শনিবার, ২৫ মে ২০২৪

ক্রলিং পেগ মুদ্রাস্ফীতি রোধ, রেমিট্যান্স প্রবাহ ও রপ্তানি আয়ের জন্যও ইতিবাচক

হীরেন পণ্ডিত
প্রকাশিত
হীরেন পণ্ডিত
প্রকাশিত : ১৫ মে, ২০২৪ ১৮:২৩

ক্রলিং পেগ পদ্ধতি কী? যার মাধ্যমে বাড়ল ডলারের দাম। একলাফে ৭ টাকা বাড়িয়ে ডলারের নতুন দাম নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতদিন ১১০ টাকায় থাকা ডলারের অফিসিয়াল দাম একদিনে ১১৭ টাকায় উন্নীত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মূলত ক্রলিং পেগ পদ্ধতিতে ডলারের এই দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। সম্প্রতি একটি সার্কুলার জা‌রি করে এ দাম ঘোষণা করেছে আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। ক্রলিং পেগ হচ্ছে দেশিয় মুদ্রার সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার সমন্বয়ের একটি পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে একটি মুদ্রার বিনিময় হারকে একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ওঠানামা করার অনুমতি দেয়া হয়। এক্ষেত্রে মুদ্রার দরের সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন সীমা নির্ধারণ করা থাকে। ফলে একবারেই খুব বেশি বাড়তে পারবে না, আবার কমতেও পারবে না।

বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের ভোজ্য তেল, মসুর ডাল ও চিনি-পেঁয়াজের মতো নিত্যপণ্য আমদানি করতে ব্যাংক থেকে ডলার কিনে ঋণপত্র (এলসি) খুলতে হয়। সাধারণত ডলারের দাম যখন বেড়ে যায়, দেশের বাজারেও পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়। আবার ডলারের দাম কমে গেলে সে অনুযায়ী পণ্যের দাম কমে যায়। গত দুই বছরে বাজারে ডলারের প্রকৃত যে রেট ছিল, সেই তুলনায় অফিসিয়াল রেট ছিল ভিন্ন। ক্রলিং পেগ পদ্ধতি চালুর আগেও রেমিট্যান্স ও আমদানি বাবদ ডলারমূল্য নির্ধারিত ছিল ১১০ টাকায়। অথচ অধিকাংশ ব্যাংককে রেমিট্যান্স কিনতে হয়েছে ১১৫-১১৬ টাকার বেশি দামে। ব্যাংক আমদানিকারকদের কাছে লোকসানে ডলার বিক্রি করেনি। তারা এরচেয়ে ১-২ টাকা বেশি দরে ডলার বিক্রি করেছে। কোনো কোনো ব্যাংক আমদানি এলসি নিষ্পত্তিতে ১২০ টাকা বেশি ডলারের দর নিয়েছে। বিনিময় হার অস্থিতিশীল হওয়ার প্রবণতা থাকলে এবং মূল্যস্ফীতি উচ্চ হারে থাকলে কোনো দেশ ক্রলিং পেগ পদ্ধতি অনুসরণ করে। বাংলাদেশ এখন এই পরিস্থিতির মধ্যেই আছে।

নতুন ক্রলিং পেগ পদ্ধতিতে ব্যবসায়ীদের পণ্যের দাম বাড়ানোর সুযোগ নেই। কারণ এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে এক্সচেঞ্জ রেট নির্ধারণ করছে, এটাই প্রকৃত মার্কেট রেট। তবে নতুন করে এই রেট বাড়ানো হলে তখন পণ্যমূল্য বাড়ার সম্ভাবনা থাকবে। ক্রলিং পেগ পদ্ধতি চালুর ফলে ব্যবসায়ীদের জন্য সুবিধা হয়েছে। আমদানিকারকরা এখন যেকোনো ব্যাংক থেকে নির্ধারিত দামে ডলার পেতে পারবেন। নতুন ক্রলিং পেগ পদ্ধতিতে ডলারের দাম বাড়েনি। উল্টো গত বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বরের তুলনায় দাম কম রয়েছে।

বৈদেশিক মুদ্রা, বিশেষ করে মার্কিন ডলারের জোগান বাড়ানোর ব্যবস্থা করা। বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যে অবস্থায় আছে, তা যে কোনো সময় বিপদের কারণ না হতে পারে সেদিকেও লক্ষ্য রাখা। বাংলাদেশ ব্যাংক অনেকদিন ধরেই কৃত্রিমভাবে ডলারের বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ করে আসছিল। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সরকার বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ বাজারের ওপর সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কোনো নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে না। শুধু অস্বাভাবিক কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেই সরকার বাজারের ওপর হস্তক্ষেপ করতে পারে। কিন্তু শুরু থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের বিনিময় হার পরোক্ষভাবে হলেও নিয়ন্ত্রণ করে আসছিল।

ক্রলিং পেগ পদ্ধতির মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক আসলে মুদ্রার বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার পথে এক ধাপ এগিয়ে যেতে চাচ্ছে। ক্রলিং পেগ পদ্ধতি হচ্ছে এ রকম এ ব্যবস্থায় ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রা টাকার বিনিময় হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি করিডর সৃষ্টি করা হবে। সেই করিডরের ভেতওে থেকে ব্যাংক ও মানি চেঞ্জার কোম্পানিগুলোকে ডলারের বিনিময় হার নির্ধারণ করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক শিডিউল ব্যাংকের জন্য ডলারের বিনিময় হার

বাংলাদেশ ব্যাংক যদি এ মুহূর্তে ডলারের বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করে, তাহলে ডলারের বিপরীতে টাকা যে অতিমূল্যায়িত হয়ে আছে তা কমে আসবে। ডলারের বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করা হলেও আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাবে-এ ধারণা সত্য নয়। কারণ, বর্তমানে আমদানিকারকদের অনেকেই ব্যাংকিং চ্যানেল থেকে চাহিদামতো ডলার কিনতে না পেরে কার্ব মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে ডলার সংগ্রহ করে তাদের চাহিদা পূরণ করছেন।

কাজেই ডলারের বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করা হলেই যে বাজারে পণ্যমূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাবে, তা নয়। যদি ডলারের উচ্চ বিনিময় হারের কারণেই স্থানীয় বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পায়, তাহলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যের মূল্য কেন বাড়ছে? স্থানীয় বাজারে বিভিন্ন পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বাড়ার পেছনে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধিই একমাত্র কারণ নয়। এজন্য বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতাই বেশি দায়ী।

বাংলাদেশের মানুষ প্রতিবছর যে পরিমাণ পণ্য ভোগ করে, এর মাত্র ২৫ শতাংশ আমদানি করতে হয়। অবশিষ্ট ৭৫ শতাংশ পণ্য স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত এবং বাজারজাত করা হয়। তাহলে এসব পণ্যের মূল্য যখন তখন বাড়ে কেন? দেশের বৈদেশিক মুদ্রার একক বৃহত্তম খাত হচ্ছে পণ্য রপ্তানি। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রথমবার ৫০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি আয় করেছে এ খাত থেকে। এর মধ্যে তৈরি পোশাকসামগ্রী রপ্তানি করে অর্জিত হয়েছে ৪২ বিলিয়ন ডলারের মতো।

এ খাতটি আমদানিনির্ভর বিধায় জাতীয় অর্থনীতিতে এর মূল্য সংযোজনের হার তুলনামূলকভাবে কম। এ খাত থেকে যে অর্থ আয় হয়, তার ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশই কাঁচামাল, ক্যাপিটাল মেশিনারিজ এবং মধ্যবর্তী পণ্য আমদানিতে পুনরায় বিদেশে চলে যায়। এছাড়া তৈরি পোশাক শিল্পে যেসব বিদেশি বিশেষজ্ঞ কাজ করেন।

বাংলাদেশের প্রকৌশলী এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞ কর্মীরা বিদেশে গিয়ে সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন। আমাদের দেশের উদ্যোক্তাদের মধ্যে দক্ষ লোকবল তৈরির চেয়ে দক্ষ জনশক্তি আমদানির প্রতি বেশি ঝোঁক লক্ষ করা যায়। দীর্ঘ মেয়াদে এ সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসজাত পণ্য আমদানি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। যেহেতু বর্তমানে দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট চলছে, তাই বাংলাদেশ ব্যাংক বিলাসজাত ১২২টি পণ্যের একটি তালিকা প্রণয়ন করে এসব পণ্য আমদানিকে নিরুৎসাহিত করে। এর উদ্দেশ্য ছিল লেনদেনের ভারসাম্যকে অনুকূল অবস্থায় নিয়ে আসা। দেখা গেল, আমদানি ব্যয় অনেকটাই কমে এসেছে।

আমাদের রপ্তানি বাণিজ্যকে পরিকল্পিতভাবে ঢেলে সাজানো দরকার। যাতে এ খাতের সম্ভাবনাকে পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগানো যায়। দেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত হচ্ছে জনশক্তি রপ্তানি। এ খাতে যে অর্থ আয় হয় তার প্রায় শতভাগই জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন করে। এছাড়া প্রায় দেড় কোটি মানুষের বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে এ খাত। কিন্তু এ খাতটি সম্পূর্ণ অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে। গত বছর ১৩ লাখ বাংলাদেশি বিদেশে গিয়েছে কর্মসংস্থানের জন্য। কিন্তু বাংলাদেশ জনশক্তি রপ্তানি খাতে আয় করেছে ২৩ বিলিয়ন ডলার।

তাহলে বাংলাদেশিরা কি পর্যাপ্ত পরিমাণে অর্থ দেশে প্রেরণ করেনি? তারা অবশ্যই দেশে অর্থ পাঠিয়েছে। কিন্তু তা বৈধ চ্যানেলের পরিবর্তে হুন্ডির মাধ্যমে পাঠিয়েছে। ব্যাংকিং চ্যানেলের তুলনায় হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ দেশে প্রেরণ করা হলে প্রতি ডলারে গড়ে ১২ থেকে ১৪ টাকা বেশি পাওয়া যায়। এজন্য ডলারের বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার পাশাপাশি প্রবাসী আয়ের ওপর দেওয়া নগদ আর্থিক প্রণোদনা বহাল রাখা যেতে পারে। তাহলে প্রবাসী বাংলাদেশিরা বৈধ চ্যানেলে অর্থ দেশে প্রেরণে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে।

এদিকে ডলারের বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারভিত্তিক করার আগে এই পদ্ধতি চালুকে কার্যকরী একটি পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন বেসরকারি ব্যাংকের সাথে সংশ্লিষ্ট। ব্যাংকগুলো এখন ১১৭ টাকার নিচে বা ওপরে ডলারের কেনাবেচা করতে পারছে। তবে এই দরের চেয়ে খুব বেশি কম বা বেশি দামে ডলারের লেনদেন করা যাবে না। প্রতিদিন কত দামে ডলার কেনাবেচা করছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সেটা জানিয়ে দিতে হবে। এছাড়া ক্রলিং পদ্ধতি চালুর ফলে চলমান ডলার-সংকট অনেকটা কেটে যাবে বলে মনে করেন এই ব্যাংকার।

এদিকে ডলারের দাম বাড়ায় আমদানি খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, এতদিন ডলার পাওয়া নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা থাকলেও পাওয়া যাচ্ছিল এবং দাম তুলনামূলক কম ছিল। এখন ডলারের দাম একবারে ৭ টাকা বাড়ানোর ফলে আমদানি ব্যয় বাড়বে, বাড়বে পণ্যের দাম। একই সঙ্গে বাড়বে মূল্যস্ফীতি। ফলে চাপ বাড়বে সাধারণ মানুষের ওপর। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, এখন থেকে ক্রলিং পেগ পদ্ধতিতে ডলার কেনাবেচা হবে। এ পদ্ধতিতে সম্প্রতি ডলারের রেট নির্ধারণ করা হয়েছে ১১৭ টাকা। মুদ্রানীতিতে একই সঙ্গে ডলারের বিনিময় মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে ক্রলিং পেগ পদ্ধতি ব্যবহারের চিন্তা করা হচ্ছে। ক্রলিং পেগ হলো একটি আর্থিক ব্যবস্থা, যা জাতীয় মুদ্রা বিনিময় হারকে একটি নির্দিষ্ট পরিসরে (ব্যান্ড) ওঠানামা করতে দেয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যান্ডের বাইরে চলে যাওয়া থেকে বিনিময় হার রাখতে চেষ্টা করে।

চীন, ভিয়েতনাম, নিকারাগুয়া এবং বতসোয়ানা এই ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এমন কয়েকটি দেশ। পেমেন্টের ভারসাম্যের স্থিতিশীলতা প্রচারের জন্য তারা এই সিস্টেমটি বেছে নেয়। এবং কখনও কখনও তারা রপ্তানি বাজারে দেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান বাড়াতে পর্যায়ক্রমে বিনিময় হার সামঞ্জস্য করে। মূল্যস্ফীতি হলো স্বতন্ত্র পণ্য ও পরিষেবার দাম বৃদ্ধি। এটি বিভিন্ন কারণে ঘটতে পারে। যেমন ক্রমবর্ধমান উৎপাদন খরচ, বর্ধিত চাহিদা বা সরকারিনীতি। বাজারে যদি কোনো পণ্য ও সেবার চাহিদা বেড়ে যায় এবং সে অনুযায়ী সরবরাহ না থাকে, তখন দাম বেড়ে যায়। আবার কোনো জিনিস তৈরি করতে যে সামগ্রী প্রয়োজন তার দাম বাড়লেও মূল পণ্যের দাম বেড়ে যায়। অন্যদিকে একটি দেশের জনসংখ্যা অনুপাতে পণ্য ও সেবা সরবরাহ পর্যাপ্ত না থাকলেও দামে এর প্রভাব পড়ে।

মুদ্রানীতিতে ২০২৪ সালের জুন মাসে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ১০ শতাংশ ও সরকারি খাতে লক্ষ্যমাত্রা ২৭ দশমিক ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ডিসেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ২ শতাংশ। সরকারি খাতে ছিল ১৮ শতাংশ। বেসরকারি উৎপাদনশীল খাতে ঋণ কমে গেলে উৎপাদন কার্য কমে যাবে; ফলে অনেক মানুষ কর্মহীন হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সরকারি খাতে তো ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধি করা হয়েছে।

ব্যাংকার ও ব্যবসায়ীরা বলেছেন, 'ক্রলিং পেগ পদ্ধতি চালুর ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে ডলারের দাম বাড়লেও এর জেরে আমদানিকৃত পণ্যের দাম বাড়ার সুযোগ নেই। কারণ প্রকৃত বিনিময় হার বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে। তাদের মতে, ডলারের অফিসিয়াল দাম ১১০ টাকা হলেও খোলাখুলিভাবে ১১৮-১২০ টাকা বা তারও বেশি দামে বেচাকেনা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক এই ব্যবধান কমানোর পদক্ষেপ নিয়ে ডলারের গড় দাম ১১৭ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে। এরচেয়ে ১ টাকা কম বা বেশি রাখা যাবে ডলারের দাম।

ক্রলিং পেগ চালুর ফলে আমদানি ব্যয় খুব বেশি বা বাড়বে না। বরং ডলারের দামের এই সমন্বয় বাজার স্থিতিশীল রাখতে ভূমিকা রাখবে। দীর্ঘদিন ধরে ডলারের রেটকে ঘিরে অনিশ্চয়তায় থাকা আমদানিকারকরা এই অনিশ্চয়তা দূর হওয়ায় স্বস্তি পাবেন। এছাড়াও আমদানিকৃত পণ্যের বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা সহজ হবে। উল্টো ডলারের ভালো দাম পাওয়ায় রেমিট্যান্স প্রবাহ ও রপ্তানি আয়ের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক


রাখাইন নিয়ন্ত্রণে অপ্রতিরোধ্য আরাকান আর্মি

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ব্রি. জে. হাসান মো. শামসুদ্দীন (অব.)

রাখাইন রাজ্যের ওপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য আরাকান আর্মি (এএ) মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে অপ্রতিরোধ্যগতিতে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। এএ সিটওয়ে এবং চকপিউ শহর ঘিরে ফেলেছে এবং সিটওয়ে এবং চকপিউ বন্দরের কাছাকাছি চীনা-অর্থায়নকৃত তেল ও গ্যাস টার্মিনালের খুব কাছের এলাকায় যুদ্ধ করছে। সমগ্র আরাকান পুনরুদ্ধার করাই এএ’র উদ্দেশ্য এবং সে উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে তারা অপ্রতিরোধ্যগতিতে এগিয়ে চলছে। দক্ষিণ রাখাইনের আন ও থান্ডওয়ে টাউনশিপের পাশাপাশি বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী উত্তর রাখাইন, বুথিডং ও মংডুতেও লড়াই তীব্র আকার ধারণ করছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বাংলাদেশের সঙ্গে লাগোয়া ট্রাইজংশন থেকে শুরু করে মংডু-সংলগ্ন পুরো এলাকা বর্তমানে এএ’র নিয়ন্ত্রণে।

২০২২ সালের নভেম্বরে এএ জান্তার সঙ্গে একটি অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়। ব্রাদারহুড এলায়েন্স ২০২৩ সালের অক্টোবরে, অপারেশন-১০২৭ নামে জান্তার ওপর সমন্বিত আক্রমণ শুরু করার পর এএ চুক্তি লঙ্ঘন করে ১৩ নভেম্বর রাখাইন রাজ্যের রাথেডং, মংডু ও মিনবাইয়া শহরে পাঁচটি ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। রাখাইনে সেনাবাহিনীর ওপর এএ’র আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে এবং দিন দিন এর তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২৭ এপ্রিল অ্যানে ওয়েস্টার্ন রিজিওনাল কমান্ডের সদর দপ্তরের কাছের দুটি কৌশলগত অবস্থানে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এএ অ্যানসহ আরও তিনটি শহরতলীতে আক্রমণ চালাচ্ছে। পরবর্তী সময়ে এএ ৩০ এপ্রিল রাখাইন রাজ্যের বুথিডং টাউনশিপে হামলা চালিয়ে তিনটি আউটপোস্ট দখল করে। বর্তমানে রাখাইন রাজ্যের ১৭টি শহরতলীর মধ্যে আটটি এবং পার্শ্ববর্তী রাজ্য চিনের পালেতোয়া শহর এখন এএ’র নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। জান্তা স্থলপথে শক্তিবৃদ্ধি করতে সেনা পাঠাতে বাধার সম্মুখীন হচ্ছে এবং এএ তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালাচ্ছে। অ্যান টাউনশিপের গ্রামগুলোর কাছেও লড়াই তীব্র আকার ধারণ করেছে। চলমান সংঘর্ষের কারণে আশপাশের গ্রামের বাসিন্দারা বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে গেছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী অ্যান পর্যন্ত রাস্তা ও নৌপথ অবরোধ করে বাণিজ্য বন্ধ করে দেওয়ায় খাদ্য ও ওষুধ সংকটের কারণে মানুষ ভোগান্তিতে দিন কাটাচ্ছে।

রাখাইন রাজ্যে এএ ও সামরিক বাহিনীর মধ্যকার লড়াইয়ের তীব্রতার কারণে বিজিপি ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য প্রাণভয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বিজিপি, সেনাবাহিনী ও শুল্ক কর্মকর্তাসহ মিয়ানমারের ৩৩০ নাগরিককে ১৫ ফেব্রুয়ারি ও পরবর্তী সময়ে ২৮৮ জনকে ২৫ এপ্রিল বিজিপির কাছে হস্তান্তর করা হয়। এএ’র আক্রমণে বিজিপি সদস্যদের প্রাণভয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া অব্যাহত রয়েছে।

২০১৭ সালে রাখাইন থেকে রোহিঙ্গা বিতারণের পর ২০১৮ সালের শেষের দিকে এএ’র সঙ্গে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়। সে সময় আরাকানে ২ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। সংঘাতের সময় ইয়াঙ্গুন থেকে খাদ্যপণ্যের আমদানি বন্ধ হয়ে গেলে রাখাইনে মানবিক সমস্যাগুলো গুরুতর হয়ে ওঠে। রাখাইনে মানবিক সাহায্যের অনুমতি দেওয়া, এএ’র প্রশাসনিক কাজে এবং রাখাইনে বিচার-প্রক্রিয়ায় জান্তা বাহিনীর বাধা না দেওয়ার শর্তে ২০২০ সালের ২৬ নভেম্বর এএ জাপানের মিয়ানমার-বিষয়ক বিশেষ দূত সাসাকাওয়ার নেতৃত্বে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে একটি অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।

২০২০ সালের নির্বাচনে এনএলডি রাখাইনে ইউনাইটেড লিগ অব আরাকানের (ইউএলএ) কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। ক্ষমতায় থাকাকালীন সু চি-সরকার এএ’কে সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকাভুক্ত করে রেখেছিল। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারির সামরিক অভ্যুত্থানের পর রাখাইন রাজ্যে আপাত শান্তি বজায় ছিল। সেসময় দেশব্যাপী চলমান প্রতিরোধ আন্দোলন থেকে এএ’কে দূরে সরিয়ে রাখতে জান্তা সংগঠনটিকে কালো তালিকা থেকে বাদ দিয়ে তাদের সঙ্গে একটি অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতির আয়োজন করে। এএ ও ইউএলএ এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পুরোপুরি রাজনীতিতে মনোনিবেশ করে এবং রাখাইন রাজ্যে ব্যাপক গণসংযোগ চালায়। সেসময় রাখাইনের অনেক এলাকায় তাদের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ও তাদের রাজনৈতিক এবং বিচারিক নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে দেয়। উত্তর এবং দক্ষিণ রাখাইনের মধ্যে যুগ যুগ ধরে বিদ্যমান দূরত্ব কমিয়ে আনে এবং ধীরে ধীরে তারা রাখাইনবাসীদের একমাত্র আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠে। এএ রাখাইনে একটি শাসনব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসন, বিচার বিভাগ এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিতে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান তৈরির লক্ষ্যে কাজ করছে। জান্তা বিষয়টি ভালোভাবে গ্রহণ না করায় ২০২২ সালের আগস্ট এএ ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মধ্যে আবার তীব্র লড়াই শুরু হয়। ২০২২ সালের নভেম্বরে পুনরায় অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধ বিরতিতে উভয়পক্ষ সম্মত হয়।

এএ মিয়ানমারের জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নতুন হওয়া সত্ত্বেও দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সফল সংগঠনগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। এএ’র ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বের কারণে উত্তর ও দক্ষিণ রাখাইনে তাদের প্রভাব ও সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক তৈরি হয়। রাখাইনে এর আগে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর এভাবে সুসংগঠিত নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। এএ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর গত ১৫ বছরে উল্লেখযোগ্য অর্জনের মাধ্যমে তাদের লক্ষ্যের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এএ’র সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার জননিরাপত্তা। বিমান হামলা এবং ল্যান্ডমাইন থেকে নিজেদের রক্ষা করার বিষয়ে তারা বাসিন্দাদের ক্রমাগত সচেতন করছে। তারা ল্যান্ডমাইন পরিষ্কার করা, খাদ্য, ওষুধ, কৃষি খাতে সহায়তা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করছে। এএ বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্ত এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর নাফ নদীসহ এই সীমান্ত দিয়ে মাদক পাচার রোধে কাজ করে যাচ্ছে, তবে তা পুরোপুরি বন্ধ করতে তারা বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতা চায়। সম্প্রতি এএ’র মুখপাত্র থেকে জানা যায় যে, তারা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ভবিষ্যতে আরাকানের সব নাগরিকদের দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত। তারা আরাকানের সব নাগরিকের জন্য কাজ করছে এবং নিজেদের লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এএ লড়াই চালিয়ে যাবে।

