শনিবার, ১৩ জুলাই ২০২৪

সিলেটে বন্যা ও জলাবদ্ধতা

সৈয়দ শাকিল আহাদ
প্রকাশিত
সৈয়দ শাকিল আহাদ
প্রকাশিত : ১৩ জুন, ২০২৪ ১৬:৪১

বাংলাদেশের অন্যতম বিভাগীয় শহর সিলেট, সিলেটকে সবাই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের অপরূপ লীলাভূমি ও ওলি আওলিয়াদের অন্যতম সূফি সাধক হযরত শাহজালাল (র.) ও হযরত শাহ পরানসহ (র.) ৩৬০ আওলিয়ার পুণ্যভূমি হিসেবে সুপরিচিত।

এই সিলেটের প্রধান নদীগুলোর মধ্যে বিশেষ করে সুরমা, কুশিয়ারার তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়া, সিলেট মহানগর ও তার আশপাশের এলাকার বিভিন্ন জলাশয় পুকুর, দীঘি, খাল-বিল, ছড়া ইত্যাদি ভরাট হয়ে যাওয়া ও দখল হওয়া এবং সিলেটের উজানে মেঘালয়ে মাত্রাতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ইত্যাদির কারণেই সৃষ্টি হয় পাহাড়ি ঢল এবং পরে বন্যা এবং শহরে জলজট।

দেশের অনেক ভাটি অঞ্চল যখন তীব্র দাবদাহে পুড়েছে তখন সিলেটের বিভিন্ন এলাকা ভাসছে জলে। সেখানে বিরাজ করছে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি। এর আগে গত এপ্রিলে বন্যায় তলিয়ে যায় সিলেটসহ আশপাশের হাওর এলাকার ফসল ও বাড়িঘর। তার মাসখানেক যেতে না যেতেই সিলেটে আবারও দেখা দিয়েছে বন্যা। এবার বন্যা এসেছে আরও ভয়ংকররূপে। তলিয়ে গেছে সিলেটের একাংশ এবং সুনামগঞ্জেরও বেশির ভাগ এলাকা যা এখন জলমগ্ন।

প্রতি বছর সিলেটে বারবার কেন হচ্ছে এই বন্যা?

কেন এত তীব্র আকার ধারণ করছে সিলেটের জলমগ্ন এলাকাগুলো? এ বিষয়ে প্রবীণদের কাছ থেকে জানা যায়, সিলেটের প্রধান প্রধান নদীগুলো বিশেষ করে সুরমা, কুশিয়ারা ইত্যাদির তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে, নগর ও এর আশপাশের এলাকার বিভিন্ন জলাশয় ভরাট, দখল হওয়া এবং সিলেটের উজানে মেঘালয়ে মাত্রাতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণেই এ বন্যা।

সম্প্রতি লক্ষণীয় সিলেটের বন্যার ফলে এই মৌসুমে সব সময়ই ঢল নামে। বহুকাল আগে আমরা আমাদের ছেলেবেলায়ও এমনটি দেখেছি। তখন পানি আটকে থাকত না, চলে যেত। কারণ আমাদের শহরে অনেক পুকুর ছিল। এখন আমরা নগরের ভেতরের সব পুকুর-দীঘি ভরাট করে বড় বড় বিল্ডিং করেছি। হাওরগুলো ভরাট করে ফেলেছি। এ ছাড়া প্রধান নদীগুলোর তলদেশ পলিমাটিতে এবং অপচনীয় পলিথিন ও প্লাস্টিকের বর্জ্য সয়লাব হয়ে গেছে। খালি মাঠগুলোও দখলদারদের কারণে ভরাট হয়ে গেছে। এ কারণে পানি নামতে পারছে না। যেকোনো দুর্যোগেই সিলেটের জন্য এটা একটা বড় ভয়ের কারণ।’

সিলেটের প্রধানতম নদী দুটি হচ্ছে, সুরমা ও কুশিয়ারা যার দুই রূপ। বর্ষায় দুই কোল উপচে ডুবিয়ে দেয় জনবসতি। আর গ্রীষ্মে শুকিয়ে পরিণত হয় মরা গাঙে। জেগে ওঠে চর। প্রায় ২৪৯ কিলোমিটার দীর্ঘ সুরমা দেশের দীর্ঘতম একটি নদী। ভারতের বরাক নদী থেকে উৎপত্তি হয়ে সিলেটের জকিগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মেঘনায় মিলিত হয়েছে। এই নদী বছরের বেশির ভাগ সময় থাকে পানিহীন, মৃতপ্রায়। পলি জমে ভরাট হয়ে পড়েছে নদীর তলদেশ। ফলে শুষ্ক মৌসুমে সুরমা হয়ে পড়ে বালুভূমি। অন্যদিকে অল্প বৃষ্টিতেই নদী উপচে নদীতীরবর্তী এলাকায় দেখা দেয় বন্যা। বৃষ্টিতে নদীর পানি উপচে তলিয়ে যায় হাওরের ফসল। ভরাট হয়ে পড়েছে এ নদীর উৎসমুখও। শুষ্ক মৌসুমে নদীর উৎসমুখের ৩২ কিলোমিটারে জেগেছে ৩৫টি চর। দুই দেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় যৌথ নদী কমিশনে সিদ্ধান্ত না হওয়ায় আটকে আছে উৎসমুখ খননও।

বাংলাদেশের সিলেট, সুনামগঞ্জ ও কুড়িগ্রামসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোতে প্রায় প্রতি বছর যে বন্যা হয়, তার পেছনে অতিবৃষ্টির বাইরে আরও কয়েকটি কারণ দেখছেন গবেষকরা।

নদী গবেষকরা মনে করেন, এ আকস্মিক বন্যার পেছনে ভারতের আসাম ও মেঘালয়ে অতিবৃষ্টি একটি বড় কারণ হলেও এর বাইরে আরও কিছু উপাদান কাজ করেছে।

তার মধ্যে একটি হলো নদীর পানি বহনের ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাওয়া। ওই অঞ্চলের নদীগুলোর নাব্য নষ্ট হয়ে যাওয়ায় মেঘালয় বা আসাম থেকে আসা বৃষ্টির অতিরিক্ত পানি নদীপথে হাওর থেকে বের হয়ে মেঘনা বা যমুনা হয়ে বঙ্গোপসাগরে চলে যেতে পারে না।

সেই সঙ্গে, সিলেটসহ হাওর এলাকার অপরিকল্পিত উন্নয়নও এর পেছনে দায়ী।

২০২২ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের পরিচালক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বিবিসিকে বলেছিলেন, ‘সিলেট বা সুনামগঞ্জ এলাকায় আগে ভূমি যেরকম ছিল, নদীতে নাব্য ছিল, এত রাস্তা-ঘাট ছিল না বা স্থাপনা তৈরি হয়নি। ফলে বন্যার পানি এখন নেমে যেতেও সময় লাগে। আগে হয়তো জলাভূমি, ডোবা থাকায় অনেক স্থানে বন্যার পানি থেকে যেতে পারত। কিন্তু এখন সেটা হচ্ছে না।’

তিনি আরও বলেছিলেন, ‘হাওরে বিভিন্ন জায়গায় পকেট পকেট আমরা রোড করে ফেলেছি। ফলে পানিপ্রবাহে বাধা তৈরি হচ্ছে। শহর এলাকায় বাড়িঘর তৈরির ফলে পানি আর গ্রাউন্ডে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। যার ফলে বন্যার তীব্রতা আমরা বেশি অনুভব করছি। এসব কারণে আগাম বন্যা হচ্ছে এবং অনেক তীব্র বন্যা হচ্ছে।’

পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিলেট কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানান, সুরমা নদীর উৎসমুখ খননে ২০১২ সালে সিলেট থেকে একটি প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এরপর নদী খননে সমীক্ষা চালানো হয়। সমীক্ষার পর নদী খননে উদ্যোগ নেওয়ার কথা থাকলেও ওই সময় মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল শিগগিরই উদ্যোগ নেওয়া হবে, পরবর্তীতে এই বিষয়ে আর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে সিলেট সদর উপজেলার কানিশাইলে ৬০০ মিটার সুরমা নদী খনন করা হয়। ওই সময় সিলেট সদর উপজেলা এবং কানাইঘাট উপজেলার কয়েকটি অংশে নদী খননের জন্য প্রস্তাবনা পেশ করা হয়। তা-ও এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।

বিশেষভাবে স্মরণীয় যে ভরাট হয়ে গেছে সিলেটের অন্য প্রধানতম নদী কুশিয়ারাও। এ দুই নদী খনন ছাড়া বন্যা থেকে উত্তরণ আদৌ সম্ভব নয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম বলেন, ‘সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে আছে। এ ছাড়া নাগরিক বর্জ্য, বিশেষ করে প্লাস্টিকজাত দ্রব্য সুরমা নদীর তলদেশে শক্তভাবে বসে আছে। এ কারণে নদী পানি ধারণ করতে পারছে না। যৌথ নদী হওয়ায় নদীর উৎসমুখ ভরাট করতে দুই দেশের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। তাই আমরা সিলেট মহানগরের অংশে সুরমা নদী খননের দাবি অসংখ্যবার জানিয়েছি।’

সুরমাসহ এ এলাকার নদীগুলো খননের জন্য একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে জানিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেট বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী বলেন, ‘সুরমাসহ এ এলাকার বেশির ভাগ নদীই নাব্য হারিয়েছে। এগুলো খনন করা প্রয়োজন। নদী খননের জন্য গত বছর আমরা ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে এটি এখন মন্ত্রণালয়ের বিবেচনাধীন।’ তিনি আরও বলেন, ‘সিলেটের নদীগুলো খননের ব্যাপারে আমাদের সরকার ও প্রধানমন্ত্রী খুবই আন্তরিক। আমরা নদী খননের পরিকল্পনা নিয়েছি। আগামী বর্ষার আগেই নদীগুলো খনন করতে হবে।’

এদিকে গত তিন দশকে ভরাট হয়ে গেছে নগরীর অর্ধশতাধিক দীঘি। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) হিসেবে, ১৫-২০ বছর আগেও সিলেট নগরে অর্ধশতাধিক বৃহৎ দীঘি ছিল। অথচ এখন টিকে আছে মাত্র ১০-১১টি। বাকিগুলো ভরাট হয়ে গেছে। অনেক জলাশয় ভরাট করে সরকারি প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে।

এ ছাড়া সিলেটের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ছোট-বড় প্রায় ২৫টি প্রাকৃতিক খাল। যা ‘ছড়া’ নামে পরিচিত। পাহাড় বা টিলার পাদদেশ থেকে উৎপত্তি হয়ে ছড়াগুলো গিয়ে মিশেছে সুরমা নদীতে। এসব ছড়া দিয়েই বর্ষায় পানি নিষ্কাশন হতো। ফলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতো না।

এখন অনেক স্থানে এসব ছড়ার অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায় না। ছড়াগুলো দখল হয়ে যাওয়ায় অল্প বৃষ্টিতেই নগরজুড়ে দেখা দেয় জলাবদ্ধতা।

সিলেট সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা জানান, নগরীর ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া ১৩টি বড় ছড়ার দৈর্ঘ্য প্রায় ৭৩ কিলোমিটার। দীর্ঘদিন ধরেই এসব ছড়ার দুই পাশ দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করেছে অবৈধ দখলদাররা। এ ছাড়া নগরের উপশহর এলাকার হাওর ভরাট করে গড়ে উঠেছে আবাসিক এলাকা। বাঘা এলাকার হাওর ভরাট করে হয়েছে ক্যান্টনমেন্ট।

জলাধারগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় নগরের পানি ধারণের ক্ষমতা কমে গেছে জানিয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘এখন বৃষ্টি হলেই নগরে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। আর ঢল নামলে বন্যা হয়ে যায়।’

সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী বলেন, ‘আমরা প্রায় ৩০ কিলোমিটার ছড়া উদ্ধার করেছি। এতে নগরীতে আগের মতো আর জলাবদ্ধতা হয় না। বেশি বৃষ্টিতে নগরীর কিছু এলাকায় পানি জমলেও অল্প সময়ের মধ্যে তা নেমে যায়। আর কোনো জলাশয় ভরাট করতে দেওয়া হচ্ছে না।’

উজানে অতিবৃষ্টি: সিলেটে গত কয়েক দিন ধরেই বৃষ্টি হচ্ছে। এর চেয়েও বেশি বৃষ্টি হচ্ছে সিলেটের উজানে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের চেরাপুঞ্জিতে। এবার রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি হচ্ছে চেরাপুঞ্জিতে। পানি উন্নয়ন বোর্ড, সিলেটের উপসহকারী প্রকৌশলী বলেন, ‘চেরাপুঞ্জিতে গত পাঁচ দিনে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া সিলেটেও অনবরত বৃষ্টি হচ্ছে। এই পানি নদী ধারণ করতে পারছে না।’। ভারতের মেঘালয়ে প্রচণ্ড বৃষ্টিপাত হচ্ছে এক দিনেই প্রায় ১ হাজার ৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এই বৃষ্টি ঢল হয়ে সিলেটের দিকে নামছে, ফলে বন্যা দেখা দিয়েছে।’

পরিবেশ আন্দোলনের নেতা আব্দুল করিম কিম বলেন, ‘ভারতের উজানের পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলের সঙ্গে প্রচুর মাটি আর বালুও আসছে। কারণ উত্তর-পূর্ব ভারতে বিশেষ করে মেঘালয় বৃক্ষশূন্য করার কারণেই এমন ভূমিক্ষয় হচ্ছে। এতে সুরমাসহ সিলেটের অন্য নদ-নদীর তলদেশ আরও ভরাট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই দ্রুত সুরমা, কুশিয়ারাসহ সিলেটের অন্য নদ-নদীর খনন করা প্রয়োজন। তবেই এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব।’

আমরা দ্রুত সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে সম্ভাব্য বিপদকে এড়িয়ে সিলেটকে বন্যামুক্ত রাখতে হলে সুরমা নদীর খনন ও দুই পাড়ে বাঁধ নির্মাণ করে বন্যা রোধ করা সম্ভব, প্রয়োজনে বুয়েটের কিংবা বিদেশি পর্যবেক্ষকের পরামর্শ গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন- এক সময় বর্যা এলেই মৌলভীবাজার প্লাবিত হতো, মনু নদীর দুই পাড়ে বাঁধ দেওয়ায় মৌলভীবাজার শহরকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছিল।

লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক


দেশের লাভ দশের লাভ

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
সৈয়দ শাকিল আহাদ

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তৈরি করার স্বপ্ন দেখেছিলেন বলেই স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ আজ ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এ রূপান্তরিত হয়েছে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে চলেছে।

দেশ এখন এগিয়ে যাচ্ছে ডিজিটাল যুগের দিকে, এরই সঙ্গে স্মার্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ধারণা পেয়েছে উল্লেখযোগ্য গতি। বলা বাহুল্য, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠনকল্পে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রেখে সরকারের রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়নে কার্যকর অবদান রাখতে আমরা সবাই বদ্ধপরিকর ও সচেতন।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাদের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে রাজনৈতিক সংহতি ও সহযোগিতার নবক্ষেত্র উন্মোচন এবং দুই দেশের সম্পর্ক যে নতুন উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে তাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

গত ২১-২২ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে বহুল আলোচিত একটি ঘটনা। নরেন্দ্র মোদির তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠনের পর এটি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিতীয় সফর।

গত ৬ জুলাই শনিবার সন্ধ্যায় ভারতের রাষ্ট্রপতি এবং উপ-রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাতের আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, গত ৯ জুন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শপথ গ্রহণে যোগদানের পর আবারও তার আমন্ত্রণে অত্যন্ত কম সময়ের ব্যবধানে প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরে আসা সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ২১-২২ জুনের ওই সফর অত্যন্ত সফল।

তিনি বলেন, ‘দুদেশের প্রধানমন্ত্রী তাদের মন্ত্রিপরিষদ সদস্য ও কর্মকর্তাদেরসহ দলগতভাবে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা শেষে একান্ত বৈঠক করেন। বৈঠকে অত্যন্ত আন্তরিকতাপূর্ণ পরিবেশে দ্বিপক্ষীয় সব বিষয়ে আলোচনা হয়।’

এ সফরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১০ সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।

দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক শেষে বাংলাদেশ-ভারত ডিজিটাল পার্টনারশিপ, বাংলাদেশ-ভারত গ্রিন পার্টনারশিপ, সমুদ্র সহযোগিতা ও সুনীল অর্থনীতি, ভারতের ইন-স্পেস এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সমঝোতা, বাংলাদেশ ও ভারতের রেল মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সংযোগসংক্রান্ত, বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট ও ভারতের ন্যাশনাল ওশানোগ্রাফিক ইনস্টিটিউটের মধ্যে গবেষণা সহযোগিতা, কৌশলগত ও অপারেশনাল খাতে সামরিক শিক্ষা সহযোগিতায় ডিফেন্স সার্ভিসেস স্টাফ কলেজ, ওয়েলিংটন-ইন্ডিয়া এবং মিরপুর ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজের মধ্যে নতুন সমঝোতা স্মারক সই এবং স্বাস্থ্য ও ওষুধসংক্রান্ত সমঝোতা নবায়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও প্রশমনে ভারতের ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি এবং বাংলাদেশ ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যমান সমঝোতা নবায়ন এবং মৎস্যসম্পদের উন্নয়নে বিদ্যমান সমঝোতা নবায়নসহ মোট ১০টি সমঝোতা সই হয়। দুদেশের মধ্যে সংযোগ বা কানেক্টিভিটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার কথা উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘চট্টগ্রাম ও মোংলাবন্দর যাতে ভারতের উত্তর-পূর্ব, বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলের জন্য ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে তাদের আগ্রহ ও আমাদের অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।’ সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে রাজনৈতিকভাবে দুদেশের ঐক্যমতের অভাব নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এরপরও যে ঘটনাগুলো ঘটছে, সেগুলোও যাতে একদম কমানো যায়, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।’

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী আছে। এগুলোর নাব্য রক্ষাসহ সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা, তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা, বন্যা দুর্যোগ মোকাবিলা এবং পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়েও গুরুত্বসহকারে আলোচনা হয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী তাদের সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতার প্রসার, ভারতের মধ্য দিয়ে নেপাল ও ভুটান থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানিতে সহায়তা এবং ভারত যে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের নতুন সঞ্চালন লাইন করছে, সেটি থেকে কীভাবে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে সে বিষয়ে আলোকপাত করেন।’

‘এ সময় পেঁয়াজ, তেল, গম, চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য আমদানিতে বাংলাদেশের জন্য নির্দিষ্ট কোটা সংরক্ষণ ও আমদানি যাতে বন্ধ না হয়, সে বিষয়েও আমরা আলোচনা করেছি’, ‘ব্রিকস সদস্য বা অংশীদার যেকোনো পদে আমরা ভারতের সমর্থন চেয়েছি এবং তারা ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। পাশাপাশি বিমসটেক, ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশনসহ বহুপক্ষীয় ফোরামগুলোতে অবস্থান শক্তিশালী করা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা ছিল ইতিবাচক।’

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে আশ্রিত প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনায় চীনের ভূমিকা বৃদ্ধির কথাও এসেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সফরে এটি আলোচনা করবেন বলেছেন। ভিসা নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ড. হাছান মাহমুদ জানান, বাংলাদেশিদের জন্য ভারত বছরে প্রায় ২০ লাখ ভিসা প্রদান করে। মেডিকেল ভিসা ত্বরান্বিত করতে ও অন্যান্য ভিসার অযথা বিলম্বরোধে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাদের মিশনগুলোকে নতুন নির্দেশনা দিয়েছেন।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যেসব সমঝোতা হয়েছে তার মধ্যে একটি ছিল রেল ট্রানজিট সংক্রান্ত। ট্রানজিট চালুর পর ভারতের ট্রেন বাংলাদেশের দর্শনা দিয়ে প্রবেশ করে চিলাহাটি-হলদিবাড়ি সীমান্ত দিয়ে ভারতে যাবে।

পরীক্ষামূলকভাবে আগামী মাসেই বাংলাদেশ দিয়ে ভারতের ট্রেন চলবে বলেও সফর শেষে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় মোহন কোয়াত্রা।

সম্মেলনে বিএনপি অভিযোগ করেছে, নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের কারিগরি ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন এবং সামরিক বিশেষজ্ঞদের ইতিবাচক বিশ্লেষণ ছাড়া এ ধরনের ‘রেল করিডোর’ প্রদান আত্মঘাতী ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী।

