রোববার, ৩ মার্চ ২০২৪

জাতিসংঘের মানবাধিকার কূটনীতিতে দেশের সাফল্য

আপডেটেড
২৪ অক্টোবর, ২০২২ ১০:১৩
দেলোয়ার হোসেন
প্রকাশিত
দেলোয়ার হোসেন
প্রকাশিত : ২২ অক্টোবর, ২০২২ ০৯:১৩

জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই মানবাধিকার কূটনীতির সঙ্গে বিশ্ব সংস্থাটি যুক্ত। মানবাধিকারসংক্রান্ত বিভিন্ন চুক্তি, ঘোষণা, কনভেনশন, জাতিসংঘের ভেতর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে দর-কষাকষি ও আলোচনার মাধ্যমে অনুমোদিত হয়েছে। ফলে মানবাধিকার কূটনীতির সঙ্গে জাতিসংঘের সম্পর্ক অনেক পুরোনো। তবে ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কাউন্সিলের মাধ্যমে মানবাধিকার কূটনীতিতে এই সংস্থাটি ব্যাপকভাবে ভূমিকা রেখে আসছে। মানবাধিকার রক্ষার ব্যাপারে যে কাঠামোগত প্রয়াসের সূচনা জাতিসংঘের হাত ধরে হয়, তারই বহিঃপ্রকাশ জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কাউন্সিল (United Nations Human Rights Council).

এই কাউন্সিলের যাত্রার শুরু থেকেই বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বেশ প্রশংসার সঙ্গে আলোচিত হয়ে আসছে। একেবারে শুরু থেকেই বাংলাদেশ এই কাউন্সিলের সদস্যপদে নির্বাচিত হওয়ার সম্মান অর্জন করে। মানবাধিকারবিষয়ক বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও মানবাধিকারকেন্দ্রিক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুরু থেকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে এই অঙ্গ সংস্থাটি। বৈশ্বিক পর্যায়ে মানবাধিকার-সম্পর্কিত বিষয়াদি তুলে ধরা ও বিভিন্ন রাষ্ট্রের মাঝে সহযোগিতা রক্ষা করাই হচ্ছে এই কাউন্সিলের মূল কর্মকাণ্ড।

১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা গৃহীত হয়। সূচনালগ্ন থেকেই এ ঘোষণা বিভিন্ন বিতর্ক ও বিরোধিতার মধ্য দিয়ে যায়। এ ছাড়া মানবাধিকার নিয়ে কাজ করার জন্য জাতিসংঘের বিশেষ কোনো সংস্থা তখন পর্যন্ত কার্যক্রম শুরু করেনি। ছিল উচ্চতর প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখার অভাব। স্নায়ুযুদ্ধের সময় বিশ্ব মূলত নিরাপত্তা ও শান্তির বিষয়গুলোকে বেশি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করত। অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও নিরস্ত্রীকরণ বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের মাঝে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এক বিশেষ চ্যালেঞ্জ ছিল। এই চ্যালেঞ্জের মূলে ছিল দুই পরাশক্তির মাঝের দ্বন্দ্ব, যা স্নায়ুযুদ্ধ হিসেবে প্রসিদ্ধ। একদিকে পশ্চিমা বিশ্ব তাদের পুঁজিবাদীব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে আধিপত্য বিস্তার করে। অন্য দিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন সমাজতন্ত্রকে সামনে রেখে তাদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করেছে। তাই জাতিসংঘের মানবাধিকার কূটনীতির জায়গাটি সেই অর্থে শক্তিশালী ছিল না। কেননা, পরাশক্তিগুলোর অগ্রাধিকারের মাঝে এই মানবাধিকার রক্ষার মতো বিষয়গুলো স্থান পায়নি। তার পরও যতটুকু স্থান পেয়েছে তা ব্যবহৃত হয়েছে কূটনৈতিক অস্ত্র হিসেবে। পশ্চিমের দেশগুলোকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাষ্ট্রের ওপর মানবাধিকার রক্ষার ব্যাপারে চাপ প্রয়োগ করলেও স্বার্থের খাতিরে অনেক অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী সরকারের সঙ্গেও সম্পর্ক স্থাপন করতে দেখা গেছে।

তবে ২০০৬ সালে এই কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। এই প্ল্যাটফর্ম আন্তরাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সহযোগিতার মাধ্যমে মানবাধিকারের মূল বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। কার্যপ্রণালি কার্যকররূপে পরিচালনার জন্য ৪৭ দেশের এক শক্তিশালী নির্বাচিত কাউন্সিল কাজ করে আসছে। এসব দেশ পৃথিবীর পাঁচটি ভিন্ন অঞ্চল থেকে নির্বাচিত হয়ে তারপর এই কাউন্সিলের সদস্য হয়। আফ্রিকা থেকে ১৩টি, এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে ১৩টি, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চল থেকে ৮টি, পশ্চিম ইউরোপ থেকে ৭টি এবং পূর্ব ইউরোপ থেকে ৬টি করে দেশ নির্বাচিত হয়। এই কাউন্সিল ৩ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়। পরপর দুই মেয়াদে কোনো দেশ দায়িত্ব পালন করলে তৃতীয় মেয়াদের জন্য তা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে না। এসব কিছুর ধারাবাহিকতা রক্ষায় এ বছরও অনুষ্ঠিত হয়েছে নির্বাচন আর তাতে বাংলাদেশ নির্বাচিত হয়েছে বিপুল ভোট প্রাপ্তির মাধ্যমে। বাংলাদেশ এশিয়া প্রশান্ত অঞ্চলের সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া দেশ। বাংলাদেশের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ১৬০। জাতিসংঘের সদস্য সংখ্যা আমলে নিলে এই ভোট বেশ বড় প্রাপ্তির ইঙ্গিত দেয়, যেখানে ৩টি রাষ্ট্র ভোট দানে বিরত ছিল। বাংলাদেশ ছাড়াও রয়েছে ১৪৫ ভোট নিয়ে ভিয়েতনাম, ১৫৪ ভোট নিয়ে মালদ্বীপ আর ১২৬ ভোট নিয়ে কিরগিজস্তান। তবে ভেবে দেখার মতো বিষয় হচ্ছে, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র ১২৩ ভোট পেয়েছে। আফগানিস্তান ১২টি, বাহরাইন ও মঙ্গোলিয়া একটি করে ভোট পেয়েছে। নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ও অনুপাতের ভিত্তিতে বলা যায় যে, এই জয় এক বিশেষ অর্জন। উল্লেখ্য, অতীতেও বাংলাদেশ বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছিল। এই জয়ে বাংলাদেশকে সাহায্য করবে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে আর বিভিন্ন রাষ্ট্রের সুচিন্তিত ভোটের মাধ্যমে অর্জিত এই জয় বাংলাদেশের সেই পথকে আরও মসৃণ করবে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সদস্যদের মাধ্যমে এই ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার দরুন বিশেষ ইস্যুতে বাংলাদেশের বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতাও সবার সামনে চলে এসেছে।

এ জয়ের পেছনে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার পরিস্থিতি ও বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার নিয়ে কাজ করায় বাংলাদেশের সক্রিয় অবস্থান বেশ কার্যকরী ভূমিকা রেখেছে। দেশের অভ্যন্তরে মানবাধিকার বিষয়টিকে বাংলাদেশ গুরুত্ব দিয়ে আসছে। বাংলাদেশ সব সময়ই মানবাধিকারকে অগ্রাধিকার দিয়ে এর বিভিন্ন দিক জনগণের সামনে তুলে ধরে আসছে। পাশাপাশি দেশের বাইরেও যৌথ বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রয়াসে বাংলাদেশের অবস্থান সবার প্রশংসা কুড়িয়ে আসছে বেশ আগে থেকেই। এই জয়ে শুধু এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেই নয়, সমগ্র বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাংলাদেশের ওপর যে বিভিন্ন দেশ আস্থা রেখেছে মানবাধিকারের মতো নাজুক বিষয়ে, তার প্রমাণ বহন করে। এ ছাড়া এই জয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার জাতীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মানবাধিকারের প্রতি যত্নশীলতার স্বীকৃতি পেয়েছে বিশ্ব মঞ্চে। এই মেয়াদে বাংলাদেশ টানা দ্বিতীয়বারের মতো জয়লাভ করায় ৬ বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে এ কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে থাকার সুযোগ পেল।

মানবাধিকার বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে সার্বজনীন মনে হলেও এ ইস্যুতে বিতর্কের শেষ নেই। তাই মানবাধিকার কূটনীতি বিশ্ব রাজনীতিতে এখন এক মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। মানবাধিকারের সংজ্ঞা, এর বিভিন্ন দিক নিয়ে এখনো নানা মত প্রচলিত রয়েছে বিভিন্ন দেশ, সংস্কৃতি ও ব্যক্তির মাঝে। তাই এ বিষয়টিকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে বিভিন্ন দেশের নিজস্ব বাস্তবতা, ইতিহাস ও সমাজব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। এই বিভিন্নতার কারণেই জাতিসংঘের সদস্য সংখ্যা ১৯৩টি। যদি পারস্পরিক ভিন্নতা নাই থাকত তবে পৃথিবীর মানুষ একটি মাত্র রাষ্ট্রের নাগরিক হতো। আর এই কারণেই যেকোনো ইস্যুতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মাঝে ব্যাপক মতপার্থক্য দেখা যায়। এখানে জাতিসংঘের কাজ হচ্ছে নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ইস্যুতে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় করা। এদের মাঝে সহযোগিতা ও আলোচনার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। আর একেই জাতিসংঘভিত্তিক কূটনীতি বলা হয়ে থাকে।

এই কূটনীতির বিষয় হিসেবে আমরা পাই, জলবায়ু পরিবর্তন, মানবাধিকার বা বিভিন্ন অর্থনৈতিক সমস্যা বা বাণিজ্যবিষয়ক আলোচনা। এর বাইরেও বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা যেমন মানব পাচার ইত্যাদি নিয়েও বিস্তর আলোচনা হয় জাতিসংঘে। এরই অংশ হিসেবে মানবাধিকারের বিষয়গুলো নিয়ে বিভিন্ন দেশের ভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় করতে তাদের মাঝে আলোচনার মাধ্যম তৈরি এবং তাদের কর্মক্ষেত্র ও এর পরিধি বৃদ্ধির জন্য করণীয় সম্পর্কিত বিভিন্ন ইস্যুর সঙ্গে মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতিতে জাতিসংঘের করণীয় বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা হয় এখানে। তাই জাতিসংঘের মানবাধিকার কূটনীতি বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এখানে বাংলাদেশের ভূমিকা অত্যন্ত স্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য। এই গ্রহণযোগ্যতার পরিচায়ক বাংলাদেশের প্রাপ্ত ১৬০ ভোট। এটি ওই রাষ্ট্রগুলোর বাংলাদেশের প্রতি এক ইতিবাচক মনোভাবের প্রকাশ।

তবে পশ্চিমা শক্তিগুলো প্রায়ই এই মানবাধিকারের ইস্যুগুলোকে তাদের স্বার্থের খাতিরে ব্যবহার করে থাকে। দেখা যায় যে, তারা বিভিন্ন দেশকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য অভিযুক্ত করে এমনকি বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে তারা হস্তক্ষেপও করে থাকে। এই মনোভাব জাতিসংঘের মানবাধিকার কূটনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কেননা, জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল করা হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে মানবাধিকারের বিষয়গুলোতে সহযোগিতা করা, ব্যবস্থা নেয়া বা কোনো চুক্তি সম্পাদন বা পদক্ষেপ এবং সুপারিশ গ্রহণ করার ব্যাপারে এখতিয়ারভুক্ত করে তা বাস্তবায়ন করার ব্যাপারে সহায়তা করা। বিভিন্ন রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের সময় এ বিষয়টিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। এই আচরণ একদিকে মানবাধিকার বিষয়ে জাতিসংঘের ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, সেই সঙ্গে নিজেদের অবস্থানকেও বিশ্বের সামনে প্রশ্নবিদ্ধ করে। জাতিসংঘের বাইরেও মানবাধিকার নিয়ে এ ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতা উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোকে উদ্বেগের ভেতর ঠেলে দেয়। মানবাধিকার লঙ্ঘনের সীমা নির্ধারণ বেশ কঠিন। কেননা, এর ব্যাপকতার কথা আমলে নিলে দেখা যাবে বিশ্বের প্রায় সব স্থানেই কোনো না কোনো সময়ে, কোনো না কোনো পদ্ধতিতে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে এবং হচ্ছে। তাই বিশেষ কিছু রাষ্ট্রের মানবাধিকার নিয়ে বক্তব্য রাখা মানবাধিকার কাউন্সিলের মূল কাজের সম্পূর্ণ বিপরীত। বরং জাতিসংঘের মানবাধিকারভিত্তিক সংস্থাটিকে আরও কার্যকরী করা, শক্তিশালী করা এবং সেই সংস্থার মানবাধিকার পরিস্থিতি সঠিকভাবে অনুধাবন করার ক্ষেত্রে সক্ষমতা অর্জনের ব্যাপারে বিশ্বশক্তিগুলোর আরও সচেষ্ট হওয়া উচিত। ৪৭ সদস্যবিশিষ্ট সংস্থাটি মানবাধিকার নিয়ে প্রশংসনীয় সব পদক্ষেপ নিয়ে যাচ্ছে। তবে আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য, জাতিসংঘের ১২৩টি দেশ কোনো না কোনোভবে এই কাউন্সিলের সদস্যপদ পেয়েছে। বাকি দেশগুলোর এখনো সদস্যপদ লাভের সুযোগ হয়নি। এখান থেকেই বাংলাদেশের মানবাধিকার কূটনীতির গুরুত্ব ও সক্ষমতা আরেকবার অনুধাবন করা যায়। মানবাধিকারকে আরও শক্তিশালী করার ব্যাপারে সবার সচেষ্ট হওয়া উচিত। জাতিসংঘের যে ভূমিকা সেখানে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি বেশ শক্তিশালী হবে। এ ছাড়া বিপুল ভোটে জয় পাওয়া বাংলাদেশকে অনুপ্রাণিত করবে নতুন উদ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে এই কাউন্সিলে মানবাধিকার রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে।

লেখক: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


টেকসই অর্থনীতি বিনির্মাণে প্রবাসী আয়ের গুরুত্ব

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
অধ্যাপক ড. স্বপন চন্দ্র মজুমদার, মোঃ হাসানুর রহমান (হাসান)

বাংলাদেশ উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম এবং নেক্সট ইলেভেন (N-11) অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ রোল মডেলের ভূমিকা পালন করে আসছে। একইসাথে দক্ষিন এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে যে কয়েকটি দেশ অর্থ-সামাজিক উন্নয়নের অনবদ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে তার মধে বাংলাদেশ অন্যতম। অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকগুলোতে প্রতিবেশী দেশগুলোকে পেছনে ফেলে সামনের সারিতে বাংলাদেশ। বর্তমান বিশ্বের অনেক স্বল্পোন্নত দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আদর্শ হিসেবে দেখা হচ্ছে বাংলাদেশকে। বাংলাদেশ বিগত এক দশকের বেশি সময় ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ছয় শতাংশের ওপরে রাখতে সক্ষম হয়েছে যদিও করনা মহামারির সময়ে এ ধারা কিছুটা কমে যায় এবং করনা পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার তার পূর্বের ধারাই ফিরতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতির আকার, ও বিভিন্ন খাতে যেমন কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য যা কিনা টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতে সহায়ক হবে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে যে কয়েকটি নিয়ামক সবথেকে বেশি ভূমিকা রেখেছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বৈদেশিক রেমিটেন্স। বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বৈদেশিক রেমিট্যান্স কাজ করছে এবং আয়ের বাহ্যিক উৎস হিসাবে বিদেশ থেকে পাঠানো রেমিট্যান্স জিডিপি এবং অর্থপ্রদানের ভারসাম্যে যথেষ্ট অবদান রাখছে। বৈদেশিক মুদ্রার এই প্রবাহ শুধুমাত্র দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে স্থিতিশীল করে না বরং জ্বালানি খরচ এবং বিনিয়োগকেও উৎসাহিত করে, যার ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়। সাম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংক এর প্রতিবেদন অনুযায়ী দক্ষিন এশিয়ার মধ্যে রেমিটেন্স আহরণের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, এশিয়া মহাদেশে রেমিটেন্স আহরণে প্রথমে আছে ভারত, এরপর পাকিস্তান, তৃতীয় বাংলাদেশ, চতুর্থ নেপাল এবং পঞ্চম অবস্থানে আছে শ্রীলঙ্কা।

বাংলাদেশের জন্য বৈদেশিক রেমিট্যান্স এত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার একটি প্রাথমিক কারণ হল দারিদ্র্য বিমোচনে এর প্রভাব। এর জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নিম্ন আয়ের কাজকর্মের উপর নির্ভর করে, বিশেষ করে কৃষি খাতে বা ডে-লেবার, রেমিট্যান্স অনেক পরিবারের জন্য একটি জীবনরেখা হিসাবে কাজ করে, তাদের দারিদ্র্য থেকে বের করে আনে এবং তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করে। এই বৈদেশিক রেমিট্যান্স স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং আবাসনের মতো প্রয়োজনীয় চাহিদাগুলির মেটাতে সহায়ক, যার ফলে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় এবং বিনিয়োগের মধ্যে ব্যবধান পূরণে বৈদেশিক রেমিটেন্স একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে, যেখানে অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের হার প্রায়ই অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিল্প সম্প্রসারণের জন্য বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা পূরণের জন্য অপর্যাপ্ত, রেমিট্যান্স প্রবাহ বিনিয়োগের মূলধনের একটি নির্ভরযোগ্য উৎস প্রদান করে। এর ফলে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে সুবিধা হয়, উদ্যোক্তাকে উৎসাহিত করে এবং অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়। বিদেশী রেমিট্যান্স আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলের ব্যবহারকে প্রচার করে এবং রেমিট্যান্স প্রাপকদের মধ্যে সঞ্চয় ও বিনিয়োগ আচরণকে উত্সাহিত করে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে অবদান রাখে। এটি কেবল আর্থিক মধ্যস্থতার দক্ষতা বাড়ায় না বরং সামগ্রিক আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করে, যার ফলে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গত অক্টোবর-২০২৩ এর পর থেকে দেশের রেমিটেন্স প্রবাহ পরবর্তী মাসগুলোতে একটানা বেড়েছে। প্রবাসীরা গত অক্টোবর-২০২৩ প্রায় ২১৭ দশমিক ৮২ বিলিয়ন টাকা রেমিট্যান্স পাঠিয়েছে, যা গত মাসের থেকে ৭১ দশমিক ০৮ বিলিয়ন টাকা বেশি। এর পরবর্তী মাসে (নভেম্বর) রেমিট্যান্স প্রবাহ সামান্য কিছুটা কমে হয় ২১৪ বিলিয়ন টাকা এবং গত ডিসেম্বর মাসে রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়ে দাড়াই ২১৯ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন টাকা। নতুন বছরে (২০২৪) প্রথম মাসে রেমিটেন্স প্রবাহ আরও বৃদ্ধি পেয়ে হয় ২৩১ দশমিক ১০ বিলিয়ন টাকা যা গত ডিসেম্বর মাসের থেকে ১১ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন টাকা বেশি। বিশ্বব্যাংকের ব্যাংকের ২০২৩ এর রেমিটেন্স সংক্রান্ত তথ্য বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার রেমিটেন্স আহরণে শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে সবার উপরে রয়েছে ভারত। ২০২২ সালে ভারতের প্রবাসী আয় ১১১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। যা বিশ্বের মোট রেমিটেন্সের ১৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে রেমিটেন্সের অবদান ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। ভারতের জিডিপিতে রেমিটেন্সের অবদান দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ৬ নম্বরে। দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবাসী আয়ে পাকিস্তানের জিডিপিতে রেমিটেন্সের অবদান ৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এদিকে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে রেমিটেন্সের অবদান ৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ যা জিডিপিতে রেমিটেন্সের অবদান দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ৪ নম্বরে। এদিক থেকে জিডিপিতে রেমিটেন্সের অবদান ভারতের থেকে বাংলাদেশের ১ দশমিক ৩৭ শতাংশ বেশি যা আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাকে ইঙ্গিত করছে এবং সামনের দিনগুলোতে রেমিটেন্সের প্রবাহকে বৃদ্ধি করতে সহায়ক হবে।

