এশিয়া কাপের সুপার ফোরে ফাইনালের লড়াইয়ে ক্রিকেটের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত-পাকিস্তানের দ্বৈরথ আরও একবার দেখার অপেক্ষায় ক্রিকেট বিশ্ব। মঞ্চ যাই হোক, এ দুই দলের ম্যাচ মানে খেলার চেয়ে বেশিকিছু। যেখানে নিজেদের সেরাটা দিতে মুখিয়ে থাকেন দুই দলের খেলোয়াড়রা। এবারের প্রেক্ষাপট বরং অন্য সময়ের চেয়ে বেশি উত্তপ্ত। আসর শুরুর আগে আয়োজন নিয়ে মাঠের বাইরে দুই দেশের লড়াইয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছিল পুরো এশিয়া কাপ।
ক্রিকেটে ভারত-পাকিস্তানের দ্বৈরথ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে। প্রতিবেশী এই দুই দেশ মাঠে মুখোমুখি হওয়া মানে উত্তেজনা যেন পৌঁছে যায় অন্য পর্যায়ে। শুধু মাঠেই নয়, মাঠের বাইরেও এই দুই দেশের সম্পর্ক এমনই। সঙ্গে তো রয়েছে রাজনৈতিক বৈরিতাও। তাই বেশ কয়েক বছর ধরেই দ্বিপক্ষীয় সিরিজ হয় না এই দুই দেশের মধ্যে; কিন্তু তাতে কী? বড় কোনো টুর্নামেন্ট অর্থাৎ এশিয়া কাপ কিংবা বিশ্বকাপের সূচি এমনভাবেই করা হয় যেন এই আসরগুলোতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী এই দুই দেশ মুখোমুখি হতে পারে আর দর্শকরা এই হাইভোল্টেজ ম্যাচ উপভোগ করতে পারে। সেই হিসাব আজ শ্রীলঙ্কার কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় বিকাল ৩টা ৩০ মিনিটে ফাইনালের দৌড়ে নামছে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ।
ওয়ান ডে ক্রিকেটে ভারত-পাক দ্বৈরথের ইতিহাস ৫৫ বছরের পুরোনো। ওয়ানডেতে এখন পর্যন্ত ১৩৩ বার মুখোমুখি হয়েছে ভারত ও পাকিস্তান। এর মধ্যে ভারতের জয় ৫৫টিতে, পাকিস্তানের জয় ৭৩টিতে। ৫টি ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়, অর্থাৎ এই পরিসংখ্যানে পাকিস্তান বেশ এগিয়ে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারত এখন পর্যন্ত যে ৫৫টি ওয়ান ডে জিতেছে, তার মধ্যে ২৬টি ম্যাচে প্রথমে ব্যাটিং করেছে ভারতীয় দল। ২৯টি ম্যাচে রান তাড়া করে জিতেছে ভারত। অর্থাৎ শুরুতে ফিল্ডিং করলে জেতার হার বেশি। ওয়ানডে ক্রিকেটে পাকিস্তানের বিপক্ষে সর্বশেষ ১০ ম্যাচের মাত্র ৩টিতে হেরেছে ভারত।
সর্বশেষ ২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপে পরস্পর দেখা হয়েছিল তাদের। সেই ম্যাচে ভারতের কাছে বৃষ্টি আইনে ৮৯ রানে হেরেছিল পাকিস্তান। তবে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে হওয়া গত এশিয়া কাপে ভারতকে হারিয়ে পাঁচ উইকেটে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছিল পাকিস্তান। এরপর ওয়ানডে ফরম্যাটে না হলেও এ সময়ে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে চারবার মুখোমুখি হয়েছে ভারত-পাকিস্তান। দু’বার করে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ও এশিয়া কাপের মঞ্চে। এর মধ্যে সমান দু’বার করে জয় ও হারের স্বাদ পেয়েছে দল দুটি।
ওয়ানডেতে দুই দলের লড়াইয়ে সর্বোচ্চ সংগ্রহ ভারতের। ৯ উইকেটে ৩৫৬। অন্যদিকে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ ৮ উইকেটে ৩৪৪। সর্বনিম্ন দলীয় রান ভারতের ৭৯, পাকিস্তানের সর্বনিম্ন ৮৭। ২০২২ টি-টোয়েন্টি এশিয়া কাপে দুইবার মুখোমুখি হয়ে ভারত ও পাকিস্তান। গ্রুপ পর্বে পাকিস্তানকে ৫ উইকেট হারায় ভারত। আর সুপার ফোরে ভারতকে ৫ উইকেটে হারিয়ে ফাইনাল খেলে পাকিস্তান। তবে এশিয়া কাপের সর্বোচ্চ ৭টি শিরোপা আছে ভারতের, শেষটি ২০১৮ সালে। পাকিস্তান এশিয়া কাপ জিতেছে দুইবার, ২০০০ এবং ২০১২ সালে। কারেন্ট প্লেয়ারদের মধ্যে এশিয়া কাপে সবচেয়ে বেশি রান রোহিত শর্মার। হবারই কথা, সেই ২০০৮ থেকে খেলছেন। ২২ ম্যাচে ৭৪৫ রান। সেঞ্চুরি ১টি, ফিফটি ৬টি। বিপরীতে ২০১৮ এশিয়া কাপে পা রাখা বাবর আজম ওই এক আসরেই ৩৫১ রান তুলে রীতিমতো হইচই ফেলে দেন।
এদিকে আজ এমন একটি লড়াইয়ের আগে কী ভাবছেন দুই দলের খেলোয়াড়রা? কোন দল এগিয়ে- এমন এক প্রশ্নের উত্তরে ম্যাচ-পূর্ব সংবাদ সম্মেলনে গতকাল পাকিস্তানের অধিনায়ক বাবর আজম ভারতের চেয়ে নিজেদেরই একটু এগিয়ে রেখেছেন। কেননা এ মাঠে সর্বশেষ ২০০৪ সালে দেখা হয়েছিল দুই দলের। এতে পাকিস্তান জিতেছিল ৫৯ রানে।
বাবর নিজেদের কেন এগিয়ে রাখছেন, সেই ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। অনেকেই মনে করতে পারেন, ভারতের চেয়ে নিজেদের বোলিং আক্রমণকে শক্তিশালী মনে করেন বলেই বাবর পাকিস্তানকে এগিয়ে রাখছেন। ব্যাপারটা আসলে তা নয়। ভারত-পাকিস্তান সুপার ফোরের ম্যাচটি হচ্ছে শ্রীলঙ্কায়। এখানে পাকিস্তান টানা অনেক দিন খেলেছে সম্প্রতি। সেই থেকে এখানকার কন্ডিশনের সঙ্গে খুব ভালোভাবেই পাকিস্তানের খেলোয়াড়রা মানিয়ে নিয়েছেন বলে মনে করেন বাবর। সেটাই তাদের কিছুটা হলেও এগিয়ে রাখবে বলে বিশ্বাস তার।
সুপার ফোরে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের দিনে আবহাওয়া কেমন থাকবে, সে বিষয়ে ‘আকুওয়েদার’ জানিয়েছে, বৃষ্টির সম্ভাবনা ৭৫ শতাংশ। দিনের শেষভাগে বজ্রঝড় হতে পারে এবং রাতে বৃষ্টির সম্ভাবনা ৭৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯৬ শতাংশ হতে পারে। ওয়েদার ডটকম জানিয়েছে, আগামীকাল কলম্বোয় বৃষ্টির সম্ভাবনা ৯০ শতাংশ। প্রথম ম্যাচ বৃষ্টির কারণে পরিত্যক্ত হওয়ায় মাঠের লড়াই উপভোগ করতে পারেননি দর্শকরা। সে ম্যাচে ভারত আগে ব্যাট করে ৪৮.৫ ওভারে ২৬৬ রান তুললেও বৃষ্টির কারণে পাকিস্তান ব্যাটিংয়ে নামতে না পারায় ম্যাচটি পরিত্যক্ত ঘোষিত হয়। পাল্লেকেলেতে যেটুকু খেলা হয়েছিল, তাতে পাক পেসারদের সঙ্গে ভারতীয় ব্যাটিংয়ের লড়াই জমে উঠেছিল।
সুপার ফোরে ইতিমধ্যেই নিজেদের প্রথম ম্যাচ জিতেছে পাকিস্তান। বাংলাদেশকে হারিয়েছেন বাবর আজমরা। রোববার ভারতের বিরুদ্ধে জিতলে ফাইনালের দরজা কার্যত খুলে যাবে তাদের সামনে। অন্যদিকে ভারত চাইবে পাকিস্তানের পথের কাঁটা হয়ে উঠতে। শেষ হাসি তোলা থাকবে কার জন্য? আর তাইতো কলম্বোতে আবার টানটান এক লড়াইয়ের অপেক্ষা।
এক রোমাঞ্চকর ম্যাচে সেনেগালকে ৩-২ গোলে পরাজিত করে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করেছে বেলজিয়াম। সিয়াটলে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে এক সময় ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে জয় ছিনিয়ে নেয় ইউরোপের রেড ডেভিলরা। অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় পেনাল্টি থেকে গোল করে বেলজিয়ামকে স্মরণীয় এক জয় এনে দেন ইউরি টিলেমান্স। নকআউট পর্বের পরবর্তী ম্যাচে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও বসনিয়া ম্যাচের জয়ী দলের মুখোমুখি হবে।
ম্যাচের শুরু থেকেই আধিপত্য বিস্তার করে খেলে সেনেগাল। ১৩তম মিনিটে ইসমাইলা সারের একটি শট পোস্টে লেগে ফিরে এলে বেলজিয়াম রক্ষা পেলেও ২৫তম মিনিটে সেনেগালের আক্রমণ আর ঠেকানো যায়নি। সাদিও মানের নিখুঁত ক্রসে হাবিব দিয়ারা গোল করে সেনেগালকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ব্যবধান দ্বিগুণ করেন ইসমাইলা সার। ৫১ মিনিটে মুসা নিয়াখাতের লম্ব থ্রু বল থেকে দুর্দান্ত গতিতে ডি-বক্সে ঢুকে বল জালে জড়ান তিনি। ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে বেলজিয়াম যখন খাদের কিনারায়, তখনই শুরু হয় তাদের প্রত্যাবর্তনের মহাকাব্য।
