহজ-সরল গ্রামের যুবক নয়। উপায়ন্ত না দেখে ইন্টারনেটে অনুসন্ধান শুরু করলাম। আর সেখান থেকেই জানলাম সিঙ্গাপুর স্মার্ট সিটির কথা। এবার আমার চিন্তার দ্বার একটু খুলে গেল। মনে পড়ল সিঙ্গাপুরের ট্রান্সপোর্ট সিস্টেমের কথা, যা সারা বিশ্বের নজর কেড়েছে। আমাদের এখন মেট্রোরেল চালু হয়েছে। সুতরাং স্মার্ট সিটির তালিকায় ঢাকা স্থান পেয়েছে। এটি এখন বাংলার গৌরব।

ইন্টারনেট থেকে আরও জানলাম স্মার্ট সিটি ধারণাটি এখন উন্নত বিশ্বে জনপ্রিয় ধারণা। এই ধারণার সঙ্গে স্মার্ট নাগরিক ধারণাটিও আছে। স্মার্ট হওয়া মানে সুনাগরিক হওয়া, যার পেছনে থাকে শিক্ষা। একসময় আমরা গ্রামের মানুষদের শহরের মানুষরা বলতাম গেঁয়ো, চাষা, আনস্মার্ট, এর বিপরীতে শহরের ফ্যাশন করা ছেলেমেয়েদের বলতাম স্মার্ট। আর যে শিশুটি চটপট প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারত তাকে বলতাম স্মার্ট। এখানে বুদ্ধিমান শিশুটি স্মার্ট। এখন আমি যেমন কিছু জানতে ইন্টারনেটে যাচ্ছি, এই অনুসন্ধান প্রক্রিয়া হচ্ছে স্মার্টনেসের বহিঃপ্রকাশ। এখন শিশুদের হাতে স্মার্ট ডিভাইস আইপ্যাড। সুতরাং স্মার্ট বাংলাদেশ মানে তাহলে স্মার্ট ডিভাইস ব্যবহার করে জ্ঞানের রাজ্যে প্রবেশ। তাই কি?

সুতরাং সুন্দর পোশাক-আশাক, বিনয়ী ও স্পষ্ট আচার-আচরণ, বুদ্ধিদীপ্ত তরুণ-তরুণীকে আমরা স্মার্ট বলে থাকি। স্মার্ট বাংলাদেশ বলতে সেই স্মার্ট শিক্ষাব্যবস্থা যেখানে আমাদের শিক্ষার্থীরা করোনার সময় বাসায় বসে ক্লাস করেছে? তাহলে আমাদের শিশুরা কি আর স্কুলে যাবে না? শিক্ষক কি তবে বাসায় বসেই ক্লাস নেবেন?

না, স্মার্ট সিটি বা স্মার্ট রাষ্ট্র এসব থেকে ভিন্ন কিছু। স্মার্ট বাংলাদেশ ওই স্মার্টনেস, যা সুন্দর পোশাক-আশাক, বিনয়ী ও স্পষ্ট আচার-আচরণ, বুদ্ধিদীপ্ত তরুণ-তরুণীকে নির্দেশ করে সেই ধারণাটি থেকে অন্য কিছু। এখানে টেকনোলজি হচ্ছে মূল চালিকাশক্তি। এর মানে কি আমরা কৃত্রিম মেধা ও রোবটের কাছে সমর্পণ করে আমাদের নাগরিক জীবন পরিচালনা করব?

স্মার্ট নাগরিক হতে হলে বুদ্ধিমান সত্তা হতে হবে। সুতরাং সেখানে থাকে জ্ঞানের বাহাদুরি। আর সেই বাহাদুরিকে যদি মূল চালিকাশক্তি বিবেচনা করি, তবে শিক্ষার উন্নয়ন সবার আগে চলে আসে। এভাবে যদি আমরা চিন্তা করি, তবে আমাদের নৈতিকতা কী হবে?

আমরা এখন যে স্মার্টনেসের কথা বলছি, তার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে কৃত্রিম মেধা ও রোবট, আছে বিগ ডাটা। আমি কাকে ভোট দেব, কাকে সুন্দরী বলব- সেটা আমাকে বলে দেবে রোবট, যে আমাদের সব তথ্য জানে।

আমরা রোগের বিবরণ দেব আর সেসব শুনে আমাদের রোবট বলে দেবে কী ওষুধ কীভাবে কত দিন খেতে হবে এবং সেগুলো কোথায় পাওয়া যাবে সেটা বলে দেবে। তেমনি আমার বাড়িটি কোথায়-কীভাবে বানানো তা ওই রোবট বলে দেবে। সুতরাং আমাদের রাজউকের অনুমতির জন্য একজন প্রকৌশলীর ওপর নির্ভর করতে হবে না। রোবটের সামনে দাঁড়ালে সে জেনে যাবে আমি অপরাধী কি না। সে ঘটনার সূক্ষ্ম অনুসন্ধান করে প্রমাণ হাজির করবে। ধর্মীয় গ্রন্থের শপথ নিয়ে আর বলতে হবে না আমি যাহা বলিব সত্য বলিব। প্রয়োজন হবে না উকিল-মোক্তারের! থাকবে না মামলার জট কিংবা শুনতে হবে না বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে! ঢাকায় বসেই কানাডায় অবস্থানরত বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীকে ফাঁসি দেয়া যাবে! পালিয়ে বাঁচার পথ রুদ্ধ হবে। কিংবা গোপন ড্রোনে করে মিশিয়ে দেয়া হবে হেমলক।

ভাবতে ভালো লাগে রোবট আমাদের নগর-গ্রামের পরিকল্পনা করে দেবে। আমাদের সবার পড়াশোনা করা লাগবে না। বরং থাকতে হবে টাকা। কারণ রোবট বিনা পয়সায় কিছু করে দেবে না। আর টাকাও আমাদের লাগবে না। থাকবে একটি স্মার্ট কার্ড। সেটা উপস্থাপন করলেই আমাদের সব সেবা পাব। এমনকি মেট্রোরেলের দরজা খুলতে হবে না। পকেটে কার্ড থাকলে দরজা স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যাবে, একেবারে চিচিং ফাঁক!

ভাবতে ভালো লাগে স্মার্ট সিস্টেম বলে দেবে গর্ভের শিশুটি কন্যা নাকি পুত্রসন্তান। কোনো প্রকার নৈতিক ঝামেলায় পড়তে হবে না গর্ভের শিশুটিকে ধ্বংস করতে। কারণ ভ্রূণটির চেতনা হওয়ার আগেই আমরা জেনে যাব। এ তো এমন সিস্টেম যে আমি কী ভাবছি তা রোবট বলে দিতে সক্ষম হবে। সুতরাং রোবট আগেই জেনেও যাবে কোন নাগরিক কোন মার্কায় ভোট দেবে। ভোটারদের ঝামেলা পোহাতে হবে না, কাকে ভোট দেব চিন্তা করে। যারা মনে করেন ভোটের দায় পরকালে বহন করতে হবে, তারাও সঠিক প্রার্থী নির্বাচন করতে পারবেন। কারণ প্রার্থীদের সব ডাটা আপনার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। সেই ডাটা আপনাকে প্রক্রিয়া করতে হবে না। স্মার্ট রোবট বলে দেবে। এমনকি হিরো আলম কেন জিতলেন না সেটাও তিনি ওই স্মার্ট সিস্টেম পর্যালোচনা করে বলে দেবেন।

আপনি সন্তানকে নিউটন কিংবা নায়িকা সোফিয়া লরেন বানাতে চান, তো সে আপনার জিন গবেষণা করে বলে দিতে পারবে কীভাবে এডিটিং করলে আপনার সন্তান নিউটন বা সোফিয়া লরেন হবে অথবা শাহরুখ খানের মতো স্মার্ট হবে। তবে জেনেটিক বলছে, আমগাছ থেকে কাঁঠাল বানানো যাবে না কিন্তু! সুতরাং বিবর্তনবাদ পাঠ অসার!

আমরা কি তবে আর আমাদের মতো থাকতে পারব না? আমরা কি তবে যন্ত্রের পেছনে যারা আছেন তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাব? আমরা কি তবে এভাবে দাসত্ব বরণ করব টেকনোলজি ও তার পেছনের মানুষগুলোর কাছে? সিদ্ধান্ত আপনার।

স্মার্ট বাংলাদেশে সিদ্ধান্ত আপনার থাকে কি? কারণ চারদিকে থাকবে সুবিধাবাদী লোকের সমাহার। তারা নানা জীবন পলিসি নিয়ে আপনাকে উৎপাত করবে, যেমন ডেভেলপাররা আপনার পুরোনো বাড়িটি ভেঙে নতুন অট্টালিকা বানিয়ে দেয়ার স্বপ্ন দেখাবে। এখানে পুলিশ বসে থাকবে কম্পিউটার কী বলে এবং সেইভাবে সে সিদ্ধান্ত নেবে। আমাদের সেনারা সিদ্ধান্ত নেবে কীভাবে সীমান্ত সুরক্ষা দেবে এবং আকাশ মুক্ত রাখবে।

কিন্তু সেখানে যদি একটি ভাইরাস কেউ ঢুকিয়ে দিতে পারে, তবে সর্বনাশ হয়ে যাবে। আপনি হয়ে যাবেন তাদের দাস অথবা একটি স্বাধীন সত্তাবিহীন মেধাশূন্য মানুষ। আপনার চিন্তার স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করে ওরা। ওই কম্পিউটারে বা রোবটের পেছনে বসে থাকা মানুষগুলো আপনাকে নিয়ে খেলবে! আপনি কারও খেলনা হবেন নাকি? অবশ্য আমাদের নিয়ে এখন ধনী দেশগুলো খেলছে। সুতরাং আমরা বন্দি, আমরা তাদের খেলনা। তারা আমাদের মাথায় সুকৌশলে ঢুকিয়ে দেয় আদর্শ, নৈতিকতা, উন্নয়ন। আমরা তাদের গোলামি করছি যুগ যুগ ধরে। আমাদের মুক্তি কোথায়, যে মুক্তি বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন। যে সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখিয়ে ছিলেন। সবুজ শ্যামল সোনার বাংলা!

আমরা এখনো সেই ব্রিটিশ আইন দিয়ে সরকার/দেশ চালাই। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের সংস্কৃতির আলোকে আইন-আদালত নির্মাণ করতে হবে। সে জন্য বুদ্ধির চর্চা করতে হবে। সে জন্য শিক্ষাব্যবস্থাকে সবার ওপরে স্থান দিতে হবে। কেবল ডাটাপ্রবাহের শক্ত অপটিক্যাল ব্যাকবোন নির্মাণ করলে হবে না। আমাদের সফটওয়্যার নিজেদের নির্মাণ করতে হবে, যাতে সেটা ক্লোনড না হয়। যার মেধাস্বত্ব থাকবে কেবল আমাদের। যেভাবে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা অর্জিত।

আমরা এখনো শ্রমবাজার অনুসন্ধান করি। আর আমাদের দেশে উচ্চপদে বিদেশি বসাই। মেধার বিকাশ ও জ্ঞানচর্চা ছাড়া স্মার্ট বাংলাদেশ সম্ভব হবে কি? কৃত্রিম মেধা দিয়ে নির্মিত রোবট আমাদের জীবনযাপনের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে হলে অবহেলিত শিক্ষা গবেষণায় মনোযোগ দিতে হবে। আমাদের মেধা আছে, এর পাচার বন্ধ করতে হবে এবং আমদানি মেধা দিয়ে আর নয়, সেই মনোবল সৃষ্টি করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন সত্যি হোক।

আগেই বলেছি রাষ্ট্র্রের অন্যতম একটি উপাদান ভূমি। সেই ভূমিব্যবস্থায় রোবট বা কৃত্রিম মেধা ও টেকনোলজি সংযুক্ত করে যে উন্নয়ন সাধন প্রধানমন্ত্রীর সরকার যে সাফল্য অর্জন করেছে, সে জন্য জাতিসংঘ পুরস্কার পেয়েছে বাংলাদেশ। কিছুদিন আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে গিয়েছিলাম একটি আবেদন জমা দিতে। দেখলাম সেটা ডিজিটাল সিস্টেম ব্যবহার করে কম্পিউটারে রেখে আমাকে একটি নম্বর দেয়া হলো। কিন্তু সেই আবেদন কোনো কাজে আসেনি। আমাকে একটি হার্ড কপি পুনরায় জমা দিতে হয়েছে। আগের জমা দেয়া ডিজিটাল কপি সেভাবেই রয়ে গেছে। অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই পুনর্মিলনীতে ডিজিটাল সিস্টেম ব্যবহার করে লটারি পুরস্কার দেয়া হয়েছে। আমরা কোথায় এগিয়ে আবার কোথায় পিছিয়ে। এই মেধাসংকট অতিক্রম করে আমরা স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে পারি যাতে সে জন্য ডারউইনের বিবর্তনবাদ নয়, কীভাবে ড্রোন বানাতে হবে সেটা শেখাতে হবে। কারণ ওই ড্রোন এখন অস্ট্রেলিয়ার দুর্গম এলাকায় ওষুধ পৌঁছে দেয়। এই লেখা যখন লিখছি তখন নজরে এল কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের অনৈতিকভাবে টাকা উপার্জনের সংবাদ। আরও জানতে পারলাম, হ্যাক হয়ে যাওয়া টাকা উদ্ধারে করা মামলার সাক্ষী দিতে ফিলিপাইনে গেছেন আমাদের প্রতিনিধি। আমাদের মেধার ঘাটতি আছে বিধায় হ্যাকার সক্ষম হয়েছে মিলিয়ন ডলার চুরি করে নিতে। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে তাই আমাদের অনেক দূর যেতে হবে। আমাদের মন-মানসিকতার পরিবর্তন সবার শীর্ষে থাকা প্রয়োজন স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে।

স্মার্ট সিস্টেম ব্যবহার করে অস্ট্রেলিয়া সেন্টার লিংক নাগরিকদের বিভিন্ন প্রকার ভাতা দিয়েছিল। রোবট আবিষ্কার করেছিল সেখানে ভুয়া টাকা গ্রহীতা। সেই ব্যবস্থা থেকে লাখ লাখ নাগরিকের কাছে ঋণ পরিশোধের বিল পাঠিয়ে ছিল। সেই অনাকাঙ্ক্ষিত বিল পেয়ে অনেকেই আত্মহত্যা করেছিল। অনেকেই মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করেছিল। স্মার্ট সিস্টেমে গলদ আছে। আশা করি আমাদের পলিসি মেকাররা সেটা বিবেচনা করবেন। যেন আমরা টাকা কিংবা ভূমি অন্যরা না নিয়ে যায়। উন্নত নৈতিক ব্যবস্থা ছাড়া স্মার্ট বাংলাদেশ অর্জন সম্ভব কি? স্মার্ট টেকনোলজি যদি হয় কৃত্রিম মেধা ও রোবটের খেলা, তবে লেখাটা শেষ করছি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি গান দিয়ে, ‘খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু আনমনে। প্রলয় সৃষ্টি তব পুতুল খেলা নিরজনে প্রভু নিরজনে॥’

