বহুল প্রত্যাশিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ঘোষণায় ছাত্র ও সংগঠনগুলোর মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ও প্রত্যাশার সৃষ্টি হয়েছে। আগামী বছরের জানুয়ারির শেষে বা ফেব্রুয়ারির শুরুতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনকে ক্যাম্পাস জীবনে গণতান্ত্রিক কাঠামো ফিরিয়ে আনার একটি সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। খবর ইউএনবির।
ডাকসু নির্বাচনের পদক্ষেপ ক্যাম্পাসে একটি সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যা একটি গণতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার আশাও জাগিয়েছে।
এর তাৎপর্য তুলে ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সভাপতি সাদিক কায়েম বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচনের সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হলে গোটা বাংলাদেশে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। জুলাই-আগস্টের গণজাগরণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন আশা জাগিয়েছে এবং আমরা গতানুগতিক রাজনৈতিক চর্চার বাইরে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেখতে চাই।’ কায়েম ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে সহযোগিতা ও সহনশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার গুরুত্বের ওপরও জোর দেন তিনি।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আবু বকর মজুমদার একই সুরে বলেন, ‘৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান ডাকসু নির্বাচন নিয়ে নতুন করে প্রত্যাশা জাগিয়ে তুলেছে। যেহেতু বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ধারাবাহিকভাবে শিক্ষার্থীদের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, তাই নির্বাচন হলে আমরা তাদের প্রতিনিধিত্ব করতে চাই।’
সভাপতি হিসেবে উপাচার্যের ভূমিকা ও বাজেট বরাদ্দে স্বচ্ছতা নিয়ে আলোচনাসহ ডাকসুর গঠনতন্ত্র সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন মজুমদার। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি, ডাকসুর কার্যক্রম কার্যকর করতে প্রশাসন সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সম্পৃক্ত করবে।’ নির্বাচনী সুষ্ঠুতা নিয়ে উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে তিনি আবাসিক হলগুলোতে অনিয়ম রোধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
ভোটের সময় নিয়ে সতর্ক হওয়ার বিষয়ে বলেছেন ঢাবি ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস। তিনি বলেন, ‘জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের ট্রমা থেকে ক্যাম্পাস ও জাতি এখনো সেরে উঠছে। খুব তাড়াতাড়ি বা খুব দেরিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ব্যাহত হতে পারে। ইতিবাচক ও উৎসবমুখর নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করতে সুস্পষ্ট রোডম্যাপ অপরিহার্য।’
সংস্কারের আহ্বান
বাম ছাত্র সংগঠনের জোট গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের সমন্বয়ক সালমান সিদ্দিক অবিলম্বে নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন। ‘আমরা চাই ডাকসু নির্বাচন দ্রুত হোক, তবে তা যেন ২০১৯ সালের একতরফা নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি না হয়।’ সব ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করে প্রার্থীদের জন্য সমতাভিত্তিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। ডাকসুর গঠনতন্ত্র সংস্কারে কমিশন গঠনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তার জোট সমমনা প্রার্থী দেবে।
একই দাবি জানান বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর সাধারণ সম্পাদক জাবির আহমেদ জুবেল। তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘ডাকসুর সভাপতি হিসেবে উপাচার্যের অযাচিত ক্ষমতা প্রয়োগ করা উচিত নয়, তার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তাকে বাধ্য থাকতে হবে। ভোটকেন্দ্রগুলোও অনুষদে স্থানান্তর করে অধিকতর প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।’
জমজমাট ক্যাম্পাস
এই ঘোষণাটি ক্যাম্পাসকে নির্বাচনী হাওয়ায় ভাসিয়েছে, শিক্ষার্থী এবং সংগঠনগুলো একটি সম্ভাব্য পরিবর্তনমূলক নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। অনেকে মনে করছেন, ডাকসু নির্বাচন একটি সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতিকে বদলে দিতে পারে। বৃহত্তর অন্তর্ভুক্তি ও গণতান্ত্রিক সম্পৃক্ততাকে উৎসাহিত করতে পারে বলেও মনে করছেন তারা।
নির্বাচনকে ঘিরে আগামীর পথচলা চ্যালেঞ্জিং। শিক্ষার্থীদের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা, ডাকসুর গঠনতন্ত্র সংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তি ও নির্বাচনে কারচুপি প্রতিরোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যখন নির্বাচনের সময়সীমা চূড়ান্ত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন প্রত্যাশা স্পষ্ট। শিক্ষার্থীরা আশা করে, দীর্ঘদিনের এই নির্বাচন শুধু তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারই পূরণ করবে না, সারা দেশে ইতিবাচক পরিবর্তনের নজির স্থাপন করবে।
‘ন্যায়-ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ার জন্যই আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছি’ বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এবার আর পেছনে নয়, সামনে এগোবো ইনশাআল্লাহ। আপনারা এ ম্যারাথনে সঙ্গী হবেন। জামায়াতে ইসলামীর বিজয় চাই না, এবার ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই।’
শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ফেনী সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয় মাঠে ১১ দলীয় জোটের নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াত আমীর এসব কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, একটি মহল প্রচার করছে জামায়াত ক্ষমতায় গেলে কওমি মাদ্রাসা বন্ধ করে দেওয়া হবে। কিন্তু বর্তমানে ইসলামী শিক্ষা ধরে রেখেছে তারাই। কওমি মাদ্রাসা আমাদের কলিজা। আমরা কথা নয়, কাজে প্রমাণ করব। যারা ভয় দেখায় তারা মতলববাজ। ন্যায়-ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ার জন্যই আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। পেছনে নয়, সামনে এগোবো ইনশাআল্লাহ। আপনারা এই ম্যারাথনে সঙ্গী হবেন। শুধু জামায়াতে ইসলামীর বিজয় চাই না, এবার ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই।
এর পূর্বে সকাল ৮টা থেকে জনসমাবেশ শুরু হয়। জনসভায় জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম মাসুম, এবি পার্টির চেয়ারম্যান ও ফেনী-২ সদর আসনে ১১দলীয় জোটের প্রার্থী মোহাম্মদ মজিবুর রহমান মঞ্জু, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সভাপতি রাশেদ প্রধান, ছাত্র শিবিরের কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক ও ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমসহ ১১ দলীয় জোটের রাজনৈতিক দলের নেতারা বক্তব্য দেন।
ফেনী জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর মুফতি আবদুল হান্নানের সভাপতিত্বে অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও ফেনী-৩ আসনে জামায়াত প্রার্থী ডা. ফখরুদ্দিন মানিক, ফেনী-৩ আসনে জামায়াত প্রার্থী অ্যাডভোকেট এস এম কামাল উদ্দিন, ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি কবির আহমদ, ফেনী জেলা জামায়াতের সাবেক আমীর এ কে এম সামছুদ্দিন, শহর জামায়াতের আমীর ইঞ্জিনিয়ার নজরুল ইসলাম, ইসলামী ছাত্র শিবিরের ফেনী শহর সভাপতি ওমর ফারুক ও জেলা সভাপতি আবু হানিফ হেলাল প্রমুখ। এ সময় জামায়াত-শিবির ও ১১ দলীয় জোটের জেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বক্তব্যে জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান সদ্য প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন ফেনীর সন্তান বেগম খালেদা জিয়াসহ জামায়াতের প্রয়াত নেতাকর্মীদের স্মরণ করে তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।
শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী–ঝিনাইগাতী) আসনে জামায়াত নেতাকে কুপিয়ে হত্যা ও দেশব্যাপী হামলা-নৈরাজ্য ও নারী হেনস্তার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) ছাত্রশিবির। শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) বাদ জুমা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে একই স্থানে এসে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে মিলিত হয়। এ সময় শাখা ছাত্র শিবিরের সভাপতি ইউসুব আলী, সেক্রেটারি রাশেদুল ইসলাম রাফি ও সাংগঠনিক সম্পাদক জাকারিয়া হোসাইন সহ নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
এ সময় উপস্থিত নেতাকর্মীরা নারায়ে তাকিবির, আল্লাহু আকবর; ইসলামী ছাত্রশিবির, জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ; প্ল্যান প্ল্যান কোন প্ল্যান, মানুষ মারার মাস্টারপ্ল্যান; বিএনপির অনেক গুণ, নির্বাচনে মানুষ খুন; আমার ভাই শহীদ কেন, ইন্টেরিম জবাব চাই; বিএনপির কালো হাত, ভেঙে দাও গুড়িয়ে দাও; চাঁদাবাজদের কালো হাত, ভেঙে দাও গুড়িয়ে দাও ইত্যাদি স্লোগান দেন।
শাখা ছাত্রশিবির সভাপতি ইউসুব আলী বলেন, আমরা জুলাইয়ে রক্ত দিয়েছি এদেশে ইনসাফ কায়েমের জন্য কিন্তু বর্তমানে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। একটি দল ভেবেছে আমরা ক্ষমতায় চলেই এসেছি, এই ভেবে বিভিন্ন অপকর্মের সাথে জড়িয়ে পড়েছে। আসন্ন নির্বাচন কেন্দ্র করে তারা আমাদের ভাইকে হত্যা করেছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কেন্দ্র করে তাদের অপকর্ম আরও বৃদ্ধি পেয়েছে, অপকর্মের কারণে জনপ্রিয়তা হারিয়ে মাথা খারাপ হয়ে গেছে, তারা আমাদের মা-বোনের গায়ে হাত তোলা শুরু করেছে। যে নেতাকর্মীরা আমার মা-বোনদের গায়ে হাত দিয়েছে তাদের বলতে চাই, আপনার হাত না থাকলে কীভাবে চলতে হবে তা প্র্যাকটিস করে আসবেন। শুধু চাঁদাবাজ কেন কোন অন্যায় সহ্য করবো না। মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য ইসলামী ছাত্রশিবির চাঁদাবাজের বিরোধীতা করেই যাবে।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, অনেকে আমাদেরকে ভয় দেখায়। এ দেশের ছাত্রসমাজ ও ছাত্রশিবির দীর্ঘদিন ধরে বাঘের সাথে লড়াই করে আসছে, বানর যদি আমাদের ভয় দেখাতে আসে তাহলে লেজ ধরে দুইটা ঘুরান দিয়ে মামুর বাড়ি পাঠাই দিব। আসুন সব ভেদাভেদ ভুলে একসাথে নির্বাচনকে উপভোগ করি।
বাক্ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সামাজিক অবস্থান সুদৃঢ় করা এবং তাঁদের প্রাত্যহিক জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনতে সম্ভাব্য সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মির্জা আব্বাস। শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর পুরানা পল্টনের ঢাকা বধির হাইস্কুলে বাংলাদেশ জাতীয় বধির সংস্থা আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। প্রায় ২০০ জন বাক্ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির উপস্থিতিতে আয়োজিত এই বিশেষ সভায় মির্জা আব্বাস গভীর মমত্ববোধ প্রকাশ করে বলেন, ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সমাজের বোঝা নয়। তাঁরা আমাদেরই সন্তান, আমাদেরই ভাই, আমাদেরই আত্মীয়।’