ম্যাচের ৮৫ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে এগিয়ে থাকা সেনেগাল জয়ের সুবাস পাচ্ছিল। কিন্তু ৮৬ থেকে ৮৯—এই মাত্র তিন মিনিটের ঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে যায় আফ্রিকানদের রক্ষণভাগ। ৮৬ মিনিটে রোমেলু লুকাকু গোল করে ব্যবধান কমান এবং ৮৯ মিনিটে ইউরি টিলেমান্সের দর্শনীয় হেডে সমতায় ফেরে বেলজিয়াম। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা ২-২ সমতায় শেষ হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। যখন মনে হচ্ছিল ম্যাচটি টাইব্রেকারে গড়াবে, তখনই ১২০ মিনিটের মাথায় নাটকীয় মোড় নেয় খেলা।
অতিরিক্ত সময়ের যোগ করা সময়ে সেনেগালের ডিফেন্ডার লামিনে কামারা ডি-বক্সের ভেতরে বেলজিয়ামের ইউরি টিলেমান্সকে ফাউল করেন। রেফারি প্রথমে বিষয়টি এড়িয়ে গেলেও ভিডিও সহকারী রেফারির (ভিএআর) সহায়তায় পেনাল্টির বাঁশি বাজান। ১২৫তম মিনিটে পেনাল্টি থেকে ঠাণ্ডা মাথার স্পট-কিকে নিজের দ্বিতীয় গোল করে বেলজিয়ামের ৩-২ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত করেন টিলেমান্স। বেলজিয়ামের এই অবিশ্বাস্য জয় বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা প্রত্যাবর্তনের গল্প হিসেবে স্থান করে নিল। অন্যদিকে অসাধারণ খেলেও শেষ মুহূর্তের ভুলে বিদায় নিতে হলো সেনেগালকে।
বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২-এর নাটকীয় এক লড়াইয়ে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোকে ২-১ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করেছে ইংল্যান্ড। ম্যাচের শুরুতে পিছিয়ে পড়েও অধিনায়ক হ্যারি কেইনের জোড়া গোলের সুবাদে এক অবিস্মরণীয় জয় পায় থ্রি লায়ন্সরা। এই জয়ের ফলে দীর্ঘ ৬০ বছর পর (১৯৬৬ সালের পর) বিশ্বকাপে প্রথম গোল হজম করে পিছিয়ে পড়ার পর ম্যাচ জয়ের রেকর্ড গড়ল ইংলিশরা। আগামী ৬ জুলাই মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়ামে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে স্বাগতিক মেক্সিকোর মুখোমুখি হবে তারা।
ম্যাচের শুরুতেই চমক দেখায় ডিআর কঙ্গো। মাত্র ৭ম মিনিটে অধিনায়ক শানসেল এমবেম্বার সহযোগিতায় ব্রায়ান সিপেঙ্গা দুর্দান্ত এক গোল করে আফ্রিকান দলটিকে এগিয়ে নেন। ডি-বক্সের বাঁ দিক থেকে নেওয়া সিপেঙ্গার ডান পায়ের সেই শটে কঙ্গো ১-০ লিড নিয়ে বিরতিতে যায়। প্রথমার্ধে ইংলিশরা বেশ কয়েকবার সুযোগ তৈরি করলেও কঙ্গোর জমাট রক্ষণভাগ ভাঙতে ব্যর্থ হয় তারা।
দ্বিতীয়ার্ধে গোল পরিশোধে মরিয়া হয়ে অল-আউট আক্রমণে যায় ইংল্যান্ড। তবে গোলের দেখা পেতে তাদের ৭৫ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। অ্যান্থনি গর্ডনের নিখুঁত ক্রস থেকে দুর্দান্ত এক হেডে গোল করে ইংল্যান্ডকে সমতায় ফেরান হ্যারি কেইন। সমতায় ফেরার পর ইংলিশদের আক্রমণের ধার আরও বেড়ে যায়। নির্ধারিত সময়ের খেলা শেষ হওয়ার মাত্র ৪ মিনিট আগে আবারও ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন কেইন। বক্সের বাইরে গর্ডনের কাছ থেকে বল পেয়ে এক জোরালো শটে বল জালে জড়িয়ে জয় নিশ্চিত করেন এই বায়ার্ন মিউনিখ তারকা।
ম্যাচের শেষ দিকে কঙ্গো সমতায় ফেরার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও ইংলিশ রক্ষণভাগ কোনো ভুল করেনি। ২-১ ব্যবধানের এই জয়ে হ্যারি কেইন জাতীয় দলের জন্য আরও একবার নিজেকে অপরিহার্য হিসেবে প্রমাণ করলেন। অন্যদিকে বীরোচিত লড়াই করেও শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হলো কঙ্গোকে। হ্যারি কেইনের এই ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন ইংলিশ সমর্থকদের মাঝে উন্মাদনা সৃষ্টি করেছে এবং মেক্সিকোর বিপক্ষে পরবর্তী ম্যাচের জন্য দলকে মানসিকভাবে চাঙ্গা করে তুলেছে।
২০২৬ বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২-এর রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে ২-০ গোলে পরাজিত করে শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করেছে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র। এই জয়ের মাধ্যমে ২০০২ সালের পর দীর্ঘ ২৪ বছর নকআউট পর্বে কোনো ম্যাচ জেতার রেকর্ড গড়ল মার্কিনরা। প্রথমার্ধে ফোলারিন বালোগুনের গোল এবং দ্বিতীয়ার্ধে মালিক টিলম্যানের জাদুকরী ফ্রি-কিকে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে স্বাগতিক দল। আগামী সোমবার সিয়াটলে রাউন্ড অব ১৬-এর ম্যাচে বেলজিয়ামের মুখোমুখি হবে তারা।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবলের পসরা সাজায় যুক্তরাষ্ট্র। প্রথমার্ধে একটি গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হয়ে গেলেও বিরতিতে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে স্বস্তি এনে দেন ফোলারিন বালোগুন। তাঁর লক্ষ্যভেদে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে প্রথমার্ধ শেষ করে মার্কিনিরা। তবে দ্বিতীয়ার্ধে এক অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্কের মুখে পড়তে হয় তাদের। বল দখলের লড়াইয়ে বসনিয়ার ডিফেন্ডারের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ায় গোলদাতা বালোগুনকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান রেফারি। রেফারির এই সিদ্ধান্তকে ধারাভাষ্যকার ও বিশেষজ্ঞরা ‘বিতর্কিত’ বলে অভিহিত করেছেন।
ম্যাচের শেষ ২৬ মিনিট ১০ জনের দলে পরিণত হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বসনিয়া একের পর এক আক্রমণের ঝড় তোলে। কিন্তু স্বাগতিকদের জমাট রক্ষণভাগে ফাটল ধরাতে ব্যর্থ হয় তারা। উল্টো ৮২ মিনিটে ডি-বক্সের বাইরে থেকে মালিক টিলম্যানের এক নিখুঁত ও চোখধাঁধানো ফ্রি-কিকে ব্যবধান দ্বিগুণ করে যুক্তরাষ্ট্র। এই গোলেই মূলত বসনিয়ার ম্যাচে ফেরার সব আশা শেষ হয়ে যায় এবং ২-০ ব্যবধানের ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত হয় মার্কিনিদের।
এই জয় যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় এক অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে লাল কার্ডের কারণে শেষ ষোলোর গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে বেলজিয়ামের বিপক্ষে নির্ভরযোগ্য স্ট্রাইকার বালোগুনকে ছাড়াই মাঠে নামতে হবে স্বাগতিকদের, যা দলটির আক্রমণভাগের জন্য বড় এক পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে। ১ জুলাই অনুষ্ঠিত এই ম্যাচ শেষে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থকদের মাঝে বাঁধভাঙা উল্লাস লক্ষ্য করা গেছে।
বিশ্বকাপের ‘রাউন্ড অব ৩২’-এর হাইভোল্টেজ ও একপেশে ম্যাচে সুইডেনকে ৩-০ গোলের বড় ব্যবধানে ধূলিসাৎ করে দাপটের সাথে শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করেছে শক্তিশালী ফ্রান্স। দলের পোস্টার বয় ও অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পের দুর্দান্ত জোড়া গোল এবং তরুণ তুর্কি ব্র্যাডলি বারকোলার এক চমৎকার গোলের সুবাদে এই বিশাল জয় পায় ফরাসিরা। মাঠের লড়াইয়ে সুইডিশরা শুরুর দিকে কিছুটা প্রতিরোধের দেয়াল গড়ার চেষ্টা করলেও, ফ্রান্সের গতিময় ও ধারালো আক্রমণের সামনে ম্যাচের সময় বাড়ার সাথে সাথে তারা সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়ে। কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার চূড়ান্ত লড়াইয়ে এবার দিদিয়ের দেশমের ফ্রান্সের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ল্যাটিন আমেরিকার দল প্যারাগুয়ে, যারা আগের ম্যাচে শক্তিশালী জার্মানিকে বিদায় করে টুর্নামেন্টের অন্যতম বড় চমক দেখিয়েছে।
