বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬
৪ ভাদ্র ১৪৩৩

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে ভুল ধারণা ও করণীয়

ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ
প্রকাশিত
ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ২০ মে, ২০২৪ ১১:৩৬

অসংক্রামক ব্যাধির মধ্যে অন্যতম হলো উচ্চ রক্তচাপ, যা প্রায়ই একটি স্থায়ী রোগ হিসেবে বিবেচিত। এর জন্য চিকিৎসা ও প্রতিরোধ খুবই জরুরি। তা না হলে বিভিন্ন জটিলতা, এমনকি হঠাৎ করে মৃত্যুরও ঝুঁকি থাকে। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে রয়েছে কিছু প্রচলিত ভুল ধারণা। তাই এ সম্পর্কে সচেতন থাকার বিকল্প নেই। যদি কারও রক্তচাপ নরমাল মাত্রার চেয়ে বেশি হয় এবং অধিকাংশ সময় এমনকি বিশ্রামকালেও বেশি থাকে, তবে ধরে নিতে হবে তিনি উচ্চ রক্তচাপের রোগী। প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো নিম্নে তুলে ধরা হলো-

(১) কোনো এক সময় একবার উচ্চ রক্তচাপ হলেই কি রোগী হিসেবে বিবেচনা করা হবে?

উত্তর: না, কেউ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে তা বলার আগে বেশ কিছু বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে। যেমন অন্তত তিন দিন ভিন্ন সময়ে বেশ কয়েকবার রক্তচাপ মাপতে হবে। এরপর যদি দেখা যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে রক্তচাপ বেশি, তবেই বলা যাবে তিনি উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। অবশ্যই বসে রক্তচাপ মাপা উচিত, শরীর ও মন যেন শান্ত অবস্থায় থাকে, এমন সময় রক্তচাপ মাপতে হবে।

(২) কোনো লক্ষণ বা উপসর্গ তো নেই, কেন চিকিৎসা নেব বা ওষুধ খেতে হবে?

উত্তর: অনেকেই মনে করেন, উচ্চ রক্তচাপ তার দৈনন্দিন জীবনপ্রবাহে কোনো সমস্যা করছে না বা রোগের কোনো লক্ষণ নেই, তাই উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ খেতে চান না বা প্রয়োজন মনে করেন না। তাদের ধারণা ভালোই তো আছি, ওষুধের কি দরকার। এই ধারণাগুলো সম্পূর্ণ ভুল। অনেক সময় উচ্চ রক্তচাপের কোনো প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যায় না। এটাই উচ্চ রক্তচাপের সবচেয়ে খারাপ দিক। নিয়ন্ত্রণ করা না হলে উচ্চ রক্তচাপ ভয়ঙ্কর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। যদিও অনেক সময় উচ্চ রক্তচাপের রোগীর বেলায় কোনো লক্ষণ থাকে না, তবুও নীরবে উচ্চ রক্তচাপ শরীরের বিভিন্ন অংশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এ জন্যই উচ্চ রক্তচাপকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। অনিয়ন্ত্রিত এবং চিকিৎসাবিহীন উচ্চ রক্তচাপ থেকে মারাত্মক শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রিত না থাকলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ ৪টি অঙ্গে মারাত্মক ধরনের জটিলতা হতে পারে। যেমন- হৎপিণ্ড, কিডনি, মস্তিষ্ক ও চোখ। অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ থেকে হৃদযন্ত্রের মাংসপেশি দুর্বল হয়ে হৃদযন্ত্র রক্ত পাম্প করতে পারে না এবং এই অবস্থাকে বলা হয় হার্ট ফেইলিওর। রক্তনালি সংকুচিত হয়ে হার্ট অ্যাটাক বা মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন হতে পারে। উচ্চ রক্তচাপের কারণে কিডনি বিকল হয়ে কার্যকারিতা হারাতে পারে। এ ছাড়া মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা স্ট্রোক হয়ে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে এবং চোখের রেটিনায় রক্তক্ষরণ হয়ে অন্ধত্ব বরণ করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি এবং বড় ধরনের জটিলতা এড়াতেই ওষুধ দেওয়া হয়।’

(৩) উচ্চ রক্তচাপ হলে কি চিকিৎসা করাতেই হবে? ওষুধ সেবন কি খুবই জরুরি?

উত্তর: অনেকেই উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত জানার পরেও ওষুধ খেতে অনীহা প্রকাশ করেন বা খেতে চান না। কারও কারও ধারণা একবার ওষুধ শুরু করলে তা আর বন্ধ করা যাবে না। সারা জীবন খেতে হবে। তাই ওষুধ শুরু না করাই ভালো। এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল, এ চিন্তাও বিপজ্জনক। মনে রাখতে হবে, উচ্চ রক্তচাপ সারে না, একে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এর জন্য নিয়মিত ওষুধপত্র সেবন করতে হবে।

(৪) রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে এলে ওষুধ কি বন্ধ করা যাবে?

উত্তর: অনেক রোগী কিছুদিন ওষুধ ব্যবহার করার পর রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে এলে ওষুধ বন্ধ করে দেন, মনে করেন রক্তচাপ ভালো হয়ে গেছে, কাজেই ওষুধ খাওয়ার দরকার কি? এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। এই ধরনের রোগীরাই হঠাৎ করে হৃদরোগ বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হন, এমনকি মৃত্যুও হয়ে থাকে। কোনোক্রমেই ডাক্তারের নির্দেশ ছাড়া ওষুধ সেবন বন্ধ করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, যারা উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত তাদের অবশ্যই ডাক্তারদের পরামর্শ নিতে হবে, নিয়মিত সারা জীবন ওষুধ সেবন করতে হবে এবং নিয়মিত চেক করাতে হবে।

(৫) উচ্চ রক্তচাপ কি শুধু বয়স্কদেরই হয়?

উত্তর: শুধু বয়স্কদের উচ্চ রক্তচাপ হয়, এ ধারণা ঠিক নয়। যেকোনো বয়সেই উচ্চ রক্তচাপ হতে পারে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, বয়স হলে রক্তচাপ একটু বেশিই থাকে, এ জন্য চিন্তার কিছু নেই, এমন ধারণাও সঠিক নয়। উচ্চ রক্তচাপ যে বয়সেই ধরা পড়ুক, তাকে উচ্চ রক্তচাপ হিসেবেই গণ্য করা উচিত। উচ্চ রক্তচাপকে স্বাভাবিক না ভেবে নিয়ন্ত্রণের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা এবং চিকিৎসা নিলে জটিলতা এড়ানো সহজ হয়।

(৬) তরুণ বয়সে উচ্চ রক্তচাপ হতে পারে কি?

উত্তর: অনেকে ভাবেন, উচ্চ রক্তচাপ বয়স্কদের রোগ। আসলে তা নয়। অল্প বয়সেও উচ্চ রক্তচাপ দেখা দিতে পারে। উচ্চ রক্তচাপের বংশগত ধারাবাহিকতা আছে, যদি বাবা-মায়ের উচ্চ রক্তচাপ থাকে তবে সন্তানেরও উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এমনকি নিকটাত্মীয়ের উচ্চ রক্তচাপ থাকলেও অন্যদের রক্তচাপের ঝুঁকি থাকে। এ ছাড়া অন্যান্য কারণ হতে পারে, যেমন-
অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, ধূমপান, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ফাস্ট ফুড, অতিরিক্ত চর্বিজাতীয় খাবার, প্রক্রিয়াজাত খাবার ইত্যাদি। অধিক ওজন এবং অলস জীবনযাত্রা, খেলাধুলা, ব্যায়াম বা কায়িক শ্রমের অভাবে অল্প বয়সিদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের প্রবণতা বাড়ছে।

কিছু কিছু অঙ্গে আক্রান্ত রোগের কারণে উচ্চ রক্তচাপ হতে পারে। নির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া গেলে একে বলা হয় সেকেন্ডারি হাইপারটেনশন। যেমন কিডনির রোগ, অ্যাড্রেনাল গ্রন্থি ও পিটুইটারি গ্রন্থির টিউমার, ধমনির বংশগত রোগ,
গর্ভধারণ অবস্থায় অ্যাকলাম্পসিয়া ও প্রি অ্যাকলাম্পসিয়া হলে, অনেক দিন ধরে জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ির ব্যবহার, স্টেরয়েড গ্রহণ এবং ব্যথা নিরামক কিছু কিছু ওষুধ সেবন করলে।

(৭) উচ্চ রক্তচাপ হলে ঘাড় ব্যথা হয় কি?

উত্তর: ঘাড়ে ব্যথা হলে কেউ কেউ মনে করেন, নিশ্চয়ই রক্তচাপ বেড়েছে। এই ধারণা অমূলক। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রক্তচাপ বৃদ্ধির কোনো উপসর্গ বোঝা যায় না।

(৮) লবণ ভেজে খাওয়া যাবে কি?

উত্তর: উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে খাবারে বাড়তি লবণের ব্যবহারে বারণ। শুধু তরকারিতে যতটুকু লবণ দেওয়া হয় তা খাওয়া যাবে। অনেকের ধারণা কাঁচা লবণ নিষেধ; কিন্তু লবণ ভেজে খাওয়া যাবে। এ ধারণাও সম্পূর্ণ ভুল। কাঁচা বা ভেজে খাওয়া লবণে কোনো পার্থক্য হবে না।

(৯) মাংস, ডিম, দুধ খাওয়া নিষেধ কি?

উত্তর: অনেকের ধারণা, উচ্চ রক্তচাপ হলে মাংস, ডিম, দুধ খাওয়া নিষেধ। এসব খাবার খেলে রক্তচাপ বাড়ে। এটা ঠিক নয়। পরিমাণ মতো এগুলো খাওয়া যাবে, তবে গরু বা খাসির মাংসের চর্বি পরিহার করতে হবে।

(১০) তেঁতুল গুলে খেলে বা টক খেলে রক্তচাপ কমে কি?

উত্তর: অনেকে মনে করেন রক্তচাপ বাড়লে পানিতে তেঁতুল গুলে খেলে বা টক খেলে রক্তচাপ কমবে। আসলে মনে রাখতে হবে এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল, তেঁতুল বা টক খাওয়ার সঙ্গে রক্তচাপ কমার কোনো সম্পর্ক নেই।

(১১) উচ্চ রক্তচাপ আছে, তাই স্যালাইন খাওয়া যাবে না?

উত্তর: ডায়রিয়া, বমি, পানিশূন্যতা বা লবণশূন্যতা হলে খাওয়ার স্যালাইন খেতে হয়; কিন্তু উচ্চ রক্তচাপের রোগী ভাবেন, তার স্যালাইন খাওয়া নিষেধ; কিন্তু এসব জরুরি পরিস্থিতিতে পানি ও লবণশূন্যতা পূরণ করা আগে জরুরি। তাই দরকারে স্যালাইন খেতে নিষেধ নেই।

উপসংহার: মনে রাখতে হবে অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, অতিরিক্ত ওজন, ধূমপান, মদ্যপান, তেল-চর্বিজাতীয় খাবার, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ ইত্যাদি উচ্চ রক্তচাপের প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। জীবনাচরণ পরিবর্তন করে রক্তচাপ বাড়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। আর ওষুধ সেবনের বেলায় অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। অনেকেই ফার্মেসিতে গিয়ে দোকানির কাছ থেকে অথবা নিজের ইচ্ছেমতো ওষুধ কিনে খেয়ে থাকেন। যেকোনো অসুখের ক্ষেত্রেই এটি বিপজ্জনক।’ মনে রাখতে হবে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য জীবনযাপন পদ্ধতির সঠিক পরিবর্তনের সঙ্গে নিয়মিত ওষুধ সেবন অত্যন্ত জরুরি। যারা উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত তাদের অবশ্যই ডাক্তারদের পরামর্শ নিতে হবে এবং নিয়মিত চেক করাতে হবে।

লেখক: প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক


নির্বাচিত

মাছে স্বয়ংসম্পূর্ণতা থেকে টেকসই সমৃদ্ধির পথে বাংলাদেশ

মো. মামুন হাসান
ছবি: সংগৃহীত
আপডেটেড ১৮ আগস্ট, ২০২৬ ২১:৪৪

নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়, প্লাবনভূমি আর বঙ্গোপসাগর-বাংলাদেশের প্রকৃতি ও মানুওষের জীবনযাত্রার সঙ্গে জল ও জলজ সম্পদের সম্পর্ক গভীর। মাছ তাই শুধু এ দেশের মানুষের খাদ্যতালিকার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুষ্টি, কর্মসংস্থান, জীবিকা, গ্রামীণ অর্থনীতি ও সংস্কৃতি। উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার সাফল্য পেরিয়ে এখন এই খাতের সামনে নতুন লক্ষ্য-নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব, প্রযুক্তিনির্ভর ও টেকসই সমৃদ্ধি। দেশের অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ের পরিমাণ প্রায় ৩৮ দশমিক ৬ লাখ হেক্টর এবং বদ্ধ জলাশয় রয়েছে ৮ দশমিক ৫ লাখ হেক্টর। এছাড়া দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বিস্তৃত ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সামুদ্রিক জলসীমা আমাদের মৎস্যসম্পদের অন্যতম প্রধান ভাণ্ডার।

‘রূপালি মৎস্যে স্বনির্ভর দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্য নিয়ে ১৬ থেকে ৩০ আগস্ট দেশে পালিত হচ্ছে জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬। এবারের মৎস্য পক্ষ শুধু উৎপাদনে অর্জিত সাফল্য উদ্‌যাপনের আয়োজন নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলজ সম্পদ সংরক্ষণ, জেলেদের জীবন-জীবিকা সুরক্ষা, নিরাপদ মাছ উৎপাদন, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর প্রত্যয়।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট মৎস্য উৎপাদন ৫২ দশমিক ৫৫ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে। আমাদের খাদ্যে প্রাপ্ত প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ যোগান দেয় মাছ। মাথাপিছু দৈনিক মাছ গ্রহণের পরিমাণ নির্ধারিত চাহিদা ৬০ গ্রাম চাহিদার বিপরীতে বৃদ্ধি পেয়ে ৬৭ দশমিক ৮০ গ্রামে উন্নীত হয়েছে। ফলে দেশের মানুষের পুষ্টি ও প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে মৎস্য খাতের অবদান আরও সুদৃঢ় হয়েছে। জাতীয় অর্থনীতিতেও এ খাতের গুরুত্ব বাড়ছে। জাতীয় জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ, কৃষিজ জিডিপিতে ২২ দশমিক ০৩ শতাংশ এবং মৎস্য খাতে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৪১ শতাংশ। অর্থাৎ মাছ এখন শুধু মানুষের পুষ্টির উৎস নয়, কর্মসংস্থান, আয় ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও বড় ভিত্তি।

মৎস্য উৎপাদনে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অবস্থানও উল্লেখযোগ্য। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার-২০২৪’ শিরোনামের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইলিশ আহরণে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রথম, অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে দ্বিতীয়, অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরণে তৃতীয়, বদ্ধ জলাশয়ে চাষকৃত মাছ উৎপাদনে পঞ্চম এবং সামুদ্রিক ও উপকূলীয় জলাশয়ে ক্রাস্টাশিয়া আহরণে অষ্টম অবস্থানে রয়েছে। এ অর্জনের পেছনে রয়েছে মৎস্যচাষি, জেলে, গবেষক, উদ্যোক্তা এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা।

উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে ৮২৭টি অভয়াশ্রম স্থাপন করা হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৮১ দশমিক ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৪৫৪টি অভয়াশ্রমের ব্যবস্থাপনা ও মেরামত করা হয়েছে। দেশীয় প্রজাতির মাছ ও শামুক সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় স্থাপন করা হয়েছে ১২০টি প্রদর্শনী খামার ও ৩২টি অভয়াশ্রম। জলাশয় সংকোচন, দূষণ, অতিরিক্ত আহরণ ও প্রাকৃতিক আবাসস্থলের পরিবর্তনের কারণে অনেক দেশীয় মাছ অস্তিত্বের ঝুঁকিতে পড়েছে। ফলে মাছ উৎপাদনের পাশাপাশি প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র ও আবাসস্থল রক্ষা এখন মৎস্য ব্যবস্থাপনার অপরিহার্য অংশ।

দেশের জলজ জীববৈচিত্র্যে প্রায় ২৬০ প্রজাতির মিঠাপানির এবং ৪৭৫ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ রয়েছে। তবে মিঠাপানির মাছের মধ্যে ৬৪টি প্রজাতি বর্তমানে বিভিন্ন মাত্রায় বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা এসব মূল্যবান মাছ সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ধারাবাহিক গবেষণার মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৪১টি বিপন্ন প্রজাতির মাছের কৃত্রিম প্রজনন, পোনা উৎপাদন এবং চাষাবাদ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা সম্ভব হয়েছে। সরকারের গৃহীত বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রম, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনাভিত্তিক সমন্বিত উদ্যোগের সুফল হিসেবে একসময় হারিয়ে যেতে বসা অনেক দেশীয় মাছ আবারও প্রাকৃতিক জলাশয়ে ফিরে আসছে এবং বাজারেও এসব মাছের উপস্থিতি ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে।

বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ মৎস্য খাতের সাফল্যের অন্যতম প্রতীক। অতিআহরণ, নির্বিচারে জাটকা নিধন ও জলবায়ু পরিবর্তন ইলিশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ২০০৩-০৪ সালে প্রণীত ‘হিলশা ম্যানেজমেন্ট অ্যাকশন প্ল্যান’-এর ভিত্তিতে সংরক্ষণ কার্যক্রমের সঙ্গে সময়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অভয়াশ্রম, নিষেধাজ্ঞা, নজরদারি, জেলেদের সহায়তা ও বিকল্প কর্মসংস্থান।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট ইলিশ আহরণ হয়েছে ৫ লাখ মেট্রিক টন, যা মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশ। ইলিশ সম্পদ সংরক্ষণে ৬টি অভয়াশ্রম ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে, যার মোট দৈর্ঘ্য ৪৩২ কিলোমিটার। ইলিশ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা ও আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জেলেদের জীবন-জীবিকার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণ কর্মসূচির আওতায় ৪০ হাজার জেলে পরিবারকে খাদ্যসামগ্রী এবং ৯ লাখ ৮৭ হাজার ১৪১ জেলে পরিবারকে ভিজিএফের চাল সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মা ইলিশ সংরক্ষণ কর্মসূচির ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞায় ১৫ হাজার ৫০৩ দশমিক ৫০১ মেট্রিক টন ভিজিএফ চাল, জাটকা সংরক্ষণ কর্মসূচিতে চার মাসে ৫৮ হাজার ৭২০ দশমিক ১৬১ মেট্রিক টন এবং সমুদ্রে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞায় ২৪ হাজার ১৬৫ দশমিক ৬২৫ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। কাপ্তাই হ্রদে মাছ আহরণ থেকে বিরত থাকা জেলেদের দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৬১০ দশমিক ৭০১ মেট্রিক টন চাল।

মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানিতেও বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬ হাজার ১৪৪ দশমিক ৯১ কোটি টাকা মূল্যমানের ৯০ হাজার ৬১৯ দশমিক ৪২ মেট্রিক টন মৎস্য ও মৎস্যজাত দ্রব্য রপ্তানি হয়েছে।

বিশ্ববাজারে অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে চিংড়ি উৎপাদনে ক্লাস্টার পদ্ধতি, মাননিয়ন্ত্রণে HACCP পদ্ধতি, বিশ্বমানের মাননিয়ন্ত্রণ পরীক্ষাগার এবং ই-ট্রেসেবিলিটি সিস্টেম চালু করা হয়েছে। ভবিষ্যতে শুধু বেশি মাছ উৎপাদন করলেই হবে না; উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা, গুণগত মান ও পরিবেশগত মানদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে

রপ্তানিমুখী মৎস্যপণ্যের মধ্যে চিংড়ির গুরুত্ব বিশেষ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে চিংড়ি উৎপাদন হয়েছে ২ দশমিক ৯৯ লাখ মেট্রিক টন এবং এসপিএফ বাগদা চিংড়ির পিএল উৎপাদন হয়েছে ১৮১ কোটি। চিংড়ি চাষে ক্লাস্টারভিত্তিক ব্যবস্থাপনা চালু করা হয়েছে। কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় চিংড়ি এস্টেটের জন্য মাস্টার প্ল্যান প্রণয়নসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম চলছে।

