রোববার, ৩ মে ২০২৬
২০ বৈশাখ ১৪৩৩
স্মরণ

হুমায়ুন আজাদ: জোনাক জ্বলা এক স্ফুলিঙ্গ

হাবীব ইমন
প্রকাশিত
হাবীব ইমন
প্রকাশিত : ১২ আগস্ট, ২০২৩ ০৮:৪৫

লোকটা স্বভাবে ছিলেন ঠোঁটকাটা- যেটা ন্যায্য ও সঠিক মনে করেছেন, সেটা বলতে কোনো দ্বিধা ছিল না তাঁর। এতে কে কী বলল, তাতে কিছু ভাবতেন না। কোনো রক্তচক্ষুকে তিনি পরোয়া করতেন না। লক্ষ্য ও সংকল্পে অটল থাকা তাঁর চরিত্রের বড় গুণ। আজীবন গতানুগতিক চিন্তাধারাকে পরিহার করেছেন তিনি, প্রথাবিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। আঘাত করেছেন অভ্যস্ত ভাবনার ছকে। আস্থা রেখেছিলেন পুরোনো বিশ্বাসে নয়, বাঙালির সংস্কৃতির শাশ্বত শক্তি আর অগ্রগমনে। কিন্তু তাঁর নামটি আজ অনেকের কাছে বিস্মরণ- যার কথা বলছি- হুমায়ুন আজাদ তিনি; আজও তিনি প্রাসঙ্গিক। তাঁর মতো কজন জোরালো ভঙ্গিমায় কথা বলেন? তাঁর সৃষ্টিকর্মে ভাষা, চিন্তা, বিজ্ঞান, সমসাময়িক থেকে রাজনৈতিক, সাহিত্য, মুক্তবুদ্ধি চর্চা, ধর্মান্ধতা, প্রতিষ্ঠান, সংস্কারবিরোধিতা, নারীবাদ সব বিষয়ই এসেছিল। ধর্মান্ধতা, উগ্রতা, ভণ্ডামির বিরুদ্ধে তিনি আজীবন সোচ্চার ছিলেন। এর ফলে তাঁর ওপর হামলা হয়েছে।

প্রচলিত সমাজের কাঠামোয় আঘাত করেছেন তিনি। কুসংস্কার ও ধর্মীয় বাড়বাড়ন্তে নিশঙ্কে কলম ধরেছিলেন। বাংলা ভাষা-সাহিত্যে পুরোনো প্রথা ভেঙে নতুনভাবে দাঁড় করাতে চেয়েছেন। বিভিন্ন অনাচারের বিরুদ্ধে কবিতায় বা প্রবন্ধে শানিত করেছেন। মাথা নত করেননি তিনি। তাঁর বিবেচনায় যা ভালো, সেটাই গ্রহণ বা মেনে নিয়েছেন। অন্য ক্ষেত্রে বিরোধিতা করেছেন কিংবা বাতিল করেছেন। এখানেই হুমায়ুন আজাদ ‘অনন্য’।

সেই উগ্রবাদীদের বিরুদ্ধে লেখার কারণে ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমি থেকে বেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিজের বাসায় ফেরার পথে দুবৃর্ত্তরা তাঁর ওপর হামলা করে। সেই বছরই ১১ আগস্ট রাতে একটি অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে হঠাৎই শরীর খারাপ হয়ে গেল তাঁর। কিছুক্ষণের মধ্যেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। এই মানুষটা মাত্র ৮০ বছর আয়ু চেয়েছিলেন, ৫৭ বছরেই তাঁর জীবনপ্রদীপ নিভে গেল।

কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, কবি, ভাষাবিজ্ঞানী, বহুমাত্রিক হিসেবে হুমায়ুন আজাদের তুলনা নেই। ক্ষণজন্মা এ মহান মানুষটি বাংলা সাহিত্যকে অনেক দিয়েছেন। এ জগতে তিনি নিজের সঙ্গেই যুদ্ধ করেছেন। তাঁর প্রয়াণে হয়তো তিনি শারীরিকভাবে বিলীন হয়েছেন, কিন্তু তাঁর আদর্শ- তাঁর সৃষ্টিকর্ম চিরকাল থাকবে। বাকস্বাধীনতা ও অন্যায়ের প্রতিবাদে তিনি আমাদের প্রেরণা। উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন দীপ্তিমান আলোকশিখা হয়ে।

হুমায়ুন আজাদ বাংলা ভাষায় বিরলপ্রজ প্রতিভা। প্রবন্ধ ও গবেষণার ক্ষেত্রে বাংলা সাহিত্যে যা দিয়েছেন, তাঁকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি অনেকে। শুদ্ধ ভাষার দখল ও তার সুষ্ঠু প্রয়োগ দেখানোর মতো লোক ছিলেন তিনি। তাঁর মতো ক্ষণজন্মা ভাষাবিজ্ঞানী বাংলা ভাষা কবে পাবে কিংবা আদৌ পাবে কি না, সন্দেহ আছে!

কোথা থেকে বাংলা ভাষা এল, তা জানাতে লিখলেন, ‘কত নদী সরোবর বা বাঙলা ভাষার জীবনী’। বই হাতে নিয়ে বইটির নাম পড়লেই বোঝা যায় নদীবিধৌত এই পলিদ্বীপের ভাষা কত না চড়াই-উতরাই পার করে আজকের এই রূপ লাভ করেছে। শুধু কি তাই, আপন মর্যাদা লাভ করতেও কি এ ভাষাকে বুকের রক্ত ঝরাতে হয়নি। এ ভাষায় মণিমাণিক্যের মতো যেসব সাহিত্য রচনা হয়েছে এই ভূখণ্ড জন্মগ্রহণ করার ফলে, এই ভাষায় কথা বলার ফলে নতুন প্রজন্ম যে সাহিত্য উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছে, তা জানাতে লিখলেন- ‘লাল নীল দীপাবলি বা বাঙলা সাহিত্যের জীবনী। এমন একেকটি প্রদীপ জ্বালিয়ে দিয়েছেন আমাদের অস্থি-মাংসে-মজ্জায়, তার বদৌলতেই তো আমরা নিজেদের বাঙালি বলে চিনতে পারি, গৌরববোধ করতে পারি। নব্বইয়ের দশকের শেষে দিকে বাংলা ভাষার ওপর একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণ রচনার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন হুমায়ুন আজাদ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি।

বহুমাত্রিক লেখক হুমায়ুন আজাদের জন্ম ১৯৪৭ সালের ২৮ এপ্রিল। তাঁর জন্মনাম ছিল হুমায়ুন কবীর। তিনি মুন্সীগঞ্জের যে গ্রামে বাস করতেন, সেটি আগে থেকেই বিখ্যাত- এখানে জন্মেছিলেন বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু। ওই গ্রামের নাম রাঢ়িখাল। তাঁর জন্ম কামারগাঁও। কিন্তু রাঢ়িখালকে মনে করতেন তাঁর জন্মগ্রাম। গ্রামটি পানির গ্রাম নামেও পরিচিত ছিল। কেননা, ওই গ্রামে ছিল অনেক পুকুর। বর্ষাকালে পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠত। তখন গ্রামটিকে পানির ওপর ভাসতে থাকা কচুরিপানার মতো মনে হতো। রাঢ়িখালের কাছেই পদ্মা নদী। রাতের বেলায় নদীতে স্টিমার চলত। তিনি তন্ময় হয়ে শুনতেন। তিনি লিখেছেন, স্টিমারের আওয়াজ আমার কাছে অলৌকিক মনে হতো। তাই আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম ‘অলৌকিক স্টিমার’।

ছোটবেলায় হুমায়ুন আজাদ যে ঘরে পড়তেন, তার সামনে ছিল বিরাট একটা কদম ফুলগাছ। প্রতি বর্ষায় ফুলে ফুলে ভরে উঠত গাছটি। স্কুলে পড়ার সময় এই কদমগাছ নিয়েই তিনি একটি উপন্যাস লেখা শুরু করেন। এ লেখায় কোনো কাহিনি ছিল না। চরিত্র ছিল না। শুধু ছিল রূপের বর্ণনা। ছেলেবেলা থেকেই তিনি ছিলেন প্রকৃতিপ্রেমী। এ জন্য তাঁর প্রতিটি লেখার মধ্যে প্রকৃতিপ্রেমের বিষয়টি লক্ষ করা যায়। তিনি তাঁর ‘ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না’ বইয়ে লিখেছেন- ‘আমি একসময় ছিলাম- ছোট। ছিলাম গ্রামে, গাঁয়ে, যেখানে মেঘ নামে সবুজ হয়ে, নীল হয়ে, লম্বা হয়ে, বাঁকা হয়ে শাপলা ফোটে; আর রাতে চাঁদ ওঠে সাদা বেলুনের মতো। ওড়ে খেজুর ডালের অনেক ওপরে। যেখানে এপাশে পুকুর ওপাশে ঘরবাড়ি। একটু দূরে মাঠে ধান, সবুজ ঘাস, কুমড়োর হলদে ফুল। একটা খাল পুকুর থেকে বের হয়ে পুঁটিমাছের লাফ আর খলশের ঝাঁক নিয়ে চলে গেছে বিলের দিকে। তার ওপর একটা কাঠের সাঁকো, নড়োবড়ো। নিচে সাঁকোর টলোমলো ছায়া। তার নাম গ্রাম।’

হুমায়ুন আজাদ প্রকৃতির স্বাদ উপভোগ করতে পারতেন। আর উপভোগের এ বিষয়টি উপস্থাপন করতেন তাঁর লেখায়। আমাদের শহরে একদল দেবদূত বইয়ের এক জায়গায় তিনি লিখেছেন- ‘আমি বৃষ্টির শব্দ শুনতে পাই, মেঘের ডাক শুনতে পাই। উত্তরের আকাশকে অন্ধকার হয়ে যেতে দেখি। আমি দেখতে পাই রুপোর পাপড়ির মতো বৃষ্টি নামছে, টিনের চালে বেজে চলছে নূপুর, খেজুর গাছ নর্তকীর বাহুর মতো তার ডাল এদিক নাড়ছে ওদিক নাড়ছে। আমি দেখতে পাই সূর্য মোমবাতির মতো কোমল হয়ে গেছে, আকাশের এপার থেকে ওপার ভরে কালো কাঁথার মতো মেঘ বিছিয়ে আছে। এখনি আঁধার হবে বেলাটুকু পোহালে। আমার শরীর জুড়িয়ে আসে, মন জুড়িয়ে আসে।’

এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন- ‘শীতের শিশির, কুয়াশা, ঠাণ্ডা বাতাস, গ্রীষ্মের প্রচণ্ড রোদ, বর্ষার প্লাবন, ঝড় মেঘ, শরতের সোনা আর কার্তিকের কুয়াশা, ফাল্গুনের সবুজ পাতা আমার ভেতরে ঢুকে গেছে। আমার যেমন ভালো লাগত বোশেখের রোদ। তেমনি ভালো লাগত মাঘের ঠাণ্ডা।’ এ কথাগুলো যেন ফেলে আসা শৈশব। শৈশবের আনন্দ-বেদনার মহাকাব্য। লেখাগুলো পড়তে পড়তে গ্রামে ফিরে যাই। ঝাড়বাতির মতো পুকুরজুড়ে ফুটে থাকা কচুরিপানা ফুলের কাছে ফিরে যাই। শাপলা শালুক আর জোনাক জ্বলা সন্ধ্যার কাছে ফিরে যাই। টিনের চালে ঝুম বৃষ্টির মাতাল নৃত্য দেখি। বর্ষাকালে পুকুরের পানিতে ডুব দিয়ে বৃষ্টির সুরেলা ছন্দ শুনি। কাদার মধ্যে হুটোপুটি, লুটোপুটি, খুনসুটি আর জাম্বুরা নিয়ে বল খেলার মাতাল সময়ে ফিরে যাই। আসলেই কি ফেরা হয়? তাঁর বইগুলো পড়ার পর কখনো কখনো এমন হয়- বুকভরে বইয়ের মিষ্টি ঘ্রাণে শ্বাস নিতে ইচ্ছে করে। মনে হয় বুকপকেটে জোনাকি পোকা নিয়ে দেবদূত হয়ে ঘুরে বেড়াই খাল, বিল, মাঠ প্রান্তরে।

হুমায়ুন আজাদ শুধু গ্রাম নয়, শহর এবং শহুরে জীবন নিয়েও ভেবেছেন। শহরের কষ্ট, শহরের স্বপ্ন, শহরের ভালো লাগা, মন্দ লাগা, ভাব ভালোবাসা, প্রশ্ন, শঙ্কা প্রভৃতি বিষয় উঠে এসেছে তাঁর লেখায়। তিনি আমাদের শহরে একদল দেবদূত বইয়ে লিখেছেন- ‘আমাদের শহরকে আমরা আর কেউ ভালোবাসি না। খুব কষ্ট পাচ্ছি কথাটি বলতে; এত নিষ্ঠুর কথা আমি কখনো বলিনি। আমি জানি আমাদের শহর আমার কথা শুনতে পেলে খুব কষ্ট পাবে। আমার মতোই আর ঘুমোতে পারবে না। মনে মনে কাঁদবে। সত্যিই আমরা কেউ আর আমাদের শহরকে ভালোবাসি না। ভালোবাসি না বলে আমরা কেউ আর ঘুমোতেও পারি না। আমাদের শহর কি ভালোবাসে আমাদের? মনে হয় ভালোবাসে না। আমি আমাদের শহরের চোখের নিচে চোখের কোণে খুব কালো কালি দেখতে পাই। মনে হয় আমাদের শহরও আমাদের মতোই ঘুমোতে পারে না। ঘুমোতে পারলে কারও চোখে এত কালি জমে না। ভালোবাসলে কেউ এত ঘুমহীন থাকে না। অথচ আমাদের শহরকে ভালোবেসে বেসে আমরা বড় হয়েছি। ভালোবেসে বেসে কথা বলতে শিখেছি, গান গাইতে শিখেছি। ভালোবেসে ফুল চিনেছি, মাটি চিনেছি, ঘাস চিনেছি, মেঘ চিনেছি।’

হুমায়ুন আজাদ তাঁর লেখায় আশা করেছেন একদিন আমাদের শিশুরাই, দেবদূত রূপে আবির্ভূত হয়ে ঘুণে ধরা ব্যবস্থা ভেঙে তৈরি করবে নতুন দেশ, সমাজ, উড়বে নবকেতন, ধ্বনিত হবে নতুন জয়ধ্বনি। আর তার জন্য তিনি শিশুদের জন্য, কিশোরের জন্য লিখে গেছেন স্বপ্নের কথা, দেশ-জাতি-মানুষের কথা, তাদের বুকপকেটে পুরে দেন সোনালি ভবিষ্যতের স্বপ্ন, আলোকোজ্জ্বল জোনাকি পোকা। একটি সুস্থ, কল্যাণে পরিপূর্ণ বাংলাদেশ চেয়েছিলেন। সেটা আজও অধরা।

লেখক: সাংবাদিক


চাঁদাবাজ ও দখলদার উৎখাত করতে সবার সহযোগিতা চাই

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
মিজানুর রহমান

সরকার পরিবর্তন হলে চাঁদাবাজ ও দখলদার পরিবর্তন হয়। ভিন্ন নামে ভিন্ন রুপে দেখা মেলে এদের। সরকার পরিবর্তন এর সাথে সাথে টেম্পু স্ট্যন্ড, বাস টার্মিনাল, লঞ্চ টার্মিনালে দখলদার ও চাঁদাবাজ এর হাত বদল হয় অর্থাৎ দায়িত্ব হস্তান্তর হয় মাত্র।এই স্থাপনাগুলোতে ব্যাপক হারে চাঁদাবাজি হয়। চাঁদাবাজদের সাথে আলাপ করে যেটা জানা যায়, জিবির চাঁদা, টার্মিনাল চাঁদা, মালিক সমিতির চাঁদা, শ্রমিক কল্যান চাঁদা নামকরণ করে তা আদায় করা হয়।

বর্তমান সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল ইসলাম দায়িত্ব পাওয়ার পর সাংবাদিক সম্মেলনে তার বক্তব্যে বলেন পরিবহন খাতের টাকাটা সমঝোতার ভিত্তিতে তোলা হচ্ছে। জোর করে আদায় হচ্ছে না। এ জন্য এটিকে চাঁদা বলা যাচ্ছে না। মন্ত্রী নিজেই বলেছেন শ্রমিকের কল্যানের নামে কতটা কল্যাণে ব্যয় করা হয় তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং শ্রমিক সংগঠন যে দল ক্ষমতায় থাকে তারাই নিয়ন্ত্রণ করেন তা স্বীকার করেছেন তাহলে কোন সমঝোতার চাঁদা বলে উল্লেখ করেছেন সেটা নাগরিকদের কাছে বোধগম্য নয়। এখানে প্রশ্ন ওঠাটা তাই স্বাভাবিক যে মন্ত্রী কি সমঝোতা বলে চাঁদাবাজিকে বৈধতা দিলেন?

সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা বাংলাদেশের নাগরিকদের দুর্ভোগ ও ট্রাজেটির মূল কারণ। সড়কে প্রতিদিন গড়ে ২৫ জনের বেশি মানুষ নিহত হয় যাদের বেশির ভাগ তরুণ ও কর্মক্ষম। সড়কে এই মৃত্যুর মিছিল নিছক দুর্ঘটনা নয় বরং কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড। ২০২৪ সালে ট্রান্সপারেসি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি)গবেষণায় দেখা যায় ব্যাক্তিমালিকানাধীন বাস মিনিবাস থেকে বছরে ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয়।

…অতীতে নানা সময়ে পরিবহন খাতের চাঁদাবাজিকে বৈধতা দেওয়ার এক ধরনের চেষ্টা দেখা গেছে। যে দল ক্ষমতায় তাদের আর্শীবাদপুষ্ট পরিবহন মালিক শ্রমিক এই সেক্টর নিয়ন্ত্রণ নেয়। সড়ক পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রক রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বিআরটিএ ও পুলিশের সহিত সহযোগিতার অবৈধ সেতুবন্ধন গড়ে ওঠে। সড়কে বিশৃঙ্খলা পিছনে এই দুর্নীতিপুষ্ট সহযোগিতা ব্যবস্থা চাঁদাবাজিই মূল কারণ। এখানে গোষ্ঠীবদ্ধ স্বার্থের বলি হতে হয় নাগরিকদের।

…বিগত সরকারগুলোর সময়ে পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি বৈধতা দেওয়ার এক ধরনের চেষ্টা দেখা গেছে। নাগরিক সমাজের প্রতিবাদের মুখে সেটা বন্ধ হলে ও পরিবহন খাতের দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির হাত থেকে কোন সরকারই মুক্ত করার উদ্যোগ নেয়নি। পরিবহন খাতে পরিচালন ব্যয়ের বাহিরে চাঁদা কিংবা কল্যান যে নামে টাকা তোলা হউক না কেন তাতে জনগনের ঘারে বাড়তি ব্যয়ের চাপ এসে পড়ে। রাস্তায় রাস্তায় চাঁদার কারণে পরিবহন ভাড়ার সঙ্গে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। বাংলাদেশে যে নৈরাজ্য পরিবহন খাত তার ভুক্তভোগী চালক ও সহকারীরাও। আইন অনুযায়ী তাদের নিয়োগপত্র এবং মাসিক বেতন দেওয়া নিশ্চিত করাটাই সবচেয়ে বড় শ্রমিক কল্যাণ।
বাস্তবে চাঁদাবাজির টাকার অংশ বিভিন্ন জনের পকেটস্থ হয়। চাঁদাবাজের এহেন কর্মের কারণে সাধারণ পাবলিকের ভোগান্তির শেষ নেই।
চাঁদাবাজদের মূল আখড়া ফুটপাতগুলো অন্যতম। একেকটা ফুটপাত একেক জনের অথবা ভাগাভাগি করে দায়িত্ব পালন করে।অথচ রাজধানী ঢাকার ফুটপাত এক সময় ছিল হাঁটার জায়গা। এখন সে অবস্থা নেই চাঁদাবাজি দখলদারিত্ব আর রাজনৈতিক পুলিশি ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা এক অঘোষিত রামরাজত্ব যেন। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ অফিস আদালত, স্কুল কলেজ, হাসপাতালে কিংবা ব্যবসা বাণিজ্যের কাজে বের হন সেই শহরেই এখন হাঁটার পথ নেই, ফুটপাত ভরা দোকান রাস্তা ভরা ভ্যান মাঝখানে জ্যাম আর বিশৃঙ্খলা।
এই অবস্থার পেছনে অনেকে ভাবতে পারেন দারিদ্র্য বা জীবিকার তাগিদ নয়-রয়েছে একটি সুসংগঠিত কুচক্রীমহলের অর্থনীতি। বিভিন্ন গবেষণা ও সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দুটি সিটি করপোরেশন এলাকায় ফুটপাত দখল করে বছরে প্রায় এক হাজার ৮২৫ কোটি টাকা চাঁদা আদায় হয়। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে কয়েক কোটি টাকা লেনদেন। এই বিপুল অংকের টাকা কিন্তু একটি টাকা ও সরকারের কোষাগারে জমা হয় না।সবটায় ভাগ পায় সিন্ডিকেট, গডফাদার রাজনৈতিক প্রভাবশালী এবং অসাধু পুলিশ সদস্য।
… ঢাকা তেজগাঁও কলেজের সম্মুখে ও ওভার ব্রিজের আশেপাশের অবস্থা খুবই খারাপ। রাজধানীর সবচেয়ে ব্যস্ততম সড়কের সংযোজন

এখানে। মেট্রোস্টেশন, এ্যালিভেট এক্সপ্রেস এর বহি:গমন এবং চার রাস্তার মোড় এখানে। রাস্তাগুলো খুব সুন্দর করে সাজানো ছিল । সেটার কি বেহাল দশা? তেজগাঁও কলেজের সামনের রাস্তা ও ওভার ব্রিজের আশেপাশের ফুটপাত জুড়ে ঠাসাঠাসিভাবে দোকান সাজিয়ে বসে আছে। শাকসবজি, ফলমূল, মশলাপাতি, জুতার সারি, মোবাইল এক্সসরি আইটেম, কাপড় চোপড়, চা বিস্কিটের দোকান থেকে শুরু করে সবকিছুই আছে। দোকানদের ভাষ্য মোতাবেক দোকান প্রতি ২০০টাকা থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। সন্ধ্যার পর লাইনম্যান এসে টাকা নিয়ে যায়। টাকা না দিলে দোকান বসতে দেওয়া হয় না। লাইনম্যানের কালেকশন সমস্যা হলে ম্যানেজার আসে। ম্যানেজারকে গড ফাদারের সরাসরি সহচর বলা হয়। বিভিন্ন সময় এই দখল উচ্ছেদ করা হয়েছে অভিযান শেষে পুরোদমে আবার বসে যায়।
…গুলিস্তান এলাকায় দুপুর বেলায় গেলে মনে হবে এটি কোন সড়ক নয় বরং খোলা আকাশের নিচে গড়ে ওঠা বিশাল বাজার। সেখানকার ভিতরের রাস্তা গুলো একদম দখল হয়ে গেছে। অথচ ভিতরের রাস্তা গুলো দিয়ে ও গাড়ি চলাচল করত। এখন আর সে অবস্থা নেই। মেইন সড়কের অনেকাংশে দখল করে রাস্তার মাঝামাঝি চলে গেছে। কাপড়, জুতা, ব্যাগ আর নিত্যণ্যের সারি সারি পসরা বসানো হয়েছে এমনকি আখমাড়াই এর মেশিন বসিয়ে দিব্বি রস বিক্রি করছে। বাস চলাচল করাত দুরের কথা রিকশা চলাচল করা ও কঠিন হয়ে যাচ্ছে। কোনো সভ্য দেশে অমনটি আছে কিনা আমাদের জানা নেই। এখানে ও কয়েকবার উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে পরবর্তীতে যেই সেই অবস্থা। এদের সাথে আলাপ করে জানা যায় এখানে চাঁদার রেইট একটু বেশি অর্থাৎ ৪০০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা দৈনিক চাঁদা দিতে হয়। চাঁদাবাজির টাকা ভাগবাটোয়ারা ও দখলদারিত্ব দ্বন্দ্ব নিয়ে খুন খারবি ও অনেক হয়েছে। তবু ও সরকারের টনক নড়ে না। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য তিনটি ঘটনা অন্যতম:…ঘটনা...১..রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় জানুয়ারি /২৬ মাসে আধিপত্য বিস্তার এবং চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেই স্বেচ্ছাসেবক দলনেতা আজিজুর রহমান মুছাসাব্বিরকে হত্যা করা হয়েছে। কারওয়ান বাজার এলাকায় প্রকাশ্যে ও গোপনে চাঁদা আদায়ের জন্য আট থেকে নয়টি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। এ চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থের ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরেই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করা হয়। বিদেশে পলাতক আন্ডারওয়ারওয়ার্ল্ড সন্ত্রাসী দিলিপ ওরফে বিবাশ এর নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ প্রশাসন।
…ঘটনা...২...জানুয়ারি /২৬ মাসে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় দেশীয় অস্ত্র ধারাল দা নিয়ে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে গণপিটুনিতে রায়হান নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে।
ঘটনায় প্রকাশ পায় নিহত রায়হান খান (৩০) চাঁদপুর জেলার চাঁদপুর থানার বহরিয়া গ্রামের মৃত বিল্লাল খানের ছেলে। তিনি পরিবারের সঙ্গে ফতুল্লায় তাঁতিবাড়ি এলাকায় ইয়ামিন বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। পুলিশ সূত্রে জানা যায় নিহত রায়হানের বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। সে একজন চাঁদাবাজ সন্ত্রাসী ও ছিনতাইকারী এবং মাদকসেবি। তার অত্যাচারে স্থানীয় জনগন অতিষ্ঠ।
স্থানীয় গ্যারেজ মালিকের কাছ থেকে সকালে ১হাজার ৫ শত টাকা চাঁদা নেয় এবং পরবর্তীতে হোটেল কর্মচারীর কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে। তার দাবিকৃত টাকা দিতে অস্বীকার করায় রায়হান বাসা থেকে ধারালো দা নিয়ে এসে হোটেল কর্মচারী কে মারধর করতে থাকে। এ সময় উপস্থিত জনতা উত্তেজিত হয়ে রায়হানকে গণপিঠুনি দেয় এবং দা দিয়ে মাথায় আঘাত করলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

ঘটনা...৩....বাংলাদেশের রাজধানী পুরান ঢাকার মিটর্ফোট হাসপাতালের সামনে ২০২৫ সালের ৯ জুলাই প্রকাশ্যে দিবালোকে এক বর্বরচিত হত্যাকাণ্ডে নিহত ব্যক্তি মো. সোহাগ ওরফে লাল চাঁদ (বয়স ৩৯) পুরান ঢাকার একজন ভান্ডারি ব্যবসায়ী ছিলেন। কয়েকজন দুর্বৃত্তর জনসমক্ষে তাকে পাথর ও ধারাল

অস্ত্র দিয়ে পিঠিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। এ হত্যাকাণ্ডের পিছনে ছিল চাঁদাবাজি ও আধিপত্যবাধ নিয়ে দ্বন্ধ। হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং জাতিকে স্তম্ভিত করে তোলে। হত্যাকাণ্ডটি রাজনৈতিক সামাজিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে।

…ফুটপাত দখল ও বিক্রির সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এক সময় উচ্চ আদালত কঠোর নির্দেশ দিয়েছিল। রাজধানী ঢাকার অবৈধ দখলদারদের নামের তালিকা দিতে রিটের পরিপেক্ষিতে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিচ ফর বাংলাদেশ এর আবেদনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে হলফনামা জমা দিতে বলা হয়। উদ্দেশ্য ছিল কারা ফুটপাত দখল করে চাঁদাবাজি করছে তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা। এর পরিপেক্ষিতে উচ্ছেদ অভিযান হয়েছে কাগজে কলমে…নির্দেশ জারি হয়েছে তবু দখলদারিত্ব থেকে যায় …আগের মতোই।
বর্তমানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন সারাদেশ ব্যাপী চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের তালিকা তৈরি করার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন। সবার আগে রাজধানীতে এই ব্যাপারে বিশেষ অভিযান চালু করা হবে। এই ক্ষেত্রে যেহেতু প্রধান মন্ত্রী আন্তরিক এবং বিরোধী দল ও চাঁদাবাজ এর ব্যাপারে সোচ্চার… এবার আর চাঁদাবাজদের রেহাই নেই। তা ছাড়া বিএনপি সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল চাঁদাবাজ নির্মুল করবে…অবশ্যই তা বাস্তবায়ন হবে যদি কর্মসূচিতে জনগণের ও অংশগ্রহণ থাকে। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চাঁদাবাজি তালিকা করার জন্য যে নির্দেশ দিয়েছেন তা যে দলেরই হউক জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে। মিডিয়াতে প্রচার করা যেতে পারে। উচ্ছেদ অভিযানের সময় ছাত্র জনতা সাধারণ পাবলিকের সহযোগিতা থাকতে হবে। সকল শ্রেণির সহযোগিতা ছাড়া উচ্ছেদ অভিযান সফল হওয়া যাবে না। চিহ্নত চাঁদাবাজদের আইনের আওতায় আনতে হবে। কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে দেশ থেকে চাঁদাবাজ ও দখলদাবাজ নির্মুল হবে।

লেখক: কলামিস্ট ও সাবেক ব্যাংকার।


সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন: উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহের করণীয়

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
দৈনিক বাংলা ডেস্ক

যেকোনো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় আসে, যখন তার প্রবৃদ্ধির চাকা সচল রাখতে কাঠামোগত সংস্কারের বিকল্প থাকে না। এই মূহুর্তে বাংলাদেশ ঠিক এমনই এক ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক ক্রান্তিকাল পার করছে। এ পরিস্থিতিতে একদিকে নানামুখী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সামাল দেওয়া এবং অন্যদিকে বিপুল কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠির জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা—সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএনপি সরকারের অগ্রাধিকার কাজমূহের অন্যতম। এ লক্ষ্যে সরকার ইতোমধ্যে নানা কর্মসূচিও নিয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে দৃশ্যমান হবে। বিএনপি’র নির্বাচনী ইশতেহারের মূল দর্শন—‘করবো কাজ, গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’—কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং এটি দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক রূপরেখার ভিত্তি। ইশতেহারে দেশে ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে ‘এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি’ গঠনের যে রূপকল্প নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। এজন্য তাদেরকে এখন গতানুগতিক ধারার প্রথাগত ‘ঋণদাতা’র খোলস থেকে বেরিয়ে এসে উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রকৃত কারিগর এবং অর্থনীতির ‘রূপান্তরকারী’ সক্রিয় অংশীদার হিসেবে অবতীর্ণ হতে হবে ।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি নাজুক অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে বর্তমানে ‘নিম্ন-স্তরের ভারসাম্য বা লো-লেভেল ইকুইলিব্রিয়াম’ পর্যায়ে অবস্থান করছে। অর্থনীতির ভাষায়, এর অর্থ হলো—একটি দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকলেও তার প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার তার প্রকৃত সম্ভাবনার চেয়ে অনেক নিচে আটকে আছে। এই স্থবিরতা বা অচলায়তন ভাঙতে হলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখেই বাংলাদেশকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি বিনিয়োগ-চালিত প্রবৃদ্ধির দিকে অগ্রসর হতে হবে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের ঘোষিত নীতিগত অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করা এবং ব্যাংকিং খাতে নিয়মভিত্তিক সুশাসন নিশ্চিত করা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