ম্যাচের বাঁশি বাজার শুরু থেকেই সুইডেনের রক্ষণভাগকে ব্যস্ত রেখে একের পর এক আক্রমণ চালাতে থাকে ফ্রান্স। ম্যাচের ১৯তম মিনিটে কিলিয়ান এমবাপ্পে সুইডিশ ডিফেন্স ভেঙে জালে বল জড়ালেও অফসাইডের কারণে রেফারি সেই গোলটি বাতিল করে দেন। প্রথমার্ধের সিংহভাগ সময় সুইডেনের গোলরক্ষক জেটারস্ট্রোমের অতিমানবীয় কিছু সেভ ও দৃঢ়তায় ফ্রান্স গোলবঞ্চিত থাকে। তবে বিরতির ঠিক আগে সুইডিশদের সেই রক্ষণব্যূহ আর ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। প্রথমার্ধের একেবারে শেষ মুহূর্তে (৪৫ মিনিটে) ডি-বক্সে বল পেয়ে নিজের একক ড্রিবলিং নৈপুণ্যে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারকে পরাস্ত করে এক দর্শনীয় কার্ভ শটে ফ্রান্সকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন এমবাপ্পে। এই মনস্তাত্ত্বিক লিড নিয়েই বিরতিতে যায় ফরাসিরা।
দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে ফিরে আক্রমণের তীব্রতা ও ধার আরও বাড়িয়ে দেয় ফরাসি আক্রমণভাগ। ম্যাচের ৫৩তম মিনিটে ব্র্যাডলি বারকোলা দারুণ এক নিয়ন্ত্রিত ও নিখুঁত শটে ব্যবধান দ্বিগুণ করে ২-০ করেন। ফ্রান্সের একের পর এক গতিময় আক্রমণে কোণঠাসা হয়ে পড়া সুইডেন পুরো ম্যাচে আর ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো সুযোগই পায়নি। এরপর ম্যাচের ৭৪তম মিনিটে নিজের ব্যক্তিগত দ্বিতীয় এবং দলের হয়ে তৃতীয় গোলটি করে সুইডেনের ম্যাচ থেকে ছিটকে যাওয়ার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন এমবাপ্পে। এই গোল উৎসবের পর শেষ পর্যন্ত ৩-০ গোলের দাপুটে ব্যবধানের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে বর্তমান বিশ্ব রানার্সআপরা।
ফ্রান্সের এই ক্লিনশিট ও আধিপত্য বজায় রাখার পেছনে গোলরক্ষক মাইক মাইগনান, ডিফেন্ডার উইলিয়াম সালিবা এবং মাঝমাঠের চালিকাশক্তি অহেলিয়াঁ চুয়ামেনিরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অন্যদিকে সুইডেনের তারকা ফরোয়ার্ড আলেকজান্ডার ইসাক ও ভিক্টর গোকেরেসরা প্রথমার্ধে দু-একটি কাউন্টার অ্যাটাক থেকে চেষ্টা করলেও ফরাসি রক্ষণভাগের ইস্পাতকঠিন দেয়ালে ফাটল ধরাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন। ফ্রান্সের এই বিশাল জয়ে এমবাপ্পের এমন বিধ্বংসী ও অতিমানবীয় ফর্ম প্যারাগুয়ের বিপক্ষে পরবর্তী নকআউট ম্যাচের জন্য বিপক্ষ শিবিরে বড় ধরনের সতর্কবার্তা দিয়ে রাখল।
রোনালদো-লেওনিদাসকে টপকে চূড়ায় এমবাপ্পে
এমবাপ্পে এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র বিশ্বকাপের নকআউটেই ১০টি গোল করেছেন। নরওয়ে ম্যাচের প্রথম গোলটির মাধ্যমে তিনি সর্বকালের তালিকায় ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রোনালদো ও লিওনিদাসকে (৮ গোল) ছাড়িয়ে গেছেন।
এমবাপ্পের একাধিক গোলের রেকর্ড
গ্রুপপর্বের পর নকআউটেও সুইডেনের বিপক্ষে জোড়া গোল করলেন এমবাপ্পে। যা বিশ্বকাপের নকআউটে তার চতুর্থ একাধিক গোলের ঘটনা। টুর্নামেন্টের ইতিহাসে অন্য যেকোনো খেলোয়াড়ের তুলনায় এই সংখ্যাটি দ্বিগুণ। এ ছাড়া সামগ্রিকভাবে বিশ্বকাপের সাত ম্যাচে একাধিক গোলের রেকর্ড গড়লেন এমবাপ্পে।
এমবাপ্পের গোল্ডেন বুট জয়ের সম্ভাবনা
চলতি আসরে এখন পর্যন্ত লিওনেল মেসির সমান সর্বোচ্চ ৬টি গোল করেছেন এমবাপ্পে। তবে এই টুর্নামেন্টে তার ২টি অ্যাসিস্ট তাকে গোল্ডেন বুট জয়ের লড়াইয়ে মেসির চেয়ে এগিয়ে রেখেছে।
এমবাপ্পে ও দেম্বেলে রেকর্ড
বিশ্বকাপে এমবাপ্পে ও উসমান দেম্বেলে যৌথভাবে ৬টি গোলে অবদান রেখেছেন (এমবাপ্পেকে দেম্বেলের ৪ অ্যাসিস্ট এবং দেম্বেলেকে এমবাপ্পের ২ অ্যাসিস্ট)। গত ৬০ বছরের মধ্যে বিশ্বকাপে এটি অন্য যেকোনো জুটির চেয়ে বেশি।
সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড থেকে সামান্য দূরে এমবাপ্পে
সুইডেন ম্যাচে জোড়া গোলের পর বিশ্বকাপে সব মিলিয়ে এমবাপ্পের গোলসংখ্যা ১৮-তে দাঁড়িয়েছে। পুরুষদের বিশ্বকাপে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় মিরোস্লাভ ক্লোসাকে (১৬ গোল) টপকে তিনি এককভাবে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছেন এবং শীর্ষ গোলদাতা লিওনেল মেসির (১৯ গোল) চেয়ে মাত্র এক গোল পিছিয়ে আছেন।
মাইকেল ওলিসের রেকর্ড
দুর্দান্ত ফর্মে থাকা ফরাসি মিডফিল্ডার মাইকেল ওলিসে চলতি বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ৫টি অ্যাসিস্ট করেছেন। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে জার্মানির টমাস হ্যাসলারের পর এক আসরে এত বেশি অ্যাসিস্ট আর কোনো ফুটবলার করতে পারেননি। তবে বিশ্বকাপের এক আসরে (১৯৭০) সর্বোচ্চ ৬টি অ্যাসিস্টের রেকর্ড এখনো ব্রাজিল কিংবদন্তি পেলের দখলে (১৯৬৬ আসর থেকে রেকর্ড সংরক্ষিত আছে)।
কোচের রেকর্ড
ফ্রান্সের ম্যানেজার হিসেবে দিদিয়ের দেশম ফিফা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে তার নবম জয় পেয়েছেন, যা এই প্রতিযোগিতার ইতিহাসে যেকোনো কোচের চেয়ে বেশি।
গোলরক্ষক জ্যাকব জেটারস্ট্রমের রেকর্ড
গোলরক্ষক জ্যাকব জেটারস্ট্রম দুর্দান্ত ফর্মে না থাকলে সুইডেন হয়তো তিনটির বেশি গোল হজম করত। ফ্রান্সের বিপক্ষে তিনি নয়টি সেভ করেছেন; গত ৬০ বছরের মধ্যে কোনো সুইডিশ গোলরক্ষকের বিশ্বকাপ ম্যাচে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সেভ (রনি হেলস্ট্রমের ১০টি সেভের পরেই তার অবস্থান, যা তিনি ১৯৭৪ সালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে করেছিলেন)।
ফ্রান্সের রেকর্ড
বিশ্বকাপের সর্বশেষ পাঁচ ম্যাচেই ন্যূনতম ৩টি করে গোল করেছে ফ্রান্স। যা ফিফার এই মেগা ইভেন্টের ইতিহাসে টানা সর্বোচ্চ ম্যাচে কমপক্ষে তিন গোলের রেকর্ড।
‘ব্যাটম্যান’ এমবাপ্পের ‘রবিন’ ওলিসে
ফ্রান্সের মাঝমাঠ থেকে শুরু করে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স লাইনে এমবাপ্পে ও ওলিসের অবাধ বিচরণ এবং নিখুঁত বোঝাপড়া দেখে যে কারোই ব্যাটম্যান-রবিনের রুদ্ধশ্বাস অভিযানের কথা মনে পড়তে বাধ্য। গতি, টানটান রোমাঞ্চ, দুই পায়ের জাদুকরী অ্যাকশন আর দুটি নদীর জল এক মোহনায় মিশে যাওয়ার মতো ফুটবলীয় রসায়নে সমৃদ্ধ তাঁদের এই জুটি। ব্যাটম্যানের জন্য রবিন ঠিক যতটা নিঃস্বার্থ, ওলিসেও এমবাপ্পের জন্য মাঠের ভেতর ঠিক ততটাই উজাড় করে দেওয়া এক যোদ্ধা। সুইডেনের বিপক্ষে ফ্রান্সের সর্বশেষ ৩-০ গোলের দাপুটে জয়েও এর স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে। ওই ম্যাচে এমবাপ্পের করা চোখ ধাঁধানো জোড়া গোলের একটির মূল উৎস ছিলেন ওলিসে, আর দলের অন্য গোলটিতেও অ্যাসিস্ট ছিল তার। গোল বা অ্যাসিস্টের সংখ্যার চেয়েও মাঠে এই দুজনের ‘টেলিপ্যাথিক’ বোঝাপড়াটাই সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ছে—পাস ঠিক কোন মুহূর্তে দিতে হবে, কে কোথায় ওত পেতে দাঁড়িয়ে আছেন, বল ঠিক কতটা সুইং করালে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারকে ফাঁকি দিয়ে সতীর্থের পায়ে পৌঁছাবে, তা যেন দুজনের মগজেই আগে থেকে প্রোগ্রাম করা!
