মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২৬
১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

বন্যা-পরবর্তীতে করণীয়

সৈয়দ শাকিল আহাদ
প্রকাশিত
সৈয়দ শাকিল আহাদ
প্রকাশিত : ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ১৭:১৯

আমাদের বাংলাদেশের অবস্থান গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ এলাকায় হওয়ায় এবং বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে প্রবাহিত বিভিন্ন উপনদীর কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছরই বর্ষাকালে ছোট থেকে মাঝারি আকারের বন্যা হয়ে থাকে।

আমাদের জানা দরকার বন্যা কী?

বন্যা হলো জলের উপচে পড়া বা খুব কমই অন্যান্য তরল যা সাধারণত শুষ্ক জমিকে নিমজ্জিত করে। ‘প্রবাহিত জল’ অর্থে, শব্দটি জোয়ারের প্রবাহের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যেতে পারে।

সাম্প্রতিক বন্যা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশের ১২টি জেলার ব্যাপক ক্ষতি করে, বিশেষ করে কৃষি জমিতে ফসল, রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, খাল-বিল, পুকুরসহ আবাদি জমি ও গৃহপালিত পশু এবং বাড়িঘর, দেকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজ ও হাসপাতাল, ব্যাংক-বিমা এমনকি ধর্মীয় উপাসনালয়ও মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিব দাবি করছেন, তারা উপদ্রুত এলাকা থেকে মানুষকে আগেভাগে সরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন, তবে মানুষ আসতে চায়নি।

আবহাওয়া অধিদপ্তর দাবি করেছে, তাদের কাছে থাকা বন্যার আগাম তথ্য তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানিয়েছে, কাজেই দায় তাদের না। তবে একজন পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ বলেছেন, আবহাওয়া অধিদপ্তর যে ভাষায় বার্তা দেয়, তা মানুষ বোঝে না। তার মতে, বার্তার ভাষাও পাল্টাতে হবে।

বন্যা-পরবর্তী ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ও সহায়তা প্রদান করা দরকার।

বর্তমানে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিটি বিভাগসহ সারা দেশের সর্বস্তরের জনগণের এমনকি বিদেশে অবস্থানরত সহৃদয়বান দেশি-বিদেশি জনগণের সবার উচিত বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসনে সাধ্যমতো সহায়তা করা।

বন্যা-পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্য সমস্যা এবং সংকট গুরুতর আকার ধারণ করে। বন্যার কারণে পানি দূষিত হয়, স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং মশাবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়তে শুরু করে। এই পরিস্থিতিগুলো দ্রুত নিরসন করা না হলে বন্যা প্লাবিত এলাকায় মহামারি আকার ধারণ করতে পারে রোগব্যাধি।

দূষিত পানি পান ও খাদ্যগ্রহণের ফলে ডায়রিয়া ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এটি শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায় এবং সময়মতো চিকিৎসা না পেলে মৃত্যুর কারণ হতে পারে। বন্যা-পরবর্তী সময়ে কলেরা সবচেয়ে বিপজ্জনক, পানিবাহিত রোগগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। দূষিত পানি ও খাবার থেকে এই রোগ ছড়ায় এবং দ্রুত অনেক মানুষের মধ্যে তা সংক্রমণ ঘটাতে পারে। এ ছাড়া দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে ছড়ানো টাইফয়েড বন্যার পরে খুবই সাধারণ একটি রোগ। রোগ বাড়তে না দিয়ে সঠিক সময়ে সঠিকভাবে চিকিৎসা না করা হলে তাতে দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। বন্যার ফলে স্থির পানি জমে থাকা এলাকাগুলো মশার প্রজননের আদর্শ ক্ষেত্রে পরিণত হয়। এ কারণে ম্যালেরিয়া রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। ডেঙ্গু ভাইরাস বহনকারী এডিস মশার জন্য বন্যা-পরবর্তী অবস্থা উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে। এটি দ্রুত রোগ ছড়াতে সক্ষম এবং ক্রমান্বয়ে পানিবাহিত এই রোগ মারাত্মক হতে পারে। চিকুনগুনিয়া আরেকটি মশাবাহিত রোগ- যা ডেঙ্গু এবং ম্যালেরিয়ার মতোই বন্যার পরে বৃদ্ধি পেতে থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে পানির সংস্পর্শে থাকার কারণে ত্বকে ফাঙ্গাল ইনফেকশন দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে ‘এথলেটস ফুট’ এবং অন্যান্য চর্মরোগ উল্লেখযোগ্য। ভেজা মাটি এবং পানিতে হাঁটাহাঁটি করার কারণে পায়ের ত্বকে বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ হতে পারে, বিশেষ করে যারা জুতা ছাড়া হাঁটেন তাদের মধ্যে। বন্যার পরে আর্দ্র ও ঠাণ্ডা পরিবেশে ঠাণ্ডা, কাশি এবং জ্বরের মতো সমস্যাগুলো বেড়ে যায়। দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এই রোগগুলোর প্রাদুর্ভাব বাড়িয়ে তোলে। ঘরের ভেতর আর্দ্রতা বাড়ার কারণে অ্যাজমা এবং অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা বাড়তে পারে, বিশেষ করে যারা ধুলা ও আর্দ্রতার প্রতি সংবেদনশীল।

বন্যা উত্তর পরিস্থিতি অল্পদিনের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। বন্যায় বিপৎসীমার ওপরে ওঠা পানি যখন আস্তে আস্তে নেমে আসে, ঠিক তখনই আসল যুদ্ধ শুরু হয়। সাধারণত বন্যার চেয়েও কঠিন হয়ে থাকে বন্যা-পরবর্তী সময় মোকাবিলা করা। সে সময় বর্তমান সময়ের মতো এত মানুষও পাশে থাকে না। তখন সামাল দিতে হয় নিজেদের। মোকাবিলা করতে হয় বন্যা-পরবর্তী সময়ের কঠিন পরিস্থিতিকে।

বন্যা-পরবর্তী সময়ে উপদ্রুত এলাকায় জনগণের স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে, লক্ষ্মীপুর, ফেনী ও নোয়াখালী জেলায় বন্যা-পরবর্তীতে ডায়রিয়া মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। জেনারেল হাসপাতালসমূহে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ধারণক্ষমতার চেয়ে ১১ গুণ বেশি রোগী নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। গুরুত্ব সহকারে প্রতিটি বাড়ির টিউবওয়েল, টয়লেট, ড্রেনেজ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসায় ফিরিয়ে আনতে হবে স্বাভাবিক অবস্থা, সরকারের পক্ষ থেকে স্থানীয় জনগণকে স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে, সে বিষয়ে সচেতন করতে হবে। এতে বন্যা-পরবর্তী রোগ প্রতিরোধে জনগণের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। বেশি বেশি করে রেডিও, টেলিভিশন এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে স্বাস্থ্য সচেতনতা বার্তা বারবার প্রচার করা যেতে পারে।

বেসরকারি উদ্যোগেও বন্যা-পরবর্তী সতর্কতামূলক পদক্ষেপসমূহের ব্যাপক প্রচারণা সংকট মোকাবেলায় সহায়ক হবে।

চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন এসব এলাকার মানুষ। লক্ষ করা গেছে, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতেও মানুষের ঠাঁই হচ্ছে না। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে ছোট-বড় সড়ক ও মহাসড়ক এবং রেললাইনও। এমনকি বেশ কিছু স্থানে বিদ্যুৎ সরবরাহও বন্ধ আছে। অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন এই ফেনী, লক্ষ্মীপুর, কুমিল্লা ও নোয়াখালীর বেশির ভাগ লোকজন।

এদিকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ সারা দেশের সঙ্গে সেনাবাহিনী বন্যাকবলিতদের উদ্ধারে এবং সহযোগিতায়, ছাত্র-জনতা ও স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।

বন্যা-পরবর্তী সময়ে বন্যার পানিতে হাঁটা উচিত নয়, সাঁতার কাটাও নিরাপদ নয়; তাছাড়া সাপের উপদ্রব তো আছে। ইদানীং সারা দেশে রাসেল ভাইপার আতঙ্কের কারণেও বন্যা উপদ্রুত এলাকায় ব্যাপক সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করা যায়। ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তায় স্বাভাবিক গতিতে গাড়ি চালানোও ঝুঁকির কারণ। কেননা ৬ ইঞ্চি পানির স্তরেও যেকোনো গাড়িচালক যেকোনো সময় নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারেন।

ভেজা বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি থেকে দূরে থাকা উচিত, এতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ঝুঁকি আছে।

বাড়িতে ঢোকার আগে প্রত্যেকের দেখে নেওয়া প্রয়োজন যে, কোনো কাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে কি না।

বৈদ্যুতিক জিনিসপত্র পরিদর্শন করার আগে কখনোই পাওয়ার চালু করা উচিত না, কারণ যেকোনো মুহূর্তে ঘটে যেতে পারে মারাত্মক দুর্ঘটনা।

সাপ ও বিভিন্ন প্রাণী বাড়িতে থাকতে পারে, তাই সবারই সতর্ক থাকা উচিত। সম্ভব হলে গ্লাভস ও বুট পরার অভ্যাস করতে হবে। বন্যা-দূষিত প্রতিটি বাড়ির বিভিন্ন ঘর পরিষ্কার, জীবাণুমুক্ত ও শুকিয়ে রাখতে হবে।

যদি কোনো বিমা থাকে, তাহলে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন যে, বিমা দাবির নথি হিসাবে ছবি বা ভিডিও আছে কি না।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রতিক বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কৃষকদের করণীয় সম্পর্কে বন্যার পানিতে ভেসে আসা কচুরিপানা, পলি, বালি এবং আবর্জনা যত দ্রুত সম্ভব পরিষ্কার করতে হবে। বন্যার পানি সরে যাওয়ার পর ৫-৭ দিন কাদাযুক্ত ধানগাছ পরিষ্কার পানি দিয়ে, প্রয়োজনে স্প্রে মেশিন দিয়ে ধৌত করে দিতে হবে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরপরই সার প্রয়োগ করা ঠিক নয়। এতে ধান গাছ পচে যেতে পারে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার ১০ দিন পর ধানের চারায় নতুন পাতা গজানো শুরু হলে বিঘাপ্রতি ৮ কেজি ইউরিয়া ও ৮ কেজি পটাশ সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে।

বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর ব্রি উদ্ভাবিত আলোক সংবেদনশীল উফশী জাত যেমন- বিআর৫, বিআর২২, বিআর২৩, ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৪৬, ব্রি ধান৫৪ এবং নাইজারশাইলসহ স্থানীয় জাতসমূহ রোপণ করতে হবে। এ ছাড়া, ব্রি উদ্ভাবিত স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন জাত ব্রি ধান৫৭ ও ব্রি ধান৬২ রোপণ করা যেতে পারে।

বন্যা উপদ্রুত জেলাসমূহের কৃষি সম্প্রসারণ অফিসারদের সমন্বয়ে টিম গঠন করে দুর্যোগ মোকাবেলায় সম্ভাব্য করণীয় নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে; চলমান কৃষি প্রণোদনা ও পুনর্বাসন কর্মসূচি জোরদার করতে হবে; বন্যার ক্ষতি মোকাবেলার জন্য উপযুক্ত জাতের আমন ধানের বীজের পর্যাপ্ত সংস্থান ও সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে; অপেক্ষাকৃত উঁচু জায়গায় আপৎকালীন বীজতলা তৈরির কাজ শুরু করতে হবে; নাবী জাতের রোপা আমন ধান চাষে কৃষকদের পরামর্শ দিতে হবে; নাবী জাতের ধানের বীজ দেশের বন্যামুক্ত এলাকা হতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সরবরাহের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে; বন্যা কবলিত ঝুঁকিপূর্ণ গুদামে রক্ষিত সার নিরাপদ জায়গায় সংরক্ষণ করতে হবে; আগাম জাতের শীতকালীন সবজি উৎপাদনের বিষয়ে কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে; বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগিতার লক্ষ্যে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ-পূর্বক মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব প্রেরণ করতে হবে; বন্যা দুর্গত এলাকার কৃষি অফিসসমূহে সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা দরকার।

বন্যা দুর্গত এলাকার সার্বক্ষণিক তথ্য সরবরাহের লক্ষ্যে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় উপজেলা, জেলা, অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ স্থাপনপূর্বক হালনাগাদ তথ্য সরবরাহ করতে হবে। বন্যাকবলিত এলাকায় সরকারি অফিসসমূহের মালামাল নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করতে হবে।

সব মিলিয়ে বন্যা-পরবর্তী পরিস্থিতি পূর্বাঞ্চলের ওই জেলাসমূহে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।

যে যা-ই বলুক বা মনে করুক আমাদের ব্যবস্থা ও প্রতিকার আমাদেরই নিতে হবে। সুদুরপ্রসারী দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দ্বারা যথাস্থানে বাঁধ নির্মাণ, ফসলি জমিকে উৎপাদনমুখী, রাস্তাঘাট পুনর্নির্মাণ, পুকুর জলাশয়ে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে মাছচাষে দ্রুত মনোযোগ ও গরিব অসহায় জনগোষ্ঠীর গৃহ পুনর্নির্মাণে সহায়তা করতে হবে।

লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক

বিষয়:

জ্ঞান, সাধনা ও সভ্যতা: প্রাচীন ভারতের শিক্ষার গল্প

আপডেটেড ১ জুন, ২০২৬ ১৬:০৪
দৈনিক বাংলা ডেস্ক

আজকের কোনো অভিভাবককে যদি বলা হয়, তাঁর সন্তানকে একটি বিদ্যালয়ে পাঠাতে হবে যেখানে নেই কোনো পাকা ভবন, নেই স্মার্ট ক্লাসরুম, নেই পরীক্ষার নম্বরের প্রতিযোগিতা, এমনকি নিজের খাবারের ব্যবস্থাও অনেক সময় নিজেকেই করতে হবে—তাহলে তিনি নিশ্চয়ই বিস্মিত হবেন। অথচ ভারতবর্ষের দীর্ঘ ইতিহাসে এমন একটি সময় ছিল, যখন এই ব্যবস্থাকেই শিক্ষার সর্বোত্তম রূপ বলে মনে করা হতো। সেই সময় জ্ঞানকে চাকরির সিঁড়ি হিসেবে নয়, মানুষ হওয়ার শিল্প হিসেবে দেখা হতো।

কল্পনা করুন, প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের একটি ভোর। অরণ্যের কিনারায় ছোট ছোট কুটির। দূরে নদীর ধারা। সূর্যের প্রথম আলো গাছের পাতায় এসে পড়েছে। কয়েকজন কিশোর ঘুম থেকে উঠে নদীতে স্নান করতে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে একজন কোনো রাজ্যের যুবরাজ, আরেকজন হয়তো একজন সাধারণ কৃষকের ছেলে। কিন্তু আশ্রমের ভেতরে তাদের পরিচয়ের কোনো পার্থক্য নেই। তারা সবাই শিষ্য। সবার কাজ একই, সবার নিয়ম একই, সবার লক্ষ্যও একই—জ্ঞান অর্জন।

প্রাচীন ভারতের গুরুকুলগুলো ছিল এমনই। সেখানে শিক্ষা শুরু হতো বই দিয়ে নয়, জীবন দিয়ে। শিষ্যরা শুধু বেদ বা উপনিষদ মুখস্থ করত না; তারা শিখত কীভাবে বিনয়ী হতে হয়, কীভাবে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করতে হয়, কীভাবে নিজের চেয়ে বড় কোনো আদর্শের জন্য বাঁচতে হয়। আজকের ভাষায় যাকে ‘ভ্যালু এডুকেশন’ বলা হয়, তখন সেটিই ছিল শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু।

তবে এই শিক্ষাব্যবস্থাকে কেবল ধর্মীয় শিক্ষা বলে ভাবলে ভুল হবে। প্রাচীন ভারতীয়রা বিস্ময়করভাবে বাস্তববাদীও ছিলেন। তারা জানতেন, শুধু আধ্যাত্মিক জ্ঞান দিয়ে সমাজ চলে না। তাই গুরুকুলের পাঠ্যক্রমে স্থান পেয়েছিল ব্যাকরণ, যুক্তিবিদ্যা, গণিত, চিকিৎসাশাস্ত্র, কৃষিবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রনীতি। পৃথিবীর অনেক অঞ্চলে যখন জ্ঞানচর্চা এখনও সীমিত পরিসরে আবদ্ধ, তখন ভারতীয় শিক্ষার্থীরা নক্ষত্রের গতি নিয়ে চিন্তা করছে, ভাষার গঠন বিশ্লেষণ করছে, রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিমালা শিখছে।

এই শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি সৌন্দর্য ছিল প্রশ্ন করার স্বাধীনতা। উপনিষদের পাতা খুললেই দেখা যায়, শিষ্য প্রশ্ন করছে, গুরু উত্তর দিচ্ছেন। আবার কখনো গুরু এমন প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছেন, যার উত্তর খুঁজতে শিষ্যকে বছরের পর বছর ভাবতে হচ্ছে। জ্ঞানকে তখন চূড়ান্ত সত্য হিসেবে পরিবেশন করা হতো না; বরং তাকে দেখা হতো অনুসন্ধানের এক অবিরাম যাত্রা হিসেবে।