‘বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতীয় রেল ট্রানজিটের ফলে বাংলাদেশের জনগণ উপকৃত হবে’, ভারত সফর শেষে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার এ দাবিকেও প্রত্যাখ্যান করেন বিএনপি মহাসচিব মি. আলমগীর। বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি জনবিচ্ছিন্ন দলের কয়েকজন নেতা বিভিন্ন মাধ্যমে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে বর্তমান সরকারের উন্নতি এ অগ্রগতিতে দীর্ঘসূত্রতা এ ক্ষতিকর মন্তব্যের মাধ্যমে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-নেত্রীরা বলছেন নানা রকম নেতিবাচক কথা, অথচ অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা।

‘বিদ্যমান অবকাঠামোর উন্নতি করে ভারতের ট্রেন চলাচল শুরু হলে তা হবে বাংলাদেশের ধারণক্ষমতার উন্নয়ন, এ ট্রেন চলাচল রেল যোগাযোগব্যবস্থায় আধুনিকীকরণ, উন্নয়ন ও সম্প্রসারনের মাধ্যমে তৈরি করবে তিন দেশের বাণিজ্যিক সমৃদ্ধি গতিশীল ও আধুনিক হবে তিন দেশের যোগাযোগব্যবস্থাসহ অর্থনৈতিক উন্নতি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর, বিশেষ করে ভারতকে রেল ট্রানজিট দেওয়ার বিষয়টিকে সবাই প্রশংসা করছে, দেশের বিশেষ কয়েকজন মিলে এক ধরনের রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করতে চাইছে বলে অনেকে বিরোধী বিএনপিসহ সমমনা দলগুলোকেই দূষছেন। এসব দলের নেতারা মনে করছেন সামনের দিনগুলোতে ‘এটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু’।

এর আগে মোংলা ও চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে পণ্যের ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট নিয়ে ভারতের দীর্ঘদিনের জোরালো দাবি পূরণ করেছিল, ভারতীয় গাড়ি চলাচলের সময় আমাদের দেশের রাস্তাঘাট নষ্ট করে ফেলবে, আগ্নেয়াস্ত্র ফেলে রেখে আমাদের ভূখণ্ড অনিরাপদ করে তুলবে, অথচ এর কিছুই হয়নি, হয়েছে উন্নত, আধুনিক এবং এর ফলে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এগুলোর বিনিময়ে যে বাংলাদেশ অর্থ আয় করছে তা আজ জনগণ জানে ও বোঝে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মঙ্গলবার অবশ্য সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ভারতকে রেল ট্রানজিট দেওয়ার সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি হবে না এবং করছে না।

বিরোধী দলগুলো কী করতে চায়

ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে রেলযোগে দেশের এক অংশ থেকে আরেক অংশে সরাসরি নিজেদের পণ্য পরিবহনের সুবিধা পাবে ভারত, যা দীর্ঘদিন ধরেই দেশটি চেয়ে আসছিল বলে প্রচার আছে।

বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে কথা বলে যে ধারণা পাওয়া গেছে তা হলো- তারা মনে করেন ভারতকে রেল ট্রানজিট দেওয়ার খবরে সারা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে সামাজিকমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তীব্র সমালোচনার প্রেক্ষাপটে এটিই আগামী দিনের বড় রাজনৈতিক ইস্যু হবে বলে তাদের ধারণা।

অবশ্য একাধিকবার দলটির অনেক নেতাই বলেছেন তাদের কর্মসূচি বা বক্তব্য বাংলাদেশের শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে, ভারতের বিরুদ্ধে নয়। দলটির নেতারা বলেছেন বরং তারা চান ভারত বাংলাদেশের কোনো বিশেষ দল নয় বরং ‘জনগণের সাথে সম্পর্ক’ দৃঢ় করুক।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, চলতি বছরের জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনে ভারতের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ আছে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর। তারা মনে করেন ‘ভারতের ভূমিকার কারণে’ই বিরোধী দলগুলোর বর্জন সত্ত্বেও নির্বাচন করতে সক্ষম হয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার।

এখন রেল ট্রানজিট ইস্যুতেও বিএনপি ও সমমনা দলগুলোও তীব্র সমালোচনা করছে। তারা মনে করেন এটিই হবে আগামী দিনের বড় রাজনৈতিক ইস্যু এবং এর বিরুদ্ধে মানুষ রাস্তায় নেমে আসবে।

দেশের বিভিন্ন মহলের বিজ্ঞজনরা মনে করেন বিশ্ব অর্থনীতির উন্নয়নে সমগ্র বিশ্বে আন্তসংযোগ অত্যন্ত জরুরি এবং গতিশীল একটি বিষয়, আমাদের দেশ, ভারতসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি দেশ এ ট্রানজিট, ট্রান্সশিপম্যান্ট আস্তে আস্তে উন্নত হচ্ছে ও গতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। আন্তরিকতার সঙ্গে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে , বাংলাদেশের ট্রেন চিলাহাটি দিয়া ভারতের হলদিবাড়ী যাবে এবং ভারতের রেলপথ ব্যবহার করে সেখান থেকে যাবে ভুটানের সীমান্তবর্তী হাসিমারা রেলস্টেশন পর্যন্ত যদিও ভুটানে এখনো রেলপথ নেই তাই এ ব্যবস্থার ফলে স্থল সীমানাবেষ্টিত ভুটানের পক্ষে বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য উন্নয়ন বৃদ্ধি পাবে এবং প্রতিটি দেশই অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হবে। এখানে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ ও ভারত ট্রানজিট বা ট্রান্সশিপমেন্ট বা ইন্টার কানেক্টিভিটি বা আন্তসংযোগ বহু দিনের এটা নিয়ে কিছু মানুষ অযথাই বিভ্রান্তি এবং নেতিবাচক কথা বলে অস্বস্তি তৈরি করার চেষ্টা করে চলেছে যা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। এরাই এক সময় নিরাপত্তা লঙ্ঘন হবে দোহাই দিয়ে সাবমেরিন ক্যাবলে আমাদের সংযুক্ত হতে না দিয়ে এদেশকে অনেক পিছনে ফেলেছিল। বিশ্বায়নে সবাই এগিয়ে যাচ্ছে, আমরাও যাব প্রধানমন্ত্রীর কথার সঙ্গে সুর মিলিয়ে আমরাও বলতে চাই ‘বিশ্বায়নের যুগে আমরা নিজেদের দরজা বন্ধ রাখতে পারি না’।- আমাদের বাঙ্গালি জাতির লাভ, আমরা এগিয়ে যাব ইনশাআল্লাহ।

লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক


কোটার যৌক্তিক সংস্কার সর্বোচ্চ আদালতেই হতে পারে

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
মমতাজউদ্দিন পাটোয়ারী

আবার সরকারি চাকরি নিয়ে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে দেশ অনেকটাই অচল অবস্থার মুখোমুখি। এবার আন্দোলনকারীরা কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে আকর্ষিকভাবে আন্দোলন শুরু করেছে। ২০১৮ সালে কোটাব্যবস্থা বাতিল করে যে পরিপত্র জারি করা হয়েছিল ওই পরিপত্রের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০২১ সালে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান অহিদুল ইসলামসহ সাতজন। আবেদনের চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত ৫ জুন হাইকোর্ট মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন। এ রায় ঘোষিত হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা আদালতে রায়ের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য অপেক্ষা না করে সরকারি নির্বাহী ক্ষমতা কোটা সংস্কারের দাবিতে রাস্তায় নেমে পড়ে। গত বুধবার তারা বাংলা ব্লকেড বা অবরোধ পালন করে। ঢাকার ২০টি এলাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখে। দেশব্যাপী রেল যোগাযোগ অবরোধ করে রাখে। ফলে চরম দুর্ভোগ শহরবাসী ও যাত্রী সাধারণের চলাচলে নেমে আসে। অথচ বুধবারই দেশের সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের পরিপেক্ষিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ ২০১৮ সালের সরকারি পরিপত্রের স্থিতাবস্তা আগামী আগস্ট মাসের ৭ তারিখ পর্যন্ত জারি করেন। ওই দিন কোটাব্যবস্থার ওপর পূর্ণাঙ্গ শুনানি ধার্য করা হয়। সুপ্রিম কোর্ট সেই পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের শ্রেণিপাঠে ফিরে যাওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখা এবং আন্দোলনকারীরা চাইলে আইনজীবীর মাধ্যমে তাদের বক্তব্য তুলে ধরতে পারবেন বলেও আদালত জানান; কিন্তু আন্দোলনকারীরা আদালতের এ নির্দেশনা গ্রহণ করেনি। তারা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে। তারা দাবি করে যে তাদের আন্দোলন আদালতের কাছে নয় সরকারের কাছে। সরকার নির্বাহী আদেশে কোটা সংস্কারের বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে পারে প্রয়োজনে সংসদে আইন পাস করতে পারে অথবা একটি কমিশন গঠন করে এর একটি স্থায়ী সমাধান করতে পারে। তারা এসব দাবিতেই বৃহস্পতিবার সাড়ে ৩টায় আবারও অবরোধ কর্মসূচি পালন করার কথা ঘোষণা করেছে।

যারা কোটা সংস্কার আন্দোলনটি অতীতে এবং এবারও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন তারা এর মধ্যে নানা ধরনের বিষয় লক্ষ্য করে থাকতে পারেন। এবারের বিষয়টি প্রথমে তুলে ধরি- দেশের সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্টের রায়টি স্থগিত রেখে ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর সরকারি চাকরিতে নারী কোটা ১০ শতাংশ, মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ এবং জেলা কোটা ১০ শতাংশ বাতিল করে পরিপত্র জারি করে - সেই অবস্থাটি পরবর্তী রায় পর্যন্ত বহাল রেখে সুপ্রিম কোর্ট যে আদেশ দিয়েছেন তাতে শিক্ষার্থীদের প্রতি দেশের সর্বোচ্চ আদালত অভিভাবকত্বের অনুভূতির প্রকাশ ঘটিয়েছেন। এর মধ্যে সরকারি যেসব নিয়োগ প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে সেগুলো সুপ্রিম কোর্ট স্থগিত করেননি, ঘোষিত নিয়মনীতি অনুযায়ী সেগুলো চলতে কোনো বাধা নেই বলে অ্যাটর্নি জেনারেল জানিয়েছেন। তাই আন্দোলনকারীদের ধৈর্য ধরা উচিত ছিল। তা ছাড়া দেশের সর্বোচ্চ আদালতে যখন কোনো মামলার রায় নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া চলতে থাকে তখন সেটির চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষা করাই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মানুষ, সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবার কর্তব্য। সেই সময়ে সর্বোচ্চ আদালতের রায়কে অমান্য করা যায় না কিংবা অন্য সিদ্ধান্তও নেওয়া যায় না। সরকারের নির্বাহী আদেশে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়াটি তখন অবৈধ হওয়ারই আইনত বিধান। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে সন্তুষ্ট না হলে এর রিভিউ করা যেতে পারে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত সংবিধানবিরোধী কোনো রায় দেবেন সেটি আশা করা যায় না। সে কারণে কোটা সংস্কারপ্রত্যাশী শিক্ষার্থীদের উচিত ছিল সর্বোচ্চ আদালতের পরামর্শ মেনে চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষা করা, নিজেদের বক্তব্য আইনজীবীর মাধ্যমে তুলে ধরা। আপিল বিভাগের প্রধান বিচারপতিসহ অন্য বিচারপতিরা দেশের তরুণদের জীবন-জীবিকা, মেধা ও দেশ সেবার সুযোগের বিষয়গুলোকে সংবিধান এবং দেশের বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করেই একটি যৌক্তিক রায় প্রদান করবেন। সেটির জন্য খুব বেশি দিন অপেক্ষা করার প্রয়োজন তাদের পড়বে না। কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ আদালতের প্রতি বিশ্বাস ও সম্মান প্রদর্শনের বিষয়টি সম্পর্কে তাদের মধ্যে অনেকেরই যে খুব বেশি জানা নেই তা তাদের নানা ধরনের উক্তি, কথাবার্তা এবং আচরণ থেকে দেখাও যাচ্ছে। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের ওপরে নিশ্চই সরকারের নির্বাহী বিভাগ নয়। সরকারের নির্বাহী বিভাগ ২০১৮ সালের যে পরিপত্রটি জারি করেছিল সেটি আদালতেই চ্যালেঞ্জ হয়েছে। আমরা হাইকোর্টের সেই রায়টি পুরোপুরি এখনো পাইনি। সুপ্রিম কোর্টেরই একমাত্র এক্তিয়ার রয়েছে হাইকোর্টের রায়ের সংযোজন, বিয়োজন ও পরিমার্জন কিংবা বাতিল করার। সরকার সেখানে আদালতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার চেয়ে বেশিকিছু করতে পারে না। তবে আইনি লড়াইয়ে সরকার যুক্তিতথ্য ও আইনের ব্যাখ্যা দিয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে পারে। সেটি যেকোনো নাগরিকও করতে পারে; কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট দেশের সংবিধানের রক্ষাকবচ। তার ভিত্তিতেই চূড়ান্ত রায় প্রদান করে থাকেন। সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায় সবার জন্যই শিরোধার্য। এ মামলাটি যদি হাইকোর্টে উপস্থাপিত না হতো তাহলে কোটা সংস্কারবাদীরা সরকারের নির্বাহী আদেশের পরিমার্জন চেয়ে তাদের বর্তমান দাবিগুলো তুলে ধরতে পারত। সে ক্ষেত্রে সরকারের চিন্তা-ভাবনা করার যথেষ্ট সুযোগ থাকত। এমনকি যে কমিশন গঠনের প্রস্তাব তারা দিচ্ছে সেটিও সরকার বিবেচনায় নিয়ে মহান জাতীয় সংসদের মাধ্যমে এর একটি কার্যপ্রণালি, রূপরেখা এবং যৌক্তিকব্যবস্থা তৈরি করতে পারত। এখন আন্দোলনকারীরা সরকারের নিকট তাদের দাবি-দাওয়া ও কমিশন গঠনের চিন্তা-ভাবনাটি সর্বোচ্চ আদালতে তুলে ধরার ব্যাপারে প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারে। সরকারের দিক থেকেও প্রগাঢ় পরিচয় দেওয়া হবে যদি আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিদের নিয়ে বসে আদালতে কোটা সংস্কারের একটি যুক্তিসঙ্গত ব্যবস্থাপত্র তুলে ধরার বিষয় তাদের সঙ্গে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা, তাদের রাস্তা ছেড়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া। দেশের সর্বোচ্চ আদালত কোটা সংস্কারের ব্যবস্থাপত্রটি সংবিধান এবং বাস্তবানুগ হলে নিশ্চয়ই আমলে নিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে সমস্যাটির একটি সমাধান দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকেই পাওয়ার সম্ভাবনা সবাই আশা করতে পারেন। কিন্তু আন্দোলনকারীদের রাস্তায় এভাবে বারবার ফিরে আসতে দেওয়া হলে শুধু জনদুর্ভোগই নয় দেশের যে কত ধরনের ক্ষতি হয় তা সবারই বোঝা আছে। এ ছাড়া আন্দোলনকারীদের মধ্যেও নানা মত, পদ এবং বিভ্রান্তবাদীর অবস্থান রয়েছে। তাদের স্লোগান, কথাবার্তা ও কাজকর্ম এক রকম হচ্ছে না, হবেও না। ফলে এটি নৈরাজ্য সৃষ্টির দিকেও চলে যেতে পারে। দেশে একটি গোষ্ঠী তো রয়েছেই এদের ব্যবহার করার জন্য। এরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমেছে কিন্তু সচেতনতার বিষয়টি তাদের মধ্যে সমান নয়। আবেগের বশবর্তী হয়ে অনেকেই অনেক কথা বলেন যা মোটেও আইনবিধি কিংবা তাদের আন্দোলনের সঙ্গেও সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কেউ কেউ এখনো বলে বেড়াচ্ছে যে ৫৬ শতাংশ কোটাই নাকি সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়ে রেখেছে। তাদের অনেকেরই হাতে কোটার প্রকৃত তথ্য-উপাত্ত নেই, ইতিহাসটাও জানা নেই। আবার কেউ কেউ এর মধ্যে রাষ্ট্র সংস্কারেরও দারি তুলে বসে আছে। নানা ধরনের দাবি, আবেগ, উচ্ছ্বাস, বিশ্বাস এবং রাজনীতির প্রতিফলন ঘটাতেও দেখা যায়। কোটার সুবিধা যারা পায় তাদের পরীক্ষা দিতে হয় না এমন ভুল ধারণাও অনেকের মধ্যে রয়েছে। অনেকের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ এবং যোদ্ধাদের সম্পর্কে শ্রদ্ধা ও সংবেদনশীল থেকে কথা বলার বিষয়টি কখনো কখনো লঙ্ঘিত হয় এটি মোটেও মেনে নেওয়ার বিষয় নয়। সে কারণেই সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে এদের শিক্ষাঙ্গনে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করাটাই শ্রেয় হবে।

আমাদের মতো দেশে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য কোটাব্যবস্থা রয়েছে। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে কোটাব্যবস্থা চালু করেছিলেন। পাকিস্তান আমলেও ব্যবস্থা চালু ছিল। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে সরকারি চাকরিতে ২০ শতাংশ মেধায় (সাধারণ), ৪০ শতাংশ জেলা কোটা এবং ১০ শতাংশ ছিল নারী কোটায়। আর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য উপহার হিসেবে কোটা সংরক্ষণ করেছিলেন ৩০ শতাংশ। কিন্তু তিনি এটির বাস্তবায়ন শুরু করে যেতে পারেননি। ১৯৭৬ সালে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের সময় ৪০ শতাংশ জেলা কোটা থেকে ২০ শতাংশ কমিয়ে সাধারণদের জন্য ২০ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশে উন্নীত করা হয়। মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ এবং নারী কোটা ১০ শতাংশ বহাল থাকলেও মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ে চাকরি প্রাপ্তি তখন অনেকটাই কল্পনাতীত ছিল। সেই সময় থেকেই স্বাধীনতাবিরোধী আদর্শের ব্যক্তি এবং তাদের সন্তানরা সরকারি চাকরি, বিভিন্ন বাহিনী এবং বিদেশে মন্ত্রণালয়ে অধীন দূতাবাসে চাকরি পাওয়া শুরু করে। সামরিক শাসক এবং তাদের গঠিত দলের শাসনামলে সেই ধারাই অব্যাহত ছিল। স্মরণ করা যেতে পারে ১৯৭৭ সালে পে ও কর্ম কমিশনের একজন সদস্য ছাড়া অন্য সবাই কোটাব্যবস্থা তুলে দিতে মত দেয়। কোটার পক্ষে মত দেওয়া সদস্য এম এম জামান ১০ বছর কোটা পদ্ধতি বহাল রেখে ১৯৮৭ সালের পর ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার মত রেখেছিলেন। ১৯৯৭ সালে মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের কোটায় চাকরিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০১০ সালে হাইকোর্টে আপিল এবং রায়ের ভিত্তিতে কোটাব্যবস্থা সংস্কারের মাধ্যমে পুনর্বহাল করা হয়। ২০১২ সালে ১ শতাংশ প্রতিবন্ধী কোটা স্থাপন হয়। ২০১৮ সালে সংস্কার নয় কোটাবিরোধী আন্দোলন দেশে চাঙ্গা হয়ে ওঠে। মুক্তিযোদ্ধা কোটার বিরুদ্ধেও তাদের অনেক অসংলগ্ন এবং অসংবেদনশীল দাবি এবং আচরণ ছিল। নানা অনভিপ্রেত ঘটনার সঙ্গেও অনেকে জড়িত ছিল। অনেক স্থানে এ নিয়ে সংঘাতময় পরিস্থিতি তখন তৈরি হয়েছিল। সেই অবস্থায় সরকার ৪, অক্টোবর কোটা পদ্ধতি বাতিল করে পরিপত্র জারি করে। সেটিরই বিরোধিতা করে হাইকোর্টে রিট হয়েছে। হাইকোর্ট সংবিধানকে বিবেচনায় নিয়েই রায় দিয়েছেন বলে আমাদের ধারণা। তবে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে হবে বলে আমরা আশা করি। এবার শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবি জানিয়ে মাঠে নেমেছেন। এখনো পর্যন্ত তারা উশৃঙ্খল কোনো আচরণ করেননি। তবে জনদুর্ভোগ ও দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ভয়ানকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এটি আর চলতে দেওয়া যায় না। সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে আদালতেই এর ফয়সালা হোক সেটি আমরা চাই।

