শনিবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৪

নতুন শিক্ষাক্রম: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

রাশেদুল ইসলাম ইয়ন
প্রকাশিত
রাশেদুল ইসলাম ইয়ন
প্রকাশিত : ১ এপ্রিল, ২০২৪ ২১:৫৩


রাশেদুল ইসলাম ইয়ন


বাংলাদেশে ২০২৩ সালে প্রথম, ষষ্ঠ এবং সপ্তম শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের পর থেকেই নানা আলোচনা সমালোচনার শিকার হতে হয়েছে দেশের সরকারকে। এমনকি নতুন শিক্ষাক্রমের বিরোধিতা করে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের সামনে মানববন্ধন করতেও দেখা গিয়েছে অভিভাবকদের।

চলতি বছরে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে যথাক্রমে দ্বিতীয়, তৃতীয়, অষ্টম ও নবম শ্রেণিগুলোতে যা পর্যায়ক্রমে ২০২৫ সালে চতুর্থ, পঞ্চম ও দশম শ্রেণিতে, ২০২৬ সালে একাদশ শ্রেণিতে এবং ২০২৭ সালে দ্বাদশ শ্রেণিতে চালু হওয়ার কথা রয়েছে। তার পাশাপাশি পূর্ববর্তী শিক্ষাক্রমের বিদ্যমান বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসা বিভাগ বিলুপ্ত করা হয়েছে। পরিবর্তন নিয়ে আসা হচ্ছে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা পদ্ধতিতেও।

অষ্টম শ্রেণির ছাত্র মোঃ সানজিদ আহমেদ খান এর ভাষ্যমতে, "নতুন শিক্ষাক্রমটি অনেক সম্ভাবনাময় হলেও, দেশের বর্তমান অবস্থায় তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে, ৫ জনের দলীয় কাজে কেবল ১-২ জন অংশগ্রহণ করছে, তবে মূল্যায়নের সময় ক্লাসের সময়ের স্বল্পতা এবং শিক্ষকের চেয়ে ছাত্রের অনুপাত অত্যধিক বেশি হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকরা চাইলেও একক মূল্যায়ন করতে পারছেন না । যার ফলে দলভুক্ত সবাইকেই সমান মূল্যায়ন করা হচ্ছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত মূল্যায়ন হচ্ছে। শিক্ষকরা কিসের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করছে তাও অস্পষ্ট। তবে এও সত্য যে নতুন শিক্ষাক্রমের ফলে চাপ কমেছে এবং অনেকেই নতুন দক্ষতা কিংবা সহ-পাঠ্যক্রম কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।"

অভিভাবকরা সংশয় প্রকাশ করছেন শিক্ষাক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে। অনেকে ধারণা করছেন এতে ছাত্র-ছাত্রীরা লেখা পড়ায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে; আবার অনেকেই রান্না শেখার বিষয়টি নিয়ে বিদ্রুপ করছেন। বিজ্ঞানের উপর গুরুত্ব কমানোর জন্যও অনেকেই শিক্ষাক্রমের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছেন। অভিভাবকরা স্কুলে পাঠানোর পাশাপাশি পূর্ববর্তী শিক্ষাক্রমের উপর অনুশীলনের জন্য সন্তানদের প্রাইভেট কোচিংয়ের শরণাপন্ন হতে লক্ষ করা যায়। এই শিক্ষাক্রমে পাঠ গ্রহন সম্পন্ন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে কীভাবে ভর্তি হবে, সেটি নিয়ে শঙ্কিত অভিভাবকরা।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. ফরহাদুল ইসলাম বলেন, "আমরা যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়েই কাজ শুরু করেছি। তারপরও যেসব সমালোচনা হচ্ছে, সেগুলো আমরা বিবেচনা করছি। পরবর্তীতে প্রয়োজন মনে করলে কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হবে। আপাতত ছেলে-মেয়েরা নতুন শিক্ষাক্রমেই পড়বে। যুগের সাথে তাল মেলাতে এর কোনও বিকল্প নেই।"

ইতোমধ্যেই জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডর (এনসিটিবি) পাবলিক পরীক্ষার খসড়া কাঠামোতে, লিখিত পরীক্ষার বিষয়টি উঠে এসেছে। তাতে প্রতিটি বিষয় এর দক্ষতা যাচাই হবে ১ কর্মদিবসের ৫ ঘন্টার মূল্যায়নের মাধ্যমে। লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি, হাতে-কলমে শেখার বিষয়টিও মূল্যায়ন করা হবে। তাছাড়া, বিভিন্ন শ্রেণিতে, শিখনকালীন মূল্যায়ন ও ২টি সামষ্টিক মূল্যায়ন থাকবে।

এসএসসি ২০২৩ ব্যাচের ছাত্র মিনহাজুল ইসলাম মাহিনের মতে, "নতুন শিক্ষাক্রমে শিক্ষার্থীরা বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা পাওয়ায়, না বুঝে মুখস্থের প্রবণতা কমে আসবে এবং হাতে কলমে শেখার ফলে পাঠ অধিক সময় আয়ত্তে থাকবে। আবার শিক্ষার বাস্তব ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে, যা ভবিষ্যতের জন্য কার্যকরী। এখন যদিও শিক্ষাক্রমের আদর্শ রূপটির দেখা মিলছে না, তবে আরো ৫-১০ বছর সময়ে আশা রাখা যায় বাংলাদেশের সকল শিক্ষার্থী সঠিকভাবে মূল্যায়িত হবে এবং আনন্দের সাথে শিক্ষা গ্রহণ করবে। তবে, দেশের শিক্ষকদের দক্ষতা যেমন বৃদ্ধি করতে হবে , তেমনি সৎ ও হতে হবে কেননা এখন শিক্ষকদের ওপরেই ছাত্রের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভরশীল। একইসা থে সরকারকে আরো দৃঢ়ভাবে মনিটরিং করতে হবে যেন শিক্ষা ক্ষেত্রে দুর্নীতি রোধ করা যায়।"

জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপলেখা -২০২১ এর ধারাবাহিকতায় এই নতুন শিক্ষাক্রম। সৃজনশীলতা ও ব্যবহারিকের উপর গুরুত্ব আরোপ করে সাজানো হয়েছে শিক্ষা কাঠামোটি। এটি শিক্ষার্থীরদের দক্ষ মানব সম্পদে রূপান্তর করবে বলে আকাঙ্ক্ষা সবার।

লেখক: শিক্ষার্থী ,একাদশ শ্রেণি, ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ


সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ওয়াসা নিয়ে কিছু কথা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ফজলে আহমেদ

ঢাকা শহরে যতগুলো সেবামূলক প্রতিষ্ঠান আছে। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ঢাকা ওয়াসা। কারণ পানির অপর নাম জীবন। পানির কোনো বিকল্প নেই। সকালে ঘুম থেকে উঠে সারাটা দিন, এমনকি গভীর রাত পর্যন্ত, পানির দরকার নেই, এমনকি কোনো সময় আছে, শুধু নাগরিক জীবনে নয়, দেশের সর্বত্রই, যেখানে লোকজন আছে, বসতি আছে। এই ঢাকা শহরে নির্দিষ্ট পরিমাণের চেয়েও দ্বিগুণ পরিমাণ লোক বসবাস করে। বলতে গেলে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। ভাসমান লোকজনের পরিমাণও নেহাত কম নয়। ভাসমান লোক হোক, আর স্থায়ী বসবাসকারী লোক হোক, সবারই পানির প্রয়োজন। এই বিশাল অঙ্কের জনগোষ্ঠীর পানির চাহিদা পরিপূর্ণ পূরণ করা নিঃসন্দেহে একটি কঠিন কাজ। ঢাকা ওয়াসা এই কাজটিই করে যাচ্ছে। ঢাকা ওয়াসা আজ একটি স্বর্ণযুগে এসে দাঁড়িয়েছে। আর তা এমনি এমনি হয়ে যায়নি, তাকে দীর্ঘ কঠিন পথ অতিক্রম করে আসতে হয়েছে। আগের ঢাকা ওয়াসা আর বর্তমান ঢাকা ওয়াসার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ। একটা সময় ঢাকা ওয়াসার অবস্থা অত্যন্ত নাজুক ছিল। ওই পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরাটা খুবই কঠিন কাজ, কিছু চিত্র তুলে ধরে, আপনাদের অবহিত করাটা সময়ের দাবি বলে আমি মনে করি। কারণ ওই সময়কে জানতে হবে, কালকে জানতে হবে, তাহলেই প্রেক্ষাপটের গুরুত্ব বাড়বে। পানির মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিসের দুর্দান্ত অভাব, একটা বছর থাকতে পারে; কিন্তু বছরের পর বছর থাকতে পারে না; কিন্তু ওই অভাবটা বছরের পর বছর চলে আসছিল। যেমন ড্রাই সিজন এলেই পানির তীব্র অভাব দেখা দিত। দু-তিন দিনেও পানির দেখা মিলত না। মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ জমে উঠত। মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যেত। পানি ছাড়া কি এতদিন চলা যায়। মহল্লার লোকজন ক্ষেপে গিয়ে দলবদ্ধভাবে কলসি নিয়ে মিছিল করে কারওয়ান বাজার হেড অফিসে, মানে ওয়াসা ভবনে আক্রমণ চালাতো, শুধু তাই নয়- ঢাকা ওয়াসার আঞ্চলিক অফিসগুলোতেও আক্রমণ চালাতো। উত্তেজিত জনতা ভাঙচুর করতেও দ্বিধাবোধ করত না। ওই সময় রাজস্ব জোনের কর্মচারীরা মহল্লার পানির বিল দিতে গেলে, ওদের মারধর করারও নজির আছে। ওদের গালি দিয়ে বলত, পানি দিতে পারিস না, আবার বিল নিয়ে আসলি। তোদের লজ্জা করে না। অকথ্য ভাষায় গালাগালা করত। একটা উদাহরণ টানলে ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার হয়ে যাবে। দুপুরবেলা প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে। আমি ও আমার একটা বন্ধু এলিফ্যান্ট রোডের একটি হোটেলে ঢুকি। হাত-মুখ ধুতে বেসিনে গিয়ে দেখি একফোঁটা পানি নেই। পেছনে তাকিয়ে দেখি হোটেলবয় দাঁড়িয়ে আছে। বললাম পানি নেই? আজ দুদিন ধরে পানির সাপ্লাই নেই। যা খাবেন তাই খেতে দিতে পারব; কিন্তু একফোঁটা পানি দিতে পারব না। না খেয়েই হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়ি। পেটের খিদে পেটেই রয়ে গেল। তার মানে শুধু যে এই হোটেলেই পানি নেই তা নয়- ঢাকা শহরের কোথাও পানি নেই। নাগরিকজীবন কতটা বিপর্যস্ত ছিল। সময়ের প্রয়োজনে, সময়ের তাগিদে দুর্দশাগ্রস্ত এই সংস্থাকে উত্তরণ করে উন্নতির চরম শিখরে নিয়ে যেতে, ওই সংস্থায় একজন মেধা বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটে, যিনি একজন উদাহরণ হয়ে আছেন। যার জ্বলন্ত উদাহরণ, অসম্ভব মেধাবী প্রকৌশলী তাকসিম এ খান। ঢাকা ওয়াসার ওই ভয়াবহ ক্রান্তিকালে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন প্রকৌশলী তাকসিম এ খান। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন এবং রাশিয়ায় পড়াশোনা করেছেন। ঢাকা শহরের পানির অভাবটা সমূলে দূর করতে হবে, ক্রাইসিস শব্দটাকে চিরতরে বিদায় করতে হবে। এই শব্দটা ঢাকাবাসীর কারও মুখে উচ্চারণ হোক তা তিনি চান না। এই কথাগুলো তিনি এক সেমিনারে দীপ্ত কণ্ঠে বলেছিলেন। সেদিন থেকে অদম্য উৎসাহ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। দীর্ঘ কঠিন পথ, অনেক বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে, অনেক সমালোচনার ঘা সহ্য করে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছেন। আজ ঢাকা ওয়াসা একটি গর্ব করার মতো আলোক-উজ্জ্বল প্রতিষ্ঠান। যার সুফল ঢাকা নগরবাসী পেয়ে যাচ্ছেন। তিনি প্রথম গভীর নলকূপ স্থাপনের দিকে মনোযোগ দিলেন। সুবিধাজনক অবস্থানে জায়গা পেলেই তিনি গভীর নলকূপ স্থাপনে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেনি। ঘন ঘন নলকূপ স্থাপনের কারণে ওই এলাকার পানির চাহিদা কমে আসতে থাকে। অন্যদিকে নিয়মিত বিদ্যুৎ থাকার ফলে, পাম্প বন্ধ হয় না। একটানা ২৪ ঘণ্টাই পাম্প চলতে থাকে। আগে বিদ্যুৎ চলে গেলেই পাম্প বন্ধ হয়ে যেত, আস্তে আস্তে পানির মেইন পাইপটা একদম পানিশূন্য হয়ে যেত। আবার বিদ্যুৎ এলে পাম্প চালিয়ে সেই শূন্য পাইপ পূরণ করতেই অনেক সময় লেগে যেত। পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে এটা ছিল একটা বড় বাধা। সেই সমস্যা আর নেই এখন। এখন দুরন্ত গতিতে চলছে মেগা প্রজেক্টের কাজ। যা তিনি গভীর আত্মবিশ্বাস নিয়ে হাত দিয়েছিলেন। ঢাকার আশপাশের নদীগুলো থেকে পানি শোধন করে ঢাকা শহরে আনা। যদিও প্রজেক্টগুলো ব্যয়বহুল ও কঠিন। কাজ শেষ হতে সময় নিচ্ছে তবে অচিরেই শেষ হবে বলে প্রকৌশলী তাকসিম এ খানের দৃঢ় বিশ্বাস। আর এসব বিষয়ে তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। আসলেও তিনি পরিশ্রমী একজন মানুষ।

বিলিং-এর মানে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও তিনি অভিনব পদ্ধতি চালু করেন। মাসের বিল মাসেই পরিশোধ করতে হবে এবং বিল যাতে নির্দিষ্ট সময়ে গ্রাহকের হাতে পৌঁছে, সেদিকে কঠোর নজরদারি আছে। এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। ফলে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে বিরাট সাফল্য পাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। ঢাকা ওয়াসার বিভিন্ন অফিস ও পাম্প হাউসগুলো এমনভাবে পুনর্নির্মাণ করেছেন বা মেরামত করেছেন, যা চোখে পড়ার মতো এবং আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যায়। যা আগে কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও অব্যবস্থাপনায় নিমজ্জিত ছিল।

তাকসিম এ খান ঢাকা ওয়াসাকে শুধু বাংলাদেশেই নয়- আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন সগৌরবে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে যখন পানি বিষয়ক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে তিনি আমন্ত্রিত হন এবং ওই অনুষ্ঠানে যোগদান করে দিকনির্দেশনা ও উপদেশমূলক বক্তৃতা দিয়ে থাকেন, যা আমাদের গর্বের বিষয়।

লেখক: কলামিস্ট ও শিশু সাহিত্যিক


বুয়েট, ছাত্ররাজনীতি, জঙ্গিবাদ ও প্রসঙ্গ কথা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ড. রাশিদ আসকারী

২০১৯ সালে মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়। আবরারের মর্মান্তিক মৃত্যু দেশবাসীর মনে এত গভীরভাবে রেখাপাত করেছিল যে, তার অব্যবহিত পর কর্তৃপক্ষ ছাত্ররাজনীতি বন্ধের মতো এত শক্ত সিদ্ধান্ত নিলেও তেমন কোনো বাঁধা আসে নাই। তারপর থেকে বুয়েট যে সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে লাগল- ব্যাপারটা এরকম হলে তো কথাই ছিল না। দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও বুয়েটের এই রাজনীতি বন্ধের রেসিপি গ্রহণ করে ক্যাম্পাসে নিরবচ্ছিন্ন শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারত; কিন্তু ব্যাপারটা তো তা নয়। আবরার মৃত্যুর দায়ভার পুরো ছাত্ররাজনীতির কাঁধে চাপিয়ে বুয়েট কর্তৃপক্ষ সে যাত্রায় নিজের চামড়া হয়তো বাঁচাতে পেরেছে; কিন্তু দেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়েছে। ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করে প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলোর নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদী ছাত্র সংগঠন বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানের ছত্রছায়ায় পরোক্ষভাবে সমাবেশ ও রাজনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যেতেই থাকে। অত্যন্ত সুকৌশলে তারা সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের সুকুমার সংবেদন ব্যবহার করে তাদের সমর্থন আদায় করে এবং প্রয়োজনে তাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে একসঙ্গে ৩৪ জন ছাত্রের গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনাটি স্থান-কাল ও পাত্র বিবেচনায় দুর্ভাবনা উদ্রেককারী।

ছাত্ররাজনীতি বন্ধের ঘটনা বুয়েটে এই প্রথম নয়। যতবারই এখানে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করা হয়েছে ততবারই মৌলবাদী শক্তি মাথা চাড়া দিয়েছে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ডাকসু, চাকসু, রাকসু, জাকসু, ঢমেকসুসহ দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ নির্বাচনে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ বিজয়ী হলেও একমাত্র বুয়েটের ইউকসুতে ছাত্রদল ও ছাত্র শিবিরের জোট ভিপিসহ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদে জয়লাভ করে। অতএব বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করে দেশের লাভ যতটা হয়েছে ক্ষতি তার চেয়ে অনেক বেশি হয়েছে, বলা যায় চক্রবৃদ্ধি হারে। ছাত্র শিবিরের কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে। টাঙ্গুয়ার হাওরে বুয়েট ছাত্রদের মোবাইলে প্রাপ্ত ছবিতে শিবিরের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের নমুনা মিলেছে। বুয়েট ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিজবুত তাহরিরের পোস্টার লাগানো হয়েছে। প্রকাশ্যে লিফলেট বিলি করে এই নিষিদ্ধ সংগঠনের পক্ষে কর্মী সংগ্রহ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটি অংশ এই কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাই ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করায় মূলধারার প্রগতিশীল রাজনীতি বন্ধ হয়েছে আর সেই সুযোগে প্রতিক্রিয়াশীল ধারার অপরাজনীতির দূষিত রক্ত বাইপাস ধরে প্রবাহিত হচ্ছে। এই ধারা বেশিদিন চলতে দিলে রাষ্ট্রের হৃৎপিণ্ড বাইপাসের দূষিত রক্তে কলুষিত হবে।

তাছাড়া যুক্তিসঙ্গত সীমাবদ্ধতা সাপেক্ষে সমাবেশ ও রাজনীতি করার অধিকার সংবিধান স্বীকৃত (দ্র. আর্টিকেল ৩৭)। আর সে জন্য আদালত চাহিবামাত্র বুয়েটে ছাত্ররাজনীতির ওপর আনীত নিষেধাজ্ঞা বাজেয়াপ্ত করে সুস্থ রাজনীতি করার সুযোগ অবারিত করেছেন। আদালত এই দায়িত্ব নেওয়ায় সরকার ও বুয়েট প্রশাসনের ওপর চাপ কমেছে। তবে প্রশাসনের মনে রাখা উচিত যে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। মাথাব্যাথা নিরাময়ের জন্য মাথা কেটে ফেলার দরকার হয় না। জায়গামতো ব্যথার ওষুধ প্রয়োগ করলেই চলে। কতিপয় বিভ্রান্ত মৌলবাদী মানুষের কারণে রাজনীতি ও সংস্কৃতির সুস্থ ধারাকে নিরুৎসাহিত করা উচিত নয়।

