ক্রিকেটীয় মহাযুদ্ধের আরেকটা দিন দেখতে যাচ্ছে বিশ্ব। বাইশ গজে হবে ধুন্ধুমার লড়াই; আর সেই আনন্দে মেতে উঠবে গ্যালারি কিংবা টেলিভিশন সেটের সামনে থাকা ক্রিকেটপ্রেমীরা। ক্রিকেটীয় মহাযুদ্ধের বাইরেও আছে এ ম্যাচের তাৎপর্য। কারণ এ ম্যাচটা যে সমীকরণ মেলানোর ম্যাচ। এমন টানটান উত্তেজনার ম্যাচে মুখোমুখি হচ্ছে বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম দুই শক্তিশালী দেশ। দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মাঠে নামবে নিউজিল্যান্ড। ত্রিনিদাদের ব্রায়ান লারা স্টেডিয়ামে ম্যাচটি শুরু হবে বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে ৬টায়। খেলার চলতি ধারাবিবরণী সরাসরি প্রচার করবে বাংলাদেশ বেতার।
শক্তির বিচারে কেউ কাউকে নাহি ছাড়ি, সমানে সমান অবস্থা। তবে ক্যারিবীয়দের ঘরের মাঠে খেলা হওয়ায় দর্শক সমর্থনে এগিয়ে থাকবে তারাই। পাশাপাশি চেনা কন্ডিশনও একটা বাড়তি সুবিধা দেবে রোভম্যান পাওয়েলের দলকে।
এবারের বিশ্বকাপে ইতোমধ্যেই দুটি ম্যাচ খেলেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। প্রথম ম্যাচে পাপুয়া নিউগিনিকে বড় ব্যবধানে হারানোর পর উগান্ডাকে অলআউট করেছিল মাত্র ৩৯ রানে। তাই প্রথম দুই ম্যাচ জিতে বেশ আত্মবিশ্বাসী ক্যারিবীয়রা। শুধু ছোট দলকেই নয়, বিশ্বকাপ শুরুর আগে পূর্ণ শক্তির দল ছাড়াই হোয়াইটওয়াশ করেছিল দক্ষিণ আফ্রিকাকে। জয়ের ধারায় থাকা ওয়েস্ট ইন্ডিজ টুর্নামেন্টের তৃতীয় জয় তুলে নিয়ে সেরা আট নিশ্চিত করতে চাইবে।
তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপরীত চিত্র নিউজিল্যান্ডের। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই তারা বড় ব্যবধানে হেরে বসেছে আফগানিস্তানের বিপক্ষে। রশিদ-নবীর স্পিন বিষে নীল হওয়ার আগে ফারুকীর পেসে পরাস্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত ৮৪ রানের বড় ব্যবধানে হেরেছিল কিউইরা। সেই হারের পর শঙ্কা তৈরি হয়েছে তাদের দ্বিতীয় রাউন্ডে খেলা নিয়েই।
বরাবরই বলা হচ্ছে ক্যারিবীয় দ্বীপ অঞ্চল স্পিনারদের জন্য সহায়ক হবে বেশ। আর নিউজিল্যান্ডের ব্যাটারদের মাথাব্যথার কারণও ওই একটাই। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচের আগে কিউই দলপতি তার দলকেও সে ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন বারবার। কিন্তু নিউজল্যান্ড পা হড়কিয়েছে ওই এক জায়গায়ই।
ব্যাটিংয়ে দুই দলের অবস্থাই অনেকটা কাছাকাছি। ব্র্যান্ডন কিং, নিকোলাস পুরান, জনসন চার্লস, শেরফান রাদারফোর্ড, রোভম্যান পাওয়েল, আন্দ্রে রাসেলদের নিয়ে গড়া ব্যাটিং লাইনআপ বেশ ধ্বংসাত্মক। নিজেদের দিনে যেকোনো কিছু করে দিতে পারেন তারা। তবে ফিন অ্যালেন, ডেভন কনওয়ে, কেন উইলিয়ামসন, ড্যারিল মিচেল, গ্ল্যান ফিলিপস, মার্ক চ্যাপম্যানদের নিয়ে গড়া ব্যাটিং লাইনআপকেও পিছিয়ে রাখার কোনো সুযোগ নেই।
স্পিন বোলিংয়ে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও পেস বোলিংয়ে এগিয়ে নিউজিল্যান্ডই। ট্রেন্ট বোল্ট, লুকি ফার্গুসন, টিম সাউদি, মিচেল ব্রাসওয়েলদের নিয়ে গড়া বোলিং আক্রমণ কাঁপন ধরানোর সক্ষমতা রাখে যেকোনো দলের। সেখানে আলজারি জোসেফ শুধু পেস বোলার হলেও আন্দ্রে রাসেল, রোমারিও শেফার্ডরা পরিচিত অলরাউন্ডার হিসেবেই।
তবে এ ম্যাচে দুই দলের পার্থক্য গড়ে দিতে পারে দুই দলের স্পিন শক্তিই। সেখানে কিছুটা এগিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজই। আকিল হোসেন, গুদাকেস মতি, রোস্টন চেজরা নিজেদের মাটিতে বেশ ভয়ংকর। বিপরীতে মিচেল স্যান্টনার নিয়মিত একাদশে খেললেও বেঞ্চে সময় কাটাতে হয় ইশ শোধিকে। এ ম্যাচে একাদশে দেখা যেতে পারে তাকে।
তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বড় শক্তির জায়গা তাদের অলরাউন্ডাররা। জাত অলরাউন্ডার যাকে বলা হয়; সেটাই ক্যারিবীয়রা। আন্দ্রে রাসেল, রোভম্যান পাওয়েল, রোস্টন চেজ, রোমারিও শেফার্ডরা একেকজন যেন দুইজন খেলোয়াড়। তারা যেমন ব্যাটিংয়ের গভীরতা বাড়ায় তেমনি বোলিংয়ের শক্তিও বাড়ায়।
তাই এ ম্যাচে কঠিন পরীক্ষাই দিতে হবে নিউজিল্যান্ডকে। সি-গ্রুপের পয়েন্ট টেবিল যেটা বলছে, এ ম্যাচে হারলে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায়ঘণ্টা বেজে যাবে নিউজিল্যান্ডের।
ক্ষুধার্ত ব্রাজিলের মুখোমুখি জাপান!
সোহরাব শাহরিয়ার অভি
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ভুলের কোনো ক্ষমা নেই। কিন্তু ব্রাজিলের জন্য এই ম্যাচের গুরুত্ব শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। হিউস্টনে জাপানের বিপক্ষে মাঠে নামবে সেলেসাওরা। লক্ষ্য শুধু শেষ ষোলো নিশ্চিত করা নয়, এক বছর আগের সেই অপমানের জবাবও দেওয়া।
২০২৫ সালের অক্টোবরে টোকিওতে দুই দলের প্রীতি ম্যাচটি এখনও নিশ্চয়ই ভুলে যাননি ব্রাজিল সমর্থকরা। প্রথমার্ধে দাপট দেখিয়ে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়েছিল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। মনে হচ্ছিল, সহজ জয় নিয়েই ফিরবে তারা। কিন্তু বিরতির পর যেন সম্পূর্ণ পাল্টে যায় ম্যাচের চিত্র। ৩-২ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে প্রথমবারের মতো ব্রাজিলকে হারানোর স্বাদ পায় ব্লু সামুরাইরা।
এবারের বিশ্বকাপে অবশ্য ভিন্ন এক ব্রাজিলকে দেখা যাচ্ছে। প্রথম ম্যাচে মরক্কোর সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করলেও এরপর টানা দুই জয় তুলে নিয়ে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে সেলেসাওরা। আক্রমণভাগে দুর্দান্ত ছন্দে আছেন ভিনিসিয়াস জুনিয়র। ইতোমধ্যে চার গোল করে দলের সবচেয়ে বড় ভরসায় পরিণত হয়েছেন তিনি। দীর্ঘ তিন বছর চোটের কারণে জাতীয় দলের বাইরে থাকার পর ফিরেছেন নেইমারও। তার অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীলতা ব্রাজিলকে দিয়েছে বাড়তি শক্তি।
তবু জাপানকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। গ্রুপ পর্বে শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল খেলেই তারা জায়গা করে নিয়েছে নকআউটে। কোচ হাজিমে মোরিয়াসুও জানেন, এবার আরও ক্ষুধার্ত এক ব্রাজিলের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে তার দল। তাই ম্যাচের আগে সতর্কবার্তাও দিয়ে রেখেছেন তিনি।
এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় যুদ্ধটা হবে মাঝমাঠে। ব্রাজিল চাইবে দ্রুত বলের দখল নিয়ে উইং দিয়ে আক্রমণ গড়তে। ভিনিসিয়াস, রায়ান কিংবা ব্রাজিলের গতিময় ফরোয়ার্ডরা ভয়ংকর। বিপরীতে জাপানের শক্তি তাদের সংগঠিত ডিফেন্স, দ্রুত প্রেসিং এবং মুহূর্তের মধ্যে রক্ষণ থেকে আক্রমণে উঠে যাওয়ার ক্ষমতা।
কাগজে-কলমে ব্রাজিল এগিয়ে। তাদের ব্যক্তিগত প্রতিভা, বড় ম্যাচের অভিজ্ঞতা এবং আক্রমণের বৈচিত্র্য পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। তবে জাপান যদি নিজেদের শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল খেলতে পারে এবং ম্যাচটাকে দীর্ঘ সময় গোলশূন্য রাখতে পারে, তাহলে অঘটনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। আর বিশ্বকাপ মানেই তো চমক, একটা ভুলেই পা পিছলে যেতে পারে যে কারও!
