শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২২

লাক্কাতুরা চা-বাগানে, দীপ্তির জীবন যেমন

লাক্কাতুরা চা-বাগানে, দীপ্তির জীবন যেমন
সিলেটের লাক্কাতুরা চা-বাগানের শ্রমিক দীপ্তি। ছবি: দৈনিক বাংলা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত
  • দেবাশীষ দেবু, সিলেট

দীপ্তির ঘরে আলো নেই। প্রায় অন্ধকার ঘরে বসেই রান্না করছিলেন তিনি। একটু দূরের উঁচু টিলার আড়ালে তখন হারিয়ে যাচ্ছে সূর্য। সন্ধ্যা নামছে লাক্কাতুরা চা-বাগানে। টিন আর বাঁশ দিয়ে তৈরি দীপ্তির ঘর। তাও কয়েকটি স্থানে ভাঙা। ঘরে কক্ষ মাত্র দুটি। স্বামী-স্ত্রী আর দুই সন্তানের থাকা-খাওয়া ও রান্নাবান্না চলে এই দুকক্ষেই। দুটি চৌকি, দুটি প্লাস্টিকের চেয়ার, কাপড় রাখার একটি ভাঙা আলনা ছাড়া ঘরে তেমন কোনো আসবাবপত্রও নেই। দুটি বৈদ্যুতিক বাতি আছে বটে, তবে কোনো ফ্যান নেই।

ঘরে আলো জ্বালাচ্ছেন না কেন? আগন্তুকের প্রশ্ন শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন তিনি। কিছুটা ইতস্তত, বিব্রত। এরপর বললেন, ‘এখনো তো কিছু কিছু দেখা যাচ্ছে। আরেকটু অন্ধকার হলেই লাইট জ্বালাব। খামাখা বিল বাড়িয়ে কী লাভ?’

সিলেটের লাক্কাতুরা চা-বাগানেরই শ্রমিক দীপ্তি। পুরো নাম দীপ্তি গোয়ালা। তার স্বামী প্রদীপ গোয়ালাও এই বাগানে কাজ করেন। একটু আগেই কাজ থেকে ফিরেছেন স্বামী-স্ত্রী। কিছু দিন আগেই তাদের দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা ছিল। আন্দোলন করে ও প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে তা সম্প্রতি ১৭০ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। এই টাকায় কী করে চলে দীপ্তিদের? কী করে কাটে তাদের দিন? এ নিয়েই আলাপ হয় দীপ্তির সঙ্গে।

দীপ্তির দিন শুরু হয় সকাল ৬টায়। ভোরে ঘুম থেকে উঠেই চা-নাশতা তৈরি করতে হয়। নাশতা বলতে কেবল আটার রুটি আর লাল চা। এসব নিজেরা খেয়ে ও বাচ্চাদের খাইয়ে সকালেই রওয়ানা দেন চা-পাতা তোলার কাজে।

দীপ্তি বলেন, ‘অনেকটা পথ হেঁটে যেতে হয়। প্রায় ৫ কিলোমিটার পথ হেঁটে কাজে যাই। তাই সকাল সকালই বেরিয়ে পড়ি। আবার সকালে কাজও ভালো করা যায়। সারা দিন দাঁড়িয়ে থেকে পাতা তুলতে হয়। একবারও বসার সুযোগ নেই। জোঁকসহ পোকামাকড়ের কামড় খেতে হয় প্রতিদিন। সাপও আছে। ঘরে ফিরতে ফিরতে বিকেল গড়িয়ে যায়।’

রান্না করতে করতেই কথা বলেন দীপ্তি। বাগান থেকে ফেরার সময় সড়কের পাশ থেকে কচুর লতি তুলে নিয়ে এসেছেন। তা দিয়ে শুঁটকি রান্না করছেন। বলেন, ‘আমাদের তো আর মাছ-মাংস খাওয়ার সামর্থ্য নাই। তাও আজকে তো শুঁটকি আছে। সব দিন তো তাও পাই না।’

বৃষ্টিতে ঘরের পাশে কাদা জমেছে। সেই কাদা জলে খেলা করছে দীপ্তির ছেলেমেয়ে। পাশেই পড়ে আছে একটি ছেঁড়া প্ল্যাকার্ড। যাতে লেখা ‘৩০০ টাকা মজুরি চাই’। আলাপ থামিয়ে ছেলেমেয়েদের একবার ধমক দেন তিনি। ঘরে আসার তাড়া দেন। এরপর আবার কথা বলা শুরু করেন।

দীপ্তির ছেলে ক্লাস ফোরে ও মেয়ে ক্লাস টু-তে পড়ে। তিনি বলেন, ‘ছেলেমেয়ের দিকে একেবারে খেয়াল রাখতে পারি না। সকালেই কাজে চলে যাই। তারা একা একাই স্কুলে যায়। স্কুল থেকে থেকে ফেরার পরও সারা দিন একাই থাকতে হয়। আমরা তো ফিরি সন্ধ্যায়।’