বুয়েট দেশের একটি অগ্রগণ্য বিদ্যাপীঠ। বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রকৌশল ও প্রযুক্তিচর্চার স্টেট অব দ্য আর্ট প্রতিষ্ঠান। এখনো আমাদের উচ্চাভিলাষী বাবা-মায়েরা সন্তানের ভর্তি তালিকায় বুয়েটকে শীর্ষস্থানে রাখে। মহান মুক্তিযুদ্ধে এই প্রতিষ্ঠানের অনেক ছাত্র-শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী অংশগ্রহণ করেন এবং পাক-হানাদার বাহিনীর হাতে ২০ জন শহীদ হন। আবার মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেও এই বিশ্ববিদ্যালের অনেকে কুখ্যাতি অর্জন করেছেন। তবে একুশ শতকের এই লগ্নে মানুষ যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে জগৎ শাসন করছে, তখন দেশের এই শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান চর্চাকেন্দ্রে ধর্মীয় গোঁড়ামি, কূপমণ্ডূকতা ও মৌলবাদ-জঙ্গিবাদের অনুশীলন চরম নৈরাশ্যের জন্ম দেয় বৈকি। আমরা বিজ্ঞানী তৈরি করছি ঠিকই; কিন্তু বিজ্ঞানমনস্কতা তৈরি করতে পারছি না। সে জন্যই সম্ভবত আমাদের স্মরণীয়-বরণীয় বিজ্ঞানমনস্ক বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় (পি সি রায় বলে সমধিক প্রসিদ্ধ) অনেক দুঃখেই বলেছেন: ‘আমি ক্লাসে এত করিয়া ছাত্রদের পড়াইলাম যে, পৃথিবীর ছায়া চাঁদের উপর পড়িয়া চন্দ্রগ্রহণ হয়। তাহারা তা পড়িল, লিখিল, নম্বর পাইল, পাস করিল। কিন্তু মজার ব্যাপার যখন সত্যি সত্যি চন্দ্রগ্রহণ হইল তখন চন্দ্রকে রাহুগ্রাস করিয়াছে বলিয়া তাহারা ঢোল, করতাল, শঙ্খ লইয়া রাস্তায় বাহির হইয়া পড়িল। ইহা এক আশ্চর্য ভারতবর্ষ।’

বিজ্ঞানচর্চার পাদপীঠে ধর্মান্ধতা-নিঃসৃত মৌলবাদ কিংবা জঙ্গিবাদের অনুশীলন যে কল্পকথা নয় তার প্রমাণ দিয়েছে গুলশান ক্যাফে হামলার (২০১৬) অন্যতম প্রধান হোতা নিব্রাস ইসলাম। নিব্রাস বাংলাদেশের একটি প্রধান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নর্থ সাউথ) এবং মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের মালয়েশিয়ার ক্যাম্পাসের ছাত্র ছিল। একুশ শতকের প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞান সে কাজে লাগাতে চেয়েছিল মধ্যযুগের এক চরম প্রতিক্রিয়াশীল মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে। নিব্রাসদের বিশ্বাস করানো হয়েছিল যে এই চরমপন্থা প্রতিষ্ঠাই মানবজীবনের মূল লক্ষ্য এবং এর জন্য পরিচালিত জিহাদে জীবন দিলে স্বর্গের সকল সুখ ও সুধা তার জন্য বরাদ্দ থাকবে। এবং সেই প্রগাঢ় কল্পিত বিশ্বাস থেকেই নিব্রাস ইসলামেরা জঙ্গিবাদী পথ বেছে নিয়েছে এবং জাগতিক এবং নৃতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় বিকশিত বহুত্ববাদী সমাজ ও সভত্যার জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বজুড়ে বিরাজিত যুবসমাজের এই মৌলবাদীকরণ প্রক্রিয়ার পেছনে যে গভীর মনস্তত্ত্ব ক্রিয়াশীল তাকে ভলতেয়ার চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন: ‘যদি তোমাকে কেউ অলীকত্বে বিশ্বাস করাতে পারে, তবে তোমাকে দিয়ে নৃশংসতা করিয়ে নিতে পারবে।’ প্রলুব্ধকর অলীকত্বে বিশ্বাস স্থাপন করে ভয়াল নৃশংসতা চালানো দুর্মর জঙ্গিরা একদিকে যেমন আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি জীবন ও জগৎকে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বুয়েটে মৌলবাদী রাজনীতির সূত্রপাত হয় একেবারে ভর্তি প্রক্রিয়ার গোড়া থেকেই। শিবির পরিচালিত কোচিং সেন্টারগুলোতে পড়ালেখার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মৌলবাদী আদর্শে দীক্ষা দেওয়া হয়। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের অনেকেই না বুঝে তা গ্রহণ করে আবার কেউ অর্ধগ্রহণ করে, কেউ বিভ্রান্ত হয়। পুরো শিবির না হয়ে আধা শিবির আধা জাতীয়তাবাদী হয়ে ওঠে। বুয়েটে ২০০৩ সালে ছাত্রদলের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে যে সাকিবুন নাহার সনি মারা যায়, সেই দুই গ্রুপের একটি ছিল ছাত্রশিবির নিয়ন্ত্রিত। বস্তুত বিএনপির রাজনীতি সর্বদাই ছিল জামায়াত-শিবিরের এক অশেষ প্রশ্রয়ের স্থান। কমফোর্ট জোন। রাজনীতিতে বিএনপির ভরাডুবি হলে শিবির আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায়। রাজনৈতিক বিবর্তনবাদের প্রক্রিয়ায় অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে তারা গিরগিটির মতো রঙ পাল্টাচ্ছে।

মোদ্দা কথা, বাংলাদেশে মৌলবাদী ছাত্ররাজনীতি বিকাশের প্রক্রিয়ার শিবির এবং অন্যান্য মৌলবাদী নিষিদ্ধ সংগঠনের ছদ্মবেশী বহুমাত্রিক তৎপরতা, বিএনপির অনিঃশেষ প্রশ্রয় এবং অনেকের সরল ঔদাসিন্য যৌথভাবে দায়ী। আধুনিক বিজ্ঞান, প্রকৌশল এবং প্রযুক্তি শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণরা আজকের এই গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদী সমাজে কালাপাহাড়ি মত্ততা দিয়ে যদি তাদের কল্পরাজ্য রচনা করতে চায়, তাহলে তা কি মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের জন্য বড় লজ্জার নয়?

লেখক: দ্বিভাষিক লেখক, অধ্যাপক, কথাসাহিত্যিক এবং প্রাক্তন উপাচার্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

বিষয়:

জুমাতুল বিদার গুরুত্ব ও ফজিলত

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির

‘জুম্মা’ একটি আরবি শব্দ যার অর্থ শুক্রবার আর ‘বিদা’ অর্থ শেষ। ‘জুমাতুল বিদা’ অর্থ শেষ শুক্রবার। রমজান মাসের শেষ জুমার দিন জুমাতুল বিদা নামে পরিচিত। মোবারকময় এমাসে দিনটি মুসলিম উম্মাহর কছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বরকতময়। রমজান আর জুমা একত্রে মিলিত হয়ে দিনটিকে আরও সীমাহীন মহিমাময় করেছে।

উম্মতে মোহাম্মাদির জন্য আল্লাহর শ্রেষ্ঠ উপহার হিসেবে বছর ঘুরে আসে মাহে রমজান আর সঙ্গে যুক্ত হয় সপ্তাহের শ্রেষ্ঠদিন ইআওমুল জুমা। তাই জুমাতুল বিদাতে প্রত্যেকটা মুসলমানের বিশেষ তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। মসজিদে জামাতের সঙ্গে জুমার নামাজ আদায় করা এবং বিশেষ মোনাজাতের মাধ্যমে মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা ও নিজের আত্মার আকুতি দয়াময় প্রভুর দরবারে পেশ করাই যেন এ দিনে মুসলমানের পরম আগ্রহ এবং প্রাপ্তির লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।

জুমাতুল বিদা অত্যন্ত মহিমাময়

(১) মাহে রমজানের কারণে: রমজান মাস সীমাহীন ফজিলতের মাস এবং এটি উম্মতে মোহাম্মাদির জন্য মহান আল্লাহর বিশেষ উপহার স্বরূপ। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের রব বলেছেন, “বনি আদমের প্রত্যেকটি নেক-আমলের সওয়াব দশগুণ থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত দেওয়া হয় শুধু রোজা ছাড়া। কেননা রোজা শুধুই আমার জন্য, আর আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব। আর নিশ্চয়ই রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মেশ্ক আম্বারের চেয়েও বেশি প্রিয়। তোমাদের কারও রোজা থাকা অবস্থায় যদি কেউ তার সঙ্গে জাহেলের মতো আচরণ করে তাহলে সে বলে দেবে, আমি একজন রোজাদার।”

(সহিহ আল-বোখারি, হাদিস: ৫৯২৭, সহিহ মুসলিম, হাদিস ১১৫১, মুসান্নেফে ইবনে আবি শাইবা, হাদিস: ৮৮৯৪, মুসনাদে আহমাদ: ৯৭১৪)

(২) জুমার দিনের মাহাত্ম্য সম্পর্কে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সূর্যদয়ের মাধ্যমে যে দিনগুলো হয় তার মধ্যে সর্বোত্তম দিন হলো জুমার দিন। এই দিনে হযরত আদমকে (আ.) সৃষ্টি করা হয়েছিল এবং এই দিনেই তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছিল এবং এই দিনেই তাকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছিল। আর এদিনের মধ্যে এমন একটি সময় আছে, যখন কোনো মুসলমান নামাজরত অবস্থায় দোয়া করলে অবশ্যই তার দোয়া কবুল করা হয়।’

(সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৪৯১)

রমজান মাসে রোজা অবস্থায় জুমার দিনের নিশ্চিত দোয়া কবুলের শেষ সুযোগ হিসেবে জুমাতুল বিদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

করণীয়: জুম্মার দিনের কিছু সুন্নত আমল রয়েছে। যেমন (১) সাবান দিয়ে ভালো করে গোসল করতে হবে (২) নতুন বা উত্তম পোশাক পরতে হবে (৩) আতর তথা সুগন্ধি ব্যবহার করতে হবে (৪) হেঁটে মসজিদে যেতে হবে (৫) আগে আগে মসজিদে প্রবেশ করতে হবে (৬) ইমামের কাছাকাছি জায়গায় বসতে হবে। (৭) ইমামের খুৎবা মনোযোগ সহকারে শুনতে হবে (৮) বেশি বেশি দরুদ শরিফ পাঠ করতে হবে (৯) কাউকে কষ্ট দেওয়া যাবে না, কোনো অনর্থক কথা/কাজ করা যাবে না। হযরত আওস ইবনে আওস আস-সাকাফি (রা.) থেকে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)কে বলতে শুনেছি, “যে ব্যক্তি জুম্মার দিনে ভালো করে গোসল করবে এবং আগে আগে পায়ে হেঁটে মসজিদে যাবে এবং ইমামের কাছাকাছি বসে খুৎবা মনোযোগ সহকারে শুনবে আর কোনো রকম অনর্থক কথা /কাজ করবে না তাকে তার প্রতিটি কদমের বিনিময়ে লাগাতার এক বছর নামাজ ও রোজার সওয়াব দান করা হবে।”

(সুনানে ইবনে মাযা, হাদিস: ১০৮৭, সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৪৫, আস্-সুনানুল কুবরা, হাদিস: ১৭০৩, সুনানে নাসাঈ, হাদিস: ১৩৮৪, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৬১৭৬, সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ২৭৮১)।

পরিশেষে মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে ফরিয়াদ আমাদের সকলের রোজা, নামাজ, সাহরি,ইফতারি, তারাবিসহ যাবতীয় ইবাদত-বন্দেগি মাহে রমজানের উছিলায় কবুল করুন। (আমিন)

লেখক: ধর্ম ও সমাজবিশ্লেষক, ধর্মীয় অনুষ্ঠান উপস্থাপক ও চেয়ারম্যান (গাউছিয়া ইসলামিক মিশন, কুমিল্লা)।

বিষয়:

হাওর উন্নয়ন

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
আহমেদ কবির রিপন

হাওর উন্নয়ন বলতে শুধু অবকাঠামোর উন্নয়ন নয়, মূল উন্নয়ন হচ্ছে টেকসই পরিকল্পনার দ্বারা সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন। জনসাধারণের জীবনমান টেকসই রাখার জন্য অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, যোগাযোগ ও চিকিৎসা ব্যবস্থার মতো জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিবেশ সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা।

আমরা বাংলাদেশের হাওরগুলোর প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য এবং বৈশিষ্ট্যকে যদি রক্ষা করতে পারি, তাহলে সেখানকার জনগোষ্ঠীসহ সারা দেশের মানুষের বিপদ কমাতে পারব, কারণ আমাদের হাকালুকি ও টাঙ্গুয়ার হাওর শীতকালীন পাখির আশ্রয়স্থল, জীববৈচিত্র্যের আঁধার আবার একই সঙ্গে মিঠাপানির মাছের বিশাল ভাণ্ডার এবং পরবর্তীতে ফসলের আবাদভূমি অর্থাৎ খানভাণ্ডার।

বিষয়টি অনেক বিজ্ঞ মানুষের বোধগম্য নয়। আমি অভিজ্ঞতার আলোকে যা বুঝতে পারি তা হলো দেশের হাওরাঞ্চল ও বনাঞ্চলের পরিবেশ সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার স্বার্থে ১৯৯৯ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ অধিদপ্তরের স্বার্থে হাকালুকি, কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, টেকনাফ, সোনাদিয়া আইল্যান্ড, টাঙ্গুয়ার হাওর ও সুন্দরবন এলাকাকে ecologically Critical Area ( eca) ঘোষণা করেন। ১৯৯৯ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত। (cwbmp) costal wetland biodiversity management project-এর মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য দেশি-বিদেশি এনজিওর সমন্বয়ে হাওরপারের বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে village conservatio group (vcg) গঠন করে পরিবেশ সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার কাজ শুরু করা হয়। আমি হাকালুকি ইসিএ ব্যবস্থাপনা সমিতির সদস্যদের নিয়ে ২০০৬ সালে ‘ভাটেরা টু বেরকুড়ি ভায়া ভূকশিমইল’ রাস্তার বেরকুড়ি গ্রাম পর্যন্ত রাস্তার উভয় পাশে বিভিন্ন প্রজাতির কয়েক হাজার গাছের চারা রোপণ করি। বেরকুড়ি কবরস্থানেও কয়েকশ গাছের চারা লাগাই। কবরস্থানে কবর খোদাই কাজে ব্যাঘাত হওয়ায় এই গাছগুলো কেটে ফেলা হয়। হাকালুকি হাওরের সব এলাকাতে বনের ন্যাচারাল গাছ সংরক্ষণের জন্য ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য পাহারাদার নিয়োগ দেওয়া হয়। বিল সেচে মাছ ধরা বন্ধ করা, পাখি শিকার বন্ধ করা, কারেন্ট জাল ব্যবহার বন্ধ করা, এ ধরনের পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখার জন্য আওয়াজ তুলে সাইনবোর্ড বসিয়ে সভা-সেমিনারের মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা হয়। তাতে অনেকটা সফলতা দেখা দিল। হাওরে পাখিদের সমাগম বেড়ে গেল। জলাভূমিতে হিজল, করচ, বরুন গাছ ও আরাং জঙ্গলে একটি সুন্দর মনোরম পরিবেশ সৃষ্টি হতে লাগল। গাছপালা ও জঙ্গল বাড়াতে খাল ও বিলে মাছের অভয়ারণ্যে সৃষ্টি হলো। মাছের প্রজাতি আস্তে আস্তে বৃদ্ধি হতে লাগল।

জনসাধারণ পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দিতে লাগল। মাছ, গাছ, পশু-পাখি রক্ষায় সাধারণ মানুষ এগিয়ে আসতে শুরু করল। গ্রাম সংরক্ষণ দলের সদস্যরা ঐক্যবদ্ধভাবে নানা রকম আর্থিক উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করল। গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, হাঁস-মোরগ পালনের মাধ্যমে আর্থিকভাবে অনেক লাভবান হলো।

হাওর-তীরবর্তী মানুষজনসহ গ্রাম সংরক্ষণ দলের সদস্যরা মিলে বিশ্ব জীববৈচিত্র্য দিবস ও বিশ্ব পরিবেশ দিবসসহ সব জাতীয় দিবস উদযাপন শুরু করল, তাদের সঙ্গে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা যুক্ত হলেন।

মোট কথা হাওরপাড়ের মানুষের হাতে হাওরের কর্তৃত্ব ফিরে এল। কিন্তু ২০১০ সালের জুন মাসে cwbnp প্রকল্পের কাজ সরকার বন্ধ করে দিল। হাওরপারের সংগঠিত ৮৪টি সমিতির কাজে ব্যাঘাত ঘটাতে। আস্তে আস্তে অপরাধমূলক কাজ, পরিবেশবিরোধী কাজ বাড়তে লাগল। এখন আবার পূর্বের অবস্থায় চলে গেছে। আমার বিশ্বাস, বর্তমান সরকার আমার বক্তব্যটি সুবিবেচনাক্রমে বক্তব্যের বর্ণনাতে সমাধানের পথ খুঁজে কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন আছে। হাওরের পরিবেশ সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ একান্ত কাম্য।

ছড়া ও খালের গভীরতা বেড়ে গেছে, এই পলি ও বালু গিয়ে নদী, নালা, খাল ও বিল অস্বাভাবিকভাবে ভরাট হয়ে গেছে। তাতে ছড়া, খাল বা নদী-তীরবর্তী জমিগুলো অনাবাদি হয়ে যাচ্ছে। প্রত্যেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে এবং উপজেলা কৃষি বিভাগের টেকসই পরিকল্পনাতে উল্লিখিত সমস্যার সমাধান সম্ভব। সরকারের দায়িত্বশীল বিভাগ ও জনপ্রতিনিধিরা বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জোরালো দারি জানাচ্ছি। মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতি ‘গ্রামকে শহর করার’ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। তাই সর্বমহল থেকে বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন আছে। কারণ ‘কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে’- সে কথাটি চির সত্য, বাস্তবায়নে সবার সহযোগিতা দরকার।

লেখক: পরিবেশবিদ ও সমাজকর্মী


ঈদ ও নববর্ষ

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
সৈয়দ শাকিল আহাদ

দীর্ঘ এক মাস রোজা রাখার পর আসছে ঈদ বা ঈদুল ফিতর । এই ঈদ উদ্‌যাপন উপলক্ষে দেশের আপামর জনগণের মাঝে ব্যাপক আনন্দের উত্তেজনা বইতে শুরু করেছে, ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসবগুলোকে ঈদ বলা হয়।

ঈদ অর্থ উৎসব, খুশি, আনন্দ।

ইসলাম ধর্মানুযায়ী ঈদের ধর্মীয় সংজ্ঞা হলো, পবিত্র রমজানে ১ মাস রোজা বা সিয়াম সাধনার পর শাওয়াল মাসের ১ তারিখে খুশি উদযাপনকে ঈদ বলা হয়।

দুটি ঈদকে ঘিরেই প্রধান এই উৎসব পালিত হয় যথাক্রমে ঈদুল ফিতর বা রমজানের ঈদ অন্যটি ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ ।

ঈদ মানে খুশি। এই খুশি সবাই উদযাপন করবে এটাই কাম্য, কবি কামরুন নুর চৌধুরী তার ঈদ কবিতার এক জায়গায় উল্লেখ করেছেন-

‘ঈদ তুমি আবার এসেছো ?

তোমাকে না কতবার মানা করেছি

দোহাই লাগে তুমি এসো না, সবার মাঝে সমানভাবে খুশি বিলিয়ে দিতে না পারলে আর এসো না ...’

