মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই ২০২৪

অর্থনীতির মূলস্রোতে কালো টাকা

আপডেটেড
১৫ জুন, ২০২৪ ১২:১৩
রজত রায়
প্রকাশিত
রজত রায়
প্রকাশিত : ১৫ জুন, ২০২৪ ১২:১৩

নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্থ্য সেনের মতে, সভ্যতার গোড়া থেকেই সাদা ও কালো টাকা পরস্পর হাত ধরাধরি করে চলেছে, যা পৃথিবীর সব দেশেই কম-বেশি রয়েছে একটি সীমারেখার মধ্যে। যেমন- পশ্চিমা বিশ্বে, মধ্যম আয়ের দেশ ল্যাটিন আমেরিকা ও এশিয়ার কিছু দেশে যেখানে অফশোর হিসাব বলে একটি কার্যক্রম প্রচলিত আছে। যেখানে বিশেষায়িত অঞ্চলে কালো টাকা বিনিয়োগ করলে কোনো প্রশ্নের মোকাবিলা করতে হয় না। যা অর্থনীতিতে একটি বৃহৎ অংশ দখল করে রয়েছে।

প্রস্তাবিত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত আয় প্রদর্শন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কালো টাকা সাদা করার নৈতিকতা এবং অর্থনীতিতে এর প্রভাব নিয়ে বিতর্ক চলে আসছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, উচ্চমূল্যস্ফীতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বৈশ্বিক সংকট, ডলার সংকট, ব্যবসা-বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে মন্দা এবং অন্যান্য বৈশ্বিক অনিশ্চিয়তায় সরকারের ব্যয় চাহিদা বেড়ে গেছে। এ কারণে রাজস্ব আহরণের বৃদ্ধি ও প্রয়োজন রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। অপ্রদর্শিত আয় মূল ধারায় নিয়ে আসার প্রয়োজন আছে। বিশেষ করে কর সুবিধার মাধ্যমে কালো টাকা সাদা করার সুবিধা দিলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির উন্নয়নে সাহায্য করবে। অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা যতদিন প্রদর্শিত না হবে ততদিন অর্থনীতি মূলধারার গতি স্তিমিত হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ২০১১ সালের গবেষণাপত্র ÒUnderground Economy of Bangladesh an Econometric analysisÓ অনুযায়ী ২০০৯ সালে দেশের অর্থনীতিতে ৬২.৭৫ শতাংশ কালো টাকা ছিল। যার পরিমাণ ৫ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। যা ২০১৪-১৫ সালের জাতীয় বাজেটের দ্বিগুণেরও বেশি। কালো টাকা বা করবহির্ভূত আয় হচ্ছে কোনো ব্যক্তি যখন আয়কর দিতে গিয়ে কোনো আয় জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে অন্তর্ভুক্ত করেন না, তখনই তা কর বহির্ভূত আয় হয়। আয় কালো নয়; কিন্তু সেই আয়ের ওপর কর দেওয়া হয়নি। নিয়মমতো এটি কর বহির্ভূত আয়।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তথ্যানুযায়ী ২০২০-২০২১ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে প্রায় ১৮ হাজার ২২০ কোটি টাকা অপ্রদর্শিত আয় প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা কর দিয়ে বৈধ করেছেন ৭ হাজার ৪৪৫ জন করদাতা। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ এবং অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ২০২০-২০২১ অর্থবছরের ২০ হাজার ৬০০ কোটি অপ্রদর্শিত বা কালো টাকা সাদা হয়েছে। প্রায় ১২ হাজার করদাতা এই টাকা সাদা করেছেন। সব মিলিয়ে সরকার কর পেয়েছে ১ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা। কালো টাকা সাদা করার তালিকায় আছেন চিকিৎসক, সরকারি চাকরিজীবী, তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক, ব্যাংকের উদ্যোক্তা মালিক, স্বর্ণ ব্যবসায়ীসহ আরও অনেকে। তবে ধনীরাই বেশি টাকা সাদা করেছেন।

অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, সব শ্রেণি পেশার মানুষই কালো টাকা সাদা করেছেন। ২০২০-২১ অর্থবছরের যে পরিমাণ কালো টাকা সাদা হয়েছে তার মধ্যে পুঁজিবাজারে ২৮২ কোটি ৪০ লাখ টাকা ও আবাসন খাতে ২ হাজার ৫১৩ কোটি ২০ লাখ টাকা সাদা হয়েছে। তথ্যানুসারে, ১৯৭১ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত অপ্রকাশিত আয়ের প্রায় ৩০ হাজার ৮২৪ কোটি টাকার হিসাব প্রকাশ করা হয়েছে, যা থেকে প্রায় ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা কর আদায় হয়েছে। করোনার কারণে বিদেশের সঙ্গে সংযোগ সেভাবে হয়নি বা ব্যাহত হয়েছে। সে কারণে এ টাকাগুলো দেশের বাইরে চলে যাওয়ায় বা অপ্রদর্শিত রাখা সম্ভব হয়নি অনেকের পক্ষে। তারাই দেশে বিশেষ সুবিধা নিয়ে টাকাগুলো সাদা করার সুযোগ নিয়েছে।

করোনাকালে শিল্পে বিনিয়োগ প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল। ফলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি বরং, ভোগ চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, নয়তো টিকে থাকতে কর্মী ছাঁটাই করেছে। এ অবস্থায় শিল্পের চাকা সচল রাখতে ও কর্মসংস্থান বাড়াতে উৎপাদনশীল খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ ২০২১-২০২২ অর্থবছরের বাজেটে বিনিয়োগের বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। আয়কর অধ্যাদেশের নতুন ধারা (১৯) অনুযায়ী, দেশের সব স্থানে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ করার সুযোগ ছিল। এ জন্য ১০ শতাংশ কর প্রদান করে সরাসরি ঘোষণা নিয়ে বৈধ করেছেন ২ হাজার ২৫১ জন করদাতা। যার পরিমাণ হলো ১ হাজার ১২৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

বর্তমানে আয়কর আইনানুযায়ী, যেকোনো করদাতা সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ কর দিয়ে এর সঙ্গে ১০ শতাংশ জরিমানা দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ নিতে পারে। তবে অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ রয়েছে। যেকোনো সংস্থা চাইলে পরবর্তী সময়ে ওই টাকার উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন করতে পারে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শুধু ব্যক্তি নয়- প্রতিষ্ঠানেরও অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা নির্দিষ্ট হারে কর দিয়ে বৈধ করার সুযোগ রাখা হয়েছে। কালো টাকা সাদা করার প্রস্তাবে বলা হয়েছে, আয়কর আইন-২০২৩ বা অন্য কোনো আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন আয়কর কর্তৃপক্ষসহ অন্য কোনো সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ ব্যক্তির কোনো পরিসম্পদ অর্জনের উৎসের বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারবে না। যদি ওই ব্যক্তি ১ জুলাই ২০২৪ থেকে ৩০ জুন ২০২৫-এর মধ্যে ২০২৪-২৫ কর বর্ষে রিটার্ন বা সংশোধিত রিটার্ন দাখিলের সময় ১৫ শতাংশ হারে কর দিয়ে রিটার্নে ওই পরিসম্পদ দেখান। এ ছাড়া জায়গা অনুপাতে নির্দিষ্ট পরিমাণ কর ও জরিমানা দিয়ে অপ্রদর্শিত জমি, অ্যাপার্টমেন্ট প্রশ্নাতীতভাবে বৈধ করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশে কালো টাকা একটি অপ্রত্যাশিত বাস্তবতা। আইএমেএফের “Shadow Economics around the world, what did we learn over the last 20 years”শীর্ষক ২০১৫ সালে প্রকাশিত একটি দলিল মতে বাংলাদেশে কালো টাকা বা শ্যাডো ইকোনমির আকার হচ্ছে দেশটির মোট জিডিপির ২৭.৬০ শতাংশ। কালো টাকার কোনো আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞা নেই। সাধারণত কালো টাকা বলতে বুঝি হিসাবের খাতায় উল্লেখ না করে অর্জিত অর্থকে। যেমন- একজন মালিক একটি ফ্ল্যাট বিক্রি করলেন ১ কোটি টাকায়। তিনি চেকের মাধ্যমে পেলেন ৬০ লাখ টাকা। অবশিষ্ট ৪০ লাখ টাকা পেলেন নগদে। এই ৪০ লাখ টাকা যদি তিনি প্রাপ্তির খাতে না প্রদর্শন করেন তবে ওই ৪০ লাখ টাকা হয়ে যাবে কালো টাকা বা আন-রেকর্ডেড মানি।

অধ্যাপক ফ্রিডরিখ স্নেইডার তার- ÒShadow Economics all over the world new estimates for 162 countries from (1999-2007)” শীর্ষক সমীক্ষায় উল্লেখ করেন- কর প্রশাসনের দুর্বলতার কারণে শ্যাডো মানি বা ব্ল্যাক মানি বিভিন্ন দেশে বেড়ে চলেছে। যে কারণে বিভিন্ন ব্যক্তি ও কোম্পানি আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কাঠামোর বাইরে চলে যেতে পারছে।

অপ্রদর্শিত আয় কীভাবে তৈরি হয় এমন প্রশ্ন আমাদের অনেকের মনে জাগ্রত। বাংলাদেশে পেশাজীবীদের আয় যেমন- চিকিৎসক, প্রকৌশলী, স্থাপত্যবিদ, শিক্ষক, এনজিও খাত কিংবা অনেক পেশায় চাকরির বাইরেও পেশাগত চর্চার মাধ্যমে অর্থ আয় করেন বা সুযোগ আছে। যেমন- চিকিৎসকরা প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন, শিক্ষকরা বিশেষ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়ান, প্রকৌশলী বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী নকশাঁ ও কাজ তদারকি করেন। এখন কোনো চিকিৎসক, শিক্ষক বা প্রকৌশলী যদি এ থেকে পাওয়া অর্থ আয়কর রিটার্নে না দেখান তা হলে সেটি কালো টাকায় পরিণত হয়।

সেবা খাত, ক্রয় খাতে যেমন নিষিদ্ধ পণ্যের ব্যবসা, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা এগুলো বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে নিষিদ্ধ। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি মাদক বিক্রি করে বা অস্ত্র বিক্রি করে অর্থ আয় করে তবে সেটি কালো টাকা আয়কর বিবরণীতে দেখানোর সুযোগ নেই। তারপর ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করা যায় প্রতিদিন দোকানে যে বিক্রি হয় এবং যে পরিমাণ লাভ হয় তার পুরোটা তারা প্রদর্শন করে না বলে অনেক টাকা অপ্রদর্শিত থেকে যায়। এটাকেও কালো টাকা বলা হয়।

অপ্রদর্শিত আয় বা কালো টাকা মূল ধারার অর্থনীতিতে নিয়ে আসার বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ কর সুবিধার মাধ্যমে কালো টাকা সাদা করার সুবিধার মাধ্যমে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা সাদা করার সুবিধা দেওয়া হলে তা সামগ্রিক অর্থনীতির উন্নয়নে সাহায্য করবে।

লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক


দুর্জন সর্বদাই পরিত্যাজ্য!

আপডেটেড ১৭ জুলাই, ২০২৪ ১০:৫৩
মোতাহার হোসেন

ছাত্রাবস্থায় ভাবসম্প্রসারণ পড়েছি, ‘দুর্জন বিদ্বান হলেও পরিত্যাজ্য।’ কারণ বিদ্যা এবং চরিত্র এ দুটি মানবজীবনে মূল্যবান সম্পদ। তাই বিদ্বানের সঙ্গ কল্যাণকর কিন্তু বিদ্বান অথচ চরিত্রহীন এমন ব্যক্তির সঙ্গ কখনো সমাজের জন্য, দেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়, এদের সঙ্গ সর্বদাই পরিত্যাজ্য। এ ধরনের বিদ্বান ব্যক্তিরা তাদের অসৎ চরিত্রের মাধ্যমে সজ্ঞানে দেশ, জাতি ও সমাজের ভয়ানক ক্ষতি করেন। অন্যদিকে, বিদ্বান ব্যক্তি সর্বত্র সম্মানিত। কিন্তু দুর্জন অর্থাৎ খারাপ প্রকৃতির লোক বিদ্বান হলেও সে সমাজের দুশমন। সবাই তাকে ঘৃণা করে। এর সঙ্গে এখন যুক্ত হতে পারে, ‘দুর্জন আর দুর্নীতিবাজ’ বিদ্বান হলেও তাদের পরিত্যাজ্য করা উচিত। কারণ দুর্নীতির দুষ্ট ক্ষত সমাজের অগ্রগতি, মানুষের প্র্যত্যাশা, স্বপ্নকে পদে পদে বাধাগ্রস্ত, ক্ষতিগ্রস্ত করে। তা ছাড়া বাস্তবে দেশের অধিকাংশ মানুষই সৎ। কেবল কিছু কিছু সরকারি, আধা-সরকারি সংস্থা, সেবাধর্মী সংস্থার কতিপয় কর্মকর্তা কর্মচারীর দুর্নীতির কারণে আজকে সরকারে যারা আছেন, বিভিন্ন সংস্থার শীর্ষ ব্যক্তিদের প্রতিও তির্যক দৃষ্টি পড়ছে, অভিযোগের আঙুল তুলছেন।

মূলত সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের বেনজির, চট্টগ্রামে পুলিশের এডিসি কামরুল, এনবিআরের মতিউর, মতিউরের দুই স্ত্রী, চার সন্তান, ক্যাশিয়ার, বান্ধবী, ফয়সাল, এনামুল, ইসলাম, পলিটেকনিক শিক্ষা বোর্ডের সার্টিফিকেট বাণিজ্যে জড়িত চেয়ারম্যান আলী আকবর খান, সিস্টেম অ্যানালিস্ট এ কে এম শামসুজ্জামান, নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ জালকারী প্রকৌশলী জিয়াউর রহমান, তার স্ত্রী নুরুন্নাহার মিতু, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার ইয়াসিন আলী ও দারুল ইহসান ইউনিভার্সিটির ডিরেক্টর বুলবুল আহমেদ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অতিরিক্ত প্রধান মালেক, মিঠু, প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে আলোচিত পিএসসির চেয়ারম্যানের সাবেক ড্রাইভার আবেদ আলী জীবন, তার ছেলে সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়ামসহ ১৭ জনকে আটক করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। আটককৃতদের ছয়জনই সরকারি কর্ম-কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে আলোচনা, নিউজ প্রকাশ এবং এ নিয়ে সরকারের দৃঢ় অবস্থান সম্পর্কে আলোকপাত করাই এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য।

সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস রহস্য উন্মোচিত হলো সম্প্রতি। প্রশ্ন ফাঁস অব্যাহত থাকায় জাতির বহু মেধাবির মেধার অবমূল্যায়ন হচ্ছে আবার যারা কম মেধাবী অথচ ফাঁস হওয়া প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়ে চাকরিতে নিয়োগের সুযোগ পাচ্ছে। সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িত খোদ বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাই। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির তিন কর্মকর্তা, তিন কর্মচারীসহ ১৭ জনকে সম্প্রতি গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি। এই চক্র অন্তত একযুগ ধরে ক্যাডার ও নন-ক্যাডার চাকরির ৩০টি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করেছে। আর এ কাজ করে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন প্রত্যেকেই। পিএসসির প্রশ্নফাঁস চক্রের ১৪ জনের ব্যাংক হিসাবে মোটা অঙ্কের লেনদেনের তথ্য পেয়েছে তদন্তকারী দল। তাদের প্রত্যেকের নামে অন্তত ৫টি থেকে সর্বোচ্চ ২০টি ব্যাংক হিসাব রয়েছে। ব্যাংকিং চ্যানেলে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে পিএসসির উপপরিচালক আবু জাফর, সাবেক গাড়িচালক আবেদ আলী, অফিস সহায়ক খলিলুর রহমান ও ডেসপাস রাইডার সাজেদুল ইসলামের হিসাবে।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন- পিএসসির উপপরিচালক আবু জাফর ও জাহাঙ্গীর আলম, প্রতিষ্ঠানটির সহকারী পরিচালক আলমগীর কবির, সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী জীবন ও তার ছেলে সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়াম, ডেসপাস রাইডার খলিলুর রহমান, অফিস সহায়ক সাজেদুল ইসলাম, নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের নিরাপত্তা-প্রহরী শাহাদাত হোসেন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের টেকনিশিয়ান নিয়ামুন হাসান, অডিটর প্রিয়নাথ রায়, নোমান সিদ্দিকী, আবু সোলায়মান মো. সোহেল, জাহিদুল ইসলাম, মামুনুর রশীদ, সাখাওয়াত হোসেন, সায়েম হোসেন ও লিটন সরকার। জাতির জন্য সর্বনাশা প্রশ্ন ফাঁস চিরতরে বন্ধের উপায় খুঁজে বের করতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।

জনগণের সেবার জন্য এবং সরকারের উন্নয়ন এজেন্ডা বাস্তবায়নসহ প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নই হচ্ছে প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীর একমাত্রা দায়িত্ব ও কর্তব্য। একইভাবে পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলায় অন্যান্য বাহিনীর দায়িত্ব হচ্ছে জনগণের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু প্রশাসন, রাজস্ব প্রশাসন ও পুলিশের কিছু কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথ পালন না করে সেবাপ্রার্থীদের ঠেকিয়ে-ঠকিয়ে, ফাইল আটকিয়ে অবৈধ, অনৈতিক পথে কামাই করছে কোটি কোটি টাকা। আর ওই টাকায় গড়ে তুলছে সুরম্য অট্টালিকা, রিসোর্ট, দামি গাড়ি, ফ্ল্যাট, থাকছে কোটি কোটি টাকার এফডিআর, শেয়ার ব্যবসা আরও কত কি। অর্থাৎ ‘টাকাই ক্ষমতা’ যেন এসব দুর্নীতিবাজদের একমাত্র লক্ষ্য। এই বক্র প্রক্রিয়া রাষ্ট্র কর্তৃক সর্বসাধারণের জন্য কোনো গৃহীত পদক্ষেপ নয়। বরং ব্যক্তিবিশেষের সুবিধা নেওয়ার জন্য ক্ষমতাশালীদের সুবিধাদানের মাধ্যমে প্ররোচনা করা, যা একই পজিশনে চাকরিরত ব্যক্তিদের মধ্যে ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি করে। পাশাপাশি দেশ, সরকার ও জনগণের প্রত্যাশিত অর্জনকে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করে। একই সঙ্গে তখন দেশের পুরো অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল।

পাকিস্তান আমলও প্রশাসনে দুর্নীতি ছিল। এখন ক্রমাগতভাবে তা বাড়ছে। অথচ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য ছিল দুর্নীতি থেকে মুক্তি এবং সৎ পরিশ্রমী ও বিবেকবান আমলাতন্ত্র এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে তোলা। নয় মাস যুদ্ধ করে স্বাধীন করা একটি দেশের কাছে জনগণের এ দাবি খুব একটা অযৌক্তিক ছিল না। অধিকাংশই সেই মহান লক্ষ্য থেকে প্রশাসন সরে গেছে। রাষ্ট্র পরিচালনার সব ক্ষেত্রেই তারা তাদের ভোগের ভাগ নিশ্চিত করতে গিয়ে রাষ্ট্রকে, প্রশাসনকে দুর্নীতির যূপ কাষ্ঠের দিকে ঠেলে দেয়। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের সময়ই দেশে রাজনীতিকে, রাজনীতিককে মূলত দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়েছিল। ঠিক একইভাবে দুর্নীতির স্বর্ণযুগ ছিল সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদ, বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময়। তখন দুর্নীতিতে রাষ্ট্রকে পর পর ৫ বার বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের তকমা লাগাতে হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা কর্মচারীর দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ হয়েছে তা রীতিমতো অবিশ্বাস্য। বিশেষ করে তাদের স্বামীর হাতে যখন আলাদিনের চেরাগ থাকে তখন স্ত্রীরাও সেই আলোয় আলোকিত হয়। আবার কখনো দুর্নীতিগ্রস্ত স্ত্রীর বদৌলতে স্বামী আলোকিত হয়। আবার উল্টো চিত্রও লক্ষণীয় স্বামীর অপরাধ, অপকর্ম, দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করায় স্ত্রীকে তালাক দিয়েছে এলজিইডির ইঞ্জিনিয়ার স্বামী আশরাফুজ্জামান।

পুলিশের কিছু সদস্যের কর্মকাণ্ড, দুর্নীতির কারণে সাধারণ এবং ভুক্তভোগী মানুষ আস্থাহীন। এ ধরনের একটা ইমেজ তৈরি হয়েছে দুর্নীতির কারণেই। দুর্নীতির সঙ্গে পুলিশ বিভাগের সংশ্লিষ্টতা ঘোচাতে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এ অবস্থার অবসান চান সবাই। তাই উপযুক্ত প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে জনগণের কাছে রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। ঘুষ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের ‘আলোচিত’ ঘটনা। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে মসনদহারা করানোর জন্য সেনাপতি মীর জাফরকে ঘুষ দিয়েছিলেন লর্ড ক্লাইভ। শুধু ঘুষ নয়, সিরাজের সিংহাসনও তাকে দেওয়া হবে বলে চুক্তি করা হয়। তার ফল শুধু বাংলা কেন ভারতবাসীও ভোগ করেছে। মীর জাফর ও ক্লাইভও ভোগ করেছেন। মীর জাফর গদিহারা-ইজ্জতহারা হয়ে মরেছেন। আর রবার্ট ক্লাইভকে করতে হয়েছে আত্মহত্যা; কিন্তু ব্যক্তির দুর্নীতির খেসারত ব্যক্তির শাস্তিতে শেষ হয় না, তার দায় ভোগ করে দেশ, প্রজন্মের পর প্রজন্ম। এমনকি দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বও চলে যেতে পারে।

ব্যক্তির দুর্নীতি তাই রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বিপর্যয় ঘটিয়ে ফেলে। নীতি নয়, দুর্নীতিই যেহেতু সংক্রামক, সেহেতু দুর্নীতিবাজরা পুরো সমাজকেই দুর্নীতিগ্রস্ত করে ফেলে। ঝুড়ির একটা পচা আম বাকি আমগুলো পচিয়ে দিতে যথেষ্ট। এ জন্যই দুর্নীতিবাজদের পরিবারে, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুমহলে খুব কম লোককেই পাওয়া যায়, যারা বলতে পারে- তুমি ভালো না, তুমি দুর্নীতিবাজ। দুই-দশ ডজন দুর্নীতিবাজ দমন করা খুবই সম্ভব। কিন্তু দুর্নীতিবান্ধব এ সংস্কৃতি এ সমাজকে পাল্টাতে প্রয়োজন সম্মিলিত প্রয়াস ও কার্যকর উদ্যোগ। নুতবা দুর্নীতিই যদি নীতি হয়ে দাঁড়ায়, তা হলে সমাজ-রাষ্ট্র-রাজনীতি মুখথুবড়ে পড়তে পারে। এ জন্য প্রয়োজন দুর্নীতির বিরুদ্ধে চির টলারেন্স নীতির বাস্তবায়ন।

আজকে গুটিকয়েক দুর্নীতিবাজ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এদের নাটকীয় আবির্ভাব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এরা তো দুর্নীতির সিস্টেমের অংশ বিশেষ মাত্র। তাই জনপ্রত্যাশা ও জনগণের মনের আশ পূরণে এদের কয়েকজনকে ঝেড়ে ফেলে দিলে সিস্টেমের বরং লাভ। তৎস্থলে ফ্রেশ ব্লাডের কর্মকর্তা নিয়ে প্রশাসনকে ঢেলে সাজানো বা নবায়ন করে নিতে পারে। বিশেষ তবে মতিউর-আবেদ আলীদের প্রতি স্থাপন হিসেবে নতুন লোকেদের নিয়োগ দিতে পারে, যাকে বলে ফ্রেশ বøাড। কারণ আমাদের মনে রাখতে হবে ‘অ্যাপেনডিক্স’ ফেলে দিলে শরীর আরও সচল, সবল হয় এবং সক্রিয় ও স্বচ্ছ হবে। এসব দুর্নীতিবাজদের দৌড়ানি দিলে, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিলে দুর্নীতির দুষ্ট ক্ষত থেকে দেশ, রাষ্ট্র, সরকার, মানুষ মুক্তি পাবে। তাই আসুন আমরা সমস্বরে, দৃঢ় কণ্ঠে দুর্নীতিকে না বলি। দুর্নীতিকে শক্ত হাতে দমন এবং মোকাবিলা করে আমাদের ভবিষ্যৎ পথ চলাকে সুগম করি। জীবন হোক কুসুমাস্তীর্ণ। সমাজ হোক দুর্নীতি মুক্ত। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে লালন করে তার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রত্যাশিত অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখি। এ দৃঢ় অঙ্গীকার হোক আমাদের সবার পথ চলার পাথেয়।