লেখক: ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


কোটা আন্দোলনের লাভ-ক্ষতি

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
সৈয়দ এনাম-উল-আজিম

প্রথমে ঢাকা তারপর সারা দেশজুড়ে শুরু হয়েছে কোটাবিরোধী আন্দোলন। এই আন্দোলন করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা। ছাত্রদের আন্দোলনের উদ্দেশ্য চাকরির ক্ষেত্রে কোটাপ্রথা বাতিল করা। উল্লেখ করার মতো বিষয় হচ্ছে- এই আন্দোলনে সাধারণ জনগণের চাওয়া-পাওয়া বা স্বার্থবিষয়ক কিছু নেই। কিন্তু আছে ভোগান্তি আর অপরিসীম ক্ষতি। এ বিষয়ে আন্দোলনের সূত্রপাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে এবং ক্রমশ ক্যাম্পাস থেকে সড়ক মহাসড়কে গড়িয়ে পড়েছে। গত ১ জুলাই-২০২৪ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনে ক্যাম্পাস থেকে ঢাকার শাহবাগের চারপাশ, ফার্মগেট, সায়েন্সল্যাব, জগন্নাথ কলেজ, ঢাকা কলেজ আর ইডেন কলেজের সড়ক সীমানা এবং সাভার, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, গোপালগঞ্জ, বরিশালসহ সব বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার সড়কগুলো ক্রমশ ছাত্রছাত্রীদের অবরোধের মুখে পড়ে আছে। সেখানে তারা নিয়মিতভাবে অবস্থান নিয়ে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করছে। কিন্তু থমকে গেছে সব পরিবহন যোগাযোগ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে আটকা পড়ে নাকাল হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। কর্মজীবীরা অফিসে পৌঁছাতে পারছেন না। অসুস্থ ও রোগীদের হাসপাতালে আনা-নেওয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ব্যাহত হচ্ছে উচ্চতর শিক্ষার নির্মল পরিবেশ। শিক্ষাঙ্গনের এই আন্দোলনের তোপে যখন দেশের রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি টাল-মাটাল তখন আমাদের মতো সাধারণ জনগণ হিসাব করতে শুরু করেছেন এই আন্দোলনে দেশ ও জনগণের লাভ-ক্ষতি। অঙ্কটা মেলানো দরকার আর মিলাতে চাইলে আমাদের একটু তথ্য নিতে হবে কোটার ইতিহাসের।

কোটার ইতিহাস: সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার ইতিহাসটা ব্রিটিশ আমল থেকেই শুরু। তখন ব্রিটিশরা সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে তাদের এবং তাবেদারগুলোকেই যোগ্য মনে করত। ব্রিটিশ আমলে সর্ব ভারতীয়রা স্বভাবতই তাই পড়াশোনার সুযোগ পেলেও চাকরি ও প্রশাসন পরিচালনায় অনেকটাই বঞ্চিত ছিল। এই বৈষম্য আর বঞ্চনা থেকে মুক্তির জন্য ব্রিটিশ তাড়াও আন্দোলন হলো। সফল হলো ভারতীয়রা। ব্রিটিশরা আন্দোলনের চাপে ১৯৪৭ সালে ভারতকে ভাগ করে পাকিস্তান আর হিন্দুস্তান বানাল। ভৌগোলিক অবস্থান আর ভাষাগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও পূর্ব বাংলাকে (বর্তমান বাংলাদেশ) পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত রাখা হলো। সৃষ্ট হলো বৈষম্য, বঞ্চনা আর নিপীড়নের নতুন ইতিহাস। অবিভক্ত পাকিস্তানে পূর্ব বাংলার বা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ শিক্ষা, চাকরি আর রাষ্ট্র পরিচালনার অংশ থেকে নতুনভাবে বৈষম্য আর বঞ্চনার শিকার হতে লাগল। ক্রমশ ফুঁসে উঠল পূর্ব বাংলার ছাত্র-জনতা। ৫২’র ভাষা আন্দোলন সেই বঞ্চনাবিরোধী রক্তাক্ত ইতিহাস। তারপর ৬২, ৬৬, ৬৯-এর ছাত্র ও গণ-আন্দোলন আর ৭১-এর সমগ্র বাঙালির সম্মিলিত মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা- স্বাধীন বাংলাদেশ ব্রিটিশ, পাকিস্তানিদের ক্রমাগত বঞ্চনার ভেতর থেকে অর্জিত স্মারক।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যখন বঙ্গবন্ধু ও এদেশের সাহসী ও নন্দিত রাজনৈতিক নেতারা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলেন তখনই সবার আগে রাষ্ট্র পরিচালনার মানদণ্ড অর্থাৎ সংবিধান রচনা করতে গিয়ে সেখানে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে শত শত বছরের বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার এদেশের জনগণ, শিক্ষিত ও অনগ্রসর গোষ্ঠীকে শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা ও রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকারকে সুরক্ষিত করলেন। তিনি সংবিধানে খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, বাসস্থান ও স্বাস্থ্যকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি সংবিধানের তৃতীয় ভাগের ২৯(৩)-এর (ক) অনুচ্ছেদে প্রথমবারের মতো ‘কোটা’ প্রথার প্রচলন করলেন। সেখানে পরিষ্কারভাবে বলা হলো- নাগরিকদের যেকোনো অনগ্রসর অংশ যাতে প্রজাতন্ত্রের কর্মে উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব লাভ করতে পারে সেই উদ্দেশ্যে তাদের অনুকূলে বিশেষ বিধান প্রণয়ন করতে রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করবে না।’ অতএব এই সাংবিধানিক অধিকার বলে ১৯৭২ সাল থেকে এদেশের অনগ্রসর জনগোষ্ঠী ও মুক্তিযোদ্ধা, নারী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীরা উচ্চতর শিক্ষা ও চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে কিছু সুবিধা ভোগ করে আসছে। যার অনুপাত সরকারের নির্বাহী আদেশে নির্দিষ্ট হয়। এটিকেই কোটা প্রথা বলে, যা বাতিলের জন্য ২০১৮ সাল থেকে ছাত্রসমাজ আন্দোলন করছে।

আন্দোলনের লাভ-ক্ষতি: ক্ষতির দিক চিন্তা করে কোনো আন্দোলন হয় না। এদেশের সব সফল আন্দোলনে অধিকার আদায়ের জন্যই হয়েছে। আর সব আন্দোলনের সূতিকাগার ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং নেতৃত্ব দিয়েছে গৌরবের ছাত্র সমাজ। কাজেই ছাত্রসমাজের সম্মিলিত সংগ্রামী ভূমিকা ও আন্দোলন অনেক গর্বিত ইতিহাস তৈরি করেছে যার সুফল আমরা স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উপভোগ করছি। তাই ওদের কোনো উদ্যোগকেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। তবে তা হতে হবে সংবিধান-সম্মত এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট। কিন্তু বাস্তবে হচ্ছে কী?

২০১৮ সালে ছাত্রসমাজের কোটাবিরোধী আন্দোলন বাতিলের জন্য ছিল না, ছিল সংস্কারের জন্য। কিন্তু সরকার যেকোনো কারণেই হোক, তা সংস্কার না করে বাতিল করেছিল। এতে কোটা প্রাপ্যদের দীর্ঘদিনের সুরক্ষিত অধিকার ক্ষুণ্ন হয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে সরকারের কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না। আর তাই সংবিধান সবার অধিকার সুরক্ষা করায় কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এই কোটা বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করলে গত ৫ জুন হাইকোর্ট এক রায়ের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধার কোটা পুনর্বহালের আদেশ দেন। সরকার যথাসময়ে সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন এবং গত ১০ জুলাই আপিল বিভাগ মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের ওপর ৪ সপ্তাহের জন্য স্থিতাবস্থা জারি করেছেন। অতএব আপিলের রায়ের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট সময়সীমা পর্যন্ত অপক্ষো না করে এবং চূড়ান্ত রায় কী হয়, তা না জেনেই ছাত্রসমাজ সরকারকে দোষারোপ করে আন্দোলনের সূচনা ও তা অব্যাহত রেখে শিক্ষাঙ্গন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও জনদুর্ভোগ বাড়িয়ে তুলছে। এই আন্দোলনকে বিএনপিসহ সব বিরোধী দল সমর্থন দেওয়ায় আন্দোলনকারীরা আরও উৎসাহ পাচ্ছে বটে কিন্তু কোটা বাতিল হলে যে অনগ্রসর জনগোষ্ঠী ছাড়াও এদেশের সর্বোচ্চ সম্মানের ও গৌরবের মুক্তিযোদ্ধা, পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তানদের সম্মান ও অধিকার বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি তারা ভাবছে না। যারা সমর্থন বা ইন্ধন দিচ্ছেন তারাও রাষ্ট্র পরিচালনা করে এসেছেন বা ভবিষ্যতেও আসবেন তারাও বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন না। সরকার একবার ভুল করতে পারে তাই বলে বারবার ভুল করবে এমনটি ভাবা ঠিক নয়। তাই কাউকে অধিকার বঞ্চিত করার হীন খেলায় মদদ দেওয়া বিবেকসম্মত কোনো কাজ হতে পারে না।

ছাত্ররা যে বিষয়টি নিয়ে শিক্ষাঙ্গনকে অস্থির করছে সেটি এখনো যেহেতু আদালতের বিচেনাধীন। তাই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা বা কোনো সিদ্ধান্ত কারও ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে আদালত অবমাননাকর। আমরা যাদের আন্দোলনরত দেখছি তারা আবেগে বা ক্রোধে ভাসতে পারে কিন্তু আমরা যারা বিচারাধীন বিষয় নিয়ে ওদের সমর্থন বা মদদ দিচ্ছি, তাদের উচিত ছাত্রদের নিবৃত্ত করা এবং প্রয়োজনে সবাইকে নিয়ে এর সম্মানজনক সমাধানের বিষয়ে আলোচনার টেবিলে বসা। মাঠ গরম করে, সড়ক অবরোধ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা নয়। এই যে ১ জুলাই থেকে চলমান আন্দোলনের ক্ষতি কার ওপর চাপছে? নিশ্চয়ই প্রথমত ছাত্রদের ওপর কারণ তাদের নিয়মিত পড়াশোনা ও পরীক্ষা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন জনগণ। যাদের স্বাভাবিক যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে।

আন্দোলন হচ্ছে চাকরিতে সরকারি কোটা বরাদ্দ নিয়ে। ১৯৮৫ সাল থেকে সরকারি চাকরিতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদে ৪৫ শতাংশ মেধার ভিত্তিতে এবং ৫৫ শতাংশ অগ্রাধিকার কোটায় নিয়োগ চালু হয়। পরবর্তী সময়ে প্রতিবন্ধীদের জন্য ১ শতাংশ বাড়িয়ে ৫৬ শতাংশ নির্ধারিত হয়। বর্তমানে যে ৫৬ শতাংশ কোটা পদ্ধতি তার ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা, ১০ শতাংশ নারী, ১০ শতাংশ জেলা কোটা, ৫ শতাংশ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী আর মাত্র ১ শতাংশ প্রতিবন্ধীদের জন্য। বাকি ৪৬ শতাংশ মেধার লড়াইয়ে যারা জিততে পারে তাদের জন্য। এখানে উল্লেখ্য, কোটায় উপযুক্ত প্রার্থী পাওয়া না গেলে তা মেধাতালিকা থেকেই পূরণ করা হয়। এই বাস্তবতা বর্তমান সময়ে কতটুকু গ্রহণযোগ্য তা পর্যালোচনা করা অবশ্যই প্রয়োজন। সরকার সে লক্ষ্যেই কাজ করছে। আদালত কী রায় দেয় সেটা দেখে যত দ্রুত সম্ভব এ বিষয়ে সব মহল পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে একটা গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন- সাধারণ জনগণ সেটিই প্রত্যাশা করে।

লাভ-ক্ষতির হিসাব করতে গেলে দেখা যাবে সরকারি চাকরিজীবীরা জনগণের একট নগণ্য অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। বেসরকারি চাকরিজীবী ও সাধারণ শ্রমিক কর্মচারীরা করে বেশির ভাগ জনগণের প্রতিনিধিত্ব। তাহলে এই কোটাবিরোধী, কোটা সংস্কার বা কোটা বাতিলের আন্দোলন কার স্বার্থে? যে আন্দোলন সংখ্যা গোরিষ্ঠ জনগণের দাবি বা চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে নয় তার পক্ষে মতামত দেওয়ার বা মদদ দেওয়া জনস্বার্থবিরোধী বলে আমার মনে হয়।

তাই সব মহলের প্রতি অনুরোধ বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা না করে আসুন কেউ আন্দোলনে নামলেই সেখানে সমর্থন না দেই। যে আন্দোলন সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের স্বার্থে, আমরা সেই আন্দোলনকে স্বাগত জানাই। সেখানে ভোগান্তি থাকলেও বেলা শেষে পাওনাটা আদায় হলে সাধারণ মানুষের তৃপ্তির হাসিটা সব কষ্টকে ম্লান করে দেয় নিশ্চিত।

লেখক: কলামিষ্ট


আয়াতুল কুরসির ফজিলত

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
মুফতি আলী হুসাইন

‘আয়াতুল কুরসি’ আল্লাহর অপূর্ব দান। এটা সুরা বাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াত। একাধিক হাদিসে আয়াতটি দিনে-রাতে মোট আটবার পড়ার কথা বলা হয়েছে, সকাল-সন্ধ্যায়, পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের পর এবং শোয়ার সময়। প্রতিটি মুমিনের কর্তব্য এই পবিত্র আয়াতটিকে প্রতিদিনের ওজিফা বানিয়ে নেওয়া। কেউ যদি আয়াতুল কুরসি পড়ে ঘুমায়, আল্লাহ তায়ালা তাকে সকল প্রকার বিপদ-আপদ বালা-মুসিবত থেকে হেফাজত করবেন। চোর-ডাকাত থেকে রক্ষা করবেন। মানুষ, শয়তান ও দুষ্ট জিনের ক্ষতি থেকেও নিরাপদ ও সুরক্ষিত রাখবেন।

উবাই ইবনে কাব [রাদিয়াল্লাহু আনহু] বর্ণনা করেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে বললেন, হে আবুল মুনযির! তোমার কাছে আল্লাহর কিতাবের কোন আয়াতটি সবচেয়ে বেশি মর্যাদাপূর্ণ? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই অধিক জানেন। তিনি আবার বললেন, হে আবুল মুনযির! তোমার কাছে আল্লাহর কিতাবের কোন আয়াতটি সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ? আমি বললাম, আয়াতুল কুরসি। তখন তিনি আমার বুকে হাত চাপড়ে বললেন, হে আবুল মুনযির! তোমার জ্ঞানের জন্য তোমাকে মোবারকবাদ। [মুসলিম: ৮১০]

আবু হুরাইরা [রাদিয়াল্লাহু আনহু] বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, আয়াতুল কুরসি কোরআনের অন্য সব আয়াতের সর্দার। আয়াতটি যে ঘরে পড়া হবে, সে ঘর থেকে শয়তান বের হয়ে যাবে। [মুসতাদরাকে হাকেম: ২১০৩]

সহিহ বুখারিতে এসেছে, আবু হুরাইরা [রাদিয়াল্লাহু আনহু] থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে রামাদান মাসে জাকাতের সম্পদ দেখাশোনা ও পাহারা দেওয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত করলেন। তিনি মুসলমানদের থেকে উসুল করা জাকাতের সম্পদ দেখাশোনা করতেন। এক রাতে এক আগন্তুক এসে জাকাতের সেই স্তূপিকৃত খেজুর থেকে মুঠি ভরে নিতে লাগল। আমি তাকে ধরে ফেললাম এবং বললাম তোমাকে আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে নিয়ে যাব। সে বলল, ‘দেখুন, আমি এক হতদরিদ্র মানুষ। পরিবারের ব্যয় নির্বাহের দায়িত্ব আমার কাঁধে। আমার দয়া হলে আমি তাকে ছেড়ে দিলাম।’

সকালে নবি কারিম (সা.) বললেন, আবু হুরাইরা! তোমার গত রাতের বন্দির কী অবস্থা? আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! সে তার অভাব-অনটন ও পরিবারের ভারগ্রস্ততার কথা বলায় আমার মনে দয়ার উদ্রেক হয়েছে বিধায় তাকে ছেড়ে দিয়েছি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, দেখ, সে তোমাকে মিথ্যা বলেছে, সে আবার আসবে। আমি বুঝতে পারলাম, যেহেতু রাসুল বলেছেন, তাহলে সে অবশ্যই আসবে। তাই আমি পূর্ব থেকেই তার অপেক্ষায় প্রস্তুত থাকলাম। ইতোমধ্যে সে আসল এবং খাদ্যস্তূপ থেকে মুঠি ভরে নিতে লাগল। আমি তাকে ধরে ফেললাম এবং বললাম, ‘আজকে আমি তোমাকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে উপস্থিত করবই। সে তখন বলতে লাগল, আমাকে ছেড়ে দিন। আমি তো অভাবী লোক। আমার ওপর পরিবারের দায়-দায়িত্ব আছে। তার কথায় আমার দয়া হলো, তাই আমি আবার তাকে ছেড়ে দিলাম।’

সকালে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘তোমার বন্দির কী খবর? আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! সে চরম হতদরিদ্র, নিজের অভাব ও পরিবারের দায়-দায়িত্বের কথা বলায় আমার মনে দয়া হয়, তাই তাকে ছেড়ে দেই।’ তিনি বললেন, ‘সে তোমাকে মিথ্যা বলেছে। সে আবার আসবে।’ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কথায় আমি তৃতীয় রাতেও তার অপেক্ষায় থাকলাম। ঠিকই সে এসে মুঠি ভরে খাদ্য নিতে লাগল। আমি তাকে ধরে ফেলি এবং বলি, এবার তোমাকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে নিয়েই ছাড়ব।

এ নিয়ে তিনবার হলো, তুমি বল আসবে না কিন্তু পরে ঠিকই এসে যাও। তখন সে বলল, আমাকে ছেড়ে দাও। আমি তোমাকে এমন কিছু কথা শিখিয়ে দেব, যার দ্বারা আল্লাহ তোমাকে উপকৃত করবেন। আমি বললাম, কী সেই কথা? সে বলল, যখন বিছানায় যাবে, আয়াতুল কুরসি পাঠ করবে। তাহলে আল্লাহর পক্ষ থেকে সকাল পর্যন্ত তোমার জন্য একজন পাহারাদার নিযুক্ত থাকবে এবং সকাল পর্যন্ত শয়তান তোমার কাছে আসতে পারবে না। আমি তাকে ছেড়ে দিলাম। রাসুলুল্লাহ সকালেই আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, গত রাতে তোমার বন্দির কী খবর? আমি বললাম, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! সে বলল যে, আমাকে কিছু কথা শিখিয়ে দেবে, যার দ্বারা আল্লাহ আমাকে উপকৃত করবেন। তাই তাকে ছেড়ে দিয়েছি।’

জিজ্ঞাসা করলেন, সে কথাগুলো কী?

সে আমাকে রাতে শোয়ার সময় আয়াতুল কুরসি পড়ে ঘুমাতে বলেছে। এতে আল্লাহ তায়ালা আমাকে সকাল পর্যন্ত হেফাজত করবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এ কথা শুনে বললেন, সে তোমাকে সত্যই বলেছে। যদিও সে মহা মিথ্যুক। এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, আবু হুরাইরা! তুমি কি জানো, তিন রাত ধরে তোমার সঙ্গে কার সাক্ষাৎ হচ্ছে?

-না, তা তো জানি না!

