গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়ে নবনির্বাচিত মেয়র জায়েদা খাতুনকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এ পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা অ্যাডভোকেট আজমত উল্লা খান।
ভোটের পরদিন শুক্রবার সকালে টঙ্গীর নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপ করছিলেন আওয়ামী লীগ মনোনীত এ মেয়র প্রার্থী।
আজমত উল্লা বলেন, ‘নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে, ইভিএমের ত্রুটির কারণে অনেকে ভোট দিতে পারেননি। রেজাল্ট যা হয়েছে, আমি তা মেনে নিয়েছি। যিনি বিজয়ী হয়েছেন, আমি তাকে অভিনন্দন জানাই। তিনি (জায়েদা) কোনো ধরনের সহযোগিতা চাইলে সেটা যদি যৌক্তিক হয়, তাহলে সহযোগিতা করব।’
পরাজয়ের কারণ খুঁজে বের করা হবে জানিয়ে আজমত উল্লা বলেন, ‘আমি যেহেতু দলীয় প্রার্থী ছিলাম, দলের সবাই বসে পর্যালোচনা করে নির্বাচনে পরাজয়ের কারণ খুঁজে বের করা হবে। দলের কেউ জড়িত থাকলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
‘নৌকা নয়, ব্যক্তির পরাজয় হয়েছে’ ভোটে জয়লাভের পর জায়েদা খাতুনের ছেলে ও তার প্রধান নির্বাচনী সমন্বয়ক জাহাঙ্গীর আলমের এমন মন্তব্য প্রসঙ্গে আজমত বলেন, ‘কথাটি স্ট্যান্ডবাজি। আমি নৌকার প্রার্থী, আমার পরাজয় মানে নৌকার পরাজয়।’
পঞ্চগড়-২ (বোদা-দেবীগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদের সুপারিশে জুলাই শহীদ পরিবারের আরও দুই সদস্য অফিস সহায়ক পদে চাকরি পেয়েছেন। একই সঙ্গে সরকারি সম্মানী (বেতন) থেকে জেলার ছয়টি জুলাই যোদ্ধা পরিবারের মধ্যে চারটি পরিবারকে প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছেন তিনি।
জানা গেছে, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী সংসদ সদস্যের পরিদর্শন কক্ষে অফিস সহায়ক নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হলে জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্যদের অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশনা দেন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ। তারই সুপারিশে বোদা ও দেবীগঞ্জ উপজেলার সংসদ সদস্যের পরিদর্শন কক্ষে অফিস সহায়ক পদে জুলাই শহীদ পরিবারের দুই সদস্যকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আত্মত্যাগী পরিবারগুলোর প্রতি সম্মান জানানো এবং তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করাই এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।
ইতোমধ্যে বোদা উপজেলা পরিষদে সংসদ সদস্যের পরিদর্শন কক্ষে অফিস সহায়ক হিসেবে সাকোয়া ইউনিয়নের জুলাই শহীদ সুমনের বোন যোগদান করেছেন।
অন্যদিকে দেবীগঞ্জ উপজেলার সংসদ সদস্যের পরিদর্শন কক্ষে অফিস সহায়ক হিসেবে মারেয়া ইউনিয়নের জুলাই শহীদ আবু সাইদের ছেলে মামুন ইসলাম যোগদান করেছেন।
দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইন্দ্রজীৎ শাহ বলেন, ‘প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ এমপির নির্দেশনা ও সুপারিশে মারেয়া ইউনিয়নের জুলাই শহীদ আবু সাইদের ছেলে মামুন ইসলামকে অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।’
এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের মতে, জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্যদের কর্মসংস্থানে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত আর্থিক সহায়তা প্রদান করে প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ একটি মানবিক উদ্যোগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, ‘আমরা ৭১ কে যেমন ধারণ করি, ঠিক তেমন ২৪ কেও ধারণ করি। অতএব সেই জায়গা থেকে আমি শপথ গ্রহণের পর সরকারিভাবে যা সম্মানী (বেতন) পাই তা থেকে জেলার ৬টি জুলাইযোদ্ধা পরিবারের মধ্যে ৪টা পরিবারকে প্রতি মাসে ৫ হাজার করে টাকা দেই এবং দুই পরিবারের দুই সদস্যকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অফিস সহায়ক পদে চাকরি দেয়ার নির্দেশনাও দিয়েছি।
কুড়িগ্রামে জৈব সারের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। এতে করে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার কমে আসায় লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা। জৈব সার দিয়ে আবাদ করায় উৎপাদন খরচ কমার পাশাপাশি মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিসহ নিরাপদ ফসল উৎপাদন হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের মীরের বাড়ি গ্রামের কৃষক দম্পতি মিনতী রাণী-কানাই চন্দ্র ট্রাইকো কম্পোস্ট সার উৎপাদন করছেন। এই সার নিজেরা ব্যবহারের পাশাপাশি অন্য কৃষকের কাছে বিক্রি করছেন। ট্রাইকো কম্পোস্ট উপকারী ছত্রাক ‘ট্রাইকোডার্মা’ সমৃদ্ধ একটি উন্নত ও পরিবেশবান্ধব জৈব সার। গোবর, হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা-ডিমের খোসা, খৈল, কচুরিপানা, খড়-কাঠের গুড়া, ছাই, চা পাতা, মেহগনির ফল,নালী গুড় এবং ট্রাইকোডার্মা মিশ্রণ করে এই সার উৎপন্ন করা হচ্ছে। এটি মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ক্ষতিকর ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগ ধ্বংস করতে প্রাকৃতিক প্রতিরোধক ও প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে। এই সার মাটিতে উপকারী অণুজীবের সংখ্যা বাড়ায় এবং মাটির অম্লত্ব-ক্ষারত্বের ভারসাম্য বজায় রাখে। এটি প্রাকৃতিক বালাইনাশক হিসেবেও কাজ করে। বিশেষ করে শিকড় পচা, ঢলে পড়া এবং উইল্ট রোগের মতো মাটি বাহিত ক্ষতিকর ছত্রাক ধ্বংস করে। গাছের শিকড় মজবুত করে এবং উদ্ভিদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সহজ করে। এতে ফলে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। জেলায় বিভিন্ন অঞ্চলে ট্রাইকো কম্পোস্ট সার ও লিচেট ব্যবহারে কৃষকদের মধ্যে দিন দিন আগ্রহ বাড়ছে। ট্রাইকো কম্পোস্ট সার ব্যবহারে মাটির গঠন ও বুনট উন্নত করে পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়ায়,পানির অপচয় রোধ করে। এছাড়া ট্রাইকো কম্পোস্ট সার উৎপাদনের সময় যে লিচেট বা তরলজাতীয় সংগ্রহ করা হয়, তা বিভিন্ন সবজি ও পানের বরজসহ ফল গাছে ব্যবহার করে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিসহ ফসলের রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে করা যায়। তাই স্বল্প খরচে ও সহজ পদ্ধতিতে উৎপাদিত এ সার ও লিচেট ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জমি তৈরির সময় প্রতি শতকে ৮ থেকে ১০ কেজি হারে ট্রাইকো কম্পোস্ট প্রয়োগ করতে হয়। টমেটো, বেগুন, শসা, পেয়ারা,আম ইত্যাদি গাছে চারা লাগানোর সময় ২ হতে ৩ কেজি সার গর্তে ভালো ভাবে মিশিয়ে দিতে হয়। ট্রাইকো কম্পোস্ট ব্যবহারে জমির রাসায়নিক সারের চাহিদা প্রায় ২৫শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। ট্রাইকো লিচেট এটি বোতলে সংগ্রহ করে ১৫-২০ মিলি প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে গাছে স্প্রে করা হয়। এতে অত্যন্ত কার্যকরী বালাইনাশক হিসেবে কাজ করে। ট্রাইকো কম্পোস্ট সার জেলায় অত্যন্ত জনপ্রিয় ও পরিবেশবান্ধব জৈব সার হয়ে উঠেছে।
নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে বিভিন্ন জেলায় এসব জৈব সার বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা আয় করছেন উদ্যোক্তারা।
কৃষক কানাই চন্দ্র বলেন, ১০০কেজি ট্রাইকো কম্পোস্ট জৈব সার তৈরি করতে গোবর-৬০কেজি, কচুরিপানা-৫কেজি, খড়-কাঠের গুড়া-১০কেজি, চা পাতা-১০কেজি, ছাই-৫ কেজি, বাড়ি বর্জ্য-৫ কেজি, ডিমের খোসা, মেহগনি গাছের ফলের খোসা-১ কেজি করে, নালী গুড় এবং ট্রাইকোডার্মা-১০০ গ্রাম করে দেয়া হয়। এতে প্রায় ৪৫ দিনের মধ্যে জৈব পদার্থ পচে ট্রাইকো কম্পোস্ট সার উৎপাদিত হয় এবং লিচেট পাওয়া যায়।
কৃষাণী মিনতী রাণী বলেন, বছরে আমরা প্রায় ১০ হাজার কেজি জৈব সার উৎপাদন করি। এই সার আমরা নিজেদের জমিতে ব্যবহার করছি এবং ১০ হতে ১৫টাকা কেজিতে স্থানীয় কৃষকদের কাছে বিক্রি করা হয়। এতে নিজেদের চাহিদা পূরণ হবার সাথে বাড়তি আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
ধরলা ট্রাইকো কম্পোস্ট উদ্যোক্তা মাসুম মিয়া বলেন, আরডিআরএস এবং পিকেএসএফ-এর সহযোগিতায় আমি ট্রাইকো কম্পোস্ট সার উৎপাদন শুরু করি। চলতি মৌসুমে ১২০ মেট্রিক টন সার উৎপাদন হয়েছে আগামী মৌসুমে ৪০০ মেট্রিক টন জৈব সার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি।
শ্রমিক বিধান চন্দ্র ও বুলবুলি বলেন, এই অঞ্চলে কাজের তেমন কোন কর্মসংস্থান নেই। শুধু কৃষি কাজের উপর নির্ভর থাকতে হয়। আমাদের গ্রামে জৈব সার উৎপাদন শুরু হওয়ায় ২০ হতে ৩০জন নারী-পুরুষের স্থায়ী কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এখানে কাজ করে দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরি পাই। বাড়ির কাজ শেষ করে সকাল ৮টা হতে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কাজ করে থাকি। এতে করে আমাদের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আরডিআরএস বাংলাদেশের কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সজিব আহমেদ বলেন, জেলায় কৃষকদের মাঝে এই সার ব্যবহার আগ্রহ বেড়েছে। জৈব সার ব্যবহারে কৃষি জমির মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং নিরাপদ ও পুষ্টিকর ফসল উৎপাদন হওয়ায় রাসায়নিকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে জীব-পরিবেশ রক্ষা পাচ্ছে। উপজেলায় জৈব সার উদ্যোক্তা তৈরিতে কাজ করতে আরডিআরএস এবং পল্লী-কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন যৌথভাবে কাজ করছে। পরিবেশবান্ধব কৃষিকে উৎসাহিত করতে তৃণমূলের কৃষকদের এই সার তৈরিতে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।
রাজারহাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুন্নাহার সাথী বলেন, ট্রাইকো কম্পোস্ট থেকে উৎপাদিত সার ও লিচেট ব্যবহার করে কৃষকেরা লাভবান হচ্ছেন। এতে করে নিরাপদ ফসলসহ জমির উর্বরতা বাড়ছে। সরকারি-বেসরকারি ভাবে কৃষকদের এই জৈব সার ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে এবং উদ্যোক্তা তৈরিতে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দেয়া হচ্ছে।
জীবন মানেই তো অদম্য পথচলা। কখনো সাফল্য, তো কখনো গভীর অন্ধকার। সব মিলিয়েই জীবন। কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা অষ্টগ্রামের কাস্তুল ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. আব্দুল আহাদ এই সত্যটি নতুন করে প্রমাণ করলেন। জীবন সংগ্রামের নানা ধাপ পেরিয়ে কোয়েল পাখির খামার করে যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তা একবার হোঁচট খেয়েও আবার নতুন করে ডানা মেলেছে।
আব্দুল আহাদের খামারের নাম ‘রাকিব-সাকিব কোয়েল খামার এন্ড হ্যাচারি’। মাত্র ৫০০ কোয়েল পাখি নিয়ে যাত্রা শুরু করা আব্দুল আহাদের এই উদ্যোগটি ছিল অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। আস্তে আস্তে খামারটি বড় আকার ধারণ করে। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে তার খামারে ৪১০০টি কোয়েল পাখি ছিল এবং সেই সময় প্রতিদিন প্রায় ৩৭০০টি করে ডিম পাওয়া যেত। কিন্তু বিধিবাম! হঠাৎ করেই মরণব্যাধি ভাইরাসে একদিনেই তার খামারের সমস্ত পাখি মারা যায়। চোখের সামনে তিল তিল করে গড়ে তোলা স্বপ্নগুলো নিভে যেতে দেখে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন এই উদ্যোক্তা।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আব্দুল আউয়ালের পরামর্শে দীর্ঘ এক মাস খামারটি সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয় এবং জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করা হয়। এরপর নতুন উদ্যমে খামারটি পুনরায় চালু করেন।
