আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে নির্বাচনী ইশতেহারে দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণের মতো ১১টি বিষয়ে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়েছে আওয়ামী লীগ। এবারের ইশতেহারে স্লোগান- ‘স্মার্ট বাংলাদেশ: উন্নয়ন দৃশ্যমান, বাড়বে এবার কর্মসংস্থান’।
গতকাল রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে এক অনুষ্ঠানে এই ইশতেহার ঘোষণা করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।
ইশতেহারে যে বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে- দ্রব্যমূল্য সবার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া, কর্মোপযোগী শিক্ষা ও যুবকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলা, লাভজনক কৃষির লক্ষ্যে সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থা, যান্ত্রিকীকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দৃশ্যমান অবকাঠামোর সুবিধা নিয়ে এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে শিল্পের প্রসার ঘটানো, ব্যাংকসহ আর্থিক খাতে দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা, নিম্ন আয়ের মানুষদের স্বাস্থ্যসেবা সুলভ করা, সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় সবাইকে যুক্ত করা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, সাম্প্রদায়িকতা এবং সব ধরনের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ রোধ করা, সর্বস্তরে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সুরক্ষা ও চর্চার প্রসার ঘটানো।
তরুণদের জন্য দেড় কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছে আওয়ামী লীগ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সব গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে তরুণ সমাজের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। জনমিতিক পরিবর্তনে ২০৪১ সালে জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকের বয়স হবে ৩০ বছরের কম; ১৫-২৯ বছর বয়সের তরুণের সংখ্যা কমবেশি ২ কোটি। বাংলাদেশের রূপান্তর ও উন্নয়নে আওয়ামী লীগ এই তরুণ ও যুবসমাজকে সম্পৃক্ত রাখবে।
আওয়ামী লীগের ইশতেহারে বলা হয়, কর্মক্ষম, যোগ্য তরুণ ও যুবকদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রসার করা হবে। জেলা ও উপজেলায় ৩১ লাখ যুবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এবং তাদের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য সহায়তা প্রদান কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। ২০৩০ সাল নাগাদ অতিরিক্ত ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বেকার যুবকদের সর্বশেষ হার ১০ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে ৩ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে।
নিরক্ষর ও স্বল্পশিক্ষিত তরুণ ও যুবসমাজের জন্য যথোপযুক্ত কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে জানিয়ে ইশতেহারে বলা হয়, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আত্মকর্মসংস্থানে উদ্যোগীদের সহজ শর্তে ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থা অব্যাহত রাখা এবং ঋণের পরিমাণ বাড়ানো হবে।
ইশতেহারে আরও জানানো হয়, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের বাইরে থাকা ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ যুবকদের অনুপাত আগামী ৫ বছরে ৭ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা হবে। আগামী ৫ বছরে ২ লাখ যুবকদের মধ্যে ৭৫০ কোটি টাকা যুব ঋণ বিতরণ করা এবং ২ লাখ ৫০ হাজার যুবককে আত্মকর্মী হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এ ছাড়া নারীর শ্রমে অংশগ্রহণের বাধা দূর করা এবং নারীশ্রমিক সংগঠন সুসংহত করা হবে।
এবারের ইশতেহারে ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য বিশেষ ঘোষণা প্রদান করেছে আওয়ামী লীগ। ‘সাম্প্রদায়িকতা যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বাংলাদেশ। মুসলমান তার ধর্মকর্ম করবে। হিন্দু তার ধর্মকর্ম করবে। বৌদ্ধ তার ধর্মকর্ম করবে। কেউ কাউকে বাধা দিতে পারবে না।’- জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এই আদর্শকে ধারণ করে ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় কমিশন গঠন ও পৃথক আইন প্রণয়নের অঙ্গীকার করা হয় এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জাতীয় সংসদে অর্পিত সম্পত্তি আইন সংশোধন করা হয়েছে এবং অর্পিত সম্পত্তি-সংশ্লিষ্ট সমস্যা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আগামীতে নির্বাচিত হলে আইন প্রয়োগে বাধা দূর করা হবে বলে জানায় আওয়ামী লীগ। ইশতেহারে বলা হয়, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ধর্মীয় সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও চা-বাগানে কর্মরত শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর ওপর সন্ত্রাস, বৈষম্যমূলক আচরণ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের চির অবসান, তাদের জীবন, সম্পদ, সম্ভ্রম, মান-মর্যাদার সুরক্ষা এবং রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের সর্বক্ষেত্রে সমান অধিকার নিশ্চিত করার নীতি অব্যাহত রাখবে।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণকে সমাজের ও উন্নয়নের মূল স্রোতে আনার জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। অনগ্রসর ও অনুন্নত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও চা-বাগান শ্রমিকদের সন্তানদের শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে বিশেষ কোটা এবং সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত আছে।
পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ। আর এ কারণেই দেশের জলবায়ু ও পরিবেশ রক্ষায় নানা প্রতিশ্রুতির কথা ইশতেহারে তুলে ধরেছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের এবারের ইশতেহারে জানানো হয়, ডেল্টা প্ল্যান তথা ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ মূলত একটি অভিযোজনভিত্তিক কারিগরি ও অর্থনৈতিক মহাপরিকল্পনা, যার উন্নয়নের ফলাফলের ওপর পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, ভূমি ব্যবহার, প্রতিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং এদের পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াকে বিবেচনা করে করা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, ইউরোপের দেশ নেদারল্যান্ডসের পরামর্শ ও সহযোগিতায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের চাবিকাঠি হিসেবে এ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। এই পরিকল্পনার রূপকল্প হচ্ছে নিরাপদ, জলবায়ু পরিবর্তনে অভিঘাত সহিষ্ণু সমৃদ্ধিশালী ব-দ্বীপ গড়ে তোলা। মহাপরিকল্পনার মিশন হচ্ছে দৃঢ়, সমন্বিত ও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনশীল কার্যকরী কৌশল অবলম্বন, এবং পানি ব্যবস্থাপনা ন্যায়সঙ্গত করা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত এবং অন্যান্য ব-দ্বীপসংক্রান্ত সমস্যা মোকাবিলা করে দীর্ঘমেয়াদি পানি ও খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।
ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলা হয়, জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে সংগতিপূর্ণভাবে ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০-এর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে: ১. ২০৩০ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্য দূরীকরণ; ২. ২০৩০ সালের মধ্যে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জন এবং ৩. ২০৪০ সাল নাগাদ একটি সমৃদ্ধ দেশের মর্যাদা অর্জন। ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০-এর কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য ৬টি হলো: ১. বন্যা ও জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত বিপর্যয় থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; ২. পানি ব্যবহারে অধিকতর দক্ষতা ও নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা; ৩. সমন্বিত ও টেকসই নদী অঞ্চল এবং মোহনা ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা; ৪. জলবায়ু ও বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ এবং সেগুলোর যথোপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করা; ৫. অন্ত ও আন্তদেশীয় পানিসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য কার্যকর প্রতিষ্ঠান ও সুশাসন গড়ে তোলা এবং ৬. ভূমি ও পানিসম্পদের সর্বোত্তম সমন্বিত ব্যবহার নিশ্চিত করা।
জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য নেওয়া উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে এতে বলা হয়, জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য পৃথিবীতে প্রথম বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয় মুজিববর্ষে। ১৯৯১ সালে ঘূর্ণিঝড়ে উদ্বাস্তু পরিবার পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় এ পর্যন্ত ৪ হাজার ৪০৯টি পরিবারকে পুনর্বাসিত করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, অভিযোজন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ডেল্টা হটস্পটভিত্তিক প্রকল্প/কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।
এতে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তন ও বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা, দূষণমুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলা এবং পানিসম্পদ রক্ষায় ইতোমধ্যে সরকার যে সকল নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, তার বাস্তবায়ন অব্যাহত থাকবে।
ইশতেহারে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য উৎপাদনশীল/সামাজিক বনায়ন ২০ শতাংশে উন্নীত; ঢাকা ও অন্যান্য বড় নগরে বায়ুর মান উন্নয়ন; শিল্পবর্জ্যের শূন্য নির্গমন/নিক্ষেপণ প্রবর্ধন; আইনসংগতভাবে বিভিন্ন নগরে জলাভূমি সংরক্ষণ, পুনরুদ্ধার ও সুরক্ষা; সমুদ্র উপকূলে ৫০০ মিটার বিস্তৃত স্থায়ী সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা। পরিবেশের ওপর প্লাস্টিক পণ্যের বিরূপ প্রভাব নিয়ন্ত্রণে প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব ও পচনশীল প্লাস্টিকের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হবে। দেশের মোট জ্বালানিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০৪১ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ অর্জনে জোরালো প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হবে। ভূ-উপরিস্থ পানির যুক্তিসংগত ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে।
এখানে আরও বলা হয়, সুন্দরবন ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বন সংরক্ষণে অগ্রাধিকারসহ দেশের বনসম্পদ রক্ষা, বন সৃজন, বন্যপ্রাণী, অতিথি পাখিসহ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।
সেই সঙ্গে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে নেপাল ও ভারতের সঙ্গে সপ্তকোষী প্রকল্পে বাংলাদেশের ন্যায্য অংশীদারত্ব অর্জনের প্রচেষ্টার কথাও জানায় আওয়ামী লীগ।
এবারের ইশতেহারে বিগত নির্বাচনগুলোর মতোই সবচাইতে গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে তরুণ প্রজন্মকে কেন্দ্র করে। ইশতেহার অনুসারে, সমৃদ্ধি অর্জনে যুবসম্পদের সর্বোচ্চ প্রয়োগ চায় আওয়ামী লীগ। আর এ কারণেই স্মার্ট বাংলাদেশ নির্মাণের রূপরেখায় প্রতিটি পদে পদে তরুণদের অংশগ্রহণের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। তরুণদের কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কর্মমুখী শিক্ষার বিষয়টি আরও একবার গুরুত্বসহকারে দেখা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আওয়ামী লীগ। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত স্মার্ট সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলা হবে যার জন্য ২০২৮ সালের মধ্যে গবাদিপশুর উৎপাদনশীলতা দেড় গুণ বাড়ানো হবে। এ ছাড়াও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গ্যাস ও এলপিজির সরবরাহ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ হাজার ও ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। পর্যায়ক্রমে ভাড়াভিত্তিক ও অদক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ করা হবে। বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের পরিমাণ ২৪ হাজার সার্কিট কিলোমিটারে উন্নীত করা হবে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের আওতায় সঞ্চালন লাইন নির্মাণ ও পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পরিবেশবান্ধব জ্বালানি থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে।
সমগ্র অঞ্চল থেকে সন্ত্রাসী এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর মূলোৎপাটনের লক্ষ্যে, সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় দক্ষিণ এশিয়া টাস্কফোর্স গঠনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন কবে বলেও প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হয়।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সারা দেশের ৩০টি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে বলে জানিয়েছেন দলটির মুখপাত্র ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। সোমবার (১২ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এই ঘোষণা দেন। আসিফ মাহমুদ জানান, এনসিপি মূলত ১১টি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত একটি বৃহত্তর নির্বাচনি সমঝোতা জোটের অংশ হিসেবে এই আসনগুলোতে লড়াই করবে। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জনস্বার্থ ও রাষ্ট্রের বৃহত্তর কল্যাণের কথা বিবেচনা করেই তাঁদের দলের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন। তিনি এই জোটটিকে মূলত ‘আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সংস্কারের জোট’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, জনগণের সমর্থনে এই জোটই ইনশাআল্লাহ আগামীতে সরকার গঠন করবে।
নির্বাচনি কৌশল ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এনসিপির এই শীর্ষ নেতা জানান যে, জোট গঠনের স্বার্থে এনসিপি অনেক ক্ষেত্রে নমনীয় হয়েছে এবং বড় ধরণের ছাড় দিয়েছে। জোটের অন্য শরিকদের মধ্যেও একই ধরণের মানসিকতা থাকায় একটি শক্তিশালী ঐক্য গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, এই জোটটি মূলত একটি কৌশলগত বা ‘স্ট্র্যাটেজিক’ জোট, এটি কোনো নির্দিষ্ট আদর্শিক জোট নয়। যেসব আসনে এনসিপির নিজস্ব কোনো প্রার্থী থাকছে না, সেই ২৭০টি আসনেও দলটি নিষ্ক্রিয় থাকবে না। বরং সেই আসনগুলোতে দলীয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হবে। তৃণমূল পর্যায়ে এনসিপির কর্মীরা মূলত গণভোটের প্রার্থী হিসেবে সক্রিয় থেকে ভোটারদের সচেতন করার কাজ চালিয়ে যাবেন।
দলের ভেতরে সাম্প্রতিক কিছু পদত্যাগের ঘটনা নিয়ে আসিফ মাহমুদ তাঁর অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি বলেন, যারা ব্যক্তিগত বা অভিমান থেকে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন, তাঁরা আমাদের দলের অমূল্য সম্পদ বা ‘অ্যাসেট’। এখন পর্যন্ত তাঁদের পদত্যাগপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয়নি এবং তিনি বিশ্বাস করেন যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে পুনরায় একসঙ্গে দেশের জন্য কাজ করার সুযোগ এখনো শেষ হয়ে যায়নি। মূলত জাতীয় সংস্কার এবং একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতেই এনসিপি এই ভারসাম্যপূর্ণ নির্বাচনি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বর্তমানে দলের পক্ষ থেকে মনোনীত ৩০ জন প্রার্থীর চূড়ান্ত তালিকা নিয়ে মাঠে নামার প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে তিনি তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন।
