৩৬ বছরের পুরোনো ২৯ দশমিক ৪৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের টাঙ্গাইল পৌরসভার ১৮টি ওয়ার্ডে ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে খেলার মাঠ। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য সচেতন পৌর বাসিন্দাদের খেলাধুলা ও শরীরচর্চা করার মাঠগুলোতে গড়ে উঠেছে বড় বড় অট্টালিকা। কোনো কোনো মাঠে বসানো হয়েছে কাঁচাবাজার। আবার অনেক মাঠের জায়গার মালিকরা প্লট আকারে বিক্রি করে দিয়েছেন তাদের ব্যক্তিগত জায়গা।
পৌরসভা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যেই পৌর এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডে হারিয়ে গেছে ১৬টি খেলার মাঠ। আরও কয়েকটি খেলার মাঠ হারাতে বসেছে। কারণ, বিভিন্ন ওয়ার্ডে যে কয়টি খেলার মাঠ এখনো রয়েছে সেগুলোও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বছরজুড়ে মাঠগুলো বাণিজ্য মেলাসহ রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ব্যস্ত থাকে। তাদের অভিযোগ, উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েরা খেলাধুলার সুযোগ না পাওয়ায় ধীরে ধীরে আসক্ত হচ্ছে মোবাইল ফোনে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) গবেষণায় জানা গেছে, শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য প্রতিদিন ন্যূনতম এক ঘণ্টা করে খেলাধুলা ও শারীরিক সক্রিয় কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকা প্রয়োজন।
টেকসই নগরায়ন সংক্রান্ত জাতিসংঘের সংস্থা ইউএন-হ্যাবিটেটের তথ্য অনুযায়ী, হাঁটার দূরত্বে খেলার মাঠ থাকা উচিত। অতিঘন নগর এলাকায় প্রতি অর্ধবর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যা বিবেচনায় ন্যূনতম একটি করে খেলার মাঠ থাকা প্রয়োজন।
সরেজমিনে দেখা যায়, টাঙ্গাইল পৌর এলাকার ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে খেলার মাঠের জায়গায় বসতভিটা গড়ে উঠেছে। এই ওয়ার্ডের থানাপাড়া এলাকার রেঞ্জার মাঠ, সবুজ সেনা মাঠ, থানাপাড়া ইস্টার্ন ক্লাব মাঠের (বাবুর্চির মাঠ) জায়গায় এরই মধ্যে বসতি গড়ে উঠেছে। ঘনবসতিপূর্ণ এই ওয়ার্ডে ৩টি খেলাধুলার ক্লাব থাকলেও তাদের কোনো খেলার মাঠ নেই।
স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, ২ নম্বর ওয়ার্ডের ঠাকুরবাড়ির মাঠটি মালিকানা দ্বন্দ্বে এলাকার শিশু-কিশোরদের ওই মাঠে খেলাধুলা প্রায় বন্ধ। স্থানীয়দের আন্দোলনের মুখে বর্তমানে শিশু-কিশোররা ওই মাঠে খেলাধুলার সুযোগ পেলেও ভবিষ্যতে ওই মাঠের জায়গা প্লট আকারে বিক্রির আলোচনা চলছে।
তিনি জানান, ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মির্জা মাঠ ও হাউজিং মাঠে নিকট অতীতে ওই এলাকার শিশু-কিশোররা খেলাধুলা করত। এ ছাড়া সকাল ও বিকেলে স্বাস্থ্য সচেতন লোকজন শরীরচর্চা করত এই মাঠ দুটিতে। বর্তমানে মাঠগুলোতে বসতি গড়ে উঠেছে।
৬ নম্বর ওয়ার্ডের কলেজ পাড়ার বালুর মাঠে গড়ে উঠেছে বিশাল বিশাল ইমারত। একই এলাকার পানির ট্যাংকের মাঠে এখন আর শিশু-কিশোরদের প্রবেশাধিকার নেই।
একই চিত্র ১১ নম্বর ওয়ার্ডের খালপাড় মাঠে। গড়ে উঠেছে বসতি; খেলাধুলার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, টাঙ্গাইল পৌর এলাকার ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের ছোট কারীবাড়ী খেলার মাঠ ও কেওছার মাঠের এখন আর অস্তিত্ব নেই। এ ছাড়া নজরুল সেনা মাঠের জায়গায় গড়ে উঠেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শহীদ স্মৃতি পৌর উদ্যান।
এই ওয়ার্ডের কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে একসময় টাঙ্গাইল শহরের এলাকার শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি খেলাধুলা ও শরীরচর্চায় ব্যস্ত থাকত। বর্তমানে এই মাঠের অধিকাংশ জায়গাজুড়ে বসেছে ট্রাকস্ট্যান্ড। ফলে শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সের লোকজন শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই মাঠটি খেলাধুলা ও শরীরচর্চার জন্য এখন আর ব্যবহার করতে পারছে না।
১৭ নম্বর ওয়ার্ডের শিমুলতলী এলাকার বালুর মাঠে এখন গড়ে উঠেছে বসতি ও বিভিন্ন ধরনের ফল ও গাছের বাগান। ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের কোদালিয়া মাঠটি এখন শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একাডেমিক ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে জানান বাসিন্দারা।
শহরের নামকরা একটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির এক ছাত্রের সঙ্গে প্রতিবেদকের কথা হয় শহীদ স্মৃতি পৌর উদ্যানে। সে জানায়, বিকেল থেকে অনেক রাত পর্যন্ত বন্ধুদের সঙ্গে পৌর উদ্যানে আড্ডা দিই। একসময় আমার ওয়ার্ডে তিনটি খেলার মাঠ থাকলেও বর্তমানে কোনো খেলার মাঠ নেই। খেলাধুলার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেকটা বাধ্য হয়েই পৌর উদ্যানে এসে আড্ডা দিই।
সরকারি সৈয়দ মহাব্বত আলী কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহজাহান মিয়া বলেন, ‘পৌর শহরে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ না থাকার ফলে শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তারা ধীরে ধীরে আসক্ত হচ্ছে মোবাইল ফোনে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মোবাইল আসক্তি থেকে রক্ষা করার জন্য পৌর এলাকায় শিশু পার্ক ও খেলার মাঠের কোনো বিকল্প নেই। পৌর শহরে যে কয়টি খেলার মাঠ এখনো অবশিষ্ট আছে, সেগুলো রক্ষা করার জোর দাবি জানাচ্ছি।’
টাঙ্গাইল পৌর মেয়র এস এম সিরাজুল হক আলমগীর বলেন, ‘ব্যক্তিমালিকানাধীন মাঠগুলোর ব্যাপারে পৌর কর্তৃপক্ষের করণীয় কিছু নেই, তবে কেন্দ্রীয় ঈদগাহ, জেলা পরিষদ মাঠ ও শহীদ স্মৃতি পৌর উদ্যানে পৌরসভার উন্নয়নমূলক কাজের জন্য কিছু জিনিসপত্র রাখা হয়েছে। এক মাসের মধ্যেই মাঠগুলো পরিষ্কার করে আবার খেলাধুলার উপযোগী করা হবে। এ ছাড়া ৩ নম্বর ওয়ার্ডের হাউজিং স্টেটে শিশু-কিশোরদের জন্য একটি খেলার মাঠ তৈরি করার সর্বাত্মক চেষ্টা করা হচ্ছে।’
টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ছানোয়ার হোসেন বলেন, ‘ঈদগাহ মাঠকে যত দ্রুত সম্ভব খেলাধুলার উপযোগী করে গড়ে তোলা হবে। এ বিষয়ে পৌর মেয়রের সঙ্গে আলোচনা করেছি। শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশের জন্য টাঙ্গাইল পৌর শহরের অদূরে দাইন্যা ইউনিয়নের বাসাখানপুরে নির্মিত হচ্ছে শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খেলাধুলাকে গুরুত্ব দেন বলেই দেশের প্রতিটি উপজেলায় একটি করে মিনি স্টেডিয়াম তৈরির প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।’
দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলায় প্রথমবার পরীক্ষামূলকভাবে ভিয়েতনাম জাতের ব্ল্যাক রাইস বা কালো ধান চাষ করা হয়েছে। উপজেলার ১ নম্বর নাফানগর ইউনিয়নের দিঘড়ী গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা রকিবুল হক নিজ উদ্যোগে এই চাষাবাদ করেছেন। কম পরিচর্যা ও খরচে ভালো ফলনের সম্ভাবনায় স্থানীয় কৃষকদের মাঝেও এই ধান চাষের আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