বৈদেশিক রেমিট্যান্স দারিদ্র্য বিমোচনে অবদান রেখে, সঞ্চয়-বিনিয়োগের ব্যবধান পূরণ, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বৈদেশিক রেমিট্যান্স খাতে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে বর্তমান সরকার বদ্ধ পরিকর। এ লক্ষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা কাজ করে যাচ্ছেন এবং প্রবাসি আয় বৃদ্ধিতে তাঁর সরকারের নানামুখি পদক্ষেপ রেমিটেন্স যোদ্ধাদেরকে আরও বেশি রেমিটেন্স পাঠাতে উদ্ভুদ্ধ করছে। কার্যকরভাবে রেমিট্যান্স প্রবাহের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর মাধ্যমে, বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও টেকসই অর্থনীতি নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে।

লেখকদ্বয়: অধ্যাপক,অর্থনীতি বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ,শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ইউনিভার্সিটি
জামালপুর সদর।


শহীদ মিনারের ইতিহাস

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
 সৈয়দ শাকিল আহাদ 

দেশ ভাগের পর ১৯৪৭ সালের ৫ ডিসেম্বর ঢাকায় বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সর্বশেষ বৈঠকে মাওলানা আকরাম খানসহ সব নেতা সিদ্ধান্ত নেন উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা হবে না। সে থেকে শুরু বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ক্রমান্বয়ে চলতে থাকে আন্দোলন। ১১ মার্চ ১৯৪৮ সালে বাংলা ভাষা আন্দোলনের জন্য আমাদের জাতীয় ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরনীয় দিন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে এ দিনে পূর্বপাকিস্তানের সর্বত্র সফল হরতাল বিক্ষোভ, ধর্মঘট ও পিকেটিং হয়। সচিবালয়ের সামনে আন্দোলনরত অবস্থায় পিকেটিং করার অপরাধে পুলিশের নির্মম লাঠিচার্জে আঘাতপ্রাপ্ত হন অনেক নেতা-কর্মী, সেদিন গ্রেপ্তার হন বাংলার রাষ্ট্রনায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, কাজি গোলাম মাহবুব, শামসুল হক, অলি আহাদ, শওকত আলী, রনেশ দাশগুপ্তসহ অনেক নেতা-কর্মী। প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত দুটি ভূখণ্ডের দুটি ভিন্ন ভাষার জাতিসত্তাকে মিলিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম থেকেই মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করে সূচনা হয়েছিল আন্দোলনের। আর এই ভাষা আন্দোলনকেই বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির পথে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে মনে করা হয়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ভাষার জন্য আন্দোলনরত ছাত্র-ছাত্রীদের যে স্থানে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন রফিকউদ্দিন, সেখানেই ২৩ ফেব্রুয়ারি এক রাতের মধ্যে গড়ে ওঠে বাংলাদেশের প্রথম শহীদ মিনার। প্রথম শহীদ মিনারটি ছিল ১০ ফুট উঁচু আর ছয় ফুট চওড়া।
সাঈদ হায়দার লিখেছেন, ‘ছাত্র ইউনিয়নের জেনারেল সেক্রেটারি জিএস শরফুদ্দিনের ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপ্লোমা ছিল, তার সার্বিক তত্ত্বাবধানেই নির্মাণকাজ আরম্ভ হয়। ওই দিনেই নির্মাণের স্থানটা নির্বাচিত হয়েছিল ১২ নম্বর শেডের ছাত্র হোস্টেলের বা ব্যারাকের পাশে, ছাত্রাবাসের নিজস্ব রাস্তার পাশে, যেখানে গুলিতে নিহত হয় প্রথম ভাষা শহীদ।’ মাত্র একজন পারদর্শী রাজমিস্ত্রির কুশলী হাতে নকশা মোতাবেক কাজ শুরু হলো, মিস্ত্রির একজন হেলপার ছিল বটে।
কিন্তু ছাত্রকর্মীরাই তো সেদিন সবচেয়ে সক্রিয় জোগালে বা যোগালী ছিল।

মাত্র কয়েক মিনিটেই আল হাসিম ও মনজুরের সবল হাতে কোদালের কোপে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পাঁচ ফুট গভীর মাটি কাটা শেষ হলো।
অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম বিবিসিকে বলেছেন, ‘পিয়ারু সরদার সেখানে কন্ট্রাক্টর ছিলেন, তার একটা গুদাম ছিল। সেখান থেকেই মালামাল নিয়ে ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে রাতারাতি শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়।’ সাঈদ হায়দার বিস্তারিত লিখেছেন, ‘কলেজ ভবন সম্প্রসারণের জন্য সেখানে স্তূপাকারে রক্ষিত ইট ছাত্ররাই লাইনে দাঁড়িয়ে হাতে হাতে নিয়ে এলো, বালু আর বস্তাভরা সিমেন্ট এলো ছাত্রকর্মী আসগরের তৎপরতায় কন্ট্রাক্টর পিয়ারু সরদারের স্বতঃস্ফূর্ত বদান্যতায়। হোস্টেল প্রাঙ্গণে নানা স্থানে অবস্থিত ট্যাপ থেকে বালতিতে করে পানি বয়ে এনেছে ছাত্ররাই। তারাই ইট ভিজিয়েছে, বালু-সিমেন্টের মর্টার বানিয়েছে, নির্মাণসামগ্রী মিস্ত্রির হাতের নাগালে পৌঁছে দিয়েছে ছাত্রদের পাশাপাশি ছাত্রীদের ভূমিকাও ছিল উল্লেখ করার মতো, ব্যারাকবাসী সব বিদ্যার্থীই নির্মাণকাজে হাত লাগিয়েছে।’ লিখেছেন তিনি। ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে এ দিনটিকে শহীদ দিবস হিসেবে পালন করা হতো। আর এই কারণেই শহীদ মিনার এর গুরুত্বটা অনেক।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন নিশ্চিত হওয়ার পর উর্দু-বাংলা বিতর্ক আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
সেই সময়কার গুরুত্বপূর্ণ ‘মিল্লাত’ পত্রিকায় এক সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিল, ‘মাতৃভাষার পরিবর্তে অন্য কোনো ভাষাকে রাষ্ট্রভাষারূপে বরণ করার চাইতে বড় দাসত্ব আর কিছু থাকিতে পারে না।’ দীর্ঘ ৯ বছরে সারা দেশে ছাত্র-ছাত্রীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার জনগণের অক্লান্ত সংগ্রামের পর ১৯৫৬ সালে আমরা পেয়েছি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি।

বর্তমানে ফেব্রুয়ারি এলেই আমরা সবাই বাংলা ভাষার আন্দোলনের কথা বেশি বেশি বলি, শহীদ মিনারকে সম্মান করি, ২১ ফেব্রুয়ারিতে খালি পায়ে দল বেধে এই শহীদ মিনারের পাদদেশে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জানাই , ফেব্রুয়ারির পর সারা বছর আর এই শহীদ মিনারের প্রতি যত্নশীল হই না । আমাদের উচিত আরও বেশি বেশি সচেতন হওয়া , নতুন প্রজন্মের কাছে শহীদ মিনারের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করা, আনাচে-কানাচে স্কুল কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিষ্ঠিত শহীদ মিনারগুলোকে যথার্থ পরিচর্যা, তদারকি ও সুষ্ঠু সংরক্ষণ করার দায়িত্ব প্রশাসনের ওপর ন্যাস্ত করা।


মেরিন ড্রাইভের পর্যটন সম্ভাবনা

আপডেটেড ২ মার্চ, ২০২৪ ১৪:২২
ড. মো. হুমায়ুন কবীর

পর্যটন মানে পরিব্রাজন, ভ্রমণ। পর্যটন মানে বেড়ানো। বেড়ানোর মাধ্যমেও অনেক সময় অনেক কিছু সৃষ্টি করা সম্ভব হয়েছে। এ পর্যটন করতে গিয়েই কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করেছিলেন। এ সম্পর্কে অনেক ভেদবাক্য জনশ্রুতি হিসেবে রয়েছে। ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে দুই পা ফেলিয়া, একটি ধানের শীষের ওপর একটি শিশির বিন্দু’ তেমনি একটি জনশ্রুতি। এসব কথার একটি অন্তর্নিহিত তাৎপর্য রয়েছে। সেটি হলো আমরা সাধারণত বেড়ানো বলতে শুধু বিদেশবিভুঁইকে বুঝে থাকি। কিন্তু আমাদের দেশের অভ্যন্তরে যে কত-শত সুন্দর সুন্দর উপভোগ্য স্থান রয়েছে সেটা মানতে পারি না। এ প্রসঙ্গে এখানে আমি একটি বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরার চেষ্টা করব।

কিছুদিন আগে আমি আমার নিজের কর্মস্থল জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের একটি পর্যটক দল নিয়ে বাংলাদেশের পর্যটন নগরীখ্যাত কক্সবাজারে পরিভ্রমণ করি। সেখানে ভ্রমণের এক পর্যায়ে বিভিন্ন জনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করার সময় একজনকে বলতে শুনেছি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা। সেখানে রিকশায় চড়ার সময় মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল। তখন সেই রিকশাওয়ালা বলে উঠল, ‘এত দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ যে কেন এখানে ছুটে আসে বুঝি না। কী আছে এ বালি ও নোনা পানির ভেতর! কই আমরা তো জন্মের পর থেকে এখানেই আছি, তা তো কিছুই আমরা পাই না।’ আবার যদি আরেকটি কথা চিন্তা করি তাহলে তা কেমন হবে! প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ পর্যটন নগরী কক্সবাজারে যায়। তারা দু-চার দিনের জন্য সেখানে গিয়ে মানসিক উত্তেজনার মধ্যে কাটায়। কিন্তু যারা সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা কিংবা যারা চাকরির পোস্টিং নিয়ে সেখানে যায় তারা হয়তো পর্যটকদের মতো উত্তেজনা অনুভব করবে না সেটাই স্বাভাবিক।

যাহোক, পর্যটন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা মনের খোরাক জোগার করে এবং ভ্রমণের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করে থাকে। আমাদের দেশে যে অনেক পর্যটন সম্ভাবনা রয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বৃহত্তর সিলেটের চা-বাগন, সিলেট ও কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওর এলাকা, সারা দেশের বিভিন্ন পুরাকীর্তি, ঐতিহাসিক স্থানসমূহ, বিশ্ব ঐহিত্য হিসেবে সুন্দরবন, সমুদ্রকন্যা কুয়াকাটা, সিলেটের লাউয়াছড়া প্রাকৃতিক বনাঞ্চল, রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট, পাহাড়, নদী, খাল-বিল ইত্যাদি কত না কী। চট্টগ্রামে রয়েছে পতেঙ্গা সি বিচ। সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত। এটির দৈর্ঘ্য হলো প্রায় ৯৬ মাইল বা ১২০ কিলোমিটার।

বছর কয়েক আগে এর সৌন্দর্য সঠিকভাবে উপভোগ করার সুযোগ সৃষ্টির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কক্সবাজার জেলা সদর থেকে ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি দৃষ্টিনন্দন দুই লেনের আধুনিক সড়ক উদ্বোধন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী মেরিন ড্রাইভ উদ্বোধন করছেন দেশবাসীর সঙ্গে আমিও খবরটি মিডিয়ার কল্যাণে তখনই জানতে পেরেছিলাম। এটি দেশের উন্নয়ন পরিক্রমায় আরেকটি সংযোজন হিসেবে উল্লেখ করে তখন আমার একটি কলামে লিখেওছিলাম। কিন্তু তখন এটি সম্পর্কে সত্যিকার অর্থে আমার পুরোপুরি কোনো ধারণা ছিল না। আমি মনে করেছিলোম, হয়তো সমুদ্রে কোনো স্টিমার বা জাহাজ দিয়ে ড্রাইভ হবে। আমার মনে হয় দেশের অনেকেরই হয়তো একই রকম অনুমান কিংবা ধারণা হতে পারে।

সেজন্য সেবার যখন আমি আমার পরিবারসহ সহকর্মীদের নিয়ে মেরিন ড্রাইভে যাব বলে ঠিক করেছি কক্সবাজার, তখনো আমার একই ধারণা বিরাজমান ছিল। যখন সেখানকার বিশেষ ধরনের চান্দের গাড়িখ্যাত খোলা জিপে করে সারা দিনের জন্য ৮০ কিলোমিটার রাস্তা আসা-যাওয়ার জন্য উঠি, তখন আমার ভুল ধারণা ভাঙে। সে এক অসাধারণ অনুভূতি। আমরা সবাই মিলে প্রায় ৩৬ জনের মতো ছিলাম। তিনটি চান্দের গাড়ি ভাড়া করে বেরিয়ে পড়ি বহু প্রত্যাশিত ও প্রতীক্ষিত মেরিন ড্রাইভে। আমাদের আগ্রহের কাছে দিনভর মুষলধারে বৃষ্টি কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। সেখানে গেলে কী যে এক অনুভূতির সৃষ্টি হয় তা বলে বোঝানো কঠিন। গর্বে বুকটা ফুলে উঠে এই ভেবে যে আমাদের বাংলাদেশে এমন একটি পর্যটন সম্পদ রয়েছে। পুরো ৮০ কিলোমিটার রাস্তা ধরেই চোখের দৃষ্টি অন্যত্র ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই।

কক্সবাজার থেকে টেকনাফ সীমান্ত হয়ে সাবরাং জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত বিস্তৃত এ মেরিন ড্রাইভের রাস্তাটি। কক্সবাজার থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই উষ্ণ উত্তেজনা। উত্তেজনার প্রধান কারণ ও আকর্ষণ ছিল যাওয়ার পথে রাস্তার বাম পাশে পাহাড় আর ডান পাশে সাগর। সাগরের ছোট ছোট ঢেউ মনের গহিনে তীব্র সমুদ্রের বিশালত্বের আনন্দের অনুভূতি এনে দিচ্ছিল বারবার। অপরদিকে পাহারগুলো মনে হলো পর্যটকদের দিকে মাথা হেলিয়ে কুর্নিশের ভঙ্গিতে তাকিয়ে রয়েছে। নতুন নির্মিত রাস্তাটিতে এমনভাবে যেন গাড়ি চলছে যেখানে পিন পতনের শব্দ ও ঝাঁকুনিটি পর্যন্ত নেই। মনে হলো পর্যটনকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য এমন একটি উদ্যোগেরই প্রয়োজন ছিল এত দিন।

আমরা একটি চান্দের গাড়িতে সপরিবারে ১২ জন উঠেছিলাম। গাড়িতে যাওয়ার সময় আমরা উত্তেজনায় একেকজন একেক কথা বলছিলাম। ডান পাশে সাগরের অংশে মাঝেমধ্যেই ঝাউ গাছের সারি। জানা গেছে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপর বঙ্গবন্ধুই নাকি সাগরের কুল রক্ষার জন্য সারি সারি ঝাউবন সৃজন করেছিলেন। ঝাউবন দুটি কাজ করে থাকে। একটি হলো সামুদ্রিক ঝড়ের বাতাস থেকে কিছুটা হলেও উপকূলবাসীকে রক্ষা করে থাকে, অপরদিকে ঢেউয়ের তোড়ে যাতে পাড় ভাঙতে না পারে সেটিার নিরাপত্তা বেষ্টনি হিসেবে কাজ করে থাকে। অনেককে বলতে শুনেছি, সাগর- পাহাড় ইত্যাদি স্থানে নাকি শুষ্ক বা শীতকালে বেড়াতে হয়। কিন্তু বর্ষাকালে যে অন্যরকম অভিজ্ঞতা সেটা সে সময় সেখানে গিয়েই বুঝতে হবে। যদি মানুষের কথা শুনে ভয়ে এ সময়ে সেখানে বেড়াতে না যেতাম তাহলে আরেকটি অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত থেকে যেতাম।

এমনিতে কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য প্রথাগত লাবণী পয়েন্ট, কলাতলী পয়েন্ট, সুগন্ধা পয়েন্ট এবং একটু অদূরে ইনানী ও হিমছড়ি বিচের দিকেই পর্যটকদের ঢল সবচেয়ে বেশি। আর সেজন্য এসব বিচ পয়েন্টকে কেন্দ্র করেই বিভিন্ন তারকাবিশিষ্ট হোটেল, মোটেল, রেস্ট হাউস ইত্যাদি গড়ে উঠেছে। বেড়ানোর জায়গার তুলনায় পর্যটকের সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে এসব স্থানে অনেক ভিড় হয়। কিন্তু মেরিন ড্রাইভের মাধ্যমে যে রাস্তা করা হয়েছে সেখানে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ৮০ কিলোমিটার একসঙ্গে সমুদ্র ও পাহাড় দর্শন একত্রে হয়ে যাচ্ছে। সেখানে যেতে যেতে সৈকতে সাম্পান নৌকার মাধ্যমে মাছ ধরার দৃশ্য দেখার দৃষ্টান্ত বিরল।

পৃথিবীর এমন অনেক দেশ আছে যেখানে তাদের মোট দেশজ অর্থনীতির প্রধান আয় আসে পর্যটন খাত থেকে। দূর দেশ ইউরোপ-আমেরিকা ছাড়াও আমাদের পার্শ্ববর্তী ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, থাইল্যান্ড, চীন ইত্যাদি প্রধান। বাংলাদেশের যে পর্যটন সম্ভাবনা রয়েছে সর্বশেষ সম্ভবনাময় সংযোজন হলো এ মেরিন ড্রাইভ। এখন সেখানে প্রয়োজন শুধু দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য তাদের উপযোগী সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন ভৌত অবকাঠামো তৈরি করা।

একটি জিনিস আমরা সবাই জানি, পর্যটন একটি বিরাট খাত। সেখানে শুধু সরকারের পক্ষে এর সপক্ষে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। বিশ্বের কোনো দেশই তা একা সরকারের পক্ষে সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি। সরকার শুধু একটি পথ বাতলে দিতে পারে মাত্র। কক্সবাজারের টেকনাফ পর্যন্ত ৮০ কিলোমিটার মেরিন ড্রাইভের রাস্তাটি তৈরি করে দেওয়া সেই উদ্যোদেরই একটি অংশ মাত্র। সরকার সেখানে সে কাজটিই করে দিয়েছে। কাজেই এ খাতের দ্রুত উন্নয়নের জন্য ব্যাপক দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ দরকার। সেটির উন্নয়নের দায়িত্ব নিতে হবে বেসরকারি খাতকেই।

সেখানে বেসরকারীভাবে পর্যটকদের জন্য বিনিয়োগ করে ব্যাপক লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। ৮০ কিলোমিটার রাস্তার পাহাড়ের অংশে অনেক ফাঁকা জায়গা রয়েছে, যেখানে ইচ্ছে করলেই পরিকল্পিতভাবে পর্যটনবান্ধব স্থাপনা, বিনোদন কেন্দ্র ইত্যাদি গড়ে তোলা সম্ভব। সরকার শুধু এসবের জন্য সহায়ক নীতিমালা প্রণয়ন করবে এবং তদারকি করবে। তবে আমরা মেরিন ড্রাইভের সময় রাস্তার পাশে কিছু দখলী সাইনবোর্ড, ব্যানার, ফেন্টুন ইত্যাদি দেখেছি। এগুলো যদি সত্যি সত্যি পরিকল্পিতভাবে পর্যটন সহায়ক স্থাপনা তৈরির উদ্দেশে হয়ে থাকে তাহলে তো কোনো কথাই নেই। আর যদি সেগুলো অবৈধ দখলদার হয়ে থাকে তাহলে কোনো বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টির আগেই সেগুলোর বিষয়ে সরকারকে কঠোর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। তা না হলে পর্যটনের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা শুরুতেই হোঁচট খাবে।

