রোববার, ২৩ জুন ২০২৪

পুলিশিং কার্যক্রমের ক্ষেত্রে ইমেজের গুরুত্ব

আপডেটেড
২৩ মে, ২০২৪ ১২:২২
ড. এম এ সোবহান পিপিএম
প্রকাশিত
ড. এম এ সোবহান পিপিএম
প্রকাশিত : ২৩ মে, ২০২৪ ১২:২১

ইমেজ বা ভাবমূর্তি গঠন (Image & Image Building)

সাধারণভাবে বলতে গেলে ইমেজ বা ভাবমূর্তি হলো সেই উপলব্ধি যা মানুষ কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা সম্পর্কে ব্যক্ত করে থাকে। ব্যাপকভাবে বলতে গেলে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের পথচলা বা তার কার্যকলাপের ইতিবাচক বা নেতিবাচক দিক সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় তাকেই ইমেজ বা ভাবমূর্তি বলে। ইমেজ হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক যা কোনো লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করে। কোনো প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের সেবাদান বা ব্যক্তিপর্যায়ের কাজের গুণগত মান, বৈশিষ্ট্য প্রভৃতির ওপর ভিত্তি করে কোনো প্রতিষ্ঠানের ইমেজ বা ভাবমূর্তি গড়ে ওঠে।

ইমেজ বা ভাবমূর্তি গঠনের উপায়

যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য ইমেজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তেমনি পুলিশ ইমেজ পুলিশের কাজের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রয়োজন পড়ে। নিম্নোক্ত উপায়ে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ইমেজ বা ভাবমূর্তি গঠন করা যেতে পারে।

কাজের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা

স্বচ্ছতা নেতা, অনুসারী এবং কর্মীদের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস তৈরি করে। তা কর্মসংশ্লিষ্ট চাপ কমায়। পক্ষান্তরে স্বচ্ছতা কর্মীদের বা অধস্তনদের মনে প্রশান্তি আনে এবং কর্মক্ষমতা বাড়ায়। নেতা বা কোনো প্রতিষ্ঠান প্রধানের দায়িত্ব হলো স্বচ্ছতার একটি সংস্কৃতি তৈরি করা যা তার অধস্তনদের জন্য অনেক সুবিধা বয়ে আনবে। তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মনোবল উন্নত করে। যখন অধস্তন ও সতীর্থরা দেখে যে কোনো ব্যক্তি এবং তাদের কাজের স্বচ্ছতা আছে বা সে খোলামেলা হতে পছন্দ করে, তাহলে তাদের ওই ব্যক্তির প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা বেড়ে যাবে। এভাবে কাজকর্মে স্বচ্ছতা থাকলে তা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি গঠনে সহায়ক হয়।

জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা

জবাবদিহিতা নাগরিকের ভোগান্তি কমিয়ে দেয়। জবাবদিহিতা কোনো দলের সদস্যদের দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। জবাবদিহিতা অনুশীলনের ফলে সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পায়, কাজের প্রতি সন্তুষ্টি ও প্রতিশ্রুতি বৃদ্ধি পায়। কাজের পরিমাণ ও গুণাগুণ বৃদ্ধি পায়। সুতরাং কোনো কাজের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি গঠনে সহায়ক হয়।

বিপদের সময়ে মানুষের পাশে থাকা

সংকটকালে ভুক্তভোগীরা অসহায় থাকে। সে সময় সাধারণ মানুষ পুলিশ বা রাজনৈতিক নেতা বা সমাজের নেতাদের সাহায্য ও সমর্থন প্রত্যাশা করে। সে জন্য বিপদকালীন সময়ে পুলিশ বা সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি বা নেতাদের উচিত ভুক্তভোগীর পাশে থাকা। তাই ভিকটিম বা ভুক্তভোগীর প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ইমেজ বা ভাবমূর্তি বৃদ্ধি হয়।

বিভিন্ন জাতি বর্ণ, ধর্ম ও প্রতিষ্ঠান নির্বিশেষে সব স্তরের মানুষের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া জোরদার করা

বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া বাড়ানোর মাধ্যমে ওই জাতিগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে দূরত্ব কমে যায় এবং তাদের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস বৃদ্ধি পায়। যখন অনুগামী, অধস্তন ও কর্মীরা ঊর্ধ্বতনের সঙ্গে দূরত্ব কম দেখতে পায়, তখন তারা কাজে অধিক মনোযোগ দিয়ে থাকে। যা প্রকারন্তরে ইমেজ বা ভাবমূর্তি গঠনে সহায়ক হয়।

জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সততা ও সাধুতা অনুশীলন করা

কোনো একজন নেতা বা প্রতিষ্ঠানের সততা অনুশীলন কর্মক্ষেত্রে অনুকূল পরিবেশ বয়ে আনে এবং অনুসারীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা বাড়ায়। যখন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাজে সততা ও সাধুতা থাকে না তখন ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কেউ বিশ্বাস করে না। কোনো প্রতিষ্ঠানের বা তার প্রধানের মধ্যে সততা ও সাধুতার চর্চা ওই ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ইমেজ বহুলাংশে বৃদ্ধি করে।

ভালো ব্যবহার করা

ভালো ব্যবহার করার মাধ্যমে ভালো সম্পর্ক স্থাপিত হয় এবং ভালো আচরণের মাধ্যমে মানুষের হৃদয় জয় করা যায়। যদি কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির উপকার করতে নাও পারে, তবে শুধু ভালো ব্যবহারের মাধ্যমে তাকে সন্তুষ্ট করতে পারে। ভালো ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যক্তি অনন্য ব্যক্তিত্বে পরিণত হয় এবং তার ইতিবাচক ইমেজ বা ভাবমূর্তি গঠিত হয়।

সংকটের সময়ে শান্ত থাকা

কোনো কাজে বা পরিস্থিতিতে শান্ত থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যখন কোনো ব্যক্তি সংকটের সময়ে শান্ত থাকে, তখন সাধারণত সে আরও যুক্তিযুক্তভাবে চিন্তা করতে পারে এবং যৌক্তিক ও সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারে। কোনো সংকটে অস্থিরতা বা অশান্ত আচরণ সংকট না থামিয়ে বরং সংকটকে আরও জটিল করে তোলে। তাই তো দেখা যায়, সংকটকালীন সময়ে শান্ত থাকার মাধ্যমে ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি গড়ে ওঠে।

মাঝেমধ্যে কৌশলী হওয়া

একজন নেতাকে বা কোনো ব্যক্তিকে বুদ্ধিমান হতে হয় এবং তাকে মাঝেমধ্যে কৌশলী হতে হয়। কারণ পরিস্থিতি সামলাতে বা সিদ্ধান্ত নিতে নেতাকে কিছু কৌশলী খেলা বা চাল দিতে হয়। তাই নেতার কৌশল ও সুচারুভাবে কাজ সম্পন্ন করার মাধ্যমে নেতার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাবে এবং তার ইমেজ বা ভাবমূর্তি গঠিত হবে।

যুক্তিবাদী হওয়া বা যৌক্তিকভাবে কাজ করা

যৌক্তিক সিদ্ধান্তগ্রহণ এবং যৌক্তিক মূল্যায়ন যৌক্তিকতার ওপর নির্ভর করে। তাই সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, সমস্যা সমাধান করা এবং রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তিবাদী হওয়া খুবই জরুরি। যা ব্যক্তির ইমেজ গঠনে ভূমিকা রাখে।

অংশীজনের মন ও মনোভাব জানা

একজন নেতাকে মনোবিজ্ঞানী হতে হয়, তাকে তার অধস্তনদের সম্পর্কে জানা উচিত এবং পাশাপাশি তাকে তার অংশীজনদের সম্পর্কেও অবগত থাকা উচিত। অংশীজনদের মন-মানসিকতা যাচাই করে সিদ্ধান্ত দেওয়া যুক্তিসঙ্গত। তাই একজন সফল নেতা অংশীজনদের মনের কথা জানেন এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। ফলে ওই ব্যক্তির ইমেজ বৃদ্ধি পায়।

ভালো কাজ বা ইতিবাচকতা প্রচার করা

কোন ভালো কাজের তথ্য বা সংবাদ সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে প্রচার করার মাধ্যমে বিষয়টির ব্যাখ্যা ও সমস্যা সবাই স্পষ্টভাবে জানতে পারে। একটি ঘটনার তথ্যপূর্ণ ব্যাখ্যা প্রচার করার মাধ্যমে জনসাধারণের সঙ্গে ধারণা শেয়ার করা, তাদের বোঝাপড়া বৃদ্ধি করা, তাদের উপলব্ধি পরিবর্তন করা এবং তাদের নতুন দক্ষতা অর্জনে সহায়ক হয়ে থাকে। তাই ভালো কাজ অংশীজনদের মধ্যে প্রচার করলে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান উভয়েরই ইমেজ বৃদ্ধি পাবে।

সরল জীবনযাপন এবং সেইসঙ্গে উচ্চ চিন্তাভাবনা

সরলতা সব সময় সাধারণ মানুষের কাছে প্রশংসিত। সরল জীবনযাপন ও উচ্চ চিন্তাভাবনা অন্য মানুষকে উৎসাহিত করে এবং প্রভাবিত করে। সাধারণত অনুসারীরা বা অধস্তনরা নেতাকে বা প্রতিষ্ঠানের বড় কর্মকর্তাকে দেখে থাকে, তাকে অনুসরণ করে এবং তার জীবনধারা নিজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে। তাই সরল জীবনযাপন ও উচ্চচিন্তা ইমেজ গঠনে সহায়ক হয়।

নিয়মানুবর্তিতা ও সময়ানুবর্তিতা অনুসরণ করা

শৃঙ্খলা ভালো অনুসারী তৈরি করে। শৃঙ্খলা বা নিয়মানুবর্তিতা চর্চা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য মঙ্গলস্বরূপ। কেননা তা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে একটি সুন্দর বা সুষ্ঠু কর্মপরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করে। সুতরাং এটা বলা যেতে পারে শৃঙ্খলা ও সময়ানুবর্তিতা অনুসরণ করা ইমেজ তৈরির সহজ উপায়। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিয়মানুবর্তিতা ও সময়ানুবর্তিতা মেনে চললে তাদের সম্পর্কে আরও অধিক ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা হয়ে থাকে এবং ইতিবাচক ভাবমূর্তি গঠিত হয়। কথা রাখা বা সময় রক্ষার মাধ্যমে ব্যক্তি এক কথার মানুষে পরিণত হয়। কোনো নেতার নিয়মানুবর্তিতা পালন নেতাকে তার কর্মীদের মধ্যে নির্ভরযোগ্য এবং বিশ্বস্ত হিসেবে পরিগণিত করে।

ভদ্রতা ও সৌজন্যতা অনুশীলন করা

যখন কোনো ব্যক্তি ভদ্রতা ও সৌজন্যতা প্রদর্শন করে তখন তার প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ এবং সম্মান সৃষ্টি হয়। ভদ্রতা ও সৌজন্যতা কোনো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য অত্যাবশ্যক। তাই তো ভদ্রতা ও সৌজন্যতা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ইমেজ বা ভাবমূর্তি গঠনে সহায়ক হয়।

পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধ প্রদর্শন করা ও সহনশীল হওয়া

পারস্পারিক শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মাধ্যমে বিশ্বাস, সম্মান ও অর্থপূর্ণ যোগাযোগের ভিত্তি রচিত হয়। কোনো ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই ব্যক্তির মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তাবোধ ও সুস্থতার অনুভূতি তৈরি হয় এবং তার মেধা, মনন ও প্রতিভা বিকশিত হতে সহায়ক হয়। একজন সহনশীল ব্যক্তি ধৈর্যর সঙ্গে অন্যের মতামত শোনেন এবং তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার চেষ্টা করেন। সহনশীল ব্যক্তি পরমতসহিষ্ণু হন এবং সবার মতামতকে শ্রদ্ধা করেন। তাই পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সহনশীলতা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে পারে।

ভালো যোগাযোগ রক্ষা করা

যোগাযোগ দক্ষতা সামাজিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাগুলোকে সক্রিয় করে। এ ছাড়া যোগাযোগ মিথস্ক্রিয়া বৃদ্ধি করে এবং সুসম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য অপরিহার্য হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। কার্যকর যোগাযোগ সংশ্লিষ্ট সবার পক্ষকে সন্তুষ্ট করে। দ্বন্দ্বময় পরিস্থিতিতে কার্যকর যোগাযোগেরমাধ্যমে একটি সম্মানজনক ও সুষ্ঠু সমাধান করা যায়। ভালো যোগাযোগ সুস্থ সম্পর্ক তৈরি এবং সুষ্ঠু বিকাশে সহায়ক বিধায় ব্যক্তিগত ইমেজ গঠনে ভূমিকা রাখে।

মার্জিত পোশাক পরিধান করা

শেক্সপিয়ার তার ম্যাকবেথ নাটকে বলেছেন, পোশাকে মানুষ চেনা যায়। সত্যই পোশাকের মাধ্যমে ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব প্রকাশ পায়। ব্যক্তিত্বের বিকাশের মাধ্যমে মানুষ সফল মানুষে পরিণত হয়। একজন ব্যক্তির পোশাক এবং পোশাক পরিধানের ধরন তার ব্যক্তিত্ব বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই বলা যায় পোশাক ব্যক্তি ইমেজ গঠনে ভূমিকা রাখে।

বিনয়ী ও শিষ্টাচার বজায় রাখা

শিষ্টাচার মানুষকে শেখায় কীভাবে বিভিন্ন পরিবেশে অন্যের সঙ্গে সুআচরণ করতে হয়। শিষ্টাচার চর্চার মাধ্যমে এক সহজাত ও কর্মময় পরিবেশ তৈরি হয়। তা সবার জীবনকে স্বাচ্ছন্দ্যময় ও আরামপ্রদ করে তোলে। শিষ্টাচার দয়া, নম্রতা ও সুবিচেনা উপহার দেয়। শিষ্টাচার জীবনের বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলায় আত্মবিশ্বাস দেয়। এটি আমাদের অন্যের অনুভূতি এবং অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে। আর বিনয়ী হওয়া এবং কোনো কাজে বিনয়ীভাব প্রদর্শন করা ব্যক্তি সম্পর্কে একটা ইতিবাচক বার্তা দেয়। সুতরাং সবাই কাজে বিনয়ী হওয়া ও শিষ্টাচার প্রদর্শন ব্যক্তির ইমেজ গঠনে বড় ভূমিকা রাখে।

পাঠ্যক্রম বহির্ভূত সৃষ্টিশীল কার্যক্রম অনুশীলন করা

পাঠ্যক্রম বহির্ভূত সৃষ্টিশীল কার্যকলাপগুলো ব্যক্তির প্রতিভার বিকাশ ঘটায়। এ ছাড়া ব্যক্তি কীভাবে একটা টিমে কাজ করে সম্মিলিতভাবে লক্ষ্য অর্জন করবে তা শেখায়। এসব কাজগুলো মানুষের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, নেতৃত্বের দক্ষতা সৃষ্টি করে এবং নিজের মানোন্নয়ন করে যা প্রকারান্তরে ইমেজ বৃদ্ধি করে। এ ছাড়া সৃজনশীল কার্যক্রমের মাধ্যমে অন্যকে আকৃষ্ট করা যায়, অন্যের কাছাকাছি যাওয়া যায় এবং অন্যকে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি শেয়ার করা যায়। যা ব্যক্তির ইমেজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হওয়া

ব্যক্তিত্ব মানুষকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। ব্যক্তিত্বের বিকাশ মানুষকে আকর্ষণীয় করে তোলে। ব্যক্তিত্বের বিকাশের মাধ্যমে ব্যক্তির যোগাযোগ দক্ষতার উন্নতি হয়। ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে ব্যক্তির চিন্তাভাবনা ও অনুভূতিগুলো পছন্দসই উপায়ে প্রকাশ পায়। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ব্যক্তি বিবেকবান, যৌক্তিক ও খোলামেলা মনের হয়। ফলে তার দ্বারা অনেকে সুবিচার ও উপকার পেয়ে থাকে। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হওয়ার মাধ্যমে ব্যক্তির ইতিবাচক ইমেজ গঠিত হয়।

পুলিশ ইমেজ

অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ সময় ধরে পুলিশ বাহিনী বা এর সদস্যদের কার্যকলাপ, আচরণ, ব্যবহার, স্বচ্ছতা, সততা, পেশাদারিত্ব ও আইনি পদক্ষেপ সম্পর্কে সামগ্রিকভাবে দেশের অধিকাংশ জনগণ বদ্ধমূল, স্থায়ী বা অপেক্ষাকৃত দীর্ঘমেয়াদি যে বিশ্বাস বা ধারণা পোষণ করে তাকে পুলিশ ইমেজ বলে।

পুলিশের কাজে ইমেজ গঠনের গুরুত্ব (Importance of Image Building in Police Functioning)

কোনো প্রতিষ্ঠানের ইতিবাচক ইমেজ জনগণের মধ্যে ওই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আস্থা, বিশ্বাসযোগ্যতা, সততা ও সাধুতার ইঙ্গিত দেয়। পুলিশ বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে নিয়োজিত। তাকে সমাজের বিভিন্ন সমস্যা ও জনসাধারণের সঙ্গে কাজ করতে হয়। সে জন্য পুলিশ ইমেজ বা ভাবমূর্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিম্নে পুলিশের কাজে ইমেজের গুরুত্ব আলোচনা করা হলো-

অপরাধ নিবারণে

অপরাধ নিবারণ পুলিশের কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এর মাধ্যমে মানুষকে অপরাধ ঘটনের কারণে শারীরিক, অর্থনৈতিক ও মননে ক্ষতিগ্রস্ততা থেকে রক্ষা করে। আর অপরাধ নিবারণে প্রযুক্তির পাশাপাশি জনসাধারণের সহায়তা অত্যন্ত প্রয়োজন পড়ে। পুলিশের বা অন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ইমেজ ভালো থাকলে জনগণ তাদের তথ্য দিয়ে, সরাসরি গ্রেপ্তারে ও অপরাধস্থলে পৌঁছে দিয়ে অপরাধ নিবারণে সহায়তা করে।

ঘটনা উদ্ঘাটনে

কোনো ঘটনা উদ্ঘাটন মামলা তদন্তে বড় ভূমিকা রাখে। ঘটনা উদ্ঘাটনে অনেক ভদ্রবেশি অপরাধী যারা অপরাধ প্রক্রিয়ার পেছনে বা অন্তরালে থেকে অঘটন ঘটায় তাদের মুখোশ উন্মোচিত হয়। সর্বোপরি তা অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখে। কোনো ঘটনা দ্রুত উদ্ঘাটন ভিকটিম বা ভুক্তভোগীকে আরও সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে রক্ষা করে, পুনরায় আরও অপরাধ ঘটন থেকে নিষ্কৃতি দেয়। কোনো সমাজে বা সম্প্রদায়ের মধ্যে পুলিশের ইতিবাচক ইমেজ থাকলে সেসব গোষ্ঠীর মানুষ পুলিশকে ঘটনা উদ্ঘাটনে সহায়তা করবে।

তদন্ত কাজে সহায়তা

মামলার তদন্তে বিজ্ঞানভিত্তিক তদন্তের গুরুত্ব অপরিসীম; কিন্তু বিজ্ঞানভিত্তিক তদন্তে জনসাধারণের সহায়তা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক তদন্তের পাশাপাশি অন্যান্য তদন্তে জনগণের সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। পুলিশ ইমেজ উন্নত হলে জনসাধারণ স্বেচ্ছায় সাক্ষ্য দিয়ে, তথ্য দিয়ে, ডকুমেন্টস দিয়ে পুলিশকে সহায়তা করবে এবং পুলিশের কাছে সর্বপ্রকার সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসবে। তাই তো সুষ্ঠুভাবে ও সুচারুভাবে তদন্ত কাজ সম্পন্ন করতে হলে জনগণের সহযোগিতা অপরিহার্য।

সাজা বা শাস্তি প্রদানে

পুলিশের ভালো ইমেজ গঠিত হলে জনসাধারণ পুলিশের ডাকে সাড়া দিয়ে আদালতে নিজে সাক্ষী দেবে, অন্যকে সাক্ষী দিতে উদ্ভূত করবে, তথ্য ও উপাত্ত দিয়ে পুলিশকে তদন্তে সহায়তা করবে। যা প্রকারন্তরে অপরাধীর সাজা প্রদানে সহায়তা করবে।

অপরাধ ও অপরাধী সম্পর্কে তথ্য পেতে

অপরাধ ও অপরাধী সম্পর্কে তথ্য পেতে পুলিশকে সমাজের সব স্তরের মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক ও মিথস্ক্রিয়া করতে হয়। ইমেজ বা ভাবমূর্তি গঠনের মাধ্যমে পুলিশ সদস্যরা সহজে জনগণের কাছে যেতে পারে এবং জনগণের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি হয় ও জনবান্ধবতার ক্ষেত্র তৈরি হয়। তাই পুলিশের ইমেজ গঠনের মাধ্যমে জনগণ অপরাধ ও অপরাধী সম্পর্কে তথ্য পাবে এবং অপরাধ প্রতিরোধ করে টেকসই আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে পারবে। পুলিশের ইমেজ উন্নত হলে মানুষ স্বপ্রণোদিত হয়ে অপরাধ ও অপরাধী সম্পর্কে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহায়তা করবে।

অপরাধী গ্রেপ্তারে

বর্তমান যুগকে বলা হয় ডিজিটাল যুগ। প্রায় সব মানুষই এখন সেল ফোন ব্যবহার করে। সব ধরনের অপরাধীরাও এখন সেল ফোন ব্যবহার করে থাকে। এ ছাড়া অপরাধী গ্রেপ্তারে পিন পয়েন্ট ইনফরমেশন বা তথ্যের প্রয়োজন হয়। আর জনগণ সহায়তা না করলে অপরাধী গ্রেপ্তারে সফলতা পাওয়া কষ্টকর। পুলিশের ইতিবাচক ইমেজ গঠিত হলে জনগণ পুলিশকে অপরাধী গ্রেপ্তারে প্রভূত সহায়তা করবে। পুলিশের ইমেজ বৃদ্ধি পেলে জনগণ অপরাধীর অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দিয়ে, অপরাধীকে ধৃত করে এবং অপরাধী গ্রেপ্তারে সরাসরি ও আর্থিকভাবে সহায়তা করবে।

সমাজ থেকে অপরাধভীতি দূর করতে

কোনো অপরাধ একবার ঘটার পর পুনরায় সে অপরাধ সংগঠিত হতে পারে। অপরাধ ভয়ের কারণে ভুক্তভোগী বা ভিকটিম বিভিন্ন রকম রোগে আক্রান্ত হতে পারে যেমন- হৃদরোগ, প্রেসার, ডায়াবেটিস ইত্যাদি। আবার অপরাধ ভয়ের কারণে ভুক্তভোগী শারীরিক বৈকল্যের স্বীকার হতে পারে। এ ছাড়া অপরাধ ভয়ের কারণে ভুক্তভোগী মানসিক আঘাত পেয়ে থাকে। সমাজ থেকে অপরাধভীতি দূর করতে ভয়ের উৎস জানা, ভয়ের মাত্রা জানা, সঠিক তদন্ত ও বিচারের ব্যবস্থা করা, ভিকটিমকে যথাযথ সাপোর্ট দেওয়া, পুলিশকে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো ও সহায়তা প্রদান, সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রেষণা, কাউন্সেলিং, জনগণ ও পুলিশের আন্তঃসম্পর্ক উন্নয়ন প্রয়োজন। এসব কাজ পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয় এবং সব ক্ষেত্রে জনগণের সহায়তা একান্ত প্রয়োজন পড়ে। আর পুলিশ ইমেজ বৃদ্ধি ঘটলে জনগণ পুলিশকে সব ক্ষেত্রে সহায়তা করবে এবং সমাজ থেকে অপরাধভীতি দূর হবে।

জঙ্গি দমনে

জঙ্গিবাদ, জঙ্গিদের সংগঠিত হওয়া এবং জঙ্গি হামলা এখন বাংলাদেশ তথা সারা বিশ্বের এক বড় সমস্যা। জঙ্গি তৎপরতা চালু রাখতে জঙ্গিগোষ্ঠীর প্রধানরা নিত্যনতুন সদস্য সংগ্রহ করে থাকে। এ ক্ষেত্রে তারা কম শিক্ষিত ও সহজ-সরল মানুষের দিকে দৃষ্টি দিয়ে থাকে। জঙ্গি দমনে প্রচলিত ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার পাশাপাশি প্রো-অ্যাকটিভ পুলিশিং ও জনগণের সর্বাত্মক অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা প্রয়োজন। পুলিশ ইমেজ গঠনের মাধ্যমে জনগণ পুলিশকে জঙ্গি দমনে সহায়তা করতে পারে।

সন্ত্রাস দমনে

সন্ত্রাস বাংলাদেশের অন্যতম এক সমস্যা। একটা ছেলে বা মানুষ কেন সন্ত্রাসী হয়, সেটা আগে খুঁজে বের করা প্রয়োজন। একজন মানুষ কিন্তু এক দিনে সন্ত্রাসী হয় না। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অসম্মান, ক্ষুধা, দরিদ্রতা, মাদকাসক্তি ইত্যাদি এর পেছনে রয়েছে। তাই সন্ত্রাস দমনে সমাজের সব স্তরের মানুষ যেমন- পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় নেতা, উন্নয়নকর্মী ও সমাজ সেবক সবাইকে কাজ করতে হবে। আর পুলিশ এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সংগঠিত করতে পারে। পুলিশের ইতিবাচক ইমেজ গঠনের মাধ্যমে সমাজের সব স্তরের মানুষকে নিয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলে সমাজ থেকে সন্ত্রাস দূর করতে পারে।

