বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

ট্রেন মিস করা বিএনপির রাজনীতির গন্তব্য

শেখর দত্ত
প্রকাশিত
শেখর দত্ত
প্রকাশিত : ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ ০৯:৪২

৭ জানুয়ারি ২০২৪ দ্বাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচনের আগে বিএনপি ‘সরকার পতন’-এর একদফা সামনে রেখে যুদ্ধংদেহী উগ্রতা নিয়ে মাঠে নেমেছিল। নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি সামনে রাখলেও দলটি সেই সরকারের কোনো রূপরেখা জনগণের সামনে দিতে পারেনি। পারবে কেমন করে! সেই পদ্ধতিতে প্রথম পেরেক থেকে শেষ পেরেক পুঁতেছিল তো সেই দলই। প্রথম পেরেকটি পোঁতে ২০০১ সালের লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আর শেষ পেরেক পুঁতেছে ২০০৬ সালে পুতুল ইয়াজউদ্দিন সরকারকে সামনে রেখে। এই বিষয়গুলো ধামাচাপা দিতেই বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা দেয়নি। দলটি নিয়মতান্ত্রিক পথে না গিয়ে যায় সরকার পতনের দাবি সামনে রেখে নির্বাচন ভণ্ডুলের সর্বনাশা লাইনে।

বিস্ময় ও হতবাক হওয়ার মতো বিষয় হচ্ছে, বিএনপির প্রধান নেতা তারেক রহমান, যাকে বলা হচ্ছে ‘দেশনায়ক’, তিনিই পালিয়ে রয়েছেন লন্ডনে। বহাল তবিয়তে সেখানে থেকে জনগণ ও নেতা-কর্মীদের মনমেজাজ না বুঝে আদেশ-নির্দেশে সর্বনাশা সব করতে তৎপর থেকেছেন। ফলে যা হবার তাই হয়েছে। বাস্তবে যে আগুনসন্ত্রাস দিয়ে বিএনপি নির্বাচন ভণ্ডুল করতে চেয়েছিল, সেই আগুনেই ২০১৪ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সময়ের মতো এখন দগ্ধ হচ্ছে বিএনপি। এটা কার না জানা যে, সরকারকে গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে সরিয়ে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার প্রতিষ্ঠা কিংবা বিদ্যমান বাস্তবতায় সংবিধান বহির্ভূত শক্তিকে ক্ষমতায় আনা যে কঠিনতম কাজ, তা নিজ কৃতকর্মে অভিযুক্ত ও শাস্তিপ্রাপ্ত তারেক রহমানের বুঝতে পারা সম্ভব ছিল না। শুরু থেকেই বিএনপির ‘দেশনায়ক’ রাজনীতিতে অপরিপক্ব, অবিবেচক ও অপরিণামদর্শী।

একটু খেয়াল করলেই স্মরণে আসবে যে, নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণার পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজি হাবিবুল আওয়াল বলেছিলেন, ‘নির্বাচনে অংশ নিতে বিএনপিকে বার বার অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু দলটি রাজি হয়নি।… তবে বিএনপি নির্বাচনে যোগ দিতে চাইলে আগামী সংসদ নির্বাচন পুনঃতফসিল করা যেতে পারে।’ বিএনপি সেই অপশন গ্রহণ করেনি, নির্বাচন বয়কট করেছে। বিএনপি নেতৃত্বের ধারণা ছিল, একদিকে সমাবেশ আর অন্যদিকে নাশকতা যতটা করা যাবে, ততই বিদেশিরা নাক গলাবে। তাতে অস্থিরতা-অরাজকতা, অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা সম্ভব হবে। নাশকতার বিষয়টি যেহেতু গোপন, তাই সরকারের ওপর দোষ চাপানোরও সুযোগ পাওয়া যাবে। ঘোলা পানিতে শিকার করা মৎসটা হবে তাদের!

বিএনপির আরও একটি হিসাবে বড় ভুল ছিল। বিএনপি মনে করেছিল, বয়কট করলে নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হবে না। অপরদিকে নাশকতাজনিত ভয়ভীতিতে ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে আসবে না। খুবই কম ভোট পড়বে। নির্বাচন হাস্যকর হবে। বিদেশিদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না নতুন সরকার। স্বীকৃতি নিয়ে বিপাকে পড়বে। রাজনৈতিক সংকট শিখরে উঠবে। সেই সুযোগে বিএনপি আপসহীন শক্তিরূপে জনগণের হৃদয়মন জয় করে নেবে। বিধ্বস্ত বিএনপি নবরূপে রাজনীতির মাঠে আসর জেঁকে বসবে।

বিএনপির এই হিসাব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক চালে তছনছ করে দিয়েছেন। ধারণা করি দলে বিভক্তি-বিবাদ বাড়বে বিবেচনায় নিয়েও দলীয় নেতাদের বিদ্রোহী হয়ে দলের প্রতীকের বিরুদ্ধে নির্বাচন করার সুযোগ করে দিয়েছেন। রাজনীতিতে আশু লাভটাই বড়। ফলে এক ঢিলে দুই পাখি মরেছে। বিভিন্ন আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোট হওয়ায় বিএনপির হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিয়েছেন আর অন্যদিকে জনগণকে দিয়ে তৃণমূলে প্রকৃত জনপ্রতিনিধি বের করে এনেছেন। এই কৌশল গ্রহণের ভেতর দিয়ে দেশেরও লাভ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুঝিয়ে দিয়েছেন, জনগণের পক্ষে কাজ না করলে, জনগণ পক্ষে না থাকলে এমপি নির্বাচিত হওয়া অসম্ভব।

নির্বাচনের পরও বিএনপি নেতারা ‘পাগল’ নয়তো ‘শিশু’র মতো কথাবার্তা বলছেন, আন্দোলনের কর্মসূচি দিয়ে যাচ্ছেন। কখনো মনে হচ্ছে কথা ও কাজ অবুঝ বালকের মতো, আবার কখনো মনে হচ্ছে প্রলাপ বকে চলেছেন, পাগলামি করছেন। নির্বাচনের পর দিন রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের অফিসে সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খান বলেছেন, আওয়ামী লীগের নাকি ‘নৈতিক পরাজয়’ হয়েছে! তিনি আরও বলেছেন, ‘সরকারকে বিদায় নিতে হবে।’ ‘কারও গায়ে হাত দেবে না বিএনপি’ এমন মন্তব্য করে বলেছেন, ‘জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পন্থায় আন্দোলন চালিয়ে যাবে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো।’

বিএনপি নেতা যখন এসব বললেন তখন আওয়ামী লীগ ছিল বিজয়ের আনন্দে। বাস্তবে বিগত ১৫ বছরে দৃশ্যমান উন্নয়ন ও ডিজিটাল দেশ হওয়ার সুফল জনগণ পাচ্ছে বিধায় আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতা-কর্মী-সমর্থক ও জনগণ রয়েছেন সাফল্য ও অর্জনের আনন্দের চূড়ায়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে শত চেষ্টা করেও বিএনপি নির্বাচন ভণ্ডুল করতে না পারায় ওই আনন্দ ছিল আকাশচুম্বি। বিজয়ী দূরদর্শী নেত্রী শেখ হাসিনা বিজয় মিছিল করতে যদি মানা না করতেন, তবে বিএনপি নেতৃত্ব দেখতে পারতেন, আওয়ামী লীগের ‘নৈতিক পরাজয়’ হয়েছে নাকি সত্যিকারের বিজয় হয়েছে। নৈতিক বিজয় দেখাতে বিজয় মিছিল করতে না দিয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনা বিএনপিকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন।

বিএনপি বলছে দলটি ‘কারও গায়ে হাত’ দেয় না, ‘শান্তিপূর্ণভাবে সরকার পতনের আন্দোলন’ চালিয়ে যাবে। কথাটা শুনেই এমন প্রবাদ মনে পড়ে: ঠাকুর ঘরে কে রে আমি কলা খাই না। বলুন তো বিএনপি নেতারা, আপনাদের প্রতিষ্ঠাতা নেতা সেনাশাসক জিয়া ক্যু-পাল্টা ক্যু খেলায় কার কার গায়ে হাত দিয়েছিলেন, কতটা রক্ত ঝরিয়েছিলেন! হত্যা আর ক্যুয়ের রাজনীতির ধারা শুরু করেছিলেন তো তিনিই। অপর সেনা স্বৈরশাসক এরশাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলন ছিল হত্যা-ক্যু, প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অন্দোলন।

ওই আন্দোলনে শামিল থেকে বিএনপি সুযোগ পেয়েছিল জিয়ার হত্যা-ক্যু ও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সামরিক শাসনের অপশাসনের প্রায়শ্চিত্ত করার। কিন্তু খালেদা জিয়া-তারেক জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে সক্ষম হয়নি। কেন না কয়লা ধুলেও ময়লা যায় না। পরবর্তীতে খালেদা জিয়ার আমলে লালবাগের সাত খুন এবং খালেদা-নিজামির শাসনামলে কিবরিয়া, আহসানউল্লাহ মাস্টারসহ রাজনীতিক-বুদ্ধিজীবী খুন হওয়ার ঘটনা আজও জনগণ ভুলে যায় নাই। কোটালীপাড়ায় বোমা পুঁতে রাখা হয়েছিল কেন? বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে গ্রেনেড হামলা? জননেত্রী শেখ হাসিনাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল বিএনপি। তারেক-বাবর-সালাম জুটি তথা হাওয়া ভবনকে ভুলবে না জনগণ।

বলা হয়েছিল বাংলাভাই মিডিয়ার সৃষ্টি। বাংলাভাই আর মুফতি গংদের লেলিয়ে দিয়ে সিরিজ বোমা হামলা থেকে শুরু করে ব্রিটিশ হাইকমিশনারকে পর্যন্ত মারতে চেয়েছিল বিএনপি। ২০১৪ সালের নির্বাচন-পূর্ব সময়ে আন্দোলনের নামে আগুনসন্ত্রাসে কতজন প্রাণ হারিয়েছিলেন, তা মনে করুন না বিএনপি নেতারা! এখন আপনারা বলছেন কারও গায়ে হাত দেবেন না। মানবাধিকার-গণতন্ত্র নিয়ে চেঁচামেচি করছেন। বিদেশিদের উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

বিএনপি দলটি প্রকাশ্যে বলেছে , ‘কারও গায়ে হাত দেবে না।’ ‘শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চলবে।’ কিন্তু বাস্তবে বিএনপি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পথ ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করেছে। সাংবিধানিক শাসন যখন বলবৎ থাকে, তখন বিরোধী দলের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অর্থ দাঁড়ায় সংসদের ভেতরে-বাইরে আন্দোলন, ‘স্যাডো কেবিনেট’ গঠন করে সরকারের পাল্টা রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক কর্মসূচি প্রদান এবং ৫ বছর পরে নির্বাচনে অংশ নেওয়া। কিন্তু বিএনপি নীতি-কৌশল নিয়েছে, নির্বাচনের আগেই সরকারের পতন ঘটানো। এই অবস্থায় প্রশ্ন হলো, বিএনপি ‘মুখে শেখ ফরিদ বগলে ইট’ রাখছে না তো! ধারাবাহিক ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে বিএনপি যদি আগের মতোই রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে এগোতে থাকে, তবে তা হবে আগুন নিয়ে খেলারই নামান্তর।

বিগত ৬ ফেব্রুয়ারি বিএনপি রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে ‘সরকারের ব্যর্থতা’র তীব্র সমালোচনা করে বলেছে, সরকার নতজানু পররাষ্ট্র নীতি গ্রহণ করছে এবং তা স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব হুমকির সম্মুখীন। এখানেও জিয়া ও খালেদা জিয়ার আমলের ইতিহাস ভুলে বিএনপি আগুন উসকে দিতে সচেষ্ট থাকছে। ইতিহাস বলে ১৯৭৮ সালে মিয়ানমার সেনা সরকার ‘বহিরাগত তাড়ানো’র নামে ‘অপারেশন কিং ড্রাগন’-এর মাধ্যমে হত্যা, ধর্ষণ, গ্রাম ধ্বংস, জমি কেড়ে নেওয়া প্রভৃতি শুরু করে। তখন নির্যাতিত রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ শুরু করে। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে শুরু করে ‘অপারেশন ক্লিন অ্যান্ড বিউটিফুল’ অপারেশন। ৯ জুলাই ১৯৯২ দৈনিকগুলোর খরবে জানা যায় ২ লাখ ৭০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। অখাদ্য খেয়ে রোগে কত রোহিঙ্গা শরণার্থী মারা গিয়েছিল? ওই দুই সময়ে কারা ছিল ক্ষমতায়- বলুন না বিএনপি নেতারা!

সেনাশাসক জিয়া এবং প্রধানমন্ত্রী খালেদা তখন সফল নাকি ব্যর্থ ছিল! নতজানু পররাষ্ট্র নিয়ে কোনো কথা বিএনপির নেতাদের মুখে মানায় না। খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রিত্বকালে সেপ্টেম্বর ১৯৯২ ভারত শুরু করে ‘অপারেশন পুশব্যাক’। ২৯ সেপ্টেম্বর বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা এক বিবৃতিতে অপারেশন পুশব্যাক সম্পর্কে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তখন কি করেছিল সরকার! নতজানু কতটুকু হয়েছিল, তা কি মনে করতে পারেন বিএনপি নেতারা! ক্ষমতায় থাকলে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব আর বিরোধী দলে থাকলে বিরোধিতা এবং এমনকি ‘ফেনী পর্যন্ত ভারত নিয়ে যাবে’ বলা কোন্ ধরনের দ্বিমুখীনতা!

বাস্তবে পাকিস্তানি আমলে পরিত্যক্ত ভাবাদর্শ নিয়ে গড়া দল বিএনপি নির্বাচনী ট্রেন মিস করে বিপদে পড়ে আয়নায় নিজের মুখ না দেখে মিথ্যা ইতিহাস, অসাড় কৌশল নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। নিজেদের ব্যর্থতা ও পরাজয় বিবেচনায় নিচ্ছে না বিএনপি। দলটি বুঝতে পারছে না যদি নীতি-কৌশল পরিবর্তন না করে যদি একইভাবে অগ্রসর হতে থাকে তবে ৫ বছর পর নিজের পাতা অক্টোপাসের ফাঁদে নিজেই আরও বেশি করে আটকা পড়বে। সংসদের প্রথম অধিবেশনে মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের দিক বিবেচনায় নিয়ে বলেছেন, ‘কেউ যাতে আন্দোলনের নামে অরাজকতা সৃষ্টি করে মানুষের জানমাল ও জীবিকার ক্ষতিসাধন না করতে পারে, সেদিকে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। সব গুজব ও অপপ্রচার বিষয়ে নজরদারি বৃদ্ধি করে জনগণকে সম্পৃক্ত রেখে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।’

একই সঙ্গে অর্থনৈতিক সংকট ও অনিশ্চয়তার বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, ‘আর্থিক খাতের সংস্কার এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।’ বাস্তবে রাষ্ট্রপতি কথিত উল্লেখিত ‘হবে’গুলোকে বিবেচনায় নিয়ে সরকার যদি নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী সুশাসন ও কর্মসংস্থান সুনিশ্চিত এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার দিকে দেশকে এগিয়ে নিতে পারে, তবে আওয়ামী লীগ আরও চাঙ্গা হয়ে উঠবে। তখন আম-ছালা দুই-ই যাবে বিএনপির।


ডায়াবেটিস প্রতিরোধের এখনই সময়

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির (বাডাস) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রতি বছরের মতো এবারও পালিত হচ্ছে জাতীয় ডায়াবেটিস সচেতনতা দিবস। ১৯৫৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি প্রতিষ্ঠা হয়। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সচেতন করে তুলতেই বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি তার প্রতিষ্ঠা দিবসকে ডায়াবেটিক সচেতনতা দিবস হিসেবে পালনের উদ্যোগ নেয়। এই দিবসটি পালনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে ডায়াবেটিস রোগের লক্ষণ, চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণ রাখার জন্য প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পর্কে গণসচেতনতা বৃদ্ধি করা। দিবসটির এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘ডায়াবেটিস প্রতিরোধের এখনই সময়’।

ডায়াবেটিস বর্তমানে একটি মহামারি রোগ হিসেবে চিহ্নিত এবং এই রোগ সারা জীবনের রোগ। নিয়ন্ত্রণে থাকলে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা যায়; কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের জটিলতা অনেক। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ডায়াবেটিস বৃদ্ধির হার বেশি। ২০০৩ সালে সারা বিশ্বে ডায়াবেটিক রোগী ছিল ১৯ কোটি। আগামী ২০৩০ সালে তা বেড়ে দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। উন্নত বিশ্বের অধিকাংশ দেশে ডায়াবেটিসকে মৃত্যুর চতুর্থ প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। সুতারাং প্রতিদিন যেমন ডায়াবেটিক রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে তেমনি, বাড়ছে ডায়াবেটিক রোগীদের নানা ধরনের জটিলতা।

ডায়াবেটিস মারাত্মক এবং প্রাণঘাতী রোগ। যা ব্যক্তি এবং তাদের পরিবার, সেই সঙ্গে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও জাতীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। আইডিএফ ডায়াবেটিস অ্যাটলাস ডায়াবেটিসের বৈশ্বিক প্রভাব সম্পর্কে সর্বশেষ যে পরিসংখ্যান এবং তথ্য দিয়েছে তাতে দেখা যায়- ২০২১ সালে ৫৩.৭ কোটি মানুষ (প্রতি ১০ জনে একজন) ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন। ২০৩০ সালের মধ্যে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৬৪.৩ কোটিতে এবং ২০৪৫ সালে ৭৮.৩ কোটিতে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ২৪ কোটি মানুষ (প্রতি ২ জনে ১ জন) জানেন না, তারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। তাদের অধিকাংশই টাইপ-২ ডায়াবেটিস আক্রান্ত। ১২ লাখেরও বেশি শিশু ও কিশোর (০-১৯ বছর) টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। ২০২১ সালে বিশ্বের ৬৭ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসের কারণে মৃত্যুবরণ করেন। ২০২১ সালে ৯৬৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয় ডায়াবেটিসের কারণে, যা বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতে মোট ব্যয়ের ৯%।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ফেডারেশনের সাম্প্রতিক তথ্য মতে, পৃথিবীতে প্রতি দশ সেকেন্ডে একজন ডায়াবেটিস রোগীর মৃত্যু হয় এবং দুজন নতুন ডায়াবেটিস রোগী শনাক্ত হয়! বর্তমানে বিশ্বে ডায়াবেটিসকে মহামারি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা দুটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন তা হচ্ছে- দৈনন্দিন জীবনে আমাদের শারীরিক সক্রিয়তা কম এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য গ্রহণ না করা। বংশগত কারণ ছাড়াও নগরায়ণ ও পরিবর্তিত জীবনধারণের কারণেই ডায়াবেটিক রোগীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে নগরায়ণের ফলে পরিবর্তিত জীবনযাপনের কারণে সারা বিশ্বেই ডায়াবেটিক রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। তবে বৃদ্ধির এই হার উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশে বেশি। বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা যায়, গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত নারীদের প্রায় অর্ধেক পরবর্তীতে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন। এমনকি অপরিকল্পিত গর্ভধারণের কারণে শিশু অপুষ্টির শিকার হলে এবং সেই শিশু পূর্ণবয়স্ক হওয়ার পর অতিরিক্ত ওজন হলে তার ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেশি থাকে। ডায়াবেটিসের ঝুঁকি থেকে বাঁচতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

ডায়াবেটিস সম্পর্কে সচেতনতার অভাবে প্রতিবছর অসংখ্য মহিলা ডায়াবেটিসের স্বীকার হচ্ছেন এবং ডায়াবেটিস নিয়ে শিশু জন্ম দিচ্ছেন অথবা নবজাতক শিশুর বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিচ্ছে। প্রতিটি গর্ভবতী মা যদি গর্ভধারণের আগেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সন্তান জন্ম দিতে পারেন তবে সন্তান সুস্থভাবে জন্ম দিতে পারবেন এবং মায়ের ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকবে। বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি গর্ভকালীন ডায়াবেটিস প্রতিরোধে গর্ভধারণ-পূর্ব সেবা দিতে বিশেষ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এরই মধ্যে সারা দেশে ‘গর্ভধারণ-পূর্ব সেবা কেন্দ্র’ খোলা হয়েছে যেখানে নির্ধারিত সময়ে বিনামূল্যে গর্ভধারণ-পূর্ব পরামর্শ এবং স্বল্পমূল্যে গর্ভধারণ সংক্রান্ত সেবা পাওয়া যাবে। এর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি প্রসবকালীন নারী ও শিশুমৃত্যুর হার যেমন কমানো সম্ভব হবে, তেমনি নারীসহ আগামী প্রজন্মকেও ডায়াবেটিসের ভয়াবহ প্রকোপ থেকে অনেকাংশে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

ডায়াবেটিসের সম্ভাবনা বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে-

 কায়িক পরিশ্রম না করা

 মোটা বা স্থূলকায় হয়ে যাওয়া

 অতিমাত্রায় ফাস্টফুড খাওয়া ও কোমল পানীয় (সফট ড্রিংকস) পান করা।

 অতিরিক্ত মানসিক চাপের মধ্যে থাকা

 ধূমপান করা ও তামাক (জর্দ্দা, গুল, খৈনী, সাদাপাতা) খাওয়া

 গর্ভকালীন বিভিন্ন সমস্যা

 যাদের বাবা-মা অথবা রক্ত সম্পর্কীয় নিকটাত্মীয়ের ডায়াবেটিস আছে এবং যাদের বয়স ৪৫ বছরের বেশি তাদের ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কাজেই ডায়াবেটিস সম্পর্কে তাদের অধিকতর সতর্ক থাকা দরকার।