জাপান বধের লক্ষ্যে হিউস্টনে পূর্ণ শক্তির ব্রাজিল দল
ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের বৈতরণী পার হয়ে প্রথম নকআউট রাউন্ড তথা শেষ ৩২-এর লড়াইয়ে নামার জন্য প্রস্তুত লাতিন আমেরিকার পরাশক্তি ব্রাজিল। সোমবার (২৯ জুন) রাত ১১টায় টেক্সাসের হিউস্টনে তাদের প্রতিপক্ষ এশিয়ার শক্তিশালী দল জাপান। এই মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে ব্রাজিল শিবিরে স্বস্তির সুবাতাস বইছে। গত শুক্রবারের অনুশীলনে নানা কারণে ৮ জন নিয়মিত ফুটবলার অনুপস্থিত থাকলেও, শনিবার সকালে পূর্ণ স্কোয়াড নিয়ে পুরোদমে ঘাম ঝরিয়েছে সেলেসাওরা।
জাপানের বিপক্ষে বেঞ্চেই বসতে হচ্ছে নেইমারকে?
বাঁচা-মরার লড়াইয়ে কোনো ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ঝুঁকি নিতে রাজি নন সেলেসাওদের হেড কোচ কার্লো আনচেলত্তি। এই হাই-ভোল্টেজ ম্যাচকে সামনে রেখে ফুটবলপ্রেমীদের মনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সবচেয়ে আলোচিত তারকা নেইমার জুনিয়র কি ব্রাজিলের শুরুর একাদশে ফিরবেন? তবে ব্রাজিলিয়ান টিম ম্যানেজমেন্ট ও সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, এই প্রশ্নের উত্তর আপাতত ‘না’।
দীর্ঘদিন চোটের সঙ্গে লড়াই করে দলে ফিরলেও নেইমারের ম্যাচ ফিটনেস এখনও আন্তর্জাতিক স্তরে টানা ৯০ মিনিট খেলার মতো পর্যায়ে পৌঁছায়নি বলে কোচিং স্টাফকে স্পষ্ট জানিয়েছেন দলের প্রধান ফিটনেস ট্রেইনাররা। নকআউটের মতো কঠিন মঞ্চে পুরোপুরি ফিট না থাকা খেলোয়াড়কে শুরুর একাদশে নামিয়ে কোনো বড় বিপদে পড়তে চান না কোচ আনচেলত্তি। সেই কারণে জাপানের বিপক্ষে নেইমারকে শুরুর একাদশে না রেখে মূলত ‘সুপার সাব’ বা বদলি খেলোয়াড় হিসেবে ব্যবহার করার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করেছে ব্রাজিলের টিম ম্যানেজমেন্ট। ম্যাচের পরিস্থিতি এবং দলের প্রয়োজন বিবেচনা করে দ্বিতীয়ার্ধের যেকোনো সময় তাকে মাঠে নামানো হতে পারে।
জাপান জিতলে অবাক হবো না- জিকো, ব্রাজিলের সাবেক ফুটবলার
বিশ্বকাপে আগের দুই আসরে নকআউট পর্বে জায়গা করে নেওয়াটাই বুঝিয়ে দিচ্ছে জাপান ফুটবলে কতটা এগিয়েছে। জাপান এখন যে কোনো দলের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত। গত কয়েক বছরে তারা ব্রাজিল, জার্মানি, স্পেন ও ইংল্যান্ডকে হারিয়ে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে।
যে দলের বিপক্ষেই তাদের ম্যাচ হোক, তারা সত্যিকার অর্থেই তৈরি থাকবে। দলটি অবশ্যই টেকনিক্যালি অনেক উন্নতি করেছে। কিন্তু জাপানের জন্য সবসময়ই মনস্তাত্ত্বিক বিষয়টিই বড় ইস্যু। কীভাবে প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে হয়, সেটা এখন খেলোয়াড়রা জানে এবং ম্যাচে পিছিয়ে পড়লে সমতা ফেরাতে মরিয়া হয়ে থাকে।
বিশ্বকাপে দ্বিতীয়বারের মতো জাপান ও ব্রাজিলের সাক্ষাৎ হতে যাচ্ছে। ২০০৬ আসরে দল দুটি প্রথমবার বিশ্বকাপে মুখোমুখি হয়েছিল, যে ম্যাচে সেলেসাওরা ৪-১ গোলে জয় তুলে নিয়েছিল। ওই ম্যাচে আমি (জিকো) জাপান দলের কোচ ছিলাম। এটা অবশ্যই আবেগময় ম্যাচ ছিল।
আগেই আমি দলকে বলেছিলাম ম্যাচ শুরুর আগমুহূর্তে আমি ব্রাজিলের জাতীয় সংগীত গাইব, যেমনটি আমি স্কুল জীবনে গাইতাম। কিন্তু ম্যাচে বল মাঠে গড়ানো মাত্রই আমি জাপানের পক্ষে নিজেকে নিংড়ে দিয়েছিলাম। তখন আমার দিদির (ওয়ালদিয়র পেরেইরা) কথা মনে পড়ছিল। যিনি ব্রাজিলের জার্সি গায়ে দুটি বিশ্বকাপ জিতেছিলেন আবার ১৯৭০ বিশ্বকাপে পেরুর কোচ হিসেবে সেলেসাওদের বিপক্ষে ম্যাচে ডাগআউটে ছিলেন। এটা আসলেই কঠিন কাজ ছিল।
১৯৯৮ সালে বিশ্বকাপে অভিষেকের পর আর কখনো আসর থেকে ছিটকে পড়েনি জাপান। দেশটি ফুটবলে অনেক এগিয়ে গেছে। ব্রাজিল বা লাতিন আমেরিকার ফুটবলারদের মতো জাপানের খেলোয়াড়রা ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবে ডাক পাচ্ছে।
ব্রাজিলের বিপক্ষে ফেরার অপেক্ষায় ‘জাপানের মেসি’
ব্রাজিলের বিপক্ষে নকআউট পর্বের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে বড় স্বস্তির খবর পেল জাপান। চোট থেকে সেরে উঠে অনুশীলনে ফিরেছেন দলের অন্যতম বড় তারকা তাকেফুসা কুবো। ‘জাপানের মেসি’ খ্যাত এই ফরোয়ার্ডের ফিরে আসায় ব্লু সামুরাইদের শিবিরে নতুন উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে।
নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচে হাঁটুতে চোট পেয়ে হুইলচেয়ারে করে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল কুবোকে। সেই ঘটনায় জাপানি সমর্থকদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। চোটের কারণে তিউনিসিয়া ও সুইডেনের বিপক্ষে ম্যাচে দলের সঙ্গে যাননি তিনি। ন্যাশভিলের নিজস্ব ট্রেইনিং সেন্টারে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া চালিয়েছেন।
সুইডেনের সঙ্গে ১-১ গোলের ড্র ম্যাচের পরদিনই অনুশীলনে ফেরেন কুবো। জাপানি সংবাদমাধ্যমের ছবিতে দেখা গেছে, আহত হাঁটুতে প্রটেক্টিভ ব্যান্ডেজ বেঁধে বল পায়ে অনুশীলন করছেন তিনি। চোটের পর এটাই প্রথমবার মাঠে বল নিয়ে অনুশীলন করতে দেখা গেল তাকে।
মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগ, দুই জায়গাতেই দক্ষতা দেখানো কুবোকে তার প্রজন্মের অন্যতম সেরা ফুটবলার মনে করা হয়। ক্লাব ক্যারিয়ারে রিয়াল মাদ্রিদ, ভিয়ারিয়াল ও মায়োর্কার মতো বড় দলে খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। বর্তমানে তিনি রিয়াল সোসিয়েদাদের হয়ে খেলছেন।
তার ফিরে আসায় জাপানের সমর্থকরা এখন ব্রাজিলের বিপক্ষে লড়াইয়ের জন্য আরও আশাবাদী। ‘এশিয়ার ব্রাজিল’ খ্যাত জাপান এখন কুবোকে সঙ্গে নিয়ে শক্তিশালী সেলেসাওদের মোকাবিলা করতে প্রস্তুত।
রাফিনিয়াকে ছাড়াই নকআউট অভিযান শুরু ব্রাজিলের
বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব শুরু হওয়ার আগেই বড় ধাক্কা খেয়েছে ব্রাজিল। দলের অন্যতম ভরসার ফরোয়ার্ড রাফিনিয়া চোটের কারণে জাপানের বিপক্ষে রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচে খেলতে পারছেন না।
সোমবার (২৯ জুন) হিউস্টনে জাপানের মুখোমুখি হবে ব্রাজিল। তবে দলের সঙ্গে সেখানে যাচ্ছেন না রাফিনিয়া।
উরুর চোট থেকে পুরোপুরি সেরে না ওঠায় তিনি নিউ জার্সিতে থেকে জাতীয় দলের ট্রেনিং সেন্টারে চিকিৎসা ও পুনর্বাসন চালিয়ে যাবেন।
জ্যোতিষ জানালো কার কাছে হেরে বিদায় নেবে ব্রাজিল
ভবিষ্যদ্বাণীর তালিকায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় জার্মান অর্থনীতিবিদ জোয়াকিম ক্লেমেন্ট। ২০১৪ সাল থেকে প্রতিটি বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন সঠিকভাবে পূর্বাভাস দেওয়ার দাবি করা এই গবেষক এবার ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, ২০২৬ বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে জাপানের কাছে হেরে বিদায় নেবে ব্রাজিল।
হিউস্টন স্টেডিয়ামে সোমবার (২৯ জুন) বাংলাদেশ সময় রাত ১১টায় জাপানের বিপক্ষে খেলতে নামবে ব্রাজিল। ‘সি’ গ্রুপের শীর্ষে থাকায় নকআউটে হাজিমে মোরিয়াসুর দলকে পেয়েছে সেলেসাওরা। ক্লেমেন্টের মতে, নকআউটের ম্যাচটিতে জয় পাবে জাপান। ফলে প্রত্যাশার আগেই শেষ হবে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ অভিযান।
এখন পর্যন্ত ক্লেমেন্টের পূর্বাভাসের সঙ্গে মিল থাকা সম্ভাব্য দুটি নকআউট ম্যাচ হলো ব্রাজিল-জাপান এবং নেদারল্যান্ডস-মরক্কো।
জাপান বাধা টপকালে শেষ ষোলোয় ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ কে?
