বৃহস্পতিবার, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

অর্থ পাচার বন্ধ হলেই রিজার্ভের ধস থামবে

প্রতীকী ছবি
আপডেটেড
৭ ডিসেম্বর, ২০২২ ০৯:০২
এম এ খালেক
প্রকাশিত
এম এ খালেক

গত ৩০ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ৭ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার বিক্রি করেছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের গ্রস পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অবশ্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত মানা হলে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভের পরিমাণ হচ্ছে ২৫ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ মোট ৬০০ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি বিক্রি করেছে। এ নিয়ে ১৫ মাসে মোট ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিক্রি করা হয়েছে রিজার্ভ থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ অর্থ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রি করে মূলত স্থানীয় মুদ্রা টাকার অবমূল্যায়ন ঠেকানোর জন্য।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের হিসাবায়ন করে দুইভাবে। এর মধ্যে একটি গ্রস হিসাব এবং অন্যটি নিট হিসাব। রিজার্ভের পরিসংখ্যান প্রকাশকালে এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড গঠনের জন্য ব্যবহৃত ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারসহ লংটার্ম ফান্ড, গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড এবং শ্রীলঙ্কাকে ঋণ হিসাবে দেয়া ২০ কোটি মার্কিন ডলারও অন্তর্ভুক্ত করে দেখানো হয়। কিন্তু আইএমএফ এবং স্থানীয় অধিকাংশ অর্থনীতিবিদের মতে, যে রিজার্ভ অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকের মালিকানায় থাকলেও হাতে বা নিয়ন্ত্রণে নেই তাকে মোট রিজার্ভে অন্তর্ভুক্ত করে দেখানোর কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। রিজার্ভ সেটাই, যা তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহারযোগ্য এবং চাওয়া মাত্রই বের করে দেয়া যায়।

মার্কিন ডলারের সংকটের কারণে গত ১৫ মাস ধরে রিজার্ভের পরিমাণ ক্রমাগত কমছে। ২০২১ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করে গিয়েছিল। সেই অবস্থা থেকে রিজার্ভ ক্রমাগত হ্রাস পেতে পেতে এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে নেমে এসেছে। বর্তমানে প্রতি মাসে গড়ে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার করে রিজার্ভ কমছে। ২০১২-২০১৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ১৫ দশমিক ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে তা ৩৩ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়। ২০২০-২০২১ অর্থবছরে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৪৬ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২১-২০২২ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২১ সালের আগস্ট মাসে রিজার্ভের পরিমাণ ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করে যায়। এটিই ছিল বাংলাদেশের এ যাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ রিজার্ভ। অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রদর্শিত এই রিজার্ভ থেকে ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োজিত রয়েছে তা বাদ দিলে নিট রিজার্ভের পরিমাণ পাওয়া যাবে।

অর্থনীতিবিদগণ মনে করছেন, পণ্য রপ্তানিকালে আন্ডার ইনভয়েসিং এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের উপার্জিত অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে দেশে আসার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি আমদানি পণ্যের ক্ষেত্রে ওভার ইনভয়েসিং করার কারণে রিজার্ভ দ্রুত কমে যাচ্ছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রা বাজারে টাকার অবমূল্যায়ন ঠেকানোর জন্য মাঝে মাঝেই রিজার্ভ থেকে বাজারে মার্কিন ডলার ছাড়ছে। এতে সার্বিকভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সূত্র মতে, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু পণ্যের আমদানি ব্যয় নিরীক্ষা করে তারা দেখেছে, এসব পণ্যের আমদানি ব্যয় প্রকৃত মূল্যের চেয়ে ২০ শতাংশ থেকে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। আমাদের দেশের একটি সাধারণ প্রবণতা হচ্ছে, কোনো রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হলে এবং জাতীয় নির্বাচনের আগের বছর দেশ থেকে অর্থ পাচার বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে মুদ্রা পাচার অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অনেকেই মনে করছেন। আগামী জাতীয় নির্বাচন হবে এ যাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন এবং জটিল নির্বাচন। তাই যারা রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে যা উপার্জন করেছেন তারা এখন তা পাচারে ব্যস্ত রয়েছেন।

অর্থ পাচারকারীদের অপতৎপরতা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে যত ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হোক রিজার্ভের স্ফীতি ধরে রাখা সম্ভব হবে না। দেশ থেকে যে ব্যাপক আকারে অর্থ পাচার হচ্ছে তার কিছু লক্ষণ বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল দায়িত্ব গ্রহণের কিছুদিন পর প্রসঙ্গক্রমে বলেছিলেন, আজ থেকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক টাকাও বাড়বে না। কিন্তু অর্থমন্ত্রী তার অঙ্গীকার রক্ষা করতে পারেননি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের যে পরিমাণ প্রকাশ করে থাকে, প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ তার চেয়ে অনেক বেশি। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের হিসাবের মধ্যে মামলাধীন প্রকল্পের নিকট পাওনা ঋণ, অবলোপনকৃত প্রকল্পের বিপরীতে পাওনা ঋণ এবং পুনঃতফসিলীকৃত প্রকল্পের নিকট পাওনা ঋণাঙ্ক অন্তর্ভুক্ত করে না। আইএমএফের সুপারিশ মোতাবেক যদি খেলাপি ঋণের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরা হয়, তাহলে ব্যাংকিং সেক্টরের খেলাপি ঋণের পরিমাণ অন্তত আড়াই থেকে তিন গুণ বৃদ্ধি পাবে। এই বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশই নানাভাবে বিদেশে পাচার হয়ে গেছে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, খেলাপি ঋণের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের সম্পর্ক কী? খেলাপি ঋণের যে অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে, তা নিশ্চয়ই স্থানীয় মুদ্রায় পাচার হয়নি। এই অর্থ বৈদেশিক মুদ্রায় কনভার্ট করেই তা পাচার করা হয়েছে। এতে রিজার্ভের ওপর টান পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সূত্র মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণের কারণে আমদানি বাবদ খোলা এলসির হার কমেছে ৩৫ শতাংশ। একই সময়ে শিল্পে ব্যবহার্য ক্যাপিটাল মেশিনারিজ, কাঁচামাল এবং মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি ব্যাপকভাবে কমেছে। এর মধ্যে কোনো কোনোটির আমদানি ৭৬ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। শিল্পে ব্যবহার্য এসব উপকরণের আমদানি হ্রাস পেলে ব্যাংক ঋণও আনুপাতিকভাবে হ্রাস পাওয়ার কথা। কিন্তু সেখানে ঘটছে সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা। চলতি মুদ্রানীতিতে ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণ প্রবৃদ্ধির হার প্রাক্কলন করা হয়েছে ১৪ দশমিক ১ শতাংশ। অথচ বাস্তবে ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি এক পর্যায়ে ১৪ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত হয়। ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণ বৃদ্ধির বিপরীতে শিল্পে ব্যবহার্য উপকরণ আমদানি কমে যাওয়ার অর্থই হচ্ছে ব্যাংক ঋণের অর্থ অন্য কোনো খাতে প্রবাহিত হয়েছে।

একটি ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংক থেকে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী ৩০ হাজার কোটি টাকা ঋণের নামে সরিয়ে নিয়েছে। এই অর্থ নিশ্চয়ই ওই শিল্পগোষ্ঠী তাদের সিন্দুকে ভরে রাখেনি। এর একটি বড় অংশই পাচার করা হয়েছে। এই পাচার কার্য বৈদেশিক মুদ্রাতেই সম্পন্ন হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রতিটি খাত সংকুচিত হয়ে পড়েছে। কিন্তু ব্যয়ের খাত ক্রমশ সম্প্রসারিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রা বাজারকে কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে মাঝে মাঝেই বাজারে মার্কিন ডলার ছেড়ে দেয়। এটি মোটেও কাম্য নয়। বরং মুদ্রার বিনিময় হারকে বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়াটাই হবে মঙ্গলজনক। ব্যাংকিং চ্যানেল এবং কার্ব মার্কেটে মুদ্রার বিনিময় হারের পার্থক্য যদি কমে না আসে, তাহলে হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স আসা কোনোভাবেই বন্ধ করা যাবে না। গত এক বছরে ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমতুল্য রেমিট্যান্স দেশে আসেনি, বিদেশেই থেকে গেছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্থানীয় বেনিফিশিয়ারিদের লোকাল কারেন্সিতে এই অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। বাংলাদেশে যেসব বিদেশি নাগরিক অবৈধভাবে কাজ করছেন, তারা প্রতিবছর অন্তত ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশে প্রেরণ করেন। এই অর্থ বৈধ চ্যানেলে পাঠানো হয় না।

বিশ্বব্যাপী উচ্চ মূল্যস্ফীতিজনিত কারণে প্রতিটি দেশেরই আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। আমাদের মতো দেশ উচ্চ মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি অর্থ পাচারের সমস্যা মোকাবিলা করছে। পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণ করে থাকে চীন। সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, চীনের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ হচ্ছে ৩ দশমিক ২৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। জাপানের রিজার্ভ ১ দশমিক ৩১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। ভারতের রিজার্ভের পরিমাণ ৬৩৪ দশমিক ২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রিজার্ভের পরিমাণ হচ্ছে ৩ হাজার ৩৮২ কোটি মার্কিন ডলার। বাংলাদেশ অনেক বছর ধরেই সার্ক দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ধারণ করে চলেছে। সার্ক দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র ভারতই রিজার্ভ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ওপরে অবস্থান করছে। বিভিন্ন দেশের মুদ্রায় রিজার্ভ সংরক্ষণ করা হয়। তবে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি রিজার্ভ সংরক্ষিত হয় মার্কিন ডলারে, যার পরিমাণ ৬ দশমিক ৭৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। এটি বিশ্বের মোট রিজার্ভের ৬১ দশমিক ৮২ শতাংশ। ইউরোপিয়ান একক মুদ্রা ইউরোতে রিজার্ভ সংরক্ষণ করা হয় ২ দশমিক ২১ ট্রিলিয়ন বা মোট বিশ্ব রিজার্ভের ২০ দশমিক ২৪ শতাংশ। জাপানি ইয়েনে রিজার্ভ সংরক্ষণ করা হয় ৫৭২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা মোট বিশ্ব রিজার্ভের ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ। চীনা ইউয়ানে রিজার্ভ সংরক্ষণ করা হয় ২১৩ বিলিয়ন বা ১ দশমিক ৯৫ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংক যদি বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের স্ফীতি অব্যাহত রাখতে চায়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অতিমূল্যায়ন এবং অবমূল্যায়ন (ওভার ইনভয়েসিং এবং আন্ডার ইনভয়েসিং) কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একই সঙ্গে মুদ্রার বিনিময় হারকে বাজারের ওপর ছেড়ে দিতে হবে। অপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। ব্যাংক ঋণের আপার ক্যাপ তুলে দিয়ে বাজারভিত্তিক করতে হবে। এসব কার্যক্রম গ্রহণ করা হলে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের স্ফীতি হ্রাসের যে প্রবণতা প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে তা অনেকটাই রোধ করা সম্ভব হবে।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার, বিডিবিএল ও অর্থনীতিবিষয়ক লেখক।


আস্থাহীনতার বিমা খাত, উত্তরণের উপায়

আপডেটেড ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ ০৮:৫১
রকিবুল হুদা মজুমদার

দেশের আর্থিক খাত বলতে আমাদের মাথায় প্রথম যে বিষয়টি আসে তা হলো ব্যাংক ও বিমা। দুটি নামই পাশাপাশি চলে। এর অন্যতম কারণ ব্যাংকের মতো বিমাও দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সেবামূলক আর্থিক খাত।

বিমা হলো নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে জীবন, সম্পদ বা মালামালের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে স্থানান্তর করা। আবার, বিমা হলো দুটি পক্ষের মধ্যে একটি আইনি চুক্তি, যেখানে একটি পক্ষ বিমাকারী বা বিমা কোম্পানি। অন্য পক্ষটি হলো বিমাকৃত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান। এ ক্ষেত্রে বিমাকারী ঝুঁকি গ্রহণ করে এবং বিমাকৃত ব্যক্তি সেই ঝুঁকির বিনিময়ে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ প্রিমিয়াম দিয়ে থাকে।

বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মতো ভারতবর্ষেও বিমা একটি প্রাচীন এবং সম্মানিত পেশা। বাংলাদেশেও স্বাধীনতার পরপর ১৯৭২ সালের ৮ আগস্ট রাষ্ট্রপতির এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিমাকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেয়া হয়। এই সুপ্রাচীন শিল্পটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশা হলেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এর ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন সন্তোষজনক হয়নি। দেশের জাতীয় আয়ের শূন্য দশমিক ৫৬ শতাংশ বিমার অবদান। অন্যদিকে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১২ শতাংশ জনগণ বিমার আওতায় এসেছে, যেখানে প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার ৪৮ শতাংশ এখন ব্যাংকিং ছাতার নিচে। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে আর্থিক খাতের অন্য অংশের চেয়ে বিমা খাত পিছিয়ে আছে। বাংলাদেশের বিমা খাত বৈশ্বিক বা অপরাপর তুলনীয় দেশের তুলনায় অনেক ছোট। তবে বিমা খাতের সার্বিক সুশাসন এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা এই খাতকে ব্যাপক সম্ভাবনাময় করে তুলতে পারে।

স্বাধীনতার পর থেকে বিমা খাতকে নিয়ে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, বিগত কয়েক বছরে এই খাতের অর্জন ঊর্ধ্বমুখী। কারণ এই খাতসংশ্লিষ্ট অর্জনগুলো প্রায় সবই পর পর এসেছে। বাংলাদেশ বিমা আইন হয় ২০১০ সালে এবং একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয় বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। আর তারপরই প্রণীত হয় ‘জাতীয় বিমা নীতি ২০১৪’। জাতীয় বিমা নীতি এই খাতের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সাধনের মূল পাথেয়। বাংলাদেশ সরকার ১ মার্চকে ‘জাতীয় বিমা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে এই পেশাকে সম্মানিত করেছে।

এসব অর্জনের মধ্যেও বিমা খাতের সংকট এখনো কাটেনি। বিমা শিল্পকে দেশের লাভজনক ও জনবান্ধন শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে হলে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। সঠিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন বিমা খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রকে কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করা যেতে পারে। যেমন- প্রকল্পভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা, স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ইত্যাদি।

প্রকল্পভিত্তিক কর্মপরিকল্পনার মধ্যে বিমা খাতসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিভাগকেন্দ্রিক মান উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নেয়া যেতে পারে। যেমন- উন্নয়ন কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতা উন্নয়নভিত্তিক প্রকল্প কিংবা বিমা গাণনিক একচুয়ারি বিভাগের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে এই বিভাগের মান উন্নয়নে পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনাতে বিমা খাতের চলমান সংকট নির্ধারণ এবং তা একটি নির্দিষ্ট মেয়াদে (২/৩ বছর মেয়াদি) বাস্তবায়নের পরিকল্পনা হাতে নেয়া যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার ন্যায় একটি কর্মপরিকল্পনা হাতে নেয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে গুরুত্ব পাবে আগামী ১০ বছর বা ২০ বছর পর বিমা খাত থেকে সরকারের প্রত্যাশা এবং এই খাতের সমৃদ্ধি।

এই খাতের যেকোনো লক্ষ্য অর্জনের জন্য দরকার দক্ষ জনশক্তি। তাই এই দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং তাদের এই শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করানো একটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ। এটি বাস্তবায়ন করতে হলে তরুণ উচ্চশিক্ষিত মেধাবীদের এই পেশায় অংশগ্রহণ করাতে হবে। অন্যদিকে এই পেশার প্রতি দেশের তরুণদের একাংশের মধ্যে অনীহা লক্ষণীয়। তাই তরুণদের এই পেশায় অংশগ্রহণ করাতে হলে তাদের আকর্ষণীয় বেতন-ভাতা নিশ্চিত করতে হবে। মেধাবী তরুণরা যত বেশি এই পেশায় অংশগ্রহণ করবে শিল্প হিসেবে বিমা তত বেশি সমৃদ্ধ হবে।

প্রযুক্তির সঙ্গে বিমাকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে হবে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। তাই এই পেশাকে আরও জনবান্ধব করতে হলে বা জনগণের দোরগোড়ায় এই সেবা নিয়ে যেতে হলে ডিজিটালাইজেশনের বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের ন্যায় ঘরে বসেই গ্রাহক যেন তার কাঙ্ক্ষিত পলিসি গ্রহণ করতে পারে এবং প্রিমিয়াম জমা দিতে পারে সেই সুবিধাকে গ্রাহকবান্ধব করে ই-বিমা নিশ্চিত করতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। বিমা যেহেতু মানুষের জীবনের এবং সম্পদের ঝুঁকি গ্রহণ করে সে ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক দুর্যোগকে মাথায় রেখে দুর্যোগপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেখানকার মানুষ এবং তাদের সম্পদের জন্য বিশেষ পলিসি গ্রহণ করতে হবে। তা ছাড়া দেশে বিমাসংক্রান্ত গবেষণা কম। এ-সংক্রান্ত গবেষণা বৃদ্ধি করতে হবে। গবেষণা বিমা শিল্পের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সমস্যা উঠিয়ে নিয়ে আসবে এবং করণীয় দিকগুলো নির্ধারণ করে দেবে। গবেষণা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন ফেলোশিপ বা বৃত্তির আয়োজন করা যেতে পারে। গবেষণার পাশাপাশি বিমা সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। এর জন্য বিভিন্ন সেমিনার, সিম্পোজিয়াম এবং বিজনেস সামিটের আয়োজন করা যেতে পারে।

পরিশেষে বলতে হয়, বর্তমান বাংলাদেশের বিমা খাত এখনো লক্ষণীয় ইমেজ সংকট বা আস্থাহীনতায় ভুগছে। এই আস্থা ফিরিয়ে আনাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তাই এই খাতসংশ্লিষ্ট সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সরকারকেও এই খাতের ইমেজকে আকর্ষণীয় এবং টেকসই করার জন্য উদ্যোগী হতে হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা: চাই আনন্দিত গৃহাঙ্গন ও শিক্ষাঙ্গন

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
সরকার আবদুল মান্নান

মানুষের মৃত্যু অবধারিত। যেকোনো বয়সেই মানুষ মারা যেতে পারে। অসুখ-বিসুখে ভুগে বা কোনো দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রতিনিয়তই মারা যাচ্ছে অসংখ্য শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী। এ ক্ষেত্রে মা-বাবা ও অন্যান্য আপনজনের কষ্ট পাওয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। কিন্তু যখন বিষয়টি হয় আত্মহত্যার এবং সন্তান-সন্ততিরা স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, তখন হিসাব একদম ভিন্ন। কারণ এই অপমৃত্যুর জন্য যতটা না দায়ী ওই শিক্ষার্থী, তার চেয়ে বেশি দায়ী মূলত অভিভাবক ও শিক্ষকরা।