লেখক: অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়


শিল্পের মহানায়ক

ঋত্বিক ঘটক
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
মিজান মনির

বাংলা চলচ্চিত্র জগতে এবং জীবনমুখী সাহিত্য ধারায় ঋত্বিক ঘটক এক বিশিষ্ট শিল্পী। প্রথম জীবনে কবি ও গল্পকার তারপর নাট্যকার, নাট্য পরিচালক, অবশেষে চলচ্চিত্রকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। তিনি ১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বর অবিভক্ত ভারতের পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশের) রাজশাহী শহরের মিয়াপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন।

লেখাপড়া শুরু করেন ময়মনসিংহের মিশন স্কুল থেকে। পরবর্তী সময়ে তিনি কলকাতার বালিগঞ্জ স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৫৮ সালে তিনি বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন কোর্স সম্পন্ন করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ ক্লাসে ভর্তি হন। কিন্তু এমএ সম্পূর্ণ না করেই তিনি পত্রিকায় লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত হন। কারণ তার কাছে ডিগ্রির চেয়ে লেখক হওয়া বেশি জরুরি ছিল। সে সময় তিনি দেশ, শনিবারের চিঠি, অগ্রণী বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখির কাজ শুরু করেন।

পত্রিকার পাশাপাশি মঞ্চ নাটককে তিনি প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। ১৯৪৮ সালে তিনি প্রথম নাটক লেখেন ‘কালো সায়র’। ১৯৫১ সালে ঋত্বিক ঘটক ভারতীয় গণনাট্য সংঘে যোগ দেন। তিনি অসংখ্য নাটক রচনা করেছেন, নির্দেশনা দিয়েছেন এবং অভিনয়ও করেছেন।

১৯৫২ সালে তিনি ‘দলিল’ শিরোনামে একটি নাটক নির্মাণ করেন। নাটকটি ১৯৫৩ সালে ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন এক্সিবিশনে প্রথম পুরস্কার অর্জন করে। চলচ্চিত্রে ঋত্বিক ঘটকের আবির্ভাব পরিচালক নিমাই ঘোষের হাত ধরে।

ঋত্বিক ঘটক ১৯৬৫ সালে স্বল্প সময়ের জন্য পুনেতে বসবাস করেন। এ সময় তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্র এবং টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে যোগদান করেন ও পরবর্তীকালে ভাইস প্রিন্সিপাল হন। এফটিআইআই-এ অবস্থানকালে তিনি শিক্ষার্থীদের নির্মিত দুটি চলচ্চিত্রের (Fear and Rendezvous) সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্রের জগতে পুনরাবির্ভাব ঘটে সত্তরের দশকে যখন এক বাংলাদেশি প্রযোজক তিতাস একটি নদীর নাম (চলচ্চিত্র) নির্মাণে এগিয়ে আসেন। অদ্বৈত মল্লবর্মন রচিত একই নামের বাংলা সাহিত্যের একটি বিখ্যাত উপন্যাস ঋত্বিক ঘটকের পরিচালনায় চলচ্চিত্রে রূপদান সম্পন্ন হয়। তিতাস একটি নদীর নাম চলচ্চিত্র আকারে মুক্তি পায় ১৯৭৩ সালে। খারাপ স্বাস্থ্য এবং অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে নিয়মিত কাজ চালিয়ে যাওয়া তার পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তার শেষ চলচ্চিত্র ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ (১৯৭৪) অনেকটা আত্মজীবনীমূলক এবং এটি তার অন্যান্য চলচ্চিত্র থেকে ভিন্ন ধাঁচের। ব্যক্তিগত জীবনে অভাব-অনটন, ঝড়-ঝঞ্ঝা ছিল, কিন্তু তিনি নিজের দর্শনের সঙ্গে আমৃত্যু আপস করেননি। কাজের স্বীকৃতি সীমিত হলেও তিনি তার সৃষ্টির তাড়না থেকে বিচ্যুত হননি কখনো। তিনি কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হন।

বাঙালির জনজীবনের অসাধারণ রূপকার হিসেবে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম এই ধ্রুবতারা ১৯৭৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি (আজকের এই দিনে) মৃত্যুবরণ করেন। বিনম্র শ্রদ্ধায় এই গুণী ব্যক্তিকে স্মরণ করছি।

লেখক: কবি


আমার বন্ধু রনি

আফরোজা সোমা
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
আফরোজা সোমা

শুভেচ্ছা কোচিং সেন্টারে ওর সঙ্গে আমার পরিচয়। আমার মতো সেও ফেল্টুস।

মানে, এসএসসিতে ২০০০ সালে খারাপ করেছে।

২০০১-এ আবার পরীক্ষা দেবে। রেজাল্ট কী গ্রেডে হবে, নাকি আগের মতো স্টার, ফার্স্ট ক্লাস ইত্যাদি হবে, তখনো কিছু কারও কাছে স্পষ্ট নয়।

তো শুভেচ্ছা কোচিংয়ে একবার ফেল করা স্টুডেন্টদের জন্য একটি ব্যাচ এবং প্রথমবার পরীক্ষা দেয়াদের জন্য আরেকটি ব্যাচ চালু করা হলো। পাশাপাশি ক্লাস হয়। একই টাইমে।

ফেল্টুসদের ব্যাচে ক্লাস করতে গিয়ে অন্য আরও অনেকের সঙ্গে রনির সঙ্গে পরিচয়। পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব। খুব ভালো বন্ধুত্ব হলো আমাদের। আমরা বন্ধুরা দল বেঁধে ওদের বাসায় যাই। ওরা দল বেঁধে বা একা আমাদের বাসায় আসে।

দিন যায়, মাস যায়, এসএসসি যায়। ভর্তি হই কলেজে।

কলেজের শেষ দিকে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার আগে আবারও ভর্তি হই শুভেচ্ছা কোচিং সেন্টারে। দিন যায়, মাস যায়, এইচএসসি পরীক্ষাও যায়। আমার রেজাল্ট অন্য বন্ধুদের চেয়ে ভালো হয়। আসলে কলেজে মানবিকে সবার চেয়ে ভালো হয়। এই নিয়েও দুষ্টুমি হয়, আমাকে পচায়ও।

কলেজ-পরবর্তী পড়ালেখা নিয়ে একেকজনের একেক ভাবনা, প্রস্তুতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিতে আসব আমি। আর কোথাও ফর্মটর্ম কেনা হয়নি আমার। ওই এক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই খ আর ঘ ইউনিট। পরীক্ষা দিতে এসে ঢাকায় আমার এক আত্মীয়র বাসায় থাকার কথা। সব মোটামুটি পাকা। যদিও আত্মীয়র বাসাটা বেশ ছোট। পরীক্ষার্থীর যতখানি পরিবেশ দরকার, ততখানি পাওয়া কঠিন হবে।

এসব কথাও রনি জানে। ওর সঙ্গ রোজই দেখা হয়। আলাপ হয়। একদিন রনি বলল, ‘অই! তুই তোর আত্মীয়র বাসায়ই উঠতে হবে কেন? তুই আমার নানার বাসায় ওঠ। নানার বাসায় আমার জন্য একটা আলাদা রুম আছে।’

রনি ছিল এ রকমই। ওই কচি বয়সে, যখন জীবন কারও কাঁধে চেপে বসে না তেমন বয়সে আরকি, রনি ছিল দিল খোলা আর বেহিসাবি ধরনের। ঢাকায় রনির নানার নিজের বাসা আছে। ও এসে মাসের মধ্যে কয়েক দিন নানার বাসায় থাকে। সেখানে থাকার জন্য সে তাল তুলল। ওর কথা আমি সিরিয়াসলি নিইনি। বন্ধুর নানার বাসায় থাকব! এটা আমার মাথায়ও আসেনি।

আরেক দিন এই নিয়ে সে আমাকে বলল, দাঁড়া! আমি নিজেই আন্টিরে কইতেছি! দেখিস, আন্টিরে আমি বুঝাইয়া বললে বুঝবে।

রনি সত্যি সত্যি আমার মাকে বুঝিয়ে ফেলল। বোঝাল যে, আমার আত্মীয়র বাসা থেকে যাতায়াতের চেয়ে ওর নানার বাসা থেকে যাতায়াত সহজ। আর আমার জন্য ওর আস্ত রুমটা ছেড়ে দেবে। ওর নানা-নানু আছেন। ওনারা খুব স্নেহ করে রাখবেন।

আমার মা আর রনির মা আলাপ করলেন। আন্টিও খুব অভয় দিলেন। আমাকে নিয়ে আমার মা রনির নানার বাসায় এলেন। নানা-নানু এত আন্তরিক! তাদের স্নেহের কথা ভোলার নয়। আমাকে রেখে দুই দিন পরে এক ইউনিটের পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর আমার মা বাড়ি ফিরে গেলেন। এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুই ইউনিটের পরীক্ষা। পরের ইউনিটের পরীক্ষার জন্য আমি রয়ে গেলাম। রনি ওর রুম আমাকে ছেড়ে দিয়ে সে অন্যদের সঙ্গে ঘুমায়। ফজরের নামাজ পড়ার পর ওর নানা আমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দেন। দুপুরে ও রাতে নানা, নানু, রনি ও আমি একসঙ্গে খাই। নানু আমার পাতে একটা বাড়তি মাংসের টুকরা তুলে দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি চান্স পেয়েছিলাম। দুই ইউনিটেই। ভর্তি হয়েছিলাম সাংবাদিকতা বিভাগে।

রনির সঙ্গে যোগাযোগ নেই আজ অনেক বছর। আমি ফার্স্ট ইয়ারে থাকতেই রনি চলে গিয়েছিল মালয়েশিয়ায়। যোগাযোগ অনিয়মিত হয়ে পড়েছিল। পরে দেশে এসেছে। কিন্তু যোগাযোগ নিয়মিত হয়নি। যোগাযোগ হতেই হবে এমন কোনো কথাও নেই। যোগাযোগ হলেও রনি সেই রনি থাকবে, তেমনও কোনো কথা নেই।

দার্শনিক হেরাক্লিটস তো বলেছেনই, এক নদীতে দুবার সাঁতার কাটা যায় না।

তা ছাড়া কী করে ভুলি দুই বন্ধুকে নিয়ে ও হেনরির লেখা গল্প ‘বিশ বছর পর’?

আমার জীবনের দিকে ফিরে তাকালে রনির কথা কৃতজ্ঞচিত্তে মনে আসে। প্রায়ই। ধ্যানে ওর নাম স্মরণে আসে। ওর কল্যাণ প্রার্থনা করি। ওর জীবন প্রশান্তিতে ভরে উঠুক।

লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক


একুশের চেতনা এবং আমাদের বাস্তবতা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
নাসির আহমেদ

অমর একুশের ভাষাশহীদদের স্মৃতিবিজড়িত ফেব্রুয়ারি আমাদের এমন এক আবেগের কেন্দ্রে অবস্থান নেয়, যা কেবল একটি মাস মাত্র নয়, একটি চেতনা। সারা পৃথিবীতেই ফেব্রুয়ারি আসে, বাংলাদেশে যেভাবে ফেব্রুয়ারি আসে, তেমন করে আর কোথাও নয়। ফেব্রুয়ারির গোটা মাসটাই আমাদের গৌরবের আর আত্মমর্যাদাপূর্ণ ত্যাগের স্মৃতিতে ভাস্বর।

মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য পাকিস্তানি অবাঙালি শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই করে আত্মদানের অবিস্মরণীয় ইতিহাস গড়েছি আমরা। সালাম, বরকত, রফিক, শফিউরের মতো কত স্বজন হারানো শোকের একুশে কালক্রমে শক্তিতে পরিণত হয়েছে। আমরা অবশেষে এই প্রত্যয় স্থিত হয়েছি যে, ‘একুশ মানে মাথা নত না করা’। একুশের তাৎপর্য নিয়ে লেখা হয়েছে প্রচুর, আরও লেখা হবে অনাগত কাল ধরে। কারণ ফেব্রুয়ারি আর একুশে আমাদের জাতীয় ইতিহাসে এমনই সুদূর প্রভাব বিস্তারী যে, এর বহুমাত্রিকতা বাতাসের মতো বেঁচে থাকার অনিবার্য উপকরণ, এমনকি প্রাণশক্তিও। সে কারণেই বাহান্নর বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার জাগরণ আমাদের পৌঁছে দিতে পেরেছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের একাত্তরে। ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে দৈনিক বাংলার জন্য লিখতে বসে মনে এলো এই কথাগুলো।

ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত ফেব্রুয়ারি আমাদের স্বাধিকার চেতনা তথা স্বাধীনতার বীজ বোনার মাস, বীজ বোনা হয়েছিল রক্তস্নাত চেতনার ভূমিতে, সেই ফেব্রুয়ারি এলেই একুশের মহান ভাষাশহীদদের এবং বাঙালির স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা সংগ্রাম পর্যন্ত স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধুসহ সব শহীদের স্মৃতি আমাদের চেতনায় উদ্ভাসিত হয়। সচেতন নাগরিক মাত্রই নতুন করে শক্তি উপলব্ধি করেন। কিন্তু একুশের চেতনা বা স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার বোধ শুধু সচেতন নাগরিকদের মধ্যে জেগে থাকলেই হবে না, সার্বিক জাতীয় জাগরণের জন্য তা আমজনতার মধ্যেই ছড়িয়ে দিতে হবে। যত দিন তা আমরা পারব না, তত দিন আমাদের জাতীয় ঐক্যের অন্তরায় দূর হবে না।

একটা ছোট্ট দৃষ্টান্ত দিই। যারা শিক্ষিত সচেতন আধুনিক যাপিতজীবনে অভ্যস্ত, বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, সে রকম স্বল্পসংখ্যক মানুষ ছাড়া দেশের সাধারণ মানুষ এই ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট কি জানেন? ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীন দুটি রাষ্ট্র ভারত এবং পাকিস্তানের জন্মের এক বছরের মধ্যেই ঘটেছিল একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা। ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮। করাচিতে পাকিস্তানের প্রথম গণপরিষদের অধিবেশন বসেছে। তাতে গণপরিষদের কার্যক্রম উর্দু এবং ইংরেজিতে হবে তা পূর্ব নির্ধারিত। কিন্তু এমন অযৌক্তিক নির্ধারণ কেন মেনে নেবে বাংলার মানুষ?