তবে মেরিন ড্রাইভের পার্শ্ববর্তী স্থানে রোহিঙ্গাদের অবস্থান মেরিন ড্রাইভের সৌন্দর্যকে খানিকটা নষ্ট করছে প্রতিনিয়ত। তবে সম্প্রতি সরাসরি ঢাকা-কক্সবাজার ট্রেনলাইন চালু করা এবং কক্সবাজারে আইকনিক রেলস্টেশন চালু পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সব পর্যটনকেন্দ্রসহ মেরিন ড্রাইভের গুরুত্ব বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।

এমনিতেই বিভিন্ন অজুহাতে সারা দেশে সরকারি সম্পত্তি ও জায়গা দখলের যেমন মহোৎসব চলে, এখানে যেন তা না হয় দেশের বৃহত্তর স্বার্থে সচেতন সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আমি এখন থেকে মাত্র ৫ বছর আগে একবার কক্সবাজার বেড়াতে গিয়েছিলাম। মাত্র ৫ বছরের ব্যবধানে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়েছে পর্যটন নগরী কক্সবাজার শহরের। এখনকার ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী আরও ৫-১০ বছরে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এভাবেই বাংলাদেশ এখন তলাবিহীন ঝুড়ির দেশ থেকে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে চলেছে। সেই ধারা আরও বেগবান হয়ে পুরো বাংলাদেশ একটি পর্যটন নগরীতে পরিণত হোক- এটাই তো আমাদের স্বপ্ন হওয়া উচিত।

লেখক: কৃষিবিদ ও রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়


ভাষীদের ঐকমত্যই ভাষার শৃঙ্খলা ও শক্তি

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
মো. রহমত উল্লাহ্

ভাষা আন্দোলন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের এ আন্দোলনে সফলতা লাভের দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে মাত্র। আমাদের রক্তে রঞ্জিত সেই একুশে ফেব্রুয়ারি এখন ইউনেসকো স্বীকৃত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। গত ১৭ নভেম্বর ১৯৯৯ তারিখে ১৮৮ দেশের সমর্থনে এই স্বীকৃতি অর্জিত হয়। বিশ্বের ১৯৪টি দেশ আজ উদযাপন করছে আমাদের শহীদ দিবস তথা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও গৌরবের। ভাষীর সংখ্যা বিবেচনায় বাংলা ভাষার স্থান এখন পঞ্চম। বহুল ব্যবহৃত ভাষা হিসেবে বিশ্বে বাংলার অবস্থান সপ্তম। প্রায় ৩০ কোটি মানুষ কথা বলে বাংলায়; যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ। সময় চলে যাচ্ছে মূল্যায়নের। নিজেকে প্রশ্ন করে জানা অপরিহার্য; বাংলা ভাষার আন্দোলনে তথা সঠিক বাংলা চর্চায় আমরা কতটা সফল?

বাস্তবে বাংলা ভাষার সমৃদ্ধি অর্জনে আমাদের সফলতা কোনো ক্ষেত্রেই সন্তোষজনক নয়। এমনকি সবাই সকল শব্দ একইভাবে বাংলায় লেখার ক্ষেত্রেও আমরা বিভিন্ন কারণে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি! ‘শহীদ মিনার’ শব্দটিও আমরা একেকজন একেকভাবে লিখে থাকি। যেমন শহীদ মিনার, শহীদমিনার, শহিদ মিনার, শহিদমিনার অর্থাৎ এক শব্দে, দুই শব্দে, ঈ-কার দিয়ে, ই-কার দিয়ে লিখি! অথচ সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট’ কর্তৃক প্রকাশিত এবং সর্বজন শ্রদ্ধেয় চারজন পণ্ডিত আনিসুজ্জামান, ওয়াহিদুল হক, জামিল চৌধুরী ও নরেন বিশ্বাস কর্তৃক যৌথভাবে সম্পাদিত ব্যবহারিক বাংলা উচ্চারণ অভিধানে ‘শহিদমিনার’ এভাবে ই-কার দিয়ে এক শব্দে লেখা আছে। যার অর্থ শহিদদের উদ্দেশে নির্মিত স্মৃতিসৌধ। স্মৃতিসৌধ ও শহিদমিনার দুটোই সমাসবদ্ধ পদ বিধায় এক শব্দে লেখা উচিত। শহিদমিনার বিদেশি শব্দ বিধায় এটি ই-কার দিয়ে লেখাই বাংলা একাডেমির বিধান। অথচ এটি অনুসরণ করেন না অনেক ব্যক্তি, অনুসরণ করা হয় না অনেক সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। শুধু তাই নয় ‘ফেব্রুয়ারি’ ‘প্রভাতফেরি’ বানানও আমরা কেউ কেউ ই-কার দিয়ে আবার কেউ কেউ ঈ-কার দিয়ে লিখে থাকি। আবার কেউ কেউ ‘প্রভাত’ ‘ফেরি’ আলাদা করে লিখে থাকি। ‘শহিদদিবস’ কেউ একসঙ্গে লিখি, কেউ আলাদা ‘শহিদ’ ‘দিবস’ লিখি। এমন বিস্তর উদাহরণ দেওয়া যাবে। এর কারণ যেমন অনেক, তেমনি মতপার্থক্যও কম নয়। অন্তত শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সব সরকারি প্রতিষ্ঠান ও তালিকাভুক্ত গণমাধ্যম যদি একই কথা/শব্দ সদা-সর্বদা একই রকম করে লিখত তাহলে এতদিনে অনেকটা কেটে যেত আমাদের বিভ্রান্তি। কিন্তু এই বিভ্রান্তির ভেতর বেড়ে ওঠা, শিক্ষা লাভ করা সব কর্মকর্তা-কর্মচারী, সব গণমাধ্যম কর্মী, এমনকি সকল শিক্ষকও এসব বিভ্রান্তির উর্ধ্বে নয়!

স্কুল-কলেজ এবং মাদ্রাসার শিক্ষকরা একই রকম বানান অনুসরণ করেন না এমন অনেক শব্দ আছে। স্কুল-কলেজের অধিকাংশ শিক্ষক এনসিটিবির তথা বাংলা একাডেমির বানান রীতি অনুসরণে একমত হলেও অধিকাংশ মাদ্রাসার শিক্ষক সেটি পুরোপুরি অনুসরণ করতে নারাজ বলেই প্রতীয়মান হয়। বিশেষ করে মাদ্রাসার হুজুররা ব্যক্তিগতভাবে যেসব বই বা কিতাব বাংলায় লিখে থাকেন, সেগুলোতে তারা প্রায় সবাই সর্বাধিক আরবি, উর্দু, ফার্সি ভাষার শব্দ ব্যবহার করে থাকেন এবং ওইসব শব্দের উচ্চারণ অনুযায়ী বানান লেখাকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন বিভিন্ন যুক্তিতে। তাদের এই প্রবণতা ইংরেজিসহ অন্যান্য ভাষার শব্দ বাংলায় লেখার ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করা যায়। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, তারা অধিকাংশ বিদেশি শব্দে ঈ-কার প্রয়োগ করে থাকেন। এ কিতাবগুলো যারা পড়ান ও যারা পড়েন তারা সবাই বিদেশি শব্দসহ অন্যান্য অনেক শব্দে ঈ-কার প্রয়োগে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। এ ধারার বিপুসংখ্যক শিক্ষার্থী যখন হুজুর হন বা অন্য কর্মক্ষেত্রে যান বা লেখালেখি করেন তখন তারা অনেক শব্দের তেমন (উচ্চারণ অনুযায়ী) বানান অর্থাৎ বাংলা একাডেমির বিধিবহির্ভূত বানানই লিখে থাকেন বেশি। সোশ্যাল মিডিয়াসহ বিভিন্ন মিডিয়াতেও এটি লক্ষ্য করা যায়। অথচ স্কুল-কলেজের সঙ্গে সম্পৃক্ত অধিকাংশরাই এরূপ উচ্চারণ অনুযায়ী সব বানান লেখার ব্যাপারে একমত পোষণ করেন না। ফলে অনেক শব্দের বানান বাংলায় লেখার ক্ষেত্রে আমরা জাতিগতভাবে মোটাদাগে দুইভাগে বিভক্ত এবং একে অপরের লেখাকে ভুল বলায় লিপ্ত। শিক্ষাধারার ভিত্তিতে সৃষ্ট আমাদের এ দুই ভাগের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ভাষাবিষয়ক জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বড় একটি চলমান অন্তরায়।

অন্য বাস্তবতা হচ্ছে শিক্ষার্থীরা কোনো একটি শব্দের বানান তাদের পাঠ্যপুস্তক থেকে একরকম শিখে, আবার যখন অন্যান্য বইয়ে, পত্রপত্রিকায়, প্রজ্ঞাপনে, টেলিভিশনে, লিফলেটে, ফেস্টুনে, ব্যানারে, নোটিশে, চিঠিপত্রে অন্যরকম দেখে, তখন বিভ্রান্তি নিয়েই বেড়ে ওঠে। তাই সঠিক শিক্ষাটি তাদের অন্তরে/ অস্তিত্বে স্থায়িত্ব লাভ করে না, করতে পারে না। তাই তারা নিজেরাও একেক সময় একেক ক্ষেত্রে একেক রকম লিখে থাকে। বড় হয়ে নিজের এই দুর্বলতা বা অনাস্থা আড়াল করার জন্য কেউ কেউ বলে থাকে, একভাবে লিখলেই হয়, কোনটাই ভুল নয়! তেমন বিভ্রান্তি ও মনোভাব নিয়েই বেড়ে উঠেছি আমি ও আমরা অনেকেই। এর বাইরে নিজের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ও বিশেষ কারও সহযোগিতায় ব্যতিক্রম হয়ে ওঠার উদাহরণ খুব বেশি নেই।

বাংলা শব্দের বানান বিভ্রাটের আরও একটি বড় কারণ যুক্ত হয়েছে সম্প্রতি। সেটি হলো মোবাইল ফোনে ও কম্পিউটারে লেখার ক্ষেত্রে অ্যাপ বা সফটওয়্যারের ভুল সাজেশন। বিশেষ করে বহুল ব্যবহৃত মোবাইল ফোন সেটে ইউনিকোড ফন্টে লেখার ক্ষেত্রে ও ভয়েস টাইপ করার ক্ষেত্রে এই সমস্যাটি অত্যন্ত প্রকট, যা আমি নিজেও অত্যন্ত বিরক্তি সহকারে ফেস করি প্রতিনিয়ত। মোবাইল ফোন সেটে বাংলা লেখার কিবোর্ড অভ্র, রিদমিক, জি-বোর্ড ইত্যাদি অ্যাপ/ সফটওয়্যার তৈরিতে বাংলা একাডেমির বানান রীতি পুরোপুরি অনুসরণ করা হয়নি বিধায় অনেক ভুল বানান সাজেশন দিয়ে থাকে। বিশেষ করে বিদেশি শব্দসমূহে ঈ-কার যুক্ত বানান লিখে/দেখিয়ে থাকে এবং সমাসবদ্ধ পদগুলোকে পৃথকভাবে লিখে/দেখিয়ে থাকে। যেমন শহীদ মিনার, শহীদ দিবস, ভাষা শহীদ, ফেব্রুয়ারী, জানুয়ারী, সরকারী, ইংরেজী, বীমা, শ্রেণী, ফ্রী ইত্যাদি। অপরদিকে যতিচিহ্ন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও সমস্যা হয়ে থাকে। যেমন, (.) একবিন্দু ও (:) কোলনকে (ঃ) বিসর্গ লিখে/দেখিয়ে থাকে। তাই বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারী বিশেষ করে অগণিত ফেসবুক ব্যবহারকারী এই ভুল বানানগুলো দেখতে দেখতে ও লিখতে লিখতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। ফলে তারা ভুল-শুদ্ধের বিভ্রান্তিতে পড়ে যায়! ভুলের ছড়াছড়িতে শুদ্ধটিও ভুলে যায়!

অপরদিকে বাংলার পণ্ডিতগণের একদল বলেন, সমাসবদ্ধ পদ একত্রে মিশে বসবে। তা না হলে ভুল হবে। আবার অন্যদল বলেন, সমাসবদ্ধ পদ একত্রে মিশে না বসলেও ভুল হবে না। অর্থাৎ ফাঁক রেখে পাশাপাশি বসলেও শুদ্ধ হবে। একেকজনের যুক্তি এক এক রকম। লক্ষণীয়, ‘Education reporter- এডুকেশন রিপোর্টার’ ফাঁক রেখে দুই শব্দে লেখার ব্যাপারে সবাই একমত হলেও ‘শিক্ষা প্রতিবেদক’ বা ‘শিক্ষা সাংবাদিক’ ফাঁক রেখে দুই শব্দে লেখার ব্যাপারে সবাই একমত নন। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে এমন উদাহরণ অনেক। আমি মনে করি, সমাসবদ্ধ পদ মিশিয়ে বা ফাঁক রেখে যেভাবে যেখানে লিখলে সঠিক অর্থ প্রকাশ পায়, সংক্ষিপ্ত হয়, শ্রুতিমধুর হয়, লিখতে/বলতে ও বুঝতে সহজ হয় সেখানে সেভাবে লেখাই উত্তম। যেমন, মুক্তিসেনা, স্মৃতিসৌধ, মাতৃভাষা, শহিদমিনার, শহিদদিবস, ভাষাশহিদ, পুষ্পাঞ্জলি, নবীনবরণ, প্রধান শিক্ষক, শিক্ষক সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ সরকার, সংবাদপত্র পরিচালক ইত্যাদি। এ ক্ষেত্রে অগণিত সমাসবদ্ধ পদ একত্র বা সন্ধি করতে গিয়ে অতি দীর্ঘ জটিল শব্দ তৈরি করাও উচিত নয়। কেননা, অতি দীর্ঘ জটিল শব্দ লিখতে, পড়তে ও মনে রাখতে অধিক চাপ নিতে হয়। যা শিশুদের জন্য আরও বেশি কষ্টকর হয়। তাই দুটির অধিক সমাসবদ্ধ পদ একত্রিত না করা এবং অধিক বর্ণ যুক্ত জটিল শব্দ তৈরি না করার বিষয়ে ঐক্যমতে পৌঁছা যায় কি না ভেবে দেখা উচিত।

মোট কথা, সকল বিভ্রান্তি নিরসন করে ভাষা যত সহজ করা যায়, বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো যায়, সাধারণ মানুষের উপযোগী করা যায় ততই মঙ্গলজনক। কেননা, ভাষার ব্যবহার বৃদ্ধি ও অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এসব অপরিহার্য। সেই সঙ্গে বল সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সব ধরনের ও পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সকল প্রকার এনজিও, সকল ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া, সকল প্রকাশনা সংস্থা, বাংলা লেখার অ্যাপ বা সফটওয়্যার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এবং এ সকল প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সবাই যাতে একই শব্দ বাংলায় একইভাবে লিখতে বাধ্য হন তেমন ঐক্য প্রতিষ্ঠার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া আবশ্যক। যত বেশি শব্দ তেমন ঐক্যের আওতায় আনা যাবে ভাষা তত বেশি শক্তিশালী হবে। লেখায়, বলায়, ভাব প্রকাশে ভাষীদের ঐকমত্যই ভাষার শৃঙ্খলা ও শক্তি।

লেখক: অধ্যক্ষ, গবেষক ও প্রাবন্ধিক


শাবান মাসের ফজিলত: করণীয় ও বর্জনীয়

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
মুফতি আলী হুসাইন

নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজান ছাড়া শাবান মাসে সর্বাধিক রোজা রাখতেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রমজান ছাড়া অন্য কোনো মাসে পূর্ণ মাস রোজা রাখতে দেখিনি। আর আমি তাঁকে রমজান ব্যতীত শাবান মাস অপেক্ষা এত অধিক পরিমাণে রোজা রাখতে আর কোনো মাসে দেখিনি। (সহীহ বুখারি, হাদীস ১৯৬৯)

অপর এক বর্ণনায় আয়েশা (রা.) বলেন-

রোজা রাখার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে সর্বাধিক প্রিয় মাস ছিল শাবান মাস। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৪৩১)

উপরিউক্ত হাদিস দুটি দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, শাবান মাসে রোজা রাখা নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে সর্বাধিক পছন্দনীয় ছিল। আর এ জন্যই তিনি রমজান মাসের পর সবচেয়ে বেশি পরিমাণে রোজা রাখতেন এ মাসে।

শাবানের রোজার নিগূঢ় রহস্য : আল্লামা তাবারি (রহ.) শাবানের রোজা তাৎপর্যপূর্ণ হওয়ার ছয়টি উল্লেখযোগ্য কারণ বর্ণনা করেছেন, তন্মধ্যে চারটি বিষয় সম্পর্কে হাদিসে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। ( উমদাতুল কারি: ১১/১৩৩)

নিম্নে সংক্ষিপ্ত আকারে আলোকপাত করা হলো।

এক. শাবান মাসে আল্লাহর কাছে আমল পেশ করা হয়

স্বভাবতই আমাদের জানতে ইচ্ছা হয় যে, শাবান মাসে প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতবেশি রোজা রাখতেন কেন? সাহাবিদের মনেও এমন প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছিল। তারা রাসুলুল্লাহকে উক্ত মাসের তাৎপর্য সম্পর্কে সরাসরি জিজ্ঞাসা করেছেন।

উসামা বিন যায়েদ (রা.) বলেন, আমি একদিন নবিজিকে বললাম-

শাবান মাসে আপনাকে যে পরিমাণ রোজা রাখতে দেখি অন্য কোনো মাসে এতবেশি রোজা রাখতে কখনো দেখিনি। (এর রহস্য কী?) প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-

শাবান হলো রজব ও রমজানের মধ্যবর্তী মাস। এ মাসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য সম্পর্কে মানুষ উদাসীন থাকে। এ মাসে মহান রাব্বুল আল্লাহর কাছে আমল পেশ করা হয়। আমি এটা পছন্দ করি যে, রোজাদার অবস্থায় আমার আমল (আল্লাহর দরবারে) পেশ করা হোক। ( সুনানে নাসায়ী, হাদিস ২৩৫৭)

দুই. রমজানকে স্বাগত জানানো এবং মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ।

শাবানের রোজা রাখার অর্থ হলো রমজানের প্রস্তুতি গ্রহণ করা, রমজানকে স্বাগত জানানো। দীর্ঘ এক মাস রোজা রাখার জন্য নিজের দেহ ও মনকে প্রস্তুত করা। আনাস (রাদি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হলো, রমজান মাসের পর সর্বোত্তম রোজা কোনটি? তিনি বলেন, রমজানের সম্মানার্থে শাবান মাসের রোজা সর্বোত্তম। ( তিরমিযি: ১/১৪৪)

রমজানের শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত্ব, মানসিক প্রস্তুতি, শারীরিক ও আত্মিক শক্তি উৎপাদন, রহমত, মাগফিরাত ও নাজাত লাভের ফুরসত এবং বিপুল পরিমাণ নেকি অর্জনের মানসিকতা সৃষ্টি হয় এই শাবান মাসে। সহজ কথায় নফল নামাজ যেমন ফরজ নামাজের সম্পূরক তদ্রূপ শাবানের রোজাও রমজানের ফরজ রোজার সম্পূরক। ( মাআরিফুল হাদিস: ৪/১৫৫; লাতায়েফুল মাআরিফ: ১/১৩৮)