এরপর ইতিহাসের মঞ্চে এল বৌদ্ধধর্ম, আর তার সঙ্গে শিক্ষার জগতেও শুরু হলো নতুন অধ্যায়। বনাঞ্চলের গুরুকুল ধীরে ধীরে জায়গা করে দিল বিশাল বিহারগুলোকে। শিক্ষা আরও প্রাতিষ্ঠানিক হলো, আরও আন্তর্জাতিক হলো। নালন্দা, বিক্রমশীলা, তক্ষশীলা কিংবা বলভীর মতো মহাবিহারগুলো কেবল ভারতের নয়, সমগ্র এশিয়ার জ্ঞানকেন্দ্রে পরিণত হলো।

নালন্দার কথা ভাবলেই আজও বিস্ময় জাগে। আমরা প্রায়ই বলি, আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বায়নের প্রতীক। অথচ দেড় হাজার বছর আগে নালন্দার আবাসিক প্রাঙ্গণে চীন, কোরিয়া, তিব্বত, সুমাত্রা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে বসে অধ্যয়ন করতেন। তখনকার পৃথিবীতে কোনো বিমান ছিল না, দ্রুত যোগাযোগের ব্যবস্থা ছিল না। তবু জ্ঞানের আকর্ষণে মানুষ হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিত।

চীনা পরিব্রাজকদের বিবরণে নালন্দার যে ছবি পাওয়া যায়, তা আজও বিস্ময়কর। হাজারো শিক্ষার্থী, অসংখ্য শিক্ষক, বিশাল গ্রন্থাগার, দিনভর বিতর্ক আর আলোচনা। সেখানে জ্ঞানকে মুখস্থ করার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো তাকে যাচাই করার ওপর। যুক্তি ছিল মর্যাদার বিষয়, বিতর্ক ছিল শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সবচেয়ে বড় কথা, সেই শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে কেবল পেশাজীবী বানানোর চেষ্টা করেনি। তার লক্ষ্য ছিল মানুষকে জ্ঞানী, সংযমী, নৈতিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। হয়তো সে কারণেই প্রাচীন ভারতের শিক্ষাকেন্দ্রগুলো শুধু বিদ্যার প্রতিষ্ঠান ছিল না; ছিল সভ্যতা নির্মাণের কারখানা।

আজ আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার যুগে বাস করছি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বড়, গবেষণাগারগুলো আরও উন্নত, তথ্যের প্রবাহও অভূতপূর্ব। কিন্তু একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে—আমরা কি শিক্ষার সেই গভীর উদ্দেশ্যকে ধরে রাখতে পেরেছি? আমরা কি এখনও মানুষ তৈরির কথা ভাবি, নাকি শুধু দক্ষ কর্মী তৈরির?

প্রাচীন ভারতের গুরুকুল ও মহাবিহারের ইতিহাস হয়তো আমাদের সেই প্রশ্নটাই নতুন করে ভাবতে শেখায়। কারণ সভ্যতার দীর্ঘ যাত্রায় প্রযুক্তি বদলায়, প্রতিষ্ঠান বদলায়, পাঠ্যক্রম বদলায়; কিন্তু শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য বদলায় না। তার কাজ এখনও মানুষের ভেতরের আলো জ্বালিয়ে দেওয়া। আর সেই আলোর সন্ধানেই তো হাজার বছর আগে অরণ্যের পথে বেরিয়েছিল একদল কিশোর, যারা জানত—জ্ঞানই মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ।

মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু অধ্যায় আছে, যেগুলো কেবল অতীতের স্মৃতি নয়—বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্যও এক অনির্বাণ আলোকবর্তিকা। প্রাচীন ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা তেমনই এক বিস্ময়কর অধ্যায়। তখন শিক্ষা ছিল না চাকরি বা জীবিকার সিঁড়ি; ছিল আত্মার উৎকর্ষ, চরিত্রের নির্মাণ এবং সত্যের অনুসন্ধানের এক পবিত্র যাত্রা। অরণ্যের ছায়াঘেরা নির্জনতায় গড়ে ওঠা গুরুকুলগুলো ছিল সেই যাত্রার প্রথম তীর্থস্থান। ‘উপনয়ন’-এর মাধ্যমে এক কিশোর যেন নতুন করে জন্ম নিত জ্ঞানের জগতে। গুরুর আশ্রমে রাজপুত্র ও সাধারণের সন্তান একই ছাদের নিচে বাস করত, একই নিয়মে জীবনযাপন করত। প্রতিদিনের শ্রম, কাঠ সংগ্রহ, ভিক্ষা এবং অধ্যয়ন তাদের শেখাত বিনয়, আত্মসংযম ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার পাঠ। প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সহাবস্থানে গড়ে উঠত এমন এক শিক্ষাদর্শন, যেখানে জ্ঞান ও জীবন ছিল অবিচ্ছেদ্য।

সময়ের প্রবাহে এই শিক্ষাব্যবস্থা আরও সমৃদ্ধ ও বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে। বেদ ও উপনিষদের আধ্যাত্মিক সাধনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা অর্জন করত জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত, চিকিৎসাশাস্ত্র, রাষ্ট্রনীতি এবং যুদ্ধকৌশলের মতো বাস্তব জ্ঞান। রামায়ণ ও মহাভারতের পৃষ্ঠাগুলোয় আমরা সেই শিক্ষারই জীবন্ত প্রতিফলন দেখতে পাই। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—এই জ্ঞানচর্চা কেবল পুরুষদের একচেটিয়া ক্ষেত্র ছিল না। গার্গী, মৈত্রেয়ীর মতো বিদুষী নারীরা তৎকালীন পণ্ডিতসমাজে নিজেদের অসাধারণ প্রজ্ঞার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। জ্ঞানকে তখন কোনো বইয়ের পাতায় বন্দী তথ্য হিসেবে দেখা হতো না; তা ছিল এক জীবন্ত শিখা, যা গুরু থেকে শিষ্যের হৃদয়ে সঞ্চারিত হতো শ্রদ্ধা, অনুশাসন ও অনুপ্রেরণার মাধ্যমে।

এরপর ভারতীয় শিক্ষার ইতিহাসে আসে এক নতুন দিগন্ত—বৌদ্ধ শিক্ষার উন্মেষ। গুরুকুলের সীমা অতিক্রম করে শিক্ষা পৌঁছে যায় বৃহত্তর সমাজে। জাত-পাত ও বংশগৌরবের প্রাচীর ভেঙে বৌদ্ধ বিহারগুলো শিক্ষাকে করে তোলে অধিকতর উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। ‘প্রব্রজ্যা’ ও ‘উপসম্পদা’ গ্রহণ করে অসংখ্য তরুণ প্রবেশ করত এই জ্ঞানসংঘে। বিহারগুলো ছিল কেবল ধর্মীয় সাধনার কেন্দ্র নয়; ছিল শিক্ষা, গবেষণা ও বৌদ্ধিক বিনিময়ের প্রাণকেন্দ্র। কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যেও সেখানে বিকশিত হয়েছিল আলোচনা, বিতর্ক ও সম্মিলিত সিদ্ধান্তগ্রহণের এক অনন্য সংস্কৃতি। জাতকের গল্পগুলো আজও সাক্ষ্য দেয়—সেই শিক্ষা ছিল মানবিক, প্রাণবন্ত এবং জীবনঘনিষ্ঠ।

এই দীর্ঘ বিবর্তনের পরিণতিতে জন্ম নেয় বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম দিককার আবাসিক আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো—তক্ষশিলা, নালন্দা ও বিক্রমশীলা। এর মধ্যে নালন্দা ছিল যেন জ্ঞানের এক মহাসাম্রাজ্য। দূর চীন, কোরিয়া, তিব্বত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে শিক্ষার্থীরা হাজার মাইল পথ অতিক্রম করে এখানে আসতেন। প্রবেশদ্বারে ‘দ্বারপণ্ডিতদের’ কঠোর মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া ছিল এক বিরাট সম্মানের বিষয়। নয় তলা বিশিষ্ট বিশাল গ্রন্থাগারে সঞ্চিত ছিল তৎকালীন বিশ্বের বিপুল জ্ঞানভাণ্ডার। ফা-হিয়েন ও হিউয়েন সাঙ-এর ভ্রমণবৃত্তান্তে আমরা পাই এমন এক বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র, যেখানে হাজারো শিক্ষক ও শিক্ষার্থী প্রতিদিন জ্ঞানের অন্বেষণে নিমগ্ন থাকতেন। ব্রাহ্মণ্য ও বৌদ্ধ—এই দুই মহান ধারার সম্মিলনে নির্মিত সেই শিক্ষাব্যবস্থা আজও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, প্রকৃত শিক্ষা কেবল তথ্যের সঞ্চয় নয়; এটি মানুষকে আরও প্রাজ্ঞ, সহনশীল এবং মানবিক করে তোলার এক অনন্ত সাধনা।

লেখক: মামুনুর রশীদ, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, পিরোজপুর সদর, পিরোজপুর।


প্রাথমিক শিক্ষা: প্রাসঙ্গিক ভাবনা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
মামনুর রশীদ-উপজেলা নির্বাহী অফিসার, পিরোজপুর সদর

শিক্ষা শব্দের আদি উৎস সংস্কৃত 'শাস' ধাতু, যার আক্ষরিক অর্থ শাসন বা শৃঙ্খলা। তবে সভ্যতার বিবর্তনে আধুনিক আন্তর্জাতিক অবয়বে শিক্ষা আজ আর কোনো শৃঙ্খল নয়, বরং মানুষের আচরণের কাঙ্ক্ষিত ও ইতিবাচক পরিবর্তনের এক মুক্ত বাতায়ন। ব্যক্তি ও সামষ্টিক রূপান্তরের এই শাশ্বত হাতিয়ারটিকে যুগে যুগে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মনীষীগণ নানা অভিধায় ভূষিত করেছেন। প্রাজ্ঞ সক্রেটিসের চোখে শিক্ষা ছিল মিথ্যার অপনোদন ও সত্যের অনুপম বিকাশ। অন্যদিকে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিক্ষার সংজ্ঞায় এনেছিলেন এক মরমী বৈচিত্র্য; তাঁর মতে, প্রকৃত শিক্ষা কেবল তথ্য পরিবেশন করে না, বরং বিশ্বসত্তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে মানুষের জীবনকে গড়ে তোলে। আধুনিক বিজ্ঞানের বরপুত্র আলবার্ট আইনস্টাইনও এই সুরেই সুর মিলিয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন, শিক্ষা কোনো তথ্য গলাধকরণের নাম নয়, বরং স্বাধীন চিন্তার মানসিক সক্ষমতা এবং সহজাত কৌতূহলের লালনভূমি। বিদ্যালয় নামক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর শেখানো সবকিছু ভুলে যাওয়ার পর মানুষের ভেতর যে আত্মিক নির্যাসটুকু অবশিষ্ট থাকে, আইনস্টাইনের দৃষ্টিতে সেটাই আসলে প্রকৃত শিক্ষা। চিরন্তন এই মননশীল দর্শনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আজ আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ভাববার সময় এসেছে—কেমন হওয়া উচিত আমাদের বুনিয়াদি বা প্রাথমিক শিক্ষার পরিকাঠামো।

​বিশ্বের শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ, দার্শনিক এবং মনস্তাত্ত্বিকদের কালজয়ী তত্ত্বগুলোকে যদি আমরা একটি সুতোয় গাঁথি, তবে আদর্শ প্রাথমিক শিক্ষার এক চমৎকার ও মানবিক রূপরেখা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। রবীন্দ্রনাথের নান্দনিকতা, নজরুলের সাম্যবাদ, সক্রেটিস ও এরিস্টটলের অকাট্য যুক্তি কিংবা আইনস্টাইনের বৈজ্ঞানিক কৌতূহল—সবকিছুই মূল অভীষ্ট ছিল শিশুকে যান্ত্রিক ছাঁচ থেকে মুক্ত করা। আইনস্টাইন যেভাবে শিক্ষাকে মনকে সচল করার ব্যায়াম হিসেবে দেখতেন, সেই ভাবনার বাস্তব প্রয়োগ ঘটতে পারে প্রাথমিক স্তরে সক্রেটিসের প্রশ্নোত্তর পদ্ধতির মাধ্যমে। সেখানে শিক্ষক শিশুকে কোনো তৈরি উত্তর মুখস্থ করাবেন না, বরং এমন সব বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্ন ছুঁড়ে দেবেন যার জট খুলতে গিয়ে শিশু নিজের যুক্তি দিয়ে ভুলকে ভাঙবে এবং সত্যকে আবিষ্কার করবে। এর সাথে যুক্ত হতে হবে রবীন্দ্রনাথের সেই 'খাঁচার শিক্ষা' থেকে মুক্তির দর্শন, যা আজ আধুনিক বিশ্বও পরম শ্রদ্ধায় লুফে নিচ্ছে। শিশুদের মন প্রাকৃতিকভাবেই অনুসন্ধিৎসু, তাই তাদের শ্রেণীকক্ষ হওয়া উচিত উন্মুক্ত প্রকৃতির অবারিত আঙিনা। বিজ্ঞান, ভূগোল বা সাহিত্যের পাঠ্যপুস্তকীয় জটিলতা ভুলে যদি তারা গাছপালা, মাটি, পাখি আর ঋতু পরিবর্তনের আবর্তনে বেড়ে ওঠে, তবেই শিক্ষণ স্থায়ী হয়। বর্তমান ইউরোপের স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে, বিশেষ করে ফিনল্যান্ডে প্রচলিত 'ফরেস্ট স্কুল' বা আউটডোর লার্নিং মূলত রবীন্দ্র দর্শনেরই এক আধুনিক বৈশ্বিক রূপান্তর।

​একটি আদর্শ প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় কোনো কৃত্রিম র‍্যাংকিং, কঠোর গ্রেডিং বা তীব্র প্রতিযোগিতার বিষাক্ত চাপ থাকা মোটেও কাম্য নয়। ফরাসি দার্শনিক রুশো, মারিয়া মন্তেসরি কিংবা কিন্ডারগার্টেন ব্যবস্থার জনক ফ্রিডরিখ ফ্রয়েবেল প্রত্যেকেই দেখিয়েছেন যে, শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের সর্বোত্তম মাধ্যম হলো খেলার ছলে শেখা। পড়াশোনা কোনো তিতা বড়ি বা ভয়ের কারণ হবে না, তা হবে শিশুর কাছে একটি পরম উপহার কিংবা আনন্দের এক অন্তহীন উৎসব। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ 'হোম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড'-এ এই সত্যেরই এক জীবন্ত জবানবন্দি দিয়েছেন। তিনি অকপটে উল্লেখ করেছেন যে, ঢাকার সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুলের কঠোর গ্রেডিং ও বৈষম্যমূলক র‍্যাংকিং ব্যবস্থা তাঁর ভেতরের সহজাত মেধা বিকাশে কোনো সহায়তাই করতে পারেনি। পরবর্তীতে শান্তিনিকেতনের প্রতিযোগিতাহীন মুক্ত পরিবেশ, প্রকৃতির অকৃত্রিম সান্নিধ্য এবং প্রশ্ন করার অবাধ স্বাধীনতাই তাঁর সুপ্ত চিন্তাশক্তিকে দারুণভাবে বিকশিত করেছিল। এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, প্রাথমিক স্তরে কৃত্রিম প্রতিযোগিতার চেয়ে ভয়হীন ও আনন্দময় পরিবেশই শিশুর মেধা বিকাশের শ্রেষ্ঠ অনুঘটক।

​গ্রীক দার্শনিক এরিস্টটল একদা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, হৃদয়কে শিক্ষিত না করে কেবল মনকে শিক্ষিত করা আসলে কোনো শিক্ষাই নয়। একই সুর বেজেছিল আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাম্যবাদী ইশতেহারে। আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো হতে হবে সেই বৈষম্যহীন সাম্যের সূতিকাগার, যেখানে ধনী-দরিদ্র বা ধর্ম-বর্ণের কৃত্রিম দেয়াল থাকবে না। পাঠ্যক্রমে এমন গল্প, নাটক বা সম্মিলিত কাজের সুযোগ রাখতে হবে যা শৈশবেই শিশুর অবচেতন মনে সহানুভূতি, সহমর্মিতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও জেন্ডার সমতার বীজ বুনে দেবে। সমাজকে কেবল ডিগ্রিধারী চতুর চাটুকার উপহার দেওয়ার চেয়ে সৎ ও মানবিক গুণসম্পন্ন 'খাঁটি মানুষ' তৈরি করাই হোক প্রাথমিক শিক্ষার মূল ব্রত। কারণ শিক্ষা মানে কেবল খাতা-কলমের যুদ্ধ কিংবা জিপিএ-৫ এর অন্ধ ইঁদুরদৌড় নয়, এটি শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক, শারীরিক ও মানসিক বিকাশের এক সুষম সমন্বয়। প্রাচীন রোমান কবি জুভেনালের সেই বিখ্যাত দর্শন—সুস্থ দেহে সুস্থ মন—অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষায় চিত্রাঙ্কন, সঙ্গীত, নৃত্য ও খেলাধুলাকে মূল পাঠ্যক্রমে গুরুত্বের সাথে নেওয়া আজ সময়ের দাবি। বিশ্বদর্শনের আয়নায় প্রাথমিক শিক্ষা কোনো অর্থকরী বিদ্যা অর্জনের কারখানা বা কেরানি তৈরির কারখানা নয়। এটি হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে একজন আদেশ শিক্ষক প্রতিটি শিশুকে তার স্বকীয়তা ও বৈচিত্র্য নিয়ে বিকশিত হওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা দেবেন। যে শিক্ষা শিশুকে প্রশ্ন করতে শেখায়, চারপাশকে ভালোবাসতে শেখায় এবং নিজের আত্মশক্তির ওপর বিশ্বাস রাখতে শেখায়—বিশ্বচিন্তার আলোকে সেটিই হলো প্রকৃত ও কাঙ্ক্ষিত প্রাথমিক শিক্ষা।


বজ্রপাত থেকে বাঁচতে তালগাছ

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
দৈনিক বাংলা ডেস্ক

বজ্রপাত থেকে বাঁচতে তালগাছ: প্রকৃতির প্রাকৃতিক বজ্রনিরোধক ও পরিবেশ রক্ষার অনন্য উপায়। বাংলাদেশে প্রতি বছর বজ্রপাতে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে মাঠে কাজ করা কৃষক, জেলে, দিনমজুর এবং খোলা জায়গায় চলাচলকারী মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের তীব্রতা ও সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। তাই বজ্রপাত থেকে সুরক্ষা এখন শুধু সচেতনতার বিষয় নয়, বরং জীবন রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এই প্রেক্ষাপটে প্রকৃতির এক অনন্য উপহার হলো তালগাছ। বহু গবেষক ও পরিবেশবিদ মনে করেন, তালগাছ শুধু পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে না, বরং বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গ্রামবাংলার পরিচিত এই গাছটি আজ আবার নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে ‘প্রাকৃতিক বজ্রনিরোধক’ হিসেবে।

তালগাছ কেন বজ্রপাত প্রতিরোধে কার্যকর ?

