মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

একমাত্র শক্তির উৎস এ দেশের গণতন্ত্রমনস্ক জনগণ

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া
প্রকাশিত
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া
প্রকাশিত : ২৩ নভেম্বর, ২০২৩ ১৩:৫৫

একটা মানুষ তার নিজ দেশের জনগণের কল্যাণে কতটা উৎসর্গ করতে পারে তার একমাত্র দৃষ্টান্ত বঙ্গবন্ধুকন্যা আমাদের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি এ দেশের মাটি ও মানুষের প্রতি এতটাই দায়িত্বশীল যে এ দেশের মানুষের কল্যাণে উৎসর্গ করেছে নিজের পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে। নিজের জীবনেও অনেক ঝুঁকি নিয়েছেন। সেই সঙ্গে নিজের জীবনকে মৃত্যুর হাতে সঁপে দিয়ে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছেন এ দেশের দরিদ্র ও অসহায় জনগোষ্ঠীসহ সব শ্রেণির মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে। বিএনপি-জামায়াত জোটের অধীনে তাদের কুশাসনে পদদলিত বাঙালি জনগণের ভাত ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে আন্দোলন শুরু করে গত প্রায় ১৫ বছরে কঠোর পরিশ্রম করে বাংলাদেশকে বিশ্ব মানচিত্রে উন্নয়নের রুল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। বাংলাদেশের মানুষের সার্বিক কল্যাণ, এ দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির স্বার্থে দীর্ঘ ১৫ বছর একটানা কাজ করে সাধারণ মানুষের ভরসাস্থল হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। বিএনপি তাদের জ্বালাও-পোড়াও এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ফলে যেখানে জনবিচ্ছিন্ন একটি দলে পরিণত হয়েছে সেখানে আওয়ামী লীগ তথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনগণের স্বার্থে কাজ করে এ দেশের অসহায় ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ভরসাস্থল হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন। শেখ হাসিনার সততা, নিষ্ঠা, দৃঢ় মনোবল, প্রজ্ঞা ও অসাধারণ নেতৃত্ব বাংলাদেশকে বিশ্ব পরিমণ্ডলে অন্যরকম উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং তিনি অর্জন করেছেন এ দেশের সাধারণ মানুষের সমর্থন ও সহায়তা, যা বিএনপির মতো বিশ্বে পরিচিত সন্ত্রাসী সংগঠনের পক্ষে অর্জন করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে শেখ হাসিনা বিএনপি-জামায়াতের আক্রোশের প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। আওয়ামী লীগ সরকার ধারাবাহিকভাবে সরকার পরিচালনায় আছে বলেই এসব অর্জন সম্ভব হয়েছে। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত-স্মার্ট বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয়ে কাজ করছে। এ জন্য প্রেক্ষিত পরিকল্পনা-২০৪১ প্রণয়ন করে বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। আজকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হতে পেরেছে। দেশ আজ খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। ২০২২ সালে দেশে ৪ কোটি ৪ লাখ টন চালসহ ৪ কোটি ৭২ লাখ টন দানাদার শস্য উৎপাদিত হয়েছে। মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, সবজি, ফলসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদন ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। দারিদ্র্যের হার ৪০ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। মাথাপিছু আয় ৫৪৩ ডলার থেকে ২ হাজার ৮২৪ ডলারে উন্নীত হয়েছে। সাক্ষরতার হার ৪৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৭৫ দশমিক ২ ভাগ। মাতৃমৃত্যু এবং শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস পেয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার ধারাবাহিকভাবে সরকার পরিচালনায় আছে বলেই এসব অর্জন সম্ভব হয়েছে।

জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের এত এত উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে ঈর্ষান্বিত সন্ত্রাসী সংগঠন বিএনপি বাংলাদেশের এতসব উন্নয়নের ধারাবাহিকতাকে ব্যাহত করে পিছনের দরজা দিয়ে বাংলাদেশের ক্ষমতায় যেতে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের মতো অপরাজনীতি চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি বাংলাদেশের অসহায় এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একমাত্র ভরসাস্থল প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাকে চিরতরে শেষ করে দেয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে এ দেশের স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি।

শুধু ২১ আগস্টে গ্রেনেড হামলাই নয়, বঙ্গবন্ধুকন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে ১৯৮৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন কায়দায় প্রায় ২১ বার হামলা হয়েছে। কখনো নিজ বাসভবনে, কখনো জনসভায়, আবার কখনো তার গাড়ির বহরে। বর্তমান বিশ্বের কোনো দেশের রাষ্ট্রনায়ককে এতবার হত্যা চেষ্টার নজির নেই। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বিদেশে থাকার কারণে বোন শেখ রেহানাসহ বেঁচে গেলেও দেশে ফেরার পর থেকে শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে বারবার। আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর দায়িত্ব নিয়ে ১৯৮১ সালের মে মাসে দেশে ফেরার পর থেকেই তার ওপর একের পর এক হামলা হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে এতবার হামলা করেও শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে ব্যর্থ হওয়ায় এখন নতুন করে বিদেশের মাটিতে হত্যা করতে বিভিন্নভাবে অপপ্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি তথা সন্ত্রাসী সংগঠন বিএনপির মূল সন্ত্রাসী তারেক জিয়া। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যাকে বারবার হত্যার চেষ্টা ও ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি। একাত্তরের পরাজিত শক্তি, পঁচাত্তরের ঘাতক ও দেশি-বিদেশি মৌলবাদী গোষ্ঠী তাকে হত্যার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাইছে। আর এভাবে পরাজিত শক্তি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে মুছে দিতে চাইছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসীন হয়ে পিতার অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করতে চেয়েছেন। অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছেন, যাতে জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের যিনি নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাকেই বারবার হত্যার চেষ্টা নেয়া হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি এর সঙ্গে সরাসরি জড়িত। শেখ হাসিনাকে হত্যা করে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তিকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার ষড়যন্ত্র থেকেই শেখ হাসিনার ওপর দেশের ভিতরে ও দেশের বাইরে বারবার হামলা করা হচ্ছে। তাদের লক্ষ্য মুক্তিযুদ্ধের ধারাকে পদানত করা ও শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে না পারলে এ ধারাকে পদানত করা সম্ভব নয়। সবাইকে তারা কিনতে পারছে বা পারবে হয়তো, কিন্তু শেখ হাসিনাকে নয়, এ জন্যই তাকে হত্যা করতে হবে। শেখ হাসিনা ফিনিক্সের মতো। ভস্মীভূত হয়ে যাওয়ার পরও আবার স্বমূর্তিতে জেগে উঠেছেন। শেখ হাসিনার স্বমূর্তিতে জেগে ওঠার মূল শক্তি এ দেশের জনগণ ও তাদের ভালোবাসা। জনগণের সমর্থন সব সময় ছিল এবং আছে বলেই তাকে বারবার হত্যার চেষ্টা করা সত্ত্বেও দমিয়ে রাখা যায়নি।

বিশ্ব নেতারা যখন শেখ হাসিনার যুগান্তকারী নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করছেন, বঙ্গবন্ধুকন্যা যখন দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন, তখনই বিএনপি ও তার দোসর রাজনৈতিক দলগুলোর গাত্রদাহ হয়ে উঠেছেন সাহসী, আত্মপ্রত্যয়ী ও দৃঢ়চেতা নেতা শেখ হাসিনা। তাই তারা বারবার নতুন করে ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। রাজনীতিতে পরাস্ত হয়ে, দেশে-বিদেশে শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে প্রলাপ বকছে বিএনপি দলটির অধিকাংশ নেতা-কর্মী। কখনো ২৭ দফা, কখনো ১০ দফা আর কখনো ১ দফার নামে মানুষকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টায় তারা লিপ্ত রয়েছে। এসব দফা অবৈধ, অসাংবিধানিক উপায়ে ক্ষমতা দখল করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশকে ধ্বংস করে দেশকে আবার জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসী রাষ্ট্রে পরিণত করার অপকৌশল মাত্র। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে দেশের মানুষকে অন্ধকারের জিঞ্জির পরানো হবে যার চূড়ান্ত পরিণতি। শুধু দেশেই নয়- সমগ্র বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় যার অদম্য চেষ্টা, সেই শেখ হাসিনাকেই বারবার ষড়যন্ত্রকারীরা টার্গেট করছে এবং বিভিন্নভাবে দেশে ও বিদেশে হত্যার অপপ্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

বাবা-মা-ভাই এবং আত্মীয়স্বজন এসব কিছু হারিয়ে পরিবার বলতে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বুঝেছিল এই বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের জনগণকে। সেই মানসিকতা নিয়ে এবং সেই আন্তরিকতা নিয়েই তিনি দেশের জন্য তথা দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। এ দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে গিয়ে বারবার শেখ হাসিনার ওপর আঘাত এসেছে। সব ধরনের আঘাত সহ্য করে নিজ দেশের এবং দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে একনিষ্ঠ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এখনো বারবার হামলা হচ্ছে। শুধু দেশে নয়, বিদেশেও তাকে হত্যার অপপ্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে সন্ত্রাসী তারেক জিয়ার নেতৃত্বে।

বঙ্গবন্ধু তনয়া জননেত্রী শেখ হাসিনা এখন শুধু বাংলাদেশের নয় বরং সারা বিশ্বের একজন শক্তিশালী ও সুপরিচিত নেত্রী। বাংলাদেশের জনগণই তার এই শক্তির মূল উৎস। এ দেশের জনগণের সমর্থন ও ভোটের শক্তিতে বিশ্বাসী প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা দক্ষ ও সুকৌশলী নেতৃত্ব দিয়ে বাংলাদেশকে উন্নয়ন এবং অগ্রযাত্রার যে স্তরে উন্নীত করেছেন তার জন্য এ দেশের আপামর জনসাধারণ প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকারের ধারাবাহিকতাই রক্ষা করতে চাইছেন। এমতাবস্থায়, বাঙালি জনগণের একমাত্র ভরসাস্থল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিদেশি ভাড়াটে করা খুনি দিয়ে হত্যার অপপ্রচেষ্টা এ দেশের গণতন্ত্রমনা জনগণ কোনো দিনও মেনে নেবে না। শেখ হাসিনা এ দেশের সাধারণ জনগণের একটা আবেগ ও ভালোবাসার জায়গা। তারেক জিয়ার নেতৃত্বে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিগুলো শেখ হাসিনাকে যতবার হত্যার চেষ্টা করবে এ দেশের জনগণ ততবারই ঢাল হয়ে শেখ হাসিনাকে রক্ষা করবে। দেশের অভ্যন্তরে অথবা বিদেশের মাটিতে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা বা হত্যার চেষ্টা করলে শেখ হাসিনার একমাত্র শক্তির উৎস এ দেশের গণতন্ত্রমনস্ক জনগণ কোনো দিনও সহ্য করবে না। সবাই একতাবদ্ধ হয়ে এসব স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় ওঠাবে এ দেশের জনগণ।

লেখক: উপাচার্য (রুটিন দায়িত্ব)

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক চেয়ারম্যান

ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।


কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তন ও কীটনাশকের হুমকি!

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
সমীরণ বিশ্বাস

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে লবণাক্ততা ঝড়-ঝঞ্ঝা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, উচ্চ তাপমাত্রা, ফ্ল্যাশ-ফ্ল্যাট ইত্যাদির তীব্রতা ত্বরান্বিত করে। বাংলাদেশে আয় ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অনন্য অবদানকারী হলো- কৃষিক্ষেত্র। শস্য উৎপাদন গ্রামীণ আয় বৃদ্ধি করে এবং দরিদ্র মানুষের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। সব কৃষি কাজের ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব কৃষিকে চরম ঝুঁকির ভিতর ফেলছে! গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রতিনিয়ত বৃদ্ধির কারণে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। এর প্রভাবে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাচ্ছে, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং চরম ভাবাপণ্য জলবায়ুর পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্রতা পৃথিবীব্যাপী জনসংখ্যার বৃদ্ধি এবং কৃষি সম্পদ কমে যাওয়ায় খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে।

গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি, উচ্চ দ্রাঘিমাংশে ফসল উৎপাদনের সময় বেড়ে যাবে তবে ফলন বৃদ্ধি পাবে, নিম্ন দ্রাঘিমার অব-উষ্ণ ও উষ্ণ এলাকায়, যেখানে বর্তমানে গ্রীষ্মকালীন দাবদাহে ফলন কমে যাচ্ছে, সেখানে আরও কম ফলন হবে, মৃত্তিকা পানি বাষ্পীভবনের বৃদ্ধিতে ফলন কমে যাবে। (সূত্র : IPCC2007 & US EPA2011)। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ও নিয়ম পরিবর্তন -মৃত্তিকা ক্ষয় ও মৃত্তিকা বাষ্পতে প্রভাব ফেলে- ফলন কমিয়ে দেবে। উচ্চ দ্রাঘিমায় বৃষ্টিপাত বেশি হবে এবং বেশির ভাগ নিম্ন দ্রাঘিমার অব-উষ্ণ এলাকায় কম হবে (২০% পর্যন্ত) যা দীর্ঘকালীন খরার সৃষ্টি করবে। ভূপৃষ্ঠের কার্বন ডাইঅক্সাইডের ঘনত্ব বাড়বে, কিছু ফলনের বৃদ্ধি বেশি হবে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যান্য ক্ষতিকর প্রভাবে উচ্চ তাপমাত্রা এবং বৃষ্টিপাত এটিকে ছাড়িয়ে যাবে। ট্রোপোস্পেয়ারিক ওজন দূষিতপর্যায়ে- কার্বন ডাইঅক্সাইড বৃদ্ধির কারণে, খারাপ ওজন বৃদ্ধি পাবে যা জীবন্ত কোষ-কলার ও অন্যান্য পদার্থের ক্ষতি করবে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে, যার ক্ষতিতে কার্বন ডাইঅক্সাইড বৃদ্ধি পাবে, ফলে ফসলের বৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে যাবে।

কৃষিতে উষ্ণতা বা তাপমাত্রার ক্ষতিকারক প্রভাব

তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ফসলের ফলন কমে যাবে। ফসলে অনাকাঙ্ক্ষিত রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ বেড়ে যাবে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ফসলের জমিতে পরাগী প্রজাপতির পরিভ্রমণ ১৪ শতাংশ হ্রাস পায়। সার্বিকভাবে পরভোজী ও পরাগী প্রজাপতির সংখ্যা কমার কারণে ব্যাপক ফসল হানি ঘটে।

কৃষিতে শৈত্যপ্রবাহের ক্ষতিকারক প্রভাব

বাংলাদেশ ক্রমান্বয়ে শীতকালের ব্যক্তি ও শীতের তীব্রতা দুই-ই কমে আসছে। এতে ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং ফলন হ্রাস পাবে। ফসলের পরাগায়ণ ব্যাহত হবে। অতি ঠাণ্ডায় আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ ইত্যাদি ফসলের উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে যাবে।

কৃষিতে লোনা পানির অনুপ্রবেশ ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির ক্ষতিকারক প্রভাব

উজান থেকে পানিপ্রবাহ বাধা ও কম বৃষ্টিপাতের কারণে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত জমির পরিমাণ বাড়ছে যা ভবিষ্যতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং পরিমিত বৃষ্টিপাতের অভাবে আরও বেশি সমস্যার সৃষ্টি করবে। লবণাক্ত অঞ্চলের মাটি কর্দমাক্ত হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে মাটি শক্ত হয়ে যায়। লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে কৃষি ও জীববৈচিত্র্য। খাবার পানি, সেচের পানির সংকট দেখা দেবে। মারা যাবে সাধু পানির মাছ। চিংড়ি প্রজাতির বৈচিত্র্যে আসবে পরিবর্তন, ক্ষতিগ্রস্ত হবে মৎস্যজীবীসহ সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা। জলবায়ুর পরিবর্তন অব্যাহত থাকলে ভাঙাগড়ার এ ভারসাম্য দিন দিন আরও প্রকট হবে।

কৃষিতে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারের প্রভাব

রাসায়নিক কীটনাশক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব একাধিক উপাত্তের মধ্যে রয়েছে। পরিবর্তিত আবহাওয়ায় বৃষ্টি, তাপমাত্রা, আবহাওয়া এবং কৃষি মাটি ইত্যাদির সঙ্গে মিলে; তাদের মধ্যস্থ কার্বন নির্গমন বাড়িয়ে, ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে, সার্বিক কৃষি কার্যক্রমকে, দিন দিন অস্বাভাবিক করে তুলছে। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি মানুষ হৃদরোগ ও স্ট্রোকে মারা যায় এবং এর পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ খাদ্যে বিষক্রিয়া। অযাচিত রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটির উর্বরতাও কমছে। এ অবস্থায় প্রাণী ও প্রকৃতি-পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এই কীটনাশকটি ব্যবহার বন্ধ করার বিকল্প নেই। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্ল্যান্ট প্রটেকশন বিভাগের এক সূত্র বলছে, দেশে ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রায় ৪২ হাজার টন বালাইনাশক ব্যবহৃত হয়েছে। তবে এর জন্য চরম মূল্য দিতে হয় প্রকৃতি ও পরিবেশকে। কারণ এর ধারাবাহিক প্রয়োগে নষ্ট হয় মাটির গুণাগুণ। মরে যায় উপকারী অনুজীব। অন্যদিকে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে মানবদেহে ঢুকে তৈরি করে ক্যানসার-হাঁপানির মতো জটিল রোগব্যাধি। মানুষের প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস করে। শিশুর বিকলাঙ্গতা তৈরি করে। তাদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে। জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউটের করা সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর এক-তৃতীয়াংশই কৃষক। রাসায়নিক কীটনাশক বিক্রির ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠিন নজরদারি এবং অভিযান পরিচালনা করা এখন সময়ের দাবি। এর যথাইচ্ছা ব্যবহার বন্ধ না করা গেলে মানবদেহ ও প্রকৃতির ক্ষতি আরও বাড়বে।

দাবদাহ, খরা, বন্যা ও হারিকেনের তীব্রতা ও সংখ্যা বেড়ে কৃষিতে অনিশ্চয়তার নিয়ামক বৃদ্ধি পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পৃথিবীর ৬.৭ বিলিয়ন জনসংখ্যার প্রায় ৪০% (২.৫ বিলিয়ন) কৃষির ওপর তাদের জীবিকা নির্বাহ করছে, যারা সমূহ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। এসব ক্ষতি এড়াতে বর্তমান কৃষি কৌশল পরিবর্তন করতে হবে এবং নতুন প্রযুক্তি ও জাত উদ্ভাবন করে সমস্যা কবলিত পরিস্থিতি ও গ্রিনহাউস গ্যাস নিয়ন্ত্রণে রেখে বেশি ফলন ফলাতে হবে।

লেখক: কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, ঢাকা।


বিকিরণ ব্যবহার: একটি দক্ষ এবং নির্ভরযোগ্য জীবাণুমুক্তকরণ পদ্ধতি

আপডেটেড ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ ১২:৫১
অধ্যাপক ড.  মোখলেসুর রহমান

রূপপুর পাওয়ার প্ল্যান্ট বাংলাদেশের জন্য পারমাণবিক শক্তিকে আরও অন্তর্ভুক্ত, করার জন্য একটি সম্ভাব্য প্রবেশদ্বার হিসেবে দাঁড়িয়েছে, ভবিষ্যতে এ ধরনের আরও সুবিধার জন্য সম্ভাব্য পথ প্রশস্ত করবে। স্বাধীনতার পাঁচ দশকে, বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি প্রমাণিত করেছে, তবুও সমালোচনামূলক প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে, বিশেষত তার শক্তির উৎস সম্পর্কিত। পারমাণবিক শক্তি কি দেশের ক্রমবর্ধমান শক্তির চাহিদার সমাধান দিতে পারে এবং অন্যান্য শক্তির জলাধারগুলো হ্রাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর ক্রমবর্ধমান চিকিৎসা ডিভাইস শিল্পকে সমর্থন করতে পারে?