আমরা আনন্দ-উল্লাস করব আর আমাদেরই মতো বিশ্বের এক প্রান্তে ফিলিস্তিনি জনগণ পোহাবে নির্যাতন, তাদেরকে সইতে হচ্ছে বাঁচা-মরার তাগিদ, কী নিষ্ঠুর যন্ত্রণা, পরম করুনাময়ের কাছে প্রার্থনা করছি দ্রুত নিষ্পত্তি হোক বিভেদ, খতম হোক বিভ্রান্তি, বিশ্ব বিবেক শান্ত হোক।

আসন্ন ঈদের সঙ্গে আমাদের দেশে আবার সম্পৃক্ত হতে যাচ্ছে নববর্ষ ১৪৩১।

বাংলা নববর্ষ আমাদের মাঝে একপ্রকার উৎসব। উৎসব পরিস্থিতিতে উদযাপিত হয়ে থাকে এবং সারা দেশে একপ্রকার ধুমধামের সঙ্গেই তা উদযাপন করা হয়ে থাকে।

এই উৎসবটিকে ভোরবেলা শোভাযাত্রা, মেলা, পান্তাভাত বিভিন্ন প্রকার নতুন স্বাদের খাওয়া, হালখাতা খোলা ইত্যাদি বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে উদ্‌যাপন করা হয়। বাংলা নববর্ষের ঐতিহ্যবাহী শুভেচ্ছা বাক্য হল ‘শুভ নববর্ষ’। উল্লেখযোগ্য হচ্ছে নতুন জামা-কাপড় পরা, উপহার বিনিময় ইত্যাদি, নববর্ষের সময় বাংলাদেশে বিশেষ করে ঢাকা শহরের বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের উদ্যোগে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়।

এই নববর্ষ উদ্‌যাপনের ইতিহাস সম্পর্কে তথ্যানুসন্ধান করে জানা যায়, বেশিরভাগ ইতিহাসবিদ মোটামুটি একমত যে, ১৫৫৬ সালে মোগল সম্রাট জালালুদ্দিন মোহাম্মদ আকবরের শাসনামল থেকে বাংলা নববর্ষ উদযাপন শুরু হয়েছিল। যদিও বাংলা সন শুরু হয়েছিল আরও পরে, কিন্তু এটি সম্রাট আকবরের সিংহাসনে আরোহণের সময় থেকেই কার্যকর বলে ধরা হয়। তবে শুরুতে এটি বর্ষবরণ ছিল না। বর্ষবরণের আনুষ্ঠানিকতা পরে যোগ করা হয়।

অতীতের ভুলত্রুটি ও ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন করে সুখ-শান্তি আর সমৃদ্ধির প্রত্যাশায় বর্তমানে যেভাবে বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপিত হয়, সেটা কখনই আগে হতো না। ইতিহাসবিদরা বলছেন, সবসময়ই এই রূপে বর্ষবরণ করা হতো না। বরং কাল পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বর্ষবরণের আনুষ্ঠানিকতায়ও এসেছে নানা পরিবর্তন ।

তাদের মতে, মোগল সম্রাট আকবরের শাসনামলে বাংলা সন গণনা শুরু হওয়ার পর খাজনা আদায়ের পর যে উৎসব থেকে বর্ষবরণের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছিল তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিবর্তিত হয়ে বর্তমান রূপ লাভ করেছে।

এই ধারাবাহিকতায় কখনো আগের বিভিন্ন নিয়ম বাদ দেওয়া হয়েছে, আবার কখনো নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে এই উৎসবের সঙ্গে। ধীরে ধীরে বাঙালি সংস্কৃতি আর রাজনীতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে গেছে এই উৎসব।

ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন তার এক লেখায় বলেন, বিভিন্ন সময়ে বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপন বাঙালির প্রতিবাদের ভাষা হয়েও উঠেছে। বিশেষ করে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর আইয়ুব খানের আমল এবং আশির দশকের শেষের দিকে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা ছিল বর্ষবরণের আনুষ্ঠানিকতা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. মীজানুর রহমান ২০২২ সালে তার এক লেখায় উল্লেখ করেছেন, বাংলা সন প্রবর্তনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল তৎকালীন বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ ও চিন্তাবিদ ফতেউল্লাহ সিরাজীকে। তিনি সৌর সন ও আরবি হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে বাংলা সন ও তারিখ নির্ধারণ করেন। আর এই ক্যালেন্ডার বা পঞ্জিকার নাম দেওয়া হয় তারিখ-ই-এলাহী। এই পুরো কাজটি করা হয়েছিল ফসল উৎপাদনের ঋতুচক্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যাতে ফসল ওঠার সময়টাতেই খাজনা আদায় করা যায়।

এর ধারাবাহিকতায় বাংলার কৃষকরা চৈত্র মাসের শেষ দিন পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার এবং অন্যান্য ভূ-স্বামীর খাজনা পরিশোধ করত। এর পরের দিন অর্থাৎ বৈশাখ মাসের প্রথম দিন ভূ-স্বামীরা তাদের মিষ্টিমুখ করাতেন। এ উপলক্ষে তখন মেলা বসত। আয়োজন করা হতো আরও নানা অনুষ্ঠানের।

মি. রহমান তার লেখায় বলেন, সম্রাট আকবরের অনুকরণে সুবেদার ইসলাম চিশতি তার বাসভবনের সামনে প্রজাদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ ও বৈশাখী উৎসব পালন করতেন। এ উপলক্ষে খাজনা আদায় ও হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি মেলায় গান-বাজনা, গরু-মহিষের লড়াই, কাবাডি খেলা হতো। পহেলা বৈশাখের খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে ছিল ভালো খাবার খাওয়া, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল মাছ, মাংস, পোলাও।

বাংলা নববর্ষ সম্পর্কে বিশিষ্ট গবেষক ও কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সৌমিত্র শেখর বলেন, বাঙালি মনস্তত্ত্বে এটা ঢুকে যায় যে, পহেলা বৈশাখ বা বছরের প্রথম দিনে যদি ভালো খাবার খাওয়া হয়, ভালো পোশাক পরা হয় এবং মিথ্যা না বলা হয়, তাহলে পুরো বছরজুড়েই ভালো পোশাক, ভালো খাবার পাওয়া যাবে, বলতে বা শুনতে হবে না মিথ্যাও।

‘এ রকম সৎ এবং শুভর চর্চা হবে।’

তিনি বলেন, ওই সময়ে কারও যাদের সাধ্য কম থাকত বা যারা দরিদ্র ছিল তারা অন্তত গরম ভাত খেত। আর গরম ভাতের সঙ্গে থাকতো মৌরালা মাছ বা মলা মাছ।

‘এই মলা মাছ দিয়ে গরম ভাত খাবে- এটিই আমরা বই-পুস্তকে পেয়েছি, আমরা প্রাচীন গ্রন্থে পেয়েছি যে, বছরের পহেলা সময়ে আমরা এটা খাব।’

কিন্তু বর্তমানে পহেলা বৈশাখে খাবারের পদ পরিবর্তন হয়ে গেছে। এখন পহেলা বৈশাখে খাবার হিসেবে পান্তা ভাত আর ইলিশ মাছই মূল পদ হিসেবে উঠে এসেছে।

ইতিহাসবিদরা বলেন, বাঙালি সংস্কৃতিতে পান্তা দারিদ্র্যের প্রতীক। তাই পান্তাকে পহেলা বৈশাখের খাবার হিসেবে গ্রহণ করার ব্যাপারটি আগে ছিল না।

তিনি বলেন, ‘যারা পান্তা প্রতিদিন খেত, তারা মনে করত যে সেদিন তারা ভালো খাবে। আর যারা ছেঁড়া পোশাক পরত ওই দিন অন্ততপক্ষে তারা ভালো পোশাক পরার চেষ্টা করত।’

বর্তমান সময়ে নববর্ষ উদ্‌যাপনে অনেক পরিবর্তন লক্ষণীয়। তবে আসন্ন ঈদ ও নববর্ষ আমাদের বাংলাদেশের মুসলিম নরনারী ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির সম্পর্ক উজ্জীবিত হবে ও দেশের সর্বত্র আনন্দ-উল্লাসে উদ্ভাসিত থাকবে সর্বশ্রেণির জনগণ ।

লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক


স্বভাবের দ্বারা মানুষ হয় আকৃতির দ্বারা নয়

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
আতিকুল ইসলাম খান

জ্ঞানী ও গুণী ভাই-বোনদের উদ্দেশ্যে বলে রাখা ভালো, জ্ঞান নিয়ে গর্ব করার কিছুই নেই। শয়তানও কিন্তু মেধাবী ছিল। মনুষ্যত্ব ও সততা না থাকলে সে মেধা মূল্যহীন। আল্লাহ রব্বুল আলামিনের সুন্দর সুন্দর সিফাতি নামের মধ্যে ইয়া আলিমু অর্থ- মহাজ্ঞানী, ইয়া হাকিমু অর্থ- প্রজ্ঞাময় সুতরাং মানুষের ইলম বা জ্ঞানের পরিসীমা যেখানে শেষ আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জ্ঞান সেখান থেকেই শুরু।

আমরা জানি, তিনিই আল্লাহ যিনি গইবি ওয়াশ শাহাদাতি অর্থাৎ একমাত্র স্পষ্ট-অস্পষ্ট, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য, সবকিছু জানেন, কোনো কিছুই তার অজানা নয়। পৃথিবীতে আল- কোরআনের প্রথম যে কথাটা তিনি নাজিল করেছেন তা হলো ইক্করা অর্থাৎ ‘পড়’ আর যার ওপর নাজিল করা হয়েছে তিনি পড়তে বা লিখতে কোনটাই জানতেন না। অতএব, এই পৃথিবীর সবচেয়ে চ্যালেঞ্জের শব্দ হচ্ছে ইক্করা ‘পড়’ আর এ পড়াই জ্ঞান অর্জনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

যা অর্জন করার জন্য আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা মানুষকে সর্বপ্রথম সুরাতুল আলাকে নির্দেশ করেছেন, ইক্করা বিসমি রব্বিকাল্লাযি খলাক্ক অর্থাৎ পড় তোমার প্রভুর নামে। সুতরাং মুসলমান জ্ঞানহীন হতে পারে না কারন মুসলিম এমন একটা জাতি যে কি না সব স্থান থেকে জ্ঞান অর্জন করতে পারে।

এককথায় ইসলাম জ্ঞনের ধর্ম।

প্রতিটি মানুষের মস্তিষ্ক হলো জ্ঞানের খনি যা আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা জ্ঞানের নুর দ্বারা পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন! সুবহান আল্লাহ!

যদিও মানুষের অপকর্মে জ্ঞানের নুর কলুষিত হয়ে যায় এবং সু-কর্মে ব্যক্তির নূর প্রজ্বলিত হয়ে জীবনকর্ম উত্তম জ্ঞানে আলোকিত হয়ে ইহকাল ও পরকালের জন্য কল্যাণকর হয় । মানুষ তার মস্তিষ্কের এই জ্ঞান ভাণ্ডার থেকে পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় জ্ঞান সংগ্রহ করে কর্ম বিশেষে সঠিক পন্থায় জ্ঞানের ধারা অব্যাহত রাখে। যার প্রভাবে মানুষ সুস্থ বিনোদনে জীবন সমাজ পরিচালনা করে সূর্যের আলোর মতো সব কাজে সব শ্রেণির মানুষের মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয় । এটাই সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের ওপর বিধাতার নির্দেশনা।

জ্ঞান সর্বদায় কল্যাণকর।

কথায় আছে যে, অ-জ্ঞানের জেগে থাকার চেয়ে,

জ্ঞানীর ঘুমিয়ে থাকা উত্তম।

জ্ঞানী মূলত কারা?

জ্ঞানী হওয়ার জন্য পদমর্যাদা, জাত ধর্ম, উচ্চডিগ্রি, প্রাচুর্য ঐশ্বর্য, প্রতিপত্তি এসব কোনো কিছুই নির্দিষ্ট নয়, কেননা আল্লাহর দেওয়া জ্ঞান নিজেই এসব গুণে পরিপূর্ণ। তবে সঠিক এবং অধিক বিদ্যাচর্চার মাধ্যমে মানুষ আরও উত্তম শিক্ষা অর্জন করে জ্ঞানের ব্যবহার যথাস্থানে প্রয়োগ করে দেশ ও জাতির কল্যাণের জন্য উন্নয়ন মূলক কিছু করতে পারে।

সৃষ্টির দায়বদ্ধতা-

মানুষ সব নিয়ামতপ্রাপ্ত হওয়ার পর ও স্রষ্টার পক্ষ হতে সৃষ্টির ওপর কিছু দায়বদ্ধতা রয়েছে যেমন আমরা মানুষ জাতির জীবন এবং শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-পতঙ্গ, জ্ঞান-বুদ্ধি, আল্লাহর দেওয়া আমানত। যা খেয়ানত করার কোনো অধিকার মানুষের নেই সুতরাং অঙ্গ, পতঙ্গ, রক্ত বিক্রি করা এবং কর্মের অপব্যবহার করা গুনাহের কাজ, তবে একে অপরের জীবন বাঁচাতে শরীরের অতিরিক্ত কিছু জিনিস বিক্রি নয়, বরং আল্লাহর নামে দান করা জায়েজ আছে।

মানুষ জীবন-জীবিকার স্বার্থে মানুষের কল্যাণে ব্যতিক্রম কিছু লেনদেন আয় উপার্জন ব্যবসা-বাণিজ্য করবে তবে, অবশ্যই প্রকৃত মানবিকতা বিবেচনায় রেখে। কারণ মানুষ বিবেক সম্পন্ন, তাকে ভালো-মন্দ বোঝার ক্ষমতা দিয়েছেন আল্লাহ রব্বুল আলামিন আর পশু বিবেক শূন্য সুতরাং সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ এবং পশু কখনো এক হতে পারে না। আর যারা অমানবিক আচরণ করে তারা হয় পাগল না হয় পশুর চেয়ে ও অধম। অর্থাৎ জন্ম হউক যথাতথা কর্ম হউক ভালো সুতরাং যে ব্যক্তি সঠিক পন্থায় জ্ঞান অর্জন করবে সে কখনো অন্যায় কথা, অকল্যাণকর কর্ম ও ভিত্তিহীন কাণ্ড ঘটাতে পারে না। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে স্পষ্ট যে , শুধু শিক্ষা নয়, বরং সুশিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড।

তাই তো বর্তমানে আমরা দেখতে পাচ্ছি শুধু শিক্ষাকে পুঁজি করে কিছু কুচক্রী গুষ্টি আমাদের এই সভ্য জাতিকে মেরুদণ্ড হীন করার জন্য পাঠ্য বই বিকৃত করে কোমল মতি ছেলেমেয়েদের মস্তিষ্কের জ্ঞানের নূর নিভিয়ে দেওয়ার জন্য অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তদন্ত সাপেক্ষে এটা রোধ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

আমাদের সময়ে আমরা নিরপেক্ষভাবে জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে যার যার ধর্ম নিয়ে ধর্মীয় সুবিধার মধ্য দিয়ে ধর্মভিত্তিক বই ও শিক্ষকগনের সমন্বয়ে, সকল ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সমঝোতার মাধ্যমে আন্তরিকতার সাথে ঐক্য বদ্ধ হয়ে অধ্যয়ন করেছি। তাছাড়া লেখাপড়ার কালি-কলম ছিল বয়সভিত্তিক। কারও ওপর কোনো বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হতো না। শিক্ষার্থীরা সুরে সুরে গাইতো-

‘বিদ্যালয় আমার বিদ্যালয়,

এখানে সভ্যতারই ফুল ফুটানো হয়’

আর এখন আমাদের ছেলে-মেয়েরা শিখছে

‘ক্রিং ক্রিং সাইকেল চলে,

ফেরিওয়ালা যায়,

এটা কোন সভ্যতা? কি শিক্ষা?

অতীতে শিক্ষণীয় ভাবে, পড়ার সময় পড়া আর খেলার সময় খেলার মাধ্যমে এমনই জ্ঞানের আলো অর্জন হতো যে, রান্না শিখার জন্য হাঁড়ি পাতিল নিয়ে স্কুলে আসতে হতো না। বৃষ্টি হলে ছাতা লাগবে এটাই তো জ্ঞানের অর্জন।

এই অধঃপতন ঠেকানোর জন্যই কবিগুরু রাবিন্দ্রনাথ ঠাকুর জুতা আবিস্কার কবিতা লিখেগেছেন। নিশ্চয়ই এ যুগের কতিপয় শিক্ষানীতির প্রবর্তকদের জুতা আবিষ্কার কবিতাটি মনোযোগ সহকারে পড়া এবং আবৃত্তি শোনা হয়নি।

এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে পৃথিবী যখন আবিষ্কারের সন্ধানে গ্রহে নক্ষত্রে ছুটছে, আমরা তখন ব্যাঙ খেলা শিখছি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসে। গরুর রচনা পড়তে পড়তে গরু হয়েছি আর ব্যাঙ হতে চাই না। এ জন্যই কি ভুপেন হাজারিকা অভিমান করে গেয়েছিলেন,

‘ও মালিক, সারাজীবন কাঁদালে যখন, মেঘ করে দাও, আমায় মেঘ করে দাও তবু, কাঁদতে পারব পরের শোকে, অনেক ভালো তাও।’

‘মানুষ যেন করো না আমায়।’

মূলত মানুষ মানুষ হয় সৎ স্বভাবের ধারা আকৃতির ধারা নয়। আমার জানা নেই এ উক্তিটি কে, কখন, কেন করেছেন, তবে তার প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা। এই বাস্তব সত্য কথাটি আজকের পৃথিবী পলকে পলকে উপলব্ধি করছে। তাই তো মানুষের পেট থেকে সুস্থ সুন্দর নিখুঁত মানুষ-শিশু জন্মানোর পর ও সেই নবজাতকের জন্য দোয়া করা হয়, বড় হয়ে মানুষের মতো মানুষ হও। সুবহান আল্লাহ!

জ্ঞানের প্রভাব-

অতীতে শিক্ষকগণকে আমরা পরম আদবের সঙ্গে সম্মান করেছি এবং এখনো শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। সে যুগের মহৎজ্ঞানী কবি-সাহিত্যিকগণের লেখা পড়ে আমরা যতটুকু জ্ঞান অর্জন করেছি তা এখনো নিঃস্বার্থভাবে ভালো থাকা এবং ভালো রাখার জন্য যথেষ্ট! সে সময়ের শিক্ষার মেরুদণ্ড, এখনো শিষ্টাচার, আদব, কায়দা, এহসান, সততা এবং সচ্চরিত্রের গুনে শক্তি সাহস নিয়ে দন্ডায়মান হয়ে আছে, ইনশা আল্লাহ!

শ্রদ্ধা মূলত এমন একটা সম্মান যা আপনা হতে আসে, চেয়ে নিতে হয় না। সত্যি কারের জ্ঞানী কখনো লোভী স্বার্থপর ও অহংকারী হতে পারে না। কারন সে তার নেক জ্ঞানের মাধ্যমে ভালো মন্দ উপলব্ধি করার ক্ষমতা রাখে। সবচেয়ে জ্ঞানী ছিল ইবলিশ, শুধু মাত্র নেক জ্ঞানের অভাবে অহংকারের জন্য আল্লাহর হুকুম অমান্য করে জান্নাত হতে বহিষ্কার হয়ে অনন্তকালের জন্য জাহান্নামি হলো তবুও আত্মসমর্পণ করেনি। পক্ষান্তরে, ইবলিশের প্ররোচনায় আমাদের আদি পিতা হযরত আদম (আ.)আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণ করেছিলেন সত্য তবে, এটা অন্যায় করে নয় বরং ভুল করে। অতঃপর তিনি তার নেক জ্ঞানের প্রভাবে আল্লাহর কাছে অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। সে প্রার্থনা আল্লাহ সুবহানাহু তা’য়ালা কবুল ও মঞ্জুর করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ!

আমাদের মহান পালনকর্তা আদম (আ.) এর এই অনুসুচনা মূলক তওবা তার সন্তানদের জন্য পবিত্র কোরআনুল কারিমে সুরাতুল বাকারার (২০১) নং আয়াতে নাজিল করেছেন–

তা হলো- রব্বানা জলাম্না আনফুসানা ওয়া ইল্লাম তাগফির লানা ওয়াতার হ্হাম্না লানা কুনান্না মিনাল খসিরিন অর্থাৎ

‘হে প্রভু! আমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছি অন্যায় করেছি। হে মহান! আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং দয়া না করেন তাহলে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।’ এটাই আমাদের শিক্ষা।

একজন মুসলিমের তুলনায় এ পৃথিবীর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের মালিক কিছুই না। কারণ মুসলমানের ফজরের দুই রাকাআত সুন্নত নামাজের মূল্য হচ্ছে অজস্র ধন বান্ডারে ভর পুর পৃথিবীর দশগুণের চেয়েও বেশি আর ফরজ নামাজের তো কথায় নেই। সুবহান আল্লাহ!