চুরি ও ডাকাতি নিয়ন্ত্রণে

চুরি ও ডাকাতিসংক্রান্ত অপরাধগুলোকে সম্পত্তিসংক্রান্ত অপরাধ বলে। এসব অপরাধে সাধারণত মানুষ শারীরিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। এসব অপরাধে ভুক্তভোগীর অনেক সময় মৃত্যু পর্যন্ত হয়ে থাকে। এসব অপরাধ দমনে পুলিশের কার্যক্রমের পাশাপাশি জনগণের অংশগ্রহণ প্রয়োজন হয়। যেমন- ভিলেজ ডিভেন্স পার্টি গঠন, কমিউনিটি পুলিশিং ও বিট পুলিশিং কার্যক্রম চালুকরণের মাধ্যমে এ জাতীয় অপরাধ নির্মূল করা যায়। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকার পুলিশের ইতিবাচক ইমেজ একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে

পুলিশের কাজের মূল কথা হলো মানুষের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা করা। কোনো সমাজের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে জনসাধারণের স্বেচ্ছায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অংশগ্রহণ এবং স্বেচ্ছায় পুলিশকে সহায়তা করতে হয়। আর যদি পুলিশ সদস্যদের জনসাধারণের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকে তাহলে তারা পুলিশকে যেকোনো অপরাধ সম্পর্কে অবগত করবে এবং সে মোতাবেক পুলিশ কাজ করবে। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে কমিউনিটি মিটিং, উঠান বৈঠক ও অপরাধ নিরোধ সভা অনেক কার্যকর ভূমিকা রাখে। এসব সভা ও বৈঠক থেকে সমাজের অপরাধের ও আইনশৃঙ্খলার সঠিক চিত্র পাওয়া যায় এবং তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে সমস্যার সমাধান করা যায়। এসব উপায়ে সমস্যা সমাধানকল্পে পুলিশ ইমেজ গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

জনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনায়

জনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনায় সংলাপ এবং সমঝোতায় পৌঁছানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেখা যায় দীর্ঘ বঞ্চনার কারণে মানুষ জনতাবদ্ধ হয়ে যায়, আন্দোলন করে, প্রতিবাদ করে ও ভাঙচুর করে। পুলিশকে তারা প্রতিপক্ষ হিসেবে নেয়। পুলিশের একারপক্ষে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হয় না। তৃতীয় কোনো ব্যক্তি বা পক্ষ বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আবেগপ্রবণ জনতাকে বোঝায়ে আলোচনার টেবিলে বসানো যায়। সে জন্য বলা হয়ে থাকে ওইসব ক্ষেত্রে পুলিশের ইমেজ গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মাদক ও মাদকাসক্তি নিয়ন্ত্রণে

আমাদের সমাজে বিরাজমান সমস্যাগুলোর মধ্যে মাদকাসক্তি অন্যতম। বর্তমানে আমাদের যুবসমাজের বড় একটা অংশ মাদকাসক্ত। এক সমীক্ষা থেকে জানা যায় বড় শহরগুলোতে যত অপরাধ ঘটে থাকে তার শতকরা ৮০ ভাগ মাদকাসক্তরা করে থাকে। মাদক ও মাদকাসক্তি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিনটি উপায়ে কাজ করা যায়। প্রথমত, চাহিদা কমিয়ে, দ্বিতীয়ত, ক্ষতি কমিয়ে এবং সর্বশেষটি হলো সরবরাহ কমিয়ে। এ তিনটি ক্ষেত্রেই জনগণের সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন। আর পুলিশকেই এ ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। সর্বোপরি জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সে জন্য পুলিশ ইমেজ গঠন অত্যন্ত গুরুত্ববহ। কারণ পুলিশের ইমেজ বৃদ্ধি ঘটলেই জনসাধারণ পুলিশকে সহায়তা করবে এবং এ দেশ থেকে মাদক ও মাদকাসক্তি নির্মূল হবে। সুতরাং ইতিবাচক ইমেজ গঠন ও ইমেজ বৃদ্ধি করার মাধ্যমে পুলিশিং ফলপ্রসূ হবে এবং এক আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠা পাবে।

লেখক: অতি: ডিআইজি, কমান্ড্যান্ট, পুলিশ স্পেশাল ট্রেনিং স্কুল (পিএসটিএস), বেতবুনিয়া, রাঙামাটি

বিষয়:

আওয়ামী লীগের ৭৫ বছর: এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস

আপডেটেড ২৩ জুন, ২০২৪ ০০:০৪
ড. মো. শাহিনুর রহমান

বাংলাদেশের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের স্রষ্টা রাজনৈতিক সংগঠনটির নাম নিঃসন্দেহে আওয়ামী লীগ। জাতি হিসেবে আমাদের যা কিছু ইতিবাচক অর্জন আর অগ্রগতি সব এ দলটির হাত ধরেই। মহান এ দলটির হীরকজয়ন্তী বা ৭৫ বছর পূর্তি উদযাপিত হচ্ছে আজ ২৩ জুন।

স্মর্তব্য, ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন উপমহাদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশেমের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের একাংশের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে পুরোনো ঢাকার টিকাটুলীর কে. এম. দাস লেনের রোজ গার্ডেন প্যালেসে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাকালে দলটির সভাপতি ছিলেন জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন টাঙ্গাইলের শামসুল হক। পরে ১৯৫৫ সালে মওলানা ভাসানীরই উদ্যোগে ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগঠনটির নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে নতুন নাম রাখা হয় নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। ১৯৭১-এ বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর দলটির নাম স্বভাবতই পাল্টে গিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ হয়ে যায়।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। এরপর চার বার তিনি সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া দলের ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম জাতীয় সম্মেলনে তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

আওয়ামী লীগের জন্মের সঙ্গে ঢাকার ১৫০ নম্বর মোগলটুলির পূর্ববঙ্গ কর্মী শিবিরের সম্পর্ক অনস্বীকার্য। ২৩ জুনের সম্মেলনের আয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন কর্মী শিবিরের নেতা শওকত আলী। তাঁর উদ্যোগে ১৫০, মোগলটুলিতে শওকত আলীর বাসভবন এবং কর্মী শিবির অফিসকে ঘিরে বেশ কয়েক মাসের প্রস্তুতিমূলক তৎপরতার পর ২৩ জুনের কর্মী সম্মেলনে নতুন দলটির নাম ঘোষণা করা হয়।

শওকত আলীর অনুরোধে কলকাতা থেকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী একটি মামলা পরিচালনার কাজে ঢাকায় এলে তিনি শওকত আলীকে মুসলিম লীগ ছেড়ে আলাদা একটি রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলার পরামর্শ দেন। শওকত আলী এ পরামর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে পূর্ববঙ্গ কর্মী শিবিরের নেতৃবৃন্দকে নতুন সংগঠন গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করেন। শামসুল হক এসময় কর্মী শিবিরের প্রধান নেতা ছিলেন। কামরুদ্দীন আহমদ, মো. তোয়াহা, অলি আহাদ, তাজউদ্দীন আহমদ, আতাউর রহমান খান, আবদুল আউয়াল, মুহম্মদ আলমাস, শামসুজ্জোহা প্রমুখ প্রথম দিকে এবং পরবর্তীতে শেখ মুজিবুর রহমান কর্মী শিবিরকেিিন্দ্রক রাজনৈতিক তৎপরতায় বিশেষভাবে যুক্ত ছিলেন। মুসলিম লীগের আবুল হাশিম-সোহরাওয়ার্দী গ্রুপের নেতারা মুসলিম লীগের অন্যায় কাজগুলোর বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার লক্ষ্যেই এখানে কর্মী শিবির গড়ে তুলেছিলেন।

মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ১৯৪৯ সালে আসামের ধুবড়ী জেলখানা থেকে ছাড়া পেয়ে ঢাকা এলে তার সঙ্গে শওকত আলীর আলোচনা হয়। শওকত আলী মওলানাকে পূর্ববঙ্গ কর্মী শিবিরকেন্দ্রিক রাজনৈতিক তৎপরতার কথা জানান। এ বিষয়ে মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানীর সঙ্গে শওকত আলীর প্রাথমিক আলোচনা হয়। এ আলোচনার সূত্র ধরে নতুন দল গঠনের জন্য একটি সাংগঠনিক কমিটি গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন শওকত আলী। এজন্যে ১৫০, মোগলটুলিতে একটি বৈঠকের আয়োজন করা হয়। মওলানা ভাসানী সে বৈঠকে যোগ দেন। এসময় খোন্দকার আবদুল হামিদের সঙ্গে পরামর্শ করে শওকত আলীর উদ্যোগে ও প্রচেষ্টায় মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি, ইয়ার মুহম্মদ খানকে সম্পাদক এবং খন্দকার মুশতাক আহমদকে দপ্তর সম্পাদক করে একটি সাংগঠনিক কমিটি গঠিত হয়।

এই সাংগঠনিক কমিটি ১৯৪৯-এর ২৩ ও ২৪ জুন রোজ গার্ডেনে নতুন দল গঠনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে এক সম্মেলনের ডাক দেয়। রোজ গার্ডেনে ২৩ জুন বিকেল ৩টায় এ সম্মেলন শুরু হয়। সম্মেলনে উপস্থিত নেতাদের মধ্যে ছিলেন শামসুল হক, শওকত আলী, আনোয়ারা খাতুন, ফজলুল কাদের চৌধুরী, আবদুল জব্বার খদ্দর, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, আতাউর রহমান খান, মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ, আলী আমজাদ খান, শামসুদ্দীন আহমদ, ইয়ার মুহম্মদ খান, মওলানা শামসুল হক, মওলানা এয়াকুব শরীফ, আবদুর রশিদ প্রমুখ।

প্রতিষ্ঠাকালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি হন মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, সহ-সভাপতি হন আতাউর রহমান খান, শাখাওয়াত হোসেন ও আলী আহমদ। টাঙ্গাইলের শামসুল হক হন সাধারণ সম্পাদক। শেখ মুজিবুর রহমান, খন্দকার মোশতাক আহমদ ও এ. কে. রফিকুল হোসেন (খায়ের মিয়া)- কে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয়। কোষাধ্যক্ষ মনোনীত হন ইয়ার মোহাম্মদ খান। প্রসঙ্গত, শেখ মুজিব তখন কারাবন্দি ছিলেন। পুরো পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সংগঠনটির নাম রাখা হয় নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলীম লীগ, যার সভাপতি হন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।

২৪ জুন বিকেলে নবগঠিত আওয়ামী মুসদিলম লীগ মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে ঢাকার আরমানিটোলা ময়দানে প্রকাশ্যে জনসভা করে। এ সভায় প্রায় চার হাজার লোক যোগ দেয়।

১৯৫২-তে বঙ্গবন্ধু সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। পরের বছর ঢাকার ‘মুকুল’ প্রেক্ষাগৃহে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সম্মেলনে তাঁকে দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ১৯৬৬ পর্যন্ত টানা তেরো বছর দলটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ ছিলো তৎকালীন পাকিস্তানে প্রথম বিরোধীদল।

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দলটি প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ৪২ দফা কর্মসূচি গ্রহণ করে। দলটির প্রধান দাবিদাওয়ার মধ্যে ছিল বাঙালির মাতৃভাষা বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া, এক ব্যক্তির এক ভোট ব্যবস্থা চালু করা, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, সংবিধান প্রণয়ন, সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠা, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং তৎকালীন পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে ব্যাপক বৈষম্য দূর করা।

১৯৫৪’র নির্বাচনে মুসলিম লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য অন্যান্য দলকে সঙ্গে নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন করতে আওয়ামী মুসলিম লীগ মুখ্য ভূমিকা পালন করে। এ লক্ষ্যে ১৯৫৩’র ৪ ডিসেম্বর দলটি কৃষক শ্রমিক পার্টি, পাকিস্তান গণতন্ত্রী দল ও নেজামে ইসলামের সঙ্গে মিলে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে।

১৯৫৪ সালের মার্চের আট থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে ২২৩টি যুক্তফ্রন্টের দখলে যায়। এর মধ্যে আওয়ামী মুসলিম লীগ একাই জয়ী হয় ১৪৩টি আসনে।

২৪ বছরের পাকিস্তানি শাসনামলে আওয়ামী মুসলিম লীগ আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে দু'বছর প্রদেশে ক্ষমতাসীন ছিল এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে কেন্দ্রে ১৩ মাস কোয়ালিশন সরকারের অংশীদার ছিল।

১৯৫৫-তে ঢাকায় অনুষ্ঠিত দলের তৃতীয় জাতীয় সম্মেলনে সকল ধর্ম, বর্ণের প্রতিনিধিত্বকারী একটি উদার অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে দলটিকে গড়ে তোলার লক্ষ্যে তার নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে শুধু আওয়ামী লীগ নামকরণ করা হয়।

পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ে মতপার্থক্যের কারণে ১৯৫৭ সালে দলে ভাঙন দেখা দেয়। সে-বছরের ৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারি কাগমারি সম্মেলনে দলে বিভক্তির ঘটনা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ অবস্থায় মাওলানা ভাসানী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন।

বাংলাদেশের ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলন। মূলত এ আন্দোলনের মধ্যেই পরবর্তী কালের স্বাধীন বাংলাদেশের বীজ প্রোথিত ছিল। ১৯৬৬’র ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর এক সম্মেলনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ছয় দফা দাবি পেশ করেন। ছয় দফা দাবির মূল লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানকে একটি যৌথরাষ্ট্রে পরিণত করা এবং ছয় দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে এই যৌথরাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গরাজ্যকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা। ছয় দফার সমর্থনে সর্বপ্রথম চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী লালদিঘি ময়দানে চট্টগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর তৎকালীন বৃহত্তর চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও এক দফার প্রবক্তা চট্টল শার্দুল জননেতা এম. এ. আজিজের নেতৃত্বে প্রথম প্রকাশ্যে সভা করেন বঙ্গবন্ধু। সে-সভায় আজিজ ঘোষণা করেন, ছয় দফা না মানলে এক দফার আন্দোলন চলবে, এবং সেটা হচ্ছে স্বাধীনতার আন্দোলন। পরবর্তীতে এই ছয় দফা দাবিকে কেন্দ্র করে স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠে।

আওয়ামী লীগ তথা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান। এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পতন ঘটে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা জেনারেল আইয়ুব খান সরকারের। এ সময় আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগ এবং আরো কিছু ছাত্র সংগঠন মিলে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে তাদের ঐতিহাসিক এগারো দফা কর্মসূচি পেশ করে, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে।

স্বৈরাচারী আয়ুবশাহীর পতনের পর ১৯৭০-এ পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদ উভয় ক্ষেত্রে নজিরবিহীন সাফল্য অর্জন করে। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইতিহাসে এ নির্বাচন এক উজ্জ্বল মাইলফলক হয়ে রয়েছে। এতে পাকিস্তানের ৩১৩ আসনের জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টিতে জয়ী হয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে এবং সরকার গঠন ও শাসনতন্ত্র প্রণয়নের যোগ্যতা অর্জন করে। প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসন পায় দলটি। জাতীয় পরিষদের সাতটি মহিলা আসন এবং প্রাদেশিক পরিষদের দশটি মহিলা আসনের সবগুলোতেই জয়ী হয় আওয়ামী লীগ।

কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সত্ত্বেও আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানানোর বদলে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে বাঙালির অধিকার নস্যাৎ করার পথ বেছে নেয় পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান। এর প্রতিবাদে আওয়ামী লীগের সভাপতি ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১-এর ৭ মার্চ ঢাকার রেস কোর্সে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে) অনুষ্ঠিত এক বিশাল জনসভায় লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতিতে প্রদত্ত এক যুগান্তকারী ভাষণে বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির পূর্ণ স্বাধীনতার লক্ষ্যে সশস্ত্র সংগ্রামের ডাক দেন।

পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে পাক স্বৈর সরকার ২৫ মার্চ বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানের লায়ালপুর জেলে পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু তার আগে তিনি লিখিতভাবে বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরুর নির্দেশ দিয়ে যান, যা চট্টগ্রামের কালুরঘাটের অস্থায়ী বেতার কেন্দ্র থেকে সম্প্রচারিত করা হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনার লক্ষ্যে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সদস্যদের নিয়ে ১৯৭১-এর ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়, যা মুজিবনগর সরকার নামে পরিচিতি লাভ করে। পাকিস্তানে কারাবন্দি আওয়ামী লীগ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতেই তাঁকে এ সরকারে রাষ্ট্রপতি পদ প্রদান করা হয়। ১৭ এপ্রিল শপথ গ্রহণের মধ্যে দিয়ে এ সরকারের কার্যক্রম শুরু হয়। অবশেষে দীর্ঘ নয় মাসের সশস্ত্র যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর পূর্ণ বিজয় অর্জনের মধ্যে দিয়ে অভ্যুদয় ঘটে নবজাত বাংলাদেশের।

১৯৭২-এর শুরুতে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে দেশে ফিরে দল ও সরকারের দায়িত্বভার গ্রহণ করে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিকে পুনর্গঠনের কার্যক্রম শুরু করেন। কিন্তু মাত্র সাড়ে চার চার বছর ক্ষমতায় থাকার পর ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট দলের কিছু বিশ^াসঘাতক আর সামরিক বাহিনীর কিছু পাকিস্তানপন্থী সদস্য মিলে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী আওয়ামী লীগ নেতাদেরকেও বন্দী করে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয় এবং নভেম্বরের ৭ তারিখে কারাগারের ভেতরেই দলের চার শীর্ষ নেতা তথা বঙ্গবন্ধু সরকারের সদস্যকেও হত্যা করা হয়। এর ফলে পরবর্তী প্রায় দু দশকের জন্যে আওয়ামী লীগের ইতিহাসে গভীরতম অন্ধকার নেমে আসে। দেশ পুনরায় সাম্প্রদায়িক পাকপন্থীদের দখলে চলে যায়।

কিন্তু বিদেশে থাকার সূত্রে বেঁচে যাওয়া বঙ্গবন্ধু-কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের দায়িত্বভার গ্রহণ করে পুনরায় দলটিকে তার চিরাচরিত আন্দোলন-সংগ্রামের ধারায় ফিরিয়ে নিয়ে যান। শেষপর্যন্ত ১৯৯৫-এর নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে প্রায় কুড়ি বছর পর আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসে আওয়ামী লীগ। দলের সভাপতি জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রথম বারের মতো প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হন। এর পর ২০০০ সালের নির্বাচনে গভীর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দলটির নির্বাচনী বিজয় ছিনিয়ে নেয়া হলেও, ২০০৯ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত তিনটি সাধারণ নির্বাচনে উপর্যুপরি জয়ের মাধ্যমে রেকর্ড সৃষ্টি করে বাঙালি জাতির প্রাণের দল আওয়ামী লীগ।

আওয়ামী লীগ এক আজন্ম সংগ্রামী দলের নাম, তবে সরকারি দল হিসেবেও এর অর্জন অপরিসীম। পর পর তিনটি নির্বাচনে জয়ী হয়ে গত প্রায় দেড় দশক ধরে টানা ক্ষমতাসীন দলটি তথা এর সূর্যপ্রতিম নেত্রী প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ শনৈ শনৈ এগিয়ে চলেছে উন্নয়নের মহাসড়ক ধরে। ইতোমধ্যে দেশটি পরিণত হয়েছে উন্নয়নশীল থেকে স্বল্পোন্নত দেশে এবং দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছে উন্নত দেশ অভিধা অর্জনের দিকে। জননেত্রী শেখ হাসিনা তথা আওয়ামী লীগের শাসনাধীন বাংলাদেশ এখন পরিণত হয়েছে তৃতীয় বিশ্বের রোল মডেলে।

আওয়ামী লীগ আর বাংলাদেশের ইতিহাস অঙ্গাঙ্গীজড়িত ও অবিচ্ছেদ্য। আজকের বাংলাদেশ বস্তুত আওয়ামী লীগেরই অবদান। মহান এ দলটি হীরকজয়ন্তী উদযাপন করছে, এদেশের অসাম্প্রদায়িক, বাঙালি জাতীয়তাবাদী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহী জনগণের জন্যে এর চেয়ে বড় সুসংবাদ আর হতে পারে না।

দলীয় সূত্র থেকে জানা গেছে, টানা চতুর্থ মেয়াদ এবং মোট পঞ্চম মেয়াদে সরকার গঠন করার পর এবার ক্ষমতাসীন অবস্থায় থেকে ৭৫ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ। এর আগে পঁচিশ বছরে রজত জয়ন্তী ও পঞ্চাশ বছরে সুবর্ণ জয়ন্তী পালনের সময় দলটি ক্ষমতায় ছিল না। এবার ক্ষমতাসীন অবস্থাতেই পঁচাত্তর বছরের হীরক জয়ন্তী পালন করছে দলটি। স্বভাবতই খুব জাঁকজমকের সঙ্গে দিনটি উদযাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটির হাইকমান্ড। এ নিয়ে সম্প্রতি গণভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় কর্মকৌশল ঠিক করতে দলের সম্পাদকমণ্ডলীকে দায়িত্ব দেন দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ শতবর্ষ পূর্ণ করে সগৌরবে প্লাটিনাম জয়ন্তী পালন করুক, এটাই আমাদের একান্ত কামনা। সেদিন হয়তো আমাদের অনেকেই এ পৃথিবীতে থাকবে না। কিন্তু আমাদের শুভেচ্ছা আমৃত্যু, এমনকি মৃত্যুর পরও থেকে যাবে মহান এই রাজনৈতিক দলটির সঙ্গেই।

লেখক: কলামিস্ট, ফোকলোরিস্ট, শিক্ষাবিদ, লেখক, অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

বিষয়:

বাংলাদেশ ও আওয়ামী লীগ একে অপরের পরিপূরক

ফাইল ছবি
আপডেটেড ২৩ জুন, ২০২৪ ০০:০১
ড. কাজী এরতেজা হাসান

আজ ২৩ জুন ২০২৪; আওয়ামী লীগের ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। আওয়ামী লীগ এ উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন দল। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের অর্জন অনেক। আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় অর্জন স্বাধীন বাংলাদেশ। বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে কোনো স্বাধীন ভূখণ্ড ছিল না। আওয়ামী লীগ অতুলনীয় রাজনৈতিক গুণাবলিসম্পন্ন বিশ্বমানের একজন নেতা তৈরি করেছে। বিশ্ব রাজনীতির হাজার বছরের ইতিহাসে একটি রাজনৈতিক দলের একজন নেতার একক নেতৃত্বে মাত্র ২২ বছরের কম সময়ের মধ্যে একটি স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠার কোনো দ্বিতীয় নজির নেই। শেখ মুজিব তার ৪ দশকের রাজনৈতিক জীবনে অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। ঠিক তেমনিই জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা হিসাবে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক মুক্তির দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছেন। করোনাকালীন মহামারির সময়েও একক নেতৃত্ব আর দূরদর্শিতার মাধ্যমে জননেত্রী শেখ হাসিনা পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। এ যেন রাজনৈতিক পরম্পরা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু লড়াই, সংগ্রাম আর আন্দোলনের মাধ্যমে আমাদের স্বাধীন ও সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র উপহার দিয়েছেন। তার কন্যা হিসেবে শেখ হাসিনা আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং উন্নয়নের শিখরে পৌঁছে দিতে বিশ্বের বুকে মর্যাদাশীল জাতিতে পরিণত করছেন। তাইতো সহজ করেই বলা যায়, বাংলাদেশ ও আওয়ামী লীগ একে অপরের পরিপূরক।

আজকের ঐতিহাসিক এই দিনে আওয়ামী লীগের ৭৫ বছরকে মোটা দাগে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট নিহত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের পুরোভাবে ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। মাঝখানে ৬ বছর বাদ দিয়ে ৪৩ বছর ধরে দলের নেতৃত্বে রয়েছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। পিতা ও কন্যার মধ্যে আওয়ামী লীগে কার অবদান বেশি- সেই বিচারের ভার ইতিহাসের। তবে এটুকু বলতে পারি, কঠিন চড়াই-উতরাইয়ের ভেতর দিয়ে ৭৪ বছরের আওয়ামী লীগকে আজকের অবস্থানে আনতে নিঃসন্দেহে পিতা-কন্যাই সর্বোচ্চ অবদান রেখেছেন। বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ, আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। দৃঢ়তার সঙ্গেই বলতে পারি, একে অপরের পরিপূরক। ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যথার্থই বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছেন। আর দেশকে এগিয়ে নিচ্ছেন তার কন্যা শেখ হাসিনা।’ এটা ঠিক, আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু এবং শেখ হাসিনাকে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করে আজকের অবস্থানে আসতে হয়েছে। আওয়ামী লীগ গঠনের পর থেকেই পশ্চিমা শোষক, শাসক ও পাকিস্তান সামরিক চক্র এ দলের বিরোধিতা করে আসছে। পাকিস্তানের ২২ বছরে প্রায় ১২ বছর শেখ মুজিবকে জেলে অন্তরীণ রাখা হয়। শুধু পূর্ব বাংলার মানুষের পক্ষে ন্যায্য কথা বলার জন্য শেখ মুজিবকে দু’বার ফাঁসির মঞ্চে যেতে হয়েছে। শেখ মুজিব তার কঠিন রাজনৈতিক জীবনে কোনোদিন আত্মগোপনে যাননি। তিনি যে কতবার গ্রেপ্তার হয়েছেন, এরও সঠিক হিসাব এ পর্যন্ত কেউ দিতে পারেনি। জেলে যাওয়ার জন্য একটি ছোট্ট বেডিং সব সময়ই রেডি থাকত। জেলখানাকে বলা হতো মুজিবের দ্বিতীয় বাসভবন। বাংলা ও বাঙালির দুঃখী মানুষের নেতা শেখ মুজিবের কোনো পারিবারিক জীবন ছিল না। জেল থেকে বের হয়ে নৌকায়, সাইকেলে ও হেঁটে সারা বাংলা ঘুরে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করেছেন।