এএ পূর্ণ আত্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মিয়ানমারের রাষ্ট্র কাঠামোর অধীনে ভবিষ্যতে আরাকান রাজ্য গড়ে তুলতে চায়। এএ’র মূল শক্তি হলো রাখাইনবাসীদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, ধর্মীয় সহনশীলতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের অঙ্গীকার। এএ নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে তাদের এক ধরনের স্বস্তিমূলক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে বলে জানা যায়। কিছু কিছু প্রশাসনিক কাজেও রোহিঙ্গাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে রাখাইনে ওদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো আর কেউ থাকবে না। এএ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন এবং আরাকানে নাগরিক মর্যাদাসহ তাদের বসবাসের বিষয়ে মিয়ানমার জান্তা সরকারের চেয়ে অনেক নমনীয়। অতীতে সেনা-সরকার ও এনএলডি রোহিঙ্গাদের প্রতি বিদ্বেষমূলক আচরণ দেখালেও এএ রোহিঙ্গাদের সঙ্গে নিয়েই এগোতে চায়। এএ রাখাইনে নিজস্ব প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও অন্যান্য অবকাঠামো তৈরির জন্য কাজ করে যাচ্ছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন টেকসই এ নিরাপদ করতে হলে এবং রাখাইনে যেকোনো ধরনের কার্যক্রম পরিচালনায় তাদেরসম্পৃক্ত করতেই হবে। বাংলাদেশ প্রান্তে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর শান্তিশৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হবে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি তাদের স্বাবলম্বী বানাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তায় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

রাখাইনে চলমান সংঘাত একটা দীর্ঘমেয়াদি সংকটের জন্ম দিতে পারে। জান্তা রাখাইনে ‘ফোর কাট স্ট্র্যাটেজি’ ব্যবহার করে সংঘাতপূর্ণ এলাকায়, খাদ্য, চিকিৎসাব্যবস্থা, যোগাযোগ বিছিন্ন করে এএ’কে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। চলমান সংঘাতে রাখাইনের সাধারণ মানুষ চরম দৈন্যদশায় রয়েছে এবং রাখাইন রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় দুর্ভিক্ষের অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। রাজ্যের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এবং উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত ও ধীর হয়ে পড়ছে। যুদ্ধ আরও তীব্র হলে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত জনগণের বাংলাদেশের সীমান্তের দিকে পালিয়ে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ আর কোনো মিয়ানমারের নাগরিককে প্রবেশ করতে দেবে না বলে জানিয়েছে। তাই বিকল্প হিসেবে থাইল্যান্ড-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে যে ধরনের মানবিক করিডোরের পরিকল্পনা করা হয়েছে রাখাইনে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তায় সে ধরনের করিডোর তৈরির পরিকল্পনা করা যেতে পারে।

অদূর ভবিষ্যতে রাখাইনের পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। রাখাইন রাজ্যটি ভু-কৌশলগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ বিধায় এখানে আঞ্চলিক দেশ ও অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও অন্যান্য স্বার্থ রয়েছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী এই গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যটি সহজে হাতছাড়া করবে না। রাখাইনের দখল নিয়ে এএ ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মধ্যে আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণ চলতে থাকবে এবং পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে। মিয়ানমার সরকার এবং এএ’র সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন, সীমান্ত নিরাপত্তা ও চলমান রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশের আরও কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

লেখক: এনডিসি, এএফডব্লিউসি, পিএসসি, এমফিল (অব.), মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা-বিষয়ক গবেষক


বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম ও চট্টগ্রামের আলম পরিবার

আপডেটেড ২৫ মে, ২০২৪ ১৬:০৮
ডেইজী মউদুদ

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন চট্টগ্রামের আলম পরিবারের (আলম ভ্রাতৃবর্গের) তৃতীয় সন্তান কবি দিদারুল আলমের সখা, বন্ধু। কবি দিদারুল আলম কবি জসীমউদ্‌দীনেরও সখা ছিলেন। এই পরিবারের একেবারে কনিষ্ঠ ভ্রাতা কবি ও শিক্ষাবিদ তাঁর জীবনী গ্রন্থ ‘পৃথিবীর পথিক’-এ লিখেছেন: ‘হঠাৎ চাটগাঁ শহরের তরুণেরা কলরবে মেতে উঠলো। স্কুল-কলেজের ছেলেরা ভিড় জমালো হবীবুল্লাহ বাহারের তামাকুমণ্ডিস্থ বাড়িতে। উঠানে, দাওয়ায়, ঘরের বাহিরে, ভিতরে চাটগাঁর তরুণরা ভিড় জমিয়েছে। সেই ভিড়ের ভিতরে বাবরি চুল মেলে ডাগর চোখে তাকিয়ে রয়েছেন কবি নজরুল। পান খাচ্ছেন, আর হারমোনিয়াম দিয়ে গান করছেন আর অট্টহাসিতে সারাবাড়ি সরগরম করে করে রেখেছেন। নজরুলের পাশেই দিদার, ফজল আর বাহার। নজরুল যেনো চট্টগ্রামে বন্যা নিয়ে এসেছেন। মূলত কবি নজরুলের সাথে দিদারুল আলমের বন্ধুত্ব হয় তাঁর রেঙ্গুন ভ্রমণের সময় মাসিক দিপালীতে কবি দিদারুল আলম ‘জঙ্গি কবি ও অপরাপর কবিতা প্রকাশিত হয়। এই কবিতাটি তিনি কবি নজরুল ইসলামকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেই লিখেছিলেন। তখন থেকেই কবি নজরুল ইসলামের সাথে কবি দিদারুল আলমের তখন থেকেই সখ্য ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

কবি নজরুল যখন চট্টগ্রামে হবীবুল্লাহ বাহারের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন, তখন একদিন কবি দিদারুল আলম একটি নতুন ধরনের ট্যাক্সি নিয়ে হাজির হলেন সেই বাড়িতে। তিনি কবিকে বলেন, চলুন, আপনাকে গ্রাম দেখিয়ে আনি। কবি তো উড়ন্ত পাখি। তিনি তো উড়তেই চান। তাই সাথে সাথে বেরিয়ে পড়লেন ঘুরে বেড়ানোর বাসনায়। গাড়ির পেছনের সিটে সাহিত্যিক-শিক্ষাবিদ আবুল ফজল, মাঝে কবি নজরুল আরেক পাশে কবি দিদারুল আলম। দিনটি ছিল ১৯২৯ সালের জানুয়ারি মাস। গাড়িটি সোজা গিয়ে থামলো ফতেয়াবাদের ছড়ারকূলস্থ আলম বাড়িতে। আলম পরিবারের রূপকার সাহিত্যিক মাহবুব উল আলম তাঁর বিভিন্ন লেখায় কবি নজরুল ইসলামের সাথে তাদের পরিবারের সম্পর্কের কথা নানানভাবে ব্যক্ত করেছেন। তিনি লিখেছেন, সুপারি বাগানের মাঝখানে তিন খানি কুঁড়েঘর ও পুকুর এই আমাদের বাড়ি। তরুণদের স্রোত চলছে অবিরাম তীর্থযাত্রীর মতো, তাদের চোখ-মুখ ভাবদীপ্ত, কবি কখনো শুয়ে আছেন, কখনো আধশুয়ে ও বসে গল্প করছেন। কবিকে সেদিন আলম পরিবারের তরফ থেকে একটি মানপত্র উপহার দেওয়া হয়। মানপত্রটি আজও কালের সাক্ষী হয়ে পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ ভ্রাতা ওহীদুল আলমের ‘পৃথিবীর পথিক গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে। এই যুগের পাঠকদের জন্য মানপত্রটি এই লেখার সাথে সংযুক্ত করলাম।

‘কবি নজরুল ইসলাম করকমলেষু

হে সৈনিক কবি,

তোমার অগ্নিবীণায় যেদিন বিদ্রোহের সুর ঝংকার দিয়ে উঠেছিল, সেদিন এই সুদূরে আমরা ‘কটি ভাই তোমায় অন্তরের অন্তস্থলে বরণ করে নিয়েছিলাম। সেদিন তোমার বহ্নি ক্রীড়ার মধ্যে আমরা তোমায় ছিনেছিলাম, আজ তোমার বুলবুলের গানেও আমরা তোমায় চিনেছি। তুমি আমাদের অতিকালের চেনা, আমাদের চির চপল সাথী, আমাদের চির সহযাত্রী। অভিনন্দন জানাবো না বন্ধু, শুধু তোমার বুকে ধরে অন্তরের গোপন কথা শুনিয়ে যাবো।

হে ব্যথার কবি,

মানব মনের শাশ্বত বেদনা তোমার নিপুণ তুলিকায় যে অপার রূপ পেয়েছে বাংলা সাহিত্যে তার তুলনা নেই। ব্যথা বিষে নীলকণ্ঠ কবি তুমি, ব্যথার উদ্বোধন করতে যেয়ে যে বিষ তোমায় গলধঃকরণ করতে হয়েছে, তা ই তোমার ললাটে জয়টিকা হয়ে ফুটে উঠেছে। ভয় নেই বন্ধু, বাংলায় তুমি যে তরুণ দলের সৃষ্টি করেছো, তাদের ললাট তোমার জয়টিকার জ্যোতিতে ভাস্বর হয়ে উঠেছে। কারবালা প্রান্তরে বীর হোসেনের আত্মা তোমার হায়দারী হাঁকে আবার জেগেছে যেন- ‘এরা শির দেয়, তবু দামামা দেয় না। বন্ধু ভোঁতা হয়ে গেছে সীমারের খঞ্জর, তরুণের অরুণ আভায় তাঁর প্রান্তে অসি ঝলসিয়ে গেছে।.. .. . ... .. .. হে প্রাণের কবি,

সোনার কাঠি, রূপার কাঠি ছুঁইয়ে এই ঘুমন্ত পুরীতে তুমি প্রাণ দিয়েছো। অসত্যের বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অত্যাচারের বিরুদ্ধে তোমার যে অভিযান, তা সফল হোক, সার্থক হোক।

ইতি

চির তোমারই

আলম পরিবার । ফতেয়াবাদ, চট্টগ্রাম। ২৬ জানুয়ারি, ১৯২৯ ।

সংবর্ধনার পরে খাবারের আয়োজন। কবি ছিলেন অল্পহারী। তবুও খেতে বসে পুকুরের তাজা মাছের প্রশংসা করেন। কবির আগমনে আলম পরিবারের কর্ত্রী মৌলভী নসিহউদ্দীনের সহধর্মিণী অর্থাৎ সাহিত্যিক শামসুল আলম, মাহবুব উল আলম, কবি দিদারুল আলম ও ওহীদুল আলমের মাতা আজিমুন্নেছা তাঁর পালিত প্রিয় মোরগ জবাই করেছিলেন। রাঁধলেন নিজ হাতে। কারণ, কবি তাঁর পুত্র দিদারুল আলমের বন্ধু, তাই সেদিন খুশিতে তাঁর সীমা ছিলো না। আমন্ত্রিত পুত্রতুল্য কবিকে তিনি নিজ হাতে খাবারও পরিবেশন করেছিলেন।

তবে সেদিন পরিবারের কনিষ্ঠ ভ্রাতা কবি ওহীদুল আলম বাড়ি ছিলেন না। তিনি রেঙ্গুনে ছিলেন। সেই দুখের কথা বহু লেখায় তিনি ব্যক্ত করেছেন। তবে পরবর্তীকালে ১৯৩৩ সালে কবি নজরুল ইসলাম মে মাসে রাউজানে সাহিত্য সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন। সেই সম্মেলনে তাঁর বড়ভাই সাহিত্যিক মাহবুব উল আলম কবি ওহীদুল আলমকে নিয়ে কবির সামনে হাজির হন। কবিকে ভাইয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, আমার ছোট ভাই ওহীদ, কবিতা লেখে, আপনার সাথে দেখা করতে এসেছে। আপনি যখন আমাদের বাড়িতে গিয়েছিলেন, তখন সে রেঙ্গুন পালিয়ে গিয়েছিল। মুহূর্তেই

কবি নজরুল তাঁর ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দুলিয়ে ডাগর ডাগর চোখে কবি ওহীদুল আলমের দিকে তাকান। একটু কাছে ডেকে পিঠে হাত বুলিয়ে বলেন, পালিয়ে গিয়েছিস? বেশ করেছিস! কারণ কবি নিজেই পলায়ন মনোবৃত্তির। তবে হঠাৎ কবি গভীর বেদনায় আচ্ছন্ন হয়ে গেলেন তাঁর প্রিয় বন্ধু কবি দিদারুল

আলমের মৃত্যুসংবাদ শুনে। কারণ ইতোপূর্বে অতি অল্প বয়সেই কবি দিদারুল আলম পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছিলেন। মূলত বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাথে আলম পরিবারের যে বন্ধুত্বের বন্ধন ছিল, তা আজ কেবলি স্মৃতি। সমকালীন সেসব ঘটনা সঠিকভাবে বর্ণনা করার কোনো চাক্ষুষ সাক্ষী এখন আর নেই। যা আছে কেবল সাহিত্যিক মাহবুব উল আলম আর কবি ওহীদুল আলমের বর্ণিত স্মৃতিকথায়। এ বিষয় নিয়ে সঠিক ও বিস্তারিত তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে গবেষণাধর্মী লেখালেখি এখন সময়ের দাবি। তা না হলে নতুন প্রজন্মের কাছে এই বিষয়গুলো কল্পকাহিনিতে পরিণত হবে।

তবে ২০০১ সালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ফতেয়াবাদের আলম বাড়ির গেটে একটি ফলক নির্মাণ করা হয়, যা কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে গেলেই মনে হবে মধু কবির মতো কেউ যেনো বলছেন, ‘দাঁড়াও , পথিকবর / জন্ম যদি তবে বঙ্গে, তিষ্ঠ ক্ষণকাল, এ সমাধিস্থলে.. .. ’।


অজ্ঞান পার্টির উপদ্রব: করণীয়

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
আহমেদ কবির রিপন

দেশের অন্যান্য স্থানের মতো সিলেট সিটিতে গণপরিবহন, অটোরিকশা, বাস ও সিএনজিতে যাত্রীরা নানা ধরনের ভোগান্তির শিকার। গোপন কৌশলে যাত্রীবেশে পাশে বসে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ও মুখে স্প্রে মেরে অজ্ঞান করে, যাত্রীর সঙ্গে থাকা মূল্যবান সব জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে দ্রুত গা-ঢাকা দেয়। এ ধরনের ঘটনার শিকার হয়ে ভুক্তভোগীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অগণিত ঘটনার ভিডিওসহ পুরো কাহিনি প্রকাশিত হয়েছে। ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের বর্ণনা মতে, সিলেট ঢাকা রোডের হুমায়ুন রশিদ চত্বর পয়েন্ট থেকে চারদিকে বিভিন্ন রোডে যাওয়ার জন্য এ পয়েন্ট হতে সিএনজি ও অটোরিকশার নির্ধারিত স্ট্যান্ড। শহরের অভ্যন্তরে বিভিন্ন পয়েন্টের সঙ্গে সিএনজি, অটোরিকশার যোগাযোগের সুবিধাজনক স্থান। এখান থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে রোড ও ট্রেনে যাতায়াতের বড় পয়েন্ট। অটোরিকশা ও সিএনজি ড্রাইভাররা এখান থেকে যাত্রীদের নির্ধারিত স্থানে নিয়ে যান। হুমায়ুন রশিদ চত্বর থেকে সিলেট বন্দর, আম্বরখানা, ওসমানী মেডিকেল, টিলাগড়, মদিনা মার্কেটসহ বিভিন্ন পয়েন্টে যাতায়াত করে থাকে। ঘটনার বিবরণে জানা যায়, যাত্রীবেশে দুষ্কৃতকারীরা সিএনজি অটোরিকশায় উঠে এবং পেছনের সিটে বসে, পাশের সিটের যাত্রীকে টার্গেট করে তাদের অপকর্ম চালায়, পুরুষ যাত্রীদের বেলা পকেটে কী আছে, সঙ্গে মূল্যবান জিনিসের প্রতি তাদের নজর থাকে। মুখে স্প্রে করে অথবা রুমালে ওষুধ মেশানো কাপড় নাকের কাছে নিলেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অচেতন হয়ে যায়। তখন সিএনজিতে অন্য যাত্রী থাকলে তাকে কৌশলে নামিয়ে দিয়ে। দুষ্কৃতকারীরা আক্রান্ত যাত্রীর সঙ্গে থাকা মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে পথের মাঝে রেখে চলে যায়। ততক্ষণে ওষুধের কার্যকারিতা শেষ হয়ে গেলে আক্রান্ত যাত্রী সে ঘটনার কোনো বিষয় স্মরণ থাকে না। মহিলা যাত্রীদের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে, পেছনে হাত নিয়ে কৌশলে স্প্রে করে, যখন সেন্স থাকে না, সে মুহূর্তে যাত্রীর সঙ্গে থাকা মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে তারা গাড়ি থামিয়ে নেমে যায়। কোনো কোনো যাত্রীর দেওয়া বর্ণনাতে জানা যায়, মহিলা যাত্রীর সঙ্গে অন্য কোনো লোক না থাকলে যাত্রীকে কৌশলে দুষ্কৃতকারীরা তার সঙ্গের মূল্যবান জিনিসপত্র ও মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে তাকে সুবিধামতো স্থানে নিয়ে, তার সঙ্গে অনৈতিক কাজ করে। ফেলে রেখে চলে যায়। পরক্ষণে ওষুধের ক্ষমতা শেষ হলে, যাত্রী স্বাভাবিক হলেও সে কোনো কিছু বলতে পারে না। মাঝে মধ্যে দূরপাল্লার বাস ও ট্রেনের যাত্রীরা এ ধরনের ঘটনার শিকার হয়ে থাকেন। যেহেতু বিচ্ছিন্ন ঘটনা পরিকল্পিতভাবে ঘটিয়ে দুষ্কৃতকারীরা খুব অল্প সময়ের মধ্যে গা-ঢাকা দেয়। তখন পথচারীরা আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসা বা গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কাজে ব্যস্ত থাকেন। ততক্ষণে ওই চোরের দল উদাও হয়ে নিরাপদ স্থানে চলে যায়। ভুক্তভোগী কার কাছে নালিশ দেবে, কে তার সাক্ষী দেবে, শেষমেষ সব ক্ষয়ক্ষতির বোঝা ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিয়ে ভুক্তভোগীরা বিরত থাকেন।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা কোর্ট কাচারিতে উপযুক্ত প্রমাণাদী, সাক্ষীর বক্তব্য ছাড়া কোনো এজাহার গ্রহণযোগ্য নয়। শেষমেষ এভাবে ঘটনার ইতি হয়ে আসে। কোনো কোনো ঘটনায় ওই সিএনজি বা অটোরিকশা চালকের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিললেও কোনো সুবিচার পাওয়া যাচ্ছে না।

যেহেতু রাস্তায় যাতায়াতের সময় বিচ্ছিন্নভাবে ঘটনাগুলো ঘটে থাকে, তখন পথচারীরা ঘটনার পর যার যার গন্তব্যে চলে যায়, এ অবস্থায় সাক্ষী পাওয়া বা ঘটনার পুরো বর্ণনা ব্যাখা দেওয়ার মতো লোক থাকে না। সেহেতু এসব ঘটনা আইনি প্রক্রিয়ায় পড়ে না, সুবিচার পাওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না।

অন্যদিকে সিটি করপোরেশনের আওতাধীন রাস্তাগুলোতে টহল পুলিশ আরও জোরদার করা দরকার। আমরা দেখছি হুমায়ুন রশিদ চত্বরে পুলিশ ফাঁড়ি আছে, আম্বরখানা পয়েন্টেও পুলিশ ফাঁড়ি আছে, বন্দরে সিলেট সিটির কেন্দ্রীয় পুলিশ ফাঁড়ি রয়েছে। তারা আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখলে, যাত্রী সাধারণের জানমাল নিরাপদ হবে। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা থেকে যাত্রী সাধারণ নিরাপদে যাতায়াতের স্বার্থে হাইওয়ে পুলিশ ও বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মনোযোগ আকর্ষণ করছি। পাশাপাশি সব গাড়ির চালক ও ট্রেড ইউনিয়নের নেত্রী এবং গাড়ির মালিক সমিতির নেত্রীবৃন্দের সমন্বয়ে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন আছে।

লেখক: সাংবাদিক ও পরিবেশকর্মী


নিউইয়র্ক বইমেলার তেত্রিশ বছর

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ফকির ইলিয়াস

নিউইয়র্ক মহানগরী এখন সরগরম। বইমেলার আমেজে ব্যস্ত বাঙালিপাড়া। অনেক অতিথি, লেখক, প্রকাশক ইতোমধ্যে নিউইয়র্কে আসতে শুরু করেছেন। এবারের বইমেলা উদ্বোধনের জন্য বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার আসার কথা রয়েছে।

এটা ভাবতেই গর্ববোধ হয় যে, মুক্তধারা ফাউন্ডেশন আয়োজিত নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বইমেলা এবার ৩৩ বছর পার করছে। ২৪, ২৫, ২৬ ও ২৭ মে ২০২৪ চার দিনব্যাপী নিউইয়র্কে এবার আয়োজিত হচ্ছে বহির্বিশ্বের এমন বড় বইমেলা।

অতিথিদের মাঝে আরও আছেন ফরিদুর রেজা সাগর, ড. সৌমিত্র শেখর, ডা. সারোয়ার আলী, প্রহ্লাদ রায়, আফজাল হোসেন, রূপা মজুমদার প্রমুখ।

গান গাইবেন রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যাসহ উত্তর আমেরিকার শিল্পীরা।

নিউইয়র্কে এখন শীতের বিদায়ের কাল। গ্রীষ্ম আসতে শুরু করেছে। এরই মাঝে জমে উঠেছে বইমেলার আয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বইমেলার ঢেউ। আড্ডায় মুখরিত নিউইয়র্ক। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে ছুটে আসছেন লেখকরা। আসছেন কানাডা, জার্মানি, সুইডেন, ইংল্যান্ড, কলকাতা, বাংলাদেশ থেকে। এসেছেন প্রকাশকরাও।

এবারের নিউইয়র্ক বইমেলা বাংলাদেশ তথা গোটা বিশ্বে মানুষে মানুষে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বাণী নিয়েই অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ‘যত বই তত প্রাণ’- এই মূলমন্ত্র এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়।

গত কয়েক বছরের মতো, এবারের মেলাও হচ্ছে বেশ জমজমাট আয়োজনে। নিউইয়র্কের বাঙালি অধ্যুষিত জ্যামাইকার একটি পারফর্মিং হলে এবার হচ্ছে বইমেলা। হলের বাইরে তাঁবু টাঙিয়ে থাকবে বইয়ের স্টলগুলো।

