শহীদুল ইসলাম
করোনা মহামারির মধ্যে লকডাউন দেয়ায় বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানের কর্মী চাকরি হারিয়েছেন। চাকরি হারানোর পর কোনো আর্থিক সুবিধা না পেয়ে অনেকের জীবন মানবেতর হয়ে ওঠে। এমন অভিজ্ঞতাকে আমলে নিয়ে কর্মক্ষম বেকার কর্মীদের জন্য ‘ভাতা’ চালু করতে যাচ্ছে সরকার।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ পাঁচ বছরের জন্য যে জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল (২০২১-২০২৬) চূড়ান্ত করেছে, সেখানে সামাজিক বিমা চালুর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সামাজিক বিমার আওতায় ‘বেকারত্ব বিমা প্রকল্প’ চালুর বিষয়ে গবেষণা করে কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আগামী বছরের মধ্যে শ্রম মন্ত্রণালয়কে এই পরিকল্পনা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠাতে হবে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের মধ্যে নির্বাচিত কিছু প্রতিষ্ঠানের বেকার শ্রমিকদের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে বেকার বিমা চালু করা হবে। আর ২০২৫ সালের জুলাইয়ের মধ্যে সারা দেশে এটি বাস্তবায়ন করা হবে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, মানুষের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত হয় এমন কোনো বিমা কর্মসূচি বাংলাদেশে নেই। কিন্তু উন্নত দেশগুলোতে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক বিমা রয়েছে। এর মধ্যে ‘বিসমার্ক’ ও ‘বেভারেজ’ মডেল বেশ প্রচলিত। ওসব মডেলের মধ্যে স্বাস্থ্য বিমা রয়েছে। তবে বাংলাদেশে আপাতত বেকারত্ব, দুর্ঘনায় আহত, পঙ্গু ও মৃত্যু এবং মাতৃত্বকালীন ঝুঁকি ও অসুস্থতাকে প্রাধান্য দিয়ে সামাজিক বিমা চালু করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
সব বিমায় প্রিমিয়াম থাকে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, এসব ক্ষেত্রে প্রিমিয়াম কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, তা এখনো ঠিক করা হয়নি। এমন হতে পারে বেকারত্ব বিমার বেশির ভাগ প্রিমিয়াম সরকার দেবে। এটি বাস্তবায়নে সরকারের একটি ফান্ড থাকবে। আমাদের লক্ষ্য, কর্মক্ষম কোনো শ্রমিক ঝামেলায় পড়লে যেন বিমার আওতায় আর্থিক সুবিধা পায়।
শ্রম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল অনুযায়ী কার্যক্রম হাতে নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। পরীক্ষামূলকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক খাতের বেকার শ্রমিকদের জন্য বেকার বিমা চালু করা হবে। পর্যায়ক্রমে সব প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক সব খাতের শ্রমিকদের জন্য এই ভাতা চালু করা হবে।
বাংলাদেশে সব মিলিয়ে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৮১ লাখ। এখন পর্যন্ত পোশাক, চামড়াজাত পণ্য ও জুতা কারখানা, রাইস মিল, ট্যানারি, পেট্রল পাম্প, চা-বাগান, রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ, স মিলস, ফার্মাসিউটিক্যালসহ ৪২টি খাতকে প্রাতিষ্ঠানিক খাত হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে সরকার। এসব প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের বেতন-ভাতা সরকার নির্ধারণ করে দেয়। যদিও কয়েকটি খাত ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক অন্য খাতের শ্রমিকদের বেতন-ভাতা সরকার নির্ধারিত হারে দেয়া হয় না।
শ্রম মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, নতুন করে ব্যক্তিমালিকানাধীন ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার; দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন ও দুগ্ধ খামার, টাইলস অ্যান্ড সিরামিক, সার কারখানা, সিমেন্ট কারখানা, ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেকটিক্যাল পণ্য প্রস্তুতকারক শিল্প, ইটভাটা শিল্প, পোলট্রি ফার্ম শিল্প, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত বিনোদনপার্ক, ব্যাটারি প্রস্তুতকারক শিল্প, শুঁটকি প্রস্তুতকারক শিল্প, পাথর ভাঙা শ্রমিক, ব্যক্তিমালিকানাধীন বিমান পরিবহনশিল্প এবং আইটি শিল্প খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক খাতভুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কারণ কোনো খাতকে প্রাতিষ্ঠানিক হিসেবে ঘোষণা করার পর সেসব খাতের শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে সরকার ভূমিকা রাখতে পারে।
২০১৬ সালের সবশেষে শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ছিল ছয় কোটি ৩৫ লাখ। তাদের মধ্যে কাজে নিয়োজিত ছয় কোটি আট লাখ মানুষ। ওই জরিপ অনুযায়ী, দেশে কর্মক্ষম বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ। ২০২০ সালে করোনার মহামারির পর অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, অনেক প্রতিষ্ঠানের কর্মী চাকরি হারিয়েছেন। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, দেশে এখন কর্মক্ষম বেকারের সংখ্যা অনেক বেশি।
সিপিডির হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৮ থেকে ২৮ বছর বয়সী যুবকদের তিনজনের একজন বেকার। লন্ডনের ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ১০০ জন স্নাতক ডিগ্রিধারীর মধ্যে ৪৭ জনই বেকার। আর আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় তিন কোটি।
শ্রম মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে তিন কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে বেকারত্বের অবসান করতে চায় সরকার। দেশে ছয় কোটি কর্মক্ষম মানুষের মধ্যে ১৫ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজের সুযোগ পান। ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে প্রতি বছর দেশের ভেতরে ১৮ লাখ ৪০ হাজার এবং বিদেশে পাঁচ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য জাতীয় কর্মসংস্থান নীতি অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। ওই নীতি অনুযায়ী বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব (সমন্বয় ও সংস্কার) মো. সামসুল আরেফিন দৈনিক বাংলাকে বলেন, সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বসে জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল চূড়ান্ত করা হয়েছে। সরকার সার্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে। সেটার ধারবাহিকতায় সামাজিক সুরক্ষার বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেয়া হচ্ছে। এসব কর্মসূচির আলোকে বেকার ভাতা চালু করা হবে।
রৌমারীতে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে বুধবার (২৪ জুন) ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে আমন ধান বীজ ও সার বিতরণ করা হয়েছে। প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় উপজেলার কৃষি অফিস চত্বরে আয়োজিত এই বিতরণ অনুষ্ঠানে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা কৃষকদের মাঝে চার ধরনের উন্নত জাতের আমন ধান বীজ ও রাসায়নিক সার তুলে দেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আলাউদ্দিন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শামসুদ্দিন, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী তরিকুল ইসলামসহ উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা। সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম বসুনিয়া।