অনলাইনে ব্ল্যাক রাইস সম্পর্কে জানার পর রকিবুল হক এর চাষে উদ্বুদ্ধ হন। প্রাথমিকভাবে ৫৫০ টাকা দিয়ে এক কেজি চাল কিনে তা খেয়ে দেখার পর তিনি চাষের সিদ্ধান্ত নেন। পরবর্তীতে অনলাইন থেকে ১ হাজার ১৫০ টাকায় দুই কেজি বীজ সংগ্রহ করে বীজতলায় চারা তৈরি করেন।
পরিবারের কাছ থেকে পৈতৃক জমিতে চাষের অনুমতি না পেয়ে তিনি ২৪ হাজার টাকায় ৩৩ শতক জমি ইজারা নেন। গত ৯ জুলাই সেই জমিতে তিনি ব্ল্যাক রাইসের চারা রোপণ করেন। আগামী ১০ থেকে ১২ অক্টোবর এই ধান কাটার সময় নির্ধারিত রয়েছে।
রকিবুল হকের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্ল্যাক রাইস চাষে সাধারণ ধানের তুলনায় অতিরিক্ত সার, সেচ কিংবা আলাদা কোনো বিশেষ পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। ৩৩ শতক জমি থেকে তিনি ১৮ থেকে ২০ মণ ধান পাওয়ার আশা করছেন। বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি ব্ল্যাক রাইস প্রায় ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সেই হিসেবে উৎপাদনের অন্যান্য খরচ বাদ না দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফলন ও বাজারদর পেলে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার টাকার ধান বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ব্ল্যাক রাইস অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যান্থোসায়ানিন, ফাইবার এবং আয়রনসমৃদ্ধ একটি পুষ্টিকর খাদ্য। উচ্চ পুষ্টিগুণের কারণে বিশ্বজুড়ে একে 'সুপারফুড' বলা হয়ে থাকে। ডায়াবেটিস, স্নায়ুরোগ ও বার্ধক্য প্রতিরোধে এই চালের উপকারিতার কথা বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। শৌখিন ক্রেতা এবং চাইনিজ রেস্তোরাঁগুলোতে এই চালের বিশেষ কদর রয়েছে।
ধান কাটার আগেই খেত দেখতে স্থানীয়রা ভিড় জমাচ্ছেন এবং অনেকে আগাম বীজ সংগ্রহের জন্য রকিবুলের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। শম্ভু রায় ও জুয়েলের মতো স্থানীয় কৃষকরা জানান, ধানের ভালো ফলন ও সুন্দর লতা দেখে তারাও আগামীতে এই ধান চাষে আগ্রহী হয়েছেন।
শুরুতে ইন্টারনেটের প্রভাবে ছেলের এই উদ্যোগকে 'পাগলামি' ভেবেছিলেন রকিবুলের বাবা আমিনুল হক। যে কারণে তিনি পৈতৃক জমি দিতে অস্বীকৃতি জানান। তবে বর্তমানে খেতের সন্তোষজনক অবস্থা দেখে তিনি নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। আমিনুল হক জানান, ছেলের সফল উদ্যোগ দেখে আগামীতে তাকে যেকোনো সহযোগিতা করতে তিনি প্রস্তুত রয়েছেন।
বোচাগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নয়ন কুমার সাহা বলেন, পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ এই ধানের চাল উৎপাদন ও দেশব্যাপী বিস্তার লাভ করলে তা দেশের কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মারুফ হাসান জানান, বোচাগঞ্জে এই প্রথম ব্ল্যাক রাইস চাষ হয়েছে। সঠিক উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করা গেলে এটি কৃষকদের জন্য অত্যন্ত লাভজনক একটি ফসল হতে পারে। প্রশাসন এই উদ্যোক্তার সফলতার দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের চৌমুহনী গ্রিড উপকেন্দ্রে ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের প্রধান সোর্স ব্রেকার বিস্ফোরণে বিকল হয়ে পড়ায় জেলা শহর মাইজদীসহ পার্শ্ববর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে মারাত্মক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ৮টার দিকে আকস্মিক এ বিস্ফোরণের পর ব্রেকারে আগুন ধরে যায়, যার ফলে চৌমুহনী থেকে মাইজদী উপকেন্দ্রে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) নোয়াখালী কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলা শহর মাইজদীতে পিডিবির আওতাধীন এলাকায় স্বাভাবিক সময়ে বিদ্যুতের মোট চাহিদা ২২ থেকে ২৫ মেগাওয়াট। তবে মূল সোর্স ব্রেকারটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিকল্প ব্যবস্থায় রিং সার্কিটের মাধ্যমে মাত্র ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। অর্ধেকেরও বেশি ঘাটতি থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত যন্ত্রপাতি পুরোপুরি মেরামত না হওয়া পর্যন্ত শহরজুড়ে রোটেশন পদ্ধতিতে অর্থাৎ এক ঘণ্টা পরপর এলাকাভিত্তিক পালাক্রমে বিদ্যুৎ রেশনিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে রাতভর চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।
বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়ে পিডিবি নোয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাবিবুল বাহার জানান, সোর্স ব্রেকারের পোল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বিকল্প উপায়ে জেলা শহরে সীমিত আকারে বিদ্যুৎ চালু রাখা হয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করতে প্রকৌশলীরা রাত থেকেই নিরবচ্ছিন্ন মেরামতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। বৃষ্টির কারণে কাজে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটলেও শনিবার বিকেলের মধ্যে নতুন ব্রেকার স্থাপন সম্পন্ন করে সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ফিড, বাচ্চা, ওষুধ, বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যয় বাড়লেও উৎপাদিত মুরগি ও ডিমের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকার পোলট্রি খামারিরা লোকসানে পড়েছেন। বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে বাজারদরের সামঞ্জস্য না থাকায় ছোট ও প্রান্তিক খামারিদের একটি অংশ উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছেন। কোথাও কোথাও খামার বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, চাঁদপুর, গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় খামারিদের একই ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, পোলট্রি উৎপাদন ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ যায় ফিডে। আর সেই ফিডের প্রধান কাঁচামালের দাম সম্প্রতি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। গত এক মাসে ভুট্টার দাম কেজিপ্রতি ৩১ টাকা ৩০ পয়সা থেকে বেড়ে ৩৮ টাকা ৮০ পয়সায় উঠেছে। ডি-অয়েলড রাইস ব্র্যানের দাম ২৬ থেকে ৩৩ টাকা, রাইস ব্র্যান অয়েল ৩৩ থেকে ৩৯ টাকা এবং সয়াবিন মিল ৫৮ থেকে ৬৬ টাকা হয়েছে। সরিষার খৈলের দামও বেড়েছে।
ফিডের দাম বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি পড়ছে খামার পর্যায়ে। গত সপ্তাহেও বিভিন্ন ধরনের পোলট্রি ফিডের দাম কেজিপ্রতি ২ থেকে ৩ টাকা বাড়ার খবর পাওয়া গেছে।
জেলায় জেলায় বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়: দিনাজপুর সদর উপজেলার পাঁচবাড়ির খামারি মোমিনুল ইসলাম আগে মাসে প্রায় ৭০ বস্তা ফিড কিনতেন। দাম বাড়ার পর এখন ৬০ বস্তা কিনছেন। এতে মুরগির কাঙ্ক্ষিত ওজন হচ্ছে না, আবার বাজারেও প্রত্যাশিত দাম মিলছে না।
ময়মনসিংহের ত্রিশালে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট। সেখানে শতাধিক প্রান্তিক খামারি ফিডের মূল্যবৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় এবং ডিম-মুরগির ন্যায্য দাম না পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে মানববন্ধন করেছেন। স্থানীয় খামারিদের কেউ কেউ লোকসানের কারণে খামার বন্ধের পথে রয়েছেন।