তালগাছ সাধারণত অনেক উঁচু হয়ে থাকে। এর উচ্চতা অনেক সময় আশপাশের অন্যান্য গাছ বা স্থাপনার চেয়ে বেশি হয়। বজ্রপাত সাধারণত উঁচু বস্তুর ওপর আঘাত হানে। তালগাছ সেই বজ্রবিদ্যুৎ নিজের শরীরের মাধ্যমে মাটির গভীরে পৌঁছে দিতে পারে। ফলে আশপাশের মানুষ বা ছোট গাছপালা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ থাকতে পারে।

বৈজ্ঞানিকভাবে বলা যায়, বজ্রপাত যখন ঘটে তখন আকাশে সৃষ্ট বৈদ্যুতিক চার্জ দ্রুত মাটিতে নামার পথ খোঁজে। উঁচু ও সোজা গাছ সেই চার্জের জন্য সহজ পথ তৈরি করে। তালগাছের গঠন এমন যে এটি বিদ্যুৎকে মাটিতে প্রবাহিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আগে রাস্তার ধারে, খোলা মাঠে এবং গ্রামাঞ্চলে প্রচুর তালগাছ দেখা যেত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই গাছের সংখ্যা কমে গেছে। ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্যের পাশাপাশি বজ্রপাতের ঝুঁকিও বেড়েছে বলে অনেকে মনে করেন।

শুধু তালগাছ নয়, অন্যান্য গাছও ভূমিকা রাখে:

তালগাছের পাশাপাশি নারকেল, সুপারি, বটগাছসহ কিছু উঁচু গাছও বজ্রপাতের ক্ষেত্রে আংশিক সুরক্ষা দিতে পারে। বিশেষ করে বটগাছের বিস্তৃত শিকড় মাটির গভীরে ছড়িয়ে থাকে, যা বিদ্যুৎ পরিবাহিত করতে সহায়ক হতে পারে। তবে তালগাছের উচ্চতা ও গঠন একে বিশেষভাবে কার্যকর করে তোলে।

নারকেল ও সুপারি গাছ উপকূলীয় এলাকায় বেশি দেখা যায়। এসব গাছও অনেক উঁচু হয় এবং বজ্রপাতের সময় বিদ্যুৎ নিজের শরীরে গ্রহণ করতে পারে। তবে এগুলো কোনো “নিশ্চিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা’ নয়; বরং প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতার অংশ।

বজ্রপাতের সময় গাছের নিচে দাঁড়ানো বিপজ্জনক:

অনেকেই ভুল করে মনে করেন, বজ্রপাতের সময় বড় গাছের নিচে আশ্রয় নিলে নিরাপদ থাকা যায়। বাস্তবে এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ বজ্রপাত সরাসরি গাছের ওপর আঘাত করলে সেই বিদ্যুৎ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং গাছের নিচে থাকা মানুষ গুরুতর আহত বা নিহত হতে পারেন।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, বজ্রপাতের সময় কখনোই তালগাছ, নারকেল গাছ, বটগাছ কিংবা অন্য কোনো উঁচু গাছের নিচে দাঁড়ানো উচিত নয়। অনেক সময় বজ্রপাতের তাপে গাছ ফেটে যায়, ডাল ভেঙে পড়ে বা আগুন ধরে যায়। তাই নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়াই সবচেয়ে ভালো উপায়।

বজ্রপাতের সময় কী করবেন ?

বজ্রপাত থেকে নিরাপদ থাকতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম মেনে চলা প্রয়োজন। যেমন, দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যান। বজ্রপাত শুরু হলে যত দ্রুত সম্ভব পাকা ঘর বা নিরাপদ ভবনের ভেতরে আশ্রয় নিতে হবে। খোলা মাঠ, নদী, হাওর বা উঁচু জায়গা এড়িয়ে চলতে হবে। মোবাইল ও বৈদ্যুতিক সংযোগ থেকে দূরে থাকুন। বজ্রপাতের সময় বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করাই ভালো। টিভি, ফ্রিজ, কম্পিউটার বা তারযুক্ত ফোন থেকে দূরে থাকতে হবে। গাছের নিচে আশ্রয় নেবেন না। এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা। বড় গাছ বজ্রপাত আকর্ষণ করতে পারে। তাই গাছের নিচে দাঁড়ানো বা বসা বিপজ্জনক। পানিতে থাকা থেকে বিরত থাকুন। নদী, পুকুর বা খালে গোসল করা কিংবা মাছ ধরা বজ্রপাতের সময় অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মাঠে থাকলে নিচু হয়ে বসুন। যদি খোলা মাঠে আটকা পড়েন, তাহলে দুই পা একসঙ্গে রেখে নিচু হয়ে বসতে হবে। তবে মাটিতে পুরো শরীর শোয়ানো যাবে না।

গ্রামবাংলায় তালগাছের ঐতিহ্য:

তালগাছ শুধু বজ্রপাত প্রতিরোধেই নয়, গ্রামীণ সংস্কৃতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলার কবিতা, গান ও লোকজ ঐতিহ্যে তালগাছের উল্লেখ বহুবার এসেছে। গ্রামবাংলার রাস্তার ধারে সারি সারি তালগাছ একসময় ছিল খুব পরিচিত দৃশ্য। তালের ফল পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে জনপ্রিয়। তাল দিয়ে পিঠা, পায়েস, বড়া ও বিভিন্ন ধরনের খাবার তৈরি হয়। তালপাতা দিয়ে তৈরি হতো হাতপাখা, ছাউনি ও নানা গৃহস্থালি সামগ্রী। অর্থাৎ তালগাছ পরিবেশ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি—তিন ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ।

তালগাছ পরিবেশ রক্ষায় কীভাবে সহায়তা করে ?

তালগাছ পরিবেশের জন্যও অত্যন্ত উপকারী। এটি বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এবং অক্সিজেন সরবরাহ করে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গাছ লাগানো সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি। তালগাছ দীর্ঘজীবী হওয়ায় বহু বছর ধরে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অবদান রাখে। এছাড়া তালগাছ মাটির ক্ষয় রোধ করে এবং ঝড়-ঝঞ্ঝার সময় বাতাসের গতি কমাতে সাহায্য করে। গ্রামীণ জীববৈচিত্র্য রক্ষাতেও এই গাছ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কেন কমে যাচ্ছে তালগাছ ?

একসময় গ্রামে প্রচুর তালগাছ থাকলেও বর্তমানে এর সংখ্যা অনেক কমে গেছে। এর কয়েকটি কারণ হলো, অপরিকল্পিত নগরায়ণ। রাস্তা সম্প্রসারণ। কৃষিজমির পরিবর্তন। দ্রুত ফলদায়ী গাছের প্রতি মানুষের ঝোঁক। তালগাছ লাগানোর দীর্ঘমেয়াদি অনীহা। তালগাছ বড় হতে সময় লাগে। ফলে অনেকেই দ্রুত লাভের আশায় অন্য গাছ লাগাতে বেশি আগ্রহী হন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তালগাছের পরিবেশগত ও নিরাপত্তাগত গুরুত্ব অনেক বেশি।

সরকার ও সমাজের করণীয়:

বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ব্যাপকভাবে তালগাছ রোপণ কর্মসূচি নেওয়া যেতে পারে। স্কুল, কলেজ, রাস্তার ধারে, খোলা মাঠে এবং কৃষিজমির আশপাশে পরিকল্পিতভাবে তালগাছ লাগানো হলে ভবিষ্যতে এর সুফল পাওয়া যাবে। পাশাপাশি বজ্রপাত সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, কৃষি বিভাগ ও পরিবেশ সংগঠনগুলো একযোগে কাজ করলে একটি ‘সবুজ সুরক্ষা বলয়’ তৈরি করা সম্ভব।

কৃষকদের জন্য বিশেষ সতর্কতা:

বাংলাদেশে বজ্রপাতে নিহতদের বড় অংশ কৃষক। কারণ তারা খোলা মাঠে কাজ করেন। তাই কৃষকদের জন্য কিছু বিশেষ সতর্কতা জরুরি, আকাশে কালো মেঘ ও বজ্রধ্বনি শুনলেই মাঠ ত্যাগ করতে হবে। ধাতব কৃষিযন্ত্র দূরে রাখতে হবে। একা উঁচু স্থানে দাঁড়ানো যাবে না। আবহাওয়ার পূর্বাভাস নিয়মিত দেখতে হবে। গ্রামের আশপাশে বেশি করে তালগাছ লাগাতে হবে। তালগাছ লাগানো এখন সময়ের দাবি।

বর্তমান সময়ে বজ্রপাত শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি জননিরাপত্তার বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রকৃতিনির্ভর সমাধানও গুরুত্বপূর্ণ। তালগাছ সেই সমাধানের অন্যতম প্রতীক। একটি তালগাছ হয়তো একদিনে বড় হয় না, কিন্তু এটি বহু বছর ধরে মানুষ ও প্রকৃতিকে সুরক্ষা দেয়। তাই আজ একটি তালগাছ লাগানো মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলা।

বজ্রপাত থেকে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব না হলেও সচেতনতা ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের মাধ্যমে ঝুঁকি অনেক কমানো যায়। তালগাছ সেই উদ্যোগের একটি কার্যকর অংশ। এটি যেমন বজ্রবিদ্যুৎ নিজের শরীরে ধারণ করে আশপাশের পরিবেশকে আংশিক সুরক্ষা দিতে পারে, তেমনি পরিবেশ রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও গ্রামীণ সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে মনে রাখতে হবে, বজ্রপাতের সময় কখনোই কোনো গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া নিরাপদ নয়। নিরাপদ ভবনে অবস্থান করাই সবচেয়ে ভালো উপায়।

আজকের দিনে প্রয়োজন শুধু সচেতনতা নয়, বরং বাস্তব পদক্ষেপ। তাই আসুন, নিজের নিরাপত্তা, পরিবেশের ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে বাড়ির আশেপাশে, রাস্তার ধারে ও খোলা জায়গায় বেশি করে তালগাছ লাগাই। একটি গাছই হতে পারে জীবন রক্ষার নীরব প্রহরী।

লেখক: সমীরণ বিশ্বাস, কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ , ঢাকা।


টমটম থেকে বৈদ্যুতিক গাড়ির পথচলা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
দৈনিক বাংলা ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের জেরে ঢাকায় জ্বালানি সংকট ও নানা ধরনের রাজনৈতিক-প্রাকৃতিক উত্তাপের ছড়াছড়ি। এর মাঝেও গত ২৪ এপ্রিল (শুক্রবার) ঢাকার ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরার (আইসিসিবি) গাড়ি ও যন্ত্রাংশের মেলায় বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) প্রদর্শনীর মুগ্ধতা যেন গ্রীষ্মের প্রার্থীত বৃষ্টি। আমরা যখন মেলায় পৌঁছালাম তখন বিকাল প্রায় ৫.৩০টা। পড়ন্ত বিকালের রোদে বসুন্ধরার হলুদাভ সোনালু ফুলগুলো হয়ে উঠল আরো অপরূপ। এই লেখায় বৈদ্যুতিক গাড়িসহ বাংলাদেশের গাড়ি নির্মাণ শিল্পের কিছু দিক তুলে ধরছি।

ঢাকা অটো শো: গত ২৩ এপ্রিল থেকে আইসিসিবিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ৩ দিনব্যাপী (২৩-২৫ এপ্রিল) ১৯তম ঢাকা অটো সিরিজ অব এক্সিবিশনস ২০২৬। এখানে একই ছাদের নিচে গাড়ি ও গাড়ির যন্ত্রাংশ প্রদর্শনীর পাশাপাশি আরও কয়েকটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ‘৩য় ইলেকট্রিক ভেহিকেল (ইভি) বাংলাদেশ প্রদর্শনী’।

এবারের এক্সিবিশনে জাপান, ভারত, চীন, মালয়েশিয়া, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যসহ ১০টি দেশের ৭০টিরও বেশি কোম্পানী অংশ নিয়েছে এবং প্রায় ২০০ বুথে নতুন প্রযুক্তি ও যানবাহন প্রদর্শন করা হয়েছে। এতে অংশ নিয়েছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন অটো মোবাইল কোম্পানী, যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি সরবরাহকারীরা। প্রদর্শনীতে মিতসুবিশি, টয়োটা, মার্সিডিজ বেঞ্জ, হোন্ডা, এমজি, প্রোটন, চাঙ্গান প্রভৃতি ব্র্যান্ডের গাড়ি প্রদর্শন করা হয়েছে। মেলাটির আয়োজক ছিলেন সেলস-গ্লোবাল।

ইলেক্ট্রিক ভেহিকেল বা বৈদ্যুতিক গাড়ি বলতে বোঝায় এক বা একাধিক বৈদ্যুতিক মোটর দ্বারা চালিত যানবাহন, যার ট্রাকশন শক্তি গাড়িতে ইন্সটলকৃত রিচার্জেবল ব্যাটারি দ্বারা সম্পন্ন হয়ে থাকে। মেলায় প্রদর্শিত হয়েছে বিভিন্ন মডেলের বৈদ্যুতিক গাড়ি ও মোটরসাইকেল (ই-বাইক)। দেশে জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রতি। তাই দর্শনার্থীদের আগ্রহ বেশি বৈদ্যুতিক গাড়ি ও মোটরসাইকেলের স্টলগুলোতে। বিশেষ করে তরুণ দর্শনার্থীদের বেশি আকর্ষণ ছিল বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের (ই-বাইক) স্টলে।

দল বেঁধে গাড়ি দেখা: তরুণ-তরুণীদের ভিড় ঠেলে আমরা প্রথমে এলাম বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (বেইল) এর প্রদর্শনীতে। আমরা মানে রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের ১৪তম ব্যাচের দশ বারো জন সতীর্থ বা ব্যাচমেট।

বেইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মাসুদ কবির (এমডি, ম্যাংগো টেলিসার্ভিস লি.) এর আমন্ত্রণেই এই প্রতিষ্ঠানের তৈরি ইভি দেখতে আমাদের আসা। এই প্রদর্শনীতে বেইল তাদের বহুল প্রতীক্ষিত প্রোটোটাইপ মডেল উন্মোচন করেছে। প্রতিষ্ঠানটি এই অটো প্রদর্শনীতে তাদের তিনটি ব্র্যান্ড-চার চাকার যাত্রী ও পণ্যবাহী যান ‘এমইভি’, মোটরবাইক ব্র্যান্ড ‘গ্লাইডার’ এবং তিন চাকার যান ‘অটোম্যাক্স’- উন্মোচন করে।

হল-১ এ বেইল ও অন্যান্য কোম্পানীর মোটর বাইক ও তিন চাকার যান দেখা ছিল চমৎকার এক অভিজ্ঞতা। চোখে পড়ার মতো দৃশ্য হলো- এসব গাড়িতে চড়ে তরুন তরুনীদের ছবি/সেলফি তোলার ধুম। আমরাও অংশ নিলাম এই ফটো- উৎসবে। এই বয়সে ই বাইকে চড়া কারো কারো ছবি মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ল মহাবিশ্বে!

