আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। আজ বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে ইশতেহার ঘোষণা করেন দলের সভাপতি শেখ হাসিনা।
ডিজিটাল থেকে স্মার্ট বাংলাদেশে উত্তরণের মাধ্যমে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত 'স্মার্ট সোনার বাংলা' হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয়ে এই নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করা হয়। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ঘোষিত ইশতেহার হুবহু দুলে ধরা হলো:-
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। প্রিয় দেশবাসী, উপস্থিত সুধিমণ্ডলী আসসালামু আলাইকুম। আপনাদের সবাইকে বিজয়ের মাসের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাইকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। টেলিভিশন, রেডিও এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সহায়তায় দেশের অভ্যন্তরে এবং বাইরে যারা এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন তাদেরও শুভেচ্ছা এবং আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
বাংলাদেশের ইতিহাসে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ধারাবাহিকভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার একটানা ১৫ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। পাঁচ বছর মেয়াদি সংসদীয় সরকারব্যবস্থা স্থিতিশীল থাকায় আমরা বাংলাদেশের অভূপূর্ব উন্নতি সাধন করতে পেরেছি। বাংলাদেশ আজ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। তার স্বপ্ন ছিল ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত, উন্নত-সমৃদ্ধ ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তোলা। যুদ্ধবিধ্বস্ত, ক্ষুধা-দারিদ্র্যে জর্জরিত একটি দেশের শাসনভার তিনি নিয়েছিলেন। তিনি হাতে সময় পেয়েছিলেন মাত্র ৩ বছর ৭ মাস ৩ দিন। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল ৯১ মার্কিন ডলার। জাতির পিতা মাত্র ৩ বছরে ১৯৭৫ সালে তা ২৭৭ মার্কিন ডলারে উন্নীত করেন। প্রবৃদ্ধি ৯ ভাগ অর্জন করেন। এই স্বল্প সময়ে ধ্বংসস্তুপ থেকে টেনে তুলে বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদায় উন্নীত করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকদের নির্মম বুলেটে জাতির পিতা নির্মমভাবে নিহত হন। সেই সঙ্গে ঘাতকেরা কেড়ে নেয় বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার সব সম্ভাবনাকে, মহান স্বাধীনতার চেতনা ও আদর্শকে। আমি পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। শ্রদ্ধা জানাই জাতীয় চার নেতার প্রতি। ৩০ লাখ শহিদ ও ২ লাখ নির্যাতিতা মা-বোনকে শ্রদ্ধা জানাই। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জানাচ্ছি সালাম।
অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে স্মরণ করছি- আমার মা বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেছা মুজিব, ছোট তিন ভাই- বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন শেখ কামাল, বীর মুক্তিযোদ্ধা লে. শেখ জামাল, আমার দশ বছর বয়সী ছোট্ট ভাই শেখ রাসেল; কামাল ও জামালের নবপরিণীতা বধু সুলতানা কামাল, পারভীন জামাল, আমার একমাত্র চাচা পঙ্গু বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ আবু নাসের, রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল উদ্দীন আহমেদ, পুলিশ কর্মকর্তা এএসআই সিদ্দিকুর রহমানসহ ১৫ আগস্টে নির্মমভাবে নিহত সকল শহীদকে। আমি তাদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।
সুধিমণ্ডলী, আজকের এ দিনে আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি এই উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক, গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশসহ আওয়ামী লীগের প্রয়াত সকল নেতৃবৃন্দকে। মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষার জন্য যারা অকাতরে জীবন দিয়েছেন সেই ভাষা শহীদদের প্রতি আমি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। স্মরণ করছি, ২০০৪ সালের ২১-এ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় নিহত আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভী রহমানসহ ২২ জন নেতা-কর্মীকে। স্বাধীনতার পূর্বে এবং স্বাধীনতার পরবর্তীকালে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক এবং ভোট ও ভাতের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে যারা নিহত হয়েছেন তাদের স্মরণ করছি।
প্রিয় দেশবাসী, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে জাতির পিতাকে হত্যার সময় আমি এবং আমার ছোটবোন বিদেশে ছিলাম। সে কারণে আমরা প্রাণে বেঁচে যাই। দীর্ঘ ৬ বছর আমরা রিফিউজি হিসেবে প্রবাস জীবন কাটাতে বাধ্য হই। তৎকালীন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান আমাদের দেশে আসতে বাধা দেয়। ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও জনগণের সমর্থন নিয়ে আমি দেশে ফিরে আসি। অবৈধভাবে ক্ষমতাসীন সরকার, জাতির পিতার হত্যাকারী ও ষড়যন্ত্রকারী এবং যুদ্ধাপরাধীদের সকল রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই আমি দেশে ফিরে আসি। শুরু করি জনগণের ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। এজন্য বার বার আমার উপর আঘাত এসেছে। জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের লক্ষে সামরিক শাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি, বার বার গ্রেফতার হয়েছি। আমাকে অন্তত ১৯ বার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু আমি দমে যাইনি। অবশেষে মানুষের ভোটের অধিকার জনগণের হাতে ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হই। ১৯৭৫ সালের বিয়োগান্তক ঘটনার ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়লাভের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। অবসান হয় হত্যা, ক্যু ও সামরিক শাসনের। ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন থেকে ২০০১ সালের ১৫ জুলাই - এই ৫ বছর পূর্ণ করে ২৬ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বপ্রথম শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে আমরা ধান ও দানাদার শস্য উৎপাদন বৃদ্ধি করে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করি। স্বাক্ষরতার হার বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি গ্রহণ, বয়স্ক, বিধবা, স্বামী নিগৃহীতা ও প্রতিবন্ধী ভাতা প্রবর্তন এবং বর্গাচাষীদের বিনা জামানতে কৃষি ঋণ প্রদান করি। ২০০১ সালের ১লা আক্টোবরে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক সম্পদ গ্যাস বিক্রির প্রতিশ্রুতি দিয়ে এবং নানা চক্রান্তের ফসল হিসেবে বিএনপি জামাত-জোট ক্ষমতার মসনদে আরোহন করে। ক্ষমতায় বসেই চরম দুর্নীতি, দুঃশাসন, হত্যা, নারী ধর্ষণ, হিন্দু-মুসলমান-খ্রিস্টান-বৌদ্ধসহ আওয়ামী লীগের অগণিত নেতাকর্মীর উপর আমানবিক নির্যাতন, লাশ গুমসহ সমগ্র দেশে হত্যা, ত্রাস ও গুমের রাজত্ব কায়েম করে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশে গ্রেনেড হামলা করে ২২ নেতা-কর্মীকে হত্যা এবং ৫০০’র বেশি মানুষকে আহত করে। জেলায় জেলায় বোমা হামলা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অস্ত্রের ঝনঝনানি, সেসন জট, ছাত্রছাত্রীদের অনিশ্চিত জীবন ছিল বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সময়কার সাধারণ চালচিত্র। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, অস্ত্র চোরাকারবারি, মানি লন্ডারিং, ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ, হাওয়া ভবনের দ্বৈত শাসনে জনজীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠেছিল।
মেয়াদ শেষে ২০০৬ সালে ক্ষমতা হস্তান্তর করে নির্বাচন দেওয়ার কথা থাকলেও বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে নানা ছলচাতুরির আশ্রয় নিতে থাকে। নির্বাচনে কারচুপির উদ্দেশ্যে ১ কোটি ২৩ লাখ ভুয়া ভোটারসমেত ভোটার তালিকা প্রণয়ন এবং আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন গঠন করে। তাদের এসব কর্মকা- বাংলাদেশকে অন্ধকারের পথে ধাবিত করে। যার ফলে দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়। সামরিক বাহিনী অন্তরালে থেকে ক্ষমতা দখল করে। ইয়াজুদ্দীন, ফখরুদ্দীন, মইনুদ্দীনের এই সরকার জনগণের অধিকার হরণ করে তাঁদের উপর স্টিমরোলার চালানো শুরু করে। প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোকে ভেঙে ফেলার উদ্যোগ নেয়। আমাকে এবং আমার দলের বহু নেতাকর্মীসহ অন্যান্য দলের নেতাকর্মীদের বন্দি করা হয়। ভিন্ন দল গঠন করার চেষ্টা করে নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু তাদের এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে সচেতন দেশবাসী ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ায়। জনগণের আন্দোলনের মুখে তারা ৯ম সংসদ নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। তবে নির্বাচন সংস্কারের যে দাবি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট উপস্থাপন করেছিল সেগুলি থেকে তারা কিছু বিষয় কার্যকর করে- যেমন: ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়ন, ১ কোটি ২৩ লাখ ভূয়া ভোটার লিস্ট বাতিল, এবং স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স ব্যবহার। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। আওয়ামী লীগ এককভাবে ২৩৩টি আসনে বিজয়ী হয়। আর বিএনপি এককভাবে মাত্র ৩০টি আসনে জয়ী হয়। বাকি আসনগুলি উভয় জোটের শরিকেরা পায়।
প্রিয় দেশবাসী, ২০০৮ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে আমরা রূপকল্প-২০২১-এর ঘোষণা দিয়েছিলাম। দিন বদলের সনদ হিসেবে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করি। এরপর শত বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে ২০১৪ ও ২০১৮ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে আমরা সফলভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করে আসছি। গত ১৫ বছরে বাংলাদেশের রূপান্তর ঘটেছে। আজকের বাংলাদেশ দারিদ্র্যক্লিষ্ট, অর্থনৈতিকভাবে ভঙ্গুর বাংলাদেশ নয়। আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে পারি, আজকের বাংলাদেশ বদলে যাওয়া বাংলাদেশ। সম্ভাবনার হাতছানি দেওয়া দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলা দুরন্ত বাংলাদেশ। ছোটখাট অভিঘাত আজ আমাদের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না। করোনা মহামারিসহ নানা অভিঘাত মোকাবিলা করে সেই প্রমাণ আমরা রেখেছি। করোনা মহামারির মধ্যেই আমরা ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করেছি। এ সময়ই জাতিসংঘ বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
সুধিবৃন্দ, দ্বাদশ নির্বাচনকে সামনে রেখে আমরা আবারও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। অতীতের ধারাবাহিকতায় এবারও আমরা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে একটি বাস্তবায়নযোগ্য নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করেছি। ২০০৮, ২০১৪ এবং ২০১৮-এর নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনাগুলির ধারাবাহিকতা দ্বাদশ নির্বাচনী ইশতেহারেও রক্ষিত হয়েছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বাদশ নির্বাচনী ইশতেহার পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করা হয়েছে। এখানে এই স্বল্প সময়ে তা সবিস্তারে তুলে ধরা সম্ভব নয়। আমি সংক্ষিপ্তাকারে কয়েকটি বিষয় আমার লিখিত বক্তব্যে আপনাদের সামনে তুলে ধরছি:
৩.১ ডিজিটাল থেকে স্মার্ট বাংলাদেশে উত্তরণ
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে বিশ্ব প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য প্রযুক্তি সক্ষমতা একান্ত প্রয়োজন। এজন্য আমরা ‘স্মার্ট নাগরিক’, ‘স্মার্ট সরকার’, ‘স্মার্ট অর্থনীতি’ ও ‘স্মার্ট সমাজ’ - এই চারটি স্তম্ভের সমন্বয়ে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার ঘোষণা দেই। স্মার্ট বাংলাদেশ বাস্তবায়নে আমরা প্রতিটি ক্ষেত্রে কাজ করছি। আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত স্মার্ট সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলবো, ইনশাআল্লাহ।
৩.২ সুশাসন
ক) গণতন্ত্র, নির্বাচন ও কার্যকর সংসদ
গণমানুষের দল আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই-সংগ্রাম করে আসছে। মানুষের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিতে আমরা সদা তৎপর। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় নির্বাচনের মাধ্যমে একটি কার্যকর সংসদই পারে কেবল জনগণের স্বার্থ রক্ষা করতে। আমরা নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করলে রাষ্ট্র পরিচালনার সকল ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, সুশাসন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা আরও সুদৃঢ় করবো।
খ) আইনের শাসন ও মানবাধিকার সুরক্ষা
