৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই নানা কারণে আলোচনা-সমালোচনায় আছে দলটি। আগস্টের শুরুতে শেখ হাসিনার ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে ‘পালিয়ে যাওয়া’র পর থেকেই জুলাই আন্দোলনে হাজারের বেশি হত্যাকাণ্ডের দায়ে অভিযুক্ত দলটির শীর্ষ নেতারা। অনেকে গ্রেপ্তার হয়ে বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন, অনেকে গোপনে দেশ ছেড়ে বিদেশে অবস্থান করছেন। রাজনীতির ময়দান থেকে তো বটেই অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকেও সব সময় কড়া বার্তা উচ্চারিত হচ্ছে দলটির অভিযুক্ত নেতাদের প্রতি। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান ও তদন্তে বের হচ্ছে নেতাদের বিপুল ‘অবৈধ সম্পদের’ খোঁজ। অনেকেই আটকাচ্ছেন দুদকের মামলার জালে। এর আগেই জুলাই হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে শত শত মামলা দায়েরের পর গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের মুখোমুখিও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ও তার পরিবার এবং দলটির কেন্দ্রীয় অনেক নেতা। হুলিয়া মাথায় নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ অনেকে। সরকারের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে চিঠিও দেওয়া হয়েছে ভারত সরকারের কাছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের সরকার পতনের ৬ মাস পূর্তির দিনে শেখ হাসিনা দলটির প্রবাসী নেতাদের সঙ্গে কথা বলার কারণে রাজধানীর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর ভবন, জাদুঘর, শেখ হাসিনার বাসভবনসহ একাধিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে ছাত্র-জনতা। এর ভেতরেই রাজনীতিতে যখন সংস্কার আর নির্বাচন ইস্যু নিয়ে বড় দলগুলোর সঙ্গে ছাত্রদের দলের মত-পার্থক্য দেখা দিয়েছে, তখন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফিরে আসার আলোচনা আবারও উত্তাপ ছড়াচ্ছে রাজনীতির মাঠে।
এ আলোচনা প্রকাশ্যে আসে গত বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের প্রতিনিধি দলের আলোচনায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহম্মদ ইউনূসের করা একটি মন্তব্যকে ঘিরে। তিনি সেখানে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন ‘অন্তর্বর্তী সরকারের আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার কোনো পরিকল্পনা নেই।’ আর এরপর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাসহ বেশ কিছু ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের এর প্রতিবাদে মিছিল হয়েছে। তারা প্রধান উপদেষ্টার এ মন্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছেন।
তবে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির দক্ষিণাঞ্চলের সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সরকারের স্থানীয় সরকার, সমবায় এবং যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসে দাবি করেন ভারতের পরিকল্পনায় ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’ নামে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসিত করার ষড়যন্ত্র চলছে। এ বিষয়টি মেনে নেওয়ার জন্য তাদের চাপ প্রয়োগের বিষয়েও বিস্তারিত লেখেন হাসনাত।
এদিকে, যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘নির্বাচন পিছিয়ে যাবে, অনিশ্চয়তা তৈরি হবে- এসব শঙ্কার কথা বলে কেউ আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের প্রশ্নে জনতার ঐক্যে ফাটল ধরাতে আসবেন না।’
যদিও গতকাল শুক্রবার রাজধানীর উত্তরার দক্ষিণখানে ফায়দাবাদ মধ্যপাড়া হাজী শুকুর আলী মাদ্রাসা সংলগ্ন মাঠে বিএনপি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, হত্যা-লুটপাটে জড়িত নয়, এমন কারও নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে বাধা নেই। এ সময় তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিয়ে কথা হচ্ছে; কিন্তু বিচার নিয়ে কথা হচ্ছে না। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বিচারের পর আওয়ামী লীগকে জনগণের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। আর জনগণ ক্ষমা করলে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।
এরপর গতকাল রাতে সংবাদ সম্মেলন করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আওয়ামী লীগের বিচার চলাকালীন আওয়ামী লীগ এবং ফ্যাসিবাদের সব সহযোগী ব্যক্তি ও সংগঠনের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। নাহিদ ইসলাম বলেন, সম্প্রতি জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক কমিশনের প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, জুলাই মাসে বাংলাদেশে সংঘটিত অপরাধ আন্তর্জাতিক অপরাধের শামিল। আওয়ামী লীগের মানবতাবিরোধী অপরাধের ব্যাপারে এত সুস্পষ্ট আন্তর্জাতিক বক্তব্য থাকার পরও বিচারিক প্রক্রিয়ায় ধীরগতি অত্যন্ত নিন্দনীয়। জাতীয় নাগরিক পার্টি অবিলম্বে জুলাই গণহত্যাসহ বিগত ফ্যাসিবাদী রেজিমের সংঘটিত গুম ও বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচারে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে চায়।
এ সময় অন্তর্বর্তী সরকার থেকে সম্প্রতি পদত্যাগ করা এই উপদেষ্টা বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মন্তব্য করেছেন ‘আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই।’ আমরা তার এ বক্তব্যের নিন্দা জানাই। আওয়ামী লীগ কর্তৃক সংঘটিত পিলখানা হত্যাকাণ্ড, শাপলা হত্যাকাণ্ড, আগ্রাসন, বিগত আন্দোলনের হত্যাকাণ্ড, গুম, ক্রসফায়ার, ভোট ডাকাতিসহ জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রশ্নে কার্যকর অগ্রগতি দৃশ্যমান হওয়ার আগে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল পথ থেকে এ ধরনের বক্তব্য অনাকাঙ্ক্ষিত।’