৪৮ দলের বিশ্বকাপের টুর্নামেন্টের বিন্যাস অনুযায়ী, শেষ ৩২-এ ‘সি’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল লড়বে ‘এফ’ গ্রুপের রানার্সআপ জাপানের বিপক্ষে। এই ম্যাচে জয়ী দল সরাসরি জায়গা করে নেবে শেষ ষোলোতে। ব্রাজিল যদি তাদের এই ম্যাচে জয় পায়, তবে শেষ ষোলোতে তাদের প্রতিপক্ষ হবে নরওয়ে এবং আইভরিকোস্টের মধ্যকার ম্যাচের জয়ী দল।
ব্রাজিল তাদের নকআউট যাত্রায় যদি নরওয়ের মুখোমুখি হয়, তবে সেটি হবে বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণীয় দ্বৈরথ। গ্রুপ ‘আই’ থেকে রানার্স আপ হয়ে আসা নরওয়ের মূল শক্তি আর্লিং হালান্ড এবং অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড। অন্যদিকে, ব্রাজিলের আক্রমণভাগে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও নেইমারের ছন্দ তাদের শিরোপার অন্যতম বড় দাবিদার হিসেবে তুলে ধরেছে।
এখন দেখার বিষয়, জাপানকে হারিয়ে ব্রাজিল কি নকআউটের মূল মঞ্চে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিতে পারে কি না।
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ফুটবল বিশ্ব দেখল এক অবিশ্বাস্য ও শ্বাসরুদ্ধকর মহানাটক। গ্রুপ ‘জে’-এর শেষ ম্যাচে আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়ার মধ্যকার হাই-ভোল্টেজ দ্বৈরথটি ৩-৩ গোলের নাটকীয় সমতায় শেষ হয়েছে। ম্যাচের নির্ধারিত ৯০ মিনিট পেরিয়ে অতিরিক্ত ও যোগ করা সময়ে একের পর এক গোল এবং নাটকের কারণে কোনো দলই শেষ পর্যন্ত হার মানেনি। তবে এই দুই দলের রোমাঞ্চকর ড্রয়ের ফলে বড় ধরনের কপাল পুড়েছে ইরানের। সমীকরণের মারপ্যাঁচে পড়ে কোনো ম্যাচ না হেরেও বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হয়েছে এশিয়ার এই পরাশক্তিকে।
ম্যাচের প্রথমার্ধ ও দ্বিতীয়ার্ধের লড়াই শেষে এক পর্যায়ে ২-২ সমতায় ছিল অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়ার ম্যাচ। খেলা যখন যোগ করা সময়ের একদম শেষ মুহূর্তে, তখন মনে হচ্ছিল ড্র নিয়েই মাঠ ছাড়বে দুই দল। কিন্তু যোগ করা সময়ের শেষ মিনিটে আলজেরিয়ার তারকা ফরোয়ার্ড রিয়াদ মাহারেজ নিজের দ্বিতীয় গোল করে দলকে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে নেন। মাহারেজের এই আকস্মিক গোল অস্ট্রিয়াকে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে দেওয়ার এবং টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় করার দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছিল।
তবে ম্যাচের আসল রোমাঞ্চ তখনও বাকি ছিল। আলজেরিয়ার গোলের রেশ কাটতে না কাটতেই রেফারি শেষ বাঁশি বাজানোর ঠিক আগমুহূর্তে ম্যাচের শেষ আক্রমণে ঝাঁপায় অস্ট্রিয়া। ডি-বক্সে উড়ে আসা বলে দুর্দান্ত এক হেডের সাহায্যে গোল করে অস্ট্রিয়াকে ৩-৩ সমতায় ফেরান স্ট্রাইকার সাসা কালাইদজিচ। শেষ মুহূর্তের এই অতিমানবীয় গোলেই টিকে যায় অস্ট্রিয়ার বিশ্বকাপ স্বপ্ন। ম্যাচে অস্ট্রিয়ার হয়ে বাকি দুটি গোল করেন অভিজ্ঞ মার্কো আরনাউটোভিচ ও মার্সেল সাবিৎজার। এই ড্রয়ের ফলে গ্রুপে রানার্সআপ হয়ে ১৯৮২ সালের পর প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে উঠল অস্ট্রিয়া, যেখানে শেষ বত্রিশে তাদের মুখোমুখি হতে হবে শক্তিশালী স্পেনের।
অন্যদিকে, আলজেরিয়ার পক্ষে অন্য গোলটি করেন রফিক বেলঘালি। ম্যাচটি ড্র হওয়ায় গ্রুপে তৃতীয় স্থানে শেষ করলেও সেরা তৃতীয় দলগুলোর একটি হিসেবে নকআউট পর্ব নিশ্চিত করেছে আলজেরিয়া। শেষ ৩২-এর লড়াইয়ে তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়িয়েছে সুইজারল্যান্ড। তবে এই ম্যাচের নাটকীয় ফলের সবচেয়ে বড় মাশুল দিতে হয়েছে ইরানকে। গ্রুপ পর্বে বেলজিয়াম, নিউজিল্যান্ড ও মিশর—তিন দলের বিপক্ষেই ড্র করে ৩ পয়েন্ট নিয়ে অপরাজিত থাকা ইরানের আশা ছিল অস্ট্রিয়া বা আলজেরিয়ার যেকোনো এক দল জিতলে তারা পরের রাউন্ডে যাবে। কিন্তু কালাইদজিচের শেষ মুহূর্তের সমতাসূচক গোল ইরানের সেই শেষ আশাটুকুও ধূলিসাৎ করে দেয়।
গ্রুপ ‘কে’-এর শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণী ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল ইউরোপিয়ান জায়ান্ট পর্তুগাল ও লাতিন আমেরিকার শক্তিশালী দল কলম্বিয়া। ফ্লোরিডার মিয়ামি গার্ডেন্সে অনুষ্ঠিত এই টানটান উত্তেজনাপূর্ণ হাই-ভোল্টেজ ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত ০-০ গোলশূন্য ব্যবধানে ড্র হয়েছে। এই ড্রয়ের সুবাদে ৩ ম্যাচে দুটি জয় ও একটি ড্রয়ে সর্বোচ্চ 7 পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নকআউট পর্বে পা রাখল কলম্বিয়া। অন্যদিকে সমান ম্যাচে ৫ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের দ্বিতীয় স্থানে থেকে রানার্সআপ হিসেবে শেষ বত্রিশ নিশ্চিত করেছে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল। এই গ্রুপ থেকে ৪ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় দল হিসেবে কঙ্গোও পরের রাউন্ডে উঠেছে।
মিয়ামি গার্ডেন্সে অনুষ্ঠিত ম্যাচটিতে কোনো দল গোলের দেখা না পেলেও পুরো সময় জুড়েই ছিল আক্রমণ ও প্রতি-আক্রমণের রোমাঞ্চ। বলের দখল এবং আক্রমণের দিক থেকে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে ছিল কলম্বিয়া। পুরো ম্যাচে ৫৫ শতাংশ বল পজিশন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি পর্তুগালের গোলপোস্টে ২৪টি শট নেয় কলম্বিয়ার স্ট্রাইকাররা, যার মধ্যে ৬টি ছিল লক্ষ্যে। বিপরীতে পর্তুগালও বেশ কিছু কাউন্টার অ্যাটাক তৈরি করে মোট ১৩টি শট নেয়, যার ২টি ছিল অন-টার্গেট। গোল না হলেও দুই দলের গতিময় ও আক্রমণাত্মক ফুটবল গ্যালারির দর্শকদের দারুণ বিনোদন জুগিয়েছে।
ম্যাচের প্রথমার্ধে পর্তুগালকে লিড এনে দেওয়ার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন মিডফিল্ডার ব্রুনো ফার্নান্দেজ। তবে কলম্বিয়ার অভিজ্ঞ গোলরক্ষক কামিলো ভারগাসের চমৎকার সেভে সে যাত্রা হতাশ হতে হয় পর্তুগিজদের। অন্যদিকে পর্তুগালের গোলরক্ষক দিয়োগো কস্তাও আজ পোস্টের নিচে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। পুরো ম্যাচে তিনি মোট ৬টি দুর্দান্ত সেভ করেন, যা চলতি আসরে তার প্রথম দুই ম্যাচের মোট সেভের চেয়েও বেশি। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধের শেষ দিকে কলম্বিয়ার ডিফেন্ডার ডেভিনসন সানচেজ বল জালে জড়িয়ে দলকে উল্লাসে মাতালেও পরবর্তীতে রেফারি অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল করে দেন।