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আইনের শাসন ও মানবাধিকারের সপক্ষে সবসময়ই সোচ্চার। সামাজিক বৈষম্য নিরসন করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কাঙ্খিত শোষণমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করাই আমাদের লক্ষ্য। যেখানে আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা এবং সুবিচার নিশ্চিত হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংরক্ষণ ও মর্যাদা সমুন্নত রাখা হবে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা এবং কার্যকারিতা সুনিশ্চিত করার ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।
গ) গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও অবাধ তথ্যপ্রবাহ
আওয়ামী লীগ সরকার অবাধ তথ্যপ্রবাহ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। ১৯৯৬ মেয়াদে আমরাই প্রথম বেসরকারি খাতে টেলিভিশন ও রেডিও উন্মুক্ত করি। বিগত ১৫ বছরে গণমাধ্যমের ব্যাপক বিকাশ ঘটেছে। দেশে পত্রিকার সংখ্যা ৩ হাজার ২৪১টি। ৩৩টি বেসরকারি টিভি চ্যানেল, ২৩টি এফএম বেতার এবং ১৮টি কমিউনিটি বেতার কেন্দ্র বর্তমানে সম্প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সাংবাদিকগণ যাতে নির্যাতন, ভয়ভীতি-হুমকি, মিথ্যা মামলার সম্মুখীন না হন তার ব্যবস্থা করা হবে। ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩’ অনুযায়ী ব্যক্তির গোপনীয়তা ও তথ্য সংরক্ষণ করা হবে এবং অপব্যবহার রোধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত থাকবে। সাংবাদিকদের জন্য দশম ওয়েজবোর্ড গঠনের প্রক্রিয়া চলমান। সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের আওতায় সাংবাদিকদের আর্থিক ও চিকিৎসা সহায়তাকে আরও সম্প্রসারণ করা হবে।
ঘ) জনকল্যাণমুখী, জবাবদিহিমূলক, দক্ষ ও স্মার্ট প্রশাসন
নাগরিককেন্দ্রিক, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, জ্ঞানভিত্তিক, কল্যাণমুখী, সমন্বিত দক্ষ স্মার্ট প্রশাসন গড়ার মাধ্যমে জনগণকে উন্নত ও মানসম্মত সেবা প্রদান ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ অঙ্গীকারবদ্ধ। মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের মাধ্যমে দক্ষ, উদ্যোগী, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর, দুর্নীতিমুক্ত দেশপ্রেমিক ও জনকল্যাণমুখী প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চলমান থাকবে।
ঙ) জনবান্ধব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গড়ে তোলা
আওয়ামী লীগ সরকার সবসময়ই তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর, উন্নত, মানবিক ও জনবান্ধব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গঠনের লক্ষ্যে কাজ করেছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। স্মার্ট বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে স্মার্ট ও আধুনিক হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
চ) দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ
আওয়ামী লীগ দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সমাজ থেকে দুর্নীতির মূলোৎপাটন করতে কাজ করে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে দুর্নীতিবিরোধী মনোভাব গড়ে তোলার জন্য পাঠ্যক্রমে দুর্নীতির কুফল ও দুর্নীতি রোধে করণীয় বিষয়ে অধ্যায় সংযোজন করা হবে।
ছ) সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িকতা
আওয়ামী লীগ সন্ত্রাস দমন, সকল নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও জনগণের জীবনমান উন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। রাষ্ট্র পরিচালনায় সংবিধানের প্রাধান্য, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং সন্ত্রাসমুক্ত সমাজগঠন সুনিশ্চিত করা হবে। বাংলাদেশ সকল ধর্ম, বর্ণ এবং পেশার মানুষের আবাসভূমি। অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশ আমাদের কাম্য।
জ) স্থানীয় সরকার
কেন্দ্রীয় বাজেটের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিভিন্ন স্তরে স্থানীয় সরকার কর্তৃক বাজেট প্রণয়ন এবং সুষম উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে দায়িত্ব বিভাজন অধিকতর স্পষ্ট করা হবে।
ঝ) ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা
ভূমির স্বল্পতা, ব্যবস্থাপনাগত দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতার কারণে ভূমি ব্যবস্থাপনায় পূর্ণ সুশাসন নিশ্চিত করার চাহিদা দীর্ঘ দিনের। প্রশাসনিক সংস্কার ও ডিজিটাল প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে আমাদের সরকার ভূমি সংক্রান্ত সমস্যাদির কার্যকর সমাধানের জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ৩টি পার্বত্য জেলা ব্যতীত ৬১টি জেলায় ১ জুলাই ২০১৯ থেকে শতভাগ ই-নামজারি নিশ্চিত করা হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ ভূমিসেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে সীমিত পর্যায়ে ঢাকা শহরে বিভিন্ন স্পটে ই-নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যা ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারণ করা হবে।
৩.৩ অর্থনীতি
ক) সামষ্টিক অর্থনীতি: উচ্চ আয়, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন
গত দেড় দশকে বাংলাদেশ একটি গতিশীল ও দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বিশ্বের দরবারে মর্যাদা লাভ করেছে। জাতীয় আয়ের মানদ-ে বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম অর্থনীতির দেশ। এসময়ে দেশের কৃষি, শিল্প ও সেবাখাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন পণ্য ও সেবা উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নির্বাচিত হলে আওয়ামী লীগ সরকার লক্ষ্য ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় নীতি-কৌশল গ্রহণ করবে। বাজারমূল্য ও আয়ের মধ্যে সঙ্গতি প্রতিষ্ঠা করা হবে।
মুদ্রা সরবরাহ ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা
মুদ্রা সরবরাহ ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রধান উপায়-উপকরণ হবে নীতি সুদ হার ব্যবহার। কর্মপোযোগী প্রশিক্ষিত যুবকদের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য ঋণ সরবরাহ সম্প্রসারণ করা হবে। আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা হবে, যা বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহে অনিশ্চয়তা লাঘব করবে। খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং এক্ষেত্রে ব্যাংক যাতে বিধি নির্ধারিত সঞ্চিতি রাখে তা নিশ্চিত করা হবে।
বিনিয়োগ ও উন্নয়ন
আওয়ামী লীগ অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেসরকারিখাতের গুরুত্ব অব্যাহত রাখবে এবং যুক্তিসংগত ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি খাতের যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ ব্যবহার করবে।
আর্থিকখাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও অপরাধ দমন
পুঁজি পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরে ঘুষ-দুর্নীতি উচ্ছেদ, অনুপার্জিত আয় রোধ, ঋণ-কর-বিল খেলাপি ও দুর্নীতিবাজদের বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে শাস্তি প্রদান এবং তাদের অবৈধ অর্থ ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে।
খ) দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈষম্য হ্রাস
আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলে দারিদ্র্যের হার ১১ শতাংশে, চরম দারিদ্র্যের অবসান এবং ২০৪১ সাল নাগাদ দারিদ্র্যের হার ৩ শতাংশে নামিয়ে আনব।
গ) ‘আমার গ্রাম-আমার শহর’: প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নগর সুবিধা সম্প্রসারণ
আমরা নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করলে পূর্বের ধারাবাহিকতায় উন্নত রাস্তাঘাট, যোগাযোগ, সুপেয় পানি, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা ও সুচিকিৎসা, মানসম্পন্ন শিক্ষা, উন্নত পয়ঃনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি, কম্পিউটার ও দ্রুতগতিসম্পন্ন ইন্টারনেট সুবিধা, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামসহ মানসম্পন্ন ভোগ্যপণ্যের বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রতিটি গ্রামকে আধুনিক শহরের সকল সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অব্যাহত থাকবে। গ্রামের যুবসমাজের শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা কমাতে গ্রামেই আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ঘ) তরুণ যুবসমাজ: ‘তারুণ্যের শক্তি-বাংলাদেশের সমৃদ্ধি’
নির্বাচিত হলে দেশের রূপান্তর ও উন্নয়নে আমরা তরুণ ও যুবসমাজকে সম্পৃক্ত রাখব। কর্মক্ষম, যোগ্য তরুণ ও যুবকদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ, জেলা ও উপজেলায় ৩১ লাখ যুবকের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং তাদের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য সহায়তা প্রদান কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
ঙ) কৃষি, খাদ্য ও পুষ্টি
আমাদের সরকার কৃষির জন্য সহায়তা ও ভর্তুকি তথা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষি উপকরণে বিনিয়োগ সহায়তা প্রদান অব্যাহত রাখবে। ব্যবহারযোগ্য কৃষি যন্ত্রপাতি সহজলভ্য ও সহজপ্রাপ্য করা হবে। কৃষি যন্ত্রপাতিতে ভর্তুকি প্রদান অব্যাহত থাকবে। বাণিজ্যিক কৃষি, জৈবপ্রযুক্তি, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, রোবোটিকস, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ন্যানো-টেকনোলজিসহ গ্রামীণ অকৃষিজ খাতের উন্নয়ন ও বিশ্বায়ন মোকাবিলায় উপযুক্ত কর্মকৌশল গ্রহণ করা হবে। কৃষির আধুনিকায়ন, প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং কৃষি গবেষণার সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ অব্যাহত থাকবে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ
২০২৮ সালের মধ্যে গবাদিপশুর উৎপাদনশীলতা ১.৫ গুণ বৃদ্ধি করা হবে। বাণিজ্যিক দুগ্ধ, পোল্ট্রি ও মৎস্য খামার প্রতিষ্ঠা, আত্মকর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য দূরীকরণে সহজ শর্তে ঋণ, প্রয়োজনীয় ভর্তুকি, প্রযুক্তিগত পরামর্শ ও নীতিগত সহায়তা প্রদান করা হবে।
চ) শিল্প উন্নয়ন
দেশের শ্রমশক্তিতে প্রতি বছর নতুন যুক্ত হওয়া ২০ লাখেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এটি অর্জনে আমরা ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছি। নতুন নতুন শিল্প স্থাপন করে আমরা শিল্পখাতের বিকাশ ঘটাবো। নির্বাচিত হলে উদ্যোক্তা শ্রেণিকে আকৃষ্ট করতে আমরা যথোপযুক্ত নীতি প্রণয়ন ও কর্মসূচি গ্রহণ করবো। কর্মসংস্থান সম্প্রসারণের জন্য ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটির শিল্প, তাঁত ও রেশমশিল্পকে সংরক্ষণ এবং প্রতিযোগিতা সক্ষম করা হবে। বেনারসি ও জামদানিশিল্পকে উৎসাহিত করা হবে। চামড়া ও পাটপণ্যে বৈচিত্র্য আনা হবে এবং এই শিল্পগুলিকে লাভজনক করার উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। পাটশিল্পে বেসরকারি খাতের উদ্যোগ উৎসাহিত করা হবে। কামার, কুমার ও মৃৎশিল্পীদের উন্নয়নের জন্য বিশেষ উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। প্রয়োজন অনুসারে এ খাতে প্রণোদনা দেওয়া হবে।
ছ) বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
বিদ্যুৎ খাতে আমরা গত ১৫ বছরে যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক উন্নয়ন ঘটিয়েছি। নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত, এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ হাজার ও ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিবেশবান্ধব জ্বালানি থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। নবায়নযোগ্য ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য গ্রিড যুগোপযোগী করার কাযক্রম শুরু হয়েছে।
জ্বালানি খাত
দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গ্যাস ও এলপিজির সরবরাহ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা হবে।
জ) যোগাযোগ
রূপকল্প-২০৪১ অর্জনে আওয়ামী লীগ সরকার নিরাপদ, মানসম্পন্ন ও উন্নয়নবান্ধব উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বিগত ১৫ বছরে ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। নৌপথ, সড়কপথ, রেলপথ ও বিমানের উন্নয়ন অব্যাহত থাকবে। নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা রাজধানী থেকে গ্রাম পর্যন্ত উন্নত করা হবে।
ঝ) অবকাঠামো উন্নয়নে মেগা প্রজেক্ট
আওয়ামী লীগ সরকার ৩ মেয়াদে বিভিন্ন মেগা প্রজেক্ট গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছে। আশা করা যায়, জাতির অহংকার ও গর্বের প্রতীক পদ্মা সেতুসহ এই সকল প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল বয়ে আনছে।
ঞ) সুনীল অর্থনীতি