তিন. আগত বছর যারা মারা যাবে তাদের নাম মালাকুল মাওতের নিকট হস্তান্তর করা হয়।

আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহকে জিজ্ঞাসা করা হলো, আপনি শাবান মাসে এত বেশি রোজা রাখেন কেন? তিনি উত্তর দিলেন, আগামী বছর যাদের মৃত্যু হবে, এ মাসে তাদের নাম মালাকুল মাওতের কাছে হস্তান্তর করা হয়। অতএব আমি এটা পছন্দ করি যে, রোজা অবস্থায় আমার নাম পেশ করা হোক। ( মুসনাদে আবি ইয়ালা: ৪৯১১; ফাতহুল বারি: ৪/২৫৩)

চার. প্রত্যেক মাসের তিন দিনের রোজা এই মাসে আদায় হয়ে যায়।

এটা একটি উল্লেখযোগ্য কারণ যে, রাসুলুল্লাহ প্রত্যেক মাসের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখের রোজা রাখতেন। কিন্তু অনেক সময় সফর বা অন্য কোনো কারণে এ দিনের রোজাগুলো তাঁর ছুটে যেত, তাই তিনি শাবান মাসে অন্যান্য মাসের ছুটে যাওয়া রোজাগুলোর কাজা করে নিতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ প্রত্যেক মাসের তিন দিন রোজা রাখতেন। কখনো এই রোজাগুলো ছুটে যেত, ফলে পুরো বছরের রোজা বাকি থাকত, তাই তিনি শাবান মাসে ছুটে যাওয়া রোজাগুলোর কাজা করে নিতেন। (নাইলুল আওতার: ৪/৩৩১)

কোরআন-হাদিসের আলোকে রমজান মাসের যেমন গুরুত্ব রয়েছে, জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও রজব মাসের যেমন গুরুত্ব রয়েছে, ঠিক তেমনি বান্দার আমলের বাৎসরিক রিপোর্টের মাস হিসেবে শাবান মাসের গুরুত্বও কম নয়। রাসুলুল্লাহ শাবানের অধিকাংশ দিন রোজা রেখেছেন। তাই এ মাসে অন্যান্য নেক আমলের পাশাপাশি সামর্থ্য অনুযায়ী রোজা রাখার চেষ্টা করা উচিত। অবশ্য রোজা রাখবে শাবান মাসের ২৭ তারিখ পর্যন্ত হাদিসে রমজানের এক-দুই দিন আগে রোজা রাখতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯১৪)

আমাদের প্রাত্যহিক ও সাপ্তাহিক এবং বাৎসরিক আমলের রিপোর্ট

প্রতিদিন আমাদের আমলনামা মহান আল্লাহর কাছে উপস্থিত করা হয়। দিনের আমলনামা রাতে আর রাতের আমলনামা দিনে পেশ করা হয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৭৯)

প্রতি সপ্তাহের সোম ও বৃহস্পতিবার আল্লাহর কাছে বান্দার আমলনামা পেশ করা হয়। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ এ দুই দিনের রোজার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করতেন।

আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার বান্দার আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়ে থাকে। কাজেই আমি এটা পছন্দ করি যে, রোজাদার অবস্থায় আমার আমলগুলো আল্লাহর দরবারে পেশ করা হোক। (তিরমিযী : ৭৪৭)

আয়েশা (রা.) বলেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করতেন। (নাসাঈ : ২৩৬০; তিরমিযী : ৭৪৫)

আর প্রতিবছর শাবান মাসে একবার আমলনামা পেশ করা হয়, এটা হলো বাৎসরিক রিপোর্ট, যা ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে। (লাতায়েফুল মাআরেফ, পৃ: ২৪৪)

অর্ধ শাবানের রাত

অর্ধ-শাবানের রাত তথা চৌদ্দ তারিখের রাতটি অত্যন্ত তাৎপর্যময়। এ রাতকে সাধারণ মানুষ শবেবরাত বলে অভিহত করে কিন্তু হাদিসের ভাষায় বলা হয় ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ অর্থাৎ অর্ধ-শাবানের রাত। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ রাতের ফজিলত প্রসঙ্গে বলেছেন, মহান আল্লাহ অর্ধ-শাবানের রাতে তাঁর সৃষ্টিকুলের প্রতি (রহমতের) দৃষ্টি দেন; অতঃপর তিনি তার সব সৃষ্টিকে ক্ষমা করে দেন, কিন্তু শিরককারী ও হিংসা-বিদ্বেষ পোষণকারীকে ক্ষমা করেন না। (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস ৫৬৬৫; বাইহাকী হাদিস ৩৮৩৩)

উপরিউক্ত হাদিসটি নির্ভরযোগ্য ও আমলযোগ্য। ইমাম ইবনে হিব্বান, ইমাম যাকিউদ্দীন মুনযিরী, যাইনুদ্দীন ইরাকী প্রমুখ হাদিস বিশারদ ইমামগণ হাদিসটিকে নির্ভরযোগ্য বলে মতামত ব্যক্ত করেছেন। আততারগীব ওয়াত তারহীব ২/১১৮; শরহুল মাওয়াহেব ৭/৪১২)।

শায়েখ নাসির উদ্দিন আলবানি (রা.) বলেন, অর্ধ-শাবানের রাতের ফজিলত প্রসঙ্গে প্রায় ৮ জন সাহাবি থেকে বিভিন্ন সূত্রে হাদিস বর্ণিত হয়েছে। সবগুলো সনদ পর্যালোচনা করে তিনি বলেন, এ সমস্ত সনদের মাধ্যমে হাদিসটি নিঃসন্দেহে সহিহ এবং আমলযোগ্য। (সিলসিলাতুল আহাদিসিস সহিহাহ: ৩/১৩৫)

সুতরাং উল্লেখিত বর্ণনা অনুযায়ী প্রতীয়মান হয় যে, অর্ধ-শাবানের রাতে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে সব মুমিনের জন্য রহমত ও মাগফিরাতের দরজা উন্মুক্ত করা হয়। তবে যারা শিরকে লিপ্ত এবং অন্যের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে আল্লাহ তাদের এ রাতে ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া সবাই এই রাতে মাগফিরাত ও রহমত প্রাপ্ত হয়।

উপর্যুক্ত হাদিস ও অন্যান্য হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী যেহেতু এ রাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষভাবে গুনাহ মাফের ঘোষণা রয়েছে। তাই গুনাহ মুক্তির রাত হিসেবে এ রাতকে শবেবরাত তথা ‘মুক্তির রজনী’ নামে অভিহিত করা হয়। কাজেই এ রাতে গুনাহ মুক্তির জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা কাম্য। পাশাপাশি অধিক নেক আমল ও দীর্ঘ রুকু-সিজদাবিশিষ্ট নফল নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত এবং দোয়া-ইস্তিগফারের মাধ্যমে আল্লাহর মাগফিরাত ও রহমত লাভের ঐকান্তিক চেষ্টা করাও কর্তব্য। মনে রাখতে হবে, এই রাতকে কেন্দ্র করে বিশেষ কোনো ইবাদত নেই। বরং কোরআন-হাদিসে বর্ণিত সাধারণ নফল ইবাদতগুলোই এ রাতে অধিক পরিমাণে করার চেষ্টা করবে। কেননা উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর ক্ষমা ও রহমত প্রাপ্তি।

শবেবরাতের আপত্তিকর কিছু বিষয়

অর্ধ-শাবান অর্থাৎ শবেবরাতে কিছু আপত্তিকর কর্মকাণ্ড পরিলক্ষিত হয়। যেমন, বাজারের দোকানপাটে, মসজিদ, ঘর-বাড়িতে আলোকসজ্জা করা, পটকা ফুটানো, আতশবাজি, কবরস্থান ও মাজারে ভিড় করা, কবরস্থান ও মাজারে আলোকসজ্জা করা, মহিলাদের প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে যাওয়া, বিশেষত বেপর্দা হয়ে দোকানপাট, মাজার ইত্যাদিতে ভিড় করা, তরুণ ও যুবক ছেলেদের সারারাত শহরের অলি-গলিতে ঘুরে বেড়ানো, হৈ-হুল্লোড় করা- এসব কিছুই আপত্তিকর কাজ। শায়েখ আবদুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী রাহ. বলেন, এই রাতের নিকৃষ্টতম বিদআত ও অপসংস্কৃতি হলো ঘর-বাড়ি, দোকানপাট আলোকসজ্জা করা, হৈচৈ ও আতশবাজির উদ্দেশ্যে জমায়েত হওয়া ইত্যাদি। এগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং এগুলোর সপক্ষে কোনো ধরনের বানোয়াট বর্ণনাও পাওয়া যায় না। সম্ভবত হিন্দুদের ‘দেওয়ালি’ প্রথা থেকে তা গ্রহণ করা হয়েছে। (মা ছাবাতা বিস সুন্নাহ, পৃ: ৩৫৩-৩৬৩)

লেখক: ইসলামী চিন্তাবিদ

বিষয়:

ভাষা আন্দোলনের প্রেরণা ও সাহসিকতা জন্ম দিয়েছে স্বাধীনতা 

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ড. আজিজুল আম্বিয়া

মাতৃভাষা আন্দোলনের ৭২ বছর পূর্ণ হলো এ বছর। এখন বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে ভাষা শহীদদের স্মরণে দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয়ে থাকে। কালো ব্যাজ ধারণ, প্রভাতফেরি সহকারে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন একুশে ফেব্রুয়ারির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৫২ সালে ভাষার দাবিতে রাজপথে নামা কিছু তরুণের বুকের তাজা রক্তে লাল হয় ঢাকার রাজপথ। আর সেই গৌরবময় ইতিহাসের কারণে আমরা লাভ করি মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। তৎকালীন পূর্ববাংলার বাংলা ভাষাভাষী প্রায় ৪ কোটি ৪০ লাখ মানুষ পাকিস্তান অধিরাজ্যের মধ্যে নিজেদের অস্তিত্ব খুঁজে পায় দেশভাগের কারণে ১৯৪৭ সালে। দুটি ভূখণ্ডের ভৌগোলিক অবস্থান প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার দূরত্ব হলেও এই দুই অংশ নিয়ে তৈরি হয় পাকিস্তান রাষ্ট্রের। এ ছাড়া উভয় অঞ্চলের ভাষাও ছিল পৃথক। পাকিস্তান স্বাধীন হয় ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট। মাত্র ছয় মাসের মাথায় করাচিতে ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ সালে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে যিনি স্পষ্ট ভাষায় দাবি তোলেন- ‘বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা হোক’, সেই মানুষটির নাম ‘ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত’।

শ্রদ্ধা রইল এই বীরসন্তানের জন্য। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তই সর্বপ্রথম বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তুলে ছিলেন। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের সেই দাবি পাকিস্তান পার্লামেন্টে প্রত্যাখ্যাত হয়। তারপরই ভাষা আন্দোলনের সূচনা ঘটে। তাই এই রাষ্ট্রের শুরু থেকেই যেন একটা বৈষম্যের গন্ধ পাওয়া গিয়েছিল। মূলত দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হয়েছিল তার আগেই আসলে শুরু হয়েছিল ভাষা নিয়ে বিতর্ক। নানান নিয়ম ভাঙার অনিয়মে চলছিল বর্তমান বাংলাদেশিদের জীবন। আর সেটি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। কেউ কেউ মনে করেন, কখনো এটি ছিল সাহিত্য-সংস্কৃতি ভিতরেই সীমাবদ্ধ। ভাষা সৈনিক আবদুল মতিন ও আহমদ রফিক লিখেছেন, ‘ভাষা আন্দোলন বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়।...এর সূচনা মূল আন্দোলন শুরু হওয়ার কয়েক দশক আগেই এবং বাঙালি মুসলমানের সেকুলার জাতীয়তাবোধের পেছনে কাজ করেছে।’ সচেতন বাঙালিরা নিজস্ব ভাষার স্বকীয়তা এবং স্বাধীনতা নিয়ে কোনো সময় আপস করেননি। তাই ভাষা আন্দোলনকে কোনো বিচ্ছিন্ন আন্দোলন বা ঘটনা বলার সুযোগ নেই; কিন্তু যখন পাকিস্তাননামক রাষ্ট্রের জন্মটা নিশ্চিত হয়ে যায়, সেই থেকে ভাষা নিয়ে বিতর্কটা আর একটা বেষ্টনীর ভিতরে সীমাবদ্ধ রয় নাই। বিভিন্ন পত্রিকার ও সম্পাদকীয় এর বিষয় হয়ে যায়। কেউ কেউ এরকম প্রশ্ন তোলেন- নিজের মাতৃভাষার পরিবর্তে অন্য একটি ভাষাকে বরণ করার মতো বড় দাসত্ব আর কি হতে পারে? দৈনিক আজাদি পত্রিকায় ১৯৪৭ সালে লেখক সাংবাদিক আবদুল হক লিখেছিলেন, ‘উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেক উর্দু-শিক্ষিতই চাকরির যোগ্যতা লাভ করবে এবং প্রত্যেক বাংলাভাষীই চাকরির অনুপযুক্ত হয়ে পড়বে।’ তৎকালীন বাংলা ভাষাভাষীদের মনের অবস্থা বুঝতে বা বিবেচনা করতে ভুল করেছিল সেই পাকিস্তানি শাসকরা। তাদের উদ্দেশ্যও ছিল মানুষের মন নয়, চাকরির বাজার আর নিজেদের বড়ত্ব দেখানোর বিষয়টি বড় ছিল তাদের কাছে। তাদের এই যে চিন্তাচেতনা তা ছিল একটি প্ল্যান মাপিক না হয় কেন তৎকালীন আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডক্টর জিয়াউদ্দিন আহমেদ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব করেছিলেন। কেন তারা পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পর পরই এ দেশের মুদ্রা, ডাকটিকিট, ট্রেনের টিকিট, পোস্টকার্ড থেকে বাংলা বাদ দিয়ে উর্দু ও ইংরেজি ভাষা ব্যবহার শুরু করে। এর প্রতিবাদে ঢাকায় ছাত্র ও ভাষাপ্রেমিকদের এক বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। যদিও এটিকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী, খাজা নাজিমুদ্দিন ১৯৪৮ সালের আইন পরিষদের এক বক্তব্যে বলেছিলেন,এগুলো ভাষা বিতর্কের অনেক আগে থেকে ছাপা হয়ে গিয়েছে; কিন্তু এতে একমত হয়নি আন্দোলনরত সোনার সন্তানরা। বাঙালিদের মনে দিন দিন উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠ বাড়তেই থাকে, তারা ভাবতে শুরু করেন উর্দু ভাষা চালু হলে দিন দিন মানুষ শিক্ষার প্রতি নিরুৎসাহিত হবে তাতে এখানকার শিক্ষার হার কমতে থাকবে, বাংলাভাষার স্বাধীনতার কবর রচনা হবে, ভাষার স্বকীয়তা ধরে রাখা যাবে না। এসব চিন্তা করে তারা রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন এবং গঠন হলো রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। জানা যায়, সে সময়কার ইসলামি সাংস্কৃতিক সংগঠনের তমদ্দুন মজলিসের নূরুল হক ভূঁইয়া, তৎকালীন সংসদ সদস্য সামসুল হক, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা অলি আহাদ এবং এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম, পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ তোয়াহাসহ অনেকে এর সদস্য থেকে গোপনে কাজ শুরু করেছিলেন। যদিও বাংলা ভাষাভাষীরা উর্দু ভাষাভাষীর চেয়ে সংখ্যায় বেশি ছিলেন তবুও তাদের শোষণনীতির পরিবর্তন হয়নি, ঘোষণা এল ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালিন রেসকোর্স ময়দানে, মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ স্পষ্ট করে জানিয়ে দিলেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এখান থেকেই সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিতির মধ্য থেকে প্রতিবাদ করে ওঠেন অনেকে; কিন্তু কে মানে কার কথা। বাঙালির ভাষার স্বাধীনতায় এল এক বিরাট বাধা। বাঙালির বিশ্বাসে তারা দারুণভাবে আঘাত হেনেছিলেন বলে ধর্মীয় চেতনাবোধ থেকে বাঙালিরা সরে এল। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রভুত্ব কায়েমের চিন্তার দাঁতভাঙা জবাব তখন থেকেই দিতে শুরু করল বাঙিালিরা । যদিও এতদিন আন্দোলনের একটি স্বাভাবিক গতি ছিল; কিন্তু ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি পাকিস্তানের অ্যাসেম্বলিতে উর্দুকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারে যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয় এবং এর ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি ঢাকায় সফরে এসে খাজা নাজিমুদ্দিন পল্টনে এক সমাবেশে সেই জিন্নাহর আগের অপ্রিয় কথাই আবার শুনালেন, সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদী কণ্ঠে স্লোগান উঠল ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। আশাহত বাঙালির ক্ষোভের মধ্যে যেন আগুন ঢেলে দিলেন নাজিমুদ্দিন। ছাত্র-শিক্ষকরা সবাই এক কাতারে এসে শুরু করলেন স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মঘট ও বিক্ষোভ মিছিল। ২১ ফেব্রুয়ারি সাধারণ ধর্মঘট ঘোষণা করেন বাংলা ভাষা রক্ষাকারীরা। তাদের আন্দোলনকে বানচাল করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও তার আশপাশের এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়; কিন্তু ছাত্র জনতা তা ভাঙার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা ১০ জন করে রাস্তায় মিছিল বের করে। পুলিশ লাঠিচার্জ, কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ, গ্রেপ্তার শুরু করে; কিন্তু সব বাধা উপেক্ষা করে ছাত্ররা মেডিকেল হোস্টেলের প্রধান ফটকের কাছে জমায়েত হয়। তখন জমায়েত বদ্ধ ছাত্ররা স্লোগান দিতে থাকলে পুলিশ মারমুখী হয় প্রতিবাদে ছাত্ররা ইট-পাটকেল ছুড়তে থাকে। একপর্যায় পুলিশ তাদের ওপর গুলিবর্ষণ করলে সেদিন এবং পরদিন পুলিশের গুলিতে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার এবং শফিউর ছাড়াও আরও অনেকে শহীদ হয়েছিলেন বলে ভাষা আন্দোলন নিয়ে লেখা বিভিন্ন বইয়ে উঠে এসেছে। আর আহত হয়েছিলেন অনেকেই। এই আন্দোলনের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রাহমানও ছিলেন সেই আলোকিত সন্তানদের একজন হিসেবে। রচিত হলো বাংলা ভাষার গৌরবের ইতিহাস। ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার দিবস ঘোষণা করা হয় এবং ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে জাতিসংঘের সদস্যদেশগুলো যথাযথ মর্যাদায় পালন করে আসছে এই দিবসটি। তাই বলা যায় আমরা বাঙালিরা যে, হারতে জানিনা এই ভাষার ইতিহাস তাই বলে দেয়। আর আমাদের এই ভাষা রক্ষার সংগ্রামে বিজয়ের কারণে আমরা প্রেরণা লাভ করি। আর এই প্রেরণা বা সাহসিকতা কাজে লাগিয়ে আমরা ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা লাভ করি। তাই এর গুরুত্ব অত্যধিক। আর (এথনোলগ-বিশ্ব সংস্করণ ২০১৭) বিশ্বের প্রায় ২৮ কোটি ৫০ লাখ বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য একটি সুন্দর দিন হয়ে ফিরে আসে প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট


মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রাপ্তি

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ড. মিহির কুমার রায়

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টানা চতুর্থবারের মতো জয়লাভ করে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম সরকারি সফরে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে যোগ দিতে ১৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় মিউনিখ যান। সেখানে অবস্থানকালে শেখ হাসিনা মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেন। মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলন এবার ৬০তম বার্ষিকী পালন করেছে। দীর্ঘ এই সময়ে সম্মেলনে অনেক বৈচিত্র্য এসেছে। এবারের সম্মেলনেও বিশ্ব নেতারা গুরুত্বপূর্ণ অনেক আন্তর্জাতিক বিষয়, যেমন- বৈশ্বিক অর্থনীতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি তিনি বেশ কয়েকজন বিশ্ব নেতার সঙ্গে বৈঠক করেন যাদের মধ্যে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শোলৎজ, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি, নেদারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুটে, আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ, কাতারের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান আল-থানি এবং ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। এ ছাড়াও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইও, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম ঘেব্রেইসাস, বিশ্বব্যাংকসহ প্রায় ৬০টি দেশের সরকারপ্রধান, আন্তর্জাতিক সংস্থা, সুশীল সমাজ, সরকারি-বেসরকারি খাতের শীর্ষ স্থানীয় প্রায় ৫০০ প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। ১৬ ফেব্রুয়ারি সম্মেলনের উদ্বোধন হয়ে ১৮ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়।

মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে রয়েছে দীর্ঘ ৬০ বছরের ইতিহাস। ১৯৬৩ সালে পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলো থেকে মূলত অংশগ্রহণ করা হতো এবং এ সম্মেলনের মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্বের যেসব হুমকি এবং নিরাপত্তা সংকট ছিল, সেগুলো নিয়ে আলোচনার উদ্দেশ্যেই মূলত মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের যাত্রা শুরু। প্রতিষ্ঠার সময়টিই বলে দিচ্ছে, স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এ সম্মেলনের উৎপত্তি এবং বরাবরই সম্মেলনটি একটি অনানুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম, যার মাধ্যমে ইউরোপের নিরাপত্তার বিষয়গুলো তখনকার পরিপ্রেক্ষিতে আলোচিত হয়েছে। এবার এর সম্মেলনের একটি বৈশিষ্ট্য ছিল, এখানে বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক একত্র হয়েছিলেন এবং একটি অনানুষ্ঠানিক পরিবেশে এ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। প্রথম কয়েক দশক আলোচনা মূলত স্নায়ুযুদ্ধের প্রভাবের মধ্যেই সীমিত ছিল এবং সেখানে একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যদিকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার দ্বন্দ্ব, প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা মুখ্য বিষয় ছিল এবং তাকে কেন্দ্র করে ইউরোপের উদ্বেগ এবং শঙ্কা ছিল। আমরা জানি, ইউরোপ তখন পশ্চিম ইউরোপ এবং পূর্ব ইউরোপে বিভক্ত ছিল। পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ অবস্থানে ছিল এবং এখনো যা বজায় আছে। এ সম্মেলন ইউরোপভিত্তিক একটি প্ল্যাটফর্ম, যেটি ইউরোপের নিরাপত্তা এবং চ্যালেঞ্জগুলো বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি করে। সেখান থেকে বিভিন্ন বিষয় আলোচনার পর পশ্চিমা বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলো তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে বাস্তবায়নের চেষ্টা করে; কিন্তু গত দুই বছর অর্থাৎ ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে নিরাপত্তা সম্মেলনের পরিপ্রেক্ষিত, আলোচ্য বিষয় এবং নিরাপত্তা সম্মেলনের ভবিষ্যৎ করণীয় সবকিছুই পালটে যায়। ফলে বর্তমান বিশ্বের একটি জটিল সময়ে এ নিরাপত্তা সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এটি অতীতের চেয়ে অনেক বড় পরিসর ধারণ করেছে। এ সম্মেলনটি একসময় পশ্চিমা দেশগুলোকে কেন্দ্র করে হলেও এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিভিন্ন দেশ সেখানে অংশগ্রহণ করছে। পুতিন একসময় নিয়মিত এ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করলেও এখন সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে তার অবস্থান। সেদিক থেকে মিউনিখ সম্মেলনে যে বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছিল, সেটি মূলত ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার যে হুমকি, সেই হুমকির বিষয়টি।

এ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বের একজন অন্যতম রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে অংশ নিয়েছেন। তিনি এ সম্মেলনে ‘ফ্রম পকেট টু প্যানেট: স্কেলিং আপ ক্লাইমেট ফিন্যান্স’ শীর্ষক একটি প্যানেল আলোচনায় বক্তৃতা ও ছয়টি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এ প্রস্তাবগুলো হলো- প্রথম, আমাদের সঠিক পথে রাখতে জলবায়ু অর্থায়নের বরাদ্দ ছাড় করার সমাধান খুঁজে বের করা। উন্নত দেশগুলোকে পরিকল্পনার ভিত্তিতে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১০০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি মেনে চলা; দ্বিতীয়, বিশ্বকে যুদ্ধ ও সংঘাত, অবৈধ দখলদারিত্ব এবং নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিকদের বিশেষ করে নারী ও শিশুদের নির্মম হত্যাকাণ্ড থেকে পরিত্রাণ পেতে হবে যা গাজা ও অন্যত্র বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছে; তৃতীয়, জলবায়ুর প্রভাব প্রশমন ও অভিযোজনের জন্য অর্থায়নের তীব্র ভারসাম্যহীনতা দূর করার জন্য অভিযোজন অর্থায়ন দ্বিগুণ করা; চতুর্থ, বিদ্যমান আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থ প্রাপ্তি সুগম করার লক্ষ্যে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সমস্যাটি তাদের সক্ষমতায় বিনিয়োগ করার সুযোগসহ সমাধান করা; পঞ্চমত, বৈশ্বিক অর্থায়নের ব্যবস্থাপনায় সংস্কারের ক্ষেত্রে বিশেষ করে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ঋণের বোঝা দূর করতে তাদের জন্য অনুদান ও সুবিধাজনক লাভের সুযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থপূর্ণ ফলাফল দেখানো; ষষ্ঠ, জলবায়ু কর্মসূচির জন্য বেসরকারি পুঁজি প্রবাহের জন্য সরকারগুলোকে সঠিক পরিকল্পনা, নীতি ও ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রকল্পের জন্য বেসরকারি পুঁজি আকৃষ্ট করার জন্য আহ্বান জানানো। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি সুস্পষ্ট যে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ ছাড়া জলবায়ু অর্থায়নের বিপুল পরিমাণ ঘাটতির কার্যকর সমাধান করা যাবে না। মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে এত বড় বড় রাষ্ট্র নেতাদের ভিড়েও ফোকাসের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা। এখানে উল্লেখ্য, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বপ্রথম এরকম একটি সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন ২০১৭ সালে এবং পরবর্তীকালে ২০১৯ সালেও তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর জন্য এটি নতুন অভিজ্ঞতা নয়। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সরব পদচারণা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা এ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে।

সম্মেলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল কতগুলো বিষয় গবেষণার মাধ্যমে পূর্ব থেকে নির্ধারণ এবং তার ওপর ভিত্তি করে একটি প্রতিবেদন তৈরি যা আলোচনার ক্ষেত্র হিসেবে স্থান পাবে। যেমন- এবারের আলোচনার মূল বিষয় ছিল ১. মিউনিখ নিরাপত্তা প্রতিবেদন ২০২৪, যার শিরোনাম হচ্ছে Lose-Lose অর্থাৎ নিরাপত্তার দিক থেকে বিশ্ব এমন একটি অবস্থানে আছে, যে পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশ বা অঞ্চল ক্রমাগত অবনতির দিকে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে এসে একটি ভালো অবস্থায় যাওয়ার অবস্থা দেখা যাচ্ছে না। বৃহৎ শক্তিগুলো যেভাবে আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো দেখছে, তাতে তারা বরং ক্রমাগত পরস্পরের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। সেখান থেকে বিজয়ী হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই; কিন্তু এবারের মিউনিখ নিরাপত্তা প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে- এখানে তারা বলছে, সবাই পরাজিত হচ্ছে; ২. ইউরোপ, ইন্দো-প্যাসেফিক, আফ্রিকা কিংবা এশিয়া এসব অঞ্চলের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়সহ অন্যান্য বিষয়ের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। ফলে এ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে; ৩. বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে যে সম্মেলন হয়েছে, সেখানে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে, সম্মেলনের বা এজেন্ডার প্রসার ঘটেছে; ৪. এবারের সম্মেলন ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইউরোপের যে সংকট সেটি সামনে উঠে এসেছে, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইন্দো-প্যাসেফিক অঞ্চলের নিরাপত্তার বিষয়টি। সেখানে চীন এবং রাশিয়ার প্রসঙ্গ গুরুত্বসহকারে উঠে এসেছে। যেহেতু অনেক দেশই সেখানে অংশগ্রহণ করছে, তাই প্রতিটি দেশেরই তাদের নিজস্ব মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে। সেদিক থেকে এটি একটি বড় ধরনের নিরাপত্তা কূটনীতির মঞ্চ; ৫. বাংলাদেশ যে বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়েছে, তা হচ্ছে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান। এ সম্মেলন ইউরোপের একটি দেশে অনুষ্ঠিত হলেও এটি মূলত ইউরোপে বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদার রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও উন্নত করার একটি সুযোগ তৈরি করেছে; ৬. বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জোরাল বক্তব্যের মধ্য ছিল বিশ্বকে কীভাবে আরও শান্তিপূর্ণ করা যায়, স্থিতিশীল করা যায়, বিশ্বের নিরাপত্তা কীভাবে বৃদ্ধি করা যায় এবং সে ক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের এগিয়ে আসা, বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলার বিষয়, গাজা যুদ্ধে নিরীহ ফিলিস্তিনিদের হত্যা এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি।

বাংলাদেশের এ সম্মেলন থেকে যা অর্জন তা হচ্ছে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করা। এ সম্মেলন ইউরোপের একটি দেশে অনুষ্ঠিত হলেও এটি মূলত ইউরোপে বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদার রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও উন্নত করার একটি সুযোগ তৈরির পথ সৃষ্টি করেছে যা প্রশংসনীয়। দেশের রাষ্ট্র প্রধানরা মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ পেয়েছে। এটি একটি উন্মুক্ত ফোরাম। সম্মেলনে রাষ্ট্র নেতারা ছাড়া শিক্ষাবিদ, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিদ, মানবাধিকার কর্মীসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।

লেখক: অর্থনীতিবিদ ও গবেষক


ডায়াবেটিস প্রতিরোধের এখনই সময়

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির (বাডাস) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রতি বছরের মতো এবারও পালিত হচ্ছে জাতীয় ডায়াবেটিস সচেতনতা দিবস। ১৯৫৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি প্রতিষ্ঠা হয়। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সচেতন করে তুলতেই বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি তার প্রতিষ্ঠা দিবসকে ডায়াবেটিক সচেতনতা দিবস হিসেবে পালনের উদ্যোগ নেয়। এই দিবসটি পালনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে ডায়াবেটিস রোগের লক্ষণ, চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণ রাখার জন্য প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পর্কে গণসচেতনতা বৃদ্ধি করা। দিবসটির এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘ডায়াবেটিস প্রতিরোধের এখনই সময়’।

ডায়াবেটিস বর্তমানে একটি মহামারি রোগ হিসেবে চিহ্নিত এবং এই রোগ সারা জীবনের রোগ। নিয়ন্ত্রণে থাকলে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা যায়; কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের জটিলতা অনেক। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ডায়াবেটিস বৃদ্ধির হার বেশি। ২০০৩ সালে সারা বিশ্বে ডায়াবেটিক রোগী ছিল ১৯ কোটি। আগামী ২০৩০ সালে তা বেড়ে দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। উন্নত বিশ্বের অধিকাংশ দেশে ডায়াবেটিসকে মৃত্যুর চতুর্থ প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। সুতারাং প্রতিদিন যেমন ডায়াবেটিক রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে তেমনি, বাড়ছে ডায়াবেটিক রোগীদের নানা ধরনের জটিলতা।

ডায়াবেটিস মারাত্মক এবং প্রাণঘাতী রোগ। যা ব্যক্তি এবং তাদের পরিবার, সেই সঙ্গে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও জাতীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। আইডিএফ ডায়াবেটিস অ্যাটলাস ডায়াবেটিসের বৈশ্বিক প্রভাব সম্পর্কে সর্বশেষ যে পরিসংখ্যান এবং তথ্য দিয়েছে তাতে দেখা যায়- ২০২১ সালে ৫৩.৭ কোটি মানুষ (প্রতি ১০ জনে একজন) ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন। ২০৩০ সালের মধ্যে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৬৪.৩ কোটিতে এবং ২০৪৫ সালে ৭৮.৩ কোটিতে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ২৪ কোটি মানুষ (প্রতি ২ জনে ১ জন) জানেন না, তারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। তাদের অধিকাংশই টাইপ-২ ডায়াবেটিস আক্রান্ত। ১২ লাখেরও বেশি শিশু ও কিশোর (০-১৯ বছর) টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। ২০২১ সালে বিশ্বের ৬৭ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসের কারণে মৃত্যুবরণ করেন। ২০২১ সালে ৯৬৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয় ডায়াবেটিসের কারণে, যা বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতে মোট ব্যয়ের ৯%।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ফেডারেশনের সাম্প্রতিক তথ্য মতে, পৃথিবীতে প্রতি দশ সেকেন্ডে একজন ডায়াবেটিস রোগীর মৃত্যু হয় এবং দুজন নতুন ডায়াবেটিস রোগী শনাক্ত হয়! বর্তমানে বিশ্বে ডায়াবেটিসকে মহামারি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা দুটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন তা হচ্ছে- দৈনন্দিন জীবনে আমাদের শারীরিক সক্রিয়তা কম এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য গ্রহণ না করা। বংশগত কারণ ছাড়াও নগরায়ণ ও পরিবর্তিত জীবনধারণের কারণেই ডায়াবেটিক রোগীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে নগরায়ণের ফলে পরিবর্তিত জীবনযাপনের কারণে সারা বিশ্বেই ডায়াবেটিক রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। তবে বৃদ্ধির এই হার উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশে বেশি। বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা যায়, গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত নারীদের প্রায় অর্ধেক পরবর্তীতে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন। এমনকি অপরিকল্পিত গর্ভধারণের কারণে শিশু অপুষ্টির শিকার হলে এবং সেই শিশু পূর্ণবয়স্ক হওয়ার পর অতিরিক্ত ওজন হলে তার ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেশি থাকে। ডায়াবেটিসের ঝুঁকি থেকে বাঁচতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

ডায়াবেটিস সম্পর্কে সচেতনতার অভাবে প্রতিবছর অসংখ্য মহিলা ডায়াবেটিসের স্বীকার হচ্ছেন এবং ডায়াবেটিস নিয়ে শিশু জন্ম দিচ্ছেন অথবা নবজাতক শিশুর বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিচ্ছে। প্রতিটি গর্ভবতী মা যদি গর্ভধারণের আগেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সন্তান জন্ম দিতে পারেন তবে সন্তান সুস্থভাবে জন্ম দিতে পারবেন এবং মায়ের ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকবে। বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি গর্ভকালীন ডায়াবেটিস প্রতিরোধে গর্ভধারণ-পূর্ব সেবা দিতে বিশেষ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এরই মধ্যে সারা দেশে ‘গর্ভধারণ-পূর্ব সেবা কেন্দ্র’ খোলা হয়েছে যেখানে নির্ধারিত সময়ে বিনামূল্যে গর্ভধারণ-পূর্ব পরামর্শ এবং স্বল্পমূল্যে গর্ভধারণ সংক্রান্ত সেবা পাওয়া যাবে। এর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি প্রসবকালীন নারী ও শিশুমৃত্যুর হার যেমন কমানো সম্ভব হবে, তেমনি নারীসহ আগামী প্রজন্মকেও ডায়াবেটিসের ভয়াবহ প্রকোপ থেকে অনেকাংশে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

ডায়াবেটিসের সম্ভাবনা বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে-

 কায়িক পরিশ্রম না করা

 মোটা বা স্থূলকায় হয়ে যাওয়া

 অতিমাত্রায় ফাস্টফুড খাওয়া ও কোমল পানীয় (সফট ড্রিংকস) পান করা।

 অতিরিক্ত মানসিক চাপের মধ্যে থাকা

 ধূমপান করা ও তামাক (জর্দ্দা, গুল, খৈনী, সাদাপাতা) খাওয়া

 গর্ভকালীন বিভিন্ন সমস্যা

 যাদের বাবা-মা অথবা রক্ত সম্পর্কীয় নিকটাত্মীয়ের ডায়াবেটিস আছে এবং যাদের বয়স ৪৫ বছরের বেশি তাদের ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কাজেই ডায়াবেটিস সম্পর্কে তাদের অধিকতর সতর্ক থাকা দরকার।

ডায়াবেটিসে মাড়ির সমস্যা:

ডায়াবেটিস রোগের জন্য দাঁতের মাড়ি এবং হাড়ে (যা দাঁতকে যথাস্থানে রাখতে সাহায্য করে) ইনফেকশন হতে পারে। অন্যান্য ইনফেকশনের মতো রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বেড়ে গেলে দাঁতের মাড়িও আক্রান্ত হতে পারে। এই সমস্যাকে প্রতিরোধ করার জন্য বছরে অন্তত দু’বার ডেন্টিস্টের শরণাপন্ন হওয়া উচিত এবং অবশ্যই ডাক্তারকে আপনার ডায়াবেটিস সম্পর্কে অবহিত করা প্রয়োজন। দিনে দুবার দাঁত ব্রাশ ও ডেন্টাল ফ্লস দ্বারা পরিষ্কার করা এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ রাখা প্রয়োজন। ডায়াবেটিস রোগীদের দাঁতের সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার এটাই প্রধান উপায়। অবস্থা খারাপ হলে ইনফেকশন দাঁতের মাড়িতে এমনকি হাড় পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে এবং এভাবেই দাঁত দুর্বল হয়ে নড়ে গিয়ে পড়ে যেতে পারে, বা এক দিন মূল্যবান দাঁতকে হারাতে হতে পারে।

লক্ষণগুলো:

*দাঁতের মাড়ি লাল হয়ে ফুলে যায়।

 দাঁতের মাড়ি থেকে রক্ত পড়ে।

 দাঁতের গোড়া থেকে মাড়ি সরে যাওয়ার কারণে দাঁতকে অস্বাভাবিক অবস্থান দেখা যায়।

 যদি দাঁত নড়ে যায় সংবেদনশীল হয়ে পড়ে।

 মুখে দুর্গন্ধ হয়।

 দাঁতের কামড় অস্বাভাবিক অনুভূত হয়।

 অকার্যকর ডেনচার (কৃত্রিম দাঁত) হয়।

এই ধরনের কোনো সমস্যায় ডেন্টিস্টের সঙ্গে অবশ্যই পরামর্শ করা প্রয়োজন।

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য পরামর্শ ও কিছু নির্দেশনা-

ডায়াবেটিস রোগীদের মাড়ির প্রদাহ বেশি হওয়ার কারণ হলো-Ñ

১. দেহে ইনসুলিন ঘাটতি হলে আমিষেরও ঘাটতি হয় ফলে কোষকলার (Tissues) স্বাভাবিক বৃদ্ধি, সংস্কার ও উৎপাদন ব্যাহত হয় তাই মুখের কোনো স্থানে ঘা হলে ও প্রদাহ থাকলে শুকাতে বিঘ্ন ঘটে;

২. দেহে রোগ-প্রতিরোধ শক্তি কমে আসে ফলে দাঁতের গোড়ায় প্লাক জমা থাকলে সহজেই মাড়ির প্রদাহ শুরু হয়;

৩. ডায়াবেটিস রোগীদের দন্তক্ষয় বা ডেন্টাল ক্যারিজ রোগ হতে পারে তার কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা উল্লেখ করেছেন-