সরকারের এই দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক রূপকল্প এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যুগোপযোগী নীতিমালার আলোকে, দেশে একটি শক্তিশালী উদ্যোক্তা শ্রেণি ও টেকসই স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সুনির্দিষ্ট কিছু কাঠামোগত ও নীতিগত পরিবর্তন আনতে হবে। যেমন:

জামানতের শেকল ভাঙা ও ক্যাশ-ফ্লো ভিত্তিক অর্থায়ন

দেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত দুর্বলতা হলো ঋণ বা বিনিয়োগ প্রদানে অতিমাত্রায় জামানত-নির্ভরতা। আইটি, ফিনটেক, এগ্রিটেক, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং কিংবা সিএমএসএমই খাতের একজন তরুণ উদ্যোক্তার মাথায় হয়তো একটি বিলিয়ন ডলারের আইডিয়া এবং দক্ষতা আছে, কিন্তু ব্যাংকে দেওয়ার মতো তার কোনো স্থাবর সম্পত্তি বা জমির দলিল নেই। ব্যাংকগুলোকে এখন এই প্রথাগত চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। জমির দলিলের বদলে উদ্যোক্তার মেধা, দক্ষতা, ব্যবসায়িক সম্ভাবনা এবং ক্যাশ-ফ্লোকে পুঁজি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। উদ্যোক্তাদের ‘ডিজিটাল লেনদেনের ফুটপ্রিন্ট’ (যেমন: মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেন, ইউটিলিটি বিল পরিশোধের হার ইত্যাদি) বিশ্লেষণ করে ‘অলটারনেটিভ ক্রেডিট স্কোরিং’ পদ্ধতির ব্যাপক প্রয়োগ ঘটাতে হবে। অবশ্য বাংলাদেশে কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংক খু্বই ক্ষুদ্র পরিসরে এ ধরণের উদ্যোক্তাদের জন্য ডিজিটাল লোন বা ন্যানো লোন সুবিধা ইতোমধ্যে চালু করেছে। কিন্তু ব্যাপকহারে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে হলে এই উদ্যোগ আরো সম্প্রসারিত ও ত্বরান্বিত করতে হবে। একইসাথে সিঙ্গেল ডিজিট সুদ হার এবং পর্যাপ্ত গ্রেস পিরিয়ডসহ ঋণদান প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও ডিজটাল করতে পারলে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির পথে আশানুরুপ গতি আসবে।

ইকুইটি ফাইন্যান্সিং ও স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম তৈরি

প্রযুক্তির উৎকর্ষের এই যুগে বাংলাদেশে স্টার্টআপ ফাইন্যান্সের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। গতানুগতিক ঋণ বা ডেট ফাইন্যান্সিং দিয়ে কখনোই একটি উদ্ভাবনী স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা সম্ভব নয়। স্টার্টআপগুলোর ব্যবসায়িক মডেলে ঝুঁকি বেশি থাকে, তাই তাদের প্রয়োজন ‘ইকুইটি ফাইন্যান্সিং’। প্রতিটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের নিজস্ব ‘ভেঞ্চার ক্যাপিটাল’ উইং বা ‘স্টার্টআপ ফান্ড’ থাকা এখন সময়ের দাবি। তরুণদের নতুন আইডিয়া বাণিজ্যিকভাবে সফল করতে সিড ফান্ডিং বা ইনোভেশন গ্রান্ট প্রদানে ব্যাংকগুলোকে আরও সাহসী ভূমিকা নিতে হবে। ব্যাংকগুলোকে বুঝতে হবে, আজকের একটি ছোট স্টার্টআপ আগামীর একটি ইউনিকর্ন কোম্পানিতে পরিণত হতে পারে।

নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’

ধর্ম-বর্ণ-দল-মত-বয়স-লিঙ্গ-অঞ্চল নির্বিশেষে দেশের সকল মানুষের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো গঠন ছাড়া ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। আমাদের দেশে পারিবারিক সম্পত্তির মালিকানায় নারীদের অংশীদারিত্ব কম থাকায়, প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নারী উদ্যোক্তারা ঋণ পাওয়া থেকে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হন। এই কাঠামোগত বাধা দূর করতে ব্যাংকগুলোকে পার্সোনাল গ্যারান্টি বা গ্রুপ গ্যারান্টির ভিত্তিতে নারীদের ঋণ দেওয়ার পরিধি বাড়াতে হবে। সরকারের ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’—এই কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নে গ্রামীণ নারীদের ঐতিহ্যবাহী পণ্য উৎপাদনে অর্থায়ন বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি, এই দেশীয় পণ্যগুলো যেন অ্যামাজন বা আলিবাবার মতো বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে সহজে বিক্রি করা যায়, সেজন্য ব্যাংকগুলোকে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে ও লজিস্টিক সংযোগে সহায়তাকারীর ভূমিকা পালন করতে হবে। ব্যাংকগুলোর প্রতিটি শাখার ‘নারী উদ্যোক্তা ডেস্ক’ যেন কেবল নামসর্বস্ব না থেকে সত্যিকার অর্থেই নারীদের ব্যবসা সম্প্রসারণে কাজ করে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

প্রান্তিক পর্যায়ে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও বিজনেস অ্যাডভাইজরি

উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ভূমিকা কেবল ঋণ বিতরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে বর্ণিত প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশের প্রত্যেক জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ চালুর উদ্যোগের সাথে সমন্বয় করে ব্যাংকগুলোকে তাদের প্রতিটি শাখা, উপশাখা বা এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটে ‘বিজনেস অ্যাডভাইজরি সেন্টার’ বা ব্যাবসায়িক পরামর্শ কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। এর মাধ্যমে ‍ব্যাংকগুলো উদ্যোক্তা উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মশালা, উদ্যোক্তা কাউন্সিলিং এবং হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের মত নানা কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো সরকারের যুব উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ইউনিয়ন ডিজিটাল সেবা কেন্দ্র বা অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। এছাড়া অনেক নতুন উদ্যোক্তা ট্রেড লাইসেন্স করা, প্রজেক্ট প্রোফাইল তৈরি, হিসাবরক্ষণ বা কর বিষয়ক আইনি জটিলতার কারণে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হন। ব্যাংকগুলো যদি তাদের নিজস্ব জনবল দিয়ে এই মেন্টরশিপ ও দিকনির্দেশনা প্রদান করে, তবে প্রান্তিক পর্যায়েও সফল উদ্যোক্তা তৈরি হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের ঝুঁকিও কমে আসবে।

গিগ ইকোনমি এবং ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বিশেষ সুবিধা

বর্তমান বিশ্বে ‘গিগ ইকোনমি’ বা স্বাধীন পেশাজীবীদের অর্থনীতি একটি বড় বাস্তবতা। দেশে প্রায় ৮ লক্ষ ফ্রিল্যান্সার ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটর তৈরির যে লক্ষ্যমাত্রা সরকার নির্ধারণ করেছে, তার সুফল পেতে ব্যাংকগুলোকে বিশেষায়িত সেবা চালু করতে হবে। ফ্রিল্যান্সারদের আয়ের প্রমাণপত্র প্রথাগত চাকরিজীবীদের মতো হয় না। তাই তাদের আয় দেশে আনার জন্য নিরবচ্ছিন্ন পেমেন্ট চ্যানেল তৈরি, আয়ের গড়ের ওপর ভিত্তি করে সহজ শর্তে ক্রেডিট কার্ড প্রদান এবং বিশেষ ডিপিএস ও ঋণ সহায়তা চালু করতে হবে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের এই কর্মীদের সঞ্চয় ও মূলধন গঠনে ব্যাংকগুলো সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।

ক্লাস্টার ভিত্তিক শিল্পায়ন ও ব্লু-ইকোনমি

আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে সরকারের ইশতেহারে উল্লেখিত সুনির্দিষ্ট অঞ্চলভিত্তিক শিল্পায়নে ব্যাংকগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, উত্তরাঞ্চলে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানি অঞ্চল গড়ে তুলতে ব্যাংকগুলোর সিন্ডিকেটেড অর্থায়ন প্রয়োজন। অন্যদিকে, দেশের সুবিশাল সমুদ্রসীমাকে কেন্দ্র করে ‘সুনীল অর্থনীতি’ বা ব্লু-ইকোনমির যে অপার সম্ভাবনা রয়েছে, তা কাজে লাগাতে হবে। হাওর ও উপকূলীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, জাহাজ ভাঙা শিল্প এবং ইকো-ট্যুরিজম খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য ক্লাস্টার-ভিত্তিক অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

সিএসআর ফান্ডের যুগোপযোগী ব্যবহার ও দক্ষতা উন্নয়ন

ব্যাংকগুলোর কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতের ব্যয়ের ধরনেও গুণগত পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। কেবল অনুদান বা ত্রাণ বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, সিএসআর তহবিলের একটি বড় অংশ তরুণদের আধুনিক প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, বিদেশি ভাষা শিক্ষা এবং স্কিল ডেভেলপমেন্টে ব্যয় করা উচিত। শিক্ষাব্যবস্থাকে বাস্তবমুখী করতে ‘ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া’র দূরত্ব ঘোচাতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে যৌথ উদ্যোগে ইনকিউবেটর, বুটক্যাম্প ও জব ফেয়ার আয়োজনে ব্যাংকগুলোর স্পন্সরশিপ দেশের জনশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে বিশাল ভূমিকা রাখবে।

অলিগার্কিক কাঠামোর বিলোপ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা

উপরোক্ত সকল উদ্যোগ তখনই সফল হবে, যখন ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। ব্যাংক পরিচালনায় এবং ঋণ মঞ্জুরিতে সকল প্রকার রাজনৈতিক, আমলাতান্ত্রিক ও পারিবারিক প্রভাব বন্ধ করতে হবে। মুষ্টিমেয় কিছু পরিবার বা গোষ্ঠীর হাতে ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা কুক্ষিগত থাকার যে সংস্কৃতি, তা ভেঙে ফেলতে হবে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে কঠোর আইনি প্রক্রিয়ায় অর্থ আদায় করে, সেই তারল্য নতুন ও সম্ভাবনাময় সাধারণ উদ্যোক্তাদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। ব্যাংকিং খাতে ন্যায়ভিত্তিক ও রুল-বেসড ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার যে কড়া বার্তা কেন্দ্রীয় ব্যাংক দিয়েছে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদকে তা অবিলম্বে ধারণ করতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, একটি দেশের অর্থনীতি যখন নতুন উচ্চতায় আরোহণের প্রস্তুতি নেয়, তখন ব্যাংকিং খাতকে তার চালিকাশক্তির ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়। বর্তমান সরকার তার নির্বাচনী ইশতেহারে ‘করবো কাজ, গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির মাধ্যমে একটি স্পষ্ট গন্তব্য নির্ধারণ করে দিয়েছে। দেশের আর্থিক খাতে নীতিনির্ধারক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংককে তার যুগোপযোগী মুদ্রানীতি ও দিকনির্দেশনার মাধ্যমে এই ইশতেহারে বর্ণিত অর্থনৈতিক গন্তব্যে পৌঁছানোর পথনকশাও তৈরি করতে হবে। এবং সেই পথনকশা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাঠে নেমে কাজ করার উদ্যোগ ও সদিচ্ছার। প্রকৃত অর্থে মেধা, পরিশ্রম, দক্ষতা, সম্ভাবনা ও তারুণ্যের ওপর আস্থা রেখে ব্যাংকগুলো যদি নতুন উদ্যোক্তাদের হাত ধরে এগোয়, তবে বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের জোয়ার সৃষ্টি হবে এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে একটি সমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভরশীল ‘ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি’র স্বপ্ন বাস্তবতায় রূপ নিতে পারে।

লেখক: ব্যাংকার ও আর্থিক খাতের বিশ্লেষক।


আফতাবনগরে ঘাস-বন পোড়ানো: পাখি ও প্রকৃতির বিরুদ্ধে অমানবিকতা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
লেখক- কাজী মাহমুদুর রহমান, ভোরের সাথী

শীতের সকালে আফতাবনগরের ঘাস-বনভূমি একসময় পাখির কলতানে মুখর এলাকা। প্রতিবছর শীতে উড়ে আসে পরিযায়ী পাখির ঝাঁক, গাছে গাছে শোনা যায় তাদের ডাক। কিন্তু প্রতিবছরের মতো এবারও সেই ঘাস-বনভূমির একাংশ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে গেছে গাছ, ঝোপঝাড়—আর সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংস হয়ে গেছে অসংখ্য পাখির নিরাপদ আশ্রয়।

এই ঘাস-বন পোড়ানোর ফলে কার্বন নিশ্বরণের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পাখিকুল। অনেক পাখির বাসা, ডিম ও ছানাপোনা আগুনে পুড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। যারা উড়তে পারেনি, তারা প্রাণ হারিয়েছে। এই দৃশ্য শুধু হৃদয়বিদারকই নয়, আমাদের মানবিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

প্রতিবছর শীত মৌসুমে সাইবেরিয়া ও অন্যান্য শীতপ্রধান অঞ্চল থেকে বিভিন্ন প্রজাতির পরিযায়ী পাখি আফতাবনগরে আসে। সাইবেরিয়ান স্টন চ্যাট, ইয়োল অকটেইলসহ নানা প্রজাতির পাখি এখানকার বনভূমি ও জলাভূমিকে নিরাপদ আশ্রয় ও খাদ্যের উৎস হিসেবে বেছে নেয়। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তারা আসে বেঁচে থাকার তাগিদে। কিন্তু ঘাস-বন পোড়ানোর কারণে তাদের সেই আশ্রয় আর নিরাপদ থাকছে না। খাদ্যের উৎস ধ্বংস হওয়ায় এসব পাখি আজ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে।

প্রকৃতির এই নির্মম ধ্বংস কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ঘাস- বন পোড়ানো কেবল পাখিদের জীবনই কেড়ে নিচ্ছে না, এটি পরিবেশের সামগ্রিক ভারসাম্যও নষ্ট করছে। পাখি প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করে, গাছের বীজ ছড়াতে সহায়তা করে এবং পরিবেশকে সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাখির সংখ্যা কমে গেলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনেও এসে পড়ে—খাদ্যচক্র ভেঙে পড়ে, পরিবেশ হয়ে ওঠে আরও ঝুঁকিপূর্ণ।

পাখিদের বাঁচানো শুধু আবেগের বিষয় নয়, এটি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব এবং একই সঙ্গে আমাদের নিজেদের স্বার্থের সঙ্গেও জড়িত। পাখির মাধ্যমে আমরা যে পরিবেশগত উপকার পাই, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাই আফতাবনগরে ঘাস-বন পোড়ানোর মতো অমানবিক কাজ অবিলম্বে বন্ধ করা জরুরি।

এক্ষেত্রে প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকার পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ অপরিহার্য। ঘাস-বনভূমি রক্ষা, নজরদারি জোরদার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি না করলে এই ধ্বংস থামানো সম্ভব নয়।