কুমিল্লার কৃতী সন্তান গণপরিষদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত একটি যৌক্তিক প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন উর্দু এবং ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাও পার্লামেন্টের কার্যক্রমে ব্যবহার করা হোক। কারণ তিনি তথ্য দিয়ে সেদিন বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যা ৬ কোটি ৯০ লাখ। এর মধ্যে ৪ কোটিরও বেশি লোকের ভাষা বাংলা, অর্থাৎ পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষাই বাংলা। তাই বাংলাকে পাকিস্তানের একটি প্রাদেশিক ভাষা হিসেবে দেখা উচিত নয়। বাংলাও হওয়া উচিত অন্যতম রাষ্ট্রভাষা।’ কিন্তু তার এই যৌক্তিক সংশোধনী প্রস্তাব সেদিন পার্লামেন্টে টেকেনি পাকিস্তানি অবাঙালি শাসকদের বাংলা ভাষা ও বাঙালিদের উপেক্ষার দৃষ্টিতে দেখার কারণে। এমন কি সেদিন গণপরিষদের বাঙালি সদস্যরাও ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাবের পক্ষে কোনো কথা বলতে পারেননি সংসদীয় দলের আপত্তির কারণে।

পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসকদের এমন অন্যায় আচরণে ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল সেদিন পূর্ব বাংলা তথা আজকের এই বাংলাদেশ। ছাত্ররা ক্লাস বর্জন করে এবং ধর্মঘট আহ্বান করে। ১১ মার্চ পূর্ব বাংলায় পালিত হয় ভাষা দিবস। গ্রেপ্তার হন সেদিনের তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, শামসুল হকসহ অনেকে। তাদের মুক্তির দাবিতে ১৩ থেকে ১৫ মার্চ ঢাকায় ধর্মঘটও পালিত হয়েছিল। এমনই অগ্নিগর্ভ ঘটনার ১০ দিনের মাথায় ঢাকায় আসেন নবীন পাকিস্তানের সরকারপ্রধান মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। আগুনে ঘি ঢালার মতো ঘোষণা করেছিল তার সেই ভয়ংকর উক্তি। ইংরেজিতে করা সেই ঔদ্ধত্যপূর্ণ উক্তির বঙ্গানুবাদ হচ্ছে, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’।

জিন্নার মুখের ওপর বাংলার দামাল ছেলেরা বলে দিয়েছিল ‘নো নো নো’ সেই প্রতিবাদের পথ ধরেই চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারি। পরবর্তী ইতিহাস আমাদের সকলেরই জানা।

কিন্তু শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ভাষা আন্দোলনের সেই পথিকৃৎ দাবিদার ব্যক্তিত্বকে রাষ্ট্রের চিরশত্রুই গণ্য করে রেখেছিল পাকিস্তানি অবাঙালি শাসকরা। যে কারণে তাকে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধকালে, কুমিল্লায়। একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষাশহীদদের নাম সবার কাছে পৌঁছেছে কিন্তু পৌঁছায়নি শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাম। তাকে জানেন শুধু সচেতন শিক্ষিত কিছু মানুষ।

একই কথা বলা যায়, একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় গুলিতে ছাত্রহত্যার খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক চট্টগ্রামে বসে এক প্রতিবাদী দীর্ঘ কবিতা রচনা করেছিলেন যিনি, সেই কবি মাহবুবউল আলম চৌধুরীর প্রসঙ্গেও। ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ শিরোনামের সেই দীর্ঘ কবিতা চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানের বিশাল প্রতিবাদ সভায় আবৃত্তির পর ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছিল জনতার মধ্যে।

অথচ শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, মাহবুবউল আলম চৌধুরী, একুশের প্রথম সংকলন ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’র সম্পাদক কবি হাসান হাফিজুর রহমানকে তো ভাষা আন্দোলনের ৭১ বছর পরও আমরা পৌঁছে দিতে পারিনি আমজনতার কাছে! পারিনি এজন্য যে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগটা সেভাবে ছিল না। আমজনতার কাছে পৌঁছানোর প্রধানতম পথ হচ্ছে, প্রাক প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তকের নানাস্তরে তাদের ছড়িয়ে দেয়ার পদক্ষেপ গ্রহণ। এ ছাড়া সারা দেশের তৃণমূল পর্যায়ে একুশে ফেব্রুয়ারি পালনের পাশাপাশি ভাষা দিবসও পালন করা এবং এসব কর্মসূচিতে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস এবং ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে নিয়মিত আলোচনার ব্যবস্থা করা, যাতে শিক্ষার্থীর সংস্কৃতি কর্মীসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে আমাদের সমস্ত সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ইতিহাস বারবার ধ্বনি-প্রতিধ্বনিত হয়। জনসাধারণের মধ্যে সংস্কৃতি পৌঁছানো না গেলে সমাজ অগ্রসর হতে পারে না। কারণ যে জাতি তার গৌরব চেনে না, সেই সমাজর মানুষ নিজের মর্যাদাও উপলব্ধি করতে পারে না।

ভাষা আন্দোলন আমাদের কম দেয়নি। আমাদের স্বাধীনতার জন্ম রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলনের গর্ভ থেকেই। অমর একুশে এখন বিশ্বব্যাপী একটি স্মরণীয় দিনও। সিকি শতাব্দী আগেও কখনো বাংলাদেশের সঙ্গে একই সমান্তরালে বিশ্ববাসীর কাছে স্মরণীয় ছিল না একুশে ফেব্রুয়ারি। বিশ্বময় আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এই দিনটি। জাতি হিসেবে আমাদের জন্য এ কম গৌরবের নয়।

বাহান্ন থেকে ২০২৩। দীর্ঘ সময়। দেখতে দেখতে ৭১ বছর অতিক্রান্ত। কিন্তু এতটুকু আবেদন ফুরোয়নি একুশের। বরং শোকের স্মৃতি ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছে শক্তিতে এবং বিশ্বময় মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদায় তা উন্নীত। কিন্তু সেই অর্জন এবং উন্নয়নকে আমরা কতখানি ব্যবহার করতে পারছি, সেটাও ভাবতে হবে এখন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অমর একুশে গ্রন্থমেলা উদ্বোধন এবং এ বছরের বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্তদের হাতে পুরস্কার তুলে দিয়ে সে অনুষ্ঠানে দেয়া ভাষণে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশে করণীয় প্রসঙ্গে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। বাংলা ভাষার সাহিত্য ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন তিনি ওই ভাষণে। একই সঙ্গে তিনি প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে ভাষা ও সাহিত্য চর্চায় বই ডিজিটালাইজড করার পরামর্শ দিয়েছেন। যাতে প্রতিটি বইয়ের অডিও ভার্সনও করা যেতে পারে সে ব্যাপারে প্রকাশকদের পরামর্শ দিয়েছেন। চলতে-ফিরতে মানুষ যেকোনো জায়গায় যাতে বই পড়তে এবং শুনতে পায়। বই পড়তে না চাইলে অডিও ভার্সনে শুনতেও পারবে। অসাধারণ সুন্দর প্রস্তাব।

আমাদের কবিতার কথা সাহিত্যসহ সৃজনশীল শাখায় এমন কিছু কালজয়ী সাহিত্য ইতিমধ্যেই সৃষ্টি হয়েছে যা যথাযথ অনূদিত হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারত। যেতে পারতো নোবেল কমিটিতে কিংবা বিশ্ববিখ্যাত আন্তর্জাতিক পুরস্কারগুলোর প্রতিযোগিতায়। এ জন্য প্রয়োজন ছিল উদ্যোগ। কিন্তু দুর্ভাগ্য, সেই উদ্যোগও শুধু প্রধানমন্ত্রীকেই নিতে হয়, অন্যদের মাথায় আসে না। কি বিচিত্র এই দেশ, হায় সেলুকাস!

অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশে অনেক অগ্রসর হয়েছে, যা বিশ্ববাসীর কাছে এখনো বিস্ময়। অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধি অর্জন করা মানেই টেকসই উন্নয়ন নয়। অর্থনীতির পাশাপাশি শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও অগ্রগতি অনিবার্যভাবে প্রয়োজন। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ করা না গেলে সে সমাজের উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়িত্ব পায় না এবং তা যথাযথ কল্যাণ- রাষ্ট্রের কাজেও লাগে না। সাহিত্য মানুষের মধ্যে সৌন্দর্যবোধের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টি করে। জ্ঞানভিত্তিক সেই সমাজ গড়ে না ওঠায় আজকে বাংলাদেশে নির্মম আত্মকেন্দ্রিকতা আর স্বার্থান্বেষী নিষ্ঠুরতার সংস্কৃতি সর্বত্র বিরাজমান। এ থেকে পরিত্রাণের পথ একটাই তা হচ্ছে মানবিক মূল্যবোধের সংস্কৃতি মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করা। আর করতে পারে কেবল সাহিত্য আর সংস্কৃতি।

গতকালই দৈনিক বাংলা সাহিত্যি পাতায় একুশে এবং বইমেলা নিয়ে একটি লেখা লিখেছিলাম যে, বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘতম বইমেলা অমর একুশে বইমেলা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে এর পরিসর। বইয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি আর মেলার বাহ্যিক প্রসারিত রূপ লেখক এবং প্রকাশকদের মধ্যে উদ্দীপনা সৃষ্টি করলেও আমাদের সৃজনশীল এবং মননশীল সাহিত্যের প্রসার কতখানি ঘটেছে। সেই প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়। আরও সহজ করে বললে বলতে হয়, পঠন-পাঠনের জায়গায় আমরা কি আসলেই খুব বেশি অগ্রসর হতে পারছি! অমর একুশের বইমেলাকে উপলক্ষ করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভালো বই প্রকাশিত হচ্ছে সন্দেহ নেই। বইয়ের কেনাবেচাও কম হচ্ছে না। সৃজনশীল সাহিত্যের বিপণন চিত্র দেখলে মনে হয় আমাদের সাহিত্য পাঠবিমুখতাও সমান তালেই যেন বেড়ে চলেছে। বিশেষ করে গল্প-কবিতার বইয়ের কাটতি গত ২০ বছরে মারাত্মকভাবে কমে গেছে। আগে বিখ্যাত কবিদের একটি কাব্যগ্রন্থ ৫০০ থেকে ১০০০ কপি এক মেলায় শেষ হয়ে যেত। এখন পাঁচ বছরেও ১ হাজার কপি বই শেষ হয় না। এর কারণ সামাজিক-রাজনৈতিক বিবর্তিত বাস্তবতার মধ্যেই নিহিত।

ভাবতে অবাক লাগে, অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে এসেও মুক্তিযুদ্ধকালের স্বাধীনতার শত্রু হিসেবে চিহ্নিতদের রাজনৈতিক দর্শনে বিশ্বাসীদের অনুসারীরাই এখনো সমাজ প্রগতির পথে বাধা! প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশকে আজও অগ্রসর হতে হচ্ছে উন্নয়নের পথে।

বোধ করি ৭১-এর সেই ঐক্য প্রতিষ্ঠা ছাড়া বাংলাদেশের বড় সাফল্য আর দীর্ঘস্থায়ী সাফল্যের পথে যাওয়া দুরূহ বৈকি। এর জন্য যা প্রয়োজন তা হচ্ছে সেই বোধের জাগরণ ঘটাতে হবে আমাদের সংস্কৃতিতে, আমাদের শিক্ষায়, সর্বোপরি মানবিক মূল্যবোধের জায়গায়, যে মূল্যবোধ বাহান্নতে, একাত্তরে আমাদের দেশপ্রেমে উজ্জীবিত করেছিল, মাতৃভাষা এবং মাতৃভূমির জন্য দুঃসাহসী করেছিল, আজ যে বোধের অভাব প্রকট।

লেখক: কবি ও সাবেক পরিচালক (বার্তা বিভাগ), বাংলাদেশ টেলিভিশন


শাহবাগ গণজাগরণের এক দশক

ছবি: সংগৃহীত
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
এফ এম শাহীন

আজ ৫ ফেব্রুয়ারি, গণজাগরণের এক দশক। সংকটময় পথ মাড়িয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করার ঐতিহাসিক বিজয়ের ১০ বছর পূর্তি। বাঙালির জাগরণ ঘটেছে যুগে যুগে, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, সর্বশেষ ২০১৩-এর শাহবাগ আন্দোলন। এটি নিশ্চিত করে বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সব শক্তিকে একত্রিত করার সফল প্রেক্ষাপট গণজাগরণ মঞ্চ।

শাহবাগের হাত ধরে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। একে অপরের হাতে-হাত, কাঁধে-কাঁধ মিলিয়ে গানে-কবিতায়-স্লোগানে শাহবাগ হলো বাংলাদেশ, আর বাংলাদেশ হলো শাহবাগ। যে তরুণ প্রজন্মের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ, সেই প্রজন্ম এগিয়ে এল মহান মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদের রক্তঋণ শোধ করতে। একাত্তরের মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে ’৭১-এ ঝাঁপিয়ে পড়ে যেভাবে পরাধীন বাংলাকে মুক্ত করেছিল বাঙালি জাতি, ঠিক তেমনই জাতি-ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায় ও শ্রেণিভেদ ভুলে আবার এক হয়ে দাঁড়াই আমরা। অনেকের মতে, রাজনীতিবিমুখ এই তরুণরা এক হয়েছিল শুধু একাত্তরের ঘাতক-দালালদের ফাঁসির দাবিতে। তাদের সঙ্গে গর্জে উঠেছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, লেখক, কবি, ছাত্র, শিক্ষক, সাংবাদিক, ডাক্তার, ইমাম, শ্রমিক, গৃহবধূ; শিশু থেকে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা নির্বিশেষ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ।

একাত্তরের মানবতাবিরোধী বিচারের উদ্যোগের শুরু থেকেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকাতে বিএনপি-জামায়াত, স্বাধীনতাবিরোধী দেশদ্রোহীরা দেশি-বিদেশি নানা ষড়যন্ত্র করে আসছিল। কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে আন্তর্জাতিক লবিস্ট নিয়োগ করেছিল তারা। দেশের মধ্যে কিছু বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদকে কিনতেও অসুবিধা হয়নি তাদের। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধে ঘাতক-দালাল, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচার করে বাঙালি জাতির ৪২ বছরের কলঙ্কমোচন করা।

আমরা মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি, কিন্তু আমাদের প্রেরণা ছিল মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের লাখো শহীদের রক্তস্নাত স্বপ্ন, বিশ্বাস আর আত্মত্যাগ। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকে স্বাধীনতাবিরোধীদের পৃষ্ঠপোষকতায় আমরা ছিলাম ক্ষুব্ধ, ক্রুদ্ধ। শাহবাগের জড়ো হওয়া তরুণদের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের রক্তঋণ শোধাতে যুদ্ধাপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি, স্বাধীনতাবিরোধী সংগঠন জামায়াতে ইসলামী ও শিবিরের মতো সংগঠনকে নিষিদ্ধকরণ। যদিও এটি ছিল দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত আকাঙ্ক্ষা।

শাহবাগ চত্বরে যে আকস্মিক, স্বতঃস্ফূর্ত গণজমায়েত ঘটেছিল সেটি কেবল প্রজন্ম চত্বরের গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল সমগ্র বাঙালির মধ্যে। প্রসারিত হয়েছিল দেশ থেকে দেশান্তরে। যার প্রধান ভূমিকায় ছিল জাতীয় প্রচারমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। নির্ভীক সাংবাদিকতা, দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ভাস্বর জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক, অনলাইন গণমাধ্যম ও সাময়িকী প্রজন্ম চত্বরের আন্দোলনের গুরুত্ব অনুধাবন করে দেশ-বিদেশে প্রচারের ব্যবস্থা করে তরুণদের উজ্জীবিত ও গণজাগরণকে তীব্র করে তুলেছিল। তবে কয়েকটি জামায়াত আদর্শের গণমাধ্যম গণজাগরণ মঞ্চকে নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াতে মত্ত হয়ে ওঠে এবং প্রচুর মিথ্যাচার ও ভুয়া তথ্য উপস্থাপন করে, যাতে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়।