ক) মুখের লালার সঙ্গে গ্লুকোজের বাড়তি সংযোজনের ফলে ওই গ্লুকোজ মুখে এক ধরনের আণুবীক্ষণিক জীবাণুর সঙ্গে মিলে অম্ল বা অ্যাসিড তৈরি করে। অ্যাসিড দাঁতের শক্ত আবরণ অ্যানামেল ক্ষয় করতে থাকে এবং ধীরে ধীরে দাঁতের ভেতরে গর্তের সৃষ্টি করে।

খ) মুখের লালার স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয় এবং পরিমাণ কমে যায় ফলে মুখের অতিরিক্ত শুকনো পরিবেশে আহারের কণাগুলো ধুয়ে-মুছে যেতে পারে না। এই খাদ্যকণাগুলো দীর্ঘদিন দাঁতের গায়ে ও মাড়ির ফাঁকে জমে থেকে দাঁতের ভেতরে গর্তের সৃষ্টি করে।

প্ল্যাক: মুখে খাদ্যকণা জমে থেকে যে আবরণ সৃষ্টি হয় এর নাম ডেন্টাল প্ল্যাক। এই প্ল্যাক লাখ লাখ আণুবীক্ষণিক জীবাণুর সমষ্টি। মুখের দুই প্রধান রোগ ডেন্টাল ক্যারিজ ও মাড়ির প্রদাহে ডেন্টাল প্ল্যাকই দায়ী।

১। ডায়াবেটিস রোগ দেখা দেওয়ার আগে যাদের মাড়ির প্রদাহ (Tissues) বা দন্তবরক প্রদাহ (Periodontitis) থাকে তাদের প্রদাহ নিঃসৃত রস বৃদ্ধি পায় ফলে ডেন্টাল প্ল্যাক বাড়তে থাকে।

২। বৃহৎ ও ক্ষুদ্র লালা গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত রস বৃদ্ধি পায় এবং তা খাদ্যকণার সঙ্গে মিসে প্ল্যাক তৈরি করে।

৩। দাঁত দিয়ে খাদ্য চিবানোর ক্ষমতা যাদের কমে (ডায়াবেটিস রোগীর মাড়ির সংক্রমণে) তাদের মুখেও প্ল্যাকের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।

ডায়াবেটিস রোগীদের রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে যেমন তিনটি D মেনে চলতে হয় যথা-

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা জাতীয় অধ্যাপক ডা. মো. ইব্রাহিমের অমর বাণী- ‘প্রত্যেক ডায়াবেটিস রোগী যদি তিনটি D- Diet, Drug, Discipline অর্থাৎ পরিমিত খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ এবং রক্ত পরীক্ষা ও নিয়মিত ব্যায়াম এই তিনটি নীতিকে নিষ্ঠার সঙ্গে প্রতিদিন মেনে চলেন তাহলে তারা অবশ্যই স্বাভাবিকের কাছাকাছি, সামাজিকভাবে উপযোগী, সৃজনশীল কাজে সক্ষম ও সম্মানজনক জীবন নির্বাহ করতে পারবেন।’

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য দাঁত বা মুখের যত্নে কয়েকটি সতর্কীকরণ ইঙ্গিত:

ক) সর্বপ্রথমই ডায়াবেটিস রোগটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা প্রয়োজন। রক্তের শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখাই দাঁত ও মাড়ির রোগ-প্রতিরোধের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। মাড়ির অতিরিক্ত প্রদাহ অনেক সময় ডায়াবেটিসকে নিয়ন্ত্রিত রাখতে অনেক অসুবিধার সৃষ্টি করে।

খ) প্রতি ছয় মাস অন্তর একজন ডেন্টাল সার্জনকে দিয়ে মুখ পরীক্ষা করা প্রয়োজন। ডেন্টাল সার্জনকে অবশ্যই আপনার ডায়াবেটিস রোগের কথা বলে রাখবেন।

গ) প্রতিদিন দুইবেলা (সকাল ও রাতে) দাঁত ব্রাশ এবং মাড়ির জন্য প্রয়োজন একটি নরম টুথব্রাশ। ব্রাশটিকে ওপরের পাটির দাঁত থেকে নিচের পাটির দাঁতে আবার নিচের পাটি থেকে ওপরের পাটির দিকে, এভাবেই ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দাঁত ও মাড়ি পরিষ্কার করা বিজ্ঞানসম্মত। দুই দাঁতের ফাঁক থেকে খাদ্যকণা বের করে দেওয়ার জন্য ডেন্টাল ফ্লস বা এক ধরনের সুতা ব্যবহার করা ভালো।

ঘ) কখনো যদি আপনার মাড়ি থেকে দাঁত ব্রাশের সময় বা খাবার খাওয়ার সময় রক্ত বের হয় তবে তা আপনার মাড়িতে প্রদাহের পূর্ব লক্ষণ কি না বোঝার জন্য অবশ্যই একজন ডেন্টাল সার্জনের পরামর্শ গ্রহণ প্রয়োজন। মনে রাখবেন ডায়াবেটিস রোগ নিয়ন্ত্রণই অন্যান্য জটিলতা থেকে মুক্ত থাকার একমাত্র চাবিকাঠি।

ঙ) বয়স যদি ৪০-এর বেশি হয় এবং ওজন যদি মাত্রাতিরিক্ত হয় কিংবা বংশে যদি কারও ডায়াবেটিস থাকে তবে অবশ্যই বছরে একবার ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা প্রয়োজন এবং গর্ভবতীরা নিশ্চিত করবেন তাদের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস আছে কি না।

চ) তামাক ও ধূমপানের সঙ্গে ডায়াবেটিসের সম্পর্ক ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। ধূমপান ও তামাক সেবন ডায়াবেটিসের ভয়াবহতা এবং জটিলতা অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা তরুণ বয়সে ধূমপান শুরু করে তারা পরবর্তীতে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারে। ডায়াবেটিস আছে এমন কেউ যদি ধূমপান, তামাক সেবন করে তবে তাদেরও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। ফলে তাদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যানসার, হৃদরোগ, স্ট্রোক ও পায়ের পচনশীল রোগ ‘গ্যাংগ্রিন’ হওয়ার সম্ভাবনা ৫ গুণ বেশি। তা ছাড়া ডায়াবেটিস রোগীদের ধূমপানের কারণে ‘মাড়ির রোগ বা পেরিওডেন্টাল ডিজিজ’-এর জটিলতা বেশি হয় এবং অকালে দাঁত পড়ে যায়।

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা জাতীয় অধ্যাপক ডা. মো. ইব্রাহিমের অমর বাণী- ‘প্রত্যেক ডায়াবেটিস রোগী যদি তিনটি D- Diet, Drug, Discipline অর্থাৎ পরিমিত খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ এবং রক্ত পরীক্ষা ও নিয়মিত ব্যায়াম এই তিনটি নীতিকে নিষ্ঠার সঙ্গে প্রতিদিন মেনে চলেন তাহলে তারা অবশ্যই স্বাভাবিকের কাছাকাছি, সামাজিকভাবে উপযোগী, সৃজনশীল কাজে সক্ষম ও সম্মানজনক জীবন নির্বাহ।

লেখক: একুশে পদকপ্রাপ্ত এবং শব্দসৈনিক, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র

বিষয়:

রাজনীতিকদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা জরুরি

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ড. সুলতান মাহমুদ রানা

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী স্থিতিশীল রাজনীতির বাতাস বইতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্বস্তির বাতাস সত্যিই কাঙ্ক্ষিত। শালীনতা, সহনশীলতা এবং উন্নত রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখানে প্রায় অসম্ভব। নির্ভয়ে বাইরে বের হওয়া, শান্তিতে বসবাস করা- সবকিছুই জনগণের প্রত্যাশিত। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর হঠকারী রাজনৈতিক কর্মসূচি- যা মানুষের শঙ্কার কারণ হয়, তা কখনোই প্রত্যাশিত নয়। এ কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর গঠনমূলক নীতি গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন সবার নিকট কাম্য। আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে, ধীরগতি সব সময়ই কল্যাণের পথে ধাবিত হয়। সুষ্ঠু রাজনীতির জন্য তা মঙ্গলকরও বটে। আর মঙ্গলকর রাজনীতির ধারাবাহিকতা রক্ষায় দেশে বিদ্যমান গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলগুলোর যথাযথ রাজনৈতিক অঙ্গীকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকার ও সরকার-বিরোধীদের যথাযথ রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সতর্কভাবে চলার সুযোগ এবং পরিবেশ নিয়ে ভাবার প্রসঙ্গটি গুরুত্বপূর্ণ।

গত বছরের ২৮ অক্টোবরের হামলা, হত্যা ও ভাঙচুরের ঘটনার মামলায় বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা কারাগারে ছিলেন। এর মধ্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিএনপি স্থায়ী কমিটির মির্জা আব্বাস ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল সম্প্রতি মুক্ত হয়েছেন। তাদের মুক্তির পর গুঞ্জন উঠেছে, তবে কি ফের চাঙ্গা হবে বিএনপি? এরই মধ্যে খবর প্রকাশ হয়েছে যে বিএনপির শীর্ষ পদে খালেদা জিয়া এবং তারেকের পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। মূলত দলকে সাংগঠনিকভাবে চাঙ্গা রাখতে এ ধরনের সিদ্ধান্তের বিষয়টি সামনে আসছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশের অভ্যন্তরীণ ও ভূরাজনৈতিক সমীকরণ মিলিয়ে নতুন করে একদফা কর্মসূচির চিন্তা করছে বিএনপি। এ লক্ষ্যে কর্মীদের চাঙ্গা করতে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করা হতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু বিএনপি এতদিন যে বিদেশি শক্তিকে খুঁটি হিসেবে ধরে ছিল, সেই খুঁটিতে এখন বেশ ভাটা পড়েছে।

তাছাড়া ইতোমধ্যেই বিএনপি বুঝতে পেরেছে যে তারেক জিয়ার নেতৃত্বে আন্দোলন ফলপ্রসূ করার সম্ভাবনা মোটেই নেই। কারণ, ভূ-রাজনৈতিক বিচারে বিদেশে বসে দেশীয় রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। যে কারণে এত কিছুর পরও বিএনপির আন্দোলনের সফলতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে গেছে। কারণ, আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো এর সঙ্গে জনপ্রত্যাশা পূরণের অঙ্গীকার।

নির্বাচন-পরবর্তী কূটনৈতিক তৎপরতা এই মুহূর্তে শতভাগ সরকারের পক্ষে। যুক্তরাষ্ট্রও তার আগের ভূমিকা থেকে সরে এসে সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আন্তর্জাতিক ইতিবাচক বার্তা দেশের জন্য যথেষ্ট মঙ্গলজনক বলে মনে হচ্ছে। ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করে গড়ে তুলতে তাদের সদিচ্ছা একাধিকবার প্রকাশ করেছে। কাজেই নানা কারণেই ৭ জানুয়ারির পর থেকে বিএনপির নেতৃত্বে এক ধরনের স্থবিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তাদের অনেক নেতা নিজেদের আত্মসমালোচনায় নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তকে ভুল বলেও আখ্যায়িত করেছেন।

রাজনীতিতে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকে তবে এবারের বিএনপির দ্বিধা-দ্বন্দ্ব এতটা আগে দেখা যায়নি। রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কিছু নেই। তবে সত্য এবং ন্যায্য কথা নিশ্চয়ই থাকতে হয়। পাশাপাশি রাজনীতিবিদদের যথাযথ কমিটমেন্ট জরুরি। আর সে কমিটমেন্টটি জনগণের নিকট হতে হয়। জনগণের নিকট কমিটমেন্ট না থাকলে রাজনীতিতে লাভবান হওয়া দুষ্কর। আপাতত বিএনপির কোনো দৃশ্যমান রাজনৈতিক কমিটমেন্ট নেই। এমনকি কোনো আন্দোলন কর্মসূচিও নেই। তাদের প্রতি জনসমর্থনও দেখা যাচ্ছে না। এই মুহূর্তে তাদের আন্দোলনে যাওয়ার কোনো ইস্যু কিংবা জোরালো কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া বর্তমানে এসএসসি পরীক্ষা এবং সামনে রমজানের কারণে, আবার সেই ঈদের পরের আন্দোলনখ্যাত বিষয়টি হাস্যরসে পরিণত হতে যাচ্ছে।

পরিস্থিতি বিশ্লেষণে বলা যায়, বেশ কিছু রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার বেড়াজালে নিজেদের আবদ্ধ করে ইতোমধ্যেই তাদের জন্য বুমেরাং পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। দলকে সুসংগঠিত করা, জনগণের সমর্থন আদায়, আন্তর্জাতিক সমর্থন তাদের পক্ষে নেওয়া প্রভৃতি বিষয় নিয়ে তারা এখন ঘূর্ণিপাকে। নিজেদের ভুল সিদ্ধান্তে বারবার নিজেরাই হোঁচট খাচ্ছে।

সাধারণ মানুষের মনেও এখন প্রশ্ন একটাই, বিএনপি এখন কী করবে? এমনকি সরকারও বিএনপির ভবিষ্যৎ নিয়ে সতর্ক ও সজাগ রয়েছে। কারণ এই মুহূর্তে সরকার তাদের নিজেদের কর্মকাণ্ডে অনেকটা ইতিবাচক স্থানে রয়েছে। বেশ কিছু ইস্যুতে সরকার যেমন সফলতা দেখিয়েছে, ঠিক তেমনি বিএনপি ব্যর্থতার পরিচয়ও দিয়েছে যথেষ্ট। তবে বিএনপিকে দুর্বল মনে করাও উচিত হবে না সরকারের। কারণ বিএনপির মাঠপর্যায়ে কিছুটা হলেও জনপ্রিয়তা রয়েছে। পরিস্থিতির কারণে ক্রমেই জনপ্রিয়তা হারালেও, আবার কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতেই পারে যাতে বিএনপির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি এবং সরকারের জনপ্রিয়তা হ্রাস পেতে পারে। ইতোপূর্বে অনেক লেখাতে উল্লেখ করেছি, সরকার কখনোই চাইবে না যে তাদের জনপ্রিয়তা চলে যাক, আর বিরোধীরা অধিক জনপ্রিয় হয়ে উঠুক।

৭ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি এবং তাদের সমমনা দল অংশগ্রহণ না করলেও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য নির্বাচন যথেষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছে। নির্বাচন-পূর্ব সময়ে আন্তর্জাতিক মহল নির্বাচন নিয়ে কিছুটা নাখোশ থাকলেও পরে নির্বাচনের স্বচ্ছতা এবং গ্রহণযোগ্যতা দেখে তারা অপেক্ষাকৃত ইতিবাচক ভূমিকা প্রদর্শন করেছে।

বিএনপি সঙ্গত কারণেই এখন বুঝে গেছে, ২০২৯ সালের আগে কোনো সংসদ নির্বাচনের সুযোগ নেই। সাংগঠনিক অবস্থা ধরে রাখার বিষয়টিই এখন তাদের মূল প্রাধান্যের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। খুব দ্রুতই স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে বিএনপিকে তাদের নিজেদের অবস্থান পুনর্জ্জীবিত করতে স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। যদিও এ বিষয়েও তাদের মনে যথেষ্ট দ্বিধা-দ্বন্দ্ব তৈরি করেছে। কারণ বিএনপি যে সিদ্ধান্তই নিচ্ছে সেটি তাদের জন্য ভুল হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে তারা অনেকটা ‘ওয়ান স্টেপ ফরোয়ার্ড এবং টু স্টেপস ব্যাক’ নীতির মতো করে চলছে।

অন্যদিকে ক্রমেই আওয়ামী লীগ সরকারের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাম্প্রতিককালে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য-বিবৃতি আত্মবিশ্বাসের বিষয়টি প্রমাণ করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন বক্তব্য-বিবৃতির পরিপ্রেক্ষিতে মনে হয়েছে, প্রতিপক্ষ কিংবা বহির্বিশ্বের কোনো চাপে বর্তমানে সরকারের নেই। ইদানীং প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারের এমন আত্মবিশ্বাসই বিএনপির জন্য ক্রমেই কাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আর সরকারের এই আত্মবিশ্বাসের বিষয়টিতে বিএনপির জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে। একদিকে সরকারের আত্মবিশ্বাস বাড়ছে অন্যদিকে নিজেদের যথাযথভাবে মজবুত করতে না পারার দীর্ঘশ্বাস হচ্ছে বিএনপির। বিশেষ করে বিদেশি মহল ক্রমেই নেতিবাচক অবস্থা থেকে বের হয়ে এসেছে। বর্তমানে উন্নয়ন এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সুশাসনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ই বহির্বিশ্বের কাছে সরকারের অন্যতম প্লাস পয়েন্ট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বারবারই বিএনপি-জামায়াতের উদ্দেশে বলে যাচ্ছেন, ‘আন্দোলন-ষড়যন্ত্র করে লাভ নেই। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকবে। দেশ এগিয়ে যাবে।’ এটি নিঃসন্দেহে প্রধানমন্ত্রীর নিজের মনের জোর ও সাহস। মূলত বিএনপি-জামায়াতের বিগত সময়ের রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের ফলেই এ শক্তি তৈরি হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর মনে। কাজেই প্রতিপক্ষকে বুঝতে হবে, আওয়ামী লীগ সরকার কোনো চাপের কাছে সহজে নতি স্বীকার করার পরিবেশ নেই। এই মুহূর্তে দেশকে এগিয়ে নিয়ে সরকারের কর্মকাণ্ডের গঠনমূলক সমালোচনা করাই বিরোধীদের দায়িত্ব হওয়া উচিত।

লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।


দুষ্ট ব্যক্তি খুব চতুর হয়

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
শফিকুল ইসলাম

ভালো মানুষের সঙ্গ পেলে জীবনের রংটাই কেমন পালটে যায়, প্রতি মুহূর্তে মনের মধ্যে অদ্ভুত দোলা দেয়, আনন্দে ভরে থাকে মন। কিন্তু এর উল্টোটাও আছে। এমন কিছু মানুষ আছেন যাদের সান্নিধ্য আমাদের মনটাকে বিষাদে ভরিয়ে তোলে। আসলে আমাদের চারপাশে কত মানুষ। প্রতিটি মানুষের বাইরের চেহারার মতো ভেতরের চেহারাও আলাদা আলাদা। আমরা নিজেরাই বলি, ভালো-মন্দ নিয়েই মানুষের জীবন। আর ভালো-মন্দ সবার মধ্যেই রয়েছে। যেমন হিংসা, ভালোবাসা, প্রেম কিংবা রাগ-ক্ষোভ। তবে কিছু কিছু মানুষের মধ্যে ভালোর থেকে খারাপ জিনিসই বেশি, যেমন হিংসা, কিংবা রাগ বা পরশ্রীকাতর ইত্যাদি ইত্যাদি। এই বিষয়গুলো কিছু মানুষের মধ্যে এতটাই বেশি পরিমাণে থাকে যে, তাদের সঙ্গে থাকতে থাকতে নিজের জীবনটাই দুর্বিষহ এবং বিষাক্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু বাইরে থেকে দেখে বোঝার সত্যিই কোনো উপায় থাকে না। কিন্তু একটু ভালো করে বুদ্ধি দিয়ে খেয়াল করলেই এ ধরনের মানুষকে সহজেই চিহ্নিত করা যায়। আর সত্যিই যদি চিহ্নিত করা যায়, তাহলে অবশ্যই এ ধরনের মানুষের থেকে দূরে থাকা উচিত।