ডায়াবেটিসে মাড়ির সমস্যা:

ডায়াবেটিস রোগের জন্য দাঁতের মাড়ি এবং হাড়ে (যা দাঁতকে যথাস্থানে রাখতে সাহায্য করে) ইনফেকশন হতে পারে। অন্যান্য ইনফেকশনের মতো রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বেড়ে গেলে দাঁতের মাড়িও আক্রান্ত হতে পারে। এই সমস্যাকে প্রতিরোধ করার জন্য বছরে অন্তত দু’বার ডেন্টিস্টের শরণাপন্ন হওয়া উচিত এবং অবশ্যই ডাক্তারকে আপনার ডায়াবেটিস সম্পর্কে অবহিত করা প্রয়োজন। দিনে দুবার দাঁত ব্রাশ ও ডেন্টাল ফ্লস দ্বারা পরিষ্কার করা এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ রাখা প্রয়োজন। ডায়াবেটিস রোগীদের দাঁতের সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার এটাই প্রধান উপায়। অবস্থা খারাপ হলে ইনফেকশন দাঁতের মাড়িতে এমনকি হাড় পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে এবং এভাবেই দাঁত দুর্বল হয়ে নড়ে গিয়ে পড়ে যেতে পারে, বা এক দিন মূল্যবান দাঁতকে হারাতে হতে পারে।

লক্ষণগুলো:

*দাঁতের মাড়ি লাল হয়ে ফুলে যায়।

 দাঁতের মাড়ি থেকে রক্ত পড়ে।

 দাঁতের গোড়া থেকে মাড়ি সরে যাওয়ার কারণে দাঁতকে অস্বাভাবিক অবস্থান দেখা যায়।

 যদি দাঁত নড়ে যায় সংবেদনশীল হয়ে পড়ে।

 মুখে দুর্গন্ধ হয়।

 দাঁতের কামড় অস্বাভাবিক অনুভূত হয়।

 অকার্যকর ডেনচার (কৃত্রিম দাঁত) হয়।

এই ধরনের কোনো সমস্যায় ডেন্টিস্টের সঙ্গে অবশ্যই পরামর্শ করা প্রয়োজন।

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য পরামর্শ ও কিছু নির্দেশনা-

ডায়াবেটিস রোগীদের মাড়ির প্রদাহ বেশি হওয়ার কারণ হলো-Ñ

১. দেহে ইনসুলিন ঘাটতি হলে আমিষেরও ঘাটতি হয় ফলে কোষকলার (Tissues) স্বাভাবিক বৃদ্ধি, সংস্কার ও উৎপাদন ব্যাহত হয় তাই মুখের কোনো স্থানে ঘা হলে ও প্রদাহ থাকলে শুকাতে বিঘ্ন ঘটে;

২. দেহে রোগ-প্রতিরোধ শক্তি কমে আসে ফলে দাঁতের গোড়ায় প্লাক জমা থাকলে সহজেই মাড়ির প্রদাহ শুরু হয়;

৩. ডায়াবেটিস রোগীদের দন্তক্ষয় বা ডেন্টাল ক্যারিজ রোগ হতে পারে তার কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা উল্লেখ করেছেন-

ক) মুখের লালার সঙ্গে গ্লুকোজের বাড়তি সংযোজনের ফলে ওই গ্লুকোজ মুখে এক ধরনের আণুবীক্ষণিক জীবাণুর সঙ্গে মিলে অম্ল বা অ্যাসিড তৈরি করে। অ্যাসিড দাঁতের শক্ত আবরণ অ্যানামেল ক্ষয় করতে থাকে এবং ধীরে ধীরে দাঁতের ভেতরে গর্তের সৃষ্টি করে।

খ) মুখের লালার স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয় এবং পরিমাণ কমে যায় ফলে মুখের অতিরিক্ত শুকনো পরিবেশে আহারের কণাগুলো ধুয়ে-মুছে যেতে পারে না। এই খাদ্যকণাগুলো দীর্ঘদিন দাঁতের গায়ে ও মাড়ির ফাঁকে জমে থেকে দাঁতের ভেতরে গর্তের সৃষ্টি করে।

প্ল্যাক: মুখে খাদ্যকণা জমে থেকে যে আবরণ সৃষ্টি হয় এর নাম ডেন্টাল প্ল্যাক। এই প্ল্যাক লাখ লাখ আণুবীক্ষণিক জীবাণুর সমষ্টি। মুখের দুই প্রধান রোগ ডেন্টাল ক্যারিজ ও মাড়ির প্রদাহে ডেন্টাল প্ল্যাকই দায়ী।

১। ডায়াবেটিস রোগ দেখা দেওয়ার আগে যাদের মাড়ির প্রদাহ (Tissues) বা দন্তবরক প্রদাহ (Periodontitis) থাকে তাদের প্রদাহ নিঃসৃত রস বৃদ্ধি পায় ফলে ডেন্টাল প্ল্যাক বাড়তে থাকে।

২। বৃহৎ ও ক্ষুদ্র লালা গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত রস বৃদ্ধি পায় এবং তা খাদ্যকণার সঙ্গে মিসে প্ল্যাক তৈরি করে।

৩। দাঁত দিয়ে খাদ্য চিবানোর ক্ষমতা যাদের কমে (ডায়াবেটিস রোগীর মাড়ির সংক্রমণে) তাদের মুখেও প্ল্যাকের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।

ডায়াবেটিস রোগীদের রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে যেমন তিনটি D মেনে চলতে হয় যথা-

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা জাতীয় অধ্যাপক ডা. মো. ইব্রাহিমের অমর বাণী- ‘প্রত্যেক ডায়াবেটিস রোগী যদি তিনটি D- Diet, Drug, Discipline অর্থাৎ পরিমিত খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ এবং রক্ত পরীক্ষা ও নিয়মিত ব্যায়াম এই তিনটি নীতিকে নিষ্ঠার সঙ্গে প্রতিদিন মেনে চলেন তাহলে তারা অবশ্যই স্বাভাবিকের কাছাকাছি, সামাজিকভাবে উপযোগী, সৃজনশীল কাজে সক্ষম ও সম্মানজনক জীবন নির্বাহ করতে পারবেন।’

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য দাঁত বা মুখের যত্নে কয়েকটি সতর্কীকরণ ইঙ্গিত:

ক) সর্বপ্রথমই ডায়াবেটিস রোগটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা প্রয়োজন। রক্তের শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখাই দাঁত ও মাড়ির রোগ-প্রতিরোধের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। মাড়ির অতিরিক্ত প্রদাহ অনেক সময় ডায়াবেটিসকে নিয়ন্ত্রিত রাখতে অনেক অসুবিধার সৃষ্টি করে।

খ) প্রতি ছয় মাস অন্তর একজন ডেন্টাল সার্জনকে দিয়ে মুখ পরীক্ষা করা প্রয়োজন। ডেন্টাল সার্জনকে অবশ্যই আপনার ডায়াবেটিস রোগের কথা বলে রাখবেন।

গ) প্রতিদিন দুইবেলা (সকাল ও রাতে) দাঁত ব্রাশ এবং মাড়ির জন্য প্রয়োজন একটি নরম টুথব্রাশ। ব্রাশটিকে ওপরের পাটির দাঁত থেকে নিচের পাটির দাঁতে আবার নিচের পাটি থেকে ওপরের পাটির দিকে, এভাবেই ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দাঁত ও মাড়ি পরিষ্কার করা বিজ্ঞানসম্মত। দুই দাঁতের ফাঁক থেকে খাদ্যকণা বের করে দেওয়ার জন্য ডেন্টাল ফ্লস বা এক ধরনের সুতা ব্যবহার করা ভালো।

ঘ) কখনো যদি আপনার মাড়ি থেকে দাঁত ব্রাশের সময় বা খাবার খাওয়ার সময় রক্ত বের হয় তবে তা আপনার মাড়িতে প্রদাহের পূর্ব লক্ষণ কি না বোঝার জন্য অবশ্যই একজন ডেন্টাল সার্জনের পরামর্শ গ্রহণ প্রয়োজন। মনে রাখবেন ডায়াবেটিস রোগ নিয়ন্ত্রণই অন্যান্য জটিলতা থেকে মুক্ত থাকার একমাত্র চাবিকাঠি।

ঙ) বয়স যদি ৪০-এর বেশি হয় এবং ওজন যদি মাত্রাতিরিক্ত হয় কিংবা বংশে যদি কারও ডায়াবেটিস থাকে তবে অবশ্যই বছরে একবার ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা প্রয়োজন এবং গর্ভবতীরা নিশ্চিত করবেন তাদের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস আছে কি না।

চ) তামাক ও ধূমপানের সঙ্গে ডায়াবেটিসের সম্পর্ক ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। ধূমপান ও তামাক সেবন ডায়াবেটিসের ভয়াবহতা এবং জটিলতা অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা তরুণ বয়সে ধূমপান শুরু করে তারা পরবর্তীতে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারে। ডায়াবেটিস আছে এমন কেউ যদি ধূমপান, তামাক সেবন করে তবে তাদেরও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। ফলে তাদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যানসার, হৃদরোগ, স্ট্রোক ও পায়ের পচনশীল রোগ ‘গ্যাংগ্রিন’ হওয়ার সম্ভাবনা ৫ গুণ বেশি। তা ছাড়া ডায়াবেটিস রোগীদের ধূমপানের কারণে ‘মাড়ির রোগ বা পেরিওডেন্টাল ডিজিজ’-এর জটিলতা বেশি হয় এবং অকালে দাঁত পড়ে যায়।

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা জাতীয় অধ্যাপক ডা. মো. ইব্রাহিমের অমর বাণী- ‘প্রত্যেক ডায়াবেটিস রোগী যদি তিনটি D- Diet, Drug, Discipline অর্থাৎ পরিমিত খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ এবং রক্ত পরীক্ষা ও নিয়মিত ব্যায়াম এই তিনটি নীতিকে নিষ্ঠার সঙ্গে প্রতিদিন মেনে চলেন তাহলে তারা অবশ্যই স্বাভাবিকের কাছাকাছি, সামাজিকভাবে উপযোগী, সৃজনশীল কাজে সক্ষম ও সম্মানজনক জীবন নির্বাহ।

লেখক: একুশে পদকপ্রাপ্ত এবং শব্দসৈনিক, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র

বিষয়:

রাজনীতিকদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা জরুরি

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ড. সুলতান মাহমুদ রানা

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী স্থিতিশীল রাজনীতির বাতাস বইতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্বস্তির বাতাস সত্যিই কাঙ্ক্ষিত। শালীনতা, সহনশীলতা এবং উন্নত রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখানে প্রায় অসম্ভব। নির্ভয়ে বাইরে বের হওয়া, শান্তিতে বসবাস করা- সবকিছুই জনগণের প্রত্যাশিত। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর হঠকারী রাজনৈতিক কর্মসূচি- যা মানুষের শঙ্কার কারণ হয়, তা কখনোই প্রত্যাশিত নয়। এ কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর গঠনমূলক নীতি গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন সবার নিকট কাম্য। আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে, ধীরগতি সব সময়ই কল্যাণের পথে ধাবিত হয়। সুষ্ঠু রাজনীতির জন্য তা মঙ্গলকরও বটে। আর মঙ্গলকর রাজনীতির ধারাবাহিকতা রক্ষায় দেশে বিদ্যমান গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলগুলোর যথাযথ রাজনৈতিক অঙ্গীকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকার ও সরকার-বিরোধীদের যথাযথ রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সতর্কভাবে চলার সুযোগ এবং পরিবেশ নিয়ে ভাবার প্রসঙ্গটি গুরুত্বপূর্ণ।

গত বছরের ২৮ অক্টোবরের হামলা, হত্যা ও ভাঙচুরের ঘটনার মামলায় বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা কারাগারে ছিলেন। এর মধ্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিএনপি স্থায়ী কমিটির মির্জা আব্বাস ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল সম্প্রতি মুক্ত হয়েছেন। তাদের মুক্তির পর গুঞ্জন উঠেছে, তবে কি ফের চাঙ্গা হবে বিএনপি? এরই মধ্যে খবর প্রকাশ হয়েছে যে বিএনপির শীর্ষ পদে খালেদা জিয়া এবং তারেকের পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। মূলত দলকে সাংগঠনিকভাবে চাঙ্গা রাখতে এ ধরনের সিদ্ধান্তের বিষয়টি সামনে আসছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশের অভ্যন্তরীণ ও ভূরাজনৈতিক সমীকরণ মিলিয়ে নতুন করে একদফা কর্মসূচির চিন্তা করছে বিএনপি। এ লক্ষ্যে কর্মীদের চাঙ্গা করতে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করা হতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু বিএনপি এতদিন যে বিদেশি শক্তিকে খুঁটি হিসেবে ধরে ছিল, সেই খুঁটিতে এখন বেশ ভাটা পড়েছে।

তাছাড়া ইতোমধ্যেই বিএনপি বুঝতে পেরেছে যে তারেক জিয়ার নেতৃত্বে আন্দোলন ফলপ্রসূ করার সম্ভাবনা মোটেই নেই। কারণ, ভূ-রাজনৈতিক বিচারে বিদেশে বসে দেশীয় রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। যে কারণে এত কিছুর পরও বিএনপির আন্দোলনের সফলতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে গেছে। কারণ, আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো এর সঙ্গে জনপ্রত্যাশা পূরণের অঙ্গীকার।

নির্বাচন-পরবর্তী কূটনৈতিক তৎপরতা এই মুহূর্তে শতভাগ সরকারের পক্ষে। যুক্তরাষ্ট্রও তার আগের ভূমিকা থেকে সরে এসে সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আন্তর্জাতিক ইতিবাচক বার্তা দেশের জন্য যথেষ্ট মঙ্গলজনক বলে মনে হচ্ছে। ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করে গড়ে তুলতে তাদের সদিচ্ছা একাধিকবার প্রকাশ করেছে। কাজেই নানা কারণেই ৭ জানুয়ারির পর থেকে বিএনপির নেতৃত্বে এক ধরনের স্থবিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তাদের অনেক নেতা নিজেদের আত্মসমালোচনায় নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তকে ভুল বলেও আখ্যায়িত করেছেন।

রাজনীতিতে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকে তবে এবারের বিএনপির দ্বিধা-দ্বন্দ্ব এতটা আগে দেখা যায়নি। রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কিছু নেই। তবে সত্য এবং ন্যায্য কথা নিশ্চয়ই থাকতে হয়। পাশাপাশি রাজনীতিবিদদের যথাযথ কমিটমেন্ট জরুরি। আর সে কমিটমেন্টটি জনগণের নিকট হতে হয়। জনগণের নিকট কমিটমেন্ট না থাকলে রাজনীতিতে লাভবান হওয়া দুষ্কর। আপাতত বিএনপির কোনো দৃশ্যমান রাজনৈতিক কমিটমেন্ট নেই। এমনকি কোনো আন্দোলন কর্মসূচিও নেই। তাদের প্রতি জনসমর্থনও দেখা যাচ্ছে না। এই মুহূর্তে তাদের আন্দোলনে যাওয়ার কোনো ইস্যু কিংবা জোরালো কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া বর্তমানে এসএসসি পরীক্ষা এবং সামনে রমজানের কারণে, আবার সেই ঈদের পরের আন্দোলনখ্যাত বিষয়টি হাস্যরসে পরিণত হতে যাচ্ছে।

পরিস্থিতি বিশ্লেষণে বলা যায়, বেশ কিছু রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার বেড়াজালে নিজেদের আবদ্ধ করে ইতোমধ্যেই তাদের জন্য বুমেরাং পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। দলকে সুসংগঠিত করা, জনগণের সমর্থন আদায়, আন্তর্জাতিক সমর্থন তাদের পক্ষে নেওয়া প্রভৃতি বিষয় নিয়ে তারা এখন ঘূর্ণিপাকে। নিজেদের ভুল সিদ্ধান্তে বারবার নিজেরাই হোঁচট খাচ্ছে।

সাধারণ মানুষের মনেও এখন প্রশ্ন একটাই, বিএনপি এখন কী করবে? এমনকি সরকারও বিএনপির ভবিষ্যৎ নিয়ে সতর্ক ও সজাগ রয়েছে। কারণ এই মুহূর্তে সরকার তাদের নিজেদের কর্মকাণ্ডে অনেকটা ইতিবাচক স্থানে রয়েছে। বেশ কিছু ইস্যুতে সরকার যেমন সফলতা দেখিয়েছে, ঠিক তেমনি বিএনপি ব্যর্থতার পরিচয়ও দিয়েছে যথেষ্ট। তবে বিএনপিকে দুর্বল মনে করাও উচিত হবে না সরকারের। কারণ বিএনপির মাঠপর্যায়ে কিছুটা হলেও জনপ্রিয়তা রয়েছে। পরিস্থিতির কারণে ক্রমেই জনপ্রিয়তা হারালেও, আবার কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতেই পারে যাতে বিএনপির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি এবং সরকারের জনপ্রিয়তা হ্রাস পেতে পারে। ইতোপূর্বে অনেক লেখাতে উল্লেখ করেছি, সরকার কখনোই চাইবে না যে তাদের জনপ্রিয়তা চলে যাক, আর বিরোধীরা অধিক জনপ্রিয় হয়ে উঠুক।

৭ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি এবং তাদের সমমনা দল অংশগ্রহণ না করলেও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য নির্বাচন যথেষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছে। নির্বাচন-পূর্ব সময়ে আন্তর্জাতিক মহল নির্বাচন নিয়ে কিছুটা নাখোশ থাকলেও পরে নির্বাচনের স্বচ্ছতা এবং গ্রহণযোগ্যতা দেখে তারা অপেক্ষাকৃত ইতিবাচক ভূমিকা প্রদর্শন করেছে।

বিএনপি সঙ্গত কারণেই এখন বুঝে গেছে, ২০২৯ সালের আগে কোনো সংসদ নির্বাচনের সুযোগ নেই। সাংগঠনিক অবস্থা ধরে রাখার বিষয়টিই এখন তাদের মূল প্রাধান্যের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। খুব দ্রুতই স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে বিএনপিকে তাদের নিজেদের অবস্থান পুনর্জ্জীবিত করতে স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। যদিও এ বিষয়েও তাদের মনে যথেষ্ট দ্বিধা-দ্বন্দ্ব তৈরি করেছে। কারণ বিএনপি যে সিদ্ধান্তই নিচ্ছে সেটি তাদের জন্য ভুল হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে তারা অনেকটা ‘ওয়ান স্টেপ ফরোয়ার্ড এবং টু স্টেপস ব্যাক’ নীতির মতো করে চলছে।

অন্যদিকে ক্রমেই আওয়ামী লীগ সরকারের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাম্প্রতিককালে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য-বিবৃতি আত্মবিশ্বাসের বিষয়টি প্রমাণ করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন বক্তব্য-বিবৃতির পরিপ্রেক্ষিতে মনে হয়েছে, প্রতিপক্ষ কিংবা বহির্বিশ্বের কোনো চাপে বর্তমানে সরকারের নেই। ইদানীং প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারের এমন আত্মবিশ্বাসই বিএনপির জন্য ক্রমেই কাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আর সরকারের এই আত্মবিশ্বাসের বিষয়টিতে বিএনপির জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে। একদিকে সরকারের আত্মবিশ্বাস বাড়ছে অন্যদিকে নিজেদের যথাযথভাবে মজবুত করতে না পারার দীর্ঘশ্বাস হচ্ছে বিএনপির। বিশেষ করে বিদেশি মহল ক্রমেই নেতিবাচক অবস্থা থেকে বের হয়ে এসেছে। বর্তমানে উন্নয়ন এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সুশাসনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ই বহির্বিশ্বের কাছে সরকারের অন্যতম প্লাস পয়েন্ট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বারবারই বিএনপি-জামায়াতের উদ্দেশে বলে যাচ্ছেন, ‘আন্দোলন-ষড়যন্ত্র করে লাভ নেই। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকবে। দেশ এগিয়ে যাবে।’ এটি নিঃসন্দেহে প্রধানমন্ত্রীর নিজের মনের জোর ও সাহস। মূলত বিএনপি-জামায়াতের বিগত সময়ের রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের ফলেই এ শক্তি তৈরি হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর মনে। কাজেই প্রতিপক্ষকে বুঝতে হবে, আওয়ামী লীগ সরকার কোনো চাপের কাছে সহজে নতি স্বীকার করার পরিবেশ নেই। এই মুহূর্তে দেশকে এগিয়ে নিয়ে সরকারের কর্মকাণ্ডের গঠনমূলক সমালোচনা করাই বিরোধীদের দায়িত্ব হওয়া উচিত।

লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।


দুষ্ট ব্যক্তি খুব চতুর হয়

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
শফিকুল ইসলাম

ভালো মানুষের সঙ্গ পেলে জীবনের রংটাই কেমন পালটে যায়, প্রতি মুহূর্তে মনের মধ্যে অদ্ভুত দোলা দেয়, আনন্দে ভরে থাকে মন। কিন্তু এর উল্টোটাও আছে। এমন কিছু মানুষ আছেন যাদের সান্নিধ্য আমাদের মনটাকে বিষাদে ভরিয়ে তোলে। আসলে আমাদের চারপাশে কত মানুষ। প্রতিটি মানুষের বাইরের চেহারার মতো ভেতরের চেহারাও আলাদা আলাদা। আমরা নিজেরাই বলি, ভালো-মন্দ নিয়েই মানুষের জীবন। আর ভালো-মন্দ সবার মধ্যেই রয়েছে। যেমন হিংসা, ভালোবাসা, প্রেম কিংবা রাগ-ক্ষোভ। তবে কিছু কিছু মানুষের মধ্যে ভালোর থেকে খারাপ জিনিসই বেশি, যেমন হিংসা, কিংবা রাগ বা পরশ্রীকাতর ইত্যাদি ইত্যাদি। এই বিষয়গুলো কিছু মানুষের মধ্যে এতটাই বেশি পরিমাণে থাকে যে, তাদের সঙ্গে থাকতে থাকতে নিজের জীবনটাই দুর্বিষহ এবং বিষাক্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু বাইরে থেকে দেখে বোঝার সত্যিই কোনো উপায় থাকে না। কিন্তু একটু ভালো করে বুদ্ধি দিয়ে খেয়াল করলেই এ ধরনের মানুষকে সহজেই চিহ্নিত করা যায়। আর সত্যিই যদি চিহ্নিত করা যায়, তাহলে অবশ্যই এ ধরনের মানুষের থেকে দূরে থাকা উচিত।