তবে মুসলমানদের জীবনে দুঃখ দুর্দশা আসবে কারণ দুনিয়া মুমিনের জন্য জেলখানা। সত্যিকারের মুসলিম ক্ষুধা এবং শত্রুর ভয় করে না কারণ চৌদ্দশ বছর আগে থেকেই আমাদের এসবে অভ্যস্ত। আল্লাহর পক্ষ হতে এটাই আমাদের পরীক্ষা এবং ফলাফল প্রাপ্তির উৎস।

আল্লাহ সুবহানাহু তা’য়ালা পবিত্র কোরআনে আয়াত নাজিল করেছেন, ইন্নাল্লাহা মায়াস সয়াবিরিন অর্থাৎ ধৈর্যশীলের সাথে আল্লাহ আছেন। সুতরাং ‘দয়াল মুরশীদ যার সখা তার, কিসের ভাবনা?’

এরপরও কিছু মুসলমান বোকা আর ধোকার রাজ্যে বাস করছে শুধু নেক জ্ঞানের অভাবে। পৃথিবীর প্রায় শেষ সময়, তাই ফেতনা ফেসাদ থাকবে হাদিসের ই কথা তবে, পৃথিবীতে একজন মুমিন মুসলমান থাকতে কিয়ামত হবে না। অতএব ভালো কাজের মাধ্যমে এখনো শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব। যুগের ওপর দোষ না চাপিয়ে বরং ভ্রান্ত জ্ঞানীদের মুখোস উন্মোচন করা দরকার। এ যুগের কিছু সংখ্যক শিক্ষকের ভুল পন্থায় শিক্ষা পেয়ে মানুষ রসাতলে যাচ্ছে অথচ শিক্ষকরাই মানুষ গড়ার কারিগর। অজ্ঞ আলেমগনের ভুল তথ্যে সাধারণ মানুষ পথভ্রষ্ট হয়ে যাচ্ছে অথচ ওনাদের হওয়ার কথা ছিল হকের পথে আলোর দিশারি । কিছু ভ্রান্ত ডিগ্রিধারি ডাক্তারদের জন্যই আজ সামান্য একটা সুন্নতি খতনা করতে গিয়ে ছোট্ট ছোট্ট শিশুরা লাশ হয়ে ঘরে ফিরছে। নিয়তির নির্মমতা কত নিষ্ঠুর। কীভাবে মূল্যহীন করে দিচ্ছে মানুষের স্বপ্ন-সাধ।

মূলত কর্তৃপক্ষের হয় দুর্নীতি না হয় দায়িত্ব কর্তব্যের চরম অবহেলায় এই ভুয়া, অযোগ্যদের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়জিত করে প্রতিনিয়ত দেশ ও জাতির ক্ষতি করছে। অন্যায় করা এবং অন্যায়কারীকে প্রশ্রয় দেওয়া সমান অপরাধ। দেশ যখন প্রযুক্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তখনই কিছু সংখ্যক ভুয়া প্রতারকেরা এক একটা প্রতিষ্ঠানে বড় পদে আসিন হয়ে সুস্থ যুব-সমাজের শক্তিশালী মেমোরিকে কুলষিত করে তাদের স্মৃতিশক্তি স্মরণশক্তি ও শ্রবণশক্তি জ্ঞান শূন্য করে দিচ্ছে। ফলে তাদের মানুষিক পেরেশানিতে রাত কাটছে নির্ঘুমে আর দিন শেষ করছে ঘুমের ঘোরে। এ ভাবে জীবনের মূল্যবান সময় হেলায় নষ্ট করে

এক পর্যায়ে নিরুপায় হয়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়। তখন ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনে যে সমস্যাটা লিখা থাকে তা হলো ডিপ্রেশন। আমাদের সাধারণ ভাষায় এ রোগের নাম দুশ্চিন্তা অথবা হতাশা। এর একটাই কারণ প্রযুক্তির অপব্যবহার। আয় আল্লাহ! পৃথিবীতে সত্য নীতি ও শোষণ বিহীন সমাজ গড়ার জন্য হযরত ওমর (আ.) এর মতো একজন সাহসী নেতার আবির্ভাব ঘটান।

লেখক: ইসলামি চিন্তাবিদ ও গবেষক


মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই বাংলাদেশের এগিয়ে যাবার প্রেরণা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
হীরেন পণ্ডিত

বাঙালি জাতির জীবনে সবচেয়ে গৌরব ও অহঙ্কারের বিষয় হলো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। কোনো জাতির জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে শরিক থাকা, সামান্যতম অবদান রাখতে পারা যে কোনো ব্যক্তির জন্য গর্বের ব্যাপার। আমাদের গৌরবের জায়গা হলো এ দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি এবং সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ করে। শোষণ-বঞ্চনামুক্ত একটি উদার, গণতান্ত্রিক, সমতাভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়েই এদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে।

১৯৪৭ সাল থেকেই শেখ মুজিব ছিলেন বাঙালি জাতির প্রধান আকর্ষণ। বাঙালি জাতির মুক্তির ইতিহাস তাকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। তরুণ শেখ মুজিব ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন বাঙালি জাতির মুক্তিদাতা। নতুন রাজনৈতিক চিন্তাচেতনা নিয়ে ১৯৪৮ সালে ছাত্রলীগ গঠন করেন। ১৯৪৯ সালে নবগঠিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি আন্দোলনে অংশ নেয়ার মাধ্যমেই রাজনৈতিক তৎপরতার সূচনা হয়। এরপর ১৯৫২ এর মহান ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট গঠন, ১৯৫৮ এর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ১৯৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন ও ১৯৬৬ এর ঐতিহাসিক ছয় দফা ভিত্তিক আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি হয়ে ওঠেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাঙালিরা দফার পক্ষে অকুণ্ঠ সমর্থন জানায়। কিন্তু পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শুরু করে। তাঁর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বের কারণে একাত্তরের মার্চ মাসের শুরুতেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অনিবার্য। তাই তিনি একাত্তরের ৭ মার্চ বাংলাদেশের মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। এ ভাষণে বাঙালির প্রতি পাকিস্তানিদের হত্যা-নিপীড়ন-নির্যাতনের চিত্র মূর্ত হয়ে উঠে। শত্রæর মোকাবিলায় তিনি বাঙালি জাতিকে নির্দেশ দেন, 'তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো।' এই সম্মোহনী ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে বাঙালি জাতি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।

বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত প্রতীকী স্টাইলে ভাষণটি দিয়েছিলেন। একদিকে মুক্তিকামী মানুষকে দীর্ঘ সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হতে বলেছেন, অন্যদিকে পাকিস্তানি শাসকদের বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দিয়েছেন। তিনি একজন বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন বিশ্বমাপের কূটনীতিবিদ। ৭ মার্চের ভাষণে তিনি সবকিছুকে প্রকাশ করেন একজন কূটনীতিবিদের মতো। তিনি বলেন, বিগত ২৩ বছরের বঞ্চনার ইতিহাস। তিনি ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪-এর নির্বাচন, ১৯৫৮-এর সামরিক শাসন, ১৯৬৬-এর ছয় দফা, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর নির্বাচনসহ তৎকালীন পাকিস্তানে বাঙালি বঞ্চনার কথা জানান, অন্যদিকে যুদ্ধকৌশলও বলে দেন এবং একটি সাজানো গোছানো অলিখিত ভাষণ দেন।

২৬ মার্চ বাংলাদেশের নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, ওই ঘোষণাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ভিত্তি, এই ঘোষণাকে ভিত্তি ধরে ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার পূর্ণাঙ্গ ঘোষণাপত্র বা সংবিধানের মাতৃকোষ ঘোষিত হয় এবং স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়। এই ঘোষণাপত্রের ওপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ সংবিধান রচিত হয়। ১৯৭০ এর নির্বাচনের ভেতর দিয়ে আসা বাংলাদেশের ওপর গণহত্যা শুরু ও যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার পরেই বাংলাদেশের জনগণের নির্বাচিত নেতা হিসেবে ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। সেটাকেই স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে সব জনপ্রতিনিধি বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে বৈধ ঘোষণা হিসেবে মেনে নেন। আর বঙ্গবন্ধু ঘোষিত স্বাধীন দেশের জন্য সরকার গঠন করেন। বঙ্গবন্ধুকে ওই সরকারের প্রধান অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি ও সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। বৈধ সরকার তখন দেশের ওপর ওই ঘোষণাপত্র অনুযায়ী সব আইন প্রণয়ন ও রাজস্ব-সংক্রান্ত সব অধিকার পায়। এই পথে দু’টি মাত্র বাধা থাকে। প্রথম হলো দেশের অভ্যন্তরে বেশ কিছু স্থান তখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দখলে ছিলো এবং দ্বিতীয়ত বাংলাদেশের জন্য অন্য রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দরকার।

এই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির জন্য দু’টি বিষয় জরুরি ছিল। প্রথমত যারা এই রাষ্ট্র গঠন করেছে তাদের প্রমাণ করতে হবে তারা বিচ্ছিন্নতাবাদী নয় এবং দ্বিতীয়ত রাষ্ট্র নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে কি না? কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অন্য একটি গণতান্ত্রিক নতুন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিতে গেলে প্রথমেই দেখতে হয় যারা নতুন রাষ্ট্র গঠন করেছে বলে দাবি করছেন, তারা বিচ্ছিন্নতাবাদী কি না? যদি তারা বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রমাণিত না হয় তাহলে স্বীকৃতি পাওয়ার বেশির ভাগ শর্ত তারা পূরণ করেন।

বাংলাদেশের এই পাকিস্তানি হানাদার বিতাড়িত করার যুদ্ধে বঙ্গবন্ধু যদি পালিয়ে যেতেন বা আন্ডার গ্রাউন্ডে গিয়ে বিপ্লবীদের মতো যুদ্ধ পরিচালনা করার চেষ্টা করতেন, তাহলে পাকিস্তানের সামরিক শাসক তাঁকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে প্রমাণ করার যথেষ্ট সুযোগ পেত। কিন্তু দেশ আক্রান্ত হওয়ার পরও বঙ্গবন্ধু নিজ বাসভবনে বসেই স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তিনি দেশের জনগণকে আক্রমণকারীদের প্রতিহত করার আহ্বান জানান এবং বিশ্ববাসীর কাছে ওই নতুন রাষ্ট্রের জন্য স্বীকৃতি চান।

এই ঘোষণা ও স্বীকৃতি চাওয়ার কাজটি ছিল প্রকাশ্যে এবং নির্বাচিত নেতা হিসেবে। তাই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে তখন তারা একটি স্বাধীন দেশের নির্বাচিত সরকার প্রধানকে গ্রেপ্তার করে। তিনি বা তাঁর দল বিচ্ছিন্নতাবাদী নয়। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু প্রকাশ্যে এভাবে গ্রেপ্তার হওয়ার ভেতর দিয়ে, স্বাধীনতা ঘোষণার পরে এই দেশটির আর বাকি যে বিজয় অর্জন করার ছিল তার বেশির ভাগ তিনি একাই করেন। অর্থাৎ তিনি বিশ্ববাসীর কাছে প্রমাণ করেন, তিনি ও তাঁর দল বিচ্ছিন্নতাবাদী নয়, তাঁরা মূলত নিজস্ব ভূমি থেকে হানাদার মুক্তির জন্য যুদ্ধ করছেন।

১৯৭১-এর ৯ মাসে পাকিস্তানের জেলে থেকে তিনি যেমন বেশির ভাগ যুদ্ধে জিতিয়ে দেন বাঙালিকে, তেমনি জেলে বসেও তিনি আগরতলা মামলার মতো নিজেকে রূপান্তরিত করেন; তাঁর আকৃতি আরও বিশাল হয়। গণতান্ত্রিক বিশ্ব প্রশ্ন করে এই নির্বাচিত নেতাকে গ্রেপ্তার করার অধিকার পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষের রয়েছে কিনা? মার্কিন প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানের পক্ষ নিলেও সিনেটে বার বার বাধাগ্রস্ত হন পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থানের জন্য। সবাই বলেন একমাত্র বঙ্গবন্ধুই তাঁর দেশ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারী। পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষ নয়। তাই মুক্তিযুদ্ধে যেমন বজ্রকণ্ঠের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের রাইফেলে, মাইন, গ্রেনেডে সবখানে ছিলেন বঙ্গবন্ধু, তেমনি আন্তর্জাতিক বিশ্বে প্রায় এককভাবে লড়াই করেন গ্রেপ্তার হওয়া নেতা বঙ্গবন্ধু।

যে কোনো মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা সংগ্রাম যেমন দেশের মানুষের আত্মত্যাগের মাধ্যমে হয়, তেমনি তার সঙ্গে সহযোদ্ধা হিসেবে পাশে দাঁড়ায় সারা পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষ। সারা পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষকে সেদিন বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়ানোর নায্যতা দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। কূটনীতিতে সেদিন ইয়াহিয়াকে পরাজিত করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির মধ্য দিয়ে সরকার গঠন করে, সশস্ত্র পথে হানাদার তাড়ানোর যুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর কূটনীতির কাছে হেরে যায় পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ। বিজয়ী হন বঙ্গবন্ধু, রূপান্তরিত হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান থেকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ। বাংলার অনেক সূর্য সন্তান হয়তো বাঙালি জাতির শৃঙ্খল মোচনের স্বপ্ন দেখেছেন। কিন্তু সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপান্তরিত করেছেন ইতিহাসের মহানায়ক, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু। তাই বলা যায় বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু এক ও অভিন্ন, একে অপরের পরিপূরক। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটিকে কল্পনা করা যায় না।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। রেসকোর্সে লাখো জনতার মাঝ থেকে বঙ্গবন্ধু বাসায় পৌঁছেন সন্ধ্যা ৬টায়। দীর্ঘ পথযাত্রা, দীর্ঘ আনুষ্ঠানিকতা, জনসভা, আবেগ-উচ্ছ¡াস-কান্না বিনিময়ের পর ১১ জানুয়ারি থেকে বঙ্গবন্ধু সব ক্লান্তি-ভাবাবেগ উপেক্ষা করে এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে দেশ পরিচালনা শুরু করেন। সেদিনই মন্ত্রিসভার সঙ্গে দু’দফা বৈঠক করেন এবং বৈঠকে সংবিধান প্রণয়নসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

বিজয়ের অর্ধশত বছর পর বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের বীজ রোপণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি বাংলাদেশকে ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন এর সদস্যপদ গ্রহণ করান ১৯৭৩ সালে। ১৯৭৫ সালের ১৪ জুন তিনি বেতবুনিয়ায় ভ‚-উপগ্রহ কেন্দ্র উদ্বোধন করেন। এই রোপিত বীজ থেকে জন্ম নেয়া চারাগাছটির বিকাশ দেখি ১৯৯৬ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনা যখন প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করার পর।

মুক্তিযোদ্ধারা যে জীবনকে তুচ্ছ করে, নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে দেশমাতা ও মাতৃভূমিকে মুক্ত করে, স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয়ের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছিলেন, তা নতুন প্রজন্মকে জানাতে হবে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অর্জন তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় একটি জাতিকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করার জন্য যত ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া দরকার সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। ফলে তারা শ্রমজীবী, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকসহ এ দেশের সূর্যসন্তানদের হত্যা করেছিল। বাঙালি জাতি কিভাবে তাদের পরাজিত করেছিল, তার যথাযথ ইতিহাস নতুন প্রজন্ম, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার দায়িত্ব ও কর্তব্য সবারই। কিন্তু আমরা সেটি কতটুকু করছি, সেই প্রশ্ন আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ হলো বাঙালি জাতির শোষণের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়ার যুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হলো আমাদের বাঙালি জাতির আজন্মলালিত স্বপ্ন, একটি জাতির চেতনার স্বপ্ন। এই স্বপ্ন দোলা দিয়েছে আমাদের মনে, আমাদের স্বপ্নকে অনুপ্রাণিত করেছে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে। সহায়তা করেছে স্বপ্ন বাস্তবায়নে এবং এই স্বপ্নকে বেগবান করেছে এবং এক নতুন আশা ত্বরান্বিত করেছে। যে চেতনা বাঙালি জাতিকে একতাবদ্ধ করেছিল একটি গণতান্ত্রিক ও শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায়। এই চেতনা নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে আমাদের আরো কাজ করতে হবে। নতুন প্রজন্মের চেতনাকে আরো শাণিত করতে হবে।

যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি, কিন্তু শুনেছে গল্পের আকারে তাদের পরিবারের কোনো বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তির কাছে, শিক্ষকের কাছে, কোনো নেতার কাছে, কোনো মুক্তিযোদ্ধার কাছে বা বইতে পড়েছে। সেই শোনা বা পড়া কতটুকু সঠিক বা তার বিস্তৃৃতি কতটুকু, তা আমরা জানি না। একটি উদ্যোগ নিতে পারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরার জন্য আমরা কতটুকু সফল? ইতিহাস বিকৃতি জাতিকে ধ্বংস আর বিভ্রান্তি ছাড়া কিছুই দিতে পারে না।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয়েছে সে বিষয়টি নতুন প্রজন্ম, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা। যা নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করবে। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাসই হবে নতুন প্রজন্মের অনুপ্রেরণার উৎস, এই চেতনাকে শাণিত করতে আমাদের এখনই কাজ শুরু করা উচিত।

শেখ হাসিনার স্বপ্ন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, দেশের মানুষকে উন্নয়নের স্বাদ পাইয়ে দেয়ার লক্ষ্যে কাজ করছেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনা, বঙ্গবন্ধুর অস্তিত্বকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে স্থান দিয়ে যথাযথ মর্যাদার আসনে বসানোই ছিল মূল লক্ষ্য। বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের অঙ্গীকার ছিলো দেশবাসীর অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা ইত্যাদি মৌলিক অধিকার পূরণ করা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশি-বিদেশি নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে উন্নয়ন, অগ্রগতি আর সমৃদ্ধির পথে হাঁটছেন। ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত একটি প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য চারটি ভিত্তি সফলভাবে বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। এগুলো হলো-স্মার্ট সিটিজেন, স্মার্ট ইকোনমি, স্মার্ট গভর্নমেন্ট ও স্মার্ট সোসাইটি। এর পাশাপাশি হাতে নেওয়া হয়েছে ২১০০ সালের বদ্বীপ কেমন হবে- সেই পরিকল্পনা। স্মার্ট বাংলাদেশে সব কাজ, সম্পাদন করা হবে প্রযুক্তির মাধ্যমে। যেখানে প্রত্যেক নাগরিক প্রযুক্তি ব্যবহারে হবে দক্ষ। ২০৪১ সালের স্মার্ট বাংলাদেশ হবে সাশ্রয়ী, টেকসই, বুদ্ধিভিত্তিক, জ্ঞানভিত্তিক এবং উদ্ভাবনী বাংলাদেশ।

আমরা সবসময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ার অঙ্গীকার করি, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের কথা বলি, কিন্তু নতুন প্রজন্মকে বোঝাতে হবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়া কী? বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল একটা দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়া। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় একটি বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা। সবার জন্য অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মুক্তিযোদ্ধাদের চেতনা এসব কোমলমতিদের হৃদয়ে গেঁথে দিতে হবে। এদের হাত ধরেই এ দেশ এক দিন দুর্নীতিমুক্ত, হিংসামুক্ত, বৈষম্যহীন বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে উঠবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক


খাদ্যের অপচয় রোধ করুন

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
শফিকুল ইসলাম

কেউ তিন বেলা খাবার পায় না আবার কেউ পেয়ে অতিরিক্ত খায় আবার কেউ যা খায় তার চেয়ে বেশি করে অপচয়। কেউ ভুগছে খাদ্যের অভাবে আবার কেউ করছে নষ্ট। এমনি করে চলছে সারা বিশ্বে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যে খাবার প্রয়োজন তা নিয়ে হিসাব-নিকাশ। অনেক বিতর্ক হয়েছে, ‘মানুষ খাওয়ার জন্য বাঁচে না কি বাঁচার জন্য খায়’। এমন বিতর্কের শেষে আমরা বুঝতে সচেষ্ট হয়েছি, মানুষ আসলে বাঁচার জন্যই খায়। বাঁচার জন্য খেতে গিয়ে মানুষ কি করছে তারই একটি প্রতিবেদন সম্প্রতি প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। যা দেখে রীতিমতো চমকে যাওয়ার মতো ঘটনা।

