শুক্রবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

বিজয়ের ৫৩-তে বাংলাদেশ : গৌরবের যা কিছু অর্জন

আপডেটেড
৫ ডিসেম্বর, ২০২৩ ১৩:৩১
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া
প্রকাশিত
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া
প্রকাশিত : ৫ ডিসেম্বর, ২০২৩ ১৩:৩১

স্বাধীনতার ৫৩ বছরে পদার্পণ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এই সময়কালে বাংলাদেশের অফুরান অর্জন, যা ব্যাপক প্রশংসিত হচ্ছে। বাংলাদেশ সদর্পে এগিয়ে চলছে ইউএনডিপির টেকসই লক্ষ্যমাত্রায়। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ’৭৫-পরবর্তী সময়ে উল্টোপথে যাত্রা শুরু করেছিল বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আবারও উন্নতির শিখরে উঠতে শুরু করে বাংলাদেশ। আওয়ামী লীগ ২০০৯ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে সরকার গঠন করে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ একটানা ক্ষমতায় থাকার ফলে অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায়, দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। গত ১৩ বছরে দেশের প্রতিটি খাতে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। আর্থসামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে রোল মডেল। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে মর্যাদাশীল উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার চূড়ান্ত সুপারিশ অর্জন করেছে। এটা আমাদের জন্য এক বিশাল অর্জন। বহু কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রায় বিশ্বের বিস্ময়।

দেশের অর্থনীতিকে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্তি বর্তমান সরকারের অদম্য সাফল্য। গত এক দশকে বাংলাদেশের স্থিতিশীল জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জন, এমনকি মহামারির সময়ও এ দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের অর্থনীতির ধারাবাহিকতাকে নির্দেশ করে। আমরা এখন উন্নয়ন মহাযজ্ঞের সুবিশাল যাত্রা অতিক্রমের মহাসন্ধিক্ষণে অবস্থান করছি। সামাজিক ও অর্থনৈতিক নানান সূচকে তার বহিঃপ্রকাশ পাওয়া যায়। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় তিন হাজার ডলার। এ দেশের গড় জিডিপি ৭% প্রায়। শিক্ষার হার ৭৫% এবং শিশু শিক্ষার হার প্রায় ৯৯%। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ, যার হার প্রায় শতভাগ। ১২১টি মেগা প্রকল্প এখন চলমান। জিডিপির আকার ৪৬০ বিলিয়ন ডলার। আগামী ২০২৫ সালে তার আকার হবে ৫০০ বিলিয়ন ডলার।

অনেক অবধারিত উন্নয়ন শোভাবর্ধন করছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশের সাহসী এবং অগ্রগতিশীল উন্নয়ন কৌশল গ্রহণের ফলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কাঠামোগত রূপান্তর ও উল্লেখযোগ্য সামাজিক অগ্রগতির মাধ্যমে বাংলাদেশকে দ্রুত উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, অর্থনীতিসহ সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য অনেক। লিঙ্গ সমতা, দারিদ্র্যসীমা হ্রাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি, রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন, ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, পোশাক শিল্প, ঔষধ শিল্প, রপ্তানি আয় বৃদ্ধিসহ নানা অর্থনৈতিক সূচক বাংলাদেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রা গভীর সমুন্দ্রবন্দর, ঢাকা মেট্রোরেলসহ দেশের মেগা প্রকল্পগুলো সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসী পদক্ষেপের কারণে।

শত বাধা-প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে দেশ আজ অনন্য স্থানে অভিষিক্ত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদক্ষ নেতৃত্বে বাংলাদেশের দিন বদল হয়েছে। তিনিই বাংলাদেশকে উপহার দিয়েছিলেন ‘রূপকল্প ২০২১’। গত দশকে দেশে বাস্তবায়িত হয়েছে ষষ্ঠ ও সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক কর্মপরিকল্পনা দুর্বার গতিতে শুরু হয়েছে। তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ, ঘরে-ঘরে বিদ্যুৎ এসবই সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর বলিষ্ঠ ও অবিচল নেতৃত্বে দেশি-বিদেশি সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে উন্নয়ন কৌশল ‘রূপকল্প-২০২১’ বাস্তবায়নের ফলে। রূপকল্প ২০২১-এর সাফল্যের ধারাবাহিকতায় প্রণীত হয়েছে রূপকল্প-২০৪১। রূপকল্প-২০৪১-এর প্রধান অভীষ্ট হলো ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে একটি উন্নত দেশ, যেখানে আজকের মূল্যে মাথাপিছু আয় হবে ১২,৫০০ মার্কিন ডলারেরও বেশি এবং বাংলাদেশ হবে সোনার বাংলা, যেখানে দারিদ্র্য হবে সূদুর অতীতের ঘটনা।

চলতি বছরের ২৫ জুন পদ্মা সেতুর উদ্বোধনে সারা জাতি এক পরম আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে। স্বপ্নের পদ্মা সেতুর দ্বার উন্মোচন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লড়াকু জীবন একসূত্রে গাঁথা। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ। আমাদের দেশের রপ্তানি পণ্য বলতে ভরসা ছিল শুধু পাট, অন্যটি চামড়া। স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ছিল মাত্র ৩৪ কোটি ৮৪ লাখ ডলার। মোট রপ্তানিতে পাট ও পাটপণ্যের অবদান ছিল ৮৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ। বিগত ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশের ৩ হাজার ৮৭৫ কোটি ডলারের মোট রপ্তানির মধ্যে পোশাকশিল্প খাত থেকে আয় হয়েছে ৩ হাজার ১৪৬ কোটি ডলার। বর্তমানে বিশ্বে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক রপ্তানিতে তৃতীয় অবস্থানে। ব্যবসাবান্ধব বর্তমান সরকার গার্মেন্ট সেক্টরে অনেক প্রণোদনা দিয়ে আসছে। যার ফলে দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে এই শিল্প। আমাদের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক খাত হচ্ছে প্রবাসীদের অর্জিত আয়। প্রতিদিন, প্রতি মাসে, প্রতি বছরে প্রবাসীরা বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠাচ্ছেন। তাতে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশ প্রবাসীদের আয়ের হিসাবে সপ্তম স্থানে অবস্থান করছে। বাংলাদেশে প্রবাসী আয় হচ্ছে ২ হাজার ২০০ কোটি ডলার।

১৯৭২-৭৩ সালে আমাদের মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৯৪ ডলার। আর ২০২১-২২ সালে আমাদের মাথা পিছু আয় দাঁড়িয়েছে ২৮২৪ মার্কিন ডলার। মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) পরপর দুই বছর ধরে ভারতের চেয়ে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। দারিদ্র্য বিমোচনে আমাদের অগ্রগতি হয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৮৯ শতাংশ। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে তা দাঁড়ায় ২০ শতাংশ।

৫২ বছরে এসে জাতীয় বাজেটের আকার অনেক বেড়েছে। ১৯৭২-৭৩ সালে বাজেট ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ সালের জাতীয় বাজেট হচ্ছে ৬ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকা। বৃহৎ এই বাজেট দেশের উন্নয়নে কাজে আসবে। উন্নয়নের ধারায় বাজেটের এই বৃদ্ধি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে আমাদের জিডিপি ২.৫ শতাংশ। করোনা মহামারিকালেও আমাদের ২০২০-২১ সালে জিডিপি অর্জিত হয়েছে ৫.৪৭ শতাংশ। আমাদের রাজস্ব আয় বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সদ্য স্বাধীন দেশ বাংলাদেশের ১৯৭২-৭৩ সালে সর্বমোট রাজস্ব আয় হয় ১৬৬ কোটি টাকা। ২০২০-২১ সালে আমাদের রাজস্ব অর্জিত হয় ২ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। বিশাল অর্জন। রাজস্ব বৃদ্ধি পেয়েছে ১ হাজার ৫৬৬ গুণ।

গত ৫২ বছরে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে কৃষিতে বিপ্লব হয়েছে। খাদ্যশস্য ১৯৭২ সালে উৎপাদিত হয় ১ দশমিক ২০ কোটি টন। আর ২০২০ সালে উৎপাদিত হয় ৪ দশমিক ২৫ কোটি টন। সবজি উৎপাদনে আমরা পৃথিবীর তৃতীয় অবস্থানে রয়েছি। সবজি উৎপাদনে পৃথিবীতে প্রথম চীন এবং দ্বিতীয় অবস্থানে ভারত। বর্তমানে আমরা নিজেদের চাহিদা পূরণ করে বিদেশে সবজি রপ্তানি করছি। পাট উৎপাদনে এখন আমরা দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছি। দেশে এখন নানা রকম পাট পণ্য তৈরি হচ্ছে, রপ্তানিও হচ্ছে।

বর্তমান সরকারের সময়ে স্বাস্থ্য খাতের অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। করোনা মহামারির সময় স্বাস্থ্য খাতের চিত্র বিশ্বে ছিল অনুকরণীয়। শিশু সুরক্ষায় বাংলাদেশ এগিয়ে। বাংলাদেশের শিশুরা জন্ম নেয়ার পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত ৯৭ শতাংশ বেঁচে থাকে। নবজাতক ও শিশুর মৃত্যুর হার কমেছে। বাংলাদেশের শিশু জন্ম নিতে প্রতি এক লাখ মায়ের মধ্যে মৃত্যু হচ্ছে ১৭৩ জন। আমাদের গড় আয়ু বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারত ও পাকিস্তানের মানুষের চেয়ে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু অনেক বেশি। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) ২০২৩ সালের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু এখন ৭৩ দশমিক ৬ বছর। অন্যদিকে ভারত ও পাকিস্তানের মানুষের গড় আয়ু যথাক্রমে ৬৭ দশমিক ৭ বছর ও ৬৭ দশমিক ৩ বছর। বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক খাতের সুফল মিলছে গড় আয়ুতে।

শিক্ষাকে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গৃহীত হয়েছে নানা পদক্ষেপ। শতভাগ ছাত্রছাত্রীর মাঝে বিনামূল্যে বই বিতরণ কার্যক্রম, নারী শিক্ষাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত উপবৃত্তি ব্যবস্থা প্রশংসার দাবি রাখে। বর্তমান সরকার ২৬ হাজার ১৯৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে নতুন করে জাতীয়করণ করেছে। ১৯৯০ সালে বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শিশুর শতকরা হার ছিল ৬১, বর্তমানে তা উন্নীত হয়েছে শতকরা প্রায় শত ভাগে।

সারা দেশ এখন উন্নয়নের বহুমাত্রিক কর্মপ্রকল্পে এগিয়ে যাচ্ছে। চট্টগ্রামের বঙ্গবন্ধু টানেল জাতির ইতিহাসের এক ভিন্নমাত্রার নতুন চমক। ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নকে বাস্তবতায় রূপ দিতে বাংলাদেশ সরকার নিয়েছে যুগান্তকারী সব পদক্ষেপ। দেশের তৃণমূল পর্যায়ে প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার অভিপ্রায়ে দেশের ৪৫৫০টি ইউনিয়ন পরিষদে স্থাপন করা হয়েছে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার। তৈরি করা হয়েছে বিশ্বের অন্যতম বিশাল ন্যাশনাল ওয়েব পোর্টাল। কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত এ পোর্টালের সংখ্যা প্রায় ২৫০০০। দেশের সবকটি উপজেলাকে আনা হয়েছে ইন্টারনেটের আওতায়।

স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোয় অনুষ্ঠিত ২৬তম জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনের (কপ-২৬) মূল অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সাহসী বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় দেশের এনডিসি আপডেট, ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশি বিনিয়োগে ১০টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিল এবং ২০৪১ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে নিজস্ব শক্তির ৪০ শতাংশ নেওয়াসহ তাঁর সরকার কর্তৃক বিভিন্ন পদক্ষেপগুলো বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরেন। এ ছাড়াও তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সম্মানে ‘মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা’ চালুকরণ প্রসঙ্গে আলোকপাত করেন। বিশ্ব দরকারে শেখ হাসিনার গ্রহণযোগ্যতা দিনে দিনে বাড়ছে, তিনি বিশ্বনেত্রীতে পরিণত হচ্ছেন।

সামনে বৈশ্বিক যে সংকট আসছে, এ নিয়ে উন্নত দেশগুলোও উদ্বিগ্ন। আমরা উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অনেকটাই স্পর্শ করে যাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এরই মধ্যে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। তাঁর উদাত্ত আহ্বানে ন্যূনতম কোনো ভূমি অনাবাদি না রেখে প্রতি ইঞ্চি জমির উর্বরতার যথার্থ ব্যবহারে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি ছাড়া আগামী দিনের সম্ভাব্য খাদ্য সংকট উত্তরণ কোনোভাবেই সম্ভব নয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সব বৈশ্বিক সংকট কাটিয়ে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, স্বাধীনতার পর গত ৫২ বছরে বাংলাদেশের যা কিছু অর্জন, তার সিংহভাগ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের হাত ধরেই হয়েছে। আমাদের গর্ব ও গৌরবের এই ধারা অব্যাহত রাখতে শেখ হাসিনার কোনো বিকল্প নেই। তাঁরই সুযোগ্য নেতৃত্বে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যেই ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত ও উন্নত-সমৃদ্ধ স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশে পরিণত হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জ্যোতির্ময় অভিযাত্রা যেন কালো অধ্যায়কে আলোক ঝরনাধারায় উদ্ভাসিত করে দিল। এক অদম্য গতিতে অশুভ সংকেতের বাধা-বিপত্তিকে দুমড়ে-মুচড়ে উপড়ে ফেলে যেন নিষ্কণ্টক পথে অপ্রতিহত গতিতে বাংলাদেশ সামনে এগিয়ে চলছে।

লেখক : উপর্চায (চলতি দায়িত্ব), বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক চেয়ারম্যান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হস্পিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
তোফায়েল আহমেদ

ইতিহাসের মহামানব জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন এই পাকিস্তান বাঙালিদের জন্য হয়নি, এক দিন বাংলার ভাগ্যনিয়ন্তা বাঙালিদের হতে হবে। সেই লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে ’৪৮-এর ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগ এবং ’৪৯-এর ২৩ জুন আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর প্রিয় মাতৃভাষা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় অভিষিক্ত করতে মহান ভাষা আন্দোলন সংগঠিত করে ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের বীজ রোপণ করেন; এরপর স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকারের পথ বেয়ে সর্বজনীন ভোটাধিকারের দাবি আদায় করে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সুদীর্ঘ পথ বেয়ে গণরায় নিয়ে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতারূপে আত্মপ্রকাশ করেন; পাকিস্তানি সামরিক শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতার হস্তে ক্ষমতা হস্তান্তরে নানামুখী টালবাহানা ও বিশ্বাসঘাতকতামূলক গণহত্যা চাপিয়ে দেওয়ার কারণে নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় অর্জিত স্বাধীনতা ঘোষণার রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন ও রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে একচ্ছত্র নেতৃত্ব প্রদান করে ৩০ লক্ষাধিক প্রাণ আর ২ লক্ষাধিক মা-বোনের সুমহান আত্মত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন; এবং বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য ৫টি মৌলিক অধিকার- অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা সাংবিধানিকভাবে বিধিবদ্ধ করেন। যে কারণে আমরা বলি, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ সমার্থক। আজ তাঁরই সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের উদ্যোগে গঠিত গণরায়ে নির্বাচিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার সংবিধানে বিধিবদ্ধ ৫টি মৌলিক অধিকার দেশের মানুষের কল্যাণে ধাপ ধাপে বাস্তবায়ন করছে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বে আজ ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ থেকে ‘স্মার্ট সোনার বাংলা’য় রূপান্তরিত হওয়ার লক্ষ্যে ধাবমান।

প্রতি বছর ২৩ ফেব্রুয়ারি দিনটি গভীরভাবে স্মরণ করি। দিনটি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন। ১৯৬৯-এর এই দিনে বাংলার দুঃখী মেহনতী মানুষের বন্ধু, বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেতাকে জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞচিত্তে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এ বছর বঙ্গবন্ধু উপাধি প্রাপ্তির ৫৫তম বার্ষিকী। বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে ’৬৯-এর গণআন্দোলন এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। কালপর্বটি ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের ‘ড্রেস রিহার্সেল’। জাতির মুক্তিসনদ ৬ দফা দেওয়াকে রাষ্ট্রদ্রোহী অপরাধ গণ্য করে বঙ্গবন্ধু মুজিবসহ সর্বমোট ৩৫ জনকে ফাঁসি দেওয়ার লক্ষ্যে ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য’ তথা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি করা হয় এবং নির্বিঘ্নে পুনরায় ক্ষমতায় আরোহণের এক ঘৃণ্য মনোবাসনা চরিতার্থে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করেন স্বৈরশাসক আইয়ুব খান। আগরতলা মামলার বিচার যখন শুরু হয় তখন আমরা জাগ্রত ছাত্রসমাজ উপলব্ধি করি বঙ্গবন্ধুকে যদি ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানো হয় তাহলে চিরদিনের জন্য বাঙালির কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যাবে। কেননা এই একটি কণ্ঠে কোটি কণ্ঠ উচ্চারিত হয়। তাই আমরা ’৬৯-এর ৪ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ডাকসু’ কার্যালয়ে চার ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে এক সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন এবং ৬ দফাকে হুবহু যুক্ত করে ঐক্যবদ্ধ ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করি। ১১ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ’৬৯-এর ১৭ জানুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের জমায়েত অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের বটতলায় এবং পূর্ব ঘোষিত ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হয়। ’৬৯-এর ১৭ জানুয়ারি যে আন্দোলন আমরা শুরু করেছিলাম, ২০ জানুয়ারি শহীদ আসাদের রক্তাক্ত জামা হাতে নিয়ে যে শপথ নিয়েছিলাম, ২৪ জানুয়ারি শহীদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করার মধ্য দিয়ে সেই আন্দোলন সর্বব্যাপী গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করেছিল। ৯ ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানে শপথ দিবসে স্লোগান দিয়েছিলাম ‘শপথ নিলাম শপথ নিলাম মুজিব তোমায় মুক্ত করব; শপথ নিলাম শপথ নিলাম মা-গো তোমায় মুক্ত করব।’ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে ১৫ ফেব্রুয়ারি ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে নির্মমভাবে হত্যা করে সান্ধ্য আইন জারি করা হলে সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করে রাজপথে প্রতিবাদ মিছিল করি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহাকে ১৮ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি সেনারা বেয়নেট চার্জে নির্মমভাবে হত্যা করে পুনরায় সান্ধ্য আইন জারি করলে যথারীতি আমরা সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করে প্রতিবাদ কর্মসূচি অব্যাহত রাখি। ২০ ফেব্রুয়ারি সমগ্র ঢাকা নগরীকে মশাল আর মিছিলের নগরীতে পরিণত করলে স্বৈরশাসক আইয়ুব খান সান্ধ্য আইন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবসে পল্টনের মহাসমুদ্রে প্রিয় নেতা শেখ মুজিবসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আটক সবার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম প্রদান করি। সমগ্র দেশ গণবিস্ফোরণে প্রকম্পিত হয়। জনরোষের ভয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খান সব রাজবন্দিকে নিঃশর্ত মুক্তি দিলে দেশজুড়ে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। প্রিয় নেতাকে কারামুক্ত করার মধ্য দিয়ে শপথ দিবসের স্লোগানের প্রথম অংশ ‘মুজিব তোমায় মুক্ত করব’, এবং ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে হাতিয়ার তুলে নিয়ে যুদ্ধ করে প্রিয় মাতৃভূমিকে হানাদারমুক্ত করে স্লোগানের দ্বিতীয় অংশ ‘মা-গো তোমায় মুক্ত করব’ বাস্তবায়ন করেছিলাম। বস্তুত, ’৬৬-এর ৮ মে গভীর রাতে ৬ দফা কর্মসূচি প্রদানের অভিযোগে দেশরক্ষা আইনে যে মুজিব গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, ৩৩ মাস পর ’৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি যে মুজিব মুক্তিলাভ করেন- নাম বিচারে এক হলেও, বাস্তবে ওই দুই মুজিবের মধ্যে ছিল গুণগত ফারাক। আগরতলা মামলাটি ছিল সমগ্র বাঙালি জাতির জন্য অগ্নিপরীক্ষার মতো। সেই অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি বন্দিদশা থেকে মুক্তমানব হয়ে বেরিয়ে আসেন। ২২ ফেব্রুয়ারি আমরা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিই, প্রিয় নেতা শেখ মুজিবকে সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে গণসংবর্ধনা জানাব। সেই সিদ্ধান্ত অনুসারেই রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ২৩ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৩টায় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে গণসংবর্ধনা সভার আয়োজন করা হয়।

শুরুতেই বলেছি, ২৩ ফেব্রুয়ারি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন। সে দিনের রেসকোর্স ময়দান যারা দেখেননি তাদের বলে বোঝানো যাবে না সেই জনসমুদ্রের কথা। আমরা যখন সেখানে পৌঁছেছি, তখন রেসকোর্স ময়দানে মানুষ আর মানুষ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ট্রেন, বাস, ট্রাক, লঞ্চ-স্টিমার বোঝাই হয়ে রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, কৃষক-শ্রমিক, সাধারণ মানুষ ছুটে এসেছে। ঢাকার মানুষ তো আছেই। অভিভূত হয়ে পড়লাম। এর পূর্বে এতবড় জনসভা দেখিনি। সেই জনসমুদ্রে লাখ লাখ লোক এসেছে প্রিয় নেতা শেখ মুজিবকে একনজর দেখতে। প্রিয় নেতাকে নিয়ে আমরা মঞ্চে উঠলাম। সে দিন সেই মঞ্চে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রেখেছিলেন। চিরাচরিত প্রথা ভঙ্গ করে আগেই সভাপতির ভাষণ দেওয়ার জন্য মঞ্চে দাঁড়িয়ে লাখ লাখ মানুষকে অনুরোধ জানিয়ে বলেছিলাম, ‘সবার শেষে বক্তৃতা করার কথা থাকলেও আপনাদের অনুমতি নিয়ে আমি আগেই বক্তৃতা করতে চাই।’ দশ লক্ষ লোকের সম্মতি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর আগেই বক্তৃতা করি। সে দিন যে ভালোবাসা মানুষের কাছ থেকে পেয়েছি তা বলে বোঝাতে পারব না। বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধুকে ‘তুমি’ সম্বোধন করে বলেছিলাম, ‘প্রিয় নেতা তোমার কাছে আমরা ঋণী, বাঙালি জাতি চিরঋণী। এই ঋণ কোনোদিনই শোধ করতে পারব না। সারা জীবন এই ঋণের বোঝা আমাদের বয়ে চলতে হবে। আজ এই ঋণের বোঝাটাকে একটু হালকা করতে চাই জাতির পক্ষ থেকে তোমাকে একটা উপাধি দিয়ে।’ ১০ লাখ লোক ২০ লাখ হাত তুলে সম্মতি জানিয়েছিল। তখনই ঘোষিত হয়েছিল, ‘যে নেতা তাঁর জীবনের যৌবন কাটিয়েছেন পাকিস্তানের কারাগারে, ফাঁসির মঞ্চে দাড়িয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন, সেই নেতাকে বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞচিত্তে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হলো।’ ১০ লাখ লোক তুমুল করতালির মধ্য দিয়ে এ প্রস্তাব গ্রহণ করে প্রিয় নেতাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে লাখ লাখ কণ্ঠে ধ্বনি তুলেছিল, ‘জয় বঙ্গবন্ধু।’

