মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০২৪

দেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকাশ   

হায়াৎ মামুদ
হায়াৎ মামুদ
প্রকাশিত
হায়াৎ মামুদ
প্রকাশিত : ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ ১১:৩৫

একটি মানবগোষ্ঠী তার উদ্ভবকাল থেকে যতদিন পর্যন্ত সে টিকে থাকছে ততদিন যাপিত গোষ্ঠীজীবনে অসংখ্য বস্তু-উপাদান ও মনন-কল্পনাজাত ভাব-উপাদানের সম্মিলনে নিজের সংস্কৃতি নির্মাণ করে তোলে। জীবন যেহেতু তৈরি হয় স্থান, কাল ও পাত্রের চালচিত্রে তাই জীবন এক জায়গায় থেমে থাকে না, সমাজের মানুষ জ্ঞাতসারে কী অজ্ঞাতে পাল্টাতে-পাল্টাতেই এগিয়ে যায়। কালস্রোতে মানুষের দৃষ্টিকোণ পরিবর্তিত হয়, সামাজিক আচরণ ও অভ্যাসে ভিন্নতা আসে, শিল্পের সাধনায় বৈচিত্র্য দেখা দেয়, মোড়বদল ঘটে। খাদ্যের অভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ, বাস্তুনির্মাণ, ভাষা, ধর্ম, সামাজিক সংস্কার, এমনকি কুসংস্কার এবং মনের গড়ন ও কল্পনার ধাঁচ সবই একটি জাতির সাংস্কৃতিক উপাদান। জীবনকে বাদ দিয়ে তাই সংস্কৃতির অস্তিত্ব নেই। জীবন পাল্টে যেতে থাকলে সে কারণে সংস্কৃতির রূপও অন্যরকম হতে থাকে। আর জীবন পাল্টায় ঘটনার অভিঘাতে। ব্যক্তি মানুষের জীবন ও গোষ্ঠীজীবন উভয়ই। আর জনসমাজের বাইরে তো সংস্কৃতি নেই। জনগোষ্ঠীর প্রবহমান জীবনধারা, তার অভ্যাস ও সংস্কার, ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বা বিচ্যুতি, তার বিশ্বাস বা সংশয় ইত্যাদি অজস্র বিষয় মিলে সমাজের যে মনোবিন্যাস তৈরি হয়ে ওঠে সেটিই প্রতিফলিত হয় সংস্কৃতির শরীরে। সমাজের চলন ঠিক করে দেয় তার ভেতরে বসবাসরত ব্যক্তি মানুষই কখনো কখনো বিশিষ্ট একক, কখনো বা বহুজনের সম্মিলনে রূপ নেওয়া সংঘ বা গোষ্ঠী। কিন্তু চলন তো নির্দিষ্ট চূড়ান্ত কোনো অবয়বে চিরস্থায়ী হয়ে থাকে না।

একটা দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক- আজ থেকে পুরো চল্লিশ বছর পেছনে যেতে হচ্ছে। আমি তখনকার সোভিয়েত ইউনিয়নে লেনিনগ্রাদ শহরে, এখন যা আদি নাম ফিরে পেয়ে সাংকৎ পিতের্বুর্গ (ইংরেজিতে এরই নাম সেন্ট পিটার্সবার্গ) হয়েছে, বছরখানেকের জন্য গেছি। একটি পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়। স্বামী-স্ত্রী ও শিশুপুত্র। তারাও গিয়েছিলেন বাইরে থেকে। ফের্নান্দ ভান দাম ছিলেন বেলজিয়ান, গেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষাতত্ত্বের মাস্টার। আমি ছিলাম একা, স্ত্রী-পুত্র ঢাকায় রেখে গেছি। ফের্নান্দ-আমি দুজনেই লেনিনগ্রাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে, একই ক্লাসে। আড্ডাবাজ দুজনেই। ফলে ঘনিষ্ঠতায় বিলম্ব হয় না। ওরা (ছাত্রাবাসেই কিংবা বলা ভালো ছাত্রছাত্রী ভবন) আছেন, সেটাই নিয়ম, তবে যেহেতু বাসিন্দা একা নন, ৩ জনের সংসার, তাই কামরার আয়তন প্রয়োজনমাফিক যথেষ্ট বড়। আমার সান্ধ্য গল্পগুজব মোটামুটি ওদের সঙ্গেই হয়।

একদিন হঠাৎ ফের্নান্দ বলে বসেন, ‘হায়াৎ তোমার বৌ-বাচ্চার ছবি তো দেখালে না।’

আমি বলি, নেই তো! দেখাব কী?

তারপর ঢাকায় বউকে লিখি ছবি পাঠাতে, বন্ধু-বান্ধব তোমাকে দেখতে চাইছে। ছবি পাঠাও।

যে যুগের কথা বলছি তখন তো কম্পিউটার-ইন্টারনেট ইত্যাদি ছিল না, এমনকি মোবাইল ফোনও নয়। মস্কো-ঢাকা-মস্কোয় চিঠি যাতায়াত নিদেনপক্ষে মাসখানেকের ধাক্কা। ফলে মাস দুই-আড়াইয়ের মাথায় যখন বন্ধু দম্পতিকে স্ত্রীর ছবি দেখাই তারা বলে ওঠেন, তোমার বউ দেখতে বেশ। আমি বলি, তাই বুঝি? হবেও বা!

তাদের কৌতূহল মেটানোয় আমার দায়িত্ব শেষ। কিন্তু ব্যাপারটা যে চুকেবুকে যায়নি তা বুঝলাম পরে। সময় আরও গড়িয়েছে। আমার চরিত্র কাঠামোয় ভারতবর্ষীয় মেজাজের এলেবেলে ভাব তারা ততদিনে বুঝে গেছেন এবং পশ্চিমি ফর্মালিটির চৌহদ্দির ত্রিসীমানায় আমরা নেই এমন সিদ্ধান্তে আসার পর একদিন মুখ খোলেন।

কিছু যদি মনে না করো, একটা জিনিস বলি।

বলো না, মনে করার কী আছে? অকপটে জিজ্ঞাসা করতে পারো, বিনা দ্বিধায় উত্তর দেবো।

ফের্নান্দ আমতা আমতা করে তার প্রাথমিক দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে চায়, ‘না মানে ঐরমযষু চবৎংড়হধষ, বুঝলে কি না, সে জন্যই...’।

হোক না পারসোনাল! কী আর এমন হাতিঘোড়া প্রশ্ন করবে যে জবাব দিতে আমার কষ্ট হবে?

বলেই ফেলি তবে, কেমন? দ্বিধা জয় করে বিশদ হতে চান বন্ধুবর, অনেক দিন আমাদের স্বামী-স্ত্রী তোমাকে নিয়ে কথা হয়েছে। আমরা আফসোস করেছি, আহা, এমন খাসা ছেলে, কিন্তু কপালের কী গেরো, দাম্পত্য সম্পর্ক ভালো নয়, স্বামী-স্ত্রীর বনিবনা নেই।

ও মা! বলে কী? চেয়ার থেকে আমার পড়ে যাওয়ার দশা প্রায়। আমি বলি, কেন মনে হয়েছিল এমন?

মনে হওয়াটা যে ভুল সে ব্যাপারে মনে মনে নিশ্চিত না হলে তো এই আলাপ পাড়া যেত না, তাই না? ঘটনাটা তোমাকে মনে করাই। আমরা তোমার বউয়ের ছবি দেখতে চাইলে তখনি যে দেখাতে পারোনি, প্রথম খটকা লাগে সেখানে।

অবাক হওয়ার পালা এবারে আমার। বলি, তোমরা দেখাতে পারো নাকি? বউয়ের ছবি সঙ্গে নিয়ে ঘোরো নাকি? আশ্চর্য! তোমরা যেন কতই দেখাও!

কী বলে! এখন ভিরমি খাওয়ার জোগাড় আমার বিদেশি বন্ধুর, আলবৎ, ছবি নিয়ে ঘোরাফেরা করি। দেখবে? এই দেখো, বলেই মানিব্যাগ খুলল তার ভেতর থেকে ছবি বের করে তারপর ব্যাখ্যা দেয়, আমরা সব বিবাহিত পুরুষই স্ত্রীর ছবি বুকে নিয়ে সর্বক্ষণ ঘুরে বেড়াই, বুকে নিয়ে মানে মানিব্যাগে নিয়ে, বুঝলে না!

কেন ঘোরো? কষ্ট হয় না?

আমার প্রশ্ন বুঝতে কষ্ট হয় তার। ধন্দে পড়ে গিয়ে বলে, কষ্ট? কেন, কষ্ট কিসের?

কষ্ট না? মানুষটি কাছে নেই, যে মানুষটিকে এত ভালোবাসি সে-ই কাছে নেই, তো ছবি কাছে রেখে কী লাভ? যতবার ছবিতে চোখ পড়বে ততবারই তো নতুন করে মন খারাপ হবে। হবে না? তুমিই ভেবে দেখো।

স্বীকার করে ফের্নান্দ, আমরা ঠিক এভাবে ভাবী না। সন্দেহ নেই আমাদের চেয়ে তোমাদের ভাবনার ধরন অনেক বেশি সংবেদনশীল। একটু থেমে পুনশ্চ যোগ করে, ব্যাপারটা কী, জানো, বিষয়টা ভালো-মন্দের নয়, এ হচ্ছে সংস্কৃতি ভিন্নতা।

আমার মনে পড়ে সৈয়দ মুজতবা আলীর পর্যবেক্ষণ। নিয়মনিষ্ঠ কট্টর জাত জর্মনরা কখনো নাকি মনের আবেগ বাইরে খুলে এনে অন্যকে দেখায় না। যেমন- চিঠি এসেছে দারুণ দুঃসংবাদ বয়ে নিয়ে, কোনো প্রিয়জনের মৃত্যু, চোখ ফেটে কান্না আসছে, বুক ভেঙে যাচ্ছে, কিন্তু সেই ভাঙন বাইরের লোক দেখবে কেন? জর্মনটি প্রক্ষালণ কক্ষে গিয়ে একচোট কেঁদে নিয়ে, তারপর হাতে-মুখে পানি ছিটিয়ে, মুছে, পরিপাটি হয়ে অন্যের সামনে হাজির হবে। শোকের ধরন একই, কিন্তু প্রকাশ ভিন্নতা সংস্কৃতির চেহারা চিনিয়ে দেয়। দুঃখে-শোকে আমরা কান্নাকাটি করি, সে তো সব মানুষই করে। কিন্তু সেই হাহাকারকে দৃষ্টিগ্রাহ্য করে তোলা ভারতীয় সংস্কৃতি অভ্যাস সম্ভবত। কিংবা কে জানে, এমনও হতে পারে যে কৃষিভিত্তিক সামাজিক গড়ন এর মূলে রয়েছে, ফলে ভারতবর্ষীয় উপমহাদেশের সমাজই নয় শুধু, এ ধরনের সমাজ যে দেশে বা যে জনগোষ্ঠীর ভেতরে আছে সেখানেই এমনটি দেখা যাবে বলে মনে হয়।

জনসমাজের বাইরে তো সংস্কৃতি নেই। জনগোষ্ঠীর প্রবহমান জীবনধারা, তার অভ্যাস ও সংস্কার, ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বা বিচ্যুতি, তার বিশ্বাস বা সংশয় ইত্যাদি অজস্র বিষয় মিলে সমাজের যে মনোবিন্যাস তৈরি হয়ে ওঠে সেটিই প্রতিফলিত হয় সংস্কৃতি শরীরে। সমাজের চলন ঠিক করে দেয় তার ভেতরে বসবাসরত ব্যক্তি মানুষই- কখনো কখনো বিশিষ্ট একক, কখনো বা বহুজনের সম্মিলনে রূপ নেয়া সংঘ বা গোষ্ঠী। কিন্তু চলন তো নির্দিষ্ট চূড়ান্ত কোনো অবয়বে চিরস্থায়ী হয়ে থাকে না। চলন পাল্টায় বহু কিছুর চাপে-প্রশ্রয়ে-সংক্ষোভে।

অন্তরালবর্তী কার্যকারণ তো থাকবেই, থাকতে বাধ্য, বড় কথা হলো ওই চলনের চলিষ্ণুতা। মানুষ পাল্টালে সমাজ পাল্টাবে, সমাজ পাল্টালে সংস্কৃতি পাল্টাবে। এই স্বাভাবিক ব্যাপারটি সাধারণ মানুষের সাধারণ চর্মচক্ষুতেই ধরা পড়ে। এই রূপান্তর কি পরিবর্তন কিন্তু এত ধীরগতিতে ঘটতে থাকে যে সঙ্গে সঙ্গে বোঝা যায় না, বেশ কিছুটা সময় পার হলে তখন চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা ও ইন্দ্রিয়জাত অনুভূতিতে উপলব্ধি করা সম্ভব হয়।

বাংলাদেশের সমাজ যে আগের জায়গায় অনড় হয়ে জগদ্দল পাথরের মতো বসে নেই, এই বাস্তবতা হৃদয়ঙ্গম করার জন্য পণ্ডিত হতে হয় না, সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক কাণ্ডজ্ঞানই যথেষ্ট। পৃথিবী এখন কব্জা করে রেখেছে অর্থনীতি ও রাজনীতি এবং দুটির কোনোটিই কেবল দৈশিক নয়, আন্তর্জাতিক বা বৈশ্বিকও। এর ফলে বিশ্বায়নের ছিদ্র দিয়ে বহির্বিশ্বের চিন্তা ও জীবনপ্রবাহ যেভাবে আমাদের জীবনে এসে ঢুকছে তা রোধ করার সাধ্য কারও হাতে নেই এবং সবই যে খোলা কর্দমাক্ত বেনো জল আমার সাংস্কৃতিক অমলিনতা কলুষিত করার জন্য সবেগে ছুটে আসছে এমনও নয়। প্রশ্ন হলো- বিবেচনা শক্তির, ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর উভয়েরই। খাদ্যবস্তু যত উত্তম, দুর্মূল্য ও বিখ্যাতই হোক না কেন, নিজের পরিপাকশক্তি হিসেবে না রাখলে তা গ্রহণ শারীরিক বিশৃঙ্খলা ও বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ডাক্তারি শাস্ত্রে অ্যালার্জি বলে একটা কথা আছে, এটি কোনো অসুখ নয়, কোনো বিষক্রিয়া জীবাণু-ভাইরাস ইত্যাদি এর উৎস নয়। নির্দিষ্ট একক কোনো ব্যক্তির দেহ বা শারীরবৃত্ত যা গ্রহণে অনিচ্ছুক ও তীব্র শারীরিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে সেটিই অ্যালার্জি।

আমার সমাজদেহের প্রকৃতি ও স্বভাবগত ক্ষমতা সে কারণেই সম্যকরূপে জানা থাকতে হবে, অন্যথায় বহিরাগতের কোনো অভিঘাত বা প্রভাবে ভারসাম্যহীনতা, ক্ষয়, বিনষ্টিপ্রবণতা ইত্যাদি এসে হাজির হতেই পারে। আত্তীকরণে ব্যাঘাত হলেই অনাসৃষ্টি দেখা দেবে। আত্তীকরণ প্রক্রিয়া কিন্তু জবরদস্তিতে হয় না, হয় স্বভাবধর্মের চাহিদাতে। ফলে মানুষ ও সমাজ সেটাকেই আত্মস্থ করে যার চাহিদা ভেতর থেকেই সৃষ্টি হয়েছে। সংস্কৃতির ভাঙা-গড়া, অর্জন-বিসর্জন ইত্যাদি কালধর্ম ও সমকালীন মানুষের স্বভাবধর্ম অনুযায়ীই ঘটে থাকে। এই সত্য অনুধাবন ও মান্য করলে সংস্কৃতি নিয়ে চিন্তা বা দুশ্চিন্তার সুরাহা মিলবে। গণতন্ত্রও বিকাশ লাভ করবে।

লেখক: সাহিত্যিক


আপনি আমি সচেতন হলেই জলাবদ্ধতা দূর হবে

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
কৃষিবিদ মো. বশিরুল ইসলাম

টানা বৃষ্টি হলেই মহানগরীগুলোতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। পথঘাটগুলো কূল-কিনারাহীন নদী হয়ে যায়। যারা বাড়ি-ঘর, মার্কেট নির্মাণ করেন তারা কি রাজউকে নির্দেশ শতভাগ মানেন? জলাবদ্ধতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের অ্যাকাউন্টে এভাবেই লেখেন চন্দ্রশিলা। জলাবদ্ধ এলাকার ছবি জুড়ে দিয়ে তিনি আরও লেখেন, ‘দেশের মানুষ কি যত্রতত্র পলিথিন, পানির বোতল, ময়লা ফেলা বন্ধ করেছেন? দায় কিন্তু সব রাষ্ট্রের একার হয় না, প্রতিটি মানুষের দায়-দায়িত্ব থাকতে হয়। কারণ সমস্যা হলে ভোগ করতে হয় প্রতিটি মানুষকেই।

হাসিব বাবু ফেসবুকে নিজের অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, জলাবদ্ধতা নিয়ে গত দুই দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রেকর্ড পরিমাণ স্ট্যাটাস দেখলাম! আচ্ছা ঢাকায় যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা তাহলে ফেলে কারা? এ পোস্টে ২ ঘণ্টার মধ্যে নিচে মন্তব্য পড়েছে ৩৬টি এবং দুজন শেয়ার করেছেন। নাজমুস শাহাদাত নামের এক ব্যক্তি মন্তব্য করেন, রাস্তার পাশে যতগুলো দোকান সব দোকানের ময়লা ঝাড়ু দিয়ে রাস্তায় ফেলে, মনে হয় রাস্তাটা একটা ডাস্টবিন! আর অলিগলিতে তো মূর্খ ভাড়াটিয়ারা প্যাকেটভর্তি ময়লা-আবর্জনা ছুড়ে ফেলে, পরে সেগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কি যে অবস্থা হয়। বলে বোঝানো সম্ভব না।

আসলে, রাজধানী ঢাকায় জলাবদ্ধতা নতুন কোনো বিষয় নয়। মাত্র ঘণ্টা খানেকের ভারী বৃষ্টিতেই পরিণত হয় পানির নগরীতে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, শুক্রবার সকাল সাড়ে ৬টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টায় ঢাকায় বৃষ্টি হয়েছে ৬০ মিলিমিটার। এরপরও অবশ্য হয়েছে, তবে তা ভারী বৃষ্টি ছিল না; কিন্তু সকালের বৃষ্টিতেই ধানমন্ডি, গ্রিন রোড, নিউ মার্কেট, মতিঝিল, আরামবাগ, কাজীপাড়া, রোকেয়া সরণি, দক্ষিণ খান, কল্যাণপুর, বিজয় সরণি, মালিবাগ, মৌচাকসহ রাজধানীর বেশির ভাগ এলাকার সড়ক ডুবে যায়। অনেক বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকেছে। কোথাও পানি ছিল হাঁটুসমান, কোথাও প্রায় কোমরসমান।

রাস্তায় গাড়িগুলোকে দেখা যায় রীতিমতো সাঁতরাতে।

আর এ জলাবদ্ধতার জন্য আমরা সরকার, মেয়র তথা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সবচেয়ে বেশি দায়ী করে থাকি। ফেসবুক থেকে শুরু করে এ দুর্ভোগ নিয়ে মিডিয়া নানা আলোচনা-সমালোচনা করি, লেখালেখি করি। এত এখন ফেসবুক কিংবা মিডিয়া আলোচনা হচ্ছে- গত চার বছরে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন জলাবদ্ধতা নিরসনে কমপক্ষে ৭৩০ কোটি টাকা খরচ করেছে। কিন্তু এর সুফল কতটা পাওয়া গেছে, তা শুক্রবার সকালের তিন ঘণ্টার বৃষ্টি দেখিয়ে দিয়েছে। গত ২৬ জুন ঢাকায় ৩ ঘণ্টায় ৬১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। সেদিনের বৃষ্টিতে ঢাকার অনেক এলাকার সড়কে পানি জমে থাকতে দেখা গেছে।

আমি মনে করি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যতই দায়ী করি না কেন- এটা মানবসৃষ্ট বেশি। কারণ আমাদের প্রতিদিন ব্যবহৃত ময়লা, প্লাস্টিক, পলিথিন ডাস্টবিনে না ফেলে ফেলছি রাস্তার। এ ময়লা, প্লাস্টিক, পলিথিন বৃষ্টির পানি সঙ্গে ড্রেনে পড়ে আবর্জনায় পূর্ণ হচ্ছে। গত কয়েক দিনে যেই পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে এর পানি যদি যথাযথভাবে ড্রেন দিয়ে না সরতে পারে তাহলে তো রাস্তাগুলো নদী হবেই। আমি স্বীকার করি ঢাকার মেয়রদের আরও বেশি সচেতন হওয়ার দরকার ছিল।

এবার আসি আমাদের কথায়- এ জলাবদ্ধতার জন্য আমরা কতটা দায়ী? আমাদের করণীয় কী? শুধু সরকার আর মেয়রকে দোষ দিয়ে যাচ্ছি, আমরা কি সরকার বা মেয়রদের কথা মানছি? আমরা কি আইন মানি? আমাদের ওপর কি আইনের প্রয়োগ করা হয়? দায়িত্বরত কর্মকর্তারা কি দায়িত্ব পালন করছে? নাহ! কেউ কিছুই মানছি না। শুধু একে ওপরের ওপর দোষ দিয়ে যাচ্ছি।

আপনি স্টুডেন্ট, অথচ আপনি ক্লাসে শিখছেন একটা ক্লাসের বাইরে এসে করছেন আরেকটা! তেমনি শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে সৌন্দর্যবর্ধনের সঙ্গে জড়িত ডেপুটি রেজিস্ট্রার ইব্রাহিম খলিল তার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আমরা কবে সভ্য হব?