লেখক: সাংবাদিক


প্রসঙ্গ ঘুষ-দুর্নীতি ও লুটপাট

আপডেটেড ১৭ জুলাই, ২০২৪ ১০:৫১
শেখর দত্ত

সাম্প্রতিক সময়ে ঘুষ-দুর্নীতি ও লুটপাটের যেসব খবর প্রকাশিত হচ্ছে, তা কল্পনাকেও যেন হার মানাচ্ছে। এসব অপকর্ম রাষ্ট্র ও সরকারের উচ্চপর্যায় যেমন- এমপি, সেনাপ্রধান, পুলিশ প্রধান, রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তা, ব্যাংকের পরিচালকরা যেমন রয়েছেন তেমনি ড্রাইভার, পিয়ন ও কেরানিও কম যায় নাই। এদের মধ্যে কেউ কেউ সাবেক আবার কেউ কেউ বর্তমানের।

এসব ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে আবারও দিচ্ছে যে, রাষ্ট্র ও সমাজজীবনে ওপর থেকে নিম্নপর্যায় পর্যন্ত নৈতিকতার অধঃপতনে ভালোভাবেই পচন ধরেছে। এই পচন প্রক্রিয়ার শেষ নিয়ে ভাবতেও কষ্ট হচ্ছে। তবে ন্যূনপক্ষে নিয়ন্ত্রিত কিংবা পদানত আদৌ কখনো হবে কি না, তা নিয়ে জনকল্যাণকামী ও দেশপ্রেমী মানুষদের ক্রমেই বেশি বেশি করে ভাবিয়ে তুলছে।

এটা তো কারওই অস্বীকার করার উপায় নেই যে, যতটুকু প্রকাশিত হয়েছে কিংবা হবে ততটুকুই জনগণ জানবে। জানবে ক্ষুদ্র খণ্ডাংশ, জানার বাইরেই বোধকরি থেকে যাবে বেশির ভাগ। কারণ দুর্নীতি হচ্ছে সমাজদেহের ক্যানসার, মর্মমূলে থাকে শক্ত অবস্থান নিয়ে গভীরে, চেইন ছাড়া তা অগ্রসর হতে পারে না। এক্ষেত্রে প্রয়োজন হচ্ছে মর্মমূলকে দুর্বল ও কোণঠাসা করা। প্রসঙ্গত, এমনটাও মনে করা হয়ে থাকে, কখনো যদি কোনো চেইনে ফাটল (মনোমালিন্য) ধরে কিংবা চেইনের কেউ ভুল করে তবেই তা প্রকাশিত হয়। সরকারের সদিচ্ছার সঙ্গে জনগণের চাপের ওপর নির্ভর করবে, ক্যানসার কতটুকু জনগণের কাছে উন্মোচিত হবে, তস্কর ও দস্যুরা কতটুকু সাজা পাবে। সর্ষে থেকে ভূত কতটুকু নামবে। সর্ব অঙ্গের ব্যথার কতটুকু ব্যথা সারাবে।

তবে অভিজ্ঞতা থেকে নির্দ্বিধায় বলা যায়, কিছুদিন এ নিয়ে হইচই চলবে, যেমন চলেছিল ২০১৯ সালের ক্যাসিনো কাণ্ডকে নিয়ে। কিছু মামলা-গ্রেপ্তার ও শাস্তি হবে, শুদ্ধাচার কৌশল বাস্তবায়ন নিয়েও হয়তো তৎপরতা চলবে। তারপর যদিও বলতে কষ্ট হচ্ছে, যা চলছে সেভাবেই চলবে। এমনটাই তো হয়ে এসেছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে দুর্নীতিকে প্রধান ইস্যু করে প্রচারে নেমেছিল। ক্ষমতা প্যারালাল কেন্দ্র হাওয়া ভবন ও ১১১ জন গডফাদারের অপকর্মকে যথার্থ ও সফলভাবে সামনে আনতে সক্ষম হয়েছিল। ওই নির্বাচনে ‘দিনবদলের সনদ’-এ পাঁচটি অগ্রাধিকারের বিষয়ে দুর্নীতিকেও রাখা হয়েছিল। কিছু কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করায় যে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছিল, তা অবস্থা পর্যবেক্ষণে সুস্পষ্ট।

প্রসঙ্গত, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতি বিষয় রিপোর্ট নিয়ে জনগণের মধ্যে বিতর্ক ও অবিশ্বাস রয়েছে, নানাদিক বিচারের যথার্থতা আছে। তবে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বিএনপি-জামায়াত আমলে ‘পরপর পাঁচবার’ বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে ওই সংগঠনের মূল্যায়ন নির্বাচনী প্রচারে আওয়ামী লীগ বেশ ভালোভাবেই ব্যবহার করেছিল। এ দিকটি বিবেচনায় নিয়ে একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছিল বলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টান্যাশনালের স্বীকৃতি আছে। ওই সংগঠনের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের অবস্থান যে ধাপে ছিল, তা থেকে ২০২৩ সালে দুই ধাপ অবনমন হয়েছে। ২০২৪ সাল বা তারপর কী হবে এ বিষয়ে অবশ্যই সরকারি দল আওয়ামী লীগকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ এই সংগঠনের মূল্যায়ন রিপোর্ট দেশের রাজনীতিকে প্রভাবিত করে। সর্বোপরি কোন পরিবার কীভাবে আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে জনগণ লক্ষ-কোটি চোখ দিয়ে যেমন দেখছে, তেমনি সমান সংখ্যক কান দিয়ে শুনছে। ফলে তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া হচ্ছে।

এটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই, বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনভিপ্রেত ও দুর্ভাগ্যজনক হত্যা-ক্যু-সামরিক শাসনের যত ঘটনা ঘটেছে, তার সঙ্গে ঘুষ-দুর্নীতি ও লুটপাট ইস্যু জড়িয়ে রয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে খাদ্য ও অর্থ ঘাটতি, দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত এবং বন্যা-দুর্ভিক্ষের মধ্যে দেশ যখন গভীর সংকটে তখন বঙ্গবন্ধু ঘুষ-দুর্নীতি নিয়ে কী বলেছিলেন, সেনাবাহিনীর অভিযানসহ কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন, তা কম-বেশি সবারই জানা। শত চেষ্টা করেও তিনি তা দমন করতে পারেননি। সরকার ও দলের অভ্যন্তরের এ গণশত্রুদের তিনি ঘৃণাভরে ‘চাটার দল’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন। সংসদীয় গণতন্ত্রের সুযোগ নিয়ে ‘চাটার দল’ ও ‘রাতের বাহিনী’ বাড়াবাড়ি করছে বিধায় তিনি তা বাতিল করে একদল বাকশাল পর্যন্ত গঠন করেছিলেন।

একটু খেয়াল করলে এটাও স্মরণে আসবে যে, ১৫ আগস্টের পট-পরিবর্তনের পর প্রথমে মোশতাকসহ স্বঘোষিত খুনিরা এবং পরে সেনাশাসক জিয়া বঙ্গবন্ধু আমলের ঘুষ-দুর্নীতিকে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রচারের ইস্যু হিসেবে ব্যাপকভাবে সামনে আনে। বিশেষভাবে রাষ্ট্রপতি জিয়া যখন ক্যান্টনমেন্টে বসে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে ব্যবহার করে সুযোগসন্ধানী-সুবিধাবাদীদের নিয়ে দল গঠন করেন, তখন ঘুষ-দুর্নীতিই হয় প্রধান ইস্যু। তবে ‘মানি ইজ নো প্রবলেম’ ও ‘রাজনীতি রাজনীতিকদের জন্য ডিফিক্যান্ট’ করার নীতি-কৌশল নিয়ে নিজেই পড়েন দুর্নীতি ও দলাদলির ঘোরপ্যাঁচের মধ্যে। গ্রাম সরকার ও যুব কমপ্লেক্স হয় গ্রামাঞ্চলে দুর্নীতির ক্যানসার ছড়িয়ে দেওয়ার বাহন। কোরআন শরিফ ছুঁয়ে মন্ত্রীদের শপথ গ্রহণ এবং নৈতিকতা উন্নয়নে ক্লাস করার হাস্যকর ও ব্যর্থ প্রচেষ্টাও জনগণ ভুলতে পারেনি।

ঘুষ-দুর্নীতি এবং তা থেকে উত্থিত সন্ত্রাস ও দলাদলিকে অন্যতম প্রধান ইস্যু করে জেনারেল জিয়া ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী করতে তৎপর হন। কিন্তু এটাই হয় তার জন্য ব্রহ্মশূল। অর্থ ও অস্ত্রশক্তির দলাদলি ঠেকাতে চট্টগ্রাম গিয়ে তিনি নির্মমভাবে নিহত হন। দুর্বল রাষ্ট্রপতি সাত্তারও ঘুষ-দুর্নীতি ও লুটপাট ইস্যুতে কোণঠাসা হন এবং শাসনকাজে সামরিক বাহিনীর অংশগ্রহণের বিষয়টি সামনে এনে বঙ্গভবন থেকে বিতাড়ন করেন সেনাশাসক এরশাদ। এরশাদের আমলে ঘুষ-দুর্নীতি চরমে ওঠে এবং গ্রাম-গঞ্জ টাউটবাজদের দখলে চলে যায়। রাজনীতি সম্পূর্ণভাবে অর্থ ও অস্ত্রের কাছে বন্দি হয়ে পড়ে। প্রশাসনে ঘুষ-দুর্নীতি ও লুটপাট সর্বোতোভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। বঙ্গবন্ধুর আমলের ‘কম্বল চোর’, ‘চাটার দল’ থেকে ক্রমে ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন হয়ে ওঠে দুর্নীতি-লুটপাট, যা থেকে সৃষ্টি হয় গডফাদার ও সন্ত্রাসী চক্র।

সার্বিক বিচারে আশির দশক হচ্ছে অর্থ ও অস্ত্রশক্তির বাড়বাড়ন্ত হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেওয়ার সময়কাল। মৎস্যজীবী ‘নিকারি’ বলে পরিচিত পরিবার থেকে উঠে আসে দুর্ভাগ্যজনকভাবে নিহত কুষ্টিয়ার এমপি আনোয়ারুল আজিম। যে ব্যক্তি সীমান্তে চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযুক্ত। তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলাও আছে। শুরুতে খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিতি পেয়ে জাতীয় পার্টির মাধ্যমে রাজনীতি শুরু করেন। ১৯৯২ সালে বিএনপি থেকে পৌরসভার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ইন্টারপোলের তালিকায় থাকা এই ব্যক্তি ২০০৭ সালের আগে-পরে অন্তত চার বছর আত্মগোপনে ছিলেন বলেও জানা যায়। এরপর আওয়ামী লীগে এসে পরপর তিনবার এমপি। এলাকা ও দলের ভেতরে-বাইরে সবাই তা জানত। অনেক নেতা-কর্মী নাকি তার হামলার স্বীকারও হয়েছেন। প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থা তা জানত না, এমনটিও কোনোক্রমেই বলা যায় না। সাংবাদিকরাও নিশ্চয়ই জানত।

গাজীপুরের রানা, নারায়ণগঞ্জের নূরু পার পায়নি। কিন্তু এমপি আনার পার পেয়েছিল। কিন্তু তার আগুন নিয়ে খেলার পরিণাম হয় ভয়াবহ, লাশও পাওয়া যায়নি। এদিকে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক অভিযুক্ত হয়ে দুর্নীতিবাজ হিসেবে ধরা খেয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ। বসুন্ধরা গ্রুপের পত্রিকা ‘কালের কণ্ঠ’ যদি তথ্য প্রকাশ না করত, তবে বেনজীর সম্পর্কে জানাই যেত না। বেনজীর- বসুন্ধরা প্রশ্রয়-দ্বন্দ্ব নিয়ে যে কত গল্প বাজারে।

ছাগলকাণ্ড না হলে রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তা ও সোনালী ব্যাংকের পরিচালক মতিউর সম্পর্কে জনগণ জানতই না। এই কাণ্ড না হলে কি কেউ জানত মতিউরের স্ত্রী উপজেলা চেয়ারম্যান হয়ে গেছেন। মানে এমপি হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। আর ভাগ্যিস, বারবার পিএসপির প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছিল। নতুবা ড্রাইভার আবেদ আলীর ভাগ্য কোথায় গিয়ে ফুল ফোটাত কে জানে! প্রধানমন্ত্রীর ‘পিয়ন’ ৪০০ কোটি টাকার মালিক! এমপি নির্বাচনেও নামতে চেয়েছিলেন। যাই হোক, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু হয়েছে। দেখা যাক, কোন পর্যন্ত গড়ায়।

তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যাচ্ছে, বহাল তবিয়তে থাকলে পৌষ মাস আর নানা কার্যকারণে ধরা পড়লে সর্বনাশ কিংবা ক্ষণে ক্ষণে আকাশে বিজলির মতো দুর্নীতিবিরোধী অভিযান কিংবা এক ধাক্কায় সব নির্মূল প্রভৃতি নীতি কৌশল যদি থাকে, তবে দুর্নীতিমুক্ত হওয়া দূরে থাকুক দুর্নীতিকে পদানত বা নিয়ন্ত্রণেও রাখা যাবে না। কারণ এ সম্পর্কিত চেইনের খুঁটি নিঃসন্দেহে শক্ত। প্রসঙ্গত, ঘুষ-দুর্নীতি ও লুটপাট নিয়ে কলামটি লিখতে গিয়ে আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতির বিষয়ে কী লেখা আছে, তা নিয়ে নাড়াচাড়া করলাম। বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলাম, ২০১৮ সালের ইশতেহারে ‘বিশেষ অঙ্গ; কিন্তু ২০২৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারের ‘বিশেষ অঙ্গীকারে’ দুর্নীতি নিয়ে কিছু নেই।

কিন্তু বাস্তবের কশাঘাতে নির্বাচনের ৬ মাস যেতে না যেতেই ঘুষ-দুর্নীতি ও লুটপাট এখন জ্বলন্ত ইস্যু। ক্যানসার রোগী যদি কখনো ভুলে যায় তার রোগ, চিকিৎসা না করায়; তবে সেই রোগী তো নির্ঘাত পড়বে স্বখাত সলিলে। আসলেই ঘুষ-দুর্নীতি ও লুটপাট নিয়ে জাতি রয়েছে মহাবিপদে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মন্দা ও জাতীয় অর্থনীতি যখন সংকটে রয়েছে, জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় যখন বাড়ছে; তখন এই মহাবিপদ থেকে উত্তরণের ধারাবাহিক ও কার্যকর কোনো পন্থা বের করার ভিন্ন বিকল্প নেই।

সর্বোপরি এটা তো ঠিক, কেবল রাজনৈতিক অঙ্গীকার, আইন প্রয়োগ ও শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে দুর্নীতি দমন করা সম্ভব নয়, এ জন্য প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা। সবদিক থেকেই জাতি হিসেবে আমরা রয়েছি পিছিয়ে। দুর্নীতিবাজরা ঘৃণার পাত্র- এমন মনোভাব খুব বেশি নয়। টাকা থাকলে তোষামদ ঘরে এসে দেখা দেয়। অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি, ঘুষ-দুর্নীতি ও লুটপাট হয় ত্রয়োস্পর্শযোগে অর্থাৎ অশুভ তিনের মিলনে। দুর্নীতিবাজ আমলা-ব্যবসায়ী-রাজনীতিকরা চেইনে যুক্ত থাকার কারণেই দুর্নীতির বাড়বাড়ন্ত হয়। ‘চাটার দল’ এ তিন নিয়েই শক্ত অবস্থান নিয়েছিল স্বাধীনতার পর। অবস্থাদৃষ্টে এখনো তেমনটাই চলছে বলে ধারণা করা যায়।

এ তিন গণশত্রুর অশুভ ঐক্য থেকে জাতিকে কীভাবে বের করে আনা যাবে, তাই এখন মুক্তিযুদ্ধে এবং বর্তমানে উন্নয়নের গতিধারায় স্থাপন করেছে যে আওয়ামী লীগ, সেই দলের সরকারকেই ভাবতে হবে। অবস্থা অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে অগ্রসর হতে হবে।

লেখক: রাজনীতিক ও কলামিস্ট

বিষয়:

অতিবৃষ্টিতে পাহাড়ধস: মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন 

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ড. মো. হুমায়ুন কবীর

আমি সরকারিভাবে একটি সফরে ২০০৫ সালে ফিলিপাইনে গিয়েছিলাম। আমরা জানি ভৌগোলিকভাবে ফিলিপাইন দেশটি পাহাড় ও সমুদ্রে ভরা। সেখানে গিয়ে আমি শুনেছি তার ঠিক আগের বছর অর্থাৎ ২০০৪ সালে ফিলিপাইনজুড়ে পাহাড়ধস হয়েছিল। সেই ভয়াবহ পাহাড়ধসে তখন হাজার মানুষের ঘরবাড়ি মাটির নিচে চাপা পড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। শুধু তাই নয়- সেখানে অনেক মানুষের জীবনও গিয়েছিল এবং রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে, বিদ্যুৎ, জ্বালানিসহ জরুরি সেবাসমূহে ব্যাপক সমস্যা দেখা দিয়েছিল। আমরা যখন বাংলাদেশি ভ্রমণকারী দলটি সাগরের পাড়ঘেঁষে বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকা পরিদর্শন করছিলাম; এক বছর গত হয়ে যাওয়ার পরও সেখানে সেই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতটি চোখে পড়ার মতোই ছিল।

বিশ্বের বিভিন্ন পাহাড়ি দেশেই পাহাড়ধসের এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে। কিছুদিন বিরতিতে এমন ঘটনা অনেকটা স্বাভাবিক হিসেবেই ধরা হয়ে থাকে। আমাদের বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি উপকূলীয় জেলায় অতিবৃষ্টিতে পাহাড়ধস এমন একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর্যায়ভুক্ত। তবে প্রায় প্রতি বছরই পাহাড়ধসের বিষয়টি আরও এক ডিগ্রি করে বেশি ভয়াবহতা লাভ করছে। কারণ রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি এবং মানুষের হতাহত হওয়ার সংখ্যা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করছে। বিভিন্ন সময়ে এসব দুর্যোগে হতাহতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। অনেক সময় পাহাড়ধসের দেড়-দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও মাটিচাপা পড়া ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে একটি-দুটি করে মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। সেই হিসেবে ক্ষণে ক্ষণে মৃতের সংখ্যা শুধু বেড়েই চলে। এমনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এখন সাংবাৎসরিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্মরণাতীতকালে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি ছিল গত ১১ জুন ২০১৭ থেকে প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে উপকূলবর্তী পাঁচটি জেলা তথা- চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙামাটি ইত্যাদিতে ব্যাপক পাহাড়ধস দেখা দেয়। এ সম্পর্কিত অতীতের নিরীক্ষাগুলো বলছে- ২০০৭ সালের ১১ জুন চট্টগ্রামের সাতটি স্থানে পাহাড়ধসে মাটিচাপায় ১২৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০০৮ সালের ১৮ আগস্ট চট্টগ্রামের লালখান বাজার মতিঝর্ণা এলাকার পাহাড়ধসে চার পরিবারের ১২ জনের মৃত্যু হয়। ২০১১ সালের ১ জুলাই চট্টগ্রামের টাইগার পাস এলাকায় বাটালি হিলের ঢালে পাহাড় ও প্রতিরক্ষা দেয়াল ধসে ১৭ জনের মৃত্যু হয়। ২০১২ সালে ২৬-২৭ জুন চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান ও সিলেটে ৯৪ জনের প্রাণহানি ঘটে। ২০১৫ সালের ২৬-২৭ জুন টানা বর্ষণ, পাহাড়ধসে এবং পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারে ১৯ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল।

তার মানে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, প্রতি বছরই যখন পাহাড়ধস ঘটছে তখন তা ঘটছে আসলে বেশির ভাগই জুন-জুলাই মাসে। আবহাওয়া কিংবা ভূতাত্ত্বিকভাবে পূর্বাভাস থেকে যতদূর জানা যায়, সেখানে দেখা গেছে প্রতি বছরের জুন থেকে আগস্টে তিন মাস পাহাড়ধসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হতে পারে; কিন্তু তিন মাসের মধ্যে জুন মাসেই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি পাহাড়ধস হতে দেখা যায়; কিন্তু আগেই বলেছি বিগত ১১ জুন ২০১৭ তারিখের পাঁচটি জেলায় পাহাড়ধস সবকিছু গুলিয়ে দিয়েছিল। সেবারের এ দুর্যোগের অন্যতম একটি ভয়াবহ দিক ছিল দীর্ঘ সময়জুড়ে পাহাড়ধস হওয়া এবং এর কারণে পুরো এলাকার জনদুর্ভোগ চরমে ওঠা। শুধু তাই নয়- সেখানে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করা প্রান্তিকপর্যায়ের মানুষ তো প্রাণ হারিয়েছেই সেই সঙ্গে তাদের উদ্ধার করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর পাঁচ সদস্যের উদ্ধারকারী একটি চৌকস দল। যেখানে একজন মেজর এবং একজন ক্যাপ্টেন পদবির কর্মকর্তাও ছিলেন।

এখন আমরা আসি কেন এরকম পাহাড়ধসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়। এটা কি শুধু আমাদের বাংলাদেশেই ঘটে থাকে নাকি বিশ্বের সবখানেই ঘটে। এসব বিষয় বিস্তারিত আলাপ করতে হলে কিছু উদাহরণ সামনে নিয়ে আসা প্রয়োজন। ওপরে আমি যে বর্ণনাক্রমিক উপাত্ত পেশ করলাম তাতে দেখা যায় ক্রমে ক্রমে বাংলাদেশে এ দুর্ঘটনা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। কাজেই এগুলো দুর্যোগ সম্পর্কে শুধু আলোকপাত করলেই চলবে না, এর প্রতিরোধ কিংবা প্রতিকারসহ অন্যান্য বিষয়ে আমাদের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। আর এটি করতে হলে তার জন্য এক বছর দুই বছর কিংবা পাঁচ বছরের কোনো পরিকল্পনা তেমন কাজে আসবে না। সে জন্য প্রয়োজন হবে দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা।

যেসব কারণে পাহাড় ধসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত হয়, তার অনেক কারণ থাকলেও মূল কারণ আসলে জলবায়ু পরিবর্তন। ইতোপূর্বে যেসব পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটছে তার একটির চেয়ে আরেকটির তীব্রতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তা ছাড়া পাহাড়ের মাটির রকমফের অর্থাৎ সেখানকার সয়েল প্রোফাইল, সয়েল টেকচার, সয়েল স্ট্রাকচার ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে কোন পাহাড় কতটা শক্ত বা নরম। বাংলাদেশের ভূমিরূপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাহাড়গুলোর বেশির ভাগই বালিমাটির স্তর দ্বারা সৃষ্ট। আমরা আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ বিশ্বের অন্যান্য পাহাড়ি দেশের যে পাহাড় পর্বতগুলো দেখতে পাবো সেগুলোর বেশির ভাগই শক্ত পাথরের মতো মাটি দ্বারা সৃষ্ট। সে জন্য সেখানকার পাহাড়ধস কোনো নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা নয়। কালে-ভদ্রে যদিওবা কখনো-সখনো পাহাড়ধস হয়, তবু তা এত ভয়াবহ আকার ধারণ করে না।

বাংলাদেশের পাহাড়গুলোর উচ্চতা এত বেশি নয়। কেওক্রাডাং নামের পাহাড়টিই সবচেয়ে বেশি উচ্চতাসম্পন্ন। কাজেই এসব পাহাড় একদিকে যেমন বেশি উচ্চতাসম্পন্ন নয়, অন্যদিকে পাহাড়ের মাটিগুলো আলগা ও বেলে প্রকৃতির। পাহাড় কেটে মাটি সরিয়ে নেওয়া, পাহাড় কেটে নতুন নতুন রাস্তা তৈরি করা, পাহাড়ের ঢালে অপরিকল্পিতভাবে বসতি স্থাপন করা, পাহাড়ের প্রাকৃতিক গাছ-গাছালির বাগান সৃজন না করে শুধু গাছপালা কেটে উজাড় করে নেওয়া ইত্যাদি আরও নানাবিধ কারণে পাহাড়ধসের মতো ঘটনা অহরহ হচ্ছে। পাহাড়ের মাটি সরানোর কয়েকটি ধাপ রয়েছে। পাহাড় কেটে কেটে মাটি দিয়ে ইট পোড়ানো, অন্যত্র রাস্তা তৈরির জন্য মাটি স্থানান্তর, দ্রুত নগরায়ণের কারণে মাটি নিয়ে নতুন নতুন নিচু জায়গা ভরাট করার কাজে ব্যবহার ইত্যাদি ইত্যাদি। তা ছাড়া স্বাভাবিক কারণেই ইদানীং পর্যটনশিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার অংশ হিসেবে রাস্তা তৈরির জন্যও পাহাড়ের মাটি কাটা হচ্ছে।

বর্ষাকালে একটি নির্দিষ্ট সময় ও তাল অনুযায়ীই প্রতি বছর বৃষ্টিপাত সংঘটিত হয়ে থাকে যা অনেকটা রীতিসিদ্ধ। কিন্তু যেসব বছরগুলোতে পাহাড়ধস হয়েছে সেসব বছরগুলোতে আগাম বৃষ্টি কিংবা অতিবৃষ্টি, দীর্ঘ সময়ের বৃষ্টি ইত্যাদিও বড় কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এমনিতে বেলে মাটি, তার ওপর অধিক এবং দীর্ঘসময় বৃষ্টি, তা ছাড়া গাছ-গাছালি কাটা তো রয়েছেই, পাশে আরও যোগ হয় বেলে ও আলগা ধরনের মাটি। ইদানীং প্রকৃতিতে আরেকটি অভিশাপের কথা আমরা সবাই লক্ষ্য করছি। সেটি হলো ভূমিকম্প এবং বজ্রপাত। দুটিই একটি আরেকটির সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। কারণ ভূকম্পনের ফলে যেমন ভূপৃষ্ঠ কেঁপে ওঠে এবং মাটির ভিতর বাহির আন্দোলিত হয়, ঠিক তেমনি বজ্রপাতের সময়ও মৃদু হলেও ভূপৃষ্ঠ কেঁপে ওঠে। তখনও মাটির উপরিভাগ আন্দোলিত হয়ে পাহাড়ের ওপরের বেলে ধরনের মাটি আলগা হয়ে পড়ে। আর বালুকাময় মাটি বলে এর প্রভাব একটু বেশি পরিলক্ষিত হয়। আমরা এও জানি, ওই অঞ্চলে এ দুর্যোগের মাত্র সপ্তাহখানেক আগেই ‘মোরা’ নামক একটি সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড় সেসব এলকাকে আন্দোলিত করে গেছে।

এসব পাহাড়ধসে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বেশি প্রাণহানির অন্যতম কারণ অপরিকল্পিত আবাসন। দেখা গেছে একশ্রেণির লোভী প্রভাশালীরা পাহাড় দখল করে তাতে আবার টাকার বিনিময়ে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষকে পাহাড়ের ঢালে কোনো রকম নিরাপত্তার কথা চিন্তা না করে ছোট ছোট বাড়িঘর তৈরি করে দিয়ে বিরাট অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয়। আর পাহাড়ের পাদদেশে বসতবাড়ি তৈরি করার ক্ষেত্রে কোনো রকম বাছ-বিছার না করে ঢালাওভাবে যেখানে-সেখানে মানুষকে থাকতে বাধ্য করে। সেখানে কোন পাহাড়ের মাটি কেমন, কোন পাহাড়ে থাকা নিরাপদ, কোনটি নিরাপদ নয় সেরকম কোনো ভাবনার সুযোগ থাকে না। এবারেও যে পাহাড়ধস হয়েছে তার মধ্যে এসব কারণেই জানমালের ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়েছে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তবুও বিভিন্ন সময় কথায় আছে, ‘চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে’। প্রতিবারেই দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার অনেক হাঁকডাক শোনা যায়। কিন্তু যখনই বিপদ কোনো রকমে কেটে যায় তখন আর ঠেকায় কে? আবার সব পর্যায় থেকেই বেমালুম ভুলে যায় সবাই। কি ভুক্তভোগী, কি সংশ্লিষ্ট এলাকা, কি সংশ্লিষ্ট বিভাগ কিংবা দপ্তর। সর্বশেষ ২০০৭ সালে পাহাড়ধসের পর এ বিষয়টি প্রতিরোধে একটি সুপারিশ প্রণয়নের জন্য ৩১ সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটি তখন ২৮টি কারণ চিহ্নিত করেছিল এবং ৩৬ দফা সুপারিশও প্রণয়ন করেছিল; কিন্তু বিগত দশ বছরেও এসব সুপারিশ আলোর মুখ দেখেনি বলে জানা গেছে। কারণ একটাই আর তা হলো বিপদ কেটে গেছে!