বাংলাদেশে অনেক আন্দোলন হয়েছে- ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ৬ দফা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ। একেকটি আন্দোলনের একেক রকম চরিত্র্য-বৈশিষ্ট্য ছিল। ’৬৯-এর গণআন্দোলনের বৈশিষ্ট্য এমন ছিল যে, তখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর বিচারের কাজ চলছিল। বঙ্গবন্ধুকে প্রধান আসামি করে আগরতলা মামলা দায়ের করে ’৬৮-এর ১৯ জুন বিচারের কাজ শুরু হয়েছিল এবং বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলাবার জন্য আইয়ুব খান পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। আইয়ুব খানের তথ্য সচিব আলতাফ গওহর ‘আইয়ুব খান’ শিরোনামে একটি বই লিখেছেন। সেই বইয়ে উল্লেখ আছে কীভাবে বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসি দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু ’৬৯-এর গণআন্দোলনের শহীদদের বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগ সেই ষড়যন্ত্রিক প্রচেষ্টাকে সমাধিস্থ করে এবং আসাদ-মতিউর-মকবুল-রুস্তম-আলমগীর-সার্জেন্ট জহুরুল হক-আনোয়ারা-ড. শামসুজ্জোহার জীবনের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির আন্দোলন সফল হয়। জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে নারায়ণগঞ্জের এক জনসভায় দম্ভোক্তি করে আইয়ুব খান বলেছিলেন, তিনি আবার পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হবেন। অথচ ১৭ জানুয়ারি আন্দোলন শুরু হলো, ২০ জানুয়ারি আসাদ শহীদ হলেন, ২৪ জানুয়ারি শহীদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হলে সর্বব্যাপী গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয় এবং সেই আইয়ুব খান এক দিন পরেই বলেছেন ‘আমি আর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব না।’ একটি আন্দোলন ৭ দিনের মধ্যে গণঅভ্যুত্থানে রূপান্তরিত হয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে, ছাত্র সমাজের নেতৃত্বে! এর তুলনা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। যে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আজকের এই স্বাধীন বাংলাদেশ, যাদের রক্ত ঋণে গোটা জাতি ঋণী, তাদের সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাতে ভোলায় নিজ গ্রামে ‘স্বাধীনতা জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠা করেছি। সেই জাদুঘরে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে শহীদ সালাম-বরকত-রফিক-জব্বারের স্মৃতি, মহান ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ৬ দফা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণআন্দোলন, শহীদদের স্মৃতিচিহ্ন, ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জাতির পিতার দুর্লভ সব আলোকচিত্র সেখানে স্থান পেয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আজ আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক। এই বাংলাদেশের স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন। তিনি ছিলেন বিশ্ববরেণ্য মহান নেতা। তার কোনো তুলনা হয় না। তিনি জন্মেছিলেন বলেই আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। তিনি যদি না জন্মাতেন আমরা আজও পাকিস্তানের দাসত্বের নিগড়ে আবদ্ধ থাকতাম। সেই মহান নেতা তাঁর জীবদ্দশায় সবসময় এই দিনগুলোর কথা সংবাদপত্রে বাণী, বিবৃতি দিয়ে শহীদদের কথা সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করতেন। কেননা, তিনি জানতেন ৬ দফা আন্দোলন না হলে ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান হতো না; ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান না হলে বঙ্গবন্ধুকে কারাগার থেকে মুক্ত করতে পারতাম না; বঙ্গবন্ধু কারাগার থেকে মুক্ত না হলে ’৭০-এর নির্বাচনে পাকিস্তানে আমরা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারতাম না; আর পাকিস্তানে যদি আমরা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারতাম, তাহলে ৯ মাস যুদ্ধ করে এই দেশ স্বাধীন করতে পারতাম না। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছাত্রসমাজের যে ভূমিকা তা গৌরবোজ্জ্বল।

বছর ঘুরে এমন একটি মধুর দিন, যখন ফিরে আসে হৃদয়ের মানসপটে কত স্মৃতি ভেসে ওঠে। আমরা সংখ্যাসাম্যের বিরুদ্ধে সংখ্যাগুরুর অবস্থান থেকে ‘এক মাথা এক ভোটে’র দাবি তুলে তা আদায় করেছিলাম। ফলত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে সংখ্যাধিক্য আসন আমরা লাভ করেছিলাম। এ দিনের প্রতিটি মুহূর্তে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে মনে পড়ে। সে দিন বক্তৃতায় আরও বলেছিলাম, ‘৬ দফা ও ১১ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের রক্তের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে আমরা ফিরে পেয়েছি। তাদের সে রক্ত যেন বৃথা না যায়, তার জন্য জোরদার আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানাই। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্রসহ সকল মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য এই আন্দোলন শুরু হয়েছে।’ বক্তৃতা শেষ করে ঘোষণা করেছিলাম, ‘এখন বক্তৃতা করবেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব।’ তুমুল করতালির মধ্যে তিনি বক্তৃতা করতে দাঁড়ালেন। চারদিকে তাকিয়ে উত্তাল জনসমুদ্রের উদ্দেশে বললেন, “রাতের অন্ধকারে সান্ধ্য আইনের কঠিন বেড়াজাল ছিন্ন করে যে মানুষ ‘মুজিবকে ফিরিয়ে আনতে হবে’ বলে আওয়াজ তুলে গুলির আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে তাদের দাবির সঙ্গে আমি বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না।” সংগ্রামী ছাত্র সমাজকে আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি ছাত্রদের ১১ দফা শুধু সমর্থনই করি না, এর জন্য আন্দোলন করে আমি পুনরায় কারাবরণে রাজি আছি। ছাত্রদের ১১ দফার মধ্যে আমার ৬ দফা দাবিও নিহিত রয়েছে। আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন। আমি যদি এ দেশের মুক্তি আনতে ও জনগণের দাবি আদায় করতে না পারি, তবে আন্দোলন করে আবার কারাগারে যাব।’ সে দিন বঙ্গবন্ধু আরও বলেছিলেন, ‘আমি গোলটেবিল বৈঠকে যাব, সেখানে আমার ৬ দফাও পেশ করব, ১১ দফাও পেশ করব।’ তিনি জীবদ্দশায় কোনোদিন ১১ দফার কথা ভুলেননি। তাঁর বক্তৃতায় সবসময় ’৬৯-এর গণআন্দোলনের কথা থাকত। এমনকি ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে আছে, ‘১৯৬৯-এর আন্দোলনে আইয়ুব খানের পতন হওয়ার পরে যখন ইয়াহিয়া খান সাহেব সরকার নিলেন, তিনি বললেন, দেশে শাসনতন্ত্র দেবেন, গণতন্ত্র দেবেন, আমরা মেনে নিলাম।’ পরিশেষে স্বভাবসুলভ কণ্ঠে কৃতজ্ঞস্বরে বলেছিলেন, ‘ভাইয়েরা আমার, তোমরা যারা রক্ত দিয়ে, জীবন দিয়ে আমাকে কারাগার থেকে মুক্ত করেছ, যদি কোনোদিন পারি নিজের রক্ত দিয়ে আমি সেই রক্তের ঋণ শোধ করে যাব।’ তিনি একা রক্ত দেননি-’৭৫-এর ১৫ আগস্ট সপরিবারে রক্ত দিয়ে বাঙালি জাতির রক্তের ঋণ তিনি শোধ করে গেছেন। বাঙালি জাতির ইতিহাসে ২৩ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ দিন। যতদিন বেঁচে থাকব হৃদয়ের গভীরে লালিত এ দিনটিকে স্মরণ করব।

লেখক: সদস্য, উপদেষ্টা পরিষদ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ; সংসদ সদস্য; বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ।


ইসলামের আলোকে সালামের মাসায়ালা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
আতিকুল ইসলাম খান

আগে সালাম পরে কালাম। আল্লাহর একটি গুণবাচক নাম হচ্ছে সালাম, যার অর্থ শান্তি। এই নাম জপ করলে আল্লাহর পক্ষ হতে শারীরিক মানসিক শান্তি ও নিরাপত্তা পাওয়া যায়। সৃষ্টির শুরু থেকেই সালামের প্রচলন। আবু হুরায়রা (রহ.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন; মহান সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি, পৃথিবীর প্রথম মানুষ, প্রথম নবী এবং আমাদের আদি পিতা হজরত আদম (আ.)কে সৃষ্টি করে প্রথমেই আদেশ করেছিলেন, হে আমার আদম! ফেরেশতাদেরকে সালাম প্রদান কর এবং ভালো করে মনোযোগ দিয়ে শুনে আস তারা কিভাবে সালামের প্রতিউত্তর প্রদান করে। কেননা, পরবর্তীতে তোমার বংশধরদের জন্য এই সালামই হবে অভিবাদন বা সম্ভাষণ। ইসলামী অভিবাদক হচ্ছে সালাম। হজরত আদম (আ.) আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতাদের বললেন- আস্‌সালামু আলাইকুম, ফেরেশতারা প্রতিউত্তরে বললেন- ওয়ালাই কুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, অর্থাৎ হে আদম তোমার ওপর আল্লাহর পক্ষ হতে শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক। মূলত আমরা যদি আদম (আ.)-এর সন্তান হয়ে থাকি, তাহলে অবশ্যই সালামের প্রতি আমাদের বিদ্বেষ থাকবে না। মুসলমানরা শান্তিকামী, তাই মুসলিমদের কাউকে দেখলে প্রথমেই সালাম প্রদান করা। সালাম দেওয়া সুন্নত কিন্তু সালামের জওয়াব দেওয়া ওয়াজিব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন; যারা আল্লাহর প্রিয় বন্দা তারাই আগে সালাম দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্থান-কাল-পাত্র এবং শ্রেণি বিবেচনা না করে মুসলমানদের সর্বদা আগে সালাম দিতেন। সালামে আল্লাহর কথা স্মরণ হয় এবং সম্প্রীতি প্রকাশ পায়। সালাম মুসলিমের জন্য সর্বোত্তম দোয়া। তা ছাড়া সালাম হচ্ছে এক মুসলমান আরেক মুসলমানের সামাজিক শান্তির চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া। একজন মুসলিমের চুক্তি হলো আমার হাত ও মুখ দ্বারা আপনি কোনো কষ্ট পাবেন না, এই চুক্তি সামাজিকভাবে প্রচলিত হলে শান্তি ভঙ্গকারী শয়তান এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাবে, কারণ শয়তান ঐক্যবদ্ধতা পছন্দ করে না। সুরা আনআম- (৫৪) নং আয়াতে রাসুলকে সম্বোধন করে এই শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যে, দেখা হলে সালাম আর খালি ঘরে প্রবেশ করার আগে বলতে হবে আস্‌সালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল বাইত। সালাম আরবি শব্দ। এর অর্থ শান্তি, প্রশান্তি, শুভকামনা, কল্যাণের দোয়া, তাছাড়া সালাম একটি সম্মানজনক অভ্যর্থনামূলক অভিনন্দন এবং ব্যাপক উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন পরিপূর্ণ ইসলামী অভিবাদন। সালাম আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের অন্যতম, সুরা হাশর, আয়াত নং-২৪।

মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে বড় হাদিয়া হচ্ছে সালাম। সুরা নিসা, আয়াত (৮৬)। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা এরশাদ করেন; তোমাকে যতটুকু সালাম প্রদান করা হয় প্রতিউত্তরে তারচেয়ে বেশি করে বাড়িয়ে সালামের জবাব দাও। কেউ যদি বলে, আস্‌সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, সালামদাতার এতটুকু বলাই সুন্নত, এর বেশি না। অর্থাৎ তোমার ওপর আল্লাহর পক্ষ হতে শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক। প্রতিউত্তরে বলতে হবে, ওয়াআলাই কুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ, অর্থাৎ আল্লাহর পক্ষ হতে তোমাকেও শান্তি, রহমত ও বারাকা দান করুন। প্রতিউত্তরে বাড়িয়ে বারাকাতুহ- এ পর্যন্তই বলা সুন্নত, কিন্তু সওয়াবের আশায় এর বেশি বাড়িয়ে বলা যাবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, সালামদাতা প্রথম কথায় পেল বিশ নেকি আর সালামের উত্তরদাতা পেল ত্রিশ নেকি, সুবহান আল্লাহ! মুসলমানদের জন্য এর চেয়ে বড় হাদিয়া আর কি হতে পারে। দেখা হলেই দোয়া। সব অবস্থায় সালাম দেওয়া জায়েজ শুধু টয়লেট ও নামাজরত অবস্থায় ব্যতীত। তবে নামাজের শেষে সালামের জবাব দিতে পারবে। আমাদের সমাজে একশ্রেণির মানুষ আছেন, যারা পায়ে ধরে সালাম করাকে বেশি আদব মনে করেন। তাদের ধারণাই নেই যে, সালাম হবে মুখে, পায়ে নয়। এটা বিজাতীয় প্রথা যা অজ্ঞতাবশত ইসলামে ঢুকে গেছে। যার ফলে মুসলমান একদিকে সওয়াব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অন্যদিকে বেদায়াত করছে। এটি পরিত্যাগ করে সঠিক পন্থায় সালামের প্রচলন চালু করতে হবে।

শয়তানের শয়তানি-

শয়তানের সহজ প্ররোচনা হলো সালামে ভেদাভেদ সৃষ্টি করে ছোট্ট একটা হিংসার বীজ বপন করা। সুরা আরাফে উল্লেখ আছে, শয়তান আল্লাহর কাছে ওয়াদা করেছিল যে, এই আদমের জন্য আমি জান্নাত থেকে বহিষ্কৃত হয়েছি। আয় আল্লাহ! আপনার বড়ত্বের কসম, আমি আদম জাতিকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সব ভালো কাজ থেকে গাফেল করে রাখব। মহান পরাক্রমশালী আল্লাহ! শয়তানের এই চ্যালেঞ্জের মুখে মুমিনদের জন্য দান করেছেন অজস্র নিয়ামত। সুবহানাল্লাহ! শয়তান কাউকে বাধ্য করে না, তবে শয়তানের কাজ হলো সুন্দর করে মানুষের চিন্তাধারায় বড়ত্ব সৃষ্টি করে তার ব্যক্তিত্বে অহংকার ঢুকিয়ে দেওয়া। শয়তানের ধোঁকায় পড়া মানুষগুলোই তার চারপাশের মানুষকে সম্মান দিতে পারে না। অথচ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন বলতে ব্যবহারে পরিবেশ-পরিস্থিতির সামঞ্জস্য রক্ষা করাকে বোঝায়। একজন যাত্রী রিকশাওয়ালাকে সালাম দিবে- এতে সালামদাতার ব্যক্তিত্ব কমবে না বরং তার ব্যক্তিত্ব আরও দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেবেন আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা।

হাদিসে এসেছে প্রথম সালামদাতা অহংকারমুক্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন; যার অন্ততে একটি সরিষা দানা পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পরবে না। সুতরাং প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত অহংকার নামক মারাত্মক ব্যাধি থেকে বাঁচার জন্য সালামের প্রতিযোগিতা করা। আল্লাহর পছন্দনীয় বান্দারাই সালামের মতো মহৎ গুণে অভ্যস্ত। তাই শয়তানের শয়তানি হলো মানুষকে অহংকারী বানিয়ে ইসলামের মৌলিক শিক্ষাগুলোকে বিকৃতভাষ্য হিসেবে প্রচলিত করে মানুষকে ইসলামের আদর্শ থেকে বঞ্চিত রাখা। কথিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.)কে একদিন এক ইহুদি বলেছিল, হে মুহাম্মদ! আসামু আালাইকা অর্থাৎ হে মোহাম্মদ তুমি ধ্বংস হও, প্রতিউত্তরে নবীজি (সা.) বলেছিলেন; ওয়া লাইকুম অর্থাৎ তুমি আমাকে যা দিলে আমি তোমাকে তাই দিলাম। সুতরাং শয়তানের শয়তানি থেকে বেঁচে থাকতে হলে ইসলামের সত্যটা জেনে-বুঝে মানতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন; অমুসলিমদের সালাম দেওয়া যাবে না, তবে তাদেরকে অভিবাদন জানাতে হবে দুনিয়ার কোনো প্রচলিত ভাষায়। কোনো মজলিসে, মুসলিম, মুশরিক, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মূর্তিপূজারি একাধিক ধর্মের মানুষ একসঙ্গে বসা থাকলে সালাম দেওয়া যাবে, কেননা অসম্মানজনক কাজ ইসলামে নেই। সুতরাং অমুসলিমদের সালামের জওয়াবে বলতে হবে ওয়া লাইকুম।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসে সালামের চারটি গুণের কথা বলা হয়েছে– শান্তি, রহমত, বরকত ও অন্তরে ভালোবাসা পয়দা। যে পরিবারে সালামের প্রচলন থাকবে, সে ঘরে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা শান্তি, রহমত ও বরকতে ভরিয়ে দেবেন এবং যে সালাম দেবে তার হেফাজতকারী হয়ে যান আল্লাহ তায়ালা। যে সন্তান বাবা-মাকে সালাম দেবে এবং বাবা-মায়ের সালামের প্রতিউত্তরের মাধ্যমে যে সওয়ার পাবে, সেই সন্তান কোনো দিন বিপথগামী হবে না। যে সংসারে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সালাম আদান-প্রদানের প্রচলন থাকবে, সে সংসারে কোনো দিন অনিষ্টকারী শয়তান কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। শয়তানের সবচেয়ে গর্বিত কাজ হলো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানো। এতে শয়তান তাদের নেতার পক্ষ হতে পুরস্কৃত হয়। সুতরাং সালাম বিচ্ছেদ নয় বরং ঐক্যবদ্ধ করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কেউ যদি দূর থেকে সালাম পাঠায়, তাহলে তোমরা তার প্রতিউত্তরে বলবে, ওয়া আলাইকা ওয়া আলাইহি সালাম। সুরা নুর, আয়াত (২৭)। বলা হয়েছে, হে মুমিনগণ তোমরা নিজেদের ঘর ছাড়া অন্য কারও ঘরে কখনো প্রবেশ করবে না- যে পর্যন্ত তাদের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় এবং সালাম দিয়ে তাদের অনুমতি ব্যতীত। তিনবার সালাম দেবে ভেতর থেকে সাড়া না এলে ভদ্রভাবে চলে আসবে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা শেষ বিচারের দিন জান্নাতিদের প্রথম অভিবাদন জানাবেন সালামের মাধ্যমে। সালামুন কওলাম মির রব্বির রহিম- অর্থাৎ দয়ালু রবের পক্ষ হতে তোমাদের জন্য সালাম। আল্লাহু আকবার! জান্নাতে আর কোনো আমল ও ইবাদত নেই, আছে শুধু সালাম আর সালাম, শান্তি আর শান্তি।

সালামে আধুনিকতার কুফল-

আমাদের সমাজে ইংরেজি শিক্ষার হার বেড়ে যাওয়ায় অধিকাংশ মানুষ সালামের পরিবর্তে হ্যালো ব্যবহার করে আর সালামকে সংক্ষিপ্ত করে বলে আসামু আলাইকা বা স্লা-মালিকুম আর প্রতিউত্তরে বলে আলাইকুম। সুতরাং তুমি যা আমিও তা। সালামের এই অশুদ্ধ উচ্চারণের প্রতিফলনে মানুষ শান্তি-শৃঙ্খলা ও রহমত-বরকত থেকে বঞ্চিত হয়ে অভিশাপ নিয়ে এক ধরনের বিষণ্ন মাতালের মতো জীবন যাপন করছে। অথচ এসব তাদেরই চাওয়া থেকে পাওয়া। তারা যা শোনে তাই বলে, আসলেই তারা জানে না, হ্যালো মানে- জাহান্নামি আর আসামু আলাইকা অথবা স্লা-মালিকুম মানে– তুমি মরে, তুমি ধ্বংস হও। স্মার্ট হওয়া ভালো তবে অতিরঞ্জিত কোনো কিছুই ভালো না। ইংরেজি ভাষা হচ্ছে মডার্ন আর আরবি হলো সুন্নাহ। সুতরাং কল্যাণের স্বার্থে ভাষার ব্যবহার প্রযোজ্য তবে, ইসলাম পরিপন্থী বিকৃত ভাষা মুসলমানদের পরিহার করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা মধ্যমপন্থা অবলম্বন কর, তাতেই কল্যাণ।

বিশ্বনবী রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, চারটি গুণ যার মধ্যে বিদ্যমান থাকবে, সে নিরাপদে জান্নাতে যেতে পারবে।

১) যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার আসায় সঠিকভাবে সালামের প্রচার-প্রসার ও আদান-প্রদান করবে, সে নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

২) যে ব্যক্তি কোনো ক্ষুধার্তকে খাবার খাওয়াবে, সে নিরাপদে জান্নাতে যাবে।

৩) যে মুসলিম আত্মীয়তার সম্পর্ক সঠিকভাবে রক্ষা করবে, সে ব্যক্তি নিরাপদে জান্নাতে যাবে।

৪) পৃথিবীর মানুষ যখন ঘুমে বিভোর থাকে, তখন যে ব্যক্তি আরামের ঘুম ত্যাগ করে কিয়ামুল লাইল আদায় করে, সে নিরাপদে জান্নাতে যাবে।

সালামের ব্যাপারে বৈষম্য-

এই উচ্চশিক্ষার জ্ঞান গরিমা ও অর্থবিত্তের সমাজে অধিকাংশ মানুষ মনে করে থাকে যে, আমিই কেবল সালাম পাওয়ার যোগ্য, আমাকে সবাই সালাম দেবে। এ ধারণাটা ভুল। বিশ্ব নবী রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনী থেকে জানা যায় তিনি দু-জাহানের বাদশা হয়েও বয়সে ছোট-বড় এবং অধীনস্থদের সর্বদায়ই আগে সালাম দিতেন। সুতরাং উম্মতে মুহাম্মদির উচিত ধনী-গরিব ঘরে বাইরে উপরস্থ-অধিনস্থ সবাইকে আগে সালাম দেওয়ার প্রতিযোগিতা করা। আখেরি নবী হজরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কত অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করে পৃথিবীতে সালাম প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছেন, আর আমরা কিনা তাঁর উম্মত হয়ে শয়তানের উপাসনা করছি। প্রথমত শয়তানের কাজ হলো মানুষের অন্তরে হিংসা নামক ভাইরাস সংক্রামিত করে সব অন্তরজুড়ে হিংসা ছড়িয়ে দেওয়া। আর এই হিংসা-প্রতিহিংসা নিরাময়ের ভ্যাকসিন হলো সালাম। সুবহান আল্লাহ!