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা তাঁদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া লিখিতভাবে পেশ করলে মির্জা আব্বাস তাঁদের আশ্বস্ত করে বলেন যে, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নির্বাচনের পরপরই এসব বাস্তবায়নে কাজ শুরু হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘তোমাদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য, তোমাদের জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য আনার জন্য আমাদের যা করা দরকার, একজন মানুষ হিসেবে উপলব্ধি করে নির্বাচনের পরপরই আমরা সেই ব্যবস্থা শুরু করব, ইনশাআল্লাহ।’ তিনি তাঁদের লিখিত দাবিনামাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করেন এবং মন্তব্য করেন যে তাঁদের প্রয়োজন আরও গভীর ও ব্যাপক। তিনি এ সময় বলেন, ‘তোমাদের দাবি–দাওয়াগুলো আমি দেখলাম। এই দাবি–দাওয়ার কাগজের কোনো প্রয়োজন নাই।…যে দাবি তোমরা দিয়েছো, এতে তোমাদের হবে না। তোমাদের আরও অনেক অনেক প্রয়োজন আছে। যেগুলো তোমরা লিখতে পারো নাই। এ প্রয়োজনটা আমরা বুঝি।’
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে মির্জা আব্বাস মানবিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করে জানান যে, সুচিকিৎসার মাধ্যমে যাঁদের সমস্যা সমাধান সম্ভব, তাঁদের জন্য সরকারি সাহায্যের পাশাপাশি তিনি ব্যক্তিগতভাবেও এগিয়ে আসবেন। বিশেষ করে কোনো শিশুর মুখে কথা ফোটানোর জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ক্ষেত্রে তিনি পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তিনি বিশ্বাস করেন, একজন মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে বা একটি শিশুর কথা বলার ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে সামান্যতম ভূমিকা রাখতে পারলেও সেটিই হবে তাঁর জীবনের প্রকৃত সার্থকতা। মূলত প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর প্রতি দায়িত্বশীল হয়ে সমাজের মূলধারায় তাঁদের সম্পৃক্ত করাই তাঁর অন্যতম লক্ষ্য বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ঢাকা-১৬ আসনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী এবং দলের কেন্দ্রীয় ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক আমিনুল হক শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) নির্বাচনী প্রচারণার নবম দিনে মিরপুর ১১ নম্বর বাজার রোড, নাভানা ও তালতলা বস্তি সংলগ্ন এলাকায় ব্যাপক গণসংযোগ করেন। প্রচারণাকালে তিনি ভোটের দিন প্রবীণ ভোটারদের যাতায়াত সহজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জানান যে, যানচলাচল বন্ধ থাকলেও বয়োবৃদ্ধদের ভোটকেন্দ্রে আনা-নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত রিকশার ব্যবস্থা রাখা হবে। আমিনুল হক আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘যাতে তারা নিরাপদে ভোট দিয়ে আবার বাড়ি ফিরতে পারেন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে।’ সুষ্ঠু ভোট গ্রহণের লক্ষ্যে তিনি ইতোমধ্যে তার এলাকার ১৩৭টি ভোটকেন্দ্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্তদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
এলাকার বিশাল একটি অংশ জুড়ে বসবাসরত প্রায় ৭০ হাজার উর্দুভাষী ভোটারের উন্নয়ন ও নাগরিক অধিকারের বিষয়ে আমিনুল হক বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। ১৯৯১ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মাধ্যমে এই জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্ব লাভের বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘সে কারণেই এই জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বিএনপির একটি ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে।’ নির্বাচনে জয়লাভ করলে এই উর্দুভাষী মানুষের স্থায়ী পুনর্বাসনের বিষয়টি তার অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবে বলেও তিনি দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
বর্তমানে নির্বাচনী পরিবেশ সন্তোষজনক উল্লেখ করে আমিনুল হক জানান যে, তারা অত্যন্ত ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছেন। তবে প্রচারণার মাঝে তিনি প্রতিপক্ষ জামায়াতের বিরুদ্ধে একটি গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেন। তিনি দাবি করেন যে, জামায়াতের একটি চক্র অর্থের বিনিময়ে ভোট ক্রয়ের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘জামায়াতের একটি চক্র ঘরে ঘরে গিয়ে বিকাশ নম্বর ও এনআইডি নম্বর সংগ্রহ করে অর্থের বিনিময়ে ভোট কেনার চেষ্টা করছে।’ এই অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে দলের নীতি-নির্ধারকদের অবহিত করার পাশাপাশি খুব শীঘ্রই নির্বাচন কমিশন ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হবে বলে তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান।