উপকূলীয় চিংড়ি চাষকে পরিবেশসহনশীল করতে স্যালিনিটি ম্যাপিং, হাইড্রোলজিক্যাল সার্ভে এবং চিংড়ি খামারসংলগ্ন ৩৪টি খাল পুনঃখননের কাজ চলছে। লক্ষ্য উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চিংড়ির গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো।

বাংলাদেশের মৎস্য খাতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার বড় অংশ রয়েছে বঙ্গোপসাগরে। প্রতি বছর ৫৮ দিন সব ধরনের সামুদ্রিক মৎস্য আহরণে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হচ্ছে। আর.ভি. মীন সন্ধানী দিয়ে ৬২টি সমুদ্র জরিপ সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি ডক্টর ফ্রিটজফ ন্যানসেন ফিশারিজ অ্যান্ড ইকোসিস্টেম সার্ভে ২০২৫ পরিচালনা করা হয়েছে। সার্ভে বাংলাদেশের জন্য নতুন ৬৫টি সামুদ্রিক প্রজাতি শনাক্ত এবং ৫টি সম্ভাব্য নতুন প্রজাতির সন্ধান পাওয়া গেছে।

কুয়াকাটা ও সলিমপুরে মেরিন প্রটেক্টেড এরিয়া ঘোষণার মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রায় ১০ দশমিক ৫৪ শতাংশ এলাকায় সংরক্ষিত এলাকা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে মেরিন রিজার্ভ, নিঝুমদ্বীপ সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা এবং নাফ সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করেছে। ফলে দেশের সামুদ্রিক জলসীমার ৮ হাজার ১০১ বর্গকিলোমিটার (৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ) এলাকাকে সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়েছে, যা জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি ১৪ দশমিক ৫) অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। এসব উদ্যোগ দেশের মৎস্যসম্পদের টেকসই উন্নয়ন এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ২০৩০-এর লক্ষ্য অর্জনে মৎস্য খাত বিশেষ ভূমিকা রেখে চলেছে।

মৎস্য খাতের ভবিষ্যৎ যে প্রযুক্তিনির্ভর হবে, তার প্রমাণ সরকারি মৎস্য খামারগুলোর আধুনিকায়ন। অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ৩১টি খামারে যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে নিবিড় চাষ প্রযুক্তি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সরকারি খামারে ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি)-ভিত্তিক বটমলাইনার প্রযুক্তি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মৎস্য খাতের অর্জন নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। তবে এই সাফল্য ধরে রাখতে উৎপাদনের সঙ্গে সংরক্ষণ ও নিরাপদ খাদ্যের ভারসাম্য নিশ্চিত করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন, জলাশয় সংকোচন, দূষণ, অতিরিক্ত আহরণ, রোগবালাই এবং উৎপাদন উপকরণের মান-সবই সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য জাতীয় মৎস্য নীতিমালা-২০২৬ বাস্তবায়ন, জলবায়ু সহিষ্ণু মৎস্যচাষ সম্প্রসারণ, স্মার্ট ও আইওটি-ভিত্তিক প্রযুক্তির ব্যবহার, উন্নত জাতের মাছ উদ্ভাবন, রোগমুক্ত পোনা উৎপাদন এবং হ্যাচারিতে পিসিআর সুবিধা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশের মৎস্যখাত এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে। লক্ষ্য শুধু আরও বেশি মাছ উৎপাদন নয়; লক্ষ্য নিরাপদ মাছ, সুস্থ জলজ পরিবেশ, সুরক্ষিত জেলে, আধুনিক প্রযুক্তি এবং প্রতিযোগিতামূলক রপ্তানি। নদী, হাওর, বিল, প্লাবনভূমি ও বঙ্গোপসাগরের জলজ সম্পদকে সুরক্ষিত রেখে বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উৎপাদন বাড়াতে পারলে মৎস্য খাত ভবিষ্যতে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার পাশাপাশি কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আরও বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।

মাছে স্বয়ংসম্পূর্ণতার অর্জনকে এবার টেকসই সমৃদ্ধিতে রূপ দেওয়াই সময়ের দাবি। রাষ্ট্র, মৎস্যচাষি, জেলে, গবেষক, উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত দায়িত্বশীল অংশগ্রহণেই সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।

লেখক : সিনিয়র তথ্য অফিসার

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।


নির্বাচিত

বিদ্যুৎ গ্রিড: রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা

ছবি: দৈনিক বাংলা
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
প্রফেসর ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী

বিদ্যুৎ বিতরণের প্রশাসনিক কাঠামো ইতিহাসের পরিক্রমায় মূলত রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের অধীনেই পরিচালিত হয়ে আসছে; সমগ্র বিশ্বে এই খাতের সম্পূর্ণ বেসরকারিকরণ বা ব্যক্তিমালিকানাধীন হস্তান্তর কোনো সাধারণ নীতি নয়, বরং তা বিরল ও ব্যতিক্রমী ঘটনামাত্র। জনগণের জীবনমান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এই গুরুত্বপূর্ণ খাতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের এই নিরন্তর নির্ভরতা কোনো আদর্শগত দৃঢ়তার দ্বারা আরোপিত নয়; বরং এটি এই সেবা খাতের অন্তর্নিহিত অর্থনৈতিক, আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সত্যকে প্রতিফলিত করে। বিদ্যুৎ বিতরণ গ্রিডগুলো হলো স্বাভাবিক একচেটিয়া বাজার (natural monopoly)-এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ, যেগুলোতে জনসাধারণের যৌথ ব্যবহারের জন্য বিপুল পরিমাণ অগ্রিম মূলধন বিনিয়োগ করতে হয়। একইসঙ্গে সামাজিক কল্যাণ, দেশের অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা ও জাতীয় নিরাপত্তার মতো অত্যাবশ্যকীয় দিকগুলোর সাথে এই খাতের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়—যা শুধু মুনাফার মাপকাঠিতে চালিত বাণিজ্যিক মডেলগুলো কখনোই সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারে না। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় সিস্টেম লস উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়ে গড়ে ৮ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে নেমে এসেছে, যা সম্পূর্ণ বেসরকারিকৃত মডেলে প্রায়শই মুনাফার স্বার্থে উপেক্ষিত হয়। গ্রামীণ বিদ্যুতায়ন: বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (BREB) মাধ্যমে দেশের প্রায় ৯৯ শতাংশের বেশি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে, যা কোনো বাণিজ্যিক কোম্পানির পক্ষে আর্থিকভাবে লাভজনক হতো না। বিনিয়োগের দীর্ঘমেয়াদ: গ্রিড সাবস্টেশন ও ট্রান্সফরমার রক্ষণাবেক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি payback horizon প্রায় ২০ থেকে ২৫ বছর হয়ে থাকে, যা স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক বিনিয়োগকারীরা সাধারণত এড়িয়ে চলেন।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর প্রেক্ষাপটে—যেখানে টেকসই অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলার জন্য অবকাঠামোগত সক্ষমতা, শিল্পোন্নয়ন ও সর্বস্তরের জনগণের জন্য সমানাধিকারভিত্তিক বিদ্যুৎসংযোগ অপরিহার্য—বিদ্যুৎ গ্রিডের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ কাদের হাতে থাকবে, সেই প্রশ্নটি বিশেষ গুরুত্ব ও তাৎপর্য বহন করে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কিছু দেশ কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আংশিক নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ, কর্মসম্পাদনাভিত্তিক চুক্তি (performance-based contracts) অথবা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (PPP) মতো মডেল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেও, বিদ্যুৎ বিতরণ খাতে সম্পূর্ণ মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রচলন কার্যত কোথাও দেখা যায় না। এই সুদীর্ঘ সতর্কতার পেছনে রয়েছে নানা কাঠামোগত ও ব্যবস্থাপনাগত প্রতিবন্ধকতা। যেমন—সমান্তরাল গ্রিড অবকাঠামো নির্মাণের আর্থিক অপচয় থেকে শুরু করে মুনাফাকেন্দ্রিক ইউটিলিটি কোম্পানিগুলোর দ্বারা সৃষ্ট সামাজিক ও আঞ্চলিক বৈষম্য, যারা জনসাধারণের মৌলিক চাহিদাকে কেবল লভ্যাংশ ও মুনাফার মানদণ্ডে বিচার করে।

জনগণের নজরদারির এই ঐতিহাসিক ভিত্তিটি গভীরভাবে প্রোথিত রয়েছে ‘স্বাভাবিক একচেটিয়া বাজার’-এর অর্থনৈতিক তত্ত্বে। বিদ্যুৎ সরবরাহের ভৌত পরিকাঠামো—স্থানীয় সাবস্টেশন, মাঝারি ও নিম্ন ভোল্টেজের বিতরণ লাইন, বিদ্যুতের খুঁটি, প্রতিরক্ষামূলক সুইচগিয়ার এবং স্টেপ-ডাউন ট্রান্সফরমার—একটি সুসংহত ও স্থায়ী নেটওয়ার্ক গঠন করে, যা কোনো প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে দ্বিতীয়বার নির্মাণ করা অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক ও ব্যবহারিকভাবে অসম্ভব। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট বা রাজশাহীর মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরাঞ্চলে যদি একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিকে একই সড়কের পাশে পৃথক পৃথক বিদ্যুৎ লাইন স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়, তবে তা বিপুল অর্থের অপচয়, পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি এবং অবকাঠামোগত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে।

যেহেতু ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে অথবা অন্য কোথাও সদৃশ ইউটিলিটি নেটওয়ার্ক নির্মাণ ভৌতভাবে অকার্যকর এবং অর্থনৈতিকভাবেও অনুত্তেজক, তাই বাজার স্বাভাবিকভাবেই একজন একক সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং সেই নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানটিই স্থানীয় ভোক্তাদের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। মূল্যনির্ধারণের প্রক্রিয়ার বাইরেও রয়েছে দেশব্যাপী বিদ্যুতায়নের একটি বৃহত্তর সামাজিক লক্ষ্য—একটি অত্যাবশ্যক উন্নয়নমূলক আদেশ, যা স্বল্পমেয়াদি মুনাফায় বিশ্বাসী বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়শই উপেক্ষা করে। শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থে পরিচালিত ইউটিলিটি কোম্পানিগুলো স্বাভাবিকভাবেই তাদের বিনিয়োগ ও সম্পদ উচ্চ ঘনত্বের এবং অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোতে কেন্দ্রীভূত করে; যেমন—ব্যস্ত বাণিজ্যিক জেলা, ভারী শিল্প কমপ্লেক্স এবং প্রধান মহানগরী এলাকা, যেখানে বিদ্যুতের চাহিদা বেশি, বিল আদায়ের হার নিশ্চিত এবং বিনিয়োগকৃত মূলধন দ্রুত ফিরে পাওয়া সম্ভব।

অন্যদিকে এই বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রান্তিক ও দুর্গম অঞ্চলগুলোকে এড়িয়ে চলে—যেমন নদীভাঙনপ্রবণ চরাঞ্চল, দূরবর্তী কৃষিনির্ভর গ্রামীণ জনপদ, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল এবং নিম্ন আয়ের শহুরে বস্তি এলাকা, যেখানে মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহার কম এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম অনিয়মিত। এসব অঞ্চলে দীর্ঘ বিদ্যুৎ লাইন স্থাপন, ট্রান্সফরমার বসানো এবং ঘূর্ণিঝড় বা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামতের খরচ যেকোনো সম্ভাব্য রাজস্ব আয়ের তুলনায় অনেক বেশি। রাষ্ট্রীয় ভূমিকা: বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (BREB) এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (BPDB) মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সার্বজনীন সেবা ম্যান্ডেট (universal service mandate) এবং ক্রস-সাবসিডি বা আন্তঃভর্তুকি মডেল কার্যকর করে থাকে। পরিসংখ্যান: BREB-এর মাধ্যমে দেশের প্রায় ৯৯ শতাংশের বেশি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে, যা কোনো private (বেসরকারি) বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আর্থিকভাবে লাভজনক হতো না। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা এবং কৃষিতে ভর্তুকি দেওয়ার মাধ্যমে জ্বালানি দারিদ্র্য দূরীকরণে রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধান আজও অপরিহার্য।

বিদ্যুৎ বিতরণের অর্থনৈতিক বাস্তবতাই যেকোনো পূর্ণাঙ্গ বেসরকারিকরণের প্রচেষ্টাকে জটিল করে তোলে। গ্রিডের সম্পদগুলো বিশাল, দীর্ঘস্থায়ী এবং অত্যন্ত মূলধননির্ভর। এর জন্য নিয়মিত বিরতিতে ভূগর্ভস্থ ক্যাবল প্রতিস্থাপন, পুরোনো সাবস্টেশন আধুনিকায়ন এবং স্মার্ট মিটারিং প্রযুক্তি প্রবর্তনের মতো দীর্ঘমেয়াদি কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হয়। এই নিরন্তর রক্ষণাবেক্ষণ ও সম্প্রসারণের জন্য বহুপ্রজন্মব্যাপী পরিশোধের দিগন্ত (multi-generational payback horizon) বিশিষ্ট আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন হয়—যা স্বল্পমেয়াদি মুনাফা ও উচ্চতারল্য পছন্দকারী বাণিজ্যিক বিনিয়োগকারীরা সাধারণত এড়িয়ে চলে। দীর্ঘমেয়াদি পরিশোধ: গ্রিড সাবস্টেশন ও ট্রান্সফরমার রক্ষণাবেক্ষণের এই দীর্ঘমেয়াদি পরিশোধ সময়কাল প্রায় ২০ থেকে ২৫ বছর হয়ে থাকে, যা বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে অত্যন্ত অনাকর্ষণীয়। নিয়ন্ত্রক চ্যালেঞ্জ: প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি ও টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত কঠিন, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাব রয়েছে এবং নিয়ন্ত্রক দখল (regulatory capture) একটি নিত্যদিনের ঘটনা। তথ্যের অসমতার সুযোগ নিয়ে বেসরকারি অপারেটররা প্রায়শই ডেটা কারসাজি করে, খরচ কমানোর নামে রক্ষণাবেক্ষণ এড়িয়ে যায় অথবা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে। ডাউনস্ট্রিম ঝুঁকি: স্থানীয় বিতরণ ব্যবস্থা চূড়ান্ত প্রান্তিক গ্রাহক পর্যন্ত বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার একমাত্র পথ হওয়ায় এটি অপারেটরকে একচ্ছত্র বাজার আধিপত্য প্রদান করে। উপকূলীয় অঞ্চলে দুর্যোগ পুনরুদ্ধারের বিশাল খরচ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এড়িয়ে চলতে চায়, ফলে দীর্ঘকাল বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন থাকে সাধারণ মানুষ।

বিদ্যুৎ বিতরণে রাষ্ট্রীয় পরিচর্যা যেমন জরুরি, তেমনি বাংলাদেশের বৃহত্তর অর্থনৈতিক ইতিহাসও বেসরকারি খাতের অনিয়ন্ত্রিত সম্প্রসারণের বিপদ সম্পর্কে আমাদের এক কঠোর শিক্ষা দেয়—বিশেষ করে আর্থিক খাতের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশের সমসাময়িক ব্যাংকিং খাত বর্তমানে এক জটিল খেলাপি ঋণের (NPL) সংকটে জর্জরিত, যার মূল শেকড় বহুলাংশে প্রোথিত রয়েছে আশির দশকে এরশাদ আমলের বেসরকারি ব্যাংকিং খাতের অনিয়ন্ত্রিত সম্প্রসারণের ইতিহাসে। ঐতিহাসিক পটভূমি: রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় যখন প্রথম প্রজন্মের বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর লাইসেন্স প্রদান করা হচ্ছিল, তখন ঋণ বিতরণের সিদ্ধান্তগুলো সঠিক আর্থিক বিচক্ষণতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিল। বৃহত্তর সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক হওয়ার পরিবর্তে সেই ঋণগুলো রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও অভ্যন্তরীণ ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান সংকট: বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ (অথবা প্রকৃত হিসাব অনুযায়ী তারও বেশি) এ গিয়ে ঠেকেছে, যা দেশের তারল্য সংকট ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে ফেলেছে। সমান্তরাল মিল: প্রাথমিক পর্যায়ের বেসরকারি ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ এবং বিদ্যুৎ খাতের বেসরকারিকরণের প্রস্তাবের মধ্যে একটি স্পষ্ট সমান্তরাল মিল রয়েছে: উভয় ক্ষেত্রেই অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিকীকরণ ব্যক্তিগত সমৃদ্ধিকে প্রাধান্য দেয়, আর কাঠামোগত দেউলিয়াত্ব এবং সামাজিক ব্যয় সরাসরি সাধারণ জনগণের কাঁধে চাপিয়ে দেয়।

দৈনন্দিন অর্থনীতি ও স্থানীয় সেবা সরবরাহের সীমানা পেরিয়ে, জাতীয় সংকট, জলবায়ু জরুরি অবস্থা এবং ভূরাজনৈতিক সরবরাহ শৃঙ্খলের ধাক্কা সামাল দিতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা এক অপূরণীয় ভূমিকা পালন করে। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় সিস্টেম লস উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়ে গড়ে ৮ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে নেমে এসেছে, যা সম্পূর্ণ বেসরকারিকৃত মডেলে প্রায়শই মুনাফার স্বার্থে উপেক্ষিত হয়। চরম সংকটের মুহূর্তে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা নাগরিকদের এমন একটি ব্যবস্থার সুরক্ষায় রাখে যা করপোরেট ব্যালেন্স শিট বা ত্রৈমাসিক লভ্যাংশের চেয়ে মানবকল্যাণ, জননিরাপত্তা এবং জাতীয় স্থিতিশীলতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। বিদ্যুৎ বিতরণ খাত এবং বেসরকারি ব্যাংকিং—উভয় ক্ষেত্রেই অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিকীকরণ জনকল্যাণকে পাশ কাটিয়ে কেবল ব্যক্তিগত বা করপোরেট স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়েছে। বিদ্যুৎ খাতে যেমন স্বাভাবিক একচেটিয়া বাজার ও দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের কারণে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য, তেমনি আর্থিক খাতেও বেসরকারি খাতের অনিয়ন্ত্রিত লাইসেন্সিং ও খেলাপি সংস্কৃতির (NPL) নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করেছে। তাই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সমতাভিত্তিক উন্নয়নের স্বার্থে এই দুটি খাতেই শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় তদারকি এবং সঠিক নীতিগত নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি।

প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি অধীনে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সচিবালয় গঠন করা অত্যন্ত জরুরি, যা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে বিদ্যুৎ বিতরণ খাতের সংকট দ্রুত সমাধান করতে পারে। একই সঙ্গে, Professor of BUET - কোনো দক্ষ টেকনোকরাত সিনিয়র সচিবকে গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থার দায়িত্ব দিলে গভীর কারিগরি দক্ষতার মাধ্যমে সিস্টেম লস কমানো এবং জটিল সরবরাহ নেটওয়ার্কের সুচারু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। পরিশেষে, মূল ভৌত সম্পদের মালিকানা নিজের হাতে রেখে, বৃহত্তর নীতিগত লক্ষ্য নির্ধারণ করে এবং অপারেশনাল ব্যর্থতার সময় হস্তক্ষেপ করার অধিকার প্রয়োগ করে সরকারকে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বহাল থাকতে হবে। বিদ্যুৎ একটি জনস্বার্থমূলক মৌলিক অধিকার, যার জন্য বাণিজ্যিক দক্ষতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সুষম মিশ্রণ প্রয়োজন। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সমতাভিত্তিক উন্নয়নের স্বার্থে এই গুরুত্বপূর্ণ খাতে শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় তদারকি এবং সঠিক নীতিগত নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি।

লেখক: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি।


নির্বাচিত

থেমে যাবে কবে গোয়েবলসীয় পূর্ণগ্রাস

ছবি: দৈনিক বাংলা
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
রাজীব কুমার দাশ

মানুষের মৌলিক অধিকারের পরে অচর্চিত যা পড়ে থাকে; তা হলো চিন্তা ও চেতনা। মানুষ জীবন খিদেসমগ্র কায়ক্লেশে পেড়িয়ে গেলেও অধরা থেকে যায়,— মানুষের রান্ডিময় মনোজীবন।