তাই তো আমাদের প্রিয় নবীজি (সা.) বলেছেন, তোমরা তোমাদের সমাজে সালামের প্রচার-প্রসার বাড়িয়ে দাও। দেখবে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তোমাদের জীবনকে শান্তি, রহমত, বরকত, নিরাপত্তা ও ভালোবাসা দিয়ে পূর্ণ করে দেবেন। আয় আল্লাহ! আমাদেরকে ব্যাপকভাবে সালাম বিনিময় করার তৌফিক দান করুন। জাজাকাল্লাহ খয়ের

‘ইনশা আল্লাহ’

লেখক: ইসলামী চিন্তাবিদ


বাংলা ভাষার বিকৃতি ও দূষণ

আপডেটেড ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ ১৩:১১
এস ডি সুব্রত

রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের বাংলা ভাষা। এ ভাষার জন্য দিতে হয়েছে প্রাণ। বাংলা একটি সমৃদ্ধ এবং শ্রুতিমধুর ভাষা। মাতৃভাষার জন্য জীবনদানের ইতিহাস বিশ্বে বিরল। আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত ভাষাকে আমরা অবজ্ঞা করে চলেছি যেন অবলীলায়। আধুনিকতার দোহাই দিয়ে কতিপয় মানুষ বাংলা ভাষাকে বিকৃত করে চলছে। ভাষাদূষণ যেন এখন বায়ুদূষণের মতো একটা স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভাষাদূষণের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ শব্দ প্রয়োগের মাধ্যমে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু ট্রলমার্কা শব্দ ও বিনোদনধর্মী বিকৃত ভিডিওতে এ দূষণ লক্ষণীয়।

দুঃখজনক হলেও সত্য- এসব বিকৃত শব্দ ও ভিডিও জনপ্রিয়তা অর্জন করছে দ্রুত, যার ফলে ভাষার দূষণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

যথাযোগ্য ব্যবহার, চর্চা আর সর্বজনীনতার ওপর ভাষার সমৃদ্ধি অনেকাংশে নির্ভরশীল। সমৃদ্ধি না ঘটলে ভাষা দীন হতে থাকে, এক সময় বিলুপ্তি ঘটে। পৃথিবীতে ভাষার মৃত্যু বা বিলুপ্তির এ রূপ অনেক উদাহরণ আছে। ভাষা দীন-দুর্বল হয়ে যাওয়ার নানাবিধ কারণও রয়েছে। এর মধ্যে আছে বিকৃতিসাধন, রূপান্তর, ভাষার ব্যবহারে অসচেতনতা, অপব্যবহার প্রভৃতি। বিশ্বায়ন, আকাশ সংস্কৃতি, ডিজিটালাইজেশনের কারণে ইংরেজির অধিক ব্যবহারের প্রভাবে মাতৃভাষা প্রবহমানতা হারাচ্ছে। তার ওপর আছে বিদেশি ভাষার আগ্রাসন। ইদানীং টিভি চ্যানেল চালু করলেই শোনা যায়- ‘হ্যালো লিসেনার্স’, ‘হ্যালো ভিউয়ার্স’।

তরুণদের মুখে মুখে ‘আবার জিগায়, বেইল নাই’ ইত্যাদি জাতীয় ভাষার ব্যবহার। আবার নাটকের নামের ক্ষেত্রে দেখা যায় ‘হাউসফুল’, ‘বাংলা টিচার ইংরেজি এবং ইংরেজি বাংলা না বেশ ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রায়ই দেখা যায় তরুণ প্রজন্মের অনেকে যে ভাষা ব্যবহার করছে তা না-আঞ্চলিক, না-প্রমিত। তারা মামাকে ‘মাম্মা’; আবার বন্ধু কিংবা বাসচালককেও মাম্মা বলে সম্বোধন করছে।

ভাষাবিদদের মতে, এভাবেই বাংলা ভাষার সঙ্গে ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, ফারসির মিশ্রণ চলছে। আধুনিকতার দোহাই দিয়ে এরকম নানা শব্দ ঢুকে বাংলা ভাষাকে দূষিত করছে, বিকৃত করছে। গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন, নাটক বা চলচ্চিত্রে এরকম ভাষার ব্যবহার মূল ভাষায় প্রভাব ফেলছে।

বাংলা ভাষার দূষণ ও বিকৃতি রোধে হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও ভাষা বিকৃতির নতুন ক্ষেত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, টুইটার। হাইকোর্টই সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর আদেশ ‘২০১৪ এবং রয়েছে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন-১৯৮৭সহ সরকারি অনেক বিধিনিষেধ; কিন্তু ওইসব আদেশ, আইন ও বিধিনিষেধের বাস্তবায়ন নেই। সর্বত্র বাংলা ভাষার দূষণ চলছেই। সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহারের আদেশও উপেক্ষিত। বিষয়গুলো নিয়ে হাইকোর্টের বিচারপতি, শিক্ষাবিদসহ নানা মহল উদ্বিগ্ন হলেও বিষয়টি দিন দিন উপেক্ষিত হচ্ছে।

একদা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলামের ‘ভাষাদূষণ নদীদূষণের মতোই বিধ্বংসী’ শীর্ষক একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছিল একটা জাতীয় দৈনিকে। সেখানে বলা হয়ছিল ‘ভাষার মাসে বাংলা ভাষার সাম্প্রতিক চর্চা আমাদের ভাবায়। শুদ্ধবাদীরা শঙ্কিত হন, বাংলা ভাষা তার রূপ হারিয়ে কোনো শংকর ভাষায় রূপ নেয়, তা ভেবে।’ ওই লেখায় আরও বলা হয়েছিল, ‘ভাষাকে নদীর সঙ্গে তুলনা করি; কিন্তু এই ভাষানদীকে আমরা যে দূষিত করছি প্রতিদিন, তা নিয়ে কি ভাবী?’ ওই লেখাটি আমলে নিয়ে তৎকালীন হাইকোর্টের বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিতভাবে বেশ কয়েক দফা নির্দেশনা দেন। একই সঙ্গে রেডিও ও টেলিভিশনে ‘বিকৃত উচ্চারণে’ এবং ‘ভাষা ব্যঙ্গ’ করে কোনো ধরনের অনুষ্ঠান প্রচার না করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ওই আদেশে আদালত বলেন, বাংলা ভাষার পবিত্রতা রক্ষা করতে সর্বতোভাবে চেষ্টা করতে হবে। এই ভাষার প্রতি আর কোনো আঘাত যাতে না আসে, সে বিষয়ে সচেষ্ট হতে হবে। এ ছাড়া আদালত, বাংলা ভাষার দূষণ, বিকৃত উচ্চারণ, ভিন্ন ভাষার সুরে বাংলা কথন, সঠিক শব্দ চয়ন না করা এবং বাংলা ভাষার অবক্ষয় রোধে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে সে বিষয়ে বাংলা একাডেমির তৎকালীন সভাপতি অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছিল

ওই কমিটি ৯ দফা সুপারিশও করেছিল।

সুপারিশে বলা হয়েছিল ভাষাদূষণ রোধে আইন তৈরি করে বিদেশি টেলিভিশন চ্যানেল এবং দেশি বেতার ও টেলিভিশন নিয়ন্ত্রণ; বিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলকভাবে প্রমিত বাংলা ভাষার একটি কোর্স চালু এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পঠন-পাঠন প্রবর্তনের উদ্যোগ; বেতার ও টেলিভিশনে প্রমিত বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত এবং ভাষায় বিদেশি শব্দের অকারণ মিশ্রণ দূর করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ; সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভাষার বিকার ও দূষণ রোধে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস রেগুলেটরি কমিশনের ব্যবস্থা গ্রহণ; বেতার ও টেলিভিশনে ভাষাদূষণ রোধ। সুপারিশে আরও বলা হয়, প্রমিত বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য তথ্য মন্ত্রণালয়কে একটি স্থায়ী কমিটি গঠন করতে হবে। ওই কমিটি বেতার ও টেলিভিশনে প্রচারিত অনুষ্ঠান পরিবীক্ষণ করে মতামত, উপদেশ ও নির্দেশ প্রদান করবে। এ ছাড়া মোবাইল ফোনের কলার টিউনে বাংলা ছাড়া অন্য ভাষার ব্যবহার নিরুৎসাহ করার এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে বলা হয়েছিল; কিন্তু বিশেষজ্ঞ কমিটির ওই সুপারিশ হাইকোর্টে ফাইলবন্দি অবস্থায় পড়ে থাকে। এ ছাড়া রাজধানীসহ সারা দেশে বড় বড় শহরে বিলবোর্ডের ভাষায় রয়েছে ইংরেজি-বাংলার মিশ্রণ। অথচ এক রিটে ২০১৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার, গাড়ির নম্বরপ্লেট ও বিভিন্ন দপ্তরের নামফলকে বাংলা ব্যবহার করতে বলা হলেও তা যথাযথভাবে পালন হচ্ছে না।

ভাষাদূষণ ও সর্বস্তরে প্রচলনের ব্যাপারে ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ভাষার বিকৃতি ও দূষণ চলছে বহুদিন ধরে। এটি চলতে থাকবে যতদিন ভাষা বিপ্লব না হয়। এর মূল কারণ ইংরেজি ভাষায় শিক্ষিত হয়ে দেশ শাসন করছি, নিজ ভাষা অবহেলিত হচ্ছে। বিষয়কে একটি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে সমাধানের চেষ্টা না করা পর্যন্ত দূষণ বিকৃতি চলতেই থাকবে। আর সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন সম্ভব। তিনি বলেন ইউরোপের দেশ-চীন-জাপানের দিকে খেয়াল করুন, তারা সেটা করতে পেরেছে। চীন-জাপানের ভাষা প্রাগৈতিহাসিক চিত্রলিপির বর্ণমালা। ওই বর্ণমালা দিয়ে যদি আণবিকশক্তি গবেষণা, মহাকাশ গবেষণা সম্ভব হয়, আমরা কেন পারব না? এর জন্য সদিচ্ছা দরকার। শাসনযন্ত্র, শিক্ষিত-সুধীসমাজ যতক্ষণ মাতৃভাষা গ্রহণ না করবে, মাতৃভাষাকে প্রাধান্য না দেবে, ততক্ষণ সর্বস্তরে বাংলা প্রচলন সম্ভব হবে না। ভাষাবিদ অধ্যাপক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, আদালত শুধু নির্দেশনাই দিতে পারেন; কিন্তু সেটি বাস্তবায়নের সঙ্গে অনেক প্রতিষ্ঠান জড়িত। ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে ওইসব প্রতিষ্ঠান সচেতন না হলে আদালতের আদেশ তো উপেক্ষিত থাকবেই।

মিডিয়ার ভাষা নামে যে জগাখিচুড়ি ভাষা চালু করেছে, তাতে ভাষার বিকৃতি হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা ইংরেজি থেকে বিশেষ্যগুলো গ্রহণ করব। যেমন- থার্মমিটার, প্রেশারকুকার ইত্যাদি। এগুলোর বিকল্প নেই। তবে বিশেষণ ও ক্রিয়াপদগুলো কেন ইংরেজির হাতে তুলে দেব। অধ্যাপক মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, নিয়মনীতির চেয়ে বড় প্রয়োজন ভাষানীতি। এ ছাড়া দরকার নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ।

ইদানীং আরও দেখা যায়, কখনো কোনো মত যদি কারও বিপক্ষে চলে যায় তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশ্লীল ভাষায় প্রতি-উত্তর দেওয়া , গালাগালি করা যেন একটা স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবাদের ভাষা মার্জিত হলে ক্ষতি নেই। এসব বিষয় দেখার জন্য নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন‌। আমাদের মাতৃভাষার দূষণরোধে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে। সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। ভাষার দূষণ রোধে সুনির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আইন প্রয়োগের বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। আসুন রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের বাংলা ভাষাকে দূষণমুক্ত করতে সবাই যে যার দায়িত্ব পালন করি। মায়ের মতো মায়ের ভাষাকে যথাযথ সম্মান করি। মাতৃভাষার মর্যাদাকে সমুন্নত করতে আসুন সবাই তৎপর হই।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক


একুশের বইমেলা: উদ্যোক্তা, প্রকাশক ও ক্রেতার অর্থনীতি

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ড. মিহির কুমার রায়

এখন চলছে ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি যা শীত-বসন্তে অনুষ্ঠিত হয় এবং এই মাসের অন্যতম আকর্ষণ বইমেলা যার আয়োজক বাংলা একাডেমি। এ বছরের বইমেলার প্রতিপাদ্য হচ্ছে- ‘পড়বো বই, গড়বো দেশ: বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ।’ এই মাসের প্রথম দিন পহেলা ফেব্রুয়ারি। রাজধানীর বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে মাসব্যাপী এ আয়োজনের উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষার জন্য যারা জীবন দিয়েছেন তাদের ত্যাগকে জাগরূক রাখতে এই মেলার নামকরণ করা হয় ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’। সে কারণে পুরো ফেব্রুয়ারি মাস ধরে এর আয়োজন। ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জনপ্রিয়। প্রকাশক চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের বটতলায় কলকাতা থেকে আনা কিছু বই নিয়ে মেলার সূচনা করেন। চিত্তরঞ্জন সাহার মুক্তধারা প্রকাশনী ইতোমধ্যে বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনী হিসেবে সুনাম অর্জন করেছে, তার দেখাদেখি অন্যরাও উৎসাহী হন। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত স্বল্পপরিসরে মেলা চলতে থাকে, ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক বাংলা একাডেমিকে বইমেলার সঙ্গে সমন্বিত করেন। তারই উদ্যোগে ১৯৭৯ সাল থেকে বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি বইমেলার ব্যবস্থাপনায় অংশীদার হয়ে ওঠে, ১৯৮৩ সালে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কাজী মনজুরে মওলা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বইমেলার আয়োজনের দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু এরশাদবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের তোড়ে সে বছর মেলা অনুষ্ঠিত হয়নি, ১৯৮৪ সাল থেকে পুরো উদ্যমে মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে এবং বাংলা একাডেমি চত্বরে জায়গা না হওয়ায় ২০১৪ সাল থেকে বইমেলা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়েছে। একাডেমি প্রাঙ্গণে ১২০টি প্রতিষ্ঠান ১৭৩টি ইউনিট এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৫১৫টি প্রতিষ্ঠান ৭৬৪টি ইউনিট বরাদ্দ পেয়েছে। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে একটি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৩৬টি প্যাভিলিয়ন থাকছে। এবার বইমেলার আঙ্গিকগত ও বিন্যাসে পরিবর্তন আনা হয়েছে, বিশেষ করে মেট্রোরেল স্টেশনের অবস্থানগত কারণে গতবারের মূল প্রবেশপথ এবার একটু সরিয়ে বাংলা একাডেমির মূল প্রবেশপথের উল্টো দিকে অর্থাৎ মন্দির গেটটি মূল প্রবেশপথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এখন আসা যাক- এই মেলাকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিপ্রকৃতি নিয়ে যা এই প্রবন্ধের মূল বিষয়। উল্লেখ্য, বইমেলাকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর জানুয়ারি মাসের শুরুতেই নতুন বই নিয়ে লেখক, পাঠক ও প্রকাশক মহলে গুঞ্জন ওঠে। এই সময় দেশবরেণ্য লেখকদ্বয়ের নতুন বই প্রকাশিত হয়, বইমেলাকে কেন্দ্র করে লেখকের প্রত্যাশা থাকে পাঠককে নতুন বই উপহার দেওয়ার, পাঠকও প্রিয় লেখকের নতুন পাঠের অধিক আগ্রহে থাকে, তাই অমর একুশে বইমেলাকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর অসংখ্য নতুন বই প্রকাশিত হয়, মেলায় অংশগ্রহণ করেন উদ্যোক্তা সংস্থা, লেখক-লেখিকা, পাঠক ও প্রকাশক যার সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি যোগসূত্র রয়েছে। এসব অংশীদারের নিজস্ব একটা ব্যবসায়িক দিক রয়েছে শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার অন্তরালে। এবার বাংলা একাডেমি যে ৬৩৫টি প্রতিষ্ঠানকে ৯৩৭টি ইউনিট বরাদ্দ দিয়েছে তা থেকে প্রাপ্তি কত সে প্রশ্নটি আসাই প্রাসঙ্গিক অর্থাৎ এই প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব আয় কত হয়েছে তা জানা না গেলেও অঙ্কটি যে অর্ধ কোটি কিংবা তার বেশি যে হবে এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। এই রাজস্ব আয়ের খাতটি বাংলা একাডেমির মতো একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার জন্য খুবই প্রয়োজনীয় সার্বিক দিকের উন্নয়নের বিবেচনায়। এ ছাড়া এই বাড়তি আয় সরকারের রাজস্ব আয়ের ভাণ্ডারে আরও একটি নতুন সংযোজন। আবার যারা স্টল বরাদ্দ নিয়ে তাদের বই প্রদর্শনের আয়োজন করে বিক্রয়ের উদ্দেশে যার মধ্যে রয়েছে পূর্বে আলোচিত প্রকাশক, লেখক, ব্যবসায়ী যাদেরও দিন শেষে আয়-ব্যয়ের একটি হিসাব রাখতে হয় এ মেলাকে ঘিরে। এ বইমেলা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে যার সঙ্গে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা জড়িত তথা বেকারত্বের অবসান ঘটায়। সেই হিসাবে একুশে বইমেলা বই বিক্রেতা, প্রকাশক, ছাপাখানা, বই বাইন্ডিং ইত্যাদি খাতের সঙ্গে জড়িতদেরও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করে। একটি বইকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে থাকে অনেক মানুষের অবদান যেমন- প্রথমত লেখক লেখেন, কম্পোজিটর হাতের লেখাকে কম্পিউটারে কম্পোজ করেন, প্রচ্ছদশিল্পী বইয়ের চরিত্র অনুযায়ী প্রচ্ছদ আঁকেন, প্রকাশক পাণ্ডুলিপি ভেদে নির্ধারিত মাপে কাঠামো দাঁড় করান, এরপর কাগজে প্রিন্ট করার পর পাণ্ডুলিপি যায় বানান সংশোধকের কাছে, সচরাচর এরা প্রতি ফর্মা ১০০ থেকে ৫০০ টাকায় দেখে থাকেন। লেখক-প্রকাশকের সম্মিলিত উদ্যোগে পাণ্ডুলিপি ফাইনাল করা হলে প্রেসে যায়। মেলাকে ঘিরে কয়েক মাস আগে থেকেই বই ছাপার কাজ শুরু হয় নীলক্ষেত, কাঁটাবন, আরামবাগসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ছাপাখানাগুলোতে যদিও পুরান ঢাকার বাংলাবাজারই এর আসল ঠিকানা। এখানেই গড়ে উঠেছে শত শত ছাপাখানা, তৈরি হয়েছে বাঁধাইখানাও। ‘বই বাজার’ হিসেবে পরিচিত পুরো এ এলাকাই দুই মাস ধরে থাকে কম্পোজ, পেস্টিং, প্লেট, ফাইনাল- শব্দে মুখর। ছুটি বাতিল করে বইয়ের কারিগররা দিন-রাত পরিশ্রম করে প্রতিটি ছাপাখানায়। কারখানাসংলগ্ন কম্পোজের দোকানগুলোর ব্যস্ততা থাকে চরমে, যেন কথা বলার সময়টুকু নেই কারও। ছাপা, বাঁধাই ও নান্দনিক মোড়ক লাগানোর পর কর্মচারীর হাত থেকেই বই চলে যায় অমর একুশে গ্রন্থমেলায়। প্রিন্টার্স মালিকরা জানান, বছরের বেশির ভাগ সময় বসে থাকলেও বইমেলার কারণে ব্যস্ততা বেড়ে যায়, প্রতিদিন প্রায় ৫০-৬০ সেট করে বই ডেলিভারি দিতে হয়। সব মিলিয়ে কাজের চাপ অনেক বাড়ে। অন্যান্য মাসের চেয়ে শ্রমিকরাও নিয়মিত বেতনের চেয়ে ১০-১৫ হাজার টাকা বাড়তি আয় করেন মেলার কয়েক মাস আগে থেকেই।

বই বাজার নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটানো অনুপ্রাণন প্রকাশনীর প্রকাশক জানান, তার প্রতিষ্ঠান থেকে গত ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি মাস পর্যন্ত ৭১টি বই প্রকাশ হয়েছে। এ মেলা শেষ হলেই আমরা নতুন করে পাণ্ডুলিপি নেওয়ার কাজ শুরু করব। মে-জুন থেকেই পাবলিস্ট (প্রকাশ) শুরু হয়, মেলা উপলক্ষে প্রায় ৩০ শতাংশ বই প্রকাশিত হয় নতুন। সারা বছরই আমাদের কাজ চলতে থাকে, বইমেলা উপলক্ষে ছাপাখানা ও বাঁধাইখানায়ও কাজের চাপ বাড়ে। ফলে এখানে খণ্ডকালীন চাকরির সুযোগ হয়, মুজুরিও দিতে হয় তুলনামূলক বেশি, ঘণ্টা হিসেবে, দৈনিক হিসেবে, মাসিক হিসেবে নানাভাবে শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয়।