সিরাজগঞ্জ-৬ (শাহজাদপুর) আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ও উপজেলা জামায়াতের আমীর মো. মিজানুর রহমানের একটি বিতর্কিত বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর জেলাজুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি শাহজাদপুর উপজেলার কায়েমপুর ইউনিয়নের স্বরুপপুর ও কাশিনাথপুর এলাকায় একটি মাদরাসার উন্নয়নকল্পে আয়োজিত ইসলামী মাহফিলে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এই মন্তব্য করেন। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে তাঁকে বলতে শোনা যায় যে, যারা নির্বাচনি লড়াইয়ে ‘দাঁড়িপাল্লার’ পক্ষে থাকবে না, তাঁদের পবিত্র কোরআনের মাহফিল শোনার কোনো প্রয়োজন নেই। তিনি উপস্থিত শ্রোতাদের অনুরোধ করেন যেন তাঁরা কোরআন ও আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার লক্ষে জামায়াতের নির্বাচনি প্রতীক দাঁড়িপাল্লার পক্ষে অবস্থান নেন।
ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর নেটিজেনদের মধ্যে তীব্র সমালোচনা শুরু হলে বিষয়টি নিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন জামায়াত নেতা মিজানুর রহমান। তিনি গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেছেন যে, বক্তব্যটি মাস দুয়েক আগে দেওয়া হয়েছিল এবং ভিডিওতে তাঁর বক্তব্যটি আংশিক বা ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্যমতে, তিনি ভিডিওতে যেভাবে দেখানো হয়েছে ঠিক সেভাবে কথাগুলো বলেননি, বরং তিনি সবাইকে কোরআনের পথে আসার জন্য সাধারণ আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে প্রার্থীর এমন সরাসরি নির্বাচনি প্রচারণা ও ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে কড়া সমালোচনা করা হয়েছে। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চু অভিযোগ করেছেন যে, জামায়াতে ইসলামী বরাবরই নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য পবিত্র ধর্মকে ব্যবহার করে আসছে। তিনি মন্তব্য করেন যে, যেহেতু দলটির নামের সাথে ইসলামের সম্পৃক্ততা রয়েছে, তাই তাঁরা সুযোগ পেলেই ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করে, যা প্রকৃত আলেম সমাজ এবং সাধারণ মানুষ পছন্দ করে না। বিএনপি নেতার মতে, জামায়াত মূলত তাঁদের সুনির্দিষ্ট মতবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষে ধর্মীয় মাহফিলগুলোকে নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়ার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে। নির্বাচনি আমেজের মধ্যে এমন মন্তব্য রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও সুস্থ ধারার রাজনীতির জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। বর্তমানে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ফের বড় ধরণের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এবার দলটির বাগেরহাট সদর উপজেলা শাখার প্রধান সমন্বয়ক আলী হুসাইনসহ মোট ১২ জন নেতাকর্মী একযোগে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। রবিবার (১১ জানুয়ারি) দুপুরে বাগেরহাট প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তাঁরা এই গণপদত্যাগের বিষয়টি জনসমক্ষে নিশ্চিত করেন। পদত্যাগকারী নেতাদের মধ্যে উপজেলা কমিটির যুগ্ম সমন্বয়ক কাজী মাহফুজুর রহমানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের সক্রিয় সদস্যরা রয়েছেন। সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা দল ছাড়ার পেছনে সংগঠনের বর্তমান গতিধারা এবং রাজনৈতিক সমীকরণের অসামঞ্জস্যতাকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
প্রধান সমন্বয়ক আলী হুসাইন তাঁর লিখিত বক্তব্যে বিস্তারিত কারণ তুলে ধরে জানান যে, তিনি ২০২৫ সালের ৩ জুন থেকে জাতীয় নাগরিক পার্টির বাগেরহাট সদর উপজেলা শাখার দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তিনি বলেন, ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে আকাঙ্ক্ষা এবং সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির জন্ম ও পথচলা শুরু হয়েছিল, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দলটির মধ্যে সেই আদর্শের প্রতিফলন আর দেখা যাচ্ছে না। তাঁর মতে, ‘নতুন বন্দোবস্তের’ যে স্বপ্নের ভিত্তিতে তাঁরা এই সংগঠনে যুক্ত হয়েছিলেন, বর্তমানের পরিবর্তিত রাজনৈতিক সমীকরণে তার চরম ব্যত্যয় ঘটেছে। আলী হুসাইন স্পষ্টভাবে দাবি করেন যে, এনসিপির বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান তাঁর ব্যক্তিগত দর্শনের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার ফলে দলটির সঙ্গে আর পথচলা সম্ভব নয়।
সংবাদ সম্মেলনে আলী হুসাইনের সাথে পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়া অন্য সদস্যরা হলেন—যুগ্ম সমন্বয়ক কাজী মাহফুজুর রহমান এবং সদস্য আশিকুর রহমান সুমন, শেখ রাসেল, শেখ মিজানুর রহমান, মো. হাসান শেখ, মো. শহিদুল ইসলাম, শেখ জাহিদুল ইসলাম, শেখ নাবিল হোসেন, মো. জনি, মুনিয়া আক্তার জেনি ও মো. রাতুল আহসান। পদত্যাগকারী এই নেতাদের অভিযোগ, যে আদর্শকে পাথেয় করে তাঁরা জুলাই বিপ্লবের চেতনা রক্ষায় কাজ করতে চেয়েছিলেন, এনসিপি এখন সেই পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। নির্বাচনের প্রাক্কালে উপজেলা পর্যায়ের একঝাঁক গুরুত্বপূর্ণ নেতার এমন বিদায়ে বাগেরহাট অঞ্চলে দলটির সাংগঠনিক ভিত্তি বড় ধরণের ধাক্কা খেল বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই পদত্যাগের বিষয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি পাওয়া যায়নি।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জাতীয় পার্টির (জাপা) মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন। আজ রোববার দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে দলের প্রার্থীদের আপিল শুনানিতে অংশ নিয়ে তিনি সাংবাদিকদের জানান যে, যদি দেশে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করা হয় এবং প্রকৃত অর্থে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সমান সুযোগ থাকে, তবে জাতীয় পার্টি অনায়াসেই ৪০ থেকে ৭০টি আসনে জয়লাভ করতে সক্ষম হবে। তিনি মনে করেন, নির্বাচনের মাঠ বর্তমানে অত্যন্ত অনিশ্চিত বা ফ্লুইড অবস্থায় রয়েছে, তাই ভোটারদের আস্থা অর্জনে একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার কোনো বিকল্প নেই। শামীম হায়দার অভিযোগ করেন যে, প্রাথমিক বাছাইয়ে তুচ্ছ ও কারিগরি ভুলকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে অনেক প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে, যা প্রার্থীদের মধ্যে এক ধরণের অস্বস্তি তৈরি করেছে।
জাতীয় পার্টির এই নেতা মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, বর্তমানে দেশে এক ধরণের ‘মবতন্ত্র’ বিরাজ করছে যা রিটার্নিং কর্মকর্তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে সংকুচিত করে দিয়েছে। তিনি দাবি করেন, রিটার্নিং কর্মকর্তারা চাইলে অনেক ছোটখাটো ভুল সংশোধনের সুযোগ দিতে পারতেন, কিন্তু তাঁরা সেটা করেননি মূলত ‘ট্যাগিং’ হওয়ার ভয়ে। কোনো প্রার্থীর আবেদন গ্রহণ করলেই তাঁকে ‘দোসর’ বা বিশেষ মহলের সহযোগী আখ্যা দেওয়ার যে অপসংস্কৃতি শুরু হয়েছে, তাতে প্রশাসনের আত্মবিশ্বাস ভেঙে পড়েছে। শামীম হায়দার পাটোয়ারী মনে করেন, এমন একটি আতঙ্কিত ও ভারাক্রান্ত প্রশাসনের অধীনে উৎসবমুখর এবং স্বতঃস্ফূর্ত ভোট গ্রহণ সম্ভব নয়। তিনি সতর্ক করে বলেন যে, যদি প্রশাসন কঠোর ও সাহসী না হয়, তবে জাতি একটি ‘মানহীন’ নির্বাচনের সাক্ষী হতে পারে, যা পরবর্তী সরকারের ম্যান্ডেটকে দুর্বল করে দেবে।
সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে তিনি বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট দাবি সরকারের সামনে উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, নির্বাচনে ব্যাপক হারে সেনাবাহিনী ও পুলিশ মোতায়েন করা এখন সময়ের দাবি। এছাড়া প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে যাঁদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ রয়েছে, তাঁদেরকে অবিলম্বে রদবদল বা বদলি করার জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। জাপা মহাসচিবের মতে, বর্তমান প্রশাসন অনেকটা বিএনপি-জামায়াতের দেওয়া তালিকার ভিত্তিতে সাজানো হয়েছে বলে জনমনে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে, যা নিরসনে কমিশনকে নিরপেক্ষতার প্রমাণ দিতে হবে। একই সাথে তিনি দেশের সকল রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটি বৃহত্তর সমঝোতার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে বলেন যে, পারস্পরিক স্পেস এবং সম্মান বজায় রেখে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা জরুরি।
দলের বর্তমান সাংগঠনিক অবস্থা এবং প্রতীক নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা প্রসঙ্গে শামীম হায়দার পাটোয়ারী অত্যন্ত স্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করেন। তিনি দাবি করেন যে, জাতীয় পার্টির মূল ও শক্তিশালী অংশটি বর্তমানে জিএম কাদেরের নেতৃত্বেই ঐক্যবদ্ধ এবং দলের নির্বাচনি প্রতীক ‘লাঙ্গল’ তাঁদের অধিকারেই রয়েছে। প্রতিকূল ও ভীতিকর রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও তাঁর দল সারা দেশের ২৪৪টি আসনে প্রার্থী দিয়ে তাঁদের শক্তিমত্তার প্রমাণ দিয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন যে, একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে যদি গণতন্ত্রকে সুসংহত করা যায়, তবে জাতীয় পার্টি জাতীয় রাজনীতিতে এক শক্তিশালী অবস্থানে ফিরে আসবে। পরিশেষে তিনি আবারও স্মরণ করিয়ে দেন যে, মানসম্মত নির্বাচন না হলে তার নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের ওপর পড়বে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। রিটার্নিং কর্মকর্তার প্রাথমিক বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করে প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার পর তিনি এক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে গণতন্ত্রের দীর্ঘ লড়াইকে কখনোই স্তব্ধ করা সম্ভব নয়। আজ রবিবার নির্বাচন ভবনে নিজের প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার রায়কে তিনি ‘সত্যের জয়’ হিসেবে অভিহিত করেন। মান্না উল্লেখ করেন যে, গণতন্ত্রের জন্য এ দেশের মানুষ রক্ত ও জীবন দিয়েছে, তাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ব্যঙ্গ করা কিংবা ক্ষমতার লোভে প্রতিপক্ষকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা অত্যন্ত অশুভ এবং এটি কখনোই কাম্য নয়। তিনি বিশ্বাস করেন, কোনো দল বা ব্যক্তি যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, জনগণের সামগ্রিক ইচ্ছার কাছে সবাই নতি স্বীকার করতে বাধ্য।
মনোনয়নপত্র বাতিলের নেপথ্যে গভীর ষড়যন্ত্র ছিল বলে অভিযোগ তুলে মাহমুদুর রহমান মান্না প্রথমেই মহান আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া আদায় করেন। তিনি বলেন, প্রার্থিতা যাচাই-বাছাইয়ের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ছোটখাটো ভুলত্রুটি সংশোধনের সুযোগ দেওয়া, কাউকে অযোগ্য হিসেবে নির্বাচন থেকে ছিটকে ফেলা নয়। নির্বাচনী আইন অনুযায়ী হলফনামা বা নথিপত্রে কোনো ত্রুটি থাকলে তা সম্পূরক তথ্যের মাধ্যমে ঠিক করার বিধান থাকলেও তাঁর ক্ষেত্রে সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি। তিনি অতীতেও বগুড়া থেকে নির্বাচন করেছেন উল্লেখ করে জানান যে, এবারের বাধাটি ছিল মূলত অশুভ রাজনৈতিক কূটকৌশলের অংশ, যা পরিস্থিতি সামাল দিতে জেলা প্রশাসন নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত কমিশনের স্বচ্ছ সিদ্ধান্তে সেই ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার পথে বড় বাধা হিসেবে আসা ব্যাংক ঋণের অভিযোগ নিয়ে মান্না চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রদান করেন। তিনি দাবি করেন, তাঁর বিরুদ্ধে ঋণখেলাপি হওয়ার যে অভিযোগ আনা হয়েছিল তা ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও সাজানো। ইসলামী ব্যাংকের বগুড়া বড়গোলা শাখার এক অসাধু কর্মকর্তার মাধ্যমে একটি ভুয়া নোটিশ তৈরি করে তাঁকে বিপাকে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। বিষয়টি জানতে পেরে তিনি দ্রুত ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে যোগাযোগ করেন এবং তদন্তের পর ওই কর্মকর্তাকে শাস্তিমূলকভাবে স্ট্যান্ড রিলিজ ও বদলি করা হয়। মান্না আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন যে, তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের খবর ফলাও করে প্রচার হলেও ষড়যন্ত্রকারীর শাস্তির বিষয়টি গণমাধ্যমে আসেনি। তিনি স্পষ্ট করেন যে, ষড়যন্ত্র করে সাময়িকভাবে কাউকে থামানো গেলেও দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক লড়াইয়ে সততাই টিকে থাকে।
নির্বাচন কমিশনের বর্তমান ভূমিকার প্রশংসা করে মান্না জানান, কমিশন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে যা প্রশংসার দাবিদার। তবে মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তিনি এখনও যথেষ্ট শঙ্কিত। মান্নার মতে, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত সক্রিয় বা ‘প্রো-অ্যাক্টিভ’ ভূমিকা পালন করছে না এবং অনেক জায়গায় তাদের রহস্যজনক নীরবতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতা ও দৃঢ়তা একান্ত প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন। বিএনপি জোটের সমর্থন প্রসঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, যেহেতু তাঁকে জোটের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, তাই বগুড়া-২ আসনে বিএনপির মনোনীত বিকল্প প্রার্থী খুব শীঘ্রই তাঁর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেবেন। চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে তিনি এখন পূর্ণোদ্যমে প্রচারণায় নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রশাসন যদি কঠোর ভূমিকা পালন না করে, তবে একটি ‘মানহীন’ নির্বাচনের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী। রবিবার নির্বাচন কমিশনের আপিল শুনানি শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এই গভীর উদ্বেগের কথা জানান। শামীম পাটোয়ারী উল্লেখ করেন যে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি বিশেষ ভীতিকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে অনেক রিটার্নিং কর্মকর্তা তাঁদের স্বাধীন বিবেচনামূলক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারছেন না। বিশেষ করে ‘মব’ বা উন্মত্ত জনতার চাপ এবং ‘ট্যাগিং’ অর্থাৎ কাউকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক তকমা দিয়ে দেওয়ার ভয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তারা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ইতস্ততবোধ করছেন। কেউ আইন অনুযায়ী কাজ করতে চাইলে তাঁকে ‘দোসর’ আখ্যা দেওয়ার যে অপসংস্কৃতি শুরু হয়েছে, তাতে প্রশাসনের আত্মবিশ্বাস ও মনোবল ভেঙে পড়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা করে জাপা মহাসচিব বলেন যে, মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময় দেশে এক ধরণের রাজনৈতিক উত্তেজনা ও অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছিল, যার ফলে অনেক প্রার্থীর পক্ষে যথাযথভাবে কাগজপত্র প্রস্তুত করা সম্ভব হয়নি। আগে যেসব ছোটখাটো ভুল বা কারিগরি ত্রুটি সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হতো, এবার তা না করে রিটার্নিং কর্মকর্তারা গণহারে মনোনয়ন বাতিল করেছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। তবে তিনি স্বস্তি প্রকাশ করে জানান যে, জাতীয় পার্টির ১৩ জন প্রার্থীর আপিলের মধ্যে ১১ জনই ইতিমধ্যে তাঁদের প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে কুমিল্লা-১ আসনের সৈয়দ মোহাম্মদ ইফতেকার আহসান এবং বগুড়া-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মো. শরিফুল ইসলাম জিন্নার আপিল কমিশন মঞ্জুর করেছে।