বর্তমানে তার খামারের পরিবেশ ও পাখিদের অবস্থা বেশ আশাব্যঞ্জক। খামারের খাঁচায় সাজানো পাখিগুলো নিয়মিত ডিম দিচ্ছে, যা খামারের অর্থনৈতিক চাকা সচল রেখেছে।
আব্দুল আহাদ জানান, খামারে উচ্চমানের ‘ইউরোপিয়ান কোয়ার্টিনিক্স’ ও ‘জাপানি কোয়েল’ জাতের পাখি লালন-পালন করছেন। ডিম দেওয়ার উপযোগী ৩০০০টি কোয়েল পাখির মধ্যে ১০০০টি নিয়মিত ডিম পাড়ছে। আর নিজস্ব হ্যাচারিতে প্রতি মাসে প্রায় ১০০০ বাচ্চা ফোটানো হচ্ছে।
সাফল্যের এই ধারা অব্যাহত রাখতে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ আব্দুল আহাদ। তিনি এখন আর শুধু স্থানীয় পর্যায়ের উদ্যোক্তা হয়ে থাকতে চান না। তার চোখে এখন বড় স্বপ্ন নিজের খামারটিকে ভবিষ্যতে সারা বাংলাদেশের মধ্যে অন্যতম বৃহৎ ও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক একটি খামারে রূপান্তরিত করা। আব্দুল আহাদের এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প হাওরবাসীর জন্য কেবল একটি খামারের বেঁচে থাকা নয়, এটি অদম্য সাহস ও আত্মবিশ্বাসের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রতিকূলতাকে জয় করে তিনি যে দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেছেন, তা স্থানীয় আরও অনেক বেকার যুবকের জন্য আশার আলো হয়ে জ্বলবে।
ফেনীর পরশুরাম সীমান্ত দিয়ে ৭ জন ভারতীয় নাগরিককে অবৈধভাবে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করেছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)।
তবে বিজিবির তাৎক্ষণিক টহল দলের তৎপরতায় ওই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে বলে বিজিবি জানিয়েছে। শনিবার (২৫ জুলাই) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ফেনী ব্যাটালিয়ন (৪ বিজিবি)-এর শ্রীপুর বিওপির দায়িত্বপূর্ণ সীমান্ত পিলার ২১৪৫-এর নিকটবর্তী দুর্গাপুর সীমান্ত এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
ফেনী ব্যাটালিয়ন (৪ বিজিবি) সূত্রে জানা যায়, ভারতের ৪৩ রাজনগর বিএসএফ ক্যাম্পের একটি টহলদল ৭ জন ব্যক্তিকে (যাদের মধ্যে ৬ জন নারী ও ১ জন ছেলে শিশু রয়েছে) বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবৈধভাবে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করে। বিষয়টি টহলরত বিজিবি সদস্যদের নজরে এলে তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে কৌশলগত অবস্থান গ্রহণ করে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বাংলাদেশে প্রবেশে বাধা দেয়।
আব্দুর রহমান নামের স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, সীমান্ত এলাকার কয়েকজনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর জন্য জড়ো হওয়ার খবরে তৎক্ষণিকভাবে বিজিবিকে জানানো হলে বিজিবি দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে তা প্রতিহত করেছেন। এক পর্যায়ে তারা আবার ভারতের অভ্যন্তরে ঢুকে যায়।
ফেনী ব্যাটালিয়ন (৪ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এম জিল্লুর রহমান সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনী জোরপূর্বক বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করলে বিজিবি সদস্যরা তা প্রতিহত করেন।
অধিনায়ক আরো বলেন, অবৈধ অনুপ্রবেশ, পুশইন কিংবা সীমান্ত আইন লঙ্ঘনের চেষ্টা প্রতিহত করতে বিজিবি সর্বদা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি ও প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ মূলক ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
ফরিদপুরে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করা হলো বরেণ্য কবি ও সাংবাদিক শেখ শামসুল হককে। ‘ভুবনেশ্বরের জল-হাওয়ায় বেড়ে ওঠা কোমলহৃদয়’ এই গুণী মানুষের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের উদ্যোগে সাহিত্য ভবনে গত শুক্রবার (২৪ জুলাই) সন্ধায় আলোচনা সভা, কবিতা পাঠের আয়োজন করা হয়।
ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক মো. আলতাফ হোসেনের সভাপতিত্বে স্মরণসভায় ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিকবৃন্দ অংশ নেন। অনুষ্ঠানে বক্তারা কবি শেখ শামসুল হকের স্মৃতিচারণ করে তার জীবন ও বর্ণাঢ্য সাহিত্যকর্মের নানা দিক তুলে ধরেন।
স্মরন সভায় বক্তরা কবি শেখ শামসুল হকের সাহিত্যি চর্চার অবদানকে স্মরণীয় করে রাখতে একটি জোরালো দাবি উত্থাপন করেন। তারা বলেন, শেখ শামসুল হকের মতো একজন নিভৃতচারী ও খ্যাতিমান কবি কে তার অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি থেকে মরণোত্তর সম্মাননা দেওয়া উচিত।
এ সময় তার জীবনের সাথে জড়িয়ে থাকা বহু স্মৃতিবিজড়িত মুহূর্ত ও অতীতের নানা কথা আবেগঘন পরিবেশে তুলে ধরেন বক্তারা।
অনুষ্ঠানে ‘অনুপ্রাস জাতীয় কবি সংগঠন সহ বিভিন্ন সাহিত্য সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। বক্তাদের তালিকায় ছিলেন প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও গবেষক অধ্যাপক এম এ সামাদ, দৈনিক ফতেহাবাদ সম্পাদক প্রফেসর এবিএম সাত্তার, কবি ও প্রকৌশলী ফরিদউজ্জামান, ডা. মো. ইমানুল হক আজাদ, কবি হাসনাইন সাজ্জাদী, কবি ও গীতিকার অনিমেষ বড়াল, কবি ও গীতিকার ইউনুস ফার্সি সিনিয়র সাংবাদিক ও প্রাবান্ধিক মফিজ ইমাম মিলন, কবি রীনা তালুকদার, লোক গবেষক খলিলউল্লাহ দিল দারাজ, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ডা. খবিরুল ইসলাম এবং দৈনিক সমকালের প্রতিবেদক হাসানুজ্জামান।
স্মরণসভার দ্বিতীয় পর্বে কবি শেখ শামসুল হকের স্মরণে তার রচিত কবিতা থেকে আবৃত্তি করেন দেশের লব্ধপ্রতিষ্ঠিত কবি ও বাচিক শিল্পীরা। কবিতা পাঠ করেন কবি আফিয়া রুবি, কবি মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান, কবি জেসমিন দীপা, কবি কবীর হুমায়ুন, কবি গিয়াসউদ্দিন চাষা, কবি শেখ নজরুল ইসলাম, কবি রুনা লায়লা, কবি ও অধ্যাপক ড. মোস্তফা দুলাল, কবি এইচ এম শাখাওয়াত হোসেন, কবি নাজমুন নাহার পারভীন (নাজ), কবি নীপা চৌধুরী, কবি জেনুন্নেছা মীনা, কবি কাজী হেমায়েত হোসেন, কবি মামুনুল ইসলাম, কবি ইসমত আরা এবং কবি নিয়াজ রায়হান সাগর।
এছাড়াও ভারত থেকে আগত বাচিক শিল্পী কবি ও সাংবাদিক আব্দুল কাইউম, অধ্যাপক জেসমিন বন্যা, অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদ, জারিফ জাওয়াদ ওহী এবং ওয়াজিহা আহনাফ শ্বেতা তাদের চমৎকার বাচিক শিল্প ও আবৃত্তির মাধ্যমে অনুষ্ঠানটিকে প্রাণবন্ত করে তোলেন। সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানটি ফরিদপুরের স্থানীয় সাহিত্য অনুরাগী ও সংস্কৃতিকর্মীদের উপস্থিতিতে এক মিলনমেলায় পরিণত হয়।
মুক্তিযুদ্ধের ৫৫ বছর। এখনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলেনি নড়াইলের পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিসের মধ্যকার গণকবরের। ঘটনাস্থলে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ ও শহীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দাবি ছিল পরিবারগুলোর।
স্বাধীনতার ৫৫ বছরে কয়েকবার সরকার বদল হয়েছে। কিন্তু কোনো সরকার আমলে দাবি পূরণ হয়নি। প্রতিবারই শুধু আশ্বাসের বাণী ছাড়া কিছু জোটেনি কপালে।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথা বলা এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের খাদ্য সহায়তা দেওয়াই ছিল তাদের অপরাধ। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীণ সময়ে নড়াইল পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিসে ছিল পাকসেনাদের ক্যাম্প। তৎকালীন নড়াইল মহকুমা পিস কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন সদর থানার তুলারামপুর গ্রামের কুখ্যাত রাজাকার মাওলানা সোলায়মান। মুক্তিযুদ্ধের ১৭ এপ্রিল তারিখে ভোর রাতে মাওলানা সোলায়মানের নেতৃত্বে একদল পাক সেনা তুলারামপুর গ্রামে প্রবেশ করে। গ্রামের তরফদার পরিবারের পাচজনসহ গ্রামের আরো তিনজনকে তুলে নিয়ে যায় সেনা ক্যাম্পে। তাদের ওপর কয়েক দফা শারীরিক নির্যাতন করা হয়।
পরে যশোর সেনা নিবাসে নিয়ে সেখানেও কয়েক দফা অমানুষিক পাশবিক নির্যাতন করা হয়। প্রায় আধা মরা অবস্থায় তাদের নড়াইল সেনাক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হয়। নড়াইল সেনা ক্যাম্পের কর্মকর্তা তাদের কয়েকজনকে দিয়ে বোর্ড অফিসের পশ্চিম পাশে কবর খুড়ে রাখে। উপর থেকে নির্দেশ পাবার পর তারা কবরের মধ্যে দাড় করিয়ে গুলি করে। এক পর্যায়ে তাদের জীবন্ত গণকবর দেয়া হয়।
গণকবরে তরফদার পরিবারের পাচজন হচ্ছে মো. আতিয়ার তরফদার, সালাম তরফদার, আলতাফ তরফদার, রফিউদ্দীন তরফদার ও মাহতাব তরফদার এবং একই গ্রামের মকবুল শিকদার, কাইজার মোল্যা ও মোকাম মোল্যা কবরে শায়িত আছেন।
তরফদার পরিবারের সদস্য মো. সাজ্জাদ হোসেন টিপু একজন সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক। মুক্তিযুদ্ধের ১৭ এপ্রিলের রোম হর্ষক ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে কয়েকবার আবেড়তাড়িত হয়ে পড়েন তিনি।সংযত হয়ে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ১৭ এপ্রিল ভোর রাতটি ছিল আমাদের পরিবারের জন্য গভীর কষ্টের দিন। গ্রামের রাজাকার সেলায়মানের নেতৃত্বে এক দল পাক সেনা আমাদের বাড়িতে প্রবেশ করে। আমার বাবা, দাদা ও চাচাদের চোখ বেঁধে সেনা গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে যায়। আমাদের পরিবার ছাড়াও আমার গ্রামের আরো লোকজনকেও একই সাথে নিয়ে যায়। তারা নড়াইল পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিসের মধ্যে পাক বাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে নির্মমভাবে নির্যাতন চালায় এবং আধমরা অবস্থায় প্রাচীরের পাশে ফেলে রাখে। পরে তাদের মধ্য থেকে আমার দাদা আতিয়ার তরফদার, সালাম তরফদার, আলতাফ তরফদার, চাচা রফিউদ্দীন তরফদার ও মাহতাব তরফদার এবং আমার গ্রামের অপর ৩ জন মকবুল শিকদার, কাইজার মোল্যা ও মোকাম মোল্যাকে টেনে হিচড়ে পাশের একটি কক্ষে রাখে। এরপর তাদের নিয়ে যাওয়া হয় যশোর সেনানিবাসে। সেখান থেকে আবারও ফিরিয়ে এনে নড়াইল পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিসের সেনা ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়।
২০ জুলাই তাদেরকে দিয়ে জোরপূর্বক ক্যাম্পের পশ্চিম কোনে একটি কবর খুঁড়ে সবাইকে তাতে নামিয়ে দেয়া হয়। এরপর প্রথমে তাদের ওপর গুলিবর্ষণ ও পরে মাটি চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়। তিনি বলেন, ঘটনাটি আমাদের জন্য খুবই বেদনার! ঘটনাস্থলে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ ও শহীদদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি ছিলো আমাদের। বেশ কয়েকবার সরকার বদল হয়েছে। আশ্বাসও পেয়েছি। কিন্তু বাস্তবে প্রতিফলিত হয়নি।
মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. সেলিম বলেন, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা তখন শহরে প্রবেশ করে পারেনি। শহরতলীতে থেকে সব খবরই পেতাম। শুনেছিলাম রাজাকার প্রধান মাওলানা সোলায়মান নেতৃত্ব দিয়ে তুলারামপুর গ্রামে সেনাবাহিনী নিয়ে গেছে। গ্রামের যাদেরকে রাজাকারের খাতায় নাম লেখাতে পারেনি সেই সমস্ত মুক্তিকামী মানুষদের ধরে নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিসে রেখে নির্যাতন করেছে। তাদের দিয়ে কবর খুড়ে জীবিত অবস্থায় মেরে ফেলে মাটি চাপা দিয়েছে। তিনি বলেন, ১০ ডিসেম্বর নড়াইল শত্রু মুক্তির দিনে মোলায়মানসহ বেশিরভাগ রাজাকারদের নড়াইলে পাওয়া যায়নি। শুনেছি তিনি ঢাকার টঙ্গী এলাকায় একটি বড় মাপের মাদ্রানা খুলে সেখানে অবস্থান করেন। বেচে আছেন কিনা বলতে পারব না।
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, নিহতদের অবশ্যই রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতির পাশাপাশি গণ কবরে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা উচিত।
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার নোহালী ইউনিয়নের তিস্তা নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার। গত বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে তিনি পরিবারগুলোর খোঁজখবর নেন এবং তাদের হাতে সরকারি ত্রাণসামগ্রী তুলে দেন। একই সঙ্গে নদীভাঙনের ভয়াবহতা তুলে ধরে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, নোহালী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের চর নোহালী কাচারীপাড়া এলাকায় তিস্তার ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। নদীর পানি বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও পানি কমতে শুরু করার পর থেকেই ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। গত কয়েক দিনে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে অন্তত ৮টি বসতবাড়ি এবং শত বিঘা আবাদি জমি। অনেক পরিবার শেষ সম্বলটুকু রক্ষায় ঘরবাড়ি খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত আলহাজ মোত্তালিব বলেন, চোখের সামনে আমার বসতবাড়ি নদীতে চলে গেল। এখন পরিবার নিয়ে কোথায় থাকব জানি না। সরকারের কাছে স্থায়ী সমাধান চাই। সুরুজ মিয়া বলেন, ত্রাণ পেয়েছি, কিন্তু ভাঙন বন্ধ না হলে আমাদের বাঁচার কোনো উপায় থাকবে না। আনোয়ার হোসেন বলেন, ঘরবাড়ি, জমিজমা সব নদীতে চলে গেছে। এখন আমরা মানবেতর জীবন কাটাচ্ছি।
এদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তারের পাঠানো প্রতিবেদনের ভিত্তিতে রংপুর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন ২৩ জুলাই বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে জরুরি চিঠি পাঠিয়েছেন। ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, নোহালী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের চর নোহালী কাচারীপাড়ায় ২২টি এবং ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডে আরও ১৪টি পরিবারের ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এছাড়া চর বাগডহরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভাঙনরত নদীতীর থেকে মাত্র ১০০ মিটার দূরে রয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বিদ্যালয়টিও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাত যত গভীর হয়, ততই বাড়ে আহমদুল হকের উৎকণ্ঠা। বয়স সত্তর ছুঁইছুঁই। অন্য সময় এ বয়সে মানুষ বিশ্রাম খোঁজেন, কিন্তু তিনি রাতভর জেগে থাকেন পাহারায়। ঘুম নয়, হাতে থাকে টর্চলাইট। কান খোলা, চোখ খোলা। কারণ, যে কোনো মুহূর্তে পাহাড় থেকে নেমে আসতে পারে বন্য হাতির পাল।
চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর শ্রীপুর-খরণদ্বীপ ইউনিয়নের মহৎবাড়ী এলাকার এই কৃষকের প্রায় এক লাখ টাকার শুকনা ধান রাখা আছে ঘরের সামনের উঠানে গোলাভরা ধান। সেই ধান রক্ষা করতেই প্রতিটি রাত কাটে উদ্বেগে।
ভোরের আলো ফোটার পরও স্বস্তি মেলে না। আহমদুল হক বলেন, ‘শুক্রবার (২৪ জুলাই) ভোরেও আমার ঘরের সামনে দিয়ে হাতি চলে গেছে। প্রায় প্রতিদিনই নির্ঘুম রাত কাটাতে হচ্ছে।
শুধু আহমদুল হক নন, গত দুই মাস ধরে একই আতঙ্কে দিন কাটছে ফতেরখীল, জৈষ্ঠ্যপুরা ও আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের। সন্ধ্যা নামলেই গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে অজানা ভয়। আর ভোর হলে শোনা যায় নতুন কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এই সময়ের মধ্যে হাতির তাণ্ডবে অন্তত ৪৮০ শতক জমির ধানের বীজতলা নষ্ট হয়েছে। বহু কৃষকের বছরের পরিশ্রম মুহূর্তেই মাটিতে মিশে গেছে।
পল্লী চিকিৎসক লিটন বড়ুয়ার ধানের গোলা উল্টে দিয়ে ধান খেয়ে ও নষ্ট করেছে হাতির পাল। একইভাবে আরও অনেক কৃষকের ক্ষেত, ফসল ও সম্পদের ক্ষতি হয়েছে।
জৈষ্ঠ্যপুরা এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, সম্প্রতি গভীর রাতে হাতির দল তার বসতবাড়ির সীমানা প্রাচীর ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। একই এলাকার জুনু মিয়ার ৪০ শতকের আখক্ষেত তছনছ করে দেয়।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের পটিয়া রেঞ্জের বন কর্মকর্তা এমদাদুল হক বলেন, বোয়ালখালী এলাকায় জনবল ও সক্ষমতা সীমিত। কর্মকর্তা কম থাকায় সব জায়গায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো কঠিন হচ্ছে। তবে নিয়মিত বন্য হাতি তাড়ানোর কাজ করা হচ্ছে। জৈষ্ঠ্যপুরা ও আশপাশের এলাকা হাতির স্বাভাবিক বিচরণভূমি হওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা সোহেল রানা বলেন, লোকালয়ে হাতি প্রবেশের বিষয়টি তাদের জানা আছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় এলিফ্যান্ট রেসকিউ টিম কাজ করবে। হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা আবেদন করলে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
‘এখন মানুষ সহযোগিতা করছে, সময় গেলে জবাবদিহি চাইবে’ বলে মন্তব্য করে পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেছেন, ৫ মাস হয়েছে আমরা (বিএনপি) এসেছি। যখন এক-দেড় বছর যাবে, মানুষ আমাদের কাছে জবাবদিহিতা আশা করবে। এখন কিন্তু সাধারণ মানুষ আমাদেরকে প্রশ্ন করে না। এখন উনারা আমাদেরকে সহযোগিতা করছেন, কাজটা শুরু করার জন্য। কিন্তু সময় যেতে বেশিক্ষণ লাগে না।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) বিকেলে লক্ষ্মীপুর পৌরসভার লামচরি জামে মসজিদ কমিটির সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, আমরা সবাই আশা করেছিলাম, সরকারই থাকুক আমাদের দাবির প্রতি সবাই সম্মান দেবে। নির্বাচনের এক মাসের মাথায় আমরা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে কাজ শুরু করেছি। অনেকেই বলতে পারেন এটি দীর্ঘদিনের প্ল্যান ছিল। প্ল্যানতো অনেক কিছুই থাকে, স্বপ্ন অনেক কিছুই থাকে। কিন্তু বাস্তবায়নটা কোথায় আটকে আছে, সেটাকে ঠিক করে সেই কাজটাকে দৃশ্যমান করে নিয়ে আসা সেটাই আসল ব্যাপার। সেজন্য প্রধানমন্ত্রী লক্ষ্মীপুরবাসীর প্রতি খুবই আন্তরিকতা দেখিয়েছেন।