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পর্যাপ্ত পরিমাণ ময়লার বিন স্থাপন এবং পরিচ্ছন্নকর্মীদের দ্বারা নিয়মিত পরিষ্কার করার পরেও ক্যাম্পাসকে ময়লা-আবর্জনা থেকে মুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। ‘আপনি নিজেই আপনার ক্যাম্পাসকে সুন্দর রাখতে পারেন না। ময়লা-আবর্জনায় সব সিঁড়ি থেকে শুরু করে ক্যাম্পাসের ফুলের গাছের টবে পর্যন্ত ফেলে রাখেন। কেউ কিছু বললে, বলেন মামা (ক্লিনার) আছে পরিষ্কার করার জন্য! হুম বলতে পারে তার সঙ্গে ঢাকার জলাবদ্ধতার সম্পর্ক কোথায়? এ লেখাটা ছোট হলেও গভীরতা অনেক বেশি। শুধু সেবা সংস্থাগুলোই নয়- নাগরিক হিসেবে প্রতিটি মানুষের কিছু দায়িত্ববোধ রয়েছে। আমরা ময়লা-আবর্জনাগুলো নিজ দায়িত্বে নির্দিষ্ট জায়গা ফেলতে পারি। কিন্তু সেটা না করে রাস্তার এখানে সেখানে কিংবা ড্রেনের মধ্যে ফেলে দিই। ড্রেন ছাড়া তো এলাকার পানি নিষ্কাশনের বিকল্প কিছু নেই।

নগর-পরিকল্পনার মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি আদর্শ শহরে ২৫ শতাংশ সবুজ এলাকা এবং ১০ থেকে ১৫ শতাংশ জলাশয়-জলাধার থাকার কথা। কিন্তু বিআইপির গবেষণার দেখা গেছে, ১৯৯৫ সালে ঢাকা শহরে সবুজ এলাকা ও ফাঁকা জায়গা ছিল ৫২ বর্গকিলোমিটারের বেশি। এখন সেটি প্রায় ৪৩ শতাংশ কমে ৩০ বর্গকিলোমিটারের কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে ১৯৯৫ সালে ঢাকা শহরের মোট আয়তনের ২০ শতাংশের বেশি ছিল জলাভূমি। এখন তা মাত্র ২ দশমিক ৯ শতাংশ। গত তিন দশকে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় মোট জলাভূমির প্রায় ৮৬ শতাংশ ভরাট করা হয়েছে। বিআইপি গবেষণাটি করেছে গত বছরে অর্থাৎ ২০২৩ সালে। এই গবেষণার তথ্যানুযায়ী, ঢাকা শহরে একদিকে সবুজ আচ্ছাদিত এলাকা ও জলাশয় কমেছে, অন্যদিকে কংক্রিট আচ্ছাদিত এলাকার পরিমাণ বেড়েছে। গত তিন দশকে (১৯৯৫ সালের পর থেকে) ঢাকায় কংক্রিটের আচ্ছাদন প্রায় ৭৬ শতাংশ বেড়েছে।

এ তথ্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমাদের জলাভূমি অধিকাংশ ভরাট হয়ে আছে। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই বিভিন্ন সড়কে পানি জমে যায় হাঁটু সমান। ওয়াসা থেকে সিটি করপোরেশন খালগুলো বুঝে পাওয়ার পর কিছু এলাকায় সমস্যার সমাধান হলেও এখনো জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পায়নি মানুষ। দুই সিটি করপোরেশন বলছে, কিছু কিছু এলাকায় এখন বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ চলমান। যার কারণে ড্রেনগুলো দিয়ে পানি সরতে না পারায় পানি জমে থাকছে। অন্যদিকে, স্থায়ীভাবে কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে পরিকল্পিত সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকার কারণে। তবে এসব এলাকায় কুইক রেসপন্স টিম কাজ করে যাচ্ছে বলে সিটি করপোরেশন থেকে জানানো হয়।

ভাবতে কষ্ট লাগে, যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সাময়িকী ‘ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’-এর জরিপে বসবাসযোগ্য শহর হিসেবে বিশ্বের ১৭৩টি শহরের মধ্যে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার অবস্থান ১৬৮। এ দায় কার? একবার ভেবে দেখুন, পলিথিন, খাবারের প্যাকেট ও প্লাস্টিকের বোতলগুলো আমরা কোথায় ফেলছি? গৃহস্থালি বর্জ্য আমরা কোথায় ফেলছি? এ ব্যাপারে আমাদের ভাবতে হবে।

আপনি আমি যখন ঘুরতে বেড়াতে যাই তখন পানিটা খেয়ে বোতলটা রাস্তায় ফেলতে দ্বিধাবোধ করি না। আবার চিপস খেয়ে খালি প্যাকেটটা কোথায় ফেলতে হবে তা জানি না। সত্যি কথা, আমরা এখন উন্নত দেশে পরিণত হতে পারিনি। কিন্তু আপনি কিন্তু প্রতিনিয়ত উন্নত দেশের কার্যকলাপ ফলো করেন। তবে কেন তা আপনার দেশের বা আপনার শহরের বেলায় নয়? ঢাকার ড্রেনগুলো কি আপনার ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের বোতল এবং প্যাকেটে ব্লক হয়ে যায় না? অনেকেই বলে সবাই ফেলে আমি একা এতটা সচেতন হয়ে কি হবে! কিছু হবে? আমার জবাব অবশ্যই হবে, পরিবর্তন এবং অব্যাশটা একজন একজন করেই করতে হয়।

ঢাকায় নদী রয়েছে, এটা আমাদের ভাগ্যের ব্যাপার। বিশ্বের অনেক দেশের রাজধানী ঘিরে কোনো নদীই নেই। কিন্তু আমরা ঢাকার চারপাশের নদীগুলোকে নষ্ট করে ফেলেছি। ঢাকা শহরের মাঝেও অতীতে খাল, বিল-ঝিল, দিঘি, পুকুর ও জলাভূমি ছিল। বৃষ্টির পানি ওই সব খাল দিয়ে নিষ্কাশিত হয়ে বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার চারপাশে নদী ও অন্যান্য জলাভূমিতে জমা হতো। মানুষ অপরিকল্পিত দালানকোঠা ও রাস্তাঘাট নির্মাণ করে সেগুলোর নামনিশানা মুছে গেছে আজ।

আমাদের হিসাব করে দেখা দরকার জলাবদ্ধতার কারণে সরকারি বা ব্যক্তিপর্যায়ে যে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে তা কি কোনোভাবেই জলাভূমি ভরাট করে নগরায়ণকে সমর্থন করে? তাহলে দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কেন রক্ষা করতে পারছে না খাল আর জলাধার। এখানেই প্রশ্নবিদ্ধ হয় আমাদের আইন ব্যবস্থা এবং আইন প্রয়োগে সদিচ্ছা। সভা-সেমিনারে সহজেই দায়ী করা যায় কিছু ব্যক্তিকে। অবশ্যই জলাবদ্ধতায় নাকাল নগরবাসীর কাছে তাদের দায়বদ্ধতা আছে। তবে নগরবাসী বুঝতে পারে সমস্যার মূল, শাখা-প্রশাখা অনেক গভীরে। যতদিন পর্যন্ত নগরায়ণে অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট প্রাধান্য পাবে, কতিপয় গোষ্ঠীর অর্থলিপ্সার কাছে উপেক্ষিত হবে মানুষ, সামাজিক মূল্যবোধ ও পরিবেশ, ততদিন প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগে আমরা বারবার বিপর্যস্ত হব।

প্রতিদিন সকাল হওয়ার আগে ঢাকা সিটি করপোরেশনের ক্লিনাররা ঢাকাকে চকচকে করে রাখে। বিশ্বাস না হলে এক দিন ভোরে এই প্রাণের শহরটাকে একটু ঘুরে দেখেন। অথচ আমরা ঘুম থেকে উঠে অফিসে যাই রাস্তায় ময়লা ফেলতে ফেলতে, স্কুল, কলেজ, ভার্সিটিতে বিদ্যা অর্জন করতে যাই রাস্তায় ময়লা ফেলতে ফেলতে। পরিবেশবাদী মিটিং করতে যাই রাস্তায় ময়লা ফেলতে ফেলতে! আমরা তো সবাই জমিদার! সবকিছুই দুই মেয়র করবে! আমার ভাষায় আমরা হচ্ছি এক টাইপের অভদ্র জমিদার।

ঢাকায় প্রতিদিন হাজার হাজার নতুন মানুষ প্রবেশ করে, তারা বেশির ভাগই মফস্বল থেকে আসে। তাদের মধ্যে এখনো ওই অভ্যাসটা নেই। কিন্তু তারা যদি ঢাকায় প্রবেশ করে দেখে সবাই নির্দিষ্ট স্থানে (ডাস্টবিন) ময়লা ফেলে, যেখানে-সেখানে ময়লা ফেললে পুলিশ জরিমানা করে। অথবা কেউ একজন ময়লা ফেললেই আরেকজন পাশ থেকে বলছে, প্লিজ ময়লাটা কষ্ট করে একটু ডাস্টবিনে ফেলুন, না হয় পুলিশ আপনাকে জরিমানা করবে। এটাও বলতে পারেন আমরা সবাই নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলি প্লিজ আপনিও ফেলুন। আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি মানুষ কখনোই বেখুশি হবে না। আমাদের দেশের একজন শ্রমিক উন্নত দেশে গিয়ে কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে সেই দেশের আইন-কানুন এবং পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়। শুধু উন্নত দেশে কেন? আমরা যখন ক্যান্টনমেন্টের ভিতর প্রবেশ করি তখন সব আইন-কানুন এবং পরিবেশের সঙ্গেও মেনে চলি।

একটু গভীরভাবে জলাবদ্ধতার কারণ যদি আমার খুঁজতে যাই তবে কয়েকটি বিষয় উঠে আসে। যেমন- জলাশয়, খাল-বিল, নদী-নালা ভরাট, পানি নিষ্কাশন তথা বৃষ্টির পানি বেরিয়ে যাওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকা। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে নগরীর খালি জায়গা কমে গেছে। অত্যন্ত ঘনবসতি হওয়ায় পয়ঃনিষ্কাশন ক্ষমতা অকার্যকর হয়ে গেছে, ডাস্টবিন ছাড়া যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলে রাখা হয়। ফলে পাড়া-মহল্লার পানি নিষ্কাশনের ড্রেন বন্ধ হয়ে যায়। বর্ষায় অতিরিক্ত খোঁড়াখুঁড়ি, ফলে একটু বৃষ্টি হলেই পুরো রাস্তাঘাট তলিয়ে যায়।

এক সময় পলিথিন ব্যাগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হলেও বেশ কয়েক বছর ধরে এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। যার কারণে কাঁচাবাজার, হাটবাজার এবং দোকানপাটে এর ব্যবহার আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। পলিথিনগুলো ড্রেন, খাল এমনকি নদ-নদীর তলদেশের গভীরতা কমিয়ে দিচ্ছে। ড্রেন পরিষ্কার করে ময়লা ড্রেনের পাশেই ফেলে রাখা হয়। সামান্য বৃষ্টিতে সে ময়লা আবার ড্রেনে গিয়েই পড়ে। সময়মতো বর্জ্য পরিষ্কার করা হয় না। নগরীতে ছোট-বড় অনেক ডাস্টবিন দেওয়া হলেও সেগুলোর ব্যবহার নেই বললেই চলে। জলাবদ্ধতা সৃষ্টির পেছনে আরেক অভিশাপ বলা যেতে পারে নির্মাণাধীন ভবনগুলো থেকে তৈরি উপজাতগুলোকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভবন তৈরির কাঁচামাল এনে জড়ো করা হয় রাস্তার ওপর। তার পর সেখান থেকে নিয়ে তৈরি করা হয় স্থাপনা।

ঢাকা জলাবদ্ধতা সমস্যা-সমাধানে গণসচেতনা সৃষ্টি করতে হবে। এ সমস্যা এক দিনে সৃষ্টি হয়নি। তাই রাতারাতি নিরসন করাও যাবে না। তবে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেগুলো স্বচ্ছতার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে। বিদ্যমান খালগুলো দখলমুক্ত ও খনন করে পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। খাল, ড্রেন পরিষ্কার রাখতে হবে। কোথায়ও যেন পলিথিন, প্লাস্টিক বা আবর্জনা আটকে না থাকে সেদিকে
নাগরিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। যেখানে-সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং তা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে। বিল্ডিং কোড অনুযায়ী বাড়ি-ঘর, অফিস, আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রথম পর্যায়ে সরকারি স্থাপনার ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টা মাথায় নিয়ে এখন পরিকল্পনা করতে হবে। কেননা এখন ঘন ঘন বৃষ্টি হচ্ছে, অসময়েও। এ ছাড়া হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী অনতিবিলম্বে ঢাকার নদীগুলোর সীমানা নির্ধারণ করে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে। সংসদ সদস্য এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলররা তার এলাকার জলাভূমি রক্ষার দায়িত্বে থাকবে। এ ক্ষেত্রে সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোর কাছে তারা দায়বদ্ধ থাকবে।

আপনি আমি সচেতন হলেই ঢাকা বাঁচবে। অবশ্যই এ জলাবদ্ধতা দূর হবে। যানজট দূর হয়ে। আলো আসবেই। আশাবাদী।

লেখক: উপপরিচালক শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়


শিক্ষাবিদের সামাজিক ভূমিকা 

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

বহু ভাষাবিদ পণ্ডিত ও প্রাচ্যের অন্যতম ভাষাবিজ্ঞানী শিক্ষাবিদ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (জন্ম ১০ জুলাই ১৮৮৫, মৃত্যু ১৩ জুলাই ১৯৬৯) ছিলেন একজন খাঁটি বাঙালি ও ধর্মপ্রাণ মুসলমান। তিনি ধর্মীয় অনুভূতি অপেক্ষা জাতীয় অনুভূতিকে অধিক গুরুত্ব প্রদান করেন। জাতীয় ও ধর্মীয় চেতনা সম্পর্কে তার বক্তব্য: ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি। এটি কোনো আদর্শের কথা নয়, এটি বাস্তব কথা। মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙালিত্বেও এমন ছাপ রেখে দিয়েছেন যে মালা-তিলক-টিকিতে কিংবা টুপি-লুঙ্গি-দাড়িতে ঢাকার জো-টি নেই’। মুহম্মদ শহীদুল্লাহর এ দুঃসাহসিক উক্তি বাঙালির জাতীয় চেতনা শাণিতকরণে মাইলফলকের ভূমিকা পালন করে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার (১৯৪৭) পরপরই দেশের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে, না বাংলা হবে এ বিতর্ক সৃষ্টি হলে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে জোরাল বক্তব্য উপস্থাপন করেন তিনি। তার এ ভূমিকার ফলে পূর্ব বাংলায় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পথ প্রশস্ত হয়। ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে শহীদুল্লাহ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ভাষা আন্দোলনের সময় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে লেখনীর মাধ্যমে ও সভা-সমিতির বক্তৃতায় জোরাল বক্তব্য উপস্থাপন করে আন্দোলনের পথ প্রশস্ত ও গতি বৃদ্ধি করেন। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে ড. জিয়াউদ্দীন উর্দু ভাষার পক্ষে ওকালতি করলে ড. শহীদুল্লাহ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এর প্রতিবাদ করে বলেন, ‘বাংলাদেশের কোর্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার পরিবর্তে উর্দু বা হিন্দি ভাষা গ্রহণ করা হইলে, ইহা রাজনৈতিক পরাধীনতারই নামান্তর হইবে। ড. জিয়াউদ্দীন আহমদ পাকিস্তানের প্রদেশসমূহের বিদ্যালয়ে শিক্ষার বাহন রূপে প্রাদেশিক ভাষার পরিবর্তে উর্দু ভাষার পক্ষে যে অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন, আমি একজন শিক্ষাবিদরূপে উহার তীব্র প্রতিবাদ জানাইতেছি। ইহা কেবল বৈজ্ঞানিক শিক্ষনীতির বিরোধীই নহে, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের নীতিবিগর্হিতও বটে।’ (পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা, দৈনিক আজাদ, ১২ শ্রাবণ ১৩৫৪)।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে বিশাল জ্ঞান তিনি অর্জন করেছিলেন তা তাকে গোঁড়ামি অথবা অহংকারী করে তোলেনি। বরং এই বিশাল জ্ঞানরাজি তাকে দান করেছিল এক সুমহান ব্যক্তিত্ব। তিনি শুধু নিজধর্ম ইসলাম চর্চা করেননি অথবা আপন ধর্মে নিজেকে সঁপে দিয়ে অন্ধত্ববরণ করেননি। অন্যের ধর্মীয় পুস্তকাবলি পাঠ ও চর্চা করে তিনি দেখিয়ে গেছেন ধর্ম মানুষকে বেঁধে রাখতে পারে না। বরং ধর্ম মানুষকে দিয়েছে মহত্তম মুক্তি।

‘যে সমস্ত অবিবাহিত লোক সন্ন্যাসী হয়ে তাদের নামের সংগে ‘স্বামী’ এই বিশেষণ যোগ করে দেয়, ভূমিকা যেমন দয়ানন্দ স্বামী, সদানন্দ স্বামী ইত্যাদি, আমি তাদের মতো স্বামী নই। আমার স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও আমি তাদের মতোই স্বামী। আমার নাম জ্ঞানানন্দ স্বামী, জ্ঞান চর্চায়ই আমার আনন্দ।’ কথা কয়টি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৮৮৫-১৯৬৯) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয়বার অবসর গ্রহণকালে সংবর্ধনা সভায় বলেছিলেন। রসিকতা করে কথা কয়টি বলা হলেও ওর ভিতর নিহিত আছে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সম্পর্কে চিরন্তন সত্য কথা। প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন এমন একজন জ্ঞানসাধক যিনি আজীবন উক্ত সাধনায় একনিষ্ঠভাবে নিয়োজিত ছিলেন। প্রায় পৌনে এক শতাব্দীকাল ধরে অক্লান্তভাবে তিনি জ্ঞানচর্চা করে গেছেন। তিনি জ্ঞান সাধনায় এই যে অসাধারণত্ব অর্জন করেছিলেন তার জন্য তিনি কোনোদিন অহমিকা দেখাননি। তিনি ছিলেন শিশুর মতো সরল। হিংসা, ঈর্ষা, অহংকার কোনোদিন তার চরিত্রে ঠাঁই পায়নি। তিনি প্রায় অর্ধশতাব্দীকাল শিক্ষকতা করে কাটান। তার এই উজ্জ্বল মানবছায়ায় জ্ঞানের সুশীতল বারিধারা পান করে কতজন যে ধন্য হয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই।

মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সব সময় অসাধারণ হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করতেন। অসাধারণ কিছু শেখার এ স্পৃহাই যে তাকে এতগুলো ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভের স্পৃহায়তা করেছিল সে বিষয়ে দ্বিমতের অবকাশ নেই। ভাবতে আশ্চর্য লাগে তিনি ১৮টি ভাষার ওপর পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন। ভাষাগুলো হলো- বাংলা, ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, সংস্কৃত, প্রাকৃত, আরবি, পারসি, বৈদিক, আবেস্তান, তিব্বতী, উর্দু, হিন্দি, সিংহলী, মৈথিলি, উড়িয়া, আসামী এবং সিন্ধি। স্কুলজীবনেই তিনি বেশ কয়েকটি ভাষা আয়ত্তে এনেছিলেন। পারিবারিক ঐতিহ্য রক্ষার্থে শেখেন উর্দু এবং পারসি। বিদ্যালয় সূত্রে শেখেন ইংরেজি, বাংলা এবং সংস্কৃত। আর হওড়াস্ব বাসার প্রতিবেশীর নিকট থেকে উড়িয়া ও হিন্দি ভাষা শিখেছিলেন। তার জীবনের দুটি ঘটনা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এ দুটি ঘটনাকে তার বিস্তৃত জ্ঞান-সাধনার দিগদর্শন বলা যেতে পারে।

আরবি ছিল তার পরিবারের প্রিয় ভাষা। অথচ এ আরবি ত্যাগ করে তিনি সংস্কৃতে এন্ট্রানস পরীক্ষা দেন। এর কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলতেন, শিক্ষকের মারের ভয়ে। হুগলি জেলা স্কুলের তখনকার আরবি শিক্ষক নাকি কারণে-অকারণে ছাত্রদের বেদম প্রহার করতেন। শহীদুল্লাহ সাহেবের এটা পছন্দ হতো না। তাই তিনি আরবির পরিবর্তে সংস্কৃত পণ্ডিতের কাছে এসে ধরা দিলেন সংস্কৃতের শিক্ষার্থী হিসেবে। এমনিভাবে তিনি সংস্কৃত শিক্ষার উৎসাহ পেলেন। ১৯০৪ ইং সালে তিনি সংস্কৃতকে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে নিয়ে এন্ট্রানস পাস করেন। ১৯০৬ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফএ পাস করার পর তিনি হুগলি কলেজে ভর্তি হন সংস্কৃতে অনার্স পড়ার জন্য। এ সময় তিনি বেশ কিছুকাল ম্যালেরিয়া রোগে ভোগেন। বছর দুয়েক পড়াশোনা করতে পারেননি। কিন্তু তাতে হতোদ্যম হয়ে তিনি পড়েননি। কলকাতার সিটি কলেজ থেকে ১৯১০ সালে তিনি সংস্কৃতে অনার্সসহ বিএ পাস করেন। তার আমলে একজন মুসলমান ছাত্রের পক্ষে সংস্কৃতে অনার্স পাস করাটা আশ্চর্যজনক ছিল বৈকি।

আর একটি ঘটনা তিনি তখন বিএ (অনার্স) পাস করে সংস্কৃতে এমএ করার জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবেন কিন্তু সংস্কৃত বিভাগের কতিপয় শিক্ষক শ্মশ্রুবদন মুসলমান মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে পড়াতে অস্বীকার করলেন। সত্যব্রত শ্যামাশ্রয়ী এক ব্রাহ্মণ পণ্ডিত এই মর্মে আপত্তি তুললেন, বেদ বেদাভগ ব্রাহ্মণদের ছাড়া আর কারও পড়ার অধিকার নেই। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে বেশ গোলযোগের সৃষ্টি হলো। সংবাদটি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের বেড়া পেরিয়ে বাইরে এল। তৎকালীন চিন্তানায়কদের তুমুলভাবে আলোড়িত করল। মওলানা মুহম্মদ আলী কমরেড পত্রিকার দি লিংগুয়া ফ্রাঙ্কা অব ইন্ডিয়া’ প্রবন্ধের এক জায়গায় লিখলেন-

‘সংস্কৃত ও আরবিতে রচিত সাহিত্য ও দর্শনের অফুরন্ত খনি শ্রেষ্ঠ প্রত্ন সাহিত্যের শিক্ষর্থীকে যে আকৃষ্ট করত তাতে সন্দেহ নেই এবং বর্তমানের চেয়ে অধিক সংখ্যায় মুসলিম বিদ্যার্থীরা সংস্কৃত ভাষা শিক্ষা করুক-এই আশা পোষণ করে, আমরা বিশ্বাস করি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো পণ্ডিত জনৈক মুসলমান ছাত্রকে সংস্কৃত পড়াতে অস্বীকার করে শহীদুল্লাহ ঘচিত ব্যাপারের মতো যে ঘটনার সৃষ্টি করে, আর তার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না।’

বেঙ্গলি পত্রিকার সম্পাদক সুরেন ব্যানার্জীর মতো লোকও লিখলেন ‘টু ডে দিস অর্থডক্স পন্ডিটস শুড বিথ্রোন ইন টু দ্য গাঙ্গেজ’।