এবারের বইমেলায় দুই বাংলার বেশ কয়েকটি বড় বড় প্রকাশনা সংস্থা যোগ দিচ্ছে। বই কেনা যাবে অনলাইনে এবং বিশেষ ছাড়ে।

মুক্তধারা ফাউন্ডেশন আয়োজিত এবারের বইমেলা তার ৩৩ বছর পূর্ণ করছে। নিউইয়র্কে ১৯৯২ সালে ‘মুক্তধারা’ এবং ‘বাঙালির চেতনা মঞ্চ’ নামে দুটি সংস্থা ও সংগঠনের উদ্যোগে বইমেলা শুরু হয়। ‘বাঙালির চেতনা মঞ্চ’ ছিল মূলত একঝাঁক শানিত তরুণের সাংস্কৃতিক ফোরাম। প্রবাসে বাংলা ভাষা সাহিত্য, সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং লালন করার প্রত্যয় নিয়েই জন্ম নেয় এই সংগঠনটি। মহান ভাষা দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘ চত্বরে অস্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ করে একুশে ফেব্রুয়ারি পালন ও শুরু হয় এই মুক্তধারা ও বাঙালির চেতনা মঞ্চের উদ্যোগে। নিজ কাঁধে বইয়ের বাক্স বহন করে ফিরে বইমেলা জমাবার প্রত্যয়ী ছিলেন মুক্তধারার কর্ণধার শ্রী বিশ্বজিত সাহা। আমি দেখেছি চোখে-বুকে একটিই স্বপ্ন, প্রবাসে পরিশুদ্ধ পাঠকশ্রেণি গড়ে উঠবে। আমি এখনো ভাবি, এক সময়ের তুখোড় সাংবাদিক বিশ্বজিত সাহা তো প্রবাসে এসে অন্য পেশাও গ্রহণ করতে পারতেন। তিনি তা করেননি কেন? করেননি এ জন্য, বাংলা ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন প্রবাসী বাঙালির মাঝে। প্রশ্নটির উত্তর আমি এখন পেয়ে যাই খুব সহজে। যখন দেখি জ্যাকসন হাইটেসের সুপরিসর ‘মুক্তধারা’ গ্রন্থকেন্দ্রে বসে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কিংবা ড. হুমায়ুন আজাদ, আনিসুল হক, হাসান আজিজুল হক, সমরেশ মজুমদার তাদের বইয়ে পাঠককে অটোগ্রাফ দিচ্ছেন ও দিয়েছেন। নিউইয়র্কে ১৯৯২ সালে প্রথম বইমেলাটির উদ্বোধক ছিলেন ড. জ্যোতি প্রকাশ দত্ত। ১৯৯৩ সালে কবি শহীদ কাদরী মেলা উদ্বোধন করেন। ১৯৯৪ সালে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল, ১৯৯৫ সালে পুরবী বসু, ১৯৯৬ সালে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, ১৯৯৭ সালে হ‍ুমায়ূন আহমেদ, ১৯৯৮ সালে সৈয়দ মোহাম্মদ উল্লাহ, ১৯৯৯ সালে দিলারা হাশেম, ২০০০ সালে ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন, ২০০১ সালে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বইমেলা উদ্বোধন করেন। ২০০১ সালে দশম বইমেলার বর্ণিল আয়োজনে একযোগে এসেছিলেন- সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, হ‍ুমায়ূন আহমেদ ও ইমদাদুল হক মিলন। ২০০২ সালে বইমেলা উদ্বোধন করেন ড. হুমায়ুন আজাদ। ২০০৩ সালে কবি জয় গোস্বামী আসেন উদ্বোধক হিসেবে। মুক্তধারার উদ্যোগে ২০০৪ সালে দুটি বইমেলা অনুষ্ঠিত হয় যুক্তরাষ্ট্রে। ওই বছর নিউইয়র্কের বইমেলা উদ্বোধন করেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ও লসএঞ্জেলেসে রাবেয়া খাতুন। ২০০৫ সালের বইমেলার উদ্বোধক ছিলেন ড. আবদুন নূর। ২০০৬ সালে পঞ্চদশ বইমেলা উদ্বোধন করেন কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক। যুক্তরাষ্ট্রে নতুন আঙ্গিকে বইমেলা শুরু হয়েছে ২০০৭ সাল থেকে। বইবিপণি ‘মুক্তধারা’র সহযোগী সংগঠন ‘মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বইমেলা রূপ নিয়েছে আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসবে। এই উৎসবের অংশ হিসেবে চারটি বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে ২০০৭ সালে। নিউইয়র্কে ড. গোলাম মুরশিদ, ডালাসে ড. আনিসুজ্জামান, লস এঞ্জেলেসে সমরেশ মজুমদার এবং নিউজার্সিতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এসব বইমেলা উদ্বোধন করেন।

২০০৮ সালে বইমেলা উদ্বোধন করেন কবি রফিক আজাদ। ২০০৯ সালে বইমেলা উদ্বোধন করেন হাসান আজিজুল হক। ২০১০ সালে বইমেলা উদ্বোধন করেন কবি সৈয়দ শামসুল হক। ২০১১ সালে বইমেলা উদ্বোধন করেন তপন রায় চৌধুরী। ২০১২ সালে বইমেলা উদ্বোধন করেন শামসুজ্জামান খান। ২০১৩ সালে বইমেলা উদ্বোধন করেন কবি নির্মলেন্দু গ‍ুণ। ২০১৪ সালে বইমেলা উদ্বোধন করেন কবি মহাদেব সাহা। ২০১৫ সালে বইমেলা উদ্বোধন করেন অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।

২০১৬ সালে বইমেলা উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন।

২০১৭ সালে ২৬তম বইমেলা উদ্বোধন করেন করেন বিশিষ্ট লেখক এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক পবিত্র সরকার। ওই বইমেলায় অতিথি হয়ে এসেছিলেন ভারত থেকে অধ্যাপক পবিত্র সরকার এবং বাংলাদেশ থেকে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান।

২০১৮ সালে উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার।

২০১৯ সালের ১৪, ১৫, ১৬ ও ১৭ জুন ছিল এই মেলা। এটি উদ্বোধন করেন কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী।

১৪ জুন ২০১৯ ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে ডাইভার্সিটি প্লাজা থেকে বর্ণাঢ্য র‌্যালির মাধ্যমে শুরু হয় এ বইমেলা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন, কনসাল জেনারেল সাদিয়া ফয়জুননেসা, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী, কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, আনিসুল হক, নাট্যব্যক্তিত্ব জামালউদ্দিন হোসেন, মুক্তিযোদ্ধা-বিজ্ঞানী-লেখক ড. নূরন্নবী, ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগের প্রধান রোকেয়া হায়দার, জ্ঞান ও সৃজনশীল সমিতির নির্বাহী পরিচালক মনিরুল হক, প্রকাশক মেসবাহউদ্দিন আহমেদ প্রমুখ।

২০২০ সালে এই বইমেলা হয় ভার্চুয়ালি। যা ঢাকা থেকে উদ্বোধন করেন জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম। ২০২১-এর বইমেলাও ভার্চুয়ালি উদ্বোধন করেন কানাডা থেকে কবি আসাদ চৌধুরী। ২০২২ সালে বইমেলার উদ্বোধক হয়ে আসেন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক অমর মিত্র। ২০২৩ সালে বইমেলা উদ্বোধন করেন কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামান।

খুবই আনন্দের কথা, বিশ্বজিত সাহা ও মুক্তধারা আমাদের এই তেত্রিশ বছরে এসব গুণীজনের সান্নিধ্য পাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। অভিবাসী প্রজন্মের হাতে লেগেছে এসব মহান মানুষের হাতের পরশ। সময় এসেছে অভিবাসী লেখকদের মূল্যায়ন করার। যেসব বাঙালি লেখক উত্তর আমেরিকায় বাংলা ভাষায় লেখালেখি করেন তাদের সম্মান জানাবার। অনুষ্ঠানিকভাবে সম্মান জানানো যেতে পারে আমেরিকায় জন্ম নেওয়া প্রজন্মকে, যারা ইংরেজি ভাষায় লেখালেখি করছে।

একুশের চেতনা এবং বইমেলাকে উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য আরও তৎপরতা বাড়াবার সময়টিও এসেছে এখন।

এই বইমেলার অর্জন অনেক। ২০২১ সালে এই বইমেলায় মুক্তধারা সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক সমরেশ মজুমদারকে। তিনি সেই বইমেলায় আসেননি, না করোনা চলার কারণে। এই পুরস্কারের অর্থমূল্য ২ হাজার ৫০০ ডলার। এই সম্মাননা তুলে দেন জিএফবির কর্ণধার গোলাম ফারুক ভূঁইয়া। তার আর্থিক সহযোগিতাতেই এই পুরস্কারের প্রচলন হয়।

এর আগে এই মুক্তধারা-জিএফবি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন কবি নির্মলেন্দু গ‍ুণ, প্রাবন্ধিক শামসুজ্জামান খান ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, কথাসাহিত্যিক দিলারা হাশেম ও কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। ২০২২ সালে এই পুরস্কার পান লেখক গোলাম মুরশিদ। ২০২৩ সালে এই সম্মাননা পান কবি আসাদ চৌধুরী।

২০২০ সাল থেকে এই বইমেলা উপলক্ষেই আরেকটি সাহিত্য পুরস্কার প্রবর্তন করা হয়েছে। ‘শহীদ কাদরী স্মৃতি-সাহিত্য পুরস্কার’ নামে এই পুরস্কারটি পাবেন বাংলাদেশের বাইরে বসবাসকারী একটি বইয়ের জন্য একজন লেখক।

নিউইয়র্ক বাংলা বইমেলা-২০২৪-এর আহ্বায়ক, সুপরিচিত লেখক হাসান ফেরদৌস। তিনি জানিয়েছেন, বইমেলা সফল করার সব আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে।

শিশু-কিশোরদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কবিতা পাঠ, আবৃত্তি, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, নাচ-গান, সেমিনার, মুক্তধারা ভাষণ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে সাজানো হয়েছে চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার।

এবারের মেলায় একটি বিতর্ক রয়েছে, ‘প্রবাসে সাহিত্য চর্চা মূল্যহীন’-শিরোনামে, যা অভিবাসীদের মাঝে বেশ হাস্যরসের জন্ম দিয়েছে।

এবারের বইমেলা উপলক্ষে চিকিৎসক, লেখক ও কবি হুমায়ুন কবির সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিন ‘ঘুংঘুর’ বের করছে বিশেষ সংখ্যা। এই সংখ্যার অতিথি সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন বিশিষ্ট চিন্তক, লেখক ড. আবদুন নূর।

প্রজন্ম এখন প্রযুক্তিনির্ভর। অনেক অ্যাপ এখন সহজ করে দিয়েছে জনজীবন। এমন একটি চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়নের স্বপ্নই ছড়িয়ে দিতে চাইছে নিউইয়র্কের বইমেলা।

বই কেনা যাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। মানুষ জ্ঞানী হয়ে না উঠতে পারলে সমাজ থেকে আঁধার দূর হয় না। আর সেই আঁধার যদি হয় সাম্প্রদায়িক উসকানি কিংবা হানাহানির- তাহলে তো শঙ্কার সীমাই থাকে না।

এবারের বইমেলা শান্তির আলো নিয়ে আসুক। মানুষের জন্য উন্মোচিত হোক জ্ঞানের দরজা- এই প্রত্যাশায় লেখক ও পাঠকরা সমবেত হছেন নিউইয়র্কে। মানুষে মানুষে সৌহার্দ্য আর প্রীতির বন্ধনে আবার জাগুক বিশ্ব।

লেখক: কবি ও কলামিস্ট


অন্যের সম্পদ সুরক্ষার গুরুত্ব

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
সৈয়দ এনাম-উল-আজিম

আমরা মুসলমান। আমাদের ধর্মের নাম ইসলাম। আলহামদুলিল্লাহ! মহান রাব্বুল আলামিন মহানবীর (সা.) ওপর পবিত্র কোরআন নাজিল করার মাধ্যমে ইসলামকে পরিপূর্ণ ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন আমাদের জন্য। ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস এবং প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোর কারণেই অন্যান্য ধর্মের চেয়ে ইসলাম স্বতন্ত্র ও মহৎ।

আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়, মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর বাণীবাহক সর্বশেষ নবী, সাম্য, নারীর মর্যাদা, অন্যের হক আদায়, প্রতিবশী ও মা-বাবার প্রতি সদাচার সহমর্মিতা, উত্তম চরিত্র, সত্যবাদিতা, ন্যায়নিষ্ঠতা, অন্যের সম্পদ সুরক্ষা ইত্যাদি হচ্ছে ইসলাম ধর্মের প্রধান বৈশিষ্ট্য, যা মানুষকে আকর্ষণ করে ইসলামের প্রতি।

আজ আমরা ইসলামের অন্যতম বৈশিষ্ট্য আমানত বা পর সম্পদ সুরক্ষার বিষয়ে আলোচনা করব।

মহান আল্লাহ বলেন ‘যে অন্যের হক নষ্ট করে সে ঈমানদার নয়’।

★ প্রিয় নবী (সা.) ছোটবেলা থেকেই আমানতদার ছিলেন। ছিলেন পরম বিশ্বাসী সবার কাছে। তাই তিনি ছিলেন ‘আল আমিন’ ছোটবেলা থেকেই। আর তাই খ্রিষ্টান, ইহুদি সব মতবাদের লোকেরাই তাকে বিশ্বাস করত এবং তার কাছে অতি মূল্যবান আসবাবপত্র গচ্ছিত রাখত। তিনি সেগুলো খেয়ানত বা নষ্ট তো করতেনই না। অধিকন্তু পরম যত্নে সেগুলো তিনি রক্ষা করতেন এবং চাহিবামাত্র আমানতকারীদের তা ফেরত দিতেন।

★পবিত্র কোরআনে বারবার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে আমানত রক্ষার প্রতি। আল্লাহতায়ালা বলেন, তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং মানুষের ধন-সম্পদের কিয়দংশ জেনে-শুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তা বিচারকের কাছে পেশ করো না। (সূরা আল-বাকারা, আয়াত-১৮৮)

★আরও বর্ণিত আছে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা আমানতকে তার মালিকের কাছে প্রত্যর্পণ করো বা ফেরত দাও। (সূরা আন-নিসা, আয়াত-৫৮)

★প্রকৃত ইমানদার হওয়ার আলামত হলো আমানত রক্ষা করা। এ সম্বন্ধে আল্লাহতায়ালা বলেন, আর (তারাই প্রকৃত মুমিন) যারা আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। (সূরা আল-মুমিনুন, আয়াত-৮)

★হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, যদি তোমাদের মধ্যে চারটি জিনিস থাকে, তবে পার্থিব কোনো জিনিস হাতছাড়া হয়ে গেলেও তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।

★আর সেই চারটি জিনিস হলো- এক. আমানতের হেফাজত করা। দুই. সত্য ভাষণ বা সত্য কথা বলা। তিন. উত্তম চরিত্র। চার. পবিত্র রিজিক বা হালাল উপার্জন। (মুসনাদে আহমদ)

★ভেবে দেখার সময় হয়েছে। এই গুণগুলো আমাদের মধ্যে আছে কি না! দুনিয়ার লোভে পড়ে কোন পাপ কাজটি আমরা করি না। মিথ্যা কথা বলা থেকে শুরু করে আমানতের খেয়ানত পর্যন্ত সবই আমরা করে বেড়াই। লোক ঠকাই। মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করি।

অথচ আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, যার চরিত্রে আমানতদারি নেই, তার ইমান নেই। আর যে অঙ্গীকার রক্ষা করে না তার দ্বীন নেই। (মুসনাদে আহমাদ)।

★অন্য হাদিসে তিনি বলেছেন, মুনাফিকের লক্ষণ তিনটি- যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন ওয়াদা করে তখন তা ভঙ্গ করে আর যখন তার কাছে আমানত রাখা হয়, তখন সে তার খেয়ানত করে। (বুখারি, মুসলিম)।

★রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব এটাও একটি আমানত। এরও যথাযথ হেফাজত করতে হবে। মানুষের প্রাপ্য মানুষদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। এখানে খেয়ানত করলেও আল্লাহতায়ালার কঠিন আজাবে পাকড়াও হতে হবে।

★ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.) ঘোষণা করেছিলেন, আমার রাষ্ট্রের একটি কুকুরও যদি না খেয়ে মারা যায়, এর জন্য আমিই দায়ী হবো।

*তিনি রাতের আঁধারে ঘুরে ঘুরে প্রজাদের খোঁজখবর রাখতেন। কেউ অভুক্ত থাকলে নিজের কাঁধে খাবারের বস্তা বহন করে তার বাড়িতে দিয়ে আসতেন।

★ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলীর (রা.) খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পরে এক রাতে তিনি বাতির আলোতে রাষ্ট্রীয় কাজ করছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি বিশেষ প্রয়োজনে তার কাছে এল। আলী (রা.) সঙ্গে সঙ্গে বাতি নিভিয়ে দিলেন।

তারপরে আগত ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলা শুরু করলেন। আগন্তুক কৌতূহলী হয়ে তার কাছে এর কারণ জানতে চাইলে তিনি জবাব দিলেন, এতক্ষণ আমি সরকারি কাজ করছিলাম। তাই সরকারি তেল ব্যবহার করেছি।

এখন তো ব্যক্তিগত কাজ করছি। সরকারি বাতি ব্যবহার করলে এটা আমানতের খেয়ানত হবে।

আরেকটি প্রসিদ্ধ হাদিসে নবীজি বলেছেন,
আল্লাহ তোমাদের তিনটি কাজ অপছন্দ করেন, (১) অনর্থক কথাবার্তা, (২) সম্পদ নষ্ট করা এবং (৩) অত্যধিক সাওয়াল করা।
(সহি বুখারি: ১৪৭৭)

হাদিসে বর্ণিত ‘সম্পদ নষ্ট করা’ কথাটি অনেক ব্যাপক। চতুর্থ শতাব্দীর প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকিহ আল্লামা খাত্তাবি (মৃত্যু: ৩৮৬) এ প্রসঙ্গে অতি উত্তম ও সিদ্ধান্তমূলক আলোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, সম্পদ নষ্ট করার অনেক সুরত রয়েছে। তবে এর মূল কথাটি হলো, ব্যয় করার ক্ষেত্রে সীমা লঙ্ঘন করা, অপাত্রে ব্যয় করা, প্রয়োজনীয় খাতে খরচ না করে অপ্রয়োজনীয় খাতে খরচ করা। তিনি আরও লিখেছেন, একজন ব্যক্তির এমন কিছু সম্পদ রয়েছে, যেগুলোর যথাযথ যত্ন না নিলে নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যেমন গোলাম, বাঁদি, গবাদি পশু প্রভৃতি। এ ক্ষেত্রে এসবের যথাযথ ও প্রয়োজনীয় যত্ন না নেওয়াও হাদিসে বর্ণিত সম্পদ নষ্ট করার অন্তর্ভুক্ত হবে। (আল্লামা খাত্তাবি কৃত শরহে বুখারি)

বর্তমানে আমরা একটি প্রবণতা লক্ষ করে থাকি। অনেক বাবা-মা বা পরিবারের কোনো সদস্য কখনো বাচ্চাদের হাতে মূল্যবান জিনিসপত্র দিয়ে দেন, কখনো তারা নিজেরাই ঘরের প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে খেলাধুলা শুরু করে। বড়রা দেখেও তাদের হাত থেকে সেটা গ্রহণ করেন না। অথচ জিনিসটি তাদের হাতে নষ্ট হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লামা খাত্তাবি লিখেছেন, “বুঝমান নয় এমন কারও কাছে সম্পদ দেওয়াও ‘সম্পদ নষ্ট করার’ অন্তর্ভুক্ত। এখান থেকে প্রমাণিত হয়, নিজের সম্পদ নষ্ট করে ফেলে যেমন- শিশু, পাগল, এদের ওপর লেনদেনের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা বৈধ রয়েছে।” তাছাড়া সূরা নিসার আয়াত ‘অবুঝদের হাতে তোমরা নিজেদের সেই সম্পদ অর্পণ করো না যাকে আল্লাহ তোমাদের জীবনের অবলম্বন বানিয়েছেন’ (আয়াত: ৫) এখান থেকেও এ ধরনের আচরণের অসঙ্গতি স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। মনে রাখা প্রয়োজন, শিশুদের সঙ্গে স্নেহপূর্ণ আচরণ ইসলামের একটি বিশেষ শিক্ষা। কিন্তু এ ক্ষেত্রে শরিয়তের স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত বিধান লঙ্ঘন করা কাম্য নয়।

সম্পদের ক্ষেত্রে শরিয়তের বিধান লঙ্ঘনের আরেকটি ক্ষেত্র হলো রাগের মুহূর্তটি। কারও কারও অভ্যাস আছে তারা কোনো কারণে রেগে গেলে হাতের কাছে যা পান তাই ছুড়ে ফেলেন। এভাবে নিজের বা অন্যের সম্পদ ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ভেঙে রাগ মিটিয়ে থাকেন। মূলত রাগ মানুষের স্বভাবজাত একটি অবস্থা। একে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ইসলাম বিভিন্ন পদ্ধতি শিখিয়েছে। রাগের সময় যত্নের সঙ্গে এগুলো অবলম্বন করতে হবে। যে সম্পদকে আল্লাহতায়ালা নেয়ামত বানিয়েছেন এবং সংরক্ষণ করার জোরালো নির্দেশ দিয়েছেন, সেই সম্পদ নষ্ট করা কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়। সুখে-দুঃখে শান্ত রাগত- সর্বাবস্থায় আল্লাহপাকের বিধানের প্রতি নিজেকে সঁপে দেওয়াই হলো একজন মুমিনের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

পবিত্র কোরআন ও হাদিস আমাদের তাই এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে বারবার নির্দেশনা দেওয়ায় একজন শুদ্ধ মুসলিম বা মুমিনের কাছে তাই অন্যের সম্পদ এবং অন্য ধর্মালম্বীরা সব সময় নিরাপদ এবং সুরক্ষিত।

*আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে ইসলামের ও মহানবীর মহান শিক্ষা অন্যের সম্পদ সুরক্ষা ও বিশ্বাস অর্জনের তৌফিক দান করুন। আমিন।

