রোহিঙ্গা সংকটের শুরু থেকেই বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে জাতিসংঘ। কিন্তু আলোচনার পর আলোচনা করেও এ বিষয়ে কোনো সমাধান দিতে পারেনি সংস্থাটি। গত পাঁচ বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। ফলে বছরের পর বছর ধরে এই বিরাট জনগোষ্ঠীর বোঝা টেনে বেড়াতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জীবন রক্ষাকারী সুরক্ষা ও সহায়তা প্রদানেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে জাতিসংঘ। তবে এক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় সে তহবিল খুবই কম। এর বাইরে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা তৈরিতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে সংস্থাটি।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইনে সেনা অভিযান শুরুর পর কয়েক মাসে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা কক্সবাজারে এসে আশ্রয় নেয়। এর আগে থেকেই বাংলাদেশে ছিল আরও চার লাখ রোহিঙ্গা। এসব রোহিঙ্গা কক্সবাজারের বিভিন্ন রোহিঙ্গা শিবিরে বসবাস করছে। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে ২০১৭ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করলেও সেই প্রত্যাবাসন আজও শুরু হয়নি। ২০১৯ সালে দুই দফা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেয়া হলেও রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কথা তুলে ধরে ফিরতে রাজি হননি রোহিঙ্গারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক এহসানুল হক দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকটের শুরু থেকেই জাতিসংঘ ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা বিভিন্ন ধরনের সমাধান নিয়ে এগিয়ে আসার চেষ্টা করেছে। সমস্যা হলো, এই সংকটের জন্য দায়ী মিয়ানমার সরকারকে রাজি করানো জাতিসংঘের একার পক্ষে সম্ভব না।’
তার মতে, প্রত্যাবাসন সমাধানে না আসার পেছনে অন্য শক্তিগুলোর ভূমিকা রয়েছে। এখানে বৃহৎ শক্তির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা উচিত। বিশেষ করে চীন, ভারত এবং রাশিয়া। এই তিন রাষ্ট্রের মধ্যে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে এই সংকটের সমাধান সম্ভব।
এহসানুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশকে জাতিসংঘের কাছে এ বিষয়টি আরও জোরালোভাবে উপস্থাপন করতে হবে। জাতিসংঘ যদি আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখে তাহলে হয়তো এই সমস্যার একটা যৌক্তিক সমাধান আসতে পারে। কারণ, সংস্থাটির অতীতে রেকর্ড বলছে, অতীতে তারা অনেক সংঘাতময় পরিস্থিতির সমাধান দিতে সমর্থ হয়েছে।’
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা দৈনিক বাংলাকে জানান, জাতিসংঘ কোনো আলাদা সত্তা নয়। সদস্য দেশগুলোকে নিয়েই জাতিসংঘ। আর সদস্য দেশগুলোর সিদ্ধান্তের বহিঃপ্রকাশ ঘটে জাতিসংঘের কর্মকাণ্ডে। মূলত রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে প্রধান বাধা নিরাপত্তা পরিষদে ভেটোদানকারী ক্ষমতাধর রাষ্ট্র রাশিয়া এবং চীন। তারা মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় গণহত্যা চালানো সত্ত্বেও দেশটির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না।
জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনও। দিন দিন দুর্বল প্রতিষ্ঠানে রূপ নিচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। সম্প্রতি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ থেকে ফিরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘রোহিঙ্গা সমস্যাসহ বিভিন্ন সমস্যায় আমরা জাতিসংঘের দিকে চেয়ে থাকি। অথচ জাতিসংঘ একটি যুদ্ধ, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধই থামাতে পারছে না। এতে বোঝা যায়, প্রতিষ্ঠানটি দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে।’ এবারের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘের কার্যকর ভূমিকার প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন।
তবে বিরাট এই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য শুরু থেকেই মানবিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে জাতিসংঘ। জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান বা যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনার (জেআরপি) মাধ্যমে গঠিত তহবিলের মাধ্যমে এই সহায়তা দিয়ে থাকে সংস্থাটি।
কক্সবাজার ও ভাসানচরে অবস্থিত রোহিঙ্গা শরণার্থী ও তাদের আশ-পাশে বসবাস করা স্থানীয় বাংলাদেশিদের জন্য ২০২২ সালের জেআরপিতে প্রায় ৮৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের তহবিল চায় জাতিসংঘ। বাংলাদেশ সরকারের নেতৃত্বে এ বছরের জেআরপি অনুযায়ী কাজ করছে ১৩৬টি সংস্থা, যার মধ্যে ৭৪টি হচ্ছে বাংলাদেশি বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠন।
বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে জাতিসংঘ। জাতিসংঘ দিবসের পাশাপাশি আজকের এই দিনটি ‘বিশ্ব উন্নয়ন তথ্য দিবস’ হিসেবেও পালিত হয়। জাতিসংঘের উদ্যোগে ১৯৭২ সাল থেকে প্রতি বছরের ২৪ অক্টোবর এ দিনটি সদস্য দেশগুলোতে পালিত হয়ে আসছে।
বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ১৩৬তম সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে যোগদান করে। যোগদানের এক সপ্তাহ পর ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান বাংলায় ভাষণ প্রদান করেছিলেন।
কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা অষ্টগ্রামে আজ যথাযোগ্য মর্যাদায় ও নানা আয়োজনে পালিত হচ্ছে বীর তরুণ ও ‘জলযোদ্ধা’ মো. ছাবিকুল ইসলামের মৃত্যুবার্ষিকী। নিজের জীবনের পরোয়া না করে দুই শিশুর প্রাণ বাঁচিয়ে বীরত্ব ও মানবতার এক অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছিলেন এই তরুণ। তার এই আত্মত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখতে এবং তরুণ প্রজন্মের মাঝে তার বীরত্বগাথা ছড়িয়ে দিতে অষ্টগ্রামে সাড়ে চার কিলোমিটার এবং ১৪ কিলোমিটারের একটি বিশেষ ম্যারাথন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে।
শুক্রবার (১০ জুলাই) সকালে শুরু হওয়া এই ম্যারাথন প্রতিযোগিতায় উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা নানা বয়সি মানুষ অংশগ্রহণ করে।
কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের বরাতীর কান্দি গ্রামের জলযোদ্ধা মো. ছাবিকুল ইসলামের জন্ম ১৯৯৬ সালের ১৩ জুন। ২০২৩ সালের ১০ জুলাই তিনি এক মর্মান্তিক অথচ গৌরবোজ্জ্বল ঘটনার মধ্য দিয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
সেদিন হাওরে একটি নৌকা ডুবির ঘটনা ঘটলে ছাবিকুল তাৎক্ষণিকভাবে প্রবল স্রোতের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়েন। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাঁতরে গিয়ে তিনি ডুবন্ত নৌকাটি থেকে ২টি শিশুকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে স্বজনদের হাতে তুলে দেন। কিন্তু সবাইকে বাঁচাতে পারলেও প্রবল স্রোতের কারণে তিনি নিজে আর তীরে ফিরতে পারেননি। পানির তীব্র টানে তিনি তলিয়ে যান এবং পরবর্তীতে ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় লোকজন অনেক চেষ্টার পর তার মৃতদেহ উদ্ধার করেন।
ম্যারাথনে অংশ নেওয়া প্রতিযোগীরা জানান, ছাবিকুল আমাদের হাওরাঞ্চলের গর্ব। তিনি যেভাবে নিজের জীবন দিয়ে দুটি নিষ্পাপ শিশুর প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন, তা আমাদের সবসময় মানবিক হওয়ার অনুপ্রেরণা জোগায়। তার মৃত্যুবার্ষিকীতে এই ম্যারাথন আয়োজন সুস্থ জীবনচর্চার পাশাপাশি তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানোর একটি চমৎকার মাধ্যম।
উপস্থিত সুধীজন ও এলাকাবাসী ছাবিকুলের স্মৃতি রক্ষার্থে এবং তার পরিবারের সহায়তায় প্রশাসনসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। ম্যারাথন শেষে বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।
বর্ষার নতুন পানি আসার সঙ্গে সঙ্গেই চলনবিল অঞ্চলে মেতে উঠেছে একশ্রেণির অসাধু মৎস্য শিকারী। নিষিদ্ধ ‘রিং জাল’ (চায়না দুয়ারী) ও কারেন্ট জাল দিয়ে অবাধে নিধন করা হচ্ছে দেশীয় প্রজাতির মা ও পোনা মাছ। এর ফলে চলনবিলে জীববৈচিত্র্য ও মৎস্য সম্পদ চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আষাঢ়-শ্রাবণের নতুন পানিতে চলনবিলে মাছ ডিম ছাড়তে শুরু করেছে। এই সুযোগে তাড়াশসহ চলনবিল অঞ্চলের বিভিন্ন পয়েন্টে অবাধে পেতে রাখা হচ্ছে সূক্ষ্ম ছিদ্রযুক্ত রিং জাল। এই জালে রেণু পোনা থেকে শুরু করে ডিম্বোলা মা মাছ—কোনো কিছুই রক্ষা পাচ্ছে না। হাট-বাজারে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে এসব নিষিদ্ধ জাল ও পোনা মাছ।
এ বিষয়ে তাড়াশ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো নাসির উদ্দীন জানান, নিষিদ্ধ রিং জাল ও চায়না দুয়ারী জাল দেশের মৎস্য সম্পদের জন্য এক বড় অভিশাপ। তিনি আরও বলেন, নতুন পানি আসার পর থেকেই চলনবিলে দেশীয় প্রজাতির মাছের বংশবৃদ্ধির মোক্ষম সময়। এই সময়ে একশ্রেণির অসাধু জেলে আইন অমান্য করে রিং জাল ব্যবহার করছেন। আমরা ইতোমধ্যেই মাঠ পর্যায়ে তদারকি শুরু করেছি। মৎস্য সম্পদ রক্ষায় আমাদের এই অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না।
চলনবিলে রিং জালের ব্যবহার এবং পোনা মাছ নিধনের বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান তিনি বলেন, চলনবিলের মৎস্য ঐতিহ্য রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। নিষিদ্ধ রিং জাল দিয়ে মা ও পোনা মাছ ধ্বংস করা দণ্ডনীয় অপরাধ। আমরা খুব দ্রুতই চলনবিলের বিভিন্ন পয়েন্টে এবং হাট-বাজারগুলোতে মোবাইল কোর্ট (ভ্রাম্যমাণ আদালত) পরিচালনা করব। যারা এই অবৈধ জাল তৈরি, বিক্রি বা মাছ শিকারে ব্যবহার করছেন, তাদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।
স্থানীয় পরিবেশবাদী ও সচেতন মহলের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে এই ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ করা সম্ভব নয়। এর জন্য জেলেদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং রিং জাল বিক্রির উৎসগুলো বন্ধ করা জরুরি। তা না হলে অদূর ভবিষ্যতে চলনবিল এক সময় দেশীয় মাছ শূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন নালিতাবাড়ী উপজেলায় দিনব্যাপী শিক্ষা, অবকাঠামো, সমাজসেবা, জনসেবা ও উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিদর্শন করেছেন। গত বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) এসব কার্যক্রম পরিদর্শন শেষে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন তিনি।