-সে ছিল শয়তান। [সহিহ বুখারি: ২৩১১]

আয়াতুল কুরসি

‘আল্লাহ, তিনি ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই। তিনি চিরঞ্জীব ও বিশ্বচরাচরের ধারক। কোনো তন্দ্রা বা নিদ্রা তাকে স্পর্শ করতে পারে না। আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সবকিছু তাঁরই মালিকানাধীন। তাঁর হুকুম ব্যতীত এমন কে আছে যে, তাঁর নিকট সুপারিশ করতে পারে? তাদের সম্মুখে ও পিছনে যা কিছু আছে সবকিছুই তিনি জানেন। তাঁর জ্ঞানসমুদ্র হতে তারা কিছুই আয়ত্ত করতে পারে না, কেবল যতটুকু তিনি দিতে ইচ্ছে করেন তা ব্যতীত। তাঁর কুরসী সমগ্র আসমান ও জমিন বেষ্টন করে আছে। আর সেগুলোর তত্ত্বাবধান তাঁকে মোটেই শ্রান্ত করে না। তিনি উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ও মহিমাময়।’ [সুরা বাকারা, আয়াত: ২৫৫]

ব্যাখ্যা

আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই

আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো বা একাধিক উপাস্য থাকলে কি সমস্যা? এ প্রশ্নের জবাবে আল্লাহ বলেন,

‘বল, ওদের কথামতো যদি তাঁর সঙ্গে অন্য উপাস্যও থাকত, তবে তারা আরশের অধিপতির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার উপায় অন্বেষণ করত।’ [সুরা বনী ইসরাইল, আয়াত: ৪২]

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছেÑ

আল্লাহ কোনো সন্তান গ্রহণ করেননি এবং তাঁর সঙ্গে অন্য কোনো ইলাহ নেই। থাকলে প্রত্যেক উপাস্য নিজ নিজ সৃষ্টি নিয়ে আলাদা হয়ে যেত এবং একজন অন্যজনের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে চাইত। তারা যা বলে, তা থেকে আল্লাহ পবিত্র। [সুরা মুমিন, আয়াত: ৯১]

সুরা আল-আম্বিয়ার ২২ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছেÑ

যদি আসমান ও জমিনে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ থাকত, তবে উভয়েই ধ্বংস হয়ে যেত। অতএব তারা যা বলে, তা থেকে আরশের অধিপতি আল্লাহ পবিত্র।’ [সুরা আম্বিয়া: ২২]

মোটকথা, আল্লাহর সঙ্গে যদি একাধিক উপাস্য থাকত, তাহলে তাদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই, আধিপত্য বিস্তারের লড়াই, ভৌগোলিক-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বিস্তারের লড়াই অনিবার্য হয়ে উঠত। তখন সব উপাস্যের ধ্বংসটাও নিশ্চিত ছিল।

চিরঞ্জীব আল্লাহকে কেউ জন্ম দেয়নি; তিনিই জন্ম-মৃত্যু সৃষ্টি করেছেন। তিনি সৃষ্টি করেন এবং সৃষ্টির বিনাশ ঘটান। জন্ম-মৃত্যুর যিনি স্রষ্টা, তিনি স্বভাবতই জন্ম-মৃত্যুর ঊর্ধ্বে। তিনি সদা-বর্তমান। মৃত্যু তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না। যখন মহাবিশ্ব বলে কিছুই ছিল না, তখনো তিনি ছিলেন। আবার যখন সব কিছুর বিনাশ ঘটবে তখনো তিনি থাকবেন। তাঁর কোনো শুরু নেই। তাঁর কেনো শেষও নেই। তিনি আদি। তিনি অনন্ত।

আল্লাহ বলেন,

তিনি চিরঞ্জীব। তিনি ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই। অতএব তাঁর কাছেই প্রার্থনা কর বিশুদ্ধ-চিত্তে, নিবেদিত প্রাণ হয়ে। সব প্রশংসা বিশ্বজগতের পালনকর্তা আল্লাহর জন্য। [সুরা মুমিন, আয়াত: ৬৫]

বিশ্বচরাচরের ধারক মহাবিশ্বসহ সব সৃষ্টিকে যিনি ধারণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ করে চলেছেন, তিনিই ‘আল-কাইয়ুম’। জড়বস্তু আর জীববস্তু; প্রত্যেকের প্রতি মুহূর্তের প্রতিটি প্রয়োজন তিনি নিজস্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী পূরণ করে চলেছেন এবং নির্ধারিত পরিণতির দিকে প্রত্যেককে পরিচালিত করে চলছেন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর গৌরব ও মহিমা ঘোষণা করে, তিনি প্রবল পরাক্রান্ত, মহাপ্রজ্ঞাবান। আসমান ও জমিনের তিনিই একচ্ছত্র মালিক এবং তিনিই জন্ম ও মৃত্যু দেন, তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান। তিনি আদি এবং তিনিই অন্ত; তিনি প্রকাশিত এবং তিনিই অপ্রকাশিত; সব বিষয়ে তিনি সম্যক অবগত। তিনি আসমান ও জমিনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর আরশে সমাসীন হয়েছেন। তিনি জানেন, যা ভূতলের গভীরতম প্রদেশে প্রবেশ করে, আর যা তা থেকে বের হয় এবং যা আকাশ থেকে অবতীর্ণ হয় এবং যা তাতে ওঠে যায়, তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন। তোমরা যা কর আল্লাহ সবই দেখেন। আসমান ও জমিনের সার্বভৌমত্ব তাঁরই; তাঁর কাছেই আছে সব বিষয়ে মীমাংসা। মানুষের বুকের গভীরে লুকায়িত সব তথ্যই আল্লাহ জানেন। [সুরা হাদীদ: ২-৬]

(কোনো তন্দ্রা এবং নিদ্রা তাকে স্পর্শ করতে পারে না) আল্লাহ ঘোষণা করছেন, তিনি তন্দ্রাচ্ছন্ন হন না এবং তাঁর ঘুমের প্রয়োজন পড়ে না। তাঁর ক্লান্তি নেই। সদা-সর্বদা বিশ্ব পরিচালনার কাজে ব্যস্ত থাকেন।

সুরা আর-রহমানে ঘোষিত হয়েছেÑ

‘তিনি প্রতিদিনই [প্রতি মুহূর্তে] বিশাল কর্মযজ্ঞে ব্যস্ত থাকেন।’ [সুরা আর-রহমান, আয়াত:২৯]

(কে আছে যে, তাঁর অনুমতি ব্যতীত সুপারিশ করবে?) এই পৃথিবীর সবকিছু আল্লাহর একক মালিকানাধীন। তিনি তাঁর আপন ইচ্ছানুযায়ী তাদের প্রত্যেককে নির্দিষ্ট পরিণতির দিকে চালিত করে চলেছেন। তাঁর ইচ্ছা কিংবা আনুগত্যের বাইরে যাওয়া কোনো সৃষ্টির পক্ষেই সম্ভব নয়। এমনকি তাঁর অধীনস্থদের কেউ নিজের বা অন্য কারও ব্যাপারে কোনো বিষয়ের সুপারিশও আল্লাহর কাছে করতে পারবে না। তবে তিনি যদি দয়া করে কাউকে সুপারিশ করার জন্য নির্বাচিত করেন এবং তাকে অনুমতি প্রদান করেন তাহলে সে সুপারিশ করতে পারবে।

(যতটুকু তিনি ইচ্ছে করেন তা ছাড়া তাঁর জ্ঞানভাণ্ডারের কিছুই তারা আয়ত্ত করতে পারে না) মহান আল্লাহ মহাবিশ্বের প্রতিটি জড় পদার্থ ও প্রাণীজগতের অতীত-বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকেফহাল। পক্ষান্তরে, মানুষ কেবল ঘটমান বর্তমান এবং অতীতের টুকরো টুকরো স্মৃতি ছাড়া আর কিছুই জানে না। তবে আল্লাহ যদি কাউকে বিশেষভাবে অন্য মানুষের তুলনায় বেশি জ্ঞান দান করেন সেটা ভিন্ন কথা। মোটকথা মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধির সীমাবদ্ধতা রয়েছে কিন্তু আল্লাহর জ্ঞানের সীমা নেই, তিনি অসীম, তাঁর জ্ঞানও অসীম।

আল্লাহ বলেন,

নিশ্চয়ই কেয়ামতের জ্ঞান কেবল আল্লাহর কাছেই আছে। তিনি বৃষ্টিবর্ষণ করেন এবং তিনিই জানেন মাতৃগর্ভে যা আছে। কেউ জানে না আগামীকাল সে কী উপার্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন দেশে সে মৃত্যুবরণ করবে। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্ববিষয়ে সম্যক অবগত। [সুরা লুকমান: ৩৪]

(তাঁর সিংহাসন (কুরসি) আসমান ও জমিনকে পরিবেষ্টন করে আছে) কুরসি শব্দের আভিধানিক অর্থ সিংহাসন, আসন, চেয়ার ইত্যাদি। আসন থেকে জমিন পর্যন্ত বিস্তৃত একটি কুদরতি সিংহাসনে আল্লাহ সমাসীন হয়ে আছেন। তাঁর অসীম কুদরত, শক্তি, ক্ষমতা, বিশালত্ব, শাসনব্যবস্থা ইত্যাদি দিয়ে মহাবিশ্বসহ প্রত্যেক জড় এবং জীবকে প্রতিনিয়ত পরিবেষ্টন করে আছেন।

আল্লাহ বলেন,

আর তারা আল্লাহকে যথার্থরূপে বোঝেনি। কেয়ামতের দিন পৃথিবী থাকবে তাঁর হাতের মুঠোয় এবং আসমানগুলো ভাঁজ করা অবস্থায় থাকবে তাঁর ডান হাতে। তিনি পবিত্র; আর এরা যাকে শরিক করে তিনি অনেক ঊর্ধ্বে। [সুরা যুমার, আয়াত: ৬৭]

লেখক: ইসলামী চিন্তাবিদ


বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে করণীয়

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
হায়দার আহমদ খান এফসিএ

সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ তার যোগ্যতা এবং শক্তিতে। এ মানুষ তার সুখ-শান্তির জন্য সমাজের প্রাপ্য সম্পদকে অধিক ব্যবহার উপযোগী করায় শ্রম বাজারের সূচনা। শ্রম বাজারের সঙ্গে শুরু হয়েছে শ্রমের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা। এ শ্রমের বিনিময় মূল্যের ওপর নির্ভর করে একজনের চাহিদা পূরণের সক্ষমতা। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে মানুষের চাহিদার রূপান্তর ঘটছে প্রতিদিন, সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার। এ প্রতিযোগিতার বাজারে সেই দেশ তত উন্নত বা দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত, যে দেশের মানুষ উন্নত সমাজব্যবস্থার সব উপকরণ বেশি উপভোগ করতে পারে। উন্নত সমাজব্যবস্থার উপকরণ সরবরাহের জন্য প্রয়োজন দক্ষ এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানবসম্পদ।

প্রতিযোগিতার বাজারে নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আয়-উপার্জন বৃদ্ধির পথ সমাজে স্বাভাবিক নিয়মেই হাজির। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সক্ষমতার বৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় শুরু হয়েছে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পন্থার ব্যবহার। আর এই বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে নতুন নতুন দ্রব্য, সেবার যেমন সৃষ্টি হচ্ছে- তেমনি সমাজে এক অসম প্রতিযোগিতাও শুরু হয়েছে। আগে মানুষ তার হাতের কাছে যেসব দ্রব্য, সেবা পেত তা দিয়েই তার চাহিদা পূরণ করত। এখন মানুষ তার যোগ্যতা বিবেচনায় প্রতিযোগিতায় সফলকাম হওয়ার জন্য সক্ষমতা বৃদ্ধির পরীক্ষার সম্মুখীন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটির মতো, আর আজ স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর ২০২৪ সালে এসে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ কোটি। ১,৪৭,৫৭০ বর্গ কিলোমিটারের বাংলাদেশে স্বাধীনতার পূর্বে ওই সংখ্যক মানুষের মধ্যে মাঝেমধ্যেই খাদ্যাভাবের খবর শোনা যেত; বর্তমানে খুব একটা এমন সংবাদ পাওয়া যায় না। কৃষি উৎপাদনের সফলতা আমাদের এক বিরাট অর্জন। তবে স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি উদ্দেশ্য ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি, সে লক্ষ্য এখনো অর্জিত হয়নি। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের মানুষ বেড়েছে, সঙ্গে বেড়েছে শ্রমিকের চাকরিতে প্রার্থীর সংখ্যা। বাংলাদেশের ১ কোটির বেশি মানুষ বিদেশে কর্মরত শ্রমিকের পদে। তাদের অধিকাংশের পারিবারিক জীবন নেই। তারপরেও বিদেশ যেতে বা পাঠাতে চায় অনেকে কারণ দেশেও তাদের কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা নেই। সম্প্রতি এক সংবাদে প্রকাশ ‘রেলপথের পরিচ্ছন্নতাকর্মী পদে চাকরি পাওয়াদের সবাই স্নাতকোত্তর’। সংবাদটি পড়ে আমার এক স্যারের কথা মনে হয়ে গেল। ১৯৮১ সালের অক্টোবর মাসে আমি যোগদান করেছিলাম বাংলাদেশ সরকারের টি অ্যান্ড টি বোর্ডে সহকারী পরিচালক (হিসাব) পদে। চাকরি জীবনের সূচনায় আমাদের পরিবার কেমন হবে তা চিন্তা করে কর্তৃপক্ষ আমাদের দিয়েছিলেন পরিবার পরিকল্পনার ওপর ট্রেনিং। সেই ট্রেনিং-এর একটি সেশনে লেকচার দিয়েছিলেন হিসাব জগতের এক সময়ের সবার গুরু ড. মো. হাবিবউল্লাহ স্যার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে স্যারকে পেয়েছিলাম শিক্ষক হিসেবে। স্যারের লেকচারের উপকারিতা জানা থাকায় আমার আগ্রহ ছিল তুঙ্গে। স্যার সব সময় ইনফরমাল পদ্ধতিতে ছাত্রদের কাছে আলোচ্য বিষয় উপস্থাপন করতেন, যা একবার শুনলে জীবনেও আর ভোলা যায় না। স্যার বলা শুরু করলেন তার ব্যক্তিগত জীবনের কাহিনি দিয়ে। স্যার যখন ইন্টারমিডিয়েটে ঢাকা কলেজে পড়েন, তখন বাড়ি থেকে টেলিগ্রাম ‘কাম শার্প দাদি সিরিয়াস’। টেলিগ্রাম পেয়ে বাড়ি যাওয়ার পর শুনলেন দাদি নাতবৌ দেখতে চান। যথারীতি বিয়ে করতে হয়েছিল স্যারকে। স্বাভাবিকভাবেই বিয়ের পর সন্তানদের আগমন শুরু হয়েছিল। পরিবার পরিকল্পনার কথা চিন্তা না করার পক্ষে কারণ- স্যারের ধারণা স্যারের ছেলেমেয়েরা চাকরি পাবেই কারণ বাংলাদেশে ম্যানেজারের চাকরির অভাব হবে না আর ‘হাবিবউল্লাহর ছেলেমেয়েরা ম্যানেজারের নিচে চাকরি করবে না’। ২০২৪ সালে অনেকের মতো আমারও ধারণা ম্যানেজারের পদে যোগ্য লোক পাওয়া যায় না, আর যোগ্য লোকের চাকরির অভাব হচ্ছে না। আর আমার ধারণা, ম্যানেজার পদে যোগ্য মানুষের অভাবের একটি প্রধান কারণ: মানসম্মত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে না পারা। আমরা যে আমাদের সন্তানদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে পারছি না তা মাঝেমধ্যে প্রকাশ হয়ে যায়। আমাদের একটি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকীয়তে দেখা যায়, তৃতীয় শ্রেণির শতকরা ৬০ এবং পঞ্চম শ্রেণির শতকরা ৭০ জন ছাত্রছাত্রী তাদের অঙ্ক বিষয়ে জ্ঞান রাখে না। এমন সংবাদ অনেক দিন ধরে আমাদের সামনে আসছে। এপ্রিল ১৭, ২০১৮ তারিখে দৈনিক বণিকবার্তার সংবাদে এসেছিল অষ্টম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা অর্জনের হার যার চিত্র এমন:

(১). বাংলায় শতকরা ৫৪ শতাংশ,

(২). ইংরেজিতে শতকরা ১৯ শতাংশ এবং

(৩). গণিতে শতকরা ২২ শতাংশ।

এমন সব ছেলেমেয়ের একটি অংশ যদি আমাদের দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে তাহলে, পরিচ্ছন্নতাকর্মী পদে চাকরির দরখাস্ত করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো উপায় থাকবে না। এই পরিবেশের জন্য দায়ী দরখাস্তকারীরা অবশ্যই নয়। অন্য এক সংবাদে প্রকাশ, বাংলাদেশের ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি যুবসমাজের ১৮.৮৭ শতাংশের কোনো প্রকার শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণ নেই (দি ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, জুন ২৪, ২০২৪)। বাংলাদেশে ম্যানেজারের পদে চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় যোগ্য প্রার্থীর সংখ্যা যথেষ্ট না থাকায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদেশি প্রার্থীদের বাংলাদেশে চাকরির সংবাদ পাওয়া যায়। সম্প্রতি প্রকাশিত এমন একটি সংবাদ ‘দেশে অবৈধ কত বিদেশি শ্রমিক কাজ করেন জানতে চান হাইকোর্ট’।

বর্তমান বিশ্বে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বেশি। আমাদের দেশ অধিকাংশ সময় গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের হাতেই ছিল কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় যে আদর্শ উদ্দেশ্য নিয়ে যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছিল আমার মতো মুক্তিযোদ্ধারা- সেই স্বপ্ন আজও বাস্তবায়ন হওয়া তো দূরের কথা, বাস্তবায়নের পথে আছে তাও বলতে লজ্জা পাওয়ার মতো। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে মাঝেমধ্যে জাতীয়পর্যায়ে আলোচনা হয়, যা সংবাদমাধ্যমে স্থান পায়। বাংলাদেশের এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া খুব একটা আমাদের নজরে আসে না বা উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। এভাবেই স্বাধীন দেশের ৫৩ বছর চলে গিয়েছে। আর কতদিন যাবে বা লাগবে উন্নতি শুরু করতে? আর কতদিন আমাদের সন্তানদের শ্রমিকের চাকরিতে বিদেশে পরিবার ছাড়া দিনের পর দিন থাকতে দিব? বাংলাদেশের একমাত্র সম্পদ তার মাটি এবং মানুষ। সেই মানুষ এবং মাটিকে ব্যবহার করার যে পরিকল্পনা দরকার তা দেখা যাচ্ছে না। ১৯৭২ সালেই শিক্ষা ক্ষেত্রে শুরু হয়েছিল নকল এবং অটো প্রমোশনের মতো ব্যবস্থা, যা আজও অনেক ক্ষেত্রে বিরাজমান। তবে মাঝেমধ্যে সরকারের আশা জাগানিয়া কিছু পদক্ষেপের কথা শোনা যায়। ‘জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহ-২০২৪’ উদ্‌যাপন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার পুণর্ব্যক্ত করে বলেছেন ‘শৈশব থেকেই সন্তানদের বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা দিতে হবে’। অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।

একটি দেশের আসল সম্পদ তার মানুষ। মানবসম্পদ ছাড়া অন্য যত সম্পদই থাকুক না কেন, মানবসম্পদ ছাড়া তা কাজে লাগানো যায় না। আর যদি উপযুক্ত এবং মানসম্মত মানবসম্পদ সৃষ্টি করা যায়, তাহলে সে দেশের মানুষ আরাম আয়েশে উন্নত জীবনযাত্রায় বসবাস করতে পারবে অন্য সব সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে। বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটি। সরকারি হিসাবে প্রায় ৩ কোটি ছেলেমেয়ে প্রাথমিক শিক্ষায় সম্পৃক্ত। সরকারের উচিত সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষায় জড়িতদের সম্পদে রূপান্তর করা। শিক্ষায় সরকারের বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ সরকারের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ নেই, ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও কম। তারপরও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। যেমন সম্প্রতি সংবাদে প্রকাশ, প্রাথমিক শিক্ষায় জড়িতদের মধ্যে ৩৭ লাখ ছেলেমেয়েকে মিড-ডে খাবার পরিবেশন করা হবে আগামী আগস্ট থেকে। সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিতির নিশ্চয়তাসহ পড়াশোনার প্রতিদিনের অগ্রগতি পর্যালোচনাও করতে হবে- তাহলেই বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার পদক্ষেপ কার্যকর হবে। চাকরির সুযোগ দিন দিন বাড়বে, তবে মেধাসম্পন্ন ব্যক্তির জন্য। আমাদের কাজ হবে সুপ্ত মেধাকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। সন্তানকে শিক্ষিত করার মাধ্যমেই আমাদের আর্থিক সচ্ছলতার টেকসই অবস্থান নিশ্চিত হবে। মনে রাখতে হবে বর্তমান বিশ্ব একটি পরিবার।

লেখক: চেয়ারম্যান, এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (ইডিএ)


এডিপি বাস্তবায়ন ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ড. মিহির কুমার রায়

বিদায়ী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে চলছে। নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও উন্নতির কোনো লক্ষণ নেই। বরং প্রকল্পে ধীরগতির কারণে অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে এডিপি বাস্তবায়ন হার নেমে এসেছে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ১১ মাসে (জুলাই-মে) এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে ৫৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ। যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৪ শতাংশ কম। অথচ অর্থবছর শেষ হতে বাকি আর মাত্র এক মাসেরও কম সময়। এ সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে হবে ৪৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ এডিপি।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ১১ মাসের এডিপি বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে। বুধবার (২৬ জুন) এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে আইএমইডি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বরাদ্দের হিসাবে কয়েকটি মন্ত্রণালয় ছাড়া বেশির ভাগই তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারছে না। এ বিষয়ে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এবার এডিপি অগ্রগতি কম আছে। অর্থবছর শেষে খুব বেশি বাস্তবায়ন হবে বলে মনে হয় না। তবে বাস্তবায়নের হার বাড়ানোর বিষয়ে জোর দেওয়া হচ্ছে।’ পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, চলতি (২০২৩-২৪) অর্থবছরের এডিপিতে ১ হাজার ৬৪৭ প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ রয়েছে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। প্রথম ১১ মাসে ৫৮ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের তত্ত্বাবধানে থাকা এসব প্রকল্পের বিপরীতে খরচ হয়েছে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা বরাদ্দের ৫৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ।