বিশেষ করে ফ্রান্স যখন প্রতিপক্ষের ডিফেন্স চূর্ণ করে আক্রমণে ওঠে, তখন মাঠের চিত্রটা চমৎকার ফুটে ওঠে। যেন কোনো এক গ্রামীণ চিরন্তন খেলায় মেতেছেন দুজনে, যেখানে প্রতিপক্ষের কোনো ডিফেন্ডার হাজার চেষ্টা করেও তাদের কাউকেই ছুঁতে বা থামাতে পারছে না। চলতি বিশ্বকাপে এমবাপ্পের গোলসংখ্যা ইতিমধ্যেই ৬-এ পৌঁছে যৌথভাবে শীর্ষস্থানে বসেছেন, যার মধ্যে ৩টি গোলের নিখুঁত উৎসই ছিলেন ওলিসে। ফরাসি আক্রমণভাগের এই জাদুকরী রূপের ট্রেলার বিশ্ববাসী প্রতি ম্যাচেই দেখছে—ওলিসের ডিফেন্সচেরা মাপা পাস আর এমবাপ্পের বিদ্যুৎগতির মুভমেন্ট; যেন দুষ্টের দমনে কমিক বইয়ের রবিন একের পর এক সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছেন আর ব্যাটম্যান এসে মোক্ষম আঘাত হানছেন।
ফ্রান্সের হয়ে প্রথম ৪ ম্যাচে ইতিমধ্যেই ৫টি গোল করিয়েছেন ওলিসে। বিশ্বকাপের সুদীর্ঘ ইতিহাসে ওলিসের আগে প্রথম ৪ ম্যাচে এমন কীর্তি গড়তে পেরেছেন মাত্র দুজন—১৯৫৪ বিশ্বকাপে হাঙ্গেরির লাজলো বুদাই (৬ অ্যাসিস্ট) এবং ১৯৩৮ বিশ্বকাপে ইতালির আমাদিও বিয়াভাতি (৫ অ্যাসিস্ট)। শুধু তাই নয়, বিশ্বকাপে একই দলের একজন খেলোয়াড় ন্যূনতম ৬টি গোল করেছেন এবং অন্যজন ন্যূনতম ৫টি গোল করিয়েছেন—এমন যুগলবন্দী বিশ্বমঞ্চে সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল সুদূর ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপে, পোল্যান্ডের কিংবদন্তি লাতো (৭ গোল) ও গাদোচা (৫ অ্যাসিস্ট) জুটির মধ্যে। এই তালিকায় এর আগে ১৯৫৮ আসরের ফন্তেইন-কোপা কিংবা ১৯৭০ আসরের পেলে-জেয়ার্জিনহোর মতো অমর জুটির নাম রয়েছে। ওলিসের প্রতিটি পাসের গোলদাতা এমবাপ্পে না হলেও, চলমান বিশ্বকাপে দুজনেই নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে বিশ্বসেরা। এমবাপ্পের চেয়ে যেমন বেশি গোল এই মুহূর্তে আর কারও নেই, তেমনি ওলিসের চেয়ে বেশি গোল বানানোর কারিগরও টুর্নামেন্টে দ্বিতীয় কেউ নেই। মাঠে তাদের এই রসায়ন দেখে মনে হয়, শত শত নুড়ির বাধা টপকে কোত্থেকে যেন মাঠের বুকে গলগল করে বেরিয়ে আসছে খাঁটি তরল সোনার স্রোত!
মেসি-এমবাপ্পে সমানে সমান
বিশ্বকাপে গোলের ধারায় দারুণ ছন্দে আছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। সুইডেনের বিপক্ষে ম্যাচে জোড়া গোল করে লিওনেল মেসিকে ছুঁয়ে ফেলেছেন ফরাসি এই স্ট্রাইকার।
বিশ্বকাপের বর্তমান আসরে দুজনেই এখন ৬টি করে গোল নিয়ে যৌথভাবে শীর্ষে রয়েছেন।
এমবাপ্পের এই ফর্ম কেবল চলতি বিশ্বকাপেই সীমাবদ্ধ নয়, বিশ্বমঞ্চে সর্বকালের সেরা গোলদাতার সিংহাসন দখলের লড়াইয়েও তিনি এখন মেসির ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছেন।
গোল গড়ের হিসেবে বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম সেরা অবস্থানে আছেন এমবাপ্পে। এখন পর্যন্ত ১৮ ম্যাচে ১৮ গোল করা এমবাপ্পের গোল গড় ম্যাচপ্রতি ১টি।
২০১৮ সালে নিজের প্রথম বিশ্বকাপেই চার গোল করে বিশ্বজয়ের সাক্ষী হয়েছিলেন এমবাপ্পে। ২০২২ আসরে আট গোল করে জিতেছিলেন গোল্ডেন বুট। আর চলতি বিশ্বকাপে চার ম্যাচে ছয় গোল করে আবারও নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তিনি। এখন দেখার বিষয়, মেসিকে ছাড়িয়ে গিয়ে এমবাপ্পে নতুন কোনো ইতিহাস গড়তে পারেন কি না।
পাকিস্তানকে ঐতিহাসিক টেস্ট হোয়াইটওয়াশের মহাকাব্য লিখে আইসিসি র্যাঙ্কিংয়ে বড় এক লাফ দিয়েছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা রেটিং পয়েন্ট নিয়ে প্রথমবারের মতো সাত নম্বরে উঠে এসেছিল টাইগাররা। তবে নিজেদের ইতিহাসের সেই সর্বোচ্চ ও গৌরবময় অবস্থানটি এক মাসও ধরে রাখতে পারল না নাজমুল হোসেন শান্তর দল। ঘরের মাঠে দুর্বল জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টে অবিশ্বাস্যভাবে ইনিংস ব্যবধানে হেরে র্যাঙ্কিংয়ে এক ধাপ পিছিয়েছে বাংলাদেশ। ক্রিকেটের দীর্ঘতম সংস্করণে বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম। আর ঘরের মাঠে কোনো ম্যাচ না খেলেই ভগ্যের জোরে এক ধাপ এগিয়ে আবারও সাতে উঠে এসেছে পাকিস্তান।
অথচ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টে স্পষ্ট ফেভারিট হিসেবেই মাঠে নেমেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে ম্যাচের প্রথম দিনেই চরম ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে মাত্র ১৪০ রানে অলআউট হয়ে যায় টাইগাররা। আচমকা ব্যাটিং ধসের সেই বড় ক্ষত আর কাটিয়ে উঠতে পারেনি শান্তর দল। পরে নিজেদের প্রথম ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নেমে জিম্বাবুয়ে ৪১০ রানের পাহাড় গড়লে বাংলাদেশের পরাজয় তখনই সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। ২৭০ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নেমে আবারও একই ব্যাটিং ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি ঘটায় বাংলাদেশ। টপঅর্ডার থেকে শুরু করে মিডলঅর্ডার—ব্যাট হাতে কেউই ক্রিজে ন্যূনতম প্রতিরোধ গড়তে পারেননি। উল্টো উইকেট বিলিয়ে দেওয়ার মিছিলে যোগ দিতে ব্যাটারদের মধ্যে যেন এক অলিখিত প্রতিযোগিতা চলছিল। শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় ইনিংসে ১৮৫ রানে সব উইকেট হারিয়ে ইনিংস ও ৮৫ রানের এক চরম লজ্জাজনক পরাজয় বরণ করে বাংলাদেশ।
নিজেদের ২৬ বছরের টেস্ট ইতিহাসে বাংলাদেশ এর আগে ইনিংস ব্যবধানে কম হারেনি। কিন্তু ক্রিকেটের পুঁচকে দল জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ইনিংস ব্যবধানে হারার রেকর্ড এটি মাত্র দ্বিতীয়বার। এর আগে সবশেষ ২০০১ সালে জিম্বাবুয়ের সঙ্গে প্রথম দ্বিপাক্ষিক দেখায় ইনিংস ব্যবধানে হেরেছিল টাইগাররা। দীর্ঘ ২৫ বছর পর আবারও রোডেশিয়ানদের বিপক্ষে এমন শোচনীয় হারের স্বাদ পেল বাংলাদেশ। আর এই নজিরবিহীন পরাজয়ে টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের সুখের দিনটা এক ঝটকায় শেষ হয়ে গেল শান্তদের।
এর আগে গত মে মাসে পাকিস্তানের মাটিতে গিয়ে স্বাগতিকদের ২-০ ব্যবধানে টেস্টে ধবলধোলাই করার এক অবিশ্বাস্য কীর্তি গড়েছিল লাল-সবুজের দল। সেই ঐতিহাসিক সিরিজ জয়ের পুরস্কার হাতেনাতে পেয়ে আইসিসির হালনাগাদ টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ে দুই ধাপ এগিয়ে প্রথমবারের মতো সপ্তম স্থানে উঠেছিল বাংলাদেশ। দীর্ঘদিন ধরে ৯ নম্বরে আটকে থাকা বাংলাদেশ ক্রিকেট দল এক ধাক্কায় পাকিস্তান ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো পরাশক্তিদের পেছনে ফেলে দিয়েছিল।
কিন্তু মাত্র এক মাসের ব্যবধানে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এক ম্যাচ হেরেই ৫ রেটিং পয়েন্ট হারিয়েছে বাংলাদেশ। পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করার পর বাংলাদেশের রেটিং পয়েন্ট দাঁড়িয়েছিল ৭৮। তবে জিম্বাবুয়ের কাছে ম্যাচটি হেরে বর্তমানে বাংলাদেশের ঝুলিতে রয়েছে ৭৩ পয়েন্ট, যার ফলে র্যাঙ্কিংয়ে তাদের অবস্থান এখন অষ্টম। অন্যদিকে, কোনো ম্যাচ না খেলেই লাভবান হওয়া পাকিস্তান ৭৫ রেটিং পয়েন্ট নিয়ে পুনরায় সপ্তম স্থানে আরোহণ করেছে। জিম্বাবুয়ের কাছে এই অপ্রত্যাশিত পরাজয় বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের ধারাবাহিকতা নিয়ে আবারও বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে দিল।