প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের চাটুকার গভর্নর মোনায়েম খান প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘আমি যতদিন গভর্নর থাকব, শেখ মুজিব ততদিন সূর্যের মুখ দেখতে পারবে না।’ অর্থাৎ মুজিবকে জেলের ভেতরেই থাকতে হবে। মোনায়েম খান এমন কথাও বলেছিলেন, ‘কোনো সরকারি কর্মকর্তা শেখ মুজিবের মেয়েকে বিয়ে করলে তাকে চাকরিচ্যুত করা হবে।’ কিন্তু ফাঁসির মঞ্চে নিয়েও সাহসের বরপুত্র শেখ মুজিবকে দমাতে পারেনি। আসলে শেখ মুজিবের লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে তিনি বাংলাদেশকে স্বাধীন করবেন। শেষ পর্যন্ত তিনি কামিয়াব হন। তরুণ নেতা শেখ মুজিবসহ অন্য নেতারা পাকিস্তান সৃষ্টির অব্যবহিত পরেই বুঝে ফেলেন, এ অদ্ভুত আকৃতির দেশ দীর্ঘকাল টিকে থাকবে না। ১৯৪৯ সালের ১৮, ১৯ ও ২০ জুন পূর্ববঙ্গ মুসলিম লীগের দ্বিতীয় কাউন্সিলে মুসলিম লীগের প্রথম সারির নেতা চৌধুরী খালিকুজ্জামান পূর্ব বাংলার নেতাদের একাংশকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে অভিযুক্ত করেন। এই সম্মেলনের প্রতিক্রিয়া হিসেবেই দীর্ঘদিন ধরে ক্ষুব্ধ পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতারা ১৯৪৯-এর ২৩ জুন ঢাকার টিকাটুলির কেএম দাশ লেনে অবস্থিত রোজ গার্ডেন হলরুমে আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে একটি সম্মেলনে মিলিত হন। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক সম্মেলনে কিছুক্ষণের জন্য উপস্থিত থেকে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। সভায় পূর্ব বাংলায় একটি আসনের উপনির্বাচনে বিজয়ী প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য (এমএলএ) শামসুল হক ‘মূল দাবি’ নামক একটি লিখিত পুস্তিকায় পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ, জনগণের প্রত্যাশা ইত্যাদি বিষয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করেন। সারা দেশ থেকে শ’তিনেক প্রতিনিধি ওই সম্মেলনে উপস্থিত হন। এই সম্মেলনেই পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দল ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ গঠন করা হয়। মওলানা ভাসানীকে সভাপতি ও শামসুল হককে সাধারণ সম্পাদক করে ৪০ সদস্যবিশিষ্ট সাংগঠনিক কমিটি গঠন করা হয়। যুবনেতা শেখ মুজিব কারাগারে থেকেই মাত্র ২৯ বছর বয়সে দলের প্রথম যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। কমিটির অন্য নেতারা হলেন- সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট আতাউর রহমান খান, সাখাওয়াত হোসেন (ঢাকা চেম্বারের প্রেসিডেন্ট), আলী আহমদ এমএলএ, অ্যাডভোকেট আলী আমজাদ খান, অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম খান, ২নং যুগ্ম সম্পাদক খোন্দকার মোশতাক আহমদ, সহ-সম্পাদক এ কে এম রফিকুল হোসেন এবং কোষাধ্যক্ষ ইয়ার মোহাম্মদ খান।

কারাগার থেকে যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত শেখ মুজিব মুক্তিলাভ করেন জুলাইয়ের শেষ দিকে। জেল থেকে বের হয়ে তিনি বিরাজমান খাদ্য সংকটের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করেন। শেখ মুজিব সেপ্টেম্বরে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের দায়ে গ্রেপ্তার হয়ে কয়েকদিন পর বের হয়ে আসেন। অক্টোবরে আওয়ামী মুসলিম লীগের সভায় পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিনের পদত্যাগ দাবি করেন শেখ মুজিব। ১৯৫৩ সালের ৯ জুলাই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে শেখ মুজিব দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এর আগে শামসুল হক অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। স্বাধীনতা লাভের মাত্র ৮ বছরের মাথায় ১৯৫৫ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ কার্যকরী পরিষদের সভায় সিদ্ধান্ত হয় যে, ‘পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন দেওয়া না হলে দলীয় সদস্যরা আইনসভা থেকে পদত্যাগ করবেন।’ এভাবেই আওয়ামী লীগ স্বায়ত্তশাসন দাবির মাধ্যমে স্বাধীনতার সোপান তৈরি করে। গোড়া থেকেই পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার দৃঢ় প্রত্যয় যে শেখ মুজিবের ছিল, তা গণপরিষদের প্রদত্ত তার বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়। ২৫ আগস্ট (১৯৫৫) করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদে প্রদত্ত বক্তব্যে শেখ মুজিব বলেন, ‘আমরা বহুবার দাবি জানিয়েছি যে, আপনারা পূর্ব পাকিস্তানকে বাংলা নামে ডাকেন। বাংলা শব্দটার একটা নিজস্ব ইতিহাস আছে, আছে এর একটা ঐতিহ্য। এই নাম আপনারা আমাদের জনগণের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে পরিবর্তন করতে পারেন। আপনারা যদি ওই নাম পরিবর্তন করতে চান, তাহলে আমাদের বাংলায় আবার যেতে হবে এবং সেখানকার জনগণের কাছে জিজ্ঞেস করতে হবে তারা নাম পরিবর্তনকে মেনে নেবে কিনা।’ এভাবে আইনসভায় পশ্চিম পাকিস্তানিদের আপনারা আর পূর্ব পাকিস্তানিদের আমরা বলে উল্লেখ করে মুজিব জানান দিলেন, পাকিস্তান এক সময় দুই টুকরো হয়ে যাবে। ওই বছরই (১৯৫৫) ২১ অক্টোবর দলের বিশেষ কাউন্সিলে আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কাউন্সিলে শেখ মুজিব দ্বিতীয়বারের মতো সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৬ সালের ২৪ জুলাই আওয়ামী লীগের সভায় প্রশাসনে সামরিক বাহিনীর প্রতিনিধিত্বের বিরোধিতা করে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯৫৭ সালের ৩০ মে শেখ মুজিব পুরো সময় দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেন। আওয়ামী লীগ আজকে বঙ্গবন্ধু ও দলের সেই আদর্শ থেকে দূরে সরে এসেছে। ওই সময় সিদ্ধান্ত ছিল, যিনি মন্ত্রী হবেন, তিনি দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকতে পারবেন না। ১৯৭২ সালে দলের বিশেষ কাউন্সিলে অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ সাধারণ সম্পাদক পদ ছেড়ে দিলে জিল্লুর রহমান সেই পদে নির্বাচিত হন। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু সভাপতির পদ ছেড়ে দেন। মন্ত্রিত্ব ছেড়ে ওই পদে আসেন এএইচএম কামারুজ্জামান।

আওয়ামী লীগের ইতিহাস, বাংলাদেশের ইতিহাস। একটি মাত্র লেখার মাধ্যমে এই ঐতিহ্যবাহী দল সম্বন্ধে কোনোকিছুই লেখা সম্ভব নয়। আইয়ুবের সামরিক শাসনের বেড়াজালের মধ্যে ১৯৬৪ সালের ২৫ জানুয়ারি শেখ মুজিবের বাসভবনে অনুষ্ঠিত সভায় আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত করা হয়। ১৯৬৬ সালের ২০ মার্চ শেখ মুজিব সভাপতি ও তাজউদ্দীন আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলগুলোর জাতীয় সম্মেলনে ৬-দফা দাবি পেশ করেন বাংলার নেতা মুজিব। আওয়ামী লীগ নেতারা ৩ মাসের প্রচারণায় ছয় দফাকে জনপ্রিয় দাবিতে পরিণত করে তোলেন। এরপর আবার শুরু হলো গ্রেপ্তার, হয়রানি, নির্যাতন। আওয়ামী লীগ, শ্রমিক লীগ, ছাত্রলীগের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার ও জামিনে মুক্তির পর ৬৬-এর ৮ মে রাতে মুজিব, তাজউদ্দীনসহ বড় নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয় দেশরক্ষা আইনে। গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ও ছয় দফার সমর্থনে স্বৈর-সামরিক শাসনের মধ্যেই ৭ জুন সফল হরতাল পালন করা হয়। এরপর মুজিবকে হত্যার জন্য নয়াষড়যন্ত্র করে আইয়ুব-মোনায়েম চক্র। ১৯৬৮-এর ৩ জানুয়ারি শেখ মুজিবকে এক নম্বর আসামি করে ৩৫ জনের বিরুদ্ধে দায়ের করা হলো আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। ১৭ জানুয়ারি রাতে বঙ্গশার্র্দুল মুজিবকে মুক্তি দিয়ে জেলগেটে পুনরায় গ্রেপ্তার করে সেনানিবাসে আটক রাখা হয়। ষড়যন্ত্র মামলার বিচার শুরু হয় ১৯ জুন। এ সময় জেলে থেকেই শেখ মুজিব বাংলার মানুষের মুকুটহীন সম্রাটে পরিণত হন।

গণঅভ্যুত্থানে ১৯৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে মুজিবসহ ৩৪ জনকে মুক্তি দেওয়া হলো। এর আগে ১৫ ফেব্রুয়ারি অন্যতম আসামি সারজেন্ট জহুরুল হককে ঢাকা কারাগারে গুলিতে হত্যা করে পাকি সামরিক চক্র। ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে লাখ লাখ লোকের সমাবেশে শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ’৬৯-এর ৫ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু সোহরাওয়ার্দীর স্মরণসভায় পূর্ব পাকিস্তানের নামকরণ করেন বাংলাদেশ। ১৯৬৯-এর ২৫ মার্চ আইয়ুবের বিদায়ের পর জেনারেল ইয়াহিয়া রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। আগেই বলেছি, আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর বড় অর্জন বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশে পরিণত করা। ’৭০-এর ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে পূর্ব বাংলায় ১৬৯ (১৬২+৭) আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬৭ (১৬০+৭) আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। ১৭ ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টি পায় আওয়ামী লীগ। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে ইয়াহিয়ার সামরিক চক্র। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানিদের কামান-বন্দুকের সামনে প্রকারান্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ২৩ মার্চ বঙ্গবন্ধুর বাসভবনসহ সারা বাংলাদেশে স্বাধীন বাংলার পতাকা ওড়ানো হয়। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সামরিক চক্র বাংলার নিরস্ত্র মানুষের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়। ওই রাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পূর্বে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের আম্রকাননে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য প্রবাসী সরকার শপথ গ্রহণ করে। শত্রুর হাতে বন্দী বঙ্গবন্ধু মুজিবকেই করা হয় রাষ্ট্রপতি। বঙ্গবন্ধুর নামেই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও তাজউদ্দীন আহমেদ এবং সৈয়দ নজরুল ইসলামদের যোগ্য পরিচালনায় ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর দেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। ’৭২-এর ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু স্বদেশে ফিরে আসেন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার মাত্র দশ মাসে জাতিকে সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য সংবিধান উপহার দেয়। সরকার অল্প সময়ে বিশ্বের প্রায় সব দেশের স্বীকৃতি আদায় করে। স্বাধীনতার শত্রুরা সাড়ে তিন বছরের মাথায় সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। জিয়ার সামরিক চক্র আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করতে ১৯৭৮ সালে বিএনপি গঠন করে। জিয়া, এরশাদ, খালেদা তিনজনই জাতির পিতা হত্যার বিচার বন্ধ, স্থগিত ও আত্মস্বীকৃত খুনিদের পুরস্কৃত করেন। ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারিতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের কামড়াকামড়ির মধ্যে দিল্লি প্রবাসী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দলের সভানেত্রী নির্বাচিত হন। ১৭ মে দেশে ফিরে তিন ভাগে বিভক্ত আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ করেন শেখ হাসিনা।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ৩ মাসের মধ্যে ১৯৭৫ এর ৭ নভেম্বর সেনাপ্রধান জিয়া উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। এরপর তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও রাষ্ট্রপতির গদি ছিনতাই করে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হন। ঘাতক সর্দার জিয়া শুধু বঙ্গবন্ধু হত্যা-ষড়যন্ত্রে মদদ দেননি, তিনি বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসকে সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলার অপচেষ্টা করেন। তিনি স্বাধীনতাবিরোধী পাকিস্তানের দালালদের ক্ষমতায় বসান। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করেন।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের এবং বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার একজন কর্মী হিসাবেই নিজেকে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করি। তাইতো দেশরত্ন শেখ হাসিনার নির্দেশে স্বাধীনতার ৫১ বছর পর সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় করে দিয়েছি। ওই সময় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনাকে জানানোর পর তিনি অত্যন্ত খুশি হয়ে শুধু এতটুকুই বলেছেন, মনসুর ভাই পারেননি, তুমি করেছো; খুব ভালো হয়েছে। এটাই আমার প্রাপ্তি। সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের স্থায়ী কার্যালয়ের কাজও এ বছরই শুরু করতে পারবো বলে নেত্রীকে কথা দিয়েছি।

আমি মনে করি, ইতিহাস একদিন বলবে; মুক্তিযোদ্ধা জিয়া প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতাযুদ্ধে অনুপ্রবেশকারী ছিলেন। এটা যদিও এখন দালিলিক প্রমাণ পাওয়া গেছে এ বিষয়ে। জিয়া, এরশাদ ও খালেদা তিনজনই পাকিস্তানের প্রেতাত্মা। এ তিন কুচক্রী মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে মিনি পাকিস্তানে পরিণত করেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা নেতৃত্বে এসে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে ফিরিয়ে আনেন। জিয়া-এরশাদ তো স্বাধীন বাংলাদেশকে প্রায় পূর্ব পাকিস্তানে রূপান্তরিত করেছিল। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা আসলে জিয়ার বানানো পূর্ব পাকিস্তানেই ফিরে আসেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজনীতি করে বঙ্গবন্ধুকন্যা আওয়ামী লীগকে ভারতীয় কংগ্রেসের ধারায় ফিরিয়ে এনেছেন। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারতীয় কংগ্রেস একাধারে ৩০ বছর ক্ষমতায় ছিল। কংগ্রেসের নেতৃত্বেই ভারত স্বাধীন হয়। স্বাধীনতাবিরোধী জিয়াচক্র বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সাড়ে তিন বছরের মাথায় রাষ্ট্রপিতাকে হত্যা করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করে। শেখ হাসিনা জনক হত্যার ২১ বছর পর আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা ২০০৮ থেকে পর পর ৩ বার নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এনেছেন। যতদূর জানা যায়, গণতান্ত্রিক বিশ্বে ভোটের মাধ্যমে এভাবে অন্য কোন নেতা শেখ হাসিনার মতো ৪বার নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়নি। আজকের এই বাংলাদেশ, বহির্বিশ্বে আমরা গর্বিত জাতিতে পরিণত হয়েছি। বিশ্বের বুকে এক সময় তলাবিহীন ঝুড়ি যারা বলতো, তারাই এখন বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত করায় জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন। বিশ্বের বুকে বাংলাদেশিরা এখন মর্যাদাশীল জাতিতে পরিণত হয়েছেন শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণেই। বিশ্ব মোড়লদের বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অর্থনৈতিক সক্ষমতার সফলতা দেখিয়ে চলছেন নিরন্তর। আওয়ামী লীগই একমাত্র রাজনৈতিক দল, যে দলটি বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের জন্য রাজনীতি করে। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজগুলো করে যাচ্ছেন শেখ হাসিনা। আমি মনে করি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে যতদিন বাংলাদেশ, ততদিনই নিরাপদ এবং উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকবে। আমাদের সকলের উচিত শেখ হাসিনার হাতকে আরও শক্তিশালী করা। আজকের এই দিনে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্য কামনা করছি। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক ভোরের পাতা, দ্য পিপলস টাইম

বিষয়:

সিলেটে বন্যার নেপথ্য কারণ

আপডেটেড ২২ জুন, ২০২৪ ১১:৫৩
শফিকুল ইসলাম

চলতি মৌসুমের তৃতীয় দফা বন্যার কবলে সিলেটসহ কয়েকটি জেলা। বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকায় বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বন্যার এমন ভয়াবহ রূপ আগে কখনো দেখেনি সিলেটবাসী। একের পর এক বন্যায় বিপর্যস্ত এ অঞ্চলের বাসিন্দারা। লাখো মানুষ পানিবন্দি।

হঠাৎ এমন বন্যার পেছনে মূল কারণ হলো বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা চেরাপুঞ্জিতে রেকর্ড বৃষ্টিপাতের ফলে ভারতের আসাম ও মেঘালয়ে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়ে পড়ে। পাশাপশি তুলনামূলক নিচু এলাকা বাংলাদেশের সিলেট ও আশপাশের এলাকা ডুবিয়ে দেয়।

এ বিষয়ে পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মত, চার কারণে বন্যায় নাকাল অবস্থা সিলেটের। সেগুলো হলো- নদীর নাব্যসংকট, হাওরে অপরিকল্পিত বাঁধ ও স্লুইচগেট নির্মাণ, হাওর-বিল-ঝিল ভরাট, নির্বিচারে পাহাড়-টিলা কাটা।

তারা আরও বলেন, মেঘালয়ে বৃষ্টিপাতের কারণে যে পাহাড়ি ঢলের সৃষ্টি হয়, এর সবই চলে আসে সিলেটে। সেই ঢলে আসা পাহাড়ি বালু-মাটি-পলি জমতে জমতে নদ-নদীগুলো প্রায় ভরাট হয়ে গেছে। এতে নদীগুলো ক্রমে সংকীর্ণ ও ভরাট হয়েছে। পাশাপাশি যেখানে-সেখানে স্লুইসগেট ও অবকাঠামো নির্মাণের কারণেও নদীর প্রবাহপথ আরও বেশি সংকুচিত হয়েছে। যে কারণে বৃষ্টির পানিতেই বন্যায় এত ভয়াবহতা।

এ রকম পরিস্থিতি সমাধানের পথগুলো হচ্ছে- সিলেটের নদ-নদীগুলোর নাব্য বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। সিলেটের প্রধান দুটি নদী সুরমা ও কুশিয়ারাসহ অন্যান্য নদ-নদী খনন করা এবং সিলেট নগরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত প্রাকৃতিক ছড়াগুলো দখলমুক্ত করে খনন করা। এভাবেই পানিপ্রবাহের স্বাভাবিক পথ নিশ্চিত হবে।

দেশের অনেক অঞ্চল যখন পুড়ছে তীব্র দাবদাহে, তখন সিলেট ভাসছে জলে। সেখানে বিরাজ করছে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি। বন্যায় প্রায়ই তলিয়ে যায় সিলেটসহ আশপাশের হাওর এলাকার ফসল। এবার বন্যা এসেছে আরও ভয়ংকর রূপে। তলিয়ে গেছে প্রায় পুরো সিলেট। সুনামগঞ্জসহ আরও কয়েকটি জেলার বেশির ভাগ এলাকা জলমগ্ন।

সিলেটের প্রধানতম নদী কুশিয়ারা, সুরমার দুই রূপ। বর্ষায় দুই কোল উপচে ডুবিয়ে দেয় জনবসতি। আর গ্রীষ্মে শুকিয়ে পরিণত হয় মরা গাঙে। জেগে উঠে চর। প্রায় ২৪৯ কিলোমিটার দীর্ঘ সুরমা দেশের দীর্ঘতম নদী। ভারতের বরাক নদী থেকে সিলেটের জকিগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মেঘনায় মিলিত হয়েছে। এই নদী বছরের বেশির ভাগ সময় থাকে পানিহীন, মৃতপ্রায়। পলি জমে ভরাট হয়ে পড়েছে নদীর তলদেশ। ফলে শুষ্ক মৌসুমে সুরমা হয়ে পড়ে বালুভূমি। অন্যদিকে অল্প বৃষ্টিতেই নদী উপচে নদী তীরবর্তী এলাকায় দেখা দেয় বন্যা। বৃষ্টিতে নদীর পানি উপচে তলিয়ে যায় হাওরের ফসল।

ভরাট হয়ে পড়েছে এ নদীর উৎসমুখও। শুষ্ক মৌসুমে নদীর উৎসমুখের ৩২ কিলোমিটারে জেগেছে ৩৫টি চর। দুই দেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় যৌথ নদী কমিশনে সিদ্ধান্ত না হওয়ায় আটকে আছে উৎসমুখ খননও।

গত ২০১৮ সালে সিলেট সদর উপজেলার কানিশাইলে ৬০০ মিটার সুরমা নদী খনন করা হয়। ওই সময় সিলেট সদর উপজেলা এবং কানাইঘাট উপজেলার কয়েকটি অংশে নদী খননের জন্য প্রস্তাবনা পেশ করা হয়, তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।

সুরমাসহ এই এলাকার নদীগুলো খননের জন্য একটি প্রকল্প পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেট বিভাগের প্রকৌশলীদের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে, তাও বছর দুই পার হয়ে গেছে। ‘সুরমাসহ এই এলাকার বেশির ভাগ নদীই নাব্য হারিয়েছে। এগুলো খনন করা প্রয়োজন। নদী খননের জন্য ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে এটি মন্ত্রণালয়ের বিবেচনাধীন।’

এদিকে গত তিন দশকে ভরাট হয়ে গেছে নগরীর অর্ধশতাধিক দীঘি। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) হিসেবে, ১৫-২০ বছর আগেও সিলেট নগরে অর্ধশতাধিক বৃহৎ দীঘি ছিল। অথচ এখন ঠিকে আছে মাত্র ১০-১১টি। বাকিগুলো ভরাট হয়ে গেছে। অনেক জলাশয় ভরাট করে সরকারি প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে।

এ ছাড়া সিলেটের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ছোট-বড় প্রায় ২৫টি প্রাকৃতিক খাল। যা ‘ছড়া’ নামে পরিচিত। পাহাড় বা টিলার পাদদেশ থেকে উৎপত্তি হয়ে ছড়াগুলো গিয়ে মিশেছে সুরমা নদীতে। এসব ছড়া দিয়েই বর্ষায় পানি নিষ্কাশন হতো। ফলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতো না।

এখন অনেক স্থানে এসব ছড়ার অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায় না। ছড়াগুলো দখল হয়ে যাওয়ায় অল্প বৃষ্টিতেই নগরজুড়ে দেখা দেয় জলাবদ্ধতা।

অন্যদিকে ভাটি এলাকায় হাওর কেটে করা হয়েছে উঁচু রাস্তা, ব্রিজ ও কালভার্ট। কিশোরগঞ্জ জেলায় হাওরে তিন উপজেলায় করা হয়েছে উঁচু রাস্তা, ব্রিজ ও কালভার্ট। এগুলো অনেক বিশাল এলাকাজুড়ে করা হয়েছে, যার ফলে স্বাভাবিক পানি প্রবাহে বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একে তো নদীর নাব্য নেই আবার অবাধ হাওর দিয়েও পানিপ্রবাহের গতিও রুদ্ধ। অপরিকল্পিতভাবে হাওর কেটে রাস্তাও বন্যা কারণ হিসেবে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

লেখক: সাংবাদিক ও সমাজকর্মী


শক্তিশালী করতে হবে শুদ্ধতার সংগ্রাম

আপডেটেড ২২ জুন, ২০২৪ ১১:৫৩
মো. রহমত উল্লাহ্

বাংলাদেশ বেতারের একজন সহকারী প্রকৌশলী আদনান ফেরদৌস চাকরি ছেড়ে সাব-রেজিস্ট্রার পদে যোগদান করেছেন বলে অনেক আলোচনা ও সমালোচনা হচ্ছে। ক্যাডার পদ ছেড়ে নন-ক্যাডার পদে যাওয়াটাকে অনেকেই ভালো চোখে দেখছেন না, দেখার কথাও নয়। কেউ কেউ বলছেন তথ্য বিভাগে পদোন্নতি অত্যন্ত সীমিত, তাই এখানে কর্মকর্তারা থাকতে চান না। এটি যৌক্তিক বলে মনে হয় না। কেননা, আমার জানা-দেখা অনেক সাব-রেজিস্ট্রার সারাজীবন একই পদে চাকরি করে অবসরে গিয়েছেন। অবশ্য তারা প্রায় সবাই অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন তা সবাই জানেন। হয়তো এ কারণেই আদনান ফেরদৌসের চাকরি পরিবর্তনের উদ্দেশ্য অসৎ বলে অগণিত মন্তব্য দেখা যায় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। প্রায় সবাই তার চিন্তা-চেতনাকে বিভিন্নভাবে অসৎ আখ্যায়িত করেছেন। এটি অযৌক্তিক নয়। সবাই জানেন সাব-রেজিস্ট্রারের অবৈধ আয় লাগামহীন। (গত ৯ জুন ২০২৪ তারিখে প্রকাশিত দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার শিরোনাম হচ্ছে, ‘কুমিল্লার আদর্শ সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস: দুই বছরে ২৫ কোটি টাকা ঘুষ নিয়েছেন সাব-রেজিস্ট্রার।’) কেউ কেউ বলেছেন, যেহেতু আদনান ফেরদৌসের অসৎ উদ্দেশের বিষয়টি প্রায় প্রমাণিত, সেহেতু তাকে সাব-রেজিস্ট্রার পদে যোগদান করতে দেওয়া উচিত হয়নি। বাস্তবে আইনগতভাবে তা সম্ভব নয়। এসব সমালোচনা শুনে সম্পদের পাহাড়ে বসা অবসরপ্রাপ্ত ও কর্মরত সাব-রেজিস্ট্রাররা হয়তো একটুও লজ্জা পাচ্ছেন না, বরং আমাদের বোকা ভেবে মুচকি হাসছেন!