লেখক: ইসলামি চিন্তাবিদ ও কলামিস্ট


ধেয়ে আসছে সৌরঝড়

আপডেটেড ২৩ মে, ২০২৪ ১২:২১
আলমগীর খোরশদ

সৌরঝড় হলো সূর্যের পৃষ্ঠে ওঠা ঝড়। সূর্যপৃষ্ঠ থেকে যখন বৈদ্যুতিক ও চৌম্বকীয় বিকিরণ ছিটকে বেরোতে থাকে, তাকেই বলে সৌরঝড়। সৌরঝড়ে সূর্যের কেন্দ্র থেকে প্লাজমা এবং চৌম্বকীয় তরঙ্গের বিরাট বিস্ফোরণ হয়। এখন জানতে হবে প্লাজমা কি? প্লাজমা হলো মুক্ত আয়ন এবং ইলেকট্রনের সংমিশ্রণ। মেডিসিন ও ফিজিওলজিতে প্লাজমা মানে রক্তের তরল উপাদান। যা শরীরে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্লাজমা প্রোটিন এবং ইমিউনোগ্লোবিন গঠন করে। সৌর প্লাজমায় দশমিক পাঁচ ভোল্ট থেকে দশ কেভির মধ্যে শক্তি থাকে। ফলে শক্তিশালী আধানযুক্ত চুম্বক ক্ষেত্র পৃথিবীর চৌম্বকমণ্ডলে প্রবেশ করলে কসমোস্পিয়ারে রঙিন আলোরচ্ছটায় সৃষ্টি করে। যাকে মেরুজ্যোতি বলে। অন্যদিকে সূর্যের প্লাজমা হলো পদার্থের অসাধারণ অবস্থা যেখানে চারপাশে হাজার হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা হয়, যা উচ্চ ভোল্টেজে পৌঁছাতে সহায়তা করে। যার ফলে কোটি কোটি সৌর পদার্থ চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যেতে পারে। সৌরজগতে তার প্রভাব পড়বে। বিশ বছর পর পর সৌরঝড়ের সম্ভাবনা থেকে যায়। তবে সৌরচক্র বা সৌর চৌম্বকীয় কার্য ১১ বছর পর পর হয়ে থাকে। সৌরচক্র বুঝতে মহাকাশ বিজ্ঞান স্টাডি করে ম্যাগনোটো হাইড্রোডাইনামিক কার্যকলাপ বুঝতে হয়। সৌরচক্রের সময়কাল গড়ে ১১ বছর। এটা সূর্যদাগ গণনা কালকে বোঝায়। সূর্যের দাগ হলো সৌর চৌম্বকীয় আবেশ, সূর্যের আপাত পৃষ্ঠ, ফটোস্ফিয়ার সক্রিয়ভাবে বিকিরণ করে সূর্যের ওপর দাগ পরিলক্ষিত হয়। ১৯০৮ সালে বিজ্ঞানী জর্জ এলিরি হেল দেখিয়েছিলেন যে সূর্যের দাগগুলো বাস্তবে শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র। ১৭৬১ সাল থেকে ১৭৭৬ সালের মধ্যে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনের রুমডের্টান মানমন্দির থেকে সূর্যের দাগ পর্যবেক্ষণ করে এ বিষয়ে ধারণা দিয়েছিলেন বিজ্ঞানী ক্রিষ্টান হোরে বো।

সূর্যপৃষ্ঠের উচ্চ তাপমাত্রা বিশিষ্ট প্লাজমা আবরণ থেকে তীব্র বেগে নির্গত বিদ্যুৎ কণার স্রোত পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে। এর নাম হলো ‘করোনাল মাস ইজেকশন’। যা পৃথিবীতে আঘাত হেনে চৌম্বকীয় ঝড়ের সৃষ্টি করে। প্রচণ্ড বিস্ফোরণের সময় সূর্যের বাইরে থাকা ‘করোনা’ অঞ্চল থেকে বেরিয়ে আসে ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউক্লীয় পদার্থগুলো, যার গতিবেগ থাকে প্রতি সেকেন্ডে ৯০০ কিলোমিটার। তার সঙ্গে সূর্যের বায়ুমণ্ডলে হঠাৎ চুম্বক ক্ষেত্রের পরিবর্তন ঘটার ফলে তীব্র বিস্ফোরণ হয়। ফলে সৌর বর্ণালির তীব্রতা বদলে যায়। এটাকে বলে সৌরশিখা। এই ঝড় পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের একদম বাইরে আয়োনোস্ফিয়ারের চৌম্বক ক্ষেত্রে আঘাত আনে। মহাজাগতিক এই ধরনের ঘটনাই সৌরঝড়। যার তাপমাত্রা ১০ মিলিয়ন ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড এবং এই ঝড়ের শক্তি প্রায় ১০০ মেগাটন হাইড্রোজেন বোমার সমান। ব্যাবিলনীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা চান্দ্র সৌরচক্রভিত্তিক পঞ্জিকার হিসাব রাখার জন্য সূর্যগ্রহণ ও সৌরকলঙ্ক বা সৌরদাগ পর্যবেক্ষণ করতেন। ১৯২১ সালে সৌরঝড় হয়েছিল, যা পৃথিবীর অকল্পনীয় ক্ষতি হয়েছিল। এতে পৃথিবীকে ঘিরে বিশাল আকৃতির চৌম্বকক্ষেত্র বরাবর বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছিল। এসব ফাঁক দিয়ে বিষাক্ত সৌরকণা ও মহাজাগতিক রশ্মি প্রবেশ করেছিল। আবার যদি এমন ঝড় হয়, সারা বিশ্বের যোগাযোগ বিঘ্নিত, স্যাটেলাইট যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ব্ল্যাক আউট হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

১৬১০ সালে গ্যালিলিও সৌরকলঙ্ক ও ঝড় বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা দেন। ২০১০ সালে নাসা কর্তৃক ক্যানাভেরাল ডায়নামিক্স অবজার্ভেটরি উৎক্ষেপণ করা হয়। যা সৌরঝড়সহ অন্যান্য সৌর বিষয়ে বিজ্ঞানীদের সম্যক ধারণা পেতে সহজ করে দেয়।

লেখক: শিশু সাহিত্যিক


ক্ষুদ্র ও মাঝারিশিল্পের উন্নয়নের চেষ্টা ও আমাদের ভূমিকা

আপডেটেড ২৩ মে, ২০২৪ ১২:২১
সৈয়দ শাকিল আহাদ

আমাদের দেশে অনেক দিন ধরে ক্ষুদ্র ও মাঝারিশিল্পের উন্নয়নের চেষ্টা চলছে, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এসএমই (স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ) শিল্প বিকাশের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এবং তার ফলে উন্নয়ন ত্বরান্বিত হচ্ছে এবং দেশ দ্রুত উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

এই বাংলাদেশে এসএমই ফাউন্ডেশন নামক প্রতিষ্ঠানটি তার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারিশিল্পের উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। এসএমই ফাউন্ডেশন ২০০৭ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তার যাত্রা শুরু করে। যাত্রা শুরুর পর থেকেই এই প্রতিষ্ঠানটি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে (১৭৬০-১৮২০) ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লব সংঘটিত হওয়ার পর দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারণা পালটে যায়। তখন মনে করা হতো, একটি দেশের দ্রুত এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কৃষি খাতের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমেই একটি দেশ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তার প্রত্যাশিত অগ্রগতি সাধন করতে পারে; কিন্তু শিল্পবিপ্লব সেই চিরাচরিত ধারণাকে সম্পূর্ণরূপে পালটে দিয়েছিল। শিল্পবিপ্লবের পর অর্থনীতিবিদরা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করেন, যে কৃষির ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে কখনো-বা দ্রুত এবং কার্যকর অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। কারণ কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায় গাণিতিক হারে। আর শিল্পোৎপাদন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায় জ্যামিতিক হারে। কাজেই একটি দেশের বর্ধিত জনসংখ্যার অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণের জন্য কৃষি নয়, বরং শিল্পের ওপরই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একটি দেশ যদি খাদ্যোৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে, তাহলে জনগণের চাহিদাকৃত খাদ্য আমদানির মাধ্যমেও পূরণ করা সম্ভব। অর্থনীতিবিদরা এটা মেনে নিয়েছেন, কৃষি নয়- একমাত্র শিল্পের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদানের মাধ্যমেই একটি দেশ দ্রুত এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন করতে পারে। শিল্পের ওপর গুরুত্ব প্রদানের বিষয়টি অর্থনীতিবিদরা মেনে নিলেও তাদের মধ্যে অনেক দিন ধরেই বিতর্ক চলছিল শিল্পের স্বরূপ কেমন হবে? আমরা কি শুধু বৃহৎ শিল্পের ওপর জোর দেব, নাকি ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প প্রতিষ্ঠায় গুরুত্ব দেব? বিশেষ করে, যেসব দেশ অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এবং সর্বদা বিনিয়োগযোগ্য পুঁজির সংকটে ভোগে তারা কী করবে? তারা কি বৃহৎ শিল্প স্থাপন করবে, নাকি ক্ষুদ্র শিল্পের ওপর জোর দেবে? আর বৃহৎশিল্প এবং ক্ষুদ্র শিল্প কি পরস্পর প্রতিপক্ষ, নাকি সহযোগী? এই জটিল প্রশ্নটি অনেক দিন ধরেই অর্থনীতিবিদদের ভাবিয়েছে। বর্তমানে অর্থনীতিবিদরা মোটামুটি একমত, কোনো দেশ, বিশেষ করে উন্নয়নশীল হলে তাদের বৃহ শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র শিল্প স্থাপনের ওপরই বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। যাদের পুঁজিসংকট নেই, তারা বৃহৎ শিল্পে অর্থায়ন করবে। আর যারা স্বল্প পুঁজির মালিক অথবা একেবারে কম পুঁজির মালিক, তারা প্রথমে ক্ষুদ্র উদ্যোগে যুক্ত হবে। সেখান থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করার পর বৃহৎ শিল্প স্থাপনে উদ্যোগী হবে। আর বৃহৎ এবং ক্ষুদ্র শিল্পের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই বা একে অন্যের প্রতিপক্ষও নয়, বরং পরিপূরক।

অনেক দেশ আছে যেখানে বৃহৎ শিল্পগুলো শুধু সংযোজনের দায়িত্ব পালন করে আর ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা শিল্পের উপকরণ তৈরি করে। জাপানের কথা এ ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত হিসাবে উল্লেখ করা যেতে পারে। জাপানের টয়োটা কোম্পানি গাড়ির কোনো পার্টস নিজেরা তৈরি করে না। তারা সাব-কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের দিয়ে গাড়ির পার্টস তৈরি করে এনে নিজস্ব কারখানায় সংযোজন করে। অর্থাৎ ক্ষুদ্র শিল্পগুলো বৃহৎ শিল্পের সহায়ক শিল্প হিসেবে কাজ করে। এতে বৃহৎ শিল্পের বিকাশ সহজতর হচ্ছে আর ক্ষুদ্র শিল্পগুলোও বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

রোববার ১৯ মে সকালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘১১তম জাতীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপণ্য (এসএমই) মেলা-২০২৪’-এ প্রধানমন্ত্রী ‘জাতীয় এসএমই উদ্যোক্তা পুরস্কার-২০২৩’ বিজয়ী সাতজন মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি এবং স্টার্ট-আপ উদ্যোক্তার হাতে ক্রেস্ট ও সনদ তুলে দেন।

শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন ওই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব জাকিয়া সুলতানা ও এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মাহবুবুল আলম বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বক্ত্যবে উল্লেখ করে বলেছেন, আমাদের দেশে শিল্প খাত পরিবেশবান্ধব হওয়া উচিত। এসব মাথায় রেখেই শিল্প খাত তৈরি করতে হবে। শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনা অবশ্যই সবাইকে করতে হবে। সামান্য একটু কেমিক্যাল ব্যবহারের ওই পয়সাটা বাঁচাতে গিয়ে দেশের সর্বনাশ, সঙ্গে সঙ্গে নিজের সর্বনাশটা কেউ করবেন না।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আমাদের দেশকে এগিয়ে নিতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রতি বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত।

এক সময় এসব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাই বড় হবে। তারা উপকৃত হবে, দেশ উপকৃত হবে। কোনো মতে পাস করেই চাকরির পেছনে না ছুটে নিজে উদ্যোক্তা হয়ে চাকরি দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। তিনি বলেন, উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য সরকার নানান সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। এসব সুবিধা আমাদের ছেলেমেয়েদের নিতে হবে। নারী উদ্যোক্তা আরও বাড়াতে হবে। নারীদের আরও বেশি সুযোগ করে দিতে হবে। তাহলে নারী-পুরুষ সমান তালে এগিয়ে যাবে। নারীদের গৃহস্থালি কাজের স্বীকৃতি দিতে হবে।

আমাদের দেশ ‘ভৌগোলিক সীমারেখায় ছোট এবং জনসংখ্যার দিক দিয়ে বড়’ উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, সে ক্ষেত্রে আমাদের নিজেদের দেশের পরিবেশ ও সবকিছু অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে হওয়া উচিত। স্বাস্থ্যসম্মত হওয়া উচিত। সঙ্গে সঙ্গে জলবায়ুর অভিঘাতে যেন আমরা ক্ষতিগ্রস্ত না হই সেদিকে সবাইকে দৃষ্টি দিতে হবে। তিনি বলেন, যারা যেখানেই কোনো শিল্প গড়ে তুলবেন সেখানে অবশ্যই লক্ষ্য রাখবেন আপনার এই শিল্পের বর্জ্য যেন নদীতে না পড়ে, আমাদের পানি যেন কোনোভাবে দূষণ না হয়, মাটিতে দূষণ যেন না হয়। সেদিকে দৃষ্টি দেওয়ার জন্য আমি বিশেষভাবে অনুরোধ জানাচ্ছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি খুব আনন্দিত, কেননা আজকের এসএমই পণ্য মেলায় দেখা যাচ্ছে উদ্যোক্তা ৬০ শতাংশই নারী। তিনি নারীদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, সমাজের একটা অংশকে বাইরে রেখে সেই সমাজ কখনো এগিয়ে যেতে পারে না। আমাদের দেশের নারী-পুরুষ সবাইকে যদি আমরা উদ্যোক্তা হিসেবে তৈরি করতে পারি তাহলে সমানভাবে দেশটা দ্রুত উন্নত হবে। এ জন্য নারী উদ্যোক্তা আমাদের দরকার। যেহেতু শিল্প মন্ত্রণালয় এবং এসএমই ফাউন্ডেশন থেকে নারী উদ্যোক্তাদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে সে ক্ষেত্রে পুরুষরা ঘরের নারীদের (স্ত্রী-কন্যা-বোন) নামে, তাদের সঙ্গে নিয়ে এখানে যুক্ত হতে পারেন। কেননা অন্যত্র ৪ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়া যাবে না। কাজেই পুরুষরা বিশেষ করে আমাদের যুবসমাজ এই সুযোগটা কাজে লাগাতে পারেন। কারণ আমরা চাই আমাদের শিল্প খাতে আরও উদ্যোক্তার সৃষ্টি হোক। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৭-০৮ অর্থ বছরের জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান ছিল ১৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ, সেখানে ২০২২-২৩ অর্থ বছরে তা বেড়ে ৩৭ দশমিক ৫৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে এবং অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি সূচকে বাংলাদেশ আজকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৭৯৬ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা বিএনপির শাসনামলে ২০০৫-০৬ অর্থ বছরে ছিল মাত্র ৫৪৩ ডলার। সরকার চ্যালেঞ্জ নিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ করায় আজকে পদ্মার ওপারেও বিশাল কর্মক্ষেত্র উন্মুক্ত হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, পদ্মার ওপারে যে জেলা বা ইউনিয়নগুলো রয়েছে সেখানকার মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন হচ্ছে। সেখানেও বিনিয়োগের বিরাট সুযোগ এসে গেছে। এসব এলাকায় ‘এসএমই’ (ফাউন্ডেশন) আরও বেশি কাজ করতে পারে এবং এখানে অনেক উদ্যোক্তার সৃষ্টি করতে পারেন। তিনি শিল্প ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, আমরা আরও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে চাই। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবকে মাথায় রেখে আমাদের আরও উদ্যোক্তা এবং কাজের লোক প্রয়োজন পড়বে। আমাদের দেশের মানুষকে কাজ দিতে হবে। তিনি বলেন, আমরা যখন পদক্ষেপ নেব সে সময় বিশেষ করে শিল্প মন্ত্রণালয় ও এসএমই ফাউন্ডেশনকে খেয়াল রাখতে হবে যে শ্রমঘন শিল্প যেন আমাদের দেশে গড়ে ওঠে। শ্রমবান্ধব কর্মপরিবেশ সৃষ্টির ওপর গুরুত্বারোপ করে শেখ হাসিনা বলেন, শ্রমিকদের বিষয়ে সবাইকে আন্তরিক হতে হবে। আপনি যদি বেশি কাজ চান তাহলে তাদের সেই কর্মপরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে। তিনি বলেন, শুধু হুকুম দিয়ে হয় না। হুকুম দিয়ে যা অর্জন করতে পারবেন, ভালোবাসা দিয়ে পারবেন তার চেয়ে অনেক বেশি। আস্থা-বিশ্বাস অর্জন করে আরও বেশি আপনি কাজ করিয়ে নিতে পারবেন। সেদিকে অবশ্যই সবাইকে দৃষ্টি দিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে সারা দেশেই ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের উন্নয়নে এবং এই খাতে বিনিয়োগের প্রতি আগ্রহী হয়েছেন দেশের ও বিদেশের প্রচুর সংখ্যক বিনিয়োগকারী।

বিশ্বের এমন অনেক দেশ আছে, যারা ক্ষুদ্র ও মাঝারিশিল্পের মাধ্যমে তাদের শিল্পায়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করেছে। বিশেষ করে, জনসংখ্যাধিক্য একটি দেশের জন্য বৃহৎ শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র শিল্পের বিকাশ খুবই জরুরি। বাংলাদেশ একটি জনসংখ্যাধিক্য দেশ; কিন্তু প্রচুর সম্ভাবনাময় একটি দেশ। বাংলাদেশের মানুষ যে কোনো কিছু একবার দেখলেই তা অনুসরণ করে নব সৃষ্টিতে মেতে উঠতে পারে। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ নানাভাবে শিল্পায়নের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

আমাদের সবাইকেই যার যার যোগ্যতা ও মেধা সংযোজিত করে স্বল্প পুঁজি খাটিয়ে ক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে চাকরির পেছনে না ছুটে নিজেদের উদ্যোগে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পে বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা ও দেশের উন্নয়নে সম্পৃক্ত হওয়া।

লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক


পুলিশিং কার্যক্রমের ক্ষেত্রে ইমেজের গুরুত্ব

আপডেটেড ২৩ মে, ২০২৪ ১২:২২
ড. এম এ সোবহান পিপিএম

ইমেজ বা ভাবমূর্তি গঠন (Image & Image Building)

সাধারণভাবে বলতে গেলে ইমেজ বা ভাবমূর্তি হলো সেই উপলব্ধি যা মানুষ কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা সম্পর্কে ব্যক্ত করে থাকে। ব্যাপকভাবে বলতে গেলে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের পথচলা বা তার কার্যকলাপের ইতিবাচক বা নেতিবাচক দিক সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় তাকেই ইমেজ বা ভাবমূর্তি বলে। ইমেজ হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক যা কোনো লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করে। কোনো প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের সেবাদান বা ব্যক্তিপর্যায়ের কাজের গুণগত মান, বৈশিষ্ট্য প্রভৃতির ওপর ভিত্তি করে কোনো প্রতিষ্ঠানের ইমেজ বা ভাবমূর্তি গড়ে ওঠে।

ইমেজ বা ভাবমূর্তি গঠনের উপায়

যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য ইমেজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তেমনি পুলিশ ইমেজ পুলিশের কাজের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রয়োজন পড়ে। নিম্নোক্ত উপায়ে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ইমেজ বা ভাবমূর্তি গঠন করা যেতে পারে।

কাজের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা

স্বচ্ছতা নেতা, অনুসারী এবং কর্মীদের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস তৈরি করে। তা কর্মসংশ্লিষ্ট চাপ কমায়। পক্ষান্তরে স্বচ্ছতা কর্মীদের বা অধস্তনদের মনে প্রশান্তি আনে এবং কর্মক্ষমতা বাড়ায়। নেতা বা কোনো প্রতিষ্ঠান প্রধানের দায়িত্ব হলো স্বচ্ছতার একটি সংস্কৃতি তৈরি করা যা তার অধস্তনদের জন্য অনেক সুবিধা বয়ে আনবে। তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মনোবল উন্নত করে। যখন অধস্তন ও সতীর্থরা দেখে যে কোনো ব্যক্তি এবং তাদের কাজের স্বচ্ছতা আছে বা সে খোলামেলা হতে পছন্দ করে, তাহলে তাদের ওই ব্যক্তির প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা বেড়ে যাবে। এভাবে কাজকর্মে স্বচ্ছতা থাকলে তা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি গঠনে সহায়ক হয়।

জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা

জবাবদিহিতা নাগরিকের ভোগান্তি কমিয়ে দেয়। জবাবদিহিতা কোনো দলের সদস্যদের দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। জবাবদিহিতা অনুশীলনের ফলে সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পায়, কাজের প্রতি সন্তুষ্টি ও প্রতিশ্রুতি বৃদ্ধি পায়। কাজের পরিমাণ ও গুণাগুণ বৃদ্ধি পায়। সুতরাং কোনো কাজের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি গঠনে সহায়ক হয়।

বিপদের সময়ে মানুষের পাশে থাকা

সংকটকালে ভুক্তভোগীরা অসহায় থাকে। সে সময় সাধারণ মানুষ পুলিশ বা রাজনৈতিক নেতা বা সমাজের নেতাদের সাহায্য ও সমর্থন প্রত্যাশা করে। সে জন্য বিপদকালীন সময়ে পুলিশ বা সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি বা নেতাদের উচিত ভুক্তভোগীর পাশে থাকা। তাই ভিকটিম বা ভুক্তভোগীর প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ইমেজ বা ভাবমূর্তি বৃদ্ধি হয়।

বিভিন্ন জাতি বর্ণ, ধর্ম ও প্রতিষ্ঠান নির্বিশেষে সব স্তরের মানুষের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া জোরদার করা

বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া বাড়ানোর মাধ্যমে ওই জাতিগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে দূরত্ব কমে যায় এবং তাদের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস বৃদ্ধি পায়। যখন অনুগামী, অধস্তন ও কর্মীরা ঊর্ধ্বতনের সঙ্গে দূরত্ব কম দেখতে পায়, তখন তারা কাজে অধিক মনোযোগ দিয়ে থাকে। যা প্রকারন্তরে ইমেজ বা ভাবমূর্তি গঠনে সহায়ক হয়।

জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সততা ও সাধুতা অনুশীলন করা

কোনো একজন নেতা বা প্রতিষ্ঠানের সততা অনুশীলন কর্মক্ষেত্রে অনুকূল পরিবেশ বয়ে আনে এবং অনুসারীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা বাড়ায়। যখন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাজে সততা ও সাধুতা থাকে না তখন ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কেউ বিশ্বাস করে না। কোনো প্রতিষ্ঠানের বা তার প্রধানের মধ্যে সততা ও সাধুতার চর্চা ওই ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ইমেজ বহুলাংশে বৃদ্ধি করে।

ভালো ব্যবহার করা

ভালো ব্যবহার করার মাধ্যমে ভালো সম্পর্ক স্থাপিত হয় এবং ভালো আচরণের মাধ্যমে মানুষের হৃদয় জয় করা যায়। যদি কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির উপকার করতে নাও পারে, তবে শুধু ভালো ব্যবহারের মাধ্যমে তাকে সন্তুষ্ট করতে পারে। ভালো ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যক্তি অনন্য ব্যক্তিত্বে পরিণত হয় এবং তার ইতিবাচক ইমেজ বা ভাবমূর্তি গঠিত হয়।