প্রকৃতি বাঁচলে, আমরাও বাঁচব—এই সত্য এখনই উপলব্ধি করার সময়। নইলে একদিন আফতাবনগরের ঘাস-বন থাকবে শুধু স্মৃতিতে, আর পাখির ডাক শোনা যাবে কেবল পুরোনো গল্পে।


মডেল তিন্নির মৃত্যু: নীরবে চলে যাওয়া থেকে আমাদের শেখা

ছবি: মডেল তিন্নি। ফাইল ছবি
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
অনলাইন ডেস্ক

২০০২ সালে মডেল তিন্নির মৃত্যুর খবরে আমাদের সমাজকে তাৎক্ষণিকভাবে একটি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। সেই প্রশ্নটি হচ্ছে, আমরা কি মানুষের ভেতরের কষ্টগুলো সত্যিই দেখতে পাই? বাহ্যিক সাফল্য, পরিচিতি কিংবা স্নিগ্ধ হাসির আড়ালে যে গভীর মানসিক সংকট লুকিয়ে থাকতে পারে, এই ঘটনাটি তারই এক বেদনাদায়ক স্মারক।

তিন্নি ছিলেন একজন সুপরিচিত মুখ। গ্ল্যামার, আত্মবিশ্বাস ও সফলতার যে ছবি আমরা পর্দায় দেখি, প্রাত্যাহিক জীবনে সেটা সবসময় বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি নয়, এ কথা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। সমাজের প্রত্যাশা, ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানপোড়ন, মানসিক একাকিত্ব কিংবা না-বলা কষ্ট, এসব কারণ মানুষের ভেতর তীব্র মানসিক সংকট তৈরি করতে পারে। কিন্তু এসব সংকট সবসময় দৃশ্যমান হয় না।

তিন্নির মৃত্যুর ঘটনায় তার ব্যক্তিগত জীবনকে বিশ্লেষণ করার চেয়ে আমাদের জন্য জরুরি হলো এই দুঃখজনক ঘটনা থেকে সচেতনতামূলক শিক্ষা নেয়া। প্রথমত, মানসিক কষ্টকে হালকাভাবে না নেওয়া যেটা একটি জীবনের জন্য বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, মানসিক সাহায্য চাওয়াকে স্বাভাবিক বিষয় হিসাবে দেখা। আমাদের সমাজে এখনো মনে করা হয় মানসিক সমস্যায় সাহায্য নেওয়া মানেই ব্যর্থতা। এই ধারণা ভাঙতে হবে। যেমন আমরা শরীর অসুস্থ হলে ডাক্তারের কাছে যাই, তেমনি মন ভেঙে পড়লে কাউন্সেলর, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা বিশ্বাসযোগ্য কারও সাহায্য নেওয়া স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়। তৃতীয়ত, সোশ্যাল মিডিয়ায় ও জনপরিসরে সংবেদনশীল আচরণ জরুরি। কোনো আত্মহত্যার ঘটনায় গুজব, অতিরঞ্জন বা ব্যক্তিগত জীবনের কাটাছেঁড়া কেবল পরিস্থিতিকে আরও ক্ষতিকর করে তোলে। আমাদের উচিত সম্মান, নীরবতা এবং দায়িত্বশীল ভাষা বজায় রাখা।

মডেল তিন্নির মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানুষের জীবন একমাত্রিক নয়। সফলতা, সৌন্দর্য বা জনপ্রিয়তা মানসিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। তাই পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী, সব সম্পর্কেই সহানুভূতিশীল হওয়া দরকার।

বাস্তবতা হচ্ছে, তিন্নির চলে যাওয়াকে আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। কিন্তু এখন থেকে যদি আমরা মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিতে শিখি এবং আরো সচেতন ও মানবিক হই, তাহলে এভাবে কাউকে হারানোর ঘটনার সংখ্যা অনেক কমে আসবে। নীরব কষ্ট যেন আর নীরব মৃত্যুতে রূপ না নেয়, এই হোক আমাদের অঙ্গীকার। লেখক : মনোরোগ বিশেষজ্ঞ


ভোট-পরবর্তী বিভ্রান্তি মোকাবিলায় রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান ড. আবু তালেবের

অধ্যাপক ড. মোঃ আবু তালেব
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
অনলাইন ডেস্ক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, স্বচ্ছ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হয়েছে বলে উল্লেখ করে ভোট-পরবর্তী বিভ্রান্তি মোকাবিলায় প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন অধ্যাপক ড. মোঃ আবু তালেব। ড. মোঃ আবু তালেব অধ্যাপক ও গবেষক হিসেবে কর্মরত আছেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়–এ।

একটি বিশ্লেষণধর্মী লেখায় তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিগত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল অবাধ, স্বচ্ছ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক—যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়েছে। নির্বাচনে হার-জিত গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অনুষঙ্গ। ব্যালটের মাধ্যমে জনরায়কে সম্মান করা প্রতিটি নাগরিকের পবিত্র দায়িত্ব। তবে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে কিছু মহল ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’–এর অভিযোগ তুলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়াচ্ছে অভিযোগ, গুজব ও অপপ্রচার।

ড. তালেব মনে করেন, এই প্রেক্ষাপটে একটি প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর জন্য তথ্যভিত্তিক, দায়িত্বশীল ও কৌশলগত ভূমিকা গ্রহণ করা সময়ের দাবি। তার প্রস্তাবিত মূল পদক্ষেপগুলো হলো:

১. প্রমাণভিত্তিক অবস্থান গ্রহণ: যে কোনো অভিযোগ তথ্য, পরিসংখ্যান ও প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করতে হবে। আবেগপ্রবণ বক্তব্যের পরিবর্তে লিখিত প্রতিবেদন, পর্যবেক্ষণ নথি ও আইনি কাঠামোর মধ্যে অভিযোগ উত্থাপন অধিক কার্যকর। একটি সুসংগঠিত ডকুমেন্টেশন সেল গঠন করলে ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে দল শক্ত ভিত্তি পাবে এবং অপপ্রচারের সুযোগ কমবে।

২. ডিজিটাল ফ্যাক্ট-চেক ও সচেতনতা: ডিজিটাল যুগে অপপ্রচার সবচেয়ে দ্রুত ছড়ায় সামাজিক মাধ্যমে। তাই একটি দক্ষ ফ্যাক্ট-চেক টিম গঠন জরুরি, যারা ভুয়া ভিডিও, পুরোনো ছবি বা বিকৃত তথ্য শনাক্ত করে প্রমাণসহ খণ্ডন করবে। দলীয় কর্মী-সমর্থকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই ছাড়া তথ্য শেয়ার না করা এবং শালীন ভাষা ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

৩. ইতিবাচক ও নীতিনিষ্ঠ রাজনৈতিক ভাষা: অপপ্রচারের জবাবে নেতিবাচকতা নয়—উন্নয়ন পরিকল্পনা, গণতান্ত্রিক অঙ্গীকার ও সুশাসনের রূপরেখা তুলে ধরা উচিত। শালীন ও নীতিনিষ্ঠ রাজনৈতিক ভাষা জনগণের আস্থা অর্জনে সহায়ক।

৪. গণমাধ্যমের সঙ্গে স্বচ্ছ যোগাযোগ: সংবাদ সম্মেলন, লিখিত বিবৃতি ও নিয়মিত ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে দলীয় অবস্থান পরিষ্কারভাবে তুলে ধরলে ভুল বোঝাবুঝি কমে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের শান্ত ও তথ্যসমৃদ্ধ জবাব দলীয় ভাবমূর্তি উন্নত করে। গণমাধ্যমকে প্রতিপক্ষ নয়, অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করাই উত্তম।

৫. আইনগত ও ন্যায়সঙ্গত পদক্ষেপ: উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভুয়া তথ্য ছড়ালে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, তবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন না হয়—সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়া জনগণের আস্থা বাড়ায়।

৬. তৃণমূল ও তরুণ সম্পৃক্ততা: তৃণমূল পর্যায়ে মতবিনিময় সভা ও সরাসরি যোগাযোগ বিভ্রান্তি দূর করতে কার্যকর। পাশাপাশি তরুণদের লক্ষ্য করে তথ্যভিত্তিক ভিডিও, ইনফোগ্রাফিক ও অনলাইন আলোচনার আয়োজন করলে অপপ্রচার মোকাবিলায় সচেতন প্রজন্ম তৈরি হবে।

৭. আত্মমূল্যায়ন ও পর্যালোচনা: অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের মাধ্যমে যোগাযোগের ঘাটতি ও কৌশলগত দুর্বলতা চিহ্নিত করা উচিত। আত্মসমালোচনার সাহস একটি রাজনৈতিক দলের পরিপক্বতার প্রমাণ।

অপপ্রচার রোধ করা শুধু একটি দলের সুনাম রক্ষা নয়—বরং গণতন্ত্রের ভিত্তি সুদৃঢ় করা। সত্যনিষ্ঠতা, ধৈর্য ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক চর্চাই পারে বিভ্রান্তির অন্ধকার দূর করতে। যদি প্রমাণনির্ভর বক্তব্য, স্বচ্ছ যোগাযোগ ও ইতিবাচক রাজনীতির চর্চা অব্যাহত থাকে, তবে একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। গণতন্ত্রের শক্তি নিহিত থাকে সত্য ও আস্থায়। তাই অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সর্বোত্তম অস্ত্র হলো তথ্য, যুক্তি ও নৈতিকতা।


কে পাবে লাল কার্ড

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
দৈনিক বাংলা ডেস্ক

লাল কার্ডের ব্যবহার সাধারণত ফুটবল খেলাতেই হয়ে থাকে। কোনো খেলোয়াড় ফুটবল খেলার আইন ভঙ্গ করলে বা মারাত্মক ফাউল করলে রেফারি তাকে লাল কার্ড দেখিয়ে বহিস্কার করতে পারেন। অবশ্য এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়কে দুবার হলুদ কার্ড দেখিয়ে সতর্ক করার বিধান রয়েছে। হলুদ কার্ড দেখানোর পরও যদি ওই খেলোয়াড় নিবৃত্ত না হন বা রেফারির আদেশ না মানেন, ওই খেলোয়াড়কে লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়ার এখতিয়ার রেফারির রয়েছে। খেলার মাঠের সে লাল কার্ড এবার উঠে এসেছে আমাদের রাজনৈতিক মাঠে।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা এখন তুঙ্গে। অংশগ্রহণকারী দলগুলো এখন তুমুল ব্যস্ত। ভোটারদের পক্ষে টানার জন্য নানা কথার ফুলঝুরির পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী দলের দোষত্রুটি জনসমক্ষে তুলে ধরছে তারা। আর তা করতে গিয়ে তারা কখনো অসহিষ্ণুতার বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে, কখনো শিষ্টাচারের সীমানা অতিক্রম করে যাচ্ছে। বলা নিস্প্রয়োজন, এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে। প্রথমত. দীর্ঘ সতের বছর পরে বাংলাদেশের জনগণ নিঃশঙ্কচিত্তে, নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত. এ নির্বাচনে দেশের অন্যতম রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগ অনুপস্থিত। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় তারা এখন নিষ্ক্রিয়। উপরন্তু তাদের শীর্ষনেতা শেখ হাসিনা রয়েছেন দেশের বাইরে; যিনি ইতোমধ্যে একটি আদালতে গণহত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। তাছাড়া দলটির প্রধম সারির নেতাদের বেশিরভাগ গণঅভ্যুত্থানের পরপরই কেউ দেশ ত্যাগ করেছেন কেউ গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। ফলে দলটি এখন অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। এর আগেও ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর আওয়ামী লীগ একই সংকটে পড়েছিল। তবে সে প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। কারণ দলটি তখন নিষিদ্ধ হয় নি। যার ফলে পঁচাত্তর পরবর্তী সব নির্বাচনেই দলটি অংশ নিতে পেরেছিল।

আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচন যে খুব একটা জমজমাট হচ্ছে না, তা ইতোমধ্যেই প্রতিভাত হয়ে উঠেছে। ১৯৭৫ পরবর্তী বাংলাদেশের নির্বাচন মানেই ছিল চির প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের ভোটের লড়াই। যদিও ২০১৪ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি নির্বাচনী মাঠে অনুপস্থিত ছিল। আর ২০১৮ সালের নির্বাচনী মাঠে নামলেও আওয়ামী লীগ ও সরকারের দ্বৈত চাপ এবং রেফারি নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতিত্বের কারণে শেষ পর্যন্ত লড়াইয়ে থাকতে পারে নি।

পত্র-পত্রিকার খবরে বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ নির্বাচনী মাঠে না থাকায় উত্তাপ অনেকটাই নেই। কেউ কেউ এ নির্বাচনকে পানসে বলেও অভিহিত করেছেন। তবে আওয়ামী লীগ না থাকলেও নির্বাচনী মাঠে যারা রয়েছেন, তাদের কার্যকলাপ ও কথাবার্তায় উত্তাপ সৃষ্টির যথেষ্ট উপাদান রয়েছে। এবারের ভোটের লড়াইয়ে প্রধান দুই পক্ষ বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। এই দুই দল বর্তমানে লিপ্ত রয়েছে বাগ্যুদ্ধে। তারা পরস্পরকে আক্রমণ-প্রতিআক্রমণের দ্বারা পরিবেশ অনেকটাই উত্তপ্ত করে তুলেছে। শুধু বাগ্যুদ্ধ নয়, ইতোমধ্যে তারা দু’চার জায়গায় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধেও অবতীর্ণ হয়েছে। শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতিতে তেমনি এক সংঘর্ষে একজন নিহত ও কয়েকজন আহত হয়েছে।

রাজনৈতিক দলের জনপ্রিয়তা বা গ্রহণযোগ্যতার ব্যারোমিটার হলো নির্বাচন। একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে জনগণ যদি অবাধে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, তাহলে প্রমাণিত হয় কোন দল কতটা জনপ্রিয় বা গ্রহণযোগ্য। বলার অপেক্ষা রাখেনা, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতে সেটা যাচাই করা সম্ভব ছিল না। কেননা, তখন জনগণ ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটই দিতে পারেনি। বাংলাদেশের জনগণ এবার নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগের অধিকার ফিরে পাবে এটাই প্রত্যাশিত। জনগণের সে ভোট পক্ষে টানার জন্য রাজনৈতিক দলের নেতা ও প্রার্থীরা সভা-সমাবেশে বক্তব্য রাখবেন, মিছিল করবেন, এসব স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে সমালোচনার নামে প্রতিপক্ষের প্রতি বিষোদগার কিংবা শিষ্টাচার বহির্ভূত আক্রমণাত্মক বক্তব্য-মন্তব্য কখনোই কাম্য নয়। অবশ্য এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, আমাদের দেশে জনগণ যেটা প্রত্যাশা করে, রাজনৈতিক দল ও সেগুলোর নেতারা বেশিরভাগ সময় তার বিপরীত কাজটি করেন।