তিনি প্রথমে উপজেলার উত্তর নাকসি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করে সেখানে শিক্ষার্থীদের মাঝে ফুটবল বিতরণ করেন। পরে নালিতাবাড়ী-গাজীরখামার সড়কের গোল্লারপাড় এলাকায় চেল্লাখালী নদীর ভাঙনকবলিত অংশ পরিদর্শন করেন। সড়ক ও নদীভাঙন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ শেষে পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং উপজেলা প্রকৌশলীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেন।
এরপর জেলা প্রশাসক নালিতাবাড়ী থানা পরিদর্শন করেন। পরে উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত ‘ভিক্ষুক পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান কর্মসূচি’-এর আওতায় ছয়জন ভিক্ষুকের মধ্যে পুনর্বাসন সামগ্রী বিতরণ করেন। এর মধ্যে তিনজনকে পাঁচটি করে ছাগল এবং অপর তিনজনকে চা ও মনোহারি দোকান পরিচালনার উপকরণ দেওয়া হয়। এছাড়া তিনজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির হাতে হুইলচেয়ার তুলে দেন।
একই দিনে ‘০৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে উপজেলা পরিষদ চত্বরে একটি গাছের চারা রোপণ করেন তিনি।
পরে জেলা প্রশাসক উপজেলা পরিষদ পরিদর্শন শেষে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক ও সুধীজনের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অংশ নেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল মালেকের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আবু সায়েমের সঞ্চালনায় সভায় আরো বক্তব্য রাখেন নালিতাবাড়ী থানার ওসি মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান, উপজেলা স্বাস্থ্য ও প. প. কর্মকর্তা ডা. জুনায়েদ আব্দুল কাইয়ুম, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মশিউর রহমান, উপজেলা বিআরডিবির চেয়ারম্যান এমএ রায়হান, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান লিটন, উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আরিফ রব্বানী, প্রেসক্লাব নালিতাবাড়ীর উপদেষ্টা এম.এ হাকাম হীরা, সামেদুল ইসলাম তালুকদার, সাবেক সেক্রেটারি মনিরুল ইসলাম প্রমুখ। দিনব্যাপী সফরের শেষ পর্যায়ে তিনি উপজেলার পোড়াগাঁও ইউনিয়নের লক্ষীকুড়া গ্রামের বাসিন্দা মোছা. রুপা বেগমের নির্মাণাধীন ঘর পরিদর্শন করেন। এ সময় পরিবারের সদস্যদের জন্য নতুন পোশাক ও শুকনা খাবার প্রদান করেন এবং গৃহনির্মাণ কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজ নেন।
যশোরের কেশবপুরে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের দোরগোড়ায় বিশেষায়িত চক্ষু চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে দিনব্যাপী একটি বিনামূল্যের চক্ষু ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) স্বেচ্ছাসেবী উন্নয়ন সংস্থা সমাধান-এর প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এ ক্যাম্পে ব্যাপক সাড়া পড়ে। শতাধিক মানুষ বিনামূল্যে চোখ পরীক্ষা, চিকিৎসা ও পরামর্শ গ্রহণ করেন।
সমাধানের ব্যবস্থাপনায়, অরবিস ইন্টারন্যাশনাল-এর অর্থায়নে এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) ও খুলনা বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতাল-এর সহযোগিতায় আয়োজিত এ ক্যাম্প পরিচালনা করেন খুলনা বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতালের অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জন ডা. মোঃ মুস্তাফিজুর রহমান ও তাঁর সহকারী চিকিৎসক দল।
ক্যাম্পে সমাধান সংস্থার বিভিন্ন শাখাভুক্ত সমিতির সদস্যদের পাশাপাশি সাধারণ চক্ষুরোগীদেরও উন্মুক্তভাবে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়।
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, এ ক্যাম্পে মোট ১৭৮ জন রোগী চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন। এর মধ্যে ৭৭ জন ছানি রোগী এবং ৮ জন অন্যান্য জটিল চক্ষুরোগী শনাক্ত হন। তাদেরকে তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান সংস্থার নিজস্ব পরিবহনে খুলনার শিরোমণি বাদামতলা অবস্থিত খুলনা বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতালে বিনামূল্যে অপারেশনের জন্য পাঠানো হয়। অপারেশন শেষে আজ ১১ জুলাই একই ব্যবস্থাপনায় তাদের নিরাপদে কেশবপুরে ফিরিয়ে আনা হবে।
সমাধান সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মোঃ রেজাউল করিম বলেন, দৃষ্টিশক্তি মানুষের জীবনের অন্যতম মূল্যবান সম্পদ। অর্থাভাবে যেন কোনো মানুষ প্রয়োজনীয় চক্ষু চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন, সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্যসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছি। অরবিস ইন্টারন্যাশনাল, পিকেএসএফ ও খুলনা বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতালের সহযোগিতায় এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে।
সমাধান সংস্থার প্রশিক্ষণ সমন্বয়কারী মোঃ মুনছুর আলী বলেন, একজন মানুষ যখন দৃষ্টিশক্তি ফিরে পান, তখন শুধু তাঁর চোখেই আলো ফেরে না—আলোকিত হয় একটি পরিবারও। এই চক্ষু ক্যাম্পের মাধ্যমে রোগীদের বিনামূল্যে পরীক্ষা, অপারেশন এবং যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে অর্থনৈতিক কারণে কেউ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন। মানুষের কল্যাণে সমাধান ভবিষ্যতেও এ ধরনের মানবিক উদ্যোগ অব্যাহত রাখবে।