নোয়াখালী জিলা স্কুল মাঠে আয়োজিত ১১ দলীয় জোটের এক বিশাল নির্বাচনি জনসভায় শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) দুপুরে প্রধান অতিথির ভাষণে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি পূরণের জোরালো প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে ঘোষণা করেন, ‘নোয়াখালীবাসী বিভাগ চায়, সিটি করপোরেশন চায়। আমরা ক্ষমতায় গেলে ইনসাফের মাধ্যমে আপনাদের এই প্রাণের দাবিগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করব, ইনশাআল্লাহ।’ বিভাগ ও সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি তিনি নদী ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, ক্লোজার নির্মাণ এবং সোনাপুর থেকে হাতিয়া পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত উন্নয়নের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
বক্তৃতায় ডা. শফিকুর রহমান দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলেন, ‘যারা দেশকে ভালোবাসার প্রমাণ দিতে পেরেছে, তাদের হাতে যদি দেশ যায়, তাহলে ভালোবাসার একটি দেশ তৈরি করা সম্ভব। যারা ভালোবাসতে পারেননি, বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছেন। যাদের হাতে দেশের জনগণ নিরাপদ নয়, ক্ষমতায় যাওয়ার পর তাদের কাছে দেশ আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে।’ তিনি বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জননিরাপত্তা ও দেশপ্রেমের বিষয়টি ভোটারদের সামনে গুরুত্বের সাথে উপস্থাপন করেন।
জামায়াত আমির তার বক্তব্যে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষার ওপর আলোকপাত করে বলেন, ‘দেশের মানুষ বুঝতে পেরেছে, তাই সারা বাংলায় মারদাঙা জোয়ার উঠেছে ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে। আমরা যেখানে যাচ্ছি সেখানে মানুষের ভালোবাসা পাচ্ছি। বিশেষ করে জুলাইযোদ্ধা যুবসমাজ মুখিয়ে আছে ১৩ তারিখ থেকে নতুন এক বাংলাদেশ দেখার জন্য। যুবকরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে তারা কি আধিপত্যবাদের পক্ষ নিবে, নাকি আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে যারা মাথা উঁচু করে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাদের পক্ষ নেবে। তারা বুঝতে পেরেছে জুলাইয়ের যে চেতনা যে আকাঙ্ক্ষা কাদের দ্বারা বাস্তবায়ন হবে।’
সবশেষে তিনি নোয়াখালীর ৬টি আসনে জোটের প্রার্থীদের বিজয়ী করার আহ্বান জানিয়ে জনগণের রায় নিয়ে ঘরে ফেরার অনুরোধ জানান। সমাবেশ চলাকালীন তিনি জামায়াত মনোনীত চারজন প্রার্থীর হাতে দলীয় প্রতীক এবং জোটভুক্ত অন্য দুই প্রার্থীর হাতে শাপলা কলি তুলে দিয়ে উপস্থিত জনতার সামনে তাদের পরিচয় করিয়ে দেন। জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও ইনসাফ কায়েমের লক্ষ্য নিয়ে আসন্ন নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করার জন্য তিনি নেতাকর্মীদের দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।
বর্তমান নির্বাচনী পরিস্থিতির ডামাডোলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কর্মকাণ্ড নিয়ে তীব্র সমালোচনা ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে বিএনপি। দলটির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী মন্তব্য করেছেন যে, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী এই নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও একটি রাজনৈতিক দলের আচার-আচরণ সন্দেহজনক।
শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, তারা দেশকে কোন দিকে নিতে চায়, তা নিয়ে তারা নিজেরাই বিভ্রান্ত এবং সম্ভবত তাদের ভেতরে কোনো বিশেষ ‘কর্মপরিকল্পনা’ রয়েছে।
রিজভী জামায়াতের সাম্প্রতিক বিভিন্ন অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, জামায়াতের দ্বিচারিতা সাধারণ মানুষের মধ্যে সংশয় ও বিভ্রান্তি তৈরি করছে। বিশেষ করে নারীদের কর্মঘণ্টা নিয়ে দলটির পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি জানান যে, তারা প্রথমে নারীদের কর্মঘণ্টা ৫ ঘণ্টা করতে চাইলো, অথচ আল-জাজিরাকে বলছে তারা ওভাবে বলেনি। আমির বলছেন তিনি এটা বলেননি। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে নারী কর্মীদের বিশাল অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিএনপির এই নেতা সংশয় প্রকাশ করেন যে, এই শক্তি ক্ষমতায় আসলে নাগরিক অধিকার আদৌ থাকবে কি না।
সংবাদ সম্মেলনে রিজভী অভিযোগ করেন যে, জামায়াত বর্তমানে জনকল্যাণমূলক চিন্তার পরিবর্তে ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে এবং জামায়াত নিজেদের সম্পর্কে কোনো শুভচিন্তার কথা না বলে চাটুকারিতার ভাষায় কথা বলছে। জামায়াত প্রধান নারীদের নেতৃত্বের আসনে দেখতে চান না দাবি করে তিনি সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন যে, আজ নারীদের দিয়ে ভোট চালাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু জামায়াত ক্ষমতায় এলে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বেন নারীরাই।