তথ্য সূত্রে জানা গেছে, এ মৌসুমে আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে উপজেলায় ১ হাজার ৫শ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের মাঝে এসব বীজ ও রাসায়নিক সার পর্যায়ক্রমে বিতরণ করা হবে। এ সময় উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে ৫ কেজি করে ধান বীজ, ১০ কেজি বিএডিসি সার এবং ১০ কেজি এমওপি সার বিতরণ করা হয়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম বসুনিয়া বলেন, ‘এই প্রণোদনা ক্রয় ও বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষেধ। যদি কেউ বিক্রয় করে, তবে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ এ কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে ফসলের আবাদ বৃদ্ধি ও আত্মনির্ভরশীল করে তুলবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় কর্মকর্তারা।
গাজীপুর জেলা পরিষদের উদ্যোগে জেলার ৩৫০ জন দুঃস্থ, অসহায় ও অতিবৃষ্টি ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে মানবিক সহায়তা ও ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ও উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত থেকে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন ড. চৌধুরী ইশরাক আহমেদ সিদ্দিকী।
অনুষ্ঠানে মূখ্য সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন মো. নজরুল ইসলাম। এসময় জেলার বিভিন্ন এলাকার অসহায় ও নিম্নআয়ের মানুষের হাতে ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা সামগ্রী তুলে দেওয়া হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. চৌধুরী ইশরাক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, “সমাজের পিছিয়ে পড়া ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো জেলা পরিষদের অন্যতম দায়িত্ব। সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পাশাপাশি জেলা পরিষদও মানবিক সহায়তার মাধ্যমে মানুষের দুঃসময়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে এ ধরনের কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
তিনি আরও বলেন, “দেশের উন্নয়নের সুফল যেন সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, সে লক্ষ্যেই জেলা পরিষদ কাজ করছে। অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে এবং তাদের কষ্ট কিছুটা লাঘব করতে এ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সমাজের বিত্তবান ও সচেতন মানুষদেরও মানবিক কাজে এগিয়ে আসতে হবে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন কালিয়াকৈর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আলহাজ্ব নুরুল ইসলাম সিকদার, সদস্য সচিব আলহাজ্ব এম আনোয়ার হোসেন, কালিয়াকৈর পৌর বিএনপির আহ্বায়ক মামুদ সরকার, গাজীপুর জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মোনায়েম কবির, কালিয়াকৈর পৌর বিএনপি নেতা আশরাফ সিদ্দিকি এবং পৌর বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রেজভি আহমেদ দুলাল।
বক্তারা বলেন, সমাজের অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াতে গাজীপুর জেলা পরিষদের এ উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয়। তারা মনে করেন, এ ধরনের মানবিক কর্মসূচি সামাজিক সম্প্রীতি, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করবে।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক এবং উপকারভোগীরা উপস্থিত ছিলেন। ত্রাণ ও সহায়তা পেয়ে সুবিধাভোগীরা গাজীপুর জেলা পরিষদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের মাধ্যমে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এ উদ্যোগ স্থানীয়ভাবে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। আয়োজকরা জানান, ভবিষ্যতেও এ ধরনের জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
চায়ের রাজ্যখ্যাত মৌলভীবাজারের পাহাড়ি টিলাজুড়ে এখন রসালো ফল আনারসের সুবাস। অনুকূল আবহাওয়া, উর্বর মাটি আর স্থানীয় কৃষকদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় চলতি মৌসুমে জেলায় আনারসের বাম্পার ফলন হয়েছে। এবার মৌলভীবাজারের আনারস ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ফিলিপাইন থেকে আমদানিকৃত উচ্চফলনশীল ও আন্তর্জাতিক মানের ‘এমডি-২’ জাত, যা স্থানীয় চাষিদের মাঝে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জেলার শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, রাজনগর, কুলাউড়া ও বড়লেখার পাহাড়ি টিলায় মোট ১ হাজার ২২৩ হেক্টর জমিতে আনারসের চাষ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এমডি-২, হানিকুইন (জলচুপি) ও জায়েন্ট কিউ জাতের প্রায় ২২ হাজার ৭৭৪ মেট্রিক টন আনারস উৎপাদিত হয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৬৮ কোটি ৩২ লাখ ২০ হাজার টাকা।
জেলার বিভিন্ন উপজেলার পাহাড়ি ও সমতল মিলিয়ে মোট ১,২২৩ হেক্টর জমিতে এবার আনারসের আবাদ করা হয়েছে। মৌসুম শেষে জেলাজুড়ে উৎপাদিত আনারসের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২,৭৭৪ মেট্রিক টন। উৎপাদিত এই বিশাল পরিমাণ আনারসের বর্তমান বাজারমূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৬৮ কোটি ৩২ লাখ ২০ হাজার টাকা।
জেলায় মোট উৎপাদনের একটি বড় অংশই এসেছে শ্রীমঙ্গল উপজেলা থেকে। দেশের আনারস উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই উপজেলায়
৪২৫ হেক্টর জমি থেকে মোট ৬,৮২১ মেট্রিক টন আনারস উৎপাদিত হয়েছে। শুধু শ্রীমঙ্গল থেকেই উৎপাদিত এই ফলের সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ১২ কোটি ৪২ লাখ টাকা।
দেশের ‘আনারস উৎপাদনের রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত শ্রীমঙ্গল উপজেলায় এবার ৪২৫ হেক্টর জমিতে আনারস চাষ হয়েছে। উপজেলার আশিদ্রোন ইউনিয়নের রাধানগর, ডলুছড়া, মহাজিরাবাদ, বালিশিরা, সাতগাঁও, রাজঘাট, কালিঘাট ও মির্জাপুরসহ বিস্তীর্ণ পাহাড়ি টিলাজুড়ে এখন পাকা আনারসের সমারোহ। স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে প্রতিদিন ট্রাক ও পিকআপ ভর্তি আনারস চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
বিশ্বজুড়ে ‘গোল্ডেন সুইট’ বা ‘এক্সট্রা সুইট পাইনআপেল’ নামে পরিচিত ফিলিপাইনের এই এমডি-২ জাতটি দেশের ৭টি জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করা হয়েছিল। এর মধ্যে শ্রীমঙ্গলে উৎপাদিত আনারস গুণে, মানে ও স্বাদে অন্য সব জেলাকে ছাড়িয়ে গেছে।
মহাজিরাবাদ গ্রামের সফল চাষি রাজু আহমেদ জানান, তিনি ২২ শতাংশ জমিতে ২,২৫০টি এমডি-২ জাতের চারা রোপণ করে ইতোমধ্যে প্রায় এক লাখ টাকার আনারস বিক্রি করেছেন। তার মতে, "এই আনারস দেশীয় জাতের চেয়ে অনেক বেশি সুস্বাদু। পাকার পরও ১০-১৫ দিন ভালো থাকে এবং এক মাসেরও বেশি সময় সংরক্ষণ করা সম্ভব।" একই আশার কথা শোনান মহাজিরাবাদ গ্রামের চাষি শফিক মিয়াও। ৩০ শতাংশ জমিতে ২,৫০০টি চারা রোপণ করে তিনিও দারুণ লাভের মুখ দেখছেন।