বগুড়ায় জাতীয় পার্টির কার্যালয় দখল করার ঘটনাকে নজিরবিহীন ও ন্যাক্কারজনক হিসেবে অভিহিত করেন শামীম হায়দার পাটোয়ারী। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, নির্বাচনি তফশিল চলাকালীন এমন ঘটনা ঘটলেও স্থানীয় প্রশাসন তা রুখতে ব্যর্থ হয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবস্থা বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন যে, বাহিনীর মধ্যে এক ধরণের দ্বিধা ও কাজের ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তিনি দাবি করেন, একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে পর্যাপ্ত সেনাবাহিনী ও পুলিশ মোতায়েন করতে হবে এবং প্রশাসনকে আরও বেশি দৃঢ় ও স্বাধীন হতে হবে। অন্যথায় নির্বাচনের মান ও গ্রহণযোগ্যতা বড় ধরণের সংকটে পড়বে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও দলের সাংগঠনিক অবস্থা প্রসঙ্গে শামীম পাটোয়ারী জানান যে, জাতীয় পার্টির অভ্যন্তরে কিছুটা বিভক্তি থাকলেও দলটির মূল অংশ জিএম কাদেরের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। আসন্ন নির্বাচনে তাঁরা প্রায় ২২০ থেকে ২৪০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। যদি একটি সত্যিকারের ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সকল দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হয়, তবে জাতীয় পার্টি ৪০ থেকে ৭০টি আসনে চমকপ্রদ ফল করতে পারবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। পরিশেষে, তিনি নির্বাচন কমিশন বা সরকারের পক্ষ থেকে সকল রাজনৈতিক দলকে নিয়ে একটি সংলাপের আয়োজন করার আহ্বান জানান, যাতে একটি সুন্দর রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচনকে সাফল্যমণ্ডিত করা যায়। মূলত ইনসাফ ও স্বচ্ছতার মাধ্যমেই একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে তারুণ্যের শক্তি ও জনমতের প্রতিফলন ঘটাতে এক অনন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও পলিসিভিত্তিক আলোচনাকে উৎসাহিত করতে চালু হয়েছে নতুন ইন্টারেক্টিভ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘ম্যাচ মাই পলিসি’। গত শনিবার (১০ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় তারেক রহমানের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে এই বিশেষ ওয়েব অ্যাপটি (www.matchmypolicy.net) জনসাধারণের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করা হয়। মূলত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো রাজনৈতিক দল জনমত যাচাই ও পলিসি নির্ধারণে এমন একটি আধুনিক ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করতে যাচ্ছে, যা তরুণ প্রজন্মের চিন্তাভাবনাকে সরাসরি গুরুত্ব প্রদান করবে।
এই ওয়েব অ্যাপটির প্রধান বিশেষত্ব হলো এর অত্যন্ত সহজ ও পরিচিত সোয়াইপভিত্তিক ইন্টারফেস। এর মাধ্যমে সাধারণ ব্যবহারকারীরা প্রতিটি স্ক্রিনে বিএনপির প্রস্তাবিত বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় নীতি, সংস্কার পরিকল্পনা ও উন্নয়নমূলক পদক্ষেপের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেখতে পাবেন। ব্যবহারকারীরা কেবল সোয়াইপ করার মাধ্যমেই সেই সকল পলিসির প্রতি নিজেদের অবস্থান বা সম্মতি জানাতে পারবেন। এছাড়া নির্দিষ্ট কোনো নীতি বা পরিকল্পনা নিয়ে যদি কারো ভিন্ন কোনো সুচিন্তিত পরামর্শ থাকে, তবে সেটির জন্য অ্যাপটিতে ‘ওপিনিয়ন’ (Opinion) নামে একটি বিশেষ সেকশন রাখা হয়েছে। এর ফলে নাগরিকরা সরাসরি লিখে তাঁদের মতামত দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছে দিতে পারবেন, যা আগামীর পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়ক হবে।
‘ম্যাচ মাই পলিসি’ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষকে, বিশেষ করে ‘জেন-জি’ ও শিক্ষিত তরুণ সমাজকে সরাসরি সম্পৃক্ত করা। বিএনপি মনে করে, জনগণের প্রত্যক্ষ ও স্বতঃস্ফূর্ত মতামতের ভিত্তিতে তৈরি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাগুলো অনেক বেশি গণমুখী, কার্যকর এবং বাস্তবসম্মত হবে। এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন নয়, বরং এটি বাংলাদেশে একটি নতুন ধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করবে যেখানে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র নিশ্চিত হবে। অ্যাপটির শেষ অংশে ব্যবহারকারীদের জন্য বিভিন্ন তথ্যবহুল কনটেন্ট রাখা হয়েছে, যা বিএনপির ভবিষ্যৎ ভাবনা সম্পর্কে জনগণকে আরও স্বচ্ছ ধারণা পেতে সাহায্য করবে। দলটির মতে, জনগণের প্রতিটি মতামতই হবে আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রধান চালিকাশক্তি।
দেশের ‘কঠিন সময়ে’ জনগণ বুক ভরা প্রত্যাশা নিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দিকে ‘তাকিয়ে আছে’ বলে মন্তব্য করেছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) বনানীর হোটেল শেরাটনের গ্র্যান্ড বলরুমে সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকদের সঙ্গে তারেক রহমানের শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আজকে একটা বেশ কঠিন সময়ে আমাদের নেতা জনাব তারেক রহমান বিদেশ থেকে দেশে এসেছেন। সমগ্র দেশের মানুষ বুক ভরা প্রত্যাশা নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তিনি ইতোমধ্যেই দূর থেকে ডিজিটালি যে কথা আমাদের সামনে বলেছেন জাতির সামনে বলেছেন গোটা জাতি আজকে অনেক বেশি আশান্বিত হয়েছে এ জন্যই যে, এবার একটা সুযোগ সৃষ্টি হবে সত্যিকার অর্থেই একটা উদারপন্থি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আমরা এখানে সৃষ্টি করতে পারব।’
এর আগে বক্তব্যের শুরুতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দলের প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি মির্জা ফখরুল একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের শহীদ এবং চব্বিশের ছাত্র গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণ করেন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের সেইসব ছেলে-মেয়ে-শিশুদের মধ্যে যারা ২০২৪ সালে আমাদের একটা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণ করবার একটা অভূতপূর্ব সুযোগ এনে দিয়েছেন। তাদের আমরা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করতে চাই।’
যুক্তরাজ্যে দেড় যুগের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে গত ২৫ ডিসেম্বর সপরিবারে দেশে ফেরেন তারেক রহমান। এরপর গত ৩০ ডিসেম্বর তার মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মারা যান।
এর ১০ দিনের মাথায় শনিবার (১০ জানুয়ারি) রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তারেক রহমানকে দলের চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়। এর পরদিন প্রথম কর্মসূচিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠকে বসলেন তারেক রহমান।
এ শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে দেশের জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার প্রধান নির্বাহী, বার্তা সংস্থাগুলোর শীর্ষ প্রধানসহ জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা অংশ নিচ্ছেন।
অনুষ্ঠানস্থলে এসে বিএনপি নেতা তারেক রহমান সম্পাদক ও সাংবাদিকদের কাছে গিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এ সময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার সঙ্গে ছিলেন।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘অনেকগুলো বছর সংগতকারণেই দলের প্রধান তারেক রহমানের সঙ্গে দেশের গণমাধ্যম সম্পাদক, সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি দেখা সাক্ষাৎ কিংবা শুভেচ্ছা বিনিময় হয়নি। এ কারণে দলের তরফে এ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে।’