বিশ্বকাপে মাঠের ফুটবলীয় লড়াইয়ের পাশাপাশি মাঠের বাইরের নানা অদ্ভুত ও অতিপ্রাকৃতিক কাণ্ডকীর্তি নিয়েও আলোচনার শেষ নেই। বিশেষ করে, গ্রুপ পর্বে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইনকে ‘কালা জাদু’ করার দাবি জানিয়ে ফুটবল বিশ্বে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিলেন ঘানার বিতর্কিত তান্ত্রিক নানা কোয়াকু বোনসাম। এরপর বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে নিয়ে এক নেতিবাচক ভবিষ্যদ্বাণী করে ফুটবল ভক্তদের মাঝে তুমুল চর্চায় আসেন তিনি। বোনসামের দাবি ছিল, কেপ ভার্দের কাছে হেরে নাকি বিশ্বকাপ থেকে লজ্জাজনক বিদায় নেবে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা। এবার সেই চর্চাকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়ে ফুটবল বিশ্বকে পুরোপুরি কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো এক নতুন ও বিস্ফোরক ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন ঘানার এই স্বঘোষিত আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর দাবি— এবারের ২০২৬ বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফিটি উঠতে যাচ্ছে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এবং পর্তুগালের হাতে। আন্তর্জাতিক বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী গণমাধ্যমে ইতিমধ্যেই এই খবরটি বেশ গুরুত্বের সাথে প্রকাশ করা হয়েছে।
এই ঘানাইয়ান ওঝার মতে, ফুটবল মাঠে আসল লড়াই শুরু হওয়ার অনেক আগেই নাকি আধ্যাত্মিক জগতে এই টুর্নামেন্টের ভাগ্য সম্পূর্ণ নির্ধারিত হয়ে গেছে। বোনসামের জোরালো ভবিষ্যদ্বাণী— এবারের বিশ্বকাপটি কেবলই রোনালদো এবং পর্তুগালের; তারাই চ্যাম্পিয়ন হবে। তিনি দাবি করেন, পর্তুগাল ইতোমধ্যে ‘আধ্যাত্মিক জগতে’ এই টুর্নামেন্টের ট্রফি জিতে নিয়েছে। তাই ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ট্রফি জেতা নিয়ে পুরোপুরি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, কারণ ফুটবল বিধাতা এবার ক্যারিয়ারের শেষলগ্নে এসে তাঁর জন্য ‘সেই কাঙ্ক্ষিত মাহেন্দ্রক্ষণ’ আগে থেকেই নির্ধারণ করে রেখেছেন। বোনসামের এমন অবিশ্বাস্য মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে ইতিমধ্যেই তুমুল আলোড়ন ও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।
এবারের বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইনকে নিয়ে হুলস্থুল খবরের শিরোনাম হয়েছিলেন বোনসাম। ইংল্যান্ড বনাম ঘানা ম্যাচের ঠিক আগে তিনি দাবি করেছিলেন, মাঠের ভেতর কেইনকে থামাতে তিনি এক বিশেষ ‘কালা জাদু’ বা অভিশাপ দিচ্ছেন। ব্রিটিশ গণমাধ্যম ‘ডেইলি স্টার’-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বেশ দম্ভোক্তি করে বলেছিলেন, "আমি অতীতে কী করতে পারি তা বিশ্ববাসীকে দেখিয়েছি, তাই তাকে (কেইন) মাঠে থামাতে আমার কী করতে হবে তা আমার খুব ভালো করেই জানা আছে।"
কাকতালীয়ভাবে, ঘানার বিরুদ্ধে সেই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটিতে শক্তিশালী ইংল্যান্ড গোলশূন্য (০-০) ড্র করে মাঠ ছাড়ে এবং হ্যারি কেইন গোল করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন। এই ম্যাচের পরেই অন্ধবিশ্বাসী ভক্তদের মাঝে বোনসামের অলৌকিক ক্ষমতা নিয়ে নতুন করে গুঞ্জন ও শোরগোল শুরু হয়। তবে ম্যাচ শেষ হওয়ার পর হ্যারি কেইনের প্রতি দেওয়া কথিত সেই ‘অভিশাপ’ দয়া করে তুলে নেওয়ার ঘোষণাও দেন এই ঘানাইয়ান তান্ত্রিক। কেইনের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত কোনো শত্রুতা নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘হ্যারি কেইন আমার শত্রু নন। আমার খুব শীঘ্রই একটি সন্তান হতে যাচ্ছে, যার নাম আমি এই ইংলিশ অধিনায়কের নামানুসারে ‘হ্যারি কেইন’ রাখব।" এমনকি তিনি কেইনকে তাঁর আধ্যাত্মিক ‘বন্ধন’ থেকে চিরতরে মুক্ত করে দেওয়ার কথা জানান, যাতে পরবর্তী ম্যাচগুলোতে কেইন স্বাভাবিকভাবে গোল করতে পারেন!
কে এই কোয়াকু বোনসাম?
ঘানার রাজধানী আক্রায় তিনটি নিজস্ব উপাসনালয় বা আধ্যাত্মিক আস্তানা পরিচালনা করা নানা কোয়াকু বোনসাম দেশটির অন্যতম শীর্ষ বিতর্কিত ও আলোচিত ব্যক্তিত্ব। নিজেকে আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী পুরোহিত ও কবিরাজ দাবি করা বোনসাম মূলত সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন আধ্যাত্মিক পরামর্শ ও ভেষজ চিকিৎসা দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন।
ফুটবল ভক্তদের কাছে অবশ্য তাঁর এই বিচিত্র কর্মকাণ্ড নতুন কিছু নয়। এর আগে ১২ বছর আগে, ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপেও তিনি ফুটবল বিশ্বে বড় ধরনের হইচই ফেলে দিয়েছিলেন। সেবার গ্রুপ পর্বে ঘানার মুখোমুখি হওয়ার আগে পর্তুগিজ যুবরাজ ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো যে মারাত্মক ইনজুরিতে পড়েছিলেন, তার পেছনে নিজের আধ্যাত্মিক ক্ষমতা ও কালো জাদুর হাত রয়েছে বলে জোর দাবি করেছিলেন এই বোনসাম।
বিচিত্র বিষয় হলো, ১২ বছর আগে যে বোনসাম রোনালদোকে ইনজুরিতে ফেলে বিশ্বকাপে আটকে দিতে চেয়েছিলেন, সেই বোনসামই এবার ২০২৬ বিশ্বকাপে এসে সুর বদলে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর হাতেই দেখছেন বিশ্বজয়ের ট্রফি। তান্ত্রিকের এই ভবিষ্যদ্বাণী শেষ পর্যন্ত মাঠের ফুটবলে কতটা সত্যি প্রমাণিত হয়, তা দেখতে মুখিয়ে আছেন ফুটবল বিশ্বের কোটি কোটি সিআরসেভেন সমর্থক।
ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ফুটবল বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি ও পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ইউরোপের উদীয়মান শক্তি নরওয়ে। তবে এই হাইভোল্টেজ মহালড়াইয়ের আগে মনস্তাত্ত্বিক চাপ এড়াতে ব্রাজিলকেই পরিষ্কার ফেভারিট মানছেন নরওয়ের পোস্টার বয় ও তারকা স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড। আগামী ৬ জুলাইয়ের নকআউট ম্যাচে সেলেসাওদের ছিটকে দেওয়া নিয়ে এই মুহূর্তে খুব একটা বড় মুখ করে কথা বলতে বা আশাবাদী হতে রাজি নন তিনি।
অথচ দুই দলের ফুটবল ইতিহাস ও পরিসংখ্যান কিন্তু পুরোপুরি কথা বলছে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ নরওয়ের পক্ষেই। অতীতে দুই দলের মোট চারবারের আন্তর্জাতিক দেখায় পরাক্রমশালী ব্রাজিল কখনোই নরওয়েকে হারাতে পারেনি। তবে অতীতের সেই অপ্রতিরোধ্য ধারা এবারও বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে বজায় থাকবে কি না, সে বিষয়ে একদমই আত্মবিশ্বাসী নন হালান্ড। বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডের (রাউন্ড অব ৩২) ম্যাচে আইভরি কোস্টকে ২-১ ব্যবধানে বিদায় করে শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করার পর আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ব্রাজিলের বিপক্ষে নরওয়ের জেতার সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে ম্যানচেস্টার সিটির এই বিধ্বংসী স্ট্রাইকার খুব সংক্ষিপ্ত ও সোজাসুজি উত্তর দেন— ‘সম্ভাবনা খুবই কম।’
এর আগে শেষ ষোলোর মঞ্চে সেলেসাওদের প্রতিপক্ষ হিসেবে পাওয়ার পর নিজের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে হালান্ড বলেছিলেন, ‘শেষ ষোলোতে আমাদের ব্রাজিলের বিপক্ষে খেলতে হবে, এটাই ফুটবলীয় বাস্তবতা।’
আইভরি কোস্টকে হারিয়ে শেষ ষোলোর ঐতিহাসিক টিকিট নিশ্চিত করার পর টেক্সাসের ডালাস স্টেডিয়ামে এক অভূতপূর্ব ও জাদুকরী উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন নরওয়ের ফুটবল সমর্থকরা। ম্যাচ শেষ হওয়ার পর মাঠের ভেতর খেলোয়াড়রাও গ্যালারির দর্শকদের সাথে একাত্ম হয়ে নিজেদের বিশ্ববিখ্যাত ও ঐতিহ্যবাহী ‘ভাইকিং রোয়িং’ উদ্যাপনে মেতে ওঠেন। মাঠে সবাই গোল হয়ে বসে দলের অধিনায়ক ও আর্সেনাল মিডফিল্ডার মার্টিন ওডেগার্ডের ড্রামের তালের সাথে তাল মিলিয়ে বৈঠা বাইবার প্রতীকী ভঙ্গিতে এই অবিস্মরণীয় জয় উদ্যাপন করেন।