আশপাশে নানান ধরনের মানুষের বসবাস। সবার মধ্যেই রয়েছে হিংসা, ভালোবাসা, প্রেম কিংবা রাগ-ক্ষোভ। তবে কিছু মানুষ রয়েছে যাদের সঙ্গে থাকলে আপনার জীবন হয়ে উঠতে পারে বিষাক্ত। আত্মপ্রেমী মানুষের সঙ্গে থাকলে মানসিক যন্ত্রণায় ভুগতেই হবে। আত্মপ্রেমী মানুষ ইংরেজিতে যাদের বলে ‘নারসিসিস্ট’ তাদের থেকে দূর থাকা উচিত। নিজেকে ভালোবাসা স্বাস্থ্যকর। তবে অতিরিক্ত আত্মপ্রেমীদের আশপাশে থাকা মানুষদের গুনতে হয় চরম মূল্য।

‘নারসিসিস্ট’দের প্রথমে বেশ মনোহর মনে হবে। তবে তারা হবে ধান্দাবাজ, একগুয়ে, সহজেই অন্যকে দোষ দেবে এবং নিজের পছন্দমতো কাজ না ভাবখানা দেখা যাবে অন্যরকম। এমন কেউ যে নিজের স্বার্থে বুদ্ধির ব্যবহার করে, ন্যায়-অন্যায়, ধর্ম-অধর্মের বিচার করেন না। নিজের লাভের জন্য বা অন্যের ক্ষতির জন্য নিজের বুদ্ধির ব্যবহার করেন।

যদি কাছের কোনো মানুষের মাঝে এ ধরনের বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করেন তবে উচিত হবে তাদের থেকে নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রেখে সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়া। তবে যারা বেশি গুজব ছড়ানোর উদ্দেশ্যে গালগল্প ফাঁদে বা নিজেদের ভালো সাজানোর জন্য বানিয়ে কথা বলে, তাদের সঙ্গ মোটেই স্বাস্থ্যকর হতে পারে না। যদি এরকম মানুষের সংস্পর্শে এসে থাকেন, তবে তাদেরকে ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলা থেকে দূরে থাকুন অথবা একেবারেই এড়িয়ে চলুন।

কারও ধ্বংসাত্মক মনোভাব যদি আপনার মানসিক ক্ষতির কারণ হওয়া শুরু করে তবে অবশ্যই তাদের থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া হবে বুদ্ধিমানের কাজ। মানুষের সহানুভূতি পাওয়ার জন্য যারা আবেগ নিয়ে খেলে তাদের থেকে দূরে থাকাই ভালো। এ ধরনের মানুষ নিজেকে খুবই ভঙ্গুরভাবে উপস্থাপন করে অন্যের সহানুভূতি জোগাড় করবে। তারপর নিজের কাজ হয়ে গেলে সেই মানুষকে অগ্রাহ্য করবে। যতক্ষণ না সেই মানুষটার প্রয়োজন ফুরাচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা হয় স্বার্থপর, একগুয়ে, চাহিদা পূরণের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাবে। এ ধরনের মানুষের সঙ্গে পরিচয় থাকলে দূরে সরে যান। কারণ মনে রাখবেন আবেগ বেঁচে যারা সম্পর্ক করে তারা ভালোবাসা চায় না, তারা খালি আপনার শক্তিটাই শুষে নেবে।

মানসিক স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের ভাষায় ‘মাকিয়াভ্যালিয়জম’কে চিহ্নিত করা হয়েছে, তাদেরকে যারা অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করার সময় খুবই শীতল অনুভূতির সঙ্গে বিভিন্ন ধান্দা করে। তাদের অনুভূতি আন্তরিক নয়, থাকে সহানুভূতির অভাব। মনোবিজ্ঞানিদের সাধারণ পরামর্শ থাকে, ‘মাকিয়াভ্যালিয়ান’ মানুষের দেখা পেলেই পালিয়ে যান। তবে ঘটনাক্রমে যদি তাদের সঙ্গে থাকতেই হয় তাহলে তাদের সঙ্গে ব্যবসায়ীর মতো ব্যবহার করুন। অর্থাৎ তাকে কিছু দিতে হলে সে আপনাকে কী দেবে- সে বিষয়ে আগে নিশ্চিত হয়ে নিন। যাকে বলে ‘উইন উইন সিচুয়েইশন’।

এমন ভাবার কারণ নেই যে, সবাই সবসময় সত্য কথা বলবে। তবে যদি সন্দেহ হয় আপনার জীবনের কেউ বেশিরভাগ সময় অনুভূতি কাড়তে অতিরিক্ত মিথ্যা বলছে তাহলে সাবধান হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। অস্বাভাবিক মিথ্যাবাদীদের প্রথমে খুবই ‘চার্মিং’ মনে হবে। তারা জীবনটাকে মজারও করে তুলতে পারে। তবে একটা রেখায় এসে এ ধরনের মানুষদের সঙ্গে মেশা বন্ধ করতে হবে কিংবা কমিয়ে দিতে হবে। কারণ বিশ্বাস না থাকলে সে সম্পর্ক জোরালো হতে পারে না। এ ধরনের মানুষদের সঙ্গে তরল সম্পর্ক রাখাই ভালো। গভীরে গেলেই মরবেন।

লেখক: সাংবাদিক ও সমাজকর্মী


কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানি সম্ভাবনা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
রেজাউল করিম খোকন

ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের নামিদামি ব্র্যান্ডের বিক্রয়কেন্দ্রে ‘বাংলাদেশে তৈরি’ ট্যাগ লাগানো পোশাকের আধিক্য নতুন কিছু নয়। তবে মধ্যপ্রাচ্য, ইইউ, এমনকি আফ্রিকা অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের সুপারশপে এখন ‘বাংলাদেশে তৈরি’ প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের দেখাও মেলে। এই প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যই নতুন রপ্তানি খাত হিসেবে আশা দেখাচ্ছে। কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য অথবা কৃষিজাত পণ্য দেশের শীর্ষ পাঁচ রপ্তানি খাতের একটি। করোনার পর ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রথমবার এই খাতের রপ্তানি এক বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়। পরের বছর সেটি বেড়ে ১১৬ কোটি ডলারে উন্নীত হয়। যদিও বিদায়ী অর্থবছরে রপ্তানি ২৭ শতাংশ কমে ৮৪ কোটি ডলারে নেমেছে। এমন প্রেক্ষাপটে কৃষিজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে চায় সরকার। গত মাসে নতুন সরকারের প্রথম বৈঠকে রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং নতুন বাজার অনুসন্ধান করে সেখানে প্রবেশে কীভাবে সহায়তা করা যায়, সে বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিশেষ করে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য; পাট ও পাটজাত পণ্য এবং কৃষিজাত পণ্য এই তিনটি খাতকে তৈরি পোশাকশিল্পের বিকাশে যেভাবে সহায়তা দেওয়া হয়েছিল, প্রয়োজনে সে রকম সহায়তা দিয়ে যেন বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে বড় সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে এ খাতে। তার মধ্যে অন্যতম প্রক্রিয়াজাত খাদ্য উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন ধরনের উপকরণ উচ্চ শুল্ক দিয়ে আমদানি করতে হয়। এ ক্ষেত্রে রপ্তানিমুখী কারখানা বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধায় এসব উপকরণ শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করে। অন্য কারখানাগুলো এই সুবিধা না পেলেও নগদ সহায়তা পায়। যদিও উন্নয়নশীল দেশ হলে নগদ সহায়তা থাকবে না। ফলে ছোট-বড় সব রপ্তানিকারকের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধায় উপকরণ আমদানির সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ থেকে কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, জার্মানি, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্যসহ ১৪৪টি দেশে কৃষিজাত পণ্য রপ্তানি হয়। কৃষিজাত পণ্যের মধ্যে রয়েছে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য, তাজা ও হিমায়িত সবজি, ফলমূল ইত্যাদি। আর প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের মধ্যে মসলা, চানাচুর, ঝালমুড়ি, বিস্কুট, সস, জেলি, আলুপুরি, পাঁপর, নুডলস, চকোলেট, বিভিন্ন ধরনের আচার, জুস, ফ্রুট ড্রিংক, চিপসসহ বিভিন্ন পণ্য। কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য খাতের সম্ভাবনা নিয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক বাজারের আকার ছিল ১৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন বা ১৩ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার। আর গত বছর বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের বাজার (দেশীয় চাহিদা ও রপ্তানি) ছিল ৪৮০ কোটি ডলারের। আর কৃষিপণ্যের বাজার ছিল ৪ হাজার ৭৫৪ কোটি ডলারের।

দেশে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের প্রায় এক হাজার কারখানা রয়েছে। তার মধ্যে ৯০ শতাংশই অতি ক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র। বাকি ১০ শতাংশ মাঝারি ও বড়। এর মধ্যে রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ২৫০ কারখানা। আমাদের প্রক্রিয়াজাত খাদ্য উৎপাদনে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিনিয়ত শিখছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা মাঝেমধ্যে কারখানা পরিদর্শনে এসে কোনো ত্রুটিবিচ্যুতি পেলে উদ্যোক্তাদের জরিমানা করেন। এ ক্ষেত্রে তারা ত্রুটি চিহ্নিত করার পর তা সংশোধনের জন্য উদ্যোক্তাদের যদি সময় বেঁধে দেন এবং সেই সময় পর আবার পরিদর্শন করে যাচাই করেন, তাহলে তারা এগিয়ে যাবে। এ ছাড়া প্যাকেজিং বা মোড়ক পণ্য এবং বিভিন্ন ধরনের উপকরণ আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া হয়, তাহলে কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত পণ্যের রপ্তানি দ্বিগুণ করা সম্ভব। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, গত অর্থবছর মোট ৫ হাজার ৫৫৬ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানির মধ্যে কৃষিজাত খাদ্যপণ্যের হিস্যা ছিল দেড় শতাংশ। বাংলাদেশ এক বিলিয়ন ডলারের কৃষিজাত পণ্য রপ্তানি করলেও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এ ক্ষেত্রে বেশ এগিয়ে আছে। ভারতের কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, বিদায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছর ভারত শুধু প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানি করেছে ৭৪০ কোটি ডলারের। তার মধ্যে আমের পাল্প ১৫, প্রক্রিয়াজাত করা সবজি ৬২, প্রক্রিয়াজাত করা ফল ও জুস ৫৯, নারকেলের পণ্য রয়েছে ১৫ কোটি ডলারের। বর্তমানে বিশ্বের ২০টি দেশে বিভিন্ন ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, পানীয় ও মসলা রপ্তানি করে চট্টগ্রামভিত্তিক কোম্পানি হিফস অ্যাগ্রো ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ। গত বছর প্রতিষ্ঠানটির রপ্তানি ছিল ৩২ লাখ মার্কিন ডলার। দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানিকারক প্রাণ গ্রুপ। তারা জুস অ্যান্ড ড্রিংকস, স্ন্যাক্স, বিস্কুট, কালিনারি, কনফেকশনারি, ফ্রোজেন ফুডসসহ বিভিন্ন পণ্য ভারত, সৌদি আরব, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, ইউকে ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে। প্রাণ গ্রুপের বার্ষিক পণ্য রপ্তানি ৩০ কোটি ডলারের। তবে খুব সহজেই সেটিকে ৩০ বিলিয়নে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। এক দশক আগে ড্রাই ফুড বা শুকনা খাদ্যপণ্য রপ্তানির বাজারে ছিল হাতেগোনা কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠী। প্রাণ-আরএফএল, স্কয়ার গ্রুপ, এসিআই ফুডসসহ কয়েকটি শিল্প গ্রুপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এই বাজার। তবে বৈশ্বিক বাজারকে সামনে রেখে গত কয়েক বছরে রপ্তানিতে যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন শিল্প গ্রুপ। এসব শিল্প গ্রুপ এত দিন দেশের বাজারে খাদ্যপণ্য বাজারজাত করে আসছিল। দেশীয় বাজারের পাশাপাশি এখন রপ্তানিতে নজর দিয়েছে তারা। আবার দেশে ডলার-সংকট তৈরি হওয়ায় গ্রুপগুলো রপ্তানি বাড়াতে জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে এখনো কোম্পানিগুলোর অন্যতম লক্ষ্য বিদেশে বসবাসকারী প্রবাসী বাংলাদেশিদের বাজার। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, এক দশক আগে ২০১২-১৩ অর্থবছরে শুকনা খাদ্যপণ্যের রপ্তানি ছিল ৪ কোটি ৫২ লাখ মার্কিন ডলারের। মোট ১৭২ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান বিশ্বের ৪৩টি দেশে খাদ্যপণ্য রপ্তানি করে। এক দশকের ব্যবধানে ২০২২-২৩ অর্থবছরে শুকনা খাদ্যপণ্য রপ্তানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ কোটি ডলারে। বর্তমানে বিশ্বের ৯৩টি দেশে এসব খাদ্যপণ্য রপ্তানি করে ২১২টি প্রতিষ্ঠান। রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে বিস্কুট, কেক, মুড়ি, সেমাই, নুডলস, রুটি-পরোটা ইত্যাদি।

খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে দীর্ঘ সময় ধরে এককভাবে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। গত অর্থবছরও রপ্তানি হওয়া শুকনা খাদ্যপণ্যের ৪৯ শতাংশ একাই রপ্তানি করেছে গ্রুপটি। গত এক দশকে শুকনা খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে যুক্ত হয়েছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ, আবুল খায়ের গ্রুপ, সিটি গ্রুপ, ইস্পাহানি গ্রুপ, বসুন্ধরা ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, টি কে গ্রুপ, আকিজ রিসোর্সেস ও সামুদা গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠান। এসব বড় গ্রুপের পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও এসব পণ্য রপ্তানি করে আসছে। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই) দেড় বছর ধরে খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে নজর দিয়েছে। গ্রুপটি তিন বছর আগে মেঘনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে মেঘনা নুডলস অ্যান্ড বিস্কুট কারখানা নামে খাদ্যপণ্য তৈরির কারখানা চালু করেছে। এ কারখানা থেকে রপ্তানি শুরু হয়েছে গত অর্থবছর। বড় শিল্প গ্রুপের মধ্যে এক বছর আগে শুকনা খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে যুক্ত হয়েছে টি কে গ্রুপ। গ্রুপটি দেশে পুষ্টি ব্র্যান্ডের খাদ্যপণ্য বাজারজাত করে আসছে। রপ্তানির শুরুতে গ্রুপটি মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতে বিস্কুট, চানাচুর, সেমাইসহ নানা ধরনের খাদ্যপণ্য রপ্তানি করে। গ্রুপটির সহযোগী প্রতিষ্ঠান সামুদা গ্রুপও খাদ্যপণ্য রপ্তানি শুরু করেছে। আগে দেশের বাজারেই শুকনা খাদ্যপণ্য বাজারজাত করে আসছিল তারা। এখন মূল্য সংযোজনের জন্যই বছরখানেক ধরে রপ্তানিতে যুক্ত হয়েছে। মূলত প্রবাসী বাংলাদেশিদের লক্ষ্য করেই তাদের এই রপ্তানি। সিটি গ্রুপ আগে কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানি করলেও শুকনা খাদ্যপণ্য রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গত অর্থবছর থেকে। বিস্কুট, মুড়িসহ নানা রকমের শুকনা খাদ্যপণ্য রপ্তানি করছে গ্রুপটি। আকিজ রিসোর্সেস লিমিটেডও এক বছর আগে শুকনা খাদ্যপণ্য রপ্তানি শুরু করেছে। মূলত খাদ্যশস্য, আটা, ময়দা, আলু ও দুধ এসব এক বা একাধিক উপকরণ দিয়ে তৈরি হয় শুকনা খাদ্যপণ্য। খাদ্যপণ্য তৈরির কাঁচামালের বড় অংশই দেশে উৎপাদিত হয়। খাদ্যপণ্য তৈরির প্রধান উপকরণ গম এখনো আমদানিনির্ভর। বাকিগুলো দেশেই উৎপাদিত হয়।

রপ্তানিতে কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের একটি উপখাত হলো শুকনা খাদ্যপণ্য। কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজত পণ্যের মোট রপ্তানি বিলিয়ন ডলার থেকে কমে গত অর্থবছর ৮৪ কোটি ৩০ লাখ ডলারে নেমে আসে। এর মধ্যে শুকনা খাদ্যপণ্য রপ্তানি ছিল ২০ কোটি ডলার। এই খাতের রপ্তানি বাড়ছে। শুকনা খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক বাজার অনেক বড়। সে তুলনায় এই খাতে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো নিচের সারিতে। তবে বড় শিল্প গ্রুপগুলো এই খাতের রপ্তানিতে যুক্ত হওয়ায় এই খাতে রপ্তানি আয় বাড়ার সম্ভাবনা দেখছেন উদ্যোক্তারা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্রের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০২২ সালে শুকনা খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক বাজার ছিল ৯ হাজার ৭৭১ কোটি ডলারের। ২০২২ সালে বৈশ্বিক তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৬৪তম। এক দশক আগে ২০১৩ সালে শুকনা খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৭৭তম। দেশের বড় শিল্প গ্রুপগুলো খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে এমন সময়ে জোর দিয়েছে, যখন রপ্তানিতে নগদ সহায়তা কমিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের- এ সংক্রান্ত জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশ হবে। উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থার বিধিবিধান অনুসারে কোনো ধরনের রপ্তানি প্রণোদনা বা নগদ সহায়তা দেওয়া যায় না। তবে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর একবারে নগদ সহায়তা প্রত্যাহার করা হলে রপ্তানি খাত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যে নগদ সহায়তা ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ আগে ১০০ টাকার পণ্য রপ্তানি করলে ২০ টাকা প্রণোদনা পেতেন রপ্তানিকারকরা। এখন পাবেন ১৫ টাকা। প্রণোদনা কমানোর কারণে উদ্যোক্তারা হোঁচট খাওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, শুকনা খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশ এখনো বিশ্বে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে। এ কারণে এই খাতের উদ্যোক্তাদের সরকারের সহযোগিতা দরকার।

রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে জোর দিতে হবে। খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক বাজার অনেক বড়। তবে সীমাবদ্ধতাও আছে। উদ্যোক্তারা এগিয়ে এলে ও সরকারি সহায়তা দেওয়া হলে এটি রপ্তানির সম্ভাবনাময় খাত হয়ে উঠবে। প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশে অনেক শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে। তার জন্য কয়েকটি ফসলকে টার্গেট করে উৎপাদন বাড়াতে হবে। তা ছাড়া শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আনার জন্য ছোট, মাঝারি ও বড় কারখানাকে সুযোগ দিতে হবে। এটি করা গেলে উদ্যোক্তাদের নগদ সহায়তার কোনো প্রয়োজন হবে না। কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের রপ্তানিতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা অসীম। তবে আমরা এখনো সম্ভাবনার ১ শতাংশও কাজে লাগাতে পারিনি। শুকনা খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক রপ্তানির বাজার বিশাল। বড় শিল্প গ্রুপগুলো শুকনা খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে নজর দিয়েছে, এটি ইতিবাচক দিক। এতে সামনে রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আরও বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থার বিধিবিধানের কারণে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ হলে নগদ সহায়তা দেওয়া যায় না। এ জন্য এই খাতে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় ছোট-মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোও যাতে টিকে থাকতে পারে, সে জন্য ভারতের মতো কৌশল নেওয়া যায়। যেমন- সরাসরি প্রণোদনা না দিয়ে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা, রপ্তানি বাজার ধরার জন্য সহযোগিতা করা যায়। রপ্তানি আয় বাড়াতে নানামুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের মধ্যে রপ্তানি বাণিজ্যকে সীমাবদ্ধ না রেখে বিভিন্ন ধরনের পণ্য রপ্তানির উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। পৃথিবীর কোন দেশে কোন ধরনের পণ্যের চাহিদা রয়েছে তা জানতে হবে। এ জন্য বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাস ও মিশনগুলোকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। বিভিন্ন দেশের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। এ জন্য আমাদের রপ্তানিকারকদের নিজস্ব উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমানে যেসব দেশের সঙ্গে আমাদের রপ্তানি বাণিজ্য চালু রয়েছে তার বাইরে আরও নতুন দেশে বাজার খোঁজার চেষ্টা জোরাল করতে হবে। রপ্তানি বাণিজ্যের বিকাশ ঘটাতে হলে আমাদের উৎপাদিত পণ্যের মান উন্নত করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার কারণে বাংলাদেশি বিভিন্ন ধরনের পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন দেশে। বিশেষ করে খাদ্য ও কৃষিজাত শিল্প পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি ব্র্যান্ডের পণ্য আন্তর্জাতিক খ্যাতি পাওয়ায় এর বাজার বিস্তৃতির উজ্জ্বল সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং নতুন বাজার সৃষ্টির প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। সময়োপযোগী, কার্যকর, বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ একান্ত প্রয়োজন এ জন্য। সরকারি দপ্তরগুলোয় হয়রানি আমলতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা এবং জটিলতা অনেক সময় রপ্তানিমুখী শিল্পখাতগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ ধরনের হয়রানি, দীর্ঘসূত্রতা, প্রশাসনিক জটিলতা দূরীকরণে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বিদ্যমান বাধা দূর করতে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করে তা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সবাইকে উদ্যোগী হতে হবে। এর মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতি ভিন্ন উচ্চতায় পৌঁছে যাবে সন্দেহ নেই। এটা অর্থনীতিতে নতুন গতি এনে দিতে পারে।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার, কলাম লেখক