সমুদ্র সম্পদ আর্থ সামাজিক উন্নয়নে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যে সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছি। সমুদ্র সম্পদ তেল, গ্যাস, খনিজ, মৎস্য ও জলজ সম্পদ আহরণ করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সমুদ্র বন্দর ও গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করা হয়েছে, যা ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণে সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
ট) এমডিজি অর্জন এবং এসডিজি বাস্তবায়ন কৌশল (২০১৬-৩০)
আমরা এমডিজি অত্যন্ত সফলতার সাথে বাস্তবায়ন করেছি। টেকসই উন্নয়ন বাস্তবায়ন অর্থাৎ এসডিজি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাসস্থান, খাদ্য নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সুপেয় পানি, স্যানিটেশন সুবিধা, শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার হ্রাস, জেন্ডার সমতা নিশ্চিতকরণসহ প্রয়োজনীয় সকল ক্ষেত্রে সাফল্যের সাথে বাস্তবায়ন শুরু করেছি। আর্থ সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে নতুন কৌশল উদ্ভাবন ও বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করে যাচ্ছি।
ঠ) ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০
জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে সংগতিপূর্ণভাবে ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ এর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে: ১. ২০৩০ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্য দূরীকরণ; ২. ২০৩০ সালের মধ্যে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জন এবং ৩. ২০৪১ সাল নাগাদ একটি উন্নত-সমৃদ্ধ দেশের মর্যাদা অর্জন। ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ এর কাঙ্খিত লক্ষ্য হচ্ছে ৬টি। এগুলো হলো: ১. বন্যা ও জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত বিপর্যয় থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; ২. পানি ব্যবহারে অধিকতর দক্ষতা ও নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা; ৩. সমন্বিত ও টেকসই নদী অঞ্চল এবং মোহনা ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা; ৪. জলবায়ু ও বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ এবং সেগুলোর যথোপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করা; ৫. অন্তঃ ও আন্তঃদেশীয় পানিসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য কার্যকর প্রতিষ্ঠান ও সুশাসন গড়ে তোলা এবং ৬. ভূমি ও পানিসম্পদের সর্বোত্তম সমন্বিত ব্যবহার নিশ্চিত করা।
৩.৪ সামাজিক নিরাপত্তা ও সেবা
ক) সর্বজনীন পেনশন: সময়োপযোগী উদ্যোগ
২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাপনা আইন প্রণীত হয় এবং ২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট মাসে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার উদ্বোধন করা হয়। এটি সমাজের সকলের জন্য। এতে রয়েছে ৪টি স্কিম: ১. প্রবাসী বাংলাদেশী নাগরিকদের জন্য ‘প্রবাস’; ২. ব্যক্তি মালিকানাধীন/বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা/কর্মচারীদের জন্য ‘প্রগতি’; ৩. স্বকর্মে নিয়োজিত নাগরিকদের জন্য ‘সুরক্ষা’ এবং ৪. স্বকর্মে নিয়োজিত অতি দরিদ্রদের জন্য ‘সমতা’। নিজেদের ভবিষ্যৎ জীবন সুরক্ষার লক্ষ্যে এই সুযোগ সকল নাগরিকদের গ্রহণ করতে আহ্বান জানাচ্ছি।
খ) শিক্ষা
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ ও মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার লক্ষ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিজ্ঞানে সমৃদ্ধ দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে আমরা নিরলস কাজ করে যাচ্ছি। নির্বাচিত হলে আওয়ামী লীগ সরকার নিষ্ঠার সঙ্গে সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে শিক্ষানীতির লক্ষ্য অনুসরণ ও বাস্তবায়ন করবে। শিক্ষার উন্নয়ন ও বিকাশ হলে সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য নিরসনে গতিবেগ সঞ্চারিত হয়। এই বিশ্বাস থেকে আওয়ামী লীগ শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়াবে এবং তার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় নারী শিক্ষকের অনুপাত ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকবে। স্মার্ট বাংলাদেশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ভাষা, উচ্চতর গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষাকে অধিকতর গুরুত্ব প্রদান করা হবে। বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য উপযুক্ত ল্যাবরেটরি গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হবে। মেধাবী বিজ্ঞান ও গণিতের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ বৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে। মাদ্রাসা শিক্ষাকে যুগোপযোগী করতে যথাযথ শিক্ষা পাঠক্রম প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন হাতে নেওয়া হয়েছে। নারী শিক্ষা প্রসারের সঙ্গে সংগতি রেখে উপবৃত্তি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। দরিদ্র ও দুর্বলতর জনগোষ্ঠীর সন্তানদের উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ আরও প্রসারিত করা হবে।
গ) স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার কল্যাণ
রূপকল্প-২০২১ এর ধারাবাহিকতায় রূপকল্প-২০৪১ এর কর্মসূচিতে মৌলিক স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ সেবা উন্নত ও সম্প্রসারিত হবে। কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও বিনামূল্যে ঔষধ বিতরণ অব্যাহত থাকবে। ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য দেশের প্রত্যেক মানুষের কাছে একটি ইউনিক হেলথ আইডি প্রদান এবং হাসপাতালে অটোমেশন ব্যবস্থাপনা চালু করা হবে। সকলের জন্য সমান সুযোগ রেখে সর্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা চালু করা হবে। ঢাকায় আন্তর্জাতিকমানের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল স্থাপন করেছি। স্বাস্থ্য বিজ্ঞান গবেষণায় বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্য ইনস্যুরেন্স চালু, হেলথি এজিং স্কিমের আওতায় প্রবীণদের অসংক্রামক রোগব্যাধি নিরাময় এবং পুনর্বাসন কেন্দ্র তৈরি করা হবে। দেশে এপিআই একটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট শিল্প উৎসাহিত করা হবে। এন্টি বায়োটিক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা হবে। সকল স্তরে মানসিক স্বাস্থ্য ও অটিজম স্বাস্থ্যসেবা প্রদান অধিকতর কার্যকর করা হবে।
ঘ) সংস্কৃতি
সংস্কৃতির চর্চা ও বিকাশে পরিপূর্ণ সহযোগিতা করতে আওয়ামী লীগ অঙ্গীকারবদ্ধ। আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে- সংস্কৃতির ভেতর দিয়েই সভ্যতা, মানবতা, বিশ্বজনীনতা ও জাতীয়তা সমৃদ্ধ ও বিকশিত হয়। বাঙালি সংস্কৃতির আবহমান ঐতিহ্য ধারণ ও বিশ্ব সংস্কৃতির সঙ্গে মেলবন্ধন রচনার লক্ষ্যে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, সংগীত, শিল্পকলা, নাটক, চলচ্চিত্র এবং সৃজনশীল সুকুমারশিল্পের উৎকর্ষ সাধনে আমরা পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত রাখবো। সকল ধর্মের শিক্ষা ও মূল্যবোধের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন এবং সামাজিক সচেতনতা, বিজ্ঞানমনস্কতা, সংস্কৃতির চর্চা ও উদার মানবিক চেতনা সৃষ্টির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হবে। লোকসংস্কৃতি ও লোকঐতিহ্য এবং নৃগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনধারার বৈশিষ্ট্যসমূহ সুরক্ষা করা হবে।
ঙ) ক্রীড়া
প্রত্যেক উপজেলায় মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ কাজ চলছে। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে ক্রীড়া ক্লাব গড়ে তুলে বিনা মূল্যে ক্রীড়াসামগ্রী বিতরণ অব্যাহত থাকবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে খেলার মাঠের উন্নয়ন, ক্রীড়া অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, খেলোয়াড়, কোচ, কর্মকর্তাসহ ক্রীড়াসংশ্লিষ্ট সকলের প্রশিক্ষণ সুবিধাদি সম্প্রসারণে পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। প্রচলিত গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলাকে দেশব্যাপী জনপ্রিয় করে তোলা, আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে ক্রিকেট, ফুটবল, হকি, শুটিং, আর্চারি, কাবাডিসহ সম্ভাবনাময় খেলাধুলাকে বিশ্বমানে উন্নীত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
চ) শ্রমিক কল্যাণ ও শ্রম নীতি
আইএলও কনভেনশন এবং আইনে প্রদত্ত শ্রমিক অধিকার ও কল্যাণমূলক শর্তাবলি পালন অব্যাহত থাকবে। নারীর শ্রমে অংশগ্রহণের বাধা দূর করা এবং নারী শ্রমিক সংগঠন সুসংহত করা হবে। পরিবেশবান্ধব গ্রিন শিল্প কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। পোশাক শিল্প কারখানায় ডে-কেয়ার সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা করেছি। গার্মেন্টস শ্রমিকরা ১৯৯৬ সালে ৮০০ টাকা মজুরী পেত; আওয়ামী লীগ সরকার তা বাড়িয়ে ১৬০০ টাকা করে। পরবর্তীতে ২০০৯-২০২৩ মেয়াদে আমরা এ মজুরী ১২ হাজার ৫০০ টাকায় বৃদ্ধি করি। ট্রেড ইউনিয়ন গঠন ও পরিচালনার অধিকার, কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ, বিধিসম্মত শ্রমঘণ্টা নির্ধারণ, নিয়োগের নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার জন্য ক্ষতিপূরণ, স্বাস্থ্যসেবা, বাসস্থান, চিত্তবিনোদন এবং শ্রম আইনে নির্ধারিত শ্রমিক কল্যাণ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা প্রদান অব্যাহত রাখা হবে।
বৈদেশিক কর্মসংস্থান আমরা দক্ষ শ্রমশক্তি রপ্তানি বৃদ্ধিতে আন্তর্জাতিক চাহিদা অনুযায়ী ট্রেডভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা বৃদ্ধি করবো। বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের আইনসংগত সহায়তার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা অব্যাহত রাখবো। বিদেশে নারী শ্রমিকদের প্রতি ন্যায্য আচরণ সংরক্ষণে আইনসংগত ব্যবস্থা নিব। ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসীদের আয় গ্রহণ সহজ করার জন্য মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
ছ) নারীর ক্ষমতায়ন
নারীর ক্ষমতায়ন, জেন্ডার সমতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নারী উন্নয়নে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। গ্রামীণ নারীদের সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন এবং শ্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ বৃদ্ধি করা হবে। গ্রামীণ নারীদের অন-লাইনে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ট্রেনিং দেওয়া হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকার নারী ও শিশু পাচার রোধে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করেছে, যা অধিকতর সক্রিয় ও কার্যকর করা হবে। শিল্প-ব্যবসা-বাণিজ্যে নারীদের আরও বেশি অংশগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া অব্যাহত থাকবে। নারী উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী গড়ে তোলার কাজে ‘জয়িতা ফাউন্ডেশন’ এর কার্যকর ভূমিকা সম্প্রসারিত হবে।
জ) শিশু কল্যাণ
আমরা শিশু-কিশোরদের ভবিষ্যতের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে যথাযথ শারীরিক ও মানসিক বিকাশে পুষ্টি, শিক্ষা ও বিনোদনের উপযুক্ত সুযোগ সৃষ্টি করার কার্যক্রম অব্যাহত রাখব। পথশিশুদের পুনর্বাসন ও নিরাপদ আবাসন, হতদরিদ্র ও ছিন্নমূল শিশুদের জন্য শিশুসদন প্রতিষ্ঠা এবং প্রাথমিক ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাদানের কর্মসূচি কার্যকর ও প্রসারিত করা হবে। শিশুশ্রম বন্ধ করার জন্য পর্যায়ক্রমে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ার কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। কন্যা শিশুদের প্রতি বৈষম্য, নির্যাতন বন্ধ ও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আইন পাশ করা হয়েছে। অটিস্টিক শিশুদের জন্য গৃহীত বিশ্বে সমাদৃত কার্যক্রমের পরিধি বাড়ানো হবে।
ঝ) মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণ
মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। নির্বাচিত হলে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় অসঙ্গতি দূর এবং প্রয়োজনীয় সংশোধন করার কাজ অব্যাহত রাখব। আওয়ামী লীগ সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের স্বীকৃতি এবং তাঁদের জন্য যেসব কল্যাণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, সেগুলো অব্যাহত রাখা হবে।
ঞ) বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ও প্রতিবন্ধী কল্যাণ