ফলে আলোচনায় আবার এসেছে আওয়ামী লীগ কি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বদল করে অভিযোগ নেই এমন নেতাদের দিয়ে দলকে নতুন করে পুনর্গঠন করে রাজনীতিতে আসতে চাইছে? হাসনাতের দেওয়া স্ট্যাটাসে পরিষ্কার, ‘সাবের হোসেন চৌধুরী, শিরিন শারমিন, তাপসকে সামনে রেখে এই পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে।’ হাসনাত আব্দুল্লাহ আরও বলেছেন, ‘একটি বিরোধী দল থাকার চেয়ে একটি দুর্বল আওয়ামী লীগসহ একাধিক বিরোধী দল থাকা’র প্রস্তাব পেয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে এনসিপির এই নেতাসহ তার দল আপত্তি জানালেও দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি ‘জুলাই বিপ্লবের’ পর থেকেই বলে আসছে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের বিষয়ে তাদের কোন পরিকল্পনা নেই, দাবিও নেই। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে আদালত ও দেশের জনগণ। আর রিজভী বলেছেন, যদি নির্দোষ নেতারা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আসেন তাহলে তাদের রাজনীতিতে বাধা নেই।
লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকার এর আগে গত ২৩ অক্টোবর আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতীম ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করলেও আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার কোন সিদ্ধানন্তের কথা জানায়নি। বরং ড. ইউনূস একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, চলমান বিচারগুলো শেষ হওয়ার পর তাদের রাজনীতিতে আসতে বাধা নেই।
এদিকে, এরমধ্যেই যদি আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব পদত্যাগ করে মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী দলটির নেতৃত্ব অপেক্ষাকৃত নবীন এবং কোন মামলার আসামি নন এমন কারো হাতে তুলে দেন তাহলে তাদের আইনিভাবে রাজনীতির অধিকার কেড়ে নেওয়া সম্ভব হবে কিনা সরকার বা কোন পক্ষের তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা এখন হতেই থাকবে। তবে নতুন নেতৃত্ব দিয়ে আওয়ামী লীগের ফেরা না ফেরার আলোচনার মধ্যেই একটা বিষয় পরিষ্কার, আগামীকাল রোববার ঐকমত্য কমিশনের কাছে প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির সংস্কারের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা জমা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই নির্বাচনের সময়ের ব্যাপারটি সুস্পষ্ট হতে থাকবে। কারণ, প্রধান উপদেষ্টার পাশাপাশি ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুইয়ও বলেছেন ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচন হবে, নির্বাচন পেছাবে না।
নেত্রকোনা-১ (কলমাকান্দা-দুর্গাপুর) সংসদীয় আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিশাল ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত চূড়ান্ত ফলাফল অনুযায়ী, কায়সার কামাল ১ লাখ ৫৮ হাজার ৩৪৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১-দলীয় জোট মনোনীত খেলাফত মজলিসের প্রার্থী গোলাম রব্বানী রিকশা প্রতীকে পেয়েছেন ৮৭ হাজার ৪৮৮ ভোট।
অর্থাৎ ৭০ হাজার ৮৫৫ ভোটের এক বিশাল ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করেছেন বিএনপির এই হেভিওয়েট প্রার্থী। সমতল, পাহাড় ও আংশিক হাওরবেষ্টিত এই জনপদে মোট ৪ লাখ ৫৩ হাজার ৮৯ জন ভোটারের মধ্যে ৫৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। নির্বাচনে কায়সার কামাল ও গোলাম রব্বানী ছাড়াও জাতীয় পার্টি, সিপিবি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং জাসদের প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
ঐতিহাসিকভাবে নেত্রকোনা-১ আসনটি হাজং বিদ্রোহ, তেভাগা ও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের মতো নানা যুগান্তকারী ঘটনার জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। স্থানীয় সূত্রগুলো জানাচ্ছে, দীর্ঘ সময় ধরে গারো, হাজং ও বাঙালি অধ্যুষিত এই জনপদে নিরলস প্রচার ও জনসেবা চালিয়ে আসছিলেন তিনি। বিশেষ করে গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে প্রথাগত রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ বা শোডাউনের পরিবর্তে তিনি মানবিক কর্মকাণ্ডে অধিক মনোযোগী হন। নিজ উদ্যোগে কয়েক হাজার দরিদ্র রোগীকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, জনগুরুত্বপূর্ণ রাস্তা ও অস্থায়ী সেতু নির্মাণ এবং মন্দির, গির্জা, মসজিদসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক উপাসনালয় সংস্কারের মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। গৃহহীনদের ঘর প্রদানসহ তার এই বিশেষ জনকল্যাণমুখী ধারার রাজনীতিই মূলত এবারের নির্বাচনে বিশাল জয়ের নেপথ্যে বড় ভূমিকা পালন করেছে।
প্রত্যাশিত এই বিজয়ের পর এক প্রতিক্রিয়ায় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য কায়সার কামাল বলেন, "আমি জনগণের জন্য রাজনীতি করি। জাতি, বর্ণ ও ধর্ম–নির্বিশেষে দুর্গাপুর ও কলমাকান্দার জনগণ আমাকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করেছেন। তাদের কাছে দেওয়া ওয়াদা যেন আমি রক্ষা করতে পারি, আমার জন্য সেই প্রার্থনা করবেন। আমি যেন সব সময় জনগণের সেবক হয়ে থাকতে পারি। এ ছাড়া এলাকার রাজনৈতিক পরিবেশকে সুন্দর রাখার ব্যাপারেও আমি সব সময় সজাগ থাকব। সবাইকে নিয়োজিত সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা দুর্গাপুর–কলমাকান্দার উন্নয়নে কাজ করব।" তার এই বক্তব্যে এলাকার সামগ্রিক উন্নয়ন এবং সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে সাথে নিয়ে সুন্দর রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ফুটে উঠেছে। দীর্ঘ দুই দশকের রাজনৈতিক সংগ্রামের পর কায়সার কামালের এই বিজয়কে কলমাকান্দা ও দুর্গাপুরবাসী তাদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।