পারমাণবিক শক্তির গুণাগুণ, বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য এর উপযুক্ততা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে কক্সবাজারে ভূগর্ভস্থ ইউরেনিয়াম মজুত উন্মোচন করা হয়েছে, যার মাত্রা 850.7 থেকে 990.6 পিপিএম (ppm) পর্যন্ত জিরকন এবং মোনাজাইট, উত্তর-পূর্বে সিলেট এবং মৌলভীবাজারে পাওয়া ঘনত্বের প্রায় দ্বিগুণ। এ ইউরেনিয়াম আকরিক খনন এবং উত্তোলনের কয়েক দশকের গবেষণা দেশটির অভ্যন্তরীণভাবে পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ করার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়, ইউরেনিয়াম বিচ্ছেদ প্রযুক্তিতে অগ্রগতি মুলতবি রয়েছে।

বাংলাদেশ বর্তমানে বায়োমাস (biomass), কয়লা, তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসসহ শক্তির উৎসের মিশ্রণের ওপর নির্ভরশীল। পেট্রো বাংলা, সরকারি মালিকানাধীন জাতীয় তেল কোম্পানি, গত কয়েক দশক ধরে দেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত বৃদ্ধির ইঙ্গিত করে ব্যাপক গবেষণা চালিয়েছে। যাই হোক, এই বৃদ্ধি একটি অসীম রিজার্ভকে নির্দেশ করে না, যদিও বাংলাদেশের অবস্থান প্রাকৃতিক গ্যাস গঠনের জন্য উপযোগী বৃহত্তম ব-দ্বীপ সমভূমি। বর্তমানে, আনুমানিক 62.9% বিদ্যুৎ প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে উৎপন্ন হয়, যার মধ্যে ডিজেল, কয়লা, ভারী তেলের ভগ্নাংশ এবং সৌর বিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য উৎগুলো অবশিষ্ট অবদান রাখে।

মোটকথা, রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাব্য টার্নিং পয়েন্ট চিহ্নিত করে, যা তার জ্বালানি চাহিদার টেকসই সমাধান হিসেবে পারমাণবিক শক্তির কার্যকারিতার একটি আভাস দেয়। যাই হোক, জাতিকে তার শক্তি পোর্টফোলিওকে বৈচিত্র্যময় করার সময় পারমাণবিক শক্তির সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণরূপে কাজে লাগাতে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত বিবেচনাসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নেভিগেট করতে হবে।

বিকিরণ রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু এবং ক্ষতিকারক জীবের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়েছে, যা জীবাণুমুক্ত করার একটি নির্ভরযোগ্য পথ প্রদান করে। আয়নাইজিং রেডিয়েশনের ব্যবহার দক্ষতার সঙ্গে অনুজীবকে নিষ্ক্রিয় করে, স্বাস্থ্যসেবা পণ্যগুলোর নিরাপত্তা এবং নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করে, বিশেষ করে যখন পণ্য প্যাকেজিংয়ের জন্য নিযুক্ত করা হয়।

বিকিরণ কার্যকরভাবে জীবাণু নির্মূল করে যা রোগ সৃষ্টি করতে পারে এবং অন্যান্য ক্ষতিকারক জীবকে নিরপেক্ষ করে। আয়নাইজিং রেডিয়েশনের মাধ্যমে নির্বীজন দক্ষতার সঙ্গে অনুজীবকে নিষ্ক্রিয় করে, প্যাকেজিংয়ের জন্য ব্যবহার করার সময় স্বাস্থ্যসেবা পণ্যগুলোর নিরাপত্তা এবং নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করে। সিরিঞ্জ এবং অস্ত্রোপচারের গ্লাভসের মতো একক-ব্যবহারের চিকিৎসা ডিভাইসগুলোকে জীবাণুমুক্ত করার জন্য এটি একটি নিরাপদ এবং সাশ্রয়ী পদ্ধতি। এর মূল সুবিধাগুলোর মধ্যে একটি হলো- এটি ইতোমধ্যে প্যাকেজ করা পণ্যগুলোর নির্বীজন সক্ষম করে। বিকিরণ ব্যবহার করে জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জামের বিস্তৃত বিন্যাস জীবাণুমুক্ত করা হয়।

চিকিৎসা পণ্য জীবাণুমুক্ত করা স্বাস্থ্যসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এবং এই উদ্দেশ্যে বিকিরণ একটি নিরাপদ এবং সাশ্রয়ী পদ্ধতি হিসাবে আবির্ভূত হয়, বিশেষ করে সিরিঞ্জ এবং অস্ত্রোপচারের গ্লাভসের মতো একক-ব্যবহারের চিকিৎসা ডিভাইসগুলোর জন্য। এর উল্লেখযোগ্য সুবিধাগুলোর মধ্যে একটি হলো ইতোমধ্যে-প্যাকেজ করা পণ্যগুলোকে জীবাণুমুক্ত করার ক্ষমতা। বিশ্বব্যাপী, 160টিরও বেশি গামা ইরেডিয়েশন সুবিধা চালু রয়েছে, বার্ষিক প্রায় 12 মিলিয়ন m3 মেডিকেল ডিভাইস জীবাণুমুক্ত করে। লক্ষণীয়ভাবে, বিশ্বব্যাপী সব একক-ব্যবহারের চিকিৎসা ডিভাইসের 40 শতাংশেরও বেশি গামা ইরেডিয়েশনের মাধ্যমে জীবাণুমুক্ত করা হয়। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি অ্যাজেন্সি (IAEA) বিকিরণ সুবিধা স্থাপনে তার সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে সমর্থন প্রসারিত করে এবং বিকিরণ ব্যবহার করে নির্বীজন অ্যাপ্লিকেশন বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশিকা প্রদান করে।

জীবাণুমুক্ত করার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি বিদ্যমান, যার মধ্যে উচ্চচাপের বাষ্প, শুষ্ক তাপ, রাসায়নিক জীবাণু এবং বিকিরণের মতো শারীরিক এজেন্ট রয়েছে। যাই হোক, এই পদ্ধতিগুলোর মধ্যে, বিকিরণ নির্বীজন একটি অনন্য অবস্থান ধারণ করে, একটি অতাপীয় সমাধান প্রদান করে যা উচ্চ তাপমাত্রার ওপর নির্ভর না করে কার্যকরভাবে অনুজীবকে ধ্বংস করে।

রেডিয়েশন থেরাপি আয়নাইজিং রেডিয়েশন ব্যবহার করে, প্রাথমিকভাবে কোবাল্ট 60 গামা রশ্মি বা ইলেকট্রন অ্যাক্সিলারেটর, বিভিন্ন চিকিৎসা পণ্যের জন্য একটি নিম্ন-তাপমাত্রা নির্বীজন পদ্ধতি হিসাবে, যার মধ্যে প্রতিস্থাপনের জন্য টিস্যু, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং চিকিৎসা যন্ত্র রয়েছে।

বিকিরণ কীভাবে নির্বীজন অর্জন করে তা বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গামা রশ্মি, বিটা কণা বা অতিবেগুনী আলোর মাধ্যমেই হোক না কেন, বিকিরণ একটি পণ্যের মধ্যে অনুজীবকে লক্ষ্য করে এবং নির্মূল করে, জীবাণুমুক্ত পরিস্রাবণের মতো উন্নত তাপমাত্রানির্ভর পদ্ধতির একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প প্রস্তাব করে।

যদিও বিকিরণ জীবাণুমুক্তকরণ অনেক সুবিধা উপস্থাপন করে, এটির সীমাবদ্ধতাগুলো শনাক্ত করা অপরিহার্য। উদাহরণস্বরূপ, সম্ভাব্য অবক্ষয়ের কারণে এটি তরল পণ্যগুলোর জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে এবং চর্বিযুক্ত কিছু খাদ্য আইটেম আদর্শ প্রার্থী নাও হতে পারে। উপরন্তু, কিছু পণ্যের বিবর্ণতা বা টেক্সচার পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে, যা প্রয়োগের যত্নশীল বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়।

সংক্ষেপে, বিকিরণ জীবাণুমুক্ত চিকিৎসা পণ্যের সন্ধানে একটি শক্তিশালী মিত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়, বিশ্বব্যাপী রোগীদের সুরক্ষা এবং সুস্থতা নিশ্চিত করার সময় নির্ভরযোগ্যতা, দক্ষতা এবং ব্যয়-কার্যকারিতা প্রদান করে।

লেখক: পারমাণবিক বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ, এমআইএসটি, ঢাকা


বাংলা একাডেমি

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
সৈয়দ শাকিল আহাদ

বাংলা একাডেমিকে আমরা অধিকাংশই চিনি বইমেলা উপলক্ষে বছরের ২য় মাসে অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি মাস এলেই মেলার আয়োজক হিসেবে, বিশেষ করে এই একাডেমি প্রাঙ্গণে মাসব্যাপী চলে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বইয়ের মেলা, যা ইতোমধ্যে পৃথিবীতে আলোচিত একটি মেলা। বেশ কয়েক বছর ধরে এই বইমেলা বাংলা একাডেমির গণ্ডি পেরিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিস্তৃত হয়েছে। তা ছাড়া প্রতিবছর সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার’ নামে একটি মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের ব্যবস্তা করার জন্যও বাংলা একাডেমির নাম সুধীজনের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত।

বাংলা একাডেমি একসময় ছিল ‘বর্ধমান হাউস’। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ ঘোষণা এবং তা কার্যকর করার পর বাংলায় সশস্ত্র আন্দোলন বিকাশ লাভ করে। ১৯০৬ সালে কংগ্রেসের পূর্ণ অধিবেশনে ‘স্বরাজ’ শব্দ গৃহীত হয়। স্বরাজ বলতে কংগ্রেসের নরমপন্থিরা বুঝেছিল ঔপনিবেশিক স্বায়ত্তশাসন, চরমপন্থিরা বুঝল স্বাধীনতা। এর থেকে উৎপত্তি হলো বিদেশি পণ্য বর্জন প্রসঙ্গ।

১৯১১ সালে ইংরেজ শাসক লর্ড হার্ডিঞ্জের শাসনামলে দিল্লির এক সভাতে ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জের উপস্থিতিতে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয়। বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর তৎকালীন গভর্নরের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্যদের জন্য তিনটি বড় বড় বাড়ি আলাদাভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল। ওই তিনটি বাড়ির একটি হলো বর্ধমান হাউস যা এখন বাংলা একাডেমি। বর্ধমানের রাজার জন্য এটি তৈরি করা হয়েছিল। এর সীমানা বা পরিধি ছিল ব্যাপক পেছনের দিকে। শিবমন্দির পর্যন্ত ছিল বর্ধমান হাউসের সীমা। মন্দিরের দায়িত্বে থাকা একজনের মতে বর্ধমানের রাজা তার পূজার জন্য এই মন্দিরটি তৈরি করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এখানে রমেশচন্দ্র মজুমদার, কাজী মোতাহার হোসেন, কবি কাজী নজরুলসহ অন্য কবিরা অতিথি হিসেবে এখানে থেকেছেন বহুদিন। পাকিস্তান হওয়ার পর পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন ছিল এই বর্ধমান হাউস। ১৯৪৭ সালে ধর্মভিত্তিক স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র পাকিস্তান সৃষ্টির পরই পূর্ব বাংলায় শুরু হয় বাঙালির জাতিসত্তা ও মাতৃভাষার অধিকারের ওপর আক্রমণ। অধিকার রক্ষার আন্দোলন ১৯৪৮-এ শুরু হয়ে ১৯৫২-এ ছাত্র-জনতার আত্মবলিদানে ঐতিহাসিক পট পরিবর্তনের সূচনা করে এবং ১৯৫৬ সালে স্বীকৃতি পায় বাংলা ভাষা। ধর্মভিত্তিক পাকিস্তানি সামরিক আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর নিগড় থেকে মুক্ত হয়ে বাঙালি তার ভাষা-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য ও নিজস্ব জাতিসত্তাভিত্তিক একটি সেক্যুলার রাষ্ট্র গঠনের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের সূচনা করে। এলক্ষ্যে ১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলার সাধারণ নির্বাচন উপলক্ষে এ কে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে গঠিত হয় রাজনৈতিক মোর্চা ‘যুক্তফ্রন্ট’। এঁদের ২১ দফা নির্বাচন ইশতিহারের ১৬নং ধারায় বলা হয় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষণা, উন্নয়ন, প্রচার এবং প্রসারের জন্য একটি গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার কথা। ওই নির্বাচনে সাম্প্রদায়িক সরকারি দল মুসলিম লীগকে পরাজিত করে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করে এবং এই বাংলা একাডেমির প্রতিষ্ঠা তাই একই ইতিহাসের ওতপ্রোত অংশ।

রাষ্ট্রের গঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক ঘটনা পরম্পরার এমন নিবিড় সংশ্লিষ্টতা বাংলাদেশের আর কোনো প্রতিষ্ঠানের নেই। এ জন্যই বাংলা একাডেমি বাঙালি জাতির অনন্য গৌরবধন্য আধুনিক ও সেক্যুলার রাষ্ট্রসত্তা, জাতিসত্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের প্রতীক। বাংলা একাডেমিকে তাই শুধু ‘জাতির মননের প্রতীক’ বললে এর সংগ্রামী ইতিহাসকে কৌশলে অস্পষ্টতার আবরণে ঢেকে দেওয়া হয়। তৎকালীন সময়ে ভাষা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে দাবি ওঠে বর্ধমান হাউসকে বাংলা একাডেমিতে রূপান্তর করার।

বাংলা একাডেমি ১৯৫৫ সালের ৩রা ডিসেম্বর বাংলা ১৭ অগ্রহায়ণ, ১৩৬২ বঙ্গাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা, গবেষণা ও প্রচারের লক্ষ্যে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে, বর্তমান বাংলাদেশে এই একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা হয়। বাংলা অভিধানসহ অদ্যাবধি সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তিন লাখের ওপরে বই প্রকাশিত হয়েছে এবং বর্তমান সরকারের সময়ে নান্দনিকতা ও নতুন সুউচ্চ ভবন ও স্বাপত্য কাঠামো বৃদ্ধিসহ এর আধুনিকায়নসহ ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়েছে।


বাংলাদেশের নতুন স্থানে চা-বাগান সৃজনের সম্ভাবনা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ড. মো. হুমায়ুন কবীর

চা একটি আন্তর্জাতিক পণ্য। চা-গাছের বৈজ্ঞানিক Camellia sinensis. চায়ের বেশ কিছু প্রকারভেদ রয়েছে। কালো চা, সাদা চা, সবুজ চা, ওলং চা ইত্যাদি বেশ কিছু নামে পরিচিত চা-পাতা। এটি বাগান আকারে আবাদ হয়ে থাকে। একটি বাগানে চা উৎপাদনের সব ধরনের কাজই সম্পন্ন করা হয়ে থাকে বিধায় তাকে ‘টি এস্টেট’ নামে ডাকা হয়। তবে এখন বাগানের বাইরে এককভাবে কৃষকপর্যায়েও কোনো কোনো স্থানে চায়ের আবাদ হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ বাংলাদেশের সর্ব উত্তরের পঞ্চগড় এলাকায় শুধু নতুন সৃজন করা চা-বাগান নয় বরং ছোট ছোট অসংখ্য খামারিরা চা আবাদে আগ্রহী হয়ে পড়ছেন। সেসব এলাকায় অন্য ফসলের চেয়ে চা চাষ করেই কৃষক বেশি লাভবান হচ্ছেন বলে জানা গেছে।

চা বাঙালির জন্য একটি বিশেষায়িত সামাজিক পানীয়। এক অর্থে এটি একটি নেশাজাতীয় পানীয়। কারণ চা পানে শরীরে তেমন কোনো পুষ্টি সংযোজিত না হলেও এর সামাজিক গুরুত্ব অনেক বেশি। জনশ্রুতি থেকে জানা যায় ব্রিটিশ শাসনামলে এক সময় চা বাঙালিকে ফ্রি খাওয়ানো হতো। ফ্রি খাওয়ানোর পেছনে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য ছিল যা পরবর্তীতে বাঙালিকে আর কেউ বুঝিয়ে দিতে হয়নি। তবে এখন চা বাঙালির নিত্য-নৈমিত্তিক কালচারে ও অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কী অফিসে, কী অতিথি আপ্যায়নে কমপক্ষে এক পেয়ালা চায়ের বিকল্প কিংবা জুড়ি নেই। পুষ্টি থাকুক বা না থাকুক, ক্ষুধা নিবারণ হোক বা না হোক এক কাপ চায়ে শরীর-মনের ক্লান্তি দূর হয়ে তা চাঙ্গা করে তোলে। তবে চায়ের মধ্যে ক্যাফেইন নামের একপ্রকার নেশাজাতীয় রাসায়নিক দ্রব্য থাকায় তার দ্বারাই এমনটি হয়ে থাকে। তা ছাড়া কিছু মাইনর পুষ্টি উপাদানও থাকে যা শরীরে কিছু কাজ করে থাকে।

অথচ এক সময় বাংলাদেশে কোনো চা-বাগান ছিল না। ব্রিটিশ বেনিয়ারা প্রথমে বাংলাদেশে কিছু কিছু এলাকায় চা-বাগান সৃজন শুরু করেন। ইতিহাস বলে ব্রিটিশ শাসনের সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক ১৮৫৬ সালের দিকে তৎকালীন সিলেটের মালনীছড়ায় প্রথম চা-বাগান সৃজন করে। এরপর চট্টগ্রাম এবং সিলেটের অন্যান্য স্থানে একে একে চা-বাগান স্থাপন করতে থাকে। এখন দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৬৬টি বাণিজ্যিক চা-বাগান রয়েছে। আগেই উল্লেখ করেছি, একটি বড় চা-বাগানে বাগান সৃজনের জন্য চারা উৎপাদনের নার্সারি থেকে শুরু করে বাগান স্থাপন এবং সেই বাগান থেকে কাঁচা চা-পাতা উত্তোলন করে সেখান থেকে বাণিজ্যিকভাবে চা উৎপাদনের সব ইন্ডাস্ট্রি রয়েছে।

সেসব বাগানে অনেক প্রযুক্তিবিদ, ব্যবস্থাপনা কর্মী ও চাশ্রমিক কাজ করার সুযোগ পায়। চাশ্রমিকদের বেশির ভাগই নারী (৭৫%)। অর্থাৎ নারী-পুরুষের অনুপাত ৪:১। তাতে একদিকে যেমন নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় অন্যদিকে তেমনি রপ্তানিমুখী শিল্পের মাধ্যমে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। ব্রিটিশরা এক সময় এ শিল্পের গোড়াপত্তন করলেও এখন তা অনেকটাই দেশীয় ব্যবসায়ীদের দখলে। কাজেই এটি এখন একটি লাভজনক শিল্প হওয়ায় দিনে দিনে নতুন নতুন সম্ভাব্য স্থানে তার চাষের আওতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এম এম ইস্পাহানী লিমিটেড, কাজী অ্যান্ড কাজী, দ্য ট্রান্সকম গ্রুপ, জেমস ফিনলে বাংলাদেশ, দ্য ওরিয়ন গ্রুপ, দ্য আবুল খায়ের গ্রুপ, ডানকানস ব্রাদার্স বাংলাদেশ লিমিটেড ইত্যাদি দেশি-বিদেশি কোম্পানি এখন বাংলাদেশে চা উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত।

বর্তমানে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলেই এর ব্যাপ্তি বেশি। কারণ দেখা গেছে বৃহত্তর সিলেটের সিলেট জেলা, হবিগঞ্জ জেলা, মৌলভীবাজার জেলা, অন্যদিকে চট্টগ্রাম জেলা, পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি জেলা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় অল্প কয়েকটি করে চা-বাগান রয়েছে। সাম্প্রতিককালে অল্প পরিমাণে চা-চাষ শুরু হয়েছে পঞ্চগড় জেলায়। পাশাপাশি আরও কয়েকটি জেলায় একই আবহাওয়া বিরাজ করায় ভারতের সীমান্তবর্তী ঠাকুরগাঁও, রাজশাহী অঞ্চলে চা-বাগান স্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে দেশের মধ্যাঞ্চলে ভারতীয় সীমান্ত এলাকায় অর্থাৎ শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনায় গাড়ো পাহাড়ের পাদদেশে চা আবাদ সম্প্রসারণ সম্ভব। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্টদের দ্বারা পরীক্ষামূলকভাবে এসব এলাকায় চা আবাদের সমীক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

আমরা জানি চা আবাদের জন্য উঁচু ও বেলে-দোঁয়াশ প্রকৃতির জমি প্রয়োজন। আবার সেখানে প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টিপাত হওয়া প্রয়োজন। তবে শর্ত থাকে যে প্রচুর বৃষ্টিপাত হলেও সেখানে পানি আটকাতে পারবে না। ছোট ছোট পাহাড় ও টিলা আছে এমন স্থানই তার জন্য উপযুক্ত হয়ে ওঠে। কাজেই এসব বিবেচনাতেই ওপরে উল্লিখিত স্থানগুলোয় চা আবাদ করা হয়ে থাকে। দেখা যাচ্ছে- এমন আবহাওয়া বিরাজ করে দেশে আরও অনেক স্থান রয়েছে যেখানে চা-বাগান স্থাপন করা যেতে পারে। কারণ চা বাংলাদেশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পণ্য। চা-চাষ ও উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ১২তম। এ খাতে দেশে বর্তমানে ৪ মিলিয়ন মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। দেশের যেসব স্থানে অন্যকোনো ফসল ফলানো সম্ভব নয়। প্রকারান্তরে পাহাড়ি এসব স্থান অনাবাদি থাকে এবং যেখানে অন্যকোনো ফসল ফলানো সম্ভব নয়, সেখানেই চায়ের আবাদ হয়। তাই নতুন নতুন স্থানে এর আবাদ বাড়াতে পারলে দেশ ও জাতি উপকৃত হবে। কাজেই আগামীতে সম্ভাব্য আরও নতুন নতুন স্থানে চায়ের আবাদ বাড়াতে হবে। তবে সে ক্ষেত্রে সরকারের চা বোর্ড, চা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও কৃষি বিভাগের যৌথ সহযোগিতা প্রয়োজন। আর দেশের সার্বিক উন্নয়নে সরকার তা করছে এবং করবে।