গত বছর প্রতি মাসে গড়ে ৩৭ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। এরা স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। এদের মোট সংখ্যা ৪৪৬। এই তথ্য জানিয়েছে বেসরকারি সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশন। তারা জানিয়েছে, এদের মধ্যে ২৭.৩৬ ভাগ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে পরিবারের সঙ্গে মান-অভিমান করে, ২৩.৩২ ভাগ প্রণয়ঘটিত কারণে, আপত্তিকর ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়ার কারণে ৪ ভাগ, শিক্ষকদের দ্বারা অপমানিত হয়ে ৬ ভাগ, গেম খেলতে বাধা দেয়ার জন্য ৭ ভাগ, পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করতে না পেরে ২৭ ভাগ, মোবাইল ফোন না কিনে দেয়ার জন্য ১০ ভাগ এবং মোটরসাইকেল কিনে না দেয়ার জন্য ৬ ভাগ শিক্ষার্থী আত্মহননের পথ বেছে নেয়। একটু খেয়াল করলেই বোঝা যাবে, প্রায় ৬০ ভাগ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার সঙ্গে অভিভাবকদের আবেগ ও অজ্ঞতা কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে আছে। শিক্ষকদের ভূমিকাও কম নয় এবং পরিবেশ-পরিস্থিতও শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে ভূমিকা রাখছে।

একটু পেছন ফিরে তাকালে দেখব, ২০১৬ সালের ১ মার্চ সুদীপ্ত দত্ত অর্জুন মারা যায়। তার মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না, আবার কেউ তাকে মেরেও ফেলেনি। তাহলে কী ঘটেছিল সুদীপ্তর জীবনে? ২ মার্চ দৈনিক পত্রিকায় সুদীপ্তকে নিয়ে একটি সংবাদ বেরোয়, যার মর্মকথা হলো- পিলখানার বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়ত সুদীপ্ত। সামনেই ছিল তার এইচএসসি পরীক্ষা। কিন্তু পরিবার-পরিজন ও সহপাঠীদের সঙ্গে অভিমান করে সে ধানমন্ডি লেকের জলে ডুবে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। সংবাদে খুব তাৎপর্যপূর্ণ তিনটি বিষয়ে ইঙ্গিত প্রদান করা হয়েছিল। প্রথমত, তার শারীরিক গড়নে সমস্যা ছিল। তাই সহপাঠীরা তাকে খোঁটা দিত। নিশ্চয়ই কোনো কোনো সহপাঠী তাকে নিয়ে ক্লাসে হাসাহাসিও করত। দ্বিতীয়ত, মা পড়াশোনার জন্য তাকে চাপ প্রয়োগ করতেন এবং তৃতীয়ত, কিশোরটি ছিল অন্তর্মুখী স্বভাবের। এসব বিরূপ পরিস্থিতির শিকার সুদীপ্ত দত্ত অর্জুন। আত্মহননের মাধ্যমে সে মুক্তির পথ খুঁজে নিয়েছিল। আর ২০১৮ সালে ভিকারুননিসা নূন স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রি অধিকারী দু-একজন শিক্ষকের অদূরদর্শিতা ও অশিক্ষকসুলভ আচরণের এবং মা-বাবার উচ্চাকাঙ্ক্ষার বলি হয়।

একজন সুদীপ্ত বা অরিত্রি আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিল। কিন্তু আরও অনেক সুদীপ্ত-অরিত্রি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে আমাদের প্রতিটি পরিবারে, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে। এবং এই ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে এসে জানা গেল, ২০২২ সালে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে ৪৪৬ জন শিক্ষার্থী। কেন আমাদের এসব শিশু, কিশোর-কিশোরি আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে? এ ব্যাপারে অভিভাবকদের দায় কতটুকু এবং শিক্ষকদের ভূমিকাই বা কী?

তথ্য বলছে নানা রকম মানসিক চাপের মধ্যে এদের ওপর মূল চাপটি আসে পড়াশোনা নিয়ে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাসার ভেতরে পড়াশোনা নিয়ে মা-বাবা প্রচণ্ড চাপ দেন। এ ছাড়া ভালো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে না পাড়ার চাপ, মেডিকেল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনির্ভাসিটি এবং ভালো ইউনির্ভাসিটিতে ভর্তি হতে না পারা, প্রত্যাশিত বিষয়ে পড়তে সুযোগ না পাওয়া এবং কর্মসংস্থান না হওয়া বা বেকারত্বের যন্ত্রণাসহ নানা রকম চাপের মধ্যে থেকে কেউ কেউ এতটাই হতাশ হয়ে পড়ে যে, শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

বিবিসি থেকে নেয়া তথ্যের আলোকে বলি, ঢাকার একটি প্রখ্যাত স্কুলে পড়ে সাহানা ইসলামের মেয়ে। সাহানা জানিয়েছেন, তিনি না চাইলেও স্কুল আর সামাজিক চাপের কাছে অনেক সময়ই মাথা নত করতে হয় অভিভাবকদের। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে যে স্কুলে পড়ে, সেখানে প্রত্যেকটা স্টুডেন্টের নম্বর নিয়ে ভীষণ চাপ দেয়, সামান্য খারাপ করলেই বাবা-মাকে ডেকেও কথা শোনানো হয়। আর বাড়ি ফিরে আমরা বাবা-মায়েরা সেই চাপটাই আবার বাচ্চাদের ওপরে চাপিয়ে দিই - আরও পড়, আরও পড় বলতে থাকি।’

আরেকজন অভিভাবক বলেন, ‘এখন সমাজটাই এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে ভালো চাকরি, ভালো বেতন এগুলোই বাচ্চাদের বা তাদের বাবা মায়েদের লক্ষ্য হয়ে উঠছে। তাই ওই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য বাচ্চারা সবসময়ই একটা চাপের মধ্যে থাকে। আবার বাবা-মায়েরাও নিজেদের অসম্পূর্ণ স্বপ্নগুলো সন্তানদের মধ্য দিয়ে পূরণ করতে চায়। যেটা আমরা করতে পারিনি, সেটা যেন ওরা করে দেখায়। সব মিলিয়ে বাচ্চাগুলোর জন্যে একটা ভয়ংকর অবস্থা তৈরি করা হচ্ছে।’

ভালো রেজাল্টের সঙ্গে যেমন মা-বাবার মর্যদা জড়িত তেমনি স্কুলের মর্যাদা জড়িত। তাই তথাকথিত ভালো স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ বেশি থাকে। শিক্ষকদেরও অভিযোগ আছে। একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষিকা তার দীর্ঘদিনের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেছেন যে, বাচ্চাদের পড়াশোনা অথবা বড় হয়ে ওঠার প্রতি বাবা-মায়েদের নজরদারির অভাব এবং কোনো ক্ষেত্রে স্পষ্ট অবহেলাও থাকে। তিনি বলেছেন, ‘অভিভাবকদের সঙ্গে আমাদের বৈঠকগুলোতে দেখি, অনেক সময় বাবারা প্রায় আসেনই না। অনেক বাবা-মা তো আবার এটাও খেয়াল রাখেন না যে মেয়ের পরীক্ষা চলছে বা রেজাল্ট হয়েছে। কিন্তু পরীক্ষায় খারাপ করলে যখন আমরা বাবা-মাকে ডেকে কথাগুলো বলি, তখন তারা বাড়ি ফিরে বাচ্চাদের বকাবকি করেন। একটা কথা অনেক বাবা-মাকেই বলতে শুনি যে, এত খরচ করার পরও কেন এ রকম খারাপ ফল হলো! এই কথাটা একটু বড় বাচ্চারা একদম নিতে পারে না।’ তিনি আরও বলছিলেন, ‘ওদের মনে তখন একটা জিনিস কাজ করে, যখন আমার প্রয়োজন ছিল বাবা-মায়ের সাহায্যের, তখন তারা কিছু বলেননি, কিন্তু ফল খারাপ হতেই খরচের প্রসঙ্গ তোলা হচ্ছে। স্কুলের যেমন দায়িত্ব আছে, তেমনই বাবা-মায়েদেরও নজর রাখা উচিত বাচ্চাদের বড় হয়ে ওঠার ওপরে।’

কলকাতার একজন শিশুমন বিশেষজ্ঞ সময়িতা ব্যানার্জি। তিনি গ্রাফোলজি, মানে হাতের লেখার সাহায্যে শিশুমনের চিকিৎসা করেন। বিবিসির অমিতাভ ভট্টশালী (২১ মার্চ, ২০১৮) তার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, ‘পড়াশোনার চাপ সহ্য করতে না পেরে আত্মহননের পথ কেন বেছে নিচ্ছে ভারতের হাজার হাজার শিশু’? সময়িতা ব্যানার্জি বলেছেন, “যে শিশু তার বাড়ির পরিবেশ নিয়ে খুশি, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটায় আনন্দে, মোটের ওপরে যার একটা ‘সুইট হোম’ আছে, তার যদি কখনো পরীক্ষায় খারাপ ফল হয়, সেটা সে সহ্য করে নিতে পারে। কিন্তু যেসব বাড়ির বা স্কুলের পরিবেশটাতেই গণ্ডগোল, বা যারা ইলেকট্রনিক মিডিয়াÑটিভি ইত্যাদি বেশি দেখে, এ রকম বাচ্চাদের স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশে কিছুটা সমস্যা তৈরি হয়। এদের যখন ছোটখাটো ব্যর্থতা মোকাবিলা করতে হয়, তখন তাদের কাছে সেটা খুব কঠিন হয়ে যায়। আর সমস্যাটা যদি বড়সড় কিছু হয়, তাহলে সে আর মোকাবিলাই করতে পারে না। তখন চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে।”

শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, অনেক শিক্ষক শিক্ষার্থীদের আবেগের জগৎকে মোটেই গুরুত্ব দেন না। অনেক সময় তারা অবিবেচকের মতো আচরণ করেন। তারা বুঝতেই চান না যে, আজকের অতি সংবেদনশীল শিক্ষার্থীর মনে তার উন্যাসিক আচরণ কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। একজন মোটা দেহের শিক্ষার্থীকে যখন স্কুল-কলেজের বিভিন্ন কর্নার থেকে ‘হাতি’ বলে অপদস্ত করা হয়, তখন শিক্ষকদের কষ্ট পেতে দেখিনি। এই উৎপীড়কদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাও তারা গ্রহণ করেননি। অধিকন্তু কেউ কেউ খুব মজা পেয়েছেন এবং স্টাফ রুমে এসে অন্য সহকর্মীদের সঙ্গে হেসে কুটি কুটি হয়ে বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেছেন। আর সেই বিবরণের মধ্যে সব অপরাধ ওই শিক্ষার্থীর। আর ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী নিত্যদিনের এই যন্ত্রণা নিয়ে কী পড়ালেখা করবে, কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, কার কাছে আশ্রয় নেবে, কার কাছে বিচার চাইবে? এসব কিছুর দিকদিশা না করতে পেরে একসময় সে পড়ালেখা ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

এসব ক্ষেত্রে শিক্ষকদের কাছ থেকে যে মমত্ববোধ ও সহযোগিতা পাওয়ার কথা, অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা তা পায় না। ফলে তাদের পড়ালেখা বিঘ্নিত হয়, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় দিনাতিপাত করে এবং এমনকি কেউ কেউ আত্মহননের পথও বেছে নেয়। শিক্ষাঙ্গনের এই অপমানজনক পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কী পরিমাণ শিক্ষার্থী প্রতি বছর স্কুল-কলেজ ছেড়ে চলে যায়, তার কোনো হিসাব আমাদের কাছে নেই। অথচ শিক্ষকগণ যদি সামান্য সচেতন হন তাহলেই রক্ষা পেতে পারে বিপুল শিক্ষার্থী।

আমাদের এই সব দুর্ভাগা শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে একমাত্র শিক্ষকরা। এসব নিরাশ্রয়ী শিক্ষার্থীর খুব নির্ভরযোগ্য আশ্রয় হয়ে উঠতে পারেন শিক্ষকরা। আর এর অনিবার্য অস্ত্র হলো স্নেহ, ভালোবাসা ও মমত্ববোধ। শিক্ষকদের স্নেহের হাত যদি আমাদের প্রতিটি শিক্ষার্থীর মাথা স্পর্শ করে তাহলে তাদের বিপথগামী হওয়ার আর কোনো পথ থাকবে না। অধিকন্তু তারা সব প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করার শক্তি অর্জন করবে এবং সুন্দরভাবে বিকশিত হওয়ার পথ খুঁজে পাবে।

অনেক শিক্ষার্থীর জন্য আবার নিজের পরিবারই একটি ভয়ংকর স্থান হয়ে ওঠে। পরীক্ষায় খুব ভালো ফলাফল করার জন্য তারা ছেলে-মেয়েদের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেন। দিনের অধিকাংশ সময় তারা পোষ্যদের যন্ত্রণার মধ্যে রাখেন। ফলাফলভিত্তিক শিক্ষার এই কুফল সর্বদাই বর্তায় শিক্ষার্থীদের ওপর। অভিভাবকগণ অনেক সময় ভুলেই যান যে, তার পোষ্যটির জন্য বিশ্রামের প্রয়োজন আছে, বিনোদনের প্রয়োজন আছে, আছে তাদের সান্নিধ্য ও স্নেহের। স্নেহ ও ভালোবাসা বিবর্জিত পরিবেশে একজন শিক্ষার্থীর কী পরিণতি হতে পারে, তার পরিচয় আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ছুটি’ গল্পের ফটিক চরিত্রে। আপনজনদের কী বিস্ময়কর অনাদর, অবহেলা আর শিক্ষক ও সহপাঠীদের নিষ্ঠুর আচরণে তাকে পাড়ি জমাতে হয়েছে পরপারে। প্রায় শতাধিক বছর পরে আজও আমাদের পরিবারে এবং শিক্ষাঙ্গনে সেই অনুদার পরিবেশের তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।

কিন্তু এখন সময় এসেছে বিষয়গুলো ভেবে দেখার। আর কোনো শিক্ষার্থীকে, সন্তানকে হারিয়ে ফেলার পূর্বেই আমাদের পারিবারিক অঙ্গন ও শিক্ষাঙ্গনকে শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষার্থীরা যেন সর্বত্রই একটি আনন্দমুখর পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ঘরে শিশু-কিশোরদের উপযোগী প্রচুর বই ও পত্রপত্রিকা থাকা দরকার আর দরকার সন্তানদের প্রতি সহানুভূতি প্রসংশিত পরিবেশ। সন্তানদের প্রতিষ্ঠা নিয়ে ভাববার দরকার আছে। কিন্তু তা যেন দুর্ভাবনা না হয়, সন্তানদের জন্য পীড়াদায়ক না হয়।

আমরা আমাদের সন্তানদের ওপর বিশ্বাস রাখতে পারি। নিশ্চয়ই তারা ভালো মানুষ হবে এবং ভালো কিছু করবে। সুদীপ্তদের আমরা আর ফিরে পাব না। কিন্তু আমরা যেন তার বিদেহী আত্মাকে এইটুকু বলতে পারি, “সুদীপ্ত, সোনা আমাদের। তোমাকে আমরা রক্ষা করতে পারিনি। ক্ষমা করো আমাদের। তোমার মতো নিরানন্দ আর স্নেহবির্বজিত অবস্থায় আর যেন কেউ চলে যেতে না পারে তার জন্য আমরা একটি আনন্দিত গৃহাঙ্গন আর একটি আনন্দিত শিক্ষাঙ্গন তৈরি করব।”

লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক


তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন অপরিহার্য

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
আসিফ মুজতবা মাহমুদ

তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার মানবদেহের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে যক্ষ্মাসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়। যারা ধূমপান করেন তাদের যক্ষ্মায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বেশি। একই সঙ্গে এ রোগে ধূমপানকারীদের মৃত্যুহারও অন্যদের তুলনায় অত্যধিক বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। এর পরও তামাক কোম্পানিগুলো ভিন্ন ভিন্ন পন্থায় দেশের তরুণ সমাজসহ নানা বয়সী মানুষের মাঝে তামাকপণ্য ছড়িয়ে দিয়ে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত। ফলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গঠনের কাজ এগিয়ে নিতে পদে পদে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

সম্প্রতি জনস্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণা সংস্থা আর্ক ফাউন্ডেশনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রতিবছর সাড়ে তিন লাখেরও বেশি মানুষ যক্ষ্মায় আক্রান্ত হন এবং মারা যান কমপক্ষে ৭০ হাজার। এর মধ্যে ২০ শতাংশ মানুষের মৃত্যুর কারণ তামাক। বিশ্বে প্রতিদিন যক্ষ্মায় মারা যান ৪ হাজার ১০০ জনের বেশি মানুষ। বিশ্বে যক্ষ্মায় আক্রান্ত মোট রোগীর দুই-তৃতীয়াংশ যে আটটি দেশে আছে, তারই একটি বাংলাদেশ। এ ছাড়া দেশে প্রতিবছর তামাকজনিত বিভিন্ন রোগে ১ লাখ ৬১ হাজার মানুষ মারা যান (Tobacco Atlas 2020)। আর বিশ্বে এই মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিবছরে প্রায় ৪০ লাখ। আবার এর মধ্যে অন্তত ১২ লাখ শুধু ধূমপানকারীদের সংস্পর্শে এসে মারা যান।

দেশে যক্ষ্মায় আক্রান্ত রোগীদের ১৮ শতাংশই ধূমপায়ী। পুরুষ রোগীদের প্রতি তিনজনে একজন ধূমপান করেন। ধূমপানের কারণে যক্ষ্মা রোগীর মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায় দুই গুণ। এ ক্ষেত্রে যক্ষ্মা রোগীদের তামাক সেবনের অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসার জন্য স্বাস্থ্য সেবাদানকারীর সংক্ষিপ্ত কাউন্সেলিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তামাক বর্জনে এই ধরনের সহায়তা পেলে প্রতিবছর বাংলাদেশে ১৪ হাজার যক্ষ্মা রোগী তামাকের অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসতে পারে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

২০৩৫ সালের মধ্যে যক্ষ্মামুক্ত বাংলাদেশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার। এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসাব্যবস্থায় তামাক নিয়ন্ত্রণ ও তামাক ব্যবহারসংশ্লিষ্ট তথ্য সংযোজন এবং তামাক বর্জনে রোগীদের সহায়তা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর এ লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে সরকার। অন্যদিকে তামাক কোম্পানিগুলো প্রতিনিয়ত তাদের ব্যবসা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশে ধূমপায়ী বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করছে। সরকার এবং তামাক কোম্পানিগুলোর লক্ষ্য সম্পূর্ণ বিপরীত। সরকারের উদ্দেশ্য সংবিধানের দায়বদ্ধতা, জনস্বাস্থ্য রক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যয় কমানো। আর তামাক কোম্পানির লক্ষ্য অধিক মুনাফা।