এ সময় বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা পরিষদের প্রশাসক সাহাব উদ্দিন সাবু, লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোহাম্মদ ইউছুফ, কমলনগর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মোহাম্মদ সামছুল আলম, জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হাছিবুর রহমান, টুমচর ইসলামিয়া কামিল মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ হারুন আল মাদানি ও রামগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর হুমায়ুন কবির প্রমুখ।
টানা বর্ষণ আর বৈরী আবহাওয়ার জেরে সপ্তাহের ব্যবধানে দাম বেড়েছে কাঁচা বাজারে। বাজারে সবচেয়ে বেশি অস্বস্তি ছড়াচ্ছে রান্নার অন্যতম প্রয়োজনীয় উপাদান কাঁচামরিচ। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যের দাম বেড়ে পৌঁছেছে প্রায় তিনগুণে।
রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা ও পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা যায়, গত চার সপ্তাহ আগে যে কাঁচামরিচ প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, বর্তমানে সেই মরিচ কিনতে ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে ২৪০ টাকা পর্যন্ত।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) রাজধানীর ব্যস্ততম কারওয়ান বাজার, হাতিরপুল ও রায়সাহেব বাজার সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা যায়, মানভেদে কাঁচামরিচ প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ২২০ থেকে ২৪০ টাকার মধ্যে। অথচ গত সপ্তাহেও রাজধানীর বাজারগুলোতে মরিচের কেজি ছিল ১২০ টাকা। অর্থাৎ সপ্তাহের ব্যবধানে দাম দ্বিগুণ হয়েছে, আর চার সপ্তাহের হিসাবে তা তিনগুণ ছাড়িয়েছে।
মরিচের সঙ্গে লাগামহীনভাবে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বেগুনের দামও। গত সপ্তাহে যে বেগুন ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছিল, চলতি সপ্তাহে তা একলাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫০ টাকায়।
কাঁচা বাজারের সার্বিক চিত্র পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, বাজারে দুয়েকটি পণ্য ছাড়া প্রায় প্রতিটি সবজির কেজি এখন শতকের ঘর ছুঁয়েছে বা তার ওপরে উঠে গেছে। বর্তমানে বাজারে উচ্ছে প্রতি কেজি ১০০ থেকে ১২০ টাকা, পটোল ৮০, ঢ্যাঁড়স ১০০, ঝিঙা ১০০, চিচিঙ্গা ৮০-১০০, শসা ১২০-১৩০ এবং গাজর ১৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
গ্রীষ্মকালীন সবজির মধ্যে কাঁকরোল ৯০-১০০, এ ছাড়া পাকা টমেটো ১২০-১৪০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। লাউ বিক্রি হচ্ছে ৮০-৯০ টাকায়।
গত সপ্তাহের বাজারদরের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, এসব সবজির দাম কেজিপ্রতি গড়ে ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তবে কাঁচা পেঁপে মিলছে কিছুটা কম দামেই, প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকায়। এ ছাড়া মিষ্টি কুমড়া প্রতি পিস ৪০ থেকে ৫০ টাকা, চাল কুমড়া ৬০-৮০ এবং কাঁচা কলা প্রতি হালি ৩০-৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
অন্যদিকে সবজির বাজার অস্থিতিশীল থাকলেও মাংস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্য পণ্যের বাজার মোটামুটি আগের অবস্থাতেই রয়েছে।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, গরুর মাংস প্রতি কেজি ৮৫০ এবং খাসির মাংস ১২০০ টাকায় স্থির রয়েছে। পোলট্রি পণ্যের মধ্যে ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৮০ ও কক মুরগি ৩৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর নিত্যপ্রয়োজনীয় আলু প্রতি কেজি ৪০ এবং পেঁয়াজ মানভেদে ৫০-৬০ টাকা কেজিতে খুচরা বাজারে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
বাজারের এই ঊর্ধ্বমুখী দামে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। প্রতিদিনের মতো কারওয়ান বাজারে কেনাকাটা করতে আসা মধ্যবিত্ত ক্রেতা মো. রফিক আফসোস প্রকাশ করে জানালেন, বাজারে এলে কোনো না কোনো পণ্যের দাম বাড়ানো অবস্থায় পাওয়া যায়। এভাবে দাম বাড়তে থাকলে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে। বাজারে চড়া দামে কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে। তাও আবার সেগুলোর মান ভালো না।
‘কিছুদিন আগেও যেসব সবজি ৭০-৮০ টাকায় কিনেছি, সেগুলো এখন ১০০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না। ভাজি করে খাওয়ার জন্য একটি বেগুন নিয়েছি, তার দামও ৪০ টাকা’— বলছিলেন রফিক।
একই হতাশার কথা জানালেন হাতিরপুল বাজারে কেনাকাটা করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী জসীম উদ্দীন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, ‘আমাদের মতো নির্দিষ্ট মানুষের আয়ের সঙ্গে বাজারের ব্যয়ের কোনো ভারসাম্য থাকছে না। প্রতিবার বাজারে এলেই হিসাব ও বাজেট এলোমেলো হয়ে যায়। প্রতিটি সবজির দাম যদি ১০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়, তবে একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার প্রতিদিন পাতে কী খাবে? সংসারের খরচ সামলাতে প্রতি সপ্তাহে আমাদের চাল, ডাল ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যের বাজেট কাটছাঁট করে সবজি কেনার টাকা মেলাতে হচ্ছে।’