বাচ্চাদের ভালো খাবার দিতে না পারারও আক্ষেপ তার কণ্ঠে। বলেন, ‘আগের রাতের ভাত থাকলে সেগুলো খেয়ে স্কুলে যায়। আর না থাকলে রুটি খেয়েই যায়। আর কিছু তো খাওয়ানোর সামর্থ্য নেই।’

তবু যেকোনো মূল্যে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করাতে চান তিনি। দীপ্তি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা তো পড়ালিখা শিখি নাই। তাই মানুষ হইতে পারলাম না। বাবুরা (চা-বাগানের কর্মকর্তারা) ঘিন্না করে। এত কষ্ট করি তবু চাইট্টা ভাতও ভালো করে খাইতে পারি না।’

এতক্ষণ রয়েসয়ে, লজ্জ্বা আর জড়তা নিয়ে কথা বলা দীপ্তির হঠাৎ কী যেন হলো! এবার অনর্গল এবং আগের চেয়ে উচ্চস্বরে বলেন, ‘পুলামাইয়ারে আমি পড়াইমুই। দরকার হইলে ভিক্ষা কইরা পড়ামু। মেট্রিক পাস করাইয়া কলেজো পাঠাইমু। তারারে আর বাগানোর কুলি হইতে দিতাম না।’

দীপ্তির কথায় আগুন ঝরে। কিন্তু কথায় অধিক মনোযোগী হওয়ায় চুলোর আগুন কিছুটা মিইয়ে আসে। কুড়িয়ে আনা গাছের শুকনো ডাল চুলোয় ঢুকিয়ে বাঁশের চোঙা দিয়ে কিছুক্ষণ ফুঁ দিতে হয়। কিছুক্ষণ কসরতের পর আগুন আবার চাঙা হয়। এরপর আবার কথায় ফেরেন দীপ্তি।

ঘরের পাশের দোকানে গিয়ে আগে সন্ধ্যার পর কিছুক্ষণ টিভি দেখতেন দীপ্তি। সন্ধ্যার পরের কিছুক্ষণই ছিল তার অবসর সময়। বাচ্চাদের পড়ালেখার কারণে আর টিভি দেখতে পারেন না। এ নিয়ে একটু আফসোস থাকলেও বাচ্চাদের স্বার্থে এইটুকু ছাড় দিতে আপত্তি নেই তার। যদিও স্বামীর আচরণ মাঝেমাঝে কষ্ট দেয় তাকে।

অভিযোগ করে তিনি বলেন ‘আমি সারা দিন বাগানে কামলা দিয়ে এসে রাতে রান্নাবান্না করি, কাপড় ধোয়াসহ কত কাজ করি। বাচ্চাদের পড়ানোর কাজ তো সে (স্বামী) করতে পারত। কিন্তু অনেক রাতে মাতাল হয়ে ঘরে ফিরে।’

লাক্কাতুরা চা-বাগানের ভেতরেই আছে বাংলা মদের দোকান। চা-শ্রমিকদের জন্যই এ দোকান। স্বল্প মজুরি আর কঠিন পরিশ্রমের কষ্ট ভুলতে অনেক শ্রমিক রাতে ভিড় করেন এ দোকানে।

আলাপের একপর্যায়ে ছবি তোলার কথা বলতে ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ান দীপ্তি। ফোনের ক্যামেরা অন করতেই হেসে ওঠেন তিনি। ম্রিয়মান আলোতেও তখন দীপ্তির মুখ উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল।


সরকারি দামে মিলছে না সার বাড়ছে আমন উৎপাদন খরচ

সরকারি দামে মিলছে না সার বাড়ছে আমন উৎপাদন খরচ
ইউরিয়ার খোঁজে লাইনে দাঁড়িয়েছেন কৃষকরা। ছবি: দৈনিক বাংলা
পাবনা প্রতিনিধি
প্রকাশিত

পাবনায় সরকারনির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে রাসায়নিক সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। কৃষকদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ডিলাররা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করায় খুচরা বাজারে দাম বেড়েছে।

তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না থাকায় বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে। আর কৃষি বিভাগ থেকে বলা হয়েছে, জেলায় সারের কোনো সংকট নেই। ইউরিয়া সারের অতিরিক্ত বরাদ্দও দিয়েছে মন্ত্রণালয়। কৃষকদের মাঝে গুজব ছড়িয়ে একটি চক্র বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে।

বর্তমানে আমনের ভরা মৌসুম চলছে। এ সময় সারের বাড়তি দামের কারণে বিপাকে পড়েছেন চাষিরা। তারা বলছেন, গত এক সপ্তাহ ধরে বিসিআইসির ডিলারদের কাছ থেকে চাহিদা অনুযায়ী সার মিলছে না। কেবল সরকারনির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দিলেই সার পাওয়া যাচ্ছে। একই চিত্র খুচরা বাজারেও। বেশি দামে যারা সার কিনছেন তাদের আমন উৎপাদনের খরচও বাড়ছে।