চাঁদপুরের মতলব উত্তরেও ফিড, ওষুধ ও লেয়ার বাচ্চার দাম বাড়ায় খামারিদের ব্যয় বেড়েছে। উৎপাদন খরচের সঙ্গে ডিমের বিক্রয়মূল্যের সামঞ্জস্য না থাকায় কয়েকটি খামার ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
গাজীপুরের শ্রীপুরে ফিডের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে প্রান্তিক খামারিরা মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ পর্যন্ত করেছেন। তাদের দাবি ছিল ফিডের দাম কমানো এবং উৎপাদন উপকরণের বাজারে কার্যকর নজরদারি।
নোয়াখালীর কবিরহাটের খামারি মাজেদুল হকের অভিজ্ঞতাও একই প্রবণতার উদাহরণ। তার খামারে ফিড ও ওষুধের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ব্যয় বেড়েছে। এক মাস আগে প্রতি কেজি ব্রয়লার ১৪০ টাকায় বিক্রি করলেও সম্প্রতি ১৩২ টাকা দরে বিক্রি করতে হয়েছে। ফলে চলতি ব্যাচ বিক্রির পর খামার বন্ধ করার কথা ভাবছেন তিনি।
খামারি ও ভোক্তার দামে ব্যবধান: শুধু উৎপাদন ব্যয় বাড়াই নয়, খামারি ও ভোক্তা পর্যায়ের দামের ব্যবধানও পোলট্রি খাতের অন্যতম সমস্যা। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রি সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক বাপন দে বলেন, অনেক সময় ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি কেজি ব্রয়লার প্রায় ১৮০ টাকা হলেও খামারিরা পান ১৩৫-১৪০ টাকা। বিপণন ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরের কারণে এ ব্যবধান তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
এ অবস্থায় নিয়মিত বাজার তদারকি, মূল্যতালিকা প্রকাশ এবং খামার থেকে ভোক্তা পর্যন্ত বিপণনব্যবস্থায় নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
কাঁচামাল ও নীতিসহায়তার দাবি: ফিড শিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, কাঁচামালের একটি বড় অংশ আন্তর্জাতিক বাজারনির্ভর। ফলে আমদানি ব্যয় বাড়লে স্থানীয় বাজারেও তার প্রভাব পড়ে। ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (এফআইএবি) কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট, কর ও শুল্ক পুনর্বিবেচনা, স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার দাবি জানিয়েছে।
খামারিরাও ফিড, বাচ্চা ও ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং সহজ শর্তে ঋণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিক্রয়মূল্য নিশ্চিত না হলে ছোট খামারিদের টিকে থাকা কঠিন হবে।
পোলট্রি খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদন উপকরণের বাজার, ফিডের কাঁচামাল এবং খামারি থেকে ভোক্তা পর্যন্ত বিপণনব্যবস্থা—এই তিন জায়গায় সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। তা না হলে প্রান্তিক খামারির সংখ্যা কমে গিয়ে ভবিষ্যতে ডিম ও মুরগির সরবরাহব্যবস্থায়ও প্রভাব পড়তে পারে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজারে তার প্রভাব ক্রমশ স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। দাম বেড়েছে সব ধরনের সবজি, ডিম, গুঁড়া দুধ, আটা-ময়দা, মাছ ও বিভিন্ন রকম ফলের। তবে মাংস ও মুরগির দাম অপরিবর্তিত থাকলেও বাড়তি দামে চাপে পড়েছেন ক্রেতারা। শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
গত সপ্তাহের তুলনায় খুচরা বাজারে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম কেজিতে ১৫ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে। বিক্রেতারা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়েছে।
মিরপুর-১ নম্বর কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা বাজারে বেড়েছে বেগুনের দাম বেড়েছে। লম্বা বেগুনের দাম বাজারভেদে ১০০-১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগে এ ধরনের বেগুন ৯০-১০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে। করলার দাম কিছুদিন আগে কমে ৬০ থেকে ৮০ টাকায় নেমেছিল। এখন মানভেদে তা ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ছোট আকারের পটল ও ঢ্যাঁড়শের দাম বেড়ে কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ৮০ টাকা হয়েছে। এক সপ্তাহ আগেও এসব সবজি ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে।
এছাড়া ঝিঙা, ধুন্দলসহ বিভিন্ন সবজির দাম ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তবে কাঁচা পেপে আগের মতো ৩০ টাকা কেজি এবং কাঁচামরিচ আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে।
সবজি বিক্রেতা রাসেল হোসেন বলেন, পরিবহন খরচ বেড়েছে। তাই পাইকারি বাজারে সবজির দাম বেড়েছে। মিজান নামের আরেক ব্যবসায়ী বলেন, যশোর থেকে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বেগুন আসে। প্রায় ৭০-৮০ টাকা কেজি দরে পাইকাররা কিনে আনতেন। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার আগে মাঝারি আকারের একটি ট্রাকের ভাড়া ছিল ১৮ হাজার টাকা। তেলের দাম বাড়ায় ট্রাকভাড়া বেড়ে ২১ হাজার টাকা হয়েছে। এখন কারওয়ান বাজারেই ১০০ টাকায় ওপরে বেগুন বিক্রি হচ্ছে।
জ্বালানির খরচ বেড়ে যাওয়ায় মাছ পরিবহনেও বাড়তি ব্যয় হচ্ছে। বিক্রেতাদের হিসাবে, প্রতি ট্রাকে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। এর প্রভাবে মাছের দাম কেজিতে ৫০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। দাম বেড়েছে ইলিশ মাছেরও।
গত সপ্তাহের মতোই চলতি সপ্তাহে ব্রয়লার ও সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে যথাক্রমে কেজি প্রতি ১৮০ ও ৩২০ টাকার মধ্যে। তবে লেয়ার মুরগির দাম কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ টাকায়। ব্রয়লার সাদা ডিম ১৪০ টাকা ডজন এবং ব্রাউন ডিম ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকা ডজন দরে বিক্রি হয়েছিল গত সপ্তাহে। আজ ব্রয়লার সাদা ডিম ১৪০ টাকা ডজন। তবে ব্রাউন ডিমের দাম বেড়ে ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকা ডজন হয়েছে। অর্থাৎ ডজনপ্রতি ব্রাউন ডিমের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ দামে ৫ টাকা করে বেড়েছে।
তবে গরু ও খাসির মাংসের দামে কোনো পরিবর্তন হয়নি। আগের দামেই গরুর মাংস ৮০০ এবং খাসির মাংস ১ হাজার ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। চালের দামেও এখন পর্যন্ত জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বড় কোনো প্রভাব দেখা যায়নি।
দাম বেড়েছে পাস্তুরিত তরল দুধের। সম্প্রতি কয়েকটি বেসরকারি বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান প্রতি লিটার দুধের দাম ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছে। এর আগে সরকারি প্রতিষ্ঠান মিল্কভিটাও প্রতি লিটার দুধের দাম ১০ টাকা বাড়িয়েছিল। এরপর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও দাম বাড়িয়েছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে আটা ও ময়দার দামও আগের তুলনায় বেশি। রাজধানীর নাখালপাড়া, মহাখালী, কলমিলতা কাঁচাবাজার ও কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি প্যাকেটজাত আটা বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকায়। ময়দা বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা দরে। সপ্তাহখানেক আগেও প্যাকেটজাত আটা ও ময়দার দাম ছিল যথাক্রমে ৬০ ও ৭০ টাকা। সেই হিসাবে আটা-ময়দা কেজিতে ১০ টাকা বেড়েছে।