বিশেষ করে আমার দেশ, নয়াদিগন্ত, ইনকিলাব, সংগ্রাম, দিনকাল ও দিগন্ত টেলিভিশন শুধু কুৎসা রটিয়ে ক্ষান্ত ছিল না, আমাদের ফ্যাসিস্ট বলতেও ছাড়েনি। তারা আমাদের তথাকথিত তরুণ প্রজন্ম বলে সম্বোধন করে এবং বারবার দাবি করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসন ও ব্যর্থতা, দুর্নীতিকে আড়াল করতে, মানুষের দৃষ্টি ভিন্ন দিকে সরাতে বামদের নিয়ে শাহবাগ চত্বরের জন্ম দেয়। গোয়েবলসের প্রোপাগান্ডার সূত্র অনুসরণ করে বিশাল বিশাল মিথ্যা নিয়ে হাজির হয়, যাতে দেশের মানুষ বিভ্রান্ত হয়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকার্য বাধাগ্রস্ত করা যায়। আমার দেশ পত্রিকা এমনভাবে শতভাগ ভুয়া খবর পরিবেশন করতে থাকে, যাতে করে মানুষ যাচাই-বাছাই করার আগেই বিভ্রান্ত হয়। ব্লগার ও শাহবাগের সংগঠক কর্মীদের নিয়ে মিথ্যা খবরের ঝুলি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনকে বিভ্রান্ত করতে। শাহবাগের বিরুদ্ধে কলম ধরে কিছু পেইড বুদ্ধিজীবী-লেখক, তারা মনের মাধুরী মিশিয়ে গল্প-প্রবন্ধ লিখতে থাকে।

এদিকে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে রাজনৈতিক দল বিএনপি তিনবার তাদের অবস্থান পাল্টায়, যার কারণে তাদের অনেক সমর্থকও বিব্রত হন। শাহবাগে নষ্ট ছেলেরা অবস্থান নিয়েছে, তারা ইতিহাস জানে না- এমন মন্তব্য করে জাতিকে বিভ্রান্ত করতে চায়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের তরুণ প্রজন্ম ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির দাবিতে যে স্ফুলিঙ্গের জন্ম দেয় তা ছড়িয়ে পড়ে সারা বাংলাদেশসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে। সারা দেশের মানুষ পুনরায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়, ১৯৭১-এর মতো সদর্পে আপসহীনভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়। আমরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে পুনর্জাগরণ ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করি।

হাজারও ষড়যন্ত্রের পর প্রজন্ম চত্বরের গর্জনে স্বাধীনতাবিরোধীদের কাঁপন ওঠে, একাত্তরের চেতনা ধারণ করে নতুন প্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধা শাহবাগে প্রাণের টানে জড়ো হন। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল, পঁচাত্তর-পরবর্তীকালে পাকিস্তানমুখী যাত্রা করা বাংলাদেশে আমাদের প্রজন্মের কেউ, এমনকি আমাদের পূর্ব বা পরবর্তী প্রজন্ম আর বিশ্বাস করতই না যে এ দেশে আবারও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা সম্ভব হবে। গোলাম আযম, নিজামী, মুজাহিদ, সাঈদী বা সাকাচৌদের কারাপ্রকোষ্ঠে আটকে রাখা সম্ভব হবে। বরং এ ধারণাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনীতি ও বাংলাদেশের পাকিস্তানমুখী যাত্রাই একমাত্র সত্য। কিন্তু শাহবাগ প্রজন্ম এসব ভুল প্রমাণ করে রুখে দাঁড়ায় আপন শক্তিতে।

দেশ-বিদেশের নানা ষড়যন্ত্রের পরও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা তার প্রতিশ্রুতি রেখেছেন, যুদ্ধাপরাধের বিচারে আপসহীন থেকে এক লৌহমানবীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। দেশের ভেতর স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-শিবির ও তাদের দোসররা হত্যা থেকে শুরু করে কী নৃশংস তাণ্ডবই না চালিয়েছে। ট্রেনে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যা, পেট্রলবোমায় পুড়িয়ে মানুষ হত্যা করা, যা বাংলাদেশ আগে কখনো দেখেনি! কুখ্যাত খুনি রাজাকার সাঈদীকে চান্দে দেখার খবর ছড়িয়ে হত্যা করা হলো রাষ্ট্রের নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশ ও সাধারণ মানুষদের।

একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী সংগঠন জামায়াত যখন শত ষড়যন্ত্র করেও তাদের পাকি আদর্শে বিশ্বাসী আদর্শিক পিতাদের, একাত্তরের ঘাতকদের বিচার বানচাল করতে পারছে না। তখন আমাদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠী হেফাজতে ইসলামকে কাজে লাগিয়ে শুরু করল দেশ ধ্বংসের চক্রান্ত। নাস্তিকতার ধোঁয়া তুলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাস্তবায়ন করা সরকারকে উৎখাত করা ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য। হাজার হাজার নিরীহ মাদ্রাসার ছাত্রকে কাজে লাগিয়ে কর্মসূচি দিল ঢাকা অচলের। ৫ মে ২০১৩, ভয়াল সেই রাত ঢাকার বুকে এঁকে দিল ইতিহাসের নিকৃষ্টতম ক্ষতচিহ্ন। শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চেও আক্রমণ করা হলো, কিন্তু জাগরণ যোদ্ধারা সেই হামলা প্রতিহত করে দিল। ছাত্রলীগ ২৬ মার্চের পর থেকে গণজাগরণ মঞ্চের কর্মসূচিতে না এলেও ওই দিন সবার আগে তারাই প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ছাত্রলীগ মৎস্য ভবনের সামনে প্রতিরোধ গড়ে তুললে হেফাজত শাহবাগে খুব বেশি আক্রমণ করতে পারেনি।

অন্যদিকে মহান মুক্তিযুদ্ধকে যারা ‘দুই কুকুরের লড়াই’ বলেছিল, তারা ভেতরে থেকে ভিন্ন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। যে ব্যক্তি শুধু কর্মসূচি পাঠ করত তাকে বানানো হলো আন্দোলনের একমাত্র নেতা, তাকে বোঝানো হলো- তোমার ডাকে লাখ লাখ মানুষ হয়েছে, তুমি লিডার! সম্মিলিত সিদ্ধান্ত থেকে তাকে দূরে সরানো হলো। এই জাগরণকে সামনে রেখে কোনো কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর। ক্ষমতার লোভ আর রাজনৈতিক অভিলাষে বিতর্কিত ও সাংঘর্ষিক সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করল কর্মসূচি পাঠ করা মুখপাত্র। ‘জয় বাংলা’র পর ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ বলতে না দেয়া, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা তোফায়েল আহমেদ ও আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুবউল আলম হানিফকে শাহবাগে অপমান করা সেই ষড়যন্ত্রের অংশ।

এখানে আরেকটি নির্মম সত্য হলো, আন্দোলনের প্রথম থেকেই দেশের তথাকথিত প্রথম সারির কিছু সুবিধাভোগী সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতা ও বঙ্গবন্ধুর চেতনা ধারণ করে না- এমন কিছু আওয়ামী নেতা-কর্মী শাহবাগের গণজাগরণ নিয়ে বিভ্রান্ত ছড়াতে উঠেপড়ে লাগল। কেউ কেউ ঈর্ষান্বিত হয়ে এমন আচরণ শুরু করল, যা পরবর্তী সময়ে শাহবাগের মধ্যে বিভেদ তৈরিতে তাদের অপচেষ্টা সফল হয়েছিল।

সাম্প্রদায়িক ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়ে যেসব আদর্শহীন নেতা এতদিন ব্যবসা-বাণিজ্য বিনা বাধায় করে আসছিল তাদের অস্বস্তিতে পড়তে হলো। তাদের নিয়ে কথা উঠতে শুরু হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তারাও পরবর্তী সময়ে সুপরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্ত ছড়াতে কাজ করেছে। তারা চায়নি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বলীয়ান এই প্রজন্মের কেউ যেন রাজনীতি ও সামাজিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত হোক। তারা ভালো করে বুঝে গেল, শাহবাগের জাগরণ যোদ্ধারা আর যাই করুক, জামায়াত-শিবির-রাজাকার স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির বিষয়ে কখনো আপষ করবে না।

মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে তরুণ প্রজন্মের এক বিপুল সম্ভাবনাময় শক্তির অপমৃত্যু ঘটল। অভূতপূর্ব জাতীয় ঐক্য যে শেষ পর্যন্ত স্বৈরাচারী মনোভাব আর অবিশ্বাসের খেলায় চুরমার হয়ে গেল! এমন ক্ষত তৈরি করল যা সারাতে আরও কয়েক যুগ অপেক্ষা করতে হবে। তবে বাঙালি সব অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে বারবার। যারা নির্মাণ করবে জাতির পিতার বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ। শাহবাগ গণজাগরণ একাত্তরের খুনি কসাই কাদেরের ফাঁসি দিতে শক্তি জুগিয়েছে। শক্তি জুগিয়েছে সত্যিকারের মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে হাঁটার। প্রজন্ম জেনেছে মুক্তিযুদ্ধে কারা গণহত্যা করেছে, কারা ধর্ষণ করেছে, তাদের বিচার এই বাংলার মাটিতেই হবে।

পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে আমরা ‘জয় বাংলা’ শব্দটি হারিয়ে ফেলেছিলাম। এই শব্দটি শিশু থেকে বৃদ্ধ সবার মুখে সমস্বরে উচ্চারিত হওয়া একটি বড় অর্জন। পঁচাত্তরের পর জয় বাংলাকে শাহবাগের গণজাগরণের মাধ্যমে অনেকাংশে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সব শক্তিকে একত্রিত করার ক্ষেত্রে সফল প্রেক্ষাপট গণজাগরণ মঞ্চ। দীর্ঘ সময় ধরে একটি অহিংস আন্দোলন করতে পারা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। আন্দোলনের মাধ্যমে সংসদে আইন প্রণয়ন ও জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে আগামী প্রজন্মকে তৈরি করার ক্ষেত্রে একটি সফল আন্দোলন।

আসুন, ইতিহাসের এই বাঁকবদলের দিনে আবারও স্মরণ করি মানবতার জন্য, মুক্তিযুদ্ধের জন্য, প্রগতির জন্য একত্রিত হওয়ার যে বিকল্প নেই তার প্রমাণ শাহবাগ গণজাগরণ। ভুলে যাওয়া চলবে না, ভালো মানুষদের অনৈক্যের ফলাফলটা পাল্টে দিতে পারে সব ইতিহাস, সব অর্জন। আমরা ভাষা আন্দোলন করেছি, মুক্তিযুদ্ধ করেছি, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন করেছি, যুদ্ধাপরাধীর বিচার শেষ করে নিশ্চিত রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ গড়ব। সেই সঙ্গে বর্তমানের নব্য দেশবিরোধী লুটেরা যারা টাকা পাচার করে দেশকে পঙ্গু করে দিতে চায়, সেই সব দুর্নীতিবাজ লুটেরার বিরুদ্ধে দেশব্যাপী জাগরণ তৈরি করার নতুন শপথ নেয়ার অঙ্গীকার করি।

লেখক: সংগঠক, গণজাগরণ মঞ্চ; সাধারণ সম্পাদক, গৌরব ’৭১


নির্বাচন: ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টাইল

ব্রাহ্মণাড়িয়ার একটি ভোটকেন্দ্রের ভোটারবিহীন ভোট কক্ষ। ছবি: দৈনিক বাংলা
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
প্রভাষ আমিন

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর এক বছরেরও কম সময় বাকি আছে। এ বছরের ডিসেম্বর বা বড়জোর আগামী বছরের জানুয়ারির শুরুর দিকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন সামনে রেখে অনেকগুলো উত্তর না পাওয়া প্রশ্ন আছে। প্রথম প্রশ্ন, নির্বাচনটি অংশগ্রহণমূলক হবে কি না, রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচনে আসবে কি না? সর্বশেষ রাজনৈতিক অবস্থানকে আমলে নিলে বর্তমান সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না বিএনপি। নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার দাবিতে তারা অনড়। আবার সরকারি দলের পয়েন্ট অব ভিউ থেকে বিবেচনা করলে, তারা সংবিধানের আলোকে বর্তমান সরকারের অধীনেই পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠানে বদ্ধপরিকর। দৃশ্যত অনড় মনে হলেও আমার ধারণা, দুই দলই নিজ নিজ অবস্থান থেকে কিছুটা হলেও ছাড় দেবে। একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন এখন সবার চাওয়া।

গত দুটি নির্বাচন যে মানের হয়েছে, সে মানের আরেকটি নির্বাচন হবে- এমন সুযোগ আওয়ামী লীগের আছে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে। দেশে-বিদেশে প্রবল চাপ তো আছেই, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অস্তিত্বের প্রশ্নও আছে। গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘ সংগ্রাম করা দলটির পক্ষে টানা তিনটি নিম্নমানের নির্বাচন করা সম্ভব নয়। তাই আওয়ামী লীগ নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে কিছু ছাড় দিয়ে হলেও বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে চাইবে। আবার টানা ১৬ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির পক্ষেও নির্বাচন বর্জন করার শক্তি, সামর্থ্য বা সাহস আছে কি না, সেটাও বিবেচনায় রাখতে হবে। নির্বাচন যে মানেরই হোক, যত সমালোচনাই হোক; আওয়ামী লীগ তো ২০১৪ সালের নির্বাচনের মেয়াদ শেষ করেছিল। ২০১৮ নির্বাচনে পাওয়া ক্ষমতার মেয়াদপূর্তি করতে যাচ্ছে। বিএনপি যদি আগামী নির্বাচন বর্জন করে, তাহলে তাদের আরও পাঁচ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার ঝুঁকি নিতে হবে। সেটা নিলে বিএনপির রাজনৈতিক অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে। আমার ধারণা, বিএনপি নিজেদের অবস্থান থেকে সরে এসে নির্বাচনকালীন সরকারে কিছু ভারসাম্যের সুযোগ পেলে নির্বাচনে যাবে। ক্ষমতায় থাকা বা যাওয়ার চেয়ে আগামী নির্বাচনটি দুই দলেরই রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্যই বেশি দরকার।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন আয়োজনে দলের নেতাদের বার্তা দিচ্ছেন, আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। সবাই যেন নির্বাচনের প্রস্তুতিতে নেমে পড়েন। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জনসভায় আগামী নির্বাচনের জন্য ভোট চাইছেন। আমরা ধরে নিচ্ছি, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। কিন্তু অংশগ্রহণমূলক হলেই সেটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য হবে, এমন কোনো কথা নেই। আমরা যদি ২০১৮ সালের নির্বাচনের দিকে তাকাই। সেটি অবশ্যই অংশগ্রহণমূলক ছিল। কিন্তু কোনোভাবেই সেটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বা গ্রহণযোগ্য ছিল না। আরেকটু পেছনে ফিরলে ২০১৪ সালের নির্বাচনের দিকে তাকালে দেখব; সেটি অংশগ্রহণমূলক, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, গ্রহণযোগ্য কিছুই ছিল না।