পাবনার সদর, আটঘরিয়া ও ঈশ্বরদী উপজেলায় সারের কয়েকটি খুচরা দোকানমালিকের সঙ্গে বলে জানা গেছে, সরকারনির্ধারিত প্রতি কেজি ইউরিয়া সারের দাম ২২ টাকা হলেও বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকায়। এমওপি, পটাশ, টিএসপিসহ সব ধরনের সারের জন্য প্রতি কেজিতে কৃষককে সরকারনির্ধারিত দরের চেয়ে ১০-১২ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে। দাম বাড়ার জন্য ডিলারদের দুষছেন খুচরা দোকানিরা। 

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে সদরের দাপুনিয়া ইউনিয়নের বিসিআইসি ডিলার আবু তালেবের দোকানে গিয়ে দেখা যায়, ইউরিয়া সার কিনতে ভিড় করেছেন আশপাশের গ্রামের কৃষকরা। বন্ধ দোকান না খুলেই ম্যানেজার জানালেন সার নেই। দীর্ঘ অপেক্ষায় সার না পেয়ে খালি হাতে ফিরে যান কৃষকরা। 

মির্জাপুর থেকে আসা কৃষক আব্দুস সালাম বলেন, সার কিনতে গেলে বিক্রেতারা সংকটের কথা বলে দাম বেশি নিচ্ছেন। বিক্রয় রসিদ চাইলেও তা দেয়া হচ্ছে না। দর-কষাকষি করতে গেলে সার না দিয়েই অপমান করে তাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। দোকানে মূল্যতালিকা টাঙিয়ে রাখলেও সে দাম রাখা হচ্ছে না।

আটঘরিয়ার দিকশাইল গ্রামের কৃষক জাহিদুল ইসলাম বলেন, কিছুদিন আগে ইউরিয়া সারের দাম বাড়িয়েছে সরকার। এখন যদি কৃষকদের সার পেতে দুর্ভোগ পোহাতে হয় বা নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি রাখা হয়, তাহলে তারা আমন ধান চাষে নিরুৎসাহিত হবেন। এতে ফলন কমে গিয়ে লোকসান বাড়বে। অন্যদিকে বাজারে চালের দামও বাড়বে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কৃষক ও খুচরা সার দোকানির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সার ডিলারদের অধিকাংশ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। অভিযোগ রয়েছে, তারা মৌসুমে যে সার বরাদ্দ পান সেটা উত্তোলন না করে বরাদ্দপত্রটা একশ্রেণির অসৎ ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দেন। সেই বরাদ্দপত্র ক্রয়কারীরা গুদাম থেকে সার উত্তোলন করে বেশি দামে বিক্রির জন্য সার মজুত করেন। এ অবস্থায় কৃষকপর্যায়ে কৃত্রিম সারসংকট দেখা দেয় ও বেশি দামে কৃষকরা কিনতে বাধ্য হন। 

পাবনা সার ব্যবসায়ী সমিতির কোষাধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম বলেন, অতিরিক্ত বরাদ্দ পাওয়া সার আশুগঞ্জ থেকে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যেই বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

এদিকে পাবনায় ইউরিয়াসহ কোনো সারেরই সংকট নেই বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক বিশ্বাস রাসেল হোসেন। তিনি জানান, চলতি আমন মৌসুমে পাবনায় চাহিদার অতিরিক্ত ১ হাজার ৫০০ মেট্রিক টনের বেশি ইউরিয়া সার বরাদ্দ পেয়েছে কৃষি বিভাগ। বিসিআইসির ১০১ জন অনুমোদিত ডিলারের মাধ্যমে শিগগিরই তা কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ শুরু হবে। বাজার কারসাজি খতিয়ে দেখতে মাঠে নেমেছে প্রশাসন।


দুর্গোৎসব আমেজের চেয়ে উদ্বেগ বেশি

দুর্গোৎসব আমেজের চেয়ে উদ্বেগ বেশি
তুমব্রু সীমান্তে চলমান গোলাগুলিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। ছবি: দৈনিক বাংলা
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশিত
  • তুমব্রু সীমান্তে গোলাগুলি

মুহিববুল্লাহ মুহিব, তুমব্রু সীমান্ত থেকে

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের তুমব্রু সীমান্তে চলমান গোলাগুলিতে স্থানীয়দের মাঝে আতঙ্ক বেড়েই চলেছে। এর ফলে আসন্ন দুর্গাপূজার উৎসবকে ঘিরে সীমান্ত এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।

মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তের কাঁটাতার থেকে ২০০ গজ ভেতরে তুমব্রু শ্রী শ্রী দুর্গা মন্দিরের অবস্থান। এর পাশেই হিন্দু সম্প্রদায়ের ১৭টি পরিবার বাস করে। স্বাধীনতার পর থেকে এ মন্দিরে হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপন করে আসছেন এখানকার বাসিন্দারা। কিন্তু মিয়ানমারের বিদ্রোহী গ্রুপ আরাকান আর্মি ও জান্তা বাহিনীর মধ্যে গত এক মাস ধরে যে সংঘর্ষ চলছে, তার প্রভাব পড়ছে সীমান্ত এলাকায়। এর ফলে দুর্গাপূজার আয়োজন নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে দিন পার করছেন সীমান্তবর্তী হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন।