এদিকে যক্ষ্মা রোগীদের মধ্যে যারা তামাক ব্যবহার করেন, তাদের চিকিৎসার সুবিধার্থে তামাক ব্যবহার ও তামাক বর্জনের তথ্য সংগ্রহ করে সবার বিজ্ঞানসম্মত কাউন্সেলিংয়ের আওতায় আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ব্যবস্থা শুধু যক্ষ্মা রোগীদের জন্য নয়, স্বাস্থ্যব্যবস্থার নানা ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ সম্ভব। এর ফলে যেমন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে রোগ নিয়ন্ত্রণ ও রোগীদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেয়া সহজতর হবে, তেমনি রোগীদের স্বাস্থ্য উন্নয়ন ও মৃত্যুহার কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। এ ছাড়া রোগীদের তামাক ব্যবহারসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ, প্রতিবেদন এবং কাউন্সেলিংয়ের উদ্যোগ নেয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বৈশ্বিক মানদণ্ডে সংক্রামক রোগগুলো ক্রমান্বয়ে নিয়ন্ত্রণে এলেও অসংক্রামক রোগের প্রকোপ বেড়েই চলেছে। তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার ক্রমবর্ধমান অসংক্রামক রোগগুলোর অন্যতম প্রধান কারণ। তাই জনগণের মাঝে তামাকের ক্ষতির বিষয়সমূহ তুলে ধরা এবং অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি নিরসনের লক্ষ্যে বাংলাদেশের অন্যতম কয়েকটি চিকিৎসকদের পেশাজীবী সংগঠন (ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটি, বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিন এবং অ্যাসোসিয়েশন অব ফিজিশিয়ানস অব বাংলাদেশ)-এর সমন্বয়ে ২০১০ সালে গঠন করা হয় ইউনাটেড ফোরাম অ্যাগেইনেস্ট। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় তামাক নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে এই ফোরাম নানাবিধ কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে এবং সরকারকে নিয়মিতভাবে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদানসহ প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ করে চলেছে।

অন্যদিকে বহুজাতিক সিগারেট কোম্পানিগুলো প্রতিনিয়ত আইন ভঙ্গ করে তামাক ব্যবহার বৃদ্ধি, কর ফাঁকিসহ নানা অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার বড় অংশ এখন তরুণ। তামাক কোম্পানিগুলো এসব তরুণের ধূমপানে আকৃষ্ট করতে নানা অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। একবার এ তরুণদের ধূমপানে আকৃষ্ট করতে পারলে তারা দীর্ঘস্থায়ী ভোক্তা পাবে। আর এ লক্ষ্যেই তামাক কোম্পানিগুলো সরকারের আইন সংশোধনের বিরোধিতা করছে। এমতাবস্থায় সরকারকে তামাক কোম্পানিগুলোর এই ধরনের কূটকৌশল সম্পর্কে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভের (গ্যাটস) ২০১৭ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি তামাক গ্রহণ করেন। তারা সিগারেটের জন্য মাসিক ১ হাজার ৭৭ টাকা এবং বিড়ির পেছনে ৩৪১ টাকা ব্যয় করেন। তামাক ব্যবহারের এই ব্যাপকতা জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। টোব্যাকো অ্যাটলাস অনুসারে, তামাকজনিত নানা রোগে বাংলাদেশে প্রতিবছর ১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি মানুষ মারা যান। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ এবং বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটির গবেষণায় দেখা গেছে, তামাকজনিত রোগের চিকিৎসা ও উৎপাদনশীলতার ক্ষতি হিসেবে প্রতিবছর ৩০ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি খরচ হয়। এসবের বাইরে তামাক চাষের ফলে জমির উর্বরতা নষ্ট হওয়া, তামাক প্রক্রিয়াজাত চুল্লির জ্বালানি হিসেবে বনভূমি নষ্ট হওয়াকে আমলে নিলে তামাকের ক্ষতি আরও বড় আকারে ধরা পড়বে।

তামাকজনিত নানা রোগে মৃত্যু এবং আর্থিক ক্ষতি প্রতিরোধ করা সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন কঠোরভাবে তামাক নিয়ন্ত্রণ। বিশ্বজুড়ে তামাক নিয়ন্ত্রণের বেশ কিছু পরীক্ষিত পদ্ধতি রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তামাকের দাম বাড়িয়ে সহজলভ্যতা কমানো, শক্তিশালী তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, তামাক ক্রয়-বিক্রয়ে বিধিনিষেধ আরোপ ইত্যাদি। তামাকের ব্যবহার কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে কর বৃদ্ধির মাধ্যমে তামাকপণ্যের মূল্য বাড়ানো। কার্যকরভাবে কর বাড়ালে তামাকপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায় এবং সহজলভ্যতা হ্রাস পায়। ফলে তরুণরা তামাক ব্যবহার শুরু করতে নিরুৎসাহিত হয়। পাশাপাশি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে যারা তামাক ব্যবহার করেন তারাও তামাক ছাড়তে উৎসাহিত হন।

তবে আমরা বেশ উৎকণ্ঠার সঙ্গে লক্ষ করছি, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের জন্য সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করার পর বেশ কয়েকটি বহুজাতিক সিগারেট কোম্পানি এই আইনের জোরালো বিরোধিতা করছে। এই আইনকে বাধাগ্রস্ত করতে নানা ধরনের অপপ্রচার, অপচেষ্টা এবং বিভ্রান্তকর তথ্য ছড়াচ্ছে। তারা অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান সম্পর্কে বিভ্রান্তকর তথ্য দিয়ে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে চাচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, বিভিন্ন ব্যক্তিপ্রতিষ্ঠানের স্বাক্ষর, নাম, পদবি, লেটারহেড ব্যবহার ও জালিয়াতি করে আইনের বিরোধিতা করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠিও পাঠিয়েছে।

যক্ষ্মায় আক্রান্তের সংখ্যা কমাতে হলে অবশ্যই আমাদের তামাকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কারণ যারা ধূমপান করেন তাদের যক্ষ্মায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। তাই তামাকপণ্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে যক্ষ্মায় আক্রান্তের হার কমাতে হবে। এ জন্য দরকার তামাক নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী আইন। বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে বেশ কিছু দুর্বলতা রয়েছে। তাই বিদ্যমান আইনের এসব দুর্বলতা নিরসনে দ্রুত আইন সংশোধন করা অপরিহার্য।

লেখক: চিকিৎসক ও মহাসচিব, বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশন


ঐতিহাসিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
আবুল কাসেম ফজলুল হক

ব্রিটিশ শাসিত ভারতে স্বাধীনতা আন্দোলন চলাকালে স্বাধীন জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের কিছু চিন্তা দেখা দিয়েছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্র গঠনের প্রয়োজনে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ সৃষ্টির চেষ্টা করা হয় এবং তা ব্যর্থ হয়। তখন পূর্ব পাকিস্তানে দেখা দেয় বাঙালি জাতীয়তাবাদ। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন (১৯৪৭-৭১), যুক্তফ্রন্টের একুশ দফা আন্দোলন (১৯৫৪-৫৮) এবং আওয়ামী লীগের ছয় দফা আন্দোলনের (১৯৬৬-৭১) মধ্য দিয়ে ক্রমে বিকশিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা। ছয় দফা আন্দোলনের ধারায় ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অগণিত নর-নারীর প্রাণের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ। তার পর ৫১ বছর পার হয়েছে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি রাষ্ট্র হয়ে উঠেছে? বাংলাদেশের জনগণ কি রাষ্ট্র গড়ে তোলার উপযোগী একটি জাতি রূপে চলছে?

বাংলাদেশের সংবিধানে জাতীয়তাবাদ (বাঙালি কিংবা বাংলাদেশি) আছে, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র আছে। আমার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী বাংলাদেশে রাজনীতিবিদদের এবং রাজনীতিতে তৎপর বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে জাতীয়তাবোধ, জাতীয়তাবাদ, জাতিরাষ্ট্র, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও আন্তর্জাতিকতাবাদ নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই। ভেবে দেখা দরকার, এই অনাগ্রহের ফল কী হচ্ছে? এর মধ্যে চিন্তা ও কর্মের একটি ধারাকে দেখা যায় ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে খুব সক্রিয় এবং অপর একটি ধারাকে দেখা যায় রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম নিয়ে খুব সক্রিয়। রাজনীতি ও সমাজ এই দুই ধারার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফল কী হচ্ছে?

১৯৮১ সাল থেকে প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে নিরঙ্কুশ সুবিধাবাদের। নৈতিক বিবেচনার প্রতি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের কোনো আগ্রহ দেখা যায় না। বাংলাদেশ হয়ে চলছে নিঃরাজনীতিকৃত। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো সুস্থ রাজনৈতিক চিন্তা নেই। নির্দলীয় রাজনীতি, অদলীয় রাজনীতি, নাগরিক কমিটি, নাগরিক আন্দোলন, সামাজিক আন্দোলন, রাজনীতিবর্জিত সুশাসনের তত্ত্ব ইত্যাদি দ্বারা নির্ধারিত হচ্ছে রাজনীতির গতি ও প্রকৃতি। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দেখা যাচ্ছে বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকারভিত্তিক নেতৃত্ব, পরিবারতন্ত্র। এই বাস্তবতায় উন্নতির পথে উত্তরণের জন্য দরকার উন্নত নতুন চিন্তা ও কাজ। প্রথমে ইতিহাসের দিক দিয়ে সমস্যার জটিলতাকে বোঝার চেষ্টা করা যাক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ১৯৪৮ সালে প্রকাশিত ‘দ্য হিস্ট্রি অব বেঙ্গল’ গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডের শেষ অধ্যায়ে যদুনাথ সরকার বাংলা-বিহার-উড়িষ্যায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠার সময়কার অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে যেসব কথা লিখেছেন, তার একটি অংশের বাংলা করলে এই দাঁড়ায়:

‘ক্লাইভ যখন নবাবের ওপর আঘাত হানে, তখন দেখা যায়, মোগল সভ্যতা তার সব শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। ভালো কিছু করার সামর্থ্য তখন তার আর নেই এবং তার অস্তিত্ব নিষ্প্রাণ। দেশের প্রশাসনব্যবস্থা তখন নৈরাশ্যজনকভাবে অসৎ ও অকর্মণ্য এবং দেশের জনগণ একটি সংকীর্ণচেতা, স্বার্থপর, উদ্ধত, অথর্ব শাসকশ্রেণি দ্বারা চরম দারিদ্র্য, অজ্ঞতা ও নৈতিক অধঃপতনে নিক্ষিপ্ত। ... সেনাবাহিনী বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতে হতে একেবারে অকেজো ও ঝাঁঝরা হয়ে পড়েছিল। রাজদরবার ও অভিজাত শ্রেণির বিপুল অনাচার ও লাম্পট্যের ফলে সাধারণ পারিবারিক জীবনের পবিত্রতা হয়েছিল বিপর্যস্ত এবং রাজদরবার ও অভিজাতদের পৃষ্ঠপোষকতায় রচিত ইন্দ্রিয়-উদ্দীপক সাহিত্য তাতে জুগিয়েছিল ইন্ধন। ধর্ম তখন পরিণত হয়েছিল সর্বপ্রকার পাপ ও অনাচারের রক্ষাকবচে।’

ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে যদুনাথ সরকারের এই উক্তির যথার্থ বিচার করতে গেলে স্বীকার করতে হয়, ‘সাম্রাজ্য লোলুপ ব্রিটিশ বেনিয়ারা ভারতবর্ষ দখল করে নিয়েছিল- এ কথা বলে, ভারতবর্ষের পরাধীনতার কারণ কেবল ব্রিটিশ বেনিয়াদের ক্ষমতালিপ্সা ও অর্থলিপ্সার ওপর চাপিয়ে যে ইতিহাস রচনা করা হয়, তাতে সত্যের অপলাপ ঘটে। প্রকৃতপক্ষে অবক্ষয়ের ধারা চলে আসছিল মুর্শিদকুলী খানের পর থেকেই। মুর্শিদাবাদের রাজনীতি ও নবাব আলীবর্দীর পরিবার তখন নিপতিত হয়েছিল চরম অবক্ষয়ে। তখনকার অবস্থা সম্বন্ধে অনুসন্ধান করলে জনসাধারণের নিষ্ক্রিয়তা ও দুর্দশা সম্পর্কেও অনেক কথা জানা যায়। কোনো কোনো দিক দিয়ে লক্ষ্মণ সেনের কালের সঙ্গে, এমনকি সপ্তম-অষ্টম শতাব্দীর মাৎস্যন্যায়ের সঙ্গে, ওই কালের সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়।

এসব বিষয় উল্লেখ করছি এই কারণে যে, ঢাকার সাম্প্রতিককালের রাজনীতির সঙ্গে মুর্শিদাবাদের তৎকালীন রাজনীতির কোনো কোনো দিক দিয়ে আশ্চর্য মিল আছে। বর্তমান সময়ের ঢাকা শহরের রাজনীতিবিদদের, রাজনৈতিকভাবে তৎপর বুদ্ধিজীবীদের, এনজিওপতিদের, সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশনগুলোর বিশিষ্ট নাগরিকদের, আমলাদের ও ধনিক-বণিকদের ঐতিহাসিক ভূমিকার সঙ্গে সেকালের মুর্শিদাবাদ শহরের শাসক সম্প্রদায়ের লোকদের ঐতিহাসিক ভূমিকার তুলনামূলক বিচারে গেলে দেখা যায়, দেশাত্মবোধ, স্বাজাত্যবোধ, আত্মমর্যাদাবোধ ও নৈতিক চেতনার দিক দিয়ে দুই কালের দুই শহরের শাসক সম্প্রদায়ের লোকরা প্রায় একই চরিত্রের। ভিন্নতা অনেক আছে, সেগুলো সবারই জানা। কিন্তু চরিত্রগত মিলের দিকটা সম্পর্কে সবাই জ্ঞাত নন। যারা জ্ঞাত, তারাও বিষয়টি নিয়ে উদাসীন থাকতেই পছন্দ করেন। তারা সন্তুষ্ট থাকেন কেবল ইংরেজদের ওপর দোষ চাপিয়েই। মুর্শিদাবাদের নবাব-দরবারের লোকদের রাজনৈতিক চরিত্র ও দুর্বলতাকে বিবেচনায় ধরতে চান না।

আজ যদি আমাদের উন্নত ভবিষ্যৎ সৃষ্টির কথা ভাবতে হয়, তা হলে অতীত সম্পর্কে আমাদের ধারণাকেও পুনর্গঠিত করতে হবে। উন্নত ভবিষ্যতের পরিকল্পনা যেমন দরকার, তেমনি দরকার অতীত সম্পর্কে প্রচলিত ধারণার পুনর্গঠনও। এজন্য কেউ কেউ বলেন, প্রত্যেক জেনারেশনকে তার ইতিহাস নতুন করে লিখতে হয়। জাতীয় চরিত্রকে উন্নত করতে হলে ইতিহাসের শিক্ষাকে অবশ্যই কাজে লাগাতে হয়।

কার্ল মার্কস ভারতে ব্রিটিশ শাসন সম্পর্কে ১৮৫৩ সালে লিখেছেন- মহামোগলদের একচ্ছত্র ক্ষমতা ভেঙে ফেলেছিল স্থানীয় মোগল শাসনকর্তারা, স্থানীয় শাসনকর্তাদের ক্ষমতা চূর্ণ করল মারাঠারা, মারাঠাদের ক্ষমতা ভাঙল আফগানরা এবং সবাই যখন সবার সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত, তখন প্রবেশ করল ব্রিটেন এবং সক্ষম হলো সবাইকেই অধীন করতে। দেশটা শুধু হিন্দু আর মুসলমানেই বিভক্ত নয়, বিভক্ত বহু উপজাতিতে ও বর্ণাশ্রম জাতিভেদে। এমন একটা ভারসাম্যের ভিত্তিতে সমাজটার কাঠামো গড়া- যা এসেছে সমাজের সদস্যদের মধ্যকার পারস্পরিক বিরাগ ও প্রথাবদ্ধ পরস্পরবিচ্ছিন্নতা থেকে। এমন একটা দেশ, এমন একটা সমাজ- সে কি বিজিত হওয়ার এক অবধারিত শিকার হয়েই ছিল না? হিন্দুস্তানের অতীত ইতিহাস সম্পর্কে যদি কিছুই আমরা না জানতাম, তা হলেও অন্তত এই একটি বিরাট ও অবিসংবাদিত তথ্য তো থাকত যে, এমনকি এই মুহূর্তেও ভারত ইংরেজ রাজ্যভুক্ত হয়ে আছে ভারতেরই খরচে এক ভারতীয় সেনাবাহিনী দ্বারাই। বিজিত হওয়ার নিয়তি ভারত তাই এড়াতে পারত না এবং তার অতীত ইতিহাস বলতে যদি কিছু থাকে তো, তার সবটাই হলো একের পর এক বিজিত হওয়ার ইতিহাস। ভারতীয় সমাজের কোনো ইতিহাসই নেই, অন্তত জানা ইতিহাস। ভারতের ইতিহাস বলে যা অভিহিত হয়, সে শুধু একের পর এক বহিরাক্রমণকারীদের ইতিহাস, যারা ওই প্রতিরোধহীন নিষ্ক্রিয় ও অপরিবর্তমান সমাজের ভিত্তির ওপর তাদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে গেছে। ভারত-বিজয়ের অধিকার ইংরেজদের ছিল কি না, এটা তাই প্রশ্ন নয়, প্রশ্ন হলো- আমরা কি চাই তুর্কি বা পারসিক বা রুশদের দ্বারা ভারত বিজয়, নাকি ব্রিটেনদের দ্বারা ভারত বিজয়?