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘হিংসা বা প্রতিহিংসা কখনো ভালো কিছু বয়ে আনে না। আমাদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকবে কিন্তু মতবিভেদ যেন না হয়। দলমত নির্বিশেষে সবাই মিলে সমস্যা সমাধান সম্ভব।’
শনিবার (১০ জানুয়ারি) রাজধানীর বনানীতে হোটেল শেরাটনে সাংবাদিকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ে বক্তব্যকালে তিনি এ কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, ‘মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু মতবিভেদ নয়– ভবিষ্যৎ সাংবাদিকতায় স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সহিংসতা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছি।’
ভবিষ্যত সাংবাদিকতায় স্বাধীনতা থাকবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা পাঁচ আগস্টের আগের পরিস্থিতিতে ফিরে যেতে চাই না। সেই সময়ে ফিরে যাওয়ার কোনো কারণই নেই।’
তারেক রহমান বলেন, ‘আমি দেশে না থাকতে পারলেও সারাক্ষণ যোগাযোগ রেখেছি। সবার তথ্য রাখার চেষ্টা করেছি। গত ১৬ বছরে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতনের কথা আমি জানি। পাশাপাশি আমার নেতা-কর্মী এবং আমার মা নির্যাতনের শিকারের বড় উদাহরণ।’
এ সময় তারেক রহমান তার বক্তব্যে দেশ গঠনের পরিকল্পনার কিছু দিক নিয়ে কথা বলেন। তার আলোচনায় উঠে এসেছে দেশের নদীতে পানি দূষণের কথাও।
তিনি বলেন, ‘একের পর এক নদী দূষণ হচ্ছে। এর সমাধান নিয়ে সংসদে এবং সেমিনারে আলোচনা হওয়া উচিত।’
নতুন প্রজন্মের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, ‘নতুন প্রজন্ম আশাবাদী হয়ে আছে। তাদের সব প্রত্যাশা হয়তো পূরণ করা সম্ভব নয়। সবাই এক হয়ে কাজ করলে জাতিকে সঠিক পথে পরিচালিত করা সম্ভব।’
দেশে দেড় কোটির মতো কৃষক আছেন মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এত বিশালসংখ্যক মানুষ- যারা ২০ কোটি মানুষের খাওয়া-পরার ব্যবস্থা করছে, খাওয়ার-অন্নের সংস্থান করছে সেই এত বড় সমাজটাকে কীভাবে সাপোর্ট দেওয়া যায়। তাদের হয়তো সেভাবে বলার সুযোগ নেই এখানে আপনারা সংবাদপত্রের যারা কর্মী আছেন আপনারা আপনাদের কিছু সমস্যার কথা বলেছেন আপনাদের সমস্যাটা আমাদের জন্য শোনতে জানতে সহজ হয় বিকজ আমাদের জন্য একটা ভেন্যু আছে, যেখানে আমরা আলাপ করতে পারি।’
তিনি বলেন, ‘ওই কৃষকগুলো যাদের কোনো ভেন্যু নেই যারা এ রকম একটা প্রোগ্রাম অর্গানাইজ করতে পারছে না তারা কীভাবে বলবে কথাগুলো। কাজেই তাদের কথা তো আমাদের জানতে হবে।’
দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীর অবদানের কথা তুলে ধরে তার বড় ছেলে তারেক বলেন, ‘মরুহুমা বেগম খালেদা জিয়া নারীদের শিক্ষার ব্যাপারটা নিশ্চিত করেছিলেন। পরবর্তীতে আগামী নির্বাচনে ইনশাআল্লাহ জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আমরা সরকার গঠনে সক্ষম হলে আমাদের একটি পরিকল্পনা রয়েছে; এই নারীরাই শিক্ষিত হয়েছে, এদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা।’
তিনি আরও বলেন, ‘একটু আগে আমি যে ফ্যামিলি কার্ডটি বলেছিলাম, সেটির লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য হচ্ছে, সেটাই এই নারী সমাজকে গড়ে তোলা। আমাদের হিসাব মতে বাংলাদেশে ৪ কোটি ফ্যামিলি আছে। আমরা যদি পরিবার হিসেবে ভাগ করি, এভারেজে একটি পরিবারে ৫ জন করে সদস্য ধরা হয়েছে।’
কৃষকদের সহায়তার জন্য কৃষি কার্ড চালুর ভাবনা রয়েছে জানিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, ‘একটি বড় সমস্যা হচ্ছে হেলথ ইস্যু। বাংলাদেশে ২০ কোটি মানুষ। আমরা স্লোগান দিয়ে হয়তো বলতে পারি যে, সকলের জন্য স্বাস্থ্যের ব্যবস্থা করব, আমরা সকলকে স্বাস্থ্য সুবিধা দেব।’
বিএনপি সরকার গঠন করলে জাতিকে সঠিকপথে পরিচালিত করবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন দলটির নতুন চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, ‘আমাদের সমস্যা ছিল, আমাদের সমস্যা আছে; অবশ্যই আমরা ৫ আগস্টের আগে ফিরে যেতে চাই না। আমি আমার অবস্থান থেকে যদি চিন্তা করি আমার এক পাশে ১৯৮১ সালের একটি জানাজা; একই সাথে আমার এক পাশে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের একটি জানাজা; আর আমার আরেক পাশে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনা। কাজেই আমার মনে হয় এটি শুধু বোধহয় আমার একার জন্য নয়, যারা আমার দলের নেতা-কর্মী সদস্য এবং সামগ্রিকভাবে পুরা দেশের মানুষের সামনে এই দুটি উদাহরণ সবচাইতে বাদ বিবেচনা করার জন্য সবচাইতে ভালো উদাহরণ যে- আসলে ৫ আগস্টের আগে ফিরে যাওয়ার কোনোই কারণ নেই আমাদের।’
সাংবাদিকদের কাছে গঠনমূলক সমালোচনা প্রত্যাশা করে তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা ইনশাআল্লাহ দেশের মানুষের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনে সক্ষম হলে যাতে আপনাদের কাছ থেকে এমন ধরনের আলোচনা-সমালোচনা আমরা পাই, যেটা আমাদের সাহায্য করবে দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে। শুধু সমালোচনা- সমালোচনা করার জন্য নয়। আপনাদের কাছ থেকে এমন সমালোচনা আমরা পাই, যাতে আমরা দেশের মানুষের যে সমস্যাগুলো আছে- সেই সমস্যাগুলো যাতে আমরা সমাধান করতে সক্ষম হই।’
বেলা ১১টা ২০ মিনিটে মাওলানা আবুল কালাম আজাদের কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এর আগে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান উপস্থিত সাংবাদিকের সঙ্গে শুভেচ্ছা ও কুশল বিনিময় করেন।
দেশের বিভিন্ন জাতীয় সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদ সংস্থা ও অনলাইন গণমাধ্যমের সম্পাদকরা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিয়েছেন। তাদের আলোচনায় বিগত আওয়ামী সরকারের আমলের গণমাধ্যমে স্বাধীনতা না থাকা এবং সংবাদকে কীভাবে তাদের স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে তা নিয়ে আলোচনা করা হয়। সাংবাদিকদের উপর দমন-নীপিড়নের বিষয়ও সেসব আলোচনায় উঠে আসে।
অনুষ্ঠানে প্রবীণ সাংবাদিক শফিক রেহমান, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, মানবজমিন প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, কালের কণ্ঠের সম্পাদক কবি হাসান হাফিজ, নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীরসহ অন্যান্য সম্পাদকরা বক্তব্য দিয়েছেন।
গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শনিবার বেলা সোয়া ১১টায় রাজধানীর বনানীর হোটেল শেরাটনের গ্র্যান্ড বলরুমে এই অনুষ্ঠান শুরু হয়। এতে দেশে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক, সাংবাদিক এবং বিএনপির নেতারা উপস্থিত আছেন।
অনুষ্ঠানস্থলে এসেই তারেক রহমান সম্পাদক ও সাংবাদিকদের কাছে গিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, অনেকগুলো বছর সংগত কারণেই দলের প্রধান তারেক রহমানের সঙ্গে দেশের গণমাধ্যম সম্পাদক, সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি দেখা সাক্ষাৎ কিংবা শুভেচ্ছা বিনিময় হয়নি। এ কারণে দলের পক্ষে এ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে।
ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও) আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আক্তারুজ্জামান বাচ্চু বলেছেন, বেগম খালেদা জিয়া কেবল একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন এ দেশের ১৮ কোটি মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার কেন্দ্রবিন্দু। তিনি আমৃত্যু দেশের মানুষের অধিকার রক্ষায় লড়াই করেছেন এবং যেকোনো দুর্যোগ, জাতীয় সংকট ও মানবিক বিপর্যয়ে সবসময় সাধারণ মানুষের পাশে ছায়ার মতো দাঁড়িয়েছেন। শুক্রবার বিকেলে গফরগাঁও পৌর এলাকার ইমামবাড়ি কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে আয়োজিত বেগম খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফিরাত ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ময়মনসিংহ জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও পাগলা থানা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ডা. মোফাখখারুল ইসলাম রানার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই মাহফিলে কয়েক হাজার নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ শরিক হন।
