নানা জল্পনা-কল্পনা শেষে মাঠে গড়াতে যাচ্ছে বিপিএলের ১১তম আসর। এর আগে ১০টি আসর অনুষ্ঠিত হলেও দেশের একমাত্র ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টের মান নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে। প্রতি আসরেই বিপিএল নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। অবস্থাদৃষ্ট এমন যে, বিপিএল মানে যেন ‘বিতর্ক প্রিমিয়ার লিগ’। ক্রিকেটারদের বেতন নিয়ে সমস্যা যেন প্রতি আসরের একটি স্বাভাবিক চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে দেশের পট-পরিবর্তনের ফলে পরিবর্তন এসেছে বিসিবিতেও। নতুন সভাপতি ফারুক আহমেদ এবার ঝেড়ে ফেলতে চান পুরনো সব বিতর্ক। উপহার দিতে চান উপভোগ্য একটি বিতর্কহীন বিপিএল। সেজন্য ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সহযোগিতা নিয়ে কাজ করছে বিসিবি। এবারের বিপিএলে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে টুর্নামেন্টের সঙ্গে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোয় এবং সেটি করা হচ্ছে খোদ প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পরিকল্পনা অনুযায়ী।
দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজ ও বিপিএল সামনে রেখে গতকাল মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়াম পরিদর্শন করেছেন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ। সভাপতি ফারুক আহমেদসহ বোর্ডের আরও কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে সভা করেছেন, যেখানে নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও উপস্থিত ছিলেন। সভায় নতুন বিপিএলের একটা প্রেজেন্টেশনও বিসিবির বিপিএল বিভাগ থেকে ক্রীড়া উপদেষ্টাকে দেখানো হয়েছে।
সভা শেষে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের সংবাদ সম্মেলনে ক্রীড়া উপদেষ্টা সাংবাদিকদের বলেন, ‘পরিবর্তিত সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে বিপিএলকে কীভাবে মানুষের সঙ্গে আরও সম্পৃক্ত করা যায়, সেটাই আমরা চেষ্টা করছি।’
বিপিএলের প্রতি দর্শকদের আগ্রহ আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিপিএলকে একটা টুর্নামেন্ট হিসেবে ভালোভাবে উপস্থাপন করতে চাই। বিসিবি অবশ্যই বড় ভূমিকাটা রাখবে। তবে আমার মনে হয়েছে, আমাদের মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা যেহেতু অলিম্পিকের মতো ইভেন্টের ডিজাইনে সাহায্য করতেন, তিনি সর্বশেষ অলিম্পিকেও বড় একটা ভূমিকা রেখেছেন, বিপিএলের মতো টুর্নামেন্টে আমরা যদি তার সেই অভিজ্ঞতা ব্যবহার না করি, সেটা দুর্ভাগ্যজনক হবে।’
এই চিন্তা থেকেই ক্রীড়া উপদেষ্টা সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে দেন বিসিবির কর্মকর্তাদের। যেখানে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস বিপিএলে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর এবং নতুনত্ব আনার তাৎক্ষণিক কিছু ধারণা দেন। সেসব নিয়েই একটা প্রাথমিক প্রেজেন্টেশন দাঁড় করায় বিসিবির বিপিএল বিভাগ। দুই-তিন দিনের মধ্যে এটা নিয়ে আবারও প্রধান উপদেষ্টার সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে বিসিবি ঠিক করবে চূড়ান্ত পরিকল্পনা।
আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘বিপিএলকে কীভাবে আন্তর্জাতিকভাবে আরও স্বীকৃত করা যায় এবং কী কী নতুনত্ব যুক্ত করা যায়, তা থেকে বিসিবি আজ একটা প্রেজেন্টেশন দিয়েছে। দিন দুয়েকের মধ্যে আমরা আবারও বসব। আমরা চাই এবারের বিপিএলটাকে নতুন করে সাজাতে এবং এবারের বিপিএল যেন আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেটে নতুন উদ্দীপনা নিয়ে আসে।’
নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ডকে থামানো যেকোনো রক্ষণভাগের জন্যই এক বিরাট পরীক্ষা। তবে নকআউট পর্বের মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে এই গোলমেশিনকে আটকে দিয়ে বড়সড় একটা চমক দেখাতে চায় আইভরিকোস্ট। আফ্রিকান পরাশক্তিরা ভালো করেই জানে, হালান্ডকে একটু জায়গা দিলেই ম্যাচের চিত্র বদলে যেতে পারে। তাই এই নরওয়েজিয়ান ফরোয়ার্ডের ওপর কড়া পাহারা বসাতে বিশেষ রক্ষণাত্মক ছক কষছে আইভরিকোস্টের কোচ। হালান্ডকে নিষ্ক্রিয় রেখে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়াই আইভরি কোস্টের মূল লক্ষ্য।
ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর লড়াইয়ে ডালাসে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে আইভরিকোস্ট ও নরওয়ে। এটি কেবল নকআউট পর্বের একটি সাধারণ ম্যাচ নয়, বরং দুই মহাদেশের দুই ভিন্ন ঘরানার ফুটবলের এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। একদিকে থাকবে আফ্রিকার গতি, আবেগ ও নতুন স্বপ্ন; অন্যদিকে উত্তর ইউরোপের দীর্ঘ অপেক্ষা, ধৈর্য এবং নতুন করে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করার শপথ। আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে এর আগে কখনো এই দুই দলের দেখা হয়নি, তাই কোনো অতীত বা হিসাব-নিকাশ ছাড়াই ডালাসের মাঠে সরাসরি নকআউটের এই রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে নামবে দুই দল।
আইভরিকোস্ট এবার বিশ্বকাপে এসেছে এমন এক ইতিহাস বদলানোর জেদ নিয়ে, যেখানে বহুবার তারা বড় আসরে এসেও দরজার সামনে থেকে ফিরে গেছে। ২০০৬, ২০১০ ও ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে দিদিয়ের দ্রগবার মতো লিজেন্ডারি ফুটবলারদের সোনালি প্রজন্ম যা করতে পারেনি, এবার ঠিক সেই অসাধ্য সাধন করে প্রথমবারের মতো নকআউটের টিকিট কেটেছে তাদের নতুন প্রজন্ম। গ্রুপ পর্বে ইকুয়েডরকে ১–০ গোলে হারিয়ে শুরু করার পর জার্মানির কাছে ২–১ গোলে হারলেও, শেষ ম্যাচে কুরাসাওকে ২–০ গোলে হারিয়ে ইতিহাস গড়ে তারা। নিকোলাস পেপের জোড়া গোল, আমাদ দিয়ালোর গতি আর আঞ্জ–ইওয়ান বনির বুদ্ধিদীপ্ত ফুটবলে আইভরিকোস্ট এখন কোনো একক তারকার ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং এক দুর্দান্ত দলগত শক্তির নাম।
অন্যদিকে, ১৯৯৮ সালের পর দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে বড় টুর্নামেন্টের বাইরে থাকা নরওয়ে এবার বিশ্বমঞ্চে ফিরেছে নতুন মুখ আর পুরোনো ক্ষুধা নিয়ে। গ্রুপ পর্বে তাদের যাত্রা ছিল ভয়ংকর। ইরাককে ৪–১ ও সেনেগালকে ৩–২ গোলে হারিয়ে আগেই নকআউট নিশ্চিত করায়, শেষ ম্যাচে ফ্রান্সের বিপক্ষে মূল একাদশের অনেককে বিশ্রাম দিয়ে ১-৪ ব্যবধানে হারে তারা। টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত ৮টি গোল করা নরওয়ের আক্রমণভাগ যতটা ভয়ংকর, ৭ গোল হজম করা রক্ষণভাগ ঠিক ততটাই নড়বড়ে। আর নরওয়ের রক্ষণের এই দুর্বলতাই আইভরিকোস্টের সবচেয়ে বড় আশার জায়গা।
তবে নরওয়ের তুরুপের তাস তাদের স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড, যিনি একাই পুরো ম্যাচের চিত্র বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। প্রথম দুই ম্যাচেই চার গোল করে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা হালান্ডকে শেষ ম্যাচে বিশ্রাম দেওয়া হয়েছিল, তাই ডালাসে তিনি ফিরছেন পুরোপুরি সতেজ হয়ে। অন্যদিকে, আইভরিকোস্টের রক্ষণভাগও এবার বেশ পরিণত; তিন ম্যাচে তারা হজম করেছে মাত্র দুই গোল। জার্মানির মতো পরাশক্তিও তাদের রক্ষণ সহজে ভাঙতে পারেনি। মঙ্গলবারের এই মহারণে আইভরিকোস্টের রক্ষণের মূল ভরসা ওসমান দিয়োমান্দের সামনে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে হালান্ডকে থামানো। কার মুখে ফুটবে শেষ হাসির রেখা, তা দেখতেই এখন মুখিয়ে আছে ফুটবল বিশ্ব।