১১ মাসের এডিপি বাস্তবায়নের চিত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, করোনার সময় ছাড়া চলতি অর্থবছরের মতো এত কম এডিপি বাস্তবায়ন আর কখনো হয়নি। ২০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছিল ২০১৯-২০ এবং ২০২০-২১ অর্থবছর। ওই অর্থবছর একই সময়ে বাস্তবায়ন হার ছিল ৫৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ। আর ২০২০-২১ অর্থবছরে ছিল ৫৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ, যা চলতি অর্থবছরের চেয়েও প্রায় এক শতাংশ বেশি। অর্থবছরের ১১ মাসে কখনো ৬০ শতাংশের নিচে নামেনি এডিপি বাস্তবায়নের হার। এমনকি গত অর্থবছরেও বাস্তবায়ন হার ছিল ৬১ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

এদিকে, সামগ্রিকভাবে এডিপি বাস্তবায়ন হারের সঙ্গে মাসের হিসাবে চলতি অর্থবছরের মে মাসে গতবারের তুলনায় কম বাস্তবায়ন হয়েছে। তথ্যানুযায়ী, শুধু মে মাসে এডিপি বাস্তবায়নে খরচ হয়েছে ২১ হাজার ৫৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা। অর্থাৎ এ সময় বাস্তবায়নের হার ৮ দশমিক ২৮ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরের মে মাসে খরচ হয় ২৬ হাজার ৯৫৭ কোটি ৫১ লাখ টাকা, যা বরাদ্দের ১১ দশমিক ৪০ শতাংশ। অর্থাৎ মাসের হিসাবে বাস্তবায়ন তিন শতাংশেরও কম হয়েছে।

আইএমইডির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাস্তবায়ন হারে সবচেয়ে পিছিয়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, পরিসংখ্যান ও সরকারি কর্মকমিশন। এ ছাড়া কয়েকটি বাদে অন্য মন্ত্রণালয় এবং বিভাগগুলোও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ৪৩ দশমিক ০৩ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ ৪৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ ৪৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন করেছে।

এ ছাড়া ১১ মাসে ৪০ শতাংশও এডিপি বাস্তবায়ন করতে পারেনি সাতটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। এরমধ্যে সবচেয়ে কম এডিপি বাস্তবায়ন করেছে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ, বাস্তবায়ন করেছে ২৭ দশমিক ০৭ শতাংশ। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ করেছে ২৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ৩০ দশমিক ০৩, বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন ৩২ দশমিক ৯৬ শতাংশ, পরিবেশ ও জলবায়ু মন্ত্রণালয় ৩৩ দশমিক ৭২ এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ ৩৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন করেছে।

চলতি অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি এডিপি বাস্তবায়ন করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংস্থাটি ১১ মাসে বাস্তবায়ন করেছে মোট বরাদ্দের ৯৬ দশমিক ৮৫ শতাংশ। এ ছাড়া জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ ৯২ দশমিক ১৪, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ ৮৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ৭৯ দশমিক ০৬, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়র বিভাগ ৭৬ দশমিক ৭৫ এবং সুরক্ষা ও সেবা বিভাগ ৭৩ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন করেছে।

শতাংশের হিসাবে বাস্তবায়নে পিছিয়ে থাকলেও টাকা খরচে এগিয়ে রয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। বিভাগটির ২৬৩ প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ ছিল ৪২ হাজার ৯৫৬ কোটি ৭১ লাখ টাকা। ১০ মাসে ব্যয় হয়েছে ২৩ হাজার ৭৬২ কোটি ২৬ লাখ টাকা, যা ৫৫ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থান বিদ্যুৎ বিভাগের, খরচ করেছে ২০ হাজার ৭৬২ কোটি ২৬ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৬৮ দশমিক ২৯ শতাংশ।

এখানে উল্লেখ্য, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিল দুটি সরকার বিধায় নির্বাচনী বছর হওয়ায় উন্নয়ন কাজের বাস্তবায়ন তথা অর্থছাড়ে ধীরগতি লক্ষণীয় যা প্রতিটি নির্বাচনী বছরেই হয়ে থাকে; কিন্তু আইনগতভাবে তা হওয়ার কথা নয়। কারণ সরকার একটি প্রশাসনিক কাঠামো থেকে কাজ করে থাকে এবং সরকার আসবে সরকার যাবে, প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের দ্বারা প্রকল্প বাস্তবায়নের অসুবিধা পাওয়ার কথা নয় যা বাস্তবে সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই আগামীতে এ জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে মনোযোগ দেওয়ার জন্য প্রস্তাব রইল।

লেখক: গবেষক ও অর্থনীতিবিদ।


প্রযুক্তির উন্নয়নে বাংলাদেশ-চীন বন্ধুত্ব

আপডেটেড ১০ জুলাই, ২০২৪ ১৯:২৬
ড. মো. ফখরুল ইসলাম

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় এক দশক পর চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে আজ ০৮ জুলাই চীনের রাজধানী বেইজিং-এর উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ছেন। তার এ রাষ্ট্রীয় সফর ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও স্মার্ট জাতিতে রূপান্তরের লক্ষ্য পূরণের জন্য দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও আলোচনার নতুন আশার সঞ্চার করেছে। চীন সরকারও দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্রে উচ্চ প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে। শেখ হাসিনা ও শি জিন পিং-এর দ্বিপক্ষীয় এ বৈঠককে স্মরণীয় করে রাখতে দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন খাতে ২০টি সমঝোতা স্মারক সম্পন্ন হতে পারে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- অর্থনৈতিক ব্যাংকিং খাত, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, ডিজিটাল ইকোনমি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি খাতে সহায়তা, ষষ্ঠ ও নবম বাংলাদেশ-চীন ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ নির্মাণ, বাংলাদেশ থেকে কৃষিপণ্য রপ্তানি এবং পিপল টু পিপল কানেক্টিভিটি খাত অগ্রগণ্য। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লক্ষণীয়, চীন মানসম্মত উচ্চশিক্ষা, উচ্চতর গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। চীনের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয় বৈশ্বিক র‌্যাক্করিং-এ শীর্ষ স্থান দখল করেছে এবং সম্পাদিত গবেষণা কার্যক্রম বিশ্ব জ্ঞান ভাণ্ডারে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। এ কথা অনস্বীকার্য, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা, সবুজ প্রযুক্তি ও বংশানু প্রকৌশল (জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং) ইত্যাদির প্রযুক্তিগত উন্নয়নে চীন বিশ্বব্যাপী নেতৃত্ব দিচ্ছে।

কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও চীনের অগ্রগতি বিশেষভাবে প্রণিদানযোগ্য, যেখানে তারা উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদশীলতা ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ গত চারদশকে দারিদ্র্যবিমোচন, খাদ্যনিরাপত্তা এবং শিক্ষা সম্প্রসারণে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। যদিও বাংলাদেশ পৌনে ২০০ পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত করেছে; কিন্তু উচ্চশিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কিউএস র‌্যাঙ্কিং, টাইমস হায়ার এডুকেশন র‌্যাঙ্কিং অথবা সাংহাই র‌্যাঙ্কিং-এ বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ৫০০-তে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। যেহেতু বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ই পাঠদানমুখী সেহেতু উদ্ভাবন ও গবেষণার র‌্যাঙ্কিং-এ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান নিম্নমুখী। একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে বাংলাদেশকে গুণগত শিক্ষা, গবেষণা ফলাফল এবং উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে, যাতে প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং রপ্তানি করতে পারে। যেহেতু চীন এসব ক্ষেত্রে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে সেহেতু বাংলাদেশ-চীনের মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্ব।

বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে উপকৃত করতে পারে। এ প্রেক্ষিতে গুণগত মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষা, উচ্চতর গবেষণা, উদ্ভাবন এবং বিশেষ করে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হতে পারে।

চীন বাংলাদেশের বিশ্বস্ত ও পরীক্ষিত বন্ধু এবং দীর্ঘদিনের উন্নয়ন অংশীদার। চীন ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে, যার ধারাবাহিকতায় দুই দেশ পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে উন্নয়নের পথে অগ্রসরমান আছে এবং চীন বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০১৬ সালে শি জিন পিং-এর ঢাকা সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক ‘কৌশলগত সহযোগিতার অংশীদারত্বে’ উন্নীত হয়। উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সম্মেলনে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস, রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা ইত্যাদির পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ইত্যাদি বিষয়ে কীভাবে চীন বাংলাদেশের উন্নয়নের সহযোগী হতে পারে তা আলোচানায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেতে পারে।

সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক র‌্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষ ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় চীনের ১০টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি চীনের প্রাথমিক, বৃত্তিমূলক এবং কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থাও বিশ্বমানের। চীন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী এবং ডিপ্লোমা, ডক্টরাল ও পোস্ট ডক্টরাল শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন মেয়াদে বৃত্তি ও ফেলোশিপ প্রদান করছে। ২০২৩ সালের তথ্যানুযায়ী ১৪,০০০-এর বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষায়তনে অধ্যয়ন ও গবেষণা করছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ-চীন অংশীদারত্ব প্রকল্পের মাধ্যমে শিক্ষার মানোন্নয়ন ও গবেষণার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

একুশ শতকে জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে বিশ্ব দরবারে টিকে থাকা এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান বিশ্বে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনে উচ্চশিক্ষা বিশেষত উচ্চতর গবেষণা অনস্বীকার্য। আমরা যদি বিশ্ব অর্থনীতির দিকে তাকাই তাহলে দেখব, দেশে উচ্চশিক্ষার হার, দক্ষ জনশক্তি ও উদ্ভাবনী শক্তি বেশি সে দেশ ও জাতি সর্বক্ষেত্রে ততো বেশি এগিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সূতিকাগার। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় নতুন জ্ঞান সৃজন, ধারণ এবং তা অংশীজনদের মধ্যে বিতরণ। বৈশ্বিক চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তার নিরিখে উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে শিক্ষা ও গবেষণায় অধিকতর গুরুত্বারোপ, গবেষণালব্ধ ফলাফল বাণিজ্যিকীকরণ ও বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডারে তা সংযোজন করা আজ সময়ের বাস্তবতা।

বিশ্বায়নের এ যুগে মেধার কোনো বিকল্প নেই। মেধাস্বত্ব আধুনিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য, উদ্ভাবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বুদ্ধিভিত্তিক শ্রমকে যথাযথভাবে গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। মানবজাতির অগ্রগতি এবং সার্বিক কল্যাণনির্ভর করে প্রযুক্তি এবং সাংস্কৃতিক জগতে নতুন কিছু সৃষ্টির ক্ষমতার ওপর। এজাতীয় নতুন সৃষ্টিকর্মগুলোর আইনি সুরক্ষা প্রয়োজন। মেধাসম্পদের প্রসার ও সংরক্ষণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে, নতুন কর্মক্ষেত্রের অবারিত সুযোগ সৃষ্টি এবং জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি করে। বিশ্বের অনেক দেশ একমাত্র মেধাসম্পদকে পুঁজি করে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থাকে সুদৃঢ় করেছে। উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে শিক্ষকদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় শিক্ষকতার পাশাপাশি নতুন জ্ঞান সৃজনে মৌলিক ও উদ্ভাবনীমূলক গবেষণা কর্মকাণ্ডে বেশি মনোনিবেশ করা প্রয়োজন শিক্ষকদের গবেষণা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নতুন আবিষ্কার/উদ্ভাবন দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। গবেষণালব্ধ ফলাফল প্যাটেন্ট হলে একদিকে যেমন গবেষকের সুনাম ও মর্যাদা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে অন্যদিকে রাষ্ট্র ও গবেষক উভয়ই আর্থিকভাবে উপকৃত হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও চীনা গবেষকরা যৌথভাবে কাজ করতে আগ্রহী হবে। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এ ধরনের কার্যক্রমকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে যৌথ কর্মশালা, সেমিনার, ডায়ালগের আয়োজন করতে পারে এবং যৌথ একাডেমিক গবেষণা কার্যক্রমের সমন্বয় করতে পারে।

উচ্চশিক্ষার কাঙ্ক্ষিতমান নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নবতর জ্ঞানের দিগন্ত উন্মোচন, উচ্চশিক্ষাকে আধুনিকায়ন, বিষয়ে বৈচিত্র্য আনয়ন ও বিশ্বমানের গবেষণা নিশ্চিতকরণসহ বৈশ্বিক র‌্যাঙ্কিং-এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান সুসংহতকরণে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের শিক্ষক ও গবেষকদের সৃজনশীল ও গবেষণা কর্মকাণ্ড যথানিয়মে প্রকাশ ও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক অনুমোদিত আওতায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষায়িত জ্ঞান ও যোগ্যতাসম্পন্ন বিশ্বমানের শিক্ষাবিদ ও গবেষক তৈরির উদ্দেশে চীনের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সম্প্রতি উদ্যোগে চীনের খ্যাতনামা ৮টি বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সঙ্গে উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগের আগ্রহ ব্যক্ত করেছে। কমিশন ও বিআরসিসির যৌথ উদ্যোগে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য মেধাস্বত্ব লালন, সংরক্ষণ এবং তা যথাযথ চর্চার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং এতদসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এবং খ্যাতনামা চীনা বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ অনুঘটকের ভূমিকা পালন করতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন চীন সফর বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে অংশীদারত্ব ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে বিশাল আশা সঞ্চার করেছে। ভূ-রাজনৈতিক ইস্যু ছাড়াও বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন, কৃষি, স্বাস্থ্য, জ্বালানি, সুনীল অর্থনীতির জন্য সামুদ্রিক জৈব সম্পদ ব্যবহার, টেকসই খাদ্য, পুষ্টি নিরাপত্তা এবং পরিবেশের ওপর উন্নত গবেষণায় অংশীদারত্ব ও সহযোগিতার বিষয়টি প্রতিভাত হবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে আশাবাদী।

লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক


গবেষণায় উন্নয়নের চেরাগ ও আমাদের করণীয়

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
অধ্যাপক ড. মো. নাছিম আখতার

চীনা তরুণ গবেষকদের একটি দল এমন এক ধরনের কাপড় আবিষ্কার করেছে যা মানুষকে ক্যামেরার চোখে অদৃশ্য করে তোলে। ইনভিস ডিফেন্স নামের এ কাপড়টি দেখতে খুবই সাধারণ এবং দামেও সস্তা। গবেষকদের দাবি এ কাপড়টি খালি চোখে দেখা গেলেও কোনো ক্যামেরা দিয়ে এটিকে শনাক্ত করা সম্ভব নয়। পোশাকটিতে এমন এক ধরনের ক্যামো ফ্ল্যাশ প্যাটার্ন আছে যা ক্যামেরার অ্যালগরিদমকে বিভ্রান্ত করে দেয়। ফলে এটি পরিহিত কাউকে ক্যামেরা শনাক্ত করতে পারে না। আবার রাতের বেলায় ক্যামেরা মানুষের দেহের তাপমাত্রা শনাক্ত করার মাধ্যমে মানুষের দেহ শনাক্ত করে; কিন্তু ইনভিস ডিফেন্সের অনিয়মিত আকারের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রক মডিউলগুলো এক ধরনের অস্বাভাবিক তাপমাত্রার প্যাটার্ন তৈরি করে যা ইনফ্রারেড ক্যামেরাকেও বিভ্রান্ত করে তোলে। এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় তা হলো পোশাকে ক্যামো ফ্ল্যাশ প্যাটার্ন ও তাপমাত্রার অস্বাভাবিক প্যাটার্ন দুটো বৈশিষ্ট্যই পোশাকের অভ্যন্তরীণ গাণিতিক ভৌত মডেলের পরিবর্তন।

শুধু কি তাই, কোনো বাণিজ্যিক পণ্যের প্রতি বছরের যে নতুন মডেল তৈরি হয় সেটিও কিন্তু ওই পণ্যের গাণিতিক মডেলের পরিবর্তন। কোনো গাড়ির মডেল পরিবর্তন করলে গাড়িটি চলার পথে বাতাসে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে তার জ্বালানি খরচ বাড়বে কি না? গাড়িটির ভরকেন্দ্রের স্থান পরিবর্তন হয়ে দুর্ঘটনায় পতিত হবে কি না? পরিবর্তিত মডেল বাতাসের চাপ সহ্য করার ক্ষমতা রাখে কি না? সবকিছুই গাণিতিক সূত্রের সূক্ষ্ম হিসাব। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের মূল বিষয়গুলো হলো প্রোগ্রামিং, সাইবার ফিজিক্যাল সিস্টেম, ব্লকচেইন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি, অগমেন্টেড রিয়েলিটি প্রভৃতি। এগুলোর উৎকর্ষ ও পরিবর্তন সাধনেও গণিতের জ্ঞান অপরিহার্য। তাই চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের অগ্রসৈনিক হতে গণিতের উৎকর্ষ সাধনের কোনো বিকল্প নেই।

সেই গণিতেই আমরা দিন দিন সামগ্রিকভাবে দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে পড়ছি। ২০২৪ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১০টি বোর্ডে মোট ফেল ৩ লাখ ১৮ হাজার ৬২৭ জন। ফেল করা শিক্ষার্থীদের ১ লাখ ৬৬ হাজার ৬০২ জন অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী গণিতে অকৃতকার্য হয়েছে। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গণিতে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব রয়েছে। পাশাপাশি প্রাথমিক পর্যায় থেকে গণিতে দুর্বলতা শিক্ষার্থীদের খারাপ ফলাফলের পেছনে মুখ্য কারণ।

একটি পরিসংখ্যান বলছে, মাধ্যমিক স্কুলগুলোয় গণিত শিক্ষকের মোট সংখ্যা ৬৪ হাজার ১৪৭। তাদের মধ্যে গণিতে স্নাতক (অনার্স) ডিগ্রিধারী শিক্ষকের সংখ্যা ৩ হাজার ৮৩৬, যা মোট শিক্ষকের ৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ। স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী আছেন ৪ হাজার ৬৪০ জন, যা মোট শিক্ষকের ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ। সে অনুযায়ী গণিতের শিক্ষকদের মধ্যে বিষয়টিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী আছেন মাত্র ১৩ দশমিক ২২ শতাংশ অর্থাৎ গণিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি ছাড়াই মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের বিষয়টি শেখাচ্ছেন ৮৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ শিক্ষক। আমার মতে কোনো একটি বিশেষ উদ্যোগের মাধ্যমে মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এ শিক্ষকদের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি করার সুযোগ দেওয়া উচিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। এতে মাধ্যমিক পর্যায়ে গণিত শিখনের মান বৃদ্ধি পাবে।

বর্তমান মাধ্যমিক পরীক্ষায় গণিতে এ প্লাস পাওয়ার পরেও উচ্চ মাধ্যমিকে শিক্ষার্থীদের মানবিক গ্রুপে চলে যাওয়ার ঘটনা অহরহ ঘটছে। যা গণিতের প্রতি শিক্ষার্থীদের ভীতিকে প্রকাশ করে। কোনো একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৩-২৪ সেশনের ভর্তি পরীক্ষায় এ ইউনিটে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১৭০৫৯৯ জন। উপস্থিতির সংখ্যা ১৪৯৩৯১ জন। সবাই বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী হয়েও গণিত প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে ৬৮২৬৪ জন। শতকরা হিসেবে যা ৪৫ ভাগ। ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্রে গণিতে মোট নম্বর ছিল ২৫। পরীক্ষায় ২০ বা ২০ এর বেশি নম্বর পেয়েছে মাত্র ১৬ জন পরীক্ষার্থী। ১৫ বা ১৫ এর বেশি পেয়েছে ৮০৬ জন। ১০ বা ১০ এর বেশি পেয়েছে ৭০১২ জন। ৫ বা ৫-এর বেশি পেয়েছে ২৭৫৭১ জন। শূন্য বা শূন্যের বেশি পেয়েছে ৬২০১৬ জন। ঋণাত্মক নম্বর পেয়েছে অনেকেই কারণ এখানে প্রতিটি ভুল উত্তরের জন্য পয়েন্ট দুই পাঁচ মাইনাস নম্বর রয়েছে। এখান থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট তা হলো শতকরা ৫৫ ভাগ এইচএসসি বিজ্ঞান শিক্ষার্থী অংক বিষয় নিয়ে প্রত্যয়ী নয়। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে বইপ্রেমী জাতি সৃষ্টি করতে হবে। সম্প্রতি ‘সিইও ওয়ার্ল্ড’ ম্যাগাজিনের জরিপে, বছরে গড়ে ১৬টি বই পড়ে ভারতীয়রা পড়ুয়া জাতি হিসেবে ২য় অবস্থানে অবস্থান করছে। তালিকাটিতে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭তম। ম্যাগাজিনটির তথ্যমতে একজন বাংলাদেশি প্রতি বছর গড়ে বই পড়ে দুই দশমিক পঁচাত্তরটি। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার যে সৃজনশীল পদ্ধতি ছিল তা আমাদের শিক্ষার্থীদের ভীষণভাবে বই বিমুখ করেছিল। এ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি না হয়ে সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল গাইড বা নোট বইয়ের সঙ্গে।