অনেকেরই ধারণা ছিল, এবারের নির্বাচনে যেহেতু এক সময়ের মিত্রদের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে, তাই নির্বাচনী মাঠে তেমন কোনো অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটবে না। প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর নেতা ও প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারণার সময় শিষ্টাচারের বিষয়ে সতর্ক থাকবেন। কিন্তু নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর পর থেকে যেসব ঘটনা ঘটছে তাতে জনমনে একরাশ হতাশা ভর করেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের’ কথা শোনা গিয়েছিল। অনেকেই আশান্বিত হয়েছিলেন, পুরানো দোষারোপের ঐতিহ্য থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের রাজনীতি সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের পথে হাঁটতে শুরু করবে। বলা হয়েছিল, পুরানো বস্তাপচা রাজনীতির বদলে দেশবাসী নতুন রাজনীতি উপহার পাবে। কিন্তু হা হতোষ্মি! যারা নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা শুনিয়েছিলেন, তারাও হাঁটছেন পুরনো পথে। বরং সমালোচনার নামে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বিরুদ্ধে অশোভনীয় উক্তির নতুন নজির স্থাপন করেছেন। ঢাকা-৮ আসনে বিএনপির প্রার্থী দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সিনিয়র রাজনীতিবিদ মির্জা আব্বাসকে এনসিপির প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী যে ভাষায় আক্রমণ করেছেন তাকে শিষ্টাচার, শালীনতা এবং সভ্যতা-ভব্যতার চূড়ান্ত লঙ্ঘন বললে অত্যুক্তি হবে না। যদিও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী সম্বন্ধে কোনো ধরনের কটুক্তি, বিষোদগার ও ব্যক্তিগত আক্রমণ নির্বাচন কমিশন প্রণীত আচরণবিধিতে নিষিদ্ধ। তবে তার তোয়াক্কা কেউ করছে বলে মনে হয় না।

এ মুহূর্তে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর বাগ্যুদ্ধে দেশবাসী যুগপৎ বিস্মিত ও আতঙ্কিত। পরস্পরের প্রতি তাদের বাক্য-তীর নিক্ষেপের ধরন দেখে মনে হচ্ছেনা, তারা একসময় ‘জান পেহচান দোস্ত’ ছিল। জামায়াত নেতারা যখন বিএনপিকে ক্ষমতায় থাকতে দুর্নীতিতে চারবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার খোঁটা দেন, তখন তারা বোধকরি ভুলে যান, তাদের দল সেই সরকারের শরিক ছিল এবং তাদের দুই শীর্ষনেতা সে সরকারের মস্ত্রী ছিলেন। ফলে চার দলীয় জোট সরকার যদি দুর্নীতিবাজ হয়ে থাকে, তাহলে সে আভিযোগ থেকে জামায়াতে ইসলামী কি বাদ যেতে পারে? ঠিক তেমনি বিএনপির পক্ষ থেকে যখন মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতার জন্য জামায়াতে ইসলামীকে তুলোধুনো করা হয়, তখন তারাও বোধকরি ভুলে যান, সব জেনেশুনেই তারা ওই বিষপান করেছিলেন। ২০০০ সালে জোটসঙ্গী করার সময় যদি জামায়াতের একাত্তরের ভূমিকা দোষের মনে না হয়ে থাকে, তাহলে এখন কেন তারা অস্পৃশ্য হবে? অন্যদিকে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘গুপ্ত’ বলে নতুন একটি শব্দের উদ্ভাবন করেছেন। এই শব্দের দ্বারা আওয়ামী লীগের শাসনামলে জামায়াতের কতিপয় নেতাকর্মীর ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় থেকে সুযোগ বুঝে স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হওয়াকেই কটাক্ষ করে থাকবেন। এর বিপরীতে জামায়াতের আমির ডাক্তার শফিকুর রহমান তারেক রহমানের লন্ডনে অবস্থান করাকে ‘সতের বছর গুপ্ত ছিলেন’ বলে কটাক্ষ করেছেন।

এদিকে গত ২ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজারের নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডাক্তার শফিকুর রহমান ‘বিএনপিকে জনগণ এবার লাল কার্ড দেখাবে’ বলে মন্তব্য করেছেন। বিপরীতে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ৪ ফেব্রুয়ারি বরিশালে নির্বাচনী জনসভায় জামায়াতে ইসলামীকে কটাক্ষ করে বলেছেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশে একটি ‘গুপ্ত সংগঠন’ নতুন জালিম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে’। বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতির দুই শীর্ষনেতার এহেন বাক্য-শর নিক্ষেপকে রাজনীতি-সচেতন মানুষ অশনি সংকেত হিসেবেই দেখছেন। তারা বলছেন, জনগণ বিএনপিকে লাল কার্ড দেখাবে, নাকি লাল গোলাপের ফুলের তোড়ায় নতুন করে বরণ করে নেবে তা দেখা যাবে ১২ ফেব্রুয়ারি। জামায়াত আমিরের কাছ থেকে সেটা শুনতে বা জানতে তারা আগ্রহী নয়। অন্যদিকে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনাকারী একটি রাজনৈতিক দলকে তথাকথিত ‘গুপ্ত সংগঠন’ বলে অভিহিত করা যে একেবারেই সমীচীন হচ্ছেনা, বিএনপি চেয়ারম্যানের তা অনুধাবন করা দরকার।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ভোট গ্রহণের আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। নির্বাচনী প্রচারণার শেষ পর্যায়ে এসে একসময়ের ‘হরিহর আত্মা’ বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী যে ধরনের অরুচিকর ভাষায় পরস্পরকে আক্রমণ করছে তাতে দেশবাসী হতাশ ও উদ্বিগ্ন। তারা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে অপরের কুৎসা বা অরাজনৈতিক সমালোচনা শুনতে আগ্রহী নয়। তারা শুনতে চায় জাতির প্রতি দলগুলোর প্রতিশ্রুতির কথা। তারা চায় দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে যেসব প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করছে, তা প্রতিপালনের নিশ্চয়তা। রাজনৈতিক দলের নেতাদের স্মরণে রাখা দরকার, জনগণ মৌখিক নয়, আন্তরিক গণতন্ত্রীদের ক্ষমতায় দেখতে চায়। আর সে গণতন্ত্রের প্রধান পূর্বশর্তই হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। তার পরিবর্তে তারা যদি পালাগানের স্টাইলে শালীন-অশালীন ভাষায় একে অপরকে আক্রমণ করেন, তাহলে দেশবাসীর হতাশার সাগরে নিমজ্জিত হওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না।

ফুটবল খেলায় কোনো খেলোয়াড়কে লাল কার্ড প্রদর্শনের একমাত্র ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি রেফারি। আর নির্বাচনে রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীদের লাল কার্ড দেখানোর ক্ষমতা জনগণ তথা ভোটারদের হাতে। সুতরাং তারাই সিদ্ধান্ত নিক ১২ ফেব্রুয়ারি কোন দলকে লাল কার্ড দেখাবে। খামোখা বাহুল্য উক্তি করে নির্বাচনী পরিবেশ উত্তপ্ত করা নিশ্চয়ই বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক নয়।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।


১৩তম জাতীয় নির্বাচন ও এআই: ভোট বাস্তব, সিদ্ধান্ত কি কৃত্রিম!

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
দৈনিক বাংলা ডেস্ক

আসন্ন ১৩তম জাতীয় নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে-এটি কেবল ব্যালট, পোস্টার আর জনসভার নির্বাচন নয়; এটি একই সঙ্গে একটি অ্যালগরিদমিক নির্বাচন কিংবা ডিজিটাইলাইজড নির্বাচন। যেখানে প্রার্থী নয়, অনেক সময় কনটেন্টই কথা বলে; বক্তব্য নয়, বরং ভিডিও ‘প্রমাণ’ হিসেবে হাজির হয়; আর যুক্তি নয়, আবেগই শেষ কথা বলে। এই নতুন নির্বাচনী ময়দানে সবচেয়ে আলোচিত, আবার সবচেয়ে ভীতিকর খেলোয়াড় হচ্ছে- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। আর এআইয়ের এই আগমনেই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছে দেশবাসী।

এক সময় নির্বাচনের অপপ্রচার বলতে বোঝাত ভুয়া লিফলেট, বিকৃত উক্তি কিংবা গুজব। সেগুলোর একটি সীমা ছিল-সবই ছিল মানুষের কণ্ঠ, মানুষের হাত, মানুষের সময়। এখন সেই সীমা ভেঙে গেছে। এআই কোনো ঘুম চেনে না, ক্লান্ত হয় না, নৈতিক দ্বিধায় পড়ে না। একটি ভিডিও বানাতে এখন আর শুটিং লাগে না, বক্তব্য বানাতে বক্তাও লাগে না। ফলে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে কেউ যদি হঠাৎ দেখে, কোনো প্রার্থী রাষ্ট্রবিরোধী কথা বলছেন, সংবেদনশীল ইস্যুতে উসকানিমূলক মন্তব্য করছেন, কিংবা এমন কিছু করছেন যা জনমনে ক্ষোভ তৈরি করে-তখন প্রশ্ন ওঠে না

‘তিনি সত্যিই বলেছেন কি না’, প্রশ্ন ওঠে ‘এটা কতটা ভাইরাল হলো?’

এই জায়গাতেই এআইয়ের অপব্যবহার সবচেয়ে ভয়ংকর হয়ে ওঠে। ডীপফেইক ভিডিও ও অডিও এমন এক বাস্তবতা তৈরি করে, যেখানে চোখ-কান আর বিশ্বাসের নির্ভরযোগ্যতা হারায়। আগে মানুষ বলত, ‘নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করি না।’ এখন নিজের চোখেই দেখে মানুষ বিভ্রান্ত হয়। ফলে নির্বাচনের মতো সংবেদনশীল সময়ে এই প্রযুক্তি হয়ে ওঠে নিখুঁত রাজনৈতিক অস্ত্র-যার আঘাত নীরব এবং দ্রুত, কিন্তু গভীর।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ঝুঁকি আরও তীব্র। কারণ আমাদের সমাজে রাজনৈতিক মেরুকরণ নতুন কিছু নয়। সমাজও ডিজিটালি বিভক্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা আগে থেকেই দুই মেরুতে বিভক্ত। এআই এই বিভাজন তৈরি করে না; বরং সেটিকে আরও ধারালো করে। যে ভোটার আগে থেকেই কাউকে সন্দেহ করে, ডীপফেইক তাকে সেই সন্দেহের

‘দৃশ্যমান প্রমাণ’ দেয়। যে ভোটার অন্ধ সমর্থক, এআই তাকে বানিয়ে দেয় কৃত্রিম বীরত্বের ভিডিও। ফলে নির্বাচন হয়ে ওঠে যুক্তির নয়, বরং কাস্টমাইজড বাস্তবতার প্রতিযোগিতা।

এখানে ব্যঙ্গটা হলো-আমরা এখন এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে কেউ কথা না বললেও তাকে দিয়ে অনেক কিছু ‘বলানো’ যায়, আর কিছু না করলেও তাকে দিয়ে অনেক কিছু ‘করানো’ যায়। তাও আবার উচ্চ রেজোলিউশনে, পরিষ্কার অডিওতে, সাবটাইটেলসহ। এই কৃত্রিম সত্যের সামনে সাধারণ ভোটার কীভাবে টিকবে? যে ভোটার দিনে দশটা পোস্ট স্ক্রল করে, তার পক্ষে যাচাই করা কি আদৌ সম্ভব?

সরকার সম্প্রতি জাতীয় এআই নীতির খসড়া প্রকাশ করেছে, যেখানে দায়িত্বশীল ব্যবহার, স্বচ্ছতা ও ঝুঁকিপূর্ণ এআই নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে। নীতির ভাষা আশাব্যঞ্জক, কিন্তু নির্বাচনের বাস্তবতা অনেক কঠিন। নীতিপত্র আর নিউজফিডের মাঝে যে সময়ের ফারাক, সেটিই সবচেয়ে বড় সমস্যা। একটি ভুয়া ভিডিও শনাক্ত করতে যেখানে ঘণ্টা কিংবা দিন লাগে, সেখানে সেটি ছড়াতে লাগে মিনিট। পরে সংশোধনী এলেও ততক্ষণে আবেগ তার কাজ করে ফেলে। আইনের প্রশ্নেও বিষয়টি জটিল। কোনটি মতপ্রকাশ, আর কোনটি পরিকল্পিত এআই-ভিত্তিক অপপ্রচার-এই সীমারেখা সব সময় স্পষ্ট নয়। বেশি কড়াকড়ি করলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্ন আসে, আবার ঢিলেঢালা হলে অপপ্রচারকারীরা আরও সাহসী হয়। তার ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর বেশিরভাগই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান-তাদের ওপর জাতীয় নির্বাচনী শাসন কার্যকর করা সহজ নয়।

তবে এআইয়ের এই অপব্যবহার শুধু প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়; এটি মূলত একটি ডিজিটাল লিটারেসির সংকট। আমাদের সমাজে ইন্টারনেট আছে, কিন্তু ইন্টারনেট বোঝার সক্ষমতা সবার নেই! ভিডিও দেখলেই সত্য ধরে নেওয়া, আবেগ উসকে দেওয়া কনটেন্ট শেয়ার করা-এই অভ্যাসই এআই-ভিত্তিক অপপ্রচারের সবচেয়ে বড় শক্তি। ব্যঙ্গ করে বলা যায়, এআই যতটা বুদ্ধিমান, আমরা অনেক সময় ততটাই বেপরোয়া।

নির্বাচনে এআইয়ের অপব্যবহার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে গণতন্ত্রের আস্থায়। কারণ গণতন্ত্র টিকে থাকে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্তের ওপর। যখন তথ্যই কৃত্রিম হয়ে যায়, তখন ভোট বাস্তব হলেও সিদ্ধান্ত হয়ে ওঠে কৃত্রিম। এটাই দেশবাসীর উদ্বেগের মূল জায়গা। মানুষ ভয় পাচ্ছে-ভোটটা আমি দেব, কিন্তু সিদ্ধান্তটা কি সত্যিই আমার হবে?

এখানে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। যদি দলগুলো নিজেরাই এআইকে প্রতিপক্ষ ঘায়েল করার হাতিয়ার বানায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত কেউই নিরাপদ থাকবে না। আজ যে দল অপপ্রচারের শিকার, কাল সে-ই অপপ্রচারক হতে পারে। এই দুষ্টচক্র ভাঙতে না পারলে নির্বাচন ব্যবস্থা ক্রমেই বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে।

সবশেষে কথা আসে নাগরিকের ভূমিকায়। প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, গণতন্ত্রের শেষ রক্ষাকবচ নাগরিকের বিবেক। আমাদের শিখতে হবে সন্দেহ করতে-ভিডিও দেখেও, অডিও শুনেও। ‘এটা কেন এখন এলো’

‘উৎসটা কী?’, ‘অন্য নির্ভরযোগ্য মাধ্যমে আছে কি?’

-এই প্রশ্নগুলোই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ। ঠাট্টা করে বললে, এখন সবচেয়ে বিপ্লবী কাজ হলো-সব কিছু সব সময় বিশ্বাস না করা!