এবারের বইমেলায় বেচাকেনা কেমন হচ্ছে জানতে চাইলে যানা যায়, গতবারে শুরু থেকেই ভালো বিক্রি হয়েছিল, এবার প্রথমদিকে তেমন না হলেও আশা করা যায় শেষ সময়ে বিক্রি বাড়বে, তবে মনে করা হচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় পাঠকরা বই কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। আবার কাগজ ও কালির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় ডিসেম্বর থেকে বইয়ের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এটাও বই বিক্রি কম হওয়ার কারণ হতে পারে। কাগজ ও কালি দেশে তৈরি হলেও উপকরণ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। আর আমদানি খরচ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। বইমেলায় স্টল ভাড়া এবং বিক্রেতা হিসেবে যারা আছে সব ক্ষেত্রেই ব্যয় আগের তুলনায় বেশি। সবশেষে আবু এম ইউসূফ বললেন, আমি আশা করব কাগজ ও কালির মূল্য বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে সরকার জোরালো ভূমিকা রাখবে। বই মানুষকে মনের খোরাক জোগায়। সুস্থ ও সুন্দর জাতি গড়ে তুলতে বইয়ের কোনো তুলনা নেই। তাই মূল্য বৃদ্ধির প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে বইশিল্পকে। এই দিক থেকে ভাষার মাসের গুরুত্ব অপরিসীম যেমন বিজ্ঞাপন ব্যবসা, দৈনিক পত্রিকা থেকে শুরু করে অনলাইন নিউজ পোস্টার ও বইমেলাকেন্দ্রিক বুলেটিন ছাপানো হয় কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞপন। এ ক্ষেত্রে দেখা যায় পণ্য হিসাবে বই ক্রেতার বহুরূপিতা যেম-ন কেউ ছাত্রছাত্রী, কেউ গবেষক, কেউ শৌখিন ক্রেতা, কেউ আবার কবি-সাহিত্যিক, কেউ আবার শিশুশ্রেণির এবং কেউ আবার প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিনিধি যারা নিজের প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগারকে সমৃদ্ধ করার জন্য ক্রেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়। একটি তথ্যে দেখা যায়- ২০২৩ সালের বইমেলায় ১০০ কোটি টাকার ওপরে বই বিক্রি হয়েছিল এবং বর্তমান বছরে এই অঙ্কটি মূল্যস্ফীতির কারণে বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে মনে হয় বিশেষত; আমাদের মতো বই পাঠের চর্চাবিমুখ মানুষের দেশে। সেই বইগুলো বইপ্রেমিক মানুষের বাসার সৌন্দর্য বর্ধনের উপকরণও বটে যা বইমেলারই অবদান। কারণ বইয়ের চেয়ে সুন্দর কিছু আছে বলে মনে হয় না যা প্রতিটি সৃজনশীল সংস্কৃতিমনা মানুষই বোঝেন। তারা বছরের এই ক্ষণটির দিকে তাকিয়ে থাকে কখন ফেব্রুয়ারি মাস আসবে আর প্রকাশনা সংস্থা তথা মুদ্রণ কর্মীরা তাদের বিনিদ্র রজনী কাটাবে মেলা শুরু হওয়ার আগে থেকেই নতুন বই মুদ্রণের প্রয়াসে যা প্রকাশনা শিল্পের জন্য একটি আলোকিত দিক। প্রতিদিনই মেলায় নতুন বই আসছে যা মেলার নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে প্রচার করা হয়ে থাকে এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কর্মীরা তাদের বিধিবদ্ধ দায়িত্বের অংশ হিসেবে বিশেষ ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে তাদের নির্ধারিত চ্যানেলগুলোতে সংবাদের অংশ হিসেবে প্রচার করছে প্রতিনিয়ত। এই ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি এবং এই একই মাসের ২১ তারিখটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতির মাধ্যমে দেশের ভাবমূর্তি বৈদেশিক অঙ্গনে অনেক প্রসারিত হয়েছে।

এখন সাহিত্যের মানদণ্ডে আমরা যদি এই সময়টিকে ঘিরে সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় সৃষ্টির বিষয়গুলোকে মূল্যায়ন করি তা হলে দেখা যাবে কবিতা ও উপন্যাসের ক্ষেত্রে একটা শূন্যতার আভাস অর্থাৎ সাহিত্যের অন্যান্য শাখার চেয়ে এই শাখা দুটোতে সংখ্যাধিক্ষের ভিত্তিতে সৃষ্টি কম যদিও মানের কথা বিবেচনায় না-ই আনি। আবার অন্যান্য শাখায় লেখক থাকলেও মানসম্মত লেখার স্বল্পতা পরিলক্ষিত হয় এই ফেব্রুয়ারি মাসকে ঘিরে। যারা সাহিত্য সমালোচক তারা বলছেন মানসম্মত সাহিত্য এবং সাহিত্যিকের সংখ্যা ক্রম অবনতিশীল বিধায় আগ্রহে ও পেশায় দুটোতেই কেমন একটা স্থবিরতা পরিলক্ষিত হয় সৃষ্টিশীল কাজে। বিষয়টি এমন যে সাহিত্য সৃষ্টি বা সাহিত্যিক হওয়া একটা ব্যক্তিগত আগ্রহের ব্যাপার যা একটি অনুকূল পরিবেশ পেলে প্রস্ফুটিত হয় যার ধারাবাহিকতা অনেক দিন পর্যন্ত চলে। এটি কোনো অনুকরণের বিষয় কিংবা শৌখিন বিষয় নয়- এই জায়গাটিতেই সংকট রয়েছে। কেউ যদি এটাকে পেশা হিসেবে নিতে চায় তবে আর্থিক দৈন্যতার সম্মুখীন হতে হবে এটাই বাস্তব বিশেষত প্রতিযোগিতামূলক বাজার অর্থনীতির যুগে যেখানে জ্ঞানচর্চার ফসলের বাজার সংগঠিত নয় আবার সামাজিক স্বীকৃতিও সহজই ধরা দেয় না। যার ফলে ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চাও ক্ষীণ হয়ে আসছে প্রজন্ম শূন্যতার কারণে। যারা চলে যাচ্ছে আর যারা আসছে তাদের মধ্যে গুণগত পার্থক্য আকাশ-জমিন যা শুধু সাহিত্য বা ভাষার ক্ষেত্রেই নয়- জীবনের সর্বক্ষেত্রে। ফলে মনের খোরাকের জন্য যে সাহিত্য প্রয়োজন সে জায়গাটিতে খাদ্য নিরাপত্তার অভাব রয়েছে যার ফলে অস্থিরতা বা অসন্তোষ বা অস্বস্তি এখন প্রায় সব পরিবারেই নিত্যদিনের সাথী যা মনের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। এ ধরনের একটি আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে সাহিত্যিক, উপন্যাসিক কিংবা কবি সৃষ্টি বিশেষত ফেব্রুয়ারি মাসব্যাপী গ্রন্থমেলাকে কেন্দ্র করে কতটুকু অবদান রাখবে তা ভেবে দেখার বিষয়। যারা জনপ্রিয়তা চায় তাদের জন্য এ ধরনের মেলা সাহিত্য কেনাবেচার একটি ক্ষেত্র হতে পারে; কিন্তু ভালো সাহিত্য বা সৃজনশীল সাহিত্যসৃষ্টি কতটুকু সম্ভব হবে তাও দেখার বিষয়। তবে আয়োজক সংস্থা বাংলা একাডেমি একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান হলেও তাদেরও অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যে এ মেলার আয়োজন করতে হয় বিশেষত দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে। কারণ অতীতের অনেক জীবনহানির ঘটনা এ মেলাকে কেন্দ্র করেই সংঘটিত হয়েছে যা আমাদের একুশের চেতনাকে বিনষ্ট করেছে। মুক্তবুদ্ধির চর্চা, সৃজনশীলতা প্রকাশনার চর্চা, সৃজনশীল সাহিত্য ইত্যাদি অনেকক্ষেত্র এ মেলায় আসা কবি-সাহিত্যিক দর্শনার্থীদের জীবনের ঝুঁকি যে বাড়িয়ে দেয় তা আমাদের মনে রাখতে হবে অতীতের ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। তাই আমাদের মতাদর্শগত বিরোধগুলো রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করতে হবে, গ্রন্থমেলা কোনোভাবেই তার ক্ষেত্র হতে পারে না বা ক্ষেত্র হতে দেওয়া যায় না। তাহলে ঘোষিত প্রাণের মেলা কথাটির কোনো গুরুত্বই থাকে না যদিও এর মধ্যে অনেক আবেগ রয়েছে যা দিয়ে সত্যিকার অর্থে জীবন চলে না। এখন যারা সাধারণ মানুষ কিংবা ছাত্রছাত্রী তাদের কাছে এসব কথার অর্থ নিরর্থক বলে মনে হতেই পারে।

লেখক: কৃষি অর্থনীতিবিদ ও গবেষক

বিষয়:

গ্রামীণ ব্যাংকের অর্থে গড়া ৭ প্রতিষ্ঠান ও ড. ইউনূস

ছবি: সংগৃহীত
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ফারাজী আজমল হোসেন

আবারও আলোচনায় ড. মুহাম্মদ ইউনূস। হঠাৎ করেই গত ১৫ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করে তিনি অভিযোগ করেন, তার সাতটি প্রতিষ্ঠান নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে গ্রামীণ ব্যাংক। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলো ‘জবরদখল’ করা হয়েছে। তার এ বক্তব্যে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। গ্রামীণ ব্যাংকের পক্ষ থেকেও দেওয়া হয়েছে জবাব। যেখানে প্রতিষ্ঠানটির দাবি, সবগুলো প্রতিষ্ঠানই তাদের ব্যাংকের অর্থে গড়া হয়েছে। আইনগতভাবেই চেয়ারম্যান ও পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এখানে ‘জবরদখল’-এর কিছু নেই।

প্রশ্ন উঠেছে, গ্রামীণ ব্যাংকের অর্থে গড়া প্রতিষ্ঠানের মালিক কীভাবে হন পেশায় শিক্ষক হিসেবে পরিচয় দেওয়া ড. মুহাম্মদ ইউনূস? এ ছাড়া অনেকেই বলছেন, গ্রামীণ টেলিকমও অলাভজনক হিসেবে পরিচালিত হওয়ার কথা। সেখানে কীভাবে এর লভ্যাংশের কথা বলছেন তিনি? এ ছাড়াও গ্রামীণ নামে প্রতিষ্ঠিত যে সাত প্রতিষ্ঠানে নিজের মালিকানা দাবি করেছেন ইউনূস, সেগুলোর মূলধন কোথা থেকে এসেছে তা নিয়েও শুরু হয়েছে জল্পনা। জানা যায়, গ্রামীণ টেলিকম ভবনে ড. ইউনূসের ১৬টি কোম্পানি রয়েছে। যার প্রতিটির চেয়ারম্যান ড. ইউনূস।

অন্যদিকে দেশের আদালত নিয়েও নানা প্রশ্ন তুলেছেন ড. ইউনূস। তার বক্তব্য, আদালতের প্রতি বিশ্বাস নেই তার। যদিও জবরদখলের অভিযোগ করে এই ঘটনায় মামলা করার কথা জানিয়েছেন তিনি। এই একই সময়ে তার কন্যা ইসরায়েলের সমর্থনে থাকা মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে সাক্ষাৎকার দিয়ে নানা অভিযোগ তুলে ধরেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই ড. ইউনূসের এসব কাণ্ডকে দেখছেন রাজনীতিকরণের প্রচেষ্টা হিসেবে।

ড. ইউনূসের অভিযোগ

গত বৃহস্পতিবার ঢাকার মিরপুরে গ্রামীণ টেলিকম ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে ড. ইউনূস দাবি করেন, গ্রামীণ ব্যাংক তাদের আটটি প্রতিষ্ঠান জবরদখল করে তাদের মতো করে চালাচ্ছে। পুলিশের কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইলেও সহযোগিতা পাওয়া যায়নি।

ঢাকার মিরপুর ১ নম্বরে চিড়িয়াখানা সড়কে গ্রামীণ টেলিকম ভবন। এই ভবনে ১৬টি কোম্পানির কার্যালয়, যার প্রতিটির চেয়ারম্যান ড. ইউনূস।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি গ্রামীণ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ ভবনের আটটি অফিস দখল করে নেওয়া হয় বলে দাবি করে তিনি বলেন, ‘ওই দিন থেকে তারা ভবনে তালা মেরে রেখেছে। নিজের বাড়িতে অন্য কেউ যদি তালা মারে, তখন কেমন লাগার কথা আপনারাই বলেন। তাহলে দেশে আইন-আদালত আছে কীসের জন্য। তারা আদালতে যেতে চায় না। আমরা জীবনে বহু দুর্যোগ দেখেছি। এমন দুর্যোগ আর কখনও দেখিনি।’

গ্রামীণ ব্যাংকের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়ার কথাও বলেন সরকারি প্রজ্ঞাপনে প্রতিষ্ঠিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

গ্রামীণ ব্যাংকের টাকায় এসব প্রতিষ্ঠান

ইউনূসের অভিযোগ খারিজ করে গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যান সাইফুল মজিদ বলেন, ‘আইনি বৈধতার ভিত্তিতে রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক (আরজেএসসি) হতে এসব প্রতিষ্ঠানের আর্টিকেল অব মেমোরেন্ডামের সার্টিফাইড কপি তোলা হয়েছে। এর কোনো পরিবর্তন হয়নি। সেখানে লেখা বিধি মোতাবেক পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আইনের বাইরে কিছুই হয়নি।’

গ্রামীণ ব্যাংকের সব টাকা এর বিত্তহীন, দরিদ্র, ভূমিহীন ও অসহায়ের কাজে ব্যয় করার বিধান রয়েছে জানিয়ে কত টাকা, কোথায় গেছে তার হিসাবও চান তিনি। বলেন, ‘গ্রামীণ ব্যাংকের মধ্য থেকে অনেক কিছু করা সম্ভব ছিল। এত প্রতিষ্ঠান বাড়ানোর কোনো প্রয়োজন ছিল না।’
বিদেশি অনুদান নিয়ে গ্রামীণ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ‘এনডাউমেন্ট ফান্ড’ নামে গ্রামীণ কল্যাণকে টাকা দেওয়া হয় জানিয়ে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান বলেন, ‘৪৪ কোটি টাকা গ্রামীণ ব্যাংক থেকে হস্তান্তর করা হয়। অনুদানসহ সব মিলিয়ে ৪৪৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা দেওয়া হয় গ্রামীণ কল্যাণে। এসবই গ্রামীণ ব্যাংকের টাকা।’

গ্রামীণ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ড. মুহাম্মদ ইউনূস অবৈধভাবে জালিয়াতের মাধ্যমে ২৮টি গ্রামীণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। গ্রামীণ ব্যাংকের অর্থে প্রতিষ্ঠিত হলেও বেআইনিভাবে এগুলোর মালিকানা নিজের নামে করে নেন
সম্প্রতি বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের অধীনে নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে প্রকৃত মালিক গ্রামীণ ব্যাংক। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ১৩ ফেব্রুয়ারি গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব গ্রহণ শুরু করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ ইউনূসের বিরুদ্ধে

প্রতিষ্ঠার সাল ১৯৮৩ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত নিরীক্ষার দাবি করে গ্রামীণ ব্যাংক চেয়ারম্যান বলেন, ‘১৯৯০ সালের আগে কোনো লেজার পাওয়া যায়নি।’

মুহাম্মদ ইউনূস মানি লন্ডারিং করেছেন অভিযোগ এনে তিনি বলেন, ‘সেই প্রমাণ রয়েছে। গ্রামীণ টেলিকম, গ্রামীণ কল্যাণ, গ্রামীণ ফান্ড- এসব প্রতিষ্ঠান গড়তে গিয়ে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে শত শত কোটি টাকা সরিয়েছেন অধ্যাপক ইউনূস।’

গ্রামীণ ব্যাংকের আইন উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মাসুদ আক্তার বলেন, ‘গ্রামীণ ব্যাংকের মালিক দরিদ্র ও ভূমিহীন মানুষ। সেই ব্যাংকের টাকায় যে প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি, তার মালিক সদস্যরা।’

অর্থ জালিয়াতির অভিযোগ

১৯৮৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর সরকার গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ (অধ্যাদেশ নম্বর-৪৬) জারি করে। শুরুতে গ্রামীণ ব্যাংকের মূলধন ছিল মাত্র তিন কোটি টাকা। এর মধ্যে বেশিরভাগই অর্থাৎ ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা ছিল সরকারের। বাকি ১ কোটি ২০ লাখ টাকা ছিল ঋণ গ্রহীতাদের। অর্থাৎ গ্রামীণ ব্যাংকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ব্যক্তিগত কোনো টাকা ছিল না। অথচ এই ব্যাংকটির টাকায় ড. ইউনূস গড়ে তুলেছেন নিয়ন্ত্রণাধীন ২৮টি প্রতিষ্ঠান।

তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, গ্রামীণ ব্যাংক তথা সরকারের টাকা আত্মসাৎ করে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়ার।

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই গ্রামীণ ব্যাংকে ঋণ এবং অনুদান দেয় দাতা গোষ্ঠী। অনুদানের সব অর্থ যদি রাষ্ট্র এবং জনগণের কাছে যায় তাহলে কারও ব্যক্তিগত লাভের সুযোগ থাকে না। তাই দাতাদের অনুদানের অর্থ দিয়ে সোশাল ভেনচার ক্যাপিটাল ফান্ড (এসভিসিএফ) গঠন করেন ড. ইউনূস।

১৯৯২ সালের ৭ অক্টোবর ওই ফান্ড দিয়ে আলাদা একটি প্রতিষ্ঠান গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৯৯৪ সালে ‘গ্রামীণ ফান্ড’ নামের একটি লিমিটেড কোম্পানি গঠন করা হয়। তাতে ওই ফান্ডের ৪৯ দশমিক ১০ কোটি টাকা স্থানান্তর করা হয়।

গ্রামীণ ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শুরু থেকেই গ্রামীণ ব্যাংক দেখিয়ে বিদেশ থেকে টাকা এনে তা সরিয়ে ফেলার চেষ্টা ছিল। গ্রামীণ ব্যাংক সরকারি প্রতিষ্ঠান হলেও এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে একাই সব সিদ্ধান্ত নিতেন ড. ইউনূস। পরিচালনা পর্ষদ এমনভাবে গঠন করা হয়েছিল, যাতে কেউ ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে কথা বলতে না পারেন। আর এই সুযোগেই ১৯৯৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর গ্রামীণ ব্যাংকের ৩৪তম বোর্ড সভায় সিদ্ধান্ত হয়, দাতা গোষ্ঠীর অনুদানের অর্থ এবং ঋণ দিয়ে সোশাল এডভান্সমেন্ট ফান্ড (এসএএফ) গঠন করা হবে। কিন্তু দাতারা গ্রামীণ ব্যাংক থেকে এভাবে অর্থ সরিয়ে ফেলার বিষয়ে আপত্তি জানায়। তাদের মত ছিল, এভাবে অর্থ স্থানান্তর জালিয়াতি।

এরপর ভিন্ন কৌশল নিয়ে ১৯৯৬ সালের ২৫ এপ্রিল গ্রামীণ ব্যাংকের বোর্ড সভায় ‘গ্রামীণ কল্যাণ’ গঠনের প্রস্তাব আনেন ড. ইউনূস।
প্রস্তাবে বলা হয়, গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্য ও কর্মীদের কল্যাণে ‘কোম্পানি আইন ১৯৯৪’-এর আওতায় গ্রামীণ কল্যাণ নামের একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করা। গ্রামীণ ব্যাংকের বোর্ড সভা এই প্রস্তাব অনুমোদন করে। এটি গ্রামীণ ব্যাংকেরই অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। গ্রামীণ কল্যাণ যে গ্রামীণ ব্যাংকেরই শাখা প্রতিষ্ঠান, তা আরও স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় এর মূলধন গঠন প্রক্রিয়ায়।

গ্রামীণ কল্যাণ-এ গ্রামীণ ব্যাংকের সোশাল এডভান্সমেন্ট ফান্ড (এসএএফ) থেকে ৬৯ কোটি টাকা প্রদান করা হয়। গ্রামীণ কল্যাণের মেমোরেন্ডাম অব আর্টিকেলেও গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে এর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মেলে।

মেমোরেন্ডাম অব আর্টিকেল অনুযায়ী, গ্রামীণ কল্যাণের ৯ সদস্যের পরিচালনা পরিষদের ২ জন সদস্য গ্রামীণ ব্যাংকের মনোনীত প্রতিনিধি। এ ছাড়াও গ্রামীণ কল্যাণের চেয়ারম্যান হবেন গ্রামীণ ব্যাংকের মনোনীত প্রতিনিধি। ড. ইউনূসও গ্রামীণ ব্যাংকের মনোনীত প্রতিনিধি হিসেবেই গ্রামীণ কল্যাণের চেয়ারম্যান হন।

এরপর গ্রামীণ কল্যাণের মাধ্যমে তিনি গড়ে তোলেন একের পর এক প্রতিষ্ঠান। এগুলো হলো- ১. গ্রামীণ টেলিকম লি: ২. গ্রামীণ ডিস্ট্রিবিউশন লি: ৩. গ্রামীণ শিক্ষা ৪. গ্রামীণ নিটওয়্যার লি: ৫. গ্রামীণ ব্যবস্থা বিকাশ ৬. গ্রামীণ আইটি পার্ক ৭. গ্রামীণ ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট ৮. গ্রামীণ সলিউশন লি: ৯. গ্রামীণ ডানোন ফুডস: লি: ১০. গ্রামীণ হেলথ কেয়ার সার্ভিসেস লি: ১১. গ্রামীণ স্টার এডুকেশন লি: ১২. গ্রামীণ ফেব্রিক্স অ্যান্ড ফ্যাশন লি: ১৩. গ্রামীণ কৃষি ফাউন্ডেশন।

অন্যদিকে, গ্রামীণ কল্যাণের আদলে প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ফান্ডের মাধ্যমে গঠন করা হয় আরও কিছু প্রতিষ্ঠান। এগুলো হলো-
১. গ্রামীণ ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লি:, ২. গ্রামীণ সল্যুশন লি:, ৩. গ্রামীণ উদ্যোগ, ৪. গ্রামীণ আইটেক লি:, ৫. গ্রামীণ সাইবারনেট লি:, ৬. গ্রামীণ নিটওয়্যার লি:, ৭. গ্রামীণ আইটি পার্ক, ৮. টিউলিপ ডেইরী অ্যান্ড প্রোডাক্ট লি:, ৯. গ্লোব কিডস ডিজিটাল লি:, ১০. গ্রামীণ বাইটেক লি:, ১১. গ্রামীণ সাইবার নেট লি:, ১২. গ্রামীণ স্টার এডুকেশন লি:, ১২. রফিক আটোভ্যান মানুফ্যাকটার লি:, ১৩. গ্রামীণ ইনফরমেশন হাইওয়ে লি:, ১৪. গ্রামীণ ব্যবস্থা সেবা লি:, ১৫. গ্রামীণ সামগ্রী।

গ্রামীণ ব্যাংকের অর্থে এবং বোর্ড সভার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে গ্রামীণ কল্যাণ এবং গ্রামীণ ফান্ড গঠিত হয়। এই দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যে প্রতিষ্ঠানগুলো গঠিত হয়েছে সেগুলোও আইনত গ্রামীণ ব্যাংকের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। ২০২০ সাল পর্যন্ত গ্রামীণ ফান্ড এবং গ্রামীণ কল্যাণের পরিচালনা পর্ষদে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিনিধিও ছিল। কিন্তু ২০২১ সাল থেকে এই প্রতিষ্ঠান দুটিতে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিনিধি নেই।

গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই দুটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হবেন গ্রামীণ ব্যাংকের মনোনীত ব্যক্তি। কিন্তু ড. মুহাম্মদ ইউনূস এখনও গ্রামীণ কল্যাণ এবং গ্রামীণ ফান্ডের চেয়ারম্যান পদে বহাল আছেন। ফলে প্রশ্ন উঠছে, কোন কর্তৃত্ব বলে তিনি এখনও চেয়ারম্যান?