পরাজিত প্রার্থীদের সাথে নিয়ে এলাকার উন্নয়ন করতে চান ব্যারিস্টার কায়সার কামাল:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নেত্রকোনা-১ আসনে বিশাল ব্যবধানে বিজয়ী হওয়ার পর এক প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি প্রার্থী ব্যারিস্টার কায়সার কামাল প্রতিহিংসামুক্ত এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির ডাক দিয়েছেন।
তিনি জানান যে, "প্রতিহিংসার রাজনীতি আর নয়। আমার আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সাথে নিয়ে বন্ধুসুলভ আচরণ বজায় রেখে এলাকার উন্নয়নে কাজ করতে চাই, যাতে মানুষ যে প্রত্যাশা নিয়ে ভোট দিয়েছে সেটা পূরণ করতে পারি।"
দীর্ঘ দেড় দশক পর সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনকে তিনি ফ্যাসিবাদের অবসানের পর জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। জুলাই বিপ্লবের বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, "ফ্যাসিস্ট রেজিমের পরে এবার প্রত্যাশিত নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। মানুষ অনেক প্রত্যাশা নিয়ে আমাদের নির্বাচিত করেছে। বিগত তিন নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে পারেনি সুষ্ঠুভাবে। এবার সদিচ্ছায় ভোট দিয়েছে, তাদের মতামতের প্রতিফলন ঘটিয়েছে। যে জুলাই যোদ্ধাদের রক্তের বিনিময়ে আজকের এই সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তাদের প্রতি সম্মান জানাই। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। কিন্তু প্রতিহিংসার রাজনীতি আর নয়, আমার আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সাথে নিয়ে ভ্রাতৃত্ববোধ বন্ধুসুলভ আচরণ বজায় রেখে এলাকার উন্নয়নে কাজ করতে চাই, যাতে মানুষ যে প্রত্যাশা নিয়ে ভোট দিয়েছে সেটা পূরণ করতে পারি।" ব্যারিস্টার কায়সার কামালের এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে নেত্রকোনার এই জনপদে ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের মাধ্যমে উন্নয়নের নতুন ধারা সূচিত হবে বলে ভোটাররা প্রত্যাশা করছেন।
দেশজুড়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে এবং এর মাধ্যমে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর বাংলাদেশ একজন পুরুষ প্রধানমন্ত্রী পেতে যাচ্ছে। কায়সার কামাল মনে করেন, জনগণের সদিচ্ছায় গঠিত এই নতুন সরকার দেশবাসীর প্রত্যাশা পূরণে সর্বোচ্চ নিষ্ঠার পরিচয় দেবে। মূলত প্রতিহিংসার বদলে সহযোগিতার রাজনীতি চর্চা করার মাধ্যমে তিনি তার নির্বাচনী এলাকায় উন্নয়নের যে অঙ্গীকার করেছেন, তা সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে একটি ‘উগ্রবাদী দল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শুক্রবার সকালে ঠাকুরগাঁওয়ের নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের সাথে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এই মন্তব্য করেন। মির্জা ফখরুল স্পষ্ট অভিযোগ করেন যে, দেশে জামায়াতের এই উত্থানের পেছনে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ফ্যাসিবাদী শাসন ও দমন-পীড়নমূলক নীতি প্রধানত দায়ী। তাঁর মতে, দীর্ঘ ১৫ বছর দেশে গণতন্ত্রকে অবরুদ্ধ করে রাখার ফলেই এমন চরমপন্থী শক্তির মাথা চাড়া দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
মতবিনিময় সভায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, যখনই কোনো দেশে প্রকৃত গণতন্ত্রকে চেপে ধরা হয় এবং জনগণের কণ্ঠ রোধ করা হয়, তখনই সেখানে উগ্রবাদী শক্তিগুলো বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের শাসনামলে ঠিক সেটিই ঘটেছে। তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের দমন-পীড়নমূলক শাসন এবং বিরোধী দলকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না দেওয়ার কারণেই জামায়াতের বর্তমান এই অবস্থান তৈরি হয়েছে। গণতান্ত্রিক পরিবেশ নষ্ট করে বিরোধী মতকে কোণঠাসা করার ফলেই এই উগ্রবাদী শক্তির উত্থান সহজতর হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ জয়ের কথা উল্লেখ করে দলটির মহাসচিব বলেন, দেশের মানুষ ইতোমধ্যে ব্যালটের মাধ্যমে তাদের রায় প্রদান করেছেন। বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ী হয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে, যা প্রমাণ করে জনগণ একটি সুষ্ঠু, সৎ ও কল্যাণমুখী রাজনীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, জনগণের এই শক্তিশালী ম্যান্ডেটের মাধ্যমে আগামীতে দেশে সকল প্রকার রাজনৈতিক অপপ্রবণতা ও উগ্রবাদ রুখে দেওয়া সম্ভব হবে। একটি গণতান্ত্রিক ও সুস্থ ধারার রাজনীতির পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে বিএনপি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও তিনি এসময় মন্তব্য করেন।
মগবাজারস্থ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আজ এক নিরুত্তাপ ও শান্ত পরিবেশ লক্ষ্য করা গেছে, যা গতকালের নির্বাচনি উত্তাপের চেয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত। নির্বাচনের দিন ও ফলাফল ঘোষণার পূর্বরাত পর্যন্ত নেতাকর্মীদের সরব উপস্থিতি থাকলেও আজ সেখানে গুটিকয়েক কর্মী ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি ছাড়া অন্য কাউকে দেখা যায়নি।
গতকাল পর্যন্ত দলটির পক্ষ থেকে সরকার গঠনের জোরালো প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হলেও এখন এটি সুনিশ্চিত যে, নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিএনপিই সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। যদিও জামায়াতে ইসলামী তাদের মূল লক্ষ্য অর্থাৎ সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়নি, তবে সংসদীয় আসনের হিসেবে এ যাবৎকালে অংশগ্রহণ করা নির্বাচনগুলোর মাঝে এবারই সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে থাকছে তারা।