শ্রীমঙ্গল কৃষি অধিদপ্তরের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মাসুকুর রহমান বলেন, "শ্রীমঙ্গলের আনারস বাগান এই অঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণ। ফিলিপাইনের এমডি-২ জাতের চারাগুলোর বৃদ্ধি ও ফলের আকৃতি, রং ও স্বাদ সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক মানের হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন জানান, এই অঞ্চলে হেক্টর প্রতি ১৫ থেকে ১৬ টন এমডি-২ আনারস উৎপাদিত হচ্ছে, যা স্থানীয় জাতের চেয়ে অনেক বেশি লাভজনক। ফলন ভালো হওয়ায় আগামীতে এটি ব্যাপকহারে চাষের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. জালাল উদ্দিন বলেন, এমডি-২ জাতের আনারস সহজে নষ্ট হয় না এবং এটি আন্তর্জাতিক বাজারে অত্যন্ত চাহিদাসম্পন্ন। এই জাতের বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে বিদেশে আনারস রপ্তানি করে দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখা সম্ভব।
ষাটের দশকে শ্রীমঙ্গলে বাণিজ্যিকভাবে শুরু হওয়া আনারস চাষ ফিলিপাইনের এই নতুন জাতেৎর হাত ধরে এবার বিশ্ববাজারে রপ্তানির নতুন স্বপ্ন দেখাবে এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সকলের।
মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় এক বিশেষ অভিযান চালিয়ে তিনটি বিদেশি পিস্তল, দেশীয় অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক দ্রব্য উদ্ধার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) ভোরের দিকে উপজেলার বড়লেখা সদর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী ‘মিশন’ নামক স্থানে এ অভিযান পরিচালিত হয়। তবে এ ঘটনায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।
বিজিবি সূত্র জানায়, বিয়ানীবাজার ব্যাটালিয়ন (৫২ বিজিবি) গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারে যে, সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে অস্ত্র ও উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক দ্রব্যের একটি বড় চালান বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে যাচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে বিয়ানীবাজার ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আতাউর রহমান সুজনের নেতৃত্বে বিওসিটিলা বিওপির একটি বিশেষ আভিযানিক দল সীমান্তে অবস্থান নেয়।
পরবর্তীতে বিজিবি টহল দল সীমান্ত পিলার ১৩৮৫/এম হতে আনুমানিক ৫০০ গজ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মিশন নামক স্থানে ব্যাপক তল্লাশি চালায়। ভোরের দিকে বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে চোরাকারবারিরা মালামাল ফেলে পালিয়ে যায়। পরে সেখান থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়, বিদেশি পিস্তল ৩টি, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক (পাওয়ারজেল নাইনটি) ৩ কেজি (২৩টি টিউব), ডেটোনেটর ২৪টি, ডেটোনেটর তৈরির তার ১৫ মিটার, ২টি কুকরি চাপাতি।
বিয়ানীবাজার ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আতাউর রহমান সুজন জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অত্যন্ত তৎপরতার সাথে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত বিস্ফোরকগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী ও মারাত্মক। দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষা এবং সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবির এমন কঠোর নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত থাকবে।
এ ঘটনায় বড়লেখা থানায় মামলা দায়েরসহ উদ্ধারকৃত আগ্নেয়াস্ত্র ও বিস্ফোরক দ্রব্য হস্তান্তরের আইনানুগ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে বিজিবি নিশ্চিত করেছে।
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার জুগিন্দা গ্রামের একটি মাছ চাষের পুকুরের ২০ লক্ষাধিক টাকার মাছ মারা গেছে।
পুর্বশত্রুতার জের ধরে অজ্ঞাত কেউ বিষ ঢেলে মাছ নিধন করেছে বলে অভিযোগ মাছ চাষী কামরুজ্জামানের।
আজ বৃহস্পতিবার ভোরে মাছ মরে ভেসে উঠলে বিষয়টি তার নজরে আসে।
স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে, কামরুজ্জামান ৩ বিঘা পুকুরে মাছ চাষ করেছেন। দুই বছর ধরে পাঙ্গাস জাতীয় মাছ চাষ করছেন । একেকটি মাছ ৭-১২ কেজি পর্যন্ত ওজন হয়েছে। কয়েকদিন পরেই মাছ বিক্রি করতেন তিনি।
অথচ আজ সকালে স্থানীয়রা পুকুরে মাছ মরে ভেসে উঠতে দেখেন। পুকুর মালিক লোকজন নিয়ে মাছ তুলে বিক্রির চেষ্টা করেছেন। তবে বিষে আক্রান্ত নেই বেশিরভাগ মাছে পচন ধরেছে। এতে তার ২০ লক্ষাধিক টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানান মাছ চাষী কামরুজক্জামান।
দ্রুততম সময়ে বিষয়টির তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
গাংনী থানার ওসি পরিদর্শক (তদন্ত) আল মামুন জানান, ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পক্রিয়া চলছে।
মেহেরপুর গাংনী উপজেলার সহড়াতলা সীমান্ত এলাকা দিয়ে ৭ জনকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা চালিয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)।
তবে বাংলাদেশ সিমান্তরক্ষাকারি বাহিনী বর্ডার গার্ড (বিজিবি) কঠোর অবস্থান ও স্থানীয়দের বাধার মূখে পুশইনের সেই চেষ্টা এখন পযর্ন্ত ব্যর্থ হয়ে রয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) ভোরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের শূন্য রেখার ১৪২এর ৫এস সাব পিলারের কাছে শূন্যরেখার ওপারে সাত জনকে দেখতে পান স্থানীয়রা। এ সময় তাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হলে বিজিবি কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। ফলে পুশইন ব্যর্থ হয় এবং ওই ব্যক্তিরা বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকা থেকে সরে যায়।
স্থানীয়দের দাবি,পুশইনের চেষ্টা করা সাতজনের মধ্যে একজন নারী ও ছয়জন পুরুষ রয়েছে। তবে তাদের পরিচয়, জাতীয়তা কিংবা কী কারণে তাদের সীমান্তে আনা হয়েছিল,সে বিষয়ে এখনও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা রোকনুজ্জামান বলেন, গতকাল মধ্যরাতে কোন একসময় ওই সাতজনকে ভারতের তারকাটা পার করে দেয়া হয়। তখন তারা সিমান্তে এলাকায় ঘোরাঘুরি করতে থাকলে আমরা তাদের দেখতে পেয়ে বিষয়টি বিজিবিকে জানিয়ে তাদের সাথে কাধে কাধ মিলিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশে বাধা প্রদান করি। পুশইনের আশঙ্কায় সীমান্ত এলাকায় বতর্মানে বিজিবি সিমান্তে লোক সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি নজরদারি অনেক বাড়িয়েছে।
বিজিবি ৬ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নাজমুল হাসান জানান,আজ বুধবার (২৫ জুন)ভোরে বিএসএফ সাতজনকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেনি। তিনি আরো বলেন,সীমান্তে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।পুশইন প্রতিরোধে বিজিবি বদ্ধপরিকর।