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন ও জাতীয় কর্মপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ সম্প্রসারণ করা হবে। “বঙ্গবন্ধু প্রতিবন্ধী সুরক্ষা বীমা” চালু করা হয়েছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা যাতে তাদের জন্য উপযোগী পরিবেশে শিক্ষা লাভ করতে পারে, সে ব্যবস্থা ও পদক্ষেপ গ্রহণ এবং সরকারি পরিষেবার দপ্তরগুলো প্রতিবন্ধীবান্ধব হিসেবে রূপান্তরের কাজ অব্যাহত থাকবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মোবাইল ফোন বা অনলাইনে ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। ব্যবসা ও শিল্প কারখানায় প্রতিবন্ধীদের চাকুরি প্রদান করা হলে ঐসব প্রতিষ্ঠানে কর ছাড় এবং বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায়ন করার লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোতে তাদের অংশগ্রহণের জন্য এবং ভোটদানে উৎসাহিত করা হবে।
প্রবীণ কল্যাণ
আমরা প্রবীণদের ক্রিয়াশীল রাখতে, সমাজ ও রাষ্ট্রের অগ্রগতিতে তাদের অবদান যোগ করতে এবং তাঁদের সুরক্ষায় সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। প্রবীণ নাগরিকদের ডিজিটাল প্রযুক্তির সকল সুযোগ-সুবিধা ও প্রযুক্তিগত সমতা অর্জনে এবং প্রবীণদের কল্যাণে উন্নত ও আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিতে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। ঢাকার আগারগাঁও-এ প্রবীণ হাসপাতাল রয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইতোমধ্যে জেরিয়াট্রিক সেবা চালু হয়েছে। দেশের সকল সরকারি হাসপাতালে জেরিয়াট্রিক সেবা প্রচলনের কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
ট) ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু
সংবিধানের আলোকে সকলের অধিকার সুরক্ষায় উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জাতীয় সংসদে অর্পিত সম্পত্তি আইন সংশোধন করা হয়েছে এবং অর্পিত সম্পত্তি সংশ্লিষ্ট সমস্যা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আইন প্রয়োগে বাধা দূর করা হবে। সংখ্যালঘুদের স্বার্থ সুরক্ষার জন্য জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন এবং সংখ্যালঘু বিশেষ সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করা হবে। আওয়ামী লীগ ধর্মীয় সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও অনগ্রসর সম্প্রদায়ের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আবশ্যক পদক্ষেপ নেওয়া অব্যাহত রাখবে।
ঠ) অনগ্রসর জনগোষ্ঠী
দলিত ও অবহেলিত জনগোষ্ঠী
দলিত ও হরিজনদের ফ্লাট নির্মাণ করে আবাসন সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। বস্তিবাসীর জন্য ফ্লাট নির্মাণ করে দেওয়া হচ্ছে। বিনামূল্যে দুই কাঠা জমি ও বাড়ী নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। আমাদের অঙ্গীকার কুষ্ঠরোগী, বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি অব্যাহত রাখা হবে। বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর দক্ষতা বৃদ্ধি করা হবে। যাতে তারা আয়বর্ধনমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হয়ে সমাজের মূল স্রোতোধারায় আসতে পারে।
হিজড়া জনগোষ্ঠী
হিজড়াদের সমাজের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত এবং তাদের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ, সামাজিক ন্যায়বিচার, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, বাসস্থান ও জীবনমান উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। হিজড়া জনগোষ্ঠীর জন্য নগদ সাহায্য ও বিনামূল্যে জমি ও বাসস্থান প্রদান কর্মসূচি সারা দেশে সম্প্রসারিত করা হবে।
ড) জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সুরক্ষা
গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স ২০২১ অনুযায়ী বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ১০টি দেশের মধ্যে ৭ম অবস্থানে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত চ্যালেঞ্জ সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করা ও খাপ খাইয়ে চলা বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ভৌত-প্রাকৃতিক চ্যালেঞ্জ।
আমাদের অঙ্গীকার
জলবায়ু পরিবর্তন ও বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা, দূষণমুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলা এবং পানিসম্পদ রক্ষায় ইতোমধ্যে আমাদের সরকার যে সকল নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, তার বাস্তবায়ন অব্যাহত থাকবে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য নিম্নলিখিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন অব্যাহত থাকবে: (ক) উৎপাদনশীল/সামাজিক বনায়ন ২০ শতাংশে উন্নীত; (খ) ঢাকা ও অন্যান্য বড় নগরে বায়ুর মান উন্নয়ন; (গ) শিল্পবর্জ্য শূন্য নির্গমন/নিক্ষেপণ প্রবর্ধন; (ঘ) আইনসংগতভাবে বিভিন্ন নগরে জলাভূমি সংরক্ষণ, পুনরুদ্ধার ও সুরক্ষা; (ঙ) সমুদ্র উপকূলে ৫০০ মিটার বিস্তৃত স্থায়ী সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা।
ঢ) এনজিও ও সরকার
সকল বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সরকারের বিধি অনুযায়ী নিবন্ধিত হবে। সরকার তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও মূল্যয়ন করবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের নিজস্ব বিধি মোতাবেক পরিচালিত হবে। দারিদ্র বিমোচন, আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও ক্ষুদ্র ঋণ প্রদান বিষয়ে নিজস্ব বিধি ও রীতি অনুযায়ী কাজ করার অধিকার অব্যাহত রাখা হবে। অর্থায়নকারী অন্যান্য এনজিও’র সকল কার্যক্রম ও আয়-ব্যয়ের হিসাব স্বচ্ছ এবং স্থানীয় জনগণ ও সরকারি নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
৩.৫ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব
ক) পররাষ্ট্র
যুদ্ধ না, শান্তিতে আমরা বিশ্বাসী। জাতির পিতার নির্দেশিত ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ এই নীতিকে ধারণ করে আওয়ামী লীগের সফল পররাষ্ট্রনীতির কল্যাণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক শক্তিশালী ও মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচিত হলে সকল দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগিতা চলমান থাকবে। আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগ, ট্রানজিট, জ্বালানি অংশীদারত্ব এবং ন্যায়সঙ্গত পানিবণ্টনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশসমূহের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশ তার ভূখণ্ডে জঙ্গি, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর উপস্থিতি রোধে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। সমগ্র অঞ্চল থেকে এর মূলোৎপাটনের লক্ষ্যে, সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় দক্ষিণ এশিয়া টাস্কফোর্স গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে আওয়ামী লীগ সরকার।
খ) প্রতিরক্ষা: নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা
দেশের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং অখ-তা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিরক্ষা সামর্থ্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কর্তৃক প্রণীত ‘প্রতিরক্ষা নীতিমালা, ১৯৭৪’-এর আলোকে ‘ফোর্সেস গোল-২০৩০’ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন চলমান রয়েছে।
আমাদের অঙ্গীকার
ফোর্সেস গোল ২০৩০ এর আলোকে প্রতিরক্ষা বাহিনীর দক্ষতা ও শৃঙ্খলা বৃদ্ধি এবং ব্যবস্থাপনার উন্নতি অব্যাহত থাকবে। সশস্ত্র বাহিনীর অফিসার ও সৈনিকদের পেশাগত দক্ষতা এবং তাদের চাকরির সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত থাকবে। দেশ ও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি অব্যাহত রাখা হবে। সশস্ত্র বাহিনীর সকল শ্রেণির সদস্যদের জন্য কল্যাণমুখী নতুন প্রকল্প ও কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।
সুধিবৃন্দ, আন্তরিকতা ও নিষ্ঠা থাকা সত্ত্বেও সরকার পরিচালনা করতে গিয়ে সবসময়ই যে আমরা শতভাগ সফল হয়েছি, এমন দাবি করবো না। তবে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কথামালার রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়। আমরা যা বলি তা বাস্তবায়ন করি। ২০০৮, ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়ন তার প্রমাণ। তবে মাঝে-মধ্যে মনুষ্য-সৃষ্ট, প্রাকৃতিক এবং বৈশ্বিক বাধাবিপত্তি আমাদের চলার গতিপথকে মন্থর করেছে। ২০১৩-১৬ সময়ে বিএনপি-জামাতের অগ্নি-সন্ত্রাস এবং জঙ্গিবাদ বিস্তারের চেষ্টা মোকাবিলা করে আমাদের এগিয়ে যেতে হয়েছে। ২০০৯ সালের পর থেকে বেশ কয়েকটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হয়েছে। সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে ২০২০ সালে যখন বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস মহামারি ছড়িয়ে পড়ে। এই মহামারি গোটা বিশ্বের অর্থনীতি এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে তছনছ করে দিয়েছিল।
আমাদের সরকার একবিংশ শতাব্দীর এই ভয়াবহ মহামারি সফলভাবে মোকাবিলা করার পাশাপাশি অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সক্ষম হয়েছে। তবে করোনাভাইরাস মহামারির ধকল কাটতে না কাটতেই প্রথমে শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং এ বছর ইজরাইল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ। যেকোন যুদ্ধ শুধু দুই প্রতিবেশির সমরাস্ত্র ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
যেমন: রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সমরাস্ত্র যুদ্ধের পাশাপাশি ভয়াবহ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক যুদ্ধে রূপান্তরিত হয়েছে। অবরোধ-পাল্টা অবরোধের ফলে গোটা বিশ্বের অর্থনীতির টালমাটাল অবস্থা হয়েছে। আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অধিক মূল্যে পণ্য ক্রয় ও আমদানি করতে বাধ্য করা হচ্ছে। দেশীয় মুদ্রার মানের ব্যাপক অবনতিতে মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে দ্রব্যমূল্য এবং মানুষের জীবনযাপনের ওপর। বহুমুখী ও সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আমরা অনেক সময় নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্য বৃদ্ধি রোধ করতে পারিনি। এ সমস্যা শুধু আমাদের দেশের নয়, এ সমস্যা ধনী-গরিব সকল দেশের। তবে, আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনির আওতা সম্প্রসারণসহ নানা উদ্যোগের মাধ্যমে নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের দুর্দশা লাঘবের। আমরা আশা করি, খুব শিগগিরই আমরা এই অভিঘাত কাটিয়ে উঠতে পারব, ইনশাআল্লাহ।
প্রিয় দেশবাসী, নির্বাচন এলেই মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশ এবং উন্নয়ন-বিরোধী একটি চক্র ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে সক্রিয় হয়ে ওঠে। নির্বাচনে কুটকৌশল অবলম্বন বা কারচুপির মাধ্যমে কিংবা পিছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় যেতে তারা আটঘাট বেধে মাঠে নামে। সফল না হলে জনগণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রতিশোধ স্পৃহায়। অগ্নি-সন্ত্রাস, যানবাহন পোড়ানো, বোমাবাজি, নাশকতা বা সন্ত্রাসী কর্মকা-ের মাধ্যমে সাধারণ জনগণকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে ঘরবন্দি করতে চায়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তার ওপর এবার তারা বিদেশ থেকেও কলকাঠি নাড়ছে। জনগণের ম্যান্ডেট পাবে না- এটা বুঝতে পেরে আগে থেকে এবার তারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছে। হরতাল-অবরোধের নামে যানবাহন পোড়ানো, মানুষ হত্যা, রেল-লাইন উপরে ফেলাসহ বিভিন্ন নাশকতা চালিয়ে যাচ্ছে। মা ও শিশুর অগ্নিদগ্ধ লাশ সকলের বিবেককে প্রচ-ভাবে নাড়া দিয়েছে। এই ধরনের হীন কাজ আর সহ্য করা যায় না। জনগণের সাড়া না পেয়ে ভাড়াটে বাহিনী দিয়ে এসব নাশকতা চালিয়ে জান-মালের ক্ষতি করছে। সন্ত্রাস করে নির্বাচন বানচাল করার স্বপ্ন-সাধ কোনদিনই তাদের পূরণ হতে দিবে না এদেশের জনগণ। ২০১৩-২০১৬ সময়ে যেমন আপনারা ওদের প্রতিহত করেছিলেন; আসুন, এবারও সম্মিলিতভাবে ওদের প্রতিহত করি। স্বাধীনতা-বিরোধী, উন্নয়ন বিরোধী এই শকুনের দল আর কোন দিন যাতে বিষময় দন্ত-নখর বসিয়ে বাংলাদেশকে ক্ষতবিক্ষত করতে না পারে- আসুন, এই বিজয়ের মাসে এ শপথ নেই।
সুধিবৃন্দ, বিগত ১৫ বছরের সরকার পরিচালনার পথ-পরিক্রমায় যা কিছু ভুলত্রুটি তার দায়ভার আমাদের। সাফল্যের কৃতিত্ব আপনাদের। আমাদের ভুলত্রুটিগুলো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আমরা কথা দিচ্ছি, অতীতের ভুলভ্রান্তি থেকে শিক্ষা নিয়ে আপনাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী ভবিষ্যৎ কর্মকা- পরিচালনা করবো। বাবা-মা, ভাই, আত্মীয়-স্বজন সকলকে হারিয়ে আমি রাজনীতিতে এসেছি শুধু আমার বাবা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত কাজ শেষ করে এদেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে। এ কাজ করতে গিয়ে আমাকে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছে বার বার। কিন্তু বাবার কথা ভেবে, আপনাদের কথা ভেবে আমি পিছ-পা হইনি। যতদিন আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখেন, সুস্থ রাখেন, ততদিন যা কর্তব্য হিসেবে আমি গ্রহণ করেছি, সেখান থেকে সরে আসবো না। আপনাদের সেবক হিসেবে কাজ করার মধ্য দিয়েই আমি আমার বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে চাই।