বিশ্বকাপে মাত্র দুটি ম্যাচ খেলেই বিশ্বমঞ্চ কাঁপিয়ে ৪টি গোল করেছেন হালান্ড। দীর্ঘ প্রায় তিন দশক (২৮ বছর) পর বিশ্বকাপে ফিরে প্রথম ম্যাচেই ইরাকের বিপক্ষে জোড়া গোল এবং পরের ম্যাচে সেনেগালের বিপক্ষেও জোড়া গোল করে গ্রুপ পর্ব শেষ হওয়ার আগেই নরওয়ের শেষ ১৬-র টিকিট নিশ্চিত করেন তিনি। নকআউট পর্বের মহালড়াইয়ের আগে দলের প্রধান তারকাকে সতেজ ও চোটমুক্ত রাখতে ফ্রান্সের বিপক্ষে শেষ গ্রুপ ম্যাচে তাকেসহ প্রথম একাদশের প্রায় ১০ জন নিয়মিত খেলোয়াড়কে পুরোপুরি বিশ্রামে রেখেছিলেন নরওয়ের মাস্টারমাইন্ড কোচ স্টালে সোলবাক্কেন। সোলবাক্কেন জানান, সেনেগালের বিপক্ষে কঠিন লড়াইয়ের পর মাঝমাঠ ও রক্ষণের ক্লান্তি দূর করতেই এই সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
অন্যদিকে, আইভরিকোস্টের প্রধান কোচ এমের্স ফায়ে খুব ভালো করেই জানেন যে ডালাসের মাঠে তাঁদের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হবে হালান্ডকে বলের জোগান থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা। নরওয়েজিয়ান এই স্ট্রাইকারকে বোতলবন্দি করার গুরুদায়িত্ব থাকবে আইভরি কোস্টের ২২ বছর বয়সী উদীয়মান ডিফেন্ডার ওসমান দিয়োমান্দের কাঁধে, যাকে দলে ভেড়াতে ইতিমধ্যেই ইউরোপের নামী-দামি ক্লাবগুলো উঠেপড়ে লেগেছে।
তবে শুধু রক্ষণেই ডিফেনসিভ ব্লক তৈরি করে বসে থাকতে রাজি নন কোচ ফায়ে। প্রতিপক্ষ নরওয়েকে শুরু থেকেই চাপে রাখতে তিনি আক্রমণভাগে তার প্রতিভাবান ফুটবলারদের পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে চান। আইভরি কোস্টের আক্রমণভাগে রয়েছেন দুর্দান্ত ফর্মে থাকা অভিজ্ঞ নিকোলা পেপে, যিনি কুরাসাওয়ের বিপক্ষে গত ম্যাচে জোড়া গোল করে দলকে জেতান। এছাড়াও তরুণ ইয়ান দিয়োমান্দে এবং ফ্রান্সের নাগরিকত্ব ছেড়ে আইভরিকোস্টের জার্সিতে খেলতে আসা আঁজে-ইওয়ান বনি নরওয়ে শিবিরের জন্য বড় হুমকি হতে পারেন।
দলগত শক্তি নিয়ে আত্মবিশ্বাসী কোচ এমের্স ফায়ে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমাদের স্কোয়াডে গোল করার দায়িত্ব কোনো একক ফুটবলারের কাঁধে অর্পিত নয়। দলে প্রায় ৯ জন ভিন্ন ফরোয়ার্ড রয়েছেন যারা যেকোনো মুহূর্তে গোল করতে পারেন। প্রতিপক্ষ কখনোই বুঝতে পারে না যে আক্রমণটা ঠিক কোন দিক থেকে আসবে। এমনকি আমাদের বদলি বেঞ্চের খেলোয়াড়রাও ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।’
ডালাসের তীব্র গরম নিয়ে নরওয়ে শিবিরে কিছুটা উদ্বেগ থাকলেও দিনের ম্যাচটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হওয়ায় স্বস্তিতে রয়েছে দুই দলই। একদিকে সতেজ হয়ে ফেরা হলান্ডের বিধ্বংসী গোল করার ক্ষুধা, অন্যদিকে আইভরি কোস্টের জমাট ডিফেন্স ও ভারসাম্যপূর্ণ আক্রমণ—সব মিলিয়ে বিশ্বমঞ্চে শেষ আটের টিকিট কাটার এই লড়াই একটি ধ্রুপদী ফুটবল ম্যাচেরই আভাস দিচ্ছে।
কিলিয়ান এমবাপ্পে মানেই মাঠে গতির ঝড় আর প্রতিপক্ষ রক্ষণভাগের জন্য এক চরম আতঙ্ক। বিশ্বকাপের মঞ্চে এবার এই ফরাসি গতিদানবকে বোতলবন্দি করতেই সব ছক কষছে সুইডেন। ফরাসি ফরোয়ার্ডের অতিমানবীয় গতি আর ড্রিবলিং দক্ষতা ম্যাচের যেকোনো মুহূর্তে ভাগ্য বদলে দিতে পারে, যা ভালো করেই জানা আছে সুইডিশ শিবিরের। তাই মাঠে নামার আগে কিলিয়ান এমবাপ্পেকে আটকানোর জন্য বিশেষ রণকৌশল সাজাচ্ছে তারা। পুরো ম্যাচজুড়ে এই ফরাসি তারকার ওপর কড়া নজরদারি রাখাই এখন সুইডেনের মূল লক্ষ্য।
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে অপ্রতিরোধ্য গতিতে নকআউট পর্বে পা রেখেছে ফ্রান্স। তবে মঙ্গলবার রাউন্ড অব ৩২-এর মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে সুইডেনের মুখোমুখি হওয়ার আগে ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশম-কে তার দলের বাম প্রান্তের কিছু দুর্বলতা ও জটিলতা সমাধান করতে হচ্ছে। গ্রুপ ‘আই’ থেকে সেনেগাল, ইরাক ও নরওয়েকে হারিয়ে শতভাগ জয় এবং ১০টি গোল নিয়ে শীর্ষে থেকে নকআউটে এসেছে ‘লে ব্লুজ’রা। কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে এবং মাইকেল অলিসের সমন্বয়ে গড়া ফ্রান্সের ফরোয়ার্ড লাইনকে এই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বিধ্বংসী আক্রমণভাগ বলা হচ্ছে।
তবে আক্রমণের ডান প্রান্ত যতটা ধারালো, বাম প্রান্তে ততটাই অস্থিতিশীলতা লক্ষ্য করা গেছে। লেফট ব্যাক পজিশনে থিও হার্নান্দেজ পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য পারফরম্যান্স দেখাতে না পারায় সুইডেনের বিপক্ষে লুকাস দিনিয়েকে শুরুর একাদশে দেখা যেতে পারে, যিনি রক্ষণভাগে বাড়তি নিরাপত্তা ও নিখুঁত ক্রস জোগাতে ওস্তাদ। অন্যদিকে, আক্রমণভাগের বাম প্রান্তে দেজিরে দুয়ের জায়গায় উইঙ্গার ব্র্যাডলি বারকোলাকে নামানোর পরিকল্পনা করছেন দেশম। বারকোলার গতি, ড্রিবলিং ও ট্রানজিশনে দ্রুত নিচে নেমে আসার ক্ষমতা অলিস-এমবাপ্পে-দেম্বেলে ত্রয়ীর পাশে ফ্রান্সের আক্রমণকে আরও বেশি সুসংহত করবে। এছাড়া সেন্ট্রাল ডিফেন্সে উইলিয়াম সালিবার প্রত্যাবর্তন ফরাসি রক্ষণভাগে বড় স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে।
সুইডেন মূলত রক্ষণাত্মক ও শারীরিক ফুটবল খেলার জন্য পরিচিত। গ্রুপ ‘এফ’ থেকে নেদারল্যান্ডসের পেছনে থেকে রানার্স-আপ হয়ে নকআউটে এসেছে তারা। প্রথম ম্যাচে তিউনিসিয়াকে ৫-১ গোলে হারিয়ে দারুণ সূচনা করলেও, পরের ম্যাচে ডাচদের কাছে ৫-১ গোলে বিধ্বস্ত হয় এবং শেষ ম্যাচে জাপানের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে। সুইডিশ শিবিরে আলেকজান্ডার ইসাক, ভিক্টর গিওকেরেস এবং অ্যান্থনি ইলাঙ্গার মতো তারকা থাকলেও ফরাসি ডিফেন্সকে ফাঁকি দিয়ে কাউন্টার অ্যাটাকে গোল বের করা তাদের জন্য বেশ কঠিন হবে।
সুইডেনের বিপক্ষে ফ্রান্সের শক্তিমত্তা নিয়ে ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি ফুটবলার গ্যারি লিনেকার ফরাসি ক্রীড়া দৈনিক ‘লেকিপ’কে বলেন, ‘আমি সুইডেনের অঘটন ঘটানোর কোনো সম্ভাবনা দেখছি না। সুইডেনের ইসাক বা গিওকেরেসরা ভালো ফুটবলার হতে পারে, কিন্তু ফ্রান্সের যে ফায়ারপাওয়ার বা গোল করার ক্ষমতা, তার ধারেকাছেও তারা নেই। হ্যাঁ, চারজন পিওর ফরোয়ার্ড নিয়ে খেললে ফ্রান্স কাউন্টার অ্যাটাকে কিছুটা ঝুঁকিতে পড়তে পারে, যেমনটা গত শুক্রবার নরওয়ের দ্বিতীয় সারির দলের বিপক্ষে দেখা গেছে। কিন্তু দিনশেষে ফ্রান্স প্রতিপক্ষের চেয়ে অনেক বেশি গোল করার সামর্থ্য রাখে।’
নকআউট পর্বের এই বাঁচা-মরার লড়াইয়ে ফ্রান্স যদি আজ সুইডেনকে পরাজিত করতে পারে, তবে শেষ ষোলো বা রাউন্ড অব ১৬-এর মঞ্চে তারা জার্মানি বনাম প্যারাগুয়ে ম্যাচের জয়ী দলের মুখোমুখি হবে। ২০১৪ সালের পর (২০২২ ফাইনালের টাইব্রেকার বাদে) বিশ্বকাপে আর কোনো নকআউট ম্যাচ না হারা ফ্রান্স আজ মাঠের লড়াইয়ে নিজেদের ফেভারিট হিসেবেই প্রমাণ করতে নামবে।
গ্রুপ পর্বেই ১০ গোল, এমবাপ্পে-দেম্বেলে-অলিসে ত্রয়ীর বিধ্বংসী রূপ দেখার অপেক্ষায় বিশ্ব
উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের ৩ ম্যাচে ১০ গোল দিয়ে প্রতিপক্ষ দলগুলোর বুকে কাঁপন ধরিয়েছে ফ্রান্স। তবে ফরাসি শিবিরের জন্য সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং প্রতিপক্ষের জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্কের বিষয় হলো— তাদের প্রধান আক্রমণভাগ ‘ত্রয়ী’ অর্থাৎ কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে এবং মাইকেল ওলিস এখনো পর্যন্ত কোনো ম্যাচে একসাথে নিজেদের শতভাগ উজার করে জ্বলে উঠতে পারেননি! কাগজে-কলমে এই তিন ফরোয়ার্ডের একসাথে সামর্থ্যের চূড়ায় পৌঁছানো বাকি থাকলেও, সাবেক সুইডিশ কিংবদন্তি তারকা জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচের দৃষ্টিতে এই ফ্রান্স দল এখনই যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্য অত্যন্ত ‘পরিপূর্ণ’ এবং ‘ভয়ঙ্কর’।
চলতি বিশ্বকাপে কিলিয়ান এমবাপ্পে একাই করেছেন ৪টি গোল। অন্যদিকে, নরওয়ের বিপক্ষে হ্যাটট্রিকসহ উসমান দেম্বেলের গোলসংখ্যাও এখন ৪। এছাড়া ব্র্যাডলি বারকোলা ও দেশির দুয়ে একটি করে গোল করেছেন। গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলোতে দেখা গেছে, এই ত্রয়ীর এক-একজন এক-একটি ম্যাচে আলো ছড়াচ্ছেন। সেনেগালের বিপক্ষে ওলিস ছিলেন আক্রমণের মূল কারিগর এবং এমবাপ্পের সঙ্গে তার বোঝাপড়া ছিল চমৎকার, যেখানে দেম্বেলে কিছুটা ধুঁকছিলেন। আবার চার দিন পর ইরাকের বিপক্ষে দেম্বেলে ফর্মে ফেরার ইঙ্গিত দেন এবং সবশেষ নরওয়ে ম্যাচে হ্যাটট্রিক করে পাদপ্রদীপের সব আলো নিজের দিকে টেনে নেন।
ফ্রান্সের হেড কোচ দিদিয়ে দেশম এখন পর্যন্ত তিন ফরোয়ার্ডকে একই ম্যাচে একসাথে সেরা ফর্মে না পেলেও, দে শঁ-র দল স্বাচ্ছন্দ্যেই ৯ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা হয়ে নকআউটে এসেছে। এর কারণ, এই ত্রয়ীর মধ্যে কেউ একজন কোনো ম্যাচে কিছুটা ম্রিয়মাণ থাকলে, বাকি দুজন দারুণভাবে সেই কমতি পুষিয়ে দিচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই ত্রয়ী যদি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসাথে জ্বলে ওঠে, তবে ফ্রান্সের আক্রমণভাগ একই সাথে সৃষ্টিশীল, ধারাল ও ক্ষিপ্র গতিসম্পন্ন হয়ে উঠবে। এমবাপ্পের ক্লান্তিহীন ছোটাছুটি ও ভীতি, দেম্বেলের অতিমানবীয় গতি এবং ওলিসের ধীরস্থির ও নিখুঁত রক্ষণচেরা পাস যেকোনো ডিফেন্সকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
তবে এই অপ্রতিরোধ্য ফ্রান্সেরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা ইব্রাহিমোভিচও উল্লেখ করেছেন। তেড়েফুঁড়ে আক্রমণে ওঠার মানসিকতার কারণে ফুলব্যাকরা ওপরে উঠে যাচ্ছেন, ফলে প্রতিপক্ষ দলগুলো কাউন্টার অ্যাটাকের সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। আক্রমণভাগের অতিরিক্ত স্বাধীনতার কারণে মাঝমাঠে অহেলিয়া চুয়ামেনি, মানু কোনো কিংবা আদ্রিওঁ রাবিওঁদের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ছে। তবে মুহূর্তের মধ্যে ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেওয়ার মতো আক্রমণভাগ থাকায়, আক্রমণের স্বার্থে রক্ষণের এই সামান্য নিরাপত্তা বিসর্জন দিতেও দ্বিধা করছেন না কোচ দে শঁ।
মঙ্গলবার শেষ বত্রিশের নকআউট ম্যাচে ফ্রান্সের মুখোমুখি হচ্ছে জ্লাতানের নিজের দেশ সুইডেন। নিজের প্রিয় মাতৃভূমি হলেও ইব্রাহিমোভিচ বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে প্রতিপক্ষকে সমীহ করছেন। সুইডেনের বাধা পেরোতে পারলে শেষ ষোলোর মঞ্চে ফ্রান্সের সামনে পড়তে পারে শক্তিশালী জার্মানি। তবে ফরাসিদের এই ভয়ঙ্কর ত্রয়ী যদি নিজেদের সেরাটা একসাথে মেলাতে পারে, তবে সামনে যে দলই আসুক না কেন— ফ্রান্সকে আটকানো বিশ্বফুটবলে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
মুখোমুখি লড়াইয়ের সামগ্রিক পরিসংখ্যান:
ফুটবল ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলতে এসেই রূপকথা লিখে ‘রাউন্ড অব ৩২’-এর নকআউট পর্বে জায়গা করে নিয়েছে আফ্রিকার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। স্পেন, উরুগুয়ে এবং সৌদি আরবের মতো বিশ্বফুটবলের চেনা পরাশক্তিদের গ্রুপ পর্বে আটকে দিয়ে নকআউট নিশ্চিত করা এই দলটি এখন টুর্নামেন্টের অন্যতম বড় চমক। তবে আগামী ৪ জুলাই মায়ামির মাঠে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে হাইভোল্টেজ নকআউট ম্যাচে মাঠে নামার আগেই লিওনেল মেসিকে কেন্দ্র করে এক দারুণ ও আবেগঘন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন কেপ ভার্দের প্রেসিডেন্ট হোসে মারিয়া নেভেস। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে মাঠের লড়াইয়ের আগে তিনি আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসিকে কেপ ভার্দে জাতীয় দলের ‘১০ নম্বর’ জার্সি বিশেষ উপহার হিসেবে দেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন।
আর্জেন্টিনার জনপ্রিয় রেডিও স্টেশন ‘রেডিও সুপার দেপোর্তিভো’-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট হোসে মারিয়া নেভেস এই ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন যে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে লিওনেল মেসিকে সর্বোচ্চ সম্মান জানাতে তাঁদের জাতীয় দলের পক্ষ থেকে মেসির জন্য একটি বিশেষ ১০ নম্বর জার্সি নিশ্চিত করতে তিনি ব্যক্তিগতভাবে সব ধরনের চেষ্টা চালাবেন।
আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ডের প্রতি নিজের ও নিজ দেশের মানুষের অগাধ মুগ্ধতার কথা জানিয়ে কেপ ভার্দের প্রেসিডেন্ট আরও বলেন যে মেসি কোটি মানুষের জন্য এক মহান অনুপ্রেরণা। কেপ ভার্দেতে তিনি অত্যন্ত সম্মানিত এবং সেখানকার সিংহভাগ ফুটবলপ্রেমীর কাছে তিনিই ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়। মেসির ফুটবলশৈলীকে তিনি ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্ব, নিখুঁত রূপ এবং বিশ্ব ফুটবলের সেরা প্রতিচ্ছবি হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
চলতি বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের নকআউটে আসার পথটি মোটেও সহজ ছিল না। তবে গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার দূরদর্শী নেতৃত্ব ও অতিমানবীয় সব সেভের ওপর ভর করে গ্রুপ পর্বে নিজেদের প্রথম ম্যাচে পরাশক্তি স্পেনকে ০-০ গোলে রুখে দেয় তারা। এরপর লাতিন জায়ান্ট উরুগুয়ের বিপক্ষে ২-২ এবং সৌদি আরবের সঙ্গে ০-০ গোলে ড্র করে অন্যতম সেরা তৃতীয় স্থান অধিকারী দল হিসেবে নকআউটের টিকিট কাটে। আগামী ৪ জুলাই বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টায় বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিরুদ্ধে মাঠের অসম লড়াইয়ে নামার আগে মেসির প্রতি কেপ ভার্দের এই ভালোবাসার বার্তা ম্যাচটিতে অন্যরকম এক সম্প্রীতির আমেজ তৈরি করেছে।
ব্রাজিলের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের নাটকীয় গোল হজম করে ২-১ ব্যবধানে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়ার পর এক নজিরবিহীন ও আবেগঘন মুহূর্তের জন্ম দিলেন জাপানের প্রধান কোচ হাজিমে মরিয়াসু। সোমবার টেক্সাসের হিউস্টন স্টেডিয়ামে রেফারি শেষ বাঁশি বাজানোর পর জাপানি শিবিরে যখন কান্নার রোল, তখন কোচ মরিয়াসু মাঠের মধ্যেই নিজের সব খেলোয়াড়কে গোল হয়ে একত্র করেন। এরপর ভরা গ্যালারি ও ক্যামেরার সামনে মাথা নিচু করে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে জাপানের জনগণের কাছে ক্ষমা চান তিনি।