চক্ষু ক্যাম্প চলাকালে উপস্থিত ছিলেন সমাধান সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মোঃ রেজাউল করিম, পরিচালক শাহাদাৎ হোসেন, প্রশিক্ষণ সমন্বয়কারী মোঃ মুনছুর আলীসহ সংস্থার অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার খাজরা ইউনিয়নের খাজরা বাজার থেকে আমাদী খেয়াঘাট পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে বেহাল অবস্থায় পড়ে থাকায় সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছেন হাজার হাজার মানুষ।
দীর্ঘ ১২ কিঃমিঃ সড়কের মধ্যে ৩ কিঃমিঃ সড়ক কাচা হওয়ায় খানাখন্দে ভরা, কাদা আর জলাবদ্ধতায় প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন পথচারী, শিক্ষার্থী, কৃষক,ব্যবসায়ী ও যানবাহনের চালকরা। বর্ষার শুরুতেই পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ায় দ্রুত সংস্কারের দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয়দের অভিযোগ,বছরের পর বছর ধরে সড়কটির স্থায়ী সংস্কার না হওয়ায় জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। খাজরা বাজার,আমাদী খেয়াঘাট এবং আশপাশের কয়েকটি গ্রামের হাজার হাজার মানুষের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম এই সড়ক। সামান্য বৃষ্টিতেই এটি পরিণত হয় কাদাময় জলাশয়ে। ফলে প্রায়ই মোটরসাইকেল,ভ্যান ও ইজিবাইক দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী,রোগী ও কর্মজীবী মানুষ।
দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগের প্রতিবাদে স্থানীয় যুবক ও শিক্ষার্থীরা ভাঙাচোরা সড়কের কাদার মধ্যে ধানের চারা রোপণ করে ব্যতিক্রমী কর্মসূচি পালন করেন। তাদের এ অভিনব প্রতিবাদ মুহূর্তেই স্থানীয়দের দৃষ্টি কাড়ে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। প্রতিবাদকারীরা বলেন,"যে রাস্তা দিয়ে হাঁটা যায় না,সেখানে ধান চাষই তো করা যায়।" তারা দ্রুত সংস্কারের দাবি জানিয়ে হুঁশিয়ারি দেন,দাবি উপেক্ষিত হলে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
খাজরা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য পদপ্রার্থী মিজানুর রহমান গাইন বলেন, এ সড়কটি শুধু একটি রাস্তা নয়,এটি হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িত। দীর্ঘদিন ধরে মানুষের দুর্ভোগ চললেও কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। দ্রুত সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
মাওলানা আব্দুর রশিদ বলেন, "সড়কটি সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। স্কুল,কলেজ, মাদরাসাগামী শিক্ষার্থী,পথচারীদের যাতায়াতে খুবই সমস্যা হচ্ছে। ডেলিভারীসহ মুমূর্ষ রোগীদেরকে আশাশুনি ও জায়গীর মহল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। জনগণ সুযোগ দিলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত কাজ বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। "তিনি রাস্তাটির কাজ দ্রুত শুরুর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
খাজরা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম বাচ্চু বলেন, এটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের সড়ক। "সড়কটির বেহাল অবস্থার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার জানানো হয়েছে। সাবেক উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাইদুজ্জামান হিমু স্যারের সঙ্গেও একাধিকবার কথা বলেছিলাম। বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।"
এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী অনিন্দ্য দেব সরকারকে তার অফিসে গিয়ে পাওয়া যায়নি এবং একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এলাকাবাসীর দাবি, জনস্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটি দ্রুত সংস্কার করা না হলে বর্ষা মৌসুমে দুর্ভোগ আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। তাই আর আশ্বাস নয়, দ্রুত দৃশ্যমান সংস্কারকাজ শুরুর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
রাজনীতি কেবল ক্ষমতা উপভোগের মাধ্যম নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের একটি পবিত্র প্রক্রিয়া বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেছেন, গণতান্ত্রিক লক্ষ্য অর্জনে সরকারের পাশাপাশি সামাজিক সংগঠনগুলোর ভূমিকাও অনস্বীকার্য।
শুক্রবার (১০ জুলাই) সকালে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে মহান স্বাধীনতার ঘোষক, সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বীর উত্তম শহীদ জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাৎ বার্ষিকী উপলক্ষে জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত মাসব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে তারেক রহমানের আসন্ন বরিশাল সফর প্রসঙ্গে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানের এবারের বরিশাল সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পরিবেশ রক্ষা ও সবুজায়নের বার্তা ছড়িয়ে দিতে এ সফরে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তারেক রহমানের এবারের বরিশাল সফরের মূল কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। তবে সফরকালে তিনি দক্ষিণাঞ্চলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। পাশাপাশি এ অঞ্চলের উন্নয়ন, সম্ভাবনা এবং জনগণের বিভিন্ন প্রত্যাশা নিয়েও আলোচনা করবেন।