দীর্ঘ ২৮ বছর পর দেশের ফুটবলে এমন মহোৎসব ও নিজ দেশের মানুষের এই বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসের কথা তুলে ধরে হালান্ড বলেন, ‘নরওয়ের সাধারণ মানুষ এখন ফুটবল নিয়ে দারুণ উচ্ছ্বসিত। জাতীয় দলকে ঘিরে বর্তমানে পুরো দেশের মানুষের মাঝে এই যে অভূতপূর্ব ঐক্য তৈরি হয়েছে, তা মাঠের ভেতর আমাদের পারফরম্যান্সেও প্রচণ্ড ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।’
তবে জাতীয় দলের এই জোয়ারের মাঝেও সামনে যে এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা অপেক্ষা করছে, সতীর্থদের সেটিও শক্তভাবে মনে করিয়ে দিয়েছেন এই গোলমেশিন। তিনি বলছিলেন, ‘আমরা এখন বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছি। টুর্নামেন্টের এই পর্যায়ে এসে প্রতিটি দলই চরম শক্তিশালী এবং এখান থেকে সামনে এগিয়ে যাওয়া মোটেও সহজ হবে না। ব্রাজিলের বিপক্ষে আমরা শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারব কি না, সেটাও আমি নিশ্চিত জানি না। তবে আমরা ম্যাচটির জন্য খুব ভালো প্রস্তুতি নিয়েছি এবং সেই মানসিক প্রস্তুতি ধরে রাখার চেষ্টা করছি।’
বর্তমান নরওয়েজিয়ান ফুটবলের সবচেয়ে বড় ও বৈশ্বিক বিজ্ঞাপন আর্লিং হালান্ড। চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপেও নিজের চেনা ছন্দে থেকে ইতিমধ্যে পাঁচটি চোখ ধাঁধানো গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে কিলিয়ান এমবাপে ও লিওনেল মেসির ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছেন তিনি। মূলত ইউরোপিয়ান অঞ্চলের বাছাইপর্বে তাঁর করা একের পর এক অবিশ্বাস্য গোলের ওপর ভর করেই দীর্ঘ ২৮ বছরের খরা কাটিয়ে নরওয়ে আবার বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। এর আগে সর্বশেষ ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে খেলেছিল নরওয়ে, যেখানে তারা গ্রুপ পর্বের ম্যাচে এই ব্রাজিলকেই ২-১ গোলে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছিল। দীর্ঘ দুই দশক পর এবার নকআউটের ভিন্ন মঞ্চে সেই ঐতিহাসিক স্মৃতির পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারেন কি না হালান্ড, তা দেখতে মুখিয়ে আছে পুরো ফুটবল বিশ্ব।
জাপানের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য এক জয় তুলে নিয়ে বিশ্বকাপের শেষ ষোলো নিশ্চিত করলেও, নকআউট পর্বের মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে বড় ধরনের এক দুঃসংবাদ পেল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ও ইনফর্ম মিডফিল্ডার লুকাস পাকেতাকে চোটের কারণে হারাতে হচ্ছে সেলেসাওদের। জাপানের বিপক্ষে ম্যাচের হাফটাইমে (প্রথমার্ধ শেষে) খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে মাঠ ছাড়া এই তারকার মঙ্গলবার একটি জরুরি মেডিকেল স্ক্যান করানো হয়। সেই ইমেজিং পরীক্ষায় তাঁর বাঁ ঊরুর পেছনের পেশীতে গুরুতর চোট নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এই চোটের ফলে নিশ্চিতভাবেই শেষ ষোলোর নকআউট ম্যাচে মাঠে নামতে পারবেন না পাকেতা। তিনি ঠিক কতদিনের জন্য মাঠের বাইরে বা সাইডলাইনে ছিটকে গেলেন, সে বিষয়ে এখনই চূড়ান্ত কোনো সময়সীমা নিশ্চিত করতে পারেনি ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন । তবে ব্রাজিলিয়ান জাতীয় দলের দক্ষ মেডিক্যাল স্টাফদের বিশেষ তত্ত্বাবধানে তাঁকে দ্রুত সুস্থ করে টুর্নামেন্টের পরের ম্যাচগুলোতে মাঠে ফেরানোর লক্ষ্যে একটি নিবিড় পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।
ব্রাজিলিয়ান ফেডারেশন তাদের এক অফিশিয়াল বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘মঙ্গলবার আমাদের দলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় লুকাস পাকেতার একটি জরুরি ইমেজিং পরীক্ষা করা হয়েছে, যেখানে তাঁর বাম ঊরুর পেছনের অংশের মাংসপেশীতে চোট ধরা পড়েছে। তিনি বর্তমানে ব্রাজিল জাতীয় দলের অভিজ্ঞ চিকিৎসাকর্মীদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে একটি নিবিড় ও আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির অধীনে থাকবেন। আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো তাঁকে যত দ্রুত সম্ভব সুস্থ করে তুলে পুনরায় মাঠের খেলায় ফিরিয়ে আনা।’
জাপান ম্যাচের প্রথমার্ধের খেলা শেষ হওয়ার পর পাকেতাকে তীব্র ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে এবং খুঁড়িয়ে মাঠ ছাড়তে দেখা গিয়েছিল। ওই কঠিন মুহূর্তে মাঠের মধ্যেই দলের দুই তারকা নেইমার জুনিয়র এবং তরুণ এন্দ্রিক তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে আগলে রেখেছিলেন। পরে দ্বিতীয়োর্ধের শুরুতে পাকেতার বদলি হিসেবেই মাঠে নামানো হয়েছিল এন্দ্রিককে, যা ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। চলতি বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ব্রাজিলের খেলা প্রতিটি ম্যাচেই প্রধান কোচ কার্লো আনচেলত্তির শুরুর একাদশের নিয়মিত ও অপরিহার্য অংশ ছিলেন এই মিডফিল্ডার। তবে দুর্ভাগ্যবশত এবার ইনজুরির লম্বা তালিকায় দলের আরেক তারকা রাফিনহার পাশে নাম লেখাতে হলো পাকেতাকেও।
এদিকে গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে ব্রাজিল শেষ ষোলো নিশ্চিত করার পর এখন তাদের পরবর্তী প্রতিপক্ষ কে হচ্ছে, তা জানার অপেক্ষায় রয়েছে পুরো দল। ডালাস স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নরওয়ে ও আইভরি কোস্টের মধ্যকার ম্যাচের জয়ী দলের বিপক্ষেই আগামী ৬ জুলাই নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার চূড়ান্ত লড়াইয়ে নামবে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। তবে মাঝমাঠের এই প্রধান ভরসাকে হারিয়ে আনচেলত্তির ট্যাকটিক্যাল ছকে যে বড় ধরনের ধাক্কা লাগলো, তা বলাই বাহুল্য।
দুই দেশের রাজনৈতিক ও ক্রিকেটীয় টানাপোড়েনের কারণে ২০২৫ সালে ভারত জাতীয় ক্রিকেট দলের বহুল প্রতীক্ষিত বাংলাদেশ সফরটি স্থগিত হয়ে গিয়েছিল। তবে ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য বড় সুখবর হলো, সেই জটিলতার মেঘ কেটে এখন নতুন আশার আলো দেখা যাচ্ছে। স্থগিত হয়ে যাওয়া এই দ্বিপাক্ষিক সিরিজটি চলতি ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসেই বাংলাদেশের মাটিতে আয়োজনের জোর প্রস্তুতি চলছে। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ভারত সিরিজসহ আগামী দুই বছরের হোম সিরিজের মিডিয়া ও সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রির জন্য আনুষ্ঠানিক দরপত্র আহ্বান করেছে।
আন্তর্জাতিক ক্রীড়াভিত্তিক নামী ওয়েবসাইট ‘ক্রিকবাজ’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, এ বছরের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে এসে স্বাগতিকদের বিপক্ষে তিনটি ওয়ানডে ও তিনটি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলবে মেন ইন ব্লু-রা। বিসিবির পক্ষ থেকে এই দরপত্র ডাকার পর চলচ্চিত্র ও ক্রিকেট বিশ্লেষকদের ধারণা, মাঠের ভেতরের ও বাইরের সব জট কেটে অবশেষে আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে দুই প্রতিবেশী দেশের এই রোমাঞ্চকর লড়াই।