৪৮ দলের বর্ধিত এই বিশ্বকাপের শেষ ৩২ বা নকআউট পর্বের রোডম্যাপও এই ম্যাচের ফলাফলের মাধ্যমে চূড়ান্ত হয়ে গেছে। গ্রুপ ‘কে’ থেকে চ্যাম্পিয়ন হওয়া কলম্বিয়া শেষ বত্রিশের লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে ‘এল’ গ্রুপ থেকে সেরা তৃতীয় দল হিসেবে নকআউট নিশ্চিত করা আফ্রিকার দেশ ঘানার বিপক্ষে। ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে আগামী ৪ জুলাই বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ৭টায়। উল্লেখ্য, আফ্রিকান দেশটি নিজেদের শেষ ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার কাছে ২-১ গোলে হেরেছিল।
অন্যদিকে, টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেভারিট হিসেবে আসা পর্তুগালকে গ্রুপ রানার্সআপ হওয়ায় নকআউট পর্বের শুরুতেই কঠিন প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। শেষ ৩২-এর হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে তারা মুখোমুখি হবে ‘এল’ গ্রুপের রানার্সআপ শক্তিশালী দল ক্রোয়েশিয়ার। ইউরোপের এই দুই পরাশক্তির মহারণটি আগামী ৩ জুলাই ভোর ৫টায় অনুষ্ঠিত হবে।
দীর্ঘ ৫২ বছর পর ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরে এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস সৃষ্টি করেছে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র। আসরে নিজেদের বাঁচা-মরার শেষ গ্রুপ ম্যাচে উজবেকিস্তানকে ৩-১ ব্যবধানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট বা শেষ বত্রিশের টিকিট নিশ্চিত করেছে আফ্রিকান এই দেশটি। ম্যাচের ৬৭ মিনিট পর্যন্ত ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে থেকেও নাটকীয়ভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে পরবর্তী সময়ে উজবেকদের জালে আরও ৩টি গোল দেয় কঙ্গোর স্ট্রাইকাররা। ১৯৭৪ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার দীর্ঘ সময় পর এটিই বিশ্বমঞ্চে দলটির সবচেয়ে বড় সাফল্য।
যুক্তরাষ্ট্রের আটালান্টার মার্সিডিজ বেঞ্জ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচটিতে বলের দখল এবং আক্রমণ—সবদিক থেকেই শুরু থেকে একচেটিয়া আধিপত্য দেখায় কঙ্গো। তবে ম্যাচের মাত্র ১০ মিনিটের মাথায় কঙ্গোর রক্ষণভাগের অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে উজবেকিস্তানকে এগিয়ে নেন ফরোয়ার্ড এল্ডর সমুরোদোভ। ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার পর গোল পরিশোধে মরিয়া হয়ে আক্রমণের পর আক্রমণ চালাতে থাকে কঙ্গো। তবে উজবেকিস্তানের জমাট রক্ষণভাগ প্রথমার্ধ ছাড়িয়ে ম্যাচের ৬৭ মিনিট পর্যন্ত কঙ্গোর সব প্রচেষ্টা সফলভাবে আটকে রাখতে সক্ষম হয়।
ম্যাচের ৬৮ মিনিটে উজবেক ডিফেন্ডার আবদুকোদির খুসানোভের একটি মারাত্মক ভুলের কারণে পেনাল্টি পায় আফ্রিকান দেশটি। ডি-বক্সে বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে তিনি কঙ্গোর উইঙ্গার ইয়োয়ানে উইসার পায়ে আঘাত করলে রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজান। স্পটকিক থেকে নিখুঁত শটে গোল করে কঙ্গোকে ১-১ সমতায় ফেরান সেই ইওয়ান উইসা। এই গোলের ঠিক ১০ মিনিট পর, অর্থাৎ ম্যাচের ৭৮ মিনিটে কঙ্গোর পক্ষে দ্বিতীয় গোলটি করে দলকে লিড এনে দেন ফিস্তন মায়েলে। আর ম্যাচের যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে উইসা নিজের দ্বিতীয় ও দলের তৃতীয় গোলটি করলে ৩-১ ব্যবধানের বড় জয় নিশ্চিত হয় কঙ্গোর।
এর আগে ১৯৭৪ বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম আসর খেলেছিল কঙ্গো, যেখানে তারা ৩টি ম্যাচের সবকটিতেই হেরেছিল এবং যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে ৯-০ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার মতো তেতো অভিজ্ঞতা হয়েছিল তাদের। তবে দীর্ঘ বিরতি দিয়ে এবারের আসরে ফিরে শুরু থেকেই ভিন্ন ইতিহাস লেখার ইঙ্গিত দিচ্ছিল দলটি। নিজেদের প্রথম ম্যাচে ইউরোপিয়ান জায়ান্ট পর্তুগালকে ১-১ গোলে রুখে দেওয়ার পর লাতিন আমেরিকার শক্তিশালী দল কলম্বিয়ার বিপক্ষেও হারের ব্যবধানটা (১-০) বড় হতে দেয়নি তারা। আর আজ শেষ ম্যাচে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে এই দাপুটে জয়ে ৪ পয়েন্ট নিয়ে পরের রাউন্ডে পা রাখল কঙ্গো।
বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে ইংল্যান্ডের কাছে হেরে টুর্নামেন্ট শুরু করেছিল লুকা মদ্রিচের ক্রোয়েশিয়া। তবে শুরুর সেই বড় ধাক্কা দারুণভাবে সামলে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ঘানাকে ২-১ গোলে হারিয়ে দিয়েছে ক্রোয়াটরা। এই রোমাঞ্চকর জয়ের মধ্য দিয়ে তারা চলতি বিশ্বকাপের শেষ ৩২ বা নক-আউট পর্ব নিশ্চিত করেছে। বাঁচা-মরার এই লড়াইয়ে জয় পাওয়ায় গ্রুপ ‘এল’ থেকে রানারআপ হিসেবেই পরের রাউন্ডের টিকিট কাটলো জ্লাতকো দালিচের দল।
যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়ামে ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণ ও প্রতিআক্রমণের মধ্য দিয়ে লড়তে থাকে দুই দল। তবে ম্যাচের ৩০তম মিনিটে প্রথম ডেডলক ভাঙেন ক্রোয়েশিয়ার মিডফিল্ডার পিটার সুচিচ। চমৎকার এক আক্রমণ থেকে বল পেয়ে তিনি ঘানার জালে জড়াতে ভুল করেননি। এর ঠিক পরের মিনিটে অর্থাৎ ৩১তম মিনিটে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর (VAR) চেকের মাধ্যমে রেফারি গোলটির চূড়ান্ত বৈধতা দিলে প্রথমার্ধের খেলা ১-০ ব্যবধানে শেষ হয়।
বিরতির পর দ্বিতীয়ান্ধের শুরু থেকেই গোল পরিশোধের নেশায় বুঁদ হয়ে উঠে ঘানা। একের পর এক আক্রমণ চালিয়ে অবশেষে ম্যাচের ৭৩তম মিনিটে তারা কাঙ্ক্ষিত সমতাসূচক গোলটি পেয়ে যায়। দলের ফরোয়ার্ড আর্নেস্ট নুয়ামাহর নেওয়া একটি নিখুঁত ফ্রি কিক থেকে বক্সের ভেতর দূরের পোস্টে থাকা ডেরিক লুকাসেন চমৎকার ভলিতে বল জালে পাঠান। শুরুতে সহকারী রেফারি অফসাইডের পতাকা তুললেও পরবর্তীতে দীর্ঘ ভিএআর পরীক্ষার মাধ্যমে গোলের বৈধতা দেন মূল রেফারি।
ঘানার এই সমতায় ফেরার আনন্দ অবশ্য খুব বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে দেয়নি ক্রোয়েশিয়া। গোল হজম করার ঠিক ১০ মিনিট পরেই, অর্থাৎ ম্যাচের ৮৩তম মিনিটে আবারও দুর্দান্তভাবে লিড নেয় ক্রোয়াটরা। দলের হয়ে ঘানার জাল কাঁপিয়ে দ্বিতীয় গোলটি করেন নিকোলা ভ্লাসিচ। ম্যাচের শেষ দিকে ঘানা আর কোনো আক্রমণ জমাতে না পারায় এবং কোনো গোল না হওয়ায় ২-১ ব্যবধানের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে ক্রোয়েশিয়া।