মন্দিরের পাশেই সুগন্ধা কর্মকারের বাড়ি। স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে নবনির্মিত প্রতিমার দিকে অসহায়ভাবে তাকিয়ে আছেন। কয়েক যুগ ধরে চলমান তাদের এ উৎসব এবার আদৌ হবে কী হবে না, তিনি তা জানেন না।

সুগন্ধা কর্মকার বলেন, বড় করে না হোক, ছোট পরিসরে হলেও এবার যেন পূজা করতে দেয়া হয়। পূজা উপলক্ষে এরই মধ্যে সন্তানদের জন্য কেনাকাটা হয়েছে। উৎসব উপলক্ষে খরচও করে ফেলেছেন। এত কিছুর পরও উৎসব করতে না পারলে তা হবে কষ্টের।

তুমব্রু বাজারের পেছনের এলাকার বাসিন্দা সুমিতা রায়। তিনি বলেন, ‘৫০ বছর ধরে এ উৎসব চলছে। আমাদের বাবা-দাদারাও পূজা করেছেন। করোনা পরিস্থিতিতেও ছোট পরিসরে পূজা হয়েছে। এবার একেবারে করতে না পারাটা হতাশাজনক হবে।’

আরেক বাসিন্দা প্রদীপ ধর বলেন, ‘দেড়শতাধিক মানুষের একমাত্র উৎসবের কেন্দ্র এ মন্দির। সেখানে যদি উৎসব করতে না পারি, তাহলে কোথায় গিয়ে করব? অন্য জায়গায় করতে হলে তো প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে যেতে হবে। তারচেয়ে বড় কথা হচ্ছে আমরা সবকিছু কিনে ফেলেছি। প্রতিমা থেকে শুরু করে যাবতীয় সব।’

তুমব্রু শ্রী শ্রী দুর্গা মন্দিরের পূজা পরিচালনা কমিটির সভাপতি রূপলা ধর দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ব্যাপক গোলাবর্ষণের শব্দ শোনা যাচ্ছে। অতীতে কখনোই এমনটা হয়নি। এর ফলে আসন্ন দুর্গাউৎসব নিয়ে তিনিসহ সবাই চিন্তায় আছেন।’

রূপলা ধর বলেন, ‘ডিসি, এসপি ও ইউএনও মহোদয় ডেকেছিলেন। তাদের কাছে জানতে চেয়েছি, কীভাবে কী করা যায়? তারা এবারের আয়োজন অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু অর্ধশত বছরের এ উৎসব, এ ব্যাপারে এলাকার লোকজনও তেমন রাজি না। প্রশাসনের অনুমতি না মিললে আমরা উৎসব করব না।’

ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান এ কে এম জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, ‘উৎসবকালীন বাদ্যযন্ত্র বাজানোর সময় যদি মিয়ানমার থেকে কোনো গোলা এসে পড়ে, তাহলে ঝুঁকি আছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তার স্বার্থেই এবারের আয়োজন অন্যত্র নেয়ার পরিকল্পনা।’

এ বিষয়ে বান্দরবানের জেলা প্রশাসক ইয়াসমিন পারভিন মুঠোফোনে দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘সীমান্ত পরিস্থিতি আমরা এখনো নজরদারিতে রেখেছি। তুমব্রু সীমান্তের মন্দিরে দুর্গাপূজা উদযাপন নিয়ে বৈঠকে আছি। এখান থেকে বেরিয়ে বিস্তারিত বলতে পারব।’

১৬ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৮টার দিকে মিয়ানমার থেকে ছোড়া মর্টার শেলে সীমান্তের শূন্যরেখায় এক রোহিঙ্গা নিহত হন। ওই দিন দুপুরেই সীমান্তের হেডম্যানপাড়ার ৩৫ নম্বর পিলারের ৩০০ মিটার মিয়ানমার সীমান্তের অভ্যন্তরে মাইন বিস্ফোরণে আহত হন বাংলাদেশি এক যুবক। এরপর থেকে তুমব্রু সীমান্তে আরও জোরালোভাবে গোলার শব্দ শোনা যাচ্ছে। গতকাল সকাল থেকে অন্তত ৫০টি গোলার শব্দ ভেসেছে তুমব্রুর পশ্চিমকুল, উত্তরপাড়া ও দক্ষিণপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায়। এমন অবস্থায় চরম আতঙ্কে আছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