লেখক: কৃষিবিদ ও রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়


এখনই দরকার রাশ টেনে ধরা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ড. মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর জাতীয় রাজনীতিতে অনেক কিছুই আগের মতো নেই। পরিস্থিতি পরিবেশ বদলে গেছে এবং যাচ্ছে। বদলে যাওয়া এই পরিস্থিতির সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকে কীভাবে নিজেদের প্রস্তুত করবে তার ওপর সেই দলের রাজনীতির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে। ৭ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে যতই মুখে বলুক যে তারা বিজয়ী হয়েছে, আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়েছে কিন্তু রাজনীতির বাস্তবতা তা বলে না। বিএনপি এবং যুগপৎ আন্দোলনকারী দলগুলো ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে দুই কৌশল নিয়ে অগ্রসর হয়েছিল। প্রথম কৌশলটি ছিল রাজধানী ঢাকায় মস্ত বড় গণ্ডগোল পাকিয়ে শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা। এটি আমার নয়, তাদেরই মুখে উচ্চারিত কথা। দ্বিতীয় কৌশল ছিল নির্বাচন বর্জনের ডাক দিয়ে নির্বাচন কমিশনসহ সবকিছুকে অচল করে দেওয়ার মাধ্যমে বিদেশিদের সমর্থনে এক দফার দাবি অনুযায়ী সরকারকে হটিয়ে পরবর্তী নির্বাচন নিজেদের মতো করে অনুষ্ঠিত করা। তাদের ধারণা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের পাশে থাকলে আওয়ামী লীগ এককভাবে নির্বাচন করতে সাহস পাবে না। তা ছাড়া বিএনপি যেহেতু নির্বাচন বর্জন ও প্রতিহত করার ডাক দিয়েছে তাই বিএনপি ছাড়া অনুষ্ঠিত ৭ জানুয়ারির নির্বাচন পশ্চিমা দেশগুলো অনুষ্ঠিত হতে দেবে না, মেনেও নেবে না। ২৮ অক্টোবরের পর থেকেই বিএনপি এবং যুগপৎ আন্দোলনকারী দলগুলো সে পথে হেঁটে ছিল। নির্বাচন বর্জন ও প্রতিহত করার নামে যখন তাণ্ডব চালানো হয়, চলন্ত বাস-ট্রেনে অগ্নিসংযোগ করে মানুষ পুড়িয়ে মারা হয় তখন রাজনীতিতে সেই সব দলের অবস্থান হয়ে যায় সন্ত্রাসী দলে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া কোনো সুযোগ থাকে না। সরকার তাই করেছে। বিএনপির বেশ কিছু নেতা নানা মামলায় কারারুদ্ধ হয়েছে। ছাত্রদল যুবদলের অনেকেই আইন ভঙ্গ করায় কারারুদ্ধ হয়েছে, অনেকে আন্দোলন ছেড়ে পালিয়ে বেড়িয়েছে। মাঠে তখন ছিল জনসমর্থনহীন কতগুলো নামসর্বস্ব দলের সামান্য কিছু নেতা ও কর্মী। তারা মাঠে চিৎকার করেছে কিন্তু জনগণ তাদের চিৎকার-চেঁচামেচিতে খুব একটা কান দেয়নি। জনগণ বুঝতে পেরেছে যে বিএনপি এবং যুগপৎ আন্দোলনকারীরা ২৮ অক্টোবরের আগে যতটা নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে ছিল, ২৮ তারিখ থেকে তা সম্পূর্ণরূপে উল্টে গেছে। এই অবস্থায় বিএনপি এবং যুগপৎ আন্দোলনকারীদের হরতাল, অবরোধ, অসহযোগ, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদির প্রতি সমর্থন জানিয়ে ভোট বর্জন করার কোনো সুযোগ তাদের নেই। বিএনপি এবং যুগপৎ আন্দোলনকারীদের হটকারী রাজনীতির পেছনে যেমন ছিল ভিন্ন উদ্দেশ্য, একইভাবে ছিল ভিন্ন ভিন্ন কার্যকারণও। বিশেষ করে লন্ডন অহির কাছে ঢাকার নেতাদের সিদ্ধান্ত কিংবা কর্মসূচি চিন্তার কোনো মূল্যই ছিল না। ফলে বিএনপি যা আশা করেছিল তার কিছুই তাদের রাজনীতির ভাগ্যে ঘটেনি। তারপরেও তারা দাবি করছে যে তাদের জয় হয়েছে; কিন্তু কীভাবে হয়েছে সেই ব্যাখ্যা কারও কাছে জানা নেই। তারপরও বিএনপি একই কথা আউড়িয়ে যাচ্ছে। বিএনপির কিছুসংখ্যক নেতা-কর্মী এখন দলের নেতাদের বক্তৃতা শুনতে আসেন; কিন্তু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নেতা-কর্মীরা এখন অনেকটাই নিষ্ক্রিয় হয়ে আছেন কিংবা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। মনে হচ্ছে এখন বিএনপির কয়েকজন নেতা দলের নেতা-কর্মীদের চাঙ্গা করার জন্য সরকারের বিরুদ্ধে আগের হুংকারগুলো দিচ্ছেন, সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করবেন বলেও দাবি করছেন; কিন্তু এসব হুংকারে যে চিঁড়া ভিজবে না তা বোঝার জন্য কাউকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হতে হবে না। বিএনপির লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য রাজনীতি সচেতন যেকোনো মানুষ বুঝতে সক্ষম। ৭ জানুয়ারি পরবর্তী পরিস্থিতিতে দলের হতাশগ্রস্ত নেতা-কর্মীদের কীভাবে সক্রিয় ও উজ্জীবিত করা যাবে, আগামী নির্বাচন পর্যন্ত ধরে রাখা সম্ভব হবে সেই চেষ্টাই করছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। বিএনপির বর্তমান নেতারা যদি তাই করে থাকেন এবং বুঝেও থাকেন তাহলে সেটি হবে রাজনৈতিকভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত। সামনে বেশ কিছু স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বিএনপি এসব নির্বাচনে অংশ নেবে কি না, নাকি আগের বর্জনতত্ত্বেই থাকে তা অবশ্য দেখার বিষয়। বর্জনতত্ত্বে অনড় থাকলে তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা সেই সিদ্ধান্ত মেনে সুবোধ বালকের মতো ঘরে বসে থাকবে- এমনটি নাও হতে পারে। সুতরাং বিএনপির সম্মুখে রাজনীতিতে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সেসব চ্যালেঞ্জ বিএনপি কীভাবে মোকাবেলা করবে তার ওপর বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনীতি নির্ভর করবে।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নির্বাচন-পূর্ববর্তী দেশের রাজনৈতিক জটিল পরিস্থিতিকে ঠাণ্ডা মাথায় কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে সাফল্যের সঙ্গে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে। সে ক্ষেত্রে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা তার রাজনৈতিক পরিপক্বতা দিয়ে নির্বাচনটিকে প্রতিহত ও বর্জনকারীদের হাত থেকে রক্ষা করতে পেরেছেন। এদিক থেকে তিনি এককভাবে রাজনীতির চ্যাম্পিয়ন হিসেবে দলকে যেমন বিজয়ী করে এনেছেন, বিদেশিসহ নানা দেশীয় ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছেন। শেখ হাসিনা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেশে এখন দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য মন্ত্রিপরিষদ এবং নিজে নানাভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। সামনে যেহেতু রোজা তাই রোজায় বাজার যথাসম্ভব স্থিতিশীল রাখাটি সরকারের জন্য একটি বড় ধরনের অগ্নিপরীক্ষা। এ পর্যন্ত যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা দেখে মনে হচ্ছে সরকার তার পরিকল্পিত সড়কেই হাঁটছে। আমদানিকৃত পণ্যগুলো এসে পৌঁছালে অনেক কিছুর দামই মানুষের নাগালের মধ্যে চলে আসতে পারে। দ্রব্যমূল্যের ইস্যুটি এখন সরকারের কাছে মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ। এটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভালো করেই জানেন। এ ব্যাপারে ভালো করেই কথা বলছেন, ব্যবস্থাও নিচ্ছেন, সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে এই সমস্যার মোকাবিলা করার উদ্যোগ নিয়েছেন। মনে হয় তিনি পারবেন। আরও কিছু চ্যালেঞ্জ সরকারের জন্য বেশ কঠিন হলেও মোকাবিলা করতে শেখ হাসিনা প্রস্তুত আছেন। বলা চলে- সরকার পরিচালনায় শেখ হাসিনা এবার মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ এনে যেমন সব মহলের প্রশংসা কুড়িয়েছেন। নতুনরা এখনো পর্যন্ত মনে হচ্ছে আন্তরিকভাবেই কাজ করছেন। ফলে সরকার সরকারের গতিতে এগিয়ে চলছেন এবং চলবেও। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যেসব বৈরী পরিস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে সেগুলো এখন সেভাবে আর নেই। মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে অংশ নিয়ে তিনি তার এবং বাংলাদেশের অবস্থান নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পেরেছেন। পশ্চিমা বিশ্ব এখন শেখ হাসিনার সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী সেটিও পরিষ্কার হয়ে গেছে। তারপরেও পশ্চিমা বিশ্বকে প্রতিনিয়ত ভুল বোঝানোর জন্য অনেকেই লেগে আছে। সুতরাং স্বস্তিতে ঘুমানোর সুযোগ নেই। দেশের অভ্যন্তরেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেঞ্চ অবস্থান জারি রাখতেই হবে। শুধু সরকারি অফিস, ব্যাংকখ্যাত, ব্যবসা-বাণিজ্য বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ইত্যাদিতে ৯ দলীয় নেতা-কর্মীদের আচার-আচরণ এবং নানাভাবে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি মোটেও হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। বিগত ১৫ বছরে তৃণমূল থেকে ওপর পর্যন্ত অনেকেরই পদ-পদবি নিয়ে নানা ধরনের দুর্নীতিতে জড়িয়ে থাকার যথেষ্ট অভিযোগ রয়েছে। সরকারের দেওয়া সামাজিক সুরক্ষা খাতে নানা ধরনের অর্থ বরাদ্দ নিয়ে নয়-ছয় করার যথেষ্ট প্রমাণ এবং অভিযোগ রয়েছে। এগুলোর সঙ্গে স্থানীয় নেতা-কর্মীদের জড়িত থাকার বিষয়টি এখন আর গোপন নয়। দলকে এখন আওয়ামী লীগের রাজনীতির আদর্শে কীভাবে সুসংগঠিত করা যায় কীভাবে জনগণের মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রতি ভালোবাসা এবং সমর্থন বৃদ্ধি করা যায় তা নিয়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড গতিশীল করতেই হবে। মাঠপর্যায়ে অনেক নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এবং আগুল রয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বেশ কিছু বাঘা বাঘা নেতা পরাজিত হওয়ার পেছনে কি কি কারণ রয়েছে সেগুলোও উদ্ঘাটন করা খুবই জরুরি বিষয়। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতীক বরাদ্দের ব্যবস্থা না থাকায় আওয়ামী লীগের অপেক্ষাকৃত সৎ, যোগ্য ও আদর্শবান নেতাদের নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিতর্কিত দুর্নীতিপরায়ণ জনসমর্থনহীন নেতারা রাজনৈতিক প্রক্রিয়াতেই বাদ পড়ে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সম্পূর্ণরূপে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখে চললে দলের জনসমর্থন দ্রুত বেড়ে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে, বিতর্কিতরা পরিত্যাজ্য হবে। গত ১৫ বছর মাঠের রাজনীতি কতটা পরিচ্ছন ছিল, না হলে কারা কারা এর জন্য দায়ী তাদের চিহ্নিত করা প্রয়োজন। যারা সত্যিকার অর্থেই দলের অভ্যন্তরে গ্রুপিং এবং নিজের স্বার্থসিদ্ধিতে দলকে ব্যবহার করেছেন তাদের ব্যাপারে দলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনাযোগ্য। দলের অঙ্গসংগঠনগুলোর ভূমিকাও পুনর্মূল্যায়নের দাবি রাখে। অনেক জায়গাতেই কৃষক নয়- অথচ কৃষকলীগের পদ-পদবি দখল করে আছেন এমন পরিস্থিতি কীভাবে পরিবর্তন করা যাবে তাও ভাবার বিষয়। সংসদে অনেকেই সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে আসার সময় জনগণের সঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তাদের প্রতিশ্রুতি তারা কতটা রক্ষা করছেন সে ক্ষেত্রেও দলের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। দলের অনেকেই জনগণের মধ্যে না থেকে শহরে এসে স্থানীয় পর্যায়ে কিছু কিছু অনুগত ব্যক্তিকে দিয়ে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেন। এর ফলে দলের মধ্যে যেমন বিভাজন তৈরি হয়, জনগণের মধ্যেও ওইসব মন্ত্রী, এমপিদের নিয়ে ক্ষোভ বিরাজ করতে দেখা যায়। আওয়ামী লীগকে গত ১৫ বছর ধরে সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় ফেলেছে বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ এবং নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্যরা। ছাত্রলীগের নামে অনেকেই নানা ধরনের কর্মকাণ্ডে যুক্ত রয়েছে যা শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত করছে ছাত্রলীগকেও বিতর্কিত করে তুলছে। ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে ভালো লেখাপড়া, গবেষণা, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক নানা বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আলোচনা ও সেমিনার অনুষ্ঠিত করার শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রিয়া প্রতিযোগিতার কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায় না। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। এর ফলে ছাত্রলীগ নামধারী অনেকেই ভালো ছাত্র হিসেবে পরিচিতি অর্জনের চেয়ে অন্য বিশেষণে বিশেষায়িত হচ্ছে। প্রকৃত শিক্ষালাভ জ্ঞানদক্ষতা এবং রাজনৈতিক সচেতনতায় সমৃদ্ধ নেতা-কর্মী খুব একটা সৃষ্টি হচ্ছে না। অন্যদিকে ব্যতিক্রম কিছুসংখ্যক উপাচার্য ছাড়া গত ১৫ বছরে বদনাম কামিয়েছেন এমন উপাচার্যের সংখ্যা বেশি হওয়ার বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। এ বিষয়গুলোর প্রতি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা নতুনভাবে ভাবতে হবে। এখনি যদি রাশ টেনে ধরা যায় তাহলে দেশের সর্বক্ষেত্রে দল এবং আদর্শ হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রসার অপ্রতিরোধ্যভাবে বাড়বে এতে কোনো সন্দেহ নেই; কিন্তু তা করা না হলে আওয়ামী লীগ যতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, দেশের ভবিষ্যৎ তার চেয়েও বেশি বিপন্ন হবে তা নিশ্চিত করে বলা চলে।


সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করতে হবে

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
হীরেন পণ্ডিত

এসডিজির অভীষ্ট ৩:৬-এ বিশ্বব্যাপী সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ও নিহতের সংখ্যা ২০২০ সালের মধ্যে অর্ধেকে কমিয়ে নিয়ে আসার কথা বলা হয়েছে। এসডিজির অভীষ্ট ১১:২-এ রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত যানবাহন সম্প্রসারণ করে সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতির মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও সুলভ পরিবহন ব্যবস্থায় সবার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জনে এখন সবাইকে কাজ করতে হবে।

সড়ককে নিরাপদ করতে ডিভাইডার স্থাপন, বাঁক সরলীকরণ, সড়ক ৪ লেনে উন্নীতকরণ, মহাসড়কে চালকদের জন্য বিশ্রামাগার নির্মাণ ও গতি নিয়ন্ত্রক বসানোসহ নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। সড়ক পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা আনয়ন, দক্ষ চালক তৈরি এবং দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে টাস্কফোর্স গঠন করে এর ভিত্তিতেই কাজ চলছে। সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধ তথা সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সরকারের পাশাপাশি পরিবহন মালিক, শ্রমিক, যাত্রী, পথচারী ও সংশ্লিষ্ট সকলকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে একযোগে কাজ করতে হবে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পর ক্ষতিগ্রস্ত সকল সড়ক ও সেতু মেরামত করে যোগাযোগ অবকাঠামো পুনঃস্থাপন করেন। তিনি ১৯৭৪ সালের মধ্যেই মুক্তিযুদ্ধে ধ্বংসপ্রাপ্ত সকল সেতু পুন:নির্মাণ করে চলাচলের উপযোগী করেন, পাশাপাশি তিনি ৪৯০ কি.মি. নতুন সড়ক নির্মাণ করেন। বাংলাদেশ সরকারের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় জাতির পিতা সড়ক পরিবহন খাতকে অগ্রাধিকার প্রদান করে আধুনিক সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কার্যক্রম শুরু করেন। সরকার জাতির পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ২০৩০ এবং প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০৪১ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নিরাপদ সড়ক নেটওয়ার্ক উন্নয়নের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন ও সময় সাশ্রয়ী যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন সম্প্রসারণের নিমিত্তে কাজ করে যাচ্ছে। নিজস্ব অর্থায়নে করা স্বপ্নের বহুমুখী পদ্মা সেতুসহ সারা দেশে বিস্তৃত যোগাযোগ ব্যবস্থা জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।

সড়ক পরিবহন ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব উন্নয়নের পাশাপাশি নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা জোরদার করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে বর্তমান সরকার। আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং টেকসই ও নিরাপদ মহাসড়ক নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করাই সরকারের লক্ষ্য। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে স্বয়ংক্রিয় মোটরযান ফিটনেস সেন্টার চালু করা হয়েছে। ই-ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রবর্তনের মাধ্যমে বিআরটিএ’র প্রায় সকল সেবা ডিজিটালাইজড করা হয়েছে, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে ৬ দফা নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে পাঁচ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ‘বাংলাদেশ রোড সেইফটি প্রজেক্ট’ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

চালকের অদক্ষতা ও বেপরোয়া যানবাহন চালানোর পাশাপাশি ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, সড়ক ও সেতুর নাজুক অবস্থাও সড়ক দুর্ঘটনার জন্য বহুলাংশে দায়ী। গণপরিবহনে বাড়তি যাত্রী সামাল দিতে গতিসীমার বাইরে দ্রুত গাড়ি চালিয়ে বেশি ট্রিপ দেয়ার অশুভ প্রতিযোগিতা আর বাড়তি মুনাফার লোভে পরিবহন সংস্থাগুলো চালকদের অনেক বেশি সময় কাজ করতে বাধ্য করে। ফলে চালকের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ পড়ে, তাকে বেসামাল হয়ে গাড়ি চালাতে হয়; যা প্রকারান্তরে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যানবাহনে রঙ লাগিয়ে যেনতেন মেরামত করে রাস্তায় চলাচল করে বিভিন্ন উৎসব-পার্বণের সময়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অতিরিক্ত যাত্রী দূর-দূরান্তে গমনাগমন করে। সড়ক-মহাসড়কে চলে বাস-ট্রাকের চালকের অমনোযোগী লড়াই। অতি আনন্দে গাড়ি চালানোর সময় তারা ব্যবহার করেন সেলফোন, যা সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত। পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী বহন, অদক্ষ চালক ও হেলপার দ্বারা যানবাহন চালানো, বিরামহীন যানবাহন চালানো, মহাসড়কে অটোরিকশা, নসিমন-করিমন ও মোটরসাইকেলের অবাধ চলাচল এবং ব্যস্ত সড়কে ওভারটেকিং, ওভারলোডিং সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয়। প্রধানমন্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে পাঁচ দফা নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেগুলো ছিল চালক ও সহকারীদের প্রশিক্ষণ প্রদান, দূরপাল্লার বাসযাত্রায় বিকল্প চালক রাখা ও ৫ ঘণ্টা পরপর চালক পরিবর্তন করা, চালক ও যাত্রীদের সিটবেল্ট বাঁধা বাধ্যতামূলক করা, চালকদের জন্য মহাসড়কে বিশ্রামাগার নির্মাণ এবং সিগন্যাল মেনে যানবাহন চালানোর ওপর কড়াকড়ি আরোপ।

উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি নির্দেশকও বটে। বাংলাদেশ দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে, আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর দৃষ্টিতে সম্ভাবনাময় অর্থনীতির দেশ। সরকারের লক্ষ্য ২০৪১ সালে উন্নত দেশ হওয়ার। উন্নয়নশীল বা মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে শামিল হওয়া বাংলাদেশের পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে অনেক কাজ চলছে। বাংলাদেশে মোটরসাইকেল বিক্রি সম্প্রীতি বহুগুণ বেড়েছে। আঞ্চলিক সড়কে মোটরসাইকেল চালানোর নিয়ম মানছেন না চালকরা; চালক ও আরোহীরা হেলমেট ঠিকমতো পরেন না; এক মোটরসাইকেলে দু'জনের বেশি না ওঠার নিয়ম মানা হয় না; জেলা-উপজেলা পর্যায়ে অনিবন্ধিত মোটরসাইকেল অহরহ চলাচল করে; অনেকের আবার মোটরসাইকেল চালানোর প্রশিক্ষণ নেই।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ বৃদ্ধি; চালকের বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্দিষ্টকরণ; বিআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধি; পরিবহনের মালিক-শ্রমিক, যাত্রী ও পথচারীদের প্রতি ট্রাফিক আইনের বাধাহীন প্রয়োগ নিশ্চিতকরণ; মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং এগুলোর জন্য আলাদা সার্ভিস রোড তৈরি; পর্যায়ক্রমে সব মহাসড়কে রোড ডিভাইডার নির্মাণ; গণপরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ; রেল ও নৌপথ সংস্কার ও সম্প্রসারণ করে সড়কপথের ওপর চাপ কমানো; টেকসই পরিবহন কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন।

যে কোনো দুর্ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সড়কে যেভাবে মানুষের প্রাণহানি ঘটছে, তা যেভাবেই হোক কমাতে হবে। নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। দক্ষ চালক তৈরির জন্য সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত সংখ্যক চালক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। এ ছাড়া সড়কে মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন চলাচল বন্ধে সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে।

সড়ক দুর্ঘটনা বিশ্বব্যাপী মানুষের মৃত্যু ও ইনজুরির অন্যতম প্রধান কারণ। সব বয়সের মানুষের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর অষ্টম প্রধান কারণ হলো সড়ক দুর্ঘটনা। ৫-২৯ বছর এবং আরো কম বয়সি শিশুদের জন্য এটি মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবেও চিহ্নিত হয়েছে। প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয় যে, বিশ্বব্যাপী শতকরা ৯০ ভাগ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে, যার সংখ্যা উন্নত দেশগুলোর তুলনায় তিন গুণ বেশি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের চিত্র অনেকটা একই রকম।

সড়ক ও জনপথ বিভাগ, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, ২০১৬-১৭ সালে পরিচালিত একটি জরিপে, অর্থনৈতিক ক্ষতি, চিকিৎসা ব্যয়, জীবনযাত্রার ব্যয়, যানবাহন ও প্রশাসনিক ক্ষতি এবং অন্যান্য হিসাব থেকে দেখানো হয়েছিলো কর্মজীবী ব্যক্তি যিনি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন তার সব মিলিয়ে একটি মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৫ মিলিয়ন টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। তবে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার জনপ্রতি পাঁচ লাখ টাকা ক্ষতি হয়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য সড়ক দুর্ঘটনা একটি উদ্বেগজনক বিষয়। দুর্ঘটনা মানবিক ও অর্থনৈতিক উভয় অবস্থাকে প্রভাবিত করে। হিউম্যান ক্যাপিটাল পদ্ধতিতে একটি খরচ অনুমান মডেল করা হয়েছে। গড় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ (টাকায়) মোট ক্ষতির পরিমাণ ৪৯ লাখ ৬৯ হাজার। একজন কর্মজীবী ব্যক্তির অর্থনৈতিক ক্ষতি, সরকারি সমীক্ষা দেখায় যে সড়ক দুর্ঘটনায় একজন কর্মজীবী ব্যক্তির মৃত্যুর ফলে গড় অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় ২৪ লাখ ৭২ হাজার ১০৮ টাকা। গুরুতর আঘাতের ক্ষেত্রে, গড় আর্থিক ক্ষতি হয় ২১ হাজার ৯৮ টাকা। ৩৮ ভাগ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে থাকে অসাবধানে গাড়ি চালানোর কারণে বেশির ভাগ চালক ট্রাফিক নিয়মের প্রতি তাদের অবাধ্য মনোভাবের পাশাপাশি সঠিকভাবে প্রশিক্ষিত বা উপযুক্ত বিশ্রামও পান না।

সড়ক-দুর্ঘটনায় হতাহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই বয়সে তরুণ বা যুবক এবং নানাবিধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত। সড়ক দুর্ঘটনার কারণ ও এর ক্ষয়-ক্ষতির ব্যাপকতা বহুমাত্রিক যা প্রতিটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। বিআইডিএস এর গবেষণায় দেখা যায়, সড়ক-দুর্ঘটনায় বাংলাদেশে প্রতিবছর জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। সড়ক-দুর্ঘটনাকে সহনীয় মাত্রায় রাখতে তথা সড়ক-দুর্ঘটনাজনিত মানুষের মৃত্যু, পঙ্গুত্ব ও অসুস্থতা এবং সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতি লাঘবের উদ্দেশ্যে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহ তার সদস্যভুক্ত প্রায় প্রতিটি দেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহকে সাথে নিয়ে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতের সংখ্যা শতকরা ৫০ ভাগ কমানোর জন্য টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ ও কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়তা করা এবং “গ্লোবাল প্ল্যান ফর সেকেন্ড ডিকেড অফ অ্যাকশন ফর রোড সেইফটি ২০২১-২০৩০” নিশ্চিত করতে কার্যকর কর্মপন্থা নির্ধারণ করে সেগুলো বাস্তবায়নে সহযোগিতা করা ইত্যাদি। আশার কথা হলো এই যে, সড়ক-দুর্ঘটনা কমানোর উদ্দেশ্যে বিশ্বব্যাপী গৃহীত এসকল পদক্ষেপ সমূহের সাথে বাংলাদেশও একাত্মতা প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি সেগুলোর বাস্তবায়নের জন্য যথাযথ কর্মপন্থা নির্ধারণ পূর্বক প্রয়োজনীয় কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে।

সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ এর আলোকে সড়ক পরিবহন বিধিমালা-২০২২ হালনাগাদ করণের মাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তা জোরদারের প্রচেষ্টা গ্রহণ সরকারের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ এবং অন্যতম প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এসডিজিগুলোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ “সড়ক পরিবহন বিধিমালা- ২০২২” এ বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য বিধান সংযুক্তিপূর্বক গেজেট প্রকাশ করেছে। এ সকল বিধিমালার কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তাকে জোরদার করে তোলাই উক্ত বিধিসমূহ সংযোজনের প্রধান উদ্দেশ্য। তাই এ ধরনের কার্যকর ও সময়োপযোগী সড়ক পরিবহন বিধিমালা জারির জন্য বাংলাদেশ সরকার নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবীদার।