সমৃদ্ধির মূলে বহুমাত্রিক জ্ঞানচর্চায় মাতৃভাষা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
অধ্যাপক ড. মো. নাছিম আখতার

তেরো কোটি মানুষের দেশ জাপান। পৃথিবীর উন্নত দেশের মধ্যে জাপান অন্যতম। মাতৃভাষাকে জাপানিরা কোন মাত্রায় সম্মান করে তা বোঝা যায় তাদের মনের ভাব প্রকাশের জন্য অক্ষর ও চিহ্নের বিন্যাস থেকে। জাপানি ভাষায় কানজি হলো চিহ্ন বা ছবি। যে চিহ্ন বা ছবি দ্বারা কোনো কিছুকে প্রকাশ করা যায়, সেগুলোকে বলে কানজি। কানজি দিয়ে যে বিষয়গুলো প্রকাশ করা যায় না সেগুলো প্রকাশের জন্য জাপানিরা দুই ধরনের বর্ণ ব্যবহার করে- কাতাকানা ও হীরাগানা। মজার বিষয় হলো জাপানি সংস্কৃতি ও ভাষার শব্দগুলোকে লেখার জন্য তারা হীরাগানা বর্ণ ব্যবহার করে। তাই নিজেদের নাম লেখার জন্য তারা হীরাগানা বর্ণমালা ব্যবহার করে। আর জাপানি ভাষায় যে শব্দগুলো বিদেশি শব্দ থেকে এসেছে সেগুলো লেখার জন্য তারা কাতাকানা বর্ণমালা ব্যবহার করে। পড়াশোনা বা অন্যকোনো উপলক্ষে জাপানে গেলে বিদেশিদের নাম লিখতে গিয়ে জাপানিরা কাতাকানা বর্ণ ব্যবহার করে। এখান থেকেই ভাষা ও সংস্কৃতির বিষয়ে জাপানিদের সচেতনতা প্রতীয়মান।

জাপানে প্রাকৃতিক সম্পদের কোনো খনি নেই। তথাপি জাপানের শিল্পায়ন সবাইকে আশ্চর্যান্বিত করে। জাপান ভিনদেশ থেকে লোহার আকরিক আমদানি করে মানসম্মত স্টিল উৎপাদনে পৃথিবীতে তৃতীয়। অন্যান্য ভারী শিল্পেও জাপান পৃথিবীতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। সমৃদ্ধির উচ্চ অবস্থানে উপনীত হতে জাপান মাতৃভাষাকে শুধু মনে ধারণই করেনি বরং বহুমাত্রিক জ্ঞানচর্চায় এর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করেছে।

একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের বার্ষিক আলোচনা সভায় আমাদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন একজন স্বনামধন্য অধ্যাপক, কলামিস্ট ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব। তিনি তার বক্তব্যে মাতৃভাষা নিয়ে ফ্রান্সের মানুষের সচেতনতার কথা তুলে ধরেন। বক্তব্যে তিনি ফ্রান্সের বিখ্যাত লুভার মিউজিয়াম ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। আমরা সবাই জানি, লুভার মিউজিয়ামটি ভাস্কর্য এবং পেইন্টিংয়ের জন্য পৃথিবী বিখ্যাত। অধ্যাপক মহোদয় গিয়েছিলেন ফ্রান্সের সেই মিউজিয়াম পরিদর্শনে; কিন্তু সেখানে সব দর্শনীয় বস্তুর নিচে লেখা বর্ণনা ফরাসি ভাষায়। ফরাসি ভাষা না জানার কারণে অধ্যাপক মহোদয় ভীষণ অসুবিধায় পড়েছিলেন। এতে তিনি কিছুটা বিরক্তও হয়েছিলেন। অনন্যোপায় হয়ে গুগলের সহায়তায় ইংরেজি করে কিছুটা বুঝলেও তার কাছে বেশির ভাগ বর্ণনাই অজানা থেকে গেল। হোটেলে ফিরে তিনি হোটেলের ম্যানেজারের সঙ্গে তার এই অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত করলেন এবং বললেন, ইংরেজিতে লেখা থাকলে ভালো হতো। কথাটি শুনে ম্যানেজার বললেন, ‘এই ভাষায় জ্ঞানার্জন করেই আমরা এতটা উন্নতি করেছি। তাই আমাদের প্রজন্মকে ভাষা সংস্কৃতি থেকে দূরে রাখতে চাই না’। তখন অধ্যাপক মহোদয় ম্যানেজারকে জিজ্ঞাসা করলেন, তাহলে আপনারা বিশ্বের নতুন সৃষ্ট জ্ঞান কীভাবে গ্রহণ করেন? উত্তরে হোটেল ম্যানেজার বললেন, ‘প্রয়োজনীয় সব নতুন জ্ঞানই আমাদের কাছে অল্প সময়ের মধ্যে ফরাসি ভাষায় মুদ্রিত হয়ে পৌঁছে যায়।’ তিনি মুচকি হেসে বলেছিলেন, ‘জ্ঞান সারা বিশ্বের, কিন্তু তা অর্জনের ভাষা একান্তই আমাদের।’ হোটেল ম্যানেজারের এমন বক্তব্য প্রমাণ করে যে ফরাসিরা নিজের ভাষা ও সংস্কৃতি দিয়ে কীভাবে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় গ্রহণ করেছে।

ইতিহাস বলে, মুসলিম চিকিৎসাবিদদের জ্ঞান ল্যাটিন ও ইউরোপের সব ভাষায় তৎকালীন সময়ে অনুবাদ করা হয়েছিল। আবু বকর মুহাম্মদ বিন জাকারিয়া আল রাজি ছিলেন মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ চিকিৎসাবিদদের অন্যতম। মানুষের কিডনি ও পিত্তথলিতে পাথর কেন হয় সে সম্পর্কে তিনি মৌলিক তথ্যপূর্ণ বই লিখেছিলেন। তার লেখা বই ‘আল জুদরি ওয়াল হাসবাহ’ ল্যাটিন ও ইউরোপের সব ভাষায় অনূদিত হয়। তার সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান হচ্ছে ‘আল হাবি’। এতে সব ধরনের রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। বইটিতে তিনি প্রতিটি রোগ সম্পর্কে প্রথমে গ্রিক, সিরীয়, আরবি, ইরানি ও ভারতীয় চিকিৎসা প্রণালির বিস্তারিত বর্ণনা দেন। তারপর নিজের মতামত ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন। মধ্য এশিয়ার আল আসুলি নামক একজন লেখক ফার্মাকোলজির একটি বই লিখেছিলেন। তার বইয়ের অর্ধেকটা ছিল ‘ডিজিজেস অব দ্যা রিচ’, বাকি অর্ধেক ছিল ‘ডিজিজেস অব দ্যা পুওর’। ইউরোপে ল্যাটিন অনুবাদে ৭০০ বছর এটা পাঠ্যবই হিসেবে চলেছে।

ইউনেস্কোর বর্ণনায় মাতৃভাষা ভাবের আদান-প্রদানের মাধ্যমের চেয়েও বেশি কিছু। এটা আমাদের মানবিকতা বিকাশের পূর্বশর্ত। আমাদের বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং পরিচয় মাতৃভাষার মধ্যে নিহিত। মাতৃভাষায় কথা বলার সময় মন, মস্তিষ্ক ও জিহ্বার মধ্যে একটি সরাসরি সম্পর্ক ও সমন্বয় তৈরি হয়। সর্বস্তরে মাতৃভাষার ব্যবহার শুধু আবেগ ও অনুভূতির বিষয় নয়- গবেষণা বলছে, মাতৃভাষায় শিক্ষা জ্ঞানের ভিত্তি উন্নয়ন, মানসিক উৎকর্ষতা, ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

রুশ মনোবিজ্ঞানী লিও ভিগোতস্কি। তিনি শিশুদের মানসিক বিকাশ নিয়ে কাজ করার জন্য বিখ্যাত। তিনি তার গবেষণায় প্রমাণ করেছেন, শিশুরা মনোযোগ, সংবেদনশীলতা, উপলব্ধি এবং স্মৃতি নিয়ে জন্মায়। একজন শিশু মাতৃগর্ভে থাকাবস্থায় শুনতে পায় এবং মাতৃভাষার শ্রুতিমধুরতা উপলব্ধি করে। যা শিশুর ব্যক্তিত্ব, চিন্তা এবং জীবন বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ইতালীয় ইলেক্ট্রো ফিজিওলজিস্ট এলিস মাদো প্রোভারিও গবেষণার মাধ্যমে দেখিয়েছেন মাতৃভাষা ও পরবর্তী সময়ে শেখা ভাষা গ্রহণ করা ও মনে রাখার ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে বৈদ্যুতিক তরঙ্গ ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় প্রবাহিত হয়। মাতৃভাষায় কথা বলা ও কিছু ভাবার ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক তরঙ্গ শক্তিশালী ও বর্ধিত আকারে প্রতিভাত হয়। তিনি বলেন, ‘এ জন্যই আমরা স্বপ্ন দেখি, চিন্তা করি এবং আবেগকে অনুভব করি নিজ মাতৃভাষায়।’ মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণা, সামাজিক প্রেক্ষাপট ও শিখন অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিখন গভীরতর, দ্রুত ও কার্যকর হয়। মাতৃভাষার অসম্পূর্ণ শিখন অন্য ভাষা শিক্ষায় বাধা সৃষ্টি করে।

পৃথিবীতে ভাষার সংখ্যা প্রায় সাত হাজার। এগারটি ভাষা সর্বাধিক ব্যবহৃত হয়। চীনা, ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, স্প্যানিশ, আরবি, রুশ, বাংলা, জার্মান, জাপানি, ফরাসি-বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও বৃহৎ জাতিগোষ্ঠী এই ভাষাগুলো ব্যবহার করে। বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩৫ কোটি। এমন বৃহৎ জনগোষ্ঠীর পড়াশোনা প্রাইমারি থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বাংলায় বাস্তবায়ন না করতে পারাটাই আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণ ছাড়া জাতি কখনো প্রকৃত জ্ঞান অনুরাগী হয়ে গড়ে উঠবে না। উচ্চশিক্ষার মাধ্যম মাতৃভাষা হলে জনগোষ্ঠীর সিংহভাগের অন্তর্ভুক্তি সম্ভব যেকোনো জ্ঞানচর্চা ও গবেষণায়। গবেষণার উন্নয়ন অর্থ জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নয়ন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতি মানে শিল্প ও প্রযুক্তির উন্নয়ন। বিষয়টি গভীরভাবে উপলব্ধি করলেই ঘটবে জাতির অর্থনৈতিক ও নৈতিক উন্নয়ন।

লেখক: উপাচার্য, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়


কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তন ও কীটনাশকের হুমকি!

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
সমীরণ বিশ্বাস

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে লবণাক্ততা ঝড়-ঝঞ্ঝা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, উচ্চ তাপমাত্রা, ফ্ল্যাশ-ফ্ল্যাট ইত্যাদির তীব্রতা ত্বরান্বিত করে। বাংলাদেশে আয় ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অনন্য অবদানকারী হলো- কৃষিক্ষেত্র। শস্য উৎপাদন গ্রামীণ আয় বৃদ্ধি করে এবং দরিদ্র মানুষের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। সব কৃষি কাজের ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব কৃষিকে চরম ঝুঁকির ভিতর ফেলছে! গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রতিনিয়ত বৃদ্ধির কারণে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। এর প্রভাবে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাচ্ছে, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং চরম ভাবাপণ্য জলবায়ুর পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্রতা পৃথিবীব্যাপী জনসংখ্যার বৃদ্ধি এবং কৃষি সম্পদ কমে যাওয়ায় খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে।

গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি, উচ্চ দ্রাঘিমাংশে ফসল উৎপাদনের সময় বেড়ে যাবে তবে ফলন বৃদ্ধি পাবে, নিম্ন দ্রাঘিমার অব-উষ্ণ ও উষ্ণ এলাকায়, যেখানে বর্তমানে গ্রীষ্মকালীন দাবদাহে ফলন কমে যাচ্ছে, সেখানে আরও কম ফলন হবে, মৃত্তিকা পানি বাষ্পীভবনের বৃদ্ধিতে ফলন কমে যাবে। (সূত্র : IPCC2007 & US EPA2011)। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ও নিয়ম পরিবর্তন -মৃত্তিকা ক্ষয় ও মৃত্তিকা বাষ্পতে প্রভাব ফেলে- ফলন কমিয়ে দেবে। উচ্চ দ্রাঘিমায় বৃষ্টিপাত বেশি হবে এবং বেশির ভাগ নিম্ন দ্রাঘিমার অব-উষ্ণ এলাকায় কম হবে (২০% পর্যন্ত) যা দীর্ঘকালীন খরার সৃষ্টি করবে। ভূপৃষ্ঠের কার্বন ডাইঅক্সাইডের ঘনত্ব বাড়বে, কিছু ফলনের বৃদ্ধি বেশি হবে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যান্য ক্ষতিকর প্রভাবে উচ্চ তাপমাত্রা এবং বৃষ্টিপাত এটিকে ছাড়িয়ে যাবে। ট্রোপোস্পেয়ারিক ওজন দূষিতপর্যায়ে- কার্বন ডাইঅক্সাইড বৃদ্ধির কারণে, খারাপ ওজন বৃদ্ধি পাবে যা জীবন্ত কোষ-কলার ও অন্যান্য পদার্থের ক্ষতি করবে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে, যার ক্ষতিতে কার্বন ডাইঅক্সাইড বৃদ্ধি পাবে, ফলে ফসলের বৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে যাবে।

কৃষিতে উষ্ণতা বা তাপমাত্রার ক্ষতিকারক প্রভাব

তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ফসলের ফলন কমে যাবে। ফসলে অনাকাঙ্ক্ষিত রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ বেড়ে যাবে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ফসলের জমিতে পরাগী প্রজাপতির পরিভ্রমণ ১৪ শতাংশ হ্রাস পায়। সার্বিকভাবে পরভোজী ও পরাগী প্রজাপতির সংখ্যা কমার কারণে ব্যাপক ফসল হানি ঘটে।

কৃষিতে শৈত্যপ্রবাহের ক্ষতিকারক প্রভাব

বাংলাদেশ ক্রমান্বয়ে শীতকালের ব্যক্তি ও শীতের তীব্রতা দুই-ই কমে আসছে। এতে ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং ফলন হ্রাস পাবে। ফসলের পরাগায়ণ ব্যাহত হবে। অতি ঠাণ্ডায় আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ ইত্যাদি ফসলের উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে যাবে।

কৃষিতে লোনা পানির অনুপ্রবেশ ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির ক্ষতিকারক প্রভাব

উজান থেকে পানিপ্রবাহ বাধা ও কম বৃষ্টিপাতের কারণে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত জমির পরিমাণ বাড়ছে যা ভবিষ্যতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং পরিমিত বৃষ্টিপাতের অভাবে আরও বেশি সমস্যার সৃষ্টি করবে। লবণাক্ত অঞ্চলের মাটি কর্দমাক্ত হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে মাটি শক্ত হয়ে যায়। লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে কৃষি ও জীববৈচিত্র্য। খাবার পানি, সেচের পানির সংকট দেখা দেবে। মারা যাবে সাধু পানির মাছ। চিংড়ি প্রজাতির বৈচিত্র্যে আসবে পরিবর্তন, ক্ষতিগ্রস্ত হবে মৎস্যজীবীসহ সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা। জলবায়ুর পরিবর্তন অব্যাহত থাকলে ভাঙাগড়ার এ ভারসাম্য দিন দিন আরও প্রকট হবে।

কৃষিতে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারের প্রভাব

রাসায়নিক কীটনাশক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব একাধিক উপাত্তের মধ্যে রয়েছে। পরিবর্তিত আবহাওয়ায় বৃষ্টি, তাপমাত্রা, আবহাওয়া এবং কৃষি মাটি ইত্যাদির সঙ্গে মিলে; তাদের মধ্যস্থ কার্বন নির্গমন বাড়িয়ে, ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে, সার্বিক কৃষি কার্যক্রমকে, দিন দিন অস্বাভাবিক করে তুলছে। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি মানুষ হৃদরোগ ও স্ট্রোকে মারা যায় এবং এর পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ খাদ্যে বিষক্রিয়া। অযাচিত রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটির উর্বরতাও কমছে। এ অবস্থায় প্রাণী ও প্রকৃতি-পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এই কীটনাশকটি ব্যবহার বন্ধ করার বিকল্প নেই। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্ল্যান্ট প্রটেকশন বিভাগের এক সূত্র বলছে, দেশে ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রায় ৪২ হাজার টন বালাইনাশক ব্যবহৃত হয়েছে। তবে এর জন্য চরম মূল্য দিতে হয় প্রকৃতি ও পরিবেশকে। কারণ এর ধারাবাহিক প্রয়োগে নষ্ট হয় মাটির গুণাগুণ। মরে যায় উপকারী অনুজীব। অন্যদিকে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে মানবদেহে ঢুকে তৈরি করে ক্যানসার-হাঁপানির মতো জটিল রোগব্যাধি। মানুষের প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস করে। শিশুর বিকলাঙ্গতা তৈরি করে। তাদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে। জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউটের করা সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর এক-তৃতীয়াংশই কৃষক। রাসায়নিক কীটনাশক বিক্রির ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠিন নজরদারি এবং অভিযান পরিচালনা করা এখন সময়ের দাবি। এর যথাইচ্ছা ব্যবহার বন্ধ না করা গেলে মানবদেহ ও প্রকৃতির ক্ষতি আরও বাড়বে।

দাবদাহ, খরা, বন্যা ও হারিকেনের তীব্রতা ও সংখ্যা বেড়ে কৃষিতে অনিশ্চয়তার নিয়ামক বৃদ্ধি পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পৃথিবীর ৬.৭ বিলিয়ন জনসংখ্যার প্রায় ৪০% (২.৫ বিলিয়ন) কৃষির ওপর তাদের জীবিকা নির্বাহ করছে, যারা সমূহ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। এসব ক্ষতি এড়াতে বর্তমান কৃষি কৌশল পরিবর্তন করতে হবে এবং নতুন প্রযুক্তি ও জাত উদ্ভাবন করে সমস্যা কবলিত পরিস্থিতি ও গ্রিনহাউস গ্যাস নিয়ন্ত্রণে রেখে বেশি ফলন ফলাতে হবে।

লেখক: কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, ঢাকা।


বিকিরণ ব্যবহার: একটি দক্ষ এবং নির্ভরযোগ্য জীবাণুমুক্তকরণ পদ্ধতি

আপডেটেড ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ ১২:৫১
অধ্যাপক ড.  মোখলেসুর রহমান

রূপপুর পাওয়ার প্ল্যান্ট বাংলাদেশের জন্য পারমাণবিক শক্তিকে আরও অন্তর্ভুক্ত, করার জন্য একটি সম্ভাব্য প্রবেশদ্বার হিসেবে দাঁড়িয়েছে, ভবিষ্যতে এ ধরনের আরও সুবিধার জন্য সম্ভাব্য পথ প্রশস্ত করবে। স্বাধীনতার পাঁচ দশকে, বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি প্রমাণিত করেছে, তবুও সমালোচনামূলক প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে, বিশেষত তার শক্তির উৎস সম্পর্কিত। পারমাণবিক শক্তি কি দেশের ক্রমবর্ধমান শক্তির চাহিদার সমাধান দিতে পারে এবং অন্যান্য শক্তির জলাধারগুলো হ্রাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর ক্রমবর্ধমান চিকিৎসা ডিভাইস শিল্পকে সমর্থন করতে পারে?