আজ শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে দলের আমির শফিকুর রহমান কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে উপস্থিত হন। তবে এ সময় তিনি অপেক্ষারত সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক কথা না বলেই সরাসরি কার্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করেন। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, জুমার নামাজের পর জামায়াতের শীর্ষ নেতারা এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হবেন এবং উক্ত আলোচনার মাধ্যমেই নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে দলের আনুষ্ঠানিক অবস্থান পরিষ্কার করা হবে। মূলত দীর্ঘ লড়াই ও নির্বাচনি ব্যস্ততার পর মগবাজারের কার্যালয়টি এখন এক শান্ত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে পরবর্তী দলীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করছে।
খুলনা-৫ আসনে নির্বাচনের ফলাফলে বিভিন্ন অসংগতির অভিযোগ তুলে ভোট পুনর্গণনার আবেদন করার ঘোষণা দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও উক্ত আসনের প্রার্থী মিয়া গোলাম পরওয়ার।
শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে নিজ নির্বাচনী এলাকায় গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান যে, "চেক করে পুনর্গণনার আবেদন করার চিন্তা করছি। ৬ হাজার ভোট কেন বাতিল করা হলো সেটা আইন অনুযায়ী পুন: আবেদনের চিন্তা করছি।" নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আরও বলেন, "নির্বাচনে ১৫০ কেন্দ্রে দায়িত্ব থাকা আমাদের অনেকেই বলছেন- কিছু অসংগতি রয়েছে। ৬ হাজার ভোট বাতিল করা হয়েছে, এটা যৌক্তিক কারণে হয়েছে কিনা, আইনের বিধান অনুযায়ী চেক করার আবেদনের চিন্তা করছি। "
নির্বাচনী লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, "আমার আসনে শুধু বিএনপি নয়, যাদের বিরুদ্ধে জুলাই হয়েছে সেই শক্তিরও একটি গোপন আতাত ছিল। আরও কিছু চক্র মিলে বড় শক্তির সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে। তারপরও দেড় লক্ষ মানুষ ভোট দিয়েছে, তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।" সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে না পারলেও জনসেবার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, "আমি কোন অন্যায় করিনি, মানুষের ওপর জুলুম করিনি, কালো টাকা দিয়ে ভোট কেনার চেষ্টা করিনি, নৈতিকতার দিক থেকে তারা আমাদের কাছে পরাজয় বরণ করেছে। সেই দিক থেকে আমি বিজয়ী, এমপি হওয়া না হওয়ার সঙ্গে মানুষের সেবা করার কোন সম্পর্ক নেই, সেবা আমার আদর্শ, এটা করে যাব।" মূলত নৈতিক বিজয় এবং আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমেই তিনি পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাচ্ছেন বলে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন।
শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর গুলশানে নিজ বাসভবন থেকে জুমার নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে নেভি হেড কোয়ার্টার মসজিদের পথে রওনা হন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ সময় দলীয় প্রধানের বাসভবনের সামনে সমবেত হওয়া বিপুল সংখ্যক উৎসুক জনতার ভিড় লক্ষ্য করা যায় এবং গন্তব্যে পৌঁছানোর আগে তিনি কিছুক্ষণ গাড়ি থামিয়ে উপস্থিত মানুষের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত কুশল বিনিময় করেন।
বিএনপি চেয়ারম্যান নিজেই গাড়ির দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে কয়েকজনের পরিচয় জানতে চাইলে উপস্থিত সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে ওঠেন, "আমরা নতুন বাংলাদেশ গড়তে আপনার সঙ্গে থাকতে চাই।" জনসাধারণের এমন আবেগঘন আহ্বানের জবাবে তাদের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে তারেক রহমান বলেন, "আমার প্রতি আপনারা যে ভালোবাসা দেখিয়েছেন, তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। আমার জন্য দোয়া করবেন।" এরপর তিনি নির্ধারিত নেভি হেড কোয়ার্টার মসজিদে উপস্থিত হয়ে সাধারণ মুসল্লিদের সঙ্গে জুমার নামাজ আদায় করেন। মূলত নির্বাচনী বিজয়ের আবহ ও পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের এই সাধারণ উপস্থিতি সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর -কাঁঠালিয়া) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী রফিকুল ইসলাম জামাল বেসরকারিভাবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) সকালে প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, ধানের শীষ প্রতীকে তিনি ৬২ হাজার ১০টি ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর আলোচিত প্রার্থী ড. ফয়জুল হক দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ৫৫ হাজার ১২০টি ভোট পেয়ে পরাজিত হয়েছেন। এ আসনের ৯০টি কেন্দ্রে ভোটগণনা শেষে এ ফল ঘোষণা করা হয় এবং প্রাপ্ত তথ্যমতে একই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী ৩ জন প্রার্থী তাদের জামানত হারিয়েছেন।
জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা যায়, ঝালকাঠি-১ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ২৮ হাজার ৪৩০ জন, যেখানে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ১৬ হাজার ৪২৭ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ১২ হাজার ১ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ২ জন। ঝালকাঠি জেলার দুটি আসনে মোট ১৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, যার মধ্যে সদর-নলছিটি বা ঝালকাঠি-২ আসনে ৮ জন প্রার্থী লড়াইয়ে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত রাজাপুর ও কাঁঠালিয়া উপজেলার ভোটারদের রায়ে বিএনপির রফিকুল ইসলাম জামালের বিজয় নিশ্চিত হওয়ার মাধ্যমে এই আসনের নির্বাচনী লড়াইয়ের সমাপ্তি ঘটল।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া বিএনপির সাতজন ‘বিদ্রোহী’ নেতা শেষ পর্যন্ত বেসরকারিভাবে বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন। দলের মনোনয়ন তথা ‘ধানের শীষ’ প্রতীক না পেয়েও তারা স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং এখন বিজয়ী হয়ে দলীয় ও জোটভুক্ত সংসদ সদস্যদের সঙ্গে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করবেন। বিজয়ী এই স্বতন্ত্র নেতাদের মধ্যে রয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল, টাঙ্গাইল-৩ আসনের লুৎফর রহমান খান আজাদ, চাঁদপুর-৪ আসনের আব্দুল হান্নান, কুমিল্লা-৭ আসনের আতিকুল আলম শাওন, ময়মনসিংহ-১ আসনের সালমান ওমর রুবেল এবং দিনাজপুর-৫ আসনের রেজওয়ানুল হক।
নির্বাচন কমিশন ও দলীয় সূত্র অনুযায়ী, দলীয় নানান উদ্যোগের পরও প্রতীক না পেয়ে সারা দেশের অর্ধশতাধিক আসনে বিএনপির এই ‘অভিমানী’ নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে অনড় ছিলেন। বিশেষ করে শরিক দলগুলোর জন্য ছেড়ে দেওয়া ১৬টি আসনের মধ্যে ১২টিতেই তারা সক্রিয় থাকায় তৃণমূলের ভোট কার্যত বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং এর ফলে অনেক আসনে বিএনপি সমর্থিত জোটের প্রার্থীরা পরাজিত হন। এই ধারাবাহিকতায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনটি জমিয়তের মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবকে ছেড়ে দেওয়া হলেও সেখান থেকে বহিষ্কৃত নেত্রী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা জয়ী হয়েছেন। কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী সৈয়দ এহসানুল হুদাকে হারিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল এবং টাঙ্গাইল-৩ আসনে দলীয় প্রার্থীর বিপরীতে লুৎফর রহমান খান আজাদ বিজয়ী হয়ে চমক দেখিয়েছেন।
একইভাবে চাঁদপুর-৪ আসনে দলীয় প্রার্থী লায়ন হারুনুর রশীদকে পেছনে ফেলে জয় পেয়েছেন উপজেলা বিএনপির বহিষ্কৃত সভাপতি আব্দুল হান্নান। কুমিল্লা-৭ আসনে এলডিপির রেদোয়ান আহমেদকে পরাজিত করে আতিকুল আলম শাওন এবং ময়মনসিংহ-১ আসনে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্সের বিপরীতে সালমান ওমর রুবেল বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া দিনাজপুর-৫ আসনে ব্যারিস্টার এ কে এম কামরুজ্জামানের পরিবর্তে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া রেজওয়ানুল হক বড় ব্যবধানে বিজয় নিশ্চিত করেছেন। মূলত নিজস্ব জনসমর্থন ও সাংগঠনিক দক্ষতা কাজে লাগিয়ে এই সাত নেতা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও সংসদে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন।
এবারের নির্বাচনে চমক দেখিয়েছে ভোটাররাই; একাধিক হেভিওয়েট প্রার্থীকে হারিয়ে বদলে দিয়েছেন সমীকরণ। সারা দেশে উৎসবমুখর পরিবেশে সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগ্রহণ শেষে বেসরকারিভাবে ফলাফলে দেড় শতাধিক আসনে জয় পেয়েছেন ধানের শীষের প্রার্থীরা। জামায়াত জোট ৭৭ এবং অন্যান্য আরও সাত প্রার্থী জয়ী হওয়ার খবর এসেছে। বহুদিনের শক্ত ঘাঁটি, প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্ব আর পরিচিত মুখ সবকিছুকে ছাপিয়ে ফলাফলে উঠে এসেছে নতুন বার্তা, নির্বাচনে বিভিন্ন দলের বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন।
নির্বাচনের বেসরকারিভাবে প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা গেছে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ দলটির তিন হেভিওয়েট প্রার্থী হেরে গেছেন। এ ছাড়া বিএনপি, খেলাফত মজলিস ও এনসিপির আলোচিত প্রার্থীরাও রয়েছেন এই তালিকায়।
মিয়া গোলাম পরওয়ার
খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) আসনে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার হেরে গেছেন। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৪৬ ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী বিজয়ী বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ আলি আসগার পেয়েছেন ১ লাখ ৪৮ হাজার ৮৫৪ ভোট। ব্যবধান ২ হাজার ৬০৮।
পোস্টাল কেন্দ্রসহ আসনটিতে মোট কেন্দ্র ছিল ১৫১টি। পরওয়ার ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে। ২০০৮ ও ২০১৮ সালেও তিনি বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী ছিলেন।
এ আসনের লক্ষাধিক ভোটার হিন্দু সম্প্রদায়ের। তাঁদের ভোট পেতে দুই প্রার্থীই চেষ্টা চালিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত হিন্দু ভোট ও আওয়ামী লীগের ভোট ব্যবধান তৈরি করেছে বলে মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকেরা।
হামিদুর রহমান আযাদ
কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতবদিয়া) আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী ও দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ বেসরকারিভাবে নির্বাচনে হেরে গেছেন।
প্রাপ্ত ফলাফলে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ফরিদ ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ২৫ হাজার ২৬২ ভোট পেয়ে ৩৫ হাজার ৬২৮ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। হামিদুর রহমান আযাদ দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ৮৯ হাজার ৬৩৪ ভোট পেয়েছেন।
শিশির মনির
সুনামগঞ্জ-২ আসনে (দিরাই ও শাল্লা) বিএনপির প্রার্থী মো. নাছির চৌধুরী পেয়েছেন ৯৭ হাজার ৭৯০ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ শিশির মনির।
মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়জুল করীম