ইভিতে চড়ে কিশোর কালের উচ্ছ্বাস: এর পর যাওয়া হলো হলো-২ এ বেইলের ৪ চাকার যাত্রীবাহী গাড়ি (স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকেল বা এসইউভি) দেখতে। কোম্পানীতে এই ব্রান্ডের আদুরে নাম- ‘এমইভি’। মীর মাসুদ কবির তার ইভির কথা ২০১৫ সালের বসন্তে এক সান্ধ্যকালীন আড্ডায় আমাদের বলেছিলেন। অবশেষে ২০২৬ এর কৃষ্ণচূড়া- জারুল-সোনালু ফোটা গ্রীষ্মে সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন হলো।

বহুদিন আগের কথা...। ছুটি শেষে পদ্মা পাড়ের রাজশাহী ক্যাডেট কলেজে আমরা যাচ্ছি। ক্যাডেটদের বড় একটা অংশ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন স্থান থেকে মূলত ট্রেন ধরে (বিশেষত উত্তরা এক্সপ্রেস) কলেজে যোগদান করতো। বন্ধু মীর মাসুদ কবির (অপু) আসতো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে। বাবা মা দুজনেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আমরা কেউ পাকশী, ইশ্বরদী, পাবনা, নাটোর, বগুড়া, দিনাজপুর, রংপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জ থেকে...।

সরদহ বা সারদা রেল স্টেশন থেকে মোক্তারপুর (ক্যাডেট কলেজ) প্রায় ৩ মাইলের পথ। স্টেশন থেকে কলেজের বাসে সেখানে যাওয়ার ব্যবস্থা। তবে মাঝেমধ্যে আমরা ঘোড়ার গাড়ি বা টমটমেও যেতাম। সে ছিল অসম্ভব আনন্দের এক যাত্রা। সেদিন বেইলের সাদা রঙের বৈদ্যুতিক গাড়িতে (এসইউভি) বসে আমরা কয়েকজন সানন্দে ছবি-টবি তুললাম। একজন সুরসিক বন্ধুর মন্তব্য মনে ধরলো- ‘ফ্রম টমটম টু ইভি’। ইভিতে বসে যেন সেই কিশোর বয়সে টমটমে চড়ার উচ্ছ্বাস। তবে এর মাঝে চলে গেছে কত বছর। জীবন এভাবেই এগিয়ে যায়। জানিনা, ঘোড়াগাড়ির চালক আমাদের প্রিয় গফুর ভাই এখন কেমন আছেন।

শতভাগ দেশে তৈরি গাড়ির যে গল্প: মাসুদ কবির ও বেইলের চেয়ারম্যান বন্ধুপ্রতীম এ.মান্নান খান (চেয়ারম্যান, ম্যাংগো টেলিসার্ভিস লি.) গল্পের মতো করে ইভি তৈরির অত্যান্ত চ্যালেঞ্জময় জার্নির কথা আমাদের বলেন। চট্টগ্রামের মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ১৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে একটি ইভি উৎপাদন কারখানা স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে যানবাহনের প্ল্যাটফর্ম ও বডি তৈরি করে আমদানি নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তারা বলেন, দেশে একটি পূর্ণাঙ্গ ইভি ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে চায়।

বাংলাদেশে ইলেকট্রিক গাড়ি সংযোজন হওয়া শুরু হয়েছে আগেই। তবে বেইলের ইভি হবে ব্যাটারিসহ শতভাগ বাংলাদেশেই তৈরি। প্রদর্শনীতে বেইলের একটা চমৎকার ব্যানার চোঁখে পড়ল-‘দি ফাস্ট মেইড ইন বাংলাদেশ ইভি’ আনভেইলড বাই দি ‘কান্ট্রিস ফাস্ট অটোমোবাইল ম্যানুফেকচারার’-বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ লি....। অর্থাৎ সম্পূর্ণ দেশীয়ভাবে বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) উৎপাদন করছে বেইল। এক্ষেত্রে বেইলই অগ্রপথিক বা পাইওনিয়ার।

ইভি নিয়ে আরো কিছু কথা: আয়োজকরা আশা করছেন এ প্রদর্শনীর মাধ্যমে দেশে বৈদ্যুতিক যানবাহনের বাজার আরো সম্প্রসারিত এবং স্থানীয় শিল্পে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ হবে। দেশীয় অটোমোবাইল শিল্পের বিকাশে এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসারে এই উদ্যোগ নতুন দিগন্ত উন্মোচক করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বিশ্লেষকদের মতে জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি এবং পরিবেশ বান্ধব পরিবহনের চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে ইভি খাতের এই অগ্রগতি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইল ফলক হতে পারে।

অটোমোবাইল শিল্পে সম্ভাবনা: অটোমোবাইল শিল্পে নতুন সম্ভাবনা দেখছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মোটর গাড়ি শিল্প দক্ষিণ এশিয়ার মাঝে তৃতীয়। এক দশকের মাঝে বাংলাদেশের দুই চাকার মোটরসাইকেল বাজারের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে। একে বিপ্লব বলা যায়।

বাংলাদেশে কয়েকটি বড় গাড়ির কারখানা রয়েছে যা মিতসুবিশি এবং প্রোটনের যাত্রীবাহী গাড়ি এবং হাইনো ও টাটার বাণিজ্যিক যানবাহনগুলো সংগ্রহ করে সংযোজন করে থাকে। এছাড়াও কয়েকটি দেশি কোম্পানী তাদের বিদেশি প্রযুক্তিবিষয়ক অংশীদারদের সঙ্গে মিরসরাই ইকোনমিক জোনে বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। বিদেশি কোম্পানীসমূহ তাদের ব্রান্ডেড যানবাহন প্রাথমিকভাবে গাড়ি সংযোজনের জন্য বিনিয়োগ করছে। ধীরে ধীরে সংযোজন কারখানাগুলো পূর্ণ গাড়ি উৎপাদন কারখানায় উন্নিত হবে।

গাড়ি তৈরির পাশাপাশি যন্ত্রাংশ (অটোমটিভ যন্ত্রাংশ) উৎপাদনেরও আছে বিশাল সম্ভাবনা। অটোমোবাইল, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও এগ্রো মেশিনারি খাত বাংলাদেশের শিল্প খাতের সম্ভাবনা ও সক্ষমতা তুলেধরেছে। এই সেক্টরগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক যানের ভবিষ্যৎ: বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অটোমোবাইল শিল্পে এখন ‘ইলেকট্রিক ভেহিকল’ বা ইভি-র জয়জয়াকার। বাংলাদেশও এই পরিবর্তনের বাইরে নয়। জনঘনত্ব এবং ক্রমবর্ধমান দূষণ বিবেচনায় বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক যানের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সরকারের পরিকল্পিত ও সমন্বিত পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি।

ইভি’র বিষয়ে সরকারের করনীয়: একটি টেকসই ইভি ইকোসিস্টেম তৈরি করতে বাংলাদেশ সরকারকে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ের দিকে নজর দিতে হবে: (১) চার্জিং অবকাঠামো নির্মাণ, (২) শুল্ক ও কর ছাড়, (৩) বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী নীতিমালা, (৪) ব্যাটারি রিসাইক্লিং ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, (৫) গণপরিবহনে ইভি-র অন্তর্ভুক্তি এবং (৬) ব্যবহারকারীদের বিশেষ প্রণোদনা প্রদান...। সরকারকে ইভি বিষয়ের নীতিমালা চূড়ান্ত করতে হবে।

বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক যানের বিপ্লব কেবল সময়ের ব্যাপার। তবে এর দ্রুত প্রসারের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং সহজলভ্য অর্থায়ন। সরকার যদি আমদানিকারক, উদ্যোক্তা এবং সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে পারে, তবে বাংলাদেশ খুব শিগগিরই দক্ষিণ এশিয়ায় পরিবেশবান্ধব পরিবহনের রোল মডেল হিসেবে আবির্ভূত হবে।

শিল্পায়নে গুরুত্ব দেওয়া হোক: গত ৫৫ বছরে বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য শিল্পায়ন হয়েছে। গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, ঔষধ ও চামড়াশিল্প খুব ভালো করেছে। কয়েকটিতো বিশ্বমানের। আমাদের অর্থনীতির সবচেয়ে ‍গুরুত্বপূর্ণ খাত হওয়া উচিত শিল্প। আমাদের প্রতিরক্ষা শিল্পায়নেও নতুন করে ভাবতে হবে।

আমাদের লক্ষ লক্ষ তরুণ এখন বেকার। ব্যাপক শিল্পায়ন না হলে এই বেকারত্ব দূর করা খুব কঠিন। তাই আমাদের ফোকাস হওয়া উচিত শিল্পায়নে। তবে শিল্প স্থাপনের সময় ২টি বিষয় মনে রাখতে হবে। প্রথমত শিল্প যেন পরিবেশ ধ্বংস না করে। দ্বিতীয়ত কৃষি জমি যেন নির্বিচারে শিল্পে ব্যবহার না করা হয়।

শেষের কথা: সরকারের শিল্প পরিচালনায় যুক্ত হওয়া উচিত নয়। সরকারের কাজ শিল্পের ফ্যাসিলিটেটর হওয়া। উদ্যোক্তাদের উৎসাহ ও সমর্থন দেওয়া। বাংলাদেশে ইভিকে স্বাগতম। অগ্রপথিক বেইল কর্তৃপক্ষকে অভিনন্দন। তরুণ শিল্পোদ্যোক্তাদের শুভেচ্ছা-তারাই বাংলাদেশকে এগিয়ে নেবে। অটোমোবাইলসহ সম্ভাবনাময় শিল্প সেক্টরসমূহকে এগিয়ে নিতে হবে। বাংলাদেশে ইভির যে সুযোগ সম্ভাবনা আছে তা কাজে লাগাতে হবে। ইভিই অটোমোবাইলের ভবিষ্যৎ। শিল্পে এগিয়ে যাক আমাদের ঐক্যবদ্ধ প্রানের বাংলাদেশ।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, গবেষক ও বিশ্লেষক, সাবেক চেয়ারম্যান বিটিএমসি।


চাঁদাবাজ ও দখলদার উৎখাত করতে সবার সহযোগিতা চাই

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
মিজানুর রহমান

সরকার পরিবর্তন হলে চাঁদাবাজ ও দখলদার পরিবর্তন হয়। ভিন্ন নামে ভিন্ন রুপে দেখা মেলে এদের। সরকার পরিবর্তন এর সাথে সাথে টেম্পু স্ট্যন্ড, বাস টার্মিনাল, লঞ্চ টার্মিনালে দখলদার ও চাঁদাবাজ এর হাত বদল হয় অর্থাৎ দায়িত্ব হস্তান্তর হয় মাত্র।এই স্থাপনাগুলোতে ব্যাপক হারে চাঁদাবাজি হয়। চাঁদাবাজদের সাথে আলাপ করে যেটা জানা যায়, জিবির চাঁদা, টার্মিনাল চাঁদা, মালিক সমিতির চাঁদা, শ্রমিক কল্যান চাঁদা নামকরণ করে তা আদায় করা হয়।

বর্তমান সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল ইসলাম দায়িত্ব পাওয়ার পর সাংবাদিক সম্মেলনে তার বক্তব্যে বলেন পরিবহন খাতের টাকাটা সমঝোতার ভিত্তিতে তোলা হচ্ছে। জোর করে আদায় হচ্ছে না। এ জন্য এটিকে চাঁদা বলা যাচ্ছে না। মন্ত্রী নিজেই বলেছেন শ্রমিকের কল্যানের নামে কতটা কল্যাণে ব্যয় করা হয় তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং শ্রমিক সংগঠন যে দল ক্ষমতায় থাকে তারাই নিয়ন্ত্রণ করেন তা স্বীকার করেছেন তাহলে কোন সমঝোতার চাঁদা বলে উল্লেখ করেছেন সেটা নাগরিকদের কাছে বোধগম্য নয়। এখানে প্রশ্ন ওঠাটা তাই স্বাভাবিক যে মন্ত্রী কি সমঝোতা বলে চাঁদাবাজিকে বৈধতা দিলেন?

সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা বাংলাদেশের নাগরিকদের দুর্ভোগ ও ট্রাজেটির মূল কারণ। সড়কে প্রতিদিন গড়ে ২৫ জনের বেশি মানুষ নিহত হয় যাদের বেশির ভাগ তরুণ ও কর্মক্ষম। সড়কে এই মৃত্যুর মিছিল নিছক দুর্ঘটনা নয় বরং কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড। ২০২৪ সালে ট্রান্সপারেসি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি)গবেষণায় দেখা যায় ব্যাক্তিমালিকানাধীন বাস মিনিবাস থেকে বছরে ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয়।

…অতীতে নানা সময়ে পরিবহন খাতের চাঁদাবাজিকে বৈধতা দেওয়ার এক ধরনের চেষ্টা দেখা গেছে। যে দল ক্ষমতায় তাদের আর্শীবাদপুষ্ট পরিবহন মালিক শ্রমিক এই সেক্টর নিয়ন্ত্রণ নেয়। সড়ক পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রক রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বিআরটিএ ও পুলিশের সহিত সহযোগিতার অবৈধ সেতুবন্ধন গড়ে ওঠে। সড়কে বিশৃঙ্খলা পিছনে এই দুর্নীতিপুষ্ট সহযোগিতা ব্যবস্থা চাঁদাবাজিই মূল কারণ। এখানে গোষ্ঠীবদ্ধ স্বার্থের বলি হতে হয় নাগরিকদের।

…বিগত সরকারগুলোর সময়ে পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি বৈধতা দেওয়ার এক ধরনের চেষ্টা দেখা গেছে। নাগরিক সমাজের প্রতিবাদের মুখে সেটা বন্ধ হলে ও পরিবহন খাতের দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির হাত থেকে কোন সরকারই মুক্ত করার উদ্যোগ নেয়নি। পরিবহন খাতে পরিচালন ব্যয়ের বাহিরে চাঁদা কিংবা কল্যান যে নামে টাকা তোলা হউক না কেন তাতে জনগনের ঘারে বাড়তি ব্যয়ের চাপ এসে পড়ে। রাস্তায় রাস্তায় চাঁদার কারণে পরিবহন ভাড়ার সঙ্গে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। বাংলাদেশে যে নৈরাজ্য পরিবহন খাত তার ভুক্তভোগী চালক ও সহকারীরাও। আইন অনুযায়ী তাদের নিয়োগপত্র এবং মাসিক বেতন দেওয়া নিশ্চিত করাটাই সবচেয়ে বড় শ্রমিক কল্যাণ।
বাস্তবে চাঁদাবাজির টাকার অংশ বিভিন্ন জনের পকেটস্থ হয়। চাঁদাবাজের এহেন কর্মের কারণে সাধারণ পাবলিকের ভোগান্তির শেষ নেই।
চাঁদাবাজদের মূল আখড়া ফুটপাতগুলো অন্যতম। একেকটা ফুটপাত একেক জনের অথবা ভাগাভাগি করে দায়িত্ব পালন করে।অথচ রাজধানী ঢাকার ফুটপাত এক সময় ছিল হাঁটার জায়গা। এখন সে অবস্থা নেই চাঁদাবাজি দখলদারিত্ব আর রাজনৈতিক পুলিশি ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা এক অঘোষিত রামরাজত্ব যেন। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ অফিস আদালত, স্কুল কলেজ, হাসপাতালে কিংবা ব্যবসা বাণিজ্যের কাজে বের হন সেই শহরেই এখন হাঁটার পথ নেই, ফুটপাত ভরা দোকান রাস্তা ভরা ভ্যান মাঝখানে জ্যাম আর বিশৃঙ্খলা।
এই অবস্থার পেছনে অনেকে ভাবতে পারেন দারিদ্র্য বা জীবিকার তাগিদ নয়-রয়েছে একটি সুসংগঠিত কুচক্রীমহলের অর্থনীতি। বিভিন্ন গবেষণা ও সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দুটি সিটি করপোরেশন এলাকায় ফুটপাত দখল করে বছরে প্রায় এক হাজার ৮২৫ কোটি টাকা চাঁদা আদায় হয়। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে কয়েক কোটি টাকা লেনদেন। এই বিপুল অংকের টাকা কিন্তু একটি টাকা ও সরকারের কোষাগারে জমা হয় না।সবটায় ভাগ পায় সিন্ডিকেট, গডফাদার রাজনৈতিক প্রভাবশালী এবং অসাধু পুলিশ সদস্য।
… ঢাকা তেজগাঁও কলেজের সম্মুখে ও ওভার ব্রিজের আশেপাশের অবস্থা খুবই খারাপ। রাজধানীর সবচেয়ে ব্যস্ততম সড়কের সংযোজন