প্রায় এক মাস ধরে নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু সীমান্তে উত্তেজনা চলছে। সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার থেকে মর্টার শেল, গোলাগুলিসহ নানা ভারী অস্ত্রের আওয়াজে এপারের ঘুমধুম ইউনিয়নের তুমব্রু ও বাইশপারী এলাকার মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। বেশ কয়েকবার মিয়ানমার রাখাইন রাজ্যের পাহাড় থেকে ছোড়া মর্টার শেল বাংলাদেশের ভূখণ্ডে এসে পড়েছে। গত ২৮ আগস্ট তুমব্রু উত্তরপাড়ায় একটি অবিস্ফোরিত মর্টার শেল এসে পড়ে। সে দিনই সীমান্তে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার ও যুদ্ধবিমানকে চক্কর দিতে দেখা যায়। এরপর ৩ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারের দুটি যুদ্ধবিমান ও ফাইটিং হেলিকপ্টার থেকে ছোড়া দুটি গোলা ঘুমধুম ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় এসে পড়ে। সেগুলো অবিস্ফোরিত থাকায় হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। এর তিন দিন পর আবার ওই সীমান্তে ভারী অস্ত্রের বিকট শব্দ ভেসে আসে।


ভোলায় বিদ্যুৎহীন ভুতুড়ে সড়ক

ভোলায় বিদ্যুৎহীন ভুতুড়ে সড়ক
বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় বন্ধ সড়কবাতি। ছবি: দৈনিক বাংলা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত
  • ​৯ বছরে বকেয়া ৭ কোটি টাকা

  • পৌর এলাকার মানুষ বিশেষ করে নারীরা নানা আশঙ্কা নিয়ে চলাচল করছেন। অন্ধকারে চুরি-ছিনতাইয়ের আতঙ্কও বেড়েছে।

ভোলা প্রতিনিধি

সাত কোটি টাকা বকেয়া বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ না করায় ভোলা পৌরসভার সড়কবাতির বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। সড়কে আলো না থাকায় রাতে চলাচলে বিপাকে পড়েছেন শহরের বাসিন্দারা।

ভোলা বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ জানিয়েছে, বকেয়া পরিশোধের জন্য পৌরসভা কর্তৃপক্ষকে বারবার চিঠি দিয়েও কাজ হয়নি। এ কারণে বিদ্যুৎ বিভাগের আওতায় পৌরসভার সব সড়কবাতির সংযোগ গত তিন দিন ধরে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। ভোলা পৌরসভার ৯ ওয়ার্ডে ৯ হাজার ৬৩৫ পরিবারে ৮৭ হাজার ২৪৩ জন নাগরিক বসবাস করেন।

বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করায় ভোলা পৌরসভা মূলত ভুতুড়ে শহরে পরিণত হয়েছে। শহরের মানুষ বিশেষ করে নারীরা নানা আশঙ্কা নিয়ে চলাচল করছেন। অন্ধকারে চুরি-ছিনতাইয়ের আতঙ্কও বেড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, নিয়মিত কর পরিশোধ করা হয় পৌর কর্তৃপক্ষকে। এর পরও এমন দুরবস্থা।

ভোলা নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব বাহাউদ্দিন বলেন, ভোলা পৌরসভাটি প্রথম শ্রেণির। কিন্তু সেই পৌরসভায় রাতে সড়কে আলো জ্বলছে না, এটা বেমানান।

বিলকিছ জাহান নামে পৌরসভার একজন বাসিন্দা বলেন, ‘সন্ধ্যার পর সড়কে বাতি না জ্বলায় নারীরা বাজারে কেনাকাটা করতে, শিশুদের কোচিং করাতে নিতে ভয় পাচ্ছেন।’ কয়েকটি ওয়ার্ডের সড়কে খানাখন্দ থাকায় অন্ধকারে দুর্ঘটনার শঙ্কাও আছে। কর্তৃপক্ষের কাছে তিনি দ্রুত এর সমাধানের দাবি জানান।

ভোলার বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন-অর-রশীদ বলেন, ভোলা ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ওজোপাডিকো) কাছে ভোলা পৌরসভার গত ৯ বছরে বেকেয়া বিল প্রায় ৭ কোটি টাকা। বিল পরিশোধের জন্য পৌর কর্তৃপক্ষকে তাগাদা দিলেও কোনো ফল হয়নি।

মামুন-আল-রশীদ বলেন, এমন পরিস্থিতিতে ওজোপাডিকোর আওতায় পৌরসভার আওতাভুক্ত সড়কবাতির বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। বিল পরিশোধ করলে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করা হবে। এ বিষয়ে পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুস সাত্তার বলেন, নাগরিক দুর্ভোগ কমাতে দ্রুত বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে কথা বলে সমস্যার সমাধান করা হবে। আর ভোলা পৌরসভার মেয়র মো. মনিরুজ্জামান বলেন, যে পরিমাণ বিল বকেয়া আছে বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে কথা বলে ধাপে ধাপে তা পরিশোধ করা হবে। পৌরসভার সড়কে শিগগিরই বাতি জ্বলবে বলেও আশা ব্যক্ত করেন মেয়র।