ম্যাচ শেষে নিজের আবেগ ধরে রেখে মরিয়াসু বলেন যে তিনি গভীরভাবে দুঃখিত কারণ তাঁরা দেশের সবাইকে এই জয় উপহার দিতে পারেননি। একজন কোচ হিসেবে এই হারের পুরো দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে তিনি সবার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। একই সঙ্গে হিউস্টনের স্টেডিয়ামে এসে সমর্থন করা অসংখ্য জাপানি সমর্থকের পাশাপাশি জাপান ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে গভীর রাত জেগে টেলিভিশন বা ইন্টারনেটে খেলা দেখা কোটি ভক্তকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান তিনি।
বিশ্বকাপের অফিশিয়াল আন্তর্জাতিক সম্প্রচারে দেখা যায় যে মরিয়াসু খেলোয়াড়দের উদ্দেশে কিছু অনুপ্রেরণামূলক কথা বলেন এবং বক্তব্য শেষ করে প্রথাগত জাপানি কায়দায় সবার সামনে মাথা নত করেন। কোচের এমন বিনয় ও সততা দেখে অশ্রুসিক্ত খেলোয়াড়রা করতালির মাধ্যমে তাঁকে বিশেষ সম্মান জানান। উল্লেখ্য যে মরিয়াসু ২০১৮ বিশ্বকাপের পর থেকে টানা আট বছর ধরে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে জাপান জাতীয় দলের প্রধান কোচের দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
ম্যাচ-পরবর্তী আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় মরিয়াসু আরও বলেন যে রাউন্ড অব ৩২-এর এই পর্যায়ে এসে তাঁদের বিশ্বকাপ যাত্রা শেষ হয়ে যাওয়াটা সত্যিই খুব হতাশাজনক। তবে এই ম্যাচে খেলোয়াড়রা মাঠে নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। টুর্নামেন্টের এই পর্যন্ত পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি দিন ফুটবলাররা পুরো প্রক্রিয়াটিকে গুরুত্ব দিয়েছে এবং অসাধারণ নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছে। কোচিং স্টাফ ও পুরো সাপোর্ট টিমও এই পুরো যাত্রায় সর্বোচ্চ নিবেদন দেখিয়েছে এবং তাঁদের সাধ্যের মধ্যে যা কিছু ছিল, সবই তাঁরা করেছেন। মরিয়াসু পরিশেষে জানান যে যদিও এখন তাঁরা ভীষণ হতাশ, তবুও এই ফলাফলকে মেনে নিয়ে ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসার প্রেরণায় রূপ দিতে চান তাঁরা।
বিশ্বকাপ ফুটবলের মূলমঞ্চে লাল-সবুজের জার্সি না থাকলেও, গ্যালারি আর রাজপথের উন্মাদনায় বাংলাদেশের নাম এখন বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। বিশেষ করে লাতিন আমেরিকার দুই পরাশক্তি আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের প্রতিটি ম্যাচের পর এদেশের সমর্থকদের বাঁধভাঙা উল্লাস আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত আলোচনার খোরাক জোগাচ্ছে। বাংলাদেশের এই ফুটবল সংবেদনশীলতার খবর এবার সরাসরি পৌঁছে গেছে খোদ ব্রাজিলিয়ান ও আর্জেন্টাইন তারকাদের কানে। আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজের পর এবার বাংলাদেশের সমর্থকদের প্রতি নিজের গভীর অনুরাগ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন ব্রাজিলের অতন্দ্র প্রহরী আলিসন বেকার।
জাপানের বিপক্ষে রুদ্ধশ্বাস জয়ের পর সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশি সাংবাদিকের উপস্থিতি টের পেয়ে আলিসন নিজেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে ওঠেন, ‘নাইচ, বাংলাদেশ!’ তিনি জানান, বাংলাদেশের মানুষের ফুটবল নিয়ে এই অভাবনীয় উন্মাদনার ভিডিও চিত্রগুলো তাঁর নজর কেড়েছে। সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আলিসন বেকার বলেন, ‘ধন্যবাদ বাংলাদেশ, আমাদের সমর্থনের জন্য। আমি বেশ কিছু ভিডিও দেখেছি। বাংলাদেশের মানুষদের আমি ধন্যবাদ দিতে চাই। ব্রাজিলিয়ানরা বাংলাদেশকে ভালোবাসে। ধন্যবাদ এত ভালোবাসা দেওয়ার জন্য। ঈশ্বর আপনাদের মঙ্গল করুক।’
যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে যখন জাপানের বিপক্ষে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি জয়সূচক গোলটি করেন, তখন বাংলাদেশে গভীর রাত। তবে সময়ের ব্যবধান এদেশের ফুটবলপ্রেমীদের আবেগে কোনো ভাটা ফেলতে পারেনি। ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বড় পর্দায় খেলা দেখতে ভিড় করেন হাজার হাজার মানুষ। প্রিয় দলের জয় নিশ্চিত হতেই মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে মিছিল ও উৎসবে মেতে ওঠেন ভক্তরা। এদেশের মানুষের এমন অকৃত্রিম ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ দেখে মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন ম্যাচ সেরা হওয়া ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার কাসেমিরোও।
উল্লেখ্য, এবারের আসরে জাপানের বিপক্ষে রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচে শুরুতে পিছিয়ে পড়ে কিছুটা অনিশ্চয়তায় ছিল সেলেসাওরা। তবে বিরতির পর কাসেমিরোর সমতাসূচক গোল এবং শেষ মুহূর্তে মার্তিনেল্লির লক্ষ্যভেদে শেষ ষোলো নিশ্চিত হয় পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের। মাঠের এই জয়ের পাশাপাশি বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের সমর্থকদের এই অকুণ্ঠ সমর্থন ব্রাজিলিয়ান শিবিরের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করছে। এর আগে আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজও বাংলাদেশের নাম শুনে একইভাবে তাঁর ভালোবাসার কথা জানিয়েছিলেন। এদেশের ফুটবল উন্মাদনা এখন আর কেবল ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা বিশ্ব ফুটবলের বড় তারকাদের হৃদয়েও বিশেষ স্থান করে নিয়েছে।
ফুটবল শুধু শিরোপার হিসাব নয়। এটি অনুভূতি, কল্পনা, সৃজনশীলতা, শিল্প আর দর্শকদের আনন্দ দেওয়ার এক অনন্য মাধ্যম। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ফুটবল সংস্কৃতির নাম ব্রাজিল। কারণ তারা শুধু ম্যাচ জেতেনি, ফুটবলকে নান্দনিকতার এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে একমাত্র দেশ হিসেবে ব্রাজিল পাঁচবার বিশ্বকাপ জিতেছে। ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪ এবং ২০০২ সালে তারা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরে অংশ নেওয়া একমাত্র দলও ব্রাজিল। ধারাবাহিকতা, সাফল্য এবং দীর্ঘ ঐতিহ্যের দিক থেকে তারা বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিধর দল।
তবে ব্রাজিলকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে শুধু পরিসংখ্যান নয়, তাদের খেলার ধরন। ছোট ছোট পাস, মনোমুগ্ধকর ড্রিবলিং, চোখধাঁধানো স্কিল, স্বতঃস্ফূর্ত আক্রমণ এবং ছন্দময় ফুটবল ব্রাজিলের পরিচয় হয়ে উঠেছে। অনেক ফুটবলপ্রেমীর কাছে ব্রাজিলের খেলা মানেই ফলাফলের পাশাপাশি সৌন্দর্যেরও উদযাপন।
বিশ্ব ফুটবলকে অসংখ্য কিংবদন্তি উপহার দিয়েছে ব্রাজিল। পেলে, গারিঞ্চা, জিকো, সক্রেটিস, রোমারিও, রোনালদো, রিভালদো, রোনালদিনিয়ো, কাকা এবং নেইমারের মতো তারকারা শুধু সাফল্যই এনে দেননি, ফুটবলকে আরও আকর্ষণীয় ও নান্দনিক করে তুলেছেন। তাদের খেলা বহু প্রজন্মের ফুটবলার ও সমর্থকদের অনুপ্রাণিত করেছে।
১৯৭০ সালের ব্রাজিল দলকে এখনও অনেক ফুটবল বিশ্লেষক ইতিহাসের সেরা জাতীয় দলগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করেন। সেই দলের আক্রমণাত্মক ও সৃজনশীল ফুটবল আজও আলোচনায় থাকে। একইভাবে ১৯৮২ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপ জিততে না পারলেও তাদের নান্দনিক ফুটবল এখনও ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে অম্লান। কারণ কিছু দল ট্রফির জন্য নয়, খেলার সৌন্দর্যের জন্যও ইতিহাসে স্থান করে নেয়।