পাহাড়ধসের সঙ্গে পরিবেশের একটি বিরাট সম্পর্ক রয়েছে। পাহাড়ধস মানেই পরিবেশের বিপর্যয়। কাজেই পরিবেশের উন্নয়ন করতে হলে মহাপরিকল্পনার বিকল্প নেই। সেই মহাপরিকল্পনা নিতে হবে দীর্ঘমেয়াদি যা আমি আগেই উল্লেখ করেছি। বাড়িঘর পরিকল্পিতভাবে বানাতে হবে। প্রতিটি বাসযোগ্য পাহাড়ের চারদিকে শক্তিশালী বাউন্ডারি ওয়াল তৈরি করতে হবে। বর্তমানে যারা পাহাড়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন তাদের সরকারিভাবেই একটি নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যেতে হবে। সেটি করার জন্য সরকার সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থানীয় সরকারকে আর্থিক বরাদ্দসহ দায়িত্ব প্রদান করতে পারে। পাহাড়ে বাড়িঘর বানানোর একটি অবশ্য পালনীয় এবং সবার গ্রহণযোগ্য নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

যে বছর বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা বেশি ঘটবে বলে আবহাওয়ার পূর্বাভাস পাওয়া যাবে সে বছর আগে থেকেই পাহাড়ে বসবাসকারী জনগণকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে হবে। এসব কাজ করার জন্য অত্যাধিক বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট বরাদ্দ দিতে হবে। পাহাড়ে সমতল ভূমির সঙ্গে ২৬ দশমিক ৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি কোণে ঢাল থাকাটা আদর্শ। কিন্তু বাংলাদেশের পাহাড়ে তা কাটতে কাটতে ৬০, ৭০ কিংবা ৯০ ডিগ্রি পর্যন্ত ঢাল তৈরি করা হয়েছে। সেগুলো আদর্শ করতে হবে নতুবা নির্দিষ্ট দূরত্ব ঠিক রেখে নিরাপত্তা দেয়াল তৈরি করে দিতে হবে। পাহাড় থেকে কমপক্ষে ৩০০ থেকে ৫০০ মিটার দূরে বাড়িঘর তৈরি করতে হবে। এসব বিষয়ে বর্তমান সরকারের বিভিন্ন সংস্থা সরকারি নির্দেশে তৎপর রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে; কিন্তু এ তৎপরতা কোনো অজুহাতেই বন্ধ না করে সামনে চালিয়ে নিতে হবে। তাহলেই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসবে।

লেখক: কৃষিবিদ ও রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়


নতুন অর্থবছর শুরু হলেও বাস্তবায়ন নিয়ে ভাবনা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ড. মিহির কুমার রায়

বিগত ৬ জুন সংসদের অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী জাতীয় সংসদে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব সংসদ উপস্থাপন করেন। এর আগে বাজেটে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর ব্যয় সম্পর্কিত ৫৯টি দাবির ওপর ভোট গ্রহণ করা হয়। এসব মঞ্জুরি দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে বিরোধী দলের ছয়জন সংসদ সদস্য মোট ২৫১টি ছাঁটাই প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এসব দাবির বিপরীতে যে ছাঁটাই প্রস্তাবগুলো আসে তার মধ্যে তিনটির ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। বিভাগগুলো হলো- আইন ও বিচার বিভাগ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় খাত। আলোচনার পর তা কণ্ঠভোটে নিষ্পত্তি করা হয়। বাজেটটি প্রস্তাবের পর এর ওপর প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, অর্থমন্ত্রীসহ ২৩৬ জন সংসদ সদস্য সাধারণ আলোচনায় অংশ নেন। গত রোববার ৩০ জুন পাস হওয়া এ বাজেট ১ জুলাই থেকে কার্যকর হচ্ছে। এখানে উল্লেখ্য, এ বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়।

সংসদে বাজেট অধিবেশন

গত ১১ জুন থেকে সংসদে বাজেট অধিবেশনে আলোচনায় অংশ নেন আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র এমপিরা, যা ৩০ জুন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। বড় কোনো সংশোধনী ছাড়াই জাতীয় সংসদে অর্থ বিল উত্থাপন হয়েছে এবং পাসও হয়েছে। এবারের বাজেটে উত্থাপিত প্রস্তাবগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল: এক. ১৫ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি। এ নিয়ে সংসদের ভেতরে-বাইরে নানা মহলে বেশ আলোচনা-সমালোচনা হলেও এটি বহাল রয়েছে; দ্বিতীয়ত. বাজেটে ব্যক্তির সর্বোচ্চ করহার ৩০ শতাংশ প্রস্তাব করা হলেও সংসদ তা গ্রহণ করেনি। এর পরিবর্তে সর্বোচ্চ কর বিদ্যমান ২৫ শতাংশই বহাল থাকছে; তৃতীয়ত. বাজেট প্রস্তাব পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের ওপর ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স বসানোর কথা বলেছিলেন অর্থমন্ত্রী। এতে বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন আপত্তি থাকলেও তা আমলে নেওয়া হয় নাই। সংশোধনী বাজেটে আগের মতোই ৫০ লাখ টাকা লাভের ওপর কর আরোপের সিদ্ধান্ত অব্যাহত থাকছে। এর ফলে পতনের মধ্যে থাকা বাজার আরও খারাপের দিকে যাবে মন্তব্য করে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষ এ কর বাতিলের দাবিতে বিবৃতিও দিয়েছে। যদিও এনবিআর এ কর প্রত্যাহার করবে না বলে জানা গেছে; চতুর্থত. নতুন অর্থ বিলে আয়কর ও কাস্টমস-সংক্রান্ত সামান্য কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশেষ করে দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের চাপে বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং হাই-টেক পার্কগুলোর কর অবকাশ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অর্থাৎ এসব অঞ্চল ও পার্কের কর অবকাশ সুবিধা আগের মতোই বহাল থাকছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক অঞ্চলে স্থাপিত শিল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি শুল্কও আগের মতো শূন্য শতাংশ রাখা হয়েছে; পঞ্চমত. প্রস্তাবিত বাজেটে বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণ বা উন্নয়নের জন্য ডেভেলপারদের আমদানি করা যন্ত্রপাতির শুল্কমুক্ত সুবিধা বাতিল করে ১ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয। শিল্প স্থাপনের মূলধনি যন্ত্রপাতিতেও ১ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়। এ ছাড়া বিনিয়োগকারীদের জন্য শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা বাতিল করা হয়; ষষ্ঠত. সংসদ সদস্যদের গাড়ি আমদানিতে শুল্ক আরোপের প্রস্তাবটি শেষ মুহূর্তে বাতিল করা হয়; অষ্টমত. কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া নিতে রিটার্ন জমার বিরূপ প্রদর্শনের শর্তে পরিবর্তন আসছে। সেক্ষেত্রে পৌর এলাকা বা গ্রামাঞ্চলে এ বিরূপ প্রদর্শনের প্রয়োজন পড়বে না। তবে সিটি করপোরেশন এলাকায় তা প্রদর্শন করতে হবে। সর্বশেষে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতারা বলেন, ‘এটি একটা গতানুগতিক বাজেট। উচিত ছিল উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে রাখা, পরিচালন ব্যয় আরও কমানো। ঋণ যাতে কম নিতে হয়, সেই ব্যবস্থা করা উচিত ছিল। প্রত্যক্ষ করের দিকে নজর দেওয়া উচিত ছিল। আমাদের দেশে যারা আয় করে, তারা ট্যাক্স দেয় না। ঋণখেলাপ যদি বন্ধ করা না যায়, তাহলে আমাদের অর্থনীতি হুমকিতে পড়বে। আমাদের বর্তমান সমস্যাগুলো অর্থনৈতিক কারণে তৈরি হয়নি। এটা হয়েছে জবাবদিহিতার অভাবে এবং সুশাসন না থাকায়। দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রসার ঘটেছে, যা টেনে ধরার কোনো উপায় রাখা হয়নি।’

বাজেট বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ কি হতে পারে

সংসদে বিরোধী দলের সদস্যরা প্রস্তাবিত বাজেটকে গতানুগতিক হিসেবেই দেখছেন। তাদের ভাষ্যমতে, অর্থনীতির চলমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় এতে কোনো নতুনত্ব আনা হয়নি। তবে প্রস্তাবিত বাজেট পাসের মাধ্যমে সরকার নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাবে বলে মনে করছেন সরকারদলীয় সংসদ সদস্যরা। এ বিষয়ে জাতীয় সংসদের সরকারদলীয় চিফ হুইপ বলেন, ‘সব সময়ই আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের বিষয়টি আমাদের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাজেট পরিকল্পনায় থাকে। তিনি ধাপে ধাপে ওই লক্ষ্যটায় যাওয়ার চেষ্টা করেন। সব সময়ই বাজেট করার আগেই তিনি এটা খেয়াল রাখেন। তিনি জনগণকে যে ওয়াদা করেছেন, সেটা প্রতিফলন থাকবে বলে আমি মনে করি। যে বাজেট প্রস্তবটা এসেছে তার অধিকাংশই পাস হয়েছে।’ এখন নিরপেক্ষ বিশ্লেষকদের মতামতটা ভিন্ন যেমন ১. বাংলাদেশের মতো একদিকে সীমিত সম্পদ, অন্যদিকে দ্রুত উন্নতির আকাঙ্ক্ষা পোষণকারী একটি দেশের বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সব সময়ই চ্যালেঞ্জিং। তবে এবার এমন কিছু চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে, যেগুলো অন্তত দেখা যায়নি। সম্প্রতি খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশেরও ওপরে উঠে গেছে। এ হারে মূল্যস্ফীতি থাকলে বিশেষত প্রান্তিক শ্রেণির মানুষের কষ্ট বেড়ে যায়। দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থানরত মানুষের সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। তখন সরকারকে বাধ্য হয়ে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বেশি বরাদ্দ দিতে হয়। ফলে অন্যান্য প্রয়োজনীয় উন্নয়নমূলক খাতে বরাদ্দ কমে যায়; ২. ইতোমধ্যে রিজার্ভ উদ্বেগজনক পরিমাণে কমে গেছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিদেশি বিনিয়োগ আসে না। কারণ তখন বিনিয়োগকারীরা ভেবে নেয়, এ দেশ থেকে বিনিয়োগের ফল হিসেবে প্রাপ্য মুনাফা তারা নিতে পারবে না; ৩. মুদ্রা বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশ একটা সময় পর্যন্ত বেশ সাফল্য দেখালেও সাম্প্রতিক সময়ে তা দেখা যাচ্ছে না। বিশেষত অর্থনীতিতে যে হারে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, সেই হারে দারিদ্র্য কমছে না। শহর-গ্রামের উদ্বেগজনক ব্যবধানের পাশাপাশি ঢাকা-চট্টগ্রামের তুলনায় বরিশাল ও খুলনার মতো এলাকার পিছিয়ে থাকা বা আঞ্চলিক বৈষম্যও চিন্তার বিষয়; ৪. এ পরিস্তিতি সামাল দিতে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। তবে একটি আমদানিনির্ভর দেশে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক কমানো যেত। তাতে বিভিন্ন আমদানি পণ্যের দাম কমানোর সম্ভাবনা ছিল। আমাদের আমদানিকৃত পণ্যের বেশির ভাগ হলো কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য ও শিল্পের যন্ত্রপাতি; শুল্ক হ্রাসের সুবিধা নিয়ে এগুলোর আমদানি বাড়লে দেশে উৎপাদন বাড়ত। এতে সরবরাহ বেড়ে পণ্যমূল্য কমে যেত। তবে ব্যষ্টিক অর্থনীতি ব্যবস্থাপনায় সব সময়ই কিছু ট্রেড অফ থাকে। এক্ষেত্রে ট্রেড অফ হলো এক্সচেঞ্জ রেট বা বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ওপর বেশি আমদানির নেতিবাচক প্রভাব। এমনিতেই আমাদের বিনিময় হার বেশ কিছু দিন ধরে ঊর্ধ্বমুখী। অর্থাৎ টাকার দাম নিম্নমুখী। বেশি আমদানি হলে টাকার মান আরও কমে যায়। এর ফলে পণ্যমূল্য বেড়ে যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ সিদ্ধান্তের ফলস্বরূপ ইতোমধ্যে ডলার এক লাফে ১১৭ টাকায় উঠেছে। ফলে সরকারকে আমদানিতে শুল্কহার হ্রাসের পাশাপাশি ট্রেড অফ মোকাবিলারও সমন্বিত কার্যক্রম নিতে হবে; ৫. এখনো ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সরকারের প্রায় নিয়মিত সভা হয়। নিছক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সভা করে, তাদের পরামর্শ দিয়ে বা তাদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়ে তো এ সমস্যার সমাধান হবে না। পণ্যের দাম বৃদ্ধির পেছনে যারা কারসাজি করে, তাদের বিরদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ না নিলে কোনো কাজ হবে না। এখন তো মাঝে মাঝেই দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নানা কর্তৃপক্ষের অভিযান দেখি। কিন্তু অভিযানের নামে বাস্তবে কী ঘটে, কেউ জানে না; ৬. মূল্যস্ফীতি কমাতে গিয়ে ব্যাংক ঋণে সুদের হার বৃদ্ধি নিয়ে ব্যবসায়ী সমাজ উদ্বিগ্ন। এর পরে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিষয়টি এ রকম যে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দিয়ে আমদানিনির্ভর দেশে মূল্যস্ফীতি কমানো যায় না। আমাদের এখানে পুঁজিবাজার ঠিকমতো কাজ না করায় শিল্পে পুঁজি সরবরাহ করতে পারছে না। শিল্প বা ব্যবসায়ের পুঁজি আসে প্রধানত ব্যাংক ঋণ থেকে। ফলে সুদের হার বৃদ্ধি তহবিল ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। ইতোমধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বেশ কমে গেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি পড়ছে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ওপর। কর্মসংস্থান কম হলে দারিদ্র্যসীমার নিচের লোক বেড়ে যাবে। সাধারণ মানুষের জন্য জীবনধারণ কঠিন হয়ে পড়বে; ৭. দেশের ব্যাংক খাতের অবস্থা করুণ- এটা তো বলাই যায়। খেলাপি ঋণ বেড়েই চলেছে এবং এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান নিয়েও প্রশ্ন আছে। কারণ পুনর্তফশিলিকৃত ঋণ, আদালতে আটকে থাকা ঋণ এবং অবলোপনকৃত ঋণকে খেলাপি ঋণের হিসাবে আনা হয় না। এর ফলে ব্যাংকগুলো তাদের মধ্যবর্তী দায়িত্ব পালন করতে পারছে না; আমানত সংগ্রহের ওপরেও এর প্রভাব পড়ে। সুশাসনের অভাব, যোগসাজশের ভিত্তিতে ঋণদান ইত্যাদি বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিছুদিন ধরে চেষ্টা করছে, তবে সাফল্য আসছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেশ কিছু পদক্ষেপ, বিশেষত ব্যাংক একীভূতকরণ কর্মসূচি তো ইতোমধ্যে বেশ সমালোচনার মধ্যে পড়েছে। বিশ্বের বহু দেশে ব্যাংক একীভূতকরণ হয়েছে। সেসব অভিজ্ঞতা আমাদের বিবেচনায় নেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। তা ছাড়া যেসব ব্যাংক পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত, তাদের একীভূতকরণে সংশ্লিষ্ট সংস্থা শুধু নয়, সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের মতো নেওয়া উচিত। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- আমানতকারীরা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে তাদের টাকা ফেরত নিতে চাইলে কোনো বাধা দেওয়া যাবে না; ৮. এবার বাজেটের অর্থায়ন নিয়েও আলোচনা আছে। একদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর লক্ষ্যমাত্রার ধারে কাছেও যেতে পারছে না; আবার পাইপলাইনে থাকা বিদেশি অর্থেরও ব্যবহার প্রত্যাশিত মাত্রায় ঘটছে না। আমাদের জিডিপি ও রাজস্বের অনুপাত বিশ্বে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। এনবিআরকে তো রাজস্ব বাড়াতেই হবে। রাজস্ব না বাড়ায় সম্প্রতি দেখা গেছে, সরকার ব্যাংক খাত থেকে বেশি ঋণ নিয়েছে। এ কারণে বেসরকারি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক দিন ধরেই আমরা এ কথা বলে আসছি, করের হার না বাড়িয়ে এখানে করের আওতা বাড়ানো দরকার। গ্রামাঞ্চলে বহু দোকান আছে, যারা নির্দিষ্ট পরিমাণ মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট দিতে পারে। তাদের অনেকে আয়করের আওতায়ও আসতে পারে। যারা ট্যাক্স শনাক্তকরণ নম্বর থাকা সত্ত্বেও রিটার্ন দাখিল করেন না, তাদের শনাক্ত করা জরুরি; ৯. এডিপি নিয়ে একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি চলছে বহু বছর ধরে। দেখা যায়, অর্থবছরের প্রথম সাত-আট মাসে বড়জোর ৪০ শতাংশ বাস্তবায়িত হলো, বাকিটা স্বল্প সময়ে তাড়াহুড়োর মাধ্যমে কাজ করে ৮০-৮৫ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়। এটা করতে গিয়ে কাজের মান খারাপ হয়। কখনো কাজ না করেই বিল তুলে নেওয়া হয়। এখানে ভালো কাজের জন্য পুরস্কার; ব্যর্থতার জন্য শাস্তির ব্যবস্থা থাকলে এডিপি বাস্তবায়নের প্রচলিত ধারায় পরিবর্তন সম্ভব; ১০. এডিপিতে বিদেশি অর্থায়নের সহজ উৎস ব্যবহারে সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতার কথাও বেশ আলোচিত। এতে বর্তমানে পাইপলাইনে থাকা বিদেশি অর্থের পরিমাণ এ উৎস থেকে আসা গত ১০ বছরের মোট অর্থের সমান হয়ে গেছে। তাই বহুপক্ষীয় উৎস থেকে আসা ঋণ ব্যবহারে মনোযোগ বেশি দেওয়া উচিত। কারণ এ ধরনের ঋণে শর্ত কিছু থাকলেও সুদের হার ও পরিশোধের সময় দ্বিপক্ষীয় উৎসের চেয়ে আমাদের দেশের জন্য অনেক ভালো। তাই সরকার সার্বিক বিষয়গুলো বিবেচনায় নেবে এই প্রত্যাশা রইল।

লেখক: অধ্যাপক (অর্থনীতি), সাবেক পরিচালক, বার্ড (কুমিল্লা)


আপনি আমি সচেতন হলেই জলাবদ্ধতা দূর হবে

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
কৃষিবিদ মো. বশিরুল ইসলাম

টানা বৃষ্টি হলেই মহানগরীগুলোতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। পথঘাটগুলো কূল-কিনারাহীন নদী হয়ে যায়। যারা বাড়ি-ঘর, মার্কেট নির্মাণ করেন তারা কি রাজউকে নির্দেশ শতভাগ মানেন? জলাবদ্ধতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের অ্যাকাউন্টে এভাবেই লেখেন চন্দ্রশিলা। জলাবদ্ধ এলাকার ছবি জুড়ে দিয়ে তিনি আরও লেখেন, ‘দেশের মানুষ কি যত্রতত্র পলিথিন, পানির বোতল, ময়লা ফেলা বন্ধ করেছেন? দায় কিন্তু সব রাষ্ট্রের একার হয় না, প্রতিটি মানুষের দায়-দায়িত্ব থাকতে হয়। কারণ সমস্যা হলে ভোগ করতে হয় প্রতিটি মানুষকেই।

হাসিব বাবু ফেসবুকে নিজের অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, জলাবদ্ধতা নিয়ে গত দুই দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রেকর্ড পরিমাণ স্ট্যাটাস দেখলাম! আচ্ছা ঢাকায় যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা তাহলে ফেলে কারা? এ পোস্টে ২ ঘণ্টার মধ্যে নিচে মন্তব্য পড়েছে ৩৬টি এবং দুজন শেয়ার করেছেন। নাজমুস শাহাদাত নামের এক ব্যক্তি মন্তব্য করেন, রাস্তার পাশে যতগুলো দোকান সব দোকানের ময়লা ঝাড়ু দিয়ে রাস্তায় ফেলে, মনে হয় রাস্তাটা একটা ডাস্টবিন! আর অলিগলিতে তো মূর্খ ভাড়াটিয়ারা প্যাকেটভর্তি ময়লা-আবর্জনা ছুড়ে ফেলে, পরে সেগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কি যে অবস্থা হয়। বলে বোঝানো সম্ভব না।

আসলে, রাজধানী ঢাকায় জলাবদ্ধতা নতুন কোনো বিষয় নয়। মাত্র ঘণ্টা খানেকের ভারী বৃষ্টিতেই পরিণত হয় পানির নগরীতে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, শুক্রবার সকাল সাড়ে ৬টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টায় ঢাকায় বৃষ্টি হয়েছে ৬০ মিলিমিটার। এরপরও অবশ্য হয়েছে, তবে তা ভারী বৃষ্টি ছিল না; কিন্তু সকালের বৃষ্টিতেই ধানমন্ডি, গ্রিন রোড, নিউ মার্কেট, মতিঝিল, আরামবাগ, কাজীপাড়া, রোকেয়া সরণি, দক্ষিণ খান, কল্যাণপুর, বিজয় সরণি, মালিবাগ, মৌচাকসহ রাজধানীর বেশির ভাগ এলাকার সড়ক ডুবে যায়। অনেক বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকেছে। কোথাও পানি ছিল হাঁটুসমান, কোথাও প্রায় কোমরসমান।

রাস্তায় গাড়িগুলোকে দেখা যায় রীতিমতো সাঁতরাতে।

আর এ জলাবদ্ধতার জন্য আমরা সরকার, মেয়র তথা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সবচেয়ে বেশি দায়ী করে থাকি। ফেসবুক থেকে শুরু করে এ দুর্ভোগ নিয়ে মিডিয়া নানা আলোচনা-সমালোচনা করি, লেখালেখি করি। এত এখন ফেসবুক কিংবা মিডিয়া আলোচনা হচ্ছে- গত চার বছরে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন জলাবদ্ধতা নিরসনে কমপক্ষে ৭৩০ কোটি টাকা খরচ করেছে। কিন্তু এর সুফল কতটা পাওয়া গেছে, তা শুক্রবার সকালের তিন ঘণ্টার বৃষ্টি দেখিয়ে দিয়েছে। গত ২৬ জুন ঢাকায় ৩ ঘণ্টায় ৬১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। সেদিনের বৃষ্টিতে ঢাকার অনেক এলাকার সড়কে পানি জমে থাকতে দেখা গেছে।

আমি মনে করি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যতই দায়ী করি না কেন- এটা মানবসৃষ্ট বেশি। কারণ আমাদের প্রতিদিন ব্যবহৃত ময়লা, প্লাস্টিক, পলিথিন ডাস্টবিনে না ফেলে ফেলছি রাস্তার। এ ময়লা, প্লাস্টিক, পলিথিন বৃষ্টির পানি সঙ্গে ড্রেনে পড়ে আবর্জনায় পূর্ণ হচ্ছে। গত কয়েক দিনে যেই পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে এর পানি যদি যথাযথভাবে ড্রেন দিয়ে না সরতে পারে তাহলে তো রাস্তাগুলো নদী হবেই। আমি স্বীকার করি ঢাকার মেয়রদের আরও বেশি সচেতন হওয়ার দরকার ছিল।

এবার আসি আমাদের কথায়- এ জলাবদ্ধতার জন্য আমরা কতটা দায়ী? আমাদের করণীয় কী? শুধু সরকার আর মেয়রকে দোষ দিয়ে যাচ্ছি, আমরা কি সরকার বা মেয়রদের কথা মানছি? আমরা কি আইন মানি? আমাদের ওপর কি আইনের প্রয়োগ করা হয়? দায়িত্বরত কর্মকর্তারা কি দায়িত্ব পালন করছে? নাহ! কেউ কিছুই মানছি না। শুধু একে ওপরের ওপর দোষ দিয়ে যাচ্ছি।

আপনি স্টুডেন্ট, অথচ আপনি ক্লাসে শিখছেন একটা ক্লাসের বাইরে এসে করছেন আরেকটা! তেমনি শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে সৌন্দর্যবর্ধনের সঙ্গে জড়িত ডেপুটি রেজিস্ট্রার ইব্রাহিম খলিল তার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আমরা কবে সভ্য হব?