তবে সেবার অর্থডক্সির (গোঁড়ামি)ই জয় হয়েছিল। বাকবিতণ্ডার ফলে সৃষ্ট চাপে বাধ্য হয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর জন্যই তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব বিভাগটি খুলতে হয়েছিল। এ বিভাগের প্রথম এবং একক ছাত্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৯১২ সালে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বে এমএ পাস করেন। যদিও তিনি সংস্কৃতে এমএ পড়া থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন তবুও তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন সংস্কৃতে উচ্চ শিক্ষালাভ করবেন। সম্ভবত তিনি এই উপমহাদেশের সংস্কৃত ভাষার শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতদের একজন ছিলেন। সংস্কৃতে এমএ পড়া থেকে বঞ্চিত হওয়ার ফলে নতুন নতুন ভাষা শিক্ষার এক সম্ভাবনার দ্বার সবার সামনে খুলে গিয়েছিল।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সুপারিশক্রমে ও বগুড়ার নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী বাহাদুরের বদান্যতায় তিনি জার্মানিতে সংস্কৃতে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য একটি রাষ্ট্রীয় বৃত্তি পান। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তিনি ভালো মেডিকেল সার্টিফিকেট পাননি, তাই তার আর জার্মানি যাওয়া হয়নি; কিন্তু এতেও তিনি হতোদ্যম হয়ে পড়েননি। প্রাচ্যের জ্ঞানভাণ্ডার তাকে বারবার হাতছানি দিয়ে ডাকছিল। সে ডাকে তিনি সাড়া দিলেন ১৯২৬ সালে। তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগে অধ্যাপনা করছিলেন। দুই বছরের ছুটি নিয়ে প্যারিসের সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন নিজের খরচে। সেখানে তিনি বৈদিক, বৌদ্ধ, সংস্কৃত, তিব্বতী এবং প্রাচীন পারসি ভাষা সম্পর্কে গবেষণা শুরু করলেন। এর ফাঁকে ফাঁকে তিনি প্যারিসের ‘আর্কিভ ডি লা প্যারোল’ নাম ধ্বনিতত্ত্ব শিক্ষায়তনে ধ্বনিতত্ত্ব বিষয়ে শিক্ষালাভ করতে লাগলেন। সেখানে তিনি ‘লেস সনস ডু বেঙ্গলি’ নামে একটি গবেষণাপত্রের জন্য উক্ত শিক্ষায়তনের মানপত্র লাভ করেছিলেন। এদিকে সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ‘লেশাঁ মিস্ত্রিক’ নামক তার গবেষণা কর্মটি জমা দিয়ে জার্মানির ফ্রাইবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয় আসেন বৈদিক সংস্কৃত ও প্রাকৃত ভাষায় ব্যুৎপত্তি অর্জনের জন্য। কিন্তু ছুটি ফুরিয়ে এল। সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণির ডক্টরেট অব লেটারেচার ডিগ্রি নিয়ে ১৯২৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন।

অনুকূল স্বাস্থ্যবিষয়ক সার্টিফিকেট না পাওয়ায় ১৯১৩ সালে তার জার্মানিতে যাওয়া না হলে তিনি আইন বিভাগে ভর্তি হন। ১৯১৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ এলএলবি পাস করেন। ১৯১৫ থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত তিনি বশিরহাটে ওকালতিও করেছিলেন। তুলনামূলক ভাষা তত্ত্বে যিনি এমএ পাস তিনি হঠাৎ করে কেন আইন শিক্ষার দিকে ঝুঁকে পড়েন তা বলা মুষ্কিল। তবে এর পিছনে সম্ভবত এটাই প্রধান কারণ ছিল, ‘তিনি চাইতেন জ্ঞানারাজ্যের সর্বত্র ভ্রমণ করতে।’ ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হকের ভাষায় ‘হি ইজ এ ওয়াকিং ইনসাইক্লোপেডিয়া অব ওরিয়েন্টাল লোর’।

লেখক: সরকারের সাবেক সচিব, এনবিআর-এর সাবেক চেয়ারম্যান


এক মুক্তিযোদ্ধার কথা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
হায়দার আহমদ খান এফসিএ

১৯৭১ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ না নিয়ে চলে গিয়েছিলাম যুদ্ধে দেশকে স্বাধীন করতে। যুদ্ধের আসল উদ্দেশ্যই ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি। এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক সমস্যার সঙ্গে একপর্যায়ে ছাত্রদের সমস্যাও যোগ হয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম আগে জাতীয় সমস্যার সমাধান হওয়া দরকার সুতরাং যুদ্ধে যাওয়া। যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করে অনিয়ম, দুর্নীতি দূর করে মানুষের জীবনকে করতে হবে আরামদায়ক। সমাজে আনতে হবে সুশাসন। সেই স্বপ্ন নিয়ে আমার মতো বেঁচে থাকা মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দিন দিন কমছে। জানিনা প্রায় ৭০ বছর বয়সের মুক্তিযোদ্ধারা সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়া চিত্র দেখে যেতে পারব কি না।

গত কয়েক দিন ধরে দুর্নীতি, পেনশন স্কিম এবং সরকারি চাকরিতে কোটাপ্রথা নিয়ে আলোচিত হচ্ছে। হঠাৎ এমন সব একাধিক বিষয়ের সংবাদ একসঙ্গে আমাদের সামনে কেন? সরকারের কাজ সফলতার সঙ্গে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা। পরিকল্পনার শতভাগ সফল বাস্তবায়নেই সফলতা। তখনই জনগণের মঙ্গল সাধন হয়েছে দাবি করতে পারবে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটি সরকার। সরকারকে যদি বিচার করার কাজে বেশি ব্যস্ত থাকতে হয় তাহলে উন্নয়নের কাজ করবে কখন? অতীতের দিনের চেয়ে আগামীকাল বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

অনিয়ম, দুর্নীতির নতুন নতুন খবর প্রকাশের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে বলা চলে। আজকের নতুন খবর পিএসসির প্রশ্নপত্র নিয়ে। সংবাদটি পড়ে নিজেকে বড় অসহায় বোধ করছি। দেশের মানুষের মঙ্গলজনক কাজের পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করে থাকেন সেই দেশের কর্মকর্তরা। সেই কর্মকর্তাদের নিয়োগ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নিয়োগ পেতে বা নিয়োগ নিতে যদি অনিয়ম হয় তাহলে তার ফসলের ফলন চলতে থাকে অবসরে যাওয়ার দিন পর্যন্ত। সরকারের সব কর্মকর্তা সৎ এবং নিষ্ঠাবান হবেন তা যেমন সম্ভব না আবার দুর্নীতিবান কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে একটি দেশের সরকারের কাজ তাও মানা যায় না। একটি সফল সরকারের কাজ হবে দেশের জনগণের মঙ্গলজনক কাজটি আদায় করে নেওয়া।

গত কয়েক দিন ধরে সরকারের পেনশন স্কিম এবং সরকারি চাকরিতে কোটাপ্রথা নিয়ে আলোচিত হচ্ছে, চলছে আন্দোলন। বাংলাদেশ সরকারের নিয়োগে কোটাপ্রথা বর্তমান, যা নিয়ে আন্দোলন। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে বলতে চাই মুক্তিযোদ্ধারা রিলিপ চায় না। তারা চায় দেশের সব মানুষের উন্নতির জন্য মঙ্গলজনক পরিকল্পনা এবং কাজ। যে উদ্দেশ্য নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে তার শতভাগ বাস্তবায়ন মানে দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি। একজন অবিবাহিত মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধ করতে করতে যদি মারা যেতেন তাহলে কি তার সন্তানের লেখাপড়া, চাকরির বিষয় নিয়ে চিন্তা করার প্রয়োজন হতো? আজকে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের চাকরির জন্য কোটাপ্রথার প্রয়োজন অবশ্যই হতো না। যে মুক্তিযোদ্ধা জীবিত আছেন তার সন্তানের কথা আলাদাভাবে চিন্তা করতেও আমি বলব না। দেশের সব মানুষ যদি সুখে-শান্তিতে থাকে তাহলেই মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরাও ভালো থাকবে। এমনটাই মুক্তিযোদ্ধার চাওয়া। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের কথা আলাদাভাবে চিন্তা করতে গিয়েই দেখা দিয়েছে এ সমস্যা। আসল সমস্যা অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধারা সুখে-শান্তিতেই। অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা দেশের পাবলিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করে। পাবলিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান যদি বজায় রাখা যায় তাহলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কোটা পদ্ধতির প্রশাসনও লাগবে না। যোগ্যতার আসল ভিত্তি মেধা। মেধার ভিত্তিতে নিয়োগকৃত কর্মকর্তারা যদি দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে না যান তাহলে দেশের উন্নয়ন কেউ আটকিয়ে রাখতে পারবে না। পাবলিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়-দায়িত্ব সরকারের হতে। শিক্ষার উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং সব দায়-দায়িত্ব সরকারের। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে, যে দেশ রক্ত দিয়ে স্বাধীন হয়েছে সে দেশের উন্নয়নের সময় এত দীর্ঘ আশা করা যায় না বা মানা যায় না। বাংলাদেশের সংবিধান এবং অর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় সাময়িকভাবে কোটাপ্রথা থাকতে পারে। সরকারের কাজ দেশের মানুষের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন। আর্থিক অবস্থা উন্নয়নের প্রধান এবং টেকসই পথ শিক্ষাব্যবস্থা উন্নত করা। দেশের মানুষ মানসম্মত শিক্ষা পায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। আর তা যদি করতে পারা না যায় এবং যে শিক্ষাব্যবস্থা চলছে তার ফলে আমাদের সন্তানদের যোগ্যতা যদি এমন হয়: (১). বাংলায় শতকরা ৫৪ শতাংশ, (২). ইংরেজিতে শতকরা ১৯ শতাংশ এবং (৩). গণিতে শতকরা ২২ শতাংশ তাহলে সমাজে নানা অস্থিরতা দূর করা অনেক সময় কঠিন হবে। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার অধিকাংশ ছাত্ররা থাকে টেনশনে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্জনের আসল দাবিদার আমাদের ছাত্রসমাজ। বর্তমান বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় কোটাপ্রথা সংশোধিত করার দাবি রাখে। ছাত্রদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পেনশন নিয়ে আন্দোলন। মনে রাখতে হবে একজন চাকরিজীবীর আর্থিক সুবিধা কোনো অবস্থায় কমানো যায় না। সেই লক্ষ্য বিবেচনায় নিয়ে পেনশন স্কিম চালু করলে আন্দোলন করার সুযোগ থাকবে না বা প্রয়োজন হবে না।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত ছাত্র এবং শিক্ষকরা আন্দোলন করছেন, ক্লাস হচ্ছে না, লেখাপড়া হচ্ছে না। প্রধানত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে তার প্রভাব পরিলক্ষিত দেশের শুধু শিক্ষাব্যবস্থায়ই নয় ব্যবসা বাণিজ্যেও। সুতরাং সময়কে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত সব সমস্যার সমাধান করা।

লেখক: চেয়ারম্যান, এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (ইডিএ)


আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠায় মূল্যবোধ চর্চা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ড. মো. আব্দুস সোবহান পিপিএম

অনেক দিন ধরে মনে মনে ভাবছিলাম অবক্ষয় ও মূল্যবোধ নিয়ে কিছু লিখব। অবশ্য অনেকের প্রেরণা ও প্রেষণাও এর পেছনে কাজ করেছে। অবক্ষয়ের পেছনে অর্থনৈতিক অসমতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সাংস্কৃতিক ও জাতিগত উত্তেজনা, সামাজিক গতিশীলতার অভাব, প্রযুক্তির পরিবর্তন, পরিবেশের অবনয়ন, পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন, মিডিয়ার প্রভাব, ভুল তথ্য পরিবেশন করা ইত্যাদি দায়ী। আবার অবক্ষয়ের পেছনে অনেক সমাজ বিজ্ঞানীর অনেক মতামত ও উপলব্ধি রয়েছে। সেগুলো আমরা অনুসরণ করতে পারি। এ অবক্ষয়ের পেছনে এক ধরনের অসুস্থতাও কাজ করে যা আবার আসে দীর্ঘদিনের নীতিবর্জিত প্রতিযোগিতা, আচরণ, ব্যবহার, কাজ ও চলাচলের ওপর ভর করে। প্রাচীন সমাজেও নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক অবক্ষয়ের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। পাশাপাশি প্রাচীন সমাজে শুদ্ধাচার চর্চা ও নৈতিকতার চর্চাও বিদ্যমান ছিল, কখনো আবার প্রাচীনকালে সত্যের যুগের অস্তিত্বের কথাও জানা যায়। অভিন্ন মূল্যবোধ সহযোগিতা ও সম্মিলিত প্রয়াসকে উৎসাহিত করে। মূল্যবোধের মাধ্যমে ব্যক্তি নৈতিক বিচার এবং সঠিকতা যাচাই করে থাকে। মূল্যবোধ ব্যক্তিকে নিজের ও অন্যদের কাছে দায়বদ্ধ করে রাখে। মূল্যবোধ চর্চার ফলে নীতি ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্যগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য হয়। তা একটি সমাজের বিশ্বাস ও ঐতিহ্য তথা সংস্কৃতিকে প্রতিফলিত করে থাকে। তা সামাজিক নিয়ম ও আইন প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখে, তা ছাড়া মূল্যবোধ ন্যায়-বিচার, মমতা এবং অন্যান্য আদর্শের পক্ষে সামাজিক আন্দোলন ও সামাজিক সংস্কারকে পরিচালিত করে, সাংগঠনিক সংস্কৃতি গঠনে ভূমিকা রাখে। নেতারা সাধারণত অন্যদের অনুপ্রাণিত করতে এবং ইতিবাচক কাজের পরিবেশ গড়ে তুলতে মূল্যবোধের ওপর নির্ভর করেন। মূল্যবোধ কোনো সংগঠন বা সংস্থার কৌশলগত পরিকল্পনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নির্দেশনা দেয়। একজন শিশু বা কিশোরের বিকশিত হওয়ার নিমিত্তে মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়া হয়ে থাকে। মূল্যবোধের কারণে ব্যক্তি কোনো বিষয়ের সঠিকতা যাচাই এবং কোনো জটিল বিষয় সম্পর্কে সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ করে থাকে। মোট কথা মূল্যবোধ ব্যক্তি ও সামষ্টিক উভয় জীবনের জন্য মৌলিক আচরণকে প্রভাবিত করে, সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি করে এবং নৈতিকতার উন্নয়ন করে থাকে। এসব ইতিবাচক চর্চার মাধ্যমেই ধীরে ধীরে সভ্যতা আজ তার চূড়ান্ত পর্যায়ে এসেছে। আধুনিক সভ্যতার কিছু অন্ধকার দিকও রয়েছে, কিছু নিষ্ঠুর রাষ্ট্রনায়ক ও ক্ষমতাধর মানুষের অপরিনামদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে এ সুন্দর ধরণীর পরিবেশের ও প্রকৃতির প্রভূত ক্ষতি হয়েছে এবং হচ্ছে। যার ফলে মানুষের অধিকার তথা মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত হয়েছে।

অবক্ষয় বলতে মূলত বিচ্যুতি বোঝায় অর্থাৎ আদর্শ অবস্থা থেকে ব্যক্তি, গোষ্ঠী, সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের অবনয়ন অবক্ষয় হিসেবে বিবেচিত। সামাজিক অবক্ষয় বলতে সাধারণত একটি সমাজের মধ্যে সামাজিক কাঠামো এবং সমাজব্যবস্থার ভাঙনকে বোঝায়। সামাজিক অবক্ষয় জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গভীর এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে থাকে। সামাজিক অবক্ষয়ের ফলে সামাজিক কাঠামো দুর্বল হয়ে যায় এবং অর্থনৈতিক সুযোগগুলো দুষ্প্রাপ্য হয়ে যায়। যার কারণে বেকারত্বের হার এবং দরিদ্রের মাত্রা বৃদ্ধি পায় ও অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি হয়। ফলে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার সৃষ্টি হয় এবং বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয় ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে ঐতিহ্যগ্রত সামাজিক বন্ধন ও সংহতি ভেঙে যায়। তা জনস্বাস্থ্য ও ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে। তা ছাড়া সমাজের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য হুমকি সৃষ্টি করে থাকে। অবক্ষয়ের কারণে শিক্ষার প্রবেশাধিকার কমে যায় এবং শিক্ষার গুণগত মানের অবনয়ন ঘটে থাকে। সামাজিক অবক্ষয়ের ফলে সম্পদের অব্যবস্থাপনা এবং প্রকৃতি ও পরিবেশের সুরক্ষার প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে। পরিবার ও পারিবারিক সম্পর্কও দুর্বল করে।

অপরদিকে মূল্যবোধ হলো ব্যক্তির গভীরভাবে ধারণ করা বিশ্বাস যা ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি এবং আচরণ ও কাজকে পরিচালনা করে এবং অন্যদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার সুযোগ করে দেয়। এ মূল্যবোধ চর্চা ও অনুশীলন ব্যক্তিগত উন্নয়ন, সামাজিক সংহতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণসহ জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মূল্যবোধের তাৎপর্য অপরিসীম। মূল্যবোধের মাধ্যমে ব্যক্তি নিজেকে জানতে বা বুঝতে পারে, তাকে দিকনির্দেশনা এবং তার কাজের ধারাবাহিকতা ও সততা বজায় রাখতে সহায়ক হয়। মূল্যবোধের চর্চার ফলে ব্যক্তি এবং একটি দলের মধ্যে বিশ্বাস ও শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হয় এবং তার মাধ্যমে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান হয়ে থাকে। অভিন্ন মূল্যবোধ সহযোগিতা ও সম্মিলিত প্রয়াসকে উৎসাহিত করে। মূল্যবোধের মাধ্যমে ব্যক্তি নৈতিক বিচার এবং সঠিকতা যাচাই করে থাকে। মূল্যবোধ ব্যক্তিকে নিজের ও অন্যদের কাছে দায়বদ্ধ করে রাখে। মূল্যবোধ চর্চার ফলে নীতি ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্যগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য হয়। একটি সমাজের বিশ্বাস ও ঐতিহ্য তথা সংস্কৃতিকে প্রতিফলিত করে থাকে। সামাজিক নিয়ম ও আইন প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখে, তা ছাড়া মূল্যবোধ ন্যায়-বিচার, মমতা এবং অন্যান্য আদর্শের পক্ষে সামাজিক আন্দোলন ও সামাজিক সংস্কারকে পরিচালিত করে এবং সাংগঠনিক সংস্কৃতি গঠনে ভূমিকা রাখে। নেতারা সাধারণত অন্যদের অনুপ্রাণিত করতে এবং ইতিবাচক কাজের পরিবেশ গড়ে তুলতে মূল্যবোধের ওপর নির্ভর করেন। মূল্যবোধ কোনো সংগঠন বা সংস্থার কৌশলগত পরিকল্পনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নির্দেশনা দেয়। একজন শিশু বা কিশোরের বিকশিত হওয়ার নিমিত্তে মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়া হয়ে থাকে। মূল্যবোধের কারণে ব্যক্তি কোনো বিষয়ের সঠিকতা যাচাই এবং কোনো জটিল বিষয় সম্পর্কে সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ করে থাকে। মোট কথা মূল্যবোধ ব্যক্তি ও সামষ্টিক উভয় জীবনের জন্য মৌলিক আচরণকে প্রভাবিত করে, সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি করে এবং নৈতিকতার উন্নয়ন করে থাকে।

এখন আসা যাক- মানুষের মূল্য, সম্মান ও যোগ্যতার বিষয়ে; যেমন প্রত্যেক মানুষের একটা বিরল যোগ্যতা রয়েছে, তেমনি তার রয়েছে যথাযথ মূল্য ও সম্মান পাওয়ার অধিকার। আমার এক প্রবাসী বন্ধু ও আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে এবং হলে থাকাকালে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার সময়ে ব্রাজিল টিমের ঘোরতর সাপোর্টার ছিলাম আবার একক খেলোয়াড় হিসেবে আর্জেটিনার দিয়াগো ম্যারাডোনার সমর্থক ছিলাম। আমাদের সমাজে কিছু খারাপ মানুষ ও সমস্যা রয়েছে সত্য; কিন্তু এগুলো আমাদের সঠিক পরিচয় নয় বা আমাদের মূল স্রোতের সঙ্গে এগুলো যায় না। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও অন্যান্য জাতীয় আন্দোলনেও কিছু বিরোধিতাকারী ও বিপথগামী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী ছিল। তাদের মোকাবিলা করেই এ মহান জাতি বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। আমাদেরও অনেক অর্জন আছে। আমাদের রয়েছে গৌরবের মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, অবকাঠামো ক্ষেত্রের বৈপ্লাবিক উন্নয়ন কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ইত্যাদি। এ ছাড়া আমাদের আছে অনেক সম্পদ, প্রতিভা, সম্ভাবনা, সাহস, ইতিহাস ও ঐতিহ্য। এ সবকিছুকে যথাযথভাবে কাজে খাটিয়ে আমাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সমস্যাগুলো আমরা সহজেই মোকাবিলা করতে পারি।

যা হোক দিয়াগো ম্যারাডোনার অকাল মৃত্যুতে মর্মাহত হয়ে, সেই প্রবাসী বন্ধুর সঙ্গে দুঃখ শেয়ার করছিলাম, সে আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, ম্যারাডোনা তার নিজের মূল্য বুঝল না। যার কারণে কিছুটা অনিয়মিত ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করে অকালে মারা গেল। এ সম্পর্কে আরও বলা যায়- মানুষের মূল্য নিহিত রয়েছে তার সচেতনতা, দায়বদ্ধতা, আদর্শ, মানবিকতা, নৈতিকতা, পরোপকারিতা ও ভালো কাজের মধ্যে। নেতারা সাধারণত অন্যদের অনুপ্রাণিত করতে এবং ইতিবাচক কাজের পরিবেশ গড়ে তুলতে মূল্যবোধের ওপর নির্ভর করেন। মূল্যবোধ কোনো সংগঠন বা সংস্থার কৌশলগত পরিকল্পনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নির্দেশনা দেয়। একজন শিশু বা কিশোরের বিকশিত হওয়ার নিমিত্তে মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়া হয়ে থাকে। মূল্যবোধের কারণে ব্যক্তি কোনো বিষয়ের সঠিকতা যাচাই এবং কোনো জটিল বিষয় সম্পর্কে সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ করে থাকে। মোট কথা মূল্যবোধ ব্যক্তি ও সামষ্টিক উভয় জীবনের জন্য মৌলিক আচরণকে প্রভাবিত করে, সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি করে এবং নৈতিকতার উন্নয়ন করে থাকে। আমাদের সমাজে কিছু খারাপ মানুষ ও সমস্যা রয়েছে সত্য; কিন্তু এগুলো আমাদের সঠিক পরিচয় নয় বা আমাদের মূল স্রোতের সঙ্গে এগুলো যায় না। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও অন্যান্য জাতীয় আন্দোলনেও কিছু বিরোধিতাকারী ও বিপথগামী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী ছিল। তাদের মোকাবিলা করেই এ মহান জাতি বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। আমাদেরও অনেক অর্জন আছে। আমাদের রয়েছে গৌরবের মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, অবকাঠামো ক্ষেত্রের বৈপ্লাবিক উন্নয়ন কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ইত্যাদি। এ ছাড়া আমাদের আছে অনেক সম্পদ, প্রতিভা, সম্ভাবনা, সাহস, ইতিহাস ও ঐতিহ্য। এ সবকিছুকে যথাযথভাবে কাজে খাটিয়ে আমাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সমস্যাগুলো আমরা সহজেই মোকাবিলা করতে পারি।