ব্যাংকটির একাধিক সূত্র দাবি করেছে, ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব থেকে অবসরে গেলেও ব্যাংকটি নিয়ন্ত্রণ করছে তার অনুগতরাই। ফলে এই অনিয়ম নিয়ে এতদিন কেউ মুখ খোলেননি।

গ্রামীণ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের রহস্যময় আচরণের কারণেই এই ব্যাংকের অর্থে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানা বঞ্চিত হয় রাষ্ট্র ও জনগণ। তবে শেষ পর্যন্ত গ্রামীণ ব্যাংকের ঘুম ভেঙেছে এবং গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানগুলো উদ্ধারের উদ্যোগ নিয়েছে।

ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে হিসাবে গরমিল

তথ্য বলছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে তিনটি। এই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট তিনটি হলো যথাক্রমে:- ১. সাউথ ইস্ট ব্যাংক, (অ্যাকাউন্ট নম্বর-০২১২১০০০২০০৬১), ২. স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, (অ্যাকাউন্ট নম্বর- ১৮১২১২৭৪৭০১) এবং ৩. রূপালি ব্যাংক, (অ্যাকাউন্ট নম্বর-০৪৮৯০১০০০৮০৯৬)। এই তিনটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মধ্যে ২০০০ সালে খোলা সাউথ ইস্ট ব্যাংকের অ্যাকাউন্টটি (অ্যাকাউন্ট নাম্বার-০২১২১০০০২০০৬১) তার মূল ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হিসেবেই প্রতীয়মান হয়েছে। এই অ্যাকাউন্টে ২০০০ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১১৮ কোটি ২৭ লাখ ৭৬ হাজার ৩৬৮ টাকা রেমিট্যান্স এসেছে। এই রেমিট্যান্সের বেশিরভাগ ৪৭ কোটি ৮৯ লাখ ৯৬ হাজার ৬৫২ টাকা এসেছে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে। সেই সময়েই একটি রাজনৈতিক দল গঠনেরও প্রয়াস করেছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
অভিযোগ রয়েছে, ২০০৫-০৬ কর বছর থেকে শুরু করে ২০২২-২৩ কর বছর পর্যন্ত সরকারকে কর ফাঁকি দেওয়ার লক্ষ্যে তিনি ১৮ কোটি ৯৪ লাখ ৩৪ হাজার ৮৩৫ টাকা রেমিট্যান্সের তথ্য গোপন করেছেন।

২০২০-২১ অর্থবছরে ড. ইউনূস-এর ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় সব টাকা তুলে ‘ইউনূস ট্রাস্ট’ গঠন করেন। ট্রাস্টের টাকা আয়করমুক্ত। সে হিসাব থেকেই এমন কাণ্ড করেন তিনি। কিন্তু এরকম ফান্ডের জন্য ১৫% কর দিতে হয়, এটি তিনি দেননি। এই ট্যাক্স ফাঁকির কারণেই তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। এই মামলায় তিনি হেরে যান। এখন মামলাটি আপিল বিভাগে বিচারাধীন।

আদালতে অনাস্থা ইউনূসের

গ্রামীণ টেলিকমে শ্রম আইন লঙ্ঘনের আলোচিত মামলাটির রায় ঘোষণা হয় গত ১ জানুয়ারি। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসসহ চারজন আসামিকে শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে একটি ধারায় ছয় মাসের কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা করে জরিমানা করে সাজা দেয় আদালত।

আরেক ধারায় ২৫ হাজার টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের চাকরি স্থায়ী করা, ছুটি সংক্রান্ত সব বিষয় আগামী ৩০ দিনের মধ্যে সমাধান করতে নির্দেশ দিয়েছেন শ্রম আদালত।

সাজা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই আসামিদের আইনজীবী জামিন আবেদন করলে তা মঞ্জুর করেন আদালত। ফলে কারাগারে যেতে হয়নি ড. ইউনূসকে।

আদালত থেকে বেরিয়ে ইউনূস বলেন, যে দোষ আমরা করি নাই, সেই দোষের ওপরে শাস্তি পেলাম। এটা আমাদের কপালে ছিল, জাতির কপালে ছিল, আমরা সেটা বহন করলাম। তার আইনজীবী বলেন, এটা কোনো রায়ই হলো না। এটা নজিরবিহীন ঘটনা। যে অভিযোগে সিভিল মামলা হওয়ার কথা ছিলে। তাতে ফৌজদারি অপরাধে সাজা দেওয়া হলো। এর বিরুদ্ধে আপিল করব।

আদালতের রায় নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করলেও সম্প্রতি প্রতিষ্ঠান জবরদখলের অভিযোগ তোলার পর সেটি নিয়ে আদালতে যাওয়ার ঘোষণা দেন ইউনূস।

ইসরায়েলের পক্ষে থাকা সিএনএন চ্যানেলে ইউনূসকন্যার সাক্ষাৎকার

ফিলিস্তিনে গণহত্যা চালানো ইসরায়েলের হয়ে পক্ষপাতমূলক সংবাদ নীতির কারণে তোপের মুখে থাকা প্রতিষ্ঠানে সিএনএন চ্যানেলে সম্প্রতি সাক্ষাৎকার দেন ইউনূসের কন্যা ও মার্কিন নাগরিক মনিকা ইউনূস।

যেখানে তিনি বাংলাদেশের বিচার বিভাগের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি তিনি নিজের বাবার পক্ষে কথা বলতে গিয়ে দেশের সাংবিধানিক কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, শ্রম আইন লঙ্ঘনের দায়ে দণ্ড পাওয়া শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে শাস্তি থেকে রক্ষা করতে লবিংয়ে নেমেছেন তার কন্যা মনিকা ইউনূস।

এ ছাড়াও ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে চলা আইনি প্রক্রিয়া বন্ধ করতে নানাভাবে চলছে আন্তর্জাতিক লবিং। তাকে ‘আইনি হয়রানি’ বন্ধ করার জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আহ্বান জানিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টে বিজ্ঞাপন হিসেবে একটি যৌথ বিবৃতি ছাপা হয়েছে, যে বিবৃতি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ১২ জন সিনেটর।

এর আগে বিচার বন্ধে বিজ্ঞাপন আকারে বিবৃতি দিয়েছেন কয়েকজন নোবেলজয়ী। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে ইউনূসের পরিচিতি আছে।

এদিকে সাক্ষাৎকারে একাধিকবার ড. ইউনূস কেন বাংলাদেশ সরকারের প্রতিহিংসার শিকার তা জানতে চাইলেও এর কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি

রাজনীতিতে নজর ইউনূসের

২০০৭ সালে সেনা-নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের তখন গ্রেপ্তার করে কারাগারে আটকে রাখা হয়।

আর সেই রাজনীতি নিষিদ্ধ ও রাজনীতিবিদদের জেল-জুলমের সময়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস নতুন একটি রাজনৈতিক দল খুলতে মাঠে নামেন। জরুরি অবস্থার মধ্যেই তিনি নাগরিক শক্তি নামের রাজনৈতিক দল গঠনের জন্য ব্যাপক তোড়জোড় চালিয়েছিলেন, যা নিয়ে প্রচুর সমালোচনা হয়।

রাজনীতিতে ইউনূসের আগ্রহের বিষয়ে মনিকা বলেন, শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর তিনি একবারের জন্য এটা ভেবেছিলেন। তবে তার রাজনৈতিক কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই।

তবে উইকিলিকস থেকে ফাঁস হওয়া গোপন নথিতে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের প্রধান দুই নেত্রীকে রাজনীতি থেকে নির্বাসনে পাঠাতে চেয়েছিলেন এই নোবেলজয়ী। জেনারেল মইন ইউ আহমেদের লেখা বই এবং আরও কিছু নথি থেকে এটি স্পষ্ট ছিল যে, ১-২ বছরের জন্য নয়, বরং দীর্ঘ মেয়াদে অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক সরকার গঠনের ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন ড. ইউনূস।


ভাষা আন্দোলন: বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
আলমগীর খোরশেদ 

প্রতিটি শিশুই জন্মের সময় চিৎকার দিয়ে মায়ের উদর থেকে পৃথিবীতে আগমন ঘটে। ও যেন কান্নার ভাষায় জানিয়ে দেয়, অন্যকোনো ভুবন থেকে হঠাৎ স্থান বদলের এই উপাখ্যান মানতে রাজি নয়। তারপরও দিন যায় সময়ের হাত ধরে। মায়ের বুকের নির্যাস টেনে বড় হয় শিশু। মুখে আসে মায়ের বুলি। মাকে চিৎকার করে দৌড়ে এসে বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে দুরন্তপনায়। মাকে মা, বাবাকে বাবা, প্রিয়াকে প্রিয়তমা বলে ডাকার মাতৃভাষা বুকের ভিতর থেকে নিংড়ে আসে। এই ভাষাও সহজে পায়নি বাঙালি জাতি। এর জন্যও রক্ত দিতে হয়েছিল, খালি হয়েছিল মায়ের কোল। মাতৃভাষা রক্ষার অধিকার আদায়ে ঢাকার কালো পিচঢালা রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল রক্তের শোণিত ধারায়। সে কথা জানতে পিছনে ফিরে যেতে হয়, ইতিহাসের পাতা ধরে।

১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে সেনাপতি মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় বাংলার স্বাধীন নবাব সিরাজুদ্দৌলার পরাজয় ও মর্মান্তিক মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয় বেনিয়া ইংরেজ শাসনের গোড়াপত্তনে। ইংরেজদের তাড়াতে স্বদেশি হলো, ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহ, ফকির সন্ন্যাস বিপ্লব, জাঁসীর রাণী, টিপু সুলতান, ক্ষুদিরাম, মাস্টারদা সূর্য সেন, প্রীতিলতা সর্বোপরী নেতাজি সুবাস বসুর আন্দোলন। অবশেষে ১৯৪৭ সালে ইংরেজরা ভারত উপমহাদেশ ছেড়ে চলে যায়। ভারতবর্ষ ভাগ হয় ভারত ও পাকিস্তান নামে। বিভক্তির অন্যতম ধারণা ছিল দ্বিজাতি তত্ত্ব। দ্বিজাতি তত্ত্ব হলো হিন্দু ও মুসলিম জাতিতে বিভক্তি। এখানে ভাষা, বর্ণ বা অন্যকোনো দিক বিবেচিত না হয়ে কেবল ধর্মকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। যে স্বপ্ন আশা নিয়ে দেশভাগ হয়েছিল, তার স্বপ্ন ধূলিস্মাৎ হয়। পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্র হলেও পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের প্রতি বৈষম্য, নিপীড়ন, অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে দাবিয়ে রাখে। পাকিস্তানের শাসনক্ষমতা তখন চলে আসে মুসলিমলীগের হাতে। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ হলেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট। লিয়াকত আলী খান হলেন প্রধানমন্ত্রী। পশ্চিমারা পূর্ব পাকিস্তানের ওপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের প্রথম আঘাতটা আনে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার ষড়যন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে। ১৯৪৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতি জ্ঞানতাপস ড. মহম্মদ শহীদুল্লাহ তার ভাষণে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে বাঙালির বাঙালিত্ব ধরে রেখে পরোক্ষভাবে বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষার পক্ষে কথা বলেন। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে করাচিতে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দেন। ওই অধিবেশনে কুমিল্লার কংগ্রেস সদস্য ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত বাংলা ভাষা ব্যবহারের পক্ষে একটি সংশোধনী প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। তার যুক্তি হলো পাকিস্তানের ৬ কোটি ৯০ লাখ জনগণের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের ৪ কোটি ৪০ লাখ জনগণের ভাষা হলো বাংলা। কাজেই সংখ্যা গরিষ্ঠ লোকের ভাষাই রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত। পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনও উর্দুর পক্ষ অবলম্বন করেন। ১১ মার্চ ১৯৪৮ গণপরিষদে প্রস্তাব পাস হয়, উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। ১১ মার্চ পূর্ব বাংলায় ‘বাংলা ভাষা দাবি দিবস’ উপলক্ষে ধর্মঘট পালিত হয়। ছাত্রদের আন্দোলনে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হন। ১৫ মার্চ জেল থেকে মুক্তি পান শেখ মুজিব। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তান সফরে এসে তৎকালীন ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের এক জনসভায় ঘোষণা দেন, ‘Urdu and Urdu shall be the state language of Pakistan মানে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সমাবর্তন অনুষ্ঠানেও একই বক্তব্য দিলেন জিন্নাহ, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু।’ তীব্র প্রতিবাদে বাঙালি ছাত্ররা ক্ষেপে ওঠে। ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান তার দলবল নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে বলেন, ‘নো, নেভার, জিন্নাহ সাহেবের ঘোষণা মানব না। উর্দুকে কিছুতেই রাষ্ট্রভাষা করতে দেওয়া হবে না। আমরা জান দেবো, জবান দেবো না।’ জিন্নাহ সাহেব ভাবতেও পারেননি, তার বক্তৃতার সরাসরি এমন এভাবে চলতে থাকে। মৌলিক অধিকার রক্ষায় জাতিকে একত্রীভূত করে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে শেখ মুজিব তার কারিশমাটিক নেতৃত্ব চালিয়ে যান। ১৯৫২ সালে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রতিবাদে ছাত্রসমাজ এক হয়ে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। শেখ মুজিব কারাগারে থেকেও সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের সঙ্গে কারাগারে দিকনির্দেশনা দেন। ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে। ছাত্রসমাজ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিলসহ এগিয়ে যায়। ঢাকা মেডিকেল সংলগ্ন জায়গায় তাদের ওপর গুলি চালায় পুলিশ। অনেকেই শহীদ হন; কিন্তু পুলিশ তাদের মরদেহ গুম করে ফেলে। পরিচয় পাওয়া কয়েকজন ভাষা শহীদদের মধ্যে সালাম, রফিক, আবুল বরকত, আবদুল জব্বার, শফিউর রহমানের নাম উল্লেখযোগ্য। পৃথিবীতে ভাষার জন্য রক্তদানের ঘটনা একমাত্র বাংলাদেশেই। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের চেতনা সাহস ও শক্তি জুগিয়েছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে। বাঙালি হয়েছে বাঘা বাঙালি।

১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কোর সাধারণ পরিষদের ৩০তম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে বাংলাদেশসহ আরও ২৭টি দেশের সমর্থন নিয়ে সর্বসম্মতিক্রমে একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আজকের প্রজন্ম ইংরেজি বাংলা মিশিয়ে যে বাংলিশ ভাষা ব্যবহার করছে, তার ভবিষ্যৎ ভালো নয়। ফলে না পারছে সঠিকভাবে বাংলা বা ইংরেজি ভাষার রপ্ততা। জাতিসংঘের অধিবেশনে প্রথম বাংলায় ভাষণ দেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জুলিওকুরি উপাধি প্রাপ্ত বিশ্বনেতা, স্বাধীনতার স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৪৭ থেকে তৎকালীন পূর্ব বাংলায় সংঘটিত সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিত দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া জাতি ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। যা ১৯৭১ সালে বাঙালি তার স্বাধীনতা পেতে ৩০ লাখ শহীদের রক্ত, পৌনে তিন লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে এনে দিয়েছিল লাল সবুজের পতাকা। ভাষা আন্দোলন থেকে ফিডব্যাক পাওয়া বাঙালি গর্জে উঠেছিল স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে আনার যুদ্ধে, তারই ফলাফল বিশ্ব মানচিত্রে জ্বল জ্বল করা আমার বাংলাদেশ।

লেখক: শিশু সাহিত্যিক


ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালির জাতীয় চেতনা প্রস্ফুটিত হয়

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
অধ‌্যাপক ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন

পাকিস্তান আন্দোলনে বেশির ভাগ পূর্ববঙ্গের নেতা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। সাধারণ মানুষেরও মনোভাব ভিন্ন ছিল না। বঙ্গবন্ধু নিজেও পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কারণ, তারা বিশ্বাস করতেন, এর ফলে তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তি মিলবে। কারণ, ১৯০ বছরের ব্রিটিশদের দুঃশাসন ও দেশীয় হিন্দু জমিদার ও মহাজনদের দৌরাত্ম্য। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ধর্মের কথা থাকলেও তার মূল বার্তাটা ছিল, মুসলিমদের স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হলে তাদের পশ্চাৎপদতা কাটবে, হিন্দু জমিদার ও মহাজনদের আধিপত্য থেকে তারা মুক্তি পাবে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগ খুলে যাবে। বাস্তবে তা হয়নি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরও সে আকাঙ্ক্ষা পূরণের সম্ভাবনা দেখা গেল না। আর রাষ্ট্রভাষার দাবিও যখন মানা হচ্ছিল না, তখন খুব সহজেই বাঙালিদের মধ্যে ক্ষোভ এবং ক্রোধ সৃষ্টি হয়। সৃষ্টি হয় জাতীয় চেতনা; বাঙালি ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের। এ দেশের বা পূর্ব বাংলার মানুষ বুঝে যায়, যারা দেশশাসন করছে তারা তাদের কেউ নয়। তারা আসলে পূর্ব বাংলায় নয়া উপনিবেশ কায়েম করতে চায়।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান জন্মের আগেই প্রস্তাবিত পাকিস্তানের শাসকদের স্বরূপ উন্মোচিত হতে থাকে এবং একই সঙ্গে এ অঞ্চলের তখনকার যুবসমাজ নিজেদের অধিকার রক্ষার চিন্তা করতে শুরু করে। প্রথম বৈঠকটি হয়েছিল কলকাতার সিরাজউদ্দৌলা হোটেলের একটি কক্ষে। সে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন হাতেগোনা কয়েকজন-কাজী ইদ্রিস, শেখ মুজিবুর রহমান, শহীদুল্লা কায়সার, রাজশাহীর আতাউর রহমান, আখলাকুর রহমান আরও কয়েকজন। আলোচ্য বিষয়- পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ববঙ্গের যুবসমাজের করণীয় কী? এর কয়েকদিন আগেই আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এক নিবন্ধে বলেছিলেন, প্রস্তাবিত পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। এর দাঁতভাঙা জবাব দিয়েছিলেন জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। আজাদে প্রকাশিত এক নিবন্ধে ড. জিয়াউদ্দীনের উত্থাপিত প্রস্তাবের বিপরীতে তিনি প্রস্তাব দিলেন, প্রস্তাবিত পাকিস্তানের যদি একটি রাষ্ট্রভাষা হয় তবে গণতন্ত্রসম্মতভাবে শতকরা ৫৬ জনের ভাষা বাংলাই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত। একাধিক রাষ্ট্রভাষা হলে উর্দুর কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর বক্তব্য আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল তখনকার প্রগতিশীল এবং অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক চিন্তার ধারক যুব-সম্প্রদায়কে। এরই ফলে সিরাজউদ্দৌলা হোটেলের বৈঠকটি আয়োজিত হয়েছিল। সিদ্ধান্ত হয়েছিল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে পূর্ববঙ্গের অসাম্প্রদায়িক যুব-সম্প্রদায়ের সম্মেলন ডাকতে হবে। বৈঠকের নেতারা ঢাকা পৌঁছালেন, ঢাকার ছাত্র ও যুব নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। ১৯৪৭ সালের ৬-৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তান কর্মী সম্মেলন আহ্বান করা হলো। ৭ সেপ্টেম্বর সম্মেলনে জন্ম নিলে পূর্ব পাকিস্তানের অসাম্প্রদায়িক যুব প্রতিষ্ঠান ‘পূর্ব পাকিস্তান গণতান্ত্রিক যুব লীগ’। সম্মেলনের কমিটিতে গৃহীত প্রস্তাবগুলো পাঠ করলেন সেদিনের ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান। ভাষা সম্পর্কিত প্রস্তাব উত্থাপন করে তিনি বললেন, ‘পূর্ব পাকিস্তান কর্মী সম্মেলন প্রস্তাব করিতেছে যে, বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের লেখার বাহন ও আইন-আদালতের ভাষা করা হউক। সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে। সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার জনসাধারণের ওপর ছাড়িয়া দেওয়া হউক। এবং জনগণের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলিয়া গৃহীত হউক।’ এভাবেই ভাষার দাবি প্রথমে উচ্চারিত হয়েছিল।

১৯৪৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান কর্মী সম্মেলনে ভাষার যে দাবি উত্থাপিত হয়েছিল তা সহস্র কণ্ঠে উচ্চারিত হলো ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসের প্রথম ভাগে। পাকিস্তানের প্রথম গণপরিষদের অধিবেশন বসেছিল- ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। তাতে গণপরিষদে কার্যক্রমে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ভাষাও যেন ব্যবহৃত হতে পারে- এমন এক প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন কংগ্রেস দলীয় সদস্য ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত। তার যুক্তি ছিল, পাকিস্তানের ৬ কোটি ৯০ লাখ লোকের মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লাখ মানুষ ছিলেন পূর্ব বাংলার এবং তাদের ৯৮% মানুষে মাতৃভাষা ছিল বাংলা। তাই বাংলাকে পাকিস্তানের একটি প্রাদেশিক ভাষা হিসেবে দেখা উচিত নয়, বাংলারও হওয়া উচিত অন্যতম রাষ্ট্রভাষা। কিন্তু এ সংশোধনীর প্রস্তাব গণপরিষদে টেকেনি। একদিকে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ও পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের বিরোধিতা, অন্যদিকে গণপরিষদের বাঙালি সদস্যরাও সংসদীয় দলের আপত্তির কারণে তাকে সমর্থন করতে পারেননি। এর প্রতিবাদে ঢাকায় ছাত্ররা ক্লাস বর্জন ও ধর্মঘট করে। ১১ মার্চ, ১৯৪৮ সালে পূর্ব বাংলায় পালিত হয় ‘ভাষা দিবস’।

জিন্নার পূর্ব বাংলা সফরের পূর্বেই ১৯৪৭ সালের ৫ ডিসেম্বর করাচিতে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এর প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। তারা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানায়। এ ছাড়া পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম বাংলা করার ব্যাপারে চাপ দিতে থাকে। ক্রমে ভাষার প্রশ্নে রাজনৈতিক দাবিতে পরিণত হয়। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে নূরুল হক ভূঁইয়াকে আহ্বায়ক করে তমদ্দুন মজলিস রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে। পরবর্তীকালে এ উদ্দেশে আরও কয়েকটি কমিটি গঠিত হয়। ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ছাত্রসমাজ দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের উপস্থিতিতে দ্বিতীয়বারের মতো রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে। এ পরিষদের আহ্বায়ক মনোনীত হন শামসুল আলম। নবগঠিত পরিষদ ১১ মার্চ হরতাল আহ্বান করে। হরতাল চলাকালে শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক, অলি আহাদ, কাজী গোলাম মাহবুবসহ অনেকে গ্রেপ্তার হন। এ সম্পর্কে এক একান্ত সাক্ষাৎকারে অলি আহাদ বলেছিলেন- ‘সেদিন সন্ধ্যায় যদি মুজিব ভাই ঢাকায় না পৌঁছাতেন তাহলে ১১ মার্চের হরতাল, পিকেটিং কিছুই হতো না।’ এ ঘটনার প্রতিবাদে ১৩-১৫ মার্চ ঢাকার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়। ছাত্রসমাজের প্রতিবাদের মুখে ১৫ মার্চ শেখ মুজিবসহ অন্য নেতাদের মুক্তি দেওয়া হয়।