পারমাণবিক শক্তির গুণাগুণ, বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য এর উপযুক্ততা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে কক্সবাজারে ভূগর্ভস্থ ইউরেনিয়াম মজুত উন্মোচন করা হয়েছে, যার মাত্রা 850.7 থেকে 990.6 পিপিএম (ppm) পর্যন্ত জিরকন এবং মোনাজাইট, উত্তর-পূর্বে সিলেট এবং মৌলভীবাজারে পাওয়া ঘনত্বের প্রায় দ্বিগুণ। এ ইউরেনিয়াম আকরিক খনন এবং উত্তোলনের কয়েক দশকের গবেষণা দেশটির অভ্যন্তরীণভাবে পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ করার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়, ইউরেনিয়াম বিচ্ছেদ প্রযুক্তিতে অগ্রগতি মুলতবি রয়েছে।

বাংলাদেশ বর্তমানে বায়োমাস (biomass), কয়লা, তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসসহ শক্তির উৎসের মিশ্রণের ওপর নির্ভরশীল। পেট্রো বাংলা, সরকারি মালিকানাধীন জাতীয় তেল কোম্পানি, গত কয়েক দশক ধরে দেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত বৃদ্ধির ইঙ্গিত করে ব্যাপক গবেষণা চালিয়েছে। যাই হোক, এই বৃদ্ধি একটি অসীম রিজার্ভকে নির্দেশ করে না, যদিও বাংলাদেশের অবস্থান প্রাকৃতিক গ্যাস গঠনের জন্য উপযোগী বৃহত্তম ব-দ্বীপ সমভূমি। বর্তমানে, আনুমানিক 62.9% বিদ্যুৎ প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে উৎপন্ন হয়, যার মধ্যে ডিজেল, কয়লা, ভারী তেলের ভগ্নাংশ এবং সৌর বিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য উৎগুলো অবশিষ্ট অবদান রাখে।

মোটকথা, রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাব্য টার্নিং পয়েন্ট চিহ্নিত করে, যা তার জ্বালানি চাহিদার টেকসই সমাধান হিসেবে পারমাণবিক শক্তির কার্যকারিতার একটি আভাস দেয়। যাই হোক, জাতিকে তার শক্তি পোর্টফোলিওকে বৈচিত্র্যময় করার সময় পারমাণবিক শক্তির সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণরূপে কাজে লাগাতে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত বিবেচনাসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নেভিগেট করতে হবে।

বিকিরণ রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু এবং ক্ষতিকারক জীবের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়েছে, যা জীবাণুমুক্ত করার একটি নির্ভরযোগ্য পথ প্রদান করে। আয়নাইজিং রেডিয়েশনের ব্যবহার দক্ষতার সঙ্গে অনুজীবকে নিষ্ক্রিয় করে, স্বাস্থ্যসেবা পণ্যগুলোর নিরাপত্তা এবং নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করে, বিশেষ করে যখন পণ্য প্যাকেজিংয়ের জন্য নিযুক্ত করা হয়।

বিকিরণ কার্যকরভাবে জীবাণু নির্মূল করে যা রোগ সৃষ্টি করতে পারে এবং অন্যান্য ক্ষতিকারক জীবকে নিরপেক্ষ করে। আয়নাইজিং রেডিয়েশনের মাধ্যমে নির্বীজন দক্ষতার সঙ্গে অনুজীবকে নিষ্ক্রিয় করে, প্যাকেজিংয়ের জন্য ব্যবহার করার সময় স্বাস্থ্যসেবা পণ্যগুলোর নিরাপত্তা এবং নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করে। সিরিঞ্জ এবং অস্ত্রোপচারের গ্লাভসের মতো একক-ব্যবহারের চিকিৎসা ডিভাইসগুলোকে জীবাণুমুক্ত করার জন্য এটি একটি নিরাপদ এবং সাশ্রয়ী পদ্ধতি। এর মূল সুবিধাগুলোর মধ্যে একটি হলো- এটি ইতোমধ্যে প্যাকেজ করা পণ্যগুলোর নির্বীজন সক্ষম করে। বিকিরণ ব্যবহার করে জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জামের বিস্তৃত বিন্যাস জীবাণুমুক্ত করা হয়।

চিকিৎসা পণ্য জীবাণুমুক্ত করা স্বাস্থ্যসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এবং এই উদ্দেশ্যে বিকিরণ একটি নিরাপদ এবং সাশ্রয়ী পদ্ধতি হিসাবে আবির্ভূত হয়, বিশেষ করে সিরিঞ্জ এবং অস্ত্রোপচারের গ্লাভসের মতো একক-ব্যবহারের চিকিৎসা ডিভাইসগুলোর জন্য। এর উল্লেখযোগ্য সুবিধাগুলোর মধ্যে একটি হলো ইতোমধ্যে-প্যাকেজ করা পণ্যগুলোকে জীবাণুমুক্ত করার ক্ষমতা। বিশ্বব্যাপী, 160টিরও বেশি গামা ইরেডিয়েশন সুবিধা চালু রয়েছে, বার্ষিক প্রায় 12 মিলিয়ন m3 মেডিকেল ডিভাইস জীবাণুমুক্ত করে। লক্ষণীয়ভাবে, বিশ্বব্যাপী সব একক-ব্যবহারের চিকিৎসা ডিভাইসের 40 শতাংশেরও বেশি গামা ইরেডিয়েশনের মাধ্যমে জীবাণুমুক্ত করা হয়। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি অ্যাজেন্সি (IAEA) বিকিরণ সুবিধা স্থাপনে তার সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে সমর্থন প্রসারিত করে এবং বিকিরণ ব্যবহার করে নির্বীজন অ্যাপ্লিকেশন বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশিকা প্রদান করে।

জীবাণুমুক্ত করার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি বিদ্যমান, যার মধ্যে উচ্চচাপের বাষ্প, শুষ্ক তাপ, রাসায়নিক জীবাণু এবং বিকিরণের মতো শারীরিক এজেন্ট রয়েছে। যাই হোক, এই পদ্ধতিগুলোর মধ্যে, বিকিরণ নির্বীজন একটি অনন্য অবস্থান ধারণ করে, একটি অতাপীয় সমাধান প্রদান করে যা উচ্চ তাপমাত্রার ওপর নির্ভর না করে কার্যকরভাবে অনুজীবকে ধ্বংস করে।

রেডিয়েশন থেরাপি আয়নাইজিং রেডিয়েশন ব্যবহার করে, প্রাথমিকভাবে কোবাল্ট 60 গামা রশ্মি বা ইলেকট্রন অ্যাক্সিলারেটর, বিভিন্ন চিকিৎসা পণ্যের জন্য একটি নিম্ন-তাপমাত্রা নির্বীজন পদ্ধতি হিসাবে, যার মধ্যে প্রতিস্থাপনের জন্য টিস্যু, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং চিকিৎসা যন্ত্র রয়েছে।

বিকিরণ কীভাবে নির্বীজন অর্জন করে তা বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গামা রশ্মি, বিটা কণা বা অতিবেগুনী আলোর মাধ্যমেই হোক না কেন, বিকিরণ একটি পণ্যের মধ্যে অনুজীবকে লক্ষ্য করে এবং নির্মূল করে, জীবাণুমুক্ত পরিস্রাবণের মতো উন্নত তাপমাত্রানির্ভর পদ্ধতির একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প প্রস্তাব করে।

যদিও বিকিরণ জীবাণুমুক্তকরণ অনেক সুবিধা উপস্থাপন করে, এটির সীমাবদ্ধতাগুলো শনাক্ত করা অপরিহার্য। উদাহরণস্বরূপ, সম্ভাব্য অবক্ষয়ের কারণে এটি তরল পণ্যগুলোর জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে এবং চর্বিযুক্ত কিছু খাদ্য আইটেম আদর্শ প্রার্থী নাও হতে পারে। উপরন্তু, কিছু পণ্যের বিবর্ণতা বা টেক্সচার পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে, যা প্রয়োগের যত্নশীল বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়।

সংক্ষেপে, বিকিরণ জীবাণুমুক্ত চিকিৎসা পণ্যের সন্ধানে একটি শক্তিশালী মিত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়, বিশ্বব্যাপী রোগীদের সুরক্ষা এবং সুস্থতা নিশ্চিত করার সময় নির্ভরযোগ্যতা, দক্ষতা এবং ব্যয়-কার্যকারিতা প্রদান করে।

লেখক: পারমাণবিক বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ, এমআইএসটি, ঢাকা


বাংলা একাডেমি

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
সৈয়দ শাকিল আহাদ

বাংলা একাডেমিকে আমরা অধিকাংশই চিনি বইমেলা উপলক্ষে বছরের ২য় মাসে অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি মাস এলেই মেলার আয়োজক হিসেবে, বিশেষ করে এই একাডেমি প্রাঙ্গণে মাসব্যাপী চলে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বইয়ের মেলা, যা ইতোমধ্যে পৃথিবীতে আলোচিত একটি মেলা। বেশ কয়েক বছর ধরে এই বইমেলা বাংলা একাডেমির গণ্ডি পেরিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিস্তৃত হয়েছে। তা ছাড়া প্রতিবছর সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার’ নামে একটি মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের ব্যবস্তা করার জন্যও বাংলা একাডেমির নাম সুধীজনের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত।

বাংলা একাডেমি একসময় ছিল ‘বর্ধমান হাউস’। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ ঘোষণা এবং তা কার্যকর করার পর বাংলায় সশস্ত্র আন্দোলন বিকাশ লাভ করে। ১৯০৬ সালে কংগ্রেসের পূর্ণ অধিবেশনে ‘স্বরাজ’ শব্দ গৃহীত হয়। স্বরাজ বলতে কংগ্রেসের নরমপন্থিরা বুঝেছিল ঔপনিবেশিক স্বায়ত্তশাসন, চরমপন্থিরা বুঝল স্বাধীনতা। এর থেকে উৎপত্তি হলো বিদেশি পণ্য বর্জন প্রসঙ্গ।

১৯১১ সালে ইংরেজ শাসক লর্ড হার্ডিঞ্জের শাসনামলে দিল্লির এক সভাতে ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জের উপস্থিতিতে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয়। বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর তৎকালীন গভর্নরের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্যদের জন্য তিনটি বড় বড় বাড়ি আলাদাভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল। ওই তিনটি বাড়ির একটি হলো বর্ধমান হাউস যা এখন বাংলা একাডেমি। বর্ধমানের রাজার জন্য এটি তৈরি করা হয়েছিল। এর সীমানা বা পরিধি ছিল ব্যাপক পেছনের দিকে। শিবমন্দির পর্যন্ত ছিল বর্ধমান হাউসের সীমা। মন্দিরের দায়িত্বে থাকা একজনের মতে বর্ধমানের রাজা তার পূজার জন্য এই মন্দিরটি তৈরি করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এখানে রমেশচন্দ্র মজুমদার, কাজী মোতাহার হোসেন, কবি কাজী নজরুলসহ অন্য কবিরা অতিথি হিসেবে এখানে থেকেছেন বহুদিন। পাকিস্তান হওয়ার পর পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন ছিল এই বর্ধমান হাউস। ১৯৪৭ সালে ধর্মভিত্তিক স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র পাকিস্তান সৃষ্টির পরই পূর্ব বাংলায় শুরু হয় বাঙালির জাতিসত্তা ও মাতৃভাষার অধিকারের ওপর আক্রমণ। অধিকার রক্ষার আন্দোলন ১৯৪৮-এ শুরু হয়ে ১৯৫২-এ ছাত্র-জনতার আত্মবলিদানে ঐতিহাসিক পট পরিবর্তনের সূচনা করে এবং ১৯৫৬ সালে স্বীকৃতি পায় বাংলা ভাষা। ধর্মভিত্তিক পাকিস্তানি সামরিক আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর নিগড় থেকে মুক্ত হয়ে বাঙালি তার ভাষা-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য ও নিজস্ব জাতিসত্তাভিত্তিক একটি সেক্যুলার রাষ্ট্র গঠনের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের সূচনা করে। এলক্ষ্যে ১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলার সাধারণ নির্বাচন উপলক্ষে এ কে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে গঠিত হয় রাজনৈতিক মোর্চা ‘যুক্তফ্রন্ট’। এঁদের ২১ দফা নির্বাচন ইশতিহারের ১৬নং ধারায় বলা হয় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষণা, উন্নয়ন, প্রচার এবং প্রসারের জন্য একটি গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার কথা। ওই নির্বাচনে সাম্প্রদায়িক সরকারি দল মুসলিম লীগকে পরাজিত করে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করে এবং এই বাংলা একাডেমির প্রতিষ্ঠা তাই একই ইতিহাসের ওতপ্রোত অংশ।

রাষ্ট্রের গঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক ঘটনা পরম্পরার এমন নিবিড় সংশ্লিষ্টতা বাংলাদেশের আর কোনো প্রতিষ্ঠানের নেই। এ জন্যই বাংলা একাডেমি বাঙালি জাতির অনন্য গৌরবধন্য আধুনিক ও সেক্যুলার রাষ্ট্রসত্তা, জাতিসত্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের প্রতীক। বাংলা একাডেমিকে তাই শুধু ‘জাতির মননের প্রতীক’ বললে এর সংগ্রামী ইতিহাসকে কৌশলে অস্পষ্টতার আবরণে ঢেকে দেওয়া হয়। তৎকালীন সময়ে ভাষা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে দাবি ওঠে বর্ধমান হাউসকে বাংলা একাডেমিতে রূপান্তর করার।

বাংলা একাডেমি ১৯৫৫ সালের ৩রা ডিসেম্বর বাংলা ১৭ অগ্রহায়ণ, ১৩৬২ বঙ্গাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা, গবেষণা ও প্রচারের লক্ষ্যে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে, বর্তমান বাংলাদেশে এই একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা হয়। বাংলা অভিধানসহ অদ্যাবধি সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তিন লাখের ওপরে বই প্রকাশিত হয়েছে এবং বর্তমান সরকারের সময়ে নান্দনিকতা ও নতুন সুউচ্চ ভবন ও স্বাপত্য কাঠামো বৃদ্ধিসহ এর আধুনিকায়নসহ ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়েছে।


বাংলাদেশের নতুন স্থানে চা-বাগান সৃজনের সম্ভাবনা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ড. মো. হুমায়ুন কবীর

চা একটি আন্তর্জাতিক পণ্য। চা-গাছের বৈজ্ঞানিক Camellia sinensis. চায়ের বেশ কিছু প্রকারভেদ রয়েছে। কালো চা, সাদা চা, সবুজ চা, ওলং চা ইত্যাদি বেশ কিছু নামে পরিচিত চা-পাতা। এটি বাগান আকারে আবাদ হয়ে থাকে। একটি বাগানে চা উৎপাদনের সব ধরনের কাজই সম্পন্ন করা হয়ে থাকে বিধায় তাকে ‘টি এস্টেট’ নামে ডাকা হয়। তবে এখন বাগানের বাইরে এককভাবে কৃষকপর্যায়েও কোনো কোনো স্থানে চায়ের আবাদ হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ বাংলাদেশের সর্ব উত্তরের পঞ্চগড় এলাকায় শুধু নতুন সৃজন করা চা-বাগান নয় বরং ছোট ছোট অসংখ্য খামারিরা চা আবাদে আগ্রহী হয়ে পড়ছেন। সেসব এলাকায় অন্য ফসলের চেয়ে চা চাষ করেই কৃষক বেশি লাভবান হচ্ছেন বলে জানা গেছে।

চা বাঙালির জন্য একটি বিশেষায়িত সামাজিক পানীয়। এক অর্থে এটি একটি নেশাজাতীয় পানীয়। কারণ চা পানে শরীরে তেমন কোনো পুষ্টি সংযোজিত না হলেও এর সামাজিক গুরুত্ব অনেক বেশি। জনশ্রুতি থেকে জানা যায় ব্রিটিশ শাসনামলে এক সময় চা বাঙালিকে ফ্রি খাওয়ানো হতো। ফ্রি খাওয়ানোর পেছনে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য ছিল যা পরবর্তীতে বাঙালিকে আর কেউ বুঝিয়ে দিতে হয়নি। তবে এখন চা বাঙালির নিত্য-নৈমিত্তিক কালচারে ও অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কী অফিসে, কী অতিথি আপ্যায়নে কমপক্ষে এক পেয়ালা চায়ের বিকল্প কিংবা জুড়ি নেই। পুষ্টি থাকুক বা না থাকুক, ক্ষুধা নিবারণ হোক বা না হোক এক কাপ চায়ে শরীর-মনের ক্লান্তি দূর হয়ে তা চাঙ্গা করে তোলে। তবে চায়ের মধ্যে ক্যাফেইন নামের একপ্রকার নেশাজাতীয় রাসায়নিক দ্রব্য থাকায় তার দ্বারাই এমনটি হয়ে থাকে। তা ছাড়া কিছু মাইনর পুষ্টি উপাদানও থাকে যা শরীরে কিছু কাজ করে থাকে।

অথচ এক সময় বাংলাদেশে কোনো চা-বাগান ছিল না। ব্রিটিশ বেনিয়ারা প্রথমে বাংলাদেশে কিছু কিছু এলাকায় চা-বাগান সৃজন শুরু করেন। ইতিহাস বলে ব্রিটিশ শাসনের সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক ১৮৫৬ সালের দিকে তৎকালীন সিলেটের মালনীছড়ায় প্রথম চা-বাগান সৃজন করে। এরপর চট্টগ্রাম এবং সিলেটের অন্যান্য স্থানে একে একে চা-বাগান স্থাপন করতে থাকে। এখন দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৬৬টি বাণিজ্যিক চা-বাগান রয়েছে। আগেই উল্লেখ করেছি, একটি বড় চা-বাগানে বাগান সৃজনের জন্য চারা উৎপাদনের নার্সারি থেকে শুরু করে বাগান স্থাপন এবং সেই বাগান থেকে কাঁচা চা-পাতা উত্তোলন করে সেখান থেকে বাণিজ্যিকভাবে চা উৎপাদনের সব ইন্ডাস্ট্রি রয়েছে।

সেসব বাগানে অনেক প্রযুক্তিবিদ, ব্যবস্থাপনা কর্মী ও চাশ্রমিক কাজ করার সুযোগ পায়। চাশ্রমিকদের বেশির ভাগই নারী (৭৫%)। অর্থাৎ নারী-পুরুষের অনুপাত ৪:১। তাতে একদিকে যেমন নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় অন্যদিকে তেমনি রপ্তানিমুখী শিল্পের মাধ্যমে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। ব্রিটিশরা এক সময় এ শিল্পের গোড়াপত্তন করলেও এখন তা অনেকটাই দেশীয় ব্যবসায়ীদের দখলে। কাজেই এটি এখন একটি লাভজনক শিল্প হওয়ায় দিনে দিনে নতুন নতুন সম্ভাব্য স্থানে তার চাষের আওতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এম এম ইস্পাহানী লিমিটেড, কাজী অ্যান্ড কাজী, দ্য ট্রান্সকম গ্রুপ, জেমস ফিনলে বাংলাদেশ, দ্য ওরিয়ন গ্রুপ, দ্য আবুল খায়ের গ্রুপ, ডানকানস ব্রাদার্স বাংলাদেশ লিমিটেড ইত্যাদি দেশি-বিদেশি কোম্পানি এখন বাংলাদেশে চা উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত।

বর্তমানে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলেই এর ব্যাপ্তি বেশি। কারণ দেখা গেছে বৃহত্তর সিলেটের সিলেট জেলা, হবিগঞ্জ জেলা, মৌলভীবাজার জেলা, অন্যদিকে চট্টগ্রাম জেলা, পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি জেলা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় অল্প কয়েকটি করে চা-বাগান রয়েছে। সাম্প্রতিককালে অল্প পরিমাণে চা-চাষ শুরু হয়েছে পঞ্চগড় জেলায়। পাশাপাশি আরও কয়েকটি জেলায় একই আবহাওয়া বিরাজ করায় ভারতের সীমান্তবর্তী ঠাকুরগাঁও, রাজশাহী অঞ্চলে চা-বাগান স্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে দেশের মধ্যাঞ্চলে ভারতীয় সীমান্ত এলাকায় অর্থাৎ শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনায় গাড়ো পাহাড়ের পাদদেশে চা আবাদ সম্প্রসারণ সম্ভব। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্টদের দ্বারা পরীক্ষামূলকভাবে এসব এলাকায় চা আবাদের সমীক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

আমরা জানি চা আবাদের জন্য উঁচু ও বেলে-দোঁয়াশ প্রকৃতির জমি প্রয়োজন। আবার সেখানে প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টিপাত হওয়া প্রয়োজন। তবে শর্ত থাকে যে প্রচুর বৃষ্টিপাত হলেও সেখানে পানি আটকাতে পারবে না। ছোট ছোট পাহাড় ও টিলা আছে এমন স্থানই তার জন্য উপযুক্ত হয়ে ওঠে। কাজেই এসব বিবেচনাতেই ওপরে উল্লিখিত স্থানগুলোয় চা আবাদ করা হয়ে থাকে। দেখা যাচ্ছে- এমন আবহাওয়া বিরাজ করে দেশে আরও অনেক স্থান রয়েছে যেখানে চা-বাগান স্থাপন করা যেতে পারে। কারণ চা বাংলাদেশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পণ্য। চা-চাষ ও উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ১২তম। এ খাতে দেশে বর্তমানে ৪ মিলিয়ন মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। দেশের যেসব স্থানে অন্যকোনো ফসল ফলানো সম্ভব নয়। প্রকারান্তরে পাহাড়ি এসব স্থান অনাবাদি থাকে এবং যেখানে অন্যকোনো ফসল ফলানো সম্ভব নয়, সেখানেই চায়ের আবাদ হয়। তাই নতুন নতুন স্থানে এর আবাদ বাড়াতে পারলে দেশ ও জাতি উপকৃত হবে। কাজেই আগামীতে সম্ভাব্য আরও নতুন নতুন স্থানে চায়ের আবাদ বাড়াতে হবে। তবে সে ক্ষেত্রে সরকারের চা বোর্ড, চা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও কৃষি বিভাগের যৌথ সহযোগিতা প্রয়োজন। আর দেশের সার্বিক উন্নয়নে সরকার তা করছে এবং করবে।