বরিশাল-৫ (সিটি-সদর) ও বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) এ দুটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমীর মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়জুল করীম।
এরমধ্যে বরিশাল-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ারের চেয়ে ৪০ হাজার ১০২ ভোট কম পেয়েছেন। মজিবর রহমান সরোয়ার পেয়েছেন ১ লাখ ৩৫ হাজার ১৪৬ ভোট ও তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ফয়জুল করিম হাতপাখা প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৯৫ হাজার ৪৪ ভোট। একইভাবে বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনে বিএনপির প্রার্থী আবুল হোসেন খানের চেয়ে ২৬ হাজার ২২৯ ভোট কম পেয়েছেন। আবুল হোসেন খান পেয়েছেন ৮২ হাজার ২১৭ ভোট ও ফয়জুল করিম ৫৫ হাজার ৯৮৮ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন।
মাহমুদুর রহমান মান্না
বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় ছিলেন। তবে শেষপর্যন্ত তিনি প্রত্যাশিত ফল করতে পারেননি। কেটলি প্রতীকে ভোট পাওয়ার সংখ্যা মাত্র ৩,৪২৬। ফলে তিনি জামানত হারিয়েছেন।
আসনটিতে বিএনপির প্রার্থী মীর শাহে আলম ১ লাখ ৪৫ হাজার ২৪ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত প্রার্থী মাওলানা শাহাদাতুজ্জামান পেয়েছেন ৯৩ হাজার ৫৪৮ ভোট পেয়েছেন।
সারজিস আলম
পঞ্চগড়-১ (তেঁতুলিয়া, পঞ্চগড় সদর ও অটোয়ারী) আসনে বিএনপি প্রার্থী নওশাদ জমির বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৪৩০ ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও ১১ দলীয় জোটের মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী সারজিস আলম শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ১ লাখ ৬৬ হাজার ১২৬ ভোট। আসটিতে ১৫৫ কেন্দ্রের এ আসনে বিজয়ী ও পরাজিত প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান ৮৩০৪।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী
ঢাকা-৮ আসনে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাস। তিনি মোট ভোট পেয়েছেন ৫৯ হাজার ৩৬৬ ভোট। এ আসনে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এনসিপির মুহাম্মাদ নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী পেয়েছেন ৫৪ হাজার ১২৭ ভোট।
তাসনিম জারা
ঢাকা-৯ আসনে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী হাবিবুর রশিদ। তিনি মোট ভোট পেয়েছেন ১ লাখ ১১ হাজার ২১২ ভোট। এ আসনে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এনসিপির মোহাম্মদ জাবেদ মিয়া পেয়েছেন ৫৩ হাজার ৮৬০ ভোট। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা পেয়েছেন ৪৪ হাজার ৬৮৪ ভোট।
মো. মামুনুল হক
ঢাকা-১৩ আসনে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী ববি হাজ্জাজ। তিনি মোট ভোট পেয়েছেন ৮৬ হাজার ৬৯৪ টি। এ আসনে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মামুনুল হক পেয়েছেন ৮৩ হাজার ৮৫১ ভোট।
রাশেদ খান
ঝিনাইদহ-৪ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও গণঅধিকার পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান তৃতীয় হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ৫৫ হাজার ৬৭০ ভোট।
এ আসনে ১ লাখ ৪ হাজার ৩১ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন জামায়াত মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতিকের প্রার্থী আবু তালিব। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি স্বতন্ত্র কাপ-পিরিচ প্রতিকের সাইফুল ইসলাম ফিরোজ পেয়েছেন ৭৫ হাজার ৭৫০ ভোট।
আমিনুল হক
ঢাকা-১৬ আসনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী আমিনুল হককে হারিয়ে জয় পেয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আব্দুল বাতেন। আসনে ৮৮ হাজার ৮২৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন দাঁড়িপাল্লার আব্দুল বাতেন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষের আমিনুল হক পেয়েছেন ৮৫ হাজার ৪৬৭ ভোট।
জিএম কাদের
রংপুর-৩ আসনে জয় পেয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. মাহবুবুর রহমান (বেলাল)। তিনি পেয়ছেন ১ লাখ ৭৫ হাজার ৮২৭ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী মো. সামসুজ্জামান সামু পেয়েছেন ৮৪ হাজার ৫৭৮ ভোট। আর লাঙ্গল প্রতীকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের পেয়েছেন ৪৩ হাজার ৩৮৫ ভোট।
সাইফুল হক
ঢাকা-১২ আসনে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী সাইফুল আলম। বিএনপি জোট সমর্থিত প্রার্থী সাইফুল হককে বিপুল ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে জয় পেয়েছেন তিনি।
দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে সাইফুল আলম পেয়েছেন ৫৩ হাজার ৭৭৩ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ‘কোদাল’ প্রতীকে পেয়েছেন ৩০ হাজার ৯৬৩ ভোট। অর্থাৎ সাইফুল হক থেকে ২২ হাজার ১৮০ ভোট বেশি পেয়েছেন সাইফুল আলম।
হারুনুর রশীদ হারুন
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও সাবেক এমপি হারুনুর রশীদ হারুনকে হারিয়ে জয় তুলে নিয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী নুরুল ইসলাম বুলবুল।
দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে নুরুল ইসলাম বুলবুল পেয়েছেন ১ লাখ ৮৯ হাজার ৬১৩। অন্যদিকে ধানের শীষ প্রতীকে হারুনুর রশীদ পেয়েছেন ১ লাখ ২৬ হাজার ৯৯৭ ভোট।
মো. গোলাম সারোয়ার তুষার
নরসিংদী-২ আসনে জয় পেয়েছেন বিএনপির আবদুল মঈন খান। তিনি ভোট পেয়েছেন ৯২ হাজার ৩৫২টি। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মো. আমজাদ হোসাইন পেয়েছেন ৫৫ হাজার ১৬৮ ভোট। আর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মো. গোলাম সারোয়ার তুষার পেয়েছেন ১৯ হাজার ২৩৬ ভোট।
সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বকে ছাপিয়ে এক নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে।
উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী জেলার তিনটি সংসদীয় আসনেই বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা। ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার ভোটগ্রহণ শেষে দিবাগত গভীর রাত ২টার দিকে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মনিরা হক আনুষ্ঠানিকভাবে এই ফলাফল ঘোষণা করেন। রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ফেনী-১ আসনে ৫৬.৪১ শতাংশ, ফেনী-২ আসনে ৫১.৮৭ শতাংশ এবং ফেনী-৩ আসনে ৫৪.৪৭ শতাংশ ভোট পড়েছে। ৪২৮টি কেন্দ্রের ২ হাজার ৪৩৯টি কক্ষে সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হয়ে বিরতিহীনভাবে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ব্যালট পেপারের মাধ্যমে এই ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
ফেনী-১ আসনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী রফিকুল আলম মজনু ১ লাখ ১৯ হাজার ৯০৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন, যেখানে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অ্যাডভোকেট এস এম কামাল উদ্দিন পেয়েছেন ৮৫ হাজার ৬১৫ ভোট। ফেনী-২ আসনে ৪ লাখ ৩৭ হাজার ৭৮ জন ভোটারের মধ্যে বিএনপির অধ্যাপক জয়নাল আবেদিন ১ লাখ ৩১ হাজার ২১০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন এবং তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ইগল প্রতীকে পেয়েছেন ৮০ হাজার ৫৮ ভোট। এদিকে ফেনী-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী আবদুল আউয়াল মিন্টু ১ লাখ ৫৭ হাজার ৪২৫ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন, যেখানে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন মানিক পেয়েছেন ১ লাখ ৮ হাজার ১৬০ ভোট।
উল্লেখ্য যে, এবারের নির্বাচনে প্রার্থীদের পাশাপাশি ভোটাররা সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তনের প্রস্তাবের পক্ষে-বিপক্ষে ‘হ্যাঁ-না’ ভোটও দিয়েছেন। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ফেনী-১ আসনে ‘হ্যাঁ’ ১,৩৯,৫৪৯ ও ‘না’ ৬০,০৫৮ ভোট; ফেনী-২ আসনে ‘হ্যাঁ’ ১,৩৮,৭৩২ ও ‘না’ ৭২,৫৩৩ ভোট এবং ফেনী-৩ আসনে ‘হ্যাঁ’ ১,৬১,৩২১ ও ‘না’ ১১৪ ভোট পড়েছে। প্রথমবারের মতো প্রবাসী ও নির্বাচনকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোট নিশ্চিত করতে ফেনীর তিনটি আসনে ১৯ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ৭ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও র্যাবসহ বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন ছিল। এই নির্বাচনে জেলার তিনটি আসনে সব মিলিয়ে ২৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে ‘জাতীয় জুলাই সনদে’ বিএনপি যেসব অঙ্গীকারে স্বাক্ষর করেছে, সরকার গঠনের পর তার প্রতিটি অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হবে বলে জানিয়েছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) সকালে ঠাকুরগাঁওয়ে নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে নির্বাচন পরবর্তী শুভেচ্ছা বিনিময় ও মতবিনিময়কালে তিনি এই দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। একইসঙ্গে তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নতুন সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে।
সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকে ‘জনগণের ভালোবাসার বিজয়’ হিসেবে অভিহিত করেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, বিএনপি সবসময় জনগণের রাজনীতি করেছে এবং জনগণও ব্যালটের মাধ্যমে তার প্রতিদান দিয়েছে। সরকার গঠন প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি স্পষ্ট করেন যে, ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে যারা রাস্তায় যুগপৎ আন্দোলন করেছে, তাদের সঙ্গে নিয়েই বিএনপি সরকার গঠন করবে। তিনি আরও জানান, দলের ৩১ দফার সংস্কার প্রস্তাবনাকে আরও বিস্তৃত করে জুলাই সনদের আলোকে রাষ্ট্র সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।
দেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রতিক উত্থান প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব সরাসরি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারকে দায়ী করেন। তিনি মন্তব্য করেন, দীর্ঘ ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন এবং গণতন্ত্রকে অবরুদ্ধ করে রাখার ফলেই উগ্রবাদী শক্তিগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছে। বিরোধী দলকে কাজ করতে না দেওয়া এবং নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করার কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে ভোটের ফলাফলে জনগণ জামায়াতকে প্রত্যাখ্যান করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সুষ্ঠু, সৎ ও কল্যাণমূলক রাজনীতির মাধ্যমে জনগণ সব অপপ্রবণতা রুখে দিতে সক্ষম হয়েছে।