১১ মার্চের আন্দোলন তখন ছড়িয়ে পড়েছে সারা পূর্ব বাংলায়। বেগতিক দেখে খাজা নাজিমুদ্দিন আপসের কথা তুললেন। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর ৮ দফা সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো। চুক্তি স্বাক্ষরের সময় যেহেতু বঙ্গবন্ধুসহ ভাষা আন্দোলনের অধিকাংশ নেতা কারারুদ্ধ ছিলেন, সেহেতু চুক্তির খসড়া কারাগারে নিয়ে গিয়ে তাতে তাদের সবার সম্মতি নেওয়া হয়। শর্তানুসারে ১৫ মার্চ নেতারা মুক্তি পেলেন। পরদিনের সভায় শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতিত্ব করলেন। সভাশেষে ব্যবস্থাপক সভা ঘেরাও করার সময় পুলিশ ছাত্রজনতার ওপর হামলা করে। বঙ্গবন্ধু সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন।

প্রকৃতপক্ষে পূর্ববঙ্গের মানুষের মধ্যে তখনো আলাদা করে নিজেদের অধিকার সচেতনতাও তৈরি হয়নি। দেশ বিভাগের পর প্রকৃত অবস্থা বাঙালিরা বুঝতে শুরু করে। কারণ, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দেখা যায়, নতুন দেশের ডাকটিকিট, মুদ্রা, মানি-অর্ডার বা টাকা পাঠানোর ফর্ম, ট্রেনের টিকিট, পোস্টকার্ড- এগুলোতে শুধু উর্দু ও ইংরেজি ব্যবহৃত হচ্ছে। পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত উর্দুভাষী সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বাঙালি কর্মকর্তাদের প্রতি বিরূপ আচরণের অভিযোগ ওঠে। একই রকম মনোভাবের শিকার হন পশ্চিম পাকিস্তানে কর্মরত বাঙালি কর্মকর্তারাও। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ও সরকারি চাকরিতেও ছিল অবাঙালিদের প্রাধান্য। পরে দেখা যায়, পূর্ব পাকিস্তান থেকে নৌবাহিনীতে লোক নিয়োগের ভর্তি পরীক্ষাও হচ্ছে উর্দু ও ইংরেজিতে।

অথচ পাকিস্তানের বাস্তবতা ছিল এই যে, সে দেশের পূর্বাংশে এবং গোটা দেশ মিলিয়েও- সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষাই ছিল বাংলা। মোট জনসংখ্যার ৫৪.৬০ শতাংশ বাংলা, ২৮.০৪ শতাংশ পাঞ্জাবি, ৫.৮ শতাংশ সিন্ধি, ৭.১ শতাংশ পশতু, ৭.২ শতাংশ উর্দু এবং বাকি অন্যান্য ভাষাভাষী নাগরিক। এর থেকে দেখা যায় উর্দু ছিল পাকিস্তানি ভাষাভাষীর দিক থেকে তৃতীয় স্থানে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা হয়েও বাংলা ভাষা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হবে না- এটা পূর্ববঙ্গের ছাত্র ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল। একদিকে ভাষা ও আত্মপরিচয়ের আবেগ তো আছেই- তা ছাড়াও এর একটা অর্থনৈতিক দিক আছে। ভাষার প্রশ্নটি যে পাকিস্তানের এক অংশের ওপর আরেক অংশের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ আধিপত্য বিস্তারের সঙ্গে জড়িত- এই বোধ তখন সবার মধ্যে জন্মাতে শুরু করে। একইরকম ঘটনা ঘটেছিল মুসলমানদের ক্ষেত্রে যখন ব্রিটিশরা ফারসির বদলে ভারতের রাষ্ট্রভাষা ইংরেজি করে। তখন চাকরির সুযোগ বলতে সরকারি চাকরিই ছিল। কিন্তু উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে সরকারি চাকরি বা সেনাবাহিনীতে চাকরি পেতে বাঙালিদের উর্দু শিখতে হবে, উর্দুভাষীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে- ফলে তাদের অসন্তোষ তৈরি হয়। ছাত্রদের জন্য এটা ছিল ভবিষ্যতের প্রশ্ন।

মি. জিন্নাহ তখন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল, গণপরিষদের সভাপতি এবং মুসলিম লিগেরও সভাপতি। ৯ দিনের পূর্ববঙ্গ সফরে তিনি ঢাকা ও চট্টগ্রামে কয়েকটি সভায় বক্তৃতা দেন। ঢাকায় প্রথম সভাটি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ, ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে- যা এখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। এরপর কার্জন হল। ইংরেজিতে দেওয়া সেসব বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, আমি খুব স্পষ্ট করেই আপনাদের বলছি, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু এবং অন্যকোনো ভাষা নয়। কেউ যদি আপনাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে তাহলে সে আসলে পাকিস্তানের শত্রু। কার্জন হলের বক্তব্যের সময় ছাত্ররা প্রতিবাদ করেছিলেন। পরে তারা স্মারকলিপিসহ জিন্নার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তাদের মধ্যে স্বাভাবিক কথাবার্তা হয়নি। মূলত জিন্নার পূর্ব বাংলা সফরের মাধ্যমে পূর্ব বাংলার মানুষ বুঝে যায় পাকিস্তান নামের দেশটিতে তাদের অবস্থান। অথচ প্রায় ২০০০ কিলোমিটার দূরত্বের দুটি আলাদা ভূখণ্ডের একটি দেশ সৃষ্টিতে তাদেরও ভূমিকা ছিল। ভাষা, নৃতত্ত্ব, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভৌগোলিক পরিবেশ, খাদ্যাভ্যাসসহ সব ক্ষেত্রে বিস্তর ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও কেবল ধর্মের ভিত্তিতে ১২৪৩ মাইলের ব্যবধানে অবস্থিত পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত করে এই অসম রাষ্ট্র গড়ে তোলা হয়।

১৯৫২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র ধর্মঘট হয়েছিল। মিছিল করে সারা শহর প্রদক্ষিণ করেছিল শত সহস্র ছাত্র-জনতা। মিছিল শেষে বেলতলায় জমা হয়। সবাই পরবর্তী ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। শামসুল হক চৌধুরী, গোলাম মওলা, আব্দুস সামাদ আজাদের মাধ্যমে সংবাদ পাঠিয়েছেন শেখ মুজিব-খবর পাঠিয়েছেন তিনি, সমর্থন জানিয়েছেন একুশের দেশব্যাপী হরতালের প্রতি। একটি বাড়তি উপদেশ-মিছিল করে সেদিন আইনসভা ঘেরাও করতে হবে, বাংলা ভাষার প্রতি সমর্থন জানিয়ে আইনসভার সদস্যদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে হবে। আরও একটি খবর পাঠিয়েছেন, তিনি এবং মহিউদ্দিন সাহেব রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিতে অনশন করবেন। একুশে ফেব্রুয়ারি হরতাল হবে। অনশনের নোটিশ দেওয়ার পর বঙ্গবন্ধুকে ফরিদপুর জেলে স্থানান্তর করা হয় ১৬ ফেব্রুয়ারি। যাওয়ার কালে নারায়ণগঞ্জ স্টিমার ঘাটে তার সঙ্গে দেখা করলেন শামসুদ্দোহাসহ অনেকে। তাদের বঙ্গবন্ধু জানালেন তার এবং মহিউদ্দিন সাহেবের অনশনের কথা। অনুরোধ করে গেলেন যেন একুশে ফেব্রুয়ারিতে হরতাল-মিছিল শেষে আইনসভা ঘেরাও করে বাংলা ভাষার সমর্থনে সদস্যদের স্বাক্ষর আদায় করা হয়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখের কথা সবারই জানা।

১৯৫২ সালে বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে ভিত্তি রচিত হয়, তা পরবর্তীকালের সব ঘটনাপ্রবাহকে প্রভাবিত করে। ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-র ছয় দফা, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচন এবং ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে একুশের চেতনা তাৎপর্যপূর্ণভাবে ভূমিকা পালন করেছে। এই আন্দোলনের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছিল বাঙালির জাতীয় চেতনা এবং বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্রের। মূলত বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাঙালিয়ানার জোয়ার ১৯৫২ সালের একুশে ফেরুয়ারির মধ্য দিয়েই এসেছে। ভাষা আন্দোলন তৎকালীন রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়। এই আন্দোলনের ফলে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিকাশ ঘটে। কারণ সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু ভাষা আন্দোলন করেছিলেন, নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, ভাষার চেতনাকে বুকে ধারণ করেছিলেন। বাঙালিদের জন্য একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এ চেতনা ছিল সর্বদা সক্রিয়।

লেখক: সদস্য, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)


একুশের অন্যতম চেতনা ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও দুর্বলের উপর সবলের আধিপত্যের অবসান

আপডেটেড ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ ২৩:২২
মো. শহীদ উল্লা খন্দকার

প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত দুটি ভূখণ্ডের দুটি ভিন্ন ভাষার জাতিসত্তাকে মিলিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম থেকেই মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করে সূচনা হয়েছিল আন্দোলনের। আর এই ভাষা আন্দোলনকেই বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির পথে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনাযোগ্য । ১৯৪৭ সালে যখন দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হয়েছিল তার আগ থেকেই আসলে শুরু হয়েছিল ভাষা নিয়ে বিতর্ক।পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন নিশ্চিত হওয়ার পর উর্দু-বাংলা বিতর্ক আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।

২১ শে ফেব্রুয়ারি রক্ত স্নাত ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবহ মহান শহীদ দিবস। একই সঙ্গে দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবেও পালিত হবে বিশ্বজুড়ে। আমাদের জাতীয় জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন এটি।

মহান আন্তজার্তিক মাতৃ ভাষা ২১ ফেব্রুয়ারীতে যারা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে বাংলাকে মায়ের ভাষা ও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন তাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও সশ্রদ্ধ সালাম জানাই।

১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর থেকেই পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলের শাসকগোষ্ঠী পূর্বাঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিকে তাদের অধীন করে রাখার পরিকল্পনা করেছিল। আজ আমরা গর্বিত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের বাসিন্দা।

১৯৫২ সালের এই দিনে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রাখতে গিয়ে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিল রফিক, সালাম, বরকত, সফিউর, জব্বাররা। তাদের রক্তে শৃঙ্খলমুক্ত হয়েছিল দুঃখিনী বর্ণমালা, মায়ের ভাষা। বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের যে সংগ্রামের সূচনা সেদিন ঘটেছিল, জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় পথ বেয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে তা চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে। একুশে ফেব্রুয়ারি তাই বাঙালির কাছে চির প্রেরণার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ড মাতৃভাষার অধিকারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনকে দমিয়ে দেয়নি।

বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে যোগ করে নতুন মাত্রা। শহীদদের রক্ত তাদের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে প্রেরণা জোগায়। এর পরের ইতিহাস পর্যায়ক্রমিক আন্দোলনের।

স্বাধীনতাসংগ্রাম, সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধসহ ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে আমাদের পথ দেখিয়েছে একুশে ফেব্রুয়ারি। তেমনি একুশ আজও পৃথিবীর বিভিন্ন জাতির ভাষার অধিকার অর্জনেরও পথিকৃৎ হয়ে আছে।

স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বাংলা ভাষায় সংবিধান প্রণীত করেন বঙ্গবন্ধু। এটি-ই একমাত্র দলিল যা বাংলা ভাষায় প্রণীত হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে প্রথম বাংলায় বক্তব্য দিয়ে বিশ্বসভায় বাংলাকে তুলে ধরেন। ’৫৪-র নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয়, আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ’৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-র স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই, ’৬৯-র গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়লাভ এবং ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠা লাভ করে বাঙালির স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ।

আর বাঙালি মুক্ত হয় ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ থেকে। বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের প্রতিটি পর্যায়ে ’৫২-র ভাষা আন্দোলন অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। তাই একুশ আমাদের জাতীয় জীবনে এক অন্তহীন প্রেরণার উৎস।

'ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়।একুশের অন্যতম চেতনা ছিল রাষ্ট্রীয় জীবনে অসাম্য বৈষম্য, দুর্বলের ওপর সবলের আধিপত্য ইত্যাদির অবসান। বাঙালির ঐতিহ্য, কৃষ্টি, আবহমানকালের সংস্কৃতি ইত্যাদি সমুন্নত রাখা।

অমর একুশের চেতনা এখন বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার মানুষের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় অনুপ্রেরণার উৎস। তবে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঠিক চর্চা ও সংরক্ষণে আমাদের আরও বেশি পরিশ্রমী হতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তির আশীর্বাদে আমরা এখন একই বৈশ্বিক গ্রামের বাসিন্দা। তাই উন্নত বিশ্বের সঙ্গে অগ্রগতির ধারা বজায় রাখতে আমাদের বর্তমান প্রজন্মকে বিভিন্ন ভাষায় প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে হবে, যা আন্তর্জাতিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃত।'

আমি বিশ্বাস করি যে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন আমাদের নিজস্ব ভাষার উন্নয়ন ও সংরক্ষণের পাশাপাশি বহুভাষিক শিক্ষার মাধ্যমে একটি টেকসই ভবিষ্যৎ গড়তে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

অমর একুশের চেতনাকে ধারণ করে বিশ্বের বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হোক, বৈষম্যহীন বর্ণিল পৃথিবী গড়ে উঠুক- শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে এটাও আমাদের প্রত্যাশা।'

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা সরকার প্রধান হিসেবে প্রতিবারই জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর সরকার বাংলাভাষাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। বাংলাদেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরও ভাষার চর্চার ব্যাবস্থা করেছেন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট গড়ে তুলেছেন, যেখানে হারিয়ে যাওয়া মাতৃভাষা নিয়ে গবেষণা হচ্ছে।

অমর একুশে গ্রন্থমেলাসহ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ‘আমাদের শিল্প, কলা, সাহিত্য, সংস্কৃতিকে আরো উন্নতমানের করে শুধু আমাদের দেশে না, বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিতে চান। ‘আমাদের সাহিত্য আরো অনুবাদ হোক। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ আমাদের সাহিত্যকে জানুক, আমাদের সংস্কৃতিকে জানুক, সেটাই আমরা চাই।

বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আদর্শ অনুসরণ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত করেছেন। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা’র অসাধারণ নেতৃত্বে বাংলাদেশ উন্নত সমৃদ্ধশালী দেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য ধারাবাহিক অগ্রগতি আর সম্মানের পথটি দিন দিন প্রশস্ত করে চলেছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। তিনি দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে দেশ ও মানুষের উন্নয়নের কাজে নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দিয়েছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মজীবন প্রায় চার দশকের। তারই নেতৃত্বে বাংলাদেশে চলমান উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখতে হবে। তাহলে প্রকৃত অর্থে বঙ্গবন্ধু’র স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র সুযোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে নেতৃত্ব দিবে। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ দেশ তথা জাতির জনকের স্বপ্নের সোনার বাংলা স্মার্ট বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হবেই।

সব মাতৃ ও আঞ্চলিক ভাষাকেই সমান মর্যাদা দিয়ে সংরক্ষণের দায়িত্ব রয়েছে বিশ্ববাসীর। একুশের শহীদদের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। শহীদ স্মৃতি অমর হোক।

লেখক: মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকার মনোনীত প্রতিনিধি।


কৃত্রিম রক্ত!

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
প্রদীপ সাহা  

মানবদেহে রক্তের ভূমিকা ও প্রয়োজনীয়তার কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। রক্ত খাদ্যবস্তু কোষসমূহে সরবরাহ করে এবং কোষ থেকে বর্জ্য পদার্থ বর্জ্য নিষ্ক্রমণ অঙ্গে নিয়ে যায়। তা ছাড়া রক্ত শ্বেতকণিকার মাধ্যমে আমাদের রোগ-প্রতিরোধ করে। অনেক সময় বিভিন্ন কারণে কিংবা কোনো দুর্ঘটনায় আমাদের শরীরে রক্ত পরিসঞ্চালনের দরকার হয়। আর প্রয়োজনের সময় রক্ত সংগ্রহ করা বা নিরাপদ রক্ত পাওয়া অনেক সময় হয়ে ওঠে দুঃসাধ্য ও কষ্টকর। অর্থ থাকলেও কখনো কখনো হাতের কাছে পাওয়া যায় না প্রয়োজনীয় গ্রুপের নিরাপদ রক্ত। বিজ্ঞানীরা রক্তকে প্রধানত চারটি গ্রুপে ভাগ করেছেন। গ্রুপগুলো হচ্ছে- গ্রুপ ‘এ’, ‘বি’, ‘এবি’ এবং ‘ও’। রক্তের প্রতিটি গ্রুপের আবার নেগেটিভ এবং পজিটিভ হিসেবে দুটি ভাগ রয়েছে। কোন রক্ত কাকে দান করা যাবে, তার ওপর ভিত্তি করেই রক্তের গ্রুপ নির্ধারণ করা হয়। রক্তের গ্রুপ প্রধানত নির্ভর করে ‘অ্যান্টিজেন’-এর ধরনের ওপর। এই অ্যান্টিজেন থাকে রক্তের কোষপর্দায়। রক্তের মধ্যে সবচেয়ে বেশি লোহিতকণিকা থাকে বলে কোষপর্দায় থাকা অ্যান্টিজেন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব বহন করে। মজার তথ্য হলো- ‘এ’ গ্রুপের রক্তে ‘এ’ অ্যান্টিজেন, ‘বি’ গ্রুপের রক্তে ‘বি’ অ্যান্টিজেন এবং ‘এবি’ গ্রুপের রক্তে ‘এ’ ও ‘বি’ উভয় অ্যান্টিজেন থাকলেও কিন্তু ‘ও’ গ্রুপের রক্তে কোনো অ্যান্টিজেন থাকে না। অন্যদিকে ‘ও’ গ্রুপের রক্তে ‘এ’ ও ‘বি’ উভয় অ্যান্টিজেন বিদ্যমান। রক্তের গ্রুপের এই হেরফেরের কারণে একজনের রক্ত ইচ্ছা করলেই আরেকজনের শরীরে সঞ্চালন করা সম্ভব হয় না বা গ্রহণ করতে পারে না। এ ক্ষেত্রে রক্তের গ্রুপের পাশাপাশি আরও অনেক কিছুই মিল থাকতে হয়। এক শরীর থেকে অন্য শরীরে রক্ত সঞ্চালনের মধ্যে দাতার অ্যান্টিবডি আর গ্রহীতার অ্যান্টিজেনের মধ্যে মিল থাকলে চলবে না। মজার ব্যাপার হচ্ছে- ‘ও’ নেগেটিভ গ্রুপের রক্ত যে কেউ গ্রহণ করতে পারে অর্থাৎ সবার শরীরের জন্যই গ্রহণযোগ্য।

রক্ত নিয়ে ভাবনার দিন শেষ হতে চলছে। ব্রিটেনের গ্লাসগো ইউনিভার্সিটির স্টেম সেল গবেষক জো মাউন্টফোর্ড কৃত্রিম রক্ত তৈরি করেছেন এবং প্রথমবারের মতো ভ্রূণসংক্রান্ত স্টেম সেল থেকে মানুষের রক্তের লোহিতকণিকা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। মি. জো মাউন্টফোর্ড এবং স্টেম সেলের অন্যান্য গবেষকরা প্রজনন ক্লিনিক থেকে অতিরিক্ত ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (আইভিএফ) ভ্রূণ অর্থাৎ টেস্টটিউব বেবি সংগ্রহ করে তা থেকে রক্তের লোহিতকণিকা উৎপাদন করার নিশ্চয়তা দিয়েছেন। ওয়েলকাম ট্রাস্টের অনুদানে পরিচালিত ৩০ লাখ পাউন্ডের প্রকল্পের মাধ্যমে কৃত্রিম রক্ত অর্থাৎ রক্তের বিকল্প উৎস হিসেবে ‘ও’ নেগেটিভ গ্রুপের রক্ত তৈরি করেছেন। গবেষক জো মাউন্টফোর্ড বলেন, আইভিএফ ভ্রূণের ভেতর ‘আরসি-৭’ নামে যে স্টেম সেলটি রয়েছে, সেটি রূপান্তর করে অক্সিজেন বহনকারী হিমোগ্লোবিন তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। আর এই হিমোগ্লোবিন তৈরির মাধ্যমে সহজেই তৈরি হবে ‘ও’ নেগেটিভ গ্রুপের রক্ত। এক জরিপে জানা যায়, ব্রিটেনে রক্ত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো রক্তের সম্পূর্ণ প্রয়োজন মেটাতে পারে না এবং বছরে তাদের প্রায় ২৫ লাখ রক্তদাতার ঘাটতি থেকে যায়। আর তাই প্রকল্পটি এই বিরাট সমস্যাকে সামনে রেখে বছরে প্রায় ১১ কোটি লিটার রক্ত তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। গবেষকরা মনে করেন, কৃত্রিম রক্তের মাধ্যমে সমগ্র ব্রিটেনের রক্তের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে। আশার কথা হচ্ছে, সবকিছু ঠিক থাকলে ব্রিটেনে কৃত্রিম রক্তের ব্যবহার সম্ভব হবে বলে গবেষকরা মনে করেন।

লেখক: বিজ্ঞানবিষয়ক কলামিস্ট


ঢাকার পরিবেশ বাসযোগ্য করতে হবে

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
মোতাহার হোসেন

রাজধানী ঢাকা বিশ্বের সর্বাধিক জনবহুল নগরীর অন্যতম। আধুনিক নগর ব্যবস্থায় যে সুযোগ-সুবিধা থাকা দরকার তার অনেকটাই অনুপস্থিত এখানে। মূলত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অধিকাংশ অফিস, আদালত, কর্মসংস্থানসহ মানুষের অপরিহার্য প্রায় সব সেবা ও সুযোগের ব্যবস্থা ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মানুষ প্রতিনিয়ত রাজধানীমুখী হচ্ছে। তা ছাড়া অনুরূপ সেবা ও সুযোগের আশায় মানুষ ঠাঁই নিচ্ছে শহর ছেড়ে নিকটস্থ বিভাগীয় ও জেলা শহরেও। একই সঙ্গে নগরায়ণের ফলে দেশের অন্য নগরগুলোতে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে জনসংখ্যা। নগরায়ণও হচ্ছে দ্রুতগতিতে। সেই সঙ্গে নগরীতে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিবিধ সমস্যা। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, যানবাহন সংকট, জলাবদ্ধতা, দূষণ ও যানজট, জলজট, মানব জটের পাশাপাশি নতুন নতুন অসংখ্য সংকট নগরবাসীর ঘাড়ে চেপে বসছে। এর বিপরীতে নগরীর বাসযোগ্যতা রক্ষার জন্য যেসব পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে, তা সময় উপযোগী নয়, আবার তা বাস্তবায়নেও রয়েছে দীর্ঘসূত্রিতা। ফলে নগরগুলো দিন দিন আরও বাসযোগ্যহীন হয়ে পড়ছে। নগরীর এই ক্রমবর্ধমান সমস্যা নিরসনে ঢাকাকে বৃত্তাকার সড়ক, নৌ, রেল যোগাযোগের আওতায় আনা, রাজধানীর নিকটস্থ জেলা,উপজেলায় পরিকল্পিত উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, অফিস, আদালত স্থানান্তর ও নতুন করে গড়ে তোলা, দেশের জেলা শহরগুলোকে হাব হিসেবে ধরে নিয়ে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। জেলাপর্যায়েই তৈরি করতে হবে কর্মসংস্থান। জেলার সঙ্গে গ্রামকে যুক্ত করে সুষম উন্নয়ন জরুরি হয়ে পড়েছে। টেকসই ও বাসযোগ্য নগরায়ণে এসবের বিকল্প নেই।