আসক্তি বাড়িয়ে কমিয়ে এড়িয়ে যাওয়াও মানুষের পক্ষে একেবারে সম্ভব নয়। সে কারণে ইন্দ্রিয় সংযম ও মনোসমুদ্র ঘূর্ণিঝড়ের মতো, প্রতিনিয়ত উত্থিত অমানবীয় ইচ্ছেসমগ্র দমনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে শ্রী গীতায় বারবার সতর্ক করেছেন। সংসারে মানুষেতে দিশা দেখিয়েছেন। অর্জুন মনের দানবীয় মানবীয় নানা প্রশ্নের শ্রীকৃষ্ণ যথাযথ উত্তর দিয়েছেন।


পৌরাণিক প্রলেপ বুলিয়ে, নানা ধর্মের ছাঁচে ফেলেও মানুষকে তার চিন্তা ও চেতনার মহাসাগরে কেউ — বাঁধা দিতে পারেননি। এমনকি দিনে-রাতে শত গর্দান নিয়েও মানুষকে কোনো রাজা মহারাজা সম্রাট ধর্ম দমিয়ে রাখতে পারেননি।
উপরন্তু মানুষের মনের ইচ্ছের বিরুদ্ধে যেখানেই বাঁধা দিতে যে কেউ চেষ্টা করেছেন, — সেখানেই ঘটেছে আসল বিপত্তি।

মনোবিদ, ডক্টর কবির খানের ফেসবুক পেজ থেকে একটানা ভেসে আসে কিছু অশরীরী বাক্য উদ্বন্ধন। তার বিক্ষুব্ধ সমুদ্র মনের নানা জায়গায় ক্রমাগত আঘাত হেনে চলেছেন, কত কত
অজানা প্রশ্নের ঢেউ। ডক্টর খান তার চিন্তা নৌকা চেপে তীরে এসে দেখেন,— কে জানি কলিং বেল টিপে টিপে সিদ্ধ মোটা ফেনা ভাতের মতো করে— ‘ঘুমে হোক আজি তোমার জাগরণ’ কয়েক কবিতা ছত্র বলে চলেছেন:


‘ফেটে পড়ছে ওদিকে এদিকে
নন্দিত নিন্দিত সমগ্র
ভুল ঠিকানা পাত্রে হয় না হৃদয় সমগ্র দান। "

ড. খান টানা ভেবে চলেছেন:
১৯৪৫ সালের ১ মে বার্লিনে সস্ত্রীক আত্মহত্যা করেন নাৎসি নেতা ও হিটলারের প্রচারমন্ত্রী জোসেফ গোয়েবলস। এর আগে তারা নিজেদের ছয় সন্তানকে হত্যা করেন। গোয়েবলস ১৯৩৩-৪৫ সাল পর্যন্ত নাৎসি জার্মানির প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রধান ছিলেন। বিদ্বেষপূর্ণ বক্তৃতা এবং ইহুদিবিরোধী তৎপরতার জন্য তিনি কুখ্যাত ছিলেন। জার্মানিতে ইহুদিদের বিরুদ্ধে যে ধারাবাহিক আক্রমণ সূচিত হয়েছিল তাতে তার হাত ছিল এবং এর ফলেই সেখানে ব্যাপক ইহুদি হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়। ফ্রেঞ্চ অকুপেশন অব দ্য রূহরের সময় তিনি নাৎসি পার্টির সংস্পর্শে আসেন এবং ১৯২৪ সালে এর সদস্য হন। বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য তাকে মাশুল দিতে হয়েছিল। তিনি কিছু নাটক এবং উপন্যাস লেখলেও তার বিতর্কিত নানা অমানবীয় কর্মকাণ্ডের কারণে প্রকাশকরা তা ছাপায়নি।

১৯২১ সালে হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি পিএইচডিও লাভ করেছিলেন। পরবর্তী সময় সাংবাদিক হিসেবেও কাজ করেন। এ ছাড়া ব্যাংকের করণিক পদেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৮৯৭ সালের ২৯ অক্টোবর জার্মানির প্রুশিয়ায় তার জন্ম হয়। ১৯৪৫ সালের শুরুতে সোভিয়েত ও মিত্রবাহিনীর সৈন্যরা যখন রাইন নদী অতিক্রম করছিল তখনই তিনি বুঝতে পারেন জার্মানির পরাজয় অনিবার্য। ৩০ এপ্রিল হিটলারের আত্মহত্যার পর গোয়েবলস মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং ১ মে তিনি তার পদাঙ্ক অনুসরণ করেন।


পল জোসেফ গোয়েবলসের জন্ম ১৮৯৭ সালের ২৯ অক্টোবর জার্মানির রিদত শহরে। তার পিতার নাম ফ্রিৎজ গোয়েবলস এবং মাতার নাম মারিয়া কেথেরিনা। দুজনই ছিলেন ধার্মিক ক্যাথলিক। তার প্রাথমিক শিক্ষা হয় ক্যাথলিক স্কুলে। ১৯২১ সালে তিনি হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন করেন।
তার ইচ্ছা ছিল লেখক হওয়ার। কিন্তু এই কাজে তিনি সফল হননি। এ ছাড়া তার নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা লেগেই ছিল। সাত বছর বয়সে একটি অপারেশন সফল না হওয়ায় তার বাঁ পায়ে সমস্যা দেখা দেয়। তাই তিনি সারা জীবন খুঁড়িয়ে হাঁটতেন।
গোয়েবলসের মিথ্যাচার নিয়ে ড. খান তার অভিসন্দর্ভের
গঠনে পঠনে ভেবে চলেছেন, মানুষ ইচ্ছে করলে কী বা পারেন বা না পারেন। মানুষ সবই করতে পারেন। তার ভয়কাতুরে মনে নানা প্রশ্নে জানান দেন, খ্রিষ্টপূর্ব পাঁচ হাজার একশ থেকে পাঁচ হাজার একশ পঞ্চাশ বছরে মহাভারতের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে গান্ধারী যখন অভিশাপ দিচ্ছিলেন, তখন শ্রীকৃষ্ণ হাসিমুখেই তা মেনে নেন। তিনি বলে গেছিলেন, তার বিরুদ্ধে উত্তরসূরি, প্রজন্ম হতে প্রজন্মান্তর নানা রকমের করে কুৎসা ঘৃনা রটিয়ে যাবেন। ফলে হয়েছোও তাই। সে মহাভারত পরিবার থেকে শুরু হয়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি নানা আবাল চরিত মিথ্যাচার প্রচারের কাজ কেউ কী বন্ধ করতে পেরেছেন!? পারবেনইবা কেমন করে? প্রজন্মান্তর কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আহ্বান কেউ কী বন্ধ করতে পেরেছেন? সত্য-মিথ্যের আধুনিক লড়াই পৃথিবী ধ্বংসের দিনই কেবল শেষ হতে পারেন। তার আগে একটু কমতে পারে। শেষ হওয়ার নয়।

ভয়ংকর রকমের মিথ্যাচার প্রচার করতে একটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেন — ইতিহাসের খলনায়ক হিটলার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার তৈরি করেন গুজব মন্ত্রণালয়।
জার্মানরা প্রচারণায় মার খেয়েছে বারবার। শুধু প্রচারণা দিয়েই ব্রিটিশরা আড়াল করেছিল অনেক কিছু। অবশ্য ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই তিনি এ কাজে তৎপর ছিলেন। হিটলার খেয়াল করেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশরা প্রচারণায় এগিয়ে ছিল।
জার্মানরা প্রচারণায় মার খেয়েছে বারবার। শুধু প্রচারণা দিয়েই ব্রিটিশরা আড়াল করেছিল অনেক কিছু। হিটলারের সময় জনপ্রিয় ছিল রেডিও। বিনামূল্যে জার্মান নাগরিকদের একটি করে রেডিও দেওয়ার ব্যবস্থা করেন মন্ত্রী গোয়েবলস। হিটলার সব সময় বিশ্বস্ত এই সহযোগীর কথা শুনতেন। কারণও ছিল। গোয়েবলসের আলোচিত উক্তি ছিল, ‘আপনি যদি একটি মিথ্যা বলেন এবং সেটা বারবার সবার সামনে বলতে থাকেন তাহলে লোকজন একসময় সেটা বিশ্বাস করতে শুরু করবে।’ জার্মানিতে তাই হয়েছিল। ইহুদি নিধনের সময় গোয়েবলস প্রচার করতেন, জার্মানিতে হিটলারের মতো শক্তিশালী একজনকে দরকার। তিনিই পারবেন জার্মান জাতিকে তার হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে দিতে। বেতারে এ প্রচারণা শুনতে শুনতে মানুষ বিশ্বাসও করত। আলোচনায় ইহুদি নিধনের পরিবর্তে সব সময় সামনে থাকত হিটলারের সাফল্য নিয়ে। যুদ্ধের আগে প্রচারণা ছিল এক ধাঁচের। যুদ্ধের সময় আরেক। জার্মান রেডিও-টিভিতে শুধুই থাকত হিটলার ও তার বাহিনীর সাফল্যের কথা। বাস্তবে যখন রাশিয়ানদের হাতে জার্মান সেনারা নাস্তানাবুদ তখন গোয়েবলসের প্রচারণা ছিল সোভিয়েত রাশিয়া তাদের দখলে। জার্মান সেনারা রাশিয়ান ভদকা পান করছে। আর রাশিয়ান মেয়ে নিয়ে আনন্দ-ফুর্তি করছে। এ ধরনের প্রচারণা প্রতিদিনই হতো। আমেরিকা আর ব্রিটিশ সেনাদের বিরুদ্ধে চলত কুৎসা রটনা। যার কোনো আগামাথা ছিল না। গোয়েবলসের শেষ পরিণতি ছিল করুণ। তাকে মরতে হয়েছিল পরিবার-পরিজন নিয়ে বিষপান করে। মৃত্যুতেও তিনি হিটলারের পথ অনুসরণ করেছিলেন।


ডক্টর খান সংসার বিবাগী। বেতনের অংশ তিনেক যাযাবরের হাতে বাদে, ফেসবুকে ফেইক অসহায় কিংবা ট্রান্সজেন্ডার আইডি জেনেও বিশ্বাস করে দান করে দেন।

এইত বছর আগের ঘটনা। এক তরুণী দাবি করে বসলেন, তার বাবা গরিব উপরি দোষ পাগলও নিঃস্ব। সাত পাঁচ না ভেবে কথিত চিকিৎসা বাবদ হাজার ত্রিশেক টাকা পাঠিয়ে দেন। বিকাশ খরচ দেননি বলে, যা তা কিপটে বুড়োর বাচ্চা বুড়ো বলে গালিগালাজও হজম করে নেন। মাস ছয় পরে তরুণী দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘স্যার, আসলে আমি মিথ্যে বলেছিলাম। আমার বয়ফ্রেন্ডকে ত্রিশ হাজার টাকা দিয়ে মোবাইল ফোন কিনে দিছিলাম। পরে ব্রেকআপ করে চলে যান।’

ড. খান এ জাতি সমাজ নিয়ে চরম হতাশ ও উদ্বিগ্ন। শতেশ যুব-যুবি রান্ডিগিরি করে গৃহীরান্ডি পেরিয়ে, — রান্ডিসমগ্র
জীবনে থিতু হয়ে গেছেন। রান্ডিসমগ্র জীবনে এসে ঘরে স্বামী-স্ত্রী নামে এক একটা বিশেষণ সর্বস্ব কথিত বিশ্বস্ত কুকুর-বিড়ালের মতো করে কিছু খাবার — এসি গাড়ি-বাড়ির জন্য কেউ না কেউ থেকে যেতে শুরু করেন। শিক্ষা পাঠ বিজ্ঞাপনের সবকটিতে মিথ্যাচার ছদ্মবেশ ধারণের মাধ্যমে দেশসমগ্রজুড়ে গোয়েবলসীয় ধৃষ্টতা সবখানে গেড়ে বসে আছেন। মনেপ্রাণে রান্ডিসমগ্র ছেড়ে মানুষ হতে কেউ চাইছেন না কেন?

মাঘী পূর্ণিমা, পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ। ড. কবির খান সাহেব দেশ জাতির হিসেবটা আরেকবার গোয়েবলসীয় জীবনের সাথে মিলিয়ে নিতে আহত চাঁদের নিহত আলো সমীপে— ‘ছত্রাক’ কবিতা লেখে বলে চলেছেন:

‘ওগো দেশ দুয়ারি চাঁদ
কোনোদিন হয়ো নাকো পর
প্রবঞ্চকের কালিতে লেখা ছিল আজিকার দিনে
গ্রহণ পাতাল পূর্ণগ্রাস;

কেউ জানুক না জানুক
কেউ দেখুক না দেখুক
ফাঁকি দাও সূর্যিটা ঘিরে
মানুষ হৃদয়ে বইছে সরলরেখা
অন্ধকারে তুমি বিনে হয় না
মানুষের হৃদয় অর্চনা।’

লেখক: কথাসাহিত্যিক প্রাবন্ধিক ও কবি।


নির্বাচিত

দিল্লি বিমানবন্দর থেকে সীমান্তের শূন্যরেখা

জাফরিন আকতার
ছবি: সংগৃহীত
আপডেটেড ১৯ জুন, ২০২৬ ২০:৩৭
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
    সীমান্তে আটকে থাকা একটি শিশু, দিল্লি বিমানবন্দরে অপেক্ষমাণ একজন সরকারি প্রতিনিধি কিংবা দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক বিশ্বাস, এসবই মনে করিয়ে দেয় যে প্রতিবেশী সম্পর্কের ভিত্তি শক্তি নয়, আস্থা; চাপ নয়, সম্মান; এবং রাজনৈতিক সুবিধা নয়, দীর্ঘমেয়াদি পারস্পরিক স্বার্থ। দিল্লি বিমানবন্দর থেকে সীমান্তের শূন্যরেখা পর্যন্ত বিস্তৃত সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই আস্থার ভিত্তিকেই নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, দুই দেশ সেই প্রশ্নের উত্তর সংঘাত দিয়ে দেয়, নাকি সংলাপ ও সহযোগিতার মাধ্যমে।

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে প্রায়ই দেখা যায়, একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশের ওপর গিয়ে পড়ে। তবে যখন সেই প্রভাব মানবাধিকার, কূটনৈতিক শিষ্টাচার এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় আস্থার প্রশ্নে রূপ নেয়, তখন বিষয়টি আর কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার থাকে না। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে ঘিরে ঘটে যাওয়া দুটি ঘটনা, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কথিত ‘পুশইন’ এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের দিল্লি বিমানবন্দর থেকে ফিরে আসা, এমনই একটি বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করছে।

প্রথম ঘটনাটি মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। দ্বিতীয় ঘটনাটি কূটনৈতিক সৌজন্য, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা এবং রাজনৈতিক আস্থার সংকটকে সামনে এনেছে। দুটি ঘটনাই আলাদা হলেও উভয়ের মধ্যে একটি সাধারণ সূত্র রয়েছে, বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের নীতিগত অবস্থান এবং সেই অবস্থানের ওপর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের সম্ভাব্য প্রভাব।

সীমান্তে পুশইন: মানবাধিকার নাকি অভিবাসন রাজনীতি?

গত কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশ সীমান্তে কথিত ‘পুশইন’ নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি জানিয়েছে, জুন মাসের শুরু থেকে শিশুসহ দুই শতাধিক মানুষকে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেওয়ার অন্তত ২১টি প্রচেষ্টা তারা প্রতিহত করেছে।

এই অভিযোগগুলো আন্তর্জাতিক গুরুত্ব পায় যখন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানায়। সংস্থাটি বলেছে, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর সদস্যদের, বিশেষ করে মুসলমানদের, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলীর বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন, ‘কোনো রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব প্রশ্নে বিরোধ থাকতে পারে; কিন্তু সেই বিরোধের সমাধান কখনোই সীমান্তে নারী, শিশু ও পরিবারকে আটকে রেখে করা যায় না। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কাউকে জোরপূর্বক বহিষ্কার করার আগে তার পরিচয়, নাগরিকত্ব, আইনি অধিকার এবং আপিলের সুযোগ নিশ্চিত করতে হয়।’

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন ওঠে আসে। যদি এসব মানুষ সত্যিই বাংলাদেশি হন, তাহলে তাদের প্রত্যাবাসনের জন্য বিদ্যমান কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া রয়েছে। আর যদি তারা ভারতীয় নাগরিক হন, তাহলে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন। দুই ক্ষেত্রেই ‘পুশইন’ কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধান নয়।

বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্রগুলো অনিয়মিত অভিবাসন মোকাবিলা করে। যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্ত, ইউরোপ-মধ্যপ্রাচ্য রুট কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রোহিঙ্গা সংকট, সব ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের কেন্দ্রীয় বিষয় হলো ‘ডিউ প্রসেস’ বা আইনি প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়া এড়িয়ে সরাসরি সীমান্তে মানুষ ঠেলে দেওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যবস্থার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

ভোটার তালিকা, নাগরিকত্ব রাজনৈতিক বাস্তবতা

এইচআরডব্লিউ তাদের প্রতিবেদনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করেছে। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় নাগরিকত্ব ও ভোটার পরিচয়ের প্রশ্ন একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে ‘অনুপ্রবেশকারী’ এবং ‘অবৈধ অভিবাসী’ প্রসঙ্গ রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বিশেষত বাংলাভাষী মুসলমান জনগোষ্ঠীকে ঘিরে এই বিতর্ক অনেক সময় রাজনৈতিক মেরুকরণের উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

২০১৯ সালে আসামের জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) প্রক্রিয়ার সময় প্রায় ১৯ লাখ মানুষের নাগরিকত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা এখনো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর আলোচনার বিষয়। বর্তমান পরিস্থিতি সেই পুরোনো উদ্বেগকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

অতএব প্রশ্ন ওঠছে, সীমান্তে পুশইনের অভিযোগ কি কেবল নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার অংশ, নাকি এটি বৃহত্তর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের বহিঃপ্রকাশ?

দিল্লি বিমানবন্দরের ঘটনা: প্রশাসনিক যাচাই নাকি রাজনৈতিক বার্তা?