আদনান ফেরদৌস যদি সাব-রেজিস্ট্রার পদ ছেড়ে বাংলাদেশ বেতারের সহকারী প্রকৌশলী পদে যেতেন তো নিশ্চয়ই এমন সমালোচনা হতো না। তাহলে এখন তাকে নিয়ে এত সমালোচনা কেন? তার সঙ্গে অন্যান্য যারা সাব-রেজিস্ট্রার পদে যোগদান করেছেন, তাদের নিয়ে কিন্তু কোনো সমালোচনা আমরা শুনছি না। যদিও তাই হওয়া উচিত ছিল। তাদের উদ্দেশ্যও কিন্তু আদনান ফেরদৌস থেকে ভিন্ন হওয়ার কথা নয়। তারাও তো অন্য চাকরি থেকে সাব-রেজিস্ট্রার পদকে লোভনীয় মনে করে অগ্রাধিকার দিয়ে অনেক চেষ্টা করে নিয়োগপত্র হাত করে যোগদান করেছেন। কেউ তাদের ঘৃণা করে বয়কট করবেন বা আত্মীয়তা করতে চাইবেন না, এমনটি হবে বলে মনে হয় না। বরং আগে যারা পাত্তা দিতেন না, এখন তারা প্রায় সবাই অধিক গুরুত্ব দেবেন। দেখতে যেমনই হোক উত্তম পাত্র-পাত্রী পাওয়ার ও সফল স্বামী-স্ত্রী হওয়ার প্রতিযোগিতায় তারা অন্য অনেক চাকরির তুলনায় বহুগুণ এগিয়ে গেছেন। খোঁজ নিলে জানা যাবে তারা এলাকায় ও আত্মীয়স্বজনের মধ্যে আদৃত হচ্ছেন, বাহবা পাচ্ছেন!

আমাদের দেশে কর্ম পছন্দ-সংক্রান্ত সমালোচনার বিষয় কিন্তু আরও অনেক আছে। যখন প্রকৌশলী, চিকিৎসক, কৃষিবিদ ইত্যাদি বিশেষ ডিগ্রিধারীরা এসে কাস্টম অফিসার, পুলিশ অফিসার, অ্যাডমিন ক্যাডার ইত্যাদি পদে নিয়োগ নিচ্ছেন ও যোগদান করছেন তখন কিন্তু এত সমালোচনা শোনা যাচ্ছে না। তাদের উদ্দেশ্য কি প্রশ্নবিদ্ধ নয়? যখন শিক্ষকতার মতো সম্মানজনক কাজ তথা শিক্ষা ক্যাডার বাদ দিয়ে অনেকেই অন্য ক্যাডারে বা চেয়ারে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করছেন ও যাচ্ছেন তখন কিন্তু এত সমালোচনা হচ্ছে না। অ্যাডমিন ক্যাডারে কেউ সুযোগ পেলে তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়, তাকে নিয়ে অনেক লেখালেখি করা হয়, তাকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার জন্য অনেক কিছুই করা হয়! তার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা হয় না! অথচ শিক্ষার্থীদের ক্যাডারের যোগ্য করে তোলার জন্য যারা নিয়োজিত থাকেন, বিসিএস পরীক্ষার প্রশ্ন তৈরি করেন, উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেন, সেই শিক্ষা ক্যাডারে কেউ সুযোগ পেলে তাকে কিন্তু সংবর্ধনা দেওয়া হয় না! বিসিএস পরীক্ষার ফরম পূরণের সময় প্রায় সব প্রার্থীর সর্বশেষ পছন্দ থাকে শিক্ষা ক্যাডার! সর্বশেষ সুযোগ কাজে লাগিয়েও অন্য পেশায় চলে যেতে চান, চলে যান শিক্ষক। এসব কি দুঃখজনক নয়? সর্বাধিক যোগ্যরা শিক্ষক হবেন, অন্য পেশা ছেড়ে শিক্ষকতায় আসবেন, শিক্ষকরা সর্বাধিক সচ্ছল ও সম্মানিত হবেন, তবেই তো শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করবে জাতি। অথচ এ জন্য আমরা কিন্তু তেমন কিছুই করছি না! যখন উচ্চশিক্ষিতরা অনেক চেষ্টা-তদবির করে অবৈধ আয়ে ভরপুর বিভিন্ন বিভাগের ছোট ছোট পদ হাত করছেন ও যোগদান করছেন তখন কিন্তু আমরা তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে খুব বেশি সমালোচনা করছি না। বরং প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে গেলে, পরিশ্রম করে বৈধ উপার্জন করতে গেলে, সৎভাবে সাধারণ জীবনযাপন করতে গেলে, আমরা অনেকেই বলছি- সে লেখাপড়া করে কী করেছে? একটা সরকারি চাকরি ম্যানেজ করতে পারে নাই! আবার সরকারি চাকরি সৎভাবে করে, সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করে, দেশকে বা মানুষকে সেবা দিয়ে সাধারণ জীবনযাপন করে, কেউ অবসরে এলে আমরাই কেউ কেউ বলছি- সে সারাজীবন সরকারি চাকরি করে কিছুই করতে পারল না! অথচ সব চাকরির ক্ষেত্র যদি সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত হতো, সব চাকরির বৈধ সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে যদি ন্যায্যতা নিশ্চিত হতো, পদ-পদবি-পরিচিতি নির্বিশেষে সব অপরাধীর যথাযথ শাস্তি যদি নিশ্চিত হতো, সর্বক্ষেত্রে সবার ন্যায্য অধিকার ও প্রাপ্য মর্যাদা যদি নিশ্চিত থাকত, তাহলে নিশ্চয়ই আলোচিত পরিস্থিতির চিত্রটি অন্যরকম হতো।

দুর্নীতিবাজদের মোটা অঙ্কের অনুদান নিয়ে অনেক মসজিদ-মাদ্রাসায় কমিটির নেতা-কর্মী বানানো হচ্ছে! সেসব দুর্নীতিবাজদের তোয়াজ করে বেড়াচ্ছেন কতিপয় হুজুর ও তাদের অনুসারীরা! অধিক চতুর দুর্নীতিবাজরা সুদ খেয়ে, ঘুষ খেয়ে, চাঁদাবাজি করে, দখলদারি করে এসে স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসা বানিয়ে সেখানকার নেতা বনে যাচ্ছেন। এসব করে অবৈধ ও কালো টাকা ধর্মীয়ভাবে সাদা হয় ও অবৈধ উপার্জনের পাপ মাফ হয় বলে আমার জানা নেই! পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, টাকা হলে সবই হয়! যার টাকা নেই তার কিছুই নেই! এই অশুভ পরিস্থিতি কিন্তু অনেক মানুষের দুর্নীতির আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে!

বেশির ভাগ ভোটারের মানসিকতা এমন হয়েছে যে, টাকা না দিলে, খাবার না দিলে, সুযোগ-সুবিধা না দিলে, ভোট দিবে না; প্রার্থী যতই সৎ ও যোগ্য হোক! অবৈধ সুযোগ-সুবিধা না দিলে সঙ্গে বা পাশে থাকবে না কর্মী, দায়িত্ব পালন করবে না কর্মচারী। রোদ-বৃষ্টি-ঈদ-পূজা ইত্যাদি উসিলা পেলেই জিনিসের দাম বাড়িয়ে দিবে ব্যবসায়ীরা, ভাড়া বাড়িয়ে দিবে রিকশাওয়ালা ও গাড়িওয়ালা! সুযোগ পেলেই সামান্য পানি মিশিয়ে দিবে দুধে। অর্থাৎ যার যতটুকু সুযোগ বা ক্ষমতা আছে, সে ততটুকুই দুর্নীতি করতে উদগ্রীব! এতে মনে হচ্ছে মনস্তাত্ত্বিকভাবে আমরা অনেকেই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছি! মনস্তাত্ত্বিকভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষের চিন্তা-চেতনা সর্বত্রই দুর্নীতির পক্ষে যুক্তি খুঁজে! তাদের কেউ এক টাকার দুর্নীতিবাজ, কেউ লাখ টাকার দুর্নীতিবাজ, কেউ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতিবাজ। নীতিকথা আজ মূল্যহীন, নীতিবানরা আজ অবহেলিত, বিজ্ঞরা মূর্খের অধীন, সততা মানেই দরিদ্রতা। সবকিছুই যেন গ্রাস করেছে দুর্নীতির দুষ্টচক্র! দুর্নীতি করা, দুর্নীতিকে সমর্থন করা, দুর্নীতিবাজকে সম্মানিত করা, যখন সামাজিকভাবে স্বাভাবিক হয়ে যায় তখন সমাজের মানুষের মানসিকতা কতটা অস্বাভাবিক হয়ে গেছে, তা কিঞ্চিৎ অনুমান করা যায়! এমন অস্বাভাবিক মানসিকতার ধারকই আদনান ফেরদৌস ও অন্যরা। এমন অস্বাভাবিক দুর্নীতিপরায়ণ মানসিকতা একদিনে কিংবা এক যুগে তৈরি হয় না, আমাদেরও হয়নি। এটি কত যে ভয়াবহ, তা আমরা অনেকেই অনুমান করতে পারছি না এখনো। মনে পচন ধরে গেলে মানুষের আর অবশিষ্ট থাকে না কিছুই!

আমাদের সবারই যে দুর্নীতিপরায়ণ মানসিকতা তৈরি হয়ে গেছে তা কিন্তু নয়। নিজের অস্তিত্ব জানান দেয় না, দিতে পারে না, এমন অগণিত ভালো মানুষ এখনো আমাদের সমাজের আনাচে-কানাচে বিদ্যমান। তবে সামাজিকভাবে স্বেচ্ছায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার মতো সক্রিয় মানুষের সংখ্যা লক্ষণীয়ভাবে কমে গেছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। কেননা, তেমনটি করতে গেলে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। কেউ ন্যায়ের পক্ষে ও অন্যায়ের বিপক্ষে সামান্য এগিয়ে এলেই আঘাত করা হয়, ফেলে দেওয়া হয়! এর বিচার চাইতে গেলেও বিপদ হয়! আমরা স্বীকার করি বা না করি বাস্তবতা হচ্ছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভালোরা ঐক্যহীন, শক্তিহীন ও দুর্বল আর মন্দরা ঐক্যবদ্ধ, শক্তিধর ও সবল! এমতাবস্থায় আমাদের নতুন প্রজন্মের ভালোরা, যোগ্যরা ও দক্ষরা বাধ্য হয়েই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে দেশ থেকে, পাড়ি জমাচ্ছে বিদেশে। এতে মাঠ খালি পেয়ে খুশি হয়ে তবল বাজাচ্ছে অযোগ্য আর দুষ্টুরা! আমাদের অনেকেই বিশ্বসেরা হচ্ছে বিদেশে গিয়ে অনুকূল পরিবেশ পেয়ে। অথচ তারা দেশে থাকলে দেশটাই বিশ্বসেরা হতে পারত তাদের দ্বারা। যারা বিদেশ যেতে পারছে না বা চাচ্ছে না; অথচ সৎভাবে পরিশ্রম করে সচ্ছল জীবনযাপন করতে চাচ্ছে, তারা চাকরি নিচ্ছে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে। একটু লক্ষ করলেই দেখা যায়, ব্যাংক ও আইটি সেক্টরসহ বিভিন্ন প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে আমাদের অনেক যোগ্য সন্তান। দুর্নীতিকে ঘৃণা করার মতো, দুর্নীতিমুক্ত থাকার মতো, সৎ জীবনযাপন করার মতো, পরিশ্রম করে অধিক অর্থ উপার্জন করার মতো, দেশ-জাতিকে ভালোবাসার মতো অনেক মানুষ এখনো অবশিষ্ট আছে এবং আরও অনেক মানুষ তৈরি হচ্ছে। এটি অবশ্যই আমাদের শুদ্ধ সমাজ ফিরে পাওয়ার সম্ভাব্য আশার বিষয়। তাই যেকোনো মূল্যে ওদের জন্য নিশ্চিত করতে হবে অনুকূল পরিবেশ। শক্তিশালী ও বাস্তবমুখী করতে হবে শুদ্ধতার সংগ্রাম। পরাস্ত করতে হবে দুর্নীতির দুষ্টচক্র। যার জন্য প্রয়োজন আইনের শাসন ও নৈতিক শিক্ষা। নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি অপরাধের শাস্তি নিশ্চিতকরণ ব্যতীত কোনো দেশের মানুষই দুর্নীতিমুক্ত হয়নি, হবে না। মহান সৃষ্টিকর্তাও তাই মানুষের জন্য উপদেশ দেওয়ার পাশাপাশি শাস্তির বিধান দিয়েছেন। যেখানে শাসন থাকে না, শাস্তির ভয় থাকে না, বিবেকের দংশন থাকে না সেখানেই মানুষ অবাধ্য হয় বেশি। এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। ক্যান্টনমেন্টের ভিতর ঢুকলেই সব ট্রাফিক আইন মেনে চলে সব ড্রাইভার। যে দেশে নৈতিক শিক্ষা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা যত বেশি সে দেশে দুর্নীতি তত কম। সে সব দেশের কৌশল আমাদের জন্য হতে পারে অনুসরণীয়। একটি দেশ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হতে যেমন দীর্ঘ সময় লাগে তেমনি দুর্নীতি থেকে উত্তরণের জন্য আরও বেশি সময় প্রয়োজন হয় এবং সেটি ধরে রাখার জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়। দেশ ও জাতির অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই শুদ্ধতার সে সংগ্রাম আরও শুদ্ধ করা, সুসংগঠিত করা ও শক্তিশালী করা অত্যাবশ্যক।

লেখক: সাহিত্যিক, শিক্ষক ও কলামিস্ট


সর্প ব্যবসা ও গবেষণা: কর্ম সংস্থানের সম্ভাবনাময় খাত

আপডেটেড ২২ জুন, ২০২৪ ১১:৫৩
ড. মিহির কুমার রায়

সর্প নিয়ে অনেক পৌরাণিক কাহিনি ইতিহাসের আদি পূর্বে উল্লিখিত আছে। সর্প পূজা, সর্প বন্দনা, সর্প লালন, সর্প চাষ, সর্প শিক্ষা, সর্প গবেষণা, সর্প ব্যবসা ইত্যাদি যুগে যুগে সময়ের আবর্তে অনেক রূপান্তর ঘটেছে সত্যি কিন্তু পালিত প্রাণী হিসাবে তার অর্থনৈতিক গুরুত্ব থাকলেও সমাজব্যবস্থায় তুলনামূলক বিচারে এই বিষয়টি তেমন উল্লেখযোগ্য স্থান করে নিতে পারেনি যেমন শিক্ষায় কিংবা গবেষণায়। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রাণী বিদ্যা বিভাগে অন্যান্য প্রাণীর সঙ্গে সর্পের শিক্ষা কিংবা গবেষণা পাঠ্যসূচিতে থাকলেও কোনো গবেষক সর্প নিয়ে গবেষণা করে স্নাতকোত্তর, এমফিল কিংবা পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছে তেমনটি দেখা যায় না। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণী বিদ্যা বিভাগের সাবেক গবেষক ও রিয়াদ চিড়িয়াখানার সাবেক কিউরেটর অধ্যাপক ড. আলী রেজা খান সর্প নিয়ে অনেক গবেষণাধর্মী পুস্তিকা কিংবা প্রবন্ধ রচনা করলেও তার ফলাফলের ভিত্তিতে কতগুলো প্রায়োগিক গবেষণা প্রকল্প কিংবা অ্যাকশন প্রোগ্রাম প্রণীত হয়েছে তা বলা যায় না কেবল উদ্যোগী গবেষক, কর্মসূচি সংগঠক ইত্যাদির অভাবের কারণে। অথচ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে, কর্ম সংস্থানে, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ তৈরিতে, বিনোদনের খোরাক জোগাতে, রপ্তানি বাণিজ্যে, চামড়ার পণ্য তৈরিতে, ওষুধ তৈরিতে, সর্পের অবদান কোনোভাবেই খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। অ্যান্টি ভেইন তৈরিতে সাপের বিষের চাহিদা অতুলনীয় আবার গোবড়া সর্প থেকে পটাশিয়াম সাইওনাইট সংগ্রহ করে ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। সর্পের বিষের চাহিদা আন্তর্জাতিক বাজারে রয়েছে যা রেমিট্যান্স অর্জনের একটি বড় বাহক হতে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষত জাপান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সর্প মাংস ও সর্প ডিম সুস্বাদু পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে খাদ্যতালিকায় স্থান করে নিয়েছে। এতসব গুণাবলি থাকা সত্ত্বেও সর্প আতঙ্ক ও সর্প নিধন যেন আমাদের জীবনে এমন শিকড় গেড়ে বসেছে যে সর্প দেখলেই আতঙ্ক আর নিধন ছাড়া মনে হয় তা আর সমাপ্তি ঘটবে না; কিন্তু এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো তার একটি আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষণের প্রয়োজন। অন্যান্য গৃহপালিত পশুর মতো সর্পকে পোষার অনেক প্রক্রিয়া এই উপমহাদেশে বিশেষত পাহাড়, জঙ্গলবেষ্টিত অঞ্চলগুলোতে রয়েছে। যেমন- কোনোকে সাপুড়ে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় কৌশলগত দিক নিয়ে তখন সে বলবে আমি ভারতের আসাম রাজ্যের কামরূপ জেলা থেকে সর্প বিদ্যায় প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছি অর্থাৎ সর্ব বিদ্যা যে একটি পাঠ্যসূচির বিষয় এখান থেকে তা অনুমান করা যায়। সে যাই হোক না কেন বাংলাদেশে বর্তমানে বর্ষাকাল কেবল আষাঢ় কিংবা শ্রাবণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না বিশেষত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অর্থাৎ বর্ষাকাল এখন আগের চেয়ে বেশি বিস্তৃত এবং এই সময়টিতে সর্প লোকালয়ের দিকে মানুষের বাড়ি কিংবা গাছে আশ্রয় নেয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই কর্মকাণ্ডগুলোকে কেবল সাপুড়ে কিংবা ওঝা কিংবা বেদেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে যদি ব্যবসা উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করা যায় তবে এই লাভজনক পেশায় অনেকেই সর্প খামার নির্মাণে এগিয়ে আসবে বলে প্রতীয়মান। তা হলে ব্যবসায়ের উপাদান হিসেবে এই প্রাণীটির বাংলাদেশে বর্তমান অবস্থা কি তা নিয়ে আলোকপাত করা যাক-

আইইউসিএন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ বন্যপ্রাণী হুমকির সম্মুখীন বিশেষত- মানুষ সৃষ্ট সর্পের বাসস্থান বনভূমি ঝোপঝাড় ধ্বংসের কারণে। বাংলাদেশে প্রাণী গবেষক আব্দুর রাজ্জাকের মতে দেশে প্রায় ৯০ প্রজাতির সাপের মধ্যে ২৭ প্রজাতি বিষাক্ত যার মধ্যে ১৩টি সমুদ্রে বসবাস করে, বাকিগুলো স্থলে যাদের বেশির ভাগের অবস্থান সিলেট-চট্টগ্রামের গভীর বন-জঙ্গলে। সর্প দেখলেই আতঙ্ক তাকে মারতে হবে এ ধরনের একটি মতবাদ বংশ পরাক্রমায় বহন করা হচ্ছে অথচ বিজ্ঞান বলছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে, খাদ্যশৃঙ্খল অটুট রাখতে, ইঁদুর, কীট-পতঙ্গ, পোকা-মাকড় ইত্যাদি বিনষ্ট করতে সর্পের ভূমিকার জুড়ি নেই। প্রকৃতিতে খাবারের প্রয়োজনে ও প্রজননের সুবিধার্থে সর্প লোকালয়ে চলে আসে আর এমনিতেই মানুষ সর্প দেখার সঙ্গে সঙ্গেই মেরে ফেলে। সম্প্রতি পত্রপত্রিকায় খবর বেরিয়েছে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে চারশরও বেশি গোখরা সর্প নিধন করা হয়েছে যা দেশের অর্থনীতি তথা প্রাণী সম্পদ উন্নয়নে একটি বড় আঘাত। অথচ এ নিবারণে দেশে কোনো আইন নেই, সাপ উদ্ধারকারী দক্ষ কোনো লোক নেই, উদ্ধার করলেও তার দায়ভার কেউ নিতে চায় না। এ ধরনের একটা পরিস্থিতিতে দক্ষ সাপুড়ে তৈরির জন্য প্রশিক্ষণ তার সঙ্গে যন্ত্রপাতির প্রয়োজন রয়েছে। দেশে দক্ষ সাপুড়ের সংখ্যা কত তা নিয়ে কোনো পরিসংখ্যান সরকারের প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরে নেই যা প্রয়োজনমাফিক ব্যবহার করা যাবে অর্থাৎ বংশানুক্রমে পাওয়া সাপুড়ে বিদ্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের যে সনাতনী দক্ষতা রয়েছে এবং তার সঙ্গে যদি বৈজ্ঞানিক ভিত্তি যোগ করা যায় তা হলে এটি একটি উন্নত ব্যবস্থা হতে পারে; কিন্তু বাদ সাধে আমাদের সমাজব্যবস্থা, সাপুড়ের ছেলেমেয়েরা এখন আর সাপুড়ে হতে চায় না কারণ এ কাজের শৈল্পিক কোনো অর্থনৈতিক মর্যাদা নেই অথচা ব্যবসায়িক উৎপাদন হিসেবে এর অনেক সম্ভাবনা রয়েছে যা এখন সময়ের দাবি। একজন সাপুড়েকে প্রশ্ন করা হয় সর্প শিকারের কৌশল সম্পর্কে এবং অনায়াসেই সে বলে ফেলতে শুরু করে যে মাটির গন্ধ থেকে বোঝা যায় এলাকায় সর্পের অবস্থান আছে কি নেই। যদি বিষয়টি ইতিবাচক হয় তবে মন্ত্রের মাধ্যমে সর্পকে গর্তের ভেতর থেকে বের করা সম্ভব হয়। এখন প্রশ্ন- এভাবে সর্প ধরে কি হবে, এসব সর্পের সংগঠিত বাজার কি? কে বা কারা এর দায়ভার নেবে? এই বিষয়গুলো এখনো অস্পষ্ট অথচ কিছু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সাপুড়ের কাছ থেকে সর্পের মহামূল্যবান বিষ কিংবা চামড়া কিনে বিদেশে পাচার করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে যা হঠাৎ খবরের কাগজে পাওয়া যায়। তাহলে সরকার সর্পের বাজারকে উন্মুক্ত করছে না কেন? কেন সর্প খামার প্রতিষ্ঠায় প্রণোদনাসহ লাইসেন্স প্রদানে আগ্রহী নয়?