এ পৃথিবীর অনেক মানুষ বিলাসিতা পছন্দ করে থাকে অর্থাৎ বিলাসী জীবনযাপনকে বেছে নেয়; কিন্তু বিলাসিতার জন্য নিজেকে বিক্রি করা সঠিক পন্থা হিসেবে বিবেচিত নয়। বিলাসিতা এবং মানুষের বাইরের সৌন্দর্য ছাড়াও মানুষের একটা অন্ত্যরীণ সৌন্দর্য রয়েছে। যেগুলো পরিশ্রম দ্বারা, সাধনা দ্বারা ও জ্ঞান দ্বারা জাগানো যায় এবং যার মাধ্যমে জগতে স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে থাকা যায়। গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের সময়ে গ্রিসের নগর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রায়ই যুদ্ধ হতো এবং সক্রেটিস নিজেই দুই দুই বার যুদ্ধে যোগ দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। যুদ্ধ শেষে এক সময় তার উপলব্ধি হলো যুদ্ধ করাই জীবনের অর্থ নয়; বরং জ্ঞান অর্জন করাই জীবনের অর্থ। উপরন্তু, অনেক সমাজ বিজ্ঞানী ও গুণীজনের মতে জীবনের মূল্য নিহিত রয়েছে কঠোর পরিশ্রম, মানব কল্যাণে নিজেকে ব্যাপৃত রাখা, সমাজের ও দেশের জন্য অবদান রাখা, যোগ্যতা অর্জন করা, লেখাপড়া করা এবং প্রেরণা ও প্রেষণা দিয়ে মানুষকে গড়ে তোলা। আমাদের মনীষীদের উপদেশ, মতামত, বাণী মানতে হবে ও তাদের জীবনকে অনুসরণ করতে হবে।

কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির সম্মান সম্পর্কে আলোকপাত করা যাক, সম্মান কিন্তু এক দিনে অর্জিত হয় না। এ জন্য অনেক সময়, অনেক শ্রম ও অধ্যবসায় প্রয়োজন হয়। অথচ দীর্ঘদিনের এ অর্জিত সম্মান খুব অল্পসময়ে এবং একটা তুচ্ছ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বা অবনয়ন হতে পারে। আজ আমাদের যুবসমাজের একটা অংশ মাদকাসক্ত, শিশু-কিশোররা মোবাইলের গেমস, ইন্টারনেট ও ফেসবুকে আসক্ত। যার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের চোখের ক্ষতি হচ্ছে, লেখাপড়া বিঘ্নিত হচ্ছে এবং সর্বোপরি সামাজিকীকরণে সমস্যা হচ্ছে। তা ছাড়া যুবসমাজের মধ্যে হতাশা, বেকারত্ব এবং কর্মহীনতা রয়েছে ও দেশে বেশকিছু কিশোর গ্যাং সক্রিয় থাকার কথাও জানা যায়। সব অপরাধ বিজ্ঞানীদের মতে সমাজ থেকে অপরাধ নিবারণের জন্য ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যথা পরিবার, শিক্ষালয়, সমাজ সংগঠক, ধর্মীয় ও জনপ্রতিনিধিদের উপদেশ, প্রেরণা ও প্রেষণামূলক কাজের মাধ্যমে সমাজের সমস্যাগুলো চিরতরে দূর করা যায়।

বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা একটা বড় সমস্যা আবার এ বিপুল জনসংখ্যার একটা অংশ অশিক্ষিত অর্থাৎ কোনোরূপ অক্ষর জ্ঞান নেই এবং অপর এক অংশ অর্ধশিক্ষিত। এ বিপুল অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত জনগোষ্ঠী অসেচতন, এমনকি নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন নয়। অধিক জনসংখ্যার জন্য প্রয়োজন অধিক খাদ্য, চিকিৎসা, বস্ত্র, বাসস্থান, পানি, অক্সিজেন, তৈল, গ্যাস, গাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইত্যাদি। অথচ পৃথিবীর ও যেকোনো দেশের সম্পদ সীমিত। দেশের এ জনসংখ্যাকে সম্পদে পরিণত করতে পারলে ভালো হয়; কিন্তু সে জন্য আমাদের বিভিন্ন মানসম্পন্ন সক্ষম প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে। তা না হলে এ বিপুল জনগোষ্ঠী দেশ ও জাতির জন্য বোঝা হয়েই থাকবে। মূল্যবোধের মাধ্যমে ব্যক্তি নৈতিক বিচার এবং সঠিকতা যাচাই করে থাকে। মূল্যবোধ ব্যক্তিকে নিজের ও অন্যদের কাছে দায়বদ্ধ করে রাখে। মূল্যবোধ চর্চার ফলে নীতি ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্যগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য হয় এবং একটি সমাজের বিশ্বাস ও ঐতিহ্য তথা সংস্কৃতিকে প্রতিফলিত করে থাকে। তা সামাজিক নিয়ম ও আইন প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখে, তা ছাড়া মূল্যবোধ ন্যায়-বিচার, মমতা এবং অন্যান্য আদর্শের পক্ষে সামাজিক আন্দোলন ও সামাজিক সংস্কারকে পরিচালিত করে এবং সাংগঠনিক সংস্কৃতি গঠনে ভূমিকা রাখে। নেতারা সাধারণত অন্যদের অনুপ্রাণিত করতে এবং ইতিবাচক কাজের পরিবেশ গড়ে তুলতে মূল্যবোধের ওপর নির্ভর করেন। মূল্যবোধ কোনো সংগঠন বা সংস্থার কৌশলগত পরিকল্পনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নির্দেশনা দেয়। একজন শিশু বা কিশোরের বিকশিত হওয়ার নিমিত্তে মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়া হয়ে থাকে। মূল্যবোধের কারণে ব্যক্তি কোনো বিষয়ের সঠিকতা যাচাই এবং কোনো জটিল বিষয় সম্পর্কে সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ করে থাকে। মোট কথা মূল্যবোধ ব্যক্তি ও সামষ্টিক উভয় জীবনের জন্য মৌলিক আচরণকে প্রভাবিত করে, সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি করে এবং নৈতিকতার উন্নয়ন করে থাকে। আমাদের সমাজে কিছু খারাপ মানুষ ও সমস্যা রয়েছে সত্য; কিন্তু এগুলো আমাদের সঠিক পরিচয় নয় বা আমাদের মূল স্রোতের সঙ্গে এগুলো যায় না। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও অন্যান্য জাতীয় আন্দোলনেও কিছু বিরোধিতাকারী ও বিপথগামী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী ছিল। তাদের মোকাবিলা করেই এ মহান জাতি বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। আমাদেরও অনেক অর্জন আছে। আমাদের রয়েছে গৌরবের মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, অবকাঠামো ক্ষেত্রের বৈপ্লবিক উন্নয়ন কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ইত্যাদি। এ ছাড়া আমাদের আছে অনেক সম্পদ, প্রতিভা, সম্ভাবনা, সাহস, ইতিহাস ও ঐতিহ্য। এ সবকিছুকে যথাযথভাবে কাজে খাটিয়ে আমাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সমস্যাগুলো আমরা সহজেই মোকাবিলা করতে পারি।

নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতিকার করতে নৈতিকতা ও শুদ্ধাচার চর্চা, অর্থনৈতিক সংস্কার, শক্তিশালী শাসন, সামাজিক সংহতি, সামাজিক গতিশীলতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, পরিবেশগত স্থায়িত্ব, পারিবারিক কাঠামো সমর্থন করা এবং ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করা প্রয়োজন পড়ে। তা ছাড়া সামাজিক অবক্ষয়কে মোকাবিলা করার জন্য একটি সামগ্রিক পদ্ধতির প্রয়োজন। তা ছাড়া ব্যাপক অর্থনৈতিক রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংস্কার বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমাজের সংশ্লিষ্ট সদস্যদের জন্য আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।

সামাজিক অবক্ষয় একটি জটিল ও বহুমুখী সমস্যা। যার অন্তর্নিহিত কারণগুলো এবং উৎস্যগুলোকে খুঁজে বের করতে হবে ও সেগুলোকে যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে হবে এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাবগুলোকে প্রশসিত করার লক্ষ্যে একটি সামগ্রিক এবং সমন্বিত প্রয়াস ও পদ্ধতির প্রয়োজন। সমাজ থেকে অবক্ষয়, নীতিবর্জিত কার্যকলাপ ও অপরাধ দূর করে সামাজিক মূল্যবোধ, নৈতিক মূল্যবোধ ইত্যাদি ফিরিয়ে আনতে হবে। আশার বিষয়- সরকার ইতোমধ্যে জাতীয় শুদ্ধাচার নীতিমালা প্রণয়ন করেছে এবং সেগুলো বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণের সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সব প্রতিষ্ঠানে সেগুলোর চর্চাও শুরু হয়েছে। যা অত্যন্ত ফলপ্রসূ বলে প্রতীয়মান হয়েছে। এ ছাড়া আমাদের অনানুষ্ঠানিক সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাগুলোকে সক্রিয় করতে হবে, তাদের জাগাতে হবে। অন্যান্য প্রয়াসের পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সব অংশীজনের দ্বারা এসব বিপথগামীকে সঠিক পথে আনতে প্রেরণা, প্রেষণা, মূল্যবোধ ও শুদ্ধাচার চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। তা হলেই এক টেকসই আইনশৃঙ্খলা, আদর্শ সমাজ ও সভ্যতা গঠন করা যাবে।

লেখক: কমান্ড্যান্ট (অ্যাডিশনাল ডিআইজি) পুলিশ স্পেশাল ট্রেনিং স্কুল (পিএসটিএস), বেতবুনিয়া, রাঙামাটি


দেশের লাভ দশের লাভ

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
সৈয়দ শাকিল আহাদ

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তৈরি করার স্বপ্ন দেখেছিলেন বলেই স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ আজ ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এ রূপান্তরিত হয়েছে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে চলেছে।

দেশ এখন এগিয়ে যাচ্ছে ডিজিটাল যুগের দিকে, এরই সঙ্গে স্মার্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ধারণা পেয়েছে উল্লেখযোগ্য গতি। বলা বাহুল্য, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠনকল্পে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রেখে সরকারের রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়নে কার্যকর অবদান রাখতে আমরা সবাই বদ্ধপরিকর ও সচেতন।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাদের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে রাজনৈতিক সংহতি ও সহযোগিতার নবক্ষেত্র উন্মোচন এবং দুই দেশের সম্পর্ক যে নতুন উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে তাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

গত ২১-২২ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে বহুল আলোচিত একটি ঘটনা। নরেন্দ্র মোদির তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠনের পর এটি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিতীয় সফর।

গত ৬ জুলাই শনিবার সন্ধ্যায় ভারতের রাষ্ট্রপতি এবং উপ-রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাতের আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, গত ৯ জুন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শপথ গ্রহণে যোগদানের পর আবারও তার আমন্ত্রণে অত্যন্ত কম সময়ের ব্যবধানে প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরে আসা সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ২১-২২ জুনের ওই সফর অত্যন্ত সফল।

তিনি বলেন, ‘দুদেশের প্রধানমন্ত্রী তাদের মন্ত্রিপরিষদ সদস্য ও কর্মকর্তাদেরসহ দলগতভাবে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা শেষে একান্ত বৈঠক করেন। বৈঠকে অত্যন্ত আন্তরিকতাপূর্ণ পরিবেশে দ্বিপক্ষীয় সব বিষয়ে আলোচনা হয়।’

এ সফরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১০ সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।

দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক শেষে বাংলাদেশ-ভারত ডিজিটাল পার্টনারশিপ, বাংলাদেশ-ভারত গ্রিন পার্টনারশিপ, সমুদ্র সহযোগিতা ও সুনীল অর্থনীতি, ভারতের ইন-স্পেস এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সমঝোতা, বাংলাদেশ ও ভারতের রেল মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সংযোগসংক্রান্ত, বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট ও ভারতের ন্যাশনাল ওশানোগ্রাফিক ইনস্টিটিউটের মধ্যে গবেষণা সহযোগিতা, কৌশলগত ও অপারেশনাল খাতে সামরিক শিক্ষা সহযোগিতায় ডিফেন্স সার্ভিসেস স্টাফ কলেজ, ওয়েলিংটন-ইন্ডিয়া এবং মিরপুর ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজের মধ্যে নতুন সমঝোতা স্মারক সই এবং স্বাস্থ্য ও ওষুধসংক্রান্ত সমঝোতা নবায়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও প্রশমনে ভারতের ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি এবং বাংলাদেশ ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যমান সমঝোতা নবায়ন এবং মৎস্যসম্পদের উন্নয়নে বিদ্যমান সমঝোতা নবায়নসহ মোট ১০টি সমঝোতা সই হয়। দুদেশের মধ্যে সংযোগ বা কানেক্টিভিটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার কথা উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘চট্টগ্রাম ও মোংলাবন্দর যাতে ভারতের উত্তর-পূর্ব, বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলের জন্য ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে তাদের আগ্রহ ও আমাদের অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।’ সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে রাজনৈতিকভাবে দুদেশের ঐক্যমতের অভাব নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এরপরও যে ঘটনাগুলো ঘটছে, সেগুলোও যাতে একদম কমানো যায়, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।’

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী আছে। এগুলোর নাব্য রক্ষাসহ সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা, তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা, বন্যা দুর্যোগ মোকাবিলা এবং পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়েও গুরুত্বসহকারে আলোচনা হয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী তাদের সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতার প্রসার, ভারতের মধ্য দিয়ে নেপাল ও ভুটান থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানিতে সহায়তা এবং ভারত যে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের নতুন সঞ্চালন লাইন করছে, সেটি থেকে কীভাবে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে সে বিষয়ে আলোকপাত করেন।’

‘এ সময় পেঁয়াজ, তেল, গম, চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য আমদানিতে বাংলাদেশের জন্য নির্দিষ্ট কোটা সংরক্ষণ ও আমদানি যাতে বন্ধ না হয়, সে বিষয়েও আমরা আলোচনা করেছি’, ‘ব্রিকস সদস্য বা অংশীদার যেকোনো পদে আমরা ভারতের সমর্থন চেয়েছি এবং তারা ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। পাশাপাশি বিমসটেক, ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশনসহ বহুপক্ষীয় ফোরামগুলোতে অবস্থান শক্তিশালী করা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা ছিল ইতিবাচক।’

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে আশ্রিত প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনায় চীনের ভূমিকা বৃদ্ধির কথাও এসেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সফরে এটি আলোচনা করবেন বলেছেন। ভিসা নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ড. হাছান মাহমুদ জানান, বাংলাদেশিদের জন্য ভারত বছরে প্রায় ২০ লাখ ভিসা প্রদান করে। মেডিকেল ভিসা ত্বরান্বিত করতে ও অন্যান্য ভিসার অযথা বিলম্বরোধে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাদের মিশনগুলোকে নতুন নির্দেশনা দিয়েছেন।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যেসব সমঝোতা হয়েছে তার মধ্যে একটি ছিল রেল ট্রানজিট সংক্রান্ত। ট্রানজিট চালুর পর ভারতের ট্রেন বাংলাদেশের দর্শনা দিয়ে প্রবেশ করে চিলাহাটি-হলদিবাড়ি সীমান্ত দিয়ে ভারতে যাবে।

পরীক্ষামূলকভাবে আগামী মাসেই বাংলাদেশ দিয়ে ভারতের ট্রেন চলবে বলেও সফর শেষে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় মোহন কোয়াত্রা।

সম্মেলনে বিএনপি অভিযোগ করেছে, নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের কারিগরি ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন এবং সামরিক বিশেষজ্ঞদের ইতিবাচক বিশ্লেষণ ছাড়া এ ধরনের ‘রেল করিডোর’ প্রদান আত্মঘাতী ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী।

‘বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতীয় রেল ট্রানজিটের ফলে বাংলাদেশের জনগণ উপকৃত হবে’, ভারত সফর শেষে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার এ দাবিকেও প্রত্যাখ্যান করেন বিএনপি মহাসচিব মি. আলমগীর। বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি জনবিচ্ছিন্ন দলের কয়েকজন নেতা বিভিন্ন মাধ্যমে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে বর্তমান সরকারের উন্নতি এ অগ্রগতিতে দীর্ঘসূত্রতা এ ক্ষতিকর মন্তব্যের মাধ্যমে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-নেত্রীরা বলছেন নানা রকম নেতিবাচক কথা, অথচ অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা।

‘বিদ্যমান অবকাঠামোর উন্নতি করে ভারতের ট্রেন চলাচল শুরু হলে তা হবে বাংলাদেশের ধারণক্ষমতার উন্নয়ন, এ ট্রেন চলাচল রেল যোগাযোগব্যবস্থায় আধুনিকীকরণ, উন্নয়ন ও সম্প্রসারনের মাধ্যমে তৈরি করবে তিন দেশের বাণিজ্যিক সমৃদ্ধি গতিশীল ও আধুনিক হবে তিন দেশের যোগাযোগব্যবস্থাসহ অর্থনৈতিক উন্নতি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর, বিশেষ করে ভারতকে রেল ট্রানজিট দেওয়ার বিষয়টিকে সবাই প্রশংসা করছে, দেশের বিশেষ কয়েকজন মিলে এক ধরনের রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করতে চাইছে বলে অনেকে বিরোধী বিএনপিসহ সমমনা দলগুলোকেই দূষছেন। এসব দলের নেতারা মনে করছেন সামনের দিনগুলোতে ‘এটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু’।

এর আগে মোংলা ও চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে পণ্যের ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট নিয়ে ভারতের দীর্ঘদিনের জোরালো দাবি পূরণ করেছিল, ভারতীয় গাড়ি চলাচলের সময় আমাদের দেশের রাস্তাঘাট নষ্ট করে ফেলবে, আগ্নেয়াস্ত্র ফেলে রেখে আমাদের ভূখণ্ড অনিরাপদ করে তুলবে, অথচ এর কিছুই হয়নি, হয়েছে উন্নত, আধুনিক এবং এর ফলে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এগুলোর বিনিময়ে যে বাংলাদেশ অর্থ আয় করছে তা আজ জনগণ জানে ও বোঝে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মঙ্গলবার অবশ্য সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ভারতকে রেল ট্রানজিট দেওয়ার সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি হবে না এবং করছে না।

বিরোধী দলগুলো কী করতে চায়

ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে রেলযোগে দেশের এক অংশ থেকে আরেক অংশে সরাসরি নিজেদের পণ্য পরিবহনের সুবিধা পাবে ভারত, যা দীর্ঘদিন ধরেই দেশটি চেয়ে আসছিল বলে প্রচার আছে।

বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে কথা বলে যে ধারণা পাওয়া গেছে তা হলো- তারা মনে করেন ভারতকে রেল ট্রানজিট দেওয়ার খবরে সারা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে সামাজিকমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তীব্র সমালোচনার প্রেক্ষাপটে এটিই আগামী দিনের বড় রাজনৈতিক ইস্যু হবে বলে তাদের ধারণা।

অবশ্য একাধিকবার দলটির অনেক নেতাই বলেছেন তাদের কর্মসূচি বা বক্তব্য বাংলাদেশের শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে, ভারতের বিরুদ্ধে নয়। দলটির নেতারা বলেছেন বরং তারা চান ভারত বাংলাদেশের কোনো বিশেষ দল নয় বরং ‘জনগণের সাথে সম্পর্ক’ দৃঢ় করুক।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, চলতি বছরের জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনে ভারতের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ আছে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর। তারা মনে করেন ‘ভারতের ভূমিকার কারণে’ই বিরোধী দলগুলোর বর্জন সত্ত্বেও নির্বাচন করতে সক্ষম হয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার।

এখন রেল ট্রানজিট ইস্যুতেও বিএনপি ও সমমনা দলগুলোও তীব্র সমালোচনা করছে। তারা মনে করেন এটিই হবে আগামী দিনের বড় রাজনৈতিক ইস্যু এবং এর বিরুদ্ধে মানুষ রাস্তায় নেমে আসবে।

দেশের বিভিন্ন মহলের বিজ্ঞজনরা মনে করেন বিশ্ব অর্থনীতির উন্নয়নে সমগ্র বিশ্বে আন্তসংযোগ অত্যন্ত জরুরি এবং গতিশীল একটি বিষয়, আমাদের দেশ, ভারতসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি দেশ এ ট্রানজিট, ট্রান্সশিপম্যান্ট আস্তে আস্তে উন্নত হচ্ছে ও গতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। আন্তরিকতার সঙ্গে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে , বাংলাদেশের ট্রেন চিলাহাটি দিয়া ভারতের হলদিবাড়ী যাবে এবং ভারতের রেলপথ ব্যবহার করে সেখান থেকে যাবে ভুটানের সীমান্তবর্তী হাসিমারা রেলস্টেশন পর্যন্ত যদিও ভুটানে এখনো রেলপথ নেই তাই এ ব্যবস্থার ফলে স্থল সীমানাবেষ্টিত ভুটানের পক্ষে বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য উন্নয়ন বৃদ্ধি পাবে এবং প্রতিটি দেশই অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হবে। এখানে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ ও ভারত ট্রানজিট বা ট্রান্সশিপমেন্ট বা ইন্টার কানেক্টিভিটি বা আন্তসংযোগ বহু দিনের এটা নিয়ে কিছু মানুষ অযথাই বিভ্রান্তি এবং নেতিবাচক কথা বলে অস্বস্তি তৈরি করার চেষ্টা করে চলেছে যা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। এরাই এক সময় নিরাপত্তা লঙ্ঘন হবে দোহাই দিয়ে সাবমেরিন ক্যাবলে আমাদের সংযুক্ত হতে না দিয়ে এদেশকে অনেক পিছনে ফেলেছিল। বিশ্বায়নে সবাই এগিয়ে যাচ্ছে, আমরাও যাব প্রধানমন্ত্রীর কথার সঙ্গে সুর মিলিয়ে আমরাও বলতে চাই ‘বিশ্বায়নের যুগে আমরা নিজেদের দরজা বন্ধ রাখতে পারি না’।- আমাদের বাঙ্গালি জাতির লাভ, আমরা এগিয়ে যাব ইনশাআল্লাহ।

লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক


কোটার যৌক্তিক সংস্কার সর্বোচ্চ আদালতেই হতে পারে

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
মমতাজউদ্দিন পাটোয়ারী

আবার সরকারি চাকরি নিয়ে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে দেশ অনেকটাই অচল অবস্থার মুখোমুখি। এবার আন্দোলনকারীরা কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে আকর্ষিকভাবে আন্দোলন শুরু করেছে। ২০১৮ সালে কোটাব্যবস্থা বাতিল করে যে পরিপত্র জারি করা হয়েছিল ওই পরিপত্রের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০২১ সালে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান অহিদুল ইসলামসহ সাতজন। আবেদনের চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত ৫ জুন হাইকোর্ট মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন। এ রায় ঘোষিত হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা আদালতে রায়ের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য অপেক্ষা না করে সরকারি নির্বাহী ক্ষমতা কোটা সংস্কারের দাবিতে রাস্তায় নেমে পড়ে। গত বুধবার তারা বাংলা ব্লকেড বা অবরোধ পালন করে। ঢাকার ২০টি এলাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখে। দেশব্যাপী রেল যোগাযোগ অবরোধ করে রাখে। ফলে চরম দুর্ভোগ শহরবাসী ও যাত্রী সাধারণের চলাচলে নেমে আসে। অথচ বুধবারই দেশের সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের পরিপেক্ষিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ ২০১৮ সালের সরকারি পরিপত্রের স্থিতাবস্তা আগামী আগস্ট মাসের ৭ তারিখ পর্যন্ত জারি করেন। ওই দিন কোটাব্যবস্থার ওপর পূর্ণাঙ্গ শুনানি ধার্য করা হয়। সুপ্রিম কোর্ট সেই পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের শ্রেণিপাঠে ফিরে যাওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখা এবং আন্দোলনকারীরা চাইলে আইনজীবীর মাধ্যমে তাদের বক্তব্য তুলে ধরতে পারবেন বলেও আদালত জানান; কিন্তু আন্দোলনকারীরা আদালতের এ নির্দেশনা গ্রহণ করেনি। তারা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে। তারা দাবি করে যে তাদের আন্দোলন আদালতের কাছে নয় সরকারের কাছে। সরকার নির্বাহী আদেশে কোটা সংস্কারের বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে পারে প্রয়োজনে সংসদে আইন পাস করতে পারে অথবা একটি কমিশন গঠন করে এর একটি স্থায়ী সমাধান করতে পারে। তারা এসব দাবিতেই বৃহস্পতিবার সাড়ে ৩টায় আবারও অবরোধ কর্মসূচি পালন করার কথা ঘোষণা করেছে।

যারা কোটা সংস্কার আন্দোলনটি অতীতে এবং এবারও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন তারা এর মধ্যে নানা ধরনের বিষয় লক্ষ্য করে থাকতে পারেন। এবারের বিষয়টি প্রথমে তুলে ধরি- দেশের সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্টের রায়টি স্থগিত রেখে ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর সরকারি চাকরিতে নারী কোটা ১০ শতাংশ, মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ এবং জেলা কোটা ১০ শতাংশ বাতিল করে পরিপত্র জারি করে - সেই অবস্থাটি পরবর্তী রায় পর্যন্ত বহাল রেখে সুপ্রিম কোর্ট যে আদেশ দিয়েছেন তাতে শিক্ষার্থীদের প্রতি দেশের সর্বোচ্চ আদালত অভিভাবকত্বের অনুভূতির প্রকাশ ঘটিয়েছেন। এর মধ্যে সরকারি যেসব নিয়োগ প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে সেগুলো সুপ্রিম কোর্ট স্থগিত করেননি, ঘোষিত নিয়মনীতি অনুযায়ী সেগুলো চলতে কোনো বাধা নেই বলে অ্যাটর্নি জেনারেল জানিয়েছেন। তাই আন্দোলনকারীদের ধৈর্য ধরা উচিত ছিল। তা ছাড়া দেশের সর্বোচ্চ আদালতে যখন কোনো মামলার রায় নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া চলতে থাকে তখন সেটির চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষা করাই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মানুষ, সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবার কর্তব্য। সেই সময়ে সর্বোচ্চ আদালতের রায়কে অমান্য করা যায় না কিংবা অন্য সিদ্ধান্তও নেওয়া যায় না। সরকারের নির্বাহী আদেশে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়াটি তখন অবৈধ হওয়ারই আইনত বিধান। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে সন্তুষ্ট না হলে এর রিভিউ করা যেতে পারে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত সংবিধানবিরোধী কোনো রায় দেবেন সেটি আশা করা যায় না। সে কারণে কোটা সংস্কারপ্রত্যাশী শিক্ষার্থীদের উচিত ছিল সর্বোচ্চ আদালতের পরামর্শ মেনে চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষা করা, নিজেদের বক্তব্য আইনজীবীর মাধ্যমে তুলে ধরা। আপিল বিভাগের প্রধান বিচারপতিসহ অন্য বিচারপতিরা দেশের তরুণদের জীবন-জীবিকা, মেধা ও দেশ সেবার সুযোগের বিষয়গুলোকে সংবিধান এবং দেশের বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করেই একটি যৌক্তিক রায় প্রদান করবেন। সেটির জন্য খুব বেশি দিন অপেক্ষা করার প্রয়োজন তাদের পড়বে না। কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ আদালতের প্রতি বিশ্বাস ও সম্মান প্রদর্শনের বিষয়টি সম্পর্কে তাদের মধ্যে অনেকেরই যে খুব বেশি জানা নেই তা তাদের নানা ধরনের উক্তি, কথাবার্তা এবং আচরণ থেকে দেখাও যাচ্ছে। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের ওপরে নিশ্চই সরকারের নির্বাহী বিভাগ নয়। সরকারের নির্বাহী বিভাগ ২০১৮ সালের যে পরিপত্রটি জারি করেছিল সেটি আদালতেই চ্যালেঞ্জ হয়েছে। আমরা হাইকোর্টের সেই রায়টি পুরোপুরি এখনো পাইনি। সুপ্রিম কোর্টেরই একমাত্র এক্তিয়ার রয়েছে হাইকোর্টের রায়ের সংযোজন, বিয়োজন ও পরিমার্জন কিংবা বাতিল করার। সরকার সেখানে আদালতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার চেয়ে বেশিকিছু করতে পারে না। তবে আইনি লড়াইয়ে সরকার যুক্তিতথ্য ও আইনের ব্যাখ্যা দিয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে পারে। সেটি যেকোনো নাগরিকও করতে পারে; কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট দেশের সংবিধানের রক্ষাকবচ। তার ভিত্তিতেই চূড়ান্ত রায় প্রদান করে থাকেন। সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায় সবার জন্যই শিরোধার্য। এ মামলাটি যদি হাইকোর্টে উপস্থাপিত না হতো তাহলে কোটা সংস্কারবাদীরা সরকারের নির্বাহী আদেশের পরিমার্জন চেয়ে তাদের বর্তমান দাবিগুলো তুলে ধরতে পারত। সে ক্ষেত্রে সরকারের চিন্তা-ভাবনা করার যথেষ্ট সুযোগ থাকত। এমনকি যে কমিশন গঠনের প্রস্তাব তারা দিচ্ছে সেটিও সরকার বিবেচনায় নিয়ে মহান জাতীয় সংসদের মাধ্যমে এর একটি কার্যপ্রণালি, রূপরেখা এবং যৌক্তিকব্যবস্থা তৈরি করতে পারত। এখন আন্দোলনকারীরা সরকারের নিকট তাদের দাবি-দাওয়া ও কমিশন গঠনের চিন্তা-ভাবনাটি সর্বোচ্চ আদালতে তুলে ধরার ব্যাপারে প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারে। সরকারের দিক থেকেও প্রগাঢ় পরিচয় দেওয়া হবে যদি আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিদের নিয়ে বসে আদালতে কোটা সংস্কারের একটি যুক্তিসঙ্গত ব্যবস্থাপত্র তুলে ধরার বিষয় তাদের সঙ্গে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা, তাদের রাস্তা ছেড়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া। দেশের সর্বোচ্চ আদালত কোটা সংস্কারের ব্যবস্থাপত্রটি সংবিধান এবং বাস্তবানুগ হলে নিশ্চয়ই আমলে নিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে সমস্যাটির একটি সমাধান দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকেই পাওয়ার সম্ভাবনা সবাই আশা করতে পারেন। কিন্তু আন্দোলনকারীদের রাস্তায় এভাবে বারবার ফিরে আসতে দেওয়া হলে শুধু জনদুর্ভোগই নয় দেশের যে কত ধরনের ক্ষতি হয় তা সবারই বোঝা আছে। এ ছাড়া আন্দোলনকারীদের মধ্যেও নানা মত, পদ এবং বিভ্রান্তবাদীর অবস্থান রয়েছে। তাদের স্লোগান, কথাবার্তা ও কাজকর্ম এক রকম হচ্ছে না, হবেও না। ফলে এটি নৈরাজ্য সৃষ্টির দিকেও চলে যেতে পারে। দেশে একটি গোষ্ঠী তো রয়েছেই এদের ব্যবহার করার জন্য। এরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমেছে কিন্তু সচেতনতার বিষয়টি তাদের মধ্যে সমান নয়। আবেগের বশবর্তী হয়ে অনেকেই অনেক কথা বলেন যা মোটেও আইনবিধি কিংবা তাদের আন্দোলনের সঙ্গেও সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কেউ কেউ এখনো বলে বেড়াচ্ছে যে ৫৬ শতাংশ কোটাই নাকি সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়ে রেখেছে। তাদের অনেকেরই হাতে কোটার প্রকৃত তথ্য-উপাত্ত নেই, ইতিহাসটাও জানা নেই। আবার কেউ কেউ এর মধ্যে রাষ্ট্র সংস্কারেরও দারি তুলে বসে আছে। নানা ধরনের দাবি, আবেগ, উচ্ছ্বাস, বিশ্বাস এবং রাজনীতির প্রতিফলন ঘটাতেও দেখা যায়। কোটার সুবিধা যারা পায় তাদের পরীক্ষা দিতে হয় না এমন ভুল ধারণাও অনেকের মধ্যে রয়েছে। অনেকের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ এবং যোদ্ধাদের সম্পর্কে শ্রদ্ধা ও সংবেদনশীল থেকে কথা বলার বিষয়টি কখনো কখনো লঙ্ঘিত হয় এটি মোটেও মেনে নেওয়ার বিষয় নয়। সে কারণেই সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে এদের শিক্ষাঙ্গনে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করাটাই শ্রেয় হবে।

আমাদের মতো দেশে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য কোটাব্যবস্থা রয়েছে। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে কোটাব্যবস্থা চালু করেছিলেন। পাকিস্তান আমলেও ব্যবস্থা চালু ছিল। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে সরকারি চাকরিতে ২০ শতাংশ মেধায় (সাধারণ), ৪০ শতাংশ জেলা কোটা এবং ১০ শতাংশ ছিল নারী কোটায়। আর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য উপহার হিসেবে কোটা সংরক্ষণ করেছিলেন ৩০ শতাংশ। কিন্তু তিনি এটির বাস্তবায়ন শুরু করে যেতে পারেননি। ১৯৭৬ সালে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের সময় ৪০ শতাংশ জেলা কোটা থেকে ২০ শতাংশ কমিয়ে সাধারণদের জন্য ২০ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশে উন্নীত করা হয়। মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ এবং নারী কোটা ১০ শতাংশ বহাল থাকলেও মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ে চাকরি প্রাপ্তি তখন অনেকটাই কল্পনাতীত ছিল। সেই সময় থেকেই স্বাধীনতাবিরোধী আদর্শের ব্যক্তি এবং তাদের সন্তানরা সরকারি চাকরি, বিভিন্ন বাহিনী এবং বিদেশে মন্ত্রণালয়ে অধীন দূতাবাসে চাকরি পাওয়া শুরু করে। সামরিক শাসক এবং তাদের গঠিত দলের শাসনামলে সেই ধারাই অব্যাহত ছিল। স্মরণ করা যেতে পারে ১৯৭৭ সালে পে ও কর্ম কমিশনের একজন সদস্য ছাড়া অন্য সবাই কোটাব্যবস্থা তুলে দিতে মত দেয়। কোটার পক্ষে মত দেওয়া সদস্য এম এম জামান ১০ বছর কোটা পদ্ধতি বহাল রেখে ১৯৮৭ সালের পর ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার মত রেখেছিলেন। ১৯৯৭ সালে মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের কোটায় চাকরিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০১০ সালে হাইকোর্টে আপিল এবং রায়ের ভিত্তিতে কোটাব্যবস্থা সংস্কারের মাধ্যমে পুনর্বহাল করা হয়। ২০১২ সালে ১ শতাংশ প্রতিবন্ধী কোটা স্থাপন হয়। ২০১৮ সালে সংস্কার নয় কোটাবিরোধী আন্দোলন দেশে চাঙ্গা হয়ে ওঠে। মুক্তিযোদ্ধা কোটার বিরুদ্ধেও তাদের অনেক অসংলগ্ন এবং অসংবেদনশীল দাবি এবং আচরণ ছিল। নানা অনভিপ্রেত ঘটনার সঙ্গেও অনেকে জড়িত ছিল। অনেক স্থানে এ নিয়ে সংঘাতময় পরিস্থিতি তখন তৈরি হয়েছিল। সেই অবস্থায় সরকার ৪, অক্টোবর কোটা পদ্ধতি বাতিল করে পরিপত্র জারি করে। সেটিরই বিরোধিতা করে হাইকোর্টে রিট হয়েছে। হাইকোর্ট সংবিধানকে বিবেচনায় নিয়েই রায় দিয়েছেন বলে আমাদের ধারণা। তবে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে হবে বলে আমরা আশা করি। এবার শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবি জানিয়ে মাঠে নেমেছেন। এখনো পর্যন্ত তারা উশৃঙ্খল কোনো আচরণ করেননি। তবে জনদুর্ভোগ ও দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ভয়ানকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এটি আর চলতে দেওয়া যায় না। সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে আদালতেই এর ফয়সালা হোক সেটি আমরা চাই।

লেখক: ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


কোটা আন্দোলনের লাভ-ক্ষতি

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
সৈয়দ এনাম-উল-আজিম

প্রথমে ঢাকা তারপর সারা দেশজুড়ে শুরু হয়েছে কোটাবিরোধী আন্দোলন। এই আন্দোলন করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা। ছাত্রদের আন্দোলনের উদ্দেশ্য চাকরির ক্ষেত্রে কোটাপ্রথা বাতিল করা। উল্লেখ করার মতো বিষয় হচ্ছে- এই আন্দোলনে সাধারণ জনগণের চাওয়া-পাওয়া বা স্বার্থবিষয়ক কিছু নেই। কিন্তু আছে ভোগান্তি আর অপরিসীম ক্ষতি। এ বিষয়ে আন্দোলনের সূত্রপাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে এবং ক্রমশ ক্যাম্পাস থেকে সড়ক মহাসড়কে গড়িয়ে পড়েছে। গত ১ জুলাই-২০২৪ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনে ক্যাম্পাস থেকে ঢাকার শাহবাগের চারপাশ, ফার্মগেট, সায়েন্সল্যাব, জগন্নাথ কলেজ, ঢাকা কলেজ আর ইডেন কলেজের সড়ক সীমানা এবং সাভার, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, গোপালগঞ্জ, বরিশালসহ সব বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার সড়কগুলো ক্রমশ ছাত্রছাত্রীদের অবরোধের মুখে পড়ে আছে। সেখানে তারা নিয়মিতভাবে অবস্থান নিয়ে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করছে। কিন্তু থমকে গেছে সব পরিবহন যোগাযোগ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে আটকা পড়ে নাকাল হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। কর্মজীবীরা অফিসে পৌঁছাতে পারছেন না। অসুস্থ ও রোগীদের হাসপাতালে আনা-নেওয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ব্যাহত হচ্ছে উচ্চতর শিক্ষার নির্মল পরিবেশ। শিক্ষাঙ্গনের এই আন্দোলনের তোপে যখন দেশের রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি টাল-মাটাল তখন আমাদের মতো সাধারণ জনগণ হিসাব করতে শুরু করেছেন এই আন্দোলনে দেশ ও জনগণের লাভ-ক্ষতি। অঙ্কটা মেলানো দরকার আর মিলাতে চাইলে আমাদের একটু তথ্য নিতে হবে কোটার ইতিহাসের।

কোটার ইতিহাস: সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার ইতিহাসটা ব্রিটিশ আমল থেকেই শুরু। তখন ব্রিটিশরা সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে তাদের এবং তাবেদারগুলোকেই যোগ্য মনে করত। ব্রিটিশ আমলে সর্ব ভারতীয়রা স্বভাবতই তাই পড়াশোনার সুযোগ পেলেও চাকরি ও প্রশাসন পরিচালনায় অনেকটাই বঞ্চিত ছিল। এই বৈষম্য আর বঞ্চনা থেকে মুক্তির জন্য ব্রিটিশ তাড়াও আন্দোলন হলো। সফল হলো ভারতীয়রা। ব্রিটিশরা আন্দোলনের চাপে ১৯৪৭ সালে ভারতকে ভাগ করে পাকিস্তান আর হিন্দুস্তান বানাল। ভৌগোলিক অবস্থান আর ভাষাগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও পূর্ব বাংলাকে (বর্তমান বাংলাদেশ) পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত রাখা হলো। সৃষ্ট হলো বৈষম্য, বঞ্চনা আর নিপীড়নের নতুন ইতিহাস। অবিভক্ত পাকিস্তানে পূর্ব বাংলার বা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ শিক্ষা, চাকরি আর রাষ্ট্র পরিচালনার অংশ থেকে নতুনভাবে বৈষম্য আর বঞ্চনার শিকার হতে লাগল। ক্রমশ ফুঁসে উঠল পূর্ব বাংলার ছাত্র-জনতা। ৫২’র ভাষা আন্দোলন সেই বঞ্চনাবিরোধী রক্তাক্ত ইতিহাস। তারপর ৬২, ৬৬, ৬৯-এর ছাত্র ও গণ-আন্দোলন আর ৭১-এর সমগ্র বাঙালির সম্মিলিত মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা- স্বাধীন বাংলাদেশ ব্রিটিশ, পাকিস্তানিদের ক্রমাগত বঞ্চনার ভেতর থেকে অর্জিত স্মারক।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যখন বঙ্গবন্ধু ও এদেশের সাহসী ও নন্দিত রাজনৈতিক নেতারা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলেন তখনই সবার আগে রাষ্ট্র পরিচালনার মানদণ্ড অর্থাৎ সংবিধান রচনা করতে গিয়ে সেখানে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে শত শত বছরের বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার এদেশের জনগণ, শিক্ষিত ও অনগ্রসর গোষ্ঠীকে শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা ও রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকারকে সুরক্ষিত করলেন। তিনি সংবিধানে খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, বাসস্থান ও স্বাস্থ্যকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি সংবিধানের তৃতীয় ভাগের ২৯(৩)-এর (ক) অনুচ্ছেদে প্রথমবারের মতো ‘কোটা’ প্রথার প্রচলন করলেন। সেখানে পরিষ্কারভাবে বলা হলো- নাগরিকদের যেকোনো অনগ্রসর অংশ যাতে প্রজাতন্ত্রের কর্মে উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব লাভ করতে পারে সেই উদ্দেশ্যে তাদের অনুকূলে বিশেষ বিধান প্রণয়ন করতে রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করবে না।’ অতএব এই সাংবিধানিক অধিকার বলে ১৯৭২ সাল থেকে এদেশের অনগ্রসর জনগোষ্ঠী ও মুক্তিযোদ্ধা, নারী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীরা উচ্চতর শিক্ষা ও চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে কিছু সুবিধা ভোগ করে আসছে। যার অনুপাত সরকারের নির্বাহী আদেশে নির্দিষ্ট হয়। এটিকেই কোটা প্রথা বলে, যা বাতিলের জন্য ২০১৮ সাল থেকে ছাত্রসমাজ আন্দোলন করছে।

আন্দোলনের লাভ-ক্ষতি: ক্ষতির দিক চিন্তা করে কোনো আন্দোলন হয় না। এদেশের সব সফল আন্দোলনে অধিকার আদায়ের জন্যই হয়েছে। আর সব আন্দোলনের সূতিকাগার ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং নেতৃত্ব দিয়েছে গৌরবের ছাত্র সমাজ। কাজেই ছাত্রসমাজের সম্মিলিত সংগ্রামী ভূমিকা ও আন্দোলন অনেক গর্বিত ইতিহাস তৈরি করেছে যার সুফল আমরা স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উপভোগ করছি। তাই ওদের কোনো উদ্যোগকেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। তবে তা হতে হবে সংবিধান-সম্মত এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট। কিন্তু বাস্তবে হচ্ছে কী?