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান ভারত সরকারের আমন্ত্রণে আয়োজিত ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশন (আইওআরএ)-এর বৈঠকে অংশ নিতে দিল্লি যান। সফরের বিষয়ে আগাম কূটনৈতিক নোট পাঠানো হয়েছিল। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই তার সফর সম্পর্কে অবগত ছিল।

কিন্তু দিল্লি বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তাকে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়ায় আটকে রাখা হয়। পরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলেও তিনি অপমানিত বোধ করে দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ভারতীয় সূত্রগুলোর বক্তব্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তারা স্বীকার করেছে যে জাহেদ উর রহমানের অতীতের ভারতবিষয়ক বক্তব্য এবং ইউটিউব আলোচনাগুলো যাচাইয়ের অংশ ছিল। এখানেই মূল প্রশ্নটি নিহিত।

একজন আমন্ত্রিত বিদেশি সরকারি প্রতিনিধিকে তার অতীত রাজনৈতিক মতামতের ভিত্তিতে বিমানবন্দরে আলাদা করে যাচাই করা হলে সেটি কি কেবল প্রশাসনিক বিষয় হিসেবে বিবেচিত হবে, নাকি তা রাজনৈতিক বার্তাও বহন করবে? বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো সাধারণত সমালোচনাকে নিরাপত্তা ঝুঁকির সমার্থক হিসেবে বিবেচনা করে না। বিশেষত যখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি একটি স্বীকৃত সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি।

ভারত যদি শেষ পর্যন্ত তাকে প্রবেশের অনুমতি দিয়েই থাকে, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, দুই ঘণ্টার বিলম্বের প্রয়োজন কী ছিল? এই ঘটনাকে হয়তো অনেকেই একটি বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক ঘটনা হিসেবে দেখবেন। কিন্তু কূটনীতিতে প্রতীকী ঘটনা অনেক সময় বাস্তব নীতির চেয়েও বড় প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আস্থার নতুন ভিত্তি গড়ে তোলার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দিল্লি বিমানবন্দরের ঘটনাটি উল্টো বার্তা দিয়েছে।

বাংলাদেশে অনেকেই এটিকে ভারতের পক্ষ থেকে একটি ‘সিগন্যাল’ হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে ভারতের একটি অংশ এটিকে নিরাপত্তাজনিত নিয়মিত প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। বাস্তবতা সম্ভবত মাঝামাঝি কোথাও। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ধারণাই অনেক সময় বাস্তবতার চেয়ে বেশি

গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যদি একটি দেশ মনে করে যে তাকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে, তাহলে সেই অনুভূতি সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

বাংলাদেশের জন্যও কিছু প্রশ্ন

এই আলোচনায় বাংলাদেশের দায়িত্বও এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

দিল্লি বিমানবন্দরের ঘটনায় প্রতিনিধিদলের বাকি সদস্যরা বৈঠকে যোগ দেওয়ার জন্য এগিয়ে যান। বাস্তবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি হয়তো রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু কূটনৈতিকভাবে এটি একটি প্রশ্নও তৈরি করেছে, সংকট মুহূর্তে একটি প্রতিনিধিদল কতটা ঐক্যবদ্ধ ছিল? আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রের মর্যাদা মুখ্য। ফলে ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশেরও আরও সুসংগঠিত কৌশল প্রয়োজন।

বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক বর্তমানে একটি পরিবর্তনশীল পর্যায়ে রয়েছে। ২০২৪ পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তরের পর দুই দেশই নতুন বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান পুনর্নির্ধারণ করছে। ভারতের জন্য বাংলাদেশ কেবল একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়; এটি উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা, আঞ্চলিক বাণিজ্য, বঙ্গোপসাগরীয় কৌশল এবং সংযোগনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক অংশীদার। এই বাস্তবতায় সীমান্তে মানবাধিকার বিতর্ক এবং কূটনৈতিক অস্বস্তি কোনো পক্ষের জন্যই লাভজনক নয়।

সামনে করণীয়

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে প্রয়োজন তিনটি বিষয়।

প্রথমত, সীমান্তে পুশইনসংক্রান্ত অভিযোগের স্বাধীন ও যৌথ তদন্ত।

দ্বিতীয়ত, নাগরিকত্ব ও প্রত্যাবাসন প্রশ্নে আন্তর্জাতিক আইনের পূর্ণ অনুসরণ।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সৃষ্ট আস্থার ঘাটতি দূর করতে উচ্চপর্যায়ের নিয়মিত কূটনৈতিক সংলাপ।

কারণ শেষ পর্যন্ত ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক কোনো একটি সরকার, কোনো একটি রাজনৈতিক দল বা কোনো একটি নির্বাচনের চেয়েও বড়।

সীমান্তে আটকে থাকা একটি শিশু, দিল্লি বিমানবন্দরে অপেক্ষমাণ একজন সরকারি প্রতিনিধি কিংবা দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক বিশ্বাস, এসবই মনে করিয়ে দেয় যে প্রতিবেশী সম্পর্কের ভিত্তি শক্তি নয়, আস্থা; চাপ নয়, সম্মান; এবং রাজনৈতিক সুবিধা নয়, দীর্ঘমেয়াদি পারস্পরিক স্বার্থ।

দিল্লি বিমানবন্দর থেকে সীমান্তের শূন্যরেখা পর্যন্ত বিস্তৃত সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই আস্থার ভিত্তিকেই নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এখন দেখার বিষয়,

দুই দেশ সেই প্রশ্নের উত্তর সংঘাত দিয়ে দেয়, নাকি সংলাপ ও সহযোগিতার মাধ্যমে।

লেখক: শিক্ষার্থী, চতুর্থ বর্ষ অন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।


নির্বাচিত

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে লড়ে যাওয়া এক অকুতোভয় বীর

ছবি: বীর মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট ফজলুর রহমান।
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
গাজী মহিবুর রহমান
    মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী একজন ফজলুর রহমান সবসময় অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক এবং মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন বাংলাদেশের কথা বলে এসেছেন। সুখি সমৃদ্ধ স্বাধীন বাংলাদেশে গরিবের পেটের ভাত, পরনের কাপড়ের নিশ্চয়তার স্বপ্ন দেখেই একদিন তিনি যুদ্ধে গিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পঞ্চান্ন বছর পরে এসে একজন মুক্তিযোদ্ধার সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রত্যাশা নতুন সরকারের কাছে রাখলাম

বাংলাদেশ নামক জাতি রাষ্ট্রটির বয়স পঞ্চান্ন হতে চলল। মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত এবং দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে বাঙালি জাতি ১৯৭১ সনে মুক্ত হয়েছিল, পেয়েছিলো স্বাধীনতা। মুক্তির এই পঞ্চান্ন বছরে দেশে নানাবিধ সংকট দেখা দিলেও মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধারা কখনো এতটা সংকটে পড়েনি, যতটা সংকটের মধ্য দিয়ে বিগত দেড়বছর অতিবাহিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক নিয়ে বিতর্ক জারি আছে, মুক্তিযোদ্ধার তালিকা নিয়ে প্রশ্ন আছে, মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে অনেক মতপার্থক্য আছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে ব্যবসা হয়েছে বলে বাজারে নানা কথা চালু আছে কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বা মুক্তিযুদ্ধকে ছোট করে এমন কোন কিছু ঘটেছে বলে কেউ বলতে পারবেনা। কিন্তু ৫ আগষ্ট গণঅভ্যুত্থানের পর মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধারা একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করেছে এ কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা। মুক্তিযুদ্ধের এই ক্রান্তিকালে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিকুল পরিবেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে লড়ে যাওয়া এক অকুতোভয় বীরের নাম বীরমুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান, এমপি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তিনি জীবনের জয়গান গেয়ে চলেছেন। সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদের অধিবেশনে তার স্বভাবসূলভ বক্তৃতায় তিনি বলেছেন, মুক্তিযোদ্ধা এবং শহীদ পরিবারের কেউ জামায়াতে ইসলামী দল করা ডাবল অপরাধ। তিনি আরও বলেছেন এ দেশের বনে জঙ্গলে শুধু দোয়েল থাকেনা, রয়েল বেঙ্গল টাইগারও থাকে। যতদিন রয়েল বেঙ্গল টাইগার থাকবে ততদিন মুক্তিযোদ্ধা জিতবে, রাজাকার জিততে পারবে না।
রণাঙ্গনের একজন সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান যাকে এখন সারাদেশের মানুষ এক নামে চিনে এবং জানে। তিনি বিভিন্ন সময় টক শোতে, বক্তৃতায় বলেছেন- মুক্তিযুদ্ধের পেট চিরে বাংলাদেশের জন্ম। মুক্তিযুদ্ধ হল বাংলাদেশের মা। হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙ্গে একটি স্বাধীন জাতি রাষ্ট্র পাবার আশায় মুসলমান মায়েরা নামাজ পড়ে খোদার কাছে দোয়া করত এবং হিন্দু মায়েরা তুলসিতলায় পুজো দিতে গিয়ে বলত হে ভগবান, আমাদের এমন এক অমৃতের সন্তান দাও যে আমাদেরকে স্বাধীনতা এনে দেবে। বাঙালি জাতির হাজার বছর ধরে চলা স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত রূপ লাভ করে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। বাঙালি জাতি পায় একটি স্বাধীন স্বার্বভৌম রাষ্ট্র, একটি লাল সবুজ পতাকা। আর এই স্বাধীনতা তথা মুক্তিযুদ্ধই বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন। ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের আঁকড়ে লিখা হয় বাহাত্তরের সংবিধান।
চিন্তায়, চেতনায়, মননে মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করে বিবেক দিয়ে, আবেগ দিয়ে যিনি সবসময় মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে আসছেন সেই তিনি এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা,মিঠামন ও অস্টগ্রাম) আসন থেকে নির্বচিত বিএনপি দলীয় একজন সংসদ সদস্য। সমস্ত পরিচয়কে ছাপিয়ে সবার কাছে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে লড়ে যাওয়া একজন অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেই বেশি সমাদৃত। তিনি তার নির্বাচনী প্রচারণায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধকে। তাঁর নির্বাচনী জনসভায় তিনি জনগণকে জিজ্ঞেস করেছেন কারা কারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আছেন তারা হাত তুলেন। দেখা গেছে জনসভায় উপস্থিত সবাই হাত তুলে তাদের অকুন্ঠ সমর্থন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ব্যক্ত করেছেন। তিনি আবার সবাই জিজ্ঞেস করেছেন আপনারা কারা কারা রাজাকারের পক্ষে আছেন তারা হাত তুলেন। কেউ হাত তুলেনি। শুধু তাই নয় তার নির্বাচনে দলমত নির্বিশেষে এমনকি চিহ্নিত আওয়ামী লীগের মুক্তিযোদ্ধারাও রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার পক্ষে নির্বাচনের মাঠে সরব ছিলেন। এমনকি অনেক মুক্তিযোদ্ধা যারা সারাজীবন নৌকা মার্কায় ভোট দিয়েছেন তারাও শুধুমাত্র ফজলুর রহমানের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দৃঢ় এবং স্পষ্ট অবস্থানের কারণে এবার ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিয়েছেন।
একজন অনলবর্ষী বক্তা হিসেবে ফজলুর রহমানের খ্যাতি সেই ছাত্র রাজনীতি থেকেই। এবার তিনি নির্বাচনী জনসভায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা তার সাবলীল বক্তৃতায় বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার, আমার বয়স আটাত্তর। আমি একষট্টি বছর যাবত রাজনীতি করি, এটাই আমার শেষ নির্বাচন। এবারই কিন্তু একজন মুক্তিযোদ্ধাকে ভোট দেওয়ার শেষ সুযোগ, এরপরে আর কোন মুক্তিযোদ্ধা নির্বাচন করতে আসবেনা। তিনি আওয়ামী লীগের ভোটারদের উদ্দেশে তার বক্তৃতায় বলেছেন-আমাকে যদি পছন্দ নাহয় আমাকে ভোট দিয়েন না কিন্তু আপনাদেরকে অনুরোধ করে বলছি অন্তত যাদের হাতে ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত লেগে আছে এবং দুই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জত যারা লুন্ঠন করেছে সেইসব রাজাকারের দলকে ভোট দিয়েন না।’
বাংলাদেশের এবারের নির্বাচনে বিভিন্ন দল থেকে কিংবা নির্দলীয়ভাবেও বিভিন্ন আসনে অনেক মুক্তিযোদ্ধা নির্বাচন করেছেন কিন্তু ফজলুর রহমানের মতো আলোচনায় আর কেউ ছিল না। এমনকি আর কারো নির্বাচনী প্রচারণা মুক্তিযুদ্ধ নির্ভরও ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ইস্পাত কঠিন অবস্থানের কারণে ফজলুর রহমান একদিকে যেমন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষের মন জয় করতে পেরেছেন অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তির টার্গেটে পরিণত হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণে দেশে বিদেশে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তির কাছে এক মুর্তিমান আতংক হয়ে উঠেছিলেন জনাব ফজলুর রহমান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফজলুর রহমানের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়ে উঠে দেশি বিদেশি চক্র। তার বক্তব্য খণ্ডিতভাবে প্রচার করে তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা থেকে শুরু করে এহেন কোনো অপচেষ্টা নাই যেটা তার বিরুদ্ধে করা হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি বুলিংয়ের শিকার হন এই সিনিয়র রাজনীতিবিদ। এমনকি তাকে ফজা পাগলা বলে আখ্যায়িত করা হয়। কিন্তু তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে এসে অফলাইন যুগের একজন মানুষ হয়েও তিনি সমানতালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই অপশক্তির মোকাবিলা করেছেন এবং প্রতিনিয়ত করে চলেছেন। ফজলুর রহমান, একজন সংসদ সদস্য. সুপ্রিম কোর্টের একজন সিনিয়র আইনজীবী, একজন প্রথিতযশা রাজনীতিবিদ এবং একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সারাজীবন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তার অবস্থানে বিন্দুমাত্র ছাড় দেবেন না বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
রাজাকারের নাতিপতি বলে যেখানে একজন ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে সেখানে একজন ফজলুর রহমান প্রতিকূল সময়ে দাঁড়িয়ে ৫ আগষ্ট পরবর্তী সময়ে জামাত-শিবিরের বিপক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে গণমাধ্যমে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে কথা বলেছেন দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে। মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করা, বাহাত্তরের সংবিধানকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুর্তির উপরে প্রস্রাব করা এমনকি বঙ্গবন্ধুর বত্রিশ নাম্বারের বাড়ি ভেঙ্গে ফেলার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা যখন ঘটেছিল দেশে তখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথা বলার লোকের বড়ই অভাব ছিল, ফজলুর রহমান তখন একজন বিএনপি নেতা হয়েও মুক্তিযুদ্ধের কথা, বাহাত্তরের সংবিধানকে সমুন্নত রাখার কথা, বঙ্গবন্ধুর কথা নির্ভয়ে নির্দ্বিধায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বলে গেছেন। তিনি তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় উচ্চ কন্ঠে বাম হাতের তর্জনী উঁচু করে বলে গেছেন, ‘এই রাজাকারের বাচ্চারা এখনো কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা বেঁচে আছে, ফজলুর রহমান কিন্তু এখনো বেঁচে আছে।’ আর প্রতিকূল পরিবেশে এসব সাহসী উচ্চারণের জন্য তাকে কঠিন সময় পাড় করতে হয়েছে। তার বাসার সামনে যেমন মব সৃষ্টি করা হয়েছে, ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে অন্যদিকে ৫ আগষ্ট ঘটিয়েছে কালো শক্তি এই কথা বলার কারণে তাকে দল থেকে তিন মাসের বহিষ্কারাদেশ দেওয়া হয়েছিলো। যদিও বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের আগেই তাকে মনোনয়ন দেওয়া হয় কিন্তু অদ্যাবধি তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে এমন খবর পাওয়া যায়নি। এতসব সমস্যার মধ্য দিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করে এগিয়ে গেছেন এবং বলেছেন যতকিছুই হোক আমি মুক্তিযুদ্ধকে ছাড়তে পারব না।
ফজলুর রহমানের ৬১ বছরের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের প্রায় পুরো সময়টাই গেছে ক্ষমতার বাইরে থেকে। অনেক বন্ধুর পথ পেরিয়ে বর্তমানে তিনি একজন বিএনপি দলীয় সাংসদ। তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে, ছাত্রলীগ থেকে আওয়ামী লীগ প্রায় ৩২ বছর কাটিয়েছেনে এই দলে। এর মধ্যে ১৯৮৬ সনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়ে কিশোরগঞ্জ সদর আসন থেকে একবার এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন জনাব ফজলুর রহমান। তার রাজনৈতিক জীবনের মেরুকরণ ঘটে ১৯৯৬ সনে। জীবনের যৌবন কাটিয়েছেন যে রাজনৈতিক দলে সেই আওয়ামী লীগ ছেড়ে ফজলুর রহমান ১৯৯৬ সনে তৎকালীন কিশোরগঞ্জ-৫ বর্তমান ৪ আসন থেকে স্বতন্ত্র নির্বাচন করেন। অল্প ভোটের ব্যবধানে তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের কাছে পরাজিত হন যদিও নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে তিনি বারবারই কারচুপির অভিযোগ করে আসছিলেন। পরবর্তীতে তিনি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীকে নিয়ে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ নামে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে গামছা প্রতীকে নির্বাচন করে আবারো আব্দুল হামিদের কাছে পরাজিত হন। পরবর্তীতে তিনি ২০০৮ এর নির্বাচনের আগে বিএনপিতে যোগদান করেন এবং ধানের শীষ প্রতীকে একই আসন থেকে আব্দুল হামিদের সাথে পরাজিত হন। ঐ নির্বাচনে তিনি প্রায় এক লাখ ভোট পেয়েছিলেন। তারপর থেকে ফজলুর রহমান বিএনপির রাজনীতিতে মনোনিবেশ করেন এবং কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মনোনীত হন। একজন উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য হয়েও বিগত দিনে বিএনপির রাজনীতিতে বিশেষ করে আন্দোলন সংগ্রামে ফজলুর রহমান সক্রিয় ছিলেন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় তাকে জেলে যেতে হয়েছে। তারপরও তিনি রাজনীতির মাঠ ছেড়ে যাননি বরং দেশে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক শাসন ফিরিয়ে আনার আন্দোলনে মাঠে ময়দানে মিডিয়াতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। রাজনৈতিক জীবনে পরিস্থিতির শিকার হয়ে যখন যে দলেই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ ও লালন করেছেন নিজের মতো করে।
সর্বশেষ অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনাব ফজলুর রহমান বিপুল ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত হয়ে শপথ গ্রহণের পর বিভিন্ন মিডিয়ায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন-‘মুক্তিযুদ্ধই হলো বাংলাদেশের ফাউন্ডেশন কাজেই তারেক রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের উপর ভিত্তি করে যদি দেশ পরিচালিত হয় তাহলে অবশ্যই দেশ ভালো চলবে।’
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী একজন ফজলুর রহমান সবসময় অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক এবং মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন বাংলাদেশের কথা বলে এসেছেন। সুখি সমৃদ্ধ স্বাধীন বাংলাদেশে গরিবের পেটের ভাত, পরনের কাপড়ের নিশ্চয়তার স্বপ্ন দেখেই একদিন তিনি যুদ্ধে গিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পঞ্চান্ন বছর পরে এসে একজন মুক্তিযোদ্ধার সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রত্যাশা নতুন সরকারের কাছে রাখলাম।

গাজী মহিবুর রহমান
কলাম লেখক।


নির্বাচিত

জ্ঞান, সাধনা ও সভ্যতা: প্রাচীন ভারতের শিক্ষার গল্প

আপডেটেড ১ জুন, ২০২৬ ১৬:০৪
দৈনিক বাংলা ডেস্ক

আজকের কোনো অভিভাবককে যদি বলা হয়, তাঁর সন্তানকে একটি বিদ্যালয়ে পাঠাতে হবে যেখানে নেই কোনো পাকা ভবন, নেই স্মার্ট ক্লাসরুম, নেই পরীক্ষার নম্বরের প্রতিযোগিতা, এমনকি নিজের খাবারের ব্যবস্থাও অনেক সময় নিজেকেই করতে হবে—তাহলে তিনি নিশ্চয়ই বিস্মিত হবেন। অথচ ভারতবর্ষের দীর্ঘ ইতিহাসে এমন একটি সময় ছিল, যখন এই ব্যবস্থাকেই শিক্ষার সর্বোত্তম রূপ বলে মনে করা হতো। সেই সময় জ্ঞানকে চাকরির সিঁড়ি হিসেবে নয়, মানুষ হওয়ার শিল্প হিসেবে দেখা হতো।

কল্পনা করুন, প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের একটি ভোর। অরণ্যের কিনারায় ছোট ছোট কুটির। দূরে নদীর ধারা। সূর্যের প্রথম আলো গাছের পাতায় এসে পড়েছে। কয়েকজন কিশোর ঘুম থেকে উঠে নদীতে স্নান করতে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে একজন কোনো রাজ্যের যুবরাজ, আরেকজন হয়তো একজন সাধারণ কৃষকের ছেলে। কিন্তু আশ্রমের ভেতরে তাদের পরিচয়ের কোনো পার্থক্য নেই। তারা সবাই শিষ্য। সবার কাজ একই, সবার নিয়ম একই, সবার লক্ষ্যও একই—জ্ঞান অর্জন।

প্রাচীন ভারতের গুরুকুলগুলো ছিল এমনই। সেখানে শিক্ষা শুরু হতো বই দিয়ে নয়, জীবন দিয়ে। শিষ্যরা শুধু বেদ বা উপনিষদ মুখস্থ করত না; তারা শিখত কীভাবে বিনয়ী হতে হয়, কীভাবে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করতে হয়, কীভাবে নিজের চেয়ে বড় কোনো আদর্শের জন্য বাঁচতে হয়। আজকের ভাষায় যাকে ‘ভ্যালু এডুকেশন’ বলা হয়, তখন সেটিই ছিল শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু।