সড়ক দুর্ঘটনার একাধিক কারণ রয়েছে যার মধ্যে অন্যতম প্রধান করণ হলো অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো। দেশে নিয়মিত ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা। অনিয়ন্ত্রিত গতি দুর্ঘটনার ঝুঁকির পাশাপাশি আঘাতের তীব্রতা এবং দুর্ঘটনার ফলে মৃত্যুর সম্ভাবনাকে সরাসরি প্রভাবিত করে। বিশ্বের ৮০ টির বেশি বড় শহরে পরিচালিত সমীক্ষার উপর ভিত্তি করে জাতিসংঘ এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, শহর এলাকায় সর্বোচ্চ গতিসীমা ৩০ কিলোমিটার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারলে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। এছাড়াও শহর এলাকায় যানবাহনের এরূপ নিম্নমাত্রার গতিসীমা যানযট ও বায়ুদূষণ কমানোর ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখে বলে গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া গেছে।

যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত গতি ছাড়াও নেশাগস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকির পাশাপাশি আঘাতের তীব্রতা এবং দুর্ঘটনার ফলে মৃত্যুর সম্ভাবনাকে সরাসরি প্রভাবিত করে। গবেষণায় এটা প্রমাণিত যে, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো নিষেধ- এই বিধানটি শতভাগ প্রয়োগ করা সম্ভব হলে দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা শতকরা ২০ ভাগ হ্রাস করা সম্ভব। (সূত্র: গ্লোবাল রোড সেইফটি পার্টনারশীপ)।

পাশাপাশি, দুই এবং তিন চাকার মোটরযান ব্যবহার মাথায় আঘাত জনিত মৃত্যু ও ট্রমার অন্যতম প্রধান কারণ। দ্রুততম সময়ের মধ্যে গন্তব্যস্থলে পৌঁছার জন্য বহু মানুষ মোটরসাইকেল ব্যবহার করছেন। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে দেশে এর ব্যবহার অত্যধিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক্ষেত্রে গতির পাশাপাশি হেলমেট পরিধানের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হেলমেট পরিধান না করা সরাসরি দুর্ঘটনার কারণ না হলেও দুর্ঘনায় আহত ব্যক্তির আঘাতের মাত্রা হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গবেষণায় এটাও দেখে গেছে যে নিরাপদ হেলমেট যথাযথা নিয়মে ব্যবহারে দুর্ঘটনায় মৃত্যু ঝুঁকি শতকরা ৪০ ভাগ এবং মাথার আঘাতের ঝুঁকি শতকরা ৭০ ভাগ হ্রাস করে। (সূত্র: গ্লোবাল রোড সেইফটি পার্টনারশীপ)।

একইভাবে সিটবেল্ট ব্যবহার সরাসরি দুর্ঘটনার কারণ না হলেও দুর্ঘনায় আহত ও নিহতের হার হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, সিটবেল্ট পরা চালক এবং সামনের আসনে যাত্রীর মধ্যে মৃত্যুর ঝুঁকি শতকরা ৪৫-৫০ ভাগ এবং পিছনের আসনের যাত্রীদের মধ্যে মৃত্যু এবং ও আঘাতের ঝুঁকি শতকরা ২৫ ভাগ হ্রাস করে। এছাড়াও গ্লোবাল রোড সেইফটি পার্টনারশীপ এর তথ্য মতে, শিশুদের জন্য নিরাপদ বা সুরক্ষিত আসনের ব্যবহার সড়ক দুর্ঘটনায় ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে শতকরা ৭০ ভাগ এবং বড় শিশুদের ক্ষেত্রে শতকরা ৫৪-৮০ ভাগ মারাত্মক আঘাত পাওয়া এবং মৃত্যু হ্রাসে অত্যন্ত কার্যকর।

যানবাহনের গতিসীমা বিষয়ে উক্ত বিধিমালার সপ্তম অধ্যায়ে সুনির্দিষ্ট বিধান সন্নিবেশিত হয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মোটরযানের গতিসীমা নির্ধারণ, নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ক নির্দেশনা বা গাইডলাইন জারি করা সংক্রান্ত বিধানটি। এর ফলে ভবিষ্যতে সড়ক ও মোটরযানের প্রকারভেদের ভিত্তিতে যথাযথ গতিসীমা নির্ধারণ করা ও এর যথাযথ বাস্তবায়নের পথ প্রশস্ত হলো। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অচিরেই এই গাইডলাইনে উল্লেখিত বিধিগুলো কার্যকর বাস্তবায়নের নিমিত্তে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

এই বিধিমালার যথাযথ বাস্তবায়ন সড়কে নিরাপত্তা বিষয়টিকে আরো জোরদার করবে এবং সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস করার মাধ্যমে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথকে আরো সহজতর করবে। সরকার বিধিমালায় যেসকল পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছে যেমন- সড়ক ও মোটরযানের প্রকারভেদের ভিত্তিতে গতিসীমা নির্ধারণ, নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা, হেলমেটের গুণগত মান নির্ধারণ, এর যথাযথ ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা, সীটবেল্টে যথাযথ ব্যবহার, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সুরক্ষিত শিশু আসন ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা ইত্যাদি বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে যত দ্রæত সম্ভব সেগুলো নিশ্চিত করণ ও বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিবেন।

সড়ক নিরাপত্তা বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সেফ সিস্টেমস এপ্রোাচ যেমন নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ মোটরযান, নিরাপদ সড়ক ব্যবহারকারী, নিরাপদ গতিসীমা ও দুর্ঘটনা পরবর্তী ব্যবস্থাপনা ইত্যাদির সমন্বয়ে একটি পৃথক সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করার বিষয়ে সরকারের যে উদ্যোগ রয়েছে সেগুলো আমাদের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে জোরদার করবে এবং বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা ও বর্তমান সরকারের অঙ্গীকার স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে এক গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী ভূমিকা পালন করবে। এতে একদিকে যেমন সড়কে মৃত্যু কমবে একইসাথে সড়ক দুর্ঘটনাজনিত অর্থনৈতিক ক্ষতি (জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ) কমানোর পথ সুগম হবে। যার মাধ্যমে এসডিজির ধারা ৩.৬ এবং ১১.২ অর্জনের পথে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে যাবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক


বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
তোফায়েল আহমেদ

ইতিহাসের মহামানব জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন এই পাকিস্তান বাঙালিদের জন্য হয়নি, এক দিন বাংলার ভাগ্যনিয়ন্তা বাঙালিদের হতে হবে। সেই লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে ’৪৮-এর ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগ এবং ’৪৯-এর ২৩ জুন আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর প্রিয় মাতৃভাষা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় অভিষিক্ত করতে মহান ভাষা আন্দোলন সংগঠিত করে ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের বীজ রোপণ করেন; এরপর স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকারের পথ বেয়ে সর্বজনীন ভোটাধিকারের দাবি আদায় করে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সুদীর্ঘ পথ বেয়ে গণরায় নিয়ে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতারূপে আত্মপ্রকাশ করেন; পাকিস্তানি সামরিক শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতার হস্তে ক্ষমতা হস্তান্তরে নানামুখী টালবাহানা ও বিশ্বাসঘাতকতামূলক গণহত্যা চাপিয়ে দেওয়ার কারণে নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় অর্জিত স্বাধীনতা ঘোষণার রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন ও রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে একচ্ছত্র নেতৃত্ব প্রদান করে ৩০ লক্ষাধিক প্রাণ আর ২ লক্ষাধিক মা-বোনের সুমহান আত্মত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন; এবং বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য ৫টি মৌলিক অধিকার- অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা সাংবিধানিকভাবে বিধিবদ্ধ করেন। যে কারণে আমরা বলি, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ সমার্থক। আজ তাঁরই সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের উদ্যোগে গঠিত গণরায়ে নির্বাচিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার সংবিধানে বিধিবদ্ধ ৫টি মৌলিক অধিকার দেশের মানুষের কল্যাণে ধাপ ধাপে বাস্তবায়ন করছে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বে আজ ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ থেকে ‘স্মার্ট সোনার বাংলা’য় রূপান্তরিত হওয়ার লক্ষ্যে ধাবমান।

প্রতি বছর ২৩ ফেব্রুয়ারি দিনটি গভীরভাবে স্মরণ করি। দিনটি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন। ১৯৬৯-এর এই দিনে বাংলার দুঃখী মেহনতী মানুষের বন্ধু, বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেতাকে জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞচিত্তে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এ বছর বঙ্গবন্ধু উপাধি প্রাপ্তির ৫৫তম বার্ষিকী। বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে ’৬৯-এর গণআন্দোলন এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। কালপর্বটি ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের ‘ড্রেস রিহার্সেল’। জাতির মুক্তিসনদ ৬ দফা দেওয়াকে রাষ্ট্রদ্রোহী অপরাধ গণ্য করে বঙ্গবন্ধু মুজিবসহ সর্বমোট ৩৫ জনকে ফাঁসি দেওয়ার লক্ষ্যে ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য’ তথা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি করা হয় এবং নির্বিঘ্নে পুনরায় ক্ষমতায় আরোহণের এক ঘৃণ্য মনোবাসনা চরিতার্থে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করেন স্বৈরশাসক আইয়ুব খান। আগরতলা মামলার বিচার যখন শুরু হয় তখন আমরা জাগ্রত ছাত্রসমাজ উপলব্ধি করি বঙ্গবন্ধুকে যদি ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানো হয় তাহলে চিরদিনের জন্য বাঙালির কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যাবে। কেননা এই একটি কণ্ঠে কোটি কণ্ঠ উচ্চারিত হয়। তাই আমরা ’৬৯-এর ৪ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ডাকসু’ কার্যালয়ে চার ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে এক সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন এবং ৬ দফাকে হুবহু যুক্ত করে ঐক্যবদ্ধ ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করি। ১১ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ’৬৯-এর ১৭ জানুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের জমায়েত অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের বটতলায় এবং পূর্ব ঘোষিত ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হয়। ’৬৯-এর ১৭ জানুয়ারি যে আন্দোলন আমরা শুরু করেছিলাম, ২০ জানুয়ারি শহীদ আসাদের রক্তাক্ত জামা হাতে নিয়ে যে শপথ নিয়েছিলাম, ২৪ জানুয়ারি শহীদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করার মধ্য দিয়ে সেই আন্দোলন সর্বব্যাপী গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করেছিল। ৯ ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানে শপথ দিবসে স্লোগান দিয়েছিলাম ‘শপথ নিলাম শপথ নিলাম মুজিব তোমায় মুক্ত করব; শপথ নিলাম শপথ নিলাম মা-গো তোমায় মুক্ত করব।’ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে ১৫ ফেব্রুয়ারি ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে নির্মমভাবে হত্যা করে সান্ধ্য আইন জারি করা হলে সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করে রাজপথে প্রতিবাদ মিছিল করি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহাকে ১৮ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি সেনারা বেয়নেট চার্জে নির্মমভাবে হত্যা করে পুনরায় সান্ধ্য আইন জারি করলে যথারীতি আমরা সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করে প্রতিবাদ কর্মসূচি অব্যাহত রাখি। ২০ ফেব্রুয়ারি সমগ্র ঢাকা নগরীকে মশাল আর মিছিলের নগরীতে পরিণত করলে স্বৈরশাসক আইয়ুব খান সান্ধ্য আইন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবসে পল্টনের মহাসমুদ্রে প্রিয় নেতা শেখ মুজিবসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আটক সবার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম প্রদান করি। সমগ্র দেশ গণবিস্ফোরণে প্রকম্পিত হয়। জনরোষের ভয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খান সব রাজবন্দিকে নিঃশর্ত মুক্তি দিলে দেশজুড়ে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। প্রিয় নেতাকে কারামুক্ত করার মধ্য দিয়ে শপথ দিবসের স্লোগানের প্রথম অংশ ‘মুজিব তোমায় মুক্ত করব’, এবং ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে হাতিয়ার তুলে নিয়ে যুদ্ধ করে প্রিয় মাতৃভূমিকে হানাদারমুক্ত করে স্লোগানের দ্বিতীয় অংশ ‘মা-গো তোমায় মুক্ত করব’ বাস্তবায়ন করেছিলাম। বস্তুত, ’৬৬-এর ৮ মে গভীর রাতে ৬ দফা কর্মসূচি প্রদানের অভিযোগে দেশরক্ষা আইনে যে মুজিব গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, ৩৩ মাস পর ’৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি যে মুজিব মুক্তিলাভ করেন- নাম বিচারে এক হলেও, বাস্তবে ওই দুই মুজিবের মধ্যে ছিল গুণগত ফারাক। আগরতলা মামলাটি ছিল সমগ্র বাঙালি জাতির জন্য অগ্নিপরীক্ষার মতো। সেই অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি বন্দিদশা থেকে মুক্তমানব হয়ে বেরিয়ে আসেন। ২২ ফেব্রুয়ারি আমরা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিই, প্রিয় নেতা শেখ মুজিবকে সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে গণসংবর্ধনা জানাব। সেই সিদ্ধান্ত অনুসারেই রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ২৩ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৩টায় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে গণসংবর্ধনা সভার আয়োজন করা হয়।

শুরুতেই বলেছি, ২৩ ফেব্রুয়ারি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন। সে দিনের রেসকোর্স ময়দান যারা দেখেননি তাদের বলে বোঝানো যাবে না সেই জনসমুদ্রের কথা। আমরা যখন সেখানে পৌঁছেছি, তখন রেসকোর্স ময়দানে মানুষ আর মানুষ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ট্রেন, বাস, ট্রাক, লঞ্চ-স্টিমার বোঝাই হয়ে রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, কৃষক-শ্রমিক, সাধারণ মানুষ ছুটে এসেছে। ঢাকার মানুষ তো আছেই। অভিভূত হয়ে পড়লাম। এর পূর্বে এতবড় জনসভা দেখিনি। সেই জনসমুদ্রে লাখ লাখ লোক এসেছে প্রিয় নেতা শেখ মুজিবকে একনজর দেখতে। প্রিয় নেতাকে নিয়ে আমরা মঞ্চে উঠলাম। সে দিন সেই মঞ্চে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রেখেছিলেন। চিরাচরিত প্রথা ভঙ্গ করে আগেই সভাপতির ভাষণ দেওয়ার জন্য মঞ্চে দাঁড়িয়ে লাখ লাখ মানুষকে অনুরোধ জানিয়ে বলেছিলাম, ‘সবার শেষে বক্তৃতা করার কথা থাকলেও আপনাদের অনুমতি নিয়ে আমি আগেই বক্তৃতা করতে চাই।’ দশ লক্ষ লোকের সম্মতি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর আগেই বক্তৃতা করি। সে দিন যে ভালোবাসা মানুষের কাছ থেকে পেয়েছি তা বলে বোঝাতে পারব না। বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধুকে ‘তুমি’ সম্বোধন করে বলেছিলাম, ‘প্রিয় নেতা তোমার কাছে আমরা ঋণী, বাঙালি জাতি চিরঋণী। এই ঋণ কোনোদিনই শোধ করতে পারব না। সারা জীবন এই ঋণের বোঝা আমাদের বয়ে চলতে হবে। আজ এই ঋণের বোঝাটাকে একটু হালকা করতে চাই জাতির পক্ষ থেকে তোমাকে একটা উপাধি দিয়ে।’ ১০ লাখ লোক ২০ লাখ হাত তুলে সম্মতি জানিয়েছিল। তখনই ঘোষিত হয়েছিল, ‘যে নেতা তাঁর জীবনের যৌবন কাটিয়েছেন পাকিস্তানের কারাগারে, ফাঁসির মঞ্চে দাড়িয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন, সেই নেতাকে বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞচিত্তে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হলো।’ ১০ লাখ লোক তুমুল করতালির মধ্য দিয়ে এ প্রস্তাব গ্রহণ করে প্রিয় নেতাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে লাখ লাখ কণ্ঠে ধ্বনি তুলেছিল, ‘জয় বঙ্গবন্ধু।’

বাংলাদেশে অনেক আন্দোলন হয়েছে- ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ৬ দফা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ। একেকটি আন্দোলনের একেক রকম চরিত্র্য-বৈশিষ্ট্য ছিল। ’৬৯-এর গণআন্দোলনের বৈশিষ্ট্য এমন ছিল যে, তখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর বিচারের কাজ চলছিল। বঙ্গবন্ধুকে প্রধান আসামি করে আগরতলা মামলা দায়ের করে ’৬৮-এর ১৯ জুন বিচারের কাজ শুরু হয়েছিল এবং বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলাবার জন্য আইয়ুব খান পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। আইয়ুব খানের তথ্য সচিব আলতাফ গওহর ‘আইয়ুব খান’ শিরোনামে একটি বই লিখেছেন। সেই বইয়ে উল্লেখ আছে কীভাবে বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসি দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু ’৬৯-এর গণআন্দোলনের শহীদদের বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগ সেই ষড়যন্ত্রিক প্রচেষ্টাকে সমাধিস্থ করে এবং আসাদ-মতিউর-মকবুল-রুস্তম-আলমগীর-সার্জেন্ট জহুরুল হক-আনোয়ারা-ড. শামসুজ্জোহার জীবনের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির আন্দোলন সফল হয়। জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে নারায়ণগঞ্জের এক জনসভায় দম্ভোক্তি করে আইয়ুব খান বলেছিলেন, তিনি আবার পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হবেন। অথচ ১৭ জানুয়ারি আন্দোলন শুরু হলো, ২০ জানুয়ারি আসাদ শহীদ হলেন, ২৪ জানুয়ারি শহীদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হলে সর্বব্যাপী গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয় এবং সেই আইয়ুব খান এক দিন পরেই বলেছেন ‘আমি আর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব না।’ একটি আন্দোলন ৭ দিনের মধ্যে গণঅভ্যুত্থানে রূপান্তরিত হয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে, ছাত্র সমাজের নেতৃত্বে! এর তুলনা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। যে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আজকের এই স্বাধীন বাংলাদেশ, যাদের রক্ত ঋণে গোটা জাতি ঋণী, তাদের সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাতে ভোলায় নিজ গ্রামে ‘স্বাধীনতা জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠা করেছি। সেই জাদুঘরে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে শহীদ সালাম-বরকত-রফিক-জব্বারের স্মৃতি, মহান ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ৬ দফা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণআন্দোলন, শহীদদের স্মৃতিচিহ্ন, ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জাতির পিতার দুর্লভ সব আলোকচিত্র সেখানে স্থান পেয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আজ আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক। এই বাংলাদেশের স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন। তিনি ছিলেন বিশ্ববরেণ্য মহান নেতা। তার কোনো তুলনা হয় না। তিনি জন্মেছিলেন বলেই আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। তিনি যদি না জন্মাতেন আমরা আজও পাকিস্তানের দাসত্বের নিগড়ে আবদ্ধ থাকতাম। সেই মহান নেতা তাঁর জীবদ্দশায় সবসময় এই দিনগুলোর কথা সংবাদপত্রে বাণী, বিবৃতি দিয়ে শহীদদের কথা সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করতেন। কেননা, তিনি জানতেন ৬ দফা আন্দোলন না হলে ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান হতো না; ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান না হলে বঙ্গবন্ধুকে কারাগার থেকে মুক্ত করতে পারতাম না; বঙ্গবন্ধু কারাগার থেকে মুক্ত না হলে ’৭০-এর নির্বাচনে পাকিস্তানে আমরা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারতাম না; আর পাকিস্তানে যদি আমরা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারতাম, তাহলে ৯ মাস যুদ্ধ করে এই দেশ স্বাধীন করতে পারতাম না। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছাত্রসমাজের যে ভূমিকা তা গৌরবোজ্জ্বল।

বছর ঘুরে এমন একটি মধুর দিন, যখন ফিরে আসে হৃদয়ের মানসপটে কত স্মৃতি ভেসে ওঠে। আমরা সংখ্যাসাম্যের বিরুদ্ধে সংখ্যাগুরুর অবস্থান থেকে ‘এক মাথা এক ভোটে’র দাবি তুলে তা আদায় করেছিলাম। ফলত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে সংখ্যাধিক্য আসন আমরা লাভ করেছিলাম। এ দিনের প্রতিটি মুহূর্তে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে মনে পড়ে। সে দিন বক্তৃতায় আরও বলেছিলাম, ‘৬ দফা ও ১১ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের রক্তের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে আমরা ফিরে পেয়েছি। তাদের সে রক্ত যেন বৃথা না যায়, তার জন্য জোরদার আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানাই। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্রসহ সকল মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য এই আন্দোলন শুরু হয়েছে।’ বক্তৃতা শেষ করে ঘোষণা করেছিলাম, ‘এখন বক্তৃতা করবেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব।’ তুমুল করতালির মধ্যে তিনি বক্তৃতা করতে দাঁড়ালেন। চারদিকে তাকিয়ে উত্তাল জনসমুদ্রের উদ্দেশে বললেন, “রাতের অন্ধকারে সান্ধ্য আইনের কঠিন বেড়াজাল ছিন্ন করে যে মানুষ ‘মুজিবকে ফিরিয়ে আনতে হবে’ বলে আওয়াজ তুলে গুলির আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে তাদের দাবির সঙ্গে আমি বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না।” সংগ্রামী ছাত্র সমাজকে আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি ছাত্রদের ১১ দফা শুধু সমর্থনই করি না, এর জন্য আন্দোলন করে আমি পুনরায় কারাবরণে রাজি আছি। ছাত্রদের ১১ দফার মধ্যে আমার ৬ দফা দাবিও নিহিত রয়েছে। আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন। আমি যদি এ দেশের মুক্তি আনতে ও জনগণের দাবি আদায় করতে না পারি, তবে আন্দোলন করে আবার কারাগারে যাব।’ সে দিন বঙ্গবন্ধু আরও বলেছিলেন, ‘আমি গোলটেবিল বৈঠকে যাব, সেখানে আমার ৬ দফাও পেশ করব, ১১ দফাও পেশ করব।’ তিনি জীবদ্দশায় কোনোদিন ১১ দফার কথা ভুলেননি। তাঁর বক্তৃতায় সবসময় ’৬৯-এর গণআন্দোলনের কথা থাকত। এমনকি ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে আছে, ‘১৯৬৯-এর আন্দোলনে আইয়ুব খানের পতন হওয়ার পরে যখন ইয়াহিয়া খান সাহেব সরকার নিলেন, তিনি বললেন, দেশে শাসনতন্ত্র দেবেন, গণতন্ত্র দেবেন, আমরা মেনে নিলাম।’ পরিশেষে স্বভাবসুলভ কণ্ঠে কৃতজ্ঞস্বরে বলেছিলেন, ‘ভাইয়েরা আমার, তোমরা যারা রক্ত দিয়ে, জীবন দিয়ে আমাকে কারাগার থেকে মুক্ত করেছ, যদি কোনোদিন পারি নিজের রক্ত দিয়ে আমি সেই রক্তের ঋণ শোধ করে যাব।’ তিনি একা রক্ত দেননি-’৭৫-এর ১৫ আগস্ট সপরিবারে রক্ত দিয়ে বাঙালি জাতির রক্তের ঋণ তিনি শোধ করে গেছেন। বাঙালি জাতির ইতিহাসে ২৩ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ দিন। যতদিন বেঁচে থাকব হৃদয়ের গভীরে লালিত এ দিনটিকে স্মরণ করব।