সরকারি মালিকানাধীন কোনো সর্পের খামার আছে বলে আমার জানা নেই যা অবিলম্বে প্রকাশ করা উচিত। তবে বেসরকারি উদ্যোগে সর্পের খামারের দু-একটির খবর পাওয়া যায়- যেগুলো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে খুব ভালো করে উঠতে পারছে না। এরকমই একজন উদ্যোক্তা পটুয়াখালীর সদর উপজেলার নন্দীপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ৫০ বছর বয়সি আব্দুর রাজ্জাক যিনি বেশ কয়েক বছর বন্যপ্রাণী ফটোগ্রাফার হিসেবে সৌদি আরবে কাজ করেন। সেই সুবাদে বণ্যপ্রাণীর প্রতিকার তার আগ্রহ প্রবল হয়ে ওঠে যার বহির্প্রকাশ ঘটে ২০০১ সালে। সৌদি আরব থেকে ফিরে আসার পর স্বীয় বাড়িতে সর্প খামার প্রতিষ্ঠার একটি পরিকল্পনা করেন যা বাস্তবায়িত হয় ২০০৯ সালে। এই উদ্যোক্তা ২৫ লাখ টাকার নিজস্ব তহবিল থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন নমুনার ১৫০টি সর্প সংগ্রহ করে খামার শুরু করে। বর্তমানে সর্প ডিমের তা দিয়ে আরও ১৫০টির নতুন বাচ্চা খামারে সংযোজিত হয়। সরকারের প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয় ব্যক্তি মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত খামারটির প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেয় ২০০৮ সালে। আবার সর্পের বিষ ব্যবসায়িকভাবে বিক্রির জন্য ২০১১ সালে সরকারের কাছে অনুমোদন চেয়ে আবেদন করা হয় যা এখন পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়নি। যদি অনুমোদন মেলে তা হলে ১৫০টি পরিপক্ব সর্প থেকে বিষ আহরণ করে প্রতি মাসে সাত কোটি টাকা আয় করা সম্ভব হবে। এরইমধ্যে অনেক ওষুধ কোম্পানি সর্পের বিষ ক্রয়ের আগ্রহ দেখিয়েছে যা অল্প বিনিয়োগে অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা। এই খামারে মোট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চাকরিজীবীর সংখ্যা আট এবং সরকার যদি প্রশিক্ষণসহ বিনিয়োগ সহায়তা দিতে পারে তাহলে এই লাভজনক ব্যবসায় অনেক উদ্যোক্তা আগ্রহ দেখাবে। সরকার সর্প খামার আইন প্রণয়ন করতে পারে এই শিল্পের মানোন্নয়নের জন্য। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষত ভারত, চীন, থাইল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সর্প খামারকে একটি লাভজনক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সেই সব দেশের সফল অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ এই শিল্পকে উজ্জীবিত করতে পারে। এ ব্যাপারে প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। কৃষির উপখাত হিসেবে এই খাতটি তুলনামূলক বিচারে অনেক পশ্চাৎপদ যা বর্তমান বছরের বাজেট প্রস্তাবনা থেকেই বোঝা যায় যা মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মিলে উন্নয়ন বাজেট মাত্র এক হাজার পনেরো কোটি টাকা যার বেশির ভাগ প্রাণীর খাদ্য ও ভ্যাকসিন আমদানিতে ব্যয়িত হবে। তাহলে প্রাণীর খামার উন্নয়ন বা আধুনিক খামার স্থাপন বিশেষত সর্পকে ঘিরে সে অর্থ কোথায়? প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন একটি এনজিও যারা প্রকৃতির প্রাণিজগৎ নিয়ে আকর্ষণীয় সংবাদ প্রচার করে যার মধ্যে সর্প একটি উল্লেখযোগ্য দিক এবং এই প্রচার মাধ্যমে কেবল তাদের ক্ষয়িষ্ণু বিলুপ্তির দিকগুলো তুলে ধরে। অথচ এটিকে হৃদয়ে মাটি ও মানুষের মতো একটি উদ্বুদ্ধমূলক অনুষ্ঠানে রূপান্তরিত করা যায় যেখানে প্রাণী উদ্যোক্তারা আরও খামারমুখী হবে এবং ব্যাংকিং খাত বিনিয়োগে এগিয়ে আসবে; কিন্তু সমস্যা হলো প্রকল্প তৈরি নিয়ে কারণ বাংলাদেশে সর্প বিশেষজ্ঞের যথেষ্ট অভাব রয়ে গেছে যারা সর্পের স্বভাব প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত। প্রকৃতিগতভাবে সর্প সরীসৃপজাতীয় নিরীহ প্রাণী যারা বুকে ভর দিয়ে হাটে এবং বনের লতাপাতা, পোকা-মাকড়, ব্যাঙ, ইঁদুর ইত্যাদি খেয়ে বেঁচে থাকে। গবেষকরা বলেন একটি সর্প যে শক্তির সঞ্চার করে তা পাঁচটি মানুষের শক্তির সমান। এই প্রাণীটি কোনোভাবে বিরক্ত না হলে তারা মানুষ কিংবা অন্য প্রাণীকে আক্রমণ করে না।

তা হলে সর্প দেখে আতঙ্কের কারণ কি যার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি এবং একেবারেই অনমূলক। বাংলাদেশে ৯০ প্রজাতির সর্পের পদচারণ থাকলেও কয়েক দশকে এগুলোর কোনো তথ্য নথিভুক্ত হয়নি। সাধারণভাবে যেসব সর্প সচরাচর দেখা যায় সেগুলো হলো ধোড়া, ঘরগীনি, কুপলী, মাচ্চা, দুধরাজ, ফনীমনসা অজগর, শামুখখোর ইত্যাদি। আবার বিষধর সর্পের মধ্যে গোখরা, পদ্ম গোখরা, শঙ্কিনী, কালনাগিনী, আলদ ইত্যাদি অন্যতম। এর বাইরেও অনেক সর্প োকতে পারে; কিন্তু প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর কিংবা অন্য কোনো দাতা সংস্থা কর্তৃক অর্থায়িত কোনো বেসরকারি সংগঠন সারা দেশে সর্পের ওপর জরিপ চালিয়েছে তার কোনো নজির জানা নেই অথচ কোনো প্রকার প্রকল্প গ্রহণ করতে গেলেই এ ধরনের ফলাফল অপরিহার্য। বাংলাদেশের প্রখ্যাত প্রাণী গবেষক ড. খান সর্পের ওপর অনেক বৈজ্ঞানিক গবেষণা সম্পন্ন করলেও আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে সর্পের অবস্থান নিয়ে কোনো গবেষণা প্রতিবেদন চোখে পড়ে না। তাই বিষয়গুলোকে বিবেচনায় নিয়ে সামনে আগাতে হবে আর অহেতুক সর্প নিধন নয়, তাকে মানবিকতার বিচারে মেনে নিতে হবে এই হোক জাতির কাছে প্রত্যাশা।

লেখক: গবেষক ও সাবেক ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি


কোরবানির চামড়া ও সংরক্ষণ

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
সৈয়দ শাকিল আহাদ

বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত হচ্ছে চামড়া শিল্প আর এই শিল্প খাতের আয়ের অবদান ২ শতাংশ এবং রপ্তানিতে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ।

দেশের জিডিপিতে অবদান শূন্য দশমিক ৬০ শতাংশ। অথচ এই শিল্প খাতের উন্নয়নে সঠিক নীতিমালার অভাবে কোরবানির ঈদে এ খাতের কাঁচা চামড়া সংগ্রহের ক্ষেত্রে অবহেলা কোনোভাবেই কমছে না, নানা জায়গায় বসেছিল গরু-ছাগলের হাট ।

প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর দেওয়া তথ্যমতে, ‘এ বছর ১ কোটি ২৯ লাখ ৮০ হাজার ৩৬৭টি গবাদি পশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত ছিল। গত বছরের তুলনায় উৎপাদনের ক্ষেত্রে ৪ লাখ ৪৪ হাজার ৩৪টি পশু এবার বেশি ছিল।’ উল্লেখ্য, কয়েক বছর ধরে পশু রপ্তানিতে ভারতের নিষেধাজ্ঞা থাকাতে বাংলাদেশকে গবাদি পশু উৎপাদনে স্বাবলম্বী হতে বাধ্য করেছে, যা আমাদের বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক উন্নতির একটি অন্যতম উদাহরণ।

এই ঈদুল আজহাতে প্রায় সোয়া কোটি গরুর চামড়া পাওয়া যায়, যা প্রশংসনীয়। চলমান অর্থনৈতিক সংকটের মাঝেও সরকারের পক্ষ থেকে এই বিপুল পরিমাণ চামড়া সংগ্রহের জন্য প্রশংসনীয় উদ্যোগ হিসেবে চারটি ব্যাংককে ২৬৫ কোটি টাকা ব্যবসায়ীদের ঋণ দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে এবং আগের বছরের দেওয়া ঋণখেলাপিরা ২% ডাউন পেমেন্টের দ্বারা ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ পাবে ।

১৯৪০ সালে রণদা প্রসাদ সাহা যাকে সবাই আর পি সাহা নামে জানি, তিনিই নারায়ণগঞ্জে প্রথম ট্যানারি স্থাপন করে চামড়া ব্যবসা শুরু করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে আরও বেশ কয়েকটি ট্যানারি গড়ে ওঠে সেখানে।

১৯৫১ সালের ৩ অক্টোবর সরকারি গেজেট নোটিফিকেশনে ভূমি অধিগ্রহণ করে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকার জনশূন্য এলাকা হাজারীবাগে স্থানান্তর করা হয় ট্যানারিগুলোকে। বর্তমানে দেশে ট্যানারির সংখ্যা ২৭০টিরও বেশি। এর ৯০ ভাগই ছিল হাজারীবাগে। ৭০ বছর ধরে হাজারীবাগে চামড়া শিল্পের কার্যক্রম চলছে। এ সময় শিল্পটির যে প্রসার হওয়ার কথা ছিল আসলে শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। চামড়া শিল্পের যতটা অগ্রগতি হয়েছে, তা এ ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়। বিগত সরকারের উল্লেখযোগ্য সহযোগিতা না পেলেও তারা সামনে এগিয়ে চলেছেন। এদিকে রাজধানী ঢাকা শহরে ঘনবসতি গড়ে ওঠায় হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি শিল্প ফের স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল। পরিবেশ দূষণ এবং এলাকাবাসীর দাবির মুখে ২০০৩ সালে হাজারীবাগ থেকে চামড়া শিল্প সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। সিদ্ধান্তের পর চামড়া শিল্পনগরী গড়তে সাভারের হরিণধরায় ২০০ একর জমি অধিগ্রহণ করে কাজ চলতে থাকে এবং একপর্যায়ে নতুন ট্যানারি শিল্প নগরীর কাজ সিংহভাগই সম্পন্ন হয়। আর্থিক কারণে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরে বিলম্ব ঘটেছে এ কথা সত্য। দীর্ঘদিন আগে স্থাপিত একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান সরিয়ে নিতে হলে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন। রাজধানী-সংলগ্ন হওয়ায় সাভারের বিভিন্ন স্থানে যে হারে বসতি বাড়ছে, তাতে আগামী ১৫-২০ বছরে এলাকাটি ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এতে করে আগামী ২০-২৫ বছর পর ফের এ বিশাল স্থাপনা সাভারের জন্য কাঁটা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলেও মনে করেন চামড়া বিশেষজ্ঞরা ।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বছরের ৪৮ ভাগ চামড়া পাওয়া যায় কোরবানির ঈদে, ১০ ভাগ রোজার ঈদ ও শবেবরাতে, ২ ভাগ হিন্দুদের কালিপূজার সময়। তাই এসব উৎসব পূজা-পার্বণে বাংলাদেশ থেকে পশুর চামড়া সংগ্রহের উদ্যোগ নেয় ভারতের সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে দেশের কিছু ভুঁইফোঁড় মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী রাতারাতি বেশি মুনাফার লোভে পাচার করেন কাঁচা চামড়া। চামড়া পাচারকারীরা কোরবানির ঈদের কয়েক দিন আগে বিভিন্ন সীমান্তের গ্রামে আশ্রয় নেয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, চোরাকারবারিসহ সন্ত্রাসী চক্রের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে তারা। পরবর্তীকালে তাদের সহায়তায় অপকৌশল অবলম্বন করে সারা দেশ থেকে সংগ্রহ করা গরু, ছাগল, ভেড়া, মহিষের চামড়া পাচার করে দেয় ওপারে। অতএব, চামড়া পাচার রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সাধারণ জনগণকেও সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

সম্প্রতি জানা গেছে, ঢাকার চামড়া যেন বাইরে পাচার না হয়, সে জন্য ঈদের দিন থেকে পরবর্তী কয়েক দিন কোনো চামড়ার ট্রাক রাজধানীর বাইরে যেতে দেওয়া হবে না। তবে ঢাকার বাইরে থেকে চামড়াবাহী ট্রাক, ট্রলার ঢাকায় আসতে পারবে। দেশের কাঁচা চামড়ার বিভিন্ন পাইকারি বাজারে বিক্রি হওয়া চামড়াবাহী ট্রাক যাতে ঈদুল আজহার দিন থেকে পরবর্তী ৭ দিন সীমান্তের দিকে যেতে না পারে, এ জন্য সতর্ক দৃষ্টি রাখতে পুলিশ-র‌্যাবকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে সীমান্তের ৭ মাইলের মধ্যে চামড়াজাত ট্রাক ঢাকায় আসার পথে যাতে কোনো বাধার সৃষ্টি না হয়, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তৎপর থাকতে বলা হয়েছে।

বিশেষভাবে বলা যায় যে, সামর্থ্যবান মুসলিম জনগণ কোরবানি দিতে সমর্থ হলেও বিপাকে পড়েন পশুর চামড়া নিয়ে, সাধারণত মসজিদ বা মাদ্রাসায় এ চামড়া দান করে দিয়ে থাকেন কিংবা কোরবানিস্থলে আগত পাইকারদের কাছে তা অত্যন্ত স্বল্পমূল্যে বিক্রি করে থাকেন। মনে রাখার মতো তথ্য, পাঁচ বছর আগেও যেখানে একটি চামড়া দুই থেকে আড়াই হাজার টাকায় বিক্রি করা যেত, তা এখন বিক্রি হয় মাত্র ৩০০ টাকায়। চামড়া ছাড়ানোর সময়ে অদক্ষ কসাই ও এর দাম কমার কারণের মধ্যে একটি কারণ ওই দিন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মৌসুমি কসাইয়ের দ্বারা চামড়া ছাড়ানোতে চামড়ার ক্ষতি সাধিত হয়ে থাকে। এর ফলে দাম বাড়ে না অথচ চামড়াজাত পণ্যের কথা বললে বলতে হয়, বিগত এক যুগ আগের তুলনায় চামড়ার তৈরি জুতা, ব্যাগসহ বিভিন্ন চামড়াজাত পণ্যের দাম বেড়েছে অন্তত দশগুণ ।

দেশের আভ্যন্তরীণ বাজারসহ দেশের বাইরেও চামড়া-চামড়াজাত পণ্যের ব্যাপক চাহিদা।

চামড়া শিল্পের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে ২০২২ সালে বিশ্বব্যাপী চামড়াজাত পণ্যের বাজার ছিল ৪২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০২৩ থেকে ২০৩২ সাল পর্যন্ত ৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ চক্রবৃদ্ধি হারে বৃদ্ধি পেয়ে ২০৩২ সাল নাগাদ ৭৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে বলে অনেকেই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। সে ক্ষেত্রে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে এই চামড়া শিল্পই হতে পারে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় একটি শিল্প খাত, শুধু চামড়াই নয় কোরবানির এসব পশুর হাড়/অস্থিগুলো রূপান্তরের মাধ্যমে উপজাত বা বাই প্রোডাক্ট হিসিবে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে ।

পরিকল্পিতভাবে এ খাতের উন্নয়ন করতে পারলে আমাদের রপ্তানি আয়ের পরিমাণ আরও বাড়ানো সম্ভব। চামড়া শিল্পের যথাযথ বিকাশ ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। তবে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বিদেশি ক্রেতারা একবার এলেও দ্বিতীয়বার আসতে আগ্রহী হন না।

উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ বা এলডাব্লুজির পূর্বশর্ত পূরণ না করে কোনো চামড়া বা চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি সম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বর্তমানে খামারিরা গরু মোটাতাজা করতে গিয়ে ইউরিয়াসহ বিজাতীয় যে খাদ্য গরুকে খাওয়ান তার ফলে এসব গরুর চামড়া কোনোক্রমেই এলডাব্লুজির দেওয়া নির্ধারিত মানের হয় না। এ ধরনের চামড়া সংরক্ষণ করা যেমন কঠিন, তেমনি প্রক্রিয়ার পরও মূল্য তেমন পাওয়া যায় না। ক্রেতাদের একটি বৃহৎ অংশের অনেকেই স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, দ্রুত এই শিল্পের পরিবেশের উন্নতি না হলে বাংলাদেশ থেকে চামড়া কিনবেন না। অতএব দেশের অর্থনীতির চাকা সচল ও এই শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বহু লোকের কর্মসংস্থানের কথা চিন্তা করে সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সবারই বিশেষ করে গরু উৎপাদনকারী খামারিসহ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে ।

লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক


মুসলমানের জীবনে সত্য-মিথ্যার প্রভাব 

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
এস এম মাহমুদুল আলম 

সবাইকে সত্যবাদী হওয়ার ব্যাপারে বেশি বেশি সতর্ক করা প্রয়োজন। জন্মের পর ছোট ছোট সন্তানদের সামনেই পিতা-মাতা অনর্গল মিথ্যা বলে চলেছেন। মিথ্যা বলাটা যেন এখন ফ্যাশনে রূপ নিয়েছে। সততায় অন্তরের প্রশান্তি। নাজাত লাভ, জান্নাত অর্জন, খোদার সন্তুষ্টি এবং ধনসম্পদেও বরকতের মাধ্যম। সততা মানব চরিত্রের শ্রেষ্ঠ গুণ। মানবজীবনে এর প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

মানব সমাজকে যে সীমারেখায় চলতে নির্দেশ দিয়েছেন মহান আল্লাহ। এগুলোর মধ্যে সততা অন্যতম। সততা ও স্বচ্ছতা নবী, আওলিয়া, ফেরেশতা, পীর-বুজুর্গ, নেককার ব্যক্তি সবার গুণ এটি। শুধু মুসলমান কেন বরং প্রত্যেক মানুষ- চাই সে মুমিন হোক বা কাফের, নেককার হোক বা বদকার। অফিসার হোক বা কর্মী। শিক্ষক হোক বা ছাত্র। পীর হোক বা মুরিদ।

ধনী হোক বা গরিব, পিতা-মাতা হোক বা সন্তানাদী। মোটকথা মানবজীবনের প্রতিটি সেক্টরের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলো সততা। মানব সমাজের নিরাপত্তা, প্রশান্তি, সুখ-শান্তি, বিনির্মাণ, উন্নতির ভিত্তি হলো সততা। এ কারণেই সততাকে আপন করে নিতে গুরুত্ব দিয়েছে ইসলাম। এই গুণ মানুষকে উন্নত, আদর্শ ও নৈতিকতায় ভূষিত করে এবং এর মাধ্যমেই ইসলামি জিন্দেগির পূর্ণতা অর্জিত হয়।

কোরআন ও হাদিসে এর ফজিলত ও প্রয়োজনীয়তা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট। আল্লাহ পাক কোরআনুল কারিমের বহু স্থানে সততা ও স্বচ্ছতা অবলম্বনকারী নারী-পুরুষের ফজিলত, আখেরাতে তাদের পুরস্কার, তাদের মর্যাদা, সৃষ্টির মধ্যে তাদের গ্রহণযোগ্য হওয়া এবং বিশেষকরে সৃষ্টিকর্তার কাছে তারা যে প্রিয় এ কথাগুলো আলোচনা করেছেন।

কোরআন-হাদিস অধ্যয়নে এ কথা বুঝে আসে যে, সততা বিষয়টি অনেক ব্যাপক। সততা শুধু সত্য কথা বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সত্য কথা বলার সঙ্গে কাজকর্ম, আকিদা-বিশ্বাস সবগুলোয় সততা অন্তর্ভুক্ত।

মহান আল্লাহ বলেন, আর কেউ আল্লাহ এবং রাসুলের আনুগত্য করলে সে নবী, সত্যনিষ্ঠ, শহীদ ও সৎকর্মপরায়ণ-যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন- তাদের সঙ্গী হবে এবং তারা কত উত্তম সঙ্গী। (সুরা নিসা, আয়াত : ৬৯)

কিয়ামতের দিন সততার কারণে জান্নাত মিলবে সত্যবাদীদের। ইরশাদ হচ্ছে, আল্লাহ বলবেন, এই সেই দিন যেদিন সত্যবাদীগণ তাদের সত্যতার জন্য উপকৃত হবে, তাদের জন্য আছে জান্নাত, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে; আল্লাহ তাদের প্রতি প্রসন্ন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট; এটা মহাসফলতা। (সুরা মায়িদা, আয়াত: ১১৯)

সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের সঙ্গ লাভ করার প্রতি আহ্বান জানিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সৎ-স্বচ্ছবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের সঙ্গী হও। (সুরা তওবা, আয়াত : ১১৯)। সত্যবাদীদের প্রশংসা ও গুণাবলি উল্লেখ করে মহান আল্লাহ বলেন, মুমিনগণ যখন সম্মিলিত বাহিনীকে দেখল, ওরা বলে উঠল, এটা তো তাই, আল্লাহ ও তার রাসুল যার প্রতিশ্রুতি আমাদেরকে দিয়েছিলেন এবং আল্লাহ ও তার রাসুল সত্যই বলেছিলেন। আর এতে তাদের ঈমান ও আনুগত্যই বৃদ্ধি পেল। মুমিনদের মধ্যে কতক আল্লাহর সঙ্গে তাদের কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে, তাদের কেউ কেউ শাহাদাতবরণ করেছে এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষায় রয়েছে। তারা তাদের অঙ্গীকারে কোনো পরিবর্তন করে নাই।

কারণ আল্লাহ সত্যবাদীদের পুরস্কৃত করেন তাদের সত্যবাদিতার জন্য এবং তার ইচ্ছা হলে মুনাফিকদের শাস্তি দেন অথবা তাদের ক্ষমা করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সুরা আহজাব, আয়াত: ২২-২৪।

এ সুরারই ৩৫ নং আয়াতে সততা এবং স্বচ্ছতাসহ অন্যান্য গুণাবলিতে গুণান্বিত নারী-পুরুষের প্রতিদান ও পুরস্কারের আলোচনা করে বলা হয়েছে, আল্লাহ তাদের জন্য রেখেছেন ক্ষমা ও মহাপ্রতিদান।

মুমিন স্বচ্ছ, মুনাফিক অস্বচ্ছ। মুমিন স্বচ্ছ, তাই তারা সত্যবাদী। মুমিনরাই যে সত্যবাদী আল্লাহতায়ালা তা অন্য আয়াতে এভাবে বলেছেন, মুমিন তো তারাই, যারা আল্লাহ ও তার রাসুলের প্রতি ঈমান এনেছে অতঃপর তাতে কোনো সন্দেহে পতিত হয়নি এবং তাদের জান-মাল দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে। তারাই তো সত্যবাদী। (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১৫)

মহাগ্রন্থ কোরআনের ন্যায় রাসুলের হাদিসেও সততার অনেক ফজিলত এবং মর্যাদার কথা ফুটে উঠেছে। রাসুলের হাদিসে সততাকে অন্তরের প্রশান্তি, নাজাত লাভ, জান্নাত অর্জন, খোদার সন্তুষ্টি এবং ধনসম্পদে বরকতের মাধ্যম বলা হয়েছে। মুমিন এ জন্যই সত্যবাদী যে, সে যা বলে তার অন্তরেও তা থাকে এবং কাজে কর্মে হুবহু সেটাই বাস্তবায়ন করে দেখায়। এতে কোনো লুকোচুরি বা অস্বচ্ছতা থাকে না। নবীজি (সা.) বলেন, সত্যবাদী ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী সিদ্দিক ও শহীদগণের সঙ্গে থাকবে। সত্যবাদী ব্যবসায়ী কারা তা হাদিসে এভাবে বর্ণিত হয়েছে, যদি ক্রেতা-বিক্রেতা সত্য বলে এবং ভালো-মন্দ প্রকাশ করে দেয়, তাহলে তাদের লেনদেন বরকতময় হবে। আর যদি উভয়ে মিথ্যা বলে এবং দোষত্রুটি গোপন করে, তাহলে এ লেনদেন থেকে বরকত উঠিয়ে নেওয়া হবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৩২) মিথ্যা বলা অথবা মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া গর্হিত অপরাধ। মিথ্যাবাদীর পক্ষে যেকোনো ধরনের পাপ করা সম্ভব। কেননা সে পাপ কাজ করে খুব সহজে তা অস্বীকার করতে পারে। এ বিষয়ে ইসলামের নির্দেশনা হলো, কোনো বিষয়ে নিশ্চিত জানাশোনা না থাকা সত্ত্বেও সে বিষয়ে অনুমানভিত্তিক কোনো কথা বলা অপরাধ।

অতএব মিথ্যা বলার আগে তা জেনে নেওয়া দরকার। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে বিষয়ে তোমার পরিপূর্ণ জ্ঞান নেই, সে বিষয়ের পেছনে পড়ে থেকো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও হৃদয়—এসবের ব্যাপারে (কিয়ামতের দিন) জিজ্ঞাসিত হবে।’ (সুরা: বনি ইসরাঈল, আয়াত: ৩৬)

মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘(অনুমানভিত্তিক) মিথ্যাচারীরা ধ্বংস হোক।’ (সুরা: জারিয়াত, আয়াত: ১০)

মিথ্যুক আল্লাহর অভিশাপপ্রাপ্ত এবং সর্বত্র নিগৃহীত। আজকাল মিথ্যা বলাটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। যে ব্যক্তি যত পরিমাণ মিথ্যা বলতে পারে, তাকে তত পরিমাণ চতুর, বুদ্ধিমান মনে করা হয়। মিথ্যা, চালাকি, ফাঁকিবাজি এগুলোর গোনাহের অনুভূতি- মানুষের দিল থেকে ওঠে যাচ্ছে। অথচ এগুলো এমন কাজ যার দ্বারা গোটা সমাজ অশান্তি, রিজিকের সঙ্কীর্ণতার মধ্যে নিপতিত হয়।

নবীজি (সা.) বলেছেন, ধীকৃত সে, যে কোনো মুমিনের ক্ষতি করে অথবা তার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে। (জামে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৪০)। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)-এর নিকট কিছু লোক এসে বললেন, আমরা রাজা-বাদশাদের দরবারে যাই, তখন তাদের সামনে (প্রশংসামূলক) এমন কিছু বলি, যা বাইরে বলি না। এ কথা শুনে হজরত ইবনে ওমর (রা.) বললেন, আমরা এগুলোকে নেফাক (কপটতা, মুনাফেকি) গণ্য করতাম। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭১৭৮)। মুসলমান আমিরদের কল্যাণকামিতার বিষয়ে যে হাদিস এসেছে তার ব্যাখ্যায় ইমাম নববি বলেন, তাদেরকে যেন মিথ্যা প্রশংসা শুনিয়ে ধোঁকা না দেয়। এটাও কল্যাণকামিতার অংশ।

হাদিসে আছে, উম্মতের ব্যাপারে আমার যে বিষয়গুলোকে ভয়, তন্মধ্যে ভয়ংকরতম হচ্ছে বাকপটু মুনাফিক। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ১/২২)

সাহাবি হজরত আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেন, স্বভাবগতভাবে একজন মুমিনের মাঝে (ভালো-মন্দ) সব চরিত্রই থাকতে পারে, দুটি চরিত্র ছাড়া এক. খিয়ানত, দুই. মিথ্যা। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২২১৭০; শুআবুল ঈমান, বাইহাকি, হাদিস: ৪৪৭১)

স্বচ্ছতার প্রশংসা করে নবীজি (সা.) বলেন, আমার সুপারিশ তার জন্য যে সাক্ষ্য দেবে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। এমন এখলাসের সঙ্গে যে, তার অন্তর তার মুখকে সত্যায়ন করবে এবং মুখ অন্তরকে সত্যায়ন করবে। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৮০৭০। নাটক, মেলাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মিথ্যা বলাটাকে জরুরি মনে করা হয়। অথচ নবীজি (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি মানুষকে হাসানোর জন্য মিথ্যা বলে, তবে তার জন্য ধ্বংস, তার জন্য ধ্বংস। (সুনানে আবু দাউদ)। এককালে মানুষ বিভিন্ন কিসসা-কাহিনি বলতে গিয়ে মিথ্যার আশ্রয় নিত। কিন্তু এখন তো মানুষ কথায় কথায় দেদারছে মিথ্যা বলে। মনে রাখতে হবে! মিথা কথা বলার কারণে লোকেরা তো হাসবে কিন্তু হাদিসের ভাষ্যমতে আল্লাহর ফেরেশতারা এই মিথ্যার দুর্গন্ধের কারণে অনেক মাইল দূরে চলে যায়। (জামে তিরমিজি) চিন্তা করে দেখতে হবে জীবনের বাঁকে বাঁকে প্রতি পদক্ষেপে আমরা মিথ্যার কি পরিমাণ আশ্রয় নিচ্ছি। সততা থেকে কত পিছিয়ে আমরা।

এ কথা বুঝতে বাকি থাকার কথা নয় যে, মিথ্যাকে একটি ফ্যাশনে পরিণত করা এবং নবী-রাসুলদের গুণ-সততা থেকে পিছিয়ে থাকা মূর্খতা এবং বোকামি ছাড়া আর কি হতে পারে?