তবে খোলা আটা ও ময়দার দর কিছুটা কম। পণ্য দুটি বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ৫৫ ও ৬৫ থেকে ৭০ টাকা দরে। পাঁচ-ছয় দিনের ব্যবধানে খোলা আটা ও ময়দার দামও বেড়েছে পাঁচ টাকা করে। মহাখালী কাঁচাবাজারের কে বি স্টোরের স্বত্বাধিকারী বিকাশ বণিক বলেন, এক-দেড় মাস আগে আটা-ময়দার দাম বেড়েছিল। এখন আরেক দফা বাড়ল। নতুন করে দুই কেজির যে প্যাকেটজাত আটা ও ময়দা দিয়েছে কোম্পানিগুলো, সেগুলোর খুচরা মূল্য লেখা রয়েছে ১৪০ এবং ১৬০ টাকা।
বাজারে ফলের দাম বেড়েছে। প্রতি কেজি মালটা ও কমলা ৪২০ থেকে ৪৫০ এবং আপেল ৩৪০ থেকে ৩৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। লাল আঙুরের জন্য কেজিতে ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা। ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ার পেছনে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে দায়ী করছেন।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে বলে পণ্যের দাম বাড়বে এবং তা মেনে নিতে হবে– বিষয়টা এমন নয়। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির জন্য কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া কত হওয়া উচিত; বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন ব্যয় কত হতে পারে– বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন থেকে এ বিষয়ে দ্রুত বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা উচিত।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, কমিশনের বলা দরকার– জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে গ্রাম থেকে ঢাকায় সবজি নিয়ে আসতে পাঁচ বা ১০ পয়সা বাড়তি খরচ হবে। এর ভিত্তিতে বাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কৃষি, খাদ্য, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংস্থাগুলো বাজার তদারক করলে সুফল মিলবে। কারণ তথ্য-উপাত্ত হাতে থাকলে ব্যবসায়ীরাও দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে কিছুটা সতর্ক থাকবে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার-সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে বাজারে পণ্যমূল্যে সামান্য যে পরিমাণ প্রভাব পড়ার কথা, কিছু ক্ষেত্রে তার চেয়ে প্রভাব বেশি পড়ছে বলে শোনা যাচ্ছে। তবে আমরা ব্যবসায়ীদের সেই সুযোগ দেব না। কারণ পরিবহন ভাড়া কেজিতে ২৫ পয়সা বাড়বে; সেই অজুহাতে দাম দ্বিগুণ বাড়াবে– এই অতি মুনাফা করার সুযোগ দেওয়া হবে না।’
জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিদিন বাজার তদারক করছি। পরিবহন ভাড়া কত বাড়ছে আর পণ্যমূল্য কত বাড়ছে, সেটি পর্যবেক্ষণ করছি। বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করছি। নজরদারি আরও কঠোর হবে।
আগামী বছরের ৩১ জানুয়ারির মধ্যে দেশের সব উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নের হাট ও বাজারে আবশ্যিকভাবে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছে সরকার।
গত বৃহস্পতিবার (২৫ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে দেশের সব উপজেলা পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদেরকে এ নির্দেশনা দিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রতিটি হাট ও বাজারের স্থায়ী শেড এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বিভিন্ন বাজারে নির্মিত চার-পাঁচতলা ভবনের ছাদের আয়তন বিবেচনায় নিয়ে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ থেকে নিজস্ব চাহিদা মেটানোর পর উদ্বৃত্ত জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
এতে আরও বলা হয়েছে, টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন দপ্তর, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থানীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বিদ্যমান দাপ্তরিক মূল ভবন ও আওতাধীন ভবনগুলোতে ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এসব ব্যবস্থায় ন্যূনতম দুই ঘণ্টার ব্যাটারি ব্যাকআপ রাখতে হবে বলেও চিঠিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব চাহিদা মেটানোর পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ নেট মিটারিং পদ্ধতিতে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে হবে উল্লেখ করে স্থানীয় সরকার বিভাগ বলেছে, ‘নেট মিটারিং নির্দেশিকা, ২০২৫’ অনুযায়ী জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের বিপরীতে ১০ টাকা ৫০ পয়সা পাওয়া যাবে। এতে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব আয় বাড়বে।
‘হাট ও বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) বিধিমালা, ২০২৫’ এর বিধি ১০-এর (ঙ) ও (চ) অনুযায়ী হাট ও বাজার থেকে পাওয়া ইজারার আয়ের ১০ শতাংশ সংশ্লিষ্ট হাট ও বাজারের রক্ষণাবেক্ষণ বা উন্নয়নে এবং আরও ১০ শতাংশ উপজেলার অন্তর্গত হাট ও বাজারের রক্ষণাবেক্ষণ বা উন্নয়নে ব্যয়ের জন্য নির্ধারিত রয়েছে। এই অর্থ ব্যবহার করে দেশের সব উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নের হাট ও বাজারে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন ও বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণ করতে বলা হয়েছে নির্দেশনায়।
নির্দেশনা অনুযায়ী, সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনকারী কোম্পানির সঙ্গে পরবর্তী ২০ বছর মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নন-জুডিসিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তি করতে হবে সংশ্লিষ্ট হাট-বাজার কর্তৃপক্ষকে।
দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ অব্যাহত রয়েছে। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। আর নতুন করে ৯৫৫ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ৭০ হাজার ছাড়িয়েছে। চলতি বছর এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ২১১ জন। শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এদিকে, ডেঙ্গু ভাইরাসের ধরনে এসেছে বড় পরিবর্তন। গত দুই বছর ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপের মধ্যে ডেন-টু সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিল। এবার তার জায়গা দখল করেছে ডেন-থ্রি। আইইডিসিআরের সাম্প্রতিক গবেষণায় ডেঙ্গু আক্রান্তদের ৯১ ভাগের শরীরে মিলেছে ডেন-থ্রি। ভাইরাসের এ পরিবর্তনে বেড়েছে উদ্বেগ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের প্রথম ২৫ দিনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১১৪ জন। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৪ হাজার ২৫৮ জন।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় বরিশাল বিভাগে ৪৪ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ২৪৬ জন, ঢাকা বিভাগে (ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ছাড়া) ২৪১ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ৭৬ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৩৩ জন, খুলনা বিভাগে ১৩০ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৩৭ জন, রংপুর বিভাগে ৪৪ জন এবং সিলেট বিভাগে ৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