সামনের ১৩তম জাতীয় নির্বাচন তাই শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি সত্য আর কৃত্রিমতার মধ্যকার এক নীরব যুদ্ধ। এই যুদ্ধে এআই যদি অনিয়ন্ত্রিত থাকে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু একটি পক্ষ নয়, পুরো গণতান্ত্রিক কাঠামো। নীতিমালা, প্রযুক্তি, আইন-সবই দরকার। কিন্তু তার চেয়েও বেশি দরকার সচেতন নাগরিক। নইলে একদিন হয়তো আমরা এমন এক নির্বাচনে পৌঁছাব, যেখানে ব্যালট বাক্স বাস্তব থাকবে, কিন্তু সেই বাক্সে দেওয়া সিদ্ধান্তের ভিত্তি হবে পুরোপুরি কৃত্রিম।

প্রফেসর ড. ইকবাল আহমেদ, কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়


নির্বাচন এসেই গেল

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
দৈনিক বাংলা ডেস্ক

আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এর নির্বাচনে ইসলামী দলগুলোর অবস্থান বেশ পাকাপোক্ত করেছে।তারা সরকার গঠনের ইংগিতও দিচ্ছে।

ভোটের বাজার হলো: সর্বমোট ২৯৮ টি সিটের জন্য ১৯৮১ জন প্রার্থী। ৫১টি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে , স্বতন্ত্র আছে ২৪৯ জন। বিএনপির কেনডিডেট ২৮৮, ইসলামিক আন্দোলন বাংলাদেশ ২৫৩ , বাংলাদেশ জামায়াত ইসলাম ২২৪ জন, ১২ টি ছোট ছোট দলও আছে।

২০২৪ এর হিংস্রতাকে পুঁজি করে বিশৃঙ্খলার জ‍ন‍্য আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী দল এবারের নির্বাচনে নেই।

যুবক দের ভোট এবার ৩৩ শতাংশ আর মহিলাদের ভোট প্রায় ৫০ শতাংশ। যে দল এই অন্দর মহলের অন্তর জয় করতে পারবে তারাই নিশ্চিত সফলতা পাবে।

বিএনপি ১৯৯০ আর ২০০০ সনে ক্ষমতায় ছিল । তাদের আদি ও অকৃত্রিম শক্র আওয়ামী লীগ এবার ভোটে নেই। বিএনপির বেগম খালেদা জিয়া অল্প কিছুদিন আগে প্রয়াত আর শেখ হাসিনা দিল্লীতে মোদির সাহেদ অতিথি। দেশের দুই হেভিওয়েট না থাকাতে জামায়েত তার অবস্থান বেশ গুছিয়ে নিয়েছে। নির্বাচনে জুলাই বিপ্লবের মহারথীদের আসন নিশ্চিত হতেই পারত তবে তাদের অর্বাচীন কান্ড যেমন দ্রুত বড়লোক হবার প্রবনতা জনমনে বিরাগের সৃষ্টি করেছে।

তারেক জিয়া। নির্বাচনের অন্যতম ফ‍্যাক্টর। মৃত পথযাত্রী মা বেগম খালেদা জিয়ার শয‍্যাপাশে আসতে তার গড়িমসি দৃষ্টি কটু পরিবেশের সৃষ্টি করেছে।১৭ বছর পর দেশে আসার সাথে সাথে লক্ষ লোকের সমাগম তাকে এতই অভিভূত করে যে তিনি অনেকটা খেই হারিয়েছেন। দেশের মাটিতে পা দিতে না দিতেই এনআইডি কার্ড তৈরি, এয়ারপোর্ট থেকে জনগণের সাথে আর্মি গাড়ি র বহর তাকে বেরিকেড দিয়ে নিঁযে আসা এসব তার মধ্যে সৃষ্টি করে ‘আই হ্যাভে প্লান’। তিনি মার্টিন লুথার কিং এর মতন আওয়াজ তুলতে চাইলেন। সেই প্ল্যানটা হলো খাল কাটবেন আর গাছ লাগাবেন। এত এত খাল কাটা হবে আর গাছ লাগানো হবে যে দেশে মানুষ বসবাসের যায়গায়ই থাকবে না।

বিএনপির এবার লড়তে হবে জামায়াতের অভিজ্ঞ নেতৃবৃন্দের সাথে। ঐ যে শুরুর এয়ারপোর্টের ধামাকা তারেক জিঁযাকে এখনও ‘ বি ইন হিজ স্যু ‘ এর মধ্যে ঢুকাতে পারে নাই। আকাশ কুসুম অলীক ভাবনারেই তিনি বাস্তব মনে করছেন। ফ্যামিলি কার্ড ঘরে ঘরে পৌঁছে দিবেন। এটা কি ! খায় নাকি মাথায দেয়। ছিলেন ইংল্যান্ডে, ছিলেন বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন এবং রাজনীতিতে অপরিপক্ক , বক্তা হিসাবেও ক‍্যারিশমেটিক নন এবং এ সব বুঝে শুনেই জামাত আর চোখে দেখছেন এবং ‘আই হ‍্যাভ্ প্লান ‘এই বাতচিত জামাত ই না সফল করে ফেলে, তাদের বয়স্ক ও বিজ্ঞ নেতারা সরকার গঠনের গন্ধ পাচ্ছেন। ভুল করে সুযোগ হাতছাড়া করবেন না।

নির্বাচনের জন্য সরকার বৈধ অস্ত্র জমা করে নিল। এখন দেশ ভরা অবৈধ অস্ত্রের হাট বাজার। বৈধ অস্ত্র দিয়ে পাখি শিকার পর্যন্ত করা যায় না। তবুও ঘরে থাকলে কিছুটা স্বস্তি, চারিদিকের উচ্ছৃঙ্খল পরিবেশের সামনে একটা শক্তি।

তারপরও সুষ্ঠ নির্বাচন চাই, চাই এলোমেলো বাংলাদেশ কে এক গুছানো বাংলাদেশ। আলহামদুলিল্লাহ।

— কলামিস্ট


স্যার-ম্যাডাম সম্বোধনের ক্ষেত্রে রকমারী আলেখ্য

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
দৈনিক বাংলা ডেস্ক

অফিস আদালতে কর্মকর্তা বা সিনিয়র কর্মীদের স্যার বা ম্যাডাম বলে সম্বোধন না করলে, চলমান রীতিগত দিক দিয়ে তেমন ভালো চোখে দেখা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অধস্তনের চাকুরী নিয়ে টানাটানি শুরু হয়; এমনকি অপরাধ হিসেবে গন্য করে নেতিবাচক স্থানে বদলি পর্যন্ত করা হয়ে থাকে, যার ভূড়ি ভূড়ি উদহারণ আছে। এ প্রেক্ষাপটে উল্লেখ্য যে, ১৭শ শতকে ব্রিটিশরা ভারতীয় উপমহাদেশে উপনিবেশ স্থাপন করলে স্যার বা ম্যাডাম শব্দের প্রচলন শুরু হয়। মূলত ব্রিটিশ প্রশাসনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শ্বেতাঙ্গ কর্মকর্তাদের প্রতি স্থানীয় জনগণের আনুগত্য প্রকাশের সারথী ধরে স্যার বা ম্যাডাম সম্বোধন চালু হয়। আর এই সূত্র ধরে সাধারণ মানুষ ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের স্যার, ব্রিটিশ নারীদের ম্যাডাম বলে ডাকতো। আর এই সম্বোধন ছিল কর্তৃত্ব ও আনুগত্যের প্রকাশ বৈ কিছু নয়। এদিকে ইংরেজরা উচ্চবর্ণের বাঙালিদের (বিশেষ করে সনাতনী ধর্মালম্বী) ‘বাবু’ বলে সম্বোধন করতো। তথ্য মতে জানা যায় যে, আঠার শতকের মাঝামাঝি সুদূরপ্রসারী বুদ্ধির আড়ালে ব্রিটিশরা এই মর্মে চিন্তা করে যে, এই উপনিবেশে এমন একটি শ্রেণি গড়ে তুলতে হবে, যারা ‘বর্ণে ভারতীয়; কিন্তু রুচিতে-বুদ্ধিতে এবং ভাবনায় হবে ব্রিটিশ’। আর এই নীতির সরণি ধরে ব্রিটিশ ভারতে গড়ে ওঠে ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা এবং একই সঙ্গে সম্বোধনের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ সামাজিক রীতি, যার একটি ছিল কর্তৃপক্ষকে ‘স্যার’ বলে ডাকা। সত্যিকারার্থে স্যার-ম্যাডাম সম্বোধনের উৎপত্তি নিয়ে যদি গভীরে যাই; তাহলে প্রতীয়মান হয় যে, অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজ অভিধানের তথ্য অনুযায়ী ১২৯৭ সাল থেকে ইংরেজি ভাষায় ‘স্যার শব্দটি ব্যবহার শুরু হয়। আর সেই সময়ে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রে বিশেষ ভূমিকা পালনের জন্য ‘নাইট’ উপাধি খেতাবী ব্যক্তিদের নামের আগে ‘স্যার’ শব্দটি যোগ করার প্রচলন ছিল বলে জানা যায়। অবশ্য এই শব্দটি ফরাসি শব্দ ঝরৎব থেকে এসেছে; যার অর্থ হলো প্রভু বা কর্তৃপক্ষ। মজার ব্যাপার হলো, তখন ইংল্যান্ডে ঝরৎ শব্দ দিয়ে এই মর্মে বোঝানো হতো যে আমি চাকরই থেকে গেলাম।

এদিকে বাংলার মধ্যযুগ বা মুঘল আমলের সংস্কৃতিতে রাজা বাদশাহদের জাঁহাপনা, হুজুর, ইত্যাদি এমন নামে সম্বোধন করা হতো। আর কর্মকর্তাদের ‘সাহেব’ বলে সম্বোধন করার প্রচলন ছিল। এ প্রেক্ষাপটে উল্লেখ্য যে, ইরানিরা ভারতবর্ষে আসার পর ‘সাহিব’ শব্দটির প্রচলন ঘটে। পরে তা অপভ্রংশ হয়ে সাহেব এ রূপ নেয়। অবশ্য ‘সাহেব’ শব্দটি আরবি ‘সাহাবী’ শব্দ থেকে এসেছে; যার অর্থ হলো সঙ্গী, সাথী, সহচর কিংবা বন্ধু। আর তাই তখন পদবির সাথে সাহেব যোগ করে ডাকা হতো। এক্ষেত্রে উদহারণ হিসেবে খান সাহেব, সচিব সাহেব, শেখ, সাহেব ইত্যাদি। আর এটি মুসলমানদের ক্ষেত্রে অধিক প্রযোজ্য ছিল। এদিকে ব্রিটিশ ও শ্বেতাঙ্গ ইউরোপীয় নারীদের ‘মেমসাহেব’ বলে সম্বোধন করা হতো। তাছাড়া মুসলিম বাঙালি বিবাহিত নারীদের ‘বেগম সাহেব’ বলা হতো। আর অফিস আদালতে হেড ক্লার্ককে বড় বাবু বলে ডাকা হতো, যা এখনো অনেক স্থানে পরিলক্ষিত হয়ে থাকে।

সত্যি কথা বলতে কি, বাংলাদেশে স্যার বা ম্যাডাম সম্বোধন সংক্রান্ত কোনো সরকারি আইন বা কোন নীতিমালা নেই। এটি মূলত একটি প্রথাগত রীতি বা সামাজিক কালচার; যা শিক্ষা, প্রশাসন এবং করপোরেট সমাজে রিলে রেসের মতো চলে এসেছে। এ ব্যাপারে উল্লেখ্য যে, সাতচল্লিশে ব্রিটিশ থেকে স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এই সংস্কৃতি বহাল থাকে। আর স্বাধীনতার পরেও শিক্ষা ও প্রশাসনে স্যার ও ম্যাডাম সম্বোধন অপরিবর্তিত থেকে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে কিছুটা সংযোজনের মাধ্যমে নিম্ন আদালতের বিচারক মন্ডলীকে উদ্দেশ্য করে আইনজীবী বা বিচারপ্রার্থীরা ‘স্যার’ বা ‘ইওর অনার’ বলে থাকেন এবং উচ্চ আদালতের বিচারকমন্ডলীকে ‘মাই লর্ড’, ‘মি লর্ড’ বলে সম্বোধন করা হয়। অথচ বাংলাদেশের আইনজীবীদের পেশাগত শৃঙ্খলা ও আচরণ নিয়ন্ত্রণকারী আইনের কোথাও এমন কোনো বিধান নেই। এদিকে ১৯৯০ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশের তৎকালীন সংস্থাপন মন্ত্রণালয় থেকে কর্মকর্তাদের স্যার/ম্যাডাম নামে সম্বোধনের রীতি বাতিল করে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এ প্রজ্ঞাপনে সরকারি অফিস বা প্রতিষ্ঠানে সম্বোধনের জন্য ‘স্যার’-এর পরিবর্তে ‘জনাব’ এবং ‘সরকারি অফিসার বা কর্মকর্তাদের নামে প্রেরিত পত্রাদির শুরুতে পুরুষের ক্ষেত্রে ‘মহোদয়’ ও মহিলাদের ক্ষেত্রে ‘মহোদয়া’ লেখার সুপারিশ করা হয়। এতদ্ব্যতীত ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি বা তার পরবর্তী হালনাগাদ সংস্করণে শিক্ষকের প্রতি সম্মান বজায় রাখা নিয়ে এতদসংক্রান্ত কিছু উল্লেখ থাকলেও স্যার বা ম্যাডাম ডাকার এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই।

প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, অর্ন্তরবর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১০/০৭/২০২৫ইং তারিখে উপদেষ্টা পরিষদের ৩৩তম বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য সিনিয়র নারী কর্মকর্তাদের স্যার বলার নিয়ম বাতিল করা হয়। এদিকে আশ্চর্যর বিষয় হলো যে, আমি যখন নব্বইয়ের দশকে ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করি। তখন কোথায় কেউ স্যার বা ম্যাডাম বলে সম্বোধন করেছেন, এমন কথা শুনিনি বা দেখিনি। আসলে স্যার বা ম্যাডাম সম্বোধনের পেছনে আইনগত কোন বাধ্যবাধকতা নেই। অথচ এটি ঔপনিবেশিক আমলে চাপিয়ে দেয়া রীতিনীতি বৈ কিছু নয়। অবশ্য এটি অফিস আদালতে সামাজিক কালচার হিসেবে আমাদের রক্তের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গিয়েছে যে, যতই আইন-কানুন করা হোক না কেন, তা সহজে মুছে যাবে না।

লেখক : গবেষক, অথর্নীতিবিদ এবং লেখক হিসেবে মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সম্মাননা ও পদকপ্রাপ্ত।


বিশ্বকাপ ফুটবল আর রাজনীতি

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
দৈনিক বাংলা ডেস্ক

ভেনিজুয়েলা দখল করার পর এবার গ্রীন ল‍্যান্ড এর বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখলে নেবার ইচ্ছা ট্রাম্পের। এতে বিশ্বের সামরিক ভারসাম‍্য নাড়া খাচ্ছে। চীনের দরজায় দাঁড়ানো ফরমোজা দখল নিতে চাচ্ছে চীন, সামরিক মহড়া ও শুরু করেছে।

এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ফুটবল বিশ্বকাপেও বয়কটের হুমকি আসছে।

গ্রীনল্যান্ড ইস‍্যুতে ডোনাল্ড ট্রাম্প কে কোনঠাসা করতে একাধিক দেশ একাট্টা হয়েছে। জার্মানিত প্রকাশ্যে মুখ খুলেছে, ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ডসহ আরও একাধিক দেশের ফেডারেশন এই নিয়ে আলোচনা করেছে।

মেক্সিকো, কানাডার সাথে আমেরিকাও এবার বিশ্বকাপের আয়োযক দেশ। আগামী ১২ জুন মেগা আসরে বল গড়াবে। তবে ভেনিজুয়েলা দখলের পর গ্রীনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের গরম বাতচিত পরিস্থিতি বেসামাল করে ফেলেছে। যে সব দেশ ট্রাম্পের বিরোধিতা করবে তাদের উপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুঁশিয়ারি দিয়েছে ট্রাম্প।গ্রীনল্যান্ড হলো ডেনমার্কের স্বশাসিত অঞ্চল।

সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে নরওয়ে, নেদারল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড এবং স্কটল্যান্ড ইতোমধ্যেই বিশ্বকাপে জায়গা পাকা করেছে। এ ছাড়াও যোগ্যতা অর্জনের প্লে-অফে খেলবে ডেনমার্ক, সুইডেন এবং আয়ারল‍্যান্ড।