লেখক: কৃষিবিদ ও রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়


এখনই দরকার রাশ টেনে ধরা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ড. মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর জাতীয় রাজনীতিতে অনেক কিছুই আগের মতো নেই। পরিস্থিতি পরিবেশ বদলে গেছে এবং যাচ্ছে। বদলে যাওয়া এই পরিস্থিতির সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকে কীভাবে নিজেদের প্রস্তুত করবে তার ওপর সেই দলের রাজনীতির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে। ৭ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে যতই মুখে বলুক যে তারা বিজয়ী হয়েছে, আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়েছে কিন্তু রাজনীতির বাস্তবতা তা বলে না। বিএনপি এবং যুগপৎ আন্দোলনকারী দলগুলো ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে দুই কৌশল নিয়ে অগ্রসর হয়েছিল। প্রথম কৌশলটি ছিল রাজধানী ঢাকায় মস্ত বড় গণ্ডগোল পাকিয়ে শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা। এটি আমার নয়, তাদেরই মুখে উচ্চারিত কথা। দ্বিতীয় কৌশল ছিল নির্বাচন বর্জনের ডাক দিয়ে নির্বাচন কমিশনসহ সবকিছুকে অচল করে দেওয়ার মাধ্যমে বিদেশিদের সমর্থনে এক দফার দাবি অনুযায়ী সরকারকে হটিয়ে পরবর্তী নির্বাচন নিজেদের মতো করে অনুষ্ঠিত করা। তাদের ধারণা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের পাশে থাকলে আওয়ামী লীগ এককভাবে নির্বাচন করতে সাহস পাবে না। তা ছাড়া বিএনপি যেহেতু নির্বাচন বর্জন ও প্রতিহত করার ডাক দিয়েছে তাই বিএনপি ছাড়া অনুষ্ঠিত ৭ জানুয়ারির নির্বাচন পশ্চিমা দেশগুলো অনুষ্ঠিত হতে দেবে না, মেনেও নেবে না। ২৮ অক্টোবরের পর থেকেই বিএনপি এবং যুগপৎ আন্দোলনকারী দলগুলো সে পথে হেঁটে ছিল। নির্বাচন বর্জন ও প্রতিহত করার নামে যখন তাণ্ডব চালানো হয়, চলন্ত বাস-ট্রেনে অগ্নিসংযোগ করে মানুষ পুড়িয়ে মারা হয় তখন রাজনীতিতে সেই সব দলের অবস্থান হয়ে যায় সন্ত্রাসী দলে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া কোনো সুযোগ থাকে না। সরকার তাই করেছে। বিএনপির বেশ কিছু নেতা নানা মামলায় কারারুদ্ধ হয়েছে। ছাত্রদল যুবদলের অনেকেই আইন ভঙ্গ করায় কারারুদ্ধ হয়েছে, অনেকে আন্দোলন ছেড়ে পালিয়ে বেড়িয়েছে। মাঠে তখন ছিল জনসমর্থনহীন কতগুলো নামসর্বস্ব দলের সামান্য কিছু নেতা ও কর্মী। তারা মাঠে চিৎকার করেছে কিন্তু জনগণ তাদের চিৎকার-চেঁচামেচিতে খুব একটা কান দেয়নি। জনগণ বুঝতে পেরেছে যে বিএনপি এবং যুগপৎ আন্দোলনকারীরা ২৮ অক্টোবরের আগে যতটা নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে ছিল, ২৮ তারিখ থেকে তা সম্পূর্ণরূপে উল্টে গেছে। এই অবস্থায় বিএনপি এবং যুগপৎ আন্দোলনকারীদের হরতাল, অবরোধ, অসহযোগ, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদির প্রতি সমর্থন জানিয়ে ভোট বর্জন করার কোনো সুযোগ তাদের নেই। বিএনপি এবং যুগপৎ আন্দোলনকারীদের হটকারী রাজনীতির পেছনে যেমন ছিল ভিন্ন উদ্দেশ্য, একইভাবে ছিল ভিন্ন ভিন্ন কার্যকারণও। বিশেষ করে লন্ডন অহির কাছে ঢাকার নেতাদের সিদ্ধান্ত কিংবা কর্মসূচি চিন্তার কোনো মূল্যই ছিল না। ফলে বিএনপি যা আশা করেছিল তার কিছুই তাদের রাজনীতির ভাগ্যে ঘটেনি। তারপরেও তারা দাবি করছে যে তাদের জয় হয়েছে; কিন্তু কীভাবে হয়েছে সেই ব্যাখ্যা কারও কাছে জানা নেই। তারপরও বিএনপি একই কথা আউড়িয়ে যাচ্ছে। বিএনপির কিছুসংখ্যক নেতা-কর্মী এখন দলের নেতাদের বক্তৃতা শুনতে আসেন; কিন্তু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নেতা-কর্মীরা এখন অনেকটাই নিষ্ক্রিয় হয়ে আছেন কিংবা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। মনে হচ্ছে এখন বিএনপির কয়েকজন নেতা দলের নেতা-কর্মীদের চাঙ্গা করার জন্য সরকারের বিরুদ্ধে আগের হুংকারগুলো দিচ্ছেন, সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করবেন বলেও দাবি করছেন; কিন্তু এসব হুংকারে যে চিঁড়া ভিজবে না তা বোঝার জন্য কাউকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হতে হবে না। বিএনপির লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য রাজনীতি সচেতন যেকোনো মানুষ বুঝতে সক্ষম। ৭ জানুয়ারি পরবর্তী পরিস্থিতিতে দলের হতাশগ্রস্ত নেতা-কর্মীদের কীভাবে সক্রিয় ও উজ্জীবিত করা যাবে, আগামী নির্বাচন পর্যন্ত ধরে রাখা সম্ভব হবে সেই চেষ্টাই করছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। বিএনপির বর্তমান নেতারা যদি তাই করে থাকেন এবং বুঝেও থাকেন তাহলে সেটি হবে রাজনৈতিকভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত। সামনে বেশ কিছু স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বিএনপি এসব নির্বাচনে অংশ নেবে কি না, নাকি আগের বর্জনতত্ত্বেই থাকে তা অবশ্য দেখার বিষয়। বর্জনতত্ত্বে অনড় থাকলে তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা সেই সিদ্ধান্ত মেনে সুবোধ বালকের মতো ঘরে বসে থাকবে- এমনটি নাও হতে পারে। সুতরাং বিএনপির সম্মুখে রাজনীতিতে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সেসব চ্যালেঞ্জ বিএনপি কীভাবে মোকাবেলা করবে তার ওপর বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনীতি নির্ভর করবে।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নির্বাচন-পূর্ববর্তী দেশের রাজনৈতিক জটিল পরিস্থিতিকে ঠাণ্ডা মাথায় কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে সাফল্যের সঙ্গে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে। সে ক্ষেত্রে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা তার রাজনৈতিক পরিপক্বতা দিয়ে নির্বাচনটিকে প্রতিহত ও বর্জনকারীদের হাত থেকে রক্ষা করতে পেরেছেন। এদিক থেকে তিনি এককভাবে রাজনীতির চ্যাম্পিয়ন হিসেবে দলকে যেমন বিজয়ী করে এনেছেন, বিদেশিসহ নানা দেশীয় ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছেন। শেখ হাসিনা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেশে এখন দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য মন্ত্রিপরিষদ এবং নিজে নানাভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। সামনে যেহেতু রোজা তাই রোজায় বাজার যথাসম্ভব স্থিতিশীল রাখাটি সরকারের জন্য একটি বড় ধরনের অগ্নিপরীক্ষা। এ পর্যন্ত যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা দেখে মনে হচ্ছে সরকার তার পরিকল্পিত সড়কেই হাঁটছে। আমদানিকৃত পণ্যগুলো এসে পৌঁছালে অনেক কিছুর দামই মানুষের নাগালের মধ্যে চলে আসতে পারে। দ্রব্যমূল্যের ইস্যুটি এখন সরকারের কাছে মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ। এটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভালো করেই জানেন। এ ব্যাপারে ভালো করেই কথা বলছেন, ব্যবস্থাও নিচ্ছেন, সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে এই সমস্যার মোকাবিলা করার উদ্যোগ নিয়েছেন। মনে হয় তিনি পারবেন। আরও কিছু চ্যালেঞ্জ সরকারের জন্য বেশ কঠিন হলেও মোকাবিলা করতে শেখ হাসিনা প্রস্তুত আছেন। বলা চলে- সরকার পরিচালনায় শেখ হাসিনা এবার মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ এনে যেমন সব মহলের প্রশংসা কুড়িয়েছেন। নতুনরা এখনো পর্যন্ত মনে হচ্ছে আন্তরিকভাবেই কাজ করছেন। ফলে সরকার সরকারের গতিতে এগিয়ে চলছেন এবং চলবেও। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যেসব বৈরী পরিস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে সেগুলো এখন সেভাবে আর নেই। মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে অংশ নিয়ে তিনি তার এবং বাংলাদেশের অবস্থান নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পেরেছেন। পশ্চিমা বিশ্ব এখন শেখ হাসিনার সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী সেটিও পরিষ্কার হয়ে গেছে। তারপরেও পশ্চিমা বিশ্বকে প্রতিনিয়ত ভুল বোঝানোর জন্য অনেকেই লেগে আছে। সুতরাং স্বস্তিতে ঘুমানোর সুযোগ নেই। দেশের অভ্যন্তরেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেঞ্চ অবস্থান জারি রাখতেই হবে। শুধু সরকারি অফিস, ব্যাংকখ্যাত, ব্যবসা-বাণিজ্য বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ইত্যাদিতে ৯ দলীয় নেতা-কর্মীদের আচার-আচরণ এবং নানাভাবে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি মোটেও হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। বিগত ১৫ বছরে তৃণমূল থেকে ওপর পর্যন্ত অনেকেরই পদ-পদবি নিয়ে নানা ধরনের দুর্নীতিতে জড়িয়ে থাকার যথেষ্ট অভিযোগ রয়েছে। সরকারের দেওয়া সামাজিক সুরক্ষা খাতে নানা ধরনের অর্থ বরাদ্দ নিয়ে নয়-ছয় করার যথেষ্ট প্রমাণ এবং অভিযোগ রয়েছে। এগুলোর সঙ্গে স্থানীয় নেতা-কর্মীদের জড়িত থাকার বিষয়টি এখন আর গোপন নয়। দলকে এখন আওয়ামী লীগের রাজনীতির আদর্শে কীভাবে সুসংগঠিত করা যায় কীভাবে জনগণের মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রতি ভালোবাসা এবং সমর্থন বৃদ্ধি করা যায় তা নিয়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড গতিশীল করতেই হবে। মাঠপর্যায়ে অনেক নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এবং আগুল রয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বেশ কিছু বাঘা বাঘা নেতা পরাজিত হওয়ার পেছনে কি কি কারণ রয়েছে সেগুলোও উদ্ঘাটন করা খুবই জরুরি বিষয়। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতীক বরাদ্দের ব্যবস্থা না থাকায় আওয়ামী লীগের অপেক্ষাকৃত সৎ, যোগ্য ও আদর্শবান নেতাদের নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিতর্কিত দুর্নীতিপরায়ণ জনসমর্থনহীন নেতারা রাজনৈতিক প্রক্রিয়াতেই বাদ পড়ে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সম্পূর্ণরূপে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখে চললে দলের জনসমর্থন দ্রুত বেড়ে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে, বিতর্কিতরা পরিত্যাজ্য হবে। গত ১৫ বছর মাঠের রাজনীতি কতটা পরিচ্ছন ছিল, না হলে কারা কারা এর জন্য দায়ী তাদের চিহ্নিত করা প্রয়োজন। যারা সত্যিকার অর্থেই দলের অভ্যন্তরে গ্রুপিং এবং নিজের স্বার্থসিদ্ধিতে দলকে ব্যবহার করেছেন তাদের ব্যাপারে দলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনাযোগ্য। দলের অঙ্গসংগঠনগুলোর ভূমিকাও পুনর্মূল্যায়নের দাবি রাখে। অনেক জায়গাতেই কৃষক নয়- অথচ কৃষকলীগের পদ-পদবি দখল করে আছেন এমন পরিস্থিতি কীভাবে পরিবর্তন করা যাবে তাও ভাবার বিষয়। সংসদে অনেকেই সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে আসার সময় জনগণের সঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তাদের প্রতিশ্রুতি তারা কতটা রক্ষা করছেন সে ক্ষেত্রেও দলের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। দলের অনেকেই জনগণের মধ্যে না থেকে শহরে এসে স্থানীয় পর্যায়ে কিছু কিছু অনুগত ব্যক্তিকে দিয়ে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেন। এর ফলে দলের মধ্যে যেমন বিভাজন তৈরি হয়, জনগণের মধ্যেও ওইসব মন্ত্রী, এমপিদের নিয়ে ক্ষোভ বিরাজ করতে দেখা যায়। আওয়ামী লীগকে গত ১৫ বছর ধরে সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় ফেলেছে বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ এবং নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্যরা। ছাত্রলীগের নামে অনেকেই নানা ধরনের কর্মকাণ্ডে যুক্ত রয়েছে যা শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত করছে ছাত্রলীগকেও বিতর্কিত করে তুলছে। ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে ভালো লেখাপড়া, গবেষণা, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক নানা বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আলোচনা ও সেমিনার অনুষ্ঠিত করার শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রিয়া প্রতিযোগিতার কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায় না। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। এর ফলে ছাত্রলীগ নামধারী অনেকেই ভালো ছাত্র হিসেবে পরিচিতি অর্জনের চেয়ে অন্য বিশেষণে বিশেষায়িত হচ্ছে। প্রকৃত শিক্ষালাভ জ্ঞানদক্ষতা এবং রাজনৈতিক সচেতনতায় সমৃদ্ধ নেতা-কর্মী খুব একটা সৃষ্টি হচ্ছে না। অন্যদিকে ব্যতিক্রম কিছুসংখ্যক উপাচার্য ছাড়া গত ১৫ বছরে বদনাম কামিয়েছেন এমন উপাচার্যের সংখ্যা বেশি হওয়ার বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। এ বিষয়গুলোর প্রতি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা নতুনভাবে ভাবতে হবে। এখনি যদি রাশ টেনে ধরা যায় তাহলে দেশের সর্বক্ষেত্রে দল এবং আদর্শ হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রসার অপ্রতিরোধ্যভাবে বাড়বে এতে কোনো সন্দেহ নেই; কিন্তু তা করা না হলে আওয়ামী লীগ যতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, দেশের ভবিষ্যৎ তার চেয়েও বেশি বিপন্ন হবে তা নিশ্চিত করে বলা চলে।


সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করতে হবে

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
হীরেন পণ্ডিত

এসডিজির অভীষ্ট ৩:৬-এ বিশ্বব্যাপী সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ও নিহতের সংখ্যা ২০২০ সালের মধ্যে অর্ধেকে কমিয়ে নিয়ে আসার কথা বলা হয়েছে। এসডিজির অভীষ্ট ১১:২-এ রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত যানবাহন সম্প্রসারণ করে সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতির মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও সুলভ পরিবহন ব্যবস্থায় সবার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জনে এখন সবাইকে কাজ করতে হবে।

সড়ককে নিরাপদ করতে ডিভাইডার স্থাপন, বাঁক সরলীকরণ, সড়ক ৪ লেনে উন্নীতকরণ, মহাসড়কে চালকদের জন্য বিশ্রামাগার নির্মাণ ও গতি নিয়ন্ত্রক বসানোসহ নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। সড়ক পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা আনয়ন, দক্ষ চালক তৈরি এবং দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে টাস্কফোর্স গঠন করে এর ভিত্তিতেই কাজ চলছে। সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধ তথা সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সরকারের পাশাপাশি পরিবহন মালিক, শ্রমিক, যাত্রী, পথচারী ও সংশ্লিষ্ট সকলকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে একযোগে কাজ করতে হবে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পর ক্ষতিগ্রস্ত সকল সড়ক ও সেতু মেরামত করে যোগাযোগ অবকাঠামো পুনঃস্থাপন করেন। তিনি ১৯৭৪ সালের মধ্যেই মুক্তিযুদ্ধে ধ্বংসপ্রাপ্ত সকল সেতু পুন:নির্মাণ করে চলাচলের উপযোগী করেন, পাশাপাশি তিনি ৪৯০ কি.মি. নতুন সড়ক নির্মাণ করেন। বাংলাদেশ সরকারের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় জাতির পিতা সড়ক পরিবহন খাতকে অগ্রাধিকার প্রদান করে আধুনিক সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কার্যক্রম শুরু করেন। সরকার জাতির পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ২০৩০ এবং প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০৪১ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নিরাপদ সড়ক নেটওয়ার্ক উন্নয়নের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন ও সময় সাশ্রয়ী যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন সম্প্রসারণের নিমিত্তে কাজ করে যাচ্ছে। নিজস্ব অর্থায়নে করা স্বপ্নের বহুমুখী পদ্মা সেতুসহ সারা দেশে বিস্তৃত যোগাযোগ ব্যবস্থা জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।

সড়ক পরিবহন ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব উন্নয়নের পাশাপাশি নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা জোরদার করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে বর্তমান সরকার। আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং টেকসই ও নিরাপদ মহাসড়ক নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করাই সরকারের লক্ষ্য। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে স্বয়ংক্রিয় মোটরযান ফিটনেস সেন্টার চালু করা হয়েছে। ই-ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রবর্তনের মাধ্যমে বিআরটিএ’র প্রায় সকল সেবা ডিজিটালাইজড করা হয়েছে, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে ৬ দফা নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে পাঁচ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ‘বাংলাদেশ রোড সেইফটি প্রজেক্ট’ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

চালকের অদক্ষতা ও বেপরোয়া যানবাহন চালানোর পাশাপাশি ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, সড়ক ও সেতুর নাজুক অবস্থাও সড়ক দুর্ঘটনার জন্য বহুলাংশে দায়ী। গণপরিবহনে বাড়তি যাত্রী সামাল দিতে গতিসীমার বাইরে দ্রুত গাড়ি চালিয়ে বেশি ট্রিপ দেয়ার অশুভ প্রতিযোগিতা আর বাড়তি মুনাফার লোভে পরিবহন সংস্থাগুলো চালকদের অনেক বেশি সময় কাজ করতে বাধ্য করে। ফলে চালকের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ পড়ে, তাকে বেসামাল হয়ে গাড়ি চালাতে হয়; যা প্রকারান্তরে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যানবাহনে রঙ লাগিয়ে যেনতেন মেরামত করে রাস্তায় চলাচল করে বিভিন্ন উৎসব-পার্বণের সময়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অতিরিক্ত যাত্রী দূর-দূরান্তে গমনাগমন করে। সড়ক-মহাসড়কে চলে বাস-ট্রাকের চালকের অমনোযোগী লড়াই। অতি আনন্দে গাড়ি চালানোর সময় তারা ব্যবহার করেন সেলফোন, যা সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত। পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী বহন, অদক্ষ চালক ও হেলপার দ্বারা যানবাহন চালানো, বিরামহীন যানবাহন চালানো, মহাসড়কে অটোরিকশা, নসিমন-করিমন ও মোটরসাইকেলের অবাধ চলাচল এবং ব্যস্ত সড়কে ওভারটেকিং, ওভারলোডিং সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয়। প্রধানমন্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে পাঁচ দফা নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেগুলো ছিল চালক ও সহকারীদের প্রশিক্ষণ প্রদান, দূরপাল্লার বাসযাত্রায় বিকল্প চালক রাখা ও ৫ ঘণ্টা পরপর চালক পরিবর্তন করা, চালক ও যাত্রীদের সিটবেল্ট বাঁধা বাধ্যতামূলক করা, চালকদের জন্য মহাসড়কে বিশ্রামাগার নির্মাণ এবং সিগন্যাল মেনে যানবাহন চালানোর ওপর কড়াকড়ি আরোপ।

উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি নির্দেশকও বটে। বাংলাদেশ দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে, আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর দৃষ্টিতে সম্ভাবনাময় অর্থনীতির দেশ। সরকারের লক্ষ্য ২০৪১ সালে উন্নত দেশ হওয়ার। উন্নয়নশীল বা মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে শামিল হওয়া বাংলাদেশের পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে অনেক কাজ চলছে। বাংলাদেশে মোটরসাইকেল বিক্রি সম্প্রীতি বহুগুণ বেড়েছে। আঞ্চলিক সড়কে মোটরসাইকেল চালানোর নিয়ম মানছেন না চালকরা; চালক ও আরোহীরা হেলমেট ঠিকমতো পরেন না; এক মোটরসাইকেলে দু'জনের বেশি না ওঠার নিয়ম মানা হয় না; জেলা-উপজেলা পর্যায়ে অনিবন্ধিত মোটরসাইকেল অহরহ চলাচল করে; অনেকের আবার মোটরসাইকেল চালানোর প্রশিক্ষণ নেই।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ বৃদ্ধি; চালকের বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্দিষ্টকরণ; বিআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধি; পরিবহনের মালিক-শ্রমিক, যাত্রী ও পথচারীদের প্রতি ট্রাফিক আইনের বাধাহীন প্রয়োগ নিশ্চিতকরণ; মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং এগুলোর জন্য আলাদা সার্ভিস রোড তৈরি; পর্যায়ক্রমে সব মহাসড়কে রোড ডিভাইডার নির্মাণ; গণপরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ; রেল ও নৌপথ সংস্কার ও সম্প্রসারণ করে সড়কপথের ওপর চাপ কমানো; টেকসই পরিবহন কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন।

যে কোনো দুর্ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সড়কে যেভাবে মানুষের প্রাণহানি ঘটছে, তা যেভাবেই হোক কমাতে হবে। নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। দক্ষ চালক তৈরির জন্য সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত সংখ্যক চালক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। এ ছাড়া সড়কে মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন চলাচল বন্ধে সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে।

সড়ক দুর্ঘটনা বিশ্বব্যাপী মানুষের মৃত্যু ও ইনজুরির অন্যতম প্রধান কারণ। সব বয়সের মানুষের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর অষ্টম প্রধান কারণ হলো সড়ক দুর্ঘটনা। ৫-২৯ বছর এবং আরো কম বয়সি শিশুদের জন্য এটি মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবেও চিহ্নিত হয়েছে। প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয় যে, বিশ্বব্যাপী শতকরা ৯০ ভাগ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে, যার সংখ্যা উন্নত দেশগুলোর তুলনায় তিন গুণ বেশি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের চিত্র অনেকটা একই রকম।