একই সময়ে হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৯৫৩ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃতদের মধ্যে জানুয়ারিতে দুজন, ফেব্রুয়ারিতে দুজন, মে মাসে একজন, জুনে ১৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন এবং আগস্টে ৪৩ জন মারা গেছেন। সেপ্টেম্বর মাসে এখন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ১১৪ জনের।
এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ৬২ দশমিক ৪ শতাংশ এবং নারী ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে মোট আক্রান্ত হয়েছেন ৭০ হাজার ১০৪ জন। একই সময়ে মারা গেছেন ২১১ জন।
ডেঙ্গুর ধরন পরিবর্তনে বেড়েছে উদ্বেগ: ডেঙ্গু ভাইরাসের ধরনে এসেছে বড় পরিবর্তন। গত দুই বছর ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপের মধ্যে ডেন-টু সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিল। এবার তার জায়গা দখল করেছে ডেন-থ্রি। আইইডিসিআরের সাম্প্রতিক গবেষণায় ডেঙ্গু আক্রান্তদের ৯১ ভাগের শরীরে মিলেছে ডেন-থ্রি। ভাইরাসের এ পরিবর্তনে বেড়েছে উদ্বেগ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যারা আগে ডেঙ্গুর এক সেরোটাইপে আক্রান্ত, দ্বিতীয় দফায় তারা ভিন্ন ধরনে আক্রান্ত হলে দেখা দিতে পারে গুরুতর জটিলতা।
দেশে ডেঙ্গু ভাইরাসের সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ধরন বা সেরোটাইপের মধ্যে গত কয়েক বছর প্রাধান্য দেখা দেয় ডেন-টু এর।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ২০২৪ সালে ডেন-টু তে শনাক্ত রোগী পাওয়া যায় ৭০ ভাগের বেশি। একই বছর, ডেন-থ্রি তে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২০ শতাংশের কিছু বেশি। আর ২০২৫ সালে ডেন-টু এর সংক্রমণ কমে দাঁড়ায় ৪৮ দশমিক ৫ ভাগ। যেখানে ডেন-থ্রি বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ শতাংশে।
তবে চলতি বছর দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান- আইইডিসিআর এর সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, এ বছর বিশ্লেষণ করা নমুনার ৯১ দশমিক ৫ ভাগেই মিলেছে ডেন-থ্রি। আর ৮ দশমিক ৫ শতাংশে ডেন-টু শনাক্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভাইরাসের এ ধরণ পরিবর্তনে বাড়ছে উদ্বেগ। যারা আগে একটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হয়ে পরে আবার ভিন্ন সেরোটাইপে আক্রান্ত হচ্ছেন তাদের ঝুঁকি বেশি হতে পারে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. কাকলী হালদার বলেন, অন্য সেরোটাইপের জন্য আক্রান্ত হয়, তখন ওই সেরোটাইপকে আগেরটি আর ধ্বংস করতে পারে না। নতুন ভাইরাস প্রবেশ করতে আরও সুযোগ পায় বেশি।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী বলেন, এ বছর যত টেস্ট হয়েছে, ৯০ শতাংশের ওপরে ডেন-থ্রি পাওয়া গেছে। এটা শহরেই বেশি। এজন্য যারা আগে আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের ঝুঁকি বেশি থাকে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই শুধু মশা প্রতিরোধে নয়,ভাইরাসের ধরন শনাক্ত, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, জটিলতা শনাক্ত করতে পারলে কমতে পারে মৃত্যুহার।
দেশের উত্তরাঞ্চলের দুই সীমান্তে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে মোট ১৮ জনকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। এর মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ সীমান্তে ৯ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা বিজিবির বাধায় ব্যর্থ হয়েছে। আর দিনাজপুরের বিরামপুর সীমান্তে পুশইনের চেষ্টা করা আরও ৯ জনের মধ্যে দুই নারীসহ তিনজনকে আটক করে ভারতে ফেরত পাঠিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বাকি ছয়জনকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
পীরগঞ্জ সীমান্তে ৯ জনকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা: বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) ভোরে ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার দানাজপুর বিওপির দায়িত্বপূর্ণ সীমান্তে তিন পুরুষ, তিন নারী ও তিন শিশুকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সীমান্ত পিলার ৩৩৯-এমপি থেকে প্রায় ১০ গজ ভারতের অভ্যন্তরে ‘বিদি’ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
বিজিবি সূত্রে জানা যায়, ভারতীয় ৬৩/ভানাইল বিএসএফ ক্যাম্পের একটি টহলদল ওই নয়জনকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করছিল। খবর পেয়ে ৪২ বিজিবির দানাজপুর বিওপির টহলদল ঘটনাস্থলে পৌঁছে বাধা দেয়। এতে পুশইনের চেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং ওই ব্যক্তিদের বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
বিরামপুরে ৯ জন, আটক ৩: একই দিন রাতে দিনাজপুরের বিরামপুর সীমান্তে আরও নয়জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে উপজেলার ২ নম্বর কাটলা ইউনিয়নের খিয়ারমামুদপুর সীমান্তে ২৯১/২০ এস সীমানা পিলারের কাছে এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়রা জানান, খিয়ারমামুদপুর গ্রামের বাসিন্দা ফেরদৌস আলীর বাড়িতে ওই রাতে বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল। এ সুযোগে সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে নয়জন নারী-পুরুষ বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। তাদের মধ্যে দুই নারীসহ তিনজন একটি বিয়েবাড়িতে ঢুকে পড়েন। বিষয়টি জানতে পেরে স্থানীয়রা বিজিবিকে খবর দেন।
পরে বিজিবির সদস্যরা খিয়ারমামুদপুর গ্রামের বাসিন্দা মিজানুর রহমানের বাড়ি থেকে ওই তিনজনকে আটক করেন। এ সময় মিজানুর বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। আটক তিনজনকে পরে ভারতে ফেরত পাঠানো হয়। তবে বাকি ছয়জনের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
জয়পুরহাট ব্যাটালিয়নের (বিজিবি-২০) আওতাধীন ভাইগড় বিওপি ক্যাম্পের কমান্ডার সুবেদার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিএসএফ দুই নারী ও একজন পুরুষকে বাংলাদেশে নিয়ে আসছিল। বিজিবি তাদের ফিরিয়ে দিয়েছে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য শুকুর আলী বলেন, ভারত থেকে আসা নয়জনের মধ্যে ছয়জনকে স্থানীয় আজিজুল ও মিজানুরের সহযোগিতায় পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। পরে মিজানুরের বাড়ি থেকে তিনজনকে আটক করে বিজিবি।
আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ, স্থানীয় যুবককে মারধর: স্থানীয়দের অভিযোগ, পুশইন করে আনা লোকজনকে আশ্রয় দেওয়ার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আজিজুল ইসলাম নামে এক যুবককে বিজিবির এক সদস্য মারধর করেন। পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে তার বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে স্থানীয়রা জানান।
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে ফেরত পাঠানো ওই তিনজন বর্তমানে সীমান্তের ২৯১/২০ এস সীমানা পিলার থেকে আনুমানিক ৫০০ গজ দূরে ভারতের শ্রীরামপুর গ্রামের একটি বাড়িতে অবস্থান করছেন।
একই সীমান্তে আগেও চেষ্টা: এর আগে ২৫ জুলাই ভোরে খিয়ারমামুদপুর সীমান্তের ২৯১/২০ এস সীমানা পিলারসংলগ্ন ভারতের শ্রীরামপুর সীমান্ত দিয়ে গুজরাটের আমেনাবাদ এলাকা থেকে আসা নয় নারীকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল বিএসএফ বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন সীমান্তে পুশইনের চেষ্টা নিয়ে বিজিবির তৎপরতা বেড়েছে। সীমান্তে সন্দেহজনক চলাচল ঠেকাতে টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন দৈনিক বাংলার ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর এবং জয়পুরহাট প্রতিনিধি।
চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৪ দিনে ঢাকার দুই কারাগারে বন্দি অবস্থায় অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের বেশিরভাগই অসুস্থ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কিংবা হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা গেছেন।
চলতি সেপ্টেম্বরের ২৪ দিনে কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার ও কাশিমপুর কারাগারের অন্তত ১০ বন্দির মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে তিনজনের বয়স ৪৫ বছরের নিচে।
সর্বশেষ গত বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) রাতে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের দুই বন্দি মোহাম্মদ ইফতেখার মাহমুদ (৩৬) ও মোহাম্মদ তোফাজ্জল হোসাইন পলাশ (৩৮)।
কারা সূত্র জানায়, গত শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) কারাগারের ভেতরে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন ইফতেখার মাহমুদ। ওই দিনই তাকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) রাত ৯টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
একই রাতে কারাগারে অচেতন হয়ে পড়েন তোফাজ্জল হোসাইন। রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হলে রাত সাড়ে ১১টার দিকে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এ মাসের শুরুতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের বন্দি বাবুল হোসেন (৪৫) মারা যান। গত ৩ সেপ্টেম্বর অসুস্থ অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়ার পর মারা যান বন্দি মো. রফিকুল ইসলাম (৫৪)। গত ১২ সেপ্টেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের হাজতি আব্দুল বারেক (৭০) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। পরদিন আব্দুল মাবুদ (৫৮) নামে আরেক বন্দি ঢাকা মেডিকেলে মারা যান।
গত ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে মারা যান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের বন্দি আলী আকবর মণ্ডল (৬৭)। এর আগে গত ৬ সেপ্টেম্বর মাত্র দুই ঘণ্টার ব্যবধানে ঢাকা মেডিকেলে মারা যান তিন কারাবন্দি—আবুল বাশার (৫৮), আবদুল কাইয়ুম (৬২) ও শাহাদাত হোসাইন লিটন (৫২)।
কারা কর্তৃপক্ষের দাবি, কারাগারে আসার সময় অনেক বন্দিই নানা ধরনের অসুস্থতায় ভুগছিলেন। গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের হাসপাতালে পাঠানো হয়। বেশিরভাগেরই মৃত্যু হয়েছে চিকিৎসাধীন অবস্থায়।
জানা গেছে- মৃতদের মধ্যে সাতজন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী বলে জানা গেছে। বাকি তিনজন মাদক মামলার আসামি ছিলেন।
কারা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, কারা হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, টেকনোলজিস্ট ও প্রশিক্ষিত জনবলের ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে চিকিৎসা সরঞ্জামেরও পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। চিকিৎসক ও জনবল সংকটে বন্দিদের চিকিৎসাসেবায় কিছুটা ব্যাঘাত ঘটছে।
কারা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে কারাগারে বন্দির সংখ্যা এক লাখের বেশি। সারা দেশের কারাগারে ২০২১ সালে ৩০৩, ২০২২ সালে ২২৩, ২০২৩ সালে ৩৭৫, ২০২৪ সালে ৩১৮ এবং ২০২৫ সালে ১৮৭ বন্দির মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরের ১৬ই আগস্ট পর্যন্ত মারা গেছেন ১২২ জন।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, ‘দেশের কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ বন্দি রয়েছে। কারাগারগুলোতে পর্যাপ্ত চিকিৎসাসুবিধা ও অ্যাম্বুলেন্সের ঘাটতি রয়েছে। ফলে কোনো বন্দি অসুস্থ হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয় না।’
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) দুজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং নয়জন সহকারী পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তা মিলে মোট ১১ কর্মকর্তাকে রদবদল করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) ডিএমপি সদর দপ্তর থেকে পৃথক তিনটি কার্যালয় আদেশে জানানো হয়, ডিএমপির পিওএম (পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট) দক্ষিণ বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার সাগর দিপা বিশ্বাসকে পিঅ্যান্ডআর বিভাগে, অতিরিক্ত উপকমিশনার আরিফা আশরাফ পিংকিকে পিওএম দক্ষিণ বিভাগে বদলি করা হয়েছে।
শাহবাগ অঞ্চলের (ট্রাফিক) সহকারী কমিশনার মেহেদি হাসান শাকিলকে নিউমার্কেট অঞ্চলে, নিউমার্কেট অঞ্চলের সহকারী কমিশনার নাসিম-এ-গুলশানকে ডিবির ওয়ারী বিভাগে, ডিএমপির সহকারী কমিশনার নাদিম হায়দার চৌধুরীকে শাহবাগ অঞ্চলের (ট্রাফিক) সহকারী কমিশনার করা হয়েছে।
আরেক আদেশে বলা হয়েছে, সহকারী কমিশনার স্বপ্না বেগমকে উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগে, উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগের সহকারী কমিশনার মনোয়ারা আকতার রিফাতকে শেরেবাংলা অঞ্চলে (ট্রাফিক), দারুস সালাম অঞ্চলের সহকারী কমিশনার ইমদাদ হোসেন বিপুলকে ডিবির মতিঝিল বিভাগে, শেরেবাংলা অঞ্চলের সহকারী কমিশনার (ট্রাফিক) জাকির হোসেনকে দারুস সালাম অঞ্চলে, লালবাগ অঞ্চলের সহকারী কমিশনার (ট্রাফিক) মাহতাব হোসেনকে ডিবির গোয়েন্দা বিভাগে এবং লালবাগ বিভাগের সহকারী কমিশনার (পেট্রোল) তারেকুল ইসলামকে লালবাগ অঞ্চলের ট্রাফিক বিভাগে বদলি করা হয়েছে।
প্রযুক্তিকে শুধু যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন ব্যবস্থার সমষ্টি হিসেবে না দেখে এর মাধ্যমে শহরকে আরও দক্ষ, টেকসই, সংযুক্ত ও নাগরিকবান্ধব করে গড়ে তুলতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ও প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান ডা. শাহাদাত হোসেন।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটিতে দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সম্মেলন ‘আইকনেক্ট ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। পরবর্তী প্রজন্মের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস, কম্পিউটার ব্যবস্থা ও প্রযুক্তিবিষয়ক এ সম্মেলনে দেশ-বিদেশের গবেষক, শিক্ষাবিদ, প্রযুক্তিবিদ ও শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।
ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব শুধু বিদ্যমান জ্ঞান শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্থানান্তর করা নয়; নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা এবং ভবিষ্যতের জটিল সমস্যা মোকাবিলায় তরুণদের প্রস্তুত করাও বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। আইকনেক্টের মতো সম্মেলন গবেষণা ও জ্ঞানকে ভৌগোলিক ও বিষয়ভিত্তিক সীমারেখা অতিক্রম করে নতুন সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করে।’
তিনি বলেন, ‘আইকনেক্ট ২০২৬ যেন শুধু কারিগরি উপস্থাপনা ও অধিবেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। এটি অর্থবহ আলোচনা, নতুন সহযোগিতা এবং দীর্ঘস্থায়ী একাডেমিক অংশীদারত্ব তৈরির কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠবে—এটাই প্রত্যাশা।’
প্রযুক্তির অগ্রগতির পাশাপাশি মানবকল্যাণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে মেয়র বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার উন্নয়ন, শিল্প খাতকে শক্তিশালী করা এবং টেকসই শহর গড়ে তুলতে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে কাজে লাগাতে হবে।’ তিনি তরুণ গবেষক ও শিক্ষার্থীদের নতুন ও কঠিন প্রশ্ন নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক এস. এম. নছরুল কদির বলেন, ‘আইকনেক্ট ২০২৬ আয়োজনের উদ্দেশ্য শুধু একটি আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা নয়; গবেষণা, জ্ঞান ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে সমাজ, শিল্প ও দেশের অর্থনীতিতে বাস্তব অবদান রাখা।’
তিনি বলেন, ‘শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো এবং গবেষণার বাস্তব ও বাণিজ্যিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব বাড়িয়ে প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির গবেষণা, শিক্ষা ও আন্তর্জাতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করা হবে।’
উপাচার্য বলেন, ‘শুধু র্যাংকিং অর্জন নয়, প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটিকে একটি মানসম্পন্ন, গবেষণাভিত্তিক ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলাই লক্ষ্য।’
অনুষ্ঠানে আইকনেক্ট ২০২৬-এর সাধারণ সভাপতি অধ্যাপক ড. শহীদ মো. আসিফ ইকবাল, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শেখ ফাত্তাহ, অধ্যাপক ড. সেলিয়া শাহনাজ, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শেখ মো. রবিউল ইসলাম, প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ ইফতেখার মনির, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক সুফিয়া আক্তার এবং সম্মেলনের আয়োজক সভাপতি ও ইইই বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক টোটন চন্দ্র মল্লিক বক্তব্য দেন। বক্তারা আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবনের গুরুত্ব তুলে ধরে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, গবেষণার প্রসার এবং প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সম্মেলনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, যোগাযোগ প্রযুক্তি ও কম্পিউটার ব্যবস্থাসহ আধুনিক প্রযুক্তির বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা ও জ্ঞান বিনিময় হচ্ছে। আয়োজকদের প্রত্যাশা, আইকনেক্ট ২০২৬-এর মাধ্যমে প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে দেশ-বিদেশের গবেষক, শিক্ষাবিদ ও শিল্প খাতের প্রতিনিধিদের মধ্যে নতুন সহযোগিতা ও অংশীদারত্বের সুযোগ তৈরি হবে।
এক দশকেরও বেশি সময় পর যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে পা রাখা চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংকে হোয়াইট হাউসে জাঁকজমকপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা ও বর্ণাঢ্য রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে স্বাগত জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দিনব্যাপী নানা জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে দুই নেতা দ্বিপক্ষীয় বৈঠক সম্পন্ন করলেও এসব আনুষ্ঠানিকতার আড়ালে বিশ্বের শীর্ষ দুই পরাশক্তির মধ্যকার কৌশলগত ও অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপি ও চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া’র।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রেসিডেন্টদের এই বহুল আলোচিত শীর্ষ বৈঠকে বাণিজ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), তাইওয়ান সংকট এবং চলমান ইরান যুদ্ধ প্রাধান্য পায়। বৈঠক শেষে ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানান, তাদের মধ্যে ‘দারুণ বৈঠক’ হয়েছে। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং সংঘাত এড়িয়ে দুই পরাশক্তির ‘শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান’ বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘চীন ও যুক্তরাষ্ট্রকে দায়িত্বশীল বৃহৎ দেশ হিসেবে কাজ করতে হবে।’
বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান অর্থনৈতিক উত্তেজনা প্রশমনে বাণিজ্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আগামী ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত দুই মাসের জন্য বাড়ানোর বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত হয়েছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে জানান, চীনের উপপ্রধানমন্ত্রী হে লিফেংয়ের সঙ্গে আকস্মিক আলোচনার পর তথাকথিত ‘বুসান চুক্তি’র মেয়াদ বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত হয়। বেসেন্ট বলেন, ‘আমরা যেটিকে বুসান চুক্তি বলি, দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক উত্তেজনা কমানোর এই সমঝোতার মেয়াদ ১০ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা ছিল। এখন তা ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হবে।’ তবে বেইজিং এই বিরতির মেয়াদ দুই বছর করার আশা করেছিল। চুক্তির আওতায় চীনের কৃষিপণ্য আমদানি বৃদ্ধি, কিছু পণ্যে শুল্ক হ্রাস এবং ২০০টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়গুলো আলোচনায় রয়েছে। চীনা প্রেসিডেন্ট এই সমঝোতাকে দুই দেশের জনগণ ও বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য ‘সুসংবাদ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘নতুন পদ্ধতি’ গ্রহণের ওপর জোর দেন।