সারা বিশ্ব প্রায় সাড়ে ৭০০ কোটি মানুষ যদি হয় আর সেখানে ১০০ কোটি মানুষের খাবার যদি দৈনিক নষ্ট হয় তাহলে অবস্থাটা কি দাঁড়ায়? অনেক দেশ আছে যেখানে খাবারের অভাবে মানুষ অহরহ মারা যাচ্ছে। আর যারা অঢেল পাচ্ছি তারা অবহেলায় অবজ্ঞায় কত খাবার নষ্ট করছি সেদিকে লক্ষ্য নেই। পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতেও প্রতিদিন ১০০ কোটি মানুষের এক বেলার সমান খাবার নষ্ট হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে পাঁচ ভাগের একভাগ খাবার ফেলে দেওয়া হচ্ছে। জাতিসংঘের পরিবেশ সংস্থার (ইউএনইপি) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

খাদ্যের অপচয় নিয়ে ইউএনইপির ফুড ওয়াস্ট ইনডেক্স শীর্ষক সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২২ সালে ১০৫ কোটি টন খাবার নষ্ট হয়েছে, যা বিশ্ববাজারে আসা উৎপাদিত খাদ্যদ্রব্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।

আর ভোক্তাদের প্রায় ১৯ শতাংশ খাবার দোকান, রেস্তোরাঁ ও গৃহস্থালি পর্যায়ে নষ্ট হয়। ফসল তোলার পর থেকে বিক্রি পর্যন্ত সরবরাহ শৃঙ্খলের মধ্যে ১৩ শতাংশ খাবারের অপচয় হয় বলে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য।

খাবার অপচয়ের এই চিত্রকে ‘বৈশ্বিক ট্র্যাজেডি’ হিসেবে ফুড ওয়েস্ট ইনডেক্স শীর্ষক প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, বিশ্বের প্রায় ৭৮ কোটির বেশি মানুষ যখন না খেয়ে আছে, তখন শত কোটি টন খাবার ময়লার ঝুড়িতে ফেলা হচ্ছে।

ইউএনইপির নির্বাহী পরিচালক ইনগার অ্যান্ডারসন এক বিবৃতিতে বলেন, মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খাবার কিনছে বলে এ ধরনের অপচয় হচ্ছে। এ ছাড়া তারা কতটুকু খেতে পারবে, তাও আন্দাজ করতে পারছে না। এতে খাবার উচ্ছিষ্ট থেকে যাচ্ছে।

এ ধরনের ঘটনাকে ‘পরিবেশগত ব্যর্থতা’ হিসেবে তুলে ধরে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ধরনের অপচয়ের ঘটনা নৈতিক নয়। উড়োজাহাজ চলাচল থেকে নিঃসরিত কার্বন যতটা না বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়াচ্ছে, তার থেকে পাঁচগুণ উষ্ণতা বাড়াচ্ছে খাদ্যবর্জ্য।

এখন পর্যন্ত বিশ্বে খাবারের অপচয় নিয়ে জাতিসংঘের সংকলিত দ্বিতীয় প্রতিবেদন এটি। প্রতিবেদনটি তৈরিতে জাতিসংঘকে সহযোগিতা করেছে অলাভজনক সংস্থা ডব্লিউআরএপি। খাবার অপচয় নিয়ে এটি এ পর্যন্ত সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ চিত্র উপস্থাপন করেছে।

ডব্লিউআরএপির কর্মকর্তা রিচার্ড সোয়ানেল বলেন, এই চিত্র দেখে আমি হতভম্ব। বিশ্বে এক বেলায় যত খাবার নষ্ট হয়, শুধু তা দিয়েই অনাহারে থাকা প্রায় ৮০ কোটি মানুষকে প্রতি বছর খাওয়ানো সম্ভব।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২ সালে যত খাবার নষ্ট হয়েছে, তার ২৮ শতাংশ নষ্ট হয়েছে রেস্তোরাঁ, ক্যান্টিন ও হোটেলের মতো খাদ্য পরিষেবা ব্যবস্থাগুলোতে। কসাই ও মুদিদোকানে নষ্ট হয়েছে ১২ শতাংশ খাবার। তবে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ৬০ শতাংশ খাবার নষ্ট হয়েছে বাসাবাড়িতে। এর পরিমাণ ৬৩ কোটি ১০ লাখ টন।

সোয়ানেল বলেন, এ ধরনের অপচয় হওয়ার বড় কারণ, মানুষ তাদের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খাবার কিনছে। এ ছাড়া তারা কতটুকু খেতে পারবে তার আন্দাজ করতে পারছে না। এতে খাবার উচ্ছিষ্ট থেকে যাচ্ছে।

সোয়ানেল বলেন, আরেকটি বিষয় হলো-মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ। উৎপাদিত খাবার নষ্ট হচ্ছে কারণ, মানুষ ভুলবশত ধারণা করে যে তাদের খাবারের মেয়াদ নেই।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, উন্নয়নশীল বিশ্বে প্রচুর খাদ্য অযথাই অপচয় হয়নি; বরং এগুলো পরিবহনের সময় কিংবা রেফ্রিজারেটরের অভাবে নষ্ট হয়েছে।


ঈদযাত্রায় স্বাস্থ্য সতর্কতা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ

রহমতের মাস মাহে রমজানের পর কড়া নাড়ছে মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর, প্রতি বছর এক অনন্য-বৈভব বিলাতে নিয়ে আসে খুশির বার্তা। ঈদ মানে আনন্দের জোয়ার। ঈদ মানে খুশির সঞ্চার। সুদীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর রমজানের শেষ দিনে আকাশের এক কোণে বাঁকা চাঁদের মিষ্টি হাসি জানান দিয়ে ঈদের আগমন, আনন্দে সবাই গেয়ে ওঠে কাজী নজরুল ইসলামের সেই অমর সংগীত, ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ। তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন? আসমানি তাগিদ’। সব মুসলমান এদিন ফিরনি-সেমাইসহ হরেক রকমের মুখরোচক খাবারের সঙ্গে সঙ্গে নতুন জামা-কাপড় পরিধান, ঈদগাহে নামাজ পড়া আর কোলাকুলি সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হন।

সবাই চায় এই সময়টাতে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে, আর তাই ইতোমধ্যে ঈদকে ঘিরে নাড়ির টানে বাড়ি ছুটবেন সবাই। রাস্তায় দেখা যাবে ঘরমুখো মানুষের ঢল। তবে ঈদ ভ্রমণে স্বাস্থ্যঝুঁকির খুঁটিনাটি জানা থাকলে ভ্রমণটি হতে পারে আরও আনন্দময়। যাত্রাপথে, বিশেষ করে যারা দূরদূরান্তে যান, তাদের রাস্তাঘাটে পোহাতে হয় হাজারও দুর্ভোগ আর বিড়ম্বনা। তারপরও বাসায় ফেরার আনন্দে মন থাকে মাতোয়ারা। তাই কষ্টগুলো আর বড় হয়ে ওঠে না। এই সময়টাতে অনেককেই ভ্রমণ করতে হয় বাস, ট্রেন অথবা লঞ্চে। রাস্তায় যানজট, ফেরি স্বল্পতা ও পারাপারের সংকট, লঞ্চ-স্টিমারে গাদাগাদি ঠাসাঠাসি। প্রচণ্ড ভিড় আর ঠেলাঠেলি করে ক্লান্তিকর ও দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে বাড়ি পৌঁছাতে হয়, আবার ছুটি শেষে কাজে যোগদান করতে হয়। সবাই চায় নির্বিঘ্নে আর নিরাপদে ঘরে ফিরতে। তবে যাওয়া-আসার ঝক্কিতে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। শিশু, বয়স্ক এবং রোগীদের পক্ষে লম্বা যাত্রাপথের ধকল সহ্য করা খুব কঠিন হয় বৈকি। তাই যাত্রাপথে কিছু সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। অন্যথায় ঈদের আনন্দ আগেভাগেই মাটি হয়ে যেতে পারে। তাই ঈদ ভ্রমণে অসুস্থ হয়ে পড়াটা কোনোক্রমেই কাম্য নয়।

ভ্রমণের জন্য ব্যাগ গোছানো: গোছগাছের ব্যাপারটির সঙ্গে কোথায় যাওয়া হচ্ছে এবং কতদিন থাকতে হবে তা জড়িত। অবশ্যই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রসহ এমনকি ছোট বাচ্চা বা বয়স্কদের জন্য যা যা দরকার, তা সঙ্গে রাখা উচিত। যতটা সম্ভব অপ্রয়োজনীয় জিনিস বাদ দেওয়া ভালো।

পরিধেয় পোশাক : এখন গরমের সময়। তাই ভ্রমণের সময় হালকা, আরামদায়ক ও সহজে বাতাস চলাচল করতে পারে এমন পোশাক পরা উচিত। টাইট কাপড়-চোপড় পরিহার করাই ভালো। এতে ভ্রমণ হয়ে উঠবে আরামদায়ক। নরম জুতা বা স্যান্ডেল পরা উচিত। আবার একেবারে নতুন জুতো পরে কোথাও রওনা হবেন না, এতে পায়ে ফোসকা পড়তে পারে। মেয়েদের জন্য হাইহিল পরিহার করে ফ্ল্যাট পরা উচিত।

যানবাহনে সতর্কতা: জানালা দিয়ে মাথা বা হাত বের করে রাখবেন না। অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে বাস, ট্রেন বা লঞ্চে ভ্রমণ থেকে বিরত থাকুন। বাস বা ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ করা খুবই বিপজ্জনক, তাই ছাদে ভ্রমণ থেকে বিরত থাকুন।

খাবার নিয়ে সতর্কতা: বাইরের খাবার এবং পানীয় কোনোভাবেই গ্রহণ করা ঠিক হবে না। ঘরের তৈরি খাবার ও পানির বোতল সঙ্গে নেওয়া উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী বিশুদ্ধ পানি পান করুন এবং বাচ্চাদেরও পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করাবেন। ভ্রমণে খাদ্য ও পানিবাহিত রোগ-প্রতিরোধের ব্যাপারে সচেষ্ট থাকতে হবে বেশি।

রোজা অবস্থায় ভ্রমণ: যে কেউ রোজা রেখে রওনা হলে অতিরিক্ত সতর্কতা হিসেবে খাবার এবং প্রয়োজনীয় পানীয় সঙ্গে রাখুন, যেন ইফতারের সময় বাইরের খাবার খেতে না হয়।

প্রয়োজনীয় ওষুধ ও ফাস্ট এইড বক্স: ঈদের সময় জরুরি ও প্রয়োজনীয় ওষুধপত্রসহ ফাস্ট এইড বক্স নেওয়া উচিত। কারণ কোনো কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেক সময় ওষুধ পাওয়া যায় না। জ্বর, মাথা বা শরীর ব্যথার জন্য প্যারাসিটামল, পেটের পীড়ার জন্য মেট্রোনিডাজল, পেটে গ্যাস, পেটফাঁপা, বুক জ্বলার জন্য এন্টাসিড, ল্যান্সোপ্রাজল বা ওমিপ্রাজল, সাধারণ সর্দি-কাশির জন্য এন্টি-হিস্টামিন, ডায়রিয়ার জন্য ওরাল স্যালাইন ইত্যাদি সঙ্গে রাখুন। এ ছাড়া তুলা, গজ, ব্যান্ডেজ, স্যাভলন ইত্যাদি সংগ্রহে রাখুন। হাত কেটে গেলে কিংবা শিশুরা খেলতে গিয়ে শরীরের কোনো অংশ কেটে গেলে এগুলোই সহায়ক হবে। নোটবুকে আপনার পরিচিত চিকিৎসক ও হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ফোন নম্বর ও ঠিকানা লিখে রাখলে ভালো হয়।

জরুরি প্রয়োজনে: পরিচিত ডাক্তার এবং পুলিশের ফোন নাম্বার সঙ্গে রাখুন। অসুস্থ বা কোনো বিপদে পড়লে যেন সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের পরামর্শ ও বিপদের সময় পুলিশের সাহায্য নিতে পারেন। পুলিশের সাহায্য নিতে যেকোনো জায়গা থেকে ৯৯৯-এ ফোন করবেন।

যারা দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভুগছেন: যারা বিভিন্ন রোগে ভোগেন, যেমন- ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, হৃদরোগ, বাতরোগ, অ্যাজমা বা অ্যালার্জি, তারা অবশ্যই ঈদ ভ্রমণে প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে নিতে ভুলবেন না। ইনহেলার, ইনসুলিন ইত্যাদিও সঙ্গে রাখবেন। ডায়াবেটিস রোগীরা লজেন্স, সুগার কিউব সঙ্গে নেবেন। প্লেনে ভ্রমণ করলে ঘন ঘন পা ম্যাসাজ করতে হবে, না হলে পায়ে রক্ত জমাট বেঁধে ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস হতে পারে। তারা পায়ে রক্তজমা প্রতিরোধকারী মোজা পরতে পারেন। যাদের ওজন বেশি তারাও এ কাজটি করতে পারেন।

মোশন সিকনেস: অনেকেরই বাসে বা যানবাহনে উঠলে মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব এমনকি বমি হয়, যাকে বলে ভ্রমণজনিত মোশন সিকনেস। এ সমস্যা প্রতিরোধে স্টিমেটিল বা ভার্গন ট্যাবলেট ভ্রমণের আধা ঘণ্টা আগে খেয়ে নেবেন। এ ছাড়া বাস বা ট্রেন চলাকালে বাইরের দিকে তাকিয়ে না থেকে চোখ বন্ধ রাখুন, ঘুমিয়েও নিতে পারেন। যাত্রাপথে অনেকে বই পড়ে সময় কাটান। এই অভ্যাসটা ভালো; কিন্তু যারা মোশন সিকনেসে ভোগেন, তারা ভ্রমণের সময় বই পড়া পরিহার করুন। কারণ যানবাহনের দুলনির সঙ্গে সঙ্গে বই পড়ার ফলে মাথা ঘোরা শুরু হতে পারে, পরে বমিও হতে পারে। তাই সতর্ক হতে হবে।

শিশুদের নিয়ে বাড়তি সতর্কতা: ট্রেনে, বাসে কিংবা লঞ্চে ভ্রমণের সময়ে শিশুরা সব সময়েই জানালার ধারের সিটটি পছন্দ করে। এ কারণে হঠাৎ করে অতিরিক্ত বাতাসের মুখোমুখি হয়। ফলে শিশুরা অনেকে ঠিক ভ্রমণের পর পরই আক্রান্ত হয় সর্দি-জ্বর কিংবা সাধারণ কাশিতে। এ ছাড়া বাইরের পানীয় এবং খাবার খেয়ে বমি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়। তাই তারা যাতে যাত্রাপথে বাইরের খাবার না খায়, সে ব্যাপারে সজাগ থাকুন। একেবারে ছোট দুগ্ধপোষ্য শিশু নিয়ে ভ্রমণ না করাই উচিত। প্রয়োজনে বের হতে হলে তাদের জন্য পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা করে নিতে হবে। চলার পথে শিশুকে অবশ্যই ধরে রাখবেন, ট্রেন, বাস বা লঞ্চ থেকে নিচে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও কিন্তু উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। খেয়াল রাখবেন কোনো বাচ্চা যেন জানালা দিয়ে হাত বাইরে না রাখে।

বয়স্কদের সতর্কতা: দীর্ঘ ভ্রমণ বয়স্কদের জন্য বেশি কষ্টসাধ্য। বিভিন্ন রোগসহ অনেকেই বাতজ্বর বা আরথ্রাইটিসে ভোগেন। তাদের জন্য বাসে বা ট্রেনে ওঠাও সহজ নয়, সে সময় তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। যাত্রাপথে যেন তারা একই ভঙ্গিতে বেশিক্ষণ বসে না থাকে এবং মাঝেমধ্যে যানবাহনের মধ্যেই যেন কিছুক্ষণ চলাফেরা করেন, সে ব্যাপারে খেয়াল রাখুন। তা না হলে বাতের ব্যথা বাড়তে পারে, এমনকি পায়ে পানি জমে পা ফুলেও যেতে পারে।

গর্ভাবস্থায় ভ্রমণে করণীয়: গর্ভবতী মহিলারা অতিরিক্ত ঝাঁকি হয় এমন পথে ভ্রমণ যথাসম্ভব পরিহার করুন। প্রথম তিন মাস ও সম্ভাব্য ডেলিভারির দুই তিন মাস আগে ভ্রমণ এড়িয়ে চলাই ভালো। যাদের ইতোপূর্বে গর্ভপাতের ইতিহাস আছে তাদের গর্ভাবস্থায় ভ্রমণ করা উচিত নয়। বিশেষ করে শেষ তিন মাস যেকোনো গর্ভবতীর ভ্রমণ নিষেধ। গর্ভাবস্থায় একা ভ্রমণ না করা উচিত। নিরাপদ মাতৃত্বের স্বার্থে কোনো ধরনের বিপদের ঝুঁকি নেওয়া উচিত হবে না।

অজ্ঞান পার্টি থেকে সাবধান: যাত্রাপথে মলম পার্টি ও ছিনতাইকারীদের আনাগোনা বেশি থাকে তাই সতর্ক থাকুন। যানবাহনে অপরিচিত কেউ খাদ্য বা পানীয় দিলে খাবেন না। কারণ প্রায়ই শোনা যায়, এ ধরনের খাবার খেয়ে অনেকেই বড় দুর্ঘটনায় পড়েছেন। কাজেই এই বিপদ এড়াতে সচেতন থাকবেন।

বাড়তি সতর্কতা: ঈদে ঘরমুখো মানুষ বাড়ি যাওয়ার জন্য খুবই ব্যস্ত হয়ে পড়েন। বাস, ট্রেন ও লঞ্চের ছাদে চড়ে ঝুঁকিপূর্ণ সফর করেন, এতে অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ-আপদের শিকার হন। অন্য সময়ের চেয়ে ঈদের সময় সড়ক দুর্ঘটনার পরিমাণ বাড়ে। এ জন্য সফরে সতর্ক ও সাবধান থাকতে হবে, কোনোভাবেই অসতর্কভাবে চলাফেরা করা যাবে না। যে কদিন গ্রামে থাকবেন, অযথা অপ্রয়োজনে রোদে এবং অন্য কোথাও বেশি ঘোরাফেরা করবেন না। এ সময় সাপে কামড়ের রোগীরও প্রচুর খবর পাওয়া যায়। বাচ্চাদের দিকে বেশি নজর রাখবেন যেন পুকুর, নদী বা জলাশয়ের পানিতে বাচ্চারা একা একা না নামে।

মনে রাখবেন ঈদের আনন্দ যেন দুঃখ বয়ে না আনে, ঈদযাত্রা যেন পরিণত না হয় বিষাদময়, সেদিকেও সবাইকে মনোযোগ দিতে হবে, যত্নবান ও সতর্ক থাকতে হবে।

লেখক: প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক


কক্সবাজারের পর্যটন সম্ভাবনা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
কর্ণেল মাসুদ পারভেজ চৌধুরী, পিএসসি