সড়ক ও জনপথ বিভাগ, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, ২০১৬-১৭ সালে পরিচালিত একটি জরিপে, অর্থনৈতিক ক্ষতি, চিকিৎসা ব্যয়, জীবনযাত্রার ব্যয়, যানবাহন ও প্রশাসনিক ক্ষতি এবং অন্যান্য হিসাব থেকে দেখানো হয়েছিলো কর্মজীবী ব্যক্তি যিনি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন তার সব মিলিয়ে একটি মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৫ মিলিয়ন টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। তবে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার জনপ্রতি পাঁচ লাখ টাকা ক্ষতি হয়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য সড়ক দুর্ঘটনা একটি উদ্বেগজনক বিষয়। দুর্ঘটনা মানবিক ও অর্থনৈতিক উভয় অবস্থাকে প্রভাবিত করে। হিউম্যান ক্যাপিটাল পদ্ধতিতে একটি খরচ অনুমান মডেল করা হয়েছে। গড় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ (টাকায়) মোট ক্ষতির পরিমাণ ৪৯ লাখ ৬৯ হাজার। একজন কর্মজীবী ব্যক্তির অর্থনৈতিক ক্ষতি, সরকারি সমীক্ষা দেখায় যে সড়ক দুর্ঘটনায় একজন কর্মজীবী ব্যক্তির মৃত্যুর ফলে গড় অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় ২৪ লাখ ৭২ হাজার ১০৮ টাকা। গুরুতর আঘাতের ক্ষেত্রে, গড় আর্থিক ক্ষতি হয় ২১ হাজার ৯৮ টাকা। ৩৮ ভাগ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে থাকে অসাবধানে গাড়ি চালানোর কারণে বেশির ভাগ চালক ট্রাফিক নিয়মের প্রতি তাদের অবাধ্য মনোভাবের পাশাপাশি সঠিকভাবে প্রশিক্ষিত বা উপযুক্ত বিশ্রামও পান না।

সড়ক-দুর্ঘটনায় হতাহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই বয়সে তরুণ বা যুবক এবং নানাবিধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত। সড়ক দুর্ঘটনার কারণ ও এর ক্ষয়-ক্ষতির ব্যাপকতা বহুমাত্রিক যা প্রতিটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। বিআইডিএস এর গবেষণায় দেখা যায়, সড়ক-দুর্ঘটনায় বাংলাদেশে প্রতিবছর জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। সড়ক-দুর্ঘটনাকে সহনীয় মাত্রায় রাখতে তথা সড়ক-দুর্ঘটনাজনিত মানুষের মৃত্যু, পঙ্গুত্ব ও অসুস্থতা এবং সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতি লাঘবের উদ্দেশ্যে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহ তার সদস্যভুক্ত প্রায় প্রতিটি দেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহকে সাথে নিয়ে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতের সংখ্যা শতকরা ৫০ ভাগ কমানোর জন্য টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ ও কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়তা করা এবং “গ্লোবাল প্ল্যান ফর সেকেন্ড ডিকেড অফ অ্যাকশন ফর রোড সেইফটি ২০২১-২০৩০” নিশ্চিত করতে কার্যকর কর্মপন্থা নির্ধারণ করে সেগুলো বাস্তবায়নে সহযোগিতা করা ইত্যাদি। আশার কথা হলো এই যে, সড়ক-দুর্ঘটনা কমানোর উদ্দেশ্যে বিশ্বব্যাপী গৃহীত এসকল পদক্ষেপ সমূহের সাথে বাংলাদেশও একাত্মতা প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি সেগুলোর বাস্তবায়নের জন্য যথাযথ কর্মপন্থা নির্ধারণ পূর্বক প্রয়োজনীয় কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে।

সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ এর আলোকে সড়ক পরিবহন বিধিমালা-২০২২ হালনাগাদ করণের মাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তা জোরদারের প্রচেষ্টা গ্রহণ সরকারের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ এবং অন্যতম প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এসডিজিগুলোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ “সড়ক পরিবহন বিধিমালা- ২০২২” এ বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য বিধান সংযুক্তিপূর্বক গেজেট প্রকাশ করেছে। এ সকল বিধিমালার কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তাকে জোরদার করে তোলাই উক্ত বিধিসমূহ সংযোজনের প্রধান উদ্দেশ্য। তাই এ ধরনের কার্যকর ও সময়োপযোগী সড়ক পরিবহন বিধিমালা জারির জন্য বাংলাদেশ সরকার নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবীদার।

সড়ক দুর্ঘটনার একাধিক কারণ রয়েছে যার মধ্যে অন্যতম প্রধান করণ হলো অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো। দেশে নিয়মিত ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা। অনিয়ন্ত্রিত গতি দুর্ঘটনার ঝুঁকির পাশাপাশি আঘাতের তীব্রতা এবং দুর্ঘটনার ফলে মৃত্যুর সম্ভাবনাকে সরাসরি প্রভাবিত করে। বিশ্বের ৮০ টির বেশি বড় শহরে পরিচালিত সমীক্ষার উপর ভিত্তি করে জাতিসংঘ এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, শহর এলাকায় সর্বোচ্চ গতিসীমা ৩০ কিলোমিটার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারলে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। এছাড়াও শহর এলাকায় যানবাহনের এরূপ নিম্নমাত্রার গতিসীমা যানযট ও বায়ুদূষণ কমানোর ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখে বলে গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া গেছে।

যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত গতি ছাড়াও নেশাগস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকির পাশাপাশি আঘাতের তীব্রতা এবং দুর্ঘটনার ফলে মৃত্যুর সম্ভাবনাকে সরাসরি প্রভাবিত করে। গবেষণায় এটা প্রমাণিত যে, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো নিষেধ- এই বিধানটি শতভাগ প্রয়োগ করা সম্ভব হলে দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা শতকরা ২০ ভাগ হ্রাস করা সম্ভব। (সূত্র: গ্লোবাল রোড সেইফটি পার্টনারশীপ)।

পাশাপাশি, দুই এবং তিন চাকার মোটরযান ব্যবহার মাথায় আঘাত জনিত মৃত্যু ও ট্রমার অন্যতম প্রধান কারণ। দ্রুততম সময়ের মধ্যে গন্তব্যস্থলে পৌঁছার জন্য বহু মানুষ মোটরসাইকেল ব্যবহার করছেন। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে দেশে এর ব্যবহার অত্যধিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক্ষেত্রে গতির পাশাপাশি হেলমেট পরিধানের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হেলমেট পরিধান না করা সরাসরি দুর্ঘটনার কারণ না হলেও দুর্ঘনায় আহত ব্যক্তির আঘাতের মাত্রা হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গবেষণায় এটাও দেখে গেছে যে নিরাপদ হেলমেট যথাযথা নিয়মে ব্যবহারে দুর্ঘটনায় মৃত্যু ঝুঁকি শতকরা ৪০ ভাগ এবং মাথার আঘাতের ঝুঁকি শতকরা ৭০ ভাগ হ্রাস করে। (সূত্র: গ্লোবাল রোড সেইফটি পার্টনারশীপ)।

একইভাবে সিটবেল্ট ব্যবহার সরাসরি দুর্ঘটনার কারণ না হলেও দুর্ঘনায় আহত ও নিহতের হার হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, সিটবেল্ট পরা চালক এবং সামনের আসনে যাত্রীর মধ্যে মৃত্যুর ঝুঁকি শতকরা ৪৫-৫০ ভাগ এবং পিছনের আসনের যাত্রীদের মধ্যে মৃত্যু এবং ও আঘাতের ঝুঁকি শতকরা ২৫ ভাগ হ্রাস করে। এছাড়াও গ্লোবাল রোড সেইফটি পার্টনারশীপ এর তথ্য মতে, শিশুদের জন্য নিরাপদ বা সুরক্ষিত আসনের ব্যবহার সড়ক দুর্ঘটনায় ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে শতকরা ৭০ ভাগ এবং বড় শিশুদের ক্ষেত্রে শতকরা ৫৪-৮০ ভাগ মারাত্মক আঘাত পাওয়া এবং মৃত্যু হ্রাসে অত্যন্ত কার্যকর।

যানবাহনের গতিসীমা বিষয়ে উক্ত বিধিমালার সপ্তম অধ্যায়ে সুনির্দিষ্ট বিধান সন্নিবেশিত হয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মোটরযানের গতিসীমা নির্ধারণ, নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ক নির্দেশনা বা গাইডলাইন জারি করা সংক্রান্ত বিধানটি। এর ফলে ভবিষ্যতে সড়ক ও মোটরযানের প্রকারভেদের ভিত্তিতে যথাযথ গতিসীমা নির্ধারণ করা ও এর যথাযথ বাস্তবায়নের পথ প্রশস্ত হলো। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অচিরেই এই গাইডলাইনে উল্লেখিত বিধিগুলো কার্যকর বাস্তবায়নের নিমিত্তে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

এই বিধিমালার যথাযথ বাস্তবায়ন সড়কে নিরাপত্তা বিষয়টিকে আরো জোরদার করবে এবং সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস করার মাধ্যমে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথকে আরো সহজতর করবে। সরকার বিধিমালায় যেসকল পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছে যেমন- সড়ক ও মোটরযানের প্রকারভেদের ভিত্তিতে গতিসীমা নির্ধারণ, নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা, হেলমেটের গুণগত মান নির্ধারণ, এর যথাযথ ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা, সীটবেল্টে যথাযথ ব্যবহার, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সুরক্ষিত শিশু আসন ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা ইত্যাদি বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে যত দ্রæত সম্ভব সেগুলো নিশ্চিত করণ ও বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিবেন।

সড়ক নিরাপত্তা বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সেফ সিস্টেমস এপ্রোাচ যেমন নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ মোটরযান, নিরাপদ সড়ক ব্যবহারকারী, নিরাপদ গতিসীমা ও দুর্ঘটনা পরবর্তী ব্যবস্থাপনা ইত্যাদির সমন্বয়ে একটি পৃথক সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করার বিষয়ে সরকারের যে উদ্যোগ রয়েছে সেগুলো আমাদের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে জোরদার করবে এবং বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা ও বর্তমান সরকারের অঙ্গীকার স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে এক গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী ভূমিকা পালন করবে। এতে একদিকে যেমন সড়কে মৃত্যু কমবে একইসাথে সড়ক দুর্ঘটনাজনিত অর্থনৈতিক ক্ষতি (জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ) কমানোর পথ সুগম হবে। যার মাধ্যমে এসডিজির ধারা ৩.৬ এবং ১১.২ অর্জনের পথে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে যাবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক


বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
তোফায়েল আহমেদ

ইতিহাসের মহামানব জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন এই পাকিস্তান বাঙালিদের জন্য হয়নি, এক দিন বাংলার ভাগ্যনিয়ন্তা বাঙালিদের হতে হবে। সেই লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে ’৪৮-এর ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগ এবং ’৪৯-এর ২৩ জুন আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর প্রিয় মাতৃভাষা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় অভিষিক্ত করতে মহান ভাষা আন্দোলন সংগঠিত করে ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের বীজ রোপণ করেন; এরপর স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকারের পথ বেয়ে সর্বজনীন ভোটাধিকারের দাবি আদায় করে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সুদীর্ঘ পথ বেয়ে গণরায় নিয়ে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতারূপে আত্মপ্রকাশ করেন; পাকিস্তানি সামরিক শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতার হস্তে ক্ষমতা হস্তান্তরে নানামুখী টালবাহানা ও বিশ্বাসঘাতকতামূলক গণহত্যা চাপিয়ে দেওয়ার কারণে নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় অর্জিত স্বাধীনতা ঘোষণার রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন ও রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে একচ্ছত্র নেতৃত্ব প্রদান করে ৩০ লক্ষাধিক প্রাণ আর ২ লক্ষাধিক মা-বোনের সুমহান আত্মত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন; এবং বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য ৫টি মৌলিক অধিকার- অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা সাংবিধানিকভাবে বিধিবদ্ধ করেন। যে কারণে আমরা বলি, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ সমার্থক। আজ তাঁরই সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের উদ্যোগে গঠিত গণরায়ে নির্বাচিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার সংবিধানে বিধিবদ্ধ ৫টি মৌলিক অধিকার দেশের মানুষের কল্যাণে ধাপ ধাপে বাস্তবায়ন করছে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বে আজ ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ থেকে ‘স্মার্ট সোনার বাংলা’য় রূপান্তরিত হওয়ার লক্ষ্যে ধাবমান।

প্রতি বছর ২৩ ফেব্রুয়ারি দিনটি গভীরভাবে স্মরণ করি। দিনটি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন। ১৯৬৯-এর এই দিনে বাংলার দুঃখী মেহনতী মানুষের বন্ধু, বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেতাকে জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞচিত্তে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এ বছর বঙ্গবন্ধু উপাধি প্রাপ্তির ৫৫তম বার্ষিকী। বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে ’৬৯-এর গণআন্দোলন এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। কালপর্বটি ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের ‘ড্রেস রিহার্সেল’। জাতির মুক্তিসনদ ৬ দফা দেওয়াকে রাষ্ট্রদ্রোহী অপরাধ গণ্য করে বঙ্গবন্ধু মুজিবসহ সর্বমোট ৩৫ জনকে ফাঁসি দেওয়ার লক্ষ্যে ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য’ তথা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি করা হয় এবং নির্বিঘ্নে পুনরায় ক্ষমতায় আরোহণের এক ঘৃণ্য মনোবাসনা চরিতার্থে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করেন স্বৈরশাসক আইয়ুব খান। আগরতলা মামলার বিচার যখন শুরু হয় তখন আমরা জাগ্রত ছাত্রসমাজ উপলব্ধি করি বঙ্গবন্ধুকে যদি ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানো হয় তাহলে চিরদিনের জন্য বাঙালির কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যাবে। কেননা এই একটি কণ্ঠে কোটি কণ্ঠ উচ্চারিত হয়। তাই আমরা ’৬৯-এর ৪ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ডাকসু’ কার্যালয়ে চার ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে এক সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন এবং ৬ দফাকে হুবহু যুক্ত করে ঐক্যবদ্ধ ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করি। ১১ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ’৬৯-এর ১৭ জানুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের জমায়েত অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের বটতলায় এবং পূর্ব ঘোষিত ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হয়। ’৬৯-এর ১৭ জানুয়ারি যে আন্দোলন আমরা শুরু করেছিলাম, ২০ জানুয়ারি শহীদ আসাদের রক্তাক্ত জামা হাতে নিয়ে যে শপথ নিয়েছিলাম, ২৪ জানুয়ারি শহীদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করার মধ্য দিয়ে সেই আন্দোলন সর্বব্যাপী গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করেছিল। ৯ ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানে শপথ দিবসে স্লোগান দিয়েছিলাম ‘শপথ নিলাম শপথ নিলাম মুজিব তোমায় মুক্ত করব; শপথ নিলাম শপথ নিলাম মা-গো তোমায় মুক্ত করব।’ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে ১৫ ফেব্রুয়ারি ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে নির্মমভাবে হত্যা করে সান্ধ্য আইন জারি করা হলে সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করে রাজপথে প্রতিবাদ মিছিল করি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহাকে ১৮ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি সেনারা বেয়নেট চার্জে নির্মমভাবে হত্যা করে পুনরায় সান্ধ্য আইন জারি করলে যথারীতি আমরা সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করে প্রতিবাদ কর্মসূচি অব্যাহত রাখি। ২০ ফেব্রুয়ারি সমগ্র ঢাকা নগরীকে মশাল আর মিছিলের নগরীতে পরিণত করলে স্বৈরশাসক আইয়ুব খান সান্ধ্য আইন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবসে পল্টনের মহাসমুদ্রে প্রিয় নেতা শেখ মুজিবসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আটক সবার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম প্রদান করি। সমগ্র দেশ গণবিস্ফোরণে প্রকম্পিত হয়। জনরোষের ভয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খান সব রাজবন্দিকে নিঃশর্ত মুক্তি দিলে দেশজুড়ে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। প্রিয় নেতাকে কারামুক্ত করার মধ্য দিয়ে শপথ দিবসের স্লোগানের প্রথম অংশ ‘মুজিব তোমায় মুক্ত করব’, এবং ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে হাতিয়ার তুলে নিয়ে যুদ্ধ করে প্রিয় মাতৃভূমিকে হানাদারমুক্ত করে স্লোগানের দ্বিতীয় অংশ ‘মা-গো তোমায় মুক্ত করব’ বাস্তবায়ন করেছিলাম। বস্তুত, ’৬৬-এর ৮ মে গভীর রাতে ৬ দফা কর্মসূচি প্রদানের অভিযোগে দেশরক্ষা আইনে যে মুজিব গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, ৩৩ মাস পর ’৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি যে মুজিব মুক্তিলাভ করেন- নাম বিচারে এক হলেও, বাস্তবে ওই দুই মুজিবের মধ্যে ছিল গুণগত ফারাক। আগরতলা মামলাটি ছিল সমগ্র বাঙালি জাতির জন্য অগ্নিপরীক্ষার মতো। সেই অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি বন্দিদশা থেকে মুক্তমানব হয়ে বেরিয়ে আসেন। ২২ ফেব্রুয়ারি আমরা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিই, প্রিয় নেতা শেখ মুজিবকে সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে গণসংবর্ধনা জানাব। সেই সিদ্ধান্ত অনুসারেই রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ২৩ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৩টায় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে গণসংবর্ধনা সভার আয়োজন করা হয়।

শুরুতেই বলেছি, ২৩ ফেব্রুয়ারি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন। সে দিনের রেসকোর্স ময়দান যারা দেখেননি তাদের বলে বোঝানো যাবে না সেই জনসমুদ্রের কথা। আমরা যখন সেখানে পৌঁছেছি, তখন রেসকোর্স ময়দানে মানুষ আর মানুষ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ট্রেন, বাস, ট্রাক, লঞ্চ-স্টিমার বোঝাই হয়ে রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, কৃষক-শ্রমিক, সাধারণ মানুষ ছুটে এসেছে। ঢাকার মানুষ তো আছেই। অভিভূত হয়ে পড়লাম। এর পূর্বে এতবড় জনসভা দেখিনি। সেই জনসমুদ্রে লাখ লাখ লোক এসেছে প্রিয় নেতা শেখ মুজিবকে একনজর দেখতে। প্রিয় নেতাকে নিয়ে আমরা মঞ্চে উঠলাম। সে দিন সেই মঞ্চে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রেখেছিলেন। চিরাচরিত প্রথা ভঙ্গ করে আগেই সভাপতির ভাষণ দেওয়ার জন্য মঞ্চে দাঁড়িয়ে লাখ লাখ মানুষকে অনুরোধ জানিয়ে বলেছিলাম, ‘সবার শেষে বক্তৃতা করার কথা থাকলেও আপনাদের অনুমতি নিয়ে আমি আগেই বক্তৃতা করতে চাই।’ দশ লক্ষ লোকের সম্মতি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর আগেই বক্তৃতা করি। সে দিন যে ভালোবাসা মানুষের কাছ থেকে পেয়েছি তা বলে বোঝাতে পারব না। বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধুকে ‘তুমি’ সম্বোধন করে বলেছিলাম, ‘প্রিয় নেতা তোমার কাছে আমরা ঋণী, বাঙালি জাতি চিরঋণী। এই ঋণ কোনোদিনই শোধ করতে পারব না। সারা জীবন এই ঋণের বোঝা আমাদের বয়ে চলতে হবে। আজ এই ঋণের বোঝাটাকে একটু হালকা করতে চাই জাতির পক্ষ থেকে তোমাকে একটা উপাধি দিয়ে।’ ১০ লাখ লোক ২০ লাখ হাত তুলে সম্মতি জানিয়েছিল। তখনই ঘোষিত হয়েছিল, ‘যে নেতা তাঁর জীবনের যৌবন কাটিয়েছেন পাকিস্তানের কারাগারে, ফাঁসির মঞ্চে দাড়িয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন, সেই নেতাকে বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞচিত্তে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হলো।’ ১০ লাখ লোক তুমুল করতালির মধ্য দিয়ে এ প্রস্তাব গ্রহণ করে প্রিয় নেতাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে লাখ লাখ কণ্ঠে ধ্বনি তুলেছিল, ‘জয় বঙ্গবন্ধু।’