ডেনমার্ক আবার ন‍্যাটোর সদস‍্য। ন‍্যাটোর একটি দেশের উপর হামলা হলে সমগ্র ন‍্যাটো দেশ গুলির উপর হামলা বলে বিবেচিত হয়।ডেনমার্ক বলেছে আমেরিকা গ্রীনল্যান্ড নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে তারাও ছেড়ে কথা বলবে না। এসব হুমকি ধামকি বিশ্বকাপ ফুটবলে আচর ফেলবেই।

বিশ্বকাপের টিকিটের দাম আমেরিকা আকাশছোঁয়া করেছে। ৭৫ টি দেশের অভিবাসীদের ভিসা স্থগিত করেছে। তবে বিশ্বকাপের জন্যই পর্যটকও স্বল্প মেয়াদি ভিসার ছাড় দেবার ঘোষণা দিলেও শন্কাত থেকেই যায়। রাজনৈতিক কারণে ব্রাজিলের সমর্থক দের নাকি ছাড় দেয়া হবে না। কয় কি ?ট্রাম্পের রাজনৈতিক আগ্রাসনের আঁচ বিশ্ব কাপ ফুটবলে প্রতি ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে দৃশ্যমান। এই পরিস্থিতিতে কোন দেশ যদি বিশ্বকাপ বয়কট করে তবে ফিফার মুখ পুরবে।

আমেরিকা এক নুতন অস্ত্র ব‍্যহবার করে ছিল ভেনিজুয়েলার নিয়ন্ত্রন নেবার সময়, ভুক্তভোগী ক কথায় , সামরিক অভিযান চলাকালীন একটি জোরালো আওয়াজ শোনা গিয়েছিল। সেটা এতটাই জোরালো যে মনে হচ্ছিল মাথা ফেটে যাবে। তারপরই নাক মুখ দিয়ে রক্ত ঝরতে শুরু করে। কারো কারো রক্ত বমি শুরু হয়। ফলে অনেকের মতন প্রেসিডেন্ট মাদুরোর নিরাপত্তায় থাকা সৈন‍্য ধীরে ধীরে মাটিতে লুটির পরে।

ট্রাম্পের কিছু কিছু কাজ প্রবল আগ্রাসী, তিনি রাশিয়া আর চীনের নিরুত্তাপ বৈদেশিক নীতির পুর ফায়দা তুলছেন।

মজা করেই বলছিল, ধরুন আমেরিকা ফুটবল মাঠে হারছে তখন এই ধরনের ‘এয়ার কন্ট্রোল’ অস্ত্র যদি মাঠে প্রয়োগ করে? কারণ ট্রাম্পকে বিশ্বাস করা যায় না।

এ সব কখনই হবেনা তবে এখন ‘keep sports clean of politics’

এ সব আর ধোপে টিকে না । দেখেন না টি-২০ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ খেলবে না। বাংলাদেশের যায়গায় স্কটল‍্যান্ড খেলবে কারন বাংলাদেশের পর তাদেরই র‍্যাংক সবার উপরে ছিল।

শুরুটা হয়ে ছিল কেকেআর এর মুস্তাফিজের খেলা নিয়ে। কেকেআর এর মালিক শাহরুখ খান। ভারতে এই মুহূর্তে চলছে মুসলিম বিদ্বেষ।আর ইস‍্যু হলো শাহরুখ, মুস্তাফিজ দুইজনই মুসলমান। মুসলমান কেন ক্রীড়াঙ্গন ডোমিনাইট করবে। প্রায় দশকোটি টাকায় মুস্তাফিজুর চুক্তিবদ্ধ হয়ে ছিল যেটি এবারের সর্বোচ্চ পেমেন্ট। মুসলমান নিয়ে এত রাগ অথচ শেখ হাসিনাকে মহা আনন্দে দিল্লি তে রেখেছে।

দাবা খেলায় ‘ ওয়েটিং মুভ’ বলে। মোদি সেই ওয়েটিং মুভ নিয়ে বসে আছে . ঘুঁটি হলো শেখ হাসিনা। সর্বত্রই খেলা। তাই না ?

-কলামিস্ট


প্রবাসী বাংলাদেশি: রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তি অথচ আইনি সুরক্ষার সংকট

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
দৈনিক বাংলা ডেস্ক

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদান অপরিসীম। প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখলেও প্রবাসীরা এখনো পর্যাপ্ত আইনি সুরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অধিকারের বাইরে রয়ে গেছে।

সম্পত্তি দখল, বিনিয়োগ প্রতারণা, পারিবারিক অনিরাপত্তা, বিদেশে শ্রমিক নির্যাতন এবং ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া—এই সমস্যাগুলো প্রবাসীদের জীবনকে ক্রমশ অনিশ্চিত করে তুলছে। এই গবেষণাধর্মী প্রবন্ধে প্রবাসীদের বর্তমান আইনি বাস্তবতা, সংকট, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং বাংলাদেশের জন্য একটি প্রস্তাবিত প্রবাসীবান্ধব আইন কাঠামো বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

মোদ্দা কথা (Keywords): প্রবাসী বাংলাদেশিদের, রেমিট্যান্স সুরক্ষা, সম্পত্তি সুরক্ষা আইন, বিনিয়োগ আইন, রাজনৈতিক অধিকার ও মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

১. ভূমিকা (Introduction):

বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রার নেপথ্যে সবচেয়ে নীরব অথচ শক্তিশালী অবদানকারীদের একটি অংশ হলো প্রবাসী বাংলাদেশিরা। গ্রাম থেকে শহর, জাতীয় বাজেট থেকে বৈদেশিক বাণিজ্য—সব ক্ষেত্রেই তাদের শ্রমলব্ধ অর্থ প্রবাহিত হচ্ছে। কিন্তু এই জনগোষ্ঠীর জন্য রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও সুরক্ষা কাঠামো এখনো পরিপূর্ণ ও কার্যকর নয়। রাষ্ট্র একদিকে প্রবাসীদের কাছ থেকে অর্থনৈতিক অবদান গ্রহণ করলেও অন্যদিকে তাদের জীবন, সম্পদ ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত আইনি কাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি। এই দ্বৈতনীতি একটি গুরুতর সাংবিধানিক ও নৈতিক সংকট তৈরি করেছে।

২. প্রবাসী ও রাষ্ট্র: অর্থনৈতিক নির্ভরতার বাস্তবতা:

মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ জাতীয় আয়ের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।

এই রেমিট্যান্স—

১। বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখে।

২। ব্যাংকিং খাতে তারল্য সৃষ্টি করে।

৩। গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখে।

৪। নির্মাণ, পরিবহন ও ভোগ্যপণ্য শিল্পে কর্মসংস্থান বাড়ায়।

৫। দারিদ্র্য হ্রাসে প্রত্যক্ষ ও পরক্ষ ভূমিকা রাখে।

তবুও প্রবাসীরা অনেক সময় দেশে নিজেদের ‘অদৃশ্য নাগরিক’ হিসেবে অনুভব করেন—যাদের অর্থ গ্রহণ করা হয়, কিন্তু অধিকার সুরক্ষায় আন্তরিকতা দেখা যায় না।

৩. প্রবাসীদের প্রধান আইনি সংকট:

৩.১ সম্পত্তি দখল ও ভূমি জালিয়াতি।

প্রবাসীদের জমি দখল বাংলাদেশের অন্যতম বড় সামাজিক ও আইনি সংকট। কারণ, প্রবাসী প্রবাসে অবস্থানের সুযোগে:—

১। জাল দলিল তৈরি করা হয়।

২। ভুয়া পাওয়ার অব অ্যাটর্নি করা হয়।

৩। প্রশাসনিক দুর্নীতি করা হয়।

৪। স্থানীয় প্রভাবশালীদের দখলদারিত্ব ভেড়ে যায়।

এসবের মাধ্যমে প্রবাসীদের সম্পত্তি হাতছাড়া হয়ে যায়। দেশে ফিরে মামলা করলেও বিচার পেতে দীর্ঘসূত্রতা ও হয়রানির শিকার হতে হয়।

৩.২ বিনিয়োগ প্রতারণা:

ফ্ল্যাট, ব্যবসা, শিল্পকারখানা ও শেয়ারবাজারে প্রবাসীরা ব্যাপক বিনিয়োগ করেন। কিন্তু দালাল, অসাধু অংশীদার ও দুর্নীতিগ্রস্ত চক্রের কারণে বহু প্রবাসী সর্বস্বান্ত হয়েছেন। বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আলাদা দ্রুতগতির আদালত বা ট্রাইব্যুনাল নেই—যা একটি বড় আইনি শূন্যতা তৈরী করে।

৩.৩ প্রবাসী পরিবার অনিরাপত্তা:

প্রবাসীর স্ত্রী, সন্তান ও বাবা-মা অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক নির্যাতন, আর্থিক আত্মসাৎ ও সম্পত্তি বিরোধের শিকার হন। রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় অপরাধীরা অধিকাংশ সময় শাস্তির আওতার বাইরে থেকে যায়।

৩.৪ বিদেশে শ্রমিক নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন:

মধ্যপ্রাচ্য ও বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি শ্রমিকরা নিম্ন মজুরি, অমানবিক কর্মপরিবেশ, শারীরিক নির্যাতন ও পাসপোর্ট জব্দের শিকার হন। দূতাবাসের সীমিত আইনি সক্ষমতার কারণে তাদের অনেকেই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হতে হয়।

৩.৫ রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত

প্রবাসীরা বাংলাদেশের নাগরিক হয়েও ভোটাধিকার ও জাতীয় রাজনীতিতে কার্যকর প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকে। জাতীয় সংসদে তাদের জন্য কোনো নির্দিষ্ট আসন নেই, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের কণ্ঠ দুর্বল করে রাখা হয়।

৪. বিদ্যমান আইনি কাঠামোর সীমাবদ্ধতা:

বর্তমানে প্রবাসীদের বিষয়গুলো বিভিন্ন সাধারণ আইনের মধ্যে খণ্ডিতভাবে বিদ্যমান। ফলে—

প্রবাসীর বিশেষ দুর্বলতা আইনে প্রতিফলিত হয় না

বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল:

১। প্রবাস থেকে মামলা পরিচালনা কার্যত অসম্ভব।

২। ডিজিটাল আইন ব্যবস্থাপনা পূর্ণাঙ্গ নয়

আইন থাকলেও বাস্তব সুফল প্রবাসীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে পান না।

৫. আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও তুলনামূলক বিশ্লেষণ:

ভারত, ফিলিপাইন, মেক্সিকো ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো প্রবাসীদের জন্য পৃথক আইন, ভোটাধিকার ও সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলেছে।

এসব দেশে—

১। প্রবাসীরা সম্পত্তি ও বিনিয়োগে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি পান।

২। দূতাবাসে শক্তিশালী লিগ্যাল সেল রয়েছে।

৩। প্রবাসীরা সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেন।

৪। বাংলাদেশ এখনো এই মানদণ্ডে অনেক পিছিয়ে রয়েছে।

৬. প্রবাসীবান্ধব আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা:

৬.১ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে:

আইনি সুরক্ষা থাকলে রেমিট্যান্সের ধারাবাহিকতা ও বিনিয়োগের প্রবাহ নিশ্চিত হবে।

৬.২ সামাজিক স্থিতি রক্ষায়

প্রবাসীর পরিবার নিরাপদ থাকলে সামাজিক অস্থিরতা কমবে।

৬.৩ রাষ্ট্র ও নাগরিকের আস্থা জোরদারে

আইনের মাধ্যমে সুরক্ষা নিশ্চিত হলে প্রবাসীদের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা দৃঢ় হবে।

৭. প্রস্তাবিত আইনসমূহ (সংক্ষিপ্ত কাঠামো):-

১। প্রবাসী নাগরিক মর্যাদা আইন।

২। প্রবাসী সম্পত্তি সুরক্ষা আইন।

৩। প্রবাসী বিনিয়োগ সুরক্ষা আইন।

৪। প্রবাসী পরিবার সুরক্ষা আইন।

৫। প্রবাসী শ্রমিক অধিকার আইন।

৬। প্রবাসী সামাজিক নিরাপত্তা আইন।

৭। প্রবাসী রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব আইন।

৮. বাস্তবায়ন কাঠামোতে এই আইনসমূহ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন:-

১। প্রবাসী অধিকার কমিশন

২। বিশেষ প্রবাসী ট্রাইব্যুনাল

৩। অনলাইন মামলা ও সাক্ষ্যগ্রহণ ব্যবস্থা ও

৪। দূতাবাসভিত্তিক আইনি সহায়তা ইউনিট

এই দায়িত্ব রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সমূহের ওপর বর্তায়।

৯. আইন না হলে সম্ভাব্য ঝুঁকি বাড়বে:

১। রেমিট্যান্স প্রবাহ হ্রাস পাবে

২। অবৈধ হুন্ডি বাজার বিস্তার কমবে।

৩। প্রবাসীদের দেশে বিনিয়োগে অনীহা বাড়বে।

৪। পারিবারিক ও সামাজিক ভাঙন

৫। রাষ্ট্র ও প্রবাসীর মধ্যে আস্থার সংকট

১০. উপসংহার (Conclusion)

প্রবাসী বাংলাদেশিরা শুধু বৈদেশিক মুদ্রার উৎস নয়—তারা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড, বৈদেশিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের কৌশলগত শক্তি। অথচ তারা আজও জমি দখল, বিনিয়োগ প্রতারণা, পরিবারিক অনিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বঞ্চনার শিকার। একটি ন্যায়ভিত্তিক ও আধুনিক রাষ্ট্রে এই অবস্থা গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রবাসীদের জন্য পৃথক, শক্তিশালী ও কার্যকর আইন প্রণয়ন কোনো দয়ার বিষয় নয়—এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা। প্রবাসীরা সমান মর্যাদার নাগরিক—এই সত্যকে আইনের ভাষায় প্রতিষ্ঠা করাই হবে আগামীর বাংলাদেশের প্রকৃত উন্নয়নের ভিত্তি।

লেখক : ড. রফিকুল ইসলাম, সম্পাদক, সমকণ্ঠ নিউজ পোর্টাল।


নার্সিং শিক্ষা সংকট: পেপার নার্স নয়, দক্ষ নার্স চাই

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
দৈনিক বাংলা ডেস্ক

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা আজ এক নীরব বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে, যার নাম নার্সিং শিক্ষা সংকট। আমরা হাসপাতাল বানাচ্ছি, যন্ত্রপাতি আনছি, চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়াচ্ছি—কিন্তু যাদের হাতে এই স্বাস্থ্যব্যবস্থা বাস্তবে চলে, সেই নার্সদের দক্ষতা তৈরিতে আমরা চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছি। নার্সিং একটি কর্মমুখী পেশা, কিন্তু বাংলাদেশে এটিকে রূপান্তর করা হয়েছে একটি তাত্ত্বিক সার্টিফিকেট প্রোগ্রামে। এর ফল আজ স্পষ্ট—রোগীর নিরাপত্তা ঝুঁকিতে, জনআস্থার সংকট গভীর, আর বৈশ্বিক সুযোগ হাতছাড়া।

নার্সিং শিক্ষা মানেই হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, রোগীর পাশে দাঁড়িয়ে শেখা, ক্লিনিক্যাল সিদ্ধান্ত নেওয়া, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং মানবিক সেবা। অথচ বাস্তবে আমরা তৈরি করছি ‘পেপার নার্স’—যাদের ডিগ্রি আছে, কিন্তু দক্ষতা নেই। দেশে বর্তমানে প্রায় পাঁচ শতাধিক সরকারি ও বেসরকারি নার্সিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একই কায়দায় নার্স তৈরি করছে। মান নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় এই প্রতিষ্ঠানগুলো সার্টিফিকেট উৎপাদনের কারখানায় পরিণত হয়েছে।