সংকটের সময়ে শান্ত থাকা

কোনো কাজে বা পরিস্থিতিতে শান্ত থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যখন কোনো ব্যক্তি সংকটের সময়ে শান্ত থাকে, তখন সাধারণত সে আরও যুক্তিযুক্তভাবে চিন্তা করতে পারে এবং যৌক্তিক ও সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারে। কোনো সংকটে অস্থিরতা বা অশান্ত আচরণ সংকট না থামিয়ে বরং সংকটকে আরও জটিল করে তোলে। তাই তো দেখা যায়, সংকটকালীন সময়ে শান্ত থাকার মাধ্যমে ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি গড়ে ওঠে।

মাঝেমধ্যে কৌশলী হওয়া

একজন নেতাকে বা কোনো ব্যক্তিকে বুদ্ধিমান হতে হয় এবং তাকে মাঝেমধ্যে কৌশলী হতে হয়। কারণ পরিস্থিতি সামলাতে বা সিদ্ধান্ত নিতে নেতাকে কিছু কৌশলী খেলা বা চাল দিতে হয়। তাই নেতার কৌশল ও সুচারুভাবে কাজ সম্পন্ন করার মাধ্যমে নেতার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাবে এবং তার ইমেজ বা ভাবমূর্তি গঠিত হবে।

যুক্তিবাদী হওয়া বা যৌক্তিকভাবে কাজ করা

যৌক্তিক সিদ্ধান্তগ্রহণ এবং যৌক্তিক মূল্যায়ন যৌক্তিকতার ওপর নির্ভর করে। তাই সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, সমস্যা সমাধান করা এবং রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তিবাদী হওয়া খুবই জরুরি। যা ব্যক্তির ইমেজ গঠনে ভূমিকা রাখে।

অংশীজনের মন ও মনোভাব জানা

একজন নেতাকে মনোবিজ্ঞানী হতে হয়, তাকে তার অধস্তনদের সম্পর্কে জানা উচিত এবং পাশাপাশি তাকে তার অংশীজনদের সম্পর্কেও অবগত থাকা উচিত। অংশীজনদের মন-মানসিকতা যাচাই করে সিদ্ধান্ত দেওয়া যুক্তিসঙ্গত। তাই একজন সফল নেতা অংশীজনদের মনের কথা জানেন এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। ফলে ওই ব্যক্তির ইমেজ বৃদ্ধি পায়।

ভালো কাজ বা ইতিবাচকতা প্রচার করা

কোন ভালো কাজের তথ্য বা সংবাদ সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে প্রচার করার মাধ্যমে বিষয়টির ব্যাখ্যা ও সমস্যা সবাই স্পষ্টভাবে জানতে পারে। একটি ঘটনার তথ্যপূর্ণ ব্যাখ্যা প্রচার করার মাধ্যমে জনসাধারণের সঙ্গে ধারণা শেয়ার করা, তাদের বোঝাপড়া বৃদ্ধি করা, তাদের উপলব্ধি পরিবর্তন করা এবং তাদের নতুন দক্ষতা অর্জনে সহায়ক হয়ে থাকে। তাই ভালো কাজ অংশীজনদের মধ্যে প্রচার করলে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান উভয়েরই ইমেজ বৃদ্ধি পাবে।

সরল জীবনযাপন এবং সেইসঙ্গে উচ্চ চিন্তাভাবনা

সরলতা সব সময় সাধারণ মানুষের কাছে প্রশংসিত। সরল জীবনযাপন ও উচ্চ চিন্তাভাবনা অন্য মানুষকে উৎসাহিত করে এবং প্রভাবিত করে। সাধারণত অনুসারীরা বা অধস্তনরা নেতাকে বা প্রতিষ্ঠানের বড় কর্মকর্তাকে দেখে থাকে, তাকে অনুসরণ করে এবং তার জীবনধারা নিজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে। তাই সরল জীবনযাপন ও উচ্চচিন্তা ইমেজ গঠনে সহায়ক হয়।

নিয়মানুবর্তিতা ও সময়ানুবর্তিতা অনুসরণ করা

শৃঙ্খলা ভালো অনুসারী তৈরি করে। শৃঙ্খলা বা নিয়মানুবর্তিতা চর্চা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য মঙ্গলস্বরূপ। কেননা তা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে একটি সুন্দর বা সুষ্ঠু কর্মপরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করে। সুতরাং এটা বলা যেতে পারে শৃঙ্খলা ও সময়ানুবর্তিতা অনুসরণ করা ইমেজ তৈরির সহজ উপায়। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিয়মানুবর্তিতা ও সময়ানুবর্তিতা মেনে চললে তাদের সম্পর্কে আরও অধিক ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা হয়ে থাকে এবং ইতিবাচক ভাবমূর্তি গঠিত হয়। কথা রাখা বা সময় রক্ষার মাধ্যমে ব্যক্তি এক কথার মানুষে পরিণত হয়। কোনো নেতার নিয়মানুবর্তিতা পালন নেতাকে তার কর্মীদের মধ্যে নির্ভরযোগ্য এবং বিশ্বস্ত হিসেবে পরিগণিত করে।

ভদ্রতা ও সৌজন্যতা অনুশীলন করা

যখন কোনো ব্যক্তি ভদ্রতা ও সৌজন্যতা প্রদর্শন করে তখন তার প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ এবং সম্মান সৃষ্টি হয়। ভদ্রতা ও সৌজন্যতা কোনো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য অত্যাবশ্যক। তাই তো ভদ্রতা ও সৌজন্যতা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ইমেজ বা ভাবমূর্তি গঠনে সহায়ক হয়।

পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধ প্রদর্শন করা ও সহনশীল হওয়া

পারস্পারিক শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মাধ্যমে বিশ্বাস, সম্মান ও অর্থপূর্ণ যোগাযোগের ভিত্তি রচিত হয়। কোনো ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই ব্যক্তির মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তাবোধ ও সুস্থতার অনুভূতি তৈরি হয় এবং তার মেধা, মনন ও প্রতিভা বিকশিত হতে সহায়ক হয়। একজন সহনশীল ব্যক্তি ধৈর্যর সঙ্গে অন্যের মতামত শোনেন এবং তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার চেষ্টা করেন। সহনশীল ব্যক্তি পরমতসহিষ্ণু হন এবং সবার মতামতকে শ্রদ্ধা করেন। তাই পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সহনশীলতা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে পারে।

ভালো যোগাযোগ রক্ষা করা

যোগাযোগ দক্ষতা সামাজিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাগুলোকে সক্রিয় করে। এ ছাড়া যোগাযোগ মিথস্ক্রিয়া বৃদ্ধি করে এবং সুসম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য অপরিহার্য হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। কার্যকর যোগাযোগ সংশ্লিষ্ট সবার পক্ষকে সন্তুষ্ট করে। দ্বন্দ্বময় পরিস্থিতিতে কার্যকর যোগাযোগেরমাধ্যমে একটি সম্মানজনক ও সুষ্ঠু সমাধান করা যায়। ভালো যোগাযোগ সুস্থ সম্পর্ক তৈরি এবং সুষ্ঠু বিকাশে সহায়ক বিধায় ব্যক্তিগত ইমেজ গঠনে ভূমিকা রাখে।

মার্জিত পোশাক পরিধান করা

শেক্সপিয়ার তার ম্যাকবেথ নাটকে বলেছেন, পোশাকে মানুষ চেনা যায়। সত্যই পোশাকের মাধ্যমে ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব প্রকাশ পায়। ব্যক্তিত্বের বিকাশের মাধ্যমে মানুষ সফল মানুষে পরিণত হয়। একজন ব্যক্তির পোশাক এবং পোশাক পরিধানের ধরন তার ব্যক্তিত্ব বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই বলা যায় পোশাক ব্যক্তি ইমেজ গঠনে ভূমিকা রাখে।

বিনয়ী ও শিষ্টাচার বজায় রাখা

শিষ্টাচার মানুষকে শেখায় কীভাবে বিভিন্ন পরিবেশে অন্যের সঙ্গে সুআচরণ করতে হয়। শিষ্টাচার চর্চার মাধ্যমে এক সহজাত ও কর্মময় পরিবেশ তৈরি হয়। তা সবার জীবনকে স্বাচ্ছন্দ্যময় ও আরামপ্রদ করে তোলে। শিষ্টাচার দয়া, নম্রতা ও সুবিচেনা উপহার দেয়। শিষ্টাচার জীবনের বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলায় আত্মবিশ্বাস দেয়। এটি আমাদের অন্যের অনুভূতি এবং অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে। আর বিনয়ী হওয়া এবং কোনো কাজে বিনয়ীভাব প্রদর্শন করা ব্যক্তি সম্পর্কে একটা ইতিবাচক বার্তা দেয়। সুতরাং সবাই কাজে বিনয়ী হওয়া ও শিষ্টাচার প্রদর্শন ব্যক্তির ইমেজ গঠনে বড় ভূমিকা রাখে।

পাঠ্যক্রম বহির্ভূত সৃষ্টিশীল কার্যক্রম অনুশীলন করা

পাঠ্যক্রম বহির্ভূত সৃষ্টিশীল কার্যকলাপগুলো ব্যক্তির প্রতিভার বিকাশ ঘটায়। এ ছাড়া ব্যক্তি কীভাবে একটা টিমে কাজ করে সম্মিলিতভাবে লক্ষ্য অর্জন করবে তা শেখায়। এসব কাজগুলো মানুষের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, নেতৃত্বের দক্ষতা সৃষ্টি করে এবং নিজের মানোন্নয়ন করে যা প্রকারান্তরে ইমেজ বৃদ্ধি করে। এ ছাড়া সৃজনশীল কার্যক্রমের মাধ্যমে অন্যকে আকৃষ্ট করা যায়, অন্যের কাছাকাছি যাওয়া যায় এবং অন্যকে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি শেয়ার করা যায়। যা ব্যক্তির ইমেজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হওয়া

ব্যক্তিত্ব মানুষকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। ব্যক্তিত্বের বিকাশ মানুষকে আকর্ষণীয় করে তোলে। ব্যক্তিত্বের বিকাশের মাধ্যমে ব্যক্তির যোগাযোগ দক্ষতার উন্নতি হয়। ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে ব্যক্তির চিন্তাভাবনা ও অনুভূতিগুলো পছন্দসই উপায়ে প্রকাশ পায়। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ব্যক্তি বিবেকবান, যৌক্তিক ও খোলামেলা মনের হয়। ফলে তার দ্বারা অনেকে সুবিচার ও উপকার পেয়ে থাকে। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হওয়ার মাধ্যমে ব্যক্তির ইতিবাচক ইমেজ গঠিত হয়।

পুলিশ ইমেজ

অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ সময় ধরে পুলিশ বাহিনী বা এর সদস্যদের কার্যকলাপ, আচরণ, ব্যবহার, স্বচ্ছতা, সততা, পেশাদারিত্ব ও আইনি পদক্ষেপ সম্পর্কে সামগ্রিকভাবে দেশের অধিকাংশ জনগণ বদ্ধমূল, স্থায়ী বা অপেক্ষাকৃত দীর্ঘমেয়াদি যে বিশ্বাস বা ধারণা পোষণ করে তাকে পুলিশ ইমেজ বলে।

পুলিশের কাজে ইমেজ গঠনের গুরুত্ব (Importance of Image Building in Police Functioning)

কোনো প্রতিষ্ঠানের ইতিবাচক ইমেজ জনগণের মধ্যে ওই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আস্থা, বিশ্বাসযোগ্যতা, সততা ও সাধুতার ইঙ্গিত দেয়। পুলিশ বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে নিয়োজিত। তাকে সমাজের বিভিন্ন সমস্যা ও জনসাধারণের সঙ্গে কাজ করতে হয়। সে জন্য পুলিশ ইমেজ বা ভাবমূর্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিম্নে পুলিশের কাজে ইমেজের গুরুত্ব আলোচনা করা হলো-

অপরাধ নিবারণে

অপরাধ নিবারণ পুলিশের কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এর মাধ্যমে মানুষকে অপরাধ ঘটনের কারণে শারীরিক, অর্থনৈতিক ও মননে ক্ষতিগ্রস্ততা থেকে রক্ষা করে। আর অপরাধ নিবারণে প্রযুক্তির পাশাপাশি জনসাধারণের সহায়তা অত্যন্ত প্রয়োজন পড়ে। পুলিশের বা অন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ইমেজ ভালো থাকলে জনগণ তাদের তথ্য দিয়ে, সরাসরি গ্রেপ্তারে ও অপরাধস্থলে পৌঁছে দিয়ে অপরাধ নিবারণে সহায়তা করে।

ঘটনা উদ্ঘাটনে

কোনো ঘটনা উদ্ঘাটন মামলা তদন্তে বড় ভূমিকা রাখে। ঘটনা উদ্ঘাটনে অনেক ভদ্রবেশি অপরাধী যারা অপরাধ প্রক্রিয়ার পেছনে বা অন্তরালে থেকে অঘটন ঘটায় তাদের মুখোশ উন্মোচিত হয়। সর্বোপরি তা অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখে। কোনো ঘটনা দ্রুত উদ্ঘাটন ভিকটিম বা ভুক্তভোগীকে আরও সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে রক্ষা করে, পুনরায় আরও অপরাধ ঘটন থেকে নিষ্কৃতি দেয়। কোনো সমাজে বা সম্প্রদায়ের মধ্যে পুলিশের ইতিবাচক ইমেজ থাকলে সেসব গোষ্ঠীর মানুষ পুলিশকে ঘটনা উদ্ঘাটনে সহায়তা করবে।

তদন্ত কাজে সহায়তা

মামলার তদন্তে বিজ্ঞানভিত্তিক তদন্তের গুরুত্ব অপরিসীম; কিন্তু বিজ্ঞানভিত্তিক তদন্তে জনসাধারণের সহায়তা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক তদন্তের পাশাপাশি অন্যান্য তদন্তে জনগণের সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। পুলিশ ইমেজ উন্নত হলে জনসাধারণ স্বেচ্ছায় সাক্ষ্য দিয়ে, তথ্য দিয়ে, ডকুমেন্টস দিয়ে পুলিশকে সহায়তা করবে এবং পুলিশের কাছে সর্বপ্রকার সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসবে। তাই তো সুষ্ঠুভাবে ও সুচারুভাবে তদন্ত কাজ সম্পন্ন করতে হলে জনগণের সহযোগিতা অপরিহার্য।

সাজা বা শাস্তি প্রদানে

পুলিশের ভালো ইমেজ গঠিত হলে জনসাধারণ পুলিশের ডাকে সাড়া দিয়ে আদালতে নিজে সাক্ষী দেবে, অন্যকে সাক্ষী দিতে উদ্ভূত করবে, তথ্য ও উপাত্ত দিয়ে পুলিশকে তদন্তে সহায়তা করবে। যা প্রকারন্তরে অপরাধীর সাজা প্রদানে সহায়তা করবে।

অপরাধ ও অপরাধী সম্পর্কে তথ্য পেতে

অপরাধ ও অপরাধী সম্পর্কে তথ্য পেতে পুলিশকে সমাজের সব স্তরের মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক ও মিথস্ক্রিয়া করতে হয়। ইমেজ বা ভাবমূর্তি গঠনের মাধ্যমে পুলিশ সদস্যরা সহজে জনগণের কাছে যেতে পারে এবং জনগণের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি হয় ও জনবান্ধবতার ক্ষেত্র তৈরি হয়। তাই পুলিশের ইমেজ গঠনের মাধ্যমে জনগণ অপরাধ ও অপরাধী সম্পর্কে তথ্য পাবে এবং অপরাধ প্রতিরোধ করে টেকসই আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে পারবে। পুলিশের ইমেজ উন্নত হলে মানুষ স্বপ্রণোদিত হয়ে অপরাধ ও অপরাধী সম্পর্কে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহায়তা করবে।

অপরাধী গ্রেপ্তারে

বর্তমান যুগকে বলা হয় ডিজিটাল যুগ। প্রায় সব মানুষই এখন সেল ফোন ব্যবহার করে। সব ধরনের অপরাধীরাও এখন সেল ফোন ব্যবহার করে থাকে। এ ছাড়া অপরাধী গ্রেপ্তারে পিন পয়েন্ট ইনফরমেশন বা তথ্যের প্রয়োজন হয়। আর জনগণ সহায়তা না করলে অপরাধী গ্রেপ্তারে সফলতা পাওয়া কষ্টকর। পুলিশের ইতিবাচক ইমেজ গঠিত হলে জনগণ পুলিশকে অপরাধী গ্রেপ্তারে প্রভূত সহায়তা করবে। পুলিশের ইমেজ বৃদ্ধি পেলে জনগণ অপরাধীর অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দিয়ে, অপরাধীকে ধৃত করে এবং অপরাধী গ্রেপ্তারে সরাসরি ও আর্থিকভাবে সহায়তা করবে।

সমাজ থেকে অপরাধভীতি দূর করতে

কোনো অপরাধ একবার ঘটার পর পুনরায় সে অপরাধ সংগঠিত হতে পারে। অপরাধ ভয়ের কারণে ভুক্তভোগী বা ভিকটিম বিভিন্ন রকম রোগে আক্রান্ত হতে পারে যেমন- হৃদরোগ, প্রেসার, ডায়াবেটিস ইত্যাদি। আবার অপরাধ ভয়ের কারণে ভুক্তভোগী শারীরিক বৈকল্যের স্বীকার হতে পারে। এ ছাড়া অপরাধ ভয়ের কারণে ভুক্তভোগী মানসিক আঘাত পেয়ে থাকে। সমাজ থেকে অপরাধভীতি দূর করতে ভয়ের উৎস জানা, ভয়ের মাত্রা জানা, সঠিক তদন্ত ও বিচারের ব্যবস্থা করা, ভিকটিমকে যথাযথ সাপোর্ট দেওয়া, পুলিশকে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো ও সহায়তা প্রদান, সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রেষণা, কাউন্সেলিং, জনগণ ও পুলিশের আন্তঃসম্পর্ক উন্নয়ন প্রয়োজন। এসব কাজ পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয় এবং সব ক্ষেত্রে জনগণের সহায়তা একান্ত প্রয়োজন পড়ে। আর পুলিশ ইমেজ বৃদ্ধি ঘটলে জনগণ পুলিশকে সব ক্ষেত্রে সহায়তা করবে এবং সমাজ থেকে অপরাধভীতি দূর হবে।

জঙ্গি দমনে

জঙ্গিবাদ, জঙ্গিদের সংগঠিত হওয়া এবং জঙ্গি হামলা এখন বাংলাদেশ তথা সারা বিশ্বের এক বড় সমস্যা। জঙ্গি তৎপরতা চালু রাখতে জঙ্গিগোষ্ঠীর প্রধানরা নিত্যনতুন সদস্য সংগ্রহ করে থাকে। এ ক্ষেত্রে তারা কম শিক্ষিত ও সহজ-সরল মানুষের দিকে দৃষ্টি দিয়ে থাকে। জঙ্গি দমনে প্রচলিত ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার পাশাপাশি প্রো-অ্যাকটিভ পুলিশিং ও জনগণের সর্বাত্মক অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা প্রয়োজন। পুলিশ ইমেজ গঠনের মাধ্যমে জনগণ পুলিশকে জঙ্গি দমনে সহায়তা করতে পারে।

সন্ত্রাস দমনে

সন্ত্রাস বাংলাদেশের অন্যতম এক সমস্যা। একটা ছেলে বা মানুষ কেন সন্ত্রাসী হয়, সেটা আগে খুঁজে বের করা প্রয়োজন। একজন মানুষ কিন্তু এক দিনে সন্ত্রাসী হয় না। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অসম্মান, ক্ষুধা, দরিদ্রতা, মাদকাসক্তি ইত্যাদি এর পেছনে রয়েছে। তাই সন্ত্রাস দমনে সমাজের সব স্তরের মানুষ যেমন- পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় নেতা, উন্নয়নকর্মী ও সমাজ সেবক সবাইকে কাজ করতে হবে। আর পুলিশ এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সংগঠিত করতে পারে। পুলিশের ইতিবাচক ইমেজ গঠনের মাধ্যমে সমাজের সব স্তরের মানুষকে নিয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলে সমাজ থেকে সন্ত্রাস দূর করতে পারে।

চুরি ও ডাকাতি নিয়ন্ত্রণে

চুরি ও ডাকাতিসংক্রান্ত অপরাধগুলোকে সম্পত্তিসংক্রান্ত অপরাধ বলে। এসব অপরাধে সাধারণত মানুষ শারীরিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। এসব অপরাধে ভুক্তভোগীর অনেক সময় মৃত্যু পর্যন্ত হয়ে থাকে। এসব অপরাধ দমনে পুলিশের কার্যক্রমের পাশাপাশি জনগণের অংশগ্রহণ প্রয়োজন হয়। যেমন- ভিলেজ ডিভেন্স পার্টি গঠন, কমিউনিটি পুলিশিং ও বিট পুলিশিং কার্যক্রম চালুকরণের মাধ্যমে এ জাতীয় অপরাধ নির্মূল করা যায়। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকার পুলিশের ইতিবাচক ইমেজ একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে

পুলিশের কাজের মূল কথা হলো মানুষের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা করা। কোনো সমাজের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে জনসাধারণের স্বেচ্ছায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অংশগ্রহণ এবং স্বেচ্ছায় পুলিশকে সহায়তা করতে হয়। আর যদি পুলিশ সদস্যদের জনসাধারণের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকে তাহলে তারা পুলিশকে যেকোনো অপরাধ সম্পর্কে অবগত করবে এবং সে মোতাবেক পুলিশ কাজ করবে। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে কমিউনিটি মিটিং, উঠান বৈঠক ও অপরাধ নিরোধ সভা অনেক কার্যকর ভূমিকা রাখে। এসব সভা ও বৈঠক থেকে সমাজের অপরাধের ও আইনশৃঙ্খলার সঠিক চিত্র পাওয়া যায় এবং তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে সমস্যার সমাধান করা যায়। এসব উপায়ে সমস্যা সমাধানকল্পে পুলিশ ইমেজ গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

জনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনায়

জনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনায় সংলাপ এবং সমঝোতায় পৌঁছানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেখা যায় দীর্ঘ বঞ্চনার কারণে মানুষ জনতাবদ্ধ হয়ে যায়, আন্দোলন করে, প্রতিবাদ করে ও ভাঙচুর করে। পুলিশকে তারা প্রতিপক্ষ হিসেবে নেয়। পুলিশের একারপক্ষে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হয় না। তৃতীয় কোনো ব্যক্তি বা পক্ষ বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আবেগপ্রবণ জনতাকে বোঝায়ে আলোচনার টেবিলে বসানো যায়। সে জন্য বলা হয়ে থাকে ওইসব ক্ষেত্রে পুলিশের ইমেজ গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মাদক ও মাদকাসক্তি নিয়ন্ত্রণে