প্রিয় দেশবাসী, এই মুহূর্তে বাংলাদেশ এক ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে সামিল হতে যাচ্ছে দেশ। এই উত্তরণ যেমন একদিকে সম্মানের, অন্যদিকে বিশাল চ্যালেঞ্জেরও। ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারকে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার সক্ষমতা থাকতে হবে। একমাত্র আওয়ামী লীগই পারবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে। মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায়, মাতৃভূমির স্বাধীনতা থেকে শুরু করে এ দেশের যা কিছু মহৎ অর্জন, তা এসেছে আওয়ামী লীগের হাত ধরে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক-বাহক বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের হাত ধরেই ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উচ্চ মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ স্মার্ট ‘সোনার বাংলা’ প্রতিষ্ঠিত হবে। আসুন, আরও একবার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনি প্রতীক নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আমাদের জয়যুক্ত করে আপনাদের সেবা করার সুযোগ দিন। আপনারা আমাদের ভোট দিন, আমরা আপনাদের উন্নয়ন, শান্তি ও সমৃদ্ধি দেবো।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সারা দেশের ৩০টি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে বলে জানিয়েছেন দলটির মুখপাত্র ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। সোমবার (১২ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এই ঘোষণা দেন। আসিফ মাহমুদ জানান, এনসিপি মূলত ১১টি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত একটি বৃহত্তর নির্বাচনি সমঝোতা জোটের অংশ হিসেবে এই আসনগুলোতে লড়াই করবে। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জনস্বার্থ ও রাষ্ট্রের বৃহত্তর কল্যাণের কথা বিবেচনা করেই তাঁদের দলের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন। তিনি এই জোটটিকে মূলত ‘আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সংস্কারের জোট’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, জনগণের সমর্থনে এই জোটই ইনশাআল্লাহ আগামীতে সরকার গঠন করবে।
নির্বাচনি কৌশল ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এনসিপির এই শীর্ষ নেতা জানান যে, জোট গঠনের স্বার্থে এনসিপি অনেক ক্ষেত্রে নমনীয় হয়েছে এবং বড় ধরণের ছাড় দিয়েছে। জোটের অন্য শরিকদের মধ্যেও একই ধরণের মানসিকতা থাকায় একটি শক্তিশালী ঐক্য গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, এই জোটটি মূলত একটি কৌশলগত বা ‘স্ট্র্যাটেজিক’ জোট, এটি কোনো নির্দিষ্ট আদর্শিক জোট নয়। যেসব আসনে এনসিপির নিজস্ব কোনো প্রার্থী থাকছে না, সেই ২৭০টি আসনেও দলটি নিষ্ক্রিয় থাকবে না। বরং সেই আসনগুলোতে দলীয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হবে। তৃণমূল পর্যায়ে এনসিপির কর্মীরা মূলত গণভোটের প্রার্থী হিসেবে সক্রিয় থেকে ভোটারদের সচেতন করার কাজ চালিয়ে যাবেন।
দলের ভেতরে সাম্প্রতিক কিছু পদত্যাগের ঘটনা নিয়ে আসিফ মাহমুদ তাঁর অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি বলেন, যারা ব্যক্তিগত বা অভিমান থেকে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন, তাঁরা আমাদের দলের অমূল্য সম্পদ বা ‘অ্যাসেট’। এখন পর্যন্ত তাঁদের পদত্যাগপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয়নি এবং তিনি বিশ্বাস করেন যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে পুনরায় একসঙ্গে দেশের জন্য কাজ করার সুযোগ এখনো শেষ হয়ে যায়নি। মূলত জাতীয় সংস্কার এবং একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতেই এনসিপি এই ভারসাম্যপূর্ণ নির্বাচনি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বর্তমানে দলের পক্ষ থেকে মনোনীত ৩০ জন প্রার্থীর চূড়ান্ত তালিকা নিয়ে মাঠে নামার প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে তিনি তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন।
সিরাজগঞ্জ-৬ (শাহজাদপুর) আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ও উপজেলা জামায়াতের আমীর মো. মিজানুর রহমানের একটি বিতর্কিত বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর জেলাজুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি শাহজাদপুর উপজেলার কায়েমপুর ইউনিয়নের স্বরুপপুর ও কাশিনাথপুর এলাকায় একটি মাদরাসার উন্নয়নকল্পে আয়োজিত ইসলামী মাহফিলে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এই মন্তব্য করেন। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে তাঁকে বলতে শোনা যায় যে, যারা নির্বাচনি লড়াইয়ে ‘দাঁড়িপাল্লার’ পক্ষে থাকবে না, তাঁদের পবিত্র কোরআনের মাহফিল শোনার কোনো প্রয়োজন নেই। তিনি উপস্থিত শ্রোতাদের অনুরোধ করেন যেন তাঁরা কোরআন ও আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার লক্ষে জামায়াতের নির্বাচনি প্রতীক দাঁড়িপাল্লার পক্ষে অবস্থান নেন।
ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর নেটিজেনদের মধ্যে তীব্র সমালোচনা শুরু হলে বিষয়টি নিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন জামায়াত নেতা মিজানুর রহমান। তিনি গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেছেন যে, বক্তব্যটি মাস দুয়েক আগে দেওয়া হয়েছিল এবং ভিডিওতে তাঁর বক্তব্যটি আংশিক বা ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্যমতে, তিনি ভিডিওতে যেভাবে দেখানো হয়েছে ঠিক সেভাবে কথাগুলো বলেননি, বরং তিনি সবাইকে কোরআনের পথে আসার জন্য সাধারণ আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে প্রার্থীর এমন সরাসরি নির্বাচনি প্রচারণা ও ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে কড়া সমালোচনা করা হয়েছে। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চু অভিযোগ করেছেন যে, জামায়াতে ইসলামী বরাবরই নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য পবিত্র ধর্মকে ব্যবহার করে আসছে। তিনি মন্তব্য করেন যে, যেহেতু দলটির নামের সাথে ইসলামের সম্পৃক্ততা রয়েছে, তাই তাঁরা সুযোগ পেলেই ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করে, যা প্রকৃত আলেম সমাজ এবং সাধারণ মানুষ পছন্দ করে না। বিএনপি নেতার মতে, জামায়াত মূলত তাঁদের সুনির্দিষ্ট মতবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষে ধর্মীয় মাহফিলগুলোকে নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়ার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে। নির্বাচনি আমেজের মধ্যে এমন মন্তব্য রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও সুস্থ ধারার রাজনীতির জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। বর্তমানে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ফের বড় ধরণের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এবার দলটির বাগেরহাট সদর উপজেলা শাখার প্রধান সমন্বয়ক আলী হুসাইনসহ মোট ১২ জন নেতাকর্মী একযোগে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। রবিবার (১১ জানুয়ারি) দুপুরে বাগেরহাট প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তাঁরা এই গণপদত্যাগের বিষয়টি জনসমক্ষে নিশ্চিত করেন। পদত্যাগকারী নেতাদের মধ্যে উপজেলা কমিটির যুগ্ম সমন্বয়ক কাজী মাহফুজুর রহমানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের সক্রিয় সদস্যরা রয়েছেন। সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা দল ছাড়ার পেছনে সংগঠনের বর্তমান গতিধারা এবং রাজনৈতিক সমীকরণের অসামঞ্জস্যতাকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
প্রধান সমন্বয়ক আলী হুসাইন তাঁর লিখিত বক্তব্যে বিস্তারিত কারণ তুলে ধরে জানান যে, তিনি ২০২৫ সালের ৩ জুন থেকে জাতীয় নাগরিক পার্টির বাগেরহাট সদর উপজেলা শাখার দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তিনি বলেন, ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে আকাঙ্ক্ষা এবং সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির জন্ম ও পথচলা শুরু হয়েছিল, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দলটির মধ্যে সেই আদর্শের প্রতিফলন আর দেখা যাচ্ছে না। তাঁর মতে, ‘নতুন বন্দোবস্তের’ যে স্বপ্নের ভিত্তিতে তাঁরা এই সংগঠনে যুক্ত হয়েছিলেন, বর্তমানের পরিবর্তিত রাজনৈতিক সমীকরণে তার চরম ব্যত্যয় ঘটেছে। আলী হুসাইন স্পষ্টভাবে দাবি করেন যে, এনসিপির বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান তাঁর ব্যক্তিগত দর্শনের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার ফলে দলটির সঙ্গে আর পথচলা সম্ভব নয়।
সংবাদ সম্মেলনে আলী হুসাইনের সাথে পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়া অন্য সদস্যরা হলেন—যুগ্ম সমন্বয়ক কাজী মাহফুজুর রহমান এবং সদস্য আশিকুর রহমান সুমন, শেখ রাসেল, শেখ মিজানুর রহমান, মো. হাসান শেখ, মো. শহিদুল ইসলাম, শেখ জাহিদুল ইসলাম, শেখ নাবিল হোসেন, মো. জনি, মুনিয়া আক্তার জেনি ও মো. রাতুল আহসান। পদত্যাগকারী এই নেতাদের অভিযোগ, যে আদর্শকে পাথেয় করে তাঁরা জুলাই বিপ্লবের চেতনা রক্ষায় কাজ করতে চেয়েছিলেন, এনসিপি এখন সেই পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। নির্বাচনের প্রাক্কালে উপজেলা পর্যায়ের একঝাঁক গুরুত্বপূর্ণ নেতার এমন বিদায়ে বাগেরহাট অঞ্চলে দলটির সাংগঠনিক ভিত্তি বড় ধরণের ধাক্কা খেল বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই পদত্যাগের বিষয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি পাওয়া যায়নি।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জাতীয় পার্টির (জাপা) মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন। আজ রোববার দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে দলের প্রার্থীদের আপিল শুনানিতে অংশ নিয়ে তিনি সাংবাদিকদের জানান যে, যদি দেশে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করা হয় এবং প্রকৃত অর্থে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সমান সুযোগ থাকে, তবে জাতীয় পার্টি অনায়াসেই ৪০ থেকে ৭০টি আসনে জয়লাভ করতে সক্ষম হবে। তিনি মনে করেন, নির্বাচনের মাঠ বর্তমানে অত্যন্ত অনিশ্চিত বা ফ্লুইড অবস্থায় রয়েছে, তাই ভোটারদের আস্থা অর্জনে একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার কোনো বিকল্প নেই। শামীম হায়দার অভিযোগ করেন যে, প্রাথমিক বাছাইয়ে তুচ্ছ ও কারিগরি ভুলকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে অনেক প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে, যা প্রার্থীদের মধ্যে এক ধরণের অস্বস্তি তৈরি করেছে।
জাতীয় পার্টির এই নেতা মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, বর্তমানে দেশে এক ধরণের ‘মবতন্ত্র’ বিরাজ করছে যা রিটার্নিং কর্মকর্তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে সংকুচিত করে দিয়েছে। তিনি দাবি করেন, রিটার্নিং কর্মকর্তারা চাইলে অনেক ছোটখাটো ভুল সংশোধনের সুযোগ দিতে পারতেন, কিন্তু তাঁরা সেটা করেননি মূলত ‘ট্যাগিং’ হওয়ার ভয়ে। কোনো প্রার্থীর আবেদন গ্রহণ করলেই তাঁকে ‘দোসর’ বা বিশেষ মহলের সহযোগী আখ্যা দেওয়ার যে অপসংস্কৃতি শুরু হয়েছে, তাতে প্রশাসনের আত্মবিশ্বাস ভেঙে পড়েছে। শামীম হায়দার পাটোয়ারী মনে করেন, এমন একটি আতঙ্কিত ও ভারাক্রান্ত প্রশাসনের অধীনে উৎসবমুখর এবং স্বতঃস্ফূর্ত ভোট গ্রহণ সম্ভব নয়। তিনি সতর্ক করে বলেন যে, যদি প্রশাসন কঠোর ও সাহসী না হয়, তবে জাতি একটি ‘মানহীন’ নির্বাচনের সাক্ষী হতে পারে, যা পরবর্তী সরকারের ম্যান্ডেটকে দুর্বল করে দেবে।
সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে তিনি বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট দাবি সরকারের সামনে উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, নির্বাচনে ব্যাপক হারে সেনাবাহিনী ও পুলিশ মোতায়েন করা এখন সময়ের দাবি। এছাড়া প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে যাঁদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ রয়েছে, তাঁদেরকে অবিলম্বে রদবদল বা বদলি করার জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। জাপা মহাসচিবের মতে, বর্তমান প্রশাসন অনেকটা বিএনপি-জামায়াতের দেওয়া তালিকার ভিত্তিতে সাজানো হয়েছে বলে জনমনে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে, যা নিরসনে কমিশনকে নিরপেক্ষতার প্রমাণ দিতে হবে। একই সাথে তিনি দেশের সকল রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটি বৃহত্তর সমঝোতার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে বলেন যে, পারস্পরিক স্পেস এবং সম্মান বজায় রেখে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা জরুরি।