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পর্যাপ্ত পরিমাণ ময়লার বিন স্থাপন এবং পরিচ্ছন্নকর্মীদের দ্বারা নিয়মিত পরিষ্কার করার পরেও ক্যাম্পাসকে ময়লা-আবর্জনা থেকে মুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। ‘আপনি নিজেই আপনার ক্যাম্পাসকে সুন্দর রাখতে পারেন না। ময়লা-আবর্জনায় সব সিঁড়ি থেকে শুরু করে ক্যাম্পাসের ফুলের গাছের টবে পর্যন্ত ফেলে রাখেন। কেউ কিছু বললে, বলেন মামা (ক্লিনার) আছে পরিষ্কার করার জন্য! হুম বলতে পারে তার সঙ্গে ঢাকার জলাবদ্ধতার সম্পর্ক কোথায়? এ লেখাটা ছোট হলেও গভীরতা অনেক বেশি। শুধু সেবা সংস্থাগুলোই নয়- নাগরিক হিসেবে প্রতিটি মানুষের কিছু দায়িত্ববোধ রয়েছে। আমরা ময়লা-আবর্জনাগুলো নিজ দায়িত্বে নির্দিষ্ট জায়গা ফেলতে পারি। কিন্তু সেটা না করে রাস্তার এখানে সেখানে কিংবা ড্রেনের মধ্যে ফেলে দিই। ড্রেন ছাড়া তো এলাকার পানি নিষ্কাশনের বিকল্প কিছু নেই।

নগর-পরিকল্পনার মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি আদর্শ শহরে ২৫ শতাংশ সবুজ এলাকা এবং ১০ থেকে ১৫ শতাংশ জলাশয়-জলাধার থাকার কথা। কিন্তু বিআইপির গবেষণার দেখা গেছে, ১৯৯৫ সালে ঢাকা শহরে সবুজ এলাকা ও ফাঁকা জায়গা ছিল ৫২ বর্গকিলোমিটারের বেশি। এখন সেটি প্রায় ৪৩ শতাংশ কমে ৩০ বর্গকিলোমিটারের কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে ১৯৯৫ সালে ঢাকা শহরের মোট আয়তনের ২০ শতাংশের বেশি ছিল জলাভূমি। এখন তা মাত্র ২ দশমিক ৯ শতাংশ। গত তিন দশকে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় মোট জলাভূমির প্রায় ৮৬ শতাংশ ভরাট করা হয়েছে। বিআইপি গবেষণাটি করেছে গত বছরে অর্থাৎ ২০২৩ সালে। এই গবেষণার তথ্যানুযায়ী, ঢাকা শহরে একদিকে সবুজ আচ্ছাদিত এলাকা ও জলাশয় কমেছে, অন্যদিকে কংক্রিট আচ্ছাদিত এলাকার পরিমাণ বেড়েছে। গত তিন দশকে (১৯৯৫ সালের পর থেকে) ঢাকায় কংক্রিটের আচ্ছাদন প্রায় ৭৬ শতাংশ বেড়েছে।

এ তথ্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমাদের জলাভূমি অধিকাংশ ভরাট হয়ে আছে। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই বিভিন্ন সড়কে পানি জমে যায় হাঁটু সমান। ওয়াসা থেকে সিটি করপোরেশন খালগুলো বুঝে পাওয়ার পর কিছু এলাকায় সমস্যার সমাধান হলেও এখনো জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পায়নি মানুষ। দুই সিটি করপোরেশন বলছে, কিছু কিছু এলাকায় এখন বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ চলমান। যার কারণে ড্রেনগুলো দিয়ে পানি সরতে না পারায় পানি জমে থাকছে। অন্যদিকে, স্থায়ীভাবে কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে পরিকল্পিত সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকার কারণে। তবে এসব এলাকায় কুইক রেসপন্স টিম কাজ করে যাচ্ছে বলে সিটি করপোরেশন থেকে জানানো হয়।

ভাবতে কষ্ট লাগে, যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সাময়িকী ‘ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’-এর জরিপে বসবাসযোগ্য শহর হিসেবে বিশ্বের ১৭৩টি শহরের মধ্যে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার অবস্থান ১৬৮। এ দায় কার? একবার ভেবে দেখুন, পলিথিন, খাবারের প্যাকেট ও প্লাস্টিকের বোতলগুলো আমরা কোথায় ফেলছি? গৃহস্থালি বর্জ্য আমরা কোথায় ফেলছি? এ ব্যাপারে আমাদের ভাবতে হবে।

আপনি আমি যখন ঘুরতে বেড়াতে যাই তখন পানিটা খেয়ে বোতলটা রাস্তায় ফেলতে দ্বিধাবোধ করি না। আবার চিপস খেয়ে খালি প্যাকেটটা কোথায় ফেলতে হবে তা জানি না। সত্যি কথা, আমরা এখন উন্নত দেশে পরিণত হতে পারিনি। কিন্তু আপনি কিন্তু প্রতিনিয়ত উন্নত দেশের কার্যকলাপ ফলো করেন। তবে কেন তা আপনার দেশের বা আপনার শহরের বেলায় নয়? ঢাকার ড্রেনগুলো কি আপনার ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের বোতল এবং প্যাকেটে ব্লক হয়ে যায় না? অনেকেই বলে সবাই ফেলে আমি একা এতটা সচেতন হয়ে কি হবে! কিছু হবে? আমার জবাব অবশ্যই হবে, পরিবর্তন এবং অব্যাশটা একজন একজন করেই করতে হয়।

ঢাকায় নদী রয়েছে, এটা আমাদের ভাগ্যের ব্যাপার। বিশ্বের অনেক দেশের রাজধানী ঘিরে কোনো নদীই নেই। কিন্তু আমরা ঢাকার চারপাশের নদীগুলোকে নষ্ট করে ফেলেছি। ঢাকা শহরের মাঝেও অতীতে খাল, বিল-ঝিল, দিঘি, পুকুর ও জলাভূমি ছিল। বৃষ্টির পানি ওই সব খাল দিয়ে নিষ্কাশিত হয়ে বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার চারপাশে নদী ও অন্যান্য জলাভূমিতে জমা হতো। মানুষ অপরিকল্পিত দালানকোঠা ও রাস্তাঘাট নির্মাণ করে সেগুলোর নামনিশানা মুছে গেছে আজ।

আমাদের হিসাব করে দেখা দরকার জলাবদ্ধতার কারণে সরকারি বা ব্যক্তিপর্যায়ে যে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে তা কি কোনোভাবেই জলাভূমি ভরাট করে নগরায়ণকে সমর্থন করে? তাহলে দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কেন রক্ষা করতে পারছে না খাল আর জলাধার। এখানেই প্রশ্নবিদ্ধ হয় আমাদের আইন ব্যবস্থা এবং আইন প্রয়োগে সদিচ্ছা। সভা-সেমিনারে সহজেই দায়ী করা যায় কিছু ব্যক্তিকে। অবশ্যই জলাবদ্ধতায় নাকাল নগরবাসীর কাছে তাদের দায়বদ্ধতা আছে। তবে নগরবাসী বুঝতে পারে সমস্যার মূল, শাখা-প্রশাখা অনেক গভীরে। যতদিন পর্যন্ত নগরায়ণে অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট প্রাধান্য পাবে, কতিপয় গোষ্ঠীর অর্থলিপ্সার কাছে উপেক্ষিত হবে মানুষ, সামাজিক মূল্যবোধ ও পরিবেশ, ততদিন প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগে আমরা বারবার বিপর্যস্ত হব।

প্রতিদিন সকাল হওয়ার আগে ঢাকা সিটি করপোরেশনের ক্লিনাররা ঢাকাকে চকচকে করে রাখে। বিশ্বাস না হলে এক দিন ভোরে এই প্রাণের শহরটাকে একটু ঘুরে দেখেন। অথচ আমরা ঘুম থেকে উঠে অফিসে যাই রাস্তায় ময়লা ফেলতে ফেলতে, স্কুল, কলেজ, ভার্সিটিতে বিদ্যা অর্জন করতে যাই রাস্তায় ময়লা ফেলতে ফেলতে। পরিবেশবাদী মিটিং করতে যাই রাস্তায় ময়লা ফেলতে ফেলতে! আমরা তো সবাই জমিদার! সবকিছুই দুই মেয়র করবে! আমার ভাষায় আমরা হচ্ছি এক টাইপের অভদ্র জমিদার।

ঢাকায় প্রতিদিন হাজার হাজার নতুন মানুষ প্রবেশ করে, তারা বেশির ভাগই মফস্বল থেকে আসে। তাদের মধ্যে এখনো ওই অভ্যাসটা নেই। কিন্তু তারা যদি ঢাকায় প্রবেশ করে দেখে সবাই নির্দিষ্ট স্থানে (ডাস্টবিন) ময়লা ফেলে, যেখানে-সেখানে ময়লা ফেললে পুলিশ জরিমানা করে। অথবা কেউ একজন ময়লা ফেললেই আরেকজন পাশ থেকে বলছে, প্লিজ ময়লাটা কষ্ট করে একটু ডাস্টবিনে ফেলুন, না হয় পুলিশ আপনাকে জরিমানা করবে। এটাও বলতে পারেন আমরা সবাই নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলি প্লিজ আপনিও ফেলুন। আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি মানুষ কখনোই বেখুশি হবে না। আমাদের দেশের একজন শ্রমিক উন্নত দেশে গিয়ে কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে সেই দেশের আইন-কানুন এবং পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়। শুধু উন্নত দেশে কেন? আমরা যখন ক্যান্টনমেন্টের ভিতর প্রবেশ করি তখন সব আইন-কানুন এবং পরিবেশের সঙ্গেও মেনে চলি।

একটু গভীরভাবে জলাবদ্ধতার কারণ যদি আমার খুঁজতে যাই তবে কয়েকটি বিষয় উঠে আসে। যেমন- জলাশয়, খাল-বিল, নদী-নালা ভরাট, পানি নিষ্কাশন তথা বৃষ্টির পানি বেরিয়ে যাওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকা। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে নগরীর খালি জায়গা কমে গেছে। অত্যন্ত ঘনবসতি হওয়ায় পয়ঃনিষ্কাশন ক্ষমতা অকার্যকর হয়ে গেছে, ডাস্টবিন ছাড়া যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলে রাখা হয়। ফলে পাড়া-মহল্লার পানি নিষ্কাশনের ড্রেন বন্ধ হয়ে যায়। বর্ষায় অতিরিক্ত খোঁড়াখুঁড়ি, ফলে একটু বৃষ্টি হলেই পুরো রাস্তাঘাট তলিয়ে যায়।

এক সময় পলিথিন ব্যাগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হলেও বেশ কয়েক বছর ধরে এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। যার কারণে কাঁচাবাজার, হাটবাজার এবং দোকানপাটে এর ব্যবহার আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। পলিথিনগুলো ড্রেন, খাল এমনকি নদ-নদীর তলদেশের গভীরতা কমিয়ে দিচ্ছে। ড্রেন পরিষ্কার করে ময়লা ড্রেনের পাশেই ফেলে রাখা হয়। সামান্য বৃষ্টিতে সে ময়লা আবার ড্রেনে গিয়েই পড়ে। সময়মতো বর্জ্য পরিষ্কার করা হয় না। নগরীতে ছোট-বড় অনেক ডাস্টবিন দেওয়া হলেও সেগুলোর ব্যবহার নেই বললেই চলে। জলাবদ্ধতা সৃষ্টির পেছনে আরেক অভিশাপ বলা যেতে পারে নির্মাণাধীন ভবনগুলো থেকে তৈরি উপজাতগুলোকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভবন তৈরির কাঁচামাল এনে জড়ো করা হয় রাস্তার ওপর। তার পর সেখান থেকে নিয়ে তৈরি করা হয় স্থাপনা।

ঢাকা জলাবদ্ধতা সমস্যা-সমাধানে গণসচেতনা সৃষ্টি করতে হবে। এ সমস্যা এক দিনে সৃষ্টি হয়নি। তাই রাতারাতি নিরসন করাও যাবে না। তবে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেগুলো স্বচ্ছতার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে। বিদ্যমান খালগুলো দখলমুক্ত ও খনন করে পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। খাল, ড্রেন পরিষ্কার রাখতে হবে। কোথায়ও যেন পলিথিন, প্লাস্টিক বা আবর্জনা আটকে না থাকে সেদিকে
নাগরিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। যেখানে-সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং তা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে। বিল্ডিং কোড অনুযায়ী বাড়ি-ঘর, অফিস, আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রথম পর্যায়ে সরকারি স্থাপনার ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টা মাথায় নিয়ে এখন পরিকল্পনা করতে হবে। কেননা এখন ঘন ঘন বৃষ্টি হচ্ছে, অসময়েও। এ ছাড়া হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী অনতিবিলম্বে ঢাকার নদীগুলোর সীমানা নির্ধারণ করে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে। সংসদ সদস্য এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলররা তার এলাকার জলাভূমি রক্ষার দায়িত্বে থাকবে। এ ক্ষেত্রে সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোর কাছে তারা দায়বদ্ধ থাকবে।

আপনি আমি সচেতন হলেই ঢাকা বাঁচবে। অবশ্যই এ জলাবদ্ধতা দূর হবে। যানজট দূর হয়ে। আলো আসবেই। আশাবাদী।

লেখক: উপপরিচালক শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়


শিক্ষাবিদের সামাজিক ভূমিকা 

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

বহু ভাষাবিদ পণ্ডিত ও প্রাচ্যের অন্যতম ভাষাবিজ্ঞানী শিক্ষাবিদ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (জন্ম ১০ জুলাই ১৮৮৫, মৃত্যু ১৩ জুলাই ১৯৬৯) ছিলেন একজন খাঁটি বাঙালি ও ধর্মপ্রাণ মুসলমান। তিনি ধর্মীয় অনুভূতি অপেক্ষা জাতীয় অনুভূতিকে অধিক গুরুত্ব প্রদান করেন। জাতীয় ও ধর্মীয় চেতনা সম্পর্কে তার বক্তব্য: ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি। এটি কোনো আদর্শের কথা নয়, এটি বাস্তব কথা। মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙালিত্বেও এমন ছাপ রেখে দিয়েছেন যে মালা-তিলক-টিকিতে কিংবা টুপি-লুঙ্গি-দাড়িতে ঢাকার জো-টি নেই’। মুহম্মদ শহীদুল্লাহর এ দুঃসাহসিক উক্তি বাঙালির জাতীয় চেতনা শাণিতকরণে মাইলফলকের ভূমিকা পালন করে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার (১৯৪৭) পরপরই দেশের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে, না বাংলা হবে এ বিতর্ক সৃষ্টি হলে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে জোরাল বক্তব্য উপস্থাপন করেন তিনি। তার এ ভূমিকার ফলে পূর্ব বাংলায় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পথ প্রশস্ত হয়। ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে শহীদুল্লাহ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ভাষা আন্দোলনের সময় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে লেখনীর মাধ্যমে ও সভা-সমিতির বক্তৃতায় জোরাল বক্তব্য উপস্থাপন করে আন্দোলনের পথ প্রশস্ত ও গতি বৃদ্ধি করেন। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে ড. জিয়াউদ্দীন উর্দু ভাষার পক্ষে ওকালতি করলে ড. শহীদুল্লাহ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এর প্রতিবাদ করে বলেন, ‘বাংলাদেশের কোর্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার পরিবর্তে উর্দু বা হিন্দি ভাষা গ্রহণ করা হইলে, ইহা রাজনৈতিক পরাধীনতারই নামান্তর হইবে। ড. জিয়াউদ্দীন আহমদ পাকিস্তানের প্রদেশসমূহের বিদ্যালয়ে শিক্ষার বাহন রূপে প্রাদেশিক ভাষার পরিবর্তে উর্দু ভাষার পক্ষে যে অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন, আমি একজন শিক্ষাবিদরূপে উহার তীব্র প্রতিবাদ জানাইতেছি। ইহা কেবল বৈজ্ঞানিক শিক্ষনীতির বিরোধীই নহে, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের নীতিবিগর্হিতও বটে।’ (পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা, দৈনিক আজাদ, ১২ শ্রাবণ ১৩৫৪)।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে বিশাল জ্ঞান তিনি অর্জন করেছিলেন তা তাকে গোঁড়ামি অথবা অহংকারী করে তোলেনি। বরং এই বিশাল জ্ঞানরাজি তাকে দান করেছিল এক সুমহান ব্যক্তিত্ব। তিনি শুধু নিজধর্ম ইসলাম চর্চা করেননি অথবা আপন ধর্মে নিজেকে সঁপে দিয়ে অন্ধত্ববরণ করেননি। অন্যের ধর্মীয় পুস্তকাবলি পাঠ ও চর্চা করে তিনি দেখিয়ে গেছেন ধর্ম মানুষকে বেঁধে রাখতে পারে না। বরং ধর্ম মানুষকে দিয়েছে মহত্তম মুক্তি।

‘যে সমস্ত অবিবাহিত লোক সন্ন্যাসী হয়ে তাদের নামের সংগে ‘স্বামী’ এই বিশেষণ যোগ করে দেয়, ভূমিকা যেমন দয়ানন্দ স্বামী, সদানন্দ স্বামী ইত্যাদি, আমি তাদের মতো স্বামী নই। আমার স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও আমি তাদের মতোই স্বামী। আমার নাম জ্ঞানানন্দ স্বামী, জ্ঞান চর্চায়ই আমার আনন্দ।’ কথা কয়টি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৮৮৫-১৯৬৯) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয়বার অবসর গ্রহণকালে সংবর্ধনা সভায় বলেছিলেন। রসিকতা করে কথা কয়টি বলা হলেও ওর ভিতর নিহিত আছে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সম্পর্কে চিরন্তন সত্য কথা। প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন এমন একজন জ্ঞানসাধক যিনি আজীবন উক্ত সাধনায় একনিষ্ঠভাবে নিয়োজিত ছিলেন। প্রায় পৌনে এক শতাব্দীকাল ধরে অক্লান্তভাবে তিনি জ্ঞানচর্চা করে গেছেন। তিনি জ্ঞান সাধনায় এই যে অসাধারণত্ব অর্জন করেছিলেন তার জন্য তিনি কোনোদিন অহমিকা দেখাননি। তিনি ছিলেন শিশুর মতো সরল। হিংসা, ঈর্ষা, অহংকার কোনোদিন তার চরিত্রে ঠাঁই পায়নি। তিনি প্রায় অর্ধশতাব্দীকাল শিক্ষকতা করে কাটান। তার এই উজ্জ্বল মানবছায়ায় জ্ঞানের সুশীতল বারিধারা পান করে কতজন যে ধন্য হয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই।

মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সব সময় অসাধারণ হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করতেন। অসাধারণ কিছু শেখার এ স্পৃহাই যে তাকে এতগুলো ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভের স্পৃহায়তা করেছিল সে বিষয়ে দ্বিমতের অবকাশ নেই। ভাবতে আশ্চর্য লাগে তিনি ১৮টি ভাষার ওপর পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন। ভাষাগুলো হলো- বাংলা, ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, সংস্কৃত, প্রাকৃত, আরবি, পারসি, বৈদিক, আবেস্তান, তিব্বতী, উর্দু, হিন্দি, সিংহলী, মৈথিলি, উড়িয়া, আসামী এবং সিন্ধি। স্কুলজীবনেই তিনি বেশ কয়েকটি ভাষা আয়ত্তে এনেছিলেন। পারিবারিক ঐতিহ্য রক্ষার্থে শেখেন উর্দু এবং পারসি। বিদ্যালয় সূত্রে শেখেন ইংরেজি, বাংলা এবং সংস্কৃত। আর হওড়াস্ব বাসার প্রতিবেশীর নিকট থেকে উড়িয়া ও হিন্দি ভাষা শিখেছিলেন। তার জীবনের দুটি ঘটনা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এ দুটি ঘটনাকে তার বিস্তৃত জ্ঞান-সাধনার দিগদর্শন বলা যেতে পারে।

আরবি ছিল তার পরিবারের প্রিয় ভাষা। অথচ এ আরবি ত্যাগ করে তিনি সংস্কৃতে এন্ট্রানস পরীক্ষা দেন। এর কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলতেন, শিক্ষকের মারের ভয়ে। হুগলি জেলা স্কুলের তখনকার আরবি শিক্ষক নাকি কারণে-অকারণে ছাত্রদের বেদম প্রহার করতেন। শহীদুল্লাহ সাহেবের এটা পছন্দ হতো না। তাই তিনি আরবির পরিবর্তে সংস্কৃত পণ্ডিতের কাছে এসে ধরা দিলেন সংস্কৃতের শিক্ষার্থী হিসেবে। এমনিভাবে তিনি সংস্কৃত শিক্ষার উৎসাহ পেলেন। ১৯০৪ ইং সালে তিনি সংস্কৃতকে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে নিয়ে এন্ট্রানস পাস করেন। ১৯০৬ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফএ পাস করার পর তিনি হুগলি কলেজে ভর্তি হন সংস্কৃতে অনার্স পড়ার জন্য। এ সময় তিনি বেশ কিছুকাল ম্যালেরিয়া রোগে ভোগেন। বছর দুয়েক পড়াশোনা করতে পারেননি। কিন্তু তাতে হতোদ্যম হয়ে তিনি পড়েননি। কলকাতার সিটি কলেজ থেকে ১৯১০ সালে তিনি সংস্কৃতে অনার্সসহ বিএ পাস করেন। তার আমলে একজন মুসলমান ছাত্রের পক্ষে সংস্কৃতে অনার্স পাস করাটা আশ্চর্যজনক ছিল বৈকি।

আর একটি ঘটনা তিনি তখন বিএ (অনার্স) পাস করে সংস্কৃতে এমএ করার জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবেন কিন্তু সংস্কৃত বিভাগের কতিপয় শিক্ষক শ্মশ্রুবদন মুসলমান মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে পড়াতে অস্বীকার করলেন। সত্যব্রত শ্যামাশ্রয়ী এক ব্রাহ্মণ পণ্ডিত এই মর্মে আপত্তি তুললেন, বেদ বেদাভগ ব্রাহ্মণদের ছাড়া আর কারও পড়ার অধিকার নেই। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে বেশ গোলযোগের সৃষ্টি হলো। সংবাদটি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের বেড়া পেরিয়ে বাইরে এল। তৎকালীন চিন্তানায়কদের তুমুলভাবে আলোড়িত করল। মওলানা মুহম্মদ আলী কমরেড পত্রিকার দি লিংগুয়া ফ্রাঙ্কা অব ইন্ডিয়া’ প্রবন্ধের এক জায়গায় লিখলেন-

‘সংস্কৃত ও আরবিতে রচিত সাহিত্য ও দর্শনের অফুরন্ত খনি শ্রেষ্ঠ প্রত্ন সাহিত্যের শিক্ষর্থীকে যে আকৃষ্ট করত তাতে সন্দেহ নেই এবং বর্তমানের চেয়ে অধিক সংখ্যায় মুসলিম বিদ্যার্থীরা সংস্কৃত ভাষা শিক্ষা করুক-এই আশা পোষণ করে, আমরা বিশ্বাস করি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো পণ্ডিত জনৈক মুসলমান ছাত্রকে সংস্কৃত পড়াতে অস্বীকার করে শহীদুল্লাহ ঘচিত ব্যাপারের মতো যে ঘটনার সৃষ্টি করে, আর তার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না।’