আক্তারুজ্জামান বাচ্চু তাঁর বক্তব্যে আরও উল্লেখ করেন যে, বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণার নাম। তাঁকে ‘গণতন্ত্রের মা’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, বেগম জিয়ার দেশপ্রেম এবং আপসহীন নেতৃত্বই আজ জাতীয়তাবাদী শক্তিকে সুসংগঠিত রেখেছে। তিনি বিশ্বাস করেন যে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শ ও বেগম খালেদা জিয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের মাধ্যমেই দেশে পুনরায় ইনসাফ ও জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। সেই লক্ষ্যেই তাঁর দলের প্রতিটি কর্মী গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে এবং মাঠ-ঘাটে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। দেশনেত্রীর রেখে যাওয়া সেই বীরত্বগাথা নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়ার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে শোকাতুর পরিবেশে বক্তারা বেগম খালেদা জিয়ার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন। এ সময় পৌর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ফজলুল হক, উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখ মো. ইসহাক, উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক শাহ আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং থানা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল হামিদ শেখসহ স্থানীয় শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন পৌর বিএনপির সাবেক দপ্তর সম্পাদক আজহারুল হক এবং ময়মনসিংহ জেলা যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক আ. আজিজ সাদেক। মাগরিবের নামাজের পর মুফতি আসাদুল্লাহর পরিচালনায় এক বিশেষ মোনাজাতের মাধ্যমে মরহুমার বিদেহী আত্মার শান্তি ও মাগফিরাত কামনা করা হয়। স্থানীয় বিএনপি নেতৃবৃন্দ জানান, প্রিয় নেত্রীর প্রয়াণে সৃষ্ট শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়, তবে তাঁর আদর্শই তাঁদের আগামীর পথচলার মূল হাতিয়ার।
চার দশকের বেশি সময় পর নতুন নেতা পেল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত এ দলের হাল ধরলেন তারই বড় ছেলে তারেক রহমান। যিনি এতদিন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন। গতকাল শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসন কার্যালয়ে বৈঠকটি হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন তারেক রহমান।
স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গুলশান কার্যালয়ের সামনে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, দলের গঠনতন্ত্রের বিধান অনুসারে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তারেক রহমানের উত্তরাঞ্চল সফর আপাতত স্থগিত করা হয়েছে বলেও জানান মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, পরবর্তীতে সফরের নতুন সময়সূচি জানানো হবে।
বৈঠকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়াও স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, বীর বিক্রম ও এ জেড এম জাহিদ হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে জানানো হয়, বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুজনিত কারণে দলের চেয়ারম্যান পদটি শূন্য হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক হয়। বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে শূন্যপদে আনুষ্ঠানিকভাবে তারেক রহমানকে দলটির চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ার পর তারেক রহমানকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনীত করা হয়। এরপর থেকেই কার্যত তার নেতৃত্বেই দল পরিচালিত হয়ে আসছে।
বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১ সাল থেকে তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকার প্রধান।
১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়ার শাহাদাত বরণের পর, তিনি ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি সাধারণ সদস্য হিসাবে বিএনপিতে যোগ দেন। তিনি ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে দলের ভাইস-চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ১৯৮৪ সালের আগস্ট মাসে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি অবাধ ও সুষ্ঠু সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন বেগম জিয়া। তার প্রধানমন্ত্রীত্বকালে বাংলাদেশ সংসদীয় গণতন্ত্রে পরিণত হয়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার মেয়াদে কিছু বড় অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল।
১৯৯৬ সালে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর খালেদা জিয়া টানা দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হন, কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং পুনরায় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রতিশ্রুতির কারণে, তিনি এক মাসের মধ্যে পদত্যাগ করেন। এরপর ২০০১ সালে আবার ক্ষমতায় আসে বিএনপি। টানা পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ২০০৬ সালে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন খালেদা জিয়া।
দুবছর দেশ চালায় সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এরপর ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার বাংলাদেশকে একটি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে পরিণত করে, তখন তিনি গণতন্ত্রের জন্য তার লড়াই নতুন করে শুরু করেছিলেন। সরকার তাকে জোরপূর্বক তার বাড়ি থেকে বের করে দেয় এবং গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন শুরু করায় তাকে গৃহবন্দি করা হয়। গণতন্ত্রের প্রতি তার ভূমিকার জন্য, তাকে ২০১১ সালে নিউ জার্সির স্টেট সিনেট ‘গণতন্ত্রের জন্য যোদ্ধা’ উপাধিতে সম্মানিত করে।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট সাজানো দুর্নীতি মামলায় ২০১৮ সালে বেগম খালেদা জিয়াকে ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২০ সালের কান্ট্রি রিপোর্টস অন হিউম্যান রাইটস প্র্যাকটিস প্রতিবেদনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় আইন বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছিল যে, মূলত নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য একটি রাজনৈতিক চক্রান্ত হিসেবেই তাকে সাজা দেওয়া হয়েছিল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে তার ন্যায্য বিচারের অধিকারকে সম্মান করা হয়নি। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতির আদেশে খালেদা জিয়া মুক্তি পেলেও তিনি আর রাজনীতিতে ফিরে আসেননি।
এরই মধ্যে প্রায় দেড় যুগের নির্বাসন শেষে গত ২৫ ডিসেম্বর সপরিবার দেশে ফেরেন তারেক রহমান।
তারেক রহমান বাংলাদেশ বিমানের বিজি-২০২ ফ্লাইটে দেশে ফেরেন। তিনি লন্ডন থেকে সিলেট হয়ে সেদিন বেলা ১১টা ৪৩ মিনিটে ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও একমাত্র মেয়ে জাইমা রহমান। বিমানবন্দর থেকে বের হয়েই তিনি খালি পায়ে শিশিরভেজা ঘাসে দাঁড়িয়ে ১৭ বছর পর প্রথম দেশের মাটির স্পর্শ নেন। পরে জনজোয়ার ঠেলে বিকেল প্রায় ৪টায় তারেক রহমান পূর্বাচলের জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়ের সংবর্ধনা মঞ্চে ওঠেন, ১৬ মিনিট বক্তব্য দেন। তিনি সবার জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানান। নারী, পুরুষ, শিশু এমনকি সব ধর্মের মানুষ যাতে নিরাপদে থাকে সেটাই তাদের চাওয়া বলে জানান। এরপর গত ৩০ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন খালেদা জিয়া। এতে চেয়ারম্যান পদটি শূন্য হয়।
বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নারীর ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি ক্ষমতায় আসেন। এর মধ্য দিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে আসে নারী। বিরোধীদলীয় নেত্রী তখন আওয়ামী লীগের শেখ হাসিনা। সেই থেকে শুরু হয় দুই নারীর রাজনৈতিক লড়াই। এই লড়াই ‘দুই বেগমের’ লড়াই বলে আখ্যায়িত করা হয়। ১৯৯১ সালের পর প্রথম বাংলাদেশ এমন এক নির্বাচনের মুখোমুখি হচ্ছে, যেখানে দুই ‘বেগম’-এর কেউই নেই। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ‘অবিচুয়ারি রিপোর্টে’ এ কথা লিখেছে দ্য গার্ডিয়ান।
গার্ডিয়ান লিখেছে, ৮০ বছর বয়সে মারা গেছেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৯০-এর দশক ও ২০০০-এর দশকের শুরুতে ক্ষমতার মেয়াদে নারীশিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে অগ্রগতির জন্য কৃতিত্ব দেওয়া হয় তাকে। তবে দীর্ঘ জীবনে তিনি দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র রাজনৈতিক বৈরিতার শিকার হয়েছেন। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে খালেদা জিয়া ও তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দক্ষিণ এশিয়ার এই রাষ্ট্রের নেতৃত্ব নিয়ে লড়াই করে গেছেন।
ক্ষমতায় থাকলে দু’জনই একে অপরকে ছাপিয়ে যেতে চেয়েছেন। উভয় নারীই ক্ষমতায় এসেছেন তাদের ঘনিষ্ঠজনের হত্যাকাণ্ডের পর। শেখ হাসিনা তার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পর রাজনৈতিক নেতৃত্বে আসেন। শেখ মুজিব ছিলেন ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট। আর জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর দলের নেতৃত্বে আসেন খালেদা। দক্ষিণ এশিয়ার বংশানুক্রমিক রাজনীতিতে এই ধারা পরিচিত- পাকিস্তানে বেনজির ভুট্টো, শ্রীলঙ্কায় সিরিমাভো বন্দরনায়েকে এবং ভারতে ইন্দিরা গান্ধী- তাদের সবাই পুরুষ আত্মীয়দের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক আন্দোলনের উত্তরাধিকার হিসেবে ক্ষমতায় এসেছিলেন।
তবে বাংলাদেশে যা ঘটেছে, তা ছিল ব্যতিক্রম। এখানে দেখা গেছে ‘দুই বেগমের লড়াই’। মুসলিম সমাজে উচ্চপদস্থ নারীদের বোঝাতে ব্যবহৃত এক প্রচলিত শব্দবন্ধ হলো বেগম। শুরুতে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা একসঙ্গে সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন। এরশাদ ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের হত্যার পরপরই ক্ষমতা দখল করেন। কিন্তু এরশাদের পতনের পর এই জোট ভেঙে যায়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।
এর পরের কয়েক দশকের রাজনৈতিক ধারা মোটামুটি স্থির হয়ে যায়। শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে প্রথম ক্ষমতায় আসেন এবং ২০০১ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। উভয়ের শাসনামলেই নির্বাচনে কারচুপি ও দুর্নীতির অভিযোগ, হরতাল, রাজপথের আন্দোলন এবং সংসদ বর্জনের ঘটনা নিয়মিত ঘটেছে। এর মধ্যেই এসেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সামরিক হস্তক্ষেপ। ২০০১ সালের নির্বাচনে খালেদা জিয়া আবার ক্ষমতায় এলেও রাজনৈতিক অস্থিরতা থামেনি। ২০০৬ সালে তার মেয়াদ শেষ হলে একটি অন্তর্বর্তী সরকার ২০০৮ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে ঐকমত্য আনার চেষ্টা করে, কিন্তু ব্যর্থ হয়। সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করে এবং দুই নেত্রীকেই আটক করা হয়। মুক্তির পরও স্পষ্ট হয়ে যায়- কিছুই বদলায়নি।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বে প্রথমবার নির্বাচন করতে গিয়ে খালেদা জিয়াকে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন নিতে হয়। এই জোট দীর্ঘদিন টিকে ছিল, যদিও ভারতের তীব্র বিরোধিতা ছিল; ভারত জামায়াতকে পাকিস্তানের প্রভাবিত শক্তি হিসেবে দেখত। ক্ষমতায় থাকাকালে খালেদা জিয়া ভারতের বদলে পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার চেষ্টা করেন, যেখানে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ ভারতের ঘনিষ্ঠতাকে অগ্রাধিকার দিতেন।
এত রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও নীতিগত দোদুল্যমানতার মাঝেও একটি প্রশ্ন রয়ে যায়, কীভাবে বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হলো? বিশ্বব্যাংকের মতে, এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে পোশাক রপ্তানি ও প্রবাসী শ্রমিকদের রেমিট্যান্স। তবে ব্যাংকটি নারী ক্ষমতায়নের কথাও উল্লেখ করেছে, যা খালেদা জিয়ার শাসনামলের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল।
তাকে যারা প্রথম চিনেছিলেন, তাদের কাছে এটি বিস্ময়কর ছিল। তিনি তখন এক ‘লাজুক গৃহবধূ’, কিশোরী বয়সে এক সেনা কর্মকর্তাকে বিয়ে করেছিলেন এবং দুই ছেলের লালনপালনেই মনোযোগী ছিলেন। খালেদা জিয়ার জন্ম হয় খালেদা খানম নামে, তৎকালীন বৃটিশ শাসিত বাংলার জলপাইগুড়িতে। বর্তমানে তা ভারতের অংশ। তিনি দাবি করেন, তার জন্মতারিখ ১৫ আগস্ট ১৯৪৫, যা তার প্রতিদ্বন্দ্বী হাসিনার পিতাকে হত্যার তারিখের সঙ্গে মিলে যায়। পরিবারে ‘পুতুল’ নামে পরিচিত ছিলেন খালেদা। তার পিতা ইস্কান্দার মজুমদার ছিলেন এক চা-ব্যবসায়ী। মায়ের নাম তাইয়েবা।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পরিবারটি দিনাজপুরে চলে আসে, যা তখন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) ছিল। সেখানেই তার পড়াশোনা। ১৯৬০ সালে তিনি জিয়াউর রহমানকে বিয়ে করেন এবং তার নাম গ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমান একজন সেনা কমান্ডার ছিলেন এবং ধারাবাহিক অভ্যুত্থানের পর ১৯৭৭ সালে প্রেসিডেন্ট হন। ১৯৮১ সালে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি নিহত হন।
স্বামীর হত্যার সময় খালেদা জিয়া বিএনপির সদস্যও ছিলেন না। তিনি ১৯৮২ সালে দলে যোগ দেন এবং ১৯৮৪ সালেই দলের চেয়ারপারসন হন। অনেকেই ভেবেছিলেন তিনি নামমাত্র নেত্রী হবেন, কিন্তু এরশাদ শাসনামলে গৃহবন্দিত্বের সময় তিনি দৃঢ়তা দেখান। ১৯৮৬ সালে সামরিক আইন বহাল রেখে এরশাদ যখন নির্বাচন দেন, খালেদা জিয়া বিএনপিকে তাতে অংশ নিতে দেননি, যদিও আওয়ামী লীগ অংশ নেয়। ফলে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি তুলনামূলকভাবে নৈতিক অবস্থানে ছিল।
ক্ষমতায় এসে তিনি স্বামীর উদার অর্থনৈতিক নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন এবং গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল করেন। তিনি মেয়েদের শিক্ষায় জোর দেন, যার ফলে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে প্রথম দিকেই স্কুলে নারী-পুরুষের সমতা অর্জন করে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়লেও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন।
খালেদা জিয়া সম্ভবত ভাবেননি যে ২০০৬ সালের পর তিনি আর কখনো ক্ষমতায় ফিরবেন না। ২০০৮ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর তিনি ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করেন। ২০১৮ সালে তিনি দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হন- যা তার সমর্থকদের মতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাকে প্রথমে পাঁচ বছর, পরে ১০ বছরের সাজা দেয়া হয়, ফলে তিনি নির্বাচনে অযোগ্য হয়ে পড়েন। তবু তিনি দেশ ছাড়েননি।
স্বাস্থ্যের অবনতির কারণে ২০২০ সালে তাকে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার পতনের পর সব বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হয়। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে তিনি সব মামলায় খালাস পান এবং আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হন, যদিও বিএনপির নেতৃত্ব এখন তারেক রহমানের হাতে। ১৯৯১ সালের পর এই প্রথম বাংলাদেশ এমন এক নির্বাচনের মুখোমুখি হলো, যেখানে কোনো ‘বেগম’ নেই।