তবে এই শিক্ষাব্যবস্থাকে কেবল ধর্মীয় শিক্ষা বলে ভাবলে ভুল হবে। প্রাচীন ভারতীয়রা বিস্ময়করভাবে বাস্তববাদীও ছিলেন। তারা জানতেন, শুধু আধ্যাত্মিক জ্ঞান দিয়ে সমাজ চলে না। তাই গুরুকুলের পাঠ্যক্রমে স্থান পেয়েছিল ব্যাকরণ, যুক্তিবিদ্যা, গণিত, চিকিৎসাশাস্ত্র, কৃষিবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রনীতি। পৃথিবীর অনেক অঞ্চলে যখন জ্ঞানচর্চা এখনও সীমিত পরিসরে আবদ্ধ, তখন ভারতীয় শিক্ষার্থীরা নক্ষত্রের গতি নিয়ে চিন্তা করছে, ভাষার গঠন বিশ্লেষণ করছে, রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিমালা শিখছে।

এই শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি সৌন্দর্য ছিল প্রশ্ন করার স্বাধীনতা। উপনিষদের পাতা খুললেই দেখা যায়, শিষ্য প্রশ্ন করছে, গুরু উত্তর দিচ্ছেন। আবার কখনো গুরু এমন প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছেন, যার উত্তর খুঁজতে শিষ্যকে বছরের পর বছর ভাবতে হচ্ছে। জ্ঞানকে তখন চূড়ান্ত সত্য হিসেবে পরিবেশন করা হতো না; বরং তাকে দেখা হতো অনুসন্ধানের এক অবিরাম যাত্রা হিসেবে।

এরপর ইতিহাসের মঞ্চে এল বৌদ্ধধর্ম, আর তার সঙ্গে শিক্ষার জগতেও শুরু হলো নতুন অধ্যায়। বনাঞ্চলের গুরুকুল ধীরে ধীরে জায়গা করে দিল বিশাল বিহারগুলোকে। শিক্ষা আরও প্রাতিষ্ঠানিক হলো, আরও আন্তর্জাতিক হলো। নালন্দা, বিক্রমশীলা, তক্ষশীলা কিংবা বলভীর মতো মহাবিহারগুলো কেবল ভারতের নয়, সমগ্র এশিয়ার জ্ঞানকেন্দ্রে পরিণত হলো।

নালন্দার কথা ভাবলেই আজও বিস্ময় জাগে। আমরা প্রায়ই বলি, আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বায়নের প্রতীক। অথচ দেড় হাজার বছর আগে নালন্দার আবাসিক প্রাঙ্গণে চীন, কোরিয়া, তিব্বত, সুমাত্রা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে বসে অধ্যয়ন করতেন। তখনকার পৃথিবীতে কোনো বিমান ছিল না, দ্রুত যোগাযোগের ব্যবস্থা ছিল না। তবু জ্ঞানের আকর্ষণে মানুষ হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিত।

চীনা পরিব্রাজকদের বিবরণে নালন্দার যে ছবি পাওয়া যায়, তা আজও বিস্ময়কর। হাজারো শিক্ষার্থী, অসংখ্য শিক্ষক, বিশাল গ্রন্থাগার, দিনভর বিতর্ক আর আলোচনা। সেখানে জ্ঞানকে মুখস্থ করার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো তাকে যাচাই করার ওপর। যুক্তি ছিল মর্যাদার বিষয়, বিতর্ক ছিল শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সবচেয়ে বড় কথা, সেই শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে কেবল পেশাজীবী বানানোর চেষ্টা করেনি। তার লক্ষ্য ছিল মানুষকে জ্ঞানী, সংযমী, নৈতিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। হয়তো সে কারণেই প্রাচীন ভারতের শিক্ষাকেন্দ্রগুলো শুধু বিদ্যার প্রতিষ্ঠান ছিল না; ছিল সভ্যতা নির্মাণের কারখানা।

আজ আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার যুগে বাস করছি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বড়, গবেষণাগারগুলো আরও উন্নত, তথ্যের প্রবাহও অভূতপূর্ব। কিন্তু একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে—আমরা কি শিক্ষার সেই গভীর উদ্দেশ্যকে ধরে রাখতে পেরেছি? আমরা কি এখনও মানুষ তৈরির কথা ভাবি, নাকি শুধু দক্ষ কর্মী তৈরির?

প্রাচীন ভারতের গুরুকুল ও মহাবিহারের ইতিহাস হয়তো আমাদের সেই প্রশ্নটাই নতুন করে ভাবতে শেখায়। কারণ সভ্যতার দীর্ঘ যাত্রায় প্রযুক্তি বদলায়, প্রতিষ্ঠান বদলায়, পাঠ্যক্রম বদলায়; কিন্তু শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য বদলায় না। তার কাজ এখনও মানুষের ভেতরের আলো জ্বালিয়ে দেওয়া। আর সেই আলোর সন্ধানেই তো হাজার বছর আগে অরণ্যের পথে বেরিয়েছিল একদল কিশোর, যারা জানত—জ্ঞানই মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ।

মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু অধ্যায় আছে, যেগুলো কেবল অতীতের স্মৃতি নয়—বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্যও এক অনির্বাণ আলোকবর্তিকা। প্রাচীন ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা তেমনই এক বিস্ময়কর অধ্যায়। তখন শিক্ষা ছিল না চাকরি বা জীবিকার সিঁড়ি; ছিল আত্মার উৎকর্ষ, চরিত্রের নির্মাণ এবং সত্যের অনুসন্ধানের এক পবিত্র যাত্রা। অরণ্যের ছায়াঘেরা নির্জনতায় গড়ে ওঠা গুরুকুলগুলো ছিল সেই যাত্রার প্রথম তীর্থস্থান। ‘উপনয়ন’-এর মাধ্যমে এক কিশোর যেন নতুন করে জন্ম নিত জ্ঞানের জগতে। গুরুর আশ্রমে রাজপুত্র ও সাধারণের সন্তান একই ছাদের নিচে বাস করত, একই নিয়মে জীবনযাপন করত। প্রতিদিনের শ্রম, কাঠ সংগ্রহ, ভিক্ষা এবং অধ্যয়ন তাদের শেখাত বিনয়, আত্মসংযম ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার পাঠ। প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সহাবস্থানে গড়ে উঠত এমন এক শিক্ষাদর্শন, যেখানে জ্ঞান ও জীবন ছিল অবিচ্ছেদ্য।

সময়ের প্রবাহে এই শিক্ষাব্যবস্থা আরও সমৃদ্ধ ও বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে। বেদ ও উপনিষদের আধ্যাত্মিক সাধনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা অর্জন করত জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত, চিকিৎসাশাস্ত্র, রাষ্ট্রনীতি এবং যুদ্ধকৌশলের মতো বাস্তব জ্ঞান। রামায়ণ ও মহাভারতের পৃষ্ঠাগুলোয় আমরা সেই শিক্ষারই জীবন্ত প্রতিফলন দেখতে পাই। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—এই জ্ঞানচর্চা কেবল পুরুষদের একচেটিয়া ক্ষেত্র ছিল না। গার্গী, মৈত্রেয়ীর মতো বিদুষী নারীরা তৎকালীন পণ্ডিতসমাজে নিজেদের অসাধারণ প্রজ্ঞার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। জ্ঞানকে তখন কোনো বইয়ের পাতায় বন্দী তথ্য হিসেবে দেখা হতো না; তা ছিল এক জীবন্ত শিখা, যা গুরু থেকে শিষ্যের হৃদয়ে সঞ্চারিত হতো শ্রদ্ধা, অনুশাসন ও অনুপ্রেরণার মাধ্যমে।

এরপর ভারতীয় শিক্ষার ইতিহাসে আসে এক নতুন দিগন্ত—বৌদ্ধ শিক্ষার উন্মেষ। গুরুকুলের সীমা অতিক্রম করে শিক্ষা পৌঁছে যায় বৃহত্তর সমাজে। জাত-পাত ও বংশগৌরবের প্রাচীর ভেঙে বৌদ্ধ বিহারগুলো শিক্ষাকে করে তোলে অধিকতর উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। ‘প্রব্রজ্যা’ ও ‘উপসম্পদা’ গ্রহণ করে অসংখ্য তরুণ প্রবেশ করত এই জ্ঞানসংঘে। বিহারগুলো ছিল কেবল ধর্মীয় সাধনার কেন্দ্র নয়; ছিল শিক্ষা, গবেষণা ও বৌদ্ধিক বিনিময়ের প্রাণকেন্দ্র। কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যেও সেখানে বিকশিত হয়েছিল আলোচনা, বিতর্ক ও সম্মিলিত সিদ্ধান্তগ্রহণের এক অনন্য সংস্কৃতি। জাতকের গল্পগুলো আজও সাক্ষ্য দেয়—সেই শিক্ষা ছিল মানবিক, প্রাণবন্ত এবং জীবনঘনিষ্ঠ।

এই দীর্ঘ বিবর্তনের পরিণতিতে জন্ম নেয় বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম দিককার আবাসিক আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো—তক্ষশিলা, নালন্দা ও বিক্রমশীলা। এর মধ্যে নালন্দা ছিল যেন জ্ঞানের এক মহাসাম্রাজ্য। দূর চীন, কোরিয়া, তিব্বত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে শিক্ষার্থীরা হাজার মাইল পথ অতিক্রম করে এখানে আসতেন। প্রবেশদ্বারে ‘দ্বারপণ্ডিতদের’ কঠোর মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া ছিল এক বিরাট সম্মানের বিষয়। নয় তলা বিশিষ্ট বিশাল গ্রন্থাগারে সঞ্চিত ছিল তৎকালীন বিশ্বের বিপুল জ্ঞানভাণ্ডার। ফা-হিয়েন ও হিউয়েন সাঙ-এর ভ্রমণবৃত্তান্তে আমরা পাই এমন এক বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র, যেখানে হাজারো শিক্ষক ও শিক্ষার্থী প্রতিদিন জ্ঞানের অন্বেষণে নিমগ্ন থাকতেন। ব্রাহ্মণ্য ও বৌদ্ধ—এই দুই মহান ধারার সম্মিলনে নির্মিত সেই শিক্ষাব্যবস্থা আজও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, প্রকৃত শিক্ষা কেবল তথ্যের সঞ্চয় নয়; এটি মানুষকে আরও প্রাজ্ঞ, সহনশীল এবং মানবিক করে তোলার এক অনন্ত সাধনা।

লেখক: মামুনুর রশীদ, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, পিরোজপুর সদর, পিরোজপুর।


নির্বাচিত

প্রাথমিক শিক্ষা: প্রাসঙ্গিক ভাবনা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
মামনুর রশীদ-উপজেলা নির্বাহী অফিসার, পিরোজপুর সদর

শিক্ষা শব্দের আদি উৎস সংস্কৃত 'শাস' ধাতু, যার আক্ষরিক অর্থ শাসন বা শৃঙ্খলা। তবে সভ্যতার বিবর্তনে আধুনিক আন্তর্জাতিক অবয়বে শিক্ষা আজ আর কোনো শৃঙ্খল নয়, বরং মানুষের আচরণের কাঙ্ক্ষিত ও ইতিবাচক পরিবর্তনের এক মুক্ত বাতায়ন। ব্যক্তি ও সামষ্টিক রূপান্তরের এই শাশ্বত হাতিয়ারটিকে যুগে যুগে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মনীষীগণ নানা অভিধায় ভূষিত করেছেন। প্রাজ্ঞ সক্রেটিসের চোখে শিক্ষা ছিল মিথ্যার অপনোদন ও সত্যের অনুপম বিকাশ। অন্যদিকে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিক্ষার সংজ্ঞায় এনেছিলেন এক মরমী বৈচিত্র্য; তাঁর মতে, প্রকৃত শিক্ষা কেবল তথ্য পরিবেশন করে না, বরং বিশ্বসত্তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে মানুষের জীবনকে গড়ে তোলে। আধুনিক বিজ্ঞানের বরপুত্র আলবার্ট আইনস্টাইনও এই সুরেই সুর মিলিয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন, শিক্ষা কোনো তথ্য গলাধকরণের নাম নয়, বরং স্বাধীন চিন্তার মানসিক সক্ষমতা এবং সহজাত কৌতূহলের লালনভূমি। বিদ্যালয় নামক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর শেখানো সবকিছু ভুলে যাওয়ার পর মানুষের ভেতর যে আত্মিক নির্যাসটুকু অবশিষ্ট থাকে, আইনস্টাইনের দৃষ্টিতে সেটাই আসলে প্রকৃত শিক্ষা। চিরন্তন এই মননশীল দর্শনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আজ আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ভাববার সময় এসেছে—কেমন হওয়া উচিত আমাদের বুনিয়াদি বা প্রাথমিক শিক্ষার পরিকাঠামো।

​বিশ্বের শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ, দার্শনিক এবং মনস্তাত্ত্বিকদের কালজয়ী তত্ত্বগুলোকে যদি আমরা একটি সুতোয় গাঁথি, তবে আদর্শ প্রাথমিক শিক্ষার এক চমৎকার ও মানবিক রূপরেখা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। রবীন্দ্রনাথের নান্দনিকতা, নজরুলের সাম্যবাদ, সক্রেটিস ও এরিস্টটলের অকাট্য যুক্তি কিংবা আইনস্টাইনের বৈজ্ঞানিক কৌতূহল—সবকিছুই মূল অভীষ্ট ছিল শিশুকে যান্ত্রিক ছাঁচ থেকে মুক্ত করা। আইনস্টাইন যেভাবে শিক্ষাকে মনকে সচল করার ব্যায়াম হিসেবে দেখতেন, সেই ভাবনার বাস্তব প্রয়োগ ঘটতে পারে প্রাথমিক স্তরে সক্রেটিসের প্রশ্নোত্তর পদ্ধতির মাধ্যমে। সেখানে শিক্ষক শিশুকে কোনো তৈরি উত্তর মুখস্থ করাবেন না, বরং এমন সব বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্ন ছুঁড়ে দেবেন যার জট খুলতে গিয়ে শিশু নিজের যুক্তি দিয়ে ভুলকে ভাঙবে এবং সত্যকে আবিষ্কার করবে। এর সাথে যুক্ত হতে হবে রবীন্দ্রনাথের সেই 'খাঁচার শিক্ষা' থেকে মুক্তির দর্শন, যা আজ আধুনিক বিশ্বও পরম শ্রদ্ধায় লুফে নিচ্ছে। শিশুদের মন প্রাকৃতিকভাবেই অনুসন্ধিৎসু, তাই তাদের শ্রেণীকক্ষ হওয়া উচিত উন্মুক্ত প্রকৃতির অবারিত আঙিনা। বিজ্ঞান, ভূগোল বা সাহিত্যের পাঠ্যপুস্তকীয় জটিলতা ভুলে যদি তারা গাছপালা, মাটি, পাখি আর ঋতু পরিবর্তনের আবর্তনে বেড়ে ওঠে, তবেই শিক্ষণ স্থায়ী হয়। বর্তমান ইউরোপের স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে, বিশেষ করে ফিনল্যান্ডে প্রচলিত 'ফরেস্ট স্কুল' বা আউটডোর লার্নিং মূলত রবীন্দ্র দর্শনেরই এক আধুনিক বৈশ্বিক রূপান্তর।

​একটি আদর্শ প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় কোনো কৃত্রিম র‍্যাংকিং, কঠোর গ্রেডিং বা তীব্র প্রতিযোগিতার বিষাক্ত চাপ থাকা মোটেও কাম্য নয়। ফরাসি দার্শনিক রুশো, মারিয়া মন্তেসরি কিংবা কিন্ডারগার্টেন ব্যবস্থার জনক ফ্রিডরিখ ফ্রয়েবেল প্রত্যেকেই দেখিয়েছেন যে, শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের সর্বোত্তম মাধ্যম হলো খেলার ছলে শেখা। পড়াশোনা কোনো তিতা বড়ি বা ভয়ের কারণ হবে না, তা হবে শিশুর কাছে একটি পরম উপহার কিংবা আনন্দের এক অন্তহীন উৎসব। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ 'হোম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড'-এ এই সত্যেরই এক জীবন্ত জবানবন্দি দিয়েছেন। তিনি অকপটে উল্লেখ করেছেন যে, ঢাকার সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুলের কঠোর গ্রেডিং ও বৈষম্যমূলক র‍্যাংকিং ব্যবস্থা তাঁর ভেতরের সহজাত মেধা বিকাশে কোনো সহায়তাই করতে পারেনি। পরবর্তীতে শান্তিনিকেতনের প্রতিযোগিতাহীন মুক্ত পরিবেশ, প্রকৃতির অকৃত্রিম সান্নিধ্য এবং প্রশ্ন করার অবাধ স্বাধীনতাই তাঁর সুপ্ত চিন্তাশক্তিকে দারুণভাবে বিকশিত করেছিল। এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, প্রাথমিক স্তরে কৃত্রিম প্রতিযোগিতার চেয়ে ভয়হীন ও আনন্দময় পরিবেশই শিশুর মেধা বিকাশের শ্রেষ্ঠ অনুঘটক।

​গ্রীক দার্শনিক এরিস্টটল একদা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, হৃদয়কে শিক্ষিত না করে কেবল মনকে শিক্ষিত করা আসলে কোনো শিক্ষাই নয়। একই সুর বেজেছিল আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাম্যবাদী ইশতেহারে। আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো হতে হবে সেই বৈষম্যহীন সাম্যের সূতিকাগার, যেখানে ধনী-দরিদ্র বা ধর্ম-বর্ণের কৃত্রিম দেয়াল থাকবে না। পাঠ্যক্রমে এমন গল্প, নাটক বা সম্মিলিত কাজের সুযোগ রাখতে হবে যা শৈশবেই শিশুর অবচেতন মনে সহানুভূতি, সহমর্মিতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও জেন্ডার সমতার বীজ বুনে দেবে। সমাজকে কেবল ডিগ্রিধারী চতুর চাটুকার উপহার দেওয়ার চেয়ে সৎ ও মানবিক গুণসম্পন্ন 'খাঁটি মানুষ' তৈরি করাই হোক প্রাথমিক শিক্ষার মূল ব্রত। কারণ শিক্ষা মানে কেবল খাতা-কলমের যুদ্ধ কিংবা জিপিএ-৫ এর অন্ধ ইঁদুরদৌড় নয়, এটি শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক, শারীরিক ও মানসিক বিকাশের এক সুষম সমন্বয়। প্রাচীন রোমান কবি জুভেনালের সেই বিখ্যাত দর্শন—সুস্থ দেহে সুস্থ মন—অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষায় চিত্রাঙ্কন, সঙ্গীত, নৃত্য ও খেলাধুলাকে মূল পাঠ্যক্রমে গুরুত্বের সাথে নেওয়া আজ সময়ের দাবি। বিশ্বদর্শনের আয়নায় প্রাথমিক শিক্ষা কোনো অর্থকরী বিদ্যা অর্জনের কারখানা বা কেরানি তৈরির কারখানা নয়। এটি হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে একজন আদেশ শিক্ষক প্রতিটি শিশুকে তার স্বকীয়তা ও বৈচিত্র্য নিয়ে বিকশিত হওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা দেবেন। যে শিক্ষা শিশুকে প্রশ্ন করতে শেখায়, চারপাশকে ভালোবাসতে শেখায় এবং নিজের আত্মশক্তির ওপর বিশ্বাস রাখতে শেখায়—বিশ্বচিন্তার আলোকে সেটিই হলো প্রকৃত ও কাঙ্ক্ষিত প্রাথমিক শিক্ষা।


নির্বাচিত

বজ্রপাত থেকে বাঁচতে তালগাছ

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
দৈনিক বাংলা ডেস্ক

বজ্রপাত থেকে বাঁচতে তালগাছ: প্রকৃতির প্রাকৃতিক বজ্রনিরোধক ও পরিবেশ রক্ষার অনন্য উপায়। বাংলাদেশে প্রতি বছর বজ্রপাতে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে মাঠে কাজ করা কৃষক, জেলে, দিনমজুর এবং খোলা জায়গায় চলাচলকারী মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের তীব্রতা ও সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। তাই বজ্রপাত থেকে সুরক্ষা এখন শুধু সচেতনতার বিষয় নয়, বরং জীবন রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এই প্রেক্ষাপটে প্রকৃতির এক অনন্য উপহার হলো তালগাছ। বহু গবেষক ও পরিবেশবিদ মনে করেন, তালগাছ শুধু পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে না, বরং বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গ্রামবাংলার পরিচিত এই গাছটি আজ আবার নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে ‘প্রাকৃতিক বজ্রনিরোধক’ হিসেবে।

তালগাছ কেন বজ্রপাত প্রতিরোধে কার্যকর ?