শিক্ষার অনুকরণে ক্ষয়িষ্ণু ঢেউয়ের দর্শন অনুসরণীয়। রিপল ওয়েভ বা ক্ষয়িষ্ণু ঢেউ। এ সম্পর্কে সম্যক ধারণা পেতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই ছেলেবেলায়। খেলার ছলে পুকুরে ঢিল ছুড়ে ঢেউ সৃষ্টি করেনি এমন ছেলেবেলা কমই আছে। পুকুরের মধ্যে যখন ঢিল ছুড়ে ঢেউ সৃষ্টি করা হয়, ওই ঢেউ বৃত্তাকার আকৃতিতে পুকুরের ধারে গিয়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। এ ধরনের ঢেউকে ক্ষয়িষ্ণু ঢেউ বলে। ঢেউ সৃষ্টি ও নিঃশেষ হওয়ার মধ্যে একটি সময় অতিবাহিত হয়। নির্দিষ্ট সময়ের পরেই ঢেউটা নিঃশেষ হয়ে যায়। তেমনি কোনো দেশের বর্তমান সমৃদ্ধি কিন্তু অন্তত ২০ বছর আগে শুরু হওয়া প্রক্রিয়ায় ফল। কোনো দেশের শিক্ষাকে অনুসরণ করতে গেলে অন্তত ১৮ থেকে ২০ বছর আগের সিস্টেমকে অনুসরণ করা উচিত। কারণ আজকে আমরা যাদের ওই দেশের স্মার্ট, প্রজ্ঞাবান গ্র্যাজুয়েট হিসেবে দেখছি তাদের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়েছিল ১৬ বছর আগে।

বিশ্ব গণিত অলিম্পিয়াডে চীন ২৩ বার, রাশিয়া ১৬ বার ও আমেরিকা ৮ বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে আমরা আমাদের গণিত শিক্ষার উন্নয়নে আউটসোর্সিং করতে পারি। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই নয়, সর্বত্রই তৈরি করতে হবে বই পড়ার সংস্কৃতি। তবেই জাতি হিসেবে বিশ্বজয়ের মূলমন্ত্র সত্যিকার অর্থেই কার্যকর হবে।

লেখক: উপাচার্য চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়


ট্রানজিট নয় ভারতবিরোধী বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া

স্বাধীনতার ৫৩ বছর শেষে ৫৪ বছরে পা রাখল বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার তথা স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি মাত্র ২৩ বছর এ দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল। আওয়ামী লীগের ২৩ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশের যাবতীয় উন্নয়ন-সমৃদ্ধির ও অর্জনের ইতিহাস রচিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশ একই সূত্রে গাঁথা। বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনা মানেই বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি। ১৯৭১-৭৫ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু এ দেশকে সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যাওয়ার সূচনা করেছিলেন আর বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা পিতার অসমাপ্ত স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়ে বাংলাদেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ ও ডিজিটাল বাংলাদেশে পরিণত করেছেন। ১৯৯৬-২০০১ সাল এবং ২০০৯ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকন্যার হাত ধরে যত উন্নয়ন হয়েছে, তার বীজ বপন করেছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আওয়ামী লীগ সরকারের ২৩ বছরের শাসনামল ছাড়া বাংলাদেশের বাকি ৩০ বছরের ইতিহাস মূলত স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির হাতে দিনের পর দিন কালো অধ্যায় রচিত হওয়ার ইতিহাস। ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত করে দেশের উন্নয়ন এবং দেশের মানুষের কল্যাণে বারবার বাধা সৃষ্টি করার ইতিহাস। বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত করে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করার ইতিহাস।

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বলছে, প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারত মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন সংকটাপন্ন ও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বন্ধু হিসেবে পাশে দাঁড়িয়েছে এবং সাহায্য করেছে। জাতি হিসেবে আমরা সব সময় ভারতের কাছে কৃতজ্ঞ। স্বাধীনতার পর থেকে দুটি দেশ যে ঐক্যের ভিত্তিতে নিজেদের সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে চলেছে তা আজ পর্যন্ত বিদ্যমান রয়েছে। তবে মাঝে বিএনপি-জামায়াত জোটের ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের ফলে কিছুটা সময় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে খানিকটা নেতিবাচক সম্পর্ক বিরাজমান থাকলেও গত ১৫ বছরে দুটি দেশের সম্পর্ক বিশেষ উচ্চতায় পৌঁছেছে। ছিটমহলসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধান এসেছে গত ১৫ বছরে। বাংলাদেশ বর্তমানে ভারতের ৫টি সর্ববৃহৎ রপ্তানিকৃত দেশের তালিকায় রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রকল্পে ভারতের সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক দিক থেকেও দুই দেশের মধ্যে অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক দল যেমন ভারতে তাদের কার্যক্রম প্রদর্শন করে, তেমনি ভারতীয় সাংস্কৃতিক দলও বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম উপস্থাপন করে। এর মাধ্যমে দুই দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একটি শক্তিশালী সেতুবন্ধন রচিত হয়েছে। এখানে বলে রাখা ভালো, যে বাংলাদেশ ও ভারত একই উপমহাদেশের দুটি রাষ্ট্র হওয়ায় দুই দেশের সাংস্কৃতিক জগতের মধ্যে অনেক মিল রয়েছে। এ কারণে আবহমান কাল থেকে উভয় দেশ সাংস্কৃতিক দিক থেকে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার এ চমৎকার সম্পর্ক বিশ্বে বিশেষ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

অথচ বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি বিএনপি বাংলাদেশ-ভারতের ঐতিহাসিক এ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বিভিন্নভাবে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের শাসনামলের ২৩ বছর ছাড়া বাকি ৩০ বছরে বাংলাদেশের ইতিহাস মূলত স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি বিএনপি কর্তৃক স্বাধীনতা যুদ্ধে আমাদের বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র ভারত নিয়ে অপপ্রচারের ইতিহাস। যখনই অর্থনৈতিক কোনো স্বার্থে প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো চুক্তি হয়েছে ঠিক তখনি বিএনপি অপপ্রচার চালিয়ে বারবার বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারে বাধার সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে অবিশ্বাসী বিএনপির এমন অপপ্রচারের রাজনীতি এখনো বিদ্যমান রয়েছে। শহীদের রক্ত ও বাঙালি মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশে এ ধরনের অপপ্রচারের রাজনীতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে যে ১০টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে, সেগুলোর একটি হলো বাংলাদেশ-ভারত রেল ট্রানজিট। ভারতের ট্রেন এতদিন বাংলাদেশের সীমান্তে এসে ইঞ্জিন পরিবর্তন করত এবং বাংলাদেশের ভূখণ্ড থেকে বাংলাদেশের ইঞ্জিনে সেই ট্রেন ভারতে পৌঁছে দেওয়া হতো। কিন্তু এখন ভারতের রেলগাড়ি বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে দেশটির পূর্ব-পশ্চিমে সংযোগ স্থাপন করতে পারবে। বাংলাদেশ-ভারতের এ রেল ট্রানজিট নিয়ে এতদিন স্যোশাল মিডিয়ায় বিএনপির ইন্ধনে একশ্রেণির মানুষ জনগণকে বিভ্রান্ত করে আসছিল। তাদের দাবি এর ফলে দেশ ভারতের কাছে বিক্রি হয়ে যাবে। ভারতবিদ্বেষী বিএনপি বাংলাদেশ-ভারত রেল ট্রানজিট নিয়ে অপপ্রচার চালিয়ে অর্থনৈতিক জ্ঞানহীন এ দেশের সাধারণ মানুষকে বোকা বানিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতিতে ঘোলাটে করে অসৎ কোনো উদ্দেশ্য হাসিল করতে চাচ্ছে। ট্রানজিট নিয়ে অপপ্রচার এখন শুধু স্যোশাল মিডিয়ায় সীমাবদ্ধ নয় বরং তা বিএনপির নেতাদের মুখে মুখে। বিএনপির নেতাদের দাবি, রেল ট্রানজিটের ফলে দেশের সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হবে, দেশ ভারতের কলোনিতে পরিণত হবে, দেশের ওপর দিয়ে রেল যেতে দেব না ইত্যাদি ইত্যাদি। বিএনপির নেতাদের এ হাস্যকর দাবি ও গৎবাধা কথা তাদের পুরোনো ইতিহাস। তারা মনে হয় সম্পূর্ণ ভুলেই গিয়েছেন, একবিংশ শতাব্দীর তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে মানুষকে এভাবে মিথ্যা বলে বোকা বানানো এত সহজ নয়। মানুষ চাইলেই অতি সহজে সব তথ্য পেয়ে যায়। যার ফলে বাংলাদেশের যেকোনো সচেতন ও দেশপ্রেমিক নাগরিক মানেই সে বোঝে অর্থনৈতিকভাবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশ-ভারত রেল ট্রানজিট নিয়ে বিএনপির এ অপপ্রচার তাদের ভারতবিদ্বেষ ছাড়া আর কিছুই না।

বাংলাদেশ-ভারত সুসম্পর্ক সত্যিকার অর্থে বিএনপির মতো স্বার্থান্বেষী একশ্রেণির দল কিংবা বিএনপির নেতাদের মতো একশ্রেণির লোক সহ্য করতে পারে না। তারা সবকিছুতেই দোষ খোঁজে, দেশ বিক্রির ষড়যন্ত্রের গন্ধ পায়; কিন্তু তারা সুকৌশলে আসল সত্যটা এড়িয়ে যায়। আমাদের বন্ধুপ্রতিম দেশ ভারত ২০২২ সালে বাংলাদেশকে ট্রানজিট দিয়েছে। বিনা মাশুলে তাদের স্থলবন্দর, বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে পণ্য পরিবহনের সুযোগ দিয়েছে। এতে বাংলাদেশের পণ্যবাহী ট্রাক নেপাল ও ভুটানে সরাসরি যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। যার ফলে সেখানে বাংলাদেশের পণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে। অথচ এ নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল বিএনপির মতো ভারতের কোনো বিরোধীদল প্রশ্ন তোলেনি, দেশ বিক্রির অজুহাত খাড়া করেনি। তাহলে বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপি কেন ট্রানজিট দিলে দেশ বিক্রি হয়ে যাবে তথা দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত আসবে এ ধরনের অযৌক্তিক দাবি করছে? এ দাবির পেছনে আসল কারণ খুঁজতে গেলে যা স্পষ্ট তা ট্রানজিট নয় বরং ভারতবিরোধী বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে বিএনপি।

সম্প্রতি ভারতকে রেলপথ ট্রানজিট সুবিধা দেওয়া প্রসঙ্গে সাংবাদিক সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। সেই সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও স্বকীয়তা বজায় রেখে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রেখে কাজ করছি। এই যে আমরা সমস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা খুলে দিলাম, তাতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে আমাদের দেশের মানুষ। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ট্রানজিট দিলে ক্ষতি কি? রেল যেগুলো বন্ধ ছিল তা আমরা আস্তে আস্তে খুলে দিয়েছি। যার ফলে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ হচ্ছে। মানুষ উপকৃত হচ্ছে, তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি হচ্ছে। যেসব জিনিস আমাদের দেশে নেই তা আনার সুযোগ হচ্ছে। অর্থনীতিতে এটা সুবিধা হচ্ছে। আমরা কি চারদিকে দরজা বন্ধ করে থাকব? সেটা হয় না। ইউরোপের দিকে তাকান, সেখানে কোনো বর্ডারই নেই, তাই বলে একটা দেশ আরেকটা দেশের কাছে বিক্রি হয়ে গিয়েছে? এক সময় সেখানে নো ম্যানস ল্যান্ড ছিল। এখন কিন্তু সেসব কিছু নেই। এখন সেসব উঠে গেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় কেন বাধা দিয়ে রাখব?’ এ ছাড়া সংসদ অধিবেশনেও প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন, ট্রানজিট দিলে ক্ষতি কী? বরং দেশের লাভ, জনগণের লাভ।

সত্যিকার অর্থে বলতে গেলে ট্রানজিট দিয়ে দেশ ও জনগণের অনেক বেশি লাভ হলেও বিএনপির ক্ষতি। কারণ ভারতবিদ্বেষী বিএনপির কাছে বাংলাদেশ-ভারত সুসম্পর্ক এক ধরনের আতঙ্কের নাম। এ সম্পর্ক যত বেশি মজবুত হবে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিএনপির ভিত তত বেশি নড়বড়ে হবে। বাংলাদেশের গণতন্ত্রমনা জনগণের সমর্থন হারিয়ে জনবিচ্ছিন্ন বিএনপির রাজনৈতিক ভিত্তি এখন ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত ও অপপ্রচারনির্ভর। কিছুদিন পরপর নতুন নতুন বিভিন্ন ইস্যু তৈরি করে অপপ্রচারের রাজনীতি করা ছাড়া বিএনপির এখন আর তেমন কিছু করার নেই। তবে আপনারা একটা বিষয় জেনে সত্যি অবাক হবেন, অল্প কিছু মাস পূর্বে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার জন্য অতীতের মতো ভারতের পিছনে ঘুরেছে। বিগত তিনটি নির্বাচনের আগে দেখা গেছে বিএনপি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল; কিন্তু নির্বাচনে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না পেয়ে আবার সমালোচনামুখর বক্তব্য শুরু করে। এবারও জাতীয় নির্বাচন বর্জনের পর নতুন করে ভারতবিরোধিতায় সোচ্চার হয় বিএনপি। তারা প্রথমে ভারতীয় পণ্য বর্জনের ডাক দিয়ে ইন্ডিয়া বয়কটের প্রচারণা চালায়। যা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বর্জনের ডাক শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। এখন আবার রেল ট্রানজিট ইস্যু নিয়ে মাঠ গরম করার চেষ্টা করছে। তাদের জনসমর্থনহীন এসব চেষ্টা এবারও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে বলে বিশ্বাস করছি।

কেননা, বঙ্গবন্ধু ও তার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশে ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচারের কোনো ভিত্তি নেই। এমতাবস্থায়, বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি বিএনপির উচিত ট্রানজিটের আড়ালে ভারতবিদ্বেষ ছড়ানো বন্ধ করা। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে শহীদের বুকের তাজা রক্ত ও বাঙালি মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলায় বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ভারতের বিরুদ্ধে বিএনপির ভিত্তিহীন অপপ্রচারের রাজনীতি কোনোভাবেই কাম্য নয়। বাংলাদেশ উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিচারে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো প্রতিবেশী দেশ ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দিয়েছে এবং ভারত থেকেও ট্রানজিট সুবিধা পেয়ে আসছে। আমরা আশা করি, বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যকার এ সুসম্পর্ক দেশ দুটিকে উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি ও সম্ভাবনার দিকে নিয়ে যাবে।

লেখক: উপাচার্য বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়


মোবাইল ফোন আসক্তি: যুবসমাজকে রক্ষার উপায় বের করতে হবে

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
শাখাওয়াত হোসেন

বিশ্বব্যাপী নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন হচ্ছে। এসব প্রযুক্তি ব্যবহারের উন্মাদনায় মেতে উঠেছে সবাই। তবে এসব প্রযুক্তির ভালো এবং মন্দ দুটি দিকই আছে। অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে কিছু কিছু প্রযুক্তি চরম ক্ষতিকর পর্যায়ে চলে গেছে। এসব প্রযুক্তি কোনো কোনো ক্ষেত্রে আশীর্বাদ নয়, অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে। তবে এখন ইচ্ছা করলেই এগুলো বন্ধ করার সুযোগ নেই। শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবাই যেমন এসব প্রযুক্তির সুফল ভোগ করছে, তেমনি কুফলও ব্যাপকভাবে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে যুবসমাজ অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার না করে বরং এর অপব্যবহার করে নিজেদের ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে মোবাইল ফোনের অপব্যবহার চরম আকার ধারণ করেছে। মোবাইল ফোন এখন সবার হাতে হাতে। বিশেষ করে যুবসমাজ মোবাইল ফোনে ব্যাপকভাবে আসক্ত হয়ে পড়েছে। লেখাপড়ায় এখন তারা চরম বিরক্ত। ২৪ ঘণ্টার যতটুকু সময় জেগে থাকে তার পুরোটাই তারা মোবাইল ফোনে থাকে। হাটেঘাটে, বাসে-স্টিমারে এমনকি ক্লাসেও তাদের মোবাইল থাকতে হবে। মোবাইল না থাকলে কেমন যেন উন্মাদের মতো হয়ে যায়। মোবাইল তার চাই-ই চাই। এতে যেমন লেখাপড়া বা অন্য কোনো কাজে তারা মন বসাতে পারছে না, তেমনিভাবে অসুস্থও হয়ে পড়ছে। সময়মতো খাওয়া-দাওয়া নেই, গোসল নেই। কেউ কিছু বললে খিটমিট করে ওঠে। কারও কথাই যেন তাদের সহ্য হয় না। সবকিছুতেই অসহ্য, অনীহা।

বিশিষ্ট চিকিৎসক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও সংসদ সদস্য প্রাণ গোপাল দত্ত সম্প্রতি জাতীয় সংসদে মোবাইল ফোনের অপব্যবহার নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার মতো তথ্য তুলে ধরেন। তার এই বক্তব্য আমার মনে হয় এ দেশের ১৬ কোটি মানুষের বক্তব্য। তিনি বলেছেন, মোবাইল ফোনের অপব্যবহারের কারণে যুবসমাজ আর কিছুদিন পর হয়তো প্রতিবন্ধী হয়ে পড়বে। তিনি বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে তার রোগীর সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। ১০ বছর থেকে শুরু করে সব বয়সের মানুষেরই এখন একই সমস্যা- কানে শোনে না, কান শোঁ শোঁ করে। ছাত্রছাত্রীরা লেখাপড়ায় মন দিতে পারে না। প্রশ্ন হচ্ছে, এমনভাবে চলতে থাকলে নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যৎ কী? যুবসমাজই একটি দেশের ভবিষ্যৎ। দেশ গঠনে তাদের ভূমিকা থাকবে সর্বাগ্রে। দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতিতে তারাই দিকনির্দেশনা দেবে। কিন্তু তারা যেভাবে মোবাইলে আসক্ত হয়ে পড়ছে- তাতে দেশের ভবিষ্যৎ, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা শঙ্কিত হয়ে পড়েছি।

আমরা তথ্যপ্রযুক্তির পক্ষে, ডিজিটাল বাংলাদেশের পক্ষে, স্মার্ট বাংলাদেশের পক্ষে। কিন্তু আমাদের ডিজিটাল পদ্ধতি অর্থাৎ মোবাইল ফোনের যে অপব্যবহার হচ্ছে তাতে আমার মনে হয় না আর বেশি দিন আমাদের এই প্রজন্ম প্রতিবন্ধী না হয়ে থাকতে পারবে। ২০১৮ সালের ৩১ অক্টোবর বিল গেটস নিজে বলেছেন, তার সন্তানকে তিনি ১৬ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে স্মার্টফোন টাচ করতে দেননি। মার্টিন কুপার এক বছর আগে বিবিসির ব্রেকফাস্ট মিটিংয়ে স্বীকার করেছেন, তিনি যদি জানতেন এই প্রজন্ম মোবাইল ফোনের সঙ্গে আট ঘণ্টা গ্লু অর্থাৎ আঁঠা হয়ে লেগে থাকবে তাহলে এটা আবিষ্কার করা তার জন্য নির্মম ভুল হয়েছে। একই সঙ্গে আরেকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি বলেছেন, আগামী ২০ বছর পর এই গ্লোবাল পপুলেশন লেখাপড়ায় প্রতিবন্ধী হয়ে যাবে। তারা প্রযুক্তি চালাতে পারবে কিন্তু কম্পোজিশন করতে পারবে না। কোনো কিছু লিখতে পারবে না, সৃষ্টিও করতে পারবে না।