এখানে। মেট্রোস্টেশন, এ্যালিভেট এক্সপ্রেস এর বহি:গমন এবং চার রাস্তার মোড় এখানে। রাস্তাগুলো খুব সুন্দর করে সাজানো ছিল । সেটার কি বেহাল দশা? তেজগাঁও কলেজের সামনের রাস্তা ও ওভার ব্রিজের আশেপাশের ফুটপাত জুড়ে ঠাসাঠাসিভাবে দোকান সাজিয়ে বসে আছে। শাকসবজি, ফলমূল, মশলাপাতি, জুতার সারি, মোবাইল এক্সসরি আইটেম, কাপড় চোপড়, চা বিস্কিটের দোকান থেকে শুরু করে সবকিছুই আছে। দোকানদের ভাষ্য মোতাবেক দোকান প্রতি ২০০টাকা থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। সন্ধ্যার পর লাইনম্যান এসে টাকা নিয়ে যায়। টাকা না দিলে দোকান বসতে দেওয়া হয় না। লাইনম্যানের কালেকশন সমস্যা হলে ম্যানেজার আসে। ম্যানেজারকে গড ফাদারের সরাসরি সহচর বলা হয়। বিভিন্ন সময় এই দখল উচ্ছেদ করা হয়েছে অভিযান শেষে পুরোদমে আবার বসে যায়।
…গুলিস্তান এলাকায় দুপুর বেলায় গেলে মনে হবে এটি কোন সড়ক নয় বরং খোলা আকাশের নিচে গড়ে ওঠা বিশাল বাজার। সেখানকার ভিতরের রাস্তা গুলো একদম দখল হয়ে গেছে। অথচ ভিতরের রাস্তা গুলো দিয়ে ও গাড়ি চলাচল করত। এখন আর সে অবস্থা নেই। মেইন সড়কের অনেকাংশে দখল করে রাস্তার মাঝামাঝি চলে গেছে। কাপড়, জুতা, ব্যাগ আর নিত্যণ্যের সারি সারি পসরা বসানো হয়েছে এমনকি আখমাড়াই এর মেশিন বসিয়ে দিব্বি রস বিক্রি করছে। বাস চলাচল করাত দুরের কথা রিকশা চলাচল করা ও কঠিন হয়ে যাচ্ছে। কোনো সভ্য দেশে অমনটি আছে কিনা আমাদের জানা নেই। এখানে ও কয়েকবার উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে পরবর্তীতে যেই সেই অবস্থা। এদের সাথে আলাপ করে জানা যায় এখানে চাঁদার রেইট একটু বেশি অর্থাৎ ৪০০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা দৈনিক চাঁদা দিতে হয়। চাঁদাবাজির টাকা ভাগবাটোয়ারা ও দখলদারিত্ব দ্বন্দ্ব নিয়ে খুন খারবি ও অনেক হয়েছে। তবু ও সরকারের টনক নড়ে না। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য তিনটি ঘটনা অন্যতম:…ঘটনা...১..রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় জানুয়ারি /২৬ মাসে আধিপত্য বিস্তার এবং চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেই স্বেচ্ছাসেবক দলনেতা আজিজুর রহমান মুছাসাব্বিরকে হত্যা করা হয়েছে। কারওয়ান বাজার এলাকায় প্রকাশ্যে ও গোপনে চাঁদা আদায়ের জন্য আট থেকে নয়টি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। এ চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থের ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরেই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করা হয়। বিদেশে পলাতক আন্ডারওয়ারওয়ার্ল্ড সন্ত্রাসী দিলিপ ওরফে বিবাশ এর নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ প্রশাসন।
…ঘটনা...২...জানুয়ারি /২৬ মাসে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় দেশীয় অস্ত্র ধারাল দা নিয়ে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে গণপিটুনিতে রায়হান নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে।
ঘটনায় প্রকাশ পায় নিহত রায়হান খান (৩০) চাঁদপুর জেলার চাঁদপুর থানার বহরিয়া গ্রামের মৃত বিল্লাল খানের ছেলে। তিনি পরিবারের সঙ্গে ফতুল্লায় তাঁতিবাড়ি এলাকায় ইয়ামিন বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। পুলিশ সূত্রে জানা যায় নিহত রায়হানের বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। সে একজন চাঁদাবাজ সন্ত্রাসী ও ছিনতাইকারী এবং মাদকসেবি। তার অত্যাচারে স্থানীয় জনগন অতিষ্ঠ।
স্থানীয় গ্যারেজ মালিকের কাছ থেকে সকালে ১হাজার ৫ শত টাকা চাঁদা নেয় এবং পরবর্তীতে হোটেল কর্মচারীর কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে। তার দাবিকৃত টাকা দিতে অস্বীকার করায় রায়হান বাসা থেকে ধারালো দা নিয়ে এসে হোটেল কর্মচারী কে মারধর করতে থাকে। এ সময় উপস্থিত জনতা উত্তেজিত হয়ে রায়হানকে গণপিঠুনি দেয় এবং দা দিয়ে মাথায় আঘাত করলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

ঘটনা...৩....বাংলাদেশের রাজধানী পুরান ঢাকার মিটর্ফোট হাসপাতালের সামনে ২০২৫ সালের ৯ জুলাই প্রকাশ্যে দিবালোকে এক বর্বরচিত হত্যাকাণ্ডে নিহত ব্যক্তি মো. সোহাগ ওরফে লাল চাঁদ (বয়স ৩৯) পুরান ঢাকার একজন ভান্ডারি ব্যবসায়ী ছিলেন। কয়েকজন দুর্বৃত্তর জনসমক্ষে তাকে পাথর ও ধারাল

অস্ত্র দিয়ে পিঠিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। এ হত্যাকাণ্ডের পিছনে ছিল চাঁদাবাজি ও আধিপত্যবাধ নিয়ে দ্বন্ধ। হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং জাতিকে স্তম্ভিত করে তোলে। হত্যাকাণ্ডটি রাজনৈতিক সামাজিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে।

…ফুটপাত দখল ও বিক্রির সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এক সময় উচ্চ আদালত কঠোর নির্দেশ দিয়েছিল। রাজধানী ঢাকার অবৈধ দখলদারদের নামের তালিকা দিতে রিটের পরিপেক্ষিতে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিচ ফর বাংলাদেশ এর আবেদনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে হলফনামা জমা দিতে বলা হয়। উদ্দেশ্য ছিল কারা ফুটপাত দখল করে চাঁদাবাজি করছে তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা। এর পরিপেক্ষিতে উচ্ছেদ অভিযান হয়েছে কাগজে কলমে…নির্দেশ জারি হয়েছে তবু দখলদারিত্ব থেকে যায় …আগের মতোই।
বর্তমানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন সারাদেশ ব্যাপী চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের তালিকা তৈরি করার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন। সবার আগে রাজধানীতে এই ব্যাপারে বিশেষ অভিযান চালু করা হবে। এই ক্ষেত্রে যেহেতু প্রধান মন্ত্রী আন্তরিক এবং বিরোধী দল ও চাঁদাবাজ এর ব্যাপারে সোচ্চার… এবার আর চাঁদাবাজদের রেহাই নেই। তা ছাড়া বিএনপি সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল চাঁদাবাজ নির্মুল করবে…অবশ্যই তা বাস্তবায়ন হবে যদি কর্মসূচিতে জনগণের ও অংশগ্রহণ থাকে। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চাঁদাবাজি তালিকা করার জন্য যে নির্দেশ দিয়েছেন তা যে দলেরই হউক জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে। মিডিয়াতে প্রচার করা যেতে পারে। উচ্ছেদ অভিযানের সময় ছাত্র জনতা সাধারণ পাবলিকের সহযোগিতা থাকতে হবে। সকল শ্রেণির সহযোগিতা ছাড়া উচ্ছেদ অভিযান সফল হওয়া যাবে না। চিহ্নত চাঁদাবাজদের আইনের আওতায় আনতে হবে। কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে দেশ থেকে চাঁদাবাজ ও দখলদাবাজ নির্মুল হবে।

লেখক: কলামিস্ট ও সাবেক ব্যাংকার।


সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন: উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহের করণীয়

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
দৈনিক বাংলা ডেস্ক

যেকোনো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় আসে, যখন তার প্রবৃদ্ধির চাকা সচল রাখতে কাঠামোগত সংস্কারের বিকল্প থাকে না। এই মূহুর্তে বাংলাদেশ ঠিক এমনই এক ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক ক্রান্তিকাল পার করছে। এ পরিস্থিতিতে একদিকে নানামুখী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সামাল দেওয়া এবং অন্যদিকে বিপুল কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠির জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা—সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএনপি সরকারের অগ্রাধিকার কাজমূহের অন্যতম। এ লক্ষ্যে সরকার ইতোমধ্যে নানা কর্মসূচিও নিয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে দৃশ্যমান হবে। বিএনপি’র নির্বাচনী ইশতেহারের মূল দর্শন—‘করবো কাজ, গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’—কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং এটি দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক রূপরেখার ভিত্তি। ইশতেহারে দেশে ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে ‘এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি’ গঠনের যে রূপকল্প নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। এজন্য তাদেরকে এখন গতানুগতিক ধারার প্রথাগত ‘ঋণদাতা’র খোলস থেকে বেরিয়ে এসে উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রকৃত কারিগর এবং অর্থনীতির ‘রূপান্তরকারী’ সক্রিয় অংশীদার হিসেবে অবতীর্ণ হতে হবে ।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি নাজুক অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে বর্তমানে ‘নিম্ন-স্তরের ভারসাম্য বা লো-লেভেল ইকুইলিব্রিয়াম’ পর্যায়ে অবস্থান করছে। অর্থনীতির ভাষায়, এর অর্থ হলো—একটি দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকলেও তার প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার তার প্রকৃত সম্ভাবনার চেয়ে অনেক নিচে আটকে আছে। এই স্থবিরতা বা অচলায়তন ভাঙতে হলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখেই বাংলাদেশকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি বিনিয়োগ-চালিত প্রবৃদ্ধির দিকে অগ্রসর হতে হবে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের ঘোষিত নীতিগত অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করা এবং ব্যাংকিং খাতে নিয়মভিত্তিক সুশাসন নিশ্চিত করা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

সরকারের এই দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক রূপকল্প এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যুগোপযোগী নীতিমালার আলোকে, দেশে একটি শক্তিশালী উদ্যোক্তা শ্রেণি ও টেকসই স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সুনির্দিষ্ট কিছু কাঠামোগত ও নীতিগত পরিবর্তন আনতে হবে। যেমন:

জামানতের শেকল ভাঙা ও ক্যাশ-ফ্লো ভিত্তিক অর্থায়ন

দেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত দুর্বলতা হলো ঋণ বা বিনিয়োগ প্রদানে অতিমাত্রায় জামানত-নির্ভরতা। আইটি, ফিনটেক, এগ্রিটেক, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং কিংবা সিএমএসএমই খাতের একজন তরুণ উদ্যোক্তার মাথায় হয়তো একটি বিলিয়ন ডলারের আইডিয়া এবং দক্ষতা আছে, কিন্তু ব্যাংকে দেওয়ার মতো তার কোনো স্থাবর সম্পত্তি বা জমির দলিল নেই। ব্যাংকগুলোকে এখন এই প্রথাগত চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। জমির দলিলের বদলে উদ্যোক্তার মেধা, দক্ষতা, ব্যবসায়িক সম্ভাবনা এবং ক্যাশ-ফ্লোকে পুঁজি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। উদ্যোক্তাদের ‘ডিজিটাল লেনদেনের ফুটপ্রিন্ট’ (যেমন: মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেন, ইউটিলিটি বিল পরিশোধের হার ইত্যাদি) বিশ্লেষণ করে ‘অলটারনেটিভ ক্রেডিট স্কোরিং’ পদ্ধতির ব্যাপক প্রয়োগ ঘটাতে হবে। অবশ্য বাংলাদেশে কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংক খু্বই ক্ষুদ্র পরিসরে এ ধরণের উদ্যোক্তাদের জন্য ডিজিটাল লোন বা ন্যানো লোন সুবিধা ইতোমধ্যে চালু করেছে। কিন্তু ব্যাপকহারে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে হলে এই উদ্যোগ আরো সম্প্রসারিত ও ত্বরান্বিত করতে হবে। একইসাথে সিঙ্গেল ডিজিট সুদ হার এবং পর্যাপ্ত গ্রেস পিরিয়ডসহ ঋণদান প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও ডিজটাল করতে পারলে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির পথে আশানুরুপ গতি আসবে।

ইকুইটি ফাইন্যান্সিং ও স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম তৈরি

প্রযুক্তির উৎকর্ষের এই যুগে বাংলাদেশে স্টার্টআপ ফাইন্যান্সের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। গতানুগতিক ঋণ বা ডেট ফাইন্যান্সিং দিয়ে কখনোই একটি উদ্ভাবনী স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা সম্ভব নয়। স্টার্টআপগুলোর ব্যবসায়িক মডেলে ঝুঁকি বেশি থাকে, তাই তাদের প্রয়োজন ‘ইকুইটি ফাইন্যান্সিং’। প্রতিটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের নিজস্ব ‘ভেঞ্চার ক্যাপিটাল’ উইং বা ‘স্টার্টআপ ফান্ড’ থাকা এখন সময়ের দাবি। তরুণদের নতুন আইডিয়া বাণিজ্যিকভাবে সফল করতে সিড ফান্ডিং বা ইনোভেশন গ্রান্ট প্রদানে ব্যাংকগুলোকে আরও সাহসী ভূমিকা নিতে হবে। ব্যাংকগুলোকে বুঝতে হবে, আজকের একটি ছোট স্টার্টআপ আগামীর একটি ইউনিকর্ন কোম্পানিতে পরিণত হতে পারে।

নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’

ধর্ম-বর্ণ-দল-মত-বয়স-লিঙ্গ-অঞ্চল নির্বিশেষে দেশের সকল মানুষের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো গঠন ছাড়া ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। আমাদের দেশে পারিবারিক সম্পত্তির মালিকানায় নারীদের অংশীদারিত্ব কম থাকায়, প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নারী উদ্যোক্তারা ঋণ পাওয়া থেকে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হন। এই কাঠামোগত বাধা দূর করতে ব্যাংকগুলোকে পার্সোনাল গ্যারান্টি বা গ্রুপ গ্যারান্টির ভিত্তিতে নারীদের ঋণ দেওয়ার পরিধি বাড়াতে হবে। সরকারের ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’—এই কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নে গ্রামীণ নারীদের ঐতিহ্যবাহী পণ্য উৎপাদনে অর্থায়ন বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি, এই দেশীয় পণ্যগুলো যেন অ্যামাজন বা আলিবাবার মতো বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে সহজে বিক্রি করা যায়, সেজন্য ব্যাংকগুলোকে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে ও লজিস্টিক সংযোগে সহায়তাকারীর ভূমিকা পালন করতে হবে। ব্যাংকগুলোর প্রতিটি শাখার ‘নারী উদ্যোক্তা ডেস্ক’ যেন কেবল নামসর্বস্ব না থেকে সত্যিকার অর্থেই নারীদের ব্যবসা সম্প্রসারণে কাজ করে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

প্রান্তিক পর্যায়ে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও বিজনেস অ্যাডভাইজরি

উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ভূমিকা কেবল ঋণ বিতরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে বর্ণিত প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশের প্রত্যেক জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ চালুর উদ্যোগের সাথে সমন্বয় করে ব্যাংকগুলোকে তাদের প্রতিটি শাখা, উপশাখা বা এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটে ‘বিজনেস অ্যাডভাইজরি সেন্টার’ বা ব্যাবসায়িক পরামর্শ কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। এর মাধ্যমে ‍ব্যাংকগুলো উদ্যোক্তা উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মশালা, উদ্যোক্তা কাউন্সিলিং এবং হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের মত নানা কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো সরকারের যুব উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ইউনিয়ন ডিজিটাল সেবা কেন্দ্র বা অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। এছাড়া অনেক নতুন উদ্যোক্তা ট্রেড লাইসেন্স করা, প্রজেক্ট প্রোফাইল তৈরি, হিসাবরক্ষণ বা কর বিষয়ক আইনি জটিলতার কারণে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হন। ব্যাংকগুলো যদি তাদের নিজস্ব জনবল দিয়ে এই মেন্টরশিপ ও দিকনির্দেশনা প্রদান করে, তবে প্রান্তিক পর্যায়েও সফল উদ্যোক্তা তৈরি হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের ঝুঁকিও কমে আসবে।

গিগ ইকোনমি এবং ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বিশেষ সুবিধা

বর্তমান বিশ্বে ‘গিগ ইকোনমি’ বা স্বাধীন পেশাজীবীদের অর্থনীতি একটি বড় বাস্তবতা। দেশে প্রায় ৮ লক্ষ ফ্রিল্যান্সার ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটর তৈরির যে লক্ষ্যমাত্রা সরকার নির্ধারণ করেছে, তার সুফল পেতে ব্যাংকগুলোকে বিশেষায়িত সেবা চালু করতে হবে। ফ্রিল্যান্সারদের আয়ের প্রমাণপত্র প্রথাগত চাকরিজীবীদের মতো হয় না। তাই তাদের আয় দেশে আনার জন্য নিরবচ্ছিন্ন পেমেন্ট চ্যানেল তৈরি, আয়ের গড়ের ওপর ভিত্তি করে সহজ শর্তে ক্রেডিট কার্ড প্রদান এবং বিশেষ ডিপিএস ও ঋণ সহায়তা চালু করতে হবে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের এই কর্মীদের সঞ্চয় ও মূলধন গঠনে ব্যাংকগুলো সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।