বিশ্বকাপে নিজেদের গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে জর্ডানের বিপক্ষে ৩-১ ব্যবধানের দুর্দান্ত জয় তুলে নিয়েছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। যুক্তরাষ্ট্রের ডালাস স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে জয় পাওয়ার পাশাপাশি ফুটবল ইতিহাসে এক অনন্য ও অবিস্মরণীয় বিশ্বরেকর্ড নিজের নামে করে নিয়েছেন আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি অধিনায়ক লিওনেল মেসি। ফুটবলের বৈশ্বিক মহামঞ্চে টানা সাতটি ম্যাচে গোল করার এক অবিশ্বাস্য কীর্তি গড়েছেন এই ফরোয়ার্ড, যা বিশ্বকাপের প্রায় শত বছরের ইতিহাসে আর কোনো ফুটবলার করে দেখাতে পারেননি।
টানা দুই জয়ে আগেই নকআউট পর্ব নিশ্চিত হওয়ায় আজ জর্ডানের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার শুরুর একাদশে ছিলেন না লিওনেল মেসি। পেশির হালকা টান থাকার কারণে কোচ লিওনেল স্কালোনি তাকে বিশ্রামে রেখেছিলেন। তবে ম্যাচের ৬০তম মিনিটে ভক্তদের উল্লাসে মুখরিত করে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। মাঠে নামার ঠিক ২০ মিনিট পর, অর্থাৎ ম্যাচের ৮০তম মিনিটে ২৫ মিটার দূর থেকে নিজের সিগনেচার স্টাইলে এক চোখধাঁধানো ও নিখুঁত ফ্রি-কিক শটে জর্ডানের জাল কাঁপিয়ে দেন মেসি।
এই জাদুকরী গোলের ওপর ভর করেই বিশ্বকাপে টানা সাতটি ম্যাচে গোল করার এই নতুন বিশ্বরেকর্ড এককভাবে নিজের করে নেন লিওনেল মেসি। এর আগে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের শেষ ৪টি ম্যাচ (অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, ক্রোয়েশিয়া ও ফ্রান্স) এবং চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম ৩টি ম্যাচেই জালের দেখা পেলেন তিনি। এই কীর্তির মাধ্যমে তিনি ফ্রান্সের কিংবদন্তি জাস্ট ফন্টেইন (১৯৫৮) এবং ব্রাজিলের জেয়ারজিনহোকে (১৯৭০) ছাড়িয়ে গেছেন, যারা এতদিন ধরে বিশ্বকাপে টানা ছয় ম্যাচে গোল করার যৌথ রেকর্ডের অংশীদার ছিলেন।
জর্ডানের বিপক্ষে করা এই গোলটি চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির ষষ্ঠ গোল। এর আগে গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক এবং দ্বিতীয় ম্যাচে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করেছিলেন তিনি। এই দুর্দান্ত ফর্মের সুবাদে বিশ্বকাপে নিজের সর্বমোট গোলসংখ্যাকে ১৯-এ নিয়ে গেলেন তিনি, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে যেকোনো পুরুষ ফুটবলারের ক্ষেত্রে সর্বকালের সর্বোচ্চ। মেসির এই রেকর্ডব্রেকিং ফ্রি-কিক এবং জিওভানি লো চেলসো ও লাউতারো মার্তিনেসের গোলে ভর করে ৩-১ ব্যবধানে জিতে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবেই শেষ বত্রিশের নকআউট পর্বে পা রাখল আলবিসেলেস্তেরা।
উত্তর আমেরিকা ফুটবল বিশ্বকাপের প্রথম দুই ম্যাচে হেরে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল সেনেগালের। তবে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে এসে এশিয়ার প্রতিনিধি ইরাকের ওপর রীতিমতো গোলবন্যা বইয়ে দিল আফ্রিকার সিংহরা। শুক্রবার টরন্টোর মাঠে অনুষ্ঠিত এই বাঁচা-মরার লড়াইয়ে ইরাককে ৫-০ গোলের বিশাল ব্যবধানে হারিয়েছে তারা। এই বড় জয়ের ফলে তিন ম্যাচ শেষে তিন পয়েন্ট নিয়ে নিজেদের গ্রুপের তৃতীয় স্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরবর্তী রাউন্ডে যাওয়ার সম্ভাবনাও উজ্জ্বল করে রাখল সেনেগাল।
খেলার শুরুতেই এক চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে ইরাক। ম্যাচের মাত্র চতুর্থ মিনিটে এক কর্নার থেকে চমৎকার হেডের সাহায্যে সেনেগালকে এগিয়ে নেন হাবিব দিয়ারা। গোল হজমের ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই ত্রয়োদশ মিনিটে মাঠের শেষ রক্ষণভাগের খেলোয়াড় রেবিন সুলাকা সেনেগালের আক্রমণভাগের খেলোয়াড়কে অবৈধভাবে টেনে ধরলে ভিডিও সহকারীর (ভিএআর) সাহায্যে তাঁকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান রেফারি। খেলার শুরুতেই ১০ জনের দলে পরিণত হওয়া ইরাক এরপর আর পুরো ম্যাচে দাঁড়াতেই পারেনি।
প্রথমার্ধে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকার পর দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে মাত্র তিন মিনিটের এক বিধ্বংসী ঝড়ে ইরাককে ম্যাচ থেকে পুরোপুরি ছিটকে দেয় সেনেগাল। ম্যাচের ৫৬তম মিনিটে চমৎকার পাস থেকে বল পেয়ে নিখুঁত শটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন ইসমাইলা সার। এর ঠিক তিন মিনিট পর অর্থাৎ ৫৯তম মিনিটে সীমানার বাইরে থেকে এক দৃষ্টিনন্দন কোণাকুণি শটে দলের তৃতীয় গোলটি করেন পেপে। ৭১তম মিনিটে নিজের জোড়া গোল পূর্ণ করে স্কোরলাইন ৪-০ করেন এই ফরোয়ার্ড। আর ম্যাচের ৮২তম মিনিটে ইরাকের কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দিয়ে ৫-০ গোলের বড় জয় নিশ্চিত করেন লিমান এনদিয়ে।
গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচের সবকটিতে হেরে শূন্য পয়েন্ট নিয়ে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিল ইরাক। তিন আসরে নয় পয়েন্ট পেয়ে এই গ্রুপ থেকে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ফ্রান্স এবং ছয় পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় দল হিসেবে পরের রাউন্ডে গেছে নরওয়ে। অন্যদিকে, এই বড় জয়ের ফলে সেনেগালের গোল ব্যবধান মাইনাস তিন থেকে এক লাফে প্লাস দুইয়ে চলে এসেছে। গ্রুপ পর্বের সব খেলা শেষ হওয়ার পর সেরা আটটি তৃতীয় স্থানাধিকারী দলের তালিকা চূড়ান্ত হলেই জানা যাবে সেনেগালের শেষ বত্রিশে ওঠার ভাগ্য।
বিশ্বকাপের বাঁচা-মরার হাইভোল্টেজ ম্যাচে উরুগুয়েকে ১-০ গোলে হারিয়ে ‘এইচ’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নকআউট পর্বে পা রাখল ২০১০ সালের বিশ্বজয়ী স্পেন। গুয়াদালাহারার মাঠে শনিবার সকালে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে স্পেনের হয়ে একমাত্র জয়সূচক গোলটি করেন তরুণ মিডফিল্ডার অ্যালেক্স বায়েনা। এই হারের মাধ্যমে উরুগুয়ের ফুটবল ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় রচিত হলো; নিজেদের ইতিহাসে এই প্রথমবার টানা দুই আসরে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হলো দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের।