ব্রাজিলের ফুটবল দর্শনের পেছনে রয়েছে তাদের সংস্কৃতি। সৈকত, বস্তি, খোলা মাঠ কিংবা ছোট গলিতে বল পায়ে বেড়ে ওঠে অসংখ্য শিশু। এই পরিবেশ থেকেই জন্ম নিয়েছে বিখ্যাত "জোগো বনিতো" বা "সুন্দর ফুটবল" দর্শন। সেখানে ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, বরং জীবনযাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
অবশ্যই বিশ্বের অন্যান্য ফুটবল শক্তিরও নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আর্জেন্টিনা আবেগ ও প্রতিভার জন্য, জার্মানি শৃঙ্খলা ও কার্যকারিতার জন্য, ইতালি রক্ষণাত্মক কৌশলের জন্য, স্পেন বল দখলভিত্তিক ফুটবলের জন্য এবং ফ্রান্স গতি, শক্তি ও আধুনিকতার জন্য সমানভাবে সমাদৃত।
ফুটবলের সর্বকালের সেরা দল কোনটি, তার নির্দিষ্ট উত্তর নেই। এটি অনেকটাই ব্যক্তিগত পছন্দ, সময় এবং দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করে। তবে ফুটবলকে শিল্প, আনন্দ এবং সৃজনশীলতার প্রতীক হিসেবে দেখলে ব্রাজিলের নাম নিঃসন্দেহে সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি।
ট্রফি একটি দলের সাফল্যকে পরিমাপ করে, কিন্তু একটি দল মানুষের হৃদয়ে কতটা গভীর ছাপ ফেলেছে, তা নির্ধারণ করে তাদের খেলার সৌন্দর্য। আর সেই সৌন্দর্যের ইতিহাসে ব্রাজিলের নাম চিরকালই উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
বিশ্বকাপ ফুটবলের আসরে নেদারল্যান্ডস ও মরক্কোর মধ্যকার লড়াইটি প্রত্যাশা অনুযায়ী এক চরম নাটকীয় ও রোমাঞ্চকর ম্যাচে পরিণত হয়েছিল। নির্ধারিত ৯০ মিনিট এবং অতিরিক্ত ৩০ মিনিটের লড়াইয়েও কোনো মীমাংসা না হওয়ায় ম্যাচটি টাইব্রেকারে গড়ায়। সেখানে ডাচদের ৩-২ ব্যবধানে পরাজিত করে শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করেছে আফ্রিকার সিংহ মরক্কো। গতবারের সেমিফাইনালিস্টদের এই জয়ে নেদারল্যান্ডসের বিশ্বকাপ স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেল।
ম্যাচের প্রথমার্ধ ছিল আক্রমণ আর পাল্টা আক্রমণে ঠাসা, তবে জালের দেখা পায়নি কোনো দলই। যদিও মরক্কো বেশ কিছু বিপজ্জনক সুযোগ তৈরি করেছিল, বিশেষ করে ইসমাইল সাইবারির একটি প্রচেষ্টা অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। দ্বিতীয়ার্ধে খেলার চিত্র বদলে যায় এবং ৭১তম মিনিটে কোডি গাকপোর গোলে লিড নেয় নেদারল্যান্ডস। সামারভিলের দুর্দান্ত এক আক্রমণ থেকে বল পেয়ে ফাউলের শিকার হওয়া সত্ত্বেও গাকপো বল জালে জড়াতে ভুল করেননি। ডাচরা যখন জয়ের সুবাস পাচ্ছিল, ঠিক তখনই ৯১তম মিনিটে বদলি খেলোয়াড় ঈসা দিওপ এক দুর্দান্ত হেডে মরক্কোকে সমতায় ফেরান।
অতিরিক্ত সময়েও দুই দলের লড়াই ছিল সমানে সমান। সুফিয়ান রাহিমির একটি নিশ্চিত গোল ডাচ গোলরক্ষক ভেরব্রুগেন অবিশ্বাস্যভাবে রুখে দিলে খেলা গড়ায় পেনাল্টি শ্যুটআউটে। টাইব্রেকারের শুরুটা নেদারল্যান্ডসের অনুকূলে থাকলেও সময়ের সাথে সাথে নাটকীয়তা বাড়তে থাকে। মরক্কোর ইয়াশিন বুনো গোলপোস্টের নিচে পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়ে সামারভিলের শট রুখে দিলে ডাচরা ব্যাকফুটে চলে যায়। অন্যদিকে মরক্কোর ইসমাইল সাইবারি শেষ শটে কোনো ভুল করেননি; তাঁর নিখুঁত লক্ষ্যভেদে ৩-২ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত হয় মরক্কোর।
এই জয়ের ফলে মরক্কো তাদের গত বিশ্বকাপের সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখল এবং প্রমাণ করল কেন তাদের ‘ডার্ক হর্স’ বলা হয়। অন্যদিকে, ম্যাচ জুড়ে আধিপত্য বজায় রেখেও শেষ মুহূর্তের অসাবধানতায় টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হলো নেদারল্যান্ডসকে। টাইব্রেকারের এই স্নায়ুচাপ জয় করে মরক্কোর জয়োল্লাস এখন বিশ্বজুড়ে ফুটবল ভক্তদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
ফুটবল বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর হাইভোল্টেজ ম্যাচে এশিয়ান পরাশক্তি জাপানের বিপক্ষে এক শ্বাসরুদ্ধকর জয় ছিনিয়ে নিয়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। হিউস্টন স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে ১-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে মাঠ ছাড়ে কার্লো আনচেলত্তির শিষ্যরা। ম্যাচের একেবারে অন্তিম মুহূর্তে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির করা নাটকীয় গোলটি জাপানের বিশ্বকাপ স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে সেলেসাওদের নকআউট পর্বের টিকিট এনে দেয়।
ম্যাচের শুরু থেকেই বলের নিয়ন্ত্রণ ও আক্রমণের দিক থেকে একক আধিপত্য বজায় রাখে ব্রাজিল। তবে জাপানের সুসংগঠিত ও জমাট রক্ষণভাগের সামনে বারবারই তাদের প্রচেষ্টাগুলো ব্যর্থ হচ্ছিল। খেলার গতির বিপরীতে গিয়ে ২৯তম মিনিটে স্তব্ধ হয়ে যায় ব্রাজিল শিবির। মাঝমাঠে বলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললে জাপানের কাইশু সানো সেই সুযোগ কাজে লাগান। একক নৈপুণ্যে কয়েকজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে ডি-বক্সের ঠিক বাইরে থেকে এক দর্শনীয় কোণাকুণি শটে বল জালে জড়ান তিনি। ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে প্রথমার্ধ শেষ করে সামুরাই ব্লুরা।
বিরতির পর গোল শোধে মরিয়া হয়ে ওঠে ব্রাজিল। আনচেলত্তি মাঠের কৌশলে পরিবর্তন এনে তরুণ প্রতিভা এন্দ্রিককে নামালে আক্রমণের ধার বহুগুণ বেড়ে যায়। ৫৬তম মিনিটে কাঙ্ক্ষিত সমতা ফেরায় ব্রাজিল। কর্নার থেকে সৃষ্ট জটলার মধ্যে অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার ক্যাসেমিরো এক নিখুঁত হেডে জাপানের জাল কাঁপান। ১-১ সমতায় ফেরার পর ব্রাজিল একের পর এক আক্রমণ শানাতে থাকে। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের একটি শট পোস্টে লেগে ফিরে আসলে হতাশ হতে হয় ভক্তদের। অন্যদিকে জাপানের গোলরক্ষক সুজুকি অবিশ্বাস্য কিছু সেভ করে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সমতা টিকিয়ে রাখেন।
ম্যাচ যখন নিশ্চিত ড্রয়ের দিকে এগোচ্ছিল এবং সবাই অতিরিক্ত সময়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনই ঘটে সেই রোমাঞ্চকর ঘটনা। যোগ করা সময়ের শেষ মিনিটে (৯৬ মিনিটে) জাপানি ডিফেন্ডার তানাকা নিজেদের বক্সের ঠিক বাইরে মারাত্মক এক ভুল করে বসেন। ব্রুনো গিমারায়েসের বাড়ানো থ্রু পাস ধরে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি বিদ্যুৎবেগে বক্সে ঢুকে পড়েন এবং ঠান্ডা মাথায় সুজুকিকে পরাস্ত করে লক্ষ্যভেদ করেন। পুরো স্টেডিয়াম তখন ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের বাঁধভাঙা উল্লাসে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।
এই জয়ের ফলে রাউন্ড অব সিক্সটিন বা শেষ ষোলোতে নিজেদের স্থান নিশ্চিত করল ব্রাজিল। সেখানে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে তাদের প্রতিপক্ষ হবে আইভরি কোস্ট অথবা নরওয়ে। পরাজয় সত্ত্বেও জাপানের লড়াকু ফুটবল বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়াচ্ছে, তবে শেষ মুহূর্তের সেই অসাবধানতাই তাদের টুর্নামেন্ট থেকে বিদায়ঘণ্টা বাজিয়ে দিল।
যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর শ্বাসরুদ্ধকর লড়াইয়ে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে স্তব্ধ করে শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করেছে প্যারাগুয়ে। মঙ্গলবার দিবাগত রাতে নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ের খেলা ১-১ গোলে ড্র থাকার পর টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নেয় লাতিন আমেরিকার দেশটি। এই হারের মাধ্যমে বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবার টাইব্রেকারে পরাজয়ের স্বাদ পেল জার্মানি, যেখানে এর আগের চারবারই তারা সফল ছিল। অন্যদিকে ২০১০ সালের পর আবারও পেনাল্টি শুটআউটে জয় দেখল প্যারাগুয়ে।
ম্যাচের শুরু থেকে জার্মানি আধিপত্য বজায় রেখে ৭৮ শতাংশ সময় বল নিজেদের দখলে রাখলেও প্যারাগুয়ের জমাট রক্ষণ ভাঙতে ব্যর্থ হয়। উল্টো ম্যাচের ৪২ মিনিটে প্রতিআক্রমণ থেকে গুস্তাভো গোমেজের ক্রসে হুলিও এনসিসোর দারুণ হেডে লিড নেয় প্যারাগুয়ে। এই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নিজেদের প্রথম গোলের ইতিহাস গড়ে দেশটি। বিরতির পর ৫৩ মিনিটে কাই হাভার্টজের একটি ক্রস সরাসরি জালে জড়ালে সমতায় ফেরে জার্মানি। এরপর জনাথন তাহ একবার বল জালে পাঠালেও ভিএআর প্রযুক্তিতে ফাউলের কারণে সেই গোল বাতিল করেন রেফারি।
পুরো ম্যাচে প্যারাগুয়ের জয়ের কারিগর ছিলেন তাদের গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিল। তিনি জার্মানদের একের পর এক আক্রমণ রুখে দিয়ে ম্যাচটিকে টাইব্রেকারে নিয়ে যান। সেখানেও বীরত্ব বজায় রেখে তিনি কাই হাভার্টজ এবং নিক ভোল্টেমেডের দুটি শট প্রতিহত করেন। যদিও সানাব্রিয়া এবং বালবুয়েনার শট লক্ষ্যভ্রষ্ট ও সেভ হওয়ায় ম্যাচটি ষষ্ঠ শট পর্যন্ত গড়ায়। জার্মানির ষষ্ঠ শটটি জনাথন তাহ গ্যালারিতে উড়িয়ে মারলে প্যারাগুয়ের সামনে জয়ের পথ খুলে যায়। হোসে মারিয়া কানালে কোনো ভুল না করে বল জালে জড়াতেই উৎসবে মাতে প্যারাগুয়ে।
অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তেও গিল দুর্দান্ত দক্ষতায় জার্মানিকে গোলবঞ্চিত রাখেন। নির্ধারিত সময়ের পর অতিরিক্ত ৩০ মিনিটেও কোনো গোল না হওয়ায় ম্যাচটি টাইব্রেকারে গড়ায়, যা ছিল চলতি বিশ্বকাপের প্রথম টাইব্রেকার। এই পরাজয়ের ফলে শিরোপাপ্রত্যাশী জার্মানিকে আসরের শেষ ৩২ থেকেই বিদায় নিতে হলো, আর অরল্যান্ডো গিলের অতিমানবীয় নৈপুণ্যে পরের রাউন্ডে পা রাখল প্যারাগুয়ে।
নকআউট শুরু হতেই বেড়েছে বিশ্বকাপের আমেজ। সেই আমেজে ঘি ঢালছে ব্রাজিল-জাপান লড়াই। আজ সোমবার (২৯ জুন) বাংলাদেশ সময় রাত ১১টায় হিউস্টন স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হবে দুই দল। ম্যাচের আগে আলোচনায় ব্রাজিলের প্রাণভোমরা নেইমার। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ১৫ মিনিটেই বুঝিয়েছেন কেন তিনি এখনও দলের বড় ভরসা।
তবে, নেইমারকে নিয়ে তেমন চিন্তিত নন জাপান তারকা কেন্তো শিওগাই। এই স্ট্রাইকারের মতে, নেইমার আর আগের মতো নেই। বরং, জাপান ভালো অবস্থানে আছে।
অনুশীলন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে কেন্তো বলেন, ‘নেইমার এখন আর আগের সেই অবস্থানে নেই। আমার মনে হয় আমরা এখন বেশ ভালো অবস্থানে আছি।’
ব্রাজিলেরও আর আগের সেই অবস্থা নেই বলে জানান কেন্তো। ‘অতীতে ব্রাজিল অনেক শক্তিশালী ছিল, কিন্তু এখন? আমার চোখে এখন ফ্রান্স খুব শক্তিশালী। আর্জেন্টিনাও তাই। সত্যি বলতে, ইদানীং ব্রাজিলকে নিয়ে তেমন একটা আলোচনা শুনি না’— যোগ করেন কেন্তো।
তাই বলে একেবারে ফেলে দিচ্ছে না ব্রাজিলকে। দল হিসেবে ব্রাজিলের মান ও শক্তির কথা স্বীকার করে কেন্তো বলেন, ‘ব্রাজিল এখনও শক্তিশালী দল। আমরা যদি জিততে পারি, তাহলে আমাদের দলের গতি আরও বৃদ্ধি পাবে।’
জাপানের বিপক্ষে ব্রাজিলের মুল লক্ষ্য শেষ ষোলো নিশ্চিত করা। এর বাইরে সেলেসাওদের জন্য এটি প্রতিশোধের মঞ্চও। দুই দলের সর্বশেষ দেখাটা সুখকর হয়নি ব্রাজিলের জন্য। এশিয়া সফরে এসে হেরে বসেছিল জাপানের বিপক্ষে। গত বছর অক্টোবরে টোকিওতে অনুষ্ঠিত সেই প্রীতি ম্যাচে জাপানের কাছে ৩-২ গোলে হেরেছিল ব্রাজিল।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ভুলের কোনো ক্ষমা নেই। কিন্তু ব্রাজিলের জন্য এই ম্যাচের গুরুত্ব শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। হিউস্টনে জাপানের বিপক্ষে মাঠে নামবে সেলেসাওরা। লক্ষ্য শুধু শেষ ষোলো নিশ্চিত করা নয়, এক বছর আগের সেই অপমানের জবাবও দেওয়া।
২০২৫ সালের অক্টোবরে টোকিওতে দুই দলের প্রীতি ম্যাচটি এখনও নিশ্চয়ই ভুলে যাননি ব্রাজিল সমর্থকরা। প্রথমার্ধে দাপট দেখিয়ে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়েছিল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। মনে হচ্ছিল, সহজ জয় নিয়েই ফিরবে তারা। কিন্তু বিরতির পর যেন সম্পূর্ণ পাল্টে যায় ম্যাচের চিত্র। ৩-২ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে প্রথমবারের মতো ব্রাজিলকে হারানোর স্বাদ পায় ব্লু সামুরাইরা।
এবারের বিশ্বকাপে অবশ্য ভিন্ন এক ব্রাজিলকে দেখা যাচ্ছে। প্রথম ম্যাচে মরক্কোর সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করলেও এরপর টানা দুই জয় তুলে নিয়ে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে সেলেসাওরা। আক্রমণভাগে দুর্দান্ত ছন্দে আছেন ভিনিসিয়াস জুনিয়র। ইতোমধ্যে চার গোল করে দলের সবচেয়ে বড় ভরসায় পরিণত হয়েছেন তিনি। দীর্ঘ তিন বছর চোটের কারণে জাতীয় দলের বাইরে থাকার পর ফিরেছেন নেইমারও। তার অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীলতা ব্রাজিলকে দিয়েছে বাড়তি শক্তি।
তবু জাপানকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। গ্রুপ পর্বে শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল খেলেই তারা জায়গা করে নিয়েছে নকআউটে। কোচ হাজিমে মোরিয়াসুও জানেন, এবার আরও ক্ষুধার্ত এক ব্রাজিলের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে তার দল। তাই ম্যাচের আগে সতর্কবার্তাও দিয়ে রেখেছেন তিনি।
এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় যুদ্ধটা হবে মাঝমাঠে। ব্রাজিল চাইবে দ্রুত বলের দখল নিয়ে উইং দিয়ে আক্রমণ গড়তে। ভিনিসিয়াস, রায়ান কিংবা ব্রাজিলের গতিময় ফরোয়ার্ডরা ভয়ংকর। বিপরীতে জাপানের শক্তি তাদের সংগঠিত ডিফেন্স, দ্রুত প্রেসিং এবং মুহূর্তের মধ্যে রক্ষণ থেকে আক্রমণে উঠে যাওয়ার ক্ষমতা।
কাগজে-কলমে ব্রাজিল এগিয়ে। তাদের ব্যক্তিগত প্রতিভা, বড় ম্যাচের অভিজ্ঞতা এবং আক্রমণের বৈচিত্র্য পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। তবে জাপান যদি নিজেদের শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল খেলতে পারে এবং ম্যাচটাকে দীর্ঘ সময় গোলশূন্য রাখতে পারে, তাহলে অঘটনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। আর বিশ্বকাপ মানেই তো চমক, একটা ভুলেই পা পিছলে যেতে পারে যে কারও!
জাপান বধের লক্ষ্যে হিউস্টনে পূর্ণ শক্তির ব্রাজিল দল
ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের বৈতরণী পার হয়ে প্রথম নকআউট রাউন্ড তথা শেষ ৩২-এর লড়াইয়ে নামার জন্য প্রস্তুত লাতিন আমেরিকার পরাশক্তি ব্রাজিল। আজ সোমবার রাত ১১টায় টেক্সাসের হিউস্টনে তাদের প্রতিপক্ষ এশিয়ার শক্তিশালী দল জাপান। এই মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে ব্রাজিল শিবিরে স্বস্তির সুবাতাস বইছে। গত শুক্রবারের অনুশীলনে নানা কারণে ৮ জন নিয়মিত ফুটবলার অনুপস্থিত থাকলেও, শনিবার সকালে পূর্ণ স্কোয়াড নিয়ে পুরোদমে ঘাম ঝরিয়েছে সেলেসাওরা।
জাপানের বিপক্ষে বেঞ্চেই বসতে হচ্ছে নেইমারকে?