তালগাছ সাধারণত অনেক উঁচু হয়ে থাকে। এর উচ্চতা অনেক সময় আশপাশের অন্যান্য গাছ বা স্থাপনার চেয়ে বেশি হয়। বজ্রপাত সাধারণত উঁচু বস্তুর ওপর আঘাত হানে। তালগাছ সেই বজ্রবিদ্যুৎ নিজের শরীরের মাধ্যমে মাটির গভীরে পৌঁছে দিতে পারে। ফলে আশপাশের মানুষ বা ছোট গাছপালা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ থাকতে পারে।

বৈজ্ঞানিকভাবে বলা যায়, বজ্রপাত যখন ঘটে তখন আকাশে সৃষ্ট বৈদ্যুতিক চার্জ দ্রুত মাটিতে নামার পথ খোঁজে। উঁচু ও সোজা গাছ সেই চার্জের জন্য সহজ পথ তৈরি করে। তালগাছের গঠন এমন যে এটি বিদ্যুৎকে মাটিতে প্রবাহিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আগে রাস্তার ধারে, খোলা মাঠে এবং গ্রামাঞ্চলে প্রচুর তালগাছ দেখা যেত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই গাছের সংখ্যা কমে গেছে। ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্যের পাশাপাশি বজ্রপাতের ঝুঁকিও বেড়েছে বলে অনেকে মনে করেন।

শুধু তালগাছ নয়, অন্যান্য গাছও ভূমিকা রাখে:

তালগাছের পাশাপাশি নারকেল, সুপারি, বটগাছসহ কিছু উঁচু গাছও বজ্রপাতের ক্ষেত্রে আংশিক সুরক্ষা দিতে পারে। বিশেষ করে বটগাছের বিস্তৃত শিকড় মাটির গভীরে ছড়িয়ে থাকে, যা বিদ্যুৎ পরিবাহিত করতে সহায়ক হতে পারে। তবে তালগাছের উচ্চতা ও গঠন একে বিশেষভাবে কার্যকর করে তোলে।

নারকেল ও সুপারি গাছ উপকূলীয় এলাকায় বেশি দেখা যায়। এসব গাছও অনেক উঁচু হয় এবং বজ্রপাতের সময় বিদ্যুৎ নিজের শরীরে গ্রহণ করতে পারে। তবে এগুলো কোনো “নিশ্চিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা’ নয়; বরং প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতার অংশ।

বজ্রপাতের সময় গাছের নিচে দাঁড়ানো বিপজ্জনক:

অনেকেই ভুল করে মনে করেন, বজ্রপাতের সময় বড় গাছের নিচে আশ্রয় নিলে নিরাপদ থাকা যায়। বাস্তবে এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ বজ্রপাত সরাসরি গাছের ওপর আঘাত করলে সেই বিদ্যুৎ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং গাছের নিচে থাকা মানুষ গুরুতর আহত বা নিহত হতে পারেন।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, বজ্রপাতের সময় কখনোই তালগাছ, নারকেল গাছ, বটগাছ কিংবা অন্য কোনো উঁচু গাছের নিচে দাঁড়ানো উচিত নয়। অনেক সময় বজ্রপাতের তাপে গাছ ফেটে যায়, ডাল ভেঙে পড়ে বা আগুন ধরে যায়। তাই নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়াই সবচেয়ে ভালো উপায়।

বজ্রপাতের সময় কী করবেন ?

বজ্রপাত থেকে নিরাপদ থাকতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম মেনে চলা প্রয়োজন। যেমন, দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যান। বজ্রপাত শুরু হলে যত দ্রুত সম্ভব পাকা ঘর বা নিরাপদ ভবনের ভেতরে আশ্রয় নিতে হবে। খোলা মাঠ, নদী, হাওর বা উঁচু জায়গা এড়িয়ে চলতে হবে। মোবাইল ও বৈদ্যুতিক সংযোগ থেকে দূরে থাকুন। বজ্রপাতের সময় বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করাই ভালো। টিভি, ফ্রিজ, কম্পিউটার বা তারযুক্ত ফোন থেকে দূরে থাকতে হবে। গাছের নিচে আশ্রয় নেবেন না। এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা। বড় গাছ বজ্রপাত আকর্ষণ করতে পারে। তাই গাছের নিচে দাঁড়ানো বা বসা বিপজ্জনক। পানিতে থাকা থেকে বিরত থাকুন। নদী, পুকুর বা খালে গোসল করা কিংবা মাছ ধরা বজ্রপাতের সময় অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মাঠে থাকলে নিচু হয়ে বসুন। যদি খোলা মাঠে আটকা পড়েন, তাহলে দুই পা একসঙ্গে রেখে নিচু হয়ে বসতে হবে। তবে মাটিতে পুরো শরীর শোয়ানো যাবে না।

গ্রামবাংলায় তালগাছের ঐতিহ্য:

তালগাছ শুধু বজ্রপাত প্রতিরোধেই নয়, গ্রামীণ সংস্কৃতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলার কবিতা, গান ও লোকজ ঐতিহ্যে তালগাছের উল্লেখ বহুবার এসেছে। গ্রামবাংলার রাস্তার ধারে সারি সারি তালগাছ একসময় ছিল খুব পরিচিত দৃশ্য। তালের ফল পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে জনপ্রিয়। তাল দিয়ে পিঠা, পায়েস, বড়া ও বিভিন্ন ধরনের খাবার তৈরি হয়। তালপাতা দিয়ে তৈরি হতো হাতপাখা, ছাউনি ও নানা গৃহস্থালি সামগ্রী। অর্থাৎ তালগাছ পরিবেশ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি—তিন ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ।

তালগাছ পরিবেশ রক্ষায় কীভাবে সহায়তা করে ?

তালগাছ পরিবেশের জন্যও অত্যন্ত উপকারী। এটি বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এবং অক্সিজেন সরবরাহ করে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গাছ লাগানো সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি। তালগাছ দীর্ঘজীবী হওয়ায় বহু বছর ধরে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অবদান রাখে। এছাড়া তালগাছ মাটির ক্ষয় রোধ করে এবং ঝড়-ঝঞ্ঝার সময় বাতাসের গতি কমাতে সাহায্য করে। গ্রামীণ জীববৈচিত্র্য রক্ষাতেও এই গাছ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কেন কমে যাচ্ছে তালগাছ ?

একসময় গ্রামে প্রচুর তালগাছ থাকলেও বর্তমানে এর সংখ্যা অনেক কমে গেছে। এর কয়েকটি কারণ হলো, অপরিকল্পিত নগরায়ণ। রাস্তা সম্প্রসারণ। কৃষিজমির পরিবর্তন। দ্রুত ফলদায়ী গাছের প্রতি মানুষের ঝোঁক। তালগাছ লাগানোর দীর্ঘমেয়াদি অনীহা। তালগাছ বড় হতে সময় লাগে। ফলে অনেকেই দ্রুত লাভের আশায় অন্য গাছ লাগাতে বেশি আগ্রহী হন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তালগাছের পরিবেশগত ও নিরাপত্তাগত গুরুত্ব অনেক বেশি।

সরকার ও সমাজের করণীয়:

বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ব্যাপকভাবে তালগাছ রোপণ কর্মসূচি নেওয়া যেতে পারে। স্কুল, কলেজ, রাস্তার ধারে, খোলা মাঠে এবং কৃষিজমির আশপাশে পরিকল্পিতভাবে তালগাছ লাগানো হলে ভবিষ্যতে এর সুফল পাওয়া যাবে। পাশাপাশি বজ্রপাত সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, কৃষি বিভাগ ও পরিবেশ সংগঠনগুলো একযোগে কাজ করলে একটি ‘সবুজ সুরক্ষা বলয়’ তৈরি করা সম্ভব।

কৃষকদের জন্য বিশেষ সতর্কতা:

বাংলাদেশে বজ্রপাতে নিহতদের বড় অংশ কৃষক। কারণ তারা খোলা মাঠে কাজ করেন। তাই কৃষকদের জন্য কিছু বিশেষ সতর্কতা জরুরি, আকাশে কালো মেঘ ও বজ্রধ্বনি শুনলেই মাঠ ত্যাগ করতে হবে। ধাতব কৃষিযন্ত্র দূরে রাখতে হবে। একা উঁচু স্থানে দাঁড়ানো যাবে না। আবহাওয়ার পূর্বাভাস নিয়মিত দেখতে হবে। গ্রামের আশপাশে বেশি করে তালগাছ লাগাতে হবে। তালগাছ লাগানো এখন সময়ের দাবি।

বর্তমান সময়ে বজ্রপাত শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি জননিরাপত্তার বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রকৃতিনির্ভর সমাধানও গুরুত্বপূর্ণ। তালগাছ সেই সমাধানের অন্যতম প্রতীক। একটি তালগাছ হয়তো একদিনে বড় হয় না, কিন্তু এটি বহু বছর ধরে মানুষ ও প্রকৃতিকে সুরক্ষা দেয়। তাই আজ একটি তালগাছ লাগানো মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলা।

বজ্রপাত থেকে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব না হলেও সচেতনতা ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের মাধ্যমে ঝুঁকি অনেক কমানো যায়। তালগাছ সেই উদ্যোগের একটি কার্যকর অংশ। এটি যেমন বজ্রবিদ্যুৎ নিজের শরীরে ধারণ করে আশপাশের পরিবেশকে আংশিক সুরক্ষা দিতে পারে, তেমনি পরিবেশ রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও গ্রামীণ সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে মনে রাখতে হবে, বজ্রপাতের সময় কখনোই কোনো গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া নিরাপদ নয়। নিরাপদ ভবনে অবস্থান করাই সবচেয়ে ভালো উপায়।

আজকের দিনে প্রয়োজন শুধু সচেতনতা নয়, বরং বাস্তব পদক্ষেপ। তাই আসুন, নিজের নিরাপত্তা, পরিবেশের ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে বাড়ির আশেপাশে, রাস্তার ধারে ও খোলা জায়গায় বেশি করে তালগাছ লাগাই। একটি গাছই হতে পারে জীবন রক্ষার নীরব প্রহরী।

লেখক: সমীরণ বিশ্বাস, কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ , ঢাকা।


নির্বাচিত

টমটম থেকে বৈদ্যুতিক গাড়ির পথচলা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
দৈনিক বাংলা ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের জেরে ঢাকায় জ্বালানি সংকট ও নানা ধরনের রাজনৈতিক-প্রাকৃতিক উত্তাপের ছড়াছড়ি। এর মাঝেও গত ২৪ এপ্রিল (শুক্রবার) ঢাকার ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরার (আইসিসিবি) গাড়ি ও যন্ত্রাংশের মেলায় বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) প্রদর্শনীর মুগ্ধতা যেন গ্রীষ্মের প্রার্থীত বৃষ্টি। আমরা যখন মেলায় পৌঁছালাম তখন বিকাল প্রায় ৫.৩০টা। পড়ন্ত বিকালের রোদে বসুন্ধরার হলুদাভ সোনালু ফুলগুলো হয়ে উঠল আরো অপরূপ। এই লেখায় বৈদ্যুতিক গাড়িসহ বাংলাদেশের গাড়ি নির্মাণ শিল্পের কিছু দিক তুলে ধরছি।

ঢাকা অটো শো: গত ২৩ এপ্রিল থেকে আইসিসিবিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ৩ দিনব্যাপী (২৩-২৫ এপ্রিল) ১৯তম ঢাকা অটো সিরিজ অব এক্সিবিশনস ২০২৬। এখানে একই ছাদের নিচে গাড়ি ও গাড়ির যন্ত্রাংশ প্রদর্শনীর পাশাপাশি আরও কয়েকটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ‘৩য় ইলেকট্রিক ভেহিকেল (ইভি) বাংলাদেশ প্রদর্শনী’।

এবারের এক্সিবিশনে জাপান, ভারত, চীন, মালয়েশিয়া, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যসহ ১০টি দেশের ৭০টিরও বেশি কোম্পানী অংশ নিয়েছে এবং প্রায় ২০০ বুথে নতুন প্রযুক্তি ও যানবাহন প্রদর্শন করা হয়েছে। এতে অংশ নিয়েছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন অটো মোবাইল কোম্পানী, যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি সরবরাহকারীরা। প্রদর্শনীতে মিতসুবিশি, টয়োটা, মার্সিডিজ বেঞ্জ, হোন্ডা, এমজি, প্রোটন, চাঙ্গান প্রভৃতি ব্র্যান্ডের গাড়ি প্রদর্শন করা হয়েছে। মেলাটির আয়োজক ছিলেন সেলস-গ্লোবাল।

ইলেক্ট্রিক ভেহিকেল বা বৈদ্যুতিক গাড়ি বলতে বোঝায় এক বা একাধিক বৈদ্যুতিক মোটর দ্বারা চালিত যানবাহন, যার ট্রাকশন শক্তি গাড়িতে ইন্সটলকৃত রিচার্জেবল ব্যাটারি দ্বারা সম্পন্ন হয়ে থাকে। মেলায় প্রদর্শিত হয়েছে বিভিন্ন মডেলের বৈদ্যুতিক গাড়ি ও মোটরসাইকেল (ই-বাইক)। দেশে জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রতি। তাই দর্শনার্থীদের আগ্রহ বেশি বৈদ্যুতিক গাড়ি ও মোটরসাইকেলের স্টলগুলোতে। বিশেষ করে তরুণ দর্শনার্থীদের বেশি আকর্ষণ ছিল বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের (ই-বাইক) স্টলে।

দল বেঁধে গাড়ি দেখা: তরুণ-তরুণীদের ভিড় ঠেলে আমরা প্রথমে এলাম বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (বেইল) এর প্রদর্শনীতে। আমরা মানে রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের ১৪তম ব্যাচের দশ বারো জন সতীর্থ বা ব্যাচমেট।

বেইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মাসুদ কবির (এমডি, ম্যাংগো টেলিসার্ভিস লি.) এর আমন্ত্রণেই এই প্রতিষ্ঠানের তৈরি ইভি দেখতে আমাদের আসা। এই প্রদর্শনীতে বেইল তাদের বহুল প্রতীক্ষিত প্রোটোটাইপ মডেল উন্মোচন করেছে। প্রতিষ্ঠানটি এই অটো প্রদর্শনীতে তাদের তিনটি ব্র্যান্ড-চার চাকার যাত্রী ও পণ্যবাহী যান ‘এমইভি’, মোটরবাইক ব্র্যান্ড ‘গ্লাইডার’ এবং তিন চাকার যান ‘অটোম্যাক্স’- উন্মোচন করে।

হল-১ এ বেইল ও অন্যান্য কোম্পানীর মোটর বাইক ও তিন চাকার যান দেখা ছিল চমৎকার এক অভিজ্ঞতা। চোখে পড়ার মতো দৃশ্য হলো- এসব গাড়িতে চড়ে তরুন তরুনীদের ছবি/সেলফি তোলার ধুম। আমরাও অংশ নিলাম এই ফটো- উৎসবে। এই বয়সে ই বাইকে চড়া কারো কারো ছবি মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ল মহাবিশ্বে!

ইভিতে চড়ে কিশোর কালের উচ্ছ্বাস: এর পর যাওয়া হলো হলো-২ এ বেইলের ৪ চাকার যাত্রীবাহী গাড়ি (স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকেল বা এসইউভি) দেখতে। কোম্পানীতে এই ব্রান্ডের আদুরে নাম- ‘এমইভি’। মীর মাসুদ কবির তার ইভির কথা ২০১৫ সালের বসন্তে এক সান্ধ্যকালীন আড্ডায় আমাদের বলেছিলেন। অবশেষে ২০২৬ এর কৃষ্ণচূড়া- জারুল-সোনালু ফোটা গ্রীষ্মে সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন হলো।

বহুদিন আগের কথা...। ছুটি শেষে পদ্মা পাড়ের রাজশাহী ক্যাডেট কলেজে আমরা যাচ্ছি। ক্যাডেটদের বড় একটা অংশ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন স্থান থেকে মূলত ট্রেন ধরে (বিশেষত উত্তরা এক্সপ্রেস) কলেজে যোগদান করতো। বন্ধু মীর মাসুদ কবির (অপু) আসতো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে। বাবা মা দুজনেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আমরা কেউ পাকশী, ইশ্বরদী, পাবনা, নাটোর, বগুড়া, দিনাজপুর, রংপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জ থেকে...।

সরদহ বা সারদা রেল স্টেশন থেকে মোক্তারপুর (ক্যাডেট কলেজ) প্রায় ৩ মাইলের পথ। স্টেশন থেকে কলেজের বাসে সেখানে যাওয়ার ব্যবস্থা। তবে মাঝেমধ্যে আমরা ঘোড়ার গাড়ি বা টমটমেও যেতাম। সে ছিল অসম্ভব আনন্দের এক যাত্রা। সেদিন বেইলের সাদা রঙের বৈদ্যুতিক গাড়িতে (এসইউভি) বসে আমরা কয়েকজন সানন্দে ছবি-টবি তুললাম। একজন সুরসিক বন্ধুর মন্তব্য মনে ধরলো- ‘ফ্রম টমটম টু ইভি’। ইভিতে বসে যেন সেই কিশোর বয়সে টমটমে চড়ার উচ্ছ্বাস। তবে এর মাঝে চলে গেছে কত বছর। জীবন এভাবেই এগিয়ে যায়। জানিনা, ঘোড়াগাড়ির চালক আমাদের প্রিয় গফুর ভাই এখন কেমন আছেন।

শতভাগ দেশে তৈরি গাড়ির যে গল্প: মাসুদ কবির ও বেইলের চেয়ারম্যান বন্ধুপ্রতীম এ.মান্নান খান (চেয়ারম্যান, ম্যাংগো টেলিসার্ভিস লি.) গল্পের মতো করে ইভি তৈরির অত্যান্ত চ্যালেঞ্জময় জার্নির কথা আমাদের বলেন। চট্টগ্রামের মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ১৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে একটি ইভি উৎপাদন কারখানা স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে যানবাহনের প্ল্যাটফর্ম ও বডি তৈরি করে আমদানি নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তারা বলেন, দেশে একটি পূর্ণাঙ্গ ইভি ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে চায়।

বাংলাদেশে ইলেকট্রিক গাড়ি সংযোজন হওয়া শুরু হয়েছে আগেই। তবে বেইলের ইভি হবে ব্যাটারিসহ শতভাগ বাংলাদেশেই তৈরি। প্রদর্শনীতে বেইলের একটা চমৎকার ব্যানার চোঁখে পড়ল-‘দি ফাস্ট মেইড ইন বাংলাদেশ ইভি’ আনভেইলড বাই দি ‘কান্ট্রিস ফাস্ট অটোমোবাইল ম্যানুফেকচারার’-বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ লি....। অর্থাৎ সম্পূর্ণ দেশীয়ভাবে বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) উৎপাদন করছে বেইল। এক্ষেত্রে বেইলই অগ্রপথিক বা পাইওনিয়ার।

ইভি নিয়ে আরো কিছু কথা: আয়োজকরা আশা করছেন এ প্রদর্শনীর মাধ্যমে দেশে বৈদ্যুতিক যানবাহনের বাজার আরো সম্প্রসারিত এবং স্থানীয় শিল্পে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ হবে। দেশীয় অটোমোবাইল শিল্পের বিকাশে এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসারে এই উদ্যোগ নতুন দিগন্ত উন্মোচক করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বিশ্লেষকদের মতে জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি এবং পরিবেশ বান্ধব পরিবহনের চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে ইভি খাতের এই অগ্রগতি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইল ফলক হতে পারে।

অটোমোবাইল শিল্পে সম্ভাবনা: অটোমোবাইল শিল্পে নতুন সম্ভাবনা দেখছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মোটর গাড়ি শিল্প দক্ষিণ এশিয়ার মাঝে তৃতীয়। এক দশকের মাঝে বাংলাদেশের দুই চাকার মোটরসাইকেল বাজারের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে। একে বিপ্লব বলা যায়।