বিসিবির এই বাণিজ্যিক পদক্ষেপকে একটি ‘চমকপ্রদ ও ইতিবাচক পদক্ষেপ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে ক্রিকবাজ। তারা জানিয়েছে, ‘ভারতীয় ও বৈশ্বিক সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পাঠানো বিসিবির এক প্রাতিষ্ঠানিক নথিতে ২০২৬ ও ২০২৭ সালের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক হোম সিরিজের জন্য আগ্রহপত্র ও আর্থিক প্রস্তাব আহ্বান করা হয়েছে। যেখানে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর উইন্ডোতে ভারতের বাংলাদেশ সফরের কথা ও ম্যাচের সংখ্যা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।’
বিসিবির দরপত্রের নথিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এই দ্বিপাক্ষিক আন্তর্জাতিক হোম সিরিজগুলোর বিশ্বব্যাপী মিডিয়া স্বত্ব (টিভি ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম) অধিগ্রহণের জন্য স্বনামধন্য টেলিভিশন সম্প্রচারক, ডিজিটাল ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, মিডিয়া মার্কেটিং এজেন্সি কিংবা কনসোর্টিয়ামের নিকট থেকে আগ্রহপত্র আহ্বান করছে। বিসিবির এই মেগা প্যাকেজে কেবল ভারত সিরিজই নয়, বরং আগামী দুই বছরের ঠাসা সূচির আরও কয়েকটি বড় সিরিজের নাম রয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— ওয়েস্ট ইন্ডিজের বাংলাদেশ সফর (২টি টেস্ট ম্যাচ), ইংল্যান্ডের বাংলাদেশ সফর (২টি টেস্ট ম্যাচ) এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হোম সিরিজ (৫টি ওয়ানডে ম্যাচ)।
ঘোষণা অনুযায়ী, ২ জুলাই (২০২৬) থেকে মিরপুর বিসিবি কার্যালয় থেকে আগ্রহপত্রের বিস্তারিত সব শর্ত ও আইনি নথি সংগ্রহ করতে পারবেন আগ্রহী ক্রেতারা। এরপর সব যাচাই-বাছাই শেষে আগামী ২২ জুলাইয়ের মধ্যে তাদের চূড়ান্ত আর্থিক প্রস্তাব ও দরপত্র বিসিবির নিকট আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দিতে হবে। সব প্রক্রিয়া সময়মতো শেষ হলে দীর্ঘদিন পর দেশের মাটিতে ভারত বনাম বাংলাদেশের ক্রিকেটীয় মহারণ দেখার স্বপ্ন পূরণ হবে দর্শকদের।
প্রবল বৃষ্টি আর বজ্রঝড়ের কারণে খেলা এক ঘণ্টা পিছিয়ে গেলেও মেক্সিকান সমর্থকদের উন্মাদনায় তার কোনো ছাপ পড়েনি। এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামের গগনবিদারি গর্জনে ভর করেই ফুটবলের নতুন এক ইতিহাস লিখল বিশ্বকাপের অন্যতম সহ-আয়োজক মেক্সিকো। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২-এর লড়াইয়ে ইকুয়েডরকে ২-০ গোলে অনায়াস জয় দিয়ে দীর্ঘ ৪০ বছরের এক আক্ষেপের ইতি টানল তারা। এর আগে সর্বশেষ ১৯৮৬ বিশ্বকাপে নকআউট পর্বের ম্যাচ জেতার স্বাদ পেয়েছিল মেক্সিকানরা।
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চললেও ইকুয়েডর ১৮ মিনিটের মাথায় প্রথম বড় সুযোগটি পায়। তবে জন ইয়েবোয়ার জোরালো শট মেক্সিকোর পোস্টে লেগে ফিরে এলে ভাগ্য সহায় হয় স্বাগতিকদের। এই বিপদ কাটিয়ে উঠতে খুব বেশি সময় নেয়নি মেক্সিকো। ম্যাচের ২২ মিনিটে এক দুর্দান্ত পাল্টা আক্রমণে ইকুয়েডরের রক্ষণভাগ ভেঙে বল জালে জড়ান হুলিয়ান কিনিয়োনেস, যার ফলে মেক্সিকো ১-০ গোলে এগিয়ে যায়।
প্রথম গোলের রেশ কাটতে না কাটতেই ৩১ মিনিটে মেক্সিকোর অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার রাউল হিমিনেজ ইকুয়েডরের কফিনে দ্বিতীয় পেরেকটি ঠুকে দেন। ইকুয়েডরের রক্ষণভাগের ভুলের সুযোগ নিয়ে কিনিয়োনেসের সঙ্গে ওয়ান-টু পাসের সুবাদে বক্সের বাইরে থেকে হিমিনেজের ডান পায়ের দর্শনীয় এক জোরালো শট জালের উপরিভাগে আশ্রয় নেয়। ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার পর মেক্সিকো আরও শক্তিশালী অবস্থানে চলে যায়।
দ্বিতীয়ার্ধে ইকুয়েডর গোল পরিশোধে মরিয়া হয়ে আক্রমণ চালালেও মেক্সিকোর জমাট রক্ষণের ফাটল ধরতে পারেনি। খেলার অন্তিম মুহূর্তে ইকুয়েডরের জন্য পরিস্থিতি আরও বিষাদময় হয়ে ওঠে। অতিরিক্ত সময়ের শেষ দিকে মেক্সিকান খেলোয়াড়ের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে এবং আপত্তিকর মন্তব্য করায় সরাসরি লাল কার্ড দেখেন ইকুয়েডরের ডিফেন্ডার পিয়েরো হিনকাপিয়ে। ১০ জনের দলে পরিণত হয়ে ইকুয়েডরের ম্যাচ জয়ের ক্ষীণ আশাটুকুও শেষ হয়ে যায়। মেক্সিকোর এই ঐতিহাসিক জয়ের মাধ্যমে পুরো স্টেডিয়ামে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায় এবং তারা কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট পেতে পরবর্তী বড় পরীক্ষার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে শুরু করেছে। মেক্সিকোর এই দাপুটে পারফরম্যান্স বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক হিসেবে তাদের শক্তি ও ঐতিহ্যেরই প্রতিফলন।
২০২৬ বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২-এর হাইভোল্টেজ ম্যাচে সুইডেনকে ৩-০ গোলের বড় ব্যবধানে পরাজিত করে শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করেছে শক্তিশালী ফ্রান্স। দলের সেরা তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পের জোড়া গোল এবং ব্র্যাডলি বারকোলার এক গোলের সুবাদে দাপুটে এই জয় পায় ফরাসিরা। মাঠের লড়াইয়ে সুইডেন শুরু থেকে প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও ফ্রান্সের গতিময় আক্রমণের সামনে শেষ পর্যন্ত তারা অসহায় হয়ে পড়ে। কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে এখন ফ্রান্সের মুখোমুখি হবে প্যারাগুয়ে, যারা আগের ম্যাচে জার্মানিকে হারিয়ে চমক দেখিয়েছে।
ম্যাচের শুরু থেকেই সুইডেনের রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করে ফ্রান্স। ১৯তম মিনিটে কিলিয়ান এমবাপ্পে জালে বল জড়ালেও অফসাইডের কারণে সেই গোলটি বাতিল হয়ে যায়। প্রথমার্ধের দীর্ঘ সময় সুইডিশ গোলরক্ষক জেটারস্ট্রোমের দৃঢ়তায় জাল অক্ষত থাকলেও বিরতির ঠিক আগে আর শেষ রক্ষা হয়নি। প্রথমার্ধের একেবারে শেষ মুহূর্তে ডি-বক্সে ঢুকে একক নৈপুণ্যে দর্শনীয় এক কার্ভ শটে ফ্রান্সকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন এমবাপ্পে। এই গোলের লিড নিয়ে বিরতিতে যায় দিদিয়ের দেশমের শিষ্যরা।
দ্বিতীয়ার্ধে ফিরে আক্রমণের ধার আরও বাড়িয়ে দেয় ফ্রান্স। ৫৩তম মিনিটে ব্র্যাডলি বারকোলা দারুণ এক নিয়ন্ত্রিত শটে ব্যবধান ২-০ করেন। একের পর এক আক্রমণে কোণঠাসা সুইডেন ম্যাচে ফেরার সুযোগই পায়নি। এরপর ৭৪তম মিনিটে নিজের দ্বিতীয় এবং দলের তৃতীয় গোলটি করে সুইডেনের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন এমবাপ্পে। এই জয়ের ফলে ৩-০ গোলের দাপুটে ব্যবধানে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে বর্তমান রানার্সআপরা।
ফ্রান্সের এই জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মাইগনান, সালিবা ও চুয়ামেনিরা। অন্যদিকে সুইডেনের হয়ে ইসাক ও গোকেরেসরা চেষ্টা করলেও ফরাসি রক্ষণভাগে ফাটল ধরাতে ব্যর্থ হন। ফ্রান্সের এই জয়ে এমবাপ্পের বিধ্বংসী ফর্ম প্যারাগুয়ের বিপক্ষে পরবর্তী ম্যাচের জন্য বড় বার্তা দিয়ে রাখল।
কেপ ভার্দে বিপক্ষে হেরে নকআউট পর্ব থেকে বিদায় নেবে বলে জানিয়েছেন ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইনের ওপর ‘অভিশাপ’ দিয়ে ‘ভাইরাল’ হওয়া ঘানার তান্ত্রিক নানা কওয়াকু বোনসাম।
শনিবার (০৪ জুলাই) মায়ামিতে অনুষ্ঠিত হবে আর্জেন্টিনা–কেপ ভার্দে রাউন্ড অব থার্টি টুর ম্যাচ। গ্রুপ পর্বের সব ম্যাচে সহজে জেতা আর্জেন্টিনা এ ম্যাচে হারবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন সেই তান্ত্রিক।
তিনি বলেছেন এভাবে, ‘শেষ ৩২-এর ম্যাচে কেপ ভার্দে আর্জেন্টিনাকে বিদায় করবে।’ এর আগে হ্যারি কেইনকে নিয়ে নানা কওয়াকু বোনসাম বলেছিলেন, আমি কেইনের ওপর কাজ করছি। আমি তার বড় কোনো ইনজুরি চাই না। তবে আমার দেশের বিরুদ্ধে তাকে আটকে রাখার জন্য যতটুকু দরকার, ততটুকুই করব। ঘানাকে জেতাতে আমি আমার কাজ করব।