বর্তমান পৃথিবীতে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম হাতিয়ার পর্যটন। পর্যটন শিল্প বহুদেশেরই অর্থনৈতিক চিত্র পাল্টে দিয়েছে, এমনকি বিভিন্ন দেশের মূল অর্থনৈতিক চালিকা শক্তিই এই পর্যটন। বহিঃবিশ্বের মতো বাংলাদেশও তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পর্যটনকে ঘিরে বহু পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। প্রাকৃতিক রূপবৈচিত্র ও একক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হওয়ায় পর্যটন বিকাশে বাংলাদেশের রয়েছে অপার সম্ভাবনা। যার মধ্যে আশার হাতছানি দিচ্ছে কক্সবাজার। কক্সবাজার, বাংলাদেশের মানচিত্রে দক্ষিন-পূর্বাঞ্চলের একটি অপার সম্ভাবনাময়ী জেলা। চট্টগ্রাম বিভাগের এই জেলাকে দেশের একটি মৎস ও অন্যতম পর্যটন শহরও বলা হয়। পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক বালুময় সমুদ্র সৈকত এই কক্সবাজারে অবস্থিত, যা ১২০ কি.মি. পর্যন্ত বিস্তৃত। সৈকতের পাশাপাশি বন-উপবন, খাল-নদী, ঝিরি-ঝরনা, বন্য প্রাণী ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যে ভরপুর এ জেলা একসময় পালঙ্কি বা প্যানোয়া নামে পরিচিত ছিল। মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এই কক্সবাজারে রয়েছে সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশনও। সৈকতের তীরে বেসরকারী হোটেল-মোটেল ছাড়াও রয়েছে পর্যটন মোটেল, সম্প্রতি গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি পাঁচ তারকা মানের হোটেলও। এক কথায় বলা চলে দেশের সবচেয়ে আকর্ষিক পর্যটন স্পট এখন এই কক্সবাজারে। নৈসর্গিক সৌন্দর্যের ছোঁয়া পেতে তাই সময় পেলেই দেশি-বিদেশি পর্যটকরা ছুটে আসেন কক্সবাজারে। বিশ্ব যখন ভ্রমণকে আলিঙ্গন করতে শুরু করেছে, তখন কক্সবাজার পর্যটকদের জন্য একটি উপযুক্ত স্পট হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।

কক্সবাজার সৈকতে গেলে দেখা যায় এক অপরুপ মনোরম দৃশ্য। আনন্দ উল্লাসে মুখরিত সাগর তীর। ইনানি পাথরের সৈকত, মহেশখালী আদিনাথ মন্দির, হিমছড়ি ঝরনা, ডুলহাজারা সাফারিপার্কসহ জেলার পর্যটন স্পটগুলোতে বছরজুড়ে লেগেই থাকে পর্যটকদের ভিড়। এই কক্সবাজারের পর্যটন শিল্প বিকাশের লক্ষ্যে সরকার ইতোমধ্যে বেশকিছু মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যার অধিকাংশই বাস্তবায়ন হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্বাবধানে ‘মেরিন ড্রাইভ সড়ক’ প্রকল্প, কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উন্নীত করার কাজ, মহেশখালী টু্রিজম পার্ক প্রকল্প, টেকনাফের সাবরাং এলাকায় ১২০০ একর জমিতে বিশেষ পর্যটন অঞ্চল প্রকল্প, কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীতকরণ, এবিসি সড়ক সম্প্রসারণ, কক্সবাজারের বাঁকখালী নদীর কস্তুরাঘাটে ব্রীজ প্রকল্প, দোহাজারী-ঘুমধুম-কক্সবাজার রেল লাইন নির্মাণ প্রকল্প, কক্সবাজারে পর্যটনের উন্নয়নে পর্যটন কর্পোরেশনের মালিকাধীন মোটেল শৈবালের ১২৫ একর জমিতে আর্ন্তজাতিক মানের পর্যটন জোন বাস্তবায়ন, একই সঙ্গে মোটেল প্রবালের ৬ একর জমিতে পর্যটন বিষয়ক একটি ইনষ্টিটিউট তৈরী করার পরিকল্পনা। সবগুলো প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে কক্সবাজার হবে একটি আদর্শ পর্যটন শহর এবং যা দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখবে। আর এ লক্ষ্যে গঠন করা হয়েছে ‘কক্সবাজার উন্নয়ন কতৃপক্ষ’। পর্যটকদের সার্বিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করারা জন্য বাংলাদেশ সরকার গঠন করেছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। পর্যটনকে বিকশিত করার সব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এখন সময়মাত্র। দ্রুত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হবে এবং প্রচুর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এই কক্সবাজারে। যা বেকারত্ব হ্রাসে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে।

কক্সবাজার হলো অবিরাম প্রবাল সমুদ্র সৈকতের অনন্য সৃষ্টি, বঙ্গোপসাগর দ্বারা আচ্ছন্ন সোনালী বালির অবিরাম প্রসারিত এই সৈকত স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক উভয় পর্যটকদের আকৃষ্ট করে, শহুরে জীবনের তাড়াহুড়ো থেকে প্রশান্তি দেয়। যেখানে মন্ত্রমুগ্ধ সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের দৃশ্যগুলি যাদুকরের যাদুর চেয়ে থেকে কম নয়। সৈকতটি সার্ফিং, জেট-স্কিইং এবং প্যারাসেইলিং সহ বিভিন্ন জল ক্রীড়ার জন্য উপযুক্ত স্থান।

কক্সবাজারের দর্শনীয় স্থানসমূহের মধ্যে ঐতিহাসিক বদর মোকাম মসজিদ, ঝাউবীথি, প্যারাবন, বার্মিজ মার্কেট, শুঁটকির আড়ৎ নাজিরারটেক, রাডার স্টেশন, হিলটপ সার্কিট হাউস, লাইট হাউস, অমেধা ক্যাং, জাদি, রাখাইন পল্লী, মোঘল আমলের প্রাচীন মসজিদ, মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র, রাবার ড্যাম, ইন্টারন্যাশনাল এমিউজমেন্ট পার্ক, শিশু পার্ক (চলমান), আন্তর্জাতিক ফুটবল কমপ্লেক্স (চলমান), বাগদা চিংড়ি পোনা উৎপাদনকারী হ্যাচারী, দরিয়ানগর পর্যটন কেন্দ্র, হিমছড়ি, ঝর্ণা, ইনানী, গাজীর টেক, পাটোয়ার টেক, বাহারছড়া, পাহাড় ও সমুদ্র, কক্সবাজার-টেকনাফ দীর্ঘতম মেরিন ড্রাইভ, শাহপরীর গার্ডেন, ঘুমধুম কুমীর চাষ প্রকল্প, টেকনাফ গেম রিজার্ভ বা ন্যাচার পার্ক, খুরুস্কুল স্মার্ট সিটি, থিম পার্ক, ইকো রিসোর্ট, চৌফলদন্ডী রিভাররেইন ট্যুরিজম, কউকের দৃষ্টি নন্দন পুকুর, দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন, লামারপাড়া ক্যাং, রামু রামকোর্ট বৌদ্ধ মন্দির, তীর্থ ধাম, আইসোলেটেড নারিকেল বাগান, বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনাকেন্দ্র, রামু রাবার বাগান, রামু চা-বাগান, দেশের একমাত্র পাহাড় বিশিষ্ট দ্বীপ মহেশখালী আদিনাথ শিব মন্দির, বৌদ্ধ মন্দির, মহেশখালীতে দেশের বিখ্যাত পানের বরজ, দেশে ৯০ ভাগ রপ্তানিকারক লবণের ফ্যাক্টরি, চিংড়ি চাষ প্রকল্প, বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক, খুটাখালী মেদাকচ্ছপিয়া ন্যাশনাল পার্ক, মগনামা ঘাট, দেশের একমাত্র বায়ু বিদ্যুৎ কেন্দ্র, বাতি ঘর, মালেক শাহের দরবার শরীফ, সোনাদিয়া দ্বীপ, কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র, হেলিকপ্টারে জয় রাইড, প্যারাসাইলিং রাইড ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

ইতোমধ্যে কক্সবাজারের পর্যটন বিকাশ এবং গভীর সমুদ্র বন্দরভিত্তিক বাণিজ্যের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ সারাদেশের সঙ্গে রেল যোগাযোগও গড়ে তোলা হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা কক্সবাজারের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তনে এসেছে রেল যোগাযোগের মাধ্যমে। এতে পর্যটন শিল্পে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি কক্সবাজারকে সিঙ্গাপুর, হংকংসহ দ্বীপভিত্তিক অর্থনৈতিক হাবের আদলে গড়ে তোলার জন্য সরকার মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।

শুধু যোগাযোগ অবকাঠামো নয়, দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে বিশ্বের বৃহত্তম উপসাগর- কক্সবাজার জেলার মাতারবাড়ী-মহেশখালীতে একটি গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ করা হচ্ছে। জাপানের অর্থনীতি ও সৌন্দর্যে ব্যাপক ভূমিকা রাখা কাশিমা বন্দরের আদলে নির্মিত মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দরটি বাংলাদেশের প্রধান আমদানি কারক চীনসহ বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনৈতিক জোট আসিয়ানের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্যের নতুন নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠবে।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই সমুদ্র নগরীতে প্রতি বছর ৬০-৭০ লাখ পর্যটক কক্সবাজারে বেড়াতে গেলেও বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা খুবই কম। এদেশে বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে ইতিমধ্যে সাবরাং, নাফ ও সোনাদিয়ায় ইকো ট্যুরিজম করা হচ্ছে। টেকনাফের সাবরাং, নাফ ও মহেশখালীর সোনাদিয়া দ্বীপ সাজানো হচ্ছে। ১৯৬২ সালে যখন কাশিমা বন্দর নির্মাণ শুরু হয়, তখন এলাকাটি ছিল ধানক্ষেত। বন্দর নির্মাণের পর এটি ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত হয়। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরও এ ধরনের বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সাবরাং ট্যুরিজম পার্কে থাকবে পাঁচ তারকা হোটেল, ইকো-ট্যুরিজম, মেরিন অ্যাকোয়ারিয়াম ও সি-ক্রুজ, বিদেশি পর্যটকদের জন্য বিশেষ সংরক্ষিত এলাকা, সেন্ট মার্টিনে যাতায়াতের বিশেষ ব্যবস্থা, ভাসমান জেটি, শিশু পার্ক, ইকো-কটেজ, সাগরমণ্ডল, পানির নিচে। রেস্তোরাঁ, ভাসমান রেস্তোরাঁ, ইত্যাদি বিনোদনের বিভিন্ন সুবিধা। এছাড়া টেকনাফ শহরের কাছে নাফ নদীর মোহনায় জালিয়ার দ্বীপকে ঘিরে নাফ ট্যুরিজম পার্ক স্থাপনের কাজ চলছে। মূলত বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে এই পার্কে ইকো কটেজ, লাইফ এন্টারটেইনমেন্ট থিয়েটার, মেগা শপিং মল, সিনেমা হল, গলফ ক্লাব, মালদ্বীপ, থাইল্যান্ডের মতো ওয়াটার স্পোর্টস বিচসহ নানা আয়োজন থাকবে।

কক্সবাজারে মেরিন ড্রাইভ সড়কের কাজ শেষ হয়েছে, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও রেললাইন প্রকল্পের কাজ শেষ। গভীর সমুদ্রবন্দর, এলএনজি টার্মিনাল, অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ তিন লাখ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের কাজ চলছে। এই প্রকল্পগুলো সম্পন্ন হলে আগামী ৫-৬ বছরের মধ্যে এই অঞ্চলটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হবে।

সারাদেশে যোগাযোগব্যবস্থা ও অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি সরকার দেশের আভ্যন্তরীন পর্যটন বিকাশে যেসব মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে তার অনন্য উদাহরণ কক্সবাজার। কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পে নতুন করে যে কটি প্রকল্প আশার প্রদীপ হিসেবে ধরা হয় এর মধ্যে অন্যতম ‘সাবরাং ট্যুরিজম অর্থনৈতিক অঞ্চল’। ২০১৬ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টেকনাফ সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক উন্নয়নকাজ উদ্বোধন করেন। টেকনাফের অর্থনৈতিক অঞ্চল সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক জোনে ১ হাজার ১৬৫ একর জমি রয়েছে। সুদীর্ঘ বালুকাময় সৈকত আর সাগর-পাহাড়ের অপূর্ব মিলন আর বৈচিত্র্যময় দৃশ্য এ স্থানকে পরিণত করেছে সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা সাবরাং ট্যুরিজম পার্কটি বিনোদনপ্রেমীদের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের পর্যটন খাতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। এটি বাস্তবায়ন হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৭০ হাজার লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছে বাস্তবায়ন সংস্থা বেজা কর্তৃপক্ষ। সাবরাং ট্যুরিজম পার্কটিতে পাঁচতারকা হোটেল, ইকো ট্যুরিজম, মেরিন অ্যাকুয়ারিয়াম, বিদেশি পর্যটকদের জন্য বিশেষ সংরক্ষিত এলাকা, সেন্টমার্টিনে ভ্রমণের বিশেষ ব্যবস্থা, ভাসমান জেটি, শিশুপার্ক, ইকো কটেজ, ওশানেরিয়াম, আন্ডার ওয়াটার রেস্টুরেন্ট, ভাসমান রেস্টুরেন্টসহ নানা বিনোদনের সুবিধা রাখা হবে। এছাড়া টেকনাফে নাফ ট্যুরিজম পার্ক ও মহেশখালী উপজেলায় সোনাদিয়া ইকো ট্যুরিজম পার্ক গড়ে তোলার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।

এর অত্যাশ্চর্য প্রাকৃতিক দৃশ্যের বাইরে, কক্সবাজার একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আবাসস্থল। এলাকাটিতে বিভিন্ন জাতিগত সম্প্রদায়ের লোকজন বসবাস করে এবং এরা এ অঞ্চলের অনন্য সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও অবদান রাখে। ইকো টুরিজমের ফলে পর্যটকদের স্থানীয় গ্রামগুলি অন্বেষণ করার, বন্ধুত্বপূর্ণ স্থানীয়দের সাথে যোগাযোগ করার এবং ঐতিহ্যগত রীতিনীতি এবং আচার-অনুষ্ঠানগুলি অনুভব করার সুযোগ রয়েছে। প্রাণবন্ত বাজার এবং রঙিন উৎসব কক্সবাজারের মানুষের জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য ঐতিহ্য বহন করে।

কক্সবাজার শুধু রোদ আর বালি নয়; এটি পরিবেশ-সচেতন ভ্রমণকারীদের জন্য একটি আশ্রয়স্থল। হিমছড়ি জাতীয় উদ্যান, কক্সবাজারের কাছে অবস্থিত, লীলাভূমি, বৈচিত্র্যময় বন্যপ্রাণী এবং হাইকিং ট্রেইলগুলি অন্বেষণ করার সুযোগ রয়েছে ভ্রমনপিপাসুদের জন্য। পার্কগুলো হাতি, চিতাবাঘ এবং অসংখ্য প্রজাতির পাখি সহ বিভিন্ন প্রজাতির জন্য একটি অভয়ারণ্য। ইকোট্যুরিজম জড়িত হওয়ায় এই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণকে আরো উৎসাহিত করে এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই ভবিষ্যত নিশ্চিত করে।

কক্সবাজারে ইকোট্যুরিজমের ব্যাপক প্রসারে পরিবেশবান্ধব আবাসন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার, পর্যটনভিত্তিক স্থানীয় বিভিন্ন ব্যবসায়ী উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। পর্যটকদের কাছে স্থানীয় সংস্কৃতি তুলে ধরতে সেখানকার হোটলেগুলোতে বৈচিত্রপূর্ন খাবারের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। সেখানকার অধিবাসীদের হাতে উৎপাদিত ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প, গহনার প্রদর্শনীর আয়োজন করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে স্থানীয় লোকজনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, আয়ের উৎস তৈরি হবে। কমিউনিটি হোম স্টে’র উদ্যোগ স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করবে, যা ইকোট্যুরিজমের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করবে।

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে তাদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারলে টেকসই পর্যটন উন্নয়নের লক্ষ্য বাস্তবায়ন সম্ভব।

কক্সবাজারকে একটি সুপরিকল্পিত পর্যটন শহর হিসাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২০১৬ সালে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠিত হয়। কক্সবাজারের অন্তর্গত সেন্টমার্টিন দ্বীপ প্রতিবেশগতভাবে সংবেদনশীল ও সংকটপূর্ণ এলাকা হওয়ায় ২০২৩ সালের মে মাসে সরকার এ দ্বীপ রক্ষার্থে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর আওতায় দ্বীপের জমি, ভূমি উন্নয়ন ও অবকাঠামো (যেমন: রেস্টহাউজ, ডরমিটরি, হোস্টেল) নির্মাণ, পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য, পর্যটনসংক্রান্ত বিষয় এবং পরিবহণ ব্যবস্থাপনায় মুখ্য ও সহযোগী বাস্তবায়নকারী সংস্থা বিনির্দেশপূর্বক একটি নির্দেশিকা জারি করেছে। তবে ইকোট্যুরিজম বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রচার-প্রচারণা না থাকায় এখনো যথেষ্ট জনসচেতনতা গড়ে ওঠেনি। ইকোট্যুরিজমের উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে টাস্কফোর্স গঠনের মাধ্যমে সমন্বিত প্রচেষ্টা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

তবে, সমুদ্র ও পাহাড়বেষ্টিত কক্সবাজারকে একটি টেকসই ও আধুনিক পর্যটন নগরী হিসাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

ইতিমধ্যে সরকারের অন্তর্ভূক্তিমূলক প্রকল্পের আওতায় কক্সবাজারে পৌঁছে গেছে রেল। যার ফলে কক্সবাজারের সাথে সারাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। এ শেষ গন্তব্যস্থল কক্সবাজার রেলস্টেশনে আবাসনসহ আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত লকার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর ফলে সেখানে বেড়াতে যাওয়া রেল যাত্রীরা তাদের লাগেজ নিরাপদে রাখতে পারবেন এবং কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত, হিমছড়ি সমুদ্রসৈকত ও বন্যপ্রাণী পার্ক, ইনানী সমুদ্রসৈকত, মহেশখালী এবং সোনাদিয়া দ্বীপে নির্বিঘ্নে সময় কাটাতে পারবেন। রেল লাইন সম্প্রসারনের ফলে ভ্রমণ তুলনামূলক আরামপ্রদ, ব্যয়সাশ্রয়ী, নিরাপদ হওয়ায় এ নগরীতে পর্যটকদের পদচারণা বৃদ্ধি পাবে বলেও আশা করা হচ্ছে।

পর্যটন খাত ছাড়াও কক্সবাজারের নানাবিধ অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে রেল যোগাযোগব্যবস্থার ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। যেমন: লবণ, কৃষিপণ্য, মৎস্য ও শুঁটকি, স্থানীয় পরিবহণ, নির্মাণ ও আবাসন খাতে ব্যাপক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।

রেলওয়ে জানায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের আন্তঃনগর ট্রেন চট্টলা এক্সপ্রেসের অবমুক্ত করা রেক দিয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে চালানো হচ্ছে ট্রেন। আর ঢাকা-কক্সবাজারে চলাচলকারী ট্রেনগুলোতে যুক্ত করা হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আনা নতুন কোচ।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বর্তমানে পর্যটন খাত পৃথিবীর জিডিপিতে প্রায় ১১ শতাংশ অবদান রাখে। বিশ্বব্যাপী ২০১৯ সালে পর্যটকের সংখ্যা ছিল প্রায় ১.৫ বিলিয়ন। ওয়ার্ল্ড ট্যুরিজম ওরগানাইজেশন ধারণা করেছিল পরবর্তী প্রত্যেক বছর আরো ৪ থেকে ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। ১৯৫০ সালে পৃথিবীতে পর্যটকের সংখ্যা ছিল মাত্র ২৫ মিলিয়ন যা ২০১৯ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪৩৫ মিলিয়নে।

ধারণা করা হচ্ছে, বিগত ৭০ বছরে পর্যটকের সংখ্যা প্রায় ৫০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি ব্যাপকতা লাভ করেছে। পর্যটনের মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধিত হয়ে বর্তমানে পৃথিবীর চারটি কর্মসংস্থানের মধ্যে একটি কর্মসংস্থান তৈরি হয় পর্যটন খাতে। বর্তমানে বাংলাদেশের পর্যটন খাতে আয় প্রায় ৭৬ দশমিক ১৯ মিলিয়ন ডলার। ভারত আয় করেছে ১০ হাজার ৭২৯ মিলিয়ন ডলার, মালদ্বীপ ৮০২ মিলিয়ন ডলার, শ্রীলঙ্কায় ৩৮৫ মিলিয়ন ডলার এবং নেপালে ১৯৮ মিলিয়ন ডলার, যা সার্কভুক্ত অন্যান্য দেশের তুলনায় অপ্রতুল।