এই ব্যর্থতার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো—এটি সরাসরি রোগীর জীবনের ওপর প্রভাব ফেলছে। দক্ষ নার্স না থাকলে ওষুধ প্রদানে ভুল হয়, সংক্রমণ বাড়ে, রোগীর অবস্থা অবনতি শনাক্ত হয় না, ICU ও জরুরি সেবায় ঝুঁকি তৈরি হয়। অর্থাৎ নার্সিং শিক্ষার দুর্বলতা মানে হাসপাতাল নিজেই একটি হাই-রিস্ক জোনে পরিণত হওয়া।

আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, প্রতিবছর দেশে প্রায় ২০ হাজারের বেশি নার্স তৈরি হলেও তাদের বড় একটি অংশ কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছে না। একদিকে দেশে হাসপাতালগুলো দক্ষ নার্সের অভাবে ভুগছে, অন্যদিকে নার্সরা বেকার—এই বৈপরীত্য প্রমাণ করে সমস্যাটি চাকরির নয়, দক্ষতার। বিদেশে নার্সদের বিপুল চাহিদা থাকা সত্ত্বেও আমাদের নার্সরা আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা ও পেশাগত ইংরেজির অভাবে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য এখন আর নরম ভাষা বা ধীর পদক্ষেপ চলবে না। সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ—সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। নার্সিং শিক্ষায় ৭০ শতাংশ ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে পূর্ণাঙ্গ স্কিল ল্যাব, প্রশিক্ষিত ক্লিনিক্যাল ইনস্ট্রাক্টর এবং বাস্তব রোগীভিত্তিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। লাইসেন্স পাওয়ার আগে OSCE ভিত্তিক দক্ষতা মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা জরুরি।

একই সঙ্গে জাতীয়ভাবে ‘নার্সিং স্কিল ও পেশাগত ইংরেজি উন্নয়ন কর্মসূচি’ চালু করতে হবে, যাতে নতুন গ্র্যাজুয়েটরা ৩–৬ মাসের নিবিড় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় কর্মবাজারে প্রবেশের যোগ্যতা অর্জন করে। এটি শুধু কর্মসংস্থানের প্রশ্ন নয়; এটি রোগীর নিরাপত্তা, হাসপাতালের মান এবং জাতীয় মর্যাদার প্রশ্ন।

আজ যদি আমরা দক্ষ নার্স তৈরির পথে না যাই, তবে আগামী দিনে হাসপাতাল থাকবে, কিন্তু নিরাপদ সেবা থাকবে না। ডিগ্রি থাকবে, কিন্তু দক্ষতা থাকবে না। আর একটি জাতির স্বাস্থ্যব্যবস্থা যখন দক্ষ নার্স ছাড়া চলে, তখন সেই জাতি কেবল অসুস্থ নয়—ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এখনই সময়—পেপার নার্স নয়, দক্ষ নার্স তৈরির।

লেখকঃ নার্সিং শিক্ষাবিদ ও গবেষণা পরামর্শক, বাংলাদেশ।


শান্তিপূর্ণ লড়াইয়ের প্রত্যাশায়

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
দৈনিক বাংলা ডেস্ক

গত ২২ জানুয়ারি দৈনিক বাংলারে প্রধান শিরোনাম ছিল- ‘ভোটের লড়াই শুরু, প্রতীক নিয়ে মাঠে প্রার্থীরা’। একই দিন অপর একটি দৈনিকের শিরোনাম ছিল, ‘আজ থেকে মাঠের লড়াই শুরু।’ বলা নিষ্প্রয়োজন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুাষ্ঠিক প্রচারণা শুরুর বিষয়টি খবরে তুলে ধরা হয়েছে। লক্ষণীয় হলো, অধিকাংশ সংবাদপত্র ‘ভোটের লড়াই’ জোড়া শব্দ ব্যবহার করেছে। কেউ কেউ অবশ্য নির্বাচনকে ভোটযুদ্ধও বলে থাকেন। তা যুদ্ধ বলি আর লড়াই বলি, বিষয়টি আসলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। যেহেতু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও প্রার্থীদের মধ্যে ভোট সংগ্রহের নিমিত্তে একটি যুদ্ধংদেহী মনোভাব কাজ করে, তাই এটাকে লড়াই বা যুদ্ধ: বলাটা অসমীচীন নয়।

লড়াই শব্দটি শুনলেই ঢাল-তলোয়ার অস্ত্র-গোলাবারুদ আর খুনোখুনির দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে। শিউরে ওঠে শরীর। তবে কিছু লড়াই আছে, যেগুলোতে অস্ত্রশস্ত্রের প্রয়োজন পড়েনা। কাউকে খুন-জখমেরও দরকার হয় না। বুদ্ধি আর কৌশলে সেসব লড়াইয়ে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়। এমন লড়াইগুলোর মধ্যে খেলাধুলা বা ক্রীড়া অন্যতম। ফুটবল, ক্রিকেট কিংবা যে কোনো খেলাই হোক না কেন, মূলত সেটা শিরোপা দখলের লড়াই। এসব লড়াইয়ে খেলোয়াড়দের বুদ্ধিমত্তা ও ক্রীড়ানৈপুণ্য জয়লাভের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অবশ্য খেলার মাঠের শান্তিপূর্ণ লড়াই সবসময় শান্তিপূর্ণ থাকে না। কখনও কখনও তা সংঘর্ষে গড়ায়। সেটা মাঠের খেলোয়াড় কিংবা মাঠের বাইরে গ্যালারিতে বসে থাকা দর্শকদের মধ্যেও হতে পারে। একসময় ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব ও আবাহনী লিমিটেডের মধ্যে অনুষ্ঠিত খেলা সংঘর্ষ ছাড়া শেষ হয়েছে খুব কম। মাঠের সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ত স্টেডিয়ামের বাইরে। আর তার অনিবার্য শিকার হতো নিরপরাধ মানুষ; মাঠের খেলা কিংবা গ্যালারির উল্লাস কোনোটাতেই যাদের কোনো ভূমিকা থাকত না। অথচ মাঠে যে দলই গোল খেয়ে থাকুক বা ফাউল করুক, ক্লাব দুটির জানবাজ সমর্থকদের লাঠি কিংবা ইটের আঘাত হজম করতে হতো স্টেডিয়ামের বাইরে পথের পাশের নীরিহ দোকানি, পথচারী এবং গাড়িগুলোকে। অনেকটা ‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখড়ের জীবন যায়’ উপমার মতো।

রাজনীতি যদিও কোনো খেলা নয়, তবে এ প্রসঙ্গে অনেকেই ‘খেলোয়াড়ি মনোভাব’ কথাটি ব্যবহার করে থাকেন। মানে, রাজনীতি যারা করবেন, তাদের মনোভাব হতে হবে খেলোয়াড়দের মতো সৌহার্দ্যপূর্ণ। জয়-পরাজয়কে সহজভাবে মেনে নেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। খেলা শেষ তো প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষ। মাঠের বাইরে সবাই সবার বন্ধু। তবে নিরেট সত্যি হলো, মুখে বললেও সে মানসিকতা আমাদের দেশের খুব কম রাজনীতিকেরই ছিল কিংবা আছে। আর এই না থাকাটা আমাদের জাতীয় জীবনে নানা উৎকট সমস্যা অতীতে সৃষ্টি করেছে। যেহেতু রাজনীতি রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে, তাই এই গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডে যারা জড়িত থাকবেন, তাদের কাছ থেকে মানুষ পরমত সহিষ্ণুতা, জনরায় মেনে নেওয়ার মানসিকতা ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যবোধ আশা করে। কিন্তু দুঃখজনক হলো, জনগণের সে আশা সবসময় হতাশার চোরাবালিতে হারিয়ে যায়।

বলা হয়ে থাকে রাজনীতির সৌন্দর্য হচ্ছে সমঝোতা ও প্রীতিসুলভ প্রতিদ্বান্দ্বিতা। প্রতিযোগিতাও বলা যায়। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা প্রতিযোগিতার বিষয়টি প্রাসঙ্গিক হয়ে দেখা দেয় নির্বাচনের সময়। নির্বাচন, বিশেষত জাতীয় নির্বাচন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ সিদ্ধান্ত নেয়, পরবর্তী মেয়াদে কারা রাষ্ট্র নামের যানটির ড্রাইভিং সিটে বসবে। জনগণ যদি রাষ্ট্রের চালক নির্বাচনে ভুল করে, তাহলে দুর্ভোগটা তাদেরই পোহাতে হয়। তবে জনগণের রাষ্ট্র-চালক নির্বাচনের ক্ষেত্রে সুস্থ পরিবেশ থাকা অন্যতম একটি পূর্বশর্ত। গণতান্ত্রিক রীতি অনুযায়ী অবাধে যদি জনগণ তথা ভোটার সাধারণ ব্যালট পেপারে তাদের অভিমত ব্যক্ত করতে পারে, তাহলে চালক নির্বাচনে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে কম। অবশ্য অনেক সময় প্রচার-প্রপাগাণ্ডার আবহে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত যে নেয়না, তা নয়। আর এক্ষেত্রে গোটা রাষ্ট্র ও নাগরিকদের খেসারত দিতে হয়।

বাংলাদেশে প্রায় দেড় দশক আদৌ কোনো নির্বাচন হয়নি। নির্বাচনের নামে হয়েছে প্রহসন। কখনো একতরফা, কখনো রাতেই ব্যালট পেপারে সিল মারা, আবার কখনো ‘আমরা-আমরাই তো’ ধরনের নির্বাচন। বলাই বাহুল্য, সেসব নির্বাচনে জনমতের বাস্তবিক প্রতিফলন ঘটে নি। হয়তো তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলটি নির্বাচনে ‘জয়লাভে’র আত্মপ্রসাদ লাভ করেছে। তবে ক্ষতি হয়েছে গণতন্ত্রের। কেননা, ওই তিনটি নির্বাচন বাংলাদেশের জনগণকে রাজনীতি, গণতন্ত্র ও নির্বাচনের প্রতি আস্থাহীন করে তুলেছিল। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশে পুনরায় অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। সে নির্বাচনের মাঠের লড়াই শুরু হয়েছে গত ২২ জানুয়ারি থেকে, যে কথা আগেই উল্লেখ করেছি। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, তারা এতদিন বাগ্যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। এবার তারা জনগণের ভোট নিজেদের পক্ষে নেয়ার জন্য মাঠে-ময়দানে তৎপরতা চালাবে। প্রচার চালাবে দ্বারে দ্বারে গিয়ে। এটাই ভোটের মূল লড়াই। এ লড়াই শেষ হবে সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি।

অবশ্য পূর্বের যেকোনো নির্বাচনের চেয়ে এবারের নির্বাচনী প্রচারণা হতে যাচ্ছে একটু ভিন্ন আবহে। আগে যেমন প্রার্থীদের পোস্টারে সারাদেশের বাড়ি-ঘরের দেয়াল ছেয়ে যেত, এবার তা হবেনা। নির্বাচন কমিশন পোস্টার ছাপানো নিষিদ্ধ করেছে। ব্যবহার করা যাবেনা ড্রোনও। তবে একটি সংসদীয় আসনে ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। জনসংযোগ-জনসভা করা যাবে নির্বাচন কমিশন প্রণীত বিধি মেনে। একই সঙ্গে বিদেশে সভা-সমাবেশের প্রাচারণাও করা যাবে না। এছাড়া আগের নির্বাচনগুলোতে যেসব তৎপরতা নিষিদ্ধ ছিল এবারও তা নিষিদ্ধ থাকছে। তন্মধ্যে দল বা প্রার্থীর পক্ষে মিছিল করা যাবে না।

দীর্ঘদিন পরে দেশের মানুষ একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন পেতে চলেছে, এমনটি মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকগণ। তবে এ নির্বাচনকে সর্বাংশে অংশগ্রহণমূলক বলার সুযোগ নেই। কেননা, কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় দেশের অন্যতম রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। তাদের সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের ভোট কাদের বাক্সে যাবে, তারচেয়ে বড় বিষয় হলো, নিরপেক্ষ নির্বাচনী পরিবেশে জনগণের কাছে দলটির গ্রহণযোগ্যতা পরিমাপ করা গেল না। যাক, সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। এ মুহূর্তে সবচেয়ে আলোচ্য বিষয় হলো, জনগণের প্রত্যাশিত একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। গণতন্ত্রপ্রিয় নাগরিকদের প্রত্যাশা, নির্বাচনটি শান্তিপূর্ণ হোক, যাতে যার ভোট সে স্বহস্তে দিতে পারে। সরকার অবশ্য শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই গ্রহণ করার কথা বলছে। তবে কিছু কিছু ঘটনা জনমনে শঙ্কার জন্ম দিয়েছে নির্বাচন আদৌ শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হবে কি না। সম্প্রতি সংঘটিত কয়েকটি হত্যাকাণ্ডকে অনেকেই অশনি সংকেত হিসেবে দেখছেন। জুলাই আন্দোলনের সময় লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের একটি বিরাট অংশ এখনো উদ্ধার করতে পারেনি সরকার। তার ওপর সীমান্তের বাইরে থেকেও অস্ত্র প্রবশে করছে, এমন খবর গণমাধ্যমে এসেছে। এসব অবৈধ অস্ত্র নির্বাচনকালে ব্যবহৃত হয়ে পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে, এমন আশঙ্কা অমূলক নয়। তাছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের খবরও পাওয়া যাচ্ছে। গত ২০ জানুয়ারি রাজধানীর মিরপুরে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির কর্মীদের মধ্যে যে সংঘর্ষ হয়েছে, তা মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে। আমাদের রাজনৈতিক ট্র্যাডিশন অনুযায়ী এই সংঘর্ষের দায় দল দুটি একে অপরের ওপর চাপাতে চাচ্ছে। তবে, এক হাতে যেমন তালি বাজেনা, তেমনি একটি পক্ষের কারণে সংঘর্ষ হয়না, এটা মনে রাখা দরকার। সবচেয়ে বড় কথা, রাজনৈতিক দলগুলো কিংবা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা যদি তাদের কর্মী-সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণ না করেন, তাহলে পরিবেশ শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ থাকবে এ নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না।

যে নির্বাচনী লড়াইটি শুরু হয়েছে, তা শান্তিুপূর্ণ রাখতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও দলগুলোর ধৈর্য্য, সংযম ও সহনশীলতা। অস্বীকার করার উপায় নেই, অতি উৎসাহী কতিপয় নেতাকর্মীর বাড়াবাড়ি পরিবেশ বিনষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অতীতে দেখা গেছে, এক প্রার্থীর পোস্টারের ওপর অন্য প্রার্থীর পোস্টার সাঁটানো, ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা, মিছিলে উসকানিমূল স্লোগান দেওয়া ইত্যাদি কারণে সংঘাত-সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত হবে স্ব স্ব দলের প্রার্থীদের এ ব্যাপারে কঠোরভাবে সতর্ক করে দেওয়া। মোদ্দা কথা হলো, রাজনৈতিক দলগুলো ভোটের লড়াইকে যদি আদর্শ ও কর্মসূচির লড়াইয়ের পরিবর্তে পেশিশক্তির লড়াইয়ে পরিণত না করে, তাহলে দেশবাসী আরেকটি সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখতে পাবে। আর যদি রাজনৈতিক দলগুলো ও তাদের প্রার্থীরা জনগণের ওপর আস্থা না রেখে পেশিশক্তির ওপর নির্ভর করে, তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচন যেমন নির্বাসনে যাবে, তেমনি গণতন্ত্রও পড়বে মুখ থুবড়ে। দেশবাসী এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর শুভবুদ্ধির প্রত্যাশা করছে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।


banner close