জালিয়াতি করে ৮৭ কোটি টাকা আয়, সম্পদ গড়েছেন স্ত্রীর নামে

জালিয়াতি করে ৮৭ কোটি টাকা আয়, সম্পদ গড়েছেন স্ত্রীর নামে
স্ত্রী মুক্তা আক্তারের সঙ্গে মোবারক হোসেন।
নুরুজ্জামান লাবু
প্রকাশিত
  • তারা দুবাইয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করার পরিকল্পনা করছিলেন। ছয় মাস আগে পরিবারের সবাই মিলে দুবাই ঘুরে আসেন

নুরুজ্জামান লাবু

একটি দুটি নয়, রাজধানীর পূর্বাচল এলাকায় অন্তত দশটি প্লট অভিনব জালিয়াতির মাধ্যমে বিক্রি করে হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় এক শ’ কোটি টাকা। আর এই টাকায় বিপুল সম্পদ গড়েছেন তার গৃহিণী স্ত্রী মুক্তা আক্তারের নামে। দুবাইয়ে কিনেছেন ফ্ল্যাট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও খুলেছেন ব্যবসা।

মোবারকের এই জালিয়াতি চক্রে জড়িত আছেন রাজউকের অসাধু কয়েকজন কর্মকর্তা। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ রূপগঞ্জের ভূমি অফিসের এক কর্মচারীও এই চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত। পুরো চক্রটিকে গ্রেপ্তারের জন্য অনুসন্ধান শুরু করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ-ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) একটি দল।

সিটিটিসির ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বিভাগের ইকোনমিক ক্রাইম সূত্র জানায়, গত ২৭ জুলাই রাজধানীর কাফরুল থানায় আকবর হায়দার নামে এক ব্যক্তি জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগে একটি মামলা করেন। মামলায় তিনি অভিযোগ করেন, আগে থেকে পরিচিত মোবারক হোসেনের মাধ্যমে তারা পূর্বাচল এলাকায় ব্যক্তিমালিকানাধীন চারটি প্লট কিনেন। পরে মোবারক আরও কয়েকটি প্লট বিক্রি হবে জানালে তিনি কিনতে সম্মত হন। এই সুযোগে মোবারক ভুয়া দলিলপত্রসহ রাজউক থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বানিয়ে আলাদা আলাদা ব্যক্তিকে বিক্রেতা সাজিয়ে বিক্রি করে।

২০১৬ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে জালিয়াতি করে এভাবে ১০টি প্লট বিক্রির মাধ্যমে মোবারক মোট ৮৭ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন।

জালিয়াতির এই মামলাটি তদন্তের জন্য কাফরুল থানা থেকে ইকোনমিক ক্রাইম স্কোয়াডের কাছে পাঠানো হলে সম্প্রতি মোবারকের স্ত্রী মুক্তা আক্তার ও তুষার নামে এক সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর প্রথম দফায় তিন দিনের রিমান্ড ও দ্বিতীয় দফায় দুই দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে পুরো জালিয়াত চক্রটিকে শনাক্ত করা হয়। মোবারকসহ এই চক্রের সব সদস্যকে গ্রেপ্তারের জন্য ইতোমধ্যে একাধিক অভিযানও চালানো হয়েছে।

সিটিটিসির অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘মোবারকের নেতৃত্বে এই চক্রটি একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে প্রতারণা ও জালিয়াতি করেছে। এই চক্রের সঙ্গে রাজউক ও ভূমি অফিসের যারা জড়িত, তাদের বিষয়েও খোঁজ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মোবারককে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চালানো হচ্ছে।

মোবারকের জালিয়াতির ধরন

তদন্তসংশ্লিস্ট সূত্র জানায়, মামলার বাদীর বিশ্বাস অর্জনের পর মোবারক তার সঙ্গে যুক্ত রাজউকে কর্মরত সহযোগীদের মাধ্যমে পূর্বাচলের বিভিন্ন প্লট মালিকের জমির কাগজপত্র সংগ্রহ করত। এরপর জালিয়াতি করে প্লট বিক্রির জন্য রাজউকের বিক্রয় অনুমতিপত্র, মালিকানা ছাড়পত্রসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে। পরে জমির আসল মালিকের নামেই শুধু ছবি পরিবর্তন করে একটি নকল জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করে।

তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, জালিয়াতচক্রটি সব কাগজপত্র তৈরি করে নিজেদের এক সদস্যকে প্লটের মালিক সাজিয়ে ক্রেতার সামনে হাজির করে। ক্রেতা কাগজপত্রের কপি নিজের কাছে রেখে রাজউকে খোঁজ নিলে সেখান থেকেও ইতিবাচক তথ্য পান। শেষ পর্যন্ত জমি কেনার জন্য রাজি হলে চক্রের সদস্যরা নিজেদের লোকজনকে ভূমি রেজিস্ট্রার সাজিয়ে ভুয়া রেজিস্ট্রেশন করায়। জমির প্রকৃত দলিলের মতো দলিলের একটি অনুলিপিও দেয়া হয় ক্রেতাকে। অথচ ওই দলিলের কোনো কিছুই ভূমি অফিসের বালাম বইয়ে থাকে না।