বিশ্ব পর্যটন সংস্থার প্রাক্কলন অনুযায়ী ২০২২ সাল নাগাদ পর্যটনশিল্প থেকে প্রতিবছর ২ ট্রিলিয়ন ডলার আয় হবে। ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের ৫১টি দেশের পর্যটকেরা বাংলাদেশে ভ্রমণ করবেন, যা মোট জিডিপির ১০ শতাংশ অবদান রাখবে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৪ সালে মোট কর্মসংস্থানের ১ দশমিক ৯ শতাংশ হবে পর্যটনশিল্পের অবদান। পর্যটনশিল্পের অপার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ার রোল মডেল।

ভ্রমণ ও পর্যটন কাউন্সিলের (ডব্লিউটিটিসি) তথ্যানুযায়ী, বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই শিল্পের অবদান ৮ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার। ২০১৯ সালে পর্যটন শিল্প বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ২ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার অবদান রাখে, যা বিশ্ব জিডিপির ১০ দশমিক ৩ শতাংশ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করে ১৫৬ কোটি পর্যটক, অর্থাৎ প্রতি সাতজনের একজন পর্যটক। জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের ফলে সাধারণ মানুষের কাছে ভ্রমণ পিপাসা অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে বিধায় আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে অনন্য অবদান রাখছে। বাংলাদেশে পর্যটন খাতে সরাসরি কর্মরত আছেন প্রায় ১৫ লাখ মানুষ।

এ ছাড়া পরোক্ষভাবে ২৩ লাখ। অর্থাৎ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পর্যটকের সংখ্যা প্রায় ১১০ কোটি। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২২ সাল নাগাদ এ সংখ্যা ২০০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। আর বিপুল সংখ্যক পর্যটকের প্রায় ৭৫ শতাংশ ভ্রমণ করবে এশিয়ার দেশগুলোতে। বাংলাদেশ যদি এ বিশাল বাজারে টিকে থাকতে পারে, তাহলে পর্যটনের হাত ধরেই বদলে যেতে পারে দেশের অর্থনীতির রূপরেখা। বাংলাদেশের গ্রামগুলো হতে পারে পর্যটন আকর্ষণের অপার সম্ভাবনা।

সারাবিশ্বের হিসেব করতে গেলে বাংলাদেশ এখনো পর্যটন শিল্পে অনেক পিছিয়ে আছে। ধারণা করা হয়, বছরে প্রায় ৪ কোটি দেশীয় পর্যটক সারা বাংলাদেশ ঘুরে বেড়ান। সে হিসেবে বাংলাদেশেও ভবিষ্যতে পর্যটকের সংখ্যা ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বৃদ্ধির বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে কক্সবাজরের পর্যটন খাতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, সেন্টমার্টিন দ্বীপ এবং সোনাদিয়া দ্বীপের বাস্তুতন্ত্রের ওপর পর্যটকদের কর্মকাণ্ডের বিরূপ প্রভাবের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৯ সালে সরকার এসব এলাকাকে প্রতিবেশগতভাবে সংকটপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করেছিল। এর প্রেক্ষিতে আমরা যেন নির্বিঘ্নে এ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবলোকন ও উপভোগ করতে পারি, তার জন্য আমাদের অবশ্যই উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র রক্ষার্থে পর্যটন স্থানগুলোর প্রতিবেশগত ধারণক্ষমতা বিবেচনার দাবি রাখে। বর্তমান ভঙ্গুর উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র দীর্ঘস্থায়ীভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এমন কর্মকাণ্ড থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। পর্যটকদের ঘোড়ায় চড়া, সৈকতে খেলাধুলা, অপরিকল্পিত ভ্রমণ, মোটরবাইক চালানো, অসতর্ক ও এলোমেলো গতিতে বোটিং, ডাইভিংয়ের মতো বিনোদনমূলক কার্যকলাপের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে উপকূলীয় মাটি, সমুদ্রসৈকত এবং প্রবাল প্রাচীরের প্রাণীদের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে। এছাড়া অনেক পর্যটক প্রয়োজনীয় সচেতনতার অভাবে তাদের খাবারের উচ্ছিষ্ট এবং পলিথিনের খালি প্যাক যেন-তেনভাবে এদিক-সেদিক নিক্ষেপ করে থাকেন। অসচেতন রেস্টহাউজ, কটেজ, রিসোর্টগুলোও তাদের উৎপাদিত বর্জ্য সরাসরি উপকূলীয় জলাশয়ে ফেলে দেয়।

বিপুলসংখ্যক পর্যটকের আগমনে খাবারের সংস্থানের প্রয়োজনে স্থানীয় সামুদ্রিক মাছের চাহিদা বাড়ে, স্যুভেনির হিসাবে বিক্রির জন্য অতিরিক্ত প্রবাল সংগ্রহীত হয়। বিভিন্ন পর্যটনসংশ্লিষ্ট কার্যাদি স্বাদু পানির চাহিদা সৃষ্টি করে, যা পূরণ করতে ভূগর্ভস্থ পানির উত্তোলন বাড়ে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়, যা মাটির ক্ষয় বৃদ্ধি এবং লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশে সাহায্য করতে পারে। এসব পরিবেশবিনাশী কর্মকাণ্ড উপকূলীয় উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতের জীবনের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে, যা এ অঞ্চলের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য এবং সূক্ষ্ম বাস্তুতন্ত্রকে বিপন্ন করতে পারে। এটা সত্য যে, গণপর্যটন ব্যবস্থায় বর্তমান প্রজন্ম উপকূলীয় কক্সবাজার জেলার অকৃত্রিম প্রকৃতির অপরূপ রূপের আস্বাদন নিতে সক্ষম হলেও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তা থেকে বঞ্চিত হতে পারে।

কক্সবাজারে দেশের পর্যটন বিকাশে ব্যাপক সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, তেমনই সমসাময়িক ও দীর্ঘ মেয়াদি প্রচুর সমস্যাও রয়েছে। কক্সবাজারের অপার সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে পর্যটনের বিকাশের সুযোগের পাশাপাশি এখানকার অন্যতম সমস্যা হলো অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও রোহিঙ্গাসহ আরও বেশ কয়েকটি সমস্যা। যেখানে-সেখানে গড়ে উঠছে ইট-পাথরের স্থাপনা, সরকারী দপ্তর কর্তৃক বাঁধা দিয়ে কিংবা আইন প্রয়োগ করেও দমানো যাচ্ছে না এসব পরিকল্পনাবিহীন কাযৃক্রম। যত্রতত্র পাহাড় কেটে প্রকৃতির ক্ষতি করে এসব অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। নদী ভরাট আর ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট নিধন করে চলছে দখলের মহোৎসব। সেন্টমার্টিনেও চলছে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের কাজ, যা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট করছে। পরিবেশবাদীরা এসব অনিয়ম বন্ধে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে গেলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। যে কক্সবাজারকে কেন্দ্র সরকারের এত এত পরিকল্পনা সেই কক্সবাজারের ১২০ কিলোমিটার সৈকতের মধ্যে বর্তমানে বিক্ষিপ্তভাবে এখানে-ওখানে মাত্র তিন কিলোমিটার এলাকা পর্যটন এলাকা হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মানবসৃষ্ট নানা সমস্যার কারণে ওই তিন কিলোমিটার সমুদ্রসৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে সম্প্রতি ব্যাপক ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। এ ভাঙনের কবলে পড়ে মাত্র কয়েক মাসে প্রায় কয়েক হাজার ঝাউগাছ বিলীন হয়ে গেছে।

রোহিঙ্গা সমস্যা এখানে আরেকটি বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৭ সালের পরে কিংবা এরও আগে দফায় দফায় সব মিলয়ে এদেশে প্রায় ১৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গার বসবাস। রোহিঙ্গাদের কারণে কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলাও চরম হুমকির মুখে রয়েছে বর্তমানে। তাদের জন্য নির্মিত ক্যাম্প থেকে পালিয়ে প্রতিদিন কক্সবাজারসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে রোহিঙ্গারা। দেশে ইয়াবা ও অস্ত্র ব্যবসার প্রসার ঘটিয়েছে তারা। চুরি, ছিনতাই, ডাকাতিসহ নানা অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ছে নিয়মিত। ব্যবহৃত হচ্ছে একাধিক গ্রুপের ভাড়াটে সন্ত্রাসী হিসাবে। জেলার শ্রমবাজারও অনেকটা তাদের দখলে বললেই চলে।

আরেকটি বিষয় হলো, কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবসায় সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেয়া একটি অঘোষিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অন্তহীন এসব সমস্যা ছাড়াও রয়েছে আরেকটি গুরুতর অপরাধ কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত এলাকায় প্রতিনিয়ত সরকারি মূল্যবান জমি দখল হচ্ছে। কোটি কোটি টাকার জমি দখল করে পর্যটন এলাকার একাধিক পয়েন্টে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের হিড়িক পড়েছে। সরকারি খাসজমি দখলের প্রতিযোগিতা চলছে ইনানী, হিমছড়ি ও শহরের সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্ট, সি-ইন পয়েন্ট, বালিকা মাদ্রাসা পয়েন্ট ও ডায়াবেটিক পয়েন্টে। অভিযোগ রয়েছে, এসব বেপরোয়া ভূমি দখল ও স্থাপন নির্মান কাজে সহযোগিতা করছেন প্রশাসনের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা।

উপর্যুক্ত সমস্যাগুলো নিরসন করতে পারলে কক্সবাজারের টেকসই উন্নয়ন-অভিযাত্রায় ইকোট্যুরিজম হতে পারে সবচেয়ে সুন্দর সমাধান। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখার পাশাপাশি উন্নত জীবিকা উপার্জনেও ইকোট্যুরিজম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। পাহাড়, বন-বনানী, বেলাভূমি, সমুদ্রসৈকতের ভূ-প্রকৃতিগত আকর্ষণ, প্রশান্তিদায়ক উপক্রান্তীয় জলবায়ু, উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতের বৈচিত্র্য, সহজগম্যতা এবং স্থানীয় জনমানুষের বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবনাচরণ ও সংস্কৃতির কারণে এখানে ইকোট্যুরিজমের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। একই স্থানে বন্যপ্রাণী, প্রবাল প্রাচীর ও ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের মতো অমূল্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সমাবেশ অত্যন্ত বিরল, যার ফলে কক্সবাজারকে দেশের প্রধান ইকোট্যুরিজম হটস্পট হিসাবে বিবেচনা করা হয়।

কক্সবাজার, এর আদিম সৈকত, সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং টেকসই পর্যটনের প্রতিশ্রুতি সহ একটি বিশ্বব্যাপী ভ্রমণ গন্তব্যে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভ্রমণকারীরা অর্থপূর্ণ এবং প্রামাণিক অভিজ্ঞতার সন্ধান করার কারণে, কক্সবাজার একটি গন্তব্য হিসাবে দাঁড়িয়েছে যা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সাংস্কৃতিক নিমগ্নতার একটি নিখুঁত মিশ্রণ সরবরাহ করে। সতর্ক পরিকল্পনা এবং দায়িত্বশীল পর্যটন অনুশীলনের মাধ্যমে, কক্সবাজার তার পর্যটন সম্ভাবনাকে উন্মোচিত করতে পারে, যা সারা বিশ্বের অভিযাত্রী এবং প্রকৃতিপ্রেমীদের হৃদয়কে মোহিত করে।

কক্সবাজারে পর্যটন শিল্প দ্রুত বিকাশমান খাত হিসেবে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অবদান রাখতে পারবে। এ শিল্পের বিকাশে আমাদের রয়েছে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, সুপ্রাচীন নিদর্শন। সরকার কক্সবাজারের অফুরন্ত সম্ভাবনাময় পর্যটনকে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে তুলে ধরতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছে। কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভ সড়ক নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। সারাবিশ্বের মধ্যে কক্সবাজার অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন স্পটে পরিচিত হয়েছে। দেশের মানুষের আয় বৃদ্ধির কারণে বিগত কয়েক বছরে অভ্যন্তরীণ পর্যটনের উল্লেখযোগ্য প্রসার ঘটেছে। একই সাথে এ খাতে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবলের ব্যাপক চাহিদা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক মানের হোটেল, মোটেল, কটেজ ও রিসোর্টের সংখ্যাবৃদ্ধির সাথে সাথে পর্যটন ও আতিথেয়তা-ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট দক্ষ ও প্রশিক্ষিত পেশাজীবীর চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। কক্সবাজার আয়তনে ছোট হলেও এর ভৌগোলিক অবস্থান, নৈসর্গিক সৌন্দর্য, সংস্কৃতি, মানুষের অতিথিপরায়ণতা ইত্যাদি বিবেচনায় এখানে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে।

কক্সবাজারের পর্যটন খাতে অপার সম্ভাবনা থাকা সত্বেও পরিকল্পনা ও তদারকির অভাবে আমরা কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পে পিছিয়ে আছি। সমন্বিত পরিকল্পনা ব্যতিত এ শিল্পের বিকাশ পুরোপুরি সম্ভব নয়। পর্যটনকে অর্থনীতিতে রুপ দিতে পর্যটন শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত সব পক্ষকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করে যেতে হবে। এ শিল্পের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। বিদেশের মতো পর্যটন শিল্প বিকাশের সুযোগ ও সম্ভাবনা কক্সবাজারে রয়েছে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগকে স্বাগত জানাতে হবে। বেসরকারি উদ্যোগকে উদ্বুদ্ধ করে সমুদ্র বেষ্টিত সেন্টমার্টিন দ্বীপ, ইনানী, ছেঁড়াদ্বীপ, টেকনাফকে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রে রূপায়িত করা যেতে পারে। স্থানীয়ভাবেও জায়গাগুলোর ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে।

কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভ সড়ক সম্প্রতি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে পর্যটন নগরীর আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটক আকর্ষণে কক্সবাজারে সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক, নাফ ট্যুরিজম পার্ক ও সোনাদিয়া ইকো ট্যুরিজম পার্কের কাজ সম্পন্ন হলে প্রতি বছর এতে বাড়তি ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

লেখক: সেনা কর্মকর্তা


বৈদেশিক মুদ্রা সংকট ও বাংলাদেশ

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ফারিহা তাসনোভা

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা মজুত হলো এমন একটি মাপকাঠি যার দ্বারা বিশ্বের প্রত্যেকটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থান কিংবা অর্থনৈতিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে একটি সুনির্দিষ্ট ধরনা লাভ করা যায়। আমাদের দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্মরণকালে সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছিল যা কি না বর্তমান সরকারের অন্যতম একটি অর্জন; কিন্তু সাম্প্রতিককালে তা হ্রাস পেয়ে ২০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছে। যা দেশের অর্থনীতির জন্য বিরাট বড় একটি চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দিয়ে তিন থেকে চার মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব বলে ধারণা করছেন অর্থনীতিবিদরা। আমাদের দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের এই সংকট রাতারাতি তৈরি হয়নি। করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিমা বিশ্বের নিষেধাজ্ঞা থেকে শুরু করে ডলারের দাম বৃদ্ধি সব কিছুর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব এতে পরিলক্ষিত।

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান একটি খাত হলো- তৈরি পোশাকশিল্প থেকে অর্জিত রপ্তানি আয়। স্বাভাবিকভাবেই রপ্তানি আয় কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ সংকট তৈরি হবে। আমাদের দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের অধিক আসে তৈরি পোশাকশিল্প থেকে। এ ছাড়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের দ্বারা প্রেরিত রেমিট্যান্স আয়ের ওপর বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ অনেকাংশে নির্ভরশীল। একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে আমরা এই বিষয়টি অনুধাবন করতে পারব, দেশের প্রধান দুটি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের খাত থেকে আমরা প্রত্যাশিত ফলাফল আদায়ে অনেকাংশে ব্যর্থ। কেননা, দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্পের কাঁচামাল এবং ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানিনির্ভর। যার ফলে তৈরি পোশাক খাত থেকে আমরা যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছি তা অনেকাংশেই কাঁচামাল ও মেশিনারিজ আমদানিতে ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে রপ্তানি আয় থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা শতভাগ মূল্য সংযোজন করতে পারছে না।

অন্যদিকে, ডলারের মূল্য বাজারভিত্তিক না হওয়ার ফলে প্রবাসী বাংলাদেশিরা বৈধ পথে দেশে টাকা পাঠাতে নিরুৎসাহিত হচ্ছে। অবৈধ পথ তথা হুন্ডির মাধ্যমে দেশে টাকা পাঠাচ্ছে যার ফলে প্রবাসীদের অর্জিত ডলার বিদেশেই রয়ে যাচ্ছে এবং দেশ রেমিট্যান্স আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

রিজার্ভ সংকট মোকাবিলার জন্য তাই আমাদের উচিত তৎপর হওয়া। তৈরি পোশাকশিল্পের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ধরে রাখতে পশ্চাৎপদ শিল্প বিস্তারে মনোযোগী হতে হবে। তৈরি পোশাকশিল্পের আনুষঙ্গিক তথা পশ্চাৎমুখী পণ্যসামগ্রী যেমন- কাঁচামাল, মেশিনারিজ দেশেই তৈরিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এর মাধ্যমে দেশের বেকার জনগোষ্ঠীর যেমন কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে তেমনি দেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে। উপার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশেই সংরক্ষিত হবে। অন্যদিকে, বাজারভিত্তিক বৈদেশিক মুদ্রার মান প্রবাসীদের বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত করবে। অর্থনৈতিক প্রণোদনার পাশাপাশি রেমিট্যান্স পাঠানোর ব্যবস্থা জনগণের জন্য আরও সহজ, হাতের নাগালে নিয়ে আসতে পারলে জনগণ বৈধ পথে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাতে উৎসাহিত হবে। অনলাইনভিত্তিক রেমিট্যান্স পাঠানোর ব্যবস্থা গ্রহণ, ঘরে বসে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রেরণ ও আদায়ের সুব্যবস্থা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ সুগম করবে। জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ সংকট নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

তৈরি পোশাকশিল্পের উন্নয়নের পাশাপাশি রপ্তানি বাণিজ্য বহুমুখীকরণের মাধ্যমে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। ২০৩১ সালে একটি উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

লেখক: এমবিএ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং সিনিয়র ব্যাংকার, জনতা ব্যাংক পিএলসি


আজ বাবা হারানো দিন

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
আলমগীর খোরশেদ 

বাবা- এমন একটি সম্বোধন, একটি শব্দ- যা কানে প্রবেশ করে, মস্তিষ্কের নিউরনে কম্পন দিয়ে, কখনো আনন্দ কখনো বা বিষাদে দুচোখের কোণকে শিশির বিন্দুতে ভিজিয়ে দেয়। বাবা বলতে মধ্যবয়সি একজন মানুষ, সারাদিন যাপিতজীবনের ভার বয়ে বিকেল বা সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরা। ঘরে রেখে যাওয়া বাবুটার জন্য সাধ্যানুযায়ী কিছু কিনে, দরজার ওপার থেকেই আদরের ডাক দিয়ে জড়িয়ে ধরা। যত দাবি, আবদার, চাওয়া, অসুস্থ হলে ডাক্তার, ওষুধ, পথ্য, শিয়রের পাশে বসে থাকা সারারাত, সব কিছুর যোগান দিতেই যেন বাবারা আসেন পৃথিবীতে।

আঁতুড় ঘরে জন্ম নেওয়া নবজাতককে সাবধানে মায়ের কোল থেকে প্রথম টেনে নেন- বাবা। নিজের সব অপরাগতা, কষ্ট, অভাববোধকে আড়াল করে- আদর, শাসন, গাম্ভীর্য, হাসি, ধমক, মেনে নেওয়া মনোভাব, হাজারও আবদার যোগান দেন যিনি তিনিই- বাবা। পৃথিবীতে সব সম্পর্কের বিকল্প হয়, কেবল হয় না- বাবা, মা আর সন্তান। এদের মাঝে বিরাজ করে ঐশ্বরিক একটা আয়নিক বন্ধন। সম্পর্কের জোরে হয়তো বাবা-মা হয়ে যায় কিন্তু তারা কখনোই সত্যিকারে বাবা বা মা হতে পারে না। লোক দেখানো মেকি হয়।