তার সম্মান সবার কাছে স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত। মুমিন মুসলিমের জন্য সততা এক অপরিহার্য গুণ। আল-কোরআনে ইরশাদ হয়েছে—‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যানুসারীদের সঙ্গী হও।’ (সুরা তাওবা: ১১৯)।

সততা, সত্যনিষ্ঠা ও সত্যবাদিতা একটি মহৎ মানবিক গুণ। প্রকৃত মানুষ বা ইনসানে কামেল হওয়া যায় না যেসব গুণ ছাড়া, সততা তন্মধ্যে অন্যতম। এ সততা রক্ষা করতে হয় প্রতিনিয়ত চলনে-বলনে, আচার-আচরণে, আমানতদারিতায়। জীবনের সর্বক্ষেত্রে এ নৈতিক গুণ অর্জন করতে হয়।

জীবনের পরতে পরতে সততার অনুশীলন করতে হয়। একটি মহৎ মানবিক গুণ হিসেবে নিজ নিজ চরিত্রে একে প্রতিস্থাপন করতে হয় এবং তাকে সংরক্ষণ করে চলতে হয়। বিষয়টি জীবনঘনিষ্ঠ, প্রাত্যহিক চর্চার ও অনুশীলনের। সৎ মানুষের মর্যাদা পৃথিবীর তাবৎ মানবগোষ্ঠী দিয়ে থাকে।

মানব চরিত্রের শ্রেষ্ঠ গুণ হচ্ছে সততা। প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য, জীবনে সততা ও বিশ্বস্ততার ফসল আহরণে যত্নবান হওয়া, কেননা সততা ও সত্যবাদিতা আখলাকে হাসানের অন্যরকম বৈশিষ্ট্য। যার মধ্যে এ গুণের সমাহার থাকবে সমাজের সব ধরনের লোক তাকে ভক্তি শ্রদ্ধা করবে। সর্বোপরি আখেরাতে আল্লাহর কাছে এর বিনিময় লাভ করবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে।

তাই আমাদেরকে সদা সর্বদা কথা ও কাজে সততা, সত্যতা ও স্বচ্ছতা রক্ষা করতে হবে। মিথ্যার অভিশাপ ও গ্লানি থেকেও বাঁচতে হবে। তাহলে মানুষ আমাদেরকে শ্রদ্ধা করবে এবং মহান আল্লাহও দেবেন আখেরাতে এর যথোপযুক্ত বিনিময়। বর্তমান প্রজন্মের সবারই ব্রত হওয়া উচিত ‘সদা সত্য কথা বলিব, সত্য বৈ মিথ্যা বলিব না।’

লেখক : ইসলামী চিন্তাবিদ


শিল্পীত সাঁকোর পরিণত রেখা মঞ্চসারথি আতাউর রহমান

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
জান্নাতুন নিসা

পাথরচাপা রৌদ্রের শূন্য দুয়ার খুলে ভারহীন ছায়াপথ পেরোনো সৃষ্টির শরীর বেয়ে নাট্যজগতের অস্থির রাত্রি জয় করতে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন বাংলা নাট্যজগতের অনন্য কীর্তিমান মানুষ। আর কেউ কেউ নাটকের মসৃণ পথ ছেড়ে মাতাল বজরার অসম্ভব অক্ষরের পরতে পরতে রাজসিক ভঙ্গিমায় মুঠো মুঠো চন্দ্রকলার রঙিন পালকে মঞ্চ মাতিয়ে চলেছেন অবলীলায়। নির্বাসিত লেখনীর বিষণ্ন ভঙ্গিমায় লেখকের মৃতপ্রায় নাটক যখন ভাঙচুরের ছোপলাগা ক্যানভাসে ঝুলন্ত, ঠিক তখনই অভিনয়ের ছাঁচে তুলে জীবন্ত শামিয়ানার অনন্যমাত্রায় নাটকটিকে যৌবতী মঞ্চায়নের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলে তিনি যে দর্শক মাতিয়েছেন কেবল তা নয়; বরং কালের বুকে সেই নাটকের পুরোধা হয়ে উঠেছেন অসম্ভবের নোঙর তুলে দিয়েই। দিকচিহ্নহীন পাথরজন্মের ন্যায় উৎসমূলকে হৃদয়ে ধারণ করে অলীক ছাইদানিতেও নির্ঘুম রাত্রির কালোত্তীর্ণ নির্জনতাকে শ্যাওলা জড়ানো কুহক লতায় জড়ো করেছেন আপন যাত্রাপথে। ব্রাত্যকথার উল্কা সরিয়ে নাট্যপ্রার্থনার ঊষাকাল প্রস্ফুটিত করেছেন মহানির্বাণের নাট্যলোকে, তিনি আমাদের মঞ্চজয়ের কারিগর, মঞ্চলোক আলো করা মানুষ আতাউর রহমান। আট দশকের অধিক সময় পেরোনো জীবনের প্রতিটি আষাঢ়ের বাঁধভাঙা চাঁদ দেখে তিনি শ্রাবণাকাঙ্ক্ষায় একদিকে যেমন মত্ত হয়েছেন। অন্যদিকে তেমনি পাঁচ দশকে নাটকের বিদগ্ধ রাজসভা থেকে স্বীয় মহিমায় অনন্তজল ভেঙে ঐশ্বর্য নিয়ে এসেছেন রুপোর ঝালরে, হয়ে উঠেছেন এই বাংলার অথচ বিশ্বজয়ী মঞ্চসারথি।

১৯৪১ সালের ১৮ জুন তদানীন্তন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির (বর্তমান বাংলাদেশ) নোয়াখালী জেলায় অবস্থিত নানাবাড়িতে পিতা-মাতার কোল আলো করে জন্মগ্রহণ করেন আতাউর রহমান। তখন কে জানত, আষাঢ়ের কোজাগরী স্পর্শে বেড়ে ওঠা কদমের হাতে হাত রেখে বর্ষার গন্ধমাদনে পথ চলতে চলতে এই আতাউর এক দিন হয়ে উঠবেন স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের নাট্যজগতের এক পুরোধা ব্যক্তিত্ব, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধপরবর্তী মঞ্চনাটক আন্দোলনের অগ্রদূত, মঞ্চসারথি আতাউর রহমান! তার পিতা ছিলেন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের স্নাতক। তার মা ছিলেন সংস্কৃতিমনা একজন মানুষ এবং তিনি বই পড়তে ভালোবাসতেন। সেই সুবাদে মায়ের কাছেই তিনি আলোর যাত্রী থেকে মুক্ত জীবনের জগতে প্রবেশের পথ খুঁজতে বই পড়ার শিক্ষা লাভ করেন। নোয়াখালীতে মামারবাড়িতে তার শৈশব কেটেছে উচ্ছলতায়। যেখানে তিনি প্রথম জুল ভার্ন রচিত টুয়েন্টি থাউজেন্ড লিগস আন্ডার দ্য সি পড়েন। পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্য, উপন্যাস, ছোটগল্প, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচনাবলি, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচনাবলির সঙ্গে গড়ে তোলেন সখ্য। এরপরই আতাউর রহমানের জীবনের প্রতিটি ক্ষণ হয়ে ওঠে ঠিক যেন অমীমাংসিত ফাল্গুনের ছায়াভেদী অমাবস্যার মাখনগলা যাত্রা।

আতাউর রহমান চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং চট্টগ্রাম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিষয়ে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। চাকরি জীবনের স্বাদ আস্বাদন থেকে নিজেকে ফিরিয়ে নেওয়া মানুষ আতাউর রহমান একটিই চাকরি করেছেন ক্লান্ত অথচ বিচলিত স্নিগ্ধতায়। আর রবীন্দ্র প্রেমের অনুভবের উত্তরে ছোট থেকেই ভালোবাসার যে বুনট তার মজ্জাগত হয়েছিল তা থেকে আজও বের হতে পারেননি তিনি। তাই তো স্কুল থেকেই সংস্কৃতি অঙ্গনের সঙ্গে নিজেকে সেই যে যুক্ত করেছেন আজও আছেন তেমনই অবিচল। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোনোর পর তার বন্ধু জিয়া হায়দার আমেরিকার ইস্ট ওয়েস্ট সেন্টার থেকে পাস করে দেশে এসে তাকে মঞ্চনাটক করার প্রস্তাব দেন। ১৯৬৮ সালে ফজলে লোহানীর বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’। তিনি হন এর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। পছন্দমতো মৌলিক নাটক না পাওয়ায় প্রথম নাটক মনস্থ করতে কয়েক বছর সময় লেগে যায়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে নিজ দল নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ে বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ নির্দেশনার মধ্য দিয়ে নাট্য নির্দেশনায় যাত্রা শুরু করেন তিনি। তার নির্দেশিত প্রথম মঞ্চনাটক মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত প্রহসন বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ-এ অভিনয় করেন লাকি ইনাম, আবুল হায়াত, ইনামুল হক, আলী যাকের ও ফখরুল ইসলাম। পরের বছর ১৯৭৩ সালে তিনি বাদল সরকার রচিত এবং আলী যাকের পরিচালিত বাকি ইতিহাস মঞ্চনাটকে অভিনয় করেন। এটি ছিল নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের হয়ে তার প্রথম অভিনয় এবং এটি ছিল বাংলাদেশে প্রথম দর্শনীর বিনিময়ে নাট্য প্রদর্শনী। এরপর মঞ্চ নাটকের নির্দেশনার পাশাপাশি ধারাবাহিকভাবে তিনি অভিনয়ও করেছেন। মঞ্চনাটকে তিনি প্রায় ২ হাজারটি প্রদশর্নীতে অভিনয় করেন। একাধারে মঞ্চ, রেডিও এবং টেলিভিশনে সমান পদচারণা তার। সেই সঙ্গে নাট্যবিষয়ক পুস্তক রচনা, নাট্যসমালোচনা, উপস্থাপনা, নাট্যশিক্ষক হিসেবে পাঠদান, টেলিভিশন নাট্যকার, প্রবন্ধকার, একজন সুবক্তা সব ক্ষেত্রেই রয়েছে তার সরব পদচারণা সব ক্ষেত্রেই নিজের স্বাক্ষরিত ঔজ্জ্বলতা রেখে চলেছেন নিরন্তর। এখন পর্যন্ত নাটক ও অন্যান্য বিষয়ে তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১২টিরও অধিক।

দীর্ঘ পাঁচ দশকের পথচলায় বাংলা মঞ্চে আতাউর রহমানের নির্দেশনায় আমরা পেয়েছি ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’, ‘ভেঁপুতে বেহাগ’, ‘মাইলপোস্ট’, ‘সাজাহান’, ‘গডোর প্রতীক্ষায়’, ‘কবর দিয়ে দাও’, ‘গ্যালিলিও’, ‘ঈর্ষা, ‘হিম্মতি মা’, ‘রক্তকরবী’, ‘নাট্যত্রয়ী’, ‘ত্রয়লাস ও ক্রেসিদা’, ‘এখন দুঃসময়’, ‘অপেক্ষমাণ’। নিজ দলের বাইরেও রয়েছে তার উল্লেখযোগ্য নির্দেশনা। তন্মধ্যে- ‘আগল ভাঙার পালা’, ‘গণনায়ক’, ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘ডেড পিকক’, ‘দণ্ডধর’, ‘ম্যাকবেথ’, ‘তাসের দেশ’, ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’, ‘নারীগণ’, ‘রুদ্র’, ‘রবি ও জালিয়ানওয়ালাবাগ’। বাংলার মঞ্চাঙ্গনের জনপ্রিয় ও সফল নাট্যনির্মাতাদের অন্যতম এই মানুষটির এখন পর্যন্ত নির্দেশিত নাটকের সংখ্যা ত্রিশের কোটা পেরিয়ে পঁয়ত্রিশে। মঞ্চে তার নির্দেশিত অনেক নাটক পেয়েছে অসাধারণ জনপ্রিয়তা, তাই আমাদের বিশ্বাস নির্দেশনায় খুব শিগগিরই অর্ধশতক কিংবা শতকের কোটা পূর্ণ হবে নিশ্চয়ই। কারণ দীর্ঘ সময়ের এই নাট্য অভিজ্ঞতায় রক্তকরবী, বাংলার মাটি বাংলার জল, হেমলেট থেকে অপেক্ষমাণ; শেক্সপিয়র থেকে রবীন্দ্রনাথ; বঙ্গবন্ধু, গান্ধীজী থেকে লিঙ্কন; নজরুল, জীবনানন্দ থেকে সৈয়দ হক তার হৃদয়ের ঝঙ্কার হয়ে উঠেছে প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্তে।

আতাউর রহমান বাংলাদেশ সেন্টার অব দ্য ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটের সাধারণ সম্পাদক এবং পরে সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সভাপতি থাকাকালীন ২০১১ সালের মে মাসে ১০ দিনব্যাপী ১ম ঢাকা আন্তর্জাতিক থিয়েটার উৎসবের আয়োজন করেন। বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের প্রাক্তন সভাপতি। বাংলা একাডেমির সম্মানীত ফেলো। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সংস্কৃতিবিষয়ক উপ-কমিটির চেয়ারম্যান। এ ছাড়া সংস্কৃতি অন্তঃপ্রাণ এই ব্যক্তিত্ব বিভিন্ন সংগঠনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। নবনাট্য আন্দোলন, গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনসহ দেশের সব সাংস্কৃতিক আন্দোলনে রয়েছে আতাউর রহমানের অসামান্য অবদান। অনন্য এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি স্বাধীনতা পুরস্কার (২০২১), শহীদ মুনীর চৌধুরী পুরস্কার, শ্রেষ্ঠ মঞ্চ নির্দেশনার জন্য চক্রবাক পুরস্কার, মঞ্চ নির্দেশনার জন্য লোক নাট্যদল স্বর্ণ পদক, অন্যদিন ও ইমপ্রেস টেলিফিল্ম পুরস্কার, মঞ্চনাটকে অবদানের জন্য অঁলিয়ো ফ্রঁসোয়া পুরস্কার, চ্যানেল আই রবীন্দ্রমেলা আজীবন সম্মাননা পুরস্কার, কাজী মাহবুবুল্লাহ আজীবন সম্মাননা পুরস্কার, বাংলা একাডেমির ফেলো, মঞ্চনাটকে অবদানের জন্য একুশে পদক (২০০১), আরটিভি স্টার অ্যাওয়ার্ডস আজীবন সম্মাননা পুরস্কারসহ (২০১৯) বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

অদৃশ্য আঁচলের বৃন্তচ্যুত অন্ধকারে বর্ণহীন নির্মোহের সীমান্তবর্তী প্রাতঃস্নানে নিজেকে সিক্ত করেছেন আতাউর রহমান। উচ্চাশায়পূর্ণ ক্লান্ত বংশলতিকার নাব্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন অকপটে। দ্যশীতি বর্ষা পেরিয়ে আমাদের মধ্যে আছেন ত্র্যশীতি বর্ষাছোঁয়া যৌবতী রোদ্র ডিঙানো তারার উজ্জ্বল বাতি হয়ে। আর আলোকিত বিচ্ছুরণে প্রজন্মের কাছে তিনি শিল্পীত সাঁকোর পরিণত রেখা হয়ে থাকবেন অনন্তকাল। এই প্রত্যাশায় ত্র্যশীতি বর্ষা আঁকুক তার জীবনের আষাঢ়ী আল্পনা। সেই সঙ্গে গুণী এই ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তীর মাহেন্দ্রক্ষণে আমি থেকে আমরা-সবাই অপেক্ষমাণ বর্ষার আলাপনে, মঞ্চসারথির শতবর্ষের জয়গানে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক ও নারীনেত্রী।


চলমান বিশ্ব বাস্তবতায় পররাষ্ট্রনীতি ও উন্নয়ন কৌশল

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
 শেখর দত্ত

বিশ্ব পরিস্থিতি ক্রমেই আরও অস্থির ও ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে। এদিকে কোভিডের সময়ে সৃষ্ট রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের ভেতর দিয়ে ঘনীভূত অর্থনৈতিক মন্দাভাবও কাটছে না। আঞ্চলিক যুদ্ধ বা উত্তেজনা বাড়ছে বৈ কমছে না। দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বা জোটগত সম্পর্ক ক্রমেই আরও বহুমুখী জটিল ও কঠিন হয়ে উঠছে। সমাজতন্ত্র-ধনতন্ত্র ঠাণ্ডাযুদ্ধ যুগে কখনো বা যুদ্ধ বা উত্তেজনা সৃষ্টি হতো। তবে তখন সংশ্লিষ্ট দেশগুলো সমাজতন্ত্র ও ধনতন্ত্র দুই পক্ষের কোন পক্ষে যাবে, উন্নয়নের কোন মডেল গ্রহণ করবে এমন বিকল্প আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর ছিল।

সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার পতনের পর আমেরিকার নেতৃতে পুঁজিবাদী এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার ক্ষণস্থায়ী কালপর্বে মনে করা হতো, বিশ্বায়নের সুবাতাস বইছে। বিশ্ব বিভক্ত থাকবে না, পারস্পরিক নির্ভরশীল বিশ্ব দ্রুতই পুঁজিবাদী দুনিয়ার মনমতো ‘বিশ্বগ্রাম’ হয়ে যাবে; কিন্তু পুঁজিবাদের ওই স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি, বরং বহুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার উদ্ভবের ভেতর দিয়ে তা অপসৃত হচ্ছে।

অতীতের দিকে দৃষ্টিপাত করলে বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করা যায়, আমেরিকাকে ‘পেপার টাইগার’, সোভিয়েত ইউনিয়নকে সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ আখ্যায়িত করে একদিকে ‘পিংপং রাজনীতি’ আর অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে পাকিস্তানের দুতালির ভেতর দিয়ে আমেরিকা-চীন মৈত্রী প্রতিষ্ঠিত হয়। এই মৈত্রীর সঙ্গে আমাদের ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত, তিন লাখ মা-বোনের ইজ্জত জড়িয়ে আছে। পুঁজিবাদ বিশেষত আমেরিকার সহযোগিতা নিয়ে বা একে ব্যবহার করেই চীন বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। বর্তমানে নতুন পরাশক্তি চীন ও পূর্বতন পরাশক্তি রাশিয়ার মৈত্রী জোরদার হয়ে ওঠায় পুঁজিবাদের পরিমণ্ডলেই পুঁজিবাদী ‘বিশ্বায়ন’, বিশ্বগ্রাম দিবাস্বপ্নে রূপ নিয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে বহুকেন্দ্রিক বিশ্বে এখন অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী হয়ে ওঠা দেশগুলো স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামরিক প্রভাব বলয় রক্ষা ও বিস্তারে উঠেপড়ে লেগেছে। এতে অস্ত্র প্রতিযোগিতা, অস্ত্র বিক্রি, অস্ত্র ব্যবহার তথা রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামরিক আগ্রাসী কার্যক্রম ক্রমেই বেশি বেশি করে বাড়ছে। প্রবাদ বলে, ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া থাকবেই। এ কারণেই ছোট দেশগুলো যেমন নানা দিক থেকে প্রচণ্ড চাপের মধ্যে পড়ছে, এসব দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলানো যেমন বাড়ছে; উল্টোদিকে তেমনি ভারসাম্য বজায় রেখে নানা ধরনের সুযোগও সেই দেশগুলোর সৃষ্টি হচ্ছে। এদিকে ছোট দেশগুলোতে অস্থিরতা অনিশ্চয়তা যত বাড়ছে, ততই শক্তিশালী দেশগুলোর অভ্যন্তরে এবং পরস্পরের মধ্যে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক দ্বান্দ্বিকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কেউ-ই শান্তিতে থাকতে পারছে না।

এই অস্থিতিশীল ও অশান্তিময় বিশ্ব বাস্তবতায় জাতীয়ভাবে আমরাও রয়েছি অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে। বিগত নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক অস্থিরতা-অনিশ্চয়তা সৃষ্টির প্রয়াস লক্ষণীয় হয়ে উঠলেও নির্বাচনের পর তা কেটে গেছে বা স্তিমিত হয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এতে এই সুযোগ অবারিত হয়েছে, ভূ-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণে নিয়ে চাপ সামলিয়ে, নাক গলানোর সুযোগকে ক্রমে সংকুচিত করা এবং ইতোমধ্যে অর্জিত সাফল্যগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে প্রাপ্ত সুযোগকে ২০০৯-২৩ সময়কালের মতোই কাজে লাগানো।

এ ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু নির্দেশিত এবং সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে গৃহীত ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতি ও কৌশল নিঃসন্দেহে আমাদের পথ দেখাবে। আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, বিভিন্ন দেশের ক্ষমতা ঘিরে রাজনীতি বিভিন্নভাবে প্রভাবিত ও পরিবর্তিত হচ্ছে। বিশেষভাবে বড় ও শক্তিশালী দেশগুলোর ক্ষমতার রাজনীতি কীভাবে আবর্তিত, রূপান্তরিত বা পরিবর্তিত- অর্থনীতি প্রভাবিত হতে পারে কি না তাও প্রতিনিয়ত হিসাবের মধ্যে রাখা ভিন্ন বিকল্প নেই।

ইতোমধ্যে ভারতে নির্বাচন হয়ে গেছে। ফলাফল যা হয়েছে, তাতে ক্ষমতাসীন দল বিজেপি তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করলেও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় এটা অনুমান করা যায়, ফলাফল ওই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক অবস্থাকে বেশ প্রভাবিত করবে। তবে একই পররাষ্ট্রমন্ত্রী বহাল থাকার ভেতর দিয়ে এটা সুস্পষ্ট হয়ে যায়, বিদেশনীতি ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আরও শক্ত অবস্থান নেবে। ভারতবিরোধী ও চীনপন্থি হিসেবে সুপরিচিত মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জুর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে আসার ভেতর দিয়ে তা সুস্পষ্ট হয়।

শপথ গ্রহণের পরদিনই পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নতির আশাপ্রকাশ করেন এবং ‘ভারতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রয়েছে’, ‘শিগগিরই জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদ পাবে’ মন্তব্য করে দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘বিশ্বে ভারতের প্রভাব ক্রমাগত বাড়ছে। এটি শুধু আমাদের উপলব্ধি নয়, অন্য দেশগুলোও মনে করে ভারত সত্যি তাদের বন্ধু।’ শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের পর দুই দেশের দুই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির ‘অত্যন্ত উষ্ণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে’ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বাংলাদেশ সফরে আমন্ত্রণ জানান।

এই সাক্ষাৎ ও আলোচনার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাসান মাহমুদ বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে অনেক বিষয় জড়িত। যেহেতু একই সরকার দেশ পরিচালনা করছেন তাই একসঙ্গে কাজ করার কিছু সুবিধা আছে। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকার কারণে দুই দেশেরই জনগণ বিভিন্ন দিক থেকে উপকৃত হচ্ছেন। আমাদের মধ্যে থাকা এই বহুমাত্রিক সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারিত ও গভীর হবে।’ একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, এই অবস্থান আওয়ামী লীগের নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

নির্বাচন-পূর্ব সময়ে আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে টানাপড়েন লক্ষণীয় হয়ে ওঠে। নির্বাচনের পরও তা যে প্রশমিত হয়েছে, তা বলা যাবে না। তবে এমনটাও আলোচনায় রয়েছে, আইএমিএফের ঋণ প্রাপ্তির ভেতর দিয়ে বাংলাদেশ সম্পর্কে আমেরিকার অবস্থান সুস্পষ্ট। চাপ দেওয়া কৌশলের অংশ হিসেবে টানাপড়েনও বজায় রয়েছে। এই টানাপড়েন যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শক্তি আমেরিকার নিজস্ব প্রভাব বলয় বৃদ্ধির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত, তা দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট। বাংলাদেশ চায় বিশ্বমন্দায় নিপতিত বহুকেন্দ্রিক বিশ্বের প্রাপ্ত অর্থনৈতিক সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ব পরিমণ্ডলে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে। এই চাওয়াটাই সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। লেখাটা যখন লিখছি তখনই সম্প্রতি বাংলাদেশ ঘুরে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুর বিবিসিতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকার পড়লাম।

বিবিসির বাংলা বিভাগের প্রধান সাংবাদিক সম্পর্কের টানাপড়েনের বিষয়টি সামনে এনে তাকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুটো অভিযোগ (যাতে তিনি দেশের নাম উল্লেখ করেননি) নিয়ে তাকে প্রশ্ন করেন। প্রথমটি বাংলাদেশে একটি বিমান ঘাঁটি স্থাপনের প্রস্তাব; দ্বিতীয়টি বাংলাদেশ-মিয়ানমারের কিছু অংশ আলাদা করে পূর্ব তিমুরের মতো একটি ‘খ্রিষ্টান রাষ্ট্র’ স্থাপনের চক্রান্ত।

তিনি এই দুই বিষয়ে আমেরিকার আগের অবস্থানই তুলে ধরে বলেন, ‘এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।’ তিনি সম্পর্ক স্বাভাবিকরণের বিষয়টি তুলে ধরে ‘স্বাধীন এবং উন্মুক্ত, সংযুক্ত, সমৃদ্ধ, নিরাপদ ও স্থিতিশীল’ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিষয়টি সামনে আনেন এবং তিনি বলেন, একটি গতিশীল ও দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান তাকে এ অঞ্চলের বাণিজ্য প্রসারে একটা সেতু এবং এই অঞ্চলে সমৃদ্ধির নোঙর হিসেবে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছে।’ তার বক্তব্য থেকে সুস্পষ্ট, আমেরিকা বাংলাদেশের কাছে কি চায়। তবে তিনি আগের এ কথাটিও বলতে ভুল করেননি, ‘আমরা সামনের দিকে তাকিয়ে আছি, পিছনে নয়।’