সীমান্তে পুশইনের অভিযোগ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিলেও বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে পরিস্থিতি বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে। সীমান্ত এলাকায় অতিরিক্ত সর্তকতা অব্যাহত রয়েছে।
নওগাঁর পাতাড়ী সীমান্তে পুশইন চেষ্টার শিকার হওয়া ৯ নারী-শিশুকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ফিরিয়ে নিয়েছে বলে ধারণা করছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে নওগাঁ-১৬ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম এক প্রেস নোটের মাধ্যমে এ তথ্য জানায়। প্রেস নোটে বলা হয়, গতকাল সারাদিন সীমান্তের শূন্য লাইন থেকে প্রায় ১০০ গজ ভারতের অভ্যন্তরে অবস্থান করছিল ওই ৯ জন। তবে বর্তমানে তাদের কোনো অবস্থান বা চলাচল দেখা যাচ্ছে না। ধারণা করা হচ্ছে, রাতের কোনো এক সময়ে বিএসএফ তাদের ভারতে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে।
এ ঘটনায় নওগাঁর সীমান্ত এলাকায় সতর্কতা বাড়িয়েছে বিজিবি। জেলার প্রতিটি সীমান্ত চৌকিতে (বিওপি) টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
এর আগে গতকাল ভোর ৪টার দিকে নওগাঁর আদাতলা বিওপির ২৪৪ নম্বর সীমান্ত পিলার এলাকা দিয়ে নারী ও শিশুসহ ৯ জনকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। স্থানীয়দের সহায়তায় বিজিবি ওই চেষ্টা প্রতিহত করে।
ভোগান্তি কমিয়ে সাধারণ যাত্রীদের সেবার মান আরও উন্নত করতে দেশজুড়ে রেল সম্প্রসারণের মহাপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে নতুন করে রেলসেবায় যুক্ত করা হচ্ছে ১০ জেলাকে। এছাড়া ৬০ নতুন ইঞ্জিন ও ২০০ নতুন কোচ সংযোজন হচ্ছে অচিরেই।
বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ২০৩২ সালের মধ্যে দ্রুতগতির ট্রেন চালনা আর আঞ্চলিক বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। নতুন অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং চলমান সংস্কার কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিগগিরই সাধারণ যাত্রীদের জন্য একটি নিরাপদ, আধুনিক ও মর্যাদাপূর্ণ রেল সেবা নিশ্চিত হতে যাচ্ছে।
রেলওয়ের দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো দেশের প্রতিটি জেলাকে একটি সমন্বিত ও পরিবেশবান্ধব রেল নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসা। এই মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে নতুন করে আরও ১০টি জেলায় দ্রুত রেললাইন চালুর জোরালো উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার।
অগ্রাধিকার প্রাপ্ত অঞ্চল ও রাজধানীর সাথে সংযোগ: প্রাথমিক ধাপে ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর পাশাপাশি দেশের অবহেলিত দক্ষিণাঞ্চলকে রেলের আওতায় আনার জোর প্রচেষ্টা চলছে। এই তালিকায় অগ্রাধিকার পাচ্ছে বরিশাল, সাতক্ষীরা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর এবং মানিকগঞ্জ। সরকারের লক্ষ্য, এই জেলাগুলোতে আধুনিক লাইন নির্মাণের পাশাপাশি যুগোপযোগী স্টেশন ও সিগন্যালিং ব্যবস্থা স্থাপন করা, যাতে উদ্বোধনের দিন থেকেই পুরোদমে এবং নিরাপদে ট্রেন চালানো সম্ভব হয়।
ঢাকার ওপর থেকে জনসংখ্যার চাপ কমাতে এবং প্রতিদিনের কর্মজীবী মানুষের যাতায়াত সহজ করতে মানিকগঞ্জ ও নরসিংদীর মতো সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর সাথে বিশেষ ‘কমিউটার রেল সার্ভিস’ চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে সাশ্রয়ী ভাড়ায় ঢাকার বাইরে থেকে এসে মানুষ দৈনন্দিন দাপ্তরিক কাজ শেষ করে রাতে নিজ জেলায় ফিরে যেতে পারবেন।
ঢাকা-কুমিল্লা কর্ড লাইন: বাঁচবে সময় ও জ্বালানি: বর্তমান রেল ব্যবস্থাপনায় গতি আনতে এবং দূরত্ব ও সময় কমিয়ে আনতে ‘ঢাকা-কুমিল্লা কর্ড লাইন’ নির্মাণের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই কর্ড লাইনটি নির্মিত হলে রাজধানী থেকে চট্টগ্রামের দূরত্ব সরাসরি প্রায় ৮০ কিলোমিটার কমে যাবে। এতে প্রতি ট্রিপে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি সাশ্রয় হবে এবং যাত্রীদের মূল্যবান সময় বাঁচবে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ: ৩৩ হাজার কোটির মেগা মিশন: দেশের প্রধান অর্থনৈতিক করিডোর ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথকে সম্পূর্ণ আধুনিক রূপ দিতে প্রায় ৩৩,৩০৯ কোটি টাকার দুটি বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এই বিশাল অংকের অর্থায়নে প্রধান সহযোগী হিসেবে আগ্রহ দেখিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। বাংলাদেশ রেলওয়ে পুরো ৩২৫ কিলোমিটার করিডোরের উন্নয়ন একসাথে এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছে, যাতে সমন্বিতভাবে ট্রেনের গতি বৃদ্ধি পায়।
প্রকল্পের উন্নয়ন প্রস্তাবনা (ডিপিপি) অনুযায়ী, ২০৩২ সালের মধ্যে এই কাজ শেষ হলে রেল খাতে আমূল পরিবর্তন আসবে।
সময় সাশ্রয় হবে: ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পৌঁছাতে বর্তমানে আন্তঃনগর ট্রেনের সময় লাগে প্রায় ৪ ঘণ্টা ৫০ মিনিট, যা ডুয়েলগেজ সম্পন্ন হলে মাত্র ৪ ঘণ্টায় নেমে আসবে (সময় কমবে প্রায় ৩৪ শতাংশ)।
শিডিউল বিপর্যয় রোধ হবে: ট্রেনের সময়সূচি বা শিডিউল মানার হার বর্তমানের ৫৫ শতাংশ থেকে একলাফে ৯৫ শতাংশে উন্নীত হবে।
সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে: বর্তমানে এই রুটে দৈনিক ৫২ জোড়া ট্রেন চলে, যা প্রকল্পের পর ৬৫ জোড়ায় উন্নীত করা সম্ভব হবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য পরিবহন: পণ্যবাহী ট্রেনের শিডিউল মানার হার ৭০ শতাংশে উন্নীত হবে, যা সড়কপথের ওপর থেকে পণ্য পরিবহনের চাপ কমাবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে গতি আনবে।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য: এই করিডোরটি ‘ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্ক’-এর অংশ হওয়ায় আখাউড়া সীমান্ত হয়ে ভারতীয় রেলের মালবাহী ও যাত্রীবাহী ট্রেন সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত যাতায়াত করতে পারবে।
ভারত থেকে আসছে ২০০ ব্রডগেজ কোচ: ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের (EIB) অর্থায়নে ৯১৫ কোটি রুপি ব্যয়ের একটি চুক্তির আওতায় ভারত থেকে মোট ২০০টি অত্যাধুনিক যাত্রীবাহী ব্রডগেজ কোচ আমদানি করছে বাংলাদেশ। ভারতের পাঞ্জাবের কাপুরথালার রেল কোচ কারখানায় (RCF) এই আধুনিক বগিগুলো তৈরি করা হচ্ছে।
চুক্তির প্রথম চালানের ২০টি ব্রডগেজ কোচ আগামী জুলাই মাসেই বাংলাদেশে পৌঁছানোর জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। দুই দেশের রেল প্রশাসনের চমৎকার সমন্বয়ে কাজ দ্রুত গতিতে চলছে। এই চুক্তির বিশেষত্ব হলো, ভারত দীর্ঘমেয়াদি ডিজাইন সাপোর্ট, প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ (স্পেয়ার পার্টস) এবং বাংলাদেশের রেল প্রকৌশলীদের বিশেষ কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদান করবে। নতুন এই ২০০ কোচ যুক্ত হলে দেশের ব্রডগেজ রুটের (পশ্চিমাঞ্চল) কোচের চাহিদা পুরোপুরি পূরণ হবে।