দলের বর্তমান সাংগঠনিক অবস্থা এবং প্রতীক নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা প্রসঙ্গে শামীম হায়দার পাটোয়ারী অত্যন্ত স্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করেন। তিনি দাবি করেন যে, জাতীয় পার্টির মূল ও শক্তিশালী অংশটি বর্তমানে জিএম কাদেরের নেতৃত্বেই ঐক্যবদ্ধ এবং দলের নির্বাচনি প্রতীক ‘লাঙ্গল’ তাঁদের অধিকারেই রয়েছে। প্রতিকূল ও ভীতিকর রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও তাঁর দল সারা দেশের ২৪৪টি আসনে প্রার্থী দিয়ে তাঁদের শক্তিমত্তার প্রমাণ দিয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন যে, একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে যদি গণতন্ত্রকে সুসংহত করা যায়, তবে জাতীয় পার্টি জাতীয় রাজনীতিতে এক শক্তিশালী অবস্থানে ফিরে আসবে। পরিশেষে তিনি আবারও স্মরণ করিয়ে দেন যে, মানসম্মত নির্বাচন না হলে তার নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের ওপর পড়বে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। রিটার্নিং কর্মকর্তার প্রাথমিক বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করে প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার পর তিনি এক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে গণতন্ত্রের দীর্ঘ লড়াইকে কখনোই স্তব্ধ করা সম্ভব নয়। আজ রবিবার নির্বাচন ভবনে নিজের প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার রায়কে তিনি ‘সত্যের জয়’ হিসেবে অভিহিত করেন। মান্না উল্লেখ করেন যে, গণতন্ত্রের জন্য এ দেশের মানুষ রক্ত ও জীবন দিয়েছে, তাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ব্যঙ্গ করা কিংবা ক্ষমতার লোভে প্রতিপক্ষকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা অত্যন্ত অশুভ এবং এটি কখনোই কাম্য নয়। তিনি বিশ্বাস করেন, কোনো দল বা ব্যক্তি যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, জনগণের সামগ্রিক ইচ্ছার কাছে সবাই নতি স্বীকার করতে বাধ্য।
মনোনয়নপত্র বাতিলের নেপথ্যে গভীর ষড়যন্ত্র ছিল বলে অভিযোগ তুলে মাহমুদুর রহমান মান্না প্রথমেই মহান আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া আদায় করেন। তিনি বলেন, প্রার্থিতা যাচাই-বাছাইয়ের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ছোটখাটো ভুলত্রুটি সংশোধনের সুযোগ দেওয়া, কাউকে অযোগ্য হিসেবে নির্বাচন থেকে ছিটকে ফেলা নয়। নির্বাচনী আইন অনুযায়ী হলফনামা বা নথিপত্রে কোনো ত্রুটি থাকলে তা সম্পূরক তথ্যের মাধ্যমে ঠিক করার বিধান থাকলেও তাঁর ক্ষেত্রে সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি। তিনি অতীতেও বগুড়া থেকে নির্বাচন করেছেন উল্লেখ করে জানান যে, এবারের বাধাটি ছিল মূলত অশুভ রাজনৈতিক কূটকৌশলের অংশ, যা পরিস্থিতি সামাল দিতে জেলা প্রশাসন নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত কমিশনের স্বচ্ছ সিদ্ধান্তে সেই ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার পথে বড় বাধা হিসেবে আসা ব্যাংক ঋণের অভিযোগ নিয়ে মান্না চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রদান করেন। তিনি দাবি করেন, তাঁর বিরুদ্ধে ঋণখেলাপি হওয়ার যে অভিযোগ আনা হয়েছিল তা ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও সাজানো। ইসলামী ব্যাংকের বগুড়া বড়গোলা শাখার এক অসাধু কর্মকর্তার মাধ্যমে একটি ভুয়া নোটিশ তৈরি করে তাঁকে বিপাকে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। বিষয়টি জানতে পেরে তিনি দ্রুত ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে যোগাযোগ করেন এবং তদন্তের পর ওই কর্মকর্তাকে শাস্তিমূলকভাবে স্ট্যান্ড রিলিজ ও বদলি করা হয়। মান্না আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন যে, তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের খবর ফলাও করে প্রচার হলেও ষড়যন্ত্রকারীর শাস্তির বিষয়টি গণমাধ্যমে আসেনি। তিনি স্পষ্ট করেন যে, ষড়যন্ত্র করে সাময়িকভাবে কাউকে থামানো গেলেও দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক লড়াইয়ে সততাই টিকে থাকে।
নির্বাচন কমিশনের বর্তমান ভূমিকার প্রশংসা করে মান্না জানান, কমিশন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে যা প্রশংসার দাবিদার। তবে মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তিনি এখনও যথেষ্ট শঙ্কিত। মান্নার মতে, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত সক্রিয় বা ‘প্রো-অ্যাক্টিভ’ ভূমিকা পালন করছে না এবং অনেক জায়গায় তাদের রহস্যজনক নীরবতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতা ও দৃঢ়তা একান্ত প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন। বিএনপি জোটের সমর্থন প্রসঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, যেহেতু তাঁকে জোটের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, তাই বগুড়া-২ আসনে বিএনপির মনোনীত বিকল্প প্রার্থী খুব শীঘ্রই তাঁর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেবেন। চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে তিনি এখন পূর্ণোদ্যমে প্রচারণায় নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রশাসন যদি কঠোর ভূমিকা পালন না করে, তবে একটি ‘মানহীন’ নির্বাচনের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী। রবিবার নির্বাচন কমিশনের আপিল শুনানি শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এই গভীর উদ্বেগের কথা জানান। শামীম পাটোয়ারী উল্লেখ করেন যে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি বিশেষ ভীতিকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে অনেক রিটার্নিং কর্মকর্তা তাঁদের স্বাধীন বিবেচনামূলক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারছেন না। বিশেষ করে ‘মব’ বা উন্মত্ত জনতার চাপ এবং ‘ট্যাগিং’ অর্থাৎ কাউকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক তকমা দিয়ে দেওয়ার ভয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তারা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ইতস্ততবোধ করছেন। কেউ আইন অনুযায়ী কাজ করতে চাইলে তাঁকে ‘দোসর’ আখ্যা দেওয়ার যে অপসংস্কৃতি শুরু হয়েছে, তাতে প্রশাসনের আত্মবিশ্বাস ও মনোবল ভেঙে পড়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা করে জাপা মহাসচিব বলেন যে, মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময় দেশে এক ধরণের রাজনৈতিক উত্তেজনা ও অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছিল, যার ফলে অনেক প্রার্থীর পক্ষে যথাযথভাবে কাগজপত্র প্রস্তুত করা সম্ভব হয়নি। আগে যেসব ছোটখাটো ভুল বা কারিগরি ত্রুটি সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হতো, এবার তা না করে রিটার্নিং কর্মকর্তারা গণহারে মনোনয়ন বাতিল করেছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। তবে তিনি স্বস্তি প্রকাশ করে জানান যে, জাতীয় পার্টির ১৩ জন প্রার্থীর আপিলের মধ্যে ১১ জনই ইতিমধ্যে তাঁদের প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে কুমিল্লা-১ আসনের সৈয়দ মোহাম্মদ ইফতেকার আহসান এবং বগুড়া-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মো. শরিফুল ইসলাম জিন্নার আপিল কমিশন মঞ্জুর করেছে।
বগুড়ায় জাতীয় পার্টির কার্যালয় দখল করার ঘটনাকে নজিরবিহীন ও ন্যাক্কারজনক হিসেবে অভিহিত করেন শামীম হায়দার পাটোয়ারী। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, নির্বাচনি তফশিল চলাকালীন এমন ঘটনা ঘটলেও স্থানীয় প্রশাসন তা রুখতে ব্যর্থ হয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবস্থা বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন যে, বাহিনীর মধ্যে এক ধরণের দ্বিধা ও কাজের ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তিনি দাবি করেন, একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে পর্যাপ্ত সেনাবাহিনী ও পুলিশ মোতায়েন করতে হবে এবং প্রশাসনকে আরও বেশি দৃঢ় ও স্বাধীন হতে হবে। অন্যথায় নির্বাচনের মান ও গ্রহণযোগ্যতা বড় ধরণের সংকটে পড়বে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও দলের সাংগঠনিক অবস্থা প্রসঙ্গে শামীম পাটোয়ারী জানান যে, জাতীয় পার্টির অভ্যন্তরে কিছুটা বিভক্তি থাকলেও দলটির মূল অংশ জিএম কাদেরের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। আসন্ন নির্বাচনে তাঁরা প্রায় ২২০ থেকে ২৪০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। যদি একটি সত্যিকারের ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সকল দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হয়, তবে জাতীয় পার্টি ৪০ থেকে ৭০টি আসনে চমকপ্রদ ফল করতে পারবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। পরিশেষে, তিনি নির্বাচন কমিশন বা সরকারের পক্ষ থেকে সকল রাজনৈতিক দলকে নিয়ে একটি সংলাপের আয়োজন করার আহ্বান জানান, যাতে একটি সুন্দর রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচনকে সাফল্যমণ্ডিত করা যায়। মূলত ইনসাফ ও স্বচ্ছতার মাধ্যমেই একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে তারুণ্যের শক্তি ও জনমতের প্রতিফলন ঘটাতে এক অনন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও পলিসিভিত্তিক আলোচনাকে উৎসাহিত করতে চালু হয়েছে নতুন ইন্টারেক্টিভ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘ম্যাচ মাই পলিসি’। গত শনিবার (১০ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় তারেক রহমানের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে এই বিশেষ ওয়েব অ্যাপটি (www.matchmypolicy.net) জনসাধারণের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করা হয়। মূলত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো রাজনৈতিক দল জনমত যাচাই ও পলিসি নির্ধারণে এমন একটি আধুনিক ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করতে যাচ্ছে, যা তরুণ প্রজন্মের চিন্তাভাবনাকে সরাসরি গুরুত্ব প্রদান করবে।
এই ওয়েব অ্যাপটির প্রধান বিশেষত্ব হলো এর অত্যন্ত সহজ ও পরিচিত সোয়াইপভিত্তিক ইন্টারফেস। এর মাধ্যমে সাধারণ ব্যবহারকারীরা প্রতিটি স্ক্রিনে বিএনপির প্রস্তাবিত বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় নীতি, সংস্কার পরিকল্পনা ও উন্নয়নমূলক পদক্ষেপের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেখতে পাবেন। ব্যবহারকারীরা কেবল সোয়াইপ করার মাধ্যমেই সেই সকল পলিসির প্রতি নিজেদের অবস্থান বা সম্মতি জানাতে পারবেন। এছাড়া নির্দিষ্ট কোনো নীতি বা পরিকল্পনা নিয়ে যদি কারো ভিন্ন কোনো সুচিন্তিত পরামর্শ থাকে, তবে সেটির জন্য অ্যাপটিতে ‘ওপিনিয়ন’ (Opinion) নামে একটি বিশেষ সেকশন রাখা হয়েছে। এর ফলে নাগরিকরা সরাসরি লিখে তাঁদের মতামত দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছে দিতে পারবেন, যা আগামীর পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়ক হবে।
‘ম্যাচ মাই পলিসি’ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষকে, বিশেষ করে ‘জেন-জি’ ও শিক্ষিত তরুণ সমাজকে সরাসরি সম্পৃক্ত করা। বিএনপি মনে করে, জনগণের প্রত্যক্ষ ও স্বতঃস্ফূর্ত মতামতের ভিত্তিতে তৈরি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাগুলো অনেক বেশি গণমুখী, কার্যকর এবং বাস্তবসম্মত হবে। এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন নয়, বরং এটি বাংলাদেশে একটি নতুন ধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করবে যেখানে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র নিশ্চিত হবে। অ্যাপটির শেষ অংশে ব্যবহারকারীদের জন্য বিভিন্ন তথ্যবহুল কনটেন্ট রাখা হয়েছে, যা বিএনপির ভবিষ্যৎ ভাবনা সম্পর্কে জনগণকে আরও স্বচ্ছ ধারণা পেতে সাহায্য করবে। দলটির মতে, জনগণের প্রতিটি মতামতই হবে আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রধান চালিকাশক্তি।
দেশের ‘কঠিন সময়ে’ জনগণ বুক ভরা প্রত্যাশা নিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দিকে ‘তাকিয়ে আছে’ বলে মন্তব্য করেছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) বনানীর হোটেল শেরাটনের গ্র্যান্ড বলরুমে সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকদের সঙ্গে তারেক রহমানের শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আজকে একটা বেশ কঠিন সময়ে আমাদের নেতা জনাব তারেক রহমান বিদেশ থেকে দেশে এসেছেন। সমগ্র দেশের মানুষ বুক ভরা প্রত্যাশা নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তিনি ইতোমধ্যেই দূর থেকে ডিজিটালি যে কথা আমাদের সামনে বলেছেন জাতির সামনে বলেছেন গোটা জাতি আজকে অনেক বেশি আশান্বিত হয়েছে এ জন্যই যে, এবার একটা সুযোগ সৃষ্টি হবে সত্যিকার অর্থেই একটা উদারপন্থি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আমরা এখানে সৃষ্টি করতে পারব।’