রাজনৈতিক মহলে একটি কথা চালু আছে, শেখ হাসিনা একই কৌশলের পুনরাবৃত্তি করেন না। আগামী নির্বাচন তাই ২০১৪ বা ২০১৮ সালের মতো হবে না। তাহলে কেমন হবে? এই প্রশ্নের উত্তর কারও জানা নেই। তবে গত বুধবার অনুষ্ঠিত ছয় আসনের উপনির্বাচনে তার কিছুটা আভাস পাওয়া গেছে। অংশগ্রহণমূলক না হলেও এই অর্থহীন উপনির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহ সৃষ্টি করা হয়েছিল। ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে ক্ষমতাসীন মহাজোট মনোনীত প্রার্থী ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী ইয়াসিন আলী হেরেছেন মহাজোটেরই আরেক শরিক জাতীয় পার্টির প্রার্থী হাফিজউদ্দিন আহমেদের কাছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আব্দুল ওদুদ জিতেছেন বটে, তবে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী সামিউল হকের সঙ্গে ভোটের পার্থক্য ছিল হাজার চারেক। সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল বগুড়া-৪ আসনে। মহাজোট মনোনীত জাসদের রেজাউল করিম তানসেনের ঘাম ঝরিয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিরো আলম। দুজনের ব্যবধান মাত্র ৮৩৪ ভোটের। এভাবেই একতরফা ও ভোটারবিহীন নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিভ্রম তৈরি করা হয়েছে।

তবে একদম নতুন স্টাইলের নির্বাচন হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে। এখানে আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থী ছিল না। ১৪-দলীয় জোট বা মহাজোটের কোনো প্রার্থী ছিল না। জাতীয় বা স্থানীয় নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের অংশ না নেয়ার এমন নজির বোধহয় আর নেই। তবে কাগজে-কলমে না থাকলেও অবস্থানগত দিক থেকে আওয়ামী লীগ এই আসনে সবচেয়ে বেশি করেছিল। একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীকে জিতিয়ে আনতে দল ও সরকার মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছিল। আওয়ামী লীগ প্রার্থী তো দেয়ইনি, বরং দলের তিন বিদ্রোহী প্রার্থীকে বসিয়ে দেয়া হয়। নির্বাচনের পাঁচ দিন আগে প্রচণ্ড মানসিক চাপে আত্মগোপনে চলে যান বিএনপির এক বিদ্রোহী প্রার্থী। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন। সব মিলিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীর জয়ের ব্যাপারে কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি আওয়ামী লীগ।

এই সৌভাগ্যবান স্বতন্ত্র প্রার্থী উকিল আব্দুস সাত্তার ভুঁইয়া। কদিন আগে সংসদ থেকে পদত্যাগ করা সাত বিএনপি সাংসদের একজন তিনি। বিএনপি উপনির্বাচন বর্জন করলেও তিনি বিএনপি থেকে পদত্যাগ করে আওয়ামী লীগের আশীর্বাদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয় পেয়েছেন। প্রায় প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত উকিল আব্দুস সাত্তারের শেষ বয়সের ডিগবাজি রাজনীতির মাঠে দারুণ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এবার নিয়ে ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া উকিল আব্দুস সাত্তার এলাকায় দারুণ জনপ্রিয়। বিএনপিও তাকে কম দেয়নি। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টাও। তবে ৮৬ বছর বয়সে এসে বুঝতে পেরেছেন, বিএনপিতে তার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। সেটির আবার একটু কাহিনি আছে।

আশুগঞ্জ ও সরাইল উপজেলা নিয়ে গঠিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সবচেয়ে বড় নেতা ছিলেন অলি আহাদ। ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক অলি আহাদ ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাংগঠনিক সম্পাদক। কিন্তু আওয়ামী লীগের সঙ্গে তার পথচলা দীর্ঘ হয়নি। ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের বিভক্তির সময় তিনি ভাসানীর সঙ্গে দল ছাড়েন। অবশ্য শেষ জীবনে তিনি ডেমোক্রেটিক লীগ নামে একটি দল গঠন করেছিলেন। ১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে অলি আহাদকে হারিয়ে দেন আওয়ামী লীগের তাহেরউদ্দিন ঠাকুর। অলি আহাদকে হারানোর পুরস্কার হিসেবে তাহের ঠাকুর বঙ্গবন্ধু মন্ত্রিসভার তথ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। বঙ্গবন্ধু হত্যার অন্যতম ষড়যন্ত্রকারী তাহেরউদ্দিন ঠাকুরই এ আসনে আওয়ামী লীগের একমাত্র সদস্য। এরপরের সব নির্বাচনে হয় উকিল সাত্তার, নয় জাতীয় পার্টি; আওয়ামী লীগ আর সুযোগ পায়নি।

আসনটি যে বিএনপির ঘাঁটি, ২০১৮ সালের নির্বাচনই তার প্রমাণ। সারা দেশে বিএনপির পাওয়া মাত্র ছয়টি আসনের একটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২। তাই এবার সুযোগ পেয়েই উকিল সাত্তারের মাধ্যমে আসনটি কব্জা করার জন্য মরিয়া হয়ে মাঠে নামে আওয়ামী লীগ। সরাসরি নিজেদের নামে না হলেও ’৭৩-এর পর এই প্রথম আওয়ামী লীগ এখানে ঢুকতে পারল। সুই হয়ে ঢুকে নিশ্চয়ই ফাল হয়ে বেরোনোর আকাঙ্ক্ষা তাদের।

৮৬ বছর বয়সের এসে উকিল সাত্তার ডিগবাজি খেলেন কেন, এবার সেই গল্প শুনুন। অলি আহাদের কন্যা ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা এখন বিএনপির রাজনীতিতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। ২০১৮ সালে সরাসরি মনোনয়ন না পেলেও সংরক্ষিত আসনে সংসদ সদস্য হন তিনি। আর সংসদে গিয়েই নিজের যোগ্যতার প্রমাণ রেখেছেন তিনি। একাই কাঁপিয়ে দিয়েছেন সংসদ। শুধু সংসদ নয়; রাজপথ, আইন অঙ্গন, কূটনৈতিক যোগাযোগ, লেখালেখি, টকশো- সব জায়গাতেই রুমিন ফারহানার স্মার্ট, সরব উপস্থিতি। এলাকায় তুমুল জনপ্রিয় হলেও জাতীয় পর্যায়ে রুমিন ফারহানার তুলনায় উকিল সাত্তার একেবারেই ম্লান। সংসদে তার উপস্থিতি কখনোই শোনা যায়নি। আগামীতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে রুমিন ফারহানাই যে বিএনপির প্রার্থী, এটি নিয়ে কোনো সংশয় নেই।

উকিল সাত্তার বুঝে গেছেন, বিএনপির কাছে তার আর কোনো দাম নেই। নিজের ক্যারিয়ার তো শেষের দিকে, চার দশকে বানানো নিজের সাম্রাজ্যে যে সন্তানকে বসিয়ে যাবেন; সে সম্ভাবনাও নেই। তাই তিনি নৌকার দ্বারে গেছেন। যদি নৌকায় করে পার হওয়া যায় বৈতরণী, ধরে রাখা যায় সাম্রাজ্য। আওয়ামী লীগেরও আকাঙ্ক্ষা যদি উকিলকে ধরে পুনরুদ্ধার করা যায় আসনটি।

চাইতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু তা পেতে আপনি কী করছেন, বিবেচ্য সেটিই। উকিল সাত্তারকে জেতাতে আওয়ামী লীগ যা করেছে, তা অনাকাঙ্ক্ষিত শুধু নয়, বিব্রতকরও। আমার ধারণা ছিল, আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে জাতীয় ও স্থানীয় সব নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। বিএনপিকে নির্বাচনে আনার টোপ হিসেবেই এমনটা করবে বলে আমার ধারণা ছিল। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি সুশীল সমাজকে বোঝানো যেত, দেখো দলীয় সরকারের অধীনেও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়। কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের উপনির্বাচন আমার সে ধারণা ভেঙে দিয়েছে। তবে মানতেই হবে, এটি একদম নতুন স্টাইল, ২০১৪ বা ২০১৮-এর মতো নয়। আওয়ামী লীগ কাগজে-কলমে কোথাও নেই। কিন্তু বাস্তবে সবকিছু তারাই করছে।

বিএনপি যদি আগামী নির্বাচনে না আসে, তাহলে সারা দেশেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টাইল প্রয়োগ করা হতে পারে। এটি বিএনপির জন্য একটি বড় হুমকিও বটে। বিএনপি একটি বড় দল। দেশের সব নির্বাচনী আসনেই উকিল সাত্তারের মতো বঞ্চিত, ক্ষুব্ধ নেতা পাওয়া যাবে। তাদের নির্বাচনে আনতে পারলে খুব সহজেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের বিভ্রম তৈরি করা যাবে। আর সেটি ২০১৪ বা ২০১৮-এর মতো হবে না। হবে খাঁটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টাইল।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট


দুর্নীতি, মুদ্রানীতি ও মূল্যস্ফীতির সমীকরণ

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
মিহির কুমার রায়

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য নিয়ে চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে বছরে দুবার মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হতো। তবে ২০১৬ সালের পর থেকে বছরে একবার করে মুদ্রানীতি ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নেয় এ সংস্থাটি। সংকট সামাল দিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিতে যাচ্ছে সরকার। এ ঋণের অন্যতম শর্ত- বছরে অন্তত দুবার মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে হবে।

জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের চেয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বেশি চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে বিধায় চাহিদা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির রাশ টানতে বেশির ভাগ দেশ সুদহার বাড়িয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো ৯ শতাংশ সুদহারের সীমা অপরিবর্তিত আছে। যে কারণে মুদ্রানীতির কার্যকারিতা অনেকাংশে কমে গেছে। এরই মধ্যে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমায় টাকার হাতবদল কমেছে। এ পরিস্থিতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যেও বাজারে তারল্য বাড়াতে সরকারের ঋণ চাহিদার বেশির ভাগই দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারকে ঋণ দিয়েছে ৬৫ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। আর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ঋণ কমিয়েছে ৩৩ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা। ফলে প্রথম ছয় মাসে সরকারের নিট ঋণ বেড়েছে মাত্র ৩২ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা।

এ ছাড়া সিএমএসএমই, রপ্তানি উন্নয়ন, খাদ্যনিরাপত্তা ও কারখানা সবুজায়নে ৪৫ হাজার কোটি টাকার চারটি পুনঃঅর্থায়ন স্কিম গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর বাইরে প্রতিদিনই রেপো, বিশেষ তারল্য সহায়তাসহ নানা উপায়ে ব্যাংকগুলোকে প্রচুর ধার দেয়া হচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের সঞ্চয়ক্ষমতা কমায় অক্টোবরের তুলনায় গত নভেম্বরে ব্যাংক খাতের আমানত ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি কমেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আগের বছরের একই মাসের তুলনায় গত ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ, আর গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৭ দশমিক ৭০ শতাংশ হয়েছে।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা প্রাক্কলন করা হয় ৫ দশমিক ৬০ শতাংশ। যদিও বিশ্বব্যাংক বলেছে, প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ২০ শতাংশের মধ্যে থাকবে। রেপোর সুদহার বাড়ানো হলেও ব্যাংকঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশেই ধরে রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে ভোক্তাঋণের ক্ষেত্রে এ সুদহার সর্বোচ্চ ১২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এতদিন মৌখিকভাবে ভোক্তাঋণের সুদহার অতিরিক্ত ৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর অনুমতি ছিল। ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার পরিবর্তিত না হলেও ব্যাংক আমানতের সুদহারের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আগের নির্দেশনা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এখন থেকে ব্যাংকগুলো নিজেদের চাহিদা ও সামর্থ্য অনুযায়ী গ্রাহকদের সুদ দিয়ে আমানত সংগ্রহ করতে পারবে।

এ মুহূর্তে দেশের ব্যাংক খাতে তারল্যসংকট চলছে, বেশ কিছু বাণিজ্যিক ব্যাংক নিজেদের নির্ধারিত সিআরআর ও এসএলআর সংরক্ষণেও ব্যর্থ হচ্ছে। এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বক্তব্য হলো- বাজারে অর্থপ্রবাহ বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন করেছে, এসব তহবিলের সুদহার দেড় থেকে সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ। কর্তৃপক্ষ মনে করে, ব্যাংকগুলো কৃষি, সিএসএমই, রপ্তানিমুখী শিল্পসহ উৎপাদনমুখী বিভিন্ন শিল্পের জন্য গঠিত তহবিল থেকে অর্থ নিক, যার মাধ্যমে দেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে। সুদহার বাড়ানোর কারণে ব্যাংকগুলো রেপো থেকে ধার নেয়ায় নিরুৎসাহিত হবে, ব্যাংকঋণের সুদহার বাড়ানো হলে দেশের রপ্তানি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ কারণে এখনই ঋণের সর্বোচ্চ সুদের ক্যাপ তুলে নেয়া হবে না বিধায় ধীরে ধীরে ব্যাংকঋণের সুদহার বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া হবে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও তারল্যসংকটের চাপের মধ্যেও নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১২ দশমিক ৮ শতাংশ। আগামী জুন পর্যন্ত এ লক্ষ্যমাত্রা ১৪ দশমিক ১ শতাংশ প্রাক্কলন করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যদিও দেশে ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি এখন ৮ শতাংশের ঘরে। সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ড কিনে নেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকারকে প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা সরবরাহ করা হয়েছে বলে মুদ্রানীতি ঘোষণা অনুষ্ঠানে জানানো হয়।

২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় রেকর্ড ৮৯ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকে। ইতিহাস সৃষ্টি করা এ আমদানি দায় দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ভারসাম্যকে নাজুক পরিস্থিতিতে ঠেলে দিয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ব্যাপক কড়াকড়ি সত্ত্বেও প্রত্যাশা অনুযায়ী আমদানি ব্যয় কমিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর ২০২২) আমদানি ব্যয় হয়েছে ৪১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। এই হিসাবে আমদানি ব্যয় কমেছে মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থবছর শেষে আমদানি ব্যয় ৮০ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেটি হলে চলতি অর্থবছরে আমদানি ব্যয় ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।

চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ৬ শতাংশ, অর্থবছর শেষে এ প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামবে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আবার অর্থবছর শেষে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে বলে মুদ্রানীতিতে আভাস দেয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে সরকারের চলতি হিসাবের ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। অর্থবছর শেষে এ ঘাটতি ৭ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে থামবে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ধারাবাহিকভাবে পতন হচ্ছে। ৮ জানুয়ারি রিজার্ভের গ্রস পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার। তবে চলতি অর্থবছর শেষে রিজার্ভের পরিমাণ ৩৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এ ব্যাপারে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের অভিমত হলো- ঘোষিত মুদ্রানীতি মূল্যস্ফীতি ও ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে খুব বেশি সহায়তা করবে না। বরং আরও উসকে দেয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একদিকে নীতিনির্ধারণী সুদের হার বাড়ানো হয়েছে। এতে ব্যাংকঋণের সুদের হার বাড়ানোর চাপ তৈরি হবে। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ কমলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হবে, মানুষের আয় কমবে। করোনার ক্ষতি মোকাবিলা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বিনিয়োগ বাড়ানোর পদক্ষেপ নেয়াটা ছিল জরুরি। কীভাবে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াবে তার কোনো দিকনির্দেশনা নেই, খেলাপি ঋণ কমানোর পদক্ষেপ নেই, কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নেই। বরং বিভিন্ন সূচকের যেসব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