ম্যাচ শেষে সেই তান্ত্রিক দাবি করেন, আমিই বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী তান্ত্রিক। এবার আমি হ্যারি কেইনকে মুক্ত করে দেবো, যাতে সে পরের ম্যাচেই গোল করতে পারে। কেইন আমার শত্রু নয়, শিগগিরই আমার এক সন্তানের নাম আমি হ্যারি রাখব।
তার সেই কথা মিলেও যায়। পরের ম্যাচে পানামার বিপক্ষে ইংল্যান্ডের ২-০ ব্যবধানের জয়ে ঠিকই গোল পান কেইন। এরপর থেকে কওয়াকু বোনসামকে নিয়ে পুরো বিশ্বব্যাপী আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। আর্জেন্টিনাকে নিয়ে করা মন্তব্য কতটা সত্যি হয়, দেখার অপেক্ষায় ফুটবলপ্রেমীরা।
নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ডকে থামানো যেকোনো রক্ষণভাগের জন্যই এক বিরাট পরীক্ষা। তবে নকআউট পর্বের মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে এই গোলমেশিনকে আটকে দিয়ে বড়সড় একটা চমক দেখাতে চায় আইভরিকোস্ট। আফ্রিকান পরাশক্তিরা ভালো করেই জানে, হালান্ডকে একটু জায়গা দিলেই ম্যাচের চিত্র বদলে যেতে পারে। তাই এই নরওয়েজিয়ান ফরোয়ার্ডের ওপর কড়া পাহারা বসাতে বিশেষ রক্ষণাত্মক ছক কষছে আইভরিকোস্টের কোচ। হালান্ডকে নিষ্ক্রিয় রেখে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়াই আইভরি কোস্টের মূল লক্ষ্য।
ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর লড়াইয়ে ডালাসে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে আইভরিকোস্ট ও নরওয়ে। এটি কেবল নকআউট পর্বের একটি সাধারণ ম্যাচ নয়, বরং দুই মহাদেশের দুই ভিন্ন ঘরানার ফুটবলের এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। একদিকে থাকবে আফ্রিকার গতি, আবেগ ও নতুন স্বপ্ন; অন্যদিকে উত্তর ইউরোপের দীর্ঘ অপেক্ষা, ধৈর্য এবং নতুন করে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করার শপথ। আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে এর আগে কখনো এই দুই দলের দেখা হয়নি, তাই কোনো অতীত বা হিসাব-নিকাশ ছাড়াই ডালাসের মাঠে সরাসরি নকআউটের এই রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে নামবে দুই দল।
আইভরিকোস্ট এবার বিশ্বকাপে এসেছে এমন এক ইতিহাস বদলানোর জেদ নিয়ে, যেখানে বহুবার তারা বড় আসরে এসেও দরজার সামনে থেকে ফিরে গেছে। ২০০৬, ২০১০ ও ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে দিদিয়ের দ্রগবার মতো লিজেন্ডারি ফুটবলারদের সোনালি প্রজন্ম যা করতে পারেনি, এবার ঠিক সেই অসাধ্য সাধন করে প্রথমবারের মতো নকআউটের টিকিট কেটেছে তাদের নতুন প্রজন্ম। গ্রুপ পর্বে ইকুয়েডরকে ১–০ গোলে হারিয়ে শুরু করার পর জার্মানির কাছে ২–১ গোলে হারলেও, শেষ ম্যাচে কুরাসাওকে ২–০ গোলে হারিয়ে ইতিহাস গড়ে তারা। নিকোলাস পেপের জোড়া গোল, আমাদ দিয়ালোর গতি আর আঞ্জ–ইওয়ান বনির বুদ্ধিদীপ্ত ফুটবলে আইভরিকোস্ট এখন কোনো একক তারকার ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং এক দুর্দান্ত দলগত শক্তির নাম।
অন্যদিকে, ১৯৯৮ সালের পর দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে বড় টুর্নামেন্টের বাইরে থাকা নরওয়ে এবার বিশ্বমঞ্চে ফিরেছে নতুন মুখ আর পুরোনো ক্ষুধা নিয়ে। গ্রুপ পর্বে তাদের যাত্রা ছিল ভয়ংকর। ইরাককে ৪–১ ও সেনেগালকে ৩–২ গোলে হারিয়ে আগেই নকআউট নিশ্চিত করায়, শেষ ম্যাচে ফ্রান্সের বিপক্ষে মূল একাদশের অনেককে বিশ্রাম দিয়ে ১-৪ ব্যবধানে হারে তারা। টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত ৮টি গোল করা নরওয়ের আক্রমণভাগ যতটা ভয়ংকর, ৭ গোল হজম করা রক্ষণভাগ ঠিক ততটাই নড়বড়ে। আর নরওয়ের রক্ষণের এই দুর্বলতাই আইভরিকোস্টের সবচেয়ে বড় আশার জায়গা।
তবে নরওয়ের তুরুপের তাস তাদের স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড, যিনি একাই পুরো ম্যাচের চিত্র বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। প্রথম দুই ম্যাচেই চার গোল করে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা হালান্ডকে শেষ ম্যাচে বিশ্রাম দেওয়া হয়েছিল, তাই ডালাসে তিনি ফিরছেন পুরোপুরি সতেজ হয়ে। অন্যদিকে, আইভরিকোস্টের রক্ষণভাগও এবার বেশ পরিণত; তিন ম্যাচে তারা হজম করেছে মাত্র দুই গোল। জার্মানির মতো পরাশক্তিও তাদের রক্ষণ সহজে ভাঙতে পারেনি। মঙ্গলবারের এই মহারণে আইভরিকোস্টের রক্ষণের মূল ভরসা ওসমান দিয়োমান্দের সামনে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে হালান্ডকে থামানো। কার মুখে ফুটবে শেষ হাসির রেখা, তা দেখতেই এখন মুখিয়ে আছে ফুটবল বিশ্ব।
বিশ্বকাপে মাত্র দুটি ম্যাচ খেলেই বিশ্বমঞ্চ কাঁপিয়ে ৪টি গোল করেছেন হালান্ড। দীর্ঘ প্রায় তিন দশক (২৮ বছর) পর বিশ্বকাপে ফিরে প্রথম ম্যাচেই ইরাকের বিপক্ষে জোড়া গোল এবং পরের ম্যাচে সেনেগালের বিপক্ষেও জোড়া গোল করে গ্রুপ পর্ব শেষ হওয়ার আগেই নরওয়ের শেষ ১৬-র টিকিট নিশ্চিত করেন তিনি। নকআউট পর্বের মহালড়াইয়ের আগে দলের প্রধান তারকাকে সতেজ ও চোটমুক্ত রাখতে ফ্রান্সের বিপক্ষে শেষ গ্রুপ ম্যাচে তাকেসহ প্রথম একাদশের প্রায় ১০ জন নিয়মিত খেলোয়াড়কে পুরোপুরি বিশ্রামে রেখেছিলেন নরওয়ের মাস্টারমাইন্ড কোচ স্টালে সোলবাক্কেন। সোলবাক্কেন জানান, সেনেগালের বিপক্ষে কঠিন লড়াইয়ের পর মাঝমাঠ ও রক্ষণের ক্লান্তি দূর করতেই এই সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
অন্যদিকে, আইভরিকোস্টের প্রধান কোচ এমের্স ফায়ে খুব ভালো করেই জানেন যে ডালাসের মাঠে তাঁদের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হবে হালান্ডকে বলের জোগান থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা। নরওয়েজিয়ান এই স্ট্রাইকারকে বোতলবন্দি করার গুরুদায়িত্ব থাকবে আইভরি কোস্টের ২২ বছর বয়সী উদীয়মান ডিফেন্ডার ওসমান দিয়োমান্দের কাঁধে, যাকে দলে ভেড়াতে ইতিমধ্যেই ইউরোপের নামী-দামি ক্লাবগুলো উঠেপড়ে লেগেছে।
তবে শুধু রক্ষণেই ডিফেনসিভ ব্লক তৈরি করে বসে থাকতে রাজি নন কোচ ফায়ে। প্রতিপক্ষ নরওয়েকে শুরু থেকেই চাপে রাখতে তিনি আক্রমণভাগে তার প্রতিভাবান ফুটবলারদের পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে চান। আইভরি কোস্টের আক্রমণভাগে রয়েছেন দুর্দান্ত ফর্মে থাকা অভিজ্ঞ নিকোলা পেপে, যিনি কুরাসাওয়ের বিপক্ষে গত ম্যাচে জোড়া গোল করে দলকে জেতান। এছাড়াও তরুণ ইয়ান দিয়োমান্দে এবং ফ্রান্সের নাগরিকত্ব ছেড়ে আইভরিকোস্টের জার্সিতে খেলতে আসা আঁজে-ইওয়ান বনি নরওয়ে শিবিরের জন্য বড় হুমকি হতে পারেন।
দলগত শক্তি নিয়ে আত্মবিশ্বাসী কোচ এমের্স ফায়ে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমাদের স্কোয়াডে গোল করার দায়িত্ব কোনো একক ফুটবলারের কাঁধে অর্পিত নয়। দলে প্রায় ৯ জন ভিন্ন ফরোয়ার্ড রয়েছেন যারা যেকোনো মুহূর্তে গোল করতে পারেন। প্রতিপক্ষ কখনোই বুঝতে পারে না যে আক্রমণটা ঠিক কোন দিক থেকে আসবে। এমনকি আমাদের বদলি বেঞ্চের খেলোয়াড়রাও ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।’
ডালাসের তীব্র গরম নিয়ে নরওয়ে শিবিরে কিছুটা উদ্বেগ থাকলেও দিনের ম্যাচটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হওয়ায় স্বস্তিতে রয়েছে দুই দলই। একদিকে সতেজ হয়ে ফেরা হলান্ডের বিধ্বংসী গোল করার ক্ষুধা, অন্যদিকে আইভরি কোস্টের জমাট ডিফেন্স ও ভারসাম্যপূর্ণ আক্রমণ—সব মিলিয়ে বিশ্বমঞ্চে শেষ আটের টিকিট কাটার এই লড়াই একটি ধ্রুপদী ফুটবল ম্যাচেরই আভাস দিচ্ছে।