আশপাশে নানান ধরনের মানুষের বসবাস। সবার মধ্যেই রয়েছে হিংসা, ভালোবাসা, প্রেম কিংবা রাগ-ক্ষোভ। তবে কিছু মানুষ রয়েছে যাদের সঙ্গে থাকলে আপনার জীবন হয়ে উঠতে পারে বিষাক্ত। আত্মপ্রেমী মানুষের সঙ্গে থাকলে মানসিক যন্ত্রণায় ভুগতেই হবে। আত্মপ্রেমী মানুষ ইংরেজিতে যাদের বলে ‘নারসিসিস্ট’ তাদের থেকে দূর থাকা উচিত। নিজেকে ভালোবাসা স্বাস্থ্যকর। তবে অতিরিক্ত আত্মপ্রেমীদের আশপাশে থাকা মানুষদের গুনতে হয় চরম মূল্য।

‘নারসিসিস্ট’দের প্রথমে বেশ মনোহর মনে হবে। তবে তারা হবে ধান্দাবাজ, একগুয়ে, সহজেই অন্যকে দোষ দেবে এবং নিজের পছন্দমতো কাজ না ভাবখানা দেখা যাবে অন্যরকম। এমন কেউ যে নিজের স্বার্থে বুদ্ধির ব্যবহার করে, ন্যায়-অন্যায়, ধর্ম-অধর্মের বিচার করেন না। নিজের লাভের জন্য বা অন্যের ক্ষতির জন্য নিজের বুদ্ধির ব্যবহার করেন।

যদি কাছের কোনো মানুষের মাঝে এ ধরনের বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করেন তবে উচিত হবে তাদের থেকে নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রেখে সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়া। তবে যারা বেশি গুজব ছড়ানোর উদ্দেশ্যে গালগল্প ফাঁদে বা নিজেদের ভালো সাজানোর জন্য বানিয়ে কথা বলে, তাদের সঙ্গ মোটেই স্বাস্থ্যকর হতে পারে না। যদি এরকম মানুষের সংস্পর্শে এসে থাকেন, তবে তাদেরকে ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলা থেকে দূরে থাকুন অথবা একেবারেই এড়িয়ে চলুন।

কারও ধ্বংসাত্মক মনোভাব যদি আপনার মানসিক ক্ষতির কারণ হওয়া শুরু করে তবে অবশ্যই তাদের থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া হবে বুদ্ধিমানের কাজ। মানুষের সহানুভূতি পাওয়ার জন্য যারা আবেগ নিয়ে খেলে তাদের থেকে দূরে থাকাই ভালো। এ ধরনের মানুষ নিজেকে খুবই ভঙ্গুরভাবে উপস্থাপন করে অন্যের সহানুভূতি জোগাড় করবে। তারপর নিজের কাজ হয়ে গেলে সেই মানুষকে অগ্রাহ্য করবে। যতক্ষণ না সেই মানুষটার প্রয়োজন ফুরাচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা হয় স্বার্থপর, একগুয়ে, চাহিদা পূরণের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাবে। এ ধরনের মানুষের সঙ্গে পরিচয় থাকলে দূরে সরে যান। কারণ মনে রাখবেন আবেগ বেঁচে যারা সম্পর্ক করে তারা ভালোবাসা চায় না, তারা খালি আপনার শক্তিটাই শুষে নেবে।

মানসিক স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের ভাষায় ‘মাকিয়াভ্যালিয়জম’কে চিহ্নিত করা হয়েছে, তাদেরকে যারা অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করার সময় খুবই শীতল অনুভূতির সঙ্গে বিভিন্ন ধান্দা করে। তাদের অনুভূতি আন্তরিক নয়, থাকে সহানুভূতির অভাব। মনোবিজ্ঞানিদের সাধারণ পরামর্শ থাকে, ‘মাকিয়াভ্যালিয়ান’ মানুষের দেখা পেলেই পালিয়ে যান। তবে ঘটনাক্রমে যদি তাদের সঙ্গে থাকতেই হয় তাহলে তাদের সঙ্গে ব্যবসায়ীর মতো ব্যবহার করুন। অর্থাৎ তাকে কিছু দিতে হলে সে আপনাকে কী দেবে- সে বিষয়ে আগে নিশ্চিত হয়ে নিন। যাকে বলে ‘উইন উইন সিচুয়েইশন’।

এমন ভাবার কারণ নেই যে, সবাই সবসময় সত্য কথা বলবে। তবে যদি সন্দেহ হয় আপনার জীবনের কেউ বেশিরভাগ সময় অনুভূতি কাড়তে অতিরিক্ত মিথ্যা বলছে তাহলে সাবধান হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। অস্বাভাবিক মিথ্যাবাদীদের প্রথমে খুবই ‘চার্মিং’ মনে হবে। তারা জীবনটাকে মজারও করে তুলতে পারে। তবে একটা রেখায় এসে এ ধরনের মানুষদের সঙ্গে মেশা বন্ধ করতে হবে কিংবা কমিয়ে দিতে হবে। কারণ বিশ্বাস না থাকলে সে সম্পর্ক জোরালো হতে পারে না। এ ধরনের মানুষদের সঙ্গে তরল সম্পর্ক রাখাই ভালো। গভীরে গেলেই মরবেন।

লেখক: সাংবাদিক ও সমাজকর্মী


কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানি সম্ভাবনা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
রেজাউল করিম খোকন

ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের নামিদামি ব্র্যান্ডের বিক্রয়কেন্দ্রে ‘বাংলাদেশে তৈরি’ ট্যাগ লাগানো পোশাকের আধিক্য নতুন কিছু নয়। তবে মধ্যপ্রাচ্য, ইইউ, এমনকি আফ্রিকা অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের সুপারশপে এখন ‘বাংলাদেশে তৈরি’ প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের দেখাও মেলে। এই প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যই নতুন রপ্তানি খাত হিসেবে আশা দেখাচ্ছে। কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য অথবা কৃষিজাত পণ্য দেশের শীর্ষ পাঁচ রপ্তানি খাতের একটি। করোনার পর ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রথমবার এই খাতের রপ্তানি এক বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়। পরের বছর সেটি বেড়ে ১১৬ কোটি ডলারে উন্নীত হয়। যদিও বিদায়ী অর্থবছরে রপ্তানি ২৭ শতাংশ কমে ৮৪ কোটি ডলারে নেমেছে। এমন প্রেক্ষাপটে কৃষিজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে চায় সরকার। গত মাসে নতুন সরকারের প্রথম বৈঠকে রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং নতুন বাজার অনুসন্ধান করে সেখানে প্রবেশে কীভাবে সহায়তা করা যায়, সে বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিশেষ করে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য; পাট ও পাটজাত পণ্য এবং কৃষিজাত পণ্য এই তিনটি খাতকে তৈরি পোশাকশিল্পের বিকাশে যেভাবে সহায়তা দেওয়া হয়েছিল, প্রয়োজনে সে রকম সহায়তা দিয়ে যেন বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে বড় সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে এ খাতে। তার মধ্যে অন্যতম প্রক্রিয়াজাত খাদ্য উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন ধরনের উপকরণ উচ্চ শুল্ক দিয়ে আমদানি করতে হয়। এ ক্ষেত্রে রপ্তানিমুখী কারখানা বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধায় এসব উপকরণ শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করে। অন্য কারখানাগুলো এই সুবিধা না পেলেও নগদ সহায়তা পায়। যদিও উন্নয়নশীল দেশ হলে নগদ সহায়তা থাকবে না। ফলে ছোট-বড় সব রপ্তানিকারকের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধায় উপকরণ আমদানির সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ থেকে কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, জার্মানি, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্যসহ ১৪৪টি দেশে কৃষিজাত পণ্য রপ্তানি হয়। কৃষিজাত পণ্যের মধ্যে রয়েছে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য, তাজা ও হিমায়িত সবজি, ফলমূল ইত্যাদি। আর প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের মধ্যে মসলা, চানাচুর, ঝালমুড়ি, বিস্কুট, সস, জেলি, আলুপুরি, পাঁপর, নুডলস, চকোলেট, বিভিন্ন ধরনের আচার, জুস, ফ্রুট ড্রিংক, চিপসসহ বিভিন্ন পণ্য। কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য খাতের সম্ভাবনা নিয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক বাজারের আকার ছিল ১৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন বা ১৩ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার। আর গত বছর বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের বাজার (দেশীয় চাহিদা ও রপ্তানি) ছিল ৪৮০ কোটি ডলারের। আর কৃষিপণ্যের বাজার ছিল ৪ হাজার ৭৫৪ কোটি ডলারের।

দেশে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের প্রায় এক হাজার কারখানা রয়েছে। তার মধ্যে ৯০ শতাংশই অতি ক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র। বাকি ১০ শতাংশ মাঝারি ও বড়। এর মধ্যে রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ২৫০ কারখানা। আমাদের প্রক্রিয়াজাত খাদ্য উৎপাদনে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিনিয়ত শিখছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা মাঝেমধ্যে কারখানা পরিদর্শনে এসে কোনো ত্রুটিবিচ্যুতি পেলে উদ্যোক্তাদের জরিমানা করেন। এ ক্ষেত্রে তারা ত্রুটি চিহ্নিত করার পর তা সংশোধনের জন্য উদ্যোক্তাদের যদি সময় বেঁধে দেন এবং সেই সময় পর আবার পরিদর্শন করে যাচাই করেন, তাহলে তারা এগিয়ে যাবে। এ ছাড়া প্যাকেজিং বা মোড়ক পণ্য এবং বিভিন্ন ধরনের উপকরণ আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া হয়, তাহলে কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত পণ্যের রপ্তানি দ্বিগুণ করা সম্ভব। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, গত অর্থবছর মোট ৫ হাজার ৫৫৬ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানির মধ্যে কৃষিজাত খাদ্যপণ্যের হিস্যা ছিল দেড় শতাংশ। বাংলাদেশ এক বিলিয়ন ডলারের কৃষিজাত পণ্য রপ্তানি করলেও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এ ক্ষেত্রে বেশ এগিয়ে আছে। ভারতের কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, বিদায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছর ভারত শুধু প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানি করেছে ৭৪০ কোটি ডলারের। তার মধ্যে আমের পাল্প ১৫, প্রক্রিয়াজাত করা সবজি ৬২, প্রক্রিয়াজাত করা ফল ও জুস ৫৯, নারকেলের পণ্য রয়েছে ১৫ কোটি ডলারের। বর্তমানে বিশ্বের ২০টি দেশে বিভিন্ন ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, পানীয় ও মসলা রপ্তানি করে চট্টগ্রামভিত্তিক কোম্পানি হিফস অ্যাগ্রো ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ। গত বছর প্রতিষ্ঠানটির রপ্তানি ছিল ৩২ লাখ মার্কিন ডলার। দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানিকারক প্রাণ গ্রুপ। তারা জুস অ্যান্ড ড্রিংকস, স্ন্যাক্স, বিস্কুট, কালিনারি, কনফেকশনারি, ফ্রোজেন ফুডসসহ বিভিন্ন পণ্য ভারত, সৌদি আরব, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, ইউকে ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে। প্রাণ গ্রুপের বার্ষিক পণ্য রপ্তানি ৩০ কোটি ডলারের। তবে খুব সহজেই সেটিকে ৩০ বিলিয়নে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। এক দশক আগে ড্রাই ফুড বা শুকনা খাদ্যপণ্য রপ্তানির বাজারে ছিল হাতেগোনা কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠী। প্রাণ-আরএফএল, স্কয়ার গ্রুপ, এসিআই ফুডসসহ কয়েকটি শিল্প গ্রুপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এই বাজার। তবে বৈশ্বিক বাজারকে সামনে রেখে গত কয়েক বছরে রপ্তানিতে যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন শিল্প গ্রুপ। এসব শিল্প গ্রুপ এত দিন দেশের বাজারে খাদ্যপণ্য বাজারজাত করে আসছিল। দেশীয় বাজারের পাশাপাশি এখন রপ্তানিতে নজর দিয়েছে তারা। আবার দেশে ডলার-সংকট তৈরি হওয়ায় গ্রুপগুলো রপ্তানি বাড়াতে জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে এখনো কোম্পানিগুলোর অন্যতম লক্ষ্য বিদেশে বসবাসকারী প্রবাসী বাংলাদেশিদের বাজার। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, এক দশক আগে ২০১২-১৩ অর্থবছরে শুকনা খাদ্যপণ্যের রপ্তানি ছিল ৪ কোটি ৫২ লাখ মার্কিন ডলারের। মোট ১৭২ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান বিশ্বের ৪৩টি দেশে খাদ্যপণ্য রপ্তানি করে। এক দশকের ব্যবধানে ২০২২-২৩ অর্থবছরে শুকনা খাদ্যপণ্য রপ্তানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ কোটি ডলারে। বর্তমানে বিশ্বের ৯৩টি দেশে এসব খাদ্যপণ্য রপ্তানি করে ২১২টি প্রতিষ্ঠান। রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে বিস্কুট, কেক, মুড়ি, সেমাই, নুডলস, রুটি-পরোটা ইত্যাদি।

খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে দীর্ঘ সময় ধরে এককভাবে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। গত অর্থবছরও রপ্তানি হওয়া শুকনা খাদ্যপণ্যের ৪৯ শতাংশ একাই রপ্তানি করেছে গ্রুপটি। গত এক দশকে শুকনা খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে যুক্ত হয়েছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ, আবুল খায়ের গ্রুপ, সিটি গ্রুপ, ইস্পাহানি গ্রুপ, বসুন্ধরা ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, টি কে গ্রুপ, আকিজ রিসোর্সেস ও সামুদা গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠান। এসব বড় গ্রুপের পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও এসব পণ্য রপ্তানি করে আসছে। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই) দেড় বছর ধরে খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে নজর দিয়েছে। গ্রুপটি তিন বছর আগে মেঘনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে মেঘনা নুডলস অ্যান্ড বিস্কুট কারখানা নামে খাদ্যপণ্য তৈরির কারখানা চালু করেছে। এ কারখানা থেকে রপ্তানি শুরু হয়েছে গত অর্থবছর। বড় শিল্প গ্রুপের মধ্যে এক বছর আগে শুকনা খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে যুক্ত হয়েছে টি কে গ্রুপ। গ্রুপটি দেশে পুষ্টি ব্র্যান্ডের খাদ্যপণ্য বাজারজাত করে আসছে। রপ্তানির শুরুতে গ্রুপটি মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতে বিস্কুট, চানাচুর, সেমাইসহ নানা ধরনের খাদ্যপণ্য রপ্তানি করে। গ্রুপটির সহযোগী প্রতিষ্ঠান সামুদা গ্রুপও খাদ্যপণ্য রপ্তানি শুরু করেছে। আগে দেশের বাজারেই শুকনা খাদ্যপণ্য বাজারজাত করে আসছিল তারা। এখন মূল্য সংযোজনের জন্যই বছরখানেক ধরে রপ্তানিতে যুক্ত হয়েছে। মূলত প্রবাসী বাংলাদেশিদের লক্ষ্য করেই তাদের এই রপ্তানি। সিটি গ্রুপ আগে কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানি করলেও শুকনা খাদ্যপণ্য রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গত অর্থবছর থেকে। বিস্কুট, মুড়িসহ নানা রকমের শুকনা খাদ্যপণ্য রপ্তানি করছে গ্রুপটি। আকিজ রিসোর্সেস লিমিটেডও এক বছর আগে শুকনা খাদ্যপণ্য রপ্তানি শুরু করেছে। মূলত খাদ্যশস্য, আটা, ময়দা, আলু ও দুধ এসব এক বা একাধিক উপকরণ দিয়ে তৈরি হয় শুকনা খাদ্যপণ্য। খাদ্যপণ্য তৈরির কাঁচামালের বড় অংশই দেশে উৎপাদিত হয়। খাদ্যপণ্য তৈরির প্রধান উপকরণ গম এখনো আমদানিনির্ভর। বাকিগুলো দেশেই উৎপাদিত হয়।

রপ্তানিতে কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের একটি উপখাত হলো শুকনা খাদ্যপণ্য। কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজত পণ্যের মোট রপ্তানি বিলিয়ন ডলার থেকে কমে গত অর্থবছর ৮৪ কোটি ৩০ লাখ ডলারে নেমে আসে। এর মধ্যে শুকনা খাদ্যপণ্য রপ্তানি ছিল ২০ কোটি ডলার। এই খাতের রপ্তানি বাড়ছে। শুকনা খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক বাজার অনেক বড়। সে তুলনায় এই খাতে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো নিচের সারিতে। তবে বড় শিল্প গ্রুপগুলো এই খাতের রপ্তানিতে যুক্ত হওয়ায় এই খাতে রপ্তানি আয় বাড়ার সম্ভাবনা দেখছেন উদ্যোক্তারা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্রের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০২২ সালে শুকনা খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক বাজার ছিল ৯ হাজার ৭৭১ কোটি ডলারের। ২০২২ সালে বৈশ্বিক তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৬৪তম। এক দশক আগে ২০১৩ সালে শুকনা খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৭৭তম। দেশের বড় শিল্প গ্রুপগুলো খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে এমন সময়ে জোর দিয়েছে, যখন রপ্তানিতে নগদ সহায়তা কমিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের- এ সংক্রান্ত জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশ হবে। উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থার বিধিবিধান অনুসারে কোনো ধরনের রপ্তানি প্রণোদনা বা নগদ সহায়তা দেওয়া যায় না। তবে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর একবারে নগদ সহায়তা প্রত্যাহার করা হলে রপ্তানি খাত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যে নগদ সহায়তা ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ আগে ১০০ টাকার পণ্য রপ্তানি করলে ২০ টাকা প্রণোদনা পেতেন রপ্তানিকারকরা। এখন পাবেন ১৫ টাকা। প্রণোদনা কমানোর কারণে উদ্যোক্তারা হোঁচট খাওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, শুকনা খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশ এখনো বিশ্বে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে। এ কারণে এই খাতের উদ্যোক্তাদের সরকারের সহযোগিতা দরকার।

রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে জোর দিতে হবে। খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক বাজার অনেক বড়। তবে সীমাবদ্ধতাও আছে। উদ্যোক্তারা এগিয়ে এলে ও সরকারি সহায়তা দেওয়া হলে এটি রপ্তানির সম্ভাবনাময় খাত হয়ে উঠবে। প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশে অনেক শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে। তার জন্য কয়েকটি ফসলকে টার্গেট করে উৎপাদন বাড়াতে হবে। তা ছাড়া শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আনার জন্য ছোট, মাঝারি ও বড় কারখানাকে সুযোগ দিতে হবে। এটি করা গেলে উদ্যোক্তাদের নগদ সহায়তার কোনো প্রয়োজন হবে না। কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের রপ্তানিতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা অসীম। তবে আমরা এখনো সম্ভাবনার ১ শতাংশও কাজে লাগাতে পারিনি। শুকনা খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক রপ্তানির বাজার বিশাল। বড় শিল্প গ্রুপগুলো শুকনা খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে নজর দিয়েছে, এটি ইতিবাচক দিক। এতে সামনে রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আরও বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থার বিধিবিধানের কারণে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ হলে নগদ সহায়তা দেওয়া যায় না। এ জন্য এই খাতে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় ছোট-মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোও যাতে টিকে থাকতে পারে, সে জন্য ভারতের মতো কৌশল নেওয়া যায়। যেমন- সরাসরি প্রণোদনা না দিয়ে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা, রপ্তানি বাজার ধরার জন্য সহযোগিতা করা যায়। রপ্তানি আয় বাড়াতে নানামুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের মধ্যে রপ্তানি বাণিজ্যকে সীমাবদ্ধ না রেখে বিভিন্ন ধরনের পণ্য রপ্তানির উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। পৃথিবীর কোন দেশে কোন ধরনের পণ্যের চাহিদা রয়েছে তা জানতে হবে। এ জন্য বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাস ও মিশনগুলোকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। বিভিন্ন দেশের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। এ জন্য আমাদের রপ্তানিকারকদের নিজস্ব উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমানে যেসব দেশের সঙ্গে আমাদের রপ্তানি বাণিজ্য চালু রয়েছে তার বাইরে আরও নতুন দেশে বাজার খোঁজার চেষ্টা জোরাল করতে হবে। রপ্তানি বাণিজ্যের বিকাশ ঘটাতে হলে আমাদের উৎপাদিত পণ্যের মান উন্নত করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার কারণে বাংলাদেশি বিভিন্ন ধরনের পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন দেশে। বিশেষ করে খাদ্য ও কৃষিজাত শিল্প পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি ব্র্যান্ডের পণ্য আন্তর্জাতিক খ্যাতি পাওয়ায় এর বাজার বিস্তৃতির উজ্জ্বল সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং নতুন বাজার সৃষ্টির প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। সময়োপযোগী, কার্যকর, বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ একান্ত প্রয়োজন এ জন্য। সরকারি দপ্তরগুলোয় হয়রানি আমলতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা এবং জটিলতা অনেক সময় রপ্তানিমুখী শিল্পখাতগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ ধরনের হয়রানি, দীর্ঘসূত্রতা, প্রশাসনিক জটিলতা দূরীকরণে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বিদ্যমান বাধা দূর করতে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করে তা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সবাইকে উদ্যোগী হতে হবে। এর মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতি ভিন্ন উচ্চতায় পৌঁছে যাবে সন্দেহ নেই। এটা অর্থনীতিতে নতুন গতি এনে দিতে পারে।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার, কলাম লেখক