আমাদের সমাজে বিরাজমান সমস্যাগুলোর মধ্যে মাদকাসক্তি অন্যতম। বর্তমানে আমাদের যুবসমাজের বড় একটা অংশ মাদকাসক্ত। এক সমীক্ষা থেকে জানা যায় বড় শহরগুলোতে যত অপরাধ ঘটে থাকে তার শতকরা ৮০ ভাগ মাদকাসক্তরা করে থাকে। মাদক ও মাদকাসক্তি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিনটি উপায়ে কাজ করা যায়। প্রথমত, চাহিদা কমিয়ে, দ্বিতীয়ত, ক্ষতি কমিয়ে এবং সর্বশেষটি হলো সরবরাহ কমিয়ে। এ তিনটি ক্ষেত্রেই জনগণের সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন। আর পুলিশকেই এ ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। সর্বোপরি জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সে জন্য পুলিশ ইমেজ গঠন অত্যন্ত গুরুত্ববহ। কারণ পুলিশের ইমেজ বৃদ্ধি ঘটলেই জনসাধারণ পুলিশকে সহায়তা করবে এবং এ দেশ থেকে মাদক ও মাদকাসক্তি নির্মূল হবে। সুতরাং ইতিবাচক ইমেজ গঠন ও ইমেজ বৃদ্ধি করার মাধ্যমে পুলিশিং ফলপ্রসূ হবে এবং এক আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠা পাবে।

লেখক: অতি: ডিআইজি, কমান্ড্যান্ট, পুলিশ স্পেশাল ট্রেনিং স্কুল (পিএসটিএস), বেতবুনিয়া, রাঙামাটি

বিষয়:

বাঙালির মেলা কালচারে প্রকৃতি ও পরিবেশ

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ড. মো. হুমায়ুন কবীর

মেলা মানে উৎসব। ছোট্ট সোনামণিদের ছড়ার বইয়ে কবি আহসান হাবীবের ‘মেলা’ নামের একটি ছড়া আছে। সেটির দুটি চরণ হলো এরকম, ‘ফুলের মেলা পাখির মেলা/ সাত আকাশে তারার মেলা’...। সাধারণভাবে কোনো স্থানে যখন কোনো জিনিসের সমাবেশ ঘটানো হয় এবং সেই সমাবেশ উপভোগ করার জন্য যে গণজমায়েত জড়ো হয় সেটাকে মেলা বলে। আর বাংলাদেশে সারাবছরই কোনো না কোনো উপলক্ষে মেলা জমায়েতের প্রচলন থাকায় বিভিন্ন নামে সেই মেলা চলতেই থাকে।

প্রতিটি মেলাই বাঙালি কালচারের সঙ্গে মিশে গেছে বলেই সেটাকেই বাঙালির মেলা কালচার বলা হয়। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো বেইমেলা। প্রতি বছরের ভাষার মাস হিসেবে পরিচিত পুরো ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে অনুষ্ঠিত হয় বাঙালি প্রাণের অন্যতম বইমেলা। এ বইমেলাকে কেন্দ্র করে যেমন পসরা বসে নতুন পুরাতন অনেক বইয়ের। আবার সেই বই কেনা ও দেখার জন্য অনেক দর্শক মেলায় জমায়েত। একুশের বইমেলাটি মূলত বাঙালির বৃদ্ধিবৃত্তিক একটি মিলনমেলাও বলা চলে।

তারপর সারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় বছরের কোনো না কোনো সময়ে ঢাকা বইমেলা, বিভিন্ন জেলাভিত্তিক বইমেলা, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ব্যানারে বইমেলা, বিভিন্ন পেশাভিত্তিক বইমেলা, কবিতার বইমেলা, গল্পের বইমেলা, উপন্যাসের বইমেলা, প্রবন্ধের বইয়ের মেলা ইত্যাদি নানা নামে মেলাগুলো চলতে থাকে। তারপর বর্ষবরণের পহেলা বৈশাখের ঐতিহ্যবাহী বাঙালির গ্রাম-বাংলার মেলায় কতই না আনন্দ-ফূর্তি হয় সম্প্রদায়ে-সম্প্রদায়ে। আর বর্তমান শেখ হাসিনার সরকার তো সেই পহেলা বৈশাখের মেলাকে আরও বেশি প্রাণবন্ত ও সাবলীল করার জন্য একে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের মাধ্যমে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছেন। বর্তমানে সরকারি চাকুরেদের জন্য চালু থাকা বছরে দুটি বোনাসের পরিবর্তে বর্ষবরণের জন্য আরও একটি বোনাস দেওয়া শুরু করেছেন।

ফেব্রুয়ারি মাসের ১৪ তারিখে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ব ভালোবাসা দিবসকে কেন্দ্র করে ভালোবাসা মেলা। হয় ফাগুনের মেলা, চৈতালি মেলা, বসন্তবরণ উৎসবে বসন্তমেলা। আছে শরৎ মেলা। শরৎকাল প্রকৃতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। সে সময় বর্ষা শেষে শীতের আমেজ শুরু হয়ে যায় প্রকৃতিতে। চারদিকে শুরু হয় রবিশস্য আবাদের ধুম। গ্রামীণ কৃষক ভোরবেলায় তার সবজি খেতে চাষ দিতে হাল নিয়ে গরুর দল তাড়িয়ে ঘুটে চলে তার মাঠের পানে। রাতের কুয়াশার শিশিরে সকালে ফসলের মাঠে, ঘাসের পাতায় তাই শীর্ষবিন্দু চোখে পড়ে। তাই তো মন চায় কবির ভাষায়, কবি নজরুলের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে গেয়ে উঠি, ‘শারদ প্রাতে একলা জাগি, সাথে জাগার সাথী কই’...।

ঠিক সেভাবে কবি গুরুর ‘চিক্ চিক্ করে বালি, কোথা নাই কাদা, একধারে কাশবন, ফুলে ফুলে সাদা’ ছড়াটি পড়লেই মনে হয় নদীর ধারের চরে শরতের সেই সাদা সাদা কাশফুলের প্রাকৃতিক বাগান। আবার বসন্তকালের বাসন্তী মেলায় গৃহিণী-তরুণী সবাই বাসন্তী রঙের শাড়ি পরে মেলা উপভোগ করে থাকে। ভাব জমিয়ে আড্ডা দেয় কপোত-কপোতি। নবান্নে শুরু হয় পিঠা উৎসব ও বাহারি রং ও পদের গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন পিঠা মেলা। আর সে জন্য ষোলো আনা বাঙালিপনায় দীক্ষিত বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক প্রতি বছরেই নতুন বছরের নবান্নে গণভবনে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী পিঠা উৎসবের আয়োজন করা হয়ে থাকে।

তার দেখাদেখি সে সময় আরও অনেক জায়গায় সেই পিঠা উৎসব সংঘটিত হয়েছিল। তার মধ্যে ময়মনসিংহের ত্রিশালে অনুষ্ঠিত পিঠা মেলা অন্যতম। মাছের হাট থাকে বাজার থাকে আমরা তা জানি; কিন্তু মাছ নিয়ে মেলা হতে পারে সেটিও দেখিয়ে দিয়েছে কোনো কোনো এলাকার মানুষ। দেশি মাছের অন্যতম এলাকা হিসেবে পরিচিত সিলেটের বিশ্বনাথে দেশি টাটকা মাছের মেলা। একইসঙ্গে শরৎকালে শীতের ঠিক আগে নদী-নালা, বিল-ঝিল, হাওর-বাঁওড়ের পানি কমে গেলে ঐতিহ্যবাহী হিসেবে পরিচিত হাঁকডাক দিয়ে এলাকাবাসী সবাই একত্রে মিলে পলো দিয়ে মাছ ধরার মেলা যা দেশের বিভিন্ন জায়গাতেই সেসব এলাকার রীতি অনুযায়ী সংঘটিত হয়ে থাকে। তেমনি সম্প্রতি হবিগঞ্জে মাছ ধরার জন্য পলো মেলা হয়ে গেল।

ঠিক সেভাবে আয়োজন করা হয়ে থাকে বিভিন্ন জায়গায় নানা নামের মেলা। এর থেকে বাদ যায় না নজরুল মেলা, রবীন্দ্র মেলা, মধুসূধন মেলা, লালন মেলা, হাসন মেলা, সুলতান মেলা ইত্যাদিও। কারণ বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য-প্রকৃতির সঙ্গে এসব সাংস্কৃতিক মেলা যে অনেক গুরুত্ব বহন করে। এলাকা ও ব্যক্তিভিত্তিক এসব মেলার অনেক বন্ধন রয়েছে সেসব এলাকার শেকড়ের সঙ্গে। মৌসুমভিত্তিক আরও যেসব গুরুত্বপূর্ণ মেলা আমাদের দেশকে মহিমান্বিত করেছে, তার মধ্যে রয়েছে- কৃষিপ্রযুক্তি মেলা, বৃক্ষমেলা, বাণিজ্য মেলা, কৃষি মেলা, দেশীয় ফল মেলা, রাসায়নিকমুক্ত নিরাপদ ফল মেলা, রাসায়নিক মুক্ত সবজি মেলা, দেশীয় সবজি মেলা, পাখি মেলা, পরিবেশ মেলা, শিল্পোদ্যোক্তা মেলা, গার্মেন্টস মেলা, পর্যটন মেলা, বিদেশ ভ্রমণ মেলা, দেশি-বিদেশি গাড়ি মেলা, মোবাইল মেলা, মোবাইলের সিমমেলা, মোবাইল সেট মেলা, ল্যাপটপ মেলা, কম্পিউটার মেলা, তথ্যপ্রযুক্তি মেলা, ব্যাংকিং মেলা, আয়কর মেলা ইত্যাদি। দুটি ঈদে হয় বিভিন্ন পণ্য মেলা, ফার্নিচার মেলা, আছে কোরবানি ঈদ এলে শুরু হয়ে যায় পশু মেলা।

কিছুদিন আগে অর্থাৎ ২০১৬ সালের ঈদুল ফিতরের সময় হয়ে গেল ভারতীয় ভিসার সহজীকরণ মেলা। এসব মেলার মাধ্যমে শুধু যে মানুষ আনন্দই উপভোগ করে তাই নয়- এর মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রচার-প্রসার ও সম্প্রসারণ হয়ে থাকে। সেই সঙ্গে প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষার্থে কাজ হয়ে থাকে। যেমন- বৃক্ষ মেলার মাধ্যমে দেশে বৃক্ষ রোপণের গুরুত্ব প্রদর্শণ করা হয়ে থাকে সারা দেশের মানুষের জন্য। সেখানে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও বেসরকারি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী পরিবেশবাদী সংগঠন এবং ব্যক্তিপর্যায়ে বৃক্ষরোপণের ব্যবস্থা করে থাকে। সেইসঙ্গে এসব মেলায় বৃক্ষরোপণের সাহায্যে কীভাবে প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব সেসব বিষয়ে লিফলেট, পাম্ফলেট, প্রচারপত্র ইত্যাদি বিলি-বণ্টন করে সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়ে থাকে।

কোনো স্থানের পরিবেশ রক্ষার্থে ঠিক কত পরিমাণ বনভূমি বা গাছ-গাছড়া থাকার প্রয়োজন এবং সেটা কীভাবে অর্জন করা সম্ভব সে বিষয়ে গান-নাটকের মাধ্যমেও প্রচারের ব্যবস্থা থাকে মেলায়। এটাকে উপলক্ষ করে সারাবছর অনেক বৃক্ষপ্রেমী সে সময় গাছ ক্রয়ের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। যেমন প্রতি বছরে বৃক্ষমেলা উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের প্রত্যেক নাগরিককে কমপক্ষে একটি করে ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা লাগানোর পরামর্শ প্রদান করে থাকেন। প্রতি বছর বর্ষাকালে অর্থাৎ গাছ লাগানোর মৌসুমের প্রথম দিকে এ মেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে।

সেখানে প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায়টি খুবই কাজে এসেছে। স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার প্রায় সাড়ে আট লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে গাছ লাগানোর ব্যাপক সাড়া পড়ে গেছে। বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং বনবিভাগের যৌথ উদ্যোগে সেখানে এ মৌসুমে প্রায় ৩০ লাখ ফলজ ও বনজ গাছ লাগানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর শিক্ষার্থীরা খুবই আগ্রহের সঙ্গে প্রকৃতি রক্ষার সেই কাজ করছে। ঠিক সেরকমভাবে সরকারের কৃষি বিভাগের উদ্যোগে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় কৃষিপ্রযুক্তি হস্তান্তর মেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে।

দেশের আপামর কৃষকদের জন্য আয়োজিত এ মেলায় নতুন নতুন কৃষি উন্নয়ন প্রযুক্তির উৎকর্ষতা প্রদর্শন করা হয়ে থাকে। যেসব উন্নত নতুন ফসলের জাত আবিষ্কারের পর তার উৎপাদন পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য মাঠপর্যায়ে যে প্রদর্শনী করা হয় তার সাফল্যগাথা সবপর্যায়ের কৃষকদের জন্য একটি প্রশিক্ষণের কাজ করে থাকে এসব কৃষি মেলার মাধ্যমে। দেশ-বিদেশের পরিবেশের সাফল্য যেমনি করে ‘প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের’ চেয়ারম্যান মুকিত মজুমদার বাবুর পরিকল্পনা ও উপস্থাপনায় ‘প্রকৃতি ও জীবন’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বেসরকারি জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল আই’-তে অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে পরিবেশন করা হয়, ঠিক তেমনি বাংলাদেশের কৃষির উন্নয়নের জন্য কৃষকদের সরাসরি হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়ার অংশ হিসেবে দেশ-বিদেশের কৃষির বিভিন্ন সাফল্যগাথা কৃষি উন্নয়নে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব সাইখ সিরাজের পরিকল্পনা ও উপস্থাপনায় সেই ‘চ্যানেল আই’-তেই ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রচার করা হয়ে থাকে।

কাজেই প্রকৃতি ও পরিবেশের উন্নতি বিবেচনায় অন্যান্য মেলার চেয়ে বৃক্ষমেলা ও কৃষি মেলার গুরুত্ব অনেক বেশি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এবারের বৃক্ষ, কৃষি ও ফল ইত্যাদি মেলায় মানুষের মধ্যে অনেক সচেতনতা তৈরি হয়েছে, ফলে পরিবেশের দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন হয়েছে এবং হচ্ছে। কাজেই দেখা যাচ্ছে, এমন কোনো জিনিস নেই যা নিয়ে বাংলাদেশে মেলা অনুষ্ঠানের উদাহরণ নেই। মেলাকে তাই আমাদের উপভোগের পাশাপাশি জনকল্যাণে ব্যবহার করতে হবে। তাহলেই বাঙালির এ চিরায়ত কালচারের মাধ্যমে শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতি ও পরিবেশের উপকারও নিশ্চিত হবে। আমাদের জন্য হবে সুন্দর ও সবার জন্য বাসযোগ্য একটি আগামী পৃথিবী।

লেখক: কৃষিবিদ ও রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

বিষয়:

নতুন সরকার গঠনের পাঁচ মাসেও মেঘ কাটেনি

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
শেখর দত্ত

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠনের প্রায় ৫ মাস অতিক্রান্ত হতে চলেছে। নতুন সরকার ছিল পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারেরই ধারাবাহিকতা। এ সত্ত্বেও নতুন সরকার মানেই হচ্ছে নতুন অঙ্গীকার, নতুন উদ্যম, নতুন প্রত্যাশা। নতুন সরকার মানেই কিছু প্রাপ্তি। এ জন্য নতুন সরকারের ১০০ দিনকে ‘হানিমুন পিরিয়ড’ বলা হয়ে থাকে। এবারে নির্বাচনের পর এই শব্দটা দু’একজন মন্ত্রী এবং কোনো কোনো প্রচার মাধ্যম ব্যবহার করলেও এ নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্য হয়নি।

এমনটা না হওয়ার কারণ সুস্পষ্ট। এবারে নির্বাচনকালে দেশের দ্বিতীয় বড় দল বিএনপিসহ বেশ কতক দল অংশগ্রহণ না করায় রাজনৈতিক সংকট এবং করোনা দুর্যোগ, রাশিয়া-ইউক্রেন ও ইসরাইল-প্যালেস্টাইন যুদ্ধের ফলে বৈশ্বিক মন্দার মধ্যে জাতীয়ভাবে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের কারণে অর্থনৈতিক সংকট বিরাজমান ছিল। এর ওপর বোঝার ওপর শাকের আঁটির মতো ছিল আন্তর্জাতিক নানা চাপ, ষড়যন্ত্র-চক্রান্তও।

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এই দুই সংকট এবং চাপ ও ষড়যন্ত্রের স্বীকৃতি আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিয়েছিলেন নির্বাচনী ইশতাহারে জনগণের প্রতি আহ্বানের সবশেষে। তিনি ভয়হীনচিত্তে উচ্চারণ করেছিলেন, সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতার লাইন: ‘মেঘ দেখে কেউ করিস নে ভয়/ আড়ালে তার সূর্য হাসে,/ হারা শশীর হারা হাসি/অন্ধকারেই ফিরে আসে।’

নতুন সরকার ক্ষমতায় নেওয়ার প্রায় ৫ মাস অতিক্রান্ত হলেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গন থেকে মেঘ বা অন্ধকার যা-ই বলা হোক না কেন তা দূর হয়নি। তবে সংকট ঘনীভূত হয়ে গেছে কিংবা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক- দুই সংকট সমানভাবে একত্রে দানা বেঁধে দেশ অস্থিরতার মধ্যে চলে যাচ্ছে, এমনটা নয়। অবশ্য অর্থনৈতিক সংকট যদি ঘনীভূত হতে থাকে তবে রাজনৈতিক সংকটও দানা বেঁধে উঠতে পারে এবং তাতে অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।

বর্তমানে রাজনৈতিক অঙ্গনে যে অবস্থা চলছে তা থেকে সুস্পষ্ট, সংবিধান সমুন্নত রেখে চলমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানের উপায় সরকার বা সরকারি দলের হাতে নেই। এমতাবস্থায় বিএনপিকে প্রায় ৫ বছর বসে থাকতে হবে নতুবা গণআন্দোলন কিংবা ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের ভেতর দিয়ে সরকারকে উৎখাত করতে হবে। ৫ বছর তো বহু সময়। আর ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত্র কখনো পরিদৃষ্ট হয় না। তাই এ দুই নিয়ে আগাম কিছু অনুমান করা যাবে না।

গণআন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারকে অপসারণের বিষয়টি নিয়ে আলোচনার প্রথমেই বলতে হয়, এ ক্ষেত্রে সরকার ও সরকারি দল রয়েছে সুবিধাজনক অবস্থায়। সংবিধান থেকে শুরু করে সরকারে থাকা প্রভৃতি আওয়ামী লীগের পক্ষে। আর আন্দোলনে নিষ্ফল বিএনপির অবস্থান ও নেতাদের বক্তৃতা বিবৃতি থেকে সুস্পষ্ট দলটি রয়েছে রাজনৈতিক দিক থেকে কিংকর্তব্যবিমূঢ়, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দিক থেকে বিভ্রান্ত এবং সাংগঠনিক দিক থেকে বিবাদ-বিভেদের মধ্যে।

ইতোমধ্যে পত্রিকা পাঠে জানা যায়, বিএনপি ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে। এমন চাওয়াটা স্বাভাবিক। এই চাওয়ার ভেতর দিয়ে এটা সুস্পষ্ট, লন্ডনে পালিয়ে থাকা দলের প্রধান নেতা ‘ভাইয়া’র নির্দেশে বিএনপি ভুল ও উল্টোপথে অনেক দূর এগিয়েছিল। প্রশ্ন হলো- এতটা ভুল করার পর ঘুরে দাঁড়ানো আদৌ সম্ভব হবে কি? কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় করণীয় ঠিক করতে পারবে কি? নিজেদের পক্ষে করণীয় ঠিক করা সম্ভব হচ্ছে না বলেই এখন সমমনা সাইনবোর্ড সর্বস্ব দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে বিএনপি পথ অনুসন্ধানে তৎপর থাকছে। নির্বাচনী ট্রেন মিস করে সংসদ-পথ সব হারিয়ে পথ বের করা অনেকটাই অসম্ভব বৈ কি!

ইতোমধ্যে ১২ দলীয় জোট, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ, গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য, গণফোরাম (মন্টু) ও গণতান্ত্রিক মঞ্চের সঙ্গে বৈঠক করেছে বিএনপি। আলোচনার এই প্রক্রিয়া আরও চলবে। এই আলোচনা চলতে চলতে কোথায় পৌঁছাবে এবং কোন ধরনের আন্দোলনের কর্মসূচি গ্রহণ করবে, তাতে কতটুকু জমায়েত করতে পারবে, তাতে আন্দোলনে জোয়ার আসবে কি না প্রভৃতি সব প্রশ্নের মধ্যে বিএনপি এখন ঘুরপাক খাচ্ছে। মূল নেতা পালিয়ে থাকা অবস্থায় এই পাক থেকে উদ্ধারের কাণ্ডারি কে হবেন কে জানে?