বেঙ্গলি পত্রিকার সম্পাদক সুরেন ব্যানার্জীর মতো লোকও লিখলেন ‘টু ডে দিস অর্থডক্স পন্ডিটস শুড বিথ্রোন ইন টু দ্য গাঙ্গেজ’।

তবে সেবার অর্থডক্সির (গোঁড়ামি)ই জয় হয়েছিল। বাকবিতণ্ডার ফলে সৃষ্ট চাপে বাধ্য হয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর জন্যই তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব বিভাগটি খুলতে হয়েছিল। এ বিভাগের প্রথম এবং একক ছাত্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৯১২ সালে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বে এমএ পাস করেন। যদিও তিনি সংস্কৃতে এমএ পড়া থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন তবুও তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন সংস্কৃতে উচ্চ শিক্ষালাভ করবেন। সম্ভবত তিনি এই উপমহাদেশের সংস্কৃত ভাষার শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতদের একজন ছিলেন। সংস্কৃতে এমএ পড়া থেকে বঞ্চিত হওয়ার ফলে নতুন নতুন ভাষা শিক্ষার এক সম্ভাবনার দ্বার সবার সামনে খুলে গিয়েছিল।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সুপারিশক্রমে ও বগুড়ার নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী বাহাদুরের বদান্যতায় তিনি জার্মানিতে সংস্কৃতে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য একটি রাষ্ট্রীয় বৃত্তি পান। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তিনি ভালো মেডিকেল সার্টিফিকেট পাননি, তাই তার আর জার্মানি যাওয়া হয়নি; কিন্তু এতেও তিনি হতোদ্যম হয়ে পড়েননি। প্রাচ্যের জ্ঞানভাণ্ডার তাকে বারবার হাতছানি দিয়ে ডাকছিল। সে ডাকে তিনি সাড়া দিলেন ১৯২৬ সালে। তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগে অধ্যাপনা করছিলেন। দুই বছরের ছুটি নিয়ে প্যারিসের সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন নিজের খরচে। সেখানে তিনি বৈদিক, বৌদ্ধ, সংস্কৃত, তিব্বতী এবং প্রাচীন পারসি ভাষা সম্পর্কে গবেষণা শুরু করলেন। এর ফাঁকে ফাঁকে তিনি প্যারিসের ‘আর্কিভ ডি লা প্যারোল’ নাম ধ্বনিতত্ত্ব শিক্ষায়তনে ধ্বনিতত্ত্ব বিষয়ে শিক্ষালাভ করতে লাগলেন। সেখানে তিনি ‘লেস সনস ডু বেঙ্গলি’ নামে একটি গবেষণাপত্রের জন্য উক্ত শিক্ষায়তনের মানপত্র লাভ করেছিলেন। এদিকে সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ‘লেশাঁ মিস্ত্রিক’ নামক তার গবেষণা কর্মটি জমা দিয়ে জার্মানির ফ্রাইবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয় আসেন বৈদিক সংস্কৃত ও প্রাকৃত ভাষায় ব্যুৎপত্তি অর্জনের জন্য। কিন্তু ছুটি ফুরিয়ে এল। সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণির ডক্টরেট অব লেটারেচার ডিগ্রি নিয়ে ১৯২৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন।

অনুকূল স্বাস্থ্যবিষয়ক সার্টিফিকেট না পাওয়ায় ১৯১৩ সালে তার জার্মানিতে যাওয়া না হলে তিনি আইন বিভাগে ভর্তি হন। ১৯১৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ এলএলবি পাস করেন। ১৯১৫ থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত তিনি বশিরহাটে ওকালতিও করেছিলেন। তুলনামূলক ভাষা তত্ত্বে যিনি এমএ পাস তিনি হঠাৎ করে কেন আইন শিক্ষার দিকে ঝুঁকে পড়েন তা বলা মুষ্কিল। তবে এর পিছনে সম্ভবত এটাই প্রধান কারণ ছিল, ‘তিনি চাইতেন জ্ঞানারাজ্যের সর্বত্র ভ্রমণ করতে।’ ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হকের ভাষায় ‘হি ইজ এ ওয়াকিং ইনসাইক্লোপেডিয়া অব ওরিয়েন্টাল লোর’।

লেখক: সরকারের সাবেক সচিব, এনবিআর-এর সাবেক চেয়ারম্যান


এক মুক্তিযোদ্ধার কথা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
হায়দার আহমদ খান এফসিএ

১৯৭১ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ না নিয়ে চলে গিয়েছিলাম যুদ্ধে দেশকে স্বাধীন করতে। যুদ্ধের আসল উদ্দেশ্যই ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি। এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক সমস্যার সঙ্গে একপর্যায়ে ছাত্রদের সমস্যাও যোগ হয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম আগে জাতীয় সমস্যার সমাধান হওয়া দরকার সুতরাং যুদ্ধে যাওয়া। যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করে অনিয়ম, দুর্নীতি দূর করে মানুষের জীবনকে করতে হবে আরামদায়ক। সমাজে আনতে হবে সুশাসন। সেই স্বপ্ন নিয়ে আমার মতো বেঁচে থাকা মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দিন দিন কমছে। জানিনা প্রায় ৭০ বছর বয়সের মুক্তিযোদ্ধারা সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়া চিত্র দেখে যেতে পারব কি না।

গত কয়েক দিন ধরে দুর্নীতি, পেনশন স্কিম এবং সরকারি চাকরিতে কোটাপ্রথা নিয়ে আলোচিত হচ্ছে। হঠাৎ এমন সব একাধিক বিষয়ের সংবাদ একসঙ্গে আমাদের সামনে কেন? সরকারের কাজ সফলতার সঙ্গে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা। পরিকল্পনার শতভাগ সফল বাস্তবায়নেই সফলতা। তখনই জনগণের মঙ্গল সাধন হয়েছে দাবি করতে পারবে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটি সরকার। সরকারকে যদি বিচার করার কাজে বেশি ব্যস্ত থাকতে হয় তাহলে উন্নয়নের কাজ করবে কখন? অতীতের দিনের চেয়ে আগামীকাল বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

অনিয়ম, দুর্নীতির নতুন নতুন খবর প্রকাশের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে বলা চলে। আজকের নতুন খবর পিএসসির প্রশ্নপত্র নিয়ে। সংবাদটি পড়ে নিজেকে বড় অসহায় বোধ করছি। দেশের মানুষের মঙ্গলজনক কাজের পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করে থাকেন সেই দেশের কর্মকর্তরা। সেই কর্মকর্তাদের নিয়োগ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নিয়োগ পেতে বা নিয়োগ নিতে যদি অনিয়ম হয় তাহলে তার ফসলের ফলন চলতে থাকে অবসরে যাওয়ার দিন পর্যন্ত। সরকারের সব কর্মকর্তা সৎ এবং নিষ্ঠাবান হবেন তা যেমন সম্ভব না আবার দুর্নীতিবান কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে একটি দেশের সরকারের কাজ তাও মানা যায় না। একটি সফল সরকারের কাজ হবে দেশের জনগণের মঙ্গলজনক কাজটি আদায় করে নেওয়া।

গত কয়েক দিন ধরে সরকারের পেনশন স্কিম এবং সরকারি চাকরিতে কোটাপ্রথা নিয়ে আলোচিত হচ্ছে, চলছে আন্দোলন। বাংলাদেশ সরকারের নিয়োগে কোটাপ্রথা বর্তমান, যা নিয়ে আন্দোলন। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে বলতে চাই মুক্তিযোদ্ধারা রিলিপ চায় না। তারা চায় দেশের সব মানুষের উন্নতির জন্য মঙ্গলজনক পরিকল্পনা এবং কাজ। যে উদ্দেশ্য নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে তার শতভাগ বাস্তবায়ন মানে দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি। একজন অবিবাহিত মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধ করতে করতে যদি মারা যেতেন তাহলে কি তার সন্তানের লেখাপড়া, চাকরির বিষয় নিয়ে চিন্তা করার প্রয়োজন হতো? আজকে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের চাকরির জন্য কোটাপ্রথার প্রয়োজন অবশ্যই হতো না। যে মুক্তিযোদ্ধা জীবিত আছেন তার সন্তানের কথা আলাদাভাবে চিন্তা করতেও আমি বলব না। দেশের সব মানুষ যদি সুখে-শান্তিতে থাকে তাহলেই মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরাও ভালো থাকবে। এমনটাই মুক্তিযোদ্ধার চাওয়া। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের কথা আলাদাভাবে চিন্তা করতে গিয়েই দেখা দিয়েছে এ সমস্যা। আসল সমস্যা অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধারা সুখে-শান্তিতেই। অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা দেশের পাবলিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করে। পাবলিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান যদি বজায় রাখা যায় তাহলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কোটা পদ্ধতির প্রশাসনও লাগবে না। যোগ্যতার আসল ভিত্তি মেধা। মেধার ভিত্তিতে নিয়োগকৃত কর্মকর্তারা যদি দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে না যান তাহলে দেশের উন্নয়ন কেউ আটকিয়ে রাখতে পারবে না। পাবলিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়-দায়িত্ব সরকারের হতে। শিক্ষার উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং সব দায়-দায়িত্ব সরকারের। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে, যে দেশ রক্ত দিয়ে স্বাধীন হয়েছে সে দেশের উন্নয়নের সময় এত দীর্ঘ আশা করা যায় না বা মানা যায় না। বাংলাদেশের সংবিধান এবং অর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় সাময়িকভাবে কোটাপ্রথা থাকতে পারে। সরকারের কাজ দেশের মানুষের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন। আর্থিক অবস্থা উন্নয়নের প্রধান এবং টেকসই পথ শিক্ষাব্যবস্থা উন্নত করা। দেশের মানুষ মানসম্মত শিক্ষা পায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। আর তা যদি করতে পারা না যায় এবং যে শিক্ষাব্যবস্থা চলছে তার ফলে আমাদের সন্তানদের যোগ্যতা যদি এমন হয়: (১). বাংলায় শতকরা ৫৪ শতাংশ, (২). ইংরেজিতে শতকরা ১৯ শতাংশ এবং (৩). গণিতে শতকরা ২২ শতাংশ তাহলে সমাজে নানা অস্থিরতা দূর করা অনেক সময় কঠিন হবে। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার অধিকাংশ ছাত্ররা থাকে টেনশনে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্জনের আসল দাবিদার আমাদের ছাত্রসমাজ। বর্তমান বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় কোটাপ্রথা সংশোধিত করার দাবি রাখে। ছাত্রদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পেনশন নিয়ে আন্দোলন। মনে রাখতে হবে একজন চাকরিজীবীর আর্থিক সুবিধা কোনো অবস্থায় কমানো যায় না। সেই লক্ষ্য বিবেচনায় নিয়ে পেনশন স্কিম চালু করলে আন্দোলন করার সুযোগ থাকবে না বা প্রয়োজন হবে না।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত ছাত্র এবং শিক্ষকরা আন্দোলন করছেন, ক্লাস হচ্ছে না, লেখাপড়া হচ্ছে না। প্রধানত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে তার প্রভাব পরিলক্ষিত দেশের শুধু শিক্ষাব্যবস্থায়ই নয় ব্যবসা বাণিজ্যেও। সুতরাং সময়কে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত সব সমস্যার সমাধান করা।

লেখক: চেয়ারম্যান, এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (ইডিএ)


আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠায় মূল্যবোধ চর্চা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ড. মো. আব্দুস সোবহান পিপিএম

অনেক দিন ধরে মনে মনে ভাবছিলাম অবক্ষয় ও মূল্যবোধ নিয়ে কিছু লিখব। অবশ্য অনেকের প্রেরণা ও প্রেষণাও এর পেছনে কাজ করেছে। অবক্ষয়ের পেছনে অর্থনৈতিক অসমতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সাংস্কৃতিক ও জাতিগত উত্তেজনা, সামাজিক গতিশীলতার অভাব, প্রযুক্তির পরিবর্তন, পরিবেশের অবনয়ন, পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন, মিডিয়ার প্রভাব, ভুল তথ্য পরিবেশন করা ইত্যাদি দায়ী। আবার অবক্ষয়ের পেছনে অনেক সমাজ বিজ্ঞানীর অনেক মতামত ও উপলব্ধি রয়েছে। সেগুলো আমরা অনুসরণ করতে পারি। এ অবক্ষয়ের পেছনে এক ধরনের অসুস্থতাও কাজ করে যা আবার আসে দীর্ঘদিনের নীতিবর্জিত প্রতিযোগিতা, আচরণ, ব্যবহার, কাজ ও চলাচলের ওপর ভর করে। প্রাচীন সমাজেও নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক অবক্ষয়ের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। পাশাপাশি প্রাচীন সমাজে শুদ্ধাচার চর্চা ও নৈতিকতার চর্চাও বিদ্যমান ছিল, কখনো আবার প্রাচীনকালে সত্যের যুগের অস্তিত্বের কথাও জানা যায়। অভিন্ন মূল্যবোধ সহযোগিতা ও সম্মিলিত প্রয়াসকে উৎসাহিত করে। মূল্যবোধের মাধ্যমে ব্যক্তি নৈতিক বিচার এবং সঠিকতা যাচাই করে থাকে। মূল্যবোধ ব্যক্তিকে নিজের ও অন্যদের কাছে দায়বদ্ধ করে রাখে। মূল্যবোধ চর্চার ফলে নীতি ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্যগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য হয়। তা একটি সমাজের বিশ্বাস ও ঐতিহ্য তথা সংস্কৃতিকে প্রতিফলিত করে থাকে। তা সামাজিক নিয়ম ও আইন প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখে, তা ছাড়া মূল্যবোধ ন্যায়-বিচার, মমতা এবং অন্যান্য আদর্শের পক্ষে সামাজিক আন্দোলন ও সামাজিক সংস্কারকে পরিচালিত করে, সাংগঠনিক সংস্কৃতি গঠনে ভূমিকা রাখে। নেতারা সাধারণত অন্যদের অনুপ্রাণিত করতে এবং ইতিবাচক কাজের পরিবেশ গড়ে তুলতে মূল্যবোধের ওপর নির্ভর করেন। মূল্যবোধ কোনো সংগঠন বা সংস্থার কৌশলগত পরিকল্পনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নির্দেশনা দেয়। একজন শিশু বা কিশোরের বিকশিত হওয়ার নিমিত্তে মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়া হয়ে থাকে। মূল্যবোধের কারণে ব্যক্তি কোনো বিষয়ের সঠিকতা যাচাই এবং কোনো জটিল বিষয় সম্পর্কে সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ করে থাকে। মোট কথা মূল্যবোধ ব্যক্তি ও সামষ্টিক উভয় জীবনের জন্য মৌলিক আচরণকে প্রভাবিত করে, সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি করে এবং নৈতিকতার উন্নয়ন করে থাকে। এসব ইতিবাচক চর্চার মাধ্যমেই ধীরে ধীরে সভ্যতা আজ তার চূড়ান্ত পর্যায়ে এসেছে। আধুনিক সভ্যতার কিছু অন্ধকার দিকও রয়েছে, কিছু নিষ্ঠুর রাষ্ট্রনায়ক ও ক্ষমতাধর মানুষের অপরিনামদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে এ সুন্দর ধরণীর পরিবেশের ও প্রকৃতির প্রভূত ক্ষতি হয়েছে এবং হচ্ছে। যার ফলে মানুষের অধিকার তথা মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত হয়েছে।

অবক্ষয় বলতে মূলত বিচ্যুতি বোঝায় অর্থাৎ আদর্শ অবস্থা থেকে ব্যক্তি, গোষ্ঠী, সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের অবনয়ন অবক্ষয় হিসেবে বিবেচিত। সামাজিক অবক্ষয় বলতে সাধারণত একটি সমাজের মধ্যে সামাজিক কাঠামো এবং সমাজব্যবস্থার ভাঙনকে বোঝায়। সামাজিক অবক্ষয় জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গভীর এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে থাকে। সামাজিক অবক্ষয়ের ফলে সামাজিক কাঠামো দুর্বল হয়ে যায় এবং অর্থনৈতিক সুযোগগুলো দুষ্প্রাপ্য হয়ে যায়। যার কারণে বেকারত্বের হার এবং দরিদ্রের মাত্রা বৃদ্ধি পায় ও অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি হয়। ফলে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার সৃষ্টি হয় এবং বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয় ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে ঐতিহ্যগ্রত সামাজিক বন্ধন ও সংহতি ভেঙে যায়। তা জনস্বাস্থ্য ও ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে। তা ছাড়া সমাজের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য হুমকি সৃষ্টি করে থাকে। অবক্ষয়ের কারণে শিক্ষার প্রবেশাধিকার কমে যায় এবং শিক্ষার গুণগত মানের অবনয়ন ঘটে থাকে। সামাজিক অবক্ষয়ের ফলে সম্পদের অব্যবস্থাপনা এবং প্রকৃতি ও পরিবেশের সুরক্ষার প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে। পরিবার ও পারিবারিক সম্পর্কও দুর্বল করে।

অপরদিকে মূল্যবোধ হলো ব্যক্তির গভীরভাবে ধারণ করা বিশ্বাস যা ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি এবং আচরণ ও কাজকে পরিচালনা করে এবং অন্যদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার সুযোগ করে দেয়। এ মূল্যবোধ চর্চা ও অনুশীলন ব্যক্তিগত উন্নয়ন, সামাজিক সংহতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণসহ জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মূল্যবোধের তাৎপর্য অপরিসীম। মূল্যবোধের মাধ্যমে ব্যক্তি নিজেকে জানতে বা বুঝতে পারে, তাকে দিকনির্দেশনা এবং তার কাজের ধারাবাহিকতা ও সততা বজায় রাখতে সহায়ক হয়। মূল্যবোধের চর্চার ফলে ব্যক্তি এবং একটি দলের মধ্যে বিশ্বাস ও শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হয় এবং তার মাধ্যমে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান হয়ে থাকে। অভিন্ন মূল্যবোধ সহযোগিতা ও সম্মিলিত প্রয়াসকে উৎসাহিত করে। মূল্যবোধের মাধ্যমে ব্যক্তি নৈতিক বিচার এবং সঠিকতা যাচাই করে থাকে। মূল্যবোধ ব্যক্তিকে নিজের ও অন্যদের কাছে দায়বদ্ধ করে রাখে। মূল্যবোধ চর্চার ফলে নীতি ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্যগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য হয়। একটি সমাজের বিশ্বাস ও ঐতিহ্য তথা সংস্কৃতিকে প্রতিফলিত করে থাকে। সামাজিক নিয়ম ও আইন প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখে, তা ছাড়া মূল্যবোধ ন্যায়-বিচার, মমতা এবং অন্যান্য আদর্শের পক্ষে সামাজিক আন্দোলন ও সামাজিক সংস্কারকে পরিচালিত করে এবং সাংগঠনিক সংস্কৃতি গঠনে ভূমিকা রাখে। নেতারা সাধারণত অন্যদের অনুপ্রাণিত করতে এবং ইতিবাচক কাজের পরিবেশ গড়ে তুলতে মূল্যবোধের ওপর নির্ভর করেন। মূল্যবোধ কোনো সংগঠন বা সংস্থার কৌশলগত পরিকল্পনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নির্দেশনা দেয়। একজন শিশু বা কিশোরের বিকশিত হওয়ার নিমিত্তে মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়া হয়ে থাকে। মূল্যবোধের কারণে ব্যক্তি কোনো বিষয়ের সঠিকতা যাচাই এবং কোনো জটিল বিষয় সম্পর্কে সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ করে থাকে। মোট কথা মূল্যবোধ ব্যক্তি ও সামষ্টিক উভয় জীবনের জন্য মৌলিক আচরণকে প্রভাবিত করে, সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি করে এবং নৈতিকতার উন্নয়ন করে থাকে।

এখন আসা যাক- মানুষের মূল্য, সম্মান ও যোগ্যতার বিষয়ে; যেমন প্রত্যেক মানুষের একটা বিরল যোগ্যতা রয়েছে, তেমনি তার রয়েছে যথাযথ মূল্য ও সম্মান পাওয়ার অধিকার। আমার এক প্রবাসী বন্ধু ও আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে এবং হলে থাকাকালে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার সময়ে ব্রাজিল টিমের ঘোরতর সাপোর্টার ছিলাম আবার একক খেলোয়াড় হিসেবে আর্জেটিনার দিয়াগো ম্যারাডোনার সমর্থক ছিলাম। আমাদের সমাজে কিছু খারাপ মানুষ ও সমস্যা রয়েছে সত্য; কিন্তু এগুলো আমাদের সঠিক পরিচয় নয় বা আমাদের মূল স্রোতের সঙ্গে এগুলো যায় না। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও অন্যান্য জাতীয় আন্দোলনেও কিছু বিরোধিতাকারী ও বিপথগামী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী ছিল। তাদের মোকাবিলা করেই এ মহান জাতি বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। আমাদেরও অনেক অর্জন আছে। আমাদের রয়েছে গৌরবের মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, অবকাঠামো ক্ষেত্রের বৈপ্লাবিক উন্নয়ন কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ইত্যাদি। এ ছাড়া আমাদের আছে অনেক সম্পদ, প্রতিভা, সম্ভাবনা, সাহস, ইতিহাস ও ঐতিহ্য। এ সবকিছুকে যথাযথভাবে কাজে খাটিয়ে আমাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সমস্যাগুলো আমরা সহজেই মোকাবিলা করতে পারি।

যা হোক দিয়াগো ম্যারাডোনার অকাল মৃত্যুতে মর্মাহত হয়ে, সেই প্রবাসী বন্ধুর সঙ্গে দুঃখ শেয়ার করছিলাম, সে আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, ম্যারাডোনা তার নিজের মূল্য বুঝল না। যার কারণে কিছুটা অনিয়মিত ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করে অকালে মারা গেল। এ সম্পর্কে আরও বলা যায়- মানুষের মূল্য নিহিত রয়েছে তার সচেতনতা, দায়বদ্ধতা, আদর্শ, মানবিকতা, নৈতিকতা, পরোপকারিতা ও ভালো কাজের মধ্যে। নেতারা সাধারণত অন্যদের অনুপ্রাণিত করতে এবং ইতিবাচক কাজের পরিবেশ গড়ে তুলতে মূল্যবোধের ওপর নির্ভর করেন। মূল্যবোধ কোনো সংগঠন বা সংস্থার কৌশলগত পরিকল্পনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নির্দেশনা দেয়। একজন শিশু বা কিশোরের বিকশিত হওয়ার নিমিত্তে মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়া হয়ে থাকে। মূল্যবোধের কারণে ব্যক্তি কোনো বিষয়ের সঠিকতা যাচাই এবং কোনো জটিল বিষয় সম্পর্কে সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ করে থাকে। মোট কথা মূল্যবোধ ব্যক্তি ও সামষ্টিক উভয় জীবনের জন্য মৌলিক আচরণকে প্রভাবিত করে, সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি করে এবং নৈতিকতার উন্নয়ন করে থাকে। আমাদের সমাজে কিছু খারাপ মানুষ ও সমস্যা রয়েছে সত্য; কিন্তু এগুলো আমাদের সঠিক পরিচয় নয় বা আমাদের মূল স্রোতের সঙ্গে এগুলো যায় না। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও অন্যান্য জাতীয় আন্দোলনেও কিছু বিরোধিতাকারী ও বিপথগামী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী ছিল। তাদের মোকাবিলা করেই এ মহান জাতি বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। আমাদেরও অনেক অর্জন আছে। আমাদের রয়েছে গৌরবের মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, অবকাঠামো ক্ষেত্রের বৈপ্লাবিক উন্নয়ন কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ইত্যাদি। এ ছাড়া আমাদের আছে অনেক সম্পদ, প্রতিভা, সম্ভাবনা, সাহস, ইতিহাস ও ঐতিহ্য। এ সবকিছুকে যথাযথভাবে কাজে খাটিয়ে আমাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সমস্যাগুলো আমরা সহজেই মোকাবিলা করতে পারি।

এ পৃথিবীর অনেক মানুষ বিলাসিতা পছন্দ করে থাকে অর্থাৎ বিলাসী জীবনযাপনকে বেছে নেয়; কিন্তু বিলাসিতার জন্য নিজেকে বিক্রি করা সঠিক পন্থা হিসেবে বিবেচিত নয়। বিলাসিতা এবং মানুষের বাইরের সৌন্দর্য ছাড়াও মানুষের একটা অন্ত্যরীণ সৌন্দর্য রয়েছে। যেগুলো পরিশ্রম দ্বারা, সাধনা দ্বারা ও জ্ঞান দ্বারা জাগানো যায় এবং যার মাধ্যমে জগতে স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে থাকা যায়। গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের সময়ে গ্রিসের নগর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রায়ই যুদ্ধ হতো এবং সক্রেটিস নিজেই দুই দুই বার যুদ্ধে যোগ দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। যুদ্ধ শেষে এক সময় তার উপলব্ধি হলো যুদ্ধ করাই জীবনের অর্থ নয়; বরং জ্ঞান অর্জন করাই জীবনের অর্থ। উপরন্তু, অনেক সমাজ বিজ্ঞানী ও গুণীজনের মতে জীবনের মূল্য নিহিত রয়েছে কঠোর পরিশ্রম, মানব কল্যাণে নিজেকে ব্যাপৃত রাখা, সমাজের ও দেশের জন্য অবদান রাখা, যোগ্যতা অর্জন করা, লেখাপড়া করা এবং প্রেরণা ও প্রেষণা দিয়ে মানুষকে গড়ে তোলা। আমাদের মনীষীদের উপদেশ, মতামত, বাণী মানতে হবে ও তাদের জীবনকে অনুসরণ করতে হবে।

কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির সম্মান সম্পর্কে আলোকপাত করা যাক, সম্মান কিন্তু এক দিনে অর্জিত হয় না। এ জন্য অনেক সময়, অনেক শ্রম ও অধ্যবসায় প্রয়োজন হয়। অথচ দীর্ঘদিনের এ অর্জিত সম্মান খুব অল্পসময়ে এবং একটা তুচ্ছ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বা অবনয়ন হতে পারে। আজ আমাদের যুবসমাজের একটা অংশ মাদকাসক্ত, শিশু-কিশোররা মোবাইলের গেমস, ইন্টারনেট ও ফেসবুকে আসক্ত। যার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের চোখের ক্ষতি হচ্ছে, লেখাপড়া বিঘ্নিত হচ্ছে এবং সর্বোপরি সামাজিকীকরণে সমস্যা হচ্ছে। তা ছাড়া যুবসমাজের মধ্যে হতাশা, বেকারত্ব এবং কর্মহীনতা রয়েছে ও দেশে বেশকিছু কিশোর গ্যাং সক্রিয় থাকার কথাও জানা যায়। সব অপরাধ বিজ্ঞানীদের মতে সমাজ থেকে অপরাধ নিবারণের জন্য ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যথা পরিবার, শিক্ষালয়, সমাজ সংগঠক, ধর্মীয় ও জনপ্রতিনিধিদের উপদেশ, প্রেরণা ও প্রেষণামূলক কাজের মাধ্যমে সমাজের সমস্যাগুলো চিরতরে দূর করা যায়।

বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা একটা বড় সমস্যা আবার এ বিপুল জনসংখ্যার একটা অংশ অশিক্ষিত অর্থাৎ কোনোরূপ অক্ষর জ্ঞান নেই এবং অপর এক অংশ অর্ধশিক্ষিত। এ বিপুল অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত জনগোষ্ঠী অসেচতন, এমনকি নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন নয়। অধিক জনসংখ্যার জন্য প্রয়োজন অধিক খাদ্য, চিকিৎসা, বস্ত্র, বাসস্থান, পানি, অক্সিজেন, তৈল, গ্যাস, গাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইত্যাদি। অথচ পৃথিবীর ও যেকোনো দেশের সম্পদ সীমিত। দেশের এ জনসংখ্যাকে সম্পদে পরিণত করতে পারলে ভালো হয়; কিন্তু সে জন্য আমাদের বিভিন্ন মানসম্পন্ন সক্ষম প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে। তা না হলে এ বিপুল জনগোষ্ঠী দেশ ও জাতির জন্য বোঝা হয়েই থাকবে। মূল্যবোধের মাধ্যমে ব্যক্তি নৈতিক বিচার এবং সঠিকতা যাচাই করে থাকে। মূল্যবোধ ব্যক্তিকে নিজের ও অন্যদের কাছে দায়বদ্ধ করে রাখে। মূল্যবোধ চর্চার ফলে নীতি ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্যগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য হয় এবং একটি সমাজের বিশ্বাস ও ঐতিহ্য তথা সংস্কৃতিকে প্রতিফলিত করে থাকে। তা সামাজিক নিয়ম ও আইন প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখে, তা ছাড়া মূল্যবোধ ন্যায়-বিচার, মমতা এবং অন্যান্য আদর্শের পক্ষে সামাজিক আন্দোলন ও সামাজিক সংস্কারকে পরিচালিত করে এবং সাংগঠনিক সংস্কৃতি গঠনে ভূমিকা রাখে। নেতারা সাধারণত অন্যদের অনুপ্রাণিত করতে এবং ইতিবাচক কাজের পরিবেশ গড়ে তুলতে মূল্যবোধের ওপর নির্ভর করেন। মূল্যবোধ কোনো সংগঠন বা সংস্থার কৌশলগত পরিকল্পনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নির্দেশনা দেয়। একজন শিশু বা কিশোরের বিকশিত হওয়ার নিমিত্তে মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়া হয়ে থাকে। মূল্যবোধের কারণে ব্যক্তি কোনো বিষয়ের সঠিকতা যাচাই এবং কোনো জটিল বিষয় সম্পর্কে সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ করে থাকে। মোট কথা মূল্যবোধ ব্যক্তি ও সামষ্টিক উভয় জীবনের জন্য মৌলিক আচরণকে প্রভাবিত করে, সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি করে এবং নৈতিকতার উন্নয়ন করে থাকে। আমাদের সমাজে কিছু খারাপ মানুষ ও সমস্যা রয়েছে সত্য; কিন্তু এগুলো আমাদের সঠিক পরিচয় নয় বা আমাদের মূল স্রোতের সঙ্গে এগুলো যায় না। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও অন্যান্য জাতীয় আন্দোলনেও কিছু বিরোধিতাকারী ও বিপথগামী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী ছিল। তাদের মোকাবিলা করেই এ মহান জাতি বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। আমাদেরও অনেক অর্জন আছে। আমাদের রয়েছে গৌরবের মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, অবকাঠামো ক্ষেত্রের বৈপ্লবিক উন্নয়ন কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ইত্যাদি। এ ছাড়া আমাদের আছে অনেক সম্পদ, প্রতিভা, সম্ভাবনা, সাহস, ইতিহাস ও ঐতিহ্য। এ সবকিছুকে যথাযথভাবে কাজে খাটিয়ে আমাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সমস্যাগুলো আমরা সহজেই মোকাবিলা করতে পারি।

নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতিকার করতে নৈতিকতা ও শুদ্ধাচার চর্চা, অর্থনৈতিক সংস্কার, শক্তিশালী শাসন, সামাজিক সংহতি, সামাজিক গতিশীলতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, পরিবেশগত স্থায়িত্ব, পারিবারিক কাঠামো সমর্থন করা এবং ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করা প্রয়োজন পড়ে। তা ছাড়া সামাজিক অবক্ষয়কে মোকাবিলা করার জন্য একটি সামগ্রিক পদ্ধতির প্রয়োজন। তা ছাড়া ব্যাপক অর্থনৈতিক রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংস্কার বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমাজের সংশ্লিষ্ট সদস্যদের জন্য আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।

সামাজিক অবক্ষয় একটি জটিল ও বহুমুখী সমস্যা। যার অন্তর্নিহিত কারণগুলো এবং উৎস্যগুলোকে খুঁজে বের করতে হবে ও সেগুলোকে যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে হবে এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাবগুলোকে প্রশসিত করার লক্ষ্যে একটি সামগ্রিক এবং সমন্বিত প্রয়াস ও পদ্ধতির প্রয়োজন। সমাজ থেকে অবক্ষয়, নীতিবর্জিত কার্যকলাপ ও অপরাধ দূর করে সামাজিক মূল্যবোধ, নৈতিক মূল্যবোধ ইত্যাদি ফিরিয়ে আনতে হবে। আশার বিষয়- সরকার ইতোমধ্যে জাতীয় শুদ্ধাচার নীতিমালা প্রণয়ন করেছে এবং সেগুলো বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণের সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সব প্রতিষ্ঠানে সেগুলোর চর্চাও শুরু হয়েছে। যা অত্যন্ত ফলপ্রসূ বলে প্রতীয়মান হয়েছে। এ ছাড়া আমাদের অনানুষ্ঠানিক সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাগুলোকে সক্রিয় করতে হবে, তাদের জাগাতে হবে। অন্যান্য প্রয়াসের পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সব অংশীজনের দ্বারা এসব বিপথগামীকে সঠিক পথে আনতে প্রেরণা, প্রেষণা, মূল্যবোধ ও শুদ্ধাচার চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। তা হলেই এক টেকসই আইনশৃঙ্খলা, আদর্শ সমাজ ও সভ্যতা গঠন করা যাবে।

লেখক: কমান্ড্যান্ট (অ্যাডিশনাল ডিআইজি) পুলিশ স্পেশাল ট্রেনিং স্কুল (পিএসটিএস), বেতবুনিয়া, রাঙামাটি


দেশের লাভ দশের লাভ

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
সৈয়দ শাকিল আহাদ

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তৈরি করার স্বপ্ন দেখেছিলেন বলেই স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ আজ ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এ রূপান্তরিত হয়েছে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে চলেছে।

দেশ এখন এগিয়ে যাচ্ছে ডিজিটাল যুগের দিকে, এরই সঙ্গে স্মার্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ধারণা পেয়েছে উল্লেখযোগ্য গতি। বলা বাহুল্য, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠনকল্পে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রেখে সরকারের রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়নে কার্যকর অবদান রাখতে আমরা সবাই বদ্ধপরিকর ও সচেতন।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাদের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে রাজনৈতিক সংহতি ও সহযোগিতার নবক্ষেত্র উন্মোচন এবং দুই দেশের সম্পর্ক যে নতুন উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে তাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

গত ২১-২২ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে বহুল আলোচিত একটি ঘটনা। নরেন্দ্র মোদির তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠনের পর এটি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিতীয় সফর।

গত ৬ জুলাই শনিবার সন্ধ্যায় ভারতের রাষ্ট্রপতি এবং উপ-রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাতের আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, গত ৯ জুন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শপথ গ্রহণে যোগদানের পর আবারও তার আমন্ত্রণে অত্যন্ত কম সময়ের ব্যবধানে প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরে আসা সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ২১-২২ জুনের ওই সফর অত্যন্ত সফল।

তিনি বলেন, ‘দুদেশের প্রধানমন্ত্রী তাদের মন্ত্রিপরিষদ সদস্য ও কর্মকর্তাদেরসহ দলগতভাবে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা শেষে একান্ত বৈঠক করেন। বৈঠকে অত্যন্ত আন্তরিকতাপূর্ণ পরিবেশে দ্বিপক্ষীয় সব বিষয়ে আলোচনা হয়।’

এ সফরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১০ সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।

দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক শেষে বাংলাদেশ-ভারত ডিজিটাল পার্টনারশিপ, বাংলাদেশ-ভারত গ্রিন পার্টনারশিপ, সমুদ্র সহযোগিতা ও সুনীল অর্থনীতি, ভারতের ইন-স্পেস এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সমঝোতা, বাংলাদেশ ও ভারতের রেল মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সংযোগসংক্রান্ত, বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট ও ভারতের ন্যাশনাল ওশানোগ্রাফিক ইনস্টিটিউটের মধ্যে গবেষণা সহযোগিতা, কৌশলগত ও অপারেশনাল খাতে সামরিক শিক্ষা সহযোগিতায় ডিফেন্স সার্ভিসেস স্টাফ কলেজ, ওয়েলিংটন-ইন্ডিয়া এবং মিরপুর ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজের মধ্যে নতুন সমঝোতা স্মারক সই এবং স্বাস্থ্য ও ওষুধসংক্রান্ত সমঝোতা নবায়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও প্রশমনে ভারতের ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি এবং বাংলাদেশ ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যমান সমঝোতা নবায়ন এবং মৎস্যসম্পদের উন্নয়নে বিদ্যমান সমঝোতা নবায়নসহ মোট ১০টি সমঝোতা সই হয়। দুদেশের মধ্যে সংযোগ বা কানেক্টিভিটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার কথা উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘চট্টগ্রাম ও মোংলাবন্দর যাতে ভারতের উত্তর-পূর্ব, বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলের জন্য ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে তাদের আগ্রহ ও আমাদের অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।’ সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে রাজনৈতিকভাবে দুদেশের ঐক্যমতের অভাব নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এরপরও যে ঘটনাগুলো ঘটছে, সেগুলোও যাতে একদম কমানো যায়, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।’

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী আছে। এগুলোর নাব্য রক্ষাসহ সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা, তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা, বন্যা দুর্যোগ মোকাবিলা এবং পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়েও গুরুত্বসহকারে আলোচনা হয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী তাদের সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতার প্রসার, ভারতের মধ্য দিয়ে নেপাল ও ভুটান থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানিতে সহায়তা এবং ভারত যে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের নতুন সঞ্চালন লাইন করছে, সেটি থেকে কীভাবে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে সে বিষয়ে আলোকপাত করেন।’

‘এ সময় পেঁয়াজ, তেল, গম, চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য আমদানিতে বাংলাদেশের জন্য নির্দিষ্ট কোটা সংরক্ষণ ও আমদানি যাতে বন্ধ না হয়, সে বিষয়েও আমরা আলোচনা করেছি’, ‘ব্রিকস সদস্য বা অংশীদার যেকোনো পদে আমরা ভারতের সমর্থন চেয়েছি এবং তারা ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। পাশাপাশি বিমসটেক, ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশনসহ বহুপক্ষীয় ফোরামগুলোতে অবস্থান শক্তিশালী করা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা ছিল ইতিবাচক।’

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে আশ্রিত প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনায় চীনের ভূমিকা বৃদ্ধির কথাও এসেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সফরে এটি আলোচনা করবেন বলেছেন। ভিসা নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ড. হাছান মাহমুদ জানান, বাংলাদেশিদের জন্য ভারত বছরে প্রায় ২০ লাখ ভিসা প্রদান করে। মেডিকেল ভিসা ত্বরান্বিত করতে ও অন্যান্য ভিসার অযথা বিলম্বরোধে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাদের মিশনগুলোকে নতুন নির্দেশনা দিয়েছেন।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যেসব সমঝোতা হয়েছে তার মধ্যে একটি ছিল রেল ট্রানজিট সংক্রান্ত। ট্রানজিট চালুর পর ভারতের ট্রেন বাংলাদেশের দর্শনা দিয়ে প্রবেশ করে চিলাহাটি-হলদিবাড়ি সীমান্ত দিয়ে ভারতে যাবে।

পরীক্ষামূলকভাবে আগামী মাসেই বাংলাদেশ দিয়ে ভারতের ট্রেন চলবে বলেও সফর শেষে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় মোহন কোয়াত্রা।

সম্মেলনে বিএনপি অভিযোগ করেছে, নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের কারিগরি ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন এবং সামরিক বিশেষজ্ঞদের ইতিবাচক বিশ্লেষণ ছাড়া এ ধরনের ‘রেল করিডোর’ প্রদান আত্মঘাতী ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী।

‘বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতীয় রেল ট্রানজিটের ফলে বাংলাদেশের জনগণ উপকৃত হবে’, ভারত সফর শেষে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার এ দাবিকেও প্রত্যাখ্যান করেন বিএনপি মহাসচিব মি. আলমগীর। বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি জনবিচ্ছিন্ন দলের কয়েকজন নেতা বিভিন্ন মাধ্যমে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে বর্তমান সরকারের উন্নতি এ অগ্রগতিতে দীর্ঘসূত্রতা এ ক্ষতিকর মন্তব্যের মাধ্যমে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-নেত্রীরা বলছেন নানা রকম নেতিবাচক কথা, অথচ অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা।

‘বিদ্যমান অবকাঠামোর উন্নতি করে ভারতের ট্রেন চলাচল শুরু হলে তা হবে বাংলাদেশের ধারণক্ষমতার উন্নয়ন, এ ট্রেন চলাচল রেল যোগাযোগব্যবস্থায় আধুনিকীকরণ, উন্নয়ন ও সম্প্রসারনের মাধ্যমে তৈরি করবে তিন দেশের বাণিজ্যিক সমৃদ্ধি গতিশীল ও আধুনিক হবে তিন দেশের যোগাযোগব্যবস্থাসহ অর্থনৈতিক উন্নতি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর, বিশেষ করে ভারতকে রেল ট্রানজিট দেওয়ার বিষয়টিকে সবাই প্রশংসা করছে, দেশের বিশেষ কয়েকজন মিলে এক ধরনের রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করতে চাইছে বলে অনেকে বিরোধী বিএনপিসহ সমমনা দলগুলোকেই দূষছেন। এসব দলের নেতারা মনে করছেন সামনের দিনগুলোতে ‘এটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু’।

এর আগে মোংলা ও চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে পণ্যের ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট নিয়ে ভারতের দীর্ঘদিনের জোরালো দাবি পূরণ করেছিল, ভারতীয় গাড়ি চলাচলের সময় আমাদের দেশের রাস্তাঘাট নষ্ট করে ফেলবে, আগ্নেয়াস্ত্র ফেলে রেখে আমাদের ভূখণ্ড অনিরাপদ করে তুলবে, অথচ এর কিছুই হয়নি, হয়েছে উন্নত, আধুনিক এবং এর ফলে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এগুলোর বিনিময়ে যে বাংলাদেশ অর্থ আয় করছে তা আজ জনগণ জানে ও বোঝে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মঙ্গলবার অবশ্য সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ভারতকে রেল ট্রানজিট দেওয়ার সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি হবে না এবং করছে না।

বিরোধী দলগুলো কী করতে চায়

ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে রেলযোগে দেশের এক অংশ থেকে আরেক অংশে সরাসরি নিজেদের পণ্য পরিবহনের সুবিধা পাবে ভারত, যা দীর্ঘদিন ধরেই দেশটি চেয়ে আসছিল বলে প্রচার আছে।

বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে কথা বলে যে ধারণা পাওয়া গেছে তা হলো- তারা মনে করেন ভারতকে রেল ট্রানজিট দেওয়ার খবরে সারা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে সামাজিকমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তীব্র সমালোচনার প্রেক্ষাপটে এটিই আগামী দিনের বড় রাজনৈতিক ইস্যু হবে বলে তাদের ধারণা।

অবশ্য একাধিকবার দলটির অনেক নেতাই বলেছেন তাদের কর্মসূচি বা বক্তব্য বাংলাদেশের শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে, ভারতের বিরুদ্ধে নয়। দলটির নেতারা বলেছেন বরং তারা চান ভারত বাংলাদেশের কোনো বিশেষ দল নয় বরং ‘জনগণের সাথে সম্পর্ক’ দৃঢ় করুক।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, চলতি বছরের জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনে ভারতের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ আছে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর। তারা মনে করেন ‘ভারতের ভূমিকার কারণে’ই বিরোধী দলগুলোর বর্জন সত্ত্বেও নির্বাচন করতে সক্ষম হয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার।

এখন রেল ট্রানজিট ইস্যুতেও বিএনপি ও সমমনা দলগুলোও তীব্র সমালোচনা করছে। তারা মনে করেন এটিই হবে আগামী দিনের বড় রাজনৈতিক ইস্যু এবং এর বিরুদ্ধে মানুষ রাস্তায় নেমে আসবে।

দেশের বিভিন্ন মহলের বিজ্ঞজনরা মনে করেন বিশ্ব অর্থনীতির উন্নয়নে সমগ্র বিশ্বে আন্তসংযোগ অত্যন্ত জরুরি এবং গতিশীল একটি বিষয়, আমাদের দেশ, ভারতসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি দেশ এ ট্রানজিট, ট্রান্সশিপম্যান্ট আস্তে আস্তে উন্নত হচ্ছে ও গতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। আন্তরিকতার সঙ্গে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে , বাংলাদেশের ট্রেন চিলাহাটি দিয়া ভারতের হলদিবাড়ী যাবে এবং ভারতের রেলপথ ব্যবহার করে সেখান থেকে যাবে ভুটানের সীমান্তবর্তী হাসিমারা রেলস্টেশন পর্যন্ত যদিও ভুটানে এখনো রেলপথ নেই তাই এ ব্যবস্থার ফলে স্থল সীমানাবেষ্টিত ভুটানের পক্ষে বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য উন্নয়ন বৃদ্ধি পাবে এবং প্রতিটি দেশই অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হবে। এখানে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ ও ভারত ট্রানজিট বা ট্রান্সশিপমেন্ট বা ইন্টার কানেক্টিভিটি বা আন্তসংযোগ বহু দিনের এটা নিয়ে কিছু মানুষ অযথাই বিভ্রান্তি এবং নেতিবাচক কথা বলে অস্বস্তি তৈরি করার চেষ্টা করে চলেছে যা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। এরাই এক সময় নিরাপত্তা লঙ্ঘন হবে দোহাই দিয়ে সাবমেরিন ক্যাবলে আমাদের সংযুক্ত হতে না দিয়ে এদেশকে অনেক পিছনে ফেলেছিল। বিশ্বায়নে সবাই এগিয়ে যাচ্ছে, আমরাও যাব প্রধানমন্ত্রীর কথার সঙ্গে সুর মিলিয়ে আমরাও বলতে চাই ‘বিশ্বায়নের যুগে আমরা নিজেদের দরজা বন্ধ রাখতে পারি না’।- আমাদের বাঙ্গালি জাতির লাভ, আমরা এগিয়ে যাব ইনশাআল্লাহ।

লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক


কোটার যৌক্তিক সংস্কার সর্বোচ্চ আদালতেই হতে পারে

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
মমতাজউদ্দিন পাটোয়ারী

আবার সরকারি চাকরি নিয়ে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে দেশ অনেকটাই অচল অবস্থার মুখোমুখি। এবার আন্দোলনকারীরা কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে আকর্ষিকভাবে আন্দোলন শুরু করেছে। ২০১৮ সালে কোটাব্যবস্থা বাতিল করে যে পরিপত্র জারি করা হয়েছিল ওই পরিপত্রের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০২১ সালে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান অহিদুল ইসলামসহ সাতজন। আবেদনের চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত ৫ জুন হাইকোর্ট মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন। এ রায় ঘোষিত হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা আদালতে রায়ের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য অপেক্ষা না করে সরকারি নির্বাহী ক্ষমতা কোটা সংস্কারের দাবিতে রাস্তায় নেমে পড়ে। গত বুধবার তারা বাংলা ব্লকেড বা অবরোধ পালন করে। ঢাকার ২০টি এলাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখে। দেশব্যাপী রেল যোগাযোগ অবরোধ করে রাখে। ফলে চরম দুর্ভোগ শহরবাসী ও যাত্রী সাধারণের চলাচলে নেমে আসে। অথচ বুধবারই দেশের সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের পরিপেক্ষিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ ২০১৮ সালের সরকারি পরিপত্রের স্থিতাবস্তা আগামী আগস্ট মাসের ৭ তারিখ পর্যন্ত জারি করেন। ওই দিন কোটাব্যবস্থার ওপর পূর্ণাঙ্গ শুনানি ধার্য করা হয়। সুপ্রিম কোর্ট সেই পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের শ্রেণিপাঠে ফিরে যাওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখা এবং আন্দোলনকারীরা চাইলে আইনজীবীর মাধ্যমে তাদের বক্তব্য তুলে ধরতে পারবেন বলেও আদালত জানান; কিন্তু আন্দোলনকারীরা আদালতের এ নির্দেশনা গ্রহণ করেনি। তারা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে। তারা দাবি করে যে তাদের আন্দোলন আদালতের কাছে নয় সরকারের কাছে। সরকার নির্বাহী আদেশে কোটা সংস্কারের বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে পারে প্রয়োজনে সংসদে আইন পাস করতে পারে অথবা একটি কমিশন গঠন করে এর একটি স্থায়ী সমাধান করতে পারে। তারা এসব দাবিতেই বৃহস্পতিবার সাড়ে ৩টায় আবারও অবরোধ কর্মসূচি পালন করার কথা ঘোষণা করেছে।