বিজয়ের এই আনন্দঘন মুহূর্তেও দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি নেতাকর্মীদের বেদনাহত করছে বলে জানান মির্জা ফখরুল। আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার আদায়ের আজীবন সংগ্রামী নেত্রী আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, যা দলের জন্য অত্যন্ত বেদনার। তবুও তাঁর আদর্শকে ধারণ করে বিএনপি জনগণের কল্যাণে কাজ করে যাবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা অব্যাহত রয়েছে এবং শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত প্রাপ্ত ২৫৮টি আসনের বেসরকারি তথ্যানুযায়ী সাতজন নারী প্রার্থীর বিজয়ী হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী মোট ৮৫ জন নারী প্রার্থীর মধ্যে এখন পর্যন্ত এই সাতজন জয়ের মালা পরেছেন। মানিকগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী আফরোজা খানম ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৩৪৫ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন, যেখানে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুহাম্মদ সাইদ নূর রিকশা প্রতীকে পেয়েছেন ৬৪ হাজার ২৪২ ভোট। ঝালকাঠি-২ আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ১৩ হাজার ১০০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন এবং তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী এস এম নেয়ামুল করিম দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন ৬৯ হাজার ৮০৫ ভোট। সিলেট-২ আসনে বিএনপির নিখোঁজ নেতা এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর (লুনা) ১ লাখ ১৭ হাজার ৯৫৬ ভোট পেয়ে বড় ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন, যেখানে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মুহাম্মদ মুনতাছির আলী পেয়েছেন ৩৮ হাজার ৬৩৫ ভোট।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রুমিন ফারহানা হাঁস প্রতীক নিয়ে ১ লাখ ১৭ হাজার ৪৯৫ ভোট পেয়ে বিপুল ব্যবধানে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন, যা তার নিকটতম প্রার্থী জুনায়েদ আল হাবিবের প্রাপ্ত ভোটের চেয়ে ৩৭ হাজার ৫৬৮ ভোট বেশি। এছাড়া নাটোর-১ আসনে বিএনপির ফারজানা শারমিন, ফরিদপুর-২ আসনে শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং ফরিদপুর–৩ আসনে নায়াব ইউসুফ আহমেদ নিজ নিজ আসনে বেসরকারিভাবে জয়ী হয়েছেন। এবারের নির্বাচনে মোট ২ হাজার ১৭ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থীর হার ছিল মাত্র ৪ শতাংশ, যেখানে ৮৪ জন নারীর মধ্যে ৬৬ জন দলীয় ও ১৯ জন স্বতন্ত্র হিসেবে লড়েছেন এবং হিজড়া জনগোষ্ঠী থেকেও একজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নারী প্রার্থীদের ৭৫ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত এবং তাদের মধ্যে প্রায় ৬৭ শতাংশই পেশাগতভাবে কর্মজীবী। ২৫ থেকে ৩৯ বছর বয়সী প্রার্থীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হলেও সামগ্রিক বিচারে এবারের নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের সাফল্য এক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বলে দাবি করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একইসঙ্গে তিনি মন্তব্য করেছেন, দেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রতিক উত্থানের একক দায়ভার আওয়ামী লীগের। শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) সকালে ঠাকুরগাঁওয়ে নিজের নির্বাচনী এলাকায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির এই শীর্ষ নেতা।
মির্জা ফখরুল বলেন, দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসন এবং বিরোধী মতকে দমন করার ফলেই রাজনীতিতে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বিষয়টিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, যখনই গণতন্ত্রকে অবরুদ্ধ করা হয় এবং মূলধারার রাজনৈতিক শক্তিকে কাজ করতে বাধা দেওয়া হয়, তখনই উগ্রবাদী বা ভিন্নমতের শক্তিগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলকে কোণঠাসা করে রাখা এবং সুষ্ঠু নির্বাচন না দেওয়ার কারণেই জামায়াতের এই উত্থান ঘটেছে।
তবে বিএনপির মহাসচিব মনে করেন, ভোটের ফলাফলে জনগণ জামায়াতকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তিনি বলেন, জনগণ ব্যালটের মাধ্যমে তাদের রায় দিয়েছে এবং বিএনপি ইতোমধ্যেই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে। সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল জুলাই সনদের বিষয়েও দলের অঙ্গীকার পুনর্ব ব্যক্ত করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর জুলাই সনদে যেসব প্রতিশ্রুতিতে স্বাক্ষর করা হয়েছিল, সরকার গঠনের পর তার প্রতিটি অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এখন পর্যন্ত ছয়টি আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থীরা নিজেদের বিজয় নিশ্চিত করেছেন। ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে দলটির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজের মাধ্যমে বিজয়ী প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করে অভিনন্দন জানানো হয়। বেসরকারিভাবে নির্বাচিত এই তালিকায় রয়েছেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম (ঢাকা-১১), সদস্য সচিব আখতার হোসেন (রংপুর-৪), দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ (কুমিল্লা-৪) এবং যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক হান্নান মাসউদ (নোয়াখালী-৬)। এছাড়াও কুড়িগ্রাম-২ আসন থেকে আতিকুর রহমান মোজাহিদ এবং নারায়াণগঞ্জ-৪ আসন থেকে আব্দুল্লাহ আল আমিন সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।
দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, ঘোষিত আসনগুলো ছাড়াও আরও একাধিক নির্বাচনী এলাকায় এনসিপি মনোনীত প্রার্থীরা জয়ের পথে এগিয়ে রয়েছেন। এই অবস্থায় চূড়ান্ত ফলাফল হাতে না আসা পর্যন্ত প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে নেতাকর্মীদের অবস্থান নিশ্চিত করার কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। এদিকে, ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়া সার্বিকভাবে উৎসবমুখর ও সুষ্ঠু হলেও পরবর্তী পর্যায়ে অসাধু উপায়ে ফলাফলে কারচুপির চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। মূলত স্বচ্ছ নির্বাচন সম্পন্ন করার স্বার্থে এবং জনগণের রায় রক্ষা করতে এনসিপি নেতৃবৃন্দ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রশাসনের ভূমিকার ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন।