মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২২

নৌকা ডুবে দুই শিশু নিখোঁজ

নৌকা ডুবে দুই শিশু নিখোঁজ
নৌকাডুবির ঘটনায় দুই শিশুকে উৎদ্ধার কার্যক্রম চলছে। ‍ছবি: সংগৃহতি
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশিত

কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে বহ্মপুত্র নদে নৌকাডুবিতে দুই শিশু নিখোঁজ হয়েছে। গতকাল সোমবার বিকেল সাড়ে ৫ টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। 

নিখোঁজ দুইজন হলো, পাগলা থানার চরশাখচূড়া গ্রামের মনির হোসেনের ছেলে ইয়াসিন (৭) ও আব্দুস ছামাদের ছেলে সিফাত (১৫)।

হোসেনপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) আসাদুজ্জামান টিটু জানান, সোমবার বিকেলে বহ্মপুত্র নদে নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়। এটি দেখতে কিশোরগঞ্জ ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেক মানুষ এসেছিলেন। ইয়াসিন ও সিফাতও এসেছিল পাগলা থানা থেকে। নৌকাবাইচ শেষে মানুষের ভিড়ে দুটি নৌকা ডুবে যায়।। এর একটিতে ছিল ওই দুই শিশু। এ সময় অন্যরা সাঁতরে তীরে উঠতে পারলেও তারা দুজন তলিয়ে যায়। 

কিশোরগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার আবুজর গিফারী বলেন, ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ও চার সদস্যের একটি ডুবুরি দল সেখানে গিয়ে উদ্ধার অভিযান চালায়।


কোটি টাকার স্বর্ণালংকার নিয়ে উধাও ব্যবসায়ী

কোটি টাকার স্বর্ণালংকার নিয়ে উধাও ব্যবসায়ী
অভিযুক্ত মিঠুন মণ্ডল। ছবি: দৈনিক বাংলা
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত

শরীয়তপুর প্রতিনিধি
শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার নয়াবাজারে গ্রাহকদের বন্ধকের প্রায় দেড় শ ভরি সোনা ও নগদ অর্থ নিয়ে পালিয়েছেন এক সোনা ব্যবসায়ী। এতে বিপাকে পড়েছেন গ্রাহকরা।

পুলিশ ও ভুক্তভোগীরা জানায়, জাজিরার নয়াবাজারে জুয়েলারি ব্যবসা করে আসছিলেন মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান থানার মধ্যপাড়ার মিঠুন মণ্ডল। বিভিন্ন সময়ে বিপদগ্রস্ত মানুষকে মাত্র দেড় থেকে দুই শতাংশ হারে সুদে সোনার গহনা বন্ধক রেখে টাকা দিতেন মিঠুন। নির্ধারিত সময়ে সুদসহ টাকা পরিশোধ করায় আস্থা অর্জন করেন তিনি। গত দুই বছরে তার কাছে প্রায় দেড় শ ভড়ি সোনা বন্ধক রেখে টাকা নেন বড়কান্দি ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক নারী-পুরুষ। গত দুই মাস আগে নয়াবাজারে সোনার দোকান তালাবদ্ধ দেখতে পেয়ে সন্দেহ হয় স্থানীয়দের। দোকান না খোলায় মিঠুনের খোঁজে এসে ভুক্তভোগীরা প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারেন। পরে সোমবার (১৯ সেপ্টেম্বর) জাজিরা থানায় লিখিত অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী রানু বেগম।
নয়াবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি দলিল উদ্দিন বলেন, মিঠুন আট বছর ধরে বাজারে ব্যবসা করেন। সম্প্রতি তিনি গ্রাহকের বন্ধক রাখা এক কোটি টাকারও বেশি মূল্যের সোনা নিয়ে পালিয়ে গেছেন।
জাজিরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, নয়াবাজারের সোনা ব্যবসায়ীর প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগী এক নারী থানায় অভিযোগ করেছেন। অভিযোগ পেয়ে ঘটনা তদন্ত করছে পুলিশ। তদন্ত শেষে দোষীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।


বহিরাগতদের দিয়ে পরীক্ষা, মাদ্রাসা সুপারসহ ২ জনের কারাদণ্ড

বহিরাগতদের দিয়ে পরীক্ষা, মাদ্রাসা সুপারসহ ২ জনের কারাদণ্ড
গাউছিয়া রহমানিয়া হোসাইনিয়া আলিম মাদ্রাসা। ফাইল ছবি
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশিত

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে দাখিল পরীক্ষায় অবৈধ উপায়ে বহিরাগত ছাত্রীদের দিয়ে পরীক্ষা দেয়ানোর অভিযোগে মাদ্রাসা সুপারসহ দুজনকে কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। মঙ্গলবার দুপুরে কটিয়াদী উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের গাউছিয়া রহমানিয়া হোসাইনিয়া আলিম মাদ্রাসায় দাখিল পরীক্ষার সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খানজাদা শাহরিয়ার বিন মান্নান।

দণ্ডিত দুজনের মধ্যে মো. সোলাইমানকে (৪৫) ছয় মাসের ও মো. সাদিকুর রহমানকে (৪২) তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। মো. সোলাইমান উপজেলার হাকিমিয়া হাবিবিয়া মহিলা দাখিল মাদ্রাসার সুপার, মো. সাদিকুর রহমান একই প্রতিষ্ঠানের সহকারী শিক্ষক। তারা গাউছিয়া রহমানিয়া হোসাইনিয়া আলিম মাদ্রাসা কেন্দ্রটির দায়িত্বে ছিলেন।

ইউএনও খানজাদা শাহরিয়ার বিন মান্নান বলেন, ওই কেন্দ্রে হাকিমিয়া হাবিবিয়া মহিলা দাখিল মাদ্রাসার ছয় ছাত্রীর বদলে মাদ্রাসার সুপার মো. সোলাইমান ও সহকারী শিক্ষক মো. সাদিকুর রহমানের সহযোগিতায় বহিরাগত ছয়জনকে পরীক্ষায় বসানো হয়েছে। কেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে এ অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। পরে সেখানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন-১৯৮০-এর ১৫ ধারায় তাদের সাজা দেয়া হয়েছে।


‘গরিবদের ইলিশ মাছ খাওয়ার অবস্থা নেই’

‘গরিবদের ইলিশ মাছ খাওয়ার অবস্থা নেই’
মেহেরপুরের বাজারে ইলিশের সরবরাহ থাকলেও দাম বেশি। ছবি: দৈনিক বাংলা
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত

ভরা মৌসুম। জেলেদের জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ধরা পড়ছে ইলিশ। বাজারে সরবরাহও ভালো। কিন্তু দামটা চড়া। বড় ইলিশ তো বটেই, জাটকা হিসেবে পরিচিত ২৫০ গ্রাম ওজনের ইলিশের কেজিও সাড়ে ৪০০ টাকার নিচে নামছেই। না। বাজারে ইলিশের ছড়াছড়ি থাকলেও দামের কারণে তাই ইলিশের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা।

ক্রেতারা বলছেন, মধ্যস্বত্বভোগী ও ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে ইলিশের দাম এত বেশি। আর ব্যবসায়ীরা বলছেন, মোকামে বেশি দাম থাকার কারণেই তাদের স্থানীয় বাজারে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে ইলিশ।

গতকাল সোমবার মেহেরপুরের ঐতিহ্যবাহী বামন্দী হাট ঘুরে দেখা যায়, বরিশালের ২ কেজি ও তার বেশি ওজনের ইলিশের কেজি ২ হাজার ৫০ টাকা থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত, সোয়া কেজি থেকে দেড় কেজি ওজনের ইলিশের কেজি ১ হাজার ৭০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা, ১ কেজির ওজনের ইলিশের কেজি ১ হাজার ৪০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা, ৭০০ গ্রাম থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের কেজি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০ টাকা এবং ২৫০ গ্রাম ওজনের (জাটকা হিসেবে পরিচিত) ইলিশের কেজিও ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা।

মটমুড়া গ্রামের প্রবাসফেরত যুবক মামুন দৈনিক বাংলাকে জানান, তিন বছর পর বাহরাইন থেকে ফিরেছেন কয়েক দিন আগে। অসুস্থ বাবার জন্য ইলিশ কিনতে এসেও দামের কারণে কিনতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘গরিবদের ইলিশ মাছ খাওয়ার অবস্থা নেই। জাতীয় মাছ ইলিশ এখন দেশের জাতীয় পর্যায়ের লোকদের মাছ হয়ে গেছে।’

গাংনী উপজেলার কোদাইলকাটি গ্রামের ৯০ বছর বয়সী বৃদ্ধ আফফান আলী বলেন, ‘দেশ স্বাধীনের আগে দুই থেকে আড়াই কেজি ওজনের একটি ইলিশ দুই টাকা কেজি দরে কিনেছি। এখন ১ কেজি ২০০ গ্রামের ইলিশের দাম প্রতি কেজি ১ হাজার ৮০০ টাকা। ইলিশ মাছ সে সময়ও বাংলাদেশ হতো, এখনো হয়। তবে দামের পার্থক্য অনেক।’

৪৮ বছর ধরে মাছ ব‍্যবসা করছেন আব্দুল গণি। তিনি দৈনিক বাংলাকে বলেন, যুদ্ধের পর দুই থেকে আড়াই কেজি ওজনের ইলিশ ছয় টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছি। এখন এই ওজনের ইলিশ পাওয়া কঠিন। পাওয়া গেলেও বতর্মান দাম ২ হাজার ১০০ টাকা থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা কেজি। মোকামেই তারা ১ হাজার ৭৫০ টাকা থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা করে কেজি দরে বিক্রি করেন।


জাম্বুরা দিয়ে ফুটবল খেলা মেয়েরাই সাফে সেরা

জাম্বুরা দিয়ে ফুটবল খেলা মেয়েরাই সাফে সেরা
আনাই ও আনুচিংয়ে বাবা রাপ্রু মগ ও মা আপ্রুমা মগীনি। ছবি: দৈনিক বাংলা
নুরুচ্ছাফা মানিক, খাগড়াছড়ি
প্রকাশিত

খাগড়াছড়ি সদরের পেরাছড়া ইউনিয়নের সাতভাইয়াপাড়া গ্রাম। এই গ্রামে জন্ম বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের খেলোয়াড আনাই মগিনী ও আনুচিং মগিনীর। শহর থেকে দূরত্ব খুব বেশি না। তবে অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে সাতভাইয়াপাড়া বরাবরই পিছিয়ে পড়া একটি গ্রাম। সেই গ্রামটিকেই অবশ্য গত কয়েক বছর ধরে মানুষ চিনতে শুরু করেছে। আর সবাইকে এই গ্রাম চিনতে বাধ্য করেছে আনাই ও আনুচিং মগিনী। যে মেয়েরা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে দেশকে চ্যাম্পিয়ন ট্রফি এনে দিয়েছে, সেই মেয়েদের গ্রামের কথা তো জানতেই হয়।

গতকাল সোমবার সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা ঘরে এনেছে বাংলাদেশের মেয়েরা। স্বাগতিক নেপালকে ৩-১ গোলের ব্যবধানে হারিয়ে আনা এই ট্রফি দেশের জন্যও প্রথম। সেই দলেরই দুই সদস্য আনুচিং ও আনাই। তাদের বাড়ি তো বটেই, তাদের গ্রামেও তাই এখন বইয়ে আনন্দের জোয়ার। গ্রামবাসীও অপেক্ষায় তাদের বরণ করে নিতে।

মঙ্গলবার (২০ সেপ্টেম্বর) সাতভাইয়াপাড়া গিয়ে কথা হয় আনাই ও আনুচিংয়ের বাবা রাপ্রু মগের সঙ্গে। তিনি বলছেন, আনুচিং ও আনাইয়ের ফুটবলে আসাটা মোটেও সহজ ছিল না। তাদের বাড়ি যেতে পার হতে হয় দুর্গম পথ। তাদের ফুটবলে আসার পথটাও ছিল তেমনই দুর্গম।

রাপ্রু মগ বলেন, আমাদের অভাব-অনটনের সংসার। মেয়েদের ঠিকমতো খাবার দিতে পারি না। পড়ালেখার খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হয়। এর মধ্যেও দুই বোনের ফুটবলের প্রতি আগ্রহ ছোটবেলা থেকে। তখন তো ফুটবল কিনে দিতে পারিনি। ওরা বাড়ির উঠানে জাম্বুরাকে ফুটবল বানিয়ে খেলত। আমাদের মতো অভাবের সংসারে মেয়েরা ফুটবল খেলবে, সেটা তো ভাবতেও পারতাম না। তাই অনেক সময় বকাও দিতাম।

দুই বোনের ফুটবলে আসার কথা জানিয়ে রাপ্রু বলেন, একসময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্ট চালু হয়। আমরা খুব একটা আগ্রহী ছিলাম না। কিন্তু ওদের স্কুলের শিক্ষক দুই বোনকে খেলতে নিয়ে গিয়েছিল। টুর্নামেন্টে ওরা ভালো খেলে। আর আগ্রহ তো ছিলই। তা দেখেই ক্রীড়া শিক্ষক দুই জনকে নিয়ে যান রাঙামাটির ঘাগড়ায়। সেখানেই ফুটবল ঠিকমতো শিখতে শুরু করে। তারপর তো আজকে সবাই জানে ওদের কৃতিত্বের কথা।

আনাই ও আনুচিংদের বাড়িতে যাওয়ার পথ। ছবি: দৈনিক বাংলা
আনাই ও আনুচিংদের বাড়িতে যাওয়ার পথ। ছবি: দৈনিক বাংলা

২০১৮ সালে বয়সভিত্তিক ফুটবলে নেপালের মাটি থেকেই জয় ছিনিয়ে এনে দেশবাসীর কাছে পরিচিত হয়ে ‍উঠতে শুরু করে খাগড়াছড়ির মেয়ে আনাই, আনুচিং ও মনিকা। তাদের ফুটবল নৈপুণ্যে মুগ্ধ হয়েছিল দেশ। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ থেকে ওই সময় তিন খেলোয়াডের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দেয়া হয়। তবে তিনজনের বাড়িতে ঘর তুলতে সহায়তা ছাড়া আর কোনো আশ্বাস আলোর মুখ দেখেনি।

এ নিয়ে আক্ষেপ করে আনাই-আনুচিংয়ের মা আপ্রুমা মগীনি বলেন, পার্বত্য জেলা পরিষদ থেকে বাড়ির পাশের ছড়ার ওপর একটি কালভার্ট করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল। চার বছরেও সেই কালভার্ট হয়নি। আরও অনেক প্রতিশ্রুতি আছে। এখন তো মেয়েদের খেলাধুলার আয়ে এখন সংসার চলে। প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন হলে হয়তো আমাদের জীবনটা একটু সহজ হতো।

মনিকা চাকমার গল্পটাও একই

খাগড়াছড়ির সবচেয়ে দুর্গম উপজেলা লক্ষ্মীছড়ি। সেই উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম সুমন্তপাড়া। ভৌগলিকভাবে দুর্গম হলেও সব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করেই সাফল্য এনেছে সেই গ্রামের মেয়ে মনিকা চাকমা। আনাই-আনুচিংয়ের মতো সে-ও সাফ নারী ফুটবল দলের একজন সদস্য।

মনিকা চাকমার গ্রামের বাড়ি সুমন্তপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, তাকে ঘিরে বেশ উচ্ছ্বাস চলছে পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীদের মধ্যে। বিদ্যুৎ ও ভালো ইন্টারনেট না থাকায় সোমবার এ গ্রামের কেউ খেলা দেখতে পারেননি। কিন্তু মনিকাদের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার খবরটা পেয়েছেন। মঙ্গলবার দিনের বেলা তাই অনেকেই অনলাইনে দেখেছেন সেই খেলা। নিজেদের গ্রামের মেয়ের এমন সফলতায় তারা ভীষণ উচ্ছ্বসিত। খুশিতে মিষ্টি বিতরণও হয়েছে গ্রামে।


পাহাড় থেকে বেড়ে ওঠা রুপনা চাকমার

পাহাড় থেকে বেড়ে ওঠা রুপনা চাকমার
রুপনা চাকমাদের বাড়ি। ইনসেটে রুপনা। ছবি: দৈনিক বাংলা
সুপ্রিয় চাকমা শুভ, রাঙামাটি
প্রকাশিত

নারীদের সাফে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ। গোলের বন্যা বইয়ে দেয়ার বিপরীতে গোটা টুর্নামেন্টে মাত্র একটি গোল হজম করতে হয়েছে বাংলাদেশের মেয়েদের, তাও ফাইনাল ম্যাচে। টুর্নামেন্টজুড়ে দলের গোলবার এমন নিখুঁতভাবে সামলানোর কারিগর রুপনা চাকমা। তার পাহাড়ি গ্রামে তাই বইছে আনন্দের ধারা। সারা দেশের মানুষের প্রশংসাও ছুঁয়ে যাচ্ছে রুপনাকে। আর গ্রামের মানুষ অপেক্ষায়, কখন রুপনা বাড়িতে আসবে।

পাহাড়ি এই মেয়ের ফুটবলার হিসেবে উঠে আসাটা যেন গল্পের মতো। রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলার ঘিলাছড়ি ইউনিয়নের ভূঁইয়ো আদাম এলাকায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা। জন্মের আগেই পৃথিবীর মায়া কাটিয়েছিলেন বাবা গাছা মনি চাকমা। প্রান্তিক এলাকার পরিবার হওয়ায় তাই সেই ছোটবেলা থেকেই মুখোমুখি ভীষণ চ্যালেঞ্জের। তারপরও ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলায় আগ্রহ ছিল। হাজাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে থেকে নানিয়ারচরে ফুটবল খেলতে গেলে তার নৈপুণ্য চোখে পড়ে শিক্ষক বীরসেন চাকমার। রুপনা যখন তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী, বীরসেন চাকমার সূত্র ধরে তাকে ঘাগড়াতে নিয়ে যান শান্তি মনি চাকমা। সেখানেই গোলরক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষণের শুরু। আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন তো রুপনা দক্ষিণ এশিয়ারই সেরা গোলরক্ষক।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রুপনার ফুটবল ক্যারিয়ার বদলালেও তার ঘরবাড়ি আর এলাকার চেহারা কিন্তু বদলায়নি। ভূঁইয়ো আদাম এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, রুপনার বাড়িতে ভাঙা একটি কুঁড়ে ঘর। সেটিই রুপনাদের একমাত্র ঘর। সেখানেই বসবাস রুপনা, তার মা আর বাকি তিন ভাই-বোনের। আর ভূঁইয়ো আদামের আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে রুপনাদের বাড়ি পৌঁছানোর আগে পার হতে হয় কাঠের একটি ব্রিজ। সেটি দেখলেই ভয় হয়, কখন যেন ভেঙে পড়ে। অবশ্য গতকালের ম্যাচের পর প্রশাসনের কাছ থেকে আশ্বাস মিলেছে, গ্রামবাসীর জন্য একটি সেতু করে দেয়া হবে সেখানে। রুপনাদের বাড়ি করে দেয়ার কথাও জানিয়েছে প্রশাসন।

রুপনাদের বাড়িতে গিয়ে কথা হয় তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। রুপনার মা কালা সোনা চাকমা জানালেন মেয়ের বেড়ে ওঠার কথা। বীরসেন চাকমা ও শান্তিমনি চাকমার প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানালেন মেয়েকে এই পর্যায়ে তুলে নিয়ে আসতে সহযোগিতা করার জন্য। কালা সোনা চাকমা বলেন, ছোটবেলা থেকেই রুপনা খেলত। শরীরে জ্বর নিয়েও ফুটবল খেলা বাদ দিত না। ২০১২ সালের দিকে সে নানিয়ারচরে ফুটবল খেলতে গিয়েছিল। সেখান থেকে তাকে বীরসেন চাকমা ও শান্তি মনি চাকমা নিয়ে যান ঘাগড়াতে। সেখান থেকেই আজ মেয়ে দেশের জন্য গৌরব নিয়ে এসেছে।

রুপনার বড় ভাই জীবন চাকমা বলেন, রুপনা ছোটবেলা থেকে খেলা পছন্দ করত। আমরাও খুব একটা না করিনি। বিকেলে কাজ থেকে ফিরে মায়ের থেকে শুনি বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। গ্রামের লোকেরা রুপনাকে নিয়ে প্রশংসা করছে। তার এত দূর আসার পেছনে মূল কারিগর হলেন ঘাগড়ার শান্তি মনি চাকমা ও বীরসেন চাকমা। রুপনা ছোটবেলায় হাজাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে থাকাকালীন সব খরচ দিয়ে তারাই রুপনাকে ঘাগড়াতে নিয়ে গিয়েছিলেন। তাদের কারণেই রুপনা আজ এত দূর আসতে পেরেছে।

তবে আক্ষেপও রয়েছে রুপনার মায়ের। তিনি বলেন, গতবারও অনূর্ধ্ব ১৪-তে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। কিন্তু সরকার, প্রশাসন বা কোনো সংস্থা কেউই দেখতে আসেনি রুপনা কীভাবে লড়াই করে বেঁচে আছে। রুপনার প্রতিভা ধরে রাখতে কেউ পাশে দাঁড়ায়নি। এখন তো সবাই খুব প্রশংসা করছে। দোয়া করি, আমার মেয়ে আরও এগিয়ে যাক।

এই পথ পেরিয়েই যেতে হয় রুপনাদের বাড়ি। ছবি: দৈনিক বাংলা
এই পথ পেরিয়েই যেতে হয় রুপনাদের বাড়ি। ছবি: দৈনিক বাংলা

রুপনাসহ ঘাগড়া এলাকার পাঁচ নারী ফুটবলারকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন শান্তি মনি চাকমা। কথা হয় তার সঙ্গেও। শিষ্যের সাফল্যে অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, মোবাইলে খেলাটি উপভোগ করেছি। তাদের এ বিজয়ের অনুভূতি মুখে বলা সম্ভব নয়। তাদের বিজয় মানে আমার বিজয়। কেননা তাদের আমিই প্রশিক্ষণ দিয়েছি। এ ছাড়া বাংলাদেশ আনসার-ভিডিপির কোচ সুইলা মং মারমা ও শিক্ষক বীরসেন চাকমারও অনেক অবদান রয়েছে।

মগাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক বীরসেন চাকমা বলেন, ২০১২ ও ২০১৩ সালেই রুপনাকে ঘাগড়াতে আনতে চেয়েছিলাম। তখন রাজি হয়নি। ২০১৪ সালে যখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ত, তখন ঘাগড়াতে নিয়ে আসি। এখন তো সে সেরা গোলরক্ষক হিসেবে কৃতিত্ব অর্জন করেছে। তার এ অর্জন শুধু তার নয়, এ অর্জন পুরো দেশবাসীর।

গ্রামের মানুষরাও রুপনাদের সাফল্য উদযাপন করতেই ব্যস্ত। রুপনাদের দেখে ফুটবল ঘিরে আগ্রহও বাড়ছে স্থানীয় মেয়েদের মধ্যে। রিপনা চাকমা নামের এক কিশোরী জানাচ্ছে, রুপনা এখন তাদের কাছে অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত। সেও ফুটবল খেলতে চায়।

ভূঁইয়ো আদাম গ্রামের বাসিন্দা আলো বিকাশ চাকমা বলেন, রুপনা অসহায় এক মায়ের সন্তান। বাবাকে দেখেনি। সেই রুপনা আজ আমাদের গ্রামের সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে দিয়েছে। সে এখন দেশের গর্ব, আগামী প্রজন্মের পথপ্রদর্শক। সে দেশ ও জাতিকে সম্মান এনে দিয়েছে। তাই জেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে সবার উচিত রুপনা ও তার পরিবারকে সহযোগিতা করা।

ওই এলাকার গ্রামপ্রধান সুদত্ত বিকাশ চাকমা বলেন, রুপনা চাকমা সম্পর্কে ভাগনি হয়। সে ছোটবেলা থেকে খেলাধুলাপ্রেমী। গ্রামের মানুষ তাকে নিয়ে গর্ববোধ করছে। তবে তার পরিবারের ও তাকে এ পর্যন্ত সাহায্য-সহযোগিতা করতে কাউকে দেখিনি। সরকার চাইলে রুপনাদের জন্য অনেক কিছু করতে পারে।

ঘিলাছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) মহিলা প্যানেল চেয়ারম্যান বাসন্তী চাকমা বলেন, রুপনা আমাদের ইউনিয়নের মেয়ে। তার জন্য আমরা গর্ববোধ করছি। কেননা সে আমাদের গ্রামের মেয়ে হয়ে বাংলাদেশের জন্য শিরোপা এনে দিয়েছে। মেয়েটির জন্মের আগেই বাবা মারা গেছেন। সরকারের পক্ষ থেকে তাকে সহায়তা করা প্রয়োজন।

সবার কাছ থেকেই রুপনাদের জন্য সরকারি সহায়তার তাগিদের কথা এসেছে। এরই মধ্যে সেই সহায়তাপ্রাপ্তির উদ্যোগও দৃশ্যমান। মঙ্গলবার বিকেলে রুপনা ও একই এলাকার আরেক ফুটবলার রিতুপর্ণা চাকমার বাড়িতে যান রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। তাদের দুজনের পরিবারের হাতে পুরস্কার হিসেবে তুলে দেন দেড় লাখ টাকা করে। এ মসয় শিক্ষাবিদ ও বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরূপা দেওয়ান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম, নানিয়ারচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফজলুল রহমানসহ জেলা প্রশাসন এবং অন্যান্য দপ্তরের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

জেলা প্রশাসক বলেন, রুপনা ও রিতু আমাদের রাঙামাটির গর্ব। তাদের এ অর্জন পুরো বাংলাদেশের মানুষ গর্বিত। তাদের এ কৃতিত্বের জন্য তাদেরকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। এ ছাড়াও এলাকাবাসীর সুবিধার জন্য একটি ব্রিজ নির্মাণ ও রুপনা চাকমাকে একটি বাড়ি নির্মাণের আশ্বাসও দেন তিনি।