নিয়মিত সুদের হার না বাড়িয়ে বাড়ানো হয়েছে নীতিনির্ধারণী বা রেপো সুদের হার। এতে ব্যাংকগুলো আরও বিপদে পড়বে। অর্থনীতিতে নানা সংকটের মধ্যে যখন ঋণপ্রবাহ আরও বাড়ানোর দরকার ছিল, তখনো কমানো হলো। মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি খুব একটা ভূমিকা রাখতে পারে না। মূল্যস্ফীতি কমাতে পণ্যমূল্যের লাগাম টানতে হবে। সে ব্যাপারে মুদ্রানীতি ও বাজেটে কোনো পদক্ষেপ নেই। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সুদহার হিসেবে পরিচিত রেপোর সুদের হার শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে সাড়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। এই নীতি সুদহার বৃদ্ধি পাওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ধার করতে ব্যাংকগুলোকে এখন বেশি সুদ দিতে হবে, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আংশিক কাজ দেবে। তবে এর প্রভাবে ঋণের প্রবাহ বেশি কমে গেলে উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়ে পণ্যের সরবরাহজনিত সংকটের কারণে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যেতে পারে।

এ ধরনের মুদ্রানীতির আরও একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট হলো- বাজারে ঋণের প্রবাহ বাড়ানোর মাধ্যমে বিনিয়োগ বাড়ানো, যা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ঋণের প্রবাহের উৎস প্রধানত আমানত সংগ্রহ ও বৈদেশিক অনুদান। আবার বৈদেশিক অনুদান সংগ্রহে অনিশ্চয়তা রয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষি ও এসএমই খাতে অর্থ জোগাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিগত পাঁচ বছরে অনেক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি ও নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে এসএমই খাতে পুনঃঅর্থায়ন স্কিমে ১৫ শতাংশ অর্থ কেবল নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এসব অর্জন দেশের সরকারকে আরও সামনে নিয়ে যাবে।

এখানে উল্লেখ্য, মুদ্রানীতির সঙ্গে রাজস্বনীতির সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ বিধায় প্রথমটির ইতিবাচক প্রভাবে যদি কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও আয়ের ওপর পড়ে, তবে দ্বিতীয়টির ওপর এর গুণগত প্রভাব পড়তে বাধ্য। আশা করা যাচ্ছে যদি প্রবাহ তথা বিনিয়োগ বাড়িয়ে উৎপাদনের পরিবেশ সৃষ্টি করা যায়, তবে রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এ ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের সামনে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, বাণিজ্য সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা; দ্বিতীয়ত, স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজে বের করা এবং তৃতীয়ত, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যাংকগুলোকে শক্তিশালী করা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা।

তবে মুদ্রানীতির শতভাগ বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারি ব্যাংকগুলোর দক্ষতা বাড়াতে হবে, যা বর্তমানে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, এ খাতে অনৈতিক কাজগুলো সার্বিক অর্জনকে কলুষিত করছে। এ ব্যাপারে সুশাসনের বিষয়টি আর্থিক খাতে সফলভাবে প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ব্যাপারে তফসিলি ব্যাংকগুলোর নজরদারি বাড়াতে পারে, তবে মুদ্রানীতির বাস্তবায়নের হার অনেকাংশে বাড়বে।

তা ছাড়া এই খাতকে গতিময় করতে শুধু অর্থঋণ আদালতই যথেষ্ট নয়, বরং বিশেষ ট্রাইব্যুন্যাল গঠন করে মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। হিসাব অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন খাতে আনুষ্ঠানিক আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে যে পরিমাণ অর্থের জোগান হয়, তা দেশের জিডিপির প্রায় ৩ শতাংশের সমান। সাধারণভাবে তত্ত্ব বলছে- দুর্নীতি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগের গতি কমিয়ে দেয়, পণ্যমূল্যকে প্রভাবিত করে এবং সর্বোপরি সুশাসনকে বাধাগ্রস্ত করে। কাজেই এসব সমস্যার সমাধান করে মুদ্রানীতির বাস্তবায়নকে ত্বরান্বিত করতে হবে। তা হলেই দেশের কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব হবে।

লেখক: অধ্যাপক, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা


প্রগতিশীলদের মৌলবাদী চিন্তা ও একজন হিরো আলম

হিরো আলম। ফাইল ছবি
আপডেটেড ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ ০৮:৩১
রঞ্জনা বিশ্বাস

আমার মা বলতেন, ‘ধানের চিটা ফেলানো যায় কিন্তু মানুষের চিটা ফেলানো যায় না।’ তবে কি মানুষ চিটা হয়? না। খ্রিষ্টধর্মে মানুষের অপরিমেয় সম্ভাবনার কথা বলেছে। প্রতিটি মানুষের মধ্যে প্রকৃতি বিশেষ বিশেষ গুণ দিয়ে দিয়েছেন, যা দিয়ে সে টিকে থাকার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। বাইবেলের একটি জায়গায় বলা আছে, ‘তোমরাই ঈশ্বর।’ ত্রিপিটকের বাণী নিয়ে রবি বিজ্ঞাপন দিয়েছিল, ‘জ্বলে উঠুন আপন শক্তিতে’।’ কোরআনে বলা হয়েছে, ‘মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত’। অথচ নিজেদের প্রগতির মানুষ বলে দাবি করা কিছু মানুষ হিরো আলমকে মানুষ ভাবতে চান না।

আমরা মানুষকে ডেল কার্নেগির বই পড়তে অনুপ্রাণিত করি। সফল মানুষ হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করি। কিন্তু কাদের ক্ষেত্রে করি? সমপদমর্যাদার মানুষের ক্ষেত্রে কিংবা আমাদের থেকে আপার ক্লাসের মানুষের ক্ষেত্রে। অপেক্ষাকৃত নিম্নবর্গের মানুষ, প্রান্তিক মানুষদের আমরা করুণার দৃষ্টিতে দেখি। তাদের উঠে আসার লড়াইটাকে হাস্যকর ও রসাত্মকভাবে উপস্থাপন করি। কেন করি? কারণ আমাদের ঔপনিবেশিক মন আমাদের দিয়ে এভাবে ভাবায়।

অথচ দেখুন, নামী মানুষ দেখলে, ধনী মানুষ দেখলে, পদ-পদবি আছে এমন মানুষ দেখলে আমরা বিগলিত হই। তাদের গায়ের সঙ্গে গা ঘেঁষে দাঁড়ানো যে চারিত্রিক দুর্বলতা সেটা কখনোই ভাবি না। সেই সব ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দিয়ে আমরা অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করি, অন্যের বিপদে দু-পয়সা দিয়ে সাহায্য করে ফলাও করে প্রচার করি, কারও ওপর বিরক্ত হলে তাকে তুই-তোকারি করে গালিগালাজ করি।

মনোবিদরা কিন্তু এ রকম আচরণকে হিস্ট্রিওনিক ব্যক্তিত্ব বলে আখ্যায়িত করেন। ভালোবাসা এদের চরিত্রে নেই। সিম্প্যাথি ইম্প্যাথিপূর্ণ দৃষ্টি দিয়ে কিছু দেখার অভ্যাস আমাদের ধাতে নেই। চট করে জাজমেন্টাল হয়ে যাওয়া এদের কাজ। নিজের দিকে কখনো এরা তাকান না, ভাবেন না একটা মানুষকে এভাবে আক্রমণ করলে মানুষটা ডিপ্রেশনে চলে যাবে না তো? আমি তার ডিপ্রেশনে চলে যাওয়ার কারণ হচ্ছি না তো!’ না, কখনো আমি ভাবি না- ‘আমি কারও ডিপ্রেশনে চলে যাওয়ার কারণ হচ্ছি? অথচ আমরা মানবিক পৃথিবী দাবি করি! বিস্ময়কর না! কাঁঠালে আমসত্ব আর কাকে বলে!

ব্রিটেনের জে কে রাওলিং- হাজার নয়, বারবার ব্যর্থ হয়েছেন। প্রকাশকদের কাছ থেকে বাজেভাবে প্রত্যাখ্যাত হতে হতে ডিপ্রেশনে চলে গিয়েছিলেন, আত্মহত্যাও করতে চেয়েছেন। অবশেষে সফল হয়েছেন। পৃথিবীটা কিন্তু আমার মতো আরামপ্রেমীরা বদলে দেননি। বদলে দিয়েছেন হিরো আলমের মতোই প্রান্তিক শোষিত-বঞ্চিত-নির্যাতিত মানুষেরা। আলবার্ট আইনস্টাইন স্কুলের পরীক্ষায় ফেল করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে এতটাই বাজে রেজাল্ট করতেন যে, বারবার বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দেয়ার কথা ভেবেছেন। তার বাবা মারা যাওয়ার আগে দুঃখ করে বলেছিলেন- ‘আমার গর্ধব ছেলেটাকে দিয়ে কিছুই হবে না।’ এডিসন তার ডায়েরিতে লিখে রেখেছিলেন, ‘আমি ছিলাম মেধাহীন একজন মানুষ।’ জ্যাক মা অসংখ্যবার ব্যর্থ হয়েছেন চাকরিজীবনে, ব্যর্থ হয়েছেন কলেজ ও ইউনিভার্সিটির জীবনেও। দশ বার পরীক্ষা দিয়ে হার্বাডে সুযোগ পাননি। কিন্তু আলিবাবার প্রতিষ্ঠাতা হয়েছেন।

ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের উঠে আসাকে আমরা অভিনন্দন জানাই। কিন্তু আমার দেশের একজন হিরো আলমের উঠে আসাকে মেনে নিতে পারি না। আমরা বলি- ‘দেশ কতটা নেতৃত্বশূন্য হলে হিরো আলমের মতো মানুষ সংসদে উঠে আসতে পারে, ভাবুন!’ অর্থাৎ দেশটাকে নেতৃত্ব দেয়ার একচেটিয়া অধিকার যেন কেবল মেধাবীদের, সম্পদশালীদের আর প্রগতিশীলদের!

কেন বাপু! হিরো আলম বা একজন প্রান্তিক মানুষও তো দেশের মালিক- সেও তো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সংসদে আসার অধিকার রাখে। যদি হেরেও যায় তাতেই বা কি! আপনি একজন গরিব, মেধাহীন, অসুন্দর চেহারার মানুষের বিপক্ষে থাকতেই পারেন। কিন্তু তাকে কটাক্ষ করে, তাকে আক্রমণ করে, গালিগালাজ করে নিজের হিস্ট্রিওনিক ব্যক্তিত্বকে প্রকাশ করাটা কি ম্যাচুউরিটির লক্ষণ? আপনি একবার ভাবেন, হিরো আলমকে নিয়ে শিক্ষিতজনেরা যত ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করেছে তার সিকি ভাগও আপনাকে নিয়ে যদি কেউ করত, আমাকে নিয়ে করত, নির্ঘাৎ আপনি-আমি ডিপ্রেশনে চলে যেতাম, হতে পারে আত্মহত্যা করতাম। কিন্তু তার মানসিক জোর এতটাই বেশি যে, তিনি কখনোই হাল ছাড়েননি। লক্ষ্য পূরণে তিনি অবিচল।

অভিজ্ঞতা থেকেই হিরো আলম সম্ভবত তার পাঠ গ্রহণ করেছেন। তিনি হেরে গেছেন, ক্ষতি নেই। একজন হেরে যাওয়া মানুষকে আমি অন্তত কটাক্ষ করব না। ভবিষ্যতে তিনি হয়তো জিতবেন। আমি তার এই উদ্যমকে সম্মান জানাই। তিনি আমাদের চেতনার জগতে তৈরি হওয়া নায়কের যে অবয়ব সেটা ভেঙে দিয়েছেন। এবং সেটাই মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে আমাদের! এটা আমাদের চিন্তার দৈন্য। আমি আর আমার মেয়ে দুজনেই হিরো আলমকে সাপোর্ট করি। ধর্মীয় মৌলবাদিতার মতো প্রগতিশীলতার যে মৌলবাদ, তাও ধ্বংস হওয়ার দরকার আছে। তথাকথিত ঔপনিবেশিক প্রগতির চর্চা করতে করতে আমরা এখন একেকজন হিস্ট্রিওনিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছি। এর থেকে মুক্তি চাই। ব্যক্তি আক্রমণ বন্ধ হোক। পেশাগত সমালোচনা চলুক। সমাজে মানুষকে, মানুষের সাফল্যকে সম্মান করার চেষ্টা করা উচিত।

ম্যাচিউরড মানুষের একটা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- পেশাগত প্রতিযোগিতায় নামা এবং পেশাদারিত্বের জায়গা থেকে সমালোচনা করা। কিন্তু আমরা প্রায়ই ব্যক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করি এবং ব্যক্তির সমালোচনায় মুখর হই, যা মূলত ব্যক্তি নিন্দার পর্যায় পড়ে। কাজেই হিরো আলমকে নিয়ে না ভেবে নিজের ব্যক্তিত্ব নিয়ে একবার ভেবে দেখুন। আপনার অবস্থান ঠিক কোথায় কিংবা আমার অবস্থান। তাহলে হিরো আলমের সাফল্যকে আর ঈর্ষা না করে আমরা আমাদের বিশেষ গুণটিকে চিহ্ণিত করে আপন শক্তিতে জ্বলে ওঠার জন্য কাজে নেমে পড়তে পারব, যা অন্যের অনুপ্রেরণার কারণ হতে পারে! হিরো আলোমের জন্য শুভেচ্ছা রইল।

লেখক: গবেষক


ধর্মগ্রন্থে ভাষার নানা প্রসঙ্গ

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
মোহাম্মদ হাননান

বর্তমান বিশ্বে কতগুলো ভাষা আছে, আর কতগুলো ভাষায় মানুষ কথা বলে, এর সঠিক পরিসংখ্যান হয়তো পাওয়া যাবে না। কারণ প্রায় প্রতি সপ্তাহেই একটি করে ভাষা বিশ্ব থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে মানে, এসব ভাষায় কথা বলার আর একজনও লোক থাকছে না। আগামী ১০০ বছরে বিশ্ব থেকে তিন হাজার ভাষা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ভাষাবিদরা। সে হিসাবে গড়ে প্রতি দুই সপ্তাহে একটি করে ভাষা অবলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে অথবা যাবে।

বিশ্বে তালিকাভুক্ত ভাষার সংখ্যা ৬ হাজার ৬০। এর মধ্যে মাত্র ৩০০ ভাষা দিয়েই বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের কথা বলার কাজটি হয়ে যাচ্ছে। ৫০টির মতো ভাষা আছে, যে ভাষাগুলোতে মাত্র একজন করে মানুষ কথা বলে। এর অর্থ, ওই একজন করে মানুষের মৃত্যু হলে ওই ৫০টি ভাষারও মৃত্যু হয়ে যাবে। ৫০০টির মতো ভাষা বিশ্বে আছে, যার মাধ্যমে কথা বলে মাত্র ১০০ জন করে লোক। ওই ১০০ জনের মৃত্যু হলে মৃত্যু হবে আরও ৫০০টি ভাষার।

বিশ্বের ভাষাগুলোর অবস্থান দৈশিক নয়, তা জাতিগত, সম্প্রদায়গত এবং গোষ্ঠীভুক্তও। পাপুয়া নিউগিনি নামে বিশ্বে একটি রাষ্ট্র আছে, যা এমন গুরুত্বপূর্ণ নয়, সেই একটি দেশে ৮১৭টি ভাষা চালু রয়েছে কথা বলার জন্য। অথচ চীন এত বড় দেশ, শতকোটিরও বেশি মানুষের বাস, সেখানে ভাষা মাত্র ২০৫টি। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে চালু আছে ৪০৭টি ভাষা।