বাংলাদেশও বোধকরি নিজস্ব স্বার্থ বজায় রেখে সামনের দিকেই তাকাতে চাইবে। সামনেই রয়েছে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহের এই নির্বাচন বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাইডেন এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যে হবে বলে ধারণা করা যায়। প্রসঙ্গত, ঠাণ্ডাযুদ্ধ যুগ ও পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের যুগে এমনটাই বলা হতো, ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান যে দলেরই সরকার হোক না কেন, আমেরিকার বিদেশনীতি পাল্টায় না; কিন্তু বহুকেন্দ্রিক বিশ্বযুগে ট্রাম্প ও বাইডেনের আমলে এসে দেখা যাচ্ছে, প্রভুত্বের মূলনীতি ঠিক রাখলেও কৌশল গ্রহণের ক্ষেত্রে দুই দলের পার্থক্য রয়েছে। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ কৌশল ছিল ট্রাম্পের; কিন্তু বাইডেন আমলে ওই কৌশল থাকেনি বলে অবস্থা পর্যবেক্ষণে প্রতীয়মান হচ্ছে।

তাই আমেরিকার নির্বাচন ও নির্বাচনী ফলাফলের দিকে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ নজরে রাখবে। একই সঙ্গে সর্ববৃহৎ শক্তির অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলানোর যুক্তিসঙ্গত ইস্যু যদি থাকে, তবে তা বিবেচনায় নিয়ে সামনে অগ্রসর হতে চেষ্টা করবে। প্রসঙ্গত, অতীতের হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা এটা আমাদের স্মরণে রাখতেই বৃহৎ শক্তি সময় বিবেচনায় পিছিয়ে আসে বটে; কিন্তু সময়-সুযোগ বুঝে আঘাত হানতে ভুল করে না। ‘দেশের সার্বিক উন্নয়ন সরকারের প্রাথমিক লক্ষ্য’ বিষয়টা বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী বাংলাদেশ ‘যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, কানাডা এবং অন্যান্য উন্নত দেশের সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগিতা চলমান’ রাখবে বলেই ধারণা করা চলে।

এদিক যুক্তরাজ্যে আগাম নির্বাচন জুলাই মাসের প্রথম দিকে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিগত মে মাসে স্থানীয় নির্বাচনে বিরোধী দল লেবার পার্টি ধরাশায়ী করেছে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টিকে। ক্ষমতাসীন দলেও নেই স্থিতিশীলতা। ২০১০ থেকে তিনবার ক্ষমতায় থাকা কনজারভেটিভ পার্টি ৫ বার প্রধানমন্ত্রী বদল করে। প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক পদত্যাগ করবেন বলে গুজব আছে। জরিপের ফলাফলে এগিয়ে আছে লেবার পার্টি। ফ্রান্সেও হচ্ছে আগাম নির্বাচন। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে মধ্যপন্থি উদার ও সমাজতান্ত্রিক দলগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখলেও ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রিয়ায় কট্টর ডানপন্থিরা সাফল্য পেয়েছে। সব মিলিয়ে আমাদের উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলোর রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতির ওপর খেয়াল রাখা এখন সময়ের দাবি।

পশ্চিমা উন্নত দেশগুলোতে ক্ষমতার রাজনীতিতে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা পরিলক্ষিত হলেও চীন ও রশিয়ায় সেই অস্থিরতা-অনিশ্চয়তা নেই। এটা ভালো কি মন্দ এ নিয়ে বিতর্ক হলেও এটাই বাস্তব, বর্তমানে তা দুই দেশের শক্তির দিক। চীনের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত। ২০১২ থেকে ২০২৩ তিন মেয়াদে শি চিন পিং চীনের প্রেসিডেন্ট। তবে এই পদটি আলঙ্কারিক। কমিউনিস্ট পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি ও কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি রয়েছেন একচ্ছত্র ক্ষমতায়। ‘আজীবন’ তার ক্ষমতায় থাকার পথও পরিষ্কার।

রাশিয়ায় ২০০০ সাল থেকে পদের এদিক-ওদিক করে পুতিন ক্ষমতায়। বিগত মার্চে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়ে গেছে। সেপ্টেম্বরে প্রথম দিকে রাষ্ট্রীয় ডুমার নির্বাচন হচ্ছে। এসবই আনুষ্ঠানিকতা। এদিকে চীন সাগরে উত্তেজনা বাড়ছে। ‘সামরিকভাবে’ চাপে রাখতে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি জাহাজ ও বিমান দিয়ে তাইওয়ানকে ঘেরাও করে রেখেছে বলে জানা যাচ্ছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন উত্তর কোরিয়া ও ভিয়েতনাম সফর করবেন বলে জানা যাচ্ছে।

এই বাস্তবতায় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বাণিজ্য যুদ্ধ ও স্যাংশনের প্রেক্ষাপটে দুই শক্তিধর দেশ চীন-রাশিয়ার জোট বর্তমান বিশ্ব বিশেষত এশিয়ার সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী শক্তি। সম্প্রতি পুতিনের চীন সফরের সময় দুই দেশ ‘আনলিমিটেড পার্টনারশিপ’ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছে। প্রসঙ্গত, চীন আমাদের ‘অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন ও কৌশলগত অংশীদার’। চীন ‘আরও বড় পরিসরে’ উন্নয়নের কর্মসূচি বাস্তবায়নে এগিয়ে আসবে বলে সহজেই ধারণা করা যাচ্ছে। রাশিয়ার সাহায্যে নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ শক্তি কেন্দ্র কার্যক্রম শুরু করার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার বাংলাদেশ। রাশিয়া এখন অ্যাভিয়েশন শিল্পে আগ্রহী। ইতোমধ্যে জানা গেছে, ব্রিকস (ব্রাজিল-রাশিয়া-ভারত-চীন-দক্ষিণ আফ্রিকার নেতৃত্বে গঠিত অর্থনৈতিক সংস্থা। যাতে বাংলাদেশ সদস্য হতে আগ্রহী) শীর্ষ সম্মেলন অক্টোবরের শেষ দিকে রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

বক্ষ্যমাণ নিবন্ধ থেকে সুস্পষ্ট, বর্তমানে অর্থনৈতিক সমস্যা-সংকট বিরাজমান থাকলেও বিদ্যমান বিশ্ব বাস্তবতায় উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রাখার সুযোগ বাংলাদেশের রয়েছে। তবে জনগণের ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমিয়ে চলমান বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে বাংলাদেশ ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’নীতি নিয়ে সাম্প্রতিক অতীতের মতো কতটা সুকৌশলে অগ্রসর হতে পারবে, তার ওপর সবকিছু নির্ভর করবে।

লেখক: রাজনীতিক


এখনো প্রাণ জুড়িয়ে দেয় হাতপাখা

আপডেটেড ১৫ জুন, ২০২৪ ১২:১৩
প্রদীপ সাহা  

গ্রামবাংলার জনপ্রিয় পাখা হচ্ছে তালপাতার হাতপাখা। গ্রামবাংলার মানুষ এখনো গরমে শীতল বাতাস পাওয়ার অবলম্বন হিসেবে হাতপাখা বোঝে। এই পাখা তৈরি ও ব্যবহারের ইতিহাস বহু প্রাচীন। বাঁশ, বেত, কাপড় এবং তালপাতার পাখা এখনো টিকে আছে। টিকে আছে পুরোনো ঐতিহ্য ধারণ করে। পীড়াদায়ক গরম থেকে সাময়িক স্বস্তির হাতিয়ার পাখা। বিদ্যুৎ তো এই সেদিনের! কিন্তু হাতপাখার প্রচলন কমে গেলেও পুরোপুরি শেষ হতে পারেনি। হাতপাখার বিবর্তন আজ থেকে প্রায় তিন হাজার বছর আগে। গ্রিক রোমানদের যুগেও হাতপাখার প্রচলন ছিল। তবে প্রথমদিকে পাখাগুলো ছিল একটা সম্পূর্ণ অংশ। ভাঁজ করা বা ফোল্ডিং পাখা এসেছে আরও অনেক পরে। ইউরোপীয় বণিকরা প্রথম এ ধরনের পাখা নিয়ে আসে চীন ও জাপান থেকে। তখন এসব পাখা ছিল অত্যন্ত মূল্যবান। এগুলোতে ব্যবহার করা হতো মণিমুক্তা ও হাতির দাঁত। সোনা-রুপার পাত বসানো হাতপাখাগুলোয় নিপুণ হাতে শিল্পীরা আঁকতেন সে সময়ের সামাজিক প্রেক্ষাপট, ধর্মীয় নানা কাহিনী এবং ফুল-লতাপাতাসহ নানা বিষয়। আঠারো শতকের প্রথমদিকে ইউরোপে হাতপাখা তৈরি শুরু হলেও তখন চীন থেকে আসা পাখার প্রচলন ছিল তুঙ্গে।

হাতপাখায় শিল্পের কারুকাজ দিয়ে তৈরি হয় নকশি পাখা। তালপাতা ছাড়া সুতা, বাঁশ, বেত, খেজুরপাতা, শোলা, শন, গমের কাঠি ও ময়ূর পালক দিয়ে নকশি পাখা তৈরি করা হয়। নকশি পাখার কদর সেই বেদ পুরাণের আমল থেকেই। দেবতাদের দুই পাশে দুই অপ্সরা নকশি পাখা হাতে বাতাস করত। রাজা-মহারাজাদের সিংহাসনের দুই পাশেও ময়ূরের পালক বা চমৎকার রেশমি কাপড়ের তৈরি পাখা হাতে ডানে-বামে দাঁড়িয়ে বাতাস করত দাসদাসী। ইংরেজ আমলে এমনকি ইংরেজ আমলের পরেও জজ-ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে এ ধরনের পাখা টেনে বাতাস করার ব্যবস্থা ছিল। অষ্টাদশ শতকে বিত্তশালীরা চন্দন কাঠের পাখা ব্যবহার করতেন, যেটি ভিজিয়ে হাওয়া খেলে চন্দনের সুগন্ধে চারদিক আমোদিত হতো। ছিল হাতির দাঁতের কারুকার্য করা পাখাও। বিত্তবান লোকের কাছারি বা টঙ্গি ঘরে ছাদ বরাবর কড়িকাঠে ঝুলানো থাকত বড় কাপড়ের পাখা; নিচে ঝুলত রশি। রশি টেনে চালানো হতো সেই পাখা।

বর্তমান আধুনিক সময়ে এ ধরনের পাখা অনেক কমই দেখা যায়। তবে গ্রামবাংলায় হাতপাখার কদর এখনো কমেনি। কৃষক মাঠে কাজ করছে, আর স্ত্রী তার জন্য খাবার নিয়ে আসছে এবং সঙ্গে একটি হাতপাখা। কৃষক খাচ্ছে আর গৃহবধূ হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছে- এ ছবি যেন মনে দাগ কেটে যায়। সৌন্দর্যের দিক দিয়ে সবচেয়ে এগিয়ে রাখার মতো যে পাখা, সেটি রঙিন সুতোর ‘নকশি পাখা’। সুতা দিয়ে পাখার গায়ে পাখি, ফুল, লতা-পাতা কিংবা ভালোবাসার মানুষের নাম অথবা ভালোবাসার চিহ্ন ফুটিয়ে তোলা হয়। পাখার বাতাসে যেমন প্রাণ জুড়িয়ে যায়, তেমনি বাহারি সব পাখা দেখে চোখও জুড়ায়। এক সময় কত রকমের পাখা থাকত বাড়িতে- কাপড়ের পাখা, বাঁশের চাটাইয়ের রঙিন পাখা, তালপাতার পাখা, ভাঁজ পাখা, চায়না পাখা, ঘোরানো পাখা। একান্নবর্তী পরিবারের কর্তা খেতে বসেছেন। থালায় ভাত, সঙ্গে নানা ব্যঞ্জন। পরিবারের কেউ তাকে তালপাখার পাখা দিয়ে বাতাস করছে- এ মনোরম দৃশ্য এখন আর নেই। প্রচণ্ড গরমে তালপাতার পাখা জলে ভিজিয়ে সেই মিষ্টি বাতাসের আমেজ এখনকার মানুষ বুঝবে না। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তালপাতার পাখা তেমন চলতে পারছে না।

পাখা তৈরিতে তালপাতার ব্যবহার ব্যাপক। ‘তালের পাখা, প্রাণের সখা, গরমকালে দিও দেখা’- এ পঙক্তিটি গ্রামবাংলার মানুষের কাছে সুপরিচিত। শীতের মাঝামাঝি সময়েই তালপাতার পাখা তৈরির কাজ শুরু হয়ে যায়। তালপাতা, বাঁশের কঞ্চি ও সুই-সুতা হলো পাখার উপকরণ। প্রথমে তিন-চার ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয় পাতা। তারপর সেই পাতাকে সাইজ করে কাটা, সরু লম্বা কাঠি দিয়ে বাঁধা, রং করা ইত্যাদি নানা পর্বের মধ্য দিয়ে পাখা তৈরি হওয়ার পর বিপণনের ব্যবস্থা করা হয়। একটি তালপাতা থেকে একটি বা দুটি পাখা তৈরি করা যায়। তালপাতার পাখা তৈরি ও বিক্রি করে অনেকের জীবিকা নির্বাহ এখনো টিকে আছে। বর্তমানে তালগাছ কমে আসার কারণে শিল্পীর সংখ্যাও কমে আসছে। অন্যদিকে, বৈদ্যুতিক পাখার প্রচলন হওয়ায় বাংলার এ জনপ্রিয় লোকশিল্প ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। তবে হাতপাখার বাতাস এখনো প্রাণ জুড়িয়ে দেয়। চিরায়ত বাংলায় হাতপাখা আজও গরমে শরীর জুড়ায়।

লেখক: বিজ্ঞানবিষয়ক গবেষক


অর্থনীতির মূলস্রোতে কালো টাকা

আপডেটেড ১৫ জুন, ২০২৪ ১২:১৩
রজত রায়

নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্থ্য সেনের মতে, সভ্যতার গোড়া থেকেই সাদা ও কালো টাকা পরস্পর হাত ধরাধরি করে চলেছে, যা পৃথিবীর সব দেশেই কম-বেশি রয়েছে একটি সীমারেখার মধ্যে। যেমন- পশ্চিমা বিশ্বে, মধ্যম আয়ের দেশ ল্যাটিন আমেরিকা ও এশিয়ার কিছু দেশে যেখানে অফশোর হিসাব বলে একটি কার্যক্রম প্রচলিত আছে। যেখানে বিশেষায়িত অঞ্চলে কালো টাকা বিনিয়োগ করলে কোনো প্রশ্নের মোকাবিলা করতে হয় না। যা অর্থনীতিতে একটি বৃহৎ অংশ দখল করে রয়েছে।

প্রস্তাবিত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত আয় প্রদর্শন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কালো টাকা সাদা করার নৈতিকতা এবং অর্থনীতিতে এর প্রভাব নিয়ে বিতর্ক চলে আসছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, উচ্চমূল্যস্ফীতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বৈশ্বিক সংকট, ডলার সংকট, ব্যবসা-বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে মন্দা এবং অন্যান্য বৈশ্বিক অনিশ্চিয়তায় সরকারের ব্যয় চাহিদা বেড়ে গেছে। এ কারণে রাজস্ব আহরণের বৃদ্ধি ও প্রয়োজন রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। অপ্রদর্শিত আয় মূল ধারায় নিয়ে আসার প্রয়োজন আছে। বিশেষ করে কর সুবিধার মাধ্যমে কালো টাকা সাদা করার সুবিধা দিলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির উন্নয়নে সাহায্য করবে। অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা যতদিন প্রদর্শিত না হবে ততদিন অর্থনীতি মূলধারার গতি স্তিমিত হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ২০১১ সালের গবেষণাপত্র ÒUnderground Economy of Bangladesh an Econometric analysisÓ অনুযায়ী ২০০৯ সালে দেশের অর্থনীতিতে ৬২.৭৫ শতাংশ কালো টাকা ছিল। যার পরিমাণ ৫ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। যা ২০১৪-১৫ সালের জাতীয় বাজেটের দ্বিগুণেরও বেশি। কালো টাকা বা করবহির্ভূত আয় হচ্ছে কোনো ব্যক্তি যখন আয়কর দিতে গিয়ে কোনো আয় জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে অন্তর্ভুক্ত করেন না, তখনই তা কর বহির্ভূত আয় হয়। আয় কালো নয়; কিন্তু সেই আয়ের ওপর কর দেওয়া হয়নি। নিয়মমতো এটি কর বহির্ভূত আয়।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তথ্যানুযায়ী ২০২০-২০২১ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে প্রায় ১৮ হাজার ২২০ কোটি টাকা অপ্রদর্শিত আয় প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা কর দিয়ে বৈধ করেছেন ৭ হাজার ৪৪৫ জন করদাতা। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ এবং অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ২০২০-২০২১ অর্থবছরের ২০ হাজার ৬০০ কোটি অপ্রদর্শিত বা কালো টাকা সাদা হয়েছে। প্রায় ১২ হাজার করদাতা এই টাকা সাদা করেছেন। সব মিলিয়ে সরকার কর পেয়েছে ১ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা। কালো টাকা সাদা করার তালিকায় আছেন চিকিৎসক, সরকারি চাকরিজীবী, তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক, ব্যাংকের উদ্যোক্তা মালিক, স্বর্ণ ব্যবসায়ীসহ আরও অনেকে। তবে ধনীরাই বেশি টাকা সাদা করেছেন।

অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, সব শ্রেণি পেশার মানুষই কালো টাকা সাদা করেছেন। ২০২০-২১ অর্থবছরের যে পরিমাণ কালো টাকা সাদা হয়েছে তার মধ্যে পুঁজিবাজারে ২৮২ কোটি ৪০ লাখ টাকা ও আবাসন খাতে ২ হাজার ৫১৩ কোটি ২০ লাখ টাকা সাদা হয়েছে। তথ্যানুসারে, ১৯৭১ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত অপ্রকাশিত আয়ের প্রায় ৩০ হাজার ৮২৪ কোটি টাকার হিসাব প্রকাশ করা হয়েছে, যা থেকে প্রায় ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা কর আদায় হয়েছে। করোনার কারণে বিদেশের সঙ্গে সংযোগ সেভাবে হয়নি বা ব্যাহত হয়েছে। সে কারণে এ টাকাগুলো দেশের বাইরে চলে যাওয়ায় বা অপ্রদর্শিত রাখা সম্ভব হয়নি অনেকের পক্ষে। তারাই দেশে বিশেষ সুবিধা নিয়ে টাকাগুলো সাদা করার সুযোগ নিয়েছে।

করোনাকালে শিল্পে বিনিয়োগ প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল। ফলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি বরং, ভোগ চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, নয়তো টিকে থাকতে কর্মী ছাঁটাই করেছে। এ অবস্থায় শিল্পের চাকা সচল রাখতে ও কর্মসংস্থান বাড়াতে উৎপাদনশীল খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ ২০২১-২০২২ অর্থবছরের বাজেটে বিনিয়োগের বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। আয়কর অধ্যাদেশের নতুন ধারা (১৯) অনুযায়ী, দেশের সব স্থানে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ করার সুযোগ ছিল। এ জন্য ১০ শতাংশ কর প্রদান করে সরাসরি ঘোষণা নিয়ে বৈধ করেছেন ২ হাজার ২৫১ জন করদাতা। যার পরিমাণ হলো ১ হাজার ১২৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

বর্তমানে আয়কর আইনানুযায়ী, যেকোনো করদাতা সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ কর দিয়ে এর সঙ্গে ১০ শতাংশ জরিমানা দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ নিতে পারে। তবে অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ রয়েছে। যেকোনো সংস্থা চাইলে পরবর্তী সময়ে ওই টাকার উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন করতে পারে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শুধু ব্যক্তি নয়- প্রতিষ্ঠানেরও অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা নির্দিষ্ট হারে কর দিয়ে বৈধ করার সুযোগ রাখা হয়েছে। কালো টাকা সাদা করার প্রস্তাবে বলা হয়েছে, আয়কর আইন-২০২৩ বা অন্য কোনো আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন আয়কর কর্তৃপক্ষসহ অন্য কোনো সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ ব্যক্তির কোনো পরিসম্পদ অর্জনের উৎসের বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারবে না। যদি ওই ব্যক্তি ১ জুলাই ২০২৪ থেকে ৩০ জুন ২০২৫-এর মধ্যে ২০২৪-২৫ কর বর্ষে রিটার্ন বা সংশোধিত রিটার্ন দাখিলের সময় ১৫ শতাংশ হারে কর দিয়ে রিটার্নে ওই পরিসম্পদ দেখান। এ ছাড়া জায়গা অনুপাতে নির্দিষ্ট পরিমাণ কর ও জরিমানা দিয়ে অপ্রদর্শিত জমি, অ্যাপার্টমেন্ট প্রশ্নাতীতভাবে বৈধ করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশে কালো টাকা একটি অপ্রত্যাশিত বাস্তবতা। আইএমেএফের “Shadow Economics around the world, what did we learn over the last 20 years”শীর্ষক ২০১৫ সালে প্রকাশিত একটি দলিল মতে বাংলাদেশে কালো টাকা বা শ্যাডো ইকোনমির আকার হচ্ছে দেশটির মোট জিডিপির ২৭.৬০ শতাংশ। কালো টাকার কোনো আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞা নেই। সাধারণত কালো টাকা বলতে বুঝি হিসাবের খাতায় উল্লেখ না করে অর্জিত অর্থকে। যেমন- একজন মালিক একটি ফ্ল্যাট বিক্রি করলেন ১ কোটি টাকায়। তিনি চেকের মাধ্যমে পেলেন ৬০ লাখ টাকা। অবশিষ্ট ৪০ লাখ টাকা পেলেন নগদে। এই ৪০ লাখ টাকা যদি তিনি প্রাপ্তির খাতে না প্রদর্শন করেন তবে ওই ৪০ লাখ টাকা হয়ে যাবে কালো টাকা বা আন-রেকর্ডেড মানি।

অধ্যাপক ফ্রিডরিখ স্নেইডার তার- ÒShadow Economics all over the world new estimates for 162 countries from (1999-2007)” শীর্ষক সমীক্ষায় উল্লেখ করেন- কর প্রশাসনের দুর্বলতার কারণে শ্যাডো মানি বা ব্ল্যাক মানি বিভিন্ন দেশে বেড়ে চলেছে। যে কারণে বিভিন্ন ব্যক্তি ও কোম্পানি আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কাঠামোর বাইরে চলে যেতে পারছে।

অপ্রদর্শিত আয় কীভাবে তৈরি হয় এমন প্রশ্ন আমাদের অনেকের মনে জাগ্রত। বাংলাদেশে পেশাজীবীদের আয় যেমন- চিকিৎসক, প্রকৌশলী, স্থাপত্যবিদ, শিক্ষক, এনজিও খাত কিংবা অনেক পেশায় চাকরির বাইরেও পেশাগত চর্চার মাধ্যমে অর্থ আয় করেন বা সুযোগ আছে। যেমন- চিকিৎসকরা প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন, শিক্ষকরা বিশেষ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়ান, প্রকৌশলী বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী নকশাঁ ও কাজ তদারকি করেন। এখন কোনো চিকিৎসক, শিক্ষক বা প্রকৌশলী যদি এ থেকে পাওয়া অর্থ আয়কর রিটার্নে না দেখান তা হলে সেটি কালো টাকায় পরিণত হয়।

সেবা খাত, ক্রয় খাতে যেমন নিষিদ্ধ পণ্যের ব্যবসা, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা এগুলো বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে নিষিদ্ধ। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি মাদক বিক্রি করে বা অস্ত্র বিক্রি করে অর্থ আয় করে তবে সেটি কালো টাকা আয়কর বিবরণীতে দেখানোর সুযোগ নেই। তারপর ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করা যায় প্রতিদিন দোকানে যে বিক্রি হয় এবং যে পরিমাণ লাভ হয় তার পুরোটা তারা প্রদর্শন করে না বলে অনেক টাকা অপ্রদর্শিত থেকে যায়। এটাকেও কালো টাকা বলা হয়।

অপ্রদর্শিত আয় বা কালো টাকা মূল ধারার অর্থনীতিতে নিয়ে আসার বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ কর সুবিধার মাধ্যমে কালো টাকা সাদা করার সুবিধার মাধ্যমে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা সাদা করার সুবিধা দেওয়া হলে তা সামগ্রিক অর্থনীতির উন্নয়নে সাহায্য করবে।

লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক


অধিকতর সম্পদশালী হওয়ার প্রেরণা ও প্রযত্ন

আপডেটেড ১৫ জুন, ২০২৪ ১২:১৩
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

কারও কারও অধিকতর ধনী হওয়ার ক্ষেত্রে, এমনকি অনেক বড় বড় অর্থনীতির দেশকে ও অঞ্চলকে টপকে এই করোনা-উত্তরকালেও আনন্দ-সর্বনাশের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কারণ হিসেবে অব্যাহত রয়েছে। বড় বড় দাগে দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে অর্থ পাচারের প্রবণতা ও প্রবাহ চলমান থাকার প্রেক্ষাপটে নতুন জাতীয় বাজেটের মোড়ক উন্মোচিত হয়েছে। ভোজ্যতেল, জ্বালানি, বিদ্যুৎ এবং এমনকি ডলারের মূল্যবৃদ্ধির টালমাটাল অবস্থায় বেশ কিছু লক্ষণ স্পষ্ট হচ্ছে যে, অর্থনীতিতে বৈষম্য বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ১৯৪৩-এর দারুণ দুর্ভিক্ষের প্রাক্কালে যেসব প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছিল তার প্রচ্ছন্ন উপস্থিতি শুধু বাংলাদেশে নয় অনেক অর্থনীতিতেও, ১৯৩০ সালের গ্রেট ডিপ্রেশন কিংবা এই নিকট অতীতে ১৯৯৭ সালের এশীয় ক্রাইসিস এবং ২০০৭-০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দার কারণ ও প্রভাবের ভূত দেখা যাচ্ছে। ঠিক এ সময়ে সমাজে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতা আনয়নে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা সংস্থায় দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে অধিষ্ঠিত কর্তাব্যক্তিদের দায়িত্ব পালনে অর্পিত ক্ষমতা প্রয়োগে প্রতিশ্রুত ও দৃঢ়চিত্ততার প্রয়োজনীয়তার প্রসঙ্গও উঠে আসছে। নিজেদের অধিক্ষেত্রে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে আদিষ্ট হয়ে যদি তাদের কর্মধারা পরিচালিত হয়, সেক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠান কার্যকরভাবে জবাবদিহিমূলক ভূমিকা পালন করতে পারে না। এক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচার ও স্বচ্ছতার অভাবে আকীর্ণ হয়ে উঠতে পারে, স্বেচ্ছচারিতার অজুহাত যৌক্তিকতা এমনকি স্বজনপ্রীতির পরিবেশ বা ক্ষেত্র তৈরি হয়। সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটি প্রধান প্রতিবন্ধকতা।