মোবাইলে ইন্টারনেট সংযোগের সুবিধার কারণে সারাবিশ্ব এখন প্রতিটি মানুষের হাতের মুঠোয়। কিন্তু এই মোবাইল আমাদের যতটা না উপকারে আসছে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতির কারণ হয়ে উঠেছে। একটা শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার ছয় মাসের মধ্যেই এই মোবাইল ফোনে আসক্ত হয়ে পড়ছে অথবা আমরা আসক্ত করে ফেলছি। শিশু যখন কান্না করে তখন তার কান্না থামানোর এখন একমাত্র মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে মোবাইল ফোন। কার্টুন দেখিয়ে তার কান্না থামাতে হচ্ছে। শিশুদের সাধারণত খাওয়ার ব্যাপারে অনাগ্রহ থাকে। এখন অধিকাংশ বাবা-মা তাদের খাওয়ানোর ব্যাপারে মোবাইলের বিভিন্ন অ্যাপস ব্যবহার করে তাদের খাওয়ানোর চেষ্টা করেন বা খাওয়ান। কিন্তু এর যে একটা সুদূরপ্রসারী ক্ষতিকর দিক আছে সে ব্যাপারে শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবাই যেন আমরা ভুলেই গেছি। অনেক বাবা-মা আহ্লাদ করে ছেলেমেয়ের হাতে মোবাইল তুলে দিয়ে তাকে স্মার্ট বানানোর কথাও বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশ করেন। কিন্তু দিন শেষে তার যে সর্বনাশ করছেন, তা যখন বোঝেন তখন কিন্তু সবই শেষ। তখন আর শত চেষ্টা করেও তাকে ফেরানো যায় না। এখন মাদকাসক্তের চেয়েও বড় নেশা হলো স্মার্টফোন। এ নেশা থেকে ছেলেমেয়েদের বের করে আনা প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। বেশি চাপ দিলে অথবা সাময়িক মোবাইল ফোনটি নিয়ে নেওয়া হলে বড় ধরনের বিপত্তিও ঘটছে। কখনো কখনো ভাত খাওয়া বন্ধ করে দেয়। একাকী এক রুমে বসে বিষণ্নতায় ভোগে। এক সময় সে সবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বড় ধরনের অঘটন ঘটিয়ে বসে। এমনকি আত্মহত্যার মতো ঘটনাও প্রায়ই আমরা ঘটতে দেখছি।

মোবাইল ফোনের কারণে কত যে সংসার ভেঙে তছনছ হয়ে যাচ্ছে, তার হিসাব নেই। প্রতারণার শিকার হয়ে অনেক নারী সমাজে মুখ দেখাতে না পেরে সমাজ-বিচ্ছিন্ন শুধু নয়, শেষ পর্যন্ত নিজের জীবনও বিপন্ন করে ফেলছেন। এখন টিকটকাররা নতুন নতুন কনটেন্ট তৈরি করে টাকা কামানোর ধান্দায় নেমেছেন। তাতে সমাজের কোনো উপকার তো হচ্ছেই না বরং সমাজ চরমভাবে কলুষিত হচ্ছে। সাম্প্রতিককালে মোবাইলে জুয়া খেলার প্রবণতা ব্যাপক বেড়েছে। এতে অনেকে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন। মাদকের নেশা থেকেও ভয়ংকরভাবে মোবাইলে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন অনেকেই। মাদক থেকে মুক্তির জন্য তো ইতোমধ্যে কিছু রিহ্যাব প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। কিন্তু মোবাইলে আসক্তদের জন্য এখনো তেমন চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। যুবসমাজ যেভাবে মোবাইলে আসক্ত ও অসুস্থ হয়ে পড়ছে, তাতে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এখনই তাদের জন্য ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। হাসপাতালগুলোতে ফ্রি কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির জন্য গ্রামগঞ্জের সর্বত্র জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করতে হবে। গ্রামগঞ্জের আনাচে-কানাচে এখন ইন্টারনেট খুবই সহজে পাওয়া যায়। ওয়াইফাই প্রতিটি পরিবারে পৌঁছে গেছে। এতে অতি সহজে ছেলেমেয়েরা এর ব্যবহার করতে পারছে। অনেক বাবা-মা ছেলেমেয়েদের ইন্টারনেটে ক্লাস করার বা ভালো কিছু জানার জন্য এই সুবিধা দিয়ে থাকেন। কিন্তু তারা যে এর চরম অপব্যবহার করছে, তা ঘুণাক্ষরেও পরিবারের সদস্যরা টের পান না। যখন দেখেন সারারাত দরজা বন্ধ করে ছেলে বা মেয়ে মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত আর ঘুম থেকে ওঠে দুপুর ১২টা-১টায় তখন কিন্তু সবই শেষ। তাকে আর কোনোভাবেই মোবাইলের এ নেশা থেকে ফেরানো যায় না। বরং কিছু বললে উল্টো ভয়ানক প্রতিক্রিয়া দেখায়। ইন্টারনেটের সুযোগে ইদানীং রাস্তার মোড়ে মোড়ে কিশোর-কিশোরী, রিকশাওয়ালা আর মুটেমজুর গভীর রাত পর্যন্ত মোবাইলে কেউ গেম খেলে, কেউ জুয়া খেলে আবার কেউ ছায়াছবি বা নানা ধরনের নিষিদ্ধ ছবি দেখায় মত্ত থাকে। এরা এমনভাবে আসক্ত হয়ে পড়েছে, সময় কীভাবে চলে যায় তা টেরই পায় না। সব কাজকর্ম বাদ দিয়ে মোবাইলের নেশায় তারা মত্ত থাকে। এদের অনেকেই এখন শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। অনেকে মানসিক বিকারগ্রস্ত। এদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় এগিয়ে না এলে আগামী প্রজন্মের কাছ থেকে আমরা কিছুই আশা করতে পারি না। বরং তারা এই সমাজের জন্য বোঝা হবে। তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়কে এ ব্যাপারে কঠোর ও কঠিন উদ্যোগ নিতে হবে। যেকোনো একটি অ্যাপসের মাধ্যমে ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অভিভাবকদের তাদের কিশোর ছেলেমেয়েদের মোবাইল দেওয়া যেকোনোভাবেই বন্ধ করতে হবে। মোবাইল দিলেও তা রাতের বেলায় যেন কোনোভাবেই ব্যবহার করতে না পারে সে ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে। তার মোবাইলে সে কী দেখে এসব ব্যাপারগুলোও লক্ষ্য রাখতে হবে।

সারা দেশের অভিভাবকরা এখন আতঙ্কিত। না পারছে ছেলেমেয়েদের কিছু বলতে, না পারছে নিয়ন্ত্রণ করতে। অনেক পরিবারকে তাদের ছেলেমেয়েদের মোবাইল নেশার কারণে চরম টেনশনে দিন অতিবাহিত করতে হচ্ছে।

প্রশ্ন হচ্ছে- এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? প্রথমেই বলব তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনে বিদেশি বিশেষজ্ঞের সহযোগিতা নিতে হবে। রাতের বেলায় একটা নির্দিষ্ট সময় অর্থাৎ রাত ১০টা থেকে সকাল ৫টা পর্যন্ত বিশেষ করে গ্রামগঞ্জে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। যেকোনো মূল্যে যুবসমাজকে রক্ষায় সব মহল থেকে উদ্যোগ নিতে হবে। না হলে একটা সময় আসবে যখন আমাদের যুবসমাজের একটা বিরাট অংশ প্রতিবন্ধী হয়ে পড়বে। তারা দেশের সম্পদ হলেও একটা সময় দেখা যাবে তারা দেশের বোঝা। আমি মনে করি সব মহল বিষয়টি বোঝে; কিন্তু যথাযথ উদ্যোগের অভাবে কিছু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হচ্ছে না। আগামী প্রজন্ম রক্ষায় আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। এ ব্যাপারে সরকার অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে বলে আমার বিশ্বাস।

লেখক: সাংবাদিক


কিয়ার স্টারমারের লেবার পার্টির নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ড. আজিজুল আম্বিয়া

৪ জুলাই বৃহস্পতিবারে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ব্রিটেনের হাউস অব পার্লামেন্টের সাধারণ নির্বাচন। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হলো এই ভোট উৎসব। নিরঙ্কুশ জয় পেল কিয়ার স্টারমারের লেবার পার্টি। ব্রিটেনের মানুষ পরিবর্তনের পক্ষেই রায় দিয়েছে। যুক্তরাজ্যের সাধারণ নির্বাচনে ভোটের ফলাফল ঘোষণা প্রায় শেষের পথে। এই নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে সরকার গঠন নিশ্চিত করেছে লেবার পার্টি। ভরাডুবি হয়েছে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির। ঋষি সুনাক ছাড়া এই দলের হেভিওয়েট বা শক্তিশালী প্রার্থীদের মধ্যে বেশির ভাগই হেরে গেছেন। পরাজিত প্রার্থীর মধ্যে লেবার পার্টির সাবেক চার প্রধানমন্ত্রীও আছেন। এর মধ্যে বর্তমান উইটনি আসনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ও মেইডেনহেড আসনে থেরেসা মে হেরে গেছেন। দুটি আসনেই জয় পেয়েছেন লিব-ডেমের প্রার্থীরা। আর উক্সব্রিজ অ্যান্ড সাউথ রুইস্লিপ আসনে বরিস জনসন ও সাউথ ওয়েস্ট নরফোক আসনে লিজ ট্রাস লেবার পার্টির প্রার্থীর কাছে হেরে গেছেন। কনজারভেটিভ পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতা প্রতিরক্ষামন্ত্রী গ্র্যান্ট শ্যাপস ও বিচারমন্ত্রী অ্যালেক্স চকও লেবার পার্টির প্রার্থীদের কাছে হেরেছেন। শিক্ষামন্ত্রী গিলিয়ান কিগান হেরেছেন লিবারেল ডেমোক্র্যাটস (লিব-ডেম) প্রার্থীর কাছে। আরেক জ্যেষ্ঠ নেতা পেনি মর্ডান্টও নির্বাচনে হেরে গেছেন। অভিবাসনমন্ত্রী টম পার্সগ্লোভ লেবার পার্টির প্রার্থীর কাছে হেরেছেন। ডানপন্থি রিফর্ম ইউকে পার্টির আলোচিত-সমালোচিত নেতা নাইজেল ফারাজ জয় পেয়েছেন। আটবারের চেষ্টায় তিনি প্রথমবারের মতো পার্লামেন্টে যাচ্ছেন। লেবার পার্টির সাবেক নেতা জেরেমি করবিন জয় পেয়েছেন। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়েন। এসবের মধ্যে রিটিশ পার্লামেন্ট নির্বাচনে চার বাঙালি কন্যার বারবার বিজয়ে ব্রিটিশ বাঙালিরা গর্বিত। এখানে প্রায় ১০ লাখ বাঙালি রয়েছেন। তারা এই জয়ের জন্য আনন্দ করছেন। এই ব্রিটিশ বাংলাদেশি আবারও বিজয়ী হয়ে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। বিজয়ীরা হলেন রুশনারা আলী তিনি পঞ্চমবারের মতো এবার বিজয়ী হলেন, লেবার পার্টি থেকে ১৫ হাজার ৮৯৬ ভোট পেয়ে তিনি এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রুশনারা আলী টাওয়ার হ্যামলেটসের বেথনাল গ্রিন অ্যান্ড বো আসন থেকে জয়লাভ করেছেন। উল্লেখ্য, যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এমপি হলেন রুশনারা আলী। লেবার পার্টি থেকে বঙ্গবন্ধুর নাতনি হ্যাম্পস্টেড এবং হাইগেট আসন থেকে টিউলিপ সিদ্দিক চতুর্থবারের মতো বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রার্থী থেকে বিশাল ব্যবধানে। তিনি মোট ভোট পেয়েছেন ২৩ হাজার ৪৩২ টি। ড. রুপা হক চতুর্থবারের মতো বিজয়ী হয়েছেন। লন্ডনের ইলিং সেন্ট্রাল এবং অ্যাক্টন আসন থেকে লেবার পার্টির মনোনয়ন নিয়ে ২২ হাজার ৩৪০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন তিনি। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কনজারভেটিভ পার্টির জেমস উইন্ডসর-ক্লাইভ পেয়েছেন ৮ হাজার ৩৪৫টি ভোট। লেবার পার্টি থেকে আফসানা বেগম পপুলার ও লাইমহাউস আসন থেকে বিপুল ভোট পেয়ে তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি মোট ভোট পেয়েছেন ১৮ হাজার ৫৩৫টি। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রিন পার্টির নাথালি সিলভিয়া বিনফাইট পেয়েছেন ৫ হাজার ৯৭৫ ভোট। রুশনারা আলী ও টিউলিপ সিদ্দিক এবং রুপা হক পূর্বে ছায়ামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ কারণে তাদের অভিজ্ঞতার কমতি নেই। এবার লেবার পার্টির সরকার গঠনে তাদের ক্যাবিনেটে মন্ত্রী হওয়ার জন্য ডাক পড়তে পারে অনেকেই ভেবেছিলেন। আর এটি হলে আরেকটি নতুন ইতিহাস তৈরি হতো ব্রিটেনে বাঙালিদের।

ব্রিটিশ পার্লামেন্ট নির্বাচনে লেবার পার্টির জয়ের পর রাজা চার্লস আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছেন দলটির নেতা স্যার কিয়ার স্টারমারকে। শুক্রবার ৫ জুলাই প্রধানমন্ত্রী ও সরকার গঠনের দায়িত্ব পাওয়ার নতুন মন্ত্রিসভা গঠন শুরু করেছেন তিনি। কিয়ার স্টারমারের বর্তমান বয়স ৬১ বছর। তিনি লন্ডনের উপকণ্ঠে অবস্থিত সারে শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার মা দেশটির ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে কাজ করেছেন। আর বাবা পেশায় ছিলেন টুলমেকার বা যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারক। তার মা আজীবন বাতের অসুস্থতায় ভুগেছেন। বাবার সঙ্গে মা কিংবা কিয়ার স্টারমার কারও সম্পর্ক ভালো ছিল না।

এক অর্থে বলা যায়, কিয়ার স্টারমার একপ্রকার শূন্য থেকেই উঠে আসা। তিনিই তার পরিবারের প্রথম ব্যক্তি যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে পা রেখেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে কিয়ার স্টারমার বাম ঘরানার একটি ম্যাগাজিন সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ব্রিটেনের লিডস ইউনিভার্সিটিতে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শুরুর আগে তিনি রিগেট গ্রামার স্কুলে এবং পরে অক্সফোর্ডের সেন্ট অ্যাডমন্ড হলে পড়াশোনা করেন। পরে তিনি একজন ব্যারিস্টার হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। দ্রুতই তিনি নিজেকে মানবাধিকার-সংক্রান্ত আইনের ক্ষেত্রে এক শক্তিশালী আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আইন বিষয়ে তার প্রজ্ঞা ও নিষ্ঠা তাকে ২০০৮ সালে ব্রিটেনের পাবলিক প্রসিকিউশন বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ করার সুযোগ তৈরি করে দেয়। এই পদে তিনি ২০১৩ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এর পরের বছর ব্রিটিশ রাজ পরিবারের তরফ থেকে তাকে নাইটহুড তথা স্যার উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এরপরই তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হন। কিয়ার স্টারমার পরে ২০১৫ সালে লেবার পার্টি থেকে প্রথমবার এমপি নির্বাচিত হন। তার নির্বাচনে জয়ের কয়েক সপ্তাহের মাথায় মা মারা যান। তার বাবাও মারা যান বছরতিনেক পর। কিয়ার স্টারমার বাবার মৃত্যুর পর একাধিকবার আক্ষেপ করেছেন যে, তিনি তার বাবাকে একবারও বলতে পারেননি যে, তিনি তাকে ভালোবাসেন।

২০১৫ সালের পর রাজনীতিতে কিয়ার স্টারমারকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০১৯ সালে লেবার পার্টির নির্বাচনে ভরাডুবির পর তাকে দলের নেতৃত্ব দেওয়া হয়। যদিও অনেকেই সমালোচনা করে বলেন, কিয়ার স্টারমারের মাঝে কোনো রাজনৈতিক ক্যারিশমা নেই। তার পরও তিনিই সেই ব্যক্তি যিনি লেবার পার্টিকে খাদের কিনার থেকে টেনে তুলে ক্ষমতার মসনদে বসিয়েছেন। আইন বিষয়ে দারুণ প্রাজ্ঞ হওয়ার পরও কিয়ার স্টারমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ- তিনি খুবই বিরক্তিকর একজন রাজনীতিবিদ। তার কোনো ক্যারিশমা নেই। কিন্তু এসব সমালোচনা তার রাজনৈতিক জীবনে খুব একটা প্রভাব ফেলেনি। বরং তিনি আরও বেশি করে সেদিকে ঝুঁকে পড়েছেন।

এ বিষয়ে একবার ব্রিটিশ সম্প্রচারমাধ্যম আইটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কিয়ার স্টারমার বলেছিলেন, ‘কেউ যদি আপনাকে বলে যে, আপনি বিরক্তিকর, তাহলে এটি মাথায় রাখবেন, আপনিই আসলে জিততে যাচ্ছেন। কিয়ার স্টারমার হয়তো তার জায়গায় অটল ছিলেন বলেই সামান্য যন্ত্র প্রস্তুতকারীর ছেলে থেকে নাইটহুড উপাধি হাসিল করে আজ ব্রিটেনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে চলেছেন। হয়তো তার বিরক্তিকর রাজনৈতিক চরিত্রই তাকে জিততে সহায়তা করেছে; যেমনটা তিনি দাবি করেছিলেন। ডাউনিং স্ট্রিটে ডাক পাচ্ছেন লেবার পার্টির নেতারা। নির্বাচনে জয়ী কোনো ব্রিটিশ-বাংলাদেশি এমপিকে মন্ত্রিসভার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য ডাকা হয়নি। স্কাই নিউজের খবর অনুসারে, নতুন মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়া মন্ত্রীদের মধ্যে অ্যাঞ্জেলা রায়নার ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী, র‍্যাচেল রিভস চ্যান্সেলর, জন হ্যালি প্রতিরক্ষামন্ত্রী, ডেভিড ল্যামি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ইভেট কুপার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, জনাথন রেনল্ডস বাণিজ্যমন্ত্রী, ব্রিজেপ ফিলিপসন শিক্ষামন্ত্রী, ওয়েস স্ট্রিটিং স্বাস্থ্যমন্ত্রী, লিজ কেন্ডাল কর্মসংস্থান ও পেনশন মন্ত্রী, পিটার কাইল বিজ্ঞানমন্ত্রী, লুইস হেই পরিবহনমন্ত্রী, শাবানা মাহমুদ আইনমন্ত্রী ও অ্যাড মিলিব্যান্ড জ্বালানি মন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। অনেক প্রত্যাশা সত্ত্বেও লেবার পার্টির নতুন মন্ত্রিসভায় এখন পর্যন্ত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত চার এমপির কাউকে ডাকা হয়নি। তাই বাঙালিরা খুশি হতে পারেননি। ব্রিটেনজুড়ে এবার সর্বোচ্চ সংখ্যক ৩৩ জন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিভিন্ন আসনে প্রার্থী হয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গত নির্বাচনে বিজয়ী সেই চারজন ছাড়া আর কেউ জয়ী হতে পারেননি। ব্যালটে প্রমাণ হয়েছে, এবারের নির্বাচনে নতুন কোনো বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী এমপি হতে ব্যর্থ হয়েছেন। ব্রিটিশ-বাংলাদেশিরা যুক্তরাজ্যে কোনো মন্ত্রিত্বও পাননি।

বাঙালি কমিউনিটিতে এবার আশা ছিল, লেবার পার্টির মন্ত্রিসভায় প্রথমবারের মতো অন্তত একজন বাংলাদেশি ঠাঁই পেতে পারেন। তবে এই বাঙালি কন্যাদের কেবিনেটে জায়গা না হলেও সংসদীয় কমিটিতে থাকবেন বলে ধারণা করছেন অনেকে। এবার হাউস অব কমন্সে প্রবেশের জন্য লড়ছিলেন রেকর্ডসংখ্যক বাঙালি। তারা বিভিন্ন দল থেকে এ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সংবাদপত্রের মাধ্যমে জানা যায়, ৩৩ জন বাঙালি প্রার্থী ব্রিটিশ এমপি হতে ভোট ছেয়েছিলেন। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ থেকে দুইজন। স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি থেকে একজন, লিবডেম থেকে একজন এবং আটজন লেবার পার্টি থেকে নির্বাচন করছিলেন।

লেখক: আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট


শিক্ষক হিসেবে আমি বিব্রত ও লজ্জিত

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ড. মো. শফিকুল ইসলাম

বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে সব শ্রেণির নাগরিকদের জন্য একটি সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করার জন্য বলেছিল। ফলে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত দেশের প্রবীণ নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তা ও বেসরকারি খাতের কর্মচারীদের জন্য একটি পেনশন স্কিম প্রবর্তন করার পরিকল্পনা হাতে নেন। এরই ধারাবাহিকতায় পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা প্রবর্তনের ঘোষণা দেন। তিনি আরও বলেন যে প্রবীণ নাগরিকদের জন্য প্রস্তাবিত পেনশন স্কিমটি সর্বজনীন হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি বিশেষ সেল এটি বাস্তবায়ন করবে। অর্থ মন্ত্রণালয় ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার ওপর একটি ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন। সেই ধারণার ভিত্তিতে এটি বাস্তবায়নের জন্য তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়কে একটি আইন প্রণয়নের জন্য বলেন। ৯ জুন ২০২২ সালে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে অর্থাৎ ১ জুলাই ২০২৩ সালে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করার ঘোষণা দেন। ৩১ জানুয়ারি ২০২৩ সালে সর্বজনীন পেনশন আইন ২০২৩ অনুমোদন লাভ করে। আইনটি হওয়ার পর ৬ জুলাই ২০২৩ সালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করে সরকার। সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার কাঠামো আরও শক্তিশালী করতে ১৩ আগস্ট ২০২৩ সালে সর্বজনীন পেনশন স্কিম বিধিমালাও প্রণীত হয়।

স্কিমটি ১ জুলাই ২০২৩ সালে চালু করার কথা থাকলেও ১৭ আগস্ট ২০২৩ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বজনীন পেনশনের আওতায় প্রবাস, প্রগতি, সুরক্ষা ও সমতা নামে ৪টি স্কিমের কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। প্রবাস হচ্ছে প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য, প্রগতি হচ্ছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত জনবলের জন্য, সুরক্ষা হচ্ছে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত বা স্বকর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিরা যেমন- কৃষক, রিকশাচালক, শ্রমিক, কামার, কুমার, জেলে, তাঁতির জন্য আর সমতা হচ্ছে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী স্বল্প আয়ের ব্যক্তিদের জন্য। লক্ষণীয় বিষয় হলো- অংশীজনদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়া সর্বজনীন পেনশন স্কিম বিধিমালা সংশোধন করে ১ জুলাই ২০২৪ সালে স্বশাসিত, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, সংবিধিবদ্ধ বা সমজাতীয় সংস্থা এবং তাদের অধীন প্রায় ৪০০ অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের নতুন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ‘প্রত্যয়’ স্কিম চালু করে সরকার। এখন পেনশন কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যাচ্ছে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সেবক নামে আরেকটি স্কিম ১ জুলাই ২০২৫ সালে প্রবর্তন করা হবে। এর জন্য আরেক দফা সর্বজনীন পেনশন স্কিম বিধিমালা হয়তো সংশোধন করতে হবে। প্রবাসী, বেসরকারি ও অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত ব্যক্তিদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সর্বজনীন পেনশন স্কিম সরকারের নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ। কিন্তু স্বশাসিত, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, সংবিধিবদ্ধ বা সমজাতীয় সংস্থায় বিদ্যমান একটি প্রতিষ্ঠিত পেনশন ব্যবস্থাকে দুর্বল করা কি আদৌ ভালো?