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, প্রকাশ্য সমাবেশ ও অন্যান্য কর্মসূচির মধ্যেও এবার বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পরিবেশ রক্ষা ও সবুজায়নের মাধ্যমে একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলাই এর অন্যতম লক্ষ্য। জনগণের কল্যাণে বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে পরিবারভিত্তিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড এবং বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত আলেম, ইমাম ও মোয়াজ্জিনদের জন্য বিশেষ কার্ড প্রদান করা হয়েছে। মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন প্রসঙ্গে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, এ অঞ্চলের উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, উন্নয়নের সম্ভাবনা এবং প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের পক্ষ থেকে আমরা প্রধানমন্ত্রীর আগমনের জন্য অত্যন্ত আগ্রহ ও প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষা করছি। তাঁর আগমন এ অঞ্চলের উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণে নতুন গতি সৃষ্টি করবে বলে আমরা আশাবাদী।
পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, একটি গাছ শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে না, এটি মানুষের জীবন রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই প্রত্যেক নাগরিককে বৃক্ষরোপণ ও গাছের পরিচর্যায় দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। দক্ষিণাঞ্চল জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হওয়ায় পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাপকভাবে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মামুন অর রশিদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার এবং বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন।
অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিকে ধারণ করে পরিবেশ রক্ষার এই উদ্যোগ সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। বৃক্ষরোপণের মতো জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। নগর ও পরিবেশ রক্ষায় পরিকল্পিত সবুজায়ন প্রয়োজন। সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে বৃক্ষরোপণে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
পরে অতিথিরা বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করেন। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্থানীয় নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
উজানের পাহাড়ি ঢলে কুমিল্লার গোমতী নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নদীর চরাঞ্চলে পানি প্রবেশ করেছে। এতে আগাম জাতের বিভিন্ন সবজি ও কৃষি ফসল তলিয়ে গিয়ে সহস্রাধিক কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
শুক্রবার (১০ জুলাই) বুড়িচং উপজেলার বালিখাড়া, ভান্তি ও কামারখাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ সবজি খেত পানিতে তলিয়ে গেছে। পানির ওপর ভেসে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি। কৃষকরা কোমরসমান পানিতে নেমে যা সম্ভব ফসল তুলে আনার চেষ্টা করছেন।
ভান্তি এলাকার কৃষক আবদুল হক জানান, প্রায় ৩ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে তিনি আগাম জাতের মুলা ও লাউ চাষ করেছিলেন। হঠাৎ গোমতীর পানি বেড়ে যাওয়ায় তার পুরো খেত পানির নিচে চলে গেছে।
আরেক কৃষক আবদুল জলিল বলেন, ‘তার ডাঁটা শাক, পুঁইশাক ও চালকুমড়ার খেত পানিতে ভেসে গেছে।’ তার মতো ভান্তি, কামারখাড়া, বালিখাড়া ও আশপাশের এলাকার অন্তত শতাধিক কৃষকের ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
কৃষক সোহেল মিয়া জানান, লাউ, চিচিঙ্গা, ডাঁটা শাক, চালকুমড়া, মুলাসহ বিভিন্ন সবজি অপরিপক্ব অবস্থায় তুলে নিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। কৃষকদের ভাষ্য, পুরোপুরি নষ্ট হওয়ার আগে যতটুকু সম্ভব ফসল উদ্ধার করে বিক্রি করে অন্তত কিছু ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে এতে লাখ লাখ টাকার ফসলহানির আশঙ্কা রয়েছে।
কুমিল্লা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মিজানুর রহমান জানান, উজানের পাহাড়ি ঢলে গোমতী নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের হাজারো কৃষকের ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। তিনি জানান, কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের সাথে তিনি নিজেও মাঠে অবস্থান করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সঙ্গে কথা বলছেন।’ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জরিপ শেষে কৃষকদের সহায়তায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
‘ক্লাইমেট অ্যাকশন: জলবায়ু পরিবর্তন—আজকের পদক্ষেপ, আগামীর নিরাপত্তা’—প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে পিরোজপুরে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়েছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস-২০২৬। পরিবেশ সুরক্ষাকে কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবু সাঈদ।