এদিকে কাঁচামরিচ ও সবজির এই অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির পেছনে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সরবরাহের ঘাটতিকে দায়ী করছেন খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা। রায়সাহেব বাজারে দীর্ঘদিন ধরে সবজি বিক্রি করছেন মো. মিলন।
পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে মিলন বলছিলেন, একটানা ভারি বৃষ্টির কারণে দেশের প্রধান প্রধান সবজি উৎপাদনকারী অঞ্চলের বহু ক্ষেতে পানি জমে গেছে। জমিতে দীর্ঘদিন পানি জমে থাকলে মরিচ ও সবজি গাছের শিকড় পচে যায়। আবার বৃষ্টিতে ফুলও ঝরে পড়ে। আবার অনেক অঞ্চল থেকে সবজি সংগ্রহ করাও সম্ভব হচ্ছে না বৃষ্টির কারণে। সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণেই বাজারে পণ্য কম আসছে এবং পাইকারিতেই দাম বেড়ে যাচ্ছে।
তবে বৃষ্টি কমে বাজারে নতুন সবজির সরবরাহ আবার স্বাভাবিক হলে সবজির দাম নিচে নেমে আসবে। আর যদি বৃষ্টি অব্যাহত থাকে, তবে আগামী কয়েকদিন দাম আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন এই বিক্রেতা।
বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুধু বৃষ্টি বা আবহাওয়ার অজুহাত দিয়ে পণ্যের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়ানো হচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখা জরুরি। বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখার পাশাপাশি পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে নিয়মিত সরকারি তদারকি বাড়ানো দরকার।
দেশে নতুন করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে দর কিছুটা বাড়লেও গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশে জ্বালানির দাম তুলনামূলক কম ছিল।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) দুপুরে সিলেট সদর উপজেলার লাক্কাতুরা চা-বাগান এলাকায় চা-শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণে দিনব্যাপী বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা, পরিবার পরিকল্পনা ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা ক্যাম্পের উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
ভোক্তা অধিদপ্তর, দুদক ও বিটাকসহ ৫ সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন নিয়োগ
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে শুল্ক আরোপের বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, নতুন করে শুল্ক আরোপের ফলে আগের পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির কোনো বাস্তব পরিবর্তন ঘটেনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগের যে নীতি ছিল, দেশটির নিজস্ব আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ায় একই হারে শুল্ক বহাল থাকবে, তবে তা নতুন নিয়মে কার্যকর হবে। ফলে নতুন শুল্ক আরোপের প্রভাব বাস্তবে একই থাকছে।
অনুষ্ঠানে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানসহ জেলা ও মহানগর বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশের পরবর্তী প্রবৃদ্ধির ধাপে দেশীয় বাস্তবতা এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক ভূঅর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি বিনিয়োগনির্ভর উন্নয়ন মডেল অনুসরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) বেঙ্গল ডেল্টা কনফারেন্স ২০২৬ (বিডিসি ২০২৬)-এর এক অধিবেশনে তিনি বলেন, ‘আমাদের এমন একটি মডেল অনুসরণ করতে হবে, যেখানে বিনিয়োগ উৎপাদনের পথ তৈরি করবে, উৎপাদন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, কর্মসংস্থান করের হার না বাড়িয়েই রাজস্ব বৃদ্ধি করবে এবং সেই রাজস্ব শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় করা হবে।’
লন্ডনের এসওএএস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অর্থনীতির অধ্যাপক মুশতাক খানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত ওই অধিবেশনে ড. তিতুমীর সরকারের অর্থনৈতিক কৌশল তুলে ধরেন।
‘বাংলাদেশ অ্যান্ড এ চেঞ্জিং ওয়ার্ল্ড: আনচার্টেড টাইমস, ইমার্জিং অর্ডারস অ্যান্ড দ্য পলিটিক্স অব কেয়ার’ প্রতিপাদ্যে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘সরকার ধাপে ধাপে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়িয়ে একটি গণতান্ত্রিক কল্যাণরাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে কাজ করছে।’
তিনি জানান, অর্থনৈতিক ধাক্কার সময় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী যাতে দারিদ্র্যের মধ্যে না পড়ে, সে জন্য সার্বজনীন জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সংস্কারের বিষয়ে ড. তিতুমীর বলেন, ‘দক্ষতা উন্নয়ন, নাগরিক শিক্ষা, উদ্ভাবন এবং তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত একটি জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।’
সুশাসন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সরকারের সংস্কার কর্মসূচির মূল ভিত্তি হলো বৈধতা, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা। তার ভাষায়, যদি একটি সরকারের বৈধতা থাকে, তবে জবাবদিহিও থাকে। সেবাদান মানেই বৈধতা, সেবাদান মানেই জবাবদিহি এবং সেবাদান মানেই স্বচ্ছতা।’
ড. তিতুমীর বলেন, ‘বর্তমান সরকার একটি নাজুক আর্থিক পরিস্থিতি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। তবে সংসদে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় সরকারের ওপর রূপান্তরমূলক সংস্কার বাস্তবায়নের দায়িত্বও বেড়েছে।’