এর আগে বক্তব্যের শুরুতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দলের প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি মির্জা ফখরুল একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের শহীদ এবং চব্বিশের ছাত্র গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণ করেন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের সেইসব ছেলে-মেয়ে-শিশুদের মধ্যে যারা ২০২৪ সালে আমাদের একটা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণ করবার একটা অভূতপূর্ব সুযোগ এনে দিয়েছেন। তাদের আমরা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করতে চাই।’
যুক্তরাজ্যে দেড় যুগের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে গত ২৫ ডিসেম্বর সপরিবারে দেশে ফেরেন তারেক রহমান। এরপর গত ৩০ ডিসেম্বর তার মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মারা যান।
এর ১০ দিনের মাথায় শনিবার (১০ জানুয়ারি) রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তারেক রহমানকে দলের চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়। এর পরদিন প্রথম কর্মসূচিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠকে বসলেন তারেক রহমান।
এ শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে দেশের জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার প্রধান নির্বাহী, বার্তা সংস্থাগুলোর শীর্ষ প্রধানসহ জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা অংশ নিচ্ছেন।
অনুষ্ঠানস্থলে এসে বিএনপি নেতা তারেক রহমান সম্পাদক ও সাংবাদিকদের কাছে গিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এ সময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার সঙ্গে ছিলেন।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘অনেকগুলো বছর সংগতকারণেই দলের প্রধান তারেক রহমানের সঙ্গে দেশের গণমাধ্যম সম্পাদক, সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি দেখা সাক্ষাৎ কিংবা শুভেচ্ছা বিনিময় হয়নি। এ কারণে দলের তরফে এ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে।’
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘হিংসা বা প্রতিহিংসা কখনো ভালো কিছু বয়ে আনে না। আমাদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকবে কিন্তু মতবিভেদ যেন না হয়। দলমত নির্বিশেষে সবাই মিলে সমস্যা সমাধান সম্ভব।’
শনিবার (১০ জানুয়ারি) রাজধানীর বনানীতে হোটেল শেরাটনে সাংবাদিকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ে বক্তব্যকালে তিনি এ কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, ‘মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু মতবিভেদ নয়– ভবিষ্যৎ সাংবাদিকতায় স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সহিংসতা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছি।’
ভবিষ্যত সাংবাদিকতায় স্বাধীনতা থাকবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা পাঁচ আগস্টের আগের পরিস্থিতিতে ফিরে যেতে চাই না। সেই সময়ে ফিরে যাওয়ার কোনো কারণই নেই।’
তারেক রহমান বলেন, ‘আমি দেশে না থাকতে পারলেও সারাক্ষণ যোগাযোগ রেখেছি। সবার তথ্য রাখার চেষ্টা করেছি। গত ১৬ বছরে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতনের কথা আমি জানি। পাশাপাশি আমার নেতা-কর্মী এবং আমার মা নির্যাতনের শিকারের বড় উদাহরণ।’
এ সময় তারেক রহমান তার বক্তব্যে দেশ গঠনের পরিকল্পনার কিছু দিক নিয়ে কথা বলেন। তার আলোচনায় উঠে এসেছে দেশের নদীতে পানি দূষণের কথাও।
তিনি বলেন, ‘একের পর এক নদী দূষণ হচ্ছে। এর সমাধান নিয়ে সংসদে এবং সেমিনারে আলোচনা হওয়া উচিত।’
নতুন প্রজন্মের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, ‘নতুন প্রজন্ম আশাবাদী হয়ে আছে। তাদের সব প্রত্যাশা হয়তো পূরণ করা সম্ভব নয়। সবাই এক হয়ে কাজ করলে জাতিকে সঠিক পথে পরিচালিত করা সম্ভব।’
দেশে দেড় কোটির মতো কৃষক আছেন মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এত বিশালসংখ্যক মানুষ- যারা ২০ কোটি মানুষের খাওয়া-পরার ব্যবস্থা করছে, খাওয়ার-অন্নের সংস্থান করছে সেই এত বড় সমাজটাকে কীভাবে সাপোর্ট দেওয়া যায়। তাদের হয়তো সেভাবে বলার সুযোগ নেই এখানে আপনারা সংবাদপত্রের যারা কর্মী আছেন আপনারা আপনাদের কিছু সমস্যার কথা বলেছেন আপনাদের সমস্যাটা আমাদের জন্য শোনতে জানতে সহজ হয় বিকজ আমাদের জন্য একটা ভেন্যু আছে, যেখানে আমরা আলাপ করতে পারি।’
তিনি বলেন, ‘ওই কৃষকগুলো যাদের কোনো ভেন্যু নেই যারা এ রকম একটা প্রোগ্রাম অর্গানাইজ করতে পারছে না তারা কীভাবে বলবে কথাগুলো। কাজেই তাদের কথা তো আমাদের জানতে হবে।’
দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীর অবদানের কথা তুলে ধরে তার বড় ছেলে তারেক বলেন, ‘মরুহুমা বেগম খালেদা জিয়া নারীদের শিক্ষার ব্যাপারটা নিশ্চিত করেছিলেন। পরবর্তীতে আগামী নির্বাচনে ইনশাআল্লাহ জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আমরা সরকার গঠনে সক্ষম হলে আমাদের একটি পরিকল্পনা রয়েছে; এই নারীরাই শিক্ষিত হয়েছে, এদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা।’
তিনি আরও বলেন, ‘একটু আগে আমি যে ফ্যামিলি কার্ডটি বলেছিলাম, সেটির লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য হচ্ছে, সেটাই এই নারী সমাজকে গড়ে তোলা। আমাদের হিসাব মতে বাংলাদেশে ৪ কোটি ফ্যামিলি আছে। আমরা যদি পরিবার হিসেবে ভাগ করি, এভারেজে একটি পরিবারে ৫ জন করে সদস্য ধরা হয়েছে।’
কৃষকদের সহায়তার জন্য কৃষি কার্ড চালুর ভাবনা রয়েছে জানিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, ‘একটি বড় সমস্যা হচ্ছে হেলথ ইস্যু। বাংলাদেশে ২০ কোটি মানুষ। আমরা স্লোগান দিয়ে হয়তো বলতে পারি যে, সকলের জন্য স্বাস্থ্যের ব্যবস্থা করব, আমরা সকলকে স্বাস্থ্য সুবিধা দেব।’
বিএনপি সরকার গঠন করলে জাতিকে সঠিকপথে পরিচালিত করবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন দলটির নতুন চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, ‘আমাদের সমস্যা ছিল, আমাদের সমস্যা আছে; অবশ্যই আমরা ৫ আগস্টের আগে ফিরে যেতে চাই না। আমি আমার অবস্থান থেকে যদি চিন্তা করি আমার এক পাশে ১৯৮১ সালের একটি জানাজা; একই সাথে আমার এক পাশে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের একটি জানাজা; আর আমার আরেক পাশে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনা। কাজেই আমার মনে হয় এটি শুধু বোধহয় আমার একার জন্য নয়, যারা আমার দলের নেতা-কর্মী সদস্য এবং সামগ্রিকভাবে পুরা দেশের মানুষের সামনে এই দুটি উদাহরণ সবচাইতে বাদ বিবেচনা করার জন্য সবচাইতে ভালো উদাহরণ যে- আসলে ৫ আগস্টের আগে ফিরে যাওয়ার কোনোই কারণ নেই আমাদের।’
সাংবাদিকদের কাছে গঠনমূলক সমালোচনা প্রত্যাশা করে তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা ইনশাআল্লাহ দেশের মানুষের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনে সক্ষম হলে যাতে আপনাদের কাছ থেকে এমন ধরনের আলোচনা-সমালোচনা আমরা পাই, যেটা আমাদের সাহায্য করবে দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে। শুধু সমালোচনা- সমালোচনা করার জন্য নয়। আপনাদের কাছ থেকে এমন সমালোচনা আমরা পাই, যাতে আমরা দেশের মানুষের যে সমস্যাগুলো আছে- সেই সমস্যাগুলো যাতে আমরা সমাধান করতে সক্ষম হই।’
বেলা ১১টা ২০ মিনিটে মাওলানা আবুল কালাম আজাদের কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এর আগে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান উপস্থিত সাংবাদিকের সঙ্গে শুভেচ্ছা ও কুশল বিনিময় করেন।
দেশের বিভিন্ন জাতীয় সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদ সংস্থা ও অনলাইন গণমাধ্যমের সম্পাদকরা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিয়েছেন। তাদের আলোচনায় বিগত আওয়ামী সরকারের আমলের গণমাধ্যমে স্বাধীনতা না থাকা এবং সংবাদকে কীভাবে তাদের স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে তা নিয়ে আলোচনা করা হয়। সাংবাদিকদের উপর দমন-নীপিড়নের বিষয়ও সেসব আলোচনায় উঠে আসে।
অনুষ্ঠানে প্রবীণ সাংবাদিক শফিক রেহমান, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, মানবজমিন প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, কালের কণ্ঠের সম্পাদক কবি হাসান হাফিজ, নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীরসহ অন্যান্য সম্পাদকরা বক্তব্য দিয়েছেন।
গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শনিবার বেলা সোয়া ১১টায় রাজধানীর বনানীর হোটেল শেরাটনের গ্র্যান্ড বলরুমে এই অনুষ্ঠান শুরু হয়। এতে দেশে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক, সাংবাদিক এবং বিএনপির নেতারা উপস্থিত আছেন।
অনুষ্ঠানস্থলে এসেই তারেক রহমান সম্পাদক ও সাংবাদিকদের কাছে গিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, অনেকগুলো বছর সংগত কারণেই দলের প্রধান তারেক রহমানের সঙ্গে দেশের গণমাধ্যম সম্পাদক, সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি দেখা সাক্ষাৎ কিংবা শুভেচ্ছা বিনিময় হয়নি। এ কারণে দলের পক্ষে এ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে।
ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও) আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আক্তারুজ্জামান বাচ্চু বলেছেন, বেগম খালেদা জিয়া কেবল একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন এ দেশের ১৮ কোটি মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার কেন্দ্রবিন্দু। তিনি আমৃত্যু দেশের মানুষের অধিকার রক্ষায় লড়াই করেছেন এবং যেকোনো দুর্যোগ, জাতীয় সংকট ও মানবিক বিপর্যয়ে সবসময় সাধারণ মানুষের পাশে ছায়ার মতো দাঁড়িয়েছেন। শুক্রবার বিকেলে গফরগাঁও পৌর এলাকার ইমামবাড়ি কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে আয়োজিত বেগম খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফিরাত ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ময়মনসিংহ জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও পাগলা থানা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ডা. মোফাখখারুল ইসলাম রানার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই মাহফিলে কয়েক হাজার নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ শরিক হন।
আক্তারুজ্জামান বাচ্চু তাঁর বক্তব্যে আরও উল্লেখ করেন যে, বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণার নাম। তাঁকে ‘গণতন্ত্রের মা’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, বেগম জিয়ার দেশপ্রেম এবং আপসহীন নেতৃত্বই আজ জাতীয়তাবাদী শক্তিকে সুসংগঠিত রেখেছে। তিনি বিশ্বাস করেন যে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শ ও বেগম খালেদা জিয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের মাধ্যমেই দেশে পুনরায় ইনসাফ ও জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। সেই লক্ষ্যেই তাঁর দলের প্রতিটি কর্মী গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে এবং মাঠ-ঘাটে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। দেশনেত্রীর রেখে যাওয়া সেই বীরত্বগাথা নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়ার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে শোকাতুর পরিবেশে বক্তারা বেগম খালেদা জিয়ার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন। এ সময় পৌর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ফজলুল হক, উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখ মো. ইসহাক, উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক শাহ আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং থানা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল হামিদ শেখসহ স্থানীয় শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন পৌর বিএনপির সাবেক দপ্তর সম্পাদক আজহারুল হক এবং ময়মনসিংহ জেলা যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক আ. আজিজ সাদেক। মাগরিবের নামাজের পর মুফতি আসাদুল্লাহর পরিচালনায় এক বিশেষ মোনাজাতের মাধ্যমে মরহুমার বিদেহী আত্মার শান্তি ও মাগফিরাত কামনা করা হয়। স্থানীয় বিএনপি নেতৃবৃন্দ জানান, প্রিয় নেত্রীর প্রয়াণে সৃষ্ট শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়, তবে তাঁর আদর্শই তাঁদের আগামীর পথচলার মূল হাতিয়ার।
চার দশকের বেশি সময় পর নতুন নেতা পেল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত এ দলের হাল ধরলেন তারই বড় ছেলে তারেক রহমান। যিনি এতদিন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন। গতকাল শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসন কার্যালয়ে বৈঠকটি হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন তারেক রহমান।