তাহলে দেশের ৩৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা এ প্রত্যয় পেনশন স্কিমকে কেন গ্রহণ করছেন না। ১৩ মার্চ ২০২৪ সালে প্রত্যয় পেনশন স্কিমের প্রজ্ঞাপন জারির পর শিক্ষক সমিতি এটিকে বৈষম্যমূলক বলে আসছেন। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য কী ধরনের স্কিম হবে তা অজানা। অন্যদিকে অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে এ স্কিমে অন্তর্ভুক্ত নতুন শিক্ষকদের চাকরি শেষে পেনশনের টাকা কম যাবে, বেতন কম পাবে ও বোনাস পাবে না। যার ফলে জীবনের অর্থনৈতিক সুরক্ষা হ্রাস পাবে এবং মেধাবী প্রজন্মরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে নিরুৎসাহিত বোধ করবেন। ভবিষ্যতে জাতি মেধা সংকটে পতিত হবে।

১ জুলাই ২০২৪ সালে প্রত্যয় পেনশন স্কিম চালুর দিন থেকে শিক্ষক সমিতির ডাকে শিক্ষার্থীদের সব ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ করে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে অচলাবস্থা বিরাজ করছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। শিক্ষকরা আজ ক্লাস, পরীক্ষা ও গবেষণা বর্জন করে আন্দোলনরত অবস্থায় রয়েছেন। এ অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে যাওয়ার আগে শিক্ষক নেতারা প্রত্যয় পেনশন স্কিমের অসঙ্গতি বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়কে লিখিত চিঠি দিয়েছেন এবং শিক্ষামন্ত্রীকে এ বিষয়ে অবহিত করেছেন। তৎপরবর্তীতে কর্তৃপক্ষ থেকে কোনো প্রকার আশ্বাস না পাওয়ায় ক্লাস, পরীক্ষা ও দাপ্তরিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখে শিক্ষকরা বিভিন্ন প্রকারের কর্মবিরতি পালন করেছিলেন।

ইতোমধ্যে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির ৬ দিন অতিবাহিত হয়েছে। এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে শিক্ষক নেতাদের আলোচনার কোনো দিনক্ষণ ঠিক হয়নি। আমি শিক্ষক হিসেবে এ আন্দোলনকে অত্যন্ত দুঃখজনক মনে করছি। কারণ শিক্ষকদের বেতন-ভাতাদি নিয়ে শিক্ষার্থীদের জীবন অন্ধকারে নিমজ্জিত করে এ ধরনের আন্দোলন পৃথিবীতে আর কোথাও হয়েছে বলে আমার জানা নেই, হলেও আমি তার ঘোর বিরোধী। করোনার ধকলে শিক্ষার্থীদের সেশনজট এখনো আমরা পুরোপুরি বিদায় দিতে পারিনি। আবার এই অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন নিয়ে আমরা ছিনিমিনি খেলছি। এর দায়ভার কে নেবে?

প্রত্যয় পেনশন স্কিম নিয়ে উদ্ভূত শিক্ষক আন্দোলনের এখন ৩টি দাবি হচ্ছে- প্রত্যয় পেনশন স্কিম বাতিল, শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল প্রবর্তন ও জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের জন্য সিনিয়র সচিবদের সমতুল্য যৌক্তিক পদ সৃজন করা। আমি মনে করি এ তিনটি দাবি অযৌক্তিক ও অমূলক নয়। পরের দুটি দাবি অনেক আগে থেকেই বলে আসছে শিক্ষক নেতারা। প্রত্যয় পেনশন স্কিমে শিক্ষকদের ঢুকিয়ে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া প্রদেয় সুবিধাদি কর্তন করা আরেকটি বৈষম্যের শিকার হচ্ছে শিক্ষক পেশাজীবী। দেশ যত উন্নত হয় সুবিধাদি তত বৃদ্ধি পায় এটাই স্বাভাবিক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৭ আগস্ট ২০২৩ সালে সর্বজনীন পেনশন স্কিমের কার্যক্রম উদ্বোধনকালে বলেছিলেন, ‘এটি সরকারি চাকরিজীবী যারা পেনশন পায় তাদের জন্য নয়, এটা এর বাইরের জনগোষ্ঠীর জন্য’। ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য রয়েছে স্বতন্ত্র বেতন স্কেল এবং সরকারি চাকরিজীবীদের তুলনায় শিক্ষকদের বেতন প্রায় দেড়গুণ।

আসলে কারা শিক্ষক পেশাজীবীদের জন্য যৌক্তিক দাবিগুলো পূরণ করতে বাঁধা দিচ্ছে, যা পৃথিবীর সব দেশে বিদ্যমান। প্রধানমন্ত্রী আপনি শিক্ষক জাতির এ দাবিগুলো পূরণ করে দিন, আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা এবং আপনার স্মার্ট, সুখী-সমৃদ্ধ ও জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে বেশি দিন লাগবে না। প্রয়োজন শিক্ষক সমাজের প্রতি আপনার বলিষ্ঠ নির্দেশনা, নিবিড় যোগাযোগ, আস্থা ও তদারকি। আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দক্ষ নেতৃত্বে দিনে দিনে র‌্যাংকিংয়ে উন্নতি লাভ করছে শিক্ষায় জিডিপির শুধুমাত্র ১.৭৬ শতাংশ বরাদ্দ নিয়ে। আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে পারি শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ান, শিক্ষকজাতি আপনাকে হতাশ করবে না। আর কোনো শিক্ষককে সর্বাত্মক আন্দোলনে দেখতে চাই না। অবিলম্বে তাদের ক্লাসে ফিরিয়ে দিন। শিক্ষকদের ক্লাস, পরীক্ষা ও গবেষণা কর্মকাণ্ড বন্ধ করে কর্মবিরতি পালন এবং প্রশাসক ও রাজনৈতিক নেতাদের কাছে বারবার ধরনা দিয়ে দাবি আদায় আমাদের জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর ও লজ্জার। আপনার প্রতি অবিচল আস্থা, ভালোবাসা ও দেশমাতৃকাকে স্বৈরশাসকের কবল থেকে মুক্ত করতে ২০০৭ সালের ১/১১-তে শিক্ষকদের প্রতিবাদ ও নির্যাতনের কথা তো আপনার অজানা নয়। আপনিই পারেন সব শিক্ষকের প্রাপ্য সম্মানটুকু দিয়ে দেশের প্রতি আমাদের দায়িত্ব পালনে আরও যত্নশীল হওয়ার পরামর্শ দিতে, যেমনটি করেছিলেন বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাকালে।

লেখক: অধ্যাপক ও সিনিয়র ফুলব্রাইট ভিজিটিং স্কলার নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাবি। ও প্রাক্তন ভিজিটিং অধ্যাপক, এমআইটি, যুক্তরাষ্ট্র।


জিরো টলারেন্স: কেতাবে আছে বাস্তবে নাই

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
এম এ মান্নান

বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতিহরে প্রধান অঙ্গীকার ছিল দেশকে দুর্নীতি থেকে মুক্ত করা। কিন্তু দুর্নীতি থেকে দেশ তো মুক্ত হয়ইনি বরং আরও দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। দুর্নীতি এখন দেশের জন্য এক বিষফোঁড়া। যা দেহের মতো দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে জ্বালা ধরাচ্ছে। ফোঁড়া গলালে যেমন রক্তপুজ গলগলিয়ে বের হয়, দুর্নীতিবাজরাও যখন ধরা পড়ে তখন তাদের কাছ থেকে শুধু শত শত কোটি টাকা নয়, হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের ফিরিস্তি বের হয়। সঙ্গে বের হয় মাঠকে মাঠ জায়গা দখল-কেনার ফিরিস্তি। বেরিয়ে আসে কোটি কোটি টাকায় কেনা আলিশান বাড়ি ও ফ্ল্যাটের পরিসংখ্যান। শোনা কথা, বাঘ নাকি একবার মানুষের রক্ত খেলে সে বাঘ রক্তের নেশায় পড়ে যায়। তখন সে বাঘ হয়ে যায় মানুষখেকো বাঘ। আমাদের দুর্নীতিবাজরা অনেকটা মানুষখোকো বাঘের মতো। তাই তারা কখনো টাকাখেকো, কখনো নদীখেকো, কখনো পাহাড়খেকো, কখনো বনখেকো আরও কত কী- শুধু খেকো আর খেকো হয়ে যায়। এসব খেকোর কারণে দুর্নীতির রাহুগ্রাস থেকে বাংলাদেশ বেরিয়ে আসতে পারছে না কোনোভাবেই। তাই একের পর এক দুর্নীতির কবলে পড়ছে দেশ। সরকারি দপ্তর-পরিদপ্তর-মহাপরিদপ্তর যা-ই আমরা বলি না কেন, সর্বত্রই দুর্নীতির এক কালো ছায়া বিস্তার করে আছে।

ইদানীং সরকারি-বেসরকারি নানা অফিসের দুর্নীতি রোধ-সংক্রান্ত চটকধারী নানা স্লোগান আমরা দেখতে পাই। মনে হয় এই বুঝি দেশ তুলসী-ধোয়ায় নতুবা সোনা-রুপার ধোয়ায় পবিত্র হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তা আর হয় কোথায়। ওই সব স্লোগান এখন দুর্নীতিবাজদের জন্য আলংকারিক স্লোগানে পরিণত হয়েছে। এবং সেটা দুর্নীতিবাজদের ফিরিস্তি দেখলেই পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। এখন দেশে শীর্ষ দুর্নীতিবাজদের আলোচনা-সমালোচনায় আছেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ। শত শত কোটি টাকা নয়, তার বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার বেশি দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে সংবাদমাধ্যমগুলোতে। একজন পুলিশের মহাপরিদর্শক হয়ে তিনি এত এত কোটি টাকার মালিক হন কীভাবে। আর সরকারের দুর্নীতি দমন সংস্থা বা অন্যান্য সংস্থা কেনই বা এসবের বিষয়ে তৎপর হয়নি। শুরুতেই যদি তার দুর্নীতির বিরুদ্ধে সজাগ দৃষ্টি রাখা হতো তাহলে হয়তো এই দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব হতো। এখন যেভাবে একর পর এক তার সম্পদ ক্রোক করা হচ্ছে, তা আর করতে হতো না।

কবি কুসুম কুমারী দাশ তার ‘আদর্শ ছেলে’ কবিতায় লিখেছিলেন, ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে’। কথায় বড় হওয়া আর কাজে বড় হওয়া এক জিনিস নয়, কথায় বড় হওয়া যায় প্রতিমুহূর্তে, কাজে বড় হতে লাগে আমৃত্যু সাধনা। পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদের একটি বক্তব্য ভাইরাল হতে দেখা গেছে ফেসবুকে কিছু দিন আগে। সেখানে তিনি জঙ্গিবাদ এবং দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছিলেন এই দেশে জঙ্গিবাদ বলে কিছু থাকবে না, দুর্নীবিাজ বলে কিছু থাকবে না- কিন্তু আপনি-আমি থাকব। দুঃখজনক হলেও সত্যি, তার চাকরিজীবনের শেষে বেরিয়ে এল তিনিই দেশে সবচেয়ে বড় দুর্নীতিবাজ এবং তিনিই দেশে থাকতে পারছেন না। তার স্ত্রী-সন্তানও পালাই পালাই অবস্থা। তাহলে বড় বড় কথা বলার দাম্ভিকতা থাকল কোথায়। তিনি যে বড় দুর্নীতিবাজ হয়ে সমালোচিত হলেন এটা শুধু তার জন্যই লজ্জার নয়, পুলিশ বিভাগের জন্য লজ্জার, দেশের জন্যও লজ্জার। পুলিশের একজন সর্বোচ্চ পদধারী ব্যক্তির কাছ থেকে জাতি এটা কখনো প্রত্যাশা করেনি। ভাগ্যিস, কোনো এক অনুসন্ধিস্যু সাংবাদিক কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে তিনি বেনজীরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন। যার বলৌদতে সরকারের প্রশাসন এবং দেশবাসী তার দুর্নীতির ফিরিস্তি জানতে পেরেছে। হাল আমলে আরেক দুর্নীতিবাজের সন্ধান পাওয়া গেছে। তার নাম মতিউর রহমান। তিনিও বেনজীরের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছে। তিনিও টাকাখেকো এবং জমিখেকো হয়েছেন। স্ত্রী-সন্তানের নামে-বেনামে টাকা আর টাকা, জমি আর জমি। তাদেরও দশাও বেনজীর পরিবারের মতো, পালাই পালাই। এমন হাজারও বেনজীর-মতিউরের মতো দুর্নীতিবাজ সমাজে রয়েছেন যাদের মুখোশ এখনো উন্মোচন করা হয়নি। জাতি দেখতে পারেনি তাদের কুৎসিত চেহারা। দুর্নীতি দমন বিভাগের এখনো উচিত একটি আন্তর্জালের মধ্যে দুর্নীতিবাজদের নজরদারিতে রাখা এবং জবাবদিহির আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করা।

গত ৬ জুনে জাতীয় সংসদে বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। আর গত ১১ জুন সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা জাতীয় সংসদে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে জনগুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন। তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে আরও কঠোর হওয়ার জন্য একমত পোষণ করেছেন। আলোচনা করেছেন কালোটাকা সাদা করা না করার বিষয় নিয়েও। এ ছাড়া এই বাজেট কীভাবে গণমুখী এবং কল্যাণকর কাজে ব্যবহার করা যায় এবং কীভাবে দেশকে এগিয়ে নেওয়া যায় তার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হওয়া এবং দুর্নীতিকে জিরো টলারেন্সে নিয়ে আসার কথা আমরা দীর্ঘদিন ধরেই শুনে আসছি এবং দেখে আসছি। একই সঙ্গে দেখে আসছি একের এক বড় বড় দুর্নীতির খবরও। তাহলে এসব আলোচনার সারমর্ম কী। কালো টাকা তো কালো টাকাই সে টাকা আবার সাদা হয় কীভাবে। মানে অবৈধ উপায়ে উপার্জিত টাকা আবার বৈধ হয় কীভাবে। এই ভ্রান্ত ধারণায় দিব্যদৃষ্টিতে যা দেখতে পাই তা হলো চোরকে চুরি করতে বলা আর গেরস্তকে সজাগ থাকতে বলা। মোদ্দা কথা দুর্নীতিকে উসকে দেওয়া।

বিএনপির শাসনামলকে আমরা দুঃশাসনের শাসনামল বলেই জানতাম। এখনো জানি। তখন দেশ দুর্নীতিবাজদের আখড়ায় পরিণত হয়েছিল। পাঁচ-পাঁচবার দেশ দুর্নীতিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। বিএনপির চেয়ারপারসনের ছেলে তারেক জিয়া দুর্নীতির সাজা মাথায় নিয়ে এখনো দেশ ছেড়ে পালিয়ে আছেন। আর জিয়া অরফানেজ বা এতিমদের একটি ট্রাস্টের ২ কোটির কিছু বেশি টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগে জেল খাটছেন একাধিকবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। দুদকের মামলা এবং আদালতের আদেশে জেল খাটছেন তিনি। অথচ দেড় হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি করে এখনো ধরা-ছোঁয়ার বাইরে বেনজীর আহমেদ। বহাল তবিয়বে আছেন মতিউর রহমান। এটা কী করে সম্ভব?

সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা গলা ফাটিয়ে বলতে থাকেন কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়, আইন সবার জন্য সমান। দুর্নীতি করে কেউ রেহাই পাবে না। তাকে অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে এবং তাকে শাস্তি ভোগ করতে হবে। আমরা আইনকে অসম্ভব রকমের শ্রদ্ধা করি এবং আস্থা রাখি দুদকের ওপরও। কিন্তু হিসাব মেলাতে পারছি না, দেড় হাজার কোটি টাকা বেশি, নাকি দুই কোটি টাকা। দুই কোটি টাকা আত্মসাৎ করে বছরের পর বছর জেল খাটছেন অসুস্থ এবং বয়স্ক একাধিক বারের প্রধানমন্ত্রী, আর শত শত কোটি টাকা নয়, হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে ধরাই পড়ছেন না দুর্নীতিবাজরা। জেল তো কোন সুদূরে।

উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণা আমাদের দীর্ঘদিনের। এটা একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তাই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা প্রায়শই বলে থাকেন, বিএনপির সময় দেশে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে, এত এত বার বাংলাদেশ দুর্নীতিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে। আরও কত কী। তারা এসব কথা বলে কী বোঝাতে চেয়েছেন তা আমাদের বোধগম্য নয়। তাহলে কি তারা এটাই বোঝাতে চেয়েছেন যে, বিএনপি দেশে যে পরিমাণ দুর্নীতি করেছে আওয়ামী লীগ এখনো সেই পরিমাণ দুর্নীতি করেনি। এখনো বিশ্বচ্যাপিম্পয়ন হয়নি। তাই বুঝি তারা বর্তমানে যেসব দুর্নীতি হচ্ছে তা জায়েজ করার কথা বলতে চাচ্ছেন। যদি তাই বোঝাতে চান তাহলে তো আর রাখঢাক করে বলার দরকার হয় না যে আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার, দেশকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সে নিয়ে আসব। আর অন্যদিকে বেরিয়ে আসবে শত শত কোটি টাকার দুর্নীতিবাজের মুখোশ।

গত ২৩ জুন ছিল আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর জনসভায় শেখ হাসিনা স্বীকার করেছেন যে দেশে বড় বড় দুর্নীতির ঘটনা ঘটছে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর এই উপলব্ধিকে সম্মান জানাই। আমাদের প্রধানমন্ত্রী বরাবরই দুর্নীতির বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলে থাকেন, তার সরকার দুর্নীতিকে জিরো টলারেন্স করে। শুধু তাই নয়, তিনি কালোবাজারি এবং সিন্ডিকের বিরুদ্ধেও উচ্চকণ্ঠ। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই দুটোই যেন জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছে আমাদের বুকে। যা দূর করাও দুরূহ।

লেখক: সাংবাদিক


banner close