এছাড়া বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা একটি ‘গোপন চিঠি’র প্রসঙ্গ টেনে বলেন যে, এর মাধ্যমে নাহের ইসলাম নামের এক নারী শিক্ষিকাকে হুমকি প্রদান করা হয়েছে। ধর্মের দোহাই দিয়ে বিএনপির নারী সমর্থকদের মাঝে ভীতি সঞ্চার করা হচ্ছে অভিযোগ করে তিনি ক্ষোভের সাথে বলেন, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে জামায়াত ‘ইতর ব্যবহার’ করছে। সব মিলিয়ে নির্বাচনী মাঠে জামায়াতের বর্তমান গতিবিধিকে সাধারণ মানুষের জন্য উদ্বেগজনক হিসেবে চিত্রায়িত করেন তিনি।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম বলেছেন, ‘জামায়াতসহ ৮ দলীয় জোট গঠন করে আমরা এগুচ্ছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে আমাদের কিছু না বলে জামায়াত অন্যান্য দলকে যুক্ত করেছে। জোটের নেতৃত্ব নিজেদের হাতে নিয়েছে জামায়াত। সেই নেতৃত্বের মাধ্যমে জামায়াত আমাদের ব্যবহার করতে চেয়েছিল। আমাদের একটা বড় আশা-আকাঙ্ক্ষা ছিল, ইসলামের পক্ষে একটা বড় উত্থান হবে। সেই আশা অন্ধকারে পরিণত হয়েছে।’ বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে নির্বাচনী জনসভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, ‘জামায়াত ইসলামকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নিতে চায় না, তখনই বাধ্য হয়ে আমরা সেখান থেকে সরে এসে জাতির সামনে যে কথা দিয়েছিলাম, সেই কথামতো হাতপাখা প্রতীকে ইসলামের একটা বাক্স জাতির সামনে রেখেছি। আশা করি, ইসলামের পথে রাখা বাক্সই বিজয়ী হবে, ইনশাআল্লাহ। যারা মানবতার মুক্তি চায়, যারা ইসলাম কায়েম করতে চায়, বিশেষ করে আলেম ওলামা আমাদের সাথে আছে। তারা হাতপাখাকে বিজয়ী করতে মুখিয়ে আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা নির্বাচন নিয়ে অনেকটা শংকিত ও হতাশ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বলেছিল এমন একটা নির্বাচন উপহার দেওয়া হবে, যে নির্বাচন মানুষ স্মরণ করবে। সেই কথাটা স্মরণ করা নিয়ে বলছি, আপনারা সেই পরিবেশ তৈরি করতে পারেননি। আমরা এখনই লক্ষ্য করছি, বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতা চলছে, আগ্রাসী ভূমিকা নিয়ে এগোচ্ছে সবাই।’
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির বলেন, ‘ভোলায় আমাদের নারী কর্মীদের ওপর যে আচরণ করছে, এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। এখন পরিবেশ ঠিক না করলে, সামনের পরিবেশের জন্য দায় আপনাদের মাথায় নিতে হবে।’
এর আগে নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য রাখেন তিনি। এ সময় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তব্য দেন।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ১৬ বছর আমরা কয়েকটি তথাকথিত নির্বাচন দেখেছি। নিশিরাতের নির্বাচন দেখেছি। আমি-ডামি নির্বাচন দেখেছি। গায়েবি নির্বাচন দেখেছি। দেশের মানুষ ভোট দিতে পারেনি। যারা ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল, তারা চলে গেছে। কিন্তু আরেকটি মহল ষড়যন্ত্র শুরু করছে, ভেতরে–ভেতরে ষড়যন্ত্র করছে—কীভাবে নির্বাচনকে ক্ষতিগ্রস্ত করা যায়, বাধাগ্রস্ত করা যায়। বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) রাজশাহীর হাজী মুহম্মদ মুহসীন সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে মাঠে নির্বাচনী জনসভায় তিনি এ কথা বলেন। এসময় আগামী নির্বাচন যেন কেউ বানচাল করতে না পারে, সে জন্য সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
তারেক রহমান বেলা ২টা ৩০ মিনিটে জনসভায় ভাষণ শুরু করেন। দীর্ঘ ২২ বছর পর রাজশাহীর মানুষের সঙ্গে সরাসরি দেখা হওয়ার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, রাজশাহীর মানুষের সঙ্গে তাঁর ‘আত্মার সম্পর্ক’ রয়েছে। তখন নিচ থেকে নেতা–কর্মী ও সমর্থকেরা করতালি দিয়ে তাকে অভিনন্দন জানান।
রাজশাহীতে আইটি পার্ক সচল করে প্রশিক্ষণ দিয়ে তরুণদের দক্ষ করে তোলা হবে বলে জানান তারেক রহমান। পাশাপাশি তিনি রাজশাহীতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ ও বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন প্রকল্প সচল করার প্রতিশ্রুতি দেন। ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হবে।
২৫ মিনিটের ভাষণে তারেক রহমান আরও বলেন, ‘অন্য জেলার মানুষের রাজশাহীর কথা মনে আসলে প্রথমে মনে আসে পদ্মা নদীর কথা। কিন্তু নদী থাকলেই তো হবে না, নদীতে পানি থাকতে হবে। আবার রাজশাহীর কথা মনে আসলে শিক্ষা নগরীর কথা মনে আসে। এখানে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে; উচ্চশিক্ষিত মানুষ আছে। কিন্তু সেই মানুষের কর্মসংস্থান নাই। এখানে আইটি ভিলেজ আছে, কাজ নাই। বরেন্দ্র বহুমুখি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান চালু করেছিলেন। ফসলের উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছিল। সেটি এখন বন্ধ হওয়ার পর্যায়ে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ধানের শীষে জয় হলে আমরা পদ্মা ব্যারেজে হাত দিতে চাই। আইটি ভিলেজে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চাই। বিএমডিএকে সচল করতে চাই। সুদসহ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করতে চাই।’
সভায় সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুন অর রশিদ। সঞ্চলনায় ছিলেন সাধারণ সম্পাদক মাফজুর রহমান। সকাল ১০ থেকে স্থানীয় নেতারা মঞ্চে বক্তব্য দিতে শুরু করেন। দুপুর ১২টা ২০ মিনিটের দিকে তারেক রহমানকে বহনকারী উড়োজাহাজ রাজশাহী হজরত শাহ মখদুম (রহ.) বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বেলা সোয়া ১টার দিকে তিনি হজরত শাহ মখদুম (রহ.)-এর দরগা শরিফে যান। পৌনে ২টার দিকে তিনি হাজী মুহম্মদ মুহসীন সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠে নির্বাচনী জনসভায় আসেন। স্থানীয়ভাবে এটি ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ময়দান হিসেবে পরিচিত।
তারেক রহমান জনসভায় বলেন, ‘২০০৪ সালে আমি রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলায় গিয়েছিলাম। শীতের সময় কম্বল বিতরণ করেছি, গরমের সময় নারী ও দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য ছাগল বিতরণ করেছি। সেই থেকেই রাজশাহীর মানুষের সঙ্গে আমার আত্মার সম্পর্ক রয়ে গেছে।’