ক্লাস্টার ভিত্তিক শিল্পায়ন ও ব্লু-ইকোনমি

আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে সরকারের ইশতেহারে উল্লেখিত সুনির্দিষ্ট অঞ্চলভিত্তিক শিল্পায়নে ব্যাংকগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, উত্তরাঞ্চলে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানি অঞ্চল গড়ে তুলতে ব্যাংকগুলোর সিন্ডিকেটেড অর্থায়ন প্রয়োজন। অন্যদিকে, দেশের সুবিশাল সমুদ্রসীমাকে কেন্দ্র করে ‘সুনীল অর্থনীতি’ বা ব্লু-ইকোনমির যে অপার সম্ভাবনা রয়েছে, তা কাজে লাগাতে হবে। হাওর ও উপকূলীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, জাহাজ ভাঙা শিল্প এবং ইকো-ট্যুরিজম খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য ক্লাস্টার-ভিত্তিক অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

সিএসআর ফান্ডের যুগোপযোগী ব্যবহার ও দক্ষতা উন্নয়ন

ব্যাংকগুলোর কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতের ব্যয়ের ধরনেও গুণগত পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। কেবল অনুদান বা ত্রাণ বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, সিএসআর তহবিলের একটি বড় অংশ তরুণদের আধুনিক প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, বিদেশি ভাষা শিক্ষা এবং স্কিল ডেভেলপমেন্টে ব্যয় করা উচিত। শিক্ষাব্যবস্থাকে বাস্তবমুখী করতে ‘ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া’র দূরত্ব ঘোচাতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে যৌথ উদ্যোগে ইনকিউবেটর, বুটক্যাম্প ও জব ফেয়ার আয়োজনে ব্যাংকগুলোর স্পন্সরশিপ দেশের জনশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে বিশাল ভূমিকা রাখবে।

অলিগার্কিক কাঠামোর বিলোপ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা

উপরোক্ত সকল উদ্যোগ তখনই সফল হবে, যখন ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। ব্যাংক পরিচালনায় এবং ঋণ মঞ্জুরিতে সকল প্রকার রাজনৈতিক, আমলাতান্ত্রিক ও পারিবারিক প্রভাব বন্ধ করতে হবে। মুষ্টিমেয় কিছু পরিবার বা গোষ্ঠীর হাতে ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা কুক্ষিগত থাকার যে সংস্কৃতি, তা ভেঙে ফেলতে হবে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে কঠোর আইনি প্রক্রিয়ায় অর্থ আদায় করে, সেই তারল্য নতুন ও সম্ভাবনাময় সাধারণ উদ্যোক্তাদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। ব্যাংকিং খাতে ন্যায়ভিত্তিক ও রুল-বেসড ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার যে কড়া বার্তা কেন্দ্রীয় ব্যাংক দিয়েছে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদকে তা অবিলম্বে ধারণ করতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, একটি দেশের অর্থনীতি যখন নতুন উচ্চতায় আরোহণের প্রস্তুতি নেয়, তখন ব্যাংকিং খাতকে তার চালিকাশক্তির ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়। বর্তমান সরকার তার নির্বাচনী ইশতেহারে ‘করবো কাজ, গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির মাধ্যমে একটি স্পষ্ট গন্তব্য নির্ধারণ করে দিয়েছে। দেশের আর্থিক খাতে নীতিনির্ধারক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংককে তার যুগোপযোগী মুদ্রানীতি ও দিকনির্দেশনার মাধ্যমে এই ইশতেহারে বর্ণিত অর্থনৈতিক গন্তব্যে পৌঁছানোর পথনকশাও তৈরি করতে হবে। এবং সেই পথনকশা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাঠে নেমে কাজ করার উদ্যোগ ও সদিচ্ছার। প্রকৃত অর্থে মেধা, পরিশ্রম, দক্ষতা, সম্ভাবনা ও তারুণ্যের ওপর আস্থা রেখে ব্যাংকগুলো যদি নতুন উদ্যোক্তাদের হাত ধরে এগোয়, তবে বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের জোয়ার সৃষ্টি হবে এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে একটি সমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভরশীল ‘ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি’র স্বপ্ন বাস্তবতায় রূপ নিতে পারে।

লেখক: ব্যাংকার ও আর্থিক খাতের বিশ্লেষক।


আফতাবনগরে ঘাস-বন পোড়ানো: পাখি ও প্রকৃতির বিরুদ্ধে অমানবিকতা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
লেখক- কাজী মাহমুদুর রহমান, ভোরের সাথী

শীতের সকালে আফতাবনগরের ঘাস-বনভূমি একসময় পাখির কলতানে মুখর এলাকা। প্রতিবছর শীতে উড়ে আসে পরিযায়ী পাখির ঝাঁক, গাছে গাছে শোনা যায় তাদের ডাক। কিন্তু প্রতিবছরের মতো এবারও সেই ঘাস-বনভূমির একাংশ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে গেছে গাছ, ঝোপঝাড়—আর সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংস হয়ে গেছে অসংখ্য পাখির নিরাপদ আশ্রয়।

এই ঘাস-বন পোড়ানোর ফলে কার্বন নিশ্বরণের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পাখিকুল। অনেক পাখির বাসা, ডিম ও ছানাপোনা আগুনে পুড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। যারা উড়তে পারেনি, তারা প্রাণ হারিয়েছে। এই দৃশ্য শুধু হৃদয়বিদারকই নয়, আমাদের মানবিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

প্রতিবছর শীত মৌসুমে সাইবেরিয়া ও অন্যান্য শীতপ্রধান অঞ্চল থেকে বিভিন্ন প্রজাতির পরিযায়ী পাখি আফতাবনগরে আসে। সাইবেরিয়ান স্টন চ্যাট, ইয়োল অকটেইলসহ নানা প্রজাতির পাখি এখানকার বনভূমি ও জলাভূমিকে নিরাপদ আশ্রয় ও খাদ্যের উৎস হিসেবে বেছে নেয়। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তারা আসে বেঁচে থাকার তাগিদে। কিন্তু ঘাস-বন পোড়ানোর কারণে তাদের সেই আশ্রয় আর নিরাপদ থাকছে না। খাদ্যের উৎস ধ্বংস হওয়ায় এসব পাখি আজ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে।

প্রকৃতির এই নির্মম ধ্বংস কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ঘাস- বন পোড়ানো কেবল পাখিদের জীবনই কেড়ে নিচ্ছে না, এটি পরিবেশের সামগ্রিক ভারসাম্যও নষ্ট করছে। পাখি প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করে, গাছের বীজ ছড়াতে সহায়তা করে এবং পরিবেশকে সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাখির সংখ্যা কমে গেলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনেও এসে পড়ে—খাদ্যচক্র ভেঙে পড়ে, পরিবেশ হয়ে ওঠে আরও ঝুঁকিপূর্ণ।

পাখিদের বাঁচানো শুধু আবেগের বিষয় নয়, এটি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব এবং একই সঙ্গে আমাদের নিজেদের স্বার্থের সঙ্গেও জড়িত। পাখির মাধ্যমে আমরা যে পরিবেশগত উপকার পাই, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাই আফতাবনগরে ঘাস-বন পোড়ানোর মতো অমানবিক কাজ অবিলম্বে বন্ধ করা জরুরি।

এক্ষেত্রে প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকার পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ অপরিহার্য। ঘাস-বনভূমি রক্ষা, নজরদারি জোরদার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি না করলে এই ধ্বংস থামানো সম্ভব নয়।

প্রকৃতি বাঁচলে, আমরাও বাঁচব—এই সত্য এখনই উপলব্ধি করার সময়। নইলে একদিন আফতাবনগরের ঘাস-বন থাকবে শুধু স্মৃতিতে, আর পাখির ডাক শোনা যাবে কেবল পুরোনো গল্পে।


মডেল তিন্নির মৃত্যু: নীরবে চলে যাওয়া থেকে আমাদের শেখা

ছবি: মডেল তিন্নি। ফাইল ছবি
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
অনলাইন ডেস্ক

২০০২ সালে মডেল তিন্নির মৃত্যুর খবরে আমাদের সমাজকে তাৎক্ষণিকভাবে একটি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। সেই প্রশ্নটি হচ্ছে, আমরা কি মানুষের ভেতরের কষ্টগুলো সত্যিই দেখতে পাই? বাহ্যিক সাফল্য, পরিচিতি কিংবা স্নিগ্ধ হাসির আড়ালে যে গভীর মানসিক সংকট লুকিয়ে থাকতে পারে, এই ঘটনাটি তারই এক বেদনাদায়ক স্মারক।

তিন্নি ছিলেন একজন সুপরিচিত মুখ। গ্ল্যামার, আত্মবিশ্বাস ও সফলতার যে ছবি আমরা পর্দায় দেখি, প্রাত্যাহিক জীবনে সেটা সবসময় বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি নয়, এ কথা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। সমাজের প্রত্যাশা, ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানপোড়ন, মানসিক একাকিত্ব কিংবা না-বলা কষ্ট, এসব কারণ মানুষের ভেতর তীব্র মানসিক সংকট তৈরি করতে পারে। কিন্তু এসব সংকট সবসময় দৃশ্যমান হয় না।

তিন্নির মৃত্যুর ঘটনায় তার ব্যক্তিগত জীবনকে বিশ্লেষণ করার চেয়ে আমাদের জন্য জরুরি হলো এই দুঃখজনক ঘটনা থেকে সচেতনতামূলক শিক্ষা নেয়া। প্রথমত, মানসিক কষ্টকে হালকাভাবে না নেওয়া যেটা একটি জীবনের জন্য বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, মানসিক সাহায্য চাওয়াকে স্বাভাবিক বিষয় হিসাবে দেখা। আমাদের সমাজে এখনো মনে করা হয় মানসিক সমস্যায় সাহায্য নেওয়া মানেই ব্যর্থতা। এই ধারণা ভাঙতে হবে। যেমন আমরা শরীর অসুস্থ হলে ডাক্তারের কাছে যাই, তেমনি মন ভেঙে পড়লে কাউন্সেলর, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা বিশ্বাসযোগ্য কারও সাহায্য নেওয়া স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়। তৃতীয়ত, সোশ্যাল মিডিয়ায় ও জনপরিসরে সংবেদনশীল আচরণ জরুরি। কোনো আত্মহত্যার ঘটনায় গুজব, অতিরঞ্জন বা ব্যক্তিগত জীবনের কাটাছেঁড়া কেবল পরিস্থিতিকে আরও ক্ষতিকর করে তোলে। আমাদের উচিত সম্মান, নীরবতা এবং দায়িত্বশীল ভাষা বজায় রাখা।

মডেল তিন্নির মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানুষের জীবন একমাত্রিক নয়। সফলতা, সৌন্দর্য বা জনপ্রিয়তা মানসিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। তাই পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী, সব সম্পর্কেই সহানুভূতিশীল হওয়া দরকার।

বাস্তবতা হচ্ছে, তিন্নির চলে যাওয়াকে আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। কিন্তু এখন থেকে যদি আমরা মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিতে শিখি এবং আরো সচেতন ও মানবিক হই, তাহলে এভাবে কাউকে হারানোর ঘটনার সংখ্যা অনেক কমে আসবে। নীরব কষ্ট যেন আর নীরব মৃত্যুতে রূপ না নেয়, এই হোক আমাদের অঙ্গীকার। লেখক : মনোরোগ বিশেষজ্ঞ


ভোট-পরবর্তী বিভ্রান্তি মোকাবিলায় রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান ড. আবু তালেবের

অধ্যাপক ড. মোঃ আবু তালেব
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
অনলাইন ডেস্ক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, স্বচ্ছ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হয়েছে বলে উল্লেখ করে ভোট-পরবর্তী বিভ্রান্তি মোকাবিলায় প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন অধ্যাপক ড. মোঃ আবু তালেব। ড. মোঃ আবু তালেব অধ্যাপক ও গবেষক হিসেবে কর্মরত আছেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়–এ।

একটি বিশ্লেষণধর্মী লেখায় তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিগত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল অবাধ, স্বচ্ছ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক—যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়েছে। নির্বাচনে হার-জিত গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অনুষঙ্গ। ব্যালটের মাধ্যমে জনরায়কে সম্মান করা প্রতিটি নাগরিকের পবিত্র দায়িত্ব। তবে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে কিছু মহল ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’–এর অভিযোগ তুলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়াচ্ছে অভিযোগ, গুজব ও অপপ্রচার।

ড. তালেব মনে করেন, এই প্রেক্ষাপটে একটি প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর জন্য তথ্যভিত্তিক, দায়িত্বশীল ও কৌশলগত ভূমিকা গ্রহণ করা সময়ের দাবি। তার প্রস্তাবিত মূল পদক্ষেপগুলো হলো:

১. প্রমাণভিত্তিক অবস্থান গ্রহণ: যে কোনো অভিযোগ তথ্য, পরিসংখ্যান ও প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করতে হবে। আবেগপ্রবণ বক্তব্যের পরিবর্তে লিখিত প্রতিবেদন, পর্যবেক্ষণ নথি ও আইনি কাঠামোর মধ্যে অভিযোগ উত্থাপন অধিক কার্যকর। একটি সুসংগঠিত ডকুমেন্টেশন সেল গঠন করলে ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে দল শক্ত ভিত্তি পাবে এবং অপপ্রচারের সুযোগ কমবে।

২. ডিজিটাল ফ্যাক্ট-চেক ও সচেতনতা: ডিজিটাল যুগে অপপ্রচার সবচেয়ে দ্রুত ছড়ায় সামাজিক মাধ্যমে। তাই একটি দক্ষ ফ্যাক্ট-চেক টিম গঠন জরুরি, যারা ভুয়া ভিডিও, পুরোনো ছবি বা বিকৃত তথ্য শনাক্ত করে প্রমাণসহ খণ্ডন করবে। দলীয় কর্মী-সমর্থকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই ছাড়া তথ্য শেয়ার না করা এবং শালীন ভাষা ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

৩. ইতিবাচক ও নীতিনিষ্ঠ রাজনৈতিক ভাষা: অপপ্রচারের জবাবে নেতিবাচকতা নয়—উন্নয়ন পরিকল্পনা, গণতান্ত্রিক অঙ্গীকার ও সুশাসনের রূপরেখা তুলে ধরা উচিত। শালীন ও নীতিনিষ্ঠ রাজনৈতিক ভাষা জনগণের আস্থা অর্জনে সহায়ক।

৪. গণমাধ্যমের সঙ্গে স্বচ্ছ যোগাযোগ: সংবাদ সম্মেলন, লিখিত বিবৃতি ও নিয়মিত ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে দলীয় অবস্থান পরিষ্কারভাবে তুলে ধরলে ভুল বোঝাবুঝি কমে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের শান্ত ও তথ্যসমৃদ্ধ জবাব দলীয় ভাবমূর্তি উন্নত করে। গণমাধ্যমকে প্রতিপক্ষ নয়, অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করাই উত্তম।

৫. আইনগত ও ন্যায়সঙ্গত পদক্ষেপ: উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভুয়া তথ্য ছড়ালে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, তবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন না হয়—সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়া জনগণের আস্থা বাড়ায়।

৬. তৃণমূল ও তরুণ সম্পৃক্ততা: তৃণমূল পর্যায়ে মতবিনিময় সভা ও সরাসরি যোগাযোগ বিভ্রান্তি দূর করতে কার্যকর। পাশাপাশি তরুণদের লক্ষ্য করে তথ্যভিত্তিক ভিডিও, ইনফোগ্রাফিক ও অনলাইন আলোচনার আয়োজন করলে অপপ্রচার মোকাবিলায় সচেতন প্রজন্ম তৈরি হবে।

৭. আত্মমূল্যায়ন ও পর্যালোচনা: অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের মাধ্যমে যোগাযোগের ঘাটতি ও কৌশলগত দুর্বলতা চিহ্নিত করা উচিত। আত্মসমালোচনার সাহস একটি রাজনৈতিক দলের পরিপক্বতার প্রমাণ।

অপপ্রচার রোধ করা শুধু একটি দলের সুনাম রক্ষা নয়—বরং গণতন্ত্রের ভিত্তি সুদৃঢ় করা। সত্যনিষ্ঠতা, ধৈর্য ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক চর্চাই পারে বিভ্রান্তির অন্ধকার দূর করতে। যদি প্রমাণনির্ভর বক্তব্য, স্বচ্ছ যোগাযোগ ও ইতিবাচক রাজনীতির চর্চা অব্যাহত থাকে, তবে একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। গণতন্ত্রের শক্তি নিহিত থাকে সত্য ও আস্থায়। তাই অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সর্বোত্তম অস্ত্র হলো তথ্য, যুক্তি ও নৈতিকতা।