বাংলাদেশে কয়েকটি বড় গাড়ির কারখানা রয়েছে যা মিতসুবিশি এবং প্রোটনের যাত্রীবাহী গাড়ি এবং হাইনো ও টাটার বাণিজ্যিক যানবাহনগুলো সংগ্রহ করে সংযোজন করে থাকে। এছাড়াও কয়েকটি দেশি কোম্পানী তাদের বিদেশি প্রযুক্তিবিষয়ক অংশীদারদের সঙ্গে মিরসরাই ইকোনমিক জোনে বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। বিদেশি কোম্পানীসমূহ তাদের ব্রান্ডেড যানবাহন প্রাথমিকভাবে গাড়ি সংযোজনের জন্য বিনিয়োগ করছে। ধীরে ধীরে সংযোজন কারখানাগুলো পূর্ণ গাড়ি উৎপাদন কারখানায় উন্নিত হবে।

গাড়ি তৈরির পাশাপাশি যন্ত্রাংশ (অটোমটিভ যন্ত্রাংশ) উৎপাদনেরও আছে বিশাল সম্ভাবনা। অটোমোবাইল, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও এগ্রো মেশিনারি খাত বাংলাদেশের শিল্প খাতের সম্ভাবনা ও সক্ষমতা তুলেধরেছে। এই সেক্টরগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক যানের ভবিষ্যৎ: বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অটোমোবাইল শিল্পে এখন ‘ইলেকট্রিক ভেহিকল’ বা ইভি-র জয়জয়াকার। বাংলাদেশও এই পরিবর্তনের বাইরে নয়। জনঘনত্ব এবং ক্রমবর্ধমান দূষণ বিবেচনায় বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক যানের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সরকারের পরিকল্পিত ও সমন্বিত পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি।

ইভি’র বিষয়ে সরকারের করনীয়: একটি টেকসই ইভি ইকোসিস্টেম তৈরি করতে বাংলাদেশ সরকারকে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ের দিকে নজর দিতে হবে: (১) চার্জিং অবকাঠামো নির্মাণ, (২) শুল্ক ও কর ছাড়, (৩) বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী নীতিমালা, (৪) ব্যাটারি রিসাইক্লিং ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, (৫) গণপরিবহনে ইভি-র অন্তর্ভুক্তি এবং (৬) ব্যবহারকারীদের বিশেষ প্রণোদনা প্রদান...। সরকারকে ইভি বিষয়ের নীতিমালা চূড়ান্ত করতে হবে।

বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক যানের বিপ্লব কেবল সময়ের ব্যাপার। তবে এর দ্রুত প্রসারের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং সহজলভ্য অর্থায়ন। সরকার যদি আমদানিকারক, উদ্যোক্তা এবং সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে পারে, তবে বাংলাদেশ খুব শিগগিরই দক্ষিণ এশিয়ায় পরিবেশবান্ধব পরিবহনের রোল মডেল হিসেবে আবির্ভূত হবে।

শিল্পায়নে গুরুত্ব দেওয়া হোক: গত ৫৫ বছরে বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য শিল্পায়ন হয়েছে। গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, ঔষধ ও চামড়াশিল্প খুব ভালো করেছে। কয়েকটিতো বিশ্বমানের। আমাদের অর্থনীতির সবচেয়ে ‍গুরুত্বপূর্ণ খাত হওয়া উচিত শিল্প। আমাদের প্রতিরক্ষা শিল্পায়নেও নতুন করে ভাবতে হবে।

আমাদের লক্ষ লক্ষ তরুণ এখন বেকার। ব্যাপক শিল্পায়ন না হলে এই বেকারত্ব দূর করা খুব কঠিন। তাই আমাদের ফোকাস হওয়া উচিত শিল্পায়নে। তবে শিল্প স্থাপনের সময় ২টি বিষয় মনে রাখতে হবে। প্রথমত শিল্প যেন পরিবেশ ধ্বংস না করে। দ্বিতীয়ত কৃষি জমি যেন নির্বিচারে শিল্পে ব্যবহার না করা হয়।

শেষের কথা: সরকারের শিল্প পরিচালনায় যুক্ত হওয়া উচিত নয়। সরকারের কাজ শিল্পের ফ্যাসিলিটেটর হওয়া। উদ্যোক্তাদের উৎসাহ ও সমর্থন দেওয়া। বাংলাদেশে ইভিকে স্বাগতম। অগ্রপথিক বেইল কর্তৃপক্ষকে অভিনন্দন। তরুণ শিল্পোদ্যোক্তাদের শুভেচ্ছা-তারাই বাংলাদেশকে এগিয়ে নেবে। অটোমোবাইলসহ সম্ভাবনাময় শিল্প সেক্টরসমূহকে এগিয়ে নিতে হবে। বাংলাদেশে ইভির যে সুযোগ সম্ভাবনা আছে তা কাজে লাগাতে হবে। ইভিই অটোমোবাইলের ভবিষ্যৎ। শিল্পে এগিয়ে যাক আমাদের ঐক্যবদ্ধ প্রানের বাংলাদেশ।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, গবেষক ও বিশ্লেষক, সাবেক চেয়ারম্যান বিটিএমসি।


নির্বাচিত

চাঁদাবাজ ও দখলদার উৎখাত করতে সবার সহযোগিতা চাই

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
মিজানুর রহমান

সরকার পরিবর্তন হলে চাঁদাবাজ ও দখলদার পরিবর্তন হয়। ভিন্ন নামে ভিন্ন রুপে দেখা মেলে এদের। সরকার পরিবর্তন এর সাথে সাথে টেম্পু স্ট্যন্ড, বাস টার্মিনাল, লঞ্চ টার্মিনালে দখলদার ও চাঁদাবাজ এর হাত বদল হয় অর্থাৎ দায়িত্ব হস্তান্তর হয় মাত্র।এই স্থাপনাগুলোতে ব্যাপক হারে চাঁদাবাজি হয়। চাঁদাবাজদের সাথে আলাপ করে যেটা জানা যায়, জিবির চাঁদা, টার্মিনাল চাঁদা, মালিক সমিতির চাঁদা, শ্রমিক কল্যান চাঁদা নামকরণ করে তা আদায় করা হয়।

বর্তমান সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল ইসলাম দায়িত্ব পাওয়ার পর সাংবাদিক সম্মেলনে তার বক্তব্যে বলেন পরিবহন খাতের টাকাটা সমঝোতার ভিত্তিতে তোলা হচ্ছে। জোর করে আদায় হচ্ছে না। এ জন্য এটিকে চাঁদা বলা যাচ্ছে না। মন্ত্রী নিজেই বলেছেন শ্রমিকের কল্যানের নামে কতটা কল্যাণে ব্যয় করা হয় তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং শ্রমিক সংগঠন যে দল ক্ষমতায় থাকে তারাই নিয়ন্ত্রণ করেন তা স্বীকার করেছেন তাহলে কোন সমঝোতার চাঁদা বলে উল্লেখ করেছেন সেটা নাগরিকদের কাছে বোধগম্য নয়। এখানে প্রশ্ন ওঠাটা তাই স্বাভাবিক যে মন্ত্রী কি সমঝোতা বলে চাঁদাবাজিকে বৈধতা দিলেন?

সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা বাংলাদেশের নাগরিকদের দুর্ভোগ ও ট্রাজেটির মূল কারণ। সড়কে প্রতিদিন গড়ে ২৫ জনের বেশি মানুষ নিহত হয় যাদের বেশির ভাগ তরুণ ও কর্মক্ষম। সড়কে এই মৃত্যুর মিছিল নিছক দুর্ঘটনা নয় বরং কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড। ২০২৪ সালে ট্রান্সপারেসি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি)গবেষণায় দেখা যায় ব্যাক্তিমালিকানাধীন বাস মিনিবাস থেকে বছরে ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয়।

…অতীতে নানা সময়ে পরিবহন খাতের চাঁদাবাজিকে বৈধতা দেওয়ার এক ধরনের চেষ্টা দেখা গেছে। যে দল ক্ষমতায় তাদের আর্শীবাদপুষ্ট পরিবহন মালিক শ্রমিক এই সেক্টর নিয়ন্ত্রণ নেয়। সড়ক পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রক রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বিআরটিএ ও পুলিশের সহিত সহযোগিতার অবৈধ সেতুবন্ধন গড়ে ওঠে। সড়কে বিশৃঙ্খলা পিছনে এই দুর্নীতিপুষ্ট সহযোগিতা ব্যবস্থা চাঁদাবাজিই মূল কারণ। এখানে গোষ্ঠীবদ্ধ স্বার্থের বলি হতে হয় নাগরিকদের।

…বিগত সরকারগুলোর সময়ে পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি বৈধতা দেওয়ার এক ধরনের চেষ্টা দেখা গেছে। নাগরিক সমাজের প্রতিবাদের মুখে সেটা বন্ধ হলে ও পরিবহন খাতের দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির হাত থেকে কোন সরকারই মুক্ত করার উদ্যোগ নেয়নি। পরিবহন খাতে পরিচালন ব্যয়ের বাহিরে চাঁদা কিংবা কল্যান যে নামে টাকা তোলা হউক না কেন তাতে জনগনের ঘারে বাড়তি ব্যয়ের চাপ এসে পড়ে। রাস্তায় রাস্তায় চাঁদার কারণে পরিবহন ভাড়ার সঙ্গে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। বাংলাদেশে যে নৈরাজ্য পরিবহন খাত তার ভুক্তভোগী চালক ও সহকারীরাও। আইন অনুযায়ী তাদের নিয়োগপত্র এবং মাসিক বেতন দেওয়া নিশ্চিত করাটাই সবচেয়ে বড় শ্রমিক কল্যাণ।
বাস্তবে চাঁদাবাজির টাকার অংশ বিভিন্ন জনের পকেটস্থ হয়। চাঁদাবাজের এহেন কর্মের কারণে সাধারণ পাবলিকের ভোগান্তির শেষ নেই।
চাঁদাবাজদের মূল আখড়া ফুটপাতগুলো অন্যতম। একেকটা ফুটপাত একেক জনের অথবা ভাগাভাগি করে দায়িত্ব পালন করে।অথচ রাজধানী ঢাকার ফুটপাত এক সময় ছিল হাঁটার জায়গা। এখন সে অবস্থা নেই চাঁদাবাজি দখলদারিত্ব আর রাজনৈতিক পুলিশি ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা এক অঘোষিত রামরাজত্ব যেন। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ অফিস আদালত, স্কুল কলেজ, হাসপাতালে কিংবা ব্যবসা বাণিজ্যের কাজে বের হন সেই শহরেই এখন হাঁটার পথ নেই, ফুটপাত ভরা দোকান রাস্তা ভরা ভ্যান মাঝখানে জ্যাম আর বিশৃঙ্খলা।
এই অবস্থার পেছনে অনেকে ভাবতে পারেন দারিদ্র্য বা জীবিকার তাগিদ নয়-রয়েছে একটি সুসংগঠিত কুচক্রীমহলের অর্থনীতি। বিভিন্ন গবেষণা ও সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দুটি সিটি করপোরেশন এলাকায় ফুটপাত দখল করে বছরে প্রায় এক হাজার ৮২৫ কোটি টাকা চাঁদা আদায় হয়। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে কয়েক কোটি টাকা লেনদেন। এই বিপুল অংকের টাকা কিন্তু একটি টাকা ও সরকারের কোষাগারে জমা হয় না।সবটায় ভাগ পায় সিন্ডিকেট, গডফাদার রাজনৈতিক প্রভাবশালী এবং অসাধু পুলিশ সদস্য।
… ঢাকা তেজগাঁও কলেজের সম্মুখে ও ওভার ব্রিজের আশেপাশের অবস্থা খুবই খারাপ। রাজধানীর সবচেয়ে ব্যস্ততম সড়কের সংযোজন

এখানে। মেট্রোস্টেশন, এ্যালিভেট এক্সপ্রেস এর বহি:গমন এবং চার রাস্তার মোড় এখানে। রাস্তাগুলো খুব সুন্দর করে সাজানো ছিল । সেটার কি বেহাল দশা? তেজগাঁও কলেজের সামনের রাস্তা ও ওভার ব্রিজের আশেপাশের ফুটপাত জুড়ে ঠাসাঠাসিভাবে দোকান সাজিয়ে বসে আছে। শাকসবজি, ফলমূল, মশলাপাতি, জুতার সারি, মোবাইল এক্সসরি আইটেম, কাপড় চোপড়, চা বিস্কিটের দোকান থেকে শুরু করে সবকিছুই আছে। দোকানদের ভাষ্য মোতাবেক দোকান প্রতি ২০০টাকা থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। সন্ধ্যার পর লাইনম্যান এসে টাকা নিয়ে যায়। টাকা না দিলে দোকান বসতে দেওয়া হয় না। লাইনম্যানের কালেকশন সমস্যা হলে ম্যানেজার আসে। ম্যানেজারকে গড ফাদারের সরাসরি সহচর বলা হয়। বিভিন্ন সময় এই দখল উচ্ছেদ করা হয়েছে অভিযান শেষে পুরোদমে আবার বসে যায়।
…গুলিস্তান এলাকায় দুপুর বেলায় গেলে মনে হবে এটি কোন সড়ক নয় বরং খোলা আকাশের নিচে গড়ে ওঠা বিশাল বাজার। সেখানকার ভিতরের রাস্তা গুলো একদম দখল হয়ে গেছে। অথচ ভিতরের রাস্তা গুলো দিয়ে ও গাড়ি চলাচল করত। এখন আর সে অবস্থা নেই। মেইন সড়কের অনেকাংশে দখল করে রাস্তার মাঝামাঝি চলে গেছে। কাপড়, জুতা, ব্যাগ আর নিত্যণ্যের সারি সারি পসরা বসানো হয়েছে এমনকি আখমাড়াই এর মেশিন বসিয়ে দিব্বি রস বিক্রি করছে। বাস চলাচল করাত দুরের কথা রিকশা চলাচল করা ও কঠিন হয়ে যাচ্ছে। কোনো সভ্য দেশে অমনটি আছে কিনা আমাদের জানা নেই। এখানে ও কয়েকবার উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে পরবর্তীতে যেই সেই অবস্থা। এদের সাথে আলাপ করে জানা যায় এখানে চাঁদার রেইট একটু বেশি অর্থাৎ ৪০০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা দৈনিক চাঁদা দিতে হয়। চাঁদাবাজির টাকা ভাগবাটোয়ারা ও দখলদারিত্ব দ্বন্দ্ব নিয়ে খুন খারবি ও অনেক হয়েছে। তবু ও সরকারের টনক নড়ে না। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য তিনটি ঘটনা অন্যতম:…ঘটনা...১..রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় জানুয়ারি /২৬ মাসে আধিপত্য বিস্তার এবং চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেই স্বেচ্ছাসেবক দলনেতা আজিজুর রহমান মুছাসাব্বিরকে হত্যা করা হয়েছে। কারওয়ান বাজার এলাকায় প্রকাশ্যে ও গোপনে চাঁদা আদায়ের জন্য আট থেকে নয়টি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। এ চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থের ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরেই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করা হয়। বিদেশে পলাতক আন্ডারওয়ারওয়ার্ল্ড সন্ত্রাসী দিলিপ ওরফে বিবাশ এর নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ প্রশাসন।
…ঘটনা...২...জানুয়ারি /২৬ মাসে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় দেশীয় অস্ত্র ধারাল দা নিয়ে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে গণপিটুনিতে রায়হান নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে।
ঘটনায় প্রকাশ পায় নিহত রায়হান খান (৩০) চাঁদপুর জেলার চাঁদপুর থানার বহরিয়া গ্রামের মৃত বিল্লাল খানের ছেলে। তিনি পরিবারের সঙ্গে ফতুল্লায় তাঁতিবাড়ি এলাকায় ইয়ামিন বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। পুলিশ সূত্রে জানা যায় নিহত রায়হানের বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। সে একজন চাঁদাবাজ সন্ত্রাসী ও ছিনতাইকারী এবং মাদকসেবি। তার অত্যাচারে স্থানীয় জনগন অতিষ্ঠ।
স্থানীয় গ্যারেজ মালিকের কাছ থেকে সকালে ১হাজার ৫ শত টাকা চাঁদা নেয় এবং পরবর্তীতে হোটেল কর্মচারীর কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে। তার দাবিকৃত টাকা দিতে অস্বীকার করায় রায়হান বাসা থেকে ধারালো দা নিয়ে এসে হোটেল কর্মচারী কে মারধর করতে থাকে। এ সময় উপস্থিত জনতা উত্তেজিত হয়ে রায়হানকে গণপিঠুনি দেয় এবং দা দিয়ে মাথায় আঘাত করলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

ঘটনা...৩....বাংলাদেশের রাজধানী পুরান ঢাকার মিটর্ফোট হাসপাতালের সামনে ২০২৫ সালের ৯ জুলাই প্রকাশ্যে দিবালোকে এক বর্বরচিত হত্যাকাণ্ডে নিহত ব্যক্তি মো. সোহাগ ওরফে লাল চাঁদ (বয়স ৩৯) পুরান ঢাকার একজন ভান্ডারি ব্যবসায়ী ছিলেন। কয়েকজন দুর্বৃত্তর জনসমক্ষে তাকে পাথর ও ধারাল

অস্ত্র দিয়ে পিঠিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। এ হত্যাকাণ্ডের পিছনে ছিল চাঁদাবাজি ও আধিপত্যবাধ নিয়ে দ্বন্ধ। হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং জাতিকে স্তম্ভিত করে তোলে। হত্যাকাণ্ডটি রাজনৈতিক সামাজিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে।

…ফুটপাত দখল ও বিক্রির সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এক সময় উচ্চ আদালত কঠোর নির্দেশ দিয়েছিল। রাজধানী ঢাকার অবৈধ দখলদারদের নামের তালিকা দিতে রিটের পরিপেক্ষিতে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিচ ফর বাংলাদেশ এর আবেদনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে হলফনামা জমা দিতে বলা হয়। উদ্দেশ্য ছিল কারা ফুটপাত দখল করে চাঁদাবাজি করছে তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা। এর পরিপেক্ষিতে উচ্ছেদ অভিযান হয়েছে কাগজে কলমে…নির্দেশ জারি হয়েছে তবু দখলদারিত্ব থেকে যায় …আগের মতোই।
বর্তমানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন সারাদেশ ব্যাপী চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের তালিকা তৈরি করার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন। সবার আগে রাজধানীতে এই ব্যাপারে বিশেষ অভিযান চালু করা হবে। এই ক্ষেত্রে যেহেতু প্রধান মন্ত্রী আন্তরিক এবং বিরোধী দল ও চাঁদাবাজ এর ব্যাপারে সোচ্চার… এবার আর চাঁদাবাজদের রেহাই নেই। তা ছাড়া বিএনপি সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল চাঁদাবাজ নির্মুল করবে…অবশ্যই তা বাস্তবায়ন হবে যদি কর্মসূচিতে জনগণের ও অংশগ্রহণ থাকে। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চাঁদাবাজি তালিকা করার জন্য যে নির্দেশ দিয়েছেন তা যে দলেরই হউক জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে। মিডিয়াতে প্রচার করা যেতে পারে। উচ্ছেদ অভিযানের সময় ছাত্র জনতা সাধারণ পাবলিকের সহযোগিতা থাকতে হবে। সকল শ্রেণির সহযোগিতা ছাড়া উচ্ছেদ অভিযান সফল হওয়া যাবে না। চিহ্নত চাঁদাবাজদের আইনের আওতায় আনতে হবে। কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে দেশ থেকে চাঁদাবাজ ও দখলদাবাজ নির্মুল হবে।

লেখক: কলামিস্ট ও সাবেক ব্যাংকার।


নির্বাচিত

সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন: উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহের করণীয়