আমাদের বাংলাদেশে ভাষার সংখ্যা কত? আমাদের জানা আছে কি? কম করে হলেও ৩০টি ভাষা প্রচলিত রয়েছে বাংলাদেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে। সংখ্যা দিয়ে একটি তালিকা দেখানো যায়। যেমন- ১. বাংলা ২. চাকমা ৩. মারমা ৪. ওঁরাও ৫. ত্রিপুরা ৬. গারো ৭. লুসাই ৮. সাঁওতালী ৯. মনিপুরী ১০. রাখাইন ১১. রামর‌্যে ১২. মারৌ ১৩. কুরুক ১৪. ককবরক ১৫. হাল্লামী ১৬. নাইতুং ১৭. ফাতুং ১৮. উসুই ১৯. আচিক ২০. কুচিক ২১. মাফি কুচিক ২২. আবেং ২৩. সাগেতাং ২৪. আত্তং ২৫. দুলিএ্যানটং ২৬. কারমেলি ২৭. মাহলেস ২৮. মনিপুরী মৈতৈ ২৯. খালাছাই। এ ভাষাগুলোর মধ্যে বাংলা ছাড়া অন্য ভাষাগুলোর কিছু নামেই আলাদা আলাদা দেখানো হয়, একের সঙ্গে অন্যের পারস্পরিক অনেক মিল রয়েছে অনেক ক্ষেত্রে। আবার সামান্য কিছু পার্থক্যের জন্যও নৃগোষ্ঠীর ভাষাগুলোর মধ্যে আলাদা আলাদা নাম হয়েছে।

বিশ্বের এতগুলো ভাষা, এ ভাষাগুলো কেমন করে এক থেকে অন্যে ভিন্ন হলো, তার নানা রকম ব্যাখ্যা ভাষাবিদদের কাছে রয়েছে। তবে এ সম্পর্কে প্রাচীন গ্রন্থ তৌরাত শরিফ, যা মুসা (আ.)-এর আমলে নাজিল হয়েছিল (যদিও মূল তৌরাত শরিফ পাওয়া এখন এক কঠিন কাজ), তার থেকে কিছু তথ্য নেয়া যায়। তৌরাত শরিফে ভাষার জন্মকথা নিয়ে একটি ছোট্ট অধ্যায় রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, তখনকার দিনে সারা বিশ্বে মানুষ কেবল একটি ভাষাতেই কথা বলত এবং তাদের শব্দগুলো ছিল একই। পরে তারা পূর্ব দিকে এগিয়ে যেতে যেতে ব্যাবিলন দেশে একটা সমভূমি পেয়ে সেখানেই বাস করতে লাগল।...

তারা বলল, ‘এসো, আমরা নিজেদের জন্য একটা শহর তৈরি করি এবং এমন একটি উঁচু ঘর তৈরি করি, যার চূড়া গিয়ে আকাশে ঠেকবে।...

মানুষ যে শহর ও উঁচু ঘর তৈরি করছিল, তা দেখার জন্য মাবুদ নেমে এলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘এরা একই জাতির লোক এবং এদের ভাষাও এক; সে জন্যই এই কাজে তারা হাত দিয়েছে। নিজেদের মতলব হাসিল করার জন্য এরপর এরা আর কোনো বাধাই মানবে না। কাজেই এসো, আমরা নিচে গিয়ে তাদের ভাষায় গোলমাল বাধিয়ে দিই যাতে তারা একে অন্যের কথা বুঝতে না পারে।

তারপর মাবুদ সেই জায়গা থেকে তাদের সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিলেন। এতে তাদের শহর তৈরির কাজও বন্ধ হয়ে গেল। এ জন্য সেই জায়গার নাম হলো ব্যাবিলন, কারণ সেখানেই মাবুদ সারা দুনিয়ায় ভাষার মধ্যে ‘গোলমাল বাধিয়ে দিয়েছিলেন’।

মূল তৌরাত শরিফে এ কথাগুলো কেমন করে ছিল তা আজ আমাদের পক্ষে বলা সম্ভব হবে না। তবে বাইবেল সোসাইটি অনূদিত ও প্রচারিত এ তৌরাত শরিফ নিঃসন্দেহে স্রষ্টার প্রতি বিদ্বেষমূলকভাবে তৈরি করেছে। বান্দারা কী শহর ও ঘরবাড়ি তৈরি করেছে তা দেখার জন্য আল্লাহর নিচে নেমে আসার প্রয়োজন নেই। আর ‘এসো, আমরা নিচে গিয়ে তাদের ভাষায় গোলমাল বাধিয়ে দিই’ এমন বাক্য আল্লাহর হতে পারে না। ‘গোলমাল’ একটি নেতিবাচক শব্দ, আল্লাহ এভাবে কথা বলবেন না। আর শেষ লাইনটিও আপত্তিকর মন্তব্য দ্বারা পূর্ণ। বলা হয়েছে, ‘মাবুদ সারা দুনিয়ায় ভাষার মধ্যে গোলমাল বাধিয়ে দিয়েছিলেন।’ এ লাইন পড়ে আল্লাহ বা মাবুদের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা হবে না, বরং নেতিবাচক ধারণা জন্ম নেবে। ভাষা প্রসঙ্গে তৌরাত শরিফের নামে এ ভাষ্য বিভ্রান্তিমূলক।

এরপর আমরা দেখতে পারি ভাষা প্রসঙ্গে ইঞ্জিল শরিফের ভাষ্য। ইঞ্জিলের করিন্থীয় ভাষ্যে যিশু বলছেন-

১. আমি যদি মানুষের এবং ফেরেশতাদের ভাষায় কথা বলি, কিন্তু আমার মধ্যে মহব্বত না থাকে, তবে আমি জোরে বাজানো ঘণ্টা বা ঝনঝন করা করতাল হয়ে পড়েছি। যদি নবী হিসেবে কথা বলার ক্ষমতা আমার থাকে, যদি আমি সব গোপন সত্যের বিষয় বুঝতে পারি, আর যদি আমার সব রকম জ্ঞান থাকে, ... কিন্তু আমার মধ্যে মহব্বত না থাকে, তবে আমার কোনোই মূল্য নেই। [ইঞ্জিল শরিফ, সপ্তম খ-, করিন্থীয় ভাষ্য, সূত্র: কিতাবুল মোকাদ্দস, বাংলাদেশ বাইবেল সোসাইটি, ঢাকা, ২০০৬, পৃষ্ঠা ২৪২-২৪৩]।

২. ... অন্য কোনো ভাষায় যে লোক কথা বলে, সে মানুষের কাছে কথা বলে না কিন্তু আল্লাহর কাছে কথা বলে, কারণ কেউ তা বুঝতে পারে না। [সূত্র: পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ২৪৩]।

৩. আমি চাই যেন তোমরা সবাই বিভিন্ন ভাষায় কথা বলতে পারো, কিন্তু আরও বেশি করে চাই যেন তোমরা নবী হিসেবে কথা বলতে পারো। [সূত্র: পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ২৪৬]।

৪. অন্য কোনো ভাষায় যে লোক কথা বলে, জামাতের লোকদের গড়ে তোলার জন্য যদি সে তার কথার মানে বুঝিয়ে না দেয়, তবে তার চেয়ে নবী হিসেবে যে কথা বলে সে-ই বরং বড়। [সূত্র: পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ২৪৩]।

৫. এ জন্য অন্য কোনো ভাষায় যে লোক কথা বলে, সে মোনাজাত করুক যেন তার মানে সে বুঝিয়ে দিতে পারে। [সূত্র: পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৪]।

৬. আমি যদি অন্য কোনো ভাষায় মোনাজাত করি, তবে আমার রুহই মোনাজাত করে, কিন্তু আমার মন কোনো কাজ করে না। [সূত্র: পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ২৪৩]।

৭. ...তা না হলে যদি তুমি রুহে আল্লাহকে শুকরিয়া জানাও, তবে সেই ভাষা বুঝতে পারে না এমন কোনো লোক যদি সেখানে উপস্থিত থাকে, তবে সে কেমন করে তোমার শুকরিয়ায় আমিন বলে সায় দেবে? সে তো জানে না তুমি কী বলছ। [সূত্র: পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ২৪৩]।

৮. আমি তোমাদের সবার চেয়ে বিভিন্ন ভাষায় কথা বলতে বেশি পারি বলে আল্লাহকে শুকরিয়া জানাই। তবে জামাতের মধ্যে বিভিন্ন ভাষায় হাজার হাজার কথা বলার বদলে অন্যদের শিক্ষা দেয়ার জন্য আমি বুদ্ধি দিয়ে বরং মাত্র পাঁচটি কথা বলব। [সূত্র: পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ২৪৩]।

৯. ...ইমানদারদের জন্য বিভিন্ন ভাষায় কথা বলা কোনো চিহ্ন নয়, বরং অ-ইমানদারদের জন্য ওটা একটা চিহ্ন। [সূত্র: পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ২৪৪]।

১০. জামাতের সব লোক এক জায়গায় মিলিত হলে পর যদি সবাই বিভিন্ন ভাষায় কথা বলতে থাকে আর তখন সেই জামাতের বাইরের লোকেরা এবং অ-ইমানদাররা ভিতের থাকে, তবে কি তারা তোমাদের পাগল বলবে না। [সূত্র: পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ২৪৪]।

ইঞ্জিল শরিফের এ যুক্তিগুলোর কোনো ব্যাখ্যা এই গ্রন্থে নেই। ফলে ভাষা বিষয়ে এখানকার উপস্থাপিত জটিল বাক্যগুলোর প্রকৃত তাৎপর্য বের করা যাচ্ছে না। শুধু এটুকু বলা যায় অথবা ভাবা যায়, বিভিন্ন রকম ভাষা সেই প্রাচীন আমলেই বিশ্বে ছিল।

পবিত্র কোরআনেও ভাষা প্রসঙ্গে নানা আয়াত রয়েছে। প্রথমে আমরা দেখব ৩০ নম্বর সুরা রুমের ২২ নম্বর আয়াত। এতে বলা হচ্ছে, তার (আল্লাহর) নিদর্শনাবলির মধ্যে অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে, আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের (মানুষের) ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। এতে জ্ঞানী লোকদের জন্য অবশ্যই দৃষ্টান্ত রয়েছে।

অন্যত্র সুরা ইব্রাহিমের ৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছ- আমি (আল্লাহ) প্রত্যেক রাসুলকেই তার স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি, তারা (রাসুলরা) যাতে (আমার কথা) তাদের (লোকদের) কাছে ব্যাখ্যা করতে পারে।... আল্লাহই শক্তিমান ও তত্ত্বজ্ঞানী।

নবী মোহাম্মদ (সা.)-এর জামানার কোরআনের তাফসিরকার আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) প্রথমে উদ্ধৃত সুরা রুমের আয়াতটির ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, ... এবং তার একত্ববাদ ও কুদরতের নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা যেমন আরবি, ফারসি ইত্যাদি ও বর্ণের বৈচিত্র্য, যেমন লাল, কালো ইত্যাদি। [তাফসিরে ইব্ন আব্বাস, তৃতীয় খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, ২০০৭, পৃষ্ঠা ২৪-২৫]।

বর্তমান জামানার কোরআনের তাফসিরকার মুফতি শাফী (র.) এ আয়াতের তাফসিরে উল্লেখ করেছেন, খোদারী কুদরতের তৃতীয় নিদর্শন... হচ্ছে, আকাশ ও পৃথিবী সৃজন, বিভিন্ন স্তরের মানুষের বিভিন্ন ভাষা ও বর্ণনাভঙ্গি এবং বিভিন্ন স্তরের বর্ণবৈষম্য, যেমন কোনো স্তর শ্বেতকায়, কেউ কৃষ্ণকায়, কেউ লালচে এবং কেউ হলদেটে। এখানে আকাশ ও পৃথিবী সৃজন তো শক্তির মহানিদর্শন বটেই, মানুষের ভাষার বিভিন্নতাও কুদরতের এক বিস্ময়কর লীলা। ভাষার বিভিন্নতার মধ্যে অভিধানের বিভিন্নতাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আরবি, ফারসি, হিন্দি, তুর্কি, ইংরেজি ইত্যাদি কত বিভিন্ন ভাষা আছে। এগুলো বিভিন্ন ভূখণ্ডে প্রচলিত। তন্মন্ধে কোনো কোনো ভাষা পরস্পর এত ভিন্নরূপ যে এদের মধ্যে পারস্পরিক কোনো সম্পর্ক আছে বলেই মনে হয় না।

স্তর ও উচ্চারণভঙ্গির বিভিন্নতাও ভাষায় বিভিন্নতার মধ্যে শামিল। আল্লাহতায়ালা প্রত্যেক পুরুষ, নারী, বালক ও বৃদ্ধের কণ্ঠস্বরে এমন স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টি করেছেন যে একজনের কণ্ঠস্বর অন্যজনের কণ্ঠস্বরের সঙ্গে পুরোপুরি মিল রাখে না। কিছু না কিছু পার্থক্য অবশ্যই থাকে।...

আধুনিক জামানার কোরআন তাফসিরকার মুফতি মুহাম্মদ শাফী (র.) তার তাফসিরে উল্লেখ করেন, বিশ্বের জাতিসমূহের মধ্যে শত শত ভাষা প্রচলিত রয়েছে। এমতাবস্থায় সবাইকে হেদায়েত করার দুটি মাত্র উপায় সম্ভবপর ছিল। এক. প্রত্যেক জাতির ভাষায় পৃথক পৃথক কোরআন অবতীর্ণ হওয়া এবং রাসুলুল্লাহ পৃথক পৃথক শিক্ষাও তদ্রূপ প্রত্যেক জাতির ভাষায় ভিন্ন ভিন্ন হওয়া। আল্লাহর অপার শক্তির সামনে এরূপ ব্যবস্থাপনা মোটেই কঠিন ছিল না, কিন্তু বিশ্ববাসীর জন্য তাদের মাধ্যমে হাজারো মতবিরোধ সত্ত্বেও ধর্মীয়, চারিত্রিক ও সামাজিক ঐক্য ও সংহতি স্থাপনের যে মহান লক্ষ্য অর্জন করা উদ্দেশ্য ছিল, এমতাবস্থায় তা অর্জিত হতো না।...