নগরীকে বাসযোগ্য করার ব্যাপারে বিভিন্ন সময়ে সরকারি, বেসমরকারি বিভিন্ন সংস্থা প্রায়শই নানান উদ্যোগ আয়োজন করে থাকে। ঠিক এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি ‘স্থায়িত্বশীল নগরায়ণ: সমস্যা ও সমাধান’ শীর্ষক এক বিশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তাতেও প্রায় অভিন্ন এমন অভিমত উঠে এসেছে। ওই অনুষ্ঠানে সিপিডির চেয়ারম্যান বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহানের পরামর্শ, অতি নগরায়ণের ফলে যানজট বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং নগরায়ণের ঝুঁকি বাড়ছে। সমন্বয়হীনতার কারণে দ্রুত নগরায়ণ সম্প্রসারিত হচ্ছে। আবাসন কোম্পানিগুলোর চটকদার বিজ্ঞাপনের ফলে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। সেখানেও নাগরিক সুবিধার ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, বিএনপির আব্দুস সালাম তালুকদার স্থানীয় সরকারমন্ত্রী থাকার সময় সিপিডির পক্ষ থেকে দেশের চারটি শহরের মেয়রকে নিয়ে বসা হয়। উদ্দেশ্য ছিল দেশের মিউনিসিপ্যালিটিগুলোকে কীভাবে শক্তিশালী করা যায়। তখন আমলাতন্ত্র বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘সেখানে মেয়রের হাতে পুলিশ থেকে শুরু করে শহরের সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ঢাকায় তা নেই। বঙ্গবন্ধুর আমলে একটি পরিকল্পনা কমিশন ছিল। আমলাতন্ত্রের কারণে সেটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। বঙ্গবন্ধু ১৩০০ সিসির টয়োটা গাড়ি ব্যবহার করতেন। এখন ঢাকা শহরে মানুষ মার্সিডিজ বেঞ্জ-বিএমডব্লিউতে চড়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু শহরটা ন্যাস্টি (নোংরা) হয়ে গেছে।’

নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলামের অভিমত, শহরে দিন দিন মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু নগর উন্নয়নের দায়িত্বে কোনো একজন সুনির্দিষ্ট মন্ত্রী নেই। যে দেশের ৩৬ শতাংশ মানুষ শহরে বাস করে সেখানে একজন নগর বিষয়কমন্ত্রী থাকা প্রয়োজন। আগামী ডেল্টা প্ল্যানে শহরের লোকসংখ্যা আরও বাড়বে। তিনি বলেন, দেশে নগরায়ণ বাড়ছে। ১৯৭৪ সালে দেশে নগরায়ণের হার ছিল মাত্র ৮ দশমিক ৮৭ শতাংশ। ১৯৮১ সালে হয় ১৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ, ১৯৯১ সালে ২০ দশমিক ১৫ শতাংশ, ২০০১ সালে ২৩ দশমিক ৪ শতাংশ, ২০১২ সালে ৩১ শতাংশ এবং ২০২২ সালে দাঁড়িয়েছে ৩৯ দশমিক ৭১ শতাংশে। নগরায়ণের ক্ষেত্রে ঢাকা বিভাগ সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছে। সবচেয়ে পিছিয়ে আছে সিলেট বিভাগ। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ১৫টি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা এসব প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে একগুচ্ছ সুপারিশ তুলে ধরা হয়।

‘নগরায়ণ ও দুর্যোগ: ভূমিকম্প ও অগ্নিকাণ্ডের অভিঘাত’ প্রবন্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং ভূতত্ত্ব বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক এএসএম মাকসুদ কামাল বলেন, যত বেশি নগরায়ণ হবে তত বেশি বিপদ ডেকে আনা হবে। বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে তার ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ করার মতো সক্ষমতা আমাদের নেই। ভূমিকম্পের দিক থেকে দেশের পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল ঝুঁকিতে থাকলেও আশার কথা হলো, নিকট ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূমিকম্প সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা নেই। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরী তার প্রবন্ধে বলেন, বাংলাদেশে ওয়ান হেলথ বা অভিন্ন স্বাস্থ্যের ধারণা প্রয়োগের জন্য আইনি কাঠামো নেই। আগামীতে মানুষের সুস্থতা নির্ভর করবে অভিন্ন স্বাস্থ্য ধারণা প্রয়োগের মধ্য দিয়ে। অভিন্ন স্বাস্থ্যের একটি প্রায়োগিক ধারণা প্রস্তুত করা দরকার।

একজন পরিবেশবিদ বলেন, বাসযোগ্য নগরীতে ১২ শতাংশ উন্মুক্ত স্থান ও ১৫ শতাংশ এলাকায় সবুজের আচ্ছাদন থাকার কথা কিন্তু আছে সামান্য। ঢাকা শহরের সঙ্গে যুক্ত আটটি নদী ঘিরে সার্কুলার নৌপথ চালু করতে না পারাটা আমাদের ব্যর্থতা। যানজটের ভারেও ন্যুব্জ হয়ে আছে ঢাকা। গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল হকের অভিমত, যানজট নিরসন করতে বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজ করার কাজও প্রথম ধাপে রয়েছে। এটাকে সামনের দিকে নিতে না পারলে কার্যকর গণপরিবহন ব্যবস্থা কোনোভাবেই গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। জনঘনত্ব ও শহরের উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনার জন্য সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এলাকাভিত্তিক জনঘনত্বের ম্যাপ তৈরি করা। এলাকাভিত্তিক সামাজিক ও নাগরিক সুবিধা ও অবকাঠামোর তালিকা প্রস্তুত করা। সেই অনুযায়ী উন্নয়ন অনুমোদন দেওয়া। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ নয় বরং সামগ্রিক টেকসই শহরের উন্নয়নকে প্রাধান্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

প্রসঙ্গত ঢাকা মাঝেমধ্যেই বায়ুদূষণে বিশ্বে শীর্ষস্থান করে নেয়। বায়ুদূষণের কারণে বিশ্বের সব মানুষের গড় আয়ু কমছে দুই বছর চার মাস। তবে বাংলাদেশে কমছে ছয় বছর আট মাস। এক পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়, গত ৩৩ বছরে রাজধানীতে থেকে বিলুপ্ত অথবা উধাও হয়েছে ১৯০০ পুকুর। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দখলদারিত্বও বিপুল পরিমাণ আবাসন চাহিদার কারণে ১৯৮৫ সাল থেকে এই পর্যন্ত গত ৩৩ বছরে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে ঢাকার ১ হাজার ৯০০ সরকারি-বেসরকারি পুকুর ও জলাধার। এসব পুকুরের মোট জমির পরিমাণ ৭০ হাজার হেক্টর। এই পুকুরগুলো এক সময় ছিল পানি ধরে রাখার অন্যতম মাধ্যম। ফলে জলাবদ্ধতা নিরসন, অগ্নিনির্বাপণ, পানীয় জলের সংকট নিরসনে এগুলোর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। মৎস্য বিভাগের পরিসংখ্যান মতে, ১৯৮৫ সালের দিকে ঢাকায় মোট পুকুর ছিল দুই হাজার। বেসরকারি হিসাবমতে, এ বছর পর্যন্ত তা এসে ঠেকেছে এক শতে। যদিও ঢাকায় পুকুরের প্রকৃত সংখ্যা কত সে হিসাব নেই দুই সিটি করপোরেশনের কাছে। ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের এক সমীক্ষা রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, গত সাড়ে তিন দশকে হারিয়ে গেছে ঢাকার ১০ হাজার হেক্টরের বেশি জলাভূমি, খাল ও নিম্নাঞ্চল।

এভাবে জলাশয় ভরাটের এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩১ সাল নাগাদ ঢাকায় জলাশয় ও নিম্নভূমির পরিমাণ মোট আয়তনের ১০ শতাংশের নিচে নেমে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে বলা হয়েছে, ১৯৭৮ সালে ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় জলাভূমির পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৯৫২ হেক্টর এবং নিম্নভূমি ১৩ হাজার ৫২৮ হেক্টর। একই সময়ে খাল ও নদী ছিল ২ হাজার ৯০০ হেক্টর। রাজধানীর বৃষ্টির পানি এসব খাল দিয়েই পড়েছে নদীতে।

২০১৪ সালে ঢাকা ও আশপাশে জলাভূমি কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৩৫ হেক্টর, নিম্নভূমি ছয় হাজার ১৯৮ হেক্টর এবং নদী-খাল এক হাজার দুই হেক্টর। অর্থাৎ ৩৫ বছরে জলাশয় কমেছে ৩৪.৪৫ শতাংশ। এ সময়ের ব্যবধানে নিম্নভূমি কমেছে ৫৪.১৮ এবং নদী-খাল ৬৫.৪৫ শতাংশ। ২০১৮ সালেও রাজধানীতে ১০০টি পুকুর জলাশয় ছিল। গেল পাঁচ বছরে নানান উন্নয়ন কাজের জন্য ভরাট হয়েছে একের পর এক পুকুর। কমতে কমতে তা এখন দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৯টিতে। যার ফলে রাজধানীতে কোনো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পানির যোগান পেতে বেগ পেতে হচ্ছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে। এ অবস্থায় জলাশয়গুলো রক্ষা করার তাগিদ সংশ্লিষ্ট মহলের। নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নগরে বড় বড় ভবন গড়ে উঠছে; কিন্তু এগুলো নির্মাণের পেছনে পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা নেই। ফলে পুকুর-খাল-বিল-জলাধার একের পর এক বিলীন হচ্ছে। জলাধার রক্ষায় আইন থাকলেও সেগুলো না মানায় একের পর এক ভরাট হয়ে সেখানে গড়ে উঠছে আবাসন। শুধু ঢাকা শহর নয়, ঢাকার বাইরেও পুকুরগুলো একের পর এক দখল হয়ে যাচ্ছে, ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ঢাকার পার্শ্ববর্তী বসিলা, কেরানীগঞ্জ, আশুলিয়া, সাভার, টঙ্গীর এসব এলাকার পুকুরগুলোও হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ ঢাকার ইতিহাস বলছে, এক সময় ঢাকার খালগুলোর সঙ্গে আশপাশের চারটি নদীর মিলন ছিল। এখন এসবের অধিকাংশই বিলীন ও বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজের প্রধান নির্বাহী ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. আতিক রহমানের অভিমত, ‘সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবে জলাভূমিগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা শহরের ভেতরে এক সময় বড় বড় জলাধার ছিল। সেগুলো ভরাট কিংবা দখল হয়ে গেছে। আগে অনেক পুকুর থাকলেও এখন তার অস্তিত্ব নেই।

রাজধানীকে বাসযোগ্য করতে নগরীর পাশাপাশি শহরতলী এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে গ্রামীণ এলাকায় পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। শব্দ ও বায়ুদূষণ রোধে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ, পয়ঃনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিয়ে দূষণমুক্ত করা। এ ক্ষেত্রে স্টেকহোল্ডার ও সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে পয়ঃনিষ্কাশনে সম্মানজনক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নগরীর নিচু এলাকার জলাবদ্ধতা ও পয়ঃনিষ্কাশন পরিকল্পিত সমাধান করা। ইটভাটা নির্মাণকাজ ও শিল্পকারখানার বায়ুদূষণের প্রধান উৎস চিহ্নিত করে দূষণের মাত্রা গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে নিয়ে আসা। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, পরিবেশদূষণ, পানিদূষণ রোধে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা। পরিবেশ ঝুঁকির বিষয়ে জনগণকে সচেতন করা। নগরীতে খোলা জায়গা ও খেলার মাঠ নির্মাণে সরকারের বিনিয়োগ, ভাসমান ও বস্তিবাসীদের রাজধানীর বাইরে শহরতলী ও পার্শ্ববর্তী জেলায় কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ, অফিস আদালত গড়ে তোলা ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করা, যানজট নিরসনে ফুটপাত নির্মাণের ওপর গুরুত্বারোপ, বাস রুটের যৌক্তিকীকরণ এবং শহরে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসম্মত পাবলিক টয়লেট, খেলার মাঠ, উন্মুক্ত জায়গা, পর্যাপ্ত জলাশয়ের ব্যবস্থা করা জরুরি। এসব করা গেলে ঢাকা বাসযোগ্য হওয়ার পথ সুগম হবে।

লেখক: সাংবাদিক


ঋতু পরিবর্তনে স্বাস্থ্য সচেতনতা জরুরি

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ

শীত যাচ্ছে, আসছে বসন্ত, এরপরই আসবে প্রচণ্ড গরমের গ্রীষ্মকাল। আবহাওয়ায় শুরু হয়েছে ঋতু পরিবর্তনের খেলা, দিনের বেলা গরম এবং রাতে শীতল হাওয়া। আবহমানকাল থেকেই ঋতুর এই পরিবর্তন চলে আসছে এবং চলতেই থাকবে। ঋতু পরিবর্তনের এই খেলায় তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, আর ধুলাবালির তারতম্যে দেখা যায় নানারকম অসুখ-বিসুখের উৎপাত। এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের স্বাস্থ্যের পরিবর্তন বা রোগব্যাধি হওয়াটাই স্বাভাবিক। তাই আমাদের সবাইকে হতে হবে সচেতন, নিতে হবে কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।

ঋতুভেদে এসব অসুখের বেশির ভাগই ভাইরাসজনিত এবং সাময়িক, কিন্তু অস্বস্তিকর।
তবে সুবিধা হলো- একটু সতর্ক হলে প্রায় ক্ষেত্রেই এগুলো প্রতিরোধ করা যায়। এমনকি রোগব্যাধি হয়ে গেলেও তা উদ্বেগের নয়, সহজ চিকিৎসায় নিরাময়যোগ্য।
ঋতু পরিবর্তনের সময় সবচেয়ে বেশি রোগব্যাধির প্রকোপ যায় শ্বাসতন্ত্রের ওপর। ছোট বাচ্চা থেকে শুরু করে বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত সবার সর্দি-কাশি বা কমন কোল্ড। বিশেষ করে শীতের শেষে আর গরমের শুরুতে তাপমাত্রা পরিবর্তনের সময়টাতেই এর প্রাদুর্ভাব বেশি। প্রায়ই দেখা যায় দু-তিন দিন নাক বন্ধ থাকে বা নাক দিয়ে পানি ঝরে। গলাব্যথা, শুকনা কাশি আর জ্বরও থাকতে পারে। এগুলো বেশির ভাগই ভাইরাসজনিত, লক্ষণভিত্তিক কিছু চিকিৎসা, এমনকি কোনো চিকিৎসা ছাড়াই ভালো হয়, কোনো অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হয় না। তবে শুকনা কাশিটা কয়েক সপ্তাহ ভোগাতে পারে। ব্যথার জন্য প্যারাসিটামলজাতীয় ওষুধ, অ্যান্টিহিস্টামিন খেতে হবে। আর গরম পানিতে গড়গড়া করতে হবে। গরম গরম চা বা গরম পানিতে আদা, মধু, লেবুর রস, তুলসি পাতার রস ইত্যাদি পান করলে উপকার পাওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রে ভাইরাসের পরপরই ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করতে পারে। কাশির সঙ্গে হলুদ বা সবুজ রঙের কফ বের হলে সঙ্গে জ্বর থাকলে ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। সে ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হয়।
এই সময়টাতে আরও ভাইরাস রোগের প্রাদুর্ভাব হতে পারে, যেমন- ইনফ্লুয়েঞ্জা, সিজনাল ফ্লু। এই রোগের লক্ষণগুলোও কমন কোল্ডের মতোই। আলাদা কোনো চিকিৎসাও প্রয়োজন হয় না, ওপরের কমন কোল্ডের মতোই উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসা দিলেই ঠিক হয়ে যায়।

জলবসন্ত রোগের প্রকোপও এই সময়ে বেশি বেশি হয়। প্রথমে একটু জ্বর-সর্দি, তারপর গায়ে ফোস্কার মতো ছোট ছোট দানা। সঙ্গে থাকে অস্বস্তিকর চুলকানি, ঢোক গিলতে অসুবিধা। গায়ে ব্যথা থাকতে পারে। এটাও কোনো মারাত্মক অসুখ নয়। জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল, শরীর চুলকালে অ্যান্টিহিস্টামিন-জাতীয় ওষুধ, ক্যালামিন লোশন ইত্যাদি ব্যবহার করলেই রোগের প্রকোপ কমে আসবে। আর সংক্রমণ হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরমার্শ নেওয়া উচিত।

সাইনোসাইটিস এবং টনসিলাইটিস-জাতীয় রোগগুলোও এই সময়ে দেখা দিতে পারে। টনসিলের সমস্যা যে কারোরই হতে পারে, তবে ছোট বাচ্চারাই বেশি আক্রান্ত হয়। হঠাৎ শীত চলে যাওয়ার প্রাক্কালে গরমের শুরুতে ঠাণ্ডা পানীয় বা আইসক্রিম খাওয়ার প্রবণতার কারণে, এমনকি বাচ্চারা স্কুলে বা অন্যান্য জায়গায় ধুলাবালিতে খেলাধুলা করলেও এসব রোগ বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। যারা হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস বা শ্বাসজনিত অন্যান্য রোগে ভোগেন, তাদের এ রোগের প্রকোপ শীতের পর বসন্তে এমনকি গরমের শুরুতে বাড়তে পারে। এ ছাড়া নিউমোনিয়া ও এর সঙ্গে জ্বর ও শ্বাসকষ্টও হয়ে থাকে। তাই কালক্ষেপণ না করে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

এ সময় বৃষ্টির ফলে রাস্তা-ঘাটসহ বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে থাকে। আবহাওয়াও স্যাঁতসেঁতে হয়ে ওঠে। এই জমে থাকা পানিতে এডিস মশা জন্ম নেয়। এ মশা ডেঙ্গুজ্বরের জীবাণু বহন করে। এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলায় কামড়ায়। তাই যেসব স্থানে পানি জমে থাকতে পারে যেমন- টব, ডাবের খোসা, প্লাস্টিক কনটেইনার পরিষ্কার ও শুকনো রাখতে হবে। অনেকে ড্রইংরুম গাছ দিয়ে সাজাতে পছন্দ করেন। সে ক্ষেত্রে প্রতিদিন টব রাখার স্থান ভালোভাবে মুছে পরিষ্কার রাখতে হবে। ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপ দেখা দিলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। বর্ষায় জমে থাকা বৃষ্টির পানি এবং স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ার কারণে যে রোগটি বেশি সংক্রমিত হয় তা হচ্ছে ফাঙ্গাল ইনফেকশন বা চর্মরোগ। দাঁদ-জাতীয় গোল চাকাচাকা ফাঙ্গাল শরীরের নানা জায়গায় হতে পারে। অসহ্য চুলকানি হয়। এগুলো গোলগাল রিং আকারে শরীরে বাড়তে থাকে। তাই অনেক সময় একে রিংওয়ার্মও বলা হয়ে থাকে। আঙ্গুলের ফাঁকে ঘা বর্ষাকালে একটি অতিপরিচিত সমস্যা এবং এতে মিক্সব্যাকটেরিয়াল ও কেনডিডাল ইনফেকশন হতে পারে। ছুলি বর্ষার সময় বাড়তে পারে। এক ধরনের ছোপছোপ সাদা অথবা কালচে দাগ মুখে-পিঠে বা বুকে হয়ে থাকে। এ সব সমস্যা এড়াতে বর্ষায় ত্বকের যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। নিয়মিত ত্বক পরিষ্কার রাখা, সাবান দিয়ে গোসল করা, জামা-কাপড় নিয়মিত পাল্টানো বা পরিষ্কার রাখা এসব সমস্যা থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে। ফাঙ্গাল ইনফেকশনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

আরও কিছু কিছু রোগ হওয়ার প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যায়, যেমন- প্রচণ্ড গরমে পিপাসার কারণে রাস্তা-ঘাটে পানি বা শরবত পান করার ফলে পানিবাহিত রোগ বেশি হতে দেখা যায়। দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়া খাদ্যদ্রব্য, ফলমূল গ্রহণ করার ফলে প্রায়ই ডায়রিয়াজনিত রোগব্যাধি দেখা দেয়। এমনকি এসব গ্রহণ করার কারণে টাইফয়েড, প্যারাটাইফয়েড, জন্ডিস, সাধারণ আমাশয়, রক্ত আমাশয়ও হতে পারে। আবার তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অতিরিক্ত তাপমাত্রায় হিট স্ট্রোক বা হিট এক্সহসশানের মতো জটিল সমস্যার প্রকোপও দেখা দিতে পারে।
কি কি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে : শীতের শেষে গ্রীষ্মের আগমনে স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা থেকে বাঁচার জন্য কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই মোটামুটি সুস্থ থাকা সম্ভব।

(১) ধুলোবালি পরিহার করতে হবে, অতিরিক্ত গরমে যাওয়াও এড়িয়ে চলতে হবে এবং ঘাম হলে মুছে ফেলতে হবে।

(২) মনে রাখতে হবে জ্বর এবং কাশি যদি দুই সপ্তাহের বেশি হয়, সর্দি একেবারে সারে না, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। অযথা অবহেলা করলে অসুখ জটিল হয়ে যেতে পারে অথবা খারাপ রোগ আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ভাইরাসজনিত অসুখে আক্রান্ত রোগীর কাছ থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকতে হবে।
(৩) যারা হাঁপানিসহ অন্যান্য শ্বাসযন্ত্রের রোগে ভোগেন তারা বাইরে বেরোলে ধুলাবালি পরিহার করুন, প্রয়োজনে মাস্ক ব্যবহার করলে আরও ভালো হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ঠাণ্ডা পানি বা খাবার খাওয়া, ধুলোবালিতে যাওয়া ইত্যাদি পরিহার করলে এসব রোগ থেকে নিরাপদ থাকা সম্ভব।
(৪) সব সময় পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। যেখানে-সেখানে দূষিত পানি বা অন্যান্য পানীয় খাওয়া বর্জন করতে হবে। পানি বা অন্য তরলজাতীয় পান করুন অন্যসময়ের চেয়ে একটু বেশি, শুধু যেন হয় বিশুদ্ধ। বিশেষ করে যারা অতিরিক্ত গরম পরিবেশে কাজকর্ম করেন তাদের বেলায় তরল পানীয়ের সঙ্গে লবণ মিশিয়ে নেবেন। ওরস্যালইনও খেতে পারেন।
(৫) পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্য গ্রহণ, কাঁচাসবজির সালাদ, ভিটামিন ‘এ’ ও ‘সি’যুক্ত ফলমূল গ্রহণ এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা, যা রোগ-প্রতিরোধে সহায়তা করে দেহকে রাখবে সুস্থ।