লেখক: সদস্য, উপদেষ্টা পরিষদ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ; সংসদ সদস্য; বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ।


ইসলামের আলোকে সালামের মাসায়ালা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
আতিকুল ইসলাম খান

আগে সালাম পরে কালাম। আল্লাহর একটি গুণবাচক নাম হচ্ছে সালাম, যার অর্থ শান্তি। এই নাম জপ করলে আল্লাহর পক্ষ হতে শারীরিক মানসিক শান্তি ও নিরাপত্তা পাওয়া যায়। সৃষ্টির শুরু থেকেই সালামের প্রচলন। আবু হুরায়রা (রহ.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন; মহান সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি, পৃথিবীর প্রথম মানুষ, প্রথম নবী এবং আমাদের আদি পিতা হজরত আদম (আ.)কে সৃষ্টি করে প্রথমেই আদেশ করেছিলেন, হে আমার আদম! ফেরেশতাদেরকে সালাম প্রদান কর এবং ভালো করে মনোযোগ দিয়ে শুনে আস তারা কিভাবে সালামের প্রতিউত্তর প্রদান করে। কেননা, পরবর্তীতে তোমার বংশধরদের জন্য এই সালামই হবে অভিবাদন বা সম্ভাষণ। ইসলামী অভিবাদক হচ্ছে সালাম। হজরত আদম (আ.) আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতাদের বললেন- আস্‌সালামু আলাইকুম, ফেরেশতারা প্রতিউত্তরে বললেন- ওয়ালাই কুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, অর্থাৎ হে আদম তোমার ওপর আল্লাহর পক্ষ হতে শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক। মূলত আমরা যদি আদম (আ.)-এর সন্তান হয়ে থাকি, তাহলে অবশ্যই সালামের প্রতি আমাদের বিদ্বেষ থাকবে না। মুসলমানরা শান্তিকামী, তাই মুসলিমদের কাউকে দেখলে প্রথমেই সালাম প্রদান করা। সালাম দেওয়া সুন্নত কিন্তু সালামের জওয়াব দেওয়া ওয়াজিব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন; যারা আল্লাহর প্রিয় বন্দা তারাই আগে সালাম দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্থান-কাল-পাত্র এবং শ্রেণি বিবেচনা না করে মুসলমানদের সর্বদা আগে সালাম দিতেন। সালামে আল্লাহর কথা স্মরণ হয় এবং সম্প্রীতি প্রকাশ পায়। সালাম মুসলিমের জন্য সর্বোত্তম দোয়া। তা ছাড়া সালাম হচ্ছে এক মুসলমান আরেক মুসলমানের সামাজিক শান্তির চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া। একজন মুসলিমের চুক্তি হলো আমার হাত ও মুখ দ্বারা আপনি কোনো কষ্ট পাবেন না, এই চুক্তি সামাজিকভাবে প্রচলিত হলে শান্তি ভঙ্গকারী শয়তান এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাবে, কারণ শয়তান ঐক্যবদ্ধতা পছন্দ করে না। সুরা আনআম- (৫৪) নং আয়াতে রাসুলকে সম্বোধন করে এই শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যে, দেখা হলে সালাম আর খালি ঘরে প্রবেশ করার আগে বলতে হবে আস্‌সালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল বাইত। সালাম আরবি শব্দ। এর অর্থ শান্তি, প্রশান্তি, শুভকামনা, কল্যাণের দোয়া, তাছাড়া সালাম একটি সম্মানজনক অভ্যর্থনামূলক অভিনন্দন এবং ব্যাপক উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন পরিপূর্ণ ইসলামী অভিবাদন। সালাম আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের অন্যতম, সুরা হাশর, আয়াত নং-২৪।

মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে বড় হাদিয়া হচ্ছে সালাম। সুরা নিসা, আয়াত (৮৬)। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা এরশাদ করেন; তোমাকে যতটুকু সালাম প্রদান করা হয় প্রতিউত্তরে তারচেয়ে বেশি করে বাড়িয়ে সালামের জবাব দাও। কেউ যদি বলে, আস্‌সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, সালামদাতার এতটুকু বলাই সুন্নত, এর বেশি না। অর্থাৎ তোমার ওপর আল্লাহর পক্ষ হতে শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক। প্রতিউত্তরে বলতে হবে, ওয়াআলাই কুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ, অর্থাৎ আল্লাহর পক্ষ হতে তোমাকেও শান্তি, রহমত ও বারাকা দান করুন। প্রতিউত্তরে বাড়িয়ে বারাকাতুহ- এ পর্যন্তই বলা সুন্নত, কিন্তু সওয়াবের আশায় এর বেশি বাড়িয়ে বলা যাবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, সালামদাতা প্রথম কথায় পেল বিশ নেকি আর সালামের উত্তরদাতা পেল ত্রিশ নেকি, সুবহান আল্লাহ! মুসলমানদের জন্য এর চেয়ে বড় হাদিয়া আর কি হতে পারে। দেখা হলেই দোয়া। সব অবস্থায় সালাম দেওয়া জায়েজ শুধু টয়লেট ও নামাজরত অবস্থায় ব্যতীত। তবে নামাজের শেষে সালামের জবাব দিতে পারবে। আমাদের সমাজে একশ্রেণির মানুষ আছেন, যারা পায়ে ধরে সালাম করাকে বেশি আদব মনে করেন। তাদের ধারণাই নেই যে, সালাম হবে মুখে, পায়ে নয়। এটা বিজাতীয় প্রথা যা অজ্ঞতাবশত ইসলামে ঢুকে গেছে। যার ফলে মুসলমান একদিকে সওয়াব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অন্যদিকে বেদায়াত করছে। এটি পরিত্যাগ করে সঠিক পন্থায় সালামের প্রচলন চালু করতে হবে।

শয়তানের শয়তানি-

শয়তানের সহজ প্ররোচনা হলো সালামে ভেদাভেদ সৃষ্টি করে ছোট্ট একটা হিংসার বীজ বপন করা। সুরা আরাফে উল্লেখ আছে, শয়তান আল্লাহর কাছে ওয়াদা করেছিল যে, এই আদমের জন্য আমি জান্নাত থেকে বহিষ্কৃত হয়েছি। আয় আল্লাহ! আপনার বড়ত্বের কসম, আমি আদম জাতিকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সব ভালো কাজ থেকে গাফেল করে রাখব। মহান পরাক্রমশালী আল্লাহ! শয়তানের এই চ্যালেঞ্জের মুখে মুমিনদের জন্য দান করেছেন অজস্র নিয়ামত। সুবহানাল্লাহ! শয়তান কাউকে বাধ্য করে না, তবে শয়তানের কাজ হলো সুন্দর করে মানুষের চিন্তাধারায় বড়ত্ব সৃষ্টি করে তার ব্যক্তিত্বে অহংকার ঢুকিয়ে দেওয়া। শয়তানের ধোঁকায় পড়া মানুষগুলোই তার চারপাশের মানুষকে সম্মান দিতে পারে না। অথচ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন বলতে ব্যবহারে পরিবেশ-পরিস্থিতির সামঞ্জস্য রক্ষা করাকে বোঝায়। একজন যাত্রী রিকশাওয়ালাকে সালাম দিবে- এতে সালামদাতার ব্যক্তিত্ব কমবে না বরং তার ব্যক্তিত্ব আরও দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেবেন আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা।

হাদিসে এসেছে প্রথম সালামদাতা অহংকারমুক্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন; যার অন্ততে একটি সরিষা দানা পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পরবে না। সুতরাং প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত অহংকার নামক মারাত্মক ব্যাধি থেকে বাঁচার জন্য সালামের প্রতিযোগিতা করা। আল্লাহর পছন্দনীয় বান্দারাই সালামের মতো মহৎ গুণে অভ্যস্ত। তাই শয়তানের শয়তানি হলো মানুষকে অহংকারী বানিয়ে ইসলামের মৌলিক শিক্ষাগুলোকে বিকৃতভাষ্য হিসেবে প্রচলিত করে মানুষকে ইসলামের আদর্শ থেকে বঞ্চিত রাখা। কথিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.)কে একদিন এক ইহুদি বলেছিল, হে মুহাম্মদ! আসামু আালাইকা অর্থাৎ হে মোহাম্মদ তুমি ধ্বংস হও, প্রতিউত্তরে নবীজি (সা.) বলেছিলেন; ওয়া লাইকুম অর্থাৎ তুমি আমাকে যা দিলে আমি তোমাকে তাই দিলাম। সুতরাং শয়তানের শয়তানি থেকে বেঁচে থাকতে হলে ইসলামের সত্যটা জেনে-বুঝে মানতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন; অমুসলিমদের সালাম দেওয়া যাবে না, তবে তাদেরকে অভিবাদন জানাতে হবে দুনিয়ার কোনো প্রচলিত ভাষায়। কোনো মজলিসে, মুসলিম, মুশরিক, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মূর্তিপূজারি একাধিক ধর্মের মানুষ একসঙ্গে বসা থাকলে সালাম দেওয়া যাবে, কেননা অসম্মানজনক কাজ ইসলামে নেই। সুতরাং অমুসলিমদের সালামের জওয়াবে বলতে হবে ওয়া লাইকুম।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসে সালামের চারটি গুণের কথা বলা হয়েছে– শান্তি, রহমত, বরকত ও অন্তরে ভালোবাসা পয়দা। যে পরিবারে সালামের প্রচলন থাকবে, সে ঘরে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা শান্তি, রহমত ও বরকতে ভরিয়ে দেবেন এবং যে সালাম দেবে তার হেফাজতকারী হয়ে যান আল্লাহ তায়ালা। যে সন্তান বাবা-মাকে সালাম দেবে এবং বাবা-মায়ের সালামের প্রতিউত্তরের মাধ্যমে যে সওয়ার পাবে, সেই সন্তান কোনো দিন বিপথগামী হবে না। যে সংসারে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সালাম আদান-প্রদানের প্রচলন থাকবে, সে সংসারে কোনো দিন অনিষ্টকারী শয়তান কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। শয়তানের সবচেয়ে গর্বিত কাজ হলো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানো। এতে শয়তান তাদের নেতার পক্ষ হতে পুরস্কৃত হয়। সুতরাং সালাম বিচ্ছেদ নয় বরং ঐক্যবদ্ধ করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কেউ যদি দূর থেকে সালাম পাঠায়, তাহলে তোমরা তার প্রতিউত্তরে বলবে, ওয়া আলাইকা ওয়া আলাইহি সালাম। সুরা নুর, আয়াত (২৭)। বলা হয়েছে, হে মুমিনগণ তোমরা নিজেদের ঘর ছাড়া অন্য কারও ঘরে কখনো প্রবেশ করবে না- যে পর্যন্ত তাদের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় এবং সালাম দিয়ে তাদের অনুমতি ব্যতীত। তিনবার সালাম দেবে ভেতর থেকে সাড়া না এলে ভদ্রভাবে চলে আসবে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা শেষ বিচারের দিন জান্নাতিদের প্রথম অভিবাদন জানাবেন সালামের মাধ্যমে। সালামুন কওলাম মির রব্বির রহিম- অর্থাৎ দয়ালু রবের পক্ষ হতে তোমাদের জন্য সালাম। আল্লাহু আকবার! জান্নাতে আর কোনো আমল ও ইবাদত নেই, আছে শুধু সালাম আর সালাম, শান্তি আর শান্তি।

সালামে আধুনিকতার কুফল-

আমাদের সমাজে ইংরেজি শিক্ষার হার বেড়ে যাওয়ায় অধিকাংশ মানুষ সালামের পরিবর্তে হ্যালো ব্যবহার করে আর সালামকে সংক্ষিপ্ত করে বলে আসামু আলাইকা বা স্লা-মালিকুম আর প্রতিউত্তরে বলে আলাইকুম। সুতরাং তুমি যা আমিও তা। সালামের এই অশুদ্ধ উচ্চারণের প্রতিফলনে মানুষ শান্তি-শৃঙ্খলা ও রহমত-বরকত থেকে বঞ্চিত হয়ে অভিশাপ নিয়ে এক ধরনের বিষণ্ন মাতালের মতো জীবন যাপন করছে। অথচ এসব তাদেরই চাওয়া থেকে পাওয়া। তারা যা শোনে তাই বলে, আসলেই তারা জানে না, হ্যালো মানে- জাহান্নামি আর আসামু আলাইকা অথবা স্লা-মালিকুম মানে– তুমি মরে, তুমি ধ্বংস হও। স্মার্ট হওয়া ভালো তবে অতিরঞ্জিত কোনো কিছুই ভালো না। ইংরেজি ভাষা হচ্ছে মডার্ন আর আরবি হলো সুন্নাহ। সুতরাং কল্যাণের স্বার্থে ভাষার ব্যবহার প্রযোজ্য তবে, ইসলাম পরিপন্থী বিকৃত ভাষা মুসলমানদের পরিহার করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা মধ্যমপন্থা অবলম্বন কর, তাতেই কল্যাণ।

বিশ্বনবী রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, চারটি গুণ যার মধ্যে বিদ্যমান থাকবে, সে নিরাপদে জান্নাতে যেতে পারবে।

১) যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার আসায় সঠিকভাবে সালামের প্রচার-প্রসার ও আদান-প্রদান করবে, সে নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

২) যে ব্যক্তি কোনো ক্ষুধার্তকে খাবার খাওয়াবে, সে নিরাপদে জান্নাতে যাবে।

৩) যে মুসলিম আত্মীয়তার সম্পর্ক সঠিকভাবে রক্ষা করবে, সে ব্যক্তি নিরাপদে জান্নাতে যাবে।

৪) পৃথিবীর মানুষ যখন ঘুমে বিভোর থাকে, তখন যে ব্যক্তি আরামের ঘুম ত্যাগ করে কিয়ামুল লাইল আদায় করে, সে নিরাপদে জান্নাতে যাবে।

সালামের ব্যাপারে বৈষম্য-

এই উচ্চশিক্ষার জ্ঞান গরিমা ও অর্থবিত্তের সমাজে অধিকাংশ মানুষ মনে করে থাকে যে, আমিই কেবল সালাম পাওয়ার যোগ্য, আমাকে সবাই সালাম দেবে। এ ধারণাটা ভুল। বিশ্ব নবী রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনী থেকে জানা যায় তিনি দু-জাহানের বাদশা হয়েও বয়সে ছোট-বড় এবং অধীনস্থদের সর্বদায়ই আগে সালাম দিতেন। সুতরাং উম্মতে মুহাম্মদির উচিত ধনী-গরিব ঘরে বাইরে উপরস্থ-অধিনস্থ সবাইকে আগে সালাম দেওয়ার প্রতিযোগিতা করা। আখেরি নবী হজরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কত অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করে পৃথিবীতে সালাম প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছেন, আর আমরা কিনা তাঁর উম্মত হয়ে শয়তানের উপাসনা করছি। প্রথমত শয়তানের কাজ হলো মানুষের অন্তরে হিংসা নামক ভাইরাস সংক্রামিত করে সব অন্তরজুড়ে হিংসা ছড়িয়ে দেওয়া। আর এই হিংসা-প্রতিহিংসা নিরাময়ের ভ্যাকসিন হলো সালাম। সুবহান আল্লাহ!

তাই তো আমাদের প্রিয় নবীজি (সা.) বলেছেন, তোমরা তোমাদের সমাজে সালামের প্রচার-প্রসার বাড়িয়ে দাও। দেখবে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তোমাদের জীবনকে শান্তি, রহমত, বরকত, নিরাপত্তা ও ভালোবাসা দিয়ে পূর্ণ করে দেবেন। আয় আল্লাহ! আমাদেরকে ব্যাপকভাবে সালাম বিনিময় করার তৌফিক দান করুন। জাজাকাল্লাহ খয়ের

‘ইনশা আল্লাহ’

লেখক: ইসলামী চিন্তাবিদ


বাংলা ভাষার বিকৃতি ও দূষণ

আপডেটেড ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ ১৩:১১
এস ডি সুব্রত

রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের বাংলা ভাষা। এ ভাষার জন্য দিতে হয়েছে প্রাণ। বাংলা একটি সমৃদ্ধ এবং শ্রুতিমধুর ভাষা। মাতৃভাষার জন্য জীবনদানের ইতিহাস বিশ্বে বিরল। আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত ভাষাকে আমরা অবজ্ঞা করে চলেছি যেন অবলীলায়। আধুনিকতার দোহাই দিয়ে কতিপয় মানুষ বাংলা ভাষাকে বিকৃত করে চলছে। ভাষাদূষণ যেন এখন বায়ুদূষণের মতো একটা স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভাষাদূষণের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ শব্দ প্রয়োগের মাধ্যমে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু ট্রলমার্কা শব্দ ও বিনোদনধর্মী বিকৃত ভিডিওতে এ দূষণ লক্ষণীয়।

দুঃখজনক হলেও সত্য- এসব বিকৃত শব্দ ও ভিডিও জনপ্রিয়তা অর্জন করছে দ্রুত, যার ফলে ভাষার দূষণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

যথাযোগ্য ব্যবহার, চর্চা আর সর্বজনীনতার ওপর ভাষার সমৃদ্ধি অনেকাংশে নির্ভরশীল। সমৃদ্ধি না ঘটলে ভাষা দীন হতে থাকে, এক সময় বিলুপ্তি ঘটে। পৃথিবীতে ভাষার মৃত্যু বা বিলুপ্তির এ রূপ অনেক উদাহরণ আছে। ভাষা দীন-দুর্বল হয়ে যাওয়ার নানাবিধ কারণও রয়েছে। এর মধ্যে আছে বিকৃতিসাধন, রূপান্তর, ভাষার ব্যবহারে অসচেতনতা, অপব্যবহার প্রভৃতি। বিশ্বায়ন, আকাশ সংস্কৃতি, ডিজিটালাইজেশনের কারণে ইংরেজির অধিক ব্যবহারের প্রভাবে মাতৃভাষা প্রবহমানতা হারাচ্ছে। তার ওপর আছে বিদেশি ভাষার আগ্রাসন। ইদানীং টিভি চ্যানেল চালু করলেই শোনা যায়- ‘হ্যালো লিসেনার্স’, ‘হ্যালো ভিউয়ার্স’।

তরুণদের মুখে মুখে ‘আবার জিগায়, বেইল নাই’ ইত্যাদি জাতীয় ভাষার ব্যবহার। আবার নাটকের নামের ক্ষেত্রে দেখা যায় ‘হাউসফুল’, ‘বাংলা টিচার ইংরেজি এবং ইংরেজি বাংলা না বেশ ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রায়ই দেখা যায় তরুণ প্রজন্মের অনেকে যে ভাষা ব্যবহার করছে তা না-আঞ্চলিক, না-প্রমিত। তারা মামাকে ‘মাম্মা’; আবার বন্ধু কিংবা বাসচালককেও মাম্মা বলে সম্বোধন করছে।

ভাষাবিদদের মতে, এভাবেই বাংলা ভাষার সঙ্গে ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, ফারসির মিশ্রণ চলছে। আধুনিকতার দোহাই দিয়ে এরকম নানা শব্দ ঢুকে বাংলা ভাষাকে দূষিত করছে, বিকৃত করছে। গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন, নাটক বা চলচ্চিত্রে এরকম ভাষার ব্যবহার মূল ভাষায় প্রভাব ফেলছে।

বাংলা ভাষার দূষণ ও বিকৃতি রোধে হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও ভাষা বিকৃতির নতুন ক্ষেত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, টুইটার। হাইকোর্টই সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর আদেশ ‘২০১৪ এবং রয়েছে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন-১৯৮৭সহ সরকারি অনেক বিধিনিষেধ; কিন্তু ওইসব আদেশ, আইন ও বিধিনিষেধের বাস্তবায়ন নেই। সর্বত্র বাংলা ভাষার দূষণ চলছেই। সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহারের আদেশও উপেক্ষিত। বিষয়গুলো নিয়ে হাইকোর্টের বিচারপতি, শিক্ষাবিদসহ নানা মহল উদ্বিগ্ন হলেও বিষয়টি দিন দিন উপেক্ষিত হচ্ছে।

একদা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলামের ‘ভাষাদূষণ নদীদূষণের মতোই বিধ্বংসী’ শীর্ষক একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছিল একটা জাতীয় দৈনিকে। সেখানে বলা হয়ছিল ‘ভাষার মাসে বাংলা ভাষার সাম্প্রতিক চর্চা আমাদের ভাবায়। শুদ্ধবাদীরা শঙ্কিত হন, বাংলা ভাষা তার রূপ হারিয়ে কোনো শংকর ভাষায় রূপ নেয়, তা ভেবে।’ ওই লেখায় আরও বলা হয়েছিল, ‘ভাষাকে নদীর সঙ্গে তুলনা করি; কিন্তু এই ভাষানদীকে আমরা যে দূষিত করছি প্রতিদিন, তা নিয়ে কি ভাবী?’ ওই লেখাটি আমলে নিয়ে তৎকালীন হাইকোর্টের বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিতভাবে বেশ কয়েক দফা নির্দেশনা দেন। একই সঙ্গে রেডিও ও টেলিভিশনে ‘বিকৃত উচ্চারণে’ এবং ‘ভাষা ব্যঙ্গ’ করে কোনো ধরনের অনুষ্ঠান প্রচার না করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ওই আদেশে আদালত বলেন, বাংলা ভাষার পবিত্রতা রক্ষা করতে সর্বতোভাবে চেষ্টা করতে হবে। এই ভাষার প্রতি আর কোনো আঘাত যাতে না আসে, সে বিষয়ে সচেষ্ট হতে হবে। এ ছাড়া আদালত, বাংলা ভাষার দূষণ, বিকৃত উচ্চারণ, ভিন্ন ভাষার সুরে বাংলা কথন, সঠিক শব্দ চয়ন না করা এবং বাংলা ভাষার অবক্ষয় রোধে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে সে বিষয়ে বাংলা একাডেমির তৎকালীন সভাপতি অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছিল

ওই কমিটি ৯ দফা সুপারিশও করেছিল।

সুপারিশে বলা হয়েছিল ভাষাদূষণ রোধে আইন তৈরি করে বিদেশি টেলিভিশন চ্যানেল এবং দেশি বেতার ও টেলিভিশন নিয়ন্ত্রণ; বিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলকভাবে প্রমিত বাংলা ভাষার একটি কোর্স চালু এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পঠন-পাঠন প্রবর্তনের উদ্যোগ; বেতার ও টেলিভিশনে প্রমিত বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত এবং ভাষায় বিদেশি শব্দের অকারণ মিশ্রণ দূর করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ; সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভাষার বিকার ও দূষণ রোধে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস রেগুলেটরি কমিশনের ব্যবস্থা গ্রহণ; বেতার ও টেলিভিশনে ভাষাদূষণ রোধ। সুপারিশে আরও বলা হয়, প্রমিত বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য তথ্য মন্ত্রণালয়কে একটি স্থায়ী কমিটি গঠন করতে হবে। ওই কমিটি বেতার ও টেলিভিশনে প্রচারিত অনুষ্ঠান পরিবীক্ষণ করে মতামত, উপদেশ ও নির্দেশ প্রদান করবে। এ ছাড়া মোবাইল ফোনের কলার টিউনে বাংলা ছাড়া অন্য ভাষার ব্যবহার নিরুৎসাহ করার এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে বলা হয়েছিল; কিন্তু বিশেষজ্ঞ কমিটির ওই সুপারিশ হাইকোর্টে ফাইলবন্দি অবস্থায় পড়ে থাকে। এ ছাড়া রাজধানীসহ সারা দেশে বড় বড় শহরে বিলবোর্ডের ভাষায় রয়েছে ইংরেজি-বাংলার মিশ্রণ। অথচ এক রিটে ২০১৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার, গাড়ির নম্বরপ্লেট ও বিভিন্ন দপ্তরের নামফলকে বাংলা ব্যবহার করতে বলা হলেও তা যথাযথভাবে পালন হচ্ছে না।