তখনকার নিতান্ত অপ্রতুল তথ্যের ভিত্তিতে কার্ল মার্কস ভারতবর্ষের ব্রিটিশ শাসনাধীনে যাওয়ার যে প্রক্রিয়া নির্দেশ করেছেন, পরবর্তীকালের অজস্র তথ্য তাকে সমর্থন করেছে, নাকচ করেনি। আত্মকলহে ভারতবর্ষ যখন দুর্বল হয়েছে, তখন বাইরে থেকে প্রবল এসে দুর্বল দেশটিকে দখল করে নিয়েছে।

আজকের দিনেও তো বাংলাদেশে তাই দেখা যাচ্ছে। দুর্নীতি, সন্ত্রাস, অন্তর্দলীয় ও আন্তদলীয় কলহ ইত্যাদিতে বাংলাদেশ সম্পূর্ণ দুর্বল হয়ে পড়েছে। প্রধান দুই দলের নেতারা দেশের রাজনীতিকে করে তুলেছেন বৃহৎ শক্তিবর্গের স্থানীয় দূতাবাস অভিমুখী, ওয়াশিংটনের স্টেট ডিপার্টমেন্টের নির্দিষ্ট ডেস্ক অভিমুখী। বৃহৎ শক্তিবর্গের স্থানীয় কূটনীতিকরা টুইসডে গ্রুপ নামে সংস্থা গঠন করে বৈঠকে বসে আলাপ-আলোচনা করে বাংলাদেশের রাজনীতির গতি ও প্রকৃতি নির্ধারণ করছেন। সেদিন মুর্শিদাবাদের ক্ষমতালিপ্সুরা সলাপরামর্শের জন্য যেতেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাসিমবাজার কুঠিতে। বাংলাদেশের শাসকশ্রেণির লোকরা তাদের সন্তানদের করে চলছেন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। যাদের বলা যায় দ্বৈত নাগরিক, কার্যত বাংলাদেশে তারাই রাজত্ব করছেন। বাংলা ভাষাকে তারা রাষ্ট্রভাষারূপে রক্ষা করছেন না। এ অবস্থায় বিদেশি প্রবল শক্তি এসে দুর্বল এই দেশটির ওপর কর্তৃত্ব খাটাচ্ছে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রায় অর্ধশতাব্দীর ইতিহাস তো আত্মকলহে জাতির আত্মশক্তি ক্ষয় করা ও পরমুখাপেক্ষী হওয়ার ইতিহাস। জাতি ও রাষ্ট্র গঠন করা হচ্ছে না।

ব্রিটিশ শাসিত বাংলায় অবশ্য নতুন মূল্যবোধ ও নৈতিক চেতনার উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছিল। পলাশির যুদ্ধকালের অবস্থা পরিবর্তিত হয়েছিল। দেখা দিয়েছিল এক রেনেসাঁস এবং পরে রেনেসাঁসের ধারায় গণজাগরণ। হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ ও দেশ ভাগ সত্ত্বেও সম্ভব হয়েছিল ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটানো ও জমিদারি ব্যবস্থার বিলোপ সাধন এবং পরে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে রেনেসাঁসের ও গণজাগরণের সেই ধারা কি চলমান আছে? রাজনৈতিক দুর্গতির জন্য সব দায়িত্ব কেবল সেনাশাসকদের ওপর চাপিয়ে যে ইতিহাস প্রচার করা হয়, তাতে বড় রকমের তথ্য বিকৃতি থাকে, তা ইতিহাস নয়।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের বদলে ‘পূর্ববাংলার বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ বিকশিত হয়ে চলছিল এবং সেই চেতনা অবলম্বন করে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনও হয়েছিল। সেই ধারায় ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন জাতিরাষ্ট্ররূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা আর জাতিরূপে বিকশিত হতে পারলাম না, আত্মকলহে ভেঙে খানখান হয়ে গেলাম এবং রাষ্ট্রের শাসকশ্রেণির লোকরা নিজেদের স্বার্থে রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে বিদেশি আধিপত্যবাদীদের ডেকে আনতে লাগল।

ভারতের ইতিহাসে কার্ল মার্কস আরও উল্লেখ করেছেন, ‘বিজয়ীর তরবারির চাপে পড়ে কখনো কখনো ভারত ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, স্বাভাবিক অবস্থায় ভালো কিছু করার সংকল্প নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি, হিন্দুস্তানে মুসলমান বা মোগল কিংবা ব্রিটিশদের চাপ যখন থাকেনি, তখন হিন্দুস্তান যতগুলো বিবদমান স্বাধীন রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়েছে, তার সংখ্যা হিন্দুস্তানের নগরগুলোর, এমনকি গ্রামগুলোর সংখ্যার মতো।’ এই অন্তর্কলহ ও সংহতিহীনতা আর জাতিরূপে বিকশিত না হওয়ার স্বভাবটা আজকের বাংলাদেশের বাঙালিদের সম্পর্কে বোধহয় একটুও কম সত্য নয়। ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’ কথাটি এ দেশে ছিল, এখন নেই। ‘বহুত্ববাদ’ চালু করা হয়েছে। ‘বহুত্বমূলক ঐক্য’ আর ‘বহুত্ববাদ’ এক নয়। কেন্দ্রীয় ঐক্যের বিবেচনা বাদ দিয়ে কেবল বহুত্বের নীতি গ্রহণ করলে জাতি টেকে না, রাষ্ট্রও টিকতে পারে না।

বাঙালিকে যারা হুজুগে, আত্মবিস্মৃত, আত্মকলহপরায়ণ, আত্মভ্রষ্ট ও আত্মঘাতী বলে অভিহিত করেছেন, তারা এ জাতির মহান সব সম্ভাবনার ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঘটনাবলিতে ব্যথিত হয়েই তা করেছেন। বাংলাদেশের জনজীবনের গোটা ইতিহাস তলিয়ে দেখলে এবং অভ্যন্তরীণ সব সম্পদ হিসাবে ধরলে উন্নত ভবিষ্যতের বিরাট সম্ভাবনা অনুভব করা যায়। দেশে উৎপাদন বাড়ছে, সম্পদ বাড়ছে, বৈষম্য বাড়ছে, অন্যায়-অবিচার বাড়ছে, সহিংসতা বাড়ছে, পাশবিক প্রবণতা বাড়ছে, মানবিক গুণাবলি কমছে। বর্তমানে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, জাতীয় হীনতাবোধ এ জাতির প্রতিটি নর-নারীর জীবনকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে। যুদ্ধোত্তর প্রথম বছরগুলোতে সার্বিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে বাঙালি জাতিকে কেউ কেউ বলেছেন নৈতিক চেতনাহীন, কেউ কেউ বলেছেন ইতিহাস চেতনাহীন। সর্বজনীন কল্যাণে এই বাস্তবতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। পরিবর্তনের জন্য দেশবাসীর সচেতনতা ও প্রস্তুতি দরকার।

লেখক: প্রগতিশীল চিন্তাবিদ ও সাবেক অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


নেতৃত্ব শূন্যতাই বিএনপির সংকট!

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
হাবীব ইমন

সম্প্রতি ঢাকার বাইরে বিএনপি ৯টি বিভাগীয় সমাবেশ শেষ করেছে। সমাবেশগুলো কতটা সফল, তার ফলাফল এখনো পাওয়া যায়নি। রাজনীতির মাঠে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। না হলে রাজনীতির গতির সঙ্গে তাল মেলানো কঠিন হয়ে যায়। মূলত নেতৃত্বের হযবরল অবস্থা, নেতৃত্বের বিক্ষিপ্ত বক্তব্য, কোন্দল ও অযোগ্য ব্যক্তিদের গণহারে পদায়নের কারণে বিএনপির মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব, শঙ্কা, ভয়, অনিশ্চয়তা প্রবলভাবে বিদ্যমান। তাই মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আটক হওয়ার পর দলটি কর্মীদের সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।

বিদেশে বসেও আন্দোলন-সংগ্রামে সফল নেতৃত্ব দেয়ার উদাহরণ ইতিহাসে অনেক আছে। এখন প্রযুক্তি অনেক এগিয়েছে। কিন্তু বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন বা তার দল প্রযুক্তির সেই সুবিধাকে কাজে লাগাতে পারেনি। একটা জোর গুঞ্জন— বিএনপির একটা অংশ ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনকে মেনে নিতে পারছে না—এ রকম বেফাঁস কথা বিভিন্ন সময়ে দলের নেতাদের মুখে শোনা গেছে। অর্থাৎ বিএনপির নেতৃত্ব নিয়ে একটা বিভ্রান্ত দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে বরাবর আছে।

বিভাগীয় সমাবেশ ঘিরে রাজনীতির মাঠে ঢেউ তুলেছিল বিএনপি। ঢাকার সমাবেশের আগ পর্যন্ত বিএনপি সুবিধাজনক অবস্থায়ই ছিল। বিভাগীয় সমাবেশগুলোয় গণ-উপস্থিতি ছিল উল্লেখ করার মতো। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। এর পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে। বিভিন্ন দলের যুগপৎ আন্দোলনের ঘোষণা ও বিভাগীয় সমাবেশগুলোয় ব্যাপক জনসমাগমের পরও বিএনপির মধ্যে ঝিমুনিভাব দেখা যাচ্ছে। অথচ বিভাগীয় সমাবেশকে কেন্দ্র করে বিএনপি দারুণভাবে চাঙা হয়েছিল। চাঙা অবস্থা থেকে বিএনপি পিছু হটতে শুরু করে গত বছরের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে।

মূলত পল্টনে সমাবেশ করতে না পারা বিএনপির জন্য একধরনের মনস্তাত্ত্বিক পরাজয়। সরকারের চাপের মুখে বিএনপি বলতে শুরু করে, নিরাপদ ও সুবিধাজনক স্থানে তারা সমাবেশ করার কথা বিবেচনা করবে। বিএনপির নমনীয় অবস্থান বুঝতে পেরেই আওয়ামী লীগ কঠোর অবস্থানে চলে যায়। গত ৭ ডিসেম্বর পল্টনে বিএনপি অফিসের সামনে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় এক বিএনপি কর্মী নিহত হন। পুলিশ অভিযান চালায় বিএনপির অফিসে।

এই ঘটনার পরপরই বিএনপিকে কিছুটা অগোছালো মনে হয়। দলীয় অফিসে হামলা এবং মহাসচিব মির্জা ফখরুলসহ অন্য নেতা-কর্মীদের গণহারে আটকের পর কোনো শক্তিশালী কর্মসূচি ঘোষণা করেনি বিএনপি। গত ৭ ডিসেম্বর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একা একা কেন্দ্রীয় অফিসের সামনে ফুটপাতে অসহায়ের মতো বসেছিলেন। এ সময় অন্য কোনো নেতা-কর্মীকে তার পাশে দেখা যায়নি। অথচ বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর ঢাউস আকারের কমিটি হয়। ৩০০ থেকে ৪০০ মানুষের কমে কোনো কমিটি হয় না। দলের সংকটময় মুহূর্তে এসব কমিটির সদস্য কোথায় ছিলেন, তা কেউ জানে না।

১০ ডিসেম্বর পল্টন থেকে সমাবেশ সরিয়ে নেয়ায় বিএনপি মূলত আওয়ামী লীগের সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক খেলায় হেরে যায়। গোলাপবাগে বড় সমাবেশ হলেও এখানে বিএনপির চেয়ে সরকারের সফলতা বেশি ছিল। সরকার বা আওয়ামী লীগ এই ঘটনায় প্রমাণ করতে পেরেছে যে তারা যেভাবে চেয়েছে, বিএনপি সেভাবেই সমাবেশ করেছে।

বিএনপির একজন নেতা বলেছিলেন, ১০ ডিসেম্বরের পর দেশ চলবে খালেদা জিয়ার কথায়। ৮ তারিখ রাতে পুলিশ দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসকে বাসা থেকে তুলে ডিবি অফিসে নেয়। ডিবি থেকে প্রথমে বলা হয়, বিএনপির অফিসের ঘটনা ও সমাবেশের স্থান নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে নিয়ে আসা হয়েছে। পরে দেখা গেল বিস্ফোরক আইনে দুই নেতার নামে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হলো। কিন্তু বিএনপির পক্ষ থেকে রাজপথে প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। যারা ১০ তারিখের পর দেশ খালেদা জিয়ার কথায় চলবে বলে আওয়াজ তুলেছিলেন, তারা নিশ্চুপ হয়ে গেলেন।

বিএনপি এর আগে অনেকবার বলেছে যে ঈদের পর আন্দোলন হবে। কিন্তু সেই ঈদ আর বিএনপির আসেনি। এ জন্য বিএনপিকে নিয়ে অনেক তামাশাও হয়েছে। এখন শোনা যাচ্ছে, সেপ্টেম্বর-অক্টোবর নাগাদ দলটি চূড়ান্ত আন্দোলনে নামতে চায়। কোনোভাবে যদি ওই সময় পর্যন্ত বিএনপির আন্দোলনকে আওয়ামী লীগ টেনে নিতে পারে, তাহলে যেকোনো প্রকারে নির্বাচন করে ফেলবে। কারণ আগামী নভেম্বরেই তফসিল ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন। আর সেপ্টেম্বর-অক্টোবরেই যদি চূড়ান্ত আন্দোলন করা হয়, তাহলে এখন বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করে সাধারণ কর্মীদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে কেন? গত কয়েক মাসে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে বিএনপির ৯ কর্মী নিহত হয়েছেন।

প্রকৃতপক্ষে এ বছরের শেষ নাগাদ বিএনপি আন্দোলন করতে পারবে। কিন্তু ওই সময় পরিস্থিতির ওপর বিএনপির নিয়ন্ত্রণ না-ও থাকতে পারে। তফসিল ঘোষণা হয়ে গেলে নির্বাচন আটকানো এই বিএনপির পক্ষে সম্ভব হবে না। ২০১৪ ও ২০১৮ সালেও পারেনি। এসব কারণে বিএনপির সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ আগে থেকেই আছে। এই সন্দেহ থেকেই শরিকদের অনেকেই সরকারের প্রলোভন বা চাপের মুখে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিতে পারে।

২০০৬ সালের পর থেকে গত ১৫ বছর বিএনপি ক্ষমতার বাইরে। ক্ষমতার বাইরে থাকা দলগুলোর নানা অর্জন থাকে, কিন্তু এই কয়েক বছরে বিএনপির প্রাপ্তি বা অর্জন কোথায়? আবার তারা কবে ক্ষমতায় ফিরতে পারবে, তা কেউ জানে না। তবে বিএনপি একটি ক্ষমতামুখী দল। গণতান্ত্রিক পন্থায়, নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়াই তাদের লক্ষ্য। গত কয়েক বছরে তাদের যে আন্দোলন, তার সিংহভাগই হচ্ছে ক্ষমতায় যাওয়ার আন্দোলন। এটা সাধারণ মানুষের ভেতর বেশি প্রভাব ফেলছে। আবার, এ কথা ভুলে গেলে চলবে না, বিএনপির ভোটব্যাংক হচ্ছে মূলত আওয়ামীবিরোধী ভোট। বাংলাদেশের ভোটের রাজনীতি দুই ভাগে বিভক্ত- আওয়ামী লীগ এবং আওয়ামী লীগবিরোধী। বিএনপি হয়তো এই আওয়ামী লীগবিরোধী প্ল্যাটফর্মের প্রতিনিধিত্ব করেছে। আজ বিএনপি না থাকলে কাল অন্যদল সে জায়গা দখল করবে। সেটা কতটা ভয়াবহ হতে পারে, বিএনপিহীন বিরোধী দলের রাজনৈতিক কার্যক্রমে বোঝা গেছে।

রাজনীতি আসলে কৌশলের খেলা। কখনো কখনো অপকৌশলেরও খেলা। রাজপথে আমরা যা দেখি, সেটা সেই কৌশল বা অপকৌশলের শেষ ধাপ। তার আগে পর্দার পেছনে চলে আসল খেলা। সেই খেলায় আওয়ামী লীগের কাছে বার বার হেরে যাচ্ছে বিএনপি। বার বার আওয়ামী লীগের কৌশলের কাছে হেরে ক্ষমতা থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে বিএনপি।

দলটি বলবে, তারা আন্দোলনের নানা চেষ্টা করেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ কঠোর হাতে সেসব দমন করেছে। কথাটি খুব একটা ভুল নয়। কিন্তু ক্ষমতার বাইরে থাকা দলগুলোর ওপর নিপীড়ন বা দমন চালানোর ইতিহাস আজ নতুন নয়, এটা তাদের আমলেও বহুবার হয়েছে।

দলটি কেন মাঠে নামতে পারছে না, সেটাও বিশ্লেষণ করা দরকার। বৃহত্তর আন্দোলনে নামার আগে বিএনপির নিজেদের সক্ষমতা যাচাই এবং আত্মসমালোচনা জরুরি।

এটা ঠিক, একটি সুষ্ঠু নির্বাচন, বর্তমান সময়ের ন্যূনতম রাজনৈতিক দাবি। বিএনপির লক্ষ্যটাও পরিষ্কার- সুষ্ঠু নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন। কিন্তু সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথটা বড়ই বন্ধুর। সেই বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছানোর সামর্থ্য বিএনপির আছে কি না, সেটা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

বস্তুত সুষ্ঠু নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বাধ্য করতে না পারলে বিএনপি দল হিসেবে টিকবে কি না, তা বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দেবে। কোনোভাবে যদি আওয়ামী লীগ আবারও কোনো প্রকার নির্বাচন করে ক্ষমতায় টিকে যায়, তবে আরও শক্তভাবে বিএনপির ওপর চড়াও হবে। আর বিএনপির শক্তি ও সামর্থ্য নিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে যাবে। ফলে ভয়াবহ অস্তিত্বের সংকটে পড়বে বিএনপি।

মনে হচ্ছে, বিএনপি আওয়ামী লীগের সঙ্গে কৌশলে কুলিয়ে উঠতে পারবে না। বিএনপির থিঙ্কট্যাংক নতুন নতুন আন্দোলনের কৌশল উদ্ভাবনে ব্যর্থ হয়েছে। সরকার দমন-নিপীড়ন করছে। এটা আমরা সবাই বলি। কিন্তু এই দমন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে বিএনপিকে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে হবে। সহিংসতা না করেও সফল আন্দোলন করা যায়। প্রতিপক্ষের চাপ সব সময়ই রাজনীতিতে থাকবে। জনসমর্থন থাকার পরও বিএনপি এই চাপের কাছে নতি স্বীকার করছে। পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে মনে হচ্ছে, বিএনপির নেতৃত্ব অনেকাংশেই একটি বিশেষ বিদেশি শক্তি ও প্রতিপক্ষের পক্ষের কবজায় চলে গেছে। এদের কাজ হচ্ছে ভয়ভীতি সঞ্চার করে বিএনপিকে আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে দূরে রাখা। বাস্তবে হচ্ছেও তাই। ডিসেম্বরে বিএনপির মধ্যে যে গতি ছিল, তার অনেকটাই এখন থিতিয়ে গেছে। সামনে রোজা। সামনে ঈদ। ওই সময় আন্দোলন জমাতে পারবে না।

২০১৪ আর ২০১৮ সালের যুদ্ধে আওয়ামী লীগের কৌশল কাজ করেছে। তারা এবারও বেশ আত্মবিশ্বাসী। বিভিন্ন কৌশলে আওয়ামী লীগ নির্বাচনমুখী হচ্ছে। দুবারই বিএনপির কৌশল মাঠে মারা গেছে। এবার তাদের তূণে কী ধরনের তির আছে, তা স্পষ্ট নয়।

দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় দণ্ড মাথায় নিয়ে সরকারের অনুকম্পায় অন্তরীণ জীবনযাপন করছেন। তার যা বয়স এবং শরীরের যে অবস্থা, তাতে তিনি আর দলের নেতৃত্ব দেবেন বা আন্দোলনে নামবেন; তেমন বাস্তবতা আদতে নেই। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানও দণ্ড মাথায় নিয়ে পালিয়ে আছেন। তাই এ অবস্থায় নেতৃত্ব শূন্যতাই বিএনপির সবচেয়ে বড় সংকট। এখানে ভালো খেলার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে দলে একজন ভালো নেতা থাকা। বিএনপির সেই নেতা কে?