কে পাবে লাল কার্ড

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
দৈনিক বাংলা ডেস্ক

লাল কার্ডের ব্যবহার সাধারণত ফুটবল খেলাতেই হয়ে থাকে। কোনো খেলোয়াড় ফুটবল খেলার আইন ভঙ্গ করলে বা মারাত্মক ফাউল করলে রেফারি তাকে লাল কার্ড দেখিয়ে বহিস্কার করতে পারেন। অবশ্য এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়কে দুবার হলুদ কার্ড দেখিয়ে সতর্ক করার বিধান রয়েছে। হলুদ কার্ড দেখানোর পরও যদি ওই খেলোয়াড় নিবৃত্ত না হন বা রেফারির আদেশ না মানেন, ওই খেলোয়াড়কে লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়ার এখতিয়ার রেফারির রয়েছে। খেলার মাঠের সে লাল কার্ড এবার উঠে এসেছে আমাদের রাজনৈতিক মাঠে।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা এখন তুঙ্গে। অংশগ্রহণকারী দলগুলো এখন তুমুল ব্যস্ত। ভোটারদের পক্ষে টানার জন্য নানা কথার ফুলঝুরির পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী দলের দোষত্রুটি জনসমক্ষে তুলে ধরছে তারা। আর তা করতে গিয়ে তারা কখনো অসহিষ্ণুতার বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে, কখনো শিষ্টাচারের সীমানা অতিক্রম করে যাচ্ছে। বলা নিস্প্রয়োজন, এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে। প্রথমত. দীর্ঘ সতের বছর পরে বাংলাদেশের জনগণ নিঃশঙ্কচিত্তে, নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত. এ নির্বাচনে দেশের অন্যতম রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগ অনুপস্থিত। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় তারা এখন নিষ্ক্রিয়। উপরন্তু তাদের শীর্ষনেতা শেখ হাসিনা রয়েছেন দেশের বাইরে; যিনি ইতোমধ্যে একটি আদালতে গণহত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। তাছাড়া দলটির প্রধম সারির নেতাদের বেশিরভাগ গণঅভ্যুত্থানের পরপরই কেউ দেশ ত্যাগ করেছেন কেউ গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। ফলে দলটি এখন অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। এর আগেও ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর আওয়ামী লীগ একই সংকটে পড়েছিল। তবে সে প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। কারণ দলটি তখন নিষিদ্ধ হয় নি। যার ফলে পঁচাত্তর পরবর্তী সব নির্বাচনেই দলটি অংশ নিতে পেরেছিল।

আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচন যে খুব একটা জমজমাট হচ্ছে না, তা ইতোমধ্যেই প্রতিভাত হয়ে উঠেছে। ১৯৭৫ পরবর্তী বাংলাদেশের নির্বাচন মানেই ছিল চির প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের ভোটের লড়াই। যদিও ২০১৪ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি নির্বাচনী মাঠে অনুপস্থিত ছিল। আর ২০১৮ সালের নির্বাচনী মাঠে নামলেও আওয়ামী লীগ ও সরকারের দ্বৈত চাপ এবং রেফারি নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতিত্বের কারণে শেষ পর্যন্ত লড়াইয়ে থাকতে পারে নি।

পত্র-পত্রিকার খবরে বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ নির্বাচনী মাঠে না থাকায় উত্তাপ অনেকটাই নেই। কেউ কেউ এ নির্বাচনকে পানসে বলেও অভিহিত করেছেন। তবে আওয়ামী লীগ না থাকলেও নির্বাচনী মাঠে যারা রয়েছেন, তাদের কার্যকলাপ ও কথাবার্তায় উত্তাপ সৃষ্টির যথেষ্ট উপাদান রয়েছে। এবারের ভোটের লড়াইয়ে প্রধান দুই পক্ষ বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। এই দুই দল বর্তমানে লিপ্ত রয়েছে বাগ্যুদ্ধে। তারা পরস্পরকে আক্রমণ-প্রতিআক্রমণের দ্বারা পরিবেশ অনেকটাই উত্তপ্ত করে তুলেছে। শুধু বাগ্যুদ্ধ নয়, ইতোমধ্যে তারা দু’চার জায়গায় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধেও অবতীর্ণ হয়েছে। শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতিতে তেমনি এক সংঘর্ষে একজন নিহত ও কয়েকজন আহত হয়েছে।

রাজনৈতিক দলের জনপ্রিয়তা বা গ্রহণযোগ্যতার ব্যারোমিটার হলো নির্বাচন। একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে জনগণ যদি অবাধে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, তাহলে প্রমাণিত হয় কোন দল কতটা জনপ্রিয় বা গ্রহণযোগ্য। বলার অপেক্ষা রাখেনা, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতে সেটা যাচাই করা সম্ভব ছিল না। কেননা, তখন জনগণ ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটই দিতে পারেনি। বাংলাদেশের জনগণ এবার নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগের অধিকার ফিরে পাবে এটাই প্রত্যাশিত। জনগণের সে ভোট পক্ষে টানার জন্য রাজনৈতিক দলের নেতা ও প্রার্থীরা সভা-সমাবেশে বক্তব্য রাখবেন, মিছিল করবেন, এসব স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে সমালোচনার নামে প্রতিপক্ষের প্রতি বিষোদগার কিংবা শিষ্টাচার বহির্ভূত আক্রমণাত্মক বক্তব্য-মন্তব্য কখনোই কাম্য নয়। অবশ্য এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, আমাদের দেশে জনগণ যেটা প্রত্যাশা করে, রাজনৈতিক দল ও সেগুলোর নেতারা বেশিরভাগ সময় তার বিপরীত কাজটি করেন।

অনেকেরই ধারণা ছিল, এবারের নির্বাচনে যেহেতু এক সময়ের মিত্রদের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে, তাই নির্বাচনী মাঠে তেমন কোনো অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটবে না। প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর নেতা ও প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারণার সময় শিষ্টাচারের বিষয়ে সতর্ক থাকবেন। কিন্তু নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর পর থেকে যেসব ঘটনা ঘটছে তাতে জনমনে একরাশ হতাশা ভর করেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের’ কথা শোনা গিয়েছিল। অনেকেই আশান্বিত হয়েছিলেন, পুরানো দোষারোপের ঐতিহ্য থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের রাজনীতি সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের পথে হাঁটতে শুরু করবে। বলা হয়েছিল, পুরানো বস্তাপচা রাজনীতির বদলে দেশবাসী নতুন রাজনীতি উপহার পাবে। কিন্তু হা হতোষ্মি! যারা নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা শুনিয়েছিলেন, তারাও হাঁটছেন পুরনো পথে। বরং সমালোচনার নামে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বিরুদ্ধে অশোভনীয় উক্তির নতুন নজির স্থাপন করেছেন। ঢাকা-৮ আসনে বিএনপির প্রার্থী দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সিনিয়র রাজনীতিবিদ মির্জা আব্বাসকে এনসিপির প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী যে ভাষায় আক্রমণ করেছেন তাকে শিষ্টাচার, শালীনতা এবং সভ্যতা-ভব্যতার চূড়ান্ত লঙ্ঘন বললে অত্যুক্তি হবে না। যদিও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী সম্বন্ধে কোনো ধরনের কটুক্তি, বিষোদগার ও ব্যক্তিগত আক্রমণ নির্বাচন কমিশন প্রণীত আচরণবিধিতে নিষিদ্ধ। তবে তার তোয়াক্কা কেউ করছে বলে মনে হয় না।

এ মুহূর্তে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর বাগ্যুদ্ধে দেশবাসী যুগপৎ বিস্মিত ও আতঙ্কিত। পরস্পরের প্রতি তাদের বাক্য-তীর নিক্ষেপের ধরন দেখে মনে হচ্ছেনা, তারা একসময় ‘জান পেহচান দোস্ত’ ছিল। জামায়াত নেতারা যখন বিএনপিকে ক্ষমতায় থাকতে দুর্নীতিতে চারবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার খোঁটা দেন, তখন তারা বোধকরি ভুলে যান, তাদের দল সেই সরকারের শরিক ছিল এবং তাদের দুই শীর্ষনেতা সে সরকারের মস্ত্রী ছিলেন। ফলে চার দলীয় জোট সরকার যদি দুর্নীতিবাজ হয়ে থাকে, তাহলে সে আভিযোগ থেকে জামায়াতে ইসলামী কি বাদ যেতে পারে? ঠিক তেমনি বিএনপির পক্ষ থেকে যখন মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতার জন্য জামায়াতে ইসলামীকে তুলোধুনো করা হয়, তখন তারাও বোধকরি ভুলে যান, সব জেনেশুনেই তারা ওই বিষপান করেছিলেন। ২০০০ সালে জোটসঙ্গী করার সময় যদি জামায়াতের একাত্তরের ভূমিকা দোষের মনে না হয়ে থাকে, তাহলে এখন কেন তারা অস্পৃশ্য হবে? অন্যদিকে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘গুপ্ত’ বলে নতুন একটি শব্দের উদ্ভাবন করেছেন। এই শব্দের দ্বারা আওয়ামী লীগের শাসনামলে জামায়াতের কতিপয় নেতাকর্মীর ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় থেকে সুযোগ বুঝে স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হওয়াকেই কটাক্ষ করে থাকবেন। এর বিপরীতে জামায়াতের আমির ডাক্তার শফিকুর রহমান তারেক রহমানের লন্ডনে অবস্থান করাকে ‘সতের বছর গুপ্ত ছিলেন’ বলে কটাক্ষ করেছেন।

এদিকে গত ২ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজারের নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডাক্তার শফিকুর রহমান ‘বিএনপিকে জনগণ এবার লাল কার্ড দেখাবে’ বলে মন্তব্য করেছেন। বিপরীতে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ৪ ফেব্রুয়ারি বরিশালে নির্বাচনী জনসভায় জামায়াতে ইসলামীকে কটাক্ষ করে বলেছেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশে একটি ‘গুপ্ত সংগঠন’ নতুন জালিম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে’। বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতির দুই শীর্ষনেতার এহেন বাক্য-শর নিক্ষেপকে রাজনীতি-সচেতন মানুষ অশনি সংকেত হিসেবেই দেখছেন। তারা বলছেন, জনগণ বিএনপিকে লাল কার্ড দেখাবে, নাকি লাল গোলাপের ফুলের তোড়ায় নতুন করে বরণ করে নেবে তা দেখা যাবে ১২ ফেব্রুয়ারি। জামায়াত আমিরের কাছ থেকে সেটা শুনতে বা জানতে তারা আগ্রহী নয়। অন্যদিকে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনাকারী একটি রাজনৈতিক দলকে তথাকথিত ‘গুপ্ত সংগঠন’ বলে অভিহিত করা যে একেবারেই সমীচীন হচ্ছেনা, বিএনপি চেয়ারম্যানের তা অনুধাবন করা দরকার।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ভোট গ্রহণের আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। নির্বাচনী প্রচারণার শেষ পর্যায়ে এসে একসময়ের ‘হরিহর আত্মা’ বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী যে ধরনের অরুচিকর ভাষায় পরস্পরকে আক্রমণ করছে তাতে দেশবাসী হতাশ ও উদ্বিগ্ন। তারা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে অপরের কুৎসা বা অরাজনৈতিক সমালোচনা শুনতে আগ্রহী নয়। তারা শুনতে চায় জাতির প্রতি দলগুলোর প্রতিশ্রুতির কথা। তারা চায় দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে যেসব প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করছে, তা প্রতিপালনের নিশ্চয়তা। রাজনৈতিক দলের নেতাদের স্মরণে রাখা দরকার, জনগণ মৌখিক নয়, আন্তরিক গণতন্ত্রীদের ক্ষমতায় দেখতে চায়। আর সে গণতন্ত্রের প্রধান পূর্বশর্তই হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। তার পরিবর্তে তারা যদি পালাগানের স্টাইলে শালীন-অশালীন ভাষায় একে অপরকে আক্রমণ করেন, তাহলে দেশবাসীর হতাশার সাগরে নিমজ্জিত হওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না।

ফুটবল খেলায় কোনো খেলোয়াড়কে লাল কার্ড প্রদর্শনের একমাত্র ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি রেফারি। আর নির্বাচনে রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীদের লাল কার্ড দেখানোর ক্ষমতা জনগণ তথা ভোটারদের হাতে। সুতরাং তারাই সিদ্ধান্ত নিক ১২ ফেব্রুয়ারি কোন দলকে লাল কার্ড দেখাবে। খামোখা বাহুল্য উক্তি করে নির্বাচনী পরিবেশ উত্তপ্ত করা নিশ্চয়ই বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক নয়।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।


১৩তম জাতীয় নির্বাচন ও এআই: ভোট বাস্তব, সিদ্ধান্ত কি কৃত্রিম!

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
দৈনিক বাংলা ডেস্ক

আসন্ন ১৩তম জাতীয় নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে-এটি কেবল ব্যালট, পোস্টার আর জনসভার নির্বাচন নয়; এটি একই সঙ্গে একটি অ্যালগরিদমিক নির্বাচন কিংবা ডিজিটাইলাইজড নির্বাচন। যেখানে প্রার্থী নয়, অনেক সময় কনটেন্টই কথা বলে; বক্তব্য নয়, বরং ভিডিও ‘প্রমাণ’ হিসেবে হাজির হয়; আর যুক্তি নয়, আবেগই শেষ কথা বলে। এই নতুন নির্বাচনী ময়দানে সবচেয়ে আলোচিত, আবার সবচেয়ে ভীতিকর খেলোয়াড় হচ্ছে- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। আর এআইয়ের এই আগমনেই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছে দেশবাসী।

এক সময় নির্বাচনের অপপ্রচার বলতে বোঝাত ভুয়া লিফলেট, বিকৃত উক্তি কিংবা গুজব। সেগুলোর একটি সীমা ছিল-সবই ছিল মানুষের কণ্ঠ, মানুষের হাত, মানুষের সময়। এখন সেই সীমা ভেঙে গেছে। এআই কোনো ঘুম চেনে না, ক্লান্ত হয় না, নৈতিক দ্বিধায় পড়ে না। একটি ভিডিও বানাতে এখন আর শুটিং লাগে না, বক্তব্য বানাতে বক্তাও লাগে না। ফলে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে কেউ যদি হঠাৎ দেখে, কোনো প্রার্থী রাষ্ট্রবিরোধী কথা বলছেন, সংবেদনশীল ইস্যুতে উসকানিমূলক মন্তব্য করছেন, কিংবা এমন কিছু করছেন যা জনমনে ক্ষোভ তৈরি করে-তখন প্রশ্ন ওঠে না

‘তিনি সত্যিই বলেছেন কি না’, প্রশ্ন ওঠে ‘এটা কতটা ভাইরাল হলো?’

এই জায়গাতেই এআইয়ের অপব্যবহার সবচেয়ে ভয়ংকর হয়ে ওঠে। ডীপফেইক ভিডিও ও অডিও এমন এক বাস্তবতা তৈরি করে, যেখানে চোখ-কান আর বিশ্বাসের নির্ভরযোগ্যতা হারায়। আগে মানুষ বলত, ‘নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করি না।’ এখন নিজের চোখেই দেখে মানুষ বিভ্রান্ত হয়। ফলে নির্বাচনের মতো সংবেদনশীল সময়ে এই প্রযুক্তি হয়ে ওঠে নিখুঁত রাজনৈতিক অস্ত্র-যার আঘাত নীরব এবং দ্রুত, কিন্তু গভীর।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ঝুঁকি আরও তীব্র। কারণ আমাদের সমাজে রাজনৈতিক মেরুকরণ নতুন কিছু নয়। সমাজও ডিজিটালি বিভক্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা আগে থেকেই দুই মেরুতে বিভক্ত। এআই এই বিভাজন তৈরি করে না; বরং সেটিকে আরও ধারালো করে। যে ভোটার আগে থেকেই কাউকে সন্দেহ করে, ডীপফেইক তাকে সেই সন্দেহের

‘দৃশ্যমান প্রমাণ’ দেয়। যে ভোটার অন্ধ সমর্থক, এআই তাকে বানিয়ে দেয় কৃত্রিম বীরত্বের ভিডিও। ফলে নির্বাচন হয়ে ওঠে যুক্তির নয়, বরং কাস্টমাইজড বাস্তবতার প্রতিযোগিতা।

এখানে ব্যঙ্গটা হলো-আমরা এখন এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে কেউ কথা না বললেও তাকে দিয়ে অনেক কিছু ‘বলানো’ যায়, আর কিছু না করলেও তাকে দিয়ে অনেক কিছু ‘করানো’ যায়। তাও আবার উচ্চ রেজোলিউশনে, পরিষ্কার অডিওতে, সাবটাইটেলসহ। এই কৃত্রিম সত্যের সামনে সাধারণ ভোটার কীভাবে টিকবে? যে ভোটার দিনে দশটা পোস্ট স্ক্রল করে, তার পক্ষে যাচাই করা কি আদৌ সম্ভব?