যারা নীতি প্রণয়ন করে, নীতি উপস্থাপন করে তাদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব দৃঢ়চিত্ততা এবং নীতি-নিয়ম পদ্ধতির প্রতি দায়িত্বশীলতা প্রত্যাশিত থেকে যাবে। তাদের মাধ্যমে, তাদের থেকে স্বচ্ছতা-জবাবদিহির নিশ্চয়তা না এলে কারও পক্ষে জবাবদিহির পরিবেশ সজন সম্ভব হয় না। সুশাসন, স্বচ্ছতা-জবাবদিহি প্রয়োজন সবার স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে এবং বর্তমানে পরিলক্ষিত চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার জন্য। কারণ এটা পরস্পরের পরিপূরক। আরেকটি বিষয় নীতিনির্ধারকরা বাস্তবায়নকারীদের দিয়ে, তাদের ভুল বা ব্যত্যয়ধর্মী নীতি বা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত করিয়ে নিতে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি কিংবা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির, ক্ষেত্রবিশেষে তাদের নানান সুযোগ-সুবিধা পাইয়ে দিয়ে প্রলুব্ধ করতে পারেন, তাদের স্বার্থ উদ্ধার করিয়ে নিয়ে আবার ক্ষেত্রেবিশেষে ষড়যন্ত্রের টোপে ফেলে বিব্রতও করতে পারেন। কায়েমি স্বার্থ উদ্ধারের জন্য এ ধরনের ‘রাজনৈতিক’ উৎকোচ কিংবা নিপীড়নের প্রথা প্রাচীনকাল থেকে কম-বেশি ছিল বা আছে, তবে তা মাত্রাতিক্রমণের ফলে সেটি প্রকারান্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিমূলক পরিস্থিতির প্রতিবন্ধকতা হিসেবে প্রতিভাত হয়ে থাকে। যেকোনো সমাজে বা অর্থনীতিতে কতিপয়ের অস্বাভাবিক অর্থপ্রাপ্তির সুযোগ ও প্রযত্ন প্রদান বৈষম্য বৃদ্ধির অন্যতম উপসর্গ। আর এই বৈষম্য বৃদ্ধিতে নানান আত্মঘাতী প্রবণতার প্রবৃদ্ধি ঘটে।

নানান আঙ্গিকে পরীক্ষা-পর্যালোচনায় দেখা যায়, শিক্ষক-চিকিৎসক-আইনজীবী-ব্যবসায়ী এমনকি অতিক্ষমতাধর চাকরিজীবীদেরও বাঞ্ছিতভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব হয় না। অতিমাত্রায় কোটারি, সিন্ডিকেট বা দলীয় বা রাজনীতিকীকরণের কারণে পেশাজীবী, সংস্থা সংগঠন এবং এমনকি সুশীল সেবকরাও প্রজাতন্ত্রের হয়ে দল-নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকতে তাদের হিমশিম খেতে হয়, গলদঘর্ম হতে হয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে এমন একটা পরিবেশ তৈরি হয়, যার ছত্রছায়ায় নানাভাবে অবৈধ অর্জনের পথ সুগম হতে পারে। সেবক প্রভুতে পরিণত হলে সম্পদ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহারের দ্বারা অর্জিত অর্থ দখলের লড়াইয়ে অর্থায়িত হয়ে এভাবে একটা ঘূর্ণায়মান দুষ্টচক্র বলয় হয়ে থাকে। অর্থাৎ সুশাসনের অভাবে স্বচ্ছতা-অস্বচ্ছতায় ঘুরেফিরে পুরো প্রক্রিয়াকে বিষিয়ে তোলে। সুতরাং সবক্ষেত্রে সর্বাগ্রে উচিত স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করা। এটা প্রয়োজন গণতন্ত্র ও সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে। বলার অপেক্ষা রাখে না, সুশাসন স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে কোনো উন্নয়ন অর্থবহ ও টেকসই হবে না। উন্নয়নে আস্থা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। এটা পরস্পরের পরিপূরক। স্বচ্ছতা-অস্বচ্ছতায় যে উন্নয়ন হয় তাতে জনগণের সুফল নিশ্চিত হতে হলে উন্নয়নের উপযোগিতা বা রিটার্ন দ্রুত পাওয়ার আবশ্যকতা দেখা দেবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কোনো কাজ শেষ করার কথা এবং বরাদ্দ সেভাবেই দেওয়া আছে। কিন্তু সেই কাজ শেষ করতে যদি বছরের পর বছর সময় লেগে যায়, দ্রব্যমূল্য ও নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধিজনিত কারণে ও অজুহাতে যদি তিন-চার গুণ টাকা খরচ করতে হয় সেটা তো সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দুর্বল পরিস্থিতিরই পরিচায়ক। আলোচ্য অর্থ দিয়ে একই সময়ে হয়তো আরও অতিরিক্ত দুটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যেত। সময়ানুগ না হওয়া এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির অজুহাতে তিন প্রকল্পের অর্থ খরচ করে একটা প্রকল্প বাস্তবায়ন করার প্রেক্ষাপটটি জনগণের কাছে ব্যাখ্যা থাকা দরকার। বলাবাহুল্য, অবকাঠামোটি যথাসময়ে নির্মিত হলে সংশ্লিষ্ট খাতে সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে উপযোগিতা সৃষ্টি হয়ে জিডিপিতে অবদান রাখতে পারত। যথাসময়ে নির্মাণ-উত্তর প্রাপ্য সেবা ও উপযোগিতার আকাঙ্ক্ষা হাওয়া হয়ে যাওয়ায় প্রাপ্তব্য উপযোগিতা মেলেনি যথাসময়ে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় অধিকতর ও অতিরিক্ত ব্যয়ের টাকা যদি বেহাত হয়ে থাকে, এমন হাতে যদি যেয়ে থাকে যারা সুশাসন ও জবাবদিহির পরিস্থিতি সৃষ্টিকে অসম্ভব করে তুলতে সেই অর্থ ব্যয় করে থাকে। অধিকতর ধনীরা নীতি-নৈতিকতা ন্যায়-নীতিনির্ভরতার পরিবেশকে কলুষিত করে পুরো সমাজ ও অর্থনীতিকে দরিদ্রের মুখে ঠেলে দেয়।

জিডিপি প্রবৃদ্ধির মূল কথা হলো- যে অর্থই ব্যয় করা হোক না কেন তা আয়-ব্যয় বা ব্যবহারের দ্বারা অবশ্যই পণ্য ও সেবা উৎপাদিত হতে হবে। পণ্য ও সেবা উৎপাদনের লক্ষ্যে যে অর্থ আয় বা ব্যয় হবে সেটাই বৈধ। আর যে আয়-ব্যয় কোনো পণ্য ও সেবা উৎপাদন করে না সেটা অবৈধ, অপব্যয় বা অপচয়। জিডিপিতে তার থাকে না কোনো ভূমিকা। আরও খোলসা করে বলা যায় যে, আয় পণ্য ও সেবা উৎপাদনের মাধ্যমে অর্জিত হয় না এবং যে ব্যয়ের মাধ্যমে পণ্য ও সেবা উৎপাদিত হয় না সেই আয়-ব্যয় জিডিপিতে কোনো অবদান রাখে না। কোনো প্রকার শ্রম বা পুঁজি বিনিয়োগ ছাড়া যে আয় তা সম্পদ বণ্টন-বৈষম্য সৃষ্টিই শুধু করে না, সেভাবে অর্জিত অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ধার ধারা হয় না। ফলে তা সৃষ্টি করে আর্থিক বিচ্যুতি। এভাবে যে অর্থ আয় বা খরচ করা হয়, তা প্রকারান্তরে অর্থনীতিকে পঙ্গু ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে।

সাম্প্রতিককালেরই আলোচ্য বিষয়, জাতীয় বাজেটে বিশেষ অ্যামনেস্টি দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুবিধা প্রদান এবং বিদেশে অর্থপাচার বৃদ্ধির প্রসঙ্গে অধিকতর ধনী হওয়ার আনন্দ বিষাদের প্যাথলজিক্যাল প্রতিবেদন দৃষ্টিসীমায় আসছে। সংগত কারণে এটা উঠে আসছে যে, দুর্নীতিজাত কালো টাকা লালন থেকে সরে না এলে আয় ও সম্পদ বণ্টনের বৈষম্য বাড়তেই থাকবে।

এটাও প্রণিধানযোগ্য যে, কর ইনসাফ প্রতিষ্ঠা না করলে কর আহরণে উন্নতি আসবে না। কর-জিডিপি অনুপাতে বাংলাদেশ যে তলানিতে, তার কারণটাই হলো এভাবে এ সমাজে কর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। মানে কাউকে ট্যাক্স দিতে বাধ্য করা হচ্ছে না বলে এমনটিই হচ্ছে। দুর্নীতিজাত অর্থ অর্থনীতির মূল ধারায় আনার উদ্যোগ ইতিবাচক। কিন্তু যথাযথ হারে কর ও জরিমানা পরিশোধ করে, সময়সীমা বেঁধে দিয়ে এবং এমনেস্টি উত্তরকালে কঠোর ব্যবস্থায় যাওয়া হবে এমন প্রত্যয় প্রকাশ করে, তা আনাই হবে ন্যয় ও নীতিসংগত এবং রাজস্ব আয় বৃদ্ধির অনুকূল। এ অর্থ কীভাবে উপার্জিত হলো, কীভাবে এল, তা নিয়ে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বিচারের বিষয়টি এখনই আগাম ছাড় দিয়ে দিলে সম্পদ পুনর্বণ্টনের কাজটি করা কঠিন হবে। অর্থাৎ বৈষম্য উসকে দেওয়া হবে, যদি টাকা কীভাবে উপার্জিত হচ্ছে, তা নিয়ে কোনো ব্যাখ্যা বা প্রশ্নের মাধ্যমে বাধা না দেওয়া হয়, তাহলে তা হবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিকে নিরুৎসাহিত করার নামান্তর।

দেখা যাচ্ছে, ২০১০ সালের পর থেকে বাংলাদেশের সমাজ ও অর্থনীতিতে সম্পদের একটা বিরাট বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। জিডিপির সংখ্যাভিত্তিক পরিমাল বেড়েছে এবং সেভাবে পারক্যাপিটা জিডিপিও বেড়েছে বলে দেখানো হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবতায় ‘গরুর হিসাব শুধু কাজির খাতায়, গোয়ালে তেমন গরু নেই’ পরিস্থিতি। ২০১৭ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে খুব দ্রুত ধনীর সংখ্যা বাড়ছে।

করোনা-উত্তরকালে রাশিয়া-ইউক্রেন সমরের এই সম্মোহিত সময়ে দেশে দেশে জীবন ও জীবিকার সংগ্রাম সন্ধিক্ষণে আর্থসামাজিক পরিবেশ-পরিস্থিতিতে যে উদগ্র উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে এবং আসন্ন মন্দায় মানবিক বিপর্যয়ের যে ইশারা বা লক্ষণ দেখা দিচ্ছে সে প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আয় বৈষম্যের উপসর্গটি বিষফোড়ায় যেন পরিণত না হয় সে প্রত্যাশা প্রবল হওয়াই স্বাভাবিক। প্রকৃতির প্রতিশোধ প্রতিক্রিয়ায় মানবভাগ্যে মহামারি বিপর্যয় আসে, বৈশ্বিক বিপর্যয় প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রণ নিরাময়ের নামে মনুষ্যসৃষ্ট রাজনৈতিক অর্থনীতির সমস্যাগুলো ঘৃতে অগ্নিসংযোগের শামিল হয়ে দাঁড়ায়।

লেখক : সাবেক সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান


স্মরণের আবরণে মরণে রে যত্নে রাখি ঢাকি...

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ডা. অবন্তি মাহমুদ

স্মরণ করছি আমার নানাভাই হাবিবুর রহমান মিলনকে তার লেখা আমারই সবচেয়ে প্রিয় একটি লাইন দিয়েই। আজকে ১০ বছর হলো- সঙ্গে নেই আমাদের, হিসাবে আসলে বেশি দিন না।

মে-জুন বছরের মাঝামাঝি এই দুটি মাস কয়েক বছর ধরে খুব একটা আহামরি লাগে না। আমাকে যারা চিনে তারা সবাই কম-বেশি জানে আমি আমার কাছের মানুষদের জন্য সবকিছু নিয়েই উদ্বিগ্ন থাকি, সেটির সুবাদেই তাদের বিশেষ দিনগুলো মুখস্থ করে রাখি, তো এই মে আর জুন মাস দুইটায় পরপরই আমার ভাই আর বাবার জন্মদিন হওয়াতে আমার উত্তেজনা তুঙ্গে থাকত একটা সময়, কীভাবে কী করব না করব, যদিও এখনো থাকে কিন্তু একই সময় মনের ভেতর নাড়া দিয়েই ওঠে মাস দুটি এলেই। কিন্তু কখনো এভাবে লিখে আমি প্রকাশ করতে পারিনি। করোনার এটা একটি ইতিবাচক দিকই যে, হাবিজাবি কথিত ব্যস্ততা না থাকায় নিজেকে অনেকটা সময় দেওয়া হচ্ছে, ফিরে দেখা হচ্ছে জীবনের কাটানো সুন্দর মুহূর্তগুলো।

আমার নানাভাই ছিলেন স্বল্পভাষী, সৎ, সাধারণ একজন মানুষ। কাউকে নিয়ে এ রকম আমি আত্মবিশ্বাসী হয়ে আর কারও সম্পর্কে বলতে পারি না, কারণ সবারই ভেতরে একটা পরিবর্তন আসে কিন্তু এই মানুষটিকে নিয়ে আমি চোখ বন্ধ করে বলতে পারি কারণ আমি তাকে এক রকমই দেখেছি শেষ দিন পর্যন্ত। আসলে নানাভাইকে নিয়ে যেটাই মনে করি, ঘুরেফিরে তার সঙ্গে আমার কাটানো শেষ কয়েকটা ঘণ্টার কথাই মনে হতে থাকে, তখন রোজা শুরু হওয়ার আর সাত দিন বাকি; নানাভাই তখন হাসপাতালে ভর্তি। আসলে ওই বছরই এপ্রিল থেকে নানাভাই অসুস্থ হতে শুরু করে। তখন থেকে জুন পর্যন্ত মনে হয় একবারের মতো বাসায় এসেছিলেন। বেশির ভাগ সময় হাসপাতালেই ছিলেন। প্রথমে পিজিতে পরে ল্যাব এইডে এটাই শেষ ছিল আর কী। পালাক্রমে সবাই নানাভাইয়ের সঙ্গে থাকত। নানু, খালারা, মামা-মামি, আমাদের মাঝে মাঝে নিয়ে যেত, তো শেষের দিকে যখন অবস্থা অবনতির দিকেই তখন প্রতিদিনই সবাই যেত। কারণ না গেলেই খোঁজ নিতে থাকত নানাভাই কেন আসেনি। সেজন্য না, কোনো অসুবিধাতে আছে কি না সেজন্য। সারাটি জীবন শুধু নিজের পরিবারের চিন্তায়ই কাটাতে দেখেছি নানাভাইকে। আমার এক খালা (আমাদের লোপা) দেশের বাইরে থাকাতে তাকে দেখার জন্য অস্থির হয়ে যাচ্ছিলেন নানাভাই। সে সময় ভিডিও কলে দেখলেই বলতেন, ‘তুই কি আসতে পারবি, সমস্যা হবে?’ সেখান থেকেই লোপাও আসার জন্য সুযোগ খুঁজছিল যদিও ওই বছরই দেশে দুই মাস নানাভাইয়ের বাসাতেই লোপা থেকে এপ্রিলেই অস্ট্রেলিয়াতে গিয়েছিল। এ জন্য আবার আসাটা একটু সময়ের ব্যাপার ছিল। মৃত্যু আসন্ন হলে সম্ভবত মানুষ আঁচ করতে পারে, নানাভাইও পেরেছিলেন বলতেন, ‘মনে হয় লুপির সঙ্গে আর দেখা হবে না’ এবং সেটাই হয়েছিল। আমাদের পরিবারে আসলে বলতে গেলে নানাভাইয়েই প্রথম চলে যাওয়া আমাদের রেখে, যার কারণে কেউই বুঝতে পারিনি যে, কী হতে যাচ্ছে- সবারই ধারণা সে সুস্থ হয়ে যাবে।

নানাভাই থাকাবস্থায় কেউই খেয়াল করিনি যে, কত বড় একটা আশ্রয় ছিলেন সবার, নিজেই টের পেতে দেননি কাউকে। কখনো কারও থেকে কোনো চাওয়া-পাওয়া ছিল না, চাওয়া একটাই পরিবারের সবাই একসঙ্গে থাকতে হবে, যত যাই হোক মিলটা ধরে রাখতেই হবে। এখনো সেটা অবশ্য আছে বলা যায়।

আমার নানাভাই মানুষটা খুব অদ্ভুত ছিলেন- ৬ ফুট লম্বা, পরনে হাফহাতা শার্ট, ঢোলা একটি প্যান্ট, হাতে রুমাল আর সিগারেটের একটি প্যাকেট হাতে নিয়ে নিজের ঘর থেকে বের হয়ে নানুকে আসি বলে বের হতেন কর্মস্থলে। রিকশায় করে ইত্তেফাকে যেতেন, এরপর সন্ধ্যায় চিরাচরিত ভালোবাসার প্রেসক্লাবে এই জায়গাটায় নানাভাইয়ের যে কত স্মৃতি- সেটা আমার মা-খালারাই ভালো জানেন। এখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা একা বসে বসে সিগারেট টানতেও কোনো ক্লান্তি ছিল না তার। মাঝে মাঝে মিলন ভাইয়ের সঙ্গে আড্ডা দিতে আসতেন অনেকেই। সিগারেটটা কখনো ছাড়তে পারেননি, কথা একটাই এটা ছাড়লেই না কি শেষ হয়ে যাবেন।

আমার মনে হয়, নানাভাই থাকাবস্থায় আমাদের সঙ্গে তার কিছুটা দূরত্ব ছিল, কারণ বাসায় একটা ঘরেই নিজের বই, পত্রিকা, কলম, রং-চা আর সিগারেট নিয়েই থাকতেন। আর আমাদের সব আবদার-অত্যাচার সব নানুর কাছে। নানুর ঘরে নানাভাইয়ের ঘরের ধারেকাছেও ঘেষত না কেউ কিন্তু নানাভাই অফিসে চলে গেলে ওই জ্ঞানের রাজ্য আমাদের খেলার রাজ্য হয়ে যেত আবার রাত ৯টার মধ্যে রাজ্য ছেড়ে দিতে হতো কারণ নানাভাই আসবে। সারা দিনে হয়তো কথাই হয়নি আমাদের সঙ্গে, আমরা যে ওই বাসায় এসেছি- নানু না জানালে জানতেন কি না সন্দেহ আছে আমার। কিন্তু ঠিক ঠিক দিন শেষে আমাদের জন্য হাতে কিছু না কিছু নিয়েই আসতেন, সেটার জন্য আমাদেরও কী অপেক্ষা আবার অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে গেলে পরদিন সকালেই নানুকে জেরা করা হতো যে, কী আনসে নানাভাই কালকে। নানু আর নানাভাইয়ের দুটি আলাদা ঘর ছিল আর নানু সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকে আর নানাভাই নিজের ধ্যানে কিন্তু দুজনের ভেতর বোঝাপড়াটা অবাক করার মতো, খুবই চমৎকার একটা সম্পর্ক ছিল দুজনের। এ জন্যই কিনা জানি না, শেষবারও বাসা থেকে হাসপাতালে যাওয়ার সময়ও শুধু নানুকেই হাত দেখিয়ে গাড়িতে উঠেছিলেন।

শেষ দিনটিও নানুই সারাক্ষণ ছিল নানাভাইয়ের সঙ্গে। একটু পরপর নানাভাইয়ের খারাপ লাগলেই নানুর দিকে তাকাতো, নানু উঠে গিয়ে দোয়া পড়ে ফুঁ দিত। আমি, ভাইয়া, আম্মু, আব্বু সন্ধ্যানাগাদ হাসপাতালে যাই; গিয়ে দেখি নানু এক পাশে দাঁড়ানো, দোয়া পড়ছে আরেক পাশে মামি মাথায় হাত বুলাচ্ছে, মামা পেছনে দাঁড়ানো। নানাভাইয়ের সবচেয়ে আদরের ছিলেন আমার মামা, এটা ওই দিনই বুঝেছি- তার আগে কখনো খেয়াল হয়নি। মামাকে এক সেকেন্ডের জন্য আড়াল হতে দিচ্ছিলেন না, আড়াল হলেই ক্রমাগত ‘সুমন কই সুমন কই’ বলছিলেন। সোফায় বসে সব দেখছিলাম আব্বু ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলছে, বড় খালা তখন আরেক প্রফেসরের চেম্বারে ঘুরছে রিপোর্ট নিয়ে আম্মু-মামি মাথার কাছে দাঁড়ানো, ছোট খালা অফিস থেকে না বাসা থেকে হাসপাতালে আসছিল মেঝো খালাও তখন হাসপাতালের দিকের রাস্তায়ই। এই হিসাবটা এখনো মিলে না, সবাই ওই সময় একই জায়গায় কীভাবে; কারণ আমাদের কারও মাথায় এটা নেই যে, আর কয়েক ঘণ্টা আছে হাতে এবং খুব যে উদ্বিগ্ন সবাই তেমনও ছিল না ব্যাপারটা, এরপর নানাভাই বললেন স্যুপ খাবেন। কথামতো দিল- মামি না আম্মু কে জানি, এখন কোনোভাবেই সে তাদের হাতে খাবেন না কথা একটাই ‘আমি কি অচল হয়ে গেসি নাকি?’ নিজের হাতে মগটা নিয়ে খেতে পারলেন না ঠিকমতো কারণ হাত কাঁপছিল, তাও মগ ছাড়লেন না। আমি আর ভাইয়া আরও কিছুক্ষণ ছিলাম সেখানে এর মধ্যে একবারই তাকিয়ে বললেন, ‘ধরবি না আমাকে?’ উঠে যে ধরব ওই কথা তো মাথায় আসছেই না কারণ নানাভাইকে কখনো স্পর্শ করে দেখেছি কি না, আমার মনে নেই। এরপর আম্মুর ধমক খেয়ে উঠে গিয়ে হাত ধরলাম, কী শক্ত করে ধরল বলল, ‘ছাড়িস না’ আমি তখনো ঘোরে যে কী হচ্ছে এভাবে তো কথা বলে না, এরপর ডিউটির ডাক্তার আসায় হাত ছাড়িয়ে বাইরে চলে আসি এটাই আমার নানাভাইকে শেষ দেখা আর প্রথম ও শেষ শক্ত করে ছোঁয়া। এরপর আমাকে আর ভাইয়াকে মামির সঙ্গে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এরপর রাত বাড়তেই থাকল আর ফোন আসতেই থাকল যে, অবস্থা ভালো না। রাতের দিকে নাকি তার সহকর্মীদের কয়েকজন এসেছিলেন তো তাদের একজনের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে বললেন, ‘লিডার আর তো দেখা হবে না’ অনেক সংগঠন করার কারণে লিডার বলে একজন আরেকজনকে তারা ডাকতেন। এরপর তাদেরও শেষ বিদায় জানালেন নানাভাই। এরপর নানাভাইয়ের নিজেরই একটা অদ্ভুত অপেক্ষা শুরু হয়। একটু একটু বলছিলেন ‘ডাক্তার কখন আসবে’ বলতে বলতে একবার অনেকক্ষণের জন্য চুপ হয়ে গেলেন সবার আসতে আসতে শঙ্কা শুরু হলো তাহলে কি আজকেই.....

এরপর নানুকে ছোট খালার সঙ্গে পাঠিয়ে দেওয়া হলো বাসায়। এতদিনের সবচেয়ে কাছের সঙ্গীকেও বিদায় জানালেন নানাভাই। এরপর আর দুই কী তিন ঘণ্টা তিন মেয়ে এক ছেলের সঙ্গেই ওই কয়েকটা শেষ ঘণ্টা গেল। এরপর আইসিইউতে নেওয়া হলো। একে একে সেখানেও ছেলেমেয়েদের বিদায় দিলেন। শেষ সাক্ষাৎটা ছিল আমার মায়ের সঙ্গে সম্ভবত টুকটাক কথা বলে আম্মুকে বলল, ‘আমি একটু ঘুমাই তাইলে’ মেয়েও তার বাবাকে ঘুম পাড়িয়ে আসলেন। এর কিছুক্ষণ পরই বড় খালা গেল কিন্তু তখন আর রেসপন্স নেই। ডাক্তার ডাকা হলো, আসলেন, দেখলেন আর শেষ হয়ে গেল সুন্দর এই মানুষটার জীবন।

আমার জীবনে দেখা প্রথম কারও মৃত্যু এটা, তাও নিজেরই পরিবারে, ওই সময়টা মনে করতে চাই না আর কী। এই লেখা আর ছবিগুলো যে দিলাম, এটার একটিই উদ্দেশ্য- আমার পরের যে জেনারেশনটা আছে; মানে বাসার ছোটগুলি ওরা যাতে এগুলো মনে রাখে সব সময় আর ধারাটাও যাতে ধরে রাখে। আমার নানাভাই যেখানেই থাকুক, সৃষ্টিকর্তা তাকে ভালো রাখুক।

লেখক: সাংবাদিক হাবিবুর রহমান মিলনের নাতনি


banner close