(৬) নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন করা, নিয়মিত ও পরিমিত কায়িক পরিশ্রম এবং ধূমপান পরিহার করা উচিত।

(৭) ঘরবাড়ি তথা ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা। ঘরের দরজা-জানালা খুলে পর্যাপ্ত পরিমাণে আলো-বাতাস প্রবেশের সুযোগ করে দিয়ে একটি নির্মল বসবাসের পরিবেশ নিশ্চিত করা।

(৮) হাত ধোয়ার অভ্যাস করা, বিশেষ করে নাক মোছার পর পর, বাইরে থেকে আসার পর এবং খাদ্যবস্তুর সংস্পর্শে আসার আগে হাত ধোয়া।

(৯) প্রতি বছর ইনফ্লুয়েঞ্জার এবং পাঁচ বছর পর পর নিউমোনিয়ার টিকা নেওয়া উচিত।

ঋতু পরিবর্তন চিরন্তন। সময়ের সঙ্গে আসবে গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত। প্রকৃতি সেজে উঠবে অপরূপ সাজে। আর এর সঙ্গে একেক সময় একেক রোগ-ব্যাধির প্রকোপ হতে থাকবে। সে অনুযায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। মনে রাখতে হবে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম।

লেখক: প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক


নিষিদ্ধ কার্বোফুরানে- হুমকিতে প্রকৃতি ও পরিবেশ

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
সমীরণ বিশ্বাস

কার্বোফুরানের বিষাক্ততা মানব স্বাস্থ্য ও আবাদযোগ্য জমির উর্বরতা উভয়ের জন্য ক্ষতিকর উল্লেখ করে ২০১৬ সালে তা নিষিদ্ধের আহ্বান জানায় জাতিসংঘ। কার্বোফুরান নিষিদ্ধ করা ৮৮তম দেশ হয় বাংলাদেশ। গত জুনের পর কার্বোফুরান গ্রুপের নিবন্ধিত কীটনাশকের বিজ্ঞাপন প্রচারসহ নবায়ন, আমদানি ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পরে আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের আবদারে নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা গেল ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ বহু আগেই এ কীটনাশকের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে এসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) শ্রেণি অনুযায়ী কার্বোফুরান টেকনিক্যাল এবং ফরমুলেশনের বিষাক্ততা মানুষসহ প্রাণিকুলের জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় কার্বোফুরানের রেজিস্টার্ড প্রোডাক্টগুলোর নবায়ন, আমদানি ও ব্যবহার কার্যক্রম আগামী জুন পর্যন্ত চলমান থাকবে। এ সময়ের পর কোনোক্রমেই কার্বোফুরানের রেজিস্টার্ড প্রোডাক্টগুলোর বিজ্ঞাপন প্রচারসহ নবায়ন, আমদানি ও ব্যবহার করা যাবে না। বালাইনাশক আমদানি, উৎপাদন, পুনরায় উৎপাদন, বিক্রয়, বিতরণ ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং এসংক্রান্ত আনুষঙ্গিক বিষয়ে বিধান প্রণয়নে ‘বালাইনাশক আইন-২০১৮’-এর ধারা ১৫, ১৮, ১৯ ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ধারা এবং ‘বালাইনাশক বিধিমালা, ১৯৮৫’-এ দেওয়া ক্ষমতাবলে সরকার এ আদেশ জারি করেছে। দানাদার কীটনাশক কার্বোফুরান প্রতিরোধক ও প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ পোকা লাগার আগে কার্বোফুরান ব্যবহার করলে পোকা লাগবে না এবং পোকা লাগার পর ব্যবহার করলে পোকা মারা যাবে। এটি মানবস্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর। এর সংস্পর্শে এলে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হতে পারে মানুষ। কার্বোফুরানের একটি দানা একটি পাখি মেরে ফেলতে পারে। পাখিরা প্রায়ই ভুল করে বীজের বদলে এ কীটনাশক খেয়ে মারা যায়। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ কীটনাশকের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দানাদার এই কীটনাশক এতটাই ভয়ংকর, জমিতে একবার ব্যবহার করলে ৩০ দিন পর্যন্ত ফসলে থাকে এর বিষাক্ততা।

কার্বোফুরান একটি দানাদার কীটনাশক। সাধারণত ধান, গম, ভুট্টার মতো শস্যের পোকা দমনে এটি ব্যবহার করা হয়। কার্বোফুরানের কারণে কৃষক নিজে তো ক্ষতিগ্রস্ত হনই; একই সঙ্গে তা ভোক্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি বয়ে আনে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্ল্যান্ট প্রটেকশন বিভাগের এক সূত্র বলছে, দেশে ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রায় ৪২ হাজার টন বালাইনাশক ব্যবহৃত হয়েছে। এর মধ্যে আট থেকে ১০ হাজার টন হচ্ছে কার্বোফুরানজাতীয়। দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত কীটনাশক এটি; কিন্তু যথাযথ নজরদারির অভাবে এখনো সারা দেশে প্রকাশ্যেই এই কীটনাশক বিক্রি হচ্ছে।

এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, গত মাসে মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর, সুনামগঞ্জ, রাজবাড়ী, ঢাকা ও মানিকগঞ্জসহ ১০টি জেলার এক ডজন দোকানে কার্বোফুরান বিক্রি হতে দেখা গেছে। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি ই-কমার্স সাইটও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে প্রকাশ্যে এই নিষিদ্ধ কীটনাশক বিক্রি করছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্যানুযায়ী, দেশে ২৫২টি প্রতিষ্ঠান কার্বোফুরান আমদানি, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিক্রি করে থাকে। কীটনাশক কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির (পিটাক) তথ্যানুসারে, ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত ৩ হাজার ২৮৫ টন কার্বোফুরান মজুত ছিল। যেসব কোম্পানির কাছে কার্বোফুরান আছে, তাদের গত ৩০ অক্টোবরের মধ্যে সব ধ্বংস করে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিল পিটাক। অন্যথায় কোম্পানিগুলোকে নিবন্ধন বাতিলসহ আইনি পদক্ষেপের মুখোমুখি হতে হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের থেকে জানা যায়, নিষিদ্ধ-পরবর্তী বিক্রি, তদারকি বা বন্ধ করতে কোথাও কোনো অভিযান চালানো হয়নি।

ক্যানসারের জন্য দায়ী কার্বোফুরান

মানুষের ক্যানসারের জন্য দায়ী বালাইনাশক কার্বোফুরানের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে চোর-পুলিশ খেলছে কৃষি মন্ত্রণালয় ও বালাইনাশক কারিগরি উপদেষ্টা কমিটি (পিটাক)। জুনের মধ্যেই বিষটির প্রয়োগ বন্ধে প্রজ্ঞাপন জারি করা হলেও সময়সীমা আরও বাড়ানোর দাবি ব্যবসায়ীদের। ইতোমধ্যে সুপারিশও করেছে পিটাক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতি দ্রুত দেশ থেকে কার্বোফুরান নিশ্চিহ্ন না করা গেলে মাশুল গুণতে হবে সবাইকে। ধান, গম, টমেটো, ঢেঁড়স, আম, লিচু, বিশেষ করে আখে যেন পোকায় না ধরে; সে জন্য যেসব বালাইনাশক ব্যবহার করা হয়; তার একটি বড় অংশ দখলে রয়েছে কার্বোফুরানের। তবে এমন সুফলের চরম মূল্য দিতে হয় প্রকৃতি ও পরিবেশকে। কারণ, এর ধারাবাহিক প্রয়োগে নষ্ট হয় মাটির গুণাগুণ। মরে যায় উপকারী অনুজীব। অন্যদিকে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে মানবদেহে ঢুকে তৈরি করে ক্যানসার-হাঁপানির মতো জটিল রোগব্যাধি। মানুষের প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস করে। শিশুর বিকলাঙ্গতা তৈরি করে। তাদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে। জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউটের করা সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর এক-তৃতীয়াংশই কৃষক।

দুর্বল নজরদারি

কার্বোফুরানের উৎপাদন, বিক্রয় ও ব্যবহার বন্ধ হলো কি না, সেটা এখন কঠোর নজরদারি দরকার। কার্বোফুরান নিষিদ্ধ করেছে সরকার। কিন্তু যথাযথ নজরদারির অভাবে এখনো সারা দেশে বিক্রি হচ্ছে এই নিষিদ্ধ ঘাতক কীটনাশক! বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি মানুষ হৃদরোগ ও স্ট্রোকে মারা যায় এবং এর পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ খাদ্যে বিষক্রিয়া। এ ছাড়া কার্বোফুরানের ব্যবহার ফলে মাটির উর্বরতাও কমছে। এ অবস্থায় প্রাণী ও প্রকৃতি-পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এই কীটনাশকটি ব্যবহার বন্ধ করার বিকল্প নেই। নিষিদ্ধ ঘোষিত কার্বোফুরান এখনো যেসব এলাকায় বিক্রি হচ্ছে সেসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান পরিচালনা করতে হবে। এর ব্যবহার বন্ধ না করা গেলে মানবদেহ ও প্রকৃতির ক্ষতি আরও বাড়বে।

লেখক: সমীরণ বিশ্বাস, কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, ঢাকা


আত্মমর্যাদাবোধ, বিশ্বাস এবং শক্তির সঞ্চয়

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

বিশ্বের মানচিত্রে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ একটি গর্বিত ভূখণ্ড। এই ভূখণ্ডে বসবাসকারী আমজনতার আজন্ম লালিত স্বপ্ন ও সাধ, আত্মমর্যাদা বিকাশের অধিকার লাভের উদ্দেশে নিয়োজিত সুদীর্ঘ সংগ্রামের চূড়ান্ত বিজয়ের লাভের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, অনন্য ঐক্য গঠনের মাধ্যমে আপনার অধিকার প্রতিষ্ঠা, নিজের পায়ে নিজে দাঁড়ানোর, স্বাধীন আশায় পথ চলার এবং আপন বুদ্ধিমতে চলার ক্ষমতা লাভ করে।

স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার। কিন্তু এই অধিকার কেউ কাউকে এমনিতে দেয় না, কিংবা ছেলের হাতের মোয়ার মতো নয় তা সহজপ্রাপ্যও, তাকে অর্জন করতে হয়, আদায় করে নিতে হয়। আবার অর্জন করার মতো সেই স্বাধীনতাকে রক্ষা করাও কঠিন। কেননা স্বাধীনতার শত্রুর অভাব নেই। স্বাধীনতা হীনতায় বাঁচতে চায় কে? আবার সুযোগ পেলে অন্যকে নিজের অধীনে রাখতে চায় না কে? বেশি দামে কেনা স্বাধীনতা কম দামে বিক্রির নজির যে নেই তা তো নয়। আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশের জনগণ শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে, পরাধীনতার নাগপাশ থেকে বেরিয়ে আসার সংগ্রামের মাধ্যমে ইতিহাসের বহু পটপরিবর্তনে চড়াইউৎরাই পেরিয়ে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জন করে তাদের আজন্ম লালিত স্বাধীনতার স্বপ্নসাধ। যে লক্ষ্য ও উদ্দেশে অশেষ আত্মত্যাগের বিনিময়ে বিজয় অর্জন তার প্রত্যাশিত পণ পূরণ এবং যথাযথ বাস্তবায়ন সম্ভব না হলে স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগের যৌক্তিকতা ভিন্ন অর্থেই পর্যবসিত হতে পারে।

ব্যবসা-বাণিজ্য এ দেশে আগমন ঘটে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ছত্রছায়ায় সাতসমুদ্র তেরো নদী পার থেকে আসা ইংরেজদের। তাদের আগে মগ ও পর্তুগিজরাও অবশ্য এসেছিল এ দেশে। প্রতিদ্বন্দ্বী বিবেচনায় এরা পরস্পরের শত্রুভাবাপন্ন হয়ে ওঠে। অত্যাচারী মগও পর্তুগিজদের দমনে ব্যর্থপ্রায় সমকালীন শাসকবর্গের সাহায্যে এগিয়ে আসে নৌযুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শী ইংরেজ বণিক। ক্রমে তারা অনুগ্রহ ভাজন হয়ে ওঠে সমকালীন বিলাসপ্রিয় উদাসীন শাসকবর্গের আর সেই উদাসীনতার সুযোগেই রাজপ্রাসাদ-অভ্যন্তরে কূটনৈতিক প্রবেশলাভ ঘটে ইংরেজদের। প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খাঁকে হাত করে তারা ক্ষমতাচ্যুত করে নবাব সিরাজুদ্দৌলাকে। পরবর্তীতে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে বাংলা বিহার উড়িষ্যার এবং ক্রমে ক্রমে ভারতবর্ষের প্রায় গোটা অঞ্চল। ঈসা খাঁ, মীর কাসিম খাঁন, টিপু সুলতান প্রমুখ সমকালীন স্বাধীনচেতা রাজন্যবর্গ স্থানীয়ভাবে তাদের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরকে চাঙ্গা করেও ব্যর্থ হন- বলাবাহুল্য বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরু সেখান থেকেই। বিদেশ বিভুঁই এ সাহায্য ও সহানুভূতি পাওয়ার জন্য সম্প্রদায়গত বিভাজন সৃষ্টি করতে আনুকূল্য প্রদর্শনার্থে ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তন করেন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। এই নীতির ফলে এ দেশীয় স্বাধীনতাকামী জনগণের মধ্যে পৃথক পৃথক অঞ্চলে জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগ্রত হয় এবং ব্রিটিশ শাসকের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ পলিসিতে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে বৃহৎ দুটি সম্প্রদায়। হিন্দু জমিদাররা ইংরেজদের আনুগত্য পেতে থাকে, পক্ষান্তরে রাজ্য হারিয়ে মন মরা মুসলমান সম্প্রদায় (যার অধিকাংশ পরিণত হয় রায়ত কৃষকে) দিন দিন বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যেতে থাকে। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহেও ইংরেজদের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ পলিসি বেশ কাজ করে, আরও দ্বিধাবিভক্তিতে আচ্ছন্ন হয় উভয় সম্প্রদায়। এরপর স্যার সৈয়দ আহমদ, নবাব আবদুল লতিফ, সৈয়দ আমির আলী, খানবাহাদুর আহ্সানউল্লা, নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী প্রমুখের শিক্ষা ও সমাজসংস্কারবাদী কর্মপ্রচেষ্টার ফলে মুসলমান সম্প্রদায় ধীরে ধীরে আধুনিক শিক্ষার আলোক পেয়ে ক্রমান্বয়ে চক্ষুষ্মান হতে থাকে। ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস এবং তার ২১ বছর পর ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মুসলিম লীগ’ নামের রাজনৈতিক সংগঠন। বৃহৎ ভারতবর্ষের ব্যাপারে না গিয়ে শুধু এই বাংলাদেশ বিষয়ে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার পিছনে যে প্রধান ঘটনা স্থপতি হিসেবে কাজ করেছে তা হলো- ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম এমন দ্বিধাবিভক্তির প্রেক্ষাপটে প্রতিদ্বন্দ্বী মনোভাব থেকেই ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে পূর্ববাংলার নেতা শের-ই-বাংলা ‘উপমহাদেশের মুসলমান প্রধান অঞ্চলগুলো নিয়ে ‘রাষ্ট্রসমূহ’ গঠনের প্রস্তাব করেন। মুসলমান প্রধান পূর্ববাংলাবাসীরা উক্ত প্রস্তাবমতে একটি পৃথক রাষ্ট্রে গঠনের দাবিদার। ১৯৩০ সালে চৌধুরী রহমত আলী ‘পাকিস্তান’ (P for Punjab, A for Afghanistan, K for Kashmir, I for Indus valley and stan for Baluchistan) শব্দটির উৎপত্তি ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা যখন প্রথম প্রকাশ করেন তখন তাতে বাংলা নামের কোনো শব্দ বা বর্ণ ছিল না, এমনকি ১৯৩৬ সালের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তানের দার্শনিক ভাবনির্মাতা স্যার মুহাম্মদ ইকবাল পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে কল্পনা ব্যক্ত করেন তাতে বাংলা অন্তর্ভুক্তির কোনো কথা ছিল না। এ সত্ত্বেও ১৯৪০ সালের লাহোর অধিবেশনে ‘রাষ্ট্রসমূহ গঠনের প্রস্তাবকে’ উপচিয়ে, বিশ্বাসঘাতকতায়, পূর্ব বঙ্গবাসীদের পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ভারতবর্ষের পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত সহস্রাধিক মাইল ব্যবধানে অবস্থিত পাকিস্তাননামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সঙ্গে একীভূত হয় এবং পাকিস্তানের একটি প্রদেশ হিসেবে ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। এটা যে পূর্ববঙ্গের প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতা প্রাপ্তি ছিল না বরং উপনিবেশবাদেও কাছে হস্তান্তর মাত্র তা পূর্ববঙ্গবাসীরা ক্রমে ক্রমে উপলব্ধি করতে পারেন। এটা বোঝা গিয়েছিল এই নব্য উপনিবেশবাদে নিজেদের আত্মমর্যাদা ও আত্মপরিচয় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে তাদের সচেতনতার পরিচয় দেয় ১৯৫৪-এর নির্বাচনে, ১৯৬২-এর ছাত্র আন্দোলনে, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে এবং ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে। এতদিনে পশ্চিম পাকিস্তানি সামন্তবাদী চক্রের আসল মুখোশ উন্মোচিত হয়। পূর্বপাকিস্তানকে একসময় তারা ব্যবহার করেছিল ইংরেজ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের স্বার্থে, সেই আন্দোলনের অন্যতম উদ্‌গাতা ছিল পূর্ব পাকিস্তানিরা। একইভাবে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানি বৈষম্যের বিরোধও তেমনি তাদের প্রথমে স্বাধীকার এবং পরে স্বাধীনতার আন্দোলনে উজ্জীবিত করে।

প্রখ্যাত লেখক হুমায়ূন কবীর তার ‘বাংলার কাব্যে’ লিখেছেন, ‘বাংলার পূর্বাঞ্চলের প্রকৃতি ভিন্নধর্মী। পূর্ব বাংলার নিসর্গ হৃদয় তাকে ভাবুক করেছে বটে; কিন্তু উদাসী করেনি। দিগন্তপ্রসারী প্রান্তরের অভাব সেখানে নেই কিন্তু সে প্রান্তরেও রয়েছে অহরহ বিস্ময়ের চঞ্চল লীলা। পদ্মা, যমুনা, মেঘনার অবিরাম স্রোতধারার নতুন জগতের সৃষ্টি ও পুরাতনের ধ্বংস।’ পূর্ববাংলায় নিসর্গ নন্দনকাননেই শুধু পরিণত করেনি তাদের (বাংলাদেশের জনগণকে) করেছে পরিশ্রমী, সাহসী-শান্ত-সূজন, আত্মবিশ্বাসী, ভাবুক, চিন্তাশীল, আবেগময় ও ঔৎসুক্যপ্রবণ। তাদের রয়েছে নিজস্ব নামে দেশ সৃষ্টির ইতিহাস, ঐতিহ্য, চলন বলন, শিল্প, সাহিত্য, স্থাপত্য ইত্যাদি। দৈহিক গড়ন গঠনে আবেগ অনুভূতিতে, রগে রক্তে তারা পৃথিবীর অন্যান্য জাতি ও সম্প্রদায় হতে আলাদা। ভৌগোলিক কারণেও তারা পৃথক ভিন্ন প্রকৃতির। জাতিগত ভাবাদর্শে, রাষ্ট্রীয় আনুগত্য প্রকাশে জাতীয়তাবোধে অন্যান্য রাষ্ট্র ও অঞ্চলে বসবাসকারী স্বধর্মী ও স্বভাসীদের থেকেও তারা স্বতন্ত্র প্রকৃতির। বাংলাদেশের জনগণ শান্তিপ্রিয়। তারা তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিজেরাই অর্জন করতে জানে এবং নিয়ন্ত্রণ করে। নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমারেখায় জনগণের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক সত্যের আত্মপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করে নিজেদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সচেতনতা জাতিসত্তার মৌলিক পরিচয়ে সমুন্নত করেছেন। স্বাধীনতা লাভে বাঙালির জাতীয়জীবনে যে নবদিগন্তের সূচনা হয় তাতে সীমাহীন শোষণ ও সুদীর্ঘকালের অবজ্ঞায় নিষ্পেষিত ঔপনিবেশিক জীবনযাত্রা থেকে মুক্তি পাওয়ার এবং নিজেদের নিয়মে চলার, নিজের পায়ে নিজের দাঁড়ানোর, বাঁচার এবং বিকশিত হওয়ার অধিকার তারা পেয়েছে। বাঙালির অর্থনৈতিক জীবনযাত্রায়, সাংস্কৃতিক সংকীর্তায়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। নতুন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শুরু করার ক্ষেত্রে আমরা নিজেরাই নিজেদের প্রশাসনের সুযোগ লাভ এবং নিজেরাই নিজেদের উন্নতি ও অবনতির নিয়ন্তা, হয়েছি সফলতা ও ব্যর্থতার দাবিদার।

স্বাধীন সার্বভৈৗম বাংলাদেশে দেশ-সমাজ-রাজনীতি ও অর্থনীতি কীভাবে নিজের পায়ে নিজেরা দাঁড়াব, দীর্ঘদিনের অবহেলা আর অবজ্ঞার ফলে ধ্বংসপ্রায় অর্থনৈতিক জীবনকে কীভাবে চাঙ্গা করে তোলা যাবে, কীভাবে সমাজজীবন থেকে বন্ধ্যানীতি কুসংস্কার আর অপয়া ভাবধারাকে অপসারিত করে জাতিসত্তার বিকাশ ঘটিয়ে জাগ্রত জাতি সভায় বাংলাদেশের অবস্থান ও গৌরবকে আরও ঐশ্বর্যমণ্ডিত করার সে চেতনা জাগৃতিতে জাতীয় ইতিহাস ও ঘটনা পরিক্রমা এই প্রতীতি জাগাতে পারে যে এ দেশ ও সমাজ গণতান্ত্রিকমনা, এখানে সকলে সকলের উন্নয়নের লক্ষ্যে একাগ্র, সকলে কর্তব্য পালনে নিরলস এবং অনন্য ঐক্যে বিশ্বাসী ও ধাতস্থ। সুতরাং আত্মত্যাগের সুমহান সঙ্কল্পে সকলের আত্মমর্যাদা বোধ যেন জাগ্রত থাকে এবং কোনো প্রকার বিভ্রান্তিতে জড়িয়ে, দায়িত্বহীনতায়, অলসতায়, একে অন্যের দোষারোপের অবয়বে নিজেদের আত্মমর্যাদা ও আত্মশক্তির অপচয় অপব্যবহারের অবকাশ সৃষ্টি না হওয়াই বাঞ্ছনীয়।

লেখক: রাজস্ব ও উন্নয়ন অর্থনীতির বিশ্লেষক


banner close