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ঠিক করার ক্ষেত্রে বিএনপি রয়েছে চরম বিভ্রান্তির মধ্যে। সাদামাঠা চোখেই বোঝা যায়, নির্বাচনী ডামাঢোলের প্রথম দিকে মানবাধিকার ইস্যু নিয়ে আমেরিকার অবস্থান ছিল সরকারের বিরুদ্ধে। বিএনপির হাবেভাবে মনে হয়েছিল পিটার হাসের পিঠে চড়েই ক্ষমতায় গিয়ে বসতে পারবে। নির্বাচন পর্বের শেষ দিকে দলটির মোহভঙ্গ হয়। সম্প্রতি সফরের সময় মন্ত্রীদের সঙ্গে যৌথ ব্রিফিংয়ে ডোনাল্ড লু যখন বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন চায় যুক্তরাষ্ট্র’ কিংবা তার সঙ্গে যখন বিএনপির বৈঠক হয় না তখন বিএনপি যে মোহভঙ্গ থেকে মনোভঙ্গ হয়েছে, তা সহজেই অনুমেয়।

প্রসঙ্গত, বিএনপি নির্বাচনের আগে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেছে। নির্বাচনের পর বিএনপি ডিগবাজি দেয় এবং তাতে দলটির ভারতবিরোধী আসল চেহারা বের হয়ে আসে। দলটি ভারতীয় পণ্য বর্জনের আন্দোলন গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়। তা ফ্লপ হওয়ার পর টনক নড়ে। এখন জানা যাচ্ছে বিএনপি ওই কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসতে চাইছে। ডিগবাজি দেওয়া ও ডিগবাজি দিতে চেষ্টা করার ভেতর দিয়ে সুস্পষ্ট, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিএনপি এখন রয়েছে বিভ্রান্তি ও বিভক্তির মধ্যে।

সর্বোপরি সাংগঠনিক দিক থেকে বিএনপির রয়েছে সবচেয়ে বিপদে। কোনো রাজনৈতিক দলের শেষ বাঁশি বাজে পরস্পরের বিরুদ্ধে তহবিল তছরুপের অভিযোগ উঠলে। নামিদামি পত্রিকায় যদি হেডিং হয় ‘আন্দোলনের তহবিল আত্মসাৎ বিএনপির নেতাদের’ কিংবা ‘ঢাকা মহানগরেও বিএনপির আন্দোলনের তহবিল নয়ছয়’ তবে আর থাকে কি! তহবিল তছরুপের অভিযোগ উঠেছিল ২০১৮ সালে নির্বাচনের আগে প্রধান নেতা ‘ভাইয়া’র বিরুদ্ধে আর এবারে উঠেছে দলীয় নেতাদের বিরুদ্ধে। ‘কারাবন্দি’ ও ‘নির্যাতিত’ নেতারা যদি ‘বরাদ্দ না পায়’ তবে দলের ভিত্তি নড়বড় হওয়ারই কথা। দলীয় কোন্দলে বিএনপি তাই বেহাল অবস্থায় রয়েছে।

বিএনপির এই অবস্থায় আওয়ামী লীগ আরও সুবিধাজনক পর্যায়ে দলকে নিয়ে যেতে পারত। ভাবমূর্তি সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়া অসম্ভব ছিল না; কিন্তু উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একদিকে বিভক্তি-পাল্টাপাল্টি আর অন্যদিকে আত্মীয়-পরিজনের সাংগঠনিক ‘সিন্ডিকেট’ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা এতে বাদ সাধছে। এখানে-ওখানে ছাত্রলীগে পাল্টাপাল্টি-মারধরও দলের ভাবমূর্তিকে ক্রমেই বেশি বেশি করে ক্ষুণ্ন করছে। প্রায় ৫ মাস হয়ে গেলেও মন্ত্রীরা মন্ত্রণালয়ভিত্তিক এমন কোনো উল্লেখ করার মতো জনবান্ধব কাজ জনগণের সামনে আনতে পারছেন না, প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রাপ্তিতে এমন কোনো ছাপ রাখতে পারছেন না, যা সময়ের এক ফোঁড়কে দশ ফোঁড় করতে পারে, যাতে মানুষের মনে আশা-উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূমিকা এ ক্ষেত্রে অনন্য। মানুষ যেমন তার ওপর ভরসা রাখছে, তেমনি কোনো বিক্ষুব্ধতা বা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সংকট দানা বেঁধে ওঠার সম্ভাবনা সৃষ্টি হলেও তিনি হস্তক্ষেপ করলে তার সমাধান হচ্ছে। বিএনপির অবস্থা এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবস্থানের কারণে রাজনৈতিক সংকট আলাদাভাবে দানা বেঁধে ওঠার সম্ভাবনা তেমনভাবে নেই বলে অনুমিত হচ্ছে।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর পুনঃপুনঃ নির্দেশ সত্ত্বেও অর্থনীতির কতক ক্ষেত্রে সংকট থেকে যাচ্ছে। এসব সংকট থেকে উত্তরণ কখন কতটুকু কীভাবে হবে তা বলে কেউ-ই জনগণকে আশ্বস্ত করতে পারছেন না। নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছিল ‘দ্রব্যমূল্য সবার ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া’ হবে; কিন্তু নির্বাচনের প্রায় ৫ মাস চলে গেলেও তা হয়নি। বিআইডিএস বলছে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৫ শতাংশ, তবে বিসিএস বলছে ১০.২২ শতাংশ। এই পার্থক্য নিয়ে বিতর্ক না করেও বলা যায়, তা বেড়ে চলেছে। পরিস্থিতি এমনই যে, গত ১৪ মে গণভবনে আগামী বাজেট নিয়ে আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘দ্রব্যমূল্যের লাগাম টানার নির্দেশ দিয়েছেন।’

প্রসঙ্গত, নির্বাচনী ইশতেহারে বাজার ব্যবস্থাপনা ও মুদ্রাস্ফীতি বিষয়ে যেসব অঙ্গীকার করা হয়েছিল, তার কতটুকু কি করা হচ্ছে তা জনগণের কাছে যেমন- সুস্পষ্ট হচ্ছে না, তেমনি সুদের হার ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মূদ্রাস্ফীতি আরও বাড়বে বলে অনুমিত হচ্ছে। নির্বাচনী ইশতেহারে আরও একটি অঙ্গীকার ছিল, ‘নিম্ন আয়ের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা সুলভ’ করা হবে। এ ব্যাপারেও কোনো উদ্যোগ পরিদৃষ্ট হচ্ছে না। দ্রব্যমূল্য ও স্বাস্থ্য খরচে মানুষ দিশেহারা ও পিষ্ট হচ্ছে। ভাতের অভাব নেই ঠিক, কিন্তু এ দুই থেকে মানুষ পরিত্রাণের পথ পাচ্ছে না।

সর্বোপরি নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর কতক বিষয়ে কিছু করবে বলে জনগণ উন্মুখ হয়েছিল; কিন্তু এখন পর্যন্ত (ক) ঘুষখোর, ঋণ-কর- বিলখেলাপি ও দুর্নীতিবাজদের ‘বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে শাস্তি প্রদান এবং তাদের অবৈধ অর্থ ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত’; (খ) ‘শুল্কফাঁকি, বিদেশে অর্থ পাচার, হুন্ডির মাধ্যমে লেনদেন, মজুতদারি ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি এবং অতি মুনাফা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা’ গ্রহণ; (গ) ‘পুঁজি পাচার অপরাধীদের বিচারের অধীনে’ আনা এবং ‘সংশ্লিষ্ট দেশের সহযোগিতায় পাচার করা অর্থ-সম্পদ ফেরত আনার উদ্যোগ’ লক্ষণীয় হয়ে উঠছে না।

বাস্তবে মুদ্রাস্ফীতি হতে থাকায় এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ইস্পিত কাজগুলো দৃশ্যমান না হওয়ায় মানুষ আশাহত হচ্ছে, ক্ষুব্ধতা বাড়ছে। শঙ্কিত হচ্ছে এই ভেবে, মুদ্রাস্ফীতির কারণে সংকট আরও বাড়বে। এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সংকট যদি ঘনীভূত হতে থাকে, তবে যেকোনো ইস্যুতে ক্ষুব্ধতার স্ফূরণ যেকোনো সময় হতে পারে।

১৯ মে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বন্ধের প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় মীরপুরে খেটে খাওয়া মানুষের জমায়েত সংবাদমাধ্যমে দেখে তেমনটা মনে হচ্ছে। বিএনপি কিন্তু সেই আশায়ই তীর্থের কাকের মতো বসে আসে। তেমন অবস্থায় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট মিলেমিশে গেলে অস্থিরতা ও অরাজকতা সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকবে। এমতাবস্থায় সরকারকে অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য অঙ্গীকার অনুযায়ী ব্যবস্থাগুলো কার্যকর ও দৃশ্যমান করা অতীব জরুরি।

লেখক: রাজনীতিক

বিষয়:

বাংলাদেশের পথ ধরে বেলুচদের পর এবার স্বাধীনতা চায় আজাদ কাশ্মীর

ছবি: সংগৃহীত
আপডেটেড ২২ মে, ২০২৪ ০০:০৩
ফারাজী আজমল হোসেন

২৩ বছরের বৈষম্য ও নিপীড়নমূলক শাসনের জেরে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীনতা পায় তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান। জন্ম নেয় নতুন দেশ বাংলাদেশ। সাম্প্রতিককালে পাকিস্তানের বহু রাজনীতিক স্বীকার করছেন দেশটির তৎকালীন শাসকদের করে যাওয়া ভুল রাজনীতি ও নিজেদের নাগরিকদের ওপর বৈষম্য ও নিপীড়নের কারণেই এমনটি ঘটেছিল। যদিও বাংলাদেশ স্বাধীনের শেকড় ছিল আরও গভীরে। তবে সেই সব বিষয় নিয়ে কি আদৌ ভাবছে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী? এমন প্রশ্নের উত্তর হবে, ‘না’। সবচেয়ে বড় কথা, একটি ঘটনা থেকে শিক্ষা নেয়নি পাকিস্তান। তারা নিজেদের বৈষম্য ও নিপীড়নমূলক মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। ফলে তাদের দেশের অভিজাত শ্রেণি ও ডিপ স্টেটের বাইরের সবাই এখনো নির্যাতিত। আর এটির সবচেয়ে বড় প্রমাণ এখনো জ্বলছে বেলুচিস্তান ও আজাদ কাশ্মীর। আর দুটি ভূখণ্ডই বাংলাদেশের পথ ধরে চাইছে স্বাধীনতা।

২০২০ সালে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের নির্বাসিত নেতা সর্দার শওকত আলী কাশ্মীরীর একটি বক্তব্য ব্যাপক আলোড়ন তোলে। ওই বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের মানুষজনকে তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করার সুযোগ দেয়নি সে দেশের সরকার। ১৯৪৭ সালে কাশ্মীর পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা চেয়েছিল। ওই বছর ২২ অক্টোবর কাশ্মীরে হামলা করে পাকিস্তান। তারপর থেকে সেখানে দখলদারিত্ব চলছে। এটি শুধু শওকত আলী কাশ্মীরীর কথা নয়। বরং ওই অঞ্চলের বাসিন্দাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ যেন এমন মননই ধারণ করেন।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের হাত থেকে মুক্ত হয়ে উপমহাদেশের প্রায় সব অঞ্চল ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হয়। তবে পার্শ্ববর্তী জম্মু-কাশ্মীরকে কোনো দেশের সঙ্গে যেমন যুক্ত করা হয়নি। এটিকে স্বাধীন কোনো দেশ বলেও ঘোষণা করা হয়নি। ওই বছরই পাকিস্তানি সৈন্যরা কাশ্মীরে প্রবেশ করে কাশ্মীর দখল করতে। তখন কাশ্মীরের রাজা আত্মরক্ষার্থে ভারতের সাহায্য চান। ভারত সাহায্যের শর্ত হিসেবে জম্মু-কাশ্মীরকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব দেয়। কাশ্মীরের রাজা তাতে রাজি হন। এরপর ভারতীয় সৈন্যরা কাশ্মীরে ঢোকে সেখান থেকে পাকিস্তানিদের তাড়াতে। প্রায় বছর খানেক সময় যুদ্ধ করে ভারত জম্মু-কাশ্মীরের তিন ভাগের দুভাগ নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়। আর পাকিস্তানের ভাগ্যে জোটে তিন ভাগের এক ভাগ। পাকিস্তান সেই এক ভাগের নাম দেয় আজাদ কাশ্মীর বা স্বাধীন কাশ্মীর। পাকিস্তানিরা চায় এটিকে জোর করে দখলে রাখতে। কাশ্মীরে একটা যুদ্ধ অবস্থা জারি রেখে নিজেদের আখের গোছানোয় মত্ত তারা। তাই তারা সন্ত্রাসবাদকে পুঁজি করেছে, অনেক স্বাধীনতাপন্থি কাশ্মীরীকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বানিয়েছে। ফলে কাশ্মীরীদের চাওয়া পূরণ হচ্ছে না। পাকিস্তানের সরকার বরাবরই কাশ্মীর আন্দোলন দমন করতে চেয়েছে কঠোর হস্তে।

ভারত ও পাকিস্তানের অধিকৃত উভয় কাশ্মীরেরই স্বাধীনতার দাবিতে কাজ করা জম্মু ও কাশ্মীর লিবারেশন ফ্রন্ট (জেকেএলএফ) ২০১৯ সালে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করলে অন্তত ৪০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে দেওয়া হয় রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা। এ ছাড়া আজাদ কাশ্মীরে নিয়মিত লেগে আছে সহিংসতা। ২০২৩ সালে পাকিস্তাননিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে হঠাৎ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য গম, আটা এবং বিদ্যুতের দাম বেড়ে যায়। মূল্যবৃদ্ধির জেরে জীবনযাপনের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খায় মানুষ। একপর্যায়ে দাম কমানোর দাবিতে গত বছরের মে মাসে আন্দোলন শুরু করে আজাদ কাশ্মীরের জনগণ। তাদের নেতৃত্ব দেয় স্থানীয় সংগঠন জম্মু-কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (জেএএসি)। গত ১৪ মে মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলাকালে পাকিস্তানি রেঞ্জার্সের গুলিতে নিহত হন তিন কাশ্মীরী।

মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে বৃহস্পতিবার থেকে জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির (জেএএসি) নেতৃত্বে আজাদ কাশ্মীরের হাজার হাজার বাসিন্দা প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল করে আসছেন। পাঁচ দিন ধরে চলা এ প্রতিবাদের মধ্যে এ পর্যন্ত চারজন নিহত হয়েছেন। সম্প্রতি গম-আটায় ভর্তুকি দেওয়া, বিদ্যুতের দাম কমিয়ে উৎপাদন খরচের সমান করা, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আর্থিক ব্যবস্থা সমন্বয়ে উন্নতিসাধনসহ ১০ দফা দাবি সরকারের কাছে পেশ করেন আজাদ কাশ্মীরের বাসিন্দারা। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ৯টি দাবিই পূরণের আশ্বাস দেয় পাকিস্তানশাসিত কাশ্মীর সরকার। কিন্তু তার কোনো প্রতিফলন গত তিন মাসে দেখেনি উপত্যকার মানুষ। জেএএসির পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিদ্যুতের দাম কমানো ছাড়া বাকি ৯টি দাবি বাস্তবায়নে রাজি হয় সরকার। কিন্তু তাতে সন্তুষ্ট হননি আন্দোলনকারীরা। এরই জেরে এ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের শুরুতে পাকিস্তানশাসিত কাশ্মীরে উত্তেজনা হঠাৎ বেড়ে যায়। জেএএসির নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মধ্যে সম্প্রতি তাদের কয়েকজন নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর প্রতিবাদে ১০ মে ধর্মঘটের ডাক দেয় জেএএসি। পরদিন ১১ মে আঞ্চলিক রাজধানী মুজাফ্ফারাবাদ অভিমুখে লং মার্চ কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত পুলিশের পাশাপাশি আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করে আঞ্চলিক সরকার। রাজধানী অভিমুখে লং মার্চ শুরুর প্রথম দিন আজাদ কাশ্মীরের বিভিন্ন শহরে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ বাধে।

এসব ঘটনায় নাগরিক সমাজের ভাষ্য, পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বরাবরের মতোই বৈষম্য ও নিপীড়নমূলক আচরণ দেখাচ্ছে নিজেদের নাগরিকদের ওপর। পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমে সাম্প্রতিককালে এরই উদাহরণ হিসেবে ১৯৭১ সালের আগে পূর্ব পাকিস্তানে এভাবে একে একে নানা প্রতিবাদ গড়ে উঠছিল বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে, এসব প্রতিবাদ দমনে শাসকগোষ্ঠীর কঠোরতার কথা। ফলে ক্রমেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে স্বাধীনতা আন্দোলন। সাম্প্রতিককালে সেই আন্দোলন জোরালো হচ্ছে। পাকিস্তানের অভ্যন্তরে স্বাধীনতা ও ন্যায্য অধিকারের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে বেলুচিস্তান, সিন্ধু এবং পাকিস্তানের দখল করা কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ। আর এই দাবিকে প্রতিহত করতে সামরিক বাহিনী, আধা-সামরিক বাহিনী এবং জঙ্গিদের ব্যবহার করছে পাকিস্তান।

২০২১ সালে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বলা হয়, পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে কোনো গণমাধ্যমই স্বাধীন নয় এবং সেখানে গুমের ঘটনা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। প্রখ্যাত সাংবাদিক তাহা সিদ্দিকি এক প্রতিবেদনে লিখেন, পাকিস্তানের দখলকৃত কাশ্মীরে কোনো রাজনৈতিক অধিকার নেই। এছাড়া জম্মু কাশ্মীর লিবারেশন ফ্রন্টের মতো যে সব দল আজাদ কাশ্মীরের স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করছে তাদেরকেও দমিয়ে রেখেছে ইসলামাবাদ।

এছাড়া পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে কাশ্মীরের কোনো রাজনৈতিক দল অংশ নিতে পারে না। ফলে পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলই সেখানে শাসন চালায়। ২০২১ সালে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর আজাদ কাশ্মীর আন্দোলন আরও একবার বড় গতি পায়। ওই সময় আজাদ জম্মু-কাশ্মীরে যাওয়ার এক বিরল সুযোগ পান মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক সাংবাদিক। সরেজমিনে তিনি দেখতে পান, ক্রমবর্ধমান স্বাধীনতাপন্থি আন্দোলন দমনে পাকিস্তানি নিরাপত্তাবাহিনী কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। ওই সময় এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এক সময় স্বাধীনতাপন্থি বিক্ষোভে অল্প কিছু মানুষ জড়ো হতো। কিন্তু এখন এসব বিক্ষোভে কয়েক হাজার মানুষ অংশ নেন।

সাম্প্রতিককালে কাশ্মীরীরা সীমান্তের দিকে বিক্ষোভ করতে গিয়েছিলেন। এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পাকিস্তানি নিরাপত্তাবাহিনীর সংঘর্ষ হয়। আজাদ কাশ্মীরের রাজনৈতিক নেতারা সীমান্তের দিকে মিছিল না নিয়ে যেতে আহ্বান জানানোর পরও কাশ্মীরীরা বিক্ষোভ করেন। কাশ্মীরের সাবেক এক সশস্ত্র স্বাধীনতাপন্থি পাকিস্তানের বিশ্বাসঘাতকতা নিয়ে ক্ষুব্ধ। তিনি বলেন, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী কাশ্মীরীদের স্বাধীনতার সংগ্রামকে কলঙ্কিত করেছে পাকিস্তানের বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে দিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে লড়াই করানোর মাধ্যমে। লস্কর-ই-তৈয়বার মতো সংগঠনগুলো ভারতের পার্লামেন্ট ও মুম্বাইয়ে হামলা চালিয়েছে। ওই স্বাধীনতা সংগ্রামী বলেন, ‘আমরা ছিলাম মুক্তিযোদ্ধা, আমরা কাশ্মীরেরই মানুষ ছিলাম। কিন্তু পরে পাকিস্তান লস্কর-ই-তৈয়বাকে আমাদের আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করায়। মানুষ আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রামকে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে। মুজাফ্ফরাবাদে কাশ্মীরের স্বাধীনতাপন্থি সংগঠন হিজবুল মুজাহিদিনের কার্যালয় মে মাস থেকে বন্ধ করে দিয়েছে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ।

আজাদ কাশ্মীরের সাবেক প্রধান বিচারপতি মানুজর গিলানি বলেন, একসময় জিহাদ ছিল জীবনের অংশ। এখন সব টম, ডিক ও হ্যারি দাঁড়িয়ে যায় এবং বলে তারা জিহাদে যাবে। এখন জিহাদিদের সন্ত্রাসী বলা হচ্ছে। একসময় তারা পাকিস্তানের স্বার্থে কাজ করত। কিন্তু এখন পাকিস্তান মনে করে এই পন্থা খারাপ। হিজবুল মুজাহিদিনের রাজনৈতিক শাখা মনে করা হয় জামাত-ই-ইসলামিকে। দলটির সাবেক প্রধান আব্দুল রশিদ তুরাবি দাবি করেন, তারা এখনো শান্তি চায়। সংলাপই সবার অগ্রাধিকারে রয়েছে। তিনি বলেন, সংকটের কূটনৈতিক সমাধানের সময় কমে যাচ্ছে এবং অনেকেই আর থেমে থাকতে রাজি না। একই অবস্থা আরেক প্রদেশ বেলুচিস্তানের। গত ৭০ বছর ধরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ন্যায় বেলুচিস্তান অবহেলিত।

১৯৪৭ সালের ১৪ ডিসেম্বর থেকে ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বেলুচিস্তানের পার্লামেন্ট পাকিস্তানের সঙ্গে একত্রিতকরণের বিরোধিতা করে। কিন্তু ১৫ এপ্রিল পাকিস্তানের সেনাবাহিনী প্রদেশটি জবরদখল করে। পাকিস্তানের সমগ্র ভূখণ্ডের ৪৬% বেলুচিস্তানে। সবচেয়ে বড় প্রদেশ হলেও এর জনসংখ্যা পাকিস্তানে সবচেয়ে কম। পাকিস্তানের ৪০% মানুষ পশতুন। সরকারি বিধি ব্যবস্থায় বৈষম্য এবং দারিদ্র্যের কারণে ক্ষুব্ধ বেলুচিস্তানের মানুষ। বিপুল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও বেলুচিস্তানের মানুষ খুবই দরিদ্র। মাত্র ২৫% মানুষ সেখানে শিক্ষিত। অথচ পাকিস্তানে শিক্ষার হার শতকরা ৪৭%। বেলুচিস্তানের বেকারত্বের হার ৩০%।

পাকিস্তানের এক-তৃতীয়াংশ গ্যাসের মজুত বেলুচিস্তানে। কিন্তু অল্প কয়েকটি শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহ আছে। বেলুচদের অভিযোগ, বেশির ভাগ পরমাণু পরীক্ষা বেলুচিস্তানে চালানো হয়। তাদের খনিজ সম্পদ ব্যবহৃত হচ্ছে পুরো পাকিস্তানের অগ্রগতিতে। এ বৈষম্যের সর্বশেষ নমুনা গোয়াদার বন্দর। প্রদেশটির হাজার হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে, অথচ বালুচদের সেখানে সম্পৃক্ত করা হয়নি। প্রথম থেকেই বৈষম্য চলছে এই প্রদেশটির ব্যাপারে। শের মোহাম্মদ মারির নেতৃত্বে ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত আন্দোলন করে বেলুচিস্তানের কয়েকটি উপজাতি।

১৯৬৭ সাল থেকে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করছে বেলুচ স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশন। সম্প্রতি বেলুচদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সেখানকার মাদ্রাসাগুলোতে ঢুকে পড়ছে তালেবান। ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত বেলুচিস্তানের ৪০ হাজার মানুষ নিখোঁজ হয়েছে এবং ১০ হাজার মানুষ খুন হয়েছে। ২০১৮ সালের ২৩ নভেম্বর করাচিতে চীনের কনস্যুলেটে বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হামলা সারা দুনিয়ার মানুষের নজরে আসে। যদিও বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি বেলুচিস্তানের খনিজ সম্পদের ব্যাপারে চীনের কর্তৃপক্ষকে আগেই সতর্ক করেছে। কারণ পাকিস্তানের সেনাবাহিনী সেখানকার বিভিন্ন জায়গাকে টার্গেট করছে।

১৯৪৭ থেকে ’৭১ সাল পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের ন্যায় দুর্ভোগে রয়েছে বেলুচিস্তানের মানুষ। চীনের কনস্যুলেটে হামলা দুঃখজনক কিন্তু বেলুচিস্তানের মানুষের দুর্ভোগের অভিযোগকে সবসময় উপেক্ষা করা যায় না। এ থেকেই প্রশ্ন উঠেছে, স্বাধীনতার পথে কি এগোচ্ছে বেলুচিস্তান? আর বেলুচিস্তানের পথ ধরেই স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আজাদ কাশ্মীরও?