ভাষাদূষণ ও সর্বস্তরে প্রচলনের ব্যাপারে ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ভাষার বিকৃতি ও দূষণ চলছে বহুদিন ধরে। এটি চলতে থাকবে যতদিন ভাষা বিপ্লব না হয়। এর মূল কারণ ইংরেজি ভাষায় শিক্ষিত হয়ে দেশ শাসন করছি, নিজ ভাষা অবহেলিত হচ্ছে। বিষয়কে একটি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে সমাধানের চেষ্টা না করা পর্যন্ত দূষণ বিকৃতি চলতেই থাকবে। আর সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন সম্ভব। তিনি বলেন ইউরোপের দেশ-চীন-জাপানের দিকে খেয়াল করুন, তারা সেটা করতে পেরেছে। চীন-জাপানের ভাষা প্রাগৈতিহাসিক চিত্রলিপির বর্ণমালা। ওই বর্ণমালা দিয়ে যদি আণবিকশক্তি গবেষণা, মহাকাশ গবেষণা সম্ভব হয়, আমরা কেন পারব না? এর জন্য সদিচ্ছা দরকার। শাসনযন্ত্র, শিক্ষিত-সুধীসমাজ যতক্ষণ মাতৃভাষা গ্রহণ না করবে, মাতৃভাষাকে প্রাধান্য না দেবে, ততক্ষণ সর্বস্তরে বাংলা প্রচলন সম্ভব হবে না। ভাষাবিদ অধ্যাপক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, আদালত শুধু নির্দেশনাই দিতে পারেন; কিন্তু সেটি বাস্তবায়নের সঙ্গে অনেক প্রতিষ্ঠান জড়িত। ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে ওইসব প্রতিষ্ঠান সচেতন না হলে আদালতের আদেশ তো উপেক্ষিত থাকবেই।

মিডিয়ার ভাষা নামে যে জগাখিচুড়ি ভাষা চালু করেছে, তাতে ভাষার বিকৃতি হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা ইংরেজি থেকে বিশেষ্যগুলো গ্রহণ করব। যেমন- থার্মমিটার, প্রেশারকুকার ইত্যাদি। এগুলোর বিকল্প নেই। তবে বিশেষণ ও ক্রিয়াপদগুলো কেন ইংরেজির হাতে তুলে দেব। অধ্যাপক মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, নিয়মনীতির চেয়ে বড় প্রয়োজন ভাষানীতি। এ ছাড়া দরকার নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ।

ইদানীং আরও দেখা যায়, কখনো কোনো মত যদি কারও বিপক্ষে চলে যায় তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশ্লীল ভাষায় প্রতি-উত্তর দেওয়া , গালাগালি করা যেন একটা স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবাদের ভাষা মার্জিত হলে ক্ষতি নেই। এসব বিষয় দেখার জন্য নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন‌। আমাদের মাতৃভাষার দূষণরোধে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে। সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। ভাষার দূষণ রোধে সুনির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আইন প্রয়োগের বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। আসুন রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের বাংলা ভাষাকে দূষণমুক্ত করতে সবাই যে যার দায়িত্ব পালন করি। মায়ের মতো মায়ের ভাষাকে যথাযথ সম্মান করি। মাতৃভাষার মর্যাদাকে সমুন্নত করতে আসুন সবাই তৎপর হই।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক


একুশের বইমেলা: উদ্যোক্তা, প্রকাশক ও ক্রেতার অর্থনীতি

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ড. মিহির কুমার রায়

এখন চলছে ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি যা শীত-বসন্তে অনুষ্ঠিত হয় এবং এই মাসের অন্যতম আকর্ষণ বইমেলা যার আয়োজক বাংলা একাডেমি। এ বছরের বইমেলার প্রতিপাদ্য হচ্ছে- ‘পড়বো বই, গড়বো দেশ: বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ।’ এই মাসের প্রথম দিন পহেলা ফেব্রুয়ারি। রাজধানীর বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে মাসব্যাপী এ আয়োজনের উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষার জন্য যারা জীবন দিয়েছেন তাদের ত্যাগকে জাগরূক রাখতে এই মেলার নামকরণ করা হয় ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’। সে কারণে পুরো ফেব্রুয়ারি মাস ধরে এর আয়োজন। ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জনপ্রিয়। প্রকাশক চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের বটতলায় কলকাতা থেকে আনা কিছু বই নিয়ে মেলার সূচনা করেন। চিত্তরঞ্জন সাহার মুক্তধারা প্রকাশনী ইতোমধ্যে বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনী হিসেবে সুনাম অর্জন করেছে, তার দেখাদেখি অন্যরাও উৎসাহী হন। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত স্বল্পপরিসরে মেলা চলতে থাকে, ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক বাংলা একাডেমিকে বইমেলার সঙ্গে সমন্বিত করেন। তারই উদ্যোগে ১৯৭৯ সাল থেকে বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি বইমেলার ব্যবস্থাপনায় অংশীদার হয়ে ওঠে, ১৯৮৩ সালে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কাজী মনজুরে মওলা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বইমেলার আয়োজনের দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু এরশাদবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের তোড়ে সে বছর মেলা অনুষ্ঠিত হয়নি, ১৯৮৪ সাল থেকে পুরো উদ্যমে মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে এবং বাংলা একাডেমি চত্বরে জায়গা না হওয়ায় ২০১৪ সাল থেকে বইমেলা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়েছে। একাডেমি প্রাঙ্গণে ১২০টি প্রতিষ্ঠান ১৭৩টি ইউনিট এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৫১৫টি প্রতিষ্ঠান ৭৬৪টি ইউনিট বরাদ্দ পেয়েছে। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে একটি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৩৬টি প্যাভিলিয়ন থাকছে। এবার বইমেলার আঙ্গিকগত ও বিন্যাসে পরিবর্তন আনা হয়েছে, বিশেষ করে মেট্রোরেল স্টেশনের অবস্থানগত কারণে গতবারের মূল প্রবেশপথ এবার একটু সরিয়ে বাংলা একাডেমির মূল প্রবেশপথের উল্টো দিকে অর্থাৎ মন্দির গেটটি মূল প্রবেশপথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এখন আসা যাক- এই মেলাকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিপ্রকৃতি নিয়ে যা এই প্রবন্ধের মূল বিষয়। উল্লেখ্য, বইমেলাকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর জানুয়ারি মাসের শুরুতেই নতুন বই নিয়ে লেখক, পাঠক ও প্রকাশক মহলে গুঞ্জন ওঠে। এই সময় দেশবরেণ্য লেখকদ্বয়ের নতুন বই প্রকাশিত হয়, বইমেলাকে কেন্দ্র করে লেখকের প্রত্যাশা থাকে পাঠককে নতুন বই উপহার দেওয়ার, পাঠকও প্রিয় লেখকের নতুন পাঠের অধিক আগ্রহে থাকে, তাই অমর একুশে বইমেলাকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর অসংখ্য নতুন বই প্রকাশিত হয়, মেলায় অংশগ্রহণ করেন উদ্যোক্তা সংস্থা, লেখক-লেখিকা, পাঠক ও প্রকাশক যার সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি যোগসূত্র রয়েছে। এসব অংশীদারের নিজস্ব একটা ব্যবসায়িক দিক রয়েছে শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার অন্তরালে। এবার বাংলা একাডেমি যে ৬৩৫টি প্রতিষ্ঠানকে ৯৩৭টি ইউনিট বরাদ্দ দিয়েছে তা থেকে প্রাপ্তি কত সে প্রশ্নটি আসাই প্রাসঙ্গিক অর্থাৎ এই প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব আয় কত হয়েছে তা জানা না গেলেও অঙ্কটি যে অর্ধ কোটি কিংবা তার বেশি যে হবে এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। এই রাজস্ব আয়ের খাতটি বাংলা একাডেমির মতো একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার জন্য খুবই প্রয়োজনীয় সার্বিক দিকের উন্নয়নের বিবেচনায়। এ ছাড়া এই বাড়তি আয় সরকারের রাজস্ব আয়ের ভাণ্ডারে আরও একটি নতুন সংযোজন। আবার যারা স্টল বরাদ্দ নিয়ে তাদের বই প্রদর্শনের আয়োজন করে বিক্রয়ের উদ্দেশে যার মধ্যে রয়েছে পূর্বে আলোচিত প্রকাশক, লেখক, ব্যবসায়ী যাদেরও দিন শেষে আয়-ব্যয়ের একটি হিসাব রাখতে হয় এ মেলাকে ঘিরে। এ বইমেলা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে যার সঙ্গে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা জড়িত তথা বেকারত্বের অবসান ঘটায়। সেই হিসাবে একুশে বইমেলা বই বিক্রেতা, প্রকাশক, ছাপাখানা, বই বাইন্ডিং ইত্যাদি খাতের সঙ্গে জড়িতদেরও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করে। একটি বইকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে থাকে অনেক মানুষের অবদান যেমন- প্রথমত লেখক লেখেন, কম্পোজিটর হাতের লেখাকে কম্পিউটারে কম্পোজ করেন, প্রচ্ছদশিল্পী বইয়ের চরিত্র অনুযায়ী প্রচ্ছদ আঁকেন, প্রকাশক পাণ্ডুলিপি ভেদে নির্ধারিত মাপে কাঠামো দাঁড় করান, এরপর কাগজে প্রিন্ট করার পর পাণ্ডুলিপি যায় বানান সংশোধকের কাছে, সচরাচর এরা প্রতি ফর্মা ১০০ থেকে ৫০০ টাকায় দেখে থাকেন। লেখক-প্রকাশকের সম্মিলিত উদ্যোগে পাণ্ডুলিপি ফাইনাল করা হলে প্রেসে যায়। মেলাকে ঘিরে কয়েক মাস আগে থেকেই বই ছাপার কাজ শুরু হয় নীলক্ষেত, কাঁটাবন, আরামবাগসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ছাপাখানাগুলোতে যদিও পুরান ঢাকার বাংলাবাজারই এর আসল ঠিকানা। এখানেই গড়ে উঠেছে শত শত ছাপাখানা, তৈরি হয়েছে বাঁধাইখানাও। ‘বই বাজার’ হিসেবে পরিচিত পুরো এ এলাকাই দুই মাস ধরে থাকে কম্পোজ, পেস্টিং, প্লেট, ফাইনাল- শব্দে মুখর। ছুটি বাতিল করে বইয়ের কারিগররা দিন-রাত পরিশ্রম করে প্রতিটি ছাপাখানায়। কারখানাসংলগ্ন কম্পোজের দোকানগুলোর ব্যস্ততা থাকে চরমে, যেন কথা বলার সময়টুকু নেই কারও। ছাপা, বাঁধাই ও নান্দনিক মোড়ক লাগানোর পর কর্মচারীর হাত থেকেই বই চলে যায় অমর একুশে গ্রন্থমেলায়। প্রিন্টার্স মালিকরা জানান, বছরের বেশির ভাগ সময় বসে থাকলেও বইমেলার কারণে ব্যস্ততা বেড়ে যায়, প্রতিদিন প্রায় ৫০-৬০ সেট করে বই ডেলিভারি দিতে হয়। সব মিলিয়ে কাজের চাপ অনেক বাড়ে। অন্যান্য মাসের চেয়ে শ্রমিকরাও নিয়মিত বেতনের চেয়ে ১০-১৫ হাজার টাকা বাড়তি আয় করেন মেলার কয়েক মাস আগে থেকেই।

বই বাজার নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটানো অনুপ্রাণন প্রকাশনীর প্রকাশক জানান, তার প্রতিষ্ঠান থেকে গত ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি মাস পর্যন্ত ৭১টি বই প্রকাশ হয়েছে। এ মেলা শেষ হলেই আমরা নতুন করে পাণ্ডুলিপি নেওয়ার কাজ শুরু করব। মে-জুন থেকেই পাবলিস্ট (প্রকাশ) শুরু হয়, মেলা উপলক্ষে প্রায় ৩০ শতাংশ বই প্রকাশিত হয় নতুন। সারা বছরই আমাদের কাজ চলতে থাকে, বইমেলা উপলক্ষে ছাপাখানা ও বাঁধাইখানায়ও কাজের চাপ বাড়ে। ফলে এখানে খণ্ডকালীন চাকরির সুযোগ হয়, মুজুরিও দিতে হয় তুলনামূলক বেশি, ঘণ্টা হিসেবে, দৈনিক হিসেবে, মাসিক হিসেবে নানাভাবে শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয়।

এবারের বইমেলায় বেচাকেনা কেমন হচ্ছে জানতে চাইলে যানা যায়, গতবারে শুরু থেকেই ভালো বিক্রি হয়েছিল, এবার প্রথমদিকে তেমন না হলেও আশা করা যায় শেষ সময়ে বিক্রি বাড়বে, তবে মনে করা হচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় পাঠকরা বই কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। আবার কাগজ ও কালির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় ডিসেম্বর থেকে বইয়ের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এটাও বই বিক্রি কম হওয়ার কারণ হতে পারে। কাগজ ও কালি দেশে তৈরি হলেও উপকরণ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। আর আমদানি খরচ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। বইমেলায় স্টল ভাড়া এবং বিক্রেতা হিসেবে যারা আছে সব ক্ষেত্রেই ব্যয় আগের তুলনায় বেশি। সবশেষে আবু এম ইউসূফ বললেন, আমি আশা করব কাগজ ও কালির মূল্য বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে সরকার জোরালো ভূমিকা রাখবে। বই মানুষকে মনের খোরাক জোগায়। সুস্থ ও সুন্দর জাতি গড়ে তুলতে বইয়ের কোনো তুলনা নেই। তাই মূল্য বৃদ্ধির প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে বইশিল্পকে। এই দিক থেকে ভাষার মাসের গুরুত্ব অপরিসীম যেমন বিজ্ঞাপন ব্যবসা, দৈনিক পত্রিকা থেকে শুরু করে অনলাইন নিউজ পোস্টার ও বইমেলাকেন্দ্রিক বুলেটিন ছাপানো হয় কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞপন। এ ক্ষেত্রে দেখা যায় পণ্য হিসাবে বই ক্রেতার বহুরূপিতা যেম-ন কেউ ছাত্রছাত্রী, কেউ গবেষক, কেউ শৌখিন ক্রেতা, কেউ আবার কবি-সাহিত্যিক, কেউ আবার শিশুশ্রেণির এবং কেউ আবার প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিনিধি যারা নিজের প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগারকে সমৃদ্ধ করার জন্য ক্রেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়। একটি তথ্যে দেখা যায়- ২০২৩ সালের বইমেলায় ১০০ কোটি টাকার ওপরে বই বিক্রি হয়েছিল এবং বর্তমান বছরে এই অঙ্কটি মূল্যস্ফীতির কারণে বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে মনে হয় বিশেষত; আমাদের মতো বই পাঠের চর্চাবিমুখ মানুষের দেশে। সেই বইগুলো বইপ্রেমিক মানুষের বাসার সৌন্দর্য বর্ধনের উপকরণও বটে যা বইমেলারই অবদান। কারণ বইয়ের চেয়ে সুন্দর কিছু আছে বলে মনে হয় না যা প্রতিটি সৃজনশীল সংস্কৃতিমনা মানুষই বোঝেন। তারা বছরের এই ক্ষণটির দিকে তাকিয়ে থাকে কখন ফেব্রুয়ারি মাস আসবে আর প্রকাশনা সংস্থা তথা মুদ্রণ কর্মীরা তাদের বিনিদ্র রজনী কাটাবে মেলা শুরু হওয়ার আগে থেকেই নতুন বই মুদ্রণের প্রয়াসে যা প্রকাশনা শিল্পের জন্য একটি আলোকিত দিক। প্রতিদিনই মেলায় নতুন বই আসছে যা মেলার নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে প্রচার করা হয়ে থাকে এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কর্মীরা তাদের বিধিবদ্ধ দায়িত্বের অংশ হিসেবে বিশেষ ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে তাদের নির্ধারিত চ্যানেলগুলোতে সংবাদের অংশ হিসেবে প্রচার করছে প্রতিনিয়ত। এই ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি এবং এই একই মাসের ২১ তারিখটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতির মাধ্যমে দেশের ভাবমূর্তি বৈদেশিক অঙ্গনে অনেক প্রসারিত হয়েছে।

এখন সাহিত্যের মানদণ্ডে আমরা যদি এই সময়টিকে ঘিরে সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় সৃষ্টির বিষয়গুলোকে মূল্যায়ন করি তা হলে দেখা যাবে কবিতা ও উপন্যাসের ক্ষেত্রে একটা শূন্যতার আভাস অর্থাৎ সাহিত্যের অন্যান্য শাখার চেয়ে এই শাখা দুটোতে সংখ্যাধিক্ষের ভিত্তিতে সৃষ্টি কম যদিও মানের কথা বিবেচনায় না-ই আনি। আবার অন্যান্য শাখায় লেখক থাকলেও মানসম্মত লেখার স্বল্পতা পরিলক্ষিত হয় এই ফেব্রুয়ারি মাসকে ঘিরে। যারা সাহিত্য সমালোচক তারা বলছেন মানসম্মত সাহিত্য এবং সাহিত্যিকের সংখ্যা ক্রম অবনতিশীল বিধায় আগ্রহে ও পেশায় দুটোতেই কেমন একটা স্থবিরতা পরিলক্ষিত হয় সৃষ্টিশীল কাজে। বিষয়টি এমন যে সাহিত্য সৃষ্টি বা সাহিত্যিক হওয়া একটা ব্যক্তিগত আগ্রহের ব্যাপার যা একটি অনুকূল পরিবেশ পেলে প্রস্ফুটিত হয় যার ধারাবাহিকতা অনেক দিন পর্যন্ত চলে। এটি কোনো অনুকরণের বিষয় কিংবা শৌখিন বিষয় নয়- এই জায়গাটিতেই সংকট রয়েছে। কেউ যদি এটাকে পেশা হিসেবে নিতে চায় তবে আর্থিক দৈন্যতার সম্মুখীন হতে হবে এটাই বাস্তব বিশেষত প্রতিযোগিতামূলক বাজার অর্থনীতির যুগে যেখানে জ্ঞানচর্চার ফসলের বাজার সংগঠিত নয় আবার সামাজিক স্বীকৃতিও সহজই ধরা দেয় না। যার ফলে ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চাও ক্ষীণ হয়ে আসছে প্রজন্ম শূন্যতার কারণে। যারা চলে যাচ্ছে আর যারা আসছে তাদের মধ্যে গুণগত পার্থক্য আকাশ-জমিন যা শুধু সাহিত্য বা ভাষার ক্ষেত্রেই নয়- জীবনের সর্বক্ষেত্রে। ফলে মনের খোরাকের জন্য যে সাহিত্য প্রয়োজন সে জায়গাটিতে খাদ্য নিরাপত্তার অভাব রয়েছে যার ফলে অস্থিরতা বা অসন্তোষ বা অস্বস্তি এখন প্রায় সব পরিবারেই নিত্যদিনের সাথী যা মনের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। এ ধরনের একটি আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে সাহিত্যিক, উপন্যাসিক কিংবা কবি সৃষ্টি বিশেষত ফেব্রুয়ারি মাসব্যাপী গ্রন্থমেলাকে কেন্দ্র করে কতটুকু অবদান রাখবে তা ভেবে দেখার বিষয়। যারা জনপ্রিয়তা চায় তাদের জন্য এ ধরনের মেলা সাহিত্য কেনাবেচার একটি ক্ষেত্র হতে পারে; কিন্তু ভালো সাহিত্য বা সৃজনশীল সাহিত্যসৃষ্টি কতটুকু সম্ভব হবে তাও দেখার বিষয়। তবে আয়োজক সংস্থা বাংলা একাডেমি একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান হলেও তাদেরও অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যে এ মেলার আয়োজন করতে হয় বিশেষত দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে। কারণ অতীতের অনেক জীবনহানির ঘটনা এ মেলাকে কেন্দ্র করেই সংঘটিত হয়েছে যা আমাদের একুশের চেতনাকে বিনষ্ট করেছে। মুক্তবুদ্ধির চর্চা, সৃজনশীলতা প্রকাশনার চর্চা, সৃজনশীল সাহিত্য ইত্যাদি অনেকক্ষেত্র এ মেলায় আসা কবি-সাহিত্যিক দর্শনার্থীদের জীবনের ঝুঁকি যে বাড়িয়ে দেয় তা আমাদের মনে রাখতে হবে অতীতের ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। তাই আমাদের মতাদর্শগত বিরোধগুলো রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করতে হবে, গ্রন্থমেলা কোনোভাবেই তার ক্ষেত্র হতে পারে না বা ক্ষেত্র হতে দেওয়া যায় না। তাহলে ঘোষিত প্রাণের মেলা কথাটির কোনো গুরুত্বই থাকে না যদিও এর মধ্যে অনেক আবেগ রয়েছে যা দিয়ে সত্যিকার অর্থে জীবন চলে না। এখন যারা সাধারণ মানুষ কিংবা ছাত্রছাত্রী তাদের কাছে এসব কথার অর্থ নিরর্থক বলে মনে হতেই পারে।

লেখক: কৃষি অর্থনীতিবিদ ও গবেষক

বিষয়:

গ্রামীণ ব্যাংকের অর্থে গড়া ৭ প্রতিষ্ঠান ও ড. ইউনূস

ছবি: সংগৃহীত
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ফারাজী আজমল হোসেন

আবারও আলোচনায় ড. মুহাম্মদ ইউনূস। হঠাৎ করেই গত ১৫ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করে তিনি অভিযোগ করেন, তার সাতটি প্রতিষ্ঠান নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে গ্রামীণ ব্যাংক। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলো ‘জবরদখল’ করা হয়েছে। তার এ বক্তব্যে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। গ্রামীণ ব্যাংকের পক্ষ থেকেও দেওয়া হয়েছে জবাব। যেখানে প্রতিষ্ঠানটির দাবি, সবগুলো প্রতিষ্ঠানই তাদের ব্যাংকের অর্থে গড়া হয়েছে। আইনগতভাবেই চেয়ারম্যান ও পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এখানে ‘জবরদখল’-এর কিছু নেই।