জালিয়াতি ও প্রতারণার শিকার আকবর হায়দার দৈনিক বাংলাকে বলেন, মোবারক আগে থেকে পরিচিত হওয়ার কারণে তার মাধ্যমে কেনা প্লটগুলোতে আগে কখনো যাননি। চলতি বছরের শুরুর দিকে তার অফিসের একজন কর্মকর্তা পূর্বাচল এলাকায় গিয়ে দেখতে পান তার কেনা প্লটে বাউন্ডারি অন্য একজন দেয়াল তৈরি করছেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজে  যোগাযোগ করলে বিমানবাহিনীর একজন কর্মকর্তা নিজেকে ওই জমির মালিক দাবি করেন। ওই ঘটনার পরপরই তিনি তার কেনা অন্য প্লটগুলোতে গিয়ে দেখতে পান সেখানে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির নামে সাইনবোর্ড টাঙানো। দ্রুত দলিল ও অন্যান্য কাগজপত্র নিয়ে তিনি রাজউক ও রূপগঞ্জ ভূমি অফিসে খোঁজ নিলে জানতে পারেন সেগুলো ভুয়া দলিল।

জালিয়াতির টাকায় স্ত্রীর নামে বিপুল সম্পদ

তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, জালিয়াতচক্রের মূল হোতা মোবারকের বাড়ি পূর্বাচলের পাশে রূপগঞ্জের ইউসুফগঞ্জে। তার বাবার নাম মোজাফফর আলী। সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ুয়া মোবারক দীর্ঘদিন রূপগঞ্জ এলাকায় বালু শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। পরে বালু সরবরাহের পাশাপাশি জমি বেচাকেনার সঙ্গে যুক্ত হন মোবারক। এ সময় রাজউক ও ভূমি অফিসের কিছু অসাধু লোকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে জালিয়াতির একটি চক্র গড়ে তোলেন।

ইছাপুরা এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোবারকের বাবা মোজাফফর আগে বিদেশে থাকতেন। তাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো ছিল না। অন্যদিকে মুক্তার বাবা নজরুল ইসলাম আগে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত সাত বছরে হঠাৎ করেই বিপুল সম্পদের মালিক বনে যান। তবে কৌশলী মোবারক জালিয়াতির মাধ্যমে উপার্জিত টাকায় নিজের পরিবর্তে স্ত্রী মুক্তার নামে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলেন। ভুক্তভোগীরা মামলা করলেও কোনো সম্পদ যাতে বেহাত না হয় সে জন্য নিজের নামে সম্পদ রাখেননি মোবারক।

সিটিটিসির কাছে রিমান্ডে থাকা মুক্তা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, কোনো পেশায় যুক্ত না থাকায় তার নিজের কোনো আয় নেই। মুক্তা জানান, গত বছরের নভেম্বরে প্রায় ৮০ লাখ টাকায় গ্লোরি ও হ্যাভলস ব্র্যান্ডের দুটি জিপ গাড়ি কিনে স্বামী মোবারক তার নামে রেজিস্ট্রেশন করে দেন।

এ ছাড়া বছর তিনেক আগে মোবারক এমভি মাইশা নামে দুটি বাল্কহেড কিনেছেন মুক্তার নামে। মাইশা পরিবহন নামে একটি বালুবাহী ট্রাকও আছে। পূর্বাচলের পাশে দাউদপুর ইউনিয়নে ১২ শতাংশ জমি, ইছাপুরা বাজার মসজিদের পাশে দশ কাঠার একটি জমিও আছে। ইছাপুরা বাজারের ওই জমিতে একটি দশ তলা ভবনের নির্মাণ কাজ চলছে। বর্তমানে ছয় তলা পর্যন্ত ছাদ ঢালাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে। সব সম্পদই স্বামী তাকে দিয়েছে বলে জানান মুক্তা।

জিজ্ঞাসাবাদে মুক্তা আক্তার আরও জানান, ইছাপুরা এলাকায় একটি গরুর খামারে তাদের অর্ধশতাধিক গরু, দুবাইয়ের দেরাই এলাকায় একটি ফ্ল্যাট ও যুক্তরাষ্ট্রে এক আত্মীয়ের মাধ্যমে একটি পেট্রোল পাম্প ও দোকান কিনেছেন। মুক্তা জানান, তার স্বামী দুবাইয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করার পরিকল্পনা করছিলেন। ছয় মাস আগে পরিবারের সবাই মিলে দুবাই ঘুরেও আসেন।

সিটিটিসির একজন কর্মকর্তা দৈনিক বাংলাকে বলেন, তারা তদন্ত করছেন প্রতারণা ও জালিয়াতির মামলা। এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়টি মানিলন্ডারিং আইনে অনুসন্ধানের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ  সিআইডিকে বলা হয়। সিআইডির ইকোনমিক ক্রাইম স্কোয়াড জ্ঞাত আয় বহির্ভূত অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়টি বিস্তারিত খোঁজ-খবর করবে।