তাই দ্বিতীয় পন্থাটিই অপরিহার্য হয়ে পড়ে। তা এই যে কোরআন একই ভাষায় অবতীর্ণ হবে এবং রাসুলের ভাষাও কোরআনের ভাষা হবে। এরপর অন্যান্য দেশীয় ও আঞ্চলিক ভাষায় এর অনুবাদ প্রচার করা হবে। [পবিত্র কোরআনুল করিম, মুফতি শাফী (র.)-এর তাফসির, মদিনা মোনাওয়ারা, ১৪১৩ হিজরি, পৃষ্ঠা ৭১১-৭১২]।

মানুষকে আল্লাহতায়ালা ভাব প্রকাশ করতে ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন তার কথা কোরআনের আরও নানা সুরায় প্রকাশিত হয়েছে। সুরা আর-রহমানের প্রথমেই আল্লাহতায়ালার বর্ণনা: পরম করুণাময় আল্লাহ। তিনিই কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষ। তিনি তাকে ভাব প্রকাশ করতে শিখিয়েছেন। [অনুবাদ বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান: কোরানশরিফ সরল বঙ্গানুবাদ, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, ২০০২ সংস্করণ, পৃষ্ঠা ৪০৩]।

মুফতি শাফী (র.)-এর তাফসির করেছেন আরও ব্যাপকভাবে। তিনি উল্লেখ করেছেন, মানব সৃষ্টির পর অসংখ্য অবদান মানবকে দান করা হয়েছে। তন্মধ্যে এখানে বিশেষভাবে বর্ণনা শিক্ষাদানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।... প্রথমে কোরআন শিক্ষা ও পরে বর্ণনা শিক্ষার উল্লেখ করা হয়েছে।

... এখানে বর্ণনার অর্থ ব্যাপক। মৌখিক বর্ণনা, লেখা ও চিঠিপত্রের মাধ্যমে বর্ণনা এবং অন্যকে বোঝানোর যত উপায় আল্লাহতায়ালা সৃষ্টি করেছেন, সবই এর অন্তর্ভুক্ত। বিভিন্ন ভূখণ্ড ও বিভিন্ন জাতির বিভিন্ন ও বাকপদ্ধতি সবই এই বর্ণনা শিক্ষার বিভিন্ন অঙ্গ...। [মুফতি শাফী (র.)-এর তাফসির, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ১৩১৬-১৩১৭]।

ধর্মগ্রন্থে ভাষা প্রসঙ্গের আয়াতগুলো এবং এর তাফসির চমকপ্রদ। এতে ভাষা প্রশ্নে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের মহত্ত্ব ও বিজ্ঞানমনষ্কতাকে উপলব্ধি করা সম্ভব হয়। সারা দুনিয়ায় একটিমাত্র ভাষা না হয়ে, জাতি ও সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভিন্ন ভাষার জন্মের রহস্যটিও মানবজাতির ইতিহাসের সঙ্গেই সংযুক্ত। ধর্মগ্রন্থই পৃথিবীর মধ্যে বিভিন্ন ভাষার বাস্তবতাকে মানুষের সামনে তুলে রয়েছে, যা মানবজাতির জন্য কল্যাণকর হয়েছে।

লেখক: ইতিহাসবিদ ও গবেষক


এক টাকার চিকিৎসক: উত্তম সেবাব্রত

আপডেটেড ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ ০৮:৩৩
এম এ মান্নান

কয়েক দিন ধরেই ফেসবুক এবং পত্রপত্রিকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন এক টাকার চিকিৎসক-খ্যাত রাজশাহীর সুমাইয়া বিনতে মোজাম্মেল। তিনি একজন এমবিবিএস চিকিৎসক। মাত্র এক টাকার বিনিময়ে নিয়মিত রোগী দেখছেন একটি ফার্মেসিতে বসে। যেখানে আমাদের দেশের চিকিৎসকদের কিছু ক্ষেত্রে নেতিবাচক হিসেবে দেখা হয়, কোনো কোনো চিকিৎসককে খেদোক্তি করা হয় কষাই হিসেবে, সেখানে এক টাকার চিকিৎসক বা বিনা পয়সার চিকিৎসক আমাদের আশ্বস্ত করে, প্রাণিত করে। গরিবরা ভরসা পায় চিকিৎসা নিতে।

একজন মানুষের ইচ্ছাশক্তিই যে বিশাল বড় একটি শক্তি, তার প্রমাণ আঁচ করা যায় সুমাইয়া বিনতে মোজাম্মেলের বাবার চিন্তাচেতনায়। যতদূর জানা যায়, সুমাইয়ার বাবা-মায়ের একসময় স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হওয়ার, মানুষকে সেবা দেয়ার। কিন্তু তারা কেউই চিকিৎসক হতে পারেননি। তবে হালও ছাড়েননি। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তাদের ঘরে যে সন্তান জন্ম নেবে তাদের চিকিৎসক বানাবেন। আর তাই পরপর তাদের তিন কন্যাসন্তানকে চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে পড়ালেন। আর তিন কন্যাসন্তানই চিকিৎসক হয়ে গেলেন। এ যেন রূপকথার গল্প। আলাদিনের চেরাগ। কাজ শুধু একটু ঘষা দেয়া, ব্যস।

তবে সুমাইয়া বিনতে মোজাম্মেলের এই এক টাকার চিকিৎসক হয়ে যাওয়াকে নানাজন নানাভাবে দেখছেন। কেউ কেউ এটাকে নেতিবাচক হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন এক টাকার চিকিৎসক সেজে সস্তায় জনপ্রিয়তা অর্জন করছেন। যা তাড়াতাড়ি সামাজিক মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব। সুমাইয়ার এই এক টাকার চিকিৎসক হওয়া নিয়ে সমাজে যে ইতিবাচক এবং নেতিবাচক মন্তব্য হচ্ছে, এ কথা স্বীকারও করেছেন সুমাইয়ার বাবা। কিন্তু আমরা চিকিৎসার মতো একটা মহৎ পেশাকে খুব সহজেই নেতিবাচক হিসেবে দেখতে চাই না। কারণ আর যা-ই হোক, এটা একটা মহৎ পেশা, সেবাধর্মী পেশা এবং জীবনঘনিষ্ঠ পেশা। এই পেশা নিয়ে প্রতারণা করা যায় না। আর এই পেশা যেহেতু তাদের পারিবারিক চিন্তাচেতনায় ছিল, তাই এটাকে নেতিবাচক হিসেবে নেয়া সমীচীন মনে করি না। আর এ দেশে শুধু সুমাইয়া একাই যে এক টাকার চিকিৎসক হয়েছেন, সেটাও না। এ দেশে আরও অনেক এক টাকার চিকিৎসক বা বিনা পয়সার চিকিৎসক বা কম টাকার চিকিৎসক ছিলেন বা আছেন। শুধু তা-ই নয়, বিনা পয়সায় বা কম পয়সার বিনিময়ে চিকিৎসা দিয়ে তারা তাদের জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করেছেন মানুষ সেবার ব্রত নিয়ে।

দেশে যখন সবকিছুর দাম হু হু করে বাড়ছে এবং অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে, তখন যদি শুনি যে বিনা পয়সায় বা মাত্র এক টাকার বিনিময়ে জীবন রক্ষাকারী একটি সেবা পাওয়া যায়, তখন সন্তোষ প্রকাশ না করাটাও যেন কৃপণতা। সত্যিকার অর্থেই দেশের নিম্নবিত্তের মানুষ এখন নিজের জীবন বাঁচাতেই হিমশিম খাচ্ছে। তাই এখন পেট বাঁচাতে খাদ্যসামগ্রী না কিনে চিকিৎসায় অর্থ ব্যয় করা যে তাদের সাধ্যের অতীত, তা উপলব্ধি করা যায় সহজেই। আর তাই এই দুঃসময়ে মানবহিতৈষী মহৎ কাজে যারা ব্রতী হয়েছেন, তাদের প্রতি আমাদের অকুণ্ঠ ভালোবাসা, অভিনন্দন।

আজ আমরা এক টাকার বা বিনা টাকার আরও কিছু সেবার কথা জানব। জানব আরও মানুষের মহৎ উদ্দেশ্যের কথা। যারা এই মহৎ কাজে ব্রতী থেকে জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করেছেন।

আমরা ভুলে যাইনি ময়মনসিংহের জয়নাল আবেদিনের কথা। তিনি এক টাকার চিকিৎসক বা বিনা পয়সার চিকিৎসক নন, তিনি তার থেকে আরও অনেক বেশি। কারণ রিকশা চালিয়ে তিনি একটি হাসপাতালই নির্মাণ করেছেন। যেখানে বিনা পয়সায় চিকিৎসা পাওয়া যায়। শুধু তা-ই নয়, এই জয়নাল রিকশা চালিয়ে খেয়ে না-খেয়ে টাকা জমিয়ে এলাকায় হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা ছাড়াও স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদ নির্মাণ করেছেন। তার এসব প্রতিষ্ঠার নেপথ্যের কাহিনি শুনলে আবেগতাড়িত হবেন। মনের অজান্তেই সিক্ত হবে দুই চোখ, গুমরে কেঁদে উঠবেন।

২০১১ সালের দিকের কথা। দৈনিক প্রথম আলোতে তাকে নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন করায় তিনি ব্যাপক প্রচারে উঠে আসেন। নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার বিটিভির ‘চেনাজানা’ অনুষ্ঠানেও তাকে নিয়ে এসেছিলেন। একজন মানুষ কতটুকু কষ্টসহিষ্ণু হতে পারেন, তা প্রকাশ পেয়েছিল ওই অনুষ্ঠানে এবং প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদনে। তিনি অশিক্ষিত ছিলেন। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট করে দিয়েছিলেন এক ভদ্র লোক। রাত-দিন রিকশা চালাতেন। ব্যাংকে টাকা জমাতেন। একসময় ব্যাংক থেকে টাকা তুলে বাড়ি গেলেন, জমি কিনলেন, মাকে বললেন, হাসপাতাল বানাবেন। গ্রামের মানুষ বলতে লাগলেন জয়নালের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। সেই জয়নাল একে একে প্রতিষ্ঠা করলেন হাসপাতাল, মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল। এটাও যেন রূপকথার গল্পের মতোই, আলাদিনের চেরাগের মতোই। শুধু একটি জীবন তিলে তিলে শেষ হয়ে গেছে। আর মানুষ দিনে দিনে চিকিৎসা পাচ্ছে, শিক্ষা পাচ্ছে, নামাজের জন্য মসজিদ পাচ্ছে, আল্লাহর নৈকট্য লাভে ব্রতী হচ্ছে। জয়নালের হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার নেপথ্যের কাহিনি আরও হৃদয়বিদারক, আরও করুণ। যা একাত্তরের দুঃসহ স্মৃতি। যা এই ছোট্ট পরিসরে তুলে ধরা সম্ভব নয়।

জয়নালকে প্রশ্ন করা হয়েছিল ‘এই যে আপনি রিকশা চালিয়ে এত কিছু করলেন আপনার অনেক বয়স হয়েছে শরীরও দুর্বল, এখনো রিকশা চালান তো আপনার কষ্ট হয় না, ভালো কিছু খেতে মন চায় না?’ জয়নালের উত্তর ছিল, ‘রিকশা না চালালে হাসপাতালের রোগীরা ওষুধ পাবে কোথা থেকে। আর আমি যদি ভালো কিছু খাই তাহলে ওষুধ কিনব কীভাবে। আমি যখন ভালো কিছু খেতে চাই, তখন আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে রোগীর ছবি। আমি আর ভালো কিছু খেতে পারি না। তাই শুকনো রুটি খেয়ে টাকা বাঁচাই, রোগীর জন্য ওষুধ কিনি।’ এই মহৎ মানুষটি ‘সাদামনের মানুষ’-এর খ্যাতি পেয়েছিলেন, পেয়েছিলেন অনেক সম্মান-সংবর্ধনা এবং সম্মাননা।

কথায় বলে নিজের বুঝ নাকি পাগলেও বোজে। কিন্তু এই পৃথিবীতে কিছু পাগল আছেন যারা নিজের বুঝও বুঝতে পারেন না বা বুঝতে চান না। আর তারা নিজের বুঝটা বুঝবেনই বা কী করে। কারণ তারা তো জন্মই নিয়েছেন পরের বুঝ বুঝতে, পরের জন্য করতে, অতঃপর পরের জন্যই মরতে। তেমনি একজন পরের জন্য করতে এবং মরতে নিবেদিতপ্রাণ মানুষ হলেন নিউজিল্যান্ডের ডা. এড্রিক বেকার।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ-পাকিস্তানের যুদ্ধের খবর তিনি জানতেন। যুদ্ধে নিহত বাঙালিদের বীভৎস ছবি দেখে তিনি আঁতকে উঠতেন। ব্যথিত হতেন। তখন থেকেই তার স্বপ্ন ছিল তিনি বাংলাদেশে আসবেন। দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়াবেন। অবশেষে ১৯৮৯ সালে তিনি বাংলাদেশে আসেন। টাঙ্গাইলের মধুপুরের কালিয়াকুড়ি গ্রামে সাড়ে চার একর জমি নিয়ে হাসপাতাল তৈরি করে গরিব মানুষের চিকিৎসাসেবা চালু করলেন। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তার চিকিৎসার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। তিনিও হয়ে গেলেন গরিবের চিকিৎসক। তার নিজ দেশ নিউজিল্যান্ড থেকে টাকা আনতেন, বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে সাহায্য আনতেন, আর এ দেশের অসহায় গরিব-দুস্থ মানুষের তিনি সেবা করতেন। এভাবেই তিনি সেবা করতে করতে বাংলাদেশে কাটিয়ে দিলেন ৩২টি বছর। এরই মধ্যে তিনি আক্রান্ত হয়ে যান দুরারোগ্য এক মরণব্যাধিতে। তাকে হাসপাতাল থেকে অন্যত্র সরিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে চাইলে তাতে তিনি নাকি রাজি হননি। তিনি চেয়েছিলেন যেখানে জীবনের বড় সময়টা বিনা পয়সায় মানুষের সেবা করে কাটিয়ে দিয়েছেন সেখানেই তার মৃত্যু হোক। হলোও তাই। তবে মৃত্যুর আগে তার শেষ চাওয়াটি পূরণ হয়নি। তিনি চেয়েছিলেন কোনো বাঙালি চিকিৎসক তার হাসপাতালের দায়িত্ব গ্রহণ করুক এবং হাসপাতাল পরিচালনা করুক। কিন্তু তার সেই আশাটি পূরণ হয়নি। বাংলাদেশের কোনো চিকিৎসক তার ডাকে সাড়া দেননি। কেউ দায়িত্ব নেননি হাসপাতাল পরিচালনার। অবশেষে তার ডাকে সারা দিয়েছেন আমেরিকার এক চিকিৎসক দম্পতি। তারাও সবকিছু ছেড়ে চিকিৎসার ব্রত নিয়ে বাংলাদেশের গরিব-দুস্থদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।

আজ আমরা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের আরেকজন চিকিৎসকের কথা বলব। তিনিও এক টাকার চিকিৎসক হিসেবে ব্যাপক খ্যাতি পেয়েছিলেন। তার নাম সুশোভন বন্দ্যোপাধায়। তিনি জন্মেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমে ১৯৩৯ সালে। অনেক বড় মাপের চিকিৎসক ছিলেন তিনি। এই চিকিৎসক প্রায় ৬০ বছর মানুষকে সেবা দিয়েছেন বিনা পয়সায় বা এক টাকায়। যখন করোনার ভয়ে বাবা ছেলেকে, ছেলে বাবাকে, মা মেয়েকে, মেয়ে মাকে এবং স্বামী স্ত্রীকে, আর স্ত্রীকে ফেলে পালিয়ে যেত, তখন এই এক টাকার চিকিৎসক নিজে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পরও অসহায় গরিবদের চিকিসা থেকে বঞ্চিত করেননি। বরং সকাল থেকে গভীর রাত অবধি রোগী দেখেছেন। এই মহৎ চিকিৎসকও গত বছরের ২৬ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন।

‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য’- এর চেয়ে চিরসত্য পৃথিবীতে আর কিছু নেই। তাই তো এই সব মহৎপ্রাণ মানুষ মানুষের জন্য সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, নিজের জীবনকে করেছেন উৎসর্গ। আমরা এমন মহৎ চিকিৎসকদের জানাই অন্তর থেকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক


banner close