২০১৮ সালে ছাত্রসমাজের কোটাবিরোধী আন্দোলন বাতিলের জন্য ছিল না, ছিল সংস্কারের জন্য। কিন্তু সরকার যেকোনো কারণেই হোক, তা সংস্কার না করে বাতিল করেছিল। এতে কোটা প্রাপ্যদের দীর্ঘদিনের সুরক্ষিত অধিকার ক্ষুণ্ন হয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে সরকারের কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না। আর তাই সংবিধান সবার অধিকার সুরক্ষা করায় কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এই কোটা বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করলে গত ৫ জুন হাইকোর্ট এক রায়ের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধার কোটা পুনর্বহালের আদেশ দেন। সরকার যথাসময়ে সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন এবং গত ১০ জুলাই আপিল বিভাগ মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের ওপর ৪ সপ্তাহের জন্য স্থিতাবস্থা জারি করেছেন। অতএব আপিলের রায়ের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট সময়সীমা পর্যন্ত অপক্ষো না করে এবং চূড়ান্ত রায় কী হয়, তা না জেনেই ছাত্রসমাজ সরকারকে দোষারোপ করে আন্দোলনের সূচনা ও তা অব্যাহত রেখে শিক্ষাঙ্গন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও জনদুর্ভোগ বাড়িয়ে তুলছে। এই আন্দোলনকে বিএনপিসহ সব বিরোধী দল সমর্থন দেওয়ায় আন্দোলনকারীরা আরও উৎসাহ পাচ্ছে বটে কিন্তু কোটা বাতিল হলে যে অনগ্রসর জনগোষ্ঠী ছাড়াও এদেশের সর্বোচ্চ সম্মানের ও গৌরবের মুক্তিযোদ্ধা, পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তানদের সম্মান ও অধিকার বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি তারা ভাবছে না। যারা সমর্থন বা ইন্ধন দিচ্ছেন তারাও রাষ্ট্র পরিচালনা করে এসেছেন বা ভবিষ্যতেও আসবেন তারাও বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন না। সরকার একবার ভুল করতে পারে তাই বলে বারবার ভুল করবে এমনটি ভাবা ঠিক নয়। তাই কাউকে অধিকার বঞ্চিত করার হীন খেলায় মদদ দেওয়া বিবেকসম্মত কোনো কাজ হতে পারে না।

ছাত্ররা যে বিষয়টি নিয়ে শিক্ষাঙ্গনকে অস্থির করছে সেটি এখনো যেহেতু আদালতের বিচেনাধীন। তাই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা বা কোনো সিদ্ধান্ত কারও ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে আদালত অবমাননাকর। আমরা যাদের আন্দোলনরত দেখছি তারা আবেগে বা ক্রোধে ভাসতে পারে কিন্তু আমরা যারা বিচারাধীন বিষয় নিয়ে ওদের সমর্থন বা মদদ দিচ্ছি, তাদের উচিত ছাত্রদের নিবৃত্ত করা এবং প্রয়োজনে সবাইকে নিয়ে এর সম্মানজনক সমাধানের বিষয়ে আলোচনার টেবিলে বসা। মাঠ গরম করে, সড়ক অবরোধ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা নয়। এই যে ১ জুলাই থেকে চলমান আন্দোলনের ক্ষতি কার ওপর চাপছে? নিশ্চয়ই প্রথমত ছাত্রদের ওপর কারণ তাদের নিয়মিত পড়াশোনা ও পরীক্ষা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন জনগণ। যাদের স্বাভাবিক যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে।

আন্দোলন হচ্ছে চাকরিতে সরকারি কোটা বরাদ্দ নিয়ে। ১৯৮৫ সাল থেকে সরকারি চাকরিতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদে ৪৫ শতাংশ মেধার ভিত্তিতে এবং ৫৫ শতাংশ অগ্রাধিকার কোটায় নিয়োগ চালু হয়। পরবর্তী সময়ে প্রতিবন্ধীদের জন্য ১ শতাংশ বাড়িয়ে ৫৬ শতাংশ নির্ধারিত হয়। বর্তমানে যে ৫৬ শতাংশ কোটা পদ্ধতি তার ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা, ১০ শতাংশ নারী, ১০ শতাংশ জেলা কোটা, ৫ শতাংশ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী আর মাত্র ১ শতাংশ প্রতিবন্ধীদের জন্য। বাকি ৪৬ শতাংশ মেধার লড়াইয়ে যারা জিততে পারে তাদের জন্য। এখানে উল্লেখ্য, কোটায় উপযুক্ত প্রার্থী পাওয়া না গেলে তা মেধাতালিকা থেকেই পূরণ করা হয়। এই বাস্তবতা বর্তমান সময়ে কতটুকু গ্রহণযোগ্য তা পর্যালোচনা করা অবশ্যই প্রয়োজন। সরকার সে লক্ষ্যেই কাজ করছে। আদালত কী রায় দেয় সেটা দেখে যত দ্রুত সম্ভব এ বিষয়ে সব মহল পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে একটা গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন- সাধারণ জনগণ সেটিই প্রত্যাশা করে।

লাভ-ক্ষতির হিসাব করতে গেলে দেখা যাবে সরকারি চাকরিজীবীরা জনগণের একট নগণ্য অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। বেসরকারি চাকরিজীবী ও সাধারণ শ্রমিক কর্মচারীরা করে বেশির ভাগ জনগণের প্রতিনিধিত্ব। তাহলে এই কোটাবিরোধী, কোটা সংস্কার বা কোটা বাতিলের আন্দোলন কার স্বার্থে? যে আন্দোলন সংখ্যা গোরিষ্ঠ জনগণের দাবি বা চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে নয় তার পক্ষে মতামত দেওয়ার বা মদদ দেওয়া জনস্বার্থবিরোধী বলে আমার মনে হয়।

তাই সব মহলের প্রতি অনুরোধ বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা না করে আসুন কেউ আন্দোলনে নামলেই সেখানে সমর্থন না দেই। যে আন্দোলন সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের স্বার্থে, আমরা সেই আন্দোলনকে স্বাগত জানাই। সেখানে ভোগান্তি থাকলেও বেলা শেষে পাওনাটা আদায় হলে সাধারণ মানুষের তৃপ্তির হাসিটা সব কষ্টকে ম্লান করে দেয় নিশ্চিত।

লেখক: কলামিষ্ট


আয়াতুল কুরসির ফজিলত

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
মুফতি আলী হুসাইন

‘আয়াতুল কুরসি’ আল্লাহর অপূর্ব দান। এটা সুরা বাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াত। একাধিক হাদিসে আয়াতটি দিনে-রাতে মোট আটবার পড়ার কথা বলা হয়েছে, সকাল-সন্ধ্যায়, পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের পর এবং শোয়ার সময়। প্রতিটি মুমিনের কর্তব্য এই পবিত্র আয়াতটিকে প্রতিদিনের ওজিফা বানিয়ে নেওয়া। কেউ যদি আয়াতুল কুরসি পড়ে ঘুমায়, আল্লাহ তায়ালা তাকে সকল প্রকার বিপদ-আপদ বালা-মুসিবত থেকে হেফাজত করবেন। চোর-ডাকাত থেকে রক্ষা করবেন। মানুষ, শয়তান ও দুষ্ট জিনের ক্ষতি থেকেও নিরাপদ ও সুরক্ষিত রাখবেন।

উবাই ইবনে কাব [রাদিয়াল্লাহু আনহু] বর্ণনা করেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে বললেন, হে আবুল মুনযির! তোমার কাছে আল্লাহর কিতাবের কোন আয়াতটি সবচেয়ে বেশি মর্যাদাপূর্ণ? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই অধিক জানেন। তিনি আবার বললেন, হে আবুল মুনযির! তোমার কাছে আল্লাহর কিতাবের কোন আয়াতটি সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ? আমি বললাম, আয়াতুল কুরসি। তখন তিনি আমার বুকে হাত চাপড়ে বললেন, হে আবুল মুনযির! তোমার জ্ঞানের জন্য তোমাকে মোবারকবাদ। [মুসলিম: ৮১০]

আবু হুরাইরা [রাদিয়াল্লাহু আনহু] বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, আয়াতুল কুরসি কোরআনের অন্য সব আয়াতের সর্দার। আয়াতটি যে ঘরে পড়া হবে, সে ঘর থেকে শয়তান বের হয়ে যাবে। [মুসতাদরাকে হাকেম: ২১০৩]

সহিহ বুখারিতে এসেছে, আবু হুরাইরা [রাদিয়াল্লাহু আনহু] থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে রামাদান মাসে জাকাতের সম্পদ দেখাশোনা ও পাহারা দেওয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত করলেন। তিনি মুসলমানদের থেকে উসুল করা জাকাতের সম্পদ দেখাশোনা করতেন। এক রাতে এক আগন্তুক এসে জাকাতের সেই স্তূপিকৃত খেজুর থেকে মুঠি ভরে নিতে লাগল। আমি তাকে ধরে ফেললাম এবং বললাম তোমাকে আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে নিয়ে যাব। সে বলল, ‘দেখুন, আমি এক হতদরিদ্র মানুষ। পরিবারের ব্যয় নির্বাহের দায়িত্ব আমার কাঁধে। আমার দয়া হলে আমি তাকে ছেড়ে দিলাম।’

সকালে নবি কারিম (সা.) বললেন, আবু হুরাইরা! তোমার গত রাতের বন্দির কী অবস্থা? আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! সে তার অভাব-অনটন ও পরিবারের ভারগ্রস্ততার কথা বলায় আমার মনে দয়ার উদ্রেক হয়েছে বিধায় তাকে ছেড়ে দিয়েছি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, দেখ, সে তোমাকে মিথ্যা বলেছে, সে আবার আসবে। আমি বুঝতে পারলাম, যেহেতু রাসুল বলেছেন, তাহলে সে অবশ্যই আসবে। তাই আমি পূর্ব থেকেই তার অপেক্ষায় প্রস্তুত থাকলাম। ইতোমধ্যে সে আসল এবং খাদ্যস্তূপ থেকে মুঠি ভরে নিতে লাগল। আমি তাকে ধরে ফেললাম এবং বললাম, ‘আজকে আমি তোমাকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে উপস্থিত করবই। সে তখন বলতে লাগল, আমাকে ছেড়ে দিন। আমি তো অভাবী লোক। আমার ওপর পরিবারের দায়-দায়িত্ব আছে। তার কথায় আমার দয়া হলো, তাই আমি আবার তাকে ছেড়ে দিলাম।’

সকালে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘তোমার বন্দির কী খবর? আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! সে চরম হতদরিদ্র, নিজের অভাব ও পরিবারের দায়-দায়িত্বের কথা বলায় আমার মনে দয়া হয়, তাই তাকে ছেড়ে দেই।’ তিনি বললেন, ‘সে তোমাকে মিথ্যা বলেছে। সে আবার আসবে।’ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কথায় আমি তৃতীয় রাতেও তার অপেক্ষায় থাকলাম। ঠিকই সে এসে মুঠি ভরে খাদ্য নিতে লাগল। আমি তাকে ধরে ফেলি এবং বলি, এবার তোমাকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে নিয়েই ছাড়ব।

এ নিয়ে তিনবার হলো, তুমি বল আসবে না কিন্তু পরে ঠিকই এসে যাও। তখন সে বলল, আমাকে ছেড়ে দাও। আমি তোমাকে এমন কিছু কথা শিখিয়ে দেব, যার দ্বারা আল্লাহ তোমাকে উপকৃত করবেন। আমি বললাম, কী সেই কথা? সে বলল, যখন বিছানায় যাবে, আয়াতুল কুরসি পাঠ করবে। তাহলে আল্লাহর পক্ষ থেকে সকাল পর্যন্ত তোমার জন্য একজন পাহারাদার নিযুক্ত থাকবে এবং সকাল পর্যন্ত শয়তান তোমার কাছে আসতে পারবে না। আমি তাকে ছেড়ে দিলাম। রাসুলুল্লাহ সকালেই আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, গত রাতে তোমার বন্দির কী খবর? আমি বললাম, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! সে বলল যে, আমাকে কিছু কথা শিখিয়ে দেবে, যার দ্বারা আল্লাহ আমাকে উপকৃত করবেন। তাই তাকে ছেড়ে দিয়েছি।’

জিজ্ঞাসা করলেন, সে কথাগুলো কী?

সে আমাকে রাতে শোয়ার সময় আয়াতুল কুরসি পড়ে ঘুমাতে বলেছে। এতে আল্লাহ তায়ালা আমাকে সকাল পর্যন্ত হেফাজত করবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এ কথা শুনে বললেন, সে তোমাকে সত্যই বলেছে। যদিও সে মহা মিথ্যুক। এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, আবু হুরাইরা! তুমি কি জানো, তিন রাত ধরে তোমার সঙ্গে কার সাক্ষাৎ হচ্ছে?

-না, তা তো জানি না!

-সে ছিল শয়তান। [সহিহ বুখারি: ২৩১১]

আয়াতুল কুরসি

‘আল্লাহ, তিনি ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই। তিনি চিরঞ্জীব ও বিশ্বচরাচরের ধারক। কোনো তন্দ্রা বা নিদ্রা তাকে স্পর্শ করতে পারে না। আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সবকিছু তাঁরই মালিকানাধীন। তাঁর হুকুম ব্যতীত এমন কে আছে যে, তাঁর নিকট সুপারিশ করতে পারে? তাদের সম্মুখে ও পিছনে যা কিছু আছে সবকিছুই তিনি জানেন। তাঁর জ্ঞানসমুদ্র হতে তারা কিছুই আয়ত্ত করতে পারে না, কেবল যতটুকু তিনি দিতে ইচ্ছে করেন তা ব্যতীত। তাঁর কুরসী সমগ্র আসমান ও জমিন বেষ্টন করে আছে। আর সেগুলোর তত্ত্বাবধান তাঁকে মোটেই শ্রান্ত করে না। তিনি উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ও মহিমাময়।’ [সুরা বাকারা, আয়াত: ২৫৫]

ব্যাখ্যা

আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই

আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো বা একাধিক উপাস্য থাকলে কি সমস্যা? এ প্রশ্নের জবাবে আল্লাহ বলেন,

‘বল, ওদের কথামতো যদি তাঁর সঙ্গে অন্য উপাস্যও থাকত, তবে তারা আরশের অধিপতির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার উপায় অন্বেষণ করত।’ [সুরা বনী ইসরাইল, আয়াত: ৪২]

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছেÑ

আল্লাহ কোনো সন্তান গ্রহণ করেননি এবং তাঁর সঙ্গে অন্য কোনো ইলাহ নেই। থাকলে প্রত্যেক উপাস্য নিজ নিজ সৃষ্টি নিয়ে আলাদা হয়ে যেত এবং একজন অন্যজনের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে চাইত। তারা যা বলে, তা থেকে আল্লাহ পবিত্র। [সুরা মুমিন, আয়াত: ৯১]

সুরা আল-আম্বিয়ার ২২ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছেÑ

যদি আসমান ও জমিনে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ থাকত, তবে উভয়েই ধ্বংস হয়ে যেত। অতএব তারা যা বলে, তা থেকে আরশের অধিপতি আল্লাহ পবিত্র।’ [সুরা আম্বিয়া: ২২]

মোটকথা, আল্লাহর সঙ্গে যদি একাধিক উপাস্য থাকত, তাহলে তাদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই, আধিপত্য বিস্তারের লড়াই, ভৌগোলিক-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বিস্তারের লড়াই অনিবার্য হয়ে উঠত। তখন সব উপাস্যের ধ্বংসটাও নিশ্চিত ছিল।

চিরঞ্জীব আল্লাহকে কেউ জন্ম দেয়নি; তিনিই জন্ম-মৃত্যু সৃষ্টি করেছেন। তিনি সৃষ্টি করেন এবং সৃষ্টির বিনাশ ঘটান। জন্ম-মৃত্যুর যিনি স্রষ্টা, তিনি স্বভাবতই জন্ম-মৃত্যুর ঊর্ধ্বে। তিনি সদা-বর্তমান। মৃত্যু তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না। যখন মহাবিশ্ব বলে কিছুই ছিল না, তখনো তিনি ছিলেন। আবার যখন সব কিছুর বিনাশ ঘটবে তখনো তিনি থাকবেন। তাঁর কোনো শুরু নেই। তাঁর কেনো শেষও নেই। তিনি আদি। তিনি অনন্ত।

আল্লাহ বলেন,

তিনি চিরঞ্জীব। তিনি ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই। অতএব তাঁর কাছেই প্রার্থনা কর বিশুদ্ধ-চিত্তে, নিবেদিত প্রাণ হয়ে। সব প্রশংসা বিশ্বজগতের পালনকর্তা আল্লাহর জন্য। [সুরা মুমিন, আয়াত: ৬৫]

বিশ্বচরাচরের ধারক মহাবিশ্বসহ সব সৃষ্টিকে যিনি ধারণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ করে চলেছেন, তিনিই ‘আল-কাইয়ুম’। জড়বস্তু আর জীববস্তু; প্রত্যেকের প্রতি মুহূর্তের প্রতিটি প্রয়োজন তিনি নিজস্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী পূরণ করে চলেছেন এবং নির্ধারিত পরিণতির দিকে প্রত্যেককে পরিচালিত করে চলছেন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর গৌরব ও মহিমা ঘোষণা করে, তিনি প্রবল পরাক্রান্ত, মহাপ্রজ্ঞাবান। আসমান ও জমিনের তিনিই একচ্ছত্র মালিক এবং তিনিই জন্ম ও মৃত্যু দেন, তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান। তিনি আদি এবং তিনিই অন্ত; তিনি প্রকাশিত এবং তিনিই অপ্রকাশিত; সব বিষয়ে তিনি সম্যক অবগত। তিনি আসমান ও জমিনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর আরশে সমাসীন হয়েছেন। তিনি জানেন, যা ভূতলের গভীরতম প্রদেশে প্রবেশ করে, আর যা তা থেকে বের হয় এবং যা আকাশ থেকে অবতীর্ণ হয় এবং যা তাতে ওঠে যায়, তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন। তোমরা যা কর আল্লাহ সবই দেখেন। আসমান ও জমিনের সার্বভৌমত্ব তাঁরই; তাঁর কাছেই আছে সব বিষয়ে মীমাংসা। মানুষের বুকের গভীরে লুকায়িত সব তথ্যই আল্লাহ জানেন। [সুরা হাদীদ: ২-৬]

(কোনো তন্দ্রা এবং নিদ্রা তাকে স্পর্শ করতে পারে না) আল্লাহ ঘোষণা করছেন, তিনি তন্দ্রাচ্ছন্ন হন না এবং তাঁর ঘুমের প্রয়োজন পড়ে না। তাঁর ক্লান্তি নেই। সদা-সর্বদা বিশ্ব পরিচালনার কাজে ব্যস্ত থাকেন।

সুরা আর-রহমানে ঘোষিত হয়েছেÑ

‘তিনি প্রতিদিনই [প্রতি মুহূর্তে] বিশাল কর্মযজ্ঞে ব্যস্ত থাকেন।’ [সুরা আর-রহমান, আয়াত:২৯]

(কে আছে যে, তাঁর অনুমতি ব্যতীত সুপারিশ করবে?) এই পৃথিবীর সবকিছু আল্লাহর একক মালিকানাধীন। তিনি তাঁর আপন ইচ্ছানুযায়ী তাদের প্রত্যেককে নির্দিষ্ট পরিণতির দিকে চালিত করে চলেছেন। তাঁর ইচ্ছা কিংবা আনুগত্যের বাইরে যাওয়া কোনো সৃষ্টির পক্ষেই সম্ভব নয়। এমনকি তাঁর অধীনস্থদের কেউ নিজের বা অন্য কারও ব্যাপারে কোনো বিষয়ের সুপারিশও আল্লাহর কাছে করতে পারবে না। তবে তিনি যদি দয়া করে কাউকে সুপারিশ করার জন্য নির্বাচিত করেন এবং তাকে অনুমতি প্রদান করেন তাহলে সে সুপারিশ করতে পারবে।

(যতটুকু তিনি ইচ্ছে করেন তা ছাড়া তাঁর জ্ঞানভাণ্ডারের কিছুই তারা আয়ত্ত করতে পারে না) মহান আল্লাহ মহাবিশ্বের প্রতিটি জড় পদার্থ ও প্রাণীজগতের অতীত-বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকেফহাল। পক্ষান্তরে, মানুষ কেবল ঘটমান বর্তমান এবং অতীতের টুকরো টুকরো স্মৃতি ছাড়া আর কিছুই জানে না। তবে আল্লাহ যদি কাউকে বিশেষভাবে অন্য মানুষের তুলনায় বেশি জ্ঞান দান করেন সেটা ভিন্ন কথা। মোটকথা মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধির সীমাবদ্ধতা রয়েছে কিন্তু আল্লাহর জ্ঞানের সীমা নেই, তিনি অসীম, তাঁর জ্ঞানও অসীম।

আল্লাহ বলেন,

নিশ্চয়ই কেয়ামতের জ্ঞান কেবল আল্লাহর কাছেই আছে। তিনি বৃষ্টিবর্ষণ করেন এবং তিনিই জানেন মাতৃগর্ভে যা আছে। কেউ জানে না আগামীকাল সে কী উপার্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন দেশে সে মৃত্যুবরণ করবে। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্ববিষয়ে সম্যক অবগত। [সুরা লুকমান: ৩৪]

(তাঁর সিংহাসন (কুরসি) আসমান ও জমিনকে পরিবেষ্টন করে আছে) কুরসি শব্দের আভিধানিক অর্থ সিংহাসন, আসন, চেয়ার ইত্যাদি। আসন থেকে জমিন পর্যন্ত বিস্তৃত একটি কুদরতি সিংহাসনে আল্লাহ সমাসীন হয়ে আছেন। তাঁর অসীম কুদরত, শক্তি, ক্ষমতা, বিশালত্ব, শাসনব্যবস্থা ইত্যাদি দিয়ে মহাবিশ্বসহ প্রত্যেক জড় এবং জীবকে প্রতিনিয়ত পরিবেষ্টন করে আছেন।

আল্লাহ বলেন,

আর তারা আল্লাহকে যথার্থরূপে বোঝেনি। কেয়ামতের দিন পৃথিবী থাকবে তাঁর হাতের মুঠোয় এবং আসমানগুলো ভাঁজ করা অবস্থায় থাকবে তাঁর ডান হাতে। তিনি পবিত্র; আর এরা যাকে শরিক করে তিনি অনেক ঊর্ধ্বে। [সুরা যুমার, আয়াত: ৬৭]

লেখক: ইসলামী চিন্তাবিদ


বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে করণীয়

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
হায়দার আহমদ খান এফসিএ

সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ তার যোগ্যতা এবং শক্তিতে। এ মানুষ তার সুখ-শান্তির জন্য সমাজের প্রাপ্য সম্পদকে অধিক ব্যবহার উপযোগী করায় শ্রম বাজারের সূচনা। শ্রম বাজারের সঙ্গে শুরু হয়েছে শ্রমের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা। এ শ্রমের বিনিময় মূল্যের ওপর নির্ভর করে একজনের চাহিদা পূরণের সক্ষমতা। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে মানুষের চাহিদার রূপান্তর ঘটছে প্রতিদিন, সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার। এ প্রতিযোগিতার বাজারে সেই দেশ তত উন্নত বা দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত, যে দেশের মানুষ উন্নত সমাজব্যবস্থার সব উপকরণ বেশি উপভোগ করতে পারে। উন্নত সমাজব্যবস্থার উপকরণ সরবরাহের জন্য প্রয়োজন দক্ষ এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানবসম্পদ।