মিটারগেজ অঞ্চলের আধুনিকায়ন ও চলমান সংস্কার কার্যক্রম: পশ্চিমাঞ্চলে ব্রডগেজ বগি আসার পাশাপাশি পূর্বাঞ্চল বা মিটারগেজ অঞ্চলের (ঢাকা-ময়মনসিংহ-জামালপুর রুট) ট্রেনের আধুনিকায়নেও বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। যুগের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য রেখে পুরনো কোচগুলোর ভেতরের সজ্জা পরিবর্তন এবং সিট ও টয়লেটগুলোর আধুনিকায়নের কাজ শুরু হয়েছে।
নিরাপদ ও আরামদায়ক যাত্রা নিশ্চিত করতে যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগ নিয়মিত বগিগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও ফিটনেস পরীক্ষা করছে। যাতায়াতকারী সম্মানিত যাত্রীরা যাতে শতভাগ স্বাচ্ছন্দ্য পান, সেজন্য ট্রেনের ভেতরের পরিবেশ ও ক্যাটারিং সার্ভিসকে আরও উন্নত ও সুশৃঙ্খল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দূরদর্শী নীতি পরিবর্তন ও আগামী ৩ বছরের রূপরেখা: অবকাঠামো ও যাত্রীসেবার মানকে একই সমান্তরালে এগিয়ে নিতে রেল মন্ত্রণালয় ও প্রশাসন অত্যন্ত দূরদর্শী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব জানিয়েছেন, সরকারের নীতিগত পরিবর্তনের অংশ হিসেবে এখন থেকে নিয়ম করা হয়েছে—ভবিষ্যতে নতুন কোনো রেলপথ সম্প্রসারণের প্রকল্প নেওয়া হলে, ট্র্যাক নির্মাণের পাশাপাশি একই প্রকল্পের বাজেটের মধ্যে প্রয়োজনীয় ইঞ্জিন ও বগি আমদানির বিষয়টিকেও বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত রাখা হবে।
বর্তমানে মিটারগেজ ও ব্রডগেজ মিলিয়ে প্রায় ৬০টি নতুন ইঞ্জিন এবং কয়েকশ আধুনিক কোচ সংগ্রহের আন্তর্জাতিক টেন্ডার প্রক্রিয়া চূড়ান্তকরণের কাজ চলছে। এই নতুন কোচগুলো সরবরাহ হতে যে সময়টুকু লাগবে, তার মধ্যেই দ্রুততম সময়ে যাত্রীসেবা সচল রাখতে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন এক বিশেষ উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন। তিনি জানান, চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ওয়ার্কশপসহ বিভিন্ন উন্নত কারখানায় প্রায় ৫০টি বগিকে জরুরি ভিত্তিতে সম্পূর্ণ নতুন সিট ও অভ্যন্তরীণ আধুনিক অবকাঠামো দিয়ে পুনর্বাসন (Rehabilitation) করা হচ্ছে, যা খুব দ্রুতই লাইনে যুক্ত হয়ে যাত্রীদের আরামদায়ক সেবা নিশ্চিত করবে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত ও আশাবাদ: ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোরকে ডুয়েলগেজ করার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামান বলেন, রেল দেশের কোটি মানুষের প্রধান গণপরিবহন। ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোরকে ডুয়েলগেজ করার সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত সময়োপযোগী।
তিনি আরো বলেন, এই মেগা প্রকল্পের পাশাপাশি সিগন্যালিং ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং দক্ষ অপারেশনাল ম্যানেজমেন্ট নিশ্চিত করা গেলে বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সুফল পাওয়া যাবে এবং দেশের অর্থনীতিতে অভূতপূর্ব গতি আসবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে মাত্র ১৬ দিনে চার দফায় বাংলাদেশে অবৈধভাবে মানুষ ঠেলে পাঠানোর (পুশইন) অপচেষ্টা চালিয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে প্রতিবারই বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং স্থানীয় গ্রামবাসীদের সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে তারা। লাঠিসোটা হাতে মাঠে নামা সাধারণ মানুষের প্রতিরোধের কাছে হার মেনেছে বিএসএফের একের পর এক কৌশল।
বিজিবি ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পুশইন সফল করতে বিএসএফ ভৌগোলিক অবস্থান, বৈরী আবহাওয়া ও মানুষের মনস্তত্ত্বকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। নজরদারি এড়াতে প্রতিটি পুশইনের জন্য গভীর রাত কিংবা ভোরবেলার সময়টিকে বেছে নেওয়া হয়। স্থলসীমান্তে বিজিবির কড়া অবস্থানের মুখে রুট পরিবর্তন করে নদীপথ বেছে নেয় বিএসএফ। রোকনপুরের নদী সীমান্ত দিয়ে নৌকাযোগে পুশইনের অপচেষ্টা চালানো হয়। অর্থের বিনিময়ে এই কাজে বিএসএফকে সহায়তা করে স্থানীয় কিছু দালাল ও মাঝি।
বিএসএফের একটি বড় কৌশল ছিল বাংলাদেশে অবৈধভাবে ঠেলে দেওয়া মানুষের দলে অধিকসংখ্যক নারী ও শিশু রাখা। এর মাধ্যমে তারা বাংলাদেশের ওপর একধরনের মানবিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা চালায়। উদ্দেশে ছিল, নারী ও শিশুদের সামনে দেখে বিজিবি যেন কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসে। এ ছাড়া সীমান্তের শূন্যরেখায় বিজিবি বাধা দিলে বিভিন্ন পোস্টে সদস্যসংখ্যা বাড়িয়ে পাল্টা সেনা সমাবেশ ঘটায় বিএসএফ। এটি ছিল মূলত বিজিবিকে ভয় দেখানো ও চাপে ফেলার কৌশল। তবে শেষ পর্যন্ত তাদের এসব কৌশল কাজে আসেনি।
১৬ দিনে চার দফা প্রতিরোধ: গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ি সীমান্ত দিয়ে গত ৪ জুন ভোররাত ৩টার দিকে ১২ পুরুষ, ১০ নারী এবং ছয় শিশুসহ মোট ২৮ জনকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা চালায় বিএসএফ। প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে সীমান্তের শূন্যরেখায় দীর্ঘ সময় আটকে থাকার পর বিজিবি ও স্থানীয়দের শক্ত অবস্থানের মুখে পরদিন তাদের ভারতে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয় বিএসএফ।
একই উপজেলার রোকনপুর সীমান্তের নদীপথে গত ১২ জুন রাত ১২টা ৪০ মিনিটে নৌকাযোগে দুই পুরুষ, আট নারী এবং পাঁচ শিশুসহ ১৫ জনকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা চালায় বিএসএফ। বিষয়টি টের পেয়ে বাধা দেয় বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীরা। প্রায় দুই ঘণ্টা শূন্যরেখায় দাঁড়িয়ে থাকার পর রাত ২টা ৪০ মিনিটে তাদের ফিরিয়ে নেয় বিএসএফ।
১৫ জুন রাত পৌনে ১১টার দিকে একই সীমান্ত দিয়ে এক নারীকে নৌকাযোগে পুশ-ইনের চেষ্টা স্থানীয়দের সহায়তায় প্রতিহত করে বিজিবি। পরবর্তীতে শিবগঞ্জ উপজেলার চৌকা সীমান্ত দিয়ে গত ২০ জুন ভোরে পাঁচ পুরুষ, ১১ নারী ও চার শিশুসহ ২০ জনকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা চালায় বিএসএফ। বিষয়টি টের পেয়ে লাঠিসোঁটা নিয়ে মাঠে নামেন গ্রামবাসী। শেষ পর্যন্ত বিজিবির পাশাপাশি স্থানীয় সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে বিএসএফের ওই পুশ-ইন প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। বাংলাদেশে আর প্রবেশ করতে পারেনি অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তিরা।
১৫ জুনের ঘটনায় বিএসএফকে সহযোগিতার অভিযোগে স্থানীয় চার দালালসহ সাত বাংলাদেশিকে আটক করে পুলিশ ও বিজিবি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত সহকারী পুলিশ সুপার এএনএম ওয়াসিম ফিরোজ এশিয়া পোস্টকে জানান, আইনি প্রক্রিয়া শেষে আটককৃতদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