বাংলাদেশে অনেক আন্দোলন হয়েছে- ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ৬ দফা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ। একেকটি আন্দোলনের একেক রকম চরিত্র্য-বৈশিষ্ট্য ছিল। ’৬৯-এর গণআন্দোলনের বৈশিষ্ট্য এমন ছিল যে, তখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর বিচারের কাজ চলছিল। বঙ্গবন্ধুকে প্রধান আসামি করে আগরতলা মামলা দায়ের করে ’৬৮-এর ১৯ জুন বিচারের কাজ শুরু হয়েছিল এবং বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলাবার জন্য আইয়ুব খান পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। আইয়ুব খানের তথ্য সচিব আলতাফ গওহর ‘আইয়ুব খান’ শিরোনামে একটি বই লিখেছেন। সেই বইয়ে উল্লেখ আছে কীভাবে বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসি দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু ’৬৯-এর গণআন্দোলনের শহীদদের বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগ সেই ষড়যন্ত্রিক প্রচেষ্টাকে সমাধিস্থ করে এবং আসাদ-মতিউর-মকবুল-রুস্তম-আলমগীর-সার্জেন্ট জহুরুল হক-আনোয়ারা-ড. শামসুজ্জোহার জীবনের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির আন্দোলন সফল হয়। জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে নারায়ণগঞ্জের এক জনসভায় দম্ভোক্তি করে আইয়ুব খান বলেছিলেন, তিনি আবার পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হবেন। অথচ ১৭ জানুয়ারি আন্দোলন শুরু হলো, ২০ জানুয়ারি আসাদ শহীদ হলেন, ২৪ জানুয়ারি শহীদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হলে সর্বব্যাপী গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয় এবং সেই আইয়ুব খান এক দিন পরেই বলেছেন ‘আমি আর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব না।’ একটি আন্দোলন ৭ দিনের মধ্যে গণঅভ্যুত্থানে রূপান্তরিত হয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে, ছাত্র সমাজের নেতৃত্বে! এর তুলনা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। যে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আজকের এই স্বাধীন বাংলাদেশ, যাদের রক্ত ঋণে গোটা জাতি ঋণী, তাদের সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাতে ভোলায় নিজ গ্রামে ‘স্বাধীনতা জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠা করেছি। সেই জাদুঘরে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে শহীদ সালাম-বরকত-রফিক-জব্বারের স্মৃতি, মহান ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ৬ দফা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণআন্দোলন, শহীদদের স্মৃতিচিহ্ন, ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জাতির পিতার দুর্লভ সব আলোকচিত্র সেখানে স্থান পেয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আজ আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক। এই বাংলাদেশের স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন। তিনি ছিলেন বিশ্ববরেণ্য মহান নেতা। তার কোনো তুলনা হয় না। তিনি জন্মেছিলেন বলেই আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। তিনি যদি না জন্মাতেন আমরা আজও পাকিস্তানের দাসত্বের নিগড়ে আবদ্ধ থাকতাম। সেই মহান নেতা তাঁর জীবদ্দশায় সবসময় এই দিনগুলোর কথা সংবাদপত্রে বাণী, বিবৃতি দিয়ে শহীদদের কথা সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করতেন। কেননা, তিনি জানতেন ৬ দফা আন্দোলন না হলে ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান হতো না; ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান না হলে বঙ্গবন্ধুকে কারাগার থেকে মুক্ত করতে পারতাম না; বঙ্গবন্ধু কারাগার থেকে মুক্ত না হলে ’৭০-এর নির্বাচনে পাকিস্তানে আমরা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারতাম না; আর পাকিস্তানে যদি আমরা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারতাম, তাহলে ৯ মাস যুদ্ধ করে এই দেশ স্বাধীন করতে পারতাম না। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছাত্রসমাজের যে ভূমিকা তা গৌরবোজ্জ্বল।

বছর ঘুরে এমন একটি মধুর দিন, যখন ফিরে আসে হৃদয়ের মানসপটে কত স্মৃতি ভেসে ওঠে। আমরা সংখ্যাসাম্যের বিরুদ্ধে সংখ্যাগুরুর অবস্থান থেকে ‘এক মাথা এক ভোটে’র দাবি তুলে তা আদায় করেছিলাম। ফলত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে সংখ্যাধিক্য আসন আমরা লাভ করেছিলাম। এ দিনের প্রতিটি মুহূর্তে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে মনে পড়ে। সে দিন বক্তৃতায় আরও বলেছিলাম, ‘৬ দফা ও ১১ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের রক্তের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে আমরা ফিরে পেয়েছি। তাদের সে রক্ত যেন বৃথা না যায়, তার জন্য জোরদার আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানাই। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্রসহ সকল মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য এই আন্দোলন শুরু হয়েছে।’ বক্তৃতা শেষ করে ঘোষণা করেছিলাম, ‘এখন বক্তৃতা করবেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব।’ তুমুল করতালির মধ্যে তিনি বক্তৃতা করতে দাঁড়ালেন। চারদিকে তাকিয়ে উত্তাল জনসমুদ্রের উদ্দেশে বললেন, “রাতের অন্ধকারে সান্ধ্য আইনের কঠিন বেড়াজাল ছিন্ন করে যে মানুষ ‘মুজিবকে ফিরিয়ে আনতে হবে’ বলে আওয়াজ তুলে গুলির আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে তাদের দাবির সঙ্গে আমি বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না।” সংগ্রামী ছাত্র সমাজকে আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি ছাত্রদের ১১ দফা শুধু সমর্থনই করি না, এর জন্য আন্দোলন করে আমি পুনরায় কারাবরণে রাজি আছি। ছাত্রদের ১১ দফার মধ্যে আমার ৬ দফা দাবিও নিহিত রয়েছে। আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন। আমি যদি এ দেশের মুক্তি আনতে ও জনগণের দাবি আদায় করতে না পারি, তবে আন্দোলন করে আবার কারাগারে যাব।’ সে দিন বঙ্গবন্ধু আরও বলেছিলেন, ‘আমি গোলটেবিল বৈঠকে যাব, সেখানে আমার ৬ দফাও পেশ করব, ১১ দফাও পেশ করব।’ তিনি জীবদ্দশায় কোনোদিন ১১ দফার কথা ভুলেননি। তাঁর বক্তৃতায় সবসময় ’৬৯-এর গণআন্দোলনের কথা থাকত। এমনকি ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে আছে, ‘১৯৬৯-এর আন্দোলনে আইয়ুব খানের পতন হওয়ার পরে যখন ইয়াহিয়া খান সাহেব সরকার নিলেন, তিনি বললেন, দেশে শাসনতন্ত্র দেবেন, গণতন্ত্র দেবেন, আমরা মেনে নিলাম।’ পরিশেষে স্বভাবসুলভ কণ্ঠে কৃতজ্ঞস্বরে বলেছিলেন, ‘ভাইয়েরা আমার, তোমরা যারা রক্ত দিয়ে, জীবন দিয়ে আমাকে কারাগার থেকে মুক্ত করেছ, যদি কোনোদিন পারি নিজের রক্ত দিয়ে আমি সেই রক্তের ঋণ শোধ করে যাব।’ তিনি একা রক্ত দেননি-’৭৫-এর ১৫ আগস্ট সপরিবারে রক্ত দিয়ে বাঙালি জাতির রক্তের ঋণ তিনি শোধ করে গেছেন। বাঙালি জাতির ইতিহাসে ২৩ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ দিন। যতদিন বেঁচে থাকব হৃদয়ের গভীরে লালিত এ দিনটিকে স্মরণ করব।

লেখক: সদস্য, উপদেষ্টা পরিষদ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ; সংসদ সদস্য; বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ।


ইসলামের আলোকে সালামের মাসায়ালা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
আতিকুল ইসলাম খান

আগে সালাম পরে কালাম। আল্লাহর একটি গুণবাচক নাম হচ্ছে সালাম, যার অর্থ শান্তি। এই নাম জপ করলে আল্লাহর পক্ষ হতে শারীরিক মানসিক শান্তি ও নিরাপত্তা পাওয়া যায়। সৃষ্টির শুরু থেকেই সালামের প্রচলন। আবু হুরায়রা (রহ.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন; মহান সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি, পৃথিবীর প্রথম মানুষ, প্রথম নবী এবং আমাদের আদি পিতা হজরত আদম (আ.)কে সৃষ্টি করে প্রথমেই আদেশ করেছিলেন, হে আমার আদম! ফেরেশতাদেরকে সালাম প্রদান কর এবং ভালো করে মনোযোগ দিয়ে শুনে আস তারা কিভাবে সালামের প্রতিউত্তর প্রদান করে। কেননা, পরবর্তীতে তোমার বংশধরদের জন্য এই সালামই হবে অভিবাদন বা সম্ভাষণ। ইসলামী অভিবাদক হচ্ছে সালাম। হজরত আদম (আ.) আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতাদের বললেন- আস্‌সালামু আলাইকুম, ফেরেশতারা প্রতিউত্তরে বললেন- ওয়ালাই কুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, অর্থাৎ হে আদম তোমার ওপর আল্লাহর পক্ষ হতে শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক। মূলত আমরা যদি আদম (আ.)-এর সন্তান হয়ে থাকি, তাহলে অবশ্যই সালামের প্রতি আমাদের বিদ্বেষ থাকবে না। মুসলমানরা শান্তিকামী, তাই মুসলিমদের কাউকে দেখলে প্রথমেই সালাম প্রদান করা। সালাম দেওয়া সুন্নত কিন্তু সালামের জওয়াব দেওয়া ওয়াজিব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন; যারা আল্লাহর প্রিয় বন্দা তারাই আগে সালাম দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্থান-কাল-পাত্র এবং শ্রেণি বিবেচনা না করে মুসলমানদের সর্বদা আগে সালাম দিতেন। সালামে আল্লাহর কথা স্মরণ হয় এবং সম্প্রীতি প্রকাশ পায়। সালাম মুসলিমের জন্য সর্বোত্তম দোয়া। তা ছাড়া সালাম হচ্ছে এক মুসলমান আরেক মুসলমানের সামাজিক শান্তির চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া। একজন মুসলিমের চুক্তি হলো আমার হাত ও মুখ দ্বারা আপনি কোনো কষ্ট পাবেন না, এই চুক্তি সামাজিকভাবে প্রচলিত হলে শান্তি ভঙ্গকারী শয়তান এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাবে, কারণ শয়তান ঐক্যবদ্ধতা পছন্দ করে না। সুরা আনআম- (৫৪) নং আয়াতে রাসুলকে সম্বোধন করে এই শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যে, দেখা হলে সালাম আর খালি ঘরে প্রবেশ করার আগে বলতে হবে আস্‌সালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল বাইত। সালাম আরবি শব্দ। এর অর্থ শান্তি, প্রশান্তি, শুভকামনা, কল্যাণের দোয়া, তাছাড়া সালাম একটি সম্মানজনক অভ্যর্থনামূলক অভিনন্দন এবং ব্যাপক উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন পরিপূর্ণ ইসলামী অভিবাদন। সালাম আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের অন্যতম, সুরা হাশর, আয়াত নং-২৪।

মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে বড় হাদিয়া হচ্ছে সালাম। সুরা নিসা, আয়াত (৮৬)। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা এরশাদ করেন; তোমাকে যতটুকু সালাম প্রদান করা হয় প্রতিউত্তরে তারচেয়ে বেশি করে বাড়িয়ে সালামের জবাব দাও। কেউ যদি বলে, আস্‌সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, সালামদাতার এতটুকু বলাই সুন্নত, এর বেশি না। অর্থাৎ তোমার ওপর আল্লাহর পক্ষ হতে শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক। প্রতিউত্তরে বলতে হবে, ওয়াআলাই কুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ, অর্থাৎ আল্লাহর পক্ষ হতে তোমাকেও শান্তি, রহমত ও বারাকা দান করুন। প্রতিউত্তরে বাড়িয়ে বারাকাতুহ- এ পর্যন্তই বলা সুন্নত, কিন্তু সওয়াবের আশায় এর বেশি বাড়িয়ে বলা যাবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, সালামদাতা প্রথম কথায় পেল বিশ নেকি আর সালামের উত্তরদাতা পেল ত্রিশ নেকি, সুবহান আল্লাহ! মুসলমানদের জন্য এর চেয়ে বড় হাদিয়া আর কি হতে পারে। দেখা হলেই দোয়া। সব অবস্থায় সালাম দেওয়া জায়েজ শুধু টয়লেট ও নামাজরত অবস্থায় ব্যতীত। তবে নামাজের শেষে সালামের জবাব দিতে পারবে। আমাদের সমাজে একশ্রেণির মানুষ আছেন, যারা পায়ে ধরে সালাম করাকে বেশি আদব মনে করেন। তাদের ধারণাই নেই যে, সালাম হবে মুখে, পায়ে নয়। এটা বিজাতীয় প্রথা যা অজ্ঞতাবশত ইসলামে ঢুকে গেছে। যার ফলে মুসলমান একদিকে সওয়াব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অন্যদিকে বেদায়াত করছে। এটি পরিত্যাগ করে সঠিক পন্থায় সালামের প্রচলন চালু করতে হবে।

শয়তানের শয়তানি-

শয়তানের সহজ প্ররোচনা হলো সালামে ভেদাভেদ সৃষ্টি করে ছোট্ট একটা হিংসার বীজ বপন করা। সুরা আরাফে উল্লেখ আছে, শয়তান আল্লাহর কাছে ওয়াদা করেছিল যে, এই আদমের জন্য আমি জান্নাত থেকে বহিষ্কৃত হয়েছি। আয় আল্লাহ! আপনার বড়ত্বের কসম, আমি আদম জাতিকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সব ভালো কাজ থেকে গাফেল করে রাখব। মহান পরাক্রমশালী আল্লাহ! শয়তানের এই চ্যালেঞ্জের মুখে মুমিনদের জন্য দান করেছেন অজস্র নিয়ামত। সুবহানাল্লাহ! শয়তান কাউকে বাধ্য করে না, তবে শয়তানের কাজ হলো সুন্দর করে মানুষের চিন্তাধারায় বড়ত্ব সৃষ্টি করে তার ব্যক্তিত্বে অহংকার ঢুকিয়ে দেওয়া। শয়তানের ধোঁকায় পড়া মানুষগুলোই তার চারপাশের মানুষকে সম্মান দিতে পারে না। অথচ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন বলতে ব্যবহারে পরিবেশ-পরিস্থিতির সামঞ্জস্য রক্ষা করাকে বোঝায়। একজন যাত্রী রিকশাওয়ালাকে সালাম দিবে- এতে সালামদাতার ব্যক্তিত্ব কমবে না বরং তার ব্যক্তিত্ব আরও দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেবেন আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা।

হাদিসে এসেছে প্রথম সালামদাতা অহংকারমুক্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন; যার অন্ততে একটি সরিষা দানা পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পরবে না। সুতরাং প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত অহংকার নামক মারাত্মক ব্যাধি থেকে বাঁচার জন্য সালামের প্রতিযোগিতা করা। আল্লাহর পছন্দনীয় বান্দারাই সালামের মতো মহৎ গুণে অভ্যস্ত। তাই শয়তানের শয়তানি হলো মানুষকে অহংকারী বানিয়ে ইসলামের মৌলিক শিক্ষাগুলোকে বিকৃতভাষ্য হিসেবে প্রচলিত করে মানুষকে ইসলামের আদর্শ থেকে বঞ্চিত রাখা। কথিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.)কে একদিন এক ইহুদি বলেছিল, হে মুহাম্মদ! আসামু আালাইকা অর্থাৎ হে মোহাম্মদ তুমি ধ্বংস হও, প্রতিউত্তরে নবীজি (সা.) বলেছিলেন; ওয়া লাইকুম অর্থাৎ তুমি আমাকে যা দিলে আমি তোমাকে তাই দিলাম। সুতরাং শয়তানের শয়তানি থেকে বেঁচে থাকতে হলে ইসলামের সত্যটা জেনে-বুঝে মানতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন; অমুসলিমদের সালাম দেওয়া যাবে না, তবে তাদেরকে অভিবাদন জানাতে হবে দুনিয়ার কোনো প্রচলিত ভাষায়। কোনো মজলিসে, মুসলিম, মুশরিক, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মূর্তিপূজারি একাধিক ধর্মের মানুষ একসঙ্গে বসা থাকলে সালাম দেওয়া যাবে, কেননা অসম্মানজনক কাজ ইসলামে নেই। সুতরাং অমুসলিমদের সালামের জওয়াবে বলতে হবে ওয়া লাইকুম।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসে সালামের চারটি গুণের কথা বলা হয়েছে– শান্তি, রহমত, বরকত ও অন্তরে ভালোবাসা পয়দা। যে পরিবারে সালামের প্রচলন থাকবে, সে ঘরে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা শান্তি, রহমত ও বরকতে ভরিয়ে দেবেন এবং যে সালাম দেবে তার হেফাজতকারী হয়ে যান আল্লাহ তায়ালা। যে সন্তান বাবা-মাকে সালাম দেবে এবং বাবা-মায়ের সালামের প্রতিউত্তরের মাধ্যমে যে সওয়ার পাবে, সেই সন্তান কোনো দিন বিপথগামী হবে না। যে সংসারে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সালাম আদান-প্রদানের প্রচলন থাকবে, সে সংসারে কোনো দিন অনিষ্টকারী শয়তান কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। শয়তানের সবচেয়ে গর্বিত কাজ হলো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানো। এতে শয়তান তাদের নেতার পক্ষ হতে পুরস্কৃত হয়। সুতরাং সালাম বিচ্ছেদ নয় বরং ঐক্যবদ্ধ করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কেউ যদি দূর থেকে সালাম পাঠায়, তাহলে তোমরা তার প্রতিউত্তরে বলবে, ওয়া আলাইকা ওয়া আলাইহি সালাম। সুরা নুর, আয়াত (২৭)। বলা হয়েছে, হে মুমিনগণ তোমরা নিজেদের ঘর ছাড়া অন্য কারও ঘরে কখনো প্রবেশ করবে না- যে পর্যন্ত তাদের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় এবং সালাম দিয়ে তাদের অনুমতি ব্যতীত। তিনবার সালাম দেবে ভেতর থেকে সাড়া না এলে ভদ্রভাবে চলে আসবে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা শেষ বিচারের দিন জান্নাতিদের প্রথম অভিবাদন জানাবেন সালামের মাধ্যমে। সালামুন কওলাম মির রব্বির রহিম- অর্থাৎ দয়ালু রবের পক্ষ হতে তোমাদের জন্য সালাম। আল্লাহু আকবার! জান্নাতে আর কোনো আমল ও ইবাদত নেই, আছে শুধু সালাম আর সালাম, শান্তি আর শান্তি।

সালামে আধুনিকতার কুফল-

আমাদের সমাজে ইংরেজি শিক্ষার হার বেড়ে যাওয়ায় অধিকাংশ মানুষ সালামের পরিবর্তে হ্যালো ব্যবহার করে আর সালামকে সংক্ষিপ্ত করে বলে আসামু আলাইকা বা স্লা-মালিকুম আর প্রতিউত্তরে বলে আলাইকুম। সুতরাং তুমি যা আমিও তা। সালামের এই অশুদ্ধ উচ্চারণের প্রতিফলনে মানুষ শান্তি-শৃঙ্খলা ও রহমত-বরকত থেকে বঞ্চিত হয়ে অভিশাপ নিয়ে এক ধরনের বিষণ্ন মাতালের মতো জীবন যাপন করছে। অথচ এসব তাদেরই চাওয়া থেকে পাওয়া। তারা যা শোনে তাই বলে, আসলেই তারা জানে না, হ্যালো মানে- জাহান্নামি আর আসামু আলাইকা অথবা স্লা-মালিকুম মানে– তুমি মরে, তুমি ধ্বংস হও। স্মার্ট হওয়া ভালো তবে অতিরঞ্জিত কোনো কিছুই ভালো না। ইংরেজি ভাষা হচ্ছে মডার্ন আর আরবি হলো সুন্নাহ। সুতরাং কল্যাণের স্বার্থে ভাষার ব্যবহার প্রযোজ্য তবে, ইসলাম পরিপন্থী বিকৃত ভাষা মুসলমানদের পরিহার করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা মধ্যমপন্থা অবলম্বন কর, তাতেই কল্যাণ।

বিশ্বনবী রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, চারটি গুণ যার মধ্যে বিদ্যমান থাকবে, সে নিরাপদে জান্নাতে যেতে পারবে।

১) যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার আসায় সঠিকভাবে সালামের প্রচার-প্রসার ও আদান-প্রদান করবে, সে নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

২) যে ব্যক্তি কোনো ক্ষুধার্তকে খাবার খাওয়াবে, সে নিরাপদে জান্নাতে যাবে।

৩) যে মুসলিম আত্মীয়তার সম্পর্ক সঠিকভাবে রক্ষা করবে, সে ব্যক্তি নিরাপদে জান্নাতে যাবে।

৪) পৃথিবীর মানুষ যখন ঘুমে বিভোর থাকে, তখন যে ব্যক্তি আরামের ঘুম ত্যাগ করে কিয়ামুল লাইল আদায় করে, সে নিরাপদে জান্নাতে যাবে।

সালামের ব্যাপারে বৈষম্য-

এই উচ্চশিক্ষার জ্ঞান গরিমা ও অর্থবিত্তের সমাজে অধিকাংশ মানুষ মনে করে থাকে যে, আমিই কেবল সালাম পাওয়ার যোগ্য, আমাকে সবাই সালাম দেবে। এ ধারণাটা ভুল। বিশ্ব নবী রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনী থেকে জানা যায় তিনি দু-জাহানের বাদশা হয়েও বয়সে ছোট-বড় এবং অধীনস্থদের সর্বদায়ই আগে সালাম দিতেন। সুতরাং উম্মতে মুহাম্মদির উচিত ধনী-গরিব ঘরে বাইরে উপরস্থ-অধিনস্থ সবাইকে আগে সালাম দেওয়ার প্রতিযোগিতা করা। আখেরি নবী হজরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কত অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করে পৃথিবীতে সালাম প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছেন, আর আমরা কিনা তাঁর উম্মত হয়ে শয়তানের উপাসনা করছি। প্রথমত শয়তানের কাজ হলো মানুষের অন্তরে হিংসা নামক ভাইরাস সংক্রামিত করে সব অন্তরজুড়ে হিংসা ছড়িয়ে দেওয়া। আর এই হিংসা-প্রতিহিংসা নিরাময়ের ভ্যাকসিন হলো সালাম। সুবহান আল্লাহ!

তাই তো আমাদের প্রিয় নবীজি (সা.) বলেছেন, তোমরা তোমাদের সমাজে সালামের প্রচার-প্রসার বাড়িয়ে দাও। দেখবে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তোমাদের জীবনকে শান্তি, রহমত, বরকত, নিরাপত্তা ও ভালোবাসা দিয়ে পূর্ণ করে দেবেন। আয় আল্লাহ! আমাদেরকে ব্যাপকভাবে সালাম বিনিময় করার তৌফিক দান করুন। জাজাকাল্লাহ খয়ের

‘ইনশা আল্লাহ’

লেখক: ইসলামী চিন্তাবিদ


banner close