প্রতিযোগিতার বাজারে নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আয়-উপার্জন বৃদ্ধির পথ সমাজে স্বাভাবিক নিয়মেই হাজির। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সক্ষমতার বৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় শুরু হয়েছে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পন্থার ব্যবহার। আর এই বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে নতুন নতুন দ্রব্য, সেবার যেমন সৃষ্টি হচ্ছে- তেমনি সমাজে এক অসম প্রতিযোগিতাও শুরু হয়েছে। আগে মানুষ তার হাতের কাছে যেসব দ্রব্য, সেবা পেত তা দিয়েই তার চাহিদা পূরণ করত। এখন মানুষ তার যোগ্যতা বিবেচনায় প্রতিযোগিতায় সফলকাম হওয়ার জন্য সক্ষমতা বৃদ্ধির পরীক্ষার সম্মুখীন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটির মতো, আর আজ স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর ২০২৪ সালে এসে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ কোটি। ১,৪৭,৫৭০ বর্গ কিলোমিটারের বাংলাদেশে স্বাধীনতার পূর্বে ওই সংখ্যক মানুষের মধ্যে মাঝেমধ্যেই খাদ্যাভাবের খবর শোনা যেত; বর্তমানে খুব একটা এমন সংবাদ পাওয়া যায় না। কৃষি উৎপাদনের সফলতা আমাদের এক বিরাট অর্জন। তবে স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি উদ্দেশ্য ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি, সে লক্ষ্য এখনো অর্জিত হয়নি। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের মানুষ বেড়েছে, সঙ্গে বেড়েছে শ্রমিকের চাকরিতে প্রার্থীর সংখ্যা। বাংলাদেশের ১ কোটির বেশি মানুষ বিদেশে কর্মরত শ্রমিকের পদে। তাদের অধিকাংশের পারিবারিক জীবন নেই। তারপরেও বিদেশ যেতে বা পাঠাতে চায় অনেকে কারণ দেশেও তাদের কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা নেই। সম্প্রতি এক সংবাদে প্রকাশ ‘রেলপথের পরিচ্ছন্নতাকর্মী পদে চাকরি পাওয়াদের সবাই স্নাতকোত্তর’। সংবাদটি পড়ে আমার এক স্যারের কথা মনে হয়ে গেল। ১৯৮১ সালের অক্টোবর মাসে আমি যোগদান করেছিলাম বাংলাদেশ সরকারের টি অ্যান্ড টি বোর্ডে সহকারী পরিচালক (হিসাব) পদে। চাকরি জীবনের সূচনায় আমাদের পরিবার কেমন হবে তা চিন্তা করে কর্তৃপক্ষ আমাদের দিয়েছিলেন পরিবার পরিকল্পনার ওপর ট্রেনিং। সেই ট্রেনিং-এর একটি সেশনে লেকচার দিয়েছিলেন হিসাব জগতের এক সময়ের সবার গুরু ড. মো. হাবিবউল্লাহ স্যার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে স্যারকে পেয়েছিলাম শিক্ষক হিসেবে। স্যারের লেকচারের উপকারিতা জানা থাকায় আমার আগ্রহ ছিল তুঙ্গে। স্যার সব সময় ইনফরমাল পদ্ধতিতে ছাত্রদের কাছে আলোচ্য বিষয় উপস্থাপন করতেন, যা একবার শুনলে জীবনেও আর ভোলা যায় না। স্যার বলা শুরু করলেন তার ব্যক্তিগত জীবনের কাহিনি দিয়ে। স্যার যখন ইন্টারমিডিয়েটে ঢাকা কলেজে পড়েন, তখন বাড়ি থেকে টেলিগ্রাম ‘কাম শার্প দাদি সিরিয়াস’। টেলিগ্রাম পেয়ে বাড়ি যাওয়ার পর শুনলেন দাদি নাতবৌ দেখতে চান। যথারীতি বিয়ে করতে হয়েছিল স্যারকে। স্বাভাবিকভাবেই বিয়ের পর সন্তানদের আগমন শুরু হয়েছিল। পরিবার পরিকল্পনার কথা চিন্তা না করার পক্ষে কারণ- স্যারের ধারণা স্যারের ছেলেমেয়েরা চাকরি পাবেই কারণ বাংলাদেশে ম্যানেজারের চাকরির অভাব হবে না আর ‘হাবিবউল্লাহর ছেলেমেয়েরা ম্যানেজারের নিচে চাকরি করবে না’। ২০২৪ সালে অনেকের মতো আমারও ধারণা ম্যানেজারের পদে যোগ্য লোক পাওয়া যায় না, আর যোগ্য লোকের চাকরির অভাব হচ্ছে না। আর আমার ধারণা, ম্যানেজার পদে যোগ্য মানুষের অভাবের একটি প্রধান কারণ: মানসম্মত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে না পারা। আমরা যে আমাদের সন্তানদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে পারছি না তা মাঝেমধ্যে প্রকাশ হয়ে যায়। আমাদের একটি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকীয়তে দেখা যায়, তৃতীয় শ্রেণির শতকরা ৬০ এবং পঞ্চম শ্রেণির শতকরা ৭০ জন ছাত্রছাত্রী তাদের অঙ্ক বিষয়ে জ্ঞান রাখে না। এমন সংবাদ অনেক দিন ধরে আমাদের সামনে আসছে। এপ্রিল ১৭, ২০১৮ তারিখে দৈনিক বণিকবার্তার সংবাদে এসেছিল অষ্টম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা অর্জনের হার যার চিত্র এমন:

(১). বাংলায় শতকরা ৫৪ শতাংশ,

(২). ইংরেজিতে শতকরা ১৯ শতাংশ এবং

(৩). গণিতে শতকরা ২২ শতাংশ।

এমন সব ছেলেমেয়ের একটি অংশ যদি আমাদের দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে তাহলে, পরিচ্ছন্নতাকর্মী পদে চাকরির দরখাস্ত করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো উপায় থাকবে না। এই পরিবেশের জন্য দায়ী দরখাস্তকারীরা অবশ্যই নয়। অন্য এক সংবাদে প্রকাশ, বাংলাদেশের ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি যুবসমাজের ১৮.৮৭ শতাংশের কোনো প্রকার শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণ নেই (দি ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, জুন ২৪, ২০২৪)। বাংলাদেশে ম্যানেজারের পদে চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় যোগ্য প্রার্থীর সংখ্যা যথেষ্ট না থাকায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদেশি প্রার্থীদের বাংলাদেশে চাকরির সংবাদ পাওয়া যায়। সম্প্রতি প্রকাশিত এমন একটি সংবাদ ‘দেশে অবৈধ কত বিদেশি শ্রমিক কাজ করেন জানতে চান হাইকোর্ট’।

বর্তমান বিশ্বে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বেশি। আমাদের দেশ অধিকাংশ সময় গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের হাতেই ছিল কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় যে আদর্শ উদ্দেশ্য নিয়ে যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছিল আমার মতো মুক্তিযোদ্ধারা- সেই স্বপ্ন আজও বাস্তবায়ন হওয়া তো দূরের কথা, বাস্তবায়নের পথে আছে তাও বলতে লজ্জা পাওয়ার মতো। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে মাঝেমধ্যে জাতীয়পর্যায়ে আলোচনা হয়, যা সংবাদমাধ্যমে স্থান পায়। বাংলাদেশের এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া খুব একটা আমাদের নজরে আসে না বা উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। এভাবেই স্বাধীন দেশের ৫৩ বছর চলে গিয়েছে। আর কতদিন যাবে বা লাগবে উন্নতি শুরু করতে? আর কতদিন আমাদের সন্তানদের শ্রমিকের চাকরিতে বিদেশে পরিবার ছাড়া দিনের পর দিন থাকতে দিব? বাংলাদেশের একমাত্র সম্পদ তার মাটি এবং মানুষ। সেই মানুষ এবং মাটিকে ব্যবহার করার যে পরিকল্পনা দরকার তা দেখা যাচ্ছে না। ১৯৭২ সালেই শিক্ষা ক্ষেত্রে শুরু হয়েছিল নকল এবং অটো প্রমোশনের মতো ব্যবস্থা, যা আজও অনেক ক্ষেত্রে বিরাজমান। তবে মাঝেমধ্যে সরকারের আশা জাগানিয়া কিছু পদক্ষেপের কথা শোনা যায়। ‘জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহ-২০২৪’ উদ্‌যাপন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার পুণর্ব্যক্ত করে বলেছেন ‘শৈশব থেকেই সন্তানদের বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা দিতে হবে’। অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।

একটি দেশের আসল সম্পদ তার মানুষ। মানবসম্পদ ছাড়া অন্য যত সম্পদই থাকুক না কেন, মানবসম্পদ ছাড়া তা কাজে লাগানো যায় না। আর যদি উপযুক্ত এবং মানসম্মত মানবসম্পদ সৃষ্টি করা যায়, তাহলে সে দেশের মানুষ আরাম আয়েশে উন্নত জীবনযাত্রায় বসবাস করতে পারবে অন্য সব সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে। বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটি। সরকারি হিসাবে প্রায় ৩ কোটি ছেলেমেয়ে প্রাথমিক শিক্ষায় সম্পৃক্ত। সরকারের উচিত সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষায় জড়িতদের সম্পদে রূপান্তর করা। শিক্ষায় সরকারের বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ সরকারের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ নেই, ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও কম। তারপরও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। যেমন সম্প্রতি সংবাদে প্রকাশ, প্রাথমিক শিক্ষায় জড়িতদের মধ্যে ৩৭ লাখ ছেলেমেয়েকে মিড-ডে খাবার পরিবেশন করা হবে আগামী আগস্ট থেকে। সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিতির নিশ্চয়তাসহ পড়াশোনার প্রতিদিনের অগ্রগতি পর্যালোচনাও করতে হবে- তাহলেই বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার পদক্ষেপ কার্যকর হবে। চাকরির সুযোগ দিন দিন বাড়বে, তবে মেধাসম্পন্ন ব্যক্তির জন্য। আমাদের কাজ হবে সুপ্ত মেধাকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। সন্তানকে শিক্ষিত করার মাধ্যমেই আমাদের আর্থিক সচ্ছলতার টেকসই অবস্থান নিশ্চিত হবে। মনে রাখতে হবে বর্তমান বিশ্ব একটি পরিবার।

লেখক: চেয়ারম্যান, এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (ইডিএ)


এডিপি বাস্তবায়ন ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ড. মিহির কুমার রায়

বিদায়ী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে চলছে। নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও উন্নতির কোনো লক্ষণ নেই। বরং প্রকল্পে ধীরগতির কারণে অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে এডিপি বাস্তবায়ন হার নেমে এসেছে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ১১ মাসে (জুলাই-মে) এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে ৫৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ। যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৪ শতাংশ কম। অথচ অর্থবছর শেষ হতে বাকি আর মাত্র এক মাসেরও কম সময়। এ সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে হবে ৪৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ এডিপি।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ১১ মাসের এডিপি বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে। বুধবার (২৬ জুন) এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে আইএমইডি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বরাদ্দের হিসাবে কয়েকটি মন্ত্রণালয় ছাড়া বেশির ভাগই তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারছে না। এ বিষয়ে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এবার এডিপি অগ্রগতি কম আছে। অর্থবছর শেষে খুব বেশি বাস্তবায়ন হবে বলে মনে হয় না। তবে বাস্তবায়নের হার বাড়ানোর বিষয়ে জোর দেওয়া হচ্ছে।’ পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, চলতি (২০২৩-২৪) অর্থবছরের এডিপিতে ১ হাজার ৬৪৭ প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ রয়েছে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। প্রথম ১১ মাসে ৫৮ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের তত্ত্বাবধানে থাকা এসব প্রকল্পের বিপরীতে খরচ হয়েছে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা বরাদ্দের ৫৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ।

১১ মাসের এডিপি বাস্তবায়নের চিত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, করোনার সময় ছাড়া চলতি অর্থবছরের মতো এত কম এডিপি বাস্তবায়ন আর কখনো হয়নি। ২০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছিল ২০১৯-২০ এবং ২০২০-২১ অর্থবছর। ওই অর্থবছর একই সময়ে বাস্তবায়ন হার ছিল ৫৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ। আর ২০২০-২১ অর্থবছরে ছিল ৫৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ, যা চলতি অর্থবছরের চেয়েও প্রায় এক শতাংশ বেশি। অর্থবছরের ১১ মাসে কখনো ৬০ শতাংশের নিচে নামেনি এডিপি বাস্তবায়নের হার। এমনকি গত অর্থবছরেও বাস্তবায়ন হার ছিল ৬১ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

এদিকে, সামগ্রিকভাবে এডিপি বাস্তবায়ন হারের সঙ্গে মাসের হিসাবে চলতি অর্থবছরের মে মাসে গতবারের তুলনায় কম বাস্তবায়ন হয়েছে। তথ্যানুযায়ী, শুধু মে মাসে এডিপি বাস্তবায়নে খরচ হয়েছে ২১ হাজার ৫৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা। অর্থাৎ এ সময় বাস্তবায়নের হার ৮ দশমিক ২৮ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরের মে মাসে খরচ হয় ২৬ হাজার ৯৫৭ কোটি ৫১ লাখ টাকা, যা বরাদ্দের ১১ দশমিক ৪০ শতাংশ। অর্থাৎ মাসের হিসাবে বাস্তবায়ন তিন শতাংশেরও কম হয়েছে।

আইএমইডির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাস্তবায়ন হারে সবচেয়ে পিছিয়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, পরিসংখ্যান ও সরকারি কর্মকমিশন। এ ছাড়া কয়েকটি বাদে অন্য মন্ত্রণালয় এবং বিভাগগুলোও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ৪৩ দশমিক ০৩ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ ৪৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ ৪৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন করেছে।

এ ছাড়া ১১ মাসে ৪০ শতাংশও এডিপি বাস্তবায়ন করতে পারেনি সাতটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। এরমধ্যে সবচেয়ে কম এডিপি বাস্তবায়ন করেছে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ, বাস্তবায়ন করেছে ২৭ দশমিক ০৭ শতাংশ। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ করেছে ২৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ৩০ দশমিক ০৩, বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন ৩২ দশমিক ৯৬ শতাংশ, পরিবেশ ও জলবায়ু মন্ত্রণালয় ৩৩ দশমিক ৭২ এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ ৩৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন করেছে।

চলতি অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি এডিপি বাস্তবায়ন করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংস্থাটি ১১ মাসে বাস্তবায়ন করেছে মোট বরাদ্দের ৯৬ দশমিক ৮৫ শতাংশ। এ ছাড়া জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ ৯২ দশমিক ১৪, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ ৮৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ৭৯ দশমিক ০৬, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়র বিভাগ ৭৬ দশমিক ৭৫ এবং সুরক্ষা ও সেবা বিভাগ ৭৩ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন করেছে।

শতাংশের হিসাবে বাস্তবায়নে পিছিয়ে থাকলেও টাকা খরচে এগিয়ে রয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। বিভাগটির ২৬৩ প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ ছিল ৪২ হাজার ৯৫৬ কোটি ৭১ লাখ টাকা। ১০ মাসে ব্যয় হয়েছে ২৩ হাজার ৭৬২ কোটি ২৬ লাখ টাকা, যা ৫৫ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থান বিদ্যুৎ বিভাগের, খরচ করেছে ২০ হাজার ৭৬২ কোটি ২৬ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৬৮ দশমিক ২৯ শতাংশ।

এখানে উল্লেখ্য, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিল দুটি সরকার বিধায় নির্বাচনী বছর হওয়ায় উন্নয়ন কাজের বাস্তবায়ন তথা অর্থছাড়ে ধীরগতি লক্ষণীয় যা প্রতিটি নির্বাচনী বছরেই হয়ে থাকে; কিন্তু আইনগতভাবে তা হওয়ার কথা নয়। কারণ সরকার একটি প্রশাসনিক কাঠামো থেকে কাজ করে থাকে এবং সরকার আসবে সরকার যাবে, প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের দ্বারা প্রকল্প বাস্তবায়নের অসুবিধা পাওয়ার কথা নয় যা বাস্তবে সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই আগামীতে এ জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে মনোযোগ দেওয়ার জন্য প্রস্তাব রইল।

লেখক: গবেষক ও অর্থনীতিবিদ।


প্রযুক্তির উন্নয়নে বাংলাদেশ-চীন বন্ধুত্ব

আপডেটেড ১০ জুলাই, ২০২৪ ১৯:২৬
ড. মো. ফখরুল ইসলাম

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় এক দশক পর চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে আজ ০৮ জুলাই চীনের রাজধানী বেইজিং-এর উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ছেন। তার এ রাষ্ট্রীয় সফর ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও স্মার্ট জাতিতে রূপান্তরের লক্ষ্য পূরণের জন্য দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও আলোচনার নতুন আশার সঞ্চার করেছে। চীন সরকারও দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্রে উচ্চ প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে। শেখ হাসিনা ও শি জিন পিং-এর দ্বিপক্ষীয় এ বৈঠককে স্মরণীয় করে রাখতে দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন খাতে ২০টি সমঝোতা স্মারক সম্পন্ন হতে পারে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- অর্থনৈতিক ব্যাংকিং খাত, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, ডিজিটাল ইকোনমি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি খাতে সহায়তা, ষষ্ঠ ও নবম বাংলাদেশ-চীন ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ নির্মাণ, বাংলাদেশ থেকে কৃষিপণ্য রপ্তানি এবং পিপল টু পিপল কানেক্টিভিটি খাত অগ্রগণ্য। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লক্ষণীয়, চীন মানসম্মত উচ্চশিক্ষা, উচ্চতর গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। চীনের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয় বৈশ্বিক র‌্যাক্করিং-এ শীর্ষ স্থান দখল করেছে এবং সম্পাদিত গবেষণা কার্যক্রম বিশ্ব জ্ঞান ভাণ্ডারে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। এ কথা অনস্বীকার্য, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা, সবুজ প্রযুক্তি ও বংশানু প্রকৌশল (জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং) ইত্যাদির প্রযুক্তিগত উন্নয়নে চীন বিশ্বব্যাপী নেতৃত্ব দিচ্ছে।

কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও চীনের অগ্রগতি বিশেষভাবে প্রণিদানযোগ্য, যেখানে তারা উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদশীলতা ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ গত চারদশকে দারিদ্র্যবিমোচন, খাদ্যনিরাপত্তা এবং শিক্ষা সম্প্রসারণে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। যদিও বাংলাদেশ পৌনে ২০০ পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত করেছে; কিন্তু উচ্চশিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কিউএস র‌্যাঙ্কিং, টাইমস হায়ার এডুকেশন র‌্যাঙ্কিং অথবা সাংহাই র‌্যাঙ্কিং-এ বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ৫০০-তে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। যেহেতু বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ই পাঠদানমুখী সেহেতু উদ্ভাবন ও গবেষণার র‌্যাঙ্কিং-এ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান নিম্নমুখী। একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে বাংলাদেশকে গুণগত শিক্ষা, গবেষণা ফলাফল এবং উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে, যাতে প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং রপ্তানি করতে পারে। যেহেতু চীন এসব ক্ষেত্রে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে সেহেতু বাংলাদেশ-চীনের মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্ব।

বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে উপকৃত করতে পারে। এ প্রেক্ষিতে গুণগত মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষা, উচ্চতর গবেষণা, উদ্ভাবন এবং বিশেষ করে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হতে পারে।

চীন বাংলাদেশের বিশ্বস্ত ও পরীক্ষিত বন্ধু এবং দীর্ঘদিনের উন্নয়ন অংশীদার। চীন ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে, যার ধারাবাহিকতায় দুই দেশ পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে উন্নয়নের পথে অগ্রসরমান আছে এবং চীন বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০১৬ সালে শি জিন পিং-এর ঢাকা সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক ‘কৌশলগত সহযোগিতার অংশীদারত্বে’ উন্নীত হয়। উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সম্মেলনে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস, রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা ইত্যাদির পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ইত্যাদি বিষয়ে কীভাবে চীন বাংলাদেশের উন্নয়নের সহযোগী হতে পারে তা আলোচানায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেতে পারে।

সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক র‌্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষ ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় চীনের ১০টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি চীনের প্রাথমিক, বৃত্তিমূলক এবং কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থাও বিশ্বমানের। চীন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী এবং ডিপ্লোমা, ডক্টরাল ও পোস্ট ডক্টরাল শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন মেয়াদে বৃত্তি ও ফেলোশিপ প্রদান করছে। ২০২৩ সালের তথ্যানুযায়ী ১৪,০০০-এর বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষায়তনে অধ্যয়ন ও গবেষণা করছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ-চীন অংশীদারত্ব প্রকল্পের মাধ্যমে শিক্ষার মানোন্নয়ন ও গবেষণার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

একুশ শতকে জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে বিশ্ব দরবারে টিকে থাকা এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান বিশ্বে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনে উচ্চশিক্ষা বিশেষত উচ্চতর গবেষণা অনস্বীকার্য। আমরা যদি বিশ্ব অর্থনীতির দিকে তাকাই তাহলে দেখব, দেশে উচ্চশিক্ষার হার, দক্ষ জনশক্তি ও উদ্ভাবনী শক্তি বেশি সে দেশ ও জাতি সর্বক্ষেত্রে ততো বেশি এগিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সূতিকাগার। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় নতুন জ্ঞান সৃজন, ধারণ এবং তা অংশীজনদের মধ্যে বিতরণ। বৈশ্বিক চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তার নিরিখে উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে শিক্ষা ও গবেষণায় অধিকতর গুরুত্বারোপ, গবেষণালব্ধ ফলাফল বাণিজ্যিকীকরণ ও বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডারে তা সংযোজন করা আজ সময়ের বাস্তবতা।

বিশ্বায়নের এ যুগে মেধার কোনো বিকল্প নেই। মেধাস্বত্ব আধুনিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য, উদ্ভাবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বুদ্ধিভিত্তিক শ্রমকে যথাযথভাবে গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। মানবজাতির অগ্রগতি এবং সার্বিক কল্যাণনির্ভর করে প্রযুক্তি এবং সাংস্কৃতিক জগতে নতুন কিছু সৃষ্টির ক্ষমতার ওপর। এজাতীয় নতুন সৃষ্টিকর্মগুলোর আইনি সুরক্ষা প্রয়োজন। মেধাসম্পদের প্রসার ও সংরক্ষণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে, নতুন কর্মক্ষেত্রের অবারিত সুযোগ সৃষ্টি এবং জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি করে। বিশ্বের অনেক দেশ একমাত্র মেধাসম্পদকে পুঁজি করে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থাকে সুদৃঢ় করেছে। উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে শিক্ষকদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় শিক্ষকতার পাশাপাশি নতুন জ্ঞান সৃজনে মৌলিক ও উদ্ভাবনীমূলক গবেষণা কর্মকাণ্ডে বেশি মনোনিবেশ করা প্রয়োজন শিক্ষকদের গবেষণা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নতুন আবিষ্কার/উদ্ভাবন দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। গবেষণালব্ধ ফলাফল প্যাটেন্ট হলে একদিকে যেমন গবেষকের সুনাম ও মর্যাদা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে অন্যদিকে রাষ্ট্র ও গবেষক উভয়ই আর্থিকভাবে উপকৃত হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও চীনা গবেষকরা যৌথভাবে কাজ করতে আগ্রহী হবে। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এ ধরনের কার্যক্রমকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে যৌথ কর্মশালা, সেমিনার, ডায়ালগের আয়োজন করতে পারে এবং যৌথ একাডেমিক গবেষণা কার্যক্রমের সমন্বয় করতে পারে।

উচ্চশিক্ষার কাঙ্ক্ষিতমান নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নবতর জ্ঞানের দিগন্ত উন্মোচন, উচ্চশিক্ষাকে আধুনিকায়ন, বিষয়ে বৈচিত্র্য আনয়ন ও বিশ্বমানের গবেষণা নিশ্চিতকরণসহ বৈশ্বিক র‌্যাঙ্কিং-এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান সুসংহতকরণে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের শিক্ষক ও গবেষকদের সৃজনশীল ও গবেষণা কর্মকাণ্ড যথানিয়মে প্রকাশ ও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক অনুমোদিত আওতায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষায়িত জ্ঞান ও যোগ্যতাসম্পন্ন বিশ্বমানের শিক্ষাবিদ ও গবেষক তৈরির উদ্দেশে চীনের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সম্প্রতি উদ্যোগে চীনের খ্যাতনামা ৮টি বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সঙ্গে উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগের আগ্রহ ব্যক্ত করেছে। কমিশন ও বিআরসিসির যৌথ উদ্যোগে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য মেধাস্বত্ব লালন, সংরক্ষণ এবং তা যথাযথ চর্চার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং এতদসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এবং খ্যাতনামা চীনা বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ অনুঘটকের ভূমিকা পালন করতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন চীন সফর বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে অংশীদারত্ব ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে বিশাল আশা সঞ্চার করেছে। ভূ-রাজনৈতিক ইস্যু ছাড়াও বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন, কৃষি, স্বাস্থ্য, জ্বালানি, সুনীল অর্থনীতির জন্য সামুদ্রিক জৈব সম্পদ ব্যবহার, টেকসই খাদ্য, পুষ্টি নিরাপত্তা এবং পরিবেশের ওপর উন্নত গবেষণায় অংশীদারত্ব ও সহযোগিতার বিষয়টি প্রতিভাত হবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে আশাবাদী।

লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক


গবেষণায় উন্নয়নের চেরাগ ও আমাদের করণীয়

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
অধ্যাপক ড. মো. নাছিম আখতার

চীনা তরুণ গবেষকদের একটি দল এমন এক ধরনের কাপড় আবিষ্কার করেছে যা মানুষকে ক্যামেরার চোখে অদৃশ্য করে তোলে। ইনভিস ডিফেন্স নামের এ কাপড়টি দেখতে খুবই সাধারণ এবং দামেও সস্তা। গবেষকদের দাবি এ কাপড়টি খালি চোখে দেখা গেলেও কোনো ক্যামেরা দিয়ে এটিকে শনাক্ত করা সম্ভব নয়। পোশাকটিতে এমন এক ধরনের ক্যামো ফ্ল্যাশ প্যাটার্ন আছে যা ক্যামেরার অ্যালগরিদমকে বিভ্রান্ত করে দেয়। ফলে এটি পরিহিত কাউকে ক্যামেরা শনাক্ত করতে পারে না। আবার রাতের বেলায় ক্যামেরা মানুষের দেহের তাপমাত্রা শনাক্ত করার মাধ্যমে মানুষের দেহ শনাক্ত করে; কিন্তু ইনভিস ডিফেন্সের অনিয়মিত আকারের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রক মডিউলগুলো এক ধরনের অস্বাভাবিক তাপমাত্রার প্যাটার্ন তৈরি করে যা ইনফ্রারেড ক্যামেরাকেও বিভ্রান্ত করে তোলে। এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় তা হলো পোশাকে ক্যামো ফ্ল্যাশ প্যাটার্ন ও তাপমাত্রার অস্বাভাবিক প্যাটার্ন দুটো বৈশিষ্ট্যই পোশাকের অভ্যন্তরীণ গাণিতিক ভৌত মডেলের পরিবর্তন।

শুধু কি তাই, কোনো বাণিজ্যিক পণ্যের প্রতি বছরের যে নতুন মডেল তৈরি হয় সেটিও কিন্তু ওই পণ্যের গাণিতিক মডেলের পরিবর্তন। কোনো গাড়ির মডেল পরিবর্তন করলে গাড়িটি চলার পথে বাতাসে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে তার জ্বালানি খরচ বাড়বে কি না? গাড়িটির ভরকেন্দ্রের স্থান পরিবর্তন হয়ে দুর্ঘটনায় পতিত হবে কি না? পরিবর্তিত মডেল বাতাসের চাপ সহ্য করার ক্ষমতা রাখে কি না? সবকিছুই গাণিতিক সূত্রের সূক্ষ্ম হিসাব। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের মূল বিষয়গুলো হলো প্রোগ্রামিং, সাইবার ফিজিক্যাল সিস্টেম, ব্লকচেইন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি, অগমেন্টেড রিয়েলিটি প্রভৃতি। এগুলোর উৎকর্ষ ও পরিবর্তন সাধনেও গণিতের জ্ঞান অপরিহার্য। তাই চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের অগ্রসৈনিক হতে গণিতের উৎকর্ষ সাধনের কোনো বিকল্প নেই।

সেই গণিতেই আমরা দিন দিন সামগ্রিকভাবে দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে পড়ছি। ২০২৪ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১০টি বোর্ডে মোট ফেল ৩ লাখ ১৮ হাজার ৬২৭ জন। ফেল করা শিক্ষার্থীদের ১ লাখ ৬৬ হাজার ৬০২ জন অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী গণিতে অকৃতকার্য হয়েছে। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গণিতে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব রয়েছে। পাশাপাশি প্রাথমিক পর্যায় থেকে গণিতে দুর্বলতা শিক্ষার্থীদের খারাপ ফলাফলের পেছনে মুখ্য কারণ।

একটি পরিসংখ্যান বলছে, মাধ্যমিক স্কুলগুলোয় গণিত শিক্ষকের মোট সংখ্যা ৬৪ হাজার ১৪৭। তাদের মধ্যে গণিতে স্নাতক (অনার্স) ডিগ্রিধারী শিক্ষকের সংখ্যা ৩ হাজার ৮৩৬, যা মোট শিক্ষকের ৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ। স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী আছেন ৪ হাজার ৬৪০ জন, যা মোট শিক্ষকের ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ। সে অনুযায়ী গণিতের শিক্ষকদের মধ্যে বিষয়টিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী আছেন মাত্র ১৩ দশমিক ২২ শতাংশ অর্থাৎ গণিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি ছাড়াই মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের বিষয়টি শেখাচ্ছেন ৮৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ শিক্ষক। আমার মতে কোনো একটি বিশেষ উদ্যোগের মাধ্যমে মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এ শিক্ষকদের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি করার সুযোগ দেওয়া উচিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। এতে মাধ্যমিক পর্যায়ে গণিত শিখনের মান বৃদ্ধি পাবে।

বর্তমান মাধ্যমিক পরীক্ষায় গণিতে এ প্লাস পাওয়ার পরেও উচ্চ মাধ্যমিকে শিক্ষার্থীদের মানবিক গ্রুপে চলে যাওয়ার ঘটনা অহরহ ঘটছে। যা গণিতের প্রতি শিক্ষার্থীদের ভীতিকে প্রকাশ করে। কোনো একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৩-২৪ সেশনের ভর্তি পরীক্ষায় এ ইউনিটে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১৭০৫৯৯ জন। উপস্থিতির সংখ্যা ১৪৯৩৯১ জন। সবাই বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী হয়েও গণিত প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে ৬৮২৬৪ জন। শতকরা হিসেবে যা ৪৫ ভাগ। ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্রে গণিতে মোট নম্বর ছিল ২৫। পরীক্ষায় ২০ বা ২০ এর বেশি নম্বর পেয়েছে মাত্র ১৬ জন পরীক্ষার্থী। ১৫ বা ১৫ এর বেশি পেয়েছে ৮০৬ জন। ১০ বা ১০ এর বেশি পেয়েছে ৭০১২ জন। ৫ বা ৫-এর বেশি পেয়েছে ২৭৫৭১ জন। শূন্য বা শূন্যের বেশি পেয়েছে ৬২০১৬ জন। ঋণাত্মক নম্বর পেয়েছে অনেকেই কারণ এখানে প্রতিটি ভুল উত্তরের জন্য পয়েন্ট দুই পাঁচ মাইনাস নম্বর রয়েছে। এখান থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট তা হলো শতকরা ৫৫ ভাগ এইচএসসি বিজ্ঞান শিক্ষার্থী অংক বিষয় নিয়ে প্রত্যয়ী নয়। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে বইপ্রেমী জাতি সৃষ্টি করতে হবে। সম্প্রতি ‘সিইও ওয়ার্ল্ড’ ম্যাগাজিনের জরিপে, বছরে গড়ে ১৬টি বই পড়ে ভারতীয়রা পড়ুয়া জাতি হিসেবে ২য় অবস্থানে অবস্থান করছে। তালিকাটিতে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭তম। ম্যাগাজিনটির তথ্যমতে একজন বাংলাদেশি প্রতি বছর গড়ে বই পড়ে দুই দশমিক পঁচাত্তরটি। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার যে সৃজনশীল পদ্ধতি ছিল তা আমাদের শিক্ষার্থীদের ভীষণভাবে বই বিমুখ করেছিল। এ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি না হয়ে সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল গাইড বা নোট বইয়ের সঙ্গে।

শিক্ষার অনুকরণে ক্ষয়িষ্ণু ঢেউয়ের দর্শন অনুসরণীয়। রিপল ওয়েভ বা ক্ষয়িষ্ণু ঢেউ। এ সম্পর্কে সম্যক ধারণা পেতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই ছেলেবেলায়। খেলার ছলে পুকুরে ঢিল ছুড়ে ঢেউ সৃষ্টি করেনি এমন ছেলেবেলা কমই আছে। পুকুরের মধ্যে যখন ঢিল ছুড়ে ঢেউ সৃষ্টি করা হয়, ওই ঢেউ বৃত্তাকার আকৃতিতে পুকুরের ধারে গিয়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। এ ধরনের ঢেউকে ক্ষয়িষ্ণু ঢেউ বলে। ঢেউ সৃষ্টি ও নিঃশেষ হওয়ার মধ্যে একটি সময় অতিবাহিত হয়। নির্দিষ্ট সময়ের পরেই ঢেউটা নিঃশেষ হয়ে যায়। তেমনি কোনো দেশের বর্তমান সমৃদ্ধি কিন্তু অন্তত ২০ বছর আগে শুরু হওয়া প্রক্রিয়ায় ফল। কোনো দেশের শিক্ষাকে অনুসরণ করতে গেলে অন্তত ১৮ থেকে ২০ বছর আগের সিস্টেমকে অনুসরণ করা উচিত। কারণ আজকে আমরা যাদের ওই দেশের স্মার্ট, প্রজ্ঞাবান গ্র্যাজুয়েট হিসেবে দেখছি তাদের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়েছিল ১৬ বছর আগে।

বিশ্ব গণিত অলিম্পিয়াডে চীন ২৩ বার, রাশিয়া ১৬ বার ও আমেরিকা ৮ বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে আমরা আমাদের গণিত শিক্ষার উন্নয়নে আউটসোর্সিং করতে পারি। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই নয়, সর্বত্রই তৈরি করতে হবে বই পড়ার সংস্কৃতি। তবেই জাতি হিসেবে বিশ্বজয়ের মূলমন্ত্র সত্যিকার অর্থেই কার্যকর হবে।

লেখক: উপাচার্য চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়


ট্রানজিট নয় ভারতবিরোধী বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া

স্বাধীনতার ৫৩ বছর শেষে ৫৪ বছরে পা রাখল বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার তথা স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি মাত্র ২৩ বছর এ দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল। আওয়ামী লীগের ২৩ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশের যাবতীয় উন্নয়ন-সমৃদ্ধির ও অর্জনের ইতিহাস রচিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশ একই সূত্রে গাঁথা। বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনা মানেই বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি। ১৯৭১-৭৫ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু এ দেশকে সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যাওয়ার সূচনা করেছিলেন আর বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা পিতার অসমাপ্ত স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়ে বাংলাদেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ ও ডিজিটাল বাংলাদেশে পরিণত করেছেন। ১৯৯৬-২০০১ সাল এবং ২০০৯ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকন্যার হাত ধরে যত উন্নয়ন হয়েছে, তার বীজ বপন করেছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আওয়ামী লীগ সরকারের ২৩ বছরের শাসনামল ছাড়া বাংলাদেশের বাকি ৩০ বছরের ইতিহাস মূলত স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির হাতে দিনের পর দিন কালো অধ্যায় রচিত হওয়ার ইতিহাস। ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত করে দেশের উন্নয়ন এবং দেশের মানুষের কল্যাণে বারবার বাধা সৃষ্টি করার ইতিহাস। বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত করে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করার ইতিহাস।

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বলছে, প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারত মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন সংকটাপন্ন ও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বন্ধু হিসেবে পাশে দাঁড়িয়েছে এবং সাহায্য করেছে। জাতি হিসেবে আমরা সব সময় ভারতের কাছে কৃতজ্ঞ। স্বাধীনতার পর থেকে দুটি দেশ যে ঐক্যের ভিত্তিতে নিজেদের সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে চলেছে তা আজ পর্যন্ত বিদ্যমান রয়েছে। তবে মাঝে বিএনপি-জামায়াত জোটের ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের ফলে কিছুটা সময় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে খানিকটা নেতিবাচক সম্পর্ক বিরাজমান থাকলেও গত ১৫ বছরে দুটি দেশের সম্পর্ক বিশেষ উচ্চতায় পৌঁছেছে। ছিটমহলসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধান এসেছে গত ১৫ বছরে। বাংলাদেশ বর্তমানে ভারতের ৫টি সর্ববৃহৎ রপ্তানিকৃত দেশের তালিকায় রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রকল্পে ভারতের সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক দিক থেকেও দুই দেশের মধ্যে অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক দল যেমন ভারতে তাদের কার্যক্রম প্রদর্শন করে, তেমনি ভারতীয় সাংস্কৃতিক দলও বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম উপস্থাপন করে। এর মাধ্যমে দুই দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একটি শক্তিশালী সেতুবন্ধন রচিত হয়েছে। এখানে বলে রাখা ভালো, যে বাংলাদেশ ও ভারত একই উপমহাদেশের দুটি রাষ্ট্র হওয়ায় দুই দেশের সাংস্কৃতিক জগতের মধ্যে অনেক মিল রয়েছে। এ কারণে আবহমান কাল থেকে উভয় দেশ সাংস্কৃতিক দিক থেকে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার এ চমৎকার সম্পর্ক বিশ্বে বিশেষ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

অথচ বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি বিএনপি বাংলাদেশ-ভারতের ঐতিহাসিক এ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বিভিন্নভাবে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের শাসনামলের ২৩ বছর ছাড়া বাকি ৩০ বছরে বাংলাদেশের ইতিহাস মূলত স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি বিএনপি কর্তৃক স্বাধীনতা যুদ্ধে আমাদের বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র ভারত নিয়ে অপপ্রচারের ইতিহাস। যখনই অর্থনৈতিক কোনো স্বার্থে প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো চুক্তি হয়েছে ঠিক তখনি বিএনপি অপপ্রচার চালিয়ে বারবার বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারে বাধার সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে অবিশ্বাসী বিএনপির এমন অপপ্রচারের রাজনীতি এখনো বিদ্যমান রয়েছে। শহীদের রক্ত ও বাঙালি মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশে এ ধরনের অপপ্রচারের রাজনীতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে যে ১০টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে, সেগুলোর একটি হলো বাংলাদেশ-ভারত রেল ট্রানজিট। ভারতের ট্রেন এতদিন বাংলাদেশের সীমান্তে এসে ইঞ্জিন পরিবর্তন করত এবং বাংলাদেশের ভূখণ্ড থেকে বাংলাদেশের ইঞ্জিনে সেই ট্রেন ভারতে পৌঁছে দেওয়া হতো। কিন্তু এখন ভারতের রেলগাড়ি বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে দেশটির পূর্ব-পশ্চিমে সংযোগ স্থাপন করতে পারবে। বাংলাদেশ-ভারতের এ রেল ট্রানজিট নিয়ে এতদিন স্যোশাল মিডিয়ায় বিএনপির ইন্ধনে একশ্রেণির মানুষ জনগণকে বিভ্রান্ত করে আসছিল। তাদের দাবি এর ফলে দেশ ভারতের কাছে বিক্রি হয়ে যাবে। ভারতবিদ্বেষী বিএনপি বাংলাদেশ-ভারত রেল ট্রানজিট নিয়ে অপপ্রচার চালিয়ে অর্থনৈতিক জ্ঞানহীন এ দেশের সাধারণ মানুষকে বোকা বানিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতিতে ঘোলাটে করে অসৎ কোনো উদ্দেশ্য হাসিল করতে চাচ্ছে। ট্রানজিট নিয়ে অপপ্রচার এখন শুধু স্যোশাল মিডিয়ায় সীমাবদ্ধ নয় বরং তা বিএনপির নেতাদের মুখে মুখে। বিএনপির নেতাদের দাবি, রেল ট্রানজিটের ফলে দেশের সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হবে, দেশ ভারতের কলোনিতে পরিণত হবে, দেশের ওপর দিয়ে রেল যেতে দেব না ইত্যাদি ইত্যাদি। বিএনপির নেতাদের এ হাস্যকর দাবি ও গৎবাধা কথা তাদের পুরোনো ইতিহাস। তারা মনে হয় সম্পূর্ণ ভুলেই গিয়েছেন, একবিংশ শতাব্দীর তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে মানুষকে এভাবে মিথ্যা বলে বোকা বানানো এত সহজ নয়। মানুষ চাইলেই অতি সহজে সব তথ্য পেয়ে যায়। যার ফলে বাংলাদেশের যেকোনো সচেতন ও দেশপ্রেমিক নাগরিক মানেই সে বোঝে অর্থনৈতিকভাবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশ-ভারত রেল ট্রানজিট নিয়ে বিএনপির এ অপপ্রচার তাদের ভারতবিদ্বেষ ছাড়া আর কিছুই না।

বাংলাদেশ-ভারত সুসম্পর্ক সত্যিকার অর্থে বিএনপির মতো স্বার্থান্বেষী একশ্রেণির দল কিংবা বিএনপির নেতাদের মতো একশ্রেণির লোক সহ্য করতে পারে না। তারা সবকিছুতেই দোষ খোঁজে, দেশ বিক্রির ষড়যন্ত্রের গন্ধ পায়; কিন্তু তারা সুকৌশলে আসল সত্যটা এড়িয়ে যায়। আমাদের বন্ধুপ্রতিম দেশ ভারত ২০২২ সালে বাংলাদেশকে ট্রানজিট দিয়েছে। বিনা মাশুলে তাদের স্থলবন্দর, বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে পণ্য পরিবহনের সুযোগ দিয়েছে। এতে বাংলাদেশের পণ্যবাহী ট্রাক নেপাল ও ভুটানে সরাসরি যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। যার ফলে সেখানে বাংলাদেশের পণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে। অথচ এ নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল বিএনপির মতো ভারতের কোনো বিরোধীদল প্রশ্ন তোলেনি, দেশ বিক্রির অজুহাত খাড়া করেনি। তাহলে বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপি কেন ট্রানজিট দিলে দেশ বিক্রি হয়ে যাবে তথা দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত আসবে এ ধরনের অযৌক্তিক দাবি করছে? এ দাবির পেছনে আসল কারণ খুঁজতে গেলে যা স্পষ্ট তা ট্রানজিট নয় বরং ভারতবিরোধী বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে বিএনপি।

সম্প্রতি ভারতকে রেলপথ ট্রানজিট সুবিধা দেওয়া প্রসঙ্গে সাংবাদিক সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। সেই সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও স্বকীয়তা বজায় রেখে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রেখে কাজ করছি। এই যে আমরা সমস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা খুলে দিলাম, তাতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে আমাদের দেশের মানুষ। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ট্রানজিট দিলে ক্ষতি কি? রেল যেগুলো বন্ধ ছিল তা আমরা আস্তে আস্তে খুলে দিয়েছি। যার ফলে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ হচ্ছে। মানুষ উপকৃত হচ্ছে, তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি হচ্ছে। যেসব জিনিস আমাদের দেশে নেই তা আনার সুযোগ হচ্ছে। অর্থনীতিতে এটা সুবিধা হচ্ছে। আমরা কি চারদিকে দরজা বন্ধ করে থাকব? সেটা হয় না। ইউরোপের দিকে তাকান, সেখানে কোনো বর্ডারই নেই, তাই বলে একটা দেশ আরেকটা দেশের কাছে বিক্রি হয়ে গিয়েছে? এক সময় সেখানে নো ম্যানস ল্যান্ড ছিল। এখন কিন্তু সেসব কিছু নেই। এখন সেসব উঠে গেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় কেন বাধা দিয়ে রাখব?’ এ ছাড়া সংসদ অধিবেশনেও প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন, ট্রানজিট দিলে ক্ষতি কী? বরং দেশের লাভ, জনগণের লাভ।

সত্যিকার অর্থে বলতে গেলে ট্রানজিট দিয়ে দেশ ও জনগণের অনেক বেশি লাভ হলেও বিএনপির ক্ষতি। কারণ ভারতবিদ্বেষী বিএনপির কাছে বাংলাদেশ-ভারত সুসম্পর্ক এক ধরনের আতঙ্কের নাম। এ সম্পর্ক যত বেশি মজবুত হবে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিএনপির ভিত তত বেশি নড়বড়ে হবে। বাংলাদেশের গণতন্ত্রমনা জনগণের সমর্থন হারিয়ে জনবিচ্ছিন্ন বিএনপির রাজনৈতিক ভিত্তি এখন ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত ও অপপ্রচারনির্ভর। কিছুদিন পরপর নতুন নতুন বিভিন্ন ইস্যু তৈরি করে অপপ্রচারের রাজনীতি করা ছাড়া বিএনপির এখন আর তেমন কিছু করার নেই। তবে আপনারা একটা বিষয় জেনে সত্যি অবাক হবেন, অল্প কিছু মাস পূর্বে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার জন্য অতীতের মতো ভারতের পিছনে ঘুরেছে। বিগত তিনটি নির্বাচনের আগে দেখা গেছে বিএনপি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল; কিন্তু নির্বাচনে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না পেয়ে আবার সমালোচনামুখর বক্তব্য শুরু করে। এবারও জাতীয় নির্বাচন বর্জনের পর নতুন করে ভারতবিরোধিতায় সোচ্চার হয় বিএনপি। তারা প্রথমে ভারতীয় পণ্য বর্জনের ডাক দিয়ে ইন্ডিয়া বয়কটের প্রচারণা চালায়। যা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বর্জনের ডাক শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। এখন আবার রেল ট্রানজিট ইস্যু নিয়ে মাঠ গরম করার চেষ্টা করছে। তাদের জনসমর্থনহীন এসব চেষ্টা এবারও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে বলে বিশ্বাস করছি।

কেননা, বঙ্গবন্ধু ও তার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশে ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচারের কোনো ভিত্তি নেই। এমতাবস্থায়, বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি বিএনপির উচিত ট্রানজিটের আড়ালে ভারতবিদ্বেষ ছড়ানো বন্ধ করা। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে শহীদের বুকের তাজা রক্ত ও বাঙালি মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলায় বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ভারতের বিরুদ্ধে বিএনপির ভিত্তিহীন অপপ্রচারের রাজনীতি কোনোভাবেই কাম্য নয়। বাংলাদেশ উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিচারে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো প্রতিবেশী দেশ ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দিয়েছে এবং ভারত থেকেও ট্রানজিট সুবিধা পেয়ে আসছে। আমরা আশা করি, বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যকার এ সুসম্পর্ক দেশ দুটিকে উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি ও সম্ভাবনার দিকে নিয়ে যাবে।

লেখক: উপাচার্য বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়


banner close