রাজস্ব আহরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘করের হার বাড়ানোর পরিবর্তে সরকার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।’ তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত দুটি বিষয়—প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং দুর্নীতি, ভাড়া-অন্বেষণ (রেন্ট-সিকিং) ও কর অব্যাহতির মতো ‘ত্রুটির উপাদান’—এখন সরকারের বিশেষ নজরে রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘রাজস্ব ফাঁকফোকর কমানো এবং আইন প্রয়োগ জোরদারের ফলে ইতোমধ্যে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে।’ উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস উল্লেখযোগ্য রাজস্ব অবদান রেখেছে। রাজস্ব আদায় আরও শক্তিশালী করতে তিনটি টাস্কফোর্সও গঠন করা হয়েছে।
তবে কর ফাঁকি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে সরকার এখনও সক্ষম নয় বলে স্বীকার করেন ড. তিতুমীর। তিনি বলেন, ‘আমরা এখনও কর ফাঁকি মোকাবিলায় পুরোপুরি সক্ষম নই। এর জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।’
আর্থিক খাত সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘খেলাপি ঋণ ও ব্যাংক পুনঃমূলধনীকরণসহ দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানে সরকার কাজ করছে। আমরা কোনো বিষয় আড়াল করছি না। সমস্যাগুলো সম্পর্কে আমরা অবগত এবং সেগুলো নিয়ে কাজ করছি।’
স্ট্যাচুটরি রেগুলেটরি অর্ডার (এসআরও) প্রসঙ্গে ড. তিতুমীর বলেন, “অতীতে এসআরওকে ‘নিলাম বাজারে’ পরিণত করা হয়েছিল, যেখানে প্রভাবশালীরা বিশেষ সুবিধা পেতেন। সরকার সেই সংস্কৃতি বন্ধে কাজ করছে।”
তিনি বলেন, ‘যদি আপনি প্রভাবশালী হন, তাহলে একটি এসআরও জারি করিয়ে সব ধরনের সুবিধা পেয়ে যেতেন। এসব ইচ্ছামাফিক কর-ছাড় আমরা পর্যালোচনা করছি এবং নিশ্চিত করছি যাতে এই এসআরও সংস্কৃতি আর না থাকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কর আরোপ ও সরকারি অর্থ ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নির্বাহী বিভাগের পরিবর্তে সংসদের মাধ্যমেই হওয়া উচিত। কোথা থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হবে এবং কোথায় ব্যয় করা হবে, তা সার্বভৌম সংসদই নির্ধারণ করবে। এটিই সরকারের সংস্কারের মূল ভিত্তি।’
শিল্পায়নকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য উল্লেখ করে ড. তিতুমীর বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশে আবার শিল্পনীতি নিয়ে কার্যকর আলোচনা শুরু হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে শিল্পনীতি ফিরে এসেছে। উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণ—২০২৯ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের আগে এসব বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে।’
সরকারের সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করে ড. তিতুমীর বলেন, ‘চলতি অর্থবছরেই এর প্রাথমিক সুফল পাওয়া যাবে। আমরা আশা করছি, বাংলাদেশকে নিয়ে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, তা বাস্তবায়ন করতে পারব।’
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের প্রসঙ্গে তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও আন্তর্জাতিক জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশকে প্রায় ৩ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়েছে, যদিও এসব সংকট সৃষ্টিতে দেশের কোনো ভূমিকা ছিল না।
তিনি বলেন, ‘যে সংকট আমাদের সৃষ্টি নয়, তার জন্যই আমাদের ৩ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষি ও ভোক্তাদের জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির চাপ থেকে সুরক্ষা দিতে সরকারকে আর্থিক ভারসাম্যও রক্ষা করতে হয়েছে।’
হরিজন জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ ও স্থায়ী আবাসন নিশ্চিত, পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগে ৮০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণ এবং দীর্ঘদিন কর্মরত অস্থায়ী কর্মীদের স্থায়ী করাসহ ৭ দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদ। শুক্রবার (২৪ জুলাই) জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত এক মানববন্ধন থেকে এসব দাবি জানানো হয়।
মানববন্ধনে আয়োজকরা বলেন, স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পরও হরিজন জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, আবাসন ও সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে নানা বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার। অথচ দেশের পরিচ্ছন্নতা, জনস্বাস্থ্য ও নাগরিক সেবায় তাদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়নের ধারায় এ জনগোষ্ঠীর সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
তারা আরও বলেন, দীর্ঘদিন কর্মরত পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য নিরাপদ ও স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা এবং আউটসোর্সিং ব্যবস্থার কারণে সৃষ্ট চাকরির অনিশ্চয়তা দূর করা জরুরি। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
সংগঠনটির দাবিগুলো হচ্ছে— হরিজন জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও স্থায়ী আবাসন নিশ্চিত করা, পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগে জাত হরিজন জনগোষ্ঠীর জন্য ৮০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণ, দীর্ঘদিন কর্মরত অস্থায়ী ও দৈনিকভিত্তিক কর্মীদের স্থায়ী করা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তায় বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া, কর্মক্ষেত্রে ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, সামাজিক বৈষম্য দূর করে সংবিধান প্রদত্ত সমঅধিকার বাস্তবায়ন এবং শিক্ষিত হরিজন জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি চাকরিতে ১ শতাংশ কোটা সংরক্ষণ।
মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদের সভাপতি লেবু বাসফোর, মহাসচিব বিমল ডোম, সংগঠনের সাবেক সভাপতি কৃষ্ণলাল, উপদেষ্টা বাইজু লাল সরদার, সিনিয়র সহ-সভাপতি কৃষ্ণচরণ কুঞ্জমাল প্রমুখ।