পুরো ম্যাচ জুড়েই দুই দলের কেউই তাদের চেনা ছন্দ বা সেরা খেলাটা মেলে ধরতে পারেনি। বলের দখল ও আক্রমণে স্পেন কিছুটা এগিয়ে থাকলেও প্রথমার্ধের বড় একটা সময় পরিষ্কার কোনো সুযোগ তৈরি করতে পারছিল না তারা। ম্যাচের ৪২তম মিনিটে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। ডান দিক থেকে মার্কোস ইয়োরেন্তের বাড়ানো পাস বক্সে পেয়ে ডান পায়ের জোরালো শট নেন ২৪ বছর বয়সী অ্যালেক্স বায়েনা। উরুগুয়ের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ফের্নান্দো মুসলেরা দুই হাত দিয়ে বলটি আটকানোর চেষ্টা করলেও তাঁর গ্লাভস ফসকে বল জালে জড়ায়। বিশ্বকাপে এটিই বায়ানার প্রথম গোল।
প্রথম গোল হজমের তিন মিনিট পরই বড় ধাক্কা খায় উরুগুয়ে। হাঁটুতে মারাত্মক চোট পেয়ে স্ট্রেচারে করে মাঠ ছাড়েন তাদের নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার মানুয়েল উগার্তে। প্রথমার্ধের গোল হজমের ভুলের খেসারত হিসেবেই হয়তো, দ্বিতীয় হাফে আর মূল গোলরক্ষক মুসলেরাকে মাঠে নামাননি উরুগুয়ের প্রধান কোচ মার্সেলো বিয়েলসা; তাঁর পরিবর্তে নামানো হয় সের্হিও রোচেতকে। ম্যাচের ৬৩তম মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করার সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করেন দানি ওলমো। লামিন ইয়ামালের চমৎকার পাস থেকে ফাঁকায় বল পেয়েও তা পোস্টের ওপর দিয়ে উড়িয়ে মারেন তিনি।
ম্যাচের শেষ দিকে দুই দলই আক্রমণ-প্রতিআক্রমণে ম্যাচ জমিয়ে তোলে। ৮৬তম মিনিটে উরুগুয়ের দে লা ক্রুসের নেওয়া একটি বিপজ্জনক শট দারুণ দক্ষতায় রুখে দেন স্প্যানিশ গোলরক্ষক উনাই সিমন। এর পরের মিনিটেই কাউন্টার অ্যাটাকে বক্সে ঢুকে ওয়ান-অন-ওয়ানে শট নেন স্পেনের ফেররান তরেস, তবে তাঁর শটটি ক্রসবারে লেগে ফিরে আসলে গোলবঞ্চিত হয় স্পেন। ম্যাচের যোগ করা সময়ে উরুগুয়ের ফেদেরিকো ভিনাস স্পেনের বক্সে পড়ে গেলে পেনাল্টির জোরালো আবেদন জানায় উরুগুয়ে, কিন্তু রেফারি তা নাকচ করে দেন। ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে স্পেনের ডিফেন্ডার পাউ কুবার্সিকে মারাত্মক ফাউল করায় উরুগুয়ের কানোবিওকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান রেফারি।
এই জয়ের ফলে ৩ ম্যাচ শেষে দুই জয় ও এক ড্রয়ে ৭ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হলো লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্পেন। অন্যদিকে, ৩ ড্রয়ে ৩ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ রানার্সআপ হয়ে ইতিহাস গড়েছে আফ্রিকার দেশ কেইপ ভার্ড। মাত্র ২ পয়েন্ট করে পাওয়া উরুগুয়ে ও সৌদি আরবকে টুর্নামেন্টের গ্রুপ পর্ব থেকেই অশ্রুসিক্ত বিদায় নিতে হলো।
গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে সৌদি আরবের বিপক্ষে ড্র করার পর মাঠের ভেতরেই একটি ফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখছিলেন কেপ ভার্দের ফুটবলাররা। উরুগুয়ে বনাম স্পেনের অন্য ম্যাচটির ফলাফল নিশ্চিত হতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে পুরো দল। কারণ, তিন ম্যাচের তিনটিতেই ড্র করে ‘এইচ’ গ্রুপের রানার্সআপ হিসেবে নকআউট পর্ব নিশ্চিত করে ফেলেছে তারা, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ হতে যাচ্ছে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের সামনে পেয়ে এই ছোট্ট দলটির মনে কোনো ভয় বা শঙ্কা নেই, বরং এক বুক রোমাঞ্চ নিয়ে তারা মেতে উঠেছে ইতিহাস গড়ার উদযাপনে।
বিশ্বকাপের গ্রুপিং যখন চূড়ান্ত হয়েছিল, তখন এই গ্রুপ থেকে স্পেন ও উরুগুয়েকেই নকআউটের ফেভারিট ধরা হয়েছিল। কেউ কেউ সম্ভাবনা দেখেছিলেন সৌদি আরবেরও। কিন্তু কোনো গাণিতিক সমীকরণেই ছিল না কেপ ভার্দের নাম। অথচ বিশ্বমঞ্চে প্রথমবার পা রেখেই তারা চমকে দেয় ফুটবল বিশ্বকে। প্রথম ম্যাচে শক্তিশালী স্পেনকে ০-০ গোলে আটকে রাখার পর দ্বিতীয় ম্যাচে লাতিন শক্তি উরুগুয়ের সাথে ২-২ গোলে ড্র করে তারা। সবশেষে শনিবার সকালে সৌদি আরবের সাথে ড্র করে অপরাজিত থেকে নকআউট পর্বের টিকিট কাটে আফ্রিকার এই দেশটি।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের ৬৭ নম্বরে থাকা কেপ ভার্দের এই সাফল্য রূপকথাকেও হার মানায়। ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী দেশটির জনসংখ্যা মাত্র ৫ লাখ ৯৩ হাজার এবং তাদের জাতীয় স্টেডিয়ামের দর্শক ধারণক্ষমতা মোটে ১৫ হাজার। বিশ্বকাপের ইতিহাসে তৃতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নিলেও, নকআউট পর্বে পৌঁছানো ইতিহাসের সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম দেশ এখন কেপ ভার্দে। এর আগে ২০০৬ বিশ্বকাপে ঘানা ও ইউক্রেন নিজেদের অভিষেক আসরে গ্রুপ পর্ব পার করার নজির দেখিয়েছিল, ২০২৬ সালে এসে সেই তালিকায় নাম লেখাল কেপ ভার্দে।
এই স্বপ্নযাত্রার নেপথ্যের সবচেয়ে বড় নায়ক তাদের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভজিনিয়া। স্পেনের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সের পর সৌদি আরবের বিরুদ্ধেও তিনটি নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে দলের দুর্গ রক্ষা করেন তিনি। তবে নকআউটের প্রথম ধাপেই তাঁদের দিতে হবে জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। আগামী শনিবার বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টায় যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামি শহরে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হবে তারা। ইন্টার মায়ামিতে খেলার কারণে মায়ামি শহরটি এখন লিওনেল মেসির নিজের শহর হিসেবেই পরিচিত, আর সেখানেই মেসির জাদু রুখে দেওয়ার কঠিন মিশন কেপ ভার্দের সামনে।
অন্যদিকে কেপ ভার্দের এই ঐতিহাসিক উত্থানের রাতে চরম হতাশা নিয়ে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে লাতিন আমেরিকার শক্তিশালী দল উরুগুয়ে। দুই ড্র ও এক হারে মাত্র ২ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ পর্ব থেকেই ছিটকে গেছে দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। পাশাপাশি ১৯৯৪ আসরের পর টানা ষষ্ঠবারের মতো গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিতে হলো এশিয়ার পরাশক্তি সৌদি আরবকেও। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে পরের রাউন্ডে যাওয়া স্পেনের প্রতিপক্ষ এখনো চূড়ান্ত না হলেও, ফুটবল বিশ্বের সব চোখ এখন মায়ামির দিকে, যেখানে ডেভিড বনাম গোলিয়াথের লড়াইয়ে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হবে কেপ ভার্দে।
বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম দুই ম্যাচে ড্র করে বেশ চাপের মুখে ছিল শক্তিশালী বেলজিয়াম। তবে ভ্যাঙ্কুবারের মাঠে শনিবার ‘জি’ গ্রুপের শেষ রাউন্ডের বাঁচা-মরার লড়াইয়ে নিউজিল্যান্ডের ওপর আক্রমণের জোয়ার বইয়ে দিয়েছে রুডি গার্সিয়ার শিষ্যরা। গতিময় আর আগ্রাসী ফুটবলের প্রদর্শনীতে নিউজিল্যান্ডকে ৫-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নকআউট পর্বের টিকিট নিশ্চিত করেছে তারা। বেলজিয়ামের এই বড় জয়ের রাতে জোড়া গোল করেছেন লিয়ান্দ্রো ট্রসার্ড; এছাড়া একটি করে গোল এসেছে কেভিন ডে ব্রুইনে, রোমেলু লুকাকু ও আলেক্সিস সালমাইকের্সের পা থেকে।
ম্যাচের শুরু থেকেই নিউজিল্যান্ডকে চেপে ধরা বেলজিয়াম ২৮তম মিনিটে প্রথম গোলের দেখা পায়। কিউই ডিফেন্ডাররা কর্নার ক্লিয়ার করতে ব্যর্থ হলে গোলমুখে বল পেয়ে যান আর্সেনাল ফরোয়ার্ড ট্রসার্ড। অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় বল জালে জড়িয়ে দলকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন তিনি। এর আগে অবশ্য দ্বাদশ মিনিটে ট্রসার্ডের একটি শট গোললাইন থেকে প্রতিহত হয় এবং ২০তম মিনিটে ভিএআরের সাহায্যে বেলজিয়ামের একটি পেনাল্টির সিদ্ধান্ত বাতিল করেন রেফারি।
প্রথমার্ধে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকার পর দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই অর্থাৎ ৫০তম মিনিটে নিজের জোড়া গোল পূর্ণ করেন ট্রসার্ড। তাঁর প্রথম শট এক সতীর্থের গায়ে লেগে ফিরে আসলে ফিরতি শটে নিখুঁতভাবে লক্ষ্যভেদ করেন তিনি। ম্যাচের ৬৬তম মিনিটে স্কোরলাইন ৩-০ করেন মাঝমাঠের জেনারেল কেভিন ডে ব্রুইনে। ডি-বক্সের বাইরে থেকে তাঁর নেওয়া এক জাদুকরী আড়াআড়ি শট নিউজিল্যান্ডের গোলরক্ষককে পরাস্ত করে দূরের পোস্ট দিয়ে জালে জড়ায়।
ম্যাচের শেষ দিকে কিছুটা লড়াইয়ের আভাস দেয় নিউজিল্যান্ড। ৮৪তম মিনিটে কর্নার থেকে বেলজিয়ান গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়ার ফিস্ট করা বল পেয়ে যান অরক্ষিত এলিজা জাস্ট। তাঁর নেওয়া গতিময় শটটি জালে জড়ালে ব্যবধান ৩-১ এ কমায় কিউইরা। তবে নিউজিল্যান্ডের এই আনন্দ স্থায়ী হয়েছে মাত্র দুই মিনিট। ৮৬তম মিনিটে কর্নার থেকে এক বুলেট গতির হেডে গোল করে ব্যবধান ৪-১ করেন বদলি হিসেবে নামা অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার রোমেলু লুকাকু। এরপর ম্যাচের যোগ করা সময়ে লুকাকুর পাস থেকে বল পেয়ে জোরালো শটে নিউজিল্যান্ডের কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দেন সালমাইকের্স (৫-১)।
এই বড় জয়ের ফলে গ্রুপ পর্বের বাধা টপকে শেষ ৩২-এ জায়গা করে নিল বেলজিয়াম। অন্যদিকে, এবারের বিশ্বকাপে ফেরার আসরে মাত্র ১ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের তলানিতে থেকে বিদায় নিতে হলো নিউজিল্যান্ডকে। এই ম্যাচের আরেকটি বড় মাইলফলক ছিল বেলজিয়ান গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়ার। কিংবদন্তি এনজো শিফোকে (১৭ ম্যাচ) ছাড়িয়ে বেলজিয়ামের হয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ১৮টি ম্যাচ খেলার অনন্য নতুন রেকর্ড গড়েছেন এই রিয়াল মাদ্রিদ তারকা।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করেছে আরও পাঁচটি শক্তিশালী দল। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে মাঠে নামার আগেই পরবর্তী রাউন্ডে যাওয়ার টিকিট হাতে পেয়েছে মিসর, ইংল্যান্ড, ঘানা, পর্তুগাল এবং প্যারাগুয়ে।
এই পাঁচটি দলের প্রত্যেকেই এখন পর্যন্ত চার পয়েন্ট করে সংগ্রহ করেছে। মূলত গ্রুপ ‘এইচ’-এর শ্বাসরুদ্ধকর সমীকরণের প্রভাবেই তাদের এই অগ্রযাত্রা নিশ্চিত হয়েছে। ওই গ্রুপ থেকে মাত্র ৩ পয়েন্ট সংগ্রহ করেই রানার্স-আপ হিসেবে শেষ ৩২-এ পা রেখেছে কেপ ভার্দে।
গ্রুপ ‘এইচ’-এর এমন ফলাফলের কারণে নকআউট পর্বে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম পয়েন্টের সীমা চারে নেমে আসে। ফলে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচটি খেলার আগেই এই পাঁচ দলের রাউন্ড অব ৩২-এ অংশগ্রহণ গাণিতিকভাবে নিশ্চিত হয়ে যায়।
উল্লেখ্য, এই পাঁচ দেশের আগে আরও ১৯টি দল ইতোমধ্যে নকআউট পর্বের টিকিট নিশ্চিত করেছে। এই তালিকায় রয়েছে— মেক্সিকো, দক্ষিণ আফ্রিকা, সুইজারল্যান্ড, কানাডা, বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা, ব্রাজিল, মরক্কো, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, আইভরিকোস্ট, ইকুয়েডর, নেদারল্যান্ডস, জাপান, সুইডেন, ফ্রান্স, নরওয়ে, আর্জেন্টিনা ও কলম্বিয়া।
ইতিহাস গড়ার খুব কাছাকাছি পৌঁছেও শেষ পর্যন্ত আক্ষেপে পুড়তে হলো ইরানকে। ভিএআরের এক কঠিন সিদ্ধান্তে তাদের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। আর এই নাটকীয় ড্রয়ের সুবাদে তিন ম্যাচে পাঁচ পয়েন্ট সংগ্রহ করে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জায়গা করে নিয়েছে মিশর।
ম্যাচের শুরুতেই চমক দেখায় মিশর। খেলা শুরুর মাত্র ৫ মিনিটের মাথায় লিড নেয় তারা। মোহাম্মদ সালাহ বক্সের ভেতর থেকে তার ট্রেডমার্ক বাঁ-পায়ের বাঁকানো শট নিলেও তা গোলরক্ষক ঠেকিয়ে দেন। তবে ফিরতি বল পান সাবের; তার নেওয়া দুর্বল শটটি রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের ভিড় কাটিয়ে গোলরক্ষকের হাতের নিচ দিয়ে জালে জড়ায়। এটি বিশ্বকাপের ইতিহাসে মিশরের দ্রুততম গোল।
পিছিয়ে পড়ে সমতায় ফিরতে মরিয়া ইরান দ্রুতই একটি পেনাল্টি আদায় করে নেয়। আবদেলমোনেমের চ্যালেঞ্জে মেহেদী তারেমি বক্সে পড়ে গেলে রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজান। তবে তারেমির নেওয়া স্পট-কিকটি বাম দিকে দুর্দান্ত ডাইভে রুখে দিয়ে মিশরের ত্রাতা হয়ে দাঁড়ান গোলরক্ষক শোবেইর।
তবে ১৫ মিনিটের মাথায় ঠিকই সমতায় ফেরে ইরান। এজাতোলাহির জোরালো শট শোবেইর প্রতিহত করলেও রিবাউন্ড থেকে অত্যন্ত কঠিন কোণ দিয়ে বল জালে পাঠান রামিন রেজাইয়ান। প্রথম ম্যাচের পর এই ম্যাচেও গোল করে দলের আশা বাঁচিয়ে রাখেন তিনি। এটিও ইরানের বিশ্বকাপ ইতিহাসের দ্রুততম গোল হিসেবে রেকর্ড গড়েছে।