স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গুলশান কার্যালয়ের সামনে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, দলের গঠনতন্ত্রের বিধান অনুসারে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তারেক রহমানের উত্তরাঞ্চল সফর আপাতত স্থগিত করা হয়েছে বলেও জানান মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, পরবর্তীতে সফরের নতুন সময়সূচি জানানো হবে।
বৈঠকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়াও স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, বীর বিক্রম ও এ জেড এম জাহিদ হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে জানানো হয়, বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুজনিত কারণে দলের চেয়ারম্যান পদটি শূন্য হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক হয়। বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে শূন্যপদে আনুষ্ঠানিকভাবে তারেক রহমানকে দলটির চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ার পর তারেক রহমানকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনীত করা হয়। এরপর থেকেই কার্যত তার নেতৃত্বেই দল পরিচালিত হয়ে আসছে।
বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১ সাল থেকে তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকার প্রধান।
১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়ার শাহাদাত বরণের পর, তিনি ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি সাধারণ সদস্য হিসাবে বিএনপিতে যোগ দেন। তিনি ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে দলের ভাইস-চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ১৯৮৪ সালের আগস্ট মাসে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি অবাধ ও সুষ্ঠু সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন বেগম জিয়া। তার প্রধানমন্ত্রীত্বকালে বাংলাদেশ সংসদীয় গণতন্ত্রে পরিণত হয়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার মেয়াদে কিছু বড় অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল।
১৯৯৬ সালে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর খালেদা জিয়া টানা দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হন, কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং পুনরায় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রতিশ্রুতির কারণে, তিনি এক মাসের মধ্যে পদত্যাগ করেন। এরপর ২০০১ সালে আবার ক্ষমতায় আসে বিএনপি। টানা পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ২০০৬ সালে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন খালেদা জিয়া।
দুবছর দেশ চালায় সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এরপর ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার বাংলাদেশকে একটি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে পরিণত করে, তখন তিনি গণতন্ত্রের জন্য তার লড়াই নতুন করে শুরু করেছিলেন। সরকার তাকে জোরপূর্বক তার বাড়ি থেকে বের করে দেয় এবং গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন শুরু করায় তাকে গৃহবন্দি করা হয়। গণতন্ত্রের প্রতি তার ভূমিকার জন্য, তাকে ২০১১ সালে নিউ জার্সির স্টেট সিনেট ‘গণতন্ত্রের জন্য যোদ্ধা’ উপাধিতে সম্মানিত করে।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট সাজানো দুর্নীতি মামলায় ২০১৮ সালে বেগম খালেদা জিয়াকে ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২০ সালের কান্ট্রি রিপোর্টস অন হিউম্যান রাইটস প্র্যাকটিস প্রতিবেদনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় আইন বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছিল যে, মূলত নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য একটি রাজনৈতিক চক্রান্ত হিসেবেই তাকে সাজা দেওয়া হয়েছিল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে তার ন্যায্য বিচারের অধিকারকে সম্মান করা হয়নি। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতির আদেশে খালেদা জিয়া মুক্তি পেলেও তিনি আর রাজনীতিতে ফিরে আসেননি।
এরই মধ্যে প্রায় দেড় যুগের নির্বাসন শেষে গত ২৫ ডিসেম্বর সপরিবার দেশে ফেরেন তারেক রহমান।
তারেক রহমান বাংলাদেশ বিমানের বিজি-২০২ ফ্লাইটে দেশে ফেরেন। তিনি লন্ডন থেকে সিলেট হয়ে সেদিন বেলা ১১টা ৪৩ মিনিটে ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও একমাত্র মেয়ে জাইমা রহমান। বিমানবন্দর থেকে বের হয়েই তিনি খালি পায়ে শিশিরভেজা ঘাসে দাঁড়িয়ে ১৭ বছর পর প্রথম দেশের মাটির স্পর্শ নেন। পরে জনজোয়ার ঠেলে বিকেল প্রায় ৪টায় তারেক রহমান পূর্বাচলের জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়ের সংবর্ধনা মঞ্চে ওঠেন, ১৬ মিনিট বক্তব্য দেন। তিনি সবার জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানান। নারী, পুরুষ, শিশু এমনকি সব ধর্মের মানুষ যাতে নিরাপদে থাকে সেটাই তাদের চাওয়া বলে জানান। এরপর গত ৩০ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন খালেদা জিয়া। এতে চেয়ারম্যান পদটি শূন্য হয়।
বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নারীর ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি ক্ষমতায় আসেন। এর মধ্য দিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে আসে নারী। বিরোধীদলীয় নেত্রী তখন আওয়ামী লীগের শেখ হাসিনা। সেই থেকে শুরু হয় দুই নারীর রাজনৈতিক লড়াই। এই লড়াই ‘দুই বেগমের’ লড়াই বলে আখ্যায়িত করা হয়। ১৯৯১ সালের পর প্রথম বাংলাদেশ এমন এক নির্বাচনের মুখোমুখি হচ্ছে, যেখানে দুই ‘বেগম’-এর কেউই নেই। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ‘অবিচুয়ারি রিপোর্টে’ এ কথা লিখেছে দ্য গার্ডিয়ান।
গার্ডিয়ান লিখেছে, ৮০ বছর বয়সে মারা গেছেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৯০-এর দশক ও ২০০০-এর দশকের শুরুতে ক্ষমতার মেয়াদে নারীশিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে অগ্রগতির জন্য কৃতিত্ব দেওয়া হয় তাকে। তবে দীর্ঘ জীবনে তিনি দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র রাজনৈতিক বৈরিতার শিকার হয়েছেন। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে খালেদা জিয়া ও তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দক্ষিণ এশিয়ার এই রাষ্ট্রের নেতৃত্ব নিয়ে লড়াই করে গেছেন।
ক্ষমতায় থাকলে দু’জনই একে অপরকে ছাপিয়ে যেতে চেয়েছেন। উভয় নারীই ক্ষমতায় এসেছেন তাদের ঘনিষ্ঠজনের হত্যাকাণ্ডের পর। শেখ হাসিনা তার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পর রাজনৈতিক নেতৃত্বে আসেন। শেখ মুজিব ছিলেন ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট। আর জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর দলের নেতৃত্বে আসেন খালেদা। দক্ষিণ এশিয়ার বংশানুক্রমিক রাজনীতিতে এই ধারা পরিচিত- পাকিস্তানে বেনজির ভুট্টো, শ্রীলঙ্কায় সিরিমাভো বন্দরনায়েকে এবং ভারতে ইন্দিরা গান্ধী- তাদের সবাই পুরুষ আত্মীয়দের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক আন্দোলনের উত্তরাধিকার হিসেবে ক্ষমতায় এসেছিলেন।
তবে বাংলাদেশে যা ঘটেছে, তা ছিল ব্যতিক্রম। এখানে দেখা গেছে ‘দুই বেগমের লড়াই’। মুসলিম সমাজে উচ্চপদস্থ নারীদের বোঝাতে ব্যবহৃত এক প্রচলিত শব্দবন্ধ হলো বেগম। শুরুতে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা একসঙ্গে সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন। এরশাদ ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের হত্যার পরপরই ক্ষমতা দখল করেন। কিন্তু এরশাদের পতনের পর এই জোট ভেঙে যায়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।
এর পরের কয়েক দশকের রাজনৈতিক ধারা মোটামুটি স্থির হয়ে যায়। শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে প্রথম ক্ষমতায় আসেন এবং ২০০১ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। উভয়ের শাসনামলেই নির্বাচনে কারচুপি ও দুর্নীতির অভিযোগ, হরতাল, রাজপথের আন্দোলন এবং সংসদ বর্জনের ঘটনা নিয়মিত ঘটেছে। এর মধ্যেই এসেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সামরিক হস্তক্ষেপ। ২০০১ সালের নির্বাচনে খালেদা জিয়া আবার ক্ষমতায় এলেও রাজনৈতিক অস্থিরতা থামেনি। ২০০৬ সালে তার মেয়াদ শেষ হলে একটি অন্তর্বর্তী সরকার ২০০৮ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে ঐকমত্য আনার চেষ্টা করে, কিন্তু ব্যর্থ হয়। সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করে এবং দুই নেত্রীকেই আটক করা হয়। মুক্তির পরও স্পষ্ট হয়ে যায়- কিছুই বদলায়নি।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বে প্রথমবার নির্বাচন করতে গিয়ে খালেদা জিয়াকে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন নিতে হয়। এই জোট দীর্ঘদিন টিকে ছিল, যদিও ভারতের তীব্র বিরোধিতা ছিল; ভারত জামায়াতকে পাকিস্তানের প্রভাবিত শক্তি হিসেবে দেখত। ক্ষমতায় থাকাকালে খালেদা জিয়া ভারতের বদলে পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার চেষ্টা করেন, যেখানে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ ভারতের ঘনিষ্ঠতাকে অগ্রাধিকার দিতেন।
এত রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও নীতিগত দোদুল্যমানতার মাঝেও একটি প্রশ্ন রয়ে যায়, কীভাবে বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হলো? বিশ্বব্যাংকের মতে, এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে পোশাক রপ্তানি ও প্রবাসী শ্রমিকদের রেমিট্যান্স। তবে ব্যাংকটি নারী ক্ষমতায়নের কথাও উল্লেখ করেছে, যা খালেদা জিয়ার শাসনামলের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল।
তাকে যারা প্রথম চিনেছিলেন, তাদের কাছে এটি বিস্ময়কর ছিল। তিনি তখন এক ‘লাজুক গৃহবধূ’, কিশোরী বয়সে এক সেনা কর্মকর্তাকে বিয়ে করেছিলেন এবং দুই ছেলের লালনপালনেই মনোযোগী ছিলেন। খালেদা জিয়ার জন্ম হয় খালেদা খানম নামে, তৎকালীন বৃটিশ শাসিত বাংলার জলপাইগুড়িতে। বর্তমানে তা ভারতের অংশ। তিনি দাবি করেন, তার জন্মতারিখ ১৫ আগস্ট ১৯৪৫, যা তার প্রতিদ্বন্দ্বী হাসিনার পিতাকে হত্যার তারিখের সঙ্গে মিলে যায়। পরিবারে ‘পুতুল’ নামে পরিচিত ছিলেন খালেদা। তার পিতা ইস্কান্দার মজুমদার ছিলেন এক চা-ব্যবসায়ী। মায়ের নাম তাইয়েবা।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পরিবারটি দিনাজপুরে চলে আসে, যা তখন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) ছিল। সেখানেই তার পড়াশোনা। ১৯৬০ সালে তিনি জিয়াউর রহমানকে বিয়ে করেন এবং তার নাম গ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমান একজন সেনা কমান্ডার ছিলেন এবং ধারাবাহিক অভ্যুত্থানের পর ১৯৭৭ সালে প্রেসিডেন্ট হন। ১৯৮১ সালে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি নিহত হন।
স্বামীর হত্যার সময় খালেদা জিয়া বিএনপির সদস্যও ছিলেন না। তিনি ১৯৮২ সালে দলে যোগ দেন এবং ১৯৮৪ সালেই দলের চেয়ারপারসন হন। অনেকেই ভেবেছিলেন তিনি নামমাত্র নেত্রী হবেন, কিন্তু এরশাদ শাসনামলে গৃহবন্দিত্বের সময় তিনি দৃঢ়তা দেখান। ১৯৮৬ সালে সামরিক আইন বহাল রেখে এরশাদ যখন নির্বাচন দেন, খালেদা জিয়া বিএনপিকে তাতে অংশ নিতে দেননি, যদিও আওয়ামী লীগ অংশ নেয়। ফলে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি তুলনামূলকভাবে নৈতিক অবস্থানে ছিল।
ক্ষমতায় এসে তিনি স্বামীর উদার অর্থনৈতিক নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন এবং গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল করেন। তিনি মেয়েদের শিক্ষায় জোর দেন, যার ফলে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে প্রথম দিকেই স্কুলে নারী-পুরুষের সমতা অর্জন করে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়লেও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন।
খালেদা জিয়া সম্ভবত ভাবেননি যে ২০০৬ সালের পর তিনি আর কখনো ক্ষমতায় ফিরবেন না। ২০০৮ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর তিনি ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করেন। ২০১৮ সালে তিনি দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হন- যা তার সমর্থকদের মতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাকে প্রথমে পাঁচ বছর, পরে ১০ বছরের সাজা দেয়া হয়, ফলে তিনি নির্বাচনে অযোগ্য হয়ে পড়েন। তবু তিনি দেশ ছাড়েননি।
স্বাস্থ্যের অবনতির কারণে ২০২০ সালে তাকে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার পতনের পর সব বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হয়। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে তিনি সব মামলায় খালাস পান এবং আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হন, যদিও বিএনপির নেতৃত্ব এখন তারেক রহমানের হাতে। ১৯৯১ সালের পর এই প্রথম বাংলাদেশ এমন এক নির্বাচনের মুখোমুখি হলো, যেখানে কোনো ‘বেগম’ নেই।