প্রশ্ন উঠেছে, গ্রামীণ ব্যাংকের অর্থে গড়া প্রতিষ্ঠানের মালিক কীভাবে হন পেশায় শিক্ষক হিসেবে পরিচয় দেওয়া ড. মুহাম্মদ ইউনূস? এ ছাড়া অনেকেই বলছেন, গ্রামীণ টেলিকমও অলাভজনক হিসেবে পরিচালিত হওয়ার কথা। সেখানে কীভাবে এর লভ্যাংশের কথা বলছেন তিনি? এ ছাড়াও গ্রামীণ নামে প্রতিষ্ঠিত যে সাত প্রতিষ্ঠানে নিজের মালিকানা দাবি করেছেন ইউনূস, সেগুলোর মূলধন কোথা থেকে এসেছে তা নিয়েও শুরু হয়েছে জল্পনা। জানা যায়, গ্রামীণ টেলিকম ভবনে ড. ইউনূসের ১৬টি কোম্পানি রয়েছে। যার প্রতিটির চেয়ারম্যান ড. ইউনূস।

অন্যদিকে দেশের আদালত নিয়েও নানা প্রশ্ন তুলেছেন ড. ইউনূস। তার বক্তব্য, আদালতের প্রতি বিশ্বাস নেই তার। যদিও জবরদখলের অভিযোগ করে এই ঘটনায় মামলা করার কথা জানিয়েছেন তিনি। এই একই সময়ে তার কন্যা ইসরায়েলের সমর্থনে থাকা মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে সাক্ষাৎকার দিয়ে নানা অভিযোগ তুলে ধরেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই ড. ইউনূসের এসব কাণ্ডকে দেখছেন রাজনীতিকরণের প্রচেষ্টা হিসেবে।

ড. ইউনূসের অভিযোগ

গত বৃহস্পতিবার ঢাকার মিরপুরে গ্রামীণ টেলিকম ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে ড. ইউনূস দাবি করেন, গ্রামীণ ব্যাংক তাদের আটটি প্রতিষ্ঠান জবরদখল করে তাদের মতো করে চালাচ্ছে। পুলিশের কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইলেও সহযোগিতা পাওয়া যায়নি।

ঢাকার মিরপুর ১ নম্বরে চিড়িয়াখানা সড়কে গ্রামীণ টেলিকম ভবন। এই ভবনে ১৬টি কোম্পানির কার্যালয়, যার প্রতিটির চেয়ারম্যান ড. ইউনূস।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি গ্রামীণ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ ভবনের আটটি অফিস দখল করে নেওয়া হয় বলে দাবি করে তিনি বলেন, ‘ওই দিন থেকে তারা ভবনে তালা মেরে রেখেছে। নিজের বাড়িতে অন্য কেউ যদি তালা মারে, তখন কেমন লাগার কথা আপনারাই বলেন। তাহলে দেশে আইন-আদালত আছে কীসের জন্য। তারা আদালতে যেতে চায় না। আমরা জীবনে বহু দুর্যোগ দেখেছি। এমন দুর্যোগ আর কখনও দেখিনি।’

গ্রামীণ ব্যাংকের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়ার কথাও বলেন সরকারি প্রজ্ঞাপনে প্রতিষ্ঠিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

গ্রামীণ ব্যাংকের টাকায় এসব প্রতিষ্ঠান

ইউনূসের অভিযোগ খারিজ করে গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যান সাইফুল মজিদ বলেন, ‘আইনি বৈধতার ভিত্তিতে রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক (আরজেএসসি) হতে এসব প্রতিষ্ঠানের আর্টিকেল অব মেমোরেন্ডামের সার্টিফাইড কপি তোলা হয়েছে। এর কোনো পরিবর্তন হয়নি। সেখানে লেখা বিধি মোতাবেক পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আইনের বাইরে কিছুই হয়নি।’

গ্রামীণ ব্যাংকের সব টাকা এর বিত্তহীন, দরিদ্র, ভূমিহীন ও অসহায়ের কাজে ব্যয় করার বিধান রয়েছে জানিয়ে কত টাকা, কোথায় গেছে তার হিসাবও চান তিনি। বলেন, ‘গ্রামীণ ব্যাংকের মধ্য থেকে অনেক কিছু করা সম্ভব ছিল। এত প্রতিষ্ঠান বাড়ানোর কোনো প্রয়োজন ছিল না।’
বিদেশি অনুদান নিয়ে গ্রামীণ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ‘এনডাউমেন্ট ফান্ড’ নামে গ্রামীণ কল্যাণকে টাকা দেওয়া হয় জানিয়ে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান বলেন, ‘৪৪ কোটি টাকা গ্রামীণ ব্যাংক থেকে হস্তান্তর করা হয়। অনুদানসহ সব মিলিয়ে ৪৪৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা দেওয়া হয় গ্রামীণ কল্যাণে। এসবই গ্রামীণ ব্যাংকের টাকা।’

গ্রামীণ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ড. মুহাম্মদ ইউনূস অবৈধভাবে জালিয়াতের মাধ্যমে ২৮টি গ্রামীণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। গ্রামীণ ব্যাংকের অর্থে প্রতিষ্ঠিত হলেও বেআইনিভাবে এগুলোর মালিকানা নিজের নামে করে নেন
সম্প্রতি বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের অধীনে নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে প্রকৃত মালিক গ্রামীণ ব্যাংক। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ১৩ ফেব্রুয়ারি গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব গ্রহণ শুরু করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ ইউনূসের বিরুদ্ধে

প্রতিষ্ঠার সাল ১৯৮৩ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত নিরীক্ষার দাবি করে গ্রামীণ ব্যাংক চেয়ারম্যান বলেন, ‘১৯৯০ সালের আগে কোনো লেজার পাওয়া যায়নি।’

মুহাম্মদ ইউনূস মানি লন্ডারিং করেছেন অভিযোগ এনে তিনি বলেন, ‘সেই প্রমাণ রয়েছে। গ্রামীণ টেলিকম, গ্রামীণ কল্যাণ, গ্রামীণ ফান্ড- এসব প্রতিষ্ঠান গড়তে গিয়ে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে শত শত কোটি টাকা সরিয়েছেন অধ্যাপক ইউনূস।’

গ্রামীণ ব্যাংকের আইন উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মাসুদ আক্তার বলেন, ‘গ্রামীণ ব্যাংকের মালিক দরিদ্র ও ভূমিহীন মানুষ। সেই ব্যাংকের টাকায় যে প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি, তার মালিক সদস্যরা।’

অর্থ জালিয়াতির অভিযোগ

১৯৮৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর সরকার গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ (অধ্যাদেশ নম্বর-৪৬) জারি করে। শুরুতে গ্রামীণ ব্যাংকের মূলধন ছিল মাত্র তিন কোটি টাকা। এর মধ্যে বেশিরভাগই অর্থাৎ ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা ছিল সরকারের। বাকি ১ কোটি ২০ লাখ টাকা ছিল ঋণ গ্রহীতাদের। অর্থাৎ গ্রামীণ ব্যাংকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ব্যক্তিগত কোনো টাকা ছিল না। অথচ এই ব্যাংকটির টাকায় ড. ইউনূস গড়ে তুলেছেন নিয়ন্ত্রণাধীন ২৮টি প্রতিষ্ঠান।

তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, গ্রামীণ ব্যাংক তথা সরকারের টাকা আত্মসাৎ করে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়ার।

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই গ্রামীণ ব্যাংকে ঋণ এবং অনুদান দেয় দাতা গোষ্ঠী। অনুদানের সব অর্থ যদি রাষ্ট্র এবং জনগণের কাছে যায় তাহলে কারও ব্যক্তিগত লাভের সুযোগ থাকে না। তাই দাতাদের অনুদানের অর্থ দিয়ে সোশাল ভেনচার ক্যাপিটাল ফান্ড (এসভিসিএফ) গঠন করেন ড. ইউনূস।

১৯৯২ সালের ৭ অক্টোবর ওই ফান্ড দিয়ে আলাদা একটি প্রতিষ্ঠান গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৯৯৪ সালে ‘গ্রামীণ ফান্ড’ নামের একটি লিমিটেড কোম্পানি গঠন করা হয়। তাতে ওই ফান্ডের ৪৯ দশমিক ১০ কোটি টাকা স্থানান্তর করা হয়।

গ্রামীণ ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শুরু থেকেই গ্রামীণ ব্যাংক দেখিয়ে বিদেশ থেকে টাকা এনে তা সরিয়ে ফেলার চেষ্টা ছিল। গ্রামীণ ব্যাংক সরকারি প্রতিষ্ঠান হলেও এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে একাই সব সিদ্ধান্ত নিতেন ড. ইউনূস। পরিচালনা পর্ষদ এমনভাবে গঠন করা হয়েছিল, যাতে কেউ ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে কথা বলতে না পারেন। আর এই সুযোগেই ১৯৯৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর গ্রামীণ ব্যাংকের ৩৪তম বোর্ড সভায় সিদ্ধান্ত হয়, দাতা গোষ্ঠীর অনুদানের অর্থ এবং ঋণ দিয়ে সোশাল এডভান্সমেন্ট ফান্ড (এসএএফ) গঠন করা হবে। কিন্তু দাতারা গ্রামীণ ব্যাংক থেকে এভাবে অর্থ সরিয়ে ফেলার বিষয়ে আপত্তি জানায়। তাদের মত ছিল, এভাবে অর্থ স্থানান্তর জালিয়াতি।

এরপর ভিন্ন কৌশল নিয়ে ১৯৯৬ সালের ২৫ এপ্রিল গ্রামীণ ব্যাংকের বোর্ড সভায় ‘গ্রামীণ কল্যাণ’ গঠনের প্রস্তাব আনেন ড. ইউনূস।
প্রস্তাবে বলা হয়, গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্য ও কর্মীদের কল্যাণে ‘কোম্পানি আইন ১৯৯৪’-এর আওতায় গ্রামীণ কল্যাণ নামের একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করা। গ্রামীণ ব্যাংকের বোর্ড সভা এই প্রস্তাব অনুমোদন করে। এটি গ্রামীণ ব্যাংকেরই অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। গ্রামীণ কল্যাণ যে গ্রামীণ ব্যাংকেরই শাখা প্রতিষ্ঠান, তা আরও স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় এর মূলধন গঠন প্রক্রিয়ায়।

গ্রামীণ কল্যাণ-এ গ্রামীণ ব্যাংকের সোশাল এডভান্সমেন্ট ফান্ড (এসএএফ) থেকে ৬৯ কোটি টাকা প্রদান করা হয়। গ্রামীণ কল্যাণের মেমোরেন্ডাম অব আর্টিকেলেও গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে এর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মেলে।

মেমোরেন্ডাম অব আর্টিকেল অনুযায়ী, গ্রামীণ কল্যাণের ৯ সদস্যের পরিচালনা পরিষদের ২ জন সদস্য গ্রামীণ ব্যাংকের মনোনীত প্রতিনিধি। এ ছাড়াও গ্রামীণ কল্যাণের চেয়ারম্যান হবেন গ্রামীণ ব্যাংকের মনোনীত প্রতিনিধি। ড. ইউনূসও গ্রামীণ ব্যাংকের মনোনীত প্রতিনিধি হিসেবেই গ্রামীণ কল্যাণের চেয়ারম্যান হন।

এরপর গ্রামীণ কল্যাণের মাধ্যমে তিনি গড়ে তোলেন একের পর এক প্রতিষ্ঠান। এগুলো হলো- ১. গ্রামীণ টেলিকম লি: ২. গ্রামীণ ডিস্ট্রিবিউশন লি: ৩. গ্রামীণ শিক্ষা ৪. গ্রামীণ নিটওয়্যার লি: ৫. গ্রামীণ ব্যবস্থা বিকাশ ৬. গ্রামীণ আইটি পার্ক ৭. গ্রামীণ ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট ৮. গ্রামীণ সলিউশন লি: ৯. গ্রামীণ ডানোন ফুডস: লি: ১০. গ্রামীণ হেলথ কেয়ার সার্ভিসেস লি: ১১. গ্রামীণ স্টার এডুকেশন লি: ১২. গ্রামীণ ফেব্রিক্স অ্যান্ড ফ্যাশন লি: ১৩. গ্রামীণ কৃষি ফাউন্ডেশন।

অন্যদিকে, গ্রামীণ কল্যাণের আদলে প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ফান্ডের মাধ্যমে গঠন করা হয় আরও কিছু প্রতিষ্ঠান। এগুলো হলো-
১. গ্রামীণ ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লি:, ২. গ্রামীণ সল্যুশন লি:, ৩. গ্রামীণ উদ্যোগ, ৪. গ্রামীণ আইটেক লি:, ৫. গ্রামীণ সাইবারনেট লি:, ৬. গ্রামীণ নিটওয়্যার লি:, ৭. গ্রামীণ আইটি পার্ক, ৮. টিউলিপ ডেইরী অ্যান্ড প্রোডাক্ট লি:, ৯. গ্লোব কিডস ডিজিটাল লি:, ১০. গ্রামীণ বাইটেক লি:, ১১. গ্রামীণ সাইবার নেট লি:, ১২. গ্রামীণ স্টার এডুকেশন লি:, ১২. রফিক আটোভ্যান মানুফ্যাকটার লি:, ১৩. গ্রামীণ ইনফরমেশন হাইওয়ে লি:, ১৪. গ্রামীণ ব্যবস্থা সেবা লি:, ১৫. গ্রামীণ সামগ্রী।

গ্রামীণ ব্যাংকের অর্থে এবং বোর্ড সভার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে গ্রামীণ কল্যাণ এবং গ্রামীণ ফান্ড গঠিত হয়। এই দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যে প্রতিষ্ঠানগুলো গঠিত হয়েছে সেগুলোও আইনত গ্রামীণ ব্যাংকের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। ২০২০ সাল পর্যন্ত গ্রামীণ ফান্ড এবং গ্রামীণ কল্যাণের পরিচালনা পর্ষদে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিনিধিও ছিল। কিন্তু ২০২১ সাল থেকে এই প্রতিষ্ঠান দুটিতে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিনিধি নেই।

গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই দুটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হবেন গ্রামীণ ব্যাংকের মনোনীত ব্যক্তি। কিন্তু ড. মুহাম্মদ ইউনূস এখনও গ্রামীণ কল্যাণ এবং গ্রামীণ ফান্ডের চেয়ারম্যান পদে বহাল আছেন। ফলে প্রশ্ন উঠছে, কোন কর্তৃত্ব বলে তিনি এখনও চেয়ারম্যান?

ব্যাংকটির একাধিক সূত্র দাবি করেছে, ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব থেকে অবসরে গেলেও ব্যাংকটি নিয়ন্ত্রণ করছে তার অনুগতরাই। ফলে এই অনিয়ম নিয়ে এতদিন কেউ মুখ খোলেননি।

গ্রামীণ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের রহস্যময় আচরণের কারণেই এই ব্যাংকের অর্থে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানা বঞ্চিত হয় রাষ্ট্র ও জনগণ। তবে শেষ পর্যন্ত গ্রামীণ ব্যাংকের ঘুম ভেঙেছে এবং গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানগুলো উদ্ধারের উদ্যোগ নিয়েছে।

ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে হিসাবে গরমিল

তথ্য বলছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে তিনটি। এই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট তিনটি হলো যথাক্রমে:- ১. সাউথ ইস্ট ব্যাংক, (অ্যাকাউন্ট নম্বর-০২১২১০০০২০০৬১), ২. স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, (অ্যাকাউন্ট নম্বর- ১৮১২১২৭৪৭০১) এবং ৩. রূপালি ব্যাংক, (অ্যাকাউন্ট নম্বর-০৪৮৯০১০০০৮০৯৬)। এই তিনটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মধ্যে ২০০০ সালে খোলা সাউথ ইস্ট ব্যাংকের অ্যাকাউন্টটি (অ্যাকাউন্ট নাম্বার-০২১২১০০০২০০৬১) তার মূল ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হিসেবেই প্রতীয়মান হয়েছে। এই অ্যাকাউন্টে ২০০০ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১১৮ কোটি ২৭ লাখ ৭৬ হাজার ৩৬৮ টাকা রেমিট্যান্স এসেছে। এই রেমিট্যান্সের বেশিরভাগ ৪৭ কোটি ৮৯ লাখ ৯৬ হাজার ৬৫২ টাকা এসেছে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে। সেই সময়েই একটি রাজনৈতিক দল গঠনেরও প্রয়াস করেছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
অভিযোগ রয়েছে, ২০০৫-০৬ কর বছর থেকে শুরু করে ২০২২-২৩ কর বছর পর্যন্ত সরকারকে কর ফাঁকি দেওয়ার লক্ষ্যে তিনি ১৮ কোটি ৯৪ লাখ ৩৪ হাজার ৮৩৫ টাকা রেমিট্যান্সের তথ্য গোপন করেছেন।

২০২০-২১ অর্থবছরে ড. ইউনূস-এর ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় সব টাকা তুলে ‘ইউনূস ট্রাস্ট’ গঠন করেন। ট্রাস্টের টাকা আয়করমুক্ত। সে হিসাব থেকেই এমন কাণ্ড করেন তিনি। কিন্তু এরকম ফান্ডের জন্য ১৫% কর দিতে হয়, এটি তিনি দেননি। এই ট্যাক্স ফাঁকির কারণেই তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। এই মামলায় তিনি হেরে যান। এখন মামলাটি আপিল বিভাগে বিচারাধীন।

আদালতে অনাস্থা ইউনূসের

গ্রামীণ টেলিকমে শ্রম আইন লঙ্ঘনের আলোচিত মামলাটির রায় ঘোষণা হয় গত ১ জানুয়ারি। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসসহ চারজন আসামিকে শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে একটি ধারায় ছয় মাসের কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা করে জরিমানা করে সাজা দেয় আদালত।

আরেক ধারায় ২৫ হাজার টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের চাকরি স্থায়ী করা, ছুটি সংক্রান্ত সব বিষয় আগামী ৩০ দিনের মধ্যে সমাধান করতে নির্দেশ দিয়েছেন শ্রম আদালত।

সাজা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই আসামিদের আইনজীবী জামিন আবেদন করলে তা মঞ্জুর করেন আদালত। ফলে কারাগারে যেতে হয়নি ড. ইউনূসকে।

আদালত থেকে বেরিয়ে ইউনূস বলেন, যে দোষ আমরা করি নাই, সেই দোষের ওপরে শাস্তি পেলাম। এটা আমাদের কপালে ছিল, জাতির কপালে ছিল, আমরা সেটা বহন করলাম। তার আইনজীবী বলেন, এটা কোনো রায়ই হলো না। এটা নজিরবিহীন ঘটনা। যে অভিযোগে সিভিল মামলা হওয়ার কথা ছিলে। তাতে ফৌজদারি অপরাধে সাজা দেওয়া হলো। এর বিরুদ্ধে আপিল করব।

আদালতের রায় নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করলেও সম্প্রতি প্রতিষ্ঠান জবরদখলের অভিযোগ তোলার পর সেটি নিয়ে আদালতে যাওয়ার ঘোষণা দেন ইউনূস।

ইসরায়েলের পক্ষে থাকা সিএনএন চ্যানেলে ইউনূসকন্যার সাক্ষাৎকার

ফিলিস্তিনে গণহত্যা চালানো ইসরায়েলের হয়ে পক্ষপাতমূলক সংবাদ নীতির কারণে তোপের মুখে থাকা প্রতিষ্ঠানে সিএনএন চ্যানেলে সম্প্রতি সাক্ষাৎকার দেন ইউনূসের কন্যা ও মার্কিন নাগরিক মনিকা ইউনূস।

যেখানে তিনি বাংলাদেশের বিচার বিভাগের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি তিনি নিজের বাবার পক্ষে কথা বলতে গিয়ে দেশের সাংবিধানিক কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, শ্রম আইন লঙ্ঘনের দায়ে দণ্ড পাওয়া শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে শাস্তি থেকে রক্ষা করতে লবিংয়ে নেমেছেন তার কন্যা মনিকা ইউনূস।

এ ছাড়াও ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে চলা আইনি প্রক্রিয়া বন্ধ করতে নানাভাবে চলছে আন্তর্জাতিক লবিং। তাকে ‘আইনি হয়রানি’ বন্ধ করার জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আহ্বান জানিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টে বিজ্ঞাপন হিসেবে একটি যৌথ বিবৃতি ছাপা হয়েছে, যে বিবৃতি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ১২ জন সিনেটর।

এর আগে বিচার বন্ধে বিজ্ঞাপন আকারে বিবৃতি দিয়েছেন কয়েকজন নোবেলজয়ী। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে ইউনূসের পরিচিতি আছে।

এদিকে সাক্ষাৎকারে একাধিকবার ড. ইউনূস কেন বাংলাদেশ সরকারের প্রতিহিংসার শিকার তা জানতে চাইলেও এর কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি

রাজনীতিতে নজর ইউনূসের

২০০৭ সালে সেনা-নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের তখন গ্রেপ্তার করে কারাগারে আটকে রাখা হয়।

আর সেই রাজনীতি নিষিদ্ধ ও রাজনীতিবিদদের জেল-জুলমের সময়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস নতুন একটি রাজনৈতিক দল খুলতে মাঠে নামেন। জরুরি অবস্থার মধ্যেই তিনি নাগরিক শক্তি নামের রাজনৈতিক দল গঠনের জন্য ব্যাপক তোড়জোড় চালিয়েছিলেন, যা নিয়ে প্রচুর সমালোচনা হয়।

রাজনীতিতে ইউনূসের আগ্রহের বিষয়ে মনিকা বলেন, শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর তিনি একবারের জন্য এটা ভেবেছিলেন। তবে তার রাজনৈতিক কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই।

তবে উইকিলিকস থেকে ফাঁস হওয়া গোপন নথিতে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের প্রধান দুই নেত্রীকে রাজনীতি থেকে নির্বাসনে পাঠাতে চেয়েছিলেন এই নোবেলজয়ী। জেনারেল মইন ইউ আহমেদের লেখা বই এবং আরও কিছু নথি থেকে এটি স্পষ্ট ছিল যে, ১-২ বছরের জন্য নয়, বরং দীর্ঘ মেয়াদে অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক সরকার গঠনের ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন ড. ইউনূস।


ভাষা আন্দোলন: বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
আলমগীর খোরশেদ 

প্রতিটি শিশুই জন্মের সময় চিৎকার দিয়ে মায়ের উদর থেকে পৃথিবীতে আগমন ঘটে। ও যেন কান্নার ভাষায় জানিয়ে দেয়, অন্যকোনো ভুবন থেকে হঠাৎ স্থান বদলের এই উপাখ্যান মানতে রাজি নয়। তারপরও দিন যায় সময়ের হাত ধরে। মায়ের বুকের নির্যাস টেনে বড় হয় শিশু। মুখে আসে মায়ের বুলি। মাকে চিৎকার করে দৌড়ে এসে বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে দুরন্তপনায়। মাকে মা, বাবাকে বাবা, প্রিয়াকে প্রিয়তমা বলে ডাকার মাতৃভাষা বুকের ভিতর থেকে নিংড়ে আসে। এই ভাষাও সহজে পায়নি বাঙালি জাতি। এর জন্যও রক্ত দিতে হয়েছিল, খালি হয়েছিল মায়ের কোল। মাতৃভাষা রক্ষার অধিকার আদায়ে ঢাকার কালো পিচঢালা রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল রক্তের শোণিত ধারায়। সে কথা জানতে পিছনে ফিরে যেতে হয়, ইতিহাসের পাতা ধরে।