বৈঠকে তাইওয়ান ইস্যুতে নিজের দেশের কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন সি চিন পিং। সিনহুয়া জানায়, সি ট্রাম্পকে এ বিষয়ে ‘বিচক্ষণতা’ প্রদর্শনের পরামর্শ দিয়ে বলেন, চীন আশা করে যুক্তরাষ্ট্র ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতার’ বিরোধিতা করবে। পাশাপাশি আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় বেইজিংয়ের অবস্থান স্পষ্ট করেন তিনি। অন্যদিকে, ইরান যুদ্ধ অবসানে গত ১৭ জুনের সমঝোতা স্মারকের শর্তাবলীতে ফিরে যেতে ওয়াশিংটনকে তাগিদ দেন সি, যার আওতায় যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং সামুদ্রিক অবরোধ প্রত্যাহারের শর্ত অন্তর্ভুক্ত ছিল।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও শীর্ষ পর্যায়ের এই বৈঠকে গভীর আলোচনা হয়। সি চিন পিং বলেন, এই প্রযুক্তির উন্নয়ন যেন ‘সবসময় মানুষের নিয়ন্ত্রণে’ থাকে এবং এর সুফল যেন মানবকল্যাণে ব্যবহৃত হয়, তা নিশ্চিত করতে বিশ্বের শীর্ষ দুই অর্থনীতির ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, দুই পরাশক্তিকে নিশ্চিত করতে হবে যেন কোনো অবস্থাতেই ‘কোনো সংঘাত ও কোনো মুখোমুখি অবস্থান’ তৈরি না হয়। জবাবে ট্রাম্প এআই-কে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ হিসেবে অভিহিত করলেও এই প্রযুক্তির বিকাশে নতুন কোনো অভ্যন্তরীণ বিধিনিষেধ আরোপের প্রয়োজনীয়তা নাকচ করে দেন।
দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর সন্ধ্যায় হোয়াইট হাউসের ইস্ট রুমে সি চিন পিং ও তার স্ত্রী পেং লিয়ুয়ানের সম্মানে এক ‘ব্ল্যাক-টাই’ রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের আয়োজন করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। মার্কিন উপাদানের সঙ্গে চীনা রন্ধনশৈলীর মেলবন্ধনে এই বিশেষ ভোজের তত্ত্বাবধান করেন মেলানিয়া। ১৯৭২ সালে রিচার্ড নিক্সন ও চৌ এনলাইয়ের ঐতিহাসিক সফরের স্মৃতিবিজড়িত আমেরিকান স্পার্কলিং ওয়াইন দিয়ে ভোজের সূচনা হয়। অতিথিদের মেনুতে ছিল সিল্কি হলুদ স্কোয়াশ ভেলুতে স্যুপ, তিলের আবরণ দেওয়া সামুদ্রিক সি-বাস মাছ এবং হোয়াইট হাউসের নিজস্ব মধুর আইসক্রিমসংবলিত ভ্যানিলা ক্রেমু। নৈশভোজে অ্যাপলের টিম কুক, টেসলার ইলন মাস্ক, অ্যামাজনের জেফ বেজোস, অ্যালফাবেটের সুন্দর পিচাই, ওপেনএআইয়ের স্যাম অল্টম্যান এবং এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াংসহ মার্কিন প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নির্বাহীরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে চীনা ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে হোয়াইট হাউস লাল রঙের ডালিয়া ও রনুনকুলাস ফুল দিয়ে সাজানো হয়। সংগীত পরিবেশন করেন ক্লাসিক্যাল ধারার গায়ক ক্রিস্টোফার ম্যাককিও এবং মার্কিন সামরিক ব্যান্ডের শিল্পীরা। নৈশভোজের মঞ্চে ট্রাম্প সি চিন পিংকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় প্রতীক টাকমাথা ঈগলের (বাল্ড ঈগল) একটি ভাস্কর্য উপহার দেন। ট্রাম্প জানান, আমেরিকার মুক্ত চেতনার প্রতীক এই শিল্পকর্মটির নকশায় তিনি ও মেলানিয়া ব্যক্তিগতভাবে ভূমিকা রেখেছেন। ট্রাম্প বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট সি এবং আমি দুজনেই বুঝি যে আমরা ভিন্ন ভিন্ন ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করি। তবে আমাদের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক টিকে আছে।’ নৈশভোজ শেষে অতিথিদের হোয়াইট হাউসের নির্মাণাধীন ৪০ কোটি ডলারের নতুন বলরুম ঘুরিয়ে দেখান ট্রাম্প এবং বলেন, ‘আপনাদের সম্মানে, আপনারাই প্রথম এখানে পা রাখবেন।’
এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে হোয়াইট হাউসের দক্ষিণ লনে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা, সদ্য সংস্কার করা রোজ গার্ডেনে সামরিক কুচকাওয়াজ এবং আকাশে বি-২ বোমারু বিমানসহ মার্কিন যুদ্ধবিমানের ফ্লাইপাস্টের মাধ্যমে চীনা প্রেসিডেন্টকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ট্রাম্প সিকে হোয়াইট হাউসের নতুন হেলিপ্যাড ও মেরিন ওয়ান হেলিকপ্টারও প্রদর্শন করেন। ওভাল অফিসে আলোচনার প্রাক্কালে সিএনএন, এমএস নাও ও পলিটিকোর সাংবাদিকদের আদালতের আদেশে প্রবেশাধিকার ফিরে পাওয়ার প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প রসিকতা করে মন্তব্য করেন যে চীনা সাংবাদিকদের আচরণ সবচেয়ে বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ।
দিনের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার ফাঁকে দুই নেতা যখন ভেতরে আলোচনা করছিলেন, তখন বাইরে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন একদল প্রতিবাদকারী। তারা ‘সি চিনপিং এখানে স্বাগত নন’ এবং ‘হংকংকে স্বাধীন করো’ বলে স্লোগান দেন। ফেন্টানিল পাচার কিংবা হংকংয়ের কারাবন্দি সংবাদমাধ্যম উদ্যোক্তা জিমি লাইয়ের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করার চেষ্টা করলেও দুই নেতার কেউই সে বিষয়ে কোনো উত্তর দেননি।
উল্লেখ্য, বুধবার সন্ধ্যায় মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজ সামরিক ঘাঁটিতে পৌঁছালে ট্রাম্প দম্পতি সশরীরে উপস্থিত হয়ে চীনা প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানান, যা গত ১১ বছরে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে প্রথম। শুক্রবার দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের সস্ত্রীক ইউএস ন্যাশনাল আর্কাইভস পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে তিন দিনের এই রাষ্ট্রীয় সফর শেষ হতে যাচ্ছে।
সুন্দরবনের কোকিলমনি এলাকা থেকে গভীর সমুদ্রে ইঞ্জিন বিকল হয়ে ভাসতে থাকা ফিশিং বোটসহ আট জন জেলেকে জীবিত উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সকালে কোস্ট গার্ড সদর দপ্তরের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
কোস্ট গার্ড সূত্রে জানা যায়, গত ১৯ সেপ্টেম্বর দুপুর এগারোটায় আট জন জেলেসহ একটি ফিশিং বোট মাছ ধরার সময় সুন্দরবনের কোকিলমনি থেকে ১১ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণে গভীর সমুদ্রে পৌঁছালে-এর ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ে এবং বোটটি ভাসতে শুরু করে। এরপর গত বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) বিকাল তিনটার দিকে বোটটি মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতায় আসলে এক জেলে বোটের মালিককে ফোন করে বিষয়টি জানান। বোট মালিক তাৎক্ষণিকভাবে কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের কাছে সহায়তার আবেদন করেন।
এই তথ্যের ভিত্তিতে কোস্ট গার্ড স্টেশন কোকিলমনির একটি দল দ্রুত গভীর সমুদ্রে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে বিকল হওয়া বোট ও আট জেলেকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে। উদ্ধারের পর জেলেদের প্রাথমিক চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় খাবার সরবরাহ করা হয়।
বর্তমানে বোটটিসহ উদ্ধারকৃত জেলেদের মালিকপক্ষের কাছে হস্তচান্তরের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, উপকূলীয় ও সমুদ্র এলাকায় শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের জরুরি উদ্ধার কার্যক্রমে তাদের এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।