গত বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর, পিরোজপুরের যৌথ উদ্যোগে জেলা সার্কিট হাউস প্রাঙ্গণ থেকে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে শেষ হয়। র্যালি পরবর্তী সময়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ‘আব্দুর রাজ্জাক - সাইফ মিজান স্মৃতিসভা কক্ষে’ এক আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক আবু সাঈদ। পরিবেশ রক্ষায় নিবেদিত ব্যক্তিদের অনুপ্রাণিত করতে আগামী বছর থেকে ‘পরিবেশ পদক’ প্রদানের ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, ‘পরিবেশ রক্ষায় যারা ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগতভাবে বিশেষ ভূমিকা রাখবেন, তাদের আমরা আগামী বছর থেকে পরিবেশ পদক দিয়ে সম্মানিত করব। এ ছাড়া আমাদের নদী ও খালগুলো দখলমুক্ত করতে হবে। আমি ইতোমধ্যে নিয়মিত দখল উচ্ছেদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি, যাতে কৃষিনির্ভর এই অর্থনীতিতে কৃষি বিপ্লব সম্ভব হয়।’
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যক্তিগত সচেতনতার ওপর জোর দিয়ে জেলা প্রশাসক আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বন্যা, খরা ও নদী ভাঙনের মতো দুর্যোগ মোকাবিলায় ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সচেতনতা সবচেয়ে জরুরি। আমরা কতটুকু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখছি, তার ওপরই নির্ভর করছে আমাদের পরিবেশের ভবিষ্যৎ।’
অনুষ্ঠানে পরিবেশ ও প্রকৃতিবিষয়ক চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। এ সময় জেলা প্রশাসক এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. আলাউদ্দীন ভূঞা জনী, জেলা বিএনপির সদস্য সচিব এস. এম. সাইদুল ইসলাম কিসমত, জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি অধ্যক্ষ জহিরুল হক এবং পরিবেশ অধিদপ্তর, পিরোজপুরের সহকারী পরিচালক নিখিল চন্দ্র ঢালী উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের প্রতিনিধি, বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন।
সবশেষে একটি সবুজ, পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব পিরোজপুর গড়ার লক্ষ্যে তিনি সব শ্রেণিপেশার মানুষের সহযোগিতা কামনা করেন।
নড়াইলের কালিয়া উপজেলার দত্তমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কম্পিউটার শিক্ষক বিদ্যালয় ছেড়েছেন ২০০৯ সালে। অথচ সরকারি কোষাগার থেকে (এমপিও) তার নামের ব্যাংক হিসাবে টাকা জমা হচ্ছে এখনোও। এ খবর বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ অন্যরা কিছুই জানেন না বলে দাবি করেছে।
এদিকে বিদ্যালয়ের ৪০১ জন কোমলমতি শিক্ষার্থী তথ্য প্রযুক্তি শিক্ষা থেকে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বঞ্চিত হচ্ছে সে দিকেও খেয়াল নেই বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের। কম্পিউটার শিক্ষকের নাম পীযুষ কান্তি ঘোষ।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, পীযুষ কান্তি ঘোষ কম্পিউটার শিক্ষক হিসেবে ২০০৬ সালে অত্র বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। তার বেতন-ভাতা এমপিওভূক্ত না হওয়ায় তিনি ২০০৯ সালে চাকরি ছেড়ে দিয়ে ঢাকার একটি বেসরকারি ব্যাংকে যোগ দেন। এরপর তিনি ওই বিদ্যালয়ে আর ফিরে আসেননি।
জানা যায়,বিদ্যালয় ছাড়ার পর তিনি এমপিও ভূক্ত হন। তার ব্যাংক হিসাবে সরকারি বেতন-ভাতার টাকা জমা হয়েছে নিয়মিত। সংশ্লিষ্টদের দাবি এভাবে প্রায় অর্ধ কোটি টাকার সরকারি অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।
শিক্ষক পীযুষ কান্তির ব্যাংক হিসাবের লেনদেন পর্যালোচনা করে দেথা গেছে চলতি বছরের জুন মাসেও তার হিসাবে সরকারি টাকা জমা হয়েছে। তখনোও তিনি একটি বেসরকারি ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত বলে জানা যায়।
টাকা উত্তোলন নিয়ে বিদ্যালয়ের সাবেক এবং বর্তমান কয়েকজন প্রধান শিক্ষকের ভূমিকা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। পীযুষ কান্তি দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও তাকে এমপিওভূক্ত রাখা এবং বেতন উত্তোলনের প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে বলে ধারনা করা হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের সহকারি প্রধান শিক্ষক গোলক চন্দ্র বিশ্বাস দাবি করেন. আমি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে পীযুষ কান্তির বেতন বন্ধ রাখি। তবে ব্যাংক হিসাবে বেতন জমার বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।
বর্তমান প্রধান শিক্ষক তুষার কান্তি ঘোষ বলেন, বিভিন্ন সময়ে পীযুষ কান্তিকে নোটিশ দিয়ে সাময়ীক বরখাস্ত করা হয়েছিল। আদালতের একটি আদেশ এবং বিদ্যালয়ের তৎকালীণ ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তার হিসাবে বেতন পাঠানো হয়েছে। পরে তার বেতন বন্ধ করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
মুঠোফোনে পীযুষ কান্তির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ২০০৯ সালে তিনি বিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে দেন। এর পর থেকে আর ওই বিদ্যালয়ে ফিরে যাননি। তিনি বলেন, তার অ্যাকাউন্টে বেতনভাতার টাকা কিভাবে জমা হয়েছে সেবিষয়ে অবগত নন। তিনি এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন।
কালিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিন্নাতুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে একটি অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নড়াইলের ভারপ্রাপ্ত জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জালাল উদ্দীন বলেন, দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থেকেও কোন শিক্ষক সরকারি বেতন-ভাতা পেয়ে থাকলে তা গুরুতর অনিয়ম। বিষটি তদন্তের জন্য কমিটি গঠন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মাগুরায় অনলাইন জুয়া, সাইবার অপরাধ ও অবৈধ আর্থিক লেনদেনের বিরুদ্ধে জেলা পুলিশের চলমান বিশেষ অভিযানে একটি অনলাইন জুয়া চক্রের কথিত মাস্টার এজেন্টকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময় তার কাছ থেকে ৫টি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন ও বিভিন্ন মোবাইল অপারেটরের ৯টি সিম কার্ড জব্দ করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে অভিযুক্তের বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে প্রায় ৩ কোটি ২১ লাখ ৬০ হাজার টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।
পুলিশ জানায়, পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় মাগুরা সদর থানার ওসির নেতৃত্বে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) রাত ১১টার দিকে সদর উপজেলার পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ভিটাসাইর এলাকায় অভিযান চালানো হয়। এ সময় ভিটাসাইর মারকাজ মসজিদপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. আমিনুল ইসলাম নয়ন (২৪)-কে গ্রেফতার করা হয়। পরে রাত পৌনে তার দিকে তার কাছ থেকে ৫টি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন ও ৯টি সিম কার্ড উদ্ধার করে জব্দ করা হয়। উদ্ধার করা মোবাইল ফোনগুলো পরীক্ষা করে বিভিন্ন অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি পুলিশের।
পুলিশ জানায়, অভিযুক্ত ব্যক্তি দেশে-বিদেশে ভিপিএন ও প্রক্সি সার্ভার ব্যবহার করে অনলাইন জুয়ার খেলোয়াড়দের মধ্যে আর্থিক লেনদেন পরিচালনা করতেন। তদন্তে তার বিকাশসহ অন্যান্য মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট এবং অনলাইন বেটিং প্ল্যাটফর্ম 1XBET-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব অ্যাকাউন্টে মোট প্রায় ৩ কোটি ২১ লাখ ৬০ হাজার টাকা লেনদেনের তথ্য শনাক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মাগুরা সদর থানার ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, অর্থের উৎস, লেনদেনের প্রকৃতি এবং অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততা যাচাই করে জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬ অনুযায়ী মামলা দায়ের করা হয়েছে। পাশাপাশি জব্দকৃত মোবাইল ফোনের ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষা এবং আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণের মাধ্যমে চক্রটির অন্যান্য সদস্যকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
মাগুরা জেলা পুলিশ অনলাইন জুয়া, সাইবার অপরাধ ও অবৈধ আর্থিক লেনদেনের বিরুদ্ধে তাদের 'জিরো টলারেন্স' অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সচেতন নাগরিকদের সহযোগিতা কামনা করেছে।
উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর টানা কয়েকদিনের অবিরাম বর্ষণে কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রামে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। গত কয়েকদিন ধরে চলা এই টানা বৃষ্টিতে উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। আকস্মিক এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ব্যাহত হচ্ছে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, সেই সাথে হাওরজুড়ে দেখা দিয়েছে তীব্র বন্যার আশঙ্কা।
জানা যায়, কালনী নদীর পানির লেভেল ২.৪৭ মিটার রেকর্ড করা হয়েছে, যা প্রাক-বর্ষা বিপৎসীমার (৫.৩৫ মিটার) ২৮৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া পার্শ্ববর্তী ইটনা স্টেশনে ধনু-বৌলাই নদীর পানি ৩.১৪ মিটার এবং চামড়াঘাট স্টেশনে ধনু নদীর পানি ২.৭৫ মিটারে অবস্থান করছে। পানি সাময়িকভাবে কিছুটা কম থাকলেও নির্বাহী প্রকৌশলীর বক্তব্য অনুযায়ী, ধারাবাহিক পানি বৃদ্ধির কারণে যেকোনো মুহূর্তে পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে।
টানা বৃষ্টির কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষ। দিনমজুর ও কৃষিশ্রমিকরা ঘর থেকে বের হতে না পারায় কোনো কাজ পাচ্ছেন না। কর্মহীন হয়ে পড়ায় অনেক পরিবারে উনুন জ্বলছে না, ফলে তারা অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছেন। একই দশা হাওরের জেলেদেরও। বৈরী আবহাওয়া এবং তীব্র স্রোতের কারণে জেলেরা নদী বা হাওরে মাছ ধরতে যেতে পারছেন না। জাল-নৌকা গুটিয়ে বসে থাকায় তাদের দৈনিক আয় একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে।
নদী ও হাওরের পানি এখনো পুরোপুরি বিপৎসীমার উপর দিয়ে অতিক্রম না করলেও আকস্মিক ঢল ও বৃষ্টির ধারাবাহিকতায় তীরবর্তী মানুষ গবাদিপশু এবং ঘরবাড়ি নিয়ে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটছে। দ্রুত সরকারি বা বেসরকারিভাবে জরুরি ত্রাণ সহায়তা না পৌঁছালে হাওরবাসীর দুর্ভোগ আরও চরমে পৌঁছার আশঙ্কা রয়েছে।
কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন মুঠোফোনে জানিয়েছেন, হাওরের নদ-নদীতে প্রতিদিন পানি বাড়ছে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, পানি এখনো বিপৎসীমার নিচে রয়েছে এবং এই মুহূর্তে বড় কোনো বন্যার সুনির্দিষ্ট পূর্বাভাস নেই। তবে যেহেতু প্রতিদিনই পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাই যেকোনো সময় বন্যার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সাজেক পর্যটন এলাকায় আটকে পড়া ৪২১ জন পর্যটককে সেনাবাহিনী ও পুলিশের বিশেষ পাহাড়ায় খাগড়াছড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে পর্যটকবাহী ১০১টি ছোট-বড় যানবাহনের একটি বহর সাজেক থেকে বাঘাইহাট হয়ে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
খাগড়াছড়ি ও সংলগ্ন পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবল বৃষ্টির ফলে দীঘিনালা-সাজেক-বাঘাইহাট সড়কের বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় সড়ক যোগাযোগ সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। তবে আবহাওয়ার সামান্য উন্নতি ও রাস্তার পানি কিছুটা কমে আসায় আটকে পড়া পর্যটকদের সরিয়ে নেওয়ার এই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়। খাগড়াছড়ি রিজিয়নের তত্ত্বাবধানে এই উদ্ধার কার্যক্রমটি পরিচালিত হয়, যেখানে পর্যটকদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, এই বহরটি বিদায়ের পর বর্তমানে সাজেক পর্যটন এলাকায় আর কোনো পর্যটক অবস্থান করছেন না।
উদ্ধারকৃত পর্যটকরা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দ্রুত ও সুশৃঙ্খলভাবে তাদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, সেনাবাহিনীর সার্বক্ষণিক নজরদারি ও সহযোগিতার ফলেই তারা কোনো বিড়ম্বনা ছাড়াই গন্তব্যে ফেরার সুযোগ পেয়েছেন। খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত জানিয়েছেন যে, পর্যটকরা খাগড়াছড়ি পৌঁছানোর পর যেন কোনো অসুবিধায় না পড়েন এবং নির্বিঘ্নে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরতে পারেন, সেজন্য স্থানীয় পরিবহন মালিক সমিতিগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আষাঢ়ের শেষভাগে এসে আকাশভাঙা বৃষ্টি আর ভারতের ত্রিপুরা হতে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে ফেনীর মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনীয়া নদীতে প্রবল পানির তোড় সৃষ্টি হয়েছে। ক্রমাগত বাড়তে থাকা পানির উচ্চতায় নদী তীরবর্তী পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলার বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র বন্যা আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। মুহুরী নদীর পানির উচ্চতা বর্তমানে বিপদসীমার কাছাকাছি অবস্থান করায় রাত পোহালেই লোকালয় প্লাবিত হওয়ার শঙ্কায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন লাখো মানুষ।
জেলা আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকাল পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৫৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে এবং আগামী কয়েকদিন এই বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, পরশুরাম পয়েন্টে মুহুরী নদীর পানি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। যদিও তা এখনো বিপদসীমা অতিক্রম করেনি, তবে ক্রমাগত ঢলের ফলে যেকোনো সময় তা লোকালয়ে প্রবেশ করতে পারে। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতি বছরই নদী ভাঙনের ফলে তাদের কৃষিজমি, গবাদিপশু এবং মৎস্য ঘের হারানোর আশঙ্কায় থাকেন।
সম্ভাব্য এই দুর্যোগ মোকাবিলায় ফেনী জেলা প্রশাসন ইতোমধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দুর্গত মানুষের জন্য ৮০টি স্থায়ী ও ১৪৪টি অস্থায়ী মিলিয়ে মোট ২২৪টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য উপজেলায় নৌকার সংখ্যা বাড়িয়ে ৯৩টিতে উন্নীত করা হয়েছে। এছাড়া মাঠ পর্যায়ে কাজ করার জন্য উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবক দল গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. মাহবুব আলম জানিয়েছেন যে, বর্তমানে জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ১ হাজার ১৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার ছাড়াও পর্যাপ্ত পরিমাণ চাল ও ৫ লাখ টাকা নগদ অর্থ মজুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানির জেরিক্যান, তেরপল, লাইফ জ্যাকেট, রেইনকোট এবং টর্চলাইটের মতো প্রয়োজনীয় সামগ্রী মজুত করা হয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় শিশু খাদ্য, গো-খাদ্য ও ঘরবাড়ি মেরামতের জন্য টিন পাঠানো হয়েছে যাতে যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব হয়।
ফেনী জেলা প্রশাসক মনিরা হক সর্বস্তরের জনগণকে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি জানান যে, সরকারি কর্মকর্তা, মেডিকেল টিম এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পাউবো-এর পক্ষ থেকে নদীর ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো চিহ্নিত করে জরুরি মেরামতের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের মাঝে মেঘ কেটে শান্ত পরিস্থিতির অপেক্ষায় রয়েছেন ফেনীর নদীপাড়ের মানুষ।