যারা কোটা সংস্কার আন্দোলনটি অতীতে এবং এবারও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন তারা এর মধ্যে নানা ধরনের বিষয় লক্ষ্য করে থাকতে পারেন। এবারের বিষয়টি প্রথমে তুলে ধরি- দেশের সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্টের রায়টি স্থগিত রেখে ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর সরকারি চাকরিতে নারী কোটা ১০ শতাংশ, মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ এবং জেলা কোটা ১০ শতাংশ বাতিল করে পরিপত্র জারি করে - সেই অবস্থাটি পরবর্তী রায় পর্যন্ত বহাল রেখে সুপ্রিম কোর্ট যে আদেশ দিয়েছেন তাতে শিক্ষার্থীদের প্রতি দেশের সর্বোচ্চ আদালত অভিভাবকত্বের অনুভূতির প্রকাশ ঘটিয়েছেন। এর মধ্যে সরকারি যেসব নিয়োগ প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে সেগুলো সুপ্রিম কোর্ট স্থগিত করেননি, ঘোষিত নিয়মনীতি অনুযায়ী সেগুলো চলতে কোনো বাধা নেই বলে অ্যাটর্নি জেনারেল জানিয়েছেন। তাই আন্দোলনকারীদের ধৈর্য ধরা উচিত ছিল। তা ছাড়া দেশের সর্বোচ্চ আদালতে যখন কোনো মামলার রায় নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া চলতে থাকে তখন সেটির চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষা করাই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মানুষ, সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবার কর্তব্য। সেই সময়ে সর্বোচ্চ আদালতের রায়কে অমান্য করা যায় না কিংবা অন্য সিদ্ধান্তও নেওয়া যায় না। সরকারের নির্বাহী আদেশে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়াটি তখন অবৈধ হওয়ারই আইনত বিধান। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে সন্তুষ্ট না হলে এর রিভিউ করা যেতে পারে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত সংবিধানবিরোধী কোনো রায় দেবেন সেটি আশা করা যায় না। সে কারণে কোটা সংস্কারপ্রত্যাশী শিক্ষার্থীদের উচিত ছিল সর্বোচ্চ আদালতের পরামর্শ মেনে চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষা করা, নিজেদের বক্তব্য আইনজীবীর মাধ্যমে তুলে ধরা। আপিল বিভাগের প্রধান বিচারপতিসহ অন্য বিচারপতিরা দেশের তরুণদের জীবন-জীবিকা, মেধা ও দেশ সেবার সুযোগের বিষয়গুলোকে সংবিধান এবং দেশের বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করেই একটি যৌক্তিক রায় প্রদান করবেন। সেটির জন্য খুব বেশি দিন অপেক্ষা করার প্রয়োজন তাদের পড়বে না। কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ আদালতের প্রতি বিশ্বাস ও সম্মান প্রদর্শনের বিষয়টি সম্পর্কে তাদের মধ্যে অনেকেরই যে খুব বেশি জানা নেই তা তাদের নানা ধরনের উক্তি, কথাবার্তা এবং আচরণ থেকে দেখাও যাচ্ছে। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের ওপরে নিশ্চই সরকারের নির্বাহী বিভাগ নয়। সরকারের নির্বাহী বিভাগ ২০১৮ সালের যে পরিপত্রটি জারি করেছিল সেটি আদালতেই চ্যালেঞ্জ হয়েছে। আমরা হাইকোর্টের সেই রায়টি পুরোপুরি এখনো পাইনি। সুপ্রিম কোর্টেরই একমাত্র এক্তিয়ার রয়েছে হাইকোর্টের রায়ের সংযোজন, বিয়োজন ও পরিমার্জন কিংবা বাতিল করার। সরকার সেখানে আদালতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার চেয়ে বেশিকিছু করতে পারে না। তবে আইনি লড়াইয়ে সরকার যুক্তিতথ্য ও আইনের ব্যাখ্যা দিয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে পারে। সেটি যেকোনো নাগরিকও করতে পারে; কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট দেশের সংবিধানের রক্ষাকবচ। তার ভিত্তিতেই চূড়ান্ত রায় প্রদান করে থাকেন। সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায় সবার জন্যই শিরোধার্য। এ মামলাটি যদি হাইকোর্টে উপস্থাপিত না হতো তাহলে কোটা সংস্কারবাদীরা সরকারের নির্বাহী আদেশের পরিমার্জন চেয়ে তাদের বর্তমান দাবিগুলো তুলে ধরতে পারত। সে ক্ষেত্রে সরকারের চিন্তা-ভাবনা করার যথেষ্ট সুযোগ থাকত। এমনকি যে কমিশন গঠনের প্রস্তাব তারা দিচ্ছে সেটিও সরকার বিবেচনায় নিয়ে মহান জাতীয় সংসদের মাধ্যমে এর একটি কার্যপ্রণালি, রূপরেখা এবং যৌক্তিকব্যবস্থা তৈরি করতে পারত। এখন আন্দোলনকারীরা সরকারের নিকট তাদের দাবি-দাওয়া ও কমিশন গঠনের চিন্তা-ভাবনাটি সর্বোচ্চ আদালতে তুলে ধরার ব্যাপারে প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারে। সরকারের দিক থেকেও প্রগাঢ় পরিচয় দেওয়া হবে যদি আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিদের নিয়ে বসে আদালতে কোটা সংস্কারের একটি যুক্তিসঙ্গত ব্যবস্থাপত্র তুলে ধরার বিষয় তাদের সঙ্গে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা, তাদের রাস্তা ছেড়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া। দেশের সর্বোচ্চ আদালত কোটা সংস্কারের ব্যবস্থাপত্রটি সংবিধান এবং বাস্তবানুগ হলে নিশ্চয়ই আমলে নিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে সমস্যাটির একটি সমাধান দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকেই পাওয়ার সম্ভাবনা সবাই আশা করতে পারেন। কিন্তু আন্দোলনকারীদের রাস্তায় এভাবে বারবার ফিরে আসতে দেওয়া হলে শুধু জনদুর্ভোগই নয় দেশের যে কত ধরনের ক্ষতি হয় তা সবারই বোঝা আছে। এ ছাড়া আন্দোলনকারীদের মধ্যেও নানা মত, পদ এবং বিভ্রান্তবাদীর অবস্থান রয়েছে। তাদের স্লোগান, কথাবার্তা ও কাজকর্ম এক রকম হচ্ছে না, হবেও না। ফলে এটি নৈরাজ্য সৃষ্টির দিকেও চলে যেতে পারে। দেশে একটি গোষ্ঠী তো রয়েছেই এদের ব্যবহার করার জন্য। এরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমেছে কিন্তু সচেতনতার বিষয়টি তাদের মধ্যে সমান নয়। আবেগের বশবর্তী হয়ে অনেকেই অনেক কথা বলেন যা মোটেও আইনবিধি কিংবা তাদের আন্দোলনের সঙ্গেও সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কেউ কেউ এখনো বলে বেড়াচ্ছে যে ৫৬ শতাংশ কোটাই নাকি সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়ে রেখেছে। তাদের অনেকেরই হাতে কোটার প্রকৃত তথ্য-উপাত্ত নেই, ইতিহাসটাও জানা নেই। আবার কেউ কেউ এর মধ্যে রাষ্ট্র সংস্কারেরও দারি তুলে বসে আছে। নানা ধরনের দাবি, আবেগ, উচ্ছ্বাস, বিশ্বাস এবং রাজনীতির প্রতিফলন ঘটাতেও দেখা যায়। কোটার সুবিধা যারা পায় তাদের পরীক্ষা দিতে হয় না এমন ভুল ধারণাও অনেকের মধ্যে রয়েছে। অনেকের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ এবং যোদ্ধাদের সম্পর্কে শ্রদ্ধা ও সংবেদনশীল থেকে কথা বলার বিষয়টি কখনো কখনো লঙ্ঘিত হয় এটি মোটেও মেনে নেওয়ার বিষয় নয়। সে কারণেই সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে এদের শিক্ষাঙ্গনে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করাটাই শ্রেয় হবে।

আমাদের মতো দেশে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য কোটাব্যবস্থা রয়েছে। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে কোটাব্যবস্থা চালু করেছিলেন। পাকিস্তান আমলেও ব্যবস্থা চালু ছিল। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে সরকারি চাকরিতে ২০ শতাংশ মেধায় (সাধারণ), ৪০ শতাংশ জেলা কোটা এবং ১০ শতাংশ ছিল নারী কোটায়। আর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য উপহার হিসেবে কোটা সংরক্ষণ করেছিলেন ৩০ শতাংশ। কিন্তু তিনি এটির বাস্তবায়ন শুরু করে যেতে পারেননি। ১৯৭৬ সালে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের সময় ৪০ শতাংশ জেলা কোটা থেকে ২০ শতাংশ কমিয়ে সাধারণদের জন্য ২০ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশে উন্নীত করা হয়। মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ এবং নারী কোটা ১০ শতাংশ বহাল থাকলেও মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ে চাকরি প্রাপ্তি তখন অনেকটাই কল্পনাতীত ছিল। সেই সময় থেকেই স্বাধীনতাবিরোধী আদর্শের ব্যক্তি এবং তাদের সন্তানরা সরকারি চাকরি, বিভিন্ন বাহিনী এবং বিদেশে মন্ত্রণালয়ে অধীন দূতাবাসে চাকরি পাওয়া শুরু করে। সামরিক শাসক এবং তাদের গঠিত দলের শাসনামলে সেই ধারাই অব্যাহত ছিল। স্মরণ করা যেতে পারে ১৯৭৭ সালে পে ও কর্ম কমিশনের একজন সদস্য ছাড়া অন্য সবাই কোটাব্যবস্থা তুলে দিতে মত দেয়। কোটার পক্ষে মত দেওয়া সদস্য এম এম জামান ১০ বছর কোটা পদ্ধতি বহাল রেখে ১৯৮৭ সালের পর ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার মত রেখেছিলেন। ১৯৯৭ সালে মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের কোটায় চাকরিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০১০ সালে হাইকোর্টে আপিল এবং রায়ের ভিত্তিতে কোটাব্যবস্থা সংস্কারের মাধ্যমে পুনর্বহাল করা হয়। ২০১২ সালে ১ শতাংশ প্রতিবন্ধী কোটা স্থাপন হয়। ২০১৮ সালে সংস্কার নয় কোটাবিরোধী আন্দোলন দেশে চাঙ্গা হয়ে ওঠে। মুক্তিযোদ্ধা কোটার বিরুদ্ধেও তাদের অনেক অসংলগ্ন এবং অসংবেদনশীল দাবি এবং আচরণ ছিল। নানা অনভিপ্রেত ঘটনার সঙ্গেও অনেকে জড়িত ছিল। অনেক স্থানে এ নিয়ে সংঘাতময় পরিস্থিতি তখন তৈরি হয়েছিল। সেই অবস্থায় সরকার ৪, অক্টোবর কোটা পদ্ধতি বাতিল করে পরিপত্র জারি করে। সেটিরই বিরোধিতা করে হাইকোর্টে রিট হয়েছে। হাইকোর্ট সংবিধানকে বিবেচনায় নিয়েই রায় দিয়েছেন বলে আমাদের ধারণা। তবে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে হবে বলে আমরা আশা করি। এবার শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবি জানিয়ে মাঠে নেমেছেন। এখনো পর্যন্ত তারা উশৃঙ্খল কোনো আচরণ করেননি। তবে জনদুর্ভোগ ও দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ভয়ানকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এটি আর চলতে দেওয়া যায় না। সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে আদালতেই এর ফয়সালা হোক সেটি আমরা চাই।

লেখক: ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


কোটা আন্দোলনের লাভ-ক্ষতি

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
সৈয়দ এনাম-উল-আজিম

প্রথমে ঢাকা তারপর সারা দেশজুড়ে শুরু হয়েছে কোটাবিরোধী আন্দোলন। এই আন্দোলন করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা। ছাত্রদের আন্দোলনের উদ্দেশ্য চাকরির ক্ষেত্রে কোটাপ্রথা বাতিল করা। উল্লেখ করার মতো বিষয় হচ্ছে- এই আন্দোলনে সাধারণ জনগণের চাওয়া-পাওয়া বা স্বার্থবিষয়ক কিছু নেই। কিন্তু আছে ভোগান্তি আর অপরিসীম ক্ষতি। এ বিষয়ে আন্দোলনের সূত্রপাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে এবং ক্রমশ ক্যাম্পাস থেকে সড়ক মহাসড়কে গড়িয়ে পড়েছে। গত ১ জুলাই-২০২৪ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনে ক্যাম্পাস থেকে ঢাকার শাহবাগের চারপাশ, ফার্মগেট, সায়েন্সল্যাব, জগন্নাথ কলেজ, ঢাকা কলেজ আর ইডেন কলেজের সড়ক সীমানা এবং সাভার, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, গোপালগঞ্জ, বরিশালসহ সব বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার সড়কগুলো ক্রমশ ছাত্রছাত্রীদের অবরোধের মুখে পড়ে আছে। সেখানে তারা নিয়মিতভাবে অবস্থান নিয়ে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করছে। কিন্তু থমকে গেছে সব পরিবহন যোগাযোগ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে আটকা পড়ে নাকাল হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। কর্মজীবীরা অফিসে পৌঁছাতে পারছেন না। অসুস্থ ও রোগীদের হাসপাতালে আনা-নেওয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ব্যাহত হচ্ছে উচ্চতর শিক্ষার নির্মল পরিবেশ। শিক্ষাঙ্গনের এই আন্দোলনের তোপে যখন দেশের রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি টাল-মাটাল তখন আমাদের মতো সাধারণ জনগণ হিসাব করতে শুরু করেছেন এই আন্দোলনে দেশ ও জনগণের লাভ-ক্ষতি। অঙ্কটা মেলানো দরকার আর মিলাতে চাইলে আমাদের একটু তথ্য নিতে হবে কোটার ইতিহাসের।

কোটার ইতিহাস: সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার ইতিহাসটা ব্রিটিশ আমল থেকেই শুরু। তখন ব্রিটিশরা সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে তাদের এবং তাবেদারগুলোকেই যোগ্য মনে করত। ব্রিটিশ আমলে সর্ব ভারতীয়রা স্বভাবতই তাই পড়াশোনার সুযোগ পেলেও চাকরি ও প্রশাসন পরিচালনায় অনেকটাই বঞ্চিত ছিল। এই বৈষম্য আর বঞ্চনা থেকে মুক্তির জন্য ব্রিটিশ তাড়াও আন্দোলন হলো। সফল হলো ভারতীয়রা। ব্রিটিশরা আন্দোলনের চাপে ১৯৪৭ সালে ভারতকে ভাগ করে পাকিস্তান আর হিন্দুস্তান বানাল। ভৌগোলিক অবস্থান আর ভাষাগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও পূর্ব বাংলাকে (বর্তমান বাংলাদেশ) পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত রাখা হলো। সৃষ্ট হলো বৈষম্য, বঞ্চনা আর নিপীড়নের নতুন ইতিহাস। অবিভক্ত পাকিস্তানে পূর্ব বাংলার বা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ শিক্ষা, চাকরি আর রাষ্ট্র পরিচালনার অংশ থেকে নতুনভাবে বৈষম্য আর বঞ্চনার শিকার হতে লাগল। ক্রমশ ফুঁসে উঠল পূর্ব বাংলার ছাত্র-জনতা। ৫২’র ভাষা আন্দোলন সেই বঞ্চনাবিরোধী রক্তাক্ত ইতিহাস। তারপর ৬২, ৬৬, ৬৯-এর ছাত্র ও গণ-আন্দোলন আর ৭১-এর সমগ্র বাঙালির সম্মিলিত মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা- স্বাধীন বাংলাদেশ ব্রিটিশ, পাকিস্তানিদের ক্রমাগত বঞ্চনার ভেতর থেকে অর্জিত স্মারক।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যখন বঙ্গবন্ধু ও এদেশের সাহসী ও নন্দিত রাজনৈতিক নেতারা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলেন তখনই সবার আগে রাষ্ট্র পরিচালনার মানদণ্ড অর্থাৎ সংবিধান রচনা করতে গিয়ে সেখানে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে শত শত বছরের বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার এদেশের জনগণ, শিক্ষিত ও অনগ্রসর গোষ্ঠীকে শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা ও রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকারকে সুরক্ষিত করলেন। তিনি সংবিধানে খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, বাসস্থান ও স্বাস্থ্যকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি সংবিধানের তৃতীয় ভাগের ২৯(৩)-এর (ক) অনুচ্ছেদে প্রথমবারের মতো ‘কোটা’ প্রথার প্রচলন করলেন। সেখানে পরিষ্কারভাবে বলা হলো- নাগরিকদের যেকোনো অনগ্রসর অংশ যাতে প্রজাতন্ত্রের কর্মে উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব লাভ করতে পারে সেই উদ্দেশ্যে তাদের অনুকূলে বিশেষ বিধান প্রণয়ন করতে রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করবে না।’ অতএব এই সাংবিধানিক অধিকার বলে ১৯৭২ সাল থেকে এদেশের অনগ্রসর জনগোষ্ঠী ও মুক্তিযোদ্ধা, নারী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীরা উচ্চতর শিক্ষা ও চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে কিছু সুবিধা ভোগ করে আসছে। যার অনুপাত সরকারের নির্বাহী আদেশে নির্দিষ্ট হয়। এটিকেই কোটা প্রথা বলে, যা বাতিলের জন্য ২০১৮ সাল থেকে ছাত্রসমাজ আন্দোলন করছে।

আন্দোলনের লাভ-ক্ষতি: ক্ষতির দিক চিন্তা করে কোনো আন্দোলন হয় না। এদেশের সব সফল আন্দোলনে অধিকার আদায়ের জন্যই হয়েছে। আর সব আন্দোলনের সূতিকাগার ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং নেতৃত্ব দিয়েছে গৌরবের ছাত্র সমাজ। কাজেই ছাত্রসমাজের সম্মিলিত সংগ্রামী ভূমিকা ও আন্দোলন অনেক গর্বিত ইতিহাস তৈরি করেছে যার সুফল আমরা স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উপভোগ করছি। তাই ওদের কোনো উদ্যোগকেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। তবে তা হতে হবে সংবিধান-সম্মত এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট। কিন্তু বাস্তবে হচ্ছে কী?

২০১৮ সালে ছাত্রসমাজের কোটাবিরোধী আন্দোলন বাতিলের জন্য ছিল না, ছিল সংস্কারের জন্য। কিন্তু সরকার যেকোনো কারণেই হোক, তা সংস্কার না করে বাতিল করেছিল। এতে কোটা প্রাপ্যদের দীর্ঘদিনের সুরক্ষিত অধিকার ক্ষুণ্ন হয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে সরকারের কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না। আর তাই সংবিধান সবার অধিকার সুরক্ষা করায় কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এই কোটা বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করলে গত ৫ জুন হাইকোর্ট এক রায়ের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধার কোটা পুনর্বহালের আদেশ দেন। সরকার যথাসময়ে সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন এবং গত ১০ জুলাই আপিল বিভাগ মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের ওপর ৪ সপ্তাহের জন্য স্থিতাবস্থা জারি করেছেন। অতএব আপিলের রায়ের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট সময়সীমা পর্যন্ত অপক্ষো না করে এবং চূড়ান্ত রায় কী হয়, তা না জেনেই ছাত্রসমাজ সরকারকে দোষারোপ করে আন্দোলনের সূচনা ও তা অব্যাহত রেখে শিক্ষাঙ্গন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও জনদুর্ভোগ বাড়িয়ে তুলছে। এই আন্দোলনকে বিএনপিসহ সব বিরোধী দল সমর্থন দেওয়ায় আন্দোলনকারীরা আরও উৎসাহ পাচ্ছে বটে কিন্তু কোটা বাতিল হলে যে অনগ্রসর জনগোষ্ঠী ছাড়াও এদেশের সর্বোচ্চ সম্মানের ও গৌরবের মুক্তিযোদ্ধা, পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তানদের সম্মান ও অধিকার বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি তারা ভাবছে না। যারা সমর্থন বা ইন্ধন দিচ্ছেন তারাও রাষ্ট্র পরিচালনা করে এসেছেন বা ভবিষ্যতেও আসবেন তারাও বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন না। সরকার একবার ভুল করতে পারে তাই বলে বারবার ভুল করবে এমনটি ভাবা ঠিক নয়। তাই কাউকে অধিকার বঞ্চিত করার হীন খেলায় মদদ দেওয়া বিবেকসম্মত কোনো কাজ হতে পারে না।

ছাত্ররা যে বিষয়টি নিয়ে শিক্ষাঙ্গনকে অস্থির করছে সেটি এখনো যেহেতু আদালতের বিচেনাধীন। তাই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা বা কোনো সিদ্ধান্ত কারও ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে আদালত অবমাননাকর। আমরা যাদের আন্দোলনরত দেখছি তারা আবেগে বা ক্রোধে ভাসতে পারে কিন্তু আমরা যারা বিচারাধীন বিষয় নিয়ে ওদের সমর্থন বা মদদ দিচ্ছি, তাদের উচিত ছাত্রদের নিবৃত্ত করা এবং প্রয়োজনে সবাইকে নিয়ে এর সম্মানজনক সমাধানের বিষয়ে আলোচনার টেবিলে বসা। মাঠ গরম করে, সড়ক অবরোধ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা নয়। এই যে ১ জুলাই থেকে চলমান আন্দোলনের ক্ষতি কার ওপর চাপছে? নিশ্চয়ই প্রথমত ছাত্রদের ওপর কারণ তাদের নিয়মিত পড়াশোনা ও পরীক্ষা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন জনগণ। যাদের স্বাভাবিক যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে।

আন্দোলন হচ্ছে চাকরিতে সরকারি কোটা বরাদ্দ নিয়ে। ১৯৮৫ সাল থেকে সরকারি চাকরিতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদে ৪৫ শতাংশ মেধার ভিত্তিতে এবং ৫৫ শতাংশ অগ্রাধিকার কোটায় নিয়োগ চালু হয়। পরবর্তী সময়ে প্রতিবন্ধীদের জন্য ১ শতাংশ বাড়িয়ে ৫৬ শতাংশ নির্ধারিত হয়। বর্তমানে যে ৫৬ শতাংশ কোটা পদ্ধতি তার ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা, ১০ শতাংশ নারী, ১০ শতাংশ জেলা কোটা, ৫ শতাংশ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী আর মাত্র ১ শতাংশ প্রতিবন্ধীদের জন্য। বাকি ৪৬ শতাংশ মেধার লড়াইয়ে যারা জিততে পারে তাদের জন্য। এখানে উল্লেখ্য, কোটায় উপযুক্ত প্রার্থী পাওয়া না গেলে তা মেধাতালিকা থেকেই পূরণ করা হয়। এই বাস্তবতা বর্তমান সময়ে কতটুকু গ্রহণযোগ্য তা পর্যালোচনা করা অবশ্যই প্রয়োজন। সরকার সে লক্ষ্যেই কাজ করছে। আদালত কী রায় দেয় সেটা দেখে যত দ্রুত সম্ভব এ বিষয়ে সব মহল পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে একটা গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন- সাধারণ জনগণ সেটিই প্রত্যাশা করে।

লাভ-ক্ষতির হিসাব করতে গেলে দেখা যাবে সরকারি চাকরিজীবীরা জনগণের একট নগণ্য অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। বেসরকারি চাকরিজীবী ও সাধারণ শ্রমিক কর্মচারীরা করে বেশির ভাগ জনগণের প্রতিনিধিত্ব। তাহলে এই কোটাবিরোধী, কোটা সংস্কার বা কোটা বাতিলের আন্দোলন কার স্বার্থে? যে আন্দোলন সংখ্যা গোরিষ্ঠ জনগণের দাবি বা চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে নয় তার পক্ষে মতামত দেওয়ার বা মদদ দেওয়া জনস্বার্থবিরোধী বলে আমার মনে হয়।

তাই সব মহলের প্রতি অনুরোধ বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা না করে আসুন কেউ আন্দোলনে নামলেই সেখানে সমর্থন না দেই। যে আন্দোলন সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের স্বার্থে, আমরা সেই আন্দোলনকে স্বাগত জানাই। সেখানে ভোগান্তি থাকলেও বেলা শেষে পাওনাটা আদায় হলে সাধারণ মানুষের তৃপ্তির হাসিটা সব কষ্টকে ম্লান করে দেয় নিশ্চিত।

লেখক: কলামিষ্ট


আয়াতুল কুরসির ফজিলত

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
মুফতি আলী হুসাইন

‘আয়াতুল কুরসি’ আল্লাহর অপূর্ব দান। এটা সুরা বাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াত। একাধিক হাদিসে আয়াতটি দিনে-রাতে মোট আটবার পড়ার কথা বলা হয়েছে, সকাল-সন্ধ্যায়, পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের পর এবং শোয়ার সময়। প্রতিটি মুমিনের কর্তব্য এই পবিত্র আয়াতটিকে প্রতিদিনের ওজিফা বানিয়ে নেওয়া। কেউ যদি আয়াতুল কুরসি পড়ে ঘুমায়, আল্লাহ তায়ালা তাকে সকল প্রকার বিপদ-আপদ বালা-মুসিবত থেকে হেফাজত করবেন। চোর-ডাকাত থেকে রক্ষা করবেন। মানুষ, শয়তান ও দুষ্ট জিনের ক্ষতি থেকেও নিরাপদ ও সুরক্ষিত রাখবেন।

উবাই ইবনে কাব [রাদিয়াল্লাহু আনহু] বর্ণনা করেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে বললেন, হে আবুল মুনযির! তোমার কাছে আল্লাহর কিতাবের কোন আয়াতটি সবচেয়ে বেশি মর্যাদাপূর্ণ? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই অধিক জানেন। তিনি আবার বললেন, হে আবুল মুনযির! তোমার কাছে আল্লাহর কিতাবের কোন আয়াতটি সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ? আমি বললাম, আয়াতুল কুরসি। তখন তিনি আমার বুকে হাত চাপড়ে বললেন, হে আবুল মুনযির! তোমার জ্ঞানের জন্য তোমাকে মোবারকবাদ। [মুসলিম: ৮১০]

আবু হুরাইরা [রাদিয়াল্লাহু আনহু] বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, আয়াতুল কুরসি কোরআনের অন্য সব আয়াতের সর্দার। আয়াতটি যে ঘরে পড়া হবে, সে ঘর থেকে শয়তান বের হয়ে যাবে। [মুসতাদরাকে হাকেম: ২১০৩]

সহিহ বুখারিতে এসেছে, আবু হুরাইরা [রাদিয়াল্লাহু আনহু] থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে রামাদান মাসে জাকাতের সম্পদ দেখাশোনা ও পাহারা দেওয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত করলেন। তিনি মুসলমানদের থেকে উসুল করা জাকাতের সম্পদ দেখাশোনা করতেন। এক রাতে এক আগন্তুক এসে জাকাতের সেই স্তূপিকৃত খেজুর থেকে মুঠি ভরে নিতে লাগল। আমি তাকে ধরে ফেললাম এবং বললাম তোমাকে আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে নিয়ে যাব। সে বলল, ‘দেখুন, আমি এক হতদরিদ্র মানুষ। পরিবারের ব্যয় নির্বাহের দায়িত্ব আমার কাঁধে। আমার দয়া হলে আমি তাকে ছেড়ে দিলাম।’

সকালে নবি কারিম (সা.) বললেন, আবু হুরাইরা! তোমার গত রাতের বন্দির কী অবস্থা? আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! সে তার অভাব-অনটন ও পরিবারের ভারগ্রস্ততার কথা বলায় আমার মনে দয়ার উদ্রেক হয়েছে বিধায় তাকে ছেড়ে দিয়েছি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, দেখ, সে তোমাকে মিথ্যা বলেছে, সে আবার আসবে। আমি বুঝতে পারলাম, যেহেতু রাসুল বলেছেন, তাহলে সে অবশ্যই আসবে। তাই আমি পূর্ব থেকেই তার অপেক্ষায় প্রস্তুত থাকলাম। ইতোমধ্যে সে আসল এবং খাদ্যস্তূপ থেকে মুঠি ভরে নিতে লাগল। আমি তাকে ধরে ফেললাম এবং বললাম, ‘আজকে আমি তোমাকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে উপস্থিত করবই। সে তখন বলতে লাগল, আমাকে ছেড়ে দিন। আমি তো অভাবী লোক। আমার ওপর পরিবারের দায়-দায়িত্ব আছে। তার কথায় আমার দয়া হলো, তাই আমি আবার তাকে ছেড়ে দিলাম।’

সকালে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘তোমার বন্দির কী খবর? আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! সে চরম হতদরিদ্র, নিজের অভাব ও পরিবারের দায়-দায়িত্বের কথা বলায় আমার মনে দয়া হয়, তাই তাকে ছেড়ে দেই।’ তিনি বললেন, ‘সে তোমাকে মিথ্যা বলেছে। সে আবার আসবে।’ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কথায় আমি তৃতীয় রাতেও তার অপেক্ষায় থাকলাম। ঠিকই সে এসে মুঠি ভরে খাদ্য নিতে লাগল। আমি তাকে ধরে ফেলি এবং বলি, এবার তোমাকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে নিয়েই ছাড়ব।

এ নিয়ে তিনবার হলো, তুমি বল আসবে না কিন্তু পরে ঠিকই এসে যাও। তখন সে বলল, আমাকে ছেড়ে দাও। আমি তোমাকে এমন কিছু কথা শিখিয়ে দেব, যার দ্বারা আল্লাহ তোমাকে উপকৃত করবেন। আমি বললাম, কী সেই কথা? সে বলল, যখন বিছানায় যাবে, আয়াতুল কুরসি পাঠ করবে। তাহলে আল্লাহর পক্ষ থেকে সকাল পর্যন্ত তোমার জন্য একজন পাহারাদার নিযুক্ত থাকবে এবং সকাল পর্যন্ত শয়তান তোমার কাছে আসতে পারবে না। আমি তাকে ছেড়ে দিলাম। রাসুলুল্লাহ সকালেই আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, গত রাতে তোমার বন্দির কী খবর? আমি বললাম, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! সে বলল যে, আমাকে কিছু কথা শিখিয়ে দেবে, যার দ্বারা আল্লাহ আমাকে উপকৃত করবেন। তাই তাকে ছেড়ে দিয়েছি।’

জিজ্ঞাসা করলেন, সে কথাগুলো কী?