বাঁচা-মরার লড়াইয়ে কোনো ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ঝুঁকি নিতে রাজি নন সেলেসাওদের হেড কোচ কার্লো আনচেলত্তি। এই হাই-ভোল্টেজ ম্যাচকে সামনে রেখে ফুটবলপ্রেমীদের মনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সবচেয়ে আলোচিত তারকা নেইমার জুনিয়র কি ব্রাজিলের শুরুর একাদশে ফিরবেন? তবে ব্রাজিলিয়ান টিম ম্যানেজমেন্ট ও সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, এই প্রশ্নের উত্তর আপাতত ‘না’।
দীর্ঘদিন চোটের সঙ্গে লড়াই করে দলে ফিরলেও নেইমারের ম্যাচ ফিটনেস এখনও আন্তর্জাতিক স্তরে টানা ৯০ মিনিট খেলার মতো পর্যায়ে পৌঁছায়নি বলে কোচিং স্টাফকে স্পষ্ট জানিয়েছেন দলের প্রধান ফিটনেস ট্রেইনাররা। নকআউটের মতো কঠিন মঞ্চে পুরোপুরি ফিট না থাকা খেলোয়াড়কে শুরুর একাদশে নামিয়ে কোনো বড় বিপদে পড়তে চান না কোচ আনচেলত্তি। সেই কারণে জাপানের বিপক্ষে নেইমারকে শুরুর একাদশে না রেখে মূলত ‘সুপার সাব’ বা বদলি খেলোয়াড় হিসেবে ব্যবহার করার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করেছে ব্রাজিলের টিম ম্যানেজমেন্ট। ম্যাচের পরিস্থিতি এবং দলের প্রয়োজন বিবেচনা করে দ্বিতীয়ার্ধের যেকোনো সময় তাকে মাঠে নামানো হতে পারে।
জাপান জিতলে অবাক হবো না- জিকো, ব্রাজিলের সাবেক ফুটবলার
বিশ্বকাপে আগের দুই আসরে নকআউট পর্বে জায়গা করে নেওয়াটাই বুঝিয়ে দিচ্ছে জাপান ফুটবলে কতটা এগিয়েছে। জাপান এখন যে কোনো দলের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত। গত কয়েক বছরে তারা ব্রাজিল, জার্মানি, স্পেন ও ইংল্যান্ডকে হারিয়ে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে।
যে দলের বিপক্ষেই তাদের ম্যাচ হোক, তারা সত্যিকার অর্থেই তৈরি থাকবে। দলটি অবশ্যই টেকনিক্যালি অনেক উন্নতি করেছে। কিন্তু জাপানের জন্য সবসময়ই মনস্তাত্ত্বিক বিষয়টিই বড় ইস্যু। কীভাবে প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে হয়, সেটা এখন খেলোয়াড়রা জানে এবং ম্যাচে পিছিয়ে পড়লে সমতা ফেরাতে মরিয়া হয়ে থাকে।
বিশ্বকাপে দ্বিতীয়বারের মতো জাপান ও ব্রাজিলের সাক্ষাৎ হতে যাচ্ছে। ২০০৬ আসরে দল দুটি প্রথমবার বিশ্বকাপে মুখোমুখি হয়েছিল, যে ম্যাচে সেলেসাওরা ৪-১ গোলে জয় তুলে নিয়েছিল। ওই ম্যাচে আমি (জিকো) জাপান দলের কোচ ছিলাম। এটা অবশ্যই আবেগময় ম্যাচ ছিল।
আগেই আমি দলকে বলেছিলাম ম্যাচ শুরুর আগমুহূর্তে আমি ব্রাজিলের জাতীয় সংগীত গাইব, যেমনটি আমি স্কুল জীবনে গাইতাম। কিন্তু ম্যাচে বল মাঠে গড়ানো মাত্রই আমি জাপানের পক্ষে নিজেকে নিংড়ে দিয়েছিলাম। তখন আমার দিদির (ওয়ালদিয়র পেরেইরা) কথা মনে পড়ছিল। যিনি ব্রাজিলের জার্সি গায়ে দুটি বিশ্বকাপ জিতেছিলেন আবার ১৯৭০ বিশ্বকাপে পেরুর কোচ হিসেবে সেলেসাওদের বিপক্ষে ম্যাচে ডাগআউটে ছিলেন। এটা আসলেই কঠিন কাজ ছিল।
১৯৯৮ সালে বিশ্বকাপে অভিষেকের পর আর কখনো আসর থেকে ছিটকে পড়েনি জাপান। দেশটি ফুটবলে অনেক এগিয়ে গেছে। ব্রাজিল বা লাতিন আমেরিকার ফুটবলারদের মতো জাপানের খেলোয়াড়রা ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবে ডাক পাচ্ছে।
ব্রাজিলের বিপক্ষে ফেরার অপেক্ষায় ‘জাপানের মেসি’
ব্রাজিলের বিপক্ষে নকআউট পর্বের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে বড় স্বস্তির খবর পেল জাপান। চোট থেকে সেরে উঠে অনুশীলনে ফিরেছেন দলের অন্যতম বড় তারকা তাকেফুসা কুবো। ‘জাপানের মেসি’ খ্যাত এই ফরোয়ার্ডের ফিরে আসায় ব্লু সামুরাইদের শিবিরে নতুন উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে।
নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচে হাঁটুতে চোট পেয়ে হুইলচেয়ারে করে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল কুবোকে। সেই ঘটনায় জাপানি সমর্থকদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। চোটের কারণে তিউনিসিয়া ও সুইডেনের বিপক্ষে ম্যাচে দলের সঙ্গে যাননি তিনি। ন্যাশভিলের নিজস্ব ট্রেইনিং সেন্টারে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া চালিয়েছেন।
সুইডেনের সঙ্গে ১-১ গোলের ড্র ম্যাচের পরদিনই অনুশীলনে ফেরেন কুবো। জাপানি সংবাদমাধ্যমের ছবিতে দেখা গেছে, আহত হাঁটুতে প্রটেক্টিভ ব্যান্ডেজ বেঁধে বল পায়ে অনুশীলন করছেন তিনি। চোটের পর এটাই প্রথমবার মাঠে বল নিয়ে অনুশীলন করতে দেখা গেল তাকে।
মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগ, দুই জায়গাতেই দক্ষতা দেখানো কুবোকে তার প্রজন্মের অন্যতম সেরা ফুটবলার মনে করা হয়। ক্লাব ক্যারিয়ারে রিয়াল মাদ্রিদ, ভিয়ারিয়াল ও মায়োর্কার মতো বড় দলে খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। বর্তমানে তিনি রিয়াল সোসিয়েদাদের হয়ে খেলছেন।
তার ফিরে আসায় জাপানের সমর্থকরা এখন ব্রাজিলের বিপক্ষে লড়াইয়ের জন্য আরও আশাবাদী। ‘এশিয়ার ব্রাজিল’ খ্যাত জাপান এখন কুবোকে সঙ্গে নিয়ে শক্তিশালী সেলেসাওদের মোকাবিলা করতে প্রস্তুত।
রাফিনিয়াকে ছাড়াই নকআউট অভিযান শুরু ব্রাজিলের
বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব শুরু হওয়ার আগেই বড় ধাক্কা খেয়েছে ব্রাজিল। দলের অন্যতম ভরসার ফরোয়ার্ড রাফিনিয়া চোটের কারণে জাপানের বিপক্ষে রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচে খেলতে পারছেন না।
আজ সোমবার হিউস্টনে জাপানের মুখোমুখি হবে ব্রাজিল। তবে দলের সঙ্গে সেখানে যাচ্ছেন না রাফিনিয়া।
উরুর চোট থেকে পুরোপুরি সেরে না ওঠায় তিনি নিউ জার্সিতে থেকে জাতীয় দলের ট্রেনিং সেন্টারে চিকিৎসা ও পুনর্বাসন চালিয়ে যাবেন।
জ্যোতিষ জানালো কার কাছে হেরে বিদায় নেবে ব্রাজিল
ভবিষ্যদ্বাণীর তালিকায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় জার্মান অর্থনীতিবিদ জোয়াকিম ক্লেমেন্ট। ২০১৪ সাল থেকে প্রতিটি বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন সঠিকভাবে পূর্বাভাস দেওয়ার দাবি করা এই গবেষক এবার ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, ২০২৬ বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে জাপানের কাছে হেরে বিদায় নেবে ব্রাজিল।
হিউস্টন স্টেডিয়ামে আজ সোমবার বাংলাদেশ সময় রাত ১১টায় জাপানের বিপক্ষে খেলতে নামবে ব্রাজিল। ‘সি’ গ্রুপের শীর্ষে থাকায় নকআউটে হাজিমে মোরিয়াসুর দলকে পেয়েছে সেলেসাওরা। ক্লেমেন্টের মতে, নকআউটের ম্যাচটিতে জয় পাবে জাপান। ফলে প্রত্যাশার আগেই শেষ হবে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ অভিযান।
এখন পর্যন্ত ক্লেমেন্টের পূর্বাভাসের সঙ্গে মিল থাকা সম্ভাব্য দুটি নকআউট ম্যাচ হলো ব্রাজিল-জাপান এবং নেদারল্যান্ডস-মরক্কো।
জাপান বাধা টপকালে শেষ ষোলোয় ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ কে?