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
দৈনিক বাংলা ডেস্ক

যেকোনো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় আসে, যখন তার প্রবৃদ্ধির চাকা সচল রাখতে কাঠামোগত সংস্কারের বিকল্প থাকে না। এই মূহুর্তে বাংলাদেশ ঠিক এমনই এক ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক ক্রান্তিকাল পার করছে। এ পরিস্থিতিতে একদিকে নানামুখী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সামাল দেওয়া এবং অন্যদিকে বিপুল কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠির জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা—সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএনপি সরকারের অগ্রাধিকার কাজমূহের অন্যতম। এ লক্ষ্যে সরকার ইতোমধ্যে নানা কর্মসূচিও নিয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে দৃশ্যমান হবে। বিএনপি’র নির্বাচনী ইশতেহারের মূল দর্শন—‘করবো কাজ, গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’—কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং এটি দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক রূপরেখার ভিত্তি। ইশতেহারে দেশে ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে ‘এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি’ গঠনের যে রূপকল্প নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। এজন্য তাদেরকে এখন গতানুগতিক ধারার প্রথাগত ‘ঋণদাতা’র খোলস থেকে বেরিয়ে এসে উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রকৃত কারিগর এবং অর্থনীতির ‘রূপান্তরকারী’ সক্রিয় অংশীদার হিসেবে অবতীর্ণ হতে হবে ।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি নাজুক অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে বর্তমানে ‘নিম্ন-স্তরের ভারসাম্য বা লো-লেভেল ইকুইলিব্রিয়াম’ পর্যায়ে অবস্থান করছে। অর্থনীতির ভাষায়, এর অর্থ হলো—একটি দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকলেও তার প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার তার প্রকৃত সম্ভাবনার চেয়ে অনেক নিচে আটকে আছে। এই স্থবিরতা বা অচলায়তন ভাঙতে হলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখেই বাংলাদেশকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি বিনিয়োগ-চালিত প্রবৃদ্ধির দিকে অগ্রসর হতে হবে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের ঘোষিত নীতিগত অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করা এবং ব্যাংকিং খাতে নিয়মভিত্তিক সুশাসন নিশ্চিত করা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

সরকারের এই দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক রূপকল্প এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যুগোপযোগী নীতিমালার আলোকে, দেশে একটি শক্তিশালী উদ্যোক্তা শ্রেণি ও টেকসই স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সুনির্দিষ্ট কিছু কাঠামোগত ও নীতিগত পরিবর্তন আনতে হবে। যেমন:

জামানতের শেকল ভাঙা ও ক্যাশ-ফ্লো ভিত্তিক অর্থায়ন

দেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত দুর্বলতা হলো ঋণ বা বিনিয়োগ প্রদানে অতিমাত্রায় জামানত-নির্ভরতা। আইটি, ফিনটেক, এগ্রিটেক, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং কিংবা সিএমএসএমই খাতের একজন তরুণ উদ্যোক্তার মাথায় হয়তো একটি বিলিয়ন ডলারের আইডিয়া এবং দক্ষতা আছে, কিন্তু ব্যাংকে দেওয়ার মতো তার কোনো স্থাবর সম্পত্তি বা জমির দলিল নেই। ব্যাংকগুলোকে এখন এই প্রথাগত চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। জমির দলিলের বদলে উদ্যোক্তার মেধা, দক্ষতা, ব্যবসায়িক সম্ভাবনা এবং ক্যাশ-ফ্লোকে পুঁজি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। উদ্যোক্তাদের ‘ডিজিটাল লেনদেনের ফুটপ্রিন্ট’ (যেমন: মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেন, ইউটিলিটি বিল পরিশোধের হার ইত্যাদি) বিশ্লেষণ করে ‘অলটারনেটিভ ক্রেডিট স্কোরিং’ পদ্ধতির ব্যাপক প্রয়োগ ঘটাতে হবে। অবশ্য বাংলাদেশে কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংক খু্বই ক্ষুদ্র পরিসরে এ ধরণের উদ্যোক্তাদের জন্য ডিজিটাল লোন বা ন্যানো লোন সুবিধা ইতোমধ্যে চালু করেছে। কিন্তু ব্যাপকহারে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে হলে এই উদ্যোগ আরো সম্প্রসারিত ও ত্বরান্বিত করতে হবে। একইসাথে সিঙ্গেল ডিজিট সুদ হার এবং পর্যাপ্ত গ্রেস পিরিয়ডসহ ঋণদান প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও ডিজটাল করতে পারলে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির পথে আশানুরুপ গতি আসবে।

ইকুইটি ফাইন্যান্সিং ও স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম তৈরি

প্রযুক্তির উৎকর্ষের এই যুগে বাংলাদেশে স্টার্টআপ ফাইন্যান্সের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। গতানুগতিক ঋণ বা ডেট ফাইন্যান্সিং দিয়ে কখনোই একটি উদ্ভাবনী স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা সম্ভব নয়। স্টার্টআপগুলোর ব্যবসায়িক মডেলে ঝুঁকি বেশি থাকে, তাই তাদের প্রয়োজন ‘ইকুইটি ফাইন্যান্সিং’। প্রতিটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের নিজস্ব ‘ভেঞ্চার ক্যাপিটাল’ উইং বা ‘স্টার্টআপ ফান্ড’ থাকা এখন সময়ের দাবি। তরুণদের নতুন আইডিয়া বাণিজ্যিকভাবে সফল করতে সিড ফান্ডিং বা ইনোভেশন গ্রান্ট প্রদানে ব্যাংকগুলোকে আরও সাহসী ভূমিকা নিতে হবে। ব্যাংকগুলোকে বুঝতে হবে, আজকের একটি ছোট স্টার্টআপ আগামীর একটি ইউনিকর্ন কোম্পানিতে পরিণত হতে পারে।

নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’

ধর্ম-বর্ণ-দল-মত-বয়স-লিঙ্গ-অঞ্চল নির্বিশেষে দেশের সকল মানুষের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো গঠন ছাড়া ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। আমাদের দেশে পারিবারিক সম্পত্তির মালিকানায় নারীদের অংশীদারিত্ব কম থাকায়, প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নারী উদ্যোক্তারা ঋণ পাওয়া থেকে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হন। এই কাঠামোগত বাধা দূর করতে ব্যাংকগুলোকে পার্সোনাল গ্যারান্টি বা গ্রুপ গ্যারান্টির ভিত্তিতে নারীদের ঋণ দেওয়ার পরিধি বাড়াতে হবে। সরকারের ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’—এই কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নে গ্রামীণ নারীদের ঐতিহ্যবাহী পণ্য উৎপাদনে অর্থায়ন বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি, এই দেশীয় পণ্যগুলো যেন অ্যামাজন বা আলিবাবার মতো বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে সহজে বিক্রি করা যায়, সেজন্য ব্যাংকগুলোকে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে ও লজিস্টিক সংযোগে সহায়তাকারীর ভূমিকা পালন করতে হবে। ব্যাংকগুলোর প্রতিটি শাখার ‘নারী উদ্যোক্তা ডেস্ক’ যেন কেবল নামসর্বস্ব না থেকে সত্যিকার অর্থেই নারীদের ব্যবসা সম্প্রসারণে কাজ করে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

প্রান্তিক পর্যায়ে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও বিজনেস অ্যাডভাইজরি

উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ভূমিকা কেবল ঋণ বিতরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে বর্ণিত প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশের প্রত্যেক জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ চালুর উদ্যোগের সাথে সমন্বয় করে ব্যাংকগুলোকে তাদের প্রতিটি শাখা, উপশাখা বা এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটে ‘বিজনেস অ্যাডভাইজরি সেন্টার’ বা ব্যাবসায়িক পরামর্শ কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। এর মাধ্যমে ‍ব্যাংকগুলো উদ্যোক্তা উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মশালা, উদ্যোক্তা কাউন্সিলিং এবং হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের মত নানা কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো সরকারের যুব উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ইউনিয়ন ডিজিটাল সেবা কেন্দ্র বা অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। এছাড়া অনেক নতুন উদ্যোক্তা ট্রেড লাইসেন্স করা, প্রজেক্ট প্রোফাইল তৈরি, হিসাবরক্ষণ বা কর বিষয়ক আইনি জটিলতার কারণে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হন। ব্যাংকগুলো যদি তাদের নিজস্ব জনবল দিয়ে এই মেন্টরশিপ ও দিকনির্দেশনা প্রদান করে, তবে প্রান্তিক পর্যায়েও সফল উদ্যোক্তা তৈরি হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের ঝুঁকিও কমে আসবে।

গিগ ইকোনমি এবং ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বিশেষ সুবিধা

বর্তমান বিশ্বে ‘গিগ ইকোনমি’ বা স্বাধীন পেশাজীবীদের অর্থনীতি একটি বড় বাস্তবতা। দেশে প্রায় ৮ লক্ষ ফ্রিল্যান্সার ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটর তৈরির যে লক্ষ্যমাত্রা সরকার নির্ধারণ করেছে, তার সুফল পেতে ব্যাংকগুলোকে বিশেষায়িত সেবা চালু করতে হবে। ফ্রিল্যান্সারদের আয়ের প্রমাণপত্র প্রথাগত চাকরিজীবীদের মতো হয় না। তাই তাদের আয় দেশে আনার জন্য নিরবচ্ছিন্ন পেমেন্ট চ্যানেল তৈরি, আয়ের গড়ের ওপর ভিত্তি করে সহজ শর্তে ক্রেডিট কার্ড প্রদান এবং বিশেষ ডিপিএস ও ঋণ সহায়তা চালু করতে হবে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের এই কর্মীদের সঞ্চয় ও মূলধন গঠনে ব্যাংকগুলো সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।

ক্লাস্টার ভিত্তিক শিল্পায়ন ও ব্লু-ইকোনমি

আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে সরকারের ইশতেহারে উল্লেখিত সুনির্দিষ্ট অঞ্চলভিত্তিক শিল্পায়নে ব্যাংকগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, উত্তরাঞ্চলে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানি অঞ্চল গড়ে তুলতে ব্যাংকগুলোর সিন্ডিকেটেড অর্থায়ন প্রয়োজন। অন্যদিকে, দেশের সুবিশাল সমুদ্রসীমাকে কেন্দ্র করে ‘সুনীল অর্থনীতি’ বা ব্লু-ইকোনমির যে অপার সম্ভাবনা রয়েছে, তা কাজে লাগাতে হবে। হাওর ও উপকূলীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, জাহাজ ভাঙা শিল্প এবং ইকো-ট্যুরিজম খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য ক্লাস্টার-ভিত্তিক অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

সিএসআর ফান্ডের যুগোপযোগী ব্যবহার ও দক্ষতা উন্নয়ন

ব্যাংকগুলোর কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতের ব্যয়ের ধরনেও গুণগত পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। কেবল অনুদান বা ত্রাণ বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, সিএসআর তহবিলের একটি বড় অংশ তরুণদের আধুনিক প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, বিদেশি ভাষা শিক্ষা এবং স্কিল ডেভেলপমেন্টে ব্যয় করা উচিত। শিক্ষাব্যবস্থাকে বাস্তবমুখী করতে ‘ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া’র দূরত্ব ঘোচাতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে যৌথ উদ্যোগে ইনকিউবেটর, বুটক্যাম্প ও জব ফেয়ার আয়োজনে ব্যাংকগুলোর স্পন্সরশিপ দেশের জনশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে বিশাল ভূমিকা রাখবে।

অলিগার্কিক কাঠামোর বিলোপ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা

উপরোক্ত সকল উদ্যোগ তখনই সফল হবে, যখন ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। ব্যাংক পরিচালনায় এবং ঋণ মঞ্জুরিতে সকল প্রকার রাজনৈতিক, আমলাতান্ত্রিক ও পারিবারিক প্রভাব বন্ধ করতে হবে। মুষ্টিমেয় কিছু পরিবার বা গোষ্ঠীর হাতে ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা কুক্ষিগত থাকার যে সংস্কৃতি, তা ভেঙে ফেলতে হবে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে কঠোর আইনি প্রক্রিয়ায় অর্থ আদায় করে, সেই তারল্য নতুন ও সম্ভাবনাময় সাধারণ উদ্যোক্তাদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। ব্যাংকিং খাতে ন্যায়ভিত্তিক ও রুল-বেসড ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার যে কড়া বার্তা কেন্দ্রীয় ব্যাংক দিয়েছে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদকে তা অবিলম্বে ধারণ করতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, একটি দেশের অর্থনীতি যখন নতুন উচ্চতায় আরোহণের প্রস্তুতি নেয়, তখন ব্যাংকিং খাতকে তার চালিকাশক্তির ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়। বর্তমান সরকার তার নির্বাচনী ইশতেহারে ‘করবো কাজ, গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির মাধ্যমে একটি স্পষ্ট গন্তব্য নির্ধারণ করে দিয়েছে। দেশের আর্থিক খাতে নীতিনির্ধারক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংককে তার যুগোপযোগী মুদ্রানীতি ও দিকনির্দেশনার মাধ্যমে এই ইশতেহারে বর্ণিত অর্থনৈতিক গন্তব্যে পৌঁছানোর পথনকশাও তৈরি করতে হবে। এবং সেই পথনকশা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাঠে নেমে কাজ করার উদ্যোগ ও সদিচ্ছার। প্রকৃত অর্থে মেধা, পরিশ্রম, দক্ষতা, সম্ভাবনা ও তারুণ্যের ওপর আস্থা রেখে ব্যাংকগুলো যদি নতুন উদ্যোক্তাদের হাত ধরে এগোয়, তবে বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের জোয়ার সৃষ্টি হবে এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে একটি সমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভরশীল ‘ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি’র স্বপ্ন বাস্তবতায় রূপ নিতে পারে।

লেখক: ব্যাংকার ও আর্থিক খাতের বিশ্লেষক।


নির্বাচিত

আফতাবনগরে ঘাস-বন পোড়ানো: পাখি ও প্রকৃতির বিরুদ্ধে অমানবিকতা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
লেখক- কাজী মাহমুদুর রহমান, ভোরের সাথী

শীতের সকালে আফতাবনগরের ঘাস-বনভূমি একসময় পাখির কলতানে মুখর এলাকা। প্রতিবছর শীতে উড়ে আসে পরিযায়ী পাখির ঝাঁক, গাছে গাছে শোনা যায় তাদের ডাক। কিন্তু প্রতিবছরের মতো এবারও সেই ঘাস-বনভূমির একাংশ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে গেছে গাছ, ঝোপঝাড়—আর সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংস হয়ে গেছে অসংখ্য পাখির নিরাপদ আশ্রয়।

এই ঘাস-বন পোড়ানোর ফলে কার্বন নিশ্বরণের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পাখিকুল। অনেক পাখির বাসা, ডিম ও ছানাপোনা আগুনে পুড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। যারা উড়তে পারেনি, তারা প্রাণ হারিয়েছে। এই দৃশ্য শুধু হৃদয়বিদারকই নয়, আমাদের মানবিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

প্রতিবছর শীত মৌসুমে সাইবেরিয়া ও অন্যান্য শীতপ্রধান অঞ্চল থেকে বিভিন্ন প্রজাতির পরিযায়ী পাখি আফতাবনগরে আসে। সাইবেরিয়ান স্টন চ্যাট, ইয়োল অকটেইলসহ নানা প্রজাতির পাখি এখানকার বনভূমি ও জলাভূমিকে নিরাপদ আশ্রয় ও খাদ্যের উৎস হিসেবে বেছে নেয়। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তারা আসে বেঁচে থাকার তাগিদে। কিন্তু ঘাস-বন পোড়ানোর কারণে তাদের সেই আশ্রয় আর নিরাপদ থাকছে না। খাদ্যের উৎস ধ্বংস হওয়ায় এসব পাখি আজ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে।

প্রকৃতির এই নির্মম ধ্বংস কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ঘাস- বন পোড়ানো কেবল পাখিদের জীবনই কেড়ে নিচ্ছে না, এটি পরিবেশের সামগ্রিক ভারসাম্যও নষ্ট করছে। পাখি প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করে, গাছের বীজ ছড়াতে সহায়তা করে এবং পরিবেশকে সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাখির সংখ্যা কমে গেলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনেও এসে পড়ে—খাদ্যচক্র ভেঙে পড়ে, পরিবেশ হয়ে ওঠে আরও ঝুঁকিপূর্ণ।

পাখিদের বাঁচানো শুধু আবেগের বিষয় নয়, এটি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব এবং একই সঙ্গে আমাদের নিজেদের স্বার্থের সঙ্গেও জড়িত। পাখির মাধ্যমে আমরা যে পরিবেশগত উপকার পাই, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাই আফতাবনগরে ঘাস-বন পোড়ানোর মতো অমানবিক কাজ অবিলম্বে বন্ধ করা জরুরি।

এক্ষেত্রে প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকার পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ অপরিহার্য। ঘাস-বনভূমি রক্ষা, নজরদারি জোরদার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি না করলে এই ধ্বংস থামানো সম্ভব নয়।

প্রকৃতি বাঁচলে, আমরাও বাঁচব—এই সত্য এখনই উপলব্ধি করার সময়। নইলে একদিন আফতাবনগরের ঘাস-বন থাকবে শুধু স্মৃতিতে, আর পাখির ডাক শোনা যাবে কেবল পুরোনো গল্পে।


নির্বাচিত

মডেল তিন্নির মৃত্যু: নীরবে চলে যাওয়া থেকে আমাদের শেখা

ছবি: মডেল তিন্নি। ফাইল ছবি
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
অনলাইন ডেস্ক

২০০২ সালে মডেল তিন্নির মৃত্যুর খবরে আমাদের সমাজকে তাৎক্ষণিকভাবে একটি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। সেই প্রশ্নটি হচ্ছে, আমরা কি মানুষের ভেতরের কষ্টগুলো সত্যিই দেখতে পাই? বাহ্যিক সাফল্য, পরিচিতি কিংবা স্নিগ্ধ হাসির আড়ালে যে গভীর মানসিক সংকট লুকিয়ে থাকতে পারে, এই ঘটনাটি তারই এক বেদনাদায়ক স্মারক।

তিন্নি ছিলেন একজন সুপরিচিত মুখ। গ্ল্যামার, আত্মবিশ্বাস ও সফলতার যে ছবি আমরা পর্দায় দেখি, প্রাত্যাহিক জীবনে সেটা সবসময় বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি নয়, এ কথা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। সমাজের প্রত্যাশা, ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানপোড়ন, মানসিক একাকিত্ব কিংবা না-বলা কষ্ট, এসব কারণ মানুষের ভেতর তীব্র মানসিক সংকট তৈরি করতে পারে। কিন্তু এসব সংকট সবসময় দৃশ্যমান হয় না।

তিন্নির মৃত্যুর ঘটনায় তার ব্যক্তিগত জীবনকে বিশ্লেষণ করার চেয়ে আমাদের জন্য জরুরি হলো এই দুঃখজনক ঘটনা থেকে সচেতনতামূলক শিক্ষা নেয়া। প্রথমত, মানসিক কষ্টকে হালকাভাবে না নেওয়া যেটা একটি জীবনের জন্য বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, মানসিক সাহায্য চাওয়াকে স্বাভাবিক বিষয় হিসাবে দেখা। আমাদের সমাজে এখনো মনে করা হয় মানসিক সমস্যায় সাহায্য নেওয়া মানেই ব্যর্থতা। এই ধারণা ভাঙতে হবে। যেমন আমরা শরীর অসুস্থ হলে ডাক্তারের কাছে যাই, তেমনি মন ভেঙে পড়লে কাউন্সেলর, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা বিশ্বাসযোগ্য কারও সাহায্য নেওয়া স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়। তৃতীয়ত, সোশ্যাল মিডিয়ায় ও জনপরিসরে সংবেদনশীল আচরণ জরুরি। কোনো আত্মহত্যার ঘটনায় গুজব, অতিরঞ্জন বা ব্যক্তিগত জীবনের কাটাছেঁড়া কেবল পরিস্থিতিকে আরও ক্ষতিকর করে তোলে। আমাদের উচিত সম্মান, নীরবতা এবং দায়িত্বশীল ভাষা বজায় রাখা।

মডেল তিন্নির মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানুষের জীবন একমাত্রিক নয়। সফলতা, সৌন্দর্য বা জনপ্রিয়তা মানসিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। তাই পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী, সব সম্পর্কেই সহানুভূতিশীল হওয়া দরকার।

বাস্তবতা হচ্ছে, তিন্নির চলে যাওয়াকে আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। কিন্তু এখন থেকে যদি আমরা মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিতে শিখি এবং আরো সচেতন ও মানবিক হই, তাহলে এভাবে কাউকে হারানোর ঘটনার সংখ্যা অনেক কমে আসবে। নীরব কষ্ট যেন আর নীরব মৃত্যুতে রূপ না নেয়, এই হোক আমাদের অঙ্গীকার। লেখক : মনোরোগ বিশেষজ্ঞ


নির্বাচিত

banner close