লেখক: প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, কেন্দ্রীয় কমিটি


নৈতিকতা ও চুরি প্রতিরোধ আইন যখন সাংঘর্ষিক

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ফরিদ আহমেদ

আইন ও নৈতিকতার বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রদের ফাইনাল পরীক্ষায় একটি প্রশ্ন করেছিলাম। ছাত্রদের পরীক্ষার খাতাগুলো দেখার কাজ প্রায় শেষ করে ফেলেছি। এ অবস্থায় মনে হলো, আমার আবার নতুন করে একটু পড়াশোনা করা দরকার। কী করলে বা কীভাবে আমি তাদের আরও সহজভাবে বোঝাতে পারি, যাতে তারা পরীক্ষার খাতায় ভালো উত্তর লিখতে পারে। এসব নিয়ে যখন ভাবছি ঠিক তখনই আমার দৃষ্টি কেড়ে নিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চন্দ্ররেণু বিদ্যা (plagiarism) বা গবেষণা চুরি প্রতিরোধ আইন।

এই আইনটির বেশ কিছু ভালো দিক আছে এবং যখন সপ্তম শ্রেণির পুস্তক লেখায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা চুরি করছেন তখন বলতে হবে এই আইন সময়োপযোগী। কিন্তু আমার দৃষ্টি থমকে গেল আইনটির ধারা ৩-এর উপধারা এ ও বি এবং ধারা ৫.২-এর উপধারা এ ও বি-এর প্রতি। ৩-এর দুটি উপধারাতে বলা হয়েছে- The rule shall come into force from the date of approval by the syndicate of the university and shall not have any retrospective effect. অর্থাৎ, এই আইন প্রবর্তনের তারিখ থেকে কার্যকর হবে এবং আইনটির দ্বারা কোনো বিষয়কে ভূতাপেক্ষ অনুমোদন দেয়া যাবে না। আরও সহজ করে বলা যায়, নিয়মটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট কর্তৃক অনুমোদনের তারিখ থেকে কার্যকর হবে এবং এর কোনো পূর্ববর্তী প্রয়োগ থাকবে না।

ধারা ৫.২-এর দুটি উপধারাতে বলা হয়েছে, The Rule shall be applied to address any offence /misconduct of plagiarism committed or reported from the date of its commencement at the university। অনুবাদ করলে এর অর্থ দাঁড়ায়- বিশ্ববিদ্যালয়ে এই আইনটি কার্যকর হওয়ার তারিখ থেকে সংঘটিত বা রিপোর্ট করা চুরির যেকোনো অপরাধ/অসদাচরণ মোকাবেলার জন্য প্রয়োগ করা হবে। এরপর এই ধারাগুলোতেই শর্ত দিয়ে বলা হয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাণ্ডারে রক্ষিত অপ্রকাশিত থিসিস, ডিসার্টেশন, মনোগ্রাফ, রিপোর্ট, পুস্তকের অধ্যায়, পুস্তক, টার্ম পেপার, গ্রাজুয়েট প্রোডাকশন- ইত্যাদি বিষয় যদি প্লাগিয়ারিজম চেকিংয়ের আওতামুক্ত থাকে, তবে ওই লেখকের উপরোক্ত লেখা থেকে প্রকাশিত প্ৰবন্ধগুলোও প্লাগিয়ারিজম চেকিংয়ের আওতামুক্ত থাকবে।

বিষয়টি আমাকে ভীষণভাবে আঘাত করায় বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনার সিদ্ধান্ত নিলাম। আইন বিভাগের এক অধ্যাপক আমাকে জানালেন, এখানে The Principle of Non-retroactivity of Criminal Law প্রয়োগ করা হয়েছে। এ ধরনের আইন প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত এক অধ্যাপককে প্রশ্ন করি, কেন এমন আইন? তিনি জানালেন যে, যদি এই ধারাটি সংযুক্ত না থাকে তবে যে কেউ যেকোনো একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারে। এবং তাতে করে বিশ্ববিদ্যালয় সমস্যায় পড়তে পারে, বিশৃঙ্খলা তৈর হতে পারে।

আমার কাছে উত্তরটি সন্তোষজনক মনে হলো না। কারণ আমি ইতিমধ্যে অভিযোগ করেছি এবং সেটাকে এখনো বিবেচনায় নেয়া হয়নি। অন্য এক অধ্যাপক আমাকে প্রশ্ন করেছেন, ‘আপনি কে অভিযোগ করার। এ নিয়ে আপনার এত মাথাব্যথা কেন?’ আরেক অধ্যাপক বললেন, ‘এর চেয়ে আরও অনেক বড় বড় বিষয় আছে যা নিয়ে আমার ভাবা উচিত! খামাখা আমি ছোটখাটো বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি।’ আরেক সরকারি কর্মকর্তা হাদিস থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বললেন, ‘আল্লাহ বিচার করবেন, আপনি এগুলো নিয়ে ভাববেন না! এর থেকে আরও কত বড় অপরাধ হচ্ছে! আমরা কি তার হিসাব রাখি!’

আমার এই অভিজ্ঞতার অপর পাশে আছেন সরকারি কর্মকর্তা ও বরেণ্য অধ্যাপকদের মত, ‘এগিয়ে যাও, তুমি সঠিক কাজটি করছ।’ আমি নিজেকে প্রশ্ন করি, আমি কি ঠিক কাজটি করছি?

এরপর শুরু হলো আমার গবেষণা, ‘The Principle of Non-retroactivity of Criminal Law’ নিয়ে। তাতে যা পেলাম সেটা হলো বিজ্ঞ আইনের অধ্যাপকরা এই আইনের বেলায় পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। প্রথমত, আইনের এই বিষয়টিকে অনিবার্য মন্দ (necessary evil ) বলে তারা অভিহিত করেছেন। এক দলের যুক্তি হলো, ‘একদিন কোনো একটি দেশে এমন একটি সরকার আসতে পারে যারা এই বলে আইন করতে পারে যে, বাংলাদেশে যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছে তারা অপরাধ করেছে। এবং এই আইনে আরও বলা থাকবে, এই আইন অনুযায়ী অতীতে সংঘটিত কর্মকাণ্ড বিচারের আওতাভুক্ত হবে।’

এমন আইন নিঃসন্দেহে একটি ভয়ানক বিষয়! আইনের অধ্যাপকেরা আরও যুক্তি দেন যে, ‘যদি আইনের ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা স্বীকার করে নেয়া হয় তাতে ন্যায়পরতা ও গণতন্ত্র উপেক্ষিত হবে।’

আমরা আইন ও নৈতিকতার সম্পর্ক জানি। দুটি বিষয় খুবই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যে কাজ যুগের পর যুগ ধরে অনৈতিক ও আইনসম্মত নয় বলে বিবেচিত, সে কাজের নাকি বিচার করা যাবে না। বিষয়টি কি গ্রহণযোগ্য হতে পারে? আমরা কেন অনুমান করছি আইন পাস করলে false case বা ভুয়া মামলা অথবা অভিযোগে ভরে যাবে যা ব্যবস্থাপনার অনুপযোগী? কোনো একটি আইন যদি অতীতে সংঘটিত অপরাধের বিচার চাওয়ার সুযোগ করে দেয় তবে সেই আইনকে অবশ্যই ভালো আইন বলতে হবে। আর ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত একটি সম্ভাব্যকে বিবেচনায় নিয়ে মন্দ যুক্তির অবতারণা করা হয় তা কি একজন নীতি-সচেতন মানুষ মেনে নিতে পারে? আইনটি যাতে নিরপরাধ কোনো ব্যক্তিকে শাস্তি না দিতে পারে সেজন্য আমাদের সতর্কতা অবলম্বন প্ৰয়োজন। আমাদের কেউ কেউ হুমকি দেন, এবার ওনারা ক্ষমতায় এলে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তির বিচার করবেন। সেজন্য আমরা সতর্ক থাকব। কিন্তু আমরা নির্দ্বিধায় সমর্থ করব ১৯৭৩ সালের The International Crimes (Tribunals) Act, 1973 (ACT NO. XIX OF 1973) কে। এই আইনটি গোলাম আজম, মতিউর রহমান নিজামী, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মুজাহিদদের বিচার করতে প্রবর্তন করা হয়েছে।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক হেনরি হার্ট ও এ এম স্যাক্স The Principle of Non-retroactivity of Criminal Law আলোচনা করেছেন। এবং ওই বরেণ্য আইনের অধ্যাপকদের অভিমত হলো, ‘একটি পুরোনো অকার্যকর আইনের পরিবর্তে একটি নতুন আইনকে অতীতে সংঘটিত অপরাধের বিচার করতে কাজে লাগানো যেতে পারে।’

সুতরাং, The International Crimes (Tribunals) Act, 1973 (ACT NO. XIX OF 1973 ) একটি ভালো আইন। এবং এই আইন প্রয়োগ করে আমরা আগামী প্রজন্মের জন্য একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছি। বিচার চলছে যুদ্ধাপরাধীদের। বাংলাদেশের বাতিঘর, জাতির বিবেক হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হবে আইন ও নৈতিকতার অগ্রপথিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার দাবিতে শত শত সভা ও মানববন্ধন করেছেন। একটি তুচ্ছ ব্যবস্থাপনা সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়ে একটি ভালো কাজকে- তথা অতীতে সংঘটিত গবেষণা চুরির বিচার চাওয়ার অধিকারকে নিষিদ্ধ করতে পারে না। কারণ ন্যায়পরতা ও গণতন্ত্র এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এবং যে ব্যবস্থাপনায় অনিশ্চয়তার কথা বলা হচ্ছে তা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি কোনোভাবেই সব সৎ গবেষকদের ওপর সন্দেহের কালো মেঘ লেপন করে তাদের ক্ষতি করা যায় না।

হয়তো কেউ কেউ উদাসীন ছিলেন। তাদের উদাসীনতা থেকে নকল করে অনেকে পার পেয়ে গেছেন। কিন্তু সেই সব অপরাধীর বিচার না চাওয়াটা কাপুরুষতা। সেই বিবেচনায় অধ্যাপক জাফর ইকবাল জাতির জন্য দৃষ্টান্ত। ন্যায় বিচার চাওয়ার পথকে রুদ্ধ করা একটি অবিচার যা মানবতাকে অবমূল্যায়ন করে। আমরা নানা ধরনের বিভ্রান্তির মধ্যে আছি। আর তাই দায়ী হওয়া ভয়ে সত্যকে মোকাবিলায় ভয় পাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নির্ভীক এবং স্পষ্টবাদিতার ধারক ও বাহক। এমন কোনো আইন করা সমীচীন নয়, যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তথা বাংলাদেশের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে।

লেখক: অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়


অর্থনৈতিক মুক্তির সোপানতলে

আপডেটেড ২৯ জানুয়ারি, ২০২৩ ১২:৩৪
মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

বাঙালির ঐতিহাসিক ‘মুক্তির সংগ্রাম’-এর প্রকৃত অর্জন বা বিজয় বিবেচনার জন্য গত পাঁচ দশকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে স্বাবলম্বী হওয়ার বিষয়টি পর্যালোচনা করা খুবই জরুরি। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্নে গোটা দেশবাসীকে সরকার যে উন্মুক্ত বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে তাতে সমাজ কিংবা সংসার এমনকি যেকোনো কর্মকাণ্ডে সবার সুচিন্তিত মতামত প্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অবশ্য প্রত্যেক নাগরিককে তার কর্তব্য পালনের মনোভাব দরকার। সেই সঙ্গে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য সবার সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস থাকা জরুরি। তেমনি জাতীয় উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগের আবশ্যকতাও একইভাবে অনস্বীকার্য।

যেকোনো দেশের উন্নয়নে জাতীয় সঞ্চয় ও বিনিয়োগে থাকা চাই প্রত্যেক নাগরিকের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অবদান। এ জন্য সরকারকে অপচয় অপব্যয় রোধ করে জুতসই প্রযুক্তি ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে দেশের সীমিত সম্পদের সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হয়। তাহলে সবার মধ্যে অভ্যাস, আগ্রহ ও একাগ্রতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। যদিও নাগরিক অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা ও উপলব্ধির জাগরণে অনিবার্য হয়ে ওঠে যে নিষ্ঠা ও আকাঙ্ক্ষা তা অর্জনের জন্য সাধনার প্রয়োজন, প্রয়োজন ত্যাগ স্বীকারের। তাই দায়-দায়িত্ব পালন ছাড়া স্বাধীনতার সুফল ভোগের দাবিদার হওয়া বাতুলতা মাত্র।

দেশের প্রত্যেকে নাগরিক নিজ নিজ অবস্থানে থেকে সব উন্নয়ন প্রচেষ্টার সমন্বয়ের মাধ্যমে সুফল ভোগ করবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একজন কর্মচারীর বেতন তার সম্পাদিত কাজের পরিমাণ অনুযায়ী না হয়ে কিংবা কাজের সফলতা-ব্যর্থতার দায় দায়িত্ব বিবেচনায় না এনে যদি দেয়া হয় তাহলে কর্মীর দক্ষতা অর্জনের প্রত্যাশা আর দায়িত্ববোধের বিকাশভাবনা মাঠে মারা যাবে। এ ধরনের ব্যর্থতার বোঝা ভারী হতে থাকলে যেকোনো উৎপাদন ব্যবস্থা ভর্তুকির পরাশ্রয়ে যেতে বাধ্য। দারিদ্র্যপীড়িত জনবহুল কোনো দেশে পাবলিক সেক্টর বেকার ও অকর্মণ্যদের জন্য যদি অভয়ারণ্য কিংবা কল্যাণ রাষ্ট্রের প্রতিভূ হিসেবে কাজ করে তাহলে সেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে। যদি বিপুল জনগোষ্ঠীকে জনশক্তিতে পরিণত করা না যায়, উপযুক্ত কর্মক্ষমতা ও প্রয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি করে, তাহলে উন্নয়ন কর্মসূচিতে বড় বড় বিনিয়োগও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে।

দেশের চাকরি যদি সোনার হরিণ হয়ে যায় তাহলে নাগরিকরা তাদের চাকরি পাওয়া এবং রাখার জন্য অস্বাভাবিক দেনদরবার চলাবে এটাই স্বাভাবিক। তাই তারা দায়-দায়িত্বহীন চাকরি পাওয়ার সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। ফলে তাদের নিজ উদ্যোগে স্বনির্ভর হওয়ার আগ্রহেও অনীহা চলে আসে। মানবসম্পদ অপচয়ের চেয়ে বড় নজির আর হতে পারে না। দরিদ্রতম পরিবেশে যেখানে শ্রেণিনির্বিশেষে সবার কঠোর পরিশ্রম, কৃচ্ছ্রসাধন ও আত্মত্যাগ আবশ্যক সেখানে সহজে ও বিনা পরিশ্রমে কীভাবে অর্থ উপার্জন সম্ভব সেদিকেই ঝোঁক বেশি হওয়াটা সুস্থতার লক্ষণ নয়।

ট্রেড ইউনিয়ন নির্বাচনে প্রার্থীর পরিচয়ে যে অঢেল অর্থব্যয় চলে তা যেন এমন এক বিনিয়োগ যা অবৈধভাবে অধিক উসুলের সুযোগ আছে। শোষক আর পুঁজিবাদী উৎপাদনব্যবস্থায় বঞ্চিত শ্রমিকশ্রেণির স্বার্থ উদ্ধারে নিবেদিত হওয়ার বদলে ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃত্ব যখন উৎপাদনবিমুখ হয় আর শ্রমিক স্বার্থ উদ্ধারের পরিবর্তে তারা আত্মস্বার্থ উদ্ধারে শোষণ করে তখন দেখা যায় যাদের তারা প্রতিনিধিত্ব করছে তাদেরই তারা প্রথম ও প্রধান প্রতিপক্ষ। সে জন্য প্রচণ্ড স্ববিরোধী এই পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে উৎপাদন, উন্নয়ন তথা শ্রমিক উন্নয়ন সবই বালখিল্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

অজুহাত দেখিয়ে অপচয়-অপব্যয় করে তহবিল আত্মসাৎ করা হলে যেকোনো সবল অর্থনৈতিক উন্নয়ন ধারাও বাধাগ্রস্ত হবে। তাই এসব রোধে সরকারকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই। তাই প্রত্যেক নাগরিক তার দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সজাগ হলে সুখী ও সমৃদ্ধশালী সমাজ ও অর্থনীতি পুনর্গঠনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। আগেই বলা হয়েছে, মানুষই তার পরিবেশের নিয়ন্তা। তাকে সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে সাধ্যমতো দায়িত্ব পালনের জন্য। সংসার, সমাজ ও দেশের উন্নয়নে তার নিজের অংশগ্রহণকে অর্থবহ করতে ঐকান্তিক নিষ্ঠার দরকার। যেমন করে সংসারে নানান বাদ-প্রতিবাদে মানুষ বেড়ে ওঠে, তার দায়- দায়িত্ব তদানুযায়ী নির্ধারিত হয় এবং তা যথাযথভাবে পালনে সংসারের গতির চাকা সচল থাকে নির্দিষ্ট নিয়মে।

বিদ্যমান ব্যবস্থাপনার সংস্কার ও কিংবা উন্নয়নকামী যে কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাস্তবায়নযোগ্যতার এবং বাস্তবায়নের দৃঢ়চিত্ততার বিষয় বিবেচনা অগ্রগণ্য না হলে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আন্তরিক প্রয়াস নিশ্চিত হয় না। জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য দূরদৃষ্টি রূপকল্প প্রণয়নকারীর, প্রগাঢ় প্রতিশ্রুতি ও দৃঢ়প্রত্যয় প্রয়োজন। সমস্যা গোচরে এলে ব্যবস্থা নিতে সব সামর্থ্য ও সীমিত সম্পদ নিঃশেষ হতে দিলে প্রকৃত উন্নয়নের জন্য পুঁজি ও প্রত্যয়ে ঘাটতি তো হবেই। সমস্যারা পরস্পরের মিত্র, একটার সঙ্গে একটার যেন নাড়ির যোগাযোগ। আইনশৃঙ্খলার সঙ্গে ব্যক্তির নিরাপত্তার, ব্যক্তির নিরাপত্তার সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তার, সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গে আয়-উপার্জনের সব কার্যক্রমের কার্যকরণগত সম্পর্ক রয়েছে।

দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামে চাই আয় উপার্জনের সুস্থ স্বাভাবিক পরিবেশ। দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মদক্ষতা ও কর্ম ক্ষমতা উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রসার ঘটবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা। সর্বত্র সেই পরিবেশের সহায়তা একান্ত অপরিহার্য। যেখানে সীমিত সম্পদের ও সুযোগের সর্বোত্তম ব্যবহার সম্ভব। একটাকে উপেক্ষা মানে যুগপৎভাবে অন্য অনেক সমস্যাকে ছাড় দেয়া। তাই সমস্যার উৎসে গিয়ে সমস্যার সমাধানে ব্রতী হতে হবে। এ কাজ কারও একার নয়, এ কাজ সবার। সে জন্য সমস্যার মোকাবিলায় প্রয়োজন সমাধানের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সমস্যা পরিপোষণের জন্য নয়। যেকোনো সংস্কারমূলক পদক্ষেপ বাস্তবায়নের জন্য জনমত সৃষ্টিতে, আস্থা আনয়নে ও একাগ্রতা পোষণে গঠনমূলক উদ্যোগ গ্রহণ অপরিহার্য। সংস্কার বাস্তবায়ন কোনোমতেই সহজসাধ্য নয় বলেই সর্বত্র দৃঢ়চিত্ততা আবশ্যক। এখানে দ্বিধান্বিত হওয়া বা দ্বিমত পোষণ কিংবা প্রথাসিদ্ধবাদী বশংবদ বেনিয়া মানসিকতার সঙ্গে আপস করার সুযোগ থাকতে নেই। অতীতে এই ভূখণ্ডে যতগুলো রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংস্কার কর্মসূচি কিংবা ধ্যানধারণা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তাদের কমবেশি ব্যর্থতার পেছনে বিরুদ্ধবাদীদের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণে অপারগতাই মুখ্য কারণ ছিল।

লেখক: সরকারের সাবেক সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান


শব্দদূষণ রোধে কালক্ষেপণে বিপত্তি বাড়বে 

আপডেটেড ২৯ জানুয়ারি, ২০২৩ ১২:৩৫
মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ

স্বাভাবিক জীবনে প্রতিদিন ঘরে ও বাইরে সুরবর্জিত শব্দ মানুষের কানে ঢুকে দেহমনের যে ক্ষতি করে চলেছে তা বেশির ভাগ মানুষ টেরই পায় না। শব্দ যদি উচ্চমাত্রার হয় তাহলে সে ক্ষতি হবে অপূরণীয়। গ্লোবাল সিটিস ইনস্টিটিউশনের এমন সমীক্ষায় দেখা যায়, রাজধানীতে প্রতিনিয়ত যে ধরনের শব্দদূষণ ঘটছে তাতে বসবাসকারী এক-চতুর্থাংশ মানুষ কানে কম শোনে এবং এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০৩৫ সাল নাগাদ ৪৫ ভাগ মানুষ কানে কম শুনবে।