কৃষকদের জন্য আলাদা পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, প্রত্যেক কৃষকের হাতে কৃষি কার্ড দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে সার, বীজ ও কৃষিঋণ সরাসরি কৃষকের হাতে পৌঁছাবে। ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হবে। এ কথা বলার পর তিনি দর্শকদের কাছ থেকে উত্তর জানতে চান, এতে চলবে? তখন সবাই করতালি দিয়ে তাকে সমর্থন জানান।
নারীদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর ঘোষণা দিয়ে তারেক রহমান বলেন, দলমত–নির্বিশেষে প্রত্যেক মায়ের হাতে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে, যাতে তারা সংসারের ন্যূনতম ব্যয় সামাল দিতে পারেন। কর্মসংস্থানের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রাজশাহীতে আইটি পার্ক থাকলেও তা কার্যত অচল। আমরা আইটি পার্ক সচল করব, প্রশিক্ষণ দিয়ে তরুণদের দক্ষ করে তুলব।’ বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার প্রবণতা কমাতে রাজশাহীতে বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ার পরিকল্পনার কথাও জানান বিএনপির চেয়ারপারসন। তিনি বলেন, দেশে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারলে বৈদেশিক মুদ্রা দেশের ভেতরেই থাকবে।
মঞ্চের পাশে জুলাই আন্দোলনে আহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, ‘৫ আগস্ট দেশে যে পরিবর্তন হয়েছে, সেই পরিবর্তন যাতে তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন করে, দেশের জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়, তাদের ত্যাগ যেন বৃথা না যায়, সেই জন্য আমাদের কাজ করতে হবে।’ গত ১৬- ১৭ বছরে ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘নিশিরাতের নির্বাচন, গায়েবি নির্বাচন আমরা দেখেছি। জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ১২ তারিখের নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্র থাকলেই জনগণের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।। আমরা ধর্ম নয়, মানুষ দেখি। ১৯৭১ সালে আপনারা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন। তখন ধর্ম দেখি নাই। এখন দেশ গড়ার সময় আমরা মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান—সবাইকে নিয়ে শান্তিতে বসবাস করতে চাই।’
আগামী নির্বাচন সম্পর্কে তারেক রহমান বলেন, ‘বিগত ১৬ বছর আমরা কয়েকটি তথাকথিত নির্বাচন দেখেছি। নিশিরাতের নির্বাচন দেখেছি, ডামি নির্বাচন দেখেছি, গায়েবি নির্বাচন দেখেছি। দেশের মানুষ ভোট দিতে পারেনি। যারা ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল, তারা চলে গেছে। কিন্তু আরেকটি মহল ষড়যন্ত্র করছে। ভেতরে-ভেতরে ষড়যন্ত্র করছে কীভাবে এই নির্বাচনকে ক্ষতিগ্রস্ত করা যায়, কীভাবে বাধাগ্রস্ত করা যায়। আগামী ১২ তারিখের নির্বাচন যেন কেউ বানচাল করতে না পারে, সে জন্য সকলকে সতর্ক থাকতে হবে। সকলকে সজাগ থাকতে হবে। জনগণ যদি ১২ তারিখে সতর্ক-সজাগ থাকে, ১৩ তারিখ থেকে শুরু হবে জনগণের দিন। জনগণের প্রত্যাশা, আশা, আকাঙ্ক্ষা যে সকল আছে, সে বিষয়ে কাজগুলো ধীরে ধীরে শুরু হবে। ধানের শীষ বিজয়ী হলে ১৩ তারিখ থেকেই শুরু হবে জনগণের জয়যাত্রা।’
যেকোনো বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে সঠিক তদন্ত করার আহ্বান জানিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা ঝগড়া-ফ্যাসাদ-বিবাদে যেতে চাই না। যেতে চাই না বলেই আজ এখানে দাঁড়িয়ে আমি কারও সমালোচনা করছি না। কিন্তু কোথাও যদি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আছে তাদের বলব, সঠিক-সুষ্ঠু তদন্ত করুন। সেই তদন্তে যদি বিএনপির কোনো ভূমিকা থাকে, আমরা সহায়তা করব। কিন্তু সঠিক তদন্ত হতে হবে। সঠিক তদন্ত অনুযায়ী দেশের আইন অনুযায়ী বিচার হতে হবে, যদি কোথাও কোনো সমস্যা হয়ে থাকে।’
মেগা দুর্নীতির উদ্দেশে অতীতে মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল অভিযোগ করে তারেক রহমান বলেন, ‘বিগত ১৬-১৭ বছর এই দেশের ভোটের অধিকার যেমন কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, তেমনি মেগা মেগা প্রকল্পের উদ্দেশ্যই ছিল মেগা দুর্নীতি। এলাকার মানুষের জন্য রাস্তাঘাট নির্মাণ, এলাকার হাসপাতাল, শিক্ষক ঠিকমতো পাঠানো, ডাক্তার ঠিকমতো পাঠানো-এগুলো কোনো কাজ ঠিকমতো করা হয়নি।’
বক্তব্য শেষে তারেক রহমান রাজশাহী, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ধানের শীষের ১৩ প্রার্থীকে পরিচয় করিয়ে দেন। সবার উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনাদের কাজ হলো আগামী ১২ তারিখ পর্যন্ত এদের দেখে রাখা। ১৩ তারিখ থেকে এরা আপনাদের দেখে রাখবে।’
বিএনপির মহাসচিব ও ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘জামায়াতে ইসলাম শুধু ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করেনি, ইতিহাস বলছে তারা ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানেরও বিরোধিতা করেছিল। তারা পাকিস্তানও চায়নি, বাংলাদেশও চায়নি।’
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) দুপুরে ঠাকুরগাঁওয়ের গড়েয়া বাজারে এক নির্বাচনি পথসভায় তিনি এসব কথা বলেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘অনেক মানুষ এসব ইতিহাস জানেন না। বইপত্রে এর সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। যে দল বাংলাদেশ রাষ্ট্রকেই বিশ্বাস করেনি, তারা কী এই দেশকে নিরাপদে রাখতে পারবে? তারা যদি ক্ষমতায় যায়, তাহলে কী এ দেশের মানুষ ভালো থাকবে?