ট্যাংক ফেটে কৃষিজমিতে ডিজেল, ক্ষতির আশঙ্কা

ট্যাংক ফেটে কৃষিজমিতে ডিজেল, ক্ষতির আশঙ্কা
সীতাকুণ্ডে জ্বালানির ট্যাংক ফেটে প্রায় তিন হাজার লিটার ডিজেল ছড়িয়ে পড়ে ফসলি জমিতে। ছবি: দৈনিক বাংলা
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
প্রকাশিত

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একটি কারখানার জেনারেটরের জ্বালানির ট্যাংক ফেটে প্রায় তিন হাজার লিটার ডিজেল ফসলি জমিতে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে ওই জমিতে থাকা ধানের বীজতলা ও ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।

গতকাল বুধবার (২১ সেপ্টেম্বর) ভোরে উপজেলার টেরিয়াল বাজার এলাকায় সিপি বাংলাদেশ লিমিটেড নামের ওই কারখানার (চট্টগ্রাম হ্যাচারি) একটি জ্বালানি ট্যাংক ফেটে যায়। ওই দিন রাতেই বিষয়টি জানাজানি হয়।

পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আশরাফ উদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘ওই কারখানায় জেনারেটরের জ্বালানির একটি ট্যাংক ফেটে কৃষিজমিতে ডিজেল ছড়িয়ে পড়েছে।’

আশরাফ উদ্দিন বলেন, ‘আমরা ওই ডিজেলের নমুনা সংগ্রহ করেছি। ছড়িয়ে পড়া ডিজেলের কিছু কিছু কারখানা কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয়রা সংগ্রহ করেছেন। তবু আমরা তাদের শুনানির জন্য ডেকেছি।’

তেল ছড়িয়ে পড়া জমির একাংশে বর্গা চাষ করেন স্থানীয় কৃষক দেলোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘ওই জমিতে আমরা বীজতলা তৈরি করেছি। আমাদের জালা (ধানের চারা) নষ্ট হয়ে গেছে। চারাগুলো রোপণের জন্য পাশে ১০ শতকের মতো জমি তৈরি করেছি, ওই জমিতেও তেল গেছে। এখন আর চারা রোপণের উপযোগী নেই জমি। এ ছাড়া শিমের খেত ছিল, সেটিও নষ্ট হয়ে গেছে।’

দেলোয়ার হোসেন আরও বলেন, ‘আমিসহ আরও চার থেকে পাঁচজন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাই আমরা ক্ষতিপূরণ দাবির সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

বারৈয়ারঢালা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান রেহান উদ্দিন বলেন, ‘আমার কাছে কেউ অভিযোগ করেনি। তবে বৃহস্পতিবার অফিসে যাওয়ার সময় বেশ কিছু মানুষকে ওই জমি থেকে তেল সংগ্রহ করতে দেখেছি। আমার কাছে মনে হয়েছে তেল ছড়িয়ে পড়া জমির পরিমাণ অন্তত এক একর হবে।’

এদিকে, কৃষিজমিতে ডিজেল ছড়িয়ে পড়লেও এ কারণে খুব বেশি ক্ষতির আশঙ্কা করছেন না সীতাকুণ্ড উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাবিব উল্লাহ। তিনি বলেন, কৃষিজমিতে ডিজেল গেলে দুটো ঘটনা ঘটতে পারে। একটা হলো- এর ফলে মাটিতে থাকা পোকামাকড় চলে যাবে। আর দ্বিতীয়টি হলো- গাছের ক্ষতি হতে পারে। তবে সেটা পর্যবেক্ষণের পর বলা যাবে। কারণ, জমির পরিমাণ এক একর হলে প্রভাব খুব বেশি হওয়ার কথা না। যদি এমন হতো যে এক শতাংশ জমিতে তেলগুলো পড়েছে, তাহলে ক্ষতির সম্ভাবনা বেশি ছিল।

ফসলি জমিতে ছড়িয়ে পড়া তেল নিষ্কাশনের উপায় নিয়েও কথা বলেছেন এই কৃষি কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘ওই জমিতে যদি পানি কমও থাকে, পরে পানি দিলে ডিজেল ভেসে উঠবে। সেগুলো সংগ্রহ করে ফের ব্যবহার করা যাবে। এদিকে জেনারেটরের জন্য মজুত করা ৩ হাজার লিটার তেল কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ার কথা স্বীকার করেছেন সিপি বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপক গাজী বিল্লাল হোসেন।’

গাজী বিল্লাল বলেন, ‘ট্যাংক ফাটেনি, পাইপলাইনের লিকেজের কারণেই এটা হয়েছে। আমাদের দৃষ্টিগোচর হওয়ার পর আমরা ডিজেল সংগ্রহ করে নিয়েছি। আমরা ওই জমিতে চাষ করা কৃষকদের সঙ্গে আলোচনাও করেছি। কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে অফিশিয়ালি বিষয়টি ডিল করব। ক্ষতিপূরণ চাইলে দেয়া হবে।’