সমৃদ্ধির মূলে বহুমাত্রিক জ্ঞানচর্চায় মাতৃভাষা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
অধ্যাপক ড. মো. নাছিম আখতার

তেরো কোটি মানুষের দেশ জাপান। পৃথিবীর উন্নত দেশের মধ্যে জাপান অন্যতম। মাতৃভাষাকে জাপানিরা কোন মাত্রায় সম্মান করে তা বোঝা যায় তাদের মনের ভাব প্রকাশের জন্য অক্ষর ও চিহ্নের বিন্যাস থেকে। জাপানি ভাষায় কানজি হলো চিহ্ন বা ছবি। যে চিহ্ন বা ছবি দ্বারা কোনো কিছুকে প্রকাশ করা যায়, সেগুলোকে বলে কানজি। কানজি দিয়ে যে বিষয়গুলো প্রকাশ করা যায় না সেগুলো প্রকাশের জন্য জাপানিরা দুই ধরনের বর্ণ ব্যবহার করে- কাতাকানা ও হীরাগানা। মজার বিষয় হলো জাপানি সংস্কৃতি ও ভাষার শব্দগুলোকে লেখার জন্য তারা হীরাগানা বর্ণ ব্যবহার করে। তাই নিজেদের নাম লেখার জন্য তারা হীরাগানা বর্ণমালা ব্যবহার করে। আর জাপানি ভাষায় যে শব্দগুলো বিদেশি শব্দ থেকে এসেছে সেগুলো লেখার জন্য তারা কাতাকানা বর্ণমালা ব্যবহার করে। পড়াশোনা বা অন্যকোনো উপলক্ষে জাপানে গেলে বিদেশিদের নাম লিখতে গিয়ে জাপানিরা কাতাকানা বর্ণ ব্যবহার করে। এখান থেকেই ভাষা ও সংস্কৃতির বিষয়ে জাপানিদের সচেতনতা প্রতীয়মান।

জাপানে প্রাকৃতিক সম্পদের কোনো খনি নেই। তথাপি জাপানের শিল্পায়ন সবাইকে আশ্চর্যান্বিত করে। জাপান ভিনদেশ থেকে লোহার আকরিক আমদানি করে মানসম্মত স্টিল উৎপাদনে পৃথিবীতে তৃতীয়। অন্যান্য ভারী শিল্পেও জাপান পৃথিবীতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। সমৃদ্ধির উচ্চ অবস্থানে উপনীত হতে জাপান মাতৃভাষাকে শুধু মনে ধারণই করেনি বরং বহুমাত্রিক জ্ঞানচর্চায় এর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করেছে।

একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের বার্ষিক আলোচনা সভায় আমাদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন একজন স্বনামধন্য অধ্যাপক, কলামিস্ট ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব। তিনি তার বক্তব্যে মাতৃভাষা নিয়ে ফ্রান্সের মানুষের সচেতনতার কথা তুলে ধরেন। বক্তব্যে তিনি ফ্রান্সের বিখ্যাত লুভার মিউজিয়াম ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। আমরা সবাই জানি, লুভার মিউজিয়ামটি ভাস্কর্য এবং পেইন্টিংয়ের জন্য পৃথিবী বিখ্যাত। অধ্যাপক মহোদয় গিয়েছিলেন ফ্রান্সের সেই মিউজিয়াম পরিদর্শনে; কিন্তু সেখানে সব দর্শনীয় বস্তুর নিচে লেখা বর্ণনা ফরাসি ভাষায়। ফরাসি ভাষা না জানার কারণে অধ্যাপক মহোদয় ভীষণ অসুবিধায় পড়েছিলেন। এতে তিনি কিছুটা বিরক্তও হয়েছিলেন। অনন্যোপায় হয়ে গুগলের সহায়তায় ইংরেজি করে কিছুটা বুঝলেও তার কাছে বেশির ভাগ বর্ণনাই অজানা থেকে গেল। হোটেলে ফিরে তিনি হোটেলের ম্যানেজারের সঙ্গে তার এই অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত করলেন এবং বললেন, ইংরেজিতে লেখা থাকলে ভালো হতো। কথাটি শুনে ম্যানেজার বললেন, ‘এই ভাষায় জ্ঞানার্জন করেই আমরা এতটা উন্নতি করেছি। তাই আমাদের প্রজন্মকে ভাষা সংস্কৃতি থেকে দূরে রাখতে চাই না’। তখন অধ্যাপক মহোদয় ম্যানেজারকে জিজ্ঞাসা করলেন, তাহলে আপনারা বিশ্বের নতুন সৃষ্ট জ্ঞান কীভাবে গ্রহণ করেন? উত্তরে হোটেল ম্যানেজার বললেন, ‘প্রয়োজনীয় সব নতুন জ্ঞানই আমাদের কাছে অল্প সময়ের মধ্যে ফরাসি ভাষায় মুদ্রিত হয়ে পৌঁছে যায়।’ তিনি মুচকি হেসে বলেছিলেন, ‘জ্ঞান সারা বিশ্বের, কিন্তু তা অর্জনের ভাষা একান্তই আমাদের।’ হোটেল ম্যানেজারের এমন বক্তব্য প্রমাণ করে যে ফরাসিরা নিজের ভাষা ও সংস্কৃতি দিয়ে কীভাবে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় গ্রহণ করেছে।

ইতিহাস বলে, মুসলিম চিকিৎসাবিদদের জ্ঞান ল্যাটিন ও ইউরোপের সব ভাষায় তৎকালীন সময়ে অনুবাদ করা হয়েছিল। আবু বকর মুহাম্মদ বিন জাকারিয়া আল রাজি ছিলেন মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ চিকিৎসাবিদদের অন্যতম। মানুষের কিডনি ও পিত্তথলিতে পাথর কেন হয় সে সম্পর্কে তিনি মৌলিক তথ্যপূর্ণ বই লিখেছিলেন। তার লেখা বই ‘আল জুদরি ওয়াল হাসবাহ’ ল্যাটিন ও ইউরোপের সব ভাষায় অনূদিত হয়। তার সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান হচ্ছে ‘আল হাবি’। এতে সব ধরনের রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। বইটিতে তিনি প্রতিটি রোগ সম্পর্কে প্রথমে গ্রিক, সিরীয়, আরবি, ইরানি ও ভারতীয় চিকিৎসা প্রণালির বিস্তারিত বর্ণনা দেন। তারপর নিজের মতামত ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন। মধ্য এশিয়ার আল আসুলি নামক একজন লেখক ফার্মাকোলজির একটি বই লিখেছিলেন। তার বইয়ের অর্ধেকটা ছিল ‘ডিজিজেস অব দ্যা রিচ’, বাকি অর্ধেক ছিল ‘ডিজিজেস অব দ্যা পুওর’। ইউরোপে ল্যাটিন অনুবাদে ৭০০ বছর এটা পাঠ্যবই হিসেবে চলেছে।

ইউনেস্কোর বর্ণনায় মাতৃভাষা ভাবের আদান-প্রদানের মাধ্যমের চেয়েও বেশি কিছু। এটা আমাদের মানবিকতা বিকাশের পূর্বশর্ত। আমাদের বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং পরিচয় মাতৃভাষার মধ্যে নিহিত। মাতৃভাষায় কথা বলার সময় মন, মস্তিষ্ক ও জিহ্বার মধ্যে একটি সরাসরি সম্পর্ক ও সমন্বয় তৈরি হয়। সর্বস্তরে মাতৃভাষার ব্যবহার শুধু আবেগ ও অনুভূতির বিষয় নয়- গবেষণা বলছে, মাতৃভাষায় শিক্ষা জ্ঞানের ভিত্তি উন্নয়ন, মানসিক উৎকর্ষতা, ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

রুশ মনোবিজ্ঞানী লিও ভিগোতস্কি। তিনি শিশুদের মানসিক বিকাশ নিয়ে কাজ করার জন্য বিখ্যাত। তিনি তার গবেষণায় প্রমাণ করেছেন, শিশুরা মনোযোগ, সংবেদনশীলতা, উপলব্ধি এবং স্মৃতি নিয়ে জন্মায়। একজন শিশু মাতৃগর্ভে থাকাবস্থায় শুনতে পায় এবং মাতৃভাষার শ্রুতিমধুরতা উপলব্ধি করে। যা শিশুর ব্যক্তিত্ব, চিন্তা এবং জীবন বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ইতালীয় ইলেক্ট্রো ফিজিওলজিস্ট এলিস মাদো প্রোভারিও গবেষণার মাধ্যমে দেখিয়েছেন মাতৃভাষা ও পরবর্তী সময়ে শেখা ভাষা গ্রহণ করা ও মনে রাখার ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে বৈদ্যুতিক তরঙ্গ ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় প্রবাহিত হয়। মাতৃভাষায় কথা বলা ও কিছু ভাবার ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক তরঙ্গ শক্তিশালী ও বর্ধিত আকারে প্রতিভাত হয়। তিনি বলেন, ‘এ জন্যই আমরা স্বপ্ন দেখি, চিন্তা করি এবং আবেগকে অনুভব করি নিজ মাতৃভাষায়।’ মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণা, সামাজিক প্রেক্ষাপট ও শিখন অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিখন গভীরতর, দ্রুত ও কার্যকর হয়। মাতৃভাষার অসম্পূর্ণ শিখন অন্য ভাষা শিক্ষায় বাধা সৃষ্টি করে।

পৃথিবীতে ভাষার সংখ্যা প্রায় সাত হাজার। এগারটি ভাষা সর্বাধিক ব্যবহৃত হয়। চীনা, ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, স্প্যানিশ, আরবি, রুশ, বাংলা, জার্মান, জাপানি, ফরাসি-বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও বৃহৎ জাতিগোষ্ঠী এই ভাষাগুলো ব্যবহার করে। বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩৫ কোটি। এমন বৃহৎ জনগোষ্ঠীর পড়াশোনা প্রাইমারি থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বাংলায় বাস্তবায়ন না করতে পারাটাই আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণ ছাড়া জাতি কখনো প্রকৃত জ্ঞান অনুরাগী হয়ে গড়ে উঠবে না। উচ্চশিক্ষার মাধ্যম মাতৃভাষা হলে জনগোষ্ঠীর সিংহভাগের অন্তর্ভুক্তি সম্ভব যেকোনো জ্ঞানচর্চা ও গবেষণায়। গবেষণার উন্নয়ন অর্থ জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নয়ন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতি মানে শিল্প ও প্রযুক্তির উন্নয়ন। বিষয়টি গভীরভাবে উপলব্ধি করলেই ঘটবে জাতির অর্থনৈতিক ও নৈতিক উন্নয়ন।

লেখক: উপাচার্য, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়


কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তন ও কীটনাশকের হুমকি!

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
সমীরণ বিশ্বাস

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে লবণাক্ততা ঝড়-ঝঞ্ঝা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, উচ্চ তাপমাত্রা, ফ্ল্যাশ-ফ্ল্যাট ইত্যাদির তীব্রতা ত্বরান্বিত করে। বাংলাদেশে আয় ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অনন্য অবদানকারী হলো- কৃষিক্ষেত্র। শস্য উৎপাদন গ্রামীণ আয় বৃদ্ধি করে এবং দরিদ্র মানুষের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। সব কৃষি কাজের ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব কৃষিকে চরম ঝুঁকির ভিতর ফেলছে! গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রতিনিয়ত বৃদ্ধির কারণে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। এর প্রভাবে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাচ্ছে, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং চরম ভাবাপণ্য জলবায়ুর পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্রতা পৃথিবীব্যাপী জনসংখ্যার বৃদ্ধি এবং কৃষি সম্পদ কমে যাওয়ায় খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে।

গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি, উচ্চ দ্রাঘিমাংশে ফসল উৎপাদনের সময় বেড়ে যাবে তবে ফলন বৃদ্ধি পাবে, নিম্ন দ্রাঘিমার অব-উষ্ণ ও উষ্ণ এলাকায়, যেখানে বর্তমানে গ্রীষ্মকালীন দাবদাহে ফলন কমে যাচ্ছে, সেখানে আরও কম ফলন হবে, মৃত্তিকা পানি বাষ্পীভবনের বৃদ্ধিতে ফলন কমে যাবে। (সূত্র : IPCC2007 & US EPA2011)। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ও নিয়ম পরিবর্তন -মৃত্তিকা ক্ষয় ও মৃত্তিকা বাষ্পতে প্রভাব ফেলে- ফলন কমিয়ে দেবে। উচ্চ দ্রাঘিমায় বৃষ্টিপাত বেশি হবে এবং বেশির ভাগ নিম্ন দ্রাঘিমার অব-উষ্ণ এলাকায় কম হবে (২০% পর্যন্ত) যা দীর্ঘকালীন খরার সৃষ্টি করবে। ভূপৃষ্ঠের কার্বন ডাইঅক্সাইডের ঘনত্ব বাড়বে, কিছু ফলনের বৃদ্ধি বেশি হবে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যান্য ক্ষতিকর প্রভাবে উচ্চ তাপমাত্রা এবং বৃষ্টিপাত এটিকে ছাড়িয়ে যাবে। ট্রোপোস্পেয়ারিক ওজন দূষিতপর্যায়ে- কার্বন ডাইঅক্সাইড বৃদ্ধির কারণে, খারাপ ওজন বৃদ্ধি পাবে যা জীবন্ত কোষ-কলার ও অন্যান্য পদার্থের ক্ষতি করবে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে, যার ক্ষতিতে কার্বন ডাইঅক্সাইড বৃদ্ধি পাবে, ফলে ফসলের বৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে যাবে।

কৃষিতে উষ্ণতা বা তাপমাত্রার ক্ষতিকারক প্রভাব

তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ফসলের ফলন কমে যাবে। ফসলে অনাকাঙ্ক্ষিত রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ বেড়ে যাবে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ফসলের জমিতে পরাগী প্রজাপতির পরিভ্রমণ ১৪ শতাংশ হ্রাস পায়। সার্বিকভাবে পরভোজী ও পরাগী প্রজাপতির সংখ্যা কমার কারণে ব্যাপক ফসল হানি ঘটে।

কৃষিতে শৈত্যপ্রবাহের ক্ষতিকারক প্রভাব

বাংলাদেশ ক্রমান্বয়ে শীতকালের ব্যক্তি ও শীতের তীব্রতা দুই-ই কমে আসছে। এতে ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং ফলন হ্রাস পাবে। ফসলের পরাগায়ণ ব্যাহত হবে। অতি ঠাণ্ডায় আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ ইত্যাদি ফসলের উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে যাবে।

কৃষিতে লোনা পানির অনুপ্রবেশ ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির ক্ষতিকারক প্রভাব

উজান থেকে পানিপ্রবাহ বাধা ও কম বৃষ্টিপাতের কারণে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত জমির পরিমাণ বাড়ছে যা ভবিষ্যতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং পরিমিত বৃষ্টিপাতের অভাবে আরও বেশি সমস্যার সৃষ্টি করবে। লবণাক্ত অঞ্চলের মাটি কর্দমাক্ত হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে মাটি শক্ত হয়ে যায়। লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে কৃষি ও জীববৈচিত্র্য। খাবার পানি, সেচের পানির সংকট দেখা দেবে। মারা যাবে সাধু পানির মাছ। চিংড়ি প্রজাতির বৈচিত্র্যে আসবে পরিবর্তন, ক্ষতিগ্রস্ত হবে মৎস্যজীবীসহ সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা। জলবায়ুর পরিবর্তন অব্যাহত থাকলে ভাঙাগড়ার এ ভারসাম্য দিন দিন আরও প্রকট হবে।

কৃষিতে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারের প্রভাব

রাসায়নিক কীটনাশক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব একাধিক উপাত্তের মধ্যে রয়েছে। পরিবর্তিত আবহাওয়ায় বৃষ্টি, তাপমাত্রা, আবহাওয়া এবং কৃষি মাটি ইত্যাদির সঙ্গে মিলে; তাদের মধ্যস্থ কার্বন নির্গমন বাড়িয়ে, ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে, সার্বিক কৃষি কার্যক্রমকে, দিন দিন অস্বাভাবিক করে তুলছে। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি মানুষ হৃদরোগ ও স্ট্রোকে মারা যায় এবং এর পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ খাদ্যে বিষক্রিয়া। অযাচিত রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটির উর্বরতাও কমছে। এ অবস্থায় প্রাণী ও প্রকৃতি-পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এই কীটনাশকটি ব্যবহার বন্ধ করার বিকল্প নেই। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্ল্যান্ট প্রটেকশন বিভাগের এক সূত্র বলছে, দেশে ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রায় ৪২ হাজার টন বালাইনাশক ব্যবহৃত হয়েছে। তবে এর জন্য চরম মূল্য দিতে হয় প্রকৃতি ও পরিবেশকে। কারণ এর ধারাবাহিক প্রয়োগে নষ্ট হয় মাটির গুণাগুণ। মরে যায় উপকারী অনুজীব। অন্যদিকে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে মানবদেহে ঢুকে তৈরি করে ক্যানসার-হাঁপানির মতো জটিল রোগব্যাধি। মানুষের প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস করে। শিশুর বিকলাঙ্গতা তৈরি করে। তাদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে। জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউটের করা সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর এক-তৃতীয়াংশই কৃষক। রাসায়নিক কীটনাশক বিক্রির ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠিন নজরদারি এবং অভিযান পরিচালনা করা এখন সময়ের দাবি। এর যথাইচ্ছা ব্যবহার বন্ধ না করা গেলে মানবদেহ ও প্রকৃতির ক্ষতি আরও বাড়বে।

দাবদাহ, খরা, বন্যা ও হারিকেনের তীব্রতা ও সংখ্যা বেড়ে কৃষিতে অনিশ্চয়তার নিয়ামক বৃদ্ধি পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পৃথিবীর ৬.৭ বিলিয়ন জনসংখ্যার প্রায় ৪০% (২.৫ বিলিয়ন) কৃষির ওপর তাদের জীবিকা নির্বাহ করছে, যারা সমূহ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। এসব ক্ষতি এড়াতে বর্তমান কৃষি কৌশল পরিবর্তন করতে হবে এবং নতুন প্রযুক্তি ও জাত উদ্ভাবন করে সমস্যা কবলিত পরিস্থিতি ও গ্রিনহাউস গ্যাস নিয়ন্ত্রণে রেখে বেশি ফলন ফলাতে হবে।

লেখক: কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, ঢাকা।


banner close