তিনি বলেন, ‘যে দল অতীতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে এবং এখনো সে ভূমিকার জন্য ক্ষমা চায়নি, এমন দলকে সমর্থন করা যায় না। আমরা বারবার বলছি— যারা বাংলাদেশের ক্ষতি করেছে, তাদের কখনো ভোট দেওয়া উচিত নয়।’
স্থানীয়দের উন্নয়নসংক্রান্ত বিভিন্ন দাবির প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘কোনো এলাকা তখনই উন্নত হয়, যখন সেই এলাকা থেকে একটি ভালো, সৎ ও দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব তৈরি হয়। নেতৃত্ব ভালো হলে উন্নয়ন আসবেই।’
নরসিংদী সদর–১ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত ও ১১ দলীয় জোট সমর্থিত সংসদ সদস্য প্রার্থী মো. ইব্রাহিম ভূঞা তার নির্বাচনী উন্নয়ন পরিকল্পনা শিরোনামে ১৫ দফা ইশতেহার ঘোষণা করেছেন। গত বুধবার (২৮ জানুয়ারি) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় নরসিংদী প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে প্রার্থী নিজেই এসব ইশতেহার তুলে ধরেন।
এসব ইশতেহারের মধ্যে রয়েছে শিক্ষার মানোন্নয়ন, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন এবং নৈতিক ও সমাজবান্ধব শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। এর অংশ হিসেবে নরসিংদীতে একটি পূর্ণাঙ্গ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ স্থাপন এবং মাধবদীর শিল্পোন্নয়নের লক্ষ্যে টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়।
এ ছাড়া বাবুরহাট এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদ পুনরুদ্ধার ও নাব্যতা নিশ্চিত করা, ফাইভস্টার মানের হোটেল নির্মাণ, জেলা স্টেডিয়ামকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা এবং একটি মাল্টিপারপাস ইনডোর স্টেডিয়াম স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
চরাঞ্চলের উন্নয়নে স্থলপথে যোগাযোগব্যবস্থা জোরদার করা এবং সেখানে একটি ৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল চালুর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরা হয়।
পাশাপাশি নরসিংদী সদরের ড্রেনেজ সিস্টেম সংস্কার করে জলাবদ্ধতা নিরসন, একাধিক শিশুপার্ক স্থাপন এবং মেঘনার চর এলাকাকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা দেওয়া হয়।
ইশতেহারে মেঘনা নদী, হাঁড়িধোয়া নদী ও পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদীর দূষণ হ্রাস, বালু উত্তোলন সিন্ডিকেট বন্ধ এবং নদীভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের অঙ্গীকার করা হয়। একই সঙ্গে বাসাবাড়ি, কলকারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
নারীদের তাৎক্ষণিক সেবায় ‘ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার’ চালু এবং ‘আমার আয়ের সংসার’ প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ নারীদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার কথা বলা হয়। এ ছাড়া কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, প্রবাসীদের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে আরও কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং আনুপাতিক হারে সংসদে প্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়।
ইশতেহারে ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে এবং ৫ বছরের নিচে সকলের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। পাশাপাশি হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানে ন্যায্য অধিকার সুনিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা হয়।
কওমী ও আলিয়া মাদ্রাসার অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষক-কর্মচারীদের পর্যাপ্ত বেতন-ভাতা প্রদান এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সরকারি ভাতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে বিশেষ স্কিল ট্রেনিং কর্মসূচি চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়। এসব প্রশিক্ষণের মধ্যে থাকবে ফ্রিল্যান্সিং, টেইলারিং, আইটি, হোম কেয়ার সার্ভিস এবং অনলাইন ব্যবসা।
সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, নরসিংদী জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মকবুল হোসেন, সদর আমীর মাহফুজ ভূইয়া, শহর আমীর আজিজুর রহমান, নরসিংদী সদর এনসিপির সমন্বয়ক নূর হোসেন, এবং নরসিংদী জেলা খেলাফত মজলিসের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আফসার অন্যান্য নেতারা।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতী সৈয়দ রেজাউল করীম অভিযোগ করেছেন যে, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বেপর্দা নারীদের পাশে বসিয়ে সেলফি তোলেন এবং তাদের কর্মকাণ্ড ইসলামের প্রকৃত আদর্শের পরিপন্থী। আজ বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) দুপুরে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা মহিলা বিএম কলেজ মাঠে আয়োজিত এক নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। লালমনিরহাট-১ আসনে হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী মুফতী ফজলুল করীম শাহারিয়ারের সমর্থনে এই বিশাল জনসভার আয়োজন করা হয়।
সমাবেশে চরমোনাই পীর জামায়াতে ইসলামীর কঠোর সমালোচনা করে বলেন, তারা মুখে ইসলামের কথা বললেও বাস্তবে ইসলামী শরিয়াহ আইন অনুযায়ী দেশ পরিচালনা করতে চায় না। জামায়াত আমিরের ব্যক্তিগত আচরণের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি দাবি করেন, শরিয়াহ আইনের তোয়াক্কা না করে তিনি বেপর্দা নারীদের সাথে ছবি তোলেন, যা তাদের দ্বিমুখী আচরণের বহিঃপ্রকাশ। ইসলামের নাম ব্যবহার করে তারা মূলত সাধারণ জনগণকে বিভ্রান্ত করছে এবং রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা চালাচ্ছে।
রেজাউল করীম তার বক্তব্যে আরও উল্লেখ করেন, জামায়াত নিজেই এখন আর নিজেদের পুরোপুরি ইসলামী দল হিসেবে দাবি করে না। তিনি উদাহরণ হিসেবে বলেন যে, জামায়াত আমির নিজেই শরিয়াহ আইনে দেশ না চালানোর কথা বলেছেন এবং তাদের জোটসঙ্গী কর্নেল (অব.) অলি আহমদসহ দলের অন্য প্রার্থীরাও বিভিন্ন সময় জামায়াতকে একটি সাধারণ রাজনৈতিক দল হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, জামায়াতের রাজনীতিতে এখন আর কোনো রাজনৈতিক শালীনতা বা ইসলামী আদর্শ অবশিষ্ট নেই।