৫৯ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, সীমান্ত দিয়ে কোনো ধরনের পুশইন কোনোভাবেই হতে দেওয়া হবে না। বিএসএফের যেকোনো চতুর কৌশল নস্যাৎ করতে বিজিবি সতর্কতা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সীমান্ত এলাকায় কঠোর নজরদারি ও সার্বক্ষণিক টহল অব্যাহত রয়েছে।
১৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম বলেন, এই ব্যাটালিয়নের আওতাধীন এলাকায় তিনবার পুশইনের অপচেষ্টা চালানো হয়। বিজিবির অনড় অবস্থানের কারণে বিএসএফের প্রতিটি চেষ্টাই প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে।
প্রায় ১৪ মাস পর দেশব্যাপী ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইন শুরু হতে যাচ্ছে। অন্ধত্ব প্রতিরোধসহ শিশুদের পুষ্টিহীনতা দূরীকরণের লক্ষ্যে আয়োজিত এই বিশেষ ক্যাম্পেইন আগামী রোববার (২৮ জুন) সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলবে। এদিন ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সি মোট ২ কোটি ৩৪ লাখ ১৪ হাজার ৯৭২ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে।
তবে ১২টি জেলার ৫৮টি উপজেলার ২৯০টি ইউনিয়নের ৭১৪টি ওয়ার্ডের দুর্গম অঞ্চলে ক্যাম্পেইন-পরবর্তী চার দিন ‘চাইল্ড টু চাইল্ড সার্চিং’ কার্যক্রম চালানো হবে। জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মোহাম্মদ ইউনুস আলী দৈনিক বাংলাকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মোহাম্মদ ইউনুস আলী দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘এবারের ক্যাম্পেইনে ২ কোটি ৩৫ লাখ ১৪ হাজার ৯৭২টি শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬ মাস থেকে ১১ মাস বয়সি শিশুদের সংখ্যা (যাদের নীল রঙের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে) ২৮ লাখ ৩৮ হাজার ৭৯৪ জন। ১২ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সি শিশুদের সংখ্যা (যাদের লাল রঙের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে) ২ কোটি ৫ লাখ ৭৬ হাজার ১৭৮ জন।’
তিনি বলেন, ‘২৮ জুন দেশব্যাপী ভিটামিন ‘‘এ’’ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইন আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বাস্তবায়নের জন্য ইতোমধ্যে ১ লাখ ২০ হাজার কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। এগুলো ইপিআইয়ের নিয়মিত কেন্দ্র। এ ছাড়া আরও ৫০০টি মোবাইলকেন্দ্র (লঞ্চঘাট, ফেরিঘাট, রেলস্টেশন, বাসস্টেশন ইত্যাদি) স্থাপন করা হয়েছে।’
ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ইতোমধ্যে হাতে এসে পৌঁছেছে বলে জানান, মোহাম্মদ ইউনুস আলী। তিনি বলেন, ‘ক্যাম্পেইন বাস্তবায়নের জন্য আমরা সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিচ্ছি। আশা করছি, ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সি শিশুদের অভিভাবকরা কাছাকাছি কেন্দ্রগুলোয় গিয়ে তাদের সন্তানদের ভিটামিন ‘‘এ’’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর ব্যবস্থা করবেন।’
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, রোববার (২৮ জুন) সকালে রাজধানীর শাহবাগের আবু সাঈদ কনভেশন সেন্টারে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইনের উদ্বোধন করবেন। অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টা এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার উপস্থিত থাকবেন।
এ ছাড়া জেলা উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় সংসদ সদস্যরা স্থানীয় প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনের উদ্বোধন করবেন। মাঠকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে ক্যাম্পেইন বাস্তবায়ন করা হবে।
জেলা উপজেলা পর্যায়ে সিভিল সার্জন এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তারা (নিজেদের টিমের মাধ্যমে) স্থানীয় পর্যায়ে মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ে তদারকির কাজ সম্পন্ন করতে মন্ত্রণালয় নির্দেশ দিয়েছে।
জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের কার্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিয়ম অনুসারে বছরে দুবার ভিটামিন এ ক্যাপসুলের ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা। তবে ক্যাপসুল সংকটে গত বছরের মার্চ মাসের পর থেকে তা আর হয়নি। দীর্ঘ ১৪ মাস পর ২৮ জুন এই ক্যাম্পেইন হচ্ছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, ‘দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ভিটামিন ‘‘এ’’ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইন আমরা আবার হাতে নিয়েছি। ক্যাম্পেইনটি সফল করতে সবাইকে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছি।’
ক্যাম্পেইনের দিন পরিবারের ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সি সব শিশুকে কাছের কেন্দ্রে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে নিয়ে গিয়ে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. রওশন জাহান আখতার আলো দৈনিক বাংলাকে জানান, ভিটামিন ‘এ’ শিশুর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভিটামিন ‘এ’ শুধু অপুষ্টিজনিত অন্ধত্ব থেকে শিশুদের রক্ষা করে না; বরং তা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়। দীর্ঘমেয়াদি ডায়রিয়া থেকে শিশুকে সুরক্ষা দেয়। শিশুর মৃত্যুঝুঁকি কমায়।
তিনি বলেন, ‘শিশুদের অন্ধত্ব ও পুষ্টিহীনতা দূর করতে বাংলাদেশে ১৯৭৩ সাল থেকে ভিটামিন ‘‘এ’’ ক্যাপসুল খাওয়ানো শুরু হয়। তখন এটি ‘‘জাতীয় রাতকানা রোগপ্রতিরোধ কার্যক্রম’’ নামে পরিচিত ছিল।’
বিগত বছরগুলোর মতো অহেতুক কোনো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হবে না বলে জানিয়েছেন শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেছেন, আগামীতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) কেবল সুনির্দিষ্ট আর্থিক উপযোগিতা, জনকল্যাণ এবং ‘ভ্যালু ফর মানি’ নিশ্চিত করেই প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হবে।’
বুধবার (২৪ জুন) ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সহযোগিতায় এবং এসএমই ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ : এসএমই খাতের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক এক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেছেন তিনি।
বিগত সময়ে অপরিকল্পিত ঋণনির্ভর মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন শিল্পমন্ত্রী। এর কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেছেন, ‘অতীতে এমন সব প্রকল্প নেওয়া শুরু হয়েছিল, যেগুলোর কোনো ইভেনচুয়াল রিটার্ন বা ভবিষ্যৎ প্রাপ্তি নেই। ৫ টাকার প্রজেক্টে ১৫ টাকা ঋণ করে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা ও উপযোগিতার ক্ষতি করা হয়েছে। ঠাণ্ডা মাথায় এগুলোর উপযোগিতা বিচার করলে মাথায় হাত দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।’
তার ভাষ্য, ‘ঋণ নিয়ে যে অবকাঠামো করা হবে, তার ওপর ভর করে যেন বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ আসে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। আগামীতে এডিপি প্রকল্প পাসের ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রীর ‘থ্রি-আর’ (রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন) নীতির পাশাপাশি প্রতিটি বিনিয়োগের একটি স্পষ্ট ও দৃশ্যমান রিটার্ন থাকতে হবে। উদ্দেশ্যবিহীন কোনো প্রকল্প আর নেওয়া হবে না।’
বছরের পর বছর ধরে লোকসানে থাকা এবং অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল শেষ হওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প কারখানাগুলো দ্রুত বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলছিলেন, ‘শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা ১৫টি চিনিকলের মধ্যে ৬টিই বন্ধ। জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সাপেক্ষে আমরা এগুলো দ্রুত বেসরকারি খাতে দিতে চাই। পুরনো কারখানার জায়গায় যে আগের শিল্পই করতে হবে এমন নয়, বিনিয়োগকারীরা তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী নতুন শিল্প করবেন।’
তিনি জানান, সরকারি বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম তৈরির তিনটি কারখানায় নতুন বিনিয়োগের জন্য রোড শো করা হয়েছে। এছাড়া দেশের সার কারখানাগুলো যেন গ্যাসের অভাবে বন্ধ না থাকে, সেজন্য একটি ডেডিকেটেড গ্যাস নেটওয়ার্ক স্থাপনের পরিকল্পনা চলছে। চিনিকলগুলোতে আখের পরিবর্তে কম সময়ে বেশি লাভজনক ‘সুগার বিট’ ব্যবহারের ফিজিবিলিটি স্টাডিও করা হচ্ছে।
বিনিয়োগ পরিবেশ সহজ করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে শিল্পমন্ত্রী বললেন, ‘নতুন কোম্পানির ব্যবসা শুরু ও মেশিনপত্র আমদানির প্রাথমিক লাইসেন্স পাওয়ার সময়সীমা ৩৫৫ দিন থেকে কমিয়ে ১৪ দিনে নামিয়ে আনব। ফায়ার লাইসেন্সসহ অন্যান্য সেবাও যেন অনলাইনে ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে ভোগান্তিহীনভাবে পাওয়া যায়, তা নিশ্চিত করা হবে।’
মন্ত্রী উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের লজিস্টিক খরচ জিডিপির ১৬ শতাংশ, যা বৈশ্বিক মানদণ্ডে ১০ শতাংশ হওয়া উচিত। জানালেন, বন্দরে হ্যান্ডলিং দক্ষতা বাড়িয়ে এই খরচ কমানো হবে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের শর্ত অনুযায়ী পণ্যের ‘ট্রেসেবিলিটি’ নিশ্চিত করা হবে, যাতে ঠাকুরগাঁওয়ের ১৫ টাকার কৃষি পণ্য কারওয়ান বাজারে এসে অযৌক্তিকভাবে ১১৫ টাকা না হয়। সাপ্লাই চেইনের এই বাড়তি খরচ রুখে দেওয়া হবে।
এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেছেন, ‘এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে বড় জিডিপি ও রপ্তানি সক্ষম দেশ হলেও আমাদের ঋণ ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব আয়ের বর্তমান বাস্তবতায় এই উত্তরণ যেন টেকসই ও স্থায়ী হয়, সেজন্য আমরা সময়সীমা আরও তিন বছর পেছানোর অনুরোধ করেছি।’
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) উন্নয়নে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ তুলে ধরে তিনি বলছিলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের মধ্যে সিএমএসএমই খাতের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা এসএমই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে বিতরণ করা হবে। আগামীতে এই খাতে ৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। পাশাপাশি সিলেট, পাবনার ঈশ্বরদী এবং ঠাকুরগাঁওয়ে নতুন করে বিসিক শিল্প পার্ক সম্প্রসারণ করা হবে এবং একটি বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ ল্যাব তৈরি করা হবে ঠাকুরগাঁওয়ে।
ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালার সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেমের সঞ্চালনায় কর্মশালায় বিশেষ অতিথি ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর নীতি বিষয়ক সদস্য ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী এবং এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী।
তীব্র গরম এবং ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদার মুখে দেশের জ্বালানি খাতে এক স্বস্তির খবর নিয়ে এসেছে দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দীর্ঘ প্রায় এক মাস সম্পূর্ণ বন্ধ থাকার পর অবশেষে পুনরুজ্জীবিত হয়েছে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটটি। ২৭৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন ৩ নম্বর ইউনিটটি দীর্ঘ ২৯ দিনের নিবিড় ও জটিল মেরামত প্রক্রিয়া শেষে গত মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৯টা থেকে সফলভাবে পুনরায় বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করেছে।
বুধবার (২৪ জুন) বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী শাহ আলম এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিক এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এই বৃহৎ ইউনিটটি সচল হওয়ায় উত্তরবঙ্গসহ সারাদেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং জাতীয় গ্রিডে লোডশেডিংয়ের চাপ অনেকটাই লাঘব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উৎপাদন পরিস্থিতি ও গ্রিডে সরবরাহ: বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, কেন্দ্রটির মোট তিনটি ইউনিটের মধ্যে বর্তমানে দুটি ইউনিট সচল রয়েছে। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ২ নম্বর ইউনিটটি বর্তমানে বন্ধ থাকলেও ১ ও ৩ নম্বর ইউনিট চালু রেখে বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত রাখা হয়েছে।
১ নম্বর ইউনিট: ১২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন এই ইউনিটটি থেকে বর্তমানে ৬৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে।
৩ নম্বর ইউনিট: ২৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন এই বড় ইউনিটটি থেকে প্রাথমিকভাবে ১৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে, যা সরাসরি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে।
বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, কারিগরি কারণে নতুন করে চালু হওয়া ইউনিটের উৎপাদন শুরুতেই সর্বোচ্চ সীমায় নেওয়া হয় না। ধাপে ধাপে এর সক্ষমতা বাড়ানো হয়। সেই ধারাবাহিকতায় আগামী কয়েকদিনের মধ্যে শুধুমাত্র ৩ নম্বর ইউনিট থেকেই ২০০ মেগাওয়াট বা তার বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে। দুই ইউনিটের সম্মিলিত উৎপাদন দেশের উত্তরাঞ্চলের বিদ্যুৎ ঘাটতি পূরণে বড় ভূমিকা রাখবে।
ত্রুটির ইতিহাস ও মেরামতের নেপথ্য কথা: ২০১৭ সালে চালু হওয়া আধুনিক এই ৩ নম্বর ইউনিটটি দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছিল। প্রায় আট বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে সচল থাকার পর ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর ইউনিটটি প্রথম বড় ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটির মুখে পড়ে। এরপর থেকেই ইউনিটটিতে এক ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়।