আজ চব্বিশ বছর- আমার বাবা চলে গেছেন না ফেরার দেশে, যেখানে গেলে কেউ কোনোদিন ফিরে আসে না। বাবাকে হারিয়ে এক বছরও গড়ালোনা, আমার মায়াবতী মা-ও বাবার সাথে দূর আকাশের তারা হয়ে প্রতিসন্ধ্যা থেকে পরদিন ভোর পর্যন্ত চেয়ে থাকেন, অপলক নেত্রে, কিছু হয়তো বলেন; কিন্তু দূর আকাশের তারাদের ভাষা তো আমার জানা নেই। বুঝব কেমন করে? আমার বাবা জান্নাতবাসী এ কে খোরশেদ উদ্দিন আহমেদ, কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া থানার নারান্দী ইউনিয়নের একাধিকবার নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন, কিশোরগঞ্জ মাল্টিপারপাস সোসাইটির দুই বার নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন। জেলা সেরা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে তখনকার সময় ছয় হাজার টাকা পুরস্কার পান। সমুদয় টাকা পাকুন্দিয়া উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় ও নারান্দী হাই স্কুল স্থাপনে দান করেন। আগে ওইখানে উইভিং ফ্যাক্টরি ছিল। বাবা এসডিও সাহেব মি. কাজিম ও ময়মনসিংহের ডিসি এম মনিরুজ্জমান সাহেবকে এনে জনসভা করে পরিত্যক্ত ফ্যাক্টরি সরিয়ে ওই জায়গায় বালিকা বিদ্যালয় স্থাপনে অনুমতি নেন। আজকের প্রজন্ম জানেনা এসব। স্বীকারও করে না কেউ। পরিবারে সবার ছোট প্রতিনিধি এই আমি আব্বার যৌবন বয়সের কীর্তিময় সাফল্য ধারা দেখার সৌভাগ্য হয়নি। আম্মার কাছ থেকে যতটুকু জেনেছি। আমার বাবা কলকাতা শহরে পুলিশে চাকরি নিয়ে শুরু করেন জীবনযাত্রা। পরে এই চাকরি ছেড়ে, কৃষি সুপারভাইজার পদে মেদিনীপুর জেলার বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন। যার বুকের ভিতর খেলা করে স্বাধীনচেতা মনোভাব, গদবাঁধা জীবন ভালো লাগবে কেমন করে? আবার চাকরি ছাড়েন বাবা। দেশে এসে পাকুন্দিয়া থানা বাজারে শুরু করেন সোডা ও সিমেন্টের ব্যবসা, ডিলারশিপ নিয়ে। শুরু হয় জীবনের পটপরিবর্তন।

রাজনীতি আব্বাকে টানত আগে থেকেই। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও জাতির পিতা

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বড় ছবি বাঁধাই করে আমাদের বাড়ির বৈঠকখানায় টানিয়ে রাখতেন আব্বা। রাজনীতিতে সফলতার স্বাক্ষর রাখেন আব্বা। তৎকালীন কিশোরগঞ্জ মহুকুমা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সহসভাপতি নির্বাচিত হন। আইয়ুববিরোধী আন্দোলন করে প্রকাশ্য জনসভা থেকে গ্রেপ্তার হন বাবা। রাজবন্দি হিসেবে কারাবরণকারী আমার বাবা ছিলেন ইংরেজি জানা তুখোড় বক্তা। ডেলিগেট বক্তা হিসেবে আব্বা বিভিন্ন জনসভায় বক্তৃতা করেছেন। আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের সময় আব্বার হাতের লেখা বই ‘হবু চন্দ্র রাজা ও গবু চন্দ্র মন্ত্রী’ তখন রাজনীতিতে সাড়া পড়ে গেছিল। ফলে আব্বা সরকারের রোষানলে পড়েন।

আব্বার জীবনদর্শন, কথা, কাজ, অ্যাকটিভনেস, সিনসিয়ারিটি ছিল অনুকরণীয়। এত সিনসিয়ার, নিয়মানুবর্তিতা, সারাজীবনে আর কাউকে দেখিনি আমি।

মনে পড়ে, আমি তখন দেশের বাইরে। আব্বা আমাকে চিঠি লিখতেন। আমরা চিঠির যুগের মানুষ প্রযুক্তিগত সুবিধা ছিল না তখন। চিঠিতে মাইডিয়ার আলম- দিয়ে শুরু করতেন আব্বা। টানা অক্ষরে সুন্দর লেখা ছিল বাবার। ইংরেজি হাতের লেখা খুবই সুন্দর ছিল তার। আজকাল চিঠি হারিয়ে গেছে, কেউ লেখে না। বাবা আমাকে লিখতেন-

: মনে রাখবে, ঘর থেকে দু’পা বেরুলেই সেটা বিদেশ। দূরে আছো- ভালো আছো, সংসারটা সমরাঙ্গন। তখন বুঝতাম না, কেন এসব লেখেন আব্বা? আজ বুঝি, সংসার কত জটিল, কত পিচ্ছিল এর পথ। আব্বা আরও লিখতেন-

: ভদ্রলোকের ভাত নেই। সহজ-সরল একটা গুণ হলেও সেটা এখন মূল্যহীন, মানুষ বোকা ভাবে।

যা আমি নিজের জীবনের উপলব্ধি থেকে হাড়ে হাড়ে বুঝেছি।

আমি গ্রামে বড় হয়েছি। বৈশাখ মাসে ঝড় এলেই আব্বা সবাইকে ডাকাডাকি করে তার ঘরে নিয়ে আসতেন। তুফান শেষ না হওয়া পর্যন্ত থাকতে হতো আব্বার কাছে।

মনে পড়ে বাড়িতে আব্বা তিন বেলায়-ই আমাদের সব ভাইবোনদের ডেকে এনে একসাথে খেতেন। আমাদের বাড়ির সামনে বড় পুকুর। আব্বা গোছলের সময় আমাকে ডেকে নিতেন সবসময়। পানিতে নেমে আব্বার কাঁধে উঠতাম। ছোট বলে সাঁতার শেখা হয়নি তখনো। আমাকে কাঁধে নিয়ে আব্বা পানিতে ডুব দিতেন। আমি তো ভয়ে শেষ। চিৎকার দিয়ে কান্না শুরু করতাম

: আব্বা তাড়াতাড়ি উডো, আমার ডর করতাছে,

আব্বা পানির নিচ থেকে মাথা উঠিয়ে বলতেন

: ভয় কিরে? আমি আছি না?

আব্বার সেই ‘ভয় কিরে, আমি আছি না?’- কথাটা আজও আমার কান, মন, অনুভূতিকে জাগিয়ে দিয়ে যায়। এমন করে নির্ভতার আশ্বাস কে দেবে? কেউ বলেনি কোনোদিন, হয়তো বলবেও না সারা জীবন।

মনে পড়ে, ছোটবেলায় আমাদের বাড়ির ষাঁড় গরুটা কখন দড়ি ছিঁড়ে এসে আমাকে পেছন থেকে ঘাড়ে গুঁতা দেয়। আমি মাটিতে পড়ে যাই। রক্ত পড়ছিল ঘাড় থেকে আমার। আব্বা খুব বকেছিলেন কাজের ছেলেটা ও আম্মাকে। প্রথম জনের দোষ, পুরাতন পচা দড়ি দিয়ে ষাঁড় বাঁধল কেন, আর আম্মাকে বকলেন, ছোট ছেলেটাকে সামলে রাখতে পারে না কেন? মনে পড়ে, আমার কোনো জ্বর বা অসুখ হলে, আব্বা দশ-পনেরো মিনিট পর পর এসে জিজ্ঞাো করতেন-

: কিরে জ্বর কমেনি এখনো?

মনে মনে বিরক্ত হতাম কিন্তু আজ অসুখ হলে, হাসপাতালে গেলেও দেখার কেউ নেই। পনেরো মিনিট কেন, পনেরো বছরেও কেউ জানতে চায় না-

: কিরে কেমন আছিস, আলম? বাচ্চারা ভালো?

আজ নিজে বাবা হয়েছি। সন্তান আর বাবার মধ্যকার রসায়নটা যখন বুঝতে শিখলাম তখন বাবা হারিয়ে গেছেন। কষ্ট লাগে এই বোধটা যদি আগে হতো, তাহলে অন্তত একটা দিন বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলতাম

: বাবা, ইউ আর মাই সুইট অ্যান্ড গ্রেট পাপা, আই লাভ ইউ।

এখন নিজে বাবা হয়ে বলতে ইচ্ছে করে-

: আব্বা, বাবা হওয়া এত কষ্ট? এত ছাড় দিতে হয়, গোপন রাখতে হয় যাপিতজীবনের কষ্টগুলো, হাসিমুখে হজম করতে হয় কত না কষ্টের পদাবলি।

আমার একমাত্র ছেলে ভার্সিটিতে। তেরো বছরে রাজকন্যা সপ্তম শ্রেণিতে। আমার রাজকন্যা আমার মায়ের কষ্ট ভুলিয়ে রাখে ওর ধমক, শাসন আমার কড়া বাবাকে মনে করিয়ে দেয়। অফিসে যাওয়ার সময় চিরুনি হাতে নিয়ে আমার টাকমাথার শেষসম্বল কটা চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলে

: আব্বুটা টাকলু কেন আমার?

আমাকে ছাড়া ও রাতে ঘুমায়না। ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি- বলে তারপর ঘুম পাড়াই।

আমার যদি কখনো মন খারাপ লাগে, শুয়ে থাকি। আমার রাজকন্যা চুপচাপ আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, আমি তখন আমার মা-বাবার স্মৃতিকে চুপ করে থেকে রোমন্থন করি।

আজ ২৩ রমজান, চব্বিশ বছর আগে এমনি দিনে আব্বা আমাদের ছেড়ে যান না ফেরার দেশে। আমার মাথার ওপর ছাদটা তখন থেকে সরে যায়, সারাজীবনের জন্য। ওপারে ভালো থাকুন বাবা।

লেখক: শিশু সাহিত্যিক


ন্যায্যতার ভিত্তিতে সরকার পরিচালনা জরুরি

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ড. সুলতান মাহমুদ রানা

সরকারের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। এর মূলত সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণই সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। গত ১৫ বছরে দেশে বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণসহ উন্নয়নের ধারাবাহিকতা যেমন আছে তেমনি ব্যাংকসহ আর্থিক খাতে সুশাসনের ঘাটতিও দেখা দিয়েছে। এমনকি সাধারণ জনগণের মনে অনেক বিষয়ে ক্ষোভ রয়েছে। কোনো কোনো ন্যায্য বিষয়ে সাধারণ জনগণ হয়রানির শিকার হয়েছেন- যেটি কোনোভাবেই কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের লক্ষণ নয়। দেশে কিছু ফুলটাইম রাজনীতিক তৈরি হয়েছে যারা সব সময়ই তদবির বাণিজ্যে ব্যস্ত রয়েছে। আর তদবির মানেই হলো দুর্নীতির বিস্তার। এটি সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে অন্যতম একটি ব্যাধি হিসেবে কাজ করে। ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ’- সংবিধানের এ কথাগুলো এখন বাস্তবায়ন হয় না। সরকারি কাজকর্মে জনগণের অংশগ্রহণ নেই। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় জনগণের যে ধরনের ন্যূনতম অংশগ্রহণ থাকা দরকার সেটিও লক্ষ্য করা যায় না। জনগণকে কোনো দলই ধর্তব্যের মধ্যে নেয় না এবং বিশ্বাসও করে না। এ কারণে সুশাসন এখন হয় না বললেই চলে।

নানা কারণে সুশাসন প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। এখন সবার মনে একটিই প্রশ্ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার সফল কি হতে পারবে? এমন প্রশ্নের বেড়াজাল থেকে মুক্ত হতে একটু সময় লাগবে বটে। বিগত ১৫ বছরে সরকারের উন্নয়নের মাত্রার দিকে লক্ষ্য করলে সফলতা বেশ কিছু দিক আমাদের চোখে পড়ে। তবে ব্যর্থতাও অনেক। সফলতা থাকলে, ব্যর্থতা থাকবে- এটিও ন্যায্য। তবে প্রত্যাশা হলো- বিগত সময়ের ভুল-ত্রুটিকে শুধরে সরকার সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। জনগণ সরকারের কাছে চায় স্বাধীনতা, সহযোগিতা ও শান্তি-শৃঙ্খলার মধ্যে বাঁচার ন্যূনতম অধিকার এবং নির্বিঘ্নে চলাফেরার ও কাজকর্মের সুযোগ এবং নিজেদের মেধা-মননশীলতা ও যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে আত্মপ্রকাশ ও বিকাশের নিশ্চয়তা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবিসংবাদিত নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে এই স্বপ্নগুলোকেই পুঁজি করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে নির্মাণ করেছিল জনগণ। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাঙালি চেতনার পরিপন্থি ঘাতকচক্র ও তাদের দেশি-বিদেশি দোসররা জাতির সে স্বপ্ন ভেঙে দেয়। বৈষম্যহীন, সমতাভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদী চেতনার আলোকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের প্রত্যাশার বিপরীতে প্রতিষ্ঠিত হয় ধর্মীয় লেবাসে একটি সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের সমন্বয়ে লুটেরা, ধনিক ও বণিক শ্রেণির স্বার্থকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। সাধারণ জনগণ এই অপরাজনৈতিক সংস্কৃতির হাতে নির্যাতিত ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের প্রেক্ষাপটে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রত্যাশায় তিন জোটের রূপরেখার ভিত্তিতে জনগণের ব্যাপক আশা-আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয়; কিন্তু জনগণের যথাযথ প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয় তৎকালীন বিএনপি সরকার। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে ১৯৯০ সালের সম্পাদিত তিন জোটের রূপরেখো বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে। এবং গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হয়; কিন্তু সে যাত্রাতেও অপূর্ণতা থেকে যায়। অনেক ক্ষেত্রেই সফল হয়েছেন। আবার বেশ কিছু ক্ষেত্রে ব্যর্থতার গ্লানি গায়ে লেপে যায়।

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে একটি বৃহৎ ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলের নির্বাচন বর্জনের প্রেক্ষাপটেও জনগণ বর্তমান সরকারকে ভোট দেয়। বিরোধী দলের নানা বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে নির্বাচিত করেছে বর্তমান সরকারকে। কাজেই জনপ্রত্যাশার মাপকাঠিও এসব বাধা-বিপত্তির ঊর্ধ্বে। যদিও ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সরকার জনগণের কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে না; কিন্তু নিশ্ছিদ্রভাবে সরকারের যাত্রাকে অক্ষুণ্ন রাখতে নির্বাচনী ইশতেহারে বর্ণিত প্রতিশ্রুতি রক্ষায় তৎপর থাকার বিকল্প নেই। ক্ষমতার পালা বদলের বাস্তবতাকে স্মরণ করে সরকারকে দেশে অপরাধ ও লুটপাটের সংস্কৃতির পরিবর্তে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী থাকতে হবে। সংকীর্ণ দলীয় আনুগত্যের বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে যোগ্যতা ও দক্ষতার দিকে নজর রাখার বিকল্প নেই। একই সঙ্গে দেশের সব নাগরিকের সরকারে অংশগ্রহণের প্রক্রিয়াকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। মন্ত্রিসভা মানুষের জন্য কাজ করবেন, দেশের সেবা করবেন। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকরের পাশাপাশি স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হবে। একই সঙ্গে তৃণমূল রাজনীতিকেও শক্তিশালী না করলে চলবে না।

আমরা জানি, রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় আসে ক্ষমতা থেকে যায়। আর এই ক্ষমতায় আসা এবং ক্ষমতায় থাকার মানদণ্ড হলো- জনগণের পূর্ণ সমর্থন। জনগণের সমর্থনের ঘাটতি হয় এমন আচরণ কোনো রাজনৈতিক দল কিংবা তাদের অঙ্গসংগঠনগুলোর নেতাদের থাকা উচিত নয়। তবে অনেকক্ষেত্রে রাতারাতি অনুপ্রবেশকারী সুবিধাবাদীদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাজনৈতিক দলের ভাবমূর্তি। সেদিকেও বিশেষ লক্ষ্য রাখা দরকার সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর। সরকারের ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি’ বিদ্যমান থাকলেও দুর্নীতি এখনো বন্ধ হয়নি। এর মূলোৎপাটন করা সহজ না হলেও হাল ছাড়া যাবে না। সম্প্রতি ভোক্তা অধিকার সংস্থা চাঁদাবাজি কিংবা পার্সেন্টেজ কমিশনের ফলে দ্রব্যমূল্য লাগামহীন হয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছে। সাধারণ মানুষের অফিস-আদালতের কোনো কাজ স্বাভাবিকভাবে হওয়া খুব কঠিন। এর জন্য কারও কাছে ধরনা দিতে হয়, তদবির করতে হয়, স্পিড মানি দিতে হয়, আবার অনেকক্ষেত্রে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির ছাড়পত্র ছাড়া হয় না। এমন নানা ধরনের বাস্তবতা আমাদের আঁকড়ে ধরেছে। এগুলো কোনোভাবেই সুশাসনের লক্ষণ নয়। এসব পরিস্থিতি থেকে মুক্ত হলে দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর শক্ত অবস্থান এবং সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। গঠনমূলক সমালোচনার মধ্য দিয়ে সরকারকে কিছুটা হলেও জবাবদিহিতার মধ্যে আনয়ন করা যায়। আমরা লক্ষ্য করেছি প্রধানমন্ত্রী সব সময়ই প্রশাসনের সব স্তরের প্রতিনিধিদের স্বচ্ছ এবং জবাবদিহমূলক কর্মকাণ্ডে শরিক হতে আহ্বান জানান। এ ক্ষেত্রে তার একার পক্ষে প্রশাসনের সব স্তরে মনিটরিং রাখা সম্ভব নয়। এ জন্য সর্বস্তরের রাজনৈতিক দল, বিশেষত বিরোধী রাজনৈতিক সংগঠনগুলো এবং জনগণকে গঠনমূলক ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। বিশেষ করে স্বাধীন সত্তা হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলোকে ভূমিকা পালন করতে হবে। কোনো বিদেশি শক্তির লেজুরবৃত্তি করলে কোনোভাবেই দেশের মঙ্গলে রাজনৈতিক কর্মসূচি নির্ধারণ করা সম্ভব হবে না।

এই মুহূর্তে জনগণের তাৎক্ষণিক প্রত্যাশা হলো, ন্যায্যতার ভিত্তিতে জনগণের কাজ পরিচালনা হওয়া। জনগণের কল্যাণ হয় এমন কাজ করতে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। এমনকি জনগণ আশা করে, সরকার চাটুকার ও দখলদারদের প্রশ্রয় দেবেন না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনকে অবশ্যই দল নিরপেক্ষ ও পেশাদারী মানসিকতা নিয়ে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি সবকিছু ন্যায্যতা, যোগ্যতা, মেধা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে হতে হবে, দলীয় কোনো অনুগত্যের ভিত্তিতে নয়।

সংসদীয় ব্যবস্থার মূল কেন্দ্র ‘জাতীয় সংসদ’কে কার্যকর করতে হবে। শুধু কথায় নয়- কাজে প্রমাণ দিতে হবে। সব বিষয়েই বিরোধী দলের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। সংসদকে আলোচনা ও সমাধানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্পিকারকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, সংসদ কার্যকর না হলে জনপ্রত্যাশা পূরণের মূল জায়গাটিও ব্যর্থ হিসেবে বিবেচিত হয়। সংসদ কার্যকর রাখতে বিরোধী দলের উপস্থিতির গুরুত্ব অনেক বেশি। এতে আসন যতই কম হোক না কেন, সেটি কোনো বিষয় না। সংসদে বিরোধী দলের নিয়মিত উপস্থিতি সংসদ কার্যকর হওয়ার মূল চাবি। সংখ্যা বিচারে নয়, বিরোধী দলকে সংসদীয় কাঠামো অনুযায়ী যথাযথ সাংবিধানিক মর্যাদার ভিত্তিতেই মূল্যায়ন করা সরকারের কর্তব্য। জনগণ গতানুগতিক রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি থেকে নিজেদের মুক্ত করতে চায়। গঠনমূলক রাজনীতি, দেশগড়ার রাজনীতি, ঐক্য আর সহযোগিতার রাজনীতিই সবার কাম্য।

লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

বিষয়:

banner close