এ হিসাবে ২০৪৫ সালে প্রায় দেড় কোটির বেশি মানুষ শব্দদূষণে আক্রান্ত হয়ে শ্রবণশক্তি হারাবে। এবারের নববর্ষ উদযাপনে থার্টিফার্স্ট নাইটে ছিল ঢাকাজুড়ে আতশবাজি আর পটকা ফোটানোর মুহুর্মুহু শব্দ। সম্প্রতি প্রকাশিত জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনএপি) ‘বার্ষিক ফ্রন্টিয়ার্স রিপোর্ট-২০২২’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ঢাকা শব্দদূষণে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (হু) নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আবাসিক এলাকার জন্য অনুমোদনযোগ্য শব্দসীমার মাত্রা ৫৫ ডেসিবেল। এ ছাড়া বাণিজ্যিক এলাকা ও যেখানে যানজট রয়েছে সেখানে এই মাত্রা ৭০ ডেসিবেল। ঘনবসতিপূর্ণ ও ব্যাপক যানজটের শহর ঢাকায় শব্দের মাত্রা পাওয়া যায় ১১৯ ডেসিবেল। পরিবেশগত শব্দের উৎস হিসেবে রাস্তার যানজট, বিমান চলাচল, রেল চলাচল, যন্ত্রপাতি, শিল্প ও বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডকে চিহ্নিত করা হয়েছে। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত রাস্তায় যানবাহন, ভারী ট্রাক, লোডারের বিকট হর্ন বাজিয়ে তীব্র বেগে ছুটে চলে। এ ধরনের শব্দ শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে বলেও উল্লেখ করা হয়।

আমাদের শহরগুলোতে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পের দ্রুত প্রসার, পরিবহনের অবাধ প্রবাহে প্রতিনিয়ত শব্দদূষণ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। রেলওয়ে ট্রেনের হুইসেলের ৯০ ডেসিবেলের ঊর্ধ্বে শব্দ, অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জেনারেটর, প্রচারের কাজে, সভায় বক্তৃতাকালে মাইক ব্যবহারেও শব্দদূষণ ঘটে। বিভিন্ন শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি চালানোর শব্দ এলাকায় দূষণের সৃষ্টি করে। এ ধরনের শব্দের মাত্রা সাধারণত ৮০ থেকে ১০০ ডেসিবেল হয়ে থাকে। শিল্পকারখানার ব্যবহৃত সাইরেন থেকে ১৪০ ডেসিবল মাত্রার তীব্র শব্দ উত্থিত হয়। বিমান উড্ডয়ন এবং ওঠা-নামার সময় প্রায় ১১০ ডেসিবেলের শব্দদূষণ ঘটে। সুরবর্জিত উচ্চ তীব্রতাসম্পন্ন শব্দ নারী, শিশুসহ রাস্তায় সার্বক্ষণিক কাজ করা মানুষ শব্দদূষণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সুরবর্জিত উচ্চমাত্রার শব্দের প্রভাবে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া, রক্তচাপ, শ্বাসক্রিয়া, দৃষ্টিশক্তি এমনকি মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপে অস্থায়ী বা স্থায়ী প্রভাব ফেলে।

উচ্চমাত্রার শব্দদূষণে হৃৎস্পন্দন বৃদ্ধি পায়। হঠাৎ রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। স্নায়ুতন্ত্রের সক্রিয়তা বেড়ে দেহের চলাচলে গতি-প্রকৃতির ক্রিয়া বিঘ্নিত হতে পারে। হৃৎপিণ্ডের ও মস্তিষ্কের কোষের ওপর অক্সিজেনের অভাবজনিত সমস্যা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে। একাগ্রতা হ্রাস পেয়ে হঠাৎ উত্তেজিত হওয়া এবং মাথাধরার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। শব্দদূষণে মানবদেহের রক্তের শর্করার ওপর প্রভাব এবং রাত্রিকালীন দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পায়। এমনকি সুরবর্জিত উচ্চমাত্রার শব্দে মানসিক অবসাদ সৃষ্টি ও স্মৃতিশক্তি লোপ পেতে পারে।

বাংলাদেশে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালায় স্পষ্ট বলা আছে- কোনো এলাকায়, দিনের কোনো সময়ে, কি ধরনের শব্দদূষণ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ বলে বিবেচিত হবে। শব্দদূষণের জন্য দোষী হিসেবে কেউ প্রমাণিত হলে প্রথম অপরাধের জন্য এক মাসের কারাদণ্ড বা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা অথবা দুই ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে। দ্বিতীয়বার একই অপরাধ করলে ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড দেয়ার কথা বলা রয়েছে। বিধান রয়েছে, আবাসিক এলাকায় রাত ৯টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত শব্দের মাত্রা ৪৫ ডেসিবেল এবং দিনের অন্য সময়ে ৫৫ ডেসিবেল অতিক্রম করতে পারবে না। বাণিজ্যিক এলাকায় তা যথাক্রমে ৬০ এবং ৭০ ডেসিবেল। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালতের চারপাশে ১০০ মিটার পর্যন্ত নীরব এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেখানে রাতে ৪০ ও দিনে ৫০ ডেসিবেল শব্দমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া আছে।

আইনানুসারে হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকার নির্ধারিত কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে ১০০ মিটার পর্যন্ত এলাকায় গাড়ির হর্ন বাজানো বা মাইকিং করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের আটটি বিভাগে গাড়ির হর্নকেই প্রধান শব্দদূষণের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। ১৯৯৭ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইন কমিটি শহরকে নীরব এলাকা, আবাসিক এলাকা, মিশ্র এলাকা, শিল্প এলাকা ও বাণিজ্যিক এলাকা- এই ৫ ভাগে ভাগ করে এলাকার দিন ও রাতভেদে শব্দের মাত্রা নির্ধারণ করে। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের অধীনে বলা আছে, সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত নির্মাণকাজে ব্যবহারের কোনো যন্ত্র চালানো যাবে না। ভয়াবহ শব্দ সৃষ্টিকারী হাইড্রলিক হর্ন বন্ধে নির্দেশনা চেয়ে ২০১৭ সালে রিট করা হলে হাইকোর্টের এক আদেশে হাইড্রলিক হর্ন আমদানিও নিষিদ্ধ করা হয়।

শব্দদূষণ রোধে প্রয়োজন ব্যক্তিগত, প্রযুক্তিগত এবং আইনগত কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ। বাড়িঘরে বিনোদনের কাজে ব্যবহৃত রেডিও, টেলিভিশনের শব্দ যথাসম্ভব কমিয়ে শুনতে হবে। পেশাগত কাজে শব্দ উৎপাদনকারী যন্ত্রপাতিতে শব্দ প্রতিরোধক যন্ত্র লাগিয়ে নিতে হবে। যানবাহন, অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ, কলকারখানা থেকে যে অনাকাঙ্ক্ষিত উচ্চশব্দ উত্থিত হয় তা উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে রোধ করা সম্ভব। শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি উন্নত প্রযুক্তি মানসম্পন্ন হলে তা থেকে শব্দদূষণ কম হবে। প্রতিরোধক ডিভাইস ব্যবহার শব্দদূষণ প্রতিরোধে ইতিবাচক ফল দেবে। স্থলপথের পরিবহন এবং বায়ুযানের চলাচলজনিত সামাজিক শব্দদূষণও প্রযুক্তিগত উপায়ে রোধ করা সম্ভব। সড়ক পরিবহনে ব্যবহৃত যানবাহনে কম শব্দ বেরোয়, এমন ইঞ্জিন ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা জরুরি। উৎসব, আয়োজনে মাইক বা লাউড স্পিকার বাজানোর জন্য শব্দসীমা নির্ধারণ করা অত্যাবশ্যক। বাড়িঘরে, স্কুল-কলেজে, হাট-বাজারের মতো জায়গায় নিচু স্বরে কথা বলার অভ্যাস করতে হবে।

শব্দদূষণ রোধে জনসচেতনতার পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং ব্যক্তিগত গাড়িচালক, বাসচালক, ট্রাকচালকদের সচেতনতা বৃদ্ধি শব্দদূষণ রোধে সহায়ক হতে পারে। আগামীতে বর্ষবরণের মতো অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে পালনের ব্যাপারে এখনই উপায় খুঁজে বের করতে হবে। বিশেষ করে, পরিবেশ-প্রতিবেশের যাতে কোনো ক্ষতি না হয় সেদিকে মনোযোগী হওয়া জরুরি। অতিরিক্ত উচ্ছ্বাসের বশবর্তী হয়ে শিশু-কিশোররা যাতে বেশি বাড়াবাড়ি বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করে সেদিকে মা-বাবাকে খেয়াল রাখতে হবে। আতশবাজি বা পটকা ফুটানোর নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে শিক্ষকরা তাদের শিক্ষার্থীদের বোঝাতে পারেন। বর্ষবরণের মতো কোনো আনন্দ উদযাপনের পথ বন্ধ করে দিলে হিতে বিপরীত হতে পারে। তাই উন্মুক্ত কোনো স্থানকে বিশেষ জোন করে উৎসব পালনের জন্য নির্ধারণের কথা ভাবা যায়। দেশের শিল্পপতি, ব্যবসায়ীরা তাদের মালিকানাধীন শিল্পকারখানার শব্দ নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারেন। রাজনৈতিক সভা সমাবেশে কম শব্দের লাউড স্পিকার ব্যবহার করে শব্দদূষণ কমিয়ে আনা যায়। শব্দদূষণকে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে গাড়ির হর্ন এবং মাইকের উচ্চশব্দ নীতি নির্ধারকরা সহজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। এ জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও জরুরিভিত্তিতে বাস্তবায়ন করতে হবে। সর্বোপরি, এ ব্যাপারে দেশের নাগরিকদের দায়িত্বশীল আচরণ এবং প্রশাসনকে সহযোগিতা প্রদান শব্দদূষণ রোধ করে পরিবেশবান্ধব নগরী গড়ে তুলে সবার জন্য দেশকে বাসযোগ্য করে তুলতে পারে।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী ও শিক্ষক


ঢাবির শূন্য স্নাতকোত্তর প্রোগ্রাম হোক উন্মুক্ত

আপডেটেড ২৯ জানুয়ারি, ২০২৩ ১২:৩৬
শরিফুল হাসান

বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থীর ইচ্ছা থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটা মাস্টার্স করার। খুবই সুন্দর ইচ্ছা। সেই সুযোগ দিতে একটা দারুণ ইতিবাচক সিদ্ধান্তও নিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তবে এখানে আমি বেশ কয়েকটি বাধা দেখছি। সেগুলো দূর করতে পারলে এটা অবশ্যই একটা ভালো সিদ্ধান্ত হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটে গত বছরের ৩০ অক্টোবর একটি নীতিমালা অনুমোদন করেছে। এর ফলে এখন থেকে যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চার বছর মেয়াদি স্নাতক সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত মাস্টার্স বা স্নাতকোত্তর প্রোগ্রামে ভর্তি হতে পারবেন।

বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৩টি বিভাগ ও ১৩টি ইনস্টিটিউটে স্নাতকোত্তরের আসন রয়েছে ৬ হাজার ২৭০টি। আসলে স্নাতক সম্পন্ন করার পর অনেক শিক্ষার্থী বিদেশে চলে যান কিংবা চাকরিতে যোগ দেন। ফলে স্নাতকোত্তরের অনেক আসন ফাঁকা থাকে। সে কারণেই বোধহয় এমন সিদ্ধান্ত।

ইতিবাচক বিষয় হলো, নীতিমালায় বয়স ও শিক্ষাবর্ষের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। আবার স্নাতকোত্তরের ফি বাইরের শিক্ষার্থী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের জন্যও সমান। আমি মনে করি, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে অনেক ছেলেমেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারবে। বিশেষ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

তবে এখানে কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে। সবাই ঢাবির নিয়মিত মাস্টার্স বা স্নাতকোত্তর প্রোগ্রামে ভর্তির জন্য আবেদন করতে পারবেন না। আবেদন করতে হলে ভর্তিচ্ছুক শিক্ষার্থীর স্নাতকে অন্তত ৩ দশমিক ২৫ সিজিপিএ থাকতে হবে। আমি জানি না, বাংলাদেশের কত শতাংশ শিক্ষার্থীর স্নাতকে ৩ দশমিক ২৫ থাকে। বিশেষ করে ইংরেজিসহ অনেক বিষয় আছে যেখানে ৩ দশমিক ২৫ পাওয়া কঠিন।

সে ক্ষেত্রে জিপিএর এই বাধ্যবাধকতা কমানো উচিত। এ ক্ষেত্রে ৩ করলে ভালো হয়। না থাকলে আরও ভালো। বিশ্ববিদ্যালয় সবার জন্য উন্মুক্ত করতে পারে। অনার্সের ফলের জন্য ভাইভায় একটা নম্বর যোগ হতে পারে। তাহলে যারা পিছিয়ে আছে তারা ভর্তি পরীক্ষায় নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ পাবে। আর যার অনার্সের ফল ভালো তার তো সুবিধা হলোই।

আরেকটা বিষয়। যতটা জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থীরা ভর্তি হওয়ার পর যতগুলো আসন ফাঁকা থাকবে, কেবল ওই কয়টি আসনেই বাইরের শিক্ষার্থীদের ভর্তি করা হবে। এখানেও একটু পরিবর্তন করা যেতে পারে। সাধারণত খুব বেশি ছেলেমেয়ে মাস্টার্স মিস করে না, বিশেষ করে ভালো বিষয়গুলোতে যারা পড়ে। কাজেই ফাঁকা আসনে থাকবে খুব অল্প।

ধরুন অর্থনীতি বা আইনে মাস্টার্সে দুটি সিট ফাঁকা থাকল‌, সে জন্য ভর্তি পরীক্ষার আয়োজন করা হলো। বিপরীতে ক্যান্ডিডেট সংখ্যা ছাড়িয়ে গেল ১০ হাজার! কেউ যেন বলতে না পারে ফরম বাণিজ্যের জন্য এটা করা হয়েছে। আমি মনে করি, শুধু শূন্য আসনে ভর্তি না করে বাইরের ছেলেমেয়েদের ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল, কতজন নিয়মিত শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি, বিভাগগুলো কতজন পড়াতে পারবে এসব বিবেচনায় ভর্তি চলতে পারে। তাতে বাইরের ছেলেমেয়েরা উপকৃত হবে।

আসলে শিক্ষার ক্ষেত্রে বয়স বা ফলাফল এগুলো কোনো বাধা না। আর এগুলো বাধা হয় না বলে আমাদের দেশের ছেলেমেয়ে বিশ্বের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয় পড়তে যেতে পারে। আশা করছি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিষয়গুলো বিবেচনা করবে।

জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় না করে আমাদের যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আছে, সেগুলো ভালো করার দিকে নজর দেয়া উচিত এবং সবাইকে সেখানে সুযোগ দেয়া উচিত। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, প্রথম সারির অন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও এ নিয়ে ভাবতে পারে।

আরেকটা কথা, শুধু গৎবাঁধা বিষয় নয়, সময়ের চাহিদা ও প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচিত নতুন নতুন কোর্স খোলা। মনে রাখতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান চর্চার জায়গা। সেখানে কোনো বিষয়ে অনড় না থেকে সবার মঙ্গলের জন্য এবং সবার সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। তাতে দেশেরই উপকার!

সেই সঙ্গে শিক্ষার উদ্দেশ্য কিন্তু শুধু ডিগ্রি বা চাকরি নয়, শিক্ষার উদ্দেশ্য মানুষ তৈরি করা। যে শিক্ষা শুধু সনদ দেয়, নৈতিক ও মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ তৈরি করে না, সেই শিক্ষায় মানবজাতির খুব একটা উপকার হয় না। কাজেই সবার আগে মানুষ হওয়া জরুরি।

(ফেসবুক থেকে)

লেখক: কলামিস্ট


চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দুর্নীতিকে উৎসাহ দেয়

এম এ খালেক
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
এম এ খালেক

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে কর্মী নিয়োগের সুনির্দিষ্ট নিয়ম আছে। একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারী নির্বাচনী পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেয়ে থাকেন। ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান চাইলেই তার পছন্দনীয় ব্যক্তিকে যেকোনো পদে বসিয়ে দিতে পারেন। এমন কী চাইলে তার নিজের আত্মীয়স্বজনকে কোম্পানির শীর্ষ পদে বসিয়ে দিতে পারেন। ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে একজন কর্মীর বয়সসীমা বলে তেমন কিছু থাকে না। মালিক চাইলে যে কাউকে নির্দিষ্ট বয়সের পরও চাকরিতে বহাল রাখতে পারেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে প্রবেশ এবং চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের একটি নির্দিষ্ট বয়স আছে। সেই বয়সসীমা সবাইকে মেনে চলতে হয়।

অজ্ঞতা বা অসাবধানতাবশত অধিকাংশ মানুষই রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে ‘সরকারি’ প্রতিষ্ঠান বলে থাকেন। আসলে এটা মোটেও ঠিক নয়। কারণ যে চারটি আবশ্যিক উপাদান বা উপকরণ নিয়ে রাষ্ট্র গঠিত হয় তার মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল এবং একমাত্র পরিবর্তনশীল উপাদান হচ্ছে সরকার। সরকার যায়, সরকার আসে। কিন্তু রাষ্ট্র তার আপন মহিমায় জেগে থাকে। সরকার হচ্ছে জনগণের পক্ষ থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। অর্থাৎ সরকার হচ্ছে রাষ্ট্রের জিম্মাদার মাত্র। সরকার যেমন রাষ্ট্রের মালিক নন, তেমনি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিরাও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিক নন। মালিকানাগত এই ধারণা বা ভিত্তি থেকেই রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ভিন্ন স্বরূপ উপলব্ধি করা যায়।

ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় সরাসরি মালিকের অধীনে। অর্থাৎ ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে মালিক স্বয়ং উপস্থিত থাকেন। আর রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় প্রতিনিধির মাধ্যমে। মালিক সেখানে সরাসরি উপস্থিত থাকেন না। ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে মালিক স্বয়ং উপস্থিত থাকেন বলে সেখানে জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতা থাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে কোনো কর্মী দুর্নীতি বা অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত হলেই তার চাকরিচ্যুতি বা কঠোর শাস্তি অনিবার্য। কিন্তু রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে মালিক স্বয়ং উপস্থিত থাকেন না বলে সেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কোনো বালাই থাকে না। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে ‘দুর্নীতির সঙ্গে দুর্ভাগ্য’ যুক্ত না হলে কারও চাকরি যায় না। কিন্তু ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে সামান্য দুর্নীতি বা অনিয়মের ঘটনা ঘটলেও একজন কর্মীর চাকরি চলে যেতে পারে।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে একজন কোনোভাবে চাকরিতে প্রবেশ করতে পারলে ৫৯ বছর বয়স পর্যন্ত তার চাকরি মোটামুটি নিশ্চিত। দুর্নীতি করলেও সাধারণত কারও চাকরিচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা থাকে না। কারণ যারা দুর্নীতির তদন্ত করে থাকেন তারা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানেরই কর্মকর্তা। কাজেই একজন সহকর্মীর প্রতি তাদের সহানুভূতি থাকাটাই স্বাভাবিক। যেহেতু দুর্নীতির সঙ্গে দুর্ভাগ্য যুক্ত না হলে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে একজন কর্মীর চাকরি চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে না। তাই এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের দুর্বিনীত ভাব প্রত্যক্ষ করা যায়। যেহেতু ৫৯ বছর বয়সের পর আর চাকরিতে বহাল থাকার সম্ভাবনা থাকে না, তাই অনেকেই চেষ্টা করে কীভাবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিজেদের আখের গুছিয়ে নেয়া যায়।