সে আমাকে রাতে শোয়ার সময় আয়াতুল কুরসি পড়ে ঘুমাতে বলেছে। এতে আল্লাহ তায়ালা আমাকে সকাল পর্যন্ত হেফাজত করবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এ কথা শুনে বললেন, সে তোমাকে সত্যই বলেছে। যদিও সে মহা মিথ্যুক। এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, আবু হুরাইরা! তুমি কি জানো, তিন রাত ধরে তোমার সঙ্গে কার সাক্ষাৎ হচ্ছে?

-না, তা তো জানি না!

-সে ছিল শয়তান। [সহিহ বুখারি: ২৩১১]

আয়াতুল কুরসি

‘আল্লাহ, তিনি ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই। তিনি চিরঞ্জীব ও বিশ্বচরাচরের ধারক। কোনো তন্দ্রা বা নিদ্রা তাকে স্পর্শ করতে পারে না। আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সবকিছু তাঁরই মালিকানাধীন। তাঁর হুকুম ব্যতীত এমন কে আছে যে, তাঁর নিকট সুপারিশ করতে পারে? তাদের সম্মুখে ও পিছনে যা কিছু আছে সবকিছুই তিনি জানেন। তাঁর জ্ঞানসমুদ্র হতে তারা কিছুই আয়ত্ত করতে পারে না, কেবল যতটুকু তিনি দিতে ইচ্ছে করেন তা ব্যতীত। তাঁর কুরসী সমগ্র আসমান ও জমিন বেষ্টন করে আছে। আর সেগুলোর তত্ত্বাবধান তাঁকে মোটেই শ্রান্ত করে না। তিনি উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ও মহিমাময়।’ [সুরা বাকারা, আয়াত: ২৫৫]

ব্যাখ্যা

আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই

আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো বা একাধিক উপাস্য থাকলে কি সমস্যা? এ প্রশ্নের জবাবে আল্লাহ বলেন,

‘বল, ওদের কথামতো যদি তাঁর সঙ্গে অন্য উপাস্যও থাকত, তবে তারা আরশের অধিপতির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার উপায় অন্বেষণ করত।’ [সুরা বনী ইসরাইল, আয়াত: ৪২]

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছেÑ

আল্লাহ কোনো সন্তান গ্রহণ করেননি এবং তাঁর সঙ্গে অন্য কোনো ইলাহ নেই। থাকলে প্রত্যেক উপাস্য নিজ নিজ সৃষ্টি নিয়ে আলাদা হয়ে যেত এবং একজন অন্যজনের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে চাইত। তারা যা বলে, তা থেকে আল্লাহ পবিত্র। [সুরা মুমিন, আয়াত: ৯১]

সুরা আল-আম্বিয়ার ২২ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছেÑ

যদি আসমান ও জমিনে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ থাকত, তবে উভয়েই ধ্বংস হয়ে যেত। অতএব তারা যা বলে, তা থেকে আরশের অধিপতি আল্লাহ পবিত্র।’ [সুরা আম্বিয়া: ২২]

মোটকথা, আল্লাহর সঙ্গে যদি একাধিক উপাস্য থাকত, তাহলে তাদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই, আধিপত্য বিস্তারের লড়াই, ভৌগোলিক-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বিস্তারের লড়াই অনিবার্য হয়ে উঠত। তখন সব উপাস্যের ধ্বংসটাও নিশ্চিত ছিল।

চিরঞ্জীব আল্লাহকে কেউ জন্ম দেয়নি; তিনিই জন্ম-মৃত্যু সৃষ্টি করেছেন। তিনি সৃষ্টি করেন এবং সৃষ্টির বিনাশ ঘটান। জন্ম-মৃত্যুর যিনি স্রষ্টা, তিনি স্বভাবতই জন্ম-মৃত্যুর ঊর্ধ্বে। তিনি সদা-বর্তমান। মৃত্যু তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না। যখন মহাবিশ্ব বলে কিছুই ছিল না, তখনো তিনি ছিলেন। আবার যখন সব কিছুর বিনাশ ঘটবে তখনো তিনি থাকবেন। তাঁর কোনো শুরু নেই। তাঁর কেনো শেষও নেই। তিনি আদি। তিনি অনন্ত।

আল্লাহ বলেন,

তিনি চিরঞ্জীব। তিনি ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই। অতএব তাঁর কাছেই প্রার্থনা কর বিশুদ্ধ-চিত্তে, নিবেদিত প্রাণ হয়ে। সব প্রশংসা বিশ্বজগতের পালনকর্তা আল্লাহর জন্য। [সুরা মুমিন, আয়াত: ৬৫]

বিশ্বচরাচরের ধারক মহাবিশ্বসহ সব সৃষ্টিকে যিনি ধারণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ করে চলেছেন, তিনিই ‘আল-কাইয়ুম’। জড়বস্তু আর জীববস্তু; প্রত্যেকের প্রতি মুহূর্তের প্রতিটি প্রয়োজন তিনি নিজস্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী পূরণ করে চলেছেন এবং নির্ধারিত পরিণতির দিকে প্রত্যেককে পরিচালিত করে চলছেন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর গৌরব ও মহিমা ঘোষণা করে, তিনি প্রবল পরাক্রান্ত, মহাপ্রজ্ঞাবান। আসমান ও জমিনের তিনিই একচ্ছত্র মালিক এবং তিনিই জন্ম ও মৃত্যু দেন, তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান। তিনি আদি এবং তিনিই অন্ত; তিনি প্রকাশিত এবং তিনিই অপ্রকাশিত; সব বিষয়ে তিনি সম্যক অবগত। তিনি আসমান ও জমিনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর আরশে সমাসীন হয়েছেন। তিনি জানেন, যা ভূতলের গভীরতম প্রদেশে প্রবেশ করে, আর যা তা থেকে বের হয় এবং যা আকাশ থেকে অবতীর্ণ হয় এবং যা তাতে ওঠে যায়, তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন। তোমরা যা কর আল্লাহ সবই দেখেন। আসমান ও জমিনের সার্বভৌমত্ব তাঁরই; তাঁর কাছেই আছে সব বিষয়ে মীমাংসা। মানুষের বুকের গভীরে লুকায়িত সব তথ্যই আল্লাহ জানেন। [সুরা হাদীদ: ২-৬]

(কোনো তন্দ্রা এবং নিদ্রা তাকে স্পর্শ করতে পারে না) আল্লাহ ঘোষণা করছেন, তিনি তন্দ্রাচ্ছন্ন হন না এবং তাঁর ঘুমের প্রয়োজন পড়ে না। তাঁর ক্লান্তি নেই। সদা-সর্বদা বিশ্ব পরিচালনার কাজে ব্যস্ত থাকেন।

সুরা আর-রহমানে ঘোষিত হয়েছেÑ

‘তিনি প্রতিদিনই [প্রতি মুহূর্তে] বিশাল কর্মযজ্ঞে ব্যস্ত থাকেন।’ [সুরা আর-রহমান, আয়াত:২৯]

(কে আছে যে, তাঁর অনুমতি ব্যতীত সুপারিশ করবে?) এই পৃথিবীর সবকিছু আল্লাহর একক মালিকানাধীন। তিনি তাঁর আপন ইচ্ছানুযায়ী তাদের প্রত্যেককে নির্দিষ্ট পরিণতির দিকে চালিত করে চলেছেন। তাঁর ইচ্ছা কিংবা আনুগত্যের বাইরে যাওয়া কোনো সৃষ্টির পক্ষেই সম্ভব নয়। এমনকি তাঁর অধীনস্থদের কেউ নিজের বা অন্য কারও ব্যাপারে কোনো বিষয়ের সুপারিশও আল্লাহর কাছে করতে পারবে না। তবে তিনি যদি দয়া করে কাউকে সুপারিশ করার জন্য নির্বাচিত করেন এবং তাকে অনুমতি প্রদান করেন তাহলে সে সুপারিশ করতে পারবে।

(যতটুকু তিনি ইচ্ছে করেন তা ছাড়া তাঁর জ্ঞানভাণ্ডারের কিছুই তারা আয়ত্ত করতে পারে না) মহান আল্লাহ মহাবিশ্বের প্রতিটি জড় পদার্থ ও প্রাণীজগতের অতীত-বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকেফহাল। পক্ষান্তরে, মানুষ কেবল ঘটমান বর্তমান এবং অতীতের টুকরো টুকরো স্মৃতি ছাড়া আর কিছুই জানে না। তবে আল্লাহ যদি কাউকে বিশেষভাবে অন্য মানুষের তুলনায় বেশি জ্ঞান দান করেন সেটা ভিন্ন কথা। মোটকথা মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধির সীমাবদ্ধতা রয়েছে কিন্তু আল্লাহর জ্ঞানের সীমা নেই, তিনি অসীম, তাঁর জ্ঞানও অসীম।

আল্লাহ বলেন,

নিশ্চয়ই কেয়ামতের জ্ঞান কেবল আল্লাহর কাছেই আছে। তিনি বৃষ্টিবর্ষণ করেন এবং তিনিই জানেন মাতৃগর্ভে যা আছে। কেউ জানে না আগামীকাল সে কী উপার্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন দেশে সে মৃত্যুবরণ করবে। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্ববিষয়ে সম্যক অবগত। [সুরা লুকমান: ৩৪]

(তাঁর সিংহাসন (কুরসি) আসমান ও জমিনকে পরিবেষ্টন করে আছে) কুরসি শব্দের আভিধানিক অর্থ সিংহাসন, আসন, চেয়ার ইত্যাদি। আসন থেকে জমিন পর্যন্ত বিস্তৃত একটি কুদরতি সিংহাসনে আল্লাহ সমাসীন হয়ে আছেন। তাঁর অসীম কুদরত, শক্তি, ক্ষমতা, বিশালত্ব, শাসনব্যবস্থা ইত্যাদি দিয়ে মহাবিশ্বসহ প্রত্যেক জড় এবং জীবকে প্রতিনিয়ত পরিবেষ্টন করে আছেন।

আল্লাহ বলেন,

আর তারা আল্লাহকে যথার্থরূপে বোঝেনি। কেয়ামতের দিন পৃথিবী থাকবে তাঁর হাতের মুঠোয় এবং আসমানগুলো ভাঁজ করা অবস্থায় থাকবে তাঁর ডান হাতে। তিনি পবিত্র; আর এরা যাকে শরিক করে তিনি অনেক ঊর্ধ্বে। [সুরা যুমার, আয়াত: ৬৭]

লেখক: ইসলামী চিন্তাবিদ


বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে করণীয়

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
হায়দার আহমদ খান এফসিএ

সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ তার যোগ্যতা এবং শক্তিতে। এ মানুষ তার সুখ-শান্তির জন্য সমাজের প্রাপ্য সম্পদকে অধিক ব্যবহার উপযোগী করায় শ্রম বাজারের সূচনা। শ্রম বাজারের সঙ্গে শুরু হয়েছে শ্রমের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা। এ শ্রমের বিনিময় মূল্যের ওপর নির্ভর করে একজনের চাহিদা পূরণের সক্ষমতা। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে মানুষের চাহিদার রূপান্তর ঘটছে প্রতিদিন, সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার। এ প্রতিযোগিতার বাজারে সেই দেশ তত উন্নত বা দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত, যে দেশের মানুষ উন্নত সমাজব্যবস্থার সব উপকরণ বেশি উপভোগ করতে পারে। উন্নত সমাজব্যবস্থার উপকরণ সরবরাহের জন্য প্রয়োজন দক্ষ এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানবসম্পদ।

প্রতিযোগিতার বাজারে নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আয়-উপার্জন বৃদ্ধির পথ সমাজে স্বাভাবিক নিয়মেই হাজির। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সক্ষমতার বৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় শুরু হয়েছে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পন্থার ব্যবহার। আর এই বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে নতুন নতুন দ্রব্য, সেবার যেমন সৃষ্টি হচ্ছে- তেমনি সমাজে এক অসম প্রতিযোগিতাও শুরু হয়েছে। আগে মানুষ তার হাতের কাছে যেসব দ্রব্য, সেবা পেত তা দিয়েই তার চাহিদা পূরণ করত। এখন মানুষ তার যোগ্যতা বিবেচনায় প্রতিযোগিতায় সফলকাম হওয়ার জন্য সক্ষমতা বৃদ্ধির পরীক্ষার সম্মুখীন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটির মতো, আর আজ স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর ২০২৪ সালে এসে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ কোটি। ১,৪৭,৫৭০ বর্গ কিলোমিটারের বাংলাদেশে স্বাধীনতার পূর্বে ওই সংখ্যক মানুষের মধ্যে মাঝেমধ্যেই খাদ্যাভাবের খবর শোনা যেত; বর্তমানে খুব একটা এমন সংবাদ পাওয়া যায় না। কৃষি উৎপাদনের সফলতা আমাদের এক বিরাট অর্জন। তবে স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি উদ্দেশ্য ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি, সে লক্ষ্য এখনো অর্জিত হয়নি। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের মানুষ বেড়েছে, সঙ্গে বেড়েছে শ্রমিকের চাকরিতে প্রার্থীর সংখ্যা। বাংলাদেশের ১ কোটির বেশি মানুষ বিদেশে কর্মরত শ্রমিকের পদে। তাদের অধিকাংশের পারিবারিক জীবন নেই। তারপরেও বিদেশ যেতে বা পাঠাতে চায় অনেকে কারণ দেশেও তাদের কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা নেই। সম্প্রতি এক সংবাদে প্রকাশ ‘রেলপথের পরিচ্ছন্নতাকর্মী পদে চাকরি পাওয়াদের সবাই স্নাতকোত্তর’। সংবাদটি পড়ে আমার এক স্যারের কথা মনে হয়ে গেল। ১৯৮১ সালের অক্টোবর মাসে আমি যোগদান করেছিলাম বাংলাদেশ সরকারের টি অ্যান্ড টি বোর্ডে সহকারী পরিচালক (হিসাব) পদে। চাকরি জীবনের সূচনায় আমাদের পরিবার কেমন হবে তা চিন্তা করে কর্তৃপক্ষ আমাদের দিয়েছিলেন পরিবার পরিকল্পনার ওপর ট্রেনিং। সেই ট্রেনিং-এর একটি সেশনে লেকচার দিয়েছিলেন হিসাব জগতের এক সময়ের সবার গুরু ড. মো. হাবিবউল্লাহ স্যার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে স্যারকে পেয়েছিলাম শিক্ষক হিসেবে। স্যারের লেকচারের উপকারিতা জানা থাকায় আমার আগ্রহ ছিল তুঙ্গে। স্যার সব সময় ইনফরমাল পদ্ধতিতে ছাত্রদের কাছে আলোচ্য বিষয় উপস্থাপন করতেন, যা একবার শুনলে জীবনেও আর ভোলা যায় না। স্যার বলা শুরু করলেন তার ব্যক্তিগত জীবনের কাহিনি দিয়ে। স্যার যখন ইন্টারমিডিয়েটে ঢাকা কলেজে পড়েন, তখন বাড়ি থেকে টেলিগ্রাম ‘কাম শার্প দাদি সিরিয়াস’। টেলিগ্রাম পেয়ে বাড়ি যাওয়ার পর শুনলেন দাদি নাতবৌ দেখতে চান। যথারীতি বিয়ে করতে হয়েছিল স্যারকে। স্বাভাবিকভাবেই বিয়ের পর সন্তানদের আগমন শুরু হয়েছিল। পরিবার পরিকল্পনার কথা চিন্তা না করার পক্ষে কারণ- স্যারের ধারণা স্যারের ছেলেমেয়েরা চাকরি পাবেই কারণ বাংলাদেশে ম্যানেজারের চাকরির অভাব হবে না আর ‘হাবিবউল্লাহর ছেলেমেয়েরা ম্যানেজারের নিচে চাকরি করবে না’। ২০২৪ সালে অনেকের মতো আমারও ধারণা ম্যানেজারের পদে যোগ্য লোক পাওয়া যায় না, আর যোগ্য লোকের চাকরির অভাব হচ্ছে না। আর আমার ধারণা, ম্যানেজার পদে যোগ্য মানুষের অভাবের একটি প্রধান কারণ: মানসম্মত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে না পারা। আমরা যে আমাদের সন্তানদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে পারছি না তা মাঝেমধ্যে প্রকাশ হয়ে যায়। আমাদের একটি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকীয়তে দেখা যায়, তৃতীয় শ্রেণির শতকরা ৬০ এবং পঞ্চম শ্রেণির শতকরা ৭০ জন ছাত্রছাত্রী তাদের অঙ্ক বিষয়ে জ্ঞান রাখে না। এমন সংবাদ অনেক দিন ধরে আমাদের সামনে আসছে। এপ্রিল ১৭, ২০১৮ তারিখে দৈনিক বণিকবার্তার সংবাদে এসেছিল অষ্টম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা অর্জনের হার যার চিত্র এমন:

(১). বাংলায় শতকরা ৫৪ শতাংশ,

(২). ইংরেজিতে শতকরা ১৯ শতাংশ এবং

(৩). গণিতে শতকরা ২২ শতাংশ।

এমন সব ছেলেমেয়ের একটি অংশ যদি আমাদের দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে তাহলে, পরিচ্ছন্নতাকর্মী পদে চাকরির দরখাস্ত করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো উপায় থাকবে না। এই পরিবেশের জন্য দায়ী দরখাস্তকারীরা অবশ্যই নয়। অন্য এক সংবাদে প্রকাশ, বাংলাদেশের ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি যুবসমাজের ১৮.৮৭ শতাংশের কোনো প্রকার শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণ নেই (দি ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, জুন ২৪, ২০২৪)। বাংলাদেশে ম্যানেজারের পদে চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় যোগ্য প্রার্থীর সংখ্যা যথেষ্ট না থাকায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদেশি প্রার্থীদের বাংলাদেশে চাকরির সংবাদ পাওয়া যায়। সম্প্রতি প্রকাশিত এমন একটি সংবাদ ‘দেশে অবৈধ কত বিদেশি শ্রমিক কাজ করেন জানতে চান হাইকোর্ট’।

বর্তমান বিশ্বে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বেশি। আমাদের দেশ অধিকাংশ সময় গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের হাতেই ছিল কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় যে আদর্শ উদ্দেশ্য নিয়ে যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছিল আমার মতো মুক্তিযোদ্ধারা- সেই স্বপ্ন আজও বাস্তবায়ন হওয়া তো দূরের কথা, বাস্তবায়নের পথে আছে তাও বলতে লজ্জা পাওয়ার মতো। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে মাঝেমধ্যে জাতীয়পর্যায়ে আলোচনা হয়, যা সংবাদমাধ্যমে স্থান পায়। বাংলাদেশের এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া খুব একটা আমাদের নজরে আসে না বা উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। এভাবেই স্বাধীন দেশের ৫৩ বছর চলে গিয়েছে। আর কতদিন যাবে বা লাগবে উন্নতি শুরু করতে? আর কতদিন আমাদের সন্তানদের শ্রমিকের চাকরিতে বিদেশে পরিবার ছাড়া দিনের পর দিন থাকতে দিব? বাংলাদেশের একমাত্র সম্পদ তার মাটি এবং মানুষ। সেই মানুষ এবং মাটিকে ব্যবহার করার যে পরিকল্পনা দরকার তা দেখা যাচ্ছে না। ১৯৭২ সালেই শিক্ষা ক্ষেত্রে শুরু হয়েছিল নকল এবং অটো প্রমোশনের মতো ব্যবস্থা, যা আজও অনেক ক্ষেত্রে বিরাজমান। তবে মাঝেমধ্যে সরকারের আশা জাগানিয়া কিছু পদক্ষেপের কথা শোনা যায়। ‘জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহ-২০২৪’ উদ্‌যাপন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার পুণর্ব্যক্ত করে বলেছেন ‘শৈশব থেকেই সন্তানদের বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা দিতে হবে’। অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।

একটি দেশের আসল সম্পদ তার মানুষ। মানবসম্পদ ছাড়া অন্য যত সম্পদই থাকুক না কেন, মানবসম্পদ ছাড়া তা কাজে লাগানো যায় না। আর যদি উপযুক্ত এবং মানসম্মত মানবসম্পদ সৃষ্টি করা যায়, তাহলে সে দেশের মানুষ আরাম আয়েশে উন্নত জীবনযাত্রায় বসবাস করতে পারবে অন্য সব সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে। বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটি। সরকারি হিসাবে প্রায় ৩ কোটি ছেলেমেয়ে প্রাথমিক শিক্ষায় সম্পৃক্ত। সরকারের উচিত সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষায় জড়িতদের সম্পদে রূপান্তর করা। শিক্ষায় সরকারের বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ সরকারের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ নেই, ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও কম। তারপরও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। যেমন সম্প্রতি সংবাদে প্রকাশ, প্রাথমিক শিক্ষায় জড়িতদের মধ্যে ৩৭ লাখ ছেলেমেয়েকে মিড-ডে খাবার পরিবেশন করা হবে আগামী আগস্ট থেকে। সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিতির নিশ্চয়তাসহ পড়াশোনার প্রতিদিনের অগ্রগতি পর্যালোচনাও করতে হবে- তাহলেই বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার পদক্ষেপ কার্যকর হবে। চাকরির সুযোগ দিন দিন বাড়বে, তবে মেধাসম্পন্ন ব্যক্তির জন্য। আমাদের কাজ হবে সুপ্ত মেধাকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। সন্তানকে শিক্ষিত করার মাধ্যমেই আমাদের আর্থিক সচ্ছলতার টেকসই অবস্থান নিশ্চিত হবে। মনে রাখতে হবে বর্তমান বিশ্ব একটি পরিবার।

লেখক: চেয়ারম্যান, এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (ইডিএ)


banner close