৪৮ দলের বিশ্বকাপের টুর্নামেন্টের বিন্যাস অনুযায়ী, শেষ ৩২-এ ‘সি’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল লড়বে ‘এফ’ গ্রুপের রানার্সআপ জাপানের বিপক্ষে। এই ম্যাচে জয়ী দল সরাসরি জায়গা করে নেবে শেষ ষোলোতে। ব্রাজিল যদি তাদের এই ম্যাচে জয় পায়, তবে শেষ ষোলোতে তাদের প্রতিপক্ষ হবে নরওয়ে এবং আইভরিকোস্টের মধ্যকার ম্যাচের জয়ী দল।
ব্রাজিল তাদের নকআউট যাত্রায় যদি নরওয়ের মুখোমুখি হয়, তবে সেটি হবে বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণীয় দ্বৈরথ। গ্রুপ ‘আই’ থেকে রানার্স আপ হয়ে আসা নরওয়ের মূল শক্তি আর্লিং হালান্ড এবং অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড। অন্যদিকে, ব্রাজিলের আক্রমণভাগে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও নেইমারের ছন্দ তাদের শিরোপার অন্যতম বড় দাবিদার হিসেবে তুলে ধরেছে।
এখন দেখার বিষয়, জাপানকে হারিয়ে ব্রাজিল কি নকআউটের মূল মঞ্চে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিতে পারে কি না।
হলিউডের শহর লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফি স্টেডিয়ামের মঞ্চটি যেন গতকাল রূপ নিয়েছিল বাস্তব জীবনের কোনো এক আবেগঘন সিনেমার চিত্রনাট্যে। ঘড়ির কাঁটায় তখন চলছে ফিফা বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২-এর প্রথম ম্যাচের ইনজুরি টাইমের অন্তিম মুহূর্ত, স্কোরবোর্ড বলছে ০-০ ড্র। ঠিক এমন এক স্নায়ুচাপের মুহূর্তে দক্ষিণ আফ্রিকার ডি-বক্সের বাইরে থেকে এক অবিশ্বাস্য ও চোখ ধাঁধানো হাফ ভলিতে বল জালে জড়ান কানাডার মিডফিল্ডার স্টিফেন ইউস্তাকিও। দক্ষিণ আফ্রিকার বাজপাখি খ্যাত গোলরক্ষক রনওয়েন উইলিয়ামসকে পরাস্ত করা এই এক গোলেই ইতিহাস গড়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শেষ ষোলো বা নকআউট পর্বের টিকিট নিশ্চিত করে টুর্নামেন্টের সহ-আয়োজক কানাডা। ২৯ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডারের ক্যারিয়ারে এটিই সম্ভবত এখন পর্যন্ত সবচেয়ে মূল্যবান এবং স্মরণীয় গোল।
বিশ্বকাপের মঞ্চে কানাডাকে অবিস্মরণীয় এক ইতিহাস গড়ে দেওয়া এই মহানায়ককে শুধু একজন সাধারণ ফুটবলার বললে ভুল হবে; স্টিফেন ইউস্তাকিও হলেন জীবনের চরম ট্র্যাজেডি ও শোককে জয় করা এক লড়াকু সৈনিক। লস অ্যাঞ্জেলেসের সেই রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তে যখন তিনি গোলটি করছিলেন, তখন তাঁর হৃদয়ের কোণায় জমা ছিল পিঠাপিঠি বাবা-মাকে হারানোর তীব্র এক বেদনা। ২০২৩ সালের এপ্রিলে ক্লাব পোর্তোর হয়ে ম্যাচ চলাকালীন সময়েই ইউস্তাকিওর মা এসমেরালদা ব্রেন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এর ঠিক এক বছর পর, হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে মারা যান তাঁর বাবাও। জীবনের এত বড় দুটি ধাক্কা ও গভীর শোক বুকে চেপেও ভেঙে পড়েননি ইউস্তাকিও, বরং সেই কান্নাকে বানিয়েছেন নিজের সবচেয়ে বড় শক্তি। অবশ্য এই বেদনার মাঝেই তাঁর ও তাঁর প্রেমিকা কনস্টান্টার কোল আলো করে আসে এক কন্যাসন্তান—বেনেদিতা।
ম্যাচ শেষের আবেগঘন সাক্ষাৎকারে নিজের চোখের জল ধরে রাখতে না পেরে ইউস্তাকিও বলেন, “আমি মাঠে যা কিছু করি, সবকিছু আমার পরিবারের জন্য; আমার প্রয়াত বাবা-মা, আমার প্রেমিকা, আমার মেয়ে, আমার ভাই এবং দেশের বন্ধুদের জন্য—এই সবার জন্য।” এর আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইউস্তাকিওর বড় ভাই তথা ইন্টার টরন্টো এফসির প্রধান কোচ মাউরো ইউস্তাকিও বলেছিলেন, তাঁরা দুই ভাই এই গভীর শোককে শক্তিতে রূপান্তর করার এবং বাবা-মায়ের জীবনকে সম্মানিত করার এক সচেতন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মাউরো আবেগের সঙ্গে বলেছিলেন, “আমাদের বাবা-মা আমাদের উড়ার জন্য ডানা দিয়েছিলেন। তাই এখন উড্ডয়নের দায়িত্বটা আমাদের নিজেদেরই।”
পর্তুগিজ কমিউনিটির ওন্টারিওর লিমিংটনে শৈশবে ফুটবল খেলা শুরু করা ইউস্তাকিও আন্তর্জাতিক ফুটবলের বয়সভিত্তিক পর্যায়ে কানাডার হয়ে যাত্রা শুরু করলেও, মাঝখানে পর্তুগালের অনূর্ধ্ব-২১ দলের হয়েও কিছু ম্যাচ খেলেছিলেন। তবে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি পাকাপাকিভাবে কানাডার সিনিয়র জাতীয় দলের হয়ে খেলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন এবং ২০২১ সালের গোল্ড কাপ, ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ ও ২০২৫ ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপেও মাঠ মাতান। রবিবারের এই ঐতিহাসিক ম্যাচে নিয়মিত অধিনায়ক আলফোনসো ডেভিস ইনজুরির কারণে শুরুর একাদশে না থাকায় দলের অন্তর্বর্তীকালীন অধিনায়কের গুরুদায়িত্ব ছিল ইউস্তাকিওর কাঁধে। সহ-আয়োজক কানাডার হয়ে নিজের ৬১তম ম্যাচে এসে ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ ও সবচেয়ে মহামূল্যবান গোলটি করলেন এই লড়াকু মিডফিল্ডার।
নিজের সেই ঐতিহাসিক জয়সূচক গোলটি নিয়ে ইউস্তাকিও আবেগপ্লুত হয়ে বলেন, “গোলটা সত্যিই অসাধারণ ছিল। তবে সত্যি বলতে, আমি যখন শটটা নিচ্ছিলাম, আমার মনে হচ্ছিল পুরো দেশবাসী আমার সঙ্গে শটটা নিয়েছে। সবাই যেন সেই শটে অল্প অল্প করে শক্তি জুগিয়েছে, আর বলটা গিয়ে আছড়ে পড়েছে জালের ভেতরে!” দক্ষিণ আফ্রিকাকে বিদায় করে এবার শেষ ষোলোর মহালড়াইয়ের অপেক্ষায় রয়েছে কানাডা। আগামীকাল নেদারল্যান্ডস বনাম মরক্কো ম্যাচের জয়ী দলের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কাটার মহাগুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে তারা।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঘরের মাঠে টি-টোয়েন্টি সিরিজে হোয়াইটওয়াশ হওয়ার পর জিম্বাবুয়ের মাটিতেও পিছু ছাড়ছে না বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ব্যাটিং ব্যর্থতা। হারারেতে স্বাগতিক জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে শুরু হওয়া একমাত্র টেস্টের প্রথম দিনেই চরম ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে ব্যাকফুটে রয়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। তবে মাঠের পারফরম্যান্সের এই চরম হতাশার মাঝেই বিশ্বমঞ্চ থেকে শান্ত-মুমিনুলদের জন্য এক দারুণ সুখবর এসেছে। অ্যান্টিগায় অনুষ্ঠিত শ্রীলঙ্কা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যকার প্রথম টেস্টের ফল সমীকরণ বদলে দিয়েছে আইসিসি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের (২০২৫-২৭)। আর তাতেই এক ধাপ এগিয়ে পয়েন্ট টেবিলের চার নম্বরে উঠে এসেছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে যখন গতকাল হারারে টেস্টের প্রথম দিনের খেলায় মাঠের লড়াইয়ে ব্যস্ত ছিল, ঠিক তখনই অ্যান্টিগায় চতুর্থ দিনে শেষ হয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও শ্রীলঙ্কার প্রথম টেস্ট। সেই ম্যাচে ক্যারিবীয়দের কাছে ইনিংস এবং ২১৭ রানের বিশাল ব্যবধানে হেরে বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে লঙ্কানরা। এই শোচনীয় হারের ফলে চলমান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চক্রের পয়েন্ট টেবিলে তিন নম্বর থেকে সোজা ছয় নম্বরে আছড়ে পড়েছে শ্রীলঙ্কা, বর্তমানে তাদের সফলতার হার ৪৪.৪৪ শতাংশ। আর লঙ্কানদের এই পতনের সুযোগেই কোনো ম্যাচ না খেলেই টেবিলের চার নম্বরে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ। শান্তর দলের বর্তমান সফলতার হার ৫৮.৩৩ শতাংশ। শ্রীলঙ্কার এই হারের সুবিধা পেয়েছে ভারতও; তারা টেবিলের ছয় থেকে পাঁচ নম্বরে (সফলতার হার ৪৮.১৫%) উঠে এসেছে। এই তালিকায় ৮৭.৫০ শতাংশ সফলতার হার নিয়ে সবার ওপরে অবস্থান করছে অস্ট্রেলিয়া।
তবে বাংলাদেশের জন্য এই স্বস্তির খবরটি আসার দিনে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে মাঠের চিত্র ছিল ভীষণ লজ্জাজনক। উল্লেখ্য, চলমান বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে টেস্ট ম্যাচটি কিন্তু টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চক্রের অন্তর্ভুক্ত নয়, কারণ আইসিসির এই ৯ দলের টুর্নামেন্টে জিম্বাবুয়ে নেই। গতকাল টস হেরে আগে ব্যাটিং করতে নেমে বাংলাদেশ একপর্যায়ে ২ উইকেটে ১১৩ রান করে বেশ ভালো অবস্থানেই ছিল। কিন্তু এরপরই শুরু হয় অবিশ্বাস্য ধস। মাত্র ২৭ রান তুলতে শেষ ৮টি উইকেট হারিয়ে বসেন শান্ত-লিটনরা! ফলে প্রথম ইনিংসে মাত্র ১৪০ রানেই গুটিয়ে যায় বাংলাদেশ। জবাবে জিম্বাবুয়ে প্রথম দিন শেষেই ১ উইকেটে ১৩৬ রান তুলে বাংলাদেশের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে।
দলের পক্ষে সর্বোচ্চ ৬০ রান করা সাবেক অধিনায়ক মুমিনুল হক প্রথম দিনের খেলা শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসে হতাশা ব্যক্ত করেন। তাঁর মতে, জিম্বাবুয়ের বোলারদের চেয়ে বাংলাদেশের ব্যাটাররাই উইকেট উপহার দিয়ে এসেছেন বেশি। তিনি বলেন, “হারারের উইকেট বা দিনটি অতটা কঠিন ছিল বলে আমি মনে করি না। জিম্বাবুয়ে অবশ্যই ভালো বোলিং করেছে, তবে আমরা আমাদের পরিকল্পনা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছি এবং নিজেদের উইকেট প্রতিপক্ষকে উপহার দিয়ে এসেছি।” মূলত জুন মাসে ফুটবল বিশ্বকাপ শুরুর পর থেকেই বাংলাদেশের ক্রিকেটে হারের খরা চলছে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথমবার ঐতিহাসিক ওয়ানডে সিরিজ জিতলেও পরের ম্যাচে ধবলধোলাইয়ের সুযোগ হাতছাড়া হয়, এরপর টি-টোয়েন্টি সিরিজে ৩-০ ব্যবধানে হারে বাংলাদেশ। আর এবার জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেও হারের শঙ্কায় পড়েছে দল, যার মাঝে একমাত্র সান্ত্বনা হয়ে এলো টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের এই টেবিল টপার উন্নতি।