সর্বশেষ বেতন কাঠামো অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের যে বেতন-ভাতা প্রদান করা হয় তা বেশ মেটো অঙ্কের হলেও বর্তমান অস্বাভাবিক উচ্চ মূল্যস্ফীতিকালে তা পর্যাপ্ত বলে বিবেচনার অবকাশ নেই। এই বেতন-ভাতা দিয়ে স্ট্যাটাস অনুযায়ী একজন কর্মকর্তার সংসার চালানোই কঠিন। এরপরও যদি কোনো রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী বিত্তের পাহাড় গড়ে তোলেন তাহলে বুঝতে হবে ‘ডাল মে কুচ কালা হ্যায়।’ কিছু দিন আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন বলেছিলেন, কানাডার বেগম পাড়ায় যেসব বাংলাদেশির বাড়ি রয়েছে তাদের একটি বড় অংশই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা যদি সৎভাবে জীবনযাপন করেন তাহলে তার সংসার চালানোই কঠিন। তিনি কানাডায় বাড়ি ক্রয় করেন কীভাবে? রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই দুর্নীতি আর অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান মূলত দুর্নীতি আর অনিয়মের কারণেই বছরের পর বছর লোকসান দিচ্ছে। একই ধরনের ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান লাভজনকভাবে পরিচালিত হলেও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান লোকসান দিচ্ছে। যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যেত তাহলে কোনো রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানই লোকসান দিতে পারে না।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগ কর্মীই প্রতিষ্ঠানটিকে নিজের প্রতিষ্ঠান মনে করেন না। তারা মনে করেন, ৫৯ বছর বয়স হয়ে গেলে তাদের প্রতিষ্ঠানের চাকরি থেকে অবসর নিতে হবে। কাজেই সময় থাকতে যা পার করে নাও। তাই রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে চাকরি পদ্ধতির ব্যাপক পরিবর্তন করা প্রয়োজন। চাকরি পদ্ধতি পরিবর্তন ছাড়া কর্মীদের মনোভাব পাল্টানো যাবে না। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে একবার চাকরিতে প্রবেশ করতে পারলে ৫৯ বছর বয়স পর্যন্ত তার কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়ে যায়। এটা একজন কর্মীর মনে অহমিকা জাগ্রত করতে পারে। তাই এ পদ্ধতি পরিবর্তন করা এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী চাকরির ব্যবস্থা বা পদ্ধতি পরিবর্তন করা প্রয়োজন। প্রতিটি চাকরিতে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কর্মী নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। যেমন, একজন কর্মী তিন বছরের জন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ লাভ করবেন। এই তিন বছরে তার কার্যক্রম এবং আচার-আচরণ যদি সন্তোষজনক হয় তাহলে পরবর্তী পদে পদোন্নতি দিয়ে চাকরির মেয়াদ আরও তিন বছর বাড়ানো যেতে পারে। এভাবে তিন বছর পর পর পদোন্নতিসহ চাকরির মেয়াদ বাড়তে থাকবে। একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর তারা চাকরি থেকে অবসরে গমন করবেন। কারও মাঝে দক্ষতার অভাব দেখা দিলে তাকে একই পদে আরও তিন বছর রাখা যেতে পারে। কিন্তু কারও মাঝে সামান্যতম দুর্নীতি বা অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে চাকরিচ্যুত করা যেতে পারে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে একটি আলাদা বিভাগ থাকবে, যারা কর্মীদের দক্ষতা এবং সততা নিশ্চিত করবেন।

একই সঙ্গে কর্মকর্তাদের অ্যানুয়াল কনফিডেন্সিয়াল রিপোর্ট (এসিআর) লিখন পদ্ধতি পরিবর্তন করতে হবে। বর্তমানে অধিকাংশ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তার নিচের পর্যায়ের কর্মকর্তার এসিআর লিখে থাকেন। এসিআর খারাপ হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পদোন্নতি, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি সুবিধা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এমনকি পদাবনতিও ঘটতে পারে। তাই নিচের পর্যায়ের কর্মকর্তারা সব সময়ই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তোয়াজ করে চলতে বাধ্য হন। এসিআর লিখন পদ্ধতি চালু করেছিল ইংরেজরা। তারা স্থানীয়দের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বহাল রাখার জন্য এই পদ্ধতির উদ্ভাবন করেছিলেন। একটি স্বাধীন দেশে এসিআরের মতো অমানবিক পদ্ধতি থাকা উচিত নয়। আর যদি এই পদ্ধতি বহাল রাখতে হয় তাহলে তা হওয়া উচিত দ্বিমুখী পদ্ধতি। অর্থাৎ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যেমন তার নিচের পর্যায়ের কর্মকর্তার এসিআর লিখবেন, তেমনি নিচের পর্যায়ের কর্মকর্তাও তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার এসিআর লিখবেন।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে প্রায়ই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগদানের একটি পদ্ধতি প্রত্যক্ষ করা যায়। এটি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা উচিত। কারণ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তা কখনোই প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কর্মকর্তার মতো দায়িত্বশীল এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনুগত হতে পারেন না। কেউ-ই একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যাবশ্যক নন। পৃথিবীতে এখনো এমন কোনো ব্যক্তির জন্ম হয়নি যাকে ছাড়া একটি প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না। একজন ব্যক্তিকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হলে সেই প্রতিষ্ঠানের নিচের পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাঝে হতাশা নেমে আসতে বাধ্য। কারণ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নিচের লেভেলের প্রতিটি কর্মীর পদোন্নতি বন্ধ হয়ে যায়। চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতি দায়বদ্ধ হতে পারেন না।

সম্প্রতি একটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৪টি বাড়ি ক্রয়ের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। তিনি একটানা ১৩ বছর সেই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে চুক্তিভিত্তিক দায়িত্বে আসীন রয়েছেন। এই ভদ্রলোকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় নানা অভিযোগ উত্থাপিত হলেও তার ব্যাপারে কোনো তদন্ত এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। যদিও তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ১৪টি বাড়ি থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ২০১৮ সালে ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মূল বেতনের পরিমাণ ছিল ৭০ কোটি টাকা। আর আড়াই হাজার স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী ওভার টাইম ভাতা গ্রহণ করেছেন ৯৫ কোটি টাকা। অভিযুক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ১৩ বছরে বেতন-ভাতা নিয়েছেন ৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এই হচ্ছে চুক্তিভিত্তিক চাকরির দৃষ্টান্ত।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাঁচাতে হলে এদের পরিচালন পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করতে হবে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে দলীয় রাজনীতি চর্চা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে। যারা এসব প্রতিষ্ঠানে বসে দলীয় রাজনীতি চর্চা করেন তাদের উদ্দেশ্য কখনোই ভালো হতে পারে না। কারণ এরা সব সময়ই সরকারদলীয় রাজনীতি করে থাকেন। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, অতীত অপকর্ম থেকে নিজেদের রক্ষা করা অথবা নতুন করে দুর্নীতি-অপকর্মের সুযোগ সৃষ্টি করা। কাজেই এদের কোনোভাবেই ছাড় দেয়া উচিত হবে না।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার-বিডিবিএল ও অর্থনীতিবিষয়ক লেখক


বারবার গুনলে কি বাঘের সংখ্যা বেড়ে যাবে?

মিহির কুমার রায়
আপডেটেড ২৮ জানুয়ারি, ২০২৩ ০৯:২৫
মিহির কুমার রায়

সুন্দরবনের অবস্থান বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তিনটি জেলা এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গের একটি জেলা নিয়ে। এটি একটি নদীমাতৃক বদ্বীপ অঞ্চল। এই অঞ্চল বিভিন্ন ছোট বড় নদী দ্বারা জালের মতো বিস্তৃত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বড় দুটি নদী হলো বলেশ্বর ও হুগলি। জাতিসংঘের ইউনেসকো ওয়ার্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে সুন্দরবনকে সুন্দরবন পশ্চিম (বাংলাদেশ), সুন্দরবন দক্ষিণ (বাংলাদেশ), সুন্দরবন পূর্ব (বাংলাদেশ) ও সুন্দরবন নর্থ পার্ক (ভারত)- এই চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে। সুন্দরবনের মোট আয়তন ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে বাংলাদেশের মধ্যে পড়েছে ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার (৬২ শতাংশ) এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দুই জেলা উত্তর চব্বিশ পরগনা ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনাজুড়ে রয়েছে বাকি ৩৮ শতাংশ।

বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ১৮৭৪-৭৫ সালে সুন্দরবন বিভাগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সুন্দরবনে সংরক্ষিত বন ব্যবস্থাপনার গোড়াপত্তন হয়। ১৮৭৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বন আইন (১৮৬৫ সালের বন আইনের ২ নম্বর ধারা) অনুযায়ী বর্তমান খুলনা ও বাগেরহাট জেলার সুন্দরবনের বনাঞ্চলকে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর ১ আগস্ট ১৮৭৬ সালে বর্তমান সাতক্ষীরা জেলাধীন সুন্দরবনের বনাঞ্চলকে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৮৭৯ সালের ২৩ জানুয়ারি আবারও সুন্দরবনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে গেজেট প্রকাশ করা হয়। এটি করা হয় ১৮৭৮ সালের বন আইনের ৩৪ নম্বর ধারা মোতাবেক। সর্বশেষ ১৯১৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি গেজেটের মাধ্যমে সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হয়।

১৯৯৩ সালের আগে সুন্দরবনসহ সমগ্র উপকূলীয় এলাকার বনাঞ্চল ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ‘প্লান্টেশন সার্কেল’-এর ওপর অর্পিত ছিল। ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে প্লান্টেশন সার্কেল বিভক্ত হয়ে যায় এবং সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনাঞ্চল ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নবপ্রতিষ্ঠিত ‘খুলনা সার্কেল’-এর ওপর ন্যস্ত করা হয়। তখন সমগ্র সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনাঞ্চল ‘সুন্দরবন বিভাগ’ এর নিয়ন্ত্রণে ছিল। ২০০১ সালে তা ভাগ করে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগ ও সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হয়। সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের সদর দপ্তর খুলনায় এবং সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের সদর দপ্তর বাগেরহাটে অবস্থিত।

সুন্দরবন এলাকায় ৪৫৩ প্রজাতির গাছ ও প্রাণীর বাস। এর মধ্যে সুন্দরী গাছ ও রয়েল বেঙ্গল টাইগার বাঙালির অহঙ্কার। তার পরও জলবায়ুর পরিবর্তন ও প্রতিকূল পরিবেশের কারণে প্রাণিকূল, বিশেষ করে রয়েল বেঙ্গল টাইগার এখন প্রায় বিপন্নের পথে। শুধু সুন্দরবন কেন, সারা বিশ্বেই বাঘ এখন বিপন্ন প্রাণীর তালিকাভুক্ত। বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়, বর্তমানে বিশ্বের ১৩টি দেশে ৩ হাজার ৮৪০টি বাঘ প্রকৃতিতে টিকে আছে। সংখ্যাটি শঙ্কাজনক। এর মধ্যে সর্বশেষ ২০১৮ সালের জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের সুন্দরবনে বাঘ আছে ১১৪টি। তার আগে ২০১৫ সালের জরিপে ১০৬টি এবং ২০০৪ সালের জরিপে ৪০৪টি বাঘের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছিল।

সময় সময় সুন্দরবন নিয়ে অনেক দেশি-বিদেশি সংস্থা জরিপ করেছে বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে। এর মধ্যে একটি বহুল পরিচিত পদ্ধতি হলো ক্যামেরা সেটিংয়ের মাধ্যমে বাঘের অস্তিত্ব শনাক্ত করা। বাংলাদেশের বন বিভাগ ২০১৮ সালে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার সুন্দরবনের ২৩৯টি পয়েন্টে ক্যামেরা বসিয়ে ২৪৯ দিনে ২ হাজার ৫০০টি বাঘের ছবি সংগ্রহ করে। এতে যে তথ্য উঠে আসে তা হলো- বাঘ ও বাঘিনীর সঙ্গম প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যে কারণে বাঘের সংখ্যা বাড়ছে না। এই অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে গত বছরের ২৩ মার্চ ‘সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ’ শীর্ষক একটি প্রকল্প অনুমোদন করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫ কোটি ৯৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা।

বাঘ বাঁচানোর এ প্রকল্পের দুটি অংশ রয়েছে। এর একটি হলো- বাঘ গণনা, অন্যটি বাঘ সংরক্ষণ। বাংলাদেশ টাইগার অ্যাকশন প্যান (২০০৯-২০১৭), ২০১০ সালের বিশ্ব বাঘ সম্মেলনের অঙ্গীকার, দ্বিতীয় টাইগার অ্যাকশন প্যান (২০১৬-২০২৭) ও গ্লোবাল টাইগার ফোরামের সিদ্ধান্তের আলোকে দেশে বাঘের হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ, সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণ এবং এর সংখ্যা বৃদ্ধির লক্ষ্যে মন্ত্রণালয় বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের অনুমোদন করে। পরিকল্পনা কমিশন থেকে টাকা ছাড়ের বিষয়টি অনুমোদনের পর বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কিছু প্রক্রিয়া ছিল। সেসব সম্পন্ন করে বাঘ গণনার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ইদানীং একটি সুখবরও শোনা যাচ্ছে। সুন্দরবনে বারবার বাঘ দেখা যাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, বনে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে। তবে গণনা শেষ হলে সঠিক সংখ্যা বলা যাবে। তার আগে খামাখা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে লাভ নেই। শুধু এটুকু মনে রাখতে হবে যে, সুন্দবনের জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে বাঘের গুরুত্ব সব থেকে বেশি। এই প্রকল্পটি মূলত বাঘের বংশবৃদ্ধির জন্য নেয়া হয়েছে।

এরই মধ্যে সুন্দরবনে বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় বাঘ গণনা শুরু হয়েছে। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে এ গণনার ফলাফল প্রকাশ করা হবে। সুন্দরবনের কালাবগি ফরেস্ট স্টেশনের আওতাধীন এলাকা থেকে এ গণনা শুরু হয়েছে। বন বিভাগ থেকে বাঘ গণনার জন্য প্রথমে নদী-খাল জরিপ করে ও বাঘের পায়ের ছাপ দেখে এলাকা নির্ধারণ করা হচ্ছে। পরে ক্যামেরার মাধ্যমে বাঘের ছবি তুলে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে বিশ্লেষণে সংখ্যা নির্ধারণ করা হবে। এ জন্য ৩ কোটি ২৪ লাখ ৩৬ হাজার টাকার অনুমোদন হয়েছে। এরই মধ্যে একটি দল বনে নদী-খাল জরিপের কাজ শুরু করেছে। এ ছাড়া গত ১ জানুয়ারি থেকে ক্যামেরা স্থাপনের কাজ শুরু করা হয়েছে। সুন্দরবনের প্রায় ৮০০টি গ্রিডে ক্যামেরা বসিয়ে বাঘসহ অন্যান্য প্রাণীর ছবি তোলা হবে। পরে তা প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হবে।

আগামী তিন মাস এ ধরনের জরিপ ও ক্যামেরা ট্র্যাপিং চলবে। এরপর আগামী নভেম্বরে আবারও একইভাবে জরিপ ও ক্যামেরা ট্র্যাপিং করা হবে। ২০২৪ সালের মার্চের দিকে এর ফলাফল জানা যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। মানুষ ও বাঘের দ্বন্দ্ব নিরসনে ৪৯টি ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিমের ৩৪০ জন সদস্য ও চারটি রেঞ্জের কমিউনিটি প্যাট্রোল গ্রুপের ১৮৫ জন সদস্যকে প্রশিক্ষণ প্রদান, তাদের পোশাক সরবরাহ ও প্রতি মাসে বনকর্মীদের সঙ্গে মাসিক সভা করার কাজ চলছে।

এ প্রকল্পের মাধ্যমে বাঘ সংরক্ষণ অংশে বাঘের বংশবৃদ্ধির জন্য পুরুষ ও নারী বাঘকে কাছাকাছি রাখতে বাঘ হস্তান্তর, তাদের বিচরণ এলাকা জানার জন্য দুটি বাঘের স্যাটেলাইট সংযুক্তি ও মনিটরিং করা, বাঘের পরজীবীর সংক্রমণ ও অন্যান্য ব্যাধির উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের কাজ চলছে। বাঘ ও অন্যান্য প্রাণী ঘূর্ণিঝড়ের সময় যাতে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে পারে সে জন্য সুন্দরবনে ১২টি মাটির উঁচু কিল্লা স্থাপন করার কাজ অব্যাহত রয়েছে।

এখন একটি প্রশ্ন বারবার আসছে যে, আগের জরিপগুলোর ফল বলছে, সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা কমে গেছে। এতে আরও ধরে নেয়া যায়, বনের বর্তমান পরিবেশ বাঘের বংশবৃদ্ধির অনুকূল নয়। এখন সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে যে জরিপ করছে তা বাঘের বংশবৃদ্ধিতে কতটুকু ফলদায়ক হবে? আরও একটি প্রশ্ন হলো- এ ধরনের প্রযুক্তিসম্পন্ন কাজ করার জন্য বন বিভাগের প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল আছে কিনা? প্রায়ই একটি অভিযোগ বন বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আসে যে, তাদের অসাধুতার কারণে দেশের বন বিভাগ উজাড় হয়ে গেছে। মধুপুর ও ভাওয়ালের গড়ের মতো সংরক্ষিত বনভূমিগুলো হুমকিতে পড়েছে।

এত কিছুর জানার পরও বন বিভাগের কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন থেকেই যায়। বাঘ গণনার জন্য যে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে তা কি বাঘের বংশবিস্তারে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে, না কি শুধুই সরকারের অর্থের অপচয় হবে? কোটি টাকা খরচ করে গণনা করলেই কি বাঘের সংখ্যা বেড়ে যাবে? আমার তো মনে হয়, গণনার কাজ বাদ দিয়ে বাঘের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য সুন্দরবনে যে অনুকূল পরিবেশ দরকার তা তৈরি করা অনেক বেশি জরুরি।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, অধ্যাপক, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা


বই নিয়ে ষড়যন্ত্রের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না

আপডেটেড ২৮ জানুয়ারি, ২০২৩ ০৯:০২
আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক

পাঠ্যপুস্তকে ভুল করাটা কোনোভাবেই বাঞ্ছনীয় নয়। তবে যেসব ভুল হয়নি সেসব বিষয় নিয়েও অপপ্রচার লক্ষ করা যাচ্ছে। অন্য দেশের বইয়ের ছবি দিয়ে আমাদের দেশে প্রচার করা হচ্ছে। বাস্তবে যেটার কোনো অস্তিত্ব নেই। এটিও ভুলের মতো মারাত্মক ঘটনা। সুতরাং পাঠ্যবই নিয়ে ষড়যন্ত্রের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না।

পাঠ্যবইয়ে ভুল হয়েছে, সেটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও স্বীকার করেছে। ভুল সংশোধন করে অতিদ্রুত ছেলেমেয়েদের হাতে বই পৌঁছে দেবে বলে অঙ্গীকার করেছে। এ লক্ষ্যে দুটি কমিটিও গঠন করেছে মন্ত্রণালয়। তারা বলছে, একটি কমিটি ভুল সংশোধন করবে। অন্যটি পাঠ্যপুস্তকে ভুল-ভ্রান্তি করার পেছনে ইচ্ছাকৃত কারোর অবহেলা আছে কি না সেটি দেখবে।

বই নিয়ে সামাজিকমাধ্যমে যারা অপপ্রচার চালাচ্ছেন। সেই কার্যক্রম দেখে বোঝা যায় যে, পাঠ্যপুস্তকের ভুলকে সরকারবিরোধী কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করার অপচেষ্টা তারা করছেন। সেই বিষয়ে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।

পাঠ্যপুস্তকে যেসব ভুল আমরা লক্ষ করেছি সেগুলো অবহেলাজনিত বলে মনে হয়েছে। সাধারণভাবে এ ধরনের ভুল হওয়ার কথা নয়। যাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, তারা এ ধরনের ভুল করবেন এটা মনে হয় না। এটা হয়তো চোখে এড়িয়ে গিয়েছে। অথবা যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে তারা বিষয়টি দেখেননি। আমি মনে করি ভবিষ্যতে যাদের পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নে দায়িত্ব দেয়া হবে, তাদের এমনভাবে বাছাই করা হোক, যেন সেসব শিক্ষকরা বাইরের কাজে অনেক বেশি ব্যস্ত না থাকেন। কারণ একজন শিক্ষক স্বাভাবিকভাবেই অনেক কমিটির দায়িত্বে থাকেন। তাদেরই আবার পাঠ্যপুস্তকের দায়িত্ব দেয়া হলে তারা যথাযথভাবে সময় দিতে পারেন না। এটা একটা বড় সমস্যা বলে আমি মনে করি। অনেক শিক্ষক আছেন যারা অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকেন না। কম ব্যস্ত মানুষ কিন্তু নিবেদিত, এমন শিক্ষকদের দায়িত্ব দেয়া হলে ভুলের মাত্রা কমানো সম্ভব হবে।

পাঠ্যবইয়ে ভুল হলে আমাদের ছাত্রছাত্রীরা ভুলকেই সঠিক মনে করে। শিক্ষকরা যতই শুদ্ধটা বলুক না কেন, শিক্ষার্থীরা মনে করে পাঠ্যবইয়ে যেটা আছে সেটাই সঠিক। পাঠ্যবইকে তারা ধর্মগ্রন্থের মতো মর্যাদা দিতে চেষ্টা করেন। সেই কারণে পাঠ্যবইয়ের দায়িত্বে যারা থাকবেন তাদের আরও বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন রয়েছে।

প্রতিবছরই পাঠ্যবইয়ে কিছু ভুল-ত্রুটি থাকে। এবার ভুলের মাত্রা অনেক বেশি বলে মনে হয়েছে। বই বিতরণের পর থেকেই দেশের মূল ধারার গণমাধ্যমে একের পর এক তথ্য উঠে এসেছে। আমার কাছে মনে হয় ভুল হয়েছে বিধায় গণমাধ্যমে সেটা প্রকাশ করেছে। আবার ভুল প্রকাশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকেও তা সংশোধনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। সেটিও প্রশংসনীয় কাজ। ভুল হলে তাৎক্ষণিকভাবে স্বীকার করা, পরিপ্রেক্ষিতে সংশোধনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। সেই পদক্ষেপটি শিক্ষা মন্ত্রণালয় নিয়েছে বলে লক্ষ করেছি।

বিষয়:

আলোকিত সন্তান চান, তবে ঘর হোক লাইব্রেরি

আপডেটেড ২৭ জানুয়ারি, ২০২৩ ১১:৪৫
সরকার আবদুল মান্নান

বই পড়া নিয়ে এখন আর কাউকে কথা বলতে শুনি না। আর লেখালেখি তো নয়ই। বই পড়া নিয়ে কোনো প্রবন্ধ-নিবন্ধ চোখে পড়ছে না অনেক দিন ধরে। কেউ লিখছেন না। একসময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, প্রমথ চৌধুরী লিখেছেন এবং আরও অনেকে লিখেছেন। তখন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষের মধ্যে বই পড়ার সংস্কৃতি তৈরি হতো স্কুলজীবন থেকেই। আমি পাঠ্যপুস্তকের কথা বলছি না। বলছি ‘আউট বই’-এর কথা। শৈশবে পাঠ্যপুস্তকের বাইরে অন্য সব বইকে আমরা ‘আউট বই’ বলতাম।

এখন শৈশব থেকে শিক্ষার্থীদের ঘাড়ে পাঠ্যপুস্তকের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে আমরা প্রায় নিশ্চিত হয়ে যাই যে, শিশুদের পড়াশোনা ভালোই হচ্ছে। কিন্তু এ কথা নিশ্চয়ই কেউই অস্বীকার করবেন না, আজ অবধি পাঠ্যপুস্তক শিখন-শেখানোর আনন্দদায়ক শিখনসামগ্রী হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়নি। এর মানে এই নয় যে, আমরা শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তকবিমুখ করার প্রেরণা জোগাব। তা আমরা করব না। বরং বিদ্যায়তনিক পরিবেশে এবং বাড়িতে কী করে তারা আনন্দের সঙ্গে পাঠ্যপুস্তক পাঠ করবে, সে ধরনের পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করব। কিন্তু এও জানা যে, এই চেষ্টা সুদূরপরাহত।

তা হলে আমরা কী করতে পারি? খুব সহজ একটি কাজ করা যেতে পারে, আর তা হলো বাড়িতে শিশু-কিশোরদের উপযোগী প্রচুর বইয়ের সমহার ঘটানো। এ প্রসঙ্গে একটি গল্পের অবতারণা করা যায়। যিনি ব্যক্তিজীবনের এই গল্পটি বলেছেন, তার নাম ওল্ফ, ম্যারিয়েন ওল্ফ। তিনি বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার সেন্টার ফর ডিসলেক্সিয়া, ডাইভারসিভ লার্নার্স অ্যান্ড সোশ্যাল জাস্টিসের পরিচালক। অধ্যাপক ওল্ফ তার প্রথম বই ‘প্রুস্ট অ্যান্ড দ্য স্কুইড’-এ লিখেছেন, তখন তিনি একটি স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। কিন্তু চতুর্থ শ্রেণিতে কী শেখানো হয়, সে বিষয়ে সব শিক্ষার্থীরই ধারণা ছিল। ওই বিষয়ে যখন শিক্ষক তাকে কিছু বলতে বলেন, তখন তিনি অনর্গল বলে যেতে থাকেন। কিছুতেই তিনি থামছিলেন না। অতিরিক্ত ও অনর্গল কথা বলার এই অভ্যাস তার জন্য একটি রোগের লক্ষণ ছিল। শিক্ষক ধৈর্যসহকারে তার কথা শুনেছেন এবং তার রোগটি চিহ্নিত করতে চেষ্টা করেছেন। পরে ওল্ফের দরিদ্র মা-বাবার সঙ্গে দেখা করেন ওই শিক্ষক এবং তাকে গ্রন্থের মধ্যে, পঠন-পাঠনের মধ্যে ব্যস্ত রাখার পরামর্শ দেন।

ওল্ফের জন্য সেভাবেই ব্যবস্থা করা হয়েছিল। প্রচুর বইয়ের মধ্যে, নানা রকম ও নানা বিষয়ের বইয়ের মধ্যে তার শৈশব অতিবাহিত হয়। অনেক বইয়ের মধ্যে প্রফেসর ওল্ফ একটি বইয়ের কথা কখনো ভুলে যাননি, আর সেই বইটি হলো ‘অল অ্যাবাউট স্টারস’। তিনি লিখেছেন, ‘বই আমার ছোটবেলার জীবন বদলে দিয়েছে।’ তিনি আরও লিখেছেন যে, তার জীবনে যদি ওই মহৎ বইগুলোর সঙ্গে পরিচয় না ঘটত, তিনি যদি ওই বইগুলো থেকে বিপুল এক জীবনের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে না পারতেন, তা হলে আজকের এই জ্ঞানসমুদ্রের দিশা তিনি কোনো কালেই পেতেন না। বাচালের মতো কথা বলেই তার জীবন নিঃশেষিত হতো। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত নীরবে-নিভৃতে বইয়ের সঙ্গে কথা বলে তার মধুর সময় অতিবাহিত করার সুযোগ হতো না।

প্রশ্ন হতে পারে, এসব ‘আউট বই’ পড়ে কী হবে? এর সঙ্গে পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করার সম্পর্ক কী? ওপরে উল্লিখিত ঘটনার আলোকে এই জিজ্ঞাসার পুরো উত্তর পাওয়া যাবে না। তবে উত্তর খুব সোজা। অনেক কিছু হওয়ার সম্ভাবনা আছে। প্রথমত, শিশু-কিশোরদের শব্দভাণ্ডারের জগৎ সমৃদ্ধ হবে; ভাষাবোধ তীব্র ও শানিত হবে; তথ্যভাণ্ডার প্রসারিত হবে; সৃজনশীল প্রতিভা বিকশিত হবে এবং অবশ্যই পরীক্ষা ও রেজাল্ট ভালো হবে। এই হলো বই পড়ার একদিক। অন্যদিক আছে বখে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে মুক্তি লাভ। কেউ কি কখনো শুনেছেন, যে শিশুরা বইয়ের মধ্যে বেড়ে উঠেছে, বই না পড়লে যাদের পেটের ভাত হজম হয় না, তারা কেউ নেশাগ্রস্ত হয়েছে, মাস্তান হয়েছে, অপরাধী হয়েছে? আমার এই প্রায় ৬০ বছর জীবনে এমন কোনো নজির পাইনি।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সবচেয়ে দুর্বলতার জায়গাটি হলো একমুখিনতা। নবম-দশম শ্রেণি পর্যন্ত আমরা বিচিত্র বিষয় পড়ার সুযোগ পাই। এই বৈচিত্র্য কমে আসে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে। তখন আমাদের জানার পরিধিও কমে আসে। আমরা বিজ্ঞান নিয়ে, মানবিকী বিজ্ঞান নিয়ে বা ব্যবসায় শিক্ষা নিয়ে পড়ি। ক্রমে আমরা ওই সব বিষয়ের আরও কোনো ক্ষুদ্রতর অধ্যায় নিয়ে পড়ি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সব ক্ষেত্রেই এই পরিধি সংকোচিত হতে থাকে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, যে বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করে শিক্ষাজীবন শেষ করা হলো, কর্মক্ষেত্রে সেই বিদ্যার সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক থাকে না। কিংবা অধিকাংশ সময় পেশাগত জীবনে এই ক্ষুদ্রতর অধ্যায়ে গভীরত গবেষণার মধ্যে নিজেকে ব্যাপৃত রাখি। সব সর্বনাশের মূল এখানেই। কারণ, ওই অধ্যয়নের যে পর্যায়ে গেলে জ্ঞানের সব শাখা একাকার হয়ে যায়, সেখানে আমরা পৌঁছোতে পারি না এবং পারি যে না, তাও বোঝার শক্তি আমাদের থাকে না। কিংবা আমাদের পেশাগত জীবনে অধ্যয়নের অধ্যায় শেষ হয়ে যায়। ফলে অধিকংশ ক্ষেত্রে যে শিক্ষিত সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়, সেই সম্প্রদায় মানবিক মানুষ হয়ে ওঠে না। তারা সুন্দর-অসুন্দরের ব্যবধান বোঝেন না, ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য চিহ্নিত করতে পারেন না, নানা রকম বৈপরীত্যের মধ্যে ঐক্য সংস্থাপন করতে পারেন না, তাদের মধ্যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সৃষ্টি হয় না এবং সর্বোপরি তাদের মধ্যে এমন কোনো মহৎ বোধ তৈরি হয় না, যাকে আশ্রয় করে তারা চমৎকার এক জীবন অতিবাহিত করতে পারে।

যে কথাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো, পাঠ্যপুস্তকের বাইরে যদি ঘরে ঘরে আমরা নানা রকম গ্রন্থের সমাহার না ঘটাই, তাহলে আমাদের শিশুদের মধ্যে গ্রন্থ পাঠের অভ্যাস তৈরি হবে না। আর যদি তাদের মধ্যে গ্রন্থ পাঠের অভ্যাস তৈরি না হয়, যদি প্রতিনিয়ত তারা বিচিত্র জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য গ্রন্থের প্রতি কৌতূহল অনুভব না করে, তা হলে কী নিয়ে তারা সময় কাটাবে? তার তো কৃষক নয়, চাকুরে নয়, ব্যবসায়ী নয়, তারা শিক্ষার্থী। প্রাতিষ্ঠানিক শিখন-শেখানো কার্যক্রমের বাইরে তাদের যথেষ্ট সময় থাকার কথা এবং সেই সময় খেলাধুলার পাশাপাশি তাদের আরও কাজ থাকতে হবে। যদি তা না থাকে, যদি সুষ্ঠু বিনোদনের ব্যবস্থা না করা হয়, তা হলে তারা এমন বিনোদনের পথ বেছে নেবে, যে বিনোদন তাদের জন্য কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে না। যেমন: টেলিভশন, ফেসবুক, ইউটিউব ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতি নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়া।

এই প্রবণতা ব্যক্তি-শিশুটির জন্য কিংবা পরিবার-পরিজনের জন্য কিংবা সমাজের জন্য এবং এমনকি রাষ্ট্রের জন্য সুখকর নয়। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তার প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করে বটে, কিন্তু প্রয়োজনের বাইরে যে জগতের সঙ্গে সে পরিচিত হচ্ছে, যেখান থেকে সে কিছুতেই নিজেকে মুক্ত করতে পারছে না, সেই জগৎ তার জন্য তো কল্যাণকর নয়ই এবং অন্য কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনবে না। সুতরাং আমাদের আবারও বিবেচনা রাখতে হবে যে, একটি আলোকিত প্রজন্ম তৈরির জন্য গ্রন্থ পাঠের বিকল্প আর কিছু হতে পারে না। এই গ্রন্থ পাঠের অভ্যাস আমরা কী করে তৈরি করতে পারি, এই বিষয়টি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।

অধিকাংশ সচ্ছল পরিবারে লক্ষ করা যায় যে, প্রতিনিয়তই সংসারের নানা প্রয়োজনে কিংবা অপ্রয়োজনে বিচিত্র সামগ্রী ক্রয় করা হয়। বাসায় প্রচুর ফার্নিচারের সমাহার ঘটানো হয়। এগুলোরও হয়তো প্রয়োজন আছে। কিন্তু গুরুত্বের ক্রম বিবেচনায় রাখা দরকার। বিশেষ করে যেসব বাসায় শেষ পর্যন্তু বই রাখার কোনো স্থানের সংকুলান নেই, সেসব বাসার কথা বলছি এবং যেসব বাসায় বই রাখার স্থান অছে, তাদের কথাও বিবেচনায় রাখতে হবে। কারণ, অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো বাসায়াই বই থাকে না। এবং যেসব সামগ্রী দিয়ে বাড়ি বা বাসায় তিল ধারণের স্থান রাখা হয় না, সেসব সামগ্রী সত্যিকার অর্থে শিশু-কিশোরদের কিংবা ওই পরিবারের পরিণত বয়সের সদস্যদের খুব কি একটা কাজে লাগে? মনে হয়, সবাই একমত হবেন যে, এর অধিকাংশই বড়লোকপনা দেখানোর অভিপ্রায় মাত্র। শেষ পর্যন্ত এসব আয়োজন কোনো কাজে আসে না। বরং সন্তানরা যদি ভালো মানুষ হয়, তার চেয়ে ভালো উপঢৌকন আর কী হতে পারে! সুতরাং অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র কমিয়ে যদি প্রতিটি পরিবারে বুক শেলফ স্থাপন করা হয় এবং প্রতি মাসেই যদি সুনির্বাচিত কিছু বই ক্রয় করা হয়, তাহলে কোনো না কোনো সময়ে কেউ না কেউ ওই বইগুলোর দু-একটি বের করে দু-এক পাতা ওলটাবে, আবার এমন বইও সেখানে থাকবে, যেটি পড়ে শেষ না করে মুক্তি পাবে না। কোনো বই কারও জীবনের মোড়ও ঘুরিয়ে দিতে পারে।

এসব বই পড়ার জন্য শিশুদের বলতে হয় না। নিজের ভালো লাগার তাগিদেই তারা পড়বে। আর কোনো ছেলেমেয়ে যদি তাও না পড়ে, তাতে হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। তখন বুঝতে হবে, অন্য কোনো সম্ভাবনা তার মধ্যে আছে এবং আমরা তার প্রতি বিশ্বাস রাখতে পারি। এভাবে একটি পঠন-অভ্যাসকেন্দ্রিক পরিবার গড়ে তোলা যেতে পারে। নিশ্চিত করে বলা যায় যে, শৈশব থেকে যেসব শিশু গ্রন্থ পাঠের অভ্যাসের ভেতর দিয়ে বেড়ে উঠবে, তাদের বিপথগামী হওয়ার আশঙ্কা অনেক কম। বলব, নেই বললেই চলে।

বই পড়া এমন এক নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া, যার ভেতর দিয়ে একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে শুধু যে জীবন ও জগতের প্রতি গভীর মমত্ববোধ সৃষ্টি হবে তা নয়, বরং আরও কত রকমের দক্ষতা, বোধ ও সংবেদনা যে তার মধ্যে তৈরি হবে, তাকে এক-দুই করে চিহ্নিত করা সম্ভব নয়। কেননা যে শব্দকে ভালোবাসে, ভাষাকে ভালোবাসে, শব্দের ভেতরগত বিচিত্র রহস্যকে ভালোবাসে, বাক্যের অন্তরালবর্তী ফাঁকফোকর গলিয়ে যার মধ্যে চিন্তার বিচিত্র মাত্রা আপন স্বভাবে ধরা দেয়, তার জন্য আর কারও দুশ্চিন্তা করার প্রয়োজন হয় না। কারণ সে বোঝে, চিন্তার চর্চা কীভাবে করতে হয় এবং তার মধ্যে অতি ধীরে ধীরে প্রজ্ঞা তৈরি হয়, মর্যাদাবোধ তৈরি হয়, অহং তৈরি হয় এবং ব্যক্তিত্ব তৈরি হয়। তার মধ্যে যেকোনো বিষয়, পরিবেশ-পরিস্থিতি ও ঘটনা বিশ্লেষণ করার নিজস্ব পরিমাপক তৈরি হয়। এবং যেকোনো নতুন পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে চলার শক্তিও সে লাভ করে গ্রন্থ পাঠের এই অভিজ্ঞতা থেকে। সুতরাং দেরি করব না; চলুন, আজকে থেকেই আমরা কিছু নির্বাচিত বই ক্রয় করে ঘরে ফিরি।

লেখক: গবেষক, শিক্ষাবিদ


banner close