বই আর খবরের কাগজের বিকল্প কিছু নেই

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
লিয়াকত হোসেন খোকন 

আর আসে না কিশোরবেলা- আগে আমরা ছোটবেলায় ভাইবোনেরা কাড়াকাড়ি করে, হুমড়ি খেয়ে পড়তাম রূপকথার বই। আরও ছিল বাটুল দি গ্রেট, নন্টে-ফন্টে, হাঁদা ভোঁদা। জনপ্রিয় কমিকসের জনপ্রিয়তার কথা স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করে আজও। একটু বড় হয়ে পড়েছি ঠাকুরমার ঝুলি, পাগলা দাশু, আবোল -তাবোল। সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালীন সময়ে চিত্রালী আর চিত্রাকাশের হয়েছিলাম প্রেমিক।

ছোটবেলায় ছিল পাড়ায় পাড়ায় লাইব্রেরি- সেখান থেকে বা অন্য বন্ধুকে ধরে গ্রন্থাগারে গিয়ে কিংবা ধার করে বই পড়ার অভ্যাস। অভ্যাস বলব না, সে যেন এক নেশা। দেবদাস, মেজদিদি, কপালকুণ্ডলা নিয়েছিল মন কেড়ে। হাতে হাতে ঘুরতে ঘুরতে জীর্ণ হয়ে যেত বই। এই ধারা অব্যাহত কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় হোস্টেলেও। এখন এই রেওয়াজ কমে গেছে। আজকের বাচ্চারা পাঠ্যবইয়ের চাপেই বোধহয় হিমশিম।

বই পড়া একটি সংস্কৃতি- ছোটদের ভেতর তা চালিয়ে দেওয়া উচিত। বইমেলায় বাচ্চাদের নিয়ে যাওয়া উচিত অভিভাবকদের। আর দরকার বই কিনে উপহার দেওয়ার রেওয়াজটা বাঁচিয়ে রাখা। কেন জানি মনে হয়, দৈনিক কাগজগুলোতে সপ্তাহে অন্তত এক দিন ছোটদের পাতা থাকা উচিত। একবার সৈয়দ মুজতবা আলী কৌতুকের মাধ্যমে চোখে আঙুল দিয়ে দেখালেন, আমরা বই পড়াটাকে কীভাবে নেহাত সময় ও অর্থের অপচয় হিসেবে দেখি।

বিমল মিত্রের একটি গল্পে পড়েছিলাম, ভাইঝির বিয়ে ঠিক করতে এক পণ্ডিতমশাই গিয়েছিলেন জমিদার বাড়িতে। তার সব পছন্দ, তবু বিয়ে দিতে রাজি হলেন না। কারণ একটাই- এত বড় ঘর, এত বৈভব; কিন্তু কোথাও বইয়ের চিহ্ন নেই। ব্যক্তি, সমাজ, জাতি, রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে শিক্ষালাভ ও জ্ঞানার্জনের উৎস হলো বই। স্বাধীন চিন্তা, কল্পনাশক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘বই হচ্ছে অতীত আর বর্তমানের মধ্যে বেঁধে দেওয়া সাঁকো। বই অতীত থেকে ভবিষ্যৎ, নিকট থেকে দূরে, প্রান্ত থেকে অন্তে, যুগ থেকে যুগান্তরে আলো ছড়ায়।’ কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘বই পড়াকে যথার্থ হিসেবে যে সঙ্গী করে নিতে পারে, তার জীবনের দুঃখকষ্টের বোঝা অনেক কমে যায়।’ কিন্তু ঘটনা হলো- বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস দিন দিন কমে যাচ্ছে।

অ্যাকাডেমিক লেখাপড়া শেষ হলে অনেকের জীবন থেকে বই চিরতরে হারিয়ে যায়। বর্তমানে ডিজিটাল যুগে সারাক্ষণ হাতে মোবাইল ভুলিয়ে দিয়েছে বইয়ের টান। কিন্তু পুরোনো বই আলমারি থেকে নামিয়ে তার পাতাগুলো স্পর্শ করা সুখ, আঘ্রাণ নেওয়ার তৃপ্তি সত্যিই কি ভোলা যায়? ডিজিটাল ডিভাইসে বই পড়ার বিকল্প হতে পারে না।

বইয়ের পাশাপাশি ছোট কাগজ বড় আশা- অন্যতম প্রধান লিটল ম্যাগাজিন মেলাকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত হয় একাধিক পত্রপত্রিকা ও বই। বইমেলায় দেখতে পাওয়া যায় নামি-অনামি পত্রপত্রিকার বিপুল সমাবেশ। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত খ্যাতনামা সাহিত্যিকদের সঙ্গে একগুচ্ছ নতুনদেরও কখনো কখনো স্থান পাওয়ার সৌভাগ্য ঘটে।

বাঙালি আত্মবিস্মৃত জাতি- এই কথা হজম করেই বলা যায়- বাংলা ভাষায় চার ও পাঁচের দশকে ছোট ছোট বই প্রকাশিত হতো। জ্ঞান-বিজ্ঞান চেতনা ও জীবনী গ্রন্থমালা। দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের মতো একজন প্রখ্যাত দার্শনিক ছিলেন তার সম্পাদক। সেখানে ‘সে-যুগে মায়েরা বড়ো’, ‘ক্ষুদে শয়তানের রাজত্ব’, ‘শোনো বলি মনের কথা’, ‘পৃথিবীর ইতিহাস’ এমন সব বই বেরিয়েছিল; কিন্তু তা আজ কোথায়? বাঙালি বেমালুম ভুলে গেছে, বাংলা সাহিত্যে সাময়িক পত্রের ভূমিকার সূচনা যে হয়েছিল ১৯১৮ সাল থেকে। তারপর বঙ্গদর্শন হয়ে আজ পর্যন্ত অসংখ্য সাময়িক পত্র, প্রবন্ধ, সাহিত্য ও বাংলা উপন্যাস, গল্প, কবিতার এক বিশাল ক্ষেত্র নির্মাণ হয়েছিল। আর লিটল ম্যাগাজিনকে তো বলা হয় বাংলা সাহিত্যের বীজতলা।

আবার এ-ও দেখা গেছে, এক সময়ের জনপ্রিয় লেখক-লেখিকারা মাত্র ৫০ বছরের মধ্যেই বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যান; কিন্তু কেন? যেমন ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায় প্রায় ২ দশক ধরে জনপ্রিয়তার চূড়ায় ছিলেন। আসল নাম তারাদাস মুখোপাধ্যায়। এই ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়ের লেখা- বহ্নিমান, হে মোর দুর্ভাগা দেশ, আকাশ বনানী জাগে, পথের ধুলো, আশার ছলনে ভুলি ইত্যাদি বই বেস্ট সেলার হয়েছিল এক সময়ে। ‘গুণধর ছেলে’ ও তার লেখা বিখ্যাত কিশোর উপন্যাস; কিন্তু আজ সেসব বইয়ের নাম জানা তো দূরের কথা, লেখকের নামই কেউ জানেন না।

নদীর প্রবল স্রোতেও কে যে থেকে যাবেন, তা কেউ জানেন না। তবে বছর ঘুরে ঘুরে একুশে ফেব্রুয়ারি আসবে- বইমেলা হবে। অনেকে বলেন, সবাই একটি করে বই কিনুন।

কিন্তু একটি কেন?

যা যা ভালো লাগবে, যে যে বই ভালো লাগবে তাই কিনুন। বইয়ের বিকল্প কিছুই হতে পারে না। বর্তমান ডিজিট্যাল বাংলাদেশের যুগে কিশোর ও কিশোরীদের হাতে হাতেও সহজভাবেই ধরা দিচ্ছে মোবাইল ফোন। কখনো তারা মোবাইলে গেম খেলায় মত্ত হয়ে থাকছে তো কখনো বা আবার ভালো-মন্দ ভিডিও দেখতেও তারা ব্যস্ত থাকছে। বাবা-মারাও যে যার নিজের নিজের ক্যারিয়ার গোছাতে ব্যস্ত, আর তাই ছেলেমেয়েদের বায়না মেটাতে গিয়ে হাতে দিয়ে দেয় ফোন। আর এই ফোনের নেশাতেই মত্ত হয়ে কিশোর ও কিশোরীরা আজ কোথাও বই পড়া থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কথায় বলে, ‘বইয়ের থেকে ভালো বন্ধু আর কিছু নেই।’ আর তাই অভিভাবকদের এই বিষয়ে একটু সচেতন থাকা উচিত। মোবাইলের বদলে হাতে দেওয়া হোক বই। যাতে জ্ঞানের আলো পৌঁছাক কিশোর ও কিশোরদের মধ্যে। মোবাইল নয়, বই ও দৈনিক পত্রিকা হয়ে উঠুক কিশোর-কিশোরী থেকে সববয়সি মানুষের প্রকৃত বন্ধু।


বাজেটে কর্মসংস্থান ও চিকিৎসার বরাদ্দ সুনিশ্চিত করতে হবে

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
রেজাউল করিম খোকন

আগামী ৬ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের বাজেট উপস্থাপন করা হবে। আগামী অর্থ বছরের বাজেট ছোটই রাখা হচ্ছে। এর আকার হতে পারে ৭ লাখ ৯৬ হাজার ৯০০ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থ বছরের মূল বাজেট ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা থেকে ৩৫ হাজার ১১৫ কোটি টাকা অর্থাৎ ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ বেশি। অন্য বছরগুলোতে এ বৃদ্ধি হয় ১০ থেকে ১৩ শতাংশের মতো। আগামী বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতি (অনুদান ছাড়া) ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা ধরা হতে পারে। এ ছাড়া রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৫ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা, চলতি অর্থ বছরে যা ছিল ৫ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআরের আদায় লক্ষ্যমাত্রা হতে পারে ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থ বছরের মূল বাজেটে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি থাকলেও সংশোধিত বাজেটে কমিয়ে ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা করা হয়। আইএমএফের শর্ত অনুয়ায়ী আগামী অর্থ বছরে সরকারের ৪ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকার কর রাজস্ব আদায় করার কথা। চলতি অর্থ বছরের মতো আগামী ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের বাজেটকেও ব্যয় সংকোচনমুখী করার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগামী বাজেটেও বিলাসপণ্য আমদানিকে নিরুৎসাহিত করার পক্ষে মত দিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই হবে আগামী বাজেটের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। প্রধানমন্ত্রী দেখতে চেয়েছিলেন, বর্তমান মেয়াদের প্রথম বাজেটে নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিফলন থাকছে কি না। অর্থ মন্ত্রণালয় বাজেটের যে কাঠামো দাঁড় করিয়েছে, তাতে সেই প্রতিফলন থাকছে বলে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। আগামী ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের জন্য ৮ লাখ কোটি টাকার বাজেটে অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং গ্রামীণ অবকাঠামো খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ থাকবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) বৃদ্ধি, আমদানি নিয়ন্ত্রণ, সতর্কতার সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি ও এ জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ, বৈধ চ্যানেলে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ রয়েছে। তবে গোটা বিশ্বেই এখন সংকোচনমূলক ব্যবস্থা চলছে। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ইত্যাদি উন্নত দেশ নীতিসুদহার বাড়িয়েছে। মার্কিন ডলার আগের তুলনায় দামি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রাক্কলন করেছিল, গত এপ্রিলে মূল্যস্ফীতি কমে যাবে। তবে কমেনি। এমন পরিস্থিতিও তৈরি করা যাবে না, যাতে আমদানি বেশি কমে যায়। আমদানি ব্যবস্থাপনা দক্ষতার সঙ্গে করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধির জন্য ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইসের (ইএফডি) বহুল ব্যবহার আশা করছেন। বেশি মূল্য সংযোজন কর (মূসক) আদায়ের ব্যাপারে তার পরামর্শ হচ্ছেÑএ কাজে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগকে কাজে লাগানো। তিনি চাইছেন, আইসিটি বিভাগ এমন অ্যাপ তৈরির উদ্যোগ নেবে, যাতে মূসকের চালান (ইনভয়েস) নিতে মানুষ আগ্রহী হন। নিজের নির্বাচনী এলাকার উদাহরণ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তার এলাকায় আয়কর দেওয়ার মতো সক্ষম ব্যক্তি অনেক আছেন; কিন্তু তারা করজালের বাইরে। আয়কর যারা দিচ্ছেন বা যারা করজালের মধ্যে আছেন, শুধু তাদের ওপর করের বোঝা না চাপিয়ে করের আওতা বৃদ্ধির পদক্ষেপ নিতে হবে। আশা করা যায়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতি ভালো হয়ে যাবে। আর বিনিময় হার নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাতে ডলারের দামও স্বাভাবিক হয়ে আসবে। বাজেট প্রণয়নে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তার অংশ হিসেবে কিছু ক্ষেত্রে করছাড় এবং অব্যাহতি কমানো হবে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার সঙ্গে আমরাও একমত। তবে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং তা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি বাজেটে থাকছে কি না, তা-ও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশ যে হারে দক্ষ শ্রমিক পাঠিয়ে প্রবাসী আয় অর্জন করছে, বাংলাদেশকেও সে ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে এবং বাজেটে তার প্রতিফলন থাকতে হবে। ডলারের দাম একলাফে ৭ টাকা বৃদ্ধির মাধ্যমে টাকার বড় অবমূল্যায়ন হয়েছে। বাজেটের আকারের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। ঢাকায় এসে আইএমএফের দল আগামী বাজেট ছোট রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। আগামী অর্থ বছরের বাজেট ছোটই রাখা হচ্ছে। চলতি অর্থ বছরের মূল বাজেটে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি থাকলেও সংশোধিত বাজেটে কমিয়ে ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা করা হয়। আইএমএফের শর্ত অনুয়ায়ী আগামী অর্থ বছরে সরকারের ৪ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকার কর রাজস্ব আদায় করার কথা। সে হিসাবে সরকারের লক্ষ্য ও আইএমএফের লক্ষ্যর কাছাকাছিই থাকছে। চলমান ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় আইএমএফের পরামর্শ ছিল করছাড় কমানো। ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের আগে তিন ধাপে সব ধরনের করছাড় বাতিলের শর্ত রয়েছে আইএমএফের। প্রথম দফায় তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কর অব্যাহতি-সুবিধা বাতিল হতে পারে। দেশীয় শিল্পের বিকাশে বিভিন্ন শিল্প খাতে যেসব মূসক অব্যাহতি রয়েছে, সেগুলোও প্রত্যাহারের দিকনির্দেশনা থাকবে আগামী বাজেটে। তবে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা বর্তমানে যে সাড়ে তিন লাখ টাকা রয়েছে, এবার তা না-ও বাড়তে পারে। নারী করদাতাদের করমুক্ত আয়ের সীমা ৪ লাখ টাকা, প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের করদাতাদের ৪ লাখ ৭৫ হাজার এবং গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা করদাতাদের করমুক্ত সীমা যে ৫ লাখ টাকা আছে, তাতেও কোনো পরিবর্তন আনা হবে না। সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং ডলার-সংকট নিরসন করা- অর্থনীতির এই তিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে ব্যয় সংকোচনের বাজেট করা ছাড়া উপায় নেই। বাজেট বড় করলে তা হয়ে যাবে বিষাক্ত জিনিস। করোনা মহামারির কারণে দেশের শিক্ষা খাতে বড় ক্ষতি হয়েছে। আবার ওই মহামারির সময়ই স্বাস্থ্য খাতের দুরবস্থার চিত্র ফুটে উঠেছিল; কিন্তু এরপরও বাজেটে এই দুটি খাত প্রত্যাশিত মনোযোগ পাচ্ছে না। টাকার অঙ্কে বরাদ্দ বাড়লেও বাজেট এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় এই দুই খাতে বরাদ্দ খুব একটা বাড়ছে না। কোভিডের আগের ধারাবাহিকতায় বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত অনেকটা অবহেলিত থেকে যাচ্ছে। আগামী বাজেটেও এর ব্যতিক্রম হওয়ার ইঙ্গিত নেই।

পৃথিবীর যে ১০টি দেশ অর্থনীতির আকারের তুলনায় শিক্ষা খাতে সবচেয়ে কম বরাদ্দ দেয়, বাংলাদেশ তার একটি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা পেতে একজন বাংলাদেশির বছরে ৮৮ ডলার খরচ করা প্রয়োজন; কিন্তু বাংলাদেশে চিকিৎসা খাতে মাথাপিছু খরচ হয় ৫৮ ডলার, যার বড় অংশই নাগরিকরা নিজেরা সংস্থান করেন। আগামী অর্থ বছরের শুধু শিক্ষা খাতে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। আর স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ থাকবে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা। এসব বরাদ্দ সরকারের পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয় মিলিয়ে। গত পাঁচ বছরের বাজেট বরাদ্দ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ সময় শিক্ষা খাতের বরাদ্দ বাজেটের ১২ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ ৫ শতাংশের আশপাশে ছিল। অন্যদিকে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতের শিক্ষা খাতের বরাদ্দ ২ শতাংশের মতো, আর স্বাস্থ্য খাতে তা ১ শতাংশের মতো। বাজেটের শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাত একসঙ্গে দেখানো হয়। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরের শুধু শিক্ষা খাতে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। আর স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ থাকবে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা। এসব বরাদ্দ সরকারের পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয় মিলিয়ে। উন্নয়ন খাতের বরাদ্দে অবশ্য সরকার শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের চেয়ে রাস্তাঘাট, জ্বালানি খাতকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। আগামী অর্থ বছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) শীর্ষ তিনটি খাতের মধ্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত নেই। বরাদ্দ পাওয়ার বিবেচনায় শীর্ষ তিন খাত হলো স্থানীয় সরকার বিভাগ; সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং বিদ্যুৎ বিভাগ। এই তিন খাতই এডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ বরাদ্দ পাচ্ছে। যেখানে বিনিয়োগ করলে লাভের ভাগ বেশি হবে, সেখানেই বিনিয়োগ করা দরকার। তাই বাজেটে প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত। শিক্ষায় দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে না পারায় বিদেশ থেকে জনবল আনতে হয়। শিক্ষিতদের মধ্যে বেকার বেশি। দেশে অনেক এমবিএ ডিগ্রিধারী আছেন; কিন্তু ভারত, শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশ থেকে লোক আনতে হচ্ছে। তারা বছরে ৬০০ কোটি ডলার নিয়ে যাচ্ছেন, যা দেশের প্রবাসী আয়ের চার ভাগের এক ভাগের সমান। গত পাঁচ বছরের বাজেট বরাদ্দ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ টাকার অঙ্কে বাড়লেও বাজেটের অনুপাতে তা ১২ শতাংশের আশপাশে আছে। এর মানে হলো, সরকার এই খাতের বিষয়ে অগ্রাধিকার দিচ্ছে না। শিক্ষা খাতের দুর্বলতা আমরা জানি; কিন্তু বাজেট ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার অজুহাতে শিক্ষা খাতকে পঙ্গু করে রাখতে পারি না। এ জন্য জিডিপির অনুপাতে বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানোয় রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। এ ছাড়া সামাজিক দায়বদ্ধতাও দরকার। আগামী বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দেও বড় কোনো পরিবর্তন আসছে না। করোনার পর স্বাস্থ্য বাজেট বাড়ানোর বিষয়ে নানা আলোচনা হলেও বাস্তব অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ বাজেটের ৫ শতাংশ ও জিডিপির ১ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে। ২০১৯-২০ অর্থ বছরে স্বাস্থ্য বাজেটের আকার ছিল ২৯ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা, যা ছিল ওই বাজেটের ৫ দশমিক ১৪ শতাংশ। পরের কয়েক বছর কোভিডের ডামাডোল থাকলেও অগ্রাধিকারে তেমন পরিবর্তন আসেনি। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাজেটের ৫ শতাংশের আশপাশেই ছিল। সর্বশেষ চলতি অর্থ বছরে ৩৮ হাজার ৫২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আগামী অর্থ বছরে তা বেড়ে ৪২ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যবিষয়ক কার্যক্রম সক্রিয় করার জন্য বাজেটে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা বাড়াতে চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্য জনবল বাড়াতে বিনিয়োগ করতে হবে। দিতে হবে শূন্য পদে লোকবল; কিন্তু সরকার অবকাঠামো নির্মাণে বেশি আগ্রহী। কারণ, এখানে স্বার্থ আছে। সেবায় বিনিয়োগ নেই। উদ্বোধন করা হয় ভবন, সেবা উদ্বোধন করা হয় না।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, খেলাপি ঋণ ও অর্থ পাচার শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এগুলো রাজনৈতিক সংকটও। এ জন্য বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন জরুরি। আসন্ন বাজেটে খাদ্য, কর্মসংস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও বাসস্থানের নিশ্চয়তার জন্য বরাদ্দ সুনিশ্চিত করতে হবে। ওই বরাদ্দ যাতে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি ছাড়াই খরচ হয়, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। সরকার বাজেটের আগে ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও বড়লোকদের সঙ্গে সংলাপ করে। যারা দেশের টাকা পাচার করছে, ব্যাংকের টাকা নিয়ে শোধ করে না, এসব সংলাপ তাদের সঙ্গেই হয়। অথচ দেশের অর্থনীতির চাকা যারা সচল রেখেছে, সেই শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে সংলাপ হয় না। এবারের বাজেটে প্রধান দুটি সংকট হলো অস্বাভাবিকভাবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির হার ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধি। ঋণখেলাপি ও টাকা পাচারকারীদের ক্ষমতা বর্তমানে শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে। পাচারের টাকা ফেরত আনার ক্ষেত্রে কোনো আইনগত বাধা নেই। সে জন্য বাজেটে এ ব্যাপারে প্রথম পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। শীর্ষ খেলাপিদের নাম প্রকাশ ও তাদের বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে। বাজেটের লক্ষ্য স্থির থাকছে না। তাতে আসল সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। এর মূল কারণ রাজনীতি ঠিক নেই। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও ডলার-সংকটের মতো সমস্যা এখন প্রকট। দেশে যথাযথভাবে ডলার আসে না। আবার দেশ থেকে ডলার চলে যায়। যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়া সম্পদের লুটপাট ঠেকানো যাবে না। বাজেটে গরিবের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। স্বাধীনতার পর যত ঋণ নেওয়া হয়েছে, তার চেয়ে বেশি ঋণ নিয়েছে এই সরকার। সরকারের সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তারাই বলছে, জ্বালানি খাতে ৩২ হাজার কোটি টাকার ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না। এর জন্য দায়ী কে? সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর নামে কয়েকটি খাতে বরাদ্দ দিয়ে দেশের মানুষের সংকট সমাধান করা যাবে না। সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নিতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মূল কথা হবে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সব বিষয়ে মানুষের দায়িত্ব নেওয়া। করের টাকা লুটপাট নয়, জনস্বার্থে ব্যবহার করতে হবে। প্রকৃত কৃষক জমি চাষ করে না, বর্গাচাষিরাই কৃষি কাজ করেন। অথচ তারা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সরকারি কোনো প্রণোদনা পান না। ফসলের ন্যায্য দামও পান না। দিন দিন উৎপাদন খরচ বাড়ছে, ঠিকমতো বিদ্যুৎ নেই। সারের দাম বাড়তি, ভালো মানের কীটনাশক ও কৃষি বিভাগ থেকে ঠিকমতো পরামর্শ পাওয়া যায় না। বাজেটে এসব নিশ্চিত করতে হবে। পোশাকশ্রমিকদের নিয়ে অনেক কথা বলা হয়। তারা নাকি দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় অবদান রাখছেন; কিন্তু তারা যে বেতন পান, তা দিয়ে ঠিকমতো ভালো খাবার খেতে পারেন না। ব্যাংকের ঋণ নিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা মেরে দিচ্ছে অনেকে। অথচ গ্রামাঞ্চলে ঋণ করার পর অনেক মানুষকে রিকশা চালিয়ে কিস্তি পরিশোধের জন্য ঢাকায় আসতে হচ্ছে। তাদের এ দেশের মানুষ মনে করলে বাজেটে দরিদ্রদের জন্য আলাদা বরাদ্দ দিতে হবে।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও কলামিস্ট

বিষয়:

banner close