চলতি বছরের শুরুতে দীর্ঘ সংস্কার কাজ শেষে গত ২০ মে ইউনিটটি পুনরায় চালু করা হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, উৎপাদন শুরুর মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় অর্থাৎ ২৫ মে আবারও বড় ধরনের কারিগরি বিপর্যয় ঘটে এবং উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। একটি বড় ইউনিট বারবার বিকল হওয়ায় বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং জাতীয় গ্রিডের ওপর চরম চাপ তৈরি হয়।
এরপর গত ২৫ মে থেকে টানা ২৯ দিন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দেশীয় ও অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের একটি দল দিনরাত নিরলসভাবে কাজ করেন। যান্ত্রিক ত্রুটিগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে চিহ্নিত করে তা মেরামত করার পর গত মঙ্গলবার রাতে ইউনিটটি আবার সচল করা সম্ভব হয়। প্রধান প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ‘৩ নম্বর ইউনিটটি পুনরায় চালু হওয়া আমাদের প্রকৌশলীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল। এর ফলে কেন্দ্রের সামগ্রিক বিদ্যুৎ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।’
কয়লাখনির জটিল ব্যবস্থাপনায় বড় স্বস্তি: এই ইউনিটটি সচল হওয়ার প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ খাতের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির দীর্ঘদিনের কোল ইয়ার্ড সংকটেরও একটি বড় সমাধান।
কয়লাখনির ভূগর্ভ থেকে প্রতিদিন যে পরিমাণ কয়লা উত্তোলন করা হয়, তা সংরক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট কোল ইয়ার্ড রয়েছে। কিন্তু তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের বড় ইউনিটটি বন্ধ থাকায় কয়লার অভ্যন্তরীণ ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে কমে গিয়েছিল। ফলে কোল ইয়ার্ডে কয়লার স্তূপ জমতে জমতে ধারণক্ষমতার শেষ পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যা খনির স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত করার উপক্রম করেছিল।
এই সংকটের কথা উল্লেখ করে বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী শাহ আলম জানান, খনির কোল ইয়ার্ড-সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে খনি কর্তৃপক্ষ সার্বক্ষণিক কাজ করে যাচ্ছে। কয়লা জট কমাতে ইতোমধ্যে ভূগর্ভ থেকে উত্তোলন করা কয়লা বিকল্প স্থানে নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী খোলা বাজারে উন্মুক্ত বিক্রির নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে তিনি যোগ করেন, তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৩ নম্বর ইউনিটটি যেহেতু দৈনিক বিপুল পরিমাণ কয়লা ব্যবহার করে, তাই এটি চালু হওয়ায় খনির উৎপাদিত কয়লার অভ্যন্তরীণ ব্যবহার বহুগুণ বেড়ে যাবে। এর ফলে খনির কোল ইয়ার্ডের ওপর থেকে চাপ কমবে এবং কয়লার সুষ্ঠু, নিরাপদ ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা খনি কর্তৃপক্ষের জন্য অনেক সহজ হবে।
দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের তাগিদ: বিশেষজ্ঞদের মতে, বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উত্তরবঙ্গের শিল্পকারখানা এবং গৃহস্থালি বিদ্যুৎ সরবরাহের মূল চালিকাশক্তি। বিশেষ করে সেচ মৌসুম ও গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে এই কেন্দ্রের ভূমিকা অপরিসীম। ৩ নম্বর ইউনিটটি বারবার যান্ত্রিক ত্রুটির কবলে পড়ায় এই অঞ্চলের গ্রাহকদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।
দীর্ঘ ২৯ দিন পর এই ইউনিটের উৎপাদনে ফেরা নিঃসন্দেহে একটি বড় সাফল্য। তবে এই সাফল্যকে ধরে রাখতে হলে প্ল্যান্টের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, ওভারহলিং এবং খুচরা যন্ত্রাংশের পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করার ওপর জোর দিতে হবে। বারবার যেন একই ত্রুটি দেখা না দেয়, সে জন্য দীর্ঘমেয়াদী কারিগরি পরিকল্পনার নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের বাজারে দেশীয় কয়লাভিত্তিক এই কেন্দ্রের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা জাতীয় অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত জরুরি।
খাগড়াছড়িতে গোলাগুলিতে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ-প্রসিত) দুই সদস্য নিহত হয়েছেন। বুধবার (২৪ জুন) দীঘিনালা ও রামগর ইউনিয়নের পৃথক দুই জায়গায় এ ঘটনা ঘটে। দুই নেতার একজন নিরাপত্তাবাহিনী ও আরেকজন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির গুলিতে নিহত হয়েছেন বলে দাবি ইউপিডিএফের।
পুলিশ, স্থানীয় ও দলীয় সূত্র জানায়, বুধবার (২৪ জুন) সকাল ১০টার দিকে রামগড় উপজেলার প্রেমতলা এলাকায় নিরাপত্তাবাহিনীর সঙ্গে ইউপিডিএফের গোলাগুলি হয়। এতে ইউপিডিএফ সদস্য ববিন ত্রিপুরা (৩২) নিহত হন। তিনি রামগড় উপজেলার মাজারা টিলা গ্রামের বাসিন্দা। একই ঘটনায় মংসানু মারমা ওরফে জীবন (২৯) নামের একজন আহত হয়েছেন বলে দাবি ইউপিডিএফের। তার বাড়ি উপজেলার দাতারাম পাড়ায়। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে একে-৪৭ রাইফেল উদ্ধার করে নিরাপত্তাবাহিনী।
ইউপিডিএফের মুখপাত্র অংগ্য মারমা মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, প্রেমতলা এলাকায় আগে থেকে অবস্থান নেওয়া নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ইউপিডিএফ কর্মীদের ওপর হামলা চালান। এতে ববিন ত্রিপুরা নিহত হন। এ ঘটনায় মংসানু মারমা নিখোঁজ রয়েছেন। তাকে আহত অবস্থায় আটক করা হয়ে থাকতে পারে বলে তাদের ধারণা।
নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে ইউপিডিএফের গোলাগুলির বিষয়টি নিশ্চিত করেন রামগড় থানার ওসি মো. নাজির আলম। তিনি বলেন, ঘটনাস্থলটি দুর্গম এলাকায় হওয়ায় নিরাপত্তা বাহিনী এখনো নিহতের মরদেহ কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেনি। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া চলমান।
অন্যদিকে দুপুরে দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়ার মুড়োপাড়া এলাকায় গুলিতে সুজন চাকমা (৪৮) নামের এক ইউপিডিএফ সদস্য নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় জেএসএসকে দায়ী করেছে ইউপিডিএফ। তবে এ বিষয়ে জেএসএসের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিকেল পাঁচটায় এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে ইউপিডিএফ। সংগঠনের মুখপাত্র অংগ্য মারমার সই করা এ বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়, জেএসএসের অস্ত্রধারী কয়েকজন তাদের কর্মীদের ওপর অতর্কিত হামলা করেছে। এ সময় সাংগঠনিক কাজে বাবুছড়ার মুড়োপাড়ায় অবস্থানরত তাদের সদস্য সুজন চাকমাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
দীঘিনালা থানার ওসি ইকবাল বাহার বলেন, সুজন চাকমা বাবুছড়া মুরোপাড়ায় একটি দোকানে বসে ছিল। এ সময় পাঁচজন মুখোশধারী কিছু লোক মোটরসাইকেলে এসে গুলি করে চলে যায়। লাশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসা হয়েছে। লাশের শরীরে তিনটি গুলি লেগেছে।