১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে সেনাপতি মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় বাংলার স্বাধীন নবাব সিরাজুদ্দৌলার পরাজয় ও মর্মান্তিক মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয় বেনিয়া ইংরেজ শাসনের গোড়াপত্তনে। ইংরেজদের তাড়াতে স্বদেশি হলো, ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহ, ফকির সন্ন্যাস বিপ্লব, জাঁসীর রাণী, টিপু সুলতান, ক্ষুদিরাম, মাস্টারদা সূর্য সেন, প্রীতিলতা সর্বোপরী নেতাজি সুবাস বসুর আন্দোলন। অবশেষে ১৯৪৭ সালে ইংরেজরা ভারত উপমহাদেশ ছেড়ে চলে যায়। ভারতবর্ষ ভাগ হয় ভারত ও পাকিস্তান নামে। বিভক্তির অন্যতম ধারণা ছিল দ্বিজাতি তত্ত্ব। দ্বিজাতি তত্ত্ব হলো হিন্দু ও মুসলিম জাতিতে বিভক্তি। এখানে ভাষা, বর্ণ বা অন্যকোনো দিক বিবেচিত না হয়ে কেবল ধর্মকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। যে স্বপ্ন আশা নিয়ে দেশভাগ হয়েছিল, তার স্বপ্ন ধূলিস্মাৎ হয়। পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্র হলেও পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের প্রতি বৈষম্য, নিপীড়ন, অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে দাবিয়ে রাখে। পাকিস্তানের শাসনক্ষমতা তখন চলে আসে মুসলিমলীগের হাতে। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ হলেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট। লিয়াকত আলী খান হলেন প্রধানমন্ত্রী। পশ্চিমারা পূর্ব পাকিস্তানের ওপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের প্রথম আঘাতটা আনে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার ষড়যন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে। ১৯৪৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতি জ্ঞানতাপস ড. মহম্মদ শহীদুল্লাহ তার ভাষণে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে বাঙালির বাঙালিত্ব ধরে রেখে পরোক্ষভাবে বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষার পক্ষে কথা বলেন। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে করাচিতে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দেন। ওই অধিবেশনে কুমিল্লার কংগ্রেস সদস্য ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত বাংলা ভাষা ব্যবহারের পক্ষে একটি সংশোধনী প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। তার যুক্তি হলো পাকিস্তানের ৬ কোটি ৯০ লাখ জনগণের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের ৪ কোটি ৪০ লাখ জনগণের ভাষা হলো বাংলা। কাজেই সংখ্যা গরিষ্ঠ লোকের ভাষাই রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত। পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনও উর্দুর পক্ষ অবলম্বন করেন। ১১ মার্চ ১৯৪৮ গণপরিষদে প্রস্তাব পাস হয়, উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। ১১ মার্চ পূর্ব বাংলায় ‘বাংলা ভাষা দাবি দিবস’ উপলক্ষে ধর্মঘট পালিত হয়। ছাত্রদের আন্দোলনে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হন। ১৫ মার্চ জেল থেকে মুক্তি পান শেখ মুজিব। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তান সফরে এসে তৎকালীন ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের এক জনসভায় ঘোষণা দেন, ‘Urdu and Urdu shall be the state language of Pakistan মানে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সমাবর্তন অনুষ্ঠানেও একই বক্তব্য দিলেন জিন্নাহ, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু।’ তীব্র প্রতিবাদে বাঙালি ছাত্ররা ক্ষেপে ওঠে। ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান তার দলবল নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে বলেন, ‘নো, নেভার, জিন্নাহ সাহেবের ঘোষণা মানব না। উর্দুকে কিছুতেই রাষ্ট্রভাষা করতে দেওয়া হবে না। আমরা জান দেবো, জবান দেবো না।’ জিন্নাহ সাহেব ভাবতেও পারেননি, তার বক্তৃতার সরাসরি এমন এভাবে চলতে থাকে। মৌলিক অধিকার রক্ষায় জাতিকে একত্রীভূত করে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে শেখ মুজিব তার কারিশমাটিক নেতৃত্ব চালিয়ে যান। ১৯৫২ সালে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রতিবাদে ছাত্রসমাজ এক হয়ে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। শেখ মুজিব কারাগারে থেকেও সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের সঙ্গে কারাগারে দিকনির্দেশনা দেন। ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে। ছাত্রসমাজ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিলসহ এগিয়ে যায়। ঢাকা মেডিকেল সংলগ্ন জায়গায় তাদের ওপর গুলি চালায় পুলিশ। অনেকেই শহীদ হন; কিন্তু পুলিশ তাদের মরদেহ গুম করে ফেলে। পরিচয় পাওয়া কয়েকজন ভাষা শহীদদের মধ্যে সালাম, রফিক, আবুল বরকত, আবদুল জব্বার, শফিউর রহমানের নাম উল্লেখযোগ্য। পৃথিবীতে ভাষার জন্য রক্তদানের ঘটনা একমাত্র বাংলাদেশেই। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের চেতনা সাহস ও শক্তি জুগিয়েছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে। বাঙালি হয়েছে বাঘা বাঙালি।

১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কোর সাধারণ পরিষদের ৩০তম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে বাংলাদেশসহ আরও ২৭টি দেশের সমর্থন নিয়ে সর্বসম্মতিক্রমে একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আজকের প্রজন্ম ইংরেজি বাংলা মিশিয়ে যে বাংলিশ ভাষা ব্যবহার করছে, তার ভবিষ্যৎ ভালো নয়। ফলে না পারছে সঠিকভাবে বাংলা বা ইংরেজি ভাষার রপ্ততা। জাতিসংঘের অধিবেশনে প্রথম বাংলায় ভাষণ দেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জুলিওকুরি উপাধি প্রাপ্ত বিশ্বনেতা, স্বাধীনতার স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৪৭ থেকে তৎকালীন পূর্ব বাংলায় সংঘটিত সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিত দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া জাতি ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। যা ১৯৭১ সালে বাঙালি তার স্বাধীনতা পেতে ৩০ লাখ শহীদের রক্ত, পৌনে তিন লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে এনে দিয়েছিল লাল সবুজের পতাকা। ভাষা আন্দোলন থেকে ফিডব্যাক পাওয়া বাঙালি গর্জে উঠেছিল স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে আনার যুদ্ধে, তারই ফলাফল বিশ্ব মানচিত্রে জ্বল জ্বল করা আমার বাংলাদেশ।

লেখক: শিশু সাহিত্যিক


ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালির জাতীয় চেতনা প্রস্ফুটিত হয়

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
অধ‌্যাপক ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন

পাকিস্তান আন্দোলনে বেশির ভাগ পূর্ববঙ্গের নেতা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। সাধারণ মানুষেরও মনোভাব ভিন্ন ছিল না। বঙ্গবন্ধু নিজেও পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কারণ, তারা বিশ্বাস করতেন, এর ফলে তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তি মিলবে। কারণ, ১৯০ বছরের ব্রিটিশদের দুঃশাসন ও দেশীয় হিন্দু জমিদার ও মহাজনদের দৌরাত্ম্য। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ধর্মের কথা থাকলেও তার মূল বার্তাটা ছিল, মুসলিমদের স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হলে তাদের পশ্চাৎপদতা কাটবে, হিন্দু জমিদার ও মহাজনদের আধিপত্য থেকে তারা মুক্তি পাবে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগ খুলে যাবে। বাস্তবে তা হয়নি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরও সে আকাঙ্ক্ষা পূরণের সম্ভাবনা দেখা গেল না। আর রাষ্ট্রভাষার দাবিও যখন মানা হচ্ছিল না, তখন খুব সহজেই বাঙালিদের মধ্যে ক্ষোভ এবং ক্রোধ সৃষ্টি হয়। সৃষ্টি হয় জাতীয় চেতনা; বাঙালি ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের। এ দেশের বা পূর্ব বাংলার মানুষ বুঝে যায়, যারা দেশশাসন করছে তারা তাদের কেউ নয়। তারা আসলে পূর্ব বাংলায় নয়া উপনিবেশ কায়েম করতে চায়।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান জন্মের আগেই প্রস্তাবিত পাকিস্তানের শাসকদের স্বরূপ উন্মোচিত হতে থাকে এবং একই সঙ্গে এ অঞ্চলের তখনকার যুবসমাজ নিজেদের অধিকার রক্ষার চিন্তা করতে শুরু করে। প্রথম বৈঠকটি হয়েছিল কলকাতার সিরাজউদ্দৌলা হোটেলের একটি কক্ষে। সে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন হাতেগোনা কয়েকজন-কাজী ইদ্রিস, শেখ মুজিবুর রহমান, শহীদুল্লা কায়সার, রাজশাহীর আতাউর রহমান, আখলাকুর রহমান আরও কয়েকজন। আলোচ্য বিষয়- পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ববঙ্গের যুবসমাজের করণীয় কী? এর কয়েকদিন আগেই আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এক নিবন্ধে বলেছিলেন, প্রস্তাবিত পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। এর দাঁতভাঙা জবাব দিয়েছিলেন জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। আজাদে প্রকাশিত এক নিবন্ধে ড. জিয়াউদ্দীনের উত্থাপিত প্রস্তাবের বিপরীতে তিনি প্রস্তাব দিলেন, প্রস্তাবিত পাকিস্তানের যদি একটি রাষ্ট্রভাষা হয় তবে গণতন্ত্রসম্মতভাবে শতকরা ৫৬ জনের ভাষা বাংলাই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত। একাধিক রাষ্ট্রভাষা হলে উর্দুর কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর বক্তব্য আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল তখনকার প্রগতিশীল এবং অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক চিন্তার ধারক যুব-সম্প্রদায়কে। এরই ফলে সিরাজউদ্দৌলা হোটেলের বৈঠকটি আয়োজিত হয়েছিল। সিদ্ধান্ত হয়েছিল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে পূর্ববঙ্গের অসাম্প্রদায়িক যুব-সম্প্রদায়ের সম্মেলন ডাকতে হবে। বৈঠকের নেতারা ঢাকা পৌঁছালেন, ঢাকার ছাত্র ও যুব নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। ১৯৪৭ সালের ৬-৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তান কর্মী সম্মেলন আহ্বান করা হলো। ৭ সেপ্টেম্বর সম্মেলনে জন্ম নিলে পূর্ব পাকিস্তানের অসাম্প্রদায়িক যুব প্রতিষ্ঠান ‘পূর্ব পাকিস্তান গণতান্ত্রিক যুব লীগ’। সম্মেলনের কমিটিতে গৃহীত প্রস্তাবগুলো পাঠ করলেন সেদিনের ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান। ভাষা সম্পর্কিত প্রস্তাব উত্থাপন করে তিনি বললেন, ‘পূর্ব পাকিস্তান কর্মী সম্মেলন প্রস্তাব করিতেছে যে, বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের লেখার বাহন ও আইন-আদালতের ভাষা করা হউক। সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে। সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার জনসাধারণের ওপর ছাড়িয়া দেওয়া হউক। এবং জনগণের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলিয়া গৃহীত হউক।’ এভাবেই ভাষার দাবি প্রথমে উচ্চারিত হয়েছিল।

১৯৪৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান কর্মী সম্মেলনে ভাষার যে দাবি উত্থাপিত হয়েছিল তা সহস্র কণ্ঠে উচ্চারিত হলো ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসের প্রথম ভাগে। পাকিস্তানের প্রথম গণপরিষদের অধিবেশন বসেছিল- ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। তাতে গণপরিষদে কার্যক্রমে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ভাষাও যেন ব্যবহৃত হতে পারে- এমন এক প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন কংগ্রেস দলীয় সদস্য ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত। তার যুক্তি ছিল, পাকিস্তানের ৬ কোটি ৯০ লাখ লোকের মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লাখ মানুষ ছিলেন পূর্ব বাংলার এবং তাদের ৯৮% মানুষে মাতৃভাষা ছিল বাংলা। তাই বাংলাকে পাকিস্তানের একটি প্রাদেশিক ভাষা হিসেবে দেখা উচিত নয়, বাংলারও হওয়া উচিত অন্যতম রাষ্ট্রভাষা। কিন্তু এ সংশোধনীর প্রস্তাব গণপরিষদে টেকেনি। একদিকে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ও পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের বিরোধিতা, অন্যদিকে গণপরিষদের বাঙালি সদস্যরাও সংসদীয় দলের আপত্তির কারণে তাকে সমর্থন করতে পারেননি। এর প্রতিবাদে ঢাকায় ছাত্ররা ক্লাস বর্জন ও ধর্মঘট করে। ১১ মার্চ, ১৯৪৮ সালে পূর্ব বাংলায় পালিত হয় ‘ভাষা দিবস’।

জিন্নার পূর্ব বাংলা সফরের পূর্বেই ১৯৪৭ সালের ৫ ডিসেম্বর করাচিতে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এর প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। তারা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানায়। এ ছাড়া পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম বাংলা করার ব্যাপারে চাপ দিতে থাকে। ক্রমে ভাষার প্রশ্নে রাজনৈতিক দাবিতে পরিণত হয়। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে নূরুল হক ভূঁইয়াকে আহ্বায়ক করে তমদ্দুন মজলিস রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে। পরবর্তীকালে এ উদ্দেশে আরও কয়েকটি কমিটি গঠিত হয়। ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ছাত্রসমাজ দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের উপস্থিতিতে দ্বিতীয়বারের মতো রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে। এ পরিষদের আহ্বায়ক মনোনীত হন শামসুল আলম। নবগঠিত পরিষদ ১১ মার্চ হরতাল আহ্বান করে। হরতাল চলাকালে শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক, অলি আহাদ, কাজী গোলাম মাহবুবসহ অনেকে গ্রেপ্তার হন। এ সম্পর্কে এক একান্ত সাক্ষাৎকারে অলি আহাদ বলেছিলেন- ‘সেদিন সন্ধ্যায় যদি মুজিব ভাই ঢাকায় না পৌঁছাতেন তাহলে ১১ মার্চের হরতাল, পিকেটিং কিছুই হতো না।’ এ ঘটনার প্রতিবাদে ১৩-১৫ মার্চ ঢাকার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়। ছাত্রসমাজের প্রতিবাদের মুখে ১৫ মার্চ শেখ মুজিবসহ অন্য নেতাদের মুক্তি দেওয়া হয়।

১১ মার্চের আন্দোলন তখন ছড়িয়ে পড়েছে সারা পূর্ব বাংলায়। বেগতিক দেখে খাজা নাজিমুদ্দিন আপসের কথা তুললেন। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর ৮ দফা সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো। চুক্তি স্বাক্ষরের সময় যেহেতু বঙ্গবন্ধুসহ ভাষা আন্দোলনের অধিকাংশ নেতা কারারুদ্ধ ছিলেন, সেহেতু চুক্তির খসড়া কারাগারে নিয়ে গিয়ে তাতে তাদের সবার সম্মতি নেওয়া হয়। শর্তানুসারে ১৫ মার্চ নেতারা মুক্তি পেলেন। পরদিনের সভায় শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতিত্ব করলেন। সভাশেষে ব্যবস্থাপক সভা ঘেরাও করার সময় পুলিশ ছাত্রজনতার ওপর হামলা করে। বঙ্গবন্ধু সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন।

প্রকৃতপক্ষে পূর্ববঙ্গের মানুষের মধ্যে তখনো আলাদা করে নিজেদের অধিকার সচেতনতাও তৈরি হয়নি। দেশ বিভাগের পর প্রকৃত অবস্থা বাঙালিরা বুঝতে শুরু করে। কারণ, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দেখা যায়, নতুন দেশের ডাকটিকিট, মুদ্রা, মানি-অর্ডার বা টাকা পাঠানোর ফর্ম, ট্রেনের টিকিট, পোস্টকার্ড- এগুলোতে শুধু উর্দু ও ইংরেজি ব্যবহৃত হচ্ছে। পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত উর্দুভাষী সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বাঙালি কর্মকর্তাদের প্রতি বিরূপ আচরণের অভিযোগ ওঠে। একই রকম মনোভাবের শিকার হন পশ্চিম পাকিস্তানে কর্মরত বাঙালি কর্মকর্তারাও। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ও সরকারি চাকরিতেও ছিল অবাঙালিদের প্রাধান্য। পরে দেখা যায়, পূর্ব পাকিস্তান থেকে নৌবাহিনীতে লোক নিয়োগের ভর্তি পরীক্ষাও হচ্ছে উর্দু ও ইংরেজিতে।

অথচ পাকিস্তানের বাস্তবতা ছিল এই যে, সে দেশের পূর্বাংশে এবং গোটা দেশ মিলিয়েও- সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষাই ছিল বাংলা। মোট জনসংখ্যার ৫৪.৬০ শতাংশ বাংলা, ২৮.০৪ শতাংশ পাঞ্জাবি, ৫.৮ শতাংশ সিন্ধি, ৭.১ শতাংশ পশতু, ৭.২ শতাংশ উর্দু এবং বাকি অন্যান্য ভাষাভাষী নাগরিক। এর থেকে দেখা যায় উর্দু ছিল পাকিস্তানি ভাষাভাষীর দিক থেকে তৃতীয় স্থানে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা হয়েও বাংলা ভাষা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হবে না- এটা পূর্ববঙ্গের ছাত্র ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল। একদিকে ভাষা ও আত্মপরিচয়ের আবেগ তো আছেই- তা ছাড়াও এর একটা অর্থনৈতিক দিক আছে। ভাষার প্রশ্নটি যে পাকিস্তানের এক অংশের ওপর আরেক অংশের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ আধিপত্য বিস্তারের সঙ্গে জড়িত- এই বোধ তখন সবার মধ্যে জন্মাতে শুরু করে। একইরকম ঘটনা ঘটেছিল মুসলমানদের ক্ষেত্রে যখন ব্রিটিশরা ফারসির বদলে ভারতের রাষ্ট্রভাষা ইংরেজি করে। তখন চাকরির সুযোগ বলতে সরকারি চাকরিই ছিল। কিন্তু উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে সরকারি চাকরি বা সেনাবাহিনীতে চাকরি পেতে বাঙালিদের উর্দু শিখতে হবে, উর্দুভাষীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে- ফলে তাদের অসন্তোষ তৈরি হয়। ছাত্রদের জন্য এটা ছিল ভবিষ্যতের প্রশ্ন।

মি. জিন্নাহ তখন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল, গণপরিষদের সভাপতি এবং মুসলিম লিগেরও সভাপতি। ৯ দিনের পূর্ববঙ্গ সফরে তিনি ঢাকা ও চট্টগ্রামে কয়েকটি সভায় বক্তৃতা দেন। ঢাকায় প্রথম সভাটি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ, ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে- যা এখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। এরপর কার্জন হল। ইংরেজিতে দেওয়া সেসব বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, আমি খুব স্পষ্ট করেই আপনাদের বলছি, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু এবং অন্যকোনো ভাষা নয়। কেউ যদি আপনাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে তাহলে সে আসলে পাকিস্তানের শত্রু। কার্জন হলের বক্তব্যের সময় ছাত্ররা প্রতিবাদ করেছিলেন। পরে তারা স্মারকলিপিসহ জিন্নার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তাদের মধ্যে স্বাভাবিক কথাবার্তা হয়নি। মূলত জিন্নার পূর্ব বাংলা সফরের মাধ্যমে পূর্ব বাংলার মানুষ বুঝে যায় পাকিস্তান নামের দেশটিতে তাদের অবস্থান। অথচ প্রায় ২০০০ কিলোমিটার দূরত্বের দুটি আলাদা ভূখণ্ডের একটি দেশ সৃষ্টিতে তাদেরও ভূমিকা ছিল। ভাষা, নৃতত্ত্ব, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভৌগোলিক পরিবেশ, খাদ্যাভ্যাসসহ সব ক্ষেত্রে বিস্তর ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও কেবল ধর্মের ভিত্তিতে ১২৪৩ মাইলের ব্যবধানে অবস্থিত পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত করে এই অসম রাষ্ট্র গড়ে তোলা হয়।

১৯৫২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র ধর্মঘট হয়েছিল। মিছিল করে সারা শহর প্রদক্ষিণ করেছিল শত সহস্র ছাত্র-জনতা। মিছিল শেষে বেলতলায় জমা হয়। সবাই পরবর্তী ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। শামসুল হক চৌধুরী, গোলাম মওলা, আব্দুস সামাদ আজাদের মাধ্যমে সংবাদ পাঠিয়েছেন শেখ মুজিব-খবর পাঠিয়েছেন তিনি, সমর্থন জানিয়েছেন একুশের দেশব্যাপী হরতালের প্রতি। একটি বাড়তি উপদেশ-মিছিল করে সেদিন আইনসভা ঘেরাও করতে হবে, বাংলা ভাষার প্রতি সমর্থন জানিয়ে আইনসভার সদস্যদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে হবে। আরও একটি খবর পাঠিয়েছেন, তিনি এবং মহিউদ্দিন সাহেব রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিতে অনশন করবেন। একুশে ফেব্রুয়ারি হরতাল হবে। অনশনের নোটিশ দেওয়ার পর বঙ্গবন্ধুকে ফরিদপুর জেলে স্থানান্তর করা হয় ১৬ ফেব্রুয়ারি। যাওয়ার কালে নারায়ণগঞ্জ স্টিমার ঘাটে তার সঙ্গে দেখা করলেন শামসুদ্দোহাসহ অনেকে। তাদের বঙ্গবন্ধু জানালেন তার এবং মহিউদ্দিন সাহেবের অনশনের কথা। অনুরোধ করে গেলেন যেন একুশে ফেব্রুয়ারিতে হরতাল-মিছিল শেষে আইনসভা ঘেরাও করে বাংলা ভাষার সমর্থনে সদস্যদের স্বাক্ষর আদায় করা হয়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখের কথা সবারই জানা।

১৯৫২ সালে বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে ভিত্তি রচিত হয়, তা পরবর্তীকালের সব ঘটনাপ্রবাহকে প্রভাবিত করে। ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-র ছয় দফা, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচন এবং ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে একুশের চেতনা তাৎপর্যপূর্ণভাবে ভূমিকা পালন করেছে। এই আন্দোলনের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছিল বাঙালির জাতীয় চেতনা এবং বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্রের। মূলত বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাঙালিয়ানার জোয়ার ১৯৫২ সালের একুশে ফেরুয়ারির মধ্য দিয়েই এসেছে। ভাষা আন্দোলন তৎকালীন রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়। এই আন্দোলনের ফলে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিকাশ ঘটে। কারণ সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু ভাষা আন্দোলন করেছিলেন, নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, ভাষার চেতনাকে বুকে ধারণ করেছিলেন। বাঙালিদের জন্য একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এ চেতনা ছিল সর্বদা সক্রিয়।

লেখক: সদস্য, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)


banner close