সরকার সম্প্রতি জাতীয় এআই নীতির খসড়া প্রকাশ করেছে, যেখানে দায়িত্বশীল ব্যবহার, স্বচ্ছতা ও ঝুঁকিপূর্ণ এআই নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে। নীতির ভাষা আশাব্যঞ্জক, কিন্তু নির্বাচনের বাস্তবতা অনেক কঠিন। নীতিপত্র আর নিউজফিডের মাঝে যে সময়ের ফারাক, সেটিই সবচেয়ে বড় সমস্যা। একটি ভুয়া ভিডিও শনাক্ত করতে যেখানে ঘণ্টা কিংবা দিন লাগে, সেখানে সেটি ছড়াতে লাগে মিনিট। পরে সংশোধনী এলেও ততক্ষণে আবেগ তার কাজ করে ফেলে। আইনের প্রশ্নেও বিষয়টি জটিল। কোনটি মতপ্রকাশ, আর কোনটি পরিকল্পিত এআই-ভিত্তিক অপপ্রচার-এই সীমারেখা সব সময় স্পষ্ট নয়। বেশি কড়াকড়ি করলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্ন আসে, আবার ঢিলেঢালা হলে অপপ্রচারকারীরা আরও সাহসী হয়। তার ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর বেশিরভাগই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান-তাদের ওপর জাতীয় নির্বাচনী শাসন কার্যকর করা সহজ নয়।

তবে এআইয়ের এই অপব্যবহার শুধু প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়; এটি মূলত একটি ডিজিটাল লিটারেসির সংকট। আমাদের সমাজে ইন্টারনেট আছে, কিন্তু ইন্টারনেট বোঝার সক্ষমতা সবার নেই! ভিডিও দেখলেই সত্য ধরে নেওয়া, আবেগ উসকে দেওয়া কনটেন্ট শেয়ার করা-এই অভ্যাসই এআই-ভিত্তিক অপপ্রচারের সবচেয়ে বড় শক্তি। ব্যঙ্গ করে বলা যায়, এআই যতটা বুদ্ধিমান, আমরা অনেক সময় ততটাই বেপরোয়া।

নির্বাচনে এআইয়ের অপব্যবহার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে গণতন্ত্রের আস্থায়। কারণ গণতন্ত্র টিকে থাকে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্তের ওপর। যখন তথ্যই কৃত্রিম হয়ে যায়, তখন ভোট বাস্তব হলেও সিদ্ধান্ত হয়ে ওঠে কৃত্রিম। এটাই দেশবাসীর উদ্বেগের মূল জায়গা। মানুষ ভয় পাচ্ছে-ভোটটা আমি দেব, কিন্তু সিদ্ধান্তটা কি সত্যিই আমার হবে?

এখানে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। যদি দলগুলো নিজেরাই এআইকে প্রতিপক্ষ ঘায়েল করার হাতিয়ার বানায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত কেউই নিরাপদ থাকবে না। আজ যে দল অপপ্রচারের শিকার, কাল সে-ই অপপ্রচারক হতে পারে। এই দুষ্টচক্র ভাঙতে না পারলে নির্বাচন ব্যবস্থা ক্রমেই বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে।

সবশেষে কথা আসে নাগরিকের ভূমিকায়। প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, গণতন্ত্রের শেষ রক্ষাকবচ নাগরিকের বিবেক। আমাদের শিখতে হবে সন্দেহ করতে-ভিডিও দেখেও, অডিও শুনেও। ‘এটা কেন এখন এলো’

‘উৎসটা কী?’, ‘অন্য নির্ভরযোগ্য মাধ্যমে আছে কি?’

-এই প্রশ্নগুলোই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ। ঠাট্টা করে বললে, এখন সবচেয়ে বিপ্লবী কাজ হলো-সব কিছু সব সময় বিশ্বাস না করা!

সামনের ১৩তম জাতীয় নির্বাচন তাই শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি সত্য আর কৃত্রিমতার মধ্যকার এক নীরব যুদ্ধ। এই যুদ্ধে এআই যদি অনিয়ন্ত্রিত থাকে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু একটি পক্ষ নয়, পুরো গণতান্ত্রিক কাঠামো। নীতিমালা, প্রযুক্তি, আইন-সবই দরকার। কিন্তু তার চেয়েও বেশি দরকার সচেতন নাগরিক। নইলে একদিন হয়তো আমরা এমন এক নির্বাচনে পৌঁছাব, যেখানে ব্যালট বাক্স বাস্তব থাকবে, কিন্তু সেই বাক্সে দেওয়া সিদ্ধান্তের ভিত্তি হবে পুরোপুরি কৃত্রিম।

প্রফেসর ড. ইকবাল আহমেদ, কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়


নির্বাচন এসেই গেল

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
দৈনিক বাংলা ডেস্ক

আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এর নির্বাচনে ইসলামী দলগুলোর অবস্থান বেশ পাকাপোক্ত করেছে।তারা সরকার গঠনের ইংগিতও দিচ্ছে।

ভোটের বাজার হলো: সর্বমোট ২৯৮ টি সিটের জন্য ১৯৮১ জন প্রার্থী। ৫১টি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে , স্বতন্ত্র আছে ২৪৯ জন। বিএনপির কেনডিডেট ২৮৮, ইসলামিক আন্দোলন বাংলাদেশ ২৫৩ , বাংলাদেশ জামায়াত ইসলাম ২২৪ জন, ১২ টি ছোট ছোট দলও আছে।

২০২৪ এর হিংস্রতাকে পুঁজি করে বিশৃঙ্খলার জ‍ন‍্য আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী দল এবারের নির্বাচনে নেই।

যুবক দের ভোট এবার ৩৩ শতাংশ আর মহিলাদের ভোট প্রায় ৫০ শতাংশ। যে দল এই অন্দর মহলের অন্তর জয় করতে পারবে তারাই নিশ্চিত সফলতা পাবে।

বিএনপি ১৯৯০ আর ২০০০ সনে ক্ষমতায় ছিল । তাদের আদি ও অকৃত্রিম শক্র আওয়ামী লীগ এবার ভোটে নেই। বিএনপির বেগম খালেদা জিয়া অল্প কিছুদিন আগে প্রয়াত আর শেখ হাসিনা দিল্লীতে মোদির সাহেদ অতিথি। দেশের দুই হেভিওয়েট না থাকাতে জামায়েত তার অবস্থান বেশ গুছিয়ে নিয়েছে। নির্বাচনে জুলাই বিপ্লবের মহারথীদের আসন নিশ্চিত হতেই পারত তবে তাদের অর্বাচীন কান্ড যেমন দ্রুত বড়লোক হবার প্রবনতা জনমনে বিরাগের সৃষ্টি করেছে।

তারেক জিয়া। নির্বাচনের অন্যতম ফ‍্যাক্টর। মৃত পথযাত্রী মা বেগম খালেদা জিয়ার শয‍্যাপাশে আসতে তার গড়িমসি দৃষ্টি কটু পরিবেশের সৃষ্টি করেছে।১৭ বছর পর দেশে আসার সাথে সাথে লক্ষ লোকের সমাগম তাকে এতই অভিভূত করে যে তিনি অনেকটা খেই হারিয়েছেন। দেশের মাটিতে পা দিতে না দিতেই এনআইডি কার্ড তৈরি, এয়ারপোর্ট থেকে জনগণের সাথে আর্মি গাড়ি র বহর তাকে বেরিকেড দিয়ে নিঁযে আসা এসব তার মধ্যে সৃষ্টি করে ‘আই হ্যাভে প্লান’। তিনি মার্টিন লুথার কিং এর মতন আওয়াজ তুলতে চাইলেন। সেই প্ল্যানটা হলো খাল কাটবেন আর গাছ লাগাবেন। এত এত খাল কাটা হবে আর গাছ লাগানো হবে যে দেশে মানুষ বসবাসের যায়গায়ই থাকবে না।

বিএনপির এবার লড়তে হবে জামায়াতের অভিজ্ঞ নেতৃবৃন্দের সাথে। ঐ যে শুরুর এয়ারপোর্টের ধামাকা তারেক জিঁযাকে এখনও ‘ বি ইন হিজ স্যু ‘ এর মধ্যে ঢুকাতে পারে নাই। আকাশ কুসুম অলীক ভাবনারেই তিনি বাস্তব মনে করছেন। ফ্যামিলি কার্ড ঘরে ঘরে পৌঁছে দিবেন। এটা কি ! খায় নাকি মাথায দেয়। ছিলেন ইংল্যান্ডে, ছিলেন বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন এবং রাজনীতিতে অপরিপক্ক , বক্তা হিসাবেও ক‍্যারিশমেটিক নন এবং এ সব বুঝে শুনেই জামাত আর চোখে দেখছেন এবং ‘আই হ‍্যাভ্ প্লান ‘এই বাতচিত জামাত ই না সফল করে ফেলে, তাদের বয়স্ক ও বিজ্ঞ নেতারা সরকার গঠনের গন্ধ পাচ্ছেন। ভুল করে সুযোগ হাতছাড়া করবেন না।

নির্বাচনের জন্য সরকার বৈধ অস্ত্র জমা করে নিল। এখন দেশ ভরা অবৈধ অস্ত্রের হাট বাজার। বৈধ অস্ত্র দিয়ে পাখি শিকার পর্যন্ত করা যায় না। তবুও ঘরে থাকলে কিছুটা স্বস্তি, চারিদিকের উচ্ছৃঙ্খল পরিবেশের সামনে একটা শক্তি।

তারপরও সুষ্ঠ নির্বাচন চাই, চাই এলোমেলো বাংলাদেশ কে এক গুছানো বাংলাদেশ। আলহামদুলিল্লাহ।

— কলামিস্ট


স্যার-ম্যাডাম সম্বোধনের ক্ষেত্রে রকমারী আলেখ্য

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
দৈনিক বাংলা ডেস্ক

অফিস আদালতে কর্মকর্তা বা সিনিয়র কর্মীদের স্যার বা ম্যাডাম বলে সম্বোধন না করলে, চলমান রীতিগত দিক দিয়ে তেমন ভালো চোখে দেখা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অধস্তনের চাকুরী নিয়ে টানাটানি শুরু হয়; এমনকি অপরাধ হিসেবে গন্য করে নেতিবাচক স্থানে বদলি পর্যন্ত করা হয়ে থাকে, যার ভূড়ি ভূড়ি উদহারণ আছে। এ প্রেক্ষাপটে উল্লেখ্য যে, ১৭শ শতকে ব্রিটিশরা ভারতীয় উপমহাদেশে উপনিবেশ স্থাপন করলে স্যার বা ম্যাডাম শব্দের প্রচলন শুরু হয়। মূলত ব্রিটিশ প্রশাসনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শ্বেতাঙ্গ কর্মকর্তাদের প্রতি স্থানীয় জনগণের আনুগত্য প্রকাশের সারথী ধরে স্যার বা ম্যাডাম সম্বোধন চালু হয়। আর এই সূত্র ধরে সাধারণ মানুষ ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের স্যার, ব্রিটিশ নারীদের ম্যাডাম বলে ডাকতো। আর এই সম্বোধন ছিল কর্তৃত্ব ও আনুগত্যের প্রকাশ বৈ কিছু নয়। এদিকে ইংরেজরা উচ্চবর্ণের বাঙালিদের (বিশেষ করে সনাতনী ধর্মালম্বী) ‘বাবু’ বলে সম্বোধন করতো। তথ্য মতে জানা যায় যে, আঠার শতকের মাঝামাঝি সুদূরপ্রসারী বুদ্ধির আড়ালে ব্রিটিশরা এই মর্মে চিন্তা করে যে, এই উপনিবেশে এমন একটি শ্রেণি গড়ে তুলতে হবে, যারা ‘বর্ণে ভারতীয়; কিন্তু রুচিতে-বুদ্ধিতে এবং ভাবনায় হবে ব্রিটিশ’। আর এই নীতির সরণি ধরে ব্রিটিশ ভারতে গড়ে ওঠে ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা এবং একই সঙ্গে সম্বোধনের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ সামাজিক রীতি, যার একটি ছিল কর্তৃপক্ষকে ‘স্যার’ বলে ডাকা। সত্যিকারার্থে স্যার-ম্যাডাম সম্বোধনের উৎপত্তি নিয়ে যদি গভীরে যাই; তাহলে প্রতীয়মান হয় যে, অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজ অভিধানের তথ্য অনুযায়ী ১২৯৭ সাল থেকে ইংরেজি ভাষায় ‘স্যার শব্দটি ব্যবহার শুরু হয়। আর সেই সময়ে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রে বিশেষ ভূমিকা পালনের জন্য ‘নাইট’ উপাধি খেতাবী ব্যক্তিদের নামের আগে ‘স্যার’ শব্দটি যোগ করার প্রচলন ছিল বলে জানা যায়। অবশ্য এই শব্দটি ফরাসি শব্দ ঝরৎব থেকে এসেছে; যার অর্থ হলো প্রভু বা কর্তৃপক্ষ। মজার ব্যাপার হলো, তখন ইংল্যান্ডে ঝরৎ শব্দ দিয়ে এই মর্মে বোঝানো হতো যে আমি চাকরই থেকে গেলাম।

এদিকে বাংলার মধ্যযুগ বা মুঘল আমলের সংস্কৃতিতে রাজা বাদশাহদের জাঁহাপনা, হুজুর, ইত্যাদি এমন নামে সম্বোধন করা হতো। আর কর্মকর্তাদের ‘সাহেব’ বলে সম্বোধন করার প্রচলন ছিল। এ প্রেক্ষাপটে উল্লেখ্য যে, ইরানিরা ভারতবর্ষে আসার পর ‘সাহিব’ শব্দটির প্রচলন ঘটে। পরে তা অপভ্রংশ হয়ে সাহেব এ রূপ নেয়। অবশ্য ‘সাহেব’ শব্দটি আরবি ‘সাহাবী’ শব্দ থেকে এসেছে; যার অর্থ হলো সঙ্গী, সাথী, সহচর কিংবা বন্ধু। আর তাই তখন পদবির সাথে সাহেব যোগ করে ডাকা হতো। এক্ষেত্রে উদহারণ হিসেবে খান সাহেব, সচিব সাহেব, শেখ, সাহেব ইত্যাদি। আর এটি মুসলমানদের ক্ষেত্রে অধিক প্রযোজ্য ছিল। এদিকে ব্রিটিশ ও শ্বেতাঙ্গ ইউরোপীয় নারীদের ‘মেমসাহেব’ বলে সম্বোধন করা হতো। তাছাড়া মুসলিম বাঙালি বিবাহিত নারীদের ‘বেগম সাহেব’ বলা হতো। আর অফিস আদালতে হেড ক্লার্ককে বড় বাবু বলে ডাকা হতো, যা এখনো অনেক স্থানে পরিলক্ষিত হয়ে থাকে।

সত্যি কথা বলতে কি, বাংলাদেশে স্যার বা ম্যাডাম সম্বোধন সংক্রান্ত কোনো সরকারি আইন বা কোন নীতিমালা নেই। এটি মূলত একটি প্রথাগত রীতি বা সামাজিক কালচার; যা শিক্ষা, প্রশাসন এবং করপোরেট সমাজে রিলে রেসের মতো চলে এসেছে। এ ব্যাপারে উল্লেখ্য যে, সাতচল্লিশে ব্রিটিশ থেকে স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এই সংস্কৃতি বহাল থাকে। আর স্বাধীনতার পরেও শিক্ষা ও প্রশাসনে স্যার ও ম্যাডাম সম্বোধন অপরিবর্তিত থেকে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে কিছুটা সংযোজনের মাধ্যমে নিম্ন আদালতের বিচারক মন্ডলীকে উদ্দেশ্য করে আইনজীবী বা বিচারপ্রার্থীরা ‘স্যার’ বা ‘ইওর অনার’ বলে থাকেন এবং উচ্চ আদালতের বিচারকমন্ডলীকে ‘মাই লর্ড’, ‘মি লর্ড’ বলে সম্বোধন করা হয়। অথচ বাংলাদেশের আইনজীবীদের পেশাগত শৃঙ্খলা ও আচরণ নিয়ন্ত্রণকারী আইনের কোথাও এমন কোনো বিধান নেই। এদিকে ১৯৯০ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশের তৎকালীন সংস্থাপন মন্ত্রণালয় থেকে কর্মকর্তাদের স্যার/ম্যাডাম নামে সম্বোধনের রীতি বাতিল করে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এ প্রজ্ঞাপনে সরকারি অফিস বা প্রতিষ্ঠানে সম্বোধনের জন্য ‘স্যার’-এর পরিবর্তে ‘জনাব’ এবং ‘সরকারি অফিসার বা কর্মকর্তাদের নামে প্রেরিত পত্রাদির শুরুতে পুরুষের ক্ষেত্রে ‘মহোদয়’ ও মহিলাদের ক্ষেত্রে ‘মহোদয়া’ লেখার সুপারিশ করা হয়। এতদ্ব্যতীত ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি বা তার পরবর্তী হালনাগাদ সংস্করণে শিক্ষকের প্রতি সম্মান বজায় রাখা নিয়ে এতদসংক্রান্ত কিছু উল্লেখ থাকলেও স্যার বা ম্যাডাম ডাকার এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই।

প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, অর্ন্তরবর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১০/০৭/২০২৫ইং তারিখে উপদেষ্টা পরিষদের ৩৩তম বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য সিনিয়র নারী কর্মকর্তাদের স্যার বলার নিয়ম বাতিল করা হয়। এদিকে আশ্চর্যর বিষয় হলো যে, আমি যখন নব্বইয়ের দশকে ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করি। তখন কোথায় কেউ স্যার বা ম্যাডাম বলে সম্বোধন করেছেন, এমন কথা শুনিনি বা দেখিনি। আসলে স্যার বা ম্যাডাম সম্বোধনের পেছনে আইনগত কোন বাধ্যবাধকতা নেই। অথচ এটি ঔপনিবেশিক আমলে চাপিয়ে দেয়া রীতিনীতি বৈ কিছু নয়। অবশ্য এটি অফিস আদালতে সামাজিক কালচার হিসেবে আমাদের রক্তের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গিয়েছে যে, যতই আইন-কানুন করা হোক না কেন, তা সহজে মুছে যাবে না।

লেখক : গবেষক, অথর্নীতিবিদ এবং লেখক হিসেবে মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সম্মাননা ও পদকপ্রাপ্ত।


banner close