দ্বিতীয়ার্ধে ইরান প্রায় অসাধ্য সাধন করে ফেলেছিল। একটি ফ্রি-কিক থেকে উড়ে আসা বল মিশরীয় রক্ষণভাগ ক্লিয়ার করতে ব্যর্থ হলে সেটি জালে জড়িয়ে দেন খালিলজাদে। ইরান যখন উৎসবে মাতোয়ারা, তখনই বাধ সাধে ভিএআর। সূক্ষ্ম বিচার শেষে দেখা যায় খালিলজাদে অফসাইডে ছিলেন। ফলে গোলটি বাতিল হওয়ায় স্বপ্নভঙ্গ হয় ইরানিদের।
শেষ পর্যন্ত ১-১ ব্যবধানের ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়ে দুই দল। টানা তিন ম্যাচে ড্র করে ৩ পয়েন্ট পাওয়া ইরানের ভাগ্য এখন অলৌকিক কোনো সমীকরণের অপেক্ষায়। অন্যদিকে ৫ পয়েন্ট নিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ড নিশ্চিত করে ইতিহাস লিখল মিশর।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম দ্রুততম হ্যাটট্রিক করে নরওয়েকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে ফ্রান্স। ওসমানে ডেম্বেলের এই বিধ্বংসী পারফরম্যান্সের ওপর ভর করেই দাপটের সাথে গ্রুপ পর্ব শেষ করল ফরাসিরা।
ম্যাচটি ঘিরে কিলিয়ান এমবাপ্পে ও আর্লিং হালান্ডের দ্বৈরথ নিয়ে ব্যাপক উত্তেজনা থাকলেও, নরওয়েজিয়ান কোচ স্টেল সোলবাকেন সবাইকে চমকে দিয়ে ম্যানচেস্টার সিটি তারকা হালান্ডকে বদলি বেঞ্চে রাখার সিদ্ধান্ত নেন।
জিলেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে সপ্তম মিনিটেই ফ্রান্সকে লিড এনে দেন পিএসজি ফরোয়ার্ড ডেম্বেলে। ২০ মিনিটে তিনি ব্যবধান দ্বিগুণ করেন। ঠিক পরের মিনিটেই থেলো আসাগার্ডের গোলে নরওয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিলেও, ৩২ মিনিটের মাথায় নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করে তাদের সেই আশা ধূলিসাৎ করে দেন ডেম্বেলে।
এর আগে ১৯৫৪ সালে চেকোস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে অস্ট্রিয়ার হয়ে এরিচ প্রোবোস্ট বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম ২৪ মিনিটের মধ্যে হ্যাটট্রিক করেছিলেন, যা দ্রুততম হ্যাটট্রিকের রেকর্ড হিসেবে আজও অম্লান।
ইরাকের বিপক্ষে আগের ম্যাচেও গোলের দেখা পেয়েছিলেন ডেম্বেলে; ফলে টুর্নামেন্টে তার বর্তমান গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪-এ। তার এমন আগুনে ফর্মের কারণে ফরাসি অধিনায়ক ও দলের প্রাণভোমরা কিলিয়ান এমবাপ্পের ওপর থেকে প্রত্যাশার চাপ অনেকটাই লাঘব হয়েছে।
ম্যাচের শেষ দিকে ডিসায়ার ডুয়ে আরও একটি গোল করলে বড় জয় নিশ্চিত হয়। এই জয়ে তিন ম্যাচে পূর্ণ ৯ পয়েন্ট নিয়ে 'গ্রুপ-আই' এর শীর্ষ দল হিসেবে পরের রাউন্ডে পা রাখল ফ্রান্স। গ্রুপ পর্বে ফরাসিরা প্রতিপক্ষের জালে মোট ১০টি গোল উৎসব করেছে।
আগামী বৃহস্পতিবার নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে 'সেরা তৃতীয়' হওয়া একটি দলের বিপক্ষে শেষ ৩২-এর লড়াইয়ে মাঠে নামবে ফ্রান্স।
মাঠের পারফরম্যান্স উজ্জ্বল হলেও 'লেস ব্লুজ'দের জন্য সময়টা মানসিকভাবে কঠিন ছিল। মায়ের মৃত্যুজনিত কারণে প্রধান কোচ দিদিয়ের দেশ্যম ফ্রান্সে ফিরে যাওয়ায় দলের ডাগ-আউটের দায়িত্ব সামলান সহকারী কোচ গাই স্টিফান। বিশ্বকাপ শেষে ১৪ বছরের দীর্ঘ পথচলা শেষ করতে যাওয়া দেশ্যম শনিবার পুনরায় দলের সাথে যোগ দেবেন।
ম্যাচের ৫০ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করার সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করেন নরওয়ের জর্জেন স্ট্র্যান্ড লারসেন। তবে হারলেও তিন ম্যাচে ৬ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় দল হিসেবে নক-আউট পর্বে পৌঁছেছে নরওয়ে। আগের দুই ম্যাচে ইরাক ও সেনেগালকে হারানোয়, এই ম্যাচে পরীক্ষা-নিরীক্ষার অংশ হিসেবে ১০টি পরিবর্তন এনে একাদশ সাজিয়েছিলেন নরওয়েজিয়ান কোচ।
দলের সেরা তারকা হালান্ড ছাড়াও অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড ও স্ট্রাইকার আলেক্সান্দার সোরলোথকে এদিন বিশ্রামে রাখা হয়। আগামী মঙ্গলবার ডালাসে শেষ ৩২-এর ম্যাচে আইভরি কোস্টের মুখোমুখি হবে নরওয়ে।
ফ্রান্স একাদশে এদিন উইলিয়াম সালিবার পরিবর্তে সুযোগ পান ক্রিস্টাল প্যালেসের ম্যাক্সেন্স ল্যাক্রোয়িক্স। এছাড়া দলে ফেরানো হয় ডুয়ে, থিও হার্নান্দেজ ও অরেলিয়েন টিচুয়ামেনিকে।
ম্যাচটি এমবাপ্পের ক্যারিয়ারের ১০১তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ হলেও, মাঠের সবটুকু আলো কেড়ে নিয়েছেন হ্যাটট্রিকম্যান ডেম্বেলে।
ম্যাচের শুরুতেই ডেম্বেলেকে গোলের চমৎকার সুযোগ তৈরি করে দেন এমবাপ্পে। ডান প্রান্ত থেকে চমৎকার ড্রিবলিংয়ে ভেতরে ঢুকে নরওয়ের গোলরক্ষক এগিল সেলভিককে বোকা বানিয়ে বল জালে জড়ান তিনি।
পিএসজিতে কোচ লুইস এনরিকের অধীনে উইং ছেড়ে সেন্ট্রাল ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলা শুরু করার পর থেকেই যেন নতুনরূপে আবির্ভূত হয়েছেন ডেম্বেলে, যা তাকে ব্যালন ডি’অর জয়ের যোগ্য দাবিদার করে তুলেছে।
এদিনও ডান প্রান্ত ব্যবহার করে নরওয়ের রক্ষণভাগে ত্রাস সৃষ্টি করেন তিনি। তার দ্বিতীয় গোলটি আসে বাঁ পায়ের নিখুঁত ও বাঁকানো শটে, যা পোস্টের কোণা দিয়ে জালের ঠিকানা খুঁজে নেয়।
হাইড্রেশন বিরতির ঠিক পরেই রেঞ্জার্সের খেলোয়াড় আসগার্ড একটি গোল শোধ করে ব্যবধান কমান। ফরাসি রক্ষণের সাময়িক অসতর্কতাকে কাজে লাগিয়ে নিচু শটে গোলরক্ষক মাইক মেইগনানকে পরাস্ত করেন তিনি।
তবে ৩২ মিনিটের মাথায় আবারও সেই বাঁ পায়ের ম্যাজিক দেখান ডেম্বেলে। প্রায় একই ভঙ্গিতে নিচের কর্নারে বল পাঠিয়ে নিজের হ্যাটট্রিক সম্পন্ন করেন তিনি।
এই হ্যাটট্রিকের মাধ্যমে ফরাসি ফুটবলের কিংবদন্তিদের কাতারে নাম লেখালেন ডেম্বেলে। ফ্রান্সের হয়ে এর আগে বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করার কৃতিত্ব ছিল কেবল জাস্ট ফন্টেইন (১৯৫৮) এবং এমবাপ্পের (২০২২)।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই পেনাল্টি পেয়েছিল নরওয়ে। অস্কার ববকে বক্সের ভেতর হার্নান্দেজ ফাউল করলে রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজান। কিন্তু স্ট্র্যান্ড লারসেনের দুর্বল স্পট-কিকটি দুর্দান্ত দক্ষতায় প্রতিহত করেন ফরাসি গোলরক্ষক মাইক মেইগনান।
সবশেষে ম্যাচের যোগ করা সময়ে হেডের মাধ্যমে ফ্রান্সের চতুর্থ গোলটি করে নরওয়ের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন ডিসায়ার ডুয়ে।