জনসভায় তিনি একটি গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করে বলেন, অতীতে যখন বিএনপি ও আওয়ামী লীগ দেশ থেকে জঙ্গিবাদ নির্মূলের দাবি করছিল, তখন জামায়াতের নায়েবে আমির আবু তাহের মার্কিন দূতাবাসে গিয়ে ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, আবু তাহের দূতাবাসে গিয়ে দেশে জঙ্গি আছে বলে বক্তব্য দিয়েছেন এবং ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে জঙ্গি সংগঠন হিসেবে উপস্থাপনের অপচেষ্টা করেছেন। এই ধরনের মিথ্যাচার যারা করে, তাদের মাধ্যমে এ দেশে কখনোই প্রকৃত ইসলাম কায়েম সম্ভব নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সবশেষে ভোটারদের উদ্দেশ্যে মুফতী রেজাউল করীম বলেন, একমাত্র ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ক্ষমতায় গেলেই এ দেশে পবিত্র কুরআন-সুন্নাহ ও শরিয়াহ ভিত্তিক ইনসাফপূর্ণ রাষ্ট্র পরিচালনা নিশ্চিত করা সম্ভব। লালমনিরহাট-১ আসনের প্রার্থী মুফতী ফজলুল করীম শাহারিয়ারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় আরও বক্তব্য দেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান এবং ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সম্পাদক সুলতান মাহমুদসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। বক্তারা আগামী নির্বাচনে হাতপাখা প্রতীকে ভোট দিয়ে দেশে ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য সকলের সহযোগিতা কামনা করেন।
দেশজুড়ে নির্বাচনী প্রচারণায় নারী কর্মীদের ওপর হামলা, হেনস্তা এবং রাজনৈতিক কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে আগামী ৩১ জানুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য বিশেষ সমাবেশটি স্থগিত করেছে জামায়াতে ইসলামীর মহিলা শাখা। আজ বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) বিকেলে দলটির মহিলা শাখার অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে এক বার্তার মাধ্যমে এই ঘোষণা দেওয়া হয়।
ফেসবুক পোস্টে জানানো হয়েছে যে, ‘অনিবার্য কারণবশত’ পূর্বনির্ধারিত এই মহিলা সমাবেশটি আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। এর আগে গত মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এই সমাবেশের ডাক দিয়েছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, আগামী শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় এই প্রতিবাদী সমাবেশ শুরু হওয়ার কথা ছিল।
সংবাদ সম্মেলনে ডা. তাহের অভিযোগ করেছিলেন যে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণার অংশ হিসেবে জামায়াতের নারী কর্মীরা যখন মাঠে কাজ করছেন, তখন দেশের বিভিন্ন স্থানে তাদের ওপর পরিকল্পিত হামলা ও শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে। তিনি সেই সময় এই সমাবেশটিকে একটি বিরল ও ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছিলেন যে, সম্ভবত এই প্রথমবার জামায়াতের নারী সংগঠনের কর্মীরা পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে এবং বাধ্য হয়ে প্রকাশ্য রাজপথে প্রতিবাদ সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
নির্বাচনী ডামাডোলের মাঝে হঠাৎ করে এই বড় ধরনের প্রতিবাদ কর্মসূচি স্থগিত হওয়ায় রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনার সৃষ্টি হয়েছে। দলীয় একটি সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে যে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং কৌশলগত কারণে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে এই সমাবেশ আপাতত পিছিয়ে দেওয়া হতে পারে। তবে পরবর্তী সময়ে কোনো নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হবে কি না, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত জামায়াতের মহিলা শাখার পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য জানানো হয়নি। প্রচারণার শেষ মুহূর্তে এই স্থগিতাদেশ দলটির নারী কর্মীদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। মূলত মাঠ পর্যায়ের নিরাপত্তা ও নির্বাচনী পরিবেশ পর্যালোচনার প্রেক্ষিতেই শীর্ষ নেতৃত্ব এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক মাঠের উত্তাপ বাড়িয়ে জামায়াতে ইসলামীকে কঠোর বার্তা দিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের চন্ডিপুর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত এক বিশাল নির্বাচনী জনসভায় তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতা করে এ দেশের মানুষের ওপর নারকীয় অত্যাচার চালিয়েছে, তাদের আগে জাতির কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা চাইতে হবে; এরপর তারা জনগণের কাছে ভোট চাওয়ার নৈতিক অধিকার পাবে। জামায়াতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক তৎপরতাকে ইঙ্গিত করে ফখরুলের এই বক্তব্য নির্বাচনী সমীকরণে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে আয়োজিত এই সমাবেশে মির্জা ফখরুল বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে উন্নয়নের নামে মূলত সাধারণ মানুষের পকেট কাটা হয়েছে এবং ব্যাপক লুটপাট চালানো হয়েছে। তাঁর মতে, প্রকৃত উন্নয়ন মানে কেবল মেগা প্রজেক্ট নয়, বরং কর্মসংস্থান ও কৃষির প্রকৃত উন্নতি। বিএনপি মহাসচিব অভিযোগ করেন যে, বিগত সরকার মানুষের আয় বাড়ার ভুয়া পরিসংখ্যান দিয়ে উন্নয়নের মিথ্যা বয়ান তৈরি করেছিল, অথচ সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে তারা কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখেনি। বর্তমানে বিএনপি সেই ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে দেশ গঠনের কাজ শুরু করেছে বলে তিনি দাবি করেন।
ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন। তিনি ঘোষণা করেন যে, বিএনপি ক্ষমতায় আসলে সাধারণ মানুষের সুরক্ষায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং ‘কৃষি কার্ড’—এই দুটি বিশেষ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রতিটি পরিবার অত্যন্ত সুলভ মূল্যে মানসম্মত শিক্ষা ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবা লাভ করবে। অন্যদিকে, কৃষি কার্ডের মাধ্যমে দেশের কৃষকরা সরাসরি সরকারি ভর্তুকি, সার, বীজ ও প্রয়োজনীয় উপকরণ লাভ করবেন, যা কৃষিপ্রধান এই দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে মজবুত করবে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসা করে মির্জা ফখরুল বলেন, দীর্ঘ ১৮ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে তাঁর ফিরে আসা এবং বিমানবন্দরে মানুষের উপচে পড়া ভিড় প্রমাণ করেছে যে দেশবাসী পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাকেই দেখতে চায়। তিনি আরও বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য এক ‘অগ্নিপরীক্ষা’। এই নির্বাচনে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হলে জাতিকে বড় মাশুল দিতে হবে। তাই ভোটারদের প্রতি তাঁর আহ্বান, একটি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত করতে হবে।
জনসভায় ঠাকুরগাঁওয়ের স্থানীয় নেতাকর্মীসহ হাজার হাজার সাধারণ মানুষের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। জনসভাস্থল ও আশপাশের এলাকা ছিল নেতাকর্মীদের স্লোগানে মুখরিত। বিএনপি মহাসচিবের এই বক্তৃতায় দলটির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি যেমন স্পষ্ট হয়েছে, তেমনি জামায়াতের প্রতি তাঁর অনমনীয় অবস্থান জোটগত রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন ইঙ্গিত প্রদান করেছে। মূলত একটি স